কবিতা সমগ্র 
ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত 

(১৩) তোমার জন্য

 

তোমার জন্য বিছিয়েছি এই মখমলি মাঠ,

অঢেল পাহাড়;

পাহাড় নদী,

নদীর ধারে নির্জন সেই স্ফটিক প্রাসাদ।

 

তোমার জন্য উঠোন জুড়ে

সূর্যদেবের স্বর্ণজালি

পাতার ফাঁকে আলপনা,  

তোমার জন্য চন্দ্ররাতে

রূপোলী আলোর ঝর্ণা

তোমার জন্য খুলেছি হাট

জানালা কপাট।

 

মনে পড়ে না কবে শেষ

দেখেছি প্লাবিত রাস্তা মাঠ;

কিভাবে রাত্রি দিন একাকার,

কিভাবে পাতার ফাঁকে সূর্য ডোবে ডোবে,

দেউড়িতে বসে শুনেছি কবে শেষ

পাখীর গান।

 

হঠাৎ আলো ঝলসে ওঠে অন্তিমে

তুমি দাঁড়ালে আচমকা পাশে,

তারপর

তোমার চলে যাওয়া

অসংখ্য তীব্র ছুঁচ এখনও ফোটে

মনে আছে বৃষ্টিতে ভেজা

দু’চোখে কান্না আজো।

 

এখনো বুকে বিঁধে আছে ছুঁচ;

কিছু ব্যথা মনে থাকে আপন,

যত্নে লালিত গভীর গোপন,

অপেক্ষায় কাটে প্রহর,

আবার মিলবো কবে,

হাত ধরে পার হব নির্জন বাতিঘর

এতগুলো বছর।

 

এ যদি ভালবাসা না হয় তবে যা হয় হোক

সে তো অনেক,

বলতে পারো ভালবাসা কোথায় শুরু

আর কোনখানে শেষ;

কে জানাবে ব্যাকরণ!

কোন গণ্ডিতে আটকাবে বাঁধবে বাঁধ ভাঙা ঢেউ,

কেন থামাতে চাও অমোঘ?

 

এখন তো বালুকাবেলা নির্জন মরুভূমি

বার বার মাথা ভেঙ্গে সমুদ্র উজাড়

দুধ ফেনার সাদা ধারা,

ভাঙ্গনে উধাও ঝাউবন

আমার একদার বিচরণ।

 

জমছে কিছু লতাগুল্ম ওধারে অগভীর খাঁড়িতে,

সমুদ্র পাখীর দল ঘিরেছে নির্জন চুড়ো

আমার আশ্রয়গুহার মাথার ওপরে।

 

বাতিঘর ছাড়িয়ে দূরে

অনেকটা গিয়েছি হেঁটে,

শেষবার এখানেই

ধরেছিলে বাড়ানো হাত,

একে একে দেখি ফিরছে মাছ ধরার নৌকো

ট্রলার।

 

আবার বৃষ্টি নামল,

নেমে যাই একছুটে

বসি কালো পাথর খণ্ডে

দূরে সত্যি ভ্রমনডিঙ্গি

দেখছি পতাকা ওড়ে মাস্তুলে,

বন্দরে যাত্রীর ভিড়ে খুঁজি তোমাকে

ফিরে যদি  আস হয়ত মনের ভুলে।

 

স্বপ্নের মসলিন জাল বোনে

ঘুমপরী আমার বিছানায়,

পথ হারিয়েছে ছোট্ট একলা পাখী

আমার ছড়ান বিকেল আকাশে,

হারানো পাখীর বাসা খুঁজে ফেরা

এদিক সেদিক আকাশ অন্ধকারে,

স্বপ্নের মসলিন জাল বোনে ঘুমপরী

শুনি হতাশ পাখীর আর্তনাদ।

 

তোমার জন্য বিছিয়েছি এই মখমলি মাঠ অঢেল পাহাড়,

পাহাড় ছুঁয়ে নেমেছে নদী, নদীর ধারে স্ফটিক প্রাসাদ।

তোমার জন্য সূর্যদেবের স্বর্ণজালি পাতার ফাঁকে

উঠোন জুড়ে আলপনা,

তোমার জন্য চন্দ্ররাতে রূপোলী আলোর ঝরনাধারা।

তোমার জন্য অনেক আগেই খুলেছি হাট জানালা কপাট।

 

(১৪) আমি যখন

 

আমি যখন বইয়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম,

তখন এক মায়াবী আলো যেন এক অট্টালিকা,

আসবাবেরা একে একে জমছে ঘরে,

বাগানে গাছে রুপোর পাতা সোনার ফুল,

কল্পনারা আসতে থাকে,

যেমন হয় একে একে ।

 

আমি যখন বইয়ের ভেতর ছুটতে লাগলাম,

খাবি খেলাম, হোঁচট খেলাম,  চমকে উঠলাম,

সঠিক তখন  কাচ ঝনঝন প্রবল আওয়াজ।

 

স্বপ্নগুলো সিলিকনের সূক্ষ্ম গুঁড়ো,

একটা একটা কুড়িয়ে নিলে-

কেমন ভাবে কাচের টুকরো বিঁধল হাতে,

হাতের মধ্যে জমল রুবি

রক্তবিন্দু একটি ফোঁটা।

(১৫) দুঃখ

 

কোন একটা কারণে আমার দুঃখ হ’লো

একরাশ নীল নীল ফুলের মত,

আমি গেলাম বাবার কাছে,

বাবা পাঠালেন ভূমার কাছে,

ভূমা এক রাশি-এক সর্বব্যাপী পুরুষ -এক নক্ষত্র

তিনি পাঠালেন হেমার কাছে,

হেমা বললেন মালিনীকে,

মালিনী বললেন দাঁড়াও চুপ করে,

দেখো আমি গাঁথছি মালা,

তোমার দুঃখগুলোকে ফুলের মত সাজিয়ে রাখ

টেবিলের ওপরের ঐ সাজিতে।

 

আমার কোন দুঃখ রইল না,

চোখের জল জমে মুক্তো হয়ে গেলো।

(১৬) হঠাৎ আগুনে

 

হঠাৎ আগুনে পুড়ে গেলো খালপার,বাক্স প্যাঁটরা।

 

দগ্ধ কেঁদে উঠল,

ছুটে এলো বিদগ্ধ, সুশীল এবং এনজিও।

বিদগ্ধ কবিতা লিখলো

সুশীল গান গাইল

এনজিও গেলো সূর্পণখার কাছে।

 

সূর্পণখার নাক ও কান ব্যান্ডেজ বাঁধা,

বাহাত্তর ঘণ্টার আগে কিছু বলবে না আইসিইউ।

(১৭) ছেলেবেলা

 

গ্রীষ্মের দাবদাহ; তাতানো দুপুর,

আমাকে ডাকল ছায়াছায়া আমবন

দিঘীর কালো জল।

ডাকলো অবগাহন শীতল;

ছোটবেলার মত সাঁতার কাটলাম,

আমাকে ডাকলো

আমারই ছোটবেলা;

বলল- কেন বড় হলে,

কেন ছেড়ে গেলে-

চলে গেলে?

 

আমি বললাম-

বড় তো হতেই হয়,

না চাইলেও,

ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ছেলেবেলা শীতল জল

বাষ্প হয়ে মেঘ হয়ে যায়,

বড় হতে থাকি মেঘ জমানোর খেলায়।

 

বৃষ্টির দিনগুলি-

আহা, মেঘ তুমি কবে ঝড় বৃষ্টিতে ফিরিয়ে আনবে ঠাণ্ডা ছেলেবেলা।

(১৮) তুমি

 

তোমাকে নিয়ে অনেকেই লিখল

গান কবিতা গাঁথা-

আমিও তাই কিছু লিখি-

নাই বা থাকল মুণ্ডু মাথা।

অনেক দূর থেকে একটা সুর

তোমার সারাদিন গুনগুন

ভাষা বুঝি না অদ্ভুত নরম সুর মুখস্থ করেছি

শরীরে মেখেছি কথা অর্থহীন

এক বিলাপ লালাবাই

আমি সান্ত্বনা দেবো না

কানে বাজে দূরাগত শব্দরেশ

তোমার প্রেমের মতো

 

আমি তোমাকে বুঝি না

তোমার কথা বুঝি না

তোমার সংসার বুঝি না

তোমার দুঃখ বুঝি না

কেবল বুঝি তুমি আমাকে ভালোবাসো খুব।

 

তোমার একরাশ গুনগুন মনের কথা গেয়ে চলুক

অজানা ভাষায় আকাশ বাতাস

আমি বুঝে নেবো ছোট ছোট ক্ষোভ

কিভাবে লোকে ভুল বোঝে তোমায়

এগুলোর ভাষা লাগে না

লালাবাই অদ্ভুত লালাবাই একঘেয়ে সুর

বলে দেয় সবটুকু যাতনার নীল নীল হ্রদ।

 

আকাশ ক্রমশ ভরে তোমার গানের দীপ্তিতে

সন্ধ্যে নামে দূরে বনানীতে।

তোমার সঙ্গে আমার কিছু ব্যক্তিগত চূড়ান্ত ক্ষোভ,

ভরে নিলাম ঝুলির ভেতর ফাঁকা মাঠে,

একটু পরে রাত্রি হ’লে রাতপাহারা দেবে যখন একান্ত চোখ,

জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখো অনেক দূরে,

মাঠের মধ্যে শুয়ে আছি নিথর দেহ

জ্যোৎস্না রাতের আবছায়াতে।

 

এমন ভাবলে ভুল হবে আমি মরে গেছি,

ঠিক তা নয়,

সময় অনেক আসে এমন দূরে যাওয়া উচিৎ হলেও

চলচ্ছক্তিহীন হয়ে থাকছি কাছাকাছি,

দূর থেকেই বলতে চাই –

ফিসফিসানি

তোমায় আমি ভালোবাসি।

 

(১৯) যন্ত্রণা

 

এক হ্যালুসিনেশনের পরে রাতের গভীরে প্রবল জলতেষ্টায় জেগে ওঠো,

শেষ ডবল ডেকার রাস্তায় চলেছে কুড়ি বছর আগে,

হাওড়া যাচ্ছে আসছে এক কামরার ট্রাম,

তাও তো দেখে ছিলে,

ভুলে গেছ সব নকশাল আমল,

কচি খোকা তুমি জানো না কিছু,

মুখ ছুঁয়েছে তরুণ দূর্বাদল ঘাস।

 

এক হ্যালুসিনেশনের পরে হাজার বছর পেরিয়ে,

ভালোবাসা রং বদলে বেগুনী হয়,

রং বদলায় যন্ত্রণারও।

আইসক্রিম শিলা তুমি

 

থমকে গেলো পরিভাষা-

ক্লীবতা জ্ঞাপক মাথানিচু হতে পারো তুমি ভাবিনি  কখনো,

আমারই কান থেকে নির্গত হ’লো অসম্ভব,

আমারই কান দিয়ে বাষ্প বের হয়ে এলো,

টগবগ করে ফুটছে ভেতরের কেটলি ফোটা জল,

অথচ তুমি আইসক্রিম শিলা শীতল চুপ করে

শুনে যাচ্ছ উচ্চতার ধৃষ্টতা।

 

আমার ঠোঁট কাঁপছিল,

মনের মধ্যে অসহায় প্যারানোয়িয়া,

আমি পালাতে চাইছি আমার বিশ্বাস থেকে,

আমি পালাতে চাই  নিজের কাছ থেকে,

হাওয়া টেনে টেনে ঢাকছি শরীর,

ঢাকছি  হাওয়ার বর্মে।

এক বল্লমের মতো,

শরীরে বিঁধে আছে অবিশ্বাস,

       

আশাভঙ্গ।

(২০) প্রেক্ষাগৃহে

 

