sea4.jpg

প্রচ্ছদঃ সুরজিৎ সিনহা, হলদিয়া 

প্রবন্ধ

kadombori1.png

গল্প 

kolkata-sketch1.jpeg
 

জুন ২০২২ সংখ্যা 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

 
touch.jpg

ব্যস্ততার মধ্যরাত

 

ব্যস্ততার মধ্যরাত 

গভীর নক্ষত্রস্বেদ শ্রমে 
স্ফুট শব্দে মহাকাব্য পড়ে পেচক 
যাযাবর ইচ্ছা উত্তরণের দোরগোড়ায় 
সমাপতনে ভোর আসবে বলে 
বুলবুলির ল্যাজ মধ্যরাতে 

জবরদখল থাকবে না শশব্যস্ত রহস্যে 

এই আশা সুনিশ্চিত। 

ধূমপান নিষেধ মধ্যরাতে

পবিত্র জলোচ্ছ্বাস সারারাত 
(লিখিত মদ্যপান নয়) 

পবিত্র ধূম উদ্গীরণ সারারাত 
(লিখিত দূষণ নয়) 

বেছে নেয় সংবাদ নক্ষত্র পবিত্র উচ্চারণে 

পুনশ্চ উদ্ভাসিত হবে বলে 
যজ্ঞ মহাজাগতিক সারারাত 

সারারাত কোন রোগ নয় মনুষ্যবাহিত 

সারারাত ধূমপান নিষেধ 

ধূমপান নিষেধ মধ্যরাতে। 

অপ্রধান স্বাক্ষর, পাথরে সূচীকর্ম

 

মাঝামাঝি ফুলের মরশুম 
ধুমধাম লৌকিক পর্ব 
অলৌকিক সান্ত্বনায় পীতনদীতে দুর্বলতা 
ঢেউ উঠছে সড়কে 
সড়কে  অবলুপ্ত ডাকপিয়ন 
তবু কেউ কড়া নাড়ছে 
অসুখী স্থবিরতা ? 
হয়তো হরিণ 
হয়তো 
সখেদে মুখ ফেরানো সুখী 
হয়তো  
অপ্রধান স্বাক্ষর 
পাথরে সূচীকর্ম 
ছিটকে পড়ে পাথরকুচির সম্মেলন 
ফিরে আসে নামঞ্জুর ধোয়া তুলসীপাতা 
জলসেচে হাত পুড়িয়ে বাড়ি ফিরে খোলা হাওয়া 
কিংবা 
‘আলাপ আলোচনায় বধিরতা বাড়ে’ শহুরে প্রবাদ । 

কবিতা

শান্তাপ্রসাদ রায়

কলকাতা 

 

Comments

Top

জুন ২০২২ সংখ্যা 

শেষ ঘুমের আগে 

আমার একটা রোবট চাই 
সকাল বেলায় ঘুম ভাঙাবে,
অ্যালার্ম ক্লকে হবে না...

পায়ের শব্দ চাই রান্না ঘর, বিছানায়,
চুলে হাতের আঙ্গুল, অভ্যাস কথা বলার
সে হোক না একপেশে 
আমার চাই 

আমার একটা কথা বলা রোবট চাই
যে আমায় ঘুম পাড়াবে 
শেষ ঘুমের আগে । 

ধারাপাত 

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি
কাল যত ঘুড়ি ছিল আকাশে 
উধাও,

ব্যান্ডউইথ খাচ্ছে কচি কাঁচা 
স্কুল ড্রেস এ সার্কাস আর বাবা মা পরীক্ষা দিয়ে ক্লান্ত

সন্ধ্যে বেলায় ছাদে উঠে স্পষ্ট গোঙানি শুনি 
গলা টিপে ধরেছে ওদের, 
এখন আর সুর শোনা যায় না 
এখন আর কেউ নামতা পড়ে না । 

women.jpg
 

গল্প

Comments

Top

জুন ২০২২ সংখ্যা 

মধ্য রাতের অতিথি

চন্দন চ্যাটার্জি

banglow.jpg

টা  সবাই  মানবেন চেয়ে যে লেখালিখি করার জন্য একটু নিরিবিলি জায়গা প্রয়োজন,  সঙ্গে একটু  অবকাশ এবং একটু  আরামও জরুরী,  তাহলেই  মনের  ভিতরের  কথাগুলো কলমের  মাধ্যমে  কাগজে ফুটে উঠবে,  আর সেটা পড়ে পাঠককুল সমৃদ্ধি ও পরিতিপ্ত হবেন । 
গল্প পড়া, গান শোনা যে কোনো জায়গায় হতে পারে, যেমন অফিস যাবার সময় গাড়িতে বসে মোবাইল বা ট্যাবলেটে বা প্রিন্টেড বই হাতে  নিয়ে পড়া যায় বা কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনা যায়। কিন্তু এই গান, গল্প, কবিতা লিখতে গেলে অনেক ধৈর্য, অধ্যবসায়, জ্ঞান এবং সর্বোপরি চিন্তা করার শক্তি ও পরিবেশ অবশ্যই প্রয়োজন। সকালে বাস ঠেঙ্গিয়ে অফিসে গিয়ে, সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে, সন্ধ্যায়  বাড়ি ফিরে এসে, স্ত্রীর সঙ্গে বাক্য যুদ্ধ ও শান্তি স্থাপনের মধ্যে দিয়ে যখন একটু নিরিবিলি ঘরের কোন পাওয়া যায়, তখন ঘুম ছাড়া মাথার মধ্যে আর কিছুই আসে না। 
এইজন্যে সমীর মাঝেমধ্যে শহর ছেড়ে তার গ্রামের বাড়ি উত্তরবঙ্গ সেবক রোডে কাছে চালসা গ্রামে চলে যায়। সমীর দেবনাথ বর্ধমান হাই স্কুলের ইকোনমিক্স এর টিচার, থাকে স্কুলের কাছে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে, গরমের ও পুজোর ছুটিতে দেশের বাড়ি যায়। যদিও সে ইকোনোমিক্সের টিচার তাহলেও সাহিত্যের প্রতি তার বেশ আকর্ষণ আছে। ছোটগল্প, প্রবন্ধ এইসব লেখালেখি করে তার লেখা দু-একটা গল্প স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি হেমেন্দ্রকুমার রায়ের কিছু ভৌতিক গল্প পড়ে তার একটা ভূতের গল্প লেখার ইচ্ছা হয়। কোন বিষয়ে কিছু লিখতে হলে তার সম্বন্ধে একটু জ্ঞান থাকা প্রয়োজন, যেমন যদি কোন ব্যক্তি বিজ্ঞান বিষয়ক গল্প লিখতে চান তবে তাঁকে বিজ্ঞান সম্বন্ধে বিশদে জানতে হবে। যেমন তিনি যদি লেখেন জলের কেমিক্যাল কম্পাউন্ড এইচ টু এস ও ফোর (H2so4) তাহলে এসিডে জল নয়, জলে এসিড ঢালা হয়ে যাবে। 
তাহলে পাঠকদের মনে হতে পারে ভৌতিক গল্প লিখার জন্য কি ভূতের সাক্ষাৎ পাওয়া দরকার, তা যদি করতে হয় তাহলে তো মুশকিল। কারণ ভূতের কোথায়, কবে, কখন, দর্শন হবে তা তো  তার জানা নেই, এমন কি তার পরিচিত কেউ জানে বলে মনে হয় না। আর অন্য লোককে যে জিজ্ঞেস করবে তাহলে তাকে পাগল বলে ভাববে। অতএব কল্পনার আশ্রয় তাকে নিতে হবে। এবার দুর্গাপূজার ছুটির সময় বাড়ি গিয়ে সে দু-তিনটে ভূতের গল্প লিখবে স্থির করলো। মহাষষ্ঠীর দিন স্কুল করে রাত্তিরে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ট্রেন ধরে পরের দিন সকালে বাড়ি পৌঁছায়। তার বাড়ি হল চালসা গ্রামে। এই গ্রামটা পরে মাল জংশন ও সেবক রোডের  মধ্যে। ছবির মতো সুন্দর গ্রাম, একদিকে চা বাগান দূরদূরান্ত পর্যন্ত দেখা যায় সবুজ গাছ সার দিয়ে রয়েছে, অন্যদিকে তিস্তা নদী। 
তিস্তা নদীর ওপারে জঙ্গল, ওয়াইল্ডলাইফ ফরেস্ট। এখানে অনেক কোম্পানির চা বাগান আছে, তার মধ্যে চালসা টি গার্ডেন বেশ বড়। এই চা বাগানের ধারে একটা মডার্ন কলোনি আছে ওখানে তার বাড়ি। বাবা, মা মারা গেছেন, এখন আছে শুধু দূর সম্পর্কের কাকা বাড়িতে থাকে ও দেখাশোনা করে। সমীরের এখনো বিয়ে হয়নি, তার স্কুলের ইতিহাস শিক্ষিকাকে বেশ পছন্দ কিন্তু মুখ ফুটে সে কথা বলতে পারে নি আজ পর্যন্ত। এহেন ব্যক্তি কিভাবে ভৌতিক গল্প লিখবেন তা কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়। 
যাই হোক তাকে দেখেই তার কাকা বেশ খুশি, সমীরকে বলল “যা বাবু একটু বিশ্রাম করে চান করে নে আমি তোর জন্য ভালো তিস্তার তেলাপিয়া মাছ নিয়ে এসেছি বাজার থেকে, রান্না করবো“। ট্রেনে সমীরের ভালো ঘুম হয় না তাই তেলাপিয়ার ঝাল দিয়ে গরম গরম ভাত খেয়ে সমীর একটা লম্বা দিবানিদ্রা দিল। ঘুম থেকে যখন উঠল তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেছে । তাদের পাড়ায় কোন দুর্গাপূজা হয় না, কিন্তু মাল বাজারে বড় পূজা হয় সেটা কালকে দেখতে যাবে ঠিক করল। পুজো আসলেই প্রকৃতিতে একটা আলাদা আমেজ আসে, সেটা সে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে। বর্ষা গড়িয়ে শরৎ আসে, তাই চারদিকে সবুজের সমারোহ, বনজঙ্গল এখন একটু বেশি ঘন ও সবুজ দেখায়, তিস্তা নদীতে এখন বেশ জল,  সন্ধ্যের সময় একটা ফুলের গন্ধ বাতাসে ভাসে, অনেকটা এলাচের মত, সমীর এটার নাম দিয়েছে এলাচ ফুল এটা দুর্গাপুজোর সময় ফোটে। দূর থেকে ভেসে আসছে মাইকের গান, সবমিলিয়ে সত্যিই একটা উৎসবের আমেজ। সমীরের বাড়িটা কলোনির একদম শেষ প্রান্তে, এর পরেই চা বাগান শুরু, দোতলা বাড়ি, ওপর-নিচে দুটো করে ঘর। ওপরের ঘরে একটাতে সমীর থাকে খালি, অন্যটা খালি। নীচের ঘরে একটা রান্না ও খাওয়া-দাওয়া হয় অন্যটাতে কাকা থাকে। 
দুইদিন বেশ কাটলো ঠাকুর দেখা, খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি এতেই চলে গেল, ভৌতিক গল্প লেখার কথা সে প্রায় ভুলেই বসেছে। আজ দশমী, মায়ের বিসর্জনের দিন। সকাল থেকেই আকাশটা কি রকম মুখ ভার করে আছে, বোধহয় মা চলে যাবে তাই ওর মন ভালো নেই। সন্ধ্যে হতে না হতেই কালো মেঘে চতুর্দিক ছেয়ে গেল এবং অল্প কিছুক্ষণ পরেই তুমুল বৃষ্টি ও তার সঙ্গে বজ্রপাত শুরু হলো। মনে হচ্ছে যেন মহাপ্রলয় আজকেই শুরু হবে। পাঁজিতে লেখা ছিল দেবী দুর্গার আগমন হাতিতে, গমন নৌকায়। কিন্তু মায়ের নৌকা চালাতে কতজন লাগবে তা বোঝা যাচ্ছে না। এই দুর্যোগে বাইরে কোথাও যাবার তো প্রশ্নই নেই, যদি কেউ ভুলে বাইরে গিয়ে থেকে থাকে তবে সেও ঘরের অভিমুখে তাড়াতাড়ি যাচ্ছে। একের দুর্যোগের রাত, তারপর ঘরে কোন কাজ নেই, তাই রাত ন'টার মধ্যে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল । এত সকাল-সকাল তার অভ্যাস নেই, তাই সে উসখুস করতে লাগলো, তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে তার খেয়াল নেই। রাত তখন কটা হবে কে জানে এমন সময় বাইরের দরজায় একটা আওয়াজ। সমীর ভাবল, কাকা এসেছে তাই জিজ্ঞাসা করল, “কে?“
বাইরে থেকে আওয়াজ আসলো, “মহাশয় আমি বিকাশ, দরজাটা একটু খুলবেন, খুব বিপদে পড়েছি তাই আশ্রয়  চাইছি। চোর ডাকাত নই সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে পারেন।”
আওয়াজ শুনে সমীর তাড়াতাড়ি নিচে দরজা খুলে দেখল এক বয়স্ক ব্যক্তি মাথায় ছাতা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কিন্তু বৃষ্টি তোরে তিনি পুরো ভিজে গেছে। বৃষ্টি তখনও পরছে তাই সমীর বলল, “ তাড়াতাড়ি ভেতরে আসুন।“
ভদ্রলোক বাড়ির ভিতরে আসলে সমীর গেট বন্ধ করে তাকে উপরে নিয়ে আসলো। ভদ্রলোক একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “মাফ করবেন, এত রাত্রে আপনাকে বিব্রত করার জন্য আমি সত্যিই খুব লজ্জিত, আসলে আমি যাচ্ছিলাম শিলিগুড়ি থেকে আলিপুরদুয়ার লোকাল ট্রেনে করে। চালসা স্টেশনে এসে বলল ট্রেন আর যাবে না, তিস্তা নদীর উপর রেললাইনে ফাটল দেখা দিয়েছে মেরামত করে তারপর যাবে। এখন ছুটির সময় তারপর এই দুর্যোগের রাত তাই কামরায় খুব কমই লোক ছিল,  যারা ছিল তারাও আস্তে আস্তে সব নেবে চলে গেল। আমার বাড়ি আলিপুরদুয়ার কাছে, এখানে কোন আত্মীয়-পরিজন নেই, তাই আর কার কাছে যাবো আমিও ট্রেন থেকে নেবে হাঁটতে লাগলাম। এই চা বাগান ধরে হাঁটতে হাঁটতে আপনার বাড়িটা প্রথমে পরায় আমি আশ্রয় চাইলাম।“

সমীর বলল, ”ঠিক আছে কোনো অসুবিধে নেই আমার পাশের ঘর খালি আছে আপনি শুতে পারবেন। আপনার খাওয়া দাওয়া হয়েছে?” ভদ্রলোক বলল, “ব্যস্ত হবেন না আমি ট্রেনে খেয়েছি তাছাড়া আমার কাছে ফ্লাক্সে চা ও বিস্কুট আছে, আমার কোনো অসুবিধে হবে না“। সমীর বলল, “ঠিক আছে আপনি বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে নিন, আমি আমার একটা পাঞ্জাবী ও লুঙ্গি দিচ্ছি পরবেন”। ভদ্রলোক ফ্রেশ হয়ে এসে পাঞ্জাবি লুঙ্গি পরে বিছানায় বসলো। সমীর জিজ্ঞাসা করল, “আপনার নাম কি জানতে পারি“। ভদ্রলোক, “নিশ্চয়ই, আমার নাম বিকাশ রায়, আলিপুরদুয়ারে বাড়ি, ওখানে একটা দোকান আছে, শিলিগুড়ি পাইকারি বাজার থেকে মাল কিনে নিয়ে যে ওখানে বিক্রি করি“। কথা বলতে বলতেই ভদ্রলোক চায়ের ফ্লাক্সটি ব্যাগ থেকে বার করে সমীরকে এক কাপ চা অফার করলেন। তারপর দুইজনে দুকাপ চা নিয়ে বসল, মাঝেমধ্যে এ  ওকে কিছু  প্রশ্ন করে  আবার ও একে কিছু প্রশ্ন করে, এইভাবে পাঁচ মিনিট যাওয়ার পর, কথায় কথায় সমীর ভৌতিক গল্প লেখা প্রসঙ্গ তুলল। বিকাশবাবু বললেন, ”সেটা তো ভালো কথা”। সমীর, ”ভালো তো বটে কিন্তু ভৌতিক গল্প কিভাবে শুরু করব সেটাই বুঝতে পারছি না”। বিকাশবাবু বললেন, “আপনার হাতে যদি খানিকটা সময় থাকে তাহলে আমার সত্যিকারের ভূত দেখার অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। সমীর চিয়ারে আরেকটু নড়েচড়ে বসলো, বাইরে তখনোও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পরছে, জানলার ওপরের পাল্লাটা খোলা আছে, তাই একটা ঠান্ডা হওয়ার ঘরে আসছে, বাইরে একটা ঝিঁঝিঁ পোকা এবং কোলা ব্যাঙের ঐক্যতান শোনা যাচ্ছে, এটাই হল ভূতের গল্প শোনার আসল পরিবেশ। সমীর মোবাইলেতে দেখল রাত্রি একটা কুড়ি মিনিট অর্থাৎ দশমী শেষ, একাদশী শুরু। বিকাশবাবু শুরু করলেন, ”আমার বাবা মারা যান খুব ছোটবেলায় কাজেই সংসারের হাল আমাকে ছোটবেলা থেকেই ধরতে হয়। মায়ের কাছে শুনেছিলাম আমাদের  আদি বাড়ি ছিল  হাসিমারায়, কি একটা কারণে বাবা ওখানকার সমস্ত পাঠ চুকিয়ে আলিপুরদুয়ার চলে যান। ওখানে একটা দোকান করেন, নিচে দোকান উপরে আমাদের থাকার ঘর ছিল। সব ঠিকই চলছিল, তারপর হঠাৎ বাবার মৃত্যু হওয়ায় আমি দোকানের দায়িত্ব নিলাম। ধীরে ধীরে আমার বয়স ও বুদ্ধি দুটোই বারতে লাগলো। তারপর আমি ঠিক করলাম এখানকার পাইকারি বাজার থেকে কিনে খুচরো বিক্রি করলে লাভ খুবই কম হয়, কিন্তু এই মালটাই যদি শিলিগুড়ি পাইকারি বাজার থেকে কেনা যায় তাহলে কিন্তু লাভ অনেক বেশি হবে, কারণ শিলিগুড়ি পাইকারি বাজারে দাম এখানকার পাইকারি বাজারের দামের থেকে অনেক কম। তাই প্রতি মাসে একদিন করে শিলিগুড়ি বাজার থেকে

