morning1.jpg
 

জুন ২০২২ সংখ্যা 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

 
touch.jpg

ব্যস্ততার মধ্যরাত

 

ব্যস্ততার মধ্যরাত 

গভীর নক্ষত্রস্বেদ শ্রমে 
স্ফুট শব্দে মহাকাব্য পড়ে পেচক 
যাযাবর ইচ্ছা উত্তরণের দোরগোড়ায় 
সমাপতনে ভোর আসবে বলে 
বুলবুলির ল্যাজ মধ্যরাতে 

জবরদখল থাকবে না শশব্যস্ত রহস্যে 

এই আশা সুনিশ্চিত। 

ধূমপান নিষেধ মধ্যরাতে

বিত্র জলোচ্ছ্বাস সারারাত 
(লিখিত মদ্যপান নয়) 

পবিত্র ধূম উদ্গীরণ সারারাত 
(লিখিত দূষণ নয়) 

বেছে নেয় সংবাদ নক্ষত্র পবিত্র উচ্চারণে 

পুনশ্চ উদ্ভাসিত হবে বলে 
যজ্ঞ মহাজাগতিক সারারাত 

সারারাত কোন রোগ নয় মনুষ্যবাহিত 

সারারাত ধূমপান নিষেধ 

ধূমপান নিষেধ মধ্যরাতে। 

অপ্রধান স্বাক্ষর, পাথরে সূচীকর্ম

 

মাঝামাঝি ফুলের মরশুম 
ধুমধাম লৌকিক পর্ব 
অলৌকিক সান্ত্বনায় পীতনদীতে দুর্বলতা 
ঢেউ উঠছে সড়কে 
সড়কে  অবলুপ্ত ডাকপিয়ন 
তবু কেউ কড়া নাড়ছে 
অসুখী স্থবিরতা? 
হয়তো হরিণ 
হয়তো 
সখেদে মুখ ফেরানো সুখী 
হয়তো  
অপ্রধান স্বাক্ষর 
পাথরে সূচীকর্ম 
ছিটকে পড়ে পাথরকুচির সম্মেলন 
ফিরে আসে নামঞ্জুর ধোয়া তুলসীপাতা 
জলসেচে হাত পুড়িয়ে বাড়ি ফিরে খোলা হাওয়া 
কিংবা 
‘আলাপ আলোচনায় বধিরতা বাড়ে’ শহুরে প্রবাদ । 

কবিতা

শান্তাপ্রসাদ রায়

কলকাতা 

 

Comments

Top

জুন ২০২২ সংখ্যা 

শেষ ঘুমের আগে 

মার একটা রোবট চাই 
সকাল বেলায় ঘুম ভাঙাবে,
অ্যালার্ম ক্লকে হবে না...

পায়ের শব্দ চাই রান্না ঘর, বিছানায়,
চুলে হাতের আঙ্গুল, অভ্যাস কথা বলার
সে হোক না একপেশে 
আমার চাই 

আমার একটা কথা বলা রোবট চাই
যে আমায় ঘুম পাড়াবে 
শেষ ঘুমের আগে। 

ধারাপাত 

কালে ঘুম থেকে উঠে দেখি
কাল যত ঘুড়ি ছিল আকাশে উধাও,

ব্যান্ডউইথ খাচ্ছে কচি কাঁচা 
স্কুল ড্রেস এ সার্কাস আর বাবা মা পরীক্ষা দিয়ে ক্লান্ত

সন্ধ্যে বেলায় ছাদে উঠে স্পষ্ট গোঙানি শুনি 
গলা টিপে ধরেছে ওদের, 
এখন আর সুর শোনা যায় না 
এখন আর কেউ নামতা পড়ে না। 

women.jpg
 

গল্প

Comments

Top

জুন ২০২২ সংখ্যা 

মধ্য রাতের অতিথি

চন্দন চ্যাটার্জি

banglow.jpg

টা  সবাই  মানবেন চেয়ে যে লেখালিখি করার জন্য একটু নিরিবিলি জায়গা প্রয়োজন,  সঙ্গে একটু  অবকাশ এবং একটু  আরামও জরুরী,  তাহলেই  মনের  ভিতরের  কথাগুলো কলমের  মাধ্যমে  কাগজে ফুটে উঠবে,  আর সেটা পড়ে পাঠককুল সমৃদ্ধি ও পরিতিপ্ত হবেন । 
গল্প পড়া, গান শোনা যে কোনো জায়গায় হতে পারে, যেমন অফিস যাবার সময় গাড়িতে বসে মোবাইল বা ট্যাবলেটে বা প্রিন্টেড বই হাতে  নিয়ে পড়া যায় বা কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনা যায়। কিন্তু এই গান, গল্প, কবিতা লিখতে গেলে অনেক ধৈর্য, অধ্যবসায়, জ্ঞান এবং সর্বোপরি চিন্তা করার শক্তি ও পরিবেশ অবশ্যই প্রয়োজন। সকালে বাস ঠেঙ্গিয়ে অফিসে গিয়ে, সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে, সন্ধ্যায়  বাড়ি ফিরে এসে, স্ত্রীর সঙ্গে বাক্য যুদ্ধ ও শান্তি স্থাপনের মধ্যে দিয়ে যখন একটু নিরিবিলি ঘরের কোন পাওয়া যায়, তখন ঘুম ছাড়া মাথার মধ্যে আর কিছুই আসে না। 
এইজন্যে সমীর মাঝেমধ্যে শহর ছেড়ে তার গ্রামের বাড়ি উত্তরবঙ্গ সেবক রোডে কাছে চালসা গ্রামে চলে যায়। সমীর দেবনাথ বর্ধমান হাই স্কুলের ইকোনমিক্স এর টিচার, থাকে স্কুলের কাছে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে, গরমের ও পুজোর ছুটিতে দেশের বাড়ি যায়। যদিও সে ইকোনোমিক্সের টিচার তাহলেও সাহিত্যের প্রতি তার বেশ আকর্ষণ আছে। ছোটগল্প, প্রবন্ধ এইসব লেখালেখি করে তার লেখা দু-একটা গল্প স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি হেমেন্দ্রকুমার রায়ের কিছু ভৌতিক গল্প পড়ে তার একটা ভূতের গল্প লেখার ইচ্ছা হয়। কোন বিষয়ে কিছু লিখতে হলে তার সম্বন্ধে একটু জ্ঞান থাকা প্রয়োজন, যেমন যদি কোন ব্যক্তি বিজ্ঞান বিষয়ক গল্প লিখতে চান তবে তাঁকে বিজ্ঞান সম্বন্ধে বিশদে জানতে হবে। যেমন তিনি যদি লেখেন জলের কেমিক্যাল কম্পাউন্ড এইচ টু এস ও ফোর (H2so4) তাহলে এসিডে জল নয়, জলে এসিড ঢালা হয়ে যাবে। 
তাহলে পাঠকদের মনে হতে পারে ভৌতিক গল্প লিখার জন্য কি ভূতের সাক্ষাৎ পাওয়া দরকার, তা যদি করতে হয় তাহলে তো মুশকিল। কারণ ভূতের কোথায়, কবে, কখন, দর্শন হবে তা তো  তার জানা নেই, এমন কি তার পরিচিত কেউ জানে বলে মনে হয় না। আর অন্য লোককে যে জিজ্ঞেস করবে তাহলে তাকে পাগল বলে ভাববে। অতএব কল্পনার আশ্রয় তাকে নিতে হবে। এবার দুর্গাপূজার ছুটির সময় বাড়ি গিয়ে সে দু-তিনটে ভূতের গল্প লিখবে স্থির করলো। মহাষষ্ঠীর দিন স্কুল করে রাত্তিরে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ট্রেন ধরে পরের দিন সকালে বাড়ি পৌঁছায়। তার বাড়ি হল চালসা গ্রামে। এই গ্রামটা পরে মাল জংশন ও সেবক রোডের  মধ্যে। ছবির মতো সুন্দর গ্রাম, একদিকে চা বাগান দূরদূরান্ত পর্যন্ত দেখা যায় সবুজ গাছ সার দিয়ে রয়েছে, অন্যদিকে তিস্তা নদী। 
তিস্তা নদীর ওপারে জঙ্গল, ওয়াইল্ডলাইফ ফরেস্ট। এখানে অনেক কোম্পানির চা বাগান আছে, তার মধ্যে চালসা টি গার্ডেন বেশ বড়। এই চা বাগানের ধারে একটা মডার্ন কলোনি আছে ওখানে তার বাড়ি। বাবা, মা মারা গেছেন, এখন আছে শুধু দূর সম্পর্কের কাকা বাড়িতে থাকে ও দেখাশোনা করে। সমীরের এখনো বিয়ে হয়নি, তার স্কুলের ইতিহাস শিক্ষিকাকে বেশ পছন্দ কিন্তু মুখ ফুটে সে কথা বলতে পারে নি আজ পর্যন্ত। এহেন ব্যক্তি কিভাবে ভৌতিক গল্প লিখবেন তা কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়। 
যাই হোক তাকে দেখেই তার কাকা বেশ খুশি, সমীরকে বলল “যা বাবু একটু বিশ্রাম করে চান করে নে আমি তোর জন্য ভালো তিস্তার তেলাপিয়া মাছ নিয়ে এসেছি বাজার থেকে, রান্না করবো“। ট্রেনে সমীরের ভালো ঘুম হয় না তাই তেলাপিয়ার ঝাল দিয়ে গরম গরম ভাত খেয়ে সমীর একটা লম্বা দিবানিদ্রা দিল। ঘুম থেকে যখন উঠল তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেছে । তাদের পাড়ায় কোন দুর্গাপূজা হয় না, কিন্তু মাল বাজারে বড় পূজা হয় সেটা কালকে দেখতে যাবে ঠিক করল। পুজো আসলেই প্রকৃতিতে একটা আলাদা আমেজ আসে, সেটা সে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে। বর্ষা গড়িয়ে শরৎ আসে, তাই চারদিকে সবুজের সমারোহ, বনজঙ্গল এখন একটু বেশি ঘন ও সবুজ দেখায়, তিস্তা নদীতে এখন বেশ জল,  সন্ধ্যের সময় একটা ফুলের গন্ধ বাতাসে ভাসে, অনেকটা এলাচের মত, সমীর এটার নাম দিয়েছে এলাচ ফুল এটা দুর্গাপুজোর সময় ফোটে। দূর থেকে ভেসে আসছে মাইকের গান, সবমিলিয়ে সত্যিই একটা উৎসবের আমেজ। সমীরের বাড়িটা কলোনির একদম শেষ প্রান্তে, এর পরেই চা বাগান শুরু, দোতলা বাড়ি, ওপর-নিচে দুটো করে ঘর। ওপরের ঘরে একটাতে সমীর থাকে খালি, অন্যটা খালি। নীচের ঘরে একটা রান্না ও খাওয়া-দাওয়া হয় অন্যটাতে কাকা থাকে। 
দুইদিন বেশ কাটলো ঠাকুর দেখা, খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি এতেই চলে গেল, ভৌতিক গল্প লেখার কথা সে প্রায় ভুলেই বসেছে। আজ দশমী, মায়ের বিসর্জনের দিন। সকাল থেকেই আকাশটা কি রকম মুখ ভার করে আছে, বোধহয় মা চলে যাবে তাই ওর মন ভালো নেই। সন্ধ্যে হতে না হতেই কালো মেঘে চতুর্দিক ছেয়ে গেল এবং অল্প কিছুক্ষণ পরেই তুমুল বৃষ্টি ও তার সঙ্গে বজ্রপাত শুরু হলো। মনে হচ্ছে যেন মহাপ্রলয় আজকেই শুরু হবে। পাঁজিতে লেখা ছিল দেবী দুর্গার আগমন হাতিতে, গমন নৌকায়। কিন্তু মায়ের নৌকা চালাতে কতজন লাগবে তা বোঝা যাচ্ছে না। এই দুর্যোগে বাইরে কোথাও যাবার তো প্রশ্নই নেই, যদি কেউ ভুলে বাইরে গিয়ে থেকে থাকে তবে সেও ঘরের অভিমুখে তাড়াতাড়ি যাচ্ছে। একের দুর্যোগের রাত, তারপর ঘরে কোন কাজ নেই, তাই রাত ন'টার মধ্যে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল । এত সকাল-সকাল তার অভ্যাস নেই, তাই সে উসখুস করতে লাগলো, তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে তার খেয়াল নেই। রাত তখন কটা হবে কে জানে এমন সময় বাইরের দরজায় একটা আওয়াজ। সমীর ভাবল, কাকা এসেছে তাই জিজ্ঞাসা করল, “কে?“
বাইরে থেকে আওয়াজ আসলো, “মহাশয় আমি বিকাশ, দরজাটা একটু খুলবেন, খুব বিপদে পড়েছি তাই আশ্রয়  চাইছি। চোর ডাকাত নই সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে পারেন।”
আওয়াজ শুনে সমীর তাড়াতাড়ি নিচে দরজা খুলে দেখল এক বয়স্ক ব্যক্তি মাথায় ছাতা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কিন্তু বৃষ্টি তোরে তিনি পুরো ভিজে গেছে। বৃষ্টি তখনও পরছে তাই সমীর বলল, “ তাড়াতাড়ি ভেতরে আসুন।“
ভদ্রলোক বাড়ির ভিতরে আসলে সমীর গেট বন্ধ করে তাকে উপরে নিয়ে আসলো। ভদ্রলোক একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “মাফ করবেন, এত রাত্রে আপনাকে বিব্রত করার জন্য আমি সত্যিই খুব লজ্জিত, আসলে আমি যাচ্ছিলাম শিলিগুড়ি থেকে আলিপুরদুয়ার লোকাল ট্রেনে করে। চালসা স্টেশনে এসে বলল ট্রেন আর যাবে না, তিস্তা নদীর উপর রেললাইনে ফাটল দেখা দিয়েছে মেরামত করে তারপর যাবে। এখন ছুটির সময় তারপর এই দুর্যোগের রাত তাই কামরায় খুব কমই লোক ছিল,  যারা ছিল তারাও আস্তে আস্তে সব নেবে চলে গেল। আমার বাড়ি আলিপুরদুয়ার কাছে, এখানে কোন আত্মীয়-পরিজন নেই, তাই আর কার কাছে যাবো আমিও ট্রেন থেকে নেবে হাঁটতে লাগলাম। এই চা বাগান ধরে হাঁটতে হাঁটতে আপনার বাড়িটা প্রথমে পরায় আমি আশ্রয় চাইলাম।“

সমীর বলল, ”ঠিক আছে কোনো অসুবিধে নেই আমার পাশের ঘর খালি আছে আপনি শুতে পারবেন। আপনার খাওয়া দাওয়া হয়েছে?” ভদ্রলোক বলল, “ব্যস্ত হবেন না আমি ট্রেনে খেয়েছি তাছাড়া আমার কাছে ফ্লাক্সে চা ও বিস্কুট আছে, আমার কোনো অসুবিধে হবে না“। সমীর বলল, “ঠিক আছে আপনি বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে নিন, আমি আমার একটা পাঞ্জাবী ও লুঙ্গি দিচ্ছি পরবেন”। ভদ্রলোক ফ্রেশ হয়ে এসে পাঞ্জাবি লুঙ্গি পরে বিছানায় বসলো। সমীর জিজ্ঞাসা করল, “আপনার নাম কি জানতে পারি“। ভদ্রলোক, “নিশ্চয়ই, আমার নাম বিকাশ রায়, আলিপুরদুয়ারে বাড়ি, ওখানে একটা দোকান আছে, শিলিগুড়ি পাইকারি বাজার থেকে মাল কিনে নিয়ে যে ওখানে বিক্রি করি“। কথা বলতে বলতেই ভদ্রলোক চায়ের ফ্লাক্সটি ব্যাগ থেকে বার করে সমীরকে এক কাপ চা অফার করলেন। তারপর দুইজনে দুকাপ চা নিয়ে বসল, মাঝেমধ্যে এ  ওকে কিছু  প্রশ্ন করে  আবার ও একে কিছু প্রশ্ন করে, এইভাবে পাঁচ মিনিট যাওয়ার পর, কথায় কথায় সমীর ভৌতিক গল্প লেখা প্রসঙ্গ তুলল। বিকাশবাবু বললেন, ”সেটা তো ভালো কথা”। সমীর, ”ভালো তো বটে কিন্তু ভৌতিক গল্প কিভাবে শুরু করব সেটাই বুঝতে পারছি না”। বিকাশবাবু বললেন, “আপনার হাতে যদি খানিকটা সময় থাকে তাহলে আমার সত্যিকারের ভূত দেখার অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। সমীর চিয়ারে আরেকটু নড়েচড়ে বসলো, বাইরে তখনোও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পরছে, জানলার ওপরের পাল্লাটা খোলা আছে, তাই একটা ঠান্ডা হওয়ার ঘরে আসছে, বাইরে একটা ঝিঁঝিঁ পোকা এবং কোলা ব্যাঙের ঐক্যতান শোনা যাচ্ছে, এটাই হল ভূতের গল্প শোনার আসল পরিবেশ। সমীর মোবাইলেতে দেখল রাত্রি একটা কুড়ি মিনিট অর্থাৎ দশমী শেষ, একাদশী শুরু। বিকাশবাবু শুরু করলেন, ”আমার বাবা মারা যান খুব ছোটবেলায় কাজেই সংসারের হাল আমাকে ছোটবেলা থেকেই ধরতে হয়। মায়ের কাছে শুনেছিলাম আমাদের  আদি বাড়ি ছিল  হাসিমারায়, কি একটা কারণে বাবা ওখানকার সমস্ত পাঠ চুকিয়ে আলিপুরদুয়ার চলে যান। ওখানে একটা দোকান করেন, নিচে দোকান উপরে আমাদের থাকার ঘর ছিল। সব ঠিকই চলছিল, তারপর হঠাৎ বাবার মৃত্যু হওয়ায় আমি দোকানের দায়িত্ব নিলাম। ধীরে ধীরে আমার বয়স ও বুদ্ধি দুটোই বারতে লাগলো। তারপর আমি ঠিক করলাম এখানকার পাইকারি বাজার থেকে কিনে খুচরো বিক্রি করলে লাভ খুবই কম হয়, কিন্তু এই মালটাই যদি শিলিগুড়ি পাইকারি বাজার থেকে কেনা যায় তাহলে কিন্তু লাভ অনেক বেশি হবে, কারণ শিলিগুড়ি পাইকারি বাজারে দাম এখানকার পাইকারি বাজারের দামের থেকে অনেক কম। তাই প্রতি মাসে একদিন করে শিলিগুড়ি বাজার থেকে

