কবিতা সমগ্র - ১৫
রেহান কৌশিক
পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিম বাংলা 

রেহান কোশিকের বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুর। সাংবাদিক হিসাবে জীবন শুরু করলেও নিজস্ব লেখার তাগিদেই সেই কাজ থেকে সরে এসেছেন। পনেরো বছর বয়েসে প্রথম কবিতা ছাপা হয় কলকাতা থেকে প্রকাশিতই 'পড়াশুনো' পত্রিকায়। তারপর থেকেই কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে অজস্র লিটিল ম্যাগাজিনে। আনন্দবাজার, দেশ, সানন্দা, গণশক্তি, নবকল্লোল, নন্দন প্রভৃতি পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে লেখা। কবিতা ছাড়াও গানের কথা, ছোটগল্প, চলচ্চিত্রের কাহিনী ও সংলাপ লিখে থাকেন। 

♣ ধুলোখেলা ♣

 

ধুয়ে যায় মাটি-রং, ভেসে চলে পুতুলের খড়...

স্রোতে কি বিষাদগান? নৃত্যশীল কালের মর্মর?

কী কী তবে ধরে রাখবে ছিন্ন হওয়া শ্বাসের গোপন

কীভাবে জীবনী গ্রন্থ এঁকে রাখবে আত্মনিমজ্জন?

 

লিখে চলে শূন্য হাত মাত্রা বেঁধে শব্দে যথাযথ

পাতাভর্তি জন্ম-মৃত্যু, মুহূর্ত বাঁধানো সব পথও।

এ লেখা ধুলোর দেহ, এই ধুলো তাবৎ স্পন্দন

স্পর্শ রাখো অন্ধ হয়ে ফিরে পাবে প্রিয় বন্ধুজন।

 

এ লেখার আয়ু নেই, সুতরাং আদি-অন্তহীন

দেহময় ধুলোবিন্দু, ধুলোর শরীরে থাকা ঋণ।

মাটিধুলো, আলোধুলো, ধুলো আকাশের

ধুলোয় দৃশ্য-অদৃশ্য ঘূর্ণমান সমস্ত শূন্যের।

 

ধুলো মাখে আলোছায়া, ধুলো ওড়ে সুগন্ধী ডানায়

লেখা হচ্ছি তুমি-আমি ভ্রাম্যমাণ ধুলোর ভাষায়...

 

 (প্রবেশক)

 

ধুলোখেলা : ১

 

ছেঁড়া পালকের গায়ে জ্বলে থাকা হলুদাভ আলো

যজ্ঞের আগুন হয়ে জাগিয়ে রেখেছে ফাঁকা মাঠ।

মন্ত্র পড়বে নির্জনতা? স্বাহা স্বাহা শব্দে অন্ধকার

আত্মঘাতী হবে বলে শূন্যদেশ দিয়েছে পাখশাট।

 

অন্ধকার পোড়া ছাই মিশে যাচ্ছে ধুলোর ভিতর

বাড়ে নাকি উর্বরতা হননের আশ্চর্য সুন্দরে?

ধুলোর ধমনি জুড়ে বেজে ওঠে বীজের ছলাৎ

জ্ঞান আর হৃদয়ের চাকা হাঁটে মাটির পাঁজরে।

 

উড়ানই তো আদিপাখি, এ শূন্যের প্রকৃত পালক

এ মাটি সন্ততি তার, সময়ের একাগ্র সাধক...

 

 

ধুলোখেলা : ২

 

কে আমায় ছুঁয়ে দিল টেনে নিয়ে দূরে ও নিবিড়ে

মুঠো মুঠো জন্মঘ্রাণ ছড়িয়ে দিল রক্তশিবিরে!

 

প্রবীন রক্তের দাগ বেয়ে উঠে আসছে সেই মুখ

আলোময় তার মুখ জেগে ওঠে অনন্তের গানে!

সে তখনও দেহমাত্র, প্রণয় শেখেনি, তীব্র ক্ষুধা

হাড়ে নিয়ে ছুটে যেত বনে-বনে হরিণ সন্ধানে...

 

সে চিনেছে, চিনিয়েছে খিদের পরেই প্রিয় হয়

ফুল। ফুল জানে স্পর্শ, অশরীরী লাবণ্য-বিস্ময়...

 

সেই স্পর্শ জাগে কেন! দেবী কি ফিরেছে পুনর্বার?

এই শুকনো করোটিতে জ্বেলে দিয়ে হোমের আগুন

ফেরাবে স্মৃতিতে আজ? আনন্দে শিকার করো, দেবী,

এই তো পেতেছি পিঠ, ছুঁড়ে মারো পাথুরে হারপুন...

 

এই যত রক্তপাত, আর্তনাদ...  সব জেনো, গান...

নিজের নি:স্ব-সংলাপ ঢেলে দিচ্ছি তোমার দু'পায়ে

এই মৃত্যু, মৃত্যু নয়, শুভজন্ম, জীবিত আখ্যান...

ধুলোখেলা : ৩

 

জন্মশব্দ উঠে আসে আর খুলে যায় স্রোতে-স্রোতে

পাথরের স্তব্ধমুখ, অচল সময় দেয় লাফ

নিজের শরীর জুড়ে যত রেখা, রক্তপাত, ছাই

সুবিস্তৃত আকাশের আলো হয়ে ঝরে পড়ে নীচে!

কে নেবে যাপন দাগ পেতে রেখে মুগ্ধ করতল?

আমি তো কখনও তাকে কাছে ডেকে দিইনি বৃষ্টির

মোহন-আশ্রয় আর কখনও বলিনি আলো নাও,

অংশ হয়ে ওঠো তুমি! তোমার হাত কি কৃপাময়

ছড়াবে আবির তবু? ডেকে নেবে পুণ্যের পাঁজরে?

