• ভারতে দেবী আরাধনার ইতিবৃত্ত - সুবিমল চক্রবর্তী

  • রবীন্দ্রযুগে নারীর অগ্রগতি - পারোমিতা চট্টোপাধ্যায় 

  • এসো গো - স্বাতী মিত্র 

  • গঙ্গার নিরন্ন মানুষেরা - আশরাফ উদ্দিন আহম্মদ 

  • সাচ্চা ঝুটা - শাশ্বতী ভট্টাচার্য

  • সোমেন চন্দের জীবন সম্মন্ধে তথ্যচিত্রের খসরা - দিলীপ মজুমদার

  • স্বাধীনতার সঙ্কট - সুদীপ্ত বিশ্বাস 

  • রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনী – সাহিত্য না অন্য কিছু? ​সুব্রত মজুমদার 

  • বাড়িয়ে দাও তোমার হাত - সনোজ চক্রবর্তী 

  • ঘাটালের ঐতিহ্যের ইতিহাস ভাসাপুল - সনোজ চক্রবর্তী

  • কচুরিপানা - সুস্মিতা দত্ত 

  • বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ - সুবিমল চক্রবর্তী 

প্রবন্ধ আলোচনা - ১

 

                       ভারতে দেবী

আরাধনার ইতিবৃত্ত​​

সুবিমল চক্রবর্তী

  ...প্রাচীন কালের সিন্ধুনদের উপত্যকায় যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সেই সভ্যতায় দেবীর আরাধনা প্রচলিত ছিল। সাড়ে চার থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে যাযাবর আর্যরা ভারত আক্রমণ করেএবং ভূমিপুত্রদের বশীভূত করে। সিন্ধুসভ্যতার দেবী আরাধনা নতুন বসতিস্থাপনকারী আর্যরা মাধ্যমে প্রচুর বিস্তার লাভ করে...

  প্রাচীন কালের সিন্ধুনদের উপত্যকায় যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সেই সভ্যতায় দেবীর আরাধনা প্রচলিত ছিল। সাড়ে চার থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে যাযাবর আর্যরা ভারত আক্রমণ করে এবং ভূমিপুত্রদের বশীভূত করে। সিন্ধুসভ্যতার দেবী আরাধনা নতুন বসতিস্থাপনকারী আর্যরা মাধ্যমে প্রচুর বিস্তার লাভ করে। শুধু তাই নয়, আরাধনার আচার অনুষ্ঠান সমূহ অনেক জটিল হয়ে ওঠে। আর্যরা অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল প্রধানত গবাদিপশু পালন। সম্ভবত কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞানই ছিল না। কিন্তু তারা ছিল শক্তিশালী যোদ্ধা, তাই স্থানীয়দের পরাভুত করতে পেরেছিল সহজেই।

  যাযাবর বৃত্তির চেয়ে একজায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে কৃষি কাজে মনোনিবেশ করলে যে নিরাপত্তা পাওয়া যায় এই সত্যটি তারা ক্রমশই উপলব্ধি করতে থাকে। তাই তারা কৃষিকাজে পারদর্শী হয়ে উঠতে থাকে। গঙ্গা ও যমুনা নদী বিধৌত ভারতের উর্বর ভূমি সহজেই যে পর্যাপ্ত ফসল ফলায় তা দেখে তারা অভিভূত হয়ে পড়ে। যাযাবরদের জন্য এটা ছিল একটা নূতন অভিজ্ঞতা। এই প্রথমবারের মত তাদের খাদ্য সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চলতে থাকে। অতএব, ‘পৃথিবী’—যা তাদের জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করে তাদের কাছে হয়ে ওঠে প্রশংসিতা এবং পরিগণিত হয় দেবী হিসেবে। ‘পৃথিবী’ হ’ল উর্বরা নারীদাত্রী। তাদের কাছে এই দেবী ছিল মায়ের মত যে মা তাদেরকে এবং তাদের গবাদিপশুসমুহকে পালন করে এবং যার কৃষিভূমি তাদের নানাবিধ সাধ-আহ্লাদ এবং যাবতীয় আমোদ-প্রমোদকে নিশ্চিত করে তোলে। শস্য পাকার সময় কৃষিজমিতে তারা আবিষ্কার করল সোনালী স্তনযুক্তা এক নারীকে যে নারী থেকে উৎসারিত হচ্ছে সমস্ত আশীর্বাদ এবং সুখ।

  অথর্ব বেদই হচ্ছে প্রথম বই যার মধ্যে রয়েছে ভূমি হিসেবে দেবী পৃথিবীর বিস্তারিত বর্ণনা। অপূর্ব সুন্দর একটা মন্ত্রের মাধ্যমে এই বেদে এই ভাবে এটি প্রকাশিত হয়েছে, 'অতীত ও বর্তমান কালের সমস্ত রাজাদের পত্নী এই দেবী আমাদের আয়ত্তের মধ্যে এনে দিন ভূমি। তিনি ধারণ করেন সবকিছু, লুক্কায়িত সমস্ত ধনরত্নের তিনিই আধার, সুঠাম স্তনযুক্তা এই দেবী যা কিছু জঙ্গম তার সব কিছুরই রক্ষাকর্ত্রী। মধুর জন্য এই দেবীকে আমরা দোহন করব, তিনি আমাদের উপর বর্ষণ করুন অপার মহিমা। এই ভূমি-যিনি আমার মা আমাকে দুগ্ধ দান করুন, দুগ্ধ দান করুন তাঁর সন্তানকে। তাঁর পাহাড় সমূহ, বরফাচ্ছাদিত পর্বতমালা, এবং তাঁর অরণ্যানী আমার জন্য আনন্দস্বরূপ হয়ে থাক। পীতাভ, কৃষ্ণকায়, বিচিত্র কারুকাজময়, লোহিত-সমস্ত বর্ণের অধিকারিণী এই কৃষিভূমিতে, এই ধরিত্রীতে যা কিনা ইন্দ্র কর্তৃক সুরক্ষিত আমি যেন নিরুপদ্রব, নিরুদ্বেগ এবং অক্ষত জীবন যাপন করতে পারি। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যে মরণশীল প্রাণীরা বিচরণ করে। তিনি ধারণ করেন দ্বিপদ ও চতুষ্পদ জীবসমুহকে তোমার ভেতর থেকে উৎসারিত হয় যে সুরভি, হে  দেবী পৃথিবী, সেই সুরভি উদ্ভিদ ও জল তাদের নিজেদের মধ্যে ধারণ করে।'

  ধরিত্রীর এই প্রাচুর্য আর্যদের সমৃদ্ধিশালী করে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের মধ্যে একটা ভয় বেড়ে যায় যে, অন্যান্য শত্রুভাবাপন্ন যাযাবরগোষ্ঠী অথবা দেশীয় বাসিন্দারা বা ভূমিপুত্ররা জোরপূর্বক তাদের কাছ থেকে ভূমি কেড়ে নেওয়ার জন্য তাদেরকে আক্রমণ করতে পারে। তাদের ভুমি এবং শস্যভাণ্ডার লুটতরাজ এবং অন্যান্য উপদ্রবের কারণে বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা সর্বদাই থেকে যায়। অপার উৎকর্ষ, ধনসম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী যেন দেবী পৃথিবীর স্থান গ্রহণ করার গৌরব নিতে চাইলেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আযরা একটা উভয়সঙ্কটের সম্মুখীন হল।

আর্যরা যে সময়টাতে উত্তর ভারত দখল করে নিয়েছিল, সেই সময় এই এলাকায় যারা বসবাস করত তাদের অর্থনৈতিক জীবন নির্ভরশীল ছিল কৃষিকাজের উপর। তারা উপাসনা করত তাদের শস্য দেবীকে। এই দেবীর প্রারম্ভিক নাম ছিল লক্ষ্মী, কারণ এই দেবী যুক্ত ছিলেন কর্দম ও জলকণার সঙ্গে এবং তিনি ছিলেন আর্য পূর্বকালীন সময়ের কৃষিকর্মও বৈষয়িক সমৃদ্ধির প্রতীক। পররতীকালে উত্তর ভারত দখলের পর আর্যরা যখন চাষবাসের পদ্ধতি আয়ত্ত করল এবং নিজেরাই যখন তাদের নিজেদের জন্য ফসল উৎপাদন করতে শিখল, তখন বিজিতদের মত তারাও সবকিছু উৎসর্গ করল লক্ষ্মীকে। কিন্তু তাদের সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হতে পারত শুধুমাত্র আর্যরা পূর্বকালীন চাষবাসের দেবীকে অর্থাৎ লক্ষ্মীকে চূর্ণবিচূর্ণ করে, পরাস্ত করে এবং বিতাড়িত করে।

ফলত আর্যরা পূর্বকালীন সময়ের লক্ষ্মীর নাম দেওয়া হল অলক্ষ্মী এবং এই দেবীকে এখন দেখা হল একটা অপশক্তি হিসেবে। অত্যন্ত অমার্জিতভাবে এই অলক্ষ্মীকে তৈরি করা হল কাদা, জল এবং গোময় দিয়ে। আর্য পূর্ব কালীন দেবী

করিষিনীর কথা স্মরণে রেখে এই অবয়ব গড়ে তোলা হল। এখানে উল্লেখ্য যে, করীষ শব্দের অর্থ গোময় অর্থাৎ গোবর। এই দেবীর হাতে শস্য ঝাড়ার কুলা যা দিয়ে  সে শস্য ঝাড়ছে। যতদিন না পর্যন্ত আর্য পূর্ব কালীন সৌভাগ্যের অবসান ঘটল, আর্যদের সাফল্য এবং কৃষি ক্ষেত্রে সৌভাগ্য যেন প্রতিষ্ঠিত হতে পারছিল না। মজার ব্যাপার হচ্ছে ঋগ্বেদের লক্ষ্মীর অপর দুটো নাম হচ্ছে জয়া বা জ্যেষ্ঠা যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সবার চাইতে বড়। এর একটা অর্থ দাঁড়ায় যে, এই দেবী হচ্ছে আর্য পূর্ব কালীন সময়ের দেবী যার স্থান দখল করেছিল পরবর্তী সময়ে আর্যদের সৌভাগ্যের দেবী।

  আর্যদের আচার অনুষ্ঠানে জল সব সময়ই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উত্তর ভারতে গঙ্গা ছিল সবচেয়ে  দীর্ঘ মনোরম নদী। বৈদিক যুগের শেষের দিকে যখন সিন্ধু সভ্যতা গঙ্গার দুই তীরে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছিল, তখন থেকেই গঙ্গা দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্বর্গ, সমুদ্র, হিমালয়, ঋষি জাহ্নু, ব্রহ্মা, শিব ও বিষ্ণু, এবং অন্যান্য দেবীদের সঙ্গে এই দেবীর পৌরাণিক যোগাযোগ তার পবিত্রতার ভাব মূর্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি অদ্যাবধি এই দেবী উপাসিত হয়ে থাকে পার্থিব বা বৈষয়িক সৌভাগ্যের জন্য। শুধু তাই নয়, চূড়ান্ত বা অন্তিম মুক্তির জন্যও এই দেবী আরাধ্যা। প্রয়াগে গঙ্গা নদী মিলিত হয় যমুনা নদীর সঙ্গে। এই সঙ্গম স্থল পুণ্যার্থীদের  জন্য একটা পবিত্র স্থান। গঙ্গা এবং যমুনা উভয়ই হিন্দু দেব-দেবীদের মধ্যে দুজন প্রধান দেবী হিসেবে স্বীকৃত। আর্য উপনিবেশকারীদের সভ্যতা আরও কয়েকটি নদীর, যেমন সরস্বতী  ও দৃশদবতী এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য - উপর নির্ভরশীল ছিল।

  আর্যরা ধন সম্পদের অগাধ ভাণ্ডার গড়ে তুলতে পেরেছিল। তার ফলে তাদের জীবনে এসেছিল অবসর। আর এই অবসরকে তারা ব্যবহার করেছিল যাবতীয় সৃষ্টিশীল কাজকর্মে। তারা সমর্থ হয়েছিল বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে তুলতে। শিল্পকলায় তারা প্রভূত উন্নয়ন সাধন করতে সমর্থ হয়েছিল। বিদ্যাদায়িনী সরস্বতী প্রতিষ্ঠিতা হল দেবী হিসেবে। এমনকি আর্যদের আগমনের পূর্বে ঋগ্বেদের যুগে বিশ্বাস করা হত যে, সরস্বতী নদীর রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা ছিল, এবং তাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল বেদের প্রাথমিক নিরাময়ের দেবতা অশ্বিনদের অন্যতমা হিসেবে। প্রাথমিক যুগের আর্য উপনিবেশের সময় সরস্বতী নদী আর্যদের উপনিবেশের পূর্ব সীমানা ছিল। মনুসংহিতায় উল্লেখ আছে, আর্যদের প্রাচীন বাসভূমি ব্রহ্মাবর্ত সরস্বতী ও দৃশদবতী নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। দৃশদবতীনদী পরবতী কালে বালুর কারণে প্রবাহ হারিয়ে ফেলে এবং লুপ্ত হয়ে হয়ে যায়।

  প্রাথমিক পর্যায়ে সরস্বতী নদী আর্যদের উপনিবেশ সম্প্রসারণে এবং সভ্যতা সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। আর্যরা সম্পূর্ণভাবে নিরক্ষর, গবাদিপশু পালক ও যাযাবর ছিল। তারা যেহেতু লিখতে বা পড়তে জানত না, মুখের ভাষা অর্থাৎ ‘বাক’ তাদের কাছে ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। তাই তাদের সংস্কৃতির যা মূলত ছিল বলি প্রদানের ধর্ম মুল ভিত্তি ছিল ‘বাক’, মুখে উচ্চারিত মন্ত্র। একই সঙ্গে তাদের গবাদিপশু সরস্বতী নদীর উভয় কুলে খুঁজে পেল বিস্তর চারণভূমি। আর্যরা ধীরে ধীরে যখন স্থায়ীভাবে বসতি গড়তে শুরু করল, তারা সৃষ্টি করল জটিল এবং বিশদ বলি প্রদানের আচার-অনুষ্ঠান। তাদের বিদ্যা সাধনার এক বিরাট অংশ বিধৃত হল এই উৎসর্গ বা বলির মন্ত্র সমূহে। ফলত, সরস্বতী হয়ে উঠল জ্ঞান বা বিদ্যার দেবী। ‘বাক’ বা মুখনিঃসৃত বাণী এবং উৎসর্গ বা বলির জন্য নির্বাচিত মন্ত্রাবলী সরস্বতী বা বাগদেবীর ধারণার উৎস হয়ে থাকল। এক পুরাণে উল্লেখিত আছে, অনার্য বা অসুরদের সঙ্গে আর্যদের এক আপস রফার সময় ‘বাক’ দেবী অনার্যদের সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের পক্ষে না গিয়ে আর্যদের পক্ষ অবলম্বন করে। বস্তুত, এই পৌরাণিক কাহিনী ভারতের ভূমিপুত্রদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আর্যদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভুত্ব স্থাপনের ইতিহাস। বিশ্ব নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে ‘বাক’ দেবী কয়েকটি বৈদিক পুরাণে ও উল্লেখিত আছে।

  ইতিমধ্যেই আর্যরা জ্ঞান ও সম্পদের জন্য পরিচিত হয়ে উঠল। ফলত তাদের সুপরিকল্পিত সম্প্রদায় সমূহের উপর বাইরের শত্রু কর্তৃক আক্রমণের ভয় বৃদ্ধি পেল। তবে যোদ্ধারা সদা প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তাদের নিজেদেরকে এবং তাদের সহায় সম্পত্তি রক্ষা করা ক্রমশই কঠিন হয়ে উঠতে থাকল। তখন তাদের প্রয়োজন হয়ে পড়ল শক্তি, সাহস এবং বীরসুলভ সহিষ্ণুতার যার দ্বারা তারা আক্রমণকারীদের হঠিয়ে দিতে পারবে । মজার ব্যাপার হল, এই সময় কালে যত পুরাণের জন্ম হয়েছে সেগুলোর প্রায়

সবগুলোতেই অনার্যদের চিত্রিত করা হয়েছে অসুর হিসেবে। দেখানো হয়েছে, তারা ছিল অসভ্য, অপশক্তি, কামুক, এবং কালো জাদুবিদ্যার অধিকারী। এই অপশক্তির মোকাবিলার স্বার্থে আরযরা ‘শক্তি’ এবং ‘মাতৃকা’ অর্থাৎ মাতৃদেবতা  উপাসনার পুজাপদ্ধতি বা ধর্মবিশ্বাসের সূত্রপাত করল। এই দেবীরা হল পুরুষ দেবতাদের মধ্য থেকে উদ্ভুত নারী দেবী অথচ পুরুষ দেবতাদের তুলনায় অনেক বেশী শক্তিশালী। দেব-দেবীর যে পদ্ধতি গড়ে উঠল তার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান হল দুর্গা, চণ্ডিকা, চামুণ্ডা এবং কালীর। এই দেবীদের চিত্রিত করা হল বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিতা শক্তিশালী ও সশ্রদ্ধ ভয় বা বিস্ময় উদ্রেককারী ভয়াল দর্শনা রণরঙ্গিণী দেবী হিসেবে। কালী, চামুণ্ডা, ধুনাবতী এবং ছিন্নমস্তা দেবীরা এদের অন্তর্ভুক্ত। এই দেবীসমুহের কল্পনা এমনভাবে  করা হয়েছিল যাতে তারা আরযদের শত্রুদের উপর ভীষণ ত্রাসের সঞ্চার করতে সমর্থ হয়। এই দেবীসমূহের অর্চনা জটিল আচার অনুষ্ঠানের এবং পশুবলি বা উৎসর্গের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হত। প্রায়ই এই আচার অনুষ্ঠান ও বলি চলত কয়েকদিন ধরে।সেই সময় মাতৃকা ছাড়াও দশ মহাবিদ্যার তান্ত্রিক গ্রুপ প্রচলিত ছিল। দশমহাবিদ্যার প্রথম ছিল কালী, অন্য নয় দেবীর নাম তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ছিন্নমস্তা, ভৈরবী, ধুনাবতী, বগলা, মাতঙ্গী এবং কমলা।

বিপদনাশিনী বা উদ্ধারকরত্রী ‘তারা’ পরবর্তী কালে বৌদ্ধ তান্ত্রিকেরা উপাস্যা হিসেবে গ্রহণ করে। ষোড়শী ছিল ষোড়শ বর্ষীয়া সুন্দরী তরুণী দেবী। ভুবনেশ্বরী তারই এক রূপ যে হল সমগ্র বিশ্বের অধিপতি। যখন সে ছিন্নমস্তা, তখন সে ধারণ করেছে এক ভয়ঙ্কর মূর্তি। এই অবস্থায় সে নিজের বাম হস্তে ধারণ করে নিজেরই মস্তক এবং পান করতে থাকে ছিন্ন মস্তক থেকে উৎসারিত রক্ত।

  ভৈরবী রূপেও সে ধারণ করে ভয়াল দর্শনারূপ। ক্রুদ্ধ এবং সংহারকারী শিবের সে স্ত্রী রূপ। ধূমাবতী সম্ভবত একমাত্র দেবী রূপ যার পরিধানে আছে বৈধব্যের বেশ। এই দেবী চিত্রিত হয়েছে কৃশকায়া বৃদ্ধা রমণী হিসেবে যার সৌন্দর্য ও মহিমাসবই নিঃশেষিত। মলিন ও ছেঁড়া বসন পরিহিতা এবং অবিন্যস্ত কেশযুক্তা এই দেবী হাতে ধারণ করে শস্য ঝাড়ার ঝুড়ি। এই দেবীর ছিল দীর্ঘ নাসিকা এবং তার চোখ থেকে যেন ঝরে পড়ছে নিষ্ঠুরতা। এই দেবীকে মনে হবে তার রয়েছে অনন্ত ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা। তাকে দেখে মনে হবে সে ধূর্ত, কলহপ্রিয় এবং প্রবঞ্চক। সে ধারণ করে আছে সমস্ত বদ গুণ যা কোনবিধবার জন্য শোভাপায় না। সে যেন সেই বিধবা যার আনন্দের জগতে সহসাই যবনিকাপাত হয়েছে যার ফলে তার মধ্যে হাহাকার করছে অপূর্ণকামনা বাসনা সমূহ। যাই হোক, এই ধূমাবতী রূপ পরোক্ষ ভাবে এবং একক ভাবে সাক্ষ্য দেয় যে বিধবাকে তুষ্ট করার জন্য তাকে পূজা করা হত।

কৌমারী রূপে এই দেবী কুমারী পূজার উপর গুরুত্ব আরোপ করে, এবং দেবী সরস্বতী রূপে সে চিত্রিত হয় নিঃসন্তান স্ত্রীরূপে, এবং অপর সমস্ত রূপে সে মাতা রূপিণী দেবী যার স্বামী ও সন্তানরা জীবিত।

বগলা দেবী রূপে বগলামুখী হিসেবেও পরিচিত (সম্ভত ‘বক’ শব্দ থেকে উদ্ভূত) এই দেবীর রয়েছে বকের শির। এই দেবী ছিল কুটিল জাদুবিদ্যা এবং বিষাক্ত দ্রব্যের  প্রতীক। বিস্ময়ের ব্যাপার হলেও এই দেবীর মুখায়বে প্রতিফলিত হয় যন্ত্রণা; মনে হয় কোন সংঘর্ষ জনিত কোন কষ্ট তাকে বিদীর্ণ করছে।

  ‘মাতঙ্গ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে হস্তী। মাতঙ্গী হস্তীর যে শক্তি তার প্রতীক। শিব পরচিত ছিল হস্তীহন্তা হিসেবে এবং মাতঙ্গী ছিল তার স্ত্রী। তাকে কল্পনা করা হত একজন সুন্দরী নারী হিসেবে। সে বসে আছে এক সিংহাসনের উপর এবং উপবিষ্টা থেকে প্রদর্শন করছে হিতকর ক্ষমতা। কমলা হিসেবে এই দেবী সদাশিবের স্ত্রী। সে সুন্দরী ও সুপ্রসন্ন এবং শুভমঙ্গলময়ী।

তদুপরি দেবীদের ছিল আরো আটটি রূপ। এই দেবীদের দেখানো হয়েছে সংসার বিবাগী সন্ন্যাসিনীরূপে। এই দেবীরা হল ত্রিপুরা, ভীষণা, চণ্ডী, কর্ত্রী, ধরত্রী, হরত্রী, বিধায়িনী, করাল ও শূলিনী। আমারা দেখতে একই দেবী একই নাম একাধিক গ্রুপে উল্লেখিত হয়েছে।

কালীর যে ভিন্ন ভিন্ন রূপ আমরা দেখছি, সেগুলো নির্ধারিত হয়েছে কোন অঞ্চলে সে পূজিতা হয়েছে এবং কীউদ্দেশ্য সাধনের জন্যও এই পূজার আয়োজন করা হয়েছে। যেমন, এই দেবীকে আমরা দেখেছি শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, গৃহকালী,  মহাকালী, রক্ষাকালী, ইত্যাদি হিসেবে। এমনকি, ডাকাতদেরও কালী রয়েছে; বাংলায় এই দেবী ডাকাতে কালী হিসেবে পরিচিত। ডাকাতি করার জন্য যাত্রার প্রাক্কালে ডাকাতের দল ধুমধামসহকারে এই দেবীর পূজা করে। কালীর এই সমস্ত রূপই স্থানীয় ভাবে জনপ্রিয় ও পূজিতা অপরাপর দেবীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে।

  সে যা-ই হোক, দেবীদেরকে পূজা করবার প্রচণ্ড এই ধর্মীয় বিশ্বাস কিন্তু নারী জাতিকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানে সমর্থ হয়নি। বরঞ্চ, নিষ্ঠুর ও কঠোর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা ভীষণভাবে পুরুষের পদানত থেকেছে এবং ভীষণভাবে তারা নিগৃহীত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। নারীর মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করবার সামর্থ্যকে শ্লাঘার বস্তু হিসেবে দেখা হয়েছে এবং এইসব নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সাহিত্য। গৌরবান্বিত করা তাদের সংসারের জন্য পুরুষের জন্য তাদের  ত্যাগকে। তাদেরকে বসানো হয়েছে দেবীর আসনে। সীতা ও রাধা হচ্ছে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে উল্লেখিত অন্যান্য দেবীদের মত এই দুই দেবীর স্বর্গীয় গুণাবলী ছিল না। তাদের প্রধানতম সদগুণ ছিল যে তারা তাদের স্বামীর প্রতি ছিল অনুগত এবং উৎসর্গীকৃত।

সন্তানের জন্মদান এবং শৈশব অবস্থায় তাদের পালনই ঐতিহ্যগত ভাবে নারীর জন্য নির্ধারিত হয়েছে। দেবী ষষ্ঠীসদাশয়া এবং মাতৃস্নেহে পরিপূর্ণা এবং এই দেবীর মধ্যে বিধৃত হয়েছে এই স্বর্গীয় ক্ষমতা। সন্তানহীনাকে সন্তানদানের স্বর্গীয় ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে দেবী ষষ্ঠীকে।

 

                      রবীন্দ্রযুগে

নারীর অগ্রগতি

পারোমিতা  চট্টোপাধ্যায় 

...রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মেয়ে গৃহবধূদের মর্মবেদনা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এই উপলব্ধি আমরা পাই তার সাধারণ মেয়ে আর মুক্তি নামক কবিতার মধ্যে দিয়ে। গৃহবঁধুদের জীবন যে শুধু রাঁধা আর খাওয়ার মধ্যে দিয়ে বয়ে যেত এর বাইরে তাদের চিন্তা করার কোন অবকাশ ছিল না তা কবি মুক্তি কবিতায় সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন....

  ষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলার নারী সমাজ অনেক পিছনে ছিল। তাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার প্রথম দিশারি বিদ্যাসাগর মহাশয়। স্ত্রী শিক্ষা প্রচলনে তার অবদান অনস্বীকার্য। তাছাড়া বিধবা বিবাই প্রচলন, বহু বিবাহ রোধ তিনি আইনের মাধ্যমে ঘটান। তৎকালীন হিন্দু সমাজপতিদের বহু বিদ্রুপ সহ্য করেও তিনি তার কাজে অচল ছিলেন। বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা তার অন্যতম কৃতিত্ব। আজকে নারী যে জায়গায় আছে তার জন্য বিদ্যাসাগর চিরস্মরণীয়।

পরবর্তীকালে স্ত্রী শিক্ষাকে রক্ষা ও নারী প্রগতির ক্ষেত্রে ব্রাহ্মসমাজ রবীব্দ্রনাথ এবং ঠাকুর পরিবারের অবদান অসীম।

  বহুবিবাহ নামক নারকীয় প্রথা থেকে মুক্তি পাবার জন্য সে সময় বহু হিন্দু কুলীন ব্রাহ্মসমাজের অন্তর্ভুক্ত হন। ঠাকুরবাড়ি ও ব্রাহ্মসমাজের মহিলারা নারী মুক্তি ও নারী প্রগতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে বঁধুদের যে দুতিনটি নাম উজ্জ্বল তার মধ্যে প্রথমেই উঠে আসে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবী। তিনি নারী কল্যানমুলক কাজ আরম্ভ করেন তার প্রতিষ্ঠিত সখি সমিতির মধ্যে দিয়ে। বিধবাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য তার প্রচেষ্ঠা প্রশংসার দাবী রাখে। অসহায় বিধবাদের যন্ত্রনা, তাদের মর্মবেদনা তিনি তার বহু নাটকে ফুটিয়ে তোলেন। স্বর্ণকুমারীর জনপ্রিয় নাটকের মধ্যে একটি ছিল ‘কাহাকে’।

এই নাটকের মাধ্যমে তিনি শিক্ষিতা আধুনিকা নারীদের অধিকার বোধ বিশ্লেষণ করেন। কবিতা লিখতেন, গান লিখতেন। তাছাড়া সংস্কারের কাজের জন্য তিনি এই কাব্য ও উপন্যাসের জগৎ ছেড়ে মন দিয়েছিলেন প্রবন্ধ লেখার কাজে। তিনি দীর্ঘদিন ‘ভারতী’ প্রত্রিকা সম্পাদনা করেন। দুঃস্থ মেয়েদের স্বাবলম্বী করার জন্য হাতের কাজ শেখানোর চেষ্টা উল্লেখযোগ্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে জগৎতারিণী স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। এরপরে যার নাম আসে তিনি হলেন মহর্ষির মধ্যম পুত্র সত্যেন্দ্রনাথের পত্নী জ্ঞানদানন্দিনী। তিনি বাংলার নারী জাগরণের অন্যতমা ছিলেন। বাঙালি মেয়েদের আধুনিক শাড়ি পড়ার ধরণ তিনি আবিষ্কার করেন। তিনি তখনকার দিনে ভারতীয় রমণী যিনি স্বামীর সাথে বিলেত যান এবং ভারতের বহু শহরে ভ্রমণ করেন। সঙ্গীত, কাব্য, অভিনয় সব কিছুতেই তার অদম্য উৎসাহ ছিল। ভারতী পত্রিকায় স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ক একটি প্রবন্ধ লেখেন। এছাড়া ছোটদের জন্য ‘বালক’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। তার রচিত ছোটদের ‘সাত ভাই চম্পা’ ও ‘তাক ডুমা ডুম’ খ্যাতি অর্জন করেন।

   রবীন্দ্রনাথের তৃতীয় ভ্রাতা হেমেন্দ্রনাথের পত্নী নিপময়ীর নাম উল্লেখ করা বিশেষ প্রয়োজন। তার ছবি আঁকা অসাধারণ প্রতিভা পরবর্তীকালে তার সন্তানের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। ‘পুণ্য’ পত্রিকায় তার আঁকা ছবি প্রকাশিত হয়।

  স্বর্ণকুমারী দেবীর কনিষ্ঠা কন্যা সরলাদেবীর নাম খুবই

উল্লেখযোগ্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। রবীন্দ্রনাথের অনেক গানের স্বরলিপি তিনি দেন। ‘বন্দেমাতারম’ সঙ্গীতে সুর তিনি দেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন। তার রচিত গ্রন্থ জীবনের ঝরা পাতা থেকে তার এবং ঠাকুরবাড়ি সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। জ্ঞানদানন্দিনীর কন্যা ইন্দিরাদেবীর নাম অত্যন্ত সুপরিচিত। রবীন্দ্রনাথের খুব কাছের এবং স্নেহ ভাজন ছিলেন। রবীন্দ্রসংগীতের প্রচুর স্বরলিপি তিনি রচনা করেন। সবশেষে আসা যাক রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে। ক্ষিতিমোহন সেনের ‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’ বইটিতে রবীন্দ্রনাথের মতে নারীর সাধনায় নারী সম্মন্ধে কবির মনোভাব সুন্দরভাবে আলোকিত হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর অনুরোধে গুজরাটে সাহিত্য সভায় যোগ দেবার জন্য গুরুদেব গুজরাট যাত্রা করেছিলেন। সম্মেলন শেষে গুজরাটের মহিলাদের আমন্ত্রনে কবি সেখানকার বণিতা আশ্রমের একটি প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে তিনি তার বক্তব্যে বলেন প্রত্যেক নারীর মধ্যে সুপ্ত আছে গৌরি যিনি তপস্যায় শিবকে জাগ্রত করে দৈত্যকুলের হাত থেকে স্বর্গকে উদ্ধার করেন। নারী যেন নিজের আত্মমর্যাদা ভুলে কখনই অন্ধের মত পুরুষকে অনুসরণ না করেন। এই কথাটাই কবিগুরু তার বিশ্বলক্ষী কবিতায় বলেছিলেনঃ ‘ভোগের আবর্জনা লুপ্ত হল ত্যাগের হোমাগ্নিতে’র বরোদায় একটি সম্মেলনে তিনি নারী দুটি রূপ বর্ণনা করেছিলেন। একজন প্রতিমা আর একরূপ তপস্বিনীর।

বলাকা কাব্যে দুটি রূপ সুন্দর ভাবে চিত্রিত হন –

‘কোন ক্ষণ সৃজনের সমুদ্র মন্থনে

উঠেছিল দুই নারী                   

অতলের শয্যাতল ছাড়ি

একজনা উর্বশী, সুন্দরী

বিশ্বের কামনা রাজ্যে রাণী,

স্বর্গের ঈশ্বরী

আর জন ফিরিয়া আনে

অশ্রুর শিশির স্নানে স্নিগ্ধ বাসনায়

মহুয়ায় সবলা নামক কবিতাটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।

‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার

কেন নাহি দিবে অধিকার

হা বিধতা’

  রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মেয়ে গৃহবধূদের মর্মবেদনা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এই উপলব্ধি আমরা পাই তার সাধারণ মেয়ে আর মুক্তি নামক কবিতার মধ্যে দিয়ে। গৃহবঁধুদের জীবন যে শুধু রাঁধা আর খাওয়ার মধ্যে দিয়ে বয়ে যেত এর বাইরে তাদের চিন্তা করার কোন অবকাশ ছিল না তা কবি মুক্তি কবিতায় সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাই রবীন্দ্রযুগে মহিলা সমিতি ও নানা রকম হাতের কাজ, ছোট পত্রিকা যেখানে মহিলারা তাদের কথা লিখতে পারেন এইসব সূচনা হয়। এই প্রসঙ্গে বলা আবশ্যক যে এই অগ্রগতিতে ব্রাহ্মসমাজ যত দ্রুত এগিয়ে ছিলেন হিন্দু সমাজের এই জায়গায় আসতে অনেক সময় লেগেছিল।

 

          এসো

    গো

      স্বাতী মিত্র

....আজ হেমন্ত ১৪১৮, তোমার আসার প্রতিক্ষায়, প্রতিক্ষা পরিবর্তনের, নতুন কোন চমকের, টাটকা কোন খবরের। ‘আমার এই অন্ধকারে কত রাত কেটে গেল, আমি আঁধারেই রয়ে গেলাম। তবু ভোরে স্বপ্ন থেকে সেই ছবি যাই এঁকে রঙে রঙে, সুরে সুরে, দেখ ওরা সব যেন গান হয়ে যেতে পারে।তুমি আসবে বোলেই সোনালী স্বপ্ন ভিড় করে আসে চোখে...

সুজনবরেষু আগামী,

  আজ হেমন্ত ১৪১৮, তোমার আসার প্রতিক্ষায়, প্রতিক্ষা পরিবর্তনের, নতুন কোন চমকের, টাটকা কোন খবরের। ‘আমার এই অন্ধকারে কত রাত কেটে গেল, আমি আঁধারেই রয়ে গেলাম। তবু ভোরে স্বপ্ন থেকে সেই ছবি যাই এঁকে রঙে রঙে, সুরে সুরে, দেখ ওরা সব যেন গান হয়ে যেতে পারে।তুমি আসবে বোলেই সোনালী স্বপ্ন ভিড় করে আসে চোখে। কিন্তু কি আনবে আমার জন্যে, আমাদের জন্যে – ভাল কিছু খবর এনো। হঠাৎ খুশির অমুল্য কিছু মুহূর্ত, যা কিনা স্মৃতির মণিকোঠায় যত্ন করে সাজিয়ে রাখতে পারি।

গোটাকতক সোনালি সকাল, গোধূলি মাখা সন্ধ্যে দু-চারখানা অথবা এক আকাশ তারায় সাজানো এক গুচ্ছ মায়াবী রাত। উথাল পাথাল কালবৈশাখী কিছু মন কেমন করা, অফিস ডুব দেওয়া বৃষ্টি ধোয়া দিন, শরতের শিউলি হৈমন্তী রোদ্দুর, মিঠে রোদমাখা শীতের চড়ুইভাতি, বসন্তের চৈতালী চাঁদ আর মহুয়ার মাতাল জোৎস্না। এমন কি দু-চারটে বিয়ের নিমন্ত্রনও আনতে পারো, হাল আমলের ধনতেরাস, জন্মদিন, মুখেভাত। খানকয়েক ভাল সিনেমা, সাহিত্য আর জীবনমুখী। কুলের আচার, ডালের বড়ি, পোস্তবাটা। সব দ্বন্দ্বের অবসান, অন্যায়ের প্রতিকার, টুকটাক অনিয়ম, নিছকই একটু মুস্কিল আসান, একমুঠো

ইচ্ছাপূরণ, সবার জন্য ভাতকাপড়, আর মস্ত এক কৌটো শান্তি।অনেক বেশি চাওয়া হয়ে গেল কি। কি যে করি বল এক আশা নিয়ে, বোবা হয়ে মরি, এত ভাষা লয়ে।তাই তো এই খোলা চিঠি তোমার কাছে। এক সমুদ্দুর সুনামীর সর্বনাশ, অন্তহীন, অর্থহীন, বন্দুকবাজীর সন্ত্রাস জীবনের ত্রুটি চেপে ধরেছে প্রতিদিন। অথচ এমন তো কথা ছিল না। ‘ছোট ছোট রাত চেনা মৌতাত, পলাশের বন, অগোছালো ঘর, খড়কুটোময় চিলেকোঠা কোন – কথা ছিল হেঁটে যাব ছায়াপথ। তবে কেন রোজ স্বপ্ন ভাঙার আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। কাহাতক আর রাজনীতির চচ্চড়ি দিয়ে ভাত খাওয়া যায়। বড্ড একঘেয়ে হয়ে গেছে। লোটন লোটন পায়রাগুলি পর্যন্ত বকম বকম করে না আর। এখন ফুড়ুৎ ফুঁড়ত চড়াইদের তরজা, আর তিনটে শালিক করে না রান্নাঘরের চালে নয়, ভোটবাহানার রঙ্গমঞ্চ। ‘অনেক তো দিন বৃথা গেল এ সংশয়ে, এসো এবার দ্বিধার বাঁধা পার হয়ে’ নতুন কিছু চাই। জানি সবই তো নেশা, সাগরে মেশা – একটি ঢেউ, একটি ঢেউ, তবু এদিন হোক না নদী, জানবে কেউ জানবে কেউ। এসো সেই প্রতিক্ষায়, সেই প্রতিক্ষার পথ বেয়ে । এক হাতে রেখো জিয়নকাঠি, অন্য হাতে স্বপ্নের ঝাঁপি। পূর্তিগন্ধময় জঞ্জাল নগরী, এই সেই শহর যার একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেখানে শুধু স্বপ্নের সমাধি খোঁড়াই জীবন। ভোরের খুব কাছে, কিন্তু সেখানে কখনো ভোর হবে না। তবে কিছু রঙ দিও ভোরে রোদে আর আকাশে – আহা গান দিও কিছু, নিকানো দাওয়ায় সোনা রঙ ধান ভাঙবার – কিছু সুখ দিও প্রিয়ার দু-চোখে স্বপ্নের দামাল শিশুর আলোছায়া হাসি কান্নায়। স্বপ্ন হারালে জীবনের আর থাকে কি। আগ মার্কা থোর বড়ি খাঁড়া আর খাঁড়া বড়ি থোর, এই জীবনে স্বপ্নই তো সব। নয় দিলেই ভরে আরো দু-একটা বাড়তি স্বপ্ন। ক্ষতি কি তাতে? আর একটা দিন বাঁচব নতুন কোন আশায়। হোক না সে স্বপ্নের অলীক মরীচিকা অথবা মোহনার স্বপ্নে দিকভ্রষ্ট কোন নদী। ক্ষণিকের বাঁচাটুকু তো সত্যি।

  জীবনের যেখানে যুদ্ধ, এস বীরের সাজে। জীবনের যেখান যজ্ঞ এস ঋত্বিক বেশে। এই কামনায়, অনেক শুভেচ্ছায়।

স্বাতী। 

 

গঙ্গার নিরন্ন

মানুষেরা

আশরাফ উদ্দীন আহম্মদ

বাসুনিয়াপট্টি, ঘোড়ামারা, বাংলাদেশ 

  ...‘আদাব’ গল্পের সেই মুসলমান মাঝির বিপন্ন মানবিক অস্তিত্বের প্রতি পরিচিত কণ্ঠস্বর, সেদিনের মতো আজো শুনতে পাই। সাহিত্যিকের যাত্রারণ - ছেচল্লিশের দাঙ্গা -মানুষে মানুষের হানাহানি এবং অপরিমিত রক্তপাতের জ্বলন্ত উদাহরণ সামনে রেখে, মোড়ল-মহাজনেরা ততক্ষণে দেশের ভাগবাটোয়ারার কুটিল পরিকল্পনা তলে-তলে সম্পন্ন করেছে...

  ঢাকা জেলার রাজানগর গ্রামে সমরেশ বসু’ র (১৯২৪-১৯৮৮) খ্রিষ্টাব্দে জন্ম। পরবর্তী সময় পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। তার উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি ‘গঙ্গা’ (১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) তে তাঁর প্রতিভা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে বলা অপেক্ষা রাখে না। যদিও প্রায় নব্বইটি উপন্যাস, পনেরোটি গল্প সংকলন এবং কালকূট ছদ্মনামেও অনেক গল্প আছে তাঁর। ছোটদের জন্য গোয়েন্দা কাহিনী-উপন্যাস-গল্প ছাড়াও গল্প ও উপন্যাসের চিত্রনাট্যও তৈরী করেছেন তিনি।

  ‘গঙ্গা’  উপন্যাসটি দিয়েই  সুনামের চরম শীর্ষে পৌঁছে গেছেন, ‘গঙ্গা’ মূলত লড়াই করে বেঁচে থাকারই কাহিনীমালা। প্রকৃতি এবং মানুষের সঙ্গেই মানুষকে লড়াই করে বেঁচে থাকার নামই যে জীবন, সেই কথায় বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। পাঠক বিলাসের সাহসিকতা আর উদ্দামতা দেখে শিহরিত না হলেও তার সমুদ্রে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেকটা সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জাগায়। একজন সামান্য মাছমারা ধীবর হয়ে তার মধ্যে যে আগুন তার খুড়ো পাঁচু লক্ষ্য করে তা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। হতদরিদ্র মাছমারারা কখনো সুখে-শানি-তে থাকতে পারেনি, তাদের জীবনটাই চলমান নদীর মতো, কোথায় যে সুখের ঠিকানা, আর কোথায় বা মা গঙ্গার কৃপা, তারা জানে না। দাদন ব্যবসায়ীদের রক্তচক্ষু, আর মহাজনদের চড়া সুদে টাকা ধার, এবং ফড়েনিদের হুকুমজারি, অল্প দামে মাছ কিনে নেওয়ার ছলনা, সবই তাদের বিপক্ষে যায়, তারা শুধু অন্ধকারেই রয়ে যায়। ঘরে মা-বাবা  স্ত্রী-সন-সন্তান হা-হাপিত্যেশ করে বসে আছে, ঘরের মানুষ অকুল দরিয়ায় জীবন বাঁচানোর ফসল তুলতে গেছে, ঘুম কি আসে কারো চোখে। হাজারো চিন্তায় মনপ্রাণ উথালপাথাল।

  এভাবেই জীবনটা চলে ধুকে-ধুকে, মালোপাড়ার মানুষের জীবনগুলো যেন বিধাতা এভাবেই গড়ে তুলেছে,যার কারণে রোগ-শোক চিরসঙ্গী। মৃত্যু যেন কাছের পড়শী, আর তাই দেখা যায় ‘গঙ্গা’র মূল চেতনা নদীর প্রতিকূলতার সঙ্গে জড়িত মৃত্যুবোধ। মানুষ-প্রকৃতি-পরিবেশ-নদী এই উপন্যাসের প্রধান বিষয়বস্তু'। সমরেশ বসু বিশেষ একটি অঞ্চলের মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি অংকিত করেছেন। নদীই হল উপন্যাসের সক্রিয় এবং আচরণশীল।

  খুড়োর বারণ শর্তেও বিলাস মনে প্রাণে ভালোবেসে ফেলে দামিনী ফড়েনির নাতনি প্রেমিক পরিত্যক্ত হিমিকে, এই হিমিই তার জীবনটাকে একটা স্থিতি'তি জায়গায় এনে পরিবর্তন সাধিত করে, পতিতাপল্লীর মেয়ে এবং যার মা ছিল রাড়ী অর্থাৎ পতিতা, সেই মেয়েটাই বিলাসকে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখায়, সমুদ্রে যাওয়ার প্রেরণা যোগায়, এমন কি সমুদ্র ধীবরের বউ হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে।

  বিলাসের চরিত্রের মধ্য দিয়ে সমরেশ বসু নিজেকে বিশাল একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কারণ গঙ্গা থেকে সমুদ্রে যাওয়ার যে কাকুতি দেখতে পাওয়া যায় তা সত্যি অপূর্ব বলতেই হয়। বিলাসকে শুধুমাত্র গঙ্গা ধরে রাখতে পারেনি, পারার কথাও নয়, কারণ যার কানে সমুদ্রের ডাক পৌঁছে সে কি আর বদ্ধ স'স্থানে পড়ে থাকে, তাই দেখা যায়, বিলাসের মন অসি'র সর্বসময়,শহর ঘেঁষা  গঙ্গা, শহরের নানান লোভনীয় হাতছানি তাকে কিছুতেই বশ করতে পারেনি। বিলাসের দুঃসাহস দেখে কখনো খুড়ো পাঁচু অবাক হয়েছে, খিস্তি-খেউড় করেছে, কিন্তু' কোনোভাবে দমাতে পারেনি, কারণ সে জানে ওর রক্ত নিবারণ সাঁইদারের রক্ত, সেই দুঃসাহসিক মানুষটা যেমন ছিলেন গুণিন তেমনি ছিলেন সমুদ্রের বাছাড়ি নৌকার মাঝি, একত্রিশ হাত বাছাড়ি নৌকা নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতো, কয়েকবার পাঁচুও সঙ্গী ছিল বড়দার, সেই দাদার আগুন ভাইপো বিলাসের মধ্যে দেখতে পেয়ে মনে মনে শিহরিত হলেও গর্বে বুক ভরে যেতো।

  ‘গঙ্গা’  উপন্যাসের সমস্যা- চরিত্র জেলেদের জীবন দিনলিপি, নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ আর সংগ্রামের, জীবন যন্ত্রণার মধ্যেই জীবনের পটভূমি রচিত হয় বারংবার। মালোপাড়ার হতশ্রী মানুষগুলো একটু খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্য যে যুদ্ধ করে  অর্থাৎ দিনরাত্রি অক্লান্ত- পরিশ্রম করে, তারপরও দারিদ্র্যে ভরপুর জীবন। বর্ষার মরশুম চার মাস, আষাঢ়-শ্রাবণ, ভাদ্র-আশ্বিন, মাছমারারা তখন অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোয়ার-ভাটার গোন কোটালের পিছে-পিছে ভেসে বেড়ায় গাঙে-নদীতে, সে এক কঠিন সংগ্রাম।

  সমরেশ বসুর জীবন ছিল ‘গঙ্গা’র মতো, বারবার কুল ভেঙে-ভেঙে সামনে যেতে চেয়েছেন, কিন্তু' বারবারই ব্যর্থ হয়েছেন, যে ‘গঙ্গা’ তার চেতনার আর উপলব্ধির পাড়

ভেঙেছে বারবার, এই গঙ্গা আক্ষরিক অর্থে নদী নয়, জীবন-মহাজীবন, শুধু জীবনই বা বলি কেন ‘সময়’, নদী চলেছে সমুদ্রে, সময়ও। অতীত থেকে ভবিষ্যতের অকুল দরিয়ায়।আজ কাল পরশুর বাঁক ছাড়িয়ে চিরকালের বা মহাকালের দিকে, মহাকাল সে তো  সুদূর দিগন্তে-, অসীমের মাঝে হারিয়ে নিজেকে খুঁজে ফেরা, এই জীবন চেতনার সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে আছে মৃত্যু চেতনা।

