প্রবন্ধ আলোচনা - ৩

  • প্রজেক্ট বালুচরী - সুশান্ত বিশ্বাস

  • দহন বেলার কবি নজরুল - পারোমিতা চট্টোপাধ্যায়

  • অগ্রন্থিত নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশ - উদয় শংকর দুর্জয়​

  • স্টাফ রুম একাল-সেকাল - সনোজ চক্রবর্তী

  • স্বর্গের পারিজাত - সুস্মিতা দত্ত 

  • ​আমার ছেলেবেলার পুজো - সনোজ চক্রবর্তী

  • তোমার অসীমে - অনীমা ভট্টাচার্য্য 

  • গ্রাম্য কুসংস্কার একটি ব্যাধি - মিজানুর রহমান মিজান

  • রবি ঠাকুরের খাওয়াদাওয়া - ফারুক আব্দুল্লাহ

প্রোজেক্ট

বালুচরী

সুশান্ত বিশ্বাস

....শাড়ির আঁচলেও গায়ে মোটিফ তৈরি বালুচরী বয়নের এক জটিল প্রক্রিয়া। নকশাটি আঁকা হয় গ্রাফ বা ছক কাগজের ওপর। আঁচল, পাড় ও বুটির পরিকল্পনা অনুযায়ী নকশার বিন্যাস নির্ধারণ করা হয়। রামায়ণ মহাভারতের দৃশ্য, রাজপুতানার মিনিয়েচার পেন্টিং, অজন্তা ইলোরার শিল্পকর্ম ছাড়াও তৎকালীন মুঘল ও ব্রিটিশ যুগের প্রভাবও দেখা যায় এর আয়তাকার বাবর্গাকার নকশায়।....

  রূপকথা আর পুরাণের বর্ণময় দৃশ্য, মনের মাধুরী মেশানো শৈল্পিক নৈপুণ্যে, রেশমের কাপড়ে ফুটিয়ে তোলার এক কালোত্তীর্ণ মাধ্যম বাংলার বালুচরী শাড়ি। বিষয় বৈচিত্র্য এবং সূক্ষ্ম কারুকাজের অপরূপ মেলবন্ধনে এর খ্যাতি দেশের সীমা ছাড়িয়ে গেছে ইতিহাসের কাল থেকে।অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজধানী স্থানান্তরণের সময় বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জ সন্নিহিত বালুচর গ্রামে এই শাড়ি তৈরির শিল্প আমদানি করেন। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় ও উৎসাহেএই ঐতিহ্যবাহী শিল্প সমৃদ্ধি লাভ করে। পরবর্তীকালে এক বিধ্বংসী বন্যায় গ্রামটি ডুবে যাওয়ার পর বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে বালুচরীশাড়ি শিল্প নতুন করে গড়ে ওঠে। সেই সময় মল্ল রাজাদের শাসনকালে তা বিশেষ সমৃদ্ধিও লাভ করে। মল্ল রাজবংশের অন্যতম ঐতিহাসিক কীর্তি পোড়ামাটির মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা পৌরাণিক চিত্রের প্রভাব দেখা যায় বালুচরী শাড়িতে।কিন্তু এই সমৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে নি। রাজনৈতিক ও আর্থিক কারণে ব্রিটিশ শাসনকালে ক্রমেই তা মুমূর্ষু শিল্পে পরিণত হয়। বেশিরভাগ তাঁতিরা বাধ্য হন তাদের পেশা পরিত্যাগ করতে। স্বাধীনতার পর সুভো ঠাকুর ও কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগে বিষ্ণুপুরের নক্সাকার অক্ষয় দাসের কৃতিত্বে দীর্ঘকাল পরে নতুন চেহারায় আবার বিষ্ণুপুরেই বালুচরী শাড়ির প্রকাশ ঘটে। এরপর ক্রমশঃ বিষ্ণুপুরেরই নিজস্ব শিল্প হয়ে উঠল বালুচরী।

   বালুচরি শাড়ি তৈরির প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ। এর মূল উপাদান রেশম সুতো। মালদহ থেকে কিলোগ্রাম হিসেবে লাচির আকারে সংগ্রহ করা কোরা সুতো নরম করে তুলতে পরিমাণ মতো সোডা সাবানের জলে ফুটোনো হয়।তারপর শাড়ির প্রয়োজন অনুযায়ী নানা রঙে তা রাঙিয়ে তোলা।দু’পাশে টান-টান করে হাতের দুই তালুতে চাপ দিয়ে এই সুতো বিপরীত মুখে পাকানো হয়। রেশমের এই সুতো এর পর বড় লাচি থেকে ছোট ছোট ববিনে পাকিয়ে পরে আবার দুটি করে ছোট ববিনের সুতো নিয়ে একটি ববিনে পাকানো হয়, যা পাকোয়ান বাট্যুইস্টিং নামে পরিচিত। এই পাকানো সুতোর পাক মজবুত করতে ড্রামের মধ্যে স্টিমিং করা হয়।এরপর মেশিনের সাহায্যে সেই সুতো থেকে তৈরি হয় বড়

লাচি এবং তা থেকে আবার ছোট লাচি। টানা বা খাড়া বুননের জন্য সেই ছোট লাচি পুড়নি বা ওয়ার্প (Warp) করা হয়। এরপর সানা গাঁথা বা ডেন্টিং করার পালা। সানা করাসুতো বিম-এ গোটানো হয়। অন্যদিকে, ভরনা বা অনুভূমিক বুননেরজন্য ছোট লাচি করা সুতো খিয়া বা ওয়েফট (Weft) করা হয়। এই সুতোকে পোক্ত করে তুলতে তা গামিং করা হয়। এরপর সেই খিয়া করা সুতো নলি বা ছোট কাটিমে গুটিয়ে রাখা হয়। তারপর নক্সা অনুযায়ী জ্যাকার্ড মেশিনে খাঁচান বেঁধে সেই মতোশিল্পী শাড়িটি মাকুর সাহায্যে বয়ন করেন। ববিন বা নলি মাকুর মধ্য দিয়ে যাওয়া আসা করে।

  শাড়ির আঁচলেও গায়ে মোটিফ তৈরি বালুচরী বয়নের এক জটিল প্রক্রিয়া। নকশাটি আঁকা হয় গ্রাফ বা ছক কাগজের ওপর। আঁচল, পাড় ও বুটির পরিকল্পনা অনুযায়ী নকশার বিন্যাস নির্ধারণ করা হয়। রামায়ণ মহাভারতের দৃশ্য, রাজপুতানার মিনিয়েচার পেন্টিং, অজন্তা ইলোরার শিল্পকর্ম ছাড়াও তৎকালীন মুঘল ও ব্রিটিশ যুগের প্রভাবও দেখা যায় এর আয়তাকার বাবর্গাকার নকশায়। গ্রাফ কাগজের নকশাটি রঙীন করে সেই অনুযায়ী কার্ড ফুটো বা পাঞ্চ করা হয়। পাঞ্চিং এর পর নকশার হিসেব অনুযায়ী কার্ড সাজিয়ে সেগুলি সেলাই করা হয়। এরপর জ্যাকার্ড মেশিনে সেগুলিকে আঁটা হয়। সম্প্রতি খাদি পর্ষদের উদ্যোগে স্বয়ংক্রিয় কার্ড পাঞ্চিং যন্ত্র স্থাপনেরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

  ১৮০১ শতাব্দীতে জোসেফ এম জ্যাকার্ড, ফুটো বা পাঞ্চ করা প্রচুর কার্ডের ধারাবাহিক বিন্যাসক্রমে সাজানো গুচ্ছ বা চেন দিয়ে জটিল নক্সার বস্ত্র বয়নের সরলীকরণের জন্য তাঁত যন্ত্র জ্যাকার্ড মেশিন বা লুম উদ্ভাবন করেন। কার্ডের প্রতিটি অবস্থানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে, পিণ্ডাকার মাথা যুক্ত হুক লাগানো থাকে, যা কার্ডের ফুটো বা ভরাট অংশের ওপর নির্ভর করে ওঠে বা আটকে থাকে। হুকটি লাগামের মতো সেই অংশকে টেনে তোলে বা নামিয়ে দেয়, যা পুড়নি বা ওয়ার্প (Warp) সুতোটিকে বহন ও চালিত করে যাতে খিয়া বা ওয়েফট (Weft) সুতোটি তার ওপরে বা নীচে প্রসারিত হয়। নির্বাচিত রঙের সুতো তাঁতে বেঁধে দুই বা তার

বেশী মাকু ব্যবহার করে বালুচরী শাড়ি তৈরি হয়। শাড়ির পাড়, গা ও আঁচলের জন্য গলানি মাকু ও বুটির জন্য চালানি মাকু ব্যবহৃত হয়। জ্যাকার্ড তাঁত প্রচলিত হবার পর একটি শাড়ি কম পক্ষে ৫ থেকে ৬ দিনের মধ্যে তৈরি করা যায়। এতে শিফট ভিত্তিতে ১ জন পুরো সময় ও ১ জন আংশিক সময়ের জন্য অর্থাৎ মোট ২ জন তাঁতি কাজ করেন।রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায়, ক্ষুদ্র ছোট মাঝারি উদ্যোগ ও বস্ত্র দপ্তরের অধীন পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্পপর্ষদ, বালুচরী শাড়ী শিল্পের বিকাশে, বাঁকুড়া জেলা কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে এর উৎপাদনের এলাকা বিষ্ণুপুর থেকে সোনামুখী পর্যন্ত প্রসারিত করার লক্ষ্যে একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এতে সোনামুখী ও তার সন্নিহিত এলাকার তাঁতিদের জীবিকা অর্জনের সুযোগ বাড়ছে। কয়েক বছর হ’ল, স্থানীয় অঞ্চলের কিছু দক্ষ কাটুনী ও বয়নশিল্পীদের সহায়তায় এখানে রেশম বস্ত্র উৎপাদনের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কেন্দ্রটির প্রয়োজনে নিজস্ব জমিতে সংশ্লিষ্ট সকলের সহায়তার জন্য খাদি পর্ষদ একটি বাড়ি তথা কর্ম-শালা নির্মাণ করেছে। যেখানে কম্পিউটার সহায়ক নকশা যন্ত্র সহ জ্যাকার্ড লুম বসানো হয়েছে।স্থানীয় তাঁত-শিল্পীদের বালুচরী শাড়ি তৈরিতে সাহায্য করার জন্য, পর্ষদ প্রয়োজনীয় দক্ষতার উন্নতিকল্পে, সোনামুখীর ৬০ জন তাঁতিকে নিয়ে প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করেছে। সহায়ক সংস্থার সহযোগিতায় বালুচরীর নকশায় রেশম বস্ত্র উৎপাদনে বিশেষগুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায় ও আধুনিক ক্রেতার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে বালুচরীর চিরাচরিত নক্সায় নানান পরিবর্তন এনে তা যুগোপযোগী করে তোলার আয়োজন করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, নকশা, কম্পিউটার সহায়ক নকশার সঠিক ব্যবহার ও বিনিয়োগ-প্রসারণ নিশ্চিত করতে খাদি পর্ষদ সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্বের মডেলে প্রোজেক্ট বালুচরী রূপায়ণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। রেশম খাদি শিল্পের এই ঐতিহ্যবাহী ও অনন্য সাধারণ পণ্যটির উপযুক্ত বিপণন বাজারে এর চাহিদা বৃদ্ধি করে তাঁত-শিল্পীদের জীবিকা উন্নয়নে যে সাহায্য করবে, সে বিষয়ে খাদি পর্ষদ আশাবাদী। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণে, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় গ্রামীণ এর বিক্রয় কেন্দ্রগুলিতে সারা বছর, খাদি ও মসলিন বস্ত্রের পাশাপাশি, বিভিন্ন নকশার ও মূল্যের বালুচরী-র সম্ভার প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সঙ্গে থাকছে বালুচরীর নকশায় সিল্কের কুর্তা, পাঞ্জাবী ও রকমারি আধুনিক ড্রেস মেটেরিয়াল। এছাড়াও, রাজ্য স্তরে কোলকাতার মিলন মেলায়, জাতীয় স্তরে দিল্লির প্রগতি ময়দানে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ইতালির নাপোলস সহ বিভিন্ন জায়গায় রেশম খাদি পণ্য বালুচরীর প্রদর্শনে পর্ষদ বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে।

 এরই পাশাপাশি, তাঁতিদের জীবনযাত্রার সার্বিক মান উন্নয়নে জনশ্রী বীমা যোজনা সহপশ্চিমবঙ্গ সরকারের নানান জনকল্যাণমুখী প্রকল্পে তাদের সামিল করে তুলতেও পর্ষদ বিশেষভাবে উদ্যোগী। স্পন্ডাইলোসিস, চক্ষু রোগের মতোপেশা জনিত অসুস্থতা নিরাময়, নিরাপদ পানীয় জল ব্যবহার, স্বাস্থ্য সচেতনতা, স্যানিটেশন ও সাক্ষরতা ইত্যাদি বিষয়ে যথাযোগ্য গুরুত্ব দিতে পর্ষদ কর্ত্তৃপক্ষ অনুপ্রেরক নিয়োগ করেছেন। কালের দীর্ঘ যাত্রায় বহুবার বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে, বাংলার বালুচরী শাড়ি শিল্প। কিন্তু তার নান্দনিক সৌন্দর্যের আকর্ষণে নিশ্চিত বিলুপ্তির পথ থেকে তাকে কখনও ফিরিয়ে এনেছে রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতা কখনও বা শিল্পী মনের অকৃত্রিম ভালোবাসা। ইতিহাস তার সাক্ষী। অস্তিত্ব রক্ষার নানা সমস্যার মোকাবিলা করে,আজ এই রেশম শিল্প ও তার শিল্পীর জীবন ও জীবিকার সামগ্রিক উন্নয়নে ব্রতী পশ্চিমবঙ্গের খাদি পর্ষদ। বালুচরীর হারিয়ে যাওয়া গর্ব ফিরিয়ে আনতে বদ্ধ পরিকর, প্রোজেক্ট বালুচরী।

