কবিতা সমগ্র
দেবাশীষ কোনার 
 
 
 

চিঠি

 

চোদ্দই ফাল্গুন ঊনিশশো ঊনআশি।

প্রাণ খুলে চিঠি লিখব বলে এক দিস্তা খাতা কিনে ফেললাম। ফাউনটেন পেন খুলে বসলাম মেশ বাড়ির এক চিলতে ঘরে।

এই ঘরই তখন আমার পরাণ বন্ধু।

আগামীর কথা ভেবে শিরায় শিরায় রক্ত নাচে।

প্রহরের পর প্রহর পার হয়ে যায়।

খরস্রোতা নদীর ঢেউয়ে পাড় ভেঙ্গে পড়ে যেন।

সমস্ত খাম পৌঁছে গেলেও কোন উত্তর আসে না

যা অস্বাভাবিক আজ বৃষ্টিঝড়া মেঘলা তোমার মতো নরম দিন। ভোর চারটেয় মধুমেহ রোগ সারাতে হাঁটতে বের হয়েছি

সবুজ পথ ধরে স্নিগ্ধ তোমার চুলের ঘ্রাণের মতো রোদ

মেখেছি সমগ্র শরীরে।

এই ভাবে এক একটা দিনের শুরু প্রবাহ থেকে প্রবাহের গভীরে

ছড়িয়ে পড়ে অনাগত সম্ভাবনার অঙ্কুর।

বাড়ি ফিরে চা আর সস্তার খাবার,

বাজার যাবার তাড়া, গতানুগতিক স্নান সেরে

পাটকরা ট্রাউজার-সার্টে ধোপদুরস্ত অফিস যাত্রা।

মাঊশ-কীবোর্ড আর চোখ থকে মনিটরে।

দিন শেষ হয়ে রাত নামে।

ক্লান্তি এসে জড়িয়ে ধরে সমগ্র চিন্তা চেতনার বাইরের খোলস।

এখনও অপেক্ষা করে আছি যক্ষের মতো

উত্তর লেখা খাম আসবে বলে

মেঘের দীর্ঘ চারণক্ষেত্র ছাড়িয়ে তুমি

মরুভূমির বালিতে ফুল ফোটাবে,

পৃথিবীর আঁধার কাটিয়ে রোদ্দুর আনবে।

আমি হতে চাই পরিপূর্ণ।

আমার ইচ্ছাগুলো সব জমে আছে।

মাঝরাতে জবাবী খাম খুলে

ঠিক আবার একদিন পরিপূর্ণ হবো, হবোই ।

নিঃসঙ্গ তমাল

কখন নিঃসঙ্গ লাগে নিজেকে ভাবতে থাকি
অভিমান আর অহংকার এসে ঘিরে ধরে
সেই জন্য নির্জন তমাল গাছটির উদ্ধত ভঙ্গি
আমাকে প্রবল ভাবে আকর্ষণ করে।

বৈশাখে ভরপুর রসসিক্ত সে
বর্ষায় ভিজে যাওয়া ঔদার্য নিয়ে
সে দাঁড়িয়ে থাকে পুকুরের খুব কাছে
একা আকাশের নিচে
মেখে নেয় রোদ্দুর,বিকালের আলো
কোথাও যাবার নেই ,কোনও ব্যস্ততা থাকে না
শুধু নিজস্ব স্মৃতি নিয়ে ,ভাবনা নিয়ে
নিজস্ব দুঃখ ও ঐশ্বর্যে মত্ত সে।

নিঃসঙ্গ তমাল গাছটি তাই অমোঘ বিকর্ষণে
আমাকে ক্রমাগত তার থেকে দূরে ঠেলে দেয়।

 

কোলাহল

চঞ্চল বৃষ্টির গন্ধে মন ভরে ওঠে খুব
তবু সেই চাতকের ডাকাডাকি কেন যে 
ভেঙে দেয় জাতকের কাহিনী গুটিকয়
পলাশের গাছে মেঘ সারা দেয়

অনাদর কেড়ে নেয় নাটকের ক্লাইম্যাক্স সহসা
নদীর ওই তীর ধরে চলে খুব পাখিদের বচসা
দূরে তোর বেহালার সুর শুনি প্রতিদিন
কোলাহল কেড়ে নেয় আলাপের বাহাদুরি

দূর ভাই আজ নয় চলো যাই পাগলের গর্ভে
মোরামের রাস্তায় ইঁট পেতে সস্তায় সার্ভে
হানা দেয় মহুয়ার গন্ধ ,আবোল - তাবোলের কুশীলব
বনের ভিতর থেকে আসে ডাক শব্দের জয়ঢাক

শিশিরের চোখে ঘুম শিউলির সাদা রঙ
মিশমিশে কাল রাত বলে দেয় রোগটার বদনাম
বাঁচবে কি মরবে জানা নেই, আশা তাই 
কোলাহলে প্রাণ ওঠে ভরে ভাই 

কোথায় হারাব আমি 

 

বউকে আদর করবার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসছে
এ যেন ফিরে যাওয়া শৈশবে
কাজ শেষে দিনের ঝটিকা পাহাড় থেকে রাত্রির নৈশব্দে
বারবার শ্রান্ত নিজেকে বিশ্রামে পাঠাবার আয়োজন
সকালে মিছরির সরবত খেয়ে ঠান্ডা হতে চাওয়া 
হারিয়ে ফেলা নিজের মধ্যে সাংবাদ পরিক্রমা
কোথায় হারাব আমি নিজেই জানিনা!

বউকে জড়িয়ে ধারবার চেষ্টা ব্যর্থ হয় প্রতিবার
লোকজনের ভিড়ে বাজারে রম রম করে লাইন
চায়ের দোকানের আড্ডা অথবা টেলিভিশন আমাকে দেখে
আমিও তাদের দেখি,ভাত খেতে খেতে দেখি
সকলে চালের ভিতর থেকে কালোমাছি বেছে ফেলছে
প্রত্যেকেই আমার মতো হারাতে চাইছে।

তবু আমি হারিয়ে যেতে চাই,কিন্তু কোথায়?
যখন দাঁত মাজি,মোটর বাইক চালাই অথবা চুল আঁচড়াই
আর বাজার করি, মাছে হাত ছোঁয়াতে গেলে মনে হয়
হাতে ফোস্কা পরে যাবে-তর্ক করি
খবর শুনে বিরক্ত হয়ে যাই-পত্রিকা পড়ি
কোথাও যেন মগ্ন হয়ে যাই আমি

ছায়ার মধ্যে থেকে দেখি প্রতিদিন প্রতিবিম্বের হার
তারা কোথাও হারিয়ে যেতে পারে না
তারা রাস্তায় হাঁটে।
এক গাছের থেকে অন্য গাছে বিলীন হয়ে যায়
মানুষও তেমন-এক মানুষের শরীর থেকে
অন্য একটি শরীরে মিশে যায়, ফিরে আসে

আমার জন্য নয় 

সব কিছুই আমার জন্য নয়
ঘেরা থাক কাঁচের দেওয়ালে সুশজ্জিত,
সভ্যতার নিদ্ড়শন এবং বাদশাহি তাম্রপত্র৷
কেবল তুমি দেখবে দু'চোখ ভ'রে সবকিছু-
দশ্ড়কের মতো,বিচারকের দৃষ্টিতে।
আর বেশ মজা করে ইচ্ছে হলে মাঝে মাঝে
টিফিন আর প্যাকেজ ড্রিকিং ওয়াটার চাইতে পার।

ঠান্ডা সভাগৃহে শীতের রোদের মতো ঝরে আনন্দফুল,
দীঘ্ড় লাউঞ্জ ভেদ করে অ্যানাউন্সমেন্ট,মেটাল ডিটেক্টার
সিকিউরিটির নজর এড়িয়ে ধূমপান নো স্মোকিং জোন
আর রুফটপ রেস্টুরেন্টে বিন্দাস ভোজ।
এ তো স্পষ্টই দেখা যায়,তাই না?

তোমাক শুধু তার ভিতর থেকে খুঁজে দেখি আর
ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি মেট্রো চ্যানেলে ব্যস্ততার মাঝে
ফুচকার দোকানে। হয়তো তখন ফুচকাও
তোমার কাছে মোগলাই-যা কিনতে আমাকে প্রয়োজন .......