  সমরেশ তার রচনায় বিষয় ও ক্ষেত্র বা আঙ্গিক পরিবর্তন করেন, ফিরে এলেন সমতলের গঙ্গায়। ধীবর বা মালোদের জীবনের বিচিত্র কাহিনীতে, নদী থেকে সমুদ্রে যার বিস-বিস্তার, এই পৃথিবীর আদিম এক শিকারী সমাজ যাদের জীবনের সিকি ভাগ ডাঙায় আর বাকি তিন সিকি ভাগই পড়ে থাকে জলে, মাছেদের সাথে, নদী এসেছে তার জীবনে সর্বনাশা কুলত্যাগিনী নারীর অনিবার্য রূপকে, জলের ঋতু বদলায়, প্রহরে-প্রহরে রঙ বদল হয়, তার অদৃশ্য অজানা গর্ভে নিঃশব্দ পদসঞ্চারে দেখা দেয় জলের শস্য, জীবনের ফসল। সেখানে ঝরা-খরা ও মরার ত্রিমিতি, মিঠে জলে মেশে জীবনের লবণ। এই মানুষগুলির  দিবারাত্রির বারোমাস্যায় ছায়া ফেলে অসংখ্য জীবাশ্ম ঘটিত জটিল সংস্কার আর কিংবদনশীল গল্পমালা। জীবিকা হয়ে ওঠে জীবনের নেশা। নিয়তির মতো নিষ্ঠুর উদাসীন প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষানুক্রমে দ্বন্দ্ব পুরুষানুক্রমে তা নাটকীয় রূপ নিয়েছে মাছমারাদের জীবনে।

  এই মাছমারাদের হালে-জালে হাত রেখে তিনি তাদের নাড়ির স্পন্দন অনুভব করেছেন, যেন মুখোমুখি বসে একই বিড়ির আগুনে গল্প ধরিয়েছেন, এই অন্তরঙ্গতাই যুগিয়েছে গঙ্গা উপন্যাসের উপকরণ। তার চাল-চরিত্র এবং চালচিত্র। গাবে মজানো জালের মতোই গল্পের রসে আঁচিয়ে এর ক্যানভাসটা ছড়িয়ে পেতেছিলেন সমরেশ, প্রবল জলস্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছিল এর ভাটিয়াল কাহিনী, বর্ণবহুল ঘটনায় ছলাৎ ছলাৎ দাঁড়টানার শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিলো থেকে-থেকে, সে সঙ্গে আরো একটা বাড়তি পাওনা, সব ছাড়িয়ে আবেগ, অন্যরকম জলের টানের মতোই ভাষায়। তবে গঙ্গা উপন্যাসটি শহর ঘেঁষা বলা যেতে পারে, চরিত্রের অনুষঙ্গে, কাহিনীর দাবিতে গঙ্গা’য় বসিরহাট-ত্রিবেণী-নৈহাটি- হুগলী-ক্যানিং-হাসনাবাদ এবং চন্দননগরের মতো বেশ কিছু অঞ্চলের কথা উল্লিখিত হয়েছে, এসব অঞ্চলের বাতাবরণ শহর ঘেঁষা। তবে উপন্যাসের ভূমিকায়, সমরেশ বসু লিখেছেন, আতপুর ও হালিশহরের মৎস্যজীবিদের সহযোগিতা না পেলে ‘গঙ্গা’ লেখা সম্ভব হতো না। উপন্যাসটি লেখার আগে অনেক মালো পরিবারের সঙ্গে দিনরাত্রি গঙ্গাবক্ষে কাটিয়েছেন তিনি।

  ‘গঙ্গা’ কিন্তু' শেষ পর্যন্ত- পাঠককে সমুদ্রে নিয়ে যেতে পারেনি, ‘গঙ্গা’ শুধু মাত্র গঙ্গাতেই থেকে গেছে, উপন্যাসের তাবৎ জায়গা জুড়ে পাঁচু খুড়ো এবং ভাইপো বিলাসের উপস্থিতি'তি লক্ষ্য করা যায়, তাদের কথোপকথন এবং গঙ্গার দৃশ্যাবলী ছিল প্রধান আর্কষণ। তারপর একদিন আমাশয় আক্রান্ত- হয়ে পাঁচু মারা যায় উপন্যাসের শেষদিকে, ঠান্ডরামও মাছের আকালের কারণে দুঃখ কষ্টে একদিন নদীতে ডুবে প্রাণ বির্সজন দেয়। বিলাসের তারপর থেকে মন আর বসেনি, সমুদ্রে যাওয়ার ইচ্ছে জাগ্রত হয়, হিমির প্রেরণা তাকে আরো  উৎসাহিত করেছে কথাটা না বললেও অবিচার করা হয়। কিন্তু' সময়ের সঙ্গে ছুটে চলার যে প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায় তাও পাঠককে বিমোহিত করে। হিমি-বিলাসের প্রেম উপাখ্যানটিও চমৎকার বলতেই হয়,নদী আর মানুষের মধ্যে কতোখানি যে মিল তা ভাবিত করে এখানে। নদীর কাছে সবাই উদার হয়ে যায়, নদী তখন ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

  বড় প্রেম যে সবসময় কাছেই টানে না, অনেক সময় দূরেও সরিয়ে দেয়। গঙ্গা’র বিলাস-হিমির প্রেমের চিত্রটি একইভাবে অংকিত হয়েছে। বিলাস ফিরে গেছে ধলতিতার দিকে, এখানে একটু নাটকীয়তা লক্ষ্য করা গেলেও ভালোবাসা সব সময়ই সুন্দর তা চিত্রায়িত করেছেন সমরেশ।  ‘গঙ্গা’ উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত- গঙ্গা’য় সীমাবদ্ধ থেকেছে, সমুদ্রে যাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা এবং একত্রিশ হাত লম্বা সেগুন কাঠের বাছাড়ি নৌকা নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরার যে স্বপ্ন তা শুধুমাত্র স্বপ্নেই রয়ে গেছে বিলাসের। বিলাস সাঁইদার হয়েছে, শাবর নিয়ে সে রাইমঙ্গল ও ঝিল্লের মোহনায় অপেক্ষা করছে সমুদ্রযাত্রার মোহনায়। বাস-বে না দেখা গেলেও আসলে সে আবেগকে ছুঁয়ে যাওয়ার যে প্রয়াস তা পাঠক ভালোভাবেই অনুধাবণ করেছে, অর্থাৎ হিমিকে যেমন পাওয়া হল না তেমনি সমুদ্রেও যাওয়া হল না, শুধু একটা হাতছানি অথবা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করেছে

সর্বদা। জেলে জীবন মূলত গ্রাম নির্ভর, গঙ্গা উপন্যাসে ধীবরদের গ্রাম ভিত্তিক সমাজজীবনের পরিচয় খুব একটা অংকিত হয়নি, মালোদের স'স্থল জীবনের ছবি অল্প পরিসরে এসেছে, তাদের জলজ জীবনের বৈচিত্র্যই এখানে বিস্তৃতভাবে পরিলক্ষিত, নৌকার ওপরে কি ভাবে জীবন অতিবাহিত হয় তা দেখানো হয়েছে, তারপরও বিলাসের প্রথম যৌবনের টুকরো-টাকরা কিছু ছবির দৃশ্যাবলী আলোকপাত করা হয়েছে, যেমন কোনও এক উদ্ভ্রান্ত- দুপুরে অমৃতের তম্বী বউয়ের শরীরের ভাজে নিজের পুরুষত্বকে সর্মপণ করেছিলো বিলাস, তারপর থেকে ওর ভেতরে একটা চনমনে ভাব লক্ষ্য করা যায়। রমণীয় সুখ বা নেশা হয়তো একেই বলে, নিজেকে আর নিজের আয়ত্বের মধ্যে রাখতে পারেনি, সেই সুখের নেশা বুকে নিয়ে খুড়ো পাঁচুর সঙ্গে গঙ্গায় মাছ মারতে এসেছে বিলাস। তবে পাঁচু প্রত্যক্ষ করেছে, নিবারণের মতোই  বিলাস দুর্বিনীত এবং স্পষ্টভাষী, কারো কথায় পরোয়া করে না, হিরো হওয়ার জন্য নয়, অন্যায় সহ্য করতে পারে না, তবে নিবারণ জাত মাছমারা হলেও যেদিন অন্যের ঘের থেকে মাছ চুরি করতো, সেদিনই হাতে কিছু পয়সা থাকতো, সেদিন বাজারে গিয়ে মদ খেতো এবং পতিতা পল্লীতে গিয়ে শরীর ও মনটাকে কিছুসময়ের জন্য তৃপ্ত করে ফিরতো, অথচ বিলাস মদ খাই না, যদিও দামিনী তাকে জোড় করে একবার খাইয়ে দিয়েছিলো, তবে নারী শরীরের প্রতি একধরণের আসত্তি পুরোদস্তুর'র ছিল, সেই লোলুপতা থেকে একরকম ভালোবাসা বাসা বাঁধে মনের কোণে, হিমিই প্রকৃতপক্ষে নায়িকা বলা অপেক্ষা রাখে না। উপন্যাসে চরিত্র অনেক থাকলেও খুড়ো পাঁচু-বিলাস হিমি-দামিনী ঘুরে ফিরে মূখ্যভাবে এসেছে, এদের জীবন নাটকই উপন্যাসের প্রাণ, নদীর মতো এগিয়ে গেছে বাঁকে, কোথাও থেমে থাকেনি, গঙ্গা’ যেন মহাভারতের সেই পবিত্র গঙ্গা।  গঙ্গায় গোষ্ঠীবদ্ধ জেলে জীবনের  নানা প্রসঙ্গে মিথ-পুরাণের কথা যেমন এসেছে, লৌকিক-অলৌকিক অনেক সংস্কার আছে, পৌরাণিক চরিত্রেরা কদাচিৎ জেলেদের সংলাপে আবার কখনো মালো সমাজের বর্ণনায় ছুঁয়ে গেছে, শান-নু-গঙ্গা, জগন্নাথ ঠাকুর, শ্রীকৃষ্ণ-রাঁধা, কালী ডাকিনী-বাসুকি প্রমুখ প্রতীকতায় ধীবরসমাজে লগ্ন হয়ে উঠে এসেছে ‘গঙ্গা’য়। দক্ষিণরায় তথা বনবিবিকে জেলের শবর থেকে দূরে থাকার মিনতি জানায়, মাছের দেবতা খোকাঠাকুরকে উদ্দেশ্য করে জেলে বউয়ের কাতর আকুতি,‘ তুমিই মাছমারার দন্ডমুন্ডের কর্তা, তুমি দিলে আমি আমার সোয়ামির হাসিমুখ দেখবো, ঘরে আমার সোহাগের বান ডাকবে, আমার ছায়েরা হেসেখেলে বেড়াবে, আমার হাঁড়ি ভরে থাকবে, নতুন সুতো আসবে, নতুন জাল বুনবো, আমি পুজো দেবো তোমাদের সকলের পায়ে’। মা গঙ্গা কৈবর্তদের পরম আরাধ্য, মাছমারাদের সারাবছরের ভাত কাপড় গঙ্গার কাছেই পাওনা, তাই গঙ্গা’য় প্রার্থনার বিষয়বস্তু', তারই দয়া-দাক্ষিণ্যে ধীবরদের অসি-ত্ব এবং জীবিকার সংস্থান। গঙ্গা জেলেদের একমাত্র ভরসা। তাই বিশ্বাস করে, জীবন-যৌবন,মরণ-টাকাপয়সা-ধনদৌলত বেঁচে থাকার সকল সুখ নিয়ে  মা-ঠাকুরুণ বসে আছে গাঙের তলায় এবং তার কৃপায় বিশ্বসংসার চলে। মা-ঠাকুরুণ সকল সহায়, সে বাঁচতে বলে বাঁচা, মরতে বললে মরা।

  নদীতীরের জীবনযাত্রার দৃশ্যাবলী বেশ কাব্যময় করে তুলে ধরেছেন, কোথাও কৃত্রিমতা নেই, যেন কলমের আগায় সাবলীল ভাবে তরতর করে বের হয়ে আসছে জীবনের কথা ও প্রতিচ্ছবি। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন,“ গঙ্গা’য় মৎস্যজীবী সমাজের অলৌকিক সংস্কার-বিশ্বাসে আবিষ্ট,নদীসমুহের জোয়ার-ভাটা আবর্ত প্রভৃতি প্রকট ও গোপন বিপদের সহিত অবিরত সংগ্রামে প্রতিনিয়ত মৃত্যু রহস্যের সম্মুখীন, জলস্রোত ও মনোস্রোতের বেগবান প্লাবনের মধ্যে অত্যাজ্য সংস্কার পরিণত জীবননীতির নোঙরে দৃঢ়সংবদ্ধ জীবনের অপূর্ব পরিচয়”।

  ‘আদাব’ গল্পের সেই মুসলমান মাঝির বিপন্ন মানবিক অস্তিত্বের প্রতি পরিচিত কণ্ঠস্বর, সেদিনের মতো আজো শুনতে পাই। সাহিত্যিকের যাত্রারণ - ছেচল্লিশের দাঙ্গা -মানুষে মানুষের হানাহানি এবং অপরিমিত রক্তপাতের জ্বলন্ত উদাহরণ সামনে রেখে, মোড়ল-মহাজনেরা ততক্ষণে দেশের ভাগবাটোয়ারার কুটিল পরিকল্পনা তলে-তলে সম্পন্ন করেছে, আর  একজন শিল্পী চোখ মেলে দাঁড়িয়ে মানুষের স্বাভাবিক মানবিক আচরণের কথা ভাবছে, সে আচরণের চরমতম সত্য হল মানুষই শুধুমাত্র মানুষ।

  সেই মানবিক ভাবনা থেকেই ‘গঙ্গা’ লেখা, সমরেশ বসু নিজেই বলেছেন, ‘উপন্যাসটি এক শিকারের কাহিনী, কিন্তু' অলক্ষ্যে চলে গেছে সেই বিবরণের ধারাবাহিকতায়। গঙ্গার বুকে মৎস্যজীবীদের সঙ্গে মাছ মারতে গিয়ে অন্যরকম এক উপলব্ধি জাগে, এবং সেই সময় ‘মাছ ধরা’ শব্দটি বড় বেমানান শোনায়, আর তাই মৎস্যজীবীদের আমিই অভিহিত করেছিলাম ‘মাছমারা’। আনন্দ বাগচীর একটি মন-ব্য,‘খন্ড দৃষ্টিতে যে জীবন শুধুই জলের পাঁচালী, লৌকিক মহাকাব্য চাপা পড়ে আছে তারই তলায়। সমরেশ বসুর চোখে অবশ্যই সেটা এড়ায় নি, বহুবার ছুঁয়ে ছেনে-ছেঁদে দেখার মতোই এই নদী আর তার নাব্যজীবন তার অজানা ছিল না। এই মাছমারাদের হালেজালে হাত রেখে তাদের নাড়ীর স্পন্দন অনুভব করেছেন...”

  নদী আর নারী দুই নিয়তির মতোই সমরেশকে চিরদিন বিপরীত আর্কষণে টেনেছে, নদীকে অবশ্য ব্যাপক অর্থে প্রকাশ করেছেন, জীবন যেখানে অতপ্রত ভাবে মিশে আছে, সেই জীবনের কথায় নদীর কাছে ব্যক্ত করেছেন কিন্তু' নারী সেই জীবনের এবং জীবনবোধেরই জ্বালানি। বারংবার আমরা তাই নদী আর নারীর কাছেই ছুটে আসি, জীবন যে এখানে চিরকালের বাঁধনে বাঁধা।

স্বাধীনতার

সঙ্কট

সুদীপ্ত বিশ্বাস

নোকারি উত্তরপাড়া, রাণাঘাট, নদীয়া, পশ্চিমবাংলা

....একটি  শিশুও জানে কিসে ভারতের মঙ্গল হবে আর কিসে হবে অমঙ্গল। কিন্তু গোটা ভারত বিশাল অজগরের মত জেগে ঘুমাচ্ছে। জাত-পাত ও ধর্ম ভিত্তিক সংরক্ষণ দেশের সব চেয়ে বড় শত্রু। কিন্তু ভোটের রাজনীতির যুগে দিন দিন বাড়ছে নানাবিধ সংরক্ষণের দাপট। দরকার, খুব দরকার এমন কিছু মানুষের যারা গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করবে- রাজা তোর কাপড় কোথায়?

  ১৮৯৮ সাল। বিচার প্রহসন সমাপ্ত হল। দামোদরের বিরুদ্ধে হত্যা অপরাধের চার্জ। পুনার প্লেগ অফিসার রান্ড সাহেব কে হত্যা করেছেন মহারাষ্ট্রের এই বিপ্লবী। বিদ্রোহী চাপেকারের মৃত্যুদণ্ড উচ্চারিত হল কোর্টে। সহাস্যে দামোদর  বললেন , ‘এই মাত্র? আর কিছু নয়?’ নির্দিষ্ট দিনে দামোদরের কণ্ঠ রোধ করল ফাঁসির নির্মম রজ্জু।ঝুলে পড়ল তার মৃত্যুহীন দেহটি। এই ভাবে শুধু মাত্র একটি নয়, একই মায়ের বুক থেকে ঝরে গেল তিন তিনটি ভাই- দামোদর, বালকৃষ্ণ ও বাসুদেব চাপেকার- চাপেকার পরিবারের তিন তিনটি সন্তান। দেশ জননীর অপমান অসহ্য মনে হয়েছিল বলেই তারা প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন দেশ মাতৃকার পরাধীনতার বন্ধন মোচনের জন্য।তাদের সংগ্রাম ছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম। সাদা চামড়ার বিদেশি মানুষের বিরুদ্ধে দেশি মানুষের সংগ্রাম।সে সংগ্রাম ছিল শক্তিশালীর বিরুদ্ধে দুর্বলের, শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের, পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার।চাপেকার ভাইদের মত প্রাণ দিতে হয়েছে বহু বিপ্লবী বন্ধুদের। কিন্তু কখনোই পিছপা হয়নি ভারতের যুবকেরা। এক জনের মৃত্যুর পর আরও দশ জন হাসি মুখে এগিয়ে এসেছে প্রাণ দান করার জন্য। কারণ, তখন তাদের মধ্যে জেগে উঠেছিল দেশাত্মবোধ। তখন ভারতবর্ষে ছিল পরাধীনতার সঙ্কট। আজ যুগ বদলেছে, স্বাধীন হয়েছে ভারতবর্ষ। কিন্তু সে আজ ভুগছে মানবিকতার সঙ্কটে যা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে স্বাধীনতার সঙ্কট। যা আরও অনেক জটিল আর ভয়ংকর। কোনও রোগকে যদি ধরা যায় তবে তা নির্মূলও করা যায়। কিন্তু রোগ ধরা না গেলে তার দাওয়াই দেওয়া সহজ নয়। সে  সময় শত্রু পক্ষ ছিল সাদা চামড়ার ইংরেজ। ইংরেজ দেখলেই বয়কট কর, বিদ্রোহ কর, যুদ্ধ কর- এই ছিল রীতি। ভারতবাসী সেটা বুঝতে পেরেছিল। তাই এসেছিল স্বাধীনতাও। কিন্তু তথাকথিত স্বাধীন ভারতবাসী আজও বুঝতে পারছে না স্বাধীনতাটা ধরে রাখা যাবে কিভাবে? তারা নিজেরাই নিজেদের কবর খুঁড়ে বসছে।এ ক্ষেত্রেও রোগটি ঢুকেছে ওই সাদা চামড়ার দেশ থেকেই। শুধু AIDS বা ডিভোর্স নয়। ভারতবর্ষকে গ্রাস করেছে ভয়ংকর পশ্চিমী ভোগবাদ। কনভেন্ট এডুকেশনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি শিশুর মনেই ঢুকে পড়েছে ভয়ংকর ভোগবাদ। ছোঁয়াচে এই রোগ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে যারা কোনও দিন স্কুলে যায়নি তাদের মধ্যেও। আজ ভারতের মানুষ সবাই ভোগী। তারা চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় ভোগ করতে চায়। এনজয়, এনজয়টাই আজকের ভারতের মূল মন্ত্র। টাকা,

টাকা চাই। আজকের ভারত সকালে ঘুম থেকে উঠে বলে - টাকা চাই। সারাদিন হন্যে হয়ে ছোটে টাকার পিছনে। রাতে ঘুমতে যাবার আগেও হাই তুলতে তুলতে বলে, টাকা চাই।কিন্তু স্বপ্নের মধ্যেও সে ধরতে পারে না তার অধরা টাকাকে। সত্যি করে বললে কত টাকা চাই, কত টাকা পেলে এই টাকার পেছনে ছোটা বন্ধ হবে সেটা জানে না একজন ভারতীয়ও। তাই তারা শুধু ছুটছে আর ছুটছে। এই ছোটাছুটিতে পরস্পরকে শুধুমাত্র ধাক্কাধাক্কি নয়, মেরে ফেলতেও পিছপা নয় ভারতবাসী। তাদের মানবিকতার ফাঁসি হয়ে গেছে অনেকদিন। সবাই চায় সবাইকে ঠকাতে। আর এই ঠকানোর জুয়া চুরিতে ঠকতে হয় সবাইকেই। মাছওয়ালা ঠকায় খদ্দেরকে। সেই খদ্দেরই তাকে ঠকায় যখন সে তেল বা চাল কিনতে তাদের দোকানে যায়। ডাক্তার ঠকান রোগীকে। সেই রোগীও ডাক্তারকে ঠকান যখন ডাক্তার গাড়িতে চড়েন, বাজারে যান, ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করান, ফ্ল্যাট কেনেন অথবা নেহাতই হাওয়া বদল করতে বেড়াতে যান অন্য কোনও জায়গায়। সব ভারতবাসীই আপ্রাণ চেষ্টা করেন তার কাছে অন্য যেই আসুক, তার গলা কাটতে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতা বা পুলিশেরাই তাদের চরিত্র হারান নি, চারিত্রিকভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন আমজনতা। প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে ভোগবাদ আর দুর্নীতি। রং মিস্ত্রি, সাইকেল মিস্ত্রি, জুতো পালিশের কবলার, ঠিকে ঝি, ছাত্র, শিক্ষক, হেডমাস্টার, জমির দালাল, ইঞ্জিনিয়ার, পলিটিশিয়ান - সবার চরিত্র সমান। সবাই-ই দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। সবাই জানে রোগ একটা হয়েছে। কিন্তু এ যে সর্ষের মধ্যেই ভূত- থুড়ি- ভূতের মধ্যেই সর্ষে। ভেজালের পরিমাণটা বাড়তে বাড়তে এতটাই বেড়ে গেছে যে এখন, আসল বস্তুটি যে কি সেটাই বোঝা দায়। স্বাধীনতার যুদ্ধটা ছিল অনেক সহজ একটা অঙ্ক। ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, ব্যস। কিন্তু আজ এ যে নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যা খুব কঠিন কাজ।সেদিন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের হতাশ যুবক অধ্যাপকের সঙ্গে কথা হল। জীবনের যাঁতা কলে ঠকতে ঠকতে এখন তিনি দ্বিধাগ্রস্ত। দুটি সন্তান তার। নিজে খুব সহজেই ম্যানেজমেন্টের থিওরির উপর লেকচার দেন এম. বি. এ’র ক্লাসে। কিন্তু কি শিক্ষা দেবেন তিনি তার নিজের কচি কাঁচা ছেলে মেয়ে দুটিকে? তাদেরকে কি শেখাবেন মানবিক বোধ সম্পন্ন মানুষ হয়ে উঠতে? বিবেকবান হতে? না কি তাদের কে শেখাবেন স্বার্থপর হতে, স্রোতের সঙ্গে ভেসে গিয়ে টাকা, টাকা করে হাই তুলতে? বিবেকবান হলে তো

তাদেরকে জীবন ভোর ঠকতে হবে, সাঁতার কাটতে হবে স্রোতের বিরুদ্ধে। কোনও মা বাবাই কি চান তার সন্তানেরা জীবনভোর ঠকুক? কষ্টে থাকুক? কিন্তু চাপেকার ভাইদের মা চেয়েছিলেন। পরাধীন ভারতের বহু মা বাবা চেয়েছিলেন তার ছেলে রায়বাহাদুর না হয়ে বিপ্লবী হোক। দুধেভাতে না থেকে গর্জে উঠুক, হাসতে হাসতে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়ুক। সে সময়ে মানবিকতার সঙ্কটটি আসেনি। মানুষ মনের অন্তঃস্থল থেকে ফকির হয়ে যায়নি। আজ লাখপতি, কোটিপতি, মিলিয়নিয়ার, বিলিয়নিয়ার-সবাই ফকির। তারা চায় তাদের ছেলেরা আরও অনেক টাকা আয় করুক। আরও লোক ঠকাক। একটি পদার্থের মধ্যে কিছু পরিমাণ অপদ্রব্য মিশে গেলে তাকে পৃথক করা যায়। কিন্তু পদার্থটির প্রতিটি পরমাণুই যদি বিষাক্ত হয়ে পড়ে তবে তাকে বিষ ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় কি? আজ ভারতীয় সমাজটির হয়েছে শেষোক্ত পদার্থটির দশা। ভাষা, জাতি, ধর্ম, রাজ্য নির্বিশেষে গোটা ভারতের একই চিত্র। ভারত একটি ভোগী দেশ।ভারত একটি দুর্নীতিপূর্ণ দেশ। যে ভারত পৃথিবীকে শুনিয়েছিল উপনিষদের শান্তির ললিত বাণী- ‘ত্যক্তেন ভুঞ্জিথ্যা’, তার এই নৈতিক অবনমন সত্যিই অকল্পনীয়। পশ্চিমী হালকা ভোগবাদ সম্পূর্ণ গ্রাস করেছে ভারতের গোটা সমাজটাকে। মিথ্যে বলা ও লোক ঠকানো ভারতবাসীর সাধারণ ধর্মে পরিণত হয়েছে। যিনি মিথ্যে বলেন না বা কাওকে ঠকান না তাকে সর্ব ক্ষেত্রেই ঠকতে হচ্ছে পদে পদে। বিপদে তার পাশে দাঁড়াবার কেউ থাকে না। তিনি সমাজের চোখে বোকা লোক। আজকের ভারতে –An honest man is a stupid man.

