প্রবন্ধ আলোচনা - ৫ 

  • শকুন্তলা, শকুন্তলা এবং শকুন্তলা - সুবিমল চক্রবর্তী

  • এপার বাংলায় সোমেন চন্দ্র - দিলীপ মজুমদার

  • মরমী বাউল শিল্পী চাঁদ মিঁইয়া - মোহাম্মদ সায়েস্থা মিয়া

অলৌকিক

সংলাপ

দিলীপ মজুমদার

        আজ মহালয়া। একটু পরে শুরু হবে মহিষাসুরমর্দিনী। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বরে। তারপরে টি ভি-র হরেক চ্যানেলে হরেক বেশে সজ্জিত হয়ে বিচিত্র দৃশ্যের অবতারণা করবেন হরেক অভিনেতা-অভিনেত্রী।

    মহালয়ার কাকভোরে জাগ্রত হলাম নিদ্রা থেকে। জাগ্রত হতে বাধ্য হলাম বলাই ভাল। এ তো কবিদের প্রিয় শরৎ নয়। তা যদি হতো তা হলে দিনভোর রাতভোর থাকত না এমন তাপপ্রবাহ। আকাশে বাতাসে স্নিগ্ধতার লেশমাত্র নেই। নেই পুজোর আগাম কোন গন্ধ। নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বৃক্ষগুলি। পথ হারিয়েছে বাতাস। তাই ঘর্মাক্ত হয়ে জেগে উঠলাম কাকভোরে।
        আজ মহালয়া। একটু পরে শুরু হবে মহিষাসুরমর্দিনী । বীরেন্দ্রকৃষ্ণের জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বরে। তারপরে টি ভি-র হরেক চ্যানেলে হরেক বেশে সজ্জিত হয়ে বিচিত্র দৃশ্যের অবতারণা করবেন হরেক অভিনেতা-অভিনেত্রী।
     আবছা অন্ধকার আছে এখনও। ভাবছিলাম অলৌকিক কোন উপায়ে যদি দেখা হয়ে যেত মা দুগ্গার সঙ্গে! দেখা হলে করজোড়ে মাকে বলতাম:  হে মা দুগ্গা, তোমার অসুরবধের কথা শুনে আসছি বহুকাল; এবার মা তুমি তাপাসুরনাশিনীরূপে আবির্ভূত হও। মাগো, ঋতুরঙ্গের কথা আমরা বিস্মৃত হতে বসেছি। শিশুপাঠ্য রচনা ছাড়া আর
   

কোথাও নেই ঋতুরঙ্গের কথা। সম্বৎসর গ্রীষ্মের দাপট। শেষপর্যন্ত তোমার সন্তানরা তাপদগ্ধ হয়ে কি বেঘোরে প্রাণ হারাবে!

     একথা ভাবার পরে মনে হল আমার কথা খণ্ডন করার জন্য মা যদি বিপরীত যুক্তি প্রতিস্থাপন করেন! যদি বলেন : বৎস, স্বকৃত পাপের ফল ভোগ করছ তোমরা। বসত গড়ার অভিপ্রায়ে বন কেটেছ নির্বিচারে, বিষাক্ত গ্যাসে ভরিয়ে দিয়েছ ভুবন, নিজেই নিজের পায়ে মেরেছ কুড়ুল। আমার তো কিছু করার নেই বাছা।

মা দুগ্গা একথা বললে কি উত্তর দেব, তারও একটা খসড়া তৈরি করে নিলাম মনে মনে। বলব: মা, তুমিই তো আমাদের বুদ্ধি দিয়েছ। নবনবোন্মেষশালিনী প্রতিভা দিয়েছ। সেই বুদ্ধি আর প্রতিভা তো প্রগতির সমস্যা সৃষ্টি করেছে মা । উল্লম্ফনের নাম যে প্রগতি। মানুষ তো এক পা আগে দুই পা পিছে করে চলতে পারে না।
    মনে এইসব চিন্তার তরঙ্গ চললেও নিদ্রার ঘোর ছিল। হঠাৎ চোখের সামনে একটা তীব্র আলোর ঝলকানি। চোখ মেলে তাকিয়ে আমি ঘাবড়ে ঘোড়া। এ কি! আমার সামনে যে স্বয়ং মা দুগ্গা ! কিন্তু কোথায় তাঁর দশটি হস্ত! হস্তে হস্তে প্রহরণ! কোথায় অসুরবধের পরিচিত উল্লাস! তাঁর করুণাঘন আয়ত চক্ষুদুটি আমার সব সন্দেহ নিরসন করল। আরে, এতো আমাদের দেশের বাড়ির সুবোধকাকুর বানানো দুগ্গার চক্ষুদুটি। অবিকল।
     নতজানু হয়ে বললাম: আমি ধন্য মাগো। আমার মনের ভাবনা শুনে দেখা দিলে তুমি। আর কদিন বাদে আসছ তুমি , তার আগে তোমাকে আসতে হল। কিন্তু মা, এ কি রূপে দেখছি তোমায়!
মা বললেন, কেন বাছা, একথা কেন?
বললাম: কোথায় গেল তোমার দশটি হাত, দশ হাতে দশটি প্রহরণ?

মা মৃদু হাসলেন। তারপরে বললেন: আমার দশপ্রহরণধারী রূপটা কল্পনায় সৃষ্টি করেছ তোমরা। নারীশক্তির কল্পনা। কিন্তু নিজেরাই নিজেদের কল্পনাকে নির্মমভাবে বিনষ্ট করে দিয়েছ।
    বুঝতে পারলাম না মা কি বলতে চাইছেন। সেটা বুঝে তিনি বললেন: অপ্রতিহত গতিতে চলে আসছে পুরুষতন্ত্র। পদদলিত হচ্ছে নারী। মহোৎসব চলছে ধর্ষণ খুন হত্যার। পরিসংখ্যানগুলো উল্টেপাল্টে দেখ।
    সব্বোনাশ। পরিসংখ্যানের কথা যখন বলছেন তখন তো রীতিমতো হোমওয়ার্ক করে এসেছেন মা। তাঁর কসমিক স্মৃতির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া তো অসম্ভব। তাই কথা ঘুরিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই বললাম: মা, কদিন বাদেই তো আসছ , সব গোছগাছ করে রেখেছ তো!
মা বললেন: আনার এখানে আসাটাকে তো তোমরা বেশ উৎসব আর ব্যবসা বানিয়ে ফেলেছ। আমি এখানে এলে তোমাদের চাহিদা মতো আওড়ে যাও মন্ত্র। ভাবো সেসব মন্ত্রে খুশি হব আমি!
    এসব কি বলছেন জগজ্জননী! বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকি বোকার মতো। মা বলেন: মন্ত্র আওড়ে কি চাও ভাবো তো দেখি। জয় চাও, যশ চাও, ধন চাও, বিঘ্ন বিপদ থেকে উদ্ধার চাও। অসুর আসলে সেইসব বিঘ্নবিপদের প্রতীক। তাই তোমাদের কল্পনা অসুরনাশিনীর মূর্তি সৃষ্টি করেছে। তোমরা ভণ্ড। তোমাদের উপর আর কোন অনুকম্পা আমার নেই। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে, প্রগতির জয়োল্লাস করে তোমরা হত্যা করেছ ঈশ্বরকে, বিনষ্ট করেছ প্রকৃতিকে, ধ্বংস করেছ নৈতিকতা-মমতা-ভালোবাসাকে। বিকল্প নির্মাণ কিছু করনি। কেবল বিনষ্টির তাণ্ডব। সেই সঙ্গে নিজেদের অগোচরে ছড়িয়ে দিয়েছ সন্দেহ আর সংশয়ের বীজ, ঘৃণা আর অবিশ্বাস আর নির্মোহ নৈর্ব্যক্তিকতার শত শত বীজ।
   শেষদিকে মা দুগ্গার কণ্ঠস্বরে বেশ রূঢ়তা ও বক্রতা এসেছিল। ঠিক সে সময় ভেসে এল বীরেন্দ্রকৃষ্ণের গম্ভীর কণ্ঠস্বর। ঘোর কেটে গেল আমার।

শকুন্তলা, শকুন্তলা এবং

শকুন্তলা

সুবিমল চক্রবর্তী

ডালাস, টেক্সাস, ইউনাটেড স্টেটস

      দুর্বাসা মুনির অভিশাপ অক্ষরে অক্ষরে ফলতে লাগল। রাজা দুষ্যন্ত শকুন্তলাকে চিনতে পারলেন না। ঋষি শাঙ্গরব ও ঋষি গৌতমী অনেক বোঝালেন, কিন্তু তাতেও কোন ফল হ’ল না। শকুন্তলা অনেক অনুনয় বিনয় করতে শুরু করলেন। কিন্তু রাজার মন অটল। রাজা শকুন্তলাকে উদ্দেশ্য করে নানান কটূক্তি করতে লাগলেন। শেষ চেষ্টাস্বরূপ শকুন্তলা রাজাপ্রদত্ত রাজার নামাঙ্কিত রাজাকে দেখানোর জন্য সেটির অনুসন্ধান করতে শুরু করলেন। ভাগ্যের কি পরিহাস! শকুন্তলা অঙ্গুরী পেলেন না।

     প্রবন্ধের নাম দেওয়া যেতে পারত “মহাভারতের দুষ্যন্ত-শকুন্তলা, কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলা, এবং সেলিম আল-দীনের শকুন্তলা”। সবগুলোতেই নায়িকা শকুন্তলা এবং কাহিনি তিন ক্ষেত্রেই আবর্তিত হয়েছে শকুন্তলাকে কেন্দ্র করে। প্রথমটির বয়স সম্ভবত আড়াই হাজার বছর, দ্বিতীয়টির দেড় হাজার বছরেরও বেশি এবং তৃতীয়টি হাল আমলের। মহাভারতের কথিত রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস ও কালিদাস এক অর্থে বা বলতে গেলে প্রায় একই কাল এবং স্থানের বাসিন্দা ছিলেন এবং তাই একই আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশের ফসল ছিলেন। স্পষ্টত ডঃ সেলিম আল-দীন বেড়ে উঠেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে। তাই শকুন্তলা আখ্যান তিন হাতে তিনটি ভিন্ন রূপ পেয়েছে। আমাদের বর্তমান প্রবন্ধটিতে এই তিন হাতের তিন রূপের উপরই আলোকপাত করতে সচেষ্ট হব।

     মহাভারত নাটক নয়, মহাকাব্য। কিন্তু কালিদাসের শকুন্তলা এবং সেলিম আল-দীনের শকুন্তলা এই দুটোই নাটক। মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্র ও উপকাহিনি নিয়ে ভারতের বিভিন্ন ভাষায় যুগে যুগে অজস্র সাহিত্য রচিত হয়েছে। সৃজনী সাহিত্য স্বাভাবিকভাবেই ব্যাসদেববর্ণিত চরিত্র বা কাহিনিকে নিরঙ্কুশভাবে আঁকড়ে ধরে থাকেনি। সৃজনী সাহিত্যে সময়, স্থান এবং লেখকের ভাবাদর্শ এবং জীবনের অভিজ্ঞতার প্রভাব পড়বেই। এই সত্যটুকু মনে রাখলে আমাদের আলোচনার বুঝতে সুবিধে হবে।

      কালের হিসেবে এটা ধরে নেওয়াটা অসঙ্গত হবে না যে মূলত মহাভারতই কালিদাস এবং সেলিম আল-দীনের নাটকের মূল এবং প্রধান অনুপ্রেরণা। হয়ত এটাও বলা অসঙ্গত হবে না যে সেলিম আল-দীনের উপর কালিদাসের শকুন্তলারও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। তবে একটা সতর্ক উচ্চারণ এখনি করে রাখা আবশ্যক। আর সেটি হচ্ছে, সেলিম আল-দীন শকুন্তলার চরিত্রচিত্রণে তাঁর যুগের প্রভাবকে অস্বীকার কতে পারেননি, তাই তাঁর শকুন্তলা ব্যাসদেব এবং কালিদাসের শকুন্তলা থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে। সেলিম আল-দীনের শকুন্তলার যন্ত্রণার মাত্রা ও তীব্রতা পৌরাণিক শকুন্তলা এবং সংস্কৃত নাটকের শকুন্তলার যন্ত্রণার মাত্রা ও তীব্রতার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান।