মাল কিনে নিয়ে যেতাম এবং আমার দোকানে বিক্রি করতাম। আস্তে আস্তে এইভাবে ব্যবসাটাকে সাজাতে লাগলাম যেদিন আমি শিলিগুড়ি আসতাম সেদিন আমার মা অথবা স্ত্রী দোকানে বসত।  সকালের গাড়িতে শিলিগুড়ি আসতাম আর মাল কিনে রাত্তিরে ফিরে যেতাম।  যখন ব্যবসা আরো একটু বড় হল তখন আমি মাল ট্রান্সপোর্ট এর কাছে দিয়ে দিতাম,  ওরা আলিপুরদুয়ারে আমাকে ডেলিভারি দিয়ে দিত।এইরকম একদিন শিলিগুড়ি থেকে সওদা করে শেষ ট্রেনে বাড়ি যাচ্ছি, ট্রেনটি যখন আলিপুরদুয়ারে পৌঁছল তখন বাজে রাত্রি সাড়ে বারোটা। আপনি এদিককার লোক কাজেই জানবেন এদিকে সিঙ্গেল লাইন, একটা ট্রেন যদি উল্টোদিক থেকে এসে যায় তাহলে তাকে সাইড দেবার জন্য অন্য ট্রেনকে স্টেশনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এইভাবে যেতে যেতেই আমার রাত্রি গভীর হয়ে যেত। এত রাত্তিরে রিক্সা থাকে না তাই আমি পায়ে হেঁটে যেতে লাগলাম। আমাদের বাড়ি স্টেশন থেকে নেবে প্রায় ১০-১২ মিনিটের হাঁটা পথ। গ্রামের মেঠো রাস্তা তারপর রাস্তায় আলো নেই। স্টেশন ছাড়িয়ে খানিকটা গেছি, এমন সময় মনে হলো কেউ আমার পিছু পিছু আসছে, এত রাত্তিরে কেউ কোথাও নেই তাই মনে একটু ভয় করতে লাগলো। মনে হল একটা ঘুঙরুর আওয়াজ আসছে। যেন সেটা আমার সঙ্গে সমান তালে পা ফেলে ফেলে যাচ্ছে। একবার আমি ইচ্ছে করে থেমে গেলাম দেখলাম আওয়াজটাও থেমে গেল। এবার আমার সত্যি ভয় হতে লাগল। খানিকবাদে দেখলাম চারদিকে একটা পচা গন্ধ ছাড়ছে মনে হল যেন মাংস পচে চারদিকে ছড়ানো রয়েছে। আমি যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম তার হাত দশ বারো দূরে একটা শিমুল গাছ ছিল, ঠিক তার নীচে দপ করে একটা নীল রঙের আলো জ্বলে উঠেই নিভে গেল। তারপর একটা আপাদ-মস্তক সাদা কাপড় মুড়ি দেওয়া ছায়ামূর্তি লক্ষ্য করলাম। মূর্তিটা ছোট থেকে আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো, লম্বা হয়ে উপর দিকে উঠতে লাগল। সাদা কাপড়ের মধ্যে যেন দুটো জ্বলন্ত চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তারপর তার দুটো হাত আমার দিকে প্রসারিত করতে লাগলো । অন্ধকার হলেও একটু বুঝতে পারলাম যে এটা হাত নয় কঙ্কাল, এমতাবস্থায় রাম নাম নেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় আমার মাথায় এলো না। আমি পিছনের দিকে যে ফিরে আসব তার উপায় নেই কারণ সামনের দিক দিয়েই আমাকে বাড়ি যেতে হবে।
আমার হাতে সবসময় একটা ছাতা থাকতো, সেইটাই খুলে আমি ঢাল হিসাবে ব্যবহার করব ঠিক করছিলাম এমন সময় একটা স্ত্রী কণ্ঠ ভেসে আসল বিকু ভয় নেই আমি তোর কোন ক্ষতি করব না অপঘাতে মরেছি, গয়ায় পিণ্ডি  দিয়ে আসবি আমার নামে, না হলে এ জ্বালা আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার পাঁচ-পাঁচটা ছেলে কেউ আমায় ভাত দেয় না। 
এতক্ষণে আমার সম্বিৎ ফিরে এল। আমাকে বিকু বলে ডাকত দেবুর মা। দেবু মানে দেবশংকর পন্ডিত, তারা পাঁচ  ভাই রমাশংকর, উমাশঙ্কর, রবিশঙ্কর, উদয়শংকর। দেবু আমার সমবয়স্ক তার ভাইয়েরা সবাই বড় এবং প্রতিষ্ঠিত। আমাদের এলাকায় পন্ডিত পরিবারের খুব নাম, সবাই জানে, চেনে আমি অনেকবার তার বাড়িতে গেছি, তার মাকে আমি বড়মা বলে ডাকতাম। বড়মা আমাকে মাঝেমধ্যেই আচার, সিঙরা, নিমকি মোরব্বা ইত্যাদি দিতেন। স্কুলে পড়ার অনেকবার টিফিন করার জন্য আমাকে টাকা ও দিতেন। তিনি অসুস্থ ছিলেন সেটা শুনেছিলাম, কিন্তু অপঘাতে মারা গেছেন সেটা জানি না। জিজ্ঞাসা করলাম, “কবে মারা গেছ”?
উত্তর এলো  কবে কি রে হতভাগা,  এখনো আমার শরীরটা এই গাছের উপরে ঝুলছে। তুই এক কাজ কর, আমাদের বাড়িতে যা ওখানে গিয়ে সব কথা বল, তারপর ওরা যেন আমার শরীরটাকে নিচে নাবায়। 
এই কথা বলার পর সাদা কাপড় জড়ানো ছায়ামূর্তি গায়েব হয়ে গেল।  আমি উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটা সাদা কাপড় জড়ানো কিছু তো ঝুলছে, কিন্তু কে বা কি তা পরিষ্কার হলো না।  আমার ভয় পাচ্ছিল তাই আর নিজে রিস্ক নিলাম না। তাড়াতাড়ি পন্ডিতবাড়ির দিকে ছুটলাম। প্রথমে দেবুর কাছে গিয়ে সব কথা বললাম। সে বলল, ” আজ থেকে একমাস মা আমার বাড়ি থেকে উমাদা বাড়িতে গিয়ে থাকবে বলেছিল”। 
আমি বললাম “চল তবে উমাদার  বাড়িতে যাই”।
উমাদা চোখ রগড়াতে রগড়াতে দরজা খুলে বলল “এত রাতে কি ব্যাপার”।
দেবু তাকে সব কথা খুলে বলল। তারপর একে একে পাঁচ ভাই এবং পাড়ার আরো কয়েকজন মিলে আলো, লাঠি, শাবল, দড়ি ইত্যাদি নিয়ে সেই শিমুল গাছের নিচে আসলো । সেই সাদা মূর্তির মুখের উপর আলো পড়তেই আমি চমকে উঠলাম। গাছের একটা ডালে দড়ি বাধা আর বড়মা গলায় দড়ির আর অপর প্রান্তটা বাধা, তার দুই হাতের মুঠো খোলা এবং সোজা, চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে গেছে,  জিবটা মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রায় বুক পর্যন্ত এবং তার থেকে রক্তের ফোঁটা ঝরছে। এই রকম বীভৎস দৃশ্য আমি আগে কক্ষনো দেখিনি। আমরা বড়মার শেষ পরিণতি যে এত ভয়ঙ্কর হবে এটা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। দু তিনজন মিলে আস্তে আস্তে বডিটাকে নিচে নাবাল। 
তারপর পুলিশে খবর দিল, পুলিশ এসে বডিটা নিয়ে গেল পোস্টমর্টেম করার জন্য। 
এর একদিন পরে পাঁচ ছেলে মিলে মাকে দাহ করল। জীবিত অবস্থায় যাকে দু মুঠো ভাতের জন্য ছেলেদের দ্বারে যেতে হত, মৃত্যুর পর অবশ্য পাঁচ ছেলে মিলে মায়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান বেশ বড় করেছিল। 
এই পর্যন্ত বলে বিকাশবাবু থামলেন। সমীর বলল, ”তাহলে এই ঘটনাটাকে লেখা যেতে পারে ? আপনি কি বলেন, হ্যাঁ আরেকটা কথা, আপনি আপনার বড়মার গয়ায় পিন্ডি দিয়েছিলেন”। ভদ্রলোক বললেন, “হ্যাঁ, এই ঘটনার মাসখানেকের মধ্যেই আমি গয়ায়  গিয়ে উনার পারলৌকিক কর্ম সেরে আসি” ।
ঠিক আছে আপনি শুয়ে পড়ো কালকে আবার কথা হবে রাত অনেক হলো এই কথা বলে সমীর নিজের ঘরে চলে গেল। খাটে শুয়ে ভাবতে লাগল গল্পটা সত্যি কিনা জানিনা কিন্তু ভদ্রলোক বলেছেন বেশ গুছিয়ে এইটাকে যদি আরেকটু রং দিয়ে লেখা যায় তবে একটা সুন্দর ভৌতিক গল্প হতে পারে। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল ঠিক নেই। তখন সকাল ন'টা বাজে, কাকা ডাকছে, “সমীর বেলা হল চা খাবি তো“।
সমীর ধড়মড় করে উঠে বসল একটু পরেই তার মনে হলো পাশের ঘরে বিকাশবাবু আছেন ।  সে কাকাকে বলল, “কাকা তিন কাপ চা কর”। 
কাকা, ”কেন তুই দু কাপ চা খাবি নাকি?“
সমীর ”আরে  আমি নয় পাশের ঘরে এক ভদ্রলোক আছেন তার জন্য"।
“ভদ্রলোক, কোথা থেকে এল” কাকা একটু বিস্ময়ের সুরে জিজ্ঞাসা করল। 
সমীর একটু বিরক্ত হয়ে “কাল রাতিরে এসেছেন সে অনেক কথা আমি তোমাকে পরে বলব ”।  
কাকা বলল, ”পাশের ঘরে তো কেউ নেই তাহলে নিশ্চয়ই চোর এসেছিল, কিছু চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে, বোধহয়”। 
কাকার কথা শুনে সমীর কিছুটা আশ্চর্য হল, তারপর দুজনে মিলে সারাবাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে নিশ্চিন্ত হল যে কোন জিনিস চুরি যায়নি সব জিনিসই নিজ নিজ স্থানে বিদ্যমান। এমনকি সেই ভদ্রলোককে পরার  জন্য যে লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি দিয়েছিল সেটা সমীর নিজেই পরে আছে। 
সমীর জিজ্ঞাসা করল, ”কাকা তুমি যখন বাইরের দরজা খুলে ছিলে তখন তা ঠিকভাবে বন্ধ ছিল”। 
কাকা বলল, ”হ্যাঁ সদর দরজা তো আমি তালা দিয়েছি রাত্রি এবং সকালে আমি খুলেছি। চাবি তো আমার ঘরে থাকে”।
সমীর ভাবল তাহলে সে স্বপ্ন দেখেছে বোধহয়। তাই এটাকে আস্তে আস্তে মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করতে লাগলো।  
ঘন্টাখানেক পরে বাজারের থলি হাতে নিয়ে, সমীর কাকাকে বলল, ”কাকা আমি একটু বাজার থেকে ঘুরে আসি। স্টেশন রোডের বাজারে যাবো দেখি ওখানে তিস্তার মাছ পাওয়া যায় কিনা”। 
স্টেশন রোডের  বাজারটা লাইনের ওপারে। তাইলে তাকে রেল লাইন পার করে যেতে হবে। লাইনের ধারে এসে সমীর দেখল এক জায়গায় কয়েকজন লোক জমায়েত হয়েছে। কাছে গিয়ে দেখল সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা আছে একটা বডি। একজনকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলল কালকে এক ব্যক্তি লাইন পার হওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা এক্সপ্রেস গাড়ি এসে তাকে কেটে দেয়। এক ব্যক্তির মৃতদেহের মুখের ওপরের সাদা চাদরটা সরালো। মৃত ব্যক্তি চেহারা দেখে সমীরের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার উপক্রম, তার মাথা ঘুরে গেল, বাজারের ব্যাগ হাত থেকে পরে গেল আরে এ তো বিকাশবাবু। এক রেলের অফিসার দাঁড়িয়ে ছিল, সে সমীরের অবস্থা দেখে জিজ্ঞাসা করল আপনি একে চেনেন। সমীর কালকের রাত্রের সব ঘটনা বলল।  এই ব্যক্তির পকেটে একটা শিলিগুড়ি টু আলিপুরদুয়ারের  টিকিট পাওয়া যায়। অফিসার আলিপুরদুয়ার জংশনে যোগাযোগ করল  এবং এখান  থেকে বডি পাঠাবার ব্যবস্থা করল।
ঘরে এসে সমীর কাকাকে সব কথা খুলে বলল।  কাকা বলল, ”তুই ক’দিন থেকে যে ভূতের গল্প লিখতে চাইছিলি তাই স্বয়ং ভুতই তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে গেছে”।
বলাবাহুল্য এর পর সমীরের আর ভূতের গল্প লেখা হয়নি। 

কবিতা

      সুকান্ত পাল

জিতপুর, মুর্শিদাবাদ

 

কবিতা

      শ্রীকান্ত দাস

 

Comments

Top

জুন ২০২২ সংখ্যা 

অন্য এক পথ 
 

এক অজানা স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছি আমি। 
এ বোধহয় অন্য এক পথ। 
তবু মনে হচ্ছে এ পথে হেঁটেছি আমি। 
ওই দুই পাহাড় এর ধারে, 
প্রকৃতির গন্ধ আমার চেনা। 
এই বৃষ্টি আর উষ্ণতা আমার 
শরীর ছুঁয়েছে বহুবার। 
এই লাবণ্য চাওয়া পাওয়াকে বিদীর্ণ করেছিলও সেদিন। 
হাড়হীম দেহে আগুন জ্বলেছিল
এমন এক পথের আঁকে বাঁকেই। 
নিস্তব্ধতায়  শুনেছিলাম ...
চেনা নিঃশ্বাস এর শব্দ। 
আর মাটির সে গন্ধে সেদিনও 
জুড়িয়েছিলাম প্রাণ। 
ফিরতে পারবনা জানি সেই পথে, অভিমানের বনে হারিয়েছে সে পথ। 
তাই অজানা স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছি আমি। 
এ বোধহয় অন্য এক পথ।

রাঙা বৌ

অ বাজায় ডুগডুগিটা ঢোলক বাজায় আ

গান ধরেছে ই-তে তাইরে নাইরে না। 

ঈ আর উ ঊ ঘুঙুর বেঁধে পায়ে

কেমন মজার নৃত্য করে ঘুরে ডানে বাঁয়ে। 

সুর ধরেছে ঋ ৯ সা রে গা মা পা

সারছে গলা এ ঐ আআ আআ আ। 

তালে তালে হাতে তালি দেয় ও ঔ

চেয়ে দেখো পালকিতে ওই আসছে রাঙা বৌ।

girl.jpg

কবিতা

সুব্রত মিত্র

 

সবাই যেন নিগূঢ় প্রতিনিধি


বাই কেমন দুরে চলে যায় 
আমি পারি না যেতে।

সবাই কেমন 
সুন্দর স্মৃতিগুলো সুন্দর করে ভুলে যায়
আমি পারি না ভুলে যেতে
সবাই কেমন
সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করে আকাশ দেখে
আমি পারিনা সেই ভান করিতে।
সবাই কেমন
স্বার্থ ত্বরান্বিত করতে নিজের প্রকৃত পরিচয়কে লুকিয়ে রাখে
সবাই কেমন আরও কিছু পাব পাব বলে
হঠাৎ করে নিজের জাতি গোত্রকে নকল করে ঢেকে রাখে,
আমি পারি না তাহা করিতে।