  একটি  শিশুও জানে কিসে ভারতের মঙ্গল হবে আর কিসে হবে অমঙ্গল। কিন্তু গোটা ভারত বিশাল অজগরের মত জেগে ঘুমাচ্ছে। জাত-পাত ও ধর্ম ভিত্তিক সংরক্ষণ দেশের সব চেয়ে বড় শত্রু। কিন্তু ভোটের রাজনীতির যুগে দিন দিন বাড়ছে নানাবিধ সংরক্ষণের দাপট। দরকার, খুব দরকার এমন কিছু মানুষের যারা গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করবে- রাজা তোর কাপড় কোথায়?

  আমজনতা মনে করে সব দোষ শাসক দলের। শাসক দলটি বদলালেই সব কিছু ম্যাজিকের মত বদলে যাবে।আবার রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে সবাই গর্জে ওঠে, পরিবর্তন, পরিবর্তন চাই। কি পরিবর্তন? না, নিজেরা সবাই দুর্নীতিগ্রস্থই থাকব, কিন্তু নতুন শাসক দল হবে ধোওয়া তুলসী পাতা। যা সত্যিই সোনার পাথর বাটি খোঁজার সামিল। সুতরাং পরিবর্তন প্রত্যাশী জনগণ নতুন শাসক দলের শাসনে কিছু দিনের মধ্যেই আবার বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপর গঠিত হয় আরও কিছু নতুন রাজনৈতিক দল যা আরও বেশি দুর্নীতিগ্রস্থ বলে প্রমাণিত হয় অল্প দিনের মধ্যেই। আসলে পরিবর্তনটি দরকার শাসক দলের নয়, জনগণের নিজেদের চরিত্রের। আম জনগণের মধ্যে থেকেই কেউ কেউ নেতা হন। সেই আম জনগণের চরিত্রই যদি কালিমা যুক্ত এবং ভোগ বাদে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়, তবে যিনি নেতা- তিনি শাসক বা বিরোধী যে দলেরই হন না কেন ,তিনি তো দুর্নীতিগ্রস্থ হবেনই। তিনি তো চুরি-চামারি, ডাকাতি, ধর্ষণ, রাহাজানি করবেনই, তিনি তো দেশটাকে বিক্রির ব্যবস্থা করবেনই। এতে অবাক হবারই বা কি আছে, হতাশ হবারই বা কি আছে?

  যতদিন না ভারতবর্ষের আমজনতার মধ্যে ফিরে আসবে বিবেকবোধ, যতদিন না ভারতবর্ষের আমজনতা ভোগবাদ ত্যাগ করে পরস্পরকে ঠকানোর জুয়োচুরি বন্ধ করে পরস্পরের সহাবস্থানে বিশ্বাসী হবে, তত দিন পর্যন্ত যতই শাসক শ্রেণির বদল হোক, গণভোট হোক, কোনও পরিবর্তন হবে না, চলতে থাকবে, চলতেই থাকবে এই মানবিকতার সঙ্কট তথা স্বাধীনতার সঙ্কট।

 

রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনী –

সাহিত্য না অন্য কিছু?

সুব্রত মজুমদার

সুব্রত মজুমদারের জন্ম কলকাতায়। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এন্ড টেক্নলোজি, থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে তিনি পাড়ি দেন সুদূর আমেরিকায়। সেখানেই তাঁর পেশাগত জীবনের পাশাপাশি চলতে থাকে লেখালেখি। নানা ধরেনের ওয়েবজাইনে তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে এবং তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা ও ভিন্ন স্বাদের লেখাগুলি অগণিত পাঠকদের মনোরঞ্জন ও প্রশংসা অর্জন করেছে। লেখকের মূল বৈশিষ্ট্য তাঁর ভ্রমন ও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়তা।

...এই প্রসঙ্গে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ও তাঁর মন্তব্যের নজির টানা খুবই দরকার। তিনি বলেছিলেন রহস্য রোমাঞ্চ সাহিত্য হিসেবে স্থান নিশ্চয়ই পেতে পারে। গল্পের বুনিয়াদ তো একই – মনুষ্য চরিত্র আর মানব ধর্ম। শুধু একটু রহস্যের গন্ধ আছে বলে সেটা নিম্ন মানের হবে কেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়া অনেক লেখকও এই ধরনের গল্প লিখেছেন।  ভাষা হল গল্পের মিডিয়াম|

    এক ধরনের উচ্চাঙ্গ বা ক্লাসিকাল সাহিত্য আছে যা কেবলমাত্র উচ্চস্তরের সাহিত্যরসিকেরাই প্রাণভরে উপভোগ করে থাকেন। তাঁদের সংখ্যা কিন্তু শতকরা কুড়ি জনের বেশি নয়। বাকি শতকরা আশিজন যে ধরনের বই পড়ে আনন্দ পান, তাকে উচ্চস্তরের সেই সাহিত্যরসিকেরা কদাচিৎ উচ্চাঙ্গ সাহিত্য বলে মূল্য  দিতে চান। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ও আর্থার কোনান ডোয়েলের জনপ্রিয়তার তুলনা মূলক বিশ্লেষণ করলেই ব্যাপারটা বোঝা যায়। বাংলায় শরৎচন্দ্র আর শরদিন্দু ব্যাপারেও সেই একই কথা বলা যায়। সাহিত্যের মাপকাঠিতে কে কতটা ওপরে বা নিচে তার নিরপেক্ষ সমালোচনাও হয়ত করা হয়েছে বহুবার।                   আপাতদৃষ্টিতে রহস্য ও রোমাঞ্চ এর প্রধান উদ্দেশ্যই হল সাধারণ মানুষকে তাঁদের দৈনন্দিন ঘটনাচক্র থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি দেওয়া। যদিও তাঁদের নিজেদের জীবনের ধারা অতি সাধারণ কিন্তু একটা আশ্চর্য আর

অসাধারণের খিদেয় এবং তৃষ্ণায় তাঁরা সর্বধা আপ্লুত হয়ে থাকেন। সেই প্রবল আকাঙ্ক্ষা থেকেই যে এই রোমাঞ্চকর সাহিত্যের জন্ম সে ব্যাপারে দ্বিমত থাকার কথা নয়। একটি ভাল রোমাঞ্চকর বইয়ের মাধ্যমে এই তীব্র আকুলতা অনায়াসে পূরণ হয়ে যায় এই বইয়ের ভিতরে থাকে না মামুলি ঘটনার বিবরণ এই গল্পের ইন্ধন নীরস আর একঘেয়ে নয় সব কিছু অভাবনীয়, চাঞ্চল্যকর, মনোময় ও রোমাঞ্চকর পাতায় পাতায় থাকে মাকড়শার জাল দিয়ে ঘেরা রহস্যের বেড়াজাল| সেই রকম বই হলে খুব অল্প খরচে এক অভূতপূর্ব জগতে নিমেষের মধ্যে চলে যাওয়া যায়

          রহস্যের প্রতি যে কোন মানুষের আকর্ষণ দুর্নিবার| কিছুটা হয়ত জন্মগত। শিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত আমজনতার মধ্যে খুব কম ব্যক্তিই আছেন যিনি রহস্য কাহিনীতে কৌতূহলী হন না, কিংবা রহস্য কাহিনীতে মগ্ন হয়ে যাননি। গোয়েন্দা গল্পের সর্ব প্রথম স্রষ্টা কে বলা শক্ত, তবে এটা হলফ করে বলা যায় যে হাজার হাজার বছর আগে যখন

মানুষের জন্ম হয়েছিল অপরাধ বোধের সূচনাও হয়েছিল একই সাথে। আর মানুষের মধ্যে যখন প্রথম অপরাধ বোধ জাগল সমাজে ঠিক তখনই নির্ঘাত ভাবে আবির্ভাব হয়েছিল একাধিক গোয়েন্দার। আর সেই গোয়েন্দাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করার জন্য পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছিল আর এক দল লোক। এনারাই হলেন গোয়েন্দা গল্পের লেখক। সমাজের সব মানুষই গোয়েন্দা গল্পের পাঠক কিন্তু সাহিত্যের সব সেবক এর লেখক নন। গোয়েন্দা কাহিনীর রূপরেখা অনুগমন করলে দেখা যাবে যে এই ধরনের গল্পের নিজস্ব এক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা ছক আছে এবং সেই ছকটি অন্য সব গল্প আর উপন্যাসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ক্লাসিকাল সাহিত্যের সেবকরা ঘোরাফেরা করেন মানুষের মনের সদর রাস্তা দিয়ে। যদি বা কখন ভুল করে সরু কোন গলিতে ঢুকেও পড়েন তা হলেও সেই গলি থাকে আলো দিয়ে সাজানো। গোয়েন্দা  কাহিনীর লেখকদের ঘোরাফেরা মানুষের মনের সঙ্কীর্ণ গুপ্ত গলিতে যেখানে থাকে শুধু অন্ধকার। কদর্যতা, নোংরা, বিপদজনক এবং কুৎসিত এর আবরণে ঢাকা এই গলির ভিতরে যে বিস্ময় লুকিয়ে আছে তাকে অন্ধকার থেকে আলোয়  টেনে বের করে আনার অসাধ্য সাধন করাই হল গোয়েন্দা কাহিনীর লেখকের মূলমন্ত্র। এই মূলমন্ত্রে পৌছনোর আগে পশ্চাদ-পটভূমিতে লেখক আর পাঠকের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতামূলক এক বুদ্ধির লড়াই। এই প্রতিযোগিতায় জিত এর ওপরেই নির্ভর করে লেখকের সার্থকতা।

      এই প্রসঙ্গে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ও তাঁর মন্তব্যের নজির টানা খুবই দরকার। তিনি বলেছিলেন রহস্য রোমাঞ্চ সাহিত্য হিসেবে স্থান নিশ্চয়ই পেতে পারে। গল্পের বুনিয়াদ তো একই – মনুষ্য চরিত্র আর মানব ধর্ম। শুধু একটু রহস্যের গন্ধ আছে বলে সেটা নিম্ন মানের হবে কেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়া অনেক লেখকও এই ধরনের গল্প লিখেছেন।  ভাষা হল গল্পের মিডিয়াম| সেই মিডিয়াম যদি ভালো না হয় তবে গল্প বলাও ভালো হবে না। গোয়েন্দা গল্প হলেও সেটাও একটা গল্প বই তো নয়। সুতরাং গল্পকে মনোজ্ঞ করে বলতেই হবে।

    সাহিত্য মানুষের রুচি পাল্টায় না মানুষের রুচির বুনিয়াদের ওপর ভিত্তি করে সাহিত্য বদলায়? প্রশ্নটি যেমন শক্ত এর উত্তরটিও তেমনই। স্থান, কাল আর পাত্র ভেদে এই প্রশ্নের সঠিক  উত্তর আজও অজানা।

 

ঘাটালের ঐতিহ্যের

ইতিহাস ভাসাপুল

সনোজ চক্রবর্ত্তী

সনোজ চক্রবর্ত্তী পেশায় স্কুল শিক্ষকতা। বানিজ্য বিভাগে স্নাতকোত্তর। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি। মুলত গল্পকার হলেও কবিতাও লিখেছেন বেশ কিছু। প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে। লেখালেখি ছাড়া অন্যতম নেশা অভিনয় ও নাটক পরিচালনা।

....ইংরেজরা তখন আমাদের দেশ শাসন করছে। হয়তো তখনো রেলগাড়ি, যন্ত্র-শকট আবিষ্কৃত হয় নি। হয়তো আবিষ্কৃত হলেও তার প্রসার ঘটে নি। তখন কলিকাতা, হাওড়া,  হুগলী জেলা সঙ্গে ঘাটাল সহ ঘাটালের পশ্চিমাঞ্চল ক্ষীরপাই, চন্দ্রকোনা, রামজীবনপুর, কামারপুকুর, গড়বেতা, পিয়ারডোবা, গোয়ালতোড়, শালবনি, সারেঙ্গা প্রভৃতি জায়গার যোগাযোগের একমাত্র উপায় শিলাবতী নদী।

   ঘাটাল অবিভক্ত মেদিনীপুর তথা বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি মহকুমা শহর। সেই অর্থে নগর পরিসেবা না থাকলেও এ শহর অনেক প্রাচীন শহর।

ঘাটাল শহরের প্রাণ শিলাবতী নদী, তবে কখনো কখনো ভারি বর্ষায় এ নদীই ঘাটালের প্রাণ সংশয় এর কারণ হয়ে পড়ে।

     ইংরেজরা তখন আমাদের দেশ শাসন করছে। হয়তো তখনো রেলগাড়ি, যন্ত্র-শকট আবিষ্কৃত হয় নি। হয়তো আবিষ্কৃত হলেও তার প্রসার ঘটে নি। তখন কলিকাতা, হাওড়া,  হুগলী জেলা সঙ্গে ঘাটাল সহ ঘাটালের পশ্চিমাঞ্চল ক্ষীরপাই, চন্দ্রকোনা, রামজীবনপুর, কামারপুকুর, গড়বেতা, পিয়ারডোবা, গোয়ালতোড়, শালবনি, সারেঙ্গা প্রভৃতি জায়গার যোগাযোগের একমাত্র উপায় শিলাবতী নদী।

     শিলাবতী নদী, বন্দর নামে একটি স্থানে দারকেশ্বরের শাখা নদী ঝুমী নদীর সঙ্গে মিলিত হয় ও এরপর নাম হয় রূপনারায়ন। রূপনারায়ন রানীচক্, কোলাঘাট, তমলুক হয়ে

এগিয়ে আসে গেঁওখালি। গেঁওখালিতে রূপনারায়ণ সঙ্গ পায় হুগলী নদীর। এই হুগলী নদীর পূর্বদিকে কলিকাতা আর পশ্চিম তীরে হাওড়া ও হুগলী জেলা। হুগলী-রূপনারায়ণ -শিলাবতী এই ছিল প্রধান পরিবহন পথ। এ পথেই সেকালে কলিকাতা থেকে প্রয়োজনীয় মালপত্র আমদানি হত ঘাটাল মারফৎ। আবার ঘাটাল সহ তার পশ্চিম দিকের বিস্তীর্ণ পশ্চার্ধ ভূমির উদ্বৃত্ত পন্য রপ্তানির হতো কলিকাতা সহ নানা প্রান্তরে। ডিঙি, নৌকা,পানসি স্টিমার যোগে পণ্যের আমদানি রপ্তানি হতো। শুধু পণ্যই নয় যাত্রী পরিবহনের একমাত্র পথ ছিল শিলাবতী।

    আর সেই আমদানি রপ্তানিকে কেন্দ্র করে, মূলত পণ্য ওঠা-নামার জন্য শিলাবতী নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল অনেক ঘাট। সেই ঘাটের অপভ্রংশ হতে ঘাটাল নামের উদ্ভব হতে পারে।

    যাইহোক অতীতে ঘাটাল ছিল ব্যবসা বাণিজ্যের এক প্রসিদ্ধ ভূমি। ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য অনেক মোকাম গড়ে

উঠে ছিল ঘাটালে। রেশম শিল্প ও নীল চাষে উৎকর্ষ লাভ করেছিল ঘাটাল এলাকা। আর্মেনীয়, ডাচ, ইংরেজ, ফরাসী প্রভৃতি বিদেশীরাও নীল কুঠি স্থাপন করে ঘাটালে।

এই সব কুঠিগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ইংরাজ ব্যবসায়ী ওয়াটসন সাহেবের কুঠি। ওয়াটসন এন্ড কোম্পানির কুঠিটি ছিল বৃহত্তম রেশম উৎপাদন কেন্দ্র। ঐ কুঠিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য অঞ্চল কুঠিবাজার নামে পরিচিতি লাভ করে।কুঠিবাজার ছিল শিলাবতী নদীর পশ্চিম তীরে আর সাহেবদের বাসস্থান ছিল নদীর পূর্ব তীরে।

    প্রতিদিনই সাহেবদের পূর্বতীরের বাসস্থান থেকে পশ্চিমের কুঠিতে আসতে হত। মাঝের নদীপথ ছিল ঝামেলার পারাপার। অপ্রসস্থ, শীর্ণ অথচ উত্তাল সেই জলস্রোতের উপর স্থায়ী সেতু নির্মাণের আধুনিক প্রযুক্তি তখনো সভ্যতার হস্তগত হয় নি।

     সেসময় পারাপারের জন্য সাহেবরা শিলাবতীর উপর নির্মাণ করেন কাঠের পুল। যে পুলটি ভেসে থাকত নৌকোর উপর। জলস্তরের উঠা নামার সঙ্গে সংগতি রেখে পুলটি উঠত বা নামত। পুলটির ভাসমানতার জন্য এর নাম হয় ভাসাপুল। সাহেবরা ঘোড়ায় চড়ে ভাসাপুল হয়ে দিনের শুরুতে পূর্ব থেকে পশ্চিম আর দিন শেষে পশ্চিম থেকে পূর্বে যাতায়াত করত। যাতায়াতের ঐ পথ ছিল কেবল সাহেবদের। এদেশের লোকজনের জন্য ঐ পথের লক্ষ্মণরেখা পার হওয়ার কোনো অনুমতি ছিল না। বিলাসী ভাসাপুল শুরুতে কেবল মাত্র বিদেশী সাহেবরা ব্যবহার করত।

       পরবর্তী কালে বেঙ্গল ফেরী এ্যাক্ট ১৮৮৫ এর ৬নং ধারা অনুসারে, ১৯০৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, পুলটি সাধারণের ব্যবহারের অনুমতি লাভ করে। স্বাধীনতা লাভের প্রায় তেরো বছর পর ১৯৬০ সালে শিলাবতী নদীর উপর আধুনিক প্রযুক্তির বিদ্যাসাগর সেতু নির্মাণ নিশ্চিত ভাবেই ভাসাপুলের চাপ কমিয়েছে। হয়তো তার উপযোগিতা নিয়েও আজ প্রশ্ন থাকতে পারে কিন্তু ঘাটাল বললে দৃশ্যপটে আজও প্রথমেই ভেসে উঠে ভাসাপুল। সুদীর্ঘ কাল ঘাটাল ও ঘাটাল-বাসির চরণে চরণে জড়িয়ে আছে বিলাসী কাঠপথ।

    ভাসাপুল ঘাটালের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।ঐতিহ্যের স্বর্ণালী স্মারক।

 

বাড়িয়ে দাও

তোমার হাত

সনোজ চক্রবর্ত্তী

সনোজ চক্রবর্ত্তী পেশায় স্কুল শিক্ষকতা। বানিজ্য বিভাগে স্নাতকোত্তর। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি। মুলত গল্পকার হলেও কবিতাও লিখেছেন বেশ কিছু। প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে। লেখালেখি ছাড়া অন্যতম নেশা অভিনয় ও নাটক পরিচালনা।

মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, সাহায্য করার যে পাঠ আমাদের শৈশব পেয়েছে আজকের শৈশবের সিলেবাসে তার জায়গাই নেই। তার ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে চারপাশে এতো স্বার্থপরতা, অসহযোগিতা। সমাজটা ক্রমশ অসামাজিক হয়ে উঠছে।

    দাওয়ায় বসানো থাকত বেশ বড় একটা ডিবে, তার মধ্যে চাল। ডিবের মধ্যে হাত ডুবিয়ে মুঠো ভরে বের করতে হতো চাল। ছোট্ট হাতে মুঠো বড় করতে গিয়ে মুঠো আলগা হয়ে ছড়িয়ে পড়ত চাল। হাঁক শোনা মাত্র ভাই-বোনদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত কে আগে হাত ডোবাতে পারে ডিবেতে।

     

সারা সপ্তা ধরে এলেও, ফি বুধবার ওরা দল বেঁধে আসত। ঘুরে বেড়াত বাড়ি বাড়ি কারণ বেস্পতিবার হাটবার, ঐ দিন হাট বসত নদীর পাড়ে। ভিক্ষা করে যে চালটু্কু পেত তার খানিক হাটে বেঁচে একটু নুন, একটু আলু, একটু ডাল কিনে নিত সুবিধে মতো।ওরা এলে যে ওদের চাল দিতে হয় তা শিখিয়ে ছিল বাড়ির গুরুজনেরা। মা-ঠাকুমার হাত জোড়া থাকলে চেঁচিয়ে ভিক্ষা দেওয়ার ফরমাশ আসত।সেই দেওয়া নেওয়াতে আনন্দ ছিল উভয়পক্ষের। চাল পেয়ে চকচক করত ওদের মুখ। আর যখন ওরা আমাদের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করত-- " বড় হও বাবা, অনেক অনেক বড় হও।" সে আশীর্বাদের জোর এতোটাই বেশি ছিল যে তখন সত্যি সত্যি বড় হওয়ার পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে যেতাম যেন।এখন বুঝেতে পারি আমাদের ছোটবেলায় বড়রা যে আমাদের হাত দিয়ে সাহায্যটা পৌঁছে দিত সে তাঁদের হাত জোড়া থাকত বলে নয়।

ছোটবেলা থেকেই পরিবারের এমনতর অনুশাসনে, অনুশীলনে ধীরে ধীরে নির্মাণ হতো চরিত্র।

     এখন বাড়িতে ভিখারী এলে চাল দেওয়ার রেওয়াজ নেই বললেই চলে। ওরাও নিতে চায় না। একটা জায়গায় এক টাকার কয়েন রাখা থাকে সেখান থেকে একটা করে তুলে নিতে বলা হয়। সতর্ক করে দেওয়া হয় একের জায়গায় যেন দুই না নেয়। সাহায্যটুকু হাতে তুলে দেওয়ার ফুরসত নেই।কারো সময় নেই অপরের দিকে তাকাবার। অপ্রতিহত গতিতে ছুটে চলেছি আমরা অসীম চাহিদা চরিতার্থে। ছোটদের সরিয়ে রাখা হয়, পাছে তাদের লেখাপড়া নষ্ট হয়,পাছে ঐ দুঃখী মানুষগুলোর থেকে জীবাণু না ঢুকে পড়ে। হেলথ-হাইজিনের হদ্দমুদ্দ। এর ফলে কায়েমি স্বার্থপরতা বাসা বাঁধতে থাকে শৈশব থেকে।

     মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, সাহায্য করার যে পাঠ আমাদের শৈশব পেয়েছে আজকের শৈশবের সিলেবাসে তার জায়গাই নেই। তার ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে চারপাশে এতো স্বার্থপরতা, অসহযোগিতা। সমাজটা ক্রমশ অসামাজিক হয়ে উঠছে।

 

সাচ্চা-ঝুটা

শাশ্বতী ভট্টাচার্য, ম্যাডিসন, উইস্কন্সিন

জানা গেল, নকল মিষ্টি স্যাকারিন  কোকেনের মতো বহুপ্রসিদ্ধ নেশার জিনিষের চাইতে বেশি আকর্ষণীয় এবং নেশাকারক, অন্তত গবেষণাগারের কতগুলি ইঁদুর কাছে।  ২০১৭ সালে মার্চ এবং ডিসেম্বরে প্রকাশিত হওয়া সুস্থ মানুষ নিয়ে করা দুটি প্রবন্ধের (Physiol Behav. 2017, 182:17-26, এবং International Journal of Obesity, 2017 41, 450–457) কথা উল্লেখ করবো।

    প্রথম দেখি অফিসের মিটিংয়ে। পিঁজা আর তার সাথে ডায়েট কোক। কি ব্যাপার?  না হেলদী। এমনি কোকে তো অনেক চিনি, তাই ডায়েট কোক। শূন্য ক্যালোরি।হেলদী, স্বাস্থ্যকর। 

-সিরিয়াসলী?