মহাভারতের শকুন্তলা

     প্রথমে মহাভারতের কাহিনিটি সংক্ষেপে বর্ণনা করা যাক। পুরুবংশীয় বীর্যবান রাজা দুষ্যন্ত সমস্ত পৃথিবী শাসন করতেন। তিনি একবার শিকারে বেরিয়ে বহু পশু বধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বিশ্রামের জন্য তাই শান্ত মনোরম অন্য এক বনে প্রবেশ করেন। সেই বনে মালিনী নদীর তীরে কণ্ব মুনির আশ্রম। হিংস্র পশুরাও এই বনে শান্তস্বভাবের। আশ্রমের ভেতরে ঢুকে মুনির দেখা না পেয়ে উচ্চকণ্ঠে বললেন, এখানে কে আছেন? বেরিয়ে এল মনোমুগ্ধকর এক সন্ন্যাসী বালিকা রাজাকে স্বাগত জানাতে। রাজাকে জানাল, তার পিতা কণ্ব ফলের সন্ধানে বেরিয়েছেন এবং তিনি শিগগিরই চলে আসবেন। ‘সুনিতম্বিনী চারুহাসিনী রূপযৌবনবতী’ কন্যার পরিচয় জানতে চাইলেন বিমোহিত রাজা। বালিকা বলল, কণ্ব মুনি তার পিতা। রাজা জানতেন যে কণ্ব ঊদ্ধরেতা সিদ্ধ পুরুষ; তিনি কিভাবে সন্তানের জন্ম দেবেন? বালিকা তার জন্মের কাহিনি শুনে ফেলেছিল যখন কণ্ব একদিন সেই কাহিনি শুনিয়েছিলেন আরেক ঋষিকে। বালিকা তার জন্মবৃত্তান্ত রাজাকে শোনালঃ দেবরাজ ইন্দ্র মুনি বিশ্বামিত্রের ঘোর ভীত হয়ে তাঁর ধ্যান ভঙ্গ করার জন্য চক্রান্ত করে স্বর্গের অপ্সরী মেনকাকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। নৃত্যরতা মেনকার বসন বায়ু হরণ করে নিলে বিশ্বামিত্র নগ্নিকাকে দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না। বিশ্বামিত্র ও মেনকার সঙ্গমে এক বালিকা সন্তানের জন্ম হ’ল। মেনকা নবজাতিকাকে মালিনী নদীর তীরে রেখেই ইন্দ্রসভায় ফিরে গেলেন। সেই সন্তানকে প্রাথমিকভাবে শকুন্ত অর্থাৎ পাখিরা পালন করল বলে তার নাম হ’ল শকুন্তলা। মহর্ষি কণ্ব কুড়িয়ে নিলেন এবং আশ্রমে গিয়ে নিজের দুহিতার মত লালনপালন করতে লাগলেন।

    রাজা বিশ্বামিত্রের ঔরসজাত শকুন্তলাতো রাজপুত্রী। দুষ্যন্ত শকুন্তলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। আর বললেন, তাঁর সমস্ত রাজ্য শুধুমাত্র শকুন্তলার। শকুন্তলা পিতার আদেশের জন্য ও পিতাকর্তৃক সম্প্রদানের জন্য অপেক্ষা করতে চাইলে রাজা বললেন, গান্ধর্বরীতিতে বিয়ে হবে এবং এই বিয়েই শ্রেষ্ঠ বিয়ে। শকুন্তলা শর্ত আরোপ করলঃ তার সন্তান যুবরাজ হবে এবং দুষ্যন্তের পরে সে-ই হবে রাজা। রাজা বললেন, তথাস্তু। আর আশ্বাস দিলেন, রাজা রাজধানীতে ফিরে গিয়ে চতুরঙ্গিনী সেনা পাঠাবেন শকুন্তলাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কণ্ব আশ্রমে ফিরলেন এবং দিব্যদৃষ্টিতে সবকিছুই জানতে পারলেন। লজ্জাবনতা শকুন্তলা আশ্বস্ত হ’ল যখন বুঝতে পারল যে পিতা খুব খুশি হয়েছেন। কণ্ব বর দিলেন, পুরুবংশীয়গণ ধর্মিষ্ঠ হবে এবং তারা কক্ষনো রাজ্যচ্যুত হবে না। তিন বছর পর শকুন্তলা একটি ‘সুন্দর মহাবলশালী অগ্নিতুল্য দ্যুতিমান’ পুত্র প্রসব কর। সকল পশুকে দমন করতে পারত বলে আশ্রমবাসীরা তার নাম দিল সর্বদমন। সর্বদমনের যুবরাজ হবার সময় হয়েছে। তাছাড়া মেয়েদের দীর্ঘকাল পিতৃগৃহে থাকলে লোকনিন্দার ভয় থাকে। কণ্ব শকুন্তলাকে রাজধানীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। রাজা দুষ্যন্ত নিজের ঔরসজাত সন্তানকে স্বীকার করা তো দূরের কথা, শকুন্তলাকে পর্যন্ত না চেনার ভান করলেন। রাজা শকুন্তলাকে ভ্রষ্টা ও দুষ্ট তাপসী বলতে পর্যন্ত কসুর করলেন না। রাজা বিশ্বামিত্রকে ব্রাহ্মণত্বলোভী, কামুক ও নির্দয় বলে অভিহিত করলেন। শকুন্তলার জননী মেনকাকে বললেন অসতী ও নির্দয়া। শকুন্তলা বললেন মেনকা দেবতাদের মধ্যে গণ্যা।

    শকুন্তলা লজ্জায় ও দুঃখে নির্বাক নিশ্চল হয়ে রইল। শকুন্তলার “চোখ রক্তবর্ণ হ’ল, ওষ্ঠ কাঁপতে লাগল, বক্র কটাক্ষে তিনি যেন রাজাকে দগ্ধ করতে লাগলেন।“ তারপর তিনি রাজাকে অভিসম্পাত করলেন, শকুন্তলাকে বিশ্বাস না করলে রাজার মাথা “শতধা বিদীর্ণ হবে”। শকুন্তলা রাজাকে আরো বললেন, রাজা চলেন ভূমিতে আর তিনি চলেন অন্তরীক্ষে। যাবার আগে শুধু বলে গেলেন যে রাজার সঙ্গে তাঁর মিলন সম্ভব নয়। আর রাজার সাহায্য না পেলেও তাঁর সন্তান সর্বদমন পৃথিবীর রাজা হবেই। তখন দুষ্যন্ত এক দৈব বাণী শুনলেনঃ শকুন্তলা যা বলেছেন তার সবটাই ঠিক। রাজা বললেন, তিনি এতক্ষণ যা বলেছেন বা করেছেন তার সবটাই ছিল অভিনয়। শকুন্তলার সতীত্ব প্রমান করার জন্যই এই অভিনয় করেছেন। তিনি শকুন্তলাকে গ্রহণ করলেন এবং আশ্বাস দিলেন যে সর্বদমনই তাঁর পর রাজা হবে। শকুন্তলা তাঁর উপর রুষ্ট হয়ে যে কথাগুলো বলেছিলেন সেগুলোর জন্য তিনি শকুন্তলাকে ক্ষমা করে দিলেন, কিন্তু নিজে অসদাচরণের জন্য মোটেই ক্ষমা চাইলেন না।

কালিদাসের শকুন্তলা 

     অনেক অনেক বছর আগে ভারতবর্ষে দুষ্যন্ত নামে এক সম্রাট ছিলেন। একবার অনেক সৈন্য সামন্ত নিয়ে তিনি মৃগয়ায় বেরিয়েছিলেন। তিনি প্রাণভয়ে ভীত এক

হরিণশিশুকে শিকারের লক্ষ্য করলেন। অকস্মাৎ দুই তপস্বী রাজাকে উদ্দেশ্য করে বললেন যে এটি আশ্রমমৃগ এবং নিরপরাধ প্রাণীটিকে যেন বধ না করা হয়। রাজার অস্ত্র আর্তের পরিত্রাণের জন্য। রাজা লজ্জিত হলেন এবং তপস্বীদেরকে প্রনাম কলেন। তপস্বীরা খুশি হয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করলেন যে তাঁর পুত্র হবে এবং সেই পুত্র পৃথিবীর অদ্বিতীয় রাজা হবেন। রাজাকে অবগত করানো হ’ল নিকটবর্তী মালিনী নদীর তীরেই কণ্ব মুনির আশ্রম। কণ্ব মুনি সোমতীর্থে গিয়েছেন। অতিথিসৎকারের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন কন্যা শকুন্তলার হাতে। রাজা আত্মাকে পবিত্র করার জন্য আশ্রম দর্শন করতে উদগ্রীব হলেন। রাজা তপোবনে প্রবেশ কলেন। খুব কাছেই অপূর্বদর্শনা তিন আশ্রমকন্যা তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। বালিকাত্রয়ের মধ্যমণিকে রাজা সহজেই শকুন্তলা বলে অনুমান করে নিতে পারলেন। অন্য দু’জন প্রিয়ংবদা এবং অনসূয়া। একটি ভ্রমর শকুন্তলাকে ভীষণভাবে উত্যক্ত করতে করছিল। সখিরা শকুন্তলাকে বললেন দুষ্যন্তকে স্মরণ করতে। এই কথা রাজার মনে সাহসের সঞ্চার করলে তিনি তাঁদের দিকে এগিয়ে গেলেন। এই অচেনা অতিথি শকুন্তলার মনে ‘তপোববিরুদ্ধ ভাবের’ উদয় হ’ল। অনসূয়া রাজার পরিচয় জানতে চাইলেন। রাজা নিজের পরিচয় গোপন করে নিজেকে রাজ্যের ধরমাধিকারে নিযুক্ত আছেন বলে জানালেন। রাজা ও শকুন্তলা দুজনেরই চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। ব্রহ্মচারী কণ্ব কিভাবে কন্যাসন্তান লাভ করলেন এই কথা জানার জন্য রাজা আকুলতা প্রকাশ করলেন। সখীরা যা জানতেন তা রাজাকে বললেন।

    রাজর্ষি বিশ্বামিত্র একবার গোমতী নদীর তীরে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। ভয় পেয়ে দেবতারা বিশ্বামিত্রের ধ্যান ভঙ্গ করার জন্য অপ্সরা মেনকাকে পাঠিয়ে দেন বিশ্বামিত্রের তপস্যাভঙ্গের জন্য। মেনকার মায়াজালে বিশ্বামিত্রের ধ্যানভঙ্গ হলে দু’জনের মিলনের ফলে এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। মেনকা এই শিশুকে অরণ্যে পরিত্যাগ করে স্বস্থানে চলে যান। এক শকুন্ত এই শিশুকে প্রতিপালন করতে লাগল। তাই তাদের সখীর নাম হ’ল শকুন্তলা। কণ্ব দৈবযুগে এই শিশুর সন্ধান পেয়ে আশ্রমে নিয়ে গিয়ে বড় করেন। উপযুক্ত পাত্র পেলে তাঁর বিয়েও দেবেন রাজা জানতে পারলেন। মেনকার গর্ভজাত সন্তানতো মানবী নন। শকুন্তলালাভ রাজার অভীষ্ট হয়ে উঠল। শকুন্তলারও অবস্থাও তথৈবচ। ইত্যবসরে রাজার হাতে দুষ্যন্তনামাঙ্কিত আংটি দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে এই ছদ্মবেশী রাজা দুষ্যন্ত ছাড়া আর কেউ নন। এখন প্রশ্ন হ’ল কেম্ন করে প্রেম নিবেদন কর যায়। সখীদের কথা মোতাবেক শকুন্তলা পদ্মপাতায় প্রেমপত্র লিখে সখীদের শোনানোর জন্য শব্দ করে পড়তে লাগল। আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা রাজা সব শুনতে পেয়ে সাহস পেয়ে আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে জানালেন যে তিনিও শকুন্তলার প্রেমে ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হচ্ছেন। রাজা আশ্বাস দিলেন যদিও তাঁর অনেক মহিষী আছেন, শকুন্তলাই হবেন তাঁর প্রিয়তমা মহিষী। প্রেমবিনিময়ের মধ্য দিয়ে কখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। পিতৃষ্বসা গৌতমি এলেন শকুন্তলার কুশল জানতে। রাজা আড়ালে চলে গিয়েছেন। পিসিকে শকুন্তলা বানিয়ে বললেন যে তাঁর সহচরীরা নদীতে জল আনতে গিয়েছেন। এরূপ কিছুদিন চলার পর দুষ্যন্ত ও শকুন্তলা গান্ধর্বমতে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হলেন। তারপর ধর্মারণ্যে কিছুদিন অবস্থান করে রাজা রাজধানীতে ফিরে গেলেন। বিদায়বেলায় নিজের নামাঙ্কিত আংটি শকুন্তলাকে হাতে দিয়ে গেলেন।

     চরম বিরহে দিন কাটছে শকুন্তলার। একদিন দুর্বাসা মুনি এলেন। বাহ্যজ্ঞানশূন্য শকুন্তলা দুর্বাসা মুনির পরিচর্যায় মনোযোগী হলেন না। ক্রুদ্ধ মুনি শকুন্তলাকে অভিসম্পাত করলেনঃ শকুন্তলাকে রাজা দুষ্যন্ত চিনতে পারবেন না। অতিকুটিলহৃদয় দুর্বাসা প্রিয়ংবদা ও অনসূয়া অনেক অনুনয়ের পর বললেন, শকুন্তলা যদি কোন অভিজ্ঞান দেখাতে পারে তাহলেই রাজা তাঁকে চিনতে পারবেন। কিছুদিন পর কণ্ব মুনি সোততীর্থ থেকে ফিরলেন। তিনি দিব্যজ্ঞানে সবকিছুই জানতে পেরেছেন। সবকিছু জেনে তিনি খুব খুশি হলেন। তিনি আরো জানতে পারলেন যে শকুন্তলা সন্তান্সম্ভবা। তিনি স্থির করলেন অচিরেই শকুন্তলাকে পতিসন্নিধানে পাঠিয়ে দেবেন। বিদায়ের কাল অশ্রুভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। বনের গাছপালা পশুপাখি শকুন্তলার নিত্যসঙ্গী ছিল।

