প্রবন্ধ

রম্য রচনা

গল্প 

কবিতা

ভ্রমণ 

কাব্য আলোচনা

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

প্রচ্ছদ শিল্পী - মেঘমল্লার (ডালাস, টেক্সাস)

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ ​

শারদীয় মাধুকরী

১৪২৬

 

প্রবন্ধ

বাঙ্গালী আর মানুষ

হইবে কি?

ভাস্কর সিন্হা

দোহা, কাতার

এখানেই বাঙ্গালীর অস্বাতন্ত্র্য! উড়ে, বিহারী, মারোয়াড়ী, পাঁইয়া, গুজ্জু, মাদ্রাসী, কাটা ইত্য়াদি- ইত্য়াদি সবাই তরল উপহাসের পাত্র। মহামহিম বাঙ্গালী বিদ্বজ্জনের সামনে সকলেই অর্বাচীন, উজবুকের দল। কথাবার্তার শালীনতা, সুষ্ঠু আচরণ, জনপরিসরে ভদ্রতা, সর্বপোরি এক সহমানুষের প্রতি সহমর্মিতার বড়ই অভাব ঘটেছে বাঙ্গালী মানসে ও জীবনে। হয়তো শুধু বাঙ্গালী নয়, সমগ্র ভারতবর্ষেই। যেহেতু বাঙ্গালীই এখানে আলোচনার বিষয়, তাই বাকিদের কথা অন্য় সময়ে হবে। 

     পরোক্ত শিরোনামায় জনৈক শুভাভিলাষী বিদ্বজন শঙ্কায়- আশঙ্কায় রবীন্দ্রস্মরণ করলে, ওনাকে আশ্বত্ত্ব করা গেল এই বলে যে, রবীন্দ্রনাথ তো বাঙ্গালীর ভাবের, চিত্তের এবং গানের জগতের মেঘমালায় চিরকালীন। তাই প্ল্য়ানচেটবিলাসী, যদিও তিনি আজ স্বর্গগগনবিহারী, তিনি প্রায়শঃই এসে থাকেন আমাদের দিবানিশির আলোচনায়। শুধু তিনি-ই বা কেন, আরও অনেক গুণীও তো আসবেন আমাদের আলোচনায়।

       হ্য়াঁ বাজার এখন সরগরম, মৌসুমীবায়ু এখন প্রবেশিত। নির্বাচন আসন্ন। ঘূর্ণি আবর্তে নিম্নচাপে সব ইঁট- পাটকেল জড়ো এক জায়গায়। নির্বাচনী প্লাবনে ভাষার তোড় কোনো বাঁধাই মানে না। আ মরি বাঙ্গলা ভাষা! তা রাজনীতির উৎসবে কবেই বা ভাষণ লৌহকপাটের কারার অন্তর্বতী ছিলো? তবে গুটিকতক ঘোঘিত

দলবাহী সংবাদ মাধ্য়ম ব্য়তীত- যাদের কর্মই আপনার ঢাক- বাদন, বাকি সংবাদমাধ্য়মের শিরোনামাগুলি দেখলেও অত্য়ন্ত হতাশার উপলব্ধি হয়। শাসক, শাসিত, বিরোধী পক্ষের সম্বন্ধে ব্য়ঙ্গ-বিদ্রূপের সুরারোপণের মূর্ছনায় মূর্ছাপ্রাপ্তি অবশ্য়ম্ভাবী। নিতান্ত সহজেই পাঠকের নিশানায়, এবং আরও অনায়াসসাধ্য় সহজিয়া শরবিদ্ধ মৃগ। এ ভাষার তো হেথায় তুরে মানাইছে না গো অবস্থা।

        এখানেই বাঙ্গালীর অস্বাতন্ত্র্য! উড়ে, বিহারী, মারোয়াড়ী, পাঁইয়া, গুজ্জু, মাদ্রাসী, কাটা ইত্য়াদি- ইত্য়াদি সবাই তরল উপহাসের পাত্র। মহামহিম বাঙ্গালী বিদ্বজ্জনের সামনে সকলেই অর্বাচীন, উজবুকের দল। কথাবার্তার শালীনতা, সুষ্ঠু আচরণ, জনপরিসরে ভদ্রতা, সর্বপোরি এক সহমানুষের প্রতি সহমর্মিতার বড়ই অভাব ঘটেছে বাঙ্গালী মানসে ও জীবনে। হয়তো শুধু বাঙ্গালী নয়, সমগ্র ভারতবর্ষেই। যেহেতু বাঙ্গালীই এখানে আলোচনার বিষয়, তাই বাকিদের কথা অন্য় সময়ে হবে। বাঙ্গালী বুঝতেই পারেনা যে অন্য়রা কতো শতপথে অগ্রবর্তীমান। বাঙ্গালী তো বাঙ্গালী-ই। খালি যুক্তিবিহীন একপেষে হিসাব। সুভাষ তো সুভাষ-ই। সেখানে বাঙ্গালীর কাছে স্বয়ং গাঁন্ধীও অতি অবহেলার পাত্র। বাঙ্গালী জানার প্রয়োজনবোধও করেনা নেতাদের মধ্য়ে যে পারস্পরিক সৌজন্য়বোধ ছিলো তাকে। সংঘাত ছিলো সর্বদাই তাত্ত্বিক। আত্মিক পারস্পরিক যোগাযোগের হিসাব সাধারন বাঙ্গালীর কাছে নেই। যেখানে সুভাষও নিজেই গাঁন্ধী, নেহেরু, আজাদ ইত্য়াদি বিগ্রেড বানিয়েছিলেন। গুরুদেব আর মহাত্মা পরস্পর পরস্পরের পূণ্য়

নামকরণ করেছিলেন। নেহেরু কন্য়াকে গুরুদেবের শরণে পাঠিয়ে ছিলেন কিছু দিনের জন্য়। বাঙ্গালীর আজি নিজেকে অন্তরের মধ্য়ে দেখিবার বড়ই প্রয়োজন বোধ হয়ে পড়েছে। অন্তরে আজি আলোক নাহিরে হলে ভীষনই মুশকিল, কুমঙ্গল। হতভাগা অপরকে অবহেলায় পারদর্শী বাঙ্গালী বেমালুম ভুলে যায় যে রবীন্দ্রনাথের ইয়েট্স বা পিয়ার্সন সাহচর্য। বিশ্বভারতী গঠনকল্পে মারোয়াড়ী ব্য়বসায়ীদের যোগদান। স্বামীজির বিদেশযাত্রায় খেতরীরাজার অসীম অবদান। স্বামীজির মহাজীবনে এই খেতরীর রাজারও কম ভূমিকা নেই রামকৃষ্ণের থেকে। রামমোহনের জীবনরক্ষায় এক তিব্বতীনির সুমহান ভূমিকা ছিলো। শরৎচন্দ্রের মানসিপটভূমি তৈরীতে বর্মাদেশীয়দের সোৎসাহ। মহান নেতার অন্তর্ধানে অবাঙ্গালীভাষীদের সক্রিয়তা এবং যারপরনাই তৎপরতা। অর্বাচীন বাঙ্গালীর এহেন ভূমিকায় নিদারুন ক্ষুব্ধ বিদ্য়াসাগর শেষজীবন অতিবাহিত করেন কর্মাটারে, অবাঙ্গালী আদিবাসীদের সাথে। যাহোক একপেষে বাঙ্গালীর একবগ্গার রোগ চিরকালের। স্বয়ং বীর সন্ন্য়াসী প্রথমে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরাগভাজন ছিলেন। যদিও পরবর্তীকালে কিছু অধ্য়য়নের পরে তাঁর বিরাগ কিয়ৎ হ্রাস পায়। বৌদ্ধ ধর্মের মঝ্ঝিম পন্থা মানবজীবনের এক অতুল অবদান। মাঝামাঝি পথে চলে উগ্রতার আর হিংস্রতার মানবিকরন করা তো যেতেই পারে। দরকার সদ্দিচ্ছার আর জীবনকে দুই চক্ষে পূর্ণরূপে দেখা। নইলে একচক্ষু হরিণের ন্য়ায় একদিকে থাকে শুধুই আঁধার।

        সবাইকেই আসন ছেড়ে যেতে হয়। ভারত বা বাঙ্গলায় সেই নিয়ম অবশ্য় খাটে না। আমেরিকার মতো দেশে সর্বাধিক দুই বারের জন্য় রাস্ট্রপতির আসনপ্রাপ্তি আছে, তার বেশী নয়। এখানে চিরকালীন। যেতে নাহি দিব। শরীর, মন না চাইলেও, দল যে চাইবে শেষ দিন পর্যন্ত। রাজনীতি আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে ঢুকে গিয়েছে। পৃথিবীর যাবৎ চাকুরি বা কর্মে প্রবেশগত যোগ্য়তার প্রয়োজন। প্রবেশ যোগ্য়তা যে শুধু ছাঁকনির কাজ করে তাই নয়, মানুষকে ঐ কর্মের জন্য় পারদর্শী হতে উৎসাহিত করে এবং ঐ কর্মে সফল হবার প্রয়োজনীয় মানের সক্ষমতার অর্জনের বোধ জাগায়। অবশ্য় রাজনীতিতে প্রবেশ যোগ্য়তার কোনো প্রয়োজন নেই, তাই মাপকাঠিরও কোনো ব্য়াপার নেই। নেতা হতে হলে বংশপরিচয় আর যোগাযোগটাই জরুরী। এমতাবস্থায় আমরা রাজনৈতিক ব্য়ক্তিসমূহের কাছ হতে কি-ই বা প্রত্য়াশা করতে পারি? এদিকে রাজনীতি সম্পদ আনার আর জোগানোর মূল শক্তি। কিছু স্বার্থান্বেষী মানবের হাতে পড়ে রাজনীতি আর দেশের হয়েছে দফারফা। স্বাধীনতার আমলের সংগ্রামী রাজনীতি আর আজকের রাজনীতি অবশ্য়ই আলাদা আলাদ বিষয়। আজকের রাজনীতি ক্ষমতাপ্রাপ্তি আর ক্ষমতার কুক্ষিগততার কাহিনীবিশেষ। কিন্তু মানদন্ডহীনতায় এই রাজনীতি মাৎসন্য়ায়ের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে। বাঙ্গালী হিসাব কষে: তুমি ভালো না খারাপ? তুমি কোন দলের? ঘটনাচক্রে তুমি সহমতের না হলে, বিপদ অবশ্য়ম্ভাবী। দলের আর বাহুবলীদের আস্ফালন চলবে তোমার শরশয্য়া বা কঙ্কটশয্য়ায় পতন না হওয়া পর্যন্ত। এই অভিমুখের অবশ্য় পরিবর্তন আশু কর্তব্য়। মাঝামাঝি কেউ থাকতেই পারেন। তোমার সর্বকর্মে আমার উৎসাহ- উদ্দীপনার অবকাশ নাও থাকতে পারে।  এমতবস্থায় আমি তোমার বন্ধু না হলেও, অমিত্রও না হতে পারি। কিছু তো মানদন্ডের মানবসমাজের সর্ব ক্ষেত্রেই মান্য়তা থাকা উচিত। নইলে অন্য় অবোলা প্রাণীকুল হতে আমরা তথাকথিত সভ্য় কিসে? অপার বুদ্ধির অধিকারী কিসে? আত্মনিরীক্ষণ আর বুদ্ধের মঝ্ঝিম পন্থায় বাঙ্গালীমনে শান্তির অবকাশ আনবে। উগ্রতা, রূঢ়তায় ঠান্ডার প্রলেপ দেবে। আমরা একই জাতি, সবাই অমৃত্য়স পুত্রাঃ! ধংসাত্মক ভূমিকা ছেড়ে, গঠনাত্মক ভূমিকার দিকে বাঙ্গালীর সুষম মনোনিবেশ অত্য়ন্ত জরুরি।

প্রবন্ধ

সাচ্চা-ঝুটা

শাশ্বতী ভট্টাচার্য

ম্যাডিসন, উইস্কন্সিন

লেখক পরিচিতিঃ- যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে রসায়নে মাস্টার্স  করে CSIR এর Indian Institute of Chemical Biology তে গবেষণা  করেন এবং যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে Ph.D  ডিগ্রী অর্জন করেন। আমেরিকার National Institute of Health এর অন্তর্বতী National Cancer Institute এ কিছুদিন পোস্টডকের কাজ করার পর এখন ইউনিভার্সিটি  অফ উইস্কসিন ইন ম্যাডিসনে ডিপার্টমেন্টের অফ মেডিসিনের সায়ান্টিস্ট। স্বামি ও কন্যা সহ ওঁনার বাস উইস্কন্সিনের  শহর ম্যাডিসনে। । পেশায় বিজ্ঞানী শাশ্বতী বাংলা ভাষায় লিখতে ও পড়তে ভালোবাসেন।

অনুযায়ী গত ২০১৫ সালে, সারা পৃথিবীতে বাড়তি ওজন মনুষ্য সভ্যতার প্রায় ৩০ শতাংশকে (২.২ বিলিয়ন) অসুবিধায় ফেলেছে।তা হলে উপায়?  নাহ, কোন চিন্তা নেই! যে বিজ্ঞান গোটা আঁখকে ছিবড়ে করে তার হৃদয় থেকে বার করে এনেছে জমায়িত চিনির স্ফটিক মানিকটিকে, কিম্বা  ভুট্টার রস থেকে আমাদের মুখে তুলে দিয়েছে গ্লুকোজের ভাই ফ্রুকটোজকে সেই বিজ্ঞান এবার আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে বেশ কয়েক প্রকারের আর্টিফিসিয়াল সুগার, বিগত কয়েক হাজার হাজার বছর ধরে বিবর্তিত হওয়া আমার মগজ যাদের মোটেও চেনে না। 

      প্রথম দেখি অফিসের মিটিংয়ে।  পিঁজা আর তার সাথে ডায়েট কোক। কি ব্যাপার?  না হেলদী। এমনি কোকে তো অনেক চিনি, তাই ডায়েট কোক। শূন্য ক্যালোরি।  হেলদী, স্বাস্থ্যকর। 

-সিরিয়াসলী?

এর পরে এই শূন্য বা কম ক্যালোরির খাবার সব জায়গায় দেখতে শুরু করলাম।  সভা-সমিতি, জলসা-ঘরে, বিবাহবাসরে। হোটেল-রেস্তোরায় তো বটেই। 

সত্তরের দশকে যার স্থান ছিল মেডিসিন ক্যাবিনেটে তা ছড়িয়ে পড়লো রান্না ঘরে, এমনকি পানীয় জল খাবার কুঁজোতেও।  আমার ডায়াবেটিক দিদা চায়ে স্যাকারীন মিশিয়ে খেতেন, তাই ওই কেমিক্যালটিকে  আমার মা ঘরে  মজুত রাখতেন, অবশ্যই তা থাকত আমাদের নাগালের বাইরে,  ডেটল, বার্ণল আর এ্যনাসিনের সাথে। তবুও শান্তি ছিল, সেটা তখনও পূর্ন-বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

তারপর একদিন ওই শূন্য ক্যালোরিকে দেখলাম শিশুদের ব্যবহার্য খাদ্য-দ্রব্যে। 

প্রিয় বন্ধুর রান্না ঘরে দুধ, ডিম, ময়দা, তেল, ইস্টের পাশে পাতার পর পাতার কৃত্রিম চিনির  স্যাচেট। শুধু তাই নয় , কেকের সমারোহ বৃ্দ্ধি করার নানা রং-বেরঙ্গের আইসিং, ফ্রস্টিংয়ের যে সমাহার,  তার উপরেও কালো -কালির বড়ো হরফে লেখা শূন্য ক্যালোরি কথাটা চোখে পড়লো।

--এইখানে এইগুলো কি রে? তোর ছেলে তো সবে দুই, আর মেয়েটা এই সেদিন থেকে স্কুলে যাচ্ছে?  ওরা কি ডায়া...? বলতে বলতে থেমে গিয়েছি।   এই রকম একটা অশুভ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা আমার একান্তই অনুচিত নয় কি?

--আরে বলিস কেন?  আমার মেয়ের খুব রান্নার সখ বুঝলি?  এই বয়সেই ও যা রান্না করে না! নির্ঘাত এমেরিল লাগাসের ঠাকুরমা ছিল গতজন্মে । দেখ না দেখ, এই কুকি, এই কেক, এই প্যস্ট্রি বানিয়ে চলেছে। তারপর  উইক-এন্ড হলো কি না, আসে পাশের গাদা গুচ্ছের সাদা-কালো  সব বন্ধু–বান্ধবকে  ঘরে  ডাকবে..., ওই সব ডেসার্ট বানাবে, খাবে আর  ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলবে!  আসলে ওর বাবারও তো ভিডিও গেমের শখ, তাই আমাদের বাড়িতে ভালো স্টক আছে।  হইহই করে  কথাগুলো বলে বন্ধু আমার দিকে তাকায়, সম্ভবত কিছু পড়েছে আমার ভ্রকুঞ্চনে, ...চিন্তা করিস না, ওগুলো সব জিরো ক্যলোরী।  ভিডিও গেম খেলাটাতে তো তেমন কোন এক্সারসাইজ নেই!  বুঝলি না? এক ঢিলে দুই পাখি।

--না।  বুঝলাম না বন্ধু। কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যা,  সাচ্চা-ঝুটা ঝুটা-সাচ্চা সব কি আমরা গুলিয়ে ফেলছি? এতো ঠিক মঙ্গলময় বার্তা নয়। আমি দীর্ঘশ্বাস গোপন করি।  জিভকে নকল মিষ্টির স্বাদ পাইয়ে নয় তো ফাঁকি দেওয়া গেল, কিন্তু এই মিষ্টির ব্যপারটা জিভেই শেষ হয়কি? জিভ থেকে যে বার্তাটা মগজ মানে, যাকে আমরা ইংরাজীতে ব্রেন বলি তার কথা মনে রেখেছো তো বন্ধু?  বার্তাটা  পাওয়ার পর শরীরে অন্তত এক প্রকারের হরমোনের ক্ষরণ হতে পারে তার কথাটা মনে রেখেছো তো বন্ধু?  সেদিন বলতে পারিনি। 

মাধুকরীতে আমার এই লেখাটা আজ তাই বন্ধু, তোমায় দিলাম।

     বাজারে আরো তো চারটে স্বাদ আছে, তবে কেন মিষ্টির প্রতি এই আকর্ষণ?   ব্যপারটা জটিল নয়, যদি মেনে নিতে পারি যে “মিষ্টি” শুধু মাত্র একটা  স্বাদই  নয়।  কেন মিষ্টির দিকে আমাদের এই অপ্রতিরোধ্য ঝোঁক, তা বোঝার জন্য বেশী দূর নয়,  মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর আগের কথা ভাবলেই চলবে।

জীবাশ্ম বিজ্ঞান অনু্যায়ী প্রায় ২.৬ মিলিয়ন খৃষ্টাব্দে মানুষের পূর্বসূরী Hominids  এর দেখা পাওয়া যায়।   যদিও Neolithic (New Stone age, আনুমানিক  খৃষ্টাব্দ ১০,২০০ সাল) যুগকে মনুষ্য  সভ্যতার  শুরুর যুগ বলা যেতে পারে, বুঝতে হবে, তারও প্রায় ১৯০ হাজার বছর আগের Paleolithic (Old-Stone age)  যুগে আজকের মানুষ বা Homosapien এর আবির্ভাবকাল। সবে বন্য জন্তু জানোয়ারের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য পাথরের ব্যবহার সে শিখেছে বটে, কিন্তু অন্য সমস্ত জীবিত প্রাণীর মতো নিছক প্রাণ ধারণের জন্য মানুষেরও দরকার ছিল খাদ্যের।

তার সেই অস্থায়ী যাযাবরের জীবনে না ছিল কোন বাসস্থান, না ছিল কোন নির্দিষ্ট খাবারের সরবরাহ, না   ছিল বিশেষ একটা বাছ-বিচার করার পরিস্থিতি। তার বেঁচে থাকা, অথবা না-থাকা প্রধানতঃ কার্বোহাইড্রেট তথা গ্লুকোজের ওপর নির্ভর-শীল।  নানা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সেই গ্লুকোজের রূপান্তরিত হয়ে তৈরী হবে এটিপি নামক এক অণু। যাবতীয় কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির মুদ্রা (Currency) এই অণুটি।

      অতএব, বিবর্তনের সহজাত কর্ষণে মানুষ বুঝতে শিখেছে কিভাবে পরিশ্রমকে এক রেখে বেশী গ্লুকোজ তথা এটিপি পাওয়া যেতে পারে।  মিষ্টি পাকা ফলটা তাই, কাঁচাটার থেকে অনেক বেশী বাঞ্ছনীয়। এইভাবেই সদ্য জাত শিশুর প্রথম খাদ্য মায়ের দুধে মিষ্টি এবং তা উপভোগ করার জন্য যেমন জিভে তার উপযোগী স্বাদ-কলিকা, ব্রেনেও তেমনি, চিনির সরসতায় নির্দিষ্ট আনন্দানুভূতি এসেছে। এর অন্য প্রান্তে অদূর ভবিষ্যতে অনাহারের সম্ভাবনায় যতটা প্রয়োজন ঠিক ততখানি খরচা করে বাড়তি গ্লুকোজকে ফ্যাটের আকারে গড়ে মজুত করে রাখার আয়োজন হয়েছে।

বন্ধু, বলা বাহুল্য এই  ভাঙ্গা আর গড়ার কাজগুলি করার জন্য যার অবদান অপরিহার্য,  তিনিই সেই সুপ্রসিদ্ধ ইনসুলিন হরমোন জগতের  Swish army knife,  কিম্বা সর্ব-ঘটের কদলী বৃন্ত।  প্রাণী জগতে এই ভদ্রলোক ইনসুলিনটি বাবুটির  আবির্ভাবকাল নিয়ে নানা গবেষণা থেকে বলা যায়, ইনি অতিবৃদ্ধ।

অন্তত পক্ষে মিলিয়ন বছর আগে তো বটেই, কেউ কেউ বলেন তার চেয়েও আরও আগে!

আজকাল দেখেছি অনেকে সাদা চাল, ওরফে ভাত পাউরুটি ইত্যাদি কার্বোহাইড্রেটকে শুধু কার্ব বলে ডাকেন (এবং বেশ ছিঃ ছিঃ কারও করেন)।  ভুললে চলবে না চাল যেমন কার্বোহাইড্রেট, যে কোন ফল, সবজি, ডাল, দুধ , আলু, ভুট্টা, ওটমিল সব কিন্তু সেই একই।  কার্বোহাইড্রেট এক ধরণের অণুর বংশগত নাম।  গ্লুকোজ এই কার্বোহাইড্রেটের গোত্রের সব থেকে সিধাসাদা সদস্য, এবং  এই প্রবন্ধে একেই আমি  সুগার, কিম্বা মাঝে মাঝে চিনি বলি ডেকেছি।

নানা বিপর্যয় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে, বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে  কার্বোহাইড্রেট আহরণ করার জন্য এবং তাকে ঠিক মতো ব্যবহার করার এই যে রীতিমতো এটা অখণ্ড (ফেল প্রুফ) একটা সিস্টেমের উদ্ভাবন হয়েছে প্রকৃতিতে, ভাবলে অবাক হতে হয়।

অতএব পাঠক, পাকা আমটি মুখে দিয়ে যে সুখ, সেই সুখ এক-দুই দিনের মামলা নয়, বিগত কয়েক শত হাজারের বছরের বিবর্তনের আমদানি। মিষ্টির আকর্ষণ তো শুধু মাত্র জিভেই সীমাবদ্ধ নেই, লাল টুক-টুকে স্ট্রবেরীটিকে তাই চোখে দেখেও সুখ! ওটা মুখে পড়লে ব্রেন যে “আহা আহ্ আহা” বলে জানান দিয়ে

উঠবে। তুমি আমি বন্ধু তো নশ্বর মানুষ, মেরে কেটে একশো বছরের আয়ু।

কৌতূহলী পাঠকের জন্য জানাই, পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণীর যাবতীয় দৃশ্য বা অদৃশ্য কাজ করার জন্য প্রয়োজন এটিপির। সাধারণতঃ  গ্লুকোজ (তথা অযৌগিক কার্বোহাইড্রেট)  থেকে এটিপি উৎপাদন হয় বটে, তবে ফ্যাট এবং সবিশেষ প্রয়োজনে আমাদের শরীর প্রোটিন থেকেও এটিপি উৎপাদন করে, (তার আগে কিন্তু সেই প্রোটিন থেকে কোন প্রকারে গ্লুকোজ বানাতে হয়) তবে সেটা কেন ঠিক অভিপ্রেত নয় আজকের প্রবন্ধে সেই আলোচনায় যাবো না। মিষ্টি শুধু খেতেই নয়, মিষ্টি নিয়ে লিখতেও সুখ।  হ্যাঁ, আধুনিক মনুষ্য-সমাজ ঠিক এই রকম  পরিস্থিতির কবলে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে, রাসায়নিক পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে, আঁখ থেকে হোক, বা  ভুট্টা দানা থেকে হোক, আমরা চিনিকে ঘনীভূত করতে শিখেছি।  আর যেই না তা পেরেছি, আমাদের চেনা প্রায় সমস্ত খাদ্যে আমরা মিষ্টি দিতে শিখেছি, মুখে দেওয়ার মতো কিছু হলেই হলো, রুটি, পাউরুটি, ভাত, ডাল, মাংস, মায় ওষুধ...। 

A spoonful of sugar helps the medicine go down, in the most delightful way!

আর তার ফল?  শিকারী খুদ ইহা শিকার হো গয়া!

