top of page
mothersday.jpg
  • পলাশ দাস
  • পার্থ সরকার

  • শান্তনু ঘোষ

  • সিদ্ধার্থ ঘোষ

  • যুবক অনার্য

  • সৌভিক সিকদার

  • সন্দীপ ব্যানার্জী

  • মোঃসাইদুর রহমান সাঈদ

  • দীপঙ্কর সাহা

  • মধুসূদন গোস্বামী

  • বাসব রায়

  • মৌ চক্রবর্তী

  • সরোজ কুমার রায় (সারথি)

  • বিশ্বজিৎ মন্ডল

  • দেবাশিস পট্টানায়ক

  • অনীক চক্রবর্তী 

  • শুভজিৎ দাস 

  • জয়দীপ চক্রবর্তী

  • সুস্মিতা হালদার

  • চৈতালী সরকার

  • রীনা নন্দী

  • কল্যান সেনগুপ্ত

  • গীতাঞ্জলী ঘোষ

  • দেবযানী পাল

  • সুশোভন দাশ 

  • পার্থ বোস

  • বিবেকানন্দ পন্ডা 

  • মৈত্রেয়ী মুখোপাধ্যায়

  • মধুসূদন গোষ্মামী 

  • তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য্য

  • শান্তনু ঘোষ

  • দিলীপ মজুমদার

  • তাপস বিশ্বাস

  • সুদীপ্ত বিশ্বাস

  • আবু আফজাল সালেহ

পর্ব - ১

লেখক/লেখিকা

পর্ব - ২

লেখক/লেখিকা

  • অনিশা দত্ত

  • সুখময় ঘোষ 

  • বাসব রায় 

  • সৌমেন্দ্র দরবার

  • মিজানুর রহমান মিজান

  • সঞ্চিতা মন্ডল

  • অরুন্ধতী ঘোষ

  • অর্ক চক্রবর্তী

  • ভাস্কর সিনহা

  • অদিতি সুর 

  • দেবার্ঘ্য মুখার্জী

  • শ্রেয়া বাগচী

  • রূপা মন্ডল​

  • সনোজ চক্রবর্তী

  • জবা রায়

  • প্রদীপ প্রামানিক

  • জিষ্ণু সেনগুপ্ত

  • সুপ্রভাত মেট্য

bijaya.jpg

পুজো বার্ষিকী 

১৪২৮

***

পর্ব - ১

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

maaforall.jpg

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

সূচীপত্র

সূচীপত্র

 পর্ব - ১

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

Watercolor Butterfly 6
mothersday.jpg

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

কবিতাঃ সুদীপ্ত বিশ্বাস

সুদীপ্ত বিশ্বাস

ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টর

রানাঘাট, নদীয়া, পঃ বাংলা

Sudipta-Biswas.jpg

কবিতা

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

আশার বাষ্প

হামারী এসে জীবন কাড়ছে তবু
আমরা চেয়েছি গেয়ে যেতে সেই গান
শবের উপরে জমছে শবের স্তুপ,
কবরের পাশে বেঁচে ওঠে কিছু প্রাণ।

রাত্রির বুকে বাড়ছে আঁধার রোজই
ফুল তবু ফোটে শবদেহটার পাশে
চাঁদ নেই তবু দূরের আকাশে দেখ,
কিছু ছোট তারা আলো দেয়, ভালোবাসে।

মৃত্যু আসছে কাড়ছে মায়ের কোল
কত ভাবনারা আর তো পেল না ভাষা
বেশ কিছু ফুল অকালেই ঝরে গেল,
মৃত্যুর পরও থেকে যায় প্রত্যাশা। 

দূরের তারার ক্ষীণকায় স্মিত আলো
সংকেতে বলে সংগ্রাম আছে বাকি
তারা খসে গেলে মৃত্যুর গান গেয়ে,
তখনও দেখবে ডাকছে ভোরের পাখি।

 

ইঞ্জেকশন!

লোকে আমায় ভয়ই পেত, বাসত না কেউ ভালো
মনে মনে সবাই আমায় দিত অনেক গালও।
তারপরে যেই কোভিড এল, তাক ধিনা ধিন ধিন
অনেক দিনের পরে এল শোধ তোলবার দিন।
আমার জন্য এখন লোকের হয় না রাতে ঘুম
লাইন দিয়ে চলছে সবার সুচ-ফোটানোর ধুম!
আমায় নিয়ে কাড়াকাড়ি, চলছে যে রাজনীতি 
সুচ দেখে আর আমজনতার একটুও নেই ভীতি! 
ফার্স্ট ডোজের পরে আবার মিলবে কবে ডোজ?
নিয়ম করে সবাই এসে যাচ্ছে নিয়ে খোঁজ। 
দুটি ডোজের মধ্যে আবার গ্যাপ যদি যায় বেড়ে
হাঁ-হাঁ করে অমনি সবাই মারতে আসে তেড়ে।
কাঁদছে সবাই ঠোঁট ফুলিয়ে যাদের আছে বাকি
এত্ত ভালোবাসা আমি কোথায় বলো রাখি?

cremation.jfif

Comments

Top

আবু আফজাল সালেহ

কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, চুয়াডাঙ্গা, বাংলাদেশ

কবিতাঃ আবু আফজল সালেহ

কবিতা

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

বৃষ্টিমাথায় ছবি আঁকি

 

বৃষ্টি বাদল ভোরবেলাতে

দ্যাখো দ্যাখো খোলো আঁখি

কদম গাছে বৃষ্টিমাখা

হাজার রকম রঙিন পাখি।

কালো পাখি হলুদ পাখি

কত্তরকম ডাকাডাকি

পীত হলুদে লাল খয়েরি

শাখা পাখির ছবি আঁকি।

 

 

পাঁকা গমখেতের সৌন্দর্য
 

নীলিমায় সাদা মেঘের মিনার
আকাশ পারে পারাবত ওড়ে
সোনাবালুতীরে ঝাউবন-- সবুজ ঢেউ
নীল নোনাজলের গর্জন,পাড় ভাঙে
অতল-রহস্যে সুউচ্চ নারিকেল বীথির উচ্ছ্বাস।

এমন সেন্টমার্টিনে এক কবিতা দাঁড়িয়ে
তার ছেড়ে দেওয়া আঁচল--
পাঁকা গমখেতের দুলে ওঠা ঢেউয়ের সৌন্দর্য ওড়ে।

বিজয়ী চুম্বন
 

দিও চারিদিকে ঘন কুয়াশার রহস্য
হিংসা-বিদ্বেষ,বায়বীয় অহংকার
জলপাথরে লুকায়িত বেদনার ছাপ।
এমন হিংস্রতার ছায়ায় তোমার
হরিণ পায়ের নূপুরধ্বনি--
যেন কার্তিকের সোনালি ধানক্ষেতের ঢেউ।

যতই জোৎস্নালোক ছায়াবৃত হোক
টিয়া ঠোঁটের উচ্চারণ বুজি, খুঁজি
তোমার কপালে এঁকে দেবো বিজয়ী চুম্বন।

 

শিশির ভেজা গোলাপ
 

রনাতলে শরীর ভিজিয়ে নিলে
যেন শিশির ভেজা গোলাপ।
কতদিন সূর্যের সঙ্গে তোমার আড়ি!
শীতনিদ্রা ছাড়তে
সূর্যপাপড়িতে ওম নাও এবার।

তুমি ও গোলাপ
গোলাপ ও তুমি
শিশির ভেজা গোলাপ তুমি।

 

touch.jpg

ভালোবাসতে মঙ্গলে যেতে হয় না
 

ভালোবাসতে হলে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া লাগে না
ঝুপড়িতেই হয়
আটচালায় হয়--
অট্টালিকাতেও ভালোবাসা থাকতে চায়।

মনের ওপর ভালোবাসার পরিণতি;
তবে শিখতে হয়।

 

ওড়া ও ভালোবাসা শিখতে হয়
 

'ড়া' আর 'উড়তে পারা' এক নয়
'ভালোবাসা' আর 'ভালোবাসতে পারা' এক নয়।
পাখির ওড়া শিখতে হয়;
ভালোবাসাও শিখতে হয়--
অন্যথা বিপথগামী হতে হয়। 

Comments

Top

কবিতাঃ পার্থ সরকার
কবিতাঃ পলাশ দাস

কবিতা

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

কবিতা

পলাশ দাস

বারাসাত, কলকাতা

বিজ্ঞাপন 

মাটির ফাটলের পাশে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি 

থমকে থাকা রোদের আকাশ 
আর হাওয়ার গায়ে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি 

জলের স্রোতহীন শরীরের পাড়ে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি 

পাথরের অহংকারের গায়ে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি

একটা সচিত্র সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন 
শিকড়, কাণ্ড ও পাতা   

 

women.jpg

কবিতা

পার্থ সরকার 

অজাতশত্রু বিস্ফোরণ শোধনাগারে

     

জাতশত্রু বিস্ফোরণ শোধনাগারে  

বর্ষা ত্রুটিযুক্ত 

তুচ্ছ হয় 
তড়িৎগতির জাগরণে 
জানবাজারের জীবিকা 

সরে যায় 
বিচ্ছেদ 
অক্ষর পরিচয়হীন 
যোগচিহ্ন 
নবকেতনের 

বিস্ফোরণ 
শোধনাগারে 

ছত্রাকার 
ঘটিবাটির 
জলপানি 


চিহ্ন নেই দেশদ্রোহিতার । 

প্রবন্ধ

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন

Comments

Top

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

বড়ু চণ্ডীদাসের

‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’

দিলীপ মজুমদার

পর্ণশ্রী, বেহালা, কলকাতা

chaitanya.jfif

[ড়ু চণ্ডীদাসের প্রামাণ্য জীবনী পাওয়া যায় নি। অনুমান করা হয় তিনি পঞ্চদশ শতকের মানুষ। মিথিলার কবি বিদ্যাপতির সমসাময়িক। বিদ্যাপতির মতো তাঁর লেখায় নাগর-বৈদগ্ধ্য নেই। জয়দেবের পরে তিনি রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলার কাব্য লিখেছেন। গীতিরস থাকলেও তাঁর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন একটি কাহিনীকাব্য। নানা কারণে এই কাব্যটি বাংলাসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য]


।।জন্মখণ্ড।।
কংসাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন দেবতারা। সৃষ্টি যাচ্ছে রসাতলে। চিন্তিত দেবতারা। একটা প্রতিবিধান করা দরকার। দেবতারা এলেন দেবাদিদেব ব্রহ্মার কাছে। সব শুনলেন ব্রহ্মা। তিনি দেবতাদের নিয়ে গেলেন সাগরে। সেখানেই আছেন শ্রীহরি। একমাত্র তিনিই করতে পারেন প্রতিবিধান। দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হলেন শ্রীহরি। তিনি তাঁদের একটি শ্বেত ও একটি কৃষ্ণ কেশ দিয়ে বললেন যে একটি কেশ থেকে বসুদেবপত্নী রোহিণীর গর্ভে জন্ম নেবেন বলরাম, আর দেবকীর গর্ভে জন্ম নেবেন বনমালী কৃষ্ণ। কংসাসুর নিহত হবেন এই কৃষ্ণের হাতে।
কংসাসুর নিধনের ব্যাপারে দেবতাদের মন্ত্রণার কথা কানে গেল নারদমুনির। সে কথা কংসকে জানাবার জন্য তিনি ছুটে এলেন তাঁর কাছে। তাঁর রঙ্গ কৌতুক দেখে কংস যখন হাসছিলেন, তখন নারদ বললেন, ‘হাসছ হাসো, কিন্তু তোমার বিনাশ আসন্ন।’
এ কি কথা বলছেন নারদমুনি! হাসি বন্ধ হয়ে গেল কংসের। কার হাতে মৃত্যু হবে কংসের? নারদ বললেন, ‘দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্মাবে যে সন্তান, তার হাতেই মৃত্যু হবে তোমার।’ নারদের কথা শুনে সচকিত কংস। না, তিনি কোন ঝুঁকি নেবেন না। দেবকীর সব সন্তানকেই হত্যা করবেন তিনি। নিজের ভগ্নী বলে কোন দয়া-মায়া করা যাবে না।
এদিকে কংসের কাছ থেকে নারদ এলেন বসুদেবের কাছে। বললেন, ‘শোনো বসুদেব, তোমার পত্নী দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্ম নেবেন ভগবান নারায়ণ। তিনি হত্যা করবেন কংসকে। তাই কংস তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হবেন। কি করে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানকে রক্ষা করতে হবে, সে পথ তোমাকে পরে বলে দেব।’
আতঙ্কগ্রস্ত কংস দেবকীর ছয়টি গর্ভ নষ্ট করে দিলেন। সপ্তম গর্ভে শ্বেতকেশ থেকে জন্ম হল বলভদ্রের। জননীর গর্ভপাতের ছল করে বলভদ্র আশ্রয় নিলেন রোহিণীর গর্ভে। অষ্টম গর্ভে কৃষ্ণকেশ থেকে জন্ম হল শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী শ্রীকৃষ্ণের। দেবকীর অষ্টম গর্ভের কথা শুনে কংস প্রহরীদের মোতায়েন করেছেন। সন্তানের জন্ম হলে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করা হবে তাকে। শত্রুর শেষ রাখবেন না কংস।
দশমাস পরে এক অন্ধকার বর্ষণমুখর রাতে জন্ম হল কৃষ্ণের। দেবতাদের অনুগ্রহে সে কথা অবগত হলেন বসুদেব। আর ঠিক একই সময়ে যশোদা প্রসব করলেন একটি কন্যা সন্তান। প্রায় অচৈতন্য ছিলেন যশোদা, তাই জানতে পারলেন না কন্যা সন্তানের কথা।
পূর্ব পরামর্শমতো বসুদেব দেবকীর নবজাত সন্তানকে কোলে নিয়ে নামলেন পথে। দৈবমায়ায় কংসের প্রহরীরা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কৃষ্ণকে নিয়ে যশোদার গৃহে এলেন বসুদেব। কৃষ্ণকে যশোদার কোলে দিয়ে যশোদার কন্যা সন্তানকে নিয়ে এলেন দেবকীর কাছে। সেই কন্যার কান্নার শব্দে নিদ্রাভঙ্গ হল প্রহরীদের। খবর গেল কংসের কাছে। কালবিলম্ব না করে তিনি ছুটে এলেন কারাগৃহে। কংস সেই নবজাত কন্যাকে আছড়ে ফেললেন পাথরে। সেই সময় এক দৈববাণী হল: তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে। তাহলে কি গোকুলের নন্দসন্তান তাঁর মৃত্যুর কারণ হবে। কংস পুতনাকে পাঠালেন নন্দগৃহে । স্তন্যপানের ছলনায় কৃষ্ণ তাকে বধ করলেন। তারপর গেল যমলার্জুন। সেও নিহত হল। এভাবে নিহত হল কেশী আদি অসুর। প্রমাদ গুনলেন কংস। 
নন্দ আর যশোদার স্নেহচ্ছায়ায় বর্ধিত হতে লাগলেন কৃষ্ণ। ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে লাগল তাঁর অনুপম দেহলাবণ্য। তাঁর ললাটের দুই দিক লঘু এবং মধ্যভাগ প্রশস্ত। নাসিকা ও লোচন সুগঠিত। ভ্রূ বঙ্কিম। ওষ্ঠাধর প্রবালসদৃশ। করযুগল আজানুলম্বিত। বক্ষস্থল মরকত মণিফলকসদৃশ। কটিদেশ সূক্ষ্ম, জঙ্ঘা রামরম্ভাসদৃশ। কেশরাসী কুঞ্চিত ও দীর্ঘ। পরিধানে পীতবস্ত্র। হাতে মনোহর বংশী।
কৃষ্ণের সম্ভোগের জন্য দেবতাদের নির্দেশে দেবী লক্ষ্মী সাগরের গৃহে পদ্মার উদরে জন্মগ্রহণ করলেন। অপরূপ সৌন্দর্যশালিনী সেই কন্যার নাম হল রাধা। নপুংসক আইহনের সঙ্গে বিবাহ হল রাধার। রাধার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিযুক্ত করা হল কুদর্শনা বৃদ্ধা বড়াইকে ।
।। তাম্বুলখণ্ড ।।
দধি-দুগ্ধের পসরা নিয়ে বড়াই ও সখীদের সঙ্গে রাধা বনপথে প্রত্যহ যান মথুরায়। একদিন চলতে চলতে রাধা বড়াইকে পেছনে ফেলে চলে এলেন বকুলতলায়। তারপরে খেয়াল হল তাঁর সঙ্গে বড়াই তো নেই। এদিকে রাধার হদিশ না পেয়ে বড়াইএর মনেও জাগল শঙ্কা। কর্তব্যে এই ত্রুটি ক্ষমা করবে না আইহনের পরিবার।
পথ চলতে চলতে বড়াই দেখতে পেলেন গোচারণরত এক রাখালকে। কাছে গিয়ে বড়াই বুঝলেন রাখাল তাঁর পরিচিত। নাম তার কানাই। হয়তো কানাই পারবে রাধার হদিশ দিতে। কানাই অর্থাৎ কৃষ্ণ বড়াইকে দেখে বললেন, ‘কি গো, বৃন্দাবনের পথে পথে এমন করে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন?  কিছু হারিয়েছে না কি?’
বড়াই বললেন, ‘সুন্দরী নাতনীকে নিয়ে আসছিলাম। তাকে আর খুঁজে পাচ্ছি না।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘সে কি! হারিয়ে গেল! নাম কি তার? দেখতে কেমন?’
-‘ বৃন্দাবনের পথেই হারিয়েছি তাকে। নাম তার চন্দ্রাবলী। ত্রৈলোক্যসুন্দরী সে। বাছা, আমাকে তুমি মথুরার পথ বলে দাও।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘নিশ্চয়ই বলে দেব মথুরার পথ। তবে একটা শর্তে। তুমি আমাকে তোমার নাতনীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে, বুঝলে!’
-‘এ আর এমন কি! তোমার সঙ্গে তার আলাপ করিয়ে দেব, কথা দিলাম।’
-‘বেশ। তাহলে তার রূপের একটু বর্ণনা দাও।’
-‘শোনো তবে। তার কেশপাশে সুরঙ্গ সিন্দুর দীপ্তি পাচ্ছে, যেন সজল মেঘের ভিতর দিয়ে উদয় হচ্ছে সূর্যের। তার অম্লান আননের দ্যুতি কনককমলের মতো। তাকে দেখলে মোহগ্রস্ত হয় তপস্বীরও মন। তার অলকাবলির ললিতকান্তি দেখে তমালকলিকারা লজ্জিত হয়। তার কজ্জলশোভিত অলস লোচন দেখে নীলোৎপল প্রবেশ করে জলে। শঙ্খ লজ্জা পায় তার কণ্ঠদেশ দেখে। পক্কদাড়িম্ব অভিমানে বিদীর্ণ হয় তার পয়োধরযুগলকে দেখে। কটিদেশ তার ক্ষীণ, গুরুভার বিপুল নিতম্ব। মত্ত রাজহংস অপেক্ষা অনুপম তার গতি।’
রাধার রূপ বর্ণনা শুনে কৃষ্ণ কামকাতর হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘রাধার রূপ বর্ণনা শুনে আমি কাতর হয়ে পড়েছি। এমন পুষ্পিত, মধুকরগুঞ্জিত বসন্তে আমি আর ধৈর্য রাখতে পারছি না।  তুমি তাকে নিয়ে এসো।’
-‘ কথা রাখব তোমার। এখন তুমি বলে দাও মথুরার পথ। আমি ঠিক রাধাকে নিয়ে আসব তোমার কাছে।’
অবশেষে রাধার দেখা পেলেন বড়াই। রাধার হাতে তুলে দিলেন কর্পূর, তাম্বুল, ফুল আর নেত্রবস্ত্র; বললেন এসব পাঠিয়েছেন কৃষ্ণ। বড়াইএর কথা শুনে অতীব ক্রুদ্ধ হলেন রাধা। মাটিতে ফেলে দেন কৃষ্ণপ্রদত্ত দ্রব্যাদি। তখন বড়াই তিরস্কার করে বলেন, ‘ছিঃ, এমন কাজ করতে নেই।  নন্দনন্দন কৃষ্ণ যে তোমার বিরহে কাতর।’
রাধা বলেন, ‘ঘরে আমার সুলক্ষণযুক্ত স্বামী আছেন। নন্দদুলাল গোপালক কৃষ্ণ আমার কে? তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করতে আমার বয়েই গেছে।’
প্রত্যুত্তরে বড়াই বলেন, ‘যে দেবতাকে স্মরণ করলে পাপমুক্তি ঘটে, তার সঙ্গে প্রেম সম্পর্ক হলে তুমি যে বিষ্ণুলোকে যাবে।’
- ‘দরকার নেই বিষ্ণুলোক। বড়াই তোমার মতলবটা কি? বয়স তো অনেক হল, এসব কুকথা বলতে লজ্জা করে না তোমার? আর কক্ষনো বলবে না এসব কথা।


।। দানখণ্ড ।।
দিনকয়েক পরের কথা। আবার দধি-দুগ্ধের পসরা সাজিয়ে বড়াইএর সঙ্গে রাধা চলেছেন মথুরার পথে। এদিকে রাধার গমন পথে মহাদানী সেজে বসে আছেন কৃষ্ণ। রাধা কাছে আসতে তিনি বললেন, ‘শোনো রাধা, আমি দানী, দান আদায় করি। এতদিন ফাঁকি দিয়েছ তুমি। আজ আর পারবে না ফাঁকি দিতে। তোমার কটিদেশ এত ক্ষীণ যে হাতের মুঠোয় ধরা যায়; দাড়িম্বসদৃশ তোমার স্তনযুগল বড় সুন্দর। আমার প্রাপ্য দান পরিশোধ করে আমাকে আলিঙ্গন করো।’
কৃষ্ণের কথা শুনে রাধা হতবাক। বড়াইকে তিনি বলেন, ‘তোমার কৃষ্ণ তো বড় নির্লজ্জ। কামলালসা চরিতার্থ করার জন্য সে মহাদানী সেজেছে। আমার যৌবন, আমার কটিদেশ, আমার স্তনযুগলের কথা বলে কেন সে? কেন আমাকে সে অপমান করছে? এর একটা বিহিত করো তুমি।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘রাজার কাছ থেকে পথ আর হাটের শুল্ক আদায়ের ভার নিয়েছি। দধি-দুগ্ধের পসরা নিয়ে তুমি প্রতিদিন যাও মথুরায়। কিন্তু দান দাও না। তোমার বহু দান বাকি পড়েছে।’
খড়ি পেতে দান গণনা করেন কৃষ্ণ, তারপর বলেন, ‘তোমার নয় লক্ষ কড়ি বাকি পড়েছে; বারো বছরের দান।’
রাধা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘কি যা তা বলছ! আমার বয়স এগারো, তাহলে বারো বছরের দান বাকি থাকে কি করে! দেখো কানাই, আমি সম্ভ্রান্ত বংশের কন্যা, সম্ভ্রান্ত বংশের বধূ, আমার রুপ-যৌবনে লাভ কি তোমার? গাছের উপর পাকা বেল দেখে কাকের লোভ হলেও সে কি তা খেতে পারে? তোমাকে মিনতি করছে, আমার মান রাখো, আমাকে যেতে দাও।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘তোমার রূপ দেখে আমি পাগল হয়েছি রাধা।’
--‘ তাহলে গলায় পাথর বেঁধে জলে ডুবে মরো।’
-‘ তুমি আমার গঙ্গা, তুমি আমার বারাণসী, তুমি সর্বতীর্থসার।’
-‘ ছি ছি, লজ্জা হয় না তোমার! আমি না তোমার মাতুলানী!’
-‘ সে সম্বন্ধ সত্যি নয়। সত্যি হল, আমি দেবরাজ, আর তুমি আমার রানি।’
- ‘ কামজ্বরে ভুগছ তুমি। বিকারের ঘোরে বলছ এ সব।’
-- ‘যাই বলো রাধা, কিন্তু আমার হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার আশা ছেড়ে দাও।’
--‘ ছি কানাই, ছিঃ। শুল্ক আদায়ের ছলনায় তুমি তোমার মামির উপর বলপ্রয়োগ করছ! জানো না, পরস্ত্রীর প্রতি লোভ মহাপাপ!’
কৃষ্ণ গম্ভীরভাবে বলেন, ‘বসুদেব আর দৈবকীর পুত্র আমি। কংসাসুর আমার মাতুল। সেই সূত্রে তুমি আমার শ্যালিকা, মাতুলানী নও। এ সব বাজে কথা বাদ দাও। একবার প্রসন্ন হয়ে আমার দিকে মুখ তুলে চাও। তোমার উন্নত পয়োধরে পীড়ন করো আমাকে। তাহলেই দূর হবে আমার সন্তাপ। রাধা, তোমার দেহের মাপ সাড়ে তিন হাত, তার জন্য দান হবে দুই কোটি মুদ্রা। মাথায় ফুলের মালার  দান লক্ষ মুদ্রা। তোমার সুন্দর কেশরাশির দান দুই লক্ষ মুদ্রা। সীমন্তের সিন্দূর দুই লক্ষ মুদ্রা। নিষ্কলঙ্ক আননের দান চার লক্ষ মুদ্রা। নীলোৎপলসদৃশ নয়ন দুটির দান পাঁচ লক্ষ। গরুড়সদৃশ নাসিকার দান ছয় লক্ষ। কর্ণকুণ্ডলের জন্য সাত লক্ষ, দন্তরাজির জন্য আট লক্ষ, বিম্বফলের মতো অধরের জন্য নয় লক্ষ, বাহুদুটির জন্য এগারো লক্ষ, নখপংক্তির জন্য বারো লক্ষ মুদ্রা দান দিতে হবে তোমাকে। না, না, শেষ নয় এখানে। তোমার স্তনযুগলের জন্য তেরো লক্ষ, কটিদেশের জন্য চোদ্দ লক্ষ, কদলীসদৃশ উরুর জন্য পনেরো লক্ষ, চরণযুগলের জন্য যোল লক্ষ আর হেমপটনিন্দিত জঘনের জন্য চৌষট্টি লক্ষ মুদ্রা দান দিতে হবে।’
--‘এ সব কি বলছ তুমি? কিসের ঘাট? কিসের দান? এ সব কপটতা ছাড়ো। মানুষের দেহের উপর আবার দান ধরা হয় না কি! দেখো কানাই, পরদার গ্রহণে বিষম পাপ। ভৈরবপত্তনে গিয়ে দেহ বিসর্জন দিয়ে তুমি পাপমুক্ত হও। ’
রাধার কথা শুনে কৃষ্ণ হেসে বলেন, ‘রাধা তোমার উরুদুটিই ভৈরবপত্তন; তা যখন এত কাছে আছে, তাহলে দূরে যাই কেন! কলসি বেঁধে গঙ্গায় ডুবে মরার কথা বলছ? তোমার কুচযুগলই তো কলসির মত, সেই কলসি বেঁধে আমি লাবণ্যগঙ্গাজলে ডুবে মরতে রাজি।’ এরপরে একটু গম্ভীর হয়ে কৃষ্ণ বলেন, ‘পাপ খণ্ডনের কৌশল আমি জানি রাধা, তোমার কাছে সে সব শুনব কেন?’