কোলাহল থেমে গেছে,

শেষ পর্দা নেমেছে প্রেক্ষাগৃহে,

আমি কি থেকে যাব নাকি,

আমি কি জানি না কিভাবে আমার আগে

হারিয়ে গেছে লক্ষ মানুষ আলোর বৃত্ত থেকে-

জীবন থেকে।

 

আমি কি জানি না কিভাবে সুদিন আনে

সুসময়ের বন্ধু অজস্র মাত্রাবিহীন,

আমি কি জানি না কিভাবে শূন্য চেয়ারের সারি

গ্রাস করে নিদ্রাহীন রাত,

আমি কি জানি না

দাঁড়াব খোলা বিশ্বে আবার অন্ধকারে,

সরে গেলে সবটুকু আলো।

(১) সে আসে ধীরে

 

অজস্র বৃশ্চিকরাশি জমিয়েছি পরাভূত সমুদ্রের আস্তাবলে

বালির দুর্গের উন্মুক্ত জানালা দিয়ে খেলে যায়  অনিমিখ কালজয়ী রোদ্দুর

একলা থাকতে বলেছিল  বৈশাখের মেঘ

সমুদ্র স্নানে ডেকেছিল হিম জ্যোৎস্নার সারস

 

জলধারা আসে কোথা থাকে বৃষ্টির ঝাপটা নাকি

পাহাড়ে আঘাত করে সমুদ্র ঢেউ

উড়ে আসে মেঘের পতন নিয়ে এলোমেলো হাওয়া

শান্ত সমুদ্রের তীরে অকস্মাৎ

উঠে আসে জলকন্যা মৎস্য নারী

বিসর্জিত লেজ পাখনা

অপুষ্ট অপটু টলোমলো পায়ে

সে কাছে আসছে ধীরে

 

(২) ট্র্যান্সসাইবেরিয়ান এক্সপ্রেস

 

মনের মধ্যে কান্নাকাটি,

পাগল খুঁজছ ঘর বসত।

তাকাও চোখের দিকে

ও আমার মনের পাগল,

রয়েছ নিশ্বাসে রয়েছ বিশ্বাসে –

রয়েছ মিথ্যায়-

একের পর এক দেশ পার হয়ে যায় ট্রেন -

ট্র্যান্সসাইবেরিয়ান এক্সপ্রেস।

 

আমি কি চলে যাব সন্তর্পণে হেঁটে

চলন্ত কামরার বাইরে?

যেতেও তো পারি,

বলো যেতেও তো পারি,

ঐ যে শায়িত তুমি নিদ্রাকাতর সে যদি দেহ হয়,

আমি তো তবে ছায়া এক মর্বিড কবিতা।

যেতেও তো পারি বলো,

যেতেও তো পারি,

তোমাকে ঘুমন্ত রেখে এদিক সেদিক-

বাইরে ছুটেছে পৃথিবী গাছপালা বরফ ঢাকা পাহাড়,

অথবা ডুব দিতে পারি মনের গভীরে,

অন্তর্লীন নিজস্ব হ্রদে।

 

 

(৩) শব্দহীন

 

পেরিয়ে যায় শব্দহীন রেলগাড়ি,

শব্দ ঢাকা পড়ে যায়;

কথা হয়নি বলা অরণ্যের কানে,

অনুরণিত তা একান্তে মনে,

কথা বলা নয়,

কিছু অনুভূতিই স্তব্ধতাতে প্রকাশিত,

এমতাবস্থায় নিজস্ব জগত,

কার সাধ্য বলো ভাঙ্গবে খোলস?

 

ভাবনাদের বাঁধতে চাওয়া ভুল,

ছোট ছোট প্রজাপতি হয়ে ওড়ে,

উড়তেই থাকে,

জ্বেলেছ আগুন

কেন কাঁদো মৃত্যুতে?

 

থামিও না বলতে দাও,

ভারি হয়ে যাবে ঠোঁট শব্দহীন আলোড়নে।

আমার সঙ্গে অপেক্ষা করছে শেষ বিকেল,

হাত ছুঁয়ে দৌড়ে যায় ঝোড়ো হাওয়া;

রোদ্দুর চলে যায়- মানুষ চলে যায়,

একের পর এক যায় লোকাল ট্রেন,

শেষ গাড়ি চলে যায়।

 

অপেক্ষায় সন্ধ্যে রাত হালকা কুয়াশারা,

তারপর চাঁদের আলোয় পথ হাঁটি

রাতের পাখিরাও খবর নেয়।

বিভিন্ন সঙ্গতে বেজে ওঠে সঙ্গীত,

না পাওয়ার দুঃখ নিয়ে গাইতে হয়।

শেষ গাড়ি চলে যাবার পর আরও ভারি ঠোঁট,

নিজেই শুনতে পাই কেবল নিজের অস্ফুট।

 

 

(৪) নালায়েক

 

এই বাদাবনে ভাসিয়ে এনেছ কাঠের ঘোড়া গোপনে!

জ্বলছে তোমার মুর্দাফরাস চোখ,

ধর্ষণ কর এক চন্দ্রাহতা-

প্রেম থাকে না লালসা থাকে,

অন্য কোন ক্ষুধা থাকে।

ধর্ষণ করো ক্ষুধাকে লালসাকে,

তুমি ধর্ষণ কর এক কাষ্ঠঘোটকী,

নালায়েক।

 

তুমি কি ভালোবাসা জানো,

ভালোবাসা কি জানে ঘোটকী?

 

তুমি কি দেখেছ কমলাকায়া,

বিটপীছায়ায় মানসীমায়া?

 

 

(৫) লাল পরী

 

লাল পরী হারিয়েছে পথ লাল পিঁপড়ের মত মেলেছে ডানাটি

সত্যি কি লাল সাদামাটা বিপ্লব না ফ্যান্টাসি অতীব হিপোক্রিসি

গোলমাল হয়ে যায় লাল কি এ যাবৎ পৃথিবীর যাবতীয় ক্ষতি

কে জানে কোথায় কতটা লেনিন স্ট্যালিন মাও

কতটা হিপোক্রিসি

লাল পরী জানে না কিছুই উড়ে বেড়ায় প্রান্তরে বটমূলে

 

লালপরী আসলে ফ্যান্টাসি গোপন গন্ধ তার গোপন যৌনতা

আপাত সারল্যে সে ডোবায় মানুষ জলে আবার তুলে ধরে

সব প্রতিবাদ ব্ল্যাসফেমি মার্ক্স বলেছেন ধর্ম আফিং

মার্ক্স তবে কী

 

এই সব লেখা জানি পর্যুদস্ত হবে

এদিকে ক্রমশ  মার্ক্সিয় বিজ্ঞান অপাংক্তেয়

দেখা যাক ভবিষ্যৎ কি দেবে কোন নিশ্চিত

 

(৬) থাকা

 

হাওয়া ঠেলে দিচ্ছে খাদের দিকে,

মাটিটা ফেটে গেলে আশ্রয় হতো ভেতরে,

চলে যাওয়ার কোনও মানে হয় না-

থাকাটাই সব।

আর এই যাঁদের আজ ভুলে গেছো-

ভেবে দেখো তাঁরা কি প্রবল ছিলেন একদা

মৃত্যুর আগে পর্যন্ত।

 

তারপরেই তো এইসব স্মৃতিস্তম্ভে

ধূপ, বাতি, পুজো আচ্চা ইত্যাদি।

 

 

(৭) চলে গেলি এভাবে

 

যখন দেখা হলো আবার

আমরা যে যার পথে

সেদিনের মতো ভালোবাসিনি আগে,

এটা বুঝেছি এতদিনে।

 

আমাকে গ্রাস করল সবুজ বন,

তারাদের ফ্যাকাসে শরীর,

পরিচিত ফ্যাকাসে মুখ দেখলাম,

তোকে দেখলাম না,

এদিকে শহরে ফিরেছে জগু অনেক দিন বাদে,

তার দাঁত হীরের মত ঝলসায়,

ঝলসায় কুমিরের মত।

 

আমি তোকে আর দেখিনি,

দেখিনি রাজকীয় চলন,

লোকে বলে খুব সকালে এক কবন্ধ

ঝাঁপ দিয়েছিলো জলে।

 

জগুর হীরের দাঁত ঝলসায় কুমিরের মত,

অনেকদিন বাদে নদীর জলে বেগুনি আভা।

 

 

(৮) রমণীরাও কি একই রকম

 

কোন জটিলতা ছিল না আকাশে,

আমরা প্রান্তরে হাঁটছি ঈষৎ বৃষ্টিপাতে,

কুড়িয়ে নিচ্ছি বালকের সারল্য,

সংগ্রহশালা ক্রমশ ভরে গেলো।

 

আমরা এখন দীর্ঘস্থায়ী শীতকালে,

আমরা এখন শীতের বিকেলে,

আমাদের কোন দৃষ্টিপাত নেই,

বিবশ মৃত্তিকা শুধু জানে

নিয়মিত হলকর্ষণ,

শস্য আহরণের পরে সুদীর্ঘ মুগ্ধতা।

আমাদের চারপাশে ক্রমশ যারা ভিড় করে আসে

তারা কি একই রকম সমস্ত ঋতুতে?

এমনকি রমণীরাও

কি একই রকম হাসে ইদানীং?

(৯) নতুন ভগবান

 

ফুল্লকুসুমিত কোন এক সকালে চলে গেলেন তিনি,

তাঁর শেষ যাত্রায় তিনি ভগবান,

স্বর্গরথ নাম কেউ দিয়েছিলো বাহনের।

কোন এক সকালে তিনি আর খেতে পারলেন না,

এমনকি ঠোঁটের কোণা থেকে গড়িয়ে পড়ল জল,

তাঁর শরীর পোড়া বিভূতি ছড়িয়ে দিলো কেউ কেউ-

নদীর পুত পবিত্র জলে।

 

খুলে ফেলা যাবতীয় সিলিন্ডার নল,

খুলে ফেলা সমস্ত ড্রিপ, স্যালাইন,

শরীর তাহার রয়েছে এক বিশাল ড্রয়ারে।

 

ফুল্লকুসুমিত কোন এক সকালে,

শবানুগামীরা হতচকিত দেবত্ব আরোপে,

সারি সারি হাত ছুঁয়ে ফেলে কপাল,

এই মৃতদেহ আজ এক নতুন ভগবান।

 

 

(১০) বৃথা

আমার সকাল বৃথা গেলো,

শুনতে পাইনি নাম কীর্তন,

কি করব?

আকাশ এত রঙিন হলে কিছু করার থাকে?

সূর্যটাও সেরকম!

মেঘের ফাঁক দিয়ে এমন এমন ছুঁড়ছে রোদ্দুর!

