কবিতা সমগ্রঃ ৪ 
ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত 

(১) সে আসে ধীরে

 

অজস্র বৃশ্চিকরাশি জমিয়েছি পরাভূত সমুদ্রের আস্তাবলে

বালির দুর্গের উন্মুক্ত জানালা দিয়ে খেলে যায়  অনিমিখ কালজয়ী রোদ্দুর

একলা থাকতে বলেছিল  বৈশাখের মেঘ

সমুদ্র স্নানে ডেকেছিল হিম জ্যোৎস্নার সারস

 

জলধারা আসে কোথা থাকে বৃষ্টির ঝাপটা নাকি

পাহাড়ে আঘাত করে সমুদ্র ঢেউ

উড়ে আসে মেঘের পতন নিয়ে এলোমেলো হাওয়া

শান্ত সমুদ্রের তীরে অকস্মাৎ

উঠে আসে জলকন্যা মৎস্য নারী

বিসর্জিত লেজ পাখনা

অপুষ্ট অপটু টলোমলো পায়ে

সে কাছে আসছে ধীরে

 

(২) ট্র্যান্সসাইবেরিয়ান এক্সপ্রেস

 

মনের মধ্যে কান্নাকাটি,

পাগল খুঁজছ ঘর বসত।

তাকাও চোখের দিকে

ও আমার মনের পাগল,

রয়েছ নিশ্বাসে রয়েছ বিশ্বাসে –

রয়েছ মিথ্যায়-

একের পর এক দেশ পার হয়ে যায় ট্রেন -

ট্র্যান্সসাইবেরিয়ান এক্সপ্রেস।

 

আমি কি চলে যাব সন্তর্পণে হেঁটে

চলন্ত কামরার বাইরে?

যেতেও তো পারি,

বলো যেতেও তো পারি,

ঐ যে শায়িত তুমি নিদ্রাকাতর সে যদি দেহ হয়,

আমি তো তবে ছায়া এক মর্বিড কবিতা।

যেতেও তো পারি বলো,

যেতেও তো পারি,

তোমাকে ঘুমন্ত রেখে এদিক সেদিক-

বাইরে ছুটেছে পৃথিবী গাছপালা বরফ ঢাকা পাহাড়,

অথবা ডুব দিতে পারি মনের গভীরে,

অন্তর্লীন নিজস্ব হ্রদে।

 

 

(৩) শব্দহীন

 

পেরিয়ে যায় শব্দহীন রেলগাড়ি,

শব্দ ঢাকা পড়ে যায়;

কথা হয়নি বলা অরণ্যের কানে,

অনুরণিত তা একান্তে মনে,

কথা বলা নয়,

কিছু অনুভূতিই স্তব্ধতাতে প্রকাশিত,

এমতাবস্থায় নিজস্ব জগত,

কার সাধ্য বলো ভাঙ্গবে খোলস?

 

ভাবনাদের বাঁধতে চাওয়া ভুল,

ছোট ছোট প্রজাপতি হয়ে ওড়ে,

উড়তেই থাকে,

জ্বেলেছ আগুন

কেন কাঁদো মৃত্যুতে?

 

থামিও না বলতে দাও,

ভারি হয়ে যাবে ঠোঁট শব্দহীন আলোড়নে।

আমার সঙ্গে অপেক্ষা করছে শেষ বিকেল,

হাত ছুঁয়ে দৌড়ে যায় ঝোড়ো হাওয়া;

রোদ্দুর চলে যায়- মানুষ চলে যায়,

একের পর এক যায় লোকাল ট্রেন,

শেষ গাড়ি চলে যায়।

 

অপেক্ষায় সন্ধ্যে রাত হালকা কুয়াশারা,

তারপর চাঁদের আলোয় পথ হাঁটি

রাতের পাখিরাও খবর নেয়।

বিভিন্ন সঙ্গতে বেজে ওঠে সঙ্গীত,

না পাওয়ার দুঃখ নিয়ে গাইতে হয়।

শেষ গাড়ি চলে যাবার পর আরও ভারি ঠোঁট,

নিজেই শুনতে পাই কেবল নিজের অস্ফুট।

 

 

(৪) নালায়েক

 

এই বাদাবনে ভাসিয়ে এনেছ কাঠের ঘোড়া গোপনে!