বেঁচে থাকার তাগিদে যে গ্লুকোজ তথা  মিষ্টির দরকার ছিল এবং তাকে ভালো লাগার এবং সংযতভাবে ব্যবহার করার যে উপকরণ বিবর্তনের রাস্তা ধরে আমাদের মস্তিকে, শরীরের বিভিন্ন  অঙ্গ প্রত্যঙ্গে প্রোথিত হয়েছিল তা আজ এক আশ্চর্য আসক্তি হয়ে বহু মানুষের দূর্বিসহ জীবন এবং ক্ষেত্র-বিশেষে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিষ্টি বহু মানুষের কাছে অবিকল সিগারেট বা মদের মতো নেশাকারক এবং জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে সেই নেশায় এনারা আক্রান্ত। বলা বাহুল্য বাড়তি চিনি ইনসুলিনের প্রভাবে ফ্যাট বা বাড়তি ওজনে পরিণত হয়েছে এবং আদমশুমারি

অনুযায়ী গত ২০১৫ সালে, সারা পৃথিবীতে বাড়তি ওজন মনুষ্য সভ্যতার প্রায় ৩০ শতাংশকে (২.২ বিলিয়ন)  অসুবিধায় ফেলেছে।তা হলে উপায়?  নাহ,  কোন চিন্তা নেই!

যে বিজ্ঞান গোটা আঁখকে ছিবড়ে করে তার হৃদয় থেকে বার করে এনেছে জমায়িত চিনির স্ফটিক মানিকটিকে,  কিম্বা  ভুট্টার রস থেকে আমাদের মুখে তুলে দিয়েছে গ্লুকোজের ভাই ফ্রুকটোজকে সেই বিজ্ঞান এবার আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে বেশ কয়েক প্রকারের আর্টিফিসিয়াল সুগার, বিগত কয়েক হাজার হাজার বছর ধরে বিবর্তিত হওয়া আমার মগজ যাদের মোটেও চেনে না। 

      এই ‘অচেনা” চিনিগুলোকে তাদের চরিত্র অনুযায়ী গোষ্ঠীবদ্ধ করলে, যারা এক্কেবারে রাসায়নিক দ্রব্য তারা হলো Sweet'N Low (Saccharin), Equal, NutraSweet (Aspartame),  Sweet One (Acesulfame potassium)  Neotame (Aspartame বড়ো দাদা)। এর পরে  লাইন দিয়ে এলো Erythritol,  Isomalt, Lactitol,  Maltitol,  Mannitol, Sorbitol,  Xylitol, Splenda (Sucralose)  প্রভৃতি। এরা চিনি কিন্তু চিনি নয়, এরা Sugar alcohol। মোটামুটি চিনির মতো একটা অণু, তার সাথে একটা আরেকটা অণু এমন করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে এদের মধ্যে যে আমাদের সেই সুপ্রসিদ্ধ বয়োজ্যেষ্ঠ ইনসুলিন বাবা-জীবন এদের ছোঁবেনও না, এরা মোটামুটি বাহ্য পদার্থ!  বহু ক্ষেত্রে জোলাপের মতো এদের আচার ব্যবহার।  এর মধ্যে Stevia নামক নকল চিনিটার মধ্যে যদি ও বা একটা প্রাকৃতিক- প্রকৃতিজ ভাব আছে , আসলে কিন্তু ওটিও Stevia rebaudiana  নামক এক গুল্ম-ঝাড়ের পাতা থেকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে বার করে আনা পদার্থ (stevioside)।

      তা হলে কি দাঁড়ালো? ভেবে দেখলে ব্যাপারটা অত্যন্ত সহজ। স্বাদের বিচারে এরা চিনি থেকে বহুতর গুনে মিষ্টি  হওয়া সত্বেও বাড়তি চিনি সংক্রান্ত  কোন ঝামেলা থাকছে না।  কেন না এরা তো মোটেও চিনি নয়, তাই ইনসুলিন নিঃষ্করণ হবে না ধরে নেওয়া যেতে পারে। আর কে না জানে ওই ইনসুলিনটাই তো যত্তো  গন্ডগোলের মূলে।  এই সে গ্লুকোজকে কোষের কাছে বিলি করে  তার থেকে এনার্জি তৈরী করতে সাহায্য করছে, এই সে বাড়তি চিনিকে ফ্যাট তৈরী করে লিভারের কাছে জমা রাখতে এগিয়ে আসছে!

তা হলে তো মুস্কিল আসান?  প্রবলেম সল্ভড।

না! ধীরে বন্ধু ধীরে। গবেষণা চলতে চলতে থাকল এবং  প্রথম অন্তরায় দেখা গেল...।

যেমনটি ভাবা গিয়েছিল,  দেখা গেল তেমনটি ঠিক হচ্ছে না। অচেনা চিনির কয়েক জন সদস্য ইঁদুরের শরীরে ইনসুলিন বাড়িয়ে দিচ্ছে!  সত্যি?  কৃত্রিম চিনির সপক্ষে যাঁরা তারা বললেন, --বুঝেছি।  ইঁদুর ব্যবহার করা হয়েছে না? তাই। মানুষ আর ইঁদুর এক নাকি?

আসতে থাকল,  ‘এই কৃত্রিম চিনিটা ওই নকলটার থেকে ভালো’র  বিবৃতি, এবং একের পর এক নকল চিনিতে বাজার ছেয়ে যেতে লাগলো।

এই সব ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে, সেই চাপান উতোর চলতেই থাকল, আর অন্য দিকে, ১৯৮০ থেকে আজকের ২০১৮ সাল অবধি, বাজারে এতো প্রকারের কৃত্রিম চিনি এবং তাদের বিক্রি পুরো মাত্রায় বজায় থাকা সত্ত্বেও থেকে জন-সাধারণের ওজন বাড়তেই থাকল।

কেন? কোথায় বাঁধলও গন্ডগোলটা? উত্তরের আশায় গবেষণা এবং কারণের খোঁজে জল ঘোলা হতেই থাকল। 

জানা গেল, কিছু কিছু নকল চিনি খাওয়ার পর মানুষের শরীরেও ইনসুলিনের ক্ষরণ হয়।  তখন সে প্রথমে খোঁজে তার অতি পরিচিত আসল গ্লুকোজটিকে  (তার পরে হাত বাড়ায় ফ্যাট কিম্বা প্রোটিনের ওপর)। ফলাফল সরূপ- রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম, এবং মগজে ক্ষুধানুভূতির বার্তা। খিদে পেয়েছে! খাবার কই? খাবার চাই! এখুনি চাই।  ফলাফল সরূপ-অতিভোজন।

       জানা গেল, নকল মিষ্টি স্যাকারিন কোকেনের মতো বহুপ্রসিদ্ধ নেশার জিনিষের চাইতে বেশি আকর্ষণীয় এবং নেশাকারক, অন্তত গবেষণাগারের কতগুলি ইঁদুর কাছে।২০১৭ সালে মার্চ এবং ডিসেম্বরে প্রকাশিত হওয়া সুস্থ মানুষ নিয়ে করা দুটি প্রবন্ধের (Physiol Behav. 2017, 182:17-26, এবং International Journal of Obesity, 2017 41, 450–457) কথা উল্লেখ করবো।

    এই দুটোতেই বক্তব্য যদিও বা সেই ‘আরো গবেষণার প্রয়োজন’ ভাবনাটা আছে, দুটোতেই গবেষকেরা কৃত্রিম চিনির কোন উপকারীতা দেখতে পারেন নি। উল্টে নিয়মিত কৃত্রিম চিনি সেবন যে পৃথুলতা বা ডায়াবেটিস নামক রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে এমন একটা স্টাডির (CMAJ. 2017;189:E929-E939) কথা  বলা আছে একটি  প্রবন্ধে।

      আমি নকল মিষ্টির সপক্ষে নই এটা হয়তো এতক্ষণে বোঝাতে পেরেছি।  আর রসগোল্লার বদলে যদি আপেল কিম্বা আমে মিষ্টি রসনা তৃপ্ত হয়, সেই চেষ্টাটাও তো করে দেখা যাক না বন্ধু। জলের মতো পানীয় আর হয় না কি?

বন্ধু, শেষ পর্যন্ত মানুষ অভ্যাসের দাস, কুকির বদলে কতগুলো ব্লুবেরী বা আঙ্গুর মুখে ফেলে দেখলে হয় না?  হয়তো কয়দিনেই সেটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।

কথায় বলে না “Prevention is better than cure”?

পরিশেষে বলি, পাঠক, মিষ্টি খেতে ইচ্ছা হলে মিষ্টিই খান না! আপনি নেশাগ্রস্থ কিনা সেটা আপনারই বিচার। ভালো থাকুন, রসে বশে থাকুন। 

কবিতা

"আমি আর লিখতে পারি না"

- প্রসেনজিৎ ঘোষ

      

মি আর লিখতে পারি না মণি!

তোর ‌জন্য ভালো ভালো কবিতা-

আর আসেনা আমার কলমে।

জানি তুই আমার কবিতা ভালোবাসতিস

এলোমেলো যাই লিখি না‌ কেনো।

ঘুম চোখে ও বারবার পড়ে

ঠিক ভুলটা ধরিয়ে দিতিস।

আর সেসব হয় না এখন।

জানিস আমিও খুব মিস্ করি

সেইসব দিন গুলো...

যেদিন প্রথম তোর ‌জন্য কবিতা লিখেছিলাম,

খুব মনে আছে.. একদম বাজে হয়েছিল।

তবুও একমাত্র তুই ই প্রশংসা করেছিলিস

খুব বাজে হয়েছিল জেনেও।

জানিস মনি আজ খুব মিস্ করি তোকে

যখন ই একা থাকি।

কেও আর আজ‌ তোর মতো

সারাদিন বকবক করেনা

প্রতি সপ্তাহে ঘুরতে যাওয়ার ও‌ আর কেউ নেই।

আমি এখন দামোদর এর পাশে

পড়ে থাকি একা হয়ে।

সময় ও কাটে ... মলিন হয়ে।

আর স্মৃতি গুলো জরিয়ে ধরে

আস্টেপিস্টে ।

কাজের ফাঁকে গোধূলি বেলায়

নানান জিনিস মাথায় আসে

কখন কখন খুব ই ইচ্ছে করে

আবার তোর জন্য কবিতা লিখি

কিন্ত্ত সত্যি আর আমি লিখতে পারিনা

তোর ‌জন্য...

মনি আমি আর লিখতে পারিনা।।।

নগ্নতা

- সুদীপ্ত বিশ্বাস

 

রাতের কাছে নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই

বরং ও রাত ঘন কালো চাদর মুড়ে

ঢেকে রাখে আমার যত নগ্নতা সব।

 

ওই আকাশে নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই

বরং আকাশ ছাতার মত মাথার উপর

মুড়ে রাখে সবকিছু  তার বুকের ভিতর।

জল বাতাসে নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই

তারা বরং একটু বেশি খুশি হয়েই

ফিসফিসিয়ে বলে কিছু বাড়তি কথা।

নদীর কাছেও নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই

বরং নদী ছলাত-ছলাত ছন্দ তুলে

নগ্ন হয়েই আমায় শুধু নাইতে বলে।

বন-পাহাড়ে নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই

বরং তারা খুব খুশিতে দুজনেই চায়

আমি যেন খালি পায়ে যাই হেঁটে যাই।

পশুপাখিওদের কাছেও লজ্জা তো নেই

বরং তারা বন্দুক আর চশমা-টুপি 

এসব ছাড়াই সত্যি কোনও বন্ধুকে চায়।

এই পৃথিবীর সত্য যারা তাদের কাছে

নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই,লজ্জা তো নেই

কারণ সত্য নগ্ন হতে লজ্জা পায় না।

মানুষ দেখে নগ্ন হতে লজ্জা করে

মানুষগুলো লুকিয়ে রাখে নিজের মুখও

তার শুধুই মিথ্যে বলে, মুখোশ পরে।

এই সমাজে নগ্ন হতে লজ্জা করে

গোটা সমাজ মিথ্যেবাদী, ভ্রষ্টাচারী

নগ্নতা আর সরলতার সুযোগ খোঁজে।

 

ভালবাসা যদি ফিরে পাই

তবে তো নাচবো ভাই

তাধিন তাধিন...

 

পোড়া বিড়ি দেব ছুঁড়ে ফেলে।

ফেলে দেব তামাকের শিশি

ছেড়ে দেব সব ছাইপাঁশ

তেতো জল, বিলিতি বা দিশি।

 

ভালবাসা যদি ফিরে পাই

তবে তো গাইবো ভাই

গলা ছেড়ে যা আসবে মনে

 

বাতাসকে বলে দেব আমি কত সুখি 

আকাশকে বলে দেব আমি কত সুখি 

পাহাড়কে বলে দেব আমি কত সুখি 

তারাদের বলে দেব আমি কত সুখি। 

 

ভালবাসা যদি ফিরে পাই

তাহলে তো  ভাই

হয়ে যাব ফুল, পাখি, নদী।

ভালবাসা ফিরে পাই যদি -

নরম পালক নিয়ে

রামধনু রঙ মেখে এসে

বয়ে যাব তির-তির,

 পাহাড়ের দেশে।

 

ভালবাসা যদি ফিরে পাই

তবে তো বাঁচবো ভাই

সমস্ত জীবন।

 

প্রতিটা মুহূর্ত বেঁচে বেঁচে

প্রতিটা শরৎ বেঁচে বেঁচে

প্রতিটা বছর বেঁচে বেঁচে

প্রতিটা দশক বেঁচে বেঁচে

তবুও তো ভরবে না মন।

বলে যাব, 'বড় ছোট এ জীবন।'

আগডুম বাগডুম

- সুদীপ্ত বিশ্বাস

গডুম বাগডুম ওই ঘোড়া ছুটল
ভোরবেলা চুপিচুপি ফুলটাও ফুটল।
বাগানেতে টুনটুনি টুই-টুই ডাকছে
গুনগুন মৌমাছি ফুলে মধু চাখছে।
ছপছপ দাঁড় টেনে নৌকারা চলছে
ছলছল কলকল নদী কথা বলছে।
আকাশের মগডালে ওই চিল উড়ছে
চিকচিক রোদ্দুরে পিঠ তার পুড়ছে।
চুপিচুপি মেঘ এসে সূর্যকে ঢাকল
তারপর রেগে-মেগে গুরগুর হাঁকল।
কড়কড় বাজ ফেলে মেঘ যেই থামল
টুপটাপ ঝিরঝির বৃষ্টিটা নামল...

 

বাক্যহারা

- সুদীপ্ত বিশ্বাস

অবলা কথারা আটকে রয়েছে চোখে

অবুঝ মনের বোবা কান্নার মত

আজকে এখন পাথর চোখেতে শুধু

হারানো আবেগ পুরানো দিনের ক্ষত।

বুঝলে না কিছু বুঝতে চাওনি বলে

সুরের ইশারা সুরকার শুধু জানে

দূরের বাতাস দূরে চলে যায় আরও

মন শুধু বোঝে হারানো গানের মানে।

এসেছিল যেটা একদিন নিঃশব্দে

বাতাসেও ছিল চুপিচুপি আসা যাওয়া

রূপকথা দেশে হারানো বিকেলগুলো

সবটাই যেন মিথ্যে অলীক মায়া।

 

জীবনের খাতা ভাসানোর পর পর

দুচোখ ভেজায় অঝোর অশ্রুধারা

অল্প দুঃখে সশব্দে কেঁদে ওঠে

গভীর দুঃখে ঠোঁটেরা বাক্যহারা

স্মৃতিসুধা

- ভাস্কর সিন্হা (দোহা, কাতার)

 

তালডিংলি পেরিয়ে, ময়নাগুড়ি এড়িয়ে, তিস্তাপাড়ের মংপোতে

হয় দেখা। ইল্শেগুড়ির মতো বৃষ্টি ছিলো সেসময়। মূর্তির জলে

মিলিয়ে যখন যায় চাপরামারি আর গোরুমারার আরণ্য়িক কুহকতা।

হাজারো পক্ষীর ঐক্য়তানের আবেশ, মনভরা রঙ্গিন সে উচ্ছ্বাস।

টিক, শাল, শিমূল, শিরীষ আর খয়েরের উদ্দামতা পেরিয়ে,

বিষহারা পালায় রাজবংশী নৃত্য় শেষে, মাগুরমারির করমে।

বন্য়েরা বনেই আনন্দিত, দেখতে দেখতেই দামাল ঐরাবতে বস্কাদ্বার

যায় যে পেরিয়ে। চালসা- খুনিয়া- ঝালং পথে বিন্দুপ্রান্তে সিন্ধুমাখা

কাঞ্চনজঙ্ঘা। পুণ্য়ব্রতা তোর্সায় অবগাহনে সিদ্ধপ্রাণা। চায়ের মেজাজী

আবেশ বয়ে চলে ভিজে, শীতে মোড়া ইংরেজী বাংলোয়। প্রথম প্রেম

শুরুর পথে- প্রথম কর্মে আসা, এইস্থানেই। ভোলার নয় লখুয়ার

শীতের ক্ষণেক রোদে নিস্পাপ সেই হাসি। কেবল সাহেবের জুতাছাপ

শুকিয়ে যায় যে তার পিঠে। আর নাম না জানা এক সুবেশী নেপালী গুড়িয়ার

উচ্চকিত হাস্য় খালি ডানা ঝাপটে নামে সমতলের মেদুর পথে।

আকাশ
- ধীমান চক্রবর্তী

ছোটোবেলায় আকাশখানা..
ছিলো অনেক বড়ো,
বড়োরা সব বলতো তখন..
"বড়ো হয়ে ওঠো!"
উঠতে উঠতে ছুটতে ছুটতে..
বড়ো হবার পরে,
ছোটোবেলার বড়ো আকাশ..
হঠাৎ বড়ো ছোটো!

ইচ্ছেমতো ছোটাছুটির..
অবাধ ছেলেবেলা,
জানি না কোন ছোটার টানে..
নিলো কখন ছুটি!
ছুটির ঘন্টা মনের কানে..
হঠাৎ গেলো বলে..
"চল না আবার
..ছেলেবেলার আকাশ হয়ে উঠি!"

আকাশ হবার ইচ্ছেটাকে..
অনেক হিসেব কষে,..
.. আটকে দিয়ে সামলে চলি..
..বড়ো হবার ঠেলা,
বাচ্চাগুলোর বড়ো হবার..
..ইচ্ছে ডানা মেলে..
উড়তে থাকুক..
তোমার আমার সবার ছোটোবেলা!!

ছন্নছাড়া

- শান্তনু বসু

 

প্রয়োজন আছে কবিতার,

তাই চাইনাও দিতে ছুটি

লিখতে পারিনা বলেই তো

গদ্য নাচায় ভ্রুকুটি।

 

মন চায় দিতে মতামত

ভয় দুচোখে "শমন" এর,

দুঃস্বপ্নের কারাগারে ঠাঁই মননের

সম্ভ্রম মাটিতে লুটোপুটি।

 

স্বপ্ন গিয়েছে ভেন্টিলেশনে

কোমায় রয়েছে বিবেক,

তেল মাখানোর দংশনে ক্ষত

বিক্ষত হাতে ভাগ্যের কাটাকুটি !

 

অর্থ লালসা ভোগ পুঁজিবাদে

সাজিয়েছে ডালি যৌবন,

মান সম্মান নিয়ত বিকোয়

দালাল চালছে গুটি।

 

শিক্ষক নামে ব্যস্ত মিছিলে

হাতে শিক্ষার বাটি

বন্ধ দরজা জোর তরজায়

বিদ্বজ্জন পরিপাটি।

 

দেশ গড়ার মহান কার্যে

যাতে না ঘটে দোষ ত্রুটি,

গোয়েন্দা গিরিটা ছেড়েছে প্রদোষ,

ফেলুদারা করে রাজনীতি।

কখনও রবীন্দ্রনাথ

যশমন ব্যানার্জী

উইনচেস্টার, ভার্জিনিয়া 

একটা মেটে রোদ জড়িয়ে আছে শহর
ধোঁয়ায় , শব্দে ভরে গেছে উপেক্ষিত সূর্যাস্ত
ধুঁকতে ধুঁকতে চলেছে হাজার কলেবর
এদিক থেকে ওদিক দিকভ্রানত উদ্দেশ্যহীন
অপ্রয়জনের জীবন এখন জীবনমুখি সাজে
প্রিয়জন আর প্রয়োজন নেই ব্যস্ততায়
নিজের জন্যেই টিকে থাকার তাগিদে
ধুঁকতে ধুঁকতে চলেছে হাজার কলেবর
এসবের মাঝে ভুল করে চোখে পড়ে
ফুল আকাশ আর কখন রবীন্দ্রনাথ

দার্জিলিং

যশমন ব্যানার্জী

উইনচেস্টার, ভার্জিনিয়া 


কুয়াশায় নির্জন বাঁকা পথ
হাজার বাঁক ঘুরে ঘুরে
জড়িয়ে ধরে ঘোলাটে সবুজ পাহাড়
ভোরে চান করে ঠান্ডা তুষার কনায়
ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘ চোখে মুখে ছুটে আসে
কথা বলা নিশ্বাস সেই ধোঁয়াতেই শান্ত
অল্প অল্প করে বেরিয়ে আসে মানুষ বাড়ি ঘর
কেমন যেন অচেনা স্বপ্ন কেটেগেল শোরগোলে
হোল্ডঅল নিয়ে স্টেশনে গরম চা
এবার দেখব নতুন স্বপ্ন কিছুদিন
তুমিও কি বদলেছ? দার্জিলিং?

বন্ধু তুই

- সৌমিলি ঘোষাল

তুই-ই আমার মনের কথা,
কান্না হাসির গান
তুই -ই আমার সুজন মাঝি ,
কুহুদের কলতান
তুই- ই আমার চাঁদের আলো,
জোৎস্না মাখা প্রহর
তুই -ই আমার অতলান্ত,
অনুভূতির অবসর।

আয় বৃষ্টি ঝেঁপে
- সুদীপ্ত বিশ্বাস

বৃষ্টি রে তুই আয় না ঝেঁপে আমাদের এই গাঁয়ে 
দে ছুঁয়ে দে মিষ্টি ছোঁয়া রাঙা মাটির পায়ে।
ওই যে মাটি, মাটির ভিতর শিকড় খোঁজে জল
বল না বৃষ্টি ওদের সঙ্গে খুশির কথা বল।
টিনের চালে অল্প আলোয় যখন ঝরিস তুই
পুকুর ভরে শালুক ফোটে বাগান জুড়ে জুঁই ।
আকাশ তখন সাত রঙেতে রামধনুটা আঁকে 
সেই খুশিতে টুনটুনিটা টুটুর টুটুর ডাকে। 
রামধনুর ওই সাতটি রঙে মন হারিয়ে যায়
অনেক দূরে তারার দেশে মেঘের সীমানায়।
মাছের খোঁজে পানকৌড়ি ওই তো দিল ডুব 
বৃষ্টি নামুক  বৃষ্টি নামুক টাপুর টুপুর টুপ...

নদী ও প্রেমিক 

- সুদীপ্ত বিশ্বাস

 

পাহাড়ের বুক চিরে ঝর্ণাটা নামে

অনেক না বলা কথা আছে নীল খামে।

 

ঝর্ণারা মিলেমিশে হয়ে যায় নদী

শুনবে নদীর গান , কান পাতো যদি।

 

ও নদী কোথায় যাও? ছল ছল তানে?

দাও নদী দাও বলে জীবনের মানে।

 

ঘন্টার ঠুন ঠুন, আজানের সুর

নদী জলে মিশে যায় সোনা রোদ্দুর।

 

ছোট ছোট ঢেউ তুলে নেচে নেচে যায়

সব মেয়ে তাই বুঝি নদী হতে চায়?

 

ও নদী চলেছ বয়ে, নদী তুমি কার?

প্রেমিকটা প্রাণপণ কাটছে সাঁতার।

 

সাঁতরে সাঁতরে আরো  কতদূর যাবে?

 

কতটা গভীরে গেলে তবে তল পাবে?

 

নদীটা যেই না গিয়ে সাগরেতে মেশে,  

প্রেমিক ঘুমিয়ে পড়ে  সঙ্গম  শেষে...

বছর দশেক পর

- সৌমিলি ঘোষাল

বছর দশেক পর

আমি ঠিক এমনই একটা দিনের কথা ভেবেছিলাম,

যেদিন বাতাসে ভেসেছিল আম্রমুকুলের মৃদু সুবাস,

কুসুম বনে উঠেছিল ঢেউ,

নবজাতকের আগমনের তীব্র উন্মাদনা ছিল মনে,

উথাল পাথাল ছিল -

দখিন দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা আমার আঁচল,

আমি ঠিক এমনই একটা দিনের কথা ভেবেছিলাম

যেদিন ছিল তোমার আসার কথা।

তারপর হয়ে গেলো বছর দশ -  বারো,

মাঝে তিস্তা তোর্সা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল,

ধূসর স্মৃতিতে লেগেছে সময়ের প্রলেপ,

কষ্ট ধুয়ে জমেছে একরাশ অভিমান,

কিন্তু ফিরে আসার কথা ভাবনি তুমি।।

অসমাপ্ত

- সৌমিলি ঘোষাল

আমি বেসেছি ভালো ওই নীলদিগন্তের, রামধনু মাখা ওই স্বপ্নগুলোকে ।

আমি বেসেছি ভালো ওই একরাশ ধুলো মাখা স্মৃতিগুলোকে ,

আমি থাকতে চেয়েছি একা  -

হৃদয়ের আঁকাবাঁকা

গোলক ধাঁধার ওই শুকনো গলিতে

আমি স্পষ্ট দেখেছি ওই

সেতারের সুরে বাজে

মলিন যন্ত্রণার নীরব প্রকাশ।

তাই এসেছি ফিরে আমি

তবু বারে বারে এই

জীবনের খাতায় গল্প লিখবো বলে

হয়ত থাকবো একা

দাড়িয়ে থাকবো তবু,

দেখবো আমায় ফেলে

এগিয়ে যাচ্ছে সব

চোখ মেলে তবু আমি

দেখবো দুচোখ ভরে

নতুন পৃথিবীটা নতুন করে।

 

মন

- সৌমিলি ঘোষাল

ওই সুদূরে যায় হারিয়ে

বিস্তৃত বালুরাশি

ওই আকাশে ঐ ছুয়ে যায়

একটু নীলের আভা

হাত বাড়িয়ে যেই ছুঁতে যাই

বাঁধন হারা ওই সীমানা

অমনি সেথা যায় হারিয়ে

এক নিমেষে ছড়িয়ে ধুলো

মেঘের ফাঁকে ফাঁকে

জন্ম যেথা মৃত্যু সেথা

যুগান্তরে যায়না বৃথা

সেই সীমাতে নিমেষ হারা

পাগল পারা মন।।

আয় বৃষ্টি
- ধীমান চক্রবর্তী

জানিনা আজ তুমি কেমন আছো..
আজকে কীসের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচো..
জানি না! তাই জানতে চাই না আর!

