• পলাশ দাস
  • পার্থ সরকার

  • শান্তনু ঘোষ

  • সিদ্ধার্থ ঘোষ

  • যুবক অনার্য

  • সৌভিক সিকদার

  • সন্দীপ ব্যানার্জী

  • মোঃসাইদুর রহমান সাঈদ

  • দীপঙ্কর সাহা

  • মধুসূদন গোস্বামী

  • বাসব রায়

  • মৌ চক্রবর্তী

  • সরোজ কুমার রায় (সারথি)

  • বিশ্বজিৎ মন্ডল

  • দেবাশিস পট্টানায়ক

  • অনীক চক্রবর্তী 

  • শুভজিৎ দাস 

  • জয়দীপ চক্রবর্তী

  • সুস্মিতা হালদার

  • চৈতালী সরকার

  • রীনা নন্দী

  • কল্যান সেনগুপ্ত

  • গীতাঞ্জলী ঘোষ

  • দেবযানী পাল

  • সুশোভন দাশ 

  • পার্থ বোস

  • বিবেকানন্দ পন্ডা 

  • মৈত্রেয়ী মুখোপাধ্যায়

  • মধুসূদন গোষ্মামী 

  • তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য্য

  • শান্তনু ঘোষ

  • দিলীপ মজুমদার

  • তাপস বিশ্বাস

  • সুদীপ্ত বিশ্বাস

  • আবু আফজাল সালেহ

 

পর্ব - ১

লেখক/লেখিকা

পর্ব - ২

লেখক/লেখিকা

  • অনিশা দত্ত

  • সুখময় ঘোষ 

  • বাসব রায় 

  • সৌমেন্দ্র দরবার

  • মিজানুর রহমান মিজান

  • সঞ্চিতা মন্ডল

  • অরুন্ধতী ঘোষ

  • অর্ক চক্রবর্তী

  • ভাস্কর সিনহা

  • অদিতি সুর 

  • দেবার্ঘ্য মুখার্জী

  • শ্রেয়া বাগচী

  • রূপা মন্ডল​

  • সনোজ চক্রবর্তী

  • জবা রায়

  • প্রদীপ প্রামানিক

  • জিষ্ণু সেনগুপ্ত

  • সুপ্রভাত মেট্য

সূচীপত্র

 পর্ব - ১

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

পুজো বার্ষিকী 

১৪২৮

***

পর্ব - ১

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

 

সুদীপ্ত বিশ্বাস

ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টর

রানাঘাট, নদীয়া, পঃ বাংলা

কবিতা

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

আশার বাষ্প

হামারী এসে জীবন কাড়ছে তবু
আমরা চেয়েছি গেয়ে যেতে সেই গান
শবের উপরে জমছে শবের স্তুপ,
কবরের পাশে বেঁচে ওঠে কিছু প্রাণ।

রাত্রির বুকে বাড়ছে আঁধার রোজই
ফুল তবু ফোটে শবদেহটার পাশে
চাঁদ নেই তবু দূরের আকাশে দেখ,
কিছু ছোট তারা আলো দেয়, ভালোবাসে।

মৃত্যু আসছে কাড়ছে মায়ের কোল
কত ভাবনারা আর তো পেল না ভাষা
বেশ কিছু ফুল অকালেই ঝরে গেল,
মৃত্যুর পরও থেকে যায় প্রত্যাশা। 

দূরের তারার ক্ষীণকায় স্মিত আলো
সংকেতে বলে সংগ্রাম আছে বাকি
তারা খসে গেলে মৃত্যুর গান গেয়ে,
তখনও দেখবে ডাকছে ভোরের পাখি।

 

ইঞ্জেকশন!

লোকে আমায় ভয়ই পেত, বাসত না কেউ ভালো
মনে মনে সবাই আমায় দিত অনেক গালও।
তারপরে যেই কোভিড এল, তাক ধিনা ধিন ধিন
অনেক দিনের পরে এল শোধ তোলবার দিন।
আমার জন্য এখন লোকের হয় না রাতে ঘুম
লাইন দিয়ে চলছে সবার সুচ-ফোটানোর ধুম!
আমায় নিয়ে কাড়াকাড়ি, চলছে যে রাজনীতি 
সুচ দেখে আর আমজনতার একটুও নেই ভীতি! 
ফার্স্ট ডোজের পরে আবার মিলবে কবে ডোজ?
নিয়ম করে সবাই এসে যাচ্ছে নিয়ে খোঁজ। 
দুটি ডোজের মধ্যে আবার গ্যাপ যদি যায় বেড়ে
হাঁ-হাঁ করে অমনি সবাই মারতে আসে তেড়ে।
কাঁদছে সবাই ঠোঁট ফুলিয়ে যাদের আছে বাকি
এত্ত ভালোবাসা আমি কোথায় বলো রাখি?

Comments

Top

আবু আফজাল সালেহ

কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, চুয়াডাঙ্গা, বাংলাদেশ

 

কবিতা

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

বৃষ্টিমাথায় ছবি আঁকি

 

বৃষ্টি বাদল ভোরবেলাতে

দ্যাখো দ্যাখো খোলো আঁখি

কদম গাছে বৃষ্টিমাখা

হাজার রকম রঙিন পাখি।

কালো পাখি হলুদ পাখি

কত্তরকম ডাকাডাকি

পীত হলুদে লাল খয়েরি

শাখা পাখির ছবি আঁকি।

 

 

পাঁকা গমখেতের সৌন্দর্য
 

নীলিমায় সাদা মেঘের মিনার
আকাশ পারে পারাবত ওড়ে
সোনাবালুতীরে ঝাউবন-- সবুজ ঢেউ
নীল নোনাজলের গর্জন,পাড় ভাঙে
অতল-রহস্যে সুউচ্চ নারিকেল বীথির উচ্ছ্বাস।

এমন সেন্টমার্টিনে এক কবিতা দাঁড়িয়ে
তার ছেড়ে দেওয়া আঁচল--
পাঁকা গমখেতের দুলে ওঠা ঢেউয়ের সৌন্দর্য ওড়ে।

বিজয়ী চুম্বন
 

দিও চারিদিকে ঘন কুয়াশার রহস্য
হিংসা-বিদ্বেষ,বায়বীয় অহংকার
জলপাথরে লুকায়িত বেদনার ছাপ।
এমন হিংস্রতার ছায়ায় তোমার
হরিণ পায়ের নূপুরধ্বনি--
যেন কার্তিকের সোনালি ধানক্ষেতের ঢেউ।

যতই জোৎস্নালোক ছায়াবৃত হোক
টিয়া ঠোঁটের উচ্চারণ বুজি, খুঁজি
তোমার কপালে এঁকে দেবো বিজয়ী চুম্বন।

 

শিশির ভেজা গোলাপ
 

রনাতলে শরীর ভিজিয়ে নিলে
যেন শিশির ভেজা গোলাপ।
কতদিন সূর্যের সঙ্গে তোমার আড়ি!
শীতনিদ্রা ছাড়তে
সূর্যপাপড়িতে ওম নাও এবার।

তুমি ও গোলাপ
গোলাপ ও তুমি
শিশির ভেজা গোলাপ তুমি।

 

ভালোবাসতে মঙ্গলে যেতে হয় না
 

ভালোবাসতে হলে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া লাগে না
ঝুপড়িতেই হয়
আটচালায় হয়--
অট্টালিকাতেও ভালোবাসা থাকতে চায়।

মনের ওপর ভালোবাসার পরিণতি;
তবে শিখতে হয়।

 

ওড়া ও ভালোবাসা শিখতে হয়
 

'ড়া' আর 'উড়তে পারা' এক নয়
'ভালোবাসা' আর 'ভালোবাসতে পারা' এক নয়।
পাখির ওড়া শিখতে হয়;
ভালোবাসাও শিখতে হয়--
অন্যথা বিপথগামী হতে হয়। 

Comments

Top

 
 

কবিতা

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

কবিতা

পলাশ দাস

বারাসাত, কলকাতা

বিজ্ঞাপন 

মাটির ফাটলের পাশে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি 

থমকে থাকা রোদের আকাশ 
আর হাওয়ার গায়ে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি 

জলের স্রোতহীন শরীরের পাড়ে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি 

পাথরের অহংকারের গায়ে 
একটা সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন রেখেছি

একটা সচিত্র সম্ভ্রান্ত বিজ্ঞাপন 
শিকড়, কাণ্ড ও পাতা   

 

কবিতা

পার্থ সরকার 

অজাতশত্রু বিস্ফোরণ শোধনাগারে

     

জাতশত্রু বিস্ফোরণ শোধনাগারে  

বর্ষা ত্রুটিযুক্ত 

তুচ্ছ হয় 
তড়িৎগতির জাগরণে 
জানবাজারের জীবিকা 

সরে যায় 
বিচ্ছেদ 
অক্ষর পরিচয়হীন 
যোগচিহ্ন 
নবকেতনের 

বিস্ফোরণ 
শোধনাগারে 

ছত্রাকার 
ঘটিবাটির 
জলপানি 


চিহ্ন নেই দেশদ্রোহিতার । 

প্রবন্ধ

 

Comments

Top

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

বড়ু চণ্ডীদাসের

‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’

দিলীপ মজুমদার

পর্ণশ্রী, বেহালা, কলকাতা

[ড়ু চণ্ডীদাসের প্রামাণ্য জীবনী পাওয়া যায় নি। অনুমান করা হয় তিনি পঞ্চদশ শতকের মানুষ। মিথিলার কবি বিদ্যাপতির সমসাময়িক। বিদ্যাপতির মতো তাঁর লেখায় নাগর-বৈদগ্ধ্য নেই। জয়দেবের পরে তিনি রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলার কাব্য লিখেছেন। গীতিরস থাকলেও তাঁর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন একটি কাহিনীকাব্য। নানা কারণে এই কাব্যটি বাংলাসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য]