অবগাহন

         

শুকনো জল ছিটিয়ে 

মনের উথাল পাথাল বন্ধ করি।

 

চল চলে যাই,

হাত ধরতে পারি আর নাই পারি

চেনা সুরে গুনগুনিয়ে উঠতে 

আমার বাধা নেই বিন্দুমাত্র,

পাশের কেউ কিছু  শুনুক না শুনুক 

কোন উত্তর দিক না দিক

চলার ছন্দে আমরা সামনে এগিয়ে যাবই।

 

যতই মেরুদণ্ড বরাবর শিরশির করা

লাভার স্রোত নামুক 

যুজতে তো হবেই।

 

আর খুব খুব তেষ্টা পেলেই 

তোমার কাছে বসে  

তোমার দেওয়া জলে 

আমার প্রাণের তৃষ্ণা মিটিয়ে নেব 

আর আবার চলব।

বিষয় যখন বিষ

গঙ্গা স্নানের মজাটাই আলাদা বুঝলেন দাদা
মরাকে পুড়িয়ে নাভিটাকে কৌটোয় পুরে
যখন আপনি অঙ্গার কি রূপ খতরনাক ভাবছেন
শান্ত করে দেবে আপনাকে হিমশীতল হিমবাহের মত
ভাই, বিষ পান করে মরে গেল অথচ দাদা
বিষয় নিয়ে ভাবতে একটুও বিলম্ব করল না।
আমাদের মাতঙ্গিনী, জহ্লাদের আর্তনাদ শুনে কাতর
বনময়ুরীর কর্কষ কণ্ঠস্বর তাকে অসহ্য লাগে
লাগাটাই তো স্বাভাবিক, কেননা শের কি কিমত
হিসাব সে নেহি হোতা। অস্ত্রগুলি সব ভোঁতা
এমনকি কাস্তে - তাতেও ধার নেই। তোতাপাখি।
যখন যা শেখে তাই বলে এরাও তেমন।
নিরুপদ্রব একটি ডুবসাঁতারের প্রয়োজন যে কতটা
সেটা তো বুঝেছিল ভাই - সে তো চলেই গেল।

 

 

কামোফ্লেজ 

আমি এক নান্দনিক চাবিকাঠি আবিষ্কার করেছি, যা দিয়ে
খুলে ফেলা যায় গুটিয়ে থাকা শরীরের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া 
ভাবছি কিভাবে এটা কাজে লাগাবো? ছড়িয়ে দেব
জনে জনে! বৃদ্ধ বাউল সন্ন্যাসী যেমন গান শোনায়
বাস্তবের ঘুণ ধরা শরীর নিয়ে বালিয়াড়ি টপকানো?
আমার পক্ষে তো সহজ নয়, তাই ভেবে চিন্তে এগোতে চাই।
কামোফ্লেজের মতো সটান আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাবে,
নাকি মরুভূমির ধূলায় ছুটিয়ে মারবে, তা জানি না।
তবে আজ এতদিন পর মনে হচ্ছে আমার সবকিছু
আবার ফিরে আসছে। যৌবন হাসছে।

পাদপ্রদীপের আলোয় দেখতে পাচ্ছি

সমুদ্র খেলছে জলতরঙ্গ হোলি।
অনুগ্রহ করে, এই সময়ে আমাকে আর বিরক্ত করো না!
আমি এবার সমুদ্রে যাব পাল তোলা নৌকায় - - - ।

নক্ষত্র পতন

 

কামড়ে খাবার মতো এতো জিনিস থাকতে তোমাদের

পছন্দ যাকে, ---
যা, ফুস করে উড়ে গেল সেই 
নাকানি চোবানি খেল

মাতব্বর যত পথের ধূলায় কাঁদে গ্লিসারিন চোখ।
ওরা আহাম্মক পাগলের প্রায়।

আয় আয় ক'রে ডাকছে তবু
প্রলোভনে পা দেবার ফাঁদে কখনও পরবে না -
জেনে গেছে ঘিন ঘিন করা সারমেয় শাবক।
#
এবার এস্কেপিসট পালা, কানে তালা ধরে যায় 
হাজার চিৎকার পৌঁছায় না কর্ণকুহরে
নক্ষত্র পতনে কাঁপে আকাশ - বাতাস।
গায়ের জোরে কেড়ে নেবে ইজ্জত?
এতোই তুচ্ছ নাকি ধেড়ে ইঁদুর তাই
না বলা কথা ভাসে প্লাবনের জলে।
#
চুষে নেওয়া মাধুর্য রস নোংরা ঘাঁটে আকণ্ঠ পাঁকে
জবু থবু বসে নান পরোটা খায় অহংকারী রানী
জানি, আমি সব জানি, কারা আলোর জ্যোৎস্না ভেঙ্গে
নামিয়ে এনেছে আঁধার এই বিষ্ণুপুরে।
এই খেলায় যুদ্ধ জয় অথবা মুছে যাওয়া কালির আঁচড় 
#
জহ্লাদের অভিপ্রায় শাসকের জানা, তাই পালা শেষ- - -

২০ সেপ্টেম্বর ,২০১৪ 

 

আর তোমাকে, সেই বালুকাবেলার মতো লাগে না;

তুমি শুধু প্রয়াসের নিভৃত ইতিহাস।

 

সেজন্য এখন একা এই নিশীথে ফিরে দেখি

পাপড়ির কারুকাজ, বৃত্তির কর্মকাণ্ড, স্তবকের বিন্যাস

ফুলের রূপ - রস - গন্ধের সাথে প্রতিস্থাপন

 

এখন ঘূর্ণাবর্তে থামে অন্দোলিত ছায়া শরীর

মধুপের ধেয়ে আসা গুঞ্জন

এখন বাতাস চায় প্রত্যাশার গভীরের ঘ্রাণ- - -

শিকড় সমেত গর্ভকোষে পাক খায় রেণুর অমৃত।

 

তবুও রাজপথ ডেকে আনে গভীর রাত্রি, উপেক্ষিত

অন্ধকারের পাতাল, উতরাইয়ের মহাফেজখানা

আর তুমি, তৃণ নও, ঊষাকালের বিভ্রম

তুমি নদীও নও, তুমি এক তারার চমক।

অনু কবিতা

 

এই অদ্ভূৎ কোলাহলে ধানি লঙ্কার ঝাল

ক্ষমা করো হে প্রভু তুমিই সুমহান।

 

আমি পর্বত নাকি পাললিক বলবে সময়

এখন চলছে খেলা ভাঙলেই মহা ভয়।

লবণাক্ত

 

এতদিন ছিলাম হার্মাদ, এবার তলিয়ে যাওয়া পাগল

হয়তো এরপর তোমাদের বিশেষণে খামতি পরলে

বলে ফেলবে ছাগল।

এখন সময় ছলছে নির্বাক চলচিত্র।

প্রতিরোধ থমকে আছে শহরের কলরবে যুবতি সমান

কজের জায়গায় বিচিত্র অভ্যুত্থান সচিত্র পরিচয়পত্র

বামাল ধরা পরে নাজেহাল নিয়ামত চাচা বাকরুদ্ধ

জন্ম যার এই দেশে সে নাকি বাংলাদেশী?

লবণাক্ত জল খেয়ে পেটে মোচড় মারছে কমবেশি ।

হাহাকার করছে মনটা, এই কি তার জন্মভুমি?

কাঁধে কোদাল নিয়ে পরিতক্ত আঙিনায় বসে

ঘাস কাটছে যে সমস্ত জোয়ান, জেনে রেখো

মাতাল জীবন

অসম্ভব দৃঢ় অভিমানে ছিটকে যাই জটিল ও নিঃসঙ্গ জীবনে
বিবাহ-বিচ্ছিন্না নারীর মতো,

পুরুষের সান্নিধ্য থেকে বহু দূরে শূন্য একাকীত্বে নিষ্কাম মনে প্রভাবশালী পুরুষের মতো,

একঘেয়ে মিছিলের ভিড়ে মিশে গিয়ে
উকিল বন্ধুর সাথে বদ্ধ ঘরে বসে পান করি
যত পান করি, তত মাতাল হই

- চারদিকে ছাড়ান থাকে গ্লাস, জগ
মৃদুমন্দ গান বাজে বক্ষ জুড়ে

- খেলা করে ঘুমন্ত অতিথি!

যত পান করি,  তত প্রবেশ করি জনশূন্য দ্বীপে
ব্যর্থ প্রেমিকের বেদনা জমা হয় পরিত্যক্ত,

নির্বাসিত প্রাণীর মতো
ভেসে যায় স্মৃতিগুলো একে একে -------
পার হয়ে সাগর - উপসাগর এবং কাজল চোখের জল

ভালোবাসা কি তাহলে কোনও অবান্তর পক্রিয়া?

মধ্যরাতের নিশি-ডাক?
বুকের খাঁচায় নৈশব্দর সঙ্গ না পাওয়া কড়া নাড়া?
আঙিনার জ্যোৎস্নায় নগ্ন ও গোপন অলংকৃত ক্যানভাস?

যত পান করি তত পাতালের গহনে প্রবেশ করি
ছিন্ন সাম্পানের মতো ভেসে যাই সুরের তুফানে

কিন্তু কেন করি পান?
পান করলে কি বিস্ফোরিত ঘূর্ণিজলে মুক্তো পাওয়া যায়?
পানে কি কোনও চক্রান্ত থাকে?
যদি তাই ভাবো, তাহলে চাপা স্বরে বলি 
আমি তোমার সান্নিধ্য পেলে সব কিছু ত্যাগ করতে পারি
আমার হাত ছেড়ে যেও না কক্ষনও, কোথাও!