মাল কিনে নিয়ে যেতাম এবং আমার দোকানে বিক্রি করতাম। আস্তে আস্তে এইভাবে ব্যবসাটাকে সাজাতে লাগলাম যেদিন আমি শিলিগুড়ি আসতাম সেদিন আমার মা অথবা স্ত্রী দোকানে বসত।  সকালের গাড়িতে শিলিগুড়ি আসতাম আর মাল কিনে রাত্তিরে ফিরে যেতাম।  যখন ব্যবসা আরো একটু বড় হল তখন আমি মাল ট্রান্সপোর্ট এর কাছে দিয়ে দিতাম,  ওরা আলিপুরদুয়ারে আমাকে ডেলিভারি দিয়ে দিত।এইরকম একদিন শিলিগুড়ি থেকে সওদা করে শেষ ট্রেনে বাড়ি যাচ্ছি, ট্রেনটি যখন আলিপুরদুয়ারে পৌঁছল তখন বাজে রাত্রি সাড়ে বারোটা। আপনি এদিককার লোক কাজেই জানবেন এদিকে সিঙ্গেল লাইন, একটা ট্রেন যদি উল্টোদিক থেকে এসে যায় তাহলে তাকে সাইড দেবার জন্য অন্য ট্রেনকে স্টেশনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এইভাবে যেতে যেতেই আমার রাত্রি গভীর হয়ে যেত। এত রাত্তিরে রিক্সা থাকে না তাই আমি পায়ে হেঁটে যেতে লাগলাম। আমাদের বাড়ি স্টেশন থেকে নেবে প্রায় ১০-১২ মিনিটের হাঁটা পথ। গ্রামের মেঠো রাস্তা তারপর রাস্তায় আলো নেই। স্টেশন ছাড়িয়ে খানিকটা গেছি, এমন সময় মনে হলো কেউ আমার পিছু পিছু আসছে, এত রাত্তিরে কেউ কোথাও নেই তাই মনে একটু ভয় করতে লাগলো। মনে হল একটা ঘুঙরুর আওয়াজ আসছে। যেন সেটা আমার সঙ্গে সমান তালে পা ফেলে ফেলে যাচ্ছে। একবার আমি ইচ্ছে করে থেমে গেলাম দেখলাম আওয়াজটাও থেমে গেল। এবার আমার সত্যি ভয় হতে লাগল। খানিকবাদে দেখলাম চারদিকে একটা পচা গন্ধ ছাড়ছে মনে হল যেন মাংস পচে চারদিকে ছড়ানো রয়েছে। আমি যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম তার হাত দশ বারো দূরে একটা শিমুল গাছ ছিল, ঠিক তার নীচে দপ করে একটা নীল রঙের আলো জ্বলে উঠেই নিভে গেল। তারপর একটা আপাদ-মস্তক সাদা কাপড় মুড়ি দেওয়া ছায়ামূর্তি লক্ষ্য করলাম। মূর্তিটা ছোট থেকে আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো, লম্বা হয়ে উপর দিকে উঠতে লাগল। সাদা কাপড়ের মধ্যে যেন দুটো জ্বলন্ত চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তারপর তার দুটো হাত আমার দিকে প্রসারিত করতে লাগলো । অন্ধকার হলেও একটু বুঝতে পারলাম যে এটা হাত নয় কঙ্কাল, এমতাবস্থায় রাম নাম নেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় আমার মাথায় এলো না। আমি পিছনের দিকে যে ফিরে আসব তার উপায় নেই কারণ সামনের দিক দিয়েই আমাকে বাড়ি যেতে হবে।
আমার হাতে সবসময় একটা ছাতা থাকতো, সেইটাই খুলে আমি ঢাল হিসাবে ব্যবহার করব ঠিক করছিলাম এমন সময় একটা স্ত্রী কণ্ঠ ভেসে আসল বিকু ভয় নেই আমি তোর কোন ক্ষতি করব না অপঘাতে মরেছি, গয়ায় পিণ্ডি  দিয়ে আসবি আমার নামে, না হলে এ জ্বালা আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার পাঁচ-পাঁচটা ছেলে কেউ আমায় ভাত দেয় না। 
এতক্ষণে আমার সম্বিৎ ফিরে এল। আমাকে বিকু বলে ডাকত দেবুর মা। দেবু মানে দেবশংকর পন্ডিত, তারা পাঁচ  ভাই রমাশংকর, উমাশঙ্কর, রবিশঙ্কর, উদয়শংকর। দেবু আমার সমবয়স্ক তার ভাইয়েরা সবাই বড় এবং প্রতিষ্ঠিত। আমাদের এলাকায় পন্ডিত পরিবারের খুব নাম, সবাই জানে, চেনে আমি অনেকবার তার বাড়িতে গেছি, তার মাকে আমি বড়মা বলে ডাকতাম। বড়মা আমাকে মাঝেমধ্যেই আচার, সিঙরা, নিমকি মোরব্বা ইত্যাদি দিতেন। স্কুলে পড়ার অনেকবার টিফিন করার জন্য আমাকে টাকা ও দিতেন। তিনি অসুস্থ ছিলেন সেটা শুনেছিলাম, কিন্তু অপঘাতে মারা গেছেন সেটা জানি না। জিজ্ঞাসা করলাম, “কবে মারা গেছ”?
উত্তর এলো  কবে কি রে হতভাগা,  এখনো আমার শরীরটা এই গাছের উপরে ঝুলছে। তুই এক কাজ কর, আমাদের বাড়িতে যা ওখানে গিয়ে সব কথা বল, তারপর ওরা যেন আমার শরীরটাকে নিচে নাবায়। 
এই কথা বলার পর সাদা কাপড় জড়ানো ছায়ামূর্তি গায়েব হয়ে গেল।  আমি উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটা সাদা কাপড় জড়ানো কিছু তো ঝুলছে, কিন্তু কে বা কি তা পরিষ্কার হলো না।  আমার ভয় পাচ্ছিল তাই আর নিজে রিস্ক নিলাম না। তাড়াতাড়ি পন্ডিতবাড়ির দিকে ছুটলাম। প্রথমে দেবুর কাছে গিয়ে সব কথা বললাম। সে বলল, ” আজ থেকে একমাস মা আমার বাড়ি থেকে উমাদা বাড়িতে গিয়ে থাকবে বলেছিল”। 
আমি বললাম “চল তবে উমাদার  বাড়িতে যাই”।
উমাদা চোখ রগড়াতে রগড়াতে দরজা খুলে বলল “এত রাতে কি ব্যাপার”।
দেবু তাকে সব কথা খুলে বলল। তারপর একে একে পাঁচ ভাই এবং পাড়ার আরো কয়েকজন মিলে আলো, লাঠি, শাবল, দড়ি ইত্যাদি নিয়ে সেই শিমুল গাছের নিচে আসলো । সেই সাদা মূর্তির মুখের উপর আলো পড়তেই আমি চমকে উঠলাম। গাছের একটা ডালে দড়ি বাধা আর বড়মা গলায় দড়ির আর অপর প্রান্তটা বাধা, তার দুই হাতের মুঠো খোলা এবং সোজা, চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে গেছে,  জিবটা মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রায় বুক পর্যন্ত এবং তার থেকে রক্তের ফোঁটা ঝরছে। এই রকম বীভৎস দৃশ্য আমি আগে কক্ষনো দেখিনি। আমরা বড়মার শেষ পরিণতি যে এত ভয়ঙ্কর হবে এটা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। দু তিনজন মিলে আস্তে আস্তে বডিটাকে নিচে নাবাল। 
তারপর পুলিশে খবর দিল, পুলিশ এসে বডিটা নিয়ে গেল পোস্টমর্টেম করার জন্য। 
এর একদিন পরে পাঁচ ছেলে মিলে মাকে দাহ করল। জীবিত অবস্থায় যাকে দু মুঠো ভাতের জন্য ছেলেদের দ্বারে যেতে হত, মৃত্যুর পর অবশ্য পাঁচ ছেলে মিলে মায়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান বেশ বড় করেছিল। 
এই পর্যন্ত বলে বিকাশবাবু থামলেন। সমীর বলল, ”তাহলে এই ঘটনাটাকে লেখা যেতে পারে ? আপনি কি বলেন, হ্যাঁ আরেকটা কথা, আপনি আপনার বড়মার গয়ায় পিন্ডি দিয়েছিলেন”। ভদ্রলোক বললেন, “হ্যাঁ, এই ঘটনার মাসখানেকের মধ্যেই আমি গয়ায়  গিয়ে উনার পারলৌকিক কর্ম সেরে আসি” ।
ঠিক আছে আপনি শুয়ে পড়ো কালকে আবার কথা হবে রাত অনেক হলো এই কথা বলে সমীর নিজের ঘরে চলে গেল। খাটে শুয়ে ভাবতে লাগল গল্পটা সত্যি কিনা জানিনা কিন্তু ভদ্রলোক বলেছেন বেশ গুছিয়ে এইটাকে যদি আরেকটু রং দিয়ে লেখা যায় তবে একটা সুন্দর ভৌতিক গল্প হতে পারে। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল ঠিক নেই। তখন সকাল ন'টা বাজে, কাকা ডাকছে, “সমীর বেলা হল চা খাবি তো“।
সমীর ধড়মড় করে উঠে বসল একটু পরেই তার মনে হলো পাশের ঘরে বিকাশবাবু আছেন ।  সে কাকাকে বলল, “কাকা তিন কাপ চা কর”। 
কাকা, ”কেন তুই দু কাপ চা খাবি নাকি?“
সমীর ”আরে  আমি নয় পাশের ঘরে এক ভদ্রলোক আছেন তার জন্য"।
“ভদ্রলোক, কোথা থেকে এল” কাকা একটু বিস্ময়ের সুরে জিজ্ঞাসা করল। 
সমীর একটু বিরক্ত হয়ে “কাল রাতিরে এসেছেন সে অনেক কথা আমি তোমাকে পরে বলব ”।  
কাকা বলল, ”পাশের ঘরে তো কেউ নেই তাহলে নিশ্চয়ই চোর এসেছিল, কিছু চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে, বোধহয়”। 
কাকার কথা শুনে সমীর কিছুটা আশ্চর্য হল, তারপর দুজনে মিলে সারাবাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে নিশ্চিন্ত হল যে কোন জিনিস চুরি যায়নি সব জিনিসই নিজ নিজ স্থানে বিদ্যমান। এমনকি সেই ভদ্রলোককে পরার  জন্য যে লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি দিয়েছিল সেটা সমীর নিজেই পরে আছে। 
সমীর জিজ্ঞাসা করল, ”কাকা তুমি যখন বাইরের দরজা খুলে ছিলে তখন তা ঠিকভাবে বন্ধ ছিল”। 
কাকা বলল, ”হ্যাঁ সদর দরজা তো আমি তালা দিয়েছি রাত্রি এবং সকালে আমি খুলেছি। চাবি তো আমার ঘরে থাকে”।
সমীর ভাবল তাহলে সে স্বপ্ন দেখেছে বোধহয়। তাই এটাকে আস্তে আস্তে মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করতে লাগলো।  
ঘন্টাখানেক পরে বাজারের থলি হাতে নিয়ে, সমীর কাকাকে বলল, ”কাকা আমি একটু বাজার থেকে ঘুরে আসি। স্টেশন রোডের বাজারে যাবো দেখি ওখানে তিস্তার মাছ পাওয়া যায় কিনা”। 
স্টেশন রোডের  বাজারটা লাইনের ওপারে। তাইলে তাকে রেল লাইন পার করে যেতে হবে। লাইনের ধারে এসে সমীর দেখল এক জায়গায় কয়েকজন লোক জমায়েত হয়েছে। কাছে গিয়ে দেখল সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা আছে একটা বডি। একজনকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলল কালকে এক ব্যক্তি লাইন পার হওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা এক্সপ্রেস গাড়ি এসে তাকে কেটে দেয়। এক ব্যক্তির মৃতদেহের মুখের ওপরের সাদা চাদরটা সরালো। মৃত ব্যক্তি চেহারা দেখে সমীরের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার উপক্রম, তার মাথা ঘুরে গেল, বাজারের ব্যাগ হাত থেকে পরে গেল আরে এ তো বিকাশবাবু। এক রেলের অফিসার দাঁড়িয়ে ছিল, সে সমীরের অবস্থা দেখে জিজ্ঞাসা করল আপনি একে চেনেন। সমীর কালকের রাত্রের সব ঘটনা বলল।  এই ব্যক্তির পকেটে একটা শিলিগুড়ি টু আলিপুরদুয়ারের  টিকিট পাওয়া যায়। অফিসার আলিপুরদুয়ার জংশনে যোগাযোগ করল  এবং এখান  থেকে বডি পাঠাবার ব্যবস্থা করল।
ঘরে এসে সমীর কাকাকে সব কথা খুলে বলল।  কাকা বলল, ”তুই ক’দিন থেকে যে ভূতের গল্প লিখতে চাইছিলি তাই স্বয়ং ভুতই তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে গেছে”।
বলাবাহুল্য এর পর সমীরের আর ভূতের গল্প লেখা হয়নি। 

কবিতা

      সুকান্ত পাল

জিতপুর, মুর্শিদাবাদ

 

কবিতা

      শ্রীকান্ত দাস

 

Comments

Top

জুন ২০২২ সংখ্যা 

অন্য এক পথ 
 

ক অজানা স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছি আমি। 
এ বোধহয় অন্য এক পথ। 
তবু মনে হচ্ছে এ পথে হেঁটেছি আমি। 
ওই দুই পাহাড় এর ধারে, 
প্রকৃতির গন্ধ আমার চেনা। 
এই বৃষ্টি আর উষ্ণতা আমার 
শরীর ছুঁয়েছে বহুবার। 
এই লাবণ্য চাওয়া পাওয়াকে বিদীর্ণ করেছিলও সেদিন। 
হাড়হীম দেহে আগুন জ্বলেছিল
এমন এক পথের আঁকে বাঁকেই। 
নিস্তব্ধতায়  শুনেছিলাম ...
চেনা নিঃশ্বাস এর শব্দ। 
আর মাটির সে গন্ধে সেদিনও 
জুড়িয়েছিলাম প্রাণ। 
ফিরতে পারবনা জানি সেই পথে, অভিমানের বনে হারিয়েছে সে পথ। 
তাই অজানা স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছি আমি। 
এ বোধহয় অন্য এক পথ।

রাঙা বৌ

বাজায় ডুগডুগিটা ঢোলক বাজায়

আ গান ধরেছে ই-তে তাইরে নাইরে না। 

ঈ আর উ ঊ ঘুঙুর বেঁধে পায়ে

কেমন মজার নৃত্য করে ঘুরে ডানে বাঁয়ে। 

সুর ধরেছে ঋ ৯ সা রে গা মা পা

সারছে গলা এ ঐ আআ আআ আ। 

তালে তালে হাতে তালি দেয় ও ঔ

চেয়ে দেখো পালকিতে ওই আসছে রাঙা বৌ।

girl.jpg

Comments

Top

জুন ২০২২ সংখ্যা 

 

কবিতা

সুব্রত মিত্র

মধ্য রাতের শেষে
                                  

রা সবাই চলে গেছে পড়ে আছি আমি একা
হবে কি? হবে কি আর বনলতা তোর সাথে দেখা?
চোরাবালির স্রোতের মতো-------
স্মৃতির কথা গুলো ভেঙে ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে যেন
তবু তোকে স্বপ্নে দেখি বলতো কেন?