তবু হঠাৎ জানতে ইচ্ছে করে..
দিশাবিহীন ছুটতে থাকার ভিড়ে..
সব পাখি কি এলো বাসায় ফিরে?
আলতো পায়ে নামছে অন্ধকার!

জানতে চাওয়া!কী আসে যায় তাতে?
ব্যস্ত জীবন বইছে নিজের খাতে..
দেখছি তাকে জমকালো আয়নাতে..
নিজের মাপে বানিয়ে তোলা ফ্রেমে!

ভিতরবওয়া শুকিয়ে যাওয়া নদী..
রূপকথারা বৃষ্টি হয়ে যদি
জল ভরে দেয়! আপত্তি নেই তাতে..
কাঙাল জীবন উঠুক ভরে প্রেমে!

ছুটতে থাকা সবার ক্লান্ত মুখে..
চাওয়াপাওয়ার হিসেব-জ্বলা বুকে..
চাইছি! কেবল চাইছি যে বুক ঠুকে..
ভালোবাসার বৃষ্টি আসুক নেমে!!

শ্রাবণ

- ধীমান চক্রবর্তী 

কাল সারারাত ধরে.. 
আমার ঘুম আসেনি চোখে,
গাছের পাতায় জলের ফোঁটা..
পড়ার শব্দ শুনে..
সোঁদা মাটির গন্ধমাখা মনে..
সারা আকাশ আমায় নিয়ে..
বেরিয়েছিলো খুঁজতে শুধু তোকে!

নাম না জানা ফুল..
যেখানে নিজের মতো ফোটে,
মেঘেরা সব দলে দলে
নতুন কিছু করার তালে..
জানিনা আজ কীসের টানে..
সেই আকাশেই জোটে!

যে আকাশে উড়তো আমার..
ছোটোবেলার স্বপ্নমাখা ঘুড়ি,
স্বপ্নধোয়া টুকরো নিয়ে..
হেলাফেলার রং মাখিয়ে..
স্মৃতির পাতা যত্ন করে জুড়ি!

সেই পাতাটি দিয়ে আমার..
নৌকোখানা ভাসিয়ে দিলো মন,
বুকের ভেতর অঝোর ধারায়..
জলের পড়ায় পাতার নড়ায়..
ভেজাও আমায় বাইশে শ্রাবণ!!

প্রবন্ধ

  রবীন্দ্রনাথ ও কর্নেল মহিম:

বন্ধুতা-বিরোধ-বন্ধুতা

দিলীপ মজুমদার

বেহালা, পর্ণশ্রী, কলকাতা

(লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক)

আগরতলার ঠাকুর পরিবারে ১৮৬৪ সালে মহিমের জন্ম। ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বয়সের পার্থক্য মাত্র তিন বছরের। মহিমের পিতা ভারতচন্দ্র ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের রাজপরিষদ, মাতা সাবিত্রী রানি ভানুমতীর সহচরী। মহিমচন্দ্রের জীবনে সাবিত্রদেবী ছাড়া আর যে নারীর গভীর প্রভাব পড়েছিল তিনি তাঁর জ্যাঠাইমা। মহিমের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কুমিল্লা শহরে। তারপর তিনি চলে এলেন কলকাতার হেয়ার স্কুলে। কিন্তু প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না তিনি। কারণ অকৃতকার্য হলেন অঙ্কে। প্রথাগত লেখাপড়ায় ইতি এখানেই।

   কর্নেল মহিমচন্দ্র। রাজা নন, কিন্তু ত্রিপুরা রাজপরিবারের এক প্রভাবশালী পুরুষ। বর্ণবন্ত চরিত্র তাঁর, তুলনাহীন ব্যক্তিত্ব । সাংবাদিক হরিশ মুখার্জীর মতো প্রথাগত শিক্ষা ছিল না তাঁর অথচ তাঁরই মতো ইংরেজি ভাষায় অনন্য পারদর্শিতা। দুজনেই স্বশিক্ষিত এবং বিচক্ষণ। দুজনেরই প্রখর রাজনৈতিক জ্ঞান। তবে হরিশ ছন্নছাড়া, মদ্যাসক্ত; কর্নেল মহিম হিসেবি ও স্থিতধী।   

      আগরতলার ঠাকুর পরিবারে ১৮৬৪ সালে মহিমের জন্ম। ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বয়সের পার্থক্য মাত্র তিন বছরের। মহিমের পিতা ভারতচন্দ্র ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের রাজপরিষদ, মাতা সাবিত্রী রানি ভানুমতীর সহচরী। মহিমচন্দ্রের জীবনে সাবিত্রদেবী ছাড়া আর যে নারীর গভীর প্রভাব পড়েছিল তিনি তাঁর জ্যাঠাইমা। মহিমের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কুমিল্লা শহরে। তারপর তিনি চলে এলেন কলকাতার হেয়ার স্কুলে। কিন্তু প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না তিনি। কারণ অকৃতকার্য হলেন অঙ্কে। প্রথাগত লেখাপড়ায় ইতি এখানেই ।অঙ্ক নয়, মহিমের রুচি ও অনুরাগ সাহিত্যে। তাই বলেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব এবং সেই সূত্রে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অনায়াস যাতায়াত, রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য। সাহিত্যপাঠ ও সাহিত্যালোচনায় হৃদয়কে রঞ্জিত করা। তবু বৈপরীত্য ও ব্যতিক্রম ছিল। রসের জগতে বিচরণ করেও মহিম রাজনীতি ও প্রশাসনিক ক্রিয়াকর্মের পাঠও গ্রহণ করেছিলেন। নবাব আবদুল লতিফ চিনতে ভুল করেন নি তাঁকে। তিনি মহিমকে নিয়ে এলেন লাটসাহেবের দপ্তরে। নিযুক্ত করলেন আবগারি দপ্তরের পরিদর্শকের পদে।ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র অনেকদিন ধরে নীরবে লক্ষ্য করছিলেন মহিমকে। ভাবছিলেন আর একটু পরিণত হলে বলা যাবে। কিন্তু যখন দেখলেন সরকারি চাকরিতে যোগদানের সিদ্ধান্ত পাকা হতে যাচ্ছে, তখন ডেকে পাঠালেন মহিম-চন্দ্রকে নিযুক্ত করলেন তাঁর এ ডি সই পদে । সেই থেকেই মহিমচন্দ্র ত্রিপুরা রাজসভার সঙ্গে যুক্ত। সুদক্ষ প্রশাসক, নানা বিরোধের সেতু, নানা সংকটের পরিত্রাতা এবং কিছু ষড়যন্ত্রের শিকার।

       ত্রিপুরার রাজপরিবারে যোগদানের কিছুপূর্বে মহিমচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়। তরুণ রবীন্দ্রনাথের ‘ভগ্নহৃদয়’ পাঠ করে আপ্লুত বীরচন্দ্র রাধারমণ ঘোষকে দূত হিসেবে পাঠিয়ে ছিলেন কবির কাছে। আপ্লুত রবীন্দ্রনাথ লিখলেন:
“মহারাজ তাঁকে সুদূর ত্রিপুরা হতে বিশেষভাবে পাঠিয়েছিলেন কেবল জানতে যে, আমাকে তিনি কবিরূপে অভিনন্দিত করতে ইচ্ছা করেন।”
রাজা ও কবির পরোক্ষ পরিচয় ঘটল যখন মহিম তখন কলকাতায়। মহারাজের নির্দেশ এল তাঁর কাছে। মহিম জানাচ্ছেন:
    “বাংলায় প্রকাশিত নতুন গ্রন্থ মহারাজ বীরচন্দ্রের নিকট পেশ করিবার ভার আমার মতো

 

কিশোর সেবকের উপর অর্পিত ছিল, সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের সহিত আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ক্রমে বন্ধুত্বে পরিণত হয়।” বীরচন্দ্র মাণিক্যের উত্তরাধিকারী কে হবেন তা নিয়ে দ্বন্দ্ব সংকট সৃষ্টি হয়। শেষপর্যন্ত রাধাকিশোরই রাজপদ লাভ করেন। মহিমছিলেন রাধাকিশোরের পক্ষে। রাধাকিশোরের রাজত্বকাল ছিল ১৮৯৭-১৯০৯। এই বারো বৎসরের সময়সীমায় রবীন্দ্রনাথ রাজার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ট হয়েছেন, তাঁর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন, নানাবিষয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেছেন,  প্রশাসন নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। মহিমচন্দ্রের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই সূত্রপাত হয়েছে বিরোধের।ত্রিপুরা রাজ্যে তখন শোচনীয় আর্থিক অনটন। তারই মধ্যে বন্ধু রবীন্দ্রনাথের আবেদনে রাজা অন্ধকবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য মাসিক ১৫ টাকা বৃত্তি বরাদ্দ করেছেন, বিলাতে গবেষণার জন্য জগদীশচ্দ্র বসুকে ১০ হাজার টাকা দান করেছেন, ‘বঙ্গদর্শন’ পুনঃপ্রকাশের জন্য আর্থিক সহায়তা করেছেন। এসব ব্যাপারকে মহিমচন্দ্রের অবিমৃশ্যকারিতা বলে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
      প্রশাসনিক ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের উপর রাধাকিশোরের আত্যন্তিক নির্ভরতা মহিমচন্দ্রের পছন্দ হয় নি। রবীন্দ্র ও মহিম দুজনেই রাধাকিশোর তথা ত্রিপুরার মঙ্গলাকাঙ্খী ছিলেন কিন্তু সেই মঙ্গলসাধনের পথ সম্বন্ধে দুজনের মতের পার্থক্য ছিল।
১.  রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন রাধাকিশোর মহৎ মানুষ, কিন্তু  প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ। তাই উপযুক্ত মন্ত্রী নির্বাচন করে তাঁর হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদান করা প্রয়োজন।
মহিমচন্দ্র কিন্তু রাজার কর্তৃত্ব খর্ব করার ব্যাপারে একান্তভাবে বিরোধী ছিলেন।
২. রাজকার্য পরিচালনার ক্ষেত্র বিশ্বস্ত বহিরাগতের উপর নির্ভর করতে বলেছিলেন।

       মহিমচন্দ্র কিন্তু এক্ষেত্রে ত্রিপুরার ভূমিপুত্রকে প্রাধান্য দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন।
সম্ভবত মন্তী নিয়োগের ব্যাপারে সম্ভবত মহিমচন্দ্রের একটা অভিমান ছিল রবীন্দ্রনাথের উপরে। মহিমের যোগ্যতা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের উচ্চ ধারনা ছিল। তিনি লিখেছিলেন, ‘ ইহা নিশ্চয় বুঝিয়াছি মহিমের বুদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত ও তীক্ষ্ণ, তাঁহার ধারনা শক্তি প্রবল এবং ত্রিপুরা রাজ্যের হিত সম্বন্ধে তাঁহার যে উৎসা্ নাই তাহা নহে।’ অথচ মহিমকে মন্ত্রীপদে নিয়োগের সুপারিশ করেন নি তিনি। 
মহিম সম্বন্ধে অভিযোগ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে ভাষা প্রয়োগ করেছিলেন সেটাও মহিমের অভিমানের কারণ হতে পারে। মহিমকে লেখা কবির দুটি চিঠির কিছু অংশ:
      ১. ‘তুমি মহারাজের অনুগ্রহে পালিত, ত্রিপুরার এই অবস্থায় তুমি কি সর্বনাশের স্রোত ঠেকাইবার জন্য একাগ্র মনে চেষ্টা করিয়াছ? নাকি স্বার্থান্বেষী.......’
      ২. ‘লোকের সাধু উদ্দেশ্যে তোমাদের বিশ্বাস নাই—সকলকেই তোমরা সন্দেহ চক্ষে দেখ-মহারাজের স্বাভাবিক ঔদার্যকে তোমরা আচ্ছন্ন করিয়া আছ।’

      রাজা রাধাকিশোরকে লেখা এক চিঠিতেও রবীন্দ্রনাথ মহিমচন্দ্রের বুদ্ধিমত্তা স্বীকার করেও বলেন, ‘কিন্তু সেই সঙ্গে তাহার দুর্বলতা আছে। সে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ একেবারে ভুলিতে পারে নাই, এই আমার বিশ্বাস।’
      মহিমচন্দ্রের সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের এই ভ্রান্তির মূলে ছিল ত্রিপুরার বাঙালি কর্মচারীদের বিকৃত তথ্য পরিবেশন। মহিম সম্বন্ধে ঈর্ষান্বিত ছিলেন তাঁরা। রবীন্দ্রনাথের কান ভাঙানোর কাজও করে যাচ্ছিলেন ক্রমাগত।
শেষপর্যন্ত রাধাকিশোরই রবীন্দ্রনাথের ভ্রান্তি দূর করেন। বিরোধের পরে ফিরে আসে বন্ধুতা। রবীন্দ্রনাথ রাধাকিশোরকে লেখেন: 
       “মহিম সম্বন্ধে আমার যে ধারনা হইয়াছে তাহা সম্ভবত অমূলক এবং সেই অমূলকতার সম্ভাবনা মনে রাখিয়াই তাহার সহিত বন্ধুভাব রক্ষা করা আমার পক্ষে কঠিন হয় না।.... মহিম সম্বন্ধে আমি নিজের কাছে নিজে লজ্জিত হইয়া আছি।”

গল্প

বিবাহ উৎসব

জয়দীপ চক্রবর্তী

বেলঘোরিয়া, কলকাতা

বিয়ের ঠিক আগের রবিবার, বাড়ির কাছে একটি অনুষ্ঠান বাড়ি ভাড়া করে ত্রিপর্নার আইবুড়ো ভাত অনুষ্ঠিত হল। শ-তিনেক লোক আমন্ত্রিত হল এই অনুষ্ঠানে। মাংস না থাকলেও তিন রকমের মাছ সহ অনুষ্ঠান বাড়ির নিয়মিত বিভাগের সকল মেনুই খাদ্য তালিকায় স্থান পেয়েছে। ফটোগ্রাফি, সেলফিগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফির মধ্যমে অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত পিঞ্জরিত হল। এই অনুষ্ঠান যেন মুল বিয়ের অনুষ্ঠানের ট্রেলার। মুল অনুষ্ঠানটি কেমন হবে, তা এই ট্রেলার দেখে সহজেই অনুমেয়।

      রিমোট কন্ট্রোল চিরদিন একজনের হাতে থাকে না। ছেলেকে এক সময়ে খেলার মাঠ থেকে টেনে প্রাইভেট টিচারের পাঠ নিতে বাধ্য করেছে যে বাবা, সেই বাবাকেই এখন ছেলের কথা মেনে শক্তিগড়ের ল্যাংচা ছেড়ে নিম-বেগুন বা উচ্ছের তরকারি খেতে হয়। নিজের শরীরের ভালোর জন্য সে নয় খাওয়া যায়, কিন্তু নিজের একমাত্র ছোটো-মেয়ের বিয়ে কখনই পঞ্জিকা না মেনে দেওয়া যায় না। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়ার জন্যও যুক্তি খাড়া করল ছেলে সৌরজ্যতি।

- পঞ্জিকা মেনে বিয়ের ডেট ঠিক করা যাবে না বাবা। তাতে অসুবিধে অনেক। বিয়ের ডেটটা আমাদের সুবিধে মতই ফেলতে হবে।

- বিয়ে আবার নিজেদের ইচ্ছেমত ডেটে হয় নাকি? কালে কালে আর কত শুনবো!

- অবাক হওয়ার কিছু নেই বাবা। বিদেশে এই কনসেপ্টেই দুর্গাপূজা হয়। ওদেশে পাঁজি মেনে চার-পাঁচদিন ধরে দুর্গাপূজা করার কারো সময় নেই। যে ডেটেই পূজা পড়ুক না কেন, ওরা উইক এন্ডেই করে। তাছাড়া দিন, ক্ষণ, লগ্ন মেনে বিয়ে হলেই যদি সবার ম্যারেজ লাইফ সুখের হয়ে যেত, তবে  এতো ডিভোর্স হোতো না, আর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এতো ঝগড়া বিবাদও সব সময় লেগে থাকতো না।

- তাহলে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করলেই হয়। এতো ঘটা করে নিয়ম মেনে বিয়ে দেওয়ার কি দরকার আছে।

- না,না। রেজিস্ট্রি ম্যারেজে ভিডিও শুটের স্কোপ কোথায়? তাছাড়া মাম্পির বিয়ে বলে কথা। শুধু তো বিয়ে, বৌভাত নয়, আইবুড়ো ভাত, মেহেন্দি, সঙ্গীত, তত্ত্ব সাজানো, প্রি-ওয়েডিং ভিডিওগ্রাফি, হাজারও অনুষ্ঠান। এতো ছুটি তো পাওয়া যাবে না। আমি পেলেও পাত্র নিজেই পাবেনা। দেবসুর্যই তো ফোন করে আমাকে বলল, বিয়েটা স্যাটার ডে ফেললে ওর সুবিধে হয়। ফ্রাইডে গুড ফ্রাইডে। ওর তিন দিন পরপর ছুটি আছে। সোম,  মঙ্গল দুদিন ছুটি নিলেই তবে হয়ে যাবে। আমি গ্রিন সিগন্যাল দিলে ও ফ্রাইডে ফ্লাইটের টিকিট কাটবে।

- ও, সবকিছু ঠিকই করে ফেলেছ। তাহলে আমাকে জিজ্ঞাসা করছ কেন?

- বাবা, তুমি রাগ না করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর। বিয়ের পাঁচ ছয়মাস আগে বিয়ের ডেটে কোনও বিয়ে বাড়ি পাবে না। মাম্পির বিয়েতে প্রায় হাজার খানেক নিমন্ত্রিত থাকবে। যে সে বিয়েবাড়ি ভাড়া করলে চলবে? তাছাড়া বিয়েটা তো ঐ বৈশাখ মাসেই হচ্ছে। শুধু কয়েকটা দিন আগে পরে এই যা।

মনে না নিতে পারলেও ছেলের যুক্তিকে মেনে নিতেই হল সৌম্যজিতকে। অবসর-প্রাপ্ত ব্যাঙ্ক ম্যানেজার সৌম্যজিত গোস্বামীর দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ে দেবস্মিতার বিয়েটা স্ত্রী মহামায়ার আপত্তি সত্ত্বেও একটু তাড়াতাড়িই দিয়েছিলেন উনি। দেবস্মিতা তখন সবে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। ছেলে সৌরজ্যতি চাটার আকাউন্টেন্ট। বেশ নামকরা একটি বেসরকারি কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত। ছোটোমেয়ে মাম্পি ওরফের ত্রিপর্না ছোটো থেকেই পড়াশোনায় বেশ ভালো। প্রাথমিক পড়াশোনার গণ্ডি কৃতিত্বের সাথে পেড়িয়ে ট্রান্সলেশনাল মেডিসিন নিয়ে পড়ার জন্যে লন্ডনে যায়। ওখানেই প্রবাসী বাঙালী দেবসুর্যের সাথে ওর পরিচয় হয়। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে আপাতত নিজের দেশে ফিরে এলেও বিয়ের পর ঐ দেশের কোনও রিসার্চ সেন্টারের সাথে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে আছে মাম্পির।

দেবসুর্য ও ত্রিপর্ণার বিয়ের দিন স্থির হয়ে গেল। অকাল বোধনের মতো অকাল বিয়েই ঠিক হল। আর সেই সঙ্গে চলল নানা রকম প্রস্তুতি পর্ব। ইভেন্ট ম্যানেজার নখদর্পণ ধরের উপর সম্পূর্ণ দায়িত্বটা থাকলেও প্রতিটি বিভাগ তত্বাবধনের দায়িত্ব বাড়ির লোকজনদের উপরই রইল।

বেশ বড়সড় একটা রিসোর্ট ভাড়া করা হল। সামনে অনেকটা জায়গা নিয়ে একটা উদ্যান রয়েছে। তার কিছুটা অংশে রকমারি খাওয়ারের স্টল বসবে। আর কিছুটা ছাড়া থাকবে অতিথিদের গাড়ি রাখার জন্য। বিয়েবাড়িটির সবকিছু মনমতো হলেও এটা সৌরজ্যতিদের বাড়ি থেকে পাঁচটি স্টেশন পড়ে, একটি পাণ্ডব বর্জিত জায়গায়। আশেপাশে দোকানপাট তেমন নেই। তাই প্রয়োজনীয় সবকিছু আগের থেকে গুছিয়ে নিয়ে বিয়ে বাড়িতে যেতে হবে। বাড়ি থেকে ঘন-ঘন যাতায়াত করাত কোনও উপায় নেই।  

সুসজ্জিত বিয়ের কার্ড তৈরি হল। একটি সুদৃশ্য ফিতে বাঁধা বাক্স। যার মধ্যে অনেকগুলো কার্ড। একটিতে ইংরাজিতে লেখা আমন্ত্রণ পত্র, একটিতে বাংলায়, আর একটি রয়েছে হিন্দিতে। একটি কার্ডে ইংরাজি হরফে রয়েছে অনুষ্ঠান বাড়ির যাওয়ার পথ নির্দেশ। এছাড়া প্রতিটি আমন্ত্রণ বাক্সে একটি ফর্ম রয়েছে। ঐ ফর্মে আমন্ত্রিতের সংখ্যা, উপস্থিত হইবার সম্ভাব্য আমন্ত্রিত, কার পার্কিং দরকার কিনা, ড্রাইভার সাথে যাবে কিনা, প্রভৃতি লেখার জায়গা রয়েছে। নিমন্ত্রণ করার সময় যিনি নিমন্ত্রণ করছেন, তিনি ফর্মটা বের করে নিমন্ত্রণ বাক্সটি আমন্ত্রিতের হাতে দেবেন। এবং আমন্ত্রিতের সাথে কথা বলে ফর্মটি পূর্ণ করবেন। এই ফর্ম থেকেই বিয়ের দিন সম্ভাব্য উপস্থিত আমন্ত্রিতের সংখ্যা, ড্রাইভারদের জন্য প্রয়োজনীয় পার্সেলের একটা ধারনা পাওয়া যাবে।

আমন্ত্রিতের তালিকায় পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়, কিছু আত্মীয়ের আত্মীয়, যেমন দেবস্মিতা, সৌরজ্যতির মামা শ্বশুর, কাকা শ্বশুর, কাছের বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, সৌরজ্যতির অফিস কলিগ, বন্ধু-বান্ধব, সৌম্যজিত বাবুর এক্স অফিস কলিগ, বন্ধু-বান্ধব, মহামায়া, ত্রিপর্নার বন্ধু-বান্ধব, কেউই বাদ পড়ল না।   

দেবস্মিতার মেয়ে ঐন্দ্রিলা ক্লাস এইটে পড়ে। আঁকার হাত ভীষণই ভাল। তাই আলপনার দায়িত্ব ওকে দেওয়া হয়েছে। অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মাসির বিয়ে। তাই পড়াশোনার চাপ নেই। নিশ্চিন্তে বিয়ে এনজয় করতে পারবে। কিভাবে আলপনা দেবে তা এখন থেকেই ভেবে রেখেছে ঐন্দ্রিলা। সাধারণ রঙ নয়। বিভিন্ন রঙের আবীর, হলুদের গুঁড়ো, চকের গুঁড়ো, প্রভৃতি দিয়ে রঙ তৈরি হবে। দোলের সময় অনেক রকম আবীর কিনে বিয়ের জন্য সরিয়ে রাখতে হবে ঐন্দ্রিলাকে।    

আলপনার সঙ্গে তত্ত্ব সাজানোর টিমেও ঐন্দ্রিলা রয়েছে। তত্ত্ব সাজানোর মুল দায়িত্বে রয়েছে সৌরজ্যতির স্ত্রী দেবাঞ্জনা। অনেক তত্ত্ব। একার হাতে করা সম্ভব নয়। দেবাঞ্জনা তাই চার-পাঁচ জনের একটা টিম করে নিয়েছে।

বিয়ের কেনাকাটা অনেক আগে থেকে শুরু হলেও কিছু জিনিষ বাদ থেকেই যায়। কোনের গয়না, বড় কোনের পোশাক, দেবাঞ্জনার ডিজাইনার ল্যাহেঙ্গা প্রভৃতি কেনা হয়ে গেলেও কিছু প্রণামী শাড়ি সহ তত্ত্বের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু বাকি থেকে গেল। বিয়ের একমাসও বাকী নেই। প্রতিটি দোকানেই চৈত্র সেলের ভিড়। তার মধ্যেই কেনাকাটা সারতে হল ত্রিপর্না, দেবাঞ্জনাদের।

বিয়ের এক সপ্তাহ আগে থেকেই অতিথিদের আগমন শুরু হয়ে গেল। দেবস্মিতার পরিবার, ওদের মাসি, পিসির পরিবার, ত্রিপর্নার স্কুল লাইফের এক বন্ধু, এক এক করে সকলেই এসে উপস্থিত হল। বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল করে এক সপ্তাহ ধরে খাওয়া দাওয়া চলল। এতো লোকের থাকার ব্যবস্থা ঐ বাড়িতে করা সম্ভব নয়। তাই পাড়া প্রতিবেশীর সাহায্যের আশ্রয় নিতে হল।

বিয়ের ঠিক আগের রবিবার, বাড়ির কাছে একটি অনুষ্ঠান বাড়ি ভাড়া করে ত্রিপর্নার আইবুড়ো ভাত অনুষ্ঠিত হল। শ-তিনেক লোক আমন্ত্রিত হল এই অনুষ্ঠানে। মাংস না থাকলেও তিন রকমের মাছ সহ অনুষ্ঠান বাড়ির নিয়মিত বিভাগের সকল মেনুই খাদ্য তালিকায় স্থান পেয়েছে। ফটোগ্রাফি, সেলফিগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফির মধ্যমে অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত পিঞ্জরিত হল। এই অনুষ্ঠান যেন মুল বিয়ের অনুষ্ঠানের ট্রেলার। মুল অনুষ্ঠানটি কেমন হবে, তা এই ট্রেলার দেখে সহজেই অনুমেয়।

বাড়ির সামনে সুসজ্জিত প্রবেশ দ্বার ও কৃত্রিম জোনাকি বাল্বের আলোক সজ্জা সৌরজ্যতিদের বাড়িটাকে আর পাঁচটা বাড়ি থেকে আলাদা করে রেখেছে। সমবয়সী মহিলা পুরুষদের আড্ডা, ইয়ার্কি, হাসাহাসি, খুনসুটি বাড়িটাকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে। এখন যেকোনো কারণেই কারণ-সুধা উপস্থিত থাকে। এখানেও তার কোনও ব্যতিক্রম নেই। বাড়ির এক কোনে একটা আড়াল খুঁজে সোমরসের আসক্ত, ভক্তরা তা সেবন করছে। কচিকাঁচারা বাবা-মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে কেউ গেম খেলছে, কেউ বা ইউটিউবে নানা ধরনের ভিডিও দেখছে। এভাবেই মুল অনুষ্ঠানের দিন এগিয়ে আসছে।      

বিয়ের দুদিন বাকি। বিয়ে বাড়িতে মেহেন্দি উৎসব চলছে। পার্লার থেকে দুইজন ভদ্রমহিলা এসে মেহেন্দি পরাচ্ছে, আর পাত্রী সহ সব মেয়েরাই লাইন দিয়ে দুহাত পেতে মেহেন্দি পরছে। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় সজনের অনেকেই রয়েছে সেই মেহেন্দি পরার দলে। দুজনে পরিয়ে কুল করতে পারছে না। পরিস্থিতি সামলাতে ঐন্দ্রিলাও নেমে পড়ল মেহেন্দি পড়াতে। পেশাদারীদের চেয়ে কোনও অংশে কম হল না ওর শিল্প। বরং নতুনত্বের স্বাদ মিশে হস্ত শিল্পগুলি আলাদা করে সকলের নজর কাড়ল। সকল হাতের শিল্পকলাই ক্যামেরা-বন্দী হল।    

বিয়ের আগের দিন মহামায়ার মনে পড়ল যে খুকুকে বলা হয়নি। খুকু হল সৌম্যজিতের খুড়তুতো বোন। ডিভোর্সি। ছেলেকে নিয়ে একাই থাকে। কারো সাথেই তেমন যোগাযোগ নেই। এদিকে দেবসুর্য আসছে। ত্রিপর্ণাকে নিয়ে দেবসুর্যকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে যাবে সৌরজ্যতি। সঙ্গে থাকবে ভিডিও ফটোগ্রাফার। সবাই মিলে ইকোপার্কে যাবে প্রি-ওয়েডিং স্যুট করতে। তাই খুকুদিকে নিমন্ত্রণ করা সৌরজ্যতির পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক কষ্টে নম্বর যোগার করে ফোন করলেন সৌম্যজিত। খুকুর ছেলে ধরল।

-           খুকু আছে?