 

এ শরীর নৌকো হয়ে দুলে ওঠে ঘূর্ণি-জলে খুব।

 

 

ধুলোখেলা : ৪

 

জন্ম, হাত দাও, ধরি। উড়ছে আজ তুলোবীজ হয়ে

সমস্ত আমার, সব কেন চলে যাচ্ছে ফেলে রেখে!

 

অদূরে ছড়ানো খড়্গ, বলি-রক্ত মেখে এই দেহ

পড়ে আছে অন্ধকারে, মিশে যাচ্ছে অনন্ত আঁধারে।

দ্যাখো, ছিন্ন দেহরেখা থেকে লাফিয়ে উঠছে বিদ্যুৎ

চিৎকারে কাঁপিয়ে দিচ্ছে হাওয়া মেঘ, আকাশমিনার!

 

হাত দাও জন্ম, এসো, ফিরিয়ে নাও বিচ্ছেদ থেকে।

 

 

ধুলোখেলা : ৫

 

মনে হয় ভেবেছিলে সমস্ত খোঁজ বিফলে গেল

জন্ম-মৃত্যু মৃত্যু-জন্ম চক্রাকার অন্বেষণ শেষে

পড়ে থাকবে শূন্যমাঠ, ছাই-সাদা অশরীরী ঋতু

নিভে যাবে পূর্বাপর আলোছায়া একা নিরুদ্দেশে!

 

এই তো পেয়েছি দ্যাখো, তোমার আগুন জুড়ে নাচ

ঘুঙুরের শব্দে শব্দে খুলে গেছে অপার সন্ধান।

পেয়েছি মেঘের দেশে তোমার সজল পদচ্ছাপ

দাগের ভিতর আজও বেজে ওঠে অলৌকিক টান...

 

যতই আড়াল রাখো মুখরতা বিগত জন্মের,

উঠে আসে নৃত্যরত শব্দ যত আত্ম-খননের...

ধুলোখেলা : ৬

 

শব্দ নয়। রং নয়। শুধু স্থির, গতির গভীরে

যেন সে অন্ধবালক নিশ্চুপ থাকে মগ্ন চৈতন্যে!

পারো না এভাবে তুমি আলো-অন্ধকার ছেড়ে

কাছে এসে ছুঁয়ে যেতে, কথাহীন স্পর্শ রেখে যেতে?

 

আমি তো চেয়েছি শুধু দৃশ্যের বাইরে দাঁড়িয়ে একা

ডেকে নেব শব্দহীন নিরাকার শঙেখর মুদ্রায়

আর তুমি সব ডানা, সমস্ত পথ, পথের ধুলো

খুলে রেখে কাছে এসে ঝরে ঝরে যাবে স্তব্ধতায়...

 

স্তব্ধতা দু'হাতে ধরে নেমে যাব অতলের দিকে

অতল, আক্ষেপ নয়, এই দ্যাখো আমার ছায়ায়

মিশে যাচ্ছি দেহাতীত, মিশে যাচ্ছে সমস্ত আকার..

 

ধুলোখেলা : ৭

 

রাত-পাহাড়ের গায়ে যত আলো জ্বলে ওঠে আর

অন্ধকার ভেঙে ভেঙে বেজে ওঠে মাদলের গান

দূর থেকে আমি দেখি হলুদ মশাল হাতে তুমি

চূড়ায় চূড়ায় একা জ্বালিয়ে দিচ্ছ জন্ম-মশাল!

 

কে দিল আলোর কাজ, কে পাঠাল এই মৃত্যুদেশে?

 

সব ক'টি স্তব্ধ চূড়া অভিশপ্ত নারী ও পুরুষ ---

যারা অস্ত্র-নির্ভরতা ছুঁড়ে ফেলে চেয়েছিল শুধু

দেবতা দানব নয়, রেখে যাবে প্রকৃত মানুষ।

 

সংঘ বড় ক্রূর হয়। তুলে দেয় পাত্রভরা বিষ

নেভে নক্ষত্রের আলো, নিভে যায় কত সক্রেটিশ!

 

আলো আজ দুলে ওঠে। জেগে ওঠে জ্ঞানের বিস্ফার

ঝলকে ঝলকে ওঠে শুদ্ধ ধাতু, আগ্নেয় চিৎকার।

 

পোড়ে সংঘের চাতুরি, পুড়ে যায় মূঢ় অন্ধকার... 

 

 

ধুলোখেলা : ৮

 

আমি কি চেয়েছি কিছু? এই মাঠ, মানুষের ছায়া?

মুঠোয় মুঠোয় দেখি উপচে উঠছে মায়াবী মোহর।

 

রংয়ের ভিতর থেকে কে এত ছড়িয়ে দেয় সুখ

সন্তানের গন্ধ চিনে কেঁপে ওঠে পাঁজরের হাড়?

কে এত লাবণ্যকণা জুড়ে জুড়ে গেঁথেছে সময়

কখনও মৃত্যুও দেখি অস্ত্র ফেলে চলে যায় দূরে!

 

আমার ভিতর তবু জেগে ওঠে ভয়, কালো-নখ

আমি যে পারিনি তাকে ডেকে নিতে অকাতর খুব...

 

 

ধুলোখেলা : ৯

 

মেঘ দেখা গেলে দূরে এখনও কি রঙিন কাগজে

নৌকো বানিয়ে দাঁড়াও? দাঁড়াও কখন বৃষ্টি এসে

ভাসাবে তোমার সব? সমস্ত বিলিয়ে চিহ্নহীন

হতে হতে মিশে যাবে কুহকিনী শূন্যতার দেশে?