জানি উঠোনে জমেছে ঝরাপাতা,

জানি জমি ছেড়ে দিতে হবে লাঙ্গলের কাছে,

জানি কর্ষিত হতে হয় সব কিছু নির্ধারিত পবনের হাতে।

তবু কেড়ে নিয়ে সারাদিন,

আমাকে মাঝে মাঝে দিও এমন এক,

নিরুদ্বেগ নিজস্ব সকাল।

(১১) অপর সূর্য

 

আমি তাকে গুড মর্নিং বলার সাথে সাথেই

সে আমাকে একটা থাপ্পড় মারল,

আমি পড়ে যাবার আগেই সে আমাকে

হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করালো ফুটপাতে,

আমি হতভম্ব হয়ে দেখলাম তাঁর স্মিত হাসি,

গুম্ফায় বুদ্ধদেব,

‘হা হতোস্মি’ কথাটা খুব আস্তে বললেও

ঠিক কানে গেলো-

আমার গালে হাল্কা ভাবে সে একটা-

চুমু খেলো।

 

গালটা যেন পুড়ে গেলো,

হামিটা যেন উড়ে গেলো,

উড়ে গেলো আগুনের গোলা হয়ে আকাশে,

অন্য এক সূর্যের মত।

 

 

(১২) তিন তাস

 

আমার হাতে তিন পাত্তি-অতীত বর্তমান আগামী,

আমি একলা ঘরে বসে -নেমে এলো প্ল্যানচেটে

প্রবক্তা, বলল সে সংসার পেতে আছে সমুদ্রের  

ধারের কোন শহরে।

 

যে চলে গেছে তাকে কে ভাবে, বাকী থাকছে দু’টো

তাস। আজকের দিনটা কাটতে চাইছে না অথচ এতগুলো

বছর পেরোলাম লহমায়।

 

বললাম আমার কোন দুঃখ নেই, তাকে কোনদিন

ভালোবাসি নি, প্রবক্তা মুচকি হাসলো, বলল মিথ্যে

বলতে তোমার কষ্ট হয়।

 

দুটো তাসও হাতে নেই, ভবিষ্যতের স্রোত দ্রুত ছুঁয়ে

যায় বর্তমান, পৌঁছে যায় অতীতে।

 

মৌচাক তাক করে ছোঁড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়,

কিন্তু বিদ্ধ করে আঙুর ক্ষেত, চুইয়ে চুইয়ে বিষ   

পড়ে মধুপাত্রে।

(২১) ক্লান্তিকর সবুজ

 

গাছের পাতায় লেগে থাকা হলুদ বিষণ্ণতা আমায় ঘিরে ধরার আগেই

আমি প্রবল বেগে ছুটে গেলাম,

সবুজ তখন ক্লান্তিকর,

লাল টকটকে সূর্যটাও ক্লান্ত-

ডুবে যাচ্ছে সমুদ্রের জলে আরব সাগরে।

 

আজকাল মাঝে মাঝে হেরে যাই,

এই স্বীকারোক্তি ভালো,

পাখির ডাকের মতো সকাল কবে যে দেখতে পাবো,

খোঁয়াড়ি ভেঙ্গে কবে যে ছুটব প্রান্তরে

বালুকা বেলায়,

কবে যে আশা আবার নির্যাসের মত

ভরে দেবে সবটুকু।

(২২) কবিতা

 

এক।

 

ঠিক শেষ রাতে আকাশ সাদা হবার আগে এক তারা জন্মাল

লেবার লাইনের বস্তিতে, সংকটে ঘুরপাকেরা এমন ভাবল;

যেন জন্মেছে এক মহাপুরুষ যে কখনো মদ খাবে না,

গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের এড়িয়ে কাজ নিয়ে

চলে যাবে দূর দেশে, ছাড়িয়ে আনবে বন্ধকী জমি সে।

 

অত ভোরে খবর রটে গেল চতুর্দিক, অ্যান্টেনায় বসে

থাকা কাকেরা এই কথা জানিয়ে দিলো বাবুদের মহল্লায়।

 

রাত শেষ হলে খুব ভোরে মারা গেলো কানহাইয়া পঞ্চান্ন

বছর বয়সে, জীর্ণ শরীরে রক্তের বদলে শিরা ধমনীতে তার

খেলা করে চলেছিল চোলাই মদের ধারা, নিরলস।

 

সদ্য প্রসূতি ডুকরে কেঁদে উঠল, মুঝে লড়কি কিঁউ নহি

দিয়া ভগবান, কিউ নেহি কিউ নেহি ভগবান।

 

দুই।

 

অনেক ঝগড়া করেও কুকুরগুলো সিদ্ধান্তে আসতে পারল না,

কে খাবে ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট সমূহ, অকুস্থলে হঠাৎ

চলে আসা বালক সারমেয় তার কৌতূহলী জিজ্ঞাসা

ভুলে গেলো আবিষ্কার করল ঝরঝর রক্ত ঝরছে কানের

পাতা থেকে, সমস্ত পৃথিবী ভুলে খিদে ভুলে ছুটে

চলে সে অনন্তকাল,  নাকি কয়েক মুহূর্ত! ট্যাক্সির কাছে

ছুটন্ত সারমেয়দের হিসেব থাকে না।

আরও একটা গেলো চাকার তলায়, যেমন যায়।

 

 

(২৩) মেডুসা

 

তোমাকে দেখলে পাথর হয়ে যাব?

এজিয়েন সাগরের থেকেও সবুজ চোখ রূপের বন্যা,

জলপ্রপাতের মত চুল,

তুমিই নার্সিসাস কী ভয়ঙ্কর,

নিজের রূপে পাগল বালিকা

পার্থিয়ান মন্দিরে দেবী অ্যাতিনার ভাঙ্গালে ঘুম।

 

শরীরে বয়ে চলেছ অতঃপর অভিশাপ,

সাপেরা কিলবিল খেলা করে বিকৃত কেশদাম।

 

(২৪) ব্ল্যাক প্যান্থার

 

ব্ল্যাক প্যান্থার লোকালয়ে থাকে না থাকলেও খাঁচাতে,

মানুষ যখন বাঁচাতে পারে না মন,

বুকের ভেতর বাসা বাঁধে প্যান্থার,

রক্তের ঘুণপোকা,

ক্রমশ খেয়ে নেয় মন শরীর,

হাড় মজ্জা মাংস,

শাইনিং সিল্ক ব্ল্যাক মুখে তার লেগে থাকে রক্তের দাগ।

 

নিস্তব্ধ নির্জনে জমতে থাকে শীত,

টিনে, পাথরে, কাঠে শব্দের টুংটাং,

তুমি ভাব বুঝি শীত আরোপ করে এই সব শর্ত বরফের সাথে।

আসলে তা নয়,

প্যান্থার হেঁটে যায় পাঁচিলে, ছাদে, ফলস সিলিঙের ফাঁকে,

এই সব আসলে একান্তই প্যান্থারের শব্দ।

 

প্যান্থারকে নিজের বলে ভাবো,

ভাবো এক বিশাল কালো সিল্কের বেড়াল,

পুষেই রাখ মনে,

আত্মস্থ করো তার হুঙ্কার,

ক্রমশ তুমিও হয়ে ওঠো প্যান্থার।

 

(২৫) ভেঙ্গে পড়ল পাঁচিল

 

লাফিয়ে উঠল কাঁটাতার ভেঙ্গে পড়ল পাঁচিল,

জানি গুরুচণ্ডালী হয়ে যাচ্ছে,

ওটা প্রাচীর হলে ভাল হতো

এরপর ব্যবহার করব স্বচ্ছতোয়া।

 

স্বচ্ছতোয়া ভাসিয়ে নিয়ে গেলো আশ্রয়ের শেষ মাটি,

তুমি শ্বেত কবুতর ডানা মেলে কোজাগরী রাতে,

কেবল উড়ছ সাদা আকাশে,

নীচে অতল প্রবাহ।

 

উড়তে উড়তে দেখছ তুমি

ভেঙ্গে যাচ্ছে বোধ বুদ্ধি আশ্রয়,

উড়ে চলা নিজের মত,

পূবদিকে এগিয়ে চলেছে একটা জাহাজ,

উড়ছে তার পাল,

উড়ছে কালো পতাকায়

স্কাল অ্যান্ড ক্রসবোন ছবি।

 

এই নিস্তরঙ্গ সমুদ্রে সার্বিক ছন্দে শেকল,

এমনকি গতি প্রকৃতি বেঁধে ফেলছে ঢেউকেও,

মোহনায় মিশছে নদী এই এলাকায়

পাইরেট শিপ টহল দিচ্ছে

শিকারের খোঁজে।

 

আশ্রয়ের শেষ মাটি চলে গেলে কবুতর

তুমিও কি বসবে পাইরেট শিপে?

(২৬) ডেমনের সাথে

 

আজ দেখলাম তিন প্রাজ্ঞ নরনারী কথা বললেন ডেমনের সাথে,

যথা বৃষ্টি হবে কিনা অথবা ফসলের সম্ভাবনা।

 

আমি তো দেখছি নগরীর পথ কেমন ছুঁয়েছে বন্দর,

ফুলে ফুলে ঢেকেছে ড্রাইভ,

তবুও বেদনায় নীল ঈশ্বরের মুখ,

ঈশ্বরের কিছু হলে তিনি কোথায় যাবেন,

হতে পারে এ আমার ভুল,

ব্ল্যাসফেমি ক্ষমা কোর,

ভুল হলে বোলে দিও,

অন্ধজনে আলো দিও,

যদিও ধারণা ঈশ্বরও সময়ে সময়ে অসহায়,

গুনে রাখছেন পুরনো কয়েন।

 

(২৭) গুপ্তঘাতক

 

গুপ্তঘাতক সুপ্ত থাকে অতল অন্ধকারে,

মনের গহ্বরে,

এই শহরে রাস্তাগুলো পাথর মোড়া,

তার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে আধপোড়া সব কাঠের বাড়ি,

গুলির চিহ্ন দেখা যাচ্ছে মন্দিরে আর গির্জা ঘরে,

গুপ্তঘাতক লড়াই করে নিজের সাথে।

 

এরকমই হতে থাকে যখন কোন নিয়ম ভাঙ্গে কৃষ্টি ভাঙ্গে,

ভাঙ্গতে থাকে পরিবেশ আর পরিচ্ছেদের রকম সকম,

চলন বলন কথা বলা,

ভাঙ্গতে থাকে ভালবাসা মূল্যবোধ আর সহানুভূতি,

সবাই কেমন মরিয়া হয়ে লড়তে থাকে ছায়ার সাথে,

সবার মনে গুপ্তঘাতক ফনফনিয়ে বেড়ে ওঠে।

 

(২৮) ভোরের স্বপ্ন

 

কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে এলো ভোরের স্বপ্ন,

চোখে ঝলসে উঠল খোলা আকাশের নীল,

কান পেতে শুনল এত পাখির ডাক-

জীবনে শোনেনি আগে।

 

ভোরের স্বপ্নদের জন্য ফুলের মালা নেই,

যাবার ঠিকানা নেই,

খালপাড়ের ঝুপড়ি ভেঙ্গে উঠেছে বহুতল।

তবু,

এখনও ট্রামের সেকেন্ড ক্লাস খিদিরপুর যায়,

চলে যায় ভোরের স্বপ্ন-

তার চোখে এখনও মায়ার কাজল।

 

(২৯) নিজস্ব সমুদ্রে

 

এই একলা ঘর তোমাকে দিয়েছে বিষণ্ণতা,

নীল নীল অন্ধকারে তুমি খুঁজেছ মুখ,

বালিশে জমিয়েছ কান্নার ফোঁপানি,

এতই নিবিড় তখন পারদ।

 

তোমার অভিমান তুমি লিখেছ আকাশে,

একা একা কথা বল যন্ত্রণার সাথে,

আয়নায় কতদিন দেখনি নিজের মুখ,

ভুলগুলো জমা করেছ হাত বাক্সের চোরকুঠুরিতে।

 

তবুও যন্ত্রণা ভালো লাগে,

ভালো লাগে একলা ঘর,

মাঝে দূরের বাতিঘর থেকে ছিটকে আসে সন্ধানী আলোর বন্যা।

 

নিশ্চিন্ত থাক তোমাকে কেউ খুঁজবে না,

তোমার বেদনা একান্তই নিজস্ব সমুদ্র,

ভোরের আলো আড়চোখে তোমায় দেখে,

সন্তর্পণে ডিঙ্গিয়ে যাবে চৌকাঠ,

মাঠের আল ছোঁবে,

ছুঁয়ে যাবে গাছের স্তব্ধতা,

সমুদ্রে ভেসে বেড়াবে একটাই মুখ,

তুমি জাল বুনে যাবে স্মৃতির সূক্ষ্ম সুতোয়।

 

 

(৩০) একলা ড্রাইভে বিষণ্ণ নীলে

 

একলা ড্রাইভে যদি মেঘ দেখ আলগা ঝুলে আছে আকাশে,

বাদল মেঘ যে কোন সময় ভাসিয়ে দেবে এই প্রান্তর,

গাড়ির ওয়াইপার ক্লান্ত হয়ে পড়লে

তুমি দাঁড়িয়ে যাবে গ্রামের পাশে।

 