এর পরে এই শূন্য বা কম ক্যালোরির খাবার সব জায়গায় দেখতে শুরু করলাম। সভা-সমিতি, জলসা-ঘরে, বিবাহবাসরে। হোটেল-রেস্তোরায় তো বটেই। 

      সত্তরের দশকে যার স্থান ছিল মেডিসিন ক্যাবিনেটে তা ছড়িয়ে পড়লো রান্না ঘরে, এমনকি পানীয় জল খাবার কুঁজোতেও। আমার ডায়াবেটিক দিদা চায়ে স্যাকারীন মিশিয়ে খেতেন, তাই ওই কেমিক্যালটিকে  আমার মা ঘরে মজুত রাখতেন, অবশ্যই তা থাকত আমাদের নাগালের বাইরে, ডেটল, বার্ণল আর এ্যনাসিনের সাথে। তবুও শান্তি ছিল, সেটা তখনও পূর্ন-বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।তারপর একদিন ওই শূন্য ক্যালোরিকে দেখলাম শিশুদের ব্যবহার্য খাদ্য-দ্রব্যে। 

    প্রিয় বন্ধুর রান্না ঘরে দুধ, ডিম, ময়দা, তেল, ইস্টের পাশে পাতার পর পাতার কৃত্রিম চিনির  স্যাচেট। শুধু তাই নয়, কেকের সমারোহ বৃ্দ্ধি করার নানা রং-বেরঙ্গের আইসিং, ফ্রস্টিংয়ের যে সমাহার, তার উপরেও কালো -কালির বড়ো হরফে লেখা শূন্য ক্যালোরি কথাটা চোখে পড়লো।

--এইখানে এইগুলো কি রে? তোর ছেলে তো সবে দুই, আর মেয়েটা এই সেদিন থেকে স্কুলে যাচ্ছে?  ওরা কি ডায়া...? বলতে বলতে থেমে গিয়েছি। এই রকম একটা অশুভ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা আমার একান্তই অনুচিত নয় কি?

--আরে বলিস কেন? আমার মেয়ের খুব রান্নার সখ বুঝলি? এই বয়সেই ও যা রান্না করে না! নির্ঘাত এমেরিল লাগাসের ঠাকুরমা ছিল গতজন্মে। দেখ না দেখ, এই কুকি, এই কেক, এই প্যস্ট্রি বানিয়ে চলেছে। তারপর  উইক-এন্ড হলো কি না, আসে পাশের গাদা গুচ্ছের সাদা-কালো  সব বন্ধু–বান্ধবকে ঘরে ডাকবে..., ওই সব ডেসার্ট বানাবে, খাবে আর  ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলবে! আসলে ওর বাবারও তো ভিডিও গেমের শখ, তাই আমাদের বাড়িতে ভালো স্টক আছে। হইহই করে কথাগুলো বলে বন্ধু আমার দিকে তাকায়, সম্ভবত কিছু পড়েছে আমার ভ্রকুঞ্চনে, ...চিন্তা করিস না, ওগুলো সব জিরো ক্যলোরী। ভিডিও গেম খেলাটাতে তো তেমন কোন এক্সারসাইজ নেই!  বুঝলি না? এক ঢিলে দুই পাখি।

--না।  বুঝলাম না বন্ধু। কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যা, সাচ্চা-ঝুটা ঝুটা-সাচ্চা সব কি আমরা গুলিয়ে ফেলছি? এতো ঠিক মঙ্গলময় বার্তা নয়। আমি দীর্ঘশ্বাস গোপন করি। জিভকে নকল মিষ্টির স্বাদ পাইয়ে নয় তো ফাঁকি দেওয়া গেল, কিন্তু এই মিষ্টির ব্যপারটা জিভেই শেষ হয়কি? জিভ থেকে যে বার্তাটা মগজ মানে, যাকে আমরা ইংরাজীতে ব্রেন বলি তার কথা মনে রেখেছো তো বন্ধু? বার্তাটা  পাওয়ার পর শরীরে অন্তত এক প্রকারের হরমোনের ক্ষরণ হতে পারে তার কথাটা মনে রেখেছো তো বন্ধু? সেদিন বলতে পারিনি।মাধুকরীতে আমার এই লেখাটা আজ তাই বন্ধু, তোমায় দিলাম।

      বাজারে আরো তো চারটে স্বাদ আছে, তবে কেন মিষ্টির প্রতি এই আকর্ষণ? ব্যপারটা জটিল নয়, যদি মেনে নিতে পারি যে “মিষ্টি” শুধু মাত্র একটা  স্বাদই নয়। কেন মিষ্টির দিকে আমাদের এই অপ্রতিরোধ্য ঝোঁক, তা বোঝার জন্য বেশী দূর নয়, মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর আগের কথা ভাবলেই চলবে।

   জীবাশ্ম বিজ্ঞান অনু্যায়ী প্রায় ২.৬ মিলিয়ন খৃষ্টাব্দে মানুষের পূর্বসূরী Hominids  এর দেখা পাওয়া যায়। যদিও Neolithic (New Stone age, আনুমানিক খৃষ্টাব্দ ১০,২০০ সাল) যুগকে মনুষ্য সভ্যতার শুরুর যুগ বলা যেতে পারে, বুঝতে হবে, তারও প্রায় ১৯০ হাজার বছর আগের Paleolithic (Old-Stone age) যুগে আজকের মানুষ বা Homosapien এর আবির্ভাবকাল। সবে বন্য জন্তু জানোয়ারের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য পাথরের ব্যবহার সে শিখেছে বটে, কিন্তু অন্য সমস্ত জীবিত প্রাণীর মতো নিছক প্রাণ ধারণের জন্য মানুষেরও দরকার ছিল খাদ্যের।

তার সেই অস্থায়ী যাযাবরের জীবনে না ছিল কোন বাসস্থান, না ছিল কোন নির্দিষ্ট খাবারের সরবরাহ, না ছিল বিশেষ

একটা বাছ-বিচার করার পরিস্থিতি। তার বেঁচে থাকা, অথবানা-থাকা প্রধানতঃ কার্বোহাইড্রেট তথা গ্লুকোজের ওপর নির্ভর-শীল। নানা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সেই গ্লুকোজের রূপান্তরিত হয়ে তৈরী হবে এটিপি নামক এক অণু। যাবতীয় কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির মুদ্রা (Currency) এই অণুটি।

     অতএব, বিবর্তনের সহজাত কর্ষণে মানুষ বুঝতে শিখেছে কিভাবে পরিশ্রমকে এক রেখে বেশী গ্লুকোজ তথা এটিপি পাওয়া যেতে পারে।  মিষ্টি পাকা ফলটা তাই, কাঁচাটার থেকে অনেক বেশী বাঞ্ছনীয়। এইভাবেই সদ্য জাত শিশুর প্রথম খাদ্য মায়ের দুধে মিষ্টি এবং তা উপভোগ করার জন্য যেমন জিভে তার উপযোগী স্বাদ-কলিকা, ব্রেনেও তেমনি, চিনির সরসতায় নির্দিষ্ট আনন্দানুভূতি এসেছে। এর অন্য প্রান্তে অদূর ভবিষ্যতে অনাহারের সম্ভাবনায় যতটা প্রয়োজন ঠিক ততখানি খরচা করে বাড়তি গ্লুকোজকে ফ্যাটের আকারে গড়ে মজুত করে রাখার আয়োজন হয়েছে।

      বন্ধু, বলা বাহুল্য এই  ভাঙ্গা আর গড়ার কাজগুলি করার জন্য যার অবদান অপরিহার্য, তিনিই সেই সুপ্রসিদ্ধ ইনসুলিন হরমোন জগতের Swish army knife, কিম্বা সর্ব-ঘটের কদলী বৃন্ত। প্রাণী জগতে এই ভদ্রলোক ইনসুলিনটি বাবুটির আবির্ভাবকাল নিয়ে নানা গবেষণা থেকে বলা যায়, ইনি অতিবৃদ্ধ।

অন্তত পক্ষে মিলিয়ন বছর আগে তো বটেই, কেউ কেউ বলেন তার চেয়েও আরও আগে!

    আজকাল দেখেছি অনেকে সাদা চাল, ওরফে ভাত পাউরুটি ইত্যাদি কার্বোহাইড্রেটকে শুধু কার্ব বলে ডাকেন (এবং বেশ ছিঃ ছিঃ কারও করেন)। ভুললে চলবে না চাল যেমন কার্বোহাইড্রেট, যে কোন ফল, সবজি, ডাল, দুধ, আলু, ভুট্টা, ওটমিল সব কিন্তু সেই একই। কার্বোহাইড্রেট এক ধরণের অণুর বংশগত নাম। গ্লুকোজ এই কার্বোহাইড্রেটের গোত্রের সব থেকে সিধাসাদা সদস্য, এবং এই প্রবন্ধে একেই আমি  সুগার, কিম্বা মাঝে মাঝে চিনি বলি ডেকেছি।

     নানা বিপর্যয় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে, বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে  কার্বোহাইড্রেট আহরণ করার জন্য এবং তাকে ঠিক মতো ব্যবহার করার এই যে রীতিমতো এটা অখণ্ড (ফেল প্রুফ) একটা সিস্টেমের উদ্ভাবন হয়েছে প্রকৃতিতে, ভাবলে অবাক হতে হয়।

       অতএব পাঠক, পাকা আমটি মুখে দিয়ে যে সুখ, সেই সুখ এক-দুই দিনের মামলা নয়, বিগত কয়েক শত হাজারের বছরের বিবর্তনের আমদানি। মিষ্টির আকর্ষণ তো শুধু মাত্র জিভেই সীমাবদ্ধ নেই, লাল টুক-টুকে স্ট্রবেরীটিকে তাই চোখে দেখেও সুখ! ওটা মুখে পড়লে ব্রেন যে “আহা আহ্ আহা” বলে জানান দিয়ে উঠবে। তুমি আমি বন্ধু তো নশ্বর মানুষ, মেরে কেটে একশো বছরের আয়ু।

কৌতূহলী পাঠকের জন্য জানাই, পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণীর যাবতীয় দৃশ্য বা অদৃশ্য কাজ করার জন্য প্রয়োজন এটিপির। সাধারণতঃ  গ্লুকোজ (তথা অযৌগিক কার্বোহাইড্রেট)  থেকে এটিপি উৎপাদন হয় বটে, তবে ফ্যাট এবং সবিশেষ প্রয়োজনে আমাদের শরীর প্রোটিন থেকেও এটিপি উৎপাদন করে, (তার আগে কিন্তু সেই প্রোটিন থেকে কোন প্রকারে গ্লুকোজ বানাতে হয়) তবে সেটা কেন ঠিক অভিপ্রেত নয় আজকের প্রবন্ধে সেই আলোচনায় যাবো না। মিষ্টি শুধু খেতেই নয়, মিষ্টি নিয়ে লিখতেও সুখ।  হ্যাঁ, আধুনিক মনুষ্য-সমাজ ঠিক এই রকম  পরিস্থিতির কবলে। 

বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে, রাসায়নিক পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে, আঁখ থেকে হোক, বা  ভুট্টা দানা থেকে হোক, আমরা চিনিকে ঘনীভূত করতে শিখেছি।  আর যেই না তা পেরেছি, আমাদের চেনা প্রায় সমস্ত খাদ্যে আমরা মিষ্টি দিতে শিখেছি, মুখে দেওয়ার মতো কিছু হলেই হলো, রুটি, পাউরুটি, ভাত, ডাল, মাংস, মায় ওষুধ...।  A spoonful of sugar helps the medicine go down, in the most delightful way!

আর তার ফল?  শিকারী খুদ ইহা শিকার হো গয়া!

বেঁচে থাকার তাগিদে যে গ্লুকোজ তথা  মিষ্টির দরকার ছিল এবং তাকে ভালো লাগার এবং সংযতভাবে ব্যবহার করার যে উপকরণ বিবর্তনের রাস্তা ধরে আমাদের মস্তিকে, শরীরের বিভিন্ন  অঙ্গ প্রত্যঙ্গে প্রোথিত হয়েছিল তা আজ এক আশ্চর্য আসক্তি হয়ে বহু মানুষের দূর্বিসহ জীবন এবং ক্ষেত্র-বিশেষে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিষ্টি বহু মানুষের কাছে অবিকল সিগারেট বা মদের মতো নেশাকারক এবং জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে সেই নেশায় এনারা আক্রান্ত। বলা বাহুল্য বাড়তি চিনি ইনসুলিনের প্রভাবে ফ্যাট বা বাড়তি ওজনে পরিণত হয়েছে এবং আদমশুমারি অনুযায়ী গত ২০১৫ সালে, সারা পৃথিবীতে বাড়তি ওজন মনুষ্য সভ্যতার প্রায় ৩০ শতাংশকে (২.২ বিলিয়ন)  অসুবিধায় ফেলেছে।

তা হলে উপায়?  নাহ,  কোন চিন্তা নেই!

যে বিজ্ঞান গোটা আঁখকে ছিবড়ে করে তার হৃদয় থেকে বার করে এনেছে জমায়িত চিনির স্ফটিক মানিকটিকে,  কিম্বা  ভুট্টার রস থেকে আমাদের মুখে তুলে দিয়েছে গ্লুকোজের ভাই ফ্রুকটোজকে সেই বিজ্ঞান এবার আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে বেশ কয়েক প্রকারের আর্টিফিসিয়াল সুগার, বিগত কয়েক হাজার হাজার বছর ধরে বিবর্তিত হওয়া আমার মগজ যাদের মোটেও চেনে না।

    এই ‘অচেনা” চিনিগুলোকে তাদের চরিত্র অনুযায়ী গোষ্ঠীবদ্ধ করলে, যারা এক্কেবারে রাসায়নিক দ্রব্য তারা হলো Sweet'N Low (Saccharin), Equal, NutraSweet (Aspartame),Sweet One (Acesulfame potassium)  Neotame (Aspartame বড়ো দাদা)। এর পরে  লাইন দিয়ে এলো Erythritol,  Isomalt, Lactitol,  Maltitol,  Mannitol, Sorbitol,  Xylitol, Splenda (Sucralose)  প্রভৃতি। এরা চিনি কিন্তু চিনি নয়, এরা Sugar alcohol। মোটামুটি চিনির মতো একটা অণু, তার সাথে একটা আরেকটা অণু এমন করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে এদের মধ্যে যে আমাদের সেই সুপ্রসিদ্ধ বয়োজ্যেষ্ঠ ইনসুলিন বাবা-জীবন এদের ছোঁবেনও না, এরা মোটামুটি বাহ্য পদার্থ! বহু ক্ষেত্রে জোলাপের মতো এদের আচার ব্যবহার। এর মধ্যে Stevia নামক নকল চিনিটার মধ্যে যদি ও বা একটা প্রাকৃতিক- প্রকৃতিজ ভাব আছে, আসলে কিন্তু ওটিও Stevia rebaudiana নামক এক গুল্ম-ঝাড়ের পাতা থেকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে বার করে আনা পদার্থ (stevioside)।

তা হলে কি দাঁড়ালো? ভেবে দেখলে ব্যাপারটা অত্যন্ত সহজ। স্বাদের বিচারে এরা চিনি থেকে বহুতর গুনে মিষ্টি  হওয়া সত্বেও বাড়তি চিনি সংক্রান্ত  কোন ঝামেলা থাকছে না। কেন না এরা তো মোটেও চিনি নয়, তাই ইনসুলিন নিঃষ্করণ হবে না ধরে নেওয়া যেতে পারে। আর কে না জানে ওই ইনসুলিনটাই তো যত্তো  গন্ডগোলের মূলে। এই সে গ্লুকোজকে কোষের কাছে বিলি করে  তার থেকে এনার্জি তৈরী করতে সাহায্য করছে, এই সে বাড়তি চিনিকে ফ্যাট তৈরী করে লিভারের কাছে জমা রাখতে এগিয়ে আসছে!

তা হলে তো মুস্কিল আসান?  প্রবলেম সল্ভড।

না! ধীরে বন্ধু ধীরে। গবেষণা চলতে চলতে থাকল এবং  প্রথম অন্তরায় দেখা গেল...।

যেমনটি ভাবা গিয়েছিল,  দেখা গেল তেমনটি ঠিক হচ্ছে না। অচেনা চিনির কয়েক জন সদস্য ইঁদুরের শরীরে ইনসুলিন বাড়িয়ে দিচ্ছে!  সত্যি?  কৃত্রিম চিনির সপক্ষে যাঁরা তারা বললেন, --বুঝেছি।  ইঁদুর ব্যবহার করা হয়েছে না? তাই। মানুষ আর ইঁদুর এক নাকি?

আসতে থাকল,  ‘এই কৃত্রিম চিনিটা ওই নকলটার থেকে ভালো’র  বিবৃতি, এবং একের পর এক নকল চিনিতে বাজার ছেয়ে যেতে লাগলো।

এই সব ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে, সেই চাপান উতোর চলতেই থাকল, আর অন্য দিকে, ১৯৮০ থেকে আজকের ২০১৮ সাল অবধি, বাজারে এতো প্রকারের কৃত্রিম চিনি এবং তাদের বিক্রি পুরো মাত্রায় বজায় থাকা সত্ত্বেও থেকে জন-সাধারণের ওজন বাড়তেই থাকল।

কেন? কোথায় বাঁধলও গন্ডগোলটা? উত্তরের আশায় গবেষণা এবং কারণের খোঁজে জল ঘোলা হতেই থাকল। 

জানা গেল, কিছু কিছু নকল চিনি খাওয়ার পর মানুষের শরীরেও ইনসুলিনের ক্ষরণ হয়।  তখন সে প্রথমে খোঁজে তার অতি পরিচিত আসল গ্লুকোজটিকে  (তার পরে হাত বাড়ায় ফ্যাট কিম্বা প্রোটিনের ওপর)। ফলাফল সরূপ- রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম, এবং  মগজে ক্ষুধানুভূতির বার্তা। খিদে পেয়েছে! খাবার কই? খাবার চাই! এখুনি চাই।  ফলাফল সরূপ-অতিভোজন।

জানা গেল, নকল মিষ্টি স্যাকারিন  কোকেনের মতো বহুপ্রসিদ্ধ নেশার জিনিষের চাইতে বেশি আকর্ষণীয় এবং নেশাকারক,  অন্তত গবেষণাগারের কতগুলি ইঁদুর কাছে।   

২০১৭ সালে মার্চ এবং ডিসেম্বরে প্রকাশিত হওয়া সুস্থ মানুষ নিয়ে করা দুটি প্রবন্ধের (Physiol Behav. 2017, 182:17-26, এবং International Journal of Obesity, 2017 41, 450–457) কথা উল্লেখ করবো।

এই দুটোতেই বক্তব্য যদিও বা সেই ‘আরো গবেষণার প্রয়োজন’ ভাবনাটা আছে,  দুটোতেই গবেষকেরা কৃত্রিম চিনির কোন উপকারীতা দেখতে পারেন নি। উল্টে নিয়মিত কৃত্রিম চিনি সেবন যে পৃথুলতা বা ডায়াবেটিস নামক রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে এমন একটা স্টাডির (CMAJ. 2017;189:E929-E939) কথা  বলা আছে একটি  প্রবন্ধে।

আমি নকল মিষ্টির সপক্ষে নই এটা হয়তো এতক্ষণে বোঝাতে পেরেছি।  আর রসগোল্লার বদলে যদি আপেল কিম্বা আমে মিষ্টি রসনা তৃপ্ত হয়, সেই চেষ্টাটাও তো করে দেখা যাক না বন্ধু। জলের মতো পানীয় আর হয় না কি?

বন্ধু, শেষ পর্যন্ত মানুষ অভ্যাসের দাস, কুকির বদলে কতগুলো ব্লুবেরী বা আঙ্গুর মুখে ফেলে দেখলে হয় না?  হয়তো কয়দিনেই সেটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।

কথায় বলে না “Prevention is better than cure”?

পরিশেষে বলি,   পাঠক,  মিষ্টি খেতে ইচ্ছা হলে মিষ্টিই খান না! আপনি নেশাগ্রস্থ কিনা সেটা আপনারই বিচার। ভালো থাকুন, রসে বশে থাকুন।  

সোমেন চন্দের জীবন

   সম্মন্ধে তথ্যচিত্রের খসরা

দিলীপ মজুমদার

বিশ শতকের তিরিশের দশকের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নানা টুকরো ছবি। সঙ্গে ভাষ্য: ১৯৩৭-৩৮ সাল। আন্দামানসহ নানা জেল থেকে বহু নেতৃস্থানীয় বন্দি মুক্তিলাভ করে ঢাকায় আসেন। কারাগারে এঁরা গ্রহণ করেছিলেন কমিউনিজমের আদর্শ। এঁদের মধ্যে ছিলেন জিতেন ঘোষ, জীবন চ্যাটার্জী, সত্যেন সেন, সুশীল ঘোষ, প্রবোধ গুপ্ত, নেপাল নাগ, বিনয় বসু, বঙ্গেশ্বর রায়, জ্ঞান চক্রবর্তী, অনিল মুখার্জী, ব্রজেন দাস, বারীন দত্ত, সতীশ পাকড়াশি, সতীন রায়, অন্নদা পালিত। এঁদের চেষ্টায় ১৯৩৮ সালের মধ্যে ঢাকা প্রেস শ্রমিক ইউনিয়ন, ইলেকট্রিক সাপ্লাই ওয়ার্কাস ইউনিয়ন, লক্ষ্মীনারায়ণ টেক্সটাইল মিল ওয়ার্কাস ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। মানিকগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ কৃষক সমিতি গড়ে ওঠে। ছাত্র ফেডারেশন শক্তিশালী হয়.