 

অনচ্ছ কুয়াশা মেখে আমার সমস্ত দৃশ্যদল

হারিয়ে ফেলেছে মুখ, কোনও চিহ্ন স্পষ্ট নেই আর।

 

যতই চেয়েছি স্পষ্ট, স্পষ্টতর রেখায় তোমাকে

কারা এসে প্রতি বাঁকে, প্রতিটি পথের প্রান্তভাগে

আমার পা থেকে খুলে নিয়ে গেছে সব চলাচল!

 

সেই শেষ থেকে, সেই ভাঙা থেকে আমিও আবার

পথ জমিয়েছি বুকে। হেঁটে গেছি অস্ত্রদাগ মুছে।

 

তোমাকে চেয়েছি খুব ধুলো মুছে সুস্পষ্ট রেখার।

 

 

ধুলোখেলা : ১০

 

কী বীজ রেখেছ পুঁতে প্রতিদিন শিকড় ছড়ায়?

নেমে যেতে হয় পথে, রক্ত জাগে তীব্র হ্রেষায়?

 

তুমি নেই ভেবে যত চেয়েছি অপার অন্ধকার

বে-আদব আলো তত ঝলসে দিয়েছে এই শরীর!

আগলে রেখেছে সে-দাগ এ-দেহের অন্ধনদীতীর...

 

ত্রাণ নেই কোনওখানে, তাড়িয়ে ফিরছ বর্শাফলায়

আমিও মরিয়া ছুটি... ছড়িয়ে যাচ্ছি খোলা রাস্তায়...

 

ধুলোখেলা : ১১

 

চলো, বসি। স্তব্ধ, স্থাণু। যেভাবে পাথর, নাভি জাগে

সেভাবে দু'জনে থাকি স্থির আর নীচে জায়মান

দৃশ্যকলা থেকে খুঁজি আমাদের ফেলে আসা দিন :

মিথ্যের পালক আজও কতখানি উজ্জ্বলতা নিয়ে

ছুঁয়ে আছে মোহমাটি, কীভাবে মন্ত্র আর আজান

টেনে নেয় বুকে, বিষে। এখনও কি রক্ত মাখে রাত?

ভেঙে পড়ে মানুষের গার্হস্থ-বাসনা খোলা মাঠে,

নিভে যায় একা একা আদরের আলো-অন্ধকার?

 

কে এত মিথ্যে সাজিয়ে গেঁথে তোলে সময়ের বাড়ি

অলীক বেদনাগুচ্ছে বেঁধেছে কে রক্তমাখা গান?

কেঁপে উঠে নৌকো নাচে ঘূর্ণির চূড়ায়, মিশে যায়

ভয়-মুদ্রা জলে আর ঘাতক সময় লাফ দিয়ে

ছিঁড়ে নেয় স্বর, ধ্বনি... যতকিছু গূঢ় অঙ্গসাজ...

 

স্রোতে ভেসে চলে বাসি-ফুল, স্তব্ধ খড়ের শরীর...

পথ

আমি তোমার হেঁটে যাওয়ার পথে

বাঁক নেওয়া এক

অন্য পথের দেহ...

চাইলে তুমি আসতে পার একা

শর্তবিহীন ধূসর ধুলো ছুঁতে

না-হয় যদি হৃদয়ে সন্দেহ...

ডিলিট বাটন হাতেই থাকে সবার

মুছতে চাইলে মুহূর্তে সব শেষ...

কার কী হল --- কেউ ভাবে না অত

ইচ্ছে হলে হোক না নিরুদ্দেশ!

পথের কিন্তু নিয়মখানি কঠিন

নামলে তোমায় ছুঁতেই হবে অন্ত!

পথ আসলে মস্ত গোঁয়ার প্রেমিক

বাজি রাখে জীবন যেমন

তেমন রাখে মরণও পর্যন্ত!

 

নাছোড়বান্দা

কে না-খোঁজে তেমন বসত, আজীবনের ঘর?

চায় তো সবাই শুনতে কোথাও

কারও বুকের স্পর্শে নিবিড় অসংশয়ী স্বর...

এই আছো আর এই তুমি নেই --- এমনই অভ্যাসে

যতই তুমি দেখাও জাদু

ডুব দিয়েছি তোমায় ছুঁতে অনন্ত-সন্ন্যাসে...

ফুল ফুটুক আর নাই বা ফুটুক, বসন্ত আসবেই

ভাবব তুমি প্রবল আছো সমস্ত শূন্যেই!

বেহস্তে, জন্নতে...

তুমি কি সেই আছো আগের মতো?

চিনতে পারো সুদূর থেকে না-বলা সব ক্ষত?

 

নাকি, এখন অভ্যাসে ভুল শান্ত স্নায়ুময়

চিহ্নমাত্র নেই কিছু নেই... সব পুরোনোই ক্ষয়!

 

আজও কিন্তু শিউলিফুলে হিমের ফোঁটা যত্নে ছবি আঁকে

জীর্ণ সাঁকোয় একলা বিকেল স্বপ্ন ছুঁয়ে থাকে!

 

হয়তো সময় খুব স্নেহহীন, করেনি ইনসাফ

না-ভুলিয়ে রাখতে পারত সামান্য উত্তাপ...

 

যাক যা হওয়ার হয়েই গেছে, যা আছে থাক ক্ষতে

চাইলে তুমি আসতে পারো

দরজা আমার খোলাই আছে বেহস্তে, জন্নতে...

স্নান

 

সকলের বুকে থাক নির্জন --- নিজস্ব স্নানঘর। 

 

পাঠালে বিষাদ কেউ একা একা স্নানে চলে যেও

জলের তুলোয় তুমি মুছে নিও অনর্থক সন্ধেদাগ যত

মুছে নিও অহেতুক ধুলো আর চিৎকারের ক্ষত...

