কবিতা সমগ্রঃ ৫
ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত 

(২১) ক্লান্তিকর সবুজ

 

গাছের পাতায় লেগে থাকা হলুদ বিষণ্ণতা আমায় ঘিরে ধরার আগেই

আমি প্রবল বেগে ছুটে গেলাম,

সবুজ তখন ক্লান্তিকর,

লাল টকটকে সূর্যটাও ক্লান্ত-

ডুবে যাচ্ছে সমুদ্রের জলে আরব সাগরে।

 

আজকাল মাঝে মাঝে হেরে যাই,

এই স্বীকারোক্তি ভালো,

পাখির ডাকের মতো সকাল কবে যে দেখতে পাবো,

খোঁয়াড়ি ভেঙ্গে কবে যে ছুটব প্রান্তরে

বালুকা বেলায়,

কবে যে আশা আবার নির্যাসের মত

ভরে দেবে সবটুকু।

(২২) কবিতা

 

এক।

 

ঠিক শেষ রাতে আকাশ সাদা হবার আগে এক তারা জন্মাল

লেবার লাইনের বস্তিতে, সংকটে ঘুরপাকেরা এমন ভাবল;

যেন জন্মেছে এক মহাপুরুষ যে কখনো মদ খাবে না,

গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের এড়িয়ে কাজ নিয়ে

চলে যাবে দূর দেশে, ছাড়িয়ে আনবে বন্ধকী জমি সে।

 

অত ভোরে খবর রটে গেল চতুর্দিক, অ্যান্টেনায় বসে

থাকা কাকেরা এই কথা জানিয়ে দিলো বাবুদের মহল্লায়।

 

রাত শেষ হলে খুব ভোরে মারা গেলো কানহাইয়া পঞ্চান্ন

বছর বয়সে, জীর্ণ শরীরে রক্তের বদলে শিরা ধমনীতে তার

খেলা করে চলেছিল চোলাই মদের ধারা, নিরলস।

 

সদ্য প্রসূতি ডুকরে কেঁদে উঠল, মুঝে লড়কি কিঁউ নহি

দিয়া ভগবান, কিউ নেহি কিউ নেহি ভগবান।

 

দুই।

 

অনেক ঝগড়া করেও কুকুরগুলো সিদ্ধান্তে আসতে পারল না,

কে খাবে ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট সমূহ, অকুস্থলে হঠাৎ

চলে আসা বালক সারমেয় তার কৌতূহলী জিজ্ঞাসা

ভুলে গেলো আবিষ্কার করল ঝরঝর রক্ত ঝরছে কানের

পাতা থেকে, সমস্ত পৃথিবী ভুলে খিদে ভুলে ছুটে

চলে সে অনন্তকাল,  নাকি কয়েক মুহূর্ত! ট্যাক্সির কাছে

ছুটন্ত সারমেয়দের হিসেব থাকে না।

আরও একটা গেলো চাকার তলায়, যেমন যায়।

 

 

(২৩) মেডুসা

 

তোমাকে দেখলে পাথর হয়ে যাব?

এজিয়েন সাগরের থেকেও সবুজ চোখ রূপের বন্যা,

জলপ্রপাতের মত চুল,

তুমিই নার্সিসাস কী ভয়ঙ্কর,

নিজের রূপে পাগল বালিকা

পার্থিয়ান মন্দিরে দেবী অ্যাতিনার ভাঙ্গালে ঘুম।

 

শরীরে বয়ে চলেছ অতঃপর অভিশাপ,

সাপেরা কিলবিল খেলা করে বিকৃত কেশদাম।

 

(২৪) ব্ল্যাক প্যান্থার

 

ব্ল্যাক প্যান্থার লোকালয়ে থাকে না থাকলেও খাঁচাতে,

মানুষ যখন বাঁচাতে পারে না মন,

বুকের ভেতর বাসা বাঁধে প্যান্থার,

রক্তের ঘুণপোকা,

ক্রমশ খেয়ে নেয় মন শরীর,

হাড় মজ্জা মাংস,

শাইনিং সিল্ক ব্ল্যাক মুখে তার লেগে থাকে রক্তের দাগ।

 