দহন বেলার

কবি – নজরুল

পারোমিতা চট্টোপাধ্যায়

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত। ইংরেজ সরকার যুদ্ধশেষে ভারতবাসীকে ‘স্বরাজ’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধে তাদের পুরোদস্তুর সাহায্য নিল। কিন্তু যুদ্ধাবসানে সেই প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে গিয়ে চালু করল কুখ্যাত রওলাট আইন। সাম্রাজ্যবাদী ইংরাজের অত্যাচার, দেশ জোড়া নিপীড়িত মানুষের হাহাকার, জাতপাতের অন্যায় ভেদাভেদ, সর্বোপরি নিরন্ন মানুষের কান্নায় ভারতের আকাশ বাতাস ঘন বাষ্পীভূত। ঠিক এইরকম রুক্ষ, দগ্ধ দহন দিনে কবির আবির্ভাব, বাংলা কাব্য সাহিত্যে।

(২১শে মে ২০১২ সালে, আকাশবাণী কলকাতার ‘প্র্যাত্যহিকী’ অনুষ্ঠানে, সম্প্রচারিত হয়েছিল এই লেখা)

  বাংলার কাব্য সাহিত্যের ঝিরিঝিরি মৃদু বাতাস আর রাখালিয়া মিঠে সুরের অপরাহ্নে হঠাৎ কালবৈশাখীর প্রমত্ততা নিয়ে, অরণ্য তোলপাড় করে, ধুলোর ঝড় তুলে, চারদিক সচকিত করে বাংলা কাব্য সাহিত্যে হাজির হয়েছিলেন নজরুল। তাঁর “এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রনতুর্য”। তাঁর অগ্নিক্ষরা চোখে ছিল বিপ্লবের অশনি সংকেত| তিনি বিদ্রোহী কবি।

  প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত। ইংরেজ সরকার যুদ্ধশেষে ভারতবাসীকে ‘স্বরাজ’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধে তাদের পুরোদস্তুর সাহায্য নিল। কিন্তু যুদ্ধাবসানে সেই প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে গিয়ে চালু করল কুখ্যাত রওলাট আইন। সাম্রাজ্যবাদী ইংরাজের অত্যাচার, দেশ জোড়া নিপীড়িত মানুষের হাহাকার, জাতপাতের অন্যায় ভেদাভেদ, সর্বোপরি নিরন্ন মানুষের কান্নায় ভারতের আকাশ বাতাস ঘন বাষ্পীভূত। ঠিক এইরকম রুক্ষ, দগ্ধ দহন দিনে কবির আবির্ভাব, বাংলা কাব্য সাহিত্যে।

  ১৮৯৯ সালের ২৪শে মে বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের জন্ম নেন নজরুল। ডাক নাম দুখু মিঞা। পিতা ধর্মপ্রাণ ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুন। সীমাহীন দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি পেয়েছিলেন মানবতার মহামন্ত্রের দীক্ষা ও দুঃখ জয়ের মহৎ উত্তরাধিকার। প্রখর-মেধা-নজরুলের জ্ঞান আহরণের তীব্র আকাঙ্খা থাকলেও দুঃসহ দারিদ্র্য তাঁকে বারবার সরিয়ে গেছে শিক্ষাঙ্গন থেকে। কখনো গার্ড সাহেবের বাড়ির চাকর, আবার কখনো রুটির দোকানের ‘বয়’, কখনো বালেটোর দলে গণ বেঁধে দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু তাঁর জানা ও শেখার আগ্রহ থেমে থাকেনি। পড়েছেন কোরান, রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত, পুরাণ। উর্দু, আরবী, ফারসী,

সংস্কৃত ভাষা শিখেছেন| সেই সুত্রে সান্নিধ্য লাভ করেছেন বহু বাউল, সুফী, ফকির ও সাধু সন্যাসীর। এইভাবে অনিশ্চিতের ঘাটে ঘাটে খেয়া ভেড়াতে ভেড়াতে এসে ভিড়লেন রানীগঞ্জের সিয়ারসোল্ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীতে। সবে প্রি-টেস্ট দিয়েছেন, সেই সময়েই বেজে উঠল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণ-দামামা। ব্রিটিশ বাহিনীর বাঙ্গালী রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে নজরুল পাড়ি দিলেন সুদুর রনাঙ্গনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইংরেজ বাহিনীর বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীর সৈনিক নজরুল দেশে ফিরলেন। যুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতিতে হৃদয় ক্ষত বিক্ষত। বুকে পরাধীনতার জ্বালা। তাঁর গান, কবিতায় তাঁর সেই জ্বালা যেন অজস্র জ্বালামুখে লাভা উদগীরণ করতে লাগল। সদম্ভে ঘোষনা করলেন –          

'আমি বিদ্রোহী ভৃগু,

ভগবান বুকে এঁকে দেব পদচিহ্ন'।

  এত জেহাদীর মুখের ভাষা! কিন্তু কার বিরুদ্ধে তাঁর এই জেহাদ? আসলে যেখানেই মানবতার লাঞ্ছনা দেখেছেন, দেখেছেন ধর্মের নামে ভন্ডামি ও ভ্রষ্টাচার, দেখেছেন অসাম্য, সীমাহীন শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদীর নির্লজ্জ, নির্বাক অধিকার হরণ সেখানেই তার লেখনি আপসহীন।

তাই একাধারে যখন বুভুক্ষু মানুষের হাহাকার অন্যদিকে রাষ্ট্র নেতাদের 'স্বরাজ' নিয়ে রশি টানাটানি, ব্যথিতকবি প্রতিবাদে মুখর হন।

'ক্ষুধাতুর শিশু চায়না ‘স্বরাজ’,

চায় দুটোভাত একটু নুন।

বেলা বয়ে যায় খায়নিকো বাছা,

কচি পেটে তার জ্বলে আগুন'।

১৯২২ সালে প্রকাশ করলেন সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ‘ধূমকেতু’কে আশির্বাদ করে লিখলেন -

'আয় চলে আয় রে ধূমকেতু

আঁধারে বাঁধ অগ্নি সেতু

দুর্দিনের এই দুর্গশিরে

উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন'।

  বাংলার বিপ্লবীরা তাঁকে একান্ত আপন করে পেলেন তাঁর কবিতায়ে ও গানে। তাই নজরুল মহাবিপ্লবের পুরোহিত।অন্যায় জাতপাতের বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র কষাঘাত হেনেছেন।

'জাতের নামে বজ্জাতি

সব জাত-জালিয়াত খেলছ জুয়া।

ছুঁলেই তোর জাত যাবে?

জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া'।

কিংবা লিখছেন - ‘মানুষেরে ঘৃণা করি, ও কারা কোরাণ, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরিমরি'? নজরুল স্বপ্ন দেখতেন এক শোষণহীন, পরাধীনতাশূন্য স্বাধীন সাম্যবাদী সমাজের| তিনি লিখেছেন -      

       'গাহি সাম্যের গান

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান'।

কিন্তু বাস্তবে দেখেন মানবাত্মার সীমাহীন লাঞ্ছনা। কবি সোচ্চারে সকলকে -                                                 'মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান'।

কখনও কখনও মনে হয় এবার কবি বোধহয় শ্রান্ত, যখন উচ্চারণ করছেন -                                                   'বন্ধুগো! আর বলিতে পারিনা,

বড় বিষ জ্বালা এই বুকে।

দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়াছি,

তাই যাহা আসে কই মুখে'।

পরক্ষণেই কম্বুকন্ঠে কবির ঘোষণা -

'...... আমি সেই দিন হব শান্ত

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল

আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না

অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ -

ভীম রণভূমে রনিবে না।'

  নজরুল যে কাজেই হাত দিয়েছেন, সে কাজেই উপচে পড়েছে তাঁর প্রাণ প্রাচুর্য। যেখানেই থাকতেন তাঁর অফুরন্ত প্রাণ শক্তিতে সেই স্থান আলোড়িত হত। কারাগারে বন্দী নজরুল গান লিখতেন আর রাজনৈতিক বন্দীর দল মহা উন্মাদনায় গাইত সেই গান –  

“কারার এই লৌহ কপাট,

ভেঙে ফেল্ কর্ রে লোপাট,    

রক্তজমাট শিকল পূজার পাষাণ বেদী।'                          অথবা

'শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল

 শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।'

তাঁর ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘দোলনচাঁপা’, ‘সর্বহারা’, ‘ভাঙার গান’ প্রভৃতি কাব্য গ্রন্থে দেশের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত চাষী, মজুর, জেলে সকলেই যেন নিজেদের মর্যাদা খুঁজে পেল। লিখলেন বহু প্রবন্ধ, অজস্র সংগীত, কয়েকটি নাটক।

  বাংলা সাহিত্যে নজরুল ইসলাম একটা ব্যতিক্রম| ঝিমিয়ে পড়া সুরের দেশে কাব্যে ও সঙ্গীতে তিনি যে প্রলয় ঝঙ্কার তুলেছিলেন তা তুলনাহীন। তিনি দহন দিনের সেই সমাজের গরলটুকু পান করে সাধনা করেছেন অমৃতের| তাই তিনিই বলতে পারেন -

'আমি চিরবিদ্রোহী বীর,

বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির'।

 

অগ্রন্থিত নির্জনতার

কবি জীবনানন্দ দাশ

উদয় শংকর দুর্জয়

......কবি জীবিত থাকা কালীন মাত্র সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল আর ঐসব কাব্যগ্রন্থে সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৬২টি কবিতা স্থান পেয়েছিল। কবির অপ্রকাশিত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধের কথা না হয় নাই লেখা হল কিন্তু শত শত কবিতা বহুকাল পর্যন্ত প্রকাশের অন্তরালে পড়েছিল। কবি জানলেন না প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের গহন পথে আজ অবধি হেঁটে চলেছেন...

     'মাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে

       কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে'

এই লাইন দুটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। উল্লেখিত পঙক্তিদ্বয় জীবনানন্দ দাশের মাতা রচিত আদর্শ ছেলে কবিতার অন্তর্গত যা কবি জীবনানন্দ দাশের আদর্শিক জীবনের সাথে সরাসরি মিলে যায়। পিতা সত্যানন্দ দাশ ও মাতা কুসুমকুমারী দাশের জ্যেষ্ঠ পুত্র আধুনিক বাঙলা কবিতার সফল সম্রাট কবি জীবনানন্দ দাশ।

    এই অক্টোবর মাস অধুনা বাঙলা কবিতার প্রধান পুরুষ কবি জীবনানন্দ দাশের তিরোধানের মাস। কবির জন্য বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।   মাইকেল মধুসূদন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে যারা কবিতাকে ভাষা, ছন্দ, কাব্যময়তা দিয়ে কবিতাকে আধুনিক করতে চেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯ - ১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১ - ১৯৬০), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮ - ১৯৭৮), বিষ্ণু দে (১৯০৯ - ১৯৮২) ও অমিয় চক্রবর্তী অন্যতম। এই পাঁচজন আধুনিকতার স্বপ্নদ্রষ্টা কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং সুপঠিত। রাবীন্দ্রিক যুগ বা সমসাময়িক কবিতার প্রেক্ষাপট থেকে বেরিয়ে এসে জীবনানন্দ দাশ দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন; লিখেছিলেন বনলতা সেন। নাটোরের আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে রূপসী বাঙলার সুদর্শন নায়ক জীবন বাবুর কাব্যকুটিরে ধরা দিয়েছিল মিস সেন। সেই থেকে জীবন বাবুর নাম উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে বনলতা সেনের নামটিই উচ্চারিত হয়। বনলতা সেন এখন একটি নক্ষত্রের মতো, আকাশের গায় জ্বলে থাকা আলোর ফুল। আর আবেগ - অনুভূতি - ভালোবাসার কবিতা মানেই ‘আমারে দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন’। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯২-১৯৭০) বলেছিলেন - 'জয়দেব -চণ্ডিদাস - বিদ্যাপতি - রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার যে আধুনিক বাঙলায় সম্পূর্ণ অপচিত হয় নাই, জীবনানন্দের কবিতা সেই আশ্বাসের বাণী বহন করে'। জীবনানন্দের কবিতা মানেই এক অমৃত শব্দপাঠ; এক আত্মতৃপ্তির স্রোত বয়ে চলে পাঠকের চৈতন্যে। তখন বিংশশতাব্দীর শুরু আর রবির আলোয় আলোকিত কবিতা অঙ্গন; জীবনানন্দ দাশ পা দিয়েছেন কবিতার উঠোনে। প্রকাশিত হল প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ ১৯২৭ সালে কিন্তু কবি বা পাঠক মহলে তেমন হৈচৈ ফেলতে পারেনি তবে বাঙলা সাহিত্যের সর্বোপরি প্রামাণিক - ইতিহাসের রচয়িতা সুকুমার সেন ‘ঝরা পালক’ এ অন্তর্ভুক্ত ‘পলাতক’ কবিতার সমালোচনা করে বলেছিলেন ‘ঝরা পালক এর একটি কবিতায় দ্বিতীয় -তৃতীয় দশাব্দসুলভ পল্লী রোমান্সের - অর্থাৎ করুণানিধান -যতীন্দ্রমোহন - কুমুদরঞ্জন - কালিদাস - শরৎচন্দ্র প্রভৃতি কবি ও গল্প লেখকদের অনুশীলিত ছবি পাই’। তিনি জীবনানন্দ সম্পর্কে আরও বলেছিলেন যেঃ ‘নূতন ইংরেজি