সবাই কেমন-
দেশকে ভালোবাসার নাম করে দেশটাকেই দখল করে
সবাই কেমন 
হতে গিয়ে ঝান্ডার তলায় নিজের আশ্রয় খুঁজে নেয়
আমি এগুলোর কোনটাই পারিনা করিতে।

সবাই কেমন ফুটপাত দখল করে বসে পড়ে রাস্তার ধারে
সবাই কেমন অপরিচিত হয়ে ওঠে
সবাই কেমন অকৃতজ্ঞ হয়ে ওঠে
সবাই কেমন প্রাপ্তিস্বীকার করতে ভুলে যায়
আমি পারিনা এভাবে ভুলে যেতে। 

ন্যায্য দাবির বিদ্রোহ
 

কালবেলা স্নান খাওয়া-দাওয়া সেরে কাজে বেরোলাম
পাটুলি হয়ে যাদবপুর, যাদবপুর থেকে যোধপুর পার্ক আমার গন্তব্য স্থল
গন্তব্য স্থলে যেতে-যেতে মাঝপথে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির সামনে রাস্তা অবরোধ
পাঁচ মিনিট;দশ মিনিট; কুড়ি মিনিট; প্রায় আধ ঘন্টা দাড়িয়ে--
তিত বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম ঐ আন্দোলনকারী যুবক যুবতীদের ওপরে। 

ওরা চিৎকার করে বলছে --  --   --  --
আমাদের কর্ম চাই,
আমাদের ধর্ম চাই।
আমাদের অধিকার চাই,
আমাদের প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা চাই।
আওয়াজগুলো আমার কর্ণপাত হওয়া মাত্রই আমার শত বিরক্তি থেমে গেল,
আমি শত ব্যস্ততার মাঝেও হঠাৎ করে শক্ত বরফের মতো শীতল পাথরে পরিণত হলাম।

ভাবলাম; হ্যাঁ ওরা তো ঠিকই বলছে,
যে কথা আমি এবং আমরা বলছি না,
যে কথা আমরা কেউই সাহস করে বলতে পারছি না
সেই কথাই ওরা বলছে।

যে কথা বাধ্য হয়ে মুখ বুজে থাকা শিশু শ্রমিক

বলতে পারছে না,

যে কথা বিধবা মায়ের দুর্দশা মোছাতে চায়

যে কথা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বদলাতে চায়ওরা সেই কথাগুলিই বলতে চায়।

এতক্ষণে আমি--------------
যাদবপুর ইউনিভার্সিটির তিন নম্বর গেটের সামনে।
স্লোগান আরও জোরদার,
মাঝরাস্তায় বড় বড় নেতাদের কুশপুত্তলিকা জ্বলছে দাউ দাউ করে।
আমি মাথা নিচু করে একজন স্বার্থপর মানুষের মত
সবকিছু না দেখার ভান করে সামনের দিকে এগিয়ে যাই।

সামনেও রক্তাক্ত অবস্থায় আন্দোলনকারী----
বেশ কয়েকজন যুবক আহত অবস্থায় খোঁড়াচ্ছে।
কেউ কেউ আবার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।
পেছন থেকে কয়েকজন সাদা পোশাকের পুলিশ আহত আন্দোলনকারী যুবকদের সাহায্য করার চেষ্টা করতে এগিয়ে আসছে।
পুলিশের চোখেও সেদিন আমি লেখা দেখেছি দয়ার অক্ষরমালা।

এই বঙ্গ দ্বেষ

 

ই বঙ্গে অনেক বুদ্ধিজীবীদের দেখতে পাই।

এই বঙ্গে অনেক মহাকবিদের দেখতে পাই।

এই বঙ্গে অনেক সম্প্রীতির বার্তা বাহককে দেখতে পাই।

এই বঙ্গে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে কথা বলার মত-- অনেক মুখরোচক নেতাদের দেখতে পাই।

যা দেখেছি সব ভুয়ো বাতাস, সব নিঃস্বতায় পোড়া এক রত্তি ছাই।

 

এই বঙ্গে অন্যায়ের প্রাতিবাদ না করে শুধু সম্মান হারানোর ভয়ে-----

লেজ গুঁটিয়ে পালানোর মত অনেক মহাপুরুষদের দেখতে পাই।

আমি খুব ছোটখাটো মানুষ অথচ আমি মস্ত বড় ছোটলোক হয়েও------

উনাদের দেখে বড় কষ্ট পাই, ওনাদের দেখে বড় লজ্জা পাই।

 

এই বঙ্গে ঝুলিয়ে সম্প্রীতির মালা

শালারা মা-বোনের ইজ্জত বেচে দেয়---

তারাই আবার দেশপ্রেমের উন্মুক্ত চেতনার ভাষণে মঞ্চ আওড়ায়।

এই বঙ্গে ঐ কান্ডারীর দল কেড়ে নেয় ইমোশন; ফাঁটকাবাজের শক্তিমান হয়ে পকেটে ভরে প্রমোশন,

সম্প্রীতির নামে নিজের স্বার্থে এখানে-----

ভেসে যায় আমার মা-বোনের সম্ভ্রম।

এই বঙ্গে ভাইয়ে-ভাইয়ে,

বাবা-কাকায় হয়ে যায় কত হানাহানি

এই বঙ্গেই আমি দেখি;

সব জেনেশুনেও জনস্বার্থে নেতারা করেনা কানাকানি,

শুধু বলে; "সম্প্রীতি, সম্প্রীতি, সম্প্রীতি"।

আমি যদি বলি ওহে নেতা,

কেন হচ্ছে তবে সমাজের এত অবনতি?

 

স্বাধীনতার এত বছর পরেও এই বঙ্গের হয়েছে কি সংস্কার?

চারিদিকে হিংসার দুর্বার,

এই বঙ্গ ঐ বঙ্গ ভেঙে হচ্ছে ছারখার

কি প্রয়োজন হয়েছিল ওদের আজ হিন্দুদের ঘরবাড়ি;

মন্দির পোড়াবার?

 

তোমরা নাকি মুসলমান;

তোমাদেরওতো ধর্মের আছে অনেক মান সম্মান

তবে কেন অন্য ধর্মের ক্ষতি করে নিজের ধর্মকে করো অপমান?

আমি বিগ্রহ চিত্তে মালা ছিড়ে ফেলি সব নেতাদের সব রাজনৈতিক দলের------------------

সব হিংস্রতার; সব নোংরা মানসিকতার।

 

আর যে সকল কবি সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা------

বুদ্ধির ঢেঁকি মাথায় নিয়ে চুপটি করে তামাশা দেখে--

তোমাদের আক্কেল হওয়া চাই, 

তোমাদেরও আছে মা বোন, আছে ভাই।

 

তবে আজ তোমাদের কলম কোথায়?

 

হে কবি, হে বুদ্ধির ঢেঁকিওয়ালা বুদ্ধিজীবী .. ....  ...  ..

তোমাদের মানবিকতাও বিক্রি হয়েছে নাকি ঐ নেতাদের গোপন পকেটে?

নাকি তোমার ধর্মটাও বিক্রি হয়ে গেছে স্বার্থের হাটে?

তুমি জানো কি?

আমাদের জাতিটাও আজ ভেসে যেতে বসেছে সস্তার ঘাটে।

 

শুনে রাখ, শুনে রাখ, সকল বুদ্ধিজীবীগণ.......

সকল জাতির জাতীয়তাবাদ, সকল ধর্মের ধর্ম প্রবাদ

সকল দেশের দেশাত্বতা, সকল মনের মহানুভবতা

সকল মনের কামনা-বাসনায়; স্পর্শতা থাকুক স্বাধীনতায়।

 

আমাদের দুই বঙ্গের আপন সিন্ধু সেই তো মোদের বঙ্গবন্ধু

তারেই বলি মোরা জাতির জনক,

সেতো আজ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মোদের অহংকারের মাইলফলক।

সে যে শিখিয়ে গেছেন একই ভাষায় দুই বঙ্গের আলিঙ্গন

শিখিয়েছেন ভালবাসতে; শিখিয়েছেন কাছে আসা আসি

সেই তো মোদের রবীন্দ্রনাথের কন্ঠকে জাতীয় সংগীতে স্থাপন করেছেন--

"আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি"।

জাগো; জাগো; জাগো;.. ..    ... জাগো মহাবীর

এই বঙ্গমাতার নিঃস্ব খাতায়-------

রাখিবো আবার অটুট ছবি আমার বঙ্গের সংস্কৃতির।

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

কবিতা

তাপস কুমার বর

কৃষ্ণনগর,  দঃ ২৪ পরগনা

 

নতুন বছর

তুন বছর মানে,
একটা স্বপ্নগড়া ইতিহাস।
নতুন বছর মানে,
মানবতার জয়-জয়কার।
নতুন বছর মানে,
সুরক্ষিত ভবিষ্যতের সন্ধান।
দেখো বন্ধু প্রিয়জন,
আজও ওরা ও কি সুখী?
ওদের থালায় জোটেনা ভাত,
ওরা যে ফুটপাত!
যাক সব মলিনতার অন্ধকার,
মুছে সাফ হোক সকল সন্ত্রাস।
এখনো স্মৃতির মন্দিরে দুখের আঘাত....
ওই দেখো কত শত মৃত্যুর চিৎকার।

নতুন বছর মানে,
একটা সুরক্ষিত সমাজ।
নতুন বছর মানে,
সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সম্মান।
নতুন বছর মানে,
ধর্ষিতা নারীর অধিকার।
ওই দেখো শিক্ষার অধিকার,
হাজার হাজার ধর্না দেওয়া রাজপথে।
দেনার দায়ে কত শ্রমিক কৃষক আজও মরে,
এখনো একমুখো ভাত জোটেনি ওদের ঘরে।
এখনো কি মা-বোন সুরক্ষিত আছে?
কাগজের হেটলাইনে দিনে দিনে কত ধর্ষিতা মরে।
ভেবে দেখেছো কি সকলে...?
হারিয়ে যাচ্ছে যুবসমাজ একে একে করে।

independence1.jpg

নতুন বছর মানে,
কত মহান স্মরণীয় সভা।
নতুন বছর মানে,
ধর্মে ধর্মে এক মানবতার জোয়ার।
নতুন বছর মানে,
তোমার আমার বাঁচার অধিকার।
আমি সেই দিন পেতে চাই ফিরে,
মানবতার নতুন সূর্যোদয়ে....
দেশের বাহু হবে মজবুত কংক্রিটে।
অধিকারের মুক্ত দরজা,
শাশ্বত হয়ে বিরাজ থাকবে।
সব জাত-পাত যাক না মুছে,
একটা শক্ত মেরুদন্ডের মানবতার মুক্ত আকাশে।

হয়তো সেদিন....
প্রাণভরা হাসি নিয়ে বলবে,
আবার নতুন বছর এসেছে!

যিশু
 

মানব রূপী ঈশ্বর হয়ে...
মর্ত্যে এসেছে যিশু।
দুখিনী মেরি মা কাঁদছে আজও..
কোথায় আমার সন্তান যিশু?
সত্য আজও ক্রশবিদ্ধ হয়ে,
তোমরা বাঁচাও আমার যিশু।

আমার যিশুর ও অভুক্ত ঘরে,
আজও মরছে কত শিশু।
ভিক্ষার ঝুলি ঝুলছে আজও,
যন্ত্রণার অভুক্ত দোরে।
শরীর থেকে রক্ত ঝরে,

ক্রশবিদ্ধ আমার যিশু।
জোসেফ মেরি কাঁদছে আজও,
তোমরা বাঁচাও আমার যিশু।

হাজার হাজার অভুক্তের চিৎকারে...
মরছে কত শিশু।
দুখিনীর ঘরে দুখিনী মা,
বাঁচাতে পারেনি তাঁর যিশু।
বড়দিন আজও বড়দিন কি..?
হতে পেরেছে অভুক্ত শিশু।
ফুটপাতে ওরা দিন-রাত ঘোরে,
ওদের বড়দিন আসেনা কিছু।

ঈশ্বর যিশু কাঁদছে আজও,
শরীরের রক্তঝরা ক্রুশে।
আমার যিশু ও অভুক্ত হয়ে...
ধুঁকে ধুঁকে মরে ফুটপাতে।
বড়দিন হয়তো সেদিন হবে,
যেদিন অনাহারের জ্বালা মিটবে!
দেখো শান্তির বাতাস আকাশে বাতাসে,
প্রাণ খোলা একটা প্রাঙ্গণে।
অশ্রু সেদিন নিপাত যাবে..
কত জোসেফ মেরির দুখিনীর ঘরে।

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

 
 
farmer.png
Mijanur Rahman.jpg

কবিতা

মিজানুর রহমান মিজান

বিশ্বনাথ, সিলেট, বাংলাদেশ

ভাইবোন বন্ধুরা তোমাদেরকে বলি
ভাল মানুষ হবে সন্তান দেখো চোখ খুলি।।
আদর সোহাগ যত্ন নিবেন সচেতনতায়
ফাঁকি দিলে বুঝান তারে নির্জন নিরালায়।।
রোজ সকালে উঠার অভ্যাস দেন শিখিয়ে
মিথ্যা বলা মহাপাপ বলুন বুঝিয়ে ।।
নজর রাখুন ভাল বন্ধুর হয় যেন সহচর
দুষ্টুদের কাছ থেকে ফিরান তারে অতি সত্তর।।
অহংকার লোভ পতনের মুল এ কথাটি সত্য
হিংসা নিন্দা পরিহারে থাকে যেন সর্বদা মত্ত।
অলসতায় দারিদ্রতা পরিশ্রমে ধন
সঙ্গ ভাল নির্বাচনে যদি হয় সুজন।।

কবিতা

পবিত্রজ্যোতি মণ্ডল

কেমন জব্দ 

লাঙ্গল টানার কাজ করেছি
জোয়াল কাঁধে নিয়ে।
সকাল-সন্ধে দুধ দিয়েছি
বাছুরকে না দিয়ে।
খেতে কিছুই দাওনি তেমন
খড়-বিচালি ছাড়া।
চলতে ফিরতে যখন তখন
পাঁচন দিয়ে মারা !
মোট বয়েছি মুখটি বুজে
বর্ষা-জলে ভিজে।
শীতের রাতে বস্তা গায়ে
সব সয়েছি নিজে।
গোয়াল থেকে বাইরে গেলেই
পরিয়ে দিতে ঠুঁসি।
গ্রীষ্মকালে ডোবার পানি
কেমন করে শুষি?
হাম্বা ছাড়া 'রা' কাড়িনি
যতই কাঁপি রাগে।
ঠুঁসির মতো মাস্ক পরেছ
এখন কেমন লাগে?