      দুর্বাসা মুনির অভিশাপ অক্ষরে অক্ষরে ফলতে লাগল। রাজা দুষ্যন্ত শকুন্তলাকে চিনতে পারলেন না। ঋষি শাঙ্গরব ও ঋষি গৌতমী অনেক বোঝালেন, কিন্তু তাতেও কোন ফল হ’ল না। শকুন্তলা অনেক অনুনয় বিনয় করতে শুরু করলেন। কিন্তু রাজার মন অটল। রাজা শকুন্তলাকে উদ্দেশ্য করে নানান কটূক্তি করতে লাগলেন। শেষ চেষ্টাস্বরূপ শকুন্তলা রাজাপ্রদত্ত রাজার নামাঙ্কিত রাজাকে দেখানোর জন্য সেটির অনুসন্ধান করতে শুরু করলেন। ভাগ্যের কি পরিহাস! শকুন্তলা অঙ্গুরী পেলেন না। রাজার ঘৃণা দ্বিগুণ হয়ে উঠল। প্রবঞ্চনা স্ত্রীজাতির স্বভাবসিদ্ধ বিদ্যা এমন কথা পর্যন্ত রাজার মুখ থেকে নির্গত হ’ল। শকুন্তলা সহসাই রুষ্ট হয়ে উঠলেন এবং রাজাকে অনার্য বলে সম্বোধন করলেন। শারদ্বত এবং শার্ঙ্গরব  এই দুই ঋষি শকুন্তলার সাথে এসেছিলেন। শার্ঙ্গরব ছিলেন উদ্ধতস্বভাবের। শকুন্তলাকে জন্মাবধি নিষ্কলুষ দাবী করে বললেন, রাজারা পরপ্রতারণা বিদ্যা শিক্ষা ও প্রয়োগ করে। রাজা কথাটা মেনে নিয়েও বললেন শকুন্তলাকে প্রতারণা করে তাঁর কী লাভ! অধিকতর শান্তস্বভাবের ঋষি শারদ্বত বললেন, অযথা বিবাদ বাড়িয়ে লাভ নেই। রাজা তাঁর পত্নীকে নিয়ে কি করবেন তার দায়িত্ব রাজার কাছে অর্পণ করে প্রস্থানোদ্যত হলেন। অসহায়া শকুন্তলা কান্নার রোল তুলে তাঁদের পেছন নিলেন। গৌতমী শকুন্তলাকে সঙ্গে নিতে চাইলেন। শার্ঙ্গরব শকুন্তলার গোপনে রাজাকে বিয়ে করার ব্যাপারটিকে কখনো মন থেকে মেনে নেননি। তিনি পাপিয়সী বলে গর্জন করে উঠলেন আর বললেন রাজার আলয়ে থেকে নিজেকে পতিব্রতা প্রমান করতে। এই কথা শুনে রাজা দুষ্যন্ত আবার নিজেকে সৎ দাবী করলে ঋষি রাজার স্মৃতিবিভ্রমের সম্ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত করলেন। এই কথা শুনে রাজা পুরোহিতের মতামত জানতে চাইলেন। পুরোহিত সন্তান ভূমিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত শকুন্তলাকে আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে মত জ্ঞাপন করলেন, কারন ভূমিষ্ট সন্তানের শরীরে রাজচিহ্ন থাকলে শকুন্তলার দাবী প্রমানিত হবে। রাজার অনুমতি নিয়ে পুরোহিত শকুন্তলাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সঙ্গে নিয়ে চললেন। পথে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। অপ্সরাতীর্থের কাছে পৌঁছুলে এক জল।তিঃপদার্থ স্ত্রীবেশে সহসা আবির্ভূত হয়ে শকুন্তলাকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। রাজা এই কথা শুনে নির্বিকার থাকলেন।

    এদিকে এক অভাবনীয় কান্ড ঘটল। স্নান করার সময় শকুন্তলার আঁচল থেকে রাজার দেওয়া অঙ্গুরী নদীর জলে পড়ে গিয়েছিল। সেটি চলে গিয়েছিল এক মাছের পেটে। মাছ যখন কাটা হ’ল তখন এটি চোখে পড়ল। জাইহক, শেষপর্যন্ত ঘটনা রাজার কানে গেল। অঙ্গুরী দেখামাত্র রাজার পূর্বস্মৃতি মনে পড়ে গেল। রাজা বিমর্ষ হলেন। তাঁর মধ্যে অনুতাপ হ’ল এবং শকুন্তলাকে ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি বিলাপ করতে লাগলেন যে শকুন্তলাকে হারিয়ে তিনি নিঃসন্তান থাকবেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর রাজবংশের বিলোপ ঘটবে। এই সময় দেবরাজ ইন্দ্রের সারথি মাতলি উপস্থিত হয়ে রাজাকে জানালেন যে কালনেমির সন্তান দুর্জয় নামে দুর্দান্ত দানবেরা দেবতাদের সাথে শত্রুতায় মত্ত হয়েছে এবং ইন্দ্র চান রাজা শত্রুদমনে আত্মনিয়োগ করেন। দুষ্যন্ত ইন্দ্রের আজ্ঞা শিরোধার্য করে ইন্দ্ররথে দেবলোকে প্রস্থান করলেন। শত্রুদমনের পর রাজা মাতলির রথে মর্তের পথে যাত্রা করলেন। তিনি কশ্যপ মুনির আশ্রম হেমকূট পর্বতে নেমে গেলেন ঋষিকে প্রণাম করার উদ্দেশ্যে। ভগবান কশ্যপ তখন নিজের পত্নী অদিতি এবং অন্যান্য ঋষিপত্নীদেরকে পতিব্রতা ধর্ম শ্রবণ করাচ্ছেন। রাজা অপেক্ষায় থাকলেন।

তিনি দেখলেন এই বনে মানুষ, পশু, পাখি ইত্যাদি সব পরস্পরকে আক্রমন না করে পরম শান্তিতে দিন যাপন করে। এম্ন সময় দেখতে পেলেন একটি বালক এক সিংহ শাবককে উত্যক্ত করছে আর দুই তাপসী তাকে বিরত রাখার জন্য অনুনয়বিনয় করছে। শিশুর দৃষ্টি অন্যত্র  ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তাপসীরা যখন তাকে মিছিমিছি খেলনা দিতে গেলেন এবং খেলনা নেওয়ার জন্য সে যখন হাত বাড়াল, রাজা তার হাতে চক্রবর্তীলক্ষণ দেখতে পেলেন। অজানা আনন্দে তাঁর মন পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। নিঃসন্তান রাজার মন কেমন বিষন্নতায় ভরে গেল। সত্যিকারের খেলনা না পেয়ে শিশু আরো বেশি বেশি করে শিশুকে উত্যক্ত করতে শুরু করল। তাপসীরা অসহায় বোধ করে সাহায্যের জন্য এদিক ওদিক তাকাল। রাজা আড়ালেই ছিলেন। এগিয়ে এসে শিশুকে ঋষিকুমার বলে সম্বোধন করলেন। তাপসীরা জানালেন যে শিশু আসলে পুরুবংশীয়। রাজার কথায় শিশু পশুউৎপীড়ন থেকে বিরত থাকল। শিশুর স্পর্শ পেয়ে রাজার মন আনন্দে উদবেলিত হয়ে উঠল। রাজার মনে প্রশ্ন জাগল এই দেবভূমিতে মানুষের উপস্থিতি কেন? তাপসী জানালেন এই শিশুর জননী অপ্সরাসম্বন্ধে এখানে এসে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। রাজা আরো জানতে পারলেন, এই শিশুর মায়ের নাম শকুন্তলা। রাজা আশানৈরাশ্যের দোলাচলে অন্তস্থিত হলেন। এমন সেখানে শকুন্তলা উপস্থিত হলেন। দু’জন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থেকে নির্বাক হয়ে রইলেন। রাজা তাঁর অতীত কর্মের জন্য বারবার ক্ষমা চাইতে লাগলেন। রাজা সকল বৃত্তান্ত শকুন্তলাকে বললেন। শকুন্তলা দোষ দিলেন অদৃষ্টকে। রাজা দুষ্যন্ত ও শকুন্তলা দু’জনে একসঙ্গে কশ্যপ মুনির সঙ্গে দেখা করলেন। কশ্যপ তাঁদের প্রাণভরে আশীর্বাদ করলেন। কশ্যপ দুর্বাসা মুনির অভিশাপ ইত্যাদি সমস্ত বৃত্তান্ত শকুন্তলা ও দুষ্যন্তকে বিস্তারিত বললেন। ভগবান কশ্যপ আরো বললেন, তাঁদের এই সন্তান একদিন এই সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর হবেন। অদিতির পরামর্শক্রমে দূতের মাধ্যমে সবকিছু কণ্ব মুনিকে জানানো হ’ল। রাজা দুষ্যন্ত ও শকুন্তলা তাঁদের সন্তানকে নিয়ে রাজধানীতে চলে গেলেন এবং পরম সুখে রাজ্যশাসন অ প্রজাপালন করতে লাগলেন।

     পৃষ্ঠার হিসেবে মহাভারতের শকুন্তলা উপাখ্যান লেখা হয়েছে তিরিশ পৃষ্ঠায় আর কালিদাসের শকুন্তলা নাটক একশ সাত পৃষ্ঠা দীর্ঘ। মহাভারতের রচয়িতা শকুন্তলা-দুষ্যন্তের খুব দ্রুত কিন্তু অত্যন্ত চমৎকারিত্বের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন এবং পাঠক বা শ্রোতার মন জয় করেছেন। এই মহাকাব্যিক বর্ণনায় এবং ঘটনার পরিবেশনায় নাটকীয়তাও রয়েছে। কিন্তু মহাভারতের কাব্যগুণ এক দিক দিয়ে বিচার করলে কালিদাসের শকুন্তলার কাব্যগুণ থেকে অনেক আলাদা। তার মানেই কালিদাস মহাভারতের মূল অনেক নতুন জিনিস ঢুকিয়েছেন। কালিদাসের বইয়ের কলেবর বৃদ্ধির অন্য কারন অবশ্যই এই একজন শ্রেষ্ঠ কবির কবিত্ব যা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর প্রকৃতির, প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যকার ঐক্য, এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার বর্ণনায়। কাহিনির দিক থেকে প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য এসেছে কালিদাসের শকুন্তলায় দুর্বাসা মুনির অভিশাপ সংযোজন। আমরা উপরের বর্ণনায় দেখেছি এই অভিশাপ কেমন করে বারবার কাহিনির গতি পাল্টেছে। অভিজ্ঞানের (রাজা দুষ্যন্তের নামাঙ্কিত অঙ্গুরী) উল্লেখ মহাভারতে নেই। এটি কালিদাস সম্ভবত বৌদ্ধ জাতক থেকে নিয়েছিলেন। এই গল্প অনুযায়ী এক রাজা বনে সাক্ষাৎ হয়েছে এমন এক ললনাকে বিয়ে করেন। বিদায়ের আগে তিনি তাঁর নবপরিণীতা স্ত্রীকে নিজের চিহ্নসম্বলিত একটি আংটি দিয়ে যান এবং বলে যান রাজার সঙ্গে পুনরায় মিলনের আগে যেন এই আংটি এবং পুত্র সন্তান সঙ্গে নিয়ে যান।  রমণী এক পুত্র সন্তানের (হবু বুদ্ধ) জন্ম দেন এবং সন্তানকে নিয়ে রাজার সঙ্গে দেখা করতে যান। রাজা তাঁকে চিনতে পারেন না। যাইহোক এক দৈব ঘটনার বলে তিনি রাজাকে বাধ্য করেন তাঁদের মধ্যকার বৈধ সম্পর্ক স্বীকার করে নিতে। ভাগবত পুরাণ এবং পদ্ম পুরাণেও শকুন্তলার কাহিনি আছে। তবে সময়ের হিসেবে এই দুই পুরাণের শকুন্তলাসম্পর্কিত কাহিনি মহাভারত থেকেই নেওয়া হয়েছে এটা হয়ত মেনে নেওয়া যায়।

     সেলিম আল-দীনের শকুন্তলার কাহিনি মহাভারত এবং কালিদাসের শকুন্তলার কাহিনির এক খুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। না দেবী না মানবী শকুন্তলার তীব্র অস্তিত্ত্বের সঙ্কট এই নাটকের প্রধান উপজীব্য। এখানে রাজা দুষ্যন্ত নেই, গান্ধর্ব বিবাহ নেই, অভিজ্ঞান নেই, নেই রাজা দুষ্যন্ত কর্তৃক তার বিয়ে এবং সন্তানের নিষ্ঠুর অস্বীকৃতি এবং পরে দৈবক্রমে রাজার সঙ্গে মিলন। ঘটনা সামান্য, কিন্তু মানুষের যন্ত্রণার গভীরতা এবং মানুষের সমাজের মলিনতা মহাভারতের কালকে ছাপিয়ে আধুনিক যুগ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। যেমন, বিশ্বামিত্র মর্তের মানুষের মুক্তিকামনায় ধ্যানে নিমগ্ন। মানুষকে দেবতাদের মতই মৃত্যুহীন করবেন। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র এতে শঙ্কিত এবং ঈর্ষান্বিত। তাই ইন্দ্রের ধ্যানভঙ্গের জন্য মেনকাকে মর্তে পাঠালেন। মেনকা সফল হলেন বিশ্বামিত্রের পদস্খলন ঘটাতে। মেনকার গর্ভে বিশ্বামিত্রের ঔরসে শকুন্তলার জন্ম হ’ল। মেনকা নবজাতিকাকে পরিত্যাগ করে মর্ত্য ছেড়ে চলে গেলেন। শকুন্তলা বড় হতে লাগলেন কণ্ব মুনির আশ্রমে। প্রকৃতি, বনের জীবজন্তু এবং দুই আশ্রমবালিকা তাঁর নিত্য সঙ্গী। একদিন সময় এল তাঁর নিজের পরিচয় জানার। এটাই হ’ল তাঁর জীবনের দুরুহতম সময়। মর্ত্যের মাটিতে ‘শৃঙ্খলিত’ স্বর্গের দেবী। তিনি তাঁর আপন মা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ সকিছুকে অর্থহীন করে তুলেছে। শুধু হাহাকার। শুধুই কানামাছি। পৃথিবী তাঁর কাছে অতীব নোংরা এক জায়গা। এ এক ঘোরতর অস্তিত্বসঙ্কট। এইভাবেই শকুন্তলার এই হাহাকারের মধ্য দিয়েই নাটকের যবনিকাপাত ঘটে।