।।জন্মখণ্ড।।
কংসাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন দেবতারা। সৃষ্টি যাচ্ছে রসাতলে। চিন্তিত দেবতারা। একটা প্রতিবিধান করা দরকার। দেবতারা এলেন দেবাদিদেব ব্রহ্মার কাছে। সব শুনলেন ব্রহ্মা। তিনি দেবতাদের নিয়ে গেলেন সাগরে। সেখানেই আছেন শ্রীহরি। একমাত্র তিনিই করতে পারেন প্রতিবিধান। দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হলেন শ্রীহরি। তিনি তাঁদের একটি শ্বেত ও একটি কৃষ্ণ কেশ দিয়ে বললেন যে একটি কেশ থেকে বসুদেবপত্নী রোহিণীর গর্ভে জন্ম নেবেন বলরাম, আর দেবকীর গর্ভে জন্ম নেবেন বনমালী কৃষ্ণ। কংসাসুর নিহত হবেন এই কৃষ্ণের হাতে।
কংসাসুর নিধনের ব্যাপারে দেবতাদের মন্ত্রণার কথা কানে গেল নারদমুনির। সে কথা কংসকে জানাবার জন্য তিনি ছুটে এলেন তাঁর কাছে। তাঁর রঙ্গ কৌতুক দেখে কংস যখন হাসছিলেন, তখন নারদ বললেন, ‘হাসছ হাসো, কিন্তু তোমার বিনাশ আসন্ন।’
এ কি কথা বলছেন নারদমুনি! হাসি বন্ধ হয়ে গেল কংসের। কার হাতে মৃত্যু হবে কংসের? নারদ বললেন, ‘দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্মাবে যে সন্তান, তার হাতেই মৃত্যু হবে তোমার।’ নারদের কথা শুনে সচকিত কংস। না, তিনি কোন ঝুঁকি নেবেন না। দেবকীর সব সন্তানকেই হত্যা করবেন তিনি। নিজের ভগ্নী বলে কোন দয়া-মায়া করা যাবে না।
এদিকে কংসের কাছ থেকে নারদ এলেন বসুদেবের কাছে। বললেন, ‘শোনো বসুদেব, তোমার পত্নী দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্ম নেবেন ভগবান নারায়ণ। তিনি হত্যা করবেন কংসকে। তাই কংস তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হবেন। কি করে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানকে রক্ষা করতে হবে, সে পথ তোমাকে পরে বলে দেব।’
আতঙ্কগ্রস্ত কংস দেবকীর ছয়টি গর্ভ নষ্ট করে দিলেন। সপ্তম গর্ভে শ্বেতকেশ থেকে জন্ম হল বলভদ্রের। জননীর গর্ভপাতের ছল করে বলভদ্র আশ্রয় নিলেন রোহিণীর গর্ভে। অষ্টম গর্ভে কৃষ্ণকেশ থেকে জন্ম হল শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী শ্রীকৃষ্ণের। দেবকীর অষ্টম গর্ভের কথা শুনে কংস প্রহরীদের মোতায়েন করেছেন। সন্তানের জন্ম হলে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করা হবে তাকে। শত্রুর শেষ রাখবেন না কংস।
দশমাস পরে এক অন্ধকার বর্ষণমুখর রাতে জন্ম হল কৃষ্ণের। দেবতাদের অনুগ্রহে সে কথা অবগত হলেন বসুদেব। আর ঠিক একই সময়ে যশোদা প্রসব করলেন একটি কন্যা সন্তান। প্রায় অচৈতন্য ছিলেন যশোদা, তাই জানতে পারলেন না কন্যা সন্তানের কথা।
পূর্ব পরামর্শমতো বসুদেব দেবকীর নবজাত সন্তানকে কোলে নিয়ে নামলেন পথে। দৈবমায়ায় কংসের প্রহরীরা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কৃষ্ণকে নিয়ে যশোদার গৃহে এলেন বসুদেব। কৃষ্ণকে যশোদার কোলে দিয়ে যশোদার কন্যা সন্তানকে নিয়ে এলেন দেবকীর কাছে। সেই কন্যার কান্নার শব্দে নিদ্রাভঙ্গ হল প্রহরীদের। খবর গেল কংসের কাছে। কালবিলম্ব না করে তিনি ছুটে এলেন কারাগৃহে। কংস সেই নবজাত কন্যাকে আছড়ে ফেললেন পাথরে। সেই সময় এক দৈববাণী হল: তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে। তাহলে কি গোকুলের নন্দসন্তান তাঁর মৃত্যুর কারণ হবে। কংস পুতনাকে পাঠালেন নন্দগৃহে । স্তন্যপানের ছলনায় কৃষ্ণ তাকে বধ করলেন। তারপর গেল যমলার্জুন। সেও নিহত হল। এভাবে নিহত হল কেশী আদি অসুর। প্রমাদ গুনলেন কংস। 
নন্দ আর যশোদার স্নেহচ্ছায়ায় বর্ধিত হতে লাগলেন কৃষ্ণ। ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে লাগল তাঁর অনুপম দেহলাবণ্য। তাঁর ললাটের দুই দিক লঘু এবং মধ্যভাগ প্রশস্ত। নাসিকা ও লোচন সুগঠিত। ভ্রূ বঙ্কিম। ওষ্ঠাধর প্রবালসদৃশ। করযুগল আজানুলম্বিত। বক্ষস্থল মরকত মণিফলকসদৃশ। কটিদেশ সূক্ষ্ম, জঙ্ঘা রামরম্ভাসদৃশ। কেশরাসী কুঞ্চিত ও দীর্ঘ। পরিধানে পীতবস্ত্র। হাতে মনোহর বংশী।
কৃষ্ণের সম্ভোগের জন্য দেবতাদের নির্দেশে দেবী লক্ষ্মী সাগরের গৃহে পদ্মার উদরে জন্মগ্রহণ করলেন। অপরূপ সৌন্দর্যশালিনী সেই কন্যার নাম হল রাধা। নপুংসক আইহনের সঙ্গে বিবাহ হল রাধার। রাধার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিযুক্ত করা হল কুদর্শনা বৃদ্ধা বড়াইকে ।
।। তাম্বুলখণ্ড ।।
দধি-দুগ্ধের পসরা নিয়ে বড়াই ও সখীদের সঙ্গে রাধা বনপথে প্রত্যহ যান মথুরায়। একদিন চলতে চলতে রাধা বড়াইকে পেছনে ফেলে চলে এলেন বকুলতলায়। তারপরে খেয়াল হল তাঁর সঙ্গে বড়াই তো নেই। এদিকে রাধার হদিশ না পেয়ে বড়াইএর মনেও জাগল শঙ্কা। কর্তব্যে এই ত্রুটি ক্ষমা করবে না আইহনের পরিবার।
পথ চলতে চলতে বড়াই দেখতে পেলেন গোচারণরত এক রাখালকে। কাছে গিয়ে বড়াই বুঝলেন রাখাল তাঁর পরিচিত। নাম তার কানাই। হয়তো কানাই পারবে রাধার হদিশ দিতে। কানাই অর্থাৎ কৃষ্ণ বড়াইকে দেখে বললেন, ‘কি গো, বৃন্দাবনের পথে পথে এমন করে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন?  কিছু হারিয়েছে না কি?’
বড়াই বললেন, ‘সুন্দরী নাতনীকে নিয়ে আসছিলাম। তাকে আর খুঁজে পাচ্ছি না।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘সে কি! হারিয়ে গেল! নাম কি তার? দেখতে কেমন?’
-‘ বৃন্দাবনের পথেই হারিয়েছি তাকে। নাম তার চন্দ্রাবলী। ত্রৈলোক্যসুন্দরী সে। বাছা, আমাকে তুমি মথুরার পথ বলে দাও।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘নিশ্চয়ই বলে দেব মথুরার পথ। তবে একটা শর্তে। তুমি আমাকে তোমার নাতনীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে, বুঝলে!’
-‘এ আর এমন কি! তোমার সঙ্গে তার আলাপ করিয়ে দেব, কথা দিলাম।’
-‘বেশ। তাহলে তার রূপের একটু বর্ণনা দাও।’
-‘শোনো তবে। তার কেশপাশে সুরঙ্গ সিন্দুর দীপ্তি পাচ্ছে, যেন সজল মেঘের ভিতর দিয়ে উদয় হচ্ছে সূর্যের। তার অম্লান আননের দ্যুতি কনককমলের মতো। তাকে দেখলে মোহগ্রস্ত হয় তপস্বীরও মন। তার অলকাবলির ললিতকান্তি দেখে তমালকলিকারা লজ্জিত হয়। তার কজ্জলশোভিত অলস লোচন দেখে নীলোৎপল প্রবেশ করে জলে। শঙ্খ লজ্জা পায় তার কণ্ঠদেশ দেখে। পক্কদাড়িম্ব অভিমানে বিদীর্ণ হয় তার পয়োধরযুগলকে দেখে। কটিদেশ তার ক্ষীণ, গুরুভার বিপুল নিতম্ব। মত্ত রাজহংস অপেক্ষা অনুপম তার গতি।’
রাধার রূপ বর্ণনা শুনে কৃষ্ণ কামকাতর হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘রাধার রূপ বর্ণনা শুনে আমি কাতর হয়ে পড়েছি। এমন পুষ্পিত, মধুকরগুঞ্জিত বসন্তে আমি আর ধৈর্য রাখতে পারছি না।  তুমি তাকে নিয়ে এসো।’
-‘ কথা রাখব তোমার। এখন তুমি বলে দাও মথুরার পথ। আমি ঠিক রাধাকে নিয়ে আসব তোমার কাছে।’
অবশেষে রাধার দেখা পেলেন বড়াই। রাধার হাতে তুলে দিলেন কর্পূর, তাম্বুল, ফুল আর নেত্রবস্ত্র; বললেন এসব পাঠিয়েছেন কৃষ্ণ। বড়াইএর কথা শুনে অতীব ক্রুদ্ধ হলেন রাধা। মাটিতে ফেলে দেন কৃষ্ণপ্রদত্ত দ্রব্যাদি। তখন বড়াই তিরস্কার করে বলেন, ‘ছিঃ, এমন কাজ করতে নেই।  নন্দনন্দন কৃষ্ণ যে তোমার বিরহে কাতর।’
রাধা বলেন, ‘ঘরে আমার সুলক্ষণযুক্ত স্বামী আছেন। নন্দদুলাল গোপালক কৃষ্ণ আমার কে? তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করতে আমার বয়েই গেছে।’
প্রত্যুত্তরে বড়াই বলেন, ‘যে দেবতাকে স্মরণ করলে পাপমুক্তি ঘটে, তার সঙ্গে প্রেম সম্পর্ক হলে তুমি যে বিষ্ণুলোকে যাবে।’
- ‘দরকার নেই বিষ্ণুলোক। বড়াই তোমার মতলবটা কি? বয়স তো অনেক হল, এসব কুকথা বলতে লজ্জা করে না তোমার? আর কক্ষনো বলবে না এসব কথা।


।। দানখণ্ড ।।
দিনকয়েক পরের কথা। আবার দধি-দুগ্ধের পসরা সাজিয়ে বড়াইএর সঙ্গে রাধা চলেছেন মথুরার পথে। এদিকে রাধার গমন পথে মহাদানী সেজে বসে আছেন কৃষ্ণ। রাধা কাছে আসতে তিনি বললেন, ‘শোনো রাধা, আমি দানী, দান আদায় করি। এতদিন ফাঁকি দিয়েছ তুমি। আজ আর পারবে না ফাঁকি দিতে। তোমার কটিদেশ এত ক্ষীণ যে হাতের মুঠোয় ধরা যায়; দাড়িম্বসদৃশ তোমার স্তনযুগল বড় সুন্দর। আমার প্রাপ্য দান পরিশোধ করে আমাকে আলিঙ্গন করো।’
কৃষ্ণের কথা শুনে রাধা হতবাক। বড়াইকে তিনি বলেন, ‘তোমার কৃষ্ণ তো বড় নির্লজ্জ। কামলালসা চরিতার্থ করার জন্য সে মহাদানী সেজেছে। আমার যৌবন, আমার কটিদেশ, আমার স্তনযুগলের কথা বলে কেন সে? কেন আমাকে সে অপমান করছে? এর একটা বিহিত করো তুমি।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘রাজার কাছ থেকে পথ আর হাটের শুল্ক আদায়ের ভার নিয়েছি। দধি-দুগ্ধের পসরা নিয়ে তুমি প্রতিদিন যাও মথুরায়। কিন্তু দান দাও না। তোমার বহু দান বাকি পড়েছে।’
খড়ি পেতে দান গণনা করেন কৃষ্ণ, তারপর বলেন, ‘তোমার নয় লক্ষ কড়ি বাকি পড়েছে; বারো বছরের দান।’
রাধা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘কি যা তা বলছ! আমার বয়স এগারো, তাহলে বারো বছরের দান বাকি থাকে কি করে! দেখো কানাই, আমি সম্ভ্রান্ত বংশের কন্যা, সম্ভ্রান্ত বংশের বধূ, আমার রুপ-যৌবনে লাভ কি তোমার? গাছের উপর পাকা বেল দেখে কাকের লোভ হলেও সে কি তা খেতে পারে? তোমাকে মিনতি করছে, আমার মান রাখো, আমাকে যেতে দাও।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘তোমার রূপ দেখে আমি পাগল হয়েছি রাধা।’
--‘ তাহলে গলায় পাথর বেঁধে জলে ডুবে মরো।’
-‘ তুমি আমার গঙ্গা, তুমি আমার বারাণসী, তুমি সর্বতীর্থসার।’
-‘ ছি ছি, লজ্জা হয় না তোমার! আমি না তোমার মাতুলানী!’
-‘ সে সম্বন্ধ সত্যি নয়। সত্যি হল, আমি দেবরাজ, আর তুমি আমার রানি।’
- ‘ কামজ্বরে ভুগছ তুমি। বিকারের ঘোরে বলছ এ সব।’
-- ‘যাই বলো রাধা, কিন্তু আমার হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার আশা ছেড়ে দাও।’
--‘ ছি কানাই, ছিঃ। শুল্ক আদায়ের ছলনায় তুমি তোমার মামির উপর বলপ্রয়োগ করছ! জানো না, পরস্ত্রীর প্রতি লোভ মহাপাপ!’
কৃষ্ণ গম্ভীরভাবে বলেন, ‘বসুদেব আর দৈবকীর পুত্র আমি। কংসাসুর আমার মাতুল। সেই সূত্রে তুমি আমার শ্যালিকা, মাতুলানী নও। এ সব বাজে কথা বাদ দাও। একবার প্রসন্ন হয়ে আমার দিকে মুখ তুলে চাও। তোমার উন্নত পয়োধরে পীড়ন করো আমাকে। তাহলেই দূর হবে আমার সন্তাপ। রাধা, তোমার দেহের মাপ সাড়ে তিন হাত, তার জন্য দান হবে দুই কোটি মুদ্রা। মাথায় ফুলের মালার  দান লক্ষ মুদ্রা। তোমার সুন্দর কেশরাশির দান দুই লক্ষ মুদ্রা। সীমন্তের সিন্দূর দুই লক্ষ মুদ্রা। নিষ্কলঙ্ক আননের দান চার লক্ষ মুদ্রা। নীলোৎপলসদৃশ নয়ন দুটির দান পাঁচ লক্ষ। গরুড়সদৃশ নাসিকার দান ছয় লক্ষ। কর্ণকুণ্ডলের জন্য সাত লক্ষ, দন্তরাজির জন্য আট লক্ষ, বিম্বফলের মতো অধরের জন্য নয় লক্ষ, বাহুদুটির জন্য এগারো লক্ষ, নখপংক্তির জন্য বারো লক্ষ মুদ্রা দান দিতে হবে তোমাকে। না, না, শেষ নয় এখানে। তোমার স্তনযুগলের জন্য তেরো লক্ষ, কটিদেশের জন্য চোদ্দ লক্ষ, কদলীসদৃশ উরুর জন্য পনেরো লক্ষ, চরণযুগলের জন্য যোল লক্ষ আর হেমপটনিন্দিত জঘনের জন্য চৌষট্টি লক্ষ মুদ্রা দান দিতে হবে।’
--‘এ সব কি বলছ তুমি? কিসের ঘাট? কিসের দান? এ সব কপটতা ছাড়ো। মানুষের দেহের উপর আবার দান ধরা হয় না কি! দেখো কানাই, পরদার গ্রহণে বিষম পাপ। ভৈরবপত্তনে গিয়ে দেহ বিসর্জন দিয়ে তুমি পাপমুক্ত হও। ’
রাধার কথা শুনে কৃষ্ণ হেসে বলেন, ‘রাধা তোমার উরুদুটিই ভৈরবপত্তন; তা যখন এত কাছে আছে, তাহলে দূরে যাই কেন! কলসি বেঁধে গঙ্গায় ডুবে মরার কথা বলছ? তোমার কুচযুগলই তো কলসির মত, সেই কলসি বেঁধে আমি লাবণ্যগঙ্গাজলে ডুবে মরতে রাজি।’ এরপরে একটু গম্ভীর হয়ে কৃষ্ণ বলেন, ‘পাপ খণ্ডনের কৌশল আমি জানি রাধা, তোমার কাছে সে সব শুনব কেন?’