চোখের কোণে জন্ম নেওয়া কালশিটে আবরণ
দিচ্ছে জানান বার্ধক্যের বাতাবরণ
যৌথ সমন্বয়ের বিগ্রহ চিত্ত ভেঙে গেছে কবে কোথায়
অদল বদল হয় ঋতুদের হাওয়া চক্র
এই জড়তার ভিড়ে তবু ভালোবাসা প্রাণ পায়,

শুভ প্রনয়ের ঝঞ্ঝা বিচলিত করে আজ তবু
যায় ডুবে ভাবনার সাগরে
ভিড়ের মাঝে যায় না মুছে বনলতা কভু,

একে একে চলে গেছে সবাই;

বয়ে গেছে জীবনের ঢের সময়

আগন্তুক পথের পথিক জেগে আছে মধ্যরাতের শূন্য গগনে

নিস্তব্ধ রাতের কোন আঁধারের আকাশে ভাসমান চাঁদ অতীন্দ্রিয় প্রহরায়,সজাগ ভোরের মিশ্রিত কোলাহলে মোহনায় ডুবে শেষ ফেরি ডাকছে আমায়।

আকুল প্রার্থনায় স্মৃতিতে মোড়া নীল খাম শোনায় তাহার নাম      

এই ভোর ভোর নয়;

এ যে স্বপ্নের ঘোর, 

নামের পাশেই আছে লেখা দেখো সেই চির বদনাম।          যাক চলে সবাই রব পড়ে আমি,             

জানি বনলতা গেছো চলে তুমিও;             

তবু তুমি কাছে মোর খুব যে দামী।

girl.jpg

Comments

জুন ২০২২ সংখ্যা 

কবিতা

দুর্গেশ রঞ্জন দে

কৃষ্ণনগর,  দঃ ২৪ পরগনা

 

জ্বলন্ত অঙ্গার

রাজ্য ক্ষুধার
তাইতো হেথাকার মানুষজন
কুৎসিত কদাকার।
অস্থিচর্মসার।
জীবনের প্রতিটি কানায় কানায় পূর্ণ
অর্ধাহার অনাহার
জীবন তাহাদের ভার।
অবশিষ্ট থাকে শুধু হাহাকার।
যোগ বিয়োগ পূরণ- ভাগ সকল
ভাজ্য ভাজক ভাগফল,
ভাগ্য রাশি ফল,
বিড়ম্বিত হয় নিষ্ফল।
তাদের ওরসে নবজাতকের জন্মলাভ,
সঙ্গে নিয়া আসে, আজন্ম পাপ-তাপ।
তাদের অক্লান্ত শ্রম দান,
গড়িয়া উঠে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান।
তাহারা একান্তই নগণ্য,
তাদের  জন্য,
বিত্ত বানরা দেশে-বিদেশে,
প্রচুর বৈভবে হইতেছে ধন্য।
এখানে হা-হুতাশ,দীর্ঘশ্বাস,
নাই আনন্দ -উল্লাস,
নিত্য ক্ষুণ্ণই বইতটির ত্রাস,
জীবনকে করিয়াছে গ্রাস।
এখানে জঠরের যাতনা,
অবারিত নিত্য আনা-গুনা,
আনন্দ উল্লাস উদ্দীপনা,
আসিতে রহিয়াছে মানা।
এখানে হাজার কষ্ট বেদনা,
তাইত আনন্দ আসিতে পারে না।
এখানে হরেক রকম,
অপুষ্টির বিচিত্র বাহার,
চুপসানো জীর্ণ-শীর্ণ চেহারা সবার।
তাদের  মনের কোন আগ্রহ,
শুনিতে বুঝিতে ও দেখিতে,
চাহে না কেহ?
কেননা তাড়াত গড্ডালিকা প্রবাহ।

তাদের জীবনে নাই ছন্দ -তাল,

তারা ছিন্ন-মূল,ভুখা-নাঙ্গা কাঙ্গাল,

সন্ধ্যা-দুপুর ও সকাল,

বংশ পরম্পরায় চিরকাল।

বিত্তবানের লালসার লোলুপ আগুন,

তাদেরকে জ্বালায় দ্বিগুণ,

জ্বলে জ্বলে হয় অঙ্গার,

তারপরও তাকিতে হয় নির্বিকার।

চাহিতে পারে না প্রতিকার,

কারণ তারা হল-পরিবেশ-পরিস্থিতির শিকার,

তাদের উপর বার বার,

আসিবে নির্যাতনের পাহাড়।

দিন আনে,দিন খায়,

এতেই তারা আনন্দ পায়,

ভূত -ভবিষ্যৎ নিরাশায়,

কাজটাই তাদের অনন্য উপায়।

অতীতকে তারা জানে,

বর্তমানকে তারা মানে,

তাই ছুটেছে তারা বর্তমানের পানে।

আগামীকল্য কোথায় থাকিবে?

কি-খাইবে?কাজ পাইবে কি না?

সে কথা তারা জানিতে চাহে না।

তারা বস্তুই বাসী,মুখে নাই তাদের,

এতটুকু হাসি।

তারা বস্তি বাসী,সমাজে তারা-উচ্ছিষ্ট,

পচা গন্ধময় বাসি।

তারা বস্তি বাসী,তাদের দুঃখ -কষ্ট,

জ্বালা-যন্রনা রাশি -রাশি।

চলছে,চলমান

মানুষ বুদ্ধির এক-
অপরূপ কলা-কৌশলে,
দাবি করিতে চায়-
সর্বস্ব আপনার বলে ।
ছলে কিংবা বলে,
কিংবা কলা-কৌশলে ।
এ-জগতের সব কিছু-
আনিতে অনন্য নিজ করতলে ।
দেশে-দেশে হানা-হানি,
জাতি-ভেদে টানা-টানি,
এ-কোন কাল- ছায়ার
উন্মুক্ত, উলঙ্গ হাতছানি ।
জ্ঞান -বিজ্ঞানে ভূতপত্তি লাভ হইয়াছে যখন,
কথায় -কথায় মুখে বলি,
আমরা সভ্য এখন।
কিন্তু হায়!
আমাদের আচার-আচরণ, এমন,
নিজ হাতে,
প্রতিনিয়ত সভ্যতার করিতেছি দাফন।
তবু বলি মুখে,
আমরা সভ্য এখন।
কত সহজলভ্য এখন-
মানুষের জীবন -যাপন।
দুরে বহু দুরে-
সাত সমোদ্র তেরো নদীর ওপারে,

girl.jpg

নিমিষে ভাবের আদান-প্রদান করে।

কম্পিউটার, সেটে-লাইট, আরও আছে, মোবাইল, ইন্টারনেট।

বাটন চাপিলে, সব কিছু মিলে হাতের নাগালে।

তৎক্ষণাৎ যোগা-যোগ, 

একে অন্যে থাকে না-কোন অনুযোগ।

চলার পথে, কাজে বা বিশ্রামে থাকে সাথে,

হাতে আছে একটি মোবাইল ফোন,

টিপ দিয়ে, হ্যালো-তুমি শোন।

স্নেহ, মায়া, মমতা, এ-সব অতীত কথা।

স্বার্থের কি নিদারুণ দান?

এগুলি করিয়াছে প্রস্থান।

স্বার্থের কি দাপট?

প্রত্যেকে আমরা হইয়াছি কপট।

স্বার্থের অদম্য হানা-আমরা স্বার্থে হইয়াছি কানা।

উবিয়া গিয়াছে অন্তরের আবেগ,

বিজ্ঞান দিয়াছে-এক অসাধারণ বেগ। 

আমাদের অন্তর এখন, ভাব-লেশ হীন,

আরাম -বেআরাম বিহীন,

চলমান যন্ত্রের মতন, চলে হন-হন।

আমরা বর্তমান, চলছি-চলমান,

হেথা নাই, মান অভিমান।

স্বার্থের মহিমা অপরূপ,

সবার চেহারা হইয়াছে বিরূপ।

স্বার্থের নিদারুণ দান,

বর্তমান থাকিতে পারে নামান-সম্মান।

তবু,আমরা চলমান, চলছি, চলমান।

চলছে বিশ্বায়ন, বিজ্ঞান করিবে, স্বার্থের উন্নয়ন।

স্বার্থের মহা-সাগরে করিয়া অবগাহন,

স্বার্থের জন্য মনন, পঠন ও হনন।

স্বার্থের এ-কঠিন ধারা,হইয়াছি স্বার্থান্ধ, আত্মহারা।

চলছে বিশ্বায়ন,বহিতেছে উষ্ণ আয়ন ।

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

 
 
 

কবিতা

তাপস কুমার বর

কৃষ্ণনগর, দঃ ২৪ পরগনা

পৃথিবীর অন্ধকার

খনো নির্বাক পৃথিবী....
জড়ত্বের ওই ওষ্ঠগুলো মৃত মমির মতো,
কলঙ্কের রৌদ্দুরে জাদুর কাঠিতে ঘুমিয়ে আছে।
রহস্যগুলো, আজ ঠেসে শিক্ষা দেওয়ার তোতা পাখির মতো....
সত্যের পরাজয়ে,
ছলনার আশ্রয়ে শকুনির পাশার চালে লুকিয়ে আছে!
বোবা কত শালিক রক্তমাখা রণাঙ্গনে,
ওই মিশরীয় সভ্যতার পিরামিডে আজও কি কাঁদছে?
দেখো ওই সত্যের ইতিহাস.....
সেই মান্ধাতার যুগ থেকে খুঁজে খুঁজে চলছে।
আজও কি তার সমাধান মিলেছে?
কত,শত বোবাকান্না মৃত শালিক দাবানলের চুল্লিতে.....
আজও পাশার চালে ধুঁকে ধুঁকে মরছে!

পৃথিবী একদিন চৈতন্য বিহীন হয়ে পড়বে,
উন্মাদ পাগলের মতো রক্তচোষক ভ‍্যাম্পায়ার হবে।
সেদিন প্রত্যাশাগুলো দুমড়ে মুচড়ে সব চুরমার হবে....
পৃথিবীর প্রশ্বাস নিঃশ্বাসে আজ কেন.....?
দুর্গন্ধের কত, শত প্রতিবাদ ঝান্ডা উড়ছে।
এখনো গভীর নিশুতি রাতে ওরা নিরাকার হয়ে....
সত্যের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
ওরা কি রাজ বিদ্রোহী হতে পারবে?
সেদিন ফসিলের চিৎকারে ওরা কি জেগে উঠবে?
হায়রে, সত্য সেলুকাস সেদিন কি পুরুর বীরত্ব প্রকাশ হবে?
দিনে দিনে ইতিহাস মমির কবরে চাপা পড়ছে...
সেদিন কি ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু সত্যের সন্ধান চালাবে?

পৃথিবীর আবহাওয়া আজ দুর্গন্ধের বর্জ্য পদার্থে বইছে!

শিক্ষার বড় খাতা কেন আজ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে?

তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মানুষের ধ্বংসলীলা চলছে।

সেদিন পৃথিবী কি রইবে?

মহাকালের রক্তচোষক হয়ে হত‍্যালীলায় রণচণ্ডী হবে!

সত্যের ইতিহাসে তোমাদের পৃথিবীর ডিটেকটিভ সাজতে হবে,
না হলে অবহেলার অভুক্ত চুল্লিতে....
পৃথিবীর ধ্বংসলীলা শুরু হবে।
সেদিন শার্লক হোমসের ডিটেকটিভ কি বাঁচাতে পারবে?
ভুলের অন্ধকারে সব স্থলভাগ জলভাগের তলায় তলিয়ে যাবে...
হাজার হাজার চিৎকার হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে স্তব্ধ হবে!

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

 
 

যোগদর্শন

প্রোজ্জ্বল মণ্ডল

images.png

যোগদর্শন হিন্দুদর্শন-রাজ্যের এক অমূল্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থের রচিয়তা মহর্ষি পতঞ্জলি। সেইজন্য একে পাতঞ্জলদর্শনও বলা হয়। এই গ্রন্থে মহর্ষি পতঞ্জলি যোগ কি, এর সাধন উপায় এবং তার ফলাফল প্রভৃতি বর্ণনা করে মানবসমাজের প্রভূত কল্যাণ সাধন করেছেন।
যোগসাধনা ভিন্ন কৈবল্য বা মোক্ষলাভ করা সম্ভব নয়। যোগদর্শন বলেন —
পঞ্চবিংশতি তত্ত্ব ভিন্ন আরও এক পুরুষ আছেন, যিনি অবিদ্যামূলক ক্লেশ, কর্ম, বিপাক ও আশয়ের সহিত সম্বন্ধশূন্য, সেই পুরুষই ঈশ্বর। তিনি সকল জ্ঞানের আধার, তিনি সর্বজ্ঞ, তিনি অনন্ত, ত্রিকালাতীত, তাঁতেই জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা। যোগ - সাধনার দ্বারা সেই জ্ঞান লাভ হয়। এই জ্ঞান লাভই —কৈবল্য বা মোক্ষলাভ। এরই পাতঞ্জল দর্শনের প্রতিপাদ্য বিষয়। এইভাবে ঈশ্বরকে স্বীকার করায় যোগদর্শনকে *“সেশ্বর সাংখ্য”* বলা হয়।

   মহর্ষি পতঞ্জলি যোগের সংজ্ঞা নির্দেশ করিয়াছেন—
       *“যোগশ্চিত্ত-বৃত্তি-নিরোধঃ”*
                          —পতঞ্জল, ১২
--অর্থাৎ যাহা দ্বারা বা যে উপায়ে চিত্তবৃত্তি রোধ করা যায় তাহারই নাম যোগ।
--এখন চিত্ত ও চিত্তবৃত্তি কি তাহা প্রথমে বুঝা প্রয়োজন। সাংখ্যের মন , বুদ্ধি ও অহংকার এই তিনের আধারস্বরূপ চিত্ত।
তমোগুণের আধিক্যবশতঃ চিত্তের মূঢ়াবস্থা। রজোসত্ত্বাদির দ্বন্দ্বভাববশতঃ চিত্তে কখনও স্থির কখনও অস্থির ভাব উপস্থিত হলে চিত্ত বিক্ষিপ্ত হয়। পূর্ণ সত্ত্বগুণ লাভে চিত্তের একাগ্র অবস্থা। এই অবস্থায় মন সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী হয়। একাগ্র অবস্থার পর চিত্তবৃত্তি সম্পূর্ণ স্থির হইলে তাহাকে চিত্তের নিরুদ্ধ অবস্থা বলে। এই অবস্থায় মন *সমাধিমগ্ন* হয়।
চিত্তবৃত্তি নিরোধ কিভাবে হতে পারে?
   —এর উত্তরে মহর্ষি পতঞ্জলি বলেন,
        *“অভ্যাস-বৈরাগ্যাভ্যাং তন্নিরোধঃ”*
                           পাতঞ্জল, ১।১২
অর্থাৎ অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারাই চিত্তবৃত্তি নিরুদ্ধ হয়। এই চিত্তবৃত্তির নিরোধের অপর নাম সমাধি। তা নানাপ্রকারে সিদ্ধ হয়ে থাকে। ঈশ্বর প্রণিধান দ্বারা সমাধি হয়। ঈশ্বরের বাচক বা প্রকাশক হইতেছে প্রণব বা ওঁকার। এই ওঁকারের জপের ও তাহার অর্থভাবনার সাহায্যে মন অন্তর্মুখী হয় এবং আত্মোপলব্ধির পথে সকল বাধা দূর হয়।
চিত্তবৃত্তি নিরোধের উপায় দুই প্রকার— *অভ্যাস* ও *বৈরাগ্য*। চিত্তবৃত্তিগুলিকে সংযত করে স্থির করবার জন্য বার বার যে প্রচেষ্টা তার নাম *অভ্যাস*। দীর্ঘকাল আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে অভ্যাস সুদৃঢ় হয়। আর নিজের জন্য দৃষ্ট অথবা অপরের নিকট শ্রুত ভোগ্য বিষয় সমূহের উপভোগ করবার যে তীব্র বাসনা বা ইচ্ছা তাহা পরিত্যাগ করিবার নাম হইল *বৈরাগ্য* বা *বিষয়-বিতৃষ্ণা*।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে গীতায় বলিয়াছেন—
        *অসংশয়ং মহাবাহো*
                *মনো দুর্নিগ্রহং চলম্।*
         *অভ্যাসেন তু কৌন্তেয়*
                   *বৈরাগ্যেন চ গৃহাতে।।*
               ‌          — গীতা—৬।৩৫
অর্থাৎ হে অৰ্জ্জুন, মন যে দুর্নিরোধ ও অত্যন্ত চঞ্চল তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা তাহাকে সংযত করা যায়।

 চিত্তকে শুদ্ধ ও শান্ত করবার জন্য যোগদর্শনে যে সমস্ত সাধনার উপদেশ দেওয়া হয়েছে, তা *অষ্টাঙ্গ যোগ* নামে পরিচিত। সেগুলি হচ্ছে— (১) *যম*, (২) *নিয়ম*, (৩) *আসন*, (৪) *প্রাণায়াম*, (৫) *প্রত্যাহার*, (৬) *ধারণা*, (৭) *ধ্যান* ও (৮) *সমাধি*।

*(১) যম :—* অহিংসা, সত্য, অস্তেয় বা অচৌর্য, ব্রহ্মচর্য্য ও অপরিগ্রহ — এই পাঁচটিকে *‘যম’* বলে। 
*“অহিংসা-সত্যাস্তেয়-ব্রহ্মচর্য্যাপরিগ্রহা যমাঃ”*।
                         —যোগদর্শন, ২।৩০

*(২) নিয়ম* পাঁচ প্রকার — শৌচ, সন্তোষ, তপস্যা, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর - প্রণিধান।
*"শৌচ-সন্তোষ-তপঃ-স্বাধ্যায়েশ্বর-*
                *প্রণিধানানি নিয়মাঃ।”*
                           পাতঞ্জল, ২।৩২
(ক) স্নানাদি দ্বারা বাহ্য শরীরের গুচিতা এবং সচ্চিস্তা সদ্ভাবনা দ্বারা চিত্তের পবিত্রতা রক্ষা করাই হইতেছে *শৌচ*। 
     *“স্নানং মনোমলং ত্যাগং*
                *শৌচ মিন্দ্রিয়-নিগ্রহঃ”*
—অর্থাৎ মনের মলিনতা ত্যাগ করাই হইতেছে — যথার্থ স্নান এবং ইন্দ্রিয়সংযমই হইল যথার্থ *শৌচ*।

(খ) যথাযোগ্য চেষ্টা দ্বারা যাহা পাওয়া যায় তাহাতে তৃপ্ত থাকার নাম *সন্তোষ*। ইহার অর্থ দুরাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করা। সন্তোষ সিদ্ধ হইলে অতি উত্তম সুখ লাভ হয়।
(গ) শীতোষ্ণাদি দ্বন্দ্ব সহ্য করা এবং মন ও ইন্দ্রিয়াদির একান্ত সংযমের নাম *তপস্যা*। তপস্যার ফলে শরীর ও ইন্দ্রিয়ের অশুদ্ধি ক্ষয় হয়।
(ঘ) *স্বাধ্যায়* — ঋষিপ্রণীত শাস্ত্রাদি পাঠ ও গুরুমন্ত্রাদি জপ করাকে *স্বাধ্যায়* বলে। স্বাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত হইলে ইষ্টদেবতার দর্শন লাভ হয়। 
(ঙ) একান্ত শ্রদ্ধা ভক্তির সহিত ভগবচ্চিন্তা এবং ঈশ্বরে সর্ব কৰ্ম্ম সমর্পণ করিয়া তাঁহাতে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করাকে *ঈশ্বর-প্রণিধান* বলে। ঈশ্বর-প্রণিধান দ্বারা যোগ - সাধনার চরম ফল সমাধি লাভ হয়।

(৩) আসন :—* যোগাভ্যাস কালে যে ভাবে শরীরকে স্থির করে দীর্ঘক্ষণ রেখে কষ্ট বোধ হয় না, তাকে আসন বলে। স্থিরভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে এবং মস্তক-গ্রীবা ও বক্ষঃস্থল সমরেখায় রেখে উপবেশন করতে হয়। একাসনে অন্তত ৩।৪ ঘণ্টা অনায়াসে বসবার অভ্যাস হলে আসনসিদ্ধি লাভ হয়। এই যোগ - সাধনার পক্ষে খুবই উপযোগী। আসন - সিদ্ধি হইলে শীতোষ্ণাদি ক্ষুধাতৃষ্ণাদি দ্বন্দ্বসকল আর বাধার সৃষ্টি করিতে পারে না।