দেখবে অমন যে বাঁশঝাড় সেও নুয়ে পড়ে ধরতে চায় শেকড়,

আর তুমি এক তালহীন কালহীন বিস্ময় মানুষ,

জানালার কাঁচ নামিয়ে ধরালে সিগারেট,

ছুঁড়ে দিলে একমুখ অহমিকা ধোঁয়া।

 

সব কিছু থেমে গেলে তাকাও বিষণ্ণ নীলে,

কষ্ট পেতেই তাকালে না হয়,

মাঝে মাঝে কষ্ট ভাল লাগে সুখের কোলাহলে।

(৩১) কবিতার কাছে

 

ঠিকানা পাল্টে ইদানীং কবিতার কাছে থাকি,

লিঙ্গ বিচার করিনি,

আবছা এক নারী আতরদান সুগন্ধ,

অঞ্জলিভরে ছড়িয়ে দেয় মায়া।

 

জনপদ এক সার্বিক ছবি আঁকে,

পোল ভল্টে পেরিয়ে যাচ্ছি বিষণ্ণতা,

তারের জঞ্জালে ঢেকে গেছে আকাশের নীল ও গাছের পাতা,

আমি যেন এক লয় ক্ষয় হীন প্রাচীন বৃক্ষ,

বুকের ভেতর লালন করেছি চাঁদের পাহাড় স্মৃতির কারুকাজ,

কিছু কিছু দাহ্যে আগুন জ্বলে

উষ্ণতা নিয়ে সরে যায় দূরে,

এই দহন অতর্কিত গ্রাস করে একলা ঘর।

 

হাইওয়েতে পড়লেই প্রতিটি বাঁক বিন্দু চেনা,

কোথায় টোল প্লাজা কোনখানে ফ্লাইওভার,

কোথায় পাশাপাশি চলে রেললাইন,

কোথায় কোন চিমনী থেকে ওঠে ধোঁয়া,

এমনকি পথের ধারের বিল বোর্ডও,

ঘিরে থাকে অজস্র অচেনা কিশোরী গ্রাম।

 

দ্রুত ছাড়িয়ে আসি

ফেলে আসি পথের ধারের শিরীষ গাছের মিছিল

কৃষ্ণচূড়া লাল ফুল,

অনেক দূর যেতে হবে।

 

সুন্দরীর নোলকের মত

বিকেলের আকাশে তখনও সূর্যটা

দোল খায়।

 

হঠাৎ স্তব্ধতা নেমে আসবে,

হঠাৎ থেমে যাবে কথা বলা, নিঃশ্বাস;

জীবনের ঘাতক হাইওয়েতে পড়ে থাকবে অবশেষ,

তুমি কি কাঁদবে কবিতা।

(৩২) কী ভাবো

             

নিজেকে কী ভাবো আলাদা স্বয়ম্ভূ কবি,

ছুঁড়ে দিচ্ছ যা মনে আসে,

তুমি কোন ক্ল্যানের বাহক বিশ্লেষণ আছে?

নাকি ঠোঁট বাঁকানো স্বভাব তোমার মুখের মানচিত্র বদলে দিয়েছে,

হাসতেও পার না প্রাণ খুলে,

হাসা উচিৎ মনে করলে কোন কোন ক্ষেত্রে একটা সাংঘাতিক খ্যাঁকখ্যাঁক,

অদ্ভুত আওয়াজে উড়ে যায় পাড়ার কাকেরা,

এবং কুকুরেরা তারস্বর কোরাস গায়।

 

কি তোমার গৎ,

কোন গোষ্ঠীর ধারক তুমি,

কোথায় লাগিয়েছ টোটেমীয় পোল।

 

তুমি যা লিখেছ নিজে মানে জান?

নাকি নানা শব্দের অদ্ভুত হারাকিরি?

আসলে তুমি এক অতি ভণ্ড,

প্রমাণ করতে চাইছ যা নও তাই।

 

(৩৩) বিট অফিসের পাশে

 

রতনপুর বিট অফিসের পাশ দিয়ে শাল সোনাঝুরি শিরীষের পথ,

তুমি ভাবছ একা একাই কাটাবে বাকি জীবন,

চল হাঁটি একসাথে কিছুটা পথ,

তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম,

উদিত সূর্যের এই ভোরে

জানি তোমার নীল চোখের তারার আড়ালে লুকিয়ে থাকে দুঃখ,

সে দুঃখ দিও আমায়,

আমার সব ভালবাসা দিলাম তোমায়,

আজও জিজ্ঞেস করে লোকে

একা থাকতে কি আমার এতই ভাল লাগে?

 

(৩৪) সোজা

 

সোজা থাকাই ভাল,

বাঁকতেও পার কিন্তু কতটা,

কতটা মোচড় নিতে পারে শরীর মন,

গাছের মত কি ততটাই দুলবে হাওয়ায় হাওয়ায়?

কি জানি সম্ভব কিনা।

 

সোজাসুজি একছুটে পেরিয়ে যেতে পার প্রান্তর,

লতাগুল্ম ঘাসেরা তোমাকে ডাকবে আয় আয়

থেকে যা কিছু ক্ষণ,

ঐ দেখ কেমন মেঘের ভেতর থেকে উঁকি দেয় সোনালী রোদ্দুর,

আয় আয় ছুঁয়ে দেখ বাদল হাওয়া।

 

সোজাসুজি বড় সোজাসুজি দেখে যাও জীবন,

দেখ কি ভালই না লাগে,

ফেলে দাও মুখোসগুলো ,

ছিঁড়ে ফেল কষ্টকর ভারি আলখাল্লাটা।

 

(৩৫) তাকে দেখে

 

তাকে দেখে চমকে উঠল গোটা অফিস,

কেউ এনে দিল জল,

আরেকজন টেনে দিল চেয়ার,

অনর্থক রেগুলেটর বাড়াতে গিয়ে কেউ কেটে ফেলল প্যাঁচ।

 

অনেকে কাছে এলো না,

মেলে ধরা খবরের কাগজ মাঝে মাঝে সরিয়ে দেখতে থাকল তাকে।

 

সেও জানে এরকম হবে,

এরকম হয়,

তাকে দেখে ছুটতে থাকে এক শহর লোক,

চুল ঠিক করতে থাকে প্রৌঢ়েরা,

আয়নায় মুখ দেখে নেয় যাবতীয় বৃদ্ধ ভামেরা।

 

তবু মাঝে মাঝে বুক কেঁপে ওঠে,

একদিন আসবে সময়,

লোলচর্ম শক্তিহীন পরনির্ভর বীভৎস সময়,

আহা যদি তার আগে পড়ে যায় শেষ নিঃশ্বাস,

আহা সে কি কাম্য!

বড় ভাল এমন মরণ।

 

 

(৩৬) কয়েকটা

 

এক

 

এভাবে হবে না চারদিক ধুধু,

গার্হ্যস্থযাপনের শিলালিপি দেখল আকাশ,

বিমূর্ত সময়ে ক্রমশ জল ছেড়ে ডাঙ্গায় ওঠে,

কানকোয় ভর করে হেঁটে যায় কইমাছ।

আবার ট্রাইপডে টাইমার,

আবার সকালের ঘোলাটে মুখ,

নিজের ছবি তুলছি,

এখনও কাটে নি কাল রাতের সিরাজির খোঁয়াড়ি।

 

ক্রমাগত পাখির ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে ডানে বাঁয়ে,

আমি প্রপিতামহ অতিবৃদ্ধ,

আলখাল্লা জোব্বায় ক্রমশ লেগে থাকছে কবিতার রঙ,

গীটার হাতে সুদর্শন তরুণ পেরিয়ে যায় কলোনির মাঠ,

ইটের পায়ে চলা পথ,

সন্তর্পণে ডিঙ্গিয়ে যায় পড়ে থাকা রজ্জুগুলো।

 

দুই

 

আকাশ মেলে ধরল স্বচ্ছ নীল ক্যানভাস,

এখানেই ছবি আঁকতে বলল মেঘ,

চারদিক বরফে ঢেকে যাচ্ছে এতটাই তুষার।

 

তিন

 

এমন পাগলামো দেখিনি কখনো

তোকে পাগল বলি সাধে

চলে যাবি যা আমার কেটে যাবে দিন মাস বছর যুগ

শুধু মনে রাখিস আমার জন্যই বেঁচে থাকবি তুই

তোর জন্য আমি।

 

বুকের মধ্যে সব সময় তুই,

থাকবি হৃৎস্পন্দনে,

এভাবেই বাঁচি আমি

এভাবেই চলে যেতে চাই,

আমার ঘুমের মধ্যেও

তোর কথাগুলো রিন রিন স্বপ্ন হয়ে বাজে।

 

কেন অমন তাকালি বল,

কত বছর আগে সেই সর্বনাশা বিকেলে।

 

 

(৩৭) মৃতদেহ

 

আমি যখনই মৃতদেহ দেখি তারা নিশ্চুপ থাকে,

আমি যখনই খোলা আকাশ দেখি তারায় ভরা,

তখন ভাবি ওটাই কি মৃতদের ঠিকানা,

মৃত্যু হলে কোথায় যায়,

সত্যি কি কোন কিছু থেকে যায়

একমাত্র স্মৃতি ছাড়া?

 

অনেক কাহিনী শুনেছি,

উৎকর্ণ অপেক্ষায় থাকি যদি মুখোমুখি হই কারো,

নানা শব্দ একাকী ঘরে উঠোনে বারান্দায় ছাদে,

অবশেষে সব শব্দেরই কারণ জানা যায়,

হাওয়ায় নড়ছিল পলিথিন মোড়ক খানা,

অথবা গাছের খেয়ালে পেকে ওঠা ফল টুপ করে খসে যায়।

 

একে একে জীবন

ছেড়ে চলে যায় বহু চেনা দেহ,

সব চিহ্নগুলো ক্রমশ ম্লান হয়ে,

তলিয়ে যায় প্রবল অন্ধকারে।

 

এখনও পর্যন্ত কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় নি,

কোথায় যাও তোমারা,

কেমন থাক।

 

(৩৮) পরমেশ্বর

 

পরমেশ্বর তোমাকে অনুভব করতে পারি,

অসীম শক্তি,

এক প্রান্তরে আমি একা

আকাশ ছুঁয়ে উঠেছে দেয়াল,

ঝড় উঠলেই আমি ছুটে যাই দেয়ালের কাছে,

আঁকড়ে ধরি প্রোথিত লৌহ শলাকা।

তুমি নেমে আস অপ্রকাশিত অলিখিত কবিতার মত,

আমার প্রয়োজনে,

এক ব্যক্তিগত ঈশ্বর।

 

আমি মেজে ঘষে ঝকঝকে করি লন্ঠন চশমার কাঁচ,

নিকনো স্বপ্নভেজা উঠোনে চারপাই পেতে আকাশ দেখি,

ঘর দেখি টালির চালা,

উঠে গেছে মাটির দোতলা,

অদূরে গোয়ালে বাছুরের ডাকে নড়ে ওঠে গাভী।

 

পরমেশ্বর তোমাকে অনুভব করি,

আমার মায়ের মত।

 

 

(৩৯) তোকেও নদীর মতো

 

আমি নদীর ধারে বাসা বেঁধেছি বুকে ধরেছি জলধারা,

তোকেও ভালবাসি নদীর মত,

নদী আমার শিরার ভেতর বয়ে চলেছে রক্তধারা,

ইউফ্রেটাস কঙ্গো নীল মিসিসিপি,

দেখেছি গঙ্গার বুকে সোনালি আলো।

 

কিভাবে ভালবাসি তোকে,

কিভাবে ভালবাসা ছড়িয়ে যায় ত্রিমাত্রিক হয়ে,

দৈর্ঘ্য প্রস্থ গভীরতায়।

 

 

(৪০) প্রজন্ম

 

প্রজন্ম বল এ দায় কার তোমার আমার,

আমি তো নীল নীল অন্ধকারে ভাসিয়েছিলাম জীবনের ভেলা,

যদি সে ডুবে যায় বল এ দায় কার,

তোমার আমার।

 

আমি জীবনের গান শুনেছি গেয়েছি দেখেছি ওঠাপড়া,

তবু বল এ দায় কার তোমার আমার,

তমসাবৃতা যে রজনী ধায় অধিকতর বেদনায়,

এ দায় একান্ত আমার,

মাথা পেতে নিই হলাহল আমি বিগত প্রজন্ম

কি রেখেছি সঞ্চয়।

 

দুরপনেয় কলঙ্করেখা যদি আঁখিতারা সজল করে

বল আমি কি এড়াতে পারি দায়,

আমি কি এড়াতে পারি এই বিচ্যুতি,

কি করেছি আমি,

শুধু কাটিয়েছি সময়,

এখন তীব্রতর বেদনায় শুধু হাহাকার হাহাকার।

 

উপাখ্যান উপাদান প্রোথিত গহ্বরে,

শিলালিপি হাহ্‌ শিলালিপি গ্রাম থেকে সোজা ছিন্নমূল শহরে,

ঢাকা বরিশাল ফেলে এসে

জমাট বাঁধা শহরের প্রান্তসীমায় চালাঘর।

 

আমারে ভালবাসল কাঠকুড়ানি,

তার লগে প্রেম নাই,

প্রেম বড় হিসাব নিকাশ,

ভাউচারে কি প্রেম লেখা যায়?