রাধা বলেন, ‘তোমার আসল অভিসন্ধি বুঝতে বাকি নেই আমার। অনেক হয়েছে, এবার পথ ছাড়ো।’-‘ আমার আসল অভিসন্ধি? তা যখন বুঝেছ, তখন এসো আমার কাছে। রতিদান করো রাধা, না হলে ছাড়ব না তোমাকে, কিছুতেই না। ’রাধা বুঝতে পারেন, কৃষ্ণের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব। তিনি বড়াইকে বলেন, ‘আমি পাখি হলে এখান থেকে উড়ে যেতাম। দেখো বড়াই, কৃষ্ণ যদি বলপ্রয়োগ করে তাহলে আমি প্রাণত্যাগ করব। নিজের মাংসের জন্য হরিণী জগতের বৈরী। আমার রূপই কাল হল। সেই রূপে প্রলুব্ধ কৃষ্ণ। কিন্তু তার আশা পূর্ণ হবে না। ’রাধার কথা শুনে একটুও বিচলিত হন না কৃষ্ণ। বরং আত্মপ্রশংসায় মুখর হয়ে ওঠেন। জানান যে কালো জগতের আলো। এ সব শুনে আরও হতাশ হন রাধা। পথ ছেড়ে দেবার জন্য কাতর অনুরোধ করেন কৃষ্ণকে। কিন্তু কৃষ্ণ অবিচলিত, তখন রাধা বড়াইকে বলেন, ‘বড়াই তোমার কি মনে হয়, নন্দনন্দন কৃষ্ণ আমার যোগ্য? মর্কটের গলায় কি গজমুক্তা মানায়?’ চতুর বড়াই দেখতে থাকেন রাধাকে। মুখে প্রতিবাদ করছেন, কিন্তু তাঁর সর্বাঙ্গে রতিরঙ্গের লক্ষণ প্রকট। ঈষৎ হেসে বড়াই বলেন, ‘এত দেরি হল কেন তোমার ? তুমি কি বনে কৃষ্ণের সঙ্গে ছিলে?’

।| নৌকাখণ্ড ।।

অনেক দিন রাধার সঙ্গে দেখা হয় নি কৃষ্ণের। তাই তাঁর মন বড় ব্যাকুল। কি ভাবে দেখা পাওয়া যায় রাধার? বড়াইকে কৃষ্ণ বলেন, ‘রাধাকে মথুরার হাটে যাবার কথা বলো। বলো যে এবার ভিন্ন পথে যাবে, তাহলে কৃষ্ণ তার হদিশ পাবে না। ’বড়াই সম্মত হন। কৃষ্ণকে তিনি যমুনার ঘাটে নৌকা গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেন। বড়াইএর কথা শুনে কৃষ্ণ এমন নৌকা তৈরি করেন, যাতে মাত্র দুজনের স্থান হয়। এরপর আরও একটা বড় নৌকা তৈরি করেন তিনি, আর সেটা ডুবিয়ে রাখেন জলে। বড়াইএর কথা শুনে যথাসময়ে ঘাটে এলেন রাধা। কিন্তু দেখা গেল বড়াই সেখানে নেই। নদীতে একটা নৌকা আছে। কিন্তু বড্ড ছোট সে নৌকা। সখীদের নিয়ে সে নৌকায় যাওয়া অসম্ভব।  একজন একজন করে পার হতে হবে।কিন্তু কোথায় ঘাটোয়াল? রাধা ভালো করে তাকিয়ে দেখে বুঝলেন, ঘাটোয়াল আর কেউ নয়, সেই নন্দনন্দন কৃষ্ণ। কি আর করেন রাধা! নৌকায় উঠে তিনি ঘাটোয়ালকে বলেন, ‘ওহে ঘাটোয়াল, আমাকে পার করে দাও তাড়াতাড়ি। পথে বলপ্রয়োগের চেষ্টা করো না। মনে রেখো, আমাদের সম্পর্কের কথা। তোমার মা যশোদা আমার ননদ, আর তুমি আমার ভাগনে।’

।। ভারখণ্ড ।।

বৃন্দাবনের অভ্যন্তরে গিয়ে কৃষ্ণ চামর গাছের ডাল কেটে তৈরি করেন বাঁক। ঝামা দিয়ে ঘষে চিকন করে তোলেন তাকে। পাটের দড়ি দিয়ে তৈরি করেন শিকে। এ ভাবে রাধার জন্য প্রস্তুত হয় ভার। কিন্তু রাধার বুঝতে বিলম্ব হয় না কৃষ্ণের অভিসন্ধি। নিশ্চয়ই তার কোন বদ মতলব আছে। রাধার পেছন পেছন আসতে থাকেন কৃষ্ণ। রাধা কৃষ্ণকে বলেন, ‘আমার পেছন পেছন আসছ কেন? তোমার কি লজ্জা নেই? তবুও আসছ? বেশ, আমার সঙ্গে আসতে চাও যদি, তাহলে এই দধি-দুগ্ধের ভার বহন করো। ’ছদ্মরাগে কৃষ্ণ বলেন, ‘এ কি বলছ রাধা? আমি হলাম ত্রিভুবনের অধিপতি। জমলার্জুন আর শকটাসুরকে আমি বধ করেছি। কংসাসুরকে বধ করার জন্য আমার জন্ম। সেই আমি ভার বহন করব তোমার ? যৌবনের অ্হংকারে এসব কি যা তা বলছ তুমি?’- ‘যমুনার ঘাটেই তো এক প্রহর বেলা কেটে গেল। মথুরার হাটে কখন যাব? আমার সখীরা সব এগিয়ে গেছে। তুমি ভার বহন করবে কি না বলে দাও। রাজি না হলে আমি আমার হার বিক্রি করে অন্য কোন ভারীকে নিযুক্ত করব।’ রাধার কথা শুনে এগিয়ে এলেন কৃষ্ণ। ভার বহনের ছলনায় নষ্ট করে দিলেন দধি-দুগ্ধ। হায় হায় করে উঠলেন রাধা, কৃষ্ণকে হাত লাগাতে বললেন তিনি। কৃষ্ণ বললেন, ‘তোমার কথায় লোকে আমাকে উপহাস করছে। আমি কেমন করে তোমার ভার বহন করব ? ’রাধা বলেন, ‘গোয়ালা হয়ে কে না ভার বহন করে? দেখো কানাই, দয়া করে এখন এটুকু করো, ফেরার পথে তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করব। ’রাধার কথা শুনে আনন্দিত হলেন কৃষ্ণ। ভারখণ্ডান্তর্গত ছত্রখণ্ড। বড়াইএর কাছে রাধা তাঁর বিড়ম্বনার কাহিনি ব্যক্ত করেন। ছলনাময় কৃষ্ণের আচরণ বুঝতে পারেন না তিনি। কখনও কৃষ্ণ মহাদানী সাজেন, কখনও আবার

ভারবহনকারী। ভার বহন করতে গিয়ে কৃষ্ণ নষ্ট করে দিয়েছেন রাধার পসরা। কিন্তু কোন অনুতাপ নেই তাঁর। কৃষ্ণ এর পরেও বলে যাচ্ছেন রাধার দেহসম্ভোগের কথা। রাধাকে নীরব দেখে কৃষ্ণ আবার তোষামোদ শুরু করেন। প্রশংসা করতে থাকেন রাধার রূপের। বলে যান যে রাধা তাঁর বিরহজ্বালা দূর করতে পারেন। বড়াই কৃষ্ণকে জানান যে তাঁর কাকুতি-মিনতিতে তুষ্ট হয়েছেন রাধা। দ্রবীভূত হয়েছে তাঁর হৃদয়। সম্মত হয়েছেন তিনি রতিদানে।বড়াই কৃষ্ণকে বলেন, ‘খর রৌদ্রে রাধা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তুমি তার মাথায় ছত্র ধারণ করে তাকে কুঞ্জে নিয়ে যাও। ’সে কথা শুনে কপট রাগ করে কৃষ্ণ বলেন, ‘কি? আমাকে রাধার মাথায় ছত্র ধারণ করতে করতে হবে? এত অপমান?’ রাধা বলেন, ‘সুরতির আকাঙ্খা থাকলে অপমান সহ্য করতে হবে।’ কৃষ্ণ বলেন, ‘রাধা, আর বিরহজ্বালা সহ্য করতে পারছি না।’

-‘ যোগী সেজে বসে আছ তুমি। বিরক্ত করছ পরনারীকে। বিয়ে করে সংসার করতে পারো না?’
গম্ভীর হবে কৃষ্ণ বলেন, ‘আমি হরি, আমিই হর, আমি মহাযোগী, আমি দেবাদিদেব। তোমার কাছে করজোড়ে রতি ভিক্ষা করছি রাধা।’


।। বৃন্দাবনখণ্ড ।।
কালিন্দী নদীর তীর। মন্দ মন্দ বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। অভিসারে এসেছেন কৃষ্ণ। অপেক্ষা করে আছেন রাধার জন্য। রাধার জন্য শয্যারচনাও প্রস্তুত। বাজছে সংকেতবেণু।
বড়াই রাধাকে বললেন, ‘রাধা তুমি আর বিলম্ব করো না। তুমি তো জানো কৃষ্ণ বড় অভিমানী । তোমার বিলম্বে তার অভিমান হবে।’
বড়াইএর মুখে বৃন্দাবনের কথা শুনে আনন্দিত হলেন গোপবালিকারা। রাধাকে নিয়ে তাঁরা যাত্রা করলেন বৃন্দাবনের দিকে। বড়াইকে সম্মুখে রেখে চলতে লাগলেন চন্দ্রাবলী। গোপবালিকারা গান গাইতে লাগলেন মনের আনন্দে। কৃষ্ণের কাছে গিয়ে তাঁরা বললেন, ‘ হে কৃষ্ণ,  লজ্জা সংকোচ ত্যাগ করে আমরা এসেছি তোমার কাছে। আমাদের তুমি ত্যাগ করো না কানাই।’
তাঁদের কথা শুনে কৃষ্ণ আনন্দিত হলেন। নানাভাবে তাঁদের মনস্তুষ্টি বিধানের চেষ্টা করলেন তিনি। তাঁরা চলে যাবার পরে কৃষ্ণের হৃদয়াসীনা হয়ে বসলেন রাধা। তখন তাঁর বসন স্খলিত, জঘন কাঞ্চিমুক্ত ।
কৃষ্ণ গাঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘রাধা, তোমার জন্য রচনা করেছি এই বৃন্দাবন। এখানে একটি নিভৃত স্থান আছে , তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব।
তারপরে কৃষ্ণ রাধার রূপের প্রশংসা শুরু করলেন। তাঁর দেহের বিবিধ অঙ্গগুলিকে তুলনা করতে লাগলেন বিবিধ ফুলের সঙ্গে। রাধার চরণযুগল হৃদয়ে ধারণ করার অনুমতি প্রার্থনা করে তিনি বলতে লাগলেন, ‘রাধা, তুমি আমার  রতনভূষণ, তুমিই আমার জীবন।’


।। কালীয়দমনখণ্ড ।।
বৃন্দাবনের মধ্য  দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে যমুনা নদী। সেই নদীতে কালীদহ নামে আছে একটি গভীর হ্রদ।  সেই হ্রদে বাস করে কালীয়নাগ নামে এক বিষধর সাপ। তার উগ্র বিষে হ্রদের জল বিষময়। কোন জন্তু পান করতে পারে না সেই জল।
গোপীদের বিদায় দিয়ে মথুরা নগরে যাবার পথে জলক্রীড়া করার ইচ্ছা হল কৃষ্ণের। কালীদহের কদম্বতলায় এলেন তিনি। গোপবালকদের নিষেধ অমান্য করে কদম্ববৃক্ষ থেকে তিনি ঝাঁপ দিলেন কালীদহে।
কালীয় নাগ সপরিবারে দংশন করতে লাগল কৃষ্ণকে। তীব্র বিষের জ্বালায় চৈতন্য হারালেন কৃষ্ণ। লোকমুখে এ কথা শুনে ছুটে এলেন নন্দ আর যশোদা। মাটিতে লুটিয়ে কাঁদতে লাগলেন তাঁরা।  কাঁদতে লাগল গোপবালকেরা। সেই বিলাপে মুখরিত হল চারদিক।
বলভদ্র বুঝতে পারলেন কৃষ্ণ আত্মবিস্মৃত হয়ে মোহগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁকে জানাতে হবে পূর্ব বৃত্তান্ত। তাহলেই তাঁর চৈতন্য ফিরে আসবে।
বলভদ্র কৃষ্ণের ঈশ্বরসত্তার কথা, নানা অবতাররূপে পৃথিবীকে রক্ষা করার কথা বলায় কৃষ্ণের চৈতন্য ফিরে এল। সকলে স্বস্তির শ্বাস ফেললেন।


।। বস্ত্রহরণখণ্ড ।।
সখীদের সঙ্গে নিয়ে গজপতিছন্দে রাধা জল আনতে চলেছেন যমুনায়। ঘাটেই দেখা কৃষ্ণের সঙ্গে। কৃষ্ণকে দেখে সখীরা বিহ্বল। চোখে তাঁদের পলক পড়ে না।
রাধা কৃষ্ণকে বললেন, ‘একটু সরে দাঁড়াও কানাই। আমাদের জল ভরতে দাও।’ 
কৃষ্ণের এমন ভাব যেন তিনি চেনেন না রাধাকে। বললেন, ‘কে তুমি? কার বধূ? কেন জল আনতে এসেছ যমুনায়?’
রাধা রেগে গিয়ে বলেন, ‘যার বধূ  হই না কেন, তাতে তোমার কী?’
কৃষ্ণ বলেন, ‘কাঁধের কলস নামিয়ে রাখো। কথা আছে তোমার সঙ্গে।’
-‘কি কথা?’
-‘এই তাম্বুল নাও তো আগে।’
-তাম্বুল দিয়ে কি বলতে চাও তুমি?’
-‘শোনো সুন্দরী, আমি হলাম সমস্ত যমুনার অধিকারী।’
-‘বুঝতে পেরেছি তোমার মতলব। তোমার সঙ্গে কোন কথা নেই আমার।’
রাধার মন জয় করার জন্য কৃষ্ণ তাঁকে স্বর্ণময় কিঙ্কিনী, পট্টবস্ত্র, স্বর্ণময় বাঁশি  দিতে চাইলেন। রাধা সম্মত হলেন না কিছুতেই। তখন কৃষ্ণ বললেন, ‘রাধা, ডালিমের মতো তোমার পয়োধর দুটি আমার মন মাতিয়েছে।’
রাধা ক্রুদ্ধভাবে বলেন, ‘আমার পয়োধর মাকাল ফল সদৃশ। দেখতে সুন্দর, কিন্তু মুখে দিলেই মৃত্যু।’
রাধার নিষ্ঠুর কথা শুনে দুঃখ পেলেন কৃষ্ণ। বড়াই তিরস্কার করলেন রাধাকে। তিনি রাধাকে সরস বচনে কৃষ্ণের তুষ্টি বিধান করতে পরামর্শ দিলেন। কৃষ্ণও জানালেন তাঁর বিরহজ্বালার কথা।
রাধা বললেন, ‘পথে-ঘাটে কেন তুমি প্রকাশ্যে এ সব বলো কানাই! কে কোথায় শুনতে পাবে । আমার শাশুড়ি বড় দুর্জন, শুনতে পেলে আমার দুর্দশার অন্ত্য থাকবে না।’
কৃষ্ণ আর পীড়াপীড়ি করলেন না। ফিরে গেলেন রাধা।
দিনকয়েক পরে সখীদের নিয়ে রাধা আবার এলেন যমুনার তীরে। কৃষ্ণ বললেন, ‘রাধা, তুমি যমুনার জলে স্নান করতে পারো।  সর্পভয় আর নেই। তাকে আমি হত্যা করেছি।’
কৃষ্ণের আশ্বাসে জলে নামলেন রাধা ও তাঁর সখীরা। জলকেলিতে মত্ত হয়ে উঠলেন তাঁরা। এই সুযোগে কৃষ্ণ তাঁদের বসন-ভূষণ নিয়ে উঠে বসলেন কদম্বতরুতে। সে কথা জানতে পেরে গোপীরা বড় বিড়ম্বনা বোধ করতে লাগলেন। অর্দ্ধজলমগ্ন হয়ে দক্ষিণ বাহুদ্বারা বক্ষোদেশ আবৃত করে রাধা বলতে লাগলেন, ‘এ তোমার কি ব্যবহার কানাই? দাও আমাদের বসন দাও’
কৃষ্ণ বলেন, ‘তীরে উঠে হাত জোড় করে দাঁড়াও। তাহলেই পাবে তোমাদের বসন-ভূষণ।’
অগত্যা তাই করতে হল রাধা ও তাঁর সখীদের। কৃষ্ণ দুচোখ ভরে দেখলেন নগ্ন যুবতীদের রূপ। তারপরে ফিরিয়ে দিলেন বসন-ভূষণ। শুধু লুকিয়ে রাখলেন রাধার হারটি।