এক.
[সন্ধ্যা। নদীর তীর। জলের শব্দ। অস্পষ্ট চলমান নৌকো। সোমেন চন্দের ছায়ামূর্তি। রবীন্দ্রনাথের ‘সুপ্রভাত’ কবিতা আবৃত্তি করছে। আর এক ছায়ামূর্তি পেছনে এসে দাঁড়ায়। সোমেনের কাঁধে হাত রাখতে সে চমকে ওঠে।]
সোমেন: আরে, সতীশদা কখন এলেন?
সতীশ: একটু আগে। তোমার আবৃত্তি শুনতে শুনতে এলাম ।
সোমেন: আপনার জন্য বিকেল থেকে অপেক্ষা করছি।
সতীশ: একটু দেরি হয়ে গেল সোমেন।
সোমেন: মিটিং ছিল?
সতীশ: হ্যাঁ। নতুন আদর্শ নিয়ে ফিরে এসেছি আন্দামান থেকে। এখন শুধু কাজ আর কাজ।
সোমেন: নতুন আদর্শ?
সতীশ: সাম্যবাদের আদর্শ। আন্দামানের বন্দিজীবনে এটাই তো ছিল নতুন আলো, নতুন পথের দিশা।
[অনেকের কথাবার্তার শব্দ। তার মধ্যে ‘লেনিন’ ‘নভেম্বর বিপ্লব’ ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ এসব ভেসে আসে]
সতীশ: আন্দামানে নবজন্ম হল আমাদের। ত্যাগ করলাম সন্ত্রাসবাদের পথ। বুঝলাম অস্ত্র নয়, ক্ষমতার উৎস হল মানুষ। সেই মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
সোমেন: এসব বিষয়ে আরও জানতে ইচ্ছে করে সতীশদা।
সতীশ: সেই জন্যই তো এসেছি তোমার কাছে। চলে এসো আমাদের প্রগতি পাঠাগারে।
সোমেন: যাব, নিশ্চয় যাব।
সতীশ: শুনেছি গল্প-কবিতা লেখ, লেখক হতে চাও। জানো স্পেনের কথা? কি ঘটছে সেখানে জানো কি?
সোমেন: শুনেছি কিছু কিছু।
সতীশ: ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে জনগণের লড়াই।
[পর্দায় ভেসে ওঠে স্পেনের গৃহযুদ্ধের ছবি--- রা লহ ফিক্স আর কড-ওয়েলের ছবি]
সতীশ: সে লড়াইতে যোগ দিয়েছেন কবি আর লেখকরা। মৃত্যুবরণ করেছেন বিপ্লবী লেখক রা লহ ফিক্স।
সোমেন: লেখকও মরণের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ল?
সতীশ: অত্যাচার যখন চরমে ওঠে, মানবতার বিকাশ যখন রুদ্ধ হয়, তখন কলম ছেড়ে ধরতে হয় তরবারি, বুকের রক্তে তৈরি করতে হয় নতুন সাহিত্য। তাই তো ফ্যাসিস্ট অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন কবি-লেখকরা।
সোমেন: এঁরাই সত্যিকারের লেখক।


দুই.
[বিশ শতকের তিরিশের দশকের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নানা টুকরো ছবি। সঙ্গে ভাষ্য: ১৯৩৭-৩৮ সাল। আন্দামানসহ নানা জেল থেকে বহু নেতৃস্থানীয় বন্দি মুক্তিলাভ করে ঢাকায় আসেন। কারাগারে এঁরা গ্রহণ করেছিলেন কমিউনিজমের আদর্শ। এঁদের মধ্যে ছিলেন জিতেন ঘোষ, জীবন চ্যাটার্জী, সত্যেন সেন, সুশীল ঘোষ, প্রবোধ গুপ্ত, নেপাল নাগ, বিনয় বসু, বঙ্গেশ্বর রায়, জ্ঞান চক্রবর্তী, অনিল মুখার্জী, ব্রজেন দাস, বারীন দত্ত, সতীশ পাকড়াশি, সতীন রায়, অন্নদা পালিত। এঁদের চেষ্টায় ১৯৩৮ সালের মধ্যে ঢাকা প্রেস শ্রমিক ইউনিয়ন, ইলেকট্রিক সাপ্লাই ওয়ার্কাস ইউনিয়ন, লক্ষ্মীনারায়ণ টেক্সটাইল মিল ওয়ার্কাস ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। মানিকগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ কৃষক সমিতি গড়ে ওঠে। ছাত্র ফেডারেশন শক্তিশালী হয়।]


তিন.
[ছোট মাটির ঘর। লেনিনের ছবি। চারদিকে প্রচারপত্র ছড়ানো। লন্ঠনের চারদিকে গোল হয়ে বসে কয়েকজন আলোচনা করছে]
রণেশ; সোমেন চন্দের সঙ্গে দেখা হল সতীশদা?

সতীশ: হ্যাঁ, বুঝলে রণেশ সোমেন খাঁটি হিরে।
রণেশ: নিরঞ্জনবাবু তার পরিবারের অনেক খবর এনেছেন। তার বাবা নরেন চন্দ ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের স্টোর্স বিভাগে কাজ করেন। সামান্য মাইনে। কোনোরকমে সংসার চলে। ম্যাট্রিক পাশ করেছে সোমেন।
সতীশ: আমার কি মনে হয় জানো! মনে হয় প্রগতি লেখক সঙ্ঘ গড়ার কাজে সোমেন হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
নিরঞ্জন: রণেশ পাবে তার যোগ্য সহকর্মী।
সতীশ: ঠিক কথা। তবে খেয়াল রেখো, সোমেনের শরীরটা ভালো নয়, সবে প্লুরিসি থেকে উঠেছে।


চার.
[ঘরের সামনে সাইনবোর্ড ‘প্রগতি পাঠাগার’। ১০/১২ জন যুবক। একজন লেনিনের লেখা থেকে কিছু পড়ছে। এমন সময় এসে দাঁড়ায় সোমেন চন্দ]
সোমেন: ভেতরে আসব রণেশদা?
রণেশ: এই দ্যাখ, সোমেন এসেছে। এসো, এসো সোমেন।
[লাজুকভাবে সোমেন ঘরে ঢুকে এককোণে বসে]
রণেশ: সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। এই হচ্ছে সোমেন চন্দ। বাড়ি বিক্রমপুর। এখন অবশ্য দক্ষিণ মৈশুন্ডির বাসিন্দা। গল্প-কবিতা লেখে। কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তার গল্প ‘শিশুতপন’। কাঁচা বয়েস কিন্তু পাকা হাত।
সোমেন: আঃ রণেশদা-
রণেশ: বড্ড লাজুক। আমাদের একজন হয়ে উঠলে অবশ্য কেটে যাবে লজ্জা। এখন থেকে সোমেন প্রগতি পাঠাগারের সদস্য।
সকলে: আমরা নতুন সদস্যের লেখা শুনব।
রণেশ: এ দাবি যে উঠবে তা জানতাম। সোমেনকে বলেও রেখেছিলাম।
সোমেন: ‘শিশুতপন’ গল্পটাই পড়ি!
রণেশ:  বেশ।
[সোমেন গল্প পড়তে শুরু করে। শেষ হতে সকলে হাততালি দিয়ে ওঠে]
সোমেন: আমি কিন্তু জানতে আর শনতে এসেছি। শুনতে চাই মার্কসবাদের কথা, রুশবিপ্লবের কাহিনী, গরিব মানুষের মুক্তিপথের  দিশা...


পাঁচ.
[বিভিন্ন ভঙ্গিমায় সোমেন। বইপত্র নাড়ছে, পড়ছে, লিখছে। ভাষ্য: শুধুমাত্র সাহিত্যের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চাননি সোমেন। মানুষের মুক্তিপথের সন্ধানই ছিল তাঁর সাধনা। গভীর অধ্যবসায়ের সঙ্গে রাত জেগে পড়তেন মার্কসবাদী সাহিত্য, জানার চেষ্টা করতেন চাষি-মজুরের সমস্যা। কৃষাণের মজুরের জীবনের শরিক হতে চাইতেন।]


ছয়.

[শীতের সকাল। কুয়াশা। রেলওয়ে ওয়ার্কশপ। শিফট চেঞ্জের সময়। নাইট শিফটের শ্রমিকরা বেরিয়ে আসছে। গেটের ওধারে সোমেন।গায়ে বিবর্ণ উলের চাদর, পায়ে বিদ্যাসাগরী চটি ।কথা বলছে শ্রমিকদের সঙ্গে]
সোমেন: আপনি ইউনিয়নের সভ্য হয়েছেন?
শ্রমিক১: না।
সোমেন: আপনি?
শ্রমিক২: গত বছর ছিলাম ।
সোমেন: আপনি ?
শ্রমিক৩: সভ্য! নাতো।
সোমেন: আচ্ছা, আপনারা কি মনে করেছেন বলুন তো! ইউনিয়নের  সভ্য না হয়ে একা একা বাঁচতে পারবেন? ওরা শক্তিমান। ওদের সঙ্গে একা পারবেন লড়াই করতে! পারবেন আপনার দাবি আদায় করতে!
[আরও শ্রমিক ভিড় করে আসে। সকলে উৎসুক হয়ে শোনে সোমেনের কথা]
সোমেন: না, একা একা বাঁচা যায় না। মালিকের সঙ্গে লড়াই না করে আপনারা আপনাদের দাবি আদায় করতে পারবেন না। মালিক তো মেরতে মেরে গায়ের রঙ ফ্যাকাসে করে দিল। তবু 
আপনাদের চৈতন্য হচ্ছে না!

 

সাত.

[প্রগতি পাঠাগারের সামনে সোমেন ও সতীশ]সোমেন: আমি শ্রমিক ইউনিয়নে কাজ করতে চাই সতীশদা ।সতীশ:  না, না-সোমেন: কেন ?সতীশ: তোমার শরীর দুর্বল। তাছাড়া সে যে বড়ো পরিশ্রমের কাজ।সোমেন: পরিশ্রমই তো করতে চাই।সতীশ: তুমি বরং প্রগতি লেখক সংঘটা ভালো করে গড়ে তোল।সোমেন: তা তো করছি।সতীশ: দুটো একসঙ্গে—সোমেন: কিন্তু একটার জন্যে আর একটা দরকার যে!সতীশ: কি বললে!সোমেন: শ্রমিক জীবনের অভিজ্ঞতা না থাকলে প্রগতি সাহিত্য লিখব কি করে! এ যুগের পালাবদলে প্রোলেটারিয়েটের ভূমিকাই প্রধান। তাদের মধ্যে যদি কাজ না করতে পারলাম তাহলে শৌখিন কমিউনিস্ট বনে লাভ কি !

আট.

[জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে সোমেন লাভ করেছিল তার লেখার উপকরণ । তার বিখ্যাত ‘ইঁদুর’ গল্পের কথা ধরা যাক। গল্পের নায়ক সুকুমার আসলে সোমেনের আত্মপ্রতিকৃতি। সুকুমার ছিল মেহনতি মানুষের আপনজন। রেলওয়ে ইয়ার্ডের পাশ দিয়ে আপন মনে হেঁটে যাচ্ছে সুকুমার।শশধর নামক এক শ্রমিক তাকে ডাকে]শশধর: ও সুকুমারবাবু-সুকুমার: আরে শশধর যে!শশধর: কাছে আসুন কথা আছে।[সুকুমার আসে। দুজন পাশাপাশি বসে। শশধর বিড়ি ধরায়]সুকুমার: কি ব্যাপার শশধর!সুকুমার: সেদিন কারখানার সাহেব আমাকে ডেকেছিলেন।সুকুমার: কেন!শশধর: শালা বলে কিনা: ড্রাইভার ইউনিয়ন ছেড়ে দাও, নইলে মুশকিল হবে।সুকুমার: আপনি কি বললেন?

শশধর: বললাম ছাড়ব না। আপনার যা ইচ্ছা হয় করুন। বলেই এই রকম গটগট করে বেরিয়ে এলাম-[শশধর বীরদর্পে হাঁটার ভঙ্গি করে। সুকুমার হাসে। দুজনে উঠে দাঁড়ায়। কথা বলতে বলতে পথ চলে। দূরে এঞ্জিনের সাঁ সাঁ শব্দ। চিৎকার। কয়েকজন শ্রমিক সুকুমারকে দেখে আনন্দে হৈ হৈ করে ওঠে]সুকুমার: আরে ইয়াসিন,  দেশ থেকে কবে ফিরলেন?ইয়াসিন: দিন দুই হল।শঙ্কর: দেশে গিয়ে ইয়াসিন খুব বীরত্ব দেখিয়ে এসেছে জানেন সুকুমারবাবু- ইয়াসিন: খালি ইয়ার্কি-শশধর:  তাহলে নিজেই বল না ইয়াসিন।সুকুমার: হ্যাঁ বলুন না ইয়াসিনভাই।ইয়াসিন: তেমন কিছু নয়। তবে কিনা গাঁয়ের চাষিরাও জাগছে। তাদের একটা বৈঠকে হাজির ছিলাম। একজন আমাকে ইউনিয়নের কথা

জানতে চাইল। আমি পকেট থেকে রসিদ বের করে দেখাতে তারা আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল-তুমি যে আমাদেরই একজন।শশধর; জানেন সুরেন কি বলছিল?সুকুমার: কি?শশধর: বলছিল আপনি ব্যারিস্টার হলেন না কেন!সুকুমার: তার মানে!
শশধর: আপনাকে কথায় হারানো যায় না। বিরোধী লোকেরা হেরে ভূত হয়ে যায় আপনার কাছে।
[সকলে হেসে ওঠে]


নয়.
[একতলা মাটির ঘর। সাত-আট জন শ্রমিকের মধ্যে সোমেন। দরখাস্ত লিখছে। দরখাস্ত নিয়ে তারা চলে গেল। দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন অনিল মুখার্জী। দেখতে পেয়ে সোমেন ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এল]
সোমেন: আরে কি সৌভাগ্য, অনিলবাবু যে!
অনিল:  সে কি কথা! সৌভাগ্য তো আমার।
সোমেন:  এ কি বলছেন!
অনিল:  পাঁচ পাঁচবার চেষ্টার পরে দেখা পেলাম।
সোমেন:  বসুন বসুন।
[অনিলকে মাদুরে বসিয়ে সোমেন উঠে দাঁড়ায়]
অনিল: আবার উঠলেন যে!
সোমেন: এই আসছি, একটু বসুন।
[সোমেন চলে যায়। স্টোভ জ্বালানোর শব্দ শোনা যায়। একটু পরে সোমেন চা নিয়ে ঢোকে]
অনিল: আবার এসব কেন?
সোমেন:  অতিথি সৎকার আর কি!
অনিল: সরলানন্দ সেদিন বলছিল আপনার কথা।
সোমেন: আমার কথা! আমার আবার কি কথা!
অনিল: ঘর-সংসারের কাজেও আপনি এক্সপার্ট।
সোমেন: বাবা আর আমি এখানে থাকি। বাবা সময় পান না । তাই-
অনিল: সরলা বলছিল তাকে নাকি আপনি নিজের হাতে রান্না করে মুসুরির ডাল আর ইলিশমাছের ঝোল খাইয়েছিলেন।
সোমেন: হ্যাঁ সরলা এসেছিল একদিন।
অনিল: নতুন কিছু লিখলেন?
[সোমেন একটা পত্রিকা এগিয়ে দেয়। ওতে ‘মহাপ্রয়াণ’ গল্প ছাপা হয়েছে। পাতা ওলটাতে ওলটাতে অনিল বলেন]
অনিল: এত কাজ করার পরে লেখেন কখন? আপনি তো দেখছি অসাধারণ লোক। সমীন্দ্র বলছিল শুধু লেখা নয়, আপনি পড়াশুনোও করেন সময় পেলে!
সোমেন: কোথায় আর পড়তে পারি! বিদ্যে তো ম্যাট্রিক। ইংরেজি বই ভালো করে বুঝতে পারি না। দেখুন না কডওয়েলের ‘ইলিউশন আ্যন্ড রিয়েলিটি’ পড়ার চেষ্টা করলাম। অনেকটাই বুঝতে পারলাম না।


দশ.
[কলকাতার বালিগঞ্জের দোতলা বাড়ি। জানালার গরাদে হাত রেখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে সোমেন। নিচের তলায় নির্মল ঘোষের অফিস ঘর। ‘বালিগঞ্জ’ পত্রিকার অফিস । একটু বাদে নির্মল ঘরে ঢুকলেন]
নির্মল: এ কি তুমি! এমন হঠাৎ!
সোমেন: হ্যাঁ। ঢাকা মেইলে চলে এলাম। এসে দেখি বাড়ি ফাঁকা।
[নির্মল হাসেন। কালো কোট হ্যাঙ্গারে ঝোলান। পরিচারককে চা আনতে বলেন]

নির্মল: কদিন আগেই তোমার চিঠি পেলাম। তুমি তো বড়দিনের বন্ধে আসবে লিখেছিলে! সোমেন: আগেই চলে এলাম। আমার উপর আবার একটা দায়িত্ব দিয়েছে কিনা!নির্মল: কি দায়িত্ব! সোমেন: এখানে তো প্রগতি লেখক সংঘের সম্মেলন শুরু হচ্ছে। সে সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে হবে। ঠিক হয়েছে ঢাকাতেও আমরা প্রগতি লেখক সংঘ গড়ে তুলব। নির্মল: সম্মেলনে যোগ দেবে? সোমেন: হ্যাঁ।নির্মল: বেশ। নিয়ে যাব। কিন্তু তোমার প্রতিশ্রুতির কথা মনে আছে তো! সেই যে বিত্তহীন মধ্যবিত্তদের নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবে! [সোমেন হাসতে হাসতে ব্যাগ থেকে উপন্যাসের পান্ডুলিপি বের করে নির্মলের হাতে দেয়, তারপর বলে] সোমেন : প্লটটা শুনুন। [আলো কমে আসে। বন্যার ছবি ভেসে ওঠে। নৌকায় আসছে স্বেচ্ছাসেবকরা। গ্রামের ধারে জলমগ্ন একটা বাড়ি। জলে পা ডুবিয়ে সেই ঘরের বারান্দায় বসে আছে একটি মেয়ে। সোমেন তন্ময় হয়ে বলে যায়]সোমেন: এক বন্যাপীড়িত গ্রাম। সে গ্রামের এক মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে মালতী। ঘরে অভাব, তবু দারুণ স্বপ্নবিলাসী। বারান্দার নিচে জল দেখে, সেই জলে নিজের ছায়া দেখে তার আনন্দ। অথচ পিছনে তার অভুক্ত সংসার, খাবার ভিক্ষা, কান্না। এসবের মধ্যেও স্বপ্ন দেখে চলে সেই মেয়ে। এসময় গ্রামে ফ্লাড রিলিফ কমিটি এল। রজত এসেছে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে। মালতীর অবাস্তব স্বপ্নকে আঘাত করল রজত]

এগারো.

[কলকাতার রাস্তায় কখনও নির্মল ঘোষের সঙ্গে কখনও একা একা ঘুরছে সোমেন ]

বারো.

[ আশুতোষ মেমোরিয়াল হল। প্রগতি লেখক সংঘের দ্বিতীয় সম্মেলন। বাইরে ফেস্টুন। বারবুশ, রোলাঁ, রবীন্দ্রনাথের ছবি । যুদ্ধবিরোধী বাণী। সোমেন কথা বলছে একজন স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে] সোমেন: কে কে এসেছেন?স্বেচ্ছাসেবক : মুলকরাজ আনন্দ, শৈলজানন্দ মুখার্জী, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার। সোমেন: রবীন্দ্রনাথ আসেন নি? স্বেচ্ছাসেবক: না, আসেন নি। তবে তিনি বাণী পাঠিয়েছেন। [এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল সত্যেন্দ্রনাথের কন্ঠ। সোমেন শুনছে তন্ময় হয়ে। সত্যেন্দ্রনাথ: এবার প্রগতি লেখক সংঘের খসড়া ইশতেহারটি আপনাদের অনুমোদনের জন্য উপস্থিত করছি ।-- ভারতীয় সমাজে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। চিরায়ত সাহিত্যধারার অবলুপ্তির পর থেকে ভারতীয় সাহিত্যে জীবন বিমুখতার মারাত্মক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।.....  সাহিত্যের মান যাদের হাতে অবনমিত হচ্ছিল সেই রক্ষণশীল শ্রেণির হাত থেকে সাহিত্যকে রক্ষা করা এবং জনগণের জীবনের সঙ্গে তাকে বাস্তবজীবনচিত্রণের উপযোগী ও ভবিষ্যতের কান্ডারী করাই  এই সংগঠনের উদ্দেশ্য।.... ভারতীয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে গর্ব করার সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে আমরা সমালোচনা করব এবং সৃজনশীল ও পারস্পরিক কাজের মধ্য দিয়ে জাতির নবজীবন সঞ্চারের চেষ্টা করব।

তেরো.
[চিন্তামগ্ন সোমেন হেঁটে যাচ্ছে শহরতলীর পথ দিয়ে। ভাষ্য: কলকাতার অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকায় ফিরে এল সোমেন । শত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘ গড়ে তোলার সঙ্কল্প তার। এই সংঘ নতুন চেতনা দেবে দেশবাসীকে। উদ্বুদ্ধ করবে নব ভাবনায়। চিনিয়ে দেবে শ্রেণীশত্রুকে। প্রেরণা দেবে তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের]

চোদ্দ.

[বিকেল। সরুগলি দিয়ে হাঁটছে সোমেন। গলায় গণসংগীতের সুর। পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত]কিরণ: এতদিন কাটিয়ে এলে কলকাতায়। একটা চিঠি পর্যন্ত পেলাম না। সোমেন: বিশ্বাস করো একদম সময় পাই নি। কিরণ: উঠেছিলে কোথায়? সোমেন: নির্মল ঘোষের বাসায়। কিরণ:  বালিগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক? সোমেন: হ্যাঁ । জানো কিরণ, ওই পত্রিকার পরের সংখ্যা থেকে ছাপা হবে আমার উপন্যাস ‘বন্যা’। কিরণ: বাঃ, ভালো খবর। প্রগতি লেখক আন্দোলনের খবর কি? সোমেন: অনেক খবর এনেছি। [ঝোলা থেকে কাগজপত্র বের করে] এই ইশতেহার, এই সংবিধান। কিরণ: আমাদের সংগঠন গড়ার কাজে লাগবে। রণেশদার সঙ্গে দেখা হয়েছে? সোমেন: হ্যাঁ। পাঠাগারে মিটিং শুক্রবারে। আর শোন কিরণ, আমরা সোভিয়েতের উপর একটা চিত্র প্রদর্শনী করব। দেবপ্রসাদ আর তুমি হবে সে কমিটির যুগ্ম সম্পাদক। কিরণ: কোথায় হবে প্রদর্শনী? সোমেন: সদর ঘাটের কাছে ব্যাপটিস্ট মিশন হলে।

 

পনেরো.

[ব্যাপটিস্ট মিশন হলে চিত্র প্রদর্শনী। সোভিয়েত রাশিয়ার নানা চিত্র। মানুষের ভিড়। সোমেনঘুরে ঘুরে ব্যাখ্যা করে বোঝাচ্ছে।]

ষোলো. 

[হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা। চিৎকার। সরলানন্দের মুখ ভেসে ওঠে। তার কন্ঠে শোনা যায়: বৈশাখের কাঠফাটা রোদ। শহরে দাঙ্গা। রাজপথ দিনে-দুপুরে জনশূন্য। মানুষের পাশ দিয়ে গা ঘেঁষে চলতে মানুষ ভয় পায়। বুক কাঁপে। কিন্তু বিশ্রাম নেই সোমেনের। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিরাম নেই তার। অনলস শিল্পী তোমাকে নমস্কার।]

সতেরো.