 

বুক পেতে তুলে নিও শুদ্ধস্নান, স্নানের মর্মর…

 

তুমি তো জানোই মেয়ে, আমি সেই, সেখানেই আছি

যেখানে রেখেছ তুমি অদ্বিতীয় বর্ণমালা ক'রে

যেখানে আমার ডানা তোমাকেই ছুঁতে চেয়ে কবে

                         উড়িয়েছে দিকে দিকে স্বাধীন-অক্ষর!

 

 

জন্মকথক

খানিক লোকও এমন থাকে --- হার মানে না, হার...

যতই নাচুক ছুরির ফলায় অন্ধ-অন্ধকার।

তারা ঠিকই পার হয়ে যায় অসুন্দরের দেশ

যেমন ধরো তেমন মানুষ গৌরী লঙ্কেশ...

 

চেনা মুখও অচেনা হয়, চেনার বাকি কত!

হত্যা এখন ত্রিশূল ছুঁলেই আইনসম্মত...

যা ঘটেছে তা তো ঘটার, অন্যে আছে বেশ

এদের তুমি পড়শি ছিলে, গৌরী লঙ্কেশ!

 

রাহাজানি নিয়মসিদ্ধ বিরুদ্ধ সব মতের

স্বচ্ছ হচ্ছে গ্রাম ও শহর নিধনে সত্যের...

ঘড়ির কাঁটা উলটে গেলেও --- সময় নির্দেশ!

সোজা রাস্তায় হাঁটতে গেলে, গৌরী লঙ্কেশ?

 

যা বলেছ, সে-সব-কথার রোদ্দুরে নাও সঙ্গে

হয়তো সময় ভাসবে না আর বিষমাখা তরঙ্গে!

সব কথা কি ফুরিয়ে যায়, মৃত্যুতে হয় শেষ?

না-শেষ কথার জন্মকথক গৌরী লঙ্কেশ...

 

আত্মহত্যাকালীন

 

আমি কি এগোব দু'পা? আর দু'কদম?

আমিও কি পাব আলো?  আলোর চেয়েও আলো? সহজ-সুন্দর?

 

মৃত্যুকাজ অন্ধকার? জলের নরম?

পেরেছে কি অন্ধকার জ্বেলে দিতে অশেষের আলো?

                  পেয়েছ কি তুমি ওই কৃপাময় ঘর?

 

বুঝিনি তখনও আমি অন্ধকার ছুঁতে তুমি ঝুঁকেছ নিবিড়!

বুঝিনি কখনও আমি --- কখন পতনখাদ

দিতে পারে শুদ্ধ-স্পর্শ কোনও একাকীর!

 

ওখানে কি অন্ধকার গর্ভে ধরে চির-আলো? গর্ভবতী হয়?

 

ভেবেছি আমার হাত --- স্বাদু-গন্ধ-অমরাবতীর

ভেবেছি আমার হাত ছুঁয়ে তুমি খুশি ছিলে খুব

                 পেয়েছিলে স্বপ্নপাঠ বিশুদ্ধ অগ্নির!

 

এখন জেনেছি শুধু রেখা থেকে রেখার ভিতর

এই হাত ---- ভুলের জ্যামিতি, অনর্গল ক্ষয়!

 

 

অপ্রেমিক

 

যেভাবে চেয়েছ তুমি সেভাবেই উড়ে গেছে পাখি

দিয়েছে শূন্যের স্তব অজটিল ঠোঁটে।

 

নদী কি জানে না ভাবো, তোমার স্বভাব!

আদিম আঙুল তার রেখে যায় ঢেউফুল স্রোত থেকে স্রোতে...

 

কবি ও লেখকও ঠিক পাখি আর নদীরা যেমন

তোমার গোপন গল্প দিয়ে

                         ভরে রাখে সুমুদ্রিত বই!

 

আমিই পারি না শুধু অনিচ্ছায় খুলে দিতে নিজেকে কোথাও

আমি-র ভিতরে অন্য যে-আমি বসত করে একা

                               আমি তারও ক্রীতদাস নই!

জলের শব্দ

 

চিহ্ন তো নেই বৃষ্টি নামার, সময় ধূ ধূ মাঠ

কোথাও তবু জলের শব্দে দিগন্তে পাখশাট! 

 

হয়তো বা জল ভিতরে বয় প্রবল ভূমিক্ষয়ে

প্রকাশ্যে তার দাগ রাখে না কখনও সংশয়ে। 

 

হয়তো দূরে একলা বিকেল মুঠোয় রেখে মেঘ

রাখছে লিখে তোমার - আমার বৃষ্টি-অনুচ্ছেদ

 

আমি কী আর ছুঁতে পারি নিভন্ত এই দিনে

খণ্ডিত যে সমস্ত আজ ব্যক্তিগত ঋণে! 

 

নিকট যত দূর হয়েছে, দূর হয়েছে দূর

দাগ রেখেছে পথের বুকে নিয়ত ভাঙচুর! 

 

হয়তো এমন ভাঙতে থাকে রেখার দেহ সব

চিহ্নবিহীন মুদ্রা আঁকে ধ্বংসের উৎসব!

 

নিঃস্ব হওয়ার আগেই বোধহয় জাগে জলের কথা

সামনে যখন অচিহ্নিত প্রগাঢ় স্তব্ধতা!

 

আমার না হোক, অন্য কারও ঝরছে মুঠোয় জল

এমন ভাবেই বাসছে ভালো কাউকে অবিরল...

 

জলের কোনও শেষ থাকে না, ভেজারও শেষ নেই

আমি-র শুধু বদল ঘটে , বৃষ্টিরা নামবেই!

দূর থেকে

 

কেউ কারো দুঃখদেহে নিঃশর্তে রেখেছে কোনও হাত?

কোনও হাত শর্তহীন হয়?

সমস্ত মানুষ জানে বিজনে গভীর হয় ক্ষত

                            জেগে ওঠে অনর্গল ক্ষয়!