রাধা বলেন, ‘তোমার আসল অভিসন্ধি বুঝতে বাকি নেই আমার। অনেক হয়েছে, এবার পথ ছাড়ো।’-‘ আমার আসল অভিসন্ধি? তা যখন বুঝেছ, তখন এসো আমার কাছে। রতিদান করো রাধা, না হলে ছাড়ব না তোমাকে, কিছুতেই না। ’রাধা বুঝতে পারেন, কৃষ্ণের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব। তিনি বড়াইকে বলেন, ‘আমি পাখি হলে এখান থেকে উড়ে যেতাম। দেখো বড়াই, কৃষ্ণ যদি বলপ্রয়োগ করে তাহলে আমি প্রাণত্যাগ করব। নিজের মাংসের জন্য হরিণী জগতের বৈরী। আমার রূপই কাল হল। সেই রূপে প্রলুব্ধ কৃষ্ণ। কিন্তু তার আশা পূর্ণ হবে না। ’রাধার কথা শুনে একটুও বিচলিত হন না কৃষ্ণ। বরং আত্মপ্রশংসায় মুখর হয়ে ওঠেন। জানান যে কালো জগতের আলো। এ সব শুনে আরও হতাশ হন রাধা। পথ ছেড়ে দেবার জন্য কাতর অনুরোধ করেন কৃষ্ণকে। কিন্তু কৃষ্ণ অবিচলিত, তখন রাধা বড়াইকে বলেন, ‘বড়াই তোমার কি মনে হয়, নন্দনন্দন কৃষ্ণ আমার যোগ্য? মর্কটের গলায় কি গজমুক্তা মানায়?’ চতুর বড়াই দেখতে থাকেন রাধাকে। মুখে প্রতিবাদ করছেন, কিন্তু তাঁর সর্বাঙ্গে রতিরঙ্গের লক্ষণ প্রকট। ঈষৎ হেসে বড়াই বলেন, ‘এত দেরি হল কেন তোমার ? তুমি কি বনে কৃষ্ণের সঙ্গে ছিলে?’

।| নৌকাখণ্ড ।।

অনেক দিন রাধার সঙ্গে দেখা হয় নি কৃষ্ণের। তাই তাঁর মন বড় ব্যাকুল। কি ভাবে দেখা পাওয়া যায় রাধার? বড়াইকে কৃষ্ণ বলেন, ‘রাধাকে মথুরার হাটে যাবার কথা বলো। বলো যে এবার ভিন্ন পথে যাবে, তাহলে কৃষ্ণ তার হদিশ পাবে না। ’বড়াই সম্মত হন। কৃষ্ণকে তিনি যমুনার ঘাটে নৌকা গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেন। বড়াইএর কথা শুনে কৃষ্ণ এমন নৌকা তৈরি করেন, যাতে মাত্র দুজনের স্থান হয়। এরপর আরও একটা বড় নৌকা তৈরি করেন তিনি, আর সেটা ডুবিয়ে রাখেন জলে। বড়াইএর কথা শুনে যথাসময়ে ঘাটে এলেন রাধা। কিন্তু দেখা গেল বড়াই সেখানে নেই। নদীতে একটা নৌকা আছে। কিন্তু বড্ড ছোট সে নৌকা। সখীদের নিয়ে সে নৌকায় যাওয়া অসম্ভব।  একজন একজন করে পার হতে হবে।কিন্তু কোথায় ঘাটোয়াল? রাধা ভালো করে তাকিয়ে দেখে বুঝলেন, ঘাটোয়াল আর কেউ নয়, সেই নন্দনন্দন কৃষ্ণ। কি আর করেন রাধা! নৌকায় উঠে তিনি ঘাটোয়ালকে বলেন, ‘ওহে ঘাটোয়াল, আমাকে পার করে দাও তাড়াতাড়ি। পথে বলপ্রয়োগের চেষ্টা করো না। মনে রেখো, আমাদের সম্পর্কের কথা। তোমার মা যশোদা আমার ননদ, আর তুমি আমার ভাগনে।’

।। ভারখণ্ড ।।

বৃন্দাবনের অভ্যন্তরে গিয়ে কৃষ্ণ চামর গাছের ডাল কেটে তৈরি করেন বাঁক। ঝামা দিয়ে ঘষে চিকন করে তোলেন তাকে। পাটের দড়ি দিয়ে তৈরি করেন শিকে। এ ভাবে রাধার জন্য প্রস্তুত হয় ভার। কিন্তু রাধার বুঝতে বিলম্ব হয় না কৃষ্ণের অভিসন্ধি। নিশ্চয়ই তার কোন বদ মতলব আছে। রাধার পেছন পেছন আসতে থাকেন কৃষ্ণ। রাধা কৃষ্ণকে বলেন, ‘আমার পেছন পেছন আসছ কেন? তোমার কি লজ্জা নেই? তবুও আসছ? বেশ, আমার সঙ্গে আসতে চাও যদি, তাহলে এই দধি-দুগ্ধের ভার বহন করো। ’ছদ্মরাগে কৃষ্ণ বলেন, ‘এ কি বলছ রাধা? আমি হলাম ত্রিভুবনের অধিপতি। জমলার্জুন আর শকটাসুরকে আমি বধ করেছি। কংসাসুরকে বধ করার জন্য আমার জন্ম। সেই আমি ভার বহন করব তোমার ? যৌবনের অ্হংকারে এসব কি যা তা বলছ তুমি?’- ‘যমুনার ঘাটেই তো এক প্রহর বেলা কেটে গেল। মথুরার হাটে কখন যাব? আমার সখীরা সব এগিয়ে গেছে। তুমি ভার বহন করবে কি না বলে দাও। রাজি না হলে আমি আমার হার বিক্রি করে অন্য কোন ভারীকে নিযুক্ত করব।’ রাধার কথা শুনে এগিয়ে এলেন কৃষ্ণ। ভার বহনের ছলনায় নষ্ট করে দিলেন দধি-দুগ্ধ। হায় হায় করে উঠলেন রাধা, কৃষ্ণকে হাত লাগাতে বললেন তিনি। কৃষ্ণ বললেন, ‘তোমার কথায় লোকে আমাকে উপহাস করছে। আমি কেমন করে তোমার ভার বহন করব ? ’রাধা বলেন, ‘গোয়ালা হয়ে কে না ভার বহন করে? দেখো কানাই, দয়া করে এখন এটুকু করো, ফেরার পথে তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করব। ’রাধার কথা শুনে আনন্দিত হলেন কৃষ্ণ। ভারখণ্ডান্তর্গত ছত্রখণ্ড। বড়াইএর কাছে রাধা তাঁর বিড়ম্বনার কাহিনি ব্যক্ত করেন। ছলনাময় কৃষ্ণের আচরণ বুঝতে পারেন না তিনি। কখনও কৃষ্ণ মহাদানী সাজেন, কখনও আবার

ভারবহনকারী। ভার বহন করতে গিয়ে কৃষ্ণ নষ্ট করে দিয়েছেন রাধার পসরা। কিন্তু কোন অনুতাপ নেই তাঁর। কৃষ্ণ এর পরেও বলে যাচ্ছেন রাধার দেহসম্ভোগের কথা। রাধাকে নীরব দেখে কৃষ্ণ আবার তোষামোদ শুরু করেন। প্রশংসা করতে থাকেন রাধার রূপের। বলে যান যে রাধা তাঁর বিরহজ্বালা দূর করতে পারেন। বড়াই কৃষ্ণকে জানান যে তাঁর কাকুতি-মিনতিতে তুষ্ট হয়েছেন রাধা। দ্রবীভূত হয়েছে তাঁর হৃদয়। সম্মত হয়েছেন তিনি রতিদানে।বড়াই কৃষ্ণকে বলেন, ‘খর রৌদ্রে রাধা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তুমি তার মাথায় ছত্র ধারণ করে তাকে কুঞ্জে নিয়ে যাও। ’সে কথা শুনে কপট রাগ করে কৃষ্ণ বলেন, ‘কি? আমাকে রাধার মাথায় ছত্র ধারণ করতে করতে হবে? এত অপমান?’ রাধা বলেন, ‘সুরতির আকাঙ্খা থাকলে অপমান সহ্য করতে হবে।’ কৃষ্ণ বলেন, ‘রাধা, আর বিরহজ্বালা সহ্য করতে পারছি না।’

-‘ যোগী সেজে বসে আছ তুমি। বিরক্ত করছ পরনারীকে। বিয়ে করে সংসার করতে পারো না?’
গম্ভীর হবে কৃষ্ণ বলেন, ‘আমি হরি, আমিই হর, আমি মহাযোগী, আমি দেবাদিদেব। তোমার কাছে করজোড়ে রতি ভিক্ষা করছি রাধা।’


।। বৃন্দাবনখণ্ড ।।
কালিন্দী নদীর তীর। মন্দ মন্দ বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। অভিসারে এসেছেন কৃষ্ণ। অপেক্ষা করে আছেন রাধার জন্য। রাধার জন্য শয্যারচনাও প্রস্তুত। বাজছে সংকেতবেণু।
বড়াই রাধাকে বললেন, ‘রাধা তুমি আর বিলম্ব করো না। তুমি তো জানো কৃষ্ণ বড় অভিমানী । তোমার বিলম্বে তার অভিমান হবে।’
বড়াইএর মুখে বৃন্দাবনের কথা শুনে আনন্দিত হলেন গোপবালিকারা। রাধাকে নিয়ে তাঁরা যাত্রা করলেন বৃন্দাবনের দিকে। বড়াইকে সম্মুখে রেখে চলতে লাগলেন চন্দ্রাবলী। গোপবালিকারা গান গাইতে লাগলেন মনের আনন্দে। কৃষ্ণের কাছে গিয়ে তাঁরা বললেন, ‘ হে কৃষ্ণ,  লজ্জা সংকোচ ত্যাগ করে আমরা এসেছি তোমার কাছে। আমাদের তুমি ত্যাগ করো না কানাই।’
তাঁদের কথা শুনে কৃষ্ণ আনন্দিত হলেন। নানাভাবে তাঁদের মনস্তুষ্টি বিধানের চেষ্টা করলেন তিনি। তাঁরা চলে যাবার পরে কৃষ্ণের হৃদয়াসীনা হয়ে বসলেন রাধা। তখন তাঁর বসন স্খলিত, জঘন কাঞ্চিমুক্ত ।
কৃষ্ণ গাঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘রাধা, তোমার জন্য রচনা করেছি এই বৃন্দাবন। এখানে একটি নিভৃত স্থান আছে , তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব।
তারপরে কৃষ্ণ রাধার রূপের প্রশংসা শুরু করলেন। তাঁর দেহের বিবিধ অঙ্গগুলিকে তুলনা করতে লাগলেন বিবিধ ফুলের সঙ্গে। রাধার চরণযুগল হৃদয়ে ধারণ করার অনুমতি প্রার্থনা করে তিনি বলতে লাগলেন, ‘রাধা, তুমি আমার  রতনভূষণ, তুমিই আমার জীবন।’


।। কালীয়দমনখণ্ড ।।
বৃন্দাবনের মধ্য  দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে যমুনা নদী। সেই নদীতে কালীদহ নামে আছে একটি গভীর হ্রদ।  সেই হ্রদে বাস করে কালীয়নাগ নামে এক বিষধর সাপ। তার উগ্র বিষে হ্রদের জল বিষময়। কোন জন্তু পান করতে পারে না সেই জল।
গোপীদের বিদায় দিয়ে মথুরা নগরে যাবার পথে জলক্রীড়া করার ইচ্ছা হল কৃষ্ণের। কালীদহের কদম্বতলায় এলেন তিনি। গোপবালকদের নিষেধ অমান্য করে কদম্ববৃক্ষ থেকে তিনি ঝাঁপ দিলেন কালীদহে।
কালীয় নাগ সপরিবারে দংশন করতে লাগল কৃষ্ণকে। তীব্র বিষের জ্বালায় চৈতন্য হারালেন কৃষ্ণ। লোকমুখে এ কথা শুনে ছুটে এলেন নন্দ আর যশোদা। মাটিতে লুটিয়ে কাঁদতে লাগলেন তাঁরা।  কাঁদতে লাগল গোপবালকেরা। সেই বিলাপে মুখরিত হল চারদিক।
বলভদ্র বুঝতে পারলেন কৃষ্ণ আত্মবিস্মৃত হয়ে মোহগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁকে জানাতে হবে পূর্ব বৃত্তান্ত। তাহলেই তাঁর চৈতন্য ফিরে আসবে।
বলভদ্র কৃষ্ণের ঈশ্বরসত্তার কথা, নানা অবতাররূপে পৃথিবীকে রক্ষা করার কথা বলায় কৃষ্ণের চৈতন্য ফিরে এল। সকলে স্বস্তির শ্বাস ফেললেন।


।। বস্ত্রহরণখণ্ড ।।
সখীদের সঙ্গে নিয়ে গজপতিছন্দে রাধা জল আনতে চলেছেন যমুনায়। ঘাটেই দেখা কৃষ্ণের সঙ্গে। কৃষ্ণকে দেখে সখীরা বিহ্বল। চোখে তাঁদের পলক পড়ে না।
রাধা কৃষ্ণকে বললেন, ‘একটু সরে দাঁড়াও কানাই। আমাদের জল ভরতে দাও।’ 
কৃষ্ণের এমন ভাব যেন তিনি চেনেন না রাধাকে। বললেন, ‘কে তুমি? কার বধূ? কেন জল আনতে এসেছ যমুনায়?’
রাধা রেগে গিয়ে বলেন, ‘যার বধূ  হই না কেন, তাতে তোমার কী?’
কৃষ্ণ বলেন, ‘কাঁধের কলস নামিয়ে রাখো। কথা আছে তোমার সঙ্গে।’
-‘কি কথা?’
-‘এই তাম্বুল নাও তো আগে।’
-তাম্বুল দিয়ে কি বলতে চাও তুমি?’
-‘শোনো সুন্দরী, আমি হলাম সমস্ত যমুনার অধিকারী।’
-‘বুঝতে পেরেছি তোমার মতলব। তোমার সঙ্গে কোন কথা নেই আমার।’
রাধার মন জয় করার জন্য কৃষ্ণ তাঁকে স্বর্ণময় কিঙ্কিনী, পট্টবস্ত্র, স্বর্ণময় বাঁশি  দিতে চাইলেন। রাধা সম্মত হলেন না কিছুতেই। তখন কৃষ্ণ বললেন, ‘রাধা, ডালিমের মতো তোমার পয়োধর দুটি আমার মন মাতিয়েছে।’
রাধা ক্রুদ্ধভাবে বলেন, ‘আমার পয়োধর মাকাল ফল সদৃশ। দেখতে সুন্দর, কিন্তু মুখে দিলেই মৃত্যু।’
রাধার নিষ্ঠুর কথা শুনে দুঃখ পেলেন কৃষ্ণ। বড়াই তিরস্কার করলেন রাধাকে। তিনি রাধাকে সরস বচনে কৃষ্ণের তুষ্টি বিধান করতে পরামর্শ দিলেন। কৃষ্ণও জানালেন তাঁর বিরহজ্বালার কথা।
রাধা বললেন, ‘পথে-ঘাটে কেন তুমি প্রকাশ্যে এ সব বলো কানাই! কে কোথায় শুনতে পাবে । আমার শাশুড়ি বড় দুর্জন, শুনতে পেলে আমার দুর্দশার অন্ত্য থাকবে না।’
কৃষ্ণ আর পীড়াপীড়ি করলেন না। ফিরে গেলেন রাধা।
দিনকয়েক পরে সখীদের নিয়ে রাধা আবার এলেন যমুনার তীরে। কৃষ্ণ বললেন, ‘রাধা, তুমি যমুনার জলে স্নান করতে পারো।  সর্পভয় আর নেই। তাকে আমি হত্যা করেছি।’
কৃষ্ণের আশ্বাসে জলে নামলেন রাধা ও তাঁর সখীরা। জলকেলিতে মত্ত হয়ে উঠলেন তাঁরা। এই সুযোগে কৃষ্ণ তাঁদের বসন-ভূষণ নিয়ে উঠে বসলেন কদম্বতরুতে। সে কথা জানতে পেরে গোপীরা বড় বিড়ম্বনা বোধ করতে লাগলেন। অর্দ্ধজলমগ্ন হয়ে দক্ষিণ বাহুদ্বারা বক্ষোদেশ আবৃত করে রাধা বলতে লাগলেন, ‘এ তোমার কি ব্যবহার কানাই? দাও আমাদের বসন দাও’
কৃষ্ণ বলেন, ‘তীরে উঠে হাত জোড় করে দাঁড়াও। তাহলেই পাবে তোমাদের বসন-ভূষণ।’
অগত্যা তাই করতে হল রাধা ও তাঁর সখীদের। কৃষ্ণ দুচোখ ভরে দেখলেন নগ্ন যুবতীদের রূপ। তারপরে ফিরিয়ে দিলেন বসন-ভূষণ। শুধু লুকিয়ে রাখলেন রাধার হারটি।


।। হারখণ্ড ।।
যশোদার কাছে এসে রাধা অভিযোগের সুরে বললেন, ‘তোমার কানাই আমার পট্টবস্ত্র আর সাতলহরী হার অপহরণ করেছিল। শেষ পর্ষন্ত পট্টবস্ত্র ফেরত দিলেও সে হার ফেরত দেয় নি এখনও।’
অবাক হয়ে যশোদা বলেন, ‘সে কি কথা!’
-‘ কৃষ্ণ বড় বেয়াড়া হয়ে উঠেছে। শাসন করো তাকে। যখন তখন সে আমাকে আর আমার সখীদের উৎপীড়ন করে। কংস যদি এ কথা জানতে পারে, তবে বড় অনর্থ হবে।’
যশোদা কৃষ্ণকে ডেকে তিরস্কার করে বললেন, ‘তোমার জন্য আর কত গঞ্জনা সহ্য করব আমি! কুবুদ্ধি পরিত্যাগ করো কানাই। সংযত করো মনকে।’


।। বাণখণ্ড ।।
যশোদার কাছে কৃষ্ণের নামে অভিযোগ করে এসেছিলেন রাধা। সে জন্য ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন কৃষ্ণ। বড়াই তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘রাধা বাড়াবাড়ি করছে। তোমার কথা বলতে গেলাম তাকে, সে আমাকে গালমন্দ করল। নিজেকে সতী বলে ঘোষণা করল। তুমি দেব বনমালী, অথচ রাধা তোমাকে একটুও সমীহ করে না।’
এ রকম অবস্থায় কি করা যায় তা জানতে চান কৃষ্ণ। বড়াই বলেন, ‘শোনো কানাই, আমি রাধাকে বৃন্দাবনে নিয়ে আসছি। তুমি তার উপর স্তম্ভন, মোহন, দহন, শোষণ, উচাটন বাণ নিক্ষেপ করো।’
মথুরার পথে যমুনা পার হয়ে রাধা এলেন বৃন্দাবনে। দেখলেন কদম্বতলায় বসে আছেন কৃষ্ণ । রাধাকে দেখে কৃষ্ণ বলেন, ‘অকারণে আমার এত নিন্দা করছ কেন? আজ আমি প্রতিশোধ নেব। পঞ্চবাণে আঘাত করব তোমাকে। দেখি কে বাঁচায় তোমাকে! এরপরে আমি আইহন আর কংসকেও হত্যা করব।’
বাণের কথা শুনে ভীত হলেন রাধা। প্রাণরক্ষার জন্য মিনতি করতে লাগলেন তিনি। কিন্তু কৃষ্ণ কোন কথা শুনলেন না। তিনি বাণ নিক্ষেপ করলেন। অনুতাপ করতে করতে রাধা মূর্চ্ছিতা হলেন। রাধার মনে জেগে উঠল কৃষ্ণপ্রেম। বড়াইএর অনুরোধে রাধার জ্ঞান ফিরিয়ে দিলেন কৃষ্ণ।


।। বংশীখণ্ড ।।
সখীদের সঙ্গে যমুনার ঘাটে স্নান করতে যান রাধা। নদীর তীরে বসে থাকেন কৃষ্ণ। যুবতীদের রঙ্গ দেখেন। কখনও বাজান করতাল, কখনও বা মৃদঙ্গ। সখীরাও কৃষ্ণের সঙ্গে রঙ্গ-তামাশায় মেতে ওঠেন। রাধা কিন্তু নিস্পৃহ থাকেন।
রাধার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কৃষ্ণ তৈরি করেন এক মোহন সুন্দর বাঁশি। সে বাঁশিতে আবার সোনা ও হিরের কাজ। সে বাঁশির সুর আকুল করে তোলে মনকে। ব্যাকুল হয়ে ওঠে রাধার মন। 
পরের দিন রাধা সেই সুরের আকর্ষণে আবার যান যমুনার ঘাটে। কিন্তু ঘাট যে শূন্য। কোথায় কৃষ্ণ! কোথায় সে মোহন বাঁশির সুর! রাধা বড়াইকে বলেন কৃষ্ণের কথা। তিরস্কার করে বড়াই বলেন, ‘কত বড় বংশের কন্যা তুমি, কত বড় বংশের বধূ। কেন পরপুরুষের সঙ্গ কামনা করছে? আগে যা হবার হয়েছে, নতুন করে আবার কেন পাপে জড়াতে চাইছ?’
ঠিক তখনি মাঝ বৃন্দাবন থেকে ভেসে আসে বাঁশির সুর।
কি যে জাদু আছে সে সুরে! রাধার প্রাণ আকুল হয়ে ওঠে। বর্তমান ভুলে যান তিনি। কাতর অনুরোধ করে তিনি বড়াইকে বলেন, ‘যেমন করে পারো আমার কানাইকে এনে দাও বড়াই ।’
ঘরের কাজে আর মন বসে না রাধার। এলোমেলো হয়ে যায় তাঁর জীবন। আগুন জ্বলে মনে । দাবানলের মতো দৃশ্যমান নয় বলে কেউ বুঝতে পারে না। রাধা যদি পাখি হতেন, তাহলে উড়ে চলে যেতে পারতেন তাঁর দয়িতের কাছে ।
সরস বসন্ত এসেছে ধরায়। রাধা অনুভব করেন তীব্র বিরহজ্বালা। বড়াইকে নিয়ে তিনি বৃন্দাবনে যান। কৃষ্ণের সন্ধানে। কিন্তু কৃষ্ণের দেখা পান না। ফিরে আসতে হয় ব্যর্থ হয়ে।গভীর রাতে আবার ভেসে আসে বাঁশির সুর। রাধা আকুল পাগলপারা। শয্যায় উঠে বসেন তিনি। স্বামী আইহনকে নিদ্রিত দেখে চুপিসারে বেরিয়ে পড়েন। পাগলের মতো খুঁজতে থাকেন কানাইকে। তারপরে মূর্চ্ছিতা হয়ে পড়েন। তাঁকে ভোরবেলা উদ্ধার করে আনেন বড়াই।
রাধার অবস্থা দেখে বড় দুঃখ হয় বড়াইএর। রাধাকে তিনি বলেন, ‘চলো, যমুনায় জল আনতে যাই। কৃষ্ণ সেখানে  থাকবে। তুমি ছল করে চুরি করে আনবে তার বাঁশি।’
--‘কি করে চুরি করব বাঁশি?’
-‘আমি মন্ত্র পড়ে কৃষ্ণকে নিদ্রিত করে রাখব। সেই সুযোগে তুমি বাঁশি চুরি করবে।’
--‘লাভ কি হবে বাঁশি চুরি করে?’
--‘লাভ আছে। সেই বাঁশি নিতে তোমার কাছে আসতে হবে কানাইকে।’
বড়াইএর পরিকল্পনামতো রাধা কৃষ্ণের বাঁশি চুরি করেন। তখন কৃষ্ণ বিলাপ শুরু করেন। বড়াই বলেন, ‘তুমি গোপীদের অপমান করেছ। প্রতিশোধ নেবার জন্য তারাই বাঁশি চুরি করেছে।’
কৃষ্ণ যান গোপীদের কাছে। হঠাৎ দেখতে পান দূরে দাঁড়িয়ে রাধা মুচকি হাসছেন। চোর কে তা বুঝতে বাকি থাকে না। কিন্তু রাধা কিছুতেই স্বীকার করতে চান না। অনুনয়ে কোন কাজ না হওয়ায় কৃষ্ণ ভীতি প্রদর্শন করে বলেন, ‘প্রাণে বাঁচতে চাও তো ফেরত দাও বাঁশি। না হলে তোমার বসন-ভূষণ কেড়ে নেব, বেঁধে রাখব তোমাকে, হত্যা করতেও দ্বিধা করব না, বুঝলে ?’
রাধা বলেন, ‘মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ কানাই। যাও বড়াইকে ধরো। সেই চতুরা বুড়ি লুকিয়ে রেখেছে তোমার বাঁশি।’
বিভ্রান্ত কৃষ্ণ বলেন, ‘তুমি বড়াইএর দোষ দাও, বড়াই তোমার দোষ দেয়। কিন্তু রাধা, আমি জানি বড়াই নয়, তুমিই লুকিয়ে রেখেছ আমার বাঁশি।’
কথা বলতে বলতে কৃষ্ণ রাধার বস্ত্রাঞ্চল ধরে বলেন, ‘বাঁশি না পেলে যেতে দেব না তোমাকে ।’
তখন মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে আসেন বড়াই, কৃষ্ণকে বলেন, ‘তুমি হাতজোড় করে বিনীতভাবে রাধার কাছে বাঁশি চাও কানাই।’
বড়াইএর কথামতো কৃষ্ণ রাধার কাছে হাতজোড় করে দাঁড়ান। রাধা বলেন, ‘এরপর থেকে আমার কথামতো চলার প্রতিশ্রুতি দেলে বাঁশি ফেরত পাবে।’
কৃষ্ণ প্রতিশ্রুতি দেন। 
রাধা বলেন, ‘আমি বিরহে কাতর হলে তুমি আমাকে সঙ্গ দেবে। কোন অন্যথা হবে না তো !’
কৃষ্ণ জানান যে কোন অন্যথা হবে না।
রাধা তখন বাঁশি ফেরত দেন কৃষ্ণকে।


।। রাধাবিরহ ।।
দীর্ঘকাল দেখা নেই কৃষ্ণের। এদিকে চৈত্রমাস এসেছে। ঋতুরাজ বসন্তের সমারোহ চারদিকে । বিরহজ্বালায় দগ্ধ হচ্ছে রাধার হৃদয়।
কোথায় গেলেন কৃষ্ণ!
নিজের প্রতিশপুতি কি ভুলে গেলেন তিনি!
বড়াইকে সঙ্গে নিয়ে রাধা যান বৃন্দাবনে। মোহিনী বেশ ধারণ করে কদম্বতলায় রচনা করেন শয্যা। অপেক্ষা করেন, অপেক্ষা করেন, কিন্তু কৃষ্ণের দেখা পাওয়া যায় না।
বৃন্দাবনের পথে পাগলের মতো ঘুরতে ঘুরতে রাধা একদিন দেখলেন গোচারণরত কৃষ্ণকে। তাঁর কাছে গিয়ে রাধা বলেন, ‘কানাই আমি যদি কোন দোষ করে থাকি, ক্ষমা করো। কিন্তু তোমার বিরহ আর সহ্য করতে পারছি না।’
কৃষ্ণ কঠিনভাবে বলেন, ‘তোমার কাঁদুনিতে ভুলছি না। আমার আশাত্যাগ করো, নিজের বাড়িতে যাও।’ 
এ কথা বলে সেখান থেকে চলে যান কৃষ্ণ। চোখের জলে ভাসতে থাকে রাধার বুক। নারদের মুখে খবর পাওয়া যায় কদম্বতলায় শয্যা রচনা করে বসে আছেন কৃষ্ণ।  বড়াইকে নিয়ে ছুটে যান রাধা। কৃষ্ণকে দেখে আনন্দে মূর্ছা যান তিনি। বড়াইএর অনুরোধে রাধাকে গ্রহণ করেন কৃষ্ণ। মিলন হয় তাঁদের। তারপরে রাধা নিদ্রিতা হলে কৃষ্ণ বড়াইকে বলেন, ‘আমি মথুরায় চললাম। তুমি রাধাকে সাবধানে রাখবে।’ জাগ্রত হয়ে কৃষ্ণকে দেখতে না পেয়ে হাহাকার করে ওঠেন রাধা। কয়েক দিন পরে রাধার কাতর অনুরোধে কৃষ্ণের সন্ধানে বড়াই যান মথুরায়। সেখানে তিনি কৃষ্ণের আশ্চর্য পরিবর্তন দেখতে পান। দেখতে পান রাধা সম্পর্কে কৃষ্ণের আর কোন আগ্রহ নেই। কংসাসুরকে বধ করাই এখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। কৃষ্ণ বড়াইকে জানান যে রাধা বড় প্রগলভ, তাঁকে দেখলে কৃষ্ণের হদকম্প হয়, তাই রাধার মুখ দর্শনের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা তাঁর নেই.