(৪) প্রাণায়াম :—* আসন - সিদ্ধি হলে প্রাণায়াম অভ্যাস করতে হয়। শ্বাস ও প্রশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করাকে *প্রাণায়াম* বলে। প্রাণায়াম তিন প্রকার— *পূরক, রেচক ও কুম্ভক*। বাইরের বায়ুকে আকর্ষণ করে দেহের ভিতর পূরণ করাকে *পূরক* বলে। ভিতরের বায়ুকে বাইরে বাইরে করে দেওয়াকে *রেচক* বলে এবং জলপূর্ণ কুম্ভের ন্যায় দেহের অভ্যন্তরে বায়ুকে ধারণ করবার নাম *কুম্ভক*। প্রাণায়ামের দ্বারা প্রাণবায়ু ও মন স্থির হয়। প্রাণায়াম সিদ্ধ হলে মোহাবরণ ক্ষয় হয়ে দিব্যজ্ঞান প্রকাশিত হয়।

(৫) প্রত্যাহার :—* ইন্দ্রিয়গুলোকে নিজ নিজ বিষয় হতে প্রতিনিবৃত্ত করে চিত্তের অনুগামী করার নাম *প্রত্যাহার*। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক — এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের পঞ্চ বিষয় শব্দ , স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ হতে প্রতিনিবৃত্ত হলে ইন্দ্রিয়গণও প্রতিনিবৃত্ত হয়ে চিত্তের অনুসরণ করে। প্রত্যাহারের তাৎপর্য মনকে ইন্দ্রিয়গণ হতে বিযুক্ত করা। মন বিযুক্ত হলে চক্ষু খোলা থাকিলেও বাহ্য বস্তু দেখিতে পাওয়া যায় না, কান খোলা থাকিলেও বাহ্য শব্দ শুনিতে পাওয়া যায় না। প্রত্যাহার সাধনার দ্বারা এই অবস্থা যোগীর ইচ্ছাধীন হয়। চিত্তবৃত্তি - নিরোধের পক্ষে এই সাধনা একান্ত প্রয়োজন। প্রত্যাহার সাধনায় সিদ্ধি হইলে ইন্দ্রিয়গণ পরম বশীভূত হয়।
যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম ও প্রত্যাহার — এই পাঁচটিকে যোগের বহিরঙ্গ সাধন বলে।
(৬) ধারণা :—* বাইরের বিষয় হতে প্রতিনিবৃত্ত করে কোন এক বিশেষ দেশে বা স্থানে চিত্তকে স্থিরভাবে ধরে রাখার নাম *ধারণা*। এই স্থান নিজের দেহের ভিতরে কোন কেন্দ্রবিন্দুতে অর্থাৎ নাসিকার অগ্রভাবে, হৃদ্‌পদ্মে অথবা বাইরের কোন দেবতার মূর্ত্তিতে হইতে পারে।

(৭) ধ্যান :—* যে বিষয়ে চিত্ত স্থির করা হয়, সেই বিষয়ে চিত্তবৃত্তির তৈলধারাবৎ একতানতা অর্থাৎ নিরবচ্ছিন্ন ভাবনাকে *ধ্যান* বলে। 
       *“ধ্যানং তৈল ধারাবৎ অবিচ্ছিন্ন*
         *স্মৃতি সংতানরূপা ধ্রুবা স্মৃতিঃ”* 
             —ব্রহ্মসূত্র, রামানুজ ভাষ্য ১।১
    *“তত্র প্রত্যয়ৈকতানতা ধ্যানম্”*
                           —পাতঞ্জল, ৩।২
সাধারণত: মন এক জায়গায় বেশীক্ষণ আবদ্ধ থাকে না, ইতস্তত: বিক্ষিপ্ত হয়। সেই বিক্ষিপ্ত মনকে বার বার জোর করে ফিরিয়ে এনে ধ্যেয় বস্তুতে আবদ্ধ করতে হয়। সেরূপ অভ্যাসের ফলে মন যখন ধ্যেয় বস্তুতে অবিচ্ছিন্নভাবে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয় তখনই ধ্যান হয়। ধারণা যতই গাঢ় হয় ততই অন্তরে প্রবেশ করে তখনই হয় ধ্যানের আরম্ভ। ধ্যান গাঢ় হলে চিত্তবৃত্তির নিরোধ হয় এবং ‘অন্তরে এক গভীর প্রশান্তভাব জাগ্রত হয়।

(৮) সমাধি :—* যোগের অষ্টম অঙ্গ বা শেষ অঙ্গের নাম সমাধি। কোন বিষয়ে দীর্ঘসময় ধ্যান করতে করতে মন যখন ধ্যেয় বস্তুর আকার ধারণ করে এবং তাহাতে লীন হয়ে যায়, তখন তাকে *সমাধি* বলে। ধ্যান গভীর হলে যখন কেবল ধ্যেয় বিষয়মাত্র জ্ঞানগোচর থাকে এবং তদ্ভিন্ন অন্য সমস্ত বিষয়ের বিস্মৃতি ঘটে , তখনকার সেইরূপ চরম চিত্তস্বৈর্য্যের নাম *‘সমাধি'*।
ধারণা, ধ্যান ও সমাধি — এই তিনটিকে যোগের অন্তরঙ্গ সাধন বলে। এই তিনটি একই বিষয়ে প্রযুক্ত হইলে তাহাকে *‘সংযম’* বলে।
জীবাত্মা পরমাত্মায় লীন হয়ে যান — এটাই *‘নিৰ্ব্বাণ মুক্তি।'* তখন সেই সিদ্ধ সমাহিত মহাপুরুষ লোককল্যাণের জন্য জগতে বিচরণ করেন এবং মুমুক্ষকে মুক্তির পথে অগ্রসর হবার জন্য সাহায্য করেন। এরূপ জীবন্মুক্ত মহাপুরুষ জগতে সত্যই খুব দুর্লভ।

 

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

গল্প 

 

উপনিষদের

মূল মন্ত্র

প্রোজ্জ্বল মণ্ডল

oldman2.jpg

পনিষৎ মানে ব্রহ্মবিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থ। উপ + নি পূর্বক সদ্ ধাতু ক্লিপ করিলে উপনিষৎ শব্দ হয়। উপ = নিকট। নি = নিশ্চয়। সৎ = প্রাপ্তি। ইহাই ব্যাকরণ গত অর্থ। আমরা ইহার অর্থ করিতেছি :- উপ = নিকট। নি = লইয়া যায়। সৎ = ব্রহ্মতত্ত্ব।
যে বিদ্যা সাধককে ব্রহ্মতত্ত্বের নিকটস্থ করে, উহার নাম উপনিষদ।
শান্তিমন্ত্রম। ওঁ পূর্ণ মদঃ পূর্ণ মিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণ পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবা বশিতে।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥ হরিঃ ওঁ ॥
অদঃ পূর্ণম্ (ইন্দ্রিয়াতীত জগৎ [ব্রহ্মদ্বারা] পূর্ণ)। ইদং পূর্ণম্ (ইন্দ্রিয়গ্রাহ্ জগৎ [ব্রহ্মদ্বারা] পূর্ণ)। নির্গুণ ব্রহ্ম হইতেই ইন্দ্রিয়াতীত ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ অভিব্যক্ত হইয়াছে। তাহা হইলেও নির্গুণ এবং নিশ্চল ব্রহ্ম পরিপূর্ণই আছেন।

১। ঈশা বাস্তমিদং সৰ্ব্বং যৎ কিঞ্চজগত্যাং জগৎ।
তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্যস্বি ধন।
“পৃথিবীতে যত রকম পদার্থ আছে, সবই ঈশা দ্বারা (ঈশ্বর, ব্রহ্ম বা আত্মা দ্বারা) ব্যাপ্ত। এইরূপে ব্রহ্ম দর্শন না করিলে তুমি ভােগী হইবে। তুমি কাহারও ধনে অভিলাষ করিও না।”

২। কুন্নেবেহ কৰ্ম্মাণি জিজীবিষেৎ শত সমাঃ।
এবং ত্বয়ি নাথে তােহস্তি ন কৰ্ম্ম লিপ্যতে নরে।
“ইহলােকে (সব রকম) কর্ম সকল সম্পন্ন করিবে এবং শত বৎসর বঁচিয়া থাকিবার ইচ্ছা পােষণ করিবে। ইহার অন্যথা করিবে না। মানবের জন্য লিপ্ততাহীন কর্মই বিহিত।”

৩। অসুর্যা নাম যে লােকা অন্ধেন তমসাবৃতাঃ।
তাভস্তে প্রেত্যাভিগচ্ছন্তি যে কে চাত্মহনাে জনাঃ॥
যাহারা আত্ম হন ও জ্ঞানহীন তমসাচ্ছন্ন মানুষ, তাহারা মৃত্যুর পর অসুরলােকে গমন করে।

৪। অনেজদেকং মনসাে জবীয়াে নৈনদেবা আপ্লব পূর্বমর্ষ।
তদ্ধাবতােইন্যানতত্যতি তিষ্ঠৎ তস্মিন্নপাে মারিশ্যা দধাতি।
তিনি এক, তিনি স্পন্দন রহিত, মন হইতেও বেগবান, (পূর্বযুগের) দেবতাগণ তাহাকে প্রাপ্ত হন নাই। তিনি স্থির হইলেও সকলকে অতিক্রম করিয়া অধিক দ্রুত বেগশীল। তাঁহাকে আশ্রয় করিয়ই মাতরিশ্বা (সগুণব্রহ্ম) স্নেহরস (আশীর্বাদ) দান করিয়া থাকেন।

৫। যথাদর্শে তথাত্মনি, যথা স্বপ্নে তথা পিতৃলােকে।
যথাঙ্গু পরীব দদৃশে, তথা গন্ধর্বলােকে,
চ্ছায়া পয়ােরি ব্রহ্মলােকে। ১০৬ ॥
দর্পণে যেমন নিজের রূপ প্রতিফলিত হয় ঠিক সেইরূপ আত্মস্বরূপে মহাশক্তি বা ব্রহ্মতত্ত্ব প্রতিফলিত হইয়া থাকে। স্বপ্নে যেমন জ্ঞানের ধারা প্রতিফলিত হয় পিতৃলােকে এই ব্রহ্মজ্ঞান বা আত্মজ্ঞানের এতটুকু প্রতিফলন হইয়া থাকে। জলের মধ্যে নিজের ছায়া যতটা প্রতিফলিত হয়, সঙ্গীত বিদ্যার মধ্য দিয়া (গন্ধর্বলােক) ততটা ব্রহ্মজ্ঞানের প্রতিফলন হইতে পারে। আর ব্রহ্মলােকে আতপ ও ছায়ার মত আত্মজ্ঞান প্রতিফলন হইয়া থাকে।

৬। যস্তু বিজ্ঞানবান্ ভবতি যুক্তেন মনসা সদা।
তস্মেন্দ্রিয়াণি বস্যানি সদা ইব সারখেঃ ॥ ৬০।
যিনি বিজ্ঞানবান হন, মনও ঘঁহার বিবেকসংযুক্ত থাকে, তাহার ইন্দ্রিয়গণ সারথির সৎ অশ্বের মতন বশীভূত থাকে।

৬। যজ্ঞ সৰ্ব্বাণি ভূতানি আত্মনেৰানুপতি।
সর্বভূতেষু চাত্মানং ততাে ন বিজুগুস্পতে।
যিনি সর্বদা সর্বভূতকে আত্মতে এবং আত্মাকে সর্বভূতে দর্শন করেন, তিনি সেইরূপ আত্মদর্শনের ফলে ঘৃণা করেন না।

৭। যন্ত্র বিজ্ঞানবান্ ভবত্য মনস্কঃ সদা শুচিঃ।
ন স তৎপদমাপ্নোতি সসারং চাধিগচ্ছতি। ৬১।
যে অবিজ্ঞানবাদী, যে অমনস্ক, যে সদা অশুচি, সে সেই ব্রহ্মপদপ্রাপ্ত হয় না, সে সংসারগতি (অর্থাৎ হীনগতি) প্রাপ্ত হয়।

৭। যস্মিন সৰ্ব্বাণি ভূতানি আত্মৈবাভূদ বিজানতঃ।
তত্র কো মােহঃ কঃ শােক একত্ব মনুপশতঃ।
যে সময়, সর্বভূতই আত্মারই রূপ, সাধকের এইরূপ অনুভব হয়, তাঁহার মােহ এবং শােক থাকে না। ইহার কারণ, তিনি সর্বত্র একই চেতনা অনুভব করেন। শক্তিবাদ ভাষ্য। এই মন্ত্রে ব্রহ্মজ্ঞানী মহাপুরুষের লক্ষণ কিরূপ, উহা জানা যায়। পূর্ব মন্ত্রে চেতনালক্ষণ বলা হইয়াছিল।

৮। যস্থ বিজ্ঞানবান্ ভবতি সমনস্কঃ সদা শুচিঃ।
সতু তৎ পদমাগ্লোতি যস্মভুয়াে ন জায়তে। ৬২।
যিনি (রখী) বিজ্ঞানবান, যিনি সমনস্ক এবং সদা শুদ্ধ, তিনি সেই পরমপদ প্রাপ্ত হন, যাহা প্রাপ্ত হইলে আর জন্ম হয় না।

৮। স পর্যগাঙ্গুক্রমকায়মব্রণ মম্নবির শুদ্ধমপাপবিদ্ধ।
কবির্মনীয়ী পরিভূঃ স্বয়ঃর্যাথাতথ্যতােইৰ্থাৎ ব্যদধাৎ শাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ।
তিনি দেশকালের বাধা অতিক্রম করিয়া সর্বব্যাপী, তিনি শুদ্ধ প্রকাশময়, তিনি কায়াহীন, তাহাতে ক্ষত নাই (অক্ষতঃ), তিনি অস্নাবিরং (শিরা রহিত, অর্থাৎ শরীর ধর্ম বর্জিত ব্যাপক তত্ত্ব), তিনি শুদ্ধ (নির্মল), তিনি অপাপবিদ্ধ (তাহাতে পাপ স্পর্শ করে অর্থাৎ পাপকর্ম তাহাতে নাই)। তিনি কবি (সর্বদ্রষ্টা), তিনি মনীষী (সর্বজ্ঞ)। তিনি পরিভূঃ (সর্বোপরি বিরাজমান, অর্থাৎ তিনি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কেহই নাই)। তিনি স্বয়ম্ভু (নিজে নিজেই আছেন)। তিনি (পরমাত্মা) শাশ্বতীভ্যঃ (শাশ্বতী শক্তিগণকে)
(সমাভ্যঃ) কালগতিতে সৃষ্টি ও লয় চক্রকে নিজ নিজ কর্তব্য সমূহকে যথাযথ করিবার শক্তিদান করিয়াছেন।

৯। বিজ্ঞান সারথি যস্ত মনঃ প্রগ্রহবা নরঃ।
সােহধ্বনঃ পারমাপ্পেতি তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদ৷ ৬৩।
বিজ্ঞান যাহার (যে রথীর) সারথি, মন যাহার ইন্দ্রিয়রূপ অশ্বগণের সংযমিত করিবার রঞ্জুরূপী, তিনি সংসারে থাকিয়াও শ্রেষ্ঠ বিষ্ণুপদ (ব্যাপক ব্রহ্মপদ) প্রাপ্ত হন।

৯। অগ্নির্যথৈকো ভুবনং প্রবিষ্টো
রূপং রূপং প্রতিরূপাে বভূব।
একস্তথা সৰ্ব্বভূতান্তরাত্মা
রূপং রূপং প্রতিরূপাে বহিশ্চ৷ 
একই অগ্নি, যেরূপ জগতে প্রবেশপূর্বক বিভিন্ন বস্তুতে তদ্রুপ হইয়া অবস্থান করিতেছে এবং অগ্নি যেমন সেই বস্তু হইতে পৃথক হইয়াও অবস্থান করিতেছে ঠিক সেইরূপ আত্মা এক এবং নানা জীবে প্রবিষ্ট থাকিয়া ও সর্বজীব হইতে স্বতন্ত্র হইয়াও অবস্থান করিতেছেন।

১০। ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরা হ্যর্থ অর্থেভ্যশ্চ পরং মনঃ।
মনসস্তু পরা বুদ্ধিবুদ্ধেরাত্মা মহান্ পরঃ ॥ ৬৪।
ইন্দ্রিয়গণ অপেক্ষা অর্থ সকল শ্রেষ্ঠ। অর্থ সকল হইতে মন শ্রেষ্ঠ। মন হইতে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধি অপেক্ষা মহানআত্মা শ্রেষ্ঠ।

১১। মহতঃ পরমব্যক্তমব্যক্তাৎ পুরুষঃ পরঃ।

পুরুষান্ন পরং কিঞ্চিৎ, সা কাষ্ঠা সা পরা গতিঃ ॥ ৬৫।
মহত্তত্ত্ব হইতে অব্যক্ত তত্ত্ব শ্রেষ্ঠ, অব্যক্ত তত্ত্ব হইতে পুরুষ তত্ত্ব শ্রেষ্ঠ। পুরুষ তত্ত্ব হইতে শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব আর কিছুই নাই। ইহাই শেষ স্তর এবং ইহাই শ্রেষ্ঠ গতি।

১২। এষ সৰ্ব্বেষু ভূতেষু গূঢ়োত্মা ন প্রকাশতে।দৃশ্যতে ত্বয়া বুদ্ধ্যা সূক্ষ্ময়া সূক্ষ্মদর্শিভিঃ ॥ ৬৬।

এই আত্মা সমস্ত ভূতের অভ্যন্তরে গুহভাবে অবস্থিত আছেন। কিন্তু সকলের নিকট ইনি প্রকাশ পান না। সূক্ষ্মদর্শী মহাত্মাগণ একাগ্র বুদ্ধি এবং সূক্ষ্ম দার্শনিকতা দ্বারা ইহাকে দর্শন করেন।