কবিতার অনুসরণে যাহারা বাঙলায় কবিতা কম অবলম্বন করিলেন তাদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ প্রধান’। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় আধুনিক কবিতার কারিগর যে পাঁচজন কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯ - ১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১ - ১৯৬০), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮ - ১৯৭৮), বিষ্ণু দে (১৯০৯ - ১৯৮২) ও অমিয় চক্রবর্তী তাঁরা সবাই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। সেই সাথে বলা যায় বাঙলা কবিতায় আধুনিকতার যে বাঁক সৃষ্টি হয়েছিল তা মূলত ইংরেজি আর ইউরোপিয়ান সাহিত্যের উৎস ধারা থেকে। সাথে সাথে স্মরণ করতে হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পাশ্চাত্যে কবিতায় আধুনিকতার নবযাত্রা ঘটিয়েছিলেন যে মহানায়কগণ তাঁদের মধ্যে এটারা পাউন্ড, টি এস এলিয়ট ও অমি লাওয়েল অন্যতম এছাড়া জন কিটস, ইয়েটস ও বায়রনের নামও উঠে আসে সমস্বরে। জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি' প্রকাশের পড় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে একটি পত্র লিখেছিলেন - ‘তোমার কবিতাগুলি পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।’ আবার এমনও বলেছিলেন কিছুটা তাচ্ছিল্য করে - ‘তোমার কবিত্বশক্তি আছে তাতে সন্দেহমাত্র নেই। – কিন্তু ভাষা প্রকৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারিনে। কাব্যের মুদ্রাদোষটা ওস্তাদিকে পরিহাসিত করে। বড় জাতের রচনার মধ্যে একটা শান্তি আছে যেখানে তার ব্যাঘাত দেখি সেখানে স্থায়িত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জন্মে। জোর দেখানো যে জোরের প্রমাণ তা নয় বরঞ্চ উল্টো’।      

   ঘরমুখো নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশকে বঙ্গীয় সাহিত্য সমাজে দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বুদ্ধদেব বসু এবং অজিত দত্তের অবদান বহুগুণে বেশি। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’, সঞ্জয় ভট্টাচার্য ও প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পাদিত ‘নিরুক্ত’, সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘পূর্বাশা’ প্রভৃতি পত্রিকাগুলো জীবনানন্দ নির্ভর হয়ে ওঠে। দীনেশরঞ্জন দাশ সম্পাদিত ‘কল্লোল’ এবং প্রেমেন্দ্র মিত্র, মুরলীধর বসু ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কালি-কলম’ যা জীবনানন্দকে অনেক বেশি মূল্যায়ন করেছিল; উল্লেখ করতে হয় তখনকার সময় এই দুটি সাহিত্য পত্রিকা ছিল আধুনিক সাহিত্যের অগ্রদূত। সাহিত্যিক নীহাররঞ্জন রায় জীবনানন্দ দাশের কবিতা সম্পর্কে বলেন - ‘যে অল্প সংখ্যক কবির কবিকর্ম নিয়ে আমার এই গর্ব, সাম্প্রতিক বাঙলা কাব্যের গর্ব, জীবনানন্দ তার অন্যতম এবং সম্ভবত মহত্তম’।

   কবি জীবিত থাকা কালীন মাত্র সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল আর ঐসব কাব্যগ্রন্থে সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৬২টি কবিতা স্থান পেয়েছিল। কবির অপ্রকাশিত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধের কথা না হয় নাই লেখা হল কিন্তু শত শত কবিতা বহুকাল পর্যন্ত প্রকাশের অন্তরালে পড়েছিল। কবি জানলেন না প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের গহন পথে আজ

অবধি হেঁটে চলেছেন। অগ্রন্থিত নির্জনতার কবি লিখেছেন - ‘মিনারে মেঘ সোনালি চিলেরে তার জানালয় ডাকে’। কবি তাঁর তীক্ষ্ণ কল্পনা শক্তি দিয়ে হরণ করে এনেছেন সুদূর মিনারের মেঘ। এক বিকেলের আড্ডা ফেলে জানালয় দাঁড়িয়ে ডাকবেন কোনও সোনালি ডানার চিলকে, যে রোদ্দুর সব আলো ডানায় মেখে, মেঘকে নামিয়েছে মিনারের চূড়ায়।    

      'আমার জীবনে কোনও ঘুম নাই

      মৎসনারীদের মাঝে সবচেয়ে রূপসী সে নাকি

      এই নিদ্রা?

      গায় তাঁর ক্ষান্ত সমুদ্রের ঘ্রাণ - আবাদ সুখ

      চিন্তার পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন - বিমুখ

      প্রাণ তার ……'

                    এই নিদ্রা/ অগ্রন্থিত কবিতা

মৎসকন্যাদের মাঝে সবচেয়ে রূপবতী হোল নিদ্রা। সে নিদ্রার কথা ভেবেই কবি নির্ঘুম সমুদ্র-ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছেন। গোলাপি আভায় ঢাকা ধূসর মেঘ যেমন বোঝে না বিয়োগ-ব্যথা ঠিক তেমনি পাখি-মন, প্রজাপতি-শতদল কখনও ছুঁয়ে দেখে না বিষণ্ণ নিঃশ্বাস। কবি ‘পাখি’ কবিতায় জ্যোৎস্না ও শীতের মাঝে আনন্দ এবং হাহাকার অনুভব করেছেন। তবু তাকে চেয়েছেন এই শীতে, শোক বিহ্বল চোখে সে আসুক, শিহরণ জাগাক নিস্তব্ধ ঘাসের শরীরে, যেখানে জ্যোৎস্নারা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকে, অঘ্রানের বিকেলের রঙে আরও শূন্যতায় ভ’রে উঠলে রংচটা বাদামী পাখি অপেক্ষায় থাকে এক ঝাঁক উজ্জ্বল রোদের জন্য।

    পাতা কুড়াবার দিন এসে অপেক্ষা করে ঘাসের উঠোনে। সোনামাখা ধান রুপোলি কারুকাজ ভুলে গিয়ে শুয়ে থাকে মাঠের উল্টো পিঠে। তবু কবি আহ্বান করেন, কেউ যেন এঁকে যায় অঘ্রানের বিকেলের ছবি। শিশির এসে মুছে দিয়ে যাক ভুল রঙের অনুজ্জ্বল কথামালা। “আমি এই অঘ্রানেরে ভালোবাসি - বিকেলের এই রং - রঙের শূন্যতা/রোদের নরম রোম - ঢালু মাঠ - বিবর্ণ বাদামি পাখি - হলুদ বিচালি। পাতা কুড়াবার দিন ঘাসে ঘাসে - কুড়ুনির মুখে নেই কোনও কথা’’। এই সব কোলাহল রেখে কবি পেরিয়ে যেতে চান সব জীবনের মানে পিছনে ফেলে। কিন্তু কবিতো নির্জনতার! কোথায় হারাবেন তিনি! নাকি কল্পনার মেঘে চড়ে সব অগোচরে দেখে যাবেন অঘ্রানের মাঠ, কার্ত্তিকের কুয়াশা, মাছরাঙার ঠোঁট, জ্যোৎস্নার অসীম বিল। কবি চলে গেছেন অরণ্যের পাতার ফাঁকের এক লোভী টুকরো আলোর পেছন পেছন।

    'চলে গেছি;

এ জীবন কবে যেন মাঠে মাঠে ঘাস হয়ে রবে

নীল আকাশের নিচে অঘ্রানের ভোরে এক

- এই শান্তি পেয়েছি জীবনে

শীতের ঝাপসা ভোরে এ জীবন

ভেলভেট জ্যাকেটের মাছরাঙা হবে

একদিন - হেমন্তের সারাদিন

তবুও বেদনা এল - তুমি এলে মনে

হেমন্তের সারাদিন - অনেক গভীর রাত -

অনেক অনেক দিন আরও

তোমার মুখের কথা - ঠোঁটে রং চোখে চুল -

এই সব ব্যথা আহরণে” 

                                     এই শান্তি/ অগ্রন্থিত কবিতা

    

    কবি ঝাপসা ভোর আর ভেলভেটের জ্যাকেট যেন মুড়ে দিলেন একে অপরকে। এমন করে গেঁথে দিয়েছেন জীবনের মানে। কবিতার সাথে প্রকৃতি, প্রকৃতির সাথে দেহ - মন, শীতের সাথে কুয়াশা-জ্যাকেট যেন মিলিয়ে দিলেন লাইনের পর লাইন। কবি কখনো বুনোহাঁসের পালকে পালকে উড়ে যেতে দেখেছেন জ্যোৎস্নার আলো, শবের জঙ্গল ছেড়ে নদী মাঠ খেয়া ঘাট ফেলে উড়ে চলেছে পাখি সব। কবে কোন কোমল স্থির নিরিবিলি পালকের রুপো দিয়ে বনের আঁধার বুনেছিল, কবি আজ এপারে বসে শুনতে পান বুনো মোরগের বুকে জেগে থাকা রাতের বিস্ময়। সব বিস্ময় কেটে গিয়ে জীবনানন্দের আলোয় আলোকিত হতে থাকবে আগামীর কবিতার শব্দ সম্ভার, রূপসী বাঙলায় কবি বার বার ফিরে আসবেন শিশিরের শব্দের মতন।

 

আমার ছেলেবেলার 

পুজো

সনোজ চক্রবর্তী

সনোজ চক্রবর্ত্তী পেশায় স্কুল শিক্ষকতা। বানিজ্য বিভাগে স্নাতকোত্তর। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি। মুলত গল্পকার হলেও কবিতাও লিখেছেন বেশ কিছু। প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে। লেখালেখি ছাড়া অন্যতম নেশা অভিনয় ও নাটক পরিচালনা।

শুধু সঙ্গত আবদার নয়, অসঙ্গত আবদারের প্রকাশে "মামাবাড়ির আবদার" এই শব্দবন্ধটি মেজাজের সঙ্গে ব্যবহার হয়েছে আবহমানকাল। মামাবাড়ির প্রতি চুম্বকটানের আরো বড় একটি কারণ ছিল আমি আর আমার ছোটমামা সমবয়সী ছিলাম। মামাবাড়ি থেকে ফিরে কুকড়াহাটীর পুজোর গপ্প শুনতাম আর মন খারাপ হয়ে যেত। 

  মার ছেলেবেলার পুজোপ্রায় ফি-বছর শারদোৎসবের সময় মা আমাদের ভাই বোনদের নিয়ে হাজির হতেন তাঁর বাবার বাড়ী অথাৎ আমাদের মামা বাড়ীতে। ফলত পুজো আসার আগে আগেই এক অপার আনন্দ পেয়ে বসত আমাদের। পুজোর মাস খানেক আগে, আমাদের এখানে বাজারে ঠাকুরদালানে নেপাল পোটিদার খড় দিয়ে ঠাকুরের কাঠামো বাঁধত। বাজার গেলেই একবারটি ঢুঁ মেরে আসতাম মন্ডপ থেকে। দাঁড়িয়ে থেকে দেখতাম কিভাবে খড়ের কাঠামো পাল্টে যেত মা-দূগ্গায়। বাড়ি ফিরে নেপাল পোটিদারকে নকল করতাম। পুকুরের পাড় থেকে মাটি নিয়ে দূগ্গা বানাতাম মেজদি আর আমি। মামাবাড়ি যাওয়ার আগে সে দূগ্গাকে সিঁড়ির তলায় লুকিয়ে রাখতাম যত্ন করে। পুজোর ছুটি শুরুর সপ্তা খানেক আগে আমাদের পুজোবকাশ শুরু হয়ে যেত। মা-দূগ্গা তাঁর ছেলেপুলে নিয়ে

বাপের বাড়ি আসার জন্য হয়তো তখনও লটবহর বাঁধাছাঁদা আরম্ভ করেন নি কিন্তু আমার মা আমাদের নিয়ে হাজির হয়ে যেতেন তাঁর বাপেরবাড়িতে অর্থাৎ আমাদের মাতুলালয়ে। মামাবাড়ি বড় আমোদের,বড় প্রশ্রয়ের আশ্রয়। কেবল কেষ্ট ছাড়া মাতুলালয় কারো কাছেই কষ্টকর হয়নি কখনও। শুধু সঙ্গত আবদার নয়, অসঙ্গত আবদারের প্রকাশে "মামাবাড়ির আবদার" এই শব্দবন্ধটি মেজাজের সঙ্গে ব্যবহার হয়েছে আবহমানকাল। মামাবাড়ির প্রতি চুম্বকটানের আরো বড় একটি কারণ ছিল আমি আর আমার ছোটমামা সমবয়সী ছিলাম। মামাবাড়ি থেকে ফিরে কুকড়াহাটীর পুজোর গপ্প শুনতাম আর মন খারাপ হয়ে যেত। তখন আমাদের এলাকার পূজো বলতে কেবল বাজার কমিটির পুজো। আমার ঠাকুরদাদা শিক্ষক ছিলেন, বেশ নাম-যশ ছিল। শোনা কথা রাষ্ট্রপতি পুরস্কার হাতছাড়া হয়েছিল কোন এক নিন্দুকের তৎপরতায়। বাজারে ঠাকুরদাদার একটা বই ও কাপড়ের দোকানও ছিল। বাজারের পুজোর প্রধান পুরোহিত ছিলেন আমার ঠাকুরদাদা। আমার এক পিশেমশাই ঐ পুজোয় চন্ডী পাঠ করতেন, প্রায় বীরেন্দ্র কৃষ্ণের আদলে। আমরা রেডিও শোনার মতো করে শুনতাম। ঐ পুজোর মন্ডপে আমাদের মতো দু-একটি পরিবার জায়গা পেত। বাকিরা মন্ডপের বাইরে। দু-এক বার আমরা ভাই বোনেরা ঐ পুজোয় থেকেছি। ঠাকুরের এতো কাছাকাছি হওয়ার চেয়েও আমাদের কাছে পুজোর সময় মামা বাড়ী যাওয়ার আনন্দই ছিল অন্য রকম।