Comments

Top

গল্প 

ঈশ্বর প্রদত্ত গুণ

ঈশ্বর প্রদত্ত গুণ

জয়দীপ চক্রবর্তী

himadri1.jpg

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

প্রায় বারো বছর ধরে মনের মধ্যে জমে থাকা প্রশ্নের আজ সঠিক উত্তর খুঁজে পেলো স্বর্নাশীষ ও বিদুষী। তাদের একমাত্র ছেলে কল্পক আজ বারো বছরের। মাস তিন চারেক বয়স থেকেই বাবা মাকে একটার পর একটা চমক দিয়ে এসেছে কল্পক।
স্বর্নাশীষ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। একটি কসমেটিক্স উৎপাদন সংস্থায় বেশ উচ্চ পদে চাকরি করে ও। নিয়মিত রুটিন মেনেই অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে রোজ দেরী হয় স্বর্নাশীষের। ছেলের জন্মের পরও সেই নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে সদ্য হওয়া বাবা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করে রোজ। কোনোদিন সফল হয় আর কোনোদিন ব্যর্থ। স্বর্নাশীষ যখনই বাড়ি ফেরে সদ্যজাত কল্পক মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকায়। সে যত সংগোপনে, যত নিঃশব্দেই ঘরে ঢুকুক না কেন বাবার উপস্থিতি ছেলে ঠিক টের পেয়ে যায়। তাড়াতাড়ি ফিরলে স্বর্নাশীষের দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসি দেয়। এই হাসি দেখার জন্যই স্বর্নাশীষের তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা। তবে কিভাবে এই সদ্যজাত শিশুর পক্ষে তার বাবার বাড়ি ফেরার খবর জানা সম্ভব হয়, তা শত চেষ্টা করেও বাড়ির কেউই বুঝতে পারে না। তাই অবাক হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনও উপায় নেই।     
এরপর কল্পক ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে, আর বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন, স্কুলের সহপাঠী, শিক্ষক, শিক্ষিকা সবাইকে অবাক করে তুলেছে। 
স্বর্নাশীষদের পাশের ফ্ল্যাটের মেয়ে অক্সিতা কল্পকের থেকে মাস ছয়েকের ছোট। দুই পরিবারের মধ্যে বেশ সদ্ভাব। সেই সুবাদে অক্সিতা কল্পকের খেলা সঙ্গী। অক্সিতার পাঁচ বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন কচিকাঁচা একত্র হয়ে খেলায় মেতেছে। লুকোচুরি খেলা। পাশাপাশি ফ্ল্যাট দুটির বিভিন্ন জায়গায় সকলে অন্তর্ধান হয়েছে। সকলকে খুঁজে বের করার ভার পড়েছে কল্পকের ওপর। করিডরে দাঁড়িয়ে শর্ত অনুযায়ী একশত গুনেছে সে। গোনা শেষ হলে করিডরে দাঁড়িয়েই অক্সিতা কোন ফ্ল্যাটের কোন ঘরের কোন-খানে আছে তা বলে দিল কল্পক। অন্যদের খুঁজতেও বেশি সময় নিলো না ও। প্রতিটি ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ওই ঘরে কে কোন জায়গায় আছে তা বলে দিল। শুধু বাচ্চারাই নয়, তাদের অভিভাবকরাও বেশ বিস্মিত। 
পাড়ায়, স্কুলে সর্বত্র কল্পক একটি আলোচনার বিষয়। কেউ বলে ওর মধ্যে একটা ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে। কেউ বলে কল্পক ম্যাজিক জানে। তবে এই ব্যাপারে কল্পককে জিজ্ঞাসাবাদ করে কেউ সঠিক উত্তর পায় নি। যে উত্তর ও দিয়েছে সেটা কেউ বিশ্বাস করেনি। ও বলেছে, চোখ বন্ধ করে এক মনে ভাবলেই নাকি ও সব কিছু বুঝতে পারে। স্বর্নাশীষ ও বিদুষীকে কল্পক অন্য উত্তর দিয়েছে। তবে সেটাও ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি ওরা। 
যাইহোক সকলে এক বাক্যে এটা স্বীকার করে যে কল্পকের জন্মসূত্রে পাওয়া একটি বিশেষ গুণ আছে। তবে সেই গুণের জন্য কোনোরূপ দর্প নেই কল্পকের। কেবল মাত্র প্রয়োজন বা মজা দিতেই ও ওর এই বিশেষ ক্ষমতা ব্যাবহার করে। 
তবে প্রয়োজন হয় প্রায়শই। স্বর্নাশীষের অফিস পিকনিকে সপরিবারে যাবে ওরা। সকাল বেলা তারই প্রস্তুতি পর্ব চলছে বাড়িতে। বিদুষী পড়েছে বেশ বিপদে। সারা মুখে একটা উদ্বিগ্নতা মেখে আলমারি, ওয়ারড্রব সর্বত্র হাতরে বেড়াচ্ছে ও। মায়ের এমন অবস্থা দেখে কল্পক জিজ্ঞাসা করল, 
- মা, কিছু খুঁজছ? 
- হ্যাঁ 
- কি খুঁজছ বল। আমি খুঁজে দিচ্ছি।
বিদুষী ওর সদ্য কেনা একটা অন্তর্বাস খুঁজছিল। অন্তর্বাসটি বেশ দামী। বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্যই কেনা। মাত্র একদিন ওটা ব্যবহার করেছে বিদুষী। ও কি খুঁজছে সেটা সাত বছরের ছেলেকে বলতে বেশ সংকোচ হচ্ছিল ওর। তবে আর কোনও উপায় না দেখে ছেলেকে বলেই ফেলল কথাটা। কল্পক ওদের শোবার ঘরে দাঁড়িয়ে একবার মাত্র ঘার একদিক থেকে বিপরীত দিকে ঘোরাল। তারপর বলল, ওটা খাটের পাশ দিয়ে পড়ে গেছে। দাঁড়াও, আমি তুলে দিচ্ছি। 
পিকনিকে গিয়েও সবাইকে চমকে দিল কল্পক। বাবা-মারা যেন নিশ্চিন্তে ও নির্বিঘ্নে এই পিকনিকটি সম্পূর্ণ ভাবে উপভোগ করতে পারে সেজন্য তাদের ছেলেমেয়েদের ব্যস্ত রাখার আয়োজন করা হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন গেম, কুইজ, আর আত্ম প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ। কেউ সেখানে গান গাইছে। কেউ নৃত্য পরিবেশন করছে। কেউ বা কবিতা আবৃত্তি করছে। 
স্বর্নাশীষ তার সহকর্মীদের সাথে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে নেশায় গলা ভিজিয়েছে। বিদুষীও স্বামীর সঙ্গ দিয়েছে। সে যে এই সুরা পানে অভ্যস্ত তা তার পানের ভঙ্গিমা, পরিমাণ ও তার অবস্থা দেখে সহজেই অনুমেয়। বিদুষীর কলেজ জীবনে কারণে অকারণে পান চলত। এখনও মাঝে মধ্যে আসরে বাসরে সুরা-পান চলে। 
নেশায় সবে মাত্র একটা ঝিমুনি ভাব এসেছে। এমন সময় স্বর্নাশীষের এক সহকর্মী এসে এমন একটা খবর দিল যে তা শুনে স্বর্নাশীষ ও বিদুষীর নেশা ছুটে গেল। তারা ছুটে গেল তাদের ছেলের কাছে। কল্পক তখন সকলের অভিবাদন কুড়চ্ছে। 
কল্পক গান, আবৃতি, নাচ কোনটাতেই পারদর্শী নয়। তাই বলে সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তার বয়েসই সকলে যখন  এক এক করে তাদের প্রতিভার পরিচয় দিয়ে হাততালি কুড়চ্ছিল, তখন কল্পক আর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ও বলল, আমি একটা ম্যাজিক দেখাবো। অনুষ্ঠান সঞ্চালক সাদরে কল্পককে তার প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ করে দিল। শুধু বাচ্চারাই নয়, বেশ কিছু অভিভাবকরাও ছিল সেখানে। কল্পক সেই দর্শকমণ্ডলীর থেকে একটি রুমাল চেয়ে নিলো। এক ভদ্রমহিলা তার রুমালটি কল্পকের হাতে দিলেন। কল্পক সেটা হাতের মুঠোয় রেখে নিজের মুখের সামনে ধরল। তারপর মনে মনে নানারকম মন্ত্র আওরায়ে সে রুমালটি যার রুমাল তাকে ফেরত দিয়ে বলল, আপনি এটা যেখানে খুশি, যার কাছে খুশি লুকিয়ে ফেলুন। আমি চোখ বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। আমার চোখ বেধে দিন। 
কল্পকের কথা অনুসারে ওর চোখ বেঁধে রুমাল লুকিয়ে ফেলা হল। তারপর চোখ খুলে দেওয়া হল। কল্পক ভীড় কাটিয়ে এক ভদ্রমহিলার সামনে গিয়ে বলল, দিন, রুমালটা বের করে দিন। ওটা আপনার ব্লাউজের ভেতর লোকানো আছে। ভদ্রমহিলা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পেছন ফিরে রুমালটা বের করে দিলেন। এই ভদ্রমহিলা ছিলেন স্বর্নাশীষের বসের স্ত্রী। একটু বেশি চালাকি করতে গিয়ে সাত বছরের ছেলের কাছে বেশ বোকা বনে গেলেন উনি। উপস্থিত দর্শক মণ্ডলী তখন করতালি দিয়ে কল্পককে অভিবাদন জানাচ্ছে। 
এই ম্যাজিকটা কল্পক স্কুলেও দেখিয়েছে বহুবার। টিফিনের সময়, বা অফ পিরিয়ডে লোকানো পেন্সিল, ই-রেজার, পেন প্রভৃতি খুঁজে দিয়ে কল্পক ওর বন্ধুদের বার বার অবাক করে দিয়েছে। কল্পক মেধাবী ছাত্র না হলেও পড়াশোনাটা ও বরাবরই আন্তরিকতা ও দায়িত্বের সাথে করে। তাই প্রথম দশ জনের মধ্যে ওর নাম বরাবরই থেকে এসেছে। ওকে যে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা  স্বর্নাশীষ বা বিদুষী কারোর তরফ

থেকেই ছিল না। ছেলের এই পড়াশোনায় তারা খুশি। স্কুল থেকে পড়াশোনার জন্য কোনও পুরষ্কার না পেলেও বাবা মার থেকে বরাবর নতুন ক্লাসে ওঠার জন্য নিজের মনের মত পুরস্কার পেয়ে এসেছে কল্পক। শুধু পড়াশোনার জন্যই নয়, ছোটখাটো যে কোনো সাফল্যের জন্যই কিছু না কিছু উপহার ও পেয়েছে নিয়মিত। স্বর্নাশীষ প্রায়শই অফিস যাওয়ার সময় মানিব্যাগ, হাতঘড়ি, রুমাল প্রভৃতি খুঁজে পায় না। যথারীতি সেসব খুঁজে দেবার ভার পড়ে কল্পকের ওপর। ও সেটা দায়িত্বের সাথে পালন করে বাবার থেকে ক্যাটবেরী, আইসক্রিম প্রভৃতি আদায় করতে ভোলে না। স্বর্নাশীষও স্বেচ্ছায় সেই আবদার মেনে নেয়। তবে বিনা কারণে ছেলে কে সে কিছুই দিতে রাজি নয়। তার কথায়, জীবনে সবকিছুই অর্জন করে নিতে হয়। ফ্রিতে কিছুই পাওয়া যায় না। 

এমনভাবেই চলতে থাকল। ওরা তিনজন নিজেদের বাঁধাধরা রুটিনে বাধা থাকল ব্যস্ততার সাথে। তবে ছুটির দিনগুলিতে তিনজন একত্রে কখনও কোথাও বেড়াতে গিয়ে, কখনও সিনেমা দেখে, কখনও বা বাইরে কোথাও খেতে গিয়ে ছুটি উপভোগ করত।
কল্পকের ঈশ্বর প্রদত্ত গুণটির জন্য ওদের যেমন কিছু সুবিধে হয়, তেমনই অনেক ঝক্কি ঝামেলাও পোহাতে হয়। পাড়া প্রতিবেশীর কিছু হারিয়ে গেলেই কল্পকের ডাক পড়ে। কল্পক তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, যে জিনিস সে কখনও দেখেনি, সেটা তার পক্ষে খুঁজে দেওয়া সম্ভব নয়। 
তা বলে প্রতিবেশীর উপকারে কল্পক যে আসে না তা নয়। কল্পকের বয়স বছর দশ। ওদের অ্যাপার্টমেন্টের তিন পরিবার মিলে পৌষ মেলায় গিয়েছে। তিন পরিবার বলতে সপরিবারে স্বর্নাশীষ, বাবা মার সাথে অক্সিতা, আর বাবা মার সাথে পাঁচ বছরের আয়ুষ। আয়ুষ ছেলেটি বেশ চঞ্চল। ওকে পাশে দাঁড় করিয়ে, ওর মা কানের দুল কিনছিল। সেই সময়ে ও এক পা এক পা করে হাঁটতে হাঁটতে মেলার ভিড়ে এমন ভাবে হারিয়ে গেল যে ওকে আর খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না। কল্পক তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মেলায় ঘুরে, মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আয়ুষকে এনে ওর বাবা মার কাছে হাজির করল।  
যতই সেটা মানুষের উপকারে আসুক না কেন, দীর্ঘদিন ধরে শরীরের মধ্যে কোনও অস্বাভাবিক কিছু বয়ে বেড়ানো উচিৎ নয়। বিদুষীদের খুব তাড়াতাড়ি একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। বিদুষীর একজন কাছের বন্ধু এমন উপদেশই দিল। উপদেশটা ফেলে দিতে পারল না বিদুষী। তবে ওরা যে ব্যাপারটা নিয়ে ডাক্তারের সাথে আলোচনা করেনি তা নয়। ওদের পারিবারিক ডাক্তার কল্পকের এই আচরণের মধ্যে ক্ষতির কিছু দেখেনি। আর উনি বলেছিলেন যে, কল্পকের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখন বিদুষীরা দেখছে বয়স বাড়ার সাথে সাথে উপসর্গ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কল্পক এখন থেকে থেকেই জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। ইদানীং ওর নাকের অগ্রভাগ বেশ ঘামছে। কল্পকের এখন বয়স বারো বছর। এমন কিছু দেরী হয়তো এখনও হয়নি। বন্ধুর কথা মেনে স্থানীয় এক ডাক্তারের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করলে উনি সব শুনে একজন নাক-কান-গলার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাতে বললেন। কল্পককে একজন নামকরা নাক-কান-গলার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখানো হল। উনি নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কল্পকের এইরকম আচরণের কারণ বিষদে ব্যাখ্যা করলেন।  প্রায় বারো বছর ধরে মনের মধ্যে জমে থাকা প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পেলো স্বর্নাশীষ ও বিদুষী।
কল্পকের যেকোনো জিনিস সহজে খুঁজে পাওয়ার কারণ হল ওর তীব্র ঘ্রাণ শক্তি। সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কের তুলনায় প্রায় চল্লিশ গুণ বেশি অংশ কল্পকের মস্তিষ্কে ঘ্রাণ সংক্রান্ত কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ। মানুষের নাকে সাধারণত ষাট লক্ষ ঘ্রাণ রিসেপ্টর থাকে, কিন্তু এই ছেলের সেই সংখ্যাটা তিরিশ কোটির কাছাকাছি। তাছাড়া কল্পকের শ্বাস গ্রহণ আর ঘ্রাণ নেওয়ার পরি-কাঠামোটা আলাদা আলাদা ভাবে গঠিত। তাই ওর শ্বাস গ্রহণ, ঘ্রাণ গ্রহণ দুটোই অবিরাম চলতে থাকে। ক্রমাগত মিউকাস নিঃসরণের ফলে ওর নাকে ঘ্রাণ অণুগুলো আটকে থাকে, যা ওকে গন্ধ শুঁকে চিনতে সাহায্য করে।  
রাসায়নিক পরীক্ষা চালানোর জন্য স্বর্নাশীষ সম্প্রতি যে মডেলটি তৈরি করেছে সেটা সত্যি প্রশংসার দাবী রাখে। সেই সঙ্গে একটি নতুন কেমিক্যাল প্ল্যান্টের নকশাও প্রস্তুত করেছে ও। কিন্তু উচ্চমহলে প্রদর্শন করার দিন ওগুলোকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। নিজের ড্রয়ারে তালা বন্দীই করে রেখেছিল স্বর্নাশীষ। প্রতিটি ড্রয়ারের ডুপ্লিকেট চাবি রয়েছে অফিস অ্যাডমিনদের কাছে। কোনোভাবে সেই চাবি জোগাড় করে সবার অলক্ষ্যে সেগুলো সরিয়েছে কেউ। কিন্তু সে কে?
এই নকশা ও মডেল উচ্চমহল দ্বারা স্বীকৃত হলে স্বর্নাশীষের পদোন্নতির একটি সম্ভাবনা রয়েছে। সহকর্মীদের মধ্যে অনেকেই সেটা চায় না। তাই তাদের মধ্যে কেউ অতি দক্ষতার সাথে  নকশা ও মডেল ড্রয়ার থেকে অদৃশ্য করে পুনরায় সেই ড্রয়ার তালাবন্দি করেছে। 
স্বর্নাশীষের মাথায় যেন বাজ পড়েছে। কিছুক্ষণ নিজের চেয়ারে বসে কি করবে ভাবতে লাগল। না, এই ঘটনা কাউকেই জানালো না ও। বিশেষ প্রয়োজনের কথা বলে ঘন্টা খানেকের ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেল ও। বাড়ি থেকে কল্পককে নিয়ে অফিসে চলে এলো স্বর্নাশীষ। আসার পথে ছেলেকে তার বাবা অফিসে নিয়ে আসার কারণ বিস্তারিতভাবে বলেছে। কল্পককে হঠাৎ অফিসে দেখে সহকর্মীরা বেশ অবাক। কারো কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কল্পককে দিয়ে নিজের ড্রয়ারটিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করালো স্বর্নাশীষ। প্রতিটি জিনিষেরই আলাদা আলাদা গন্ধ রয়েছে। জিনিসগুলো ড্রয়ারে না থাকলেও তার গন্ধ এখনও ড্রয়ারে লেগে রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটা অনুধাবন সম্ভব নয়। সেই ঘ্রাণ ভালো করে অনুধাবন করে বাবার সাথে সারা অফিস ঘুরে বেরালো কল্পক। আর কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ ও খোঁজাখুঁজির পর স্টোর রুম থেকে স্বর্নাশীষের হারিয়ে যাওয়া জিনিস উদ্ধার করে কল্পক। 
স্টোররুমে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তা থেকে অপকর্মটি কে করেছে তা সহজেই জানা গেল। স্বর্নাশীষের দুটো সিট পড়ে বসা এক সহকর্মীর কাজ এটা। চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হল সেই লোকটিকে। 
স্বর্নাশীষের নকশা ও মডেল উচ্চমহলে বেশ প্রশংসিত হল। ফলস্বরূপ স্বর্নাশীষের জুটল পদোন্নতি। আর কল্পক? সে তার বাবার থেকে উপহার পেল একটি দামী ল্যাপটপ। সেই ল্যাপটপ নিয়ে ভীষণ খুশি সে। 
বাড়িতে ল্যাপটপ আসার খবর পেয়েই পাশের ফ্ল্যাটের অক্সিতা ছুটে এসেছে। দুজন মিলে অনেকক্ষণ ধরে চলল এই নতুন আনা ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রটির কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রকার পরীক্ষা নিরীক্ষা ও আলোচনা। একটা অন্যরকম খুশি মেখে রয়েছে দুজন। এটাই বোধহয় কল্পকের পাওয়া শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার। 
এই ঈশ্বর প্রদত্ত গুণের সদ্ব্যবহার করে ভবিষ্যতেও এমনভাবে মানুষের উপকারে আসতে চায় কল্পক। তবে কিছু পাওয়ার আশায় নয়, মনের তাগিদে। সেখানেই হবে এই গুণ লাভের প্রকৃত সার্থকতা।

Comments

Top

ভ্রমণ

বরফ-মরুর দেশে

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

বরফ-মরুর দেশে

অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়

বরোদা, গুজরাট

Baraf1.JPG
Baraf2.JPG

Spiti is “a world within a world” …….. “a place where Gods live”
                                                                          Rudyard Kipling, Kim

আসতে পারব, এমন নিশ্চয়তা ছিল না একেবারে গোড়ার থেকেই। সুযোগটা এসেছিল একেবারে হঠাৎ। একটা geological field workshop আয়োজিত হবার কথা, Association of Petroleum Geologists, বা সংক্ষেপে, APG-র তরফ থেকে, জুলাই ১১ থেকে ১৬, হিমাচল প্রদেশের স্পিতি উপত্যকায়। সময়টা ২০০৪ সাল, কর্মসূত্রে ভারতদর্শনে তখন আমার অবস্থান অন্ধ্রপ্রদেশের রাজামুন্দ্রী শহরে। এখান থেকে আমি ও শ্রীহরি রাও মনোনীত হয়েছি। যাবার রাস্তা মানালী থেকে রোহতং পাস ও কুনজুম পাস হয়ে, আরো ৪-৫ ঘণ্টার পথ পেরিয়ে, প্রায় তিব্বতের প্রান্তসীমায়। এদিকে খবরে শুনছি, উত্তর ভারতে ভারী বর্ষা – হিমাচলে বন্যা – বিপাশা নদীতে জলস্ফীতি, ইত্যাদি। বুঝতে পারছিলাম না, আদৌ দিল্লী থেকে এগোতে পারব কিনা আগে। তখন দিল্লী থেকে একটা ছোট dornier বিমান চলত, সিমলা ছুঁয়ে কুলু অবধি – আবহাওয়া ঠিক না থাকলে বা পর্যাপ্ত যাত্রী না পেলে মাঝেমধ্যেই সেটা বাতিলও হয়ে যেত! এই বর্ষায় পাহাড়ি পথ যতটা সম্ভব এড়ানোর চেষ্টাতে সেই ছোট্ট বিমানেই কুলুর পথে রওনা দিলাম। সমতল পেরিয়ে পাহাড়ের কাছে আসতেই ঢুকে পড়লাম মেঘের রাজ্যে – উপরে, নীচে, চারপাশে শুধুই সাদা/ধূসর তুলোর মত মেঘ। মাঝেমধ্যে মেঘের জানালা দিয়ে চকিতের মতো দেখা দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে কিছু পাহাড়ী ঘরবাড়ি/জলধারা/খেত ইত্যাদি। একসময়ে মেঘের ফাঁকে সাদার ঝলক দেখে বুঝলাম, এসে পড়েছি বরফের কাছাকাছি – ইন্দ্রাসন শৃঙ্গটি দেখেই চিনলাম, এবং আরো কয়েকটি শৃঙ্গ – যা বোধহয় মানালীর পশ্চিমে/দক্ষিণে আমরা দেখতে পাই। নতুন আশায় মন চনমনিয়ে উঠল – হিমালয় তাহলে দর্শন দিচ্ছেন – আমাদের আগামীর পথে স্বাগত জানাচ্ছেন! কেউ কেউ বলেন, দেবতাত্মা নিজে না চাইলে, মানুষ হাজার চেষ্টাতেও তার দর্শন পায় না। কুলু ও মানালীর মাঝামাঝি Bhuntarএ বিপাশা নদীর ধারে ছোট্ট এয়ারপোর্ট। নদীর একটা বাঁকের মুখ থেকেই রানওয়ে শুরু হয়েছে, তাই প্লেন নামার সময়ে নদীর জল প্রায় ছুঁয়ে ফেলতে ফেলতে হঠাৎ রানওয়েতে ঢুকে পড়ে। এখানে এসে খবর পেলাম, কুলু থেকে মানালী যাবার সোজা রাস্তাটি এখনো পুরোপুরি বাহনযোগ্য হয়ে ওঠেনি। চলতে হবে একটু ঘুরপথে – বিপাশার পূর্বধার দিয়ে, যে রাস্তা গেছে Naggar ও পাথরিকুল হয়ে। এ পথে পড়ে Roerich Estate – অতীতের বিখ্যাত সিনেমা শিল্পী দেবিকারানী ও তাঁর স্বামী, চিত্রশিল্পী Nikolai Roerich দের ব্যক্তিগত বাসগৃহ, যা এখন সংগ্রহালয় – দেখে নেওয়া হল সেটাও। 
পথের অনিশ্চয়তার কারণে মানালী এসে পড়েছি একদিন আগে, আজ ৯ জুলাই, শনিবার। অথচ APG নির্ধারিত হোটেলে আমাদের বুকিং রবিবার থেকে। কাজেই একদিনের মতো আশ্রয় নেওয়া গেল বিপাশা নদীর ঠিক পাশে সরকারী লজে। মনে পড়ল, যখন প্রথম মানালী আসি, ১৯৭৮ সালে, তখন এই বাড়িটি সবে তৈরি হচ্ছিল। সেই সময়ের মানালী ছিল একটা ছোট্ট ঘুমন্ত গ্রাম, চারধারে শুধু পাইন আর চীর এর শোভা – তার একমাত্র পর্যটকনিবাস ছিল এর ঠিক পাশের বাড়ীটি, এখন তার জীর্ণদশা - ব্যবহৃত হয় সরকারী ডরমিটরি হিসাবে। কিন্তু সেদিনের বিপাশা নদী তার স্বচ্ছ জলের অবিশ্রান্ত গর্জনের মাধুর্য হারিয়ে আজ বয়ে নিয়ে চলেছে শুধুই শহরের শ’খানেক হোটেলের বর্জ্য আর পঙ্ক! 
অসময়ের মানালী, রাস্তাঘাট ফাঁকা, যদিও দোকানীরা পসরা সাজিয়ে বসেছে অনেকেই। ভুটিয়া বাজারে এক বৃদ্ধ দোকানীর কাছে sleeping bag কিনেছিলাম বছর দুই আগে। সেই বৃদ্ধ এখনো রয়েছেন, এবং আশ্চর্য, সেই একই দামে সেই ব্যাগ বিক্রি করছেন! পরদিন সকালে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম হিড়িম্বা দেবীর মন্দিরে – আকাশছোঁয়া পাইনগাছের ঘন প্রহরার মাঝ দিয়ে রাস্তা – পর্যটকের অভাবে সে জায়গাও স্বভাবতঃই ফাঁকা। সংলগ্ন চত্বরে অন্যসময়ে মেলা বসে যায়। ফেরার বেলা পথসংক্ষেপ করার লোভে রাস্তা হারিয়ে ফেললাম আপেলবাগানের মধ্যে – অনেকটা উল্টো হাঁটতে হল। দুপুরের দিকে গিয়ে উঠলাম আমাদের নির্ধারিত হোটেলে – ম্যাল সংলগ্ন জনঅরণ্য থেকে অনেকটাই ওপরে উঠে এসে, বেশ অভিজাত হোটেলপাড়ায় – হোটেল Snowcrest Manor – মানালির হোটেলগুলির মধ্যে নাকি এটাই সবচেয়ে উঁচুতে! পাহাড়ের ঢালের ওপর হোটেল, চারপাশে ঘিরে রয়েছে আপেলবাগান, নেমে গেছে অনেক নীচে অবধি। বড় বড় পাতিলেবুর মাপের কচি কচি আপেলে সব গাছ ভর্তি। সামনে থেকে দেখা যায় গোটা মানালী শহরের বিস্তার, নীচে বিপাশা নদী, পেরিয়ে ওপারের পাহাড়, তার গা বেয়ে আমাদের আগামীর চলার পথ – রোহতং পাসের অভিমুখে।
একে একে আমাদের অন্য participants দের সঙ্গে দেখা হল। কেউ কেউ দীর্ঘদিনের চেনা, আবার পরিচয় হল অনেক নতুনজনের সঙ্গেও। বেশীরভাগ ONGC থেকেই, তবে কয়েকজন geologist অন্য কোম্পানী থেকেও এসেছে। আমাদের আগামী কয়েকদিনের পথের দিশারী হিসাবে এসেছেন Geological Survey of India বা GSI থেকে অবসরপ্রাপ্ত ডিরেক্টর, প্রবীণ ডঃ ভার্গব, যিনি এই অঞ্চলে কাজ করে চলেছেন বিগত প্রায় দুই দশক ধরে। স্পিতির geology বিষয়ে ডঃ ভার্গবকে একজন বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়। জায়গাটাকে চেনেন নিজের হাতের তালুর মতোই – যা আমরা পরের কয়েকদিনে প্রতিপদে টের পেয়েছি। আরও এসেছেন অধ্যাপক দিলীপ মুখোপাধ্যায়, IIT, Roorkee থেকে, যদিও শারীরিক কারণে তিনি আমাদের যাত্রাসঙ্গী হতে পারলেন না। এঁরা দুজনে জানালেন যেখানে যেতে হবে, সেই স্পিতি উপত্যকা ও সংলগ্ন পীন উপত্যকার বিষয়ে বিভিন্ন জ্ঞাতব্য বিষয়। জানালেন যাত্রাপথের নানান সাবধানতার কথা। আমাদের পথে পড়বে ১৩,০৫০ ফুট উচ্চতায় রোহতং পাস, এবং ১৪,৯৩০ ফুটে কুনজুম পাস – এইসব জায়গায় altitude sickness খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, তাই যথাবিহিত সাবধানতা অবলম্বন করা, কিছু কিছু শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলা খুবই জরুরী। তাছাড়া, দলের বেশীরভাগেরই জীবনে এই  প্রথম এতটা উচ্চতায় আসা। আমাদের মোট ২৬ জনের দলটি বিন্যস্ত থাকবে ৮টি গাড়ীতে। প্রত্যেক গাড়ীতেই থাকবে অক্সিজেনের বোতল, জল, ইত্যাদি। ভোর ছটার মধ্যে রওনা দিতে হবে, গন্তব্য Kaza পৌঁছতে বিকেল/সন্ধ্যে হয়ে যাবে। মানালী থেকে Kaza র দূরত্ব যদিও মাত্র ২০৫ কিমি – সমতলে ভালো রাস্তায় ওই দূরত্ব হয়তো ঘণ্টা তিনেকেই পৌঁছান যায়, কিন্তু এক্ষেত্রে পথের দুর্গমতার কারণে ৯-১০ ঘণ্টাও লেগে যেতে পারে। থাকতে হবে Kaza তে, ১৪,৫০০ ফুট উচ্চতায়, স্পিতি নদীর ওপর, তাঁবুতে। আমাদের প্রত্যেকের গাড়ীর নম্বর ও তাঁবুর নম্বর জানিয়ে দেওয়া হল। আমার গাড়ীর সঙ্গী মুম্বই থেকে আসা রোহিত কোটেচা, কুলকর্নি আর শ্রীহরি রাও। তাঁবুর সঙ্গী থাকবে চেন্নাই থেকে আসা গোপীনাথ ও অরিজিতদা।

সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ, মাঝেমধ্যে কুয়াশা, তারই মধ্যে রওনা দিলাম। মানালী ছাড়িয়ে, বিপাশা নদীর পূর্বধারে পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা ওপরে উঠতে লাগল। দুপাশের প্রহরী পাইন-বার্চ ও আপেল বাগানের সীমানা ছাড়িয়ে গাছপালাও ক্রমশঃ পাতলা হতে লাগল। দূরে দূরে এক-আধটা গ্রাম। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম মারহি – এখানে একটু থামা, প্রাতঃরাশ সাঙ্গ করে, ফের চলা শুরু। যত ওপরে উঠছি, হাওয়ার দাপট ক্রমশঃ বাড়ছে। কোথাও কোথাও অনেক ওপর থেকে ঝর্ণা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পথের পাশে, কখনো পথের ওপরেই – তার দুধ-সাদা ফেনার ওপর সূর্যের আলো এসে যেন শত-শত রামধনু তৈরী করছে! মাঝেমধ্যে দূর পাহাড়ের উঁচুতে মেঘ-বরফের লুকোচুরি দেখা দিতে লাগল। শ্রীহরি অত্যুৎসাহে ছবি তুলে চলেছে। কোটেচা তার সপরিবারে রোহতং ভ্রমণের গল্প শোনাচ্ছে। এ রাস্তা বছরের বেশীরভাগ সময়েই বরফে বন্ধ থাকে, কেবল জুন থেকে অক্টোবর যাতায়াত সম্ভব হয়। একসময়ে পথের পাশেই ধূলিমলিন বরফের দেখা পাওয়া গেল – ধূলোয় প্রায় লাল হয়ে গেছে, কাছে গিয়ে একটু খুঁড়লে, ভেতরের সাদা ঝকমকিয়ে উঠছে। হঠাৎ দেখি, রাস্তার দুপাশে প্রায় মানুষ-সমান উঁচু বরফের পাঁচিল, তার মাঝ দিয়ে রাস্তা। রোহতং পাস আর বেশী দূরে নেই। বরফ দেখার উত্তেজনায় high altitude সংক্রান্ত সব সতর্কীকরণ ভুলে গিয়ে সকলেই নেমে গিয়ে বরফের ওপর অল্পবিস্তর দৌড়ঝাঁপ করে নিলাম। রোহতং পাসকে বলা হয়, বৈচিত্র্যময় লাহু-স্পিতি উপত্যকার প্রবেশদ্বার। বিপাশা নদীর উৎপত্তিও এর কাছাকাছি, Beas Kund থেকে। উপকথায় আছে, একসময়ে লাহুলের মানুষজন পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে কুলু যাবার পথ না পেয়ে মহাদেবের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তখন নাকি মহাদেব পাহাড়ের মধ্যে পদাঘাত করে পথ সৃষ্টি করে দিলেন, তৈরী হল রোহতং গিরিবর্ত্ম! এতক্ষণ গিরিখাদের পাশ দিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ যেন একটা প্রায় সমতলভুমিতে এসে পড়লাম। চারিদিকে শুধু বরফ, মাঝে ছোট্ট মন্দির নাগদেবতার – সেটা প্রদক্ষিণ করে, তবে সব গাড়ীর আগে চলা। মরশুমে এখানে প্রচুর দোকানপাট বসে, তার চিহ্ন চারিদিকে ছড়ানো। থাকে স্কি করা, ঘোড়া বা ইয়াকের পিঠে চড়ার ব্যবস্থাও। আকাশ এখনো বেশ মেঘলা, যদিও ডঃ ভার্গব আশ্বাসবাণী শুনিয়ে চলেছেন যে স্পিতিতে ঢুকলেই একদম পরিষ্কার আকাশ পাওয়া যাবে।

Baraf3.JPG

রোহতং পেরিয়ে, পথ খানিকটা নীচের দিকে গেছে – ছোট্ট গ্রাম, গ্রামফু। এখান থেকে পথটা দুভাগ হয়ে গেছে – পশ্চিমে লাহু-স্পিতি জেলার সদর শহর কেলং হয়ে চলে গেছে কাশ্মীরের লে অবধি। একদা এটি ছিল পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম motorable রাস্তা। আর আমরা যাব পূর্বদিকে, চন্দ্র নদীর ধার দিয়ে। পথ অত্যন্ত খারাপ – মাঝেমধ্যে পুরো রাস্তাই ধুয়ে গেছে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণার জলে। খুব সাবধানে পার করতে হচ্ছিল গাড়িগুলোকে। এইরকম একটা জায়গায় আটকে গেল একটা গাড়ি – টাটা সুমোগুলো কোনক্রমে চলে এলেও, সবুজ কোয়ালিস গাড়িটা কিছুতেই নড়তে পারছিল না। একটা বড় বাসও আটকে পড়েছিল, অনেক স্থানীয় মানুষের সাহায্য পাওয়া গেল – কোনমতে উদ্ধার হোল সে যাত্রা। 
কোটেচা অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল, এবার একবার গাড়ী থামিয়ে হঠাৎ বমি করে বসল। আমাদের যাত্রায় altitude sickness এর প্রথম শিকার। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এই altitude sickness আটকাতে রসুন ভীষণ কাজে দেয়। আমি কাঁচা রসুন সঙ্গেই এনেছিলাম, মানালী থেকেই অন্যদেরও দিয়েছিলাম। কিন্তু শুদ্ধ নিরামিষাশী, পুরোদস্তুর গুজরাটি কোটেচাকে কিছুতেই দেওয়া যায়নি। দেখলাম, ও লাঞ্চপ্যাকটাও খোলেনি। ও খানিকটা সুস্থ হলে, আবার রওনা দিলাম – যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি চলতে থাকল গাড়ী। কুনজুম পাসের কাছাকাছি পৌঁছতে, মনে হল চারপাশের বরফাবৃত পাহাড়গুলো যেন একদম হাতের কাছে চলে এল। পাশেই দেখা গেল পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম হিমবাহ – Bara Shigri glacier। কুনজুম পাসের উচ্চতা ৪৫৫১ মি, বা ১৪,৯৩০ ফুট। একদম ওপরে এখানেও একটা ছোট্ট মন্দির – বোধহয় দুর্গার, এবং চারপাশে প্রচুর পতাকা টাঙানো রয়েছে। কুনজুম পাসের পূর্বদিক থেকেই উৎপত্তি স্পিতি নদীর – সোজা পূর্বমুখী গিয়ে Khab নামক এক জায়গায় গিয়ে পড়েছে শত নদীতে – শত তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশ করার ঠিক পরেই। এই স্পিতি নদীর অববাহিকা ধরেই আমাদের আগামী কয়েকদিনের পরিক্রমা – আমাদের এখানে আসার মূল উদ্দেশ্য। স্পিতি উপত্যকাকে বলা হয় museum of Indian Geology – হিমালয় পর্বতের উৎপত্তির বিভিন্ন পর্যায়গুলি এখানের ভূতাত্ত্বিক গঠনে যেমন সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে, তেমনটা আর কোথাও নেই। সেজন্যই APG এই অঞ্চলটাকে বেছে নিয়ে আমাদের ডেকে এনেছে কর্মজীবনের প্রাত্যহিকতার একঘেয়েমি থেকে – একটু তাজা অক্সিজেনের সন্ধানে!
কুনজুম পাস থেকে কিছুটা এগিয়ে আরেকটি ছোট্ট জনপদ, লোসার। স্পিতি/কিন্নরগামী সব বিদেশী পর্যটকদের এখানে নাম নথিভুক্ত করাতে হয়। আমাদের গাড়ীগুলোরও কিছু কাগজপত্রের কাজ রয়েছে, আমরা সেই ফাঁকে চা-পর্ব সেরে ফেললাম একটা ছোট দোকানে। ডঃ ভার্গব কাছেই একটা পাথরের মধ্যে কিছু ফসিলের নমুনা দেখালেন। মাঝেও কয়েকবার থেমে কিছু কিছু ভূতাত্ত্বিক গঠন দেখিয়েছেন। ওঁর মতে, স্পিতির বিশাল ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যকে ভালোভাবে দেখতে/জানতে হলে, অন্ততঃ বছর দেড়েক সময় দেওয়া দরকার। অথচ আমাদের হাতে সময় মাত্র চার-পাঁচ দিন! কাজেই, কয়েকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বা type area কোনমতে দেখা যেতে পারে।
কিন্তু ওদিকে কোটেচা এখন আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছে – কাজেই ঠিক হোল, আমাদের গাড়ীটা আর কোথাও না থেমে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব Kaza পৌঁছবে – সেখানে সরকারী হাসপাতাল আছে। এখন রাস্তা অনেকটাই সমতল, কারণ আমরা তিব্বত মালভূমির এক প্রান্তদেশে ঢুকে পড়েছি। একপাশ দিয়ে নদী বয়ে চলেছে, আর ছোট ছোট ঘাস ও প্রচুর নুড়িপাথরের মধ্যে দিয়ে সাপের মত এঁকে-বেঁকে চলে গেছে পিচ-বাঁধানো রাস্তা। ঘণ্টা দুয়েক পরে যখন Kaza পৌঁছলাম, তখন সবে অন্ধকার নামছে। ডাক্তার দেখে সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেন ও স্যালাইনের ব্যবস্থা করলেন, জানালেন severe dehydration হয়ে গেছে, রাতটা observationএ থাকা ভাল। তারপর আমাদেরও পরীক্ষা করলেন – রক্তচাপ প্রত্যেকেরই বেড়ে গেছে, এত উচ্চতায় এটাই স্বাভাবিক। কোটেচাকে ওখানে রেখে, রাতে ড্রাইভারের ওখানে থাকার ব্যবস্থা করে, ফিরলাম আমাদের তাঁবুতে। 
এখানে স্পিতি নদী অনেকটা চওড়া হয়ে গেছে, নদীর বুকে বিশাল বিশাল চড়া পড়েছে। সেইরকমই একটা চড়ায় আমাদের তাঁবুগুলো সাজানো হয়েছে। মাঝে একটা বড় রান্না/খাবার তাঁবু, তার চারপাশে আমাদের থাকার তাঁবুগুলো। একেকটাতে তিনজন করে থাকার ব্যবস্থা। আরেকপাশে টয়লেট ও স্নানের আলাদা কয়েকটা তাঁবু। সব জিনিসপত্র একদিন আগে বড় ট্রাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। জেনারেটর চালিয়ে হয়েছে আলোর ব্যবস্থা, আবার ছোট পাম্প চালিয়ে নদীর জল তুলে ট্রাকের ড্রাইভার কেবিনের মাথায় রাখা জলের ট্যাঙ্কে ওঠানো হচ্ছে। হাত ধোওয়ার জন্য দুটো washbasin রাখা, আছে জল গরমের ব্যবস্থাও, অভিনব কাঠের আগুনের geyser এ। থাকার তাঁবুতে তিনজনের খাট-বিছানা ছাড়াও, একটা ছোট টেবিল ও চেয়ার রাখা – নাঃ, এই দুর্গম অঞ্চলে এত সুন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য APG-র যতই প্রশংসা করা যায়, কম হয়!
লাহু-স্পিতি জেলার স্পিতি মহকুমার সদর শহর এই Kaza – ৩৬০০ মি উচ্চতায়, এখানেই রয়েছে পৃথিবীর উচ্চতম অবস্থানের পেট্রোল পাম্পটি। এখানের আরো একটি বিশেষত্ব – এত উচ্চতায় এটাই সম্ভবতঃ হিমালয়ের একমাত্র জায়গা যেখানে সারাবছর যাতায়াত করা যায়! আমরা যে পথে এলাম, সেটা ছাড়াও এখানে পৌঁছানোর আরো একটি রাস্তা আছে, সিমলা থেকে কিন্নর উপত্যকা হয়ে – সেপথে যেহেতু খুব উঁচু কোনো পাস ইত্যাদি নেই, সেটি প্রায় সারাবছরই খোলা থাকে। কিন্তু দূরত্ব এপথের দ্বিগুণেরও বেশী। এখান থেকে বেশ কয়েকটি ট্রেকিং রুট শুরু হয়েছে। কিছু হোটেল, সরকারী Rest House ইত্যাদিও রয়েছে। বেশ কয়েকজন বিদেশী/বিদেশিনীকে দেখলাম, ট্রেকিং করতে এসেছে। 
এই workshop এর আগে এবং পরেও, হিমালয়ের অনেক জায়গায় আমার ঘোরার সৌভাগ্য হয়েছে, কিন্তু এই অঞ্চলের চেহারা যেন একেবারেই অন্যরকম। চারদিকে শুধু ধূসর-বাদামী নেড়া পাহাড়, তাতে পাথরের চেয়ে মাটির প্রলেপই বেশী, কদাচিৎ অল্প কিছু গাছপালা দেখা দিচ্ছে মরুভূমির রুক্ষ সৌন্দর্য নিয়ে। শীতে তাপমাত্রা নেমে যায় শূন্যের বেশ কয়েকধাপ নীচে। এমনকি এখনো, সূর্যাস্তের পরেই বেশ ঠাণ্ডা থাকে। স্থানীয় মানুষজন খুব সহজ-সরল, সদা হাসিমুখ ও উপকারী। বৌদ্ধ ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ই আছেন। বৌদ্ধ গুম্ফাগুলি দেখলে বোঝা যায়, বৌদ্ধধর্মের একটি অন্যতম প্রাচীন ধারা এ অঞ্চলে সযত্নে সংরক্ষিত। 
পরের তিন-চারটে দিন যেন স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কেটে গেল – সকালে উঠে তৈরী হয়ে, গরম ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা দেওয়া, মাঝে ডঃ ভার্গব নির্দেশিত জায়গায় থামা, সেখানের study, আবার চলা। কোথাও চড়তে হচ্ছে পাহাড়ের ধাপ বেয়ে বেশ কিছুটা ওপরে।  অনেক রকমের আগে-না-দেখা ফসিল দেখলাম, বেশ কিছু geological features যা পাঠ্যবইতেই পড়া ছিল, দেখতে পেলাম চাক্ষুষ – যেন হিমালয়ের বিশাল ক্যানভাসে কোনো শিল্পীর সযত্নে আঁকা ছবি। কিছু বিশেষ প্রজাতির ফসিল – দেখিনি কখনো আগে – ডঃ ভার্গব খুঁজে খুঁজে দেখালেন। রাস্তা করার জন্য কোথাও কোথাও পাথর ভাঙা হয়েছে – সেখানে fresh exposure পেয়ে গেলাম অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম ফসিল কুড়োতে। মাঝেমধ্যে বেশ খানিকটা হাঁটতে হচ্ছিল, কোনো একটা বিশেষ feature খুঁজে পাওয়ার জন্য। একজায়গায় তো একটা বড় অঘটন থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেলাম। গাড়ী ছেড়ে আমরা একটা নড়বড়ে সাঁকোতে স্পিতি নদী পেরিয়ে অন্যপাশের পাহাড়ে চড়ছিলাম – খুব খাঁড়া, প্রায় vertical পাহাড়, একটু উঠেই কিছুক্ষণ থামতে হচ্ছিল। অথচ বর্ষীয়ান ডঃ ভার্গব দিব্যি উঠে যাচ্ছেন, প্রায় সবার আগে! শ্রীহরি একটু পিছিয়ে পড়েছিল ছবি তোলার জন্য। হঠাৎ দেখি ও নীচে থেকে চিৎকার করছে – আমাদের এক সঙ্গী এ কে সিং এর শ্বাস আটকে দুচোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে – অক্সিজেন দিলেও নিতে পারছে না! শেষে অনেক চেষ্টায় একবার শ্বাস নিতে পারল, আমরাও যেন প্রাণ হাতে ফিরে পেলাম! ওকে আরো একটা অক্সিজেন বোতল দেওয়া হল, ক্রমশঃ খানিকটা সুস্থ হয়ে উঠল। ওর সঙ্গে আরো দুয়েকজনকে নীচে রেখে, আমরা ওপরে যথাবিহিত study সেরে, এবার নামার সময়ে দেখি আরেক বিপত্তি – এত খাড়াই জায়গা থেকে নামার পথ পাই না! অনেক চেষ্টায় কোনোভাবে নামা গেল, কিন্তু ওদিকে আখতারদা রয়ে গেছে ওপরে – সাহস পাচ্ছেনা নামতে। আরো সমস্যা, জায়গাটাতে পাথর কম, বালি আর নুড়িই বেশি, আর অল্প কিছু ছোট ঘাস। অনেক মানসিক দাওয়াই প্রয়োগ করে, অবশেষে নামানো গেল!
সেইদিনই দুপুরের পর আমরা গেছিলাম এ অঞ্চলের প্রাচীনতম বৌদ্ধ গুম্ফা, Tabo Monastery তে। হাজার বছরের পুরনো, এর আদি স্থাপনা নাকি ৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে! পরে বিভিন্ন সময়ে আবার সংস্কার হয়েছে। ৩০৫০ মি উচ্চতায়, এটি বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম বৌদ্ধ গুম্ফা। আদি গুম্ফাটি বিরাট চওড়া মাটির দেওয়ালে ঘেরা ছোট মত ঘর, ঢুকতে হয় প্রায়ান্ধকার সুড়ঙ্গের মত একচিলতে জায়গা দিয়ে। ভেতরের দেওয়ালগুলো জুড়ে আছে অনেক চিত্রকলা, কোথাও এক ইঞ্চি জায়গা খালি নেই। রয়েছে নানান মূর্তি – বুদ্ধ, ও সেইসঙ্গে আরো অনেক দেবদেবী। এবং আশ্চর্য, সমস্ত মূর্তি আর paintings এর মৌলিক রং নাকি এখনো অবিকৃত রয়েছে! UNESCO থেকে World Heritage Site এর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এই “Ajanta of the Himalayas” কে! একপাশে রয়েছে প্রাচীন পুঁথি ও পাণ্ডুলিপির এক সংগ্রহশালা। জনশ্রুতি, বার্ধক্যে নাকি এখানেই অবসরযাপনের পরিকল্পনা দালাই লামার!
আরেকদিন field work শেষে পৌঁছে গেলাম Kibber নামের ছোট্ট একটা গ্রামে। ৪২০০ মি উচ্চতায় এটিই নাকি পৃথিবীর উচ্চতম motorable গ্রাম। রয়েছে বিজলিবাতিও। কিন্তু আমরা ওখানে পৌঁছতেই শুরু হয়ে গেল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ফলে বেশীক্ষণ থাকা গেল না। এখানেই আরেকটা মজার জিনিস দেখেছিলাম – এক পাহাড় থেকে দূরের অন্য এক পাহাড়ের গ্রামে জিনিসপত্র আদান-প্রদানের ropeway! ফেরার সময়ে দেখে নিলাম Kye Monastery – বিশ্বের নয়নাভিরাম গুম্ফাগুলির মধ্যে অন্যতম। স্পিতি উপত্যকার বৃহত্তম এটি, একটা ন্যাড়া পাহাড়ের ঢালে বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে বানানো। এখান থেকে পুরো উপত্যকা সুন্দরভাবে দৃশ্যমান। মূল গুম্ফার চূড়ায় ত্রিশূল দেখে বোঝা যায়, তিব্বতী বৌদ্ধরা শিবেরও উপাসক। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল, সাম্প্রতিক এক লেখকের শিব-সংক্রান্ত বিখ্যাত কল্পকাহিনীতে তিব্বতেরই কোনো এক অঞ্চলকে শিবের উৎপত্তিস্থল দেখানো হয়েছে! (Ref: Amish Tripathi, The Shiva trilogy)।
আজ এখানের শেষ রাত। সন্ধ্যায় campfire হোল, অনেকের বিবিধ সুপ্ত প্রতিভা বেরিয়ে এলো। এমনকি, বর্ষীয়ান ডঃ ভার্গব ও ডঃ শ্রীনিবাসনও নেচে নিলেন খানিকটা।! এবার যে যার ঘরে ফেরার পালা। অনেক কিছু পাওয়া ও আরো অনেক অপূর্ণতা নিয়েই পরদিন নেমে এলাম মানালী, সেই একই হোটেলে। রাতে valedictory function এ সবাই নিজস্ব মতামত জানালেন এই workshop নিয়ে, তবে একটা ব্যাপারে দেখা গেল সকলেই একমত – এরকম উদ্যোগ আরো বেশি, আরো ঘন ঘন হওয়া উচিৎ। কয়েকদিনের মিলনমেলা সাঙ্গ হল, বিসর্জনের বাজনা কানে নিয়ে, হিমালয়কে আরেকবার বিদায় জানিয়ে, সবাই যে যার রোজনামচার গন্তব্যে ফেরত চললাম।

Comments

Top

কবিতা

কবিতাঃ মধুসূদন গোস্বামী
কবিতাঃ সৌভিক সিকদার

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

মধুসূদন গোস্বামী

বেঙ্গালুরু

কান্না বারণ এখানে

কান্না বারণ এখানে -

সবাই যে জেনে যাবে আমি মৃত।

কেউ দাঁড়াবেনা তোমাদের পাশে-

আমি এখন এক অস্পৃশ্য ক্ষত।

অথচ এই তো সেদিন –

কান্নার সোরগোলে, মৃত্যুর হা্তছানি।

ঝাঁকে ঝাঁকে প্রতিবেশীকুল –

চোখে জল, হাহুতাস, সান্ত্বনার বাণী।

হিমঘরে দুদিনের বন্দীদশা –

সজ্ঞানে হয়েছে মনে, বেঁচে আছি ক্ষীণ ।

শ্বাস কষ্ট তবু মাঝে মাঝে –

নিঃশ্বেসিত বায়ুমন্ডল – শ্বাসবায়ু হীন।

 

বিশাল ধরার মাঝে –

অফুরন্ত প্রাণবায়ু, অপার ভান্ডার।

তবুও পা্রোনি দিতে বুক ভরা শ্বাস –

মানুষ না ভগবান- দোষ তবে কার?

মন চায় আরো কিছুক্ষণ –

অবশিষ্ট প্রাণবায়ু বিদায়ের বেলা,

উত্তরীয়ে ঢাকা হল আপাদমস্তক –

শেষ বুঝি তোমাদের কারিগরী খেলা?

কান্না বারণ এখানে –

আসবেনা কেউ ফুলের তোড়া হাতে,

চন্দনের টিপ দেবেনা কেউ।

আতর শিশি কেউ এনেছ সাথে?

ভয় ছিল সবাকার মনে –

আমার শেষ নিঃশ্বাস যদি বয়ে আনে,

শক্তিধর ভাইরাস যদি করে ভর-

তোমাদের সবাকার প্রাণে?

 

মৃত্যুহীন প্রাণ –

কে কোথায় দেখেছে কোনোদিন?