    নাট্যকার এই নাটকে অনেক চরিত্রের এবং ঘটনার সমাবেশ ঘটিয়েছেন যা ব্যাসদেব বা কালিদাসে নেই। তার মানেই তিনি ভারতীয় পুরাণের অন্যত্রও বিচরণ করেছেন। যেমন অর্ক চরিত্র। বিশ্বামিত্রের চোখের যন্ত্রণা। যন্ত্রণার উপশমের জন্য ইন্দ্রের পাঠানো কামবৃক্ষের শিকড়। বিশ্বামিত্রের কামার্ত হয়ে যাওয়া। দেবরাজ ইন্দ্রের চক্রান্তের অংশ হিসেবে নাট্যকার চতুর নারদকে এনেছেন। এনেছেন তক্ষককে নদীর জলকে বিষাক্ত করে দেওয়ার জন্য। তক্ষক এসেছে শূদ্রের সাজে। সে ‘জল’ না বলে বলছে ‘পানি’। শূদ্রের নদীর জল স্পর্শ করার অধিকার নেই। বিশ্বামিত্রের প্রিয় নদী কৌশিকী উল্লেখিত হয়েছে নাটকে। নাটকে উল্লেখিত হয়েছে সমুদ্রমন্থনের বাসুকির কথা। নাটকে দেবতাকে মানুষের বিরুদ্ধশক্তি হিসেবে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখানো হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, মহাভারত এবং কালিদাসের শকুন্তলায় মানুষের নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস রয়েছে। সেলিম আল-দীন মানবতার বা মানুষের জয়গান গাইতে চেয়েছেন। শকুন্তলার তীব্র অস্তিত্বসঙ্কটকে উপলক্ষ করে নিয়েছেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

১। রাজশেখর বসুর মহাভারতের সারানুবাদ।

২। বিদ্যাসাগরের ‘শকুন্তলা’।

৩। Myth = Mithya by Dr. Devdutt Pattanaik.

৪। An English translation of Kalidas’s Recognition of Shakuntala by W.J.Johnson.

৫। সেলিম আল-দীনের শকুন্তলা নাটকের মঞ্চাভিনয়।

৬। ‘শকুন্তলা’ চলচ্চিত্র।

 
 

এপার বাংলায় সোমেন চন্দ : পুনরাবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠা

দিলীপ মজুমদার

সোমেন চন্দ্রর রচনাবলি প্রকাশিত হবার পরে দর্পণ, বাংলাদেশ, যুগান্তর, সত্যযুগ, কালান্তর, গণশক্তি প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সমালোচনা। ‘দেশ’ পত্রিকায় তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সনাতন পাঠকের ছদ্মনামে সাহিত্য সমালোচনা করতেন। একদিন অধীর পাল তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন আমাকে। বই দিলাম। তিনি ‘দেশ’ পত্রিকায় আমার প্রচেষ্টার প্রশংসা করে একটি অনুচ্ছেদ লিখলেন। এভাবে ধীরে ধীরে বইটি জনপ্রিয় হতে লাগল। আবদুল্লাহ রসুল, সৈয়দ শাহেদুল্লাহ, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, অনুনয় চট্টোপাধ্যায়, সুদর্শন রায় চৌধুরী, সুধাংশু দাশগুপ্ত প্রমুখ কিছু সি পি এম নেতাও মৌখিকভাবে বইটির প্রচারে সাহায্য করেছিলেন।

    সাল ১৯৭২। প্রখর গ্রীষ্মকাল। দগ্ধ হচ্ছে তিলোত্তমা কলকাতা। সে তাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে তখনকার রাজনীতি। চারদিকে সন্ত্রাসের তাপ। কমিউনিস্ট, বিশেষ করে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিক্রিয়াশীল ও অতিবামেদের আক্রমণ। কখনও সামনা-সামনি, কখনও চোরাগোপ্তা।

     এমনি এক তাপদগ্ধ দিনে আমি বেলভিডিয়ারে জাতীয় গ্রন্থাগারে। পুরনো পত্রিকার পাতা উল্টানো আমার নেশা। সেদিন পাতা উল্টাচ্ছি ‘পরিচয়’ পত্রিকার। হঠাৎ চোখে পড়ল ‘ইঁদুর’ নামক একটি গল্প। লেখক সোমেন চন্দ। অপরিচিত নাম। আগে শুনিনি কোনদিন। সময় কাটানোর জন্য পড়তে শুরু করলাম। প্রথম অনুচ্ছদে বাসায় ইঁদুরের উপদ্রবের কথা, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ইঁদুর মারা পরিকল্পনার কথা। তৃতীয় থেকে পঞ্চম পরিচ্ছেদও মামুলি। কিন্তু তারপর আর উদাসীন থাকা গেল না। কথা বলতে শুরু করল ইতিহাস। দেখতে পেলাম মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থরোপিত বনস্পতির কোটরে ও ফাটলে অস্বস্তিকর ইঁদুরের উপদ্রব। দেখতে পেলাম অর্থনৈতিক সংকট কিভাবে জটিলতা সৃষ্টি করে মানব-সম্পর্কের। ক্লেদাক্ত হয়ে ওঠে সম্পর্ক। স্বামী তার স্ত্রীকে বলে, ‘শয়তান মাগী বেরিয়ে যা।’ কিন্তু দুর্বার জীবনীশক্তি মানুষের। তাই বিবাদের পরে সুবাদ। অপমানিতা স্ত্রী উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন আপন মহিমায়, ‘ অল্প একটু ঘোমটা টেনে কাপড়ের প্রচুর দৈর্ঘ্য দিয়ে নিজেকে ভালোভাবে আচ্ছাদিত করলেন। তারপর এক অশিক্ষিতা নববধূর মতো ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হতে লাগলেন। অঙ্গভঙ্গির সঞ্চালনে যে সঙ্গীতের সৃষ্টি হয়, সেই সঙ্গীতের  আয়নায় আমার কাছে সব স্পষ্ট হয়ে উঠল।’

     এই গল্প আঠারো-উনিশ বছরের তরুণের লেখা! বিস্ময়, বিস্ময়। এই গল্পের পাশাপাশি পড়লাম সতীশ পাকড়াশির স্মৃতিচারণ। কৈশোর থেকেই সাহিত্যানুরাগী সোমেন চন্দ। ঢাকার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হত তাঁর লেখা। কলকাতার বিখ্যাত ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘শিশু তপন’ নামে একটি গল্পও প্রকাশিত হয়েছিল। ঘটনাচক্রে সোমেনের সঙ্গে আন্দামানফেরৎ বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশির পরিচয় হয় , তাঁর মাধ্যমে পরিচয় হয় অন্যান্য মার্কসবাদী কর্মীদের সঙ্গে। এঁদের গভীর প্রভাব পড়ে সোমেনের জীবনে। কৃষাণ ও মজুরের জীবনের শরিক হয়ে কর্মে ও কথায়-গানে তাঁদের আত্মীয়তা অর্জনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন সোমেন চন্দ। মাত্র ২২ বছর বয়েসে রাজনৈতিক আততায়ীদের হাতে নিহত হন তিনি।

     সোমেনের এই পরিচয় জানার পরে আমার কৌতূহল বেড়ে গেল। কোথায় পাওয়া যাবে তাঁর অন্যান্য লেখার খোঁজ, কোথায় পাওয়া যাবে তাঁর বিস্তৃত জীবনবৃত্ত! প্রথম খোঁজ করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের কাছে। ড. ক্ষেত্র গুপ্তের মতো যাঁরা মার্কসবাদীমনোভাবাপন্ন তাঁরা বললেন, সোমেন চন্দের নাম জানলেও তাঁর বিস্তৃত পরিচয় জানেন না। যেসব মার্কসবাদী নেতা পরিচিত ছিলেন  এক এক করে তাঁদের কাছেও গেলাম। ফল হল না কিছু। আমাদের ছাত্রফ্রন্টের নেতা শ্যামল চক্রবর্তী পরামর্শ দিলেন কাকাবাবুর কাছে যাবার। কাকাবাবু হলেন মুজফফর আহমদ। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি তখন লেক প্লেসে সেন্ট্রাল কমিটির অফিসে থাকেন। তাঁর বই লেখার কাজে সাহায্য করে আমাদের রবীন্দ্র ভারতীর ছাত্রনেতা সুমন্ত হীরা। সুমন্তই একদিন আমাকে নিয়ে গেল কাকাবাবুর কাছে  লেক প্লেসে। আমার মুখে সোমেন চন্দের কথা শুনে কাকাবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর মুখে বেদনার ছায়া। তারপর মৃদুকন্ঠে বললেন : অকালে প্রাণ দিতে হল এমন প্রতিভাবান ছেলেটাকে। 

    পথ দেখালেন কাকাবাবু। তিনি আমাকে শিশির নাগ আর সুধী প্রধানের কা্ছে যেতে বললেন। সুধী প্রধান আমার বাড়ির কাছে নিউ আলিপুরে থাকেন। তাঁর কাছে পেলাম সোমেনের একটি গল্পগ্রন্থ। ‘সংকেত ও অন্যান্য গল্প’। চল্লিশের দশকে ঢাকা থেকে ছাপা। কিন্তু সুধীবাবু বলে দিলেন বইটি নিয়ে যাওয়া চলবে না, তাঁর বাড়িতে বসে কপি করে নিতে হবে। তাই সই। আমার বন্ধু চিত্রা ধর দিন পনেরো ধরে কপি করল। ‘দেশ’ পত্রিকা থেকে খুঁজে পেলাম সোমেন চন্দের ‘শিশুতপন’ গল্পটি। শিশির নাগ আমাকে নিয়ে গেলেন কবি ও সোমেনের বন্ধু কিরণশঙ্কর সেনগুপ্তের বাসায়। এখানে পেলাম প্রচুর সাহায্য। পেলাম সোমেনের ‘বনস্পতি’ গল্পগ্রন্থ, পত্রিকায় প্রকাশিত সোমেনের দুটি একাঙ্ক নাটক, ‘প্রতিরোধ’ পত্রিকার ফাইল। অক্লান্ত চিত্রা এসব কপি করে গেল নীরবে। কিরণবাবু বললেন : সোমেনের মৃত্যুর ৩০ বছর পরে আপনি যে উদ্যোগ নি্যেছেন তার জন্য ধন্যবাদ। তিনি তো ধন্যবাদ দিলেন কিন্তু সোমেনের লেখা কপি করে বা তাঁর জীবনবৃত্ত উদ্ধার করে আমি কি করব! কে ছাপবে সোমেনের রচনাবলি! লেখালেখির জগতে আমি তো হরিদাস পাল। কে চেনে আমাকে!

    কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের ভূপেন কেবিনে প্রতি শুক্রবার বিকেলের দিকে আড্ডা দিতে আসেন কয়েকজন অধ্যাপক । তাঁদের মধ্যে আছেন পীযূষ দাশগুপ্তের ভাই অধ্যাপক শঙ্কর দাশগুপ্ত আর রবীন্দ্রভারতীর নবনিযুক্ত অধ্যাপক রবীন গুপ্ত। এঁরা দুজনেই মার্কসবাদী কমিউনিস্ট দলের অনুরাগী, কিন্তু সদস্য নন। আমার কথা শুনে দুজনেই উৎসাহিত। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের নবজাতক প্রকাশন শঙ্করদার কয়েকটি বই প্রকাশ করেছেন। শঙ্করদা সেইদিনই আমাকে নিয়ে গেলেন নবজাতকে। পরিচয় করিয়ে দিলেন প্রকাশক মজহারুল ইসলামের সঙ্গে। বামপন্থী বই প্রকাশ করে তাঁর তখন নামডাক হয়েছে। শঙ্করদার কথা শুনেই রাজি হয়ে গেলেন মজহারুল। আমার মনে হচ্ছিল যেন স্বপ্ন দেখছি। নামডাকহীন, প্রায় অজ্ঞাতকুলশীলের জীবনের প্রথম বই এত সহজে, কোন কাঠখড় না পুড়িয়ে প্রকাশের পথ পেয়ে গেল! প্রকাশক আমাকে প্রুফ দেখে দিতে বললেন  প্রুফ দেখা জানি না শুনেও হতোদ্যম হলেন না কিছুতেই। বললেন প্রেসে বসতে বসতে শিখে যাব। তবে আর একটা অনুরোধ করলেন। কি না , মুজফফর সাহেবের ভূমিকা যেন থাকে বইতে। তখন মুজফফরসাহেব বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। লেখাপড়া বন্ধ। তবু তিনিও হতোদ্যম হলেন না। ঠিক হল তিনি মুখে বলবেন, আর সুমন্ত সেটা লিখে নেবে।

    প্রেসে দেওয়ার জন্য পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করতে লাগলাম । আমার হাতে আছে সোমেনের ২০টি গল্প : শিশুতপন, মরুদ্যান, ভালো-না-লাগার শেষ, আমিল, সত্যবতীর বিদায় , সিগারেট, গান, প্রত্যাবর্তন, অকল্পিত, মহাপ্রয়াণ, প্রান্তর, বনস্পতি, পথবর্তী, রাত্রিশেষ, স্বপ্ন, একটি রাত, সংকেত, দাঙ্গা, ইঁদুর, মুহূর্ত। একাঙ্ক নাটিকা ২টি : বিপ্লব, প্রস্তাবনা। কবিতা একটি : রাজপথ। এরপর যোগ করলাম ৬টি পরিশিষ্ট। সোমেনের জীবন ও কর্মের পরিচয় দেবার জন্য বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা থেকে বিভিন্ন তথ্যের সংকলন। পরিশিষ্টগুলি এইরকম : ১]