।। হারখণ্ড ।।
যশোদার কাছে এসে রাধা অভিযোগের সুরে বললেন, ‘তোমার কানাই আমার পট্টবস্ত্র আর সাতলহরী হার অপহরণ করেছিল। শেষ পর্ষন্ত পট্টবস্ত্র ফেরত দিলেও সে হার ফেরত দেয় নি এখনও।’
অবাক হয়ে যশোদা বলেন, ‘সে কি কথা!’
-‘ কৃষ্ণ বড় বেয়াড়া হয়ে উঠেছে। শাসন করো তাকে। যখন তখন সে আমাকে আর আমার সখীদের উৎপীড়ন করে। কংস যদি এ কথা জানতে পারে, তবে বড় অনর্থ হবে।’
যশোদা কৃষ্ণকে ডেকে তিরস্কার করে বললেন, ‘তোমার জন্য আর কত গঞ্জনা সহ্য করব আমি! কুবুদ্ধি পরিত্যাগ করো কানাই। সংযত করো মনকে।’


।। বাণখণ্ড ।।
যশোদার কাছে কৃষ্ণের নামে অভিযোগ করে এসেছিলেন রাধা। সে জন্য ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন কৃষ্ণ। বড়াই তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘রাধা বাড়াবাড়ি করছে। তোমার কথা বলতে গেলাম তাকে, সে আমাকে গালমন্দ করল। নিজেকে সতী বলে ঘোষণা করল। তুমি দেব বনমালী, অথচ রাধা তোমাকে একটুও সমীহ করে না।’
এ রকম অবস্থায় কি করা যায় তা জানতে চান কৃষ্ণ। বড়াই বলেন, ‘শোনো কানাই, আমি রাধাকে বৃন্দাবনে নিয়ে আসছি। তুমি তার উপর স্তম্ভন, মোহন, দহন, শোষণ, উচাটন বাণ নিক্ষেপ করো।’
মথুরার পথে যমুনা পার হয়ে রাধা এলেন বৃন্দাবনে। দেখলেন কদম্বতলায় বসে আছেন কৃষ্ণ । রাধাকে দেখে কৃষ্ণ বলেন, ‘অকারণে আমার এত নিন্দা করছ কেন? আজ আমি প্রতিশোধ নেব। পঞ্চবাণে আঘাত করব তোমাকে। দেখি কে বাঁচায় তোমাকে! এরপরে আমি আইহন আর কংসকেও হত্যা করব।’
বাণের কথা শুনে ভীত হলেন রাধা। প্রাণরক্ষার জন্য মিনতি করতে লাগলেন তিনি। কিন্তু কৃষ্ণ কোন কথা শুনলেন না। তিনি বাণ নিক্ষেপ করলেন। অনুতাপ করতে করতে রাধা মূর্চ্ছিতা হলেন। রাধার মনে জেগে উঠল কৃষ্ণপ্রেম। বড়াইএর অনুরোধে রাধার জ্ঞান ফিরিয়ে দিলেন কৃষ্ণ।


।। বংশীখণ্ড ।।
সখীদের সঙ্গে যমুনার ঘাটে স্নান করতে যান রাধা। নদীর তীরে বসে থাকেন কৃষ্ণ। যুবতীদের রঙ্গ দেখেন। কখনও বাজান করতাল, কখনও বা মৃদঙ্গ। সখীরাও কৃষ্ণের সঙ্গে রঙ্গ-তামাশায় মেতে ওঠেন। রাধা কিন্তু নিস্পৃহ থাকেন।
রাধার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কৃষ্ণ তৈরি করেন এক মোহন সুন্দর বাঁশি। সে বাঁশিতে আবার সোনা ও হিরের কাজ। সে বাঁশির সুর আকুল করে তোলে মনকে। ব্যাকুল হয়ে ওঠে রাধার মন। 
পরের দিন রাধা সেই সুরের আকর্ষণে আবার যান যমুনার ঘাটে। কিন্তু ঘাট যে শূন্য। কোথায় কৃষ্ণ! কোথায় সে মোহন বাঁশির সুর! রাধা বড়াইকে বলেন কৃষ্ণের কথা। তিরস্কার করে বড়াই বলেন, ‘কত বড় বংশের কন্যা তুমি, কত বড় বংশের বধূ। কেন পরপুরুষের সঙ্গ কামনা করছে? আগে যা হবার হয়েছে, নতুন করে আবার কেন পাপে জড়াতে চাইছ?’
ঠিক তখনি মাঝ বৃন্দাবন থেকে ভেসে আসে বাঁশির সুর।
কি যে জাদু আছে সে সুরে! রাধার প্রাণ আকুল হয়ে ওঠে। বর্তমান ভুলে যান তিনি। কাতর অনুরোধ করে তিনি বড়াইকে বলেন, ‘যেমন করে পারো আমার কানাইকে এনে দাও বড়াই ।’
ঘরের কাজে আর মন বসে না রাধার। এলোমেলো হয়ে যায় তাঁর জীবন। আগুন জ্বলে মনে । দাবানলের মতো দৃশ্যমান নয় বলে কেউ বুঝতে পারে না। রাধা যদি পাখি হতেন, তাহলে উড়ে চলে যেতে পারতেন তাঁর দয়িতের কাছে ।
সরস বসন্ত এসেছে ধরায়। রাধা অনুভব করেন তীব্র বিরহজ্বালা। বড়াইকে নিয়ে তিনি বৃন্দাবনে যান। কৃষ্ণের সন্ধানে। কিন্তু কৃষ্ণের দেখা পান না। ফিরে আসতে হয় ব্যর্থ হয়ে।গভীর রাতে আবার ভেসে আসে বাঁশির সুর। রাধা আকুল পাগলপারা। শয্যায় উঠে বসেন তিনি। স্বামী আইহনকে নিদ্রিত দেখে চুপিসারে বেরিয়ে পড়েন। পাগলের মতো খুঁজতে থাকেন কানাইকে। তারপরে মূর্চ্ছিতা হয়ে পড়েন। তাঁকে ভোরবেলা উদ্ধার করে আনেন বড়াই।
রাধার অবস্থা দেখে বড় দুঃখ হয় বড়াইএর। রাধাকে তিনি বলেন, ‘চলো, যমুনায় জল আনতে যাই। কৃষ্ণ সেখানে  থাকবে। তুমি ছল করে চুরি করে আনবে তার বাঁশি।’
--‘কি করে চুরি করব বাঁশি?’
-‘আমি মন্ত্র পড়ে কৃষ্ণকে নিদ্রিত করে রাখব। সেই সুযোগে তুমি বাঁশি চুরি করবে।’
--‘লাভ কি হবে বাঁশি চুরি করে?’
--‘লাভ আছে। সেই বাঁশি নিতে তোমার কাছে আসতে হবে কানাইকে।’
বড়াইএর পরিকল্পনামতো রাধা কৃষ্ণের বাঁশি চুরি করেন। তখন কৃষ্ণ বিলাপ শুরু করেন। বড়াই বলেন, ‘তুমি গোপীদের অপমান করেছ। প্রতিশোধ নেবার জন্য তারাই বাঁশি চুরি করেছে।’
কৃষ্ণ যান গোপীদের কাছে। হঠাৎ দেখতে পান দূরে দাঁড়িয়ে রাধা মুচকি হাসছেন। চোর কে তা বুঝতে বাকি থাকে না। কিন্তু রাধা কিছুতেই স্বীকার করতে চান না। অনুনয়ে কোন কাজ না হওয়ায় কৃষ্ণ ভীতি প্রদর্শন করে বলেন, ‘প্রাণে বাঁচতে চাও তো ফেরত দাও বাঁশি। না হলে তোমার বসন-ভূষণ কেড়ে নেব, বেঁধে রাখব তোমাকে, হত্যা করতেও দ্বিধা করব না, বুঝলে ?’
রাধা বলেন, ‘মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ কানাই। যাও বড়াইকে ধরো। সেই চতুরা বুড়ি লুকিয়ে রেখেছে তোমার বাঁশি।’
বিভ্রান্ত কৃষ্ণ বলেন, ‘তুমি বড়াইএর দোষ দাও, বড়াই তোমার দোষ দেয়। কিন্তু রাধা, আমি জানি বড়াই নয়, তুমিই লুকিয়ে রেখেছ আমার বাঁশি।’
কথা বলতে বলতে কৃষ্ণ রাধার বস্ত্রাঞ্চল ধরে বলেন, ‘বাঁশি না পেলে যেতে দেব না তোমাকে ।’
তখন মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে আসেন বড়াই, কৃষ্ণকে বলেন, ‘তুমি হাতজোড় করে বিনীতভাবে রাধার কাছে বাঁশি চাও কানাই।’
বড়াইএর কথামতো কৃষ্ণ রাধার কাছে হাতজোড় করে দাঁড়ান। রাধা বলেন, ‘এরপর থেকে আমার কথামতো চলার প্রতিশ্রুতি দেলে বাঁশি ফেরত পাবে।’
কৃষ্ণ প্রতিশ্রুতি দেন। 
রাধা বলেন, ‘আমি বিরহে কাতর হলে তুমি আমাকে সঙ্গ দেবে। কোন অন্যথা হবে না তো !’
কৃষ্ণ জানান যে কোন অন্যথা হবে না।
রাধা তখন বাঁশি ফেরত দেন কৃষ্ণকে।


।। রাধাবিরহ ।।
দীর্ঘকাল দেখা নেই কৃষ্ণের। এদিকে চৈত্রমাস এসেছে। ঋতুরাজ বসন্তের সমারোহ চারদিকে । বিরহজ্বালায় দগ্ধ হচ্ছে রাধার হৃদয়।
কোথায় গেলেন কৃষ্ণ!
নিজের প্রতিশপুতি কি ভুলে গেলেন তিনি!
বড়াইকে সঙ্গে নিয়ে রাধা যান বৃন্দাবনে। মোহিনী বেশ ধারণ করে কদম্বতলায় রচনা করেন শয্যা। অপেক্ষা করেন, অপেক্ষা করেন, কিন্তু কৃষ্ণের দেখা পাওয়া যায় না।
বৃন্দাবনের পথে পাগলের মতো ঘুরতে ঘুরতে রাধা একদিন দেখলেন গোচারণরত কৃষ্ণকে। তাঁর কাছে গিয়ে রাধা বলেন, ‘কানাই আমি যদি কোন দোষ করে থাকি, ক্ষমা করো। কিন্তু তোমার বিরহ আর সহ্য করতে পারছি না।’
কৃষ্ণ কঠিনভাবে বলেন, ‘তোমার কাঁদুনিতে ভুলছি না। আমার আশাত্যাগ করো, নিজের বাড়িতে যাও।’ 
এ কথা বলে সেখান থেকে চলে যান কৃষ্ণ। চোখের জলে ভাসতে থাকে রাধার বুক। নারদের মুখে খবর পাওয়া যায় কদম্বতলায় শয্যা রচনা করে বসে আছেন কৃষ্ণ।  বড়াইকে নিয়ে ছুটে যান রাধা। কৃষ্ণকে দেখে আনন্দে মূর্ছা যান তিনি। বড়াইএর অনুরোধে রাধাকে গ্রহণ করেন কৃষ্ণ। মিলন হয় তাঁদের। তারপরে রাধা নিদ্রিতা হলে কৃষ্ণ বড়াইকে বলেন, ‘আমি মথুরায় চললাম। তুমি রাধাকে সাবধানে রাখবে।’ জাগ্রত হয়ে কৃষ্ণকে দেখতে না পেয়ে হাহাকার করে ওঠেন রাধা। কয়েক দিন পরে রাধার কাতর অনুরোধে কৃষ্ণের সন্ধানে বড়াই যান মথুরায়। সেখানে তিনি কৃষ্ণের আশ্চর্য পরিবর্তন দেখতে পান। দেখতে পান রাধা সম্পর্কে কৃষ্ণের আর কোন আগ্রহ নেই। কংসাসুরকে বধ করাই এখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। কৃষ্ণ বড়াইকে জানান যে রাধা বড় প্রগলভ, তাঁকে দেখলে কৃষ্ণের হদকম্প হয়, তাই রাধার মুখ দর্শনের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা তাঁর নেই.