মরণের পরে তবু সহানুভূতি ছিল,

আজ শুধু ঘৃণা বহি দেহ হল লীন।

সৌভিক সিকদার

womenday.jpeg

নারী

মি মানি না কাঁটাতার
আমার সারা শরীরজুড়ে শুধুই স্বাধীনতার বিশাল পাহাড়।
রক্ত চক্ষু শয়তানের কারাগার ছেড়ে আজ আমি পলাতক..
ঈশ্বর তো আমার সাথেই,ভয় কি আমার হয়! 
বিপ্লবের রক্তমাখা রাত হোক, বা হোক রোমান যুদ্ধ আমি আবার হেরেও জিতবো চিরণ যখন আমার সঙ্গী।
মরে গিয়েও আমি আবার পুনরায় জীবিত হব।
ভেঙে দেবো সমাজে সব স্বার্থগণ্ডি।
পর্দা আমার চোখে নয় পুরুষ!তোমার চোখেই কামের কু-দৃষ্টি।
আমাকে শোষণ করেছো তুমি, বন্দী করেছো টারটারাস কারাগারে।
তাও আমি মুক্ত হবো পুরুষ!
দেবো মিথ্যা বিশ্বাস এর কাগজ সব জ্বালিয়ে।
আমি শকুন্তলা নই, না আমি সীতা আমি অনন্ত আগুনের সেই না বোঝা প্রদীপের জ্বলন্ত শিখা।                      

 

আজ আমায় পারবে না অন্ধকারে দমিয়ে দিতে না পারবে দিতে বনবাস 
আমি সেই মানুষ যে এক পুরুষ কেই রাখি গর্ভে ন’মাস।
আমি মানি না মিথ্যা আইন ঈশ্বর এর নকল বুলি,
ইন্দ্রও তো কামুক হয়ে যা।                                          

যখন আমি নিজের বস্ত্র খুলি।          

আমায় পারবে না চুপ করিয়ে রাখতে,              

না পারবে পাথর মেরে করতে হত্যা                          

আমি আবার পুনরায় জীবিত হবো পুরুষ,            

করে দেবো তোমাদের ঈশ্বর বিশ্বাস মিথ্যা।        

আমি সীতা নই আমি খাদিজা নই না আমি মেরী                                                          
আমি হলাম স্বাধীন আত্মা আমি হলাম নারী।

Comments

Top

গল্প 

শেষ প্রতিশোধ

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

শেষ প্রতিশোধ

পার্থ বোস

ব্যাঙ্গালর

talking1.jpeg

প্রদীপ্ত জেনেশুনেই পোস্টিংটা দিল্লীতে নিয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে চাকরী পেয়েছে সে। মনামি দিল্লী চলে যাবার পড় থেকে প্রদীপ্ত ফন্দি আঁটছিল কিভাবে দিল্লী যাওয়া যায়। কিন্তু এ কথাটা সে গোপন রেখেছে সকলের থেকে।
ফেসবুক, টুইটার, লিংকডিন, ইন্সটাগ্রাম কোথাও মনামির কোন হদিস সে পায় নি। তাই দিল্লীতে এসেই যতগুলো বাঙালি সংগঠন আছে কোন না কোন অছিলায় ফোন করে মনামির খোঁজ করছে তন্ন তন্ন করে। 
কথায় বলে টেলিপ্যাথির একটা জোর আছে। সেটা প্রমাণ হয়ে গেল – যেদিন হঠাৎ করে প্রদীপ্ত মনামির দেখা পেল।
প্রদীপ্ত দাঁড়িয়েছিল দিল্লীর চাঁদনি চকের মোড়ের কাছে অটো ধরবে বলে। হঠাৎ সে দেখতে পেল রাস্তার ঠিক বিপরীত দিকে মনামি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তা পার হবে বলে। 
নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না প্রদীপ্ত।
মনামি রাস্তা পার হয়ে আসতেই প্রদীপ্ত বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে একটু আদিখ্যেতা করেই বলল “আরে তুমি এখানে কি করে?  কেমন আছো? ”
সেই শুরু প্রদীপ্ত আর মনামির নতুন এপিসোড। প্রায় মাস খানেক হতে চলেছে ওরা প্রায়ই এখানে সেখানে দেখা করে গল্পগুজব করে।
প্রদীপ্ত অনেকবার চেষ্টা করেছে মনামি কোথায় থাকে জানতে - মনামি কিন্তু বলেনি। এ ব্যাপারে প্রদীপ্তর কোন তাড়াহুড়ো নেই। সে ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়েই এগোচ্ছে।
সেদিন বসেছিল চাঁদনি চকের কাছেই একটা কুলফি কাফেতে। সন্ধ্যে সবে সবে নেমেছে। বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পরছে। কিন্তু প্রদীপ্তর রোমান্টিক মনে তখন রোমান্সের তুফান খেলে চলেছে।
অনেকদিন ধরে চেপে রাখা কথাটা বেড়িয়ে এলো মুখ থেকে - “মনামি তোমাকে আমি তীব্র ভাবে ভালবাসি। সত্যি বলতে দিল্লী আসাই তোমার কারণে।” 
মনামি উত্তর করতে দেরি করল না এক সেকেন্ডও – “কিন্তু আমি তো তরুণের জন্যই অপেক্ষা করে আছি। আমার বিশ্বাস সে খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে।”
প্রদীপ্ত মনামির এই উত্তরটা একেবারেই আশা করেনি। তীব্র বিস্ময় নিয়ে সে বলল – “কিন্তু আমি তো শুনেছি ডাক্তার বলেছে তরুণ আর কোনদিনই ভালো হবে না।”
মনামি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মুচকি হেসে বলল “তুমি ভুল জানো। বিশ্বাস না হয় মৈনাককে ফোন করে তরুণকে দেখে আসতে বল না। তাহলেই জানতে পারবে।”
সেদিন সারা রাত প্রদীপ্ত ঘুমাতে পারেনি। এতো খাটাখাটনির পর শেষে এই ভাবে তীরে এসে তরী ডুবে যাবে? – প্রদীপ্ত মনামির উত্তরটা মেনে নিতে পারছিল না কিছুতেই। তাদের মাঝে সেই তরুন এখনও উপস্থিত – এটা ভাবলেই প্রদীপ্তর মাথা আগুন হয়ে উঠছিল। তার মনে পড়ে যাচ্ছিল প্রায় বছর চারেক আগেকার সব কথা।
কাঁকিনাড়ার বিবেক পল্লি – এই পাড়াতেই প্রদীপ্ত, তরুণ, মৈনাক এক সাথেই ছোট থেকে বড় হয়েছে। এই পাড়ার এক মাত্র ক্লাব - সুভাস সংঘ। এই ক্লাবের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে গান করার জন্য প্রদীপ্তর ক্লাস-ফ্রেন্ড মনামিকে নিয়ে এসেছিল পাড়াতে। সেই অনুষ্ঠানেই মৈনাক আর তরুণের সঙ্গে মনামির পরিচয়।
এদের এই তিন বন্ধুর মধ্যে তরুণ পড়াশুনা সবচেয়ে ভালো ছিল। সে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সাইন্সে বিই পরছিল। প্রদীপ্ত কমার্স নিয়ে ব্যারাকপুরের রাস্টগুরু সুরেন্দ্রনাথ এ ভর্তি হয়েছিল। মনামির সঙ্গে প্রদীপ্তর আলাপ এখানেই। মনামিও কাঁকিনাড়ার অন্য পাড়ায় থাকত । ফলে কলেজে এক সাথেই যাতায়াত করত তারা। মৈনাক ছিল কলকাতার বঙ্গবাসীর কমার্সের ছাত্র। প্রদীপ্ত, তরুণ, মৈনাক - এরা তিনজনই ছিল পাড়ার ক্লাব সুভাস সংঘের একটিভ মেম্বার। প্রদীপ্তর বাবা ছিল সুভাস সংঘের সেক্রেটারি।
তরুণ পাড়ার এক বিত্তশালী ফ্যামিলির ছেলে। বাবা মা দুজনেই কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মচারী। তরুণকে দেখতে শুনতে বেশ ভালো। ফর্সা রঙের সঙ্গে কোঁচকান চুল তরুণকে মেয়েদের কাছে আরও বেশী করে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। ফলে তরুণ মনামির বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রেমে পরিণত হতে বেশী সময় লাগেনি।
পূর্ব পরিচিত হলেও প্রদীপ্তর মনের খবর মনামি কোনদিনই রাখেনি। রাখলে জানতো ভগ্ন হৃদয় নিয়ে এক ব্যর্থ প্রেমিক সর্বদা হাসি মুখ নিয়ে তাদের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তরুণের সব ভালোর মাঝে তার এক বদ নেশা মনামিকে দুর্ভাবনায় ফেলেছিল। দুবেলা গাঁজা না টানলে তরুণ সুস্থ থাকতে পারত না। এ নেশাটা সে কলেজ ক্যাম্পাস থেকেই ধরেছিল। কোন কোনদিন নেশার পরিমাণ এতটাই বেশী হয়ে যেত যে তরুণ মনামির সাথে কথা বলতে বলতেই চৈতন্য হারিয়ে ফেলত। 
এই নেশা নিয়ে তাদের মধ্যে অশান্তি শুরু হয়েছিল বেশ কিছুদিন থেকে। মনামি রাগ করে কয়েকবার সম্পর্ক ভেঙ্গে দিয়েছিল। কিন্তু তরুণ এসে ধরত প্রদীপ্তকে। প্রদীপ্ত আবার মনামিকে বুঝিয়ে সুজিয়ে রাগ ভাঙ্গাত।
তরুণ বহুবার প্রতিজ্ঞা করেছে এই নেশা সে ছেড়ে দেবে। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। পরিমাণে কমালেও পুরো ছেড়ে দেয়া সম্ভব ছিল না তরুণের।
সেদিন তরুণের বাড়ীতে পার্টি ছিল। তরুণ অন ক্যাম্পাসে একটা নাম করা এম-এন-সিতে চাকরী পেয়েছিল। সে কারণেই পার্টি।
পার্টিতে পাড়ার জনা দশেক বন্ধুর সঙ্গে মনামিও নিমন্ত্রিত  ছিল। রাত তখন নটার আশপাস হবে। ফিস-ফ্রাই,  চিকেন কাবাব সহযোগে  কোল-ড্রিইংস আর বিয়ারের যথেচ্ছ ধ্বংসসাধন চলেছে। মনামি হঠাৎ আবিষ্কার করল তরুণ সেখানে নেই। খোঁজ করতেই দেখা গেল সে একলা দোতলার ছাদে বসে এক মনে গাঁজায় দম দিয়ে চলেছে। দেখেই মনামি রেগে অগ্নি শর্মা। বিস্তর চেঁচামেচি করে সে নিচে নেমেন এলো। খুঁজতে একাই গেছিল নেমে এলো একাই। কিন্তু এক তলায় নামার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক তীব্র আর্তনাদ শুনতে পাওয়া গেল।
দোতলার ছাঁদ থেকে পরে গেছে তরুণ। তবে পুরপুরি মাটিতে না পড়ে নারকেল গাছের একটা শক্ত পাতায় ঝুলে ছিল। কিন্তু তার মাথাটা কার্নিশে আঘাত লেগেছে তীব্র ভাবে। রক্তাত্ত্ব তরুণকে দেখে সবাই হতভম্ব।
দুমাস ধরে যমে মানুষে টানাটানির পড় যখন তরুণকে হসপিটাল থেকে ছাড়া হল, তখন সে নব্বই-ভাগ ব্রেইন ড্যামেজ বিশিষ্ট এক পারালাইসিস রুগী।
সকলের ধারণা হল ছাদে গিয়ে মনামি অত্যন্ত অশান্তি করার জন্য তরুণ সুইসাইড করার চেষ্টা করেছিল। মনামি এতটা বাড়াবাড়ি না করলেই ভালো হত।

তরুণের বাবা-মাও মনামির প্রতি প্রায় একই মনোভাব পোষণ করত। প্রদীপ্ত কিন্তু মনামির পক্ষ নিয়েই মনামিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল – মনামি যা করেছে যে কোন মেয়েরই সেটা করা উচিত ছিল। মনামি নিজে কিন্তু চরম আত্মগ্লানিতে ভুগছিল। মানুষের বক্র চাউনি আর হুল ফোটান কথায় মনামি কিন্তু কাঁকিনাড়ায় আর বেশিদিন থাকতে পারল না। এর মাস তিনেক পর একটা অনামি কলেজে এম-বিয়ে করতে সে দিল্লী চলে যায়। তারপর থেকে সে কোন দিন আর কাঁকিনাড়ায় ফেরেনি। এবং পূর্ব পরিচিত সমস্ত বন্ধু-বান্ধদের থেকে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। তরুণরাও কাঁকিনাড়া ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে কলকাতার মৌলালির কাছে একটা ফ্লাটে চলে আসে। আসলে তরুণকে প্রায়ই মল্লিক বাজারে অবস্থিত ইন্সটিটিউড অব নিউরোসাইন্স হসপিটালে মাস দু তিন বার আসতে হোত। কাঁকিনাড়া থেকে অত দূর যাতায়াত করে তরুণের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। তাই ওরা কাঁকিনাড়ার বাড়ীটা বিক্রি করে মৌলালিতে একটা ফ্ল্যাট কেনে যাতায়াতের সুবিধার জন্য। এরপর বিবেকানন্দপল্লির সবার মধ্যে থেকেই ধীরে ধীরে তরুণ আর মনামির স্মৃতি ম্লান হয়ে আসে। প্রদীপ্ত কিন্তু ভুলতে পারেনি মনামিকে। কিন্তু আজ এতো কিছুর পর মনামির মুখ থেকে তরুণের কথা শুনে প্রদীপ্ত সম্পূর্ণ দিশেহারা। কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। অনেক ভেবে প্রদীপ্ত মৈনাককে ফোন করল। কিন্তু সে আসল সত্যি কথাটা বলতে পারল না। প্রথমে কিছুক্ষণ খেজুরে আলাপ করে বলল “জানিস তো মাস খানেক আগে হঠাৎ করে মনামির সঙ্গে দেখা। তারপর থেকে ওর সাথে প্রায়ই দেখা হয়। কিন্তু কাল ও আমাকে হঠাৎ করে প্রপোজ করেছে। কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগছে। তরুণ যদি সুস্থ হয়ে এটা শোনে কেমন খারাপ লাগবে বলত। আমি সেটা ওকে বললাম। ও বলছে তরুণ কখনওই ভালো হবে না। আমি এটা ঠিক মেনে নিতে পারছি না। তাই তোকে বলছিলাম- তুই একবার মৌলালি তে গিয়ে দেখবি তরুণ কেমন আছে।” মৈনাক সর্বদা বন্ধুদের সাহায্য করার জন্য পা বাড়িয়েই থাকে– তাতে নিজের বা নিজের ফ্যামিলির কোন সমস্যা হলেও পরোয়া করে না। মৈনাক পরদিনই ছুটল মউলালি। তরুণরা মৌলালিতে শিফট হবার প্রথম প্রথম এক দু বার আসলেও মৈনাকের এই শেষ তিন বছরে আসা হয়নি একবারও। তরুণের বাবা তথাগত রায় মৈনাককে এতদিন পর দেখে একটু আশ্চর্য হল। মৈনাক তরুণ কেমন আছে জানতে চাইলে তথাগত যা বলল মৈনাক সেটা কোন দিন আশা করেনি। তথাগত বলল- “ভগবানের কাছে কি পাপ করেছি জানি না। নইলে ভগবান আমাদের এত কষ্ট দিচ্ছেন কেন? একটু আশার আলো দেখছিলাম বুজলে। এই তিন বছর ধরে ক্রমাগত ফিজিওথেরাপি আর মেডিসিন চলার ফলে তরুণ হাতের আঙ্গুলগুলো মাঝে মাঝে নড়াতে পারছিল। কিন্তু মাস ছয়েক আগে তরুণের জন্মদিনের দিন ওর মা একটা কেক বানিয়ে ছিল। ওর সামনে রেখে ওর হাত ধরে কেকটা কাটিয়ে কেকটা একটু মুখ দিয়েছিল ওর মা।

কি হল বুঝলাম না। হঠাৎ ওর চোখ উল্টে হাত পা বেঁকে কেমন বেহুশের মতো হয়ে পরল। সঙ্গে সঙ্গে হসপিটাল নিয়ে গেলাম। ডক্টর দেখে বলল একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে। ছেলের কোন সাড়া শব্দ নেই। শুধু নিশ্বাস পড়ছে। ডক্টর বলল বাহাত্তর ঘণ্টার পর জ্ঞান ফিরতে পারে। কিন্তু চার দিন পরও জ্ঞান ফিরল না। ব্যাঙ্গালর থেকে বড় ডাক্তার এল। সে চেক করে বলল - রোগী কোমায় চলে গেছে। এখান থেকে বেড়িয়ে আসা আর সম্ভব নয়। তরুণ সেই থেকে ঐ হসপিটালের একটা কেবিন এ শুয়ে আছে আজ ছ’মাস হল। ”মৈনাক তীব্র বেদনার সঙ্গে বলল “এত কিছু ঘটে গেছে আমরা তো কিছুই জানি না। একবার তো পাড়ার কাউকে ফোন করতে পারতেন।” তথাগত খুব বিতৃষ্ণার সঙ্গে বলল “তোমাদের ঐ বিবেকপল্লীর কিছু বিবেকহীন লোকের ফোন নাম্বার আমার কাছে ছিল। তাদের আর ফোন করতে ইচ্ছা করছিল না।” মৈনাক লজ্জিত মুখ নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিল। চোখ দুটো তার জলে ভরে গেছে। নিজেকে একটু সামলে বলল “মনামি এসেছিল তরুণকে দেখতে?” তথাগত বেদনাপূর্ণ গলায় বলল “ঐ অভাগী মেয়েটার কথা আর বলো না। খুব অন্যায় করেছি ওর সাথে আমরা সবাই।” মৈনাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করল “ওর সাথে অন্যায় হয়েছে! কি রকম?” তথাগত একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল “সে তো অনেক কথা। মনামি দিল্লী চলে যাবার পর থেকে প্রায়ই আমাকে ফোন করত তরুণ কেমন আছে জানতে। আমরা সত্যি বলতে ওর সঙ্গে ভালভাবে কথা পর্যন্ত বলতাম না। মনের মধ্যে একটা বিতৃষ্ণা কাজ করত। বাঙ্গালরের ডাক্তার তরুণকে দেখে যেদিন বলল ও পুরপুরি কোমায় চলে গেছে ঠিক সেদিনই মনামি আমাকে ফোন করেছিল। আমি তখন হসপিটালেই। আমি বললাম তিন চারদিন ধরে যা যা হয়েছে। ও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। আর বারবার বলতে থাকল আমি সেদিন কেন ওকে এভাবে বকতে গেলাম। এই বলতে বলতেই ফোনটা কেটে দিলো। আমি আর রিং ব্যাক করিনি। আর ভগবানের কি খেলা দেখ ঠিক সেই সময়েই আমার সাথে দেখা হল তোমাদের বিবেকপল্লীতেই আমার প্রতিবেশী ছিল রজত সাহার স্ত্রীর সঙ্গে।”
মৈনাক ঘাড় নেড়ে বলল “হ্যাঁ, হ্যাঁ রজতকাকুর তো স্ট্রোক হয়েছিল কয়েক মাস আগে।” তথাগত সম্মতির সুরে বলল “হ্যাঁ, উনি ওনার হাসব্যান্ডকে নিয়ে এসেছিল হসপিটালে। উনি আমাকে দেখেই কেঁদে ফেললেন। উনি যা বললেন তাতে তো আমি আকাশ থেকে পড়লাম। কাঁদতে কাঁদতে উনি বললেন – 'দাদা আমি ভয়ে এতদিন কিছু বলতে পারিনি। আজও আপনাকে সাহায্য করতে পারব না। তবু একটা গোপন কথা আপনাকে বলছি – যেদিন তরুণ ছাদ থেকে পড়ে যায় আমি ছিলাম আমার বাড়ীর ছাদে। আমি প্রায় প্রতিদিনই ঐ সময়টা ছাদেই একটু পায়চারি করতাম। আমার ছাদে আলো ছিল না। ফলে কেউ আমাকে দেখতে পাইনি। কিন্তু আমি সব দেখেছি। সেদিন মনামি নেমে যাবার পর পরই ছাদে প্রদীপ্ত উঠেছিল। তরুণ তখন ছদের রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল। প্রদীপ্ত এসেই পিছন থেকে তরুণকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েই নিচের সিড়িঁতে নেমে যায়।”
মৈনাক প্রায় চেঁচিয়ে উঠে বলল “সে কি প্রদীপ্ত এটা করেছে - ভাবতেই পারছি না।” তথাগত বলল “আমিও ভাবতে পারিনি। উনি আরো বললেন উনি নাকি এর আগেও দেখেছে প্রদীপ্ত পকেটে করে গাঁজা এনে তরুণকে দিত। মানে প্রথম থেকে প্রদীপ্তর ইনটেনশন ছিল তরুণকে শেষ করার।”
মৈনাক উত্তেজিত হয়ে বলল “আপনি এখনও এসব আমাদের পাড়ার কাউকে জানাননি কেন?”
-“কাকে জানাব? রজতবাবুর ওয়াইফ কোন অশান্তি চান না। উনি কোন সাক্ষী দিতেও পারবেন না। তাহলে আমি কিসের জোরে বলব। আর প্রদীপ্তর বাবা ঐ ক্লাবের সেক্রেটারি তার উপর উনি এক জন বিশিষ্ট পার্টি লিডার।”
মৈনাক নিজের হাত কচলাতে কচলাতে বলল “ব্যাপারটাকে এই ভাবে চুপ করে সহ্য করে যেতে হবে?”
তথাগত হতাশের সুরে বলল “প্রদীপ্ত এক সাথে দুটো পরিবারকে শেষ করল। আমাদের পরিবারের কথা তো শুনলে। এবার মনামিদের কথা বলি। রজতবাবুর ওয়াইফের সাথে কথা বলে বুঝতে পারি মনামির ব্যাপারে আমাদের কত ভুল ধারণা ছিল। আমি সে কথা বলব বলেই তখনই মনামিকে ফোন করি। ফোনটা ধরল ওর মা। উনি যা বললেন তাতে আমার স্ট্রোক হবার জোগাড়। আমার সাথে কথা বলার পরই মনামি রান্নাঘরে ঢুকে গায়ে আগুন দেয়। অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় ওরা ওকে তখনই হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছে। আমি আর থাকতে পারিনি। তরুণের সমস্ত দায়িত্ব ওর মায়ের উপর দিয়ে আমি সঙ্গে সঙ্গে প্লেনে করে দিল্লী চলে যাই। মেয়েটার কাছে আমাকে ক্ষমা চাইতেই হবে। দুদিন যমে মানুষে টানাটানি হল। সময় যত যাচ্ছে অবস্থার অবনতি হচ্ছে। এর মধ্যে আমি ডাক্তারকে বারবার অনুরোধ করি - আমি এক বার ওর সাথে কথা বলতে চাই। খুব অনুরোধের পর একটা সুযোগ মিলল। ডাক্তার বলল যতটা কম সময়ে নেয়া যায়। আমি দেখা করে ওকে বললাম প্রদীপ্তর এই শয়তানি। ও খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ল  –কিছু যেন বলতে চাইছিল। সারা মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠল। ওর তীব্র কষ্ট হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম। তারপর হঠাৎ করেই ও স্তব্ধ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নার্স -ডাক্তারবাবুদের দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না -  মনামি আমাদের ছেড়ে চলে গেল চিরতরে। আমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।”
কথা ছিল মৈনাক তরুণদের বাড়ী থেকে বেড়িয়েই প্রদীপ্তকে ফোন করবে। কিন্তু মৈনাকের ইচ্ছা করছিল না। রাগে দুঃখে তার ঠিক কি করা উচিৎ সে ভেবে পাচ্ছিল না। তাই সে তরুণদের বাড়ী থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছিল। কিন্তু অপরদিকে প্রদীপ্তর ধৈর্য বাগ মানছিল না। 
মোবাইলর রিঙটা বাজতে শুরুর করল। মৈনাক দেখল প্রদীপ্ত ফোন করেছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা ধরল। অপর প্রান্ত থেকে প্রদীপ্তর উত্তেজিত গলা ভেসে এলো – “কিরে, কি কথা হল? তরুণ কেমন আছে?”
মৈনাক তীব্র রাগকে চেপে স্বাভাবিক গলায় বলল – “তরুণ এখন বেশ ভালো আছে। ও খুব তাড়াতাড়ি কথাবার্তাও বলতেও শুরু করবে। আচ্ছা সত্যি করে বলত - তুই সত্যি কি মনামির সাথে কথা বলেছিস?”
‘তরুণ আবার কথাবার্তা বলতে শুরু করবে’ - এটা শুনেই প্রদীপ্তর মাথাটা ঘুরতে শুরু করেছিল। তবু নিজেকে সামলে বলল – “আরে হ্যাঁ রে। আমি অকারণে কেন মিথ্যা বলতে যাবো। “
মৈনাক বলল – “আমার মনে হয় তোর ডাক্তার দেখানো উচিৎ। তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কারণ মনামি ছয় মাস আগে মারা গেছে।”
প্রদীপ্ত তীব্র অবিশ্বাসের সুরে বলল – “কি বলছিস আবোল তাবোল। আমি তো আজ বিকালেও ওর সাথে কথা বলেছি।”
মৈনাক গম্ভীর গলায় বলল “তুই কার সাথে কথা বলেছিস- সেটা তুই আর তোর বিকৃত মস্তিষ্ক জানে। কিন্তু তুই আসল সত্যিটা শোন- মনামি আজ আর নেই। কিন্তু আজ আমরা সবাই জানি সেদিন রাতে তরুণকেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিল। তলে তলে তরুণকে কে গাঁজা সাপ্লাই করতো। তরুণ কথা বলতে শুরু করলেই আমরা কোর্টে যাবো।”
প্রদীপ্তর মুখে কোন উত্তর নেই। মৈনাকের কানে প্রদীপ্তর ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ার শব্দ আসছিল। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল – “তোকে আমি পড়ে ফোন করছি।”
মৈনাকের কাছে প্রদীপ্তর আর কোনদিন কোন ফোন আসে নি। কিন্তু একটা মর্মান্তিক খবর একটা ইংরাজি দৈনিকের মাধ্যমে দিল্লী থেকে আছড়ে পড়েছিল বিবেকপল্লীতে– দিল্লীর গীতা কলোনির এলেকার এক বহুতল ফ্লাটের ছাদ থেকে পড়ে এক বাঙালি যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু। মাথা সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। 
প্রাথমিকভাবে পুলিশের অনুমান যুবক আত্মহত্যা করেছে। ইদানীং যুবকের মস্তিষ্ক বিভ্রম দেখা দিয়েছিল। সে অফিস থেকে বেড়িয়ে রাস্তা ধারে দাঁড়িয়ে একা একা হাত পা নেড়ে কথা বলত। রেস্টুরেন্টে ঢুকে একটা টেবিল বুক করে দুজনের খাবার অর্ডার দিত। আর এমন ভাবে কথা বলতে বলতে খেত যেন তার সামনে কেউ বসে আছে।
দিল্লীতে যুবকের কোন বন্ধু বা পূর্ব পরিচিত কেউ ছিল না। পকেটে থাকা আইডি কার্ড থেকে অনুমান করা হচ্ছে যুবকের নাম – প্রদীপ্ত সরকার। একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে চাকরী করত।এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর সুভাষ
 সংঘ খুব ঘটা করে এক শোক সভা আয়োজন করেছিল। হাজার হোক ক্লাবের সেক্রেটারির ছেলের অকাল মৃত্যু - আয়োজন তো বড় হবেই। দুই মিনিটের নীরবতা পালনের সময় মৈনাকের চোখে-মুখে ছিল এক তৃপ্তির হাসি আর হাতে ছিল একটা চিঠি। যে চিঠিটা দু-এক দিন আগেই দিল্লী থেকে তার কাছে পৌঁছেছে। তাতে লেখা ছিল – “মাস পাঁচেক আগে আমি খুঁজে খুঁজে মনামির মামা বাড়ি গেছিলাম। সেখানেই শুনেছিলাম- মনামি মারা গেছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনি। আজও করি না। তুই ভাবছিস আমি পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু আমি মনামিকে দেখতে পাই। কিন্তু ঐ তরুণের জন্য ও আজও আমাকে পছন্দ করে না। আমি এটা মেনে নিতে পারি না। মনামি আমার। ওকে আমার থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। কিন্তু আজ হঠাৎ করে তরুণের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। এক সাথে কত খেলেছি, আড্ডা মেরেছি। আজ যেন বন্ধু হিসাবে একটা কর্তব্য অনুভব করছি - ওকে যে এভাবে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমাকে প্রতিশোধ নিতেই হবে। আর সেটাই হবে আমার শেষ প্রতিশোধ। – ইতি প্রদীপ্ত”