নিস্তব্ধ নির্জনে জমতে থাকে শীত,

টিনে, পাথরে, কাঠে শব্দের টুংটাং,

তুমি ভাব বুঝি শীত আরোপ করে এই সব শর্ত বরফের সাথে।

আসলে তা নয়,

প্যান্থার হেঁটে যায় পাঁচিলে, ছাদে, ফলস সিলিঙের ফাঁকে,

এই সব আসলে একান্তই প্যান্থারের শব্দ।

 

প্যান্থারকে নিজের বলে ভাবো,

ভাবো এক বিশাল কালো সিল্কের বেড়াল,

পুষেই রাখ মনে,

আত্মস্থ করো তার হুঙ্কার,

ক্রমশ তুমিও হয়ে ওঠো প্যান্থার।

 

(২৫) ভেঙ্গে পড়ল পাঁচিল

 

লাফিয়ে উঠল কাঁটাতার ভেঙ্গে পড়ল পাঁচিল,

জানি গুরুচণ্ডালী হয়ে যাচ্ছে,

ওটা প্রাচীর হলে ভাল হতো

এরপর ব্যবহার করব স্বচ্ছতোয়া।

 

স্বচ্ছতোয়া ভাসিয়ে নিয়ে গেলো আশ্রয়ের শেষ মাটি,

তুমি শ্বেত কবুতর ডানা মেলে কোজাগরী রাতে,

কেবল উড়ছ সাদা আকাশে,

নীচে অতল প্রবাহ।

 

উড়তে উড়তে দেখছ তুমি

ভেঙ্গে যাচ্ছে বোধ বুদ্ধি আশ্রয়,

উড়ে চলা নিজের মত,

পূবদিকে এগিয়ে চলেছে একটা জাহাজ,

উড়ছে তার পাল,

উড়ছে কালো পতাকায়

স্কাল অ্যান্ড ক্রসবোন ছবি।

 

এই নিস্তরঙ্গ সমুদ্রে সার্বিক ছন্দে শেকল,

এমনকি গতি প্রকৃতি বেঁধে ফেলছে ঢেউকেও,

মোহনায় মিশছে নদী এই এলাকায়

পাইরেট শিপ টহল দিচ্ছে

শিকারের খোঁজে।

 

আশ্রয়ের শেষ মাটি চলে গেলে কবুতর

তুমিও কি বসবে পাইরেট শিপে?

(২৬) ডেমনের সাথে

 

আজ দেখলাম তিন প্রাজ্ঞ নরনারী কথা বললেন ডেমনের সাথে,

যথা বৃষ্টি হবে কিনা অথবা ফসলের সম্ভাবনা।

 

আমি তো দেখছি নগরীর পথ কেমন ছুঁয়েছে বন্দর,

ফুলে ফুলে ঢেকেছে ড্রাইভ,

তবুও বেদনায় নীল ঈশ্বরের মুখ,

ঈশ্বরের কিছু হলে তিনি কোথায় যাবেন,

হতে পারে এ আমার ভুল,

ব্ল্যাসফেমি ক্ষমা কোর,

ভুল হলে বোলে দিও,

অন্ধজনে আলো দিও,

যদিও ধারণা ঈশ্বরও সময়ে সময়ে অসহায়,

গুনে রাখছেন পুরনো কয়েন।

 

(২৭) গুপ্তঘাতক

 

গুপ্তঘাতক সুপ্ত থাকে অতল অন্ধকারে,

মনের গহ্বরে,

এই শহরে রাস্তাগুলো পাথর মোড়া,

তার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে আধপোড়া সব কাঠের বাড়ি,

গুলির চিহ্ন দেখা যাচ্ছে মন্দিরে আর গির্জা ঘরে,

গুপ্তঘাতক লড়াই করে নিজের সাথে।

 

এরকমই হতে থাকে যখন কোন নিয়ম ভাঙ্গে কৃষ্টি ভাঙ্গে,

ভাঙ্গতে থাকে পরিবেশ আর পরিচ্ছেদের রকম সকম,

চলন বলন কথা বলা,

ভাঙ্গতে থাকে ভালবাসা মূল্যবোধ আর সহানুভূতি,

সবাই কেমন মরিয়া হয়ে লড়তে থাকে ছায়ার সাথে,

সবার মনে গুপ্তঘাতক ফনফনিয়ে বেড়ে ওঠে।

 

