• শিশুর শৈশব ও ভবিষ্যতের ভাবনা - পল্লব কুমার দত্ত

  • থিমঃ নারী দিবসের ভাবনা - স্নেহাশীষ দাস  

  • বিপ্রতীপ পদার্থ বা অ্যান্টাই মিটার - সুবিমল চক্রবর্তী

  • কালীনাচ ও চড়কমেলা একটি গ্রাম্য সংস্কৃতি - সনোজ চক্রবর্তী 

  • দেশ ভ্রমণ - মিজানুর রহমান মিজান

  • নতুন ইংরেজী বছর ২০১৮ হউক শান্তির বীজ বপনের সাল -  মোস্তফা কামাল

  • বুদ্ধিমান দাঁত - সরসিজ দাস 

প্রবন্ধ আলোচনা - ২

শিশুর শৈশব ও

ভবিষ্যতের ভাবনা

পল্লব কুমার দত্ত

....এছাড়া আরো যেটা আমাদের ভাবার তা হল ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা কিন্ডারগার্ডেন, কে জি স্কুলগুলির শিক্ষাকে নিয়ে ব্যবসাতে নেমে পড়ার প্রতিযোগিতা। শিশুদের যখন মাতৃক্রোড়ে আদর খাবার সময়, যখন তারা ভাল করে কথা বলতে পারে না, চলতে শেখে না, নিজের কাজ নিজে করতে শেখে না....

  আশ্রমের রূপ ও বিকাশ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেলান ‘ছেলেরা বিশ্ব প্রকৃতির অত্যন্ত কাছের সামগ্রী। আরাম কেদারায় তারা আরাম করতে চায় না, গাছের ডালে তারা চায় ছুটি। জীবনের আরম্ভে অভ্যাদের দ্বারা অভিভূত হওয়ার আগে কৃত্তিমতার জাল থেকে ছুটি পাবার জন্য ছেলেরা ছটফট করতে থাকে, সহজ প্রাণলীলার অধিকার তারা দাবী করে বয়স্কদের শাসন এড়িয়ে। শিক্ষাগুরু হিসাবে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ভাবনা আজ আমাদের চিত্ত মানস ক্ষেত্রে আসে না। আমরা এখন প্রতিযোগিতায় নেমেছি। আমাদের শিশুদের এক এক জনকে এক একটি দিকে দিকপাল করে তুলবো এই আশায়। শিশুদের শিশুকাল  তাই হারিয়ে যাচ্ছে পিতা মাতার এই চাওয়ার আকাঙ্খায়। শিশুদের একদিকে আছে বিশাল ব্যাগের বোঝা অর্থাৎ পড়াশোনার চাপ, অন্যদিকে আছে নাচের স্কুল, গানের স্কুল, আঁকার স্কুল, যোগ ব্যায়াম, আছে ক্রিকেট কোচিং। শিশুর সময় নেই খেলাধুলা করার। একটু বড় হলেই এক একটি বিষয়ের এক একজন প্রাইভেট টিউটর। সকাল, বিকাল ও সন্ধ্যা সকল সময়েই ব্যাস্ত।
  এছাড়া আরো যেটা আমাদের ভাবার তা হল ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা কিন্ডারগার্ডেন, কে জি স্কুলগুলির

শিক্ষাকে নিয়ে ব্যবসাতে নেমে পড়ার প্রতিযোগিতা। শিশুদের যখন মাতৃক্রোড়ে আদর খাবার সময়, যখন তারাcভাল করে কথা বলতে পারে না, চলতে শেখে না, নিজের কাজ নিজে করতে শেখে না, যখন তাদের নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঐ সমস্ত স্কুলগুলিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ তাই বলছেন – ছেলেরা অবোধ হয়ে দুর্বল হয়ে মায়ের কোলে আসে, সেইজন্য তাদের রক্ষার প্রধান উপায় মায়ের মনের অপর্যাপ্ত স্নেহ’। এখন প্রায় সকল পরিবারই অনু পরিবার। যৌথ পরিবারের যে সুফল তা থেকে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। তারপর বাবা মা উভয়েই যদি চাকুরীজিবী হন তাহলে শিশুকে রাখতে হচ্ছে ক্রেসে বা কাজের লোকের কাছে। বাবা-মায়ের অপত্য স্নেহের কি পরিপূরক হতে পারে এই ব্যবস্থা? তাই শিশুর মনে মানবিক বিকার আসতে বাধ্য। এই মানসিক বিকার থেকেই জন্ম নেয় অপরাধমূলক কাজের প্রবণতা। অন্যদিকে পিতা মাতারা প্রতিযোগিতায় নেমেছেন কি ভাবে ছেলেমেয়েদের একটি বিভাগে (শিক্ষার ব্যবহারিক প্রয়োগমুলক বিষয়) ভর্তি করে সহজও অল্প সময়ে সাফল্য আনা যায়। তাতে করে ছাত্র ছাত্রীদের মেধার দিকটাতে কোন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আবার এই প্রবণতা দেখা যায় যে ছাত্র ছাত্রীরা মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করলেই অভিভাবকরা ধরে

 

নেন যে তাদের ছেলেমেয়েরা বিশাল মেধার অধিকারী।তাদের ঠেলে দেওয়া হয় বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়তে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাসের আকাশ পাতাল তফাৎ বোঝার ক্ষমতাই নেই অভিভাবকদের। ফল প্রকাশিত হবার পর চৈতণ্য হয়। নিজের কাজ নিজে করতে শেখে না, যখন তাদের নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঐ সমস্ত স্কুলগুলিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ তাই বলছেন – ছেলেরা অবোধ হয়ে দুর্বল হয়ে মায়ের কোলে আসে, সেইজন্য তাদের রক্ষার প্রধান উপায় মায়ের মনের অপর্যাপ্ত স্নেহ’ ।      এখন প্রায় সকল পরিবারই অনু পরিবার। যৌথ পরিবারের যে সুফল তা থেকে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। তারপর বাবা মা উভয়েই যদি চাকুরীজিবী হন তাহলে শিশুকে রাখতে হচ্ছে ক্রেসে বা কাজের লোকের কাছে। বাবা-মায়ের অপত্য স্নেহের কি পরিপূরক হতে পারে এই ব্যবস্থা? তাই শিশুর মনে মানবিক বিকার আসতে বাধ্য। এই মানসিক বিকার থেকেই জন্ম নেয় অপরাধমূলক কাজের প্রবণতা। বিশ্বায়নের যুগে শিক্ষাকে ব্যবসা হিসাবে নিয়ে হাজির দেশি-বিদেশী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। খুব অল্প সময়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। এই প্রলোভনে অভিভাবকরা দিগবিদিগ জ্ঞানশূণ্য হয়ে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করে দিচ্ছেন। আর এই প্রতিযোগিতায় সামিল হচ্ছে সকল স্তরের মানুষ। মোহভঙ্গ হয় যখন দেখা যায় এই খরচা করেও চাকরি হচ্ছে না বা হলেও অল্প পারিশ্রমিকের চাকরী। ভীষণ হতাশায়, কর্মহীনতায়, দিশাহীনতায়, জর্জরিত হচ্ছে যুব সমাজ। সাধারণ ছাত্র ছাত্রী শতকরা হিসাবে যারা সংখ্যায় বেশী তাদের ভবিষ্যৎ আরো অন্ধকার। লেখাপড়া শিখে রুটি রোজগারের পথ প্রায় বন্ধ। যেমন করে হোক রোজগারের পথ বেছে নিতে অসামাজিক কাজে নেমে পড়ার হাতছানি। এই বিপথমুখী হওয়ার বা অবক্ষয় রোধ করার জাদুমন্ত্র কি তা জানা নেই। তবে চরিত্র গঠনের শিক্ষাটা শিশুকাল থেকে

   শিশু বা ছাত্রদের দেওয়া উচিত। কারণ বর্তমান ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে ভদ্রতা, নম্রতা, সভ্যতা-ভব্যতা, পরিশালীত আচরণের অভাব আছে। চরিত্র গঠনের শিক্ষার কথা পৃথিবীর সকল শিক্ষাবিদরাই বলে গেছেন। শিক্ষাবিদ হিসাবে বিবেকানন্দের সেই অনন্য উক্তিটি – ‘প্রাণীজগতের বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মানুষের সর্বশ্রেষ্ট জীবে উন্নীত, এখন মানুষের মনের বিবর্তন দরকার যাতে সর্বশ্রেষ্ট চরিত্রের অধিকারী হয়। সমাজ পরিবর্তনের যত ভালই তত্ত্ব আসুক না কেন, তার রূপকার বা অনুগামীরা যদি উৎকৃষ্ট মনের বা চরিত্রের অধিকারী না হন, তাহলে সমাজের উন্নতি কখনই সম্ভব না। বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে শিশুর পিতাকে আরো জাগিয়ে তুলতে পারব সে বিষয়ে আশাবাদী, কারণ ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।

থিমঃ নারী

দিবসের ভাবনা

স্নেহাশীষ দাস

দঃ কলকাতা

বিদিশা দ্বিচক্রযানে আরোহণ রপ্ত করিতেই তাহার সমবয়স্ক বালকরাও দ্বিচক্রযানে উৎসাহী হইল। তাহারা স্বীয় স্বীয় অবিভাবকগণের নিকট দ্বিচক্রযানের নিমিত্ত উৎপাত শুরু করিল। অনেকগুলো দ্বিচক্রযান পাড়ায় আসিল। সকলেরই রাবিশ ফেলা রাস্তায় ফরফর ঝরঝর করিয়া দ্বিচক্রযান চালাইতে লাগিল।

দ্বিচক্রযানঃ

  ভবেশবাবুর একাদশী কন্যা বিদিশার দ্বিচক্রযান চালনাকে উপলক্ষ্য করিয়া বিবেকানন্দ পল্লীতে একটি বিপ্লব ঘটিয়া গেল। বিদিশা চতুর্থ শ্রেণীতে উল্লেখযোগ্য ফল করায় তাহার মাতুল তাহারই ইচ্ছাক্রমে দ্বি-চক্রযানটি তাহাকে উপহার দিয়াছিলেন।  বিদিশা দ্বিচক্রযানে আরোহণ রপ্ত করিতেই তাহার সমবয়স্ক বালকরাও দ্বিচক্রযানে উৎসাহী হইল। তাহারা স্বীয় স্বীয় অবিভাবকগণের নিকট দ্বিচক্রযানের নিমিত্ত উৎপাত শুরু করিল। অনেকগুলো দ্বিচক্রযান পাড়ায় আসিল। সকলেরই রাবিশ ফেলা রাস্তায় ফরফর ঝরঝর করিয়া দ্বিচক্রযান চালাইতে লাগিল। অভিভাবকবৃন্দ সাধারণভাবে ইহার মধ্যে মন্দ কিছু দেখেন নাই। সর্ব বিষয়ে দৃষ্টিপ্রদায়িনী পাড়ার স্বঘোষিত অভিভাবিকা কামিনী বৌদি সর্বপ্রথম আবিষ্কার করলেন বালকদিগের সকল দৌড় বিদিশাকে কেন্দ্র করিয়া এবং বিদিশা থাকিলে সকলে নিজ নিজ দ্বিচক্রযানের বেগ এরূপ বৃদ্ধি করে যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে। কামিনী বৌদি তাহার পর্যবেক্ষণ ও ভাবনার কথা অভিভাবকদিগের অন্তরে