-           না, আপনি কে বলছেন?

-           আমি ওর সৌম্যদা বলছি।

-           ও, বড়মামু। মা তো নার্সিংহোমে ভর্তি। হিমোগ্লোবিন খুব কমে গেছে। ডাক্তার ইমিডিয়েটলি রক্ত দিতে বলেছে। মাকে কিছু বলতে হবে?

-           না, অনেকদিন কোনও খবর পাইনা, তাই ফোন করেছিলাম।

-           আমি তো এখন ব্লাড ব্যাঙ্কে আছি। নার্সিংহোমে গিয়ে মাকে তোমার কথা বলব। তুমি ফোন করেছ শুনলে মা খুশি হবে।

-           ঠিক আছে। এখন তবে রাখি। পড়ে ফোন করে খবর নেব।

ফোন রেখে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন সৌম্যজিত।

শুটিং শেষ করে দেবসুর্যকে ওর মামা বাড়ি পৌঁছে দিল সৌরজ্যতিরা। মামাবাড়ি থেকেই বিয়ে করতে আসবে ও। ভিডিও ফটোগ্রাফাররা আজ সন্ধ্যে বেলাতেই মেয়েদের জলভরা, গঙ্গা নিমন্ত্রণের ভিডিও তুলবে। কাল অতো সকালে তাদের পক্ষে আসা সম্ভব নয়। বাড়ির কাছাকাছি পুকুর নেই। তাই একটি সুইংপুলে অধিকর্তাদের অনুমতি নিয়ে প্রক্সি   জলভরা, গঙ্গা নিমন্ত্রণ হল এবং তা চলমান ক্যামেরায় বন্দী হল।

ত্রিপর্নাকে বাড়ি পৌঁছে, সৌরজ্যতি রিসোর্টে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে গেল। ত্রিপর্না বাড়ি ফিরে দেখল মা, বৌদিরা জল ভরার পর্ব শেষ করে বাড়ি ফিরেছে। ফটোগ্রাফাররা ত্রিপর্নার দধি-মঙ্গলের ভিডিও ও স্টিল ফটোগ্রাফিও ঐ দিনই সেরে নিলো। 

নখদর্পণ ধরের তত্ত্বাবধানে দশকর্মা সহ বিয়ের সমস্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী রিসোর্টে পোঁছে গিয়েছে। রিসোর্টটি সুসজ্জিত হয়ে উঠছে। পেশাদার শিল্পীদের দিয়ে তত্ত্ব সাজানো হয়েছে। বিয়ের কুঞ্জ প্রস্তুত হচ্ছে। দুই একটা ছোটোখাটো সংশোধন, পরিবর্তন করতে বলে একটু রাত করেই বাড়ি ফিরল সৌরজ্যতি।

পরের দিনের গোছ-গাছ ও গল্পগুজব করে সবাই এতো রাতে ঘুমল যে বিয়ের দিন কেউই ভোরে উঠতে পারল না। তাই ত্রিপর্নার দধি-মঙ্গলটা আর হল না। তবে আগের দিনই ফটো-স্যুট হয়ে যাওয়াতে কেউই তেমন চাপ নিলো না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে বাড়ির নানা কাজকর্ম ও ব্যস্ততা শুরু হল। অনুষ্ঠান বাড়ি ও এদিক সেদিক যাওয়ার জন্য বাড়ির গাড়িটি যথেষ্ট নয়। আরও দুটো গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। প্রথমে ঐন্দ্রিলা সহ আরও কয়েকজনকে প্রাতঃভোজন করিয়ে একটা ভাড়াগাড়িতে অনুষ্ঠান বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ওখানে পোঁছে ঐন্দ্রিলা বিবাহ-কুঞ্জে নিজের আলপনা শিল্পকর্ম শুরু করল। এরপর একে একে সকলেই অনুষ্ঠান বাড়িতে পৌঁছল।

যথা সময়েও ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদের তত্ত্ব এসে উপস্থিত হল। পাত্রপক্ষ প্রবাসী হওয়ায় বিয়ের নিয়ম-কানুনের সাথে অতোটা অভ্যস্ত নয়। তবে আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর পরামর্শ মত যতটা সম্ভব প্রচলিত নিয়ম মেনেই ছেলের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন ওনারা। গায়েহলুদ, স্নান, খাওয়া-দাওয়া প্রভৃতি সেরে ত্রিপর্না, সাজতে বসল। একটি নামকরা পার্লার থেকে বিউটিশিয়ান আনিয়েছে নখদর্পণ। ত্রিপর্না সহ সবার সাজগোজ সম্পূর্ণ হতে সন্ধ্যে গড়িয়ে গেল। ধীরে ধীরে আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করল। ক্রমশই বাড়টি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল। বিভিন্ন খাবারের স্টলের একপাশে একটি অস্থায়ী মঞ্চে অর্কেস্ট্রা সহযোগে কণ্ঠি সঙ্গীত পরিবেশিত হচ্ছে। তারই তালে তালে মঞ্চের সামনে কিছু আমন্ত্রিত অতিথি কোমর দোলাচ্ছে। এই কারণেই বিয়ের লগ্ন একটু রাতে ঠিক করেছে সৌরজ্যতিরা। 

সুসজ্জিত, অতিসজ্জিত, স্বল্প-বাসিত মহিলারা কখনও একক, কখনও বা সমবেত ভাবে সেলফী তুলে মোবাইল বন্দী করছে। ত্রিপর্নার সাথে ছবি তোলার জন্যও সকলে ব্যাকুল। ত্রিপর্নার এই চাপ এড়াতে ফটোগ্রাফাররা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছে। ওর কিছু ছবি তারা আগেই তুলে রেখেছে। এবারে যার ছবির সাথে জোড়ার দরকার তার ছবি তুলে ক্যামেরাতেই জুড়ে দিচ্ছে তারা। ছবি দুটি যে আলাদা ভাবে তোলা, তা ছবি দেখে একদমই বোঝা যাচ্ছে না। পুরো অনুষ্ঠানটি ফেসবুক লাইভ হচ্ছে। যে সকল আত্মীয় বন্ধুবান্ধবরা দূরে থাকার জন্যে, বা অন্য অসুবিধের জন্যে বিয়েতে আসতে পারেনি, তারাও অনুষ্ঠানটি দেখতে পাচ্ছে।

একটু দেরীতেই বর এসে উপস্থিত হয়েছে। বর বরণ, বর ও বরযাত্রীর আপ্যায়ন, ফটোগ্রাফির পর বরকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হল। সৌম্যজিত সম্প্রদান করবেন। নির্ধারিত মন্ত্রপাঠ চলল। নাচ গান, খাওয়া-দাওয়া সেরে বিয়ে দেখতে ভীর করেছে সবাই। নির্ধারিত সময়ে কনেকে আনা হল। সাত-পাঁক, শুভদৃষ্টি, মালাবদলের পর কন্যা সম্প্রদান হল। সবকিছু প্রথা মতোই চলছে। তবে একটু সংক্ষিপ্ত। ফটোগ্রাফির প্রয়োজনে ফটোগ্রাফারের নির্দেশে পাত্রপাত্রীদের  মাঝেমাঝেই স্ট্যাচু হতে হচ্ছে। যজ্ঞ শেষে সিঁদুর-দান পর্ব। পুরোহিতের নির্দেশে লজ্জ্বাবস্ত্র দিয়ে ঢাকা হল কনেকে। কিন্তু সিঁদুর কোথায়? পুরোহিতের ফর্দ অনুযায়ী নখ-দর্পণ যা যা এনেছে, তারমধ্যে সিঁদুর নেই।

সিঁদুর তো ছেলের বাড়ির তত্ত্বের সাথে আসে। বললেন মেয়ের এক আত্মীয়া। কিন্তু সেই তত্ত্বেও সিঁদুর নেই। ছেলের বাড়ির লোক বলল, আমাদের এইসব নিয়ম কানুন ভালো জানা নেই। আমাদের সিঁদুর পাঠানোর ব্যাপারে কিছু তো বলা হয়নি।

এখন কার দোষ সেটা না খুঁজে, কিভাবে সমস্যাটার সমাধান করা যায়, সেটা ভাবতে হবে।  সৌরজ্যতির বক্তব্য।

-  আশে পাশে কোনও দোকানও নেই। আর এতো রাতে কোন দোকানই খোলা থাকবে?

-  এখন বাড়িতে গিয়ে নিয়ে আসতেও বড্ড দেরী হয়ে যাবে।

-  একদম পাণ্ডব বর্জিত জায়গা। আশে পাশেও কোনও বাড়ি নেই।

- আর বাড়ি থেকেই কি কোনও লাভ হোতো? এখন কোনও মহিলারাই গুঁড়ো সিঁদুর ব্যবহার করেনা। সিঁদুর স্টীক বা লিকুইড সিঁদুর দিয়ে কাজ সারে।

উপস্থিত সকলেই নানা রকম মন্তব্য করতে লাগলো। কিন্তু কারো কথাতেই সমাধান বেরিয়ে এলো না।

পুরোহিত মশাই বললেন, সিঁদুর স্টীক বা লিকুইড সিঁদুরই দেখুন না উপস্থিত কোনও মহিলার কাছে পাওয়া যায় কিনা। অগত্যা ওটা দিয়েই কাজ সারি।

না, না। ওসব চলবে না। ওতে ফটো ভালো উঠবে না। নাকে সিঁদুর না পড়লে আবার সিঁদুর-দান হল নাকি? ফটোগ্রাফার অসম্মতি প্রকাশ করল।

না না। লিকুইড সিঁদুর ফিদুর চলবে না। ফেসবুক লাইভ হচ্ছে। আমার বিদেশের বন্ধুরাও বিয়ে দেখছে। লোকে দেখে বলবে কি? কিন্তু কোনও উপায়ও তো দেখছি না। সৌরজ্যতির কথায় চাপা উত্তেজনা।                

বাড়ির বড় জামাই অংশুজিত এতক্ষণ চুপচাপ বসে কি যেন ভাবছিল। হঠাৎ মেয়ে ঐন্দ্রিলাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, তুই যা যা দিয়ে আলপনা দিয়েছিস, তার কি কিছু অবশিষ্ট আছে?

- আছে তো। আমি গুছিয়ে যত্ন করে রেখে দিয়েছি।

- ওখানে দ্যাখ তো একটু লাল আবির আছে কিনা।

- হ্যাঁ আছে তো। অনেকটাই আছে। আমি এখুনি নিয়ে আসছি।

ঐন্দ্রিলা আবীর নিয়ে এলে অংশুজিত ওটা সৌরজ্যতির হাতে দিয়ে বলল, নেও এটা দিয়ে কাজ সারো। তোমার ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি বা ফেসবুক লাইভ, কোনটাতেই কিছু বোঝা যাবে না।

দারুণ আইডিয়া। সৌরজ্যতি যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেল।

আবীর দিয়েই সিঁদুরদান পর্ব সাঙ্গ হল। খুব সুন্দর ফটো ও ভিডিও উঠল। সোশাল মিডিয়ায় কোনও ত্রুটিই প্রকাশ পেল না। শুধু  সৌম্যজিত ও মহামায়ার মনের কোথায় যেন একটা অতৃপ্তি রয়েই গেল।

গল্প

শেষ থেকে শুরু

মৈত্রেয়ী মুখোপাধ্যায়

দেখতে দেখতে এক বছর কাটল। এখন অনিতা দেবী ব্যস্ত থাকেন। সেতার শেখার ক্লাসে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, এখনই ১২ জন। রুমিও শেখে, খুব উৎসাহ তার। তাছাড়া অবসরের সঙ্গী বই তো আছেই। বিকেলে ছাদে হাঁটা অনিতা দেবীর অভ্যাস। হাঁটতে হাঁটতেই ভাবছিলেন রুমিকে আর সকলের মতো ভেবে ভুল করতে যাচ্ছিলেন। বৌমা তাঁর কাছে মেয়ের চেয়ে কম নয়।

(১)

    অনিতা দেবীর বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই। বারো বছর হলো তাঁর স্বামী গত হয়েছেন। দুই ছেলে মেয়েকে নিজের হাতে মানুষ করেছেন। ছেলে প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার।মেয়েও এই বছরই এক নামকরা কলেজের শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিয়েছে। শিক্ষকতা তাঁর ভালোবাসা ছিল, আর গান তাঁর প্রেম। সেতার বাজাতে পারেন চমৎকার। দশ বছর আগেই যদিও বিসর্জন দিয়েছেন গান।সংসারের চাপে তা আর ফিরে আসেনি অনিতা দেবীর জীবনে।

তিনদিন আগে তাঁর ছেলের বিয়ে হয়েছে,প্রেমের বিয়ে।যদিও দেখাশোনা করেই হয়েছে।বৌমা কেমন ব্যবহার করবে তাঁর সাথে, ছেলেও কি পাল্টে যাবে? দূরে সরে যাবে মায়ের থেকে?...এসব ভাবনা বিচলিত করছে অনিতা দেবীকে। যা সব শোনা যায়...পাশের বাড়ির বৌদিও বলেছিলেন..নাঃ কিসব ভাবছেন,নিজের ছেলের ওপরেও ভরসা নেই? রুমিকেও নিজের মেয়ের চোখেই দেখবেন,সে ও তো অন্য পরিবেশে এসেছে..গুছিয়ে দিতে হবে এদের সংসার...মেয়েটারও বিয়ে দিতে হবে..তবে ছুটি আমার। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন অনিতা দেবী। ছাদে গাছগুলোকে জল দিতে দিতে এসব ভাবছিলেন। হঠাৎ পিছন থেকে বৌমার গলা শুনে চমকে উঠলেন।

-"মা, হলো তোমার? চলো চলো নিচে। একটা জিনিস আছে তোমার জন্যে। চলো।"-"কি জিনিস?"-" চলো না দেখবে। সে, সুমি সবাই অপেক্ষা করছে।"-

"আচ্ছা বাবা চল চল।"

-"কেক! পায়েস!"

-"Happy birthday to you ma" তিনজনে একসাথে বলল,আর সাথে হাততালি।-"আমার জন্মদিন মনে আছে তোদের!"

-"মায়ের জন্মদিন সন্তানরা ভুলতে পারে, কেকটা কাটো জলদি।"বাচ্চাদের মতো বলে উঠল সুমি।

-"পায়েসটা মা বৌদি বানিয়েছে,কেকটা আমি, আর এই গিফটটা আমাদের সকলের তরফ থেকে।"

চোখে জল এসে গেল অনিতা দেবীর। সামলে নিলেন নিজেকে।

-"বাঃ বেশ হয়েছে শালটা।"

-"তোমার পছন্দ হয়েছে মা?" জিজ্ঞেস করল অরুণ।

-"হ্যাঁ রে বাবু। চল তোরা খাবি চল।"

দিনটা ভালোই কাটলো। রাত্রে শুয়ে ভাবছিলেন অনিতা দেবী। নাঃ, মেয়েটি যত্নশীলা, নিজের মায়ের মতোই আমায় দেখে..ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লেন।

(২)

     কয়েক দিন পর খেতে খেতে অরুণ হঠাৎ বলল,"মা, তুমি এতো সুন্দর সেতার বাজাও,আবার তো শুরু করতে পারো। তোমার জন্য এক ছাত্রী আছে।"

-"এতো বছর পর! কতদিন অভ্যাস নেই বলতো! গান বল,পড়াশুনো সবটাই সাধনা। আমি কি আর পারব?"

-"কেন পারবেনা মা? তুমি তো আমায় বলোনি তুমি সেতার জানো? আমার খুব ইচ্ছে শিখবার। তোমার কাছে শিখব।"

-"হ্যাঁ  মা , বৌদি ঠিক বলছে। কেন তুমি পারবেনা? আজকালকার দিনে কজন জানে?"

-"না,না, তোরা বলিসনা আমায় এই নিয়ে।আর বৌমাকে আমার পরিচিত একজনের কাছে পাঠিয়ে দেব,যত্ন করে শেখাবে।"

-"না আমি তোমার কাছে শিখব।please মা, না কোরোনা। তুমি practice করো পারবে অবশ্যিই। এমনিও তুমি বলো সময় কাটেনা ঘরে বসে, এতে তোমার মনও ভালো থাকবে আর কিছুজন শিখতেও পারবে।" এক নিঃশ্বাসে বলল রুমি।

-"মা, সবাই এতো করে বলছে,আর সৌরভ বলেছে তার মেয়েকে সেতার তোমায় শেখাতে হবে। না কোরোনা মা।" অনুনয় করে বলল অরুণ।

-"ঠিক আছে, ভেবে দেখছি। তোরা যা জেদ ধরেছিস।"

      পরের দিন ভোর বেলা সবার ঘুম ভাঙল. রাগ ভৈরবীর সুরে। সকলে বাইরের ঘরে এসে অবাক হয়ে গেল। চোখ বন্ধ করে নিবিষ্ট মনে তাদের মা সেতারে সুর তুলছেন! এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরী হয়েছে যেন! মায়ের সামনে এসে ওরাও বসে পড়ল। আস্তে আস্তে আকাশ অরুণ আভায় রাঙা হয়ে উঠল, পাখিদের কাকলিতে চঞ্চল হয়ে উঠল যেন প্রকৃতি। রাগ শেষ হতে অনিতা দেবী জিজ্ঞাসা করলেন স্মিত হেসে,"কেমন?""অসাধারণ মা!" সবাই একসাথে বলে উঠল।

-"যাক পাশ করেছি তবে।"

-"আমাদের মা ফেল করতেই পারেনা।" মাকে জড়িয়ে ধরে বলল সুমি।

-"একদম ঠিক। চলো খাবার ব্যবস্থা করি।" রুমি বলল।

 

(৩)

 

দেখতে দেখতে এক বছর কাটল। এখন অনিতা দেবী ব্যস্ত থাকেন। সেতার শেখার ক্লাসে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, এখনই ১২ জন। রুমিও শেখে, খুব উৎসাহ তার। তাছাড়া অবসরের সঙ্গী বই তো আছেই। বিকেলে ছাদে হাঁটা অনিতা দেবীর অভ্যাস। হাঁটতে হাঁটতেই ভাবছিলেন রুমিকে আর সকলের মতো ভেবে ভুল করতে যাচ্ছিলেন। বৌমা তাঁর কাছে মেয়ের চেয়ে কম নয়। তিনি নিজেকে ভাগ্য বান মনে করে ভগবানকে ধন্যবাদ দেন এমন বৌমা পাওয়ার জন্যে। এদের সবার উৎসাহেই তো আবার সব শেষ থেকে শুরু করতে পেরেছেন।তাঁর প্রথম 'প্রেম' ফিরে এসেছে জীবনে। জীবন সায়ান্থে দাঁড়িয়েও আজ নিজেকে সুখী বলতে তাঁর কোনো রকম দ্বিধা আসেনা। শান্তির শ্বাস ফেলে নিজের মনেই বলে উঠলেন,"সবার জীবনই যেন এরকম হয় ঈশ্বর।"

দিনের শেষে শ্রান্ত কুঁড়িটিও বেঁচে ওঠে নতুন উদ্যোগে বিকশিত হওয়ার অদম্যে ইচ্ছায়। মানুষ কেন পারবেনা?

গল্প

এলেম দেখালো 

গদাই          অমিতাভ মৈত্র

নিভৃতে দুজনের অনেক কথাই হলো। আসল কথাটি শুনে গিন্নী চোখ কপালে তুলে মৃদু হাসি মুখে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। তারপরের আলোচনা দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিপুর্ণ ছিল। অনন্ত আর তার গিন্নী ছেলের কাছে বিয়ের কথা পাড়তেই দেখা গেল চিনুর ঘন ঘন বাড়িতে আসার সুফল স্বরূপ কখন ছেলে গদাই-এর সঙ্গে তার এক আবেগ মিশ্রিত বোঝাপড়া তৈরী হয়েই বসে ছিল সবার অলক্ষে। যথা সময় বিয়ের দিন এগিয়ে এলো।