(২৮) ভোরের স্বপ্ন

 

কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে এলো ভোরের স্বপ্ন,

চোখে ঝলসে উঠল খোলা আকাশের নীল,

কান পেতে শুনল এত পাখির ডাক-

জীবনে শোনেনি আগে।

 

ভোরের স্বপ্নদের জন্য ফুলের মালা নেই,

যাবার ঠিকানা নেই,

খালপাড়ের ঝুপড়ি ভেঙ্গে উঠেছে বহুতল।

তবু,

এখনও ট্রামের সেকেন্ড ক্লাস খিদিরপুর যায়,

চলে যায় ভোরের স্বপ্ন-

তার চোখে এখনও মায়ার কাজল।

 

(২৯) নিজস্ব সমুদ্রে

 

এই একলা ঘর তোমাকে দিয়েছে বিষণ্ণতা,

নীল নীল অন্ধকারে তুমি খুঁজেছ মুখ,

বালিশে জমিয়েছ কান্নার ফোঁপানি,

এতই নিবিড় তখন পারদ।

 

তোমার অভিমান তুমি লিখেছ আকাশে,

একা একা কথা বল যন্ত্রণার সাথে,

আয়নায় কতদিন দেখনি নিজের মুখ,

ভুলগুলো জমা করেছ হাত বাক্সের চোরকুঠুরিতে।

 

তবুও যন্ত্রণা ভালো লাগে,

ভালো লাগে একলা ঘর,

মাঝে দূরের বাতিঘর থেকে ছিটকে আসে সন্ধানী আলোর বন্যা।

 

নিশ্চিন্ত থাক তোমাকে কেউ খুঁজবে না,

তোমার বেদনা একান্তই নিজস্ব সমুদ্র,

ভোরের আলো আড়চোখে তোমায় দেখে,

সন্তর্পণে ডিঙ্গিয়ে যাবে চৌকাঠ,

মাঠের আল ছোঁবে,

ছুঁয়ে যাবে গাছের স্তব্ধতা,

সমুদ্রে ভেসে বেড়াবে একটাই মুখ,

তুমি জাল বুনে যাবে স্মৃতির সূক্ষ্ম সুতোয়।

 

 

(৩০) একলা ড্রাইভে বিষণ্ণ নীলে

 

একলা ড্রাইভে যদি মেঘ দেখ আলগা ঝুলে আছে আকাশে,

বাদল মেঘ যে কোন সময় ভাসিয়ে দেবে এই প্রান্তর,

গাড়ির ওয়াইপার ক্লান্ত হয়ে পড়লে

তুমি দাঁড়িয়ে যাবে গ্রামের পাশে।

 

দেখবে অমন যে বাঁশঝাড় সেও নুয়ে পড়ে ধরতে চায় শেকড়,

আর তুমি এক তালহীন কালহীন বিস্ময় মানুষ,

জানালার কাঁচ নামিয়ে ধরালে সিগারেট,

ছুঁড়ে দিলে একমুখ অহমিকা ধোঁয়া।

 

সব কিছু থেমে গেলে তাকাও বিষণ্ণ নীলে,

কষ্ট পেতেই তাকালে না হয়,

মাঝে মাঝে কষ্ট ভাল লাগে সুখের কোলাহলে।

(৩১) কবিতার কাছে

 

ঠিকানা পাল্টে ইদানীং কবিতার কাছে থাকি,

লিঙ্গ বিচার করিনি,

আবছা এক নারী আতরদান সুগন্ধ,

অঞ্জলিভরে ছড়িয়ে দেয় মায়া।

 

জনপদ এক সার্বিক ছবি আঁকে,

পোল ভল্টে পেরিয়ে যাচ্ছি বিষণ্ণতা,

তারের জঞ্জালে ঢেকে গেছে আকাশের নীল ও গাছের পাতা,

আমি যেন এক লয় ক্ষয় হীন প্রাচীন বৃক্ষ,

বুকের ভেতর লালন করেছি চাঁদের পাহাড় স্মৃতির কারুকাজ,

কিছু কিছু দাহ্যে আগুন জ্বলে

উষ্ণতা নিয়ে সরে যায় দূরে,

এই দহন অতর্কিত গ্রাস করে একলা ঘর।

 