 

 

বাঁচার নির্ঘন্ট

দাঁড়িয়ে আছি বাসস্টপে একা শুনশান কেউ কোথাও নেই
নিশ্চুপে নিরুপদ্রুপে যেন খাঁচায় বন্দী পাখি
দূর থেকে তাক করে আছে কেউ।

লক্ষভেদ করলেই

আমার মাথা থেকে ধর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
আমার জীবন এক সুতোর ওপর নির্ভর করে আছে
একটু এদিক সেদিক হলেই তাল কেটে যাবে
জবাবদিহী করবার কোনও আধিকার নেই আমার
মৃত্যু পরোয়ানা লেখা চিঠিতে শুধু সময় সংক্ষেপ
আমি তবুও দমতে পারি না, মনে হয় ঘুড়ে দাঁড়াই
জানি জীবনে একবার মরতে হবে।

তবে কেন মরার আগে মরব?

বৃষ্টি এসে আমাকে ভেজায় প্রবল ভাবে
এখন আমি বাঁচা মরার সন্ধিক্ষণে অপেক্ষারত
আমার এতদিনের জীবনের সব হিসেব-নিকেশ
চুকিয়ে দিতে হবে।

কোনও গড়মিল খুঁজে পেলেই
জারি হবে আদেশনামা।

সভ্য সমাজের আমি এখন কলঙ্ক
আমার চারপাশে এখন শকুনের দল

ছিঁড়ে খাবে বলে অপেক্ষা করে আছে ।

জীবন বাজি রেখে আমি এখন ডুব সাঁতার দিতে প্রস্তুত
চোরা অভিমানে আমার দেহ থেকে খসে পড়ছে বিদ্যুত
লড়াই করতে করতে আমি এখন ক্লান্ত
আমাকে গ্রাস করে নষ্ট চাঁদ 
পরিযায়ী ক্ষোভে জর্জরিত আমি
মাদক সেবনের উপকারিতার বিজ্ঞাপন দিলেই মুক্তি।

 

 

শত যোযন দূরে 

শত যোযন দূরে মস্ত ভীড়ে
হারিয়ে যাই ডাউন ট্রেনের জবরজংএ
উৎস্য কোথায় জানি না তার তীর
পায়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলে

চলতে গিয়ে খেই হারিয়ে যাই
হাপুস নয়ন কাঁদছে দেখি মা-ই
চুলের ওপর হালকা হাসি ঘ্রাণ
তুমি তখন সাধছ কোনও গান

ঝগড়া ছাড়া এই অবহে আর কি আছে
হতাশ আশায় স্বস্তি যদি বৃষ্টি নামে
পয়সা বাদে নগদ কিছু অর্থ চাই
মুখ লুকিয়ে কে চলে যায় কে জানে?

 

 

লাগামছাড়া 

অসংখ্য যে বাক্যবানে মৃত্যু তুফান ছুট
সহ্য করা সহজ সে কী দূরন্ত অদ্ভূৎ
নরক যেথা গুলজার আর স্বর্গ কলঙ্কিত
বোধের ঘরে মূর্খ থাকে চির অপরিচিত
বিশ্বাস যার মুখ লুকিয়ে আড়াল খোঁজে দ্রুত
প্রভুর কাছে ভিক্ষা মাগে আবেগে আপ্লুত


 

গায়েব কথার ইতিহাস 

রোমন্থন করতে করতে বাঙ্গালি কেবল হাত বাড়ায় অতীতে
সন্ধে থেকে মইপাট টিভির পর্দায় চোখ একের পর এক সিরিয়াল
আজ দূর্ঘটনা সমুদ্র স্নান করতে গিয়ে তিন জনের সলিল সমাধি
চোরা স্রোত বড় বেয়ারা কখন যে কার ওপর বদলা নেবে ...
ব্রেকের সময় এক আধবার খবরের আপডেট

দুখঃজনক ঘটনা ।

প্রতিদিন এভাবেই আমাদের মোসাহেবি ইতিহাস দোলে
পেন্ডুলামের মতন।

স্মৃতি আঁকড়ে ভাসতে থাকি উথাল-পাতাল
পথ শেষ হয়ে কানাগলি দেওয়ালে পিঠ -

এবার ঘুড়ে না দাঁড়ালে
রক্ষা করতে কেউ আসবে না।

নদীর জল বিপদসীমা ছুঁয়ে ফেলবে
চল নতুন করে ইতিহাস লিখি .........

 

অনার কিলিং


বাউন্ডারির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকিস রাত্রিদিন
হারিয়ে ফেলিস মখমলের সঙ্ঘা 
দাঁতাল হাতির পায়ে পায়ে খেলিস রাত্রিবাস
খুলিস জঙ্ঘা মধুবাতা রিতায়তে
চলছে ভালই বাঁধাগতে কেমন

ধাং কুর কুর বাদ্যি বাজে আর সাজে
তপস্বিনী বালিকা বধূ হলে মানায়?
দরদ উথলে উঠছে ফেনার মত
সফেন সাঁতার কাটার এমন মোহ
যা হিম্মত থাকে তো এলিট সমাজে


ঢ্যামনা ডোম পাড়ায় কেন?
ধানি লঙ্কায় যদি অত লোভ 
ভুলিয়ে দে না পুত্র শোক
খ্যাতির পাহারে চড়ে এ বিড়ম্বনা
যুতসই একটা জবাব চাই যে

মাতঙ্গিনী গোয়াল ঘরে 
নামাজ পড়ে সাহাদাত 
কে বলেছে মিলমিশ হবে
অনার কিলিং দেখেছেন
আরুশি হত্যা মামলা ঘুম ভাঙাক!

 

 

সন্তানের সাথে ছলনা

 

আমার প্রতিটি চলা বলে দিচ্ছে আমি প্রতারক
মধ্য দুপুর বেলা ভাবছি পাগল সাজিয়ে নিজেই নিজেকে
কেন পাঠিয়ে দিলাম না শলাকার অভ্যন্তরে?
যখন ফুল ফোটার আগে কুঁড়িটিকে লালন করার
প্রয়োজন ছিল, তখন মেতেছিলাম লোভ-লালসায়
অন্ধকার সেই পথের শেষ প্রান্তে এসে উপলব্ধি ---।

সন্তানের সাথে ছলনা আমার নিদারুণ ব্যথার
চোখ থেকে ঝরে পড়ছে জল, তবু অভিমান
সে একটি কথাও বলেনি আমাকে।
তার সমস্ত সম্বল কেড়ে নিয়ে আমি একা
বসে আছি অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মতো।
কে কার আবেগ মেখে সম্মুখে যায়?

ওকে দিশা দেখাতে না পারার জন্য কে দোষী?
ভাবছি নিজেই একটা রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার খুলে
সেখানে নিজের চিকিৎসা করাবো।
কেননা আমার মত মানসিক ভারসাম্যহীনকে
সবার আগে পাগলা গারদে পাঠানো উচিৎ।
আমি শঠ শুধু যে তাই নয়, প্রতারণা করেছি সন্তানের সাথে।

 

 


 

কবিতা সমগ্র
সুমন কুমার সাহু
হলদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ 

অদ্ভুদ জীবনের ছবি

আজি এ অদ্ভুদ জীবনের ছবি

আমি এঁকে চলি বারে বারে

জীবনের শত রঙ হাতে

তবুএ রঙে ডোবেনি

               -মোর তুলি 

 

যে ছবি এঁকেছি আগে

সে কবে ধুয়ে মুছে গেছে

তাই এঁকে চলি বারে বারে

জানি এও যাবে মুছে

          -এ জীবনের সাথে 

 

আমার এই অদ্ভুদ  ছবি

কবে গেছে মিশে জীবনের সাথে

শেষ হয়েও রয়ে যাবে সব ই

যদি কোনো দিন হাতে

             -তুলে নাও তুলি

 

শত রঙে রঙিও না

আমি যে শুধু তোমার রঙেতে রঙি

সে রঙ যদি না দাও তুমি

হতে প্রস্তুত আমি

           -অদ্ভুদ জীবনের ছবি।

 

বৃষ্টি ভেজা মন

বৃষ্টি ভেজা মন যে আমার

শুধু তোমাকেই চায়

থমকে দাঁড়ায় জীবন পথে

কখন বৃষ্টি থেমে যায়।

 

জমে ওঠা অভিমানী মেঘ

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ঝরে

কখন ও আবেগ ঝড়ো হয়ে

মুষল ধারায় কাঁদে।

 

তবু এ বর্ষায় মন

ভরসা রাখে প্রাণে

প্রেমের বন্যা বয়ে

তুমি আবার আসবে ফিরে!