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

 
 

কবিতা

শক্তিপ্রসাদ ঘোষ 

রবীন্দ্রনগর, নিউটাউন, কোচবিহার

ঘর

রের ভিতরে ঘরটির তালা বেশির ভাগই বন্ধ থাকে 
সপ্তাহ অন্তে বাবা বাড়ি এলে মা আঁচলে 
লুকোন চাবি দিয়ে তলাটা খুলতো 
আমরা উঁকি মেরে দেখতে চেষ্টা করতাম 
ঘরের ভেতর কি কি আছে ঠিক দেখতে পেতাম না 
তবে ঘর মাঝে মাঝে উজ্জ্বল আলোয় ভরে উঠতো 
কখনো ঘুটঘুটে ঘরের ভেতর টা 
এখনো আজানাই রয়ে গেছে 
এখনো ঘরের ভেতর আছি ঘরটি নেই।

 

কবিতা

মৌ চক্রবর্তী

দেবী সিরিজ ১৩

সূর্যের সঙ্গে প্রথম দেখা যখন
মনে মনে জানি তেপান্তরের রানী আমি 
গেছোফুল গোত্রে  গুচ্ছলগ্ন 
কলকাতার দেশে দেশের মতন এখানে ছাদঘর
চাঁদ উপড়ে দেয়  আলো
আলাপ তো আগেই ছিল 
কলকাতার রাস্তায় হারিয়ে অনেকক্ষণ

ফের দেখা দিনালোকে 
মায়ের মুখের তেজ গড়গড়িয়ে যেন
পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে
চোখে চোখ
হাতে হাত
মন পাগলেরা
  মনের ইতিহাস লিখবে সূর্যরঙের কালিতে
ওই রঙ শাড়ি মায়েরও তো 
দেবীর মতন মা আর মা দেবী হতে হতে পাথর প্রতিমা কোনও
যার গায়ে আলো গেলে জ্বলে প্রদীপমন

 

দেবী সিরিজ ১৪
 

মেঘ পেরিয়ে কতবার বেরিয়ে আসছে 
           চাঁদের রুপোলি সবজে শান্ত মেঘালো
মায়ের গায়ের ওরকম রঙ হয়  
যখন মা মাঝরাতের উঠোনে সবজি কাটে
যখন মা নানা রঙের সুতোয় সেলাই করে নকশা

মায়ের গায়ের ওরকম রঙ স্বপ্নদেখা আলো
এমনটি নয় মা আমার 
ছবিতে মিশে থাকে শেষ সারিতে 
কেবলই পুরনো গল্প বলা ঝাঁপি খুলে
 
আলপনার মতন দুঃখের দুয়ারে চোখের জলে তুলো
ভিজিয়ে মা  _ মনে মনে সাজ সারে
বারে বারে মাজে বেহায়া দাগ 
মায়ের আঙুল সেতার ছুঁলে 

বেদনা ভুলে কড়াইতে সাঁতলায় নুন হলুদ মিশে যায় মন্দভাল 
কেউই ডাকেনি তাকে কোনোদিন 
দিনের কাছে মা ঘোমটায় ঢাকা
আমার মায়ের রঙ কালো যেন সে পরী 
                          যেন সে সাজে রাততারার ফুলে 


দেবী সিরিজ ১৭
 

কালিমতী মেয়ে বসেছে লালমাটির দাওয়ায়

হাঁটুময় সন্ধ্যা
কুয়াশা তার এলোচুলে 
                  রাতের অপেক্ষায় 

হলদেফুল ডাগর চোখে চোখ রেখে 
জনমভর ভজে 
চেনা সুর মনালাপ গায়

তারপর 
মাঠ পেরিয়ে  লুটিয়ে থাকে 
কোন নিরাকার সাধনায়

 


দেবী সিরিজ ২১
 

সুড়ঙ্গ থেকে ঠিকরে আসা আলোয় 
দেবী লাগছে মাকে
মুখ মাটির লেপে
চোখ দ্বীপপুঞ্জের মতন
ঠোঁট ব্যথা সয়ে সন্ন্যাসী
হাত বাউলের দোতারা
এমন সময় ডাকি, শুনছ মা  ...
একি মা রুমি পড়নি তুমি
মা বলে, ছেঁচে জল রাতভর জেগেছি সামান্য সেই মেয়ের মতন রুগ্ন ছেলের জ্বর 
সন্তান স্তবে কেটে গেছে প্রথম বেলা 
বই ফেলে
কোল পেতে রেখেছি যেভাবে বট অশ্বথ পুরনো বাড়ির পাশে ছায়া
বই সরিয়ে রাঁধতে রাঁধতে দুপুর 
শেষ রোদে ধুয়েছি এঁটো বাসনকোসন 

বই সরে গেছে যেদিকে শেকড় খুব 
রুমি আমাকে বলে গেছিল,  পালাচ্ছি  সবুজালি ছুঁয়ে শপথ কর বলবি না
তিন সত্যি করতে করতেই বলি, পালাসনি রুমি লড়াই কর 
যেমন মা ঠাকুমায় 
যেমন তারও মায়ের লড়াই ছিল  

এখন বেলা চড়ছে রোদ গাছে গাছে 
মায়ের শরীর ভরে রোদ্দুর মাকে দেবী নাকি 
জলপরী 
না না  __ মাকে মনে হচ্ছে  শুধুই  নারী 

 

দেবী সিরিজ ২২

ই তো মুখর দিনেদুপুরে

এই তো মুখর রাতে

এক পা থাকে মনের ভেতর

এক পা হাঁটে চেনা অতীতে

তার নামে চিঠি আসে না কখনও

কখনও
লগন আসে না
পরব ছুটি নেই 

 এমনই দিন যায় বাগানের মালি হয়ে মা সাজায় 
শ্রীমতী মন কোজাগরী আল্পনা লেপে দুয়ার সজ্জায়

আগামীর তরে 
ঋতু আসে
সে ছুঁয়ে দেখে হাওয়া

পুজোর ছুটি ছুটি ছুটি ছিল সব্বার

মায়েরই হয়নি কোথাও যাওয়া
 

দেবী সিরিজ ২৪


সেজেছে দুয়ার চালের গন্ধে ভরে উঠছে চারপাশ যেন
আল্পনা 

ধানের গোছা 
চৌকাঠ পেরিয়ে ধূপগন্ধ 
আঁচল পেরিয়ে 
মঙ্গলকামনায়
পঞ্চ প্রদীপ_ব্যঞ্জন
   মুখরিত কেউ বা কারা আজ যেন সবাই স্বজন

তারই মধ্যে আলোর ফুলে ফুলে দুঃখ আসে পাঁচিলে 
ছুটি নেই__ হবে না ঘরে ফেরা
মনের কান্না কন্যারূপে মা ঢেলে দেয় শাঁখ ফুঁইয়ে
দুলে ওঠে বুঝি একলা মনখানি তার _ বহুকাল আগে ফেলে আসা ঘোর 
পুতুলপারুল সংসার 
না হল বলা না হল চলাচল

পাথরমানবী মা 

এত ঐশ্বর্যে মা
গৃহসম্ভার ভূষিতা মা শক্তিমত্তা মা তবুও কেন অসম্পূর্ণা

 

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

কবিতা

ঋতুরাজ হালদার

জি এস বোস রোড, কলকাতা 

 

রেভেরি


ফিল্টার অবধি খাওয়া
সিগারেট,
শুকনো চায়ের কাপ।
রাস্তায় রিস্কাওয়ালার
রেডিওতে গান,
   "আপ যেসা কই
   মেরে জিন্দেগী মে আয়
   তো বাত বান যায়।"

আকাশ ভরা মেঘ
গুরু-গুরু করছে
থেকে থেকে,
আসবে হয়ত তুমি...
বৃষ্টি বৃষ্টি আর বৃষ্টি।

থমকে থাকি সময়ের 
মত,
আয়নায় থাকা ছেলেটি
তাকিয়ে থাকে আমার দিকে,
বলতে চায় সে অনেক কথা,
কিন্তু দুর্ভাগ্য!
আমি যে বোবা...

ঊর্ধ্বে তুমি

রাজভোগেরও ঊর্ধ্বে 
তোমার ঠোঁটের স্বাদ
শত চেষ্টায়েও পারি না বুঝতে
তোমার মনের বিষাদ।

মরাল প্রতিম তীক্ষ্ণ চোখে
কাজল ভরা অন্ধকার 
নিয়ে থাকো,
ওরম ভাবে মেঘের আড়ালে
আমায় ফেলে যেও নাকো।

পায়ে তোমার পদ্ম ফোটে 
বুকে তোমার সূর্য ওঠে 
রাতের মত কালো চুলে
জ্যোৎস্না ভাসে জটে জটে।

তোমার সুরে ঠাই দিও মোরে 
দিও মোরে ছন্দের আলো,
মর্ত্য হতে অনেক দূরে 
স্বর্গের সীমা পেড়িয়ে 
পদ্মার আসনে বসলে তোমায়
মানাবে বড়ো ভালো।।
অঝোর সুর

ছন্দে মধুর
অঝোর সুর
অমৃত ধারা
আজ বাঁধনহারা।

দিগন্ত হতে ভেসে আসে
অশনির ডাক,
প্রান্ত জুড়ে 
আসক্ত মেঘ
করছে আজ বিরাজ।

পুলকিত কেয়া


পন ঘোরে মগ্ন
আজ বাস্তব তার
অকলুষিত স্বপ্ন।
ঐশী মধুর
অক্লান্ত বর্ষণ।
অখল ছন্দে মাতোয়ারা 
আজ জল কন্যা সীতা।

ছন্দে মধুর
অঝোর সুর
অমৃত ধারা
আজ বাঁধনহারা।।
রাতের গান

নিস্তব্ধ অন্ধকারে 
ঝিঁঝিঁর ডাক 
রাতের গান গায়ে।
নীলাভ আভায়
জ্যোৎস্না মিশে
মায়া মোহনার তীর গড়ে।

সেই তীরের চাতক আমি,
অভাগা মুনি।
তারার চাদর মুড়ে
অসীমের প্রহর গুনি।
চিত্তে বয়ে
নিরন্তর খেয়ালের স্রোত।
মেঘের ভেলায় ভেসে
অগস্ত্য যাত্রার
স্বপ্ন বুনি।

দিগন্ত হতে আলো ফোঁটে
শিশির বিন্দু আমার দেহে
বাসা বাধে।
রাতের গান স্তব্ধ হয়।
আমি আবার আমার
নিদ্রায় ফিরে যাই।
অন্ধকারে,
তোমায় দেখতে পাই।

 

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

প্রবন্ধ

 

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

গল্প 

 

প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিদ্যার পরিচয়

প্রোজ্জ্বল মণ্ডল

প্রাচীন ভারতের বৈদিক মুনি-ঋষিরা ধ্যান যোগ বলে তাদের মতাদর্শ বেদ, নক্ষত্রকল্প, শাস্ত্র ইত্যাদি গ্রন্থে মহাবিশ্বের মহাজাগতিক‌ শক্তি যেমন সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, জোয়ার-ভাটা, আবর্তন-পরিক্রমণ গতি ইত্যাদি সম্বন্ধে লিখে রেখে গেছেন, যা ছিল পাশ্চাত্য দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের ধারণা দেওয়ার বহু পূর্বেই।
বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে ও সংস্কৃতির চর্চার অভাবে সেই সব জ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যার ফলে পাশ্চাত্য দেশগুলোর থেকে ভারত পিছিয়ে পড়েছে। এইসব সংশোধন হওয়া প্রয়োজন। এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি -

*বেদে সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা :-*
যত্ ত্বা সূর্য স্বর্ভানু স্তমবিধ্যদাসুরঃ।
অক্ষেত্রবিদ যথা মুগ্ধ ভুবনান্যদীধয়ুঃ।।
              - ঋগবেদ ০৫/৪০/০৫

*অর্থ :-* হে সূর্য, যাকে (চাঁদ) তুমি তোমার নিজ আলো উপহার স্বরূপ প্রদান করেছ, তাঁর (চাঁদের) দ্বারা যখন তুমি আচ্ছাদিত হও, তখন আকস্মিক অন্ধকারে পৃথিবী ভীত হয়।

*সূর্যকে সমস্ত গ্রহ পরিক্রমণ করে, বেদে তার প্রমাণ:-*
“পঞ্চারচে পরিবর্তমানে তস্মিন্নাতস্থর্ভুবনানি বিশ্বা।“
               - ঋগবেদ ১/১৬৪/১৩
*অর্থ :-* পৃথিবীসহ সমস্ত গ্রহ নিজ অক্ষের চারিদিকে এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তন করে।

*হনুমানচল্লীসা তে পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব:-*
    অনেকেই জানেন যে হনুমানচল্লীসাতে একটি লাইনে বলা আছে..
     “যুগ সহস্র যোজন পর ভানু ।
     লীল্যো তাই মধুর ফল জানু ।।
       ১ যুগ= ১২০০০ বছর ।
       ১ সহস্র = ১০০০
       ১ যোজন = ৮ মাইল ।
যুগ × সহস্র × যোজন = এক ভানু
১২০০০ × ১০০০ × ৮ = ৯৬০০০০০০ মাইল
      ১ মাইল = ১.৬ কিমি
            ⁂ ৯৬০০০০০০ মাইল
            = ৯৬০০০০০০ × ১.৬ কিমি
              = ১৫৩৬০০০০০ কিমি।
এটিই হল পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব। নাসা (NASA) বলেছে এটাই পৃথিবী থেকে সূর্যের প্রকৃত দূরত্ব। যা প্রমাণ করে।
ভগবান বীর হনুমান ছোটোবেলায় সূর্যকে মধুর ফল ভেবে খাবার জন্য লাফ দিয়েছিল। এটি আশ্চর্যজনক মনে হলেও অর্থবহ দিক থেকে বর্তমান যুগেও সত্য।

*বেদে উল্লেখিত সূর্যের নিজ অক্ষের উপর আবর্তন ও পরিক্রমণ*
যজুর্বেদে ৩৩/৪৩ নং মন্ত্রে উল্লেখ আছে - 
সূর্য তার গ্রহদের নিয়ে (ছিন্ন অংশ) মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে প্রদক্ষিণরত অবস্থায় নিজ কক্ষপথে ও নিজের অক্ষে প্রদক্ষিণ করে।

চন্দ্র ও সূর্যের গ্রহণ, নক্ষত্রবৃত্ত, রাশিচক্র, জোয়ারভাটাদি তত্ত্ব, তিথি-বার ইত্যাদির ব্যবস্থাচক্র প্রভৃতি আর্য্যঋষিরাই প্রথমে আবিষ্কার করেছিলেন। পৃথিবী যে গোলাকার তাহা আর্য্যঋষিগণ ইংরেজরা এদেশে আসার বহুপূর্ব্বে আবিষ্কার করেছিলেন যথা-
      “কপিথ – ফলবৎ বিশ্বং
       দক্ষিণোত্তরয়োঃ সমম্ ।” – নক্ষত্রকল্প
অর্থাৎ, পৃথিবী কপিথফল অর্থাৎ কোয়াতবেলের ন্যায় গোলাকার এবং উত্তর ও দক্ষিণে কিঞ্চিৎ চাপা। “সৰ্ব্বতঃ পর্ব্বতারাম-গ্রাম-চৈত্যচয়ৈশ্চিতঃ।
কদম্ব-কেশরগ্রন্থিকেশর-প্রসবৈরিব।।” 
                     - সিদ্ধান্ত শিরোমণি
অর্থাৎ, কদম্ব যেমন গোলাকার ও খেসরসমূহে পরিবেষ্টিত, সেইরূপ এই পৃথিবীও গোলাকার এবং সর্ব্বদিকেই গ্রাম, বৃক্ষ, পৰ্ব্বত, নদ-নদী, সমুদ্র ইত্যাদির দ্বারা পরিবেষ্টিত।
পৃথিবীর যে গতি আছে তাহা গ্রীসদেশীয় পণ্ডিত পিথাগোরাসের জন্মের বহু পূর্বে এবং ইটালি দেশীয় কোপারনিকাসেরও বহুপুর্ব্বে আর্যভট্ট বলে গিয়েছিলেন- 
    “চলা পৃথ্বী স্থিরা ভাতি।” - আৰ্য্যভট্ট 
অর্থাৎ, পৃথিবী চলছে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন স্থির রয়েছে।
ভপঞ্জরঃ স্থিরো ভুরেবাবৃত্ত্যা-বৃত্ত্যা-প্রতিদৈবসিকৌ।
উদয়াস্তময়ৌ সম্পাদয়তি নক্ষত্ৰ গ্ৰহানাম্॥
                    -আৰ্য্যভট্ট –ভপঞ্জর 

অর্থাৎ নক্ষত্রমণ্ডল, রাশিচক্র স্থির আছে। কিন্তু পৃথিবী বারংবার আবৃত্তি বা পরিভ্রমণ দ্বারা গ্রহ নক্ষত্রাদির প্রাত্যহিক উদয়াস্ত সম্পাদন করছে।   

images.png

এই গতিবিচার দ্বারা সূর্যের উদয়াস্ত সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন দেশে যে সময়ের তারতম্য হয় তাও পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের বহু পুর্ব্বে ভারতীয় ঋষিগণ আবিষ্কার করেছিলেন—
    “লঙ্কাপুরেঽকস্য যদোদয় : স্যাৎ
     তদা দিনাৰ্দ্ধং যমকোটি-পুৰ্য্যাম্।
     অধন্তদা সিদ্ধপুরেঽস্তকালঃ
     স্যাৎ - রোমকে রাত্রিদলং তদৈব॥” 
অর্থাৎ -- লঙ্কায় যখন সূর্যের উদয় হয়, তখন যমকোটিপুরীতে দ্বিপ্রহরবেলা, আর যখন লঙ্কার অধোভাগে সিদ্ধপুরে সূর্য অস্তগমনোন্মুখী তখন রোমদেশে রাত্রিকাল।

পৃথিবী যে শূন্যমণ্ডলে অবস্থিত এবং পৃথিবীর যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আছে তা স্যার আইজাক নিউটন জন্মগ্রহণ করিবার বহু পূর্ব্বে ভারতীয় ঋষিগণ আবিষ্কার করেছিলেন।
*সূৰ্য্যসিদ্ধান্ত লিখেছেন-* 
        “ভূগোলো ব্যোম্নি তিষ্ঠতি।”
*অর্থাৎ* গোলাকার পৃথিবী শূন্যমণ্ডলে অবস্থান করছে।

*ভাস্করাচার্য্য তাহার সিদ্ধান্ত শিরোমণিতে লিখেছিলেন-*
“নান্যাধারং স্বশক্ত্যা বিয়তি চ নিয়তং তিষ্ঠতীহাস্য পৃষ্ঠে। নিষ্ঠং বিশ্বঞ্চ শশ্বৎ সদনুজমনুজা-দিত্যদৈত্যং সমন্ত্যং।।“ 
*অর্থাৎ* পৃথিবী বিনা আধারে স্বীয় শক্তিদ্বারা আকাশমণ্ডলীতে অবস্থান করছে। এরই পৃষ্ঠে চতুৰ্দ্দিকে দেব, দানব, মানবাদি সমস্ত বসবাস করছে

*মাধ্যাকর্ষণ সম্বন্ধে ভাস্করাচার্য্য তাহার বিখ্যাত“ গোলাধ্যায়”-এ লিখেছিলেন—*
      “আকৃষ্ট শক্তিশ্চ মহী তয়া যত্
       খস্থং গুরু স্বাভিমুর্খং স্বশক্ত্যা।
        আকৃষ্যতে তৎ পততীব ভাতি
         সমে সমন্তাৎ ক্ব পতত্বিয়ংখে॥”
*অর্থাৎ* পৃথিবী আকর্ষণ শক্তি-বিশিষ্টা। কারণ কোন গুরুভার বস্তু আকাশে নিক্ষেপ করিলে পৃথিবী নিজ শক্তি দিয়ে তাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। কিন্তু আমরা মনে করি যেন তা পতিত হয়। চারিদিকেই সমান আকাশ, কাজেই পৃথিবী ছাড়া পড়বে কোথায়?