 

আমিও রাখিনি হাত যতটা উচিত ছিল রাখা।

 

অথচ চেয়েছি ছুঁই, ছুঁয়ে থাকি তোমার বিষাদ

কিন্তু খুঁজে দেখি সব শূন্যের ধারণা

আমার ভিতর দেশে রেখে গেছে মহর্ষি কণাদ! 

 

তোমার মনখারাপের পাশে

আজ শুধু রেখে আসি দীর্ঘ-নদীজল

অপার স্থিরতা নিয়ে দূর থেকে ছুঁয়ে থাকি একা

                                                 তোমার অতল…

 

চেনো সেই, স্পর্শ চেনো? মনে মনে জেগেছে সন্দেহ? 

তাহলে এবার যাও, ভোরবেলা নদীর কিনারে

কুয়াশা সরিয়ে দ্যাখো --- ঢেউজলে ডোবে ভাসে কার

                                                  মৌন - মৃতদেহ!

 

 

দস্যু

 

ভেবেছ তাতার দস্যু। সমস্ত লুণ্ঠন করে চলে যাই দূরে

আর তুমি পড়ে থাকো নিহত বিশ্বাস নিয়ে কোনও অন্ত:পুরে!

 

ভাবো তুমি প্রেমিক মাত্রই

সময়ের ধূ ধূ ছোঁয়া এক দিগন্তবিহীন বালির ওপর

জ্বেলে রেখে রাত্রির আগুন

                          গুণে-গেঁথে দ্যাখে লুঠের মোহর!

 

ভুল ভুল, এ কেবল ভুল...

পারে না কখনও কেউ নিয়ে যেতে সমস্তের সব

হৃদয়ের দস্যুতায় যত বেশি নি:স্ব হবে, জেনো

                       তত বেশি পূর্ণ হয় পূর্ণের উৎসব...

 

দাঁড়াও, দাঁড়াও উঠে। যেগুলো ভেবেছ অন্ধকার

স্বপ্নের আলো থাকে তাদের গর্ভেই...

 

চলো, আজ লিখে দিয়ে যাবো

এই ভিড়, নির্জনতা, এই ধুলোবালি

এ শহর, জনপদ, এ কলকাতা তোমার নামেই...

 

ফসল

 

ধাবমান জলের দিকেই

হেঁটে যাই প্রতিদিন সকলে, প্রত্যেকে।

 

এ ভ্রমণ অনিবার্য পাঠ

যে সময় দাঁড়িয়েছ একাকী, প্রথম

       আলোর সুগন্ধ ছুঁয়ে জলভূমি থেকে...

 

ফেরাও তো থাকে সেই জলের কাছেই

থাকে সব ভেসে-যাওয়া অন্তহীন জলের দিকেই!

 

মিশে যায় চিতাভষ্ম গতির ভিতর একা স্থির হবে বলে

প্রগাঢ় ঘূর্ণির দেশে ফিরে পাবে নিজের নিশ্চল!

 

গতির ভিতর থাকে স্থিরতার প্রিয় জন্মঘর

স্থিরতার অন্তর্গতে শুয়ে থাকে গতির মর্মর...

 

এই সূত্র খুঁজে পায় সেই

চিনেছে যে বেঁচে থাকা, আয়ুর প্রকৃত সত্য জলের ফসল...

 

 

বৃষ্টি আর অর্ধেকজীবন

 

কে বলে বৃষ্টির মানে শুধুই আকাশ-ভাঙা জল!

কখনও প্রণয়লিপি ভিতরে উজ্জ্বল...

 

দ্যাখো দ্যাখো, জেগে ওঠে উত্থান... উত্থান...

জড় থেকে মৃত থেকে শব থেকে খুলে খুলে নেয়

                              জমে থাকা আত্মঘাতী টান।

 

জল ভাঙে ধ্বংস-ঘর। মুছে যায় কালো স্মৃতিজন।

বৃষ্টি ছুঁয়ে ফিরে পায় নবজন্ম প্রেমিকের মন...

 

এই শোনো, কাছে এসো। চিনতে পারো সেই দাগি ঠোঁট?

বেছে নেওয়া মধ্যরাত, ফাঁকা রেলপথ?

চূড়ান্ত পতন সেই, সেই রক্তস্রোত?

 

আহা, মনে করে দ্যাখো... নিভে যাওয়া বৃষ্টির ভিতর

দেহহীন দু'ছায়ার নিবিড় গমন...

 

আমাদের ফেলা আসা বৃষ্টি আর অর্ধেকজীবন!

 

পাপ

 

সহস্র পাপ বুকে নিয়ে আজীবন ঘুরেছি অনেক।

 

ভুলে যাই চিঠি লিখি

ভুলে যাই গানের আবিরবিন্দু রেখে আসি তোমার দু'হাতে...

 

হেমন্তের রাত্রি জ্বেলে রাখে কুয়াশার আলো

সে আলোয় আঁকতে পারিনি তোমাকে এখনও।

মধ্যরাতে আমার সারেঙ্গী পারেনি

বৃষ্টি হয়ে ছুঁয়ে দিতে আমূল হৃদয়... এভাবেই ভাবো,

ভেবেছ আমাকে তুমি সমস্ত আয়ুষ্কাল জুড়ে!

 

এই সব পাপ নয়, বলো?

এত পাপ কার কাছে গচ্ছিত রেখে চলে যাবো আমি!

 

অথচ জানে সারা শীতকাল, তোমার সমস্ত ঝরাপাতা

বুকে রেখে শব্দহীন হেঁটে যাই পথ থেকে পথের ভিতর।

জানে সব বসন্তের দিন, কীভাবে তোমার পায়ে

আরণ্যক অন্ধকার দিয়ে লিখে রাখি নিবিড় বিশ্বাস...