গোপনে ঢালিলেন। তাহার চমকাইয়া উঠিলেন, সর্বনাশ হইতে কিছু বাকি নেই। তাহার জোট বাঁধিলেন, হ্যাঁ অত্যন্ত অশোভনভাবে ভবেশবাবুর পত্নীকে স্মরণ করাইয়া দিলেন যে কন্যা বড় হইয়াছে। কেবলমাত্র ‘মেয়ে’ এই অপরাধে বিদিশার দ্বিচক্রযান চালনা বন্ধ হইল।

লেডিজ সীট

  নতুনহাট নারী প্রগতির সম্পাদিকা সুনীতা পাল শকুন্তলা পার্কের উচ্চতর উপার্জনকারী শ্রেণী চিহ্নিত ফ্লাটে থাকেন।আমাদের এই হাজামাটা নতুনহাটে ‘উইম্যান্স লিবের’ প্রধান বক্তা। ফিবছর নারী দিবসে নারী প্রগতির বিশেষ অনুষ্ঠান হয়। প্রগতি কিছু হয় কিনা তা বলার সাহস আমার নেই। তবে পোশাক, গহনার, সুগন্ধীর এক মনোরম পরিবেশ হয়। এবারের অনুষ্ঠানের দু-দিন আগে সুনীতাদেবী ব্লিচ করিয়েছেন। অনুষ্ঠানের দিন কমলালেবুর খোসা, শসা, কাঁচাহলুদ, টকদই, মুলতানি মাটি, মুসুরডাল বাটা ইত্যাদি মিশিয়ে মাস্ক নিয়েছেন। চুল রঙ করেছেন। দুপুর দুটো থেকে মেকআপ এ বসেছেন। আইলাইনারের সুক্ষ টাচ,

হালকা মেকআপ, ঠোঁটে মানানসই রঙ, লাগসহ খোঁপা, কুঁচিতে পিন – আরো কত কি। মুশকিল হল পৌনে পাঁচটা নাগাদ ড্রাইভার ফোন করে জানালো যে সে আসতে পারবে না। অগত্যা সমস্ত ‘ফ্যানিটি’ ব্যাগে পুরে বাসে চাপতে হল। ভীড়ে ভরা ১৮-সি তে মহিলা সনে একজন বয়স্ক মানুষ বসেছিলেন। মহিলারাই তাকে অনুমতি দিয়েছিলেন।সুনীতাদেবী পছন্দ করলেন না। বললেন – দেখি সিট টা ছাড়ুন তো, দেখছেন তো এটা লেডিস সিট’। বৃদ্ধ বললেন – মাগো আমার শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল। তাই এনাদের বলে একটু বসেছি। তৎক্ষণাৎ ঝাঁঝিয়ে উঠলেন – শরীর খারাপ লাগতেই পারে, কিন্তু আপনি তো যাবেন জেন্টসের দিকে। যান ওদিকে ওদের বলুন একটু বসতে দিতে। চাষিদের এক বউ ছেলে কোলে বসেছিল ময়নাগোড় নামবে। বৃদ্ধ উঠার উপক্রম করতেই তার হাত ধরে তাকে বসালো। বলল – বাবা, তুমি এখানেই বসো, দিদিমণি আপনি আমার এখানটায় বসুন। বৌটি ছেলে কোলে দাঁড়াল আর সুনীতাদেবী তা কেন বলে আর দেরী করলেন না।

কেয়ার অ্যান্ড কাবলি

  সকাল ছটায় কলিংবেলটা বাজলো। রাণীহাটি মহাবিদ্যালয়ের দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্রী শ্রীপর্ণা দরজাটা খুলে অপ্রত্যাশিত ভাবে তার বান্ধবী তন্দ্রাকে পেল। এত সকালে আসার কারণ জানতে চাওয়ার আগেই তন্দ্রা বলল – নারী দিবসের থিম। শ্রীপর্ণা বলল – কি করতে চাস? তন্দ্রা বলল – তোর স্বদেশী যুগের সেই বিদেশী পণ্য পোড়ানোর আন্দোলন মনে আছে। - হ্যাঁ মনে আছে, মানে সিনেমায় দেখেছি। আবার তন্দ্রা বলল হ্যাঁ নারী দিবসে এমনই একটা কিছু করতে চাই। মানে ? কি পোড়াবি তুই? শ্রীপর্ণা বলে ‘কেয়ার অ্যান্ড কাবলি’ সংক্ষেপে ‘কে আ কা’। শ্রীপর্ণা – কেন তাতে কি লাভ? তন্দ্রা বলল – তুই টিভিতে ওদের অ্যাডটা দেখেছিস’ – বলে কিনা কাশ হামারা এক বেটা হোতা। বেটিতে সাধ মেটে না। তার চেয়েও মেয়ে বাপের সাধ মেটাচ্ছে ‘কেয়ার অ্যান্ড কাবলি’ মেখে। মানে মেয়েদের যোগ্যতা লেখাপড়ায় নয় রঙে। রঙ সাদা হলে তবেই সে উপার্জনক্ষম। এতো নারীত্বের অবমাননা। নারী কি পণ্য নাকি যে রঙ চং মেখে নিজেকে বিক্রয়যোগ্য করে তুলতে হবে। আমরা এটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েই নারী দিবস পালন করবো। তুই খালি একটা পোস্টার লিখে সকাল সাড়ে নটায় রাণীহাটির মোড়ে চলে আয়। ওদের সব আমি খবর দিচ্ছি। এক ঝাঁক তরুণীর কেয়ার অ্যান্ড কাবলি বহ্নুৎসবের জেরে রানীহাটির মোড়ে বেশ কিছুক্ষণ ট্র্যাফিক আটকে ছিল।

 

বিপ্রতীপ-পদার্থ বা

অ্যান্টাই-ম্যাটার

সুবিমল চক্রবর্তী

ডালাস, টেক্সাস

.....মনুষ্য সমাজের জন্য এটা অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার যে, বিপ্রতীপ-পদার্থঅত্যন্ত বিরল, বলতে গেলে এর কোন অস্তিত্বই নেই। এই বাস্তব সত্যের কারনেই আমরা এখনো পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছি। তা না হলে পদার্থ ও বিপ্রতীপ-পদার্থের ক্ষণিকের মৃত্যু-নৃত্যের মধ্য দিয়ে আমরা সবাই কোথায় হারিয়ে যেতাম, হারিয়ে যেত আমাদের ‘বিপ্রতীপ-আমরা’....

  ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে যদি আমরা শুরু করি বিপ্রতীপ-কণা দিয়ে। কণা ও বিপ্রতীপ-কণার একই ভর থাকবে, কিন্তু থাকবে বিপরীত বৈদ্যুতিক চার্জ। যেমন, ইলেকট্রনের বিপ্রতীপ-কণা হচ্ছে পজিট্রন। ইলেক্ট্রন ও পজিট্রনের ভর একই, কিন্তু ইলেক্ট্রনের চার্জ ঋণাত্মক এবং পজিট্রনের চার্জ ধনাত্মক। সাধারণ মানুষের কাছে রেড কোয়ার্ক পরিচিত কণা নয়। রেড কোয়ার্কের বিপ্রতীপ-কণা হচ্ছে বিপ্রতীপ-লাল বিপ্রতীপ-কোয়ার্ক। এখানে ‘লাল’ কিন্তু আমাদের পরিচিত লাল রং নয়। বৈজ্ঞানিকেরা ‘লাল’ শব্দটি দিয়ে কণাটির একটা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেছেন মাত্র। যে সব কণার চার্জ নেই সেই সব কণার বিপ্রতীপ-কণা নিজেরাই। যেমন, নিউট্রনের কোন চার্জ নেই বলে নিউট্রনের বিপ্রতীপ কণাও নিউট্রন। এখন আমরা যদি কণা থেকে ম্যাটার বা পদার্থে যাই, আমরা বলব যে, বিপ্রতীপ-পদার্থ পদার্থের এক আজব ছায়া যেখানে বাম হয়ে যায় ডান এবং ধনাত্মক হয়ে যায় ঋণাত্মক। একটা স্থূল দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। ধরা যাক মাটি কেটে কেউ একটা পুতুল বানিয়ে সেটা হুবহু তুলে আনল। পুতুলটাকে যদি বলি পদার্থ, পুতুলবানানো জায়গাটার পুতুলাকৃতির যে গর্ত পড়ে থাকল সেই গর্তকে বলব বিপ্রতীত-পদার্থ। কোন পদার্থ যদি তার বিপ্রতীপ-পদার্থের মুখোমুখি হয়, মুহূর্তের মধ্যে তারা ‘মৃত্যু নৃত্যে’ শরিক হয়ে একে অপরকে ধ্বংস করে দেবে। তার মানেই হচ্ছে, পদার্থ ও বিপ্রতীত-পদার্থ পরস্পর পরস্পরের যম।এই আজব বিপ্রতীপ কণার অস্তিত্বের সম্ভাবনার দিকে আঙুল নির্দেশ করা হয়েছিল মাত্র সাতাশি বছর আগে। আর কয়েক বছর পরেই সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল উপরে উল্লেখিত পজিট্রনের।

       মনুষ্য সমাজের জন্য এটা অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার যে, বিপ্রতীপ-পদার্থঅত্যন্ত বিরল, বলতে গেলে এর কোন অস্তিত্বই নেই। এই বাস্তব সত্যের কারনেই আমরা এখনো পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছি। তা না হলে পদার্থ ও বিপ্রতীপ-পদার্থের ক্ষণিকের মৃত্যু-নৃত্যের মধ্য দিয়ে আমরা সবাই কোথায় হারিয়ে যেতাম, হারিয়ে যেত আমাদের ‘বিপ্রতীপ-আমরা’। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এইটুকু জোর দিয়ে বলতে পারেন যে, আমাদের এই সমগ্র বিশ্বের স্বাভাবিকতা হচ্ছে পদার্থ, বিপ্রতীপ-পদার্থ নয়। ধারণা করা হয়, বিগ ব্যাং বা মহা বিস্ফোরণের (যে প্রক্রিয়ায় এই বিশ্বের সূত্রপাত হয়েছিল) পরবর্তী মুহূর্তে প্রথমেই যেটা ঘটেছিল সেটা হ’ল বিপ্রতীপ-পদার্থের ধ্বংস-সাধন। যে বস্তুবিশ্ব এখন টিকে আছে, সে বস্তুবিশ্বেএখন বিরাজিত শুধুমাত্র সেই সব উচ্ছিষ্ট যেগুলো চৌদ্দ বিলিয়ন বছর আগে ঘটে যাওয়া‘মহা সংহার’-এর খেলা যে খেলায় পদার্থ ও বিপ্রতীপ-পদার্থ পরস্পরকে সংহার করেছিল। সেই মহা সংহারেরখেলায় সব বিপ্রতীপ পদার্থ খতম হয়ে গেছে, কিন্তু সব পদার্থ খতম হয়নি। তার মানে দুষ্ট বিপ্রতীপ পদার্থ এই খেলায় হেরে গেছে এবং জিৎ হয়েছে পদার্থের। আমরা জানি এই বিশ্বে শুধুমাত্র পদার্থই নয়, চৌদ্দ বিলিয়ন বছর ধরে এখানে বিরাজ করছে ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক বিকিরণ। এখন কথা হচ্ছে, বিপ্রতীপ পদার্থ যখন পদার্থকে