উষা

বহুদিন পর আজ

মিশেছে কলম

সাদা নির্জীব কাগজে

সজীব সতেজ মন

উধাও চোখের ঘুম

-জেগে রোই তন্দ্রা আচ্ছন্নে

 

নির্মম শানিত

কলমের ধার

কেটে চলে বুলি খাতার 'পরে

ওই বুঝি ভোর হলো

ওই বুঝি উঠলো রবি

-মন পড়ে রয় জানালার ধারে

 

রাতের এই অন্ধকারে

মোমবাতি গলে চলেছে

ধীরে ধীরে নিঃশব্দে

ভোরের আলো ওঠার আগে

যদি যায় নিভে

-কলমের নিপিড়ন যাবে বুঝি থেমে

 

মনের এই দ্বন্দ খেলা

কলমের ছুটে চলা

একদিন যাবে থেমে

হয়তো সেদিন ঘুমিয়ে যাবো

মিলিযে যাবো অথৈ জলে

-চোখের বালি মিশে।

তীরের খোঁজে

একলা মনের রাত্রি কাঁদে

হায়েরে ভালবাসা

গভীর চোখের সরোবরে

ঝিলমিল আলেয়া।

 

পলক ফেলে মুক্ত ঝরে

শোকায়ে গভীর নিশ্বাসে

আকাশ কালো ঘন মেঘে

এখনো বুকের মাঝে।

 

কাটছে সময় ভাঙছে ঢেউ

ভালবাসার তীরে

অথেই জলে আমার কেউ

রয়েছে তীরের খোঁজে।

 

একলা মনে

তোমার কথা ভাবলে পরে

জল আসে চোখে

বুকের ভেতর শুন্য লাগে

একলা মনের মাঝে।

 

রয়েছো তুমি তোমায় নিয়ে

আমার থেকে দুরে

নেমে আসো দুগাল বেয়ে

তোমায় ভাবলে পরে।

 

বুকের মাঝে মেঘ হয়ে

থেকো চিরতরে

ভালোলাগার স্বপ্ন ধুয়ে

বৃষ্টি নামাও চোখে।

 

 

তুমি

তুমি আমার ভোরের আকাশ

স্বপ্ন মাখা দিন

তুমি আমার ঘুম ভাঙা চোখ

অনুভুতি দূরবিন।

তুমি আমার মেঘলা হাওয়া

বিদ্যুত ঝলকানি

তুমি আমার দুরন্ত রোদ্দুর

আলোক সন্ধানী।

তুমি আমার গোধূলির সুর

সন্ধ্যা রজনী

তুমি আমার রাতের তারা

মিটিমিটি লজ্জবতী।

তুমি আমার হৃদয়ের স্পন্দন

শব্দ সৃজনে

তুমি আমার জীবন কথা

কবিতা তোমাকে।

কবিতা সমগ্র
ঈপ্সিতা মন্ডল 
ওয়াটারলু, অন্টারিও, কানাডা

মাটির টানে


বাদল ঝরা দিনের শেষে মেঘবালিকা এসে,
বললে আমার কানে কানে, বললে আমায় হেসে,
`আসো যদি আমার সাথে ওই পাহাড়ের চূড়ায়,
তোমায় নিয়ে উধাও হব পাগল মেঘের ভেলায়;
রামধনুকের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে শেষে,
হাজির হব আমরা দু'জন ইন্দ্রদেবের দেশে;
শোক-দুঃখ-আঘাত-ব্যথা নেই তো সেথায় কিছু,
সারাটা দিন কাটিয়ে দেব মেঘের পিছু পিছু!
সূর্যদেবের রথে চড়ে ঘুরব সারা আকাশ;
কিংবা নেব মনের সুখে পারিজাতের সুবাস।
তোমার তরে নদীর তীরে রইব অপেক্ষায় –
পক্ষীরাজে উডিয়ে নেব একটি লহমায়!'
মেঘবালিকার কথা শুনে সইল না আর তর, –
রাঙামাটির পথটি বেয়ে চললেম নদী-চর।

গোধূলিবেলার আকাশ তখন খেলছে রাঙা সিঁদুর; –
এমন সময় শুনতে পেলেম করুণ বাঁশির সুর!
সে যে আমার রাখাল ছেলে – ডাক দিয়েছে আমায়, –
তারে ছেড়ে যাচ্ছি আমি কোন সে সুখের আশায়?
সেই তো আমার ইন্দ্রধনু, সেই তো আমার পারিজাত,
তারই স্পর্শে ভুলব সকল শোক-দুঃখ-আঘাত;
তার মধুর হাসি ভাসাবে মোর জগৎ-পারাবার,
তার বাঁশির সুরে দেব পাড়ি তিন-ভুবনের-পার!
ছুটব দু'জন হাওয়ার সাথে তেপান্তরের মাঠে;
সাঁঝের বেলা কাটবে মোদের কাজলাদিঘির ঘাটে; –
কাজলাদিঘির কালো জলে দেবে তখন ধরা,
স্বর্গলোকে আছে যত চন্দ্র-গ্রহ-তারা! 

তুষারদেশে


বৃষ্টির টুপটাপ নয়,
শুধুই নিঃশব্দে ঝরে যাওয়া,
প্রকৃতি যেন সাদা-কালো ক্যানভাস --
সূর্য-মেঘ আঁকে আলো-ছায়া।
মেতে যখন ওঠে পাগল হাওয়া
সে স্তব্ধতা হঠাৎ ভেঙে যায়;
ধূসর কালির আবছায়াতে মুড়ে,
সব কিছু সে উড়িয়ে নিতে চায়! 

তারই মধ্যে দুর্দমনীয় মানুষ,
চলেছে তার দৈনন্দিন কাজে;
শৈত্য প্রবাহ হোক না যতই প্রবল
অকর্মণ্য স্থবিরতা কি সাজে ?
অসহায় হয়ে থাকেনি সে বন্দী,
হিমেল হাওয়ার কঠোর নাগপাশে;
প্রকৃতিকে তার নিজের করে নিয়ে,
জয় করেছে নিতান্ত অনায়াসে।

সুবিস্তৃত তুষার ক্ষেত্র মাঝে
যন্ত্র পায়ে বরফের বুক চিরে,
দাপিয়ে বেড়ায় প্রবল উল্লাসে
পাখির মত হাওয়ায় ভর করে!
বরফ জমা শীতল ঘেরাটোপ
হয়েছে তার গতির মাধ্যম, --
হার-না-মানা প্রাণশক্তির কাছে
কিছুই যেন নয় আর দুর্গম।

সাদা-কালো


জানালা দিয়ে চাইলেই দেখা যায় --
বিস্তীর্ণ প্রান্তর, সাদা বরফে ঢাকা;
তারই কোণে ক'টি পর্ণমোচী বৃক্ষ,
বরফের পরতে মোড়া তাদের কৃষ্ণবর্ণ শাখা।

মধ্যেমধ্যে সে প্রলেপ ঝরে পড়ে,
উস্কানি দেয় তীব্র হিমেল হাওয়া;
খামখেয়ালী ভাঙন যেন ছোট্ট সাদা প্রাচীরে;
ভ্রুক্ষেপহীন কাঠবিড়ালীর ক্ষিপ্র আসা-যাওয়া।

মাঠের অন্য প্রান্তে চোখে পড়ে,
সগর্বে মাথা উঁচিয়ে গগনচুম্বী আবাসন;
বেড়ার গায়ে মোটরগাড়ির সারি,
তাদের দেহেও সাদা বরফের পুরু আস্তরণ।

এরই মাঝে আবার শুরু হয়
দমকা হাওয়া,নতুন তুষারপাত;
তুলোর পরতে আবার ভরতে থাকে
সযত্নে সাফ করা আবাসন-ফুটপাথ।  

অনুভব

ধূলি-ধূসর আঁধার রাতে,
দেখা হল তোমার সাথে;--
জাদুর কাঠি মনের ছোঁয়ায়
ভেসে গেলেম মাতাল হাওয়ায়;
চেয়ে দেখি, 'একি হল?'
আঁধার রাত মিলিয়ে গেল!”
সপ্তরঙের রামধনু ভোর
এঁকে দিলে দুই চোখে মোর!
তোমার আলোর অমলধারা
ভাঙল বুঝি রুদ্ধ কারা,
শুনতে পেলেম পাখির কূজন,--
ছিঁড়ল শিকল টুটল বাঁধন;
দুঃস্বপনের সুপ্তি শেষে
এলেম যেন হাসির দেশে!
জগৎজোড়া খুশির মাঝে
নিজেকে আজ পেলেম খুঁজে।

আজকে আমায় ডাক দিয়েছে
সাগরপারের দিগন্ত,--
আজকে আমার মনের মাঝে
চিরনবীন বসন্ত;
আজকে আমি মুক্ত পাখি
বাধা-বাঁধন ছাড়া,
আজকে আমায় স্বপ্ন দেখায়
দূর আকাশের তারা;
আজকে আমার মনের কথা
শঙ্খ-চিলের পাখায় পাখায়
নীলাম্বরের বক্ষপটে
মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়ায়!
তোমার স্নিগ্ধ করস্পর্শে
সাজল জগৎ নতুন সাজে,
আজকে তোমায় আপন করে
পেলেম আমি নিজের মাঝে।


স্বপ্নের ভোর

দীপ্ত সূর্য বাজাও তূর্য ঘুচাও কুজ্ঝটিকা,--

আর যেন মোরে ডরাতে না পারে আঁধারের বিভীষিকা;
হে প্রভাকর দাও এই বর তব মঙ্গল আলোকে,
অন্ধ-তমসা দুখের অমানিশা না রহে এ ধরালোকে;
হে জ্যোতির্ময় করিবারে জয় মিথ্যার কালরাত্রি,
ঘুচাও মূঢ়তা জাগাও দৃঢ়তা কর সত্যের যাত্রী।


