প্রবন্ধ আলোচনা - ৪ 

  • অশোকের রক্তিমরাগে - সুস্মিতা দত্ত 

  • স্বপ্ন সত্য বাস্তব - মিজানুর রহমান মিজান 

  • সুন্দর সমাজ - মিজানুর রহমান মিজান 

  • রথ যাত্রা - সনোজ চক্রবর্তী

  • বৌদ্ধ ঐতিহ্যএর পথ ধরে মোগলমারি - অতনু প্রধান 

একুশে

ফেব্রুয়ারী

মিজানুর রহমান মিজান

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে ঢাকায় ছাত্রদের উপর গুলি চালাবার সংবাদ পেয়ে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী রাত্রে রোগ শয্যায় শায়িত থেকে চট্টগ্রামের মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর একুশের প্রথম কবিতা ,“কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি“ 

     মাদের জাতীয় জীবনের একটি গুরুত্ব পূর্ণ দিন হচ্ছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারী। এ দিনের সাথে আমাদের স্বাধিকার, গৌরব, বেদনা  অর্জন ও প্রাপ্তির ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত, নিখাদ প্রেমাসক্তে সিক্ত। নিজ মাতৃভাষার যথোপযুক্ত মর্যাদা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে সংগ্রামে সচকিত কয়েকজন তরুণ অকাতরে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রাজপথ করেছিল রঞ্জিত। সে এক অপূর্ব, অতুলনীয় ইতিহাস। যাকে ভাষা আন্দোলন নামে অভিহিত করা হয়। আবার একুশে ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ 

প্রতিষ্ঠায় সক্ষমতা অর্জন একান্ত গৌরবের। এ কাহিনী জন্ম দিয়েছে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস“এর। বিশেষ সময় ও বিশেষ আন্দোলনের স্মৃতির সহিত সম্পৃক্ত না থেকে জাতীয় চেতনার প্রতিকে রূপান্তরিত সার্থক সফলতা। বাঙ্গালী জাতীর সাধনা, আন্দোলন সংগ্রামের প্রেরণা উৎস মুলে বিরাট অবদানের স্বীকৃত অস্তিত্ব। পৃথিবীতে মায়ের ভাষা রক্ষায় জীবন দানকারী একমাত্র জাতি বাঙ্গালী হিসাবে চিহ্নিত। একুশে ফেব্রুয়ারী আমাদের ন্যায্য দাবী আদায়ের সংগ্রামী ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাত থেকে মুক্ত হলে ও আমাদের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি সম্ভব হয়নি বলে একুশে ফেব্রুয়ারী তার জ্বলন্ত উদাহরণ। পাকিস্তানি শাসকরা যে এদেশের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়েছিল তার জ্বলন্ত প্রমাণ হিসাবে বলতে হয় সর্বাগ্রে মাতৃভাষা কেড়ে নেয়ার চক্রান্ত অন্যতম। বৃহদাংশ জনগণের মাতৃভাষা বাংলা হলে ও অমর্যাদা স্বরূপ উর্দুকেই রাষ্ট্র ভাষা রূপে প্রতিষ্ঠার অশুভ চক্রান্ত চালায়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের কর্ণধার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদার কথা বললে বাঙ্গালী প্রতিবাদ জানায়। কিছু দিন নীরব থাকলে ও খাজা নাজিম উদ্দিন সরকার কর্তৃক আবারো উত্থাপিত হলে প্রতিবাদে বাংলার ছাত্র সমাজ ফুসে উঠে। ১৪৪ ধারা জারী করে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী ছাত্র সমাজকে দমাতে চাইলে ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার নিমিত্তে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে জড়ো হতে থাকলে পুলিশ গুলি চালিয়ে রফিক, বরকত, 

জব্বার, সালামসহ আরো অনেকে নিহত হয়। সে সংবাদ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে সারা বাংলায় দাবানলের মত মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠে এবং  ঐ দিনকে “শহিদ দিবস“ হিসাবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু' শহিদ দিবস কেবল পালনের মধ্যেই সীমিত থাকেনি। এর প্রভাব বিস্তার লাভে স্বাধিকার আন্দোলনের পথ প্রসারিত করে। ১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে পৃথিবীর বুকে পৃথক মানচিত্র ও পতাকার অধিকার লাভে সক্ষম হয়। বাঙ্গালী বীরের জাতি। পর্যায়ক্রমে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ১৮৮ জাতি সমন্বয়ে সংগঠিত জাতি সংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো প্যারিস অধিবেশনে “একুশে ফেব্রুয়ারী“ কে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস“ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এ জাতির একটি বিশিষ্ট অর্জনকে স্বীকৃতি দান করেছে। প্রতিবাদের সহিত অর্জনের সমন্বয় সাধনে একুশের চেতনা জাতীয়তা-বোধে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিতের মুল মন্ত্র।
      এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে ঢাকায় ছাত্রদের উপর গুলি চালাবার সংবাদ পেয়ে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী রাত্রে রোগ শয্যায় শায়িত থেকে চট্টগ্রামের মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর একুশের প্রথম কবিতা “ কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি“। কবিতাটি আন্দোলনকে বেগবান করতে বিরাট ভূমিকা রাখে। সর্বত্র, সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত হোক মর্যাদার স্ব-মহিমায় “শহিদ দিবস“ থেকে যেমন “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে“ উত্তরণ হয়েছে। এ আমার প্রাণের দাবী।

একদিন সুনামগঞ্জের

হাসান রাজার বাড়িতে

মিজানুর রহমান মিজান

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত। ইংরেজ সরকার যুদ্ধশেষে ভারতবাসীকে ‘স্বরাজ’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধে তাদের পুরোদস্তুর সাহায্য নিল। কিন্তু যুদ্ধাবসানে সেই প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে গিয়ে চালু করল কুখ্যাত রওলাট আইন। সাম্রাজ্যবাদী ইংরাজের অত্যাচার, দেশ জোড়া নিপীড়িত মানুষের হাহাকার, জাতপাতের অন্যায় ভেদাভেদ, সর্বোপরি নিরন্ন মানুষের কান্নায় ভারতের আকাশ বাতাস ঘন বাষ্পীভূত। ঠিক এইরকম রুক্ষ, দগ্ধ দহন দিনে কবির আবির্ভাব, বাংলা কাব্য সাহিত্যে।

   জুলাই মাসের ১৮ তারিখ ২০১৭ সাল। আমি সবেমাত্র অপারেশন করে ডাক্তারের পরামর্শানুযায়ী বিশ্রামে আছি।আমার অসুস্থতার খবর পেয়ে আমার লন্ডন প্রবাসী ভাগিনা দবির উদ্দিন স্ত্রী সন্তানসহ আসেন আমাকে দেখতে। আমি অপারেশন করালাম তাদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে ও নিবিড় পরিচর্যায়ে থেকে।একটু সুস্থতার পথে। ভাগনা ফিরে যাবার সময় ঘনিয়ে এসেছে।তাদের অভিলাষ একবার সুনাম গঞ্জে যাবার।ভাটি এলাকা পরিদর্শন ও কিছু পারিবারিক কাজ জগঝাপ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। সুনামগঞ্জ পরিদর্শন করা আমারই মতো আমার প্রবাসী ভাগিনী ও নাতিদের। তাই তাদের আর্তি পূরণার্থে এবং আমার ও দারুণ ইচ্ছে একবার সুনাম গঞ্জ ভ্রমণ করা। দিন তারিখ ঠিক করে ভোর ৮ ঘটিকায় রওয়ানা দিলাম নোহা যোগে লামাকাজি হয়ে সুনাম গঞ্জ রোড ধরে। আমরা সকাল নয় ঘটিকায় পৌঁছলাম জগঝাপ ভূমি অফিসে। অফিস খোলা পেলাম। কিন্তু কর্মকর্তার আগমন এখন ও ঘটেনি। তাই চা পানের উদ্দেশ্যে পার্শ্বের অনতিদূরে স্টলে গেলাম। গাড়িতে রয়ে  গেলেন আমার প্রবাসী ভাগিনী তিন নাতিসহ।চা পান করলাম। আবার আসলাম অফিসে। পেয়ে গেলাম কর্মকর্তাকে। আমাদের কাঙ্ক্ষিত কাগজের কথা বলতেই এবং আমি সাংবাদিক শুনেই তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন, আপনি ঘুরে আসুন। আমি কাগজ রেডি করে রাখবো। আশ্বস্থতায় আনন্দই পেলাম। আমরা ছুটলাম লক্ষ্যপানে। 
     বেলা সাড়ে বারাটায় পৌঁছলাম সুনাম গঞ্জ শহরে। চলে গেলাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। তথ্য সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে কিছু কাগজ সংগ্রহের নিমিত্তে। এখানে প্রায় ঘন্টা খানেক সময় অতিবাহিত হল। উদ্দেশ্য আমাদের সফল হয়নি। কারণ আমাদের যে সকল কাগজ ও তথ্যের প্রয়োজন তা নাকি জমা হয়নি। তাই মনস্থ করলাম কিছু খেয়ে নেবার। তাই ঢুকলাম একটি বড় হোটেলে। খাবার গ্রহণ শেষে অনেক আলাপ আলোচনায় সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম তাহির পুর তথা টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে আসা সম্ভব হবে না। সময় আমাদেরকে যাত্রা সংক্ষিপ্ত করণের আভাষ দিচ্ছে। তাই সে আশা ছেড়ে দিয়ে মনোনিবেশ করলাম সুনামগঞ্জ শহরের অনতিদূরে অবস্থিত হাসন রাজার বাড়ি দর্শন করে বাড়ির দিকে ফিরে আসা।যেমন কথা বা সিদ্ধান্ত, তেমনি কাজে হলাম ধাবিত। আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিলাম সে উদ্দেশ্য সার্থক ও সফলতার চূড়ান্ত রূপদানে।

দশ মিনিটের ব্যবধানে আমরা পৌঁছলাম হাসন রাজার বাড়ির ফটকে। সুরমা নদীর তীর ঘেঁষে হাসন রাজার বাড়িটির অবস্থান। আমাদের গাড়িটি ফটক অতিক্রম করে ভিতরে নিয়ে গেলাম। মুল গৃহের একটু আগে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লাম সবাই একে একে।ভিতরে প্রবেশ করলাম যখন আমরা তখন যাদুঘরটি একেবারে জনশূন্য। একজন তরুণ সেখানে সার্বক্ষণিক থাকেন।যার নাম হল রেদোয়ানুল ইসলাম হৃদয়। তিনি আমাদের গাইড লাইন দিলেন। আমরা দেখতে লাগলাম যাদুঘরের প্রতিটি কক্ষ ঘুরে ঘুরে। ঐ তরুণ আমার পরিচয় জেনে আমাকে জানালেন তিনি হাসন রাজার গান গেয়ে শুনাবেন যদি আমরা আগ্রহ প্রকাশ করি। আমি সানন্দে সম্মতি প্রদান করলে তিনি একে একে তিনটি গান গেয়ে শোনালেন। বেশ ভালই লাগলো। আমরা দেখছিলাম প্রতিটি কক্ষে রক্ষিত হাসন রাজার ব্যবহৃত পোশাক, তাঁর বংশ পরিচয়, নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী, গানের পাণ্ডুলিপি, সঙ্গীত চর্চায় ব্যবহৃত ঢোলসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং নানা  দুর্লভ উপকরণ সমূহ।
   যাদুঘর থেকে বের হয়ে দেখতে গেলাম হাসন রাজার বাড়ি। ঘুরে ঘুরে দেখলাম সব কিছুই। বাড়িতে একটি তিনতলা, একটি দুতলা ভবনসহ প্রাচীন আমলের কাঠ ও টিনের চালার মোট সাতটি গৃহ। তিনতলা ঘরের নিচতলার চারটি ঘর নিয়ে হাসন রাজা মিউজিয়ামের অবস্থান।
   অভ্যর্থনা কক্ষের সম্মুখ দেয়ালে রয়েছে হাসন রাজার একক একটি ছবি এক পাশে এবং অপর পাশে রয়েছে ঘোড়ার উপরে বসা অবস্থায় হাসন রাজারই ছবি। অভ্যর্থনা কক্ষের ভিতরে একটি ফ্রেমে বাঁধা রয়েছে হাসন রাজার বংশ পরিচয়। দেখা গেল সুরমা নদী তীরের তেঘরিয়া ( লক্ষণশ্রী) গ্রামে ১৮৫৪ সালের ২১ শে ডিসেম্বর জন্মেছিলেন এ সুর সাধক। পিতার নাম দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী ও মাতা হুরমত জান বিবি। হাসন রাজার পূর্বপুরুষ ছিলেন ভারতের অধিবাসী। ভাগ্যন্বেষনে তাঁরা আসেন বাংলাদেশের যশোর জেলায়। সেখানে একটি খন্ড রাজ্য স্থাপন করে ও স্থায়ী হতে পারেননি। এ রাজ্যের প্রতিষ্টাতা রাজা বিজয়সিংহ দেব পারিবারিক কলহ ও ছোট ভাই দুর্জয় সিংহের শত্রুতায় চলে আসেন সিলেটের বিশ্বনাথ থানার অন্তর্গত কোনাউরা গ্রামে।সময়টা তখন ছিল ষোড়শ শতকের শেষের দিকে। বানারসীরাম ছিলেন তাঁর অধ:স্তন পুরুষ। বানারসীরামের ছেলে বীরেন্দ্র চন্দ্র ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হন এবং মুসলিম নাম বাবু খান গ্রহণ করেন।তিনির কয়েক পুরুষ পর বাবু খানেরই উত্তর পুরুষ দেওয়ান আলী রাজার দ্বিতীয় সন্তান হচ্ছেন হাসন রাজা। মায়ের দিক থেকে হাসন রাজা হচ্ছেন হুরমত জাহান বেগমের সন্তান।দেওয়ান আলী রাজা তৎকালীন মোমেনশাহী জেলার খারিয়াজুরী পরগণার ভূইয়া পরিবারের মজলিশ প্রতাপ সাহেবের বংশধর হুরমত জাহান বেগমকে বিয়ে করেন। সুতরাং হাসন রাজার নানার বাড়ি হচ্ছে ময়মনসিংহ। দেওয়ান আলী রাজা হুরমত জাহান বেগমকে বিবাহ করার পর বৈবাহিক সূত্রে শ্বশুর প্রদত্ত সুনামগঞ্জের লক্ষণছিরিতে (তেঘরিয়া) অনেক সম্পত্তি লাভ