*আর্যভট্টও লিখেছিলেন—*
       “আকৃষ্ট শক্তিশ্চ মহি যৎ তয়া
        প্রক্ষিপ্যতে তৎ তয়া ধাৰ্য্যতে।” 
*অর্থাৎ* পৃথিবী আকর্ষণ-শক্তি বিশিষ্টা। কারণ যাহা কিছু ঊর্দ্ধে প্রক্ষিপ্ত হয় তাহাই আকর্ষণশক্তি দ্বারা পৃথিবী ধারণ করে।

শাস্ত্রের গুহ্য মর্ম্ম বুঝতে না পেরে আমরা অনেকে রাহু কেতুকে দৈত্য মনে করি এবং এই দৈত্যদ্বয় চন্দ্র – সূৰ্য্যকে মাঝে মাঝে গ্রাস করে এবং সেই জন্যই সূর্য্য ও চন্দ্রগ্রহণ হয় বলে অনেকে মনে করেন।  কিন্তু ঋষিগণ ব্রহ্মপুরাণে বহুপূর্ব্বে লিখেছিলেন-
        “পৰ্ব্বকালে তু সংপ্রাপ্তে
                   চন্দ্রার্কো ছাদয়িস্যসি।
          ভূমিচ্ছায়াগতশ্চন্দ্ৰং
                     চন্দ্ৰগোঽকং কদাচন।”
                                        —পৰ্ব্বকালে
*অর্থাৎ* পূর্ণিমা ও প্রতিপদের সন্ধিকালে এবং অমাবস্যা ও প্রতিপদের সন্ধিকালে রাহুরূপ ছায়া চন্দ্র সূর্যকে আচ্ছাদন করে। সেই জন্যই সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ হয়।

*সূৰ্য্যসিদ্ধান্ত গ্রন্থে বলেছেন—*
           “ছাদকো ভাস্করস্যেন্দু
                    -অধঃস্থো ঘনবস্তুবেৎ।
          ভূচ্ছায়াং প্রাঙ্মুখশ্চন্দ্রো
                   বিশত্যস্য ভবেদসৌ॥”
                        -সূৰ্য্যসিদ্ধান্ত , ৪।৯

*জোয়ারভাটা সম্বন্ধে বিষ্ণুপুরাণে উল্লেখ আছে—* 
   “স্থালীস্থমগ্নিসংযোগাৎ - উদ্ৰেকি সলিলং যথা।
  তমেন্দুবৃদ্ধৌ সলিলমপ্তোধৌ মুনিসত্তম।।৯০
ন ন্যুনা নাতিরিক্তাশ্চ বর্দ্ধন্ত্যাপো হ্রসন্তি চ।
উদয়াস্ত ময়েম্বিন্দোঃ পক্ষয়ো শুক্ল কৃষ্ণয়োঃ॥৯১ 
      -বিষ্ণুপুরাণ ২।৪।৯০-৯১
*অর্থ :-* জোয়ারভাটায় প্রকৃত পক্ষে জলের হ্রাস – বৃদ্ধি হয় না। হাঁড়ীতে জল চড়িয়ে অগ্নির উত্তাপ দিলে জল যেমন ফেঁপে উপরের দিকে ওঠে , সেইরকম শুক্ল ও কৃষ্ণ পক্ষে চন্দ্রের কলার হাস ও বদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র – জলেরও হ্রাস বৃদ্ধি হয়ে থাকে।

উপরোক্ত উল্লেখিত বিভিন্ন গ্রন্থের আলোচিত বিষয় থেকে প্রমাণ পাই শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কার-সংস্কৃতি দিক থেকে প্রাচীন ভারতের বৈদিক সভ্যতা ছিল অনেক বেশি উন্নত। আমরা চাই এইসব বৈদিক জ্ঞান আবার বিশ্বসংসারে ছড়িয়ে পড়ুক।
                     
                               
            

ঠেলার নাম বাবাজী

চন্দন চ্যাটার্জি

টনাটি ছোট, কারণটি তার থেকেও ছোট।  
সকালবেলায় পরেশবাবু তার স্ত্রীকে বললেন “একটু চা দেবে”। 
ব্যাস, জ্বলন্ত আগুনে ঘি পড়লে যেরকম জোয়ালা ওঠে ঠিক সেইরকম জ্বলে উঠলেন কাদম্বরী দেবী। 
“আমাকে কি মন্দিরের ঘন্টা পেয়েছো যখন খুশি বাজাবে, আমাকে কি বিনা মাইনের চাকর পেয়েছো যখন যা বলবে তখন তাই করতে হবে, আমি কি আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপের জিন একবার ঘষলেই নিজের ইচ্ছে মত জিনিস চেয়ে বসবে, আমাকে কি সান্তাক্রুজ পেয়েছ তোমার সব ইচ্ছে পূরণ করব”।
পরেশবাবু বাধা দিয়ে বললেন “এবার থামো, কারণ বৌদ্ধ, শিখ, বা জৈন মতে ইচ্ছাপূরণ করার জন্য যে ব্যক্তি বা চরিত্র আছে তা আমার জানা নেই। কাজেই তুমি ভুল বলছো ঠিক বলছো তা আমি বুঝতে পারবো না“।
কাদম্বরীদেবী ততোধিক উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, “রাখো তো তোমার ঠাট্টা, ইয়ার্কি, অফিসে গিয়ে চা খাবে, ব্রেকফাস্ট করে দিয়েছি তাড়াতাড়ি গিলে অফিস যাও। আজ আমার বাবা-মা ও ভাই আসবে”। 
এটা ঠিক কোন ব্যক্তির কাছে যদি টাটা বিড়লা এর থেকেও বেশি সম্পত্তি থাকে তবুও স্ত্রীর চোখে তার বাবা হল একমাত্র সফল ব্যক্তি, তার ভাই হল দুনিয়ার সবথেকে সুখী, আর দুনিয়ার সবথেকে হতভাগ্য নিস্কর্মা অসফল ব্যক্তি হল তার স্বামী। এইজন্য সে নিজে দুনিয়ার সবথেকে দুঃখী মহিলা। 
পরেশবাবু, সংসার জীবনের এই মূলমন্ত্র বিয়ের পরেই বুঝতে পেরেছিলে তাই সকালে উঠে স্ত্রীর বাক্যবাণে বিদ্ধ এবং রাত্রে শুতে যাওয়ার আগে সন্ধিস্থাপন এই ছিল তার প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। 
পরেশবাবুর বাড়ি উত্তর কলকাতায়, কাশিপুরে, চাকরি করেন হাওড়া গ্রামীণ ব্যাংকে, কেরানী পদে, হাওড়ার দাশনগর শাখায়।  মোটা গোলগাল চেহারা, মাথা জুড়ে টাক, পরনে পাজামা পাঞ্জাবি, চোখে চশমা তা অবশ্য লেখাপড়া সংক্রান্ত কাজ কর্ম করার জন্য, না হলে খালি চোখে তিনি সবকিছু দেখতে পান। বাড়িতে উনি ওনার স্ত্রী ও একপুত্র থাকে। পুত্র লেখাপড়া ভালোভাবে করতে পারে নি, তাই কাশিপুর বাজারে একটা দোকান করে দিয়েছেন।  সম্প্রতি তার বিবাহের কথাবার্তা চলছে। 
পরেশবাবুর শ্বশুরবাড়ি নবদ্বীপ শান্তিপুর। শান্তিপুরের রাস মেলা বিখ্যাত, তাই ওই সময় তিনি সপরিবারে শান্তিপুরে যান। তাও বছরে একবার। এখন তার শ্বশুরমশাই অসুস্থ তাই কলকাতার কোঠারি হসপিটাল এ তাকে দেখাতে আসবে, কথাটা তিনি অবশ্য কালকেই শুনেছিলেন। তাই আজ থেকে তার কথাবার্তা, খাওয়া-দাওয়া, ওঠাবসা সবকিছু নিয়ন্ত্রিত, কারণ মা পার্বতীর সামনে যখন স্বয়ং ভোলানাথের চলে না, তিনি তো কোন ছার। 
দেখতে দেখতে পরেশবাবুর চাকরিজীবন প্রায় শেষ প্রান্তে এসে উপস্থিত। সামনের দুই হাজার কুড়ি সালের জানুয়ারিতে তিনি রিটায়ার করবেন, অর্থাৎ হাতে আর মাত্র এক বছর সময়। এই সময় চাকরিতে অহেতুক ছুটি নেওয়া তার অর্থনৈতিক, শারীরিক ও মানসিক সবদিক থেকেই ক্ষতিকর। অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ তো বোঝা যায়, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিকর কি ভাবে তাই বলছি, ছুটি নিলে তিনি ঘরে বসে থাকবেন। ঘরেতে থাকলে স্ত্রীর কথা শুনতে হবে আর সেটা থেকে এড়ানোর জন্য যদি তিনি পাড়ার চায়ের দোকানে গিয়ে বসেন তবে আলুর চপ, বেগুনি, পিয়াজি দেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, আর এই বয়সে এক-একটা তেলেভাজা যেন এক-একটা বৃশ্চিক দংশনের সমান, সেটা বুঝতে পারবে মাঝরাতের পর। 
এইসব কথা ভাবতে ভাবতে তিনি অফিসে যাচ্ছিলেন। আজ তিনি এমন অন্যমনস্ক যে তার অফিস সেকেন্ড ফ্লোরে তিনি লিফটে করে থার্ড ফ্লোর পর্যন্ত উঠে পড়েছিলেন। আবার একটা ফ্লোর তিনি হেঁটে নিচে নেবে আসেন, আর সেইটা অফিসের পিয়ন রামকরণ দেখতে পায়। রামকরণ আসলে বিবিসি নিউজ, তাই এই খবরটা ছড়াতে বেশি সময় লাগে না। 
লাঞ্চের সময় অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার দীপকদা তো বলেই ফেলল,”পরেশদা কিছুদিন ছুটি নিয়ে কোথাও বেরিয়ে আসুন শরীর ও মন দুটোই হালকা হবে”।
পরেশবাবুর সামনের টেবিলে বসেন সমরেশ রায়। তারা প্রায় সমবয়সী, কিন্তু তার রিটায়ার হতে আরো তিন বছর বাকি। ছুটির পর সমরেশ, পরেশবাবুকে ধর্মতলায় নিয়ে আসলো, ওখানে দত্ত কেবিনে চিকেন কবিরাজি ও টোস্ট খাইয়ে তারপর তাকে কাশীপুরের বাসে তুলে দিল। অফিসে পরেশবাবুর একমাত্র বন্ধু এবং শুভাকাঙ্খী হল এই সমরেশ। এ বেশ সুখেই আছে, বিয়ে সাদি করেনি, দাদার কাছে থাকে, খায়, মাসান্তে কিছু টাকা বউদির হাতে দিলেই হল। বাজার দোকান করা নেই, ছেলেপুলের ঝামেলা নেই, একদম মুক্ত ও সুখী পুরুষ।  
বছরে একবার ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে কখনো কেদারনাথ, বদ্রিনাথ, ঋষিকেশ বৃন্দাবন বা পুরী, দীঘা তো লেগেই আছে। একদিন অফিসে পরেশবাবুকে বেশ বিষণ্ণ দেখাচ্ছিলো। তাই দেখে সমরেশ বলল “কি হয়েছে পরেশদা বৌদির সঙ্গে আবার ঝগড়া”।
পরেশবাবু বললেন “আর বলিস না ভাই বউ তো নয় যেন এক শাণিত দুমুখো তলোয়ার, আসতে যেতে দুই দিকেই কাটে। জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা ধরে গেছে, ভাবছি কোন সাধু সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয় চলে যাব। তুই তো প্রায়ই পাহাড়ে যাস কোন একটা গুহা ভাড়া পাওয়া যায় না কি দেখিস তো আমি চলে যাব”। সমাবেশ বলল “দাদা সাধু হওয়া অত সোজা নয়”
পরেশবাবু “আরে কি সহজ নয়? কোন একটা মাল-দার পার্টিকে শিষ্য করে তার বাড়ীতে থেকে যাব। দিনরাত খাবো দাব, হরিনাম করব। অন্য সব সাধুদের দেখিস নি, ওদের কিসের চিন্তা? মস্ত জীবন”।
সমরেশ, ”একটা কথা বলব পরেশদা রাগ করবেন না। তুমি বরং একবার সাধু সাজো। মেকাপের ভার আমার, একটু প্রচার করে দেব এবং বৌদিকে গিয়ে আমি ম্যানেজ করে দেব এই একঘেয়ে জীবন থেকে বৈচিত্র আসবে তুমি জগৎটাকে নতুন চোখে দেখতে পাবে”। 
পরেশবাবু কিছু না বলে চুপ করে থাকেন, আসলে সমরেশ মন্দ বলেননি বাড়ি থেকে পালিয়ে বউকে জব্দ করার একটা সুযোগ আছে। আর যদি ধরা পড়ে যায় তাহলে সত্যি কথা বলে দেবো। 
এরপর আবার একমাস কেটে গেছে দুর্গা পুজোর কিছু আগে, পুজোর জামা কাপড় কেনা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তুমুল গন্ডগোল শেষ মেশ তিনি অফিসে যাবার সময় বলে গেলেন, ”দূর তারি সংসারের মাথায় মারো ঝাড়ু, আমি যাচ্ছি আর আসবো না সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয় চলে যাব ইত্যাদি।“
আজ শনিবার তাই অর্ধ দিবস অফিস হবে। বেলা একটার সময় দুই বন্ধু হাওড়া ময়দান এর কাছে একটা রেস্টুরেন্টে বসে খানিক চিন্তা-ভাবনা করলেন। তারপর সমরেশ কিভাবে সাধু হওয়া যায় সেই সম্বন্ধে একটা ছোটখাটো লেকচার দিল, এই একটা সুযোগ এসেছে বউকে জব্দ করতে হবে একটা শিক্ষা দিতেই হবে, না হলে এরপরে বাকি জীবনটা কাটানো মুশকিল হবে। 

সমরেশের বাড়ি বরানগর মঠের কাছে, রাত্রি পরেশবাবু, সমরেশের বাড়িতে ছিলেন। ভোরবেলা থেকে অ্যাকশন শুরু হবে। ইতিমধ্যে রাত্রি পরেশবাবু না ফেরায় কাদম্বরী দেবী বেশ চিন্তিত, প্রথমটা  অভিমান, দুঃখ, কিন্তু  রাত যত বাড়তে থাকে ততই দুঃখটি দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়। একবার অফিসে ফোন করলেন কিন্তু তা রিং বেজে গেল কারণ শনিবার ব্যাংক বন্ধ হয় সাড়ে বারোটায়। পাড়ার দু একজন মহিলা এসে জুটল, যাদের সঙ্গে কাদম্বরী দেবী দুপুরে পান খেতে খেতে, পরচর্চা ও পরনিন্দা করেন। তাদের একজন যুক্তি দিল থানাতে খবর দিতে এবং কাগজে নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন দিতে। কাদম্বরীদেবীর স্বামীর সঙ্গে যতই ঝগড়া করুক, থানা পুলিশের নাম শুনে একটু চুপ করে রইলেন কারণ থানা পুলিশে তার বড় ভয়। হঠাৎ তার ছেলে বলল সমরেশকাকুকে ফোন করবো। সমরেশ, পরেশবাবুর বাড়িতে অনেকবার গিয়েছিলেন তাই সবাই তাকে চেনে। ছেলেটা সমরেশকে  ফোন করতেই সমরেশ বলল ” ছুটি তো আমাদের সাড়ে বারোটায় হয়ে গেছে, তোমার বাবা তো এতোক্ষণ পৌঁছে যাবার কথা আমি তো বলতে পারছি না ভাই”। ছেলেটা বলল, ”তবে কি একবার থানায় খবর দেবো” সমরেশ তাড়াতাড়ি বলে উঠলো “না না থানায় জানাবার দরকার নেই হয়তো রাগ করে কোন আত্মীয়র বাড়িতে গেছে দু-একদিনের মধ্যে ফিরে আসবে তোমরা কোন চিন্তা করো না আমি কাল সকাল বেলায় তোমাদের বাড়ি যাবো”।