ধ্বংস করে (নিজেও অবশ্য ধ্বংস হয়ে যায়), তখন কী ঘটনা ঘটে? একটা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে একটা গামা রশ্মির স্ফুলিঙ্গ তৈরি হতে পারে। এই গামা রশ্মি আলোর বেগে বধ্য ভুমি থেকে মুহূর্তের মধ্যে অনেক দূরে চলে যাবে। সব বিপ্রতীপ পদার্থই যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এটা বলা যাবে না। এই মহাবিশ্বের কোন দূর প্রান্তে হয়ত এদের হদিস পাওয়া যাবে। এমন কি হতে পারে না যে, মহাবিশ্বের দুর প্রান্ত থেকে ছুটে এসে বিপ্রতীপ পদার্থ আমাদের পৃথিবীর উপরই পতিত হ’ল? আমাদের পৃথিবীতো পদার্থ দিয়ে তৈরি। আমাদের পৃথিবীর পদার্থও মহাশূন্য থেকে উড়ে আসা বিপ্রতীপ পদার্থের ক্ষণিকের মৃত্যু-নৃত্যের মধ্য দিয়ে মহা ধ্বংস সাধিত হতে পারে। বিনিময়ে সম পরিমানের বিকিরণ দৃষ্ট হবে। এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল এমনটাই বিশ্বাস করেন বিজ্ঞানীরা। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯০৭ সালের ৩০শে জুন। ঘটেছিল মস্কো থেকে এক হাজার মাইল পুবে টাঙ্গাস্কা (Tunguska) নদীর বিরল বসতির উপত্যকায়। চোখ ঝলসানো আগুনের গোলা নিমেষের মধ্যে অতিক্রম করে গিয়েছিল দক্ষিণ-পূর্বথেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে। সারা পৃথিবীতে ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল। বায়ুমণ্ডলে চাপের তরঙ্গ রাশিয়া ও সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিস্ফোরণ ৭০০ কিলোমিটার দূর থেকেও পরিদৃশ্যমান ছিল। লন্ডনে সময়ের আগেই দিনের আলো ফুটে উঠেছিল। মনে করা হয় এক ঘনমিটারের মত বিপ্রতীপ-শিলা সেদিন পৃথিবীকে আঘাত করেছিল।

      টাঙ্গাস্কা (Tunguska)’র ঘটনা শুধু আমাদের এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, বিপ্রতীপ পদার্থের সুপ্ত শক্তি বা ক্ষমতা কতটা ভয়ানক হতে পারে। বিগ ব্যাং-এর পর বিপুল পরিমানের শক্তি বিবিধ কণায় রূপান্তরিত হয়েছিল। এই সব কণিকা দিয়ে তৈরি হয়েছিল পরমাণু আর এই পরমাণু দিয়েই তৈরি হয়েছে পৃথিবীর যাবতীয় সবকিছু। রাসায়নিক ও নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে এগুলোর পুনর্বিন্যাস ঘটে এবং তৈরি হয় নতুন নতুন অণু-পরমাণু। জীবিত পদার্থগুলো রাসায়নিক কারখানার মত। কার্বন, অক্সিজেন, আর অন্যান্য যে সকল মৌলিক পদার্থ দিয়ে এগুলো তৈরি তাদের মধ্যে ক্রমাগত যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটছে তার ফলে এনার্জি বা শক্তি নিঃসৃত হচ্ছে। পদার্থের বেশির ভাগ শক্তি পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসে জমা থাকে। এই জন্যই নিউক্লিয়ার পাওয়ার কেমিক্যাল পাওয়ারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু এই নিউক্লিয়ার এনার্জিও সম্পূর্ণ সুপ্ত এনার্জির অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। এক কিলোগ্রাম বিপ্রতীপ পদার্থকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করলে যে পরিমান শক্তি নিঃসৃত হবে তার পরিমান এক কিলোগ্রাম টিএনটি বিস্ফোরণে যে শক্তি নিঃসৃত হবে তার দশ বিলিয়ন গুণ বেশি। আর নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় উৎপাদিত শক্তির হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী।প্রাকৃতিক নিয়মেই তৈরি হচ্ছে ইলেক্ট্রনের বিপ্রতীপ কণা পজিট্রন। সবচেয়ে হাল্কা নিগেটিভ চার্জের ইলেকট্রন যেমন সকল পদার্থের পরমাণুতেই থাকে, তত্ত্বগতভাবে তেমনি পজিট্রন থাকে বিপ্রতীপ-বিশ্বের বিপ্রতীপ-পরমাণুতে। এই বিশ্বে যত মৌলিক পদার্থ রয়েছে (হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রজেন, লোহা, রূপা, সোনা,

ইত্যাদি) তাদের অনেকগুলোর (যেমন, রেডিয়াম) নিউক্লিয়াসের মৌলিক কণাগুলোর মধ্যে ক্রমাগত পুনর্বিন্যাস ঘটছে আর এই পুনর্বিন্যাস ঘটবার সময় পরমাণুটি তেজ বিকিরণ করছে। প্রাকৃতিক এই পদ্ধতি radioactivity নামে পরিচিত। এই বিকিরণের মাধ্যমে মৌলিক পদার্থটি অন্য একটি মৌলিক পদার্থে রূপান্তরিত হয়ে স্থিতাবস্থা প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ যে মৌলিক পদার্থে রূপান্তরিত হয় সেটি আর তেজ বিকিরণ করে না। এটি একাধিক স্তরে ঘটতে পারে। রেডিয়াম রুপান্তরিত হয় র‍্যাডন-এ। নিউক্লিয়াসের ভেতরে মৌলিক কণাগুলোর (নিউট্রন ও প্রোটন) পুনর্বিন্যাসের সময় পজিট্রন তৈরি হতে পারে। সদ্য-সৃষ্ট এই পজিট্রন নিউক্লিয়াস থেকে ত্বরিতগতিতে উধাও হয়ে যায়। কিন্তু উধাও হয়ে কোথায় যাবে! আমরা দেখেছি, পজিট্রনের বিপ্রতীপ কণা হচ্ছে ইলেক্ট্রন। ইলেকট্রনগুলো পরমাণুর অংশ কিন্তু থাকে নিউক্লিয়াসের বাইরে। সদ্যসৃষ্ট পজিট্রন নিউক্লিয়াসের চার দিকে ঘূর্ণায়মান কোন এক ইলেক্ট্রনের সঙ্গে সহমরনে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিনিময়ে তৈরি হয় গামা রশ্মি। এখানে উল্লেখ্য যে, গামা, আলো, মাইক্রোওয়েভ, ইত্যাদি সবই ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ। এদের মধ্যে গামা রশ্মি খুব শক্তিশালী। বিপ্রতীপ কণা মরণ খেলায় মত্ত হলেও একে নিয়ন্ত্রণ করে (PET (Positron Emission Therapy)) জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।

সূর্যের কেন্দ্রে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে অজস্র পজিট্রন তৈরি হয়। আজ যে সূর্যালোকে আমরা স্নাত হচ্ছি তার মূল উৎস হ’ল এক লক্ষ বছর আগে সূর্যের কেন্দ্রে সৃষ্ট পজিট্রন। তবে সেই পজিট্রন তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। সূর্যের বেশির ভাগই হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেন সবচেয়ে সরল মৌলিক পদার্থ। হাইড্রোজেন পরমাণুর কেন্দ্র নিউক্লিয়াসে নিউট্রন নেই, আছে শুধুমাত্র একটি প্রোটন।আর নিউক্লিয়াসের বাইরে নিউক্লিয়াসকে প্রদক্ষিণ করছে শুধুমাত্র একটি ইলেক্ট্রন। সূর্যের কেন্দ্রে তাপমাত্রা হচ্ছে এক কোটি ডিগ্রি। এই তাপমাত্রায় হাইড্রজেন প্রোটন ও ইলেকট্রন এই দুই উপাদানে বিশ্লিষ্ট হয়ে দিগ্বিদিকে ছুটতে থাকে। কখনো কখনো দুটো প্রোটন একত্রে মিলিত হয়ে শেষ পর্যন্ত হিলিয়াম নামক মৌলিক পদার্থে পরিণত হয়। হিলিয়াম হাইড্রোজেনের পরের সরলতম মৌলিক পদার্থ যার পরমাণু দুটো প্রোটন আর দুটো নিউট্রনের সমন্বয়েগঠিত। দুটো আলাদা প্রোটন একত্রিত হয়ে যখন হিলিয়ামের বীজ তৈরি করে (মনে রাখতে হবে, পূর্ণ হিলিয়াম পরমাণু হতে হলে দুটো নিউট্রনও লাগবে), তখনআইনস্টাইনের বিখ্যাত E=mc2 সমীকরণ অনুসারে কিছু শক্তি বা এনার্জি হারায়। এই শক্তি অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে আলোতে পরিণত হয়। অনুকূল পরিস্থিতিতে প্রোটন কণা নিউট্রন কণায় রুপান্তরিত হয় এবং কিছু এনার্জি বা শক্তিও উৎপাদন করে। উৎপাদিত এই শক্তির কিছুটা পজিট্রন কণায় পরিণত হয়। পজিট্রন ছুটন্ত ইলেকট্রনের সান্নিধ্যে এসেই চিরতরে হারিয়ে যায়। কিন্তু তৈরি হয় গামা রশ্মির। নবজাত এই গামা রশ্মি জন্মভূমি সূর্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে আলোর গতিতে (সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মেইল)। কিন্তু বেরিয়ে যাওয়া সহজ হয় না যেহেতু ফুটন্ত সূর্যের মধ্যে  ঘুরে বেড়াচ্ছে বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন এবং প্রোটন কণা। গামা রশ্মি ক্রমশঃ শক্তি হারাতে হারাতে এক লক্ষ বচ্ছর পর সূর্যের উপরিভাগে এসে পৌঁছুতে পারে। শক্তি হারানো মানেই গামা রশ্মি রূপান্তরিত হয় এক্স-রেতে এবং এক্স-রে শক্তি হারিয়ে পরিনত হয় অতিবেগুনী (আল্ট্রাভাইওলেট) রশ্মিতে এবং পরিশেষে পরিণত হয় আমাদের পরিচিত আলোতে যার মানে আমাদের দৃষ্টিগ্রাহ্য রংধনুর রং-গুলোতে। সুতরাং, দিনের আলো হচ্ছে সূর্যের কেন্দ্রে সৃষ্ট ইলেক্ট্রনের বিপ্রতীপ কণা পজিট্রনের সংহার।

বিপ্রতীপ পদার্থের সংহার করবার ক্ষমতা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর একটা প্রিয় বিষয়। তবে বাস্তবের সঙ্গে এই কল্প কাহিনির কোন মিল নেই, এগুলো সবই অবৈজ্ঞানিক। বিপ্রতীপ পদার্থ ব্যবহার করে প্রচন্ড শক্তিশালী মারনাস্ত্র বানানোর অবাস্তব দুর্বুদ্ধিও যুদ্ধবাজদের মাথায় যে ভর করেনি তা নয়। তবে সুসংবাদও আছে। আগে উল্লেখ করেছি পজিট্রন এমিশন থেরাপির কথা। বিপ্রতীপ ঠিক মত নিয়ন্ত্রন করতে পারলে মানবসভ্যতার প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে হয়ত। তবে একে সংগ্রহ করে প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

 

একজন আদর্শ, সফল ও

গুণী শিক্ষকের কথা

মিজানুর রহমান মিজান

  ...মানুষ গড়ার কারিগর বা হাতিয়ার বলা হয়ে থাকে শিক্ষককে। মূলত: শিশুর জন্মের প্রাথমিক ধাপ মা বাবা পরিচালনা করেন। এরপরই একটা শিশু তার প্রতিভা, জ্ঞান, মেধা, বিবেক বুদ্ধি বিকাশের সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন একজন শিক্ষক। সুতরাং শিক্ষক যত গুণী, জ্ঞানী ও মেধা সম্পন্ন হবেন ছাত্রের উপর এর প্রভাব কমবেশি প্রতিফলিত হবেই। কারণ শিশুরা অনুকরণ ও অনুস্মরণযোগ্য।...