যেদিকে তাকাই ধূসর কালো,
দিকে দিকে শুধু নিবিছে আলো,--
হে দেব, পুনঃ প্রদীপ জ্বালো
অন্ধ হৃদয়-গহ্বরে;
চক্ষু মোদের স্বপ্ন-বিভোর :--
আসবে কি সেই 'স্বপ্নের ভোর'?
গুনগুনিয়ে উঠবে ভ্রমর
রুক্ষ মনের কন্দরে!
উদিত হও হে নবারুণ,
ছড়াক ধরায় অরুণ কিরণ,
ঊষার আলোয় 'সোনার বরণ'
প্লাবিত হোক ধরিত্রী;
হিংসার আজি হোক পরাজয়,
পুষ্পের রঙে রাঙুক হৃদয়,
মানবজীবনে হোক অক্ষয়
প্রেম-ভালবাসা-মৈত্রী।

 

 

স্বপ্ন ছিল

স্বপ্ন ছিল বুকের মাঝে

যত্ন করে গাঁথা;
স্বপ্ন যে হায় পাখির মত
যায় কি তারে বাঁধা?
ভেবেছিলেম সোনার খাঁচায়
শিকল দিয়ে ধরে
রাখব তারে সারাজীবন
কেবল নিজের করে!
মুক্ত পাখি গায়ের জোরে
বন্দী করা যেই
বদ্ধ হলেম নিজেই যেন
সেই কারাগারেই;
'লালন করা স্বপ্ন তুমি
বাঁধন হয়ে শেষে
এলে আমার জীবন জুড়ে
দুঃস্বপনের বেশে?
কেন তবে এমন করে
চেয়েছিলেম তোমায়?
দুলিয়েছিলে হৃদয় কেন
এমনি দুরাশায়?'

উড়িয়ে দিলেম বন্দী পাখি
মুক্তি পাওয়ার আশায়,
কঠিন কঠোর বাস্তবেতেই
যুঝতে হবে আমায়;
থাক না পাখি বনের মাঝে
থাক না অমনি ছাড়া -
জানলা দিয়ে দেখব তারে
নাই বা দিল ধরা?
ভালবেসে নিজেই যদি
আসে আমার তরে,
বরণ করে নেব তখন
নেব আপন করে।

কবিতা সমগ্র
রবীন ঘোষ
বরিশাল, বাংলাদেশ
রবীন ঘোষের জন্ম বরিশালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'হিরণ্ময় তোমার হাতে' প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৬ তে। 'পিলসুজে সাঁঝের বাতি' তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। কবিতা লেখার শুরু ১৯৭৩-৭৪ সালে। 'সুনীল করতল' নামে তখন বহুল প্রশংসিত কবিতা পত্রিকার সম্পাদকদ্বয়ের একজন। সেই সময় নিয়মিত সাময়িকী বা পত্র পত্রিকায় কবিতা লিখেছেন। কর্মব্যস্ততায় অনেক বছর লেখালেখির জগতে না থাকলেও ২০১৩-১৪ সাল থেকে আবার লিখতে আরম্ভ করেন। পেশায় তিনি একজন চিকিৎসক। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ। ছাত্রজীবন শুরু বরিশালের 'প্রভাতী স্কুলে'। পরবর্তীকালে 'ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের' পরিধি ছাড়িয়ে 'ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ' থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। 'শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ' থেকে এম বি বি এস পাশ করেন। থাইল্যান্ড থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন। বিদেশেও ছিলেন কয়েক বছর। বর্তমানে রবীনবাবুর কর্মস্থল ও বাসস্থান বরিশাল শহরেই।

১) একলা ডিঙা

 

যেন হোঁচট খেয়ে উঠোনে চলে এলো রোদ

মিহিদানা মেঘে ছেয়ে আছে আকাশের মুখ

 

ভেবেছিলে মুঠোহাত খুলে দিলে অন্ধকারে চিতার অঙ্গার

ভেবে নিলে, বৈঠকখানার রঙচটা সোফায়

আসনপিঁড়ি করে বসে থাকে বিষন্ন গোধূলি

 

সুবর্ণ ঘোড়ায় টানা রথ থেমে যায় দিগন্তের পাড়ে,

নদীর শিরশিরে হাওয়া, জ্যোৎস্না খেয়ে নেয়া বিস্তৃত জল

বাঁকের মুখে শতবর্ষী বটবৃক্ষের মূল

 

সেইখানে চকমকে জলে দোলে আনন্দীর খেয়া

                                       একা -

আমাদের বেদনায় ঋষি, একাকিত্ব আর নক্ষত্রের আলো

জলের আলোড়নে সবই একাকার।

 

ভোর হয়। দূরে শোনা যায় স্তোত্রধ্বনি কার -

 

 

২) দাগ পড়ে থাকে

 

নিকষ কলসের গায়ে ফুটে ওঠে বাসনা-মুকুর

সন্তর্পণে - - - অতি ধীরে

হে আমার প্রিয় সখী, অধীত প্রণয়

 

হৃদের বিস্তৃত শানকীতে মুখ দেখে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চাঁদ

হেমন্তের ঝরাপাতায় কোন দূরের আগুনের ধূলো

বিরান ঝিলের বুকে জন্মের শোধ হাসে কুমারী শালুক

 

বুকের ভেতরে তান্ডব বর্ষণ

বুকের ভেতরে অস্ফুট দুধধান

বুকের ভেতরে ঝগরুটে রাগী শালিক

 

কুয়াশা ঢাকা ভোরে আকুল খেয়াটির কাছে ফিরি

যেইখানে রূপটান দিয়ে এইমাত্র জেগেছে দিগন্ত

 

সেইখানে প্রার্থনার দুইহাত তুলে ধরি ,

যদি জলের দাগ পড়ে থাকে বিশীর্ণ খাড়ির উপরে

শিঙ্গাধ্বনি অন্তরিক্ষে, ভুল জীবনের ছায়া পথ থেকে --

 

হে আমার প্রিয় সখী, অধীত প্রণয়

 

৩) দূরের তুমি

 

বৃত্তের শহর থেকে বেরিয়ে আসি, নর্তকিরাও সাজঘরে

মুখোশ পরে আজ যে মেয়েরা মজলিস মাতিয়ে গেলো

তারাও পায়ের মল খুলে ফিরে গেছে আবাসনে।

 

টেবিলে আধাশেষ গ্লাস ; টুকরো খাবার ইতস্তত ছড়িয়ে চারিদিকে।

একটু পরে কেতাদুরস্ত বালকেরা এসে সব ধুয়ে মুছে দেবে।

 

জলের ধারা এসে শুকিয়েছে জঙ্গলেরই এইপাশে

ত্রস্ত চোখ হরিণীরা গুটিপায়ে ক্ষীনকায়া নদীটির ধারে

বাতাসের মর্মর শুনি, তোমার বসতী বুঝি অরণ্য ছাড়িয়েও

-       আরো দূরে ?

৪) জ্বলে যায়

 

যেখানেই হাত রাখ, সবুজের গহীন অরণ্য

নিমিষেই ছাই হয় আবাদী জমিন

পাখপাখালির আওয়াজ, ভয়ার্ত বনভূমি;

 

শ্রমণের গৈরিক বসন

নির্বাসনে হেঁটমাথা দেহাতী দোতারা –

 

ঋতু বদল হলে পাতাঝরার দিন

পাহাড়ের মাঝ দিয়ে চলা সরুপথ

বিবর্ণ শুকনো পাতায় নিজেকে ঢেকে ফেলে –

 

তোমারও সময় হল এবার

বুকের সবুজ শ্বাস যেটুকুই বাকি ছিল

হাত রাখ, জ্বলে যাক সেইটুকু দাবানলে।

৫) অক্ষর

 

একটি অক্ষরের মত থাকে স্বপ্নে ও পথে

রক্তের শতদল

ফুটে আছে পদ্মঝিলে গভীরে অতলে –

 

একটি অক্ষরের মতই উৎফুল্ল অরণ্যে

প্রাকৃতিক সুবর্ণ আভা

কতো মমতায় জেগে ছিল মিছিলের হাতে –

 

আমারই কবিতার ভাষা, মায়া বসনের রঙ!