ক্রমে ক্রমে রাত বাড়তে লাগলো কাদম্বরী দেবী না খেয়ে শুয়ে পড়লেন। পরেরদিন খুব ভোরবেলায় সমরেশ, পরেশবাবুর বাড়িতে গিয়ে ভালো করে বুঝিয়ে আসলো এবং থানা পুলিশ করতে মানা করলো কারণ রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট পেতে সমস্যা হবে।

oldman2.jpg

কেবলমাত্র আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে একটু খোঁজখবর নিতে বলল। কাদম্বরী দেবীর দুই ননদ, একজনের আরামবাগে বিয়ে হয়েছে অন্যজন আসানসোলে। ছেলেটা দোকান বন্ধ রেখে বাবার খোঁজে বের হলো। একদিনে দুই জায়গা যাওয়া সম্ভব নয়। তাই তার ফিরে আসতে তিন চার দিন সময় লাগবে এই কথা সে মাকে বলে গেল। 
কাদম্বরী দেবী একা বাড়িতে আছেন অনেকটাই খালি খালি লাগছে বিশেষ করে সন্ধ্যের পর থেকে। আসলে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়াটা একটা হজমীগুলির মতো হয়ে গেছে এটা না হলে যেন তার দুপুরের ভাত হজম হয় না। 
রবিবার দুপুরে সমরেশ সবে খেয়েদেয়ে আজকের রবিবাসরীয়টা নিয়ে একটা গল্প পড়ার উপক্রম করছে এমন সময় তাদের বাড়ির দরজায় এক সাধু আসলো গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, মাথায় লম্বা লম্বা জটা, পরনে গেরুয়া পোশাক, হাতে কমন্ডুল, কাঁধে ঝোলা, কপালে সিঁদুরের টিপ, পায়ে খড়ম, দেখলে যেন ভক্তিতে মাথা নত হয়ে আসে। 
সমরেশের বৌদি ভিক্ষার সামগ্রী নিয়ে সাধুবাবাকে দেবার উপক্রম করছে, এমন সময় সমরেশ এসে সাধু বাবাকে দেখেই চিনতে পারল, বৌদিকে বলল আমি যখন কেদারনাথে গিয়েছিলাম তখন একবার এনার আশ্রমে গিয়েছিলাম। উনি খুবই মস্ত বড় সাধু, একবারে বাক সিদ্ধ পুরুষ, যাকে যা বলেন তাই হয়ে যায়। 
সাধারণ লোক বিশেষ করে স্ত্রীলোক সাধুসন্তদের বেশি সম্মান করে কারণ তারা ভাবে তাদের প্রকৃত মনের কথা একমাত্র সাধুবাবারা বুঝতে পারবে এবং তা সমস্যা সমাধানের উপায় বাতলে দেবে তাই সাধুবাবাকে সম্মানের সঙ্গে ভেতরে নিয়ে গেলেন, খড়ম খুলে পা ধুয়ে গামছা দিয়ে মুছিয়ে দিল। নিচে একটা বড় কম্বলের আসন পেতে দিল বসার জন্য। খানিক পরে জল, দুধ, ফলমূল আহারের জন্য দিল। 
সাধুবাবা কিছু ফল মূল গ্রহণ করলেন, কিছু উপদেশ দিলেন, এইভাবে দেখতে দেখতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। তার কিছুক্ষণ পর সমরেশের দাদা সমরেশকে জিজ্ঞেস করল “হ্যাঁ রে সাধুবাবা কোথায় থাকবেন আমাদের ঠাকুরঘরে”। 
যদিও সাধুবাবার থাকার জায়গা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, তথাপি সমরেশ বলল, ”হ্যাঁ ঠাকুর ঘরে থাকতে পারেন, কিন্তু ইনি অত্যন্ত সিদ্ধপুরুষ কাল থেকে বোধকরি অনেক লোক আসতে শুরু করবে। তাই আমার মনে হয় অগ্রদূত ক্লাব এর পাশে যে ঘর আছে যেখানে বাসন্তী পূজা হয় ওখানে সাধু বাবার থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, তা হলে অনেক লোক দর্শন করতে পারবে”।
সন্ধ্যেবেলায় সমরেশ সাধুবাবাকে নিয়ে ক্লাব ঘরের দিকে গেল এবং ওনার থাকার ব্যবস্থা করে দিল। পরেরদিন সকাল হতে না হতেই রটে গেল অগ্রদূত ক্লাবে একজন মহাসিদ্ধ পুরুষ হিমালয় থেকে এসেছেন। একটা সিঙ্গেল খাটিয়া ছিল তার ওপর সুসজ্জিতভাবে বসে সাধুবাবা দর্শন দিচ্ছেন, কাউকে আশীর্বাদস্বরূপ একটা ফুল দিচ্ছেন বা কিছু মাদুলি দিচ্ছেন যে কেউ আসছে তারা সাধু বাবার জন্য ফলমূল মিষ্টান্ন ধুপ এইসব নিয়ে আসছেন। ক্লাবের একজন ছেলে সেগুলি এক জায়গায় গুছিয়ে রাখছে অপর কয়েকজন ছেলে লাইন নিয়ন্ত্রিত করছে যাতে করে সবাই সাধু বাবার দর্শন লাভ করতে পারে। 
সেই সকাল থেকে শুরু হয়েছে একজন একজন করে অনেক লোক আছে তাদের অভাব-অভিযোগ দুঃখ দারিদ্রতা শোকতাপ সবকিছুই বাবাকে জানাচ্ছে। বাবা প্রয়োজনমতো উপদেশ দিচ্ছেন ও প্রসাদী ফুল দিচ্ছেন। 
এইভাবে তিন দিন কাটল, বাবা রোজ সকালে স্নান করে তৈরি হয়ে বসেন, তারপর দর্শন চলে রাত্রি পর্যন্ত। মাঝখানে দুপুরে সময় এক ঘন্টা বিশ্রাম বাবা পান। বাবা যাকে যা বলছেন কারুর মিলেছে, কারুর মেলেনি কিন্তু তাই নিয়ে কোন অভিযোগ নেই। কারণ মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাস আছে যদি কোন খারাপ হয় তাহলে সেটাও ভগবানের ইচ্ছা, হয়তো এরপর তাঁর আশীর্বাদে আরো ভালো হবে, এখন তিনি ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন। বাস্তবিকপক্ষে ভবিষ্যৎ ভালো হবে উজ্জল হবে এই আশাতেই মানুষ বর্তমানে কাজ করে। 
দিন চারেক কাটার পর সাধুবাবার বেশ অসুবিধে হচ্ছে। এক ভাবে বসে থাকতে থাকতে তার কোমরে স্পন্ডালাইসিস হয়ে যাবার জোগাড়। ওদিকে চায়ের বদলে দুধ, তা আবার পেটে গ্যাস হয়। দুপুরবেলায় আতপ চালের ভাত ঘি এবং সেদ্ধ আলু। আমিষ খাবারের আস্বাদ  তিনি প্রায় ভুলেই গেছেন, চিকেন কষা, ডিমের অমলেট কিরকম খেতে তা ভুলে গেছেন। রাত্রিতে মাঝেমধ্যে তিনি স্বপ্নে দেখেন ধর্মতলায় দত্ত কেবিনে বসে চিকেন কবিরাজি, চিকেন রোল খাছেন, বা  হাওড়া ময়দানে ফ্রাই রাইস, চিলি চিকেন বা নিদেন পক্ষে পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানে তেলেভাজা বেগুনি এইসব খাচ্ছেন।  এইসব চিন্তা করতে করতে রাত্রি তার ঘুম হয় না। খালি পেটে দুধ খেলে তার গ্যাস হয়ে যায়, তাই এই চার দিনে তার প্রায় দশ কেজি ওজন বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। খড়ম পরা তার অভ্যাস নয় তাই চলতে ভীষণ অসুবিধা হয়। এক ভক্ত আবার পায়েতে আলতা লাগিয়ে দিয়েছে, সকালবেলা চান করার সময় সেটা ঘষে ঘষে তুলতে গিয়ে ছাল উঠে গেছে, জ্বালা করছে, কিন্তু কাউকে কিছু বলতেও পারছেন না। এই কদিন ভগবানের নামের পরিবর্তে অফিস ও সংসারের  কথা বেশি করে মনে হচ্ছে। এখন তিনি হাড়েহাড়ে বুঝতে পারছেন সাধু হওয়া কোনো সহজ কাজ নয় । যাদের জীবনে ত্যাগ নেই তারা সাধু হতে পারবে না।  
ওদিকে সপ্তা খানেক পরে পরেশবাবুর ছেলে এসে তার মাকে জানালো পিসিদের বাড়িতে বাবা যায়নি। আর শ্বশুরবাড়িতে তো কখনো একা যান না তাহলে কোথায় গেছে সেটা এখন কাদম্বরীদেবীর মনে চিন্তার ছাপ ফেলেছে। এদিকে বরানগরে এক সিদ্ধ পুরুষ এসেছেন হিমালয় থেকে সেটা কাদম্বরীদেবীর কানে পৌঁছেছে। তিনি নাকি অন্তর্যামী ভূত-ভবিষ্যৎ সব দেখতে পান একবার তার স্বামী কোথায় গেছে কেমন আছে তা জানার জন্য বরানগরে গেলে কেমন হয়। এই কথা মনে করতেই ছেলেটাকে তিনি সমরেশকাকুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন।  
সমরেশ বললো,” ঠিক আছে তোমার মাকে নিয়ে কালকে আসো আমি দেখছি কি করা যায়”। 
যথারীতি কাদম্বরী দেবী ও তার ছেলে সকালবেলায় বাবাজির দর্শনে আসল, সঙ্গে কাশীপুরে বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা ও একটা চাঁপাফুলের গন্ধওলা ধুপ নিয়ে আসল। কিন্তু ভিড় থাকায় তারা বাবাজির সামনে আসতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল আর দু একজনের সঙ্গে কথা বলে বাবাকে বিশ্রাম নেবেন। 
কাদম্বরী দেবীকে দেখেই বাবাজি বললেন “তুই তোর স্বামীর সঙ্গে এত ঝগড়া করিস কেন? তাই সে বাড়ি থেকে চলে গেছে”। কাদম্বরী দেবী কাঁদ কাঁদ স্বরে বললেন “বাবা খুব অন্যায় হয়ে গেছে, মা কালীর নামে দিব্যি করছি আজ থেকে আর ঝগড়া করবো না। আমার স্বামী যেন ফিরে আসে, কোথায় আছে, কেমন আছে সেটা যদি বলে দেন”।
সাধুবাবা বললেন “মায়ের নাম নিয়ে শপথ করেছিস কিন্তু মনে রাখিস আবার ঝগড়া করলে সে চলে যাবে আর ফিরে আসবে না” । 
কাদম্বরীদেবীর বললেন “না বাবা এই নাক মুলছি, এই কান মুলছি আর ঝগড়া করবো না আমার স্বামীকে ফিরিয়ে এনে দিন”।
বাবাজি তার হাতে মন্ত্রপুত ফুল দিলে দিয়ে বললেন” এইটা রাখ, কালকের মধ্যেই তোর স্বামী ফিরে আসবে”।
কাদম্বরী দেবী অত্যন্ত খুশি মনে বাবাজিকে প্রণাম করে চলে গেলেন।

পরদিন দুপুরবেলায় দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ, ছেলে এসে দরজা খুলে চমকে গেল এবং চেঁচিয়ে বলল “মা বাবা এসেছে”। কাদম্বরীদেবীর রান্নাঘর থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন। ছোট ছেলেকে মা যেমন হাত ধরে নিয়ে যায় সেই রকম তিনি পরেশবাবুর হাত ধরে আস্তে আস্তে নিয়ে যেতে লাগলেন। 
সোফার ওপর নিয়ে গিয়ে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন “এ কদিন কোথায় ছিলে, কোথায় গিয়েছিলে,কি করছিলে”।
পরেশবাবু “সে অনেক কথা পরে বলব এখন চান করছি, খেতে দাও” কাঁধের ব্যাগটা সোফার ওপর রেখে তিনি চান করতে যাবার জন্য বাথরুমের দিকে গেলেন।
ওদিকে কাদম্বরী দেবী, পরেশবাবুর ব্যাগ থেকে একটা কাশীপুরের দোকানে মিষ্টির প্যাকেট একটা চাঁপা ফুলের গন্ধওলা ধুপের প্যাকেট বের করলেন। পরেশবাবু সেই দিকে একবার আড় চোখে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে চলে গেলেন, না তাকাবার ভান করে। আর ওদিকে কাদম্বরীদেবীর মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলেন। 
বলাবাহুল্য পরেশবাবু জীবিত ছিলেন ৭২ বছর এই সময় তাদের মধ্যে আর ঝগড়া হয়নি।

 

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

 

গল্প 

দা লাস্ট বাস
মূলঃ ডার্সি কোটস 

ভাষান্তর: অরূপ ঘোষ

রাজের কপাল বাস টাইম টেবিলটাতে প্রায় লেগে গেলো যখন সে বাসের চলার পথগুলি দেখছিল। ছাব্বিশ, আটাশ আর চল্লিশ নাম্বার ওখানে থামে, কিন্তু ওখানে এটা লেখা নেই, যে এদের মধ্যে কোনটা, ক্যালগ্যারিতে যায়!
সে একপলকে রাস্তার দুপাশের বাড়িগুলির দিকে তাকিয়ে নিলো। সেখানকার বাসিন্দারা ওর দিকে তাকিয়ে আছে, তার কনফিউশন দেখে হাসছে, এই আইডিয়াটা তার পছন্দ হল না! পরিচিত অপমানের অনুভূতিটা ওর পেটের ভেতর পাকিয়ে উঠতে চাইলো, কিন্তু ও জোর করে ঠেলে সেটাকে নিচে পাঠিয়ে দিলো।
এই পাড়াতে তোমার লজ্জিত হবার কিছুই নেই, এটা একটা বস্তি থেকে মাত্র কয়েক কদম দূরে; এখানকার বাসিন্দাদের অর্ধেকের বেশিই হয়ত লেখাপড়া জানেই না!
একটা টায়ারের আর্তনাদ রাজকে বিরক্ত করল এবার। ও ঘুরে তাকাল, আর বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করলো, একটা বাস এসে ওর পাশে দাঁড়িয়েছে, আশ্চর্য ! আমি তো এটা আসতেই শুনিনি!     
সে বাসের সামনে দিক নিদর্শন বা কোন নাম্বার দেখার আশাতে তাকাল, কিন্তু ওটার সেরকম কিছুই ছিল না! দরজাগুলি বিকট ‘হুশ’ শব্দ করে খুলে গেল।
“হেই” রাজ ডাকল, আর ড্রাইভার, মোটাসোটা মধ্যবয়সী লোক, মুখে বিনয়ী হাসি ঝোলানো, ওর দিকে ঝুঁকে এলো “তোমরা কোথায় যাচ্ছ?”
মানুষটি হাসল “সব ধরনের জায়গায়, ছেলে! তুমি কোথায় যেতে চাও?”
রাজ ওর চারপাশের জরাজীর্ণ বাড়িগুলির দিকে তাকাল, সে এ ধরণের জায়গাতে ওই ধরণের বাস মোটেও আশা করেনি, ড্রাইভারটাকে দেখে মনে হয় সে আরামদায়ক মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত শহরতলীতে থেকে অভ্যস্ত, একটা প্রাইভেট স্কুলের বাস চালায় বড়জোর।
“আহ!” রাজ পেছনে ম্যাপটার দিকে তাকাল, তার ক্যালগ্যারিতে যাওয়ার রাস্তা সম্পর্কে খুব অস্পষ্ট ধারণা ছিল, যেখানে তার ভাইয়ের বন্ধু থাকে। কিন্তু সে যে কোন মূল্যে এই পাড়া থেকে বেরোতে চাইছিল। 
“তোমরা কি ক্যালগ্যারির আশপাশ দিয়ে যাবে?” শুধালো সে।
“অবশ্যই” ড্রাইভারটা বলল রাজকে বাসে উঠতে ইশারা করতে করতে “আমরা আরও কিছু শহরতলী ঢুঁ মারবো, তাই এটা একটা লম্বা ভ্রমণ হবে, চলবে?”
রাজ ইতস্তত করতে লাগলো, এক পা বাসের ভেতর, লম্বা ভ্রমণ মানে বেশি পয়সা, সেটা তার কাছে নেই “কত দিতে হবে?”
বাস ড্রাইভারটি ওর দিকে মূল্যায়নের দৃষ্টিতে তাকাল, ওর নীল চোখগুলি রাজের দাগ পড়া হুডি আর ছেঁড়া জিন্সের ওপর ঘুরে এলো। “ছেলে, আমার মনে হয় এটা বলা উচিত হচ্ছে না, কিন্তু আমার মনে হয় তুমি কিছু সমস্যাতে আছো!”
একজন মদ্যপ আর বদমেজাজি বাপকে যদি সমস্যা ধরা হয়, তাহলে রাজ গভীর সমস্যাতেই আছে। সে অসহায়ভাবে কাঁধ ঝাঁকাল শুধু একবার।
“হেই” ড্রাইভার বলল উষ্ণ হাসি হেসে “আমাদের সবারই কোন না কোন সময় উপরে উঠার জন্য হাতের প্রয়োজন হয়, টিকেট আমার পয়সায়, উঠে পড়!”
রাজ হতবাক হয়ে গেল, বিড়বিড় করে ধন্যবাদ জানিয়ে বাসে উঠে পড়ল, পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে যাবার পর সে সিটের খোঁজে এদিক সেদিক তাকাল।
বাসটাতে বিভিন্ন ধরণের যাত্রী সমাবেশ দেখা গেলো, সামনের দিকে এক সুন্দরী অল্পবয়সী মহিলাকে দেখা গেলো নীল ডাই করা চুল আর নাকে ছিদ্র করে রিং পরা। তিন রো পরে এক ব্যবসায়ী বসে ছিল হাতের চারপাশে নেতানো খবরের কাগজ মুড়ে, আরেকটু পেছনে এক অল্পবয়সী ছেলে বসে ছিল যার বয়স রাজের চাইতেও অনেক কম। ওর ফ্যাকাসে মুখ আর সঙ্গী যাত্রীদের দিকে সন্দেহাকুল দৃষ্টিতে তাকানো দেখে রাজ সন্দেহ করল, ব্যাটা মনে হয় নেশা করেছে ভালোই! এক গৃহহীন দেখতে লোক আরেকটা জানালার পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল। অন্যপাশে দুই মধ্যবয়সী মহিলা বসে ছিলেন, শেষদিকে, কিছু একটা বুনছিলেন। গাঢ় করে চোখে মাস্কারা দেয়া আরেক মেয়ে জানলা দিয়ে বাইরে গভীর মনোযোগের সাথে দেখছিল।
রাজ প্রথম দিকে বসা সুন্দরী মহিলার পেছনের সিটে বসল আর আরাম করে সিটে হেলান দিলো, মহিলা ওনাকে পার হবার সময় উজ্জ্বল হাসি দিলো একটা, রাজ ওনাকে তার সেরা হাসিটা উপহার দিলো। 
“সবাই বসেছে?” ড্রাইভার বলল গিয়ার বদলাতে বদলাতে।
রাজ আচমকা একটা শক টের পেলো নিজের ওপর, যখন এতক্ষণ ওরা কথা বলছিল, ড্রাইভারের হাত দুটো কোলের ওপর রাখা ছিল, সেগুলো রাজ দেখতে পায়নি তাই। এখন সেগুলো যখন স্টিয়ারিং হুইলে ফেরত গেল, রাজ দেখতে পেল দশটা লম্বা ঘন হলুদ নখ!
এটা ওই ফিটফাট দেখতে ড্রাইভারের জন্য এতোটাই বেমানান আর উদ্ভট ছিল যে, রাজ ওর চোখ সরাতে পারলো না। নখগুলি ছিল কমপক্ষে তিন ফুট লম্বা, আর মাথার দিকে বেশ ছুঁচালো! 
“খারাপ দিন?” হাস্কি একটা কণ্ঠ জিজ্ঞেস করল, রাজ চমকে উঠে সুন্দরী মহিলাটির দিকে তাকাল। 
“কি ---- ??” রাজ তোতলাতে শুরু করেও থেমে গেল।

