পুজো বার্ষিকী ২০২৮

প্রচ্ছদঃ সুরজিৎ সিনহা, হলদিয়া 

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

 

কবিতা

সুদীপ্ত বিশ্বাস

ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টর

রানাঘাট, নদীয়া, পঃ বাংলা

আশার বাষ্প

হামারী এসে জীবন কাড়ছে তবু
আমরা চেয়েছি গেয়ে যেতে সেই গান
শবের উপরে জমছে শবের স্তুপ,
কবরের পাশে বেঁচে ওঠে কিছু প্রাণ।

রাত্রির বুকে বাড়ছে আঁধার রোজই
ফুল তবু ফোটে শবদেহটার পাশে
চাঁদ নেই তবু দূরের আকাশে দেখ,
কিছু ছোট তারা আলো দেয়,ভালোবাসে।

মৃত্যু আসছে কাড়ছে মায়ের কোল
কত ভাবনারা আর তো পেল না ভাষা
বেশ কিছু ফুল অকালেই ঝরে গেল,
মৃত্যুর পরও থেকে যায় প্রত্যাশা। 

দূরের তারার ক্ষীণকায় স্মিত আলো
সংকেতে বলে সংগ্রাম আছে বাকি
তারা খসে গেলে মৃত্যুর গান গেয়ে,
তখনও দেখবে ডাকছে ভোরের পাখি।

 

ইঞ্জেকশন!

লোকে আমায় ভয়ই পেত,বাসত না কেউ ভালো
মনে মনে সবাই আমায় দিত অনেক গালও।
তারপরে যেই কোভিড এল, তাক ধিনা ধিন ধিন
অনেক দিনের পরে এল শোধ তোলবার দিন।
আমার জন্য এখন লোকের হয় না রাতে ঘুম
লাইন দিয়ে চলছে সবার সুচ-ফোটানোর ধুম!
আমায় নিয়ে কাড়াকাড়ি, চলছে যে রাজনীতি 
সুচ দেখে আর আমজনতার একটুও নেই ভীতি! 
ফার্স্ট ডোজের পরে আবার মিলবে কবে ডোজ?
নিয়ম করে সবাই এসে যাচ্ছে নিয়ে খোঁজ। 
দুটি ডোজের মধ্যে আবার গ্যাপ যদি যায় বেড়ে
হাঁ-হাঁ করে অমনি সবাই মারতে আসে তেড়ে।
কাঁদছে সবাই ঠোঁট ফুলিয়ে যাদের আছে বাকি
এত্ত ভালোবাসা আমি কোথায় বলো রাখি?

Comments

Top

কবিতা

আবু আফজাল সালেহ

কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, চুয়াডাঙ্গা, বাংলাদেশ

 

বৃষ্টিমাথায় ছবি আঁকি

 

বৃষ্টি বাদল ভোরবেলাতে

দ্যাখো দ্যাখো খোলো আঁখি

কদম গাছে বৃষ্টিমাখা

হাজার রকম রঙিন পাখি।

কালো পাখি হলুদ পাখি

কত্তরকম ডাকাডাকি

পীত হলুদে লাল খয়েরি

শাখা পাখির ছবি আঁকি।

 

 

পাঁকা গমখেতের সৌন্দর্য
 

নীলিমায় সাদা মেঘের মিনার
আকাশ পারে পারাবত ওড়ে
সোনাবালুতীরে ঝাউবন-- সবুজ ঢেউ
নীল নোনাজলের গর্জন,পাড় ভাঙে
অতল-রহস্যে সুউচ্চ নারিকেল বীথির উচ্ছ্বাস।

এমন সেন্টমার্টিনে এক কবিতা দাঁড়িয়ে
তার ছেড়ে দেওয়া আঁচল--
পাঁকা গমখেতের দুলে ওঠা ঢেউয়ের সৌন্দর্য ওড়ে।

বিজয়ী চুম্বন
 

দিও চারিদিকে ঘন কুয়াশার রহস্য
হিংসা-বিদ্বেষ,বায়বীয় অহংকার
জলপাথরে লুকায়িত বেদনার ছাপ।
এমন হিংস্রতার ছায়ায় তোমার
হরিণ পায়ের নূপুরধ্বনি--
যেন কার্তিকের সোনালি ধানক্ষেতের ঢেউ।

যতই জোৎস্নালোক ছায়াবৃত হোক
টিয়া ঠোঁটের উচ্চারণ বুজি, খুঁজি
তোমার কপালে এঁকে দেবো বিজয়ী চুম্বন।

 

শিশির ভেজা গোলাপ
 

রনাতলে শরীর ভিজিয়ে নিলে
যেন শিশির ভেজা গোলাপ।
কতদিন সূর্যের সঙ্গে তোমার আড়ি!
শীতনিদ্রা ছাড়তে
সূর্যপাপড়িতে ওম নাও এবার।

তুমি ও গোলাপ
গোলাপ ও তুমি
শিশির ভেজা গোলাপ তুমি।

 

ভালোবাসতে মঙ্গলে যেতে হয় না
 

ভালোবাসতে হলে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া লাগে না
ঝুপড়িতেই হয়
আটচালায় হয়--
অট্টালিকাতেও ভালোবাসা থাকতে চায়।

মনের ওপর ভালোবাসার পরিণতি;
তবে শিখতে হয়।

 

ওড়া ও ভালোবাসা শিখতে হয়
 

'ড়া' আর 'উড়তে পারা' এক নয়
'ভালোবাসা' আর 'ভালোবাসতে পারা' এক নয়।
পাখির ওড়া শিখতে হয়;
ভালোবাসাও শিখতে হয়--
অন্যথা বিপথগামী হতে হয়। 

 

গল্প

বিবাহ উৎসব

জয়দীপ চক্রবর্তী 

marriage2.jpg

Comments

Top


রিমোট কন্ট্রোল চিরদিন একজনের হাতে থাকে না। ছেলেকে এক সময়ে খেলার মাঠ থেকে টেনে প্রাইভেট টিচারের পাঠ নিতে বাধ্য করেছে যে বাবা, সেই বাবাকেই এখন ছেলের কথা মেনে শক্তিগড়ের ল্যাংচা ছেড়ে নিম-বেগুন বা উচ্ছের তরকারি খেতে হয়। নিজের শরীরের ভালোর জন্য সে নয় খাওয়া যায়, কিন্তু নিজের একমাত্র ছোটো-মেয়ের বিয়ে কখনই পঞ্জিকা না মেনে দেওয়া যায় না। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়ার জন্যও যুক্তি খাড়া করল ছেলে সৌরজ্যোতি। 
পঞ্জিকা মেনে বিয়ের ডেট ঠিক করা যাবে না বাবা। তাতে অসুবিধে অনেক। বিয়ের ডেটটা আমাদের সুবিধে মতই ফেলতে হবে।
বিয়ে আবার নিজেদের ইচ্ছেমত ডেটে হয় নাকি? কালে কালে আর কত শুনবো!
অবাক হওয়ার কিছু নেই বাবা। বিদেশে এই কনসেপ্টেই দুর্গাপূজা হয়। ওদেশে পাঁজি মেনে চার-পাঁচদিন ধরে দুর্গাপূজা করার কারো সময় নেই। যে ডেটেই পূজা পড়ুক না কেন, ওরা উইক এন্ডেই করে। তাছাড়া দিন, ক্ষণ, লগ্ন মেনে বিয়ে হলেই যদি সবার ম্যারেজ লাইফ সুখের হয়ে যেত, তবে  এতো ডিভোর্স হোতো না, আর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এতো ঝগড়া বিবাদও সব সময় লেগে থাকতো না। 
তাহলে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করলেই হয়। এতো ঘটা করে নিয়ম মেনে বিয়ে দেওয়ার কি দরকার আছে। 
না,না। রেজিস্ট্রি ম্যারেজে ভিডিও শুটের স্কোপ কোথায়? তাছাড়া মাম্পির বিয়ে বলে কথা। শুধু তো বিয়ে, বৌভাত নয়, আইবুড়ো ভাত, মেহেন্দি, সঙ্গীত, তত্ত্ব সাজানো, প্রি-ওয়েডিং ভিডিওগ্রাফি, হাজারও অনুষ্ঠান। এতো ছুটি তো পাওয়া যাবে না। আমি পেলেও পাত্র নিজেই পাবেনা। দেবসুর্যই তো ফোন করে আমাকে বলল, বিয়েটা স্যাটার ডে ফেললে ওর সুবিধে হয়। ফ্রাইডে গুড ফ্রাইডে। ওর তিন দিন পরপর ছুটি আছে। সোম,  মঙ্গল দুদিন ছুটি নিলেই তবে হয়ে যাবে। আমি গ্রিন সিগন্যাল দিলে ও ফ্রাইডে ফ্লাইটের টিকিট কাটবে। 
ও, সবকিছু ঠিকই করে ফেলেছ। তাহলে আমাকে জিজ্ঞাসা করছ কেন? 
বাবা, তুমি রাগ না করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর। বিয়ের পাঁচ ছয়মাস আগে বিয়ের ডেটে কোনও বিয়ে বাড়ি পাবে না। মাম্পির বিয়েতে প্রায় হাজার খানেক নিমন্ত্রিত থাকবে। যে সে বিয়েবাড়ি ভাড়া করলে চলবে? তাছাড়া বিয়েটা তো ঐ বৈশাখ মাসেই হচ্ছে। শুধু কয়েকটা দিন আগে পরে এই যা। 
মনে না নিতে পারলেও ছেলের যুক্তিকে মেনে নিতেই হল সৌম্যজিতকে। অবসর-প্রাপ্ত ব্যাঙ্ক ম্যানেজার সৌম্যজিত গোস্বামীর দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ে দেবস্মিতার বিয়েটা স্ত্রী মহামায়ার আপত্তি সত্ত্বেও একটু তাড়াতাড়িই দিয়েছিলেন উনি। দেবস্মিতা তখন সবে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। ছেলে সৌরজ্যোতি চাটার আকাউন্টেন্ট। বেশ নামকরা একটি বেসরকারি কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত। ছোটোমেয়ে মাম্পি ওরফের ত্রিপর্ণা ছোটো থেকেই পড়াশোনায় বেশ ভালো। প্রাথমিক পড়াশোনার গণ্ডি কৃতিত্বের সাথে পেড়িয়ে ট্রান্সলেশনাল মেডিসিন নিয়ে পড়ার জন্যে লন্ডনে যায়। ওখানেই প্রবাসী বাঙালী দেবসুর্যের সাথে ওর পরিচয় হয়। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে আপাতত নিজের দেশে ফিরে এলেও বিয়ের পর ঐ দেশের কোনও রিসার্চ সেন্টারের সাথে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে আছে মাম্পির।
দেবসুর্য ও ত্রিপর্ণার বিয়ের দিন স্থির হয়ে গেল। অকাল বোধনের মতো অকাল বিয়েই ঠিক হল। আর সেই সঙ্গে চলল নানা রকম প্রস্তুতি পর্ব। ইভেন্ট ম্যানেজার নখদর্পণ ধরের উপর সম্পূর্ণ দায়িত্বটা থাকলেও প্রতিটি বিভাগ তত্ত্বাবোধনে দায়িত্ব বাড়ির লোকজনদের উপরই রইল। 
বেশ বড়সড় একটা রিসোর্ট ভাড়া করা হল। সামনে অনেকটা জায়গা নিয়ে একটা উদ্যান রয়েছে। তার কিছুটা অংশে রকমারি খাওয়ারের স্টল বসবে। আর কিছুটা ছাড়া থাকবে অতিথিদের গাড়ি রাখার জন্য। বিয়েবাড়িটির সবকিছু মনমতো হলেও এটা সৌরজ্যোতিদের বাড়ি থেকে পাঁচটি স্টেশন পড়ে, একটি পাণ্ডব বর্জিত জায়গায়। আশেপাশে দোকানপাট তেমন নেই। তাই প্রয়োজনীয় সবকিছু আগের থেকে গুছিয়ে নিয়ে বিয়ে বাড়িতে যেতে হবে। বাড়ি থেকে ঘন-ঘন যাতায়াত করাত কোনও উপায় নেই।    
সুসজ্জিত বিয়ের কার্ড তৈরি হল। একটি সুদৃশ্য ফিতে বাঁধা বাক্স। যার মধ্যে অনেকগুলো কার্ড। একটিতে ইংরাজিতে লেখা আমন্ত্রণ পত্র, একটিতে বাংলায়, আর একটি রয়েছে হিন্দিতে। একটি কার্ডে ইংরাজি হরফে রয়েছে অনুষ্ঠান বাড়ির যাওয়ার পথ নির্দেশ। এছাড়া প্রতিটি আমন্ত্রণ বাক্সে একটি ফর্ম রয়েছে। ঐ ফর্মে আমন্ত্রিতের সংখ্যা, উপস্থিত হইবার সম্ভাব্য আমন্ত্রিত, কার পার্কিং দরকার কিনা, ড্রাইভার সাথে যাবে কিনা, প্রভৃতি লেখার জায়গা রয়েছে। নিমন্ত্রণ করার সময় যিনি নিমন্ত্রণ করছেন, তিনি ফর্মটা বের করে নিমন্ত্রণ বাক্সটি আমন্ত্রিতের হাতে দেবেন। এবং আমন্ত্রিতের সাথে কথা বলে ফর্মটি পূর্ণ করবেন। এই ফর্ম থেকেই বিয়ের দিন সম্ভাব্য উপস্থিত আমন্ত্রিতের সংখ্যা, ড্রাইভারদের জন্য প্রয়োজনীয় পার্সেলের একটা ধারনা পাওয়া যাবে। 
আমন্ত্রিতের তালিকায় পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়, কিছু আত্মীয়ের আত্মীয়, যেমন দেবস্মিতা, সৌরজ্যোতির মামা শ্বশুর, কাকা শ্বশুর, কাছের বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, সৌরজ্যোতির অফিস কলিগ, বন্ধু-বান্ধব, সৌম্যজিত বাবুর এক্স অফিস কলিগ, বন্ধু-বান্ধব, মহামায়া, ত্রিপর্ণার বন্ধু-বান্ধব, কেউই বাদ পড়ল না।    
দেবস্মিতার মেয়ে ঐন্দ্রিলা ক্লাস এইটে পড়ে। আঁকার হাত ভীষণই ভাল। তাই আলপনার দায়িত্ব ওকে দেওয়া হয়েছে। অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মাসির বিয়ে। তাই পড়াশোনার চাপ নেই। নিশ্চিন্তে বিয়ে এনজয় করতে পারবে। কিভাবে আলপনা দেবে তা এখন থেকেই ভেবে রেখেছে ঐন্দ্রিলা। সাধারণ রঙ নয়। বিভিন্ন রঙের আবীর, হলুদের গুঁড়ো, চকের গুঁড়ো, প্রভৃতি দিয়ে রঙ তৈরি হবে। দোলের সময় অনেক রকম আবীর কিনে বিয়ের জন্য সরিয়ে রাখতে হবে ঐন্দ্রিলাকে।     
আলপনার সঙ্গে তত্ত্ব সাজানোর টিমেও ঐন্দ্রিলা রয়েছে। তত্ত্ব সাজানোর মুল দায়িত্বে রয়েছে সৌরজ্যোতির স্ত্রী দেবাঞ্জনা। অনেক তত্ত্ব। একার হাতে করা সম্ভব নয়। দেবাঞ্জনা তাই চার-পাঁচ জনের একটা টিম করে নিয়েছে। 
বিয়ের কেনাকাটা অনেক আগে থেকে শুরু হলেও কিছু জিনিষ বাদ থেকেই যায়। কোনের গয়না, বড় কোনের পোশাক, দেবাঞ্জনার ডিজাইনার ল্যাহেঙ্গা প্রভৃতি কেনা হয়ে গেলেও কিছু প্রণামী শাড়ি সহ তত্ত্বের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু বাকি থেকে গেল। বিয়ের একমাসও বাকী নেই। প্রতিটি দোকানেই চৈত্র সেলের ভিড়। তার মধ্যেই কেনাকাটা সারতে হল ত্রিপর্ণা, দেবাঞ্জনাদের।

বিয়ের এক সপ্তাহ আগে থেকেই অতিথিদের আগমন শুরু হয়ে গেল। দেবস্মিতার পরিবার, ওদের মাসি, পিসির পরিবার, ত্রিপর্ণার স্কুল লাইফের এক বন্ধু, এক এক করে সকলেই এসে উপস্থিত হল। বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল করে এক সপ্তাহ ধরে খাওয়া দাওয়া চলল। এতো লোকের থাকার ব্যবস্থা ঐ বাড়িতে করা সম্ভব নয়। তাই পাড়া প্রতিবেশীর সাহায্যের আশ্রয় নিতে হল। বিয়ের ঠিক আগের রবিবার, বাড়ির কাছে একটি অনুষ্ঠান বাড়ি ভাড়া করে ত্রিপর্ণার আইবুড়ো ভাত অনুষ্ঠিত হল। শ-তিনেক লোক আমন্ত্রিত হল এই অনুষ্ঠানে। মাংস না থাকলেও তিন রকমের মাছ সহ অনুষ্ঠান বাড়ির নিয়মিত বিভাগের সকল মেনুই খাদ্য তালিকায় স্থান পেয়েছে। ফটোগ্রাফি, সেলফিগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফির মধ্যমে অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত পিঞ্জরিত হল। এই অনুষ্ঠান যেন মুল বিয়ের অনুষ্ঠানের ট্রেলার। মুল অনুষ্ঠানটি কেমন হবে, তা এই ট্রেলার দেখে সহজেই অনুমেয়। বাড়ির সামনে সুসজ্জিত প্রবেশ দ্বার ও কৃত্রিম জোনাকি বাল্বের আলোক সজ্জা সৌরজ্যোতিদের বাড়িটাকে আর পাঁচটা বাড়ি থেকে আলাদা করে রেখেছে। সমবয়সী মহিলা পুরুষদের আড্ডা, ইয়ার্কি, হাসাহাসি, খুনসুটি বাড়িটাকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে। এখন যেকোনো কারণেই কারণ-সুধা উপস্থিত থাকে। এখানেও তার কোনও ব্যতিক্রম নেই। বাড়ির এক কোনে একটা আড়াল খুঁজে সোমরসের আসক্ত, ভক্তরা তা সেবন করছে। কচিকাঁচারা বাবা-মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে কেউ গেম খেলছে, কেউ বা ইউটিউবে নানা ধরনের ভিডিও দেখছে। এভাবেই মুল অনুষ্ঠানের দিন এগিয়ে আসছে।

বিয়ের দুদিন বাকি। বিয়ে বাড়িতে মেহেন্দি উৎসব চলছে। পার্লার থেকে দুইজন ভদ্রমহিলা এসে মেহেন্দি পরাচ্ছে, আর পাত্রী সহ সব মেয়েরাই লাইন দিয়ে দুহাত পেতে মেহেন্দি পরছে। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় সজনের অনেকেই রয়েছে সেই মেহেন্দি পরার দলে। দুজনে পরিয়ে কুল করতে পারছে না। পরিস্থিতি সামলাতে ঐন্দ্রিলাও নেমে পড়ল মেহেন্দি পড়াতে। পেশাদারীদের চেয়ে কোনও অংশে কম হল না ওর শিল্প। বরং নতুনত্বের স্বাদ মিশে  