সোমেন চন্দের সামগ্রিক পরিচয় ২] সোমেন চন্দের লেখা কয়েকটি চিঠি ৩] সোমেন চন্দের দুটি গল্পসংকলনের ভূমিকা ৪] সোমেন চন্দের সাহিত্য প্রতিভা- সমসাময়িক সমালোচনা ও তথ্য  ৫] সোমেনের মৃত্যু ও তার প্রতিক্রিয়া ৬] সোমেনের মৃত্যু ও নতুন সম্ভাবনা। বইএর সব ফর্মা ছাপা হবার পরেই সুমন্ত কাকাবাবুর ভূমিকা নিয়ে হাজির হল। কিম্বার নার্সিং হোমে চরম অসুস্থ অবস্থায় লেখা হয়েছে। এটাই মুজফফর আহমদের শেষ লেখা। সেদিক থেকে ফাঁকতালে আমি ঈর্ষণীয় গৌরব লাভ করেছি। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি ছিল পার্টির বইএর দোকান। নবজাতকের বই ভালই বিক্রি হত সেখান থেকে। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হল ‘সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনা সংগ্রহ’। নবজাতকের কর্মচারী মুস্তাফাকে মজহারুল পাঠালেন ন্যাশনাল বুক এজেন্সিতে। বিক্রির জন্য বই দিয়ে আসতে। কিন্তু সে এজেন্সির এক কর্তাব্যক্তি বললেন: ‘ ১৯৬৪ সালে পার্টি ভাগ হওয়ার পরে ( সি পি আই ও সি পি এম ) সোমেন চন্দ কোন দলে আছেন তা না জানলে তাঁর বই  তো রাখা যাবে না।’ কাকাবাবুকে সেকথা জানাতে তিনি সেই কর্তাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, ‘আপনারা কি কোন খোঁজ রাখেন না? সোমেন চন্দ পার্টি ভাগ হওয়ার অনেক আগে ১৯৪২ সালে মারা গেছেন।’

   বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরে কিরণবাবুর পরামর্শে অন্নদাশঙ্কর রায় ও তাঁর স্ত্রী লীলা রায়, রণেশ দাশগুপ্ত, সোমেনের বৈমাত্রেয় ভাই কল্যাণ চন্দ, শিশির নাগ, সুধী প্রধান এঁদের এক কপি করে বই দিয়ে এলাম। একদিন কিরণশঙ্করবাবুর বাড়িতে বই দিতে গিয়ে দেখি বিখ্যাত কবি বীরেন চট্টোপাধ্যায় আছেন সেখানে। তিনি বললেন সোমেনের হত্যাপ্রসঙ্গে বিশেয করে কোন রাজনৈতিক দলের নাম না করাই ভালো। তখনো আমি জানতাম না সোমেনের হত্যাকাণ্ডে আর এস পি দলের লোক জড়িত ছিলেন। সেটা পরে জানতে পেরেছি ‘একতা’ পত্রিকায় কমিউনিস্ট নেতা জ্ঞান চক্রবর্তীর একটি  প্রবন্ধ পড়ে। বীরেনদা নিজে আর এস পি দলের সঙ্গে ছিলেন এবং তখন পশ্চিমবঙ্গের যুক্তফ্রন্টে আর এস পি যুক্ত ছিল। সেই কারণে বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের নাম না করার কথা বলেছিলেন বীরেনদা। দুঃখের বিষয় শ্রদ্ধেয় বীরেনদার কথা আমি রাখতে পার নি। তা করতে হলে ইতিহাসের মর্ষাদা লঙ্ঘন করতে হয় ।

    সোমেন চন্দ্রর রচনাবলি প্রকাশিত হবার পরে দর্পণ, বাংলাদেশ, যুগান্তর, সত্যযুগ, কালান্তর, গণশক্তি প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সমালোচনা। ‘দেশ’ পত্রিকায় তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সনাতন পাঠকের ছদ্মনামে সাহিত্য সমালোচনা করতেন। একদিন অধীর পাল তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন আমাকে। বই দিলাম। তিনি ‘দেশ’ পত্রিকায় আমার প্রচেষ্টার প্রশংসা করে একটি অনুচ্ছেদ লিখলেন। এভাবে ধীরে ধীরে বইটি জনপ্রিয় হতে লাগল। আবদুল্লাহ রসুল, সৈয়দ শাহেদুল্লাহ, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, অনুনয় চট্টোপাধ্যায়, সুদর্শন রায় চৌধুরী, সুধাংশু দাশগুপ্ত প্রমুখ কিছু সি পি এম নেতাও মৌখিকভাবে বইটির প্রচারে সাহায্য করেছিলেন। সি পি এমের বিভিন্ন লোকাল কমিটি নবজাতক থেকে রাজনীতির বই নিয়ে যেতেন। তাঁদের হাতে হাতে ঘুরতে লাগল আমার বইটি। পুজো স্টলেও এ বই শোভা পেল। এভাবে সোমেন চন্দ ধীরে ধীরে পরিচিত ও জনপ্রিয় হতে লাগলেন এপার বাংলার মানুষজনের কাছে ।

     ‘সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনাবলির’ দীর্ঘ সমালোচনা প্রকাশিত হয় ‘যুগান্তর’ পত্রিকায়। এই সমালোচনা লিখেছিলেন সাংবাদিক ও সোমেন চন্দের বন্ধু সরলানন্দ সেন । তাঁর ঢাকুরিয়ার বাড়িতে গিয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এসেছিলাম। এই সমালোচনা প্রকাশিত হবার দিন পাঁচেকের মধ্যে একটা চিঠি পেলাম। লিখেছেন নির্মলকুমার ঘোষ। লিখেছেন সোমেনের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ছিল। তাঁর পত্রিকায় সোমেনের কয়েকটি গল্প ও একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। সেসব তাঁর কাছে আছে। আমাকে তিনি দিয়ে যেতে চান। আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। তাহলে ‘সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনাবলি’ ২য় খণ্ড প্রকাশ করা যাবে।

     কালবিলম্ব না করে পরের দিনই দাশনগরে নির্মলবাবুর বাসায় চলে গেলাম। চল্লিশের দশকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হত ‘বালিগঞ্জ’ আর ‘সবুজবাংলার কথা’। সেই দুটি পত্রিকা থেকে পেলাম সোমেনের উপন্যাস ‘বন্যা’। আর  চারটি গল্প : ‘মরুভূমিতে মুক্তি’ , ‘রানু ও স্যার বিজয়শঙ্কর’, ‘এক্স সোলজার’ , ‘অন্ধ শ্রীবিলাসের আনেক দিনের একদিন’ । পত্রিকা থেকে লেখাগুলি কপি করে দিল রনজিৎ মাইতি।

আমরা ঠিক করলাম সোমেন চন্দ স্মৃতি রক্ষা কমিটি তৈরি করব। সেই কমিটি পালন করবে সোমেনের জন্মদিবস। ১৯৭৬ সালের ১৬মে গঠিত হল সেই কমিটি।সভাপতি- নারায়ণ চৌধুরী, সহ সভাপতি- ড. রবীন্দ্র গুপ্ত, সাধারণ সম্পাদক-নীতীশ বিশ্বাস, যুগ্ম সম্পাদক- বিশ্বেশ্বর রায় ও শুভাশিস চক্রবর্তী, কোষাধ্যক্ষ-তপন মজুমদার; সদস্য –সুদর্শন রায় চৌধুরী, রজত রায়, মজহারুল ইসলাম, নকুল দাস, উজ্জ্বল চক্রবর্তী, রাসবিহারী দত্ত, তাপস ঘোষ, কুমার সেনগুপ্ত, মুস্তফা কামাল, শিখা চন্দ, মুহম্মদ সাদিকুজ্জমান , দুলাল সরকার, অজয় কোলে, মুকুলেশ বিশ্বাস, সীমা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রণব বিশ্বাস, স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়, শিপ্রা মুখোপাধ্যায়, দিলীপ মজুমদার।

     কলকাতার স্টুডেন্স হলে এই স্মৃতি রক্ষা কমিটির উদ্যোগে সোমেনের জন্মদিবস পালিত হয়। সভাকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য আমরা দেশের বিশিষ্ট লেখক, বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপকদের এক বিবৃতি প্রচার করি। বিশিষ্টজনের তালিকাটি এইরকম: অন্নদাশঙ্কর রায়, বিনয় ঘোষ, সুধী প্রধান, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, সুচিত্রা মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ড. রবীন্দ্র গুপ্ত, ড. ক্ষেত্র গুপ্ত, ড. অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়, ড.অরুণ বসু, ড. মহাদেবপ্রসাদ সাহা, নেপাল মজুমদার, মহম্মদ আবদুল্লাহ রসুল, ভবানী মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণ চক্রবর্তী, তপোবিজয় ঘোষ, নন্দগোপাল সেনগূপ্ত, জ্যোতি ভট্টাচার্য, নারায়ণ চৌধুরী, গোপাল হালদার, কৃষ্ণ ধর , অমিতাভ দাশগুপ্ত, প্রফুল্ল রায়, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, সুধাংশু ঘোষ, শিবরাম চক্রবর্তী, খগেন্দ্রনাথ মিত্র,  কল্পতরু সেনগুপ্ত, খালেদ চৌধুরী, এস এ মাসুদ, লীলা রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, ড. অরবিন্দ পোদ্দার, ড, প্রভাত গোস্বামী, জীবনলাল গোস্বামী, মিহির আচার্য,  নির্মাল্য আচার্য, ধনঞ্জয় দাশ, সৌরি ঘটক, অমিতাভ চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বিমল কর, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, ড. ক্ষুদিরাম দাশ, ড. দেবীপদ ভট্টাচার্য, ড. সরোজমোহন মিত্র।

    স্টুডেন্স হলের সভা সাফল্যমণ্ডিত হয়। সভায় জ্যোতি বসু, আবদুল্লা্হ রসুল, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রভৃতি বামপন্থী নেতাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন নারায়ণ চৌধুরী, নেপাল মজুমদার, ড. রবীন্দ্র গুপ্ত, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, অমিতাভ দাশগুপ্ত, তরুণ সান্যাল, দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ চন্দ প্রভৃতি বুদ্ধিজীবীরা।

    সোমেন স্মৃতি রক্ষা কমিটির পাশাপাশি আমরা সোমেনের ব্যক্তি ও রচনা পরিচয় সম্বলিত একটি ছোট পুস্তিকা মুদ্রিত করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পাঠাতে থাকি। এটা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সোমেনের নাম ও অবদান যুক্ত করার প্রচেষ্টা। ড. সুকুমার সেন, ড. অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. দেবীপদ ভট্টাচার্য, ড. ক্ষেত্র গুপ্ত প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের ঐতি্হাসিকদেরও দ্বারস্থ হই।

     ১৯৭৭ সালের ৫-অগস্ট মুজফফর আহমদের জন্মদিনে প্রকাশিত হয় ‘সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনা সংগ্রহের’ ২য় খণ্ড । এতে তাঁর ‘বন্যা’ উপন্যাস আছে; আর আছে ৪টি গল্প : মরুভূমিতে মুক্তি, রানু ও স্যার বিজয়শঙ্কর, এক্স সোলজার, অন্ধ শ্রীবিলাসের অনেক দিনের একদিন। অশোক মিত্রের ‘ইঁদুর’ গল্পের ইংরেজি অনুবাদ ও লীলা রায়ের ‘সংকেত’ গল্পের ইংরেজি অনুবাদও যুক্ত করেছিলাম। কাকাবাবু বলেছিলেন ‘ইঁদুর’ গল্পটি অন্যান্য ভারতীয় ভাষায়  অনূদিত হয়েছিল। সেসব অনুবাদের সন্ধান পাই নি।

২য় খণ্ডের পরিশিষ্ট ছিল ৬টি : ১] সোমেন চন্দ : স্মৃতিকথা, আলোচনা ২] সোমেন চন্দ : পটভূমি ঢাকা ৩] সোমেন চন্দ ও কয়েকটি পত্রিকা ৪] সোবিয়েত সুহৃদ সমিতি ৫] প্রগতি লেখক সঙ্ঘ ও ফ্যাসিবিরোধী লেখক সঙ্ঘ : কিছু তথ্য ও আলোচনা ৬] সোমেন ও সমকালীন সাহিত্যচিন্তা । দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকায় আমি লিখেছিলাম : ‘ প্রথম খণ্ড প্রকাশের সময় আমার ভীতি ছিল বিস্মৃতির গর্ভে প্রায় নিমজ্জিত একজন জীবনসংগ্রামী জীবনশিল্পীকে মানুষ কিভাবে গ্রহণ করবেন এ কথা ভেবে। আজ আনন্দের সঙ্গে বলি আমার শ্রম সাথর্ক হয়েছে।

  ‘বাংলাদেশের প্রগতিপরায়ণ মানুষ সোমেনানুরাগী হয়েছেন এবং সোমেনানুরাগী মানুষ সোমেন-সাহিত্য প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। সোমেনের অনুপ্রেরণাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই শ্রেণিবিভক্ত সমাজে অব্যাহত থাকুক শিল্পীর সংগ্রাম এবং সৃষ্টি হতে থাক সংগ্রামের শিল্পী।’