করেন এবং সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেন।তাই দেখা যায় হাসন রাজার পিতা, পিতামহ প্রপিতামহ সকলই ছিলেন বিশ্বনাথের রামপাশা গ্রামের অধিবাসী। অপরদিকে দৃষ্ট হয় হাসন রাজার একটি গানে ও আত্ম-পরিচয় দিতে গেয়েছেন- “হাসন রাজা মরিয়া যাইব না পুরিতে আশা, লক্ষণছিরি জমিদারী বাড়ি রামপাশা”।
     জাদুঘরের একটি শোকেসে রাখা হাসন রাজার পোশাক, একটি মখমলের আলখেল্লা ও সাদা দু’টি গেঞ্জি। জানা যায় তিনি বেশির ভাগ সময় সাদাসিধা পোষাকে পরতে ছিলেন অভ্যস্ত। সাদা ধুতি পরতেন লুঙ্গির মত করে এবং গায়ে থাকত সাদা গেঞ্জি। পায়ে দিতেন কাঠের খড়ম। আর কোন অনুষ্ঠান বা উৎসবে পরতেন জরির কারুকার্য খচিত আলখেল্লা। জাদুঘরের একাংশে লক্ষিত হল চেয়ার-টেবিল। তাতে বসেই হাসন রাজা নাকি গান লিখতেন।
  যাদুঘরের একটি কক্ষে রয়েছে একটি বজরা( বড় নৌকা)। এ নৌকায় চড়ে হাসন রাজা নাকি বের হতেন নৌবিহারে। বর্ষাকালে হাসন রাজা নৌবিহারে বেরুলে নৌকায় নাচ-গানের আসর বসাতেন। এখানে থাকতো বাদ্যযন্ত্রসহ নাচের ব্যবস্থা।অনেক সময় হতেন তিনি নিমগ্ন গান, কবিতা রচনায়। 
   অপর একটি রোমে আছে হাসন রাজার হাতের স্পর্শ পাওয়া একটি দোতারা ও দু’টি ঢোল। আবার কখন  ও কখন ও ঘোড়া বা হাতিতে চড়ে ও বের হতেন শিকারে। যাদুঘরে রক্ষিত একটি হাতে অঙ্কিত ছবিতে দেখা যায়, তিনি হাতিতে চড়ে শিকারে যাচ্ছেন। যাদুঘরে আরো আছে তাঁর ব্যবহৃত দুধের পাত্র ও পানদানি। আছে তিনির স্বহস্তের লিখিত গানের পাণ্ডুলিপি। আমাদের আগমনের খবর পেয়ে আসলেন তত্ত্বাবধায়ক সামারীন দেওয়ান।তিনির সাথে আলাপ হল। জানলাম অনেক কিছু। মুল বাড়ি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। বললেন ভিতরে যেতে। চলে গেলাম ভিতর বাড়ি। প্রাচীন আমলের পাকাযুক্ত গৃহের ছাদ দেয়া হয়েছে বড় বড় তক্তার দ্বারা। গৃহের চাল আগেকার দিনের টিনের দ্বারা চাউনি যুক্ত তা আমাদেরকে জানান দিচ্ছিল। কাঠগুলি আজো রয়েছে অক্ষত। কোন পোকা ধরেনি। হেঁটে হেঁটে চলে গেলাম ঘর পেরিয়ে পুকুর পাড়ে। সামান্য ঝোপ-জঙ্গল বেষ্টিত পুকুর পাড়, পুকুর আজকের প্রজন্ম করছেন ব্যবহার। তিনি ১৯২২ সালে মারা যান। তাঁকে কবরস্থ করা হয় রামপাশা গ্রামের পারিবারিক কবর স্থানে। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বিদায়ী সাক্ষাতে মিলিত হলাম সামারীন দেওয়ানের সঙ্গে।তিনি একটি বই আমাকে উপহার প্রদান করলেন হাসন রাজা সম্পর্কিত। আমার বাবা একজন বাউল শিল্পী ছিলেন জেনে তিনি আরো আনন্দিত হলেন। অত:পর সেখান থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম সুরমা নদীর তীরে। দেখলাম নৈসর্গিক দৃশ্য।সময় কম হাতে থাকায় নদীর তীরে বেশিক্ষণ থাকা হয়নি। রওয়ানা দিলাম বিশ্বনাথের তথা বাড়ির দিকে। আসার বেলা কিন্তু শহিদ মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য ও পাগলার মসজিদ ঘুরে আসতে এবং ছবি তোলতে ভুল করিনি।অন্যদিন পাগলার বড় মসজিদের সম্পর্কে লেখার আশাবাদ ব্যক্ত করে আল্লাহর শোকরিয়া আদায়ান্তে এখানেই সমাপ্য ঘোষণা করছি।          

 

একজন আদর্শ

শিক্ষক : রজনী কান্ত

মিজানুর রহমান মিজান

......কবি জীবিত থাকা কালীন মাত্র সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল আর ঐসব কাব্যগ্রন্থে সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৬২টি কবিতা স্থান পেয়েছিল। কবির অপ্রকাশিত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধের কথা না হয় নাই লেখা হল কিন্তু শত শত কবিতা বহুকাল পর্যন্ত প্রকাশের অন্তরালে পড়েছিল। কবি জানলেন না প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের গহন পথে আজ অবধি হেঁটে চলেছেন...

     নবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় আমাদেও জাতীয় জীবন জাগরণের অগ্রদূত, অন্ধকারাচছন্ন এলাকায় আলোর পরশ বিতরণে ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সুচনাকারী শ্রদ্ধেয় শিক্ষক রজনী কান্ত দেব। কেননা এ সময় অত্র এলাকায় শিক্ষার আলো পৌছেনি বললেই চলে।

     স্বর্গীয় রজনী কান্ত দেব আনুমানিক ১৮৯১ সালে টাকা দক্ষিণের ফুলসাইন গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। রাস গবিন্দ রায় এর দুই পুত্রের মধ্যে বড় ছিলেন আমাদের উল্লেখিত শিক্ষক রজনী কান্ত দেব। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এম. ই পরিক্ষায় কৃতিত্বের সহিত পাশ করে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানুষ গড়ার কাজে যোগ দেন। ২ বৎসর শিক্ষকতার পর তিনি বি. টি ট্রেনিং এর নিমিত্তে ভারতের শিলচরে নর্মাল স্কুলে চলে যান। সেখান থেকে এক বৎসরে কৃতিত্বের সহিত ট্রেনিং সমাপনান্তে আবার ঐ স্কুলে চলে আসেন। কিন্তু ভাগ্যচক্রেই হোক আর অত্র এলাকাবাসীর সৌভাগ্য ক্রমেই হোক কিছু দিনের মধ্যেই তিনি চলে আসেন উত্তর বিশ্বনাথে। এ সময় বিশ্বনাথ থানার খাজাঞ্চী ইউনিয়নের অন্তর্গত চন্দগ্রাম অভয়াচরন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রমথনাথ ভট্রাচার্য্যের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তাঁর পদার্পণ এ ক্ষীণ শিখা, সমস্যা জর্জরিত বিদ্যাঙ্গনে। কারণ প্রমথনাথ এর বাড়ি ছিল পঞ্চখন্ডে। তিনি ব্যক্তিগত কারনে ১৯১২ সালে বাড়িতে থাকার ইচছা প্রকাশ হেতু প্রধান শিক্ষকের শুন্য পদ পুরণার্থে তাঁকে ছয় মাসের জন্য ঐ স্থানে পাঠানো হয়। প্রথমাবতস্থায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান এর জন্য তাঁকে অত্র এলাকাবাসী “বড় মাষ্টার বাবু” নামে অভিহিত করেন এবং আজ ও তাঁর ছাত্রদের ও জনগণের কাছে ঐ নামেই বহুল পরিচিতির কথা শুনা যায়। এখানে আসার অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতিতে মুগ্ধ হয়ে এলাকাবাসী উর্ধবতন কর্মকর্তার কাছে আবেদন করে এ স্থানে থাকার অনুরোধ জানান এবং এতে তিনি ও সম্মতি প্রদান করেন। অত্র স্খুলের প্রতিষ্ঠাতা অভয়াচরণ এর গৃহে লজিং হিসেবে বসবাস করার সুযোগ পান।

     কবিতার অনুসরণে যাহারা বাঙলায় কবিতা অবলম্বন করিলেন তাদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ প্রধান। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় আধুনিক কবিতার কারিগর যে পাঁচজন কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯ - ১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১ - ১৯৬০), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮ - ১৯৭৮), বিষ্ণু দে (১৯০৯ - ১৯৮২) ও অমিয় চক্রবর্তী তাঁরা সবাই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। সেই সাথে বলা যায় বাঙলা কবিতায় আধুনিকতার যে বাঁক সৃষ্টি হয়েছিল তা মূলত ইংরেজি আর  

ইউরোপিয়ান সাহিত্যের উৎস ধারা থেকে। সাথে সাথে স্মরণ করতে হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পাশ্চাত্যে কবিতায় আধুনিকতার নবযাত্রা ঘটিয়েছিলেন যে মহানায়কগণ তাঁদের মধ্যে এটারা পাউন্ড, টি এস এলিয়ট ও অমি লাওয়েল অন্যতম এছাড়া জন কিটস, ইয়েটস ও বায়রনের নামও উঠে আসে সমস্বরে। জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি' প্রকাশের পড় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে একটি পত্র লিখেছিলেন - ‘তোমার কবিতাগুলি পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।’ আবার এমনও বলেছিলেন কিছুটা তাচ্ছিল্য করে - ‘তোমার কবিত্বশক্তি আছে তাতে সন্দেহমাত্র নেই। – কিন্তু ভাষা প্রকৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারিনে। কাব্যের মুদ্রাদোষটা ওস্তাদিকে পরিহাসিত করে। বড় জাতের রচনার মধ্যে একটা শান্তি আছে যেখানে তার ব্যাঘাত দেখি সেখানে স্থায়িত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জন্মে। জোর দেখানো যে জোরের প্রমাণ তা নয় বরঞ্চ উল্টো’।      

   ঘরমুখো নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশকে বঙ্গীয় সাহিত্য সমাজে দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বুদ্ধদেব বসু এবং অজিত দত্তের অবদান বহুগুণে বেশি। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’, সঞ্জয় ভট্টাচার্য ও প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পাদিত ‘নিরুক্ত’, সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘পূর্বাশা’ প্রভৃতি পত্রিকাগুলো জীবনানন্দ নির্ভর হয়ে ওঠে। দীনেশরঞ্জন দাশ সম্পাদিত ‘কল্লোল’ এবং প্রেমেন্দ্র মিত্র, মুরলীধর বসু ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কালি-কলম’ যা জীবনানন্দকে অনেক বেশি মূল্যায়ন করেছিল; উল্লেখ করতে হয় তখনকার সময় এই দুটি সাহিত্য পত্রিকা ছিল আধুনিক সাহিত্যের অগ্রদূত। সাহিত্যিক নীহাররঞ্জন রায় জীবনানন্দ দাশের কবিতা সম্পর্কে বলেন - ‘যে অল্প সংখ্যক কবির কবিকর্ম নিয়ে আমার এই গর্ব, সাম্প্রতিক বাঙলা কাব্যের গর্ব, জীবনানন্দ তার অন্যতম এবং সম্ভবত মহত্তম’।

     কবি জীবিত থাকা কালীন মাত্র সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল আর ঐসব কাব্যগ্রন্থে সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৬২টি কবিতা স্থান পেয়েছিল। কবির অপ্রকাশিত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধের কথা না হয় নাই লেখা হল কিন্তু শত শত কবিতা বহুকাল পর্যন্ত প্রকাশের অন্তরালে পড়েছিল। কবি জানলেন না প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের গহন পথে আজ অবধি হেঁটে চলেছেন। অগ্রন্থিত নির্জনতার কবি লিখেছেন - ‘মিনারে মেঘ সোনালি চিলেরে তার জানালয় ডাকে’। কবি তাঁর তীক্ষ্ণ কল্পনা শক্তি দিয়ে হরণ করে এনেছেন সুদূর মিনারের মেঘ। এক বিকেলের আড্ডা ফেলে জানালয় দাঁড়িয়ে ডাকবেন কোনও সোনালি ডানার চিলকে, যে রোদ্দুর সব আলো ডানায় মেখে, মেঘকে নামিয়েছে মিনারের চূড়ায়।    

      'আমার জীবনে কোনও ঘুম নাই

      মৎসনারীদের মাঝে সবচেয়ে রূপসী সে নাকি

      এই নিদ্রা?