হাইওয়েতে পড়লেই প্রতিটি বাঁক বিন্দু চেনা,

কোথায় টোল প্লাজা কোনখানে ফ্লাইওভার,

কোথায় পাশাপাশি চলে রেললাইন,

কোথায় কোন চিমনী থেকে ওঠে ধোঁয়া,

এমনকি পথের ধারের বিল বোর্ডও,

ঘিরে থাকে অজস্র অচেনা কিশোরী গ্রাম।

 

দ্রুত ছাড়িয়ে আসি

ফেলে আসি পথের ধারের শিরীষ গাছের মিছিল

কৃষ্ণচূড়া লাল ফুল,

অনেক দূর যেতে হবে।

 

সুন্দরীর নোলকের মত

বিকেলের আকাশে তখনও সূর্যটা

দোল খায়।

 

হঠাৎ স্তব্ধতা নেমে আসবে,

হঠাৎ থেমে যাবে কথা বলা, নিঃশ্বাস;

জীবনের ঘাতক হাইওয়েতে পড়ে থাকবে অবশেষ,

তুমি কি কাঁদবে কবিতা।

(৩২) কী ভাবো

             

নিজেকে কী ভাবো আলাদা স্বয়ম্ভূ কবি,

ছুঁড়ে দিচ্ছ যা মনে আসে,

তুমি কোন ক্ল্যানের বাহক বিশ্লেষণ আছে?

নাকি ঠোঁট বাঁকানো স্বভাব তোমার মুখের মানচিত্র বদলে দিয়েছে,

হাসতেও পার না প্রাণ খুলে,

হাসা উচিৎ মনে করলে কোন কোন ক্ষেত্রে একটা সাংঘাতিক খ্যাঁকখ্যাঁক,

অদ্ভুত আওয়াজে উড়ে যায় পাড়ার কাকেরা,

এবং কুকুরেরা তারস্বর কোরাস গায়।

 

কি তোমার গৎ,

কোন গোষ্ঠীর ধারক তুমি,

কোথায় লাগিয়েছ টোটেমীয় পোল।

 

তুমি যা লিখেছ নিজে মানে জান?

নাকি নানা শব্দের অদ্ভুত হারাকিরি?

আসলে তুমি এক অতি ভণ্ড,

প্রমাণ করতে চাইছ যা নও তাই।

 

(৩৩) বিট অফিসের পাশে

 

রতনপুর বিট অফিসের পাশ দিয়ে শাল সোনাঝুরি শিরীষের পথ,

তুমি ভাবছ একা একাই কাটাবে বাকি জীবন,

চল হাঁটি একসাথে কিছুটা পথ,

তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম,

উদিত সূর্যের এই ভোরে

জানি তোমার নীল চোখের তারার আড়ালে লুকিয়ে থাকে দুঃখ,

সে দুঃখ দিও আমায়,

আমার সব ভালবাসা দিলাম তোমায়,

আজও জিজ্ঞেস করে লোকে

একা থাকতে কি আমার এতই ভাল লাগে?

 

(৩৪) সোজা

 

সোজা থাকাই ভাল,

বাঁকতেও পার কিন্তু কতটা,

কতটা মোচড় নিতে পারে শরীর মন,

গাছের মত কি ততটাই দুলবে হাওয়ায় হাওয়ায়?