  মানুষ গড়ার কারিগর বা হাতিয়ার বলা হয়ে থাকে শিক্ষককে। মূলত: শিশুর জন্মের প্রাথমিক ধাপ মা বাবা পরিচালনা করেন। এরপরই একটা শিশু তার প্রতিভা, জ্ঞান, মেধা, বিবেক বুদ্ধি বিকাশের সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন একজন শিক্ষক। সুতরাং শিক্ষক যত গুণী, জ্ঞানী ও মেধা সম্পন্ন হবেন ছাত্রের উপর এর প্রভাব কমবেশি প্রতিফলিত হবেই। কারণ শিশুরা অনুকরণ ও অনুস্মরণযোগ্য। শিক্ষকের প্রত্যেকটা কাজকর্ম, আচরণ লক্ষ্য করে ছাত্ররা। পাশাপাশি পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার সমন্বয় সাধিত হয়। শিক্ষকরা জাতীর বিবেক বলে আখ্যায়িত করা হয় এ সমস্ত কারণে। সর্বোপরি শিক্ষকের উপর নির্ভর করে ছাত্রছাত্রীর সার্বিক সফলতা নির্ভর চারিত্রিক সনদ। শিক্ষকরা অর্পিত দায়িত্ব সচেতনতাবোধে কাজকর্ম পরিচালনা করে সমাজকে একটা দিকনির্দেশক যন্ত্রের নিয়ামক ভূমিকা পালন করে আত্মমর্যাদা সম্পন্ন সমাজ সৃষ্টির প্রয়াস অব্যাহত রাখেন। আমাদের উল্লেখিত শিক্ষক জ্ঞান, গুণ ও আদর্শের প্রতীক রূপে গণ্য। তিনি তাঁর কর্মময় জীবনটা ব্যয় করেন এ পথেই।

  জন্ম-মৃত্যু মানুষের অবধারিত। এটাকে জয় করা সম্ভবপর হয় না কাহার ও। তথাপি পৃথিবীর বুকে কিছু কিছু মানুষ বা প্রতিভা বিকশিত হয় ফল ও ফুলে। সুশোভিত ও বিমুগ্ধ করে সবাইকে। আর ক্ষণজন্মা এসব প্রতিভাকে আমরা সঠিক মূল্যায়ন করি না। কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। তার সঠিক ও যথার্থ কম পদ্ধতি আগ-পিছ একদিন মুখরিত হয়। কিন্তু আমরা যেন দর্জিও ফিতার মাপে কাটসাট করা মানুষ। গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বেশি কৃপণতাবোধে আমরা ভোগী। যার যা প্রাপ্য তা দিতে হয়। নতুবা “যে সমাজ, জাতীয় গুণীর কদর জানে না, সে সমাজে গুণীজন জন্মায় না” এ অপবাদে ও অপরাধে তাড়িত হবো সর্বক্ষণ। সুতরাং এ বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার কঠিন ও দৃপ্ত প্রত্যয় ও প্রত্যাশী।

   সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার তেলিকুনা গ্রাম একটি অজপাড়া গাঁ। আর এ গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর মৌলবী মো: আব্দুর রাজ্জাক বি.এস. সি. বি. টি। তৎকালীন সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশ্বনাথ উপজেলা ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত। এ অপবাদ অদ্যাবধি আমরা ঘুচাতে পারিনি সম্ভবত।

২০/৩০ টি গ্রাম ঘুরে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া ছিল দুষ্কর। শিক্ষিত লোকের পরিমাণ বা সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য ছিল। যা হোক আশার কথা পূর্ব থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তথাপি এ ফলাফল ও পর্যাপ্ত নয়। সে দিন ও খাজাঞ্চী ইউনিয়নে কোন হাইস্কুল ছিল না। আজ যদি ও দু’টি বিদ্যমান। এ থেকে সহজে অনুধাবনযোগ্য শিক্ষাক্ষেত্রের হালচাল। মুসলমানরা ছিলেন অত্যন্ত নাজুক পর্যায়ে। যাহোক আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের মামার বাড়ি ছিল চৌধুরী গাঁও। সেখানে যাওয়া-আসার সুবাদে রাম সুন্দর হাই স্কুলের ছাত্রছাত্রীর স্কুলে আগমন দেখার সুযোগ হয়েছিল। ছাত্রছাত্রীর আসা-যাওয়া দেখে তাঁহার শিক্ষার প্রতি ঝোঁক, আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু' আগ্রহবোধ করলেই তখন লেখাপড়া করা সম্ভব ছিল না আমাদের পারিপার্শ্বিকতায়। কারণ অধিকাংশ মুসলমানরা ছেলেমেয়েদের স্কুলে দিতেন না বা অভিশাপ মনে করতেন নানা প্রকার কুসংস্কারের ফলে। তবু ও রাজ্জাক সাহেব দমিবার পাত্র নন। তিনি আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে অভিভাবককে রাজী করান স্কুলে ভর্তি হবার নিমিত্তে। ভাগ্য চক্রেই হোক আর লেখাপড়ার উৎসাহে অনুপ্রাণিত হয়েই হোক আমার শিক্ষক রাজ্জাক সাহেব লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকেন কৃতিত্বের সহিত। প্রত্যেকটি পরীক্ষায় প্রথম স'সন্তানের অধিকারী ছিলেন তিনি। স্যারের লেখাপড়ার আগ্রহ এবং মেধায় মুগ্ধ হয়ে রাম সুন্দর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বৃত্তি প্রদান করেন প্রথমার্ধেই। তখনকার সময়ে বৃত্তি প্রাপ্তি অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার ছিল। বৃত্তি প্রদান করা হত মেধাভিত্তিক অথচ অঞ্চল ভিত্তিক।

  বিশ্বনাথের ঐতিহ্যবাহী রাম সুন্দর হাই স্কুল হতে স্টার মার্কসহ এস এস সি পাশ করেন ১৯৩৩ সালে। অত:পর তিনি ঐ বৎসরই সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৩৫ সালে আই এস সি পাশ করেন প্রথম বিভাগে। তারপর ১৯৩৭ সালে একই কলেজ হতে বি এস সি প্রথম বিভাগে পাশ করেন। স্যারের কৃতিত্বপূর্ণ সফলতায় বৃটিশ সরকার আমন্ত্রণ জানায় বৃত্তিসহ বোম্বে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার নিমিত্তে।

  তিনি পারিবারিক বিবিধ জটিলতার আবর্তে ঘুর পাকের মাধ্যমে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি না হয়ে বি টি ট্রেনিং এর জন্য ১৯৩৮ সালে ভারতের শিলং চলে যান। ১৯৩৯ সালে ট্রেনিং সমাপনান্তে সরকারের আমন্ত্রণে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায়

অংশ গ্রহণ করে শিলং ইউনিভার্সিটির মধ্যে ২য় হন। প্রথম শ্রেণীর একজন ম্যাজিস্ট্রেট রূপে ভারতের কুকি অঞ্চলে প্রেরণের নির্দেশ প্রাপ্ত হন। কিন্তু স্যার উপজাতীয় পরিবেশ, সামাজিকতা, আচরণ ইত্যাদিতে অনভ্যস্ততার দরুণ রাজি না হবার সুবাদে সাব-ইন্সপেক্টর পদে সিলেটের বানিয়াচং থানায় নিয়োগ প্রদান করা হয়।

  তখনকার সময় সিলেট জেলার শিক্ষা অফিসার ছিলেন ফজলুর রব সাহেব। তিনির ভাষ্য থেকে জানা যায় ১৯৪৪ সালে বানিয়াচং থানার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার একমাত্র রাস্তা ছিল নদী পথে। নদী পথে ও এক মাত্র বাহন ছিল ভাড়া করা নৌকা বা চায়না নৌকা বলে খ্যাত সে সময়কার এক প্রকার ছোট ছোট নৌকা। এ ভাড়া করা নৌকায় করে এক দিন স্যার পাড়ি জমান বানিয়াচং থানার উদ্দেশ্যে মাঝি মাল্লাসহ। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া ও পরিবেশ দর্শনে স্যার বিচলিত ও শঙ্কিত হয়ে উঠেন। সেখানকার অবস্থা অত্যন্ত করুণ, কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ থাকার কারণে সারা রাত্রি মাঝি মাল্লাসহ নৌকায় রাত যাপন করে পরদিন ভোর বেলা সিলেটের পথে রওয়ানা হন।

  সে সময় একদিকে যেমন চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত ছিল না বা ডাক্তার প্রাপ্তি ছিল কঠিন। অপরদিকে বর্তমানের মত এত ঔষধপত্র ও আবিষ্কৃত হয় নাই। এমতাবস্থায় বানিয়াচং থানায় ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব মহামারী হিসেবে দেখা দেয়। হাজার হাজার মানুষ ম্যালেরিয়া রোগে ঐ বৎসর মারা যান। কোন কোন গৃহে বাতি জ্বালাবার মত মানুষ ছিল না। লাশের গন্ধে বানিয়াচং এর বাতাস বিকট রূপ লাভ করেছিল। এ দুর্যোগ ও সংকটময় মুহূর্তে সেখানে বসবাস করা অনুপযোগী ভেবে তিনি চলে আসেন। সর্বোপরি রাজ্জাক সাহেব লাশের পর লাশ দেখে ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে পড়েন।

  এরপর ঐ বৎসরই তিনি স্কুল সাব ইন্সপেক্টর পদ হতে বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে সুনাম গঞ্জ জুবিলী হাই স্কুলে যোগদান করেন। ১/৯/৪৪ খ্রীষ্টাব্দ হতে ১৩/৮/৪৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ২ বৎসর সফলতার সহিত শিক্ষকতা করে বদলি হয়ে চলে আসেন সিলেট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৪/৮/৪৭ খ্রী: হতে ১৫/৮/৬৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ বিশ বৎসর উক্ত স্কুলে কৃতিত্ব ও সফলতার সহিত শিক্ষকতা করে সহকারী প্রধান শিক্ষক রূপে পদোন্নতি দিয়ে সরকার ফেনি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রেরণ করেন। কিন্তু রাজ্জাক সাহেব ফেনিতে না যাওয়ায় প্রায় এক বৎসর প্রাপ্ত ছুটি কাটিয়ে সিলেট সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগ দেন। এখানে কয়েক বৎসর চাকুরী করে ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে অবসর গ্রহণ করেন।