      গায় তাঁর ক্ষান্ত সমুদ্রের ঘ্রাণ - আবাদ সুখ

      চিন্তার পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন - বিমুখ

      প্রাণ তার ……'

                    এই নিদ্রা/ অগ্রন্থিত কবিতা

মৎসকন্যাদের মাঝে সবচেয়ে রূপবতী হোল নিদ্রা। সে নিদ্রার কথা ভেবেই কবি নির্ঘুম সমুদ্র-ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছেন। গোলাপি আভায় ঢাকা ধূসর মেঘ যেমন বোঝে না বিয়োগ-ব্যথা ঠিক তেমনি পাখি-মন, প্রজাপতি-শতদল কখনও ছুঁয়ে দেখে না বিষণ্ণ নিঃশ্বাস। কবি ‘পাখি’ কবিতায় জ্যোৎস্না ও শীতের মাঝে আনন্দ এবং হাহাকার অনুভব করেছেন। তবু তাকে চেয়েছেন এই শীতে, শোক বিহ্বল চোখে সে আসুক, শিহরণ জাগাক নিস্তব্ধ ঘাসের শরীরে, যেখানে জ্যোৎস্নারা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকে, অঘ্রানের বিকেলের রঙে আরও শূন্যতায় ভ’রে উঠলে রংচটা বাদামী পাখি অপেক্ষায় থাকে এক ঝাঁক উজ্জ্বল রোদের জন্য।

    পাতা কুড়াবার দিন এসে অপেক্ষা করে ঘাসের উঠোনে। সোনামাখা ধান রুপোলি কারুকাজ ভুলে গিয়ে শুয়ে থাকে মাঠের উল্টো পিঠে। তবু কবি আহ্বান করেন, কেউ যেন এঁকে যায় অঘ্রানের বিকেলের ছবি। শিশির এসে মুছে দিয়ে যাক ভুল রঙের অনুজ্জ্বল কথামালা। “আমি এই অঘ্রাণেরে ভালোবাসি - বিকেলের এই রং - রঙের শূন্যতা/রোদের নরম রোম - ঢালু মাঠ - বিবর্ণ বাদামি পাখি - হলুদ বিচালি। পাতা কুড়াবার দিন ঘাসে ঘাসে - কুড়ুনির মুখে নেই কোনও কথা’’। এই সব কোলাহল রেখে কবি পেরিয়ে যেতে চান সব জীবনের মানে পিছনে ফেলে। কিন্তু কবিতো নির্জনতার! কোথায় হারাবেন তিনি! নাকি কল্পনার মেঘে চড়ে সব অগোচরে দেখে যাবেন অঘ্রানের মাঠ, কার্ত্তিকের কুয়াশা, মাছরাঙার ঠোঁট, জ্যোৎস্নার অসীম বিল। কবি চলে গেছেন অরণ্যের পাতার ফাঁকের এক লোভী টুকরো আলোর পেছন পেছন।

    'চলে গেছি;

এ জীবন কবে যেন মাঠে মাঠে ঘাস হয়ে রবে

নীল আকাশের নিচে অঘ্রানের ভোরে এক

- এই শান্তি পেয়েছি জীবনে

শীতের ঝাপসা ভোরে এ জীবন

ভেলভেট জ্যাকেটের মাছরাঙা হবে

একদিন - হেমন্তের সারাদিন

তবুও বেদনা এল - তুমি এলে মনে

হেমন্তের সারাদিন - অনেক গভীর রাত -

অনেক অনেক দিন আরও

তোমার মুখের কথা - ঠোঁটে রং চোখে চুল -

এই সব ব্যথা আহরণে” 

                                     এই শান্তি/ অগ্রন্থিত কবিতা

    

    কবি ঝাপসা ভোর আর ভেলভেটের জ্যাকেট যেন মুড়ে দিলেন একে অপরকে। এমন করে গেঁথে দিয়েছেন জীবনের মানে। কবিতার সাথে প্রকৃতি, প্রকৃতির সাথে দেহ - মন, শীতের সাথে কুয়াশা-জ্যাকেট যেন মিলিয়ে দিলেন লাইনের পর লাইন। কবি কখনো বুনোহাঁসের পালকে পালকে উড়ে যেতে দেখেছেন জ্যোৎস্নার আলো, শবের জঙ্গল ছেড়ে নদী মাঠ খেয়া ঘাট ফেলে উড়ে চলেছে পাখি সব। কবে কোন কোমল স্থির নিরিবিলি পালকের রুপো দিয়ে বনের আঁধার বুনেছিল, কবি আজ এপারে বসে শুনতে পান বুনো মোরগের বুকে জেগে থাকা রাতের বিস্ময়। সব বিস্ময় কেটে গিয়ে জীবনানন্দের আলোয় আলোকিত হতে থাকবে আগামীর কবিতার শব্দ সম্ভার, রূপসী বাঙলায় কবি বার বার ফিরে আসবেন শিশিরের শব্দের মতন।

পরিবেশ

দূষণ

কৃষ্ণতরু বর্মন

   ডালাস, টেক্সাস

পরিবেশের ক্ষতি করতে পাওয়ার প্লান্টের ভূমিকাও কম নয়। আমেরিকাতে প্রতি বছর পাওয়ার প্ল্যান্টএর দূষণের ফলে প্রায় ২৩,০০০ মানুষ মারা যান। ইউ এস এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সির তক্তাবোধনে একটি কন্সাল্টিং কোম্পানির রিপোর্ট এ জানা যায় ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের একটি পর্যবেক্ষক দল গত বছর আগষ্ট মাসে একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট ২৪ ঘন্টা বন্ধ থাকার আগে ও পরে দূষণের মাত্রা পরীক্ষা করার জন্য সমীক্ষা চালায়।

     রিবেশ দূষণ বেশ পরিচিত শব্দ। যদিও এর প্রভাব বা কুফল সম্মন্ধে আমরা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল, তবুও দূষণ ছাড়া আমাদের একটি দিনও চলা সম্ভব নয়। কোন না কোন ভাবেই এই দূষণ আমাদের নিত্য সঙ্গী, তা আমরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন। এটা কোন প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এই সমস্যা এখন সারা পৃথিবীর।
       মানুষ আজ এক কঠিন সমস্যার মুখোমুখি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজে পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে যে লাফালাফি করা হয়, বাস্তবে আমরা কতটা সচেতন? এক কথায় উত্তর বেশ কঠিন। একেবারে যে সচেতন নই যে তা ঠিক না, আবার যতটা দরকার ততটা আমরা পারি কি? যদি তাই-ই হত প্রতি বছরে শুধু বায়ু দূষণেই তিন মিলিয়ন মানুষ মারা যেত না।
      বায়ু ও জলকে পরিবেশ দূষণের মধ্যম হিসাবে ধরা যেতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা আমরা নিজেই। আমাদের চরম অবজ্ঞা ও অবহেলাই আমাদের সবাইকে চরম বিনাশের দিকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে চলেছে। অজ্ঞতা বলা হয়ত ঠিক হবে না, এক অদ্ভুত উদাসীনতাই আমাদের বিপদ ডেকে আনছে। তবে যে সবাই হাত গুটিয়ে বসে তাও ঠিক না। সম্প্রতি ব্রিটেনের দূষণ বিষয়ক একটি রিপোর্টে জলকেই দূষণের প্রধান মাধ্যম হিসাবে ধরা হয়েছে। এই দেশের ৭৬ শতাংশই জুড়ে রয়েছে ছোট বড় ফার্ম। এই সমীক্ষায় জানা গেছে, এই সমস্ত ফার্মগুলির পরিচালন-গত ত্রুটি থাকার ফলে নিকটবর্তী নদী, লেক বা জলাশয়েই ৯০ শতাংশ নাইট্রেট ও ৪০ শতাংশ ফসফরাস মিশ্রিত হয়। জলে নাইট্রেট ও ফসফরাসের মিশ্রণে ইউট্রোফিকেশন অবস্থার সৃষ্টি হয় যাতে কিনা অ্যাকোয়েটিক পরিবেশের ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাছাড়া এলগল ব্লুম যেমন অ্যালগে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয় ফলে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ সরকার ইতিমধ্যে প্রায় দুই লক্ষ্য চাষীকে তাদের ফার্মগুলি দূষণমুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। সরকারী মহলের ধারণা এর ফলে প্রায় ১৫ – ২০ শতাংশ ফার্ম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাস্তবে কাজ কতটা এগোবে তাতে সন্দেহ থাকলেও উদ্যোগটি যে বেশ প্রশংসাজনক তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এই দূষণের ভয়াল করাঘাত থেকে বাদ পড়ে নি মহাসাগরও। ধরা যাক, ‘রেড টাইড’ এর কথা। সমুদ্রের ধারে একধরণের লাল রঙের এলগি পাওয়া যায় যাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলা হয় ‘রেড টাইড’। দঃ আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্বে ফ্লোরিডার টেম্পা উপকূলে এই ধরনের এলগি পাওয়া যায়। অনেকটা সেলের মত দেখতে বিভিন্ন প্রজাতির মেরিন উদ্ভিদ একত্রে মিলিত হয়ে এই রেড টাইড তৈরি করে। এগুলোতে কেমিক্যাল টক্সিন থাকায় সামুদ্রিক মাছ তো

মরেই তাছাড়া এই সংস্পর্শে এলে মানুষেরও রেসপিরেটরি সমস্যা দিতে পারে। শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত কেমিক্যালই জলে দূষণের মূল কারণ। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী শিল্প ও কৃষিজাত বর্জ্য পদার্থগুলির বিনষ্টিকরণ পদ্ধতি বেশ জটিল ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তার ফলে ছোট কিংবা বড় উৎপাদনশীল সংস্থাগুলি সবার লক্ষ্যে বা অলক্ষ্যে নিকটবর্তী নদী বা লেকে তাদের বর্জ্য পদার্থগুলি ফেলে দিতে দ্বিধা বোধ করে না। পরিবেশ সচেতনতার আর কি বড় উদাহারণ থাকতে পারে! পরিসংখ্যান থেকেই জানা যায় যে, ১৯৭০ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যেই সারা বিশ্বে কেমিক্যাল দ্রব্য বিক্রি ১৭১ বিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫০০ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে অর্থাৎ কিনা প্রায় ৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিকারক দ্রব্যগুলির মধ্যে পড়ে ব্যাটারিতে থাকা মার্কারি, গ্যাসোলিনের সীসা এবং পলিউটেন্ট যেগুলো তেল থেকে তৈরী করা হয় যেমন প্লাস্টিক। এই হেভি মেটাল পুরো ফুড চেইনকে কন্ট্যানিমেট করে।  এর ফলে বিষক্রিয়া থেকে আমরাও বাদ পড়ি না।
দূষণের ফলে গত ৫০ বছরে ইউরোপে ও আমেরিকাতে টেস্টিক্যাল ক্যান্সারের হার প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রেষ্ট ক্যান্সার ১৯৬০ সালে যেখানে ছিল প্রতি ২০ জনে ১, এখন সেটা বেড়ে প্রতি ৮ জনে ১ জন এসে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া প্রতি বছর ১০০০ নতুন নতুন কেমিক্যাল তৈরী করা হচ্ছে, যা কিনা বাজারে আরো ৭,০০০ কেমিক্যাল মলিকিউলস এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কেমিক্যালের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। দূষণ এত মারাত্মকভাবে বাড়ছে যে প্রাণীর রেসপিরেটরি অঙ্গগুলিকে ব্লক করে দেয় এমন ডি-ডি-টি অ্যান্টার্কটিকার পেঙ্গুইনের ফ্যাটেও পাওয়া গেছে।
সারা বিশ্বে নিউক্লিয়ার ওয়েস্টের পরিমাণ প্রায় ২০০,০০০ টন। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যপদার্থ নিয়ে আমরা কি করব? এক কথায় উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন। আর এও জানি যে কমপক্ষে এর ৫ শতাংশ আগামী হাজার হাজার বছর এই পৃথিবীতে থাকবে। উন্নতিশীল দেশগুলি যেমন ইংল্যান্ড, জার্মানি, হল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া তাদের নিউক্লিয়ার বর্জ্যপদার্থ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে রপ্তানি করে। এর পিছনে প্রধান কারণ বর্জ্যপদার্থ বিনষ্টকরণ পদ্ধতি বেশ জটিল ও অর্থবহল। তবে তৃতীয় বিশ্বের দেশ এখন কিন্তু আমদানীর ব্যাপারে বেশ সতর্ক। ১৯৯১ সালে ‘বামকো’ চুক্তির মাধ্যমে দঃ আফ্রিকা বর্জ্যপদার্থ আমদানি বন্ধ করেছে। দঃ পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি কিন্তু এখনো আমদানি বন্ধ করে নি। একটি সার্ভতে জানা গেছে আমেরিকার রিসাইকেল্ড কমপিউটারের অর্ধেকই চীনে রপ্তানি হয়। তাছাড়া উন্নতিশীল দেশে যে সব দ্রব্য সামগ্রী নিষিদ্ধ প্রায় ৪৭ রকমের ওষুধ, ৫০০,০০০ টন কীট নাশক সেগুলো অনায়াসে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে বিক্রি হচ্ছে।

আমেরিকার কথাই ধরা যাক। আপাতদৃষ্টিতে এখানকার পরিবেশ অন্য দেশের তুলনায় বসবাস যোগ্য মনে হলেও এদেশে দূষণের বহর কম নয়। শিল্প হল এদেশের পরিবেশ দূষণের মূল কারণ। প্রায় ৩৭০ হাজার উৎপাদনশীল সংস্থা তাদের শিল্পজাত বর্জ্যপদার্থ নদী, লেক বা কোন স্ট্রিমে ফেলে দেয়। ইউ এস এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সির মতে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ নদী, লেক বা স্ট্রিমের জল এত দূষিত যে তা ব্যবহারের অযোগ্য। এই পলিউটেন্টের মধ্যে আছে ফসটেট, নাইট্রেট, মার্কারি, সীস, কস্টিক সোডা, সালফার, সালফিউরিক অ্যাসিড, পেট্রোকেমিক্যাল ও অন্যান্য সোডিয়াম কম্পাউন্ড। জমিতে ব্যবহৃত