হস্ত শিল্পগুলি আলাদা করে সকলের নজর কাড়ল। সকল হাতের শিল্পকলাই ক্যামেরা-বন্দী হল। বিয়ের আগের দিন মহামায়ার মনে পড়ল যে খুকুকে বলা হয়নি। খুকু হল সৌম্যজিতের খুড়তুতো বোন। ডিভোর্সি। ছেলেকে নিয়ে একাই থাকে। কারো সাথেই তেমন যোগাযোগ নেই। এদিকে দেবসুর্য আসছে। ত্রিপর্ণাকে নিয়ে দেবসুর্যকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে যাবে সৌরজ্যোতি। সঙ্গে থাকবে ভিডিও ফটোগ্রাফার। সবাই মিলে ইকোপার্কে যাবে প্রি-ওয়েডিং স্যুট করতে। তাই খুকুদিকে নিমন্ত্রণ করা সৌরজ্যোতির পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক কষ্টে নম্বর যোগার করে ফোন করলেন সৌম্যজিত। খুকুর ছেলে ধরল।
খুকু আছে?
না, আপনি কে বলছেন?
আমি ওর সৌম্যদা বলছি। 
ও, বড়মামু। মা তো নার্সিংহোমে ভর্তি। হিমোগ্লোবিন খুব কমে গেছে। ডাক্তার ইমিডিয়েটলি রক্ত দিতে বলেছে। মাকে কিছু বলতে হবে?
না, অনেকদিন কোনও খবর পাইনা, তাই ফোন করেছিলাম।
আমি তো এখন ব্লাড ব্যাঙ্কে আছি। নার্সিংহোমে গিয়ে মাকে তোমার কথা বলব। তুমি ফোন করেছ শুনলে মা খুশি হবে।
ঠিক আছে। এখন তবে রাখি। পড়ে ফোন করে খবর নেব। 
ফোন রেখে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন সৌম্যজিত। 
শুটিং শেষ করে দেবসুর্যকে ওর মামা বাড়ি পৌঁছে দিল সৌরজ্যোতিরা। মামাবাড়ি থেকেই বিয়ে করতে আসবে ও। ভিডিও ফটোগ্রাফাররা আজ সন্ধ্যে বেলাতেই মেয়েদের জলভরা, গঙ্গা নিমন্ত্রণের ভিডিও তুলবে। কাল অতো সকালে তাদের পক্ষে আসা সম্ভব নয়। বাড়ির কাছাকাছি পুকুর নেই। তাই একটি সুইমিংপুলে অধিকর্তাদের অনুমতি নিয়ে প্রক্সি   জলভরা, গঙ্গা নিমন্ত্রণ হল এবং তা চলমান ক্যামেরায় বন্দী হল। 
ত্রিপর্ণাকে বাড়ি পৌঁছে, সৌরজ্যাতিকে রিসোর্টে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে গেল। ত্রিপর্ণা বাড়ি ফিরে দেখল মা, বৌদিরা জল ভরার পর্ব শেষ করে বাড়ি ফিরেছে। ফটোগ্রাফাররা ত্রিপর্ণার দধি-মঙ্গলের ভিডিও ও স্টিল ফটোগ্রাফিও ঐ দিনই সেরে নিলো।  
নখদর্পণ ধরের তত্ত্বাবধানে দশকর্মা সহ বিয়ের সমস্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী রিসোর্টে পোঁছে গিয়েছে। রিসোর্টটি সুসজ্জিত হয়ে উঠছে। পেশাদার শিল্পীদের দিয়ে তত্ত্ব সাজানো হয়েছে। বিয়ের কুঞ্জ প্রস্তুত হচ্ছে। দুই একটা ছোটোখাটো সংশোধন, পরিবর্তন করতে বলে একটু রাত করেই বাড়ি ফিরল সৌরজ্যোতি। 
পরের দিনের গোছ-গাছ ও গল্পগুজব করে সবাই এতো রাতে ঘুমল যে বিয়ের দিন কেউই ভোরে উঠতে পারল না। তাই ত্রিপর্ণার দধি-মঙ্গলটা আর হল না। তবে আগের দিনই ফটো-স্যুট হয়ে যাওয়াতে কেউই তেমন চাপ নিলো না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে বাড়ির নানা কাজকর্ম ও ব্যস্ততা শুরু হল। অনুষ্ঠান বাড়ি ও এদিক সেদিক যাওয়ার জন্য বাড়ির গাড়িটি যথেষ্ট নয়। আরও দুটো গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। প্রথমে ঐন্দ্রিলা সহ আরও কয়েকজনকে প্রাতঃভোজন করিয়ে একটা ভাড়াগাড়িতে অনুষ্ঠান বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ওখানে পোঁছে ঐন্দ্রিলা বিবাহ-কুঞ্জে নিজের আলপনা শিল্পকর্ম শুরু করল। এরপর একে একে সকলেই অনুষ্ঠান বাড়িতে পৌঁছল। 
যথা সময়েও ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদের তত্ত্ব এসে উপস্থিত হল। পাত্রপক্ষ প্রবাসী হওয়ায় বিয়ের নিয়ম-কানুনের সাথে অতোটা অভ্যস্ত নয়। তবে আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর পরামর্শ মত যতটা সম্ভব প্রচলিত নিয়ম মেনেই ছেলের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন ওনারা। গায়েহলুদ, স্নান, খাওয়া-দাওয়া প্রভৃতি সেরে ত্রিপর্ণা, সাজতে বসল। একটি নামকরা পার্লার থেকে বিউটিশিয়ান আনিয়েছে নখদর্পণ। ত্রিপর্ণা সহ সবার সাজগোজ সম্পূর্ণ হতে সন্ধ্যে গড়িয়ে গেল। ধীরে ধীরে আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করল। ক্রমশই বাড়টি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল। বিভিন্ন খাবারের স্টলের একপাশে একটি অস্থায়ী মঞ্চে অর্কেস্ট্রা সহযোগে কণ্ঠি সঙ্গীত পরিবেশিত হচ্ছে। তারই তালে তালে মঞ্চের সামনে কিছু আমন্ত্রিত অতিথি কোমর দোলাচ্ছে। এই কারণেই বিয়ের লগ্ন একটু রাতে ঠিক করেছে সৌরজ্যোতিরা।  
সুসজ্জিত, অতিসজ্জিত, স্বল্প-বাসিত মহিলারা কখনও একক, কখনও বা সমবেত ভাবে সেলফি তুলে মোবাইল বন্দী করছে। ত্রিপর্ণার সাথে ছবি তোলার জন্যও সকলে ব্যাকুল। ত্রিপর্ণার এই চাপ এড়াতে ফটোগ্রাফাররা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছে। ওর কিছু ছবি তারা আগেই তুলে রেখেছে। এবারে যার ছবির সাথে জোড়ার দরকার তার ছবি তুলে ক্যামেরাতেই জুড়ে দিচ্ছে তারা। ছবি দুটি যে আলাদা ভাবে তোলা, তা ছবি দেখে একদমই বোঝা যাচ্ছে না। পুরো অনুষ্ঠানটি ফেসবুক লাইভ হচ্ছে। যে সকল আত্মীয় বন্ধুবান্ধবরা দূরে থাকার জন্যে, বা অন্য অসুবিধের জন্যে বিয়েতে আসতে পারেনি, তারাও অনুষ্ঠানটি দেখতে পাচ্ছে।
একটু দেরীতেই বর এসে উপস্থিত হয়েছে। বর বরণ, বর ও বরযাত্রীর আপ্যায়ন, ফটোগ্রাফির পর বরকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হল। সৌম্যজিত সম্প্রদান করবেন। নির্ধারিত মন্ত্রপাঠ চলল। নাচ গান, খাওয়া-দাওয়া সেরে বিয়ে দেখতে ভীর করেছে সবাই। নির্ধারিত সময়ে কনেকে আনা হল। সাত-পাঁক, শুভদৃষ্টি, মালাবদলের পর কন্যা সম্প্রদান হল। সবকিছু প্রথা মতোই চলছে। তবে একটু সংক্ষিপ্ত। ফটোগ্রাফির প্রয়োজনে ফটোগ্রাফারের নির্দেশে পাত্রপাত্রীদের  মাঝেমাঝেই স্ট্যাচু হতে হচ্ছে। যজ্ঞ শেষে সিঁদুর-দান পর্ব। পুরোহিতের নির্দেশে লজ্জাবস্ত্র দিয়ে ঢাকা হল কনেকে। কিন্তু সিঁদুর কোথায়? পুরোহিতের ফর্দ অনুযায়ী নখ-দর্পণ যা যা এনেছে, তারমধ্যে সিঁদুর নেই।
সিঁদুর তো ছেলের বাড়ির তত্ত্বের সাথে আসে। বললেন মেয়ের এক আত্মীয়া। কিন্তু সেই তত্ত্বেও সিঁদুর নেই। ছেলের বাড়ির লোক বলল, আমাদের এইসব নিয়ম কানুন ভালো জানা নেই। আমাদের সিঁদুর পাঠানোর ব্যাপারে কিছু তো বলা হয়নি।
এখন কার দোষ সেটা না খুঁজে, কিভাবে সমস্যাটার সমাধান করা যায়, সেটা ভাবতে হবে।  সৌরজ্যোতির বক্তব্য। 
আশে পাশে কোনও দোকানও নেই। আর এতো রাতে কোন দোকানই খোলা থাকবে?
এখন বাড়িতে গিয়ে নিয়ে আসতেও বড্ড দেরী হয়ে যাবে। 
একদম পাণ্ডব বর্জিত জায়গা। আশে পাশেও কোনও বাড়ি নেই।
আর বাড়ি থেকেই কি কোনও লাভ হোতো? এখন কোনও মহিলারাই গুঁড়ো সিঁদুর ব্যবহার করেনা। সিঁদুর স্টীক বা লিকুইড সিঁদুর দিয়ে কাজ সারে।
উপস্থিত সকলেই নানা রকম মন্তব্য করতে লাগলো। কিন্তু কারো কথাতেই সমাধান বেরিয়ে এলো না।
পুরোহিত মশাই বললেন, সিঁদুর স্টীক বা লিকুইড সিঁদুরই দেখুন না উপস্থিত কোনও মহিলার কাছে পাওয়া যায় কিনা। অগত্যা ওটা দিয়েই কাজ সারি। 
না, না। ওসব চলবে না। ওতে ফটো ভালো উঠবে না। নাকে সিঁদুর না পড়লে আবার সিঁদুর-দান হল নাকি? ফটোগ্রাফার অসম্মতি প্রকাশ করল।
না না। লিকুইড সিঁদুর ফিদুর চলবে না। ফেসবুক লাইভ হচ্ছে। আমার বিদেশের বন্ধুরাও বিয়ে দেখছে। লোকে দেখে বলবে কি? কিন্তু কোনও উপায়ও তো দেখছি না। সৌরজ্যোতির কথায় চাপা উত্তেজনা।           
বাড়ির বড় জামাই অংশুজিত এতক্ষণ চুপচাপ বসে কি যেন ভাবছিল। হঠাৎ মেয়ে ঐন্দ্রিলাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, তুই যা যা দিয়ে আলপনা দিয়েছিস, তার কি কিছু অবশিষ্ট আছে?
আছে তো। আমি গুছিয়ে যত্ন করে রেখে দিয়েছি। 
ওখানে দ্যাখ তো একটু লাল আবির আছে কিনা।
হ্যাঁ আছে তো। অনেকটাই আছে। আমি এখুনি নিয়ে আসছি।
ঐন্দ্রিলা আবীর নিয়ে এলে অংশুজিত ওটা সৌরজ্যোতির হাতে দিয়ে বলল, নেও এটা দিয়ে কাজ সারো। তোমার ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি বা ফেসবুক লাইভ, কোনটাতেই কিছু বোঝা যাবেনা।
দারুণ আইডিয়া। সৌরজ্যোতি যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেল।
আবীর দিয়েই সিঁদুরদান পর্ব সাঙ্গ হল। খুব সুন্দর ফটো ও ভিডিও উঠল। সোশাল মিডিয়ায় কোনও ত্রুটিই প্রকাশ পেল না। শুধু  সৌম্যজিত ও মহামায়ার মনের কোথায় যেন একটা অতৃপ্তি রয়েই গেল। 

Comments

Top

কবিতা

পলাশ দাস

বারাসাত, কলকাতা

কবিতা

পার্থ সরকার 

বিজ্ঞাপন 

মাটির ফাটলের পাশে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি 

থমকে থাকা রোদের আকাশ 
আর হাওয়ার গায়ে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি 

জলের স্রোতহীন শরীরের পাড়ে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি 

পাথরের অহংকারের গায়ে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি

একটা সচিত্র সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন 
শিকড়, কাণ্ড ও পাতা   

 

অজাতশত্রু বিস্ফোরণ শোধনাগারে

     

জাতশত্রু বিস্ফোরণ শোধনাগারে  

বর্ষা ত্রুটিযুক্ত 

তুচ্ছ হয় 
তড়িৎগতির জাগরণে 
জানবাজারের জীবিকা 

সরে যায় 
বিচ্ছেদ 
অক্ষর পরিচয়হীন 
যোগচিহ্ন 
নবকেতনের 

বিস্ফোরণ 
শোধনাগারে 

ছত্রাকার 
ঘটিবাটির 
জলপানি 


চিহ্ন নেই দেশদ্রোহিতার । 

 
 

Comments

Top

প্রবন্ধ

 

বড়ু চণ্ডীদাসের

‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’

 দিলীপ মজুমদার

পর্ণশ্রী, বেহালা, কলকাতা 

[ড়ু চণ্ডীদাসের প্রামাণ্য জীবনী পাওয়া যায় নি। অনুমান করা হয় তিনি পঞ্চদশ শতকের মানুষ। মিথিলার কবি বিদ্যাপতির সমসাময়িক। বিদ্যাপতির মতো তাঁর লেখায় নাগর-বৈদগ্ধ্য নেই। জয়দেবের পরে তিনি রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলার কাব্য লিখেছেন। গীতিরস থাকলেও তাঁর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন একটি কাহিনীকাব্য। নানা কারণে এই কাব্যটি বাংলাসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য]


।।জন্মখণ্ড।।
কংসাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন দেবতারা। সৃষ্টি যাচ্ছে রসাতলে। চিন্তিত দেবতারা। একটা প্রতিবিধান করা দরকার। দেবতারা এলেন দেবাদিদেব ব্রহ্মার কাছে। সব শুনলেন ব্রহ্মা। তিনি দেবতাদের নিয়ে গেলেন সাগরে। সেখানেই আছেন শ্রীহরি। একমাত্র তিনিই করতে পারেন প্রতিবিধান। দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হলেন শ্রীহরি। তিনি তাঁদের একটি শ্বেত ও একটি কৃষ্ণ কেশ দিয়ে বললেন যে একটি কেশ থেকে বসুদেবপত্নী রোহিণীর গর্ভে জন্ম নেবেন বলরাম, আর দেবকীর গর্ভে জন্ম নেবেন বনমালী কৃষ্ণ। কংসাসুর নিহত হবেন এই কৃষ্ণের হাতে।
কংসাসুর নিধনের ব্যাপারে দেবতাদের মন্ত্রণার কথা কানে গেল নারদমুনির। সে কথা কংসকে জানাবার জন্য তিনি ছুটে এলেন তাঁর কাছে। তাঁর রঙ্গ কৌতুক দেখে কংস যখন হাসছিলেন, তখন নারদ বললেন, ‘হাসছ হাসো, কিন্তু তোমার বিনাশ আসন্ন।’
এ কি কথা বলছেন নারদমুনি! হাসি বন্ধ হয়ে গেল কংসের। কার হাতে মৃত্যু হবে কংসের? নারদ বললেন, ‘দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্মাবে যে সন্তান, তার হাতেই মৃত্যু হবে তোমার।’ নারদের কথা শুনে সচকিত কংস। না, তিনি কোন ঝুঁকি নেবেন না। দেবকীর সব সন্তানকেই হত্যা করবেন তিনি। নিজের ভগ্নী বলে কোন দয়া-মায়া করা যাবে না।
এদিকে কংসের কাছ থেকে নারদ এলেন বসুদেবের কাছে। বললেন, ‘শোনো বসুদেব, তোমার পত্নী দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্ম নেবেন ভগবান নারায়ণ। তিনি হত্যা করবেন কংসকে। তাই কংস তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হবেন। কি করে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানকে রক্ষা করতে হবে, সে পথ তোমাকে পরে বলে দেব।’
আতঙ্কগ্রস্ত কংস দেবকীর ছয়টি গর্ভ নষ্ট করে দিলেন। সপ্তম গর্ভে শ্বেতকেশ থেকে জন্ম হল বলভদ্রের। জননীর গর্ভপাতের ছল করে বলভদ্র আশ্রয় নিলেন রোহিণীর গর্ভে। অষ্টম গর্ভে কৃষ্ণকেশ থেকে জন্ম হল শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী শ্রীকৃষ্ণের। দেবকীর অষ্টম গর্ভের কথা শুনে কংস প্রহরীদের মোতায়েন করেছেন। সন্তানের জন্ম হলে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করা হবে তাকে। শত্রুর শেষ রাখবেন না কংস।
দশমাস পরে এক অন্ধকার বর্ষণমুখর রাতে জন্ম হল কৃষ্ণের। দেবতাদের অনুগ্রহে সে কথা অবগত হলেন বসুদেব। আর ঠিক একই সময়ে যশোদা প্রসব করলেন একটি কন্যা সন্তান। প্রায় অচৈতন্য ছিলেন যশোদা, তাই জানতে পারলেন না কন্যা সন্তানের কথা।
পূর্ব পরামর্শমতো বসুদেব দেবকীর নবজাত সন্তানকে কোলে নিয়ে নামলেন পথে। দৈবমায়ায় কংসের প্রহরীরা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কৃষ্ণকে নিয়ে যশোদার গৃহে এলেন বসুদেব। কৃষ্ণকে যশোদার কোলে দিয়ে যশোদার কন্যা সন্তানকে নিয়ে এলেন দেবকীর কাছে। সেই কন্যার কান্নার শব্দে নিদ্রাভঙ্গ হল প্রহরীদের। খবর গেল কংসের কাছে। কালবিলম্ব না করে তিনি ছুটে এলেন কারাগৃহে। কংস সেই নবজাত কন্যাকে আছড়ে ফেললেন পাথরে। সেই সময় এক দৈববাণী হল: তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে। তাহলে কি গোকুলের নন্দসন্তান তাঁর মৃত্যুর কারণ হবে। কংস পুতনাকে পাঠালেন নন্দগৃহে । স্তন্যপানের ছলনায় কৃষ্ণ তাকে বধ করলেন। তারপর গেল যমলার্জুন। সেও নিহত হল। এভাবে নিহত হল কেশী আদি অসুর। প্রমাদ গুনলেন কংস। 
নন্দ আর যশোদার স্নেহচ্ছায়ায় বর্ধিত হতে লাগলেন কৃষ্ণ। ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে লাগল তাঁর অনুপম দেহলাবণ্য। তাঁর ললাটের দুই দিক লঘু এবং মধ্যভাগ প্রশস্ত। নাসিকা ও লোচন সুগঠিত। ভ্রূ বঙ্কিম। ওষ্ঠাধর প্রবালসদৃশ। করযুগল আজানুলম্বিত। বক্ষস্থল মরকত মণিফলকসদৃশ। কটিদেশ সূক্ষ্ম, জঙ্ঘা রামরম্ভাসদৃশ। কেশরাসী কুঞ্চিত ও দীর্ঘ। পরিধানে পীতবস্ত্র। হাতে মনোহর বংশী।
কৃষ্ণের সম্ভোগের জন্য দেবতাদের নির্দেশে দেবী লক্ষ্মী সাগরের গৃহে পদ্মার উদরে জন্মগ্রহণ করলেন। অপরূপ সৌন্দর্যশালিনী সেই কন্যার নাম হল রাধা। নপুংসক আইহনের সঙ্গে বিবাহ হল রাধার। রাধার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিযুক্ত করা হল কুদর্শনা বৃদ্ধা বড়াইকে ।
।। তাম্বুলখণ্ড ।।
দধি-দুগ্ধের পসরা নিয়ে বড়াই ও সখীদের সঙ্গে রাধা বনপথে প্রত্যহ যান মথুরায়। একদিন চলতে চলতে রাধা বড়াইকে পেছনে ফেলে চলে এলেন বকুলতলায়। তারপরে খেয়াল হল তাঁর সঙ্গে বড়াই তো নেই। এদিকে রাধার হদিশ না পেয়ে বড়াইএর মনেও জাগল শঙ্কা। কর্তব্যে এই ত্রুটি ক্ষমা করবে না আইহনের পরিবার।
পথ চলতে চলতে বড়াই দেখতে পেলেন গোচারণরত এক রাখালকে। কাছে গিয়ে বড়াই বুঝলেন রাখাল তাঁর পরিচিত। নাম তার কানাই। হয়তো কানাই পারবে রাধার হদিশ দিতে। কানাই অর্থাৎ কৃষ্ণ বড়াইকে দেখে বললেন, ‘কি গো, বৃন্দাবনের পথে পথে এমন করে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন?  কিছু হারিয়েছে না কি?’
বড়াই বললেন, ‘সুন্দরী নাতনীকে নিয়ে আসছিলাম। তাকে আর খুঁজে পাচ্ছি না।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘সে কি! হারিয়ে গেল! নাম কি তার? দেখতে কেমন?’
-‘ বৃন্দাবনের পথেই হারিয়েছি তাকে। নাম তার চন্দ্রাবলী। ত্রৈলোক্যসুন্দরী সে। বাছা, আমাকে তুমি মথুরার পথ বলে দাও।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘নিশ্চয়ই বলে দেব মথুরার পথ। তবে একটা শর্তে। তুমি আমাকে তোমার নাতনীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে, বুঝলে!’
-‘এ আর এমন কি! তোমার সঙ্গে তার আলাপ করিয়ে দেব, কথা দিলাম।’
-‘বেশ। তাহলে তার রূপের একটু বর্ণনা দাও।’
-‘শোনো তবে। তার কেশপাশে সুরঙ্গ সিন্দুর দীপ্তি পাচ্ছে, যেন সজল মেঘের ভিতর দিয়ে উদয় হচ্ছে সূর্যের। তার অম্লান আননের দ্যুতি কনককমলের মতো। তাকে দেখলে মোহগ্রস্ত হয় তপস্বীরও মন। তার অলকাবলির ললিতকান্তি দেখে তমালকলিকারা লজ্জিত হয়। তার কজ্জলশোভিত অলস লোচন দেখে নীলোৎপল প্রবেশ করে জলে। শঙ্খ লজ্জা পায় তার কণ্ঠদেশ দেখে। পক্কদাড়িম্ব অভিমানে বিদীর্ণ হয় তার পয়োধরযুগলকে দেখে। কটিদেশ তার ক্ষীণ, গুরুভার বিপুল নিতম্ব। মত্ত রাজহংস অপেক্ষা অনুপম তার গতি।’
রাধার রূপ বর্ণনা শুনে কৃষ্ণ কামকাতর হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘রাধার রূপ বর্ণনা শুনে আমি কাতর হয়ে পড়েছি। এমন পুষ্পিত, মধুকরগুঞ্জিত বসন্তে আমি আর ধৈর্য রাখতে পারছি না।  তুমি তাকে নিয়ে এসো।’
-‘ কথা রাখব তোমার। এখন তুমি বলে দাও মথুরার পথ। আমি ঠিক রাধাকে নিয়ে আসব তোমার কাছে।’
অবশেষে রাধার দেখা পেলেন বড়াই। রাধার হাতে তুলে দিলেন কর্পূর, তাম্বুল, ফুল আর নেত্রবস্ত্র; বললেন এসব পাঠিয়েছেন কৃষ্ণ। বড়াইএর কথা শুনে অতীব ক্রুদ্ধ হলেন রাধা। মাটিতে ফেলে দেন কৃষ্ণপ্রদত্ত দ্রব্যাদি। তখন বড়াই তিরস্কার করে বলেন, ‘ছিঃ, এমন কাজ করতে নেই।  নন্দনন্দন কৃষ্ণ যে তোমার বিরহে কাতর।’
রাধা বলেন, ‘ঘরে আমার সুলক্ষণযুক্ত স্বামী আছেন। নন্দদুলাল গোপালক কৃষ্ণ আমার কে? তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করতে আমার বয়েই গেছে।’
প্রত্যুত্তরে বড়াই বলেন, ‘যে দেবতাকে স্মরণ করলে পাপমুক্তি ঘটে, তার সঙ্গে প্রেম সম্পর্ক হলে তুমি যে বিষ্ণুলোকে যাবে।’
- ‘দরকার নেই বিষ্ণুলোক। বড়াই তোমার মতলবটা কি? বয়স তো অনেক হল, এসব কুকথা বলতে লজ্জা করে না তোমার? আর কক্ষনো বলবে না এসব কথা।