 

তোমার সমস্ত না-বোঝা বস্তুত গাঢ়তর পাপ

সহস্র পাপ বুকে নিয়ে আজীবন ঘুরেছি অনেক।

 

 

একজন গেরিলার স্বপ্ন

 

শেষ পর্যন্ত যখন রুদ্ধ হতে থাকে শ্বাস

চন্দন-আভা দু'চোখে লাগিয়ে নিশ্চুপে খোলে ত্রাণের শিবির!

 

এভাবেই তাকে আজন্ম চিনি...

নক্ষত্রের আলো বুকে নিয়ে কতদিন একা

                              যুদ্ধের মাঠ ফিরিয়েছে সঙ্গীর!

 

এই যে এখন রাত্রিরজনী, দিবস ও দিন

শালবন আর খনির ভিতর ছুটে যাই রোজ দিক থেকে দিকে

সশস্ত্র হাত তাক করে থাকে দখলের ইতিহাস ভেঙে দিতে...

                   নিশ্চিত জানি ফিরবে সুদিন গুণ-ভাগ-দশমিকে।

 

বিপ্লব কোনও মিথ্যের শ্লোক শেখেনি কখনও

দেয়নি স্লোগান অলীক কল্পনাতে

স্পষ্ট জেনেছে, ন্যায্য দাবির অধিকার সব

                  লুকিয়ে রয়েছে বাসস্থান ও ভাতে...

 

ফিরবে মানুষ মানুষের দেশে জীবিত অথবা মৃত

তুমি ছাড়া আর কে-ই-বা রয়েছে শহিদের এত প্রিয়!

 

মৃত হলে তুমি চন্দনে এঁকো,  জীবিত থাকলে চুম্বন ছুঁড়ে দিও...

 

 

ঝরাপাতার গল্প

 

নানা রংয়ের দু:খকথা ঝরাপাতার রূপান্তরে

আজন্মকাল জমতে থাকে ক্রমান্বয়ে ভিতর ঘরে

 

সে কি শুধুই দিনযাপন আর বেঁচে-থাকার সালতামামি!

দূরের থেকে কাছে এবং কাছের থেকে দূরগামী

 

যে-সব স্পর্শ খুব গভীরে অবিচ্ছিন্ন দাঁড় টানছে

পৌঁছে যেতে ব্যক্তিগত রহস্য আর রোমাঞ্চে...

 

ক'জন চেনে নিজের মধ্যে মুখ-লুকোনো মহল্লা কে?

ক'জন জানে নিজের ভিতর চেনা পথের অন্য বাঁকে

 

দাঁড়ায় যখন নিজের চাওয়া,  সে কি তখন নিজেও বোঝে?

চেনা এবং না-চেনার এই দ্বন্দ্বে মানুষ খণ্ডিত যে!

 

আবহমান দ্বন্দ্ব ছুঁয়েই উঠছে গড়ে দু:খদেশ

কেউ চিনি আর নাই বা চিনি, পাতা ঝরার নেই তো শেষ...

 

 

প্রত্নকথা

 

 দেখেছ পাথর শুধু, দ্যাখোনি তো প্রত্নের বিস্ময়

কীভাবে ছড়ায় আলো অন্তর্গতে তার

                                   শিরা আর উপশিরাময়!

 

বিগত ঝড়ের নীচে মরাপাখি বুকে ধ'রে আজও

বসে আছে কোনও এক দু:খী সান্ধ্যকাল।

এমন বিষাদ-সন্ধে, সমাহিত শোক

জয় করে সন্তদল হেঁটে চলে ধুলো পায়ে খুলে দিতে পথের আড়াল...

 

শব্দহীন সমাধিতে থাকে কত বৃষ্টিপাত, জল

কত দীর্ঘ বালিয়াড়ি, ঢেউয়ের উত্থান

সে সব প্রকৃত স্পর্শে জেগে উঠতে জানে

                      জানে স্রোত-ঘূর্ণি, জানে টান!

 

সমস্ত নিশ্চল ভেবে দূরে থাকা ভালো?

নিজেকে জ্বালাও আর স্তব্ধ তাকে বুকে নিয়ে জ্বালো...

 

দেখেছ পাথর শুধু, দ্যাখোনি তো প্রত্নের বিস্ময়

কীভাবে ছড়ায় আলো অন্তর্গতে তার

                                   শিরা আর উপশিরাময়!

 

 

 
কবিতা সমগ্র - ১৫

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর এ দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি যেমন অবদান রেখে চলেছেন তেমনি সৃষ্টিশীল লেখার ক্ষেত্রেও তাঁর পদচারণা। তিনি মনে করেন বিজ্ঞান চর্চা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি একে অন্যের পরিপূরক। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, গবেষক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, কবি, গীতিকার, নাট্যকার, সমাজ সংস্কারক ও সাংস্কৃতিক কর্মী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শনে বিশ্বাসী এই মানুষটির ছোটবেলা থেকেই লেখায় হাতেখড়ি। কৈশোর ও তারুণ্যে তিনি বাংলা একাডেমি, খেলাঘর,  কঁচিকাচার মেলা সহ বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করেছেন। এই সময় তাঁর প্রবন্ধ, কবিতা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকৌশল বিদ্যা অধ্যায়নের সময় তিনি প্রগতিশীল কর্মী হিসেবে কাজ করে সহিত চর্চা করে গেছেন। এ সময় তাঁর লেখাগুলো বিশ্ববিদালয়ের ম্যাগাজিনে এখনও সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও অনেকদিন ধরেই তিনি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। বাংলা ও ইংরেজি দুই সাহিত্যেই তাঁর সমান দক্ষতা রয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্র, প্রকৃতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, পরিবর্তন, সম্ভাবনা ও মানুষ তাঁর লেখার মূল উপজীব্য বিষয়।  তিনি একজন ভাল বক্তা। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক্ শো সহ বিভিন্ন সৃজনশীল অনুষ্ঠানে তাকে অতিথি হিসেবে দেখা যায়। ভারতরে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী অজিত কুমার পাঁজা কলকাতা দূরদর্শনের একটি প্রতিযোগিতায় তাঁর প্রেরিত প্রবন্ধে মোহিত হয়ে নিজ হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সে সময় সম্প্রচারিত হয়। এই খবরটি আজকাল, সংবাদ, বাংলাবাজার সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া তিনি ফিলিপিন্স, চীন, বি-টিভি  সহ দেশ বিদেশের বিভিন্ন পুরুস্কারে ভূষিত হন। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একজন কর্মী হিসেবে তিনি কাজ করে চলেছেন। 