Comments

Top

গল্প 

সরস্বতীর অভিশাপ

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

সরস্বতীর অভিশাপ

বিবেকানন্দ পণ্ডা

হাওড়া, পশ্চিম বঙ্গ

teacher.jpg

ক শিমুলিয়া ভোলানাথ উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের গেট দিয়ে সকাল ১১টা নাগাদ তমোজিতের গাড়িটা যখন ভেতরে ঢুকছে তখন মাইকে বাজছিল "মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি।" কিন্তু পর মুহূর্তেই সব বদলে গেল, একটি ছেলে উত্তেজিত হয়ে ঘোষণা করতে লাগল " আনন্দ সংবাদ, আনন্দ সংবাদ, আমাদের মধ্যে এখন এসে গেছেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়, আমাদের প্রাক্তন ছাত্র, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী প্রফেসর তমোজিৎ প্রধান। তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছেন আমাদের সহকারী শিক্ষক তন্ময় দাস। "গাড়ি থেকে নামতে না নামতেই তন্ময় একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে স্বাগত জানালেন তমোজিৎকে, বললেন "আপনি যে আপনার সব ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে আমাদের স্কুলের প্লাটিনাম জুবিলিতে আসতে রাজি হয়েছেন তাতে আমরা অভিভূত।" ছাত্রছাত্রীরা সবাই দলবেঁধে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সবাই তাকে নিয়ে গেল প্রধান শিক্ষক সত্যজিৎ রায়ের কক্ষে। ছাত্রছাত্রীরা সুযোগ পেলেই তাকে প্রণাম করে যাচ্ছে। প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তখন সমস্ত শিক্ষক শিক্ষিকাদের ভিড়, তারা তাদের হাতের মোবাইলে অন্তত একবার বিশিষ্ট বিজ্ঞানীকে নিজেদের সঙ্গে একই ফ্রেমে বন্দি করতে চায়। প্রধান শিক্ষক একে একে সমস্ত শিক্ষক শিক্ষিকাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তমোজিৎ চারিদিকে তাকিয়ে তার পুরনো স্কুল জীবনটাকে একবার অনুভব করার চেষ্টা করে, পারে না, কত যে বদলে গেছে চারপাশটা। সেই ছোট স্কুল বাড়িটার পাশে উঠেছে একটা বিশাল বিল্ডিং। খেলার মাঠটা অনেক সুন্দর হয়েছে। আগে তো গোটা মাঠটা আগাছা আর ছোট বড় গাছে ছেয়ে থাকত। এখন গোটা স্কুলের চারিদিকে বিশাল পাঁচিল। স্কুলের মাঠের একপাশে বসেছে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় ভোলানাথ জানার মর্ম্মর মূর্তি।  
স্কুলের প্রাঙ্গণে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে চলছে সভার কাজ। তমোজিতের সঙ্গে একে একে এই চক শিমুলিয়া গ্রামের অন্যান্য বিশিষ্টজনদেরও মঞ্চে ডেকে নেওয়া হল। গতকাল শ্রীপঞ্চমী ছিল, এখনো ঠাণ্ডার রেশ রয়েছে। প্রধান শিক্ষক সত্যজিৎবাবুর ভাষণ দিয়ে সভার কাজ শুরু হল। তমোজিৎকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্বর্ধনা জানালেন প্রধান শিক্ষক, আর মানপত্র পাঠ করে তার হাতে সেটি তুলে দিলেন জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষিকা তমালী হালদার। নিজের পুরনো স্কুলে এসে এমন সম্বর্ধনা পেয়ে তমোজিৎ একেবারে অভিভূত। স্কুল সম্পর্কে বলতে উঠে গ্রাম প্রধান জগদীশ মালাকার জানালেন কি ভাবে এই স্কুল জেলার মধ্যে রেজাল্টের দিক দিয়ে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারপর তমোজিতের উদাহরণ দিয়ে সব ছাত্রকে উদ্বুদ্ধ করলেন। ক্রমে অন্য বক্তারাও স্কুল নিয়ে তাঁদের সুচিন্তিত মতামত রাখতে লাগলেন। তমোজিৎ বলতে উঠে বলল, "তোমরা আজ যারা ছাত্র, তারা শুধু একটা কথাই মনে রাখবে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন, আর তার মাধ্যমে নিজেকে সমাজের কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত করা। যে শিক্ষা সমাজের কল্যাণ করে না, মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায় না, তাকে শিক্ষা না বলে অশিক্ষা বলা উচিৎ। লেখাপড়া করে শুধু ভাল রেজাল্ট করলেই চলবে না, ভাল মানুষ হতে হবে।" চারিদিকে তুমুল হাততালি। এর শুরু হল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর সামনের সারিতে চেয়ারে বসে মাঘ মাসের মিঠে কড়া রোদে গা এলিয়ে দিয়ে তমোজিৎ ডুবে গেল ২৬ বছর আগে ছেড়ে যাওয়া তার স্কুল জীবনের স্মৃতিতে।
আজ সকালেই মুম্বাই থেকে ফ্লাইটে কোলকাতা আর তার পর প্রায় দেড় ঘণ্টার গাড়ি পথে চক শিমুলিয়া গ্রাম এসেছে তমোজিৎ। ক্লান্তি থাকলেও নিজের ছেড়ে যাওয়া গ্রাম, স্কুল দেখার উৎসাহেই সে ছুটে এসেছে এত দুরে। সেই কবে ছেড়েছে গ্রাম। বাবার ছিল ট্রান্সফারের চাকরি, বিডিও অফিসে কাজ। সেই সূত্রে একাদশ শ্রেণীতে এসে ভর্তি হয়েছিল চক শিমুলিয়া ভোলানাথ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। লেখাপড়াতে সব সময়েই সে ভাল ছিল, তাই এখানের সব শিক্ষক শিক্ষিকাদের বাড়তি নজর থাকত তার ওপর। স্কুলের ছেলে মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত বন্ধুত্ব আর গ্রামের খোলামেলা পরিবেশ কয়েকদিনেই আপন করে নীল তাকে। অনেক বন্ধুকেই মনে পড়ে আজ। সুনীল, নির্মল গৌর, নবীন, রবি, বনানী, অনামিকা, গীতা, সবাই এখন কে কোথায় কে জানে! ভেবেছিল এতদিন পরে নিজের স্কুলে পা দিয়ে হয়ত পুরনো কোন বন্ধুর দেখা পাবে। কাউকে না পেয়ে একটু হতাশই হল সে, আসলে ২৬ বছর সময়টা তো কম নয়। তাদের সময় বিজ্ঞান বিভাগের ক্লাসের মেয়েরা ডান দিকের বেঞ্চগুলোতে বসত, আর ছেলেরা বসত বাঁ দিকে। গ্রামের মেয়েরা একটু লাজুক প্রকৃতির, কথাবার্তা খুব কম হত। প্রথম প্রথম তো কোন মেয়ের সঙ্গেই তার আলাপ ছিল না।  
সেবার স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান বিভাগের সবাই রবি ঠাকুরের 'বিদায় অভিশাপ' কবিতাটা আবৃত্তি করবে বলে ঠিক করল। অনামিকা খুব সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করে, তাই সেই হবে দেবযানী। 'কচ' কে খোঁজার জন্য বাংলার স্যার মধুবাবু একে একে বিভিন্ন ছেলের টেষ্ট নিলেন। অবশেষে মধু স্যার 'কচ' হিসেবে তাকেই ঠিক করলেন। কবিতা বলতে উঠে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। কবিতার প্রথম দিকে তমোজিৎ ও অনামিকা ঠিকঠাক বলছিল। আবৃত্তির একজায়গায় অনামিকার কণ্ঠে দেবযানী বলে চলে, "সে কি আমি দেখি নাই? ধরা পড়িয়াছ বন্ধু, বন্দী তুমি তাই মোর কাছে। এ বন্ধন নাড়িবে কাটিতে। ইন্দ্র আর তব ইন্দ্র নয়।" এর পর কচে’র বলার কথা, "শুচিস্মিতে, সহস্র বৎসর ধরি এরই লাগি করেছি সাধনা?" কি যে হল তমোজিতের, ভুল করে বলে বসল, "অনামিকে, সহস্র বৎসর ধরি এরই লাগি করেছি সাধনা?" চারিদিকে হাসির রোল উঠল। মধুবাবু দরজার আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে কান মলে বলেছিলেন, "বাঁদর একটি।" কিন্তু তারপর থেকেই ক্রমে ক্রমে অনামিকার সঙ্গে দূরত্বটা কমতে থাকে। চলতে থাকে ক্লাস নোট দেওয়া নেওয়া। গ্রামের প্রায় সবাই চেনা, তাই তাদের চোখে ধুলো দিয়ে দুজনের কোথাও ঘুরে বেড়ান বা একান্তে সময় কাটানো প্রায় অসম্ভব ছিল। ক্লাস নোট দেওয়া নেওয়ার সময় চলত ছোট ছোট চিঠির আদান প্রদান, তার মধ্যেই ছিল নতুন প্রেমের শিহরণ। দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে একটা বছর কেটে গেল। স্কুলের সরস্বতী পূজোর দায়িত্বটা থাকত দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের ওপর। স্কুলের সেবারের নাটক 'আমি সিরাজের বেগম'। ক্লাসের পর চলতে থাকল রিহার্সাল। সিরাজের চরিত্রে নির্মল, বেগম লুৎফাঊন্নিসা হল অনামিকা। আর মোহনলালের চরিত্রে তমোজিৎ। গীতা ছিল ঘসেটি বেগমের ভূমিকায়। সুনীল ও গৌর যথাক্রমে মীরজাফর ও জগৎশেঠের চরিত্রে। রিহার্সাল শেষ হতে হতে সন্ধ্যে হয়ে যেত। অনামিকার বাড়ি বেশ কিছুটা দুরে জংগল পথে, রাতে একা মেয়ে যাওয়ার বিপদ অনেক, তাই প্রায়ই অনামিকাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে দিতে চলতে থাকত হৃদয় বিনিময়ের শেষ না হওয়া গল্প। অনামিকা বিজ্ঞানের ছাত্রী হলেও পাপ, অভিশাপ এগুলোকে খুব ভয় পেত। পূজোর আগের দিন অনেক কাজ, রিহার্সাল হবে রাত অবধি, তাই দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা সবাই রাতে স্কুল হস্টেলে থাকবে ঠিক করল। অনামিকা সেদিন এমন একটা আগুনরঙা ঝলমলে শাড়ি পরে এসেছিলো যে তমোজিৎ না তাকিয়ে থাকতে পারছিল না, বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল ওর দিকে। সারাদিনের বিভিন্ন পূজোর কাজ আর প্যাণ্ডেলের সাজ সজ্জার পর স্কুলের একটা ক্লাস ঘরে নাটকের অন্তিম রিহার্সাল শুরু হল। মধুবাবু ধরে ধরে সবাইকে শিখিয়ে দিচ্ছিলেন।   
"স্যার চলুন খাওয়ার আয়োজন হয়েছে" প্রধান শিক্ষক সত্যজিৎ রায়ের কথায় ঘোর কাটে তমোজিতের। অনেক রকম খাওয়ার আয়োজনই ছিল। সমস্ত শিক্ষক শিক্ষিকা, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী ও গ্রামের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে খাওয়ার খেতে খেতে আলোচনা চলছিল স্কুল নিয়ে। সত্যজিৎবাবু খেতে খেতে বললেন, "আজ রাতটা আপনাকে আমাদের এখানেই থেকে যেতে হবে। এই চক শিমুলিয়া গ্রামে তো আপনার থাকার মত কোন জায়গা সেরকম নেই, তাই আপনার থাকার ব্যবস্থা আমাদের অঙ্কের মাষ্টারমশাই তন্ময়বাবুর বাড়িতে করা হয়েছে, কিছু মনে করবেন না যেন।" 
"তা কেন, আমিও তো এই গ্রামেই কাটিয়েছি। তাছাড়া তন্ময়বাবুর বাড়িতে থাকলে রাতে অনেক গল্পই করা যাবে।"
বিকেলে ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলছিল। সন্ধের পর শুরু হল দু দুটো নাটক। একটা  ছাত্রছাত্রীদের আর একটা শিক্ষক শিক্ষিকাদের। ছাত্রছাত্রীরা অভিনয় করল 'বাঞ্ছারামের বাগান' আর শিক্ষক শিক্ষিকাদের নাটক 'ঝিন্দের বন্দী' । শিক্ষক শিক্ষিকাদের নাটক 'ঝিন্দের বন্দী'র শঙ্কর সিং এর চরিত্রে সত্যজিৎবাবু, কস্তূরী বাই এর চরিত্রে তমালী ম্যাডাম আর ময়ূরবাহনের ভূমিকায় তন্ময়বাবু। তন্ময়বাবু অসাধারণ অভিনয় করলেন। নাটক দেখতে দেখতে চেয়ারে তমোজিতের পাশে বসে জগদীশবাবু সমানে বক্‌ বক্‌ করে যাচ্ছিলেন। "আপনি অঙ্কের স্যার তন্ময়বাবুর বাড়িতে থাকবেন তো, ওখানে আপনার কোন অসুবিধা হবে না। তন্ময়বাবু খুব ভালো মানুষ, আর খুব ছাত্র দরদী, গরীব ছাত্রদের বাড়িতে ডেকে বিনে পয়সায় পড়ান।" 
"তাহলে তো তন্ময়বাবু খুব উদার হৃদয়ের মানুষ" যোগ করে তমোজিৎ। জগদীশবাবু   উৎসাহ পেয়ে বলতে থাকেন, "তা তো বটেই", তার পর গলা নামিয়ে বলতে থাকেন, "তবে একটা কথা শোনা যায় ওনার সম্পর্কে। সে অনেক আগে, তখন উনি কলেজের ছাত্র, গ্রামে ফিরছিলেন। হঠাৎ দেখেন একটা কম বয়সী মেয়ে সুবর্ণরেখার জলে ভেসে যাচ্ছে। উনি মেয়েটিকে উদ্ধার করে তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে তুলেন। মেয়েটি নাকি সুইসাইড করতে গিয়েছিল। চারিদিকে ঢি ঢি পড়ে গেল, এ মেয়ের বিয়ে হবে কি করে! সবাইকে অবাক করে দিয়ে কয়েক দিন পর তন্ময়বাবুই বিয়ে করলেন মেয়েটিকে। কে জানে কেন মেয়েটি সুইসাইড করতে গিয়েছিল! লোকে অনেক কিছুই বলে। অবশ্য অনেক বছর তো হয়ে গেল, গাঁয়ের পুরনো লোকজন ছাড়া আর বিশেষ কেউ এ ঘটনা জানেও না।" তমোজিৎ একটু অবাক হয়ে বলে, "জগদীশবাবু, লোকে যাই বলুক না কেন, তন্ময়বাবু ব্যাপারে আপনি যা বললেন, তাতে ওনার ওপর আমার শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেল।" নাটকের পর সব কুশীলবরা মঞ্চ থেকে নিচে নেমে এলে তন্ময়বাবু তমোজিতের দিকে তাকিয়ে বলেন, "চলুন, একটা রাত এই গরীবের বাড়িতে কষ্ট করে কাটিয়ে দেবেন। আপনার মত বিশ্ববরেণ্য মানুষের এক দিনের সাহচর্য্যে আমরা ধন্য হই।" তমোজিৎ একগাল হেসে বলে, "একি বলছেন আপনি? আজ আপনার যা অভিনয় দেখলাম তাতে তো আমার মনে হচ্ছিল যে স্টেজের ওপর ময়ূরবাহনের সাজে স্বয়ং সৌমিত্র চট্ট্যোপাধ্যায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাছাড়া ছাত্রবৎসল হিসেবে আপনার সুনাম এখন চারিদিকে। তাই আজকের রাতটা আপনার বাড়িতে কাটাতে পারলে আমি নিজেকেই ধন্য বলে মনে করব।" পাশ থেকে তমালী ম্যাম বলে ওঠেন, "স্যার, তন্ময়বাবুর মেয়ে গত বৎসর ডাক্তারি পাস করেছে। ওই আমাদের গ্রামের একমাত্র ডাক্তার, আপদে বিপদে আমাদের একমাত্র অবলম্বন।" রাতের খাওয়া শেষ করে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পাঁচ মিনিটেই তন্ময়বাবুর বাড়িতে পৌঁছে গেল তমোজিৎ। সুবর্ণরেখার পাড়ে বড় হাটটা ছাড়িয়ে ছোট্ট দোতলা বাড়ি। দরজা খোলাই ছিল। বারান্দার আলো এসে পড়েছে সামনের গোলাপ আর গাঁদায় ভরা বাগানে। তমোজিৎকে নিয়ে তন্ময়বাবু ঢুকলেন বাড়ির বৈঠক খানায়। ভেতর থেকে একটি বছর ২৫ এর মেয়ে বেরিয়ে এল, আলো আঁধারে তার মুখটা ঠিকমত দেখতে পায় নি তমোজিৎ। "এ আমার মেয়ে শ্রীময়ী, আর শ্রীময়ী ইনি হলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী তন্ময় প্রধান, উনি আমাদের স্কুলের প্লাটিনাম জুবিলি তে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছেন,"

নীরবতা ভেঙ্গে বলেন তন্ময়। শ্রীময়ী গড় হয়ে প্রণাম করে, আর তমোজিৎ শশব্যস্ত হয়ে ধরে ফেলে, "থাক মা থাক, দীর্ঘজীবী হও। তারপর তোমার ডাক্তারি প্র্যাকটিস কেমন চলছে?" কথা বলতে বলতে তিনজনই ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। বাড়ির টিউবের আলোতে এবার ভালো করে শ্রীময়ীকে দেখে তমোজিৎ। অনেকদিন আগে দেখা স্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া অনামিকার মুখটা মনের পর্দাতে ভেসে ওঠে। অনামিকার সঙ্গে এই মেয়ের মুখের গড়ন, চেহারার আদলে অদ্ভুত মিল। "মায়ের শরীরটা ভাল নেই, তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে।" শ্রীময়ী বলে চলে, "রাত হয়েছে, আপনিও ক্লান্ত, চলুন আপনাকে শোয়ার ঘর দেখিয়ে দিই।"  তন্ময় বলে ওঠে, "হ্যাঁ তাই ভাল, আপনি শুয়ে পড়ুন, কাল সকালে মিতু, মানে আমার স্ত্রীর সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দেব।"
সারাদিনের ছুটোছুটিতে তমোজিৎ সত্যি খুব  ক্লান্ত ছিল, তাই আর না কথা বাড়িয়ে শোয়ার ঘরে পা বাড়ায়। বিছানায় শুয়ে কিন্তু ঘুম আসে না। জঙ্গল ঘেরা আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা সুবর্ণরেখার দৌলতে এই চক শিমুলিয়া গ্রামে জানুয়ারীর শেষেও হাড় কাঁপুনি ঠাণ্ডা। বাইরে একটানা ঝিঁঝিঁ ডেকে চলেছে, সঙ্গে হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ। শেয়ালের ডাকও শুনতে পেল একবার। কেমন একটা অস্বস্তি মনের গভীর থেকে পাক খেতে খেতে গলা দিয়ে দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার জীবন এতদিন স্ত্রী প্রতিভা আর ছেলে বিকাশকে নিয়ে সুখেই কেটেছে। ছেলে সেট পরীক্ষা দিয়ে আমেরিকায় পড়ছে। প্রতিভা একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে। গবেষণা, সুনাম, অর্থ, সব কিছু  সবসময় তার পেছনে ধাওয়া করেছে, কোন পুরনো স্মৃতি সেভাবে কখনো তাকে বিব্রত করে নি। আজ কিন্তু বার বার তার মনে পড়ছে অনামিকার কথা, বিশেষ করে স্কুলে সরস্বতী পূজোর সময়কার কথাটা।  
পূজোর আগের রাতে রিহার্সাল শেষ হতে হতে রাত ১১ টা। নির্মল, গৌর, গীতারা খাওয়ার জন্য হোস্টেলে চলে গেলেও রাতে নির্জন ক্লাস ঘরে তখনো বসে থাকল শুধু তমোজিৎ আর অনামিকা। ক্লাস ঘরের এক কোনে রাখা ছিল সরস্বতী প্রতিমা, ঠিক হল পরদিন ভোর ভোর প্যান্ডেলে প্রতিমা রাখা হবে। অনামিকা তাড়া লাগায়," কিরে, খাবি চল?" তমোজিৎ মুচকি হেসে বলল, দাঁড়া, দাঁড়া,  দুদিন পরে হায়ার সেকেণ্ডারী পরীক্ষা, পড়া না করে মা সরস্বতীর সামনে রাত জেগে রিহার্সাল করছি, মায়ের কাছে প্রার্থনা করে একটু পাপটা কমিয়ে নি।" অনামিকা একটা বেঞ্চের ওপর চড়ে বসে পা দুলোতে দুলোতে ব্যাঙ্গের সুরে বলে, "তুই পাপের ভয়ে প্রার্থনা করবি? যাক্‌ তোর যখন শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে, তাহলে আমার হয়েও একটু প্রার্থনা করে দিস, যাতে আমার পাপটাও কম হয়।" তমোজিৎ মজা করে বলেছিল, "তুই যা সেজে এসেছিস তাতে তোকেই একটা জ্যান্ত সরস্বতী মনে হচ্ছে। মা তোর সব দোষ এমনিতেই মাফ করে দেবেন।" ঘরের কোনে রাখা মূর্তিটার দিকে দেখিয়ে সে বলেছিল, "আমি ওই মাটির সরস্বতীর কাছে কিছু চাই না, জ্যান্ত সরস্বতীর কাছেই আমার মনের কথা জানাচ্ছি।" কথাগুলো বলেই হাঁটু গেড়ে বসে গিয়েছিল অনামিকা পায়ের কাছে। অনামিকা হেসে ফেলেছিল, তারপর সরস্বতীর ভঙ্গিমায় হাত তুলে গম্ভীর হয়ে বলে ওঠে "তথাস্তু:, এখন বল বৎস, কি তোমার মনো বাঞ্ছা?" সেই নির্জন ক্লাস রুমে তমোজিতের মাথাটা তখন কেমন দপদপ করে ওঠে, সারা শরীরে যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ। টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায় সে। তারপর সটান এগিয়ে গিয়ে দুহাতে জাপটে ধরে অনামিকার মাথা, মুখ নিচু করে আলতো করে ঠোট ছোঁয়ায় অনামিকার কপালে। থরথর করে কাঁপতে থাকে অনামিকা, কাঁপাকাঁপা গলায় বলে, "কি করছিস তুই, সামনেই যে মা সরস্বতী!" তমোজিতের সারা শরীরে তখন আগুন, ফিসফিসিয়ে বলে, "ওটা মাটির পুতুল, তুই ই আমার সরস্বতী।" তার পরের আধ ঘণ্টায় শরীরের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেল স্থান, কাল, ন্যায়, অন্যায়, ভাল মন্দ, অতীত, বর্তমান সব সবকিছু। আগুন যখন নিভল তখন কেউই আর কথা বলার মত অবস্থাতে ছিল না। শুধু হোস্টেলে ফিরে যাওয়ার আগে ফোঁপাতে ফোঁপাতে অনামিকা বলেছিল, "তুই কেন এমন করলি তমোজিৎ, শেষ পর্যন্ত মা সরস্বতীর সম্মুখে এমন কাজ! আমাদের পাপের বোঝা যে অনেক ভারী হয়ে গেল রে, দেবতার রোষ থেকে আমরা বাঁচব না।" সেদিন তমোজিৎ একটাও কথা না বলে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
পরদিন পূজোর সময় দু একবার অনামিকার মুখোমুখি হলেও সবাই সাথে থাকায় আর কোন কথা হয় নি দুজনের। রাতে মঞ্চস্থ হল 'আমি সিরাজের বেগম'। নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে বার বার তাল কাটতে থাকে তমোজিৎ ও অনামিকার। গীতা তো একবার গ্রিনরুমে বলেই ফেলল, "কি হয়েছে বলত তোদের দুজনেই, এত ভুলে যাচ্ছিস কেন?" নাটকের পর তমোজিতকে একা পেয়ে অনামিকা মৃদুস্বরে বলে "আমরা কিন্তু কাজটা ঠিক করি নি, এর ফল যে কি হবে কে জানে!" তমোজিৎ কি বলবে খুঁজে পেল না, কিছু সময় চুপ করে থেকে বলল, "পরীক্ষার আর বেশি বাকি নেই, এখন ওসব ভুলে যা লেখাপড়ায় মনে দে, দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে।" অনামিকা একটা শ্লেষের হাসি দিয়ে বলেছিল, "ভুলে যা কথাটা ছেলেরা যত সহজে বলতে পারে মেয়েদের পক্ষে ভুলে যাওয়া টা ততটাই কঠিন।" চক শিমুলিয়াতে এর পরের দিনগুলো খুব দ্রুত কেটে যায় তমোজিতের। উচ্চমাধ্যমিকে ভাল ফল করে আই আই টি মুম্বাইতে পড়তে যায় তমোজিৎ। অনামিকাও ভাল ফল করেছিল, তবে তমোজিতের বাবার ট্রান্সফার হয়ে যাওয়ায় চক শিমুলিয়ার সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায় তমোজিতের, তাই অনামিকার ব্যপারে আর কোন খবর পায় নি। বরং বলা ভাল খবর পেতে চায় নি। আসলে ওই রাতের ঘটনার পর তার মনে একটা অপরাধ বোধ তৈরি হয়েছিল, তাই কোনদিনও অনামিকার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে নি, বরং নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। ভয়ে অনামিকার কথা সে ভাবতে চাইত না। এই গ্রামে এসে আর তারপর শ্রীময়ীকে দেখার পর না চাইলেও আবার পুরনো কথাগুলো তার মনে ভিড় জমিয়েছে। ভাবতে ভাবতে তমোজিতের গলা শুকিয়ে কাঠ। উঠে জল খেয়ে আবার ঘুমোনোর চেষ্টা করে। চাকরি, গবেষণা, সংসার এ সব নিয়েই এতদিন মেতে ছিল সে, অনামিকার কথা তো এতদিন তাকে নাড়া দেয় নি! চক শিমুলিয়াতে এবার না এলেই বুঝি ভাল হত। 
পরদিন সকালে উঠে স্নান করে পোষাক পরে তৈরি হয় তমোজিৎ, কোলকাতা থেকে দুপুরের ফ্লাইট ধরতে হবে। শ্রীময়ী চা নিয়ে আসে, "বাবা আর মা আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে, আসুন ব্রেকফাস্ট করবেন।" শ্রীময়ী মেয়েটা কিন্তু বেশ, খুব প্রাণোচ্ছল, হাসিখুশি, দেখলে শুধু যে অনামিকাকে মনে পড়ে যায় তা নয়, কেমন যেন স্নেহের বাঁধনে বাঁধতে ইচ্ছে হয়। এসব ভাবতে ভাবতে তমোজিৎ চা শেষ করে শ্রীময়ীর সাথে এসে উপস্থিত হয় ডাইনিং হলে, একটু দূরে চেয়ারে চোখে চশমা দিয়ে এক মধ্যবয়সী মহিলা বসে আছেন। তমোজিৎকে দেখেই এগিয়ে আসেন তন্ময়। "আসুন তমোজিৎবাবু, পরিচয় করিয়ে দি," ভদ্রমহিলার দিকে ইঙ্গিত করে বলে," আমার স্ত্রী মিতু মানে...।" কথা শেষ হওয়ার আগেই ভদ্রমহিলার দিকে হাত জোড় করে এগিয়ে যায় তমোজিৎ। ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বলেন "কেমন আছেন প্রফেসার, আমি অনামিকা।" অনামিকাকে দেখে তমোজিৎ থ হয়ে যায়, মুখের ভাষা হারিয়ে গেছে, কোনক্রমে প্রতিনমস্কার করে। মনের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর আলোড়ন, 'এ যে সত্যিই অনামিকা, চুলে সামান্য পাক ধরেছে আর শরীর কিছুটা ভারী হয়েছে আগের থেকে, তবে চিনতে কোন অসুবিধা হয় না।' অনামিকা বলতে থাকে, "বসুন প্রফেসর, আসলে গতকাল রাতে আমার শরীরটা ঠিক ছিল না, তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিলাম।"