কীটনাশকের ভূমিকাও কম নয়। সারা বিশ্ব জুড়ে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। আমেরিকার স্যান জ্যাকুইন এ বছর কীটনাশক জনিত দূষণ একধাপে ৩৪ শতাংশ বেড়ে গেছে। যার ফলঃশ্রতু এখানকার এলাকার বাতাসে প্রায় ৬ শতাংশ স্মোক মেকিং গ্যাস বেড়েছে। কাজেই প্রতিদিন সারা পৃথিবীতে যে কত পরিমাণ কীটনাশক জনিত দূষণ ছড়াচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। এই স্মোক গ্যাসের প্রকোপে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ অ্যাজমাতে ভোগেন। ১৯৯৭ সালে অ্যাজমা রোগীর আনুমাণিক সংখ্যা ছিল ১৪.৯ মিলিয়ন। তার মধ্যে শিশুর সংখ্যাই ছিল প্রায় ৫ মিলিয়ন। শুধুমাত্র পূর্ব আমেরিকাতেই ১৯৯৭ সালে ১৬০,০০০ মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ভর্তি হয়েছিলেন।
     পরিবেশের ক্ষতি করতে পাওয়ার প্লান্টের ভূমিকাও কম নয়। আমেরিকাতে প্রতি বছর পাওয়ার প্ল্যান্টএর দূষণের ফলে প্রায় ২৩,০০০ মানুষ মারা যান। ইউ এস এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সির তক্তাবোধনে একটি কন্সাল্টিং কোম্পানির রিপোর্ট এ জানা যায় ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের একটি পর্যবেক্ষক দল গত বছর আগষ্ট মাসে একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট ২৪ ঘন্টা বন্ধ থাকার আগে ও পরে দূষণের মাত্রা পরীক্ষা করার জন্য সমীক্ষা চালায়। এতে দেখা গেছে প্ল্যান্টটি চব্বিশ ঘন্টা বন্ধ থাকার ফলে বাতাসে সালফারডাই অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ ৯০ শতাংশ এবং স্লগ স্মোকের পরিমাণ ৫০ শতাংশ কমে গেছে। বলাবাহুল্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা পাওয়ার ইন্ডাস্ট্রি এই রিপোর্ট মানতে চান না। তবে ১৯৯৮ সালে একটি সরকারী রিপোর্টে জানা যায় বাতাসে ছড়িয়ে থাকা সালফারডাই অক্সাইডের ৬৭ শতাংশ, নাইট্রোজেন অক্সাইডের ২৫ শতাংশ, মার্কারির ৩৩ শতাংশ এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের ৪০ শতাংশই আসে এই পাওয়ার প্ল্যান্টগুলি থেকে।
    এবারে হু-এর (ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন) একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টের দিকে তাকানো যাক। মেক্সিকো সিটির নাম একদম উপরে। এই শহরের বাতাস হু এর মতে পৃথিবীর সবচেয়ে কন্ট্যামিনেটেড। যখন কোন ব্যাক্তির বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে কম করে এক দিনও তার নিঃসৃত বাতাসে ১০০-১২০ পি পি বি (পার্টস পার বিলিয়ন) ‘ওজোন কন্ট্যামিন্যান্টস’ থাকে তাহলে সেই বাতাসকে কন্ট্যামিনেটেড বলে ধরা হয়। এই শহরের বাসিন্দাদের বছরে প্রায় ৩০০ দিনই তাদের নিঃশ্বাসে গড়ে ২৫০ পি পি বি ওজোন কন্ট্যামিন্যান্টস নিয়ে থাকেন। এর ফল স্বরূপ শহরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকের রিপোর্ট অনুসারে ৪০০,০০০ মানুষ চিকিৎসার জন্য ভর্তি হন এবং কম করে ৩০০ !!! জন মানুষ মারা যান।
     দূষণ নিয়ে লিখতে গেলে পাঠকদের সামনে এরকম অজস্র উদাহারণ তুলে ধরা যেতে পারে। চলতেই পারে নানা যুক্তি তর্কের নানা ভারী ভারী পর্যালোচনা। যতই আমরা এই দূষণ নিয়ে আলোচনা করি না কেন, এই প্রভাব ক্ষণিকের। সাময়িকভাবে মনে রেখাপাত করলেও কয়েক মিনিটেই উধাও। যা হয় হবে, কি আর করা যাবে গোছের একটা আড়মোড়া ভেঙে ল্যাপটপের সাট-ডাউন করে দিলেই মস্তিষ্ক ফাঁকা। দু-পা দূরে লিভিং রুমের সোফায় একটা জম্পেশ সিনেমা চালিয়ে দিলেই ব্যস... মনটা ফুরফুরে হালকা।

 

 

 অশোকের

রক্তিমরাগে

সুস্মিতা দত্ত

...চিরসবুজ প্রকৃতির শিম্বগোত্রীয় এই উদ্ভিদটি ১৫-২০ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। পাতাগুলি ১৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ আয়তাকার। হলুদ-কমলা বা লাল রঙের গুচ্ছাকারে সারা বছর ফুল ফোটে, তবে মার্চ থেকে মে মাসে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। ফুলগুলি সুগন্ধিযুক্ত। ফলগুলি মসৃণ, চর্মকৃত চওড়া । জন্মস্থান উষ্ণমন্ডলীয় বৃষ্টি প্রধান অঞ্চল প্রধানত ভারত, বর্মা ও মালয়েশিয়া।

গাছ 

শোকের রক্তিমরাগে
রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে
রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত আকাশে  

                                        ----- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

     অশোকের রক্তরাগ মাখানো আকাশ হৃদয়ে দোলা জাগিয়ে ঋতুরাজ বসন্তের আগমন বার্তাকে সূচিত করে। মেতে ওঠে প্রতিটি হৃদয় রঙের খেলায়। অশোক ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত শুকনো পাহাড়ী অঞ্চলের বিশেষত গ্রাম বাংলার রাঢ় অঞ্চলের একটি বিলুপ্তপ্রায় বৃক্ষ। বৈজ্ঞানিক নাম Saraca Asoca। একে আঙনপ্রিয়া বা হেমপুষ্প ও বলা হয়।  সব শোক হর্ন করায় এর আর এক নাম অশোক অর্থাৎ নাই শোক বা শোকবিহীন বৃক্ষ।    

      ভারতীয় পৌরাণিক চরিত্র কুবেরের যক্ষিণীর সাথে জড়িত এই অশোক বৃক্ষ। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন বৌদ্ধ ও হিন্দু মন্দিরের প্রবেশদ্বারের শিল্পকলায় এর স্থাপত্য নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। 

     অশোক গাছের নিচে মূলে দণ্ডায়মান প্রস্ফুটিত ফুলের শাখা হাতে  নারী মূর্তি উর্বরতার দেবীর প্রতীকী হিসেবে গণ্য করা হয়। হিন্দুশাস্ত্র মতে প্রেমের দেবতা কামদেবের পঞ্চবাণের একটি পুষ্প এই অশোক ফুল। আবার হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণে সিঙ্ঘলরাজ রাবণ রামচন্দ্রের সীতাকে এই অশোক বাটিকাতেই বন্দিনী করে রেখেছিলেন যেখানে প্রভুভক্ত হনুমান মাতা সীতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরম্পরায় এই পবিত্র বনস্পতিটি প্রতিবছর চৈত্রমাসে পূজিত হয়।
                          

ফুল


       চিরসবুজ প্রকৃতির শিম্বগোত্রীয় এই উদ্ভিদটি ১৫-২০ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। পাতাগুলি ১৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ আয়তাকার। হলুদ-কমলা বা লাল রঙের গুচ্ছাকারে সারা বছর ফুল ফোটে, তবে মার্চ থেকে মে মাসে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। ফুলগুলি সুগন্ধিযুক্ত। ফলগুলি মসৃণ, চর্মকৃত চওড়া । জন্মস্থান উষ্ণমন্ডলীয় বৃষ্টি প্রধান অঞ্চল প্রধানত ভারত, বর্মা ও মালয়েশিয়া। ভারতে এটি হিমালয় অঞ্চলে, কেরালা, দাক্ষিণাত্য মালভূমি অঞ্চলে এবং পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায়। 

     পবিত্র এই উদ্ভিদটির ছাল, পাতা, বীজ, ফুল সবই মূল্যবান ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই ঔষধিটির ছালে রয়েছে

পাতা

tannins, flavonoids, steroids, volatile oil, glycosides, and various steroidal glycosides. পাতা থেকে পাওয়া যায়  carbohydrates, tannins, gallic acid এবং egallic acid.  ফুলগুলি সমৃদ্ধ saracasin, saracadin, waxy substances, proteins, carbohydrates and steroids এ এবং বীজে রয়েছে  বিভিন্ন fatty acids, oleic, linoleic, palmitic and stearic acid.
তিক্তস্বাদ বিশিষ্ট এই ঔষধিটি ক্ষত, আলসার, টিউমার দূরীকরণে ও রক্তক্ষরণ রোধে ব্যবহৃত হয়। এই ঔষধিটির স্বাভাবিক পরিষ্কারক ধর্ম থাকায় এটি শরীরের বিষক্রিয়া দুর করে সাহায্য করে। শীতলকারক এই বনস্পতিটি শুধু কৃমিনাশকই নয়, এটি হৃদরোগের মহাষৌধ, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, ক্লান্তি দুর করে এবং হরমোনের সমতা বিধান করে। রক্তের উপাদান গুলির ও রক্ত সঞ্চালন নিয়মিত করে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া মহিলাদের বাধক যন্ত্রণা দূরীকরণ এবং ঋতুস্রাব নিয়মিত করতে, জরায়ু রক্তক্ষরণ ও জরায়ু টিউমার, ডিম্বাশয়ের সিস্ট, প্রদরস্রাব সারাতে এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঔষধি। এছাড়াও পিত্ত ও কলিক যন্ত্রণার ঔষধ।
উপকারী এই ঔষধি বৃক্ষটিকে শহরাঞ্চলে রাস্তার দুধারে রোপন করা হলে  ছায়াপ্রদানের সাথে সৌর্ন্দ্রয্যায়ন ও হবে এবং অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষিত হবে।

 

ফল ও বীজ 

স্বপ্ন - সত্য- বাস্তব

মিজানুর রহমান মিজান

......বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর বিচিত্র রূপ সর্বক্ষণ ধারণ করে চলছে কালের চাকায় পিষ্টতার নিরিখে। সমাজ, সামাজিকতা পরিবর্তনশীল অহরহ নিত্য নুতন রূপে। আরো বিচিত্রিতা বৈচিত্র্যময় বাংলার শ্যামল সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত প্রান্তরে কত মানুষ কত রূপে যে জীবন যাপিত করছে তার হিসাব আমরা বা ক‘জন রাখি? আমরা প্রয়োজন বোধ করি ? তবে জেনে রাখা ভাল সম্ভব হলে এ প্রয়োজনটুকু বোধ আপন নিবাস থেকে চাওয়া-পাওয়া রূপে।

     ডিগ্রি পরীক্ষার রেজাল্ট আউট হয়েছে তিন দিন পূর্বে জানা থাকা সত্ত্বে ও একটা অজানা আশঙ্কা, দ্বিধা, সংকোচে ফলাফল দেখতে শফিক কলেজে যাচ্ছে না। ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অনুরোধে সবার অলক্ষ্যে চুপিসারে ঐদিন রাত্রে কলেজে যাবার পথে সহপাঠী আতাউর যখন বলল, “শফিক পাশ করেছ জেনে ও কেন আমাকে দেখা দিচ্ছ না? আতাউর ও শফিক একই সঙ্গে ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়েছিল, পাশ ও করেছে। কিন্তু' শফিক এ মাত্র যাত্রারম্ভ করেছে বাস্তব ও সত্যতা যাচাই করতে ফলাফল সম্পর্কে। কারণ শফিকের মনে একটা দ্বন্ধ। সে পাশ করতে পারবে কি না? আজ ঘনিষ্ঠ বন্ধু কয়েছ দু‘বার পরীক্ষায় ফেল করে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে বেকার জীবন কাটাচ্ছে। দরিদ্র পিতামাতার এক মাত্র সন্তান শফিক হওয়া সত্ত্বে ও অমানসিক পরিশ্রম আর কষ্টের বিনিময়ে দ্বিতীয় বিভাগে এস এস সি পাশ করেই একটি দোকানে চাকুরী গ্রহণ করে। চাকুরীতে অনভ্যাস' এবং ভোর ৬টা থেকে এক নাগাড়ে রাত্রি ১২টা পর্যন্ত কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়ায় চাকুরীতে ইস্তফা দিতে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। কারণ শফিকের কাজে ফাঁকি দেয়ার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই। বরং অতিরিক্ত কাজ করতে ইচ্ছুক বা সদা প্রস্তুত। সুতরাং মালিক পক্ষ শফিকের দায়িত্ববোধ, কর্তব্যে একনিষ্ঠতা ও সততায় মুগ্ধ হয়ে বার বার থাকার অনুরোধ উপেক্ষা করে একদিন চলে আসে। প্রাপ্ত বেতনের সামান্য অংশ আট সদস্যের পরিবারে খরচ করে বাকী টাকা দ্বারা কলেজে একাদশ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয় যদি ও সে ছাত্র ছিল মানবিক বিভাগের এস এস সি-তে। শফিক লেখাপড়ায় অত্যন্ত ভাল ছিল বলে আলাদা একটা সুনামের অধিকারী ছিল স্কুল সহ এলাকায়। অনেক সহপাঠী চ্যালেঞ্জ করে ও দ্বিতীয় স্থানে পিছু হঠাতে পারেনি কখন ও। প্রত্যেকটা পরীক্ষায় প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ফাষ্ঠ বয় হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে।১৯৭৭ সালে শহর ব্যতীত পল্লী অঞ্চলে কোন কলেজ শফিকের এলাকায় ছিল না। তাছাড়া শফিকের বাড়ি থেকে শহরের দূরত্ব ছিল (১২ মাইল) প্রায় ১৮ কিলোমিটার। শহরের সাথে যোগাযোগের এক মাত্র ব্যবস্থা ছিল রেলওয়ে। বাড়ি থেকে ৫ কি.মি পায়ে হেটে ষ্টেশন পর্যন্ত পৌছাব। সেখান থেকে ট্রেনে শহরে পৌছা অবলম্বন। কোন দিন ট্রেন ফেল করলে শ্রীচরণের উপর নির্ভর করে অভীষ্ট বা গন্তব্যস্থল'ল কলেজে পৌছতে হত। তবে এখনকার মত নয়টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে  এ প্রশ্নের উদ্রেক হত না। যথা নিয়মে নির্দিষ্ট সময় ট্রেন চলাচল ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার, দৈবাৎ ব্যতিক্রম ছাড়া। সুতরাং ট্রেন ফেলের ভয়ে সেহরীসম খাবার খেয়ে শহরে পৌঁছে দশটার তথা ক্লাস আরম্ভ হবার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত হোটেল অথবা কলেজের ক্যান্টিনে বসে সময় কাটাতে হত। তবে একটা সুন্দর ও আনন্দ ঘন পরিবেশ ছিল অত্র এলাকা থেকে তখন কলেজ যাত্রী ছাত্র সংখ্যা প্রায় চল্লিশ জনের মত ছিল নিয়মিত। শফিক বন্ধুদের সাহচর্যে থেকে ক্লাস করে। তারপর ও নিয়তির অমোঘ বিধান আর ভাগ্যের সুপ্রসন্নতা বুঝি অদূরে থেকে মিটি মিটি হাসছিলেন। অর্থনৈতিক দুরাবস্থা এবং পারিবারিক দায়িত্ব বোধে সচেতনতার জন্য চাকুরী বা অর্থোপার্জন অতীব জরুরী হয়ে পড়ে। সমস্যা জর্জরিত জীবনে পড়ালেখায় মনোযোগী