     আলো আঁধারির মধ্যে স্পষ্ট দেখা গেল লোকটা ঘাপটি মেরে বসে আছে। অনন্ত ঘর থেকে বেরলেই লোকটার মুখোমুখি পড়ে যাবে। এখন কোন ভাবেই বেরোনো উচিৎ হবেনা। লোকটার নড়াচড়ার ওপর অনন্ত লক্ষ্য রাখছে। নিস্তব্ধ রাত। নিজের হৃৎপিন্ডের শব্দ শুনতে পাচ্ছে অনন্ত। লোকটা ধীরে ধীরে এবার উঠছে। পা টিপে টিপে এগোচ্ছে অনন্তর ছেলের ঘরের দিকে। মতলবটা কি তার। নিশ্চয়ই চোর।… বাড়িতে ঢুকলো কি করে?... এসব কথা পরে ভাবা যাবে। লোকটার হাতে কি একটা চকচক করছে। না কোন অস্ত্র নয়…একটা টিনের সরু কৌটো। একটা বিপদের গন্ধ পেলো অনন্ত। মাঝে মাঝে সে থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে দেখছে। না, আর অপেক্ষা করা যায়না। ছেলের ঘরের জানলাটা খোলা আর ওই খোলা জানলাই লোকটার লক্ষ্য। অনন্তর ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলেই লোকটা সজাগ হয়ে যাবে। উপায় নেই। নিঃশব্দে অনন্ত দরজা খুলে ফেললো। লোকটা টের পায়নি। এবার সে অনন্তর দিকে পিছন করে ছেলের ঘরের ভেতরে উঁকি মেরে কি যেন দেখছে। অনন্ত ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে। কৃষ্ণ পক্ষের রাত... যেন একটু বেশী অন্ধকার। লোকটার মন পড়ে আছে ছেলের ঘরের অন্দরে। অনন্ত এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে। হাতের কৌটোটার মুখে একটা স্প্রে করার ব্যবস্থা আছে। লোকটার উদ্দেশ্য অনন্তর কাছে বেশ পরিস্কার। অনন্তর বাঁ হাতটা একবার শুন্যে উঠে সবেগে এসে পড়লো লোকটার ঘাড়ে। একটা আর্তনাদ করে সে মাটিতে চিৎপাত হয়ে কাৎরাচ্ছে। অনন্তর বাঁপায়ের নীচে লোকটার ডান হাতের আঙুলগুলো তখন চেপ্টে আছে আর অনন্ত তার ওপরে চাপ আরো বাড়িয়ে চলেছে। লোকটার আর্তনাদে অনন্তর বউ বেরিয়ে এসে এই দৃশ্য দেখে হাউমাউ করে উঠলো। লোকটা এবার চিৎকার করে কান্না শুরু করতেই অনন্ত বউকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে বললো, “চট করে আমার গামছাটা দাও।” ঘুম চোখে এবং আতঙ্কে গামছা খুঁজে পাচ্ছে না গিন্নী। অনন্তর আবার চিৎকার, “চোখের মাথাটা খেয়েছ নাকি? দড়িতে ঝুলছে, তোমার নাকের ডগায়।” এবার ছেলের ঘরে আলো জ্বলে উঠলো। “কি হয়েছে, অ্যাঁ? বাবা তুমি…?” ছেলের কথা শেষ হলো না, অনন্তর বাজখাঁই কন্ঠ গর্জে উঠলো, “বলিহারি তোর ঘুম, বিছানার চাদরটা নিয়ে এসে বাছাধনের পাদুটো বাঁধ। গিন্নী তুমি মোড়াটা নিয়ে এসো।” ততোক্ষণে লোকটির দুটো হাত পিছমোড়া করে বাঁধা হয়ে গেছে। ছেলে বাবার হুকুম মতো পা-দুটো একসঙ্গে বেঁধে ফেলেছে। এবার অনন্ত তার আরো একটি শক্তির পরিচয় দেখিয়ে লোকটিকে এক অদ্ভুত কায়দায় চোখের নিমেষে তুলে মোড়ায় বসিয়ে দিলো। নিজে একটা চেয়ার আনিয়ে আগন্তুকের মুখোমুখি বসে তাকে মনোযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করতে থাকলো। লোকটি তখনও কাতরাচ্ছে এবং কাঁদছে। এবার অনন্তই মুখ খুললো, “কে তুই? এতো রাত্রে বাড়িতে ঢুকলি কোথা দিয়ে?” লোকটা মাথা নীচু করে কাতরাচ্ছে এবং কেঁদে চলেছে। “কেঁদে পার পাবি না। বল ওই ঘরের জানলায় উঁকি মেরে কি খুঁজছিলি? কনটেনার থেকে কি স্প্রে করতে যাচ্ছিলি? মেরে ফেলার ধান্দা করছিলি আমার ছেলেটাকে হারামজাদা? মুখ খোল নইলে এইখানেই একটা খুনোখুনি বা দাঙ্গা লেগে যাবে।”এই শুনে লোকটি বাবারে, মারে, মরে যাবো রে…কে কোথায় আছিস আমায় বাঁচারে বলে মড়াকান্না জুড়ে দিলো। এই শুনে অনন্তর গিন্নী মুখ ঝামটা দিয়ে অনন্তকে বললেন, “তুমি একটু থামো দিকিনি বাপু। তখন থেকে এই মারবো, সেই মারবো, খুন করে ফেলবো করে যাচ্ছ তো ও তোমার জেরার জবাবটা দেবে কোত্থেকে শুনি।” এবার আগন্তুককে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আর তুমি বাপু এই রাত দুপুরে বাড়িতে চুপি চুপি ঢুকে কাজটা ভাল করোনি। কি মতলবে ঢুকেছিলে একবার বলো দিকিনি। তোমার নামটাই বা কি? বাড়িতে ঢুকলে কি করে?” লোকটির কান্নার দমক একটু কমলেও কাতরানি কমেনি। ওই অবস্থাতেই এইবার মুখ খুললো, “মা ঠাকরুন দুজনে মিলে এক ডজন কোশ্চেন করেচো। আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ,  কোনটা ছেড়ে কোনটা অ্যানসার দেবো? এক একজন একটা করে কোশ্চেন করো। একটার অ্যানসার পেলে পর আর একটা। একে এক পাঁচমণী রদ্দার ঝাড়ে আমি হড়কে গেচি, তার ওপরে…ওরে বাবা…দেড়সো কেজি ওজনের ওই বডিটার চাপ আমার দুটো আঙুলের ওপর রেখে রগড়াচ্ছিল গো। ওরে বাবা রে…এমন জানলে কোন শালা এতো রিক্স নিতো। কেষ্টর দেখা নেই শালা আগেই বেন্দাবন দেকিয়ে দিলো। মা ঠাকরুন আমার হাতের বাঁদনটা খুলে দ্যান… যন্তনায় মরে যাবো গো। তকোন খুনের দায়ে বাবুর তিনসো দুই কে ঠ্যাকাবে মা!” গিন্নী এবার ছেলেকে এক ধমক দিয়ে চ্যাঁচালেন, “ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি এ্যাতো কতা গিলচিস? পেছনের বাঁধনটা ওর খুলে দে। কি সব তিনশো-দুই-টুই বলচে। এসবের মানে কি?” বাঁধন খোলার পর আঙুলের অবস্থা দেখে আগন্তুক ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না জুড়ে দিলো আবার। আঙুল দুটো ফুলে লাল হয়ে আছে। এবার অনন্ত একটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠলো, “তুই তো দেখছি মহা ছিঁচকাঁদুনে। এতো দুর্বল শরীর হলে এইসব লাইনে এলি কেন? এই মারেই যদি তোর অক্কা পাবার অবস্থা হয় তবে ধরা পড়ে জনগনের পেটানি বা শ্রীঘরে পুলিশের পেটানি পড়লে কি করবি, এ কারবার তো তুলে দিতে হবে?”                                                                            

    পুলিশের পেটানি কেন জুটবে না বাবু, জুটেছে। কিন্তু যে রদ্দাটা আপনি ঝাড়লেন তার আদ্দেক ঝাড়লেই যন্তোর ব্রেকডাউন হয়ে যেতো। আপনার এতো লেবার দিয়ে পুরোটা ঝাড়ার দরকার ছিলনা। সুদুমুদু এনার্জিলস কল্লেন। আজ পুরো খালাস হয়ে যাইনি এটা আমার বাপের ভাগ্যি জানবেন।” ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললো আগন্তুক।

“ওটাতো ট্রায়াল দিয়ে দেখলাম। কতোকাল আগের ট্রেনিং। অব্যবহারে মরচে ধরে গেল না  রিক্ষা করে দেখলাম। ওই সঙ্গে পায়ের কাজটাও একবার পরখ করে দেখে নিলাম। অতোটা ফাস্ট আমার পা তোর ডান হাতের আঙুলের কাছে না পৌঁছলে তুই আমার লুঙ্গি ধরে টানতিস। আর তারপরে গিন্নী, ছেলে আর তোর সামনে যে সিনটা তৈরী হতো সেটা সেন্সার করতো কে শুনি।” বললো অনন্ত রদ্দার ঘায়ে আমি তখন সরসে ফুলের বাগান দেখছিলুম সুদু, আপনার লুঙ্গী তো তকোন সিনেই নেই। অ্যাকোনো দু-চারটে ফুল চোকের ওপর চমকাচ্চে।” যাগগে গিন্নী আপাততঃ ওর আঙুলে একটু বরফ দিতে হবে। সকাল হলে হাসপাতালে গিয়ে এক্সরে করে দেখতে হবে ভেঙেছে কিনা। ভাঙলে কপালে দুঃখ আছে। গদাই, দেখ তো ফ্রিজে বরফ আছে কিনা।”

আগন্তুক বলে উঠলো, “আমার তো দু-পা চাদরে বাঁদা, আমি বরফ আনবো কি করে?” আরে বাবা আমি আমার ছেলেকে বলেছি দেখতে। তোকে কেন বলতে যাবো? এই তো বাবু বললেন, গদাই, দেখ তো ফ্রিজে বরফ আছে কিনা। হ্যাঁ, আমি আমার ছেলে গদাইকে বলেছি। কি বিপদে পড়া গেল, বাবু আমার নামও তো গদাই, সবাই আদর করে আমায় কাটা গদাই বলে ডাকে। আমার লাইনে সবাই ওই নামেই আমাকে রেসপেক্ট করে। যেকোন পকেট, যেখানে বলবেন কেটে  মালকড়ি বার করে নেবো। একটা পিমড়ে  পকেটে  ঢুকলে জানতে পারবেন হয়তো কিন্তু কাটা গদাই আঙুল ঢোকালে আজ পোজ্জন্ত ওপর ওয়ালা ছাড়া কারুর সাদ্দি নেই বুজতে পারে। থানায় বড়বাবু থেকে দারোয়ান ওই নামে আমাকে সবাই চেনে। আলিপুর কোটে যান, গেট থেকে জজ সাহেব পোজ্জন্ত, এই নামের এলেম জানে। আজকেই যা একটু হড়কে গেচি।

      কাটা গদাই-এর আঙুলের হাড়ে চিড় খেয়েছিল।  প্লাস্টার করা ডান হাত, তার গলায় ঝুলে আপাততঃ বেশ কিছুদিনের অবসর যাপন করবে। অনন্ত তাকে আশ্বস্ত করেছে এই সময়ের জন্যে তার অর্থনৈতিক দায়ভার যতোটা সম্ভব বহণ করবে। পঞ্চাননতলার যে কলোনিতে গদাই থাকে সেখানে তাকে পৌঁছতে গিয়ে অনন্তর গদাই সম্মন্ধে সম্ভ্রম একমাত্রা বাড়লো। গদাই-এর একটি পালিত মেয়ে আছে। রাত্রে চুরি করতে বেরিয়ে ছোট্ট মেয়েটিকে রাস্তায় বসে কাঁদতে দেখে, নিজের কাছে নিয়ে আসে। ভেবেছিল সুযোগ পেলে কোন অনাথ আশ্রমে দিয়ে আসবে। চেষ্টাও করেছিল কিন্তু নাটক নভেলে ব্যাপারটা যতো সহজে হয় ততো সহজে এই ধরা ছোঁয়ার পৃথিবীতে অনাথকে কেউ কোন আশ্রম সহজে গ্রহন করেনা। করলেও অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়। এতো কিছু করার সঙ্গতি বা সুযোগ গদাইদের থাকেনা। তাই অগত্যা মেয়েটি গদাই-এর কাছেই বেড়ে উঠলো। গদাই অকৃতদার ফলে সে একাধারে মেয়েটির বাবা আবার মা-ও। এখন তার ঠিক বয়েসটা গদাই জানেনা…আন্দাজ করা যায় আঠেরো-উনিশ হবে। গদাই তাকে স্কুলে পড়িয়ে সেই গোন্ডী প্রায় পার করে এনেছে। এর জন্যে গদাইকে শরীর ও হাতের কাজে যথেষ্ট পারদর্শী হতে হয়েছে এবং ঝুঁকি নিতে হয়েছে প্রতি পদক্ষেপে। পুলিশ মহলে গদাইকে সবাই চেনে এবং তার জীবন যাপন সম্মন্ধে ওয়াকিবহাল। আর এই সুবাদে সে আইনের বাইরে কিছু বিশেষ সুবিধে যে পায়না তা নয়।

     প্রথম দুচার দিন অনন্তর হুকুমে তার ড্রাইভার, গদাই-এর বাড়িতে রাতের এবং দুপুরের খাবার পৌঁছে দিতো। গদাই অনেকবার অনন্তকে বোঝাবার চেষ্টা করেছে যে খাবার পাঠাবার দরকার নেই কারণ গদাই-এর মেয়ে রান্না করার ব্যাপারে যথেষ্ট পটু। কিন্তু অনন্ত সে কথায় কান দেয়নি। অনন্ত জানে গদাইকে সে আপাততঃ ভাতে মেরেছে…তার দক্ষতা ভাঙিয়ে রোজকারের পথ, আপাততঃ ভাঙা আঙুলের প্লাস্টারের নীচে থমকে গেছে।

    গাড়িতে রোজ দুবেলার খাবার আসছে দেখে গদাই-এর প্রতিবেশীদের মধ্যে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হলো। পাশের ঘরের জগা এসে গদাইকে জিজ্ঞেস করলো, “কি ব্যাপার গুরু, বাড়ির দুয়োরে সকালে-বিকেলে ঝাঁচকচকে গাড়ি আসছে, গাড়ি থেকে ভাল মন্দ খাবার নামছে। এমন সাঁসালো খদ্দের কোতায় পেলে? শালা গতোর খাটাতে হচ্চেনা, মাচ নিজেই জালে লাপিয়ে এসে পড়চে।” গদাই কথাটা এড়িয়ে গেছে। সত্যি কথা বললে তার অনেক ক্ষতি হবার সম্ভাবনা আছে। অনন্তর গাড়ি সকালে সন্ধ্যেয় আসাটা বন্ধ হওয়া দরকার অবিলম্বে। যা ঘটে গেল তাই সামলাতে কতো মিথ্যের আশ্রয় নিতে হচ্ছে তা গদাই আর তার মেয়েই জানে। উপায় না দেখে মেয়েকে নিয়ে অনন্তর বাড়িতে এক রবিবারের সকালে গিয়ে হাজির হলো গদাই। দিনের আলোয় লোকের বাড়িতে বেল দিয়ে ঢোকা বা ডাকার অভ্যেস কবে ছিল, গদাই মনে করতে পারে না। প্রথমতঃ যার তার বাড়িতে সে ঢোকেনা। কারুর বাড়িতে ঢোকার আগে তাকে অনেক খবর নিতে হয়, কখন হাত করতে হয় বাড়ির কাজের লোকদের, কখনও বা সিকিউরিটির লোক। সেখানেও সব সময় কোলকে পাওয়া মুস্কিল কারণ তারা বেশীরভাগ সময় এইসব ঝুঁকি নিতে চায়না। তবে পাড়ার কিছু কিছু ছেলেদের সহযোগীতা পাওয়া যায়, বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের চ্যালা-চামুন্ডাদের, যাদের অনৈতিক সহায়তায় দল ক্ষমতার সুবিধে ভোগ করে আর তার বদলে যেকোন অসামাজিক কাজে সরকার তথা পুলিশের সার্বিক সহায়তা তারা আদায় করে নেয়। শুধু

এদেরকে, মৌখিক চুক্তি মতো, রোজকারের ভাগ দিতে হয় গদাইকে। আজকাল ফ্ল্যাট বাড়িতে গ্রিলের ব্যাবহার কমে আসছে। ফলে গ্রিল কেটে ফেলার ঝামেলা ক্রমশঃ কমছে। এটা একটা ভাল লক্ষণ। নিত্য নতুন নিরাপত্তার ব্যাবস্থা যেমন হচ্ছে গদাইদের অত্যাধুনিক মস্তিষ্ক ঘাম ঝরাচ্ছে সেই নিরাপত্তার ছিদ্র অন্বেষণে। আজ তাই সকালবেলা নিরাপত্তাহীন অনন্তর বাড়ির দরজায় শরীরের বা হাতের কোন দক্ষতার ব্যাবহার ছাড়াই শুধু বেল বাজাতে সে কতোটা অদক্ষ তা উপলব্ধি করলো গদাই। গৃহস্থের বাড়িতে অতিথি হয়ে এলে, আমাদের সমাজে, হাতে মিষ্টি নিয়ে আসার চলন যে আছে গদাই তা জানে। মিষ্টির বদলে মেয়েকে দিয়ে মাছের একটি পদ আজ রান্না করে নিয়ে এসেছে গদাই। দরজা খুলে অনন্তর চাকর গদাইকে দেখে তার পরিচয় জানতে চাওয়ায় সে প্রথমে একটু থতমত খেয়ে বললো, “বাবু আমাকে চেনেন, গিয়ে বলুন গদাই এয়েচে, তাহলেই হবে।” গলায় কাপড়ের টুকরো দিয়ে প্লাস্টার করা ডান হাত ঝোলানো গদাই আর তার মেয়েকে দেখে সাদরে ভেতরে নিয়ে এলো অনন্ত। “কি খবর গদাই, কেমন আছিস? সঙ্গে এটি কে, তোর মেয়ে? বাঃ, কি মিষ্টি মুখখানি। হাত কেমন আছে? ওষুধগুলো ঠিক মতো খাচ্ছিস তো? রাতে-দুপুরে আর বেরচ্ছিস না তো?” কথার মাঝখানেই অনন্তকে বাধা দিয়ে গদাই বলতে শুরু করলো, বাবু সেইদিন রাতের বেলা থেকে আমি লক্ষ্য কচ্চি, আপনি একসঙ্গে একশোটা কোশ্চেন করেন। এতগুলো কোশ্চেন মাথার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে যায়। একটা করে করুন আমি একটা করে জবাব দিই। হ্যাঁ, একটা কোশ্চেন মনে আচে। ঠিকই ধরেচেন, এই আমার মেয়ে। খুব ভাল রান্না করে বাবু। এই দেকুন আপনাদের জন্যে কি রান্না করে নিয়ে এয়চে।” গদাই-এর কথায় অনন্ত একটু দমে গিয়েছিল কিন্তু মেয়েটি এসে এমন ভাবে প্রণাম করতেই আবার সামলে নিলো। “বাঃ, খুব লক্ষ্মী মেয়ে। আবার রান্নাও করিস ভাল। একবার পরীক্ষা করে দেখতে হচ্ছে। ও গিন্নী, এই দেখ গদাই কাকে নিয়ে এসেছে। বোস তো মা, বোস। এইখানে বোস। লজ্জার কিচ্ছু নেই। গদাই তুইও বোস।” সোফায় বসতে দুজনেই ইতস্ততঃ করছিল। অনন্তর অনুমতি পাওয়ায় দুজনেই গুটিসুটি হয়ে এক কোণে বসলো। অনন্তর গিন্নীও এসে বসলেন আর একটা সোফায়। রাতের আলো আঁধারিতে দেখা সেদিনের বাড়িটা যেন গদাই-এর চোখে সম্পুর্ণ বদলে গেছে। বাড়ির ভেতর আর এই ঘরটুকু দেখলেই বোঝা যায় অনন্তর বনেদিয়ানা। ঘরের পুরণো কালের বিশাল ঝাড়বাতিটা দেখলে তাক লেগে যায়। বিশাল ঘরের এক কোণে সেকালের, এক মানুষ সমান গ্র্যান্ড ফাদার ঘড়ি। তার সঙ্গে মানানসই আসবাবে ঘর সাজানো। কতো যে সোনা রূপোর কাজ করা ফুলদানি আর পাত্র আছে তার হিসেব নেই। এরই কয়েকটা হাতাতে সেদিন রাত্রে গদাই ঢুকেছিল এই বাড়িতে। সরাতে পারলে একটা বড় দাঁও মারা যেতো। ওর কাছে খবরটা ছিল সঠিক কিন্তু কে জানতো বুড়োটা এইরকম ষন্ডা মার্কা আর রাতে ব্যাটা ঘুমোয়না।

“কি রে গদাই কি এতো ভাবছিস?” অনন্তর ডাকে গদাই নিজেকে সামলে নিলো।

“না বাবু, একটা কতা আপনাকে না বললেই নয়।” বলে ফ্যাল, এতো কিন্তু কিন্তু করছিস কেন?”                                                                                       

“বলছিলাম কি বাবু, কতাটা অন্যভাবে নেবেন না। আপনাদের মতো লোকের পায়ের ধুলো পড়েচে আমার ওই বস্তির ঘরে, এ আমার সাত পুরুসের ভাগ্য। সেদিনের ঘটনার পর আপনি আমার অনেক করেচেন। বাবু আর দয়া করে গাড়ি করে খাবার পাঠাবেন না দুবেলা। আসপাসের লোকজনের কতার উত্তর দিতে দিতে আর ঢপ দিতে দিতে নিজের জালে নিজেই জড়িয়ে যাচ্চি বাবু। আপনি আমার হাতের এই হাল করেচেন এই কতা আমার সাগরেতরা জেনে ফেললে আমার কাজ কারবার সব মায়ের ভোগে যাবে। আর ঘাড়ের একমণী রদ্দার সেই টায়াল নাকি বেশ বললেন, সেটার কতা তো কেউ জানেনা। এইসব লাফ্রা সাত কান কল্লে আমি পুরো ডাউন হয়ে যাবো। আপনি কিচু মাইন্ড করবেন না বাবু।

“আচ্ছা আচ্ছা সেসব কথা পরে হবে। এখন বোস তো। তোর মেয়ের রান্নাটা খেয়ে দেখতে দে। দুজনে আমার এখানে দুপুরের খাওয়া সেরে তবে যাবি।”

এদিকে গিন্নীর সঙ্গে গদাই-এর মেয়ের ভাব জমে গেল দারুন। মেয়েটি যে এত সুন্দরী আর মিষ্টি স্বভাবের এটা এরা কেউই ভাবতে পারেনি। শাড়ি পরে একটু বড় বড় দেখালেও বয়েস আঠেরো উনিশের বেশী নয়। পরিবেশ আর জীবনযাপনের ছাপ, গদাই-এর শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিতে বিদ্যমান কিন্তু বস্তির পরিবেশ সামান্যই ছাপ ফেলেছে মেয়েটির শরীরে বা স্বভাবে।

দুপুরে খাবারের পাতে গদাই-এর মেয়ের রান্না খেয়ে সবাই হতবাক। মাছের এই পদটা অপূর্ব রান্না করেছে মেয়েটি। অনন্ত বলল, “বাঃ এতো অতি উঁচু দরের রান্না। এই রান্না তুই কোথায় শিখলি এই বয়েসে? আরে বাবা তোর নামটাই তো জানা হয়নি।” পাশ থেকে গিন্নী বললেন, “আমি জেনে নিয়েছি, নামটাও খুব আদরের। ওর নাম চিনু। ভাল নামটা জানা হয়নি।” “বাঃ, বেশ মিষ্টি নাম। আর ভাল নামের দরকার নেই, চিনুই খুব ভাল। তা মা চিনু তুই এই রকম আর কটা ভাল রান্না জানিস? ভেবে চিন্তে বল। যা যা বলবি সব কটা পদ আমাকে রান্না করে খাওয়াতে হবে কিন্তু। কিরে খাওয়াবি তো, বুড়োটাকে?”   

      দেয়ালে ঠেস দিয়ে মাথা সামান্য নীচু করে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো চিনু। এক কোণে গদাই গুটিসুটি মেরে বসে খাচ্ছে। বিশাল ডাইনিং টেবিলের এক কোণে অনভ্যস্ত চেয়ারে বসে খেতে তার অস্বস্তির সীমা নেই। রবিবারের ছুটির দিনে অনন্তর ছেলে, আর এক গদাই, সঙ্গী হয়েছে এই মধ্যাহ্নভোজে।

     এরপরে প্রায় প্রতি রবিবারে চিনু আসতো অনন্তর বাড়িতে। নানা পদের নতুন নতুন রান্না করে চিনু অনন্তকে তাক লাগিয়ে দিলো। চিনুর স্বভাবও খুব শান্ত আর একটু লাজুক। অনন্ত একদিন গদাইকে বললো, “শোন গদাই তোর মেয়েটা আমার কাছেই থাক। আমার তো মেয়ে নেই। ও থাকলে আমরা সবাই খুব খুশী হবো। আর তাছাড়া ভালমন্দ খাওয়ার লোভটা আমি আর চেপে রাখতে পারছি না। আর একটা কথা ভেবে দেখ গদাই, ওই বস্তির পরিবেশ… তোর মেয়ে বড় হয়েছে। কোনদিন কি বিপদ ঘটবে কেউ বলতে পারে?”

“না বাবু লোকের বাড়িতে রান্নার কাজ করাতে মেয়েকে আমি পাটাবো না। ওকে লেকাপড়া শেকাবো ভাল করে।”

“তুই আমার কথার এই মানে করলি গবেট কোথাকার? তোর মেয়েকে কি মাইনে করা রান্নার লোক ভেবেছি আমি? আমার কথা থেকে এই বুঝলি তুই?”  

“তাহলে বাবু, আপনি কি বলতে চাইছেন?”

“দাঁড়া আমাকে কটা দিন একটু ভাবতে দে। একটা কথা আমার মাথায় কদিন ঘুরছে। চিনুকে এসব কথা বলিসনি যেন। আমার কথার নিজের মতো একটা মানে করবি আর সেইটাই মেয়েটাকে বোঝাবি আর তার ফলে চিনু আমাকে ভুল বুঝবে। কটা দিন সময় যাক। ওকে আমার বাড়িতে আসতে মানা করিসনি যেন। তোর বুদ্ধির ওপর আমার ভরসা নেই।” “কি যে বলেন বাবু এই বুদ্ধিতে এতকাল এই রকম ঝক্কির লাইনে করে খাচ্ছি। দশ-বারোটা লোকের একটা দল চালাই আমি। আমাদের ল্যাইনে পতি ইঞ্চি সামনে হাঁটবেন, খোঁচোর, পুলিশ, কোট, জেল খাটা, পাবলিকের ক্যালানি লেগেই আচে। এইসব ঝক্কি অনেক বছর সামলে তবে একটা কেস্টোবিস্টু হওয়া যায়, দশটা লোক মান্নি করে। বুদ্দি না থাকলে কবে পোটকে যেতাম। আজকেরটা একটু গুবলেট হয়ে গেচে।”

মাস ছয়েক পরে একদিন রাত্রে শুতে যাবার আগে অনন্ত গিন্নীর কাছে এসে বসলো। অনন্তর বউ স্নিগ্ধা একটু সন্দেহের চোখে স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন, “কি গো, এমন উসখুস করচো কেন, কিচু বলবে?”

“না তেমন কিছু নয়।”

“তেমন কিচু নয় তো ওরকম কোচ্চো কেন? শুতে যাবে তো যাও।”  

“হ্যাঁ, এই যাবো।”

উঁহু, ব্যাপার তেমন সুবিধের ঠেকছে না, কি বলবে বলেই ফ্যালো না। এতো দনমনর কি আচে?”          

“বলবো বলবো করছি তো কিন্তু পারছি কই? বললেই এখন তুমি তাতে রাজী হবে কিনা আমার সন্দেহ আছে।

“কিসের আবার রাজী হওয়া। আমি তো ছাই মাথামুন্ডু কিছু বুঝতেই পারছি না। না বললে বুঝবো কি করে? “বললাম যে, বলতে তো চাইছি কিন্তু…”  

“আবার এক কথা, বলে ফেল, একবার শুনি না কি কতা।”

“তাহলে বলেই ফেলি, কি বলো?"

আরে হ্যাঁ বলো।”

“বলছিলাম কি, ছেলের তো বিয়ের বয়েস হয়েই গেল। বিয়ে তো দিতে হবে, কি বলো?”

“হ্যাঁ সে তো আমিই তোমাকে কতবার বলিচি। তুমিই কানে নাও না। যাক এতদিনে তোমার সুবুদ্ধি হয়েছে, এটাই আনন্দের কথা। কিন্তু এই কথা বলতে বাপু এতো উসখুসুনি কেন। এর মধ্যে আর কিছু প্যাঁচ আচে নাকি?”  