  অবসর জীবন অতিবাহিত করার প্রাক্কালে কিছু দিন বেসরকারি তথা সিলেট রেল ষ্টেশন সংলগ্ন নছিবা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রূপে অতিবাহিত করেন। সর্বশেষ বিশ্বনাথ উপজেলার নিজ গ্রামের পার্শ্ববর্তী উত্তর বিশ্বনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে চার বৎসর প্রধান শিক্ষক রূপে চাকুরী জীবন অতিবাহিত করে বার্ধক্য জনিত কারণে স্কুল ছেড়ে বাড়িতে বাকী জীবন কাটান।

       ১৯৯৩ খ্রীষ্টাব্দের ১০ অক্টোবর নিজ বাড়িতে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যু কালে তিনি দুই পুত্র ও চার মেয়ে রেখে যান। তিনির কিছু বিজ্ঞান বিষয়ক লিখা প্রবন্ধ ও কবিতার পান্ডুলিপি বড় ছেলের নিকট রেখে যান। এগুলোর মধ্যে একটি প্রবন্ধ ও একটি কবিতা আমি এনে তা আমার সম্পাদিত ম্যাগাজিন দীপ্তিতে প্রকাশ করলে বিপুল পাঠক প্রিয়তা অর্জন করে। বাকি লেখাগুলি প্রকাশিত হলে অনেক কিছু অবগত হওয়া যাবে। কালের আবর্তনে একদিন হারিয়ে যাবে বিস্মৃতির অতলান্তে হয়ত। যেমন হারিয়ে গেছেন আমোদের মধ্য থেকে শ্রদ্ধেয় স্যার আব্দুর রাজ্জাক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস স্যার ছিলেন বিশ্বনাথের প্রথম মুসলিম এক জন বি এস সি। আমি স্যারের মাগফেরাত কামনা করি নিরন্তর সর্বান্তকরণে। জ্ঞানের আলো বিতরণে প্রদীপ থেকে প্রদীপান্তরে ক্ষয় নাই, আছে অমরত্ব।

 

ওঁ সহ নাববতু ও অসৎ

হইতে মোরে সৎ পথে নাও

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ 

সনোজ চক্রবর্ত্তী পেশায় স্কুল শিক্ষকতা। বানিজ্য বিভাগে স্নাতকোত্তর। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি। মুলত গল্পকার হলেও কবিতাও লিখেছেন বেশ কিছু। প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে। লেখালেখি ছাড়া অন্যতম নেশা অভিনয় ও নাটক পরিচালনা।

....প্রার্থনার সময় আমার স্কুলের মাস্টারমশাইদের কথা মনে পড়ত। যাদের আমি আমার ছাত্রাবস্থায়, প্রার্থনার সময় ঋষি হয়ে যেতে দেখেছি। আমি তাঁদের মতো প্রার্থনায় নিবিষ্ট হতে চাইতাম। শুদ্ধ উচ্চারণে স্তোত্র বলতাম। অন্তর দিয়ে প্রার্থনা করতাম।....

  আমার জীবনের প্রথম প্রার্থনা সঙ্গীত "অসৎ হইতে মোরে সৎ পথে নাও, জ্ঞানের আলোক জ্বেলে আঁধার ঘুচাও..."।

  তখন আমি পল্লীজ্যোতি পাঠাগারের ক্রেশে পড়ি। আমাদের কুকড়াহাটীর অনেকেরই হাতেখড়ি পাঠাগারে, ইন্দুমাসি আর সুকৃতিপিসির কাছে। আমরা যারা ক্রেশে পড়তাম তাদের সবাই ওদের দিদিমণি বললেও আমি মাসি ও পিসি বলতাম। আমাদের বাড়ির উল্টোদিকে ওদের দুজনের বাড়ি। ক্রেশে শুধু লেখাপড়া নয় গান, ছড়া, কবিতা, ব্রতচারী খেলাধুলাও হত। টিফিনে ছিল রোজ দিন নানা রকম খাওয়ার। কখনো মুড়ি-বাতাসা-বাদাম কোনোদিন চিঁড়ে-দই, আবার কোনোদিন সুজির হালুয়া। যেদিন পায়েস হতো সেদিন সকাল থেকে ক্লাস রুম গন্ধে থাকত ভরে। সেদিন লেখাপড়ায় বারবার ভুল হয়ে যেত আমাদের।

এই খাবারগুলো আসত সরকারি ভাবে। শৈশব বয়স খাওয়ারটাই বুঝত। তার আবার সরকার হয়, সে বয়সে এতো সব বুঝিনি।

  সকাল সকাল ইন্দু মাসি বা সুকৃতি পিসির হাত ধরে চলে যেতে হতো পাঠাগারে, ঘুম জড়ানো চোখে। চোখ জুড়ে আসতে ঘুমে, পা জড়িয়ে যেত, হ্যাঁচকা টানে অগ্রসর হতো অনিচ্ছার যাত্রা। শৈশবের আবার একাল-সেকাল!

সেই দিক থেকে শৈশব বরাবরই অত্যাচারিত।

প্রার্থনার সময় আমরা জনা চল্লিশেক পাঠাগারের দেওয়ালে পিঠ রেখে দাঁড়িয়ে পড়তাম। দাঁড়াতাম ভি এর মতো পা, নমস্কারের মুদ্রায় হাত দুটি জোড়া আর শিব নেত্রে। তখন তো আমরা শিশু, তাই প্রার্থনা করতাম না। প্রার্থনা গাইতাম। গাইতাম গলা ছেড়ে, বিশুদ্ধ সুর কোনো দিনই হতো না। 

যে দিনগুলোতে রামকৃষ্ণ, সারদা মা বা বিবেকানন্দকে নিয়ে গান হতো, সে গান গাইতে ভারি ভাল লাগত। ভাল লাগার কারণ হয়তো মানুষগুলোকে চিনি বলে। চেনা বলতে ছবিতে আর গল্পে চেনা আর কি।

আমাদের ক্রেশে "আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে..."হত কিন্তু "জনগণ মন..." বেশি হত না।

প্রার্থনা গাইতাম এ টুকুই সত্য কিন্তু "অসৎ হইতে মোরে সৎ পথে..." - আমরা ঠিক বুঝে উঠতাম না।

ইন্দু মাসি বা সুকৃতি পিসি প্রার্থনার পর যখন বলত - ভাল হতে হবে, সত্যি কথা বলতে হবে, লেখাপড়া করতে হবে তখন কথা গুলো বুঝতে পারতাম।

বুঝতে পারতাম প্রার্থনার নাম করে আমাদের দিয়ে কায়দা করে ঐ কথাগুলো বলিয়ে নেওয়া হয়।

আমাদের ছুটি হলে দেখতাম পাঠাগারের সামনে দিয়ে বড় ইস্কুলের দিকে বড় বড় দাদারা সাদা জামা, নীল প্যান্ট আর দিদিরা সাদা জামা, সবুজ ফ্রকের সঙ্গে মাথায় সবুজ ফিতে লাগিয়ে বেণী দোলাতে দোলাতে চলে যেত। আমার খুব ইচ্ছে হত ঐ স্কুলে যাওয়ার।

  ছুটির পর রাস্তার ধারে কৃষ্ণচূড়া গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে ওদের স্কুল যাওয়া দেখতাম। ফর্সা মতো একটি মেয়ে তার বেণী দুটো দুলিয়ে স্কুল চলে গেলে বাড়ি ফিরতাম। ততক্ষণে মাসি বা পিসি ক্রেশে তালা ঝুলিয়ে বাড়ির পথ ধরত। ঐ মেয়েটিকে নিয়ে সন্দীপের সঙ্গে একবার আমার মারামারি পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল। একদিন আমি সন্দীপকে বলেছিলাম ওটা আমার বউ। একথা শুনে, কিছু না বোঝার আগেই, সন্দীপ আমার নাকে একটা ঘুষি লাগিয়ে দে ছুট।

নাকে ব্যথা নিয়ে এক সপ্তাহ ক্রেশ কামাই হয়েছিল আমার। সেই সাত দিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঘুমের মধ্যে কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুল, সবুজ ফিতে বাঁধা ছোট্ট দুটো বেণীর দোলুনি জেগে উঠত স্বপ্নে।

  তারপর ক্রেশ ছেড়ে প্রাইমারি স্কুল। রোজদিন "জনগণ মন..." গাই। গাওয়া হয় যতটা চিৎকার হয় তার বেশি। তখন প্রার্থনায় পাশের কাউকে কাতুকুতু দেওয়া,চুল ধরে টেনে দেওয়ার নেশা পেয়ে বসেছিল আমাকে। শুধু আমাকেই নয় তাপস, ভ্রমর, দিলীপ, সন্দীপ এদেরও হাত নিশপিশ করত প্রার্থনার সময়। কে কতটা বেয়াদপি করল তা নিয়ে একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা ছিল নিজেদের মধ্যে। 

পুরো চার বছর "জনগণ মন..." গেয়েও তার অর্থ বুঝে ওঠা হয় নি।

ক্রেশের মতো কেউ কোনোদিন ভেঙে দেয় নি "জনগণ মন..." কে।

প্রাইমারি স্কুল টপকে হাইস্কুল। অনেক ছাত্র-ছাত্রী। প্রার্থনার দীর্ঘ লাইন। লাইনে লাইনে ছড়ি হতে হেড মাস্টার মশাই -এর চোখ রাঙানি। নিচের দিকের ক্লাস ভয়ে চুপ। একেবারে পুজোর নিয়ম মেনে প্রার্থনা। প্রার্থনা শেষে সারিবদ্ধ ভাবে ক্লাসরুমে যাওয়া। কোনো কোনো স্যার আমাদের মতো বা আমাদের থেকেও নিষ্ঠা ভরে প্রার্থনার লাইনে দাঁড়াত। তাঁদের দেখে প্রার্থনাকে একটা পুজা, একটা উপাসনা, একটা নিবেদন, একটা বিশ্বাস বলে মেনে নিতে ইচ্ছে হতো। সব বদমাইশি ভুলে একাত্ম হয়ে যেতে চাইত মন প্রার্থনায়।

এরপর যখন ক্লাস এইট বা নাইন, যখন গলার স্বর একটু একটু করে ধার হারিয়ে মোটা হয়ে যাচ্ছিল, তখন প্রার্থনা

মানে একটা লাইন ছাড়া আর কিছু ছিল না। বাধ্য ছেলের মতো লাইনে দাঁড়ানো। এর মধ্যে যারা বেশি রকমের ওঁচাটে তার প্রার্থনায় অাদনান্দ স্বামী হয়ে উঠত। একটা বিকৃত সুরে "জনগণ মন..." গাইত।

এমন একটা অন্তরাল রেখে গাইত যে বদমাইশিটা বোঝা গেলেও, বদমাইশটাকে খোঁজা - খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার সামিল ছিল।

আমার অন্তত এক দিনের আদনান্দ স্বামী হওয়ার ইচ্ছে থাকলেও, সাহস ছিল না বলে, নিজের গলাটা ভিন্ন ধারায় কানে এল না কোনো দিন।

সে যাত্রায়ও "জনগণ মন..." বোঝার বাইরেই থেকে গেল।

"জনগণ মন..." কিম্বা "আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...." কে নিজের থেকে বোঝার মতো বয়সটা যখন হলো। তখন আর প্রার্থনা গাইতে হতো না। তখন আমি কলেজ।

পৃথিবীটা সত্যিই গোল। না হলে এমন দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আবার প্রার্থনা লাইনে দাঁড়াতে হয়!