১২। একোবশী সৰ্ব্বভূতান্তরাত্মা
একং রূপং বহুধা যঃ করােতি।
তমাত্মস্থং যেইনুপশ্যন্তি ধীরা
স্তেষাং সুখং শাশ্বতং নেতরেষা৷ ৯৮
বশী (সর্বনিয়ন্তা) এক, তিনিই সমস্ত জীবে অন্তরাত্মা হইয়া অবস্থান করিতেছেন। তিনি একই আত্মরূপকে বহু রূপ করিয়াছেন, সেই সর্বনিয়ন্তাকে (বশীকে) যিনি ধীর হইয়া নিজের মধ্যে অনুভব করেন, তিনিই শাশ্বত সুখ প্রাপ্ত হন, অন্যে নহে।

১৩। নিত্যোহনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানা
একো বহুনাং যাে বিদধাতি কামান্।
তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যতি ধীরা
স্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষা৷ ৯৯।
সমস্ত অনিত্য পদার্থের মধ্যে যিনি অবিনাশী, যিনি সমস্ত চেতনার মধ্যে চেতনা সঞ্চার করেন, এক হইয়াও যিনি বহুর কামনা পূর্ণ করেন; নিজের (মস্তিষ্ক মধ্যস্থিত শিব পিণ্ড) মধ্যে আত্মস্থ হইয়া যিনি তাহাকে প্রত্যক্ষ করেন তাহারই শাশ্বত শান্তি লাভ হয়,
অন্যের নহে।

১৩। অঙ্গুষ্ঠ মাত্রঃ পুরুষাে জ্যোতিরেবাধূমকঃ ।
ঈশানাে ভূতভব্যস্য স এবাদ্য স উ শ্বঃ |
এতদ্বৈতৎ|| ৮৪||
অঙ্গুষ্ঠমাত্র পুরুষই জ্যোতির্ময় আত্মা, তাহাতে কোনই ধূম্র নাই অর্থাৎ অজ্ঞানতা নাই। তিনি অতীত এবং ভবিষ্যতের ঈশ্বর। তিনিই আজ এবং তিনিই কাল। ইহাই নচিকেতা জিজ্ঞাসিত আত্মতত্ত্ব।

১৩। যচ্ছেদ্বানসী প্রাজ্ঞস্ত যচ্ছে জ্ঞান আত্মনি।
জ্ঞানমাত্মনি মহতি তদ যচ্ছেচ্ছান্ত আত্মনি। ৬৭ ।
আকে
প্রাজ্ঞ ব্যক্তি (বিবেকশালী মনুষ্য) বা ইন্দ্রিয়কে মনে সংযম করিবেন। (বা যে মনে সংযমিত হইয়াছে) সেই সংযমিত মনকে আনাত্মাতে সংযম করিবেন।
মহৎতত্ত্বে সংযমিত করিবেন এবং মহত্তত্ত্বে সংযমিত আত্মাকে প্রশান্ত আত্মাতে সংযমিত করিবেন।

১৪। উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবােধত।
ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া দুর্গংপথস্তৎ কবয়াে বদন্তি। ৬৮ ॥

১৪। সতিঞ্চ বিনাশঞ্চ যস্তদ্বেদোভয় সহ।
বিনাশেন মৃত্যুং তীক্বা সত্যা স মৃতমম্মুতে।
যে জানে “সতি” এবং “বিনাশের একত্র অনুষ্ঠান চলে, সে লােক বিনাশের অনুশীলন করিয়া মৃত্যুকে অতিক্রম করে এবং “সতির আশ্রয়ে অমৃতত্ব প্রাপ্ত হন। উখিত হও। জাগ্রত হও। শ্রেষ্ঠ গুরুর নিকট বার বার জ্ঞান লাভে উৎসাহিত হও।
আত্মজ্ঞান বিকাশের এই পথকে আত্মজ্ঞান সম্পন্ন মহাত্মাগণ শাণিত ক্ষুরের উপর দিয়া বিচরণের মত দুর্গম বলিয়াছেন।

১৫। অশব্দম স্পর্শম রূপম ব্যয়য়ং
তথা রসং নিত্যমগন্ধবচ্চ যৎ।
অনাদ্যনমন্তং মহতঃ পরং ধ্রুবং
নিচায্য তং মৃত্যু মুথাৎ প্রমুচ্যতে। ৬৯।
তিনি অশব্দ, তিনি অস্পর্শ, তিনি অরূপ, তিনি অরস, তিনি অগন্ধ, তিনি নিত্য, তিনি আদি অন্তহীন, তিনি মহৎ তত্ত্ব হইতেও শ্রেষ্ঠ, তিনি ধ্রুব, তাহাকে (তপস্যা, সাধনা ও শাস্ত্রজ্ঞান দ্বারা) নিশ্চয়রূপে নির্ণয় করিয়া সাধক জন্ম মৃত্যু হইতে বিমুক্ত হন।

প্রতিবােধবিদিতং মতমমৃতত্ত্বং হি বিন্দতে।
আত্মনা বিন্দতে বীৰ্যং বিদ্যয়া বিন্দতেমৃত। ৪
প্রতিটি বােধ আত্মাই করেন, এইভাবে জানাই মুক্তির সাধনা। এইরূপ জানাই (লৌকিক ঐশ্বর্য বিষয়ে) বীর্যকে জানা এবং এইরূপ জানাই অমৃতকে জানা।

যদি মনসে সুবেদেতি দমেবাপি।
নূনং ত্বং বেথ ব্রহ্মণাে রূপ।
যদস্য ত্বং যদস্য দেবেষথ নু
মীমাংসমেব তে মনে বিদিত। ১
যদি মনে কর, ব্রহ্মের রূপ তুমি জানিয়াছ, তবে জানিবে উহা অল্পজ্ঞান। কারণ, ব্রহ্মের ভৌতিকরূপ (বিশ্বরূপ) এবং দৈবরূপ উভয়ই অল্প। কাজেই তােমার জ্ঞাত
ব্রহ্মরূপটি (যুক্তিতর্ক দ্বারা) মীমাংসা করা কর্তব্য।

২৪। নাবিরতাে দুশ্চরিতান্নাশান্তো না সমাহিতঃ।
নাশান্ত মানসাে বাপি প্রজ্ঞানে নৈব মাঞ্চুয়াৎ। ৫৩।
যে মনুষ্য দুশ্চরিত্র হইতে বিরত নহে, সংযতেন্দ্রিয় নহে, সমাহিত চিত্ত নহে এবং ভােগস্পৃহা রহিত নহে; সে মনুষ্য আত্মজ্ঞান লাভ করিতে সক্ষম নহে; পরন্তু যে মনুষ্য দুশ্চরিত্র হইতে বিরত, সংযতেন্দ্রিয়, সমাহিত চিত্ত এবং ভােগস্পৃহা রহিত সে মনুষ্য প্রজ্ঞানের (অর্থাৎ জ্ঞানের ক্রমবিকাশের পথে আত্মজ্ঞান প্রাপ্ত হয়।

 

নাহং মনে সুবেদেতি নাে ন বেদেতি বেদ চ।
যাে নস্তদুবেদ বেদ নাে ন বেদেতি বেদ চ। ২
আমি উত্তমরূপে ব্রহ্মকে জানি এইরূপ আমি মনে করি না। এবং আমি তাহাকে একেবারেই জানি না, ইহাও মনে করি না। আমাদের মধ্যে যিনি “জানি” এবং “জানি ” কথার ভাব বুঝিতে পারেন, তিনি ব্রহ্মকে জানিতে পারেন।

নায়মা প্রচলন লভ্যা
ন মেনা ন বহুনা তন
যমেনৈষ বৃণুতে তেন লভ্য-
স্তস্যৈব আত্মা বিবৃহূতে তনু স্বাম। ৫২।
কেবল প্রবচন (শাস্ত্রাধ্যায়ন ও শাস্ত্রব্যাখ্যা) দ্বারা এই আত্মাকে লাভ করা যায় না। কেবল মেধাদ্বারা বা বহু শাস্ত্রশ্রবণেও আত্মাকে লাভ করা যায় না। পরন্তু, যিনি আত্মাকে (জীবন লক্ষ্যে) বরণ করিয়া লন, তিনি (তপস্যার প্রভাবে) তাহাকে জানিতে সক্ষম হন। এইরূপ ব্যক্তির নিকটই আত্মতত্ত্ব উপদেশ দান করা যায়।

অঙ্গুষ্ঠ মাত্রঃ পুরুষাে মধ্য আত্মনি তিষ্ঠতি।
ঈশানাে ভূতভব্যস্য ন ততাে বিজুগুপ্সতে।
এতদ্বৈতৎ॥ ৮৩।
শরীরের মধ্যে অঙ্গুষ্ঠ পরিমিত স্থানে পুরুষ (আত্মা) বিদ্যমান আছেন। তিনি অতীতের ঈশ্বর, তিনি ভবিষ্যতেরও ঈশ্বর। তঁহাকে জানিতে পারিলে আর কিছুই অজ্ঞাত থাকে না। ইহাই নচিকেতার জিজ্ঞাসিত আত্মতত্ত্ব।

 

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

 

গল্প 

গীতার নির্দেশে       ক্ষত্রিয় ধর্মের আহবান

bus driver.jpg

নিরুৎসাহ, ভেঙ্গে পড়া শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির কাজ নয়। অর্জুন ও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বিপরীত দলে নিজের আপন জনদের দেখে ভেঙে পড়েছিল। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে ভর্ৎসনা দিয়ে জাগিয়ে দিয়েছিলেন।------
*কুতস্তং কস্মলমিদং বিসমে সমুপস্থিতম্।*
*অনার্য় জুষ্টমসর্গ্যমকীর্তিকরমর্জুনঃ।।*
                                ---- গীতা
অর্থাৎ এই বিকট পরিস্থিতিতে মোহরুপী মলিনতা তোমার কোথা থেকে এলো? এটি অনার্য (শ্রেষ্ঠ নয়) এবং এটি স্বর্গকারি নয়; এটি মোটেও কীর্তিকর নয়।

     *ক্লৈব্যং মা স্ম গমঃ পার্থ*
                      *নৈতত্বয়্যুপপদ্যতে।*
       *ক্ষুদ্রং হৃজয়দৌর্বল্যং*
                      *ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ।।*
অর্থাৎ, কাপুরষতা, কাপুরুষতাই। এটি করুণাবশত ও ভয় জনিতই হোক না – কেন। অতএব নিজের স্বত্ব ও অধিকারের রক্ষার জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকতে হয়। অন্যায়ের প্রতিকার করা উচিত। এ ছাড়া পলায়ন নয়, পুরুষার্থ নির্বাচন করা উচিত।

          *এবং বুদ্ধেঃ পরং বুদ্ধা*
                   *সংস্তভ্যাত্মানমাত্মনা।*
           *জহি শত্রুং মহাবাহো*
                  *কামরূপং দুরাসদম্।।৪৩।।*
অনুবাদঃ- হে মহাবীর অর্জুন! নিজেকে জড় ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির অতীত জেনে, নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধির দ্বারা মনকে স্থির কর এবং এভাবেই চিৎ-শক্তির দ্বারা কামরূপ দুর্জয় শত্রুকে জয় কর।--এই মোহ মলিনতা ত্যাগ করে যুদ্ধ করো। যেখানে ধর্মের পরাভব হয়, অধর্মের উন্নতি হয়; সংস্কৃতির পরাভব হয়, অপসংস্কৃতি উন্নতি হয়; শ্রেষ্ঠ যোগ্য ব্যাক্তি পীড়িত হয়, আর অযোগ্য ব্যক্তি মজা করে; সেখানে যুদ্ধ করতে হয়। আজ আমরা যেমন তেমন ভাবেই ভারত দেশকে দেখছি তা আমাদের পূর্বপুরুষদের বলিদানের ফল। গুরু গোবিন্দ সিং, বীর শিবাজী, মহারানা প্রতাপ, এ ধরনের অসংখ্য বীর পুরুষদের বলিদান না হলে আমরা আজ যে রূপে নিজের দেশকে দেখছি এটাও দেখতে পেতাম না। তারমানে যোগীরাজ শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন রূপে আমাদেরকেই বললেন যে,--- ভয়, কাপুরুষতা, অকর্মণ্যতাকে ত্যাগ দিয়ে সংস্কৃতি ও ধর্মকে বাঁচাতে যদি প্রাণ দিতে হয় তবে দিয়ে দিন। কিন্তু মরার মত বেঁচে থেকে লাভ নেই। মৃত্যু কেবল শরীর থেকে আত্মার আলাদা হওয়ার নাম নয়। যদি আপনি নিজের সংস্কৃতি ও ধর্মের উপরে আঘাত হচ্ছে জেনেও চুপ থাকেন তাকেও মৃত্যু বলা হয়। পার্থক্য শুধু একটি

যে, সেটি শরীরের মৃত্যু, আর এটি হবে আত্মার মৃত্যু। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের অন্তরাত্মায় ওঠা প্রতিবাদকে যে দাবিয়ে দেয় তাকে “আত্মহত্যাকারী” বলা হয়। ------ 

     *ওম্ অসূর্য়া নাম তে লোকা*
                    *অন্ধেন তমসাবৃতা:।*
          *তাংস্তে প্রেত্যাভিগচ্ছন্তি*
                  *য়ে কে চাত্মহনো জনা:।।*
                           ---- (যজুর্বেদ ৪০)
অর্থাত্ এইরকম আত্মহত্যাকারীকে অসুর, রাক্ষস নাম বলা হয়েছে। যারা ঘোর অবিদ্যা অন্ধকারে আচ্ছন্ন। যারা চোখের সামনে অন্যায় দেখেও পাশ কেটে যায়।তাদের আত্মহত্যাকারী বলা হয়। এবং তারা মৃত্যুর পরে মনুষ্য জন্ম পায় না, বরং প্রেত্যযোনিতে যায়।
একদিন না একদিন মরতে তো হবেই সবাইকে। যে এমনি মরে যায় তার জীবন ব্যর্থ। তাকে কেউ মনে রাখে না। কিন্তু কীর্তিমান পুরুষ বেঁচে থাকে লোকের হৃদয়ে।  

আমাদের এই ভাবনায় বসে থাকলে চলবে না যে, ঈশ্বর অবতার হয়ে আসবে আর আমাদেরকে বাঁচিয়ে দেবে। শ্রীকৃষ্ণ নিজে অবতার হয়ে যদি বাঁচাতে আসেন তবে তিনি অর্জুনকে তার জীবিত অবস্থায় কেন যুদ্ধের প্রেরণা দিয়েছিলেন। নিজেই শত্রুদেরকে সংহার কেন করলেন না? অবতারের ভাবনা করে বসে থেকে লাভ নেই। আমাদেরকে নিজের ব্যবস্থা ভাবতে হবে। এখানে কেউ বাঁচাতে আসবে না। যেমনটি গড়বেন তেমনটি ঘুরে আসে। কোন কিছুই ব্যর্থ যায়না। আম গাছ লাগালে আমের বাগানে জন্ম নেবেন। বাবলা গাছ লাগালে কাঁটার ওপরে জন্ম নেবেন। এই পরিবেশে জন্মানোর কারণ হল আমাদের কর্ম। আমরা কোথাও না কোথাও অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়েছি। তার ফল আজ ভোগ করতে হচ্ছে। আমরা আজ যা গড়বো, তা আগে আমাদের ভোগ করতে হবে। ঈশ্বর ন্যায়কারি। তিনি যথাযথভাবে কর্মের ফল আমাদেরকে প্রাপ্ত করান। তাই আমাদেরকেই স্বর্গ বানাতে হবে, রাস্তার কাটা সরাতে হবে। এড়িয়ে গেলে চলবেনা। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে, অধর্মের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। কারণ সংস্কৃতি রক্ষার জন্য ধর্মের রক্ষার জন্য অধর্মকে এড়িয়ে গেলে অধর্ম আরো বেড়ে যাবে। তখন আপনার পরবর্তী প্রজন্ম তার কুফল ভোগ করবে। মৃত্যু প্রতিনিয়ত হচ্ছে। কে কাকে মনে রেখেছে? নিখোঁজের মতো আমরা মরে যাই। এই মৃত্যু কি কোন মৃত্যু হল?  মৃত্যু তো তাকে বলে যেমন বান্দা বৈরাগীর হয়েছিল। মৃত্যু তাকে বলে যেমন গুরু তেগবাহাদুরের হয়েছিল। আমরা নিজের ধর্মকে বাঁচাতে গিয়ে যদি মরি তবে আমরা অমর হয়ে যাব। আমার মৃত্যুকে দেখে হাজার হাজার প্রাণ আহুতি দিতে তৈরি হবে, নিজের দেশের জন্য, নিজের ধর্মের জন্য, ও নিজের সংস্কৃতির জন্য। মহর্ষি মনু বলেছেন--- ধর্মকে যে রক্ষা করে ধর্ম তার রক্ষা করে। ধর্মকে যে হত্যা করে ধর্ম তার হত্যা করে। তাই মূক পশুর মতো বোবা হয়ে থাকলে চলবে না। অন্যায় অধর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। গর্জে উঠুন। ঈশ্বর আপনার সঙ্গে আছেন।

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

 