“না না প্যাঁচ থাকবে কেন। কোন প্যাঁচ নেই। ছেলের বিয়ের বয়েস হয়েছে, উপযুক্ত ছেলে। বাপের ব্যবসা দেখছে মন দিয়ে। আর কি চাই।” 

“উঁহু আসল কথাটাই এখনও তুমি চেপে আছো। আচ্ছা তুমি কিরকম লোক গো, নিজের ঘরের বউকে মন খুলে একটা কতা তখন থেকে বলতে পাচ্চোনি? তোমার কিসের সংকোচ আমার কাচে?”

“আচ্ছা ঠিক আছে, শোন মন দিয়ে। কোন আপত্তি থাকলে না চেঁচিয়ে শান্ত হয়ে তোমার কথা বলবে। আপোষে সব মীমাংসা হবে কিন্তু পাড়া মাথায় করে চেঁচাতে পারবে না। এই কথাটা আগে দাও, তারপরে বলবো।“

“আচ্ছা সেও নাহয় দেয়া গেল, এবার বলো।”

নিভৃতে দুজনের অনেক কথাই হলো। আসল কথাটি শুনে গিন্নী চোখ কপালে তুলে মৃদু হাসি মুখে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। তারপরের আলোচনা দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিপুর্ণ ছিল। অনন্ত আর তার গিন্নী ছেলের কাছে বিয়ের কথা পাড়তেই দেখা গেল চিনুর ঘন ঘন বাড়িতে আসার সুফল স্বরূপ কখন ছেলে গদাই-এর সঙ্গে তার এক আবেগ মিশ্রিত বোঝাপড়া তৈরী হয়েই বসে ছিল সবার অলক্ষে। যথা সময় বিয়ের দিন এগিয়ে এলো। বছর খানেকের মধ্যে অনন্তর বাড়িতে আত্মীয় সমাগম ক্রমশঃ বাড়তে থাকলো। বাড়ির বিশাল ছাতে বাঁশ বেঁধে মন্ডপ সাজানো শেষ হলো। অনন্ত ভেবেছিল চিনুকে ঘরের বউ করে আনতে গিন্নী এবং গদাই-এর নিশ্চয়ই ঘোর আপত্তি থাকবে। আর যাই হোক বস্তিতে থাকা চোরের মেয়ে তো। তাকে বউ করে ঘরে তুললে বনেদি বাড়ির মান সম্মান তলানিতে ঠেকবে। কথা একদম ওঠেনি তা নয় কিন্তু অনন্তর দুঃসাহসিক ব্যক্তিত্ব সেই সব আলোচনা নিয়ে টুঁ-শব্দটি করার সুযোগ দেয়নি কাউকে। বিয়ে মিটলো নির্বিঘ্নে। সেন কেটারারের রান্না খেয়ে লোকে ধন্য ধন্য করলো কিন্তু অনন্ত বললো, “আমার চিনুর হাতের মোচার ঘন্টো আর ইলিশ মাছের ভাপের কাছে সেন কাটারার নিতান্তই তুচ্ছ। বৌমার হাতের চিংড়ির মালাইকারিটাই বা কম কিসের।” অনন্তর ছেলের বিয়েতে আর বৌভাতে হাজার লোক খেলো কব্জি ডুবিয়ে।

দুদিন পরে সেন কেটারারের মালিককে ফোন করে অনন্ত তাদের বাকী টাকা নিয়ে যাবার জন্যে একজন বিশ্বস্ত লোককে পাঠাতে বলল। সেন কেটারারের মালিকের জবাব শুনে অনন্ত বেশ হকচকিয়ে গেল। তিনি বললেন অনন্তর কাছ থেকে একজন ভদ্রলোক গিয়ে ইতিমধ্যেই পাই পয়সা মিটিয়ে দিয়ে এসেছে। অথচ সেন কেটারারের বাকী টাকা, দুহাজার টাকার নোটে, খামবন্দী অবস্থায় অনন্তর সঙ্গে রয়েছে। ওভার কোটের ভেতরের পকেটে হাত দিয়েই অনন্ত চমকে উঠলো। Zipper লাগানো পকেটের ভেতরে টাকা সমেত খামটার চিহ্ন মাত্র নেই। অনন্ত মুখটা ঘুরিয়ে গিন্নীকে ডাকতে গিয়ে দেখে ছেলের শ্বশুর কাটা গদাই দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। অনন্তকে দেখে এগিয়ে এসে সামান্য কটা টাকা অনন্তর হাতে দিয়ে বলল, “এই পঞ্চাশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা ফেরৎ হয়েচে।“

“কিসের টাকা ফেরৎ?” হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করে অনন্ত।                                       “কেন? সেন কেটারারের বাকী টাকা মিটিয়ে এই খুচরো টাকা কটা ফেরৎ হওয়ার তো কতাই ছিল।”

একটু থেমে গদাই হাসি হাসি মুখে বললো, “দেড় বচ্ছর হলো পুরণো কারবার ছেড়ে দিইচি। ভাবলুম বহুৎ দিন আগের টেনিং, কাজে না লাগিয়ে, আঙুলের গাঁটে গাঁটে মরচে ধরে গেল কিনা পরখ করে একবারটি দেকি। দেকলাম দিব্বি চলচে, একটুও মরচে ধরেনি গো। চোট খাওয়া আঙুলে একটু টান ধরে এই যা।”

প্রবন্ধ

ধন্য় ওয়াজেদ আলী, আপনি নির্মমভাবে সত্য়/

পরিবেশসংস্থাপনাথায় সম্ভবামি/জগতহিতায়

ভাস্কর সিন্হা

দোহা, কাতার

 তবে আজকে মানুষের যে ক্রমাগত নিজেকে  শ্রেষ্ঠ থেকে শ্রেষ্ঠতর করে তোলার অভিপ্রয়াস রয়েছে, তাকে কুর্নিশ না জানিয়ে উপায় নেই।  প্রতিদিন ধরাধামে নিত্য়নতুন মানুষের আগমন ঘটছে। প্রতিদিনই একদল নতুন মনুষ্য় সাবালকত অর্জন করছে এবং প্রতিনিয়তই বিভিন্নভাবে বিভিন্ন বিষয়ে মানুষ নিজেকে বা নিজ বিষয়ে শ্রেষ্ঠ ক্ষমতার বা শ্রেষ্ঠ শক্তির উৎকর্ষিতার অর্জনে প্রয়াসী।

পরিবেশসংস্থাপনাথায় সম্ভবামি

    সুন্দর জীবনের উপাদান কি? কবিত্বের উপস্থাপনায়, "আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী।" ক্ষমতা বা শক্তি-ই তো রাজত্বের চাবিকাঠি। তা সে রাজত্ব দেশের, জমির, ভক্তির বা ব্য়বসার- যারই হোক না কেন। বুদ্ধিমান মনুষ্য় খুব সহজেই এই চাবিকাঠির রহস্য়ের উদ্ঘাটন করতে পেরেছে। প্রাণীকুলেও ক্ষমতা বা শক্তির রাজত্ব চলে। তবে সেটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শারীরিক সক্ষমতা বা বলশীলতা। কিন্তু মনুষ্য়কুল ঐ শারীরিক সক্ষমতা ছাড়াও, বুদ্ধির আনুকূল্য়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শিতায় পারঙ্গম হয়েই থাকে। মনুষ্য় বুদ্ধির সীমা- পরিসীমা নেই। মানুষে থেমে থাকতেও পারে না। অজানাকে জানার, অজানাতে রাজত্ব করার সীমাহীন আগ্রহ মনুষ্য়কুলকে দিগ্বিদিকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়। কেউ সাহিত্য় সাধনার শিখরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে সচেষ্ট। কেউ আপনাকে ভক্তকুলের হৃদয়রাজ প্রতিপন্ন করতে অতিব্য়গ্র। আবার বা কেউ চিত্রাঙ্কনে, কেউ কবিতায়, কেউ গদ্য়ে, কেউ ভ্রমনকাহিনীতে, কেউ সঙ্গীতে, কেউ ক্রীড়ায়, কেউ রাজনীতিতে, কেউ ব্য়বসায়ে, কেউ যুদ্ধে, কেউ প্রেমে-- এতো- শতো বিবিধ বিষয় আছে, যা বলে শেষ হওয়ার নয়। কেউ কেউ ব্য়াপার- স্য়াপারগুলিকে অতীব বিশিষ্ট করে তুলেছে। যেমন কেউ দাড়িয়াল হবার পরিবর্তে সেইস্থলে মধু-মক্ষিকার চাষবাস করেই থাকে। কেউ দীর্ঘতম নখরায়ুধ হয়ে শ্লাঘা অনুভব করে। কেউ যেমন দীর্ঘতম কেশের অধিকারী। কেউ বা দীর্ঘতম শ্মশ্রুশোভিত হয়ে শ্লাঘনীয়তা উপলব্ধি করে। আর অতি বিশিষ্টতার কথা এখানে থাকুক। হয়তো অন্য় কখনও আবার এ বিষয়ে আলোচনার অবসর হবে।

     তবে আজকে মানুষের যে ক্রমাগত নিজেকে  শ্রেষ্ঠ থেকে শ্রেষ্ঠতর করে তোলার অভিপ্রয়াস রয়েছে, তাকে কুর্নিশ না জানিয়ে উপায় নেই।  প্রতিদিন ধরাধামে নিত্য়নতুন মানুষের আগমন ঘটছে। প্রতিদিনই একদল নতুন মনুষ্য় সাবালকত অর্জন করছে এবং প্রতিনিয়তই বিভিন্নভাবে বিভিন্ন বিষয়ে মানুষ নিজেকে বা নিজ বিষয়ে শ্রেষ্ঠ ক্ষমতার বা শ্রেষ্ঠ শক্তির উৎকর্ষিতার অর্জনে প্রয়াসী। মানুষের এই ক্ষমতালিপ্সুতার সীমা- পরিসীমা নেই। সবাই আরো, আরো, আরও চায়। মানুষ থামতেও জানে না। অবাক হতে হয় যখন ভয়ালো চলচিত্রকেও আরও ভয়াবহ রূপে, নারকীয় রূপে প্রকাশ করা হয়, গণখুনী আরো, আরও বীভৎস হত্য়ালীলা চালাতেই থাকে।

    এই ক্ষমতার অধিকারকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার সময় হয়ে এসেছে। ক্ষমতালিপ্সুতা, ভোগবাদ ইত্য়াদি থেকে সরে এসে অন্য় বিষয়ে মনোনিবেশের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সসাগরা ধরিত্রীতে মনুষ্য় ছাড়াও সহস্র- কোটি প্রাণীকুল রয়েছে। তার উপরে আরো সহস্র- কোটি বা তার উপর সংখ্য়ক উদ্ভিদকুল। এই সকলকেই সুস্থ ও সুন্দরভাবে এই পৃথিবীতে অধিবাসের পরিসর থাকা উচিত।

      আজ এক বিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয় উপস্থিত। আজ এক গণিতজ্ঞের গনণা অত্য়ন্ত আবশ্য়ক। এই আমাদের জ্ঞানবোধ্য় একইমাত্র সুজলা- সুফলা ধরিত্রীতে সবাইকেই সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে কত সংখ্য়ক প্রাণের বা প্রাণীর আবশ্য়কতা? অবশ্য় কিছু প্রাণ সুমহান, কিছু প্রাণ ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ ধরলে- আবহমান কাল ধরে যা চলছে- প্রাকৃতিক নিয়মই দৃঢ়ভাবে বলবৎ হয় না কি? অতএব যা চলছে, তাই চলুক- প্রকৃতি-ই আপন খেয়ালে নিত্য়- নতুন রূপের সমাহার করতে থাকুক। প্রাকৃতিক নিয়মগুলিকে বেশী টানা- হেঁচড়া বা ভন্ডুল করার প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকাই ভালো।

    উপরোক্ত ভাবনাগুলিতে সহমত হয়েও, একদল শুভচিন্তক আমাদের যথাবিধ সতর্কিকরণ করে চলেছেন। পোলান্ডের কাতোয়িসে পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষাকর্তাদের সম্মেলনে ইদানিন্তন এ নিয়ে প্রচুর জলঘোলা হল। কিন্তু অনায়াস সমাধান দূর অস্ত। আমরা যদি সত্য়ি-ই আমাদিগকে "অমৃতস্য় পুত্রাঃ " মেনে থাকি, তাহলে আমাদের সত্য়ি সত্য়ি-ই পৃথিবীর তাপমাত্রার অধোগতির প্রচেষ্টা আর জাগতিক অন্য় প্রাণীকুল এবং উদ্ভিদকুলের প্রতি সহমর্মিতার মনোভাবাপন্ন হওয়া অতীব কর্তব্য়।

ধন্য় ওয়াজেদ আলী, আপনি নির্মমভাবে সত্য়

 

    সেই কত দীর্ঘকাল আগে বিদ্য়ালয়ের পাঠ্য়পুস্তকে এস ওয়াজেদ আলির লেখায় পড়েছিলাম যে সেই ট্রাডিশন আজও সমানে চলছে। উনি দুলে দুলে কৃত্তিবাসী রামায়ণ পাঠ নিয়ে বলেছিলেন। পাঁচ হাজার বছরের ট্রাডিশন আমাদের অস্থিমজ্জায় মিশে গিয়েছে। শক, হূণ, পাঠান, মোগল, ইংরেজ, পর্তুগিজ, ইত্য়াদিসকল যেই আসুক না কেন, আমাদের ডিএনএ তো একই, সেই আদি অকৃত্রিম রয়ে গিয়েছে। তাই জমিদার প্রথার কাগজে- কলমে অবলুপ্তি ঘটলেও, একদিকে তথাকথিত জমিদার- জোতদার শ্রেণী ক্ষমতার কুক্ষিগততায় বিশ্বাসী, অন্য়দিকে দিশাহারা মজুর- শ্রমিক শ্রেণী ক্ষমতাসীনদের অঙ্গুলিহেলনে অবসন্ন। তাই দেখা যায় যে কৃষি ৠণের মকুবতার কারণে- অকারণে সরকারের পতন হয়। যদিও দেখার বিষয় যে এই ৠণ মকুবে আসল লাভ কয়েকজন ধনী কৃষকের ঘরেই পৌঁছোয়। মজুর কৃষকের ৠণ নেবারও সামর্থ্য় নেই, বা তার নম্বর আসার আগেই কেটে যায়। আর ভোটের ঘরে মালিকের বলে রাখা চিহ্নতেই ছাপ পড়ে। ভারতে এই মালিক- শ্রমিকের সমাজ অনন্তকাল ধরেই চলেছে এবং ওয়াজেদ আলির ভাষায় ট্রাডিশন বদলাওনি।

       কথাপ্রসঙ্গে ১৯৯১ এ আল্পস পর্বতমালার ওতজালে পাওয়া তাম্রযুগের এক প্রাকৃতিক ভাবে তৈরী এক বরফ মানবের মমি যে খ্রীষ্টপূর্বাব্দ ৩৪০০ থেকে ৩১০০ এর কোনও এক সময়ের হবে, যে তথ্য় পাওয়া যাচ্ছে যে এত দিনেও মানবের খাদ্য়াভাস মোটামুটি একই রয়েছে- সেই দানাশস্য় আর ছাগ মাংস। আর অদ্ভুতভাবে ব্য়ক্তিটির মৃত্য়ুও হয়েছে চোরাগোপ্তা আক্রমনে, পিছন হতে কেউ আচমকা শরনিক্ষেপ করেছে।

     সে যাক, অর্থনীতি একটু খোলা হাওয়া পেলে কিছু মধ্য়বিত্তের আবির্ভাব হয়েছে অস্বীকারের নয়, কিন্তু বৃহত্তর দুনিয়ার সংজ্ঞায় তারা নিম্নবিত্তই বটে। হ্য়াঁ হয়তো একটু সচ্ছ্বল, এই যা, তার বেশী কিছু নয়। বড়ো বহুজাতিক সংস্থাকেও ভারতের বাজার ধরতে নিচুক্ষেত্রের মালের উপরেই বেশী ভরসা রাখতে হয়, উচ্চক্ষেত্রের মাল কয়টাই বা বিকিকিনি হয়? সেজন্য় ভারতেই ছোটো ছোটো পাউচে সাবুন বা দন্তমাজন এবং অন্য় মাল সকল বিক্রিত হয়, যা দুনিয়ার অন্য়প্রান্তে হিসেবের মধ্য়েই পড়ে না। মোবাইল সংস্থাগুলিকে নিম্নদামের বিশেষ মোবাইল সেট আনতে হয় ভারতবাজার ধরার জন্য়।ভারতে বৈদ্য়ুতিক বাহনের বাজার দু চাকার জন্য় যতটা উপযোগী সেই তুলনায় চার চাকার জন্য় নয়।

     সেই রাজ- রাজড়াদের আমল থেকেই এই চলে আসছে। একদল বলে আসছে, অন্য়দল শুনছে। পৃথিবীতে যতো নিত্য়নতুন আবিস্কার হয়েছে মূলতঃ সবই মধ্য়বিত্তের অবদান। ভারতে সেই মধ্য়বিত্ত কোথায়? এককালে ভারতবর্ষে গান- বাজনার, ধর্মালোচনার বেশ কিছু শাখাপ্রশাকার বিকাশ ঘটেছিল, তাও ঐ রাজ- রাজড়াদের অনুগ্রহেই। গণিতেও একটু আধটু। রাজারা নিজেরাই মধ্য়বিত্তদের বিকাশ চাইলেন না। উচ্চ আর নিম্ন বিত্তদের সমাজ  রাজাদের বেশ পছন্দসই ছিল। রাজা আর শ্রমিক সমাজ। এই যে এত দিনেও কৃষিজাত পণ্য়ের সংরক্ষণ বা উন্নতিকরন করে লাভজনক বিশাল ব্য়বসার দিকে দৃকপাত করা হয় না, ঐ একই কারণে। মধ্য়বিত্ত কৃষিজাত ব্য়বসার বিশাল ফাঁকি আমাদের উন্নতিকল্পে বিশাল বাধা। ইংরেজরা এসে রাজাদের দেখে শিখল- এক দেশে দুই শ্রেণীর জন্য় দুই নিয়ম চালু হলো। ইংরেজরা আবার বেশী চালাক এবং সম্রাজ্ঞীর অত্য়ন্ত অনুগতপ্রাণ, তাই লাভের সব গুড় সাগরপাড়েই পাড়ি দিতে থাকল।     

 

ফুলের সব মধু খেয়ে মৌমাছি গেল উড়ে। আম্বেদকরেরা ভাবলেন যে একটা নতুন সমাজ বানানো যাক। নিম্নশ্রেণীর জন্য় চালু হল সংরক্ষণ। কিন্তু মার্কসের আদর্শ যেমন বইএর পাতাতেই রয়ে গেলো, তেমনই হলো আমাদের সংরক্ষণ। তৈরী হলো সুবিধাবাদী শ্রেণীর। ক্ষমতাবানেরা চিরকালই আপনার দলবৃদ্ধিতে সিদ্ধহস্ত। এই যেমন ওবামা রাষ্ট্রপতি হওয়াতে ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেই ফেলেছিলেন যে ওবামা তো আমাদেরই মতো এবং আমাদের একজন, রংটা শুধু একটু বেশী রোদে পোড়া, এই যা। এই ধরাধামে কেউই ক্ষমতার বিনাশ চায় না, যা শুধু অন্য়রূপে, অন্য়ভাবে বিকাশমান হয়। তাই আগের দিনের রাজা- রাজরাড়ারা আজ মন্ত্রী, বা সাংসদ। আর সংরক্ষণে সুবিধাবাদীরা শুধু ফেঁপে ফুলে বড়ই হলো না, সর্বস্তরে দুর্নীতির সুবিকাশ ঘটেই গেলো।  শঙ্কা একই যে এই ঘুণপোকা তো সবই অস্থিমজ্জা খেয়ে হজম করে দেবে না তো?

জগতহিতায়

 

    প্রত্য়েক দেশই তার দেশবাসীর স্বার্থান্বেষণে তৎপর। এটাই জাগতিক নিয়ম। আমেরিকা আর্থিক স্বার্থে সৌদি বা কুয়েতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলে। কতো শত কোটি ডলারের বার্ষিক বরাত নিয়ে যায় তার অস্ত্র এবং বিমান শিল্পের জন্য়। সেই একই নিয়মে, ভারতকে দুর্বল প্রতিপন্ন করার জন্য় চিন ক্রমাগত পাকিস্তানকে আর্থিক, মানসিক, সামরিক ও আরো নানাবিধ সুযোগ- সুবিধার হস্তান্তর করে চলে, এটা জেনেও যে ঐ সাহায্য়ের সিংহভাগ ব্য়বহৃত হবে ভারতের পর্যদুস্ততার জন্য়।

কিন্তু ক্ষুদ্র স্বার্থরক্ষাই কি সব? এই ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে স্বার্থান্বেষীরা কি পৃথিবীটাকে আরো টুকরো, টুকরো করে দিচ্ছে না? ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের চরিতার্থতায় কি বৃহত মানবসভ্য়তা পর্যদুস্ত হয়ে উঠছে না? মানবসভ্য়তা কি ক্রমাগত এক সর্বনাশ থেকে আর এক ধ্বংসের পথে অভিমুখী হয়ে চালিত হচ্ছে না?

এই মারামারি- হানাহানির জগৎ থেকে সরে এসে আমরা যদি আমাদের উন্নতি এবং সার্বিক বিকাশের প্রচেষ্টা করতাম, তাহলে মানবসভ্য়তার যারপরনাই উন্নতি হতো না?

ধর্ম ব্য়াপারটি যে বেশ বাড়াবাড়ির পর্যায়ভুক্ত হয়ে গিয়েছে, আর সন্দেহ নেই। ধর্ম তো মানুষকে শান্তি আর ঈশ্বরের নিকটগামী করে তোলার পথই মাত্র ছিলো। কিন্তু ধর্ম এখন এক ভীষণ বিধ্বংসী এবং জিঘাংসা শিকারী হয়ে উঠেছে সন্দেহ নেই।  অন্য় ধর্মকে অবমাননার মধ্য়ে কোনো মহত্ত্বের বিকাশ ঘটে না, বরং আমরাই আরো সঙ্কুচিত হয়ে যাই।

     সত্য় বলতে সব মানবই হোমো সেপিয়েন্স পরিবারভুক্ত। এই যেমন সর্প পরিবারভুক্ত সব সাপই সাপ, তা চন্দ্রবোড়া, কেউটে বা পাইথন যাই হোক না কেন। আবার সব গাঁদা তো গাঁদাই, তা লাল বা হলুদ বা অন্য় কোন মিশ্র রঙের ফুল হোক না কেন। সব মানুষই তো একে অন্য়ের ভাই- ভাই। আমি এই "ভাই" কথাটি সাধারণ- সর্বজনগ্রাহ্য় হিসেবে তুলে ধরছি, মহিলা পাঠিকারা এতে আশাকরি বিরাগভাজন হবেন না। আমাদের ত্বকের ভিন্ন ভিন্ন রঙ তো মেলানিন আর সূর্যকিরণের যোগসাজসে। তো এক বর্ণকে আর এক বর্ণের উপর অগ্রাধিকার তো আমরাই দিয়েছি। এক বর্ণকে আর এক বর্ণের উপর রাজত্বের অধিকার তো আমরাই মেনে নিয়েছি। বুদ্ধি মানুষের সম্বল, সাতন্ত্রতা তো মানুষের চরিত্রগত। তাই দেশে- দেশে এত শত- কোটি ভাষার উদ্ভব, এত- শত খাদ্য়াভাষের রকমফের। এত রকম পোষাকের ব্য়ঞ্জনা। তার মানেই আমরা যে আলাদা হয়ে গেলাম, তা তো নয়। হ্য়াঁ, আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারায় বা প্রয়োগে কিছু- কিছু বিভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু আমরা তো সকলেই একই- অমৃতস্য় পুত্রাঃ! হ্য়াঁ, পথে চলতে- চলতে কেউ এগিয়ে গিয়েছে। কেউ- কেউ বেশী সুযোগ পেয়েছে। কেউ- কেউ সেই বেশী সুযোগের অপব্য়বহার করেছে। কেউ- কেউ ক্ষমতা কুক্ষিগত করেই থাকতে চেয়েছে। এই খানেই এসেছে বিপদ।

     লঙ্কায় যে যায়, সেই হয় রাবণ। আমাদের মধ্য়ে যারা একবার ভি আই পি হয়ে গেলো, আর সেই আরাম ছাড়তে তাদের কষ্ট হোল। যেন- তেন প্রকারেণ, ওই আরামভোগ তাদের চিরকালীন ব্রত হয়ে উঠল। শুধু তাই নয়, সেই আরাম আর সুযোগ যেন চোদ্দ পুরুষ বা তার পরেও বলবৎ রাখতে পারে, সেই চেষ্টার চিরকালীন বন্দোবস্তের আয়োজনের শেষ থাকল না

   প্য়ারেটো নিয়মানুসারে বলা যেতেই পারে যে, পৃথিবীর আশি শতাংশ সম্পদের মালিকানা শুধু সমগ্র জনসংখ্য়ার কুড়ি শতাংসর হাতে। এটা একটা মোটা -মোটা হিসেব। সূক্ষ হিসাবে কুড়ি নিশ্চয় আরো নিচস্থ হবে। তাহলে ঐ কথা যে, আমরা সবাই সমান- এ কথা তো বইয়ের পাতাতেই রয়ে গেলো। যারা এই ধরণীতে আগে এল, অস্ত্র- শস্ত্র বা বাহূবলে অধিকার প্রথমেই কায়েম করল,  সম্পত্তি বা মালিকানা তাদের হাতেই রয়ে গেলো। বসুন্ধরা চিরকালই বীরভোগ্য়া, প্রান্তিকের হিসাব তো পরিধিতেই রয়ে গেলো।

খুনোখুনি বা জোর- জবরদস্তির উপায়ের আলোচনা এখানে হচ্ছে না। ওসব সভ্য়তার সমীকরণে আসে না। কিন্তু সুস্থজীবনের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলির তো সবাই কাছেই পৌঁছানো উচিত সুষ্ঠুভাবে, এনিয়ে দ্বিমত হবার অবকাশ নেই। তাই এই হানাহানির কুশ্রীতা, ভাগাভাগির নিয়ম, ধর্মান্ধতার বেড়ি, সামাজিক- অর্থনৈতিক- মানসিক ঘেরাটোপ থেকে মহামুক্ত হয়ে, বিবিধের মাঝে মানবের মহামিলনের সাধনাই মানবজীবনকে উত্তরণের পথ দর্শাতে পারে।