Comments

Top

গল্প 

 

ঈশ্বর প্রদত্ত গুণ

জয়দীপ চক্রবর্তী

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

প্রায় বারো বছর ধরে মনের মধ্যে জমে থাকা প্রশ্নের আজ সঠিক উত্তর খুঁজে পেলো স্বর্নাশীষ ও বিদুষী। তাদের একমাত্র ছেলে কল্পক আজ বারো বছরের। মাস তিন চারেক বয়স থেকেই বাবা মাকে একটার পর একটা চমক দিয়ে এসেছে কল্পক।
স্বর্নাশীষ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। একটি কসমেটিক্স উৎপাদন সংস্থায় বেশ উচ্চ পদে চাকরি করে ও। নিয়মিত রুটিন মেনেই অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে রোজ দেরী হয় স্বর্নাশীষের। ছেলের জন্মের পরও সেই নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে সদ্য হওয়া বাবা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করে রোজ। কোনোদিন সফল হয় আর কোনোদিন ব্যর্থ। স্বর্নাশীষ যখনই বাড়ি ফেরে সদ্যজাত কল্পক মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকায়। সে যত সংগোপনে, যত নিঃশব্দেই ঘরে ঢুকুক না কেন বাবার উপস্থিতি ছেলে ঠিক টের পেয়ে যায়। তাড়াতাড়ি ফিরলে স্বর্নাশীষের দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসি দেয়। এই হাসি দেখার জন্যই স্বর্নাশীষের তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা। তবে কিভাবে এই সদ্যজাত শিশুর পক্ষে তার বাবার বাড়ি ফেরার খবর জানা সম্ভব হয়, তা শত চেষ্টা করেও বাড়ির কেউই বুঝতে পারে না। তাই অবাক হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনও উপায় নেই।     
এরপর কল্পক ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে, আর বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন, স্কুলের সহপাঠী, শিক্ষক, শিক্ষিকা সবাইকে অবাক করে তুলেছে। 
স্বর্নাশীষদের পাশের ফ্ল্যাটের মেয়ে অক্সিতা কল্পকের থেকে মাস ছয়েকের ছোট। দুই পরিবারের মধ্যে বেশ সদ্ভাব। সেই সুবাদে অক্সিতা কল্পকের খেলা সঙ্গী। অক্সিতার পাঁচ বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন কচিকাঁচা একত্র হয়ে খেলায় মেতেছে। লুকোচুরি খেলা। পাশাপাশি ফ্ল্যাট দুটির বিভিন্ন জায়গায় সকলে অন্তর্ধান হয়েছে। সকলকে খুঁজে বের করার ভার পড়েছে কল্পকের ওপর। করিডরে দাঁড়িয়ে শর্ত অনুযায়ী একশত গুনেছে সে। গোনা শেষ হলে করিডরে দাঁড়িয়েই অক্সিতা কোন ফ্ল্যাটের কোন ঘরের কোন-খানে আছে তা বলে দিল কল্পক। অন্যদের খুঁজতেও বেশি সময় নিলো না ও। প্রতিটি ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ওই ঘরে কে কোন জায়গায় আছে তা বলে দিল। শুধু বাচ্চারাই নয়, তাদের অভিভাবকরাও বেশ বিস্মিত। 
পাড়ায়, স্কুলে সর্বত্র কল্পক একটি আলোচনার বিষয়। কেউ বলে ওর মধ্যে একটা ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে। কেউ বলে কল্পক ম্যাজিক জানে। তবে এই ব্যাপারে কল্পককে জিজ্ঞাসাবাদ করে কেউ সঠিক উত্তর পায় নি। যে উত্তর ও দিয়েছে সেটা কেউ বিশ্বাস করেনি। ও বলেছে, চোখ বন্ধ করে এক মনে ভাবলেই নাকি ও সব কিছু বুঝতে পারে। স্বর্নাশীষ ও বিদুষীকে কল্পক অন্য উত্তর দিয়েছে। তবে সেটাও ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি ওরা। 
যাইহোক সকলে এক বাক্যে এটা স্বীকার করে যে কল্পকের জন্মসূত্রে পাওয়া একটি বিশেষ গুণ আছে। তবে সেই গুণের জন্য কোনোরূপ দর্প নেই কল্পকের। কেবল মাত্র প্রয়োজন বা মজা দিতেই ও ওর এই বিশেষ ক্ষমতা ব্যাবহার করে। 
তবে প্রয়োজন হয় প্রায়শই। স্বর্নাশীষের অফিস পিকনিকে সপরিবারে যাবে ওরা। সকাল বেলা তারই প্রস্তুতি পর্ব চলছে বাড়িতে। বিদুষী পড়েছে বেশ বিপদে। সারা মুখে একটা উদ্বিগ্নতা মেখে আলমারি, ওয়ারড্রব সর্বত্র হাতরে বেড়াচ্ছে ও। মায়ের এমন অবস্থা দেখে কল্পক জিজ্ঞাসা করল, 
- মা, কিছু খুঁজছ? 
- হ্যাঁ 
- কি খুঁজছ বল। আমি খুঁজে দিচ্ছি।
বিদুষী ওর সদ্য কেনা একটা অন্তর্বাস খুঁজছিল। অন্তর্বাসটি বেশ দামী। বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্যই কেনা। মাত্র একদিন ওটা ব্যবহার করেছে বিদুষী। ও কি খুঁজছে সেটা সাত বছরের ছেলেকে বলতে বেশ সংকোচ হচ্ছিল ওর। তবে আর কোনও উপায় না দেখে ছেলেকে বলেই ফেলল কথাটা। কল্পক ওদের শোবার ঘরে দাঁড়িয়ে একবার মাত্র ঘার একদিক থেকে বিপরীত দিকে ঘোরাল। তারপর বলল, ওটা খাটের পাশ দিয়ে পড়ে গেছে। দাঁড়াও, আমি তুলে দিচ্ছি। 
পিকনিকে গিয়েও সবাইকে চমকে দিল কল্পক। বাবা-মারা যেন নিশ্চিন্তে ও নির্বিঘ্নে এই পিকনিকটি সম্পূর্ণ ভাবে উপভোগ করতে পারে সেজন্য তাদের ছেলেমেয়েদের ব্যস্ত রাখার আয়োজন করা হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন গেম, কুইজ, আর আত্ম প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ। কেউ সেখানে গান গাইছে। কেউ নৃত্য পরিবেশন করছে। কেউ বা কবিতা আবৃত্তি করছে। 
স্বর্নাশীষ তার সহকর্মীদের সাথে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে নেশায় গলা ভিজিয়েছে। বিদুষীও স্বামীর সঙ্গ দিয়েছে। সে যে এই সুরা পানে অভ্যস্ত তা তার পানের ভঙ্গিমা, পরিমাণ ও তার অবস্থা দেখে সহজেই অনুমেয়। বিদুষীর কলেজ জীবনে কারণে অকারণে পান চলত। এখনও মাঝে মধ্যে আসরে বাসরে সুরা-পান চলে। 
নেশায় সবে মাত্র একটা ঝিমুনি ভাব এসেছে। এমন সময় স্বর্নাশীষের এক সহকর্মী এসে এমন একটা খবর দিল যে তা শুনে স্বর্নাশীষ ও বিদুষীর নেশা ছুটে গেল। তারা ছুটে গেল তাদের ছেলের কাছে। কল্পক তখন সকলের অভিবাদন কুড়চ্ছে। 
কল্পক গান, আবৃতি, নাচ কোনটাতেই পারদর্শী নয়। তাই বলে সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তার বয়েসই সকলে যখন  এক এক করে তাদের প্রতিভার পরিচয় দিয়ে হাততালি কুড়চ্ছিল, তখন কল্পক আর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ও বলল, আমি একটা ম্যাজিক দেখাবো। অনুষ্ঠান সঞ্চালক সাদরে কল্পককে তার প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ করে দিল। শুধু বাচ্চারাই নয়, বেশ কিছু অভিভাবকরাও ছিল সেখানে। কল্পক সেই দর্শকমণ্ডলীর থেকে একটি রুমাল চেয়ে নিলো। এক ভদ্রমহিলা তার রুমালটি কল্পকের হাতে দিলেন। কল্পক সেটা হাতের মুঠোয় রেখে নিজের মুখের সামনে ধরল। তারপর মনে মনে নানারকম মন্ত্র আওরায়ে সে রুমালটি যার রুমাল তাকে ফেরত দিয়ে বলল, আপনি এটা যেখানে খুশি, যার কাছে খুশি লুকিয়ে ফেলুন। আমি চোখ বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। আমার চোখ বেধে দিন। 
কল্পকের কথা অনুসারে ওর চোখ বেঁধে রুমাল লুকিয়ে ফেলা হল। তারপর চোখ খুলে দেওয়া হল। কল্পক ভীড় কাটিয়ে এক ভদ্রমহিলার সামনে গিয়ে বলল, দিন, রুমালটা বের করে দিন। ওটা আপনার ব্লাউজের ভেতর লোকানো আছে। ভদ্রমহিলা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পেছন ফিরে রুমালটা বের করে দিলেন। এই ভদ্রমহিলা ছিলেন স্বর্নাশীষের বসের স্ত্রী। একটু বেশি চালাকি করতে গিয়ে সাত বছরের ছেলের কাছে বেশ বোকা বনে গেলেন উনি। উপস্থিত দর্শক মণ্ডলী তখন করতালি দিয়ে কল্পককে অভিবাদন জানাচ্ছে। 
এই ম্যাজিকটা কল্পক স্কুলেও দেখিয়েছে বহুবার। টিফিনের সময়, বা অফ পিরিয়ডে লোকানো পেন্সিল, ই-রেজার, পেন প্রভৃতি খুঁজে দিয়ে কল্পক ওর বন্ধুদের বার বার অবাক করে দিয়েছে। কল্পক মেধাবী ছাত্র না হলেও পড়াশোনাটা ও বরাবরই আন্তরিকতা ও দায়িত্বের সাথে করে। তাই প্রথম দশ জনের মধ্যে ওর নাম বরাবরই থেকে এসেছে। ওকে যে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা  স্বর্নাশীষ বা বিদুষী কারোর তরফ

থেকেই ছিল না। ছেলের এই পড়াশোনায় তারা খুশি। স্কুল থেকে পড়াশোনার জন্য কোনও পুরষ্কার না পেলেও বাবা মার থেকে বরাবর নতুন ক্লাসে ওঠার জন্য নিজের মনের মত পুরস্কার পেয়ে এসেছে কল্পক। শুধু পড়াশোনার জন্যই নয়, ছোটখাটো যে কোনো সাফল্যের জন্যই কিছু না কিছু উপহার ও পেয়েছে নিয়মিত। স্বর্নাশীষ প্রায়শই অফিস যাওয়ার সময় মানিব্যাগ, হাতঘড়ি, রুমাল প্রভৃতি খুঁজে পায় না। যথারীতি সেসব খুঁজে দেবার ভার পড়ে কল্পকের ওপর। ও সেটা দায়িত্বের সাথে পালন করে বাবার থেকে ক্যাটবেরী, আইসক্রিম প্রভৃতি আদায় করতে ভোলে না। স্বর্নাশীষও স্বেচ্ছায় সেই আবদার মেনে নেয়। তবে বিনা কারণে ছেলে কে সে কিছুই দিতে রাজি নয়। তার কথায়, জীবনে সবকিছুই অর্জন করে নিতে হয়। ফ্রিতে কিছুই পাওয়া যায় না। 