জ্বলছে তোমার মুর্দাফরাস চোখ,

ধর্ষণ কর এক চন্দ্রাহতা-

প্রেম থাকে না লালসা থাকে,

অন্য কোন ক্ষুধা থাকে।

ধর্ষণ করো ক্ষুধাকে লালসাকে,

তুমি ধর্ষণ কর এক কাষ্ঠঘোটকী,

নালায়েক।

 

তুমি কি ভালোবাসা জানো,

ভালোবাসা কি জানে ঘোটকী?

 

তুমি কি দেখেছ কমলাকায়া,

বিটপীছায়ায় মানসীমায়া?

 

 

(৫) লাল পরী

 

লাল পরী হারিয়েছে পথ লাল পিঁপড়ের মত মেলেছে ডানাটি

সত্যি কি লাল সাদামাটা বিপ্লব না ফ্যান্টাসি অতীব হিপোক্রিসি

গোলমাল হয়ে যায় লাল কি এ যাবৎ পৃথিবীর যাবতীয় ক্ষতি

কে জানে কোথায় কতটা লেনিন স্ট্যালিন মাও

কতটা হিপোক্রিসি

লাল পরী জানে না কিছুই উড়ে বেড়ায় প্রান্তরে বটমূলে

 

লালপরী আসলে ফ্যান্টাসি গোপন গন্ধ তার গোপন যৌনতা

আপাত সারল্যে সে ডোবায় মানুষ জলে আবার তুলে ধরে

সব প্রতিবাদ ব্ল্যাসফেমি মার্ক্স বলেছেন ধর্ম আফিং

মার্ক্স তবে কী

 

এই সব লেখা জানি পর্যুদস্ত হবে

এদিকে ক্রমশ  মার্ক্সিয় বিজ্ঞান অপাংক্তেয়

দেখা যাক ভবিষ্যৎ কি দেবে কোন নিশ্চিত

 

(৬) থাকা

 

হাওয়া ঠেলে দিচ্ছে খাদের দিকে,

মাটিটা ফেটে গেলে আশ্রয় হতো ভেতরে,

চলে যাওয়ার কোনও মানে হয় না-

থাকাটাই সব।

আর এই যাঁদের আজ ভুলে গেছো-

ভেবে দেখো তাঁরা কি প্রবল ছিলেন একদা

মৃত্যুর আগে পর্যন্ত।

 

তারপরেই তো এইসব স্মৃতিস্তম্ভে

ধূপ, বাতি, পুজো আচ্চা ইত্যাদি।

 

 

(৭) চলে গেলি এভাবে

 

যখন দেখা হলো আবার

আমরা যে যার পথে

সেদিনের মতো ভালোবাসিনি আগে,

এটা বুঝেছি এতদিনে।

 

আমাকে গ্রাস করল সবুজ বন,

তারাদের ফ্যাকাসে শরীর,

পরিচিত ফ্যাকাসে মুখ দেখলাম,

তোকে দেখলাম না,

এদিকে শহরে ফিরেছে জগু অনেক দিন বাদে,

তার দাঁত হীরের মত ঝলসায়,

ঝলসায় কুমিরের মত।

 

আমি তোকে আর দেখিনি,

দেখিনি রাজকীয় চলন,

লোকে বলে খুব সকালে এক কবন্ধ

ঝাঁপ দিয়েছিলো জলে।

 

জগুর হীরের দাঁত ঝলসায় কুমিরের মত,

অনেকদিন বাদে নদীর জলে বেগুনি আভা।

 

 

(৮) রমণীরাও কি একই রকম

 

কোন জটিলতা ছিল না আকাশে,

আমরা প্রান্তরে হাঁটছি ঈষৎ বৃষ্টিপাতে,

কুড়িয়ে নিচ্ছি বালকের সারল্য,

সংগ্রহশালা ক্রমশ ভরে গেলো।

 

আমরা এখন দীর্ঘস্থায়ী শীতকালে,

আমরা এখন শীতের বিকেলে,

আমাদের কোন দৃষ্টিপাত নেই,

বিবশ মৃত্তিকা শুধু জানে

নিয়মিত হলকর্ষণ,

শস্য আহরণের পরে সুদীর্ঘ মুগ্ধতা।

আমাদের চারপাশে ক্রমশ যারা ভিড় করে আসে

তারা কি একই রকম সমস্ত ঋতুতে?