 

 

 

৬) মায়াজাল 

 

ঊষা মুহূর্তের আলোর অন্যরকম মায়া থাকে

নদীজলে মায়াজাল –

ডুব দিলে আলোময় সমস্ত শরীর ।

কপালের ঠিক মধ্যখানে কোন এক হিরন্ময়

স্পর্শ লেগে উজ্জল হয়ে ওঠে নিম্নগামী দেহ

 

ঢেউ ভেঙে আদর মাখে নদীপাড়ের বালুকণা,

পাখিদের কলরব, আড়মোড়া ভেঙে জাগে অরণ্যসংসার,

অবারিত ধানক্ষেত, বল্কলে আবৃত মোহ –

এই আমি, এই তুমি শুয়ে থাকি আলোময়

তটিনী প্রান্তরে, নিস্কলুষ আদুল শিশুদের মতো –

কবিতা সমগ্র
তাপসকিরণ রায় 
জব্বলপুর, মধ্যপ্রদেশ

ঢাল নেমে গেল
            
আকাশ দেখে উদার হতে পারো নি 
বাতাসের স্পর্শে পারো নি 
শিশুর চঞ্চলতা শরীরে মাখতে 
বৃষ্টির ধারাপাতে জীবনের 
    অবিন্যস্ত শরীর তোমার 
     নিয়ম ভেগেছে বারবার
চৈত্রের খরায় তৃষিত মৃগ হয়ে 
ছুটে গেছ মরীচিকার মুখে 
বৈশাখের জন্মে ঝড়ের দাপটে 
ভাঙ্গা শান্তির মোহ তোমার নেই 
শ্রাবণের ধারায় বয়ে যায় মন
দুরের প্রিয়র মর্ম ব্যথা...
কাঁদে বকুল কুড়োনো বেলা 
মেঘলা আকাশ বাষ্পে 
ঝাপসা ছবির মলাট
প্রকৃতির নিয়ম ভাঙ্গার 
সৃষ্টি ছাড়া খেলায় মেতেছ তুমি 
অস্থির চৈতন্য তোমায় 
        সাগরে ভাসায়...
সবুজ দ্বীপের স্বপ্ন ভেঙ্গে বন্যা এলো
ছন্ন ছাড়া জীবনের 
ঢাল নেমে গেল 
ভয়াবহ খাই ধরে.

 

 

একটি জোনাকী

অন্ধকারকে লজ্জা দিয়ে  যায় একটি জোনাকি
তোমার আলোকিত স্নাত দেহ 
সূর্যের আলো নিয়ে খেলা করে ,
সূর্য ডোবা কালো আঁধারের ওপারে ওঠে চাঁদ
সন্ধ্যার রাগিণী উদাসী সুরে 
করুণার গোধূলি ছড়ায় 
গৃহ গৃহবধূর চোখে জ্বলে ওঠে প্রদীপ শিখা
চন্দন তিলকে সাজা চর্চিত শরীর তোমার 
চাঁদের শরীরে কি সত্যি কলঙ্কের টিকা!
নাকি,ঈর্ষার জ্বালায় গালে দাও কাজলের ফোঁটা 
সর্বনাশী নজর এড়াতে!
কৃষ্ণ তিলে তুমি রাঙ্গাও মন--
কৃষ্ণ বিহীন যমুনা তীরে  
গোপী চরে ব্রজ হীন 
ডুবে থাকে উলঙ্গ চাঁদ.
আলোর পিপাসা নিয়ে এ কি সর্বনাশা
খেলা তোমার!     

 

 

এঁদো পুকুর,মশার ডিম
                  
মিষ্টি চাঁদের রুপোলি চামচের  
ভাঙ্গা দাঁতে মুখ দেয় কুব্জি বুড়ি, 
এঁদো পুকুরের মাছহীন নর্দমা ভাসে 
                                মশার ডিমের ঝাঁক, 
অস্থিরতা জমে কুমীরের মুখে 
হাঁ-করা হাঙ্গরের লেজ কে যেন দেখে ছিল আজ মনে নেই! 
              ভুতের শিশুর অন্য জন্মে মানুষের শ্বাসে 
বাসা বাঁধার আশায় আকাশের আগুনে সেঁকে রুটি,
সবুজের মাঠে ছেঁড়া স্বপ্নরা মেঘে করে অন্ধকার,
          আগুনে যন্ত্রের মানুষ বুকে তাপে আগামী বীজ.
কালো ছেলেটার পেটে জমা পাথরের কুঁচি,
                     অবুঝ চিৎকারে বনের বধিরতা-- 
অন্ধকার গ্রহণের দিনে চাঁদ তারা ছেঁটে 
                      বাগান পেড়িয়ে সময়ের পথ গড়ে।
 ফুটে উঠা ভ্রূণ প্রাণিত স্পন্দন হারায়
মৃত শরীরে ফোটে অচেতন বৃদ্ধিতা
যন্ত্র মানব শাসিত পৃথিবীটা হেঁটে পার করে ... 

কাপালিকের ফুসলানো চিতা আগুনে 
                           খাদ্যের অভয়ে চাল ফোটে,
শামুকের লক্ষ বছর গুটানো ফসিল  
লক্ষ বছর পেছন থেকে বেরিয়ে এলো কদাকার কোনো জীব।

কেউ তো জ্বলে 

কেউ তো জ্বলে 

তাই আলো দেয় সে 

  প্রদীপের বুকে কাঁপে 

তেলের ঔযষে 

প্যাচানো সলতের পীড়ায় 

        মৃত্যুর ধীর যন্ত্রণ।

 

তেজস্ক্রিয় আত্মার খোলসে 

    বিস্ফোরণের বোমা ফাটে 

প্রতিবাদী সংজ্ঞায়।

আকাশ ফাটে সূর্যের বেদনায় 

রং ঝরে গোধুলির 

 

শক্তির সততা বুকের অগ্নি-দাবে

অঙ্গারে ভাঙ্গে গড়ে

হীরকের উজ্জল দ্যুতি। 

ক্ষয়িত লাভা আগুনের বন্যায় ছোটে

লৌহ সভ্যতার হাতিয়ার। 

 

মন পোড়ে

আঁখির পলকে জমে বরফের ছেঁটা পরশ।

উমোষ হৃদয়ে পোড়ে

সবুজ রং,পাখীর পালক 

ভোরের পূব আকাশে 

শেষ চিহ্নের ঈশ্পাতি ধোঁয়া ওড়ে।   

ঘুড়ির ঠিকানা

 

ছোট বেলায় ঘুড়ি উড়িয়েছি

দুপুর বেলায় আঠা ও কাঁচ গুঁড়োয় দিয়েছি মাঞ্জা

লাট খেয়েছে ঘুড়ি,প্যাঁচের মারণে

অবশেষে সেই ভোঁ কাটা...

 

ছুটেছি ঘুড়ির পেছনে

অলঙ্ঘ সে ডোরে

হাতের মুঠোয় তাকে নামিয়াছি

 

আজ বড়বেলাতেও ঠিক তেমনি

হাঁটু গেঁড়ে সুত ছাড়ি

অবলীলার এ ঘুড়ি কাটাকাটি

আজও চলেছে ...

 

আজও অদৃশ্য ঘুড়ির শিকড়ে

জল ঢালি

চিহ্নহীন সে আকাশ স্বপ্ন

বৃন্তচ্যুত সে ঘুড়ির মত

হাতে ধরা অনিয়ন্ত্রিত লাটাই

পাই নি সেই ঘুড়ির ঠিকানা ।।  

ঘষে মুছে দিলে দাগ

 

আয়না দেখলে বারবার
কোথাও তো নেই সে চিহ্ন 
মনের ভিতর 
       স্মৃতি ছেঁড়া বাকলে
দেওয়াল লিখনে, শিল্পীর আঁকা চোখ
ভেসে ওঠা তুমি,
লিখে নেও তুমি কোনো নাম হৃদয়ে তোমার  
'ইতি'-লেখা কোনো চিঠির পাতায় 
ছাপা দাগ, ছাঁচের পরতে লাগা অবিকল তুমি 
উঠে আছে পুবের তীর বাওয়া 
নাবিকের ছায়া শরীর--মিশে গেল জনতার ভিড়ে 
মুছে নিলে মুখ --সমস্ত এঁটো কাঁটা যা ছিল লেগে
বিকিরণ ফাঁদে--হৃদয়ের কাঁটা ছিল বেঁধা 
ব্যথার জানালা দিয়ে  
পরিচ্ছদের পৃষ্ঠা থেকে কেটে দিলে 
তবু খচ খচ ব্যথার সাল গড়া জলে ভিজে,
খরায় শুকোয়--টন টন জমা দুঃখ 
মুছে ফেলতে পারো নি তুমি 
নিজের রূপ দেখে নিজেই হয়েছ মোহিত 
কে ছড়ালো সাত রঙা বর্ণ চোরা রং!  

পলাশের বসন্ত ঠোঁটে

 

আমারও বয়স ছিলো
মনের উঁকি ঝুঁকি ইচ্ছাগুলি...
আকাশের ছায়া এসে আমার গায়ের 
ওড়না উড়াত... 

আমার য়ে ছিলো ভালবাসা 
গোলাপের বৃন্তে তবু কাঁটার আঁচড়  
আমার ঘুমন্ত মুখ সুপ্ত গহ্বরে 
পাতা কাটা কিছু কীট 
বিরক্তির ঘিন ঘিন ভাবনায় 
জেগে ওঠা মন ছিলো...

সীমান্তের ভাঁজ চুলে
লালিম গোধূলি আঁকা 
ললাট লিখন আঁচরে ছিলো 
গোল ছবি চাঁদ!