মামাবাড়ির দাদু কলকাতায় একটা বনেদী বাড়িতে পুজো করতে যেতেন। দশমীর পরের দিন আমি আর ছোটো মামা সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থাকতাম বাসস্ট্যান্ডে। পুজো ফেরত দাদুর বোচকা বয়ে আনতাম ঘাম ঝরিয়ে।বোচকা থেকে বেরাত নারকেল নাড়ু, হাল্কা টোকচে যাওয়া সন্দেশ, ফল, আলতা, সিঁদুর, গামছা, কাপড় আরো কত কি। মায়ের জন্য বরাদ্দ হত শাড়ি আর আমাদের হাতে দেওয়া হত নারকেল নাড়ু, সন্দেশ আর ফল। তখন রাগ হত, কেন কার্তিক গনেশকে প্যান্ট-শার্ট দেওয়া হয় না! মামা বাড়ীর ওখানে পুজো নিয়ে উন্মাদনা কোন দিনই ছিল না। যদিও মামা বাড়ী থেকে দু-কিমি পায়ে হেঁটে এক বনেদি বাড়ীর পুজো দেখতে যেতাম ভাই-বোন মিলে। বাবা কিন্তু কোন দিন আমাদের ঐ মামা বাড়ী যাওয়ার আনন্দে বাদ সাধেন নি। দু-এক বছর ছাড়া মা কেও মামা বাড়ী যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে হয় নি। পরে বড় হয়ে বুঝেছি অধীকাংশ বছর পুজোয় আমাদের ভাই-বোনেদের নতুন জামা-কাপড় হত না। বাবা তাঁর সাধ্যের বাইরে বেরিয়েও পুরো পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদন ও আমাদের লেখাপড়ার আয়োজন সম্পূর্ন করে উঠতে পারতেন না। তাছাড়া বর্ষার পর পর খোরাকির একটা অনটন দেখা দিত সংসারে। তাই মা প্রায় ফি-বছর আমাদের সরিয়ে নিতেন মামা বাড়ীর আনন্দ ঘন আশ্রয়ে, যেখান থেকে দু-কিমি দূরে মা দুগ্গা আসতেন সপরিবারে।

 

গ্রাম্য কুসংস্কার

একটি ব্যাধি

মিজানুর রহমান মিজান

বিশ্বনাথ, সিলেট, বাংলাদেশ

.....গ্রামের অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মানুষের অনেকের মধ্যে এ ধরণের শত শত কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস বিরাজমান। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ সমস্ত কুসংস্কার বিশ্বাস করে মিথ্যা ও ক্ষতিকর অনেক রুসুম বা রেওয়াজকে বাধ্যতামূলক পালন করার ফলে অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করে প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে সমাজকে প্রগতির পথকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে মারাত্মক বিঘ্নের সহায়ক।

   গ্রাম প্রধান বাংলাদেশ। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ আজ ও অনেক ক্ষেত্রে অসচেতন। তাছাড়া শিক্ষিতের হার কোন কোন ক্ষেত্রে যদি ও বলা হয়ে থাকে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথাপি প্রকৃত শিক্ষার হার আনুপাতিক হারে কম বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিত মাত্রই সুশিক্ষিত ও স্বশিক্ষিত। এ শ্রেণীর আনুপাতিক হার এর কথা বলছি। সরকার ছাত্রীদের বেতন মওকুফসহ উপবৃত্তি চালু করে সত্যিই একটি প্রশংসনীয় ও গর্বিত উদ্যোগ নিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে পূর্বের তুলনায় বর্তমানে গ্রামের স্কুলগুলিতে ছাত্রী সংখ্যা উল্লেখজনক বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ অনেক অভিভাবক কিছু দিন পূর্বে ও মেয়েকে স্কুলে পাঠানো বিভিন্ন কারণে অভিশাপ মনে করতেন। কিন্তু' এখন উপবৃত্তিসহ বেতন মওকুফের ফলে স্কুলে পাঠাতে বা শিক্ষা লাভে আগ্রহী। শিক্ষাক্ষেত্রে এটা উল্লেখযোগ্য বা আশানুরূপ ফল প্রাপ্তির একটা অংশ। তথাপি দেশের শিক্ষার্থীর একটা বিরাট অংশ প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিপর্যয়ে ঝরে পড়ে। ঝরে পড়া অংশ বা অল্প শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের মধ্যে কুসংস্কার বাসা বেঁধে আছে গ্রামাঞ্চলে। গ্রামের মানুষের মধ্যে অসংখ্য সমস্যা বিদ্যমান। তার অন্যতম একটি সমস্যা হচ্ছে কুসংস্কার। গ্রামের কুসংস্কারগুলো মেয়েদের মধ্যে বহুল পরিমাণে বিরাজমান। কুসংস্কারকে ওরা ধর্মীয় ফরজ কাজের মত আঁকড়ে ধরে। ফলে ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিরাট অন্তরায়। 
    গ্রামে এক সময় কঠোর নিয়ম চালু ছিল সোমবারে মেয়েরা বাপের বাড়ি হতে স্বামীর বাড়ি আসবে না। মেয়ের মা এক্ষেত্রে সাধারণত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেই। এ যে কুসংস্কার তা বুঝানো যাবে না। অনেক ক্ষেত্রে আমি দেখেছি মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করবে। এমন ও রূপ ধারণ করে যা বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াবে। কিন্তু পরিশেষে এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হবে। পূর্ব পুরুষরা এ কাজে উৎসাহিত করেছেন। তা পালনে অদ্যাবধি অভ্যাস' অনেক পরিবার। এক্ষেত্রে একজন শিক্ষিত ব্যক্তি যতই বুঝাবার চেষ্টা করবে, ততই বিপদ ও ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হবে। তবে আশার কথা বর্তমানে অনেকটা দূরীভূত হয়েছে।
      কয়েক বৎসর পূর্বে ও গ্রামাঞ্চলে চৈত্রের শেষে গুরুতর রোগ মুক্তি উপলক্ষ্যে এক প্রকার “রুট” নামক রুটি তৈরী করে বণ্টন করা হত। রুটিটি ছিল অত্যন্ত মজাদার ও ব্যয়বহুল। এটা ছিল গৃহস্থের'র গরুর পরিমাণের উপর নির্ভরশীল। গৃহস্থের যে কয়টা গরু ছিল ছোট বড় ততটা রুটি তৈরী হত। এ রুটি তৈরী করতে উক্ত সময় গ্রামময় হিড়িক পড়ে যেত। প্রতিদিন একাধিক পরিবারে রুটি তৈরী হত। গ্রামের যুব সম্প্রদায় এ কাজে ব্যস্ত থাকতেন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। মুরবিবয়ানরা দিক নির্দেশনা প্রদান করতেন। খেতে ও অনেক সুস্বাদু ছিল। কিন্তু' বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে গরুর সংখ্যা পূর্ব থেকে অনেক কমে গিয়াছে এবং অনেক পরিবারে গরু থাকলে ও আজ আর রুট নামক রুটি তৈরী মোটেই হয় না। রুটের কথা মানুষ ভুলেই গেছে। বয়স্কদের মুখ থেকে অনেক সময় শুনা আক্ষেপের সুরে, ‘বহুদিন হয় উহার স্বাদ থেকে বঞ্চিতের কথা’।
     ছোট শিশুর দাঁত পর্যায় ক্রমে পতিত হয়ে আবার নূতন দাঁত গজায়। পড়ন্ত দাঁত কাক দেখলে নূতন দাঁত উঠবে না এ বিশ্বাস অনেকের মধ্যে বিদ্যমান। পোকায় খাওয়া আম খেলে শিশুরা সহজে সাঁতার শিখতে পারবে, পারা যায়। সুতরাং শিশুকে পোকায় খাওয়া আম খেতে প্রতিযোগিতায় নামানো হয়। 
    কোথাও যাত্রা কালে পিছন থেকে ডাকা অমঙ্গল। জরুরী কিছু ফেলে গেলে ও অমঙ্গলের লক্ষণ। কথা হল জরুরী, এমন কি যে কার্যোপলক্ষ্যে যাত্রা শুরু সে জিনিষ ফেলে গেলে ভুল বশত: ফিরে এসে নেয়াটা অমঙ্গলের লক্ষণ বিদ্যমান। এক্ষেত্রে যুক্তি কতটুকু তা ভেবে কুল কিনারা পাই না। 

    আমি এক দিন ভীষণ বিপদে পড়ে যাই পথিমধ্যে এক লোকের অদ্ভুত আচরণে। তার কথা হল ওর ডান পাশ দিয়ে কেহ যেতে পারবে না। জানিনা তিনি কতটুকু জীবন চলার পথে এ নিয়ম মেনে চলতে পারেন।    অনেক আছেন কোথাও যাত্রাকালে গৃহের দরজাকে সালাম দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। ফলশ্রুতিতে নাকি গৃহে নিরাপদে ফিরে আসার অভয় বার্তার একটি সুলক্ষণ বা নিশ্চয়তার অনেক গ্যারান্টি। চলার পথে সকল বিপদ আপদ থেকে মুক্তির পূর্ণ অবলম্বন।    যাত্রাকালে শূন্য কলসী দর্শন অমঙ্গল আশঙ্কা। এক্ষেত্রে অনেকে অনেক প্রকার অশালীন উক্তি বা আচরণ করে থাকেন। রাত্রিকালে ঘর থেকে অনেকে টাকাপয়সা লেনদেন করেন না, লক্ষই চলে যাবার ভয়ে বা অজুহাতে। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে জীবনের কি এ নিয়ম যথাযথ পালনের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারেন এটাই আমার জিজ্ঞাস্য?     রবি ও বৃহস্পতিবার বাঁশ কাটতে মানা। সন্ধ্যার পর ঝাডু দিয়ে আবর্জনা বাহিরে ফেলতে নেই। রাত্রি বেলা আয়নায় মুখ দর্শন নিষিদ্ধ। গৃহস্থ' খাবার গ্রহণ কালে ভিক্ষুক দরজায় দাড়িয়ে ভিক্ষা চাইলে দিতে মানা।     ছোট বড় কেহ যদি কঠিন অসুখে ভোগে দীর্ঘদিন তবে রোগীর রোগমুক্তি হবে কি না, তা জানার উদগ্র আগ্রহ নিয়ে সন্ধ্যার পর তিনজন মহিলা (একজন বিধবা, একজন বিবাহিত, একজন অবিবাহিত মহিলা) তিন রাস্তার সংযোগ স্থলে আড়ালে দাড়িয়ে ঠিকবাজি বা আলামত প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে নীরবে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। ঐ সময় ঐ রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারী লোকদের কথাবার্তা থেকে ঠিকবাজরা ধারণা পেয়ে থাকেন রোগীর রোগ সম্পর্কে। 