স্কুলে পড়াতে এসে দেখলাম দিন দিন প্রার্থনাটা পাল্টে যায়। কোন দিন -

"জনগণ মন..." তো কোন দিন- "আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে..."।

কিন্তু একটা স্তোত্র রোজদিন উচ্চারিত হয়-

ওঁ সহ নাববতু

সহ নৌ ভুনক্তু

সহ বীর্যং করবাবহৈ

তেজস্বী নাবধীতমস্ত

মা বিদ্বিষাবহৈ

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

প্রার্থনার সময় আমার স্কুলের মাস্টারমশাইদের কথা মনে পড়ত। যাদের আমি আমার ছাত্রাবস্থায়, প্রার্থনার সময় ঋষি হয়ে যেতে দেখেছি। আমি তাঁদের মতো প্রার্থনায় নিবিষ্ট হতে চাইতাম। শুদ্ধ উচ্চারণে স্তোত্র বলতাম। অন্তর দিয়ে প্রার্থনা করতাম।

একদিন প্রার্থনা শেষে এক ছাত্র আমার কাছে স্তোত্রটির অর্থ জানতে চাইলো। আমার বুকের ভিতরে বিশ্বাস শূন্য অবস্থা। আপ্রাণ চেষ্টা করছি স্মার্ট হওয়ার। চেষ্টা করছি পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার। আমি অক্ষমতা আড়াল করতে, পরে আসিস বলে জিজ্ঞাসার পাশ কাটালাম।

উপনিষদ খুলে বসলাম-

ওঁ সহ নাববতু-

পরমেশ্বর আমাদের অর্থাৎ শিষ্য ও গুরু উভয়ের চিত্তে ব্রহ্মবিদ্যা প্রকাশের দ্বারা উভয়কে সর্বতোভাবে রক্ষা করুন।

সহ নৌ ভুনক্তু-

ব্রহ্মবিদ্যার ফল যে পরমানন্দ সেই আনন্দ-অমৃতে আমাদের পরিতৃপ্ত করুন।

সহ বীর্যং করবাবহৈ-

আমরা উভয়েই যেন বীর্যবান হতে পারি।

তেজস্বী নাবধীতমস্ত-

আমাদের অধীত বিদ্যা যেন নিষ্প্রভ না হয়।

মা বিদ্বিষাবহৈ-

আমরা একে অপরকে যেন দ্বেষ না করি।

ওঁ শান্তিঃ,শান্তিঃ,শান্তিঃ-

আত্মজ্ঞান লাভের যাবতীয় প্রতিবন্ধক উপশান্ত হোক।

পড়তে পড়তে আশ্চর্য জনক ভাবে ফিরে ফিরে আসছিল স্কুলের প্রার্থনা লাইন,মাস্টার মশাই দের তাপস মূর্তি,পাঠাগারের দেওয়াল জুড়ে গোটা চল্লিশেক শৈশব,ইন্দুমাসি, সুকৃতিপিসি আর শিব নেত্রে শৈশবের সেই প্রার্থনা -" অসৎ হইতে মোরে সৎ পথে নাও..."।

"ওঁ সহ নাববতু.." - এর সঙ্গে "অসৎ হইতে মোরে সৎ পথে নাও..." কিভাবে যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।

মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল আঙ্গিকে, অনুভবে, অনুধ্যানে।

অনুভব করলাম অন্তর প্রার্থনার অন্তর্নিহিত ভাবনায় অবগাহন করলে জীবনটাই হয়ে ওঠে প্রার্থনা।

 

কালীনাচ ও চড়কমেলা 

একটি গ্রাম্য সংস্কৃতি

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ 

সনোজ চক্রবর্ত্তী পেশায় স্কুল শিক্ষকতা। বানিজ্য বিভাগে স্নাতকোত্তর। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি। মুলত গল্পকার হলেও কবিতাও লিখেছেন বেশ কিছু। প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে। লেখালেখি ছাড়া অন্যতম নেশা অভিনয় ও নাটক পরিচালনা।

.....চৈত্র মাসের শেষদিন চড়ক মেলা হয়। সেই চড়ক মেলায় কারসাজি দেখায় সন্ন্যাসীরা।যাইহোক ঐ দিনের ভোরে কালীনাচ হয়। সন্ন্যাসীদের কাউকে কাউকে কালী সাজানো হয়।জুন পুড়িয়ে তার সঙ্গে চিটেগুড় মিশিয়ে যে কালো রং তৈরী হয় সেই রংই হয় কালীর গাত্রবর্ণ।ভোরের আলো আঁধারীতে আলো বলতে মশাল। তাল গাছের কাঁচা ডাসায় কাপড় জড়িয়ে তৈরী হয় মশাল। মশালের ইন্ধন হল পোড়া মবিল।

    মাদের কুকড়াহাটী ও তার পড়শি গ্রামের মানুষজন বছরে দুটো দিন খুব ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়ে। মহালয়ার ভোর আর চৈত্র সংক্রান্তির ভোর। চড়কের ভোরে অপেক্ষাকৃত একটু আগেই উঠে পড়ে মানুষজন,প্রায় শেষ রাত থেকে। ছেলে, বুড়ো, পুরুষ, মহিলা সকলেই সে রাত্রি জাগারণের শরিক হয়। এক সময় আমার বাবা আমার হাত ধরে নিয়ে যেতেন আমাকে, এখন আমি আমার সন্তানের হাত ধরে নিয়ে যাই ভোর রাতের শিব তলায়। মোটামোটি বৈশাখ থেকে রৌদ্র প্রখর হতে শুরু করে। গ্রামের কৃষিজীবি মানুষেরা যারা প্রকৃত অর্থে দুঃখজীবিও, তার বর্ষার প্রত্যাশায় গাজন উৎসবে ব্রতী হয়। নিম্নবর্গের হিন্দুরা প্রায় এক বস্ত্রে শিবের উপাসনা শুরু করে। 
এই ব্রতীরা সন্ন্যাসী নাম পায় তখন।
সারা বছর শিব-উপাসনার একছত্র অধিকার ছিল উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের। 
বছরের শেষ কটা দিন শিব উপাসনায় অবর্ণনীয় কৃচ্ছ্র সাধনে মেতে উঠে গ্রামের প্রান্তিক মানুষেরা। শারীরিক ভাবে নিজেদের ক্ষত বিক্ষত করে তারা সন্তুষ্ট করতে চায় মহাদেবকে। সারা বছর ধরে প্রান্তিক মানুষজনদের কষ্ট, বঞ্চনা, ব্যর্থতা যেন অর্ঘ হয়ে উঠে অনায়াসে।
আসলে দেব আরাধনার ঐ বিভৎসতা বোধহয় বারেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আর্থসামাজিক বৈষম্যকে।সারা দিনে একবার খাওয়া। মোটামুটি পাঁচ দিন ধরে চলে উপাসনা। ভোর রাতে মুলত ভারী খাওয়াটা খায় সন্ন্যাসীরা।

চৈত্র মাসের শেষদিন চড়ক মেলা হয়। সেই চড়ক মেলায় কারসাজি দেখায় সন্ন্যাসীরা।যাইহোক ঐ দিনের ভোরে কালীনাচ হয়। সন্ন্যাসীদের কাউকে কাউকে কালী সাজানো হয়।জুন পুড়িয়ে তার সঙ্গে চিটেগুড় মিশিয়ে যে কালো রং তৈরী হয় সেই রংই হয় কালীর গাত্রবর্ণ।ভোরের আলো আঁধারীতে আলো বলতে মশাল। তাল গাছের কাঁচা ডাসায় কাপড় জড়িয়ে তৈরী হয় মশাল। মশালের ইন্ধন হল পোড়া মবিল।
মশাল থেকে ঝরে পড়া আলোক ফোঁটাগুলো গ্রামের পথে আলোর আলপনা হয়ে জ্বলে।
সারাদিনের না খাওয়ায় কালী রূপী সন্ন্যাসীর একটা ঘোর, একটা আচ্ছন্নতা তৈরী হয়।
উন্মত্তের মতো নাচতে থাকে কালী। 
মবিলের মশাল পথ নির্দেশ করে।
ভোরের আলো আঁধারী, কালীর করাল রূপ, লকলকে জিভ, চকচকে খর্ড়্গ চারপাশে একটা ভৌতিক পরিবেশ জাগিয়ে তোলে। 
কালীকে ঘিরে ধরা দর্শনার্থীদের কখনো কখনো তাড়া করে কালি। 
কতবার এমন হয়েছে ছোট বয়সে বাবার হাতছুট হয়ে কালীর তাড়ায় পথের ধারের কাঁটা ঝোপে ক্ষত বিক্ষত হয়েছি। তবুও শেষ রাতের অন্ধকার সালটে ঐ কালীর উদ্দাম নৃত্য, চারপাশের আমোদিত মানুষজন, কালীর হাত থেকে বাঁচার জন্য হুড়োহুড়ি, মশালের আলো, পোড়া মোবিলের গন্ধ, সন্ন্যাসীদের নিয়ম-নিষ্ঠার অন্য রকম একটা আকর্ষণ আছে।

ভোরের আলো মাখা, শরীর ধোয়ানো মিঠে বাতাস, সবাই মিলে এক হওয়া, আনন্দ করা সে ভোলার নয়।
উৎসব শেষে যখন বাড়ি ফেরার পালা তখন পুব আকাশে সূর্য ঢেলে দিয়েছে লাল আবির। চোখে মুখে বছরের শেষ দিনের নরম আলো।

ভাবনা সুত্রঃ দেবাশিস সরকার।

"হে নূতন দেখা দিক আরবার" কবি তাঁর জন্মদিন নিয়ে কবিতা লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন কিন্তু গান লেখেন নি।

তাই শান্তিদেব ঘোষ অনুরোধ করে বসলেন গুরুদেবের কাছে, জন্মদিনে একটা গান লিখতে।
কবি শান্তিদেবকে বোঝান, এ সম্ভব নয়।
নিজের জন্মদিনের গান নিজে লিখলে লোকে কি বলবে।
শেষ পর্যন্ত ১৯২২ সালে লেখা পঁচিশে বৈশাখ কবিতাটি একটু অদল বদল করে সুর দেওয়া হল ২৩ শে বৈশাখ।
ঐ জন্মদিন ছিল তাঁর জীবৎকালের শেষ জন্মদিন। আর ঐ গানটি ছিল শেষ গান।

তথ্যসুত্রঃ গানের পেছনে রবীন্দ্রনাথ// সমীর সেনগুপ্ত।

"তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী"