এমনকি রমণীরাও

কি একই রকম হাসে ইদানীং?

(৯) নতুন ভগবান

 

ফুল্লকুসুমিত কোন এক সকালে চলে গেলেন তিনি,

তাঁর শেষ যাত্রায় তিনি ভগবান,

স্বর্গরথ নাম কেউ দিয়েছিলো বাহনের।

কোন এক সকালে তিনি আর খেতে পারলেন না,

এমনকি ঠোঁটের কোণা থেকে গড়িয়ে পড়ল জল,

তাঁর শরীর পোড়া বিভূতি ছড়িয়ে দিলো কেউ কেউ-

নদীর পুত পবিত্র জলে।

 

খুলে ফেলা যাবতীয় সিলিন্ডার নল,

খুলে ফেলা সমস্ত ড্রিপ, স্যালাইন,

শরীর তাহার রয়েছে এক বিশাল ড্রয়ারে।

 

ফুল্লকুসুমিত কোন এক সকালে,

শবানুগামীরা হতচকিত দেবত্ব আরোপে,

সারি সারি হাত ছুঁয়ে ফেলে কপাল,

এই মৃতদেহ আজ এক নতুন ভগবান।

 

 

(১০) বৃথা

আমার সকাল বৃথা গেলো,

শুনতে পাইনি নাম কীর্তন,

কি করব?

আকাশ এত রঙিন হলে কিছু করার থাকে?

সূর্যটাও সেরকম!

মেঘের ফাঁক দিয়ে এমন এমন ছুঁড়ছে রোদ্দুর!

জানি উঠোনে জমেছে ঝরাপাতা,

জানি জমি ছেড়ে দিতে হবে লাঙ্গলের কাছে,

জানি কর্ষিত হতে হয় সব কিছু নির্ধারিত পবনের হাতে।

তবু কেড়ে নিয়ে সারাদিন,

আমাকে মাঝে মাঝে দিও এমন এক,

নিরুদ্বেগ নিজস্ব সকাল।

(১১) অপর সূর্য

 

আমি তাকে গুড মর্নিং বলার সাথে সাথেই

সে আমাকে একটা থাপ্পড় মারল,

আমি পড়ে যাবার আগেই সে আমাকে

হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করালো ফুটপাতে,

আমি হতভম্ব হয়ে দেখলাম তাঁর স্মিত হাসি,

গুম্ফায় বুদ্ধদেব,

‘হা হতোস্মি’ কথাটা খুব আস্তে বললেও

ঠিক কানে গেলো-

আমার গালে হাল্কা ভাবে সে একটা-

চুমু খেলো।

 

গালটা যেন পুড়ে গেলো,

হামিটা যেন উড়ে গেলো,

উড়ে গেলো আগুনের গোলা হয়ে আকাশে,

অন্য এক সূর্যের মত।

 

 

(১২) তিন তাস

 

আমার হাতে তিন পাত্তি-অতীত বর্তমান আগামী,

আমি একলা ঘরে বসে -নেমে এলো প্ল্যানচেটে

প্রবক্তা, বলল সে সংসার পেতে আছে সমুদ্রের  

ধারের কোন শহরে।

 

যে চলে গেছে তাকে কে ভাবে, বাকী থাকছে দু’টো

তাস। আজকের দিনটা কাটতে চাইছে না অথচ এতগুলো

বছর পেরোলাম লহমায়।

 

বললাম আমার কোন দুঃখ নেই, তাকে কোনদিন

ভালোবাসি নি, প্রবক্তা মুচকি হাসলো, বলল মিথ্যে

বলতে তোমার কষ্ট হয়।

 

দুটো তাসও হাতে নেই, ভবিষ্যতের স্রোত দ্রুত ছুঁয়ে

যায় বর্তমান, পৌঁছে যায় অতীতে।

 

মৌচাক তাক করে ছোঁড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়,

কিন্তু বিদ্ধ করে আঙুর ক্ষেত, চুইয়ে চুইয়ে বিষ   

পড়ে মধুপাত্রে।

(১৩) তোমার জন্য

 