বল কি করি উপায়,

আত্মগত বড় আত্মগত এই বেঁচে থাকা।

(৪১) তিনি

 

তিনি আমাকে আঁকতে বলেছেন গোলাপ বাগান,

তিনি বলেছেন ঐ যে রুপোলী চাবি তাতে খোলা যায় কোষাগার,

আমি তাই এই বারান্দায় মেঘে চৌকাঠে ছড়িয়ে দিয়েছি শব্দস্নান,

তিনি বলেছেন তাই দীর্ঘতর হয় ছায়া;

ছায়ার মধ্যে আমার আঁকা কৃষ্ণ গোলাপ মরবিড ফোটে।

 

যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতংগা বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধবেগাঃ ।

তথৈব নাশায় বিশন্তি লোকাস্তবাপি বক্ত্রাণি সমৃদ্ধবেগাঃ   ।

যত কিছু প্রত্যয় যা কিছু ধারক,

গলনাঙ্ক পেরিয়ে যায় তাপ প্রবাহ,

আজানু বিস্তৃত তৃণভূমি,

চেতনা জুড়ে তীব্র শিহরন,

আকণ্ঠ আকাশ নিয়ে প্রান্তর জেগে থাকে,

জেগে থাকে ধূপ ধুনো ইজেল প্যাস্টেল।

 

 

(৪২) ধূসর বেড়াল

 

জেগে ওঠে ধুসর বেড়াল,

বেড়াজাল ছিঁড়ে দ্রুত চলে যায় দূরে,

ঝড়জলে নামছি আমি প্যারাট্রুপার,

নামতেই হবে অন্ধকারে,

ডিঙ্গিয়ে যাব মনখারাপের একশো নালা,

আমার আগে ছুটেছে এক আদিম জানোয়ার।

পিঠ তার টান টান ধনুকের ছিলা,

মুহূর্তে পেরিয়ে যায় যাবতীয় বিষাদের স্তূপ,

চারপাশ শুনশান নগরী ঘুমোয়,

মাঝে মাঝে ঝোড়ো হাওয়া ফিসফাস সনেটের মতো,

গান গায় ধারাপাত বৃষ্টি ফোঁটায়,

জানোয়ার ছুটে চলে সুতীব্র বেগে,

দহিত অনলে বাষ্প শরীর নিয়ে

আমিও পেরোতে থাকি একরাশ মায়া।

 

(৪৩) টেল লাইট লাল

 

একটু সাহস দিলে তোমাকে প্রেম বলতে পারতাম,

একটু তাকাতে যদি আমার চোখে,

সাগর দেখতে পেতে,

এর চেয়ে আর বেশী কিছু বলব না,

বলা ঠিক নয়।

 

একটু ভালবাসা দিলে পেতে শতগুণ,

একটু স্পর্শ দিলে ছড়িয়ে যেত ওম,

তুমি তো আলুলায়িত কুন্তলা,

আলসেতে ঝুঁকে দেখছিলে পাখিদের এ ডাল সে ডাল,

অথচ আমি একনিবিষ্ট আবদ্ধ দেখছি তোমাকে।

 

আমার দৃষ্টিতে তুমি,

আমার মনে তুমি,

আমার ভেতরে তুমি,

বাইরে হাহাকার গরম হাওয়া,

লু বইতে থাকে এ সময়ে।

 

একটু সাহস দিলে না আমাকে,

তাকালে না চোখ তুলে,

আর তো মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা,

চলে যাব দূরে,

বিকেলের ট্রেনে,

প্ল্যাটফর্মে দেখবে টেল লাইট লাল।

 

(৪৪) প্রবাহ

 

আয়নায় তাকালাম কেন জানি না,

এত বৃদ্ধ আমি!

আয়না ভুল বলে না,

বয়েস বাড়লে বৃদ্ধই হয়।

মাটির বয়েস নেই,

সবুজ বনের বয়েস হয় না,

পাহাড়কে কেউ বৃদ্ধ বলে না,

নদীও চিরন্তন।

 

আমি প্রকৃতি হব,

মিশে যাব মাটিতে ঘাসে সবুজে তারুণ্যে,

বর্ষার ভরা নদী নামলে পাহাড় থেকে,

জেনো আমিই আসলে রয়েছি জলে।

সাগরের ঢেউয়ে আমি,

আমি রোদ্দুরে সুবাতাসে,

যখন দাবানলে পুড়ে যাবে গাছ মাটি ঘাস,

হাওয়ার সঙ্গে আসবে ছুটে আমারই দীর্ঘশ্বাস।

 

কেন ভাব আমি জীবিত কি মৃত,

কেন ভাব না আমি আমি আমিতে নেই আমি,

আমি চলে যায় মহাস্রোতে জীবন প্রবাহে,

অনন্ত পথিকের মত,

থামে না  পথ চলা কথা বলা

প্রবাহ বেঁচে থাকে।

 

চল দাঁড়াই নদীতীরে সাগর পারে,

ছুটে যাই পাহাড়ে ঝরনার কাছে,

প্রবাহ প্রবাহ তোমাকে ধরব হৃদয়ে,

শুনব কলতান সঙ্গীত।

 

 

(৪৫) আমার ঘর

সদরে আমার ঘর –

তুমি দেখলে ভাববে ঝড় বয়ে গেছে,

এতো অগোছালো।

 

এই আমার দেহাতী বাগান,

এখানে পাখিরা গান গায় স্বরলিপি ছাড়া।

 

ওইদিকে পুকুরের ধারে আমার পোড়ামাটি চারুকলা ওয়ার্কশপ,

তার পাশেই শুয়ে আছে লালি ছটি ফুটফুটে বাচ্চার মা,

সপরিবারে দ্বিপ্রাহরিক আধোজাগরণে,

পুকুরে হাঁসেদের ওঠানামা দেখে মিটমিটে চোখে।

প্রাচীন পরিত্যক্ত জৈন দেউলে

আর্কিওলজিকাল সার্ভেকে বিদ্রূপ করে শুকচ্ছে তিলের খড়,

ইকো পার্কের বোটগুলো সার সার রোদ পোহায়,

উঁই ঢিপিতে ছেয়েছে সেগুন বন।

 

আমার ঘর,

তুমি দেখলে ভাববে ঝড় বয়ে গেছে,

এতো অগোছালো।

চিন্তায় আছি,

সত্যিই ঝড় উঠতে পারে,

ঘর ভাঙ্গতে পারে দু’একটি পাখির,

যারা গান গায় স্বরলিপি ছাড়া।

ঝড়ের আগেই পৌঁছতে চাইছি বাগানে,

হে সারথি ওড়াও পঙ্খীরাজ আকাশের নীলে।

 

(৪৬) আবার যদি শুরু করা যায়

 

কি ভাবে জানলে বল আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস

কিভাবে আমার গভীরে তোমার বাস

কিভাবে জানলে আমার না বলা কথা গুলো

 

অনেক দুঃখ তুমি কুড়িয়ে নিয়েছ

আমার হতাশার যত বিষফল

আবার চল যাই নদীর অগভীরে গোড়ালি ডুবে যাওয়া কাদাজলে

আবার যদি শুরু করা যায় বাকী পথ একসাথে চলা

তোমার সঙ্গেই শুরু আর শেষ আমার যত কথা বলা

চাইছি ভুলতে বল কি করে ভোলা যায়

বল কি করে ফেলে আসি জীবন যা হারিয়ে গেছে তারায় তারায়

কেন যে এখনও দেখি তোমাকে

স্মৃতির পর্দা সরে যায়

মনে হয় এই বুঝি ছুঁয়ে ফেলব তোমায়

তোমাকে ভাল না বেসে কি করে থাকি বল

কি করে ভুলি বল

তোমার পিঠ ছুঁয়ে নেমে আসা চুলের জলপ্রপাত

 

আবার যদি শুরু করা যায়

 

(৪৭) নিজের মতো

 

আমার জীবন বাঁচি আমি নিজের মত,

দূরে থাক;

আমার নেশায় মাতাল হয়ো না,

সামলে নিও।

 

আমি বড় আত্মকেন্দ্রিক,

নিজেকে নিয়েই থাকি বেশ;

কাছে এলে দুঃখ পেতে পার,

সেটাও আমার সয় না,

আমি চাই না আমার জন্য কাঁদুক বনলতা।

 

এই আমার পাতার কুটির,

ওদিকে গান গায় পাহাড়ি ঝর্ণা;

ঝর্নাও নিজের মত।

 

আমি ছুটে বেড়াচ্ছি ইউক্যালিপটাসে সোনাঝুরিতে,

আমি দেখছি নদীতে স্নান করা ললনা,

মাথায় বোঝা নিয়ে চলে যাওয়া অরণ্য রমণী,

ফসলের ক্ষেত,

চাষিবৌ,

কৃষকের মাঠ ভরা ধান নীল নীল আকাশ,

আকাশভরা মেঘের ছবি,

আমি নেশাগ্রস্ত যুবক

ইহকাল পরকাল বিসর্জিত।

তুমিও কি মাতাল হবে?

হয়ো না।

দুঃখ পাবে।

 

 

(৪৮) নিশ্চিন্ততার অলীক

 

আমার না বলা কথারা জমে থাকে রাতের নীরবতায়,

এই নির্জনতায়

সাম্প্রতিকতম স্বপ্ন দেখছি দু’টো হলুদ প্রজাপতির চিত্রিত শরীর,

বনপথ

আর হঠাৎ থমকে যাওয়া দ্রুতপদ কাঠবেরালি,

এছাড়া চেনা শালিকের অচেনা চাউনি।

 

আমার রাত ভাল লাগে,

দ্রুততার সারাদিন এক চলচ্চিত্র ছবি হয়ে উঠে আসে চোখের পর্দায়।

 

ভাঙ্গা মন ছেঁড়া সুখের আফিং ঘোর,

অজস্র ধর্ষিত মৃত শিশুর মুখ,

কাজ খুঁজে ক্লান্ত ঘরে ফেরা হাজার সবল হাত,

সুখী সচ্ছল গৃহবাসীর কন্ট্রাস্ট,

সব সব দেখি আধো ঘুমে!