।। দানখণ্ড ।।
দিনকয়েক পরের কথা। আবার দধি-দুগ্ধের পসরা সাজিয়ে বড়াইএর সঙ্গে রাধা চলেছেন মথুরার পথে। এদিকে রাধার গমন পথে মহাদানী সেজে বসে আছেন কৃষ্ণ। রাধা কাছে আসতে তিনি বললেন, ‘শোনো রাধা, আমি দানী, দান আদায় করি। এতদিন ফাঁকি দিয়েছ তুমি। আজ আর পারবে না ফাঁকি দিতে। তোমার কটিদেশ এত ক্ষীণ যে হাতের মুঠোয় ধরা যায়; দাড়িম্বসদৃশ তোমার স্তনযুগল বড় সুন্দর। আমার প্রাপ্য দান পরিশোধ করে আমাকে আলিঙ্গন করো।’
কৃষ্ণের কথা শুনে রাধা হতবাক। বড়াইকে তিনি বলেন, ‘তোমার কৃষ্ণ তো বড় নির্লজ্জ। কামলালসা চরিতার্থ করার জন্য সে মহাদানী সেজেছে। আমার যৌবন, আমার কটিদেশ, আমার স্তনযুগলের কথা বলে কেন সে? কেন আমাকে সে অপমান করছে? এর একটা বিহিত করো তুমি।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘রাজার কাছ থেকে পথ আর হাটের শুল্ক আদায়ের ভার নিয়েছি। দধি-দুগ্ধের পসরা নিয়ে তুমি প্রতিদিন যাও মথুরায়। কিন্তু দান দাও না। তোমার বহু দান বাকি পড়েছে।’
খড়ি পেতে দান গণনা করেন কৃষ্ণ, তারপর বলেন, ‘তোমার নয় লক্ষ কড়ি বাকি পড়েছে; বারো বছরের দান।’
রাধা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘কি যা তা বলছ! আমার বয়স এগারো, তাহলে বারো বছরের দান বাকি থাকে কি করে! দেখো কানাই, আমি সম্ভ্রান্ত বংশের কন্যা, সম্ভ্রান্ত বংশের বধূ, আমার রুপ-যৌবনে লাভ কি তোমার? গাছের উপর পাকা বেল দেখে কাকের লোভ হলেও সে কি তা খেতে পারে? তোমাকে মিনতি করছে, আমার মান রাখো, আমাকে যেতে দাও।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘তোমার রূপ দেখে আমি পাগল হয়েছি রাধা।’
--‘ তাহলে গলায় পাথর বেঁধে জলে ডুবে মরো।’
-‘ তুমি আমার গঙ্গা, তুমি আমার বারাণসী, তুমি সর্বতীর্থসার।’
-‘ ছি ছি, লজ্জা হয় না তোমার! আমি না তোমার মাতুলানী!’
-‘ সে সম্বন্ধ সত্যি নয়। সত্যি হল, আমি দেবরাজ, আর তুমি আমার রানি।’
- ‘ কামজ্বরে ভুগছ তুমি। বিকারের ঘোরে বলছ এ সব।’
-- ‘যাই বলো রাধা, কিন্তু আমার হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার আশা ছেড়ে দাও।’
--‘ ছি কানাই, ছিঃ। শুল্ক আদায়ের ছলনায় তুমি তোমার মামির উপর বলপ্রয়োগ করছ! জানো না, পরস্ত্রীর প্রতি লোভ মহাপাপ!’
কৃষ্ণ গম্ভীরভাবে বলেন, ‘বসুদেব আর দৈবকীর পুত্র আমি। কংসাসুর আমার মাতুল। সেই সূত্রে তুমি আমার শ্যালিকা, মাতুলানী নও। এ সব বাজে কথা বাদ দাও। একবার প্রসন্ন হয়ে আমার দিকে মুখ তুলে চাও। তোমার উন্নত পয়োধরে পীড়ন করো আমাকে। তাহলেই দূর হবে আমার সন্তাপ। রাধা, তোমার দেহের মাপ সাড়ে তিন হাত, তার জন্য দান হবে দুই কোটি মুদ্রা। মাথায় ফুলের মালার  দান লক্ষ মুদ্রা। তোমার সুন্দর কেশরাশির দান দুই লক্ষ মুদ্রা। সীমন্তের সিন্দূর দুই লক্ষ মুদ্রা। নিষ্কলঙ্ক আননের দান চার লক্ষ মুদ্রা। নীলোৎপলসদৃশ নয়ন দুটির দান পাঁচ লক্ষ। গরুড়সদৃশ নাসিকার দান ছয় লক্ষ। কর্ণকুণ্ডলের জন্য সাত লক্ষ, দন্তরাজির জন্য আট লক্ষ, বিম্বফলের মতো অধরের জন্য নয় লক্ষ, বাহুদুটির জন্য এগারো লক্ষ, নখপংক্তির জন্য বারো লক্ষ মুদ্রা দান দিতে হবে তোমাকে। না, না, শেষ নয় এখানে। তোমার স্তনযুগলের জন্য তেরো লক্ষ, কটিদেশের জন্য চোদ্দ লক্ষ, কদলীসদৃশ উরুর জন্য পনেরো লক্ষ, চরণযুগলের জন্য যোল লক্ষ আর হেমপটনিন্দিত জঘনের জন্য চৌষট্টি লক্ষ মুদ্রা দান দিতে হবে।’
--‘এ সব কি বলছ তুমি? কিসের ঘাট? কিসের দান? এ সব কপটতা ছাড়ো। মানুষের দেহের উপর আবার দান ধরা হয় না কি! দেখো কানাই, পরদার গ্রহণে বিষম পাপ। ভৈরবপত্তনে গিয়ে দেহ বিসর্জন দিয়ে তুমি পাপমুক্ত হও। ’
রাধার কথা শুনে কৃষ্ণ হেসে বলেন, ‘রাধা তোমার উরুদুটিই ভৈরবপত্তন; তা যখন এত কাছে আছে, তাহলে দূরে যাই কেন! কলসি বেঁধে গঙ্গায় ডুবে মরার কথা বলছ? তোমার কুচযুগলই তো কলসির মত, সেই কলসি বেঁধে আমি লাবণ্যগঙ্গাজলে ডুবে মরতে রাজি।’ এরপরে একটু গম্ভীর হয়ে কৃষ্ণ বলেন, ‘পাপ খণ্ডনের কৌশল আমি জানি রাধা, তোমার কাছে সে সব শুনব কেন?’

রাধা বলেন, ‘তোমার আসল অভিসন্ধি বুঝতে বাকি নেই আমার। অনেক হয়েছে, এবার পথ ছাড়ো।’-‘ আমার আসল অভিসন্ধি? তা যখন বুঝেছ, তখন এসো আমার কাছে। রতিদান করো রাধা, না হলে ছাড়ব না তোমাকে, কিছুতেই না। ’রাধা বুঝতে পারেন, কৃষ্ণের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব। তিনি বড়াইকে বলেন, ‘আমি পাখি হলে এখান থেকে উড়ে যেতাম। দেখো বড়াই, কৃষ্ণ যদি বলপ্রয়োগ করে তাহলে আমি প্রাণত্যাগ করব। নিজের মাংসের জন্য হরিণী জগতের বৈরী। আমার রূপই কাল হল। সেই রূপে প্রলুব্ধ কৃষ্ণ। কিন্তু তার আশা পূর্ণ হবে না। ’রাধার কথা শুনে একটুও বিচলিত হন না কৃষ্ণ। বরং আত্মপ্রশংসায় মুখর হয়ে ওঠেন। জানান যে কালো জগতের আলো। এ সব শুনে আরও হতাশ হন রাধা। পথ ছেড়ে দেবার জন্য কাতর অনুরোধ করেন কৃষ্ণকে। কিন্তু কৃষ্ণ অবিচলিত, তখন রাধা বড়াইকে বলেন, ‘বড়াই তোমার কি মনে হয়, নন্দনন্দন কৃষ্ণ আমার যোগ্য? মর্কটের গলায় কি গজমুক্তা মানায়?’ চতুর বড়াই দেখতে থাকেন রাধাকে। মুখে প্রতিবাদ করছেন, কিন্তু তাঁর সর্বাঙ্গে রতিরঙ্গের লক্ষণ প্রকট। ঈষৎ হেসে বড়াই বলেন, ‘এত দেরি হল কেন তোমার ? তুমি কি বনে কৃষ্ণের সঙ্গে ছিলে?’

।| নৌকাখণ্ড ।।

অনেক দিন রাধার সঙ্গে দেখা হয় নি কৃষ্ণের। তাই তাঁর মন বড় ব্যাকুল। কি ভাবে দেখা পাওয়া যায় রাধার? বড়াইকে কৃষ্ণ বলেন, ‘রাধাকে মথুরার হাটে যাবার কথা বলো। বলো যে এবার ভিন্ন পথে যাবে, তাহলে কৃষ্ণ তার হদিশ পাবে না। ’বড়াই সম্মত হন। কৃষ্ণকে তিনি যমুনার ঘাটে নৌকা গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেন। বড়াইএর কথা শুনে কৃষ্ণ এমন নৌকা তৈরি করেন, যাতে মাত্র দুজনের স্থান হয়। এরপর আরও একটা বড় নৌকা তৈরি করেন তিনি, আর সেটা ডুবিয়ে রাখেন জলে। বড়াইএর কথা শুনে যথাসময়ে ঘাটে এলেন রাধা। কিন্তু দেখা গেল বড়াই সেখানে নেই। নদীতে একটা নৌকা আছে। কিন্তু বড্ড ছোট সে নৌকা। সখীদের নিয়ে সে নৌকায় যাওয়া অসম্ভব।  একজন একজন করে পার হতে হবে।কিন্তু কোথায় ঘাটোয়াল? রাধা ভালো করে তাকিয়ে দেখে বুঝলেন, ঘাটোয়াল আর কেউ নয়, সেই নন্দনন্দন কৃষ্ণ। কি আর করেন রাধা! নৌকায় উঠে তিনি ঘাটোয়ালকে বলেন, ‘ওহে ঘাটোয়াল, আমাকে পার করে দাও তাড়াতাড়ি। পথে বলপ্রয়োগের চেষ্টা করো না। মনে রেখো, আমাদের সম্পর্কের কথা। তোমার মা যশোদা আমার ননদ, আর তুমি আমার ভাগনে।’

।। ভারখণ্ড ।।

বৃন্দাবনের অভ্যন্তরে গিয়ে কৃষ্ণ চামর গাছের ডাল কেটে তৈরি করেন বাঁক। ঝামা দিয়ে ঘষে চিকন করে তোলেন তাকে। পাটের দড়ি দিয়ে তৈরি করেন শিকে। এ ভাবে রাধার জন্য প্রস্তুত হয় ভার। কিন্তু রাধার বুঝতে বিলম্ব হয় না কৃষ্ণের অভিসন্ধি। নিশ্চয়ই তার কোন বদ মতলব আছে। রাধার পেছন পেছন আসতে থাকেন কৃষ্ণ। রাধা কৃষ্ণকে বলেন, ‘আমার পেছন পেছন আসছ কেন? তোমার কি লজ্জা নেই? তবুও আসছ? বেশ, আমার সঙ্গে আসতে চাও যদি, তাহলে এই দধি-দুগ্ধের ভার বহন করো। ’ছদ্মরাগে কৃষ্ণ বলেন, ‘এ কি বলছ রাধা? আমি হলাম ত্রিভুবনের অধিপতি। জমলার্জুন আর শকটাসুরকে আমি বধ করেছি। কংসাসুরকে বধ করার জন্য আমার জন্ম। সেই আমি ভার বহন করব তোমার ? যৌবনের অ্হংকারে এসব কি যা তা বলছ তুমি?’- ‘যমুনার ঘাটেই তো এক প্রহর বেলা কেটে গেল। মথুরার হাটে কখন যাব? আমার সখীরা সব এগিয়ে গেছে। তুমি ভার বহন করবে কি না বলে দাও। রাজি না হলে আমি আমার হার বিক্রি করে অন্য কোন ভারীকে নিযুক্ত করব।’ রাধার কথা শুনে এগিয়ে এলেন কৃষ্ণ। ভার বহনের ছলনায় নষ্ট করে দিলেন দধি-দুগ্ধ। হায় হায় করে উঠলেন রাধা, কৃষ্ণকে হাত লাগাতে বললেন তিনি। কৃষ্ণ বললেন, ‘তোমার কথায় লোকে আমাকে উপহাস করছে। আমি কেমন করে তোমার ভার বহন করব ? ’রাধা বলেন, ‘গোয়ালা হয়ে কে না ভার বহন করে? দেখো কানাই, দয়া করে এখন এটুকু করো, ফেরার পথে তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করব। ’রাধার কথা শুনে আনন্দিত হলেন কৃষ্ণ। ভারখণ্ডান্তর্গত ছত্রখণ্ড। বড়াইএর কাছে রাধা তাঁর বিড়ম্বনার কাহিনি ব্যক্ত করেন। ছলনাময় কৃষ্ণের আচরণ বুঝতে পারেন না তিনি। কখনও কৃষ্ণ মহাদানী সাজেন, কখনও আবার

ভারবহনকারী। ভার বহন করতে গিয়ে কৃষ্ণ নষ্ট করে দিয়েছেন রাধার পসরা। কিন্তু কোন অনুতাপ নেই তাঁর। কৃষ্ণ এর পরেও বলে যাচ্ছেন রাধার দেহসম্ভোগের কথা। রাধাকে নীরব দেখে কৃষ্ণ আবার তোষামোদ শুরু করেন। প্রশংসা করতে থাকেন রাধার রূপের। বলে যান যে রাধা তাঁর বিরহজ্বালা দূর করতে পারেন। বড়াই কৃষ্ণকে জানান যে তাঁর কাকুতি-মিনতিতে তুষ্ট হয়েছেন রাধা। দ্রবীভূত হয়েছে তাঁর হৃদয়। সম্মত হয়েছেন তিনি রতিদানে।বড়াই কৃষ্ণকে বলেন, ‘খর রৌদ্রে রাধা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তুমি তার মাথায় ছত্র ধারণ করে তাকে কুঞ্জে নিয়ে যাও। ’সে কথা শুনে কপট রাগ করে কৃষ্ণ বলেন, ‘কি? আমাকে রাধার মাথায় ছত্র ধারণ করতে করতে হবে? এত অপমান?’ রাধা বলেন, ‘সুরতির আকাঙ্খা থাকলে অপমান সহ্য করতে হবে।’ কৃষ্ণ বলেন, ‘রাধা, আর বিরহজ্বালা সহ্য করতে পারছি না।’

-‘ যোগী সেজে বসে আছ তুমি। বিরক্ত করছ পরনারীকে। বিয়ে করে সংসার করতে পারো না?’
গম্ভীর হবে কৃষ্ণ বলেন, ‘আমি হরি, আমিই হর, আমি মহাযোগী, আমি দেবাদিদেব। তোমার কাছে করজোড়ে রতি ভিক্ষা করছি রাধা।’


।। বৃন্দাবনখণ্ড ।।
কালিন্দী নদীর তীর। মন্দ মন্দ বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। অভিসারে এসেছেন কৃষ্ণ। অপেক্ষা করে আছেন রাধার জন্য। রাধার জন্য শয্যারচনাও প্রস্তুত। বাজছে সংকেতবেণু।
বড়াই রাধাকে বললেন, ‘রাধা তুমি আর বিলম্ব করো না। তুমি তো জানো কৃষ্ণ বড় অভিমানী । তোমার বিলম্বে তার অভিমান হবে।’
বড়াইএর মুখে বৃন্দাবনের কথা শুনে আনন্দিত হলেন গোপবালিকারা। রাধাকে নিয়ে তাঁরা যাত্রা করলেন বৃন্দাবনের দিকে। বড়াইকে সম্মুখে রেখে চলতে লাগলেন চন্দ্রাবলী। গোপবালিকারা গান গাইতে লাগলেন মনের আনন্দে। কৃষ্ণের কাছে গিয়ে তাঁরা বললেন, ‘ হে কৃষ্ণ,  লজ্জা সংকোচ ত্যাগ করে আমরা এসেছি তোমার কাছে। আমাদের তুমি ত্যাগ করো না কানাই।’
তাঁদের কথা শুনে কৃষ্ণ আনন্দিত হলেন। নানাভাবে তাঁদের মনস্তুষ্টি বিধানের চেষ্টা করলেন তিনি। তাঁরা চলে যাবার পরে কৃষ্ণের হৃদয়াসীনা হয়ে বসলেন রাধা। তখন তাঁর বসন স্খলিত, জঘন কাঞ্চিমুক্ত ।
কৃষ্ণ গাঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘রাধা, তোমার জন্য রচনা করেছি এই বৃন্দাবন। এখানে একটি নিভৃত স্থান আছে , তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব।
তারপরে কৃষ্ণ রাধার রূপের প্রশংসা শুরু করলেন। তাঁর দেহের বিবিধ অঙ্গগুলিকে তুলনা করতে লাগলেন বিবিধ ফুলের সঙ্গে। রাধার চরণযুগল হৃদয়ে ধারণ করার অনুমতি প্রার্থনা করে তিনি বলতে লাগলেন, ‘রাধা, তুমি আমার  রতনভূষণ, তুমিই আমার জীবন।’


।। কালীয়দমনখণ্ড ।।
বৃন্দাবনের মধ্য  দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে যমুনা নদী। সেই নদীতে কালীদহ নামে আছে একটি গভীর হ্রদ।  সেই হ্রদে বাস করে কালীয়নাগ নামে এক বিষধর সাপ। তার উগ্র বিষে হ্রদের জল বিষময়। কোন জন্তু পান করতে পারে না সেই জল।
গোপীদের বিদায় দিয়ে মথুরা নগরে যাবার পথে জলক্রীড়া করার ইচ্ছা হল কৃষ্ণের। কালীদহের কদম্বতলায় এলেন তিনি। গোপবালকদের নিষেধ অমান্য করে কদম্ববৃক্ষ থেকে তিনি ঝাঁপ দিলেন কালীদহে।
কালীয় নাগ সপরিবারে দংশন করতে লাগল কৃষ্ণকে। তীব্র বিষের জ্বালায় চৈতন্য হারালেন কৃষ্ণ। লোকমুখে এ কথা শুনে ছুটে এলেন নন্দ আর যশোদা। মাটিতে লুটিয়ে কাঁদতে লাগলেন তাঁরা।  কাঁদতে লাগল গোপবালকেরা। সেই বিলাপে মুখরিত হল চারদিক।
বলভদ্র বুঝতে পারলেন কৃষ্ণ আত্মবিস্মৃত হয়ে মোহগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁকে জানাতে হবে পূর্ব বৃত্তান্ত। তাহলেই তাঁর চৈতন্য ফিরে আসবে।
বলভদ্র কৃষ্ণের ঈশ্বরসত্তার কথা, নানা অবতাররূপে পৃথিবীকে রক্ষা করার কথা বলায় কৃষ্ণের চৈতন্য ফিরে এল। সকলে স্বস্তির শ্বাস ফেললেন।


।। বস্ত্রহরণখণ্ড ।।
সখীদের সঙ্গে নিয়ে গজপতিছন্দে রাধা জল আনতে চলেছেন যমুনায়। ঘাটেই দেখা কৃষ্ণের সঙ্গে। কৃষ্ণকে দেখে সখীরা বিহ্বল। চোখে তাঁদের পলক পড়ে না।
রাধা কৃষ্ণকে বললেন, ‘একটু সরে দাঁড়াও কানাই। আমাদের জল ভরতে দাও।’ 
কৃষ্ণের এমন ভাব যেন তিনি চেনেন না রাধাকে। বললেন, ‘কে তুমি? কার বধূ? কেন জল আনতে এসেছ যমুনায়?’
রাধা রেগে গিয়ে বলেন, ‘যার বধূ  হই না কেন, তাতে তোমার কী?’
কৃষ্ণ বলেন, ‘কাঁধের কলস নামিয়ে রাখো। কথা আছে তোমার সঙ্গে।’
-‘কি কথা?’
-‘এই তাম্বুল নাও তো আগে।’
-তাম্বুল দিয়ে কি বলতে চাও তুমি?’
-‘শোনো সুন্দরী, আমি হলাম সমস্ত যমুনার অধিকারী।’
-‘বুঝতে পেরেছি তোমার মতলব। তোমার সঙ্গে কোন কথা নেই আমার।’
রাধার মন জয় করার জন্য কৃষ্ণ তাঁকে স্বর্ণময় কিঙ্কিনী, পট্টবস্ত্র, স্বর্ণময় বাঁশি  দিতে চাইলেন। রাধা সম্মত হলেন না কিছুতেই। তখন কৃষ্ণ বললেন, ‘রাধা, ডালিমের মতো তোমার পয়োধর দুটি আমার মন মাতিয়েছে।’
রাধা ক্রুদ্ধভাবে বলেন, ‘আমার পয়োধর মাকাল ফল সদৃশ। দেখতে সুন্দর, কিন্তু মুখে দিলেই মৃত্যু।’
রাধার নিষ্ঠুর কথা শুনে দুঃখ পেলেন কৃষ্ণ। বড়াই তিরস্কার করলেন রাধাকে। তিনি রাধাকে সরস বচনে কৃষ্ণের তুষ্টি বিধান করতে পরামর্শ দিলেন। কৃষ্ণও জানালেন তাঁর বিরহজ্বালার কথা।
রাধা বললেন, ‘পথে-ঘাটে কেন তুমি প্রকাশ্যে এ সব বলো কানাই! কে কোথায় শুনতে পাবে । আমার শাশুড়ি বড় দুর্জন, শুনতে পেলে আমার দুর্দশার অন্ত্য থাকবে না।’
কৃষ্ণ আর পীড়াপীড়ি করলেন না। ফিরে গেলেন রাধা।
দিনকয়েক পরে সখীদের নিয়ে রাধা আবার এলেন যমুনার তীরে। কৃষ্ণ বললেন, ‘রাধা, তুমি যমুনার জলে স্নান করতে পারো।  সর্পভয় আর নেই। তাকে আমি হত্যা করেছি।’
কৃষ্ণের আশ্বাসে জলে নামলেন রাধা ও তাঁর সখীরা। জলকেলিতে মত্ত হয়ে উঠলেন তাঁরা। এই সুযোগে কৃষ্ণ তাঁদের বসন-ভূষণ নিয়ে উঠে বসলেন কদম্বতরুতে। সে কথা জানতে পেরে গোপীরা বড় বিড়ম্বনা বোধ করতে লাগলেন। অর্দ্ধজলমগ্ন হয়ে দক্ষিণ বাহুদ্বারা বক্ষোদেশ আবৃত করে রাধা বলতে লাগলেন, ‘এ তোমার কি ব্যবহার কানাই? দাও আমাদের বসন দাও’
কৃষ্ণ বলেন, ‘তীরে উঠে হাত জোড় করে দাঁড়াও। তাহলেই পাবে তোমাদের বসন-ভূষণ।’
অগত্যা তাই করতে হল রাধা ও তাঁর সখীদের। কৃষ্ণ দুচোখ ভরে দেখলেন নগ্ন যুবতীদের রূপ। তারপরে ফিরিয়ে দিলেন বসন-ভূষণ। শুধু লুকিয়ে রাখলেন রাধার হারটি।