নিজের শব্দহীন অস্তিত্ব


অপরিচিত একটা শহরে এসে থমকে গেলাম
চারদিকে  কেমন যেন  দম বন্ধ  হওয়া নিস্তব্ধতা 
থম থমে ভাব যেন নির্বাক এক স্থবিরতা |
ভাবনাগুলো পাখি হল 
দৃষ্টির বৃষ্টিরা ফিকে ফিকে রং হয়ে উড়াল দিল
কোন এক বৃক্ষহীন অরণ্যে, 
কারা যেন লাল গালিচায় মুখ চেপে   বোবা হয়ে গাইছিল
ধনে ধান্যে লাল নূপুরের একটুকরো চিলতে পরা
মানবতার জন্যে |   
মানুষগুলো জীবন্ত না মৃত 
শিয়াল আর শুকুনির লাল চোখে 
নীলাভ অন্তঃরাত্মা কম্পিত স্পন্দিত,  
তারপর নন্দিত  নিন্দিত  তপোবনে 
কি একটা কর্কটক্রান্তির শিহরণে,  
তোলপাড় মন দেখতে পেল    
একটা ধ্বংস স্তূপে  ভাঙাচোরা দূরবীনে 
দাঁড়িয়ে আছে গোরস্থান |
পুরনো বেলে মাটি খসে খসে পড়েছে 
যেন অবহেলার শুষ্ক গন্ধে খুশবু বিছানো অভিমান  
একটা আস্তিনে ঢাকা ঝাপসা কুয়াশার মত
লাশের কবর , 
যেন জিন্দা লাশের কাক ডাকা 
অথিতি নিয়ে এসেছে পড়ন্ত বিকেলের খবর |
কিন্তু কেন তারপরও 
খুব চেনা মানুষের  কবর বলে ওটাকে 
মনে হতেই শরীরটা যেন হয়ে গেলো কংকাল,   
আত্মাটা ফুড়ুৎ করে বজ্রপাতের আঘাতে 
দেখতে পেল  শব্দহীন লাশের পঙ্গপাল |
আর ওখানে ওটা আর কারো নয় 
আমারিকবর  যার মৃত্যু হয়েছে আজ নয়তো 
কবে কেউ জানেনা. 
সব যেন রহস্য আর সাদা কাপড়ের ভিতর 
নিজের অস্তিত্ব |
থমকে দাঁড়িয়ে বলে  পুনর জন্ম   নাকি 
বেঁচে থাকা কিংবা মরে যাওয়া 
এখনও অনেকটা পথ ঢেকে  রাখি 
যদি আবার আসি ফিরে, 
ঐ পঙ্গপালের ভিড়ে,  
নূতন করে ঘুরে দাঁড়াবার  স্বপ্ন পুরুষদের 
অভিশাপের বিষে তৃষিত আবেশে | 

 

 

নিথর দেহে প্রাণ

 

থমকে গেলো জীবন
যেমন থমকে আছে মায়াবতীর মায়াবন,  
যেমন থমকে আছে হিমাদ্রির ক্ষত বিক্ষত দেহ, 
নর পিশাচদের তাণ্ডব নৃত্যে 
মনে হয় সব যেন  রক্তের হোলি খেলা 
অগ্নির তীব্র দ্রোহ বিদ্রোহের 
ঘাতে   প্রতিঘাতে 
ছিন্নপত্রের বর্ষণ  অবগাহন |
কি যে হল সব যেন বদলে গেল নিমিষেই 
আলাদীনের জাদুর চেরাগের মতো   
যেন টেমস নদী হয়ে গেল মহাসাগর 
তারপর ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে 
আলেকজান্ডারের বিশ্বজয়ের মতো 
পথ হারালো  কলম্বাসের ভ্রান্ত যাত্রা
আঁকা বাঁকা  কোন শঙ্কিত গলিপথে |
রুখে  দাঁড়ানোর শপথ নিলো ওরা
প্রতিবাদী কণ্ঠ ভেঙে ফেললো কাঁচের দেয়াল 
বলল উচ্চকণ্ঠে,   
আমরা মানুষ,  আমরা নারী 
আমরাই পৃথিবীটা বদলে দিতে পারি 
খামোশ শয়তান বন্ধ  কর তোদের অযাচিত খবরদারি |
প্রতীক্ষার স্বপ্নঘুড়ি উড়ে 
দিন যায় সময় বদলায় 
মুক্ত হয় বদ্ধ খাঁচার অবরুদ্ধ পাখি 
কোনো এক দূর আকাশে 
না বলা অনেক কথার মিছিলে
কিংবা জোছনা রাতে তারাদের ভিড়ে  |

 


খণ্ডিত স্বপ্ন

 