গল্প 

অনাহুত বরযাত্রী

পার্থ বোস

ব্যাঙ্গালুরু

তকাল ছিয়ানব্বই বছর বয়সে আমাদের গোটা পরিবারকে গভীর শোকের মধ্যে রেখে চলে গেলেন সাহেব দাদু। জন্মের সময় বাচ্চার গায়ের রং ছিল টুকটুকে ফর্সা।  তাই দেখে বাবা মা আদর করে নাম রেখেছিলেন ‘সাহেব’। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এই সাহেব দাদু। চাকরি জীবনে সরকারি অনেক বড় বড় পোষ্ট দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। ফলে আদব-কায়দার মধ্যেও একটা সাহেব সুলভ আচরণ তার ছিল। কিন্তু রিটায়ার করার পর তার স্বভাবে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। চাকরি জীবনে উনি যতটা  ডিসিপ্লিন  মেনে চলতেন, অবসর নেবার পর সেই ডিসিপ্লিনকে ভঙ্গ করার ইচ্ছা ততটাই প্রবল হয়ে ওঠে।
কিন্তু ইচ্ছা করলেই তো সেটা প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। বিশেষত সাহেব ঠাম্মির মত জাঁদরেল একজন প্রশাসক যখন আছেন। এক কথায় অবসরপ্রাপ্ত জীবনে সাহেব দাদু ছিলেন সম্পূর্ণভাবে সাহেব ঠাম্মির তত্ত্বাবধানে। কিন্তু সুযোগ পেলেই সাহেব দাদু বাধা নিয়মগুলো ভাঙ্গার তীব্র প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেন।
আমার নিজের ঠাকুরদা ঠাকুরমা মারা যাবার পর ঠাকুরদার এই ছোট ভাই অর্থাৎ সাহেব দাদুই ছিলেন আমাদের গোটা পরিবারের অভিভাবক। সত্যি বলতে তিনি ছিলেন যথার্থই অভিভাবক। তার অভিভাবকত্বে আমাদের গোটা পরিবার তার কাছে ঋণী। তার বহু কীর্তির সাক্ষী আমাদের এই পরিবার। তাই আজ এই গভীর শোকের মধ্যে আজ থেকে ছাব্বিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক কাহিনীর কথা বার বার মনে পড়ছে। আজ আপনাদের সেই কাহিনীটাই শোনাব।
সালটা ছিল উনিশ পঁচানব্বই। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে আমার বাবা ছিলেন দ্বিতীয়। আমরা থাকতাম দক্ষিণ কলকাতার হাজরাতে। বাবার বড় দাদা মানে আমার জেঠু তার পরিবার এবং অবিবাহিত ছোট দুই ভাই মানে আমার মেজো আর ছোট কাকাকে নিয়ে থাকতেন আমাদের পৈত্রিক বাড়ী হাওড়ার সাঁতরাগাছিতে। আর  বাবার ঠিক পরের ভাই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বড়ো কাকা পরিবার নিয়ে থাকতেন রাউরকেল্লায়।
অবিবাহিত দুই কাকার মধ্যে মেজ কাকা বিয়ে করতে একেবারেই রাজি ছিলেন না। কলেজ জীবনে কারোর কাছে আঘাত পেয়ে সারা জীবন অবিবাহিত থাকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে ছিলেন। দাদু ঠাম্মি গত হয়েছে বেশ কয়েক বছর হল। কিন্তু বাকি ভাইরা মেজ কাকাকে হাজার বুঝিয়েও কোন লাভ হয় নি। আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীরাও চেষ্টার ত্রুটি রাখিনি। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হয় নি। কিন্তু এতে ছোট কাকার বিয়ের আয়োজনে বিলম্ব হয়ে যাচ্ছিল। তাতে ছোট কাকা যে মনে মনে ভীষণ রুষ্ট ছিলেন সেটা বলাই বাহুল্য।
শেষে নিপীড়িত ছোট কাকা নিজেই নিজের বিয়ে ঠিক করে বসলেন। আমাদের গোটা পরিবারই পণপ্রথা আর জাতপাতের ঘোর বিরোধী। ফলে ছোট কাকার পছন্দ করা পাত্রীকে মেনে নিতে কারোই কোন সমস্যা হল না। এক কথায় সবাই রাজী। রৈ রৈ করে বিয়ের আয়োজনে মেতে উঠল সবাই।
অনেকদিন পর আমাদের সেই পৈত্রিক বাড়িতে বিয়ে। তাই ছোট কাকার বিয়ে নিয়ে আমরা সবাই খুব উল্লাসিত। আমি,মা আর বাবা পোঁছালাম বিয়ের আগের দিন রাতে। কারণ ওই দিনই আমার মাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষাটা ছিল।
বাড়িতে পৌঁছে দেখলাম আমরা বাদে সবাই চলে এসেছে। কাছের দুরের আত্মীয় স্বজন মিলিয়ে বিয়ে বাড়ী জমজমাট। ততক্ষণে রাতের খাবারের সময় হয়ে গেছিল। ঢুকতেই জেঠু বললেন “হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসে যাও, তারপর শুনব পরীক্ষা কেমন হোল”। 
খাবারের জন্য আমি সন্ধ্যে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম। তাই বসতে আর বিলম্ব করলাম না। জায়গা পেলাম - ঠিক সাহেব দাদুর পাশে। 
বয়স সত্তর অতিক্রম করা ব্যক্তির রাতের খাবারের বহর দেখে আমি তো অবাক। শুনেছিলাম উনি খেতে ভালোবাসেন। তাই বলে এত? কমপক্ষে চল্লিশটা লুচি তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চিকেন কসা।
একটা কথা বলা হয়নি। উনি কিছুদিন আগে ওনার ছেলের কাছে আমেরিকা গেছিলেন। ওখান থেকে উনি ওনার দাঁত গুলো বাঁধিয়ে এসেছেন। শুনেছি নকল দাঁতের পাটিটা এতটাই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বানানো যে এটা পড়লে যুবা বয়সে যা চেবানো সম্ভব ছিল না ,তাও চেবানো যায়। সেই শোনা কথাটা যে একশ শতাংশ সত্যি তা তো আমি নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি। শুধু এটাই বুঝতে পারছি না - এই দাঁত কি খিদে আর হজম শক্তিকেও বাড়ীয়ে দেয়? হয়ত হবে, নইলে এই বয়সে চল্লিশটা লুচি কেজি খানেক চিকেন কসা সহকারে রাতের খাবার সম্ভব নয়। আমি তো পনেরটার পরেই হাল ছেঁড়ে দিয়েছি।
মনে মনে সাহেব ঠাম্মি খুব রেগে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সবার মাঝে দাদুকে শাসন করাটা অশোভন দেখাবে ভেবেই চুপ করে ছিলেন। সাহেব দাদুও সেই সুযোগ্যার সদ্ব্যবহার করছিলেন।
খাওয়া চলতেই চলতেই সাহেব ঠাম্মি দু’দুবার এসে সাহেব দাদুকে বলেছেন “রাত করে বেশী খেও না”। প্রতিবারই সাহেব দাদু উত্তর দিয়েছেন “না না আমি বেশী খাচ্ছি না। পুর পেট ভরে খাচ্ছি না। তোমাকে অতো চিন্তা করতে হবে না। আমি বুঝেই খাচ্ছি।” আমি শুধু অবাক হয়ে ভাবছি লোকটা পেট ভরে খেলে কতটা খেত।
পরের দিন খুব সকাল সকাল সবাই উঠে পড়লাম। রৈ রৈ করে দধিমঙ্গল, গায়ে হলুদ কাটিয়ে পৌঁছেগেলাম বিকালে। আমার বাবা আর সাহেব ঠাম্মি ছোটকাকাকে নিয়ে বরের গাড়িতে বেরিয়ে গেল। সাহেব দাদুরই যাবার কথা ছিল। কিন্তু তিনি দুপুরের খাওয়া খেয়ে আর বেরতে চাইলেন না। আসলে খাওয়াটা একটু বেশী হয়ে গেছিল। তাই না ঘুমিয়ে বেরতে চাইছিলেন না।
কনে মানে হবু কাকিমার বাড়ী সেই উত্তর চব্বিশ পরগনার বেড়াচাঁপাতে। সাঁতরাগাছি থেকে বেড়াচাঁপা যেতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগবে। বিয়ের লগ্ন সন্ধ্যেতে হওয়ায় বরের গাড়ী দুপুর তিনটের আগেই বেড়িয়ে গেছে। জেঠু তারা দিচ্ছিলেন যাতে বরযাত্রীর গাড়ীও বিকাল পাঁচটার মধ্যে বেরতে পারে। 

আমারা সবাই বেশ ব্যস্ত হয়েই সাজগোজ করছি। জেঠু আর জেঠিমা আমাদের সাথে যাবেন না, বাড়ীতেই থাকবেন। জেঠুর নারায়ণ শিলা আছে। আজ আবার পূর্ণিমা। এমনিতেই নারায়ণকে দুবেলা ভোগ না দিয়ে, সান্ধ্যা আহ্নিক না করে জেঠু কিছু খান না। আর তাছাড়া প্যান্ডেলের কাজ পুরো শেষ হয় নি। জেঠু দাঁড়িয়ে থেকে সেই কাজটা শেষ করাবে।এদিকে আমাদের সাজগোজ সম্পূর্ণ শেষ। ঘড়ীতেও পাঁচটা বেজে গেছে। কিন্তু বরযাত্রীর গাড়ী এখনও আসে নি। জেঠু খুব অস্থির হয়ে উঠেছেন। প্রায় সারে পাঁচটার সময় গাড়ীটা এলো। লাল রঙের বেশ বিলাসবহুল সুন্দর একটা বাস। কিন্তু গাড়ীর ড্রাইভারকে দেখে জেঠু ভীষণ রেগে গেলেন। “পাঁচু তুই কেন ? মন্টু কোথায়? আর এত দেরিই বা হল কেন?”রোগা ছিপ ছিপে বেঁটে খাটো আমার থেকে তিন চার বছরের বড় পাঁচু চিরুনি দিয়ে তার ঝাঁকড়া চুল গুলো আছড়াতে আছড়াতে উত্তর দিল “মন্টুদার পেট খারাপ। বার বার বাথরুম যেতে হচ্ছে। তাই আমাকে পাঠাল। আমি সঙ্গে কোন হেল্পার পাচ্ছিলাম না বলে দেরি হচ্ছিল।”জেঠু বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন “কিন্তু তুই পারবি ঠিকঠাক চালাতে?”পাঁচু দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিল ”কেন পারব না? আমি তো এখন ফুল ড্রাইভার। লাইসেন্সও পেয়ে গেছি।”এই পাঁচু হল মন্টুদার হেল্পার। মন্টুদাই ওকে নিজের হাতে গাড়ী চালান শিখিয়েছে। মন্টুদা খুব ছোট থেকে ড্রাইভারই করছে। আমাদের এ বাড়ীর সঙ্গে ওর খুব ভাল সম্পর্ক। মাঝে মাঝে জেঠুর কোথাও যাবার হলে ওকে খবর দিলে ও এসে জেঠুর অ্যাম্বাসাডরটা চালায়। পাকা কথার দিন জেঠু আর বাবাকে মন্টুদাই অ্যাম্বাসাডরেই নিয়ে গেছিল বেড়াচাঁপাতে। বরযাত্রী গাড়ী মন্টুদাই জোগাড় করে নিজেই চালাবে বলে ছিল। তাই জেঠুও নিশ্চিন্তে ছিলেন। কারণ কন্যাপক্ষের বাড়ী ছোটকাকা ছাড়া জেঠু ,বাবা আর এই মন্টুদাই চিনত। তাই জেঠু পাঁচুকে আবার প্রশ্ন করলেন “তুই ঠিকঠাক চিনে যেতে পারবি?”পাঁচু মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলে “হ্যাঁ হ্যাঁ , মন্টুদা আমাকে পুরো ছবি একে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই দেখুন না।” সে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দেখাল। জেঠু দেখে বেশ খুশি হলেন। পাচু আরও বলল “রাস্তাটা এক দম সোজা। বেড়াচাঁপা বাজার থেকে ডান দিকে বেঁকে সোজা পুব দিকে। প্রাইমারী ইস্কুলের অপোজিটে -বিরাট উঠানয়ালা তিনতলা বাড়ী।” পাচুর কথায় আশ্বস্ত হয়ে জেঠু গাড়ি ছাড়ার পারমিশন দিলেন। বাস ছাড়ার পর বড় কাকা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন “পৌছাতে পৌছাতে কটা বাজবে কে জানে?” গাড়ী ছাড়ার সাথে সাথেতেই বড় কাকা বাসের ভিডিও সেট এ হিন্দি সিনেমার গান চালিয়ে দিল। আমরা সবাই মজাকরে দেখতে দেখতে চলেছি।কিন্তু কোনা এক্সপ্রেস আর এম-জি রোড এত জ্যাম ছিল যে গাড়ী প্রায় নড়তেই চায়না। তিন ঘণ্টা লাগল ওই দুটো রোড পেরতেই। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত জ্যাম পিছু ছাড়ল না। তারপর জ্যাম কমলেও রাস্তার অবস্থা ভালো না হওয়ায় বাস স্পিড তুলতে পারল না। এগারোটা বেজে যাবার পর আমাদের সকলের মধ্যেই একটা ঝিমুনি ভাব চলে এসেছিল। সবার মুখে চোখে একটা ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি গোছের অভিব্যক্তি।“পাচু আর কতক্ষণ? তোর মন্টুদার ম্যাপ কি বলছে?” বিরক্তি ও ক্লান্তি মেশানো গলায় প্রশ্ন করলেন বড়কাকা। রাস্তার দিকে মুখ রেখেই পাচু উত্তর দিল “মাপ বলছে একটু পরই একটা বাজার পরবে আর সেটা থেকেই ডান দিক বেঁকে যেতে হবে। তারপর সোজা রাস্তা। একটা স্কুল পরবে তার পাশেই বিয়ে বাড়ী।”কথাটা শুনেই আমরা চল্লিশ জন বরযাত্রী জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে রাস্তার সামনে দেখতে দেখতে চললাম। কিছুক্ষণ পর একটু আলো ঝলমলে একটু জনবহুল একটা এলাকা আসতেই পাচু বলল “এই তো বাজার চলে এসছে। এই বার ডান দিক।”বাস ডান দিকে ঢুকে সোজা রাস্তায় চলতে শুরু করল। রাস্তার শুরুর দিকে কিছু বাড়ীতে আলো থাকলেও কিছুটা পর থেকে শুরু হল অন্ধকার। এখানে কি তবে লোডশেডিং চলছে। কিন্তু সেই স্কুল কোথায় ? অন্ধকারে কি করে বুঝব? ঘড়ীতে তখন পণে বারোটা।আরও খানিকটা যাবার পর দুরে দেখতে পেলাম একটা আলো ঝলমলে অনুষ্ঠান বাড়ী।“মনে হচ্ছে ঐ বাড়িটাই হবে।” হাসি হাসি মুখ করে বললেন বড় কাকিমা।বাস কাছাকাছি পৌছাতেই দেখলাম অনুষ্ঠান বাড়ীর লোকজন রাস্তা উপড়েই দাঁড়িয়ে আছে। ওরা হাত দেখিয়ে বাসটাকে পাশের মাঠের মধ্যে ঢুকতে বলল। আমরা খুব খুশি। যাক বাবা একটু দেরি হলেও অবশেষে পৌঁছলাম।

কনে পক্ষের একজন মোটা চেহারার সাদা চুলয়ালা বয়স্ক লোকটি বলল “যখনই শুনলাম কল্যাণীতে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে, তখনি ভেবেছিলাম আপনাদের দেরি হবে। আপনারা খুব জ্যাম পেয়েছেন তো ?”বড় কাকা বললেন “সে আর বলতে।”কিন্তু সাহেব দাদু বিরক্তি নিয়ে বললেন “কি আশ্চর্য ? কল্যাণীতে এক্সিডেন্ট হয়েছে বলে কোনা এক্সপ্রেসে জ্যাম? এই দেশটার কোন দিন উন্নতি হবে না।” সত্যি আমাদের কাছেও ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগছিল।         বিয়ে বাড়ী ঢোকার মুখেই কনে পক্ষের সবাই আমাদের বলছে ব্যাচ ফাঁকা আছে আমরা যেন আগেই খেতে বসে যাই। রাত বারোটায় ব্যাচ ফাঁকা থাকাটাই স্বাভাবিক। এদিকে কিছুক্ষণ আগে কনে নাকি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিয়ে এখন স্থগিত আছে।         তাই বিয়ে শুরু হতে সময় লাগবে। তাই আমাদের খেতে বসে যাওয়াই ভাল। আমার মা সেই বয়স্ক লোকটির কাছে বাবা আর সাহেব ঠাম্মির খোঁজ করছিলেন। সেই লোকটি একটু আমতা আমতা করে বলল “বরের সাথে যারা এসেছিল, তাদের খাওয়া হয়ে গেছে।”সেই শুনে আমরা বিয়ের বাড়ীতে না ঢুকে মাঠের যে দিকে খাওয়া জন্য প্যান্ডেল করা হয়েছিল সেই দিকেই চললাম। বলাই বাহুল্য আমাদের প্রত্যেকের পেটেই ছুঁচোয় ডন মারছিল। তাই শুরুতেই সরাসরি খাওয়ার আমন্ত্রণে আমারা প্রত্যেকেই বেশ খুশী হলাম।বেশ আরাম করেই আমাদের খাওয়া দাওয়া চলছিল। কনে পক্ষ খুব যত্ন নিয়েই আমাদের পরিবেশন করছিলেন। পরিবেশক সবাই কনের আত্মীয় সজন বলেই মনে হল। পোশাকের উপর গামছা পরে হাতে বালতি নিয়ে পরিবেশন করছিলেন। খাবারের মেনু খুবই সাদামাটা। আমাদের সবার মনের মধ্যে একটা খটকা লাগছিল। শুনেছিলাম কনে বাড়ীর আর্থিক অবস্থা খুবই উচ্চ প্রকৃতির। কিন্তু এই প্যান্ডেল, পরিবেশনের লোকজন এবং খাবারে মেনু কোনটাই আর্থিক প্রাচুর্যের পরিচায়ক ছিল না। মুরগি কিংবা পাঁঠা কোন প্রকারের মাংসই ছিল না। আমিষ বলতে শুধুই কাতলা মাছ। সাহেব দাদু কিন্তু সব খাবারই খুব তৃপ্তি করে এক মনে খেয়ে চলেছেন। বলাবাহুল্য পাশে সাহেব ঠাম্মি না থাকায় খাবারের পরিমাণও বেড়ে চলেছে। এমন সময় একটা লোক একটা বড় থালায় রান্না করা একটা প্রকাণ্ড মাছের মাথা নিয়ে হাজির। বাবার সঙ্গে আমি প্রায়ই লেক মার্কেটে যেতাম। কিন্তু কোন দিন এত বড় মাছের মাথা দেখিনি। মাথাটা খুব কম হলেও তিন কেজি হবে। কনেপক্ষের সেই লোকটিই বলল “এটা আমাদের পাড়ার পুকুরের আজকের ধরা সব চেয়ে বড় মাছের। মাছটা বারো কেজি ওজনের।এটা শুধু মাত্র রান্না করা হয়েছে আপনাদের জন্য। কে খাবেন বলুন?”আমরা প্রায় সবাই এক সাথেই ঘাড় নেড়ে জানিয়ে দিলাম না আমরা কেউ খাব না। কিন্তু আমাদের এই সমবেত নায়ের মাঝে আর একটা গলার স্বর প্রকট হল “এটা কি জ্যান্ত মাছের মাথা ?” ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মাছের মাথাটার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন সাহেব দাদু। প্রশ্নটা উনিই করেছেন। কনে পক্ষের লোকটা বলল “এক দম জ্যান্ত মাছের। আমি নিজের হাতে ধরেছি। আপনি খান?”