প্রবন্ধ

রবীন্দ্রনাথ ও তরুণ বিপ্লবীরা

দিলীপ মজুমদার

পর্ণশ্রী, কলকাতা 

লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক

‘হিজলিকারার যে রক্ষীরা সেখানকার দুজন রাজবন্দীকে খুন করেছে তাদের প্রতি কোন একটি আ্যংলো ইন্ডিয়ান সংবাদপত্র খ্রিস্টোপদিষ্ট মানবপ্রেমের পুনঃপুনঃ ঘোষণা করেছেন। অপরাধকারীদের প্রতি দরদের কারণ এই যে, লেখকের মতে, নানা উৎপাতে তাদের স্নায়ুতন্ত্রের পরে এত বেশি অসহ্য চাপ লাগে যে, বিচারবুদ্ধিসঙ্গত স্থৈর্য তাদের কাছে প্রত্যাশাই করা যায় না ।

 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

সবুজের

প্রতীক্ষায়

সুশোভন দাস

একে অন্যেকে শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নিল। বিজন কম্পিউটার বন্ধ করে বিছানায় এলো। ভালো সময় কেন যে এতো তাড়াতাড়ি কেটে যায় সেটাই ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে উঠে ফেসবুক খুলে সুপ্রভাত জানাল অনামিকাকে। কিন্তু সারাদিন কেটে গেল অনামিকার কোনো দেখা নেই। একটা চাপা অস্বস্তির মধ্যে সারাদিনটা কেটে গেল। যথারীতি রাতের খাওয়া সেরে ফেসবুক খুলে বসল বিজন। ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘর ছুঁতেই অনামিকার চ্যাট বক্সের সবুজ আলোটা জ্বলে উঠল। সাথে সাথে একটা মেসেজ এলো- “শুভ সন্ধ্যা”।

      প্রায় সাড়ে তিন বছর পর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে চোখ রাখল বিজন। কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলে সে। তারপর প্রথম কয়েক সপ্তাহ অনেকটা করে সময় দিয়ে কলেজের বন্ধুদের অ্যাড করে। সাথে কলেজের বিল্ডিং, ক্যান্টিন, খেলার মাঠ, ক্লাস রুম, কমন রুম, রতনদা’র চায়ের দোকানে আড্ডা- যা পেরেছে সব ছবি তুলে ফেসবুক ভরিয়ে দিয়েছে। মাস ছয় কাটতে না কাটতেই ফেসবুক কেমন যেন একটা একঘেঁয়ে লাগতে শুরু করল,- এটাই যেন একটা নাটকের মঞ্চ আর সবাই কারণে-অকারণে নিজেদের কান্ড-কারখানা দিন-ক্ষণ মিলিয়ে গোটা ব্রম্ভান্ডের সামনে তারস্বরে প্রচার করছে। ধীরে ধীরে বিজন নিজেকে ফেসবুকের একঘেঁয়ে জগৎ থেকে বের করে নিজের পুরানো বাস্তব জগতে নিয়ে এলো। কিন্তু ততদিনে বাস্তব যে নিজেই ফেসবুক আর ইন্টারনেটের মায়াজালে আটকা পড়েছে এবং যতদিন যাচ্ছে সেই জালের জট আরও ভয়ঙ্কর হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারল না। যখন নিজের বন্ধুগুলোকে সামনাসামনি কথা না বলে শুধু মাত্র ঘাড় নিচু করে ফোনের মধ্যে ডুব দিতে দেখল  আর মুখ তুললেই কে কটা লাইক আর কমেন্ট পেল তার হিসাব করতে শুনল, তখন তার সামনে বর্তমান বাস্তব একেবারে পদ্ম পাতায় ধরা জলের মতো টলটল করে ভেসে উঠল। বন্ধুদের কাছে অন্তর্জাল যেখানে অক্সিজেন হয়ে উঠল তার কাছে সেটা ফাঁসের দড়ি মনে হতে লাগল। তাই দ্বিতীয়বার ওই অন্তরজালের জগতে নিজেকে আর ধরা দিল না। বন্ধুরা যত নিজেদেরকে জালের জটে জড়িয়েছে, বিজনের সাথে বন্ধুত্বের সুতো ততই পাতলা হয়েছে । একাকীত্ব কাটাতে গল্প কবিতা উপন্যাসের উপর তার আগ্রহ অনেক বেড়ে গেল। ‘বই মানুষের সব থেকে ভালো বন্ধু’ – এই কথাটা দেখতে দেখতে বিজনের জীবনে সার্থক হয়ে উঠল।

অনেক বছর পর ফেসবুক খুলে দেখল প্রচুর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আর ইনবক্সে উপছে পড়া মেসেজের ভিড়। প্রোফাইল ঘুরে পুরানো ছবি দেখতে দেখতে তার কলেজের দিনগুলো চোখের সামনে ফুটে উঠল। কত সময় পেরিয়ে গেছে তবু মনে হচ্ছে সব কিছু যেন কালই ঘটেছে- সেই ক্যান্টিন-আড্ডা-বন্ধু। ফ্রেন্ডলিস্টে একবার চোখ বুলিয়ে দেখল বন্ধু সংখ্যা একশো আট হয়ে আছে। একটু মুচকি হেসে মনে মনে ভাবল,-“ ইন্টারনেটের দৌলতে সত্যিই বন্ধুত্বের একশো আট।”

অনেকের প্রোফাইল ঘুরে জানতে পারল বিয়ে হয়ে গেছে, অনেকে বিদেশে আছে- কত সব বাহারি ছবি সাথে কতকিছু লেখা। কেউ আবার প্রেম করছে আর ফলাও করে তার ছবি সহ রবির গান লেখা-

‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম। 

নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমা নিশীথিনী-সম॥‘

কে একজন সেই ছবিতে কমেন্ট করেছে – ‘এই ফাগুনি পূর্ণিমা রাতে চল পলায়ে যাই’।

কমেন্টটা পড়েই হা হা করে হেসে উঠল বিজন। বিজনের হাসি শুনে বারান্দা থেকে বিজনের মা বলে উঠল,-“কি রে ! একা একাই হাসছিস! ব্যাপার কি? উঠবি না নাকি? সেই সকাল থেকে কম্পিউটারে মুখ গুঁজে পড়ে আছিস। স্নান খাওয়া করবি, নাকি কোনও ইচ্ছা নেই?”

মায়ের গলা শুনে স্ক্রিনের নীচে ডান দিকের কোণায় তাকাল। ফুটে ওঠা সময় তখন ১১:৫৭ AM।

সময় দেখেই অবাক হয়ে বিজন বলে উঠল,-“এই রে। এতো বারোটা বাজতে চলল। সাধে কি আর বলে যে ফেসবুক করলে সময়ের কোনো জ্ঞান থাকে না। কোথা দিয়ে যে তিন ঘন্টা কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না!”

তাড়াতাড়ি করে গান বন্ধ করে ফেসবুক লগ আউট করতে যাবে তখনই টুং করে একটা শব্দ হল আর সাথে সাথে ইনবক্স লাল হয়ে 1 দেখাল। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টেও লাল হয়ে 1 দেখাচ্ছে।

বেশ কিছুটা কৌতুহলী হয়ে মেসেজ খুলল। একটা হাত নেড়ে হাই জানাচ্ছে অনামিকা রায়। তাড়াতাড়ি করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট খুলে সেখানেও দেখল অনামিকা রায়ের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। অনামিকার প্রোফাইলে যাওয়ার  আগেই টুং করে আরও একটা শব্দ করে অনামিকার দ্বিতীয় মেসেজ ঢুকল-

“ অজানাকে জানার আশায়

নতুন পথে পাড়ি,

হাতের মাঝে হাত রেখে

    আমি কি বন্ধু হতে পারি? ”

বারান্দা থেকে বিজনের মা আবার বলে উঠলেন,-“ওরে এবার স্নান করে আয়। অবেলায় স্নান করলে আবার তোর ঠাণ্ডা লাগবে।”

তাড়াতাড়ি করে মেসেজটা দেখে প্রথমে লগ আউট তারপর কম্পিউটার বন্ধ করে ঘর বেরিয়ে এল বিজন। কম্পিউটার ছেড়ে উঠে আসলেও ফেসবুক থেকে বেরতে পারল না সে। মাথার মধ্যে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকল,- “কে এই অনামিকা রায়?” সাথে তার লেখা চার লাইনের ছড়ার শেষ লাইনটা –“আমি কি বন্ধু হতে পারি?”

“প্রোফাইল পিকচার থাকলেও সেটা কোনও মানুষের ছবি না। তার জায়গায় আছে এক গাদা বইয়ের স্তুপাকার ছবি। অনামিকা নামে কোনো বান্ধবী বা ক্লাসমেট কেউ ছিল বলে মনে পড়ছে না। বন্ধুদের মুখে ফেক প্রোফাইলের কথা অনেক শুনেছি। তবে কি এটাও একটা ফেক প্রোফাইল ? যদি তাই হবে তাহলে অমন একটা ছড়া লিখে পাঠাল কেন বন্ধু হওয়ার জন্য? প্রোফাইলটা ভালো করে ঘুরে দেখতে হবে -কে এই অনামিকা।”- এই সব সাত-পাচঁ চিন্তা বিজনকে বেশ কিছুটা অস্থির করে তুলল।

মনের মাঝে অস্থিরতা চেপে, তাড়াতাড়ি স্নান করে এসে খাবার টেবিলে বসল। অন্যান্য দিন খাবার টেবিলে বসে মায়ের সাথে নিজের নতুন চাকরী, নতুন জায়গা নিয়ে অনেক গল্প করে। কিন্তু আজ খাবারের থালা থেকে মুখ তুলল না একবারও। প্রায় গোগ্রাসে থালায় দেওয়া খাবার গুলো গিলতে থাকল। মায়ের নানাবিধ কথায় দু-একবার হুঁ-হ্যাঁ বলে উত্তর দিয়ে তড়িঘড়ি খাবার শেষ করে টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল। তাড়াতাড়ি করার কারণ স্বরূপ বলল,-“একটা আর্জেন্ট মেল এসেছে। একটু কাজ করতে হবে অফিসের।”

নিজের রুমে এসে কম্পিউটার অন করতেই ঢং করে একটা ঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়াল ঘড়িটা দুপুর একটা বাজার জানান দিল। একটুও সময় নষ্ট না করে সরাসরি ফেসবুক খুলে বসল বিজন। ইতি মধ্যে আরও কয়েকটা মেসেজ এসেছে অনামিকার- ‘অন আছো , আমার মেসেজও দেখছ তবুও কিছু রিপ্লাই দিলে না। এটা আত্মমর্যাদা নাকি ভীরুতা? নাকি একটা মেয়ে নিজে থেকে কথা বলছে বলে নিজের ঘ্যাম বাড়িয়ে নিচ্ছ?’

এর মধ্যে কোনোটাই যে নয় সেটা বলবে কি করে সেটাই বুঝে উঠতে পারল না বিজন। অনামিকার মেসেজে লাস্ট সিন দেখাচ্ছে ১২.৩০ pm। তার মেসেজ বক্সের সবুজ আলোটা এখন আর জ্বলছে না। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করে তাকে লিখে পাঠাল,-‘তোমায় চিনতে পারছি না ? কে তুমি? এই ভাবতে ভাবতেই সময় চলে গেল।’

চেয়ারের উপর একটু শরীরটা হেলিয়ে দিয়ে অনামিকার প্রোফাইল দেখতে শুরু করল বিজন। যদিও সেখান থেকে বিজন খুব বেশি কিছু জানতে পারল না অনামিকার সম্পর্কে। কলকাতা থেকে পড়াশুনা করেছে। সমবয়স্কাই মনে হচ্ছে। অনেক ছবি আছে কিন্তু একটাও তার নিজের ছবি নেই। প্রায় সব ছবিতে প্রচুর প্রচুর লাইক আর কমেন্ট। সেগুলো দেখতে দেখতে কখন যে তার চোখ বুজে এসেছিল নিজেই তার টের পায়নি।

ঢং ঢং করে দু-বার দেওয়াল ঘড়িটা বেজে উঠতে বিজনের ঘুম ভাঙল। কম্পিউটারটাও তার সাথেই ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ। মাউসটা একটু নাড়া পেতেই জেগে উঠল আবার। মেসেজ বক্সের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হল বিজন। অনামিকার লাস্ট সিন ১০ মিনিট আগে দেখাচ্ছে। অনামিকা তার মেসেজ দেখেছে অথচ কোনও রিপ্লাই দেয়নি। বিজন লিখে পাঠাল,-‘একটু চোখটা বুজে এসেছিল আর সেই সুযোগেই তুমি মেসেজ পড়ে চলে গেলে। নিঃশব্দে! তবে সব সময় সফল হবে না।’

তারপর একটা স্মাইলি পাঠিয়ে দিল। আরও কিছুটা সময় কেটে গেল ফেসবুকের দিয়ে চেয়ে। এই চৈত্রের অবসন্ন অপরাহ্ন যেন বড়ই দীর্ঘ। আবার একটা অস্থির ভাব তার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিছুই করার নেই এখন। একটু রোদ পড়লে বিকালের দিকে বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে তার। কিন্তু বিকাল হতে এখন অনেক দেরি। পাশের ঘরে উঁকি মেরে দেখল মা ঘুমাচ্ছে। কিন্তু এখন আর নিজের ঘুম আর আসবে না। কম্পিউটারে হালকা করে কিশোর কুমারের গান চালিয়ে দিয়ে শরৎরচনাবলী তুলে নিল। কিছুটা পড়ল-কিছুতা অন্যমনস্ক হয়ে অনামিকার কথা ভেবে সময় কাটাল।

বিকাল হতেই ক্লাব ঘর তারপর চায়ের দোকানে একটু আড্ডা দিয়ে রাত ন’টার দিকে বাড়ি ফিরল বিজন। রাতের খাবার খেয়েই আবার ফেসবুক খুলে বসল। না- তার শেষ মেসেজটা দেখেনি অনামিকা। তার নামের পাশে সবুজ আলোটা জ্বলছে না। এখন সবে পৌনে দশটা। আরও একটু দেখা যাক।

ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘর ছুঁতে না ছঁতেই সবুজ আলো জ্বলে উঠল। সাথে সাথে একটা মেসেজ ঢুকল।

-আমায় সফল হতে দেবেনা কিভাবে? নজরবন্দী করে রাখবে বুঝি।

বিজন এবার আর দেরি করল না। তাড়াতাড়ি লিখল- নজরবন্দী নয় শুধু সময়ের অপেক্ষা। এই যে এখন ধরে ফেলেছি।

-ওত পেতে বসেছিলে বুঝি ধরবে বলে?

- অনেকটা সেরকম ভাবতে পার। তবে ওত পাতে শিকারীরা আর বন্ধুরা করে অপেক্ষা।

- তাই বুঝি। তাহলে বন্ধু বলে স্বীকার করলে।

-অজানা কে জানার জন্য কিছু একটা দিয়ে শুরু করতে হয়। আমাদের না হয় বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হোক।

-আচ্ছা এতো বছর পর আবার ফেসবুকে আসার কারণ কি?

-তেমন কোনো কারণ নেই। অনেকদিন পর ইচ্ছা হল তাই। অকারণটাই কারণ হিসাবে ধরে নাও।

-ধরেই যদি নেবো তাহলে জিজ্ঞাসা করলাম কেন?

-আসলে, আফিসে একটা স্কুল ফ্রেন্ডের সাথে দেখা। সেই জিজ্ঞাসা করল ফেসবুকে আছি কি না। তাই একটু উঁকি মারা। তা তুমি কি করে জানলে আমি অনেক বছর পর ফেসবুকে এসেছি?

-তোমার লাস্ট আপডেট দেখাচ্ছে  july 2015। সেই লাস্ট ছবি দিয়েছো। তারপর আর কোনো কিছু নেই।

-বাঃ বাঃ! তোমার তো দেখছি বেশ গোয়েন্দা প্রতিভা আছে। ক্রাইম প্যাট্রোল থেকে ডাক এলো বলে।

-তুমি উঁকি মারতে এসেই একটা মেয়ের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আর মেসেজ শুরু। তোমার মেয়েভাগ্য তুঙ্গে দেখছি। বাড়ির বাইরে পাত্রীর বাবাদের লাইন লাগলো বলে।

-আচ্ছা। আওয়াজ দেওয়া হচ্ছে?

-তোমারটা বুঝি অন্য কিছু ছিল?

অনামিকার রিপ্লাই দেখে মুচকি হাসল বিজন। উত্তরে কি বলবে কিছু খুঁজে পেল না। একটু ভেবে নিয়ে লিখল,- তোমার কোনো ছবি নেই প্রোফাইলে। তুমি আসলে কে সেটা বুঝবো কি করে?

-তোমার প্রশ্নটা ঠিক এটা নয়। তোমার আসল প্রশ্ন আমি মেয়ে না ফেক প্রোফাইল থেকে চ্যাট করছি?

-বুঝেই যখন গেছ তাহলে উত্তরটা দিয়ে দাও।

প্রায় মিনিট পাঁচেক কোনো উত্তর এলো না অনামিকার দিক থেকে। তারপর একটা অডিও ফাইল পাঠাল সে।

অডিও ফাইলটা প্লে করতেই একটা মেয়েলী কন্ঠে গান বেজে উঠল-‘ল্যাগ যা গলে’।

গানের প্রথম দুটো লাইন শেষ হওয়ার পর একই কন্ঠ বলে উঠল-‘হাই বিজন। এবার বিশ্বাস হল তো।’

বিজন মোহিত হয়ে আবার প্লে করল অডিও ফাইলটা। ওদিক থেকে রিপ্লাই এলো-“ কি হল? কোথায় হারিয়ে গেলে?”

-তুমি কি রোজ রসগোল্লা খাও?

-এটা কেমন প্রশ্ন? গান শুনে বুঝি রসগোল্লার কথা মনে পড়ল?

-অনেকটা তাই। শিব যেমন বিষ খেয়ে নীলকণ্ঠ হয়েছে তেমনই হয়তো তুমি রসগোল্লা খেয়ে এমন মিষ্টি কন্ঠ বানিয়েছ।

-ইস্। এমন উপমা শোনালে আমার এখন রসগোল্লা খেতে ইচ্ছা করছে। দেখে ফ্রিজ থেকে কিছু ঝাঁপা যায় কি না।

-তুমি ফ্রিজ থেকে এখন রসগোল্লা চুরি করতে যাচ্ছ ? ধরা পড়লে একেবারে কেলেঙ্কারি কেস।

-ওরে আমার সাধু পুরুষ রে, নিজে যেন কোনো দিন বাবার পকেট থেকে টাকা ঝাঁপেনি। আর আমার বাবার ফ্রিজ থেকে চুরি করছি, অন্যের বাবার নয়।

-অল দা বেস্ট। তা আমার শেয়ার দেবে না ?

-ধরা পড়লে যেটা পাব সেটা পুরোটা তোমায় দেব। খুশি তো?

-থাক। তোমার রসগোল্লা তুমি খাও আমি গান শুনেই খুশি।

মিনিট দুই নীরবতার পর অনামিকা লিখে পাঠাল- “মিশন সাক্সেস। দুটো মেরে দিলাম।“

-বাঃ। তোমার তো দেখছি বহুমুখী প্রতিভা। তা আর কি কি প্রতিভা আছে?

- বাকি প্রতিভা ক্রমশ প্রকাশ্য। আপাতত নিদ্রাদেবীর স্মরণাপন্ন হতে হবে।

- এতো তাড়াতাড়ি ! এইতো সবে কথা শুরু হল এর মধ্যেই বিদায়ের সুর।

- ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখো। বারোটা বাজল বলে। এখন না ঘুমালে আমার ঘুমের বারোটা বেজে যাবে।

সময়টা দেখে বিজন একটু চমকে উঠল। এতো তাড়াতাড়ি দু-ঘন্টা কোথা দিয়ে কেটে গেল বুঝতেই পারল না। বুঝতে পারল আজ আর কথা হবে না। তাই লিখে পাঠাল,- “আবার কখন কথা হবে ?”

-আজ যেমন হল।

একে অন্যেকে শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নিল। বিজন কম্পিউটার বন্ধ করে বিছানায় এলো। ভালো সময় কেন যে এতো তাড়াতাড়ি কেটে যায় সেটাই ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে উঠে ফেসবুক খুলে সুপ্রভাত জানাল অনামিকাকে। কিন্তু সারাদিন কেটে গেল অনামিকার কোনো দেখা নেই। একটা চাপা অস্বস্তির মধ্যে সারাদিনটা কেটে গেল। যথারীতি রাতের খাওয়া সেরে ফেসবুক খুলে বসল বিজন। ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘর ছুঁতেই অনামিকার চ্যাট বক্সের সবুজ আলোটা জ্বলে উঠল। সাথে সাথে একটা মেসেজ এলো- “শুভ সন্ধ্যা”

- ভেবেছিলাম সুপ্রভাতের উত্তরে শুভরাত্রি পাবো।

- একটা চাপা রাগের আভাস পাচ্ছি। সারাদিন বুঝি অপেক্ষা করছিলে?

- কেন? তুমি বুঝি চাও যে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করি?

- ঈশ্ ! অভিমান দেখছি আকাশ ছুঁয়েছে। সারাদিন কাজের পর এতক্ষণে যে সময় পেলাম।

- রাত দশটার সময় যদি সন্ধ্যা হয়ে থাকে আর সেটা যদি চন্দ্র সূর্য জানতে পারে তাহলে এখুনি তারা ধর্মঘট করবে ধর্মতলার মোড়ে।

- তাই বুঝি ! তাহলে তাদের স্লোগান কি হবে ? “ধর্মতলার মোড়ে, একফালি চাঁদ আটকে গেছে ইলেক্ট্রিকের তারে।“

-তা জানি না। তবে তোমায় ইলেক্ট্রিক শক্ দেওয়ার সুযোগ পেলে ছেড়ে দেবে না।

- কেন? আমি বুঝি তাদের আটকে রেখেছি?

- অবশ্যই। গায়ের জোরে রাতকে সন্ধ্যা বলে সময়কে আটকে দিয়েছ।

- বাঃ রে! কবি লেখকরা নিজেদের লেখায় সময় থমকে দাঁড় করিয়ে দেয় তখন কিছু হয় না আর আমি করলেই দোষ?

- আচমকা একরাশ অনুভূতির টানাপোড়েনের ভিড় মানসিক ভাবে স্থাবর করে দিলে তখনই সময় থমকে দাঁড়ায়। এবার বল এরমধ্যে তোমার কোনটা হয়েছে ?

- আমার তো কিছুই হয়নি। যা হওয়ার তোমার হয়েছে।

- কি রকম ?

- এই যে সারাদিন অপেক্ষা করার পর দশটা বাজার সাথে সবুজ আলো জ্বলে ওঠা, একটা মেসেজ আসা, সব মিলিয়ে ক্ষণিকের জন্য ভিড় করা অনুভূতির টানাপোড়েন- সময় যে সেখানেই থমকে গিয়েছিল তোমার কাছে, তোমার অজান্তে।

-তুমি দেখছি আমার মনের খবর আমার আগে পড়ে ফেলছ। কি নিয়ে পড়াশুনা করেছ তুমি- সাইকোলজি?

- কিছু কৌতূহল অপূর্ণ থাকাই ভালো। সব জেনে গেলে যে জানার আগ্রহ শেষ হয়ে যায়।

- তা ঠিক। কিন্তু কিছুই যে জানা হয়নি তোমার সম্পর্কে।

- নাম, ধাম, গোত্র, বাসস্থান, কর্ম আর কর্মস্থান। নিজের মতো বসিয়ে নাও। ঠিক-ভুলটা আপেক্ষিক। আজ যা ভুল, কে জানে কাল হয়তো তা ঠিক। সময় যে প্রবাহমান।

-হুঁ। আর তুমি সেই প্রবাহমান সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছো।

- অবশ্যই। কেন তুমি বুঝি দাও নি ?

-না। আমার সময় যে থমকে গেছে ঘড়ির কাঁটার দশটায়।

- শুনেছি, রাত বাড়লে নেশা বাড়ে। তোমার দেখছি নেশা মাথায় চড়ে বসেছে।

- তোমার বুঝি রাত হয়েছে? এই না বললে সবে কলির সন্ধ্যা।

- কাল যে সোমবার। কাজ নেই বুঝি?

- কালটা কাল বুঝবো। আজ যে আছো তুমি।

- যদি কাল না থাকি কি করবে তুমি?

- রাত জাগা তারা হয়ে অপেক্ষা করব এক অন্য কালের জন্য যেখানে থাকবে তুমি।

- তুমি বড়ই কল্পনাপ্রবণ। বাস্তব কিন্তু অনেক আলাদা।

- স্বপ্ন না থাকলে সেটা সত্যি করার ইচ্ছাটাও যে থাকে না।

- তা কি স্বপ্ন দেখছ?

- আমার স্বপ্নে এসো। নিজ চোখে দেখে নাও।

- ভারি তোমার স্বপ্ন। বয়ে গেছে আমার দেখতে।

- আমন্ত্রণ পত্র প্রত্যাখ্যান করছো। বিনা পত্রে প্রবেশ নিষেধ – সেটা জানতো ?

- তোমার স্বপ্ন বুঝি সার্কাস শো? টিকিট কাটলে তবেই দেখতে পাওয়া যাবে?

- অনেকটা তাই। আমন্ত্রণ পত্র বল আর টিকিটই বল, ওটা না থাকলে অনুভূতির স্রোতে গা ভাসাতে পারবে না যে।

- আমি সাঁতার জানি না। স্রোতে গা ভাসাতে গিয়ে ভরা ডুবি হয় যদি?

- স্বপ্নে মানুষ বাঁচে, তাই ডুবে গেলেও মরে যাবে না।

- আশার আলো দেখাচ্ছো তাহলে। লাই্টম্যান হয়ে গেলে নাকি?

- শুধু আশা নয়, ভরসার হাতও বাড়িয়ে দিলাম। 

- হাত যখন বাড়িয়েছো আলোটা বন্ধ করে দাও আর নিদ্রাদেবীর স্মরণাপন্ন হও। সময় বলছে সোমবারের একটা ঘন্টা শেষ হতে চলেছে।

- উফ্! তোমার সাথে কথা বলতে এলেই ঘড়িটা ঘোড়া হয়ে যায়। যাই হোক, কাল আসবে তো ? আমি অপেক্ষায় থাকব একই সময়ে।

- জানি না। কিছুটা অনিশ্চিত থাক। সব কিছু নিশ্চিত হয়ে গেলে মজাটাই হারিয়ে যায় যে।

- তবুও ?

- শুভরাত্রি।

- শুভরাত্রি ও সুপ্রভাত।

অনামিকার চ্যাট বক্সের আলোটা আরও কিছুটা সময় সবুজ হয়ে রইল। তারপর সেটা নিভে যেতে বিজন নিজের রুমের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।

সারা সপ্তাহ কাজের ব্যাস্ততার মধ্যেও রাত দশটার সময় ফেসবুক খুলতে ভুল করেনি বিজন। কিন্তু অনামিকার কোনও সাড়াশব্দ পেল না। অধীর অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকল উইকেন্ডের আশায়। কিন্তু সেখানেও অনামিকার দেখা নেই। কয়েকটা মেসেজ পাঠিয়েছিল বিজন। কিন্তু সেগুলো আন্ সিন হয়েই পড়ে আছে চ্যাট বক্সে। কিছু না জানিয়ে এভাবে অনামিকার চলে যাওয়াটা বিজন মন থেকে মেনে নিতে পারছিল না। একটা অন্যমনস্কতা সারাক্ষণ তাকে ঘিরে থাকত। অনামিকার পাঠানো গানটা বার বার শুনত। সারাদিন অপেক্ষা করত রাত দশটা বাজার। আর রাত দশটা বাজলেই সব কিছু ছেড়ে ফেসবুক খুলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত অনামিকার চ্যাট বক্সের আলোটার দিকে- সবুজ হয়ে জ্বলে ওঠার অপেক্ষায়।

এক দুই করে দেখতে দেখতে প্রায় ছ’টা উইকেন্ড কেটে গেল কিন্তু অনামিকার চ্যাট বক্সের আলো আজও ফ্যাকাশে। রাতের খাবার খেয়ে কিছু একটা ভেবে তাড়াতাড়ি অনামিকার প্রোফাইল খুলে দেখতে লাগল বিজন। অনামিকার শেষ আপডেট অঞ্জন দত্তের একটা গান শেয়ার করা। শেয়ার করার ডেট ও টাইম দেখে বুঝল যে রাতে শেষ কথা হয়েছিল অনামিকার সাথে সেই সময় শেয়ার করেছিল। গানটা প্লে করার সাথে সাথে ঢং ঢং করে দেওয়াল ঘড়িটা দশটা ঘণ্টা বাজিয়ে রাত দশটার সংকেত দিল। বিজন চেয়ারের উপর গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। বাতাসে অঞ্জন দত্তের গলায় ভেসে এলো – “আমি আসবো ফিরে, ফিরে আসবো তোমার পাড়ায়।”

কবিতা

মরুমহীরুহ
ভাস্কর সিনহা, দোহা, কাতার 
 
পশ্চিমের না কি, উত্তরাগত সেই হাওয়া?
সব এলোমেলো, খেঁজুরে পাতার
অবিন্যস্ত রূপে পাওয়া। থমকে এসে দুয়ারে
শুষ্ক নিম ডাল, আধো ভঙ্গুর, হতভাগ্য পাতা।
উত্তরের সাগর মুকুটে, পূর্বে জনপদ,
এই মরুদেশে পথহারা তাই, ঢুঁড়ে মরেছি 
যোজন বিস্তর। খুঁজে ফিরি সুবর্ণ মরীচিকায়
ঘুমে- আধোভ্রমে, গৃহস্থ মোরগের সুপ্রভাতীয় 
বন্দনায়। কুয়াশাময় সেই প্রহেলিকা-
আদ্য়ন্ত নগ্ন যে, বাহুডোরে আগলে রেখেছে
নগ্নিকারে। রসায়নে সিক্ত হয়ে জন্মিছে আখ্যান-
প্রেমে, আবেগে, আবিষ্ট বীজ মন্ত্র যে মহীরুহতার। 
শাখা-প্রশাখায় আকাশ চুম্বিতে, ধর পাকড়ে
চন্দ্র-তারা। মূলস্থ সজীবতার সন্ধানে, গহন মৃত্তিকায় আপনহারা।

 


স্মৃতিসুধা 
ভাস্কর সিনহা, দোহা, কাতার 
 
তালডিংলি পেরিয়ে, ময়নাগুড়ি এড়িয়ে, তিস্তাপাড়ের মংপোতে 
হয় দেখা। ইলশেগুঁড়ির মতো বৃষ্টি ছিল সেসময়। মূর্তির জলে
মিলিয়ে যখন যায় চাপরা-মারি আর গোরুমারার আরণ্য়িক কুহকতা।
হাজারো পক্ষীর ঐক্যতানের আবেশ, মনভরা রঙ্গিন সে উচ্ছ্বাস।
টিক, শাল, শিমূল, শিরীষ আর খয়েরের উদ্দামতা পেরিয়ে,
বিষহারা পালায় রাজবংশী নৃত্য শেষে, মাগুরমারির করমে।
বন্যেরা বনেই আনন্দিত, দেখতে দেখতেই দামাল ঐরাবতে বস্কাদ্বার 
যায় যে পেরিয়ে। চালসা- খুনিয়া- ঝালং পথে বিন্দুপ্রান্তে সিন্ধুমাখা
কাঞ্চনজঙ্ঘা। পুণ্যব্রতা তোর্সায় অবগাহনে সিদ্ধপ্রাণা। চায়ের মেজাজী
আবেশ বয়ে চলে ভিজে, শীতে মোড়া ইংরেজী বাংলোয়। প্রথম প্রেম
শুরুর পথে- প্রথম কর্মে আসা, এইস্থানেই। ভোলার নয় লখুয়ার
শীতের ক্ষণেক রোদে নিষ্পাপ সেই হাসি। কেবল সাহেবের জুতাছাপ
শুকিয়ে যায় যে তার পিঠে। আর নাম না জানা এক সুবেশী নেপালী গুড়িয়ার 
উচ্চকিত হাস্য খালি ডানা ঝাপটে নামে সমতলের মেদুর পথে।

 


বিরস পরিভ্রমণ 
ভাস্কর সিনহা, দোহা, কাতার 
 
শুভাকাক্ষী হে, অতি বিরস এ চলা। কলাপত্রে পাত পেড়ে
দুই দলা কিছু জ্বালা। মদিরতার মোহ নেই যে সুলভ সুরায়-
আছে যা বিবশতায়, স্মৃতিবিবাগীতায় বা অন্তে রিক্ত বিবমিষায়।
স্বার্থকামী, স্বভূমে গগনব্যায়াপী লালসার হোমযজ্ঞে নিঃস্বের আহূতি।
প্রোজ্জ্বল যেন শীর্ষে মুকুটখানি আর অপরিবর্তনীয় সুশ্রী
কর্মকুন্ঠ সেই সিংহাসনী। নিষ্প্রভ রিক্তের চকিত পশ্চিমা নিঃশ্বাস, 
চতুর্দিকে হারায়ে গেছে যে কবে। ক্লেদাক্ত, মৃতপ্রায়, সর্বহারাগন উচ্ছিষ্টে খুঁজে 
মরে যে জীয়নকাঠি। চার্চিলে হায়, আকাল কখনোই দেখে নাই কালাপানির পাড়ে।
কোন উপায়ে এই বাঁচা? সহজিয়া আলো, বাতাসে আর জলের সন্তরণে বাঁচা যে 
অভিসম্পাতময়, পরিশ্রুতের সুদৃশ্য বিপননে দীনচেতন গেছে যে হারায়ে।
ফুরিয়ে যেতে- যেতে, প্রান্তিক হতে- হতে, খামের রোগে মাথা কুটে মরা;
হয়তো বা মরিচঝাঁপির ছাউনিতে দুঃসহ এক দমবন্ধের দানবীয় লীলা।
জালিয়ানওয়ালাবাগ বলে যে, বা ইহুদিবস্তির নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ-
মানুষে- মানুষের সাংঘাতিক শত্রু এই শুধু নিশ্চিতরূপে বলা।

রক্তচক্ষু
সন্দীপ ঘোষ, বাঁকুড়া 

রক্তচক্ষু মুদিলে ক্ষণিক 
শান্তি একটু শান্তনীড়ে।

মুদিত নয়নে ভাবিয়া ভাবিয়া সারা,
বিনাকবচে কবে লুটাইয়া দিবে উন্মত্ত কালবৈশাখী ঝড়ে।

আসিছে উত্সব, দেখিছে জনতা, 
কি হয়! কি হয়! কি হয়!
প্রকৃতির মাঝে খাদ্য খুঁজিয়া মরে,
না-- আজ আর হয়রান নয়।

আসিছে উত্সব, আসিছে উত্সব---
তন্ত্রে তন্ত্রে হইতেছে ধ্বনি,
সঠিক ঠিকানায় পৌঁছিয়া যাইবে 
              অনেকেই তাহা জানে।

অভিনব ভাবনার নাই কোন শেষ,
       কলিকালে  আছে তা যে,
নিশানা ঠিকানা নিশানায়
             হইলে অনুর্ত্তীন,
রক্তচক্ষুর দহনে পুড়িবে ঘিলু---
        ঘিলু আর রহিবে না মগজে।

হিজিবিজি
ভাস্কর সিনহা, দোহা, কাতার 
 
সরস সবুজাভ ডালে বয়স্থ পাতার কারিকুরি,
ইষৎ সবুজ বোঁটায় হলুদ ব্যাপ্তিতে মৌমাছির মধু চুম্বন।
বাউন্ডুলে সূর্যিজ্য়াঠা যবে পশ্চিমে দেবে পাড়ি, সধবার একাদশীতে
তবে চন্দ্রিমার ব্য়াকুলিত সম্ভাষণ। সিক্ত জমির বীজে ফসল 
দিয়েছে উঁকি, গোলাখানায় আজ আর নেইতো কিছুই ফাঁকি। 
পেলব হস্ত ও শুভ্র শঙ্খগুলি যেন হর্ষিত কমল বনে, দূরাবাসে এসে
ক্ষণিকের স্মৃতিপটে অবিরল ছবি জন্মায় যে মনে। আবছায়ারা 
খালি কথাই বলে ভোরের রাতে এসে। আধোভ্রমে, আধোঘুমে,
অধরা, নাধরা বাক্যবুলি কোথায় হারায় যে হেসে। বেড়ার কোন গলে,
কার্নিশের ফাঁক পেলে, শীত ঘিরে আসে, শিশির ঝরে পড়ে সঙ্গোপনে। 
ঘাসের বুকে নিম ফুলের সুঘ্রাণ, ইতি- উতি ঝরে পড়া, রহস্যের আবিলতা।
মিলিয়ে যায়, হারিয়ে যায় অজানা বুনো পথের মতো। চকিত ঝোড়ো
আবহাওয়ায় যদি ফিরে আসে কিছু হারানো বাস, ধূলিধূসর কিছু ব্যথা। নিজস্ব

প্রাপ্তিযোগের স্মৃতি- সততই মেদুর। খুঁজে ফেরা যার রঙমশাল আর হারানো সুর। 

সাঁঝের পলাশ

ভাস্কর সিনহা, দোহা, কাতার  

ফুটপাত জুড়ে ঝেঁপে নামে সাঁঝ,

আঁধারঘিরে ধরে দিবালোকের গ্লানি।

টিমটিমি জ্বলেতারাবৎ কিছু বাতি।

দগ্ধোদর কৈশোরের জ্বলৎস্বপ্ন মিশে যায় কুয়াশায়,

পোড়া ছাই ছন্নছাড়া দিগ্বিদিকে,

যেদিকে খুশী- হাওয়ায় ঘুড্ডি ওড়া। 

কিছু দলা ভস্ম জেদী, আঁকড়ে থাকে যেন পুঁটুলির পাশে।

দুদিনের এই রাগ, ক্রোধ, আবেগ  প্রশমিত যবে রমণে, লোভে, হীনতায়- সাধারণ মানে। 

দুহাতে কুশ্রীতা মেখেছি কতো?

জানে কি এক ভারতেইশত কোটি ভারত?

নিরন্নের, বাদীর- বিবাদীর, জাতির- বেজাতের, ধর্মের- অধর্মের, উচ্চ- নীচের, ভাবের- অভাবের, দুঃখের- সুখের-কারে ছাড়ি- কারে যে ধরি?

হায় রে, সব যে বসে আপনার সনে।কখনো নিজের তরে তোমারে মানিনি। ছিনিয়ে নিয়েছি-যত কুরুবিন্দ, ফিরাই দিয়াছি তব শুধু কুরব আর কুরন্ড। 

একটি

গরুর রচনা

সুদীপ্ত বিশ্বাস, রাণাঘাট

     বস্ ইন্ডিকাস সত্যিই ইন্ডিয়ার বস্ ছিল কি না জানি না, তবে এই নিরীহ প্রাণীটিকে আমরা গরু বলে এক ডাকে চিনি।গোমূর্খ বলে পরিচিত এই প্রাণীটির মাথায় সার-বুদ্ধি না থাকলেও  এর মল থেকে সার পাওয়া যায়।বোধ বুদ্ধিহীন এই প্রাণীটি ভারতবাসীর আইডল অর্থাৎ 'ইন্ডিয়ান-আইডল'। বৈদিক যুগ থেকেই গোমাতা পূজনীয় তবে গো-মতি/গো-বুদ্ধি নিন্দনীয়। হিন্দু  ধর্ম গরু ও মানুষকে ভিন্ন চোখে দেখে না।গলায় দড়ি দিয়ে গরু মরলে তার মালিককে অশৌচ পালন করতে হয়,কিন্তু গরুর সৎকারটি পার্সিধর্ম অনুসারে হয়।অর্থাৎ মৃত্যুর পরে মৃতদেহকে ভাগাড়ে ফেলে আসা হয় চিল-শকুনে খাওয়ার জন্য।ঠিক যেমন পার্সিরা মৃতদেহকে উঁচু স্থানে রেখে আসে।তবে বর্তমানে Diclofenac জাতীয় ঔষধ পশু চিকিৎসায় ব্যবহারের ফলে শকুন মারা যাচ্ছে গরুর অভিশাপে ( অর্থাৎ পৃথিবীকে আর শকুন-তলা বলা যাবে না)। এজন্য উভয় ক্ষেত্রেই মৃতদেহ সৎকারের বিকল্প পন্থা ভাবা হচ্ছে।

        গরু অতি উপকারী প্রাণী তবে কিছু ধর্মের ষাঁড় আছে (মানব সমাজেও আছে) যারা এই নামে কালিমা লিপ্ত করছে।গরুর মল মূত্র অবধি ব্যবহৃত হলেও ষাঁড়ের নাদ

রম্য রচনা

কোনও কাজেই লাগে না। সিংহনাদের মত গম্ভীর না হলেও গরুর হাম্বা ডাক কম যায় কিসে? এক বিখ্যাত সুরকার স্বজাতীয় ডাককে যথেষ্ট সম্মান জানিয়ে 'হাম্বা- হাম্বা' শব্দটিকে একটি হিন্দি চলচ্চিত্রের গানে ব্যবহার করেছিলেন। মানুষের ল্যাজও নেই গোবরও নেই, তবু কত মানুষ প্রতিনিয়ত 'ল্যাজে গোবরে' হয়। এটা কি মানুষের গো- অনুকরণ নয়? হিন্দুধর্মে গো মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ কিন্তু কোনও হিন্দু শাস্ত্রে নরমাংস ভক্ষণ বা ক্যানিবালিজম নিষিদ্ধ নয়। অর্থাৎ শাস্ত্রে গরু মানুষের চেয়ে বেশি মর্যাদা পেয়েছে। হিন্দুধর্ম ত্যাগের সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে প্রকাশ্যে গো-মাংস ভক্ষণ, এতে কর্পূরের ন্যায় উদ্বায়ী হিন্দুত্ব  ফুঁৎকারে উবে যায়। সেকালে ব্রাহ্ম সমাজের নও জোয়ানেরা প্রকাশ্যে সভা ডেকে গোমাংস ভক্ষণ করে ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করেছিল, অর্থাৎ ব্রাহ্মণত্ব অর্জনের জন্য গোমাংসের চেয়ে উৎকৃষ্ট মাধ্যম বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে বিরল। গরু মাতা অর্থাৎ 'গোমাতা' হল হিন্দুদের মাতা। তাই বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে  পঞ্চগব্য পান করতে হয়, যার দুটি প্রধান উপাদান হল গোমূত্র বা 'চোনা'। গরুর দুধের সঙ্গে চোনার সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়।যাইহোক চোনা নিয়ে বেশি আলোচনা না করাই শ্রেয় (তবে জেনে রাখা ভাল চোনার উপর আলোকপাত করাকে আলোচনা বলে)। বাঁদরের যোগ্য কিছু উত্তর পুরুষ গাছে উঠতে পটু কিন্তু এব্যাপারে গরু মানুষের থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। গরু গাছে উঠতে পারে না, তবে গল্পের গরু গাছে উঠতে দক্ষ।

     ৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। বুধবার। রাত সাড়ে ন’টা।

মেদিনীপুর জেলার খড়গপুরের বন্দিনিবাসে হঠাৎ বেজে উঠল পাগলা ঘণ্টি। প্রায় ৫০ জন পুলিশ ও ২৪ জন সিপাই ‘হুকুম মিল গিয়া’, ‘শালা লোককো মারো’, ‘রামজিকা জয়’ ধ্বনি দিতে দিতে ঘিরে ফেলল বন্দীনিবাস। তারপর ছুঁড়তে লাগল গুলি। ৮ টি পোস্টের সেন্ট্রি ও পুলিশ তাদের সঙ্গ যোগ দেয়। খাবার ঘরে ছিলেন বরিশালের কৃষ্ণপদ ব্যানার্জী। গুলিতে আহত হন তিনি। অন্য বন্দিরা তাড়াতাড়ি খাবার ঘরের আলো নিভিয়ে দেন।

বরিশালের তারকেশ্বর সেন ছিলেন সিঁড়ির নিচে। গুলি তাঁর মাথায় লাগে। সঙ্গে সঙ্গে মারা যান তিনি। ঘরের দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন সন্তোষ মিত্র। একাধিক গুলি লাগে তাঁর পেটে। তিনিও মারা যান। সে ঘরে ছিলেন শচীনচন্দ্রনাথ ঘোষ। একটা গুলি তাঁর মেরুদণ্ডে ও আর একটা গুলি তাঁর পায়ে লাগে। তাঁর পাশে ছিলেন কৃষ্ণনগরের গোবিন্দপদ দত্ত। তাঁর বাম হাতে গুলি লাগে।

এরপরে পুলিশ ও সিপাইরা সিঁড়ির উপরে উঠে একটি ঘরে বহরমপুরের সবিতাশেখর রায়চৌধুরীর উপর চড়াও হয়। বেয়নেট চার্জ করার ফলে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন ও অচৈতন্য হয়ে পড়েন। বরিশালের সুধীর সেন তারকেশ্বর সেনের রক্তাপ্লুত দেহের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পেছন থেকে গুলি করা হয় তাঁকে। পুলিশের গুলিতে আহত হন বহরমপুরের তারাপদ গুপ্ত ও বরিশালের কুঞ্জবিহারী বসু।

এরপরে পুলিশ পশ্চিম প্রান্তে দৌড়ে গিয়ে আক্রমণ করে বন্দিদের। গুলি লাগে কলকাতার সত্যেন চৌধুরী ও চট্টগ্রামের অশ্বিনী গুহের শরীরে। আক্রান্ত হন মুন্সিগঞ্জের প্রবোধ গুপ্ত। রংপুরের রমেশ চাকী ও ময়মনসিংহের নরেশ সোম গুলিবিদ্ধ হন । যশোরের হেমন্ত তরফদার লাঠি ও ব্যাটনের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঢাকার মনোহর মুখার্জীর বাম হাতে গুলি লাগে।

১৭ সেপ্টেম্বর হিজলির ঘটনা সম্বন্ধে একটি সরকারি ইশতেহার প্রকাশ করে বলা হয়:  ১৬ সেপ্টেম্বর রাত ন’টার অল্প পরে হিজলি বন্দীনিবাসের একদল রাজবন্দি চারজন সেন্ট্রির উপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালায়। এ্জন সেন্ট্রির বন্দুক থেকে তারা বেয়নেট কেড়ে নেয়, অন্য একজন তার উপর চড়াও হয়। এরকম অবস্থায় আত্মরক্ষা ও শৃঙ্খলারক্ষার জন্য তারা গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হয়। ফলে দুজন বন্দি নিহত ও কুড়ি জন বন্দি আহত হয়। আধঘন্টা পরে অবস্থা আয়ত্তে আসে।

হিজলির এই ঘটনার যে সরকারি তদন্ত হয় তার উপর স্বাভাবিকভাবে আস্থা ছিল না বন্দিদের। তাঁরা বাংলার গভর্নরের কাছে এক আবেদনে জানান: “গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাত্রিতে বন্দিদের ব্যারাকের মধ্যে তাঁহাদের শুইবার ঘরে, খাইবার ঘরে এবং হাসপাতালে গুলি বর্ষণ করা হইয়াছিল; তাহার ফলে দুইজন বন্দির মৃত্যু হয় ও বিশজন আহত হয়। বিনা কারণে, পূর্ব হইতে পরামর্শ করিয়া এবং অন্যায়রূপে এই গুলিবর্ষণ করা হইয়াছে। এই সম্বন্ধে গবর্নমেন্ট যে বিবরণ প্রকাশ করিয়াছেন তাহা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বিদ্বেষমূলক ও কল্পিত কথায় পূর্ণ।”

সরকারি তদন্তে প্রকৃত সত্য প্রকাশ পায় নি।

হিজলির হত্যাকাণ্ড সম্বন্ধে যে বেসরকারি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, সে কমিটির তদন্তের বিবরণ পাওয়া যায় নীরদরঞ্জন দাশগুপ্তের ‘হিজলির কথা’ শীর্ষক রচনায়। রচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়। বেসরকারি তদন্তে ধরা পড়েছে যে বন্দিশালার বন্দিদের সঙ্গে বড়কর্তা মিঃ বেকারের সম্পর্ক মোটেই ভালো ছিল না। গার্লিক ও আসানুল্লা হত্যার পরে বন্দিরা উল্লসিত হব এবং বন্দিশালা আলোকমালায় সুসজ্জিত করে বলে মিঃ বেকারের ধারনা হয়। ফলে তিনি বন্দিদের মাসোয়ারা কমিয়ে দেন এবং তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে থাকেন। প্রভুভক্ত পুলিশ ও সিপাইরা বন্দিদের শায়েস্তা করার কথা ভাবতে থাকে। শুধু মিঃ বেকার নন, পুলিশের ইন্সপেক্টর মিঃ মার্শালের সঙ্গেও বন্দিদের সম্পর্ক ভালো ছিল না। বেসরকারি তদন্তকারীরা তিনটি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছিলেন:

ক] আগের দিন সিপাইদের সঙ্গে বন্দিদের গোলমাল হয়েছিল। মিঃ বেকার সে গোলমাল না মিটিয়ে হিজলি ত্যাগ করে খড়গপুর চলে গিয়েছিলেন কেন?

খ] গুলিবর্ষণের আধঘন্টা পরে মিঃ বেকার এসেছিলেন ডাক্তার নিয়ে। বন্দিরা অনেকে যে গুরুতর আহত সেকথা তিনি ডাক্তারকে জানান নি। তাই ডাক্তারের পক্ষে প্রাথমিক চিকিৎসা করাও সম্ভব হয় নি।

গ] ঘটনা ঘটার প্রায় দুঘন্টার পরে আহত বন্দিদের খড়গপুরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় কেন?

হিজলি বন্দীনিবাসে ইংরেজদের এই অত্যাচারের প্রতিবাদে টাউন হলে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয় ২৬ সেপ্টেম্বর । অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ তখন কলকাতায় ছিলেন। সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য তাঁকে অনুরোধ করা হলে তিনি রাজি হন। অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, নীলরতন সরকার, সুভাষচন্দ্র বসু, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, বীরেন্দ্রনাথ শাসমল, বসন্ত মজুমদার।

টাউন হলে সভা শুরু হবার কথা ৪-৩০ মিনিটে। কিন্তু দেখা গেল বেলা তিনটের মধ্যে ভর্তি হয়ে গেছে টাউন হল। মানুষ শুনতে এসেছেন রবীন্দ্রনাথের কথা, যিনি বাংলার তরুণদের প্রতি মমতাবশত অসুস্থ শরীর নিয়েও আসছেন সভায়। রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির আধঘন্টা পূর্বে প্রমাদ গুণতে শিরি করলেন উদ্যোক্তারা। তিল ধারণের জায়গা নেই। জনতার চাপে যে কোন মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে কাঠের সিঁড়ি। তখন ঠিক করা হয় টাউন হলের পরিবর্তে সভা হবে মনুমেন্ট ময়দানে। মনুমেন্টের দিকে ছুটে চলল জনতা।

তখন মাইক্রোফোন ছিল না। খালি গলায় এত মানুষের কাছে বক্তব্য হাজির করা সম্ভব নয়। তাই ঠিক হল মুমেন্টের উত্তর ও দক্ষিণে দুটি সভা হয়ে।

সভাস্থলে সাড়ে পাঁচটায় আসেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর জন্য ইনভ্যালিড চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ বললেন:

“এতবড় জনসভায়  যোগ দেওয়া আমার শরীরে পক্ষে ক্ষতিকর, মনের পক্ষে উদভ্রান্তিজনক,  কিন্তু যখন ডাক পড়ল  থাকতে পারলুম না। ডাক এল সেই