একটুকরো পোড়া মাটি হাতে 
দাঁড়িয়ে ছিল একটা কংকাল
নির্বাক চোখ আর অন্তঃসারশূন্য অস্থি মজ্জা  
যেন মৃত মানুষ,  জীবন্ত একটা লাশ |
পৃথিবীতে এসে 
কলঙ্কিত করল মানব  সভ্যতাকে,  
চেনা আয়নায় চড়া দামে বাজার থেকে 
কেনা ক্রীতদাস মনে হলো তাকে, 
কিন্তু অচেনা তার বৃষ্টির জল 
পাহাড়ে ধসে পরা কোনো আদম সন্তানের উপাখ্যান 
কিংবা পিষে যাওয়া শোষিত বঞ্চিত মানুষ | 
ভাবনা যেন স্বপ্ন হলো উড়াল দিল 
সাত সাগর তেরো নদী পার হয়ে দেখা পেল
এক রাজকন্যার, 
যার রেশমি চুরির ঝংকার  আর স্বর্ণলতা
মনে দাগ কাটল পিরিতের যন্ত্রণার দাগ 
আর মস্তিষ্ক মাংসপিণ্ড হয়ে মানচিত্র দিয়ে 
বুলেটের আঘাতে যেন হল অবাক 
কিন্তু থাকলনা বেশিক্ষণ,    
রূপের রঙ্গ  ভেঙে পড়লো মাথার উপর
বাস্তবতা কড়া নাড়ল কল্পিত রূপকথায় |      
তারপর হিমালয়ের হিমশীতল ঠান্ডায় 
কম্পিত হল মন ভূমিকম্প নেমে এলো ধরিত্রীতে 
বাস্তবতা ক্ষুধিত পিশাচের অগ্নিমূর্তি হয়ে 
চেপে ধরলো গলা 
আর বললো তোমাদের ঠাঁই নেই 
মানুষের আধুনিক  সভ্যতায় |
এখনো কান পেতে শুনি তার আর্তনাদ 
অশরীরী আত্মা বিলাপ বার বার যেন 
বলে উঠে 
এবার সময় এসেছে আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার |

তুমি আছ বলে

 
তুমি আছ বলে আজও বাজে মনের নূপুর
ছবি আঁকে তৃতীয় নয়ন শ্রাবণের
বৃষ্টি ঝলসানো মধ্যদুপুর।
তুমি আছ বলে
আজও রাতের তারারা উল্কাবৃষ্টির খোঁজে
সেতারে সুরটানে নিরন্তর আলোর আকর্ষণে।
তুমি আছ বলে আজও চোখের দৃষ্টিসীমা
কবিতা লেখে মনের ভাষায়
কোন এক লক্ষ্যহীন লোকান্তরে।
তুমি আছ বলে আজও আমার ধমনিতে
রক্তের স্রোত বিস্ফোরিত হয়
আবেগের বিস্ফোরণে
স্থান কাল পাত্র মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়
তোমার লাল বেনারসির মহাসিন্ধুর মহাকাব্যে।


 
দুঃখ নেবে দুঃখ

 

দুঃখ নেবে দুঃখ
দুই পয়সার আলতা কেনার
সুখ দুঃখের দুঃখ 
আঁধার আলোর দুঃখ
জীবন যেথায় থমকে দাঁড়ায়
রুক্ষ পথের দুঃখ ।
দুঃখ নেবে দুঃখ
দুখী মায়ের কান্না ভেজা
কষ্ট ঢাকার দুঃখ ।
দুঃখ নেবে দুঃখ
জীবন গড়ার দুঃখ
জন্ম থেকে জ্বলছে যারা
তাদের পোড়ার দুঃখ ।
দুঃখ নেবে দুঃখ
মা হারানোর দুঃখ
জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া
শৈশবেরই দুঃখ ।
দুঃখ নেবে দুঃখ
 দুঃখ থেকে জেগে ওঠা
শেষ বিকেলের দুঃখ।

 


অন্তহীন বিজয়


আমি বিজয় দেখিনি আমি 
দেখেছি জ্বলন্ত রাজপথ
দেখেছি মিছিল, বিপ্লবী অবরোধ ।
আমি দেখেছি
রক্তে ভেজা শহীদের নিথর 
দেহে  বাংলা মায়ের মুখ  
আমি বিজয় দেখিনি আমি
দেখেছি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার
আগামীদিনের স্বপ্ন জাগার সুখ ।
আমি বিজয় দেখিনি আমি       
দেখেছি বীরাঙ্গনার
কালজয়ী এক কিংবদন্তির
চাপা কান্নার  দীর্ঘশ্বাসে
দূর্গা দুর্গতিনাশিনীর          
সংগ্রামী এক রূপ ।
আমি বিজয় দেখিনি আমি
দেখেছি বর্বর গণহত্যা
শহীদ বুদ্ধিজীবির লাশ

অন্তহীন পদ যাত্রা


নিস্তব্ধ তাকিয়ে থাকি অন্তহীন দৃষ্টিতে
জীবনের কোলাহল খুঁজি নিভৃত
এক চন্দ্রালোকে
তারপর থেমে যাই
কোন এক লোকালয়ে
যেখানে মানুষ ক্রীতদাস হয়
অশুভ শক্তির ইন্দ্রজালে
যেখানে হিংস্র দানবেরা নগ্ন নৃত্যের
উন্মাদনায় কম্পিত করে ধ্রুম্রজাল।
তারা বলে
সবচেয়ে খেতে ভাল মানুষের রক্ত
আর শুকুনির মতো ব্যবচ্ছেদ করে
মানুষের খন্ডিত মাংসপিন্ড।
অবিরত লড়াই করে মুক্ত চিন্তা
স্বপ্ন দেখে ভেঙে পড়েছে
সংকীর্ণতার অবরুদ্ধ শিকল
জেগে উঠেছে মানুষ
আলোকিত প্রভাত ফেরির

বিরামহীন পদযাত্রায়।

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?