bus driver.jpg

“তোমাকে বেশ ভালোই চিন্তিত দেখাচ্ছিল” মহিলা বলল, ওনার স্বর রাজ যা আশা করেছিল তার থেকেও নিচু, আর অবাক হয়ে আবিষ্কার করল যে সে এটা পছন্দই করছে!”  একটা ইতস্তত হাসিতে ভরে যাচ্ছিল রাজের মুখ, কিন্তু দ্রুত সেটা মুছে ফেলে সে বলল “ওয়েল, সবচেয়ে সেরা না, আম্মম্মম ......”“হেই” পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ঘেউ করে উঠলো “এটা তো হাইড স্ট্রিটে যাওয়ার রাস্তা না! রাজ পেছন ফিরে দেখল, নেশা করা ছেলেটা কথা বলে উঠেছে, তাকে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছিল, সিটে মোচড়ামুচড়ি করছিলো আর বার বার চোরা চোখে বিপরীত দিকে কিছু একটা বুনন রত দুই মহিলার দিকে তাকাচ্ছিল ! 
বাস ড্রাইভারটা রিয়ার ভিউ মিররে তাকাল, একটা উজ্জ্বল হাসিতে ভরে গেল তার মুখ “তুমি ঠিক বলেছ!” তারপর বাসের বাকিদের উদ্দেশে বলল “কি মনে হয়, আমাদের জন্য যথেষ্ট হয়েছে না?”
সম্মিলিত কণ্ঠে আওয়াজ এলো
“ইয়াহ!”
“আমার জন্য চলবে!”
“চলো কাজটা সেরে ফেলি!”
ড্রাইভার একটা শার্প টার্ন নিয়ে স্পিড বাড়িয়ে দিলো, বাসটাকে চালিয়ে নিয়ে চলল আরও কিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন, কম ব্যাবহার করা অলি গলি দিয়ে। রাজ ওর পেটের ভেতর একটা অস্বস্তিকর সুড়সুড়ি টের পাচ্ছিল। সে সুন্দরী মহিলাটির দিকে তাকাল, যে রাজের দিকে ফেরার জন্য সিটে ঘুরে বসেছে। মহিলার বড় কালো চোখগুলি নিঃশব্দ হাসিতে কুঁচকে গেল। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছিল উনি কোন কিছুরই পরোয়া করেন না!
রাজ পেছনে বাসের বাকিদের দিকে তাকাল, বুনন করতে থাকা মহিলারা আর ব্যবসায়ীটাকে দেখে কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না! শুধু নেশাখোর ছেলেটা, গাঢ় মাস্কারা দেয়া মেয়েটা আর গৃহহীন লোকটা, যে এইমাত্র ঘুমের দেশ থেকে ফেরত এসেছে, ওদেরকেই বেশ বিচলিত মনে হল।
“এখানে কি হচ্ছে?” রাজ ড্রাইভারের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল। যে এলাকাতে গাড়িটা ঢুকেছে সেটা সে চেনে না, কিন্তু ওটা দেখতে শিল্প এলাকার মতো লাগছিল। ওয়্যারহাউজগুলি লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আর রাস্তাতে আর কোন গাড়িই দেখা যাচ্ছিল না । 
“একটু অপেক্ষা করো” ড্রাইভার বলল “বুঝতে পারবে!”
রাজ বুঝতে চায়না, সে শুধু চায় এই বালের বাস থেকে নেমে যেতে, ওই ......ওই ভয়ঙ্কর যাত্রী, ওই বড় নখ অলা ড্রাইভার থেকে দূরে চলে যেতে চায়!
“তোমার হাতে কি সমস্যা?” নেশাখোর ছেলেটার কণ্ঠ শোনা গেলো আবার, রাজ ঘুরলো। ওই ছেলেটা বুনন করতে থাকা মহিলা দুটির দিকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু ওনারা অমায়িক হাসি নিয়ে তাকালেন এদিকে। রাজ আরেকটু ঝুঁকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু মহিলা দুজন বুনন করা স্কার্ফগুলি দিয়ে ওনাদের হাত ঢেকে রেখেছিলেন। 
রাজ অনুভব করল, যে লুকানো আঙ্গুল খুব খারাপ ইঙ্গিত বহন করে, ও বাসের বাকিদের হাতের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো। নেশাখোর, গৃহহীন, মাস্কারা দেয়া মেয়ে আর ওর নিজের হাত দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু বুনন করা মহিলারা স্কার্ফ দিয়ে, ব্যবসায়ী পেপার দিয়ে আর ওর নিজের সামনে বসা সুন্দরী মহিলা নিজেরগুলি পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন।
“কিহ ???!!” সে শুরু করতে যেতেই বাসটা হঠাৎ থেমে গেলো। 
ওখানে কোন স্ট্রিট লাইট, কোন বাড়িঘর, কোন গাড়িঘোড়া কিছুই ছিলো না। রাজ দাঁড়িয়ে গেলো দরজা দিয়ে বের হয়ে যাবে বলে, কিন্তু ড্রাইভারটা একটা বোতামে চাপ দিতেই মৃদু শব্দ করে দরজাগুলি লক হয়ে গেলো।
“চলো খাই!” বাস ড্রাইভার বলল স্বাভাবিকভাবে! এবং হঠাৎ করেই, লুকিয়ে রাখা হাতগুলি বেরিয়ে এলো স্কার্ফ, পকেট আর পেপারের আড়াল ছেড়ে। 
রাজ গলার গভীরে একটা চিৎকার তৈরি হচ্ছে টের পেলো, কিন্তু সে জানতো কেউ ওকে শুনতে পাবে না! জন্তুগুলো তাদের লম্বা হলুদ নখগুলি নিয়ে শ্বাপদের ক্ষিপ্রতায় নড়ে উঠলো। বুনন কারী মহিলা দুজন ঝাঁপিয়ে পড়ল নেশাখোরের ওপর, ওদের চোয়ালগুলি এমনভাবে খুলে গেলো, কোন মানুষের চোয়াল ওভাবে খুলতে পারেনা, ভেতরে দেখা গেলো হাঙ্গরের মতো তীক্ষ্ণ আর ছুঁচালো দাঁত! ওরা এত দ্রুত নড়াচড়া করছিলো যে রাজ খালি চোখে ওদের ফলো করতে পারছিল না, কিন্তু নিষ্ফল, গড়গড়া করার মতো চিৎকার রক্তের স্প্রেতে ভেসে যাওয়া ঠিকই দেখতে পেলো। স্যুট পরা ব্যবসায়ী পেপার ফেলে দিয়ে ঘুরে সিটের ওপর দিয়ে লাফিয়ে পড়ল পেছনের গৃহহীন লোকটার ওপর! বাস ড্রাইভার লাফিয়ে রাজকে ফেলে এগিয়ে গেলো ভীতসন্ত্রস্ত টিনেজ মেয়েটির দিকে। রাজের চিবুকে রক্তের ছিটে এসে লাগলো, আর ও ঘুরে সভয়ে দেখল সুন্দরী মহিলাটির কালো চোখগুলি ওর মুখ থেকে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে!
“সরি” মহিলাটা হাসছিল, কিন্তু ওর নিশ্বাস কোন অসুস্থ আর পচা জিনিস দিয়ে দূষিত মনে হল যখন সে তার হলুদ বড় বড় নখগুলি রাজের দিকে বাড়িয়ে ধরল “আজকের দিনটা তোমার জন্য আরও জঘন্য আর ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দেবে!”

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

 

গল্প 

অনাহুত বরযাত্রী

পার্থ বোস

ব্যাঙ্গালুরু

তকাল ছিয়ানব্বই বছর বয়সে আমাদের গোটা পরিবারকে গভীর শোকের মধ্যে রেখে চলে গেলেন সাহেব দাদু। জন্মের সময় বাচ্চার গায়ের রং ছিল টুকটুকে ফর্সা।  তাই দেখে বাবা মা আদর করে নাম রেখেছিলেন ‘সাহেব’। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এই সাহেব দাদু। চাকরি জীবনে সরকারি অনেক বড় বড় পোষ্ট দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। ফলে আদব-কায়দার মধ্যেও একটা সাহেব সুলভ আচরণ তার ছিল। কিন্তু রিটায়ার করার পর তার স্বভাবে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। চাকরি জীবনে উনি যতটা  ডিসিপ্লিন  মেনে চলতেন, অবসর নেবার পর সেই ডিসিপ্লিনকে ভঙ্গ করার ইচ্ছা ততটাই প্রবল হয়ে ওঠে।
কিন্তু ইচ্ছা করলেই তো সেটা প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। বিশেষত সাহেব ঠাম্মির মত জাঁদরেল একজন প্রশাসক যখন আছেন। এক কথায় অবসরপ্রাপ্ত জীবনে সাহেব দাদু ছিলেন সম্পূর্ণভাবে সাহেব ঠাম্মির তত্ত্বাবধানে। কিন্তু সুযোগ পেলেই সাহেব দাদু বাধা নিয়মগুলো ভাঙ্গার তীব্র প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেন।
আমার নিজের ঠাকুরদা ঠাকুরমা মারা যাবার পর ঠাকুরদার এই ছোট ভাই অর্থাৎ সাহেব দাদুই ছিলেন আমাদের গোটা পরিবারের অভিভাবক। সত্যি বলতে তিনি ছিলেন যথার্থই অভিভাবক। তার অভিভাবকত্বে আমাদের গোটা পরিবার তার কাছে ঋণী। তার বহু কীর্তির সাক্ষী আমাদের এই পরিবার। তাই আজ এই গভীর শোকের মধ্যে আজ থেকে ছাব্বিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক কাহিনীর কথা বার বার মনে পড়ছে। আজ আপনাদের সেই কাহিনীটাই শোনাব।
সালটা ছিল উনিশ পঁচানব্বই। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে আমার বাবা ছিলেন দ্বিতীয়। আমরা থাকতাম দক্ষিণ কলকাতার হাজরাতে। বাবার বড় দাদা মানে আমার জেঠু তার পরিবার এবং অবিবাহিত ছোট দুই ভাই মানে আমার মেজো আর ছোট কাকাকে নিয়ে থাকতেন আমাদের পৈত্রিক বাড়ী হাওড়ার সাঁতরাগাছিতে। আর  বাবার ঠিক পরের ভাই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বড়ো কাকা পরিবার নিয়ে থাকতেন রাউরকেল্লায়।
অবিবাহিত দুই কাকার মধ্যে মেজ কাকা বিয়ে করতে একেবারেই রাজি ছিলেন না। কলেজ জীবনে কারোর কাছে আঘাত পেয়ে সারা জীবন অবিবাহিত থাকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে ছিলেন। দাদু ঠাম্মি গত হয়েছে বেশ কয়েক বছর হল। কিন্তু বাকি ভাইরা মেজ কাকাকে হাজার বুঝিয়েও কোন লাভ হয় নি। আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীরাও চেষ্টার ত্রুটি রাখিনি। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হয় নি। কিন্তু এতে ছোট কাকার বিয়ের আয়োজনে বিলম্ব হয়ে যাচ্ছিল। তাতে ছোট কাকা যে মনে মনে ভীষণ রুষ্ট ছিলেন সেটা বলাই বাহুল্য।
শেষে নিপীড়িত ছোট কাকা নিজেই নিজের বিয়ে ঠিক করে বসলেন। আমাদের গোটা পরিবারই পণপ্রথা আর জাতপাতের ঘোর বিরোধী। ফলে ছোট কাকার পছন্দ করা পাত্রীকে মেনে নিতে কারোই কোন সমস্যা হল না। এক কথায় সবাই রাজী। রৈ রৈ করে বিয়ের আয়োজনে মেতে উঠল সবাই।
অনেকদিন পর আমাদের সেই পৈত্রিক বাড়িতে বিয়ে। তাই ছোট কাকার বিয়ে নিয়ে আমরা সবাই খুব উল্লাসিত। আমি,মা আর বাবা পোঁছালাম বিয়ের আগের দিন রাতে। কারণ ওই দিনই আমার মাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষাটা ছিল।
বাড়িতে পৌঁছে দেখলাম আমরা বাদে সবাই চলে এসেছে। কাছের দুরের আত্মীয় স্বজন মিলিয়ে বিয়ে বাড়ী জমজমাট। ততক্ষণে রাতের খাবারের সময় হয়ে গেছিল। ঢুকতেই জেঠু বললেন “হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসে যাও, তারপর শুনব পরীক্ষা কেমন হোল”। 
খাবারের জন্য আমি সন্ধ্যে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম। তাই বসতে আর বিলম্ব করলাম না। জায়গা পেলাম - ঠিক সাহেব দাদুর পাশে। 
বয়স সত্তর অতিক্রম করা ব্যক্তির রাতের খাবারের বহর দেখে আমি তো অবাক। শুনেছিলাম উনি খেতে ভালোবাসেন। তাই বলে এত? কমপক্ষে চল্লিশটা লুচি তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চিকেন কসা।
একটা কথা বলা হয়নি। উনি কিছুদিন আগে ওনার ছেলের কাছে আমেরিকা গেছিলেন। ওখান থেকে উনি ওনার দাঁত গুলো বাঁধিয়ে এসেছেন। শুনেছি নকল দাঁতের পাটিটা এতটাই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বানানো যে এটা পড়লে যুবা বয়সে যা চেবানো সম্ভব ছিল না ,তাও চেবানো যায়। সেই শোনা কথাটা যে একশ শতাংশ সত্যি তা তো আমি নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি। শুধু এটাই বুঝতে পারছি না - এই দাঁত কি খিদে আর হজম শক্তিকেও বাড়ীয়ে দেয়? হয়ত হবে, নইলে এই বয়সে চল্লিশটা লুচি কেজি খানেক চিকেন কসা সহকারে রাতের খাবার সম্ভব নয়। আমি তো পনেরটার পরেই হাল ছেঁড়ে দিয়েছি।
মনে মনে সাহেব ঠাম্মি খুব রেগে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সবার মাঝে দাদুকে শাসন করাটা অশোভন দেখাবে ভেবেই চুপ করে ছিলেন। সাহেব দাদুও সেই সুযোগ্যার সদ্ব্যবহার করছিলেন।
খাওয়া চলতেই চলতেই সাহেব ঠাম্মি দু’দুবার এসে সাহেব দাদুকে বলেছেন “রাত করে বেশী খেও না”। প্রতিবারই সাহেব দাদু উত্তর দিয়েছেন “না না আমি বেশী খাচ্ছি না। পুর পেট ভরে খাচ্ছি না। তোমাকে অতো চিন্তা করতে হবে না। আমি বুঝেই খাচ্ছি।” আমি শুধু অবাক হয়ে ভাবছি লোকটা পেট ভরে খেলে কতটা খেত।
পরের দিন খুব সকাল সকাল সবাই উঠে পড়লাম। রৈ রৈ করে দধিমঙ্গল, গায়ে হলুদ কাটিয়ে পৌঁছেগেলাম বিকালে। আমার বাবা আর সাহেব ঠাম্মি ছোটকাকাকে নিয়ে বরের গাড়িতে বেরিয়ে গেল। সাহেব দাদুরই যাবার কথা ছিল। কিন্তু তিনি দুপুরের খাওয়া খেয়ে আর বেরতে চাইলেন না। আসলে খাওয়াটা একটু বেশী হয়ে গেছিল। তাই না ঘুমিয়ে বেরতে চাইছিলেন না।
কনে মানে হবু কাকিমার বাড়ী সেই উত্তর চব্বিশ পরগনার বেড়াচাঁপাতে। সাঁতরাগাছি থেকে বেড়াচাঁপা যেতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগবে। বিয়ের লগ্ন সন্ধ্যেতে হওয়ায় বরের গাড়ী দুপুর তিনটের আগেই বেড়িয়ে গেছে। জেঠু তারা দিচ্ছিলেন যাতে বরযাত্রীর গাড়ীও বিকাল পাঁচটার মধ্যে বেরতে পারে। 