একটা সর্পিল অন্ধকার মাঝে মাঝে নেমে আসে,

মনে হয় তলিয়ে যাচ্ছি,

টুকরো হয়ে যায় কাঁচের মেঝে নিশ্চিন্ততার অলীক,

মাথা ঠুকে যায় সমুদ্র অতলে,

চিৎকারে জেগে উঠি,

নিজের শব্দ কি এতই কর্কশ।

 

(৪৯) মার্জিনাল ম্যান

 

এই দেখ সরসিজ ফুটেছে,

সায়াহ্নের ছায়া বনানীতে,

আকাশে নীল ক্যানভাসে কেবল মেঘের নানা ছবি

এটা কি কল্পনার জাল না সত্যি?

 

ভাল লাগে না,

যায় আসে না কিছুই,

থাকুক অথবা চলে যাক ঝড়।

 

আমি তো হত্যা করেছি নিজেকে,

আমার জীবন শুরু করেছি,

নাকি শেষ?

যায় আসে না কিছুই থাকুক না ঝড়।

 

যদি আগামীকাল আমাকে না দেখতে পাও?

আমি তো মার্জিনাল ম্যান

একটা ল্যান্ডস্লাইড ধরে নামছি পাহাড় থেকে।

আকাশ দেখ শুধু ,

আমাকে দেখ না,

বেঁচে থাকতে আমার কোন দয়া লাগবে না।

না, কিছুই হয় নি, থেকো নিজের মত।

 

(৫০) দেরী করে

সেই তুমি এলে এলে বড় দেরী করে দিলে

কেন চলে গেলে মাতিয়ে তাতিয়ে তোমাকে কেড়ে নিলো কে কেন

কেন কেড়ে নেয় তাদের কারা যেন যাদের থাকার কথা ছিল

কাদের থাকার কথা থাকে আর কে থেকে যায় শেষ পর্যন্ত

কে জানে

 

কে জানে কখন মন উচাটন কোন স্বপ্ন সন্ধানী তার স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়

কেন ভেঙ্গে যায় অতঃপর এক একটা তাসের ঘর

কে কি চালায় সমাজ সংসার

হাহাকার শুধু হাহাকার

 

কে কোথায় জ্বালাবে দীপশিখা

সৃষ্টিকর্তা কোন আগুনে পোড়ান কোন খাঁটি সোনা

নাকি সীতাকেই বারবার পরীক্ষা

 

তুমি এলে কেন এলে এ তোমার সময় নয়

আরও আগে অথবা কিছু পরে তোমাকে মানিয়ে যেত বেশ

(৫১) এখানে কেন

 

আমি কেন এখানে কেন ঘুরছি ভাবনার সীমানায়;

আমি কেন এখানে থাকতে পারতাম ওখানেও;

এ পাশে বসছি কেন ওপাশে কেন নয়?

আমি বরাবর কেন এপাশেই থাকি?

কেন বাঁধা থাকি নাগপাশে, কেন দাদা লাগে;

কেন ধাঁধা লাগে, কেন গুরু লাগে;

কেন নতজানু সবকটা পাথরের কাছে;

কেন দেবতা দিয়েছ এত চাহিদা এত হাহাকার।

 

(৫২) কে তুমি?

 

তুমি কি কবি?

যদি তাই ভাব, তবে কেন ভাব?

তুমি তো কশাই হয়ে পারতে,

অথবা চাষা হয়ে ফসল ফলাতে খাসা,

কিম্বা মালী অথবা ফুল বিক্রেতা।

তবু কেন কবি?

হতাশ প্রেমিক নাকি?

চাইছ প্রেমিকা পরুক কবিতা,

হা হুতাশ করুক সে করেছে ভুল,

তোমার মত হীরে ফেলে তুলেছে কাঁচ,

জড়িয়ে ধরেছে কাঁটাগাছ,

আর তুমি ছিলে এক মহতী সুললিত ফুলের বাগান।

 

কেন তুমি কবি হতে গেলে?

হবার জন্য অপেক্ষায় ছিল অনেককিছু,

রাইস মিল শাঁসালো মনসবদারি, বাগিচা।

হবার জন্য অপেক্ষায় ছিল অনেককিছু,

কেন তুমি ছুঁলে না সেসব কিছু,

আচ্ছন্ন থেকে গেলে কবিতায়।

 

(৫৩) জনপদে

জনপদে থেমে যাওয়া শান্ত বিকেলের মত

লঘুপায়ে নেমে এলো ক্ষোভ

ভালবাসার গণ্ডী ঘুচে গেছে

টাকা আনা পাই গোনে আনমনা উদাস বালক

হিসেবের খাতায় জমা খরচের দাগ সদর্থক তো নয়ই

চোখে তার আগুণ

প্রতারিত নিঃশেষিত স্বাধীনতার সন্তানেরা ক্রমশ

দেশে দেশে হারিয়ে ফেলে একাকীত্বে।

জনপদে থেমে যাওয়া শান্ত বিকেলের মত

লঘুপায়ে নেমে এলো ক্ষোভ

প্রান্তিক মাতা শুষ্ক স্তন তার কোলে মৃত শিশু

তাঁর কোন জাত নেই দেশ নেই

কোন জাত দেশ থাকে না গোলাতে গুঁড়িয়ে যাওয়া বিদ্যালয়ের আর হাসপাতালের।

অসাম্যের কোন জাত থাকে না,

অত্যাচারের কোন দেশ ভাগ নেই,

আমি জানি না কোনটা দেশ কোনটা বিদেশ,

আমি জানি না

ভিন্ন বেড়ার মানুষেরা কেন গায় একই সুরে গান।

 

 

(৫৪) নীরা এবং

 

লঘু মরালীর মতো নারীটিকে নিয়ে গেলে বিদেশী বাতাস

আকস্মিক ভূমিকম্পে ভেঙ্গে গেলে সবগুলো সিঁড়ি

বড়ই প্রাসঙ্গিক হয়ে যান তিনি

অন্দরের বাগানে তখন অনায়াসী সুবাস

আশ্চর্য অর্বাচীন নক্ষত্র

দীর্ঘ অপরাহ্ণের ছায়া তাকে কাঁদাতে তো পারেই না

বরং ঠিক বিপরীত

আকাশের আয়নায় মুখ দেখে

নিক্ষেপ করেন অতি দীর্ঘ বল্লম

দেশান্তরী রোদ্দুর

তাঁর সাহসী  চুম্বনে

বেলাশেষের জলজ পাপড়ি অবনতা হয় আশ্লেষে।

 

থমকে দাঁড়িয়ে তিনি নীরার চোখের দিকে....

ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার, যেন মায়াপাশ

সত্যবদ্ধ অভিমানে চোখ জ্বালা করে ওঠে

সেই অমোঘ মুহূর্তে আমারও পৃথিবী তখন নির্ঘুম জ্যোৎস্না আলোকে

ঘুমিয়ে পড়ে শুনশান চারপাশ

নদী থেকে তুলে এনে যাবতীয় দীর্ঘশ্বাস

ইতিহাস প্রাণ ফিরে পায় অলীক উল্লাসে

অতীত জীবিত হয় আমার যাদুঘরে

পৌরাণিক প্রাগৈতিহাসিক থেকে শুরু করে নিকট অতীত

অপেক্ষায় থাকে সেই অমোঘ মুহূর্তের

যখন রাত গভীর হয়

আর

নিখুঁত গোল চাঁদ কে হঠাৎ সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়

এক ফালি মেঘ।

 

চাঁদের নীলাভ রং এ লেগে আছে নীরার বিষাদ

আমি ছুটে যাই ঐরাবতের কাছে

তাকে শোনাই নীরার কথা

আন্তরিক জীবনবোধের গান।

 

ঐরাবত ভাবেনি সেভাবে কোনদিন নীরা এবং মানুষের দৈনন্দিন,

একদিন সেও আসবে শুঁকবে মাটীর ঘ্রাণ বুনো গন্ধ

ভাববে নীরাকে নিয়ে

বকুলমালার তীব্র গন্ধ এসে বলে তাকে বলে দেবে নীরা আজ খুশি

হঠাৎ উদাস হাওয়া এলোমেলো পাগলা ঘণ্টি বাজিয়ে আকাশ জুড়ে

খেলা শুরু করলে

ঐরাবতও জেনে নেবে নীরা আজ বেড়াতে গিয়েছে।

আমিও পৌঁছে যাই নীরার কাছে

যাই যাই করেও শীত যায় না

উদাসী সকালে মেঘেরা নানা ছবি আঁকে

অনায়াস ফর্মেশনে ভেসে ওঠে অসংখ্য মুখ

ভাবনার খেই কেটে পূব আকাশের সূর্য ছুঁয়ে

বাঁদিকে ঘুরে যায় নিঃসঙ্গ বিমান

ঠিক সেই পুরনো মুখ 

সেই ভঙ্গী সেই গ্রীবা সেই চকিত চাহনি

আমার মনে আমার কাব্যে আবার সেই তুমি নীরা।

 

যদিও জানি এ সত্যি নয়

এই প্রৌঢ়

সায়াহ্নে হাতড়ে বেড়াচ্ছে হারানো অধ্যায়

সে সব বলার কথা নয়

কিছু কিছু ক্ষত জমাট রক্ত ক্ষরণ

মনিমুক্তো জমাই থাকে মনের গভীর সিন্দুকে

সমুদ্রের ঢেউ ভাঙে বালিতে

আমার  পা স্পর্শ করে ফিসফাস বলে যায়

অজস্র একান্ত এমন কথা আমি ভাবি গর্জন

ছুঁয়ে থাকি ভাঙা ঢেউ –

আগামী বসন্তের পতনোন্মুখ বৃক্ষদের

আগামী বর্ষার ক্রন্দসী ধানক্ষেতদের

সমুদ্রের তরঙ্গ বালুকণাদের কান্না কথা গান শুনব

উদাসী আকাশকে বলব তাদের কথা

চাঁদ ডুবে গেলে

বলব নীরার কথা।

 

(৫৫) দেখি কেমন পারো

 

ধর একটা টেস্ট কেস

ছড়াতে হবে স্পেল

গিনিপিগ খুঁজছ তুমি

এই তো আমি

কর হিপ্নটাইজ

দেখি কেমন পারো

 

আমি ঠিক করেছি

আমার চোখের পলক পড়বে না

আমি ঠিক করেছি

আমার চোখের মুখের একটা মাংসপেশিও কাঁপবে না

 

দেখি তুমি কেমন নাড়াও রূমাল জাদুকাঠি

আমি না নড়লে কেউ আমাকে নাড়াতে পারবে না

 

(৫৬) নিকষিত হেম

 

এই আমার কলুষিত প্রেম নিকষিত হেম

প্রেম কাকে বলে আমি জানি না জানি মোহ

মোহ টেনেছিল তোমার দিকে

তোমার হিসেবের বাইরে আমার ঘুরপাক

 

তোমার মোহে ডুবলে কি ভাল হতো

কে জানে

কেটে গেল সুতো ঘুড়ির ভোকাট্টা দেখলাম আমি

তুমি ও দেখলে

জানি না হাততালি দিয়েছিলে কিনা

জানি না কেন দেখালে তোমার ক্লিভেজ

সমস্তটাই কি অকারণ?

ক্লিভেজ দেখ অনেক রকম হতে পারে

বুকের পিঠের মনের

তুমি কোন ক্লিভেজ দেখিয়েছিলে মনে রাখতে বল

এত দিন বাদেও?

 

হা হতোস্মি আমার কি এতই স্মৃতিশক্তি

বড় বেশি আকাঙ্ক্ষা তোমার আমকে নিয়ে

আগেই বলেছি কি না জানি না

এ তোমার বড় দোষ

দু’রকম মানে

এমন কথা বললে কেন

খেলতে হয় খেল না এক্কা দোক্কা

মানুষ নিয়ে খেলার কি কারণ!