     আমি ১৯৯৭ সাল থেকে উভয় পায়ের হাটুঁর জয়েন্টে মারাত্মক ও ভীষণ যন্ত্রণায় কাতর। এ রোগ আমাকে যে কষ্ট ও জ্বালা দিচ্ছে তা একমাত্র আল্লাহ ও আমি ছাড়া কেহ অনুধাবন করতে পারবে না। বুঝতে পারবে যদি আমার মত এ জাতীয় রোগে কেহ আক্রান্ত হয়ে থাকেন। অনেক ডাক্তার, ঔষধ পত্র ব্যবহার করে কোনো ফলাফল প্রাপ্তি হচ্ছে না বিধায় আমার মা, স্ত্রী অসির একটিবার পীর ফকিরের নিকট যেতে। কিন্তু আমার কোন সময়ই পীর ফকিরের (প্রকৃত আলীম ব্যতীত) নিকট যেতে বা ওরা কিছু করতে পারবে বলে বিশ্বাস নেই। তবু ও শেষ পর্যন্ত মায়ের পীড়াপীড়িতে এক দিন রওয়ানা হলাম এক মহিলা পীরানীর নিকট। তিনি নাকি রোগীর সব কিছু বলে দিতে পারেন। এমন কি বলে দেন হিসেবে অনেক লোকের যাতায়াত তথায় হয়। মহিলার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলাম সকাল দশটায়। পেয়ে গেলাম সেখানে আমার মত দু’জন পুরুষ রোগী। আর বাকি সাতজন রোগী সবাই মহিলা। রোগীর পরিমাণ কমপক্ষে ধীরে ধীরে বর্ধিত হয়ে ২৫/৩০ জনে উন্নীত হল। ধারাবাহিকতায় পীরানী প্রথম কিস্তি দশজন রোগীর আর্জি নিয়ে (তাদের ভাষায়) মোরাকাবায় বসলেন। একেক করে বলতে লাগলেন প্রত্যেকের মনের অভিলাষ। আর রোগীরা বলতে লাগলেন ঠিক ঠিকই পীরানী বলে যাচ্ছেন তাদের হৃদয়ের কথা, মনের অভিব্যক্তি। সবাইকে তাবিজ কবজ দিলেন নিলেন তার বিনিময়ে টাকা পয়সা যার যার রোগ বুঝে পথ্যের মত। দ্বিতীয় দফায় প্রথম ক্রমিকে আমি তারপর অপর দু’পুরুষ এর সর্বশেষে নিলেন আর সাতজন মহিলা রোগীর আর্জি। বসলেন মোরাকাবায়। ডাক পড়ল আমার। তিনি বলে যাচ্ছেন আমার মাথা ঘুরে, বুকে পিঠে বেদনা, কোমর বেদনা ইত্যাদি। কিন্তু একটিবার ও বললেন না আমার হাঁটুর অসুবিধা বা রোগের কথা। কারণ হল আমাকে দেখতে সুস্থ অনুভূত হয়। কিন্তু আমি হাঁটু মোটেই ভাঁজ করতে পারি না। চেয়ার ব্যতীত বসতে পারি না। দেখতে পারছেন না বা আমি পূর্বে কিছুই বলিনি বিধায় বলা সম্ভব হচ্ছে না। আমি জবাব দিলাম আমার রোগের বা উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য হচ্ছে না। তিনি জবাব দিলেন বুঝতে পারছি না আপনার সব কিছু আমি ঝাপসা দেখছি। যাহোক আমাকে বাদ দিয়ে ক্রমান্বয়ে পরবর্তী পুরুষদের বেলা ও একই রূপ। অর্থাৎ ওরা জবাব দিলেন তাদের রোগের বা উদ্দেশ্যের সাথে মিল হচ্ছে না। অত:পর ঐ দু’ব্যক্তির বেলা ও বলা হল আপনাদের সব কিছু অন্ধকার দেখছি। তবে পরবর্তী রোগীদের সব কিছু তিনি বলে দিলেন এবং রোগীরা ঠিক ঠিক বলে চলেছেন। শেষ মুহূর্তে আমরা পুরুষদের বলা জবাব হল জানি না আপনাদের ভাগ্য মন্দ না তিনির ( পীরানীর) ভাগ্য মন্দ। যাহোক অন্য একদিন আপনারা আসুন দেখা যাবে। কি আর করা বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসলাম। তবে এখানে যা লক্ষণীয় তাহলো মহিলাদের বেলা কিছু কমন কথা বললেই তাদের মনের কথার সাথে মিলে যায়। যেমন ‘আপনার খন্নির দোষ, চালানের মুখে পড়েছেন, মাথা ঘুরায়, তলপেটে বেদনা, একটি মহিলা আপনার স্বামীর প্রতি আগ্রহী, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে করার বাসনা ইত্যাদি। অপর দিকে মহিলারা পীরানীর নিকটে গিয়েই শুরু করেন বলাবলি কি উপলক্ষ্যে গমণ অথবা অপর মহিলার সাথে আলাপ জুড়ে দেন, আমি এসেছি বোন আমার মেয়ের বিবাহের অনেক আলাপ আসে কিন্তু ফিরে যায়, আমার স্বামী সর্বদা অন্যমনস্ক থাকেন, স্বামী সংসারের প্রতি উদাসীন ইত্যাদি। রোগী মেয়েদের মুখ থেকেই পীরানী পেয়ে যান আগমণের হেতু বা কার্যকারণ। সুতরাং রোগ সম্পর্কে বলতে পীরের কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা থাকে না। 

      মহিলার বাড়ি থেকে বের হয়ে খবর পেলাম উক্ত গ্রামে আরেকজন নব্য ছেলে পীর হয়েছে মাস খানেক হবে। আমরা তিনজন পুরুষ পরামর্শ করে ঐ সময়ই রওয়ানা হলাম পীরের বাড়ি অভিমুখে। সেখানে ও লক্ষ্য করলাম মহিলাদের সংখ্যাধিক্যতার। অর্থাৎ পুরুষ রোগী নেই বললেই চলে। বেশ কিছু সময় বসতে হল সারির মাধ্যমে পীরের সাক্ষাৎ পেতে। তাই করলাম। ইত্যবসরে পীর সাহেবের পিতা আমাদেরকে আপ্যায়ন করলেন পান, সুপারী ও সিগারেট পরিবেশনের মাধ্যমে। আমরা তা সানন্দে গ্রহণ করলাম। যেহেতু আশেপাশে কোন দোকান ছিল না বলে পান সুপারী থেকে বঞ্চিত ছিলাম অনেকক্ষণ যাবত। এক সময় পীরের সাহচর্য পেতে সক্ষম হলাম। পীর সাহেব আমাকে বললেন, আমার মাথা ঘুরায়, শারীরিক দূর্বলতা ইত্যাদি। কিন্তু আমি যে উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম তার ধারে কাছে ও যেতে সক্ষম হন নাই। তথাপি পীর সাহেব আমার হাতে একটি তাবিজ ধরে দিলেন যা পূর্ব থেকে লিখিত অনেকগুলির মধ্যে একটি। অপর সঙ্গিদ্বয় এমতাবস্থায় বিফল হয়ে ফিরে আসলেন। বাহিরে এসে পথ চলতে চলতে তাবিজ খুলে দেখলাম হ-য-ব-র-ল কিছু আরবী লিখা। দিনটা খসে পড়ল জীবন চলার পথ থেকে বিস্মৃতির পথে। সাথে অর্থনৈতিক ও শারীরিক পরিশ্রম। রাতে পায়ের ব্যথায় ঘুম হল হারাম। পীর সাহেবদের এ হল কেরামতি। কিন্তু আমি অর্জন করলাম এ বিরাট তথ্য ও তত্ত্ব। 

     মেয়েরা মায়ের জাত। আবার একটা প্রবাদসম ‘তাদের অন্তর অত্যন্ত কোমল’। তথাপি মানুষের মন বড়ই সন্দেহ প্রবণ। কথায় আছে ‘সন্দেহ প্রবণ মন, আঁধার ঘুচে না কখন’। সন্দেহ নামক বস'টি যার অন্তরে একবার স্থান লাভ করেছে তা থেকে পরিত্রাণ প্রাপ্তি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার। পীর সাহেবরা (প্রকৃত আলীম ব্যতীত) সহজ সরল মেয়েদের মধ্যে একটি সন্দেহের বীজ বপন বা রোপণ করে অনেক সংসারে আগুন জ্বালিয়ে দেন। যে আগুনে পুড়ে সোনার সংসার ধ্বংস হয় তার হিসেব আমরা রাখি না। অনেকটা থেকে যায় অজ্ঞাতে। যেমন স্ত্রী গেলেন রোগ সারাতে পীর সাহেব বলে দিলেন আপনার স্বামী একটি বাড়িতে যান ঘন ঘন। দ্বিতীয় বিয়ে করার সম্ভাবনা। অথবা একটি মেয়ে আপনার স্বামীর প্রতি আগ্রহী। কিন্তু এক্ষেত্রে হয়ত স্বামী প্রবল ঘুণাক্ষরে ও এ জাতীয় কাজের থেকে অনেক দুরের বাসিন্দা। কিন্তু স্ত্রী এ জাতীয় কথাকে সঠিক ও বিশ্বাস করে শুরু করলেন দৌড় বিভিন্ন রূপে। কারণ কোন স্ত্রীই চায় না

স্বামীর অংশে ভাগ দিতে বা বসাতে। সুতরাং স্ত্রী ঐ বাড়ির প্রতি, সংসারের প্রতি, লোকের প্রতি সর্বোপরি।

      স্বামীর প্রতি সন্দেহ প্রবণতার মাধ্যমে সাংসারিক সব কিছু তুচ্ছ করে গুরুত্ব দিলেন ধ্যান ধারণায়, চিন্তা চেতনায় উল্লেখিত ব্যাপারটিকে। কেমন করে স্বামীকে বশে আনা বা রাখা যায়। শুরু হল এখানে ওখানে যাতায়াত। অনেকটা জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে স্বামীর। এতে একদিকে অর্থ ব্যয়, অপর দিকে সংসারের প্রতি একটা উদাসীনতা। মনে সর্বক্ষণ স্বামীকে বশে আনা বা রাখা। আমি এসব ও প্রত্যক্ষ করেছি এ ধরণের অনেকক্ষেত্রে স্বামীর প্রতি সরাসরি বাক্য ছুড়ে দেয় স্ত্রী, আপনি এখানে ওখানে যান? এ থেকে শুরু হয় দ্বিধা, ধন্ধ। এমন কি বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। অপর দিকে পীর সাহেব পথ্য দানের মাধ্যমে তিনি হচ্ছেন চর্বিদার। বৃদ্ধি হচ্ছে মোটা, তাজা। খেলাটা শুরু না করলে তিনির কাছে লোক যাতায়াত হবে না, অর্জিত হয় না তিনির টাকা রোজগারের ব্যবস্থা। এ প্রকৃতির অনেক পীর সাহেবকে প্রত্যক্ষ করেছি দু’চার বৎসর পীর হয়ে পরবর্তীতে অন্য পেশার মাধ্যমে জীবিকার্জন করতে। পীর যদি সত্যিই পীর হয়ে থাকেন তবে কেন পেশার পরিবর্তন? দীর্ঘ দিন কেন থাকে না পীরের কেরামতি? অর্থাৎ যে ক’দিন মানুষকে প্রতারণা করা যায় ততদিন পীর এবং রোগীরা যখন প্রতারণা বুঝে ফেলে তখনই চলে যায় পীরালী। কিন্তু এ অল্প দিন পীর ব্যবসার মাধ্যমে অনেক অনেক সংসারে আগুন জ্বালিয়ে তিনি হন ক্ষান্ত। এ আগুন জ্বলে কিন্তু অনির্বাণ লোক চক্ষুর অন্তরালে, অলক্ষ্যে দিনের পর দিন, চিরদিন। অপর দিকে শুধু পীর সাহেবকে দোষ দিয়ে লাভ কি? আমি, আমরা না গেলে - বিশ্বাস না করলে, পীর কি করে আমাকে নিয়ে যাবে? সব নষ্টের মুল আমরাই। আমরা বিশ্বাস করি বলেই পীর সাহেব ধোঁকা দেবার প্রয়াস পান, ধোঁকায় তৃপ্ত হন, তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়। (সব নয়) মহিলা শ্রেণী এ পক্ষের বেশী অনুসারী। তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে বুঝাতে হবে। বুঝাতে সক্ষম হলে অবশ্যই একটি সুফল বয়ে আসবে, পাবো এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। 
       এক লোক সুদীর্ঘ ১৪ বৎসর প্রবাস জীবন কাটায় স্ত্রী সন্তান তথা পরিবারের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের নিমিত্তে। আমি লক্ষ্য করেছি ঐ লোকটি না খেয়ে না পরে টাকা পয়সা পাঠিয়ে দিত স্ত্রী সন্তানের জন্য। তার কথা ছিল যদি আমি না খেয়ে না পরে স্ত্রী সন্তানকে ভাল ও উন্নত বস্ত্র পরিহিত করাতে পারি এটাই সুন্দও ও সার্থক। কিন্তু জানি না কোন অপরাধে স্ত্রী স্বামীকে এ জাতীয় কার্যের মাধ্যমে প্রবাস ছাড়া, সংসার ছাড়া, সন্তান থাকাবস্তায় সন্তানবিহীন অবস্থায় দিনাতিবাহিত করছে। সোনার সংসারটা তছনছ করে লোকটি বিপর্যস্ত অবস্থায় বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়িয়েছে। তারপর ও স্বামী ছিল উদগ্রীব স্ত্রী যদি ভুল বুঝতে পারে বা আসার দৃঢ়তা প্রকাশ করে, তবে একটি পথের সন্ধান বা সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে স্বামী তার চাচাত ভাই, ভাতিজা সঙ্গে নিয়েছে যে কারো সঙ্গ ধরে আসার উপলক্ষ্য মনে করে যদি ইচ্ছুক হয়। এখানে স্ত্রী কোন সুযোগ নেয়নি। বরং তারই ( স্ত্রী) সম্মুখে তার পিতা, ভাই উদ্ধত আচরণ প্রদর্শন, এমন কি হুমকি প্রদান করে। তারপর ও স্বামী হাল ছাড়ে নাই। সে (স্বামী) ভেবেছে হয়ত অন্য কোন পন্থায়, সুযোগে স্বামীকে একা পেয়ে সুযোগ নিতে চায়। একা সম্মুখস্থ হয়েছে। চেয়েছে টাকা। যে আসবে না তাকে আনার কথা বলা বা প্রচেষ্টা হবে নির্যাতন তুল্য ভেবে তৎক্ষণাৎ টাকা প্রদানে সম্মতি এবং টাকা যথারীতি প্রদেয়। মোশাররফ হোসেন বিষাদ সিন্ধুতে সীমারের কার্যকলাপে যথার্থ বলছিলেন, ‘অর্থ! রে পার্থক্যই অর্থ! তুই সকল অনর্থের মুল’। এ জগতে যে যে বা যারা সীমারসম পাষন্ড হয়ে টাকাকে অধিক গুরুত্ব দেয়, ওরা কি চায়সহজেই বিজ্ঞজনের অনুধাবন যোগ্যতায় ধরা পড়ে ,পড়বে। তা পাঠকের উপর ন্যস্ত। এখানে ও কথা ছিল না যদি পরবর্তীতে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত না হত। ‘সময়ের এক....অসময়ের দশফোঁড়’ এরম ত স্বামী প্রবর ততদিনে বিয়ে করে সম্মুখ পানে এগিয়ে যাবার যাত্রায় সামিল। স্বগতোক্তি স্বরূপ উচ্চারিত হয়, ‘এখন কেন কান্দ গো রাই, আগে কি মনে ছিল না’।
     গ্রামে সন্তান জন্মের পর মায়েরা আজো জাল বা বিভিন্ন লতাপাতার অংশ বিশেষ ইত্যাদি আঁতুড় গৃহে বা রুমে লটকোয়ে রাখেন, রুমটি বন্ধ রাখার পক্ষপাতী। জালের টুকরো রাখেন লটকোয়ে জিন বা শয়তানের আছর থেকে পরিত্রাণের আশায়। আগুন জ্বালানো হয় প্রত্যেক দরজায় শয়তান নাকি আগুনকে ভয় পায়। বাচ্চাকে অনেক দিন বের করতেন না রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপলক্ষ্য মনে করে। অনেক  মাকে বুঝানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার শাল দুধ শিশুকে খাওয়াতে। তাদের অভিমত শাল দুধ শিশুর জন্য বিষসদৃশ। তবে আশার কথা হলো বর্তমানে অনেকটা দূরীভূত হয়েছে বিভিন্ন প্রকার প্রচারণার পরিপ্রেক্ষিতে।
     গ্রামের অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মানুষের অনেকের মধ্যে এ ধরণের শত শত কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস বিরাজমান। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ সমস্ত কুসংস্কার বিশ্বাস করে মিথ্যা ও ক্ষতিকর অনেক রুসুম বা রেওয়াজকে বাধ্যতামূলক পালন করার ফলে অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করে প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে সমাজকে প্রগতির পথকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে মারাত্মক বিঘ্নের সহায়ক। সঠিক ও পূর্ণ ইসলামী আকিদার অভাবে সমাজ সংসারকে সঠিক দিক নির্দেশনা থেকে বঞ্চনার ফলে একটি সুন্দর, সুস্থ জীবনকে ধ্বংসের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। সুতরাং এ ব্যাধি আক্রান্ত সমাজকে নিরক্ষরতার মতো অভিশাপ থেকে রক্ষা কল্পে রেড়িও, টিভি এমন কি পাঠ্য পুস্তকে প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করে অভিযান পরিচালনা অত্যন্ত জরুরী। ইসলামী আকিদার পূর্ণ প্রচার ও প্রসারতা কাম্য নিরন্তর।  