।। হারখণ্ড ।।
যশোদার কাছে এসে রাধা অভিযোগের সুরে বললেন, ‘তোমার কানাই আমার পট্টবস্ত্র আর সাতলহরী হার অপহরণ করেছিল। শেষ পর্ষন্ত পট্টবস্ত্র ফেরত দিলেও সে হার ফেরত দেয় নি এখনও।’
অবাক হয়ে যশোদা বলেন, ‘সে কি কথা!’
-‘ কৃষ্ণ বড় বেয়াড়া হয়ে উঠেছে। শাসন করো তাকে। যখন তখন সে আমাকে আর আমার সখীদের উৎপীড়ন করে। কংস যদি এ কথা জানতে পারে, তবে বড় অনর্থ হবে।’
যশোদা কৃষ্ণকে ডেকে তিরস্কার করে বললেন, ‘তোমার জন্য আর কত গঞ্জনা সহ্য করব আমি! কুবুদ্ধি পরিত্যাগ করো কানাই। সংযত করো মনকে।’


।। বাণখণ্ড ।।
যশোদার কাছে কৃষ্ণের নামে অভিযোগ করে এসেছিলেন রাধা। সে জন্য ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন কৃষ্ণ। বড়াই তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘রাধা বাড়াবাড়ি করছে। তোমার কথা বলতে গেলাম তাকে, সে আমাকে গালমন্দ করল। নিজেকে সতী বলে ঘোষণা করল। তুমি দেব বনমালী, অথচ রাধা তোমাকে একটুও সমীহ করে না।’
এ রকম অবস্থায় কি করা যায় তা জানতে চান কৃষ্ণ। বড়াই বলেন, ‘শোনো কানাই, আমি রাধাকে বৃন্দাবনে নিয়ে আসছি। তুমি তার উপর স্তম্ভন, মোহন, দহন, শোষণ, উচাটন বাণ নিক্ষেপ করো।’
মথুরার পথে যমুনা পার হয়ে রাধা এলেন বৃন্দাবনে। দেখলেন কদম্বতলায় বসে আছেন কৃষ্ণ । রাধাকে দেখে কৃষ্ণ বলেন, ‘অকারণে আমার এত নিন্দা করছ কেন? আজ আমি প্রতিশোধ নেব। পঞ্চবাণে আঘাত করব তোমাকে। দেখি কে বাঁচায় তোমাকে! এরপরে আমি আইহন আর কংসকেও হত্যা করব।’
বাণের কথা শুনে ভীত হলেন রাধা। প্রাণরক্ষার জন্য মিনতি করতে লাগলেন তিনি। কিন্তু কৃষ্ণ কোন কথা শুনলেন না। তিনি বাণ নিক্ষেপ করলেন। অনুতাপ করতে করতে রাধা মূর্চ্ছিতা হলেন। রাধার মনে জেগে উঠল কৃষ্ণপ্রেম। বড়াইএর অনুরোধে রাধার জ্ঞান ফিরিয়ে দিলেন কৃষ্ণ।


।। বংশীখণ্ড ।।
সখীদের সঙ্গে যমুনার ঘাটে স্নান করতে যান রাধা। নদীর তীরে বসে থাকেন কৃষ্ণ। যুবতীদের রঙ্গ দেখেন। কখনও বাজান করতাল, কখনও বা মৃদঙ্গ। সখীরাও কৃষ্ণের সঙ্গে রঙ্গ-তামাশায় মেতে ওঠেন। রাধা কিন্তু নিস্পৃহ থাকেন।
রাধার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কৃষ্ণ তৈরি করেন এক মোহন সুন্দর বাঁশি। সে বাঁশিতে আবার সোনা ও হিরের কাজ। সে বাঁশির সুর আকুল করে তোলে মনকে। ব্যাকুল হয়ে ওঠে রাধার মন। 
পরের দিন রাধা সেই সুরের আকর্ষণে আবার যান যমুনার ঘাটে। কিন্তু ঘাট যে শূন্য। কোথায় কৃষ্ণ! কোথায় সে মোহন বাঁশির সুর! রাধা বড়াইকে বলেন কৃষ্ণের কথা। তিরস্কার করে বড়াই বলেন, ‘কত বড় বংশের কন্যা তুমি, কত বড় বংশের বধূ। কেন পরপুরুষের সঙ্গ কামনা করছে? আগে যা হবার হয়েছে, নতুন করে আবার কেন পাপে জড়াতে চাইছ?’
ঠিক তখনি মাঝ বৃন্দাবন থেকে ভেসে আসে বাঁশির সুর।
কি যে জাদু আছে সে সুরে! রাধার প্রাণ আকুল হয়ে ওঠে। বর্তমান ভুলে যান তিনি। কাতর অনুরোধ করে তিনি বড়াইকে বলেন, ‘যেমন করে পারো আমার কানাইকে এনে দাও বড়াই ।’
ঘরের কাজে আর মন বসে না রাধার। এলোমেলো হয়ে যায় তাঁর জীবন। আগুন জ্বলে মনে । দাবানলের মতো দৃশ্যমান নয় বলে কেউ বুঝতে পারে না। রাধা যদি পাখি হতেন, তাহলে উড়ে চলে যেতে পারতেন তাঁর দয়িতের কাছে ।
সরস বসন্ত এসেছে ধরায়। রাধা অনুভব করেন তীব্র বিরহজ্বালা। বড়াইকে নিয়ে তিনি বৃন্দাবনে যান। কৃষ্ণের সন্ধানে। কিন্তু কৃষ্ণের দেখা পান না। ফিরে আসতে হয় ব্যর্থ হয়ে।গভীর রাতে আবার ভেসে আসে বাঁশির সুর। রাধা আকুল পাগলপারা। শয্যায় উঠে বসেন তিনি। স্বামী আইহনকে নিদ্রিত দেখে চুপিসারে বেরিয়ে পড়েন। পাগলের মতো খুঁজতে থাকেন কানাইকে। তারপরে মূর্চ্ছিতা হয়ে পড়েন। তাঁকে ভোরবেলা উদ্ধার করে আনেন বড়াই।
রাধার অবস্থা দেখে বড় দুঃখ হয় বড়াইএর। রাধাকে তিনি বলেন, ‘চলো, যমুনায় জল আনতে যাই। কৃষ্ণ সেখানে  থাকবে। তুমি ছল করে চুরি করে আনবে তার বাঁশি।’
--‘কি করে চুরি করব বাঁশি?’
-‘আমি মন্ত্র পড়ে কৃষ্ণকে নিদ্রিত করে রাখব। সেই সুযোগে তুমি বাঁশি চুরি করবে।’
--‘লাভ কি হবে বাঁশি চুরি করে?’
--‘লাভ আছে। সেই বাঁশি নিতে তোমার কাছে আসতে হবে কানাইকে।’
বড়াইএর পরিকল্পনামতো রাধা কৃষ্ণের বাঁশি চুরি করেন। তখন কৃষ্ণ বিলাপ শুরু করেন। বড়াই বলেন, ‘তুমি গোপীদের অপমান করেছ। প্রতিশোধ নেবার জন্য তারাই বাঁশি চুরি করেছে।’
কৃষ্ণ যান গোপীদের কাছে। হঠাৎ দেখতে পান দূরে দাঁড়িয়ে রাধা মুচকি হাসছেন। চোর কে তা বুঝতে বাকি থাকে না। কিন্তু রাধা কিছুতেই স্বীকার করতে চান না। অনুনয়ে কোন কাজ না হওয়ায় কৃষ্ণ ভীতি প্রদর্শন করে বলেন, ‘প্রাণে বাঁচতে চাও তো ফেরত দাও বাঁশি। না হলে তোমার বসন-ভূষণ কেড়ে নেব, বেঁধে রাখব তোমাকে, হত্যা করতেও দ্বিধা করব না, বুঝলে ?’
রাধা বলেন, ‘মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ কানাই। যাও বড়াইকে ধরো। সেই চতুরা বুড়ি লুকিয়ে রেখেছে তোমার বাঁশি।’
বিভ্রান্ত কৃষ্ণ বলেন, ‘তুমি বড়াইএর দোষ দাও, বড়াই তোমার দোষ দেয়। কিন্তু রাধা, আমি জানি বড়াই নয়, তুমিই লুকিয়ে রেখেছ আমার বাঁশি।’
কথা বলতে বলতে কৃষ্ণ রাধার বস্ত্রাঞ্চল ধরে বলেন, ‘বাঁশি না পেলে যেতে দেব না তোমাকে ।’
তখন মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে আসেন বড়াই, কৃষ্ণকে বলেন, ‘তুমি হাতজোড় করে বিনীতভাবে রাধার কাছে বাঁশি চাও কানাই।’
বড়াইএর কথামতো কৃষ্ণ রাধার কাছে হাতজোড় করে দাঁড়ান। রাধা বলেন, ‘এরপর থেকে আমার কথামতো চলার প্রতিশ্রুতি দেলে বাঁশি ফেরত পাবে।’
কৃষ্ণ প্রতিশ্রুতি দেন। 
রাধা বলেন, ‘আমি বিরহে কাতর হলে তুমি আমাকে সঙ্গ দেবে। কোন অন্যথা হবে না তো !’
কৃষ্ণ জানান যে কোন অন্যথা হবে না।
রাধা তখন বাঁশি ফেরত দেন কৃষ্ণকে।


।। রাধাবিরহ ।।
দীর্ঘকাল দেখা নেই কৃষ্ণের। এদিকে চৈত্রমাস এসেছে। ঋতুরাজ বসন্তের সমারোহ চারদিকে । বিরহজ্বালায় দগ্ধ হচ্ছে রাধার হৃদয়।
কোথায় গেলেন কৃষ্ণ!
নিজের প্রতিশপুতি কি ভুলে গেলেন তিনি!
বড়াইকে সঙ্গে নিয়ে রাধা যান বৃন্দাবনে। মোহিনী বেশ ধারণ করে কদম্বতলায় রচনা করেন শয্যা। অপেক্ষা করেন, অপেক্ষা করেন, কিন্তু কৃষ্ণের দেখা পাওয়া যায় না।
বৃন্দাবনের পথে পাগলের মতো ঘুরতে ঘুরতে রাধা একদিন দেখলেন গোচারণরত কৃষ্ণকে। তাঁর কাছে গিয়ে রাধা বলেন, ‘কানাই আমি যদি কোন দোষ করে থাকি, ক্ষমা করো। কিন্তু তোমার বিরহ আর সহ্য করতে পারছি না।’
কৃষ্ণ কঠিনভাবে বলেন, ‘তোমার কাঁদুনিতে ভুলছি না। আমার আশাত্যাগ করো, নিজের বাড়িতে যাও।’ 
এ কথা বলে সেখান থেকে চলে যান কৃষ্ণ। চোখের জলে ভাসতে থাকে রাধার বুক। নারদের মুখে খবর পাওয়া যায় কদম্বতলায় শয্যা রচনা করে বসে আছেন কৃষ্ণ।  বড়াইকে নিয়ে ছুটে যান রাধা। কৃষ্ণকে দেখে আনন্দে মূর্ছা যান তিনি। বড়াইএর অনুরোধে রাধাকে গ্রহণ করেন কৃষ্ণ। মিলন হয় তাঁদের। তারপরে রাধা নিদ্রিতা হলে কৃষ্ণ বড়াইকে বলেন, ‘আমি মথুরায় চললাম। তুমি রাধাকে সাবধানে রাখবে।’ জাগ্রত হয়ে কৃষ্ণকে দেখতে না পেয়ে হাহাকার করে ওঠেন রাধা। কয়েক দিন পরে রাধার কাতর অনুরোধে কৃষ্ণের সন্ধানে বড়াই যান মথুরায়। সেখানে তিনি কৃষ্ণের আশ্চর্য পরিবর্তন দেখতে পান। দেখতে পান রাধা সম্পর্কে কৃষ্ণের আর কোন আগ্রহ নেই। কংসাসুরকে বধ করাই এখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। কৃষ্ণ বড়াইকে জানান যে রাধা বড় প্রগলভ, তাঁকে দেখলে কৃষ্ণের হদকম্প হয়, তাই রাধার মুখ দর্শনের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা তাঁর নেই.

Comments

Top

 

ঈশ্বর প্রদত্ত গুণ

জয়দীপ চক্রবর্তী

গল্প 

প্রায় বারো বছর ধরে মনের মধ্যে জমে থাকা প্রশ্নের আজ সঠিক উত্তর খুঁজে পেলো স্বর্নাশীষ ও বিদুষী। তাদের একমাত্র ছেলে কল্পক আজ বারো বছরের। মাস তিন চারেক বয়স থেকেই বাবা মাকে একটার পর একটা চমক দিয়ে এসেছে কল্পক।
স্বর্নাশীষ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। একটি কসমেটিক্স উৎপাদন সংস্থায় বেশ উচ্চ পদে চাকরি করে ও। নিয়মিত রুটিন মেনেই অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে রোজ দেরী হয় স্বর্নাশীষের। ছেলের জন্মের পরও সেই নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে সদ্য হওয়া বাবা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করে রোজ। কোনোদিন সফল হয় আর কোনোদিন ব্যর্থ। স্বর্নাশীষ যখনই বাড়ি ফেরে  সদ্যজাত কল্পক মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকায়। সে যত সংগোপনে, যত নিঃশব্দেই ঘরে ঢুকুক না কেন বাবার উপস্থিতি ছেলে ঠিক টের পেয়ে যায়। তাড়াতাড়ি ফিরলে স্বর্নাশীষের দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসি দেয়। এই হাসি দেখার জন্যই স্বর্নাশীষের তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা। তবে কিভাবে এই সদ্যজাত শিশুর পক্ষে তার বাবার বাড়ি ফেরার খবর জানা সম্ভব হয়, তা শত চেষ্টা করেও বাড়ির কেউই বুঝতে পারে না। তাই অবাক হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনও উপায় নেই।     
এরপর কল্পক ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে, আর বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন, স্কুলের সহপাঠী, শিক্ষক, শিক্ষিকা সবাইকে অবাক করে তুলেছে। 
স্বর্নাশীষদের পাশের ফ্ল্যাটের মেয়ে অক্সিতা কল্পকের থেকে মাস ছয়েকের ছোট। দুই পরিবারের মধ্যে বেশ সদ্ভাব। সেই সুবাদে অক্সিতা কল্পকের খেলা সঙ্গী। অক্সিতার পাঁচ বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন কচিকাঁচা একত্র হয়ে খেলায় মেতেছে। লুকোচুরি খেলা। পাশাপাশি ফ্ল্যাট দুটির বিভিন্ন জায়গায় সকলে অন্তর্ধান হয়েছে। সকলকে খুঁজে বের করার ভার পড়েছে কল্পকের ওপর। করিডরে দাঁড়িয়ে শর্ত অনুযায়ী একশত গুনেছে সে। গোনা শেষ হলে করিডরে দাঁড়িয়েই অক্সিতা কোন ফ্ল্যাটের কোন ঘরের কোন-খানে আছে তা বলে দিল কল্পক। অন্যদের খুঁজতেও বেশি সময় নিলো না ও। প্রতিটি ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ওই ঘরে কে কোন জায়গায় আছে তা বলে দিল। শুধু বাচ্চারাই নয়, তাদের অভিভাবকরাও বেশ বিস্মিত। 
পাড়ায়, স্কুলে সর্বত্র কল্পক একটি আলোচনার বিষয়। কেউ বলে ওর মধ্যে একটা ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে। কেউ বলে কল্পক ম্যাজিক জানে। তবে এই ব্যাপারে কল্পককে জিজ্ঞাসাবাদ করে কেউ সঠিক উত্তর পায় নি। যে উত্তর ও দিয়েছে সেটা কেউ বিশ্বাস করেনি। ও বলেছে, চোখ বন্ধ করে এক মনে ভাবলেই নাকি ও সব কিছু বুঝতে পারে। স্বর্নাশীষ ও বিদুষীকে কল্পক অন্য উত্তর দিয়েছে। তবে সেটাও ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি ওরা। 
যাইহোক সকলে এক বাক্যে এটা স্বীকার করে যে কল্পকের জন্মসূত্রে পাওয়া একটি বিশেষ গুণ আছে। তবে সেই গুণের জন্য কোনোরূপ দর্প নেই কল্পকের। কেবল মাত্র প্রয়োজন বা মজা দিতেই ও ওর এই বিশেষ ক্ষমতা ব্যাবহার করে। 
তবে প্রয়োজন হয় প্রায়শই। স্বর্নাশীষের অফিস পিকনিকে সপরিবারে যাবে ওরা। সকাল বেলা তারই প্রস্তুতি পর্ব চলছে বাড়িতে। বিদুষী পড়েছে বেশ বিপদে। সারা মুখে একটা উদ্বিগ্নতা মেখে আলমারি, ওয়ারড্রব সর্বত্র হাতরে বেড়াচ্ছে ও। মায়ের এমন অবস্থা দেখে কল্পক জিজ্ঞাসা করল, 
- মা, কিছু খুঁজছ? 
- হ্যাঁ,   
- কি খুঁজছ বল। আমি খুঁজে দিচ্ছি।
বিদুষী ওর সদ্য কেনা একটা অন্তর্বাস খুঁজছিল। অন্তর্বাসটি বেশ দামী। বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্যই কেনা। মাত্র একদিন ওটা ব্যবহার করেছে বিদুষী। ও কি খুঁজছে সেটা সাত বছরের ছেলেকে বলতে বেশ সংকোচ হচ্ছিল ওর। তবে আর কোনও উপায় না দেখে ছেলেকে বলেই ফেলল কথাটা। কল্পক ওদের শোবার ঘরে দাড়িয়ে একবার মাত্র ঘার একদিক থেকে বিপরীত দিকে ঘোরাল। তারপর বলল, ওটা খাটের পাশ দিয়ে পড়ে গেছে। দাঁড়াও, আমি তুলে দিচ্ছি। 
পিকনিকে গিয়েও সবাইকে চমকে দিল কল্পক। বাবা-মারা যেন নিশ্চিন্তে ও নির্বিঘ্নে এই পিকনিকটি সম্পূর্ণ ভাবে উপভোগ করতে পারে সেজন্য তাদের ছেলেমেয়েদের ব্যস্ত রাখার আয়োজন করা হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন গেম, কুইজ, আর আত্ম প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ। কেউ সেখানে গান গাইছে। কেউ নৃত্য পরিবেষণ করছে। কেউ বা কবিতা আবৃতি করছে। 
স্বর্নাশীষ তার সহকর্মীদের সাথে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে নেশায় গলা ভিজিয়েছে। বিদুষীও স্বামীর সঙ্গ দিয়েছে। সে যে এই সুরা পানে অভ্যস্ত তা তার পানের ভঙ্গিমা, পরিমাণ ও তার অবস্থা দেখে সহজেই অনুমেয়। বিদুষীর কলেজ জীবনে কারণে অকারণে কাড়ন পান চলত। এখনও মাঝে মধ্যে আসরে বাসরে সুরা-পান চলে। 
নেশায় সবে মাত্র একটা ঝিমুনি ভাব এসেছে। এমন সময় স্বর্নাশীষের এক সহকর্মী এসে এমন একটা খবর দিল যে তা শুনে স্বর্নাশীষ ও বিদুষীর নেশা ছুটে গেল। তারা ছুটে গেল তাদের ছেলের কাছে। কল্পক তখন সকলের অভিবাদন কুড়চ্ছে। 
কল্পক গান, আবৃতি, নাচ কোনটাতেই পারদর্শী নয়। তাই বলে সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তার বয়েসই সকলে যখন  এক এক করে তাদের প্রতিভার পরিচয় দিয়ে হাততালি কুড়চ্ছিল, তখন কল্পক আর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ও বলল, আমি একটা ম্যাজিক দেখাবো। অনুষ্ঠান সঞ্চালক সাদরে কল্পককে তার প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ করে দিল। শুধু বাচ্চারাই নয়, বেশ কিছু অভিভাবকরাও ছিল সেখানে। কল্পক সেই দর্শক মণ্ডলীর থেকে একটি রুমাল চেয়ে নিলো। এক ভদ্রমহিলা তার রুমালটি কল্পকের হাতে দিলেন। কল্পক সেটা হাতের মুঠোয় রেখে নিজের মুখের সামনে ধরল। তারপর মনে মনে নানারকম মন্ত্র আওরায়ে সে রুমালটি যার রুমাল তাকে ফেরত দিয়ে বলল, আপনি এটা যেখানে খুশি, যার কাছে খুশি লুকিয়ে ফেলুন। আমি চোখ বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। আমার চোখ বেধে দিন। 
কল্পকের কথা অনুসারে ওর চোখ বেঁধে রুমাল লুকিয়ে ফেলা হল। তারপর ওর চোখ খুলে দেওয়া হল। কল্পক ভীর কাটিয়ে এক ভদ্রমহিলার সামনে গিয়ে বলল, দিন, রুমালটা বের করে দিন। ওটা আপনার ব্লাউজের ভেতর লোকানো আছে। ভদ্রমহিলা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পেছন ফিরে রুমালটা বের করে দিলেন। এই ভদ্রমহিলা ছিলেন স্বর্নাশীষের বসের স্ত্রী। একটু বেশি চালাকি করতে গিয়ে সাত বছরের ছেলের কাছে বেশ বোকা বনে গেলেন উনি। উপস্থিত দর্শক মণ্ডলী তখন করতালি দিয়ে কল্পককে  অভিবাদন জানাচ্ছে। 
এই ম্যাজিকটা কল্পক স্কুলেও দেখিয়েছে বহুবার। টিফিনের সময়, বা অফ পিরিয়ডে লোকানো পেন্সিল, ই-রেজার, পেন প্রভৃতি খুঁজে দিয়ে কল্পক ওর বন্ধুদের বার বার অবাক করে দিয়েছে।   
কল্পক মেধাবী ছাত্র না হলেও পড়াশোনাটা ও বরাবরই আন্তরিকতা ও দায়িত্বের সাথে করে। তাই প্রথম দশ জনের মধ্যে ওর নাম বরাবরই থেকে এসেছে। ওকে যে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা  স্বর্নাশীষ বা বিদুষী কারোর তরফ থেকেই ছিল না।