আমার ইচ্ছে ছিলো
সমস্ত সবুজতায় পৃথিবী ছুঁয়ে যাক
আঁকিবুঁকি মন্দাক্রান্তা 
কবিতার ছবিতে নীল সমুদ্র
কিম্বা  ভোরের জেগে ওঠা 
মিষ্টি রোদ্দুরে স্থির বসে থাকি 
ঘ্রাণ নিই মুকুলের
পলাশের বসন্ত ঠোঁটে 
শেষ চুম্বন আঁকা থাক আমার।

অবাধ বাগানে 


হাভাতে ভিখারী রাস্তার পাতা চাতে,
খোলসের নীচে কে রাজা কে ফকির!
জীবনটা তো জামা পাল্টাবার মতো নয়  
ক্ষনস্থায়ী তামাশার চমক। 
ম্যাজিকের খালি হাত 
সোনা ধরে আকাশের মুঠোয়্,
পুরনো রাজবাড়ী ঘুমোয় নীশিথে,
অঙ্কের ছকে সরে না কুয়াশার আস্তরণ।
          
গাছের  তালে ও বেধেছে বাসা,
অনাম এ পৃথিবী ঘুরছে তো ঠিক ঠাক!
মন-প্রানের ঠিকানা কোথায়,
জীবনকে ঘিরে থাকা দেওয়াল নিরাপত্তা--
মানুষ নয়,পোষা কুকুর ঘুমায় বিছানায়।
                   

গরম ঠান্ডা কিছু নয়,
তুমি ঘুমাছ না জেগে আছ 
অথবা স্বপ্নের ঘর ভাঙ্গা খেলায় 
সাদা কাপড় জড়িয়ে 
দেওয়াল ভেদের খেলায় মেতেছ।
আছি,নেই হওয়ার দোলায়
কেমন চলছি, বলছি, হাসছি, খেলছি দেখ--
এই জ্যোত্স্না রাতের অবাধ বাগানে 
কেউ কি আছ কথাও?

আর এক জন...

পেলেই থেমে যায় চাওয়া পাওয়া

তার চেয়ে কিছু না পাওয়া থাক না মন জুড়ে!

তাকে মনে পড়ে , অনেক পথ এক সাথে

এগিয়ে যাবার যে স্মৃতি

হারিয়ে গেল, এখনো কোন আস্বিনের ঝড়ে

সে কথা মনে পড়ে

সে শীতল বিছানো পাটিতে

এক হলেও আর এক জন...।

কিছু আঁচড় চিহ্ন

 

লিখি 

তবু থেকে যায় আরও কিছু না বলার প্রচ্ছদ,

পৃষ্ঠার মলাট ছবি ভরাতে পারে না মন.

সে নদী ছোট হতে হতে

কিছু আঁচর চিহ্ন নেয় ঠাঁই 

কিছু বালি রেখার নীচে সে থাকে ঘুমিয়ে...

 

একান্ত আপন কোনো লেখা

যদিও স্পর্শ করে বুকের সান্নিধ্য.

সীমিত শব্দের ছকে কতটুকু পায় প্রাণ !

কতটুকু এঁকে তোলা সে ছবি 

নৈরাশ্যের শুন্যতা পেরেছে ভাঙতে?

 

কখনো স্তব্ধতায় মুখর থাকে ভিতর কলহ.

নিদ্রায় কল কল শব্দ ভাঙে ঢেউ!

ভাঙা চোরা সে কল কব্জা জুড়ে 

কখনো কি 

একত্রতা খুঁজে পাবে?

তবু একান্তে নদীর কুল ভাঙবে,

কিছু আঁকিবুকি রেখা নিয়ে 

তার লেখা চলবে অতল মানসে!

 

 

মৃত শরীর  


বেমানান শিশুদের গাম্ভীযর্তা,

শ্বাশত সত্য কি আত্মার অমরতা?

ক্ষমা যেচে যায়, 

মৃত শরীর পালায়

বিছানা খালি রেখে,

রঙ্গিন কাগজ ঢেকে 

ফুলদান

বাড়ায় মান,

খোলা আকাশ ছাদে

বেদনা কাঁদে!

রাতের আঁধার 

চোখ ধাঁধার,

স্বপ্ন কাটে

পথে ঘাটে,

শুন্য হাতে 

কি তুমি চাও?

দেবতার চরণে তাও

চড়েছে নৈবেদ্য,

দুর্ভেদ্য 

সুচিকায় গাঁথা মালা--

জ্বালা

বেঁধা বুক, 

ধুক ধুক 

 

পাখীর দুঃখ নিয়ে 

খাঁচা ভোলানোর গান দিয়ে

আমায় আটক করেছ তুমি!

তুমি ছুঁয়ে আছ ভূমি

মাথায় আকাশ নিয়ে 

ভাবনা ভুলিয়ে

অস্থির

স্থবির ।।

কবিতা সমগ্র
তাপসকিরণ রায় 
জব্বলপুর, মধ্যপ্রদেশ

ঢাল নেমে গেল
            
আকাশ দেখে উদার হতে পারো নি 
বাতাসের স্পর্শে পারো নি 
শিশুর চঞ্চলতা শরীরে মাখতে 
বৃষ্টির ধারাপাতে জীবনের 
    অবিন্যস্ত শরীর তোমার 
     নিয়ম ভেগেছে বারবার
চৈত্রের খরায় তৃষিত মৃগ হয়ে 
ছুটে গেছ মরীচিকার মুখে 
বৈশাখের জন্মে ঝড়ের দাপটে 
ভাঙ্গা শান্তির মোহ তোমার নেই 
শ্রাবণের ধারায় বয়ে যায় মন
দুরের প্রিয়র মর্ম ব্যথা...
কাঁদে বকুল কুড়োনো বেলা 
মেঘলা আকাশ বাষ্পে 
ঝাপসা ছবির মলাট
প্রকৃতির নিয়ম ভাঙ্গার 
সৃষ্টি ছাড়া খেলায় মেতেছ তুমি 
অস্থির চৈতন্য তোমায় 
        সাগরে ভাসায়...
সবুজ দ্বীপের স্বপ্ন ভেঙ্গে বন্যা এলো
ছন্ন ছাড়া জীবনের 
ঢাল নেমে গেল 
ভয়াবহ খাই ধরে.

 

 

একটি জোনাকী

অন্ধকারকে লজ্জা দিয়ে  যায় একটি জোনাকি
তোমার আলোকিত স্নাত দেহ 
সূর্যের আলো নিয়ে খেলা করে ,
সূর্য ডোবা কালো আঁধারের ওপারে ওঠে চাঁদ
সন্ধ্যার রাগিণী উদাসী সুরে 
করুণার গোধূলি ছড়ায় 
গৃহ গৃহবধূর চোখে জ্বলে ওঠে প্রদীপ শিখা
চন্দন তিলকে সাজা চর্চিত শরীর তোমার 
চাঁদের শরীরে কি সত্যি কলঙ্কের টিকা!
নাকি,ঈর্ষার জ্বালায় গালে দাও কাজলের ফোঁটা 
সর্বনাশী নজর এড়াতে!
কৃষ্ণ তিলে তুমি রাঙ্গাও মন--
কৃষ্ণ বিহীন যমুনা তীরে  
গোপী চরে ব্রজ হীন 
ডুবে থাকে উলঙ্গ চাঁদ.
আলোর পিপাসা নিয়ে এ কি সর্বনাশা
খেলা তোমার!     

 

 

এঁদো পুকুর,মশার ডিম
                  
মিষ্টি চাঁদের রুপোলি চামচের  
ভাঙ্গা দাঁতে মুখ দেয় কুব্জি বুড়ি, 
এঁদো পুকুরের মাছহীন নর্দমা ভাসে 
                                মশার ডিমের ঝাঁক, 
অস্থিরতা জমে কুমীরের মুখে 
হাঁ-করা হাঙ্গরের লেজ কে যেন দেখে ছিল আজ মনে নেই! 
              ভুতের শিশুর অন্য জন্মে মানুষের শ্বাসে 
বাসা বাঁধার আশায় আকাশের আগুনে সেঁকে রুটি,
সবুজের মাঠে ছেঁড়া স্বপ্নরা মেঘে করে অন্ধকার,
          আগুনে যন্ত্রের মানুষ বুকে তাপে আগামী বীজ.
কালো ছেলেটার পেটে জমা পাথরের কুঁচি,
                     অবুঝ চিৎকারে বনের বধিরতা-- 
অন্ধকার গ্রহণের দিনে চাঁদ তারা ছেঁটে 
                      বাগান পেড়িয়ে সময়ের পথ গড়ে।
 ফুটে উঠা ভ্রূণ প্রাণিত স্পন্দন হারায়
মৃত শরীরে ফোটে অচেতন বৃদ্ধিতা
যন্ত্র মানব শাসিত পৃথিবীটা হেঁটে পার করে ... 