    সোমেন চন্দের প্রচারে কয়েকটি পত্রিকা বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ‘সত্যযুগ’ পত্রিকার রবিবারের পাতায় আমি লিখি‘ সোমেন চন্দ; বাংলার প্রথম সাহিত্যিক শহিদ ’ নামক একটি ছোট প্রবন্ধ। সোমেন যে প্রথম সাহিত্যিক শহিদ, একথা পরে সকলেই স্বীকার করে নেন। নেপাল মজুমদারও সোমেনকে ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহিদ বলে উল্লেখ করেন। কবি দুর্গাদাস সরকার  সাপ্তাহিক ও মাসিক ‘বাংলাদেশ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি আমাকে সোমেনের গল্পের শিল্পশৈলী নিয়ে লেখতে পরামর্শ দেন। আমার সে লেখা ১০টি কিস্তিতে প্রকাশিত হয়। হীরেন বসুর দর্পণ পত্রিকায় ড. ক্ষেত্র গুপ্তের এক অনবদ্য গ্রন্থসমালোচনা। আকাশবাণী কলকাতার কথিকা বিভাগ পরিচালনা করতেন প্রখ্যাত কবি কবিতা সিংহ। তিনি সোমেন চন্দ বিষয়ে আমার একটি কথিকা প্রচারের সুযোগ করে দেন। এই কথিকা একাধিকবার সম্প্রচারিত হয়েছে। তখন দূরদর্শনের বাড়বাড়ন্ত হয় নি। বেতার ছিল ভীষণ শক্তিশালী মাধ্যম। আমার কথিকা দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষের কাছে যে ছড়িয়েছিল তার প্রমাণ পেয়েছি। কথিকাটি পরে ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছিল।সোমেন চন্দের প্রচারে সি পি এম দলের বিভিন্ন গণসংগঠন বিশেষ করে গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী কলাকুশলী সম্মিলনী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বিভিন্ন জেলার মতো কেন্দ্রীয়ভাবেও তাঁরা আলোচনাসভার আয়োজন করেন।

আমি তখন ড. ক্ষেত্র গুপ্তের অধীনে পরশুরামের গল্প নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলাম। কিন্তু সে ব্যাপারে উৎসাহ পাচ্ছিলাম না। সোমেন চন্দের সাহিত্য কেন গবেষণার বিষয় হতে পারে না, সে প্রশ্ন ঘুরছিল আমার মাথায়। সোমেনের সঙ্গে রাজনীতি জড়িত বলে ক্ষেত্রবাবুও উৎসাহ দেখান নি। উৎসাহ দেখালেন ড. রবীন্দ্র গুপ্ত। ‘বাংলাদেশ’ পত্রিকায় আমার ধারাবাহিক প্রবন্ধ পড়েছিলেন তিনি। সে কথা তিনি ক্ষেত্রবাবুকে বলে রাজি করালেন। জমা দেওয়া হল synopsis. কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাতিল করলেন । কারণ রাজনীতি। তারপরে ড. দেবীপদ ভট্টাচার্য উপাচার্য হয়ে এলেন রবীন্দ্র ভারতীতে। দেবীবাবু বামপন্থার অনুরাগী ছিলেন এবং রবীনবাবু ছিলেন তাঁর স্নেহভাজন। সোমেন চন্দ বিষয়ে গবেষণার বিশেষ উদ্যোগ নিলেন উপাচার্য স্বয়ং । কেটে গেল সব বাধা। ১৯৮৫ সালে আমাকে পি এইচ ডি ডিগ্রি দেওয়া হল ‘ প্রগতি লেখক আন্দোলনের প্রথম পর্যায় ও সোমেন চন্দের সাহিত্যচর্চা’ বিষয়ে। গাইড ছিলেন ড. ক্ষেত্র গুপ্ত; পরীক্ষক ছিলেন—নন্দগোপাল সেনগুপ্ত এবং ড. ক্ষদিরাম দাশ। ভাইবা বা মৌখিক জিঞ্জাসাবাদের দিন মজার ঘটনা ঘটে। ক্ষেত্রবাবু যখন অন্যান্য পরীক্ষকদের প্রশ্ন করতে বললেন তখন নন্দগোপালবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘ওকে প্রশ্ন করতে হলে ওর বই পড়েই প্রশ্ন করতে হবে।’

   গবেষণার বিযয়টি পরে ‘সোমেন চন্দের সাহিত্যচর্চা’ নামে বই আকারে প্রকাশ করেন নবজাতক প্রকাশন। তখন অবশ্য মজহারুল প্রয়াত। তাঁর ছেলে বুলবুলই উদ্যোগ নিয়ে বইটি প্রকাশ করে। ততদিনে স্নাতকস্তরে সোমেন চন্দের গল্প পাঠ্য হয়ে্ছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্বল্প পরিসরে হলেও স্থান পেয়েছেন সোমেন চন্দ।

   যতদূর জানি তখনো বাংলাদেশে সোমেন চন্দের রচনাবলি প্রকাশিত হয় নি। এ বিষয়ে আমি একটি প্রস্তাব দিই ঢাকার বাংলা একাডেমিকে। তাঁরা ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসের (পত্রসংখ্যা- ৬৩৮২) চিঠিতে জানান;‘ মহাপরিচালক সাহেবকে লিখিত আপনার ২৫.১.৭৯ তারিখের চিঢির জন্য ধন্যবাদ। বাংলা একাডেমির প্রত্যেকটি কাজ উন্নয়ন পরিকল্পনার অর্ন্তভুক্ত। বর্তমানে দ্বিবার্ষিকী উন্নয়ন পরিকল্পনার (১৯৭৮-৮০ ) কাজ চলছে। স্বর্গীয় সোমেন চন্দের রচনাবলি প্রকাশের জন্য কোন অর্থ বরাদ্দ নেই। কাজেই উক্ত রচনাবলি প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভবপর হচ্ছে না বলে আমরা দুঃখিত ।’ বাংলা একাডেমির সংকলন বিভাগের পক্ষে এই চিঠি লিখেছিলেন এ কে এন হাবিবুল্লাহ খোন্দকার। 

    এর পরেও আমি বাংলা একাডেমিকে চিঠি দিয়েছি । উত্তর পাই নি। ২০১১ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালককে শামসুজ্জামান খান সাহেবকে আমি একটি চিঠিতে লিখেছিলাম :

‘ হয়তো আপনার বিদিত আছে যে সোমেন চন্দের সম্পূর্ণ রচনাবলি আমার সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয়। কলকাতার নবজাতক প্রকাশন সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনা সংগ্রহের প্রথম খণ্ড ১৯৭৩ সালে এবং ২য় খণ্ড ১৯৭৭ সালে প্রকাশ করেন। ১৯৭৯ সালের ২৫ জানুয়ারি একটি পত্রে আমি ঢাকার বাংলা একাডেমিকে সোমেন চন্দের সম্পূর্ণ রচনাবলি প্রকাশের অনুরোধ জানাই। সে পত্রের উত্তরে আপনি অর্থনৈতিক কারণ অক্ষমতার কথা জানান।

‘আমার উক্ত গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছিলেন মুজফফর আহমদ । সোমেন চন্দের রচনাকে বাংলা সাহিত্যে নতুন সংযোজন বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়, হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনয় ঘোষ, ড.ক্ষুদিরাম দাস, ড. ক্ষেত্র গুপ্ত , প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ লেখক ও গবেষকরা। সোমেন চন্দ সম্বন্ধে গবেষণার জন্য আমি পি এইচ ডি ডিগ্রি লাভ করি।

‘ ২০০০ সালে শিল্পী আক্রান্ত নামে আমি সোমেন চন্দের জীবনোপন্যাস লিখি। ২০১০ সালে প্রকাশিত হয় আমার বই : সোমেন চন্দের সাহিত্যচর্চা।

‘ সোমেন চন্দ ছাড়াও ময়মনসিংহের কেদারনাথ মজুমদার সম্বন্ধে আমি গবেষণা করেছি। ঐতিহাসিক ড. নিশীথরঞ্জন রায়ের ভূমিকাসম্বলিত কেদারনাথ ও সৌরভ এবং বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্য আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। সম্প্রতি আমার সওগাত-মুসলিমমানস-রবীন্দ্রনাথ নামে আর একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

‘ গ্রন্থগুলির একটি করে কপি পাঠালাম। আমার শ্রম ও সাধনাকে বাংলা একাডেমি স্বীকৃতি জানালে ধন্য হব। বয়সের উপান্তে উপনীত বলে উপযাচক হয়েই এই আবেদন করছি।’

      দুঃখের বিষয় এ চিঠির কোন উত্তর পাই নি। আমার শিক্ষক ড. ক্ষেত্র গুপ্ত বক্তৃতা উপলক্ষে ঢাকা গিয়েছেলেন। ফিরে এসে তিনি জানালেন যে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার কথাপ্রকাশ প্রকাশন থেকে ড. বিশ্বজিৎ ঘোষের সম্পাদনায় সোমেন চন্দের রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছে।

      মাঝে মাঝে এমন ভাবনা হয় যে সোমেন চন্দকে বিস্মৃতি ও বঞ্চনার হাত থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে গিয়ে আমিও বঞ্চিত হয়েছি। পরবর্তীকালে আমাদের এপার বাংলায় নেপোয় মারে দই প্রবাদের সার্থকতা দেখতে পাচ্ছি। সোমেন চন্দের প্রচুর আবিষ্কারক গজিয়ে উঠছেন। সরকারি পুরস্কার ও অনুষ্ঠানে আমি ব্রাত্য। আশা ছিল সোমেন চন্দের জন্মভূমি ওপার বাংলায় সামান্য হলেও স্বীকৃতি পাব । তা হব নি। না হোক, এটুকু সান্ত্বনা আমার থাকবে যে একজন জীবনশিল্পীকে বিস্মৃতির হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছি আমি।

 

মরমী বাউল শিল্পী

চাঁন মিয়া আমাদের 

মোহাম্মদ সায়েস্থা মিয়া   

মহা-সচিব: সিলেট সাহিত্য ফোরাম,সিলেট।

     জন্ম হোক যথা কর্ম হোক তার জয়

         মানুষ মানুষের কাছে দেয়, ব্যবহারে  তার পরিচয়।

 

    আমরা বিশ্বাস করি মানুষ তার আপন কর্মে মরে গিয়ে ও অমর হয়ে বেঁচে থাকে। বিশ্বাস না করে উপায় নেই, কারণ অতীতের মানবরা যে পথ মত এবং এগিয়ে যাওয়ার দ্বার উন্মোচন করে গেছেন আমরা তাদের অনুস্মরণ ও দেখানো পথ ছাড়া নতুন কোন পথ আবিষ্কার করতে পারছি কি ? সুস্পষ্ট উত্তর নেই। জবাবটা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে কেউ উপস্থাপন করতে পারবেন, মনে হয় তা সম্ভব নয়। তাইতো বলতে হয় আমরা তাদের পথে হাঁটছি। কথা না বাড়িয়ে বলবো অমরত্বœকে জাগ্রত বিশ্বাসে মেনে নেয়া ছাড়া কোন গতি পথ খোলা থাকে না। তর্ক না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আজকের প্রসঙ্গ একজন বাউল  শিল্পী নিয়ে, যাহার সুর আমাদের প্রাণে বাজে, আমাদের সুখ দু:খে তাদের রচনা তাদের কণ্ঠ এগিয়ে যেতে সাহস যোগায়, আনন্দ দেয় নির্জনতাকে তাড়ায় যে কথা, সুর, গান প্রাণের খোরাক বলে সিক্ত। বাউল বা গীতিকার যে কোন একজন গুণী মানুষের যাপিত জীবন সংগ্রাম ও তাঁর জীবন যাপন করার বিষয়গুলো দু-চার কলম লিখে শেষ করার নয়। কিন্তু সর্বত্রই আমাদের পরিসর থাকে ছোট তাই আমাদের অনিচ্ছাকৃত ভাবে কলেবর সংক্ষিপ্ত করতেই হয়। সংক্ষিপ্ত আকারে বাউল শিল্পী চাঁন মিয়ার জীবন সংক্রান্ত আলোচনা আজকে উপস্থাপন করছি যা আরো দীর্ঘ পরিসরে আগামীতে লিখার চেষ্টা রাখবো অব্যাহত এই আশায়। আজকের পরিসরে মনের অজান্তে কোন ত্রæটি লক্ষিত হলে সবাইকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আশাও রাখছি পাঠক মহলে। মরমী বাউল শিল্পী চাঁন মিয়া আমাদের অহংকার শিরোনামে ঐ ব্যক্তি কে ছিলেন তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিম্মে তোলে ধরলাম।

জন্ম, নাম, ঠিকানা।

     সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ০২ নং খাজাঞ্চী ইউপি’র অন্তর্ভুক্ত জয়নগর (নোয়াপাড়া) নামে একটি প্রাচীন গ্রামের নাম। ঐ গাঁয়ের তালুকদার আসরব আলী সাহেবের তিন ছেলের কনিষ্ঠ সন্তান এক কালের প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী ও গীতিকার, গায়ক, অজ¯্র ভক্তবৃন্দের প্রিয় মুখ, তখনকার শিল্প সংস্কৃতির ধারক বাহক যাকে এক নামেই দেশ বিদেশের সবাই চিনতো। বাউল শিল্পী চাঁন মিয়া যার নাম। ১৯২৪ সালে সভ্রান্ত তালুকদার মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম হয়।  তাঁর বড় দু’ভাই মোঃ হারুন রশিদ এবং মেঝো ভাই মোঃ তোতা মিয়া। ব্যক্তিগত জীবনে বাউলের ভাইয়েরা ছিলেন প্রতিষ্ঠিত। দেখতে বাউল চাঁন মিয়া ছিলেন অত্যন্ত সুশ্রী , সুন্দর , সুঠাম দেহের হাস্যজ্জোল, লাবণ্যময়ী এক বুদ্ধি বিচক্ষণতার উজ্জ্বল আলোক বর্তিকা। যাকে চেহারায় অনেকটা পরিচয় ঘটিয়ে দিতো। চাঁন মিয়াকে একবার দেখলে যে কারোর স্মৃতিপট থেকে মুখয়ব অগোচরে অচেনা থাকতো না। যার চেহারা আজ ও আমার স্মৃতির আয়নায় উজ্জ্বল হয়ে আছে।