ছেলের এই পড়াশোনায় তারা খুশি। স্কুল থেকে পড়াশোনার জন্য কোনও পুরষ্কার না পেলেও বাবা মার থেকে বরাবর  নতুন ক্লাসে ওঠার জন্য নিজের মনের মত পুরস্কার পেয়ে এসেছে কল্পক। শুধু পড়াশোনার জন্যই নয়, ছোট খাটো যেকোনো সাফল্যের জন্যই কিছু না কিছু উপহার ও পেয়েছে নিয়মিত। স্বর্নাশীষ প্রায়শই অফিস যাওয়ার সময় মানিব্যাগ, হাতঘড়ি, রুমাল প্রভৃতি খুঁজে পায় না। যথারীতি সেসব খুঁজে দেবার ভার পড়ে কল্পকের ওপর। ও সেটা দায়িত্বের সাথে পালন করে বাবার থেকে ক্যাটবেরী, আইসক্রিম প্রভৃতি আদায় করতে ভোলে না। স্বর্নাশীষও স্বেচ্ছায় সেই আবদার মেনে নেয়। তবে বিনা কারণে ছেলে কে সে কিছুই দিতে রাজি নয়। তার কথায়, জীবনে সবকিছুই অর্জন করে নিতে হয়। ফ্রিতে কিছুই পাওয়া যায় না। 

এমনভাবেই চলতে থাকল। ওরা তিনজন নিজেদের বাঁধাধরা রুটিনে বাধা থাকল ব্যস্ততার সাথে। তবে ছুটির দিনগুলিতে তিনজন একত্রে কখনও কোথাও বেড়াতে গিয়ে, কখনও সিনেমা দেখে, কখনও বা বাইরে কোথাও খেতে গিয়ে ছুটি উপভোগ করত।
কল্পকের ঈশ্বর প্রদত্ত গুনটির জন্য ওদের যেমন কিছু সুবিধে হয়, তেমনই অনেক ঝক্কি ঝামেলাও পোহাতে হয়। পাড়া প্রতিবেশীর কিছু হারিয়ে গেলেই কল্পকের ডাক পড়ে। কল্পক তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, যে জিনিস সে কখনও দেখেনি, সেটা তার পক্ষে খুঁজে দেওয়া সম্ভব নয়। 
তা বলে প্রতিবেশীর উপকারে কল্পক যে আসে না তা নয়। কল্পকের বয়স বছর দশ। ওদের অ্যাপার্টমেন্টের তিন পরিবার মিলে পৌষ মেলায় গিয়েছে। তিন পরিবার বলতে সপরিবারে স্বর্নাশীষ, বাবা মার সাথে অক্সিতা, আর বাবা মার সাথে পাঁচ বছরের আয়ুষ। আয়ুষ ছেলেটি বেশ চঞ্চল। ওকে পাশে দাঁড় করিয়ে, ওর মা কানের দুল কিনছিল। সেই সময়ে ও এক পা এক পা করে হাঁটতে হাঁটতে মেলার ভিড়ে এমন ভাবে হারিয়ে গেল যে ওকে আর খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না। কল্পক তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মেলায় ঘুরে, মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আয়ুষকে এনে ওর বাবা মার কাছে হাজির করল।  
যতই সেটা মানুষের উপকারে আসুক না কেন, দীর্ঘদিন ধরে শরীরের মধ্যে কোনও অস্বাভাবিক কিছু বয়ে বেড়ানো উচিৎ নয়। বিদুষীদের খুব তাড়াতাড়ি একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। বিদুষীর একজন কাছের বন্ধু এমন উপদেশই দিল। উপদেশটা ফেলে দিতে পারল না বিদুষী। তবে ওরা যে ব্যাপারটা নিয়ে ডাক্তারের সাথে আলোচনা করেনি তা নয়। ওদের পারিবারিক ডাক্তার কল্পকের এই আচরণের মধ্যে ক্ষতির কিছু দেখেনি। আর উনি বলেছিলেন যে, কল্পকের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখন বিদুষীরা দেখছে বয়স বাড়ার সাথে সাথে উপসর্গ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কল্পক এখন থেকে থেকেই জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। ইদানীং ওর নাকের অগ্রভাগ বেশ ঘামছে। কল্পকের এখন বয়স বারো বছর। এমন কিছু দেরী হয়তো এখনও হয়নি। বন্ধুর কথা মেনে স্থানীয় এক ডাক্তারের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করলে উনি সব শুনে একজন নাক-কান-গলার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাতে বললেন। কল্পককে একজন নামকরা নাক-কান-গলার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখানো হল। উনি নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কল্পকের এইরকম আচরণের কারণ বিষদে ব্যাখ্যা করলেন।  প্রায় বারো বছর ধরে মনের মধ্যে জমে থাকা প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পেলো স্বর্নাশীষ ও বিদুষী।
কল্পকের যেকোনো জিনিস সহজে খুঁজে পাওয়ার কারণ হল ওর তীব্র ঘ্রাণ শক্তি। সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কের তুলনায় প্রায় চল্লিশ গুণ বেশি অংশ কল্পকের মস্তিষ্কে ঘ্রাণ সংক্রান্ত কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ। মানুষের নাকে সাধারণত ষাট লক্ষ ঘ্রাণ রিসেপ্টর থাকে, কিন্তু এই ছেলের সেই সংখ্যাটা তিরিশ কোটির কাছাকাছি। তাছাড়া কল্পকের শ্বাস গ্রহণ আর ঘ্রাণ নেওয়ার পরি-কাঠামোটা আলাদা আলাদা ভাবে গঠিত। তাই ওর শ্বাস গ্রহণ, ঘ্রাণ গ্রহণ দুটোই অবিরাম চলতে থাকে। ক্রমাগত মিউকাস নিঃসরণের ফলে ওর নাকে ঘ্রাণ অণুগুলো আটকে থাকে, যা ওকে গন্ধ শুঁকে চিনতে সাহায্য করে।  
রাসায়নিক পরীক্ষা চালানোর জন্য স্বর্নাশীষ সম্প্রতি যে মডেলটি তৈরি করেছে সেটা সত্যি প্রশংসার দাবী রাখে। সেই সঙ্গে একটি নতুন কেমিক্যাল প্ল্যান্টের নকশাও প্রস্তুত করেছে ও। কিন্তু উচ্চমহলে প্রদর্শন করার দিন ওগুলোকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। নিজের ড্রয়ারে তালা বন্দীই করে রেখেছিল স্বর্নাশীষ। প্রতিটি ড্রয়ারের ডুপ্লিকেট চাবি রয়েছে অফিস অ্যাডমিনদের কাছে। কোনোভাবে সেই চাবি জোগাড় করে সবার অলক্ষ্যে সেগুলো সরিয়েছে কেউ। কিন্তু সে কে?
এই নকশা ও মডেল উচ্চমহল দ্বারা স্বীকৃত হলে স্বর্নাশীষের পদোন্নতির একটি সম্ভাবনা রয়েছে। সহকর্মীদের মধ্যে অনেকেই সেটা চায় না। তাই তাদের মধ্যে কেউ অতি দক্ষতার সাথে  নকশা ও মডেল ড্রয়ার থেকে অদৃশ্য করে পুনরায় সেই ড্রয়ার তালাবন্দি করেছে। 
স্বর্নাশীষের মাথায় যেন বাজ পড়েছে। কিছুক্ষণ নিজের চেয়ারে বসে কি করবে ভাবতে লাগল। না, এই ঘটনা কাউকেই জানালো না ও। বিশেষ প্রয়োজনের কথা বলে ঘন্টা খানেকের ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেল ও। বাড়ি থেকে কল্পককে নিয়ে অফিসে চলে এলো স্বর্নাশীষ। আসার পথে ছেলেকে তার বাবা অফিসে নিয়ে আসার কারণ বিস্তারিত ভাবে বলেছে। কল্পককে হঠাৎ অফিসে দেখে সহকর্মীরা বেশ অবাক। কারো কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কল্পককে দিয়ে নিজের ড্রয়ারটিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করালো স্বর্নাশীষ। প্রতিটি জিনিষেরই আলাদা আলাদা গন্ধ রয়েছে। জিনিসগুলো ড্রয়ারে না থাকলেও তার গন্ধ এখনও ড্রয়ারে লেগে রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটা অনুধাবন সম্ভব নয়। সেই ঘ্রাণ ভালো করে অনুধাবন করে বাবার সাথে সারা অফিস ঘুরে বেড়াল কল্পক। আর কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ ও খোঁজাখুঁজির পর স্টোর রুম থেকে  স্বর্নাশীষের হারিয়ে যাওয়া জিনিস উদ্ধার করে কল্পক। 
স্টোররুমে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তা থেকে অপকর্মটি কে করেছে তা সহজেই জানা গেল। স্বর্নাশীষের দুটো সিট পড়ে বসা এক সহকর্মীর কাজ এটা। চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হল সেই লোকটিকে। 
স্বর্নাশীষের নকশা ও মডেল উচ্চমহলে বেশ প্রশংসিত হল। ফলস্বরূপ স্বর্নাশীষের জুটল পদোন্নতি। আর কল্পক? সে তার বাবার থেকে উপহার পেল একটি দামী ল্যাপটপ। সেই ল্যাপটপ নিয়ে ভীষণ খুশি সে। 
বাড়িতে ল্যাপটপ আসার খবর পেয়েই পাশের ফ্ল্যাটের অক্সিতা ছুটে এসেছে। দুজন মিলে অনেকক্ষণ ধরে চলল এই নতুন আনা ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রটির কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রকার পরীক্ষা নিরীক্ষা ও আলোচনা। একটা অন্যরকম খুশি মেখে রয়েছে দুজন। এটাই বোধহয় কল্পকের পাওয়া শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার। 
এই ঈশ্বর প্রদত্ত গুনের সদ্ব্যবহার করে ভবিষ্যতেও এমন ভাবে মানুষের উপকারে আসতে চায় কল্পক। তবে কিছু পাওয়ার আশায় নয়, মনের তাগিদে।সেখানেই হবে এই গুণ লাভের প্রকৃত সার্থকতা।

 

Comments

Top

 

গল্প 

নিষ্পত্তি

স্বরূপ মণ্ডল 

বাগডাঙ্গ, কান্দি, মুর্শিদাবাদ

ই সাইকেলটা নিয়েই বিজয়বাবুর যত ঝঞ্ঝাট! না পারেন বিক্রি করতে, না পান চালাতে। চাকরিসূত্রে বাইরে থাকতে হয়। মাঝে-মধ্যে যখন বাড়ি আসেন তখন দু-চারদিন যা চালানো হয়। তারপর ভাল করে পুঁছে, তেল, মোবিল, হাওয়া যা দরকার দিয়ে আবার চলে যান। বাবার সাইকেল। বয়সটাও কম হলো না। প্রায় পঞ্চাশ তো হবেই। আজ-কাল ওই রকম মজবুত সাইকেল মেলা ভার! তাছাড়া বাবার স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে। 
বাড়িতে বৃদ্ধা মা তাঁর স্বামীর স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে রয়েছেন। তাঁকে নড়ানোর যো টি নেই। কাজেই সপরিবারে চাকুরি স্থলে বাস করার বাসনা ত্যাগ দিয়েছেন বিজয়বাবু। এতে টানাপড়েন বেশি হয় ঠিকই কিন্তু সব দিক বজায় থাকে। এমনটা অবশ্য বিজয়বাবুই ভাবেন। প্রথম প্রথম অশান্তি করে দেখেছে আহুতি। কোন লাভ হয় নি। পরে এভাবেই মানিয়ে নিয়েছে সে। 
আহুতি অনেকবার বলেছে, সাইকেলটা চাকরির জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাড়িতে পড়ে থেকে থেকে অচল হতে বসেছে। তাছাড়া যেখানে ঘর-ভাড়া নিয়েছেন সেখান থেকে স্কুলটা প্রায় দু কি.মি. তো হবেই। একটা সেকেণ্ড-হ্যাণ্ড সাইকেলের খোঁজ করে দেখেছেন। দেড়-দু হাজারের কমে নয়। সাইকেলটা আনাই যায়। কিন্তু আনবেন কি উপায়ে? বাস জার্নির কথা ভাবলেই গা গুলিয়ে ওঠে। আবার ‘সাইকেল পার্সেল’ ব্যাপারটা কতকটা সম্মান হানিকরও বটে। অনেক ভেবে একটা উপায় বাতলেছে আহুতি। ঘণ্টা নয়েকের জার্নি, জেনেরাল কামড়ার জানলায় চেন দিয়ে কোনোরকমে বেঁধে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে! আহুতির বুদ্ধি আছে বটে। অবশ্য সাংসারিক বিষয়ে মেয়েদের বুদ্ধি একটু বেশিই হয়। সে কথা মানেন বিজয়বাবু। যেমনি ভাবনা তেমনি কাজ। 
জঙ্গীপুর স্টেশন। বাড়ি থেকে আধ ঘণ্টার রাস্তা। সাইকেল চালিয়ে স্টেশনে গেলেন বিজয়বাবু। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় তিস্তা-তোর্সা। একটা চালু টিকিট কেটে প্লাটফর্মের শেষ প্রান্তের দিকে এগিয়ে গেলেন। এর আগে বেশ কয়েকবার জেনেরাল কম্পার্টমেন্টে যাতায়াত করেছেন। জায়গা মতো সাইকেলটা নিয়ে দাঁড়ালেন। ট্রেন আসার খবর হয়ে গেছে। 
মিনিট দু’য়েকের মধ্যে ট্রেন ঢুকলো। তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে চেনটা বের করে সাইকেলটা জানলার সঙ্গে বাঁধতে লাগলেন। জানলার পাশেই একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক বসেছিলেন। চেঁচিয়ে উঠলেন, “করছেন কি?” “দেখতেই তো পাচ্ছেন,” বিজয়বাবুর ডাঁটের সঙ্গে বললেন। ভদ্রলোক ভাবলেন, লোকাল প্যাসেঞ্জার, পরের স্টেশনেই হয়ত নেমে যাবেন, তাই চুপ করে গেলেন। বাঁধা-ছাঁদা করে বিজয়বাবু কামড়ায় উঠলেন। ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি। এ সময় ভিড় একটু কমই থাকে। জিজ্ঞাসাবাদ করে একটা বসার জায়গার ব্যবস্থা করে ফেললেন। ব্যাগ থেকে একটা তুঁষের চাদর বের করে গায়ে জড়িয়ে আরাম করে বসতেই আহুতির ফোন। “কি গো, ট্রেনে উঠেছ? আর সাইকেলটার ব্যবস্থা হয়েছে? বসার জায়গা পেয়েছ?” আহুতি এরকমই। জিজ্ঞাসা করতে শুরু করলে একসঙ্গে একাধিক প্রশ্ন করে ফেলে, উত্তরের অপেক্ষা করে না। যেন জিজ্ঞাসার জন্যই জিজ্ঞাসা করা। বিজয়বাবু একে একে তার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আশ্বস্ত করলেন যে সবকিছু ঠিকঠাকই আছে। ফোন রেখে ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা বাসি ম্যাগাজিন বের করে স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই পড়তে শুরু করলেন। পড়তে পড়তে আপনা আপনিই চোখ চলে যাচ্ছে জানলার বাইরে ঝুলন্ত সাইকেলটার দিকে। ত্রস্ত চোখ স্বস্তি পেয়ে ফিরে আসছে পাতায়। এতে পড়ার গতি কমলেও

মনের গতি ঠিক থাকছে বিজয়বাবুর। বাঁ হাতটা চোখের সামনে ধরলেন। রাত সাড়ে ন’টা। চারপাশটা চোখ বুলালেন। বেশির ভাগই স্মার্টফোনে ডুবে রয়েছে, কেউ কেউ রাতের খাবারে মনোনিবেশ করেছে, হকারদের আনাগোনা তো লেগেই রয়েছে। ট্রেন চলছে আপন গতিতে। টিফিন কৌটোটা বের করে খুলতেই ভ্রু কুঁচকলেন। “আহুতির এই এক দোষ! আদর করে মানুষ মেরে ফেলবে, রাতের খাবার আর দিনের খাবারের মধ্যে তফাৎ টুকুও বোঝে না,” বিড়বিড় করলেন বিজয়বাবু। মালদা টাউন ঢুকলো ট্রেন। যতটুকু পারলেন খেয়ে বাকিটুকু ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে টিফিন কৌটোটা জায়গা মতো রেখে নিশ্চিন্ত হয়ে বসলেন। মনে মনে বললেন, “আর ঘণ্টা ছ’য়েক”। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলেন ইতোমধ্যে আহুতি বার কয়েক কল করেছিল। কল ব্যাক করতেই অপর প্রান্ত থেকে আবার প্রশ্ন, “খেয়েছ? তরকারি নষ্ট হয়ে যায় নি তো? পেট ভরেছে? ট্রেন মালদা ঢুকেছে?” বিজয়বাবু উত্তর দিয়ে মা ও মেয়ের খোঁজ খবর নিয়ে ফোন রাখলেন। তারপর মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করে চোখ বুজলেন।… 
চোখ খুললেন এক আর.পি.এফ অফিসারের চেঁচামেচিতে। হাত ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটা। কোন একটা স্টেশনে দাঁড়িয়ে রয়েছে ট্রেন। ঠিক ঠাওর করতে পারলেন না। অফিসার জিজ্ঞাসা করলেন, “এই সাইকেলটা কার?” সবাই এ ওর দিকে চাইতেই বিজয়বাবু বলে উঠলেন, “ওটি আমার, কেন কি হয়েছে?” অফিসারটি বললেন, “ফাইন লাগবে।” “ফাইন কিসের মশাই! আমি কি সাইকেলের জন্য কারও কোনো অসুবিধা করেছি? সাইকেলটা তো বাইরে বাঁধা রয়েছে,” চেঁচিয়ে বললেন বিজয়বাবু। “পার্সেল করেন নি কেন? এসব জিনিস পার্সেল করে নিয়ে যেতে হয়,” অফিসার ঝাঁঝিয়ে উঠলেন। ‘এ তো মহা বিড়ম্বনায় পড়া গেল!’ স্বগতোক্তি করলেন বিজয়বাবু। “আপনি আমার সঙ্গে আসুন,” ধমকের সুরে বললেন অফিসার। “দেখুন আমি কোথাও যেতে-টেতে পারবো না, কত ফাইন লাগবে তাই বলুন?” পাল্টা আক্রমণ করলেন বিজয়বাবু। “এটা কি লোকাল ট্রেন পেয়েছেন? যা খুশি, যেমন করে খুশি নিয়ে গেলেই হলো, আসুন বলছি,” ব্যবহার ক্রমশ রুক্ষ হচ্ছিল অফিসারের। বিজয়বাবু কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারলেন না, একটা সাইকেল যার সঙ্গে তাঁর বাবার স্মৃতি জড়িয়ে আছে সেটাকে কারও কোনো অসুবিধা না করে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোকাল ট্রেন আর এক্সপ্রেস ট্রেনের মধ্যে পার্থক্য কি আছে? স্কুলের অনেক অবাধ্য, অমনোযোগী ছাত্রকে তিনি নিজে হাতে গড়ে তুলেছেন। অথচ এত চেষ্টা করেও এই আর.পি.এফ অফিসারকে বোঝাতে পারলেন না। ভুল যখন করেছেন তখন মাশুলও গুণতে হবে। মনে মনে রাগ হচ্ছিল, আহুতি যদি বুদ্ধিটা না দিত তাহলে আজ এইভাবে অপদস্থ হতে হতো না। যখন বুঝলেন কোনোভাবেই এদের বোঝানো যাবে না, তখন ফাইন দিয়ে পাকা রসিদ নিয়ে নিজের জায়গায় এসে বসলেন। ব্যাগের পকেটে রসিদটা রেখে জানলার দিকে তাকাতেই বাজ পড়লো মাথায়। সাইকেল কোথায়? এ যে শুধু চেনটা ঝুলছে! বিজয়বাবু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। 
ঝিমঝিম করছিল মাথাটা। কখন যে ঝিমুনি এসেছিল বুঝতেই পারেন নি। অ্যালার্মের টোনে ঘোর কাটলো। ভোর চারটা। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ঢুকলো ট্রেন। শান্তভাবে নেমে গেলেন বিজয়বাবু। জানলার দিকে ফিরেও তাকালেন না। চেনটা তখনও ঝুলছে। ঝোলা ব্যাগের ভিতরে বেজেই চললো ফোনটা। 

Comments

Top

 

Comments

Top

 
 

কবিতা

পার্থ সরকার

একাকী ভূতপূর্ব আখ্যান 

 

ভিজে যাচ্ছে কথা 

সরু বৃষ্টিধারায় 

ক্রমেই জমাট বাধছে কুয়াশা পৃথিবীর ওপর 

ক্রমেই জমে যাচ্ছে সমুদ্র 

উঠোন জুড়ে জল 

ঘরে বাইরের আদ্র পরিকল্পনায় 

 

তাকিয়ে দেখে নৈঃশব্দ 

ভয় মেশানো আনন্দে 

সম্মুখে স্বাধীনতার মূর্তি 

আর তার প্রশ্ন- ও কি কেবল মূর্তি? 