“দাও দেখি” লজ্জা লজ্জা মুখে বললেন সাহেব দাদু। সাহেব দাদুর খাবারের এই রকম নমুনা দেখে আমরা সবাই বেশ চিন্তিত।          আমার মা আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন "বাড়ীর ভেতরে গিয়ে তোর সাহেব ঠাম্মিকে গিয়ে ডেকে নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি। উনি ছাড়া সাহেব কাকাকে আটকানো মুস্কিল। সত্তর বছরে এই রকম খেয়ে বাসে এতোটা জার্নি করলে অবধারিত অসুস্থ হবেন। তখন বউভাতটাই মাটি হবে।"         আমি ছুটলাম বাড়ীর ভিতরে। কিন্তু কি আশ্চর্য বাবা বা সাহেব ঠাম্মি কাউকেই খুঁজে পেলাম না। সব চেয়ে অবাক হলাম বরের পোশাকে যে বসে আছে সে আমার ছোটকাকা নয়। কি যে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার খুব ভয় করতে শুরু করেছে। কথাগুলো মাকে বলতেই মা বললেন “কেলেঙ্কারি কান্ড। তাড়াতাড়ি তোর বড় কাকাকে ডাক“। ইতি মধ্যে সাহেব দাদু বাদে সকলের খাওয়া হয়ে গেছিল। বড় কাকাকে পাওয়া গেল প্যান্ডেলের পিছনে হাত মুখ ধোয়ার জায়গায়। 

আমরা কিছু বলার আগেই দেখি পাচু বড় কাকাকে ডাকছে। সে আমাদের সঙ্গে খেতে বসে নি। সিগারেট ফুঁকতে গেছিল। পাচুর সঙ্গে একজন স্থানীয় লোক। বড় কাকা কাছে আসতেই পাচু বলল “কাকা, বিরাট একটা ভুল হয়ে গেছে। বারাসাতে আমি টাকি রোডে ঢুকতে গিয়ে ব্যারাকপুর রোডেএ ঢুকে গেছিলাম। আর বেড়াচাঁপা ভেবে নীলগঞ্জে ঢুকে গেছি। এটা না অন্য বাড়ী। আপনারা যে বাড়ী যাবেন এটা সেটা নয়।” স্থানীয় লোকটাকে দেখিয়ে পাচু আরও বলল “এই দাদার পাশেই মুদিখানা দোকান। উনি বললেন এদের বরযাত্রী কৃষ্ণনগর থেকে আসার কথা।

wedding_priests2.jpg

আসলে কল্যাণীতে বিরাট এক্সিডেন্ট হয়েছে তো - তাই হয়ত ওদের গাড়ী আসতে পারছে না। আমি রাস্তাটা পুরো বুঝে নিয়েছি। আপনারা গাড়ীতে উঠে পড়ুন। আমি এবার ঠিকঠাক নিয়ে যাব।” 
এতক্ষণ পর আমার সব কিছু একে একে দুই হল। বড় কাকা বললেন “ইশ, কি বিশ্রী ব্যাপার। চল্লিশটা প্লেট কি কম কথা? লজ্জায় ওদের সামনে যেতে পারব না।"
সেই পাড়ার লোকটি বলল "সত্যি বিশ্রী ব্যাপার। কারণ যখন এদের অ্যাকচুয়াল বরযাত্রী আসবে তখন এরা খেতে দেবে কি? একেই এনার মানে কনের বাবার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। এই বিয়েটাই তো আমরা পাড়ার সবাই চাঁদা তুলে দিচ্ছি। এদিকে বরপক্ষ তো ত্রিশ হাজার টাকা পণ চেয়েছে। সে টাকা এখনও জোগাড় হয় নি।"
লোকটির কথা শুনে আমার প্রত্যেকের মন দুঃখে ভরে উঠল। আমি ছুটলাম সাহেব দাদুর কাছে। গিয়ে দেখি উনি তখনও সেই বিরাট সাইজের মাছের মাথাটাকে বাগে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি কানের কাছে গিয়ে বললাম "দাদু, পাচু আমাদের ভুল করে অন্য বাড়ীতে নিয়ে এসেছে। "
দাদু নির্বিকার চিত্তে বললেন "সেটা আমি খেতে বসেই বুঝেছি। কিন্তু এতো খিদে পেয়েছিল তাই আর মুখ খুলিনি। বুজলে ওরা মানুষ খুব ভালো। কি যত্ন করে খেতে বসাল। তাই আর ওদের কষ্ট দিতে মন চাইল না। " 
আমি বললাম "কিন্তু এখন যদি অ্যাকচুয়াল বরযাত্রী এসে পড়ে?"
উনি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন "ওদের বেড়াচাপার নাম ঠিকানা দিয়ে ওখানে পাঠিয়ে দেব। আমাদের খাওয়াটা না হয় ওরাই খাক। "
এমন সময় বিয়ের আসর থেকে একটা কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। সঙ্গে খুব চেঁচামেচিও হচ্ছে।
সেটা শুনে দাদু বললেন "তুমি গিয়ে দেখত কি হচ্ছে। আমি মুড়টা শেষ করে আসছি। আমাকে মুড়টাকে একটু তৃপ্তি করে খেতে দাও।"
আমি আর কি বলব? আমি এবং আমাদের বাকি সবাই ছুটে গেলাম বিয়ের আসরের দিকে। পাচুর সঙ্গের পাড়ার লোকটি ঠিকই বলেছিল। কনের বাবার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। দেখলাম মাটির ভিতওয়ালা একটা বেড়ার বাড়ীর উঠানে বড় একটা চাঁদোয়া টাঙিয়ে বিয়ের আসর বসেছে। 
আসরের ঠিক মাঝখানে একটা মোটা গোঁফওয়ালা লোক চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল করে উপস্থিত জনতার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছেন। আর মনে মনে গজগজ করে চলেছেন। ওনার সামনে একটা বয়স্ক লোক এবং একজন মহিলা হাঁটু গেঁড়ে হাত জোড় করে ওনার কৃপা পাওয়ার আসায় বসে আছে। মহিলাটি হাউহাউ করে কেঁদে চলেছেন।
দুতিন মিনিট দাঁড়ানর পর উপস্থিত জনতার ফিসফিস কথাবার্তায় এই ঘটমান নাটকের কাহিনী বোধগম্য হল। হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা মানুষ দুটি কনের বাবা ও মা। আর ঐ গুঁফো লোকটা পাত্রের বাবা।
পাত্রপক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা পণ চেয়েছিল। কিন্তু কন্যাপক্ষ বিশ হাজার জোগাড় করতে পেরেছে। কিন্তু বাকি দশ হাজার বলেছে সামনের এক বছরের মধ্যে  শোধ করে দেবে। এতেই পাত্রের বাবা ভীষণ রেগে গেছেন। তিনি এখনই পাত্রকে নিয়ে চলে যাবেন। মেয়ের বাবা মা আত্মীয় সজন এমনকি পাড়া প্রতিবেশীরাও ক্রমাগত অনুরোধ করেছে বিয়েটা সম্পন্ন করতে। কিন্তু পাত্র এবং পাত্রের বাবা দুজনেই তাদের সিদ্ধান্তে অনড়। 
পাত্রের বাবা হুঙ্কার দিয়ে বলল  "এখন একটা বাজে। রাত দুটোয় একটা লগ্ন আছে। এই এক ঘন্টার মধ্যে যদি দশ হাজার টাকা জোগাড় করতে পারেন তো ঐ লগনে মেয়ের বিয়ে হবে। নইলে নয়। এটাই আপনাদের লাস্ট চান্স। নয়ত আমি ছেলে নিয়ে চলে যাবো। আর কোন চান্স দেব না। "
ক্লাস নাইনে আমাদের সিলেবাসে রবীন্দ্রনাথের দেনাপাওনা ছিল। প্রতিবার পড়লেই মনটা কষ্টে ভরে উঠত। নিজের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতাম। বাস্তবে এতো নিষ্ঠুর কোন ছেলের বাড়ীর লোক হবে না। সাহিত্যের খাতিরে হয়ত রবীন্দ্রনাথ একটু রং চড়িয়ে লিখেছেন। আজ এই খানে দাঁড়িয়ে নিজের মনকে দেওয়া সেই সান্ত্বনা কর্পূরের মতো উবে গেল। তাও তো দেনাপাওনায় অন্তত পাত্র বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল। এই ক্ষেত্রে তো সেটাও নয়। 
কাঁদো কাঁদো গলায় কনের বাবা বলল "এক ঘণ্টায় অতো টাকা কোথায় পাব তালোয় মশাই। একটু মেয়েটার কথা ভাবুন। আপনি বিয়েটা করিয়ে দিন। আমি যত তাড়াতাড়ি পারি টাকাটা শোধ করে দেব। "
পাত্রের বাবা হাত নেড়ে, শরীর ঝাঁকিয়ে বলল "ওসব ধার বাকির মধ্যে আমি নেই। আমি এক কথার মানুষ। টাকা ফেললে বিয়ে হবে। নইলে হবে না।"
"আপনি এতো নিষ্ঠুর কেন বলুন তো। ছেলে কি আপনার ব্যবসার জিনিস যে দর দাম করছেন।" যিনি এই কথাগুলো বললেন তার গলার স্বর শুনে আমাদের পক্ষের সবাই বেশ হতচকিত হয়ে উঠল। কারণ কথাগুলো বলেছেন সাহেব দাদু। 
পাত্রের বাবা তো বটেই সেই সঙ্গে কনের বাবা মাও হতচকিত হয়ে উঠল।
পাত্রের বাবা কর্কশ গলায় বলল "কে আপনি? এতো জ্ঞান মারছেন কেন?"
আমার শান্ত স্বভাবের মেজো কাকু পাত্রের বাবার এই রকম অভদ্র আচরণে তীব্র রেগে তেড়ে গিয়ে বললেন "মুখ সামলে কথা বলবেন।"
সাহেব দাদু মেজো কাকাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন -" শুনুন মশাই। আমার জ্ঞান আছে তাই মারছি। আপনার মতো অজ্ঞানী নির্লজ্জ নই। আমি কনের দূরসম্পর্কের জ্যাঠা। আপনার টাকা আমি দিচ্ছি।"
সাহেব দাদু নিজের পাঞ্জাবির গলা থেকে সোনার চারটি বোতাম খুলে পাত্রের বাবার হাতে দিয়ে বললেন "এর দাম বিশ হাজার টাকার বেশী হবে। নিন এবার বিয়েটা শুরু করান।"
পাত্রের বাবা সেই একই রকম কর্কশ গলায় বলল "আমাকে কি বোকা পেয়েছেন। এসব ইমিটেসন নিয়ে আমি বিয়ে করাতে রাজি হয়ে যাবো?"
মেজো কাকু আবার রেগে বললেন "কাকে কি বলছেন আপনি জানেন? এগুলো ইমিটেসন কেন হতে যাবে। পিওর গোল্ড।"
পাত্রের বাবা বলল "আমি ক্যাশ চাই। নইলে আমরা যাচ্ছি।"
সাহেব দাদু এবার খুব রেগে গেলেন। কনের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন "এই রকম কসাইকে কোথা থেকে জোটালেন আপনারা। এরা তো আপনার মেয়েকে নিয়ে গিয়েও শান্তিতে রাখবে না।"
ভিড়ের মধ্যে থেকে কয়েক জন দাদুকে সায় দিয়ে বলল "ঠিকই বলেছেন । নিয়ে গিয়ে কারণে অকারণে বাপের বাড়ী থেকে টাকা আনার জন্য আবার চাপ দেবে।"
অন্যরা বলল "হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক। সেটাই করবে।"
এসব শুনে পাত্রের বাবা রেগে বলল "আমারা এতো খারাপ হলে আমরা তাহলে চলে যাচ্ছি? "
ভিড়ের মধ্যে থেকে সেই মোটা সোটা চেহারার সাদা চুলওয়ালা বৃদ্ধ লোকটি বলল "শুধু মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা আপনার এই বেয়াদপি সহ্য করছি। নইলে অনেক আগেই আপনার চলে যাবার ব্যবস্থা করে দিতাম। এক্ষণিই হাতের কাছে একটা ভালো ছেলে পেলে আপনার বেয়াদপির যোগ্য জবাব দিয়ে দিতাম।" 
বৃদ্ধ লোকটি সাহেব দাদুর দিকে তাকিয়ে বলল "বুঝলেন মশাই মেয়েটার গায়ের রং একটু চাপা আর গরিব ব্রাহ্মণ ফ্যামিলি। তাই সহজে পাত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষে এরা রাজি হওয়াতে আমরা গ্রামের সবাই চাঁদা তুলে মেয়েটার বিয়ের ব্যবস্থা করছিলাম। আর এই সুযোগে এই লোকটি কসাইয়ের মতো ব্যবহার করে চলেছে।"
সাহেব দাদু মেজো কাকার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন "বিজন বাবা, আর বৈরাগী হয়ে থাকিস না। এই দুঃখী মেয়েটাকে এই কসাইদের হাত থেকে তুই বাঁচা। আজ এই অভাগা মেয়েটাকে তুই উদ্ধার কর।"
এই রকম আচমকা অনুরোধে মেজো কাকা কেমন থতমত খেয়ে বললেন "আমি কি করব?"
আমার মা আর বড়ো কাকিমা এগিয়ে এসে বললেন "হ্যাঁ হ্যাঁ তুমিই পারবে। রাজি হয়ে যাও ঠাকুরপো। আর অমত কর না। এই মেয়েটার কথা ভাবো।"
ইতিমধ্যে বড়ো কাকা বরের মাথা থেকে টোপরটা খুলে মেজো কাকার মাথায় পড়িয়ে দিয়ে বললেন "এই তো বেশ মানিয়েছে।" 
উপস্থিত সবাই তীব্র কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের দিকে। সাহেব দাদু তখন আমাদের বিস্তারিত পরিচয় দিয়ে, পাচুর দিকভ্রান্ত হয়ে এই বাড়ীতে এসে পড়ার পুরো কাহিনী বর্ণনা করলেন। 
সাহেব দাদুর এই মেজো কাকাকে পাত্র করার প্রস্তাবে কনের বাবা- মা আনন্দে দাদুর সামনে কেঁদে ফেললেন।
আপনারা হয়তো ভাবছেন গল্পটা এখানেই একটা হ্যাপি এন্ডিং হয়ে গল্পের নটে গাছটি এখানেই মুড়িয়ে গেল। না, একেবারেই সেটা হল না। কেন হল না সেটাই এবার বলছি। 
আমরা বেশ আনন্দে ছিলাম অবশেষে মেজো কাকার আইবুড়ো নাম ঘুচলো। একটা নির্ভেজাল আনন্দের আবেশে আমারা সবাই বেশ মজেছিলাম। 
হঠাৎ বিদ্রোহীর ভঙ্গিতে মেজো কাকা বললেন "তোমরা মেয়েটির মতামত নিচ্ছ না। এক তরফা ডিসিশন নিচ্ছ। এটা খুব অন্যায় হচ্ছে। আমি মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে চাই।"
সাহেব দাদুও দেখলাম তাতে সায় দিলেন। বললেন "হ্যাঁ, বিজন ঠিকই বলেছে। আমিও মেয়েটির সাথে কথা বলতে চাই।"
অমনি কনের মা-বাবা দুজনেই তড়িঘড়ি  বলল "ওর মতামত মানে আমাদের মতামতই। মেয়ে আমার বড় বাধ্য।"
সাহেব দাদু বললেন "তবু মেয়ের সাথে একবার কথা হওয়া দরকার।"
সবাই তখন চলল কনে অসুস্থ হয়ে যে ঘরে ছিল সেই ঘরের দিকে। ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। 
কয়েকজন পাড়া প্রতিবেশী দরজায় ঠকঠক করে ডাকতে লাগল "এই মিনা, মিনা"।
এত কোলাহলের মধ্যে একটা জিনিসই খারাপ লাগলো। হঠাৎ কনের মা আমার কানের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল- "বাবা, তোমার দাদু বললেন তোমাদের টাইটেল রায়। তা তোমরা কি ব্রাহ্মণ না কায়স্ত?”
আমরা ব্রাহ্মণ জেনে ভদ্র মহিলা খুব স্বস্তি পেলেন। কিন্তু ওদিকে কনের ঘরের সামনে বেশ ভিড় জমে গেছে। অনেক ডাকাডাকির পরেও কনে কিন্তু দরজা খুলল না। উপস্থিত সকলের মুখে চোখে তখন এক অজানা আশঙ্কার ছাপ। 
সাহেব দাদু বললেন "ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না। দরজা ভেঙ্গে ফেলুন।"
সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোকজন সম্মিলিত ভাবে দরজায় গুরুতর রকমের ধাক্কাধাক্কি করে দরজা ভেঙ্গে ফেলল। দরজা ভেঙে ঢুকতেই এক মর্মান্তিক দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠলো। কণে অচৈতন্য অবস্থায় পরে আছে। তার মুখ থেকে সাদা ফেনার মতো কিছু বেরিয়ে আসছিল। 
তীব্র আশঙ্কায় সাহেব দাদু চেঁচিয়ে উঠলেন "এ তো বিষ খেয়েছে মনে হচ্ছে। এখনি হসপিটাল নিয়ে যেতে হবে।"
ঘটনার আকস্মিকতায় উপস্থিত সকলে দিশেহারা হয়ে পড়ল। কণের বাবা-মা "ওরে মিনা, এ তুই কি করলি" বলে তীব্র কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। 
পাড়ার কিছু লোক কনেকে নিয়ে হসপিটালে ছুটল। পিছন পিছন আমরাও ছুটলাম।
এদিকে বরপক্ষের বাড়ির লোকদের অবস্থা খুব খারাপ। পাড়ার লোক তাদের এই মারে তো সেই মারে। সাহেব দাদু বললেন "এদেরকে ধরে রাখুন। আগে মেয়েটার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে আসি। তারপরে এদের পুলিশে দেবার ব্যবস্থা করছি।"
সেদিনের অবশিষ্ট রাতটুকু আমাদের হসপিটালের সামনেই কাটল। হসপিটালে পৌঁছাতেই ডাক্তার বাবুরা কনের মুখ দিয়ে পাম্প করে সমস্ত পাকস্থলী ওয়াশ করল। সমান তালে চলল স্যালাইন আর ইনজেকশন। শেষে ভোরের দিকে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হল। কনেকে ভর্তি করে নেয়া হল। কিন্তু কনে তখনও অচৈতন্য। ডাক্তার বাবুরা বলল "বিষক্রিয়া কাটলেই জ্ঞান ফিরবে।"
কনের জ্ঞান ফিরে আসার প্রতীক্ষায় প্রায় শ'দুয়েক লোক হসপিটালের চাতালে বসে রইলাম। পাড়া প্রতিবেশীদের নিজস্ব কথোপকথনে জানতে পারলাম আরও এক করুণ কাহিনী।
মেয়েটি একটি ছেলেকে ভালবাসত। সে নিচু জাত হওয়াতে তাকে বাড়ির লোক মেনে নেয়নি। এমনকি প্রেমিক ছেলেটিকে বিশ্রীভাবে অপমান করে পাড়া থেকে তারিয়ে দিয়েছে কনের বাবা-মা এবং তাদের বেশ কিছু ক্ষমতাবান আত্মীয় স্বজন।
সেই মোটা সোটা চেহারার সাদা চুলওয়ালা বৃদ্ধ লোকটি সাহেব দাদুকে জানাল "একে তো মেয়েটির এই বিয়েতে মত ছিল না। তার উপর সকলের সামনে পাত্রপক্ষের এই অপমান - মেয়েটা নিতে পারেনি। ওর মা বাবা যদি এই সব জাতপাত না নেমে যদি ওই ছেলেটির সঙ্গে বিয়ে দিত - তাহলে হয়ত মেয়েটা সুখীই হত। "
কথাগুলো শুনে সাহেব দাদু খুবই কষ্ট পেলেন। উনি নিজে গিয়ে কনের মা বাবকে অনেক করে বোঝালেন। শেষে ওনারা সাহেব দাদুকে কথা দিল - মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠলে ওনারা মেয়ের সেই প্রেমিকের সাথেই বিয়ে দেবে।
সাহেব দাদু বললেন "তবে আর শুভ কাজে দেরি কেন? ছেলেটিকে ডেকে আনুন। এই মণ্ডপেই শুভ কাজ সম্পন্ন করে তবেই আমরা এখান থেকে বিদায় নেব।"
পাড়া-প্রতিবেশীরাও সাহেব দাদুর কথায় খুব খুশী হল। তারাই সেই প্রেমিককে খুঁজে বার করে হসপিটালে নিয়ে এলো।
ওদিকে বর এবং তাঁর বাবা দুজনেরই সুমতি ফিরেছে।  তারাও এখন পনের অবশিষ্ট টাকা ছাড়াই মেয়েটিকে বিয়ে করতে রাজী।
আমি মেজো কাকার দিকে তাকিয়ে দেখলাম - তিনিও বেশ চিন্তিত। কিন্তু হঠাৎ নার্স এক ভয়ঙ্কর খবর দিয়ে গেল। কনের বাড়ীর লোককে ডাক্তার ডেকে পাঠিয়েছে - হঠাৎ করে কনের ব্লাড প্রেশার নামতে শুরু করেছে। পালস রেটও কমে যাচ্ছে ক্রমশ। 
আমরা সবাই খুবই উদ্বিগ্ন। সবাই মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছিল। কিন্তু কনের শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে এগোতে লাগলো। শেষে বেলা এগারটা নাগাত আমাদের সবাইকে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে রেখে মেয়েটি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেল।
একটা সমবেত কান্নার রোল উঠল হাসপাতাল চত্বরে। আমরা এদের কাউকে ছিনতাম না। কিন্তু এই কয়েক ঘণ্টার আলাপেই মেয়েটির মৃত্যুতে আমাদের মন একটা স্বজন হারানোর বেদনায় শোকার্ত হয়ে উঠল। 
আমার মা বললেন "ভাগ্যের কি পরিহাস না? কাল রাতে মেয়েটাকে বিয়ে দেবার জন্য কতো কাকুতি নিমতি। আর আজ তিন তিনটে ছেলে মেয়েটাকে বিয়ে করতে রাজী। অথচ মেয়েটাই নেই।"
মেয়েটিকে শেষ যাত্রায় বিদায় করে আমারা যখন বাসে উঠলাম সূর্য তখন অস্তাচলে। 
 