আমারা সবাই বেশ ব্যস্ত হয়েই সাজগোজ করছি। জেঠু আর জেঠিমা আমাদের সাথে যাবেন না, বাড়ীতেই থাকবেন। জেঠুর নারায়ণ শিলা আছে। আজ আবার পূর্ণিমা। এমনিতেই নারায়ণকে দুবেলা ভোগ না দিয়ে, সান্ধ্যা আহ্নিক না করে জেঠু কিছু খান না। আর তাছাড়া প্যান্ডেলের কাজ পুরো শেষ হয় নি। জেঠু দাঁড়িয়ে থেকে সেই কাজটা শেষ করাবে।এদিকে আমাদের সাজগোজ সম্পূর্ণ শেষ। ঘড়ীতেও পাঁচটা বেজে গেছে। কিন্তু বরযাত্রীর গাড়ী এখনও আসে নি। জেঠু খুব অস্থির হয়ে উঠেছেন। প্রায় সারে পাঁচটার সময় গাড়ীটা এলো। লাল রঙের বেশ বিলাসবহুল সুন্দর একটা বাস। কিন্তু গাড়ীর ড্রাইভারকে দেখে জেঠু ভীষণ রেগে গেলেন। “পাঁচু তুই কেন ? মন্টু কোথায়? আর এত দেরিই বা হল কেন?”রোগা ছিপ ছিপে বেঁটে খাটো আমার থেকে তিন চার বছরের বড় পাঁচু চিরুনি দিয়ে তার ঝাঁকড়া চুল গুলো আছড়াতে আছড়াতে উত্তর দিল “মন্টুদার পেট খারাপ। বার বার বাথরুম যেতে হচ্ছে। তাই আমাকে পাঠাল। আমি সঙ্গে কোন হেল্পার পাচ্ছিলাম না বলে দেরি হচ্ছিল।”জেঠু বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন “কিন্তু তুই পারবি ঠিকঠাক চালাতে?”পাঁচু দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিল ”কেন পারব না? আমি তো এখন ফুল ড্রাইভার। লাইসেন্সও পেয়ে গেছি।”এই পাঁচু হল মন্টুদার হেল্পার। মন্টুদাই ওকে নিজের হাতে গাড়ী চালান শিখিয়েছে। মন্টুদা খুব ছোট থেকে ড্রাইভারই করছে। আমাদের এ বাড়ীর সঙ্গে ওর খুব ভাল সম্পর্ক। মাঝে মাঝে জেঠুর কোথাও যাবার হলে ওকে খবর দিলে ও এসে জেঠুর অ্যাম্বাসাডরটা চালায়। পাকা কথার দিন জেঠু আর বাবাকে মন্টুদাই অ্যাম্বাসাডরেই নিয়ে গেছিল বেড়াচাঁপাতে। বরযাত্রী গাড়ী মন্টুদাই জোগাড় করে নিজেই চালাবে বলে ছিল। তাই জেঠুও নিশ্চিন্তে ছিলেন। কারণ কন্যাপক্ষের বাড়ী ছোটকাকা ছাড়া জেঠু ,বাবা আর এই মন্টুদাই চিনত। তাই জেঠু পাঁচুকে আবার প্রশ্ন করলেন “তুই ঠিকঠাক চিনে যেতে পারবি?”পাঁচু মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলে “হ্যাঁ হ্যাঁ , মন্টুদা আমাকে পুরো ছবি একে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই দেখুন না।” সে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দেখাল। জেঠু দেখে বেশ খুশি হলেন। পাচু আরও বলল “রাস্তাটা এক দম সোজা। বেড়াচাঁপা বাজার থেকে ডান দিকে বেঁকে সোজা পুব দিকে। প্রাইমারী ইস্কুলের অপোজিটে -বিরাট উঠানয়ালা তিনতলা বাড়ী।” পাচুর কথায় আশ্বস্ত হয়ে জেঠু গাড়ি ছাড়ার পারমিশন দিলেন। বাস ছাড়ার পর বড় কাকা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন “পৌছাতে পৌছাতে কটা বাজবে কে জানে?” গাড়ী ছাড়ার সাথে সাথেতেই বড় কাকা বাসের ভিডিও সেট এ হিন্দি সিনেমার গান চালিয়ে দিল। আমরা সবাই মজাকরে দেখতে দেখতে চলেছি।কিন্তু কোনা এক্সপ্রেস আর এম-জি রোড এত জ্যাম ছিল যে গাড়ী প্রায় নড়তেই চায়না। তিন ঘণ্টা লাগল ওই দুটো রোড পেরতেই। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত জ্যাম পিছু ছাড়ল না। তারপর জ্যাম কমলেও রাস্তার অবস্থা ভালো না হওয়ায় বাস স্পিড তুলতে পারল না। এগারোটা বেজে যাবার পর আমাদের সকলের মধ্যেই একটা ঝিমুনি ভাব চলে এসেছিল। সবার মুখে চোখে একটা ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি গোছের অভিব্যক্তি।“পাচু আর কতক্ষণ? তোর মন্টুদার ম্যাপ কি বলছে?” বিরক্তি ও ক্লান্তি মেশানো গলায় প্রশ্ন করলেন বড়কাকা। রাস্তার দিকে মুখ রেখেই পাচু উত্তর দিল “মাপ বলছে একটু পরই একটা বাজার পরবে আর সেটা থেকেই ডান দিক বেঁকে যেতে হবে। তারপর সোজা রাস্তা। একটা স্কুল পরবে তার পাশেই বিয়ে বাড়ী।”কথাটা শুনেই আমরা চল্লিশ জন বরযাত্রী জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে রাস্তার সামনে দেখতে দেখতে চললাম। কিছুক্ষণ পর একটু আলো ঝলমলে একটু জনবহুল একটা এলাকা আসতেই পাচু বলল “এই তো বাজার চলে এসছে। এই বার ডান দিক।”বাস ডান দিকে ঢুকে সোজা রাস্তায় চলতে শুরু করল। রাস্তার শুরুর দিকে কিছু বাড়ীতে আলো থাকলেও কিছুটা পর থেকে শুরু হল অন্ধকার। এখানে কি তবে লোডশেডিং চলছে। কিন্তু সেই স্কুল কোথায় ? অন্ধকারে কি করে বুঝব? ঘড়ীতে তখন পণে বারোটা।আরও খানিকটা যাবার পর দুরে দেখতে পেলাম একটা আলো ঝলমলে অনুষ্ঠান বাড়ী।“মনে হচ্ছে ঐ বাড়িটাই হবে।” হাসি হাসি মুখ করে বললেন বড় কাকিমা।বাস কাছাকাছি পৌছাতেই দেখলাম অনুষ্ঠান বাড়ীর লোকজন রাস্তা উপড়েই দাঁড়িয়ে আছে। ওরা হাত দেখিয়ে বাসটাকে পাশের মাঠের মধ্যে ঢুকতে বলল। আমরা খুব খুশি। যাক বাবা একটু দেরি হলেও অবশেষে পৌঁছলাম।

কনে পক্ষের একজন মোটা চেহারার সাদা চুলয়ালা বয়স্ক লোকটি বলল “যখনই শুনলাম কল্যাণীতে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে, তখনি ভেবেছিলাম আপনাদের দেরি হবে। আপনারা খুব জ্যাম পেয়েছেন তো ?”বড় কাকা বললেন “সে আর বলতে।”কিন্তু সাহেব দাদু বিরক্তি নিয়ে বললেন “কি আশ্চর্য ? কল্যাণীতে এক্সিডেন্ট হয়েছে বলে কোনা এক্সপ্রেসে জ্যাম? এই দেশটার কোন দিন উন্নতি হবে না।” সত্যি আমাদের কাছেও ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগছিল।         বিয়ে বাড়ী ঢোকার মুখেই কনে পক্ষের সবাই আমাদের বলছে ব্যাচ ফাঁকা আছে আমরা যেন আগেই খেতে বসে যাই। রাত বারোটায় ব্যাচ ফাঁকা থাকাটাই স্বাভাবিক। এদিকে কিছুক্ষণ আগে কনে নাকি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিয়ে এখন স্থগিত আছে।         তাই বিয়ে শুরু হতে সময় লাগবে। তাই আমাদের খেতে বসে যাওয়াই ভাল। আমার মা সেই বয়স্ক লোকটির কাছে বাবা আর সাহেব ঠাম্মির খোঁজ করছিলেন। সেই লোকটি একটু আমতা আমতা করে বলল “বরের সাথে যারা এসেছিল, তাদের খাওয়া হয়ে গেছে।”সেই শুনে আমরা বিয়ের বাড়ীতে না ঢুকে মাঠের যে দিকে খাওয়া জন্য প্যান্ডেল করা হয়েছিল সেই দিকেই চললাম। বলাই বাহুল্য আমাদের প্রত্যেকের পেটেই ছুঁচোয় ডন মারছিল। তাই শুরুতেই সরাসরি খাওয়ার আমন্ত্রণে আমারা প্রত্যেকেই বেশ খুশী হলাম।বেশ আরাম করেই আমাদের খাওয়া দাওয়া চলছিল। কনে পক্ষ খুব যত্ন নিয়েই আমাদের পরিবেশন করছিলেন। পরিবেশক সবাই কনের আত্মীয় সজন বলেই মনে হল। পোশাকের উপর গামছা পরে হাতে বালতি নিয়ে পরিবেশন করছিলেন। খাবারের মেনু খুবই সাদামাটা। আমাদের সবার মনের মধ্যে একটা খটকা লাগছিল। শুনেছিলাম কনে বাড়ীর আর্থিক অবস্থা খুবই উচ্চ প্রকৃতির। কিন্তু এই প্যান্ডেল, পরিবেশনের লোকজন এবং খাবারে মেনু কোনটাই আর্থিক প্রাচুর্যের পরিচায়ক ছিল না। মুরগি কিংবা পাঁঠা কোন প্রকারের মাংসই ছিল না। আমিষ বলতে শুধুই কাতলা মাছ। সাহেব দাদু কিন্তু সব খাবারই খুব তৃপ্তি করে এক মনে খেয়ে চলেছেন। বলাবাহুল্য পাশে সাহেব ঠাম্মি না থাকায় খাবারের পরিমাণও বেড়ে চলেছে। এমন সময় একটা লোক একটা বড় থালায় রান্না করা একটা প্রকাণ্ড মাছের মাথা নিয়ে হাজির। বাবার সঙ্গে আমি প্রায়ই লেক মার্কেটে যেতাম। কিন্তু কোন দিন এত বড় মাছের মাথা দেখিনি। মাথাটা খুব কম হলেও তিন কেজি হবে। কনেপক্ষের সেই লোকটিই বলল “এটা আমাদের পাড়ার পুকুরের আজকের ধরা সব চেয়ে বড় মাছের। মাছটা বারো কেজি ওজনের।এটা শুধু মাত্র রান্না করা হয়েছে আপনাদের জন্য। কে খাবেন বলুন?”আমরা প্রায় সবাই এক সাথেই ঘাড় নেড়ে জানিয়ে দিলাম না আমরা কেউ খাব না। কিন্তু আমাদের এই সমবেত নায়ের মাঝে আর একটা গলার স্বর প্রকট হল “এটা কি জ্যান্ত মাছের মাথা ?” ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মাছের মাথাটার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন সাহেব দাদু। প্রশ্নটা উনিই করেছেন। কনে পক্ষের লোকটা বলল “এক দম জ্যান্ত মাছের। আমি নিজের হাতে ধরেছি। আপনি খান?”

“দাও দেখি” লজ্জা লজ্জা মুখে বললেন সাহেব দাদু। সাহেব দাদুর খাবারের এই রকম নমুনা দেখে আমরা সবাই বেশ চিন্তিত।          আমার মা আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন "বাড়ীর ভেতরে গিয়ে তোর সাহেব ঠাম্মিকে গিয়ে ডেকে নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি। উনি ছাড়া সাহেব কাকাকে আটকানো মুস্কিল। সত্তর বছরে এই রকম খেয়ে বাসে এতোটা জার্নি করলে অবধারিত অসুস্থ হবেন। তখন বউভাতটাই মাটি হবে।"         আমি ছুটলাম বাড়ীর ভিতরে। কিন্তু কি আশ্চর্য বাবা বা সাহেব ঠাম্মি কাউকেই খুঁজে পেলাম না। সব চেয়ে অবাক হলাম বরের পোশাকে যে বসে আছে সে আমার ছোটকাকা নয়। কি যে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার খুব ভয় করতে শুরু করেছে। কথাগুলো মাকে বলতেই মা বললেন “কেলেঙ্কারি কান্ড। তাড়াতাড়ি তোর বড় কাকাকে ডাক“। ইতি মধ্যে সাহেব দাদু বাদে সকলের খাওয়া হয়ে গেছিল। বড় কাকাকে পাওয়া গেল প্যান্ডেলের পিছনে হাত মুখ ধোয়ার জায়গায়। 

আমরা কিছু বলার আগেই দেখি পাচু বড় কাকাকে ডাকছে। সে আমাদের সঙ্গে খেতে বসে নি। সিগারেট ফুঁকতে গেছিল। পাচুর সঙ্গে একজন স্থানীয় লোক। বড় কাকা কাছে আসতেই পাচু বলল “কাকা, বিরাট একটা ভুল হয়ে গেছে। বারাসাতে আমি টাকি রোডে ঢুকতে গিয়ে ব্যারাকপুর রোডেএ ঢুকে গেছিলাম। আর বেড়াচাঁপা ভেবে নীলগঞ্জে ঢুকে গেছি। এটা না অন্য বাড়ী। আপনারা যে বাড়ী যাবেন এটা সেটা নয়।” স্থানীয় লোকটাকে দেখিয়ে পাচু আরও বলল “এই দাদার পাশেই মুদিখানা দোকান। উনি বললেন এদের বরযাত্রী কৃষ্ণনগর থেকে আসার কথা।

wedding_priests2.jpg

আসলে কল্যাণীতে বিরাট এক্সিডেন্ট হয়েছে তো - তাই হয়ত ওদের গাড়ী আসতে পারছে না। আমি রাস্তাটা পুরো বুঝে নিয়েছি। আপনারা গাড়ীতে উঠে পড়ুন। আমি এবার ঠিকঠাক নিয়ে যাব।” 
এতক্ষণ পর আমার সব কিছু একে একে দুই হল। বড় কাকা বললেন “ইশ, কি বিশ্রী ব্যাপার। চল্লিশটা প্লেট কি কম কথা? লজ্জায় ওদের সামনে যেতে পারব না।"
সেই পাড়ার লোকটি বলল "সত্যি বিশ্রী ব্যাপার। কারণ যখন এদের অ্যাকচুয়াল বরযাত্রী আসবে তখন এরা খেতে দেবে কি? একেই এনার মানে কনের বাবার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। এই বিয়েটাই তো আমরা পাড়ার সবাই চাঁদা তুলে দিচ্ছি। এদিকে বরপক্ষ তো ত্রিশ হাজার টাকা পণ চেয়েছে। সে টাকা এখনও জোগাড় হয় নি।"
লোকটির কথা শুনে আমার প্রত্যেকের মন দুঃখে ভরে উঠল। আমি ছুটলাম সাহেব দাদুর কাছে। গিয়ে দেখি উনি তখনও সেই বিরাট সাইজের মাছের মাথাটাকে বাগে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি কানের কাছে গিয়ে বললাম "দাদু, পাচু আমাদের ভুল করে অন্য বাড়ীতে নিয়ে এসেছে। "
দাদু নির্বিকার চিত্তে বললেন "সেটা আমি খেতে বসেই বুঝেছি। কিন্তু এতো খিদে পেয়েছিল তাই আর মুখ খুলিনি। বুজলে ওরা মানুষ খুব ভালো। কি যত্ন করে খেতে বসাল। তাই আর ওদের কষ্ট দিতে মন চাইল না। " 
আমি বললাম "কিন্তু এখন যদি অ্যাকচুয়াল বরযাত্রী এসে পড়ে?"
উনি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন "ওদের বেড়াচাপার নাম ঠিকানা দিয়ে ওখানে পাঠিয়ে দেব।