 

আহার শেষে মরচে ধরা লোহা 

কমে ক্রমে আসে মাটি 

পায়ের তলায় 

স্বাধীনতার। 

কবিতা

রবীন্দ্র দাস

হৃদয়ের দিগন্ত

                

দূরে থাকা বসন্ত ছুঁয়ে যায়

অল্প কথার কিছু বার্তা,

তাতে ভরে রাখা একটু হাসি 

হৃদয়ের অলিন্দে রক্ত শীতল হয়ে আসে।

তারপর একটু আবেগ...

স্নেহভাজনের পথটুকুও

সূর্য অস্তমিতের রক্তিম আভাটা

বুঝবে এপথ খুবই শক্ত,

তাই পাখি আজও ডানা মেলে ওড়ে আর সেই শূন্য মন দাঁড়িয়ে থাকে শেষ দিগন্তের 

দিকে চেয়ে...

Comments

Top

গল্প 

গ্রামে যাত্রা

কল্যান সেনগুপ্ত

 

মুকুল ট্রেনে উঠেই বললে - 'শোন এবার পিসির পালা পড়েছে পুজো আর যাত্রার। তাই পিসেমশাই, ভাই শুভ দুজনেই নাটক করবে। ওদের নাটকটা কিন্তু দেখতেই হবে। রাতে হবে। খেয়েই শুয়ে পড়িস না আমার প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যাবে। কলেজ ছুটি। লক্ষ্মী পুজো শেষ ,আমি আর সুনীল চলেছি মুকুলের পিসির বাড়ির গ্রামে। আমরা হচ্ছি বিশিষ্ট দর্শক। পিসির হয়ে দর্শক বাড়াতে চলেছি। মুকুল বলেছে ভালো খাওয়া দাওয়া হবে। লোভটা আসলে ওটাই, কিন্তু মুখে বলা যাবে না। ওদের নাটক দেখতে হবে, ভালো বলতে হবেই। আরেকটা লোভ তিন মহলা জমিদার বাড়ি দেখব। জমিদার বাড়ি সিনেমায় দেখেছি।'

স্টেশনে পৌঁছে মনটা দমে গেল। দেখি ঘোড়ার গাড়ি আসেনি। এসেছে একটা অ্যাম্বাসাডর । অনেকটা গ্রামের ভিতরে চারিদিকে সবুজ গাছগাছালি ভরা রাস্তা পেরিয়ে সেই বাড়ি। সামনেই একটা পেল্লাই গেট, ওপরে সিংহর মূর্তি। দেখেই আমাদের উত্তেজনা তুঙ্গে। পাঁচিল ঘেরা জায়গা। লাল মোরাম বাঁধানো রাস্তা। ঢুকে সামনে অনেকটা ফাঁকা জমি দুদিকে ফুলের বাগান। একটু দূরে বিরাট গাড়ি বারান্দা দেওয়া প্রবেশ পথ। গাড়ি এসে দাঁড়ালে একজন কর্মচারী এসে আমার মুকুল আর সুনীলের ব্যাগগুলো নিয়ে চলে গেল ভিতরে। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে শুভ। প্রথমেই বিরাট এক বসার ঘর, ইয়া উঁচু। বড় বড় অয়েল পেইন্টিং দেয়ালে। একতলা আমাদের এখানে দুতলা বাড়ির মত। একদিকে সোফা সেট অন্য দিকে বিরাট জলচৌকি ওপরে যেমন দেখেছি সিনেমায় তেমন সাদা চাদরে ঢাকা সঙ্গে  কিছু বালিশ। এক দেয়ালে প্রচুর বই। প্রথম মহলটা একরকম অফিস, কাছারি, গুদাম। পরের মহলে অতিথিদের ঘর, নাটমন্দির, শেষে  অংশে জমিদার বাড়ির লোকজনেরা থাকে। আমরা তিনজন গুটিগুটি সব পেরিয়ে শেষে পিসির পেল্লাই রান্নাঘরে হাজির। পিসি দেখে নি নিশ্চিন্ত, যাক বাপের বাড়ি থেকে কেউ তো এসেছে। শুভ আনন্দে আটখানা। বলে - "কি যে আনন্দ হচ্ছে কি বলব। কাউকে চিনি না। কালে ভদ্রে আসা। কথা বলার কেউ নেই এই বিরাট বাড়িতে। তোরা এসেছিস এবার দারুন জমবে। চল, চল সব ঘুরে দেখাই"। 

আমরা দুদিন থাকবো। প্রথম দিন গ্রামের লোকেদের যাত্রা, পরের দিন বাড়ির লোকেদের নাটক। দুপাশে দুটো বিরাট দীঘি। তার চারদিকে প্রচুর গাছ গাছালি। ছাদে গেলে বাড়িটার ব্যাপ্তি বোঝা যায়।  কিন্তু শেষের মহল বড়ো খালি খালি। আমরা যে ঘরে থাকবো ঠিক হলো সেটা একটা বিরাট ঘর। অন্তত তিরিশ ফুট লম্বা আর পনেরো ফুট চওড়া। একদিকে অন্তত পাঁচজন শোয়া যায় এমন খাঠ, অন্য দিকে একটা পালিশ করা পুরনো কাঠের সোফা সেট, সঙ্গে কিছু সাইড টেবিল। একটা কাঠের আলমারি তাতে অনেক বই। আর আছে এক আরাম কেদারা, ভাঁজ করা  হাতল, সেটা তে হাত রাখা যায় আবার বাড়িয়ে নিলে পা ও রাখা যায়। একদিকে ঘরের ইয়া চওড়া চকমেলানো বারান্দা আর দুটো জানালা। অন্যদিকে তিনটে মাটি থেকে আট দশ ফুট উঁচু জানলা। আমরা খুপরি খুপরি ঘরে থেকে অভ্যস্ত। জমিদার বাড়ির প্রত্যেকটা ঘরই হলঘর। এখানে একা একা চলা ফেরা করা বেশ মুশকিল। কেমন একটা ভয় ভয় করে। ঘর দেখে মনে হল একটা স্বপ্নের দেশে চলে এসেছি। জানলা দিয়ে তাকালে সামনে দীঘি  তারপর বড় বড় আম জাম কাঁঠাল গাছের সারি। পাঁচিল দেখা যায় না। বড়বড় গাছের জন্যে। ঘরের সঙ্গেই লাগোয়া বাথরুম। ঘরে দিনের বেলা বেশিক্ষণ থাকা হয় নি। গ্রাম দেখা, পাশের গ্রামের মন্দির দেখে, জব্বর খেয়ে কাটলো সেদিন।

দুপুরবেলা আমি সুনীল, মুকুল আর শুভ বের হলাম গ্রাম দেখতে।  দুর্গা মন্ডপ, নদীর পাশে কালী মন্দির, বাজার, আর দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেত। যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ।আলের ওপর দিয়ে একটু হাটলাম। প্রচুর পাখির কলকাকলি বাড়ছে কারণ আলো কমে আসছে। সোঁদা গন্ধ পথে ঘাটে গাছতলায়। দুর্গা মন্ডপের পাশে যাত্রা, কীর্তনের জন্যে বাঁধানো চাতাল, সেখানে সেদিনের যাত্রার রিহার্সাল চলছে। কারুর খালি গা লুঙ্গি পড়া, কারুর পায়জামা বা হাফ প্যান্ট। হাতে তীর ধনুক,।দেখে মনেহলো রামায়ণ বা মহাভারতের কোনো অংশ নিয়ে যাত্রা। গলার গমক দুর থেকে শোনা যাচ্ছে। গিয়ে দাড়িয়ে একটু দেখতেই যে নেতা সে এগিয়ে এলে, বললে একটু হেসে "বুঝলেন না শেষ মিনিট টাচ চলছে। আসবেন কিন্তু"। শুরু রাত নটা। প্রচুর হাঁটাহাঁটি করলাম আর সন্ধ্যার আগেই ফিরে এলাম রাজবাড়ীতে। রাত্রিটা তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে গ্রামের লোকেদের যাত্রা দেখতে বসলাম আমি মুকুল, সুনীল আর শুভ। কিন্তু বসতে থাকে পারছি না।একদিকে প্রবল মশা। তার সঙ্গে গ্রামের লোকদের এত ভিড় যে লোকে প্রায় গায়ের ওপর উঠে আসছে। তারপর লুচি মাংস খেয়ে প্রবল ঘুমের আনাগোনা। চুপিচুপি আমি আর সুনীল গিয়ে অন্ধকারে দোতলায়  উঠে ময়দানের মতো খাঠে শরীরটা ফেলেছি আর ঘুমের অতল সাগরে তলিয়ে গেছি।

পরদিন শুভ আর মুকুল এসে তুললে।

- কিরে তোরা কি ঘুমোতে এসেছিস? যাত্রার পর প্রাইজ দেবার সময় তোরা নেই।। সবাই ডাকাডাকি করছিল। শেষে মা বলল - সকাল বেলা ঘর থেকে বেরিয়েছে তাই পারেনি ঘুমিয়ে পড়েছে"। "আজ কিন্তু থাকতেই হবে রাত্রে মনে আছে ত? আজ বাড়িতে হেভি ব্যাপার সবাই আস্তে যেতে পার্ট মুখস্ত করছে, ভুলে গেলে দৌড়ে গিয়ে খাতা দেখে আসছে। শুভ বললে সুনীল তুই ভালো প্রমোট করিস, বাবা বেশ নার্ভাস পার্ট নিয়ে। তুই আজ আপনাদের একদিকের প্রমোটে থাকিস। বাবা তোর কথা বলছিল। তোকে আগে কলকাতার পাড়ায় দেখেছে মনে হয়।

রাত্রে ঝপর ঝপর বাজনার পড়ে নাটক শুরু হলো। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের, চন্দ্রগুপ্ত। গিজগিজ করছে গ্রামের লোক। মুকুলকে আর আমাকে একটা সামনে বসার জায়গা দিয়েছে মাটিতে। কিন্তু এমন চাপ মহিলা, বাচ্চা, যুবকরা প্রায় গায়ের ওপর উঠে পড়ে আর কি। সুনীল একদিকে আর খাজাঞ্চি খানার একজন অন্যদিকে বই হাতে দাড়িয়ে উইংস এর পাশে। নাটক শুরু হল, একটু পর থেকেই মঞ্চে ছেলে বাবা থেমে থেমে উচ্চস্বরে কথা বলছে। মানে যেটুকু প্ৰমোট এ শোনা গেল ফের সেটা জোরে জোরে বললে তারপর সব চুপ। পার্ট বেমালুম ভুলে গুলিয়ে গেছে। স্টেজ এ সব পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে। বুঝলাম কিছুই মুখস্ত করেনি কেউ। প্রতি মুহূর্তে থমকে যাচ্ছে, কোনো সময় প্রমোটেরের কথাও না শুনতে পেয়ে উইং এর দিকে চাইছে। দর্শক প্রজা, বেশি কিছু বলতেও পারছে না। এর মধ্যে শুভ একবার স্টেজ এর মাঝখানে আর তখন প্রম্পট শুনতে পাচ্ছে না। অগত্যা সে কিছু একটা অছিলায় উইংসের দিকে গেছে আর তখনই সুনীলের হাত থেকে বইটা পড়ে গেছে মাটিতে। তাড়াতাড়ি করে তুলে আর খুঁজে পাচ্ছে না কোথা থেকে প্রম্পট করবে। আর স্টেজ এ শুভর হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছে। শেষে ওটা খুঁজে পেতে আবার প্রম্পট শুরু করলে নাটক চলতে থাকে। সে একটা বিশ্রী ব্যাপার। হঠাৎ দেখলাম শুভর বাবা প্রম্পট না শুনতে পেয়ে, প্রথমে চোখ দিয়ে বার দুই পরের পার্টটুকু জিজ্ঞাসা করললেন, কোনো উত্তর না পেয়ে উইং এর আড়ালে প্রমোটারের কাছে যেতে গিয়ে উইংস এর ভিতরে ঢুকে গেলেন। এদিকে তখন সুনীল হঠাৎ পেট কামড়াতে বই রেখে দৌড়েছে বাথরুম এ। এইবার দর্শক চিৎকার শুরু করেছে বেরিয়ে আসুন, বেরিয়ে আসুন কিছু শুনতে পারছি না। আর সুনীল সেখান থেকে কেটে পড়েছে। পিসেমশাই যখন সুনীলকে পেলেন না তখন নাটক থেমে গেল। পরিচালক শুভর এক কাকা বললেন প্রমোটার এর পেট কামড়েছে। তাই উনি থাকতে পারবেন না। আরেকজনকে জোগাড় করে শুরু হল। সুনীল একটু বাদে এসে বললে অন্ধকারে - চল চল ওপরে যাই। বেদম পেট কামড়াচ্ছিল তাই দৌড়েছিলাম বড় বাথরুম। মুকুল বললে - আমি যেতে পারব না, তোরা যা। 

আমি বললাম -  এটা কুকুরের পেট এত  মাছ, ঘি এ ভাজা লুচি, পায়েস, মাংস সহ্য হয়? 

জানি এখন আর কেউ কিছু বলবে না। নাটক শুরু হলো আবার আর আমরা একলাফে সিড়ি ভেঙে দোতলায় ঘরে ঢুকে বিছানায় লাফ। 

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল পেটে বেগ আসাতে। তখনও নাটক চলছে শুনতে পাচ্ছি। বাথরুম যাবার সময় ঘুম চোখে বুঝতে পারি নি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে পা দিয়ে মনেহল অন্য এক জগৎ। ঘরের অর্ধেক জোৎস্নার নীলচে আলোয় ভাসছে। ঘরের মধ্যে অর্ধেক আলো অন্ধকার। জানলার সামনে দাড়িয়ে মনে হল বাড়িতে নয় দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। চোখ যতদূর যায় দীঘির এদিকওদিক পুরোটাই দেখা যাচ্ছে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হালকা বাতাস বইছে। কদিন বাদে পূর্ণিমা, দীঘির ওপর চাঁদের প্রতিবিম্ব তিরতির করে কাঁপছে। টিঃ, টি করে কোনো অজানা পাখির ডাক দুর থেকে ভেসে আসছে। দীঘির জল মাঝে মাঝেই ছোট ছোট ঢেউ তুলছে হঠাৎ হঠাৎ। দূরে ভূতের মতন আম, জাম, কাঁঠালের সারি পরপর দাঁড়িয়ে আছে। হালকা কীর্তনের খোলের শব্দ আসছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে। আর কাছে কোথাও কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে। বাঁশির  সুর বাতাসে গুমরে গুমরে উঠছে। বেজেই চলেছে। ভীষণ করুণ সে সুর। সুর চরাচরকে বিদীর্ণ করছে। বুকের মধ্যে সেই সুরের মায়াজাল ছেয়ে ফেলছে, শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে ভেসে যাচ্ছি কোথাও। মুকুলকে একটা ধন্যবাদ দিতেই হবে নাহলে আমি শহরের গলি রাস্তার ইট কাঠ ফেলে এই রাত্রির রূপ দেখবার সৌভাগ্য হয়? সৃষ্টি কর্তা কখন যে খুলে দেন তার রূপের ডালি, মেলে ধরেন নিজেকে  জানি না। সুখ অসুখ আনন্দ বেদনার কোনো অনুভূতিই নয়, একটা দুঃখ বোধ , একটা ঘোর, ঢেকে ফেলছে মন প্রাণকে। অথচ তেমন দুঃখ বোধ এখন ত আমার নেই। এমন অপার্থিব, অসাধারণ, দৃশ্যতে স্নাত হতে হয়ে ভিজে গেছি। দাড়িয়েই আছি। চোখ ফেরাতে পারছি না। সময় চলে যাচ্ছে। কতক্ষণ ছিলাম জানি না। হঠাৎ সুনীল উঠে পড়ল। কোনদিকে না তাকিয়ে দৌড়ে সোজা বাথরুমে। আমি বিছানায় এসে শুলাম। এমন দৃশ্য দেখব ভাবিনি। ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

ঘুম ভাঙলো শুভ, আর মুকুলের কথাবার্তায়। - কিরে কেমন আছিস? তোকে আর সুনীল কে নিয়ে ত চিন্তায় পড়ে গেলাম। মুকুলের পিসি হজমের ওষুধ নিয়ে এলেন। মুকুল বললে - জানিস নাটকটা পরে খুব জমে গেছিল। পিসেমশাই পরের দিকে পার্ট মনে পড়ে যাওয়াতে স্টেজ এ নাকি ফাটিয়ে দিয়েছে। যিনি নাটকের প্রথমেই পার্ট মনে না পড়াতে প্রমোটরকে খুঁজতে উইংন্স এর আড়ালে চলে যেতে পারেন তিনি পরে কী করে ফাটালেন সেটা বড় প্রশ্ন। জানি করা যাবে না সুনীল শুধু আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসলে। পিসেমশাই বেস্ট অ্যাক্টর হয়েছেন। মুকুলের পিসি খুব আফসোস করলেন আমরা বাকিটা দেখতে না পাওয়ার জন্যে। পিসি নাটকের কথা বলছেন আর আমি গতকাল যে অপার্থিব দৃশ্য দেখেছি তার কথাই ভাবছিলাম। আহা এই জীবনে এমন আর কি দেখতে পাবো? মনে হয় না। গ্রামের যাত্রায় যাত্রা না করলে এত কিছু দেখা হোত না। পিসিকে একটা মনে মনে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার আসবো কথা দিয়ে, সিঙ্গী মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে, আমরা কলকাতার দিকে রওনা দিলাম।

Comments

Top

গল্প 

বলেন স্যার

শান্তনু ঘোষ

 

তুর্থ পিরিয়ড চলাকালীন ক্লাস এইট বি সেকশনের ঘর থেকে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ পাওয়া যেতেই একরাশ উৎকন্ঠা নিয়ে হেডস্যার বুদ্ধদেব চৌধুরীবাবু তার ঘর ছেড়ে পড়িমড়ি করে উঠে এসে বারান্দায় দাঁড়ালেন। হেডস্যারের ঘরের সামনের লম্বা বারান্দার ঠিক উল্টোদিকে স্কুল মাঠের পশ্চিম দিকে এইট বি সেকশনের ঘর। শোরগোলটা আসছে ঠিক সেখান থেকেই। উচ্চকণ্ঠে সংস্কৃতের মাস্টারমশাই যিনি পণ্ডিতমশাই নামেই স্কুলে পরিচিত - তার ভারী গলা আর সঙ্গে বেতের ছপ ছপ আওয়াজে সদা গম্ভীর হেডস্যারের ঘরের লাগোয়া টিচার্স রুমে থেকেও সবাই যেন শশব্যস্ত হয়ে বেড়িয়ে আসলেন।
হেডস্যার বুদ্ধদেব চৌধুরী চিন্তিত হয়ে বললেন, আজ আবার কি হলো, উফ! প্রত্যেকদিন এই অশান্তি আর ভালো লাগেনা। ধুর এসব দেখবো না অফিশিয়াল মেটার সামলাবো। সামনের সপ্তাহেই ডিআই ভিজিট। সঙ্গে অন্যান্য আধিকারিকরা আসবেন। কত কি হিসেব সামলাতে হবে? তার মধ্যে এই উটকো অশান্তি আর ভালো লাগে না ....ধুর।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্কুলের দপ্তরি শ্যামল মুৎসুদ্দি কে বললেন, কতবার যে পন্ডিত মশাই কে বলেছি, আরে বাবা দিনকাল ভালো না, আপনি বদলান নিজেকে। কর্পোরাল পানিশমেন্ট এখন নিষিদ্ধ পুরোমাত্রায়। কে কার কথা শোনে? বয়স্ক মানুষ, কিছু বললেই প্রেস্টিজে নেবেন। আর এদিকে কিছু হলে ঠেলা সামলাব আমি। পারিনা বাপু।
ঠিক তখনই ক্লাস নাইন এর ঘর থেকে আসছিলেন স্কুলের তরুণতম শিক্ষক রণিত মজুমদার। যে ইতিহাস ক্লাসে কোনদিনও ছেলেমেয়েরা রস কস পেত না, রণিতের ছোঁয়ায় যেন এক লহমায় বদলে গেল তাদের মনস্তত্ত্ব। স্কুলের ছাত্রছাত্রী সংক্রান্ত খুঁটিনাটি ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে তাই রণিত স্যার হেডস্যারের অন্যতম সেনাপতি। হাতের কাছে  রণিতকে পেয়ে হেডস্যার কাছে এসে বললেন, রণিত, তুমি এসব একটু থামাও না ভাই। কোথা থেকে গার্জেন এসে উটকো ঝুট-ঝামেলা করবে ......
আর ভালো লাগছে না ভাই। আমার অনেক কাজ আছে। এসব নিয়ে মাথা ঘামালে চলবেনা। তুমি একটু এটাকে সামলাও না। 
রণিত মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন হেডস্যার বুদ্ধবাবু। উনি জানেন রণিত গিয়ে ঠিক সামাল দেবে। গতবার সরস্বতী পুজোর রাতে  স্কুলের পাশের শঙ্কর মন্ডল এর বাড়ির নারকেল লোপাট হওয়া নিয়ে যা কান্ড হয়েছিল তা সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছিল বুদ্ধবাবুকে। শেষে রণিতের বুদ্ধিতেই অবস্থা সামাল দেওয়া গিয়েছিল সে বারের মত।
হেডস্যারের কথা মত রণিতবাবু ও আরো জনা তিনেক তারই বয়সী মাস্টারমশাই ঝড়ের গতিতে রওনা হলো এইট বি এর  উদ্দেশ্যে। ওই ঘরে তখন রীতিমত ঝড় বয়ে চলছে। বাইরে থেকে কর্কশ গলায় শোনা যাচ্ছে পন্ডিত স্যারের বকুনি আর বেতের ছপ ছপ আওয়াজ। রণিতরা বুঝতে পারল ব্যাপারটা মোটেই পড়াশোনা কেন্দ্রিক নয়।ঘরে ঢুকেই পন্ডিতমশাই কে জিজ্ঞেস করতেই উনি বললেন, "এরা মানুষ হবে!!!!! অসভ্য কোথাকার। আমি স্কুলের সিনিয়র টিচার আমার সঙ্গে কিনা ফাজলামো"।
বেত্রাঘাত প্রাপক ছাত্রটি কিন্তু যথারীতি নির্বিকার। রণিত পন্ডিতমশাইয়ের কাছে গিয়ে ওনাকে শান্ত হয়ে বসতে বললেন, "মাস্টার মশাই, আপনি উত্তেজিত হবেন না। আমি দেখছি ব্যাপারটা"।