প্রবন্ধ

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

 

বিবেক চেতনায়

জাগ্রত মন

মনোরঞ্জন সাঁতরা 

স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের সুপ্ত চেতনাকে তার শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বাণী দিয়ে জাগ্রত করেছিলেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি বেদান্ত ও যোগ দর্শন পাশ্চাত্যে প্রচার করেন। উত্তর কলকাতার সিমলা এলাকার দত্ত পরিবারের ছেলে নরেন্দ্র নাথ দত্তই হয়েছিলেন পরবর্তী জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ।
তার জন্ম ১৮৬৩ সালের ১২ই জানুয়ারি। মা ভুবনেশ্বরী দেবী এবং বাবা বিশ্বনাথ দত্ত দুজনেরই যথেষ্ট প্রভাব ছিল তাঁর জীবনে।

কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে কিছুদিন পড়াশোনা করার পর স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন তিনি। পাশ করার ঠিক দুবছর আগে আঠারো বছর বয়সে তিনি যোগসাধক ও দার্শনিক রামকৃষ্ণ পরমহংসের সান্নিধ্যে আসেন। স্বামী প্রভানন্দ কথায়  খুব অল্প বয়স থেকেই বিবেকানন্দের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখা গিয়েছিল।রামকৃষ্ণ পরমহংসের সান্নিধ্য বিবেকানন্দের জীবন দর্শনকে পুরোপুরি বদলে দেয়।এর মধ্যে কিছু ছিল তাঁর জন্মলব্ধ আর কিছু তিনি যে পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তার অবদান। কিন্তু তাঁর জীবনে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এনেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।

বিবেকানন্দের সঙ্গে রামকৃষ্ণের যোগাযোগের সময়কাল ছিল মাত্র পাঁচ বছর।

প্রথমদিকে নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংসকে গুরু বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। এমনকি তার চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশও করেছিলেন। কিন্তু রামকৃষ্ণ পরমহংসের ব্যক্তিত্বের প্রতি পরে তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন ও তাঁকে গুরু হিসাবে মেনে নেন।

স্বামী প্রভানন্দ বলেছেন এই অল্প সময়ে গুরু শিষ্যের মধ্যে যেরকম সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সেটা ছিল খুবই বিরল: "দুজন দুজনকে নানাভাবে যাচাই করে দেখেছেন।"
রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ ভারতের আর্থ সামাজিক অবস্থা দেখার জন্য স্বামী বিবেকানন্দ প্রায় পাঁচ বছর সারা ভারত ঘুরে বেড়ান।
তাঁর ভারত ভ্রমণের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছিলেন এবং সেসব জায়গায় শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, নির্ধন সর্ব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশেছিলেন। যার ফলে তাঁর চরিত্রে অসাধারণ কিছু গুণ এসেছিল। তাঁর জীবনদর্শন পরিপুষ্টতা লাভ করেছিল। এই সব কিছু নিয়েই গড়ে উঠেছিলেন বিবেকানন্দ।

তাঁর ভারত ভ্রমণের সময় বিবেকানন্দ সন্ন্যাসীর মত প্রধানত ভিক্ষা করে জীবনধারণ করতেন এবং মূলত পায়ে হেঁটে, আর কখনও বা অনুরাগীদের কেটে দেওয়া টিকিটে রেলপথে ভ্রমণ করতেন।

বিবেকানন্দ সারা জীবন ভারতীয় সঙ্গীতের একান্ত অনুরাগী ছিলেন। নিজে গান গাইতেনও ভাল।

swamibibek.jpg

মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি সন্ন্যাসী হবার সঙ্কল্প গ্রহণ করেন।বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্মসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ যখন দেন তাঁর বয়স তখন তিরিশ। ১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর ওই বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় তিনি ভারত ও হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। শিকাগো ধর্মসভায় তাঁর বক্তৃতা ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। এরপর তিনি আমেরিকা, ইংল্যাণ্ড ও ইউরোপে হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অসংখ্য সাধারণ ও ঘরোয়া বক্তৃতা দেন এবং ক্লাস নেন।

দু-বার তিনি ইংল্যাণ্ড ভ্রমণ করেন ১৮৯৫ এবং ১৮৯৬ সালে এবং সেখানে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এক আইরিশ নারী মিস মার্গারেট নোবেলের, যিনি পরে পরিচিত হন ভগিনী নিবেদিতা নামে। বছর দুয়েকের মধ্যে তিনি কলকাতায় চলে আসেন স্থায়ীভাবে এবং স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালের পয়লা মে আনুষ্ঠানিকভাবে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তার এবং চিকিৎসা ও দাতব্যকাজের মধ্যে দিয়ে জনগণের সেবার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল এই সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলন।
লেখক ও গবেষক, অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর মতে স্বামী বিবেকানন্দ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন শুধু বাংলায় বা ভারতবর্ষে নয়, সারা পৃথিবীতে।
ত্যাগে, তপস্যায়, আনন্দে, যন্ত্রণায়, মানুষের প্রতি ভালবাসায় তিনি উন্মোথিত ছিলেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে তিনি বেদান্ত ভিত্তিক সেবাধর্মের প্রবর্তন করেন। সেবা হয়ে আসছে অনেকদিন ধরে। কিন্তু মানবসেবাকে একটা ধর্মসত্য রূপে উপস্থিত করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।
"তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল -বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর, জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।"
বিবেকানন্দ ভারতের সর্বব্যাপী দারিদ্রের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন, এই দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্যই ভারতে জাতীয় নবজাগরণের প্রয়োজন আছে।
স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে গবেষণা করেছেন সাহিত্যিক শঙ্কর। বিবেকানন্দের উচ্চ চিন্তাধারা, আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা অনেক মানুষের জন্য প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
বিবেকানন্দের জীবন আমার মনে হয় আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্যে বেঁচে থাকার একটা ওষুধ। সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে কী করে আত্মপ্রকাশ এবং আত্মবিকাশের চেষ্টা করা যায় তা তিনি দেখিয়ে গেছেন।

মাত্র উনচল্লিশ বছরে তাঁর জীবনাবসান হয় ১৯০২ সালের চৌঠা জুলাই।

 

গল্প

Comments

Top

মার্চ ২০২২ সংখ্যা 

ঘন্টাকর্ণ
চন্দন চ্যাটার্জি

তার আসল নাম ঘন্টেশ্বর দাস। কিন্তু লোকে তাকে ঘন্টাকর্ণ বলে বেশি জানে। মোটা গোলগাল চেহারা, গায়ের রঙ কাল, থাকে বাগবাজার এলাকায়। বাগবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাঠ শেষ করে, শ্যামবাজার এস. ভী. ইন্সটিটিউশন থেকে উচ্চমাধ্যমিক পড়েছে। তার বাবা ব্যাঙ্কশাল কোটের মুহুরী। আসলে কোটের সামনে ঢুকতে গেলে কিছু লোক আছে যারা চারদিক থেকে ঘিরে ধরে, এবং বিভিন্ন প্রশ্নের বাণে জর্জরিত করে, যেমন কি দরকার আছে এভীডেভীট করবেন? স্ট্যাম্প পেপার লাগবে? নোটারি করার আছে? তা হলে আমার সঙ্গে আসুন। ঘন্টেশ্বরের পিতা হচ্ছে এদের মধ্যে একজন। কাজেই তার যে রোজগার খুব একটা বেশি নয় সেটা বলাবাহুল্য বাড়িটা নিজেদের তাই কোনরকমে খাওয়া পরা চলে যায়। বাড়িতে ও তার বাবা-মা থাকে। স্কুল স্পোর্টসে সে প্রায় সব ইভেন্টে নাম দিতো। ১০০ মিটার রেসেতে সবাই যখন কমপ্লিট করত ও তখন অর্ধেক রাস্তা পার করতে পারে না। এটা  তার ভারী  শরীর যেমন একটা কারণ তেমনি শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যাও একটা কারণ। ঘণ্টাকর্ণ কখনোই নিশ্বাস প্রশ্বাসকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। একবার তো ওয়েট লিফটিংএর সময় পিছন থেকে তার প্যান্ট ছিড়ে যায় তাও সকলের সামনে সে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। অবশ্য তখন সে ক্লাস সিক্সে পড়তো। যদি কেউ ওকে বলতো তুই তো কোন বছর কোন স্পোর্টস ইভেন্টে কোন রেঙ্ক করতে পারিস না, তা হলে সব ইভেন্টে নাম দিস কেন। তখন সে একটা খুব সুন্দর জবাব দিত ইভেন্টে অংশ নেওয়াটাই বড় কথা, হারি জিতি সেটা বড় কথা নয়, আজ হারছি কিন্তু অন্যদিন হয়তো জিতবো। হ্যাঁ এটাকেই বলে স্পোর্টসম্যান স্প্রিরিট।
এত সবের মধ্যে তার অংকের মাথা ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। 
ক্লাসের ছেলেরা যখন সাতের নামতা মুখস্ত বলতে হোঁচট খায় ও তখন সতেরও আঠারও এমনকি কুড়ি পর্যন্ত নামতা এক নাগাড়ে বলে যেতে পারত। এইজন্যে অংকের টিচার বাসুদেববাবুর খুব প্রিয় ছাত্র ছিল। ও যখন ক্লাস এইটে পড়ত তখন ক্লাস নাইনের অংক করতে পারত। ওর মনে হতো যেন অংকের বই দরকার আর অন্যসব বইয়ের কোন দরকারই নেই, বিশেষ করে ইতিহাস। ইতিহাস বইটা তার কাছেএকটা জঞ্জাল ছাড়া কিছু নয়। কে কোন খ্রিস্টাব্দে কি কাজ করেছে তার ফল কি হয়েছে সেইটা আজকে জেনে কি লাভ আছে।  আমরা তো সামনের দিকে এগোছি। তাহলে ইতিহাস পড়ে পিছনের দিকে তাকাবার কি দরকার। এ বিষয়ে সে তো একবার ইতিহাস স্যারকে প্রশ্ন করেছিল। স্যার বলেছিলেন তোকে যদি নম্বর পেতে হয় তাহলে এটা তোকে জানতে হবে। তাছাড়া ইতিহাস পড়লে তুই পূর্বপুরুষদের কথা তাদের ধ্যানধারণা, চিন্তাধারা এগুলো জানতে পারবি। এটা না জানলে তুই ভবিষ্যতে চলবি কি করে। যাইহোক এইকথা তার কিন্তু মনে ধরে নি। 
অংক দিয়ে সে অনেক সময় অনেককে বোকা বানিয়ে দিয়েছে। তার দু একটা উদাহরণ বলতে পারি। একবার সায়েন্স টিচার আসার আগে সে ব্ল্যাকবোর্ডে দুটো সমীকরণ করে রেখে ছিল কতকটা এইরকমঃ
যদি      0  =  0                                          বা,  1   =  1 X 4
বা,    1 X 0   =  1 X 0                                বা,   1  =  4
বা,   1 X (2-2)   =  1 X (4-4)                    এইটা কি ঠিক  ?
বা,   1 X (2-2)   = 1 X { (2)2 - (2)2}         আর একটা ছিল
বা,   1 X (2-2)   = 1 X (2-2)(2+2)            যদি -2 > -3
                 1 X (2-2)(2+2)                     বা, -2 X-2 > -3 X-2
বা,    1  = ---------------                          বা, 4 >6
                      (2-2)
বা,   1   =   1 X (2+2)                               এইটা কি ঠ

বিজ্ঞানের টিচার  তো এটা দেখে প্রথমে রেগে গেলেন পরে ঘণ্টাকর্ণের বুদ্ধির তারিফ করে ছিলেন। 

আরেকবার একটা চায়ের দোকানে বসে, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিছিল সে একটা প্রবলেম তৈরি করে সেটা সকলকে জানাল।
সেইটা এরকম কোন একটা রেস্টুরেন্টে খাবারের জন্য তিন বন্ধু ঢুকলো খাওয়ার শেষে ওয়েটার তাদের বিল দিল। তিরিশ টাকা হয়েছে। প্রত্যেকে দশ টাকা করে ওয়েটারকে দিল। ওয়েটার তিরিশ টাকা ম্যানেজারবাবুকে দিল। ম্যানেজারবাবু একটু দেখে বললেন আরে ভুল হয়ে গেছে এতে পঁচিশ টাকার বিল হবে। তখন তিনি পাঁচ টাকা ফেরত দিয়ে দিলেন ওয়েটারকে। ওয়েটার ভাবল পাঁচ টাকা কিভাবে তিন জনের মধ্যে কিভাবে ভাগ করব। তার থেকে আমি দুই টাকা নি, বাকি তিন টাকা ওদেরকে ফেরত দি। ওরা এক টাকা করে পাবে।এখন প্রশ্নটা হল তিনজন লোক এক টাকা করে ফেরত পেয়েছে। তাহলে তারা নয় (9) টাকা করে দিয়েছে। নয় গুনিতক তিন হল সাতাশ টাকা, তার কাছে আছে দুই টাকা তাহলে উনতিরিশ টাকা। কিন্তু বিল ছিল তিরিশ টাকার। তাহলে এক টাকা গেল কোথায়।