তোমার জন্য বিছিয়েছি এই মখমলি মাঠ,

অঢেল পাহাড়;

পাহাড় নদী,

নদীর ধারে নির্জন সেই স্ফটিক প্রাসাদ।

 

তোমার জন্য উঠোন জুড়ে

সূর্যদেবের স্বর্ণজালি

পাতার ফাঁকে আলপনা,  

তোমার জন্য চন্দ্ররাতে

রূপোলী আলোর ঝর্ণা

তোমার জন্য খুলেছি হাট

জানালা কপাট।

 

মনে পড়ে না কবে শেষ

দেখেছি প্লাবিত রাস্তা মাঠ;

কিভাবে রাত্রি দিন একাকার,

কিভাবে পাতার ফাঁকে সূর্য ডোবে ডোবে,

দেউড়িতে বসে শুনেছি কবে শেষ

পাখীর গান।

 

হঠাৎ আলো ঝলসে ওঠে অন্তিমে

তুমি দাঁড়ালে আচমকা পাশে,

তারপর

তোমার চলে যাওয়া

অসংখ্য তীব্র ছুঁচ এখনও ফোটে

মনে আছে বৃষ্টিতে ভেজা

দু’চোখে কান্না আজো।

 

এখনো বুকে বিঁধে আছে ছুঁচ;

কিছু ব্যথা মনে থাকে আপন,

যত্নে লালিত গভীর গোপন,

অপেক্ষায় কাটে প্রহর,

আবার মিলবো কবে,

হাত ধরে পার হব নির্জন বাতিঘর

এতগুলো বছর।

 

এ যদি ভালবাসা না হয় তবে যা হয় হোক

সে তো অনেক,

বলতে পারো ভালবাসা কোথায় শুরু

আর কোনখানে শেষ;

কে জানাবে ব্যাকরণ!

কোন গণ্ডিতে আটকাবে বাঁধবে বাঁধ ভাঙা ঢেউ,

কেন থামাতে চাও অমোঘ?

 

এখন তো বালুকাবেলা নির্জন মরুভূমি

বার বার মাথা ভেঙ্গে সমুদ্র উজাড়

দুধ ফেনার সাদা ধারা,

ভাঙ্গনে উধাও ঝাউবন

আমার একদার বিচরণ।

 

জমছে কিছু লতাগুল্ম ওধারে অগভীর খাঁড়িতে,

সমুদ্র পাখীর দল ঘিরেছে নির্জন চুড়ো

আমার আশ্রয়গুহার মাথার ওপরে।

 

বাতিঘর ছাড়িয়ে দূরে

অনেকটা গিয়েছি হেঁটে,

শেষবার এখানেই

ধরেছিলে বাড়ানো হাত,

একে একে দেখি ফিরছে মাছ ধরার নৌকো

ট্রলার।

 

আবার বৃষ্টি নামল,

নেমে যাই একছুটে

বসি কালো পাথর খণ্ডে

দূরে সত্যি ভ্রমনডিঙ্গি

দেখছি পতাকা ওড়ে মাস্তুলে,

বন্দরে যাত্রীর ভিড়ে খুঁজি তোমাকে

ফিরে যদি  আস হয়ত মনের ভুলে।

 

স্বপ্নের মসলিন জাল বোনে

ঘুমপরী আমার বিছানায়,

পথ হারিয়েছে ছোট্ট একলা পাখী

আমার ছড়ান বিকেল আকাশে,

হারানো পাখীর বাসা খুঁজে ফেরা

এদিক সেদিক আকাশ অন্ধকারে,

স্বপ্নের মসলিন জাল বোনে ঘুমপরী

শুনি হতাশ পাখীর আর্তনাদ।

 

তোমার জন্য বিছিয়েছি এই মখমলি মাঠ অঢেল পাহাড়,

পাহাড় ছুঁয়ে নেমেছে নদী, নদীর ধারে স্ফটিক প্রাসাদ।

তোমার জন্য সূর্যদেবের স্বর্ণজালি পাতার ফাঁকে

উঠোন জুড়ে আলপনা,

তোমার জন্য চন্দ্ররাতে রূপোলী আলোর ঝরনাধারা।

তোমার জন্য অনেক আগেই খুলেছি হাট জানালা কপাট।

 