১৯০৯ সাল, ২৮ শে সেপ্টেম্বর। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে সংগীতজ্ঞ এনায়েৎ খাঁ-এর সংবর্ধনা সভা। কবিও উপস্থিত।
সংবর্ধনা শেষে কবিকে গানের অনুরোধ করা হলে কবি আপত্তি করলেন। সবার অনুরোধ ক্রমশ জোরদার হচ্ছিল কিন্তু কবি ওস্তাদের সামনে মুখ খুলবেন না।
অনুরোধকারীদের মধ্যে গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন। তিনি বললেন ' আপনি ভাল গাইতে পারেন বলে অহংকার আছে, সেই অহংকারে পাছে কোন দিক দিয়ে ঘা লাগে তাই.....'
এরপর আর কবি না গেয়ে পারলেন না।
খালি গলায় গাইলেন।
"তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী"

তথ্যসুত্রঃ গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ// সমীর সেনগুপ্ত।

"তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা"

ভগ্নহৃদয় গীতিকাব্যটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় ১৮৮১ তে।
এই গ্রন্থেই প্রথম উৎসর্গ পত্র দেখা যায়।
কবির জীবৎকালে প্রকাশিত ২০৮ টি বাংলা গ্রন্থের ৬৪ টি তে উৎসর্গ পত্র দেখা যায়।
৭টি গ্রন্থ কাদম্বরী দেবীকে উৎসর্গীকৃত।
ম্যাকবেথ এর প্রধানা ডাইনির নাম হেকটি।
রবীন্দ্রনাথ কাদম্বরীদেবীকে মজা করে হেকটি বলতেন।
গ্রন্থটির উৎসর্গ পত্রে লেখা ছিল-
'শ্রীমতী হে-কে'
গ্রন্থটির উপহার পৃষ্ঠায় ঐ গানটি আছে।

কবি গানটিতে তিন বার সুর দেন।
স্বামী বিবেকানন্দের খুব প্রিয় গান এটি।
রামকৃষ্ণদেবকে তিনি দু-বার গানটি শুনিয়েছেন।

তথ্য সুত্রঃ গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ// সমীর সেনগুপ্ত।

 

দেশ ভ্রমণ

                                                        মিজানুর রহমান মিজান

বিশ্বনাথ, সিলেট, বাংলাদেশ

.........প্রত্যেক মানুষের জ্ঞান অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য। মনের চোখ ফুটাতে জ্ঞানার্জন অপরিহার্য। বার্টানড্‌ রাসেল বলেছেন,“সংসার জ্বালা যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে ,মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদ কালে তার ভিতর ডুব দেওয়া।

     প্রত্যেক মানুষের জ্ঞান অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য। মনের চোখ ফুটাতে জ্ঞানার্জন অপরিহার্য। বার্টানড্‌ রাসেল বলেছেন,“সংসার জ্বালা যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে ,মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদ কালে তার ভিতর ডুব দেওয়া। যে যত বেশী ভুবন সৃষ্টি করতে পারে,ভব যন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার তত বেশী হয়।“তাই জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মনের চোখ ফুটিয়ে মনের ভিতর অসংখ্য ভুবন সৃষ্টি করত দু:খ, ক্লেশ এড়িয়ে যেতে হলে এ কাজের  উৎকৃষ্ট পথ দেশ ভ্রমণ। ক্লান্তি ও গ্লানি দুরের সঞ্জীবনী ভ্রমণ, দেখে শেখার একটি উত্তম মাধ্যম।মানব সমাজের বৈশিষ্ঠ পরিস্ফুটিত হয় তার মেধা,মনন ও বুদ্ধি মত্তায়। তাই  মানুষের অদম্য স্পৃহা এক স্থান থেকে অন্য স্থান যেতে অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে ভ্রমণ করায় হৃদয়ে আলোড়িত করে। আল্লাহ কতই না সুন্দর ও

বৈচিত্র্যময় বৈচিত্রতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এ পৃথিবী। সৃষ্টি অপার সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে ভ্রমণের প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা বইয়ের পাতা থেকে যা অর্জন করে তা অস্পষ্ট।বর্ণনার চেয়ে বাস্তব অতি স্পষ্ট। তাই শিক্ষা সফর বা ভ্রমণের মাধ্যমে উপাদানগুলো দর্শনে প্রত্যক্ষ আনন্দের খোরাক যোগায়। বিভিন্ন দেশের মানুষ, সৃষ্টি, সভ্যতা, আবহাওয়া ইত্যাদির সঙ্গে পরিচিত হয়ে সংকীর্ণতা, ক্ষুদ্রতাকে পরিহার পূর্বক উদার, নৈতিকতা, মনুষ্যত্ব ও মানবিক মূল্যবোধে আকৃষ্ট হতে পারে এবং জীবনে পূর্ণতা প্রাপ্তির সুস্পষ্টটা গ্রহণে  উদ্বুদ্ধ হতে পারে। ব্রিটেনে অল্প দিনের ভ্রমণে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হলো সে দেশের মানুষ সময়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। নয়টার অফিস নয়টায় যোগদান। কিঞ্চিত বিলম্বতায় অনভ্যস্ত। যা আমাদের দেশে অত্যন্ত কম পরিলক্ষিত হয়। আলস্যে ভর করে “করব“ বলে সময় ব্যয়ে

অধিক অভ্যস্ত। কিন্তু সময়ের "এক ফোড়.. দশ ফোড়“ কথাটির যথার্থ মর্মার্থ অনুধাবনে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ। জনগণ আইন মান্যে, পালনে যথেষ্ট সচেতন, শ্রদ্ধাশীল। সরকার ও জনগণের সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট আন্তরিক। উদাহরণ স্বরূপ ট্রেন সরকারী সম্পদ,জনগণের কল্যাণার্থে ব্যবহৃত। কোন প্রকার ত্রুতি বিচ্যুতির নিমিত্তে বিলম্ব হলে বিকল্প সরকারী বাস তাৎক্ষনিক বিনা মূল্যে রাস্তায় চালু করবে, করে জনগণকে ভোগান্তি থেকে রক্ষার্থে। অথচ আমাদের দেশে তা দুরে থাক,অনেক ক্ষেত্রে নোটিশ প্রদান ও করবে না। উপরন্তু “নয়টার গাড়ী কয়টায় ছাড়ে“ প্রশ্নের সম্মুখীন। গাড়ীর যন্ত্রাংশ চুরি হচ্ছে না,কেউ তামাসাচ্ছলে ও হাত দিয়ে দেখছে না। আমি বেশ কিছুদিন সৌদি আরবে ছিলাম। সেখানে অত্যধিক গরমের আধিক্যতা। ব্রিটেনে ঠান্ডার সখ্যতা, মেঘলা আকাশ, অধিকাংশ সময়। ঠান্ডারও রকমফের রয়েছে। কখন ও পতিত হয় বরফ, কখন ফ্রীজি ঠান্ডা (অত্যধিক ঠান্ডা) কখন অল্প মাত্রার অর্থাৎ শীত প্রধান দেশ। আমাদের দেশে ঠান্ডা-গরম উভয়ের সংমিশ্রণ। ব্রিটেনে প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়মানুবর্তিতা, শৃংখলাবোধ, সুন্দরেরও উন্নয়নের, সমৃদ্ধির স্পর্শ ছোঁয়া বিরাজমান। 

    সকল মানুষ ভ্রমণে সাধ্যানুযায়ী অভ্যাস হলে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে দ্বার হবে প্রসারিত। মহান আল্লাহর দরবারে কামনা জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনে “সুদূর চীন দেশে যাও“ বাক্যটির যথার্থতা উপলব্ধি ও বাস্তবায়নের জন্য সাধ্যাতীত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার তৌফিক দান করতে। আর “মানুষ মানুষের জন্য“ এবং “মানুষ মানবতার জন্য“ এ আলোকে হোক  উদ্ভাসিত।       

 

নতুন ইংরেজী বছর ২০১৮ হউক শান্তির বীজ বপনের সাল

                                                       মোস্তফা কামাল

.........প্রত্যেক মানুষের জ্ঞান অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য। মনের চোখ ফুটাতে জ্ঞানার্জন অপরিহার্য। বার্টানড্‌ রাসেল বলেছেন,“সংসার জ্বালা যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে ,মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদ কালে তার ভিতর ডুব দেওয়া।

     তুন নতুন স্বপ্ন, আশা, সংকল্প আর প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হলো ইংরাজী নববর্ষ ২০১৮। আনন্দ আর রকমারী উৎসবের মধ্য দিয়ে সমগ্র বিশ্ববাসী স্বাগত জানিয়েছে নতুন খ্রিস্টীয় বছর ২০১৮-কে এবং সকলের মাঝে মেতে উঠেছে নতুন বছরের নতুন নতুন প্রত্যাশা। বিগত বছরের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসাব নতুন বছরের পরিকল্পনাগুলিকে আরও উজ্জীবিত করবে এমন ভাবনাগুলিকে সম্বল করে বিশ্ববাসী খ্রিস্টীয় ২০১৮ সালকে সাদরে বরণ করে নিয়েছে, সকলেই নতুন নতুন স্বপ্নের ছক আঁকছে, পরিকল্পনা করছে উন্নত

জীবন আর সামগ্রিক উন্নয়নের। পাশাপাশি নতুন বছরের  এই শুভক্ষণে সকলেরই অজানা সামনের দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে বিশ্ববাসীর ভাগ্যে। তবে সব কিছু ভাগ্যেরউপর ছেড়ে না দিয়ে ভাল কিছু প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শপথ এখন সকলেরই। সকলেরই মঙ্গলময় প্রত্যাশা সব সময়ই থাকে, উন্নয়নের আশায়ই পথ চলা শুরু হয় নতুন বছরের নতুন দিনগুলোতে। নতুন বছর ২০১৮ এর শুরু থেকেই সকলেই প্রত্যাশা আর স্বপ্নে উদ্ভাসিত হোক এবং সূচনা হোক আলোকিত আর নিরাপদ জীবনধারার ।

বিশ্বের সকল আশাবাদী মানুষের অপূর্ণতাগুলি পরিপূর্ণতা লাভ করবে নতুন এই বছরে এবং জীবনের পুরনো সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজতে সক্ষম হবে সকলেই। সুষ্ঠ এবং যুগোপযোগী পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়বিচার, প্রতিটি মানুষ ফিরে পাবে তার কাঙ্ক্ষিত অধিকার- নতুন বছরে এমন প্রত্যাশা আজ সকলের মনে। দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বিভেদহীন সমাজ গঠনে আমাদের প্রত্যেকের প্রতিজ্ঞা হোক নতুন এই বছরে। ঐক্যবদ্ধ উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিশ্রম ও সততাকে সম্বল করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংকল্প হওয়া আমাদের প্রত্যেকের জন্যই জরুরী। সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ও গঠনমূলক কাজগুলি দেশের উন্নয়নে সহায়ক হবে, ইংরাজী নতুন বছরে ভাল কিছু করার শপথ নিব আমরা প্রত্যেকেই এবং দিনবদলের প্রত্যয়ে সকলেই দেশপ্রেমিক হিসেবে কাজ করে সমৃদ্ধিতে ভরে তুলবো আমাদের ভারতবর্ষকে।
বিশ্বের বয়স বাড়ল আরও এক বছর, সূচনা হলো একটি নতুন বছরের । “সময় ও নদীর স্রোত কারও জন্যই অপেক্ষা করে না”- আবহমান সূর্য একটি পুরনো বছরকে কালস্রোতের উর্মিমালায় বিলীন করে আবার শুরু করল নতুন যাত্রার। নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে উন্নয়ন, অগ্রগতি আর অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার অপরিমেয় প্রত্যাশায় উদ্ভাসিত হোক ২০১৮। বছরের নতুন দিনের সূর্যালোকে স্নান করে সিক্ত হবে জাতি-ধম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব শ্রেণী পেশার মানুষ। বিগত সময়ের সব ভুল শুধরে নেয়ার সময় এসেছে আজ, ২০১৮ হবে শান্তির বীজ বপনের সাল, অনাবিল স্বপ্ন আর অফুরন্ত প্রাণোম্মাদনা নিয়ে নতুন সূর্যের আলোয় অগ্রসর হবে সকল মানুষ, নতুন বছরে সকলেরই প্রত্যাশা একটি ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত সুখী সমৃদ্ধিশালী দেশ দেখার। নতুন বছরে সকল শান্তিকামী মানুষের প্রার্থনা-“আর কোন হিংস্রতা বা সন্ত্রাস নয়, নয় কোন হত্যা-খুন বা অপহরণ, ২০১৮ হউক শান্তির বীজ বপনের সাল”।