এমনভাবেই চলতে থাকল। ওরা তিনজন নিজেদের বাঁধাধরা রুটিনে বাধা থাকল ব্যস্ততার সাথে। তবে ছুটির দিনগুলিতে তিনজন একত্রে কখনও কোথাও বেড়াতে গিয়ে, কখনও সিনেমা দেখে, কখনও বা বাইরে কোথাও খেতে গিয়ে ছুটি উপভোগ করত।
কল্পকের ঈশ্বর প্রদত্ত গুণটির জন্য ওদের যেমন কিছু সুবিধে হয়, তেমনই অনেক ঝক্কি ঝামেলাও পোহাতে হয়। পাড়া প্রতিবেশীর কিছু হারিয়ে গেলেই কল্পকের ডাক পড়ে। কল্পক তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, যে জিনিস সে কখনও দেখেনি, সেটা তার পক্ষে খুঁজে দেওয়া সম্ভব নয়। 
তা বলে প্রতিবেশীর উপকারে কল্পক যে আসে না তা নয়। কল্পকের বয়স বছর দশ। ওদের অ্যাপার্টমেন্টের তিন পরিবার মিলে পৌষ মেলায় গিয়েছে। তিন পরিবার বলতে সপরিবারে স্বর্নাশীষ, বাবা মার সাথে অক্সিতা, আর বাবা মার সাথে পাঁচ বছরের আয়ুষ। আয়ুষ ছেলেটি বেশ চঞ্চল। ওকে পাশে দাঁড় করিয়ে, ওর মা কানের দুল কিনছিল। সেই সময়ে ও এক পা এক পা করে হাঁটতে হাঁটতে মেলার ভিড়ে এমন ভাবে হারিয়ে গেল যে ওকে আর খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না। কল্পক তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মেলায় ঘুরে, মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আয়ুষকে এনে ওর বাবা মার কাছে হাজির করল।  
যতই সেটা মানুষের উপকারে আসুক না কেন, দীর্ঘদিন ধরে শরীরের মধ্যে কোনও অস্বাভাবিক কিছু বয়ে বেড়ানো উচিৎ নয়। বিদুষীদের খুব তাড়াতাড়ি একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। বিদুষীর একজন কাছের বন্ধু এমন উপদেশই দিল। উপদেশটা ফেলে দিতে পারল না বিদুষী। তবে ওরা যে ব্যাপারটা নিয়ে ডাক্তারের সাথে আলোচনা করেনি তা নয়। ওদের পারিবারিক ডাক্তার কল্পকের এই আচরণের মধ্যে ক্ষতির কিছু দেখেনি। আর উনি বলেছিলেন যে, কল্পকের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখন বিদুষীরা দেখছে বয়স বাড়ার সাথে সাথে উপসর্গ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কল্পক এখন থেকে থেকেই জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। ইদানীং ওর নাকের অগ্রভাগ বেশ ঘামছে। কল্পকের এখন বয়স বারো বছর। এমন কিছু দেরী হয়তো এখনও হয়নি। বন্ধুর কথা মেনে স্থানীয় এক ডাক্তারের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করলে উনি সব শুনে একজন নাক-কান-গলার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাতে বললেন। কল্পককে একজন নামকরা নাক-কান-গলার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখানো হল। উনি নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কল্পকের এইরকম আচরণের কারণ বিষদে ব্যাখ্যা করলেন।  প্রায় বারো বছর ধরে মনের মধ্যে জমে থাকা প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পেলো স্বর্নাশীষ ও বিদুষী।
কল্পকের যেকোনো জিনিস সহজে খুঁজে পাওয়ার কারণ হল ওর তীব্র ঘ্রাণ শক্তি। সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কের তুলনায় প্রায় চল্লিশ গুণ বেশি অংশ কল্পকের মস্তিষ্কে ঘ্রাণ সংক্রান্ত কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ। মানুষের নাকে সাধারণত ষাট লক্ষ ঘ্রাণ রিসেপ্টর থাকে, কিন্তু এই ছেলের সেই সংখ্যাটা তিরিশ কোটির কাছাকাছি। তাছাড়া কল্পকের শ্বাস গ্রহণ আর ঘ্রাণ নেওয়ার পরি-কাঠামোটা আলাদা আলাদা ভাবে গঠিত। তাই ওর শ্বাস গ্রহণ, ঘ্রাণ গ্রহণ দুটোই অবিরাম চলতে থাকে। ক্রমাগত মিউকাস নিঃসরণের ফলে ওর নাকে ঘ্রাণ অণুগুলো আটকে থাকে, যা ওকে গন্ধ শুঁকে চিনতে সাহায্য করে।  
রাসায়নিক পরীক্ষা চালানোর জন্য স্বর্নাশীষ সম্প্রতি যে মডেলটি তৈরি করেছে সেটা সত্যি প্রশংসার দাবী রাখে। সেই সঙ্গে একটি নতুন কেমিক্যাল প্ল্যান্টের নকশাও প্রস্তুত করেছে ও। কিন্তু উচ্চমহলে প্রদর্শন করার দিন ওগুলোকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। নিজের ড্রয়ারে তালা বন্দীই করে রেখেছিল স্বর্নাশীষ। প্রতিটি ড্রয়ারের ডুপ্লিকেট চাবি রয়েছে অফিস অ্যাডমিনদের কাছে। কোনোভাবে সেই চাবি জোগাড় করে সবার অলক্ষ্যে সেগুলো সরিয়েছে কেউ। কিন্তু সে কে?
এই নকশা ও মডেল উচ্চমহল দ্বারা স্বীকৃত হলে স্বর্নাশীষের পদোন্নতির একটি সম্ভাবনা রয়েছে। সহকর্মীদের মধ্যে অনেকেই সেটা চায় না। তাই তাদের মধ্যে কেউ অতি দক্ষতার সাথে  নকশা ও মডেল ড্রয়ার থেকে অদৃশ্য করে পুনরায় সেই ড্রয়ার তালাবন্দি করেছে। 
স্বর্নাশীষের মাথায় যেন বাজ পড়েছে। কিছুক্ষণ নিজের চেয়ারে বসে কি করবে ভাবতে লাগল। না, এই ঘটনা কাউকেই জানালো না ও। বিশেষ প্রয়োজনের কথা বলে ঘন্টা খানেকের ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেল ও। বাড়ি থেকে কল্পককে নিয়ে অফিসে চলে এলো স্বর্নাশীষ। আসার পথে ছেলেকে তার বাবা অফিসে নিয়ে আসার কারণ বিস্তারিতভাবে বলেছে। কল্পককে হঠাৎ অফিসে দেখে সহকর্মীরা বেশ অবাক। কারো কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কল্পককে দিয়ে নিজের ড্রয়ারটিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করালো স্বর্নাশীষ। প্রতিটি জিনিষেরই আলাদা আলাদা গন্ধ রয়েছে। জিনিসগুলো ড্রয়ারে না থাকলেও তার গন্ধ এখনও ড্রয়ারে লেগে রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটা অনুধাবন সম্ভব নয়। সেই ঘ্রাণ ভালো করে অনুধাবন করে বাবার সাথে সারা অফিস ঘুরে বেরালো কল্পক। আর কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ ও খোঁজাখুঁজির পর স্টোর রুম থেকে স্বর্নাশীষের হারিয়ে যাওয়া জিনিস উদ্ধার করে কল্পক। 
স্টোররুমে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তা থেকে অপকর্মটি কে করেছে তা সহজেই জানা গেল। স্বর্নাশীষের দুটো সিট পড়ে বসা এক সহকর্মীর কাজ এটা। চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হল সেই লোকটিকে। 
স্বর্নাশীষের নকশা ও মডেল উচ্চমহলে বেশ প্রশংসিত হল। ফলস্বরূপ স্বর্নাশীষের জুটল পদোন্নতি। আর কল্পক? সে তার বাবার থেকে উপহার পেল একটি দামী ল্যাপটপ। সেই ল্যাপটপ নিয়ে ভীষণ খুশি সে। 
বাড়িতে ল্যাপটপ আসার খবর পেয়েই পাশের ফ্ল্যাটের অক্সিতা ছুটে এসেছে। দুজন মিলে অনেকক্ষণ ধরে চলল এই নতুন আনা ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রটির কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রকার পরীক্ষা নিরীক্ষা ও আলোচনা। একটা অন্যরকম খুশি মেখে রয়েছে দুজন। এটাই বোধহয় কল্পকের পাওয়া শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার। 
এই ঈশ্বর প্রদত্ত গুণের সদ্ব্যবহার করে ভবিষ্যতেও এমনভাবে মানুষের উপকারে আসতে চায় কল্পক। তবে কিছু পাওয়ার আশায় নয়, মনের তাগিদে। সেখানেই হবে এই গুণ লাভের প্রকৃত সার্থকতা।

Comments

Top

ভ্রমণ

 

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

বরফ-মরুর দেশে

অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়

বরোদা, গুজরাট

Spiti is “a world within a world” …….. “a place where Gods live”
                                                                          Rudyard Kipling, Kim

আসতে পারব, এমন নিশ্চয়তা ছিল না একেবারে গোড়ার থেকেই। সুযোগটা এসেছিল একেবারে হঠাৎ। একটা geological field workshop আয়োজিত হবার কথা, Association of Petroleum Geologists, বা সংক্ষেপে, APG-র তরফ থেকে, জুলাই ১১ থেকে ১৬, হিমাচল প্রদেশের স্পিতি উপত্যকায়। সময়টা ২০০৪ সাল, কর্মসূত্রে ভারতদর্শনে তখন আমার অবস্থান অন্ধ্রপ্রদেশের রাজামুন্দ্রী শহরে। এখান থেকে আমি ও শ্রীহরি রাও মনোনীত হয়েছি। যাবার রাস্তা মানালী থেকে রোহতং পাস ও কুনজুম পাস হয়ে, আরো ৪-৫ ঘণ্টার পথ পেরিয়ে, প্রায় তিব্বতের প্রান্তসীমায়। এদিকে খবরে শুনছি, উত্তর ভারতে ভারী বর্ষা – হিমাচলে বন্যা – বিপাশা নদীতে জলস্ফীতি, ইত্যাদি। বুঝতে পারছিলাম না, আদৌ দিল্লী থেকে এগোতে পারব কিনা আগে। তখন দিল্লী থেকে একটা ছোট dornier বিমান চলত, সিমলা ছুঁয়ে কুলু অবধি – আবহাওয়া ঠিক না থাকলে বা পর্যাপ্ত যাত্রী না পেলে মাঝেমধ্যেই সেটা বাতিলও হয়ে যেত! এই বর্ষায় পাহাড়ি পথ যতটা সম্ভব এড়ানোর চেষ্টাতে সেই ছোট্ট বিমানেই কুলুর পথে রওনা দিলাম। সমতল পেরিয়ে পাহাড়ের কাছে আসতেই ঢুকে পড়লাম মেঘের রাজ্যে – উপরে, নীচে, চারপাশে শুধুই সাদা/ধূসর তুলোর মত মেঘ। মাঝেমধ্যে মেঘের জানালা দিয়ে চকিতের মতো দেখা দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে কিছু পাহাড়ী ঘরবাড়ি/জলধারা/খেত ইত্যাদি। একসময়ে মেঘের ফাঁকে সাদার ঝলক দেখে বুঝলাম, এসে পড়েছি বরফের কাছাকাছি – ইন্দ্রাসন শৃঙ্গটি দেখেই চিনলাম, এবং আরো কয়েকটি শৃঙ্গ – যা বোধহয় মানালীর পশ্চিমে/দক্ষিণে আমরা দেখতে পাই। নতুন আশায় মন চনমনিয়ে উঠল – হিমালয় তাহলে দর্শন দিচ্ছেন – আমাদের আগামীর পথে স্বাগত জানাচ্ছেন! কেউ কেউ বলেন, দেবতাত্মা নিজে না চাইলে, মানুষ হাজার চেষ্টাতেও তার দর্শন পায় না। কুলু ও মানালীর মাঝামাঝি Bhuntarএ বিপাশা নদীর ধারে ছোট্ট এয়ারপোর্ট। নদীর একটা বাঁকের মুখ থেকেই রানওয়ে শুরু হয়েছে, তাই প্লেন নামার সময়ে নদীর জল প্রায় ছুঁয়ে ফেলতে ফেলতে হঠাৎ রানওয়েতে ঢুকে পড়ে। এখানে এসে খবর পেলাম, কুলু থেকে মানালী যাবার সোজা রাস্তাটি এখনো পুরোপুরি বাহনযোগ্য হয়ে ওঠেনি। চলতে হবে একটু ঘুরপথে – বিপাশার পূর্বধার দিয়ে, যে রাস্তা গেছে Naggar ও পাথরিকুল হয়ে। এ পথে পড়ে Roerich Estate – অতীতের বিখ্যাত সিনেমা শিল্পী দেবিকারানী ও তাঁর স্বামী, চিত্রশিল্পী Nikolai Roerich দের ব্যক্তিগত বাসগৃহ, যা এখন সংগ্রহালয় – দেখে নেওয়া হল সেটাও। 
পথের অনিশ্চয়তার কারণে মানালী এসে পড়েছি একদিন আগে, আজ ৯ জুলাই, শনিবার। অথচ APG নির্ধারিত হোটেলে আমাদের বুকিং রবিবার থেকে। কাজেই একদিনের মতো আশ্রয় নেওয়া গেল বিপাশা নদীর ঠিক পাশে সরকারী লজে। মনে পড়ল, যখন প্রথম মানালী আসি, ১৯৭৮ সালে, তখন এই বাড়িটি সবে তৈরি হচ্ছিল। সেই সময়ের মানালী ছিল একটা ছোট্ট ঘুমন্ত গ্রাম, চারধারে শুধু পাইন আর চীর এর শোভা – তার একমাত্র পর্যটকনিবাস ছিল এর ঠিক পাশের বাড়ীটি, এখন তার জীর্ণদশা - ব্যবহৃত হয় সরকারী ডরমিটরি হিসাবে। কিন্তু সেদিনের বিপাশা নদী তার স্বচ্ছ জলের অবিশ্রান্ত গর্জনের মাধুর্য হারিয়ে আজ বয়ে নিয়ে চলেছে শুধুই শহরের শ’খানেক হোটেলের বর্জ্য আর পঙ্ক! 
অসময়ের মানালী, রাস্তাঘাট ফাঁকা, যদিও দোকানীরা পসরা সাজিয়ে বসেছে অনেকেই। ভুটিয়া বাজারে এক বৃদ্ধ দোকানীর কাছে sleeping bag কিনেছিলাম বছর দুই আগে। সেই বৃদ্ধ এখনো রয়েছেন, এবং আশ্চর্য, সেই একই দামে সেই ব্যাগ বিক্রি করছেন! পরদিন সকালে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম হিড়িম্বা দেবীর মন্দিরে – আকাশছোঁয়া পাইনগাছের ঘন প্রহরার মাঝ দিয়ে রাস্তা – পর্যটকের অভাবে সে জায়গাও স্বভাবতঃই ফাঁকা। সংলগ্ন চত্বরে অন্যসময়ে মেলা বসে যায়। ফেরার বেলা পথসংক্ষেপ করার লোভে রাস্তা হারিয়ে ফেললাম আপেলবাগানের মধ্যে – অনেকটা উল্টো হাঁটতে হল। দুপুরের দিকে গিয়ে উঠলাম আমাদের নির্ধারিত হোটেলে – ম্যাল সংলগ্ন জনঅরণ্য থেকে অনেকটাই ওপরে উঠে এসে, বেশ অভিজাত হোটেলপাড়ায় – হোটেল Snowcrest Manor – মানালির হোটেলগুলির মধ্যে নাকি এটাই সবচেয়ে উঁচুতে! পাহাড়ের ঢালের ওপর হোটেল, চারপাশে ঘিরে রয়েছে আপেলবাগান, নেমে গেছে অনেক নীচে অবধি। বড় বড় পাতিলেবুর মাপের কচি কচি আপেলে সব গাছ ভর্তি। সামনে থেকে দেখা যায় গোটা মানালী শহরের বিস্তার, নীচে বিপাশা নদী, পেরিয়ে ওপারের পাহাড়, তার গা বেয়ে আমাদের আগামীর চলার পথ – রোহতং পাসের অভিমুখে।
একে একে আমাদের অন্য participants দের সঙ্গে দেখা হল। কেউ কেউ দীর্ঘদিনের চেনা, আবার পরিচয় হল অনেক নতুনজনের সঙ্গেও। বেশীরভাগ ONGC থেকেই, তবে কয়েকজন geologist অন্য কোম্পানী থেকেও এসেছে। আমাদের আগামী কয়েকদিনের পথের দিশারী হিসাবে এসেছেন Geological Survey of India বা GSI থেকে অবসরপ্রাপ্ত ডিরেক্টর, প্রবীণ ডঃ ভার্গব, যিনি এই অঞ্চলে কাজ করে চলেছেন বিগত প্রায় দুই দশক ধরে। স্পিতির geology বিষয়ে ডঃ ভার্গবকে একজন বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়। জায়গাটাকে চেনেন নিজের হাতের তালুর মতোই – যা আমরা পরের কয়েকদিনে প্রতিপদে টের পেয়েছি। আরও এসেছেন অধ্যাপক দিলীপ মুখোপাধ্যায়, IIT, Roorkee থেকে, যদিও শারীরিক কারণে তিনি আমাদের যাত্রাসঙ্গী হতে পারলেন না। এঁরা দুজনে জানালেন যেখানে যেতে হবে, সেই স্পিতি উপত্যকা ও সংলগ্ন পীন উপত্যকার বিষয়ে বিভিন্ন জ্ঞাতব্য বিষয়। জানালেন যাত্রাপথের নানান সাবধানতার কথা। আমাদের পথে পড়বে ১৩,০৫০ ফুট উচ্চতায় রোহতং পাস, এবং ১৪,৯৩০ ফুটে কুনজুম পাস – এইসব জায়গায় altitude sickness খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, তাই যথাবিহিত সাবধানতা অবলম্বন করা, কিছু কিছু শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলা খুবই জরুরী। তাছাড়া, দলের বেশীরভাগেরই জীবনে এই  প্রথম এতটা উচ্চতায় আসা। আমাদের মোট ২৬ জনের দলটি বিন্যস্ত থাকবে ৮টি গাড়ীতে। প্রত্যেক গাড়ীতেই থাকবে অক্সিজেনের বোতল, জল, ইত্যাদি। ভোর ছটার মধ্যে রওনা দিতে হবে, গন্তব্য Kaza পৌঁছতে বিকেল/সন্ধ্যে হয়ে যাবে। মানালী থেকে Kaza র দূরত্ব যদিও মাত্র ২০৫ কিমি – সমতলে ভালো রাস্তায় ওই দূরত্ব হয়তো ঘণ্টা তিনেকেই পৌঁছান যায়, কিন্তু এক্ষেত্রে পথের দুর্গমতার কারণে ৯-১০ ঘণ্টাও লেগে যেতে পারে। থাকতে হবে Kaza তে, ১৪,৫০০ ফুট উচ্চতায়, স্পিতি নদীর ওপর, তাঁবুতে। আমাদের প্রত্যেকের গাড়ীর নম্বর ও তাঁবুর নম্বর জানিয়ে দেওয়া হল। আমার গাড়ীর সঙ্গী মুম্বই থেকে আসা রোহিত কোটেচা, কুলকর্নি আর শ্রীহরি রাও। তাঁবুর সঙ্গী থাকবে চেন্নাই থেকে আসা গোপীনাথ ও অরিজিতদা।

সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ, মাঝেমধ্যে কুয়াশা, তারই মধ্যে রওনা দিলাম। মানালী ছাড়িয়ে, বিপাশা নদীর পূর্বধারে পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা ওপরে উঠতে লাগল। দুপাশের প্রহরী পাইন-বার্চ ও আপেল বাগানের সীমানা ছাড়িয়ে গাছপালাও ক্রমশঃ পাতলা হতে লাগল। দূরে দূরে এক-আধটা গ্রাম। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম মারহি – এখানে একটু থামা, প্রাতঃরাশ সাঙ্গ করে, ফের চলা শুরু। যত ওপরে উঠছি, হাওয়ার দাপট ক্রমশঃ বাড়ছে। কোথাও কোথাও অনেক ওপর থেকে ঝর্ণা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পথের পাশে, কখনো পথের ওপরেই – তার দুধ-সাদা ফেনার ওপর সূর্যের আলো এসে যেন শত-শত রামধনু তৈরী করছে! মাঝেমধ্যে দূর পাহাড়ের উঁচুতে মেঘ-বরফের লুকোচুরি দেখা দিতে লাগল। শ্রীহরি অত্যুৎসাহে ছবি তুলে চলেছে। কোটেচা তার সপরিবারে রোহতং ভ্রমণের গল্প শোনাচ্ছে। এ রাস্তা বছরের বেশীরভাগ সময়েই বরফে বন্ধ থাকে, কেবল জুন থেকে অক্টোবর যাতায়াত সম্ভব হয়। একসময়ে পথের পাশেই ধূলিমলিন বরফের দেখা পাওয়া গেল – ধূলোয় প্রায় লাল হয়ে গেছে, কাছে গিয়ে একটু খুঁড়লে, ভেতরের সাদা ঝকমকিয়ে উঠছে। হঠাৎ দেখি, রাস্তার দুপাশে প্রায় মানুষ-সমান উঁচু বরফের পাঁচিল, তার মাঝ দিয়ে রাস্তা। রোহতং পাস আর বেশী দূরে নেই। বরফ দেখার উত্তেজনায় high altitude সংক্রান্ত সব সতর্কীকরণ ভুলে গিয়ে সকলেই নেমে গিয়ে বরফের ওপর অল্পবিস্তর দৌড়ঝাঁপ করে নিলাম। রোহতং পাসকে বলা হয়, বৈচিত্র্যময় লাহু-স্পিতি উপত্যকার প্রবেশদ্বার। বিপাশা নদীর উৎপত্তিও এর কাছাকাছি, Beas Kund থেকে। উপকথায় আছে, একসময়ে লাহুলের মানুষজন পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে কুলু যাবার পথ না পেয়ে মহাদেবের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তখন নাকি মহাদেব পাহাড়ের মধ্যে পদাঘাত করে পথ সৃষ্টি করে দিলেন, তৈরী হল রোহতং গিরিবর্ত্ম! এতক্ষণ গিরিখাদের পাশ দিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ যেন একটা প্রায় সমতলভুমিতে এসে পড়লাম। চারিদিকে শুধু বরফ, মাঝে ছোট্ট মন্দির নাগদেবতার – সেটা প্রদক্ষিণ করে, তবে সব গাড়ীর আগে চলা। মরশুমে এখানে প্রচুর দোকানপাট বসে, তার চিহ্ন চারিদিকে ছড়ানো। থাকে স্কি করা, ঘোড়া বা ইয়াকের পিঠে চড়ার ব্যবস্থাও। আকাশ এখনো বেশ মেঘলা, যদিও ডঃ ভার্গব আশ্বাসবাণী শুনিয়ে চলেছেন যে স্পিতিতে ঢুকলেই একদম পরিষ্কার আকাশ পাওয়া যাবে।