কতক্ষণ থাকা সম্ভবপর? চারদিক থেকে অমাবস্যার আঁধার চাঁদের আলোকে ম্লান করে দেয় ধীরে ধীরে। অন্যনুপায় হয়ে একজন উকিলের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করে দিনের বেলা। প্রয়োজন আর বাস্থবতার নিরিখে কলেজের দিবা বিভাগ থেকে নৈশ বিভাগে পরিবর্তন আনতে হয়। তিন মাস বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুবাদে স্যারদের আশ্বাস বাণী বা আত্ম-বিশ্বাস এসেছিল শফিকের প্রতি মানবিক বিভাগ থেকে আসলে ও বিজ্ঞান বিভাগে সফলতা অর্জনের সম্ভাবনার পরিচয়। কিন্তু' নৈশ বিভাগে বিজ্ঞান বিভাগের সুযোগ ছিল না। তবে সবচেয়ে আশার কথা তখন নৈশ বিভাগ ছিল মদন মোহন কলেজ বলে অন্তত পক্ষে শফিকের লেখাপড়া করার একটা পথ ছিল। নতুবা অকালে ঝরে পড়ত অত্যন্ত আগ্রহী থাকা সত্ত্বে ও। সে সময় বর্তমানের মত এত সুযোগ বা বেসরকারী ব্যবস্থা'ও ছিল না। যা হোক শফিক গ্রুপ পরিবর্তন করে বাণিজ্য বিভাগের বই পত্র পুরাতন ক্রয় করে পরিচিত অগ্রজ এক জনের নিকট থেকে। কলেজ যাত্রী সহপাঠীদের সহিত আংশিক সাহচর্য রল শফিকের ভাগ্য লিপির খাতায়। সকালের ট্রেনে প্রতি দিন সবার সহযাত্রী থাকা সম্ভব হল না। বন্ধুরা কলেজের পাঠ সমাপ্তির পর বিকাল বেলার ট্রেনে বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা। আর শফিক দিনের বেলা কর্তব্য পালনের পর নৈশ বিভাগে ক্লাস করে রাত্রি দশটার ট্রেনে বাড়ি অভিমুখে যাত্রা করে গৃহে পৌঁছে আহার বিহার সমাপ্তির পর নিদ্রা দেবীকে জড়িয়ে কতক্ষণ পর সেহরী তুল্য আহার গ্রহণ এবং গোসল, পোষাক পরিচ্ছদ পরিধানের পর প্রাত্যহিক কাজ শুরু করতে সময় কতটুকু থাকে, তা সহজে অনুমেয়। তথাপি শফিকের জীবন যুদ্ধ থেমে নেই। একজন অকুতোভয় সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ ক্ষেত্রে অগ্রযাত্রী রূপে অগ্রসরমান। 

      বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর বিচিত্র রূপ সর্বক্ষণ ধারণ করে চলছে কালের চাকায় পিষ্টতার নিরিখে। সমাজ, সামাজিকতা পরিবর্তনশীল অহরহ নিত্য নুতন রূপে। আরো বিচিত্রিতা বৈচিত্র্যময় বাংলার শ্যামল সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত প্রান্তরে কত মানুষ কত রূপে যে জীবন যাপিত করছে তার হিসাব আমরা বা ক‘জন রাখি? আমরা প্রয়োজন বোধ করি ? তবে জেনে রাখা ভাল সম্ভব হলে এ প্রয়োজনটুকু বোধ আপন নিবাস থেকে চাওয়া-পাওয়া রূপে। এতে লাভ ছাড়া ক্ষতি দেখি না। একাধারে দু‘মাস শফিক আইনজীবির সহকারী হিসেবে ব্যয় করে যদি ও একটু স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল। কিন্তু' তার মনে অজানা একটা শঙ্কা ও সংকোচ বোধ ছিল সদা জাগ্রত। “এখানে নয়, অন্য খানে, অন্য কোথাও “এ ভাব বা বোধে ছিল মত্ত। সত্যিই এক দিন এ কাজে ইস্তফা দিয়ে ঢুকে পড়ে সাব রেজিষ্টারী অফিসে নকল নবীশ পদে যোগদানের মাধ্যমে। নকল নবীশ চাকুরী থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা পাশ করে তৃতীয় বিভাগে। শফিক দারুণ চিন্তায় পতিত হল । তৃতীয় বিভাগে পাশ করা কাম্য ছিল না। কিন্তু' ভোর বেলা বাড়ি হতে রওয়ানা হয়ে রাত ১২ টা - ১টায় এসে লেখাপড়ার সুযোগ কতটুকু তা আবার একটু তীক্ষ্ন দৃষ্টি প্রখরতা মেলে দিলে অংক মেলবে। তথাপি শফিকের জীবন যুদ্ধ থেমে নেই। কারণ পৃথিবী ঘূর্ণায়মান ,আর জীবন চলমান, চলতেই হবে। চলা থামানো সম্ভব নয় এ দুনিয়ার ঘূর্ণিপাকে।  

        এত পরিশ্রম করে শারীরিক, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত' হয়ে চিন্তার মহাসমুদ্রে সাতার কেটে চলেছে। কোন কুল কিনারা নেই। চোখের সম্মুখে ভেসে উঠে মা-বাবা-বোনদের করুণ চাহনি। অপর দিকে লেখাপড়ার অত্যন্ত আগ্রহ , ইচ্ছাকে দমন করতে ও বিবেক নামক বস' বার বার দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য সচেতনতার ঘণ্টা অনবরত চোখের সামনে তুলে ধরে। তাছাড়া ডিগ্রি ক্লাসে লেখাপড়া করা কতটুকু সহজ বা কঠিন তা শিক্ষিত মাত্রই জ্ঞাত। 
         ঐ হোক অনেক ভাবনা চিন্তার পর ভর্তি হল ঠিকই ফাষ্ট ইয়ারে নাইট বিভাগে। কিন্তু' লেখাপড়ার পরিধি এবং কাজের সমন্বয় সাধনে অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। এক মাস ক্লাস করার পর লেখাপড়া ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয় বাধ্য হয়ে চাকুরীকে ধরে রেখে। এখানে মনে হয় ভাগ্য দেবী সুপ্রসন্ন হয়ে শফিককে আহবান জানান প্রথম থেকে দশম পর্যন্ত পঠিত একটি মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের। শফিক বহু চিন্তা ভাবনার পর সিদ্ধান্ত নেয় অন্তত পক্ষে শহরে যাওয়া আসার সময়টুকু বাঁচবে। অপর পক্ষে মাদ্রাসা বাড়ির নিকটবর্তী এবং শিক্ষকতায় লেখাপড়ার সহায়তা ও অর্থনৈতিক দিক সচল থাকবে। নিজের পক্ষে লেখাপড়ার পথ সুগম হবে। সুতরাং স্কুলে (মাদ্রাসায় ) যোগদান করাই শ্রেয় বিবেচনায় চাকুরী ছেড়ে বাড়িতে আসে। মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে এক বছর অতিক্রান্তে সাধ্য মত লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করে। এমনি সময় ডাক আসে শফিকের নিজ অধ্যয়নকারী হাই স্কুলে যোগদানের নিমিত্তে। এলাকার আহবানকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ চিত্তে যোগদান করে ঐ স্কুলে সহকারী শিক্ষক রূপে। স্কুলে ঐ সময় তারই অপর এক সহপাঠী ও যোগদান করে। সহপাঠির লেখাপড়া নিয়মিত সচল থাকলে ও শফিক অনিয়মিত। ফাষ্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে উত্তীর্ণ পরীক্ষা শফিকের দেয়া সম্ভব হয়নি নানাবিধ জটিলতার কারণে। লেখাপড়ার ক্ষেত্রে যবনিকাপাত ঘটেপ্রায় শফিকের জীবনে। কিন্তু' টেষ্ট পরীক্ষার মাত্র এক মাস পূর্বে শফিকের ভাবান্তর ঘটে, দারুণ আগ্রহ ও ঝোঁক চেপে বসে মাথায় এবং অধ্যক্ষের নিকট যোগাযোগ করে তার হৃদয়ের আর্তি অতি যত্ন সহকারে প্রকাশ করে তিনির দোয়াসহ অনুমতি প্রার্থী হয়। শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ মহোদয় শফিকের অদম্য স্পৃহা, আগ্রহ, ইচ্ছা, অনুপ্রেরণা, উৎসাহ উদ্দীপনায় মুগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছার ইচ্ছা প্রকাশ বা মতামত প্রদান করেন। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ফলাফলে সবাইকে চমকে দিয়ে উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু' সহপাঠী (যে নিয়মিত) অবিশ্বাস্য ও অপ্রত্যাশিত ভাবে ফেল করে। কিন্তু' আমি নির্ধিদ্বায় ও অত্যন্ত সচেতনতার সহিত বলতে পারি দৃঢ়তার সঙ্গে নকল নামক শব্দটির সঙ্গে শফিক ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ,অখ্যাত। শফিকের মেধা শক্তিই তার সাফল্যের চাবি কাঠি। কিন্তু' লজ্জায় এ সকল প্রতিভা থেকে যায় অজ্ঞাত, লোক চক্ষুর অন্তরালে। পল্লীতে এমন অনেক প্রতিভা সুপ্ত বিকশিত হতে পারে না দারিদ্র্যতার কষাঘাতে জর্জরিত থাকার ফলে। ওরা পারে না নীচে নামতে। আবার উপরে উঠার সিঁড়ি থাকে নাগালের বাইরে। অপর শফিকের প্রতিভা যেন বিকাশের পথ সহজ সাধ্য হয় এ কামনা সর্বান্তকরণে, সর্বক্ষণ। “ ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়“ যত বাধা বিপত্তি আসুক না কেন ? জয় হোক স্পৃহা ও বাসনার সর্বকালে।  

 

সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে

নৈতিকতার প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী

মিজানুর রহমান মিজান

...চিরসবুজ প্রকৃতির শিম্বগোত্রীয় এই উদ্ভিদটি ১৫-২০ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। পাতাগুলি ১৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ আয়তাকার। হলুদ-কমলা বা লাল রঙের গুচ্ছাকারে সারা বছর ফুল ফোটে, তবে মার্চ থেকে মে মাসে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। ফুলগুলি সুগন্ধিযুক্ত। ফলগুলি মসৃণ, চর্মকৃত চওড়া । জন্মস্থান উষ্ণমন্ডলীয় বৃষ্টি প্রধান অঞ্চল প্রধানত ভারত, বর্মা ও মালয়েশিয়া।

  একটা সুসভ্য সমাজ গঠনে মানুষের নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন আচার-আচরণ, সৌহার্দ পূর্ণ মনোভাব থাকা আবশ্যক। নৈতিক উৎকর্ষতা সমাজ বিনির্মাণে সুসংগঠনের মুল মন্ত্র হিসেবে পরিগণিত। সমাজ,সভ্যতা,শালীনতা সমৃদ্ধ হয়ে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মানবিক মূল্যবোধে এগিয়ে যাবার নামই সংস্কৃতি। আবার সুন্দর ও কল্যাণের পথ অনুসরণে সমাজের সুদৃঢ় ভিত জীবন যাত্রার অন্যতম উপাদান। সুন্দরের প্রতি মানুষের আকর্ষণ যেমন বেশী, অসুন্দরকে মানুষ অনুরূপ বর্জন করার পক্ষপাতী। কিন্তু' সামাজিক অবস্থানে অনেক সময় লোভ-লালসার মোহে অসুন্দরকে আঁকড়িয়ে ধরে। ফলে সমাজে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলার। সুন্দরের পরিবর্তে অসুন্দর মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। যাকে বলা চলে অপসংস্কৃতি। কিন্তু' অপসংস্কৃতি কখনই মঙ্গল বয়ে আনে না বা বয়ে আনতে পারে না। এক্ষেত্রে প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব আব্দুর রহমান শাদাব বলেছেন, “সমাজ জীবন বিষিয়ে তুলতে দুরাচারীর সংখ্যা বেশী হবার দরকার নেই। পর পর তিন রাত্রি পাড়ায় ডাকাতি হলে গৃহস্থের চোখে আর ঘুম থাকে না“ বলে বাস্তবতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন সুনৈপূণ্যতার সহিত। আবার নিকোলাস চেমস ফোর্ড বলেন, সমাজ দুই ধরনের লোক নিয়ে গঠিত যারা তাদের আহারের রুচি বা ক্ষুধার তুলনায় অনেক বেশী খাবার খায়, আর যারা ক্ষুধার তুলনায় খুব কম আহার খায়“। আবার সময়ের সহিত পাল্লা দিয়ে বা যুগের সহিত তাল মিলাতে গিয়ে অনেক কিছু হয়ে উঠে নির্ধারিত,অবধারিত ও অনিবার্য। সর্বোপরি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় সত্য, সততা ও মানবিক মূল্যবোধের সরব উপস্থিতি'তি ধরে রাখা বা পুনরুদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া অপরিহার্য। এক্ষেত্রে ভিনসেন্ট বলেন ,“পরিবর্তনের জন্য প্রচেষ্টা থাকলে জীবনে অথবা সমাজে পরিবর্তন আসবেই“। সত্য ,সুন্দরের পূজারী হওয়া সর্বোত্তম পন্থা। 
       আমরা সুতীক্ষ্ণ নজরদারীতে দেখতে পাই এক সময় আমাদের সমাজ জীবনে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর ছিল। আজ তা বহুলাংশে নির্বাসিত জীবনের অধিকারী। ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে সুসম্পর্ক হেতু শ্রদ্ধা, সম্মান, মর্যাদা বন্ধু সুলভ আচরণে বিমোহিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। কিন্তু' লোভ লালসা ও প্রতিহিংসার দাবানলে তা পরিপূর্ণ গ্রাসের সম্মুখীন। যা কখন ও কাম্য ছিল না বা থাকার কথা ও নয়। আমরা ছোট বেলা প্রত্যক্ষ করেছি, স্বজন ব্যতীত ও এলাকার কোন মুরবিবয়ান বা বয়োজৈষ্টদেও সম্মুখে যুবক সম্প্রদায় এমন কোন কাজ করতে ইতস্তত বোধ করতেন যা বেয়াদবির বা অমর্যাদার সামিল। যা আজ উধাও শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। “কি হলো“ বা আমিত্বের অহংকারে গর্বিত। প্রাইভেট পড়াব বর্তমান ছাত্রদের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক বলে বিবেচিত। আমি বুঝি না যে শিক্ষক প্রাইভেট পড়ান স্কুলে ক্লাসের সমসংখ্যক ছাত্রদের জড়ো করে। ঐ শিক্ষকই ত ক্লাস নেন ঐ বিষয়ের উপর। প্রাইভেট পড়লে ছাত্ররা অনায়াসে বুঝে। কিন্তু' ক্লাস নিলে ছাত্ররা বুঝে না। এ দু‘য়ের মাঝে কি পরিমাণ পার্থক্য বিরাজমান? শিক্ষক  যেমন প্রাইভেট পড়াতে অভ্যাস', অনুরূপ ছাত্ররা ও পড়তে অতি উৎসাহী। সুতরাং এক্ষেত্রে ছাত্র শিক্ষক অভিভাবক সচেতন হলে এ থেকে পরিত্রাণের উপায় উদ্ভাবন সম্ভব। কোমল মতি ছাত্রদের যে দিক নির্দেশনা দেবেন বা মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত রেখে শিক্ষক দেবেন । তাই তারা গ্রহণে অনুপ্রাণিত হবে, আগ্রহ জমবে। গাইড বই নিষিদ্ধ। কিন্তু' এক শ্রেণীর শিক্ষক এ ব্যাপারে জড়িত। ছাত্রদের 
উৎসাহিত করে তোলেন বই বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে। কিন্তু' ঐ শিক্ষকের বিবেক বোধ জাগ্রত না