 

বুদ্ধিমান

দাঁত

                                                       সরসিজ দাস

.........প্রত্যেক মানুষের জ্ঞান অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য। মনের চোখ ফুটাতে জ্ঞানার্জন অপরিহার্য। বার্টানড্‌ রাসেল বলেছেন,“সংসার জ্বালা যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে ,মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদ কালে তার ভিতর ডুব দেওয়া।

      কাশে এখনো সূর্য রয়েছে।সন্ধ্যা হতে ঢের দেরী। তবু আজ ওদের খেলা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। সব মিলিয়ে এক ঘন্টাও খেললনা ওরা।
'কি-রে আজ পটলা, রাজু, হোদল-র খবর কি? খেলতে এলনা কেন? ওদের ছাড়া আজ খেলাটা জমল না।', খেলা শেষে মাঠে বসে  বলল টিটু।
'কি জানি? সূর্য আজ পশ্চিম দিক দিয়ে উঠেছে মনে হয়। রাজু খেলতে এলনা, ভাবা যায়!', বলল টিটু।
'কাল তো বলাই-দার টিউশন-এ ওরা তিন জন-ই এসেছিল', বলল ভোম্বল।
'এই তো সবে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হল, এর-ই মধ্যে টিউশন! পারিস-ও বটে তোরা। তা, বলাই-দা মানে যিনি অঙ্ক করান তো। শুনেছি, ওনার ছাত্ররা জল খেতে চাইলে উনি ওনার মেয়ে-কে বলেন আধ গ্লাস জল এনে দিতে!', বলল গুগুল।
'আধ গ্লাস', হো হো করে হেসে উঠলো ওরা।

'লোক-টা রাম কিপ্টে', বলল  ভোম্বল, 'খাতা কারেক্ট করার সময়ও  স্টুডেন্টদের পেন ব্যবহার করে। নিজের পেনের কালি পর্যন্ত খরচ করতে চায় না।'
'আচ্ছা ওদের মোবাইল-এ কল করেছিলি? আমি করেছিলাম, কিন্তু কেউ ধরল না।', টিটু বলল।
'দাড়া আমি এখন আর-একবার করে দেখছি,' বলে হোদল-কে ফোন করল গুগুল।
'কি-রে আজ এলিনা কেন? .........সেকি! কি করে?..........আমাদের-কে বাদ দিয়ে দিলি!.......... বেশ হয়েছে ..........কবে আসবি আবার ............ ওকে, বাই .....', ফোনে এই কথা গুলো বলল গুগুল।
'কি হয়েছে?', গুগুল ফোন রাখতেই জানতে চাইল টিটু।
'শালাগুলো কাল টিউশানির পর খেতে গেছিল। হোদলের থেকে জোর করে কোল্ড-ড্রিঙ্কস আর প্যাটিস আদায় করেছিল', বলল গুগুল।
'আমাকে ডাকল না তো', মুখ কালো করে বলল ভোম্বল। 'তুই কাঁদিস পরে, আগে আমাকে কথাটা শেষ করতে দে', বলল গুগুল, 'প্যাটিস-গুলো বোধহয় ভালো ছিল না। ওই তিন-জনের-ই food poisoning হয়ে গেছে।'

'বেশ হয়েছে, আমাদের না দিয়ে খেলে এটাই হবে', বলল হোদল, 'তা ওরা আবার কবে খেলতে আসবে?'
'বমি-টা বন্ধ হয়েছে। তবে লুস-মোশন চলছে। 'লুস' টাইট হলে তবেই ওরা আসবে। আরো এক-দুই দিন লাগবে বোধ হয়', বলল গুগুল।
'আমাদের বাড়িতে কাল এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আমাদের এক আত্মীয়ও food poisoning-র জন্য হাসপাতালে ভর্তি', বলল ভোম্বল। 
'আমাদের দেশ-এ ফুড ইন্সপেক্টর-রা এত ফাঁকিবাজ আর ঘুষখোর হয়। কেউ নিজের কাজ ঠিক করে করে না', বলল টিটু।
'ফুড ইন্সপেকশন কিন্তু সব সময় কাজ করে না। মনে নেই, ২০১১-তে জার্মানি-তে কত লোক E-Coli ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে মারা গেছিল। শাকসবজির মধ্যে দিয়ে এই ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল। ওদের দেশ-এ কিন্তু ফুড inspection বেশ ভালো ভাবে হয়। তবু-ও  ওরা এটা আটকাতে পারেনি', বলল গুগুল।
'কাল, আলোচনার সময় বুড়ো-দা একটা নতুন আবিষ্কারের কথা বলল যা food  poisoning আটকাতে সাহায্য করতে পারে', বলল ভোম্বল।
'বুড়ো-দা মানে তোর জ্যাঠতুতো দাদা তো, যে USA-তে PhD করে। সে এখন এখানে?', জানতে চাইল গুগুল।
'হ্যাঁ, পরশু দিন বুড়ো-দা এসেছে,' বলল ভোম্বল।
'তা একদিন আমাদের সাথে আলাপ করিয়ে দে', বলল টিটু।
'হ্যাঁ, মা বলছিল তোদের একদিন নেমন্তন্ন করবে,' বলল ভোম্বল।
'দারুণ ব্যাপার তো। এবার বল, তোর বুড়ো-দা কি বলল?', বলল টিটু।

'বুড়ো-দা বলল যে USA-র Princton এবং Tufts ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এক রকম বুদ্ধিমান দাঁত আবিষ্কার করেছেন, যেটা বলে দেবে যে মুখের মধ্যের খাবার-এ কোনও হানিকারক ব্যাকটেরিয়া আছে কিনা?', বলে থামল ভোম্বল। দেখল সবাই হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
   'বুদ্ধিমান দাঁত! একমিনিট সময় দে ব্যাপারটা একটু হজম করে নি', বলল টিটু।
   'আর একটু খুলে বল, এটা কি ভাবে কাজ করে? এটা কি কোন কৃত্রিম দাঁত?', জানতে চাইল গুগুল।

'না, কৃত্রিম নয়। আসল দাঁত। গ্রাফেন - নামের একটি পদার্থ দিয়ে ওনারা দাঁত-র উপর একটা ট্যাটু বানান। সেই ট্যাটু মুখের মধ্যে কোনও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ধরতে পারে', বলল ভোম্বল।

'গ্রাফেন কি?', জানতে চাইল টিটু।
'সহজ ভাবে বললে এটা one-atom thick layer of Graphite', বলল ভোম্বল।
'one atom thick বানায় কি ভাবে? এতো কল্পনা করাই মুশকিল!' বলল টিটু।
'nanotechnology-তে এরকম নাকি বানানো যায় এখন', বলল ভোম্বল।
'আচ্ছা, ওই ট্যাটু কোন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কথা মানুষ-দের জানায় কি ভাবে? ওই ট্যাটুর মধ্যের খবর জানার জন্য কি কোনও wire ওই  ট্যাটুর সাথে লাগাতে হবে?', জানতে চাইল গুগুল।
'না না, ওই ট্যাটু-র মধ্যে ছোট একটা antenna আছে। antenna-টা গ্রাফেনের সাথে যুক্ত থাকে। কিন্তু ওই ট্যাটু-র মধ্যে কোনও battery নেই। একটা receiver যন্ত্র  wireless communication-র মাধ্যমে ওই ট্যাটু-র সাথে যোগাযোগ করে এবং ওই ট্যাটু-র  মধ্যে জমা তথ্য সংগ্রহ করে।  রোগীর মুখে কোন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এলে ওই receiver যন্ত্রে সেটা ফুটে ওঠে। কোন wire ব্যবহার  না ব্যবহার করেই ডাক্তার বা রোগী নিজে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কথা জানতে পারে। এর ফলে, ডাক্তার-রা কোন অসুখ শুরুতেই ধরতে বা চিকিত্সা করতে পারবে আর রোগীরাও অসুখ সম্পর্কে সাবধান হয়ে যাবে। ', বলল ভোম্বল।
'ওনারা এটা কি মানুষের উপর পরীক্ষা করেছেন?' বলল গুগুল।
'ওনারা এই ট্যাটু গরুর দাঁতে লাগিয়ে তার উপর মানুষের মুখের ভেতরের হওয়া ছেড়ে দেখেছেন যে ওই ট্যাটু ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ধরতে পেরেছে। গরুর দাঁত ব্যবহার করেছেন কারণ মানুষের দাঁতের পক্ষে ওই ট্যাটু একটু বড়। তবে ওনারা এরপর মানুষের দাঁতের মত করে ওই  ট্যাটু বানাবেন', বলল ভোম্বল।
'ওই ট্যাটু কোন কোন ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ধরতে পারে?', জানতে চাইল টিটু।
'গবেষকরা এখনো পর্যন্ত  কিছু stomach ulcers and some cancer-র সাথে যুক্ত ব্যাকটেরিয়া সনাক্ত করতে পেরেছেন। যদিও আরো গবেষণার দরকার আছে', বলল ভোম্বল।
'আচ্ছা, খাবার খেলে বা ব্রাশ-করলে ওই ট্যাটু-টা উঠে আসবে না তো?', জানতে চাইল গুগুল।
'হ্যাঁ, এটা খুব দরকারী বিষয়। এই মুহূর্তে, ওই ট্যাটু খুব স্থায়ী নয়। তবে গবেষকরা এটাকে আরো স্থায়ী করার চেষ্টা করছেন যাতে দাঁত মাজলে বা খাবার খেলে এটা দাঁত ছেড়ে বেরিয়ে না আসে', বলল ভোম্বল।
'বুদ্ধিমান দাঁত-ই বটে! হাই-ফাই আবিষ্কার কিন্তু!', বলল গুগুল। সবাই মাথা নেড়ে তাতে সায় দিল।
'ও! একটা হেব্বি রসালো খবর আছে। আমি ভুলেই গেছিলাম বলতে', বলে উঠল গুগুল।
বিকেল প্রায় শেষ হতে চলল। ওরা এবার অন্য বিষয়ে আলোচনা করতে সুরু করল। তবে আমাদের তাতে আগ্রহ নেই, কি বল তোমরা?

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?