রোহতং পেরিয়ে, পথ খানিকটা নীচের দিকে গেছে – ছোট্ট গ্রাম, গ্রামফু। এখান থেকে পথটা দুভাগ হয়ে গেছে – পশ্চিমে লাহু-স্পিতি জেলার সদর শহর কেলং হয়ে চলে গেছে কাশ্মীরের লে অবধি। একদা এটি ছিল পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম motorable রাস্তা। আর আমরা যাব পূর্বদিকে, চন্দ্র নদীর ধার দিয়ে। পথ অত্যন্ত খারাপ – মাঝেমধ্যে পুরো রাস্তাই ধুয়ে গেছে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণার জলে। খুব সাবধানে পার করতে হচ্ছিল গাড়িগুলোকে। এইরকম একটা জায়গায় আটকে গেল একটা গাড়ি – টাটা সুমোগুলো কোনক্রমে চলে এলেও, সবুজ কোয়ালিস গাড়িটা কিছুতেই নড়তে পারছিল না। একটা বড় বাসও আটকে পড়েছিল, অনেক স্থানীয় মানুষের সাহায্য পাওয়া গেল – কোনমতে উদ্ধার হোল সে যাত্রা। 
কোটেচা অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল, এবার একবার গাড়ী থামিয়ে হঠাৎ বমি করে বসল। আমাদের যাত্রায় altitude sickness এর প্রথম শিকার। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এই altitude sickness আটকাতে রসুন ভীষণ কাজে দেয়। আমি কাঁচা রসুন সঙ্গেই এনেছিলাম, মানালী থেকেই অন্যদেরও দিয়েছিলাম। কিন্তু শুদ্ধ নিরামিষাশী, পুরোদস্তুর গুজরাটি কোটেচাকে কিছুতেই দেওয়া যায়নি। দেখলাম, ও লাঞ্চপ্যাকটাও খোলেনি। ও খানিকটা সুস্থ হলে, আবার রওনা দিলাম – যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি চলতে থাকল গাড়ী। কুনজুম পাসের কাছাকাছি পৌঁছতে, মনে হল চারপাশের বরফাবৃত পাহাড়গুলো যেন একদম হাতের কাছে চলে এল। পাশেই দেখা গেল পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম হিমবাহ – Bara Shigri glacier। কুনজুম পাসের উচ্চতা ৪৫৫১ মি, বা ১৪,৯৩০ ফুট। একদম ওপরে এখানেও একটা ছোট্ট মন্দির – বোধহয় দুর্গার, এবং চারপাশে প্রচুর পতাকা টাঙানো রয়েছে। কুনজুম পাসের পূর্বদিক থেকেই উৎপত্তি স্পিতি নদীর – সোজা পূর্বমুখী গিয়ে Khab নামক এক জায়গায় গিয়ে পড়েছে শত নদীতে – শত তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশ করার ঠিক পরেই। এই স্পিতি নদীর অববাহিকা ধরেই আমাদের আগামী কয়েকদিনের পরিক্রমা – আমাদের এখানে আসার মূল উদ্দেশ্য। স্পিতি উপত্যকাকে বলা হয় museum of Indian Geology – হিমালয় পর্বতের উৎপত্তির বিভিন্ন পর্যায়গুলি এখানের ভূতাত্ত্বিক গঠনে যেমন সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে, তেমনটা আর কোথাও নেই। সেজন্যই APG এই অঞ্চলটাকে বেছে নিয়ে আমাদের ডেকে এনেছে কর্মজীবনের প্রাত্যহিকতার একঘেয়েমি থেকে – একটু তাজা অক্সিজেনের সন্ধানে!
কুনজুম পাস থেকে কিছুটা এগিয়ে আরেকটি ছোট্ট জনপদ, লোসার। স্পিতি/কিন্নরগামী সব বিদেশী পর্যটকদের এখানে নাম নথিভুক্ত করাতে হয়। আমাদের গাড়ীগুলোরও কিছু কাগজপত্রের কাজ রয়েছে, আমরা সেই ফাঁকে চা-পর্ব সেরে ফেললাম একটা ছোট দোকানে। ডঃ ভার্গব কাছেই একটা পাথরের মধ্যে কিছু ফসিলের নমুনা দেখালেন। মাঝেও কয়েকবার থেমে কিছু কিছু ভূতাত্ত্বিক গঠন দেখিয়েছেন। ওঁর মতে, স্পিতির বিশাল ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যকে ভালোভাবে দেখতে/জানতে হলে, অন্ততঃ বছর দেড়েক সময় দেওয়া দরকার। অথচ আমাদের হাতে সময় মাত্র চার-পাঁচ দিন! কাজেই, কয়েকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বা type area কোনমতে দেখা যেতে পারে।
কিন্তু ওদিকে কোটেচা এখন আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছে – কাজেই ঠিক হোল, আমাদের গাড়ীটা আর কোথাও না থেমে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব Kaza পৌঁছবে – সেখানে সরকারী হাসপাতাল আছে। এখন রাস্তা অনেকটাই সমতল, কারণ আমরা তিব্বত মালভূমির এক প্রান্তদেশে ঢুকে পড়েছি। একপাশ দিয়ে নদী বয়ে চলেছে, আর ছোট ছোট ঘাস ও প্রচুর নুড়িপাথরের মধ্যে দিয়ে সাপের মত এঁকে-বেঁকে চলে গেছে পিচ-বাঁধানো রাস্তা। ঘণ্টা দুয়েক পরে যখন Kaza পৌঁছলাম, তখন সবে অন্ধকার নামছে। ডাক্তার দেখে সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেন ও স্যালাইনের ব্যবস্থা করলেন, জানালেন severe dehydration হয়ে গেছে, রাতটা observationএ থাকা ভাল। তারপর আমাদেরও পরীক্ষা করলেন – রক্তচাপ প্রত্যেকেরই বেড়ে গেছে, এত উচ্চতায় এটাই স্বাভাবিক। কোটেচাকে ওখানে রেখে, রাতে ড্রাইভারের ওখানে থাকার ব্যবস্থা করে, ফিরলাম আমাদের তাঁবুতে। 
এখানে স্পিতি নদী অনেকটা চওড়া হয়ে গেছে, নদীর বুকে বিশাল বিশাল চড়া পড়েছে। সেইরকমই একটা চড়ায় আমাদের তাঁবুগুলো সাজানো হয়েছে। মাঝে একটা বড় রান্না/খাবার তাঁবু, তার চারপাশে আমাদের থাকার তাঁবুগুলো। একেকটাতে তিনজন করে থাকার ব্যবস্থা। আরেকপাশে টয়লেট ও স্নানের আলাদা কয়েকটা তাঁবু। সব জিনিসপত্র একদিন আগে বড় ট্রাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। জেনারেটর চালিয়ে হয়েছে আলোর ব্যবস্থা, আবার ছোট পাম্প চালিয়ে নদীর জল তুলে ট্রাকের ড্রাইভার কেবিনের মাথায় রাখা জলের ট্যাঙ্কে ওঠানো হচ্ছে। হাত ধোওয়ার জন্য দুটো washbasin রাখা, আছে জল গরমের ব্যবস্থাও, অভিনব কাঠের আগুনের geyser এ। থাকার তাঁবুতে তিনজনের খাট-বিছানা ছাড়াও, একটা ছোট টেবিল ও চেয়ার রাখা – নাঃ, এই দুর্গম অঞ্চলে এত সুন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য APG-র যতই প্রশংসা করা যায়, কম হয়!
লাহু-স্পিতি জেলার স্পিতি মহকুমার সদর শহর এই Kaza – ৩৬০০ মি উচ্চতায়, এখানেই রয়েছে পৃথিবীর উচ্চতম অবস্থানের পেট্রোল পাম্পটি। এখানের আরো একটি বিশেষত্ব – এত উচ্চতায় এটাই সম্ভবতঃ হিমালয়ের একমাত্র জায়গা যেখানে সারাবছর যাতায়াত করা যায়! আমরা যে পথে এলাম, সেটা ছাড়াও এখানে পৌঁছানোর আরো একটি রাস্তা আছে, সিমলা থেকে কিন্নর উপত্যকা হয়ে – সেপথে যেহেতু খুব উঁচু কোনো পাস ইত্যাদি নেই, সেটি প্রায় সারাবছরই খোলা থাকে। কিন্তু দূরত্ব এপথের দ্বিগুণেরও বেশী। এখান থেকে বেশ কয়েকটি ট্রেকিং রুট শুরু হয়েছে। কিছু হোটেল, সরকারী Rest House ইত্যাদিও রয়েছে। বেশ কয়েকজন বিদেশী/বিদেশিনীকে দেখলাম, ট্রেকিং করতে এসেছে। 
এই workshop এর আগে এবং পরেও, হিমালয়ের অনেক জায়গায় আমার ঘোরার সৌভাগ্য হয়েছে, কিন্তু এই অঞ্চলের চেহারা যেন একেবারেই অন্যরকম। চারদিকে শুধু ধূসর-বাদামী নেড়া পাহাড়, তাতে পাথরের চেয়ে মাটির প্রলেপই বেশী, কদাচিৎ অল্প কিছু গাছপালা দেখা দিচ্ছে মরুভূমির রুক্ষ সৌন্দর্য নিয়ে। শীতে তাপমাত্রা নেমে যায় শূন্যের বেশ কয়েকধাপ নীচে। এমনকি এখনো, সূর্যাস্তের পরেই বেশ ঠাণ্ডা থাকে। স্থানীয় মানুষজন খুব সহজ-সরল, সদা হাসিমুখ ও উপকারী। বৌদ্ধ ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ই আছেন। বৌদ্ধ গুম্ফাগুলি দেখলে বোঝা যায়, বৌদ্ধধর্মের একটি অন্যতম প্রাচীন ধারা এ অঞ্চলে সযত্নে সংরক্ষিত। 
পরের তিন-চারটে দিন যেন স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কেটে গেল – সকালে উঠে তৈরী হয়ে, গরম ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা দেওয়া, মাঝে ডঃ ভার্গব নির্দেশিত জায়গায় থামা, সেখানের study, আবার চলা। কোথাও চড়তে হচ্ছে পাহাড়ের ধাপ বেয়ে বেশ কিছুটা ওপরে।  অনেক রকমের আগে-না-দেখা ফসিল দেখলাম, বেশ কিছু geological features যা পাঠ্যবইতেই পড়া ছিল, দেখতে পেলাম চাক্ষুষ – যেন হিমালয়ের বিশাল ক্যানভাসে কোনো শিল্পীর সযত্নে আঁকা ছবি। কিছু বিশেষ প্রজাতির ফসিল – দেখিনি কখনো আগে – ডঃ ভার্গব খুঁজে খুঁজে দেখালেন। রাস্তা করার জন্য কোথাও কোথাও পাথর ভাঙা হয়েছে – সেখানে fresh exposure পেয়ে গেলাম অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম ফসিল কুড়োতে। মাঝেমধ্যে বেশ খানিকটা হাঁটতে হচ্ছিল, কোনো একটা বিশেষ feature খুঁজে পাওয়ার জন্য। একজায়গায় তো একটা বড় অঘটন থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেলাম। গাড়ী ছেড়ে আমরা একটা নড়বড়ে সাঁকোতে স্পিতি নদী পেরিয়ে অন্যপাশের পাহাড়ে চড়ছিলাম – খুব খাঁড়া, প্রায় vertical পাহাড়, একটু উঠেই কিছুক্ষণ থামতে হচ্ছিল। অথচ বর্ষীয়ান ডঃ ভার্গব দিব্যি উঠে যাচ্ছেন, প্রায় সবার আগে! শ্রীহরি একটু পিছিয়ে পড়েছিল ছবি তোলার জন্য। হঠাৎ দেখি ও নীচে থেকে চিৎকার করছে – আমাদের এক সঙ্গী এ কে সিং এর শ্বাস আটকে দুচোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে – অক্সিজেন দিলেও নিতে পারছে না! শেষে অনেক চেষ্টায় একবার শ্বাস নিতে পারল, আমরাও যেন প্রাণ হাতে ফিরে পেলাম! ওকে আরো একটা অক্সিজেন বোতল দেওয়া হল, ক্রমশঃ খানিকটা সুস্থ হয়ে উঠল। ওর সঙ্গে আরো দুয়েকজনকে নীচে রেখে, আমরা ওপরে যথাবিহিত study সেরে, এবার নামার সময়ে দেখি আরেক বিপত্তি – এত খাড়াই জায়গা থেকে নামার পথ পাই না! অনেক চেষ্টায় কোনোভাবে নামা গেল, কিন্তু ওদিকে আখতারদা রয়ে গেছে ওপরে – সাহস পাচ্ছেনা নামতে। আরো সমস্যা, জায়গাটাতে পাথর কম, বালি আর নুড়িই বেশি, আর অল্প কিছু ছোট ঘাস। অনেক মানসিক দাওয়াই প্রয়োগ করে, অবশেষে নামানো গেল!
সেইদিনই দুপুরের পর আমরা গেছিলাম এ অঞ্চলের প্রাচীনতম বৌদ্ধ গুম্ফা, Tabo Monastery তে। হাজার বছরের পুরনো, এর আদি স্থাপনা নাকি ৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে! পরে বিভিন্ন সময়ে আবার সংস্কার হয়েছে। ৩০৫০ মি উচ্চতায়, এটি বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম বৌদ্ধ গুম্ফা। আদি গুম্ফাটি বিরাট চওড়া মাটির দেওয়ালে ঘেরা ছোট মত ঘর, ঢুকতে হয় প্রায়ান্ধকার সুড়ঙ্গের মত একচিলতে জায়গা দিয়ে। ভেতরের দেওয়ালগুলো জুড়ে আছে অনেক চিত্রকলা, কোথাও এক ইঞ্চি জায়গা খালি নেই। রয়েছে নানান মূর্তি – বুদ্ধ, ও সেইসঙ্গে আরো অনেক দেবদেবী। এবং আশ্চর্য, সমস্ত মূর্তি আর paintings এর মৌলিক রং নাকি এখনো অবিকৃত রয়েছে! UNESCO থেকে World Heritage Site এর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এই “Ajanta of the Himalayas” কে! একপাশে রয়েছে প্রাচীন পুঁথি ও পাণ্ডুলিপির এক সংগ্রহশালা। জনশ্রুতি, বার্ধক্যে নাকি এখানেই অবসরযাপনের পরিকল্পনা দালাই লামার!
আরেকদিন field work শেষে পৌঁছে গেলাম Kibber নামের ছোট্ট একটা গ্রামে। ৪২০০ মি উচ্চতায় এটিই নাকি পৃথিবীর উচ্চতম motorable গ্রাম। রয়েছে বিজলিবাতিও। কিন্তু আমরা ওখানে পৌঁছতেই শুরু হয়ে গেল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ফলে বেশীক্ষণ থাকা গেল না। এখানেই আরেকটা মজার জিনিস দেখেছিলাম – এক পাহাড় থেকে দূরের অন্য এক পাহাড়ের গ্রামে জিনিসপত্র আদান-প্রদানের ropeway! ফেরার সময়ে দেখে নিলাম Kye Monastery – বিশ্বের নয়নাভিরাম গুম্ফাগুলির মধ্যে অন্যতম। স্পিতি উপত্যকার বৃহত্তম এটি, একটা ন্যাড়া পাহাড়ের ঢালে বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে বানানো। এখান থেকে পুরো উপত্যকা সুন্দরভাবে দৃশ্যমান। মূল গুম্ফার চূড়ায় ত্রিশূল দেখে বোঝা যায়, তিব্বতী বৌদ্ধরা শিবেরও উপাসক। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল, সাম্প্রতিক এক লেখকের শিব-সংক্রান্ত বিখ্যাত কল্পকাহিনীতে তিব্বতেরই কোনো এক অঞ্চলকে শিবের উৎপত্তিস্থল দেখানো হয়েছে! (Ref: Amish Tripathi, The Shiva trilogy)।
আজ এখানের শেষ রাত। সন্ধ্যায় campfire হোল, অনেকের বিবিধ সুপ্ত প্রতিভা বেরিয়ে এলো। এমনকি, বর্ষীয়ান ডঃ ভার্গব ও ডঃ শ্রীনিবাসনও নেচে নিলেন খানিকটা।! এবার যে যার ঘরে ফেরার পালা। অনেক কিছু পাওয়া ও আরো অনেক অপূর্ণতা নিয়েই পরদিন নেমে এলাম মানালী, সেই একই হোটেলে। রাতে valedictory function এ সবাই নিজস্ব মতামত জানালেন এই workshop নিয়ে, তবে একটা ব্যাপারে দেখা গেল সকলেই একমত – এরকম উদ্যোগ আরো বেশি, আরো ঘন ঘন হওয়া উচিৎ। কয়েকদিনের মিলনমেলা সাঙ্গ হল, বিসর্জনের বাজনা কানে নিয়ে, হিমালয়কে আরেকবার বিদায় জানিয়ে, সবাই যে যার রোজনামচার গন্তব্যে ফেরত চললাম।

Comments

Top

কবিতা

 
 

মাধুকরী পুজো বার্ষিকী ১৪২৮: পর্ব - ১

মধুসূদন গোস্বামী

বেঙ্গালুরু

কান্না বারণ এখানে

কান্না বারণ এখানে -

সবাই যে জেনে যাবে আমি মৃত।

কেউ দাঁড়াবেনা তোমাদের পাশে-

আমি এখন এক অস্পৃশ্য ক্ষত।

অথচ এই তো সেদিন –

কান্নার সোরগোলে, মৃত্যুর হা্তছানি।

ঝাঁকে ঝাঁকে প্রতিবেশীকুল –

চোখে জল, হাহুতাস, সান্ত্বনার বাণী।

হিমঘরে দুদিনের বন্দীদশা –

সজ্ঞানে হয়েছে মনে, বেঁচে আছি ক্ষীণ ।

শ্বাস কষ্ট তবু মাঝে মাঝে –

নিঃশ্বেসিত বায়ুমন্ডল – শ্বাসবায়ু হীন।

 

বিশাল ধরার মাঝে –

অফুরন্ত প্রাণবায়ু, অপার ভান্ডার।

তবুও পা্রোনি দিতে বুক ভরা শ্বাস –

মানুষ না ভগবান- দোষ তবে কার?

মন চায় আরো কিছুক্ষণ –

অবশিষ্ট প্রাণবায়ু বিদায়ের বেলা,

উত্তরীয়ে ঢাকা হল আপাদমস্তক –

শেষ বুঝি তোমাদের কারিগরী খেলা?

কান্না বারণ এখানে –

আসবেনা কেউ ফুলের তোড়া হাতে,

চন্দনের টিপ দেবেনা কেউ।

আতর শিশি কেউ এনেছ সাথে?

ভয় ছিল সবাকার মনে –

আমার শেষ নিঃশ্বাস যদি বয়ে আনে,

শক্তিধর ভাইরাস যদি করে ভর-

তোমাদের সবাকার প্রাণে?

 

মৃত্যুহীন প্রাণ –

কে কোথায় দেখেছে কোনোদিন?

মরণের পরে তবু সহানুভূতি ছিল,

আজ শুধু ঘৃণা বহি দেহ হল লীন।

সৌভিক সিকদার

নারী

মি মানি না কাঁটাতার
আমার সারা শরীরজুড়ে শুধুই স্বাধীনতার বিশাল পাহাড়।
রক্ত চক্ষু শয়তানের কারাগার ছেড়ে আজ আমি পলাতক..
ঈশ্বর তো আমার সাথেই,ভয় কি আমার হয়! 
বিপ্লবের রক্তমাখা রাত হোক, বা হোক রোমান যুদ্ধ আমি আবার হেরেও জিতবো চিরণ যখন আমার সঙ্গী।
মরে গিয়েও আমি আবার পুনরায় জীবিত হব।
ভেঙে দেবো সমাজে সব স্বার্থগণ্ডি।
পর্দা আমার চোখে নয় পুরুষ!তোমার চোখেই কামের কু-দৃষ্টি।
আমাকে শোষণ করেছো তুমি, বন্দী করেছো টারটারাস কারাগারে।
তাও আমি মুক্ত হবো পুরুষ!
দেবো মিথ্যা বিশ্বাস এর কাগজ সব জ্বালিয়ে।
আমি শকুন্তলা নই, না আমি সীতা আমি অনন্ত আগুনের সেই না বোঝা প্রদীপের জ্বলন্ত শিখা।                      

 

আজ আমায় পারবে না অন্ধকারে দমিয়ে দিতে না পারবে দিতে বনবাস 
আমি সেই মানুষ যে এক পুরুষ কেই রাখি গর্ভে ন’মাস।
আমি মানি না মিথ্যা আইন ঈশ্বর এর নকল বুলি,
ইন্দ্রও তো কামুক হয়ে যা।                                          

যখন আমি নিজের বস্ত্র খুলি।          

আমায় পারবে না চুপ করিয়ে রাখতে,              

না পারবে পাথর মেরে করতে হত্যা                          

আমি আবার পুনরায় জীবিত হবো পুরুষ,            

করে দেবো তোমাদের ঈশ্বর বিশ্বাস মিথ্যা।        

আমি সীতা নই আমি খাদিজা নই না আমি মেরী                                                          
আমি হলাম স্বাধীন আত্মা আমি হলাম নারী।

Comments