কি জানি সম্ভব কিনা।

 

সোজাসুজি একছুটে পেরিয়ে যেতে পার প্রান্তর,

লতাগুল্ম ঘাসেরা তোমাকে ডাকবে আয় আয়

থেকে যা কিছু ক্ষণ,

ঐ দেখ কেমন মেঘের ভেতর থেকে উঁকি দেয় সোনালী রোদ্দুর,

আয় আয় ছুঁয়ে দেখ বাদল হাওয়া।

 

সোজাসুজি বড় সোজাসুজি দেখে যাও জীবন,

দেখ কি ভালই না লাগে,

ফেলে দাও মুখোসগুলো ,

ছিঁড়ে ফেল কষ্টকর ভারি আলখাল্লাটা।

 

(৩৫) তাকে দেখে

 

তাকে দেখে চমকে উঠল গোটা অফিস,

কেউ এনে দিল জল,

আরেকজন টেনে দিল চেয়ার,

অনর্থক রেগুলেটর বাড়াতে গিয়ে কেউ কেটে ফেলল প্যাঁচ।

 

অনেকে কাছে এলো না,

মেলে ধরা খবরের কাগজ মাঝে মাঝে সরিয়ে দেখতে থাকল তাকে।

 

সেও জানে এরকম হবে,

এরকম হয়,

তাকে দেখে ছুটতে থাকে এক শহর লোক,

চুল ঠিক করতে থাকে প্রৌঢ়েরা,

আয়নায় মুখ দেখে নেয় যাবতীয় বৃদ্ধ ভামেরা।

 

তবু মাঝে মাঝে বুক কেঁপে ওঠে,

একদিন আসবে সময়,

লোলচর্ম শক্তিহীন পরনির্ভর বীভৎস সময়,

আহা যদি তার আগে পড়ে যায় শেষ নিঃশ্বাস,

আহা সে কি কাম্য!

বড় ভাল এমন মরণ।

 

 

(৩৬) কয়েকটা

 

এক

 

এভাবে হবে না চারদিক ধুধু,

গার্হ্যস্থযাপনের শিলালিপি দেখল আকাশ,

বিমূর্ত সময়ে ক্রমশ জল ছেড়ে ডাঙ্গায় ওঠে,

কানকোয় ভর করে হেঁটে যায় কইমাছ।

আবার ট্রাইপডে টাইমার,

আবার সকালের ঘোলাটে মুখ,

নিজের ছবি তুলছি,

এখনও কাটে নি কাল রাতের সিরাজির খোঁয়াড়ি।

 

ক্রমাগত পাখির ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে ডানে বাঁয়ে,

আমি প্রপিতামহ অতিবৃদ্ধ,

আলখাল্লা জোব্বায় ক্রমশ লেগে থাকছে কবিতার রঙ,

গীটার হাতে সুদর্শন তরুণ পেরিয়ে যায় কলোনির মাঠ,

ইটের পায়ে চলা পথ,

সন্তর্পণে ডিঙ্গিয়ে যায় পড়ে থাকা রজ্জুগুলো।

 

দুই

 

আকাশ মেলে ধরল স্বচ্ছ নীল ক্যানভাস,

এখানেই ছবি আঁকতে বলল মেঘ,

চারদিক বরফে ঢেকে যাচ্ছে এতটাই তুষার।

 

তিন

 

এমন পাগলামো দেখিনি কখনো

তোকে পাগল বলি সাধে

চলে যাবি যা আমার কেটে যাবে দিন মাস বছর যুগ

শুধু মনে রাখিস আমার জন্যই বেঁচে থাকবি তুই

তোর জন্য আমি।

 

বুকের মধ্যে সব সময় তুই,

থাকবি হৃৎস্পন্দনে,

এভাবেই বাঁচি আমি

এভাবেই চলে যেতে চাই,

আমার ঘুমের মধ্যেও

তোর কথাগুলো রিন রিন স্বপ্ন হয়ে বাজে।

 

কেন অমন তাকালি বল,

কত বছর আগে সেই সর্বনাশা বিকেলে।

 

 

(৩৭) মৃতদেহ

 

আমি যখনই মৃতদেহ দেখি তারা নিশ্চুপ থাকে,

আমি যখনই খোলা আকাশ দেখি তারায় ভরা,

তখন ভাবি ওটাই কি মৃতদের ঠিকানা,

মৃত্যু হলে কোথায় যায়,

সত্যি কি কোন কিছু থেকে যায়

একমাত্র স্মৃতি ছাড়া?