"দেখো, দেখো। তোমাদের আশকারায় আজ এই দশা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের। আরো মাথায় তোল।"
মাছ ধরতে যাও, খেলাধুলা কর ওদের সঙ্গে। আরে তোমাদের জন্যই তো আজকে এদের এত বড় সাহস" রীতিমতো দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বললেন পন্ডিত মশাই। 

রণিত বুঝল তার প্রতি এই স্যারের একটা ক্ষোভ ভেতরে রয়েছ। শুধু এই স্যারের কেন, সিনিয়রদের একাংশের তার ওপরে তা যথেষ্টই রয়েছে তা সে বিলক্ষণ বুঝতে পারে। আর থাকবে নাই বা কেন, চিরাচরিত মারধরের পদ্ধতি বাদ দিয়ে নতুনভাবে ছেলে মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশে শিক্ষাদানের পদ্ধতি ও চালু করেছে তাতে ও অল্প সময়ের মধ্যেই যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে সন্দেহ নেই। এনিয়ে টিচার্স রুমে ও ফিসফাস কম হয় না তাকে নিয়ে। রণিত এসবকে কোন পরোয়া না করেই তার জয়ফুল লার্নিং এর পদ্ধতি চালিয়ে যাচ্ছে। ফল ও পাওয়া যাচ্ছে হাতেনাতে। ছাত্র-ছাত্রীরা ওদের সমস্যা অকপটে বলতে পারে রণিতদের, বিশেষ করে রণিতকে। তাই স্কুলে কোথায় কোন ছাত্র কার সঙ্গে মারামারি করছে, কি সমস্যা তৈরী হচ্ছে এ নিয়ে হেডস্যার এই জাতীয় সমস্যাগুলোকে ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকেন। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। মারধরের সাময়িক বিরতি হতেই রণিত ছাত্রটির কাছে এগিয়ে গেল। ওর মুখটা চেনা হলেও নামটা নয়। তবে রণিত বিলক্ষণ জানে ছেলেটি একটু ফচকে ধরনের। গতবার সরস্বতী পুজোর রাতে স্কুলের পাশের বাড়ির শঙ্কর মন্ডলের বাগানের নারকেলগুলো বেমালুম হাফিস হয়ে গেছিল। রণিত নিজস্ব নেটওয়ার্ক খাটিয়ে জানতে পেরেছিল ওই কেসে এই ছেলেটি প্রাইম সাসপেক্ট ছিল। সাক্ষী-প্রমাণ না থাকায় সে যাত্রায় ছেলেটি বেঁচে গিয়েছিল। তখন থেকেই ওকে চিনে রেখেছিল রণিত। তবে স্পোর্টসম্যান হিসেবে ছেলেটার বেশ নামডাক আছে। ভালো ফুটবল খেলে, সাঁতার কাটে, বর্ষা ছোঁড়ে। স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টস এ অনেকগুলোই পুরস্কার পেয়েছিল গতবার। ছেলেটা ক্লাস এইটে পড়লেও গায়ে-গতরে যথেষ্টই শক্তপোক্ত; সিনিয়র ক্লাসের ছেলেদের মত লাগে। তখনকার মত নামটা জানা হলেও কিছুতেই এই মুহূর্তে মাথায় আসলো না রণিতের।
যাই হোক দাঁড়িয়ে থাকা আপাত শান্ত এই ছেলেটি যে পন্ডিতমশাই এর রাগের অন্যতম কারণ সেটা বুঝতে আর বাকি রইলো না।
ওর কাছে গিয়ে রণিত জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে রে?

স্যারকে কি বলেছিস? স্যার তোর ব্যবহারে এত রেগে গেলেন কেন? ছেলেটি যথারীতি নির্বাক থাকলেও চিৎকার করে পণ্ডিতমশায় বললেন, "ও কি বলবে? ওকে জিজ্ঞাসা করছ কেন? আমি বলছি কি হয়েছে?"
তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে আসলেন রণিতের কাছে। সোজা চুলের মুঠি ধরলেন ছাত্রটির । বললেন, "হারামজাদাটাকে ওর নাম জিজ্ঞেস করছি বারবার। আর বলছে কিনা - 'বলেন স্যার'। ফাজলামি পেয়েছিস? একটা পাক্কা শয়তান । বারবার জিজ্ঞেস করছি, তোর নাম কি , তোর নাম কি, ঘুরে ফিরে একই কথা - বলেন স্যার ,বলেন স্যার। আরে বলছি না তো কি করছি? গাধা কোথাকার ......স্টুপিড,,, ছাগল"।
ছাত্রটির উদ্দেশ্যে আরও বেশকিছু চোখা চোখা বিশেষণ ব্যবহার করে ক্লান্ত হয়ে শেষে চেয়ারে বসে পড়লেন পন্ডিতমশাই। ছাত্রটি কিন্তু নির্বিকার চিত্তে যথারীতি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, যেন কিছুই জানে না।
ছাত্রটির চিবুকে হাত দিয়ে মাথা উঁচু করেই রণিত জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে রে? এত রেগে গেছেন কেন? নিশ্চয়ই তুই কিছু করেছিস। তোদের জন্য আমার মাথা মাথা কাটা গেল।
কোন উত্তর নেই এবারও। পন্ডিতমশাই ওর দিকে তেড়ে গিয়ে বা কানটা ধরে জিজ্ঞেস করলেন, "তোর নাম কি?" ছেলেটি যথারীতি উত্তর দিল, 'বলেন স্যার।'
কান  ছেড়ে এবার চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে পন্ডিত মশাই বললেন, "বলছি না তো কি চুপচাপ আছি? তখন থেকেই তো একটা কথাই বলে যাচ্ছি। বারবার জিজ্ঞেস করছি তোর নাম কি? তোর নাম কি? আর কোন উত্তর নেই। ব্যাটা শুধু বলে কিনা, বলেন স্যার ,বলেন স্যার।"
আবার শুরু হলো পন্ডিত মশাই এর পিঠ পূজা। রণিত কিছুটা ব্যস্ত হয়ে বলল," আরে আরে মাস্টার মশাই, আপনি উত্তেজিত হবেন না, দেখছি দেখছি। আপনার শরীরটা কিন্তু ভালো নেই। ওটা খেয়াল রাখবেন, কিছু হলে তখন মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।"
সঙ্গে সঙ্গে ওনাকে টেনে নিয়ে গেলেন অন্যদিকে। কানের কাছে কিছু একটা বলতেই রণিতের দিকে অত্যন্ত রেগে গিয়ে তাকালেন পন্ডিত মশাই। তারপর গজ গজ করতে করতে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন। বাইরে থেকে তখনো গর্জন করেই যাচ্ছেন পন্ডিত মশাই, "যতই জিজ্ঞেস করি ব্যাটা বলে কিনা বলেন স্যার, বলেন স্যার ,,,,কত বড় আস্পর্ধা, সাহস বলিহারি এদের"।
রণিত গোটা ক্লাসের দিকে তাকিয়ে দেখল ছাত্রছাত্রীরা মুখটিপে মিচকি মিচকি হাসছে। ব্যাপারটা বোধগম্য করবার জন্য ক্লাসের ফার্স্টবয় শুভম এর দিকে এগিয়ে গেল রণিত। বলল শুভম, সত্যি করে বলতো কি হয়েছে পণ্ডিতমশাই এত রেগে গেছেন কেন? কি বলেছে ছেলেটি? বল বল আমাকে। কোন ভয় নেই। আমাকে তুই নির্দ্বিধায় বলতে পারিস ।কেউ তোকে কিচ্ছু করবে না।
শুভম আস্তে আস্তে বলল স্যার, ওই ছেলেটির নাম বলেন সোরেন। পন্ডিত স্যার যখন ওর নাম জিজ্ঞেস করলেন তখন থেকেই সমস্যা। ও সেটাই বলেছিল, 'বলেন স্যার', আর পন্ডিত স্যার রেগে গিয়ে ভাবলেন তার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছে। ব্যস....
আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারছিলাম না স্যার, পাছে পন্ডিত স্যার আমাদের না মারেন। এটাই হল মূল ঘটনা।
এতক্ষণ পর সবকিছু পরিষ্কার হতেই হো হো হো হো করে হেসে উঠল রণিত সহ শুভঙ্কর ,পীযূষ, কাজল ও  অন্যান্য ক্লাস থেকে আসা উপস্থিত শিক্ষকরা। একযোগে এহেন হাসির আওয়াজে গোটা ক্লাসের শোরগোল বাইরে বেরিয়ে যেতেই প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে সটান হাজির প্রধান শিক্ষক। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, কি হয়েছে? প্রথমে মারধর আর এখন হাসির আওয়াজ কি ব্যাপার বলতো। আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
হাসির আওয়াজ শুনে পণ্ডিতমশাই ও ঘরের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লেন। ঈষৎ বিরক্তি সহকারে রণিতকে বললেন, "এই রণিত তোমাদের কী হয়েছে বলতো? তোমরা সবাই দাঁত বার করে এমন হ্যাঁ হ্যাঁ করে হাসছো কেন? তুমিও কি ওদের ফচকেমিতে যোগ দিলে নাকি?
রণিত হাসতে হাসতেই বললো, মাস্টারমশাই আপনি শান্ত হোন। আপনি কিন্তু শুধু শুধুই ওকে এতক্ষণ ধরে মারধর করলেন। ওতো আপনার কথারই উত্তর দিয়েছে। আপনি যেমনটা জানতে চাইছিলেন ঠিক সেই উত্তরটাই দিচ্ছিল। আপনি বুঝতে পারেননি তাই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল।
দৃশ্যত হতবুদ্ধির মত পন্ডিতমশাই চশমাটাকে নাকের ডগায় ঠিকমতো বুঝে নিয়ে বললেন, মানে? কি বলতে চাইছো তুমি? আমি বুঝতে পারিনি। ঠিক আছে তুমি যখন সবটা বুঝেছো তাহলে এবার আমাকে বোঝাও তো বাপু।
হাসতে হাসতে রণিত বলল, মাস্টারমশাই ছেলেটির নাম বলেন সোরেন। আর এখান থেকে যত সমস্যার উৎপত্তি। যখন আপনি জিজ্ঞাসা করলেন তোর নাম কি? ও আপনাকে বলেছিল, বলেন স্যার। ও ঠিকই বলেছে। ও তো ওর নামটাই বলেছিল ।কিন্তু আপনি তা বুঝতে পারেননি। তাই ভাবছিলেন আপনার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছে, ফাজলামি করছে। আসলে তা নয়। আপনাকে ও বলতে চাইছিল, ওর নাম বলেন স্যার।
সবটা শুনেই হেডস্যার বুদ্ধদেব চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত হা হা, হাহা করে অট্টহাসি শুরু করলেন যা সহজে থামেন থামতে চাইল না। আর হাসির দমকা হাওয়ায় উপস্থিত সকলেই যোগদান করলো শুধু পণ্ডিতমশাই ছাড়া।
এরপর পরাজিত সৈনিকের মতো কোনমতে এক টিপ নস্যি নাকে গুঁজেই ক্লাসরুম থেকে অদৃশ্য হলেন পণ্ডিতমশাই ঝড়ের বেগে। পেছনে বাকি মাস্টারমশাইরা। টিফিন এর বেলের পাশাপাশি তখন পেছন শোনা যাচ্ছে ছাত্রদের সমবেত আওয়াজ ,,,,,,,,,, বলেন স্যার ,,,,,,, বলেন স্যার।  

Comments

Top

কবিতা

মিজানুর রহমান মিজান 

সিলেট, বিশ্বনাথ, বাংলাদেশ

 

কথা কি সত্য নয় 

জ মরলে কাল দু’দিন হয় 
মানুষ তোমার কিবা রয়। 
অস্থায়িত্বের এ ভবে এসে দেখাও দেমাগ 
ভাল কথায় ঝম্প মেরে দেখাও রাগ 
কিন্তু অল্প রোগে ধরলে থাকে কাতরতার ভয়। 
হাবভাবে তো মস্ত গুণের বাহার 
দয়ার গুণে চল কর আহার বিহার 
তা ভুলে যাও, স্মরণ কি না হয়।
সরলে গরল মিলিয়ে বল মন্দ কথা 
শূন্য পুণ্য ভেদ ভুলে মিষ্টকে বানাও তিতা 
চাপে পড়লে সোজা হতে হয়।
কেহ গরম পদ পদবীতে, কেহ পেশী শক্তিতে 
কেহ গরম কথায় আবার কেহ  টাকাতে 
সম্বলের অভাবে সকলই হিম হয়।  
অনেক সময় মহাবিপদেও কাটে না ঘোর 
রাজার তেলে খুশবো ছড়াও অন্ত:পুর 
সব হারাবে নিশ্চয় একদিন এ কথা কি সত্য নয়? 

তারে ভুলে 

দেখা পাবার অপেক্ষাতে কাটে সারাবেলা 

দিনমান কাটাই থেকে একেলা, নিরালা। 

মনের যতো দু:খ ব্যথা বলবো একান্তে 

হতাশ হয়ে ফিরি নীড়ে  দিনান্তে 

লজ্জা শরম বিসর্জি আছি ধরে পালা।

আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু 

যাক জীবন হই যদি বলির পশু 

আশার  আশে অবশেষে পরতে যদি পারি মালা।

বন্ধু বিনা কেবা আছে সদা রহমত যেজন যাচে 

তারে ভুলে অন্যের কাছে দিন কাটাই হয়ে বেভুলা।

আমার আমি কই

লছি সদায় বন্ধের দয়ায়
আমার আমি কই।
আমিতো আমি নয় অন্যের উপর নির্ভয়
বাহাদুরি কোথা রয় অযথা শুধু হইচই।
একদিনের রোগে পাইলে সর্বাঙ্গ অবশ হলে
পাই না মুক্তি কোনকালে, দয়ার দয়ায় শুধু রই।
এ ভব সংসারে, অতল গভীরে
পড়িয়া আধাঁরে, পথহারা ভিন্নতা কই।
হোক জয় বা পরাজয়, ভাবি না এ বিষয়
যখন যেথা ইচ্ছা হয়, তব নাম জপি কষ্ট হয় যতই।

Comments

Top

কবিতা

এক ডজন ছোট্ট কবিতা

আশরাফ উল আলম শিকদার

ঢাকা, বাংলাদেশ

 

মৃত্যুকে ছুঁয়ে ফিরে আসা
হ্যাচ্চো! মৃত্যুকে ছুঁয়ে ফিরে আসা


করোনার পর
এই করোনার পর
শহর সব হচ্ছে সরব 
ভিখারী মুখর


একটা ভালো খবর
জেগে উঠে বসে থাকি বিছানায়
একটা ভালো খবরের আশায়
শেষে ইমেল খুলি, সেই থোড়-বড়ি-খাড়া ...


ভগ্ন দূত
পয়সা অনেক আজ
এসেছে হাতে, অর্থাৎ
কাল অভাব আসছে।

শত্রু মিত্র বিচার
মিত্রের শত্রু কে
শত্রু জানে মিত্র কে
তারা একই জন


সংযোগ সংস্থাপন
সংযোগ সংস্থাপন
সম্পর্ক রক্ষণ-বেক্ষণ
আত্মীয় স্বজন


চাই স্বাধীনতা মোর
বিনিময়ে যাক
বা থাক প্রাণ বা গর্দান, চাই
স্বাধীনতা মোর।


মাকড়সা
সে বসে আছে
পোকামাকড়ের আশায়
খাবার অপেক্ষায়

চোখ
শিয়ালের দু চোখ
গভীর রাতে উকি দেয়
হাস-মুরগির বাসায়

ওয়ান ইসটু ফোর
আরশোলার পা
গরম চিকেন স্যূপে ─
ওয়ান ইসটু ফোর


সন্দেহ
প্রভুকে ডাকে
কুকুর চিৎকারে, চোর, চোর
সন্দেহে সব্বাই


তোমার ছোট্ট নাও
বড় মাছের লোভ
নেয় টেনে মাঝ সাগরে
তোমার ছোট্ট নাও

Comments

Top

গল্প 

অজানার টানে

পিন্টু মিত্র

অ্যাশ ভ্যালি, ইংল্যান্ড

লেখকের পরিচয়: আমি একজন অশীতিপর বৃদ্ধ কোভিড-১৯ এর জ্বালায় একান্ত বাস করছি। আ মার ছোটবেলা কেটেছে গ্রাম বাংলায়, লেখাপড়া ও কাজে তাগিদায় বাকিটা কাল দেশে বিদেশে। পরে কি হবে জানি না।

 

রাতের শেষ  ট্রেনটা যখন আমায় একা অন্ধকারে রেখে পিছনের  জ্বলজ্বলে লাল আলোটা দেখিয়ে একেঁ বেকেঁ  মিলেয়ে গেল দূরদূরান্তে তখনও অনুমান করেত পারিনি  রাতের আঁধার বহুক্ষণ আগেই মিতালী পাতিয়েছে দুর্যোগের সাথে। একা জনমানব শূন্য ধুধু মাঠের মাঝে কোন ষ্টেশন ঘর নেই কারণ এটা একটা হল্ট ষ্টেশন। ভয়ডর বলে কোন কিছুই আমার কোনকালে ছিল না, তবে দুঃসাহসীও নই আমি। অবশ্য ভয় বুকে ভরে ভবঘুরে হওয়া যায় না।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে হয়ে পড়েছিলাম দিশেহারা। কি করব কোন দিকে যাব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এমন সময় দেখি আমার পাসে এসে দাঁড়িয়েছে আরও একজন। গহন অন্ধকারের জন্য ওনার মুখটা দেখতে পাইনি। তবে পরনে খাটো ধুতি আর সাদা ধবধবে পৈতেটা জানান দেয় যে উনি ব্রাহ্মণ। তার মুখটা না দেখতে পাওয়ার আরও একটা কারণ, একমুখ দাড়িগোঁফের জঙ্গল। উনি খুব মোলায়েম স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ”এই অসময়ে গাড়ি থেকে নেমে কোথায় যাওয়া হবে বাবু-মশায়ের?”
গলার আওয়াজ আর ওই অন্ধকার নিরালা নিরিবিলি জায়গায় কেমন যেন গা ছমছম শিহরণ জাগায় দেহমনে। তবু সাহসে ভর করে বলি, 
“যাব তো অনেক দুর। ভেবেছিলাম দুপুর নাগাদই এখানে থেকে পৌঁছে যাব পদ্মপুর। কিন্তু বিধি বাম গাড়িটা এমন বিগড়ে গেল যে দুপুরের গাড়ি এই রাতের আঁধারে নামিয়ে দিয়ে গেল তেপান্তরের মাঠে, বোঝা মুশকিল কোনদিকে গেলে কাছেপিঠের কোন গ্রামে যাবার রাস্তা পাব? কোন মানুষেরই দেখা নেই এখানে। আপনি কি এখানে থাকেন? তাহলে দয়া করে যদি একটা গাঁয়ে যাবার রাস্তা বাতলে দেন। সেখানে কারুর দোড়ে শুয়ে রাতটা কাটিয়ে কাল ভোরেই রওনা দেব পদ্মপুর।“
উনি শুধালেন, “তা সেখানে কাদের ঘরে যাবে? যতদূর জানি লোকজন তো খুব বেশি থাকে না সেখানে।“
আমি বলি, “না কারুর ঘরে নয়, শুনেছি সেখানে নাকি এক বিশাল দিঘিতে সারা বছর পদ্মফুল ফোটে তারই কোলে যে একটিমাত্র বসতি আছে সেই গ্রামের নাম পদ্মপুর।“
আমায় থামিয়ে প্রশ্ন করলেন, “তা সেখানে কার কাছে এমন কি দরকার পড়ল যে দুর্যোগকে সামনে দেখেও  সেখানেই যেতে হবে?”
আমায় একটু গুছিয়ে বলতে হল, “ব্যাপারটা আপনাকে খুলেই বলি, শুনেছি ওখানে নাকি একটা আদিকালের ভগ্নপ্রায় মহামায়ার মন্দির আছে। সেখানে বহুদিন আগে একজন সাধক বসে সাধনা করেছিলেন। তার সাধনায় খুব প্রীত হয়ে মহামায়া ওনাকে দর্শন ও দিয়েছিলেন। এই সত্যটা এখনও লোক পরম্পরায় শুধু শোনাই যায় না, মানুষজন সেটা বিশ্বাস করে তাই দূরদূরান্তের পুণ্য কামিরা মাঝে মধ্যে চলে আসে এখানে। তবে সেই সাধকের কেউই আর দেখা পায়নি তার মহামায়ার দর্শন পাবার পরদিন থেকে। আর এখনও বিশেষ বিশেষ অন্ধকার রাতে ওই মন্দির থেকে ভেসে আসে গুরু গম্ভীর কন্ঠে ওঁকার ধ্বনি। বাতাসে ভেসে আসে সুগন্ধী ধুপধুনোর গন্ধ। দূরদূরান্ত থেকে কান পাতলে শোনা যায় মৃদু মন্দ জপের মন্ত্র উচ্চারণের শব্দ। সেই সাধককে এখানকার লোকেরা পাগলা বাবা বলে ডাকতো। আজও সবাই সেই নামেই স্মরণ করে। শুনেছি খুব ভাগ্যবান হলে, তাঁর দর্শন না হলেও তাঁর সুমধুর স্বর শোনা যায়।“
এরপরই সামনে এসে পথ বন্ধ হয়ে যায়। পিছন থেকে আর কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে আমি তারে জিজ্ঞাসা করি, “এবার কোনদিকে যাব?”
এই সময় হঠাৎ কড়কড় করে মেঘ ডেকে বিদ্যুৎ চমকাল। তারই আলোতে দেখতে পাই অনেক দুরে ডানদিকের রাস্তায় কিছু মাটির ঘর দাঁড়িয়ে আছে, এই নিশুতি রাতের পথহারা পথিকের মত। এরই মধ্যে আবার শুরু হল বৃষ্টি। এবার খুব রাগ হল, এই বিজনে সেই অমঙ্গলে মানুষটা উপর। যাবার আগে রাস্তাটা একবার বলে দিয়ে গেলে কি ক্ষতিটা হত তার? জানিনা কতক্ষণ হেঁটেছিলাম এর মধ্যেই এসে পড়ি এক বাড়ির নাগালের মধ্যে। সব ঘর বন্ধ হয়ে থেকেও একটা ঘরের দাওয়ায় এক ধারে মনে হয় কেও একজন রান্নাপাতি চাপিয়েছেন কারণ বাইরে আগুনের আলোর নির্দেশন। পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই সেই দিকে। ততক্ষণে ভিজে গিয়েছে সারা শরীর। যিনি রান্না করছিলেন তার পরনের কাপড় দেখে সহজেই অনুমান করা যায় তিনি একজন মহিলা। আমি কোন ভণিতা না করে বলি, 
“মা, হেমন্তের এই অসময়ের বৃষ্টিতে কাক ভেজা ভিজেছি। তোমার দোয়ারে একটু বসার ঠাঁই হবে মা? আমার বড্ড শীত করছে।“
এরপরেই মহিলা মুখ ফিরিয়ে আমাকে অবাক বিস্ময়ে দেখে বলে, “ওইখানে দাড়িয়ে আছ কেন বাবা, উঠে এস দাওয়াতে। ভিজে যে একবারে ঢোল হয়ে গেছ, উঠে এস, উঠে এস।“