হলে করণীয় কিছুই নেই। যে শিক্ষকের বিবেক বিসর্জিত, ঐ শিক্ষকের  নিকট থেকে ছাত্ররা কি শিখবে আমার প্রশ্ন থেকেই যায়। নীতির অভাব ঐ শিক্ষকের চরিত্রে প্রকট। সুতরাং নৈতিকতার প্রয়োজন সর্বাগ্রে। সরকার আইন করে যথাযথ প্রয়োগের সহিত নাগরিকের আইন মান্যের বা পালনের অভ্যাস গঠন অতীব জরুরী।  বয়ঃক্রম অনুসারে গ্রামের মানুষজন সম্মিলিত ভ্রাতৃত্ববোধ, সহযোগিতা, সহমর্মিতা প্রকাশ বা বিপদে এগিয়ে আসা নৈমিত্তিক ব্যাপারে ছিল পরিগণিত। এ ক্ষেত্রে দু‘একটা ঘটনার উদ্ধৃতি বিষয়টিকে সুস্পষ্ট রূপে প্রতীয়মানে সাহায্য করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস । আমি ১০/১১ বছরের বালক । শীতের সকাল বেলা প্রতি দিনের মত গ্রামের সকল সমবয়সী জমায়েত হত এক স্থানে। আমরা ও কয়েকজন ছোট হওয়াতে তাঁদের থেকে একটা দূরত্ব বজায় রেখে খোশ গল্পে মত্ত। ওরা একে অপরের চুল কাটছেন পালাক্রমে অত্যন্ত আনন্দ উল্লাসের সহিত। যা নিয়মের আবর্তে নির্ধারিত। ইত্য বসরে গ্রামের এক বয়োজৈষ্ট ব্যক্তি দুর থেকে একজনের নাম ধরে বললেন তিনির ছোট ছেলের চুল কেটে দিতে পায়ে চলা না থামিয়ে। তাৎক্ষণিক এক যুবক ছোট বিবেচনায় সাথে সাথে চুল কেটে দিলেন এবং ঐ বয়সের আরো দু‘জনের। অত:পর তাদের কর্মে নিয়োজিত। 
      দশ পনের জনের কাফেলা। দু‘জন দু‘জন হয়ে পারস্পরিক চুল কাটায় মশগুল। ফাঁকে ফাঁকে রং তামাশা। সবেমাত্র একজনের আগমন। আগন্তুক ব্যক্তিকে একজন ধরেন বিড়ি প্রদানের নিমিত্তে। এ ক্ষেত্রে উভয়ে তামাশা স্বরূপ জেদ ধরেছেন দিবেন না এবং না নিয়ে ছাড়বেন না। অপর একজন শরিক হয়েছেন নেবার দলে এবং তিনির হাতে সম্পূর্ণ নুতন ব্লেড খোলে ঐ ব্যক্তির কনুইর উপর ধরে বলছেন, না দিলে হাত কেটে দেব। হঠাৎ ধৃত ব্যক্তি মুক্ত হবার প্রত্যাশায় জোরে ঝাঁকুনি মারতেই পূর্ণ ব্লেড হাতের মাংসে ঢুকে পড়ে। শুরু হয় অঝোর ধারায় রক্তপাত। প্রচুর রক্তপাতের ফলে মানুষটি ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করে। এখন সকল যুবক ঐ যুবকের সুস্থতার চিন্তায় মগ্ন। সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যুব সম্প্রদায়ের মাঝে। সমবয়সীদের মুহূর্তে আগমন। কিন্তু' কেউ কাউকে কটু বাক্য, অশালীন  বা উত্তেজনা মূলক কথা থেকে বিরত। একটাই মাত্র সবার লক্ষ্য ওকে সুস্থ করে তোলা এবং সুস্থ হয়ে ওঠা। যে ক‘দিন ঐ ব্যক্তি অসুস্থ ছিলেন সকলেই তার প্রয়োজনীয় পারিবারিক কাজ কর্ম সমাধা করে দিয়েছেন। তার অনুপস্থিতি পরিবারকে বুঝতেই দেয়া হয়নি। আর অভিভাবক মহল সমবয়সীদের ব্যাপার বলে সর্বক্ষণ এড়িয়ে চলার নীতিতে ছিলেন বিশ্বাসী এবং অটল।

    আমি আশির দশকে স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলাম। একটি ঘর তৈরীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ঘর তৈরীর সকল সরঞ্জাম ক্রয় করেছি বিভিন্ন স্থানে। এগুলো সংগ্রহে আমার অনেক টাকার দরকার। ভাবনায় কুল কিনারা পাচ্ছি না। অকস্মাৎ পাশের গ্রামের এক যুবক বললেন উপযাচক হয়ে আপনার যাবতীয় সরঞ্জাম পরিবহনের একটি তারিখ নির্দিষ্ট করে জানানোর নিমিত্তে। তিনির কথা মত তারিখ সাব্যস্ত করে বলতেই ঐদিন আমার সকল সরঞ্জাম বিশ জন যুবক মিলে এনে দিলেন এবং তারা সুবিধা জনক দিনক্ষণ ঠিক করে স্বেচ্ছায় এসে ঘরটি তৈরী করে দিলেন। সে সময় এ জাতীয় কর্ম পন্থা ছিল প্রচুর বিদ্যমান। কিন্তু বর্তমানে একে অপরের ছোট খাট ব্যাপারে ও এগিয়ে আসার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে বা একে বারে নির্বাসিত। বড় হলেত কথাই নেই। সর্বত্র কর্ম বিমুখতার লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় অধিক হারে।  

      খেলাধুলা, উৎসব অনুষ্ঠানে ছিল ঐক্যের প্রাণ চাঞ্চল্য। নিত্যদিন প্রত্যেক গ্রামের নির্দিষ্ট মাঠে বিভিন্ন বয়সের মানুষের একত্রিত হবার সুবাদে একে অপরের সুখ-দু:খের অংশীদার, সমব্যথী ছিলেন সর্বক্ষণ। ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্বের অপূর্ব বাঁধন হত মজবুত। “মানুষ মানুষের জন্য“শ্লোগান ছিল যুতসই। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় অত্যাধুনিক আবিষ্কারের ফলে প্রত্যেকের ঘরে বসে টিভি, ভিসিডি ইত্যাদি দর্শনে সক্ষম হওয়ায় পূর্বের মত ভাবের আদান-প্রদান উঠেছে লাটে। কে কোথায়, কখন চলছে পাশের গৃহের প্রতিবেশী ও খবর রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না বা হয় ও না। এ জাতীয় জীবন যাত্রাকে বলা হত শহুরে জীবন। আজ গ্রামকে গ্রাস করেছে শহুরে জীবনের প্রভাবে। সবাই যেন যন্ত্র চালিত, যন্ত্র মানব রোবট। উৎসবে ,অনুষ্ঠানে গ্রামের সবাই নিজের কাজ হৃদয় তন্ত্রীতে ধারণ পূর্বক রাত দিন ছিল কর্মব্যস্ত। আজ টাকার বিনিময়ে শ্রমিক নিয়োজিত। একে অপরের সহিত কথাবার্তা ,আচার-আচরণে শ্রদ্ধা, সম্মান, সমীহ, আন্তরিক সৌহার্দ্য পূর্ণতার পরিবর্তে মেকির প্রবণতা লক্ষণীয়। জায়গা জমি ক্রয়-বিক্রয়ে মৌখিক কথাবার্তা অনেক গুরুত্ব বহনকারী ছিল। কথা রক্ষা, ওয়াদা পালনে ছিলেন অধিক সচেষ্ট। ভঙ্গ বা বর খেলাফের সংখ্যা ছিল নগণ্য। সহজ সারলিকতা প্রদর্শন ছিল নৈমিত্তিক। কারসাজি, প্রতারণার হার ছিল হাতে গোণা। গ্রাম্য সালিশ বৈঠকে ন্যায় বিচার প্রাপ্তি বা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার প্রবণতা অধিক মাত্রায় হত প্রতিষ্ঠিত। আজ সালিশ বিচারে ও ঘুষের ছড়াছড়ি এবং মুখ চেয়ে বিচারের ফলে “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে“ অহরহ। ন্যায় বিচার ব্যবস্থাটা'াটা যেন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অসহায়ের ন্যায় বিচার প্রাপ্তি সোনার হরিণ তুল্য। সালিশ বিচারকরা আধুনিক ঘুষের প্রবণতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত। এই যেমন বিচারে আসতে হলে টাকা নেবে ঋণ স্বরূপ অথবা চাইবে ঋণ। না দিলে আসবে না। আবার দিলে তা আর ফেরত পাবে না। এ ধারার সংস্কৃতিকে আমি বলতে চাই আধুনিক ঘুষ। দুর্বলের স্বপক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার মানুষের বড়ই অভাব, তীব্র থেকে তীব্রতর। এ থেকে উত্তরণ জরুরী । সৎ থাকা ও সত্য বলা দু:স্বপ্নের মত।“ বিবেক মানুষের সর্বোচ্চ আদালত“ বাক্যটিকে আমাদের জীবন যাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করার সচেতনতা সবার হৃদয়ে ধারণ করা এবং লালনে অগ্রসর থাকা আবশ্যক। 
       বিয়ে শাদীর ক্ষেত্রে বর পক্ষ থেকে গ্রামের সকল মুরবিবয়ানকে নিমন্ত্রণ করে “বর সাজাতে হত“। আবার কনে পক্ষের বাড়ীতে বরকে বরণ করতে কনের গ্রামের মুরবিবয়ানকে নিমন্ত্রণ করে অনুমতি সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। এটা এক প্রকার বাধ্যতামূলকের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু' আজ পঞ্চায়েত বা গ্রাম বাসীর নিমন্ত্রণে কোন প্রকার বাধ্যবাধকতা ছাড়া ও “ইচ্ছে হলে“ নিমন্ত্রণের ব্যাপার বলে গণ্য। পুরাতন বলে এ সকল নিয়ম নীতি পরিগণিত। নিত্য নুতন নিয়ম প্রতিষ্ঠিত। নৈতিকতার মান উন্নত হলে একটি জাতি ,দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। নতুবা নীতি হীনতার পচনে সোপান হয় ব্যাহত। 
    অর্থ ও জনবলে বলীয়ান হয়ে প্রতিবেশীর ভূ-সম্পত্তি তিলে তিলে গ্রাস যা সর্বক্ষেত্রে নীতিহীনতার পরিচায়ক। আপনার গাছের ডাল কাটবেন না অপরের বিরাট ক্ষতির পর ও তা কি মানবিক? আপনার ভূমির এক ইঞ্চি ও রাখবেন না,খনন করবেন জলাশয়। ভাঙ্গনের মাধ্যমে মাটি নেবার আজব ফন্দি এবং চাতুরী। মানুষ নামের অমানুষের কাজ নয় কি? মরণ রয়েছে সর্বক্ষণ তোমার সাথী হয়ে। নিবে না কিছুই সঙ্গে। কোন লোভে পশুত্বের আচরণে মগ্ন ? ভাবিয়া করিও কাজ, নাহি পাবে লাজ। মানব জীবন সবার সফল ও সার্থক হোক মানবীয় গুণাবলীতে এ আশাবাদ মহান আল্লাহর দরবারে। 

রথ যাত্রা

সনোজ চক্রবর্তী

রথ আর রথী তে পার্থক্য প্রবল। আমরা সাধারণ ভাবনায় রথকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি। প্রকৃত পক্ষে রথীই হলেন রথের মালিক। রথ চলে রথীর ইচ্ছায়, রথীর অভিপ্রায়ে। রথ রথীকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেয় মাত্র। রথ হল রথীর বাহন। রথীর ইচ্ছানুযায়ী রথ চালনা করে সারথি। আবার সারথি রথ নিয়ন্ত্রণ করে লাগামের সাহায্যে। 