 

অনেক কাহিনী শুনেছি,

উৎকর্ণ অপেক্ষায় থাকি যদি মুখোমুখি হই কারো,

নানা শব্দ একাকী ঘরে উঠোনে বারান্দায় ছাদে,

অবশেষে সব শব্দেরই কারণ জানা যায়,

হাওয়ায় নড়ছিল পলিথিন মোড়ক খানা,

অথবা গাছের খেয়ালে পেকে ওঠা ফল টুপ করে খসে যায়।

 

একে একে জীবন

ছেড়ে চলে যায় বহু চেনা দেহ,

সব চিহ্নগুলো ক্রমশ ম্লান হয়ে,

তলিয়ে যায় প্রবল অন্ধকারে।

 

এখনও পর্যন্ত কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় নি,

কোথায় যাও তোমারা,

কেমন থাক।

 

(৩৮) পরমেশ্বর

 

পরমেশ্বর তোমাকে অনুভব করতে পারি,

অসীম শক্তি,

এক প্রান্তরে আমি একা

আকাশ ছুঁয়ে উঠেছে দেয়াল,

ঝড় উঠলেই আমি ছুটে যাই দেয়ালের কাছে,

আঁকড়ে ধরি প্রোথিত লৌহ শলাকা।

তুমি নেমে আস অপ্রকাশিত অলিখিত কবিতার মত,

আমার প্রয়োজনে,

এক ব্যক্তিগত ঈশ্বর।

 

আমি মেজে ঘষে ঝকঝকে করি লন্ঠন চশমার কাঁচ,

নিকনো স্বপ্নভেজা উঠোনে চারপাই পেতে আকাশ দেখি,

ঘর দেখি টালির চালা,

উঠে গেছে মাটির দোতলা,

অদূরে গোয়ালে বাছুরের ডাকে নড়ে ওঠে গাভী।

 

পরমেশ্বর তোমাকে অনুভব করি,

আমার মায়ের মত।

 

 

(৩৯) তোকেও নদীর মতো

 

আমি নদীর ধারে বাসা বেঁধেছি বুকে ধরেছি জলধারা,

তোকেও ভালবাসি নদীর মত,

নদী আমার শিরার ভেতর বয়ে চলেছে রক্তধারা,

ইউফ্রেটাস কঙ্গো নীল মিসিসিপি,

দেখেছি গঙ্গার বুকে সোনালি আলো।

 

কিভাবে ভালবাসি তোকে,

কিভাবে ভালবাসা ছড়িয়ে যায় ত্রিমাত্রিক হয়ে,

দৈর্ঘ্য প্রস্থ গভীরতায়।

 

 

(৪০) প্রজন্ম

 

প্রজন্ম বল এ দায় কার তোমার আমার,

আমি তো নীল নীল অন্ধকারে ভাসিয়েছিলাম জীবনের ভেলা,

যদি সে ডুবে যায় বল এ দায় কার,

তোমার আমার।

 

আমি জীবনের গান শুনেছি গেয়েছি দেখেছি ওঠাপড়া,

তবু বল এ দায় কার তোমার আমার,

তমসাবৃতা যে রজনী ধায় অধিকতর বেদনায়,

এ দায় একান্ত আমার,

মাথা পেতে নিই হলাহল আমি বিগত প্রজন্ম

কি রেখেছি সঞ্চয়।

 

দুরপনেয় কলঙ্করেখা যদি আঁখিতারা সজল করে

বল আমি কি এড়াতে পারি দায়,

আমি কি এড়াতে পারি এই বিচ্যুতি,

কি করেছি আমি,

শুধু কাটিয়েছি সময়,

এখন তীব্রতর বেদনায় শুধু হাহাকার হাহাকার।

 

উপাখ্যান উপাদান প্রোথিত গহ্বরে,

শিলালিপি হাহ্‌ শিলালিপি গ্রাম থেকে সোজা ছিন্নমূল শহরে,

ঢাকা বরিশাল ফেলে এসে

জমাট বাঁধা শহরের প্রান্তসীমায় চালাঘর।

 

আমারে ভালবাসল কাঠকুড়ানি,

তার লগে প্রেম নাই,

প্রেম বড় হিসাব নিকাশ,

ভাউচারে কি প্রেম লেখা যায়?

বল কি করি উপায়,

আত্মগত বড় আত্মগত এই বেঁচে থাকা।

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?