এরপরেই যখন ওই মহিলার সামনে এসে দাঁড়াই, আমি স্তব্ধ বিস্ময় দেখি মা বলে ভাববার মতনই ওই মহিলা। একহারা চেহারার প্রৌড় সদ্য স্নাত, স্নিগ্ধময়ী দৃষ্টি, টিকোলো নাকের দুপাশে ফালা ফালা দুচোখের, দৃষ্টিতে একটা মায়াবী টান, যেন নিজের মাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। ঈষৎ মাজা মাজা রং, পরনে কালাপাড় সাদা শাড়ি। আমি জবজবে ভিজে কাপড়ে মাটির দাওয়ায় উঠতে ইতস্তত করছি দেখে মহিলা বললেন, “এখন আর ভাবার কিছু নেই বাবা। দেরি করলে অসুখ বাধাবে একটা।“এরপর অবশ্য ধীরে সুস্থে আমার বোঁচকা থেকে শুকনো কাপড় বার করে পরে নিই আর দাওয়ার কোনে বেশ একটু শুকনো জায়গা দেখে আরাম করে বসি। জানিনা কতক্ষণ ওই ভাবে বসে থাকতে থাকতে ঘুমে ঢুলে পড়েছিলাম। এক সময় মহিলা ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। চোখ খুলে দেখি এক ঘটি জল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দাওয়ার ধারে সেই মহিলা। আমাকে জাগতে দেখে বললেন, “নাও, হাত মুখ ধুয়ে এসে ভাতের পাতে বসে পর দেখি।“ আমি অম্লান বদনে বলি, “ইষ্টিশানে নেমে ওখানকার দোকান থেকে পেট ভরে মুড়ি আর আলুর দম খেয়েছি মা। আমার তো এখন আর খিদে নেই।"
“মা বলে যখন ডাকলে বাছা তখন একটা কথা বলি শোন। সন্তানের শুখনো মুখ দেখলেই মায়ের অন্তরটা টনটন করে উঠে। একমাত্র মা ই বুঝতে পারে সন্তানের জঠর জ্বালা। নাও আর দেরী কর না, হাত ধুয়ে বসে পর দেখি।
“সে যেন আচমকা নাড়া দিয়ে মা ডাকার সার্থকতার জানান দেয়। 
আর কথা না বাড়িয়ে আমি একটা তালপাতার আসনে বসে দেখি কলাপাতায় উজাড় করে দেওয়া গরম ভাত আর সাথে দুটুকরো করে কাটা একটা বেশ বড় মাপের কাঁচকলা সেদ্দ মাত্র। আজ দুদিন পেটে ভাত পড়েনি। পথের ধারের দোকানের কেনা মুড়ি, দুখানা বাতাসা আর ঢকঢক করে খাওয়া জল এই দিয়েই  চলছিল। তাই খাবার সময় আর কোনদিকেই তাকাবার ফুরসত ছিল না। আমার ওই আগ্রাসী ক্ষুধা দেখেই মহিলা হাঁড়িতে তুলে রাখা কটা ভাত ও ঢেলে দিলেন আমার পাতে। খাওয়া শেষ করে ওঠার সময় আমার অত্যন্ত কুণ্ঠিত দেখে মহিলা বললেন, “বাবা, এর জন্য মনে কোন ক্ষোভ এনো না।"
নিজেকে অপরাধী ও মনে করবে না। জানবে পাগলা বাবাই তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন তোমার ক্ষুধা তৃষ্ণা দূর করার জন্য। যাও বাবা দোরে চাটাই পাতা আছে রাতটুকু নিশ্চিন্ত মনে আরাম করে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দাও। কাল সকালের কথা কাল ভাবা যাবে। তবে আমি খুব সকাল সকাল কাজে যাই আর ফিরতে অনেকটা রাত হয়ে যায়। তা বাবা তোমার কথা তো কিছু জানা হল না। তোমার আচার ব্যবহার দেখতে তো ভদ্দরঘরের ছেলে বলেই মনে হয়, তাহলে এমন বাউন্ডুলেপানা ব্যবহার কোন আক্কেলে? তবে যদি কোন বাধা থাকে তাহলে আমার শোনার কোন প্রয়োজন নেই।“
“না মা, বাধা নেই কিছুই। কিন্তু সব শুনে আমাকে যেন ভুল বুঝ না। ঘরে খাওয়া পরার কোন অভাব নেই কিছুই। বাবা মা ভাই বোন সবাই আছে ঘরে। 
লেখাপড়াও বেশ কিছুদূর পর্যন্ত হয়েছিল কিন্তু হঠাৎ একদিন অজানাকে জানার প্রবল আগ্রহে ঘর ছাড়লাম সকলের অজান্তে। তারপর থেকেই ভবঘুরে জীবনের আরম্ভ। মা, কেন জানিনা সব সময় মনে হয় এই তো নাগালের মধ্যে আছে সেই জন তবুও কেন তাকে দেখতে পাই না আর তাই হয়ত থেকে থেকে আসক্তিটা বাড়তে বাড়তে এখন নিদারুণ এক আবেগে পরিণত হয়েছে আর তাইত ছুটে বেড়াচ্ছি অন্ধের মত। জানিনা কবে সঠিক দিশা পাব। আর দেখা না পেলে অন্তত দেখার অনুভূতির পরিতৃপ্তি পাব।
“মহিলা কিছু কথা না বলে বেশ কিছুটা সময় নীরব থাকার পর উঠে দাঁড়িয়ে ঘরে ঢোকার আগে বললেন, “বাবা তোমার জন্ম সার্থক। সার্থক হয়েছে তোমার ভবঘুরে জীবন। সন্ধেরাতে যে তোমাকে ইষ্টিশান থেকে পদ্মপুকুরে যাবার হদিশ না দিয়ে বেশ কিছুটা পথ তোমায় সঙ্গ দেয় রাতের আশ্রয়স্থল পর্যন্ত, যার অদূরেই পদ্মপুকুর, সেই কত যুগ আগের পাগলা বাবা। শিশুর মত সরলতা, সাধকের মতন অহরহ চিন্তা আর ঐকান্তিক আতির্, তাঁকে বাধ্য করে আরাধ্যকের সান্নিধ্যে আসতে। আর কিছু বলার নেই বাবা। এবার ঘুমবার চেষ্টা কর।“ এরপর মহিলা চলে যান। ঘরের আগড় বন্ধ করার শব্দই জানিয়ে দেয় আর কোন কথা নয়।
মহিলার কথাশুনে মনটা তোলপাড় করে ওঠে। বহু দূর ওপার থেকে কেউ যেন নিঃশব্দে হাসছে মনে হয়। বহুক্ষণ এপাশ ওপাশ করার পর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বেশ দেরী করে উঠে দেখি আমার শেয়রে ঠোঙ্গা ভর্তি মুড়ি আর কয়েকটা বাতাসা। চোখেমুখে জল দিয়ে মুড়ির ঠোঙ্গাটা বোঁচকায় ভরে জায়গাটা ছাড়ার আগে কোথাও মহিলার দেখা পেলাম না। অগত্য দাওয়ায় একটা প্রণাম করি ওই মহিলার উদ্দেশ্যে, মনে হয় বাংলার ঘরে ঘরে এমন মা আছে বলেই এখন এদেশে এত স্নিগ্ধতা ও কমলতা বিরাজ করছে। হঠাৎ বহু দিন পরে কেন জানিনা নিজের অজান্তে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে চোখ থেকে।

Comments

Top

কবিতা

কনকজ্যোতি রায়

 

ফ্রেম

ন জুড়ে তারাহীন আকাশ
হৃদয়ে অলীক কল্পনার অনুরণন
চোখের পাতায় ভেসে যাওয়া টুকরো টুকরো মেঘ।

অনেকদিন বৃষ্টি হয় নি,
সিঞ্চনের আশায় পাতাগুলি হলুদ
শুষ্ক ধানের শিষে ফলে না মমতার ফসল,
ক্ষয়িষ্ণু শিকড় উৎপাটনের অপেক্ষায়,
ধূমকেতুর মতো হঠাৎ এসেই মিলিয়ে যায়
লাল নীল আর সবুজ স্বপ্নগুলো,
ভালবাসার মোড়কে নকল সোনা
বাজারদর তারই সবচেয়ে বেশী
অলিতে গলিতে হীরের টুকরোর ছড়াছড়ি।

প্রজাপতিটা আসেনি অনেকদিন
ওটা শুধুই রং ভুল করে
ধরতে পারলে  বাঁধিয়ে রাখতাম
সুদৃশ্য ফ্রেমে,
নিরাভরণ নয়, মালা দিয়ে।

 

প্রবহমান

                 

কদিন
      চরাচরের নিস্তব্ধতায় মুখোমুখি
      রুদ্ধগতি মহাকাল, বিপুলা বৈশাখী,
      বনানীর মর্মর, হৃদয়ে কলতান
      নীল স্বপ্ন চোখে, ভ্রমরের আহবান।

অতঃপর
      ঢাকা পড়ল নক্ষত্র, ভেঙে গেল বাঁধ
      আবিষ্কৃত হল বেঁচে থাকার আহ্লাদ,
      ছায়া যেন কায়া, জগৎ তখন মায়া
      বুকের মাঝে আগুন, দৃষ্টিতে আলেয়া,
      সত্ত্বার ইতি,  সংযমের বলিদান
      দুমড়ানো  পাঁপড়ি, তছনছ বাগান।

অবশেষে
      থেমে গেল তুফান, ঝরে পড়ল পাতা
      ঝর্না তখন নদী,  বালুচরে শূন্যতা,
      বসন্ত ইতিহাস,  গ্রীষ্মের হাতছানি
      অলক্ষ্যে বাজল প্রলয়ের পদধ্বনি

স্বপ্নবৃষ্টি

 

ঘাসের মত  হলে পদানত হয়েই থাকতে হবে,
তার চেয়ে কাঁটাঝোপ হওয়া ভাল
অন্তত প্রতিবাদের অক্ষমতার আফসোস থাকে না।

মাটীর মত হলে জড়বৎ হয়েই থাকতে হবে, 
তার চেয়ে নুড়িপাথর হওয়া ভাল
অন্তত পথিকের পায়ের সাথে কম্পিত হওয়া যায়।

ঢেউ এর মত হলে তীরে এসে ভেঙে পড়তেই হবে,
তার চেয়ে হিমশৈল হওয়া ভাল
অন্তত ক্ষণস্থায়ী  অস্তিত্বের দুঃখ থাকে না।

নক্ষত্রের মত হলে অবিরাম জ্বলতেই হবে,
তার চেয়ে চাঁদ হওয়া ভাল
অন্তত রাতের অন্ধকারে স্নিগ্ধ আলো বিতরণের গর্ব থাকে।

রাত্রির মত হলে সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই মিলিয়ে যেতে হবে,
তার চেয়ে  প্রত্যুষ হওয়া ভাল
অন্তত অল্প আলোর আভাসের মধ্যে উজ্জ্বলতার প্রকাশ থাকে।

মেঘের মত হলে পরনিয়ন্ত্রিত হয়েই উড়ে যেতে হবে,
তার চেয়ে আকাশ হওয়া ভাল
অন্তত অসীম পর্যন্ত বিস্তার লাভ করা যায়।

বাতাসের মত হলে স্বেচ্ছাহীন বয়ে যেতেই হবে,
তার চেয়ে দখিণাবায়ু হওয়া ভাল
অন্তত শুষ্ক হৃদয়ে আনা যায় শীতলতার স্পর্শ। 

Comments

Top

 

কবিতা

মৌ চক্রবর্তী

কলকাতা

কবিতা

তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য 

 

সুভাষিনী

দেখ দেশ ...

জোছনার ভারে নুয়ে গেছে নারকেল পাতা 

আরেকটু হাঁটলেই সূর্য পৌঁছে যাবে 

আরেকটু বাঁ আরেকটু ডানে তুলসির গায়ে 

জবার কেশরে গোলাপের বৃন্তে ফিকে গল্পের সরণি 

 

ধানের শীষে ধান মিশে দিনের মতন শিশির জুতো পায়ে

নন্দিনী ... একমুঠো মুড়ি হাতে বৃষ্টির আঁচল বেঁধে কোমরে

দেশ __  ছাতিমতলায় পাতার কোলে নদী জ্যোৎস্নার স্বরলিপি 

মন সুর মন আনচান দিনের কাছে ফড়িং জীবন 

           লিখবে মৃত্যু কাহানি ... 

কবি পরিচিতি: তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য, জন্ম কলকাতা উনিশশো ঊনআশি সালের ছয়ই জুন। পড়াশোনা কলকাতায়। বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয় এবং তারপরে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে স্নাতক। তারপর ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর এবং পেশায় প্রবেশ। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির অভ্যাস পারিবারিক উৎসাহে। পরিবারে হাতে লেখা পত্রিকার চল ছিল বহু বছর যাবৎ। ছোটবেলায় সন্দেশ পত্রিকায় রচনা প্রকাশ। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখালিখি। বহুজাতিক সংস্থায় বর্তমানে কর্মরত এবং নিজস্ব ব্যবসার সাথে যুক্ত এবং অধ্যাপনার কাজেও জড়িত। কর্মসূত্রে বহু মানুষের সাথে আলাপ ও পরিচয় যা বারবার রচনায় বিভিন্নভাবে ধরা পড়েছে। যদিও ভ্রমণপিপাসু কিন্তু সে পিপাসা সময়াভাবে চরিতার্থ হয় না। সাহিত্যানুরাগী এবং বাঙলা সাহিত্য সহ তার ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

মানসজননী

দিগন্ত সমুদ্রের সম্মুখে 
ওড়াচ্ছি একা আমি বিজয়কেতন,
               ঔদ্ধত্য নয়, নম্রতার সাথে।
আশে পাশে কেউ কোথা নেই, কোনো রব নেই
আমি আছি জেগে তাঁর তরে-
                           আমার মানসজননী।
বীরত্বের সাথে আমি করব আহ্বান 
রণসাজে সজ্জিত হব তাঁর আপন হস্তে 
     উন্মত্ত মলয়ে আসে ভেসে সেই 
                      মৃদু আকাশবাণী 
সমুদ্রের গর্জনে বাজে আমার রণবাদ্য।

রত্নাকরের রত্নে খচিত হোক সেই আশীর্বাদ 
আমি নতশিরে স্বীকার করব।
সমুদ্রের বক্ষের অন্তরালে যে অন্তরাত্মা
আন্দোলন করে আপন খেয়ালে,
    তপঃসাধনে তুষ্ট হয়ে পূর্ণ করে দিক
জোয়ার ভাঁটা আর জ্যোৎস্নার মণি মাণিক্য
                    এই ভিক্ষুকের রিক্ত বিবরে।
উৎসুক ধ্যানমগ্ন নয়ন তবু জেগে রয়
সন্ধানে সন্ধানে মাতে বিহ্বল সে চেতনা
        সে চেতনা আমার
মিশে রয় এই ব্যাপক মগ্নতার সাথে 
          আমার মানসজননী।
                                     

Comments

Top

প্রবন্ধ

স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে  

উত্তরপাড়া হিতকরী সভা

সুখময় ঘোষ

শ্রীরামপুর, হুগলী

স্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এদেশে শাসনভার গ্রহণ করলেও ভারতবর্ষে শিক্ষা বিস্তারে তাদের কোন সহানুভূতি ছিল না। বাণিজ্য বিস্তার করে মুনাফালাভ করাই ছিলে তাঁদের উদ্দেশ্য। পরে ইউরোপীয় মিশনারীরা এদেশে খ্রীস্টধর্ম প্রচারে এসে জনগণকেও শিক্ষিত করতে উদ্যোগী হয়। শ্রীরামপুরের মিশনারীরা এই বিষয়ে প্রধান পথপ্রদর্শক ছিলেন। তাঁদের হাত ধরেই এই বাংলায় শিক্ষা বিস্তারের সাথে সাথে স্ত্রীশিক্ষার প্রসারও শুরু হয়। শ্রীরামপুরের নামজাদা পাদ্রী জোশুয়া মার্শম্যানের স্ত্রী হানা মার্শম্যানের চেষ্টায় ১৮০০ খ্রীস্টাব্দে শ্রীরামপুরে বঙ্গদেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। এই প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তৎকালীন সরকার বাহাদুর নারীদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের কোন আগ্রহই দেখাইনি। সেইসময় ১৮৪৯ খ্রীস্টাব্দের ৭ মে ডিঙ্কওয়াটার বিটন কোলকাতায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তখন স্ত্রীশিক্ষা নিয়ে জোরদার আন্দোলন চালাচ্ছিলেন। তিনি মনে করতেন দেশের উন্নতির জন্য নারীদের শিক্ষিত করা একান্তই জরুরী। সৌভাগ্যক্রমে বিটন সাহেবের সাথে পরিচয়সূত্রে বিদ্যাসাগরের মহাশয় ঐ ‘বিটন নারী বিদ্যালয়ের’ সম্পাদকরূপে নিযুক্ত হন। তিনি বালিকা বিদ্যালয়ের গাড়ীর দুপাশে দেশের মানুষকে সচেতন করার  জন্য মনুসংহিতার এই শ্লোকটি খোদাই করে দিয়েছিলেন – ‘ কন্যাপ্যেবং পালনীয়া শিক্ষনীয়াতিযত্নতঃ’। যার অর্থ ‘পুত্রের ন্যায় কন্যাকেও যত্নের সহিত পালন করতে ও শিক্ষা দিতে হবে’। 
বিলেত ও ভারতবর্ষে যখন এদেশের নারী শিক্ষার স্বপক্ষে জনমত জোরদার হচ্ছে তখন ১৮৫৪ খ্রীস্টাব্দে  বিলেতের কর্তৃপক্ষ ভারতবর্ষে স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং সেখানকার পার্লামেন্টে এইদেশে বহুল সংখ্যায় বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনে প্রস্তাব গৃহীত হয়। কর্তৃপক্ষের এই দৃষ্টিভঙ্গির পর দক্ষিণবঙ্গের তৎকালীন বিদ্যালয় পরিদর্শক বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য বহু গ্রামবাসীদের কাছ থেকে আবেদনপত্র পেয়েছিলেন। গড়ে ওঠে বালিকা বিদ্যালয়গুলিকে সাহায্যের জন্য কয়েকটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, এদের মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ উত্তরপাড়া হিতকরী সভা’। বিদ্যাসাগরের এই স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৮৬৩ খ্রীস্টাব্দের ৫ এপ্রিল সমাজ সংস্কারক হরিহর চট্টোপাধ্যায় এই সভা প্রতিষ্ঠা করেন। বিজয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সভাপতি হন। উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় এবং রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ‍্যায় এই সভা প্রতিষ্ঠায় তাঁদের আন্তরিক সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন।  শিক্ষাবিস্তার বিশেষত: স্ত্রী শিক্ষার প্রচেষ্টায় তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ছিল। 
উনবিংশ শতাব্দীর নারীমুক্তি আন্দোলন সংঘটিত করতে ব্যাপকতর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উত্তরপাড়া হিতকরী সভা। স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার ছাড়াও সমাজ সংস্কারেও এই সভা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল। সভা  প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল &ndas