কাপালিকের ফুসলানো চিতা আগুনে 
                           খাদ্যের অভয়ে চাল ফোটে,
শামুকের লক্ষ বছর গুটানো ফসিল  
লক্ষ বছর পেছন থেকে বেরিয়ে এলো কদাকার কোনো জীব।

কেউ তো জ্বলে 

কেউ তো জ্বলে 

তাই আলো দেয় সে 

  প্রদীপের বুকে কাঁপে 

তেলের ঔযষে 

প্যাচানো সলতের পীড়ায় 

        মৃত্যুর ধীর যন্ত্রণ।

 

তেজস্ক্রিয় আত্মার খোলসে 

    বিস্ফোরণের বোমা ফাটে 

প্রতিবাদী সংজ্ঞায়।

আকাশ ফাটে সূর্যের বেদনায় 

রং ঝরে গোধুলির 

 

শক্তির সততা বুকের অগ্নি-দাবে

অঙ্গারে ভাঙ্গে গড়ে

হীরকের উজ্জল দ্যুতি। 

ক্ষয়িত লাভা আগুনের বন্যায় ছোটে

লৌহ সভ্যতার হাতিয়ার। 

 

মন পোড়ে

আঁখির পলকে জমে বরফের ছেঁটা পরশ।

উমোষ হৃদয়ে পোড়ে

সবুজ রং,পাখীর পালক 

ভোরের পূব আকাশে 

শেষ চিহ্নের ঈশ্পাতি ধোঁয়া ওড়ে।   

ঘুড়ির ঠিকানা

 

ছোট বেলায় ঘুড়ি উড়িয়েছি

দুপুর বেলায় আঠা ও কাঁচ গুঁড়োয় দিয়েছি মাঞ্জা

লাট খেয়েছে ঘুড়ি,প্যাঁচের মারণে

অবশেষে সেই ভোঁ কাটা...

 

ছুটেছি ঘুড়ির পেছনে

অলঙ্ঘ সে ডোরে

হাতের মুঠোয় তাকে নামিয়াছি

 

আজ বড়বেলাতেও ঠিক তেমনি

হাঁটু গেঁড়ে সুত ছাড়ি

অবলীলার এ ঘুড়ি কাটাকাটি

আজও চলেছে ...

 

আজও অদৃশ্য ঘুড়ির শিকড়ে

জল ঢালি

চিহ্নহীন সে আকাশ স্বপ্ন

বৃন্তচ্যুত সে ঘুড়ির মত

হাতে ধরা অনিয়ন্ত্রিত লাটাই

পাই নি সেই ঘুড়ির ঠিকানা ।।  

ঘষে মুছে দিলে দাগ

 

আয়না দেখলে বারবার
কোথাও তো নেই সে চিহ্ন 
মনের ভিতর 
       স্মৃতি ছেঁড়া বাকলে
দেওয়াল লিখনে, শিল্পীর আঁকা চোখ
ভেসে ওঠা তুমি,
লিখে নেও তুমি কোনো নাম হৃদয়ে তোমার  
'ইতি'-লেখা কোনো চিঠির পাতায় 
ছাপা দাগ, ছাঁচের পরতে লাগা অবিকল তুমি 
উঠে আছে পুবের তীর বাওয়া 
নাবিকের ছায়া শরীর--মিশে গেল জনতার ভিড়ে 
মুছে নিলে মুখ --সমস্ত এঁটো কাঁটা যা ছিল লেগে
বিকিরণ ফাঁদে--হৃদয়ের কাঁটা ছিল বেঁধা 
ব্যথার জানালা দিয়ে  
পরিচ্ছদের পৃষ্ঠা থেকে কেটে দিলে 
তবু খচ খচ ব্যথার সাল গড়া জলে ভিজে,
খরায় শুকোয়--টন টন জমা দুঃখ 
মুছে ফেলতে পারো নি তুমি 
নিজের রূপ দেখে নিজেই হয়েছ মোহিত 
কে ছড়ালো সাত রঙা বর্ণ চোরা রং!  

পলাশের বসন্ত ঠোঁটে

 

আমারও বয়স ছিলো
মনের উঁকি ঝুঁকি ইচ্ছাগুলি...
আকাশের ছায়া এসে আমার গায়ের 
ওড়না উড়াত... 

আমার য়ে ছিলো ভালবাসা 
গোলাপের বৃন্তে তবু কাঁটার আঁচড়  
আমার ঘুমন্ত মুখ সুপ্ত গহ্বরে 
পাতা কাটা কিছু কীট 
বিরক্তির ঘিন ঘিন ভাবনায় 
জেগে ওঠা মন ছিলো...

সীমান্তের ভাঁজ চুলে
লালিম গোধূলি আঁকা 
ললাট লিখন আঁচরে ছিলো 
গোল ছবি চাঁদ!

আমার ইচ্ছে ছিলো
সমস্ত সবুজতায় পৃথিবী ছুঁয়ে যাক
আঁকিবুঁকি মন্দাক্রান্তা 
কবিতার ছবিতে নীল সমুদ্র
কিম্বা  ভোরের জেগে ওঠা 
মিষ্টি রোদ্দুরে স্থির বসে থাকি 
ঘ্রাণ নিই মুকুলের
পলাশের বসন্ত ঠোঁটে 
শেষ চুম্বন আঁকা থাক আমার।

অবাধ বাগানে 


হাভাতে ভিখারী রাস্তার পাতা চাতে,
খোলসের নীচে কে রাজা কে ফকির!
জীবনটা তো জামা পাল্টাবার মতো নয়  
ক্ষনস্থায়ী তামাশার চমক। 
ম্যাজিকের খালি হাত 
সোনা ধরে আকাশের মুঠোয়্,
পুরনো রাজবাড়ী ঘুমোয় নীশিথে,
অঙ্কের ছকে সরে না কুয়াশার আস্তরণ।
          
গাছের  তালে ও বেধেছে বাসা,
অনাম এ পৃথিবী ঘুরছে তো ঠিক ঠাক!
মন-প্রানের ঠিকানা কোথায়,
জীবনকে ঘিরে থাকা দেওয়াল নিরাপত্তা--
মানুষ নয়,পোষা কুকুর ঘুমায় বিছানায়।
                   

গরম ঠান্ডা কিছু নয়,
তুমি ঘুমাছ না জেগে আছ 
অথবা স্বপ্নের ঘর ভাঙ্গা খেলায় 
সাদা কাপড় জড়িয়ে 
দেওয়াল ভেদের খেলায় মেতেছ।
আছি,নেই হওয়ার দোলায়
কেমন চলছি, বলছি, হাসছি, খেলছি দেখ--
এই জ্যোত্স্না রাতের অবাধ বাগানে 
কেউ কি আছ কথাও?

আর এক জন...

পেলেই থেমে যায় চাওয়া পাওয়া

তার চেয়ে কিছু না পাওয়া থাক না মন জুড়ে!

তাকে মনে পড়ে , অনেক পথ এক সাথে

এগিয়ে যাবার যে স্মৃতি

হারিয়ে গেল, এখনো কোন আস্বিনের ঝড়ে

সে কথা মনে পড়ে

সে শীতল বিছানো পাটিতে

এক হলেও আর এক জন...।

কিছু আঁচড় চিহ্ন

 

লিখি 

তবু থেকে যায় আরও কিছু না বলার প্রচ্ছদ,

পৃষ্ঠার মলাট ছবি ভরাতে পারে না মন.

সে নদী ছোট হতে হতে

কিছু আঁচর চিহ্ন নেয় ঠাঁই 

কিছু বালি রেখার নীচে সে থাকে ঘুমিয়ে...

 

একান্ত আপন কোনো লেখা

যদিও স্পর্শ করে বুকের সান্নিধ্য.

সীমিত শব্দের ছকে কতটুকু পায় প্রাণ !

কতটুকু এঁকে তোলা সে ছবি 

নৈরাশ্যের শুন্যতা পেরেছে ভাঙতে?

 

কখনো স্তব্ধতায় মুখর থাকে ভিতর কলহ.

নিদ্রায় কল কল শব্দ ভাঙে ঢেউ!

ভাঙা চোরা সে কল কব্জা জুড়ে 

কখনো কি 

একত্রতা খুঁজে পাবে?

তবু একান্তে নদীর কুল ভাঙবে,

কিছু আঁকিবুকি রেখা নিয়ে 

তার লেখা চলবে অতল মানসে!

 

 

মৃত শরীর  


বেমানান শিশুদের গাম্ভীযর্তা,

শ্বাশত সত্য কি আত্মার অমরতা?

ক্ষমা যেচে যায়, 

মৃত শরীর পালায়

বিছানা খালি রেখে,

রঙ্গিন কাগজ ঢেকে 

ফুলদান

বাড়ায় মান,

খোলা আকাশ ছাদে

বেদনা কাঁদে!

রাতের আঁধার 

চোখ ধাঁধার,

স্বপ্ন কাটে

পথে ঘাটে,

শুন্য হাতে 

কি তুমি চাও?

দেবতার চরণে তাও

চড়েছে নৈবেদ্য,

দুর্ভেদ্য 

সুচিকায় গাঁথা মালা--

জ্বালা

বেঁধা বুক, 

ধুক ধুক 

 

পাখীর দুঃখ নিয়ে 

খাঁচা ভোলানোর গান দিয়ে

আমায় আটক করেছ তুমি!

তুমি ছুঁয়ে আছ ভূমি

মাথায় আকাশ নিয়ে 

ভাবনা ভুলিয়ে

অস্থির

স্থবির ।।

Please mention the "name of the articles and the authors" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Maadhukari explores Bengali Literature Around The World