 

(৫৭) চলো

 

চল আমরা থাকি আপন আপন

যে যার ঘ্যামে

গরমে ঘেমে

এবং নিজের পা বাঁচিয়ে

ল্যাং মারি

একে অপরকে নির্বিশেষে

 

সকলে মিলে অবশেষে

পতিত হই

তোর ভাল আমার কি

আমার ভাল তোর কি

আমাদের ভাল কার কি

কারো ভাল দেখতে নেই

দেখতে পেলেও বলতে নেই

আমি আমি আমিই সব

আমার জন্য রাজপ্রাসাদ তন্বী নারী

হীরের আংটি সোনার ফুল

আমিই সঠিক বেবাক ভুল

 

 

(৫৮) শৈত্য-প্রবাহে

শৈত্য প্রবাহে সব রং ঢাকা পড়ে যায়

বৃত্তের ভেতরে চাঁদের গোল আকার

পৃথিবী অক্ষরেখায় ঘুরে যায়

ঘোরে কক্ষের সীমানায়

প্রবল ঘোরে কাঁটা

দ্রুত মুছে ফেলে সময়

কবজার ওপর দরজা ঘুরে যায়    

ফিরে আসি পুরনো টানেলে

একা এক খুঁজতে থাকি পুরনো সময়

সূত্রপাতে ফিরতে থাকে

আসি মূল প্রসঙ্গে

স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেখি মুখ

 

(৫৯) কবিতার শাসন

 

মানুষ কবে পৌঁছে যাবে নির্বিবাদী কবিতার ভোরে?

কবিতা চালাবে শাসন ভাঙ্গবে হাহাকার

অনুলিপি পৌঁছে যাবে সব অনুশাসনে।

জলছবিতে ঢেকে যাবে সমস্ত বিজ্ঞাপন

গান আর কবিতাই হবে রাষ্ট্রভাষা,

সংবিধান প্রণেতার আবশ্যিক হবে কাব্যতীর্থ উপাধি।

 

কবে যে ভালবাসা জুড়বে সব ছন্নছাড়া হৃদয়,

হবে সমস্ত পাঠক্রমের আবশ্যিক বিষয়।

 

(৬০) মেয়ে

মেয়ে সে একজন দুঃখ চেনে নি

তাকে চেনাবে এই ভাবে?

এত কষ্ট দেবে তাকে?

 

মেয়ে একজন গড়ে উঠছিল ধীরে ধীরে

সে মা হতে পারত ধারণ করত জীবন

তার দেবার অনেক কিছু ছিল পৃথিবীকে।

 

থামিয়ে দিলে?

এভাবে!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!

(৭১) সারসেরা

 

কাগজের সারস বসেছিল সেন্টার টেবিলে

হাওয়াতে নড়ে

নড়ে তার পাখা

দুবলা পাতলা সে এক সারস

 

সারস ভেঙ্গেছে অহমিকা বোধ

তার ক্ষোভ ভেসেছে জলে

আকাশ ছুঁয়ে নেমেছে বাতাসে ভেসে অবশেষে

সেন্টার টেবিলে

কাগজের সারসেরা সার সার টেবিলে বসে

চক্রবৃদ্ধি বাড়ে

হাজার হাজার সারস বসে থাকে

হাজার হাজার চেয়ারে টেবিলে

একই রকম তারা একই মুখ চোখ

হাওয়াতে নড়ে কাগজের ডানা

সারসের শরীর নড়ে

(৭২) ঘুমপরী পতঙ্গ

 

ঘুমপরী পতঙ্গ অনেক উড়ে উড়ে চলে স্বাধিকার বোধ

অন্যায় অনেক উড়ে যায় সীমানায় অপরাধ

ভালবাসাটাসা ছেঁদো কথা

প্রতিশ্রুতিগুলো বহুশ্রুত

থামাও গল্পগাছা

এরপরে কি বলবে তুমি কাঠপুতুলি

সবটাই জানা

বাজাও শুধু তাকধিনাধিন

টেবিল বাজনা

 

(৭৩) সেরা

মান্যবর রেখেছি ডাবের জল

আচমন  আহ্নিক সমাপনে হয়ে উঠুন দুর্দম

 

সুবিশাল উপত্যকার সব কটি ধানের শীষ

এই পাহাড়ি ঝর্ণার সুশীতল

ওই আকাশের ক্যানভাসে মেঘের চারুকলা

গাছের আড়ালে কোটরে  পাখিদের ডাকাডাকি কথা বলা

আপনার অপেক্ষায় রয়েছে

 

আসুন প্রকৃতির কোলে

ভ্রু যুগল বেয়ে শরীর বেয়ে

নেমে আসুক শান্তি স্রোত

 

আপনি বড় একলা জানি

সাথী তাই থাক প্রকৃতি 

 

 

(৭৪) প্রেম

 

গ্লাসে রয়েছে পুনর্নবীকরণ নির্যাস

তলানিতে ভীরু প্রেম

প্রেম না ছাই চোখের মোহ

প্রেম কবার হয়

পুরুষ নারীর ভাল লাগাই প্রেম না কি

প্রেম হলেই শুতে হবে

 

প্রেম এক শিরশিরানি ভাল লাগা রাত জাগা

সাত পাঁচ ভাবা

ভাবতে ভাবতে সকাল হয়ে যাওয়া

 

প্রেম মানে কোথা দিয়ে বয়ে যায় ভরা দুপুর বেলা

প্রেম মানে প্রতিটা কথা চলন বলন অর্থ খোঁজা

প্রেম মানে ছেড়ে না যাওয়া

প্রেম এক আবদ্ধতা

 

যাও ছেড়ে দিলাম তোমাকে

খেলো না প্রেম প্রেম খেলা

অভিনয় জমছে না

না তোমার না আমার

ছুঁড়ে দিলাম গ্লাস সমেত পুনর্নবীকরণ

রিচার্জ করছি না ভালবাসা

হলে হবে এমনি

থাকলে থাক এমনি

গেলে চলে যাক

নিজের সঙ্গেই অতঃপর খেলব প্রেম প্রেম খেলা

দিন রাত সারা বেলা

 

(৭৫) কথা

 

কথা কি বলতেই হয়

এলোমেলো কথা ব্যথা

ব্যথা কি পেতেই হয়

 

দৃষ্টি কি দিতেই হবে

দৃষ্টিহীন চোখ কি ঈশ্বরের দান নয়

আমরা কেউ রাতের আকাশকে ব্ল্যাকবোর্ড ভাবি না

আর্মিলারি স্ফিয়ার ধরতে চায় আকাশ

আমরা জানি চন্দ্রগ্রহণ

রাতফুল ও পাখিদের বিভ্রান্ত করে

 

কথা কি বলতেই হয়

ব্যথা কি পেতেই হয়

 

 

(৭৬) শান্ত নদীতীর

তুমি শান্ত নদীতীর  ঝোপের আড়ালে

তরঙ্গহীন কেন

কোন নারী কি দেখবে তার মুখ

করবে শৃঙ্গার

প্রসাধন চর্চিত রূপ লাবণীর তৃষ্ণায় অধীর

নাকি নিষ্কম্প জলরাশি

বুকে ধরেছে আকাশের নীল সংলগ্ন মেঘেদের

আসা যাওয়া সাগর স্রোতে ভাসে ভেলা

 

চল বসলাম না হয় তোমার তীরে

আমরা দু’জনেই তো একাকীত্বের গুনছি প্রহর

আসুক কিছু হাওয়া

ছোট ছোট ঢেউ কিছু ছুঁয়ে যাক কিনারার মাটি

আমার ভাবনারা যত

সমতুল তরঙ্গ রাশি

 

 

(৭৭) ডুয়েল

 

ঘোড়া থেকে নেমেছি স্টিরাপে ছিল আলতো পা

চল ধরো হাতিয়ার শেষ লড়াই হয়ে যাক

হাতে থাক সাঁই সাঁই লিকলিকে তরোয়াল

 

আমরা দুজনেই আলখাল্লায় ঢেকেছি শরীর

মুখোস বর্মে একাকার চোখ মুখ আর দৃশ্যমানতা

আমরা সত্যিই যথাক্রমে তো

নাকি প্রক্সি ওয়ার লড়ছে অন্য কেউ

 

ভোজসভা ব্যাহত এই আকস্মিক ডুয়েলে

আমাদের শিভালরি অসাধারণ

আমরা ভীত নই মৃত্যুতে

হোক না বীর গতি

ক্ষতি নেই তাতে

 

সামলাও আমার আঘাত

তোমার বর্ম ভেদ করে রক্তপাত শুরু

আমিও আহত হব

 

ওই দেখ জনতা পলায়ন মুখী

ওরা শান্তির খোঁজে ব্যাঙ্কোয়েট থেকে অনেক দূরে জমায়েত মাঠে

সন্ত্রস্ত ললনারা চোখে হাত

তোমাকে আমাকে দেখে আঙ্গুলের ফাঁকে

আমরা লড়াই নিয়ে কখনও টেবিলে

কখনও সিঁড়িতে কখনও ব্যালকনি পরিক্রমায়

 

ওই দেখ তোমার তরবারি ফালা ফালা করে দিল পর্দা

ঝনঝন ভেঙ্গে গেল উজ্জ্বল শ্যান্ডেলিয়ার

পালাবার পথ নেই

আমরা নিজেরা নিজেদের বেঁধেছি মৃত্যুতে

হয় তুমি নয়ত আমি

অথবা দুজনেই

লড়ছি শেষ মোলাকাত

 

 

(৭৮) শেষ কথা

কথা কি শেষ হয় শেষ কথা কে বলে

বাতাস নাকি মানুষ

হৃদয় নিংড়ে দিলে উজাড় করে কি আর থাকে

শেওলা পিছল দিঘীর পারে পা রেখেছ সাবধানে

ভেজা কাপড় শুকিয়ে যাচ্ছে গায়ে

তুমি নাকি বাউণ্ডুলে ভবঘুরে

হতেই পারে

 

এমন ভাবে জড়িয়ে যায় শব্দ পাহাড় কিসের নেশায়

বাসায় ফেরার আগে ঝোড়ো হাওয়ায় পাখি ডানা ঝাপটায়

কুলুঙ্গির পিদিম নেভায় হুহু বাতাস

আকাশ মেতেছে ঝড়ের নেশায়

 

ঘরের ভেতর অন্ধকার বাইরে প্রবল বজ্র হুঙ্কার

কোথায় তুমি যাবে এখন

তুমি কার কে তোমার

কবে কথা শেষ হবে

কবে তোমাকে পেরিয়ে যাবে তুমি

 

আমার স্বপ্নের মাঝে কেন ভুল জড়িয়ে দিলে

এমন তো কথা ছিল না

 

(৭৯) অন্য কারও

 

ফুলের সাজ খুলে গেছে প্রবল ঝলসায় বিদ্যুৎ

দমকা হাওয়ায় ওড়ে বসন ওড়ে আঁচল

তুমি নও অন্য কেউ

অন্য কারো

সশব্দে ভেঙ্গে পড়ল ডাল ওপড়াল গাছ

এই তাণ্ডব চলবে কিছুক্ষণ

আকাশের ওপর ছিল রাস্তাঘাট মেঘের মিনার

অথবা দানবের মুখ

ক্রমশ দিগন্তে ঝলকানি

মেঘেরা ক্রমশ কালো হয়ে একাকার

আমার এই ঘর খোলা কপাট

বাইরে এসেছি

 

তুমিও কি হার মান মাঝে মাঝে স্মৃতির কাছে

হয়ে যাও ভাবনার অধীন

তোমারও কি দুর্যোগে গান আসে মনে

যা সম্পূর্ণ বিপরীত

 

কেন যে আমার মত খুঁজি তোমাকে

তুমি তো তুমি

সহজাত বেড়ে ওঠো অনায়াস লতা

 

আমার দুয়ারগুলো নাড়ায় ঝড়ের হাওয়া

আমার রক্তে তখন শান্ত সঙ্গীত

তুমি ভাল থাক ভাল থাক ভাল থাক

 

আমার যা হয় হোক

ঘরে যাব ঝড় থেমে গেলে

(৮০) খুঁজছি

আঁতিপাঁতি খুঁজছি তোমায় মাঝরাতে

খুঁজছি আমার বিছানাতে

খুঁজছি কেন যদিও জানি নেই তুমি

থাকার কোন কথা ছিল না কোনকালে

 