বাউল শিল্পী চাঁন মিয়ার লেখা পড়া ও শিক্ষা-দীক্ষা

      আজ থেকে প্রায় শতবছর আগের শিক্ষাদীক্ষার পরিবেশ কেমন ছিল তা আমাদের সবারই জানা। বাল্য জীবন ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে মসজিদ ও মক্তবে শুরু হতো সবার, কিংবা অনেকেই লেখাপড়া থেকে থাকতেন বঞ্চিত। মসজিদ মক্তবের পাশাপাশি পাড়া গায়ের দূর দূরান্তে দু-চারটা প্রাথমিক বিদ্যালয় তখন ছিল, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা শুরুর একমাত্র সূচনার অগ্রযাত্রা হিসাবে। পায়ে হেটে অনুন্নত গ্রামীণ জনপদে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠশালায় মানুষের হাতে খড়ির যাত্রা ছিল কঠিন সংগ্রামে জীবন যুদ্ধে বিজয়ের মুকুট পরিধান সমতুল্য। মানুষ কষ্ট ক্লেশ সহ্য করে ছোট বেলায় দুর গাঁয়ে স্কুলের আঙ্গিনায় পদচারণ করে শিক্ষা লাভ করতেন। কতো ঝড় ঝাপটা সহ্য করে তিলে তিলে অগ্রসর হতো-তা বাউল শিল্পী চাঁন মিয়ার জীবন তার বাস্তব উদাহরণ। তিন কিলোমিটার প্রচুর কাঁদা মাড়িয়ে স্কুল আঙ্গিনায় পদচারণ করতে একটু ও পিছু হটেননি তিনি। চাঁন মিয়ার জন্মস্থানের পুরো এলাকার মাঝে চন্দ্রগাম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছিল বলে তথ্য সূত্রে আমি অবগত হয়েছি। তিনির শিক্ষা জীবন ঐ স্কুলেই। জয়নগর থেকে বাউল শিল্পী চাঁন মিয়া এ স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া শুরু করেন এবং এক সময় প্রাইমারী পড়া শেষ করেন।এখন লেখাপড়ার যে মান তাতে বলা যায় বর্তমান মেট্রিক এর চাইতে বেশি তাৎপর্য্য পূর্ণ হবে প্রাইমারীর লেখাপড়া আমি মনে করি। আগের লেখাপড়ার মান ভাল ছিল, যেহেতু বর্তমানে বি.এ. পাশ করে ও অনেকে দরখাস্ত লিখতে জানে না, পারে না। যাক আগেকার লেখাপড়া আর বর্তমান লেখাপড়ার গুরুত্ব বেশি না কম তার বিবেচনা করবেন পাঠক। প্রাইমারী শেষ করার পর তিনি সংস্কৃতি ভাষার উপর গভীর জ্ঞান, ধ্যান ও চর্চা আয়ত্ব করে পরবর্তীতে জীবন সফলতায় ব্যবহার করেন। মাধ্যমিক স্কুলে লেখাপড়া করার সুভাগ্য তাঁর হয়নি। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি প্রচুর আগ্রহ যে ছিল তার, সেই বিষয়টি আজ অনায়াসে ¯স্বীকার করতে হয়। নানা  জনের কাছে খোজ নিলেই পাওয়া যায়, তার সেই জীবন ইতিহাসগুলো।

যুব বয়সে গানের প্রতি তার আগ্রহ:

     মরমী বাউল চাঁন মিয়ার বয়স পা পা করে বাড়তে লাগলো। আনুমানিক ২০/২২ বৎসর যখন তার বয়স তখন তিনি হারমোনিয়াম বাজানো শিখেন। এখনকার মতো আগে এতো আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ছিলনা। হারমোনিয়াম শিখে গান রিহার্সাল করতে থাকেন। তখন সংস্কৃতি ও বিনোদনের মধ্যে মানুষ পুঁথি পাঠ, জারী, সারী, ভাটিয়ালী, পল্লী গান বেশি পছন্দ করতো। সে সব গানের আসর হতো মানুষের ঘরে ঘরে আঙিনায় আঙিনায়। বাউল চাঁন মিয়াও পুঁথিপাঠ দিয়ে তার গানের জীবন শুরু করেন। প্রথমে তিনি আগেকার নামী দামী শিল্পীদের গানের আসরে সহযোগী শিল্পী হিসাবে যাতায়াত করতেন। প্রয়াত বাউল দূরবীনশাহ ও প্রয়াত বাউল সফর আলীসহ সে সময়ের গুণী শিল্পী ও গায়কের গানের আগ্রহ ও উৎসাহ চাঁন মিয়াকে গানের জগতে প্রবেশে সহায়তা করে।

 

বৈবাহিক জীবন:

   তিনি এক মাত্র ঘনিষ্ঠ সহযোগী যার জন্ম একি গ্রামে, এবং চাঁন মিয়ার বয়সে ছোট হয়ে যার জন্ম তার নাম মোঃ উম্মর আলী। বাউলের সহ-সাথীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম বাউলের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ইতিহাস। উম্মর আলী যে সব তথ্য প্রদান করেন তা অবিকল লিখার চেষ্টা করছি। তারপর ও বহু সংমিশ্রিত জীবনাতীত ঘটনাবলীর মাঝে সব বলা যাবে না, জানা যায়নি এখন পর্যন্ত। যতটুক জানতে পেরেছি তা বাউলে জীবনের সাথে সংযুক্ত হয়ে আছে। উম্মর আলীর ভাষ্যমতে বাউল শিল্পী চাঁন মিয়া বত্রিশ বছর বয়সে বিবাহিত জীবন শুরু করেন এবং এ সময়ে তার গানের জগতে ব্যাপক পরিচিতি সু-খ্যাতি ছড়িয়েছে চার দিকে। তাঁকে আনুষ্ঠানিক পালা গানের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনের জন্য চতুর্দিক থেকে একের পর এক দাওয়াত আসতো। তখন বৃহত্তর সিলেট জেলার (বিভাগ তখন হয়নি) মানুষ তার যাদুমাখা কণ্ঠে উদ্বেলিত হয়ে শিল্পীর মায়াবী সুরেলা জগতের ভক্তে ভক্ত হয়ে পড়ে।

গুরুজনের সান্নিধ্যে ও গান পরিবেশন:

    শিল্পীর সাধনা শুরু সখের বসে, ভাবের তাড়নায়, দশের ভাল’র জন্য। জীবনের উন্নতির জন্য আধ্যাত্বিক ও আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন। আত্মশুদ্ধির জন্য গুরুর দীক্ষা আবশ্যক তাই উস্তাদ বা গুরুর শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু বাউলের এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। নিজে কোন দিন উস্তাদের কাছে গান শিখতে যাননি। জীবনের উন্নয়নে এত সব তার নিজের ব্যক্তি সাধনা, আরাধনা, চেষ্টা, আগ্রহ থাকার কারণে আয়ত্ব করতে সম্ভব হয়েছে। হারমোনিয়াম শিখার পর তিনি সরঞ্জামাদি কিনে নিয়ে দুতারা নিজের হাতে বানিয়ে ছিলেন এবং বহু কাল অনুষ্ঠানে নিজের বানানো দুতারা দিয়ে গান গাইতেন। পরে তিনি বিখ্যাত মরমী বাউল দুরবীন শাহের সাহচার্য্য লাভ করেন। দুরবীন শাহ গানের আসরে আসরে গাইতেন। মরমী বাউল দুরবীন শাহের গান আজও মানুষের কাছে অমিয় বাণীর মতো শ্রোতাদের কাছে গ্রহণীয়।

সাধক দুরবীনশাহ বাউল চাঁন মিয়াকে তার রচিত একটি গানের বই উপহার দেন। তিনি রাতভর গান রিহার্সাল করতেন এবং পরিবেশন করতেন। তখনকার সময় কারবালার ইতিহাসের ঘটনা পুথি আকারে বাউল সাধকেরা গাইতেন এবং মানুষ তৃপ্তি সহকারে শ্রবণ করতো। মর্মান্তিক নিদারুণ কারবালার ইতিহাসকে জঙ্গঁনামার পুঁথি নামে মানুষের কাছে পরিচিত ছিল। মাধুর্য্য মন্ডিত কোকিলা কণ্ঠের শিল্পীদের দ্বারা পরিবেশন করিয়ে সবাই দলে দলে শুনতো এই কাহিনীগুলো। হিন্দি ভাষায় রচিত জঙ্গঁনামার পুঁথি, গাজী কালুর কেচ্ছা এ রকম আরো অনেক জারী, সারী, ভাটিয়ালী গানের আসর বসিয়ে গ্রামের লোকজন আনন্দ বিনোদন উপভোগ করতো। মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছিলো চাঁন মিয়ার কণ্ঠে গান শুনার জন্য তার গলার সুর ছিল অতি মাধুর্য্য ও মিষ্টভাষী। সরু কণ্ঠ ও ভাব গাম্ভীর্যপূর্ণ অঙ্গ ভঙ্গিমা প্রদর্শন শিল্পীর সাফল্যের ছিল এক মাত্র কারণ। মানুষ যখন শুনতো কোথাও চাঁন মিয়ার আগমন , উপস্থিতি তখন মানুষের ভারে ঐ স্থানের জায়গা সংকুলান হতো না। এ সময় টেপ রেকর্ডারের কদর ছিল প্রচুর। মানুষ টেপ দ্বারা গান রেকর্ড করে শুনতো। বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ টেপরেকর্ডার নিয়ে আসতো বাউল চাঁন মিয়ার গান রেকর্ড করার জন্য। প্রতিটি গানের আসরে শতেকটা টেপ রেকর্ডার থাকতো হাজির। প্রত্যেক টেপ ওয়ালা খুশি মনে বাউলকে ৩০/৪০/ বা ততোর্ধো টাকা দিতো বখশিস। এছাড়া বাউল শিল্পী সফর আলীর গান ও তিনি পছন্দ করে গাইতেন। বাউল সফর আলীর ঐ গানটি গেয়ে  ছাতক থানার দুলার বাজারে একটি আসর মাতিয়েছিলেন। হাজার দর্শকের মন জয় করেছিলেন সেদিন চাঁন মিয়া। গানটি নিন্মরূপ:

বন্ধু আইওরে গগনেরেই চান

বাটায় সাজাইয়া রাখছি সোনামুখি পান।

বন্ধু আইওরে।

বন্ধুরে,তুই বন্ধু আসিবে বলে দ’ুভাগ মাথার চুল

চুলের উপর বাইন্ধা রাখছি সোনা মুখি ফুল

বন্ধু আইওরে।

বন্ধুরে নিশিকালে নীরব হইলে আইও

অভাগিনীর ফুলে মধু একবার খেয়ে যাইও

বন্ধু আইওরে।

সফর আলী কয়রে বন্ধু তুমি না আসিলে

ফুলের শয্যা জলে ভাসাইবো রাত্রি নিশা কালে

বন্ধু আইওরে।

 

এ রকম কত গান তিনি গেয়েছেন তার কোন পরিসংখ্যান নেই, সংরক্ষণের কারণে, যা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। বাউল চাঁন মিয়া একাধারে ৩ বছর মরমী সাধক দুরবীন শাহের নিকট যাতায়াত করেছেন এবং রাতভর গান রচনা করে গান গেয়ে জীবন কাটিয়েছেন। তিনির বাল্যসাথী উম্মর আলী বলেন , আগে মানুষ হৃদয় দিয়ে গান শুনতো চোখের জলে বুক ভাসাতো কেউ কেউ। কিন্তু এখন মানুষ সুখের বসে শুনে গান কেউ হৃদয় দিয়ে গানের ভাষা , গানের কথা উপলব্ধি করতে চায়না। বর্তমানে নানান ধারায় আবিষ্কৃত গান আমাদের পুরনো সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টিকে ধ্বংস করে ফেলছে। পুরনো ঐতিহ্যকে আমাদের ঠিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে আমাদের প্রতি তার পরামর্শ। দাওয়াতি পালা গানের আসরে জীবনের অনেক সময় কাটিয়েছেন বাউল শিল্পী চাঁন মিয়া।

 

বাউল চাঁন  মিয়ার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গানের অনুষ্ঠানের স্থান:

    একদিনের জন্য দাওয়াত আসলে যখন অনুষ্ঠানে হাজির হতেন তখন ৪/৫ দিন গান পরিবেশন করে ও রেহাই পাওয়া যেত না । একের পর এক গানের আসর চলতে থাকত। ভক্তরা এসে জোর করে এখান থেকে অন্য-খানে নিয়ে যেত।সিলেটের মেনি খলা গ্রামে আপ্তাব মিয়া বাড়িতে এক নাগাড়ে ছয়মাস প্রতি মঙ্গল বার  সাপ্তাহিক ভাবে পালাগানের অনুষ্ঠান চলতেই থাকে। সালুটিকর বল্লা গ্রামে,ছাতক থানার রাজারগাঁও,বালাগঞ্জ থানার তাজপুর, সহ মাসের পর মাস , দিনের পর দিন বাউল চাঁন মিয়া গান গেয়েই যেতেন।