(১৪) আমি যখন

 

আমি যখন বইয়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম,

তখন এক মায়াবী আলো যেন এক অট্টালিকা,

আসবাবেরা একে একে জমছে ঘরে,

বাগানে গাছে রুপোর পাতা সোনার ফুল,

কল্পনারা আসতে থাকে,

যেমন হয় একে একে ।

 

আমি যখন বইয়ের ভেতর ছুটতে লাগলাম,

খাবি খেলাম, হোঁচট খেলাম,  চমকে উঠলাম,

সঠিক তখন  কাচ ঝনঝন প্রবল আওয়াজ।

 

স্বপ্নগুলো সিলিকনের সূক্ষ্ম গুঁড়ো,

একটা একটা কুড়িয়ে নিলে-

কেমন ভাবে কাচের টুকরো বিঁধল হাতে,

হাতের মধ্যে জমল রুবি

রক্তবিন্দু একটি ফোঁটা।

(১৫) দুঃখ

 

কোন একটা কারণে আমার দুঃখ হ’লো

একরাশ নীল নীল ফুলের মত,

আমি গেলাম বাবার কাছে,

বাবা পাঠালেন ভূমার কাছে,

ভূমা এক রাশি-এক সর্বব্যাপী পুরুষ -এক নক্ষত্র

তিনি পাঠালেন হেমার কাছে,

হেমা বললেন মালিনীকে,

মালিনী বললেন দাঁড়াও চুপ করে,

দেখো আমি গাঁথছি মালা,

তোমার দুঃখগুলোকে ফুলের মত সাজিয়ে রাখ

টেবিলের ওপরের ঐ সাজিতে।

 

আমার কোন দুঃখ রইল না,

চোখের জল জমে মুক্তো হয়ে গেলো।

(১৬) হঠাৎ আগুনে

 

হঠাৎ আগুনে পুড়ে গেলো খালপার,বাক্স প্যাঁটরা।

 

দগ্ধ কেঁদে উঠল,

ছুটে এলো বিদগ্ধ, সুশীল এবং এনজিও।

বিদগ্ধ কবিতা লিখলো

সুশীল গান গাইল

এনজিও গেলো সূর্পণখার কাছে।

 

সূর্পণখার নাক ও কান ব্যান্ডেজ বাঁধা,

বাহাত্তর ঘণ্টার আগে কিছু বলবে না আইসিইউ।

(১৭) ছেলেবেলা

 

গ্রীষ্মের দাবদাহ; তাতানো দুপুর,

আমাকে ডাকল ছায়াছায়া আমবন

দিঘীর কালো জল।

ডাকলো অবগাহন শীতল;

ছোটবেলার মত সাঁতার কাটলাম,

আমাকে ডাকলো

আমারই ছোটবেলা;

বলল- কেন বড় হলে,

কেন ছেড়ে গেলে-

চলে গেলে?

 

আমি বললাম-

বড় তো হতেই হয়,

না চাইলেও,

ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ছেলেবেলা শীতল জল

বাষ্প হয়ে মেঘ হয়ে যায়,

বড় হতে থাকি মেঘ জমানোর খেলায়।

 

বৃষ্টির দিনগুলি-

আহা, মেঘ তুমি কবে ঝড় বৃষ্টিতে ফিরিয়ে আনবে ঠাণ্ডা ছেলেবেলা।

(১৮) তুমি

 

তোমাকে নিয়ে অনেকেই লিখল

গান কবিতা গাঁথা-

আমিও তাই কিছু লিখি-

নাই বা থাকল মুণ্ডু মাথা।

অনেক দূর থেকে একটা সুর

তোমার সারাদিন গুনগুন

ভাষা বুঝি না অদ্ভুত নরম সুর মুখস্থ করেছি

শরীরে মেখেছি কথা অর্থহীন

এক বিলাপ লালাবাই

আমি সান্ত্বনা দেবো না

কানে বাজে দূরাগত শব্দরেশ

তোমার প্রেমের মতো

 

আমি তোমাকে বুঝি না

তোমার কথা বুঝি না

তোমার সংসার বুঝি না

তোমার দুঃখ বুঝি না

কেবল বুঝি তুমি আমাকে ভালোবাসো খুব।

 