রথ যাত্রা ও মনুষ্য জীবন 
সনোজ চক্রবর্ত্তী 
আত্মানাং রথীনং বিদ্ধিঃ 
শরীরং রথ মে ব তু। 
বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধিঃ 
মনঃ পগ্রহঃ মে ব চঃ। 

রথ আর রথীতে পার্থক্য প্রবল। আমরা সাধারণ ভাবনায় রথকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি। প্রকৃত পক্ষে রথীই হলেন রথের মালিক। রথ চলে রথীর ইচ্ছায়, রথীর অভিপ্রায়ে। রথ রথীকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেয় মাত্র। রথ হল রথীর বাহন। রথীর ইচ্ছানুযায়ী রথ চালনা করে সারথি। আবার সারথি রথ নিয়ন্ত্রণ করে লাগামের সাহায্যে। 
আত্মানাং রথীনং বিদ্ধিঃ- শরীর মধ্যস্থ আত্মাই রথী অর্থাৎ রথের মালিক। 

শরীরং রথ মে ব তু- শরীর হল রথ। শরীর আত্মার বাহন। বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধিঃ- বুদ্ধি হল রথের চালক বা সারথি। মনঃ পগ্রহঃ মে ব চঃ- মন হল লাগাম। 

      রথ যাত্রা আসলে মানব জীবন ও জীবন যাত্রারই বিমূর্ত ছবি। রথ বলতে আমরা চাকা বিশিষ্ট যান বুঝি। রথ তো দাঁড়িয়ে থাকার জন্য নয়,রথ চলার জন্য। যে রথ দাঁড়িয়ে থাকে তার সার্থকতা কোথায়! তাই রথকে পথে নামতেই হয়। রথ সচলতার, গতিশীলতার প্রতীক। তার এই গতিশীলতা রথীর জন্য, এই গতিশীলতা রথীর উত্তরণ যাত্রা। আত্মা আমাদের শরীর নামক রথে চেপে উত্তরণের অভিপ্রায়ে চলছে। তার যাত্রা অনন্ত কালের, তার গন্তব্য পরমাত্মার সন্ধান,পার্থিব সুখ সমৃদ্ধি হেলায় অবহেলা করে তার এগিয়ে যাওয়া। এই যাত্রায় বুদ্ধি আত্মার সারথি। সে রথকে সঠিক দিশায় এগিয়ে নিয়ে যায়। বুদ্ধি দ্বিবিধ - সু ও কু। সুবুদ্ধি উৎকর্ষের, উত্তরণের পথে যাত্রার নির্দেশ দেয়। কুবুদ্ধি অপকর্ষ ও অধঃপতনের পথে টেনে নামায়।

পৃথিবীতে মানুষের হাতে দু-ধরনের খেলনা আছে। একটা শ্রেয়- একেবারে সাদামাটা, পরিষ্কার, ঝকঝকে স্ফটিক পাথর। অন্যটা প্রেয়- সেটা রং বাহারি। শ্রেয় বলে যদি আমাকে নিয়ে খেল তবে তুমি আমার মতো হবে সাদাসিধে,দিলখোলা। প্রেয় বলে আমার সঙ্গে খেললে আমারর মতো চটকদারি, রঙিন হবে। শ্রেয় হল মোক্ষ, প্রেয় হল পার্থিব সুখ আর ঐশ্বর্য। মানুষ প্রেয়-ই প্রতি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে। এই প্রেয় আসলে মানুষের ইন্দ্রিয় আসক্তি। এগুলো হল দুষ্টু ঘোড়া।

তাই দুষ্টু ঘোড়া গুলো কে সঠিক পথে চালনা করতে পারে একমাত্র দক্ষ সারথি। আমাদের বুদ্ধি হল সারথি। সারথির হাতিয়ার হল লাগাম। ঘোড়াগুলি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে রথ কখনোই গন্তব্যে পৌছাতে পারে না। ঘোড়াগুলি নিয়ন্ত্রিত হয় লাগামের সাহায্যে, এক্ষেত্রে আমাদের মন হল লাগাম। মন শরীরস্থ ঘোড়া রূপী ইন্দ্রিয়গুলির নিয়ন্ত্রক। মনের লাগাম যদি কষে ধরা যায় তবে সঠিক দিশায় যাত্রা সম্পন্ন সম্ভব হয়।

যার মন ইন্দ্রিয়গুলিকে বশীভূত করতে পারে তার আত্মা পরমাত্মার সন্ধান পায়।

বাংলা গানের

একাল সেকাল

মহুয়া ব্যানার্জ্জী (সঙ্গীত শিল্পী)

....তাই সিডি করবো না ডিজিটাল রিলিজ করবো - এই প্রসঙ্গে আমি নিজে একজন নতুন প্রজন্মের সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে মনে করি যতদিন না সিডিকে তার পুরনো জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বা বিকল্প কোন রাস্তা পাওয়া যাচ্ছে যতদিন না এফ এম এর সাহায্যে লোকের ঘরে গান পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত আমরা ডিজিটাল এই ঝুঁকে থাকবো...

     এই সেদিন ও বলতে শুনতাম - "What Bengal thinks today, India thinks tomorrow" আর আজ আমরা আক্ষেপ করে বলি বাংলার স্বর্ণযুগের গান নিয়ে বা সেই বাঙালির অহংকার কোথায়? যদিও আজ আমরা সমকালীন বাংলা গানকেও প্রায় একই রকম ভাবে পিছনে ফেলে দিচ্ছি। ছোটবেলায় আমাদের গান শোনার একমাত্র যন্ত্র ছিল রেডিও। সেই সময় বাংলা গানের কথা ও সুর আমরা রেডিও তে হাঁ করে গিলতাম। তৎক্ষনাৎ শুনে সেটা লেখার চেষ্টা করতাম। অপেক্ষা করতাম আবার শোনার জন্যে। আর এখন তো বাংলা গান নিয়ে এমন সব পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়েছে তাতে সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যাবার জোগাড়। আজ বাংলা গানের গায়ে লেগেছে বিশ্বায়নের ছোঁয়া। হাইটেক প্যাকেজিং এর লেবেল। আর বলাবাহুল্য এই ভাবেই কিন্তু তৈরি হচ্ছে একটা হচপচ অবস্থা।

        গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে ক্যাসেট সেই অবধি ঠিক ছিল। তার পরবর্তীতে এলো সিডি। কিন্তু এই সিডি নিয়ে আমরা নতুন প্রজন্মরা কিন্তু একদমই আশাবাদী হতে

পারছি না তাই আমরা ঝুঁকছি ডিজিটাল রিলিজ এর দিকেই। প্রথমত সিডির অডিও ফরম্যাট করতে খরচ তারপর বিপণীর জন্য আলাদা খরচা। সিডি কেনা থেকে সরে এসেছেন বহু মানুষ। ফলে লোকের কাছে গান পৌঁছচ্ছে না। বিকল্প হিসেবে আমরা সিডির সব চেয়ে ভালো গান টার দৃশ্যায়ন করতে শুরু করলাম সেখানেও অনেকটা খরচ। এরপর সেই ভিডিওটা চ্যানেলের মাধ্যমে লোকের কাছে পৌছনো। সেখানেও খরচ। সুতরাং এত খরচ করার পরে দ্বিতীয় বার সিডি করার কথা খুব কম শিল্পীই ভাবছেন.. তাহলে বাকি শিল্পীরা কোথায় যাবেন আর শিল্পীর নতুন গানই বা কোথায় যাবে? এত টাকা খরচ করার পর শিল্পী কি বা রিটার্ন পাবে?

      আমি আগেই বলেছি আগে গান শোনার মাধ্যমই ছিল রেডিও। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে এফ এম রেডিও ও নতুন গান শোনানো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে (সেটা সিনেমার গানের ক্ষেত্রে নয় কিন্তু) তাই আজ আমাদের ডিজিটালই ভরসা .. নিজের ইউটিউব চ্যানেল করো সেখানে গান বানিয়ে দিয়ে দাও (এই বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি

ব্যাস এক নিমেষেই পৃথিবীর সারা প্রান্তে নিজের গান পৌঁছনো তো যাচ্ছে। কাউকে তো বলতে হচ্ছে না সিডি কিনুন … আর বেশী সংখ্যক ভিউয়ার্স হলে শিল্পী তার কিছুটা লভ্যাংশও পাচ্ছে. এতে করে নতুন শিল্পীরা কিন্তু উৎসাহ পাচ্ছে। কিন্তু ডিজিটাল এ একটি অসুবিধে হল প্রবীণ মানুষের কাছে না পৌঁছনো। কারণ তারা এখনো টেকস্যাভি নন। তাই অনেকেই লিঙ্ক এর মানে বোঝেন না। আর সিডি উপহার দেওয়া ও নেওয়া থেকেও আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। গ্রামোফোন বা ক্যাসেট সিডি বাড়িতে আমরা সংরক্ষণ করতে পারলেও ডিজিটাল কিন্তু কম্পিউটার ও মোবাইল বন্দীই থাকছে।

        তাই সিডি করবো না ডিজিটাল রিলিজ করবো - এই প্রসঙ্গে আমি নিজে একজন নতুন প্রজন্মের সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে মনে করি যতদিন না সিডিকে তার পুরনো জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বা বিকল্প কোন রাস্তা পাওয়া যাচ্ছে যতদিন না এফ এম এর সাহায্যে লোকের ঘরে গান পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত আমরা ডিজিটাল এই ঝুঁকে থাকবো... যে ফরম্যাট এই হোক আপনারা নতুন গান শুনুন ও শোনান এইটুকুই কাম্য।

বৌদ্ধ ঐতিহ্যের পথ

ধরে মোগলমারি 

অতনু প্রধান 

.....১৯৯৯ সালে প্রাচীন নদী-বাণিজ্য সংক্রান্ত পুরাতাত্ত্বিক সাক্ষ্যের খোঁজে সুবর্ণরেখার গতিপথ ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের কাজে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাঁতন শহরে আসেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. অশোক দত্ত। ড. দত্তের সঙ্গে পরিচয় হয় দাঁতন হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, ইতিহাস প্রেমী শ্রী নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস মহাশয়ের।

     মোগলমারি আজ আর কেবল অখ্যাত গ্রাম নয়, সংবাদ শিরোনামে অবস্থান তার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের বিদগ্ধ মহলে প্রত্নচর্চার অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে। মোগলমারিকে নিয়ে নিরন্তর গবেষণায় ইতিহাস যেমন উদ্‌ঘাটিত হচ্ছে, তেমন সমৃদ্ধ ও সংযোজিত হচ্ছে ইতিহাসের পৃষ্ঠা।  


নাম মাহাত্ম্য –  
    ১) বহু বছর ধরে ইতিহাস গর্ভে ধারণ করে থাকা গ্রাম মোগলমারি। সপ্তদশ শতাব্দীতে মির্জা নাথান লিখিত ‘বাহারিস্তান-ই-ঘাইবি’ বইটিতে দুই মোঘল সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার হাল হকিকত জানা যায়। ১৫৭৫ সালে মেদিনীপুর আর জলেশ্বরের(ওড়িশা) মাঝামাঝি তুকারুই নামে এক স্থানে মোঘল ও পাঠানের যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে মোঘলদের বহু ক্ষয়-ক্ষতি হয়। সেই মোঘল থেকেই হয়তো মোগলমারি নামের উৎপত্তি।  
    ২) স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে মাড় শব্দের অর্থ সড়ক বা পথ। মোঘলরা এই পথ মাড়িয়ে গিয়েছিল বলে এই স্থানে মাড়>মাড়ই>মাড়ি- ব্যবহৃত হয়েছিল। তাই কালের বিবর্তনে মোগলমাড়ি>মোগলমারি নামাঙ্কিত হয়ে প্রচলিত হয়ে আসছে। দাঁতন-১ ব্লকের অন্তর্গত মোগলমারি গ্রাম। এই দাঁতনের পুরোনো নাম দণ্ডভুক্তি ছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। সপ্তম শতাব্দীতে রাজা শশাঙ্কের রাজত্বকালে এই দণ্ডভুক্তিতেই তাঁর ভূমিদানের দলিল পাওয়া যায়। 

ইতিহাস – 
    ঐতিহাসিক ও গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, গ্রামটির প্রাচীন নাম ‘অমরাবতী’। এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র সামন্ত রাজা ছিলেন বিক্রমকেশরী। তাঁর বিদূষী কন্যা সখীসেনার এক সময়ের অধ্যয়নের কেন্দ্র ছিল এখানে- অনেকেই তা মনে করেন। সখীসেনার সাথে মন্ত্রীপুত্র অহিমাণিকের প্রণয় কাহিনীর জনশ্রুতি রয়েছে, যা বর্ধমানের লোককবি ফকির রামের অমর কাব্য ‘সখীসোনা’ থেকে পাওয়া যায়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ তাঁর ‘কিংবদন্তীর দেশে’ গ্রন্থে এই কাহিনী ‘সখীসেনার পাঠশালা’ নামে বর্ণনা করেছেন। ক্ষুদ্র পল্লীমাটির উপর আজ পড়ে রয়েছে সেই মুখর পাঠশালার এক ভগ্নস্তূপ। 
      চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার বিভিন্ন বৌদ্ধবিহার গুলি পরিদর্শন করেন। তিনি তাঁর সি-ইউ-কি গ্রন্থে বঙ্গদেশের চার রাজ্যের বিশেষ বর্ণনা করেছিলেন- পুন্ড্রবর্ধন, সমতটী, কর্ণসুবর্ণ এবং তাম্রলিপ্ত। এই তাম্রলিপ্ত রাজ্যে ১০টি বৌদ্ধবিহার ও এক-হাজার বৌদ্ধ সন্নাসীর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছিলেন। এযাবৎ  কাল পর্যন্ত তাম্রলিপ্ত সন্নিহিত অঞ্চলে কোন বৌদ্ধবিহার-ই আবিষ্কৃত হয়নি, মোগলমারি ব্যতিত।  
     পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন স্থলের মধ্যে মোগলমারি অতীতের একটি বিষ্ময়কর রত্নভাণ্ডার। যা আজ সখীসেনার পাঠশালার সকল জনশ্রুতির দ্বিধা দ্বন্দ্বকে দূরে সরিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে অবস্থিত অন্যান্য বৃহৎ ও প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্যগুলির মধ্যে এটি অন্যতম।