কয়েক ভক্তের ঘটনা:

    এক মহিলা ভক্ত লন্ডন থেকে তার গান শুনে দেশে এসে  বাউল চাঁন মিয়াকে দাওয়াত করলেন,মহিলার বাড়ি কোম্পানিগঞ্জে। বাউলের সাথে উম্মও আলী আব্দুল হামিদ, ইর্শাদ আলী,আয়ুব আলী, রতন নামের আরো একজন নিয়ে মহিলার বাড়িতে উপস্থিত হলেন। সেখানে গিয়ে অবাক কান্ড। মহিলা একশত পাঠি বিছিয়ে বিরাট মাহফিল আয়োজন করেছেন তাঁর আঙ্গিনায়। হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়েছে। গান শুরু হল। এক পর্যায়ে গান শুনে মহিলার ভাবের বাদ ভেঙ্গে মাঠিতে লুঠিয়ে কাঁদছেন। কারবালার ঘটনা তার হৃদয়ে এমন কঠোর আঘাত করেছে যা তিনি সামলে নিতে পারছেন না। ভদ্র মহিলার মাটিতে পড়ে এমন কান্না দেখে শিল্পী তাকে সান্ত্বনা দিয়ে  কান্না বারণ করালেন। এমন ঘটনা নারী পুরুষের মধ্যে অনেকবার ঘটেছে। প্রিয় পাঠক অনুভব করুন বাউল চাঁন মিয়ার কণ্ঠ এবং তার গান পরিবেশনার ভঙ্গি কেমন শৈল্পিক ছিল।

 

মাতৃভূমির প্রতি বাউলের ভালবাসা:

    মানুষ যেখানে জন্মে যে দেশে জন্মে সে স্থান ও সে দেশকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসে। বাউল চাঁন মিয়াও তাই। জাগ্রত বিবেক এবং মরমী বাউল, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক গণ সর্বদায় দেশপ্রেমে নিবেদিত থাকেন। সমাজের অধিকার, বঞ্চনা, নির্যাতন, জুলুম, শোষণ কবি প্রাণে বেশি লাগে। মা-মাটিকে নিয়ে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত করেন গৌরব। মা-মাটির উপর জুলুম অত্যাচার নির্যাতন শোষণ শাসন বরদাস্ত হয়না দেশপ্রেমিকের। এক্ষেত্রে বাউল চান মিয়া উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশকে যখন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দখলদারিত্বের হাত থেকে মুক্তির দীর্ঘ সংগ্রাম চলে ১৯৭১ সালে তখন তার অবদান স্মরণীয়। অন্যান্য কবি শিল্পীদের মত তিনি ও মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির জন্য উজ্জীবিত হয়ে গান রচনা করে বিভিন্ন স্থানে পরিবেশন করেন।  মুক্তিকামী আবাল বৃদ্ধ বণিতা মৃত্তিকা উদ্ধারে বাউলদের সুরে ও তাদের সুরের মূর্ছনায় উদ্বেলিত হয়ে বীর বিক্রমে করেছে যুদ্ধ। গান  কবিতা তাদের দিয়েছিলো গায়ে শক্তি প্রেরণা। উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালের গানগুলো আজ নেই, তবে জনমুখে দু-চার লাইন করে গুন গুন এখনো দুটি শ্লোক শুনা যায়। বাল্য সাথী উম্মর আলী তার একটি গানের শ্লোক তার মুখে এভাবেই উচ্চারণ করেন।

ইন্দিরা জননী হইয়া মায়ের ছেলে কুলে লইয়া

দুধ খাওয়াইলও রিলিফ দিয়া

রক্ষা করল সবার প্রাণ

গাওরে সবাই মুক্তির জন্য বাংলাদেশের গান।

..........................................................

এছাড়া তাঁর সচরাচর আরো কয়েকটি গান সংরক্ষিত করা হয়েছে যা নিম্নরূপ।

 

গান ১) 

পিঞ্জরার পাখিরে ওরে পাখি তরে বিনয় করি

অভাগীরে কাঁদাইয়া যাইও না আর ছাড়ি।

 

দুধ কলা মাখন ছানা ওরে পাখি ,

খাবাইলাম আদর করি

ফুলের বিছানায় রাখলাম

কতই না যতন করি।

 

আগে যদি জানতাম পাখিরে ,

ওরে পাখি যাইবে পাসরী

লোহার শিকল দিয়া ,

রাখতাম বন্দি করি।

আমারে ছাড়িয়া পাখিরে

ওরে পাখি রইলে কার ঘরে

চাঁন মিয়া কয় আসবে একদিন

আমার ঘরে ফিরি।

গান ২)  

 ময়নায় কান্দেরে পিঞ্জরার বানে চাইয়া

কোন দিন জানি যাবে ময়না পিঞ্জরা ফেলিয়া।

জীবন কাটাইলাম মাটির পিঞ্জরায় থাকিয়া

এখন আমি কোথায় যাব পিঞ্জরা ফেলিয়া।

মাটির কায়া মাটিতে যাবে মিশিয়া

কথায় নিয়া রাখবো আল্লায় পাই না ভাবিয়া।

চাঁন মিয়া কয় জানতাম যদি যাইব মিশিয়া

তবে না করিতাম খেলা মাটির কায়া লইয়া।

 

গান ৩)      

কি করলেরে ফকির বেটা

সারা জীবন ফকিরি

ফল পাইবে শূন্য একটা ।

১)মদ গাঞ্জা করিয়া পান

হারাইলে হুশ জ্ঞান

না মানিয়া হাদিছ কোরান

চুলেতে লাগাইলে জটা।

২)লাল টুপ মাথায় বান্দিয়া

লোহার ডান্ডা হাতে নিয়া

আবুল তাবোল তাই বকিয়া

হাতে টানলে গুটা।

৩) শরিয়ত ছাড়া মারফত মিলে না

কোরানেতে আছে জানা

হাদিছ ছাড়া কিছুই পাবে না

না শিখাইলে মুর্শিদ বেটা।

৪) বাউল ও চাঁন মিয়া বলে

কি করবে তুই হাশরের কালে

আমল নামা দেখবে খোলে

পড়ে গেছে বিষম ঠাটা।

 

গান ৪)            

যেদিন হতে বন্ধু হারা ধারা বয় দুই নয়নে

কুলমান সবই নিল গো সই কি যাদু জানে।

১) আকাশেতে নাইরে চন্দ্র কি করে তার আগুনে

ওরে নারীর ও বসন্ত কালে পুরুষ রাখে যতনে।

২) নয়া ঘর বান্দিয়া লোকে ছানি দেয় উলু ছনে

যে বা নারীর ¯^ামী নাই গো কি করে তার রুপ ঘনে।

৩)  যৌবন কালে পিরিত মিষ্টি পান মিষ্টি হয় চুনে

বাউল ও চাঁন মিয়া বলে পিরিত করে অন্তরে ধরল ঘুণে।

 

গান ৫)   

 

বহু দিনের পোড়া বন্ধু যাও শীতল করিয়া

বন্ধু মোরে যাইও না ছাড়িয়া।

১/ হৃদয় বাসরে রাখমু বন্ধু যতন করিয়া

চরণ তলে পড়ে থাকমু তোমার দাসী হইয়া।

২/ কুল ছাড়া করিল বন্ধু পিরিতি শিখাইয়া

লোক সমাজে যাই না বন্ধু তোমার লাগিয়া।

৩/ চাঁন মিয়া দীন দুখিনী কাঁদি নিশিদিয়া

ছাইড়া যাইতে সঙ্গে নিও দু:খিনী জানিয়া।

 

আরো কয়েকটি গানের প্রথম কলি।

 

১। আমার রজনী ভোর হইল গো

কোকিলায় ডাকিল

ডাক শুনিয়া দুই নয়নে নিদ্রা না আইল।

 

২। বহু দিনের পোড়া যাও শীতল করিয়া

    বন্ধু মোরে যাইও না ছাড়িয়া।

 

৩। যে দিন হতে বন্ধু হারা, ধারা বয় দুই নয়নে

কুল মান সবই নিলো গো সই, কি যাদু জানে।

 

৪। কে কয় পিরিত ভালা গো

এর মত আর নাই জ্বালা।

 

৫।  ক্ষণস্থায়ী এই জগতে রবে না চিরকাল

     আসা যাওয়া বিফল হইল, পারের কড়ি নাই আমার।

 

৬। গরীব হইলে ভবে কেউ চিনে না

    গরীব ধনির বাড়িতে যায়,

    মনে মনে কইতে রয়

    কোন জিনিষটা নিত আইছে করে ভাবনা।

 

৭। হরিণী কাঁদিয়া বলে, পড়িয়া শিকারীর জালে

    তরাইয়া লও আমারে নবী মোস্তফায়।

 

৮। একদিন নবী গেলেন সংসার ছাড়ি

    কইতে না পরি।

 

৯।  সাহারাতে ফুটলরে ফুল,দু’জাহানের বাদশা মকবুল

      ভ্রমর আকুল গন্ধ পাইয়া তার।

 

১০।  সব হারাইলাম কামিনীর হাটে গো , একদিন ধরিবে যমদূতে।

 

বাউল চাঁন মিয়ার সন্তান সন্ততি:

   তিনি সাত মেয়ে এক ছেলে সন্তানের গর্বিত জনক। মেয়েদের উপযুক্ত পাত্রদের হাতে সমর্পণ করে এক মাত্র ছেলেকেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। ছেলেকে সমাজের সুনাগরিক হিসাবে গড়েছেন। বর্তমানে বাউল চাঁন মিয়ার মত তিনি ও সমাজ থেকে সমাজান্তরে একটি নাম নিয়ে উদ্ভাসিত। বৃহত্তর বাংলার সবাই তাকে একজন লেখক কলামিস্ট হিসাবে চিনতে পারছে। এটাকেই বলে ‘বাপে বেটা’। বাউল চাঁন মিয়ার একমাত্র ছেলের নাম মিজানুর রহমান মিজান। তিনি বর্তমানে লেখালেখির পাশাপাশি বিশ্বনাথ প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত। মরমী বাউল চাঁন মিয়ার একমাত্র ছেলে একজন সু-সাহিত্যিক ও বটে।

 

কঠিন রোগাক্রান্ত বাউল :

    মানুষের সব কোলাহলের দিন এক সময় ফুরিয়ে আসে বয়স বাড়ার সাথে সাথে। কখনো রোগ এসে বাসা বাধে মানব দেহে আর এসব আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। আল্লাহ যাকে খুশি সুস্থ রাখেন, যাকে খুশি অসুখ বা রোগ দান করেন। বাউল চাঁন মিয়ার বসয় যখন ৮০তে পৌঁছে তখন তিনি দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ পাঁচটি বছর ঐ রোগে ভুগেন।  দিন দিন রোগ যন্ত্রণা প্রবল হয়। সময় তার গতিতেই চলে।

 

বাউলের ইন্তেকাল:

    সব ঝংকার নিস্তেজ-শোকের মাতম বাউল শিল্পী চাঁন মিয়া ২০০৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭ ঘটিকায় নিজ বাসগৃহে ইন্তেকাল করেন।(ইন্না... রাজিউন)।

 

শিল্পী চাঁন মিয়ার সাথীগন:

     ১। ঢোলক ঢফকি বাদক মোঃ উম্মর আলী সাং জয়নগর  নোয়াপাড়া) ডাক রাজাগঞ্জ বাজার, উপজেলা বিশ্বনাথ, জেলা সিলেট,  ২। মন্দিরা বাদক মোঃ আব্দুল হামিদ সাং জয়নগর  নোয়াপাড়া) ডাক রাজাগঞ্জ বাজার, উপজেলা বিশ্বনাথ, জেলা সিলেট, ৩। অন্যান্য যন্ত্র বাদক মোঃ ইর্শাদ আলী সাং গনাইঘর ডাক রাজাগঞ্জ বাজার, উপজেলা বিশ্বনাথ, জেলা সিলেট, ৪। আয়ুব আলী, সাং কাবিলপুর, ডাক রাজাগঞ্জ বাজার, উপজেলা বিশ্বনাথ, জেলা সিলেট, ৫। বাঁশী বাদক মোঃ রতন, সাং কাবিলপুর, ডাক রাজাগঞ্জ বাজার, উপজেলা বিশ্বনাথ, জেলা সিলেট।

 

বাউল চাঁন মিয়ার স্মৃতি রক্ষার্থে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা:

     মানুষ মরে গেলে তার সু-কর্মগুলো ধরে রাখার ব্যবস্থা করা উচিত। বাউল চাঁন মিয়ার স্মৃতিকে যুগ যুগ ধরে রাখার জন্য তাঁর এক মাত্র পুত্র সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট মিজানুর রহমান মিজান বাউলের নামানুসারে ২০০৬ সালে বিশ্বনাথের রাজাগঞ্জ বাজারে “চাঁন মিয়া স্মৃতি পাঠাগার” প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে প্রতিনিয়ত এলাকার মানুষ বিনা পয়সায় বই পত্রিকা পড়ে জ্ঞান ব্যপ্তি করছে। পাঠাগারের এ যাত্রা যেন চিরজাগরুক থাকে এই আশাবাদ হৃদয়ে। বাউল চাঁন মিয়াকে নিয়ে আরো শিকড় সন্ধানী গবেষণা  করলে এবং তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করলে সমাজের জন্য মঙ্গল বয়ে নিয়ে অসবে এই ক্ষণজন্মা গুণীজন আমাদের গৌরব হয়ে থাকবেন এই থাকছে সবার প্রতি বার্তা।

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?