 

তোমার অসীমে

প্রাণমন লয়ে

অনিমা ভট্টাচার্য্য

ডালাস, টেক্সাস

...  ‘যুক্তি বিদ্যা’র সঙ্গে ‘উপলব্ধি’র একটি বিপরীত সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তিজ্ঞানকে ‘খন্ডিত’ করে আর ‘উপলব্ধি’ অখন্ড  সত্যকে জানার কথা বলে। ‘খন্ডিত সত্য’ ‘সোনার পাথরবাটির’ মতনই অসম্ভব ধারণা। তাই যা ‘সত্য’ তাই ‘পূর্ণ’, তাই ‘একক’ – ‘পূর্ণমিদং পূর্ণমদঃ পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে ......’।

    চারদিকের কোলাহলের মাঝে মনকে এক এক সময় বিশ্রাম দিতে ইচ্ছে করে। কোলাহল থেকে সরিয়ে এনে মন চিন্তার গভীর দেশে নিজেকে নিমজ্জিত করতে চায়। মন ভাবে নিশীথে, নিরজনে – এ জগতে কত কি চাইবার ছিল – তাও চাওয়া হ’ল না। “কত যে বলার ছিল, হল না কিছুই বলা; কত যে চাওয়ার ছিল হ’ল না কিছুই চাওয়া ...... “এই অতৃপ্তি, দুর্নিবার আকাঙ্খার মাঝেই কাটে জীবন – মন তার ভার বয়ে বেড়ায়।

যাদুকরের যাদুতে মন মেতেছিল, নৃত্য গীতের তালে তালে মন নেচেছিল এক সময় – এখন সেই যাদুকর ও নেই, নৃত্যগীতের তালের গতিও নিস্তেজ হয়ে আসে। কোথায় যেন সব কিছুর তাল কেটে যায়।

     অন্তরে দ্বন্দ্ব, বাইরেও দ্বন্দ্ব – কিন্তু কেনো এত দ্বন্দ্ব তার উত্তর কে দেবে। ‘তুমি’ ‘তুমি’ আর ‘আমি’ ‘আমি’ এই যে

বেড়া গড়ে তুলেছি ‘তোমার’ ‘আমার’ মাঝে, এই বেড়াইতো মনের সহজ গতিকে অসহজ করে তোলে। তার থেকেই সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্বের। সামাজিক জীবনের নিয়ম কানুন আপাতদৃষ্টিতে সেই দ্বন্দ্বের খানিকটা সমাধান করতে চেষ্টা করে, ক্ষণিকের জন্য সরে গেলেও আবার সুযোগ পেলেই যেন সে মাথাচাড়া দিয়ে বেরিয়ে আসে। তাই ধর্মপ্রাণ মহাঋষিরা বলেছেন, যতই আনন্দ করো, রূপরসের মাধুরী যতই পান করো না কেনো ‘দুঃখ তোমার ঘুচবে না যতক্ষণ না  ‘তোমার’ ‘আমার’ মধ্যে যে মিথ্যা প্রাচীর খাড়া করেছ তাকে ভেঙে ফেলতে পারছো। তোমার সুখ, তোমার দুঃখ যে  কেবল তোমারই তা নয় – তা আমারও। এ কেবল সহানুভূতির কথা নয়, compassion ও নয়, empathy ও নয়, এটি হ’চ্ছে ‘একাত্মবাদের’ মূল কথা। একাত্মবাদের মূল চেতনা হচ্ছে ‘তোমার’ ‘আমার’ ‘সত্তার’ একই রূপ – অনন্ত সচ্চিদানন্দের রূপ। এটি কেবল theoretical level এর জ্ঞান নয় – এটি অনুভূতির ব্যাপার। এই চেতনাকে উপলব্ধির স্তরে আনতে হবে। ‘যুক্তিটা’ এখানে বড় কথা নয় – এখানে উপলব্ধির গভীরতাটাই বড়ো –

where logic fails, awareness in the intuition succeeds.

     শুধুমাত্র উপলব্ধির পর্য্যায়ে রাখলেই হবে না। সেই উপলব্ধির সঙ্গে মিশ্রণ হবে “আনন্দের”। সেই ‘আনন্দ’ প্রকাশিত হবে সকল কর্মে, সকল ধর্মে। “সকল কর্মে সকল বাক্যে প্রকাশিবে তব আরাধনা...”।

এই হবে জীবনপথের সাধনা, এ যেমন সত্য, তেমনই আনন্দোজ্জ্বল।

     ‘যুক্তি বিদ্যা’র সঙ্গে ‘উপলব্ধি’র একটি বিপরীত সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তিজ্ঞানকে ‘খন্ডিত’ করে আর ‘উপলব্ধি’ অখন্ড  সত্যকে জানার কথা বলে। ‘খন্ডিত সত্য’ ‘সোনার পাথরবাটির’ মতনই অসম্ভব ধারণা। তাই যা ‘সত্য’ তাই ‘পূর্ণ’, তাই ‘একক’ – ‘পূর্ণমিদং পূর্ণমদঃ পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে ......’।

     এই পরিপূর্ণ ভাবটি উপলব্ধি করার মধ্যে ‘আনন্দ’ ‘আছে’, ‘বিমল প্রশান্তি’ও আছে। তাই কবিগুরু বললেন, ’তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে যতদূর আমি যাই, কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই ...’। আমাদের এই সসীমতাকে অসীমতার মাঝে ডুবিয়ে দিতে পারা আর কোলাহল দ্বন্দ্বময় জীবন থেকে নিজেকে মুক্ত করা – একই কথা, এজন্যে গীতায় শ্রীভগবান অর্জুনকে দ্বন্দ্বহীন চেতনার কথা বললেন,

           “নির্দ্বন্দ্বো, নিত্যসত্ত্বস্থো,

            নির্যোগক্ষেম আত্মবান্ ......”

এতেই মনের প্রশান্তি, মায়াময়লীলার সমাপ্তি, আর আনন্দলোকের প্রাপ্তি !!

 

“শরৎ, তোমার শিশির-ধোওয়া কুন্ডলে –

বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে

আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি”।।

                          -  রবীন্দ্রনাথ

 

রবি ঠাকুরের

  খাওয়াদাওয়া

ফারুক আব্দুল্লাহ

  কল্যাণী, পশ্চিমবাংলা

.....দেশীয় খাবারের মধ্যে কৈ মাছের তরকারী, চিতল মাছের পেটি ভাজা, এছাড়া ভাপা ইলিশ, ফুলকপি দিয়ে তৈরি  নানান পদ ছিল রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয়। এছাড়া মিষ্টি খাবারের মধ্যে পায়েস, চন্দ্রপুলি, ক্ষীর, নারকেল দিয়ে তৈরি মিষ্টি, দই এর মালপোয়া, চিঁড়ের পুলি, মানকচুর জিলিপি, আমসত্ত্ব এগুলি খেতে খুব ভালবাসতেন তিনি। তবে পায়েস ও পিঠে পুলির প্রতি কবির টান ছিল বেশি।

   রবীন্দ্রনাথ আমদের সবার প্রিয় কবি এবং  শ্রদ্ধার ব্যক্তি। প্রিয় মানুষদের জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে  জানার আগ্রহ বোধহয় কমবেশি সবারই থাকে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও আমাদের  কৌতূহলের অন্ত নেই। লেখক রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে সুপরিচিত হলেও তার ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন দিক আজও অনেকের কাছেই অজানা। রবীন্দ্রনাথের চরিত্রের এমনই এক ঊল্লেখযোগ্য দিক হল তার ‘ভোজনরসিকতা’

     রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলা থেকেই খেতে খুব  ভালবাসতেন এবং আমৃত্যু কাল পর্যন্ত খাবারের প্রতি তার ভালোবাসা থেকেই গেছিল। এ সম্পর্কে  কবির বাল্যকালে লেখা একটি কবিতার উল্লেখ করা যেতে পারে যেখানে তিনি প্রাতরাশের বিভিন্ন খাদ্য সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন।

  “আমসত্ব দুধে ফেলি. তাহাতে কদলি দলি'. সন্দেশ মাখিয়া তাতে... হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিঃশব্দ,. পিপীলিকা কাঁদিয়া যায় পাতে...”

    রবীন্দ্রনাথ সারাদিনে বেশ কয়েকবার খেতেন। তিনি ভোরবেলায় খুব তাড়াতাড়ি উঠে পরতেন,তার দিনের শুরু হত এক কাপ চা অথবা কফি খেয়ে। একটু বেলা হয়ে প্রাতঃরাশে  ভেজা বাদাম, মধু সহযোগে টোস্ট এবং এক কাপ দুধ। আবার মাঝে মাঝে তার ছোটবেলার প্রিয় খাবার সন্দেশ, কলা, দুধে ফেলে মেখে খেতেন। এর পর সকাল দশটা নাগাদ তিনি লেবুর রস খেতেন এবং মধ্যাহ্ন ভোজনে রবীন্দ্রনাথ ভাত খেতেন, তবে তিনি ভাত খুব অল্প পরিমাণে খেতেন। বিকেলে কবির জন্য বরাদ্দ ছিল মুড়ি ও চা। কবির রাতের খাবারে থাকত সব্জির স্যুপ কয়েকটি লুচি ও তরকারী। রবীন্দ্রনাথ দুপুরের খাবার পরিবারের সবাই মিলে ঘরের মেঝেতে বসে খেতেন কিন্তু রাতের বেলায় তিনি খেতেন ডাইনিং টেবিলে বসে।

     আমিষ ও নিরামিষ সব ধরনের খাবারই রবীন্দ্রনাথের পছন্দের তালিকায় ছিল। দেশী বিদেশী কোন খাবারেই তার অরুচি ছিল না। তার প্রিয় খাবারের তালিকায় ছিল ব্রিটিশ পদ, আপেল দিয়ে রান্না খাসীর মাংস, তুর্কী কাবাব, তিনি বিদেশে গিয়ে যে সব খাবার খেতেন  সেগুলির রান্না পদ্ধতি জেনে ঠাকুর বাড়ির রান্না ঘরে সেগুলি করার অনুরোধ করতেন। ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা রান্না নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা –নিরীক্ষা চালাতেন, নিত্য নতুন  খাবারের পদ তৈরিতে তারা সব সময় ব্যস্ত থাকতেন। তারা অতিসাধারণ  উপাদান যেমন পটল ও আলুর খোসা দিয়েও সুস্বাদু পদ তৈরি করতেন। রবীন্দ্রনাথের একটি স্বভাব ছিল তিনি দেশে বিদেশে যেখানেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতেন সেখানকার মেনুকার্ড তিনি  সংগ্রহ করতেন এবং  সেগুলি তিনি সংরক্ষণ করে রাখতেন এই ঘটনা থেকেই রবীন্দ্রনাথের ভোজন রসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।