হৃদয় নিংড়ে যাকে দেহ মন সব কিছু দিয়েছিলাম

(৬১) সে

 

সে কখনো আসে নিদ্রায় কখনো জাগরণে।

কাল্পনিক নয় বাস্তব ও নয়।

বড় কাছের।

রোজ তার সাড়া পাই।

নিদ্রায় বা জাগরণে।

 

সে তার কথা বলে যায়।

সাদা এক দোতলা বাড়ির কথা।

পড়াশুনোর কথা ভবিষ্যতের কথা।

 

একটা প্রান্তর দেখতে পাই।

তাকে দেখতে পাই।

উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত চোখ সারল্যে ভরা।

সামনা সামনি হলে অনেক কিছু ভেঙ্গে যায়।

ভাঙ্গতে চাই না।

 

(৬২) নদীর চরে

 

একলা নদীর চরে বিষাদ জেগে ওঠে ভোরের বাতাসে

কেটেছে আরও একটা নির্ঘুম রাত গত রাত

চাঁদের হলুদ আলোয় ছড়ানো ছিল একরাশ মায়া

গ্রীষ্মের দিন জিটি রোড দুপুরের বটগাছ

এখনো চোখের পাতায় এখনো অজস্র চলচ্চিত্র দেখে যাই

একলা নদীর ধারে চর জেগে ওঠে

হাওয়াতে দুলতে থাকে অজস্র বিষাদের কাশফুল

 

(৬৩) না বোল না

 

আবছা চাঁদের আলোয় যে মানুষটা তোমাকে সঙ্গ দেয়

তাকে না বোল না

তার জন্য জমিয়ে রাখ তোমার সেই বিখ্যাত হাসি

যে হাসির জন্য ছুটেছি বহু মাইল

সে চাইলে তুমি নাচতে পার যুগলবন্দী

 

মন রেখে দিও আমার জন্য কেবল

রেখে দিও শেষ নাচ

বনের পথে তার সঙ্গে বাড়ি ফিরো না

তাকে বলে দিও

আমার বাহুলগ্না হবে তুমি

তুমি আমার তুমি আমার তুমি আমার

এই কথা বলে দিও

 

বলে দিও শেষ নৃত্য তুমি নাচবে না তার সাথে

ওটা আমার জন্য তুলে রেখেছ তুমি

বলে দিও

বলে দিও সব হবে তার সাথে নাচ গান

শুধু আমার সঙ্গে ফিরবে তুমি একই ঘোড়ায় একসাথে

 

(৬৪) যাচ্ছি ডুয়ার্স

 

বনভূমি নদী আর পাখিদের এক আশ্চর্য দুপুর

ডুয়ার্সে অপেক্ষায় ছিল আমার

কালিমাটি নদীর বেডই রাস্তা

আগে জানতাম না পাহাড় থেকে যেখানে নামে নদী

সুনসান এই দুপুরে

 

কিষাণগঞ্জ এক অদ্ভুত সঙ্গম

পাশাপাশি এন এইচ থার্টিফোর ও শতাব্দী

রাতের রাস্তা জুড়ে ট্রাকেরা মালবাহী

আর এই এক ঘর চলমান লোক

কলকল কলকল

ক্রমাগত মোবাইলে বাজে রিংটোন

হঠাৎ চমকে উঠি সশব্দে পেরিয়ে যায় বিপরীত ট্রেন

 

কলকাতার প্রবল দুপুরে চড়েছি বাতানুকূলে

ছিমছাম এই যান্ত্রিক

একে একে পার হয় কালভার্ট লেভেলক্রসিং

আর না থামা ষ্টেশনে প্ল্যাটফর্মের সারি সারি মুখ

 

আলো জ্বলে জনপদে

যদিও নির্জন পথঘাট

কালো কাঁচের আড়ালে আমার সমস্ত বিকেল দুপুর দেখে যায়

চলমান মায়াবী বায়স্কোপ

 

মাঠের কোথাও ধান

জড়ো করা খড়ের  গাদা

গবাদি পশুর ভিড়ে একলা রাখাল

আর কত নদী  

বাঁশলোই গঙ্গা অজয় ময়ূরাক্ষী মহানন্দা

একরাশ রেল সেতু কালভার্ট ঝনঝন

 

আসছে অন্য জনপদেরা

অন্য এক আত্মীয়তা গায়ে মেখে

অপেক্ষায় উত্তরবঙ্গের কিছু মানুষজন

কবি পুণ্যশ্লোক তাঁদের একজন

যারা জানে তারা বোঝে

এই সব মনের আকুতি

এক পশলা বৃষ্টির পর বনস্থলী নিস্তব্ধ

পাখির ডাকের সকাল ক্রমশ প্রকাশ্য বলা ভুল

সে যেন দাঁড়িয়ে আছে

এখন কি সত্যি সকাল

এক ভাবে ডেকে যাচ্ছে পাখিরা পালা করে

ছন্দোবদ্ধ টুইটকার

(৬৫) শরীর মাপছিলো

 

মনে কোন পাপ ছিল না শরীর মাপছিল দুটো চোখ

শরীরের মাপ ছিল চোখে

শরীরে উত্তাপ ছিল

উত্তাপ ছিল বুকে

গলে যাচ্ছিল বরফ চূড়া

টানেলে টানেলে পাহাড় পেরিয়ে বরফ

পেরিয়ে ছুটেছে ট্রান্স সাইবেরিয়ান এক্সপ্রেস

কোথা থেকে কোথায় চলে গেল কল্পনা এবং ট্রেন 

জিভের লাগাম দিলাম ছেড়ে

 

মনে কোন পাপ ছিল না

শরীর তবু কাঁপছিল তিরতির

মাপছিল দুটো চোখ

চোখের আয়নায় কম্পমান আলম্বিত রেখা

শরীর রেখার মত নাকি আগুনের ছায়া

আগুন নড়ে চড়ে

আগুনের পাপ থাকে না

খাদ গালিয়ে বের করে নেয় পাকা সোনা

 

আগুন পরীক্ষা করে শরীরে

শরীরে পাপ ছিল কিনা

শরীর আগুনের রেখা নড়ে চড়ে কম্পমান

শরীর ধরা পড়ে যায় চোখে

চোখে চোখ পড়লে চোখ তাকায় নির্জনে

মনে মনে  খুঁজে বেড়ায় মুখ শরীর

চেনা বালিয়াড়ি ক্যাম্প ফায়ার

 

(৬৬) জন্মদিন

 

এলোমেলো হাওয়াতে ঈশ্বরের বাগানে পেকে যায় গ্রীষ্মের আমেরা

বালিকারা যুবতী হন

এই প্রৌঢ় ক্রমশ নারী দর্শন দিক দর্শন সমাজ দর্শন ও

নাবালিকা ধর্ষণের কাহিনীর প্রেক্ষাপটে

বৃদ্ধ হতে থাকে

কি আশ্চর্য মুদ্রিত হয় বর্ণমালা কি বোর্ডে

 

তিনশো চৌষট্টি দিন আলাদা নয় জন্মদিনের চেয়ে

প্রত্যর্পণের কিছু সৈনিক

তাঁদের দৈনিক বক্তব্য এখানে কেন ভুল মণ্ডপে

আমি কি দিয়েছি বল প্রত্যর্পণ কেন

সোনালি রেলিং আমি পাতি নি হ্রদের ধারে

এই সুবিশাল হাওয়া জাহাজ আমার তৈরি নয়

নদীর ধারের প্রস্তর খণ্ডে বসে থাকি অকর্মণ্য এক

 

তিনশো পঁয়ষট্টিতম দিনে তার কি কার কি

কেন জন্মদিন

জান আমার মরণ হলে কোন এপিটাফ লিখবে না কেউ

এমনও কি শরীর কর্তিত ঊর্ধ্বাংশও

যাকে আবক্ষ বলে

বসবে না

 

তবুও মণ্ডপে বক্তব্য রাখছে কেউ

গালে হাত দিয়ে শুনছি

ভুল ভাঙ্গাবো না

তিনশ পঁয়ষট্টিতম দিনে

কারা যেন কেক প্যাস্ট্রির ক্রিম মাখিয়ে দেয় সর্বাঙ্গে

 

(৬৭) নতুন সকাল

 

যদি ঘুম ভেঙ্গে উঠে দেখি নতুন সকালে

কোলাহল থেমে গেছে সমস্ত আস্তাবলে

প্রভাত সমীরে সূর্যালোকে উজ্জ্বল নগরী গ্রাম

বিশাল শক্তিতে জেগে উঠছে আমার দেশ

 

সমস্ত ভয় ভীতি বাধা দূর করে মানুষ

ডিঙ্গিয়ে যায় সব সীমানা

বুকে জড়িয়ে ধরে একটাই পরিচয়ে

জাত নয় ধর্ম নয় রং নয় বর্ণ নয়

সে পরিচয় ঈশ্বরের সন্তান

 

আমাকে বোল না কেউ এ দুরাশা বাস্তব নয়

সত্যি বলছি বাঁচব না তবে

 

হানাহানি শেষ কর নীতি একটাই ধর্মনীতি মানবধর্ম

নীতি একটাই অর্থনীতি

(৬৮) শেষ দেশলাই

বুকের মধ্যে জমে থাকা প্রেম

নীল কার্ডিগানের সর্বত্র সাদা লবঙ্গছাপ বুটি

মুহূর্তে হাউয়ের মত উড়ে যায় সবটুকু বারুদের একরাশ ধোঁয়া

ধোঁকাদারি দুনিয়ায়

আজকাল প্রেম কেনাবেচা হয়

না কি হতো বরাবর

হা হতোস্মি প্রাগৈতিহাসিকেও

 

মেঘের মিনার সরিয়ে ক্রমশ দুরের পাহাড়ে উজ্জ্বল হয়

এক নির্জন বাতিঘরের মত দুঃখ জমানো সিন্দুক

আবার ঢাকা পড়ে মেঘে

অতি শীতল হাওয়ার সাথে ভেসে আসে বরফের কুচি

আজানুলম্বিত ঘাসের ফাঁকে

হঠাৎ হারিয়ে যায় শেষ দেশলাই

 

(৬৯) বৃষ্টি নামে

বুকের মধ্যে রাস্তাঘাট সালটা সত্তর

কলেজ স্ট্রীট বিবেকানন্দ রোড

বৃষ্টি নামে

তরুণীর চুলে ট্রামের শরীরে

কৃষ্ণচূড়া গাছ বেয়ে

 

বৃষ্টি বরফ সমস্ত শিকাগো জুড়ে

স্টারবাক আর পারফিউমের সুঘ্রাণে

ভেসে যায় বিদেশী এয়ারপোর্ট

উড়ানের এখনও  কিছুটা দেরী

 

(৭০) স্বাধীনতা

 

আজো মার খায় অর্ধমৃত

ভরা জোছনাতেও তাদের হাতের তালুতে দোল খায় না

স্বপ্ন

আজো মরে যায় পুড়ে ধর্ষণে গুলিতে ছুরিতে

এখানে ওখানে মানুষ আহা তোমার দেশের

সহনাগরিক

জাঁকিয়ে বসেছে পাপ

 

আমার লজ্জা সফেদ জামার আস্তিনে গুটিয়ে

আমার লজ্জা ইংরেজিতে বলি লিখি

আমার লজ্জা ভাল খাওয়া থাকা

 

আমার লজ্জা

অকাম্য ব্যবস্থাপনা অভাব দুর্বলতা

সীমাহীন লোভ লোভ লোভ

আর আত্মকেন্দ্রিকতা

সোনায় মুড়িয়ে দেয়া যেত

প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেয়া যেত সুখ

 

রোল মডেলের মৃত্যুতে সুদীর্ঘকাল নৃত্যরত

চুহাগন দৃষ্টি দূষণ

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Maadhukari explores Bengali Literature Around The World