তমোজিতের কথা হারিয়ে গেছে, অনামিকা একতরফা কথা বলে চলে আর তমোজিৎ কোনদিকে না তাকিয়ে মাঝে মাঝে সৌজন্যমূলক হুঁ হাঁ বলে খাওয়া চালিয়ে যাচ্ছিল আর বোঝার চেষ্টা করছিল, 'অনামিকা কি সত্যিই তাকে চিনতে পারে নি, না অভিনয় করে যাচ্ছে তার সাথে। তন্ময়বাবু ও কি তাদের সম্পর্কের কথা কিছু জানেন না?' এখন মনে হচ্ছে যত তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালাতে পারবে ততই মঙ্গল। "বুঝলেন প্রফেসার আমার মেয়ে যেদিন জন্মালো সেদিন মহাষষ্ঠী, মনে হল মা দুর্গা এলো আমার কোলে, নাম রাখলাম শ্রীময়ী।" অনামিকা বলে চলে, "সময় কত তাড়াতাড়ি ছুটে চলে, আমার সেদিনের সেই একরত্তি মেয়েটা এখন ডাক্তার, গত পূজোয় ২৫ বছর পূর্ণ করল। মেয়ের তো এবার বিয়ে দিতে হবে। জগৎটা খুবই জটিল। এত খারাপ মানুষের মাঝে একটা ভাল মানুষ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন।" তমোজিতের মনে হতে লাগল সবার উপস্থিতিতে অনামিকা একটা কসে থাপ্পড় বসাল তার গালে, গলা দিয়ে খাওয়ার আর নামতে চাইছে না। বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসে তাড়াতাড়ি, বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িতে ওঠার আগে তন্ময়বাবু বলেন, "বিয়ের আগে একটা বড় দুর্ঘটনাতে পড়ে অনামিকা, তার পর থেকেই ওর কিছুট মানসিক সমস্যা দেখা দেয়, পুরনো সব কথা মনে করতে পারে না। যাই হোক আমাদের চক শিমুলিয়া স্কুলের পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, সময় পেলে আবার আসবেন, আমাদের ছেলে মেয়েরা আপনাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হবে।" 
দুদিকে ফাঁকা মাঠ আর জংগলের মাঝ দিয়ে হু হু করে এগিয়ে চলে গাড়ি। পেছনের সিটে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে তমোজিৎ, মনের মধ্যে হাজার চিন্তার ঝড়। আজ থেকে ঠিক ২৬ বছর আগে সে ছেড়েছে চক শিমুলিয়া গ্রাম। অনামিকার মেয়ে শ্রীময়ী-র বয়স ও ২৫ হল। জানুয়ারীতে সরস্বতী পূজো হওয়ার প্রায় নয় সাড়ে নয় মাস পরে হয় অক্টোবরের দুর্গাপূজা। কথাগুলো মনে হতেই তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নিচে নেমে যেতে থাকল। তাহলে কি শ্রীময়ী শুধু অনামিকার মেয়ে নয়, সে কি তারও...। না আর ভাবতে পারছে না সে। এখন এই কষ্ট আর কাপুরুষতা নিয়ে তাকে সারা জীবন কাটাতে হবে? নিজের মেয়ে হলেও শ্রীময়ীকে সে মেয়ের পরিচয় দিতে পারবে না! তার জন্যই তাহলে অনামিকা সুইসাইড করতে গিয়েছিল! সে তো তাহলে খুনি! চক শিমুলিয়াতে এসে যে চরম সত্যের মুখোমুখি তাকে হতে হল, তাতে তার এতদিন ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা সব ইমেজ কেমন যেন এক লহমায় চুরচুর হয়ে ধুলোয় লুটয়ে পড়ল। মনে হতে লাগল এই গ্রামের সবাই হয়ত জানে ঘটনাটা, তাই স্কুলের সবাই তাকে সম্বর্ধনা দিয়ে চরম উপহাস করল। তন্ময়বাবুও কি পিছন ফিরে হাসছিলেন তাকে দেখে? সবার কাছে তো সে এখন এক ভয়ঙ্কর শয়তান, আর তন্ময়বাবু এক মহামানব যে তার ওগরানো বিষ গলায় ধারণ করে নীলকণ্ঠ হয়েছে। তার এই শিক্ষা, সম্মান, গবেষণা সব, সব আজ মিথ্যে হয়ে গেল। মা সরস্বতীর মূর্তির সাক্ষাতে ২৬ বছর আগে মুহূর্তের উত্তেজনায় যে অন্যায় সে করেছিল এতদিন পর তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে কি চরম সাজা দিলেন তিনি! চোখ খুলে গাড়ির কাচ দিয়ে বাইরে তাকাল তমোজিৎ। পথের ধারে কতকগুলি মলিন বসনের গাঁয়ের ছেলে মেয়ে নাচতে নাচতে তালি দিয়ে খেলা করছে। তমোজিতের যেন কানে এসে লাগল ওরা সবাই তালি দিয়ে বলছে, "দ্যাখ দ্যাখ, ওই নোংরা লোকটা একটা পরিষ্কার মানুষের পোষাক পরে কেমন ভয় পেয়ে পালাচ্ছে, পাছে কেউ চিনে নেয়।" চোখ ঘুরিয়ে নেয় জানালার কাঁচ থেকে, মাথা বোঁ বোঁ করছে। প্রচণ্ড ঘামছে সে, আর বিড়বিড় করে বলছে, "অনামিকা আমায় ক্ষমা কর। আমি জানি তুমি আর শ্রীময়ী দুজনেই তন্ময়বাবুর কাছে ভাল আছ। হে ঈশ্বর আমায়  শান্তি দাও, আমায় শান্তি দাও।"

Comments

Top

অনীক চক্রবর্তী

হায়দ্রাবাদ

কবিতাঃ অনীক চক্রবর্তী

কবিতা

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

রুদ্ধ
 

লো একটা সিগারেট ধরাই ইরিনা রাতুশিনস্কায়া *
যেমন তুমি চেয়েছিলে.......
অন্তত ধোঁয়াগুলোকে মুক্তি দিই 

একটাও চড়ুই আসেনা এখানে আর
বিষণ্ণ বসন্ত গেলে রুগ্ন বর্ষা শুধু
আর কঠিন উত্তাপ ছড়ায় সূর্যের বরফ্শীতল হৃদয়
এই দোরগোড়ায়
ততটুকুই স্মৃতি
কুড়িয়ে বাড়িয়ে যতটুকু সঞ্চয়
রুটির টুকরো

চলো একটা সিগারেট ধরাই
অন্তত স্মৃতিগুলোকে মুক্ত করি
এ কারাবাসে

একটাও চড়ুই আসেনা
এখানে 
কম দামে জীবনের কালোবাজারি হয়
কুড়িয়ে বাড়িয়ে 
যতটুকু সঞ্চয়
তাই নিয়ে 
চলো, একটা সিগারেট ধরাই।

১৪ই জুলাই, ২০২০
হায়দরাবাদ 

*ইরিনা রাতুশিনস্কায়া (জন্ম - ৪ঠা মার্চ, ১৯৫৪; মৃত্যু - ৫ই জুলাই, ২০১৭) : 
 
ভিন্নমতাবলম্বী সোভিয়েত কবি। তদানীন্তন সোভিয়েত রেজিম এর বিরোধিতার জন্য কেজিবির কোপে পড়েন এবং ফলস্বরূপ ভোগ করতে হয় দীর্ঘ হাজতবাস। কেজিবি যখন ইরিনাকে আটক করে তখন তার বয়স ২৮। ওদেসায় ছাত্রাবস্থায় কেজিবি তাকে মেয়েদের একটি দলে যোগ দেওয়ার আদেশ দেয়, যে দলের মূল কাজ ছিল বিদেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তাদের খবরাখবর কেজিবিকে পৌঁছে দেওয়া। পরবর্তীতে বিবিসির কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কবি বলেন, "এটা ছিল অনেকটা একধরনের যৌনকর্মী হিসাবে কাজ করার মত -দেহব্যবসা করে গুপ্তচরবৃত্তি। আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছিলাম আমি সহযোগিতা করতে পারব না। তখন থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম কেজিবি - আজ হোক‌- কাল হোক- আমার পিছনে লাগবে।"

প্রমিথিয়াস 
 

যারা এখনো গুহামানবের মতো ভালোবাসে
যারা এখনো গুহামানবীর মতো ভালোবাসতে পারে
যারা ভালোবাসার রঙে মনজঙ্গলের দেওয়ালে দেওয়ালে খুঁজে পায় গুহাচিত্র
যারা জানে বাউলের গানে দোতারার তারে রক্ত ঝরে
যারা জানে প্রজাপতির রঙ-বেরঙ আদতে camouflage
যারা শত প্রযুক্তি পার করেও ফিরে আসে এক সরল palaeolithic আস্তানায় দৈনন্দিন
তেমনই এক আদিম আলিঙ্গনের দুই প্রান্ত আমি চিনতাম।
 
শ্বেত বল্কল বেশে                            
নিষ্পত্র ভুর্যের জঙ্গলে, তুষারপ্রান্তে
তাদের বল্গা-শিকার আমি দেখেছি। 
আর ফিরে এসেছি আয়নায় তোমার কাছে
বারেবার।
 
তারপর
 
রাতের আঁধারে চুপিচুপি আমরা চুরি করে এনেছি কত আগুন
কতবার

প্রতিদিন দানবী ঈগল খুবলে খাবলে উপড়ে নিয়েছে আমাদের রক্তাক্ত যকৃৎ
 
তবুও
চুরি করে এনেছি আগুন
আর মশাল থেকে মশাল জ্বেলেছি
এঁকেছি গুহাচিত্র
এঁকে চলেছি গুহাচিত্র
বারেবার
 
কারণ আদিম আলিঙ্গনের দুই প্রান্তের মানব মানবীরা একদিন ফিরে আসবেই
আর তুষার প্রান্তর পেরিয়ে তারা খুঁজে পাবে সংকেত
খুঁজে পাবে মনজঙ্গলের গুহাচিত্র, দোতারার রক্ত আর প্রজাপতির camouflage.....
সেই palaeolithic আস্তানায়।
 
বা হয়তো তোমার আয়নায়
আমাকে।

touch.jpg

সম

বিতায় যাকে খুঁজছিলাম সেই আশ্বিনের আকাশ আজ হঠাৎ ডানা মেলে উড়ে এলো হুড়মুড় একটা উদ্বাস্তু চড়ুইয়ের সাথে কাকভোরে।

অনেক দিন আগে কাশরোদ্দুর যেন এমন ছিলো ব্যাঙ্গলোর ছাড়িয়ে, স্টেট হাইওয়ের পথে গাড়ি থামিয়ে যেখানে মাটির কাঁধে ঝুঁকে পড়ে প্রেমকামড় বসিয়েছিলো রাস্তার ওপারের শুকনো গুলমোহরের ডাল

সিগারেট ধরিয়ে আমরা জেনেছিলাম আমাদের পথ চলা 
সমস্ত সব রাস্তার থেকে বেশি। একরত্তি ধোঁয়া 

থেকে গিয়েছিলো কাশ আকাশে।


আজ হঠাৎ ডানা মেলে উড়ে এলো। 
কাশভোরে ।।

ইদিপাস

ধিকাংশ বাঙালীর মনে একটা ভুল ধারণা আছে যে কাশফুল শুধুমাত্র ফোঁটে বাঙলার মাটিতেই। এটা ঠিক নয়। ভারতবর্ষের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে তো বটেই, বিদেশের মাটিতেও বিস্তৃত এলাকা জুড়ে কাশবন আমি দেখেছি। যতদূর জানি এধরনের ফুলকে পরিভাষায় বলে catkins। অবশ্য ভুলও হতে পারে। আমি উদ্ভিদ বিশারদ নই। তবে অনুবাদে যতই খামতি থাক ভ্রান্তিবিহীন অনুরণন, 
কারণ, 
একথা হলফ করে বলতে পারি যেখানে যখনই কাশফুল পেয়েছি
আকাশপানে চেয়েছি
আর দেখেছি
পেঁজা তুলোর মেঘে মেঘে
শরতের আদর মেখে
আকাশ বড় ফুরফুরে
আর দূরে, বহুদূরে 
সেই কাশদুপুরে
দৌড়ে দৌড়ে ঘুরে ঘুরে
দুর্গা, অপু, বিভূতিভূষণ 
আর ফোকলা হাসিমেখে ইন্দির ঠাকুরণ।
সেই ধানক্ষেত, স্টীম ইঞ্জিন, রেলগাড়ি,
কচি কুয়াশার আধ্ ভোরে আকাশবাণীর আলোয়
আমার মধ্যবিত্ত বাড়ি 
আশ্বিনের শারদপ্রাতে সেখানে আলোক মঞ্জরী।
এবার বুঝি ঢাক বাজবে
এইবার বুঝি চিন্ময়ীর হবে মৃন্ময়ী রূপে অবতারণ 
বিশ্ব চরাচর জুড়ে মাতৃশক্তি নারীশক্তির আরাধন
আর পরিত্যক্ত ক্ষেতের মাঝে পুড়িয়ে ফেলা বালিকার নিগৃহীত জীবন
আমাদের 
ক্লেদাক্ত 
মানসপটের 
অনুরণন।

তাই
যেখানে যখনই কাশফুল পেয়েছি
আকাশপানে চেয়েছি
আর পেঁজা তুলোট মেঘের শার্সিতে দেখেছি
শহরে শহরে
গ্রামে গ্রামে
হাটে বাজারে
লাঞ্ছনার ইতিহাস।

 

দরপেশ
 

একটা নদী।

দোকানি আকাশের কাছ থেকে বিকেলের রঙ কিনে বহমান। সোনাগলানো কাঁচরঙ, দুধেআলতা, কামরাঙা, সিঁদূরগলানো, লোহাজ্বালানো, পাখির বাসা পোড়ানো এক জীবন শাদা জামা। নির্ভেজাল সাদা
যার মাঝে রক্তের লাল, খয়েরি ঘাম, সোনাগলানো কাঁচরঙ, লোহাজ্বালানো দুধেআলতা, পাখির বাসা পোড়ানো রাঙা সিঁদূর, বারংবার বন্দী রামধনু আকাশ।

আচ্ছা, কত রঙ কয়েদ করলে রঙ পাল্টে ফেলা যায় ইচ্ছেমতো? কতদিন? কতবার?
নাকি রঙগুলো সব বেহাঙ্ড়া? যতই আলাদা করো সব মিলেমিশে আবার সফেদ? আবার এক জীবন শাদা জামা?

এক ঝোলাব্যাগ ভর্তি মানুষের ইতিহাস
তাদের মরণবাচন গান, হাঁতুড়ি কোদালের জরাজীর্ণ ফুসফুসের ধুকপুকানি।

এক বুকপকেটবেঁধা কলম ভরা আশ্চর্য সব কবিতা আশ্চর্য সব মানুষের দোকানি আকাশের রঙের বেসাতি পুষিয়ে দেওয়া একবুক নদীর গান
টালমাটাল কত কবিতা বেঁধে রাখলে ইতিহাস পাল্টানো যায়?
কতদিন? কতবার? ইচ্ছেমতো?

একমুখ হাসি জুড়ে কতকথা তোমার আমার
আর, বিকেলটাকে বুকজলে নিজের করে নিয়ে নদীর একমুঠো প্রতিবাদ ............
মৃত্যুশয্যায় ধুঁকছে আজ।

একচোখ বর্তমানে
পিঞ্জরে পিঞ্জরে
আমরা দেখছি।
আমরা দেখছি কত বাঁধ বাঁধলে নদীকে হাতকড়া পড়ানো যায় চিরন্তন।

আমরা দেখছি
সর্পিল পাহাড়ি রাস্তায় রাস্তায় ডাইনিরা সব হাসছে।
আমরা দেখছি। 

আমরা ম্যাক্'বেথ।

নক্ষত্র নয়
 

ঠাকুমা যখন মারা যায়, তখন আমি খুব ছোটো। লোডশেডিং এর রাতে বাবার হাত ধরে চলেছি। চাঁদের আলোয় রুপোর নদী শহরতলীর অনাদৃত গলি। আকাশপানে চেয়ে বাবা বললেন ঠাকুমা এখন এক নক্ষত্র।

কাঁটায় বেঁধা দিন রাত এখন।

আলকাত্‌‍‍রায় আটকে পড়া মাছির ছটফটানির,

গোঙানির কাল।

চাঁদের আলোয় রুপোর নদীর রেললাইন।

যাদের ছায়া আমাদের দেশকালে কোনো দাগ কাটে না তারা পথযাত্রী।

তাদের বেদনায় ফোটে না কোনো ফুল।

তাদের চেতনায় হয় না সবুজ পান্না আমাদের ।

যারা নিছকই খবরের কাগজের কিছু ছবি।

তারাও ক্লান্ত হয়।

হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে পথভ্রান্ত হয়।

সহস্রাব্দের মড়কের  ক্লান্তি নিয়ে তারা যখন ঘুমিয়ে পড়ে, চাঁদের আলোয় রুপোলী রেললাইন তখন তাদের শীতল করে। 
হিমশীতল কাটা কিছু লাশ। 

নক্ষত্র নয়।

birds.jpg

Comments

Top

গল্প

মৃত্যুর শব্দ

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

Maitrayee Mukhopadhyay.jpg

মৃত্যুর শব্দ 

মৈত্রেয়ী মুখোপাধ্যায়

পঃ মেদিনীপুর, পঃ বাংলা 

women edu.jpg

(১)

পাহাড়ের গা ঘেঁষে বাঁক নিতে গিয়ে বেসামাল হয়ে গেল গাড়িটা। গড়িয়ে পড়ল খাদে। গাড়ির ভেতরে থাকা মানুষগুলোর আর্তনাদে কান চেপে ধরল মোহিনী। আহহ্, কি ভয়ানক আওয়াজ! গাড়ির ভেতরে থাকা সকলের মুখ অস্পষ্ট। নিজেকে সেই অজানা যাত্রীদের মাঝে দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল মোহিনী। ধড়ফড় করে উঠে বসল। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। দুঃস্বপ্ন। খাট থেকে নামল কোনো রকমে। পা কাঁপছে। ডাইনিংয়ে এলো। বোতলে জল নেই। রান্নাঘরে জল ভরতে গিয়ে চোখ গেল জানালার দিকে।
আশ্চর্য, জানালা তো প্রতিদিন সন্ধ্যে হলেই লাগিয়ে দিই। আজ কি তবে ভুলে গিয়েছিলাম? মনে করার চেষ্টা করল মোহিনী। জানালা বন্ধ করতে গিয়ে বাইরের দিকে চোখ পড়তেই ক্ষণিকের জন্য ভয় লাগল ওর। জমাট অন্ধকার ঝুলে আছে আকাশে। এক্ষুনি যেন ঢুকে পড়বে ঘরে। তাড়াতাড়ি জানালা বন্ধ করে শোবার ঘরে গেল। ঘড়ি জানান দিচ্ছে মধ্যরাত; দুটো বেজে দশ মিনিট। আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুতেই ঘুম আসছে না। এপাশ ওপাশ করতে করতে একসময়  ঘুমিয়ে পড়ল।

(২)

মোহিনী একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে। এই ফ্ল্যাট ওর কেনা নয়, ভাড়ায় আছে। ওর এক কলিগ ঠিক করে দিয়েছিল এটা। ছোটোর ওপরে বেশ ভালো। খোলামেলা। ওর বেডরুম লাগোয়া একফালি বারান্দাও আছে। ভালো না লাগলে বারান্দাতে এসে বসে। সাথে বই আর কফি। জায়গাটা নিরিবিলি। আসলে এখনো সেভাবে বাড়িঘর গজিয়ে ওঠেনি এই দিকটায়। ফ্ল্যাটের উত্তরদিক পুরো ফাঁকা। বেশ কিছুটা দূরে একতলা একটা বাড়ি আছে। পরিত্যক্ত। এরকম জায়গায় পরিত্যক্ত বাড়ি দেখে মোহিনী একটু অবাকই হয়েছিল। ওর মা-বাবা মাঝেমধ্যে মেয়ের কাছে এসে থেকে যান কয়েকদিনের জন্য। নিজের বাড়ি ছেড়ে তাঁরা খুব একটা আসতে চান না বাঁকুড়ায়।

ব্যাংক থেকে ফিরেই আবার বেরনোর জন্য তৈরী হলো মোহিনী। অফিস কলিগের জন্মদিনের নিমন্ত্রণ। সন্ধ্যে হয় হয়। বেরোনোর আগে ভালো করে দেখে নিল সব জানালা গুলো বন্ধ করেছে কিনা। বসার ঘরের আলো নেভাতে গিয়ে থমকালো। নাহ্,থাক। জ্বলুক এটা।

বাড়ি ফিরল যখন তখন দশটা পেরিয়ে গেছে। খুব ক্লান্ত লাগছে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে ঘুমে। ইদানিং একটা বিষয় লক্ষ্য করছে মোহিনী। সন্ধ্যে হয়ে গেলেই ক্লান্ত লাগে খুব , কাজ করতেও ইচ্ছে হয় না। ছুটির দিনেও হয় এরকম।

মাকে বলতে মা বলেছিলেন,

— সারা সপ্তাহ কাজের এতো চাপ থাকে তোর তাই এরকম লাগছে। ও কিছু নয়। ছুটিছাটায় তো কাছেপিঠে কোথাও ঘুরে আসতে পারিস।

একা একা কোথাও যেতে ওর ভালো লাগেনা। এখানে ওর সেরকম কোনো বন্ধু নেই। মনের দুটো কথা বলারও লোক নেই। আসা থেকে দেখছে ওর ফ্ল্যাটের উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের দরজায় বড় তালা ঝুলছে। তিনতলায় ও একা!

দরকার ছাড়া কোথাও বেরোয় না। রান্নাবান্না, ঘরের সব কাজ নিজেই করে। ওতেই বেশিরভাগ সময় কেটে যায়। আর অবসরের সঙ্গী বই। ছোট থেকেই বই পড়তে ভালবাসে মোহিনী। দুষ্প্রাপ্য কয়েকটি বইও আছে ওর সংগ্রহে। তার মধ্যে একটি বই খুঁজতে তিনবার কলকাতা ছুটেছে ও। বইটির বিষয়ে জানতে পারে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে। তখনই বইটিকে বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিল ওর। অবশেষে আগের সপ্তাহে কলেজ স্ট্রিটে অনেক ঘুরে খুব পুরনো ছোট্ট এক বই দোকানে পেল বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই বই। এক কপিই অবশিষ্ট ছিল দোকানে। যেন ওর আসার অপেক্ষাতে ছিল। অনেক দিন আগেই বইটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বইটি এক অনামী লেখকের লেখা। একটাই উপন্যাস। কাহিনীতে অনেক মোড়। রহস্য না ভৌতিক এখনো বুঝতে পারেনি মোহিনী। বইটি হাতে নিলেই মোহিনীর মনে হয় বইটি যেন ওকে টানছে চুম্বকের মতো।

(৩)

রাতের খাওয়া শেষ করে অফিসের কাজ করছিল মোহিনী। একটানা বসার জন্য পিঠে ব্যথা করছে। টেবিলে রাখা নতুন বইটার দিকে দেখল। বাকি কাজটুকু কাল সেরে নেবে। এখন আর করতে ইচ্ছে করছে না। ফাইলগুলো গুছিয়ে রেখে বইটা নিয়ে খাটে হেলান দিয়ে শুলো। পড়তে পড়তে  বুকের ওপরেই বই রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
আবার সেই স্বপ্ন। পাহাড়ের বাঁক, খাদে পড়ন্ত গাড়ি, আর্ত চিৎকার আর তার সাথে একটা মুখ; বীভৎস সে মুখ। ক্রোধে ঘৃণায় জ্বলছে দুটো লাল চোখ। মুখের অর্ধেক কঙ্কাল, অর্ধেক চামড়া; গলে পড়ছে গাল বেয়ে। ঠোঁটের কষে শুকনো রক্ত। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসছে সেই মুখ, একটু একটু করে। তীক্ষ্ম কর্কশ শব্দ। পচা মাংসের গন্ধ। গা গুলিয়ে আসছে মোহিনীর। আসছে, এগিয়ে আসছে সে, লক্ষ্য মোহিনী।
চিৎকার করে উঠল মোহিনী। দরদর করে ঘামছে। গলা শুকিয়ে গেছে। চোখ গেল বালিশের পাশে। বইটা খোলা অবস্থায় আছে। উঠে চোখে মুখে জল দিল। অনেকটা  জল খেলেও গলার ভেতরটা আরো শুকিয়ে যাচ্ছে যেন। বইটা টেবিলে রাখতে গিয়ে দেখল ঘড়িতে একটা বেজে দশ মিনিট হয়েছে সবে। ঘরের আলোটা জ্বলছিল এতক্ষণ। আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।

এরকম স্বপ্ন আগে কখনো তো দেখিনি। কেন একই স্বপ্ন দেখছি বারবার? তাও এতো স্পষ্ট? ঐ বইটা পড়ার জন্যই কি? প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছিল মোহিনী। শেষে মনকে বোঝালো স্বপ্নের সাথে বইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। ভয় পাওয়ার কি আছে এত? ভগবানের নাম স্মরণ করল। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল। বাইরে তখন টিপ্ টিপ্ করে বৃষ্টি নেমেছে।

পরের দিনটা শুরু হল আকাশের মুখ ভার দিয়ে। বৃষ্টি এখন হচ্ছেনা আর। তবে শেষ রাতে ভালোই বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাঘাট ভেজা। অফিস থেকে বেরোতে একটু দেরি হয়ে গেল মোহিনীর। রাস্তাঘাট আজ কেমন ফাঁকা ফাঁকা। লোকজন বিশেষ  নেই।  অটো থেকে নেমে গলির শেষেই ওর ফ্ল্যাট। রাস্তাটায় আলো জ্বলছে না। কালো মেঘে অসময়ে সন্ধ্যে নেমেছিল অনেকক্ষণ। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে ফোনের টর্চ জ্বালতে গিয়ে দেখে জ্বলছে না। আশ্চর্য তো, ফোনের কী হলো। বিরক্ত হল মোহিনী। আচমকা পায়ের শব্দে ও দাঁড়িয়ে গেল। পিছনে ঘুরে দেখল। কেউ নেই। পায়ের শব্দও থেমে গেছে। আবার হাঁটা শুরু করতেই আবার সেই শব্দ। পা ঘষটে চলার মতো শব্দ। ঝোড়ো হাওয়া বইছে। এবার ভয় লাগল মোহিনীর। রাস্তায় একটা মানুষ তো দূর, কুকুরও নেই। প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে ফ্ল্যাটে ঢুকল। মুখ লাল হয়ে গেছে। হাঁপাচ্ছে। ওর এরকম অবস্থা দেখে ফ্ল্যাটের দাড়োয়ান অবাক।

— আপনি ঠিক আছেন ম্যাডাম?