     দেশীয় খাবারের মধ্যে কৈ মাছের তরকারী, চিতল মাছের পেটি ভাজা, এছাড়া ভাপা ইলিশ, ফুলকপি দিয়ে তৈরি  নানান পদ ছিল রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয়। এছাড়া মিষ্টি খাবারের মধ্যে পায়েস, চন্দ্রপুলি, ক্ষীর, নারকেল দিয়ে তৈরি মিষ্টি, দই এর মালপোয়া, চিঁড়ের পুলি,মানকচুর জিলিপি, আমসত্ত্ব এগুলি খেতে খুব ভালবাসতেন তিনি। তবে পায়েস ও পিঠে পুলির প্রতি কবির টান ছিল বেশি।

       রবীন্দ্রনাথের ফলের প্রতিও একটা আকর্ষণ ছিল। তিনি দুপুরের খাওয়ার আগে ফল খেতেন যেমন পাকা পেঁপে,কলা,বাতাবি লেবু আমের সময় আম তবে আম ছিল রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয় ফল। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস এলে রবীন্দ্রনাথের ভীষণ খুশী হতেন। কবি আম কেটে খেতে পছন্দ করতেন না তিনি আম চুষে খেতেন। টমি ওয়াডা নামে রবীন্দ্র অনুরাগী এক জাপানী ভদ্র মহিলার আমন্ত্রণে দ্বিতীয়বার কবি জাপানে যাওয়ার কথা ভাবতে থাকেন, কিন্তু সেটি আমের সময় ছিল রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমের ভক্ত ফলে পাকা আমের লোভ তার জাপান যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাড়ায়। অবশেষে ঠিক হয় বড় বড় বরফ বক্সে করে আমও কবির সাথে জাপান যাবে।

তথ্য সূত্র

১) দুর্গাপদ চট্টোপাধ্যায়, অজানা রবীন্দ্রনাথ,এ পি পি,১১৭, কেশব চন্দ্র সেন স্ট্রিট,কলকাতা-৭০০০০৯

২)http//Bengalcuisine.in/tagorean¬_cuisine

৩) http//hindustantimes.com/india/savour…

 

স্টাফ রুমের

একাল সেকাল

সনোজ চক্রবর্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা

.....দেশীয় খাবারের মধ্যে কৈ মাছের তরকারী, চিতল মাছের পেটি ভাজা, এছাড়া ভাপা ইলিশ, ফুলকপি দিয়ে তৈরি  নানান পদ ছিল রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয়। এছাড়া মিষ্টি খাবারের মধ্যে পায়েস, চন্দ্রপুলি, ক্ষীর, নারকেল দিয়ে তৈরি মিষ্টি, দই এর মালপোয়া, চিঁড়ের পুলি, মানকচুর জিলিপি, আমসত্ত্ব এগুলি খেতে খুব ভালবাসতেন তিনি। তবে পায়েস ও পিঠে পুলির প্রতি কবির টান ছিল বেশি।

      প্ত দুপুরের রোদ ভেঙে ইটের এবড়ো থেবড়ো পথ ধরে এগিয়ে চলেছে সাইকেলটা। আরোহী সহ সাইকেলের ছায়া মিশে গেছে চাকার তলায়। মাথার উপর সূর্য। জীর্ণ সাইকেলটার সারা শরীরে শব্দ। সাইকেলটি যেমন জীর্ণ ঠিক তেমনই আরোহীও ভগ্ন স্বাস্থ্য। প্রায় ছয় কিমি পথ বেয়ে স্যার চলেছেন সহকর্মীকে দেখতে। তখন তো আর হাত ফোন ছিল না, যে বাথরুম করতে করতে বিশ্বের খবর নেওয়া যাবে! লেবু জল হাতে নিয়েই বসে গেল শরীর। অসুস্থ সহকর্মীকে দেখতে এসে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এ ঘটনা বছর পঁচিশ আগের ঘটনা।
কিছু দিন আগে আমার এক বন্ধুর মা মারা গেলেন, মৃত্যুর দিন দুই পর তার অতি ঘনিষ্ঠ এক শিক্ষক সহকর্মী খোঁজ নিয়েছিলেন। ‘মাসিমা কেমন আছেন?’

আবার হেড মাস্টার পাহাড়ি মশাই এতো ব্যস্ততার মাঝেও বারবার খোঁজ নিয়েছেন।২৬/৪/১৭ একটি পোষ্ট দেখার পর ইচ্ছেটা বেশ তাড়া দিচ্ছিল লেখার জন্য। বারবার মনকে বোঝালাম না এ হয় না, কারো পোষ্ট দেখে লেখাটা ভালো দেখায় না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম লেখাটাই উচিত কাজ হবে। শিক্ষকদের একাল সেকাল বলে বোধহয় কিছু হয় না। সেকালের শিক্ষকদের মধ্যে মারামারি হতো আর একালের শিক্ষকরা সবাই গৌতম বুদ্ধের ভাইপোর নাতির ঘরের পুতি, তার নাতির নাতি.... তার নাতির খুড়তোতো ভাইয়ের নাতির কাছে দীক্ষা নিয়েছেন এ কষ্ট কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমার শিক্ষকতার দশ বছর পূর্ণ হলো। সে হিসাবে আমি একালেই পড়ব তবুও এতো বড় মিথ্যাকে প্রশ্রয় করার শিক্ষা আমি পাইনি।
সময়ের স্রোতে ভাল মন্দ দুইই আছে। 
বিগত দিনে অসংখ্য সুশিক্ষকদের মধ্যে মন্দ ছিল। তা না হলে ভালো মন্দের দ্বন্দ্বটা থাকে কি করে। এখনও ভালো শিক্ষকের পাশাপাশি মন্দরাও রয়েছেন। প্রশ্ন থাকতে পারে কোন সময়টা ভাল? এ প্রশ্নের জবার একটু অন্য ভাবে আসুক।
আমরা যারা একালের শিক্ষক, আমাদের আচার আচরণ, পড়ানো, কথা বলা, হাঁটা চলা, এমন কি ছাত্র-ছাত্রীদের বকা ঝকা করাটাও আমাদের বিগত দিনের কোনো না কোনো শিক্ষকের আদলে নির্মিত। এটা আমার বিশ্বাসের জায়গা, অন্য কেউ ভিন্ন মত হতেই পারেন।

মানুষ অনুকরণ প্রিয়। সমাজে বর্তমানে যে ক্ষয়িষ্ণু ভাব তার জন্য অনুকরণ যোগ্য চরিত্রের অভাব কি অন্যতম

কারণ নয়? বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা অসহিষ্ণুতা, মূল্যবোধের অভাব এগুলো কি প্রমাণ করে যে আমরা একটা ভাল সময়ের মধ্য দিয়ে হাঁটছি?
কাজের মধ্য দিয়ে মানুষ যতটা শিক্ষা নেয় তার অধিক শিক্ষা নেয় অবসরে। অবসরই তাকে আত্মসমালোচনার পরিসর এনে দেয়। নিজের ত্রুটি বিচ্যুতি নির্ণয় ও তার সংশোধন মূলক ব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত অবসরের প্রয়োজন। অবসর অলস সময় নয় বরং অবসর মানুষকে পূর্ণতা দান করে।
এখন এই একটি জিনিসের বড় অভাব। আমাদের কোনো অবসর নেই। ফলত আত্মসমালোচনা, আত্মসংশোধনের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলত ত্রুটিপূর্ণ জীবনের বহমানতা সমাজের বহুদূর পর্যন্ত বিস্তার পেয়ে যায়। আর যদি সেই চরিত্রের অনুকরণ ঘটে তবে তা সমাজের ক্ষয় ত্বরান্বিত করে।
কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর জন্মদিন পালন কাজের পরিবেশকে আন্তরিক বা স্বাস্থ্যকর করবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। যারা এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাদের একটা বাড়তি মিষ্টি দেওয়ার প্রস্তাব রইল। যদি জন্মদিনের বিরোধীতায় কতিপয় পুরানো শিক্ষক থেকে থাকেন তবুও এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঐ সময়টাকে অস্বীকার করা যায় না। একাল সেকাল বলা যায় না।
বর্তমান সময় হল উইন্ডো ড্রেসিং- এর সময়।
জন্মদিন পালন যেন বাতায়ন সজ্জায় পরিণত না হয়। সে যেন কেবল আয়োজনে আটকা না পড়ে, অন্তরের অন্দর মহলের আহ্বান হয়ে ওঠে।

 

স্বর্গের

পারিজাত

সুস্মিতা দত্ত

......চিকিৎসাক্ষেত্রে এই ঔষধির উপকারিতা অনস্বীকার্য। ডেঙ্গু এবং চিকিনগুনিয়ার ক্ষেত্রে শিউলি পাতার রস খুবই কার্যকারী। এটি রক্তের অনুচক্রিকার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

গাছ

   রাতে প্রস্ফুটিত ফুলের সুবাসে, প্রভাতে শিশির ভেজা সবুজ ঘাসে ঝড়ে পড়া শুভ্র-কমলার চোখ-জুড়ানো আচ্ছাদনে, শিউলি বা শেফালি জানিয়ে দেয় শরৎ ঋতুর আগমন বার্তা। শিউলি বা শেফালি গ্রাম-বাংলার একটি অতি পরিচিত গাছ। বৈজ্ঞানিক নাম Nyctanthes Arbor Tristis যা স্বর্গের পারিজাত নামে অভিহিত। ইংরাজী নাম Night Jasmine.
      কথিত আছে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্রের বাগান থেকে পারিজাত মর্ত্যে এনেছিলেন। আবার ভগবৎ গীতা, মহাভারত ও বিষ্ণুপুরাণ মতে সমুদ্র মন্থনে উঠেছিল এই পারিজাত। এর অপর একটি নাম Arbor Tristis অর্থাৎ Sad tree. বেলা বাড়ার সাথে সাথে এই ফুলের উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে বিষণ্ণতায় পরিণত হয়, তাই এই নামকরণ। জলপাই বা অলিভ প্রজাতিভুক্ত এই ভেষজ উদ্ভিদটির জন্মস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া- ভারত, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, ক্রান্তীয় আবহমন্ডল।

চিরসবুজ প্রকৃতির এই উদ্ভিদটির উচ্চতা ১০ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। রন্ধন কার্য্যে ঔষধি হিসেবে এর কিছু ব্যবহার সর্বজনবিদিত। শিউলি ফুলের বোঁটা থেমে নি:সৃত নির্যাস খাদ্যদ্রব্যে ও কাপড় রঙিন করতে ব্যবহৃত উৎকৃষ্ট রঞ্জক। এই উদ্ভিদের কান্ড, গাছের ছাল, ফুল, ফল, পাতা সবকিছুই উপকারী। পুষ্টিগত গুণের দিক দিয়ে ক্ষারীয় প্রকৃতির এই ভেষজ উদ্ভিদটির পাতায় রয়েছে Anthocyanins, Ascorbic Acid, Astragalin, Benzoic Acid, Beta-Armin, Beta-Sitosterol, Fructose, Manital, Glucose, Carotene, Tannic Acid, Methyl Salicylate, Oleanolnic Acid, Nicotifloin.

গাছের ছাল বা বাকলে রয়েছ ফুলের নির্যাসে রয়েছে Glycosides, Alkaloids। এই উদ্ভিদের বীজ থেকে পাওয়া যায়  Arbortristosides A ও B, Oleic Glycerides of lanoleic, Myristic Acid, Nyctanthic Acid এবং জলে দ্রবণীয় Polysaccharides.