[বাড়ি জ্বলছে। চিৎকার। ছোটাছুটি। একদল মারমুখী লোককে থামাবার চেষ্টা করে সোমেন। তার তাকে ঠেলে ফেলে দিয়ে চলে যায়। অন্যদিক থেকে ভেসে আসে আর্তনাদ। সোমেন এগিয়ে গিয়ে দেখে একটা মৃতদেহ। ভালো করে দেখে ‘আরে এ যে মকবুল’ বলে সে শোকে ভেঙে পড়ে। এই সময় আর একদল মারমুখী জনতা আসে। সোমেন তাদের দিকে এগিয়ে যায়।] সোমেন: আপনারা মকবুলকে মেরে ফেললেন? [জনতা চুপ] সোমেন: কথা বলছেন না কেন? ও কি কারও ক্ষতি করেছিল? জনতা: না তা নয় তবে-সোমেন: তবে কি? জনতা: ও মুসলমান। ওর জাতভাইরা যোগেনকে খুন করেছে। সোমেন: কি বললেন?[আর্তনাদ করে ওঠে সোমেন। তারপর নিজের মনে বলে: বাঃ ভালোই হল। মকবুল আর যোগেণ ছিল গলায় গলায় বন্ধু । আপনাদের দুই দলের পাগলামির বলি হতে হল দুই বন্ধুকে। কিন্তু এই পাগলামি আর কতকাল চলবে? বলতে পারেন কবে থামবে এই ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা?

আঠারো.

[প্রগতি লেখক সংঘের আসরে সোমেন। অচ্যুত গোস্বামী বলে] অচ্যুত: ঢাকায় শুরু হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এ ক্ষেত্রে প্রগতি লেখকদেরও একটা ভূমিকা আছে। সাহিত্যের মাধ্যমে সচেতন করতে হবে মানুষকে। গত বৈঠকে দাঙ্গাবিরোধী গল্প লেখার আবেদন জানানো হয়েছিল। কেউ কি এনেছেন গল্প? সোমেন: আমি এনেছি। সকলে: পড়ুন গল্পটা। সোমেন: ছোট ছোট কতকগুলো  চিত্রের মধ্য দিয়ে দাঙ্গার পরিস্থিতি তুলে ধরেছি।

দৃশ্যগুলির পটভূমিতে আছে এক পরিবার। মা-বাবা বিভ্রান্ত। ছোট ভাই অজয় হিন্দু সোশ্যালিস্টদের অশুভ চিন্তাদর্শের শিকার। বড়ভাই অশোক কমিউনিস্ট কর্মী। তাদের বাবা আর ফিরলেন না অফিস থেকে। দাঙ্গার শিকার হলেন তিনি ........[সোমেনের ‘দাঙ্গা’ গল্পের কিছু চিত্র ভেসে ওঠে]

১.[ দরজার কানাড়ার শব্দ। মা দরজা খুললেন। অশোক ঢুকলও] মা: একশবার বলেছি রাস্তায় যখন-তখন বেরবি না । কে শোনে কার কথা। যা না বাপু, মামার বাড়ি থেকে দিনকতক ঘুরে আয়। অশোক: এত কাজ ফেলে যাই কেমন করে মা? মা: কাজ না ছাই। কে শুনবে রে তোদের কথা? তোদের রাশিয়া পারবে জার্মানির সঙ্গে? অশোক: পারবে না কেন? বিপ্লবের মরণ নেই মা।

[মা খাবার এনে অশোকের পাশে বসলেন। অশোক খেতে শুরু করে]
মা: হ্যাঁরে এ কি সত্যি!
অশোক: কি মা?
মা: ওই যে তোর বাবা বললেন জার্মানি সব নিয়ে নিয়েছে রাশিয়ার! তারা একেবারে এসে পড়েছে আমাদের দেশের কাছে!
[অশোক হো হো করে হেসে ওঠে]
অশোক: এঁরা হিটলারের চেয়েও লাফিয়ে চলেন।
[এই সময় অজয় ঘরে ঢুকলও]
অজয়: জানিস দাদা, নবাববাড়ি সার্চ হয়ে গেছে?
অশোক: এটি আবার কোথ্থেকে আমদানি হল?
অজয়: বারে, নিজের কানে শুনে এসেছি।
অশোক: কচু শুনেছ।
অজয়: তা তো বলবেই। তোমরা কমিউনিস্টরা হিন্দুও নও, মুসলমানও নও।
অশোক: তাহলে আমরা ইহুদির বাচ্চা নারে!
২.
[রাত গভীর। ঘরের ভেতর অস্থিরভাবে পায়চারি করছে অশোক। উদ্বিগ্ন মা এলেন]
মা: তোর বাবা তো এখনো এলেন না !
অশোক: দেখি আর একটু ।
৩.
[ঢংঢং করে দুটো বাজল। বাইরে সৈন্যদের টহল। মা-বোন কাঁদছে। অশোকের বন্ধু বিমল এল]
অশোক: কি হল বিমল? কোন খোঁজ পেলি?
বিমল: অফিস থেকে পাঁচটায় বেরিয়েছেন।
অশোক: তাহলে!
[অশোকের অস্থিরতা বেড়ে যাব। তার চোখ ছলছল করে। এমন সময় ঘরে ধোঁয়া ঢোকে পাশের ঘর থেকে। অশোক ছুটে সে ঘরে ঢুকে দেখে হিন্দু- মুসলমান ঐক্যের আবেদনপত্রগুলিতে আগুন দিয়েছে অজয়। সেই আগুনে তাকে হিংস্র দেখায়]
অশোক: কি করছিস এসব?
অজয়: তোমাদের ঐক্যের মড়া পোড়াচ্ছি।
অশোক: অজু ভুল করছিস।
অজয়: দাদা রাখ তোমার কমিউনিজম। ওসব আমরা জানি ।
অশোক: কি জানিস?
অজয়: জানি যে তোমরা দেশের শত্রু।
অশোক: ফ্যাসিস্ট এজেন্টদের মতো কথা বলছিস। জানিস দাঙ্গা কেন হয়? জানিস কি প্যালেস্টাইন আর আয়ারল্যান্ডের কথা?


উনিশ.
[তন্ময় হয়ে লিখছে সোমেন। লেখাগুলো এবং সেই সঙ্গে সোমেনের কন্ঠস্বর ভেসে ওঠে: সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম, ভারতীয়দের পারস্পরিক তিক্ততা আর শত্রুতা বন্ধ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা আজ দেশপ্রেমিক ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের কর্তব্য। শুধু মানবতার নিকট আবেদন এবং জনগণের মধ্যে স্বদেশপ্রেম জাগিয়ে তুলে, সাম্রাজ্যবাদ আর তার এজেন্টদের স্বরূপ উন্মোচন করেই এ কাজ করা যাবে না। জনগণের প্রাত্যহিক জীবন ও সংগ্রামের গৌরবময় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে]


কুড়ি.
[হলঘরের বাইরে ব্যানার—‘ বর্ধিতায়ন সভা—ঢাকা প্রগতি লেখক সংঘ’। দেওয়ালের পোস্টারে লেখা :  হিটলার সোভিয়েত থেকে হাত ওঠাও, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে একসাথে, দুনিয়ার মজদুর এক হও। মঞ্চে উঠলেন  রনেশ দাশগুপ্ত]
রণেশ; এবার বক্তব্য রাখবেন আপনাদের প্রিয় লেখক সোমেন চন্দ।
[করতালি। নানা মন্তব্য। মঞ্চে সোমেন]
সোমেন: বন্ধুগণ ১ গত ২২শে জুন হিটলার আক্রমণ করেছে সোভিয়েত রাশিয়া। এই আক্রমণ পৃথিবীর সামনে এনেছে নতুন বিপদ।
[হিটলার বাহিনী ও লালফোজের নানা দৃশ্য ভেসে ওঠে]
সোমেন: চাষি মজুরের দল রাশিয়ায় এক নতুন সভ্যতার ইমারত গড়ে তুলেছে দেখে গাত্রদাহ শুরু হয় ফ্যাসিস্টদের। হিটলার তাদেরই প্রতিনিধি। গতবছর পশ্চিম ইউরোপকে পদানত করে হিটলার বুঝেছিল সারা দুনিয়ায় জয়পতাকা ওড়াতে হলে ধ্বংস করতে হবে সোভিয়েতকে। দুনিয়ার মেহনতি মানুষ সোভিয়েতের উপর এই আক্রমণ সহ্য করবে না। তাই আসুন বন্ধুগণ আমরা ঐক্যের প্রাচীর গড়ে তুলি। ........
[করতালি। স্লোগান]


একুশ.
[নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহির ফ্যাসিবিরোধী অনুষ্ঠানের খণ্ডচিত্র। সর্বত্র সোমেনের মুখচ্ছবি]


বাইশ.
[সোভিয়েত সুহৃদ সমিতির অফিস। দরজার সামনে কিরণশঙ্কর। উত্তেজিত। রণেশ এলেন]
কিরণ; কালকের সভায় তো সিদ্ধান্ত নিলেন কিন্তু আমাদের কান্ডারি কই?
রণেশ; কার কথা বলছ ?
কিরণ: সোমেনের কথা।
রণেশ: ওর তো রাজশাহি যাবার কথা।
কিরণ: তা জানি। কিন্তু গতকালই তো ফেরার কথা।
রণেশ: তাই তো!
কিরণ: এদিকে দিনক্ষণ স্থির। কলকাতায় নেতাদের চিঠি পাঠানো হল।
[দূরে সোমেনকে আসতে দেখা যায়। এদের মুখে হাসি ফোটে। সোমেন কাছে আসে]
সোমেন: কি ব্যাপার এত উত্তেজিত কেন?
কিরণ: ঢাকায় ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সোমেন: চমৎকার।
রণেশ; তোমার উপর বিরাট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোমেন: কি রকম?
কিরণ: বিরাট মিছিল আনতে হবে।
সোমেন: নিশ্চয় আনবো।


তেইশ.
[ঢাকার সূত্রাপুর।ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনের মঞ্চ। ব্যস্ততা। এককোণে রণেশ ও এক যুবক]
যুবক: সবাই এসে গেছেন?
রণেশ: মোটামুটি । জ্যোতি বসু, বঙ্কিম মুখার্জী...
[এক স্বেচ্ছাসেবক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে এবং রণেশকে বলে]
স্বেচ্ছাসেবক:  সরলানন্দ আপনাকে তাড়াতাড়ি ডাকছে।
রণেশ: সে কোথায়?
স্বেচ্ছাসেবক:  মঞ্চের পাশে টিকিট ঘরে।
[রণেশ দ্রুতপায়ে সরলানন্দের কাছে এলেন] 
রণেশ: কি ব্যাপার সরলা?
সরলা: একটা গোলমালের আশঙ্কা করছি।
রণেশ: কেন?
সরলা: একটিই লোক বারে বারে এসে টিকিট নিয়ে যাচ্ছে।
রণেশ; চেনো তাকে? 
সরলা: না, আমাদের কেউ নয়।
[আর এক যুবক ব্যস্ত হয়ে ছুটে আসে]
যুবক: উপারে কয়েকজন জড়ো হয়েছে।
রণেশ: সংখ্যা?
যুবক: ৩০-৩৫এর মতো।
রণেশ: হাতে কিছু আছে?
যুবক: হকিস্টিক, লোহার ডান্ডা ।
[কিরণশঙ্কর  ছুটে এলেন]
কিরণ: সভা শুরু করব রণেশদা?
যুবক: কিন্তু...
রণেশ: হ্যাঁ শুরু করো সভা।
[রণেশ যুবকদের কি নির্দেশ দিলেন। তারা চলে গেল। সরলা আর রণেশ কথা বলতে লাগলেন]


চব্বিশ.
[সম্মেলনের মঞ্চ। জ্যোতি বসু বসে আছেন। বঙ্কিম মুখার্জী উঠে দাঁড়ালেন বক্তৃতা দেবার জন্য]


পঁচিশ.
[রেলওয়ে ইউনিয়নের অফিস। কয়েকজন শ্রমিক ও সোমেন। সমীন্দ্র হোড় এর প্রবেশ]
সমীন্দ্র; মিছিল চলে গেল যে !
সোমেন: জানি।
সমীন্দ্র; তুমি বসে কেন?
সোমেন: কয়েকজন আসবে। এলেই দৌড়াব। ধরে ফেলব মিছিল।
সমীন্দ্র:  আমি যাচ্ছি।  দেরি করো না।


ছাব্বিশ.
[ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনের মঞ্চ। সরলানন্দ গেটের কাছে। একজন দৌড়ে এসে কি বলল তার কানে কানে। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। টলতে টলতে কোনোরকমে এল মঞ্চের কাছে। ডাকল রণেশকে। সরলার কথা শুনে হতচকিত রণেশ । তারপর কোনোরকমে নিজেকে সামলে উঠে এল মঞ্চে]
রণেশ: বন্ধুগণ! এইমাত্র খবর এল- কি ভয়ঙ্কর খবর- আমাদের সোমেন আর নেই। সম্মেলনের দিকে আসছিল সে মিছিল নিয়ে। পথে তাকে ঘিরে ধরে ফ্যাসিস্ট গুন্ডারা। নির্মমভাবে খুন করে।
[সভায় তীব্র উত্তেজনা। কান্না]


সাতাশ.
[ভেসে ওঠে সোমেনের মুখ]
সোমেন: হ্যাঁ নিহত হয়েছি আমি। ব্যক্তিমানুষ চলে যায় পৃথিবী ছেড়ে। কিন্তু আদর্শের মৃত্যু নেই। তার অনুরণন চলে যুগ যুগ। আমি ভালবেসেছিলাম মানুষকে। তাই মানুষের শত্রুদের কাছে আমি অপরাধী। কিন্তু আমার ভালোবাসা মৃত্যুহীন। তার বীজ থেকে যাবে। ভালোবাসার সেই বীজ নির্মূল করার সাধ্য কারোর নেই...........

 

 
 

কচুরিপানা

সুস্মিতা দত্ত 

মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, সাহায্য করার যে পাঠ আমাদের শৈশব পেয়েছে আজকের শৈশবের সিলেবাসে তার জায়গাই নেই। তার ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে চারপাশে এতো স্বার্থপরতা, অসহযোগিতা। সমাজটা ক্রমশ অসামাজিক হয়ে উঠছে।

     চুরিপানা বা Water Hyacinth, গ্রাম-বাংলার জলাশয়ে অবহেলায় গজিয়ে ওঠা দ্রুত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আগাছা।  এর অপকারীতা সকলের জানা হলেও উপকারী দিকগুলি প্রায় অজানা। তাই ঘরের পাশে থাকা সত্ত্বেও এর দিকে কেউ ফিরে চাই না। বৈজ্ঞানিক নাম   Eichornia crassipes জন্মস্থান দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, তবে গ্রীষ্মপ্রধান উষ্ম পরিমন্ডলে যে কোন জলাভূমিই এর জন্ম ও বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত।
    পুরু উজ্জ্বল ডিম্বাকৃতি পাতা বিশিষ্ট বহুবর্ষজীবি জলজ ভাসমান উদ্ভিদটি জলের উপর ১ মিটার পর্যন্ত উত্থিত থাকে। দীর্ঘ ঋজু বায়বীয় কান্ড থেকে কৃষ্ণ-বেগুনি বর্ণের

পালকের মতো মূলগুলি ঝুলন্ত অবস্থায় ভাসমান থাকে। বিশেষভাবে বিন্যস্ত অক্ষে ৬-৭ টি ফুল থাকে। এক একটি ফুলে ৬ টি পাপড়ি থাকে যার ৫ টি হাক্কা বেগুনি আর একটি গাঢ় বেগুনি, মাঝে হলুদ ছোপ। ফেব্রুয়ারী-মার্চ মাসে এর ফুল ফোটে। একটি ফুল থেকে ১০০০০ বীজ হয়। এর বীজগুলি প্রায় ২৮ বছর জীবিত থাকে। শুধু জ্বালানি হিসাবেই নয়, জমিতে সার হিসাবেও ব্যবহার্য্য। এটি দূষিত জলের বিশেষ করে দুগ্ধ ও কাগজ শিল্পজাত দূষিত জলের উত্তম পরিশোধক। এর মূলগুলি জল থেকে সীসা, পারদ, পটাশিয়াম, স্ট্রনসিয়াম প্রভৃতি উপাদান গুলি শোষণ করতে পারে।

এটি পশুখাদ্য বিশেষত বরাহ এবং সোনালি মাছের ভাল খাদ্য। এর সবুজ অংশগুলি ক্যারোটিন সমৃদ্ধ খাবার এবং খাদ্যদ্রব্যে মশালা হিসাবে জাপান ও তাইওয়ানে ব্যবহৃত হয়। এর থেমে প্রস্তুত তেল অশ্বের চর্মরোগের ঔষধ। কচুরিপানা ৬০ শতাংশ সেলুলোজ সমৃদ্ধ হওয়াই একে পাটের সাথে মিশ্রিত করে দড়ি, হাতব্যাগ, আসবাব ও কাগজ প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা যায়। শুধু তাই নয়, এটিকে এখন পলিএষ্টারের সাথে মিশ্রিত করে বস্ত্রশিল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে।এছাড়াও কচুরিপানার অপূর্ব সুন্দর ফুল গুলি বাগানে , গৃহে  ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সজ্জা হিসাবে সৌর্ন্দয্যায়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।ঈশ্বর যখন কোন জিনিস সৃষ্টি করেন, তখন অবশ্যই সেটি মানব কল্যাণের জন্য, প্রয়োজন শুধু উদ্ভাবন শিল্প সত্তার।

 

‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ

              এবং মধুসূদন দত্তর  সমাজসচেতনতা                                         

  সুবিমল চক্রবর্তী

                                                       ডালাস, টেক্সাস

‘মধুসূদন রচনাবলী’র সম্পাদকদ্বয় ভূমিকায় বলেছেন, “মধুসূদন যত বড় কবি ছিলেন অবশ্যই সে মাপের নাট্যকার ছিলেন না। কিন্তু বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর স্থান খুবই উঁচুতে। শৈশবের দুর্বলতা কাটিয়ে তিনি বাংলা নাটকের যৌবনের শক্তি দিয়েছিলেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের কথা মনে রাখলে তাঁর কোন সিরিয়াস নাটককেই প্রথম শ্রেণীর লেখা বলা যায় না। কিন্তু লঘু-ব্যঙ্গ নাট্যে তাঁর কৃতিত্ব বিশ্বমানের, বিশেষত ‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ অতি উচ্চ মানের উচ্চ স্তরের প্রহসনের মর্যাদা দাবী করে।

  বাংলা অভিধান বলছে, প্রহসন মানে হচ্ছে হাস্যরসাত্মক নাটক। ‘প্রহসন’ শব্দটির মধ্যেই হাস্যরসের ইঙ্গিত রয়েছে। ইংরেজিতে প্রহসনকে বলি farce। প্রহসনের হওয়ার কথা বাস্তবতাবর্জিত। সাহিত্যের বিশ্বকোষের দিকে তাকানো যাকঃ হাল্কা নাট্যধর্মী  রচনা যার মধ্যে সন্নিবেশিত থাকবে অসম্ভব সব ঘটনা, ঘটনার অতিরঞ্জন, বাঁধাধরা চরিত্রসমূহ, এবং সহিংস ক্রীড়ামোদ বা ডানপিটেমি। প্রহসনে একসঙ্গে সবগুলো বৈশিষ্ট্য থাকবে এমন কথা নেই। প্রহসনকে ‘নাট্যধর্মী রচনা’ না বলে নাটকই বলা যায়। কমেডিও এবং প্রহসনের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ সহজ নয়। কমেডিকে হতে হবে হাল্কা মেজাজের এবং মনোরঞ্জনকারী নাটক। আবার কমেডিতে সিরিয়াস এবং গভীর বিষয় হাল্কা পরিচিত এবং ব্যাঙ্গাত্মকভাবেও পরিবেশিত হতে পারে। আমরা বাংলায় কমেডিকে একটা সীমিত অর্থেও ব্যবহার করি। কমেডিকে আমরা বলি মিলনাত্মক নাটক যেখানে সচরাচর মধুর মিলনের মধ্য দিয়ে নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটে। ‘Farce-comedy’ নামে সাহিত্যে এমন এক কমেডির ধারণা আছে যাতে প্রহসনের বৈশিষ্ট্যও বিদ্যমান।

      নাটকের ইতিহাসে প্রহসন বা কমেডি নতুন কোন সংযোজন নয়। প্রাচীন গ্রীসে প্রহসন এবং কমেডি লেখা হত এবং অভিনীতও হত। নাটকের প্রধান এই দুটো ধারাই সর্বকালে সর্বযুগে দেশে দেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবেও প্রহসন এবং কমেডি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এখানে একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। সাধারণভাবে সৌন্দর্যতত্ত্ব এবং বৌদ্ধিকবিচারে প্রহসনকে কমেডির তুলনায় নিকৃষ্টমানের মনে করা হয়। এমনটা মনে করার কারন প্রহসনের মধ্যে পরিশীলতার অভাব (যেমন, ভাঁড়ামি) এবং অবাস্তব ঘটনার সন্নিবেশ থাকতে পারে। যেহেতু আমরা মধুসূদনের ‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনটি নিয়ে আলোচনা করব, এই কথাগুলো আমাদের মনে রাখলে সুবিধে হবে।

     ‘মধুসূদন রচনাবলী’র সম্পাদকদ্বয় ভূমিকায় বলেছেন, “মধুসূদন যত বড় কবি ছিলেন অবশ্যই সে মাপের নাট্যকার ছিলেন না। কিন্তু বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর স্থান খুবই উঁচুতে। শৈশবের দুর্বলতা কাটিয়ে তিনি বাংলা নাটকের যৌবনের শক্তি দিয়েছিলেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের কথা মনে রাখলে তাঁর কোন সিরিয়াস নাটককেই প্রথম শ্রেণীর লেখা বলা যায় না। কিন্তু লঘু-ব্যঙ্গ নাট্যে তাঁর কৃতিত্ব বিশ্বমানের, বিশেষত ‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ অতি উচ্চ মানের উচ্চ স্তরের প্রহসনের মর্যাদা দাবী করে। “ মধুসূদন ‘শরমিষ্ঠা’ নাটক লিখেন ১৮৫৯ সনে এবং বাংলা নাটক দিয়েই পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে বাংলা সাহিত্যের চর্চায় মনোনিবেশ করেন। ঐ সময়টাতে বাংলা নাটক দিয়ে রামনারায়ণ তর্করত্ন বাজার মাত করে রেখেছেন। তাঁর নাটকে সমাজসচেতনতা ছিল, তবে পুরাণভিত্তিক নাটক লিখতেন এবং প্রধানত সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ করতেন। মধুসূদনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। তিনি চাইছিলেন ইউরোপীয় ধারায় নাটক রচনা করতে। কিন্তু ইউরোপীয় ধাঁচের নাটকের দর্শক তখনো তৈরি হয়নি। তাই সংস্কৃত নাটকের ধাঁচেই লিখতে হ’ল ‘শর্মিষ্ঠা'। কিন্তু সমসাময়িক নাটকের তুলনায় ‘শরমিষ্ঠা’ অনেক বেশি উজ্জ্বল বলে সাহিত্য- এবং নাট্যরসিকদের কাছ থেকে যথেষ্ট প্রশংসা পেয়েছিলেন।   

      ‘শরমিষ্ঠা’ নাটক বেশ জাঁকজমকের সাথে বেলগাছিয়া থিয়েটারে অভিনীত হয়েছে। থিয়েটারকর্তৃপক্ষ চাইছিলেন একটু নতুন ধরণের হাস্যরসাত্মক ছোট নাটক যা একই দিনে মঞ্চস্থ।করা যাবে। মধুসূদন তখন ‘পদ্মাবতী’ (গ্রিক পুরাণের ‘স্বর্ণ আপেলের’ কাহিনিকে ভারতীয় পুরাণের মত করে লেখা)  নাটক লিখছিলেন। প্রতিভাবান মধুসূদন ‘পদ্মাবতী’ লেখা স্থগিত করে খুব দ্রুত দুটো প্রহসন লিখে ফেললেন। প্রহসন দুটো হ’ল ‘একেই কি 

বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ’। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে এই দুটো প্রহসনের একটিও মঞ্চস্থ হ’ল না। এর আগে রামনারায়ণ তর্করত্ন লিখেছেন ‘কুলীনকুল-সর্বস্ব’। নাটকটি চিন্তাধারার দিক থেকে বেশ আধুনিক ছিল, কিন্তু এটি নাট্যকার লিখেছিলেন সংস্কৃত নাটকের রীতি অনুসরণ করে। মধুসূদন সংস্কৃত নাটকের বাইরে এসে ইউরোপীয় ধারার নাটক লিখতে চাইলেন। এবং তিনি সেটাই করলেন। পৌরাণিক কাহিনি ও চরিত্রের মোড়কে আধুনিক চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে অর্থাৎ পুরাণের ছদ্মাবরণে নাটক রচনা না করে সমসাময়িক নগ্ন ও নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে তাঁর প্রহসনের উপজীব্য করলেন। এটা করলেন বিদেশী আদর্শকে সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করে নিয়ে। মধুসূদনের সমাজচেতনা যে কতটা গভীর ছিল এই প্রহসনদুটো তার জ্বলজ্যান্ত প্রমান। তবে ‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ রচনা হিসেবে ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ রচনাটির চেয়ে অনেক উঁচু মানের। প্রফুল্ল কুমার পাত্র এবং ডঃ ক্ষেত্র গুপ্ত ‘মধুসূদন রচনাবলীর’ ভূমিকায় এই কথাটি খুব সিন্দর করে ফুট্যে তুলেছেনঃ ‘কিন্তু বর্ণহীন বাস্তবতার দিকে চোখ পড়তেই তাঁর মনে হ’ল অনেক স্খলন পতন পাপ জীবনের মধ্যে জীবনের মধ্যে জমা হয়ে আছে। তার প্রতি কবির ব্যঙ্গ উদ্যত হয়ে রইল এদুটি লেখায়।

      ‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনে মধুসূদন সমাজের যে চিত্র এঁকেছেন সে সমাজ বৃহত্তর সমাজের আংশিক প্রতিফলন মাত্র; অর্থাৎ কিনা যে চরিত্রগুলো এখানে সাজানো হয়েছে বৃহত্তর সমাজে এদের আনাগোনা আছে ঠিকই, কিন্তু এরাই সমাজের একমাত্র প্রতিনিধি নয়। এখানে শোষিত কৃষক আছে, আছে ধর্মের ধ্বজাধারী নারীলোভী প্রজাশোষক অর্থ গৃধ্নু জমিদার, আর আছে জমিদারের তোষামোদকারী অর্থলোভী দালালেরা। এখানে যেমন আছে লোভ ও ভণ্ডামি, তেমনি আছে ক্রোধ প্রতিশোধ-আকাঙ্ক্ষা ছলচাতুরী এবং বিদ্রোহ। নীচে একটু বিস্তারিত বলা হ’ল।

        ভক্তপ্রসাদ বাবু জমিদার। ভদ্রপ্রসাদ বৈষ্ণব মতে বিশ্বাসী। হানিফ গাজী গরীব কৃষক। গা-গতরে কঠোর পরিশ্রম করলেও ফসলের জন্য প্রকৃতির উপর ভরসা করে থাকতে হয়। এবার প্রচন্ড খরা হওয়াতে ফলন খুব খারাপ। ‘দশ ছালা ধানও বাড়ী’ আনতে পারেনি। পীরের দরগায় শিন্নি দিয়েও কোন লাভ হয়নি। কিন্তু ভগ্নপ্রসাদ ছাড়বে কেন? কড়ায় গণ্ডায় সব উসুল করে নেবে। কাকুতি মিনতি শুনবে না কিছুতেই। এই সময় হাতে মালা জপতে জপতে সময় মত খাজনা না দেওয়ার জন্য হানিফকে কটূ ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে ভক্তপ্রসাদ এগিয়ে আসে। খাজনা পাওনা হয়েছে এগারো সিকে আর হানিফ দিতে চায় তিন সিকে যদিও পুরো এগারো সিকে সে সঙ্গে এনেছে। ভক্তর কর্মচারী গদাধর এই সুজগে কিছু ফায়দা লুটতে চায়। সে হানিফকে বোঝায় সে জমিদারের সঙ্গে ওর হয়ে কথা বলবে।

হানিফকে একটু দূরে সরিয়ে দিয়ে লম্পট নারীলোভী ভক্তকে সে হানিফের জওয়ান বৌয়ের লোভ দেখায়। ভক্তর জিবে জল এসে যায়।

       এদিকে আবার ধরমের ভয় আর ‘মুসলমান মাগীদের মুখ’ থেকে পেঁয়াজের গন্ধ আসে বলে মন্তব্য করে। ধূর্ত গদাধর বুঝিয়ে বলে ‘শ্রীকৃষ্ণ ব্রজে গোয়ালাদের মেয়েদের নিয়ে কেলি করেন’। কামলোলুপ ভক্ত তিন সিকে নিয়েই হানিফকে বিদেয় করে। এখন তার মাথায় খেলছে কিভাবে হানিফের বৌ ফতেমাকে পাওয়া যায়। গদাধরের সঙ্গে অনেক দরাদরি করে কুড়ি টাকা খরচ করতে রাজী হয়। এই সময় হাজির হয় বাচস্পতি। বাচস্পতি শ্রদ্ধেয় মানুষ। শ্রদ্ধার সাথে বিনয়ের সাথে কথা বলতে হয়। কিন্তু তাই বলে শোষণ থেমে থাকে না। ভক্ত তার ব্রহ্মত্র ভূমি দখল করেছে। মা ঠাকরুন পরলোক গমন করেছে। টাকা দরকার। অনেক শুকনো সহানুভূতি দেখিয়ে কোন রকম সাহায্যের আশ্বাস না দিয়েই বাচস্পতিকে বিদেয় করে দিল ভক্ত। বাচস্পতি চলে গেলে ভক্ত গদাধরের সঙ্গে তার পুরনো নারীসংক্রান্ত কুকীর্তি নিয়ে আলাপে মশগুল হ’ল। তার খপ্পরে পড়ে ভটচায্যিদের মেয়ে এখন ‘বাজারে’ হয়ে গিয়েছে। এই লম্পটের কোন প্রকারের শোক আফসোস নেই। এখন তার মাথায় ঘুরছে ফতেমা। কত তাড়াতাড়ি ছুঁড়িকে পাওয়া যায় সেটাই এখন চিন্তা। গদাধরও তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার সঙ্গে খেলছে। কর্তা যত বেশি লালায়িত হবে, ততই তার লাভ। মনে মনে বলে, ‘গো মড়কেই মুচির পার্বণ’। এমন সময় ভগী আর তার মেয়ে পাঁচি জল আনতে ঘাটের দিকে যায়। পাঁচিকে দেখেও ভক্ত লোভের হাত বাড়ায়। 

কাছে ডাকে। গুরুজনসুলভ আচরণের অভিনয় করলেও তার কামুক দৃষ্টি সদ্যবিবাহিতা পাঁচির চোখ এড়ায় না। স্বামী কোলকাতায় থাকে। কায়দা করে ভক্ত জেনে নেয় পাঁচির বাবা পীতাম্বর কয়েক দিনের জন্য গ্রামের বাইরে গিয়েছে। নবযৌবনা পাঁচিকে পাওয়ার এই তো সুযোগ। গদাধরকে বলে যত টাকাই লাগুক এই মেয়েকে তার চাইই। গদাধর বলে পঞ্চাশ টাকা হলে পিসিকে দিয়ে কাজটা করানো যাবে। এত কিছুর মধ্যে তার ধর্মকর্ম সবই চলছে।  

       হানিফ গোঁয়ারগোবিন্দ। তবে পাঁচির মত ধুরন্ধরও বটে। দু’জনে ঠিক করে মানসম্মান না খুইয়ে কিভাবে ভক্তর কাছ থেকে টাকাপয়সা হাতিয়ে নেওয়া যায়। টাকাপয়সা ও কুপ্রস্তাব নিয়ে পুঁটি আসে। হানিফ আড়ালে লুকোয়। সে হানিফকে যমের মত ভয় করে। মনে মনে ভক্তর লাম্পট্যের কথা ভাবতে ভাবতে, ‘পাতিনেড়ে বেটাদের’ বাড়িঘরের ছিরি দেখে ভেতরে ভেতরে ঘেন্না করতে করতে নিশ্চিত হয়ে নিল যে হানিফ বাড়ি নেই। হানিফ জানত পুঁটি কেন এসেছে। আড়ালে দাঁড়িয়ে থেকে সে ফুঁসতে লাগল। হিন্দু ব্যাটার এত দুঃসাহস মুসলমানের ইজ্জৎ মারতে চায়। পুঁটি ফতেমাকে টাকা দিয়ে কখন কি করতে হবে বলে চলে গেল। যাবার আগে বলে গেল নেড়েদের আবার মান্সম্মানের ব্যাপার আছে নাকি, ওরা তো আবার বিয়ে বস্তে পারে। ফতেমাও কথা মুখপোড়া ফতেমাও কথা শোনাতে ছাড়ল না। ইঙ্গিত দিল, হিন্দু মেয়েরা বিধবা হলে বিয়ে করে ঠিকই, কিন্তু কি করে কে না জানে। সন্ধ্যেবেলা তাকে আমবাগানে জেতে হবে। ক্রুদ্ধ হানিফ ফতেমাকে বারবার হুঁশিয়ার করে দিল কাফের জেন তার গায়ে হাত না দিতে পারে।

      শ্রাদ্ধের খরচ যোগাতে বাচস্পতির তেঁতুল গাছ বিক্রি করার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। গাছ কাটতে হানিফের শরণাপন্ন হ’ল। বাচস্পতিকেও ভক্ত ঠকিয়েছে। দুজনেই শোষিত। ফলে ওদের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য তৈরি হ’ল। হানিফ বাচস্পতিকে একটু আগের ঘটনা সব খুলে বলল।  বাচস্পতি নিজেও নেড়েদের সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ না থাকলেও শোষক জমিদারকে জব্দ করে কিভাবে ন্যায্য পাওনা আদায় করা যায় সে ব্যাপারে পরামর্শ করে ফেলল। এদিকে পুঁটি আবার এসে ফতেমাকে গোপনে বলে গেল যে আমাবাগানে গেলে কাজ হবে না, পুরনো শিবমন্দিরে যেতে হবে।

       ভক্তর তো আর সময় কাটে না। কখন সন্ধ্যে হবে। ভাল করে সাজগোঁজ করে নিল। পাঁচিকে পেল না, ফতেমাকে পাবে তো? এই অস্থির অবস্থায় এল আনন্দ। আনন্দ কোলকাতায় থাকে। তার ছেলে অম্বিকার সঙ্গে যোগাযোগ আছে। আলাপ করে 

জানতে পারল কোলকাতায় জাতিভেদ উবে যাচ্ছে। ব্রাহ্মণদের সেই সম্মান আর নেই। গঙ্গাস্নানের প্রতি সেই ঝোঁক আর নেই। কোলকাতায় নেড়েদের হাতের রান্না পর্যন্ত খায় অনেকে। রক্ষণশীল ভক্ত শিউড়ে উঠল। এমনকি যাতে গোল্লায় না যায় তার জন্য ছেলেকে গ্রামে ফিরিয়ে আনতে চাইল। আনন্দ মত দিল এমনটা করা ঠিক হবে না যেহেতু অম্বিকা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছেলে। গদাধরের বাবুর কথা শুনে মনে মনে হাসে। ভাবে বুড়ো একটা আস্ত ভণ্ড। সে যাইহোক, সবাই চলে গেলে গদার ইচ্ছে করে বাবুর মত আরাম করে হুঁকো টানে আর তখন কেউ তার পা টিপে দিক। ভৃত্য রামের সাথে কিছুক্ষণ এই মজা করে। বাবুর পায়ের শব্দ শুনে তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ে। বাবু আসে। তার সাজগোজ দেকে সে স্বগতোক্তি করে, ‘আজ বুড়োর ঠাট দেখলে হাসি পায়! শান্তিপুরে ধুতি, জামদানের মেরজাই, ঢাকাই চাদোর, জরির জুতো, আবার মাথায় তাজ। হা! হা! হা!’

      ভক্ত মনে মনে বলে, তাজ পরে ভালই হয়েছে। নেড়ে মাগীরা এই সব পছন্দ করে। আর এতে টিকিটাও ঢাকা পড়েছে। বুড়ো গায়ে আতরও মেখে নিল খানিকটা। ভাবে, ‘নেড়েরা আবাল বৃদ্ধ বনিতা আতরের খোসবু বড় পছন্দ করে।‘ নেড়ে মাগীর গায়ে পেঁয়াজের গন্ধ থাকতে পারে এই চিন্তায় আতরের কয়েকটি ছোট শিশি সঙ্গে নিল। আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে ভক্তকে বলে গেল, কেউ খোঁজ করলে বলতে যে সে জপে ব্যস্ত।

      প্রহসনের ক্লাইমেক্স ঘটে দ্বিতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় গর্ভাঙ্কে। এটাই শেষ দৃশ্য। এবং এটি ঘটে একটি উদ্যানের পরিত্যক্ত ষিব মন্দিরের কাছে। ভক্ত বাবু আসবে অভিসারে। বাচস্পতি ও হানিফ কাছেই আত্মগোপন করে থাকে। গোঁয়ারগোবিন্দ হানিফ ভেতরে ভেতরে অস্থির। পারে তো এখনি ভক্তর গলা টিপে ধরে। বাচস্পতি তাকে সংযত রাখতে চেষ্টা করে।

      ঘটনাস্থলে ফতেমা এবং পুঁটি প্রবেশ করে। ফতেমা ভয়ে অস্থির। ভূতের ভয়ও আছে। গোঁয়ার স্বামীর কথা তো বলাই বাহুল্য। পুঁটি তাকে সান্ত্বনা দেয়, ধৈর্য ধরতে বলে, আশ্বাস দেয়। ভূতের ভয় পুঁটিরও আছে। ভয়ে অস্পৃশ্য ফতেমাকে জড়িয়ে ধরে। ফতেমা পাশের মসজিদে আশ্রয় নিতে চায়। পুঁটি সায় দেয় না আর মনে মনে ভাবে, ‘আঃ, এই বুড় ডেকরা মরেছে না কি?’ এর মধ্যেই ভক্ত ও গদাধর চলে আসে। এসেই তার ‘মনোমোহিনীর’ খোঁজ করে। ফতেমাকে দেখতে পেয়ে মনে মনে বলে, যবনী হলে

কি হবে, এ তো রূপে লক্ষ্মী। কেউ আসছে কি না সেদিকে নজর রাখতে বলে ভক্ত ভয়ে ও লজ্জায় আড়ষ্ট ফতেমার দিকে এগিয়ে যায়। হরিবোল বলতে বলতে ফতেমাকে কাছে আহ্বান করে। গদাধর মনে মনে বলে, হরিবোল বলছ কেন? আল্লা আল্লা বল। গোঁয়ার চাষির ঘরে এমন রূপসী! ভক্তর প্রাণে কাব্য আসেঃ

ময়ূর চকোর শুক চাতকে না পায়।  

হায় বিধি পাকা আম দাঁড়কাকে খায়।।

পুঁটি মনে মনে বলে, আজ বাদে কাল বুড়ো শিঙ্গে ফুঁকবে, কিন্তু এখনো রসের নাগর। প্রকাশ্যে কর্তাকে বলে, নেড়ে মেয়ে কি এইসব কাব্যি বুঝবে? এদিকে ফতেমার ভয় কাটে না, সে পালাতে চায়। পুঁটি বিরক্ত হয়। বলে, ‘তেঁতুল নয় মিষ্টি, নেড়ে নয় ইষ্টি।‘ এত কাকুতি মিনতি, এত প্রেম নিবেদন—তবু ছুঁড়ির মন ভরে না! কামাতুর ভক্তর কাব্যি আর কমে না। পুঁটি বোঝাতে চায় ফতেমা ভয় পাচ্ছে পাছে কেউ দেখে ফেলে। তাই মন্দিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। ভক্তর ধরমের ভয় আছে। আবার যুক্তি দেয় ভগ্ন শিবে শিবত্ব নেই। ভাবে ‘বিশেষ এমন স্বর্গের অপ্সরীর জন্যে হিন্দুয়ানি ত্যাগ করাই বা কোন ছার?’ নেপথ্যে শোনা যায় গম্ভীর গলায় কে বলছে, ‘বটে রে পাষণ্ড, নরাধম দুরাচার?’ সবাই ভয় পায়। ভক্ত গদাকে কাছে ডাকে। পুঁটি মূর্ছা যায়। আবার হুঙ্কার ধ্বনি। গদা পালায়। ভক্ত বলে, ও মা গো। হুঙ্কার আবার ভেসে আসে। ভক্ত কিছু জানে না দাবী ‘অষ্টাঙ্গে প্রণিপাত’ হয়। হানিফ মুখ ঢেকে এসে ভক্তকে উত্তম মধ্যম দিয়ে বেগে পালিয়ে যায়। ভক্ত ভয়ে ব্যথায় কোঁকাতে থাকে। এইসময় বাচস্পতি রামপ্রসাদী গাইতে গাইতে আসে ‘মায়ের এই তো বিচার বটে’। বাচস্পতির আগমনে গদাধর ভরসা পায় কারন ভূত ব্রাহ্মণকে ভয় পায়। পুঁটি উঠে বসে। উঠে বসে ভক্ত। আমরা আগে দেখেছি সবই বাচস্পতি ও হানিফের সাজানো খেলা। তবুও বাচস্পতি ফতেমাকে দেখে রহস্য করে বলে, ও এখানে কেন? ভক্তর আর কোন কিছু গোপন করার নেই। ভয়ে অপমানে সব স্বীকার করে। শপথ করে আর কখনো এই অধর্মের পথে পা বাড়াবে না। বাচস্পতির কাছে কৃপা ভিক্ষা করে, তাকে পরম আত্মীয় বলে সম্বধন করে। বাচস্পতি সুযোগ লুফে নেয়। বলে, তার ব্রহ্মত্র ভূমিটুকু কর্তা কেড়ে নেওয়ার পর এখন নিঃস্ব, কর্তার আত্মীয় হবে কি করে! ভক্ত ওই জমি ফিরিয়ে দেবে প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ নগদ টাকাও দেবে অঙ্গীকার করে। এমন সময় হাজির হয় হানিফ। বলে বিবিকে খুঁজতে খুঁজতে একানে এসেছে। ভক্তর কাটা ঘায়ে সে নুনের ছিটা দেয়। বলে, কর্তার মুসলমান হওয়ার সাধ হয়েছে তা বললেই হ’ত, ফতেমার দিকে নজর দেওয়ার দরকার ছিল না, সে তাকে ‘সোনার চাঁদ’ ধরে এনে  দিত। ভক্ত হানিফের কাছে মাপ চায় আর বলে সে তাকে কিছু টাকাপয়সা দেবে। হানিফ ক্ষান্ত হয় না। কর্তাকে মনে করিয়ে দেয় সে কথায় কথায় নেড়ে বলে গালিগালাজ করে আর এখন নিজেই তো নেড়ে হতে চাইছে। এই খুশির খবর সে সবাইকে সে বলে বেড়াবে। এইভাবে ভীতিপ্রদর্শন ভাল ফল দেয়। ভক্ত লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে জেতে চায়। বাচস্পতি হানিফকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কিছু বলে। ফতেমাও টিটকিরি মারতে ছাড়ে না। বাচস্পতি মিটমাট করে দিতে চায়। ভক্তকে বলে হানিফকে দু’শ টাকা দিতে। ভক্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজী হয়। গদা দুশ্চিন্তায়, তার রোজগারের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল ভক্তর ভাল মানুষ হওয়ার প্রতিজ্ঞা শুনে। পুঁটি এই ব্যবসা বাদ দিয়ে গতর খাটিয়ে উপার্জন করবে বলে ঠিক করে। তবে ওর মনে সন্দেহ থেকে যায়, নেড়ে মাগীদের সাথে পোষা ভূত থাকে কি না! ভক্তর অনেক খেসারত দিতে হ’ল। মানসম্মান তো যথেষ্ট খোয়া গেল। নারায়ণের কাছে প্রার্থনা করি যেন এমন দুর্মতি তার আর না ঘটে।

        দুই অঙ্কের সর্বমোট চার দৃশ্যের নাটকটির দুটো সফল মঞ্চায়ন দেখেছি। একটি ছিল হিউষ্টনের একটি নাট্যগ্রুপের। সময় পাল্টেছে। এমন নাটক পরে অনেক হয়েছে এবং হচ্ছে। মনে রাখতে হবে মধুসূদন এটি লিখেছিলেন আজ থেকে একশ আটান্ন বছর আগে। তখনো রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়নি। বাংলা গদ্য নিয়ে তখনো নিরীক্ষা চলছে। যশোরের আঞ্চলিক ভাষা সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন কারো কারো মুখে। আগেই বলেছি, বাংলা নাটককে সংস্কৃত নাটকের ধারাবাহিকতা থেকে মুক্তি দিয়ে ইউরোপীয় ধারায় প্রবাহিত করতে চেয়েছেন। এবং তিনি অসম্ভব সফলতা পেয়েছেন। ডঃ অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন - ‘সম্প্রতি কোন কোন অতি আধুনিক সমালোচক বলতে শুরু করেছেন—মাইকেল বাংলা জানতেন না। এই দু’খানি প্রহসন থেকেই দেখা যাবে মাইকেলের নানা ধরনের বাংলা, মায় উপভাষা—কতটা জানা ছিল, আর জনজীবনের সঙ্গে তিনি কতটা নিবিড়ভাবে পরিচিত ছিলেন।‘ প্রতিভাশালী দীনবন্ধু মিত্রও মধুসূদনের প্রহসনের  আদর্শে ‘সধবার একাদশী’ লিখেছিলেন। আমরা আগেই বলেছি বেলগাছিয়া থিয়েটারের অনুরোধে (অন্য এক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, পাইকপাড়ার বিদ্যোৎসাহী জমিদার সিঙ্ঘভ্রাতাদের অনুরোধে) ‘পদ্মাবতী’ নাটক লেখা মাঝপথে স্থগিত রেখে প্রহসন লিখেছিলেন। কিন্তু থিয়েটার কর্তৃপক্ষ প্রহসনদুটোর মঞ্চায়ন করেননি। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের মধ্য থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে এমন ভয় ছিল এটা সম্ভবত নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এই প্রহসনদুটো যাতে মঞ্চস্থ না হয় তার জন্য প্রতিপক্ষ থেকে শাসানিও এসে ছিল। মধুসুদন মনে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। রেগে গিয়ে লিখেছিলেন, উনি বাংলায় আর লিখবেন না, লিখবেন হিব্রু আর চীনা ভাষায়। সুখের বিষয় বেলগাছিয়াতে না হলেও অন্যত্র এগুলো অভিনীত হয়েছিল।

বিস্ময় জাগে যখন ভাবা যায় তিনি তাঁর বিচিত্র জীবনের এত উত্থান পতনের কোন ফাঁকে সমাজের আবিলতাকে এত সূক্ষ্মভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছেন বা দেখেছেন। আর দেখতে পেরেছিলেন বলেই বাংলা গদ্য বাংলা নাটককে মধুসূদন অনেক খানি মুক্ত করে দিয়ে গেছেন। 

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

১। প্রফুল্ল কুমার পাত্র ও D; ক্ষেত্র গুপ্ত কর্তৃক সম্পাদিত ‘মধুসূদন রচনাবলী’।

২। ডঃ অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ‘বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ (১৯৯৫ সংস্করণ)।

৩। Merriam Webster’s Encyclopedia of Literature (1995).

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?