তোমার একরাশ গুনগুন মনের কথা গেয়ে চলুক

অজানা ভাষায় আকাশ বাতাস

আমি বুঝে নেবো ছোট ছোট ক্ষোভ

কিভাবে লোকে ভুল বোঝে তোমায়

এগুলোর ভাষা লাগে না

লালাবাই অদ্ভুত লালাবাই একঘেয়ে সুর

বলে দেয় সবটুকু যাতনার নীল নীল হ্রদ।

 

আকাশ ক্রমশ ভরে তোমার গানের দীপ্তিতে

সন্ধ্যে নামে দূরে বনানীতে।

তোমার সঙ্গে আমার কিছু ব্যক্তিগত চূড়ান্ত ক্ষোভ,

ভরে নিলাম ঝুলির ভেতর ফাঁকা মাঠে,

একটু পরে রাত্রি হ’লে রাতপাহারা দেবে যখন একান্ত চোখ,

জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখো অনেক দূরে,

মাঠের মধ্যে শুয়ে আছি নিথর দেহ

জ্যোৎস্না রাতের আবছায়াতে।

 

এমন ভাবলে ভুল হবে আমি মরে গেছি,

ঠিক তা নয়,

সময় অনেক আসে এমন দূরে যাওয়া উচিৎ হলেও

চলচ্ছক্তিহীন হয়ে থাকছি কাছাকাছি,

দূর থেকেই বলতে চাই –

ফিসফিসানি

তোমায় আমি ভালোবাসি।

 

(১৯) যন্ত্রণা

 

এক হ্যালুসিনেশনের পরে রাতের গভীরে প্রবল জলতেষ্টায় জেগে ওঠো,

শেষ ডবল ডেকার রাস্তায় চলেছে কুড়ি বছর আগে,

হাওড়া যাচ্ছে আসছে এক কামরার ট্রাম,

তাও তো দেখে ছিলে,

ভুলে গেছ সব নকশাল আমল,

কচি খোকা তুমি জানো না কিছু,

মুখ ছুঁয়েছে তরুণ দূর্বাদল ঘাস।

 

এক হ্যালুসিনেশনের পরে হাজার বছর পেরিয়ে,

ভালোবাসা রং বদলে বেগুনী হয়,

রং বদলায় যন্ত্রণারও।

আইসক্রিম শিলা তুমি

 

থমকে গেলো পরিভাষা-

ক্লীবতা জ্ঞাপক মাথানিচু হতে পারো তুমি ভাবিনি  কখনো,

আমারই কান থেকে নির্গত হ’লো অসম্ভব,

আমারই কান দিয়ে বাষ্প বের হয়ে এলো,

টগবগ করে ফুটছে ভেতরের কেটলি ফোটা জল,

অথচ তুমি আইসক্রিম শিলা শীতল চুপ করে

শুনে যাচ্ছ উচ্চতার ধৃষ্টতা।

 

আমার ঠোঁট কাঁপছিল,

মনের মধ্যে অসহায় প্যারানোয়িয়া,

আমি পালাতে চাইছি আমার বিশ্বাস থেকে,

আমি পালাতে চাই  নিজের কাছ থেকে,

হাওয়া টেনে টেনে ঢাকছি শরীর,

ঢাকছি  হাওয়ার বর্মে।

এক বল্লমের মতো,

শরীরে বিঁধে আছে অবিশ্বাস,

       

আশাভঙ্গ।

(২০) প্রেক্ষাগৃহে

 

কোলাহল থেমে গেছে,

শেষ পর্দা নেমেছে প্রেক্ষাগৃহে,

আমি কি থেকে যাব নাকি,

আমি কি জানি না কিভাবে আমার আগে

হারিয়ে গেছে লক্ষ মানুষ আলোর বৃত্ত থেকে-

জীবন থেকে।

 

আমি কি জানি না কিভাবে সুদিন আনে

সুসময়ের বন্ধু অজস্র মাত্রাবিহীন,

আমি কি জানি না কিভাবে শূন্য চেয়ারের সারি

গ্রাস করে নিদ্রাহীন রাত,

আমি কি জানি না

দাঁড়াব খোলা বিশ্বে আবার অন্ধকারে,

সরে গেলে সবটুকু আলো।

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?