— হ্যাঁ।

মোহিনী কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে এল। কিছুক্ষণ বসার পর একটু ধাতস্থ হল। মাথাটা যেন ভারী হয়ে আছে। কোনোরকমে রান্না শেষ করেই মাকে ফোন করল।

— হ্যালো, মা, কেমন আছো? বাবা কেমন আছে?

— ভালো আছি রে। তোর বাবা তো তার বাগান নিয়ে ব্যস্ত। তুই কেমন আছিস? শরীর ঠিক আছে তো? কাজ কেমন চলছে?

মাকে ঘটনা গুলো বলবে ভেবেও চেপে গেল। বেকার  চিন্তা করবে।

— ভালো আছি। কাজ হচ্ছে ভালোই। চাপ আছে কাজের।

আর টুকটাক কিছু কথা বলে ফোন রাখল মোহনা। মনটা বেশ হালকা লাগছে এখন। আজ আর বইটা পড়বে না ঠিক করেছিল। কিন্তু রাত্রে খাওয়ার পরে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। মন চাইছে পড়তে, মাথা চাইছে না। এক অদ্ভুত অবস্থা। অবশেষে মনের জয় হল।

 

(৪)

আজ আর শুলোনা। খাটেই বইটা খুলে বসল। পড়তে পড়তে এতই মগ্ন হয়ে গিয়েছিল যে খেয়াল করেনি কখন বারোটা বেজে গিয়েছে। চার্চের বারোটার ঘন্টা বাজতে চমক ভাঙল ওর। এতো রাত অব্দি সচরাচর জাগে না। ভোরে ওঠা ওর অভ্যেস।

বইটা বেশ ইন্টারেস্টিং। সূক্ষভাবে প্রকৃতির বর্ণনা আছে। যতক্ষণ পড়ছিল, ওর মনে হচ্ছিল, যেন সেই জায়গাতেই ও আছে। চারপাশে পাহাড়, রডোডেনড্রনের লাল-লাল ফুল, সরু রাস্তা। এসব ভাবতে ভাবতে বই রেখে ঘরের জানালা বন্ধ করল মোহিনী। বৃষ্টি পড়ছে হালকা। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। আলো নেভানোর আগে দেখল বারোটা বেজে দশ ছুঁইছুঁই।

শুতে যাবে, এমন সময় ধপ করে কিছু পড়ার শব্দ হলো। চমকে উঠল। তাড়াতাড়ি আলো জ্বালালো ঘরের। কোথাও অস্বাভাবিক  কিছু চোখে পড়ল না। কিন্তু শব্দটা এই ঘরেই হয়েছে। চারিদিক ভালো করে দেখল; ডাইনিং, বসার ঘর সব জায়গা। নাহ্। কিছু নেই। ঘরে আসতেই চোখ গেল টেবিলের  দিকে। বই গায়েব। এখানেই তো রেখেছিল। গেল কোথায়? আবার একপ্রস্থ খোঁজাখুঁজি। কি মনে হতে ডাইনিং রুমে এসে দেখল সেখানের চেয়ারে আছে বইটা।আশ্চর্য, এখানে এলো কী করে? তবে কি আমিই এক খেয়ালে এখানে রেখেছিলাম? তাই যদি হয় তবুও এত জোরে শব্দটা কোথায় হল? বাইরে? তাই হবে হয়তো। ভাবল মোহিনী। বইটা ঠিক জায়গায় রেখে শুয়ে পড়ল। কিছুতেই ঘুম আসছে না ওর। কোথায় একটা কুকুর অনবরত কেঁদে চলেছে। কুকুরের কান্নার শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যাচ্ছে। বৃষ্টি বোধহয় থেমেছে। কেমন এক অস্বস্তি লাগছে মোহিনীর। কেন এরকম হচ্ছে, বুঝতে পারছে না। প্রতিটা ঘটনার মধ্যে সংযোগ খোঁজার চেষ্টা করল। সব অস্পষ্ট। মাথা ব্যথা করছে। গল্পের লাইনগুলো মনে আসছে বারবার। সেই রডোডেনড্রনের লাল রং, নাম না জানা অর্কিড, পাহাড়ের সারি..।

 

(৫)

আজ রবিবার। রোদ ঝলমলে সকাল। কে বলবে গতকাল মেঘে ঢাকা ছিল আকাশ? আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি বোঝা দায়। মোহিনী কফির কাপ হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। রাতের ঘটনাগুলো মাথায় আসতেই ভাবল এর একটা বিহিত করতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? কারো সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করবে সেরকম তো কেউ নেই ওর। মা-বাবা জানলে চিন্তা করবে অকারণ। ভাবনায় ছেদ পড়ল। কলিংবেলের শব্দ। এতো সকালে কে এলো? দরজা খুলতেই একটু অবাকই হল মোহিনী। অস্মিতা আর মিতালি এসেছে, অফিস কলিগ। ওরা প্রায় সমবয়সী।

— আরে তোরা! আয়, ভেতরে আয়।

— বেশ সাজিয়েছিস তো রুমটা। সোফায় বসতে বসতে বলল মিতালি।

— ঐ আরকি। একটু বোস তোরা। আমি ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করি।

— তুই একা কেন করবি, আমরা হেল্প করছি। উঠতে গিয়ে বলল অস্মিতা।

— আরে দরকার নেই। পাস্তা করতে আর কতক্ষণ লাগে। চা খাবি না কফি?

— কফি খাবো পরে। অস্মিতার দিকে তাকিয়ে বলল মিতালি। অস্মিতা মাথা নাড়ল, সম্মতি জানাল।

— ঠিক আছে। তোরা ঘরগুলো ঘুরে দেখ ততক্ষণ, আমি আসছি।

— হ্যাঁ, হ্যাঁ।

ওরা দুজন মিলে ঘরগুলো ঘুরে দেখছিল। টেবিলের ওপর রাখা বইটা নিয়ে পাতা ওল্টাচ্ছিল অস্মিতা।

— কি দেখছিস রে অস্মি? ব্যালকনি থেকে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিগ্যেস করল মিতালি।

— একটা বই। বেশ পুরনো মনে হচ্ছে।

— বইটার নাম কি? জিগ্যেস করল মিতালি।

ফোন বেজে উঠল অস্মিতার। অচেনা নাম্বার।

— হ্যালো, কে বলছেন?

ও প্রান্ত থেকে কোনো উত্তর নেই।

বার কয়েক হ্যালো,হ্যালো করে শেষে ফোন কেটে দিল অস্মিতা।

— ফোন করা কেন ভাই চুপ থাকবে যখন। বিরক্তিকর। অস্মিতার মুখে বিরক্তির ছাপ।

— চলে আয়, পাস্তা রেডি। রান্নাঘর থেকে খাওয়ার ডাক পড়ল।

সবাই ডাইনিং টেবিল ঘিরে বসল। খেতে খেতে বেশ গল্প চলছিল। মোহিনী ভাবছিল ওর সেই স্বপ্নের কথাটা বলবে কিনা। বিশ্বাসযোগ্য তো নয়। বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে ভূতপ্রেত নিয়ে ভাবতেও কষ্ট হয়। কি মনে করবে ভেবে ওদের বলল না। যা হবে দেখা যাবে। ছোটো থেকেই সাহসী বলে সুনাম আছে ওর। ক্যারাটেতে ব্ল্যাক বেল্ট।

— এবার কাজের কথা শোন; যে জন্য এতো সকালে আসা। খাওয়ার শেষে বলল মিতালি।

— এক মিনিট। কফিটা নিয়ে আসি।

কফির কাপে ছোট্টো চুমুক দিয়ে অস্মিতা বলল, কফিটা দারুণ হয়েছে মোহি।

— এবার শোন। ভাবছিলাম দার্জিলিংয়ে ঘুরতে গেলে কেমন হয়? পরের সপ্তাহে পরপর চারদিন সরকারি ছুটি পড়েছে। আর দুদিন নিজেরা ছুটি নিয়ে নেব ম্যানেজ করে। এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মোহিনীর মুখের দিকে তাকাল মিতালি।

একটু ভেবে মোহিনী বলল, আইডিয়া ভালো। কিন্তু কারা কারা যাচ্ছি?

— এই তো আমরা তিনজন আর আমার এক মাসতুতো দিদি। জামাইবাবু ওখানেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের উচ্চপদস্থ অফিসার। সব ব্যবস্থা উনি করে রাখবেন। দিদি কয়েকদিনের জন্য এসেছিল এখানে। প্ল্যানটা তারই। এবার বল, যাবি? উৎসাহ নিয়ে প্রশ্ন করল মিতালি।

মোহিনী হেসে বলল, ওকে, নো প্রবলেম। মাও বলছিল কোথাও ঘুরে আসার জন্য।

— টিকিটের ব্যবস্থা আমিই করছি। একসাথে কাটলে পরপর সিট পাওয়া যাবে।

— সোয়েটার নিতে ভুলিসনা যেন। জুলাই মাসেও ওখানে ঠান্ডা থাকবে। বলল অস্মিতা।

—ঠিক আছে তবে, আজ আসি রে। আমরা বৃহস্পতিবার রওনা হব। হাতে আর তিন দিন সময়। টিকিট বুক করে তোকে পাঠিয়ে দেব। বেরোতে বেরোতে বলল মিতালি।

— হ্যাঁ রে। অফিসে তো দেখা হচ্ছেই।

অস্মিতা হেসে বলল, সে আর বলতে।

— আসছি রে।

— সাবধানে যাস। আসিস আবার।

— হ্যাঁ; তুইও যাস। বাই। হাত নেড়ে চলে গেল ওরা। 

ওরা চলে যেতেই মাকে ফোন করে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলল মোহিনী। বাড়ি থেকে কোনো আপত্তি নেই।

মন খুশি খুশি হয়ে গেছে ওর। অনেকদিন পর কোথাও বেড়াতে যাবে। মা-বাবার সাথে গেলে আরো ভালো লাগত। ওর ইচ্ছে আছে মা-বাবাকে নিজের টাকায় বেড়াতে নিয়ে যাবে, দূরে কোথাও। দুপুরে লিস্ট বানাতে বসল কি কি নিয়ে যাবে আর কিছু কিনতে হবে কিনা। কয়েকটা জিনিস কিনবার আছে। বিকেলে বেরোতে হবে। এসবের মাঝখানে বইটার কথা মনেই পড়লনা ওর। 

(৬)

সন্ধ্যে নামার আগেই ঘরে চলে এল। এটা ওটা করে অনেক কিছুই কেনা হয়ে গেছে। রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে জিনিসপত্র সব গোছাতে বসল। অফিসের কিছু কাজ বাকি ছিল। সেগুলো শেষ করে যখন শুতে গেল তখন এগারোটা বেজে গেছে। চোখ ভারী হয়ে আসছে ঘুমে।

শোবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল মোহিনী। গভীর ঘুম। স্বপ্ন বিহীন রাত। পরের দিন আবার বাঁধাধরা রুটিন মাফিক কাজ। অফিসের কাজ সেরে ফিরতে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল মোহিনীর। রাতের খাবার কিনে নিয়ে এসেছে। দরজা খুলে আলো জ্বালাতে গিয়ে দেখে জ্বলছে না। অদ্ভুত ব্যাপার। সিঁড়িতে তো আলো জ্বলছে। বাল্বটা খারাপ হয়ে গেল নাকি? টিউবটাও তো জ্বলছেনা। অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে ডাইনিংয়ে এলো।

সেখানেও একই অবস্থা। খোলা জানালা দিয়ে রাস্তার ভেপার ল্যাম্পের মৃদু আলো ঘরে এসে পড়ছে। হালকা আলো-আঁধারিতে দেখল মাটিতে কিছু একটা পড়ে আছে। জিনিসটির দিকে এগিয়ে যেতেই অদ্ভুত কান্ড। ঘসঘস শব্দ করে পিছোচ্ছে বাক্সের মতো জিনিসটা। মোহিনী যত এগোচ্ছে তত পিছিয়ে যাচ্ছে বস্তুটি। মোহিনী যেন মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছে। মরীচিকার পিছনে ছুটছে। ব্যালকনির দরজা খুলতেই দেখল ভারী জিনিসটা রেলিংয়ের পাশে পড়ে আছে। রাস্তার আলোয় স্পষ্ট দেখল জিনিসটা আর কিছুই নয়, সেই বই। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় চোখে ধুলো ঢুকে গেল ওর। চোখ জ্বলছে, তাকাতে পারছেনা। কোনোরকমে ঘরে ঢুকে চোখে জল দিল। জ্বালা ভাব কমেছে একটু। চোখ ঠিক হতেই দেখল আলো জ্বলছে ঘরে। একটু আগে যা হল মনে আসতেই ছুটে শোবার ঘরে গিয়ে দেখল বইটা টেবিলেই আছে! তবে একটু আগে যে বারান্দায় ছিল, আর, তার আগে ডাইনিংয়ে? ওটা তো চোখের ভুল নয়। বারান্দায় যেতে গিয়ে দেখল দরজার ছিটকিনি লাগানোই আছে। এতক্ষণ যা হলো তার কোনো চিহ্নই আর নেই। মোহিনীর মনে এক অজানা ভীতি চেপে বসল। ওর পা কাঁপছে। খাটে বসে একের পর এক সাজাচ্ছে ঘটনাগুলো। কেন হচ্ছে, তার কোনো উত্তর পেলনা। বইটাই কি তবে..কিন্তু এও কি সম্ভব? এরকম কখনো শোনেনি তো। বইটা আপাতত আর পড়বেনা ঠিক করল ও। তখনই মনে পড়ল গতকাল তো পড়েনি, আর কোনো ভয়ের স্বপ্নও দেখেনি। কিন্তু বইটা পড়তে যে ওর ভীষণ ইচ্ছে করছে। সেই পাহাড়... না। ঐ বই নিয়ে আর ভাববে না মোহিনী, কিছুতেই না। রাতে আজ আর অফিসের কাজ করতে ইচ্ছে হলোনা। কি মনে হতে বইটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল। হঠাৎ চোখ গেল শেষ পৃষ্ঠায়। পৃষ্ঠাটি ফাঁকা! হলদেটে হয়ে গেছে। ভালো করে ভেতরের পৃষ্ঠাগুলো দেখল। সব ঠিক আছে শুধু শেষ পাতাটা বাদে। বইটা রাখল মোহিনী। দশটা বেজে দশ মিনিট। শুয়ে শুয়ে বিভিন্ন বিষয়ে  চিন্তা করতে লাগল। আচমকাই মনে পড়ল বারান্দার দরজা বন্ধ করেই ও বেরিয়ে ছিল সকালে। তাহলে বইটা বারান্দায় কী করে গেল? দরজা খুলল কে? মনে হতেই অজানা আতঙ্ক ঘিরে ধরল ওকে। পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করে ঘুুুমোনোর চেষ্টা করতে লাগল। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল ওর। কেন ভাঙল বুঝতে পারলো না ঘুমের ঘোরে। খসখস করে একটা আওয়াজ হচ্ছে। একটু পরেই শব্দটা থেমে গেল। তখনই কোথায় একটা কুকুর কেঁদে উঠলো, আকাশ- বাতাস কাঁপিয়ে। কুকুরের কান্না অশুভ, বলে সবাই। কোনো পশুরই কান্না ভালো লাগে না মোহিনীর। মন খারাপ লাগে। ফুল স্পিডে চলা ফ্যানের শব্দের ভেতর দিয়েও কান্নার আওয়াজ আসছে। শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল জানেনা। ঘুম ভাঙল একেবারে সকালে।আজ অনেক কাজ আছে। আর দুদিন পরে রওনা হবে। গতকাল টিকিট ফোনে পাঠিয়ে দিয়েছিল মিতালি। রেডি হতে হতে বইটার দিকে দেখল একবার। ঠিকই আছে। সব স্বাভাবিক।

 

(৭)

বুধবারের সন্ধ্যা। কাল সকালে গাড়িতে করে হাওড়া যাবে সবাই। দুপুরে ট্রেন। ব্যাগ গোছানো শেষ। বইটা কি নেব? নেবে ভেবেও নিলো না। টেবিলে রেখে দিল। বেড়াতে গেলেও গল্পের বই ওর সঙ্গী হয়। ট্রলি আর হ্যান্ড ব্যাগটা বসার ঘরে রাখল। রাত্রে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। ভোরে উঠতে হবে। উফফ্, যা আনন্দ হচ্ছে না! কখন যে যাবে! ফোনে গান চালিয়ে কাজ করছিল মোহিনী। গুনগুন করে নিজেও গাইছিল। সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিল আরেকবার। 

গান থেমে গেল। ফোন বাজছে। অচেনা নাম্বার। ফোনটা রিসিভ করল।

— হ্যালো।

অন্যদিকে কোনো শব্দ নেই।

— হ্যালো, কে বলছেন?

নিরুত্তর।

ফোনটা রাখতে যেতেই কানে এলো ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ। ভয়ে ফোন কেটে দিল মোহিনী। নাম্বারটা ব্লক করতে গিয়ে দেখল ঐ নাম্বার নেই কল লিস্টে! আবার দেখল লিস্টটা। বিকেলবেলায় মা শেষ ফোন করেছিল ওকে। এখন বাজে আটটা বারো। ফোনটা এসেছিল দু-তিন মিনিট আগে। আবার সেই ভয় মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। ভাবতে পারছেনা আর। ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে শুতে গেল। ঘুম আসতে অসুবিধে হলো না। বেড়াতে যাওয়ার আনন্দে- উত্তেজনায় ভুলে গেল বইটার কথা।

সকালে উঠেই চোখ গেল টেবিলের দিকে। বইটা আছে ওখানেই। সাড়ে সাতটার দিকে গাড়ি এলো। ওরা তিনজন এখান থেকে যাচ্ছে, আর মিতালির মাসিমণি ওঁর বাপের বাড়ি থেকে সোজা হাওড়ায় চলে আসবেন। কলকাতায় বাপের বাড়ি। ট্রেন ছাড়ল ঠিক সময়ে। বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিল মোহিনী। সবাই গল্প করছে। টুকটাক খাওয়াদাওয়াও চলছে। ইন্দ্রাণী মাসিমণিকে খুব ভালো লেগেছে মোহিনীর। হাসিখুশি মানুষ। বয়স খুব বেশি হলে চল্লিশ হবে। বিভিন্ন বিষয়ে গল্প হচ্ছিল। এগারোটার দিকে ওরা নিউ জলপাইগুড়িতে নামল। মেসোমশাই নিতে এসেছিলেন ওদের, অফিসের জিপ নিয়ে। উনিও মাসিমণির মতো হাসিখুশি, গল্প করতে ভালবাসেন। কাছেই একটা হোটেল বুক করে ছিলেন। রাতটা ওখানেই কাটিয়ে পরের দিন সকালে রওনা হবে দার্জিলিংয়ের উদ্দেশ্যে। রাতটা নির্বিঘ্নেই কাটলো। 

পরের দিন সকালে অল্প কিছু খেয়ে নিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল। মেসোমশাই নিজেই ড্রাইভ করছেন। রাস্তাঘাট ওনার চেনা। শিলিগুড়িতে এলো যখন, নটা বেজে গেছে। সেবক রোডের পাশে একটা ছোটো দোকানে টিফিন করল সবাই। স্টিম মোমো মোহিনীর খুব পছন্দের। 

শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং অনেকটা রাস্তা। সতর্কতা আর দক্ষতার সাথে গাড়ি না চালালে যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘুরে ঘুরে ওপর দিকে উঠছে গাড়ি। দূরে অবিন্যস্ত পাহাড়ের সারি। সবুজ চা বাগান। পাহাড়ের কোলে ছোটো ছোটো বাড়ি। কোনো কোনো বাড়ির কাছে রঙিন পতাকা উড়ছে। ওগুলোতে বুদ্ধদেবের বাণী লেখা থাকে মেসোমশাইয়ের কাছ থেকে জানল মোহিনী। সোয়েটার, মাফলারের ভেতর দিয়েও ঠান্ডা লাগছে মোহিনীর। মাঝে আবার ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হয়ে গেল। মেঘগুলো কতো কাছে! হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে যেন। গাড়ির ভেতরে বসেই মোহিনী  ফোনে কয়েকটা ছবি তুললো। জানলার কাঁচের জন্য খুব স্পষ্ট আসেনি ছবিগুলো। সারা রাস্তা মজা করতে করতে বাংলোয় এসে পৌঁছল যখন, তখন দুপুর হয়ে গেছে। বাংলোয় এক নেপালি ভদ্রলোক রান্নার কাজ করেন। বাগানের পরিচর্যার জন্য একজন মালি আছেন। বাংলোর ঠিক পিছন দিকেই পাইন গাছের সারি। কিছু ফার্ণ গোত্রের গাছও আছে। তিন বান্ধবী মিলে চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল।

একটা গাছের সামনে গিয়ে দাঁড়াল মোহিনী। লাল লাল থোকা থোকা ফুল।

— আরে, এই তো রডোডেনড্রন! বলল অস্মিতা।

ওর দিকে তাকিয়ে মোহিনী বলল, কি সুন্দর রঙ না!

— হ্যাঁ রে। মিতালি কোথায় গেল?

— মোহি, অস্মি তাড়াতাড়ি এদিকে আয়। মিতালি চিৎকার করে ডাকছে।

পাইন গাছগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিতালি।

আঙুল তুলে সামনের দিকে দেখাল,

— গাছের ফাঁক দিয়ে দেখ। কী বলত ওটা?

দুজনেই একসাথে বলল, পাহাড়।

— হ্যাঁ, কি পাহাড়? নাম কি?

— কি নাম? অস্মিতা জিগ্যেস করল।

— কে টু।

অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মোহিনী বলল, কাঞ্চনজঙ্ঘা!

— ইয়েস। হেসে উঠল মিতালি।

মেঘের চাদর সরতেই কাঞ্চনজঙ্ঘা আরেকটু স্পষ্ট হল। অবাক চোখে দেখছে মোহিনী। ছবির কাঞ্চনজঙ্ঘা ওর সামনে!

 

(৮)

দুপুরে ঘুমানোর অভ্যেস নেই মোহিনীর। শুয়ে ফোন ঘাটছিল। মিতু আর অস্মি ঘুমিয়ে পড়েছে। একটা খাটে ওরা তিনজন। মাসিমণি আর মেসোমশাই  অন্য ঘরে। ঘরটা বেশ বড়। মেঝে কাঠের। কাচের বড়ো বড়ো জানালা তিনটে বন্ধ। পরদা সরানো আছে। বাইরেটা দেখল ও। কেমন যেন ছায়া ছায়া ভাব। মেঘের পাতলা আস্তরণ গাছপালার ডালে আটকে আছে। ঘুম ঘুম লাগছে মোহিনীর। পাতলা কম্বলটা ভালো করে গায়ে চাপা নিয়ে অচিরেই ঘুমিয়ে পড়ল। একটা সরু পাহাড়ি পথ। পথের একপাশে গুল্ম জাতীয় গাছ নাম না জানা সাদা আর বেগুনি রঙের ফুলে ভরে আছে। ফাঁকা রাস্তা। একাই হাঁটছে মোহিনী।

ধোঁয়া মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে খাদ থেকে  কুয়াশা উঠছে ওপরে। কুচো কুচো মেঘ এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওকে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর এসে পড়েছে । অন্ধকার নামছে। ফিরবার পথ ধরল। অনেকক্ষণ তো হাঁটছি, তাহলে এখনো বাড়ি পৌঁছতে পারলাম না কেন? চিন্তা হচ্ছে এবার। এমন সময় কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ল সামনের পাহাড়ের মাথায়। তার সাথে সোঁ সোঁ করে বাতাস। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে এগোচ্ছে ও। বাতাসের ধাক্কায় ঠিকমতো  হাঁটতে পারছেনা। কানে এলো সেই ফ্যাসফ্যাসে স্বর। কাছে এগিয়ে এসেছে, একদম কানের কাছে; 'সময় শেষ' তীক্ষ্ম অস্পষ্ট স্বরে কানের পর্দা যেন চিরে যাচ্ছে। পিছন দিকে ঘুরতে যেতেই শক্ত দুটো হাত চেপে ধরল ওর গলা। মোহিনী আপ্রাণ চেষ্টা করছে ছাড়াতে, পারছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে ওর।

কঙ্কালের হাত টুঁটি টিপে ধরেছে; আঙুলগুলো সাঁড়াশির মতো বসে যাচ্ছে গলায়। আর পারছেনা মোহিনী। তখনই হঠাৎ ওর পায়ের তলার মাটি সরে গেল। খাদে পড়ছে ও, গভীর কালো খাদটা ওকে গিলবে বলেই হাঁ করে আছে। ভয়ংকর অট্টহাস্যে চারপাশ কেঁপে উঠল। মোহিনী চেঁচিয়ে উঠল, বাঁচাও, বাঁচাও..।

— এই মোহি, এই মোহি, কী হল তোর? মোহিনীর কাঁধে ঝাঁকুনি দিল অস্মিতা।

ওর চিৎকার শুনে সবাই ছুটে এসেছে ওদের ঘরে।

অস্মিতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মোহিনী। এখনও ভয়ে কাঁপছে।

মিতালি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, শান্ত হ, শান্ত হ। স্বপ্ন দেখেছিস। তোর কোনো ভয় নেই, আমরা আছি তো তোর সাথে।

এক গ্লাস জল নিয়ে এসে মোহিনীকে খাইয়ে দিলেন ইন্দ্রাণী।

— কোনো ভয় নেই। আমরা তো আছি। কোনো অসুবিধে হলেই বলবে আমাকে।

মেসোমশাই ওর মাথায় হাত রেখে কোনো মন্ত্র পড়লেন, মনে হয় গায়ত্রী মন্ত্র। ওকে আশ্বস্ত করে ওনারা চলে গেলেন।

সন্ধ্যে নেমেছে। ছটা দশ বাজে।

— চল্ লুডো খেলি। এরকম মুখ ভার করে বসে থাকতে হবে না তোকে। মোহিনীকে একরকম জোর করেই খেলতে বসালো মিতালি। চা আর পকোড়া খেতে খেতে খেলা চলল। মাসিমণিও ওদের সাথে খেলতে বসে পড়েছেন।মোহিনীর খেলাতে মন নেই। অন্যমনস্ক। সেই স্বপ্নের রে