বীজ 

ফুল ও পাতা    

       চিকিৎসাক্ষেত্রে এই ঔষধির উপকারিতা অনস্বীকার্য। ডেঙ্গু এবং চিকিনগুনিয়ার ক্ষেত্রে শিউলি পাতার রস খুবই কার্যকারী। এটি রক্তের অনুচক্রিকার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। শুধুমাত্র কৃমি ও উকুননাশকই নয়, উচ্চ রক্তচাপ, সায়টিকা বাত, ম্যালেরিয়া, জন্ডিস, হেপাটাইটিস, মধুমেহ, কোষ্ঠবদ্ধতা, ডায়রিয়া, স্কার্ভি ইত্যাদি রোগের উৎকৃষ্ট  প্রতিষেধক। ব্যথানাশক তিক্তস্বাদ বিশিষ্ট উদ্ভিদটির ব্যবহার চুলের অকালপক্কতা, খুস্কিরোধে ও চর্মরোগে ফলপ্রদ। এই উদ্ভিদটির ছালের নির্যাস গেঁটেবাত এবং কাশি, হাঁপানি রোগে বিশেষ ফলদায়ী। পরিশেষে বলি, শুধু নয়নাভিরাম শোভায়  নয়, প্রাকৃতিক ভেষজগুণে ভরপুর এই অমূল্য সম্পদ জীবজগতের কল্যাণে বিধাতার কি অপূর্ব সৃষ্টি! সকলের উচিত এই নৈসর্গিক ঐশ্বর্য্যকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা।

ফুল ও কুড়ি 

 

অনন্যা

কাদম্বরী

রজত কান্তি সিংহ

...কাদম্বরী হলেন সেই নারী যিনি রবীন্দ্রনাথের প্রাণের ভিতর প্রথমে প্রবেশ করে তাঁর হৃদয়ের গভীরতম স্থলে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন। কাদম্বরী হলেন সেই নারী যিনি তাঁর খেলার সঙ্গী হয়েছিলেন, বন্ধু হয়েছিলেন, তাঁকে যত্ন করেছিলেন, স্নেহ করেছিলেন, প্রেরণা দিয়েছিলেন এবং ভালবেসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ একদিন বললেন – ‘বৌঠান, তুমি আসার আগে বুঝিনি মেয়েরা কত ভালবাসা, কত আদর ঢেলে দিতে পারে একটা পুরুষের জীবনে।’

  কাদম্বরী এবং রবীন্দ্রনাথের মধুর সম্পর্ক নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। রবীন্দ্রনাথের মতন প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যে নারী ঘনিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন তাকে যতই সাধারণ নারী বলে মনে করা হোক না কেন তিনি নিশ্চয়ই অনন্যা।                                                      কাদম্বরী দেবী বাবা-মায়ের তৃতীয় কন্যা ছিলেন। বড়দিদি বরদাসুন্দরী, মেজদিদি মনোরমা এবং ছোটবোন ছিলেন শ্বেতাম্বরী। বাবা ছিলেন শ্রী শ্যাম গাঙ্গুলি এবং মা ছিলেন শ্রীমতি ত্রৈলোক্যসুন্দরী। কাদম্বরীর জন্ম হয় 5th July, 1859 – রবীন্দ্রনাথের থেকে দু বছরের বড়।           
     কাদম্বরীর বাবা শ্যাম গাঙ্গুলি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বাজার সরকার ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির একতলায় ছোট একটি ঘরে শ্যাম এবং ত্রৈলোক্যসুন্দরী কাদম্বরীর জন্মের আগে থেকেই বাস করতেন। ছোটবেলায় কাদম্বরী ছোট রবিকে বারান্দায় রেলিং ধরে আকাশের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং বাগানে খেলতে অনেকবার দেখেছেন। হয়তো তার ইচ্ছেও হয়েছিল রবির সঙ্গে গিয়ে খেলা করে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও অভিজাত এবং ধনী পরিবারের রবির সঙ্গে খেলতে যাওয়ার সাহস এবং সুযোগ কোনটাই গরীব ঘরের মেয়ে কাদম্বরীর ছিল না। 
    মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তেরোটি ছেলে - মেয়ে। সকলের ছোট ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের ডাক নাম ছিল রবি। রবির জন্ম হয় 1861 সালের 7th May। রবির নতুনদা, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জন্ম হয় 1849 সালের 4th May - রবীন্দ্রনাথের থেকে ১২ বছরের বড়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যেমন ছিলেন রূপবান তেমনি ছিলেন বিদ্বান - নানা বিষয়ে ছিল তাঁর জ্ঞান এবং পারদর্শিতা - যাকে বলা যায় Multitalented Personality। একাধারে ছিলেন লেখক, নাট্যকার, অভিনেতা, সম্পাদক, অনুবাদক এবং উচ্চমানের শিল্পি। তিনি ভালো আঁকতে পারতেন  আবার পিয়ানো, সেতার, বেহালা, হারমোনিয়াম ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র গুলিও বাজাতে পারতেন ভালো। পিয়ানোতে উনি নতুন নতুন সুর সৃষ্টি (Music Compose)  করে প্রথমের দিকে বন্ধু অক্ষয় চন্দ্র চৌধুরী এবং পরে ভাই রবিকে পাশে বসিয়ে সেই সুরের উপর কথা বা Lyrics দিতে বলতেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোর বাড়িকে সাহিত্যে, নাটকে এবং সঙ্গীতে মাতিয়ে রাখতেন। মেজ বৌঠাকুরাণী জ্ঞানদানন্দিনী ঠাকুরপো জ্যোতির বিয়ের জন্য সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধু ডাঃ সূর্য্যকুমার চক্রবর্ত্তীর বিলেত ফেরত মেয়েকে পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ রাজি না হওয়ায় সেখানে জ্যোতির বিয়ে হল না। পরে, দেবেন্দ্রনাথ স্বয়ং তাঁদেরই    

কর্মচারী শ্যাম গাঙ্গুলির ৯ বছরের কালো ও রোগা মেয়ে কাদম্বরীর সঙ্গে জ্যোতির বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। দেবেন্দ্রনাথের এই সিদ্ধান্তে ঠাকুরবাড়ির মাহিলা মহল খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। তারা কেহই কাদম্বরীকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের যোগ্য পাত্রী বলে মেনে নিতে পারেননি। বিয়ের দিন ঠিক হল 5TH July, 1865। দিনটা ছিল কাদম্বরীর জন্ম দিন। বিয়ের দিন নিয়ে মা ত্রৈলোক্যসুন্দরী আপত্তি জানালেন। কারণ জন্মদিনে বিয়ে হলে মেয়ে সুখী হয় না। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ কোন সংস্কার বা কারুর কোন কথা শুনলেন না। নির্ধারিত দিনেই বিয়ে হল।
     কাদম্বরী যখন নতুন বৌ হয়ে ঠাকুরবাড়িতে এলেন তখন তার লেখাপড়ার জ্ঞান খুবই সামান্য ছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রথমেই তার শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন এবং সাথে সাথে ঘোড়ায় - চড়ার প্রশিক্ষণও তাকে দিতে লাগলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নারী শিক্ষা এবং নারী মুক্তির সমর্থক ছিলেন। কিছু দিনের মধ্যে ঘোড়ায় চড়া শিখে নিয়ে কাদাম্বারী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে তদানীন্তন মহিলা সমাজের সকল সংস্কার এবং লজ্জাকে উপেক্ষা করে প্রায় প্রত্যেকদিন বিকেলে ময়দানের দিকে বেড়াতে যেতেন।      ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথের একমাত্র খেলার সঙ্গী এবং বন্ধু হয়ে উঠেছিল কাদম্বরী । কাদম্বরীকে উনি মনের সব কথা খুলে বলতে পারতেন। স্কুল থেকে এসেই রবি কাদম্বরীর ঘরে চলে 
যেতেন। কাদম্বরী ও রবির জন্য তাঁর পছন্দমত কিছু খাবার প্রত্যেকদিন ঠিক করে রাখতেন যাতে রবি স্কুল থেকে এসে কিছু খেতে পায়। নিজেদের মধ্যে মাঝে মাঝে দাবা খেলা হত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কোনদিন খেলায় জিততে পারতেন না। নতুন কোন কবিতা রচনা করলেই তিনি কাদম্বরীকে পড়ে শুনাতেন। কাদম্বরী মন দিয়ে শুনতেন এবং মাঝে মধ্যে মন্তব্যও করতেন। ধীরে ধীরে কাদম্বরীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগল, সম্পর্ক ও হয়ে উঠল মধুর। দুজনে দুজনের চোখের সামনে কৈশোর কাটিয়ে যৌবনে পদার্পণ করলেন।

 চার – পাঁচ বছরের মধ্যে কাদম্বরী ঠাকুরবাড়ির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হবার জন্য নিজেকে তৈরী করে ফেললেন। একবার ঠিক হল জ্যোতিন্দ্রনাথের “অলীকবাবু” নাটকটি বাড়িতে মঞ্চস্থ করা হবে। অলীকের অভিনয় করলেন রবীন্দ্রনাথ আর নায়িকা হেমাঙ্গিনীর      অভিনয় করলেন কাদম্বরী। সেদিন কাদম্বরীর সাবলীন এবং সুন্দর আভিনয় দেখে সকল দর্শক হতবাক এবং মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বন্ধু ছিলেন। সেই সুত্রে ঠাকুরবাড়িতে

মাঝে মাঝে আসতেন। তখন কাদম্বরীর সঙ্গে বিহারীর পরিচয় এবং বন্ধুত্ব হয়। উনি নতুন কিছু রচনা করলে কাদম্বরীকে শোনাতে আসতেন। কাদম্বরী বিহারীলালের গুনমুগ্ধ শ্রোতা এবং পাঠিকা ছিলেন। রবিকে বিহারীর থেকে আরও ভাল কবিতা লেখার জন্য প্রেরণা দিতেন। প্রথম প্রথম বিহারীলালের কবিতা কাদম্বরীর ভাল লাগলেও পরবর্তী কালে বিহারীর কবিতা কাদম্বরীর মনে বিশেষ কোন আবেদন জাগাতে পারত না, বড্ড সেকেলের বলে মনে হত। রবীন্দ্রনাথের কবিতা তখন তাঁর বেশি ভাল লাগত। উনি বেশ বুঝতে পারছিলেন রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালের প্রভাব মুক্ত এক আলাদা গোত্রের কবি। ইচ্ছে করে প্রশংসার মাত্রা একটু চেপে রেখে রবিকে কবিতা লেখার জন্য প্রেরণা দিতেই থাকতেন।

       গ্রীষ্মের দুপুরে যখন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নীচের তলায় কাছারির কাজে ব্যস্ত থাকতেন তখন রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখা কবিতা পড়ে অথবা কোন কোন দিন সেই সময়ের প্রখ্যাত লেখকের লেখা যেমন বঙ্কিমচান্দ্রের “বিষবৃক্ষ” পড়ে কাদম্বরীকে শুনাতেন। কাদম্বরী হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করতেন আর মন দিয়ে পাঠ শুনতেন। রবীন্দ্রনাথের “নষ্টনীড়” গল্পের ভিত্তিতে নির্মিত সত্যজিৎ রায়ের “চারুলতা” সিনেমায় অমল–চারুর সম্পর্ক যেন রবি–কাদম্বরী সম্পর্কেরই প্রতিফলন। কাদম্বরী বাড়ির ছাদের উপর একটা বাগান করেছিলেন। সেখানে অনেক রকম ফুলের গাছ ছিল। বিকেলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, কাদম্বরী এবং রবীন্দ্রনাথ সেখানে বসে মনোরঞ্জন করতেন। সেইসময় নানা কথা, গল্প এবং গানও হত। কাদম্বরী ভাল গান গাইতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথ বলতেন বৌঠান তার ঠাকুরদার থেকে কণ্ঠ পেয়েছেন। কাদম্বরীর ঠাকুরদা জগমোহন গাঙ্গুলি এক উচ্চমানের সঙ্গীত শিল্পি ছিলেন।
      জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজেকে নানা কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত রাখার জন্য কাদম্বরীকে প্রাণবন্ত সঙ্গ দিতে পারতেন না। কাদম্বরী নিঃসন্তান ছিলেন। তার উপর ঠাকুরবাড়ির মহিলা মহল কাদম্বরীকে অবহেলা করতেন। ফলে একাকীত্বের যন্ত্রণায় কাদম্বরী কষ্ট পেতেন। রবীন্দ্রনাথ তখন বিলেতে। রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীর ছোটমেয়ে নির্মলাকে নিয়ে কাদম্বরী ব্যস্ত থাকতেন। একদিন খুব মগ্ন হয়ে একটি পত্র পড়ছিলেন। সেইসময় ক্ষনিকের জন্য ছোট্ট নির্মলার খেয়াল কাদম্বরী করতে পারেননি।  ঠিক ঐ সময়ে নির্মলা লোহার পাক দেওয়া সিঁড়ী থেকে পড়ে  গিয়ে দুঃঘটনা ঘটায়। দুর্ভাগ্যবশতঃ ওই দুঃঘটনায় নির্মলার মৃত্যু হয়। কাদম্বরী অত্যধিক শোকে বিধ্বস্ত হয়ে পড়লেন এবং সারাজীবন অপরাধ বোধের দুঃসহ কষ্ট ভোগ করেছেন।  
      একবার কাদম্বরী খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁকে নিয়ে চন্দননগরের বাগান বাড়িতে কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে নিয়ে যান। পরে রবীন্দ্রনাথ ও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। সেখানে প্রত্যেকদিন বিকেলে সবাই মিলে নৌকায় করে গঙ্গাবক্ষে বেড়াতেন। সোনালী বিকেলে এবং সন্ধ্যার জ্যোৎস্নায় গঙ্গাবক্ষের চতুর্দিকের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করে সকলে আনন্দপূর্ণ মন নিয়ে বাসায় ফিরতেন। এক ঝড় বৃষ্টির দিনে ঘরে ফিরেই রবীন্দ্রনাথ মনের আনন্দে নিজের রচিত সুরে বিদ্যাপতির পদ গেয়ে শুনিয়েছিলেন বৌঠানকে -                                                 
             “ভরা বাদর, মহা ভাদর
             শূন্য মন্দির মোর –’                       
       ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ মাকে হারিয়েছেন। মায়ের আদর যত্ন তিনি বেশি দিন পাননি। কাদম্বরী না আসা পর্যন্ত তাঁর জীবনে নারী বলে যেন কোন কিছুই ছিল না। কাদম্বরীর ভিতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেন জীবনে প্রথম নারীকে চিনলেন। কাদম্বরী হলেন সেই নারী যিনি রবীন্দ্রনাথের প্রাণের ভিতর প্রথমে প্রবেশ করে তাঁর হৃদয়ের গভীরতম স্থলে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন। কাদম্বরী হলেন সেই নারী যিনি তাঁর খেলার সঙ্গী হয়েছিলেন, বন্ধু হয়েছিলেন, তাঁকে যত্ন করেছিলেন, স্নেহ করেছিলেন, প্রেরণা দিয়েছিলেন এবং ভালবেসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ একদিন বললেন – ‘বৌঠান, তুমি আসার আগে বুঝিনি মেয়েরা কত ভালবাসা, কত আদর ঢেলে দিতে পারে একটা পুরুষের জীবনে।’

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?