আবিষ্কার ও প্রত্নখননের সময় সারণি -     

     ১৯৯৯ সালে প্রাচীন নদী-বাণিজ্য সংক্রান্ত পুরাতাত্ত্বিক সাক্ষ্যের খোঁজে সুবর্ণরেখার গতিপথ ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের কাজে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাঁতন শহরে আসেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. অশোক দত্ত। ড. দত্তের সঙ্গে পরিচয় হয় দাঁতন হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, ইতিহাস প্রেমী শ্রী নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস মহাশয়ের। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে নানান আলোচনার সূত্রে শ্রী বিশ্বাস দাঁতন ১ নং ব্লকের মোগলমারি (২১˚৫৭’ উঃ অঃ / ৮৭˚১৬’ পূঃ দ্রাঃ)গ্রামে সখীসেনা ঢিবি নামে একটি প্রাচীন ইটের ঢিবির সন্ধান দিয়েছিলেন। ঢিবিটি গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এবং বর্তমানে মোগলমারি তরুণ সেবা সংঘ ও পাঠাগার নামে একটি সংস্থার নিয়ন্ত্রাণাধীন। প্রত্নসমীক্ষার সময় দেখা গেছে গ্রামে অবস্থিত সুউচ্চ ঢিবিটিই শুধু নয়, বর্তমানে প্রায় সমগ্র গ্রামটি অবস্থিত একটি বিশাল প্রাচীন প্রত্নক্ষেত্রের উপর। গ্রামের অভ্যন্তরে অবস্থিত ইটের তিনটি গোলাকার স্তূপের অংশ এবং গ্রামবাসীদের কাছে সযত্নে

সংরক্ষিত পোড়ামাটির গোলাকার উৎসর্গ ফলক, যার উপর উৎকীর্ণ খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের ব্রাহ্মী লিপিতে এবং মিশ্র সংস্কৃত-প্রাকৃত ভাষায় লেখা বৌদ্ধ ধর্মের অতি প্রাচীন বাণী ‘এ ধর্ম হেতু প্রভব ---’ এবং ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় মস্তকহীন বুদ্ধ মূর্তি ড. অশোক দত্তের বৌদ্ধ নিদর্শন সংক্রান্ত ধারণাকে যেমন সুদৃঢ় করেছিল তেমনি ড. দত্ত উদ্বুদ্ধও হয়েছিলেন মোগলমারির সখীসেনা ঢিবিতে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন করার জন্য। 


প্রত্নখননের প্রথম পর্যায় (২০০৩-২০০৪):
    খননকার্য শুরু হয় ঢিবির উত্তর পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশে। খননে পাওয়া যায় নকশাযুক্ত ইট, বৌদ্ধ ভিক্ষু বা সন্ন্যাসীদের বাসস্থানের কুঠুরি। পাওয়া যায় ত্রিরথ কাঠামো যুক্ত নকশা, যা দেখে গবেষকদের প্রাথমিক অনুমান স্থানটিতে মন্দির বা গর্ভগৃহ ছিল। গ্রামের অভ্যন্তরে খনন চালিয়ে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধস্তূপ ও এক বিশেষ ধরনের মৃৎপাত্র পাওয়া যায়, যাকে কৃষ্ণ-লোহিত মৃৎপাত্র বলা হয়।

 

প্রত্নখননের দ্বিতীয় পর্যায় (২০০৬-২০০৭):      

    এই পর্যায়ের খনন ঢিবির পূর্ব ও পশ্চিম দিকে পরিচালিত হয়। পাওয়া যায় নকশাযুক্ত ইট দ্বারা সুসজ্জিত দেওয়াল, স্টাকো পলেস্তারা যুক্ত দেওয়াল, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের থাকার কুঠুরি। উদ্ধার হয় খণ্ড বিখণ্ড বুদ্ধের মূর্তি, আদি মধ্যযুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের পুরাবস্তু, লোহার সামগ্রী এবং ষষ্ঠ শতাব্দীর সিদ্ধমাতৃকা লিপিতে উৎকীর্ণ পোড়ামাটির সিল। 

 

প্রত্নখননের তৃতীয় পর্যায় (২০০৭-২০০৮):                         খননকার্য হয় ঢিবির উত্তর, পূর্ব ও মধ্যভাগে। খননে স্টাকোর পদ্মের পাঁপড়ির ন্যায় পলেস্তারার নকশাযুক্ত সুসজ্জিত দেওয়াল, প্রদক্ষিণ পথ, বৌদ্ধস্তূপ, স্টাকো নির্মিত মুখাবয়ব, পাথরের মূর্তি, তামার মুদ্রা ও প্রচুর মৃৎপাত্র পাওয়া যায়।

 

প্রত্নখননের চতুর্থ পর্যায় (২০০৯-২০১০):    

এই পর্যায়ের উৎখনন ঢিবির উত্তর দিকে পরিচালিত হয়। আবিস্কৃত হয় বৌদ্ধ বিহারের মূল প্রবেশদ্বার, প্রবেশদ্বারের উভয় দিকে দুটি সমায়তনের বৃহৎ কক্ষ, ইটের কারুকার্য মণ্ডিত স্তম্ভযুক্ত কুলুঙ্গি, চুনের পলেস্তারা যুক্ত মেঝে এবং পোড়ামাটির প্রদীপ। 

প্রত্নখননের ষষ্ঠ পর্যায় (২০১১-২০১২):        

      এই পর্যায়ের খননকার্য হয় ঢিবির দক্ষিণ, মধ্য ও দক্ষিণ পশ্চিম দিকে। ঢিবির মধ্যভাগে পশ্চিমমুখী দেওয়ালে ১৩টি স্টাকোর মূর্তি উন্মোচিত হয়, যার মধ্যে কুবের জাঙ্গুলী, অবলোকিতেশ্বর, লোকেশ্বর, গন্ধর্ব, নৃত্যরত মানব মানবী ও গণমূর্তি প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও সিদ্ধ মাতৃকা হরফে উৎকীর্ণ বুদ্ধের বাণী সম্বলিত সিল, প্রদীপ, লোহার কাঁটা, আতরদান, নকশাযুক্ত ইট, নিত্য ব্যবহার্য মৃৎপাত্র ইত্যাদি পাওয়া যায়। এই পর্যায়-ই ছিল ড. অশোক দত্তের নেতৃত্বে শেষ বারের জন্য মোগলমারির বুকে প্রত্নখনন। এরপর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর ৭ই মার্চ’ ২০১৩ মোগলমারি ‘সখীসেনা ঢিবি’-কে রাজ্য সংরক্ষিত সৌধের মর্যাদা প্রদান করে এবং রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব ও সংগ্রহশালা অধিকারের অধীনে মোগলমারিতে সপ্তম পর্যায়ের প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের কাজ। 

প্রত্নখননের সপ্তম পর্যায় (২০১৩-২০১৪):       

    খননকার্য হয় ঢিবির উত্তর, পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে। পশ্চিম দিকে উন্মোচিত হয় সীমানা প্রাচীর, গর্ভগৃহ, প্রদক্ষিণ পথ, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের থাকার কুঠুরি। পাওয়া যায় বেশ কয়েকটি স্টাকো মূর্তি, যার মধ্যে মঞ্জুশ্রীর মূর্তিটি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও পাওয়া যায় মস্তকহীন বুদ্ধমূর্তি, রাজা সমাচার দেবের মিশ্রধাতুর মুদ্রা এবং সোনার লকেট। এই পর্যায়ের খননের শেষের দিকে উৎখনন চালিয়ে বিহারের নামফলক বা নামমুদ্রা উদ্ধার হয়। ফলকটিতে “শ্রীবন্দক মহাবিহারে আর্যভিক্ষু সংঘ” লেখা রয়েছে বলে গবেষকগণ প্রাথমিক পাঠোদ্ধার করেন

প্রত্নখননের অষ্টম পর্যায় (২০১৪-২০১৫):         

     অষ্টম পর্যায়ের উৎখনন হয় ঢিবির উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও মধ্যভাগ জুড়ে। উন্মোচিত হয় বিশালাকার স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ, বৌদ্ধ স্তূপ, উৎসর্গ ফলক, মূর্তির ভাঙা অংশ, লোহার কাঁটা, তামার বালা ও আংটি, পোড়ামাটির প্রদীপ, হাতির দাঁতের জপমালা, নকশাযুক্ত ইট ইত্যাদি। 

প্রত্নখননের নবম পর্যায় (২০১৫-২০১৬):     
    এই পর্যায়ে ঢিবির দক্ষিণ, পূর্ব ও মধ্যভাগ জুড়ে খননকার্য করা হয়। উৎখননে ঢিবির কেন্দ্রস্থল থকে উদ্ধার হয় ৯৫টি ব্রোঞ্জের মূর্তি, যার মধ্যে ২৫-৩০টি বুদ্ধমূর্তি ছাড়াও অবলোকিতেশ্বর, হারীতী, তারা, সরস্বতী প্রভৃতি মূর্তিও পাওয়া যায়। উদ্ধার হয় স্বর্ণ মুকুটের একটি অংশ। এছাড়াও পাওয়া যায় ধাতুর ধুনুচি, জল ছিটানোর কমন্ডলু, ধাতব স্তূপ, খেলনা গাড়ির চাকা, নিত্য ব্যবহার্য মৃৎপাত্র, পোড়ামাটির অলঙ্কার, পাথরের মূর্তির ভাঙা অংশ ও ভাস্কর্য ইত্যাদি। 


নিরীক্ষণ: 
    মোগলমারি বৌদ্ধ মহাবিহারে নবম পর্যায়ের উৎখনন পরিসমাপ্তির পর প্রাপ্ত পুরাবস্তু ও প্রত্নক্ষেত্রটি পর্যালোচনা করে প্রত্নতত্ত্ববিদগণ নিম্নরূপ মন্তব্য পোষণ করেন –
    ১) মোগলমারি গ্রামের অভ্যন্তরে উৎখননে প্রাপ্ত কৃষ্ণ-লোহিত মৃৎপাত্র, এই অঞ্চলে তাম্রাশ্মীয় বা প্রাক-ঐতিহাসিক যুগের জনবসতির মুখ্য নিদর্শন।
  ২) মহাবিহারটি গঠন শৈলী ছিল ত্রিরথ কাঠামো। আয়তনে মহাবিহারটি ৬০ মিটার × ৬০ মিটার (৩৬০০ বর্গমিটার)। এযাবৎ পশ্চিমবঙ্গে আবিষ্কৃত বৌদ্ধবিহার গুলির মধ্যে সর্ববৃহৎ।
   ৩) এযাবৎ খননে প্রায় ৫২ ধরনের নকশাযুক্ত ইটের ব্যবহারের নিদর্শন এবং স্টাকো ব্যবহারের নিদর্শন বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
    ৪) মহাবিহারটির নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণের তিনটি পৃথক পৃথক পর্যায় চিহ্নিতকরণ করা হয়েছে।
    ৫) রাজা সমাচারদেবের মিশ্রধাতুর মুদ্রা, স্বর্ণ লোকেট, স্বর্ণ মুকুট এবং মহাবিহারের নামফলক বা নামমুদ্রা উদ্ধার হল উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার।  
   ৬) সময়গত ও গঠনগত দিক দিয়ে এই মহাবিহারটি নালন্দা, বিক্রমশীলা, পাহাড়পুর, ময়নামতী প্রভৃতি বিহারের সঙ্গে সাদৃশপূর্ণ।
  ৭) সর্বোপরি উৎখননে বিষ্ময়কর আবিষ্কার হল, মহাবিহারটির একটি স্থানে, একদিনে, একসঙ্গে ৯৫টি ব্রোঞ্জ মূর্তি উদ্ধার সমগ্র পৃথিবীর প্রত্নখননের ইতিহাসে এক বিরলতম দৃষ্টান্ত।  

উপসংহার :
    মোগলমারির সঙ্গে মোঘল সাম্রাজ্যের একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকলেও এক সময় ঐতিহ্যমণ্ডিত বৌদ্ধ সংস্কৃতি নির্ভর একটি বিস্তীর্ণ জনপথ গড়ে উঠেছিল মোগলমারিতে। শুধুমাত্র বৌদ্ধ মহাবিহার নয়, সমগ্র গ্রাম জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে বৌদ্ধ স্থাপত্যের নিদর্শন, যা এক কথায় অনবদ্য। মোগলমারিতে অতীত ও বর্তমান যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এক সময় এই গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো সুবর্ণরেখা নদী। এই নদীকেই কেন্দ্র করে, নদীর বাম তীরে প্রায় ১৫০০ বছর আগে গড়ে উঠেছিল বিহারটি। বর্তমান নদীটি প্রত্নক্ষেত্রটির ৪.৫ কিলোমিটার পশ্চিমে প্রবাহিত হচ্ছে। বিহারটির দেওয়ালের বাইরের অংশ কারুকার্য মণ্ডিত নকশাযুক্ত স্টাকোর পলেস্তারা যুক্ত থাকায় এক সময় সূবর্ণরেখার তীরে বিহারটী এক অপরূপ সৌন্দর্য বহন করতো। কিন্তু কালের নিয়মে সবই আজ ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। তবে এখনো যে টুকু অক্ষত রয়েছে তাও কোন অংশেই কম নয়। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ , যদিও অনন্য নয় , একদিকে  বিহারের দক্ষিণঅংশ এবং অন্য দিকে উড়িষ্যার উত্তরাংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ  সম্বন্ধ স্থাপন করেছিল  সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত মোগলমারি। এভাবে মোগলমারি  প্রাথমিক  মধ্যযুগে  ভারতের  পূর্বাঞ্চলে  বৌদ্ধ সংস্কৃতির এক ঐতিহ্য বহন করেছিল, যেখানে আজ থেকে কয়েকশ বছর পূর্বে উচ্চারিত হতো সেই পবিত্র মহামন্ত্র ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি .......’।  

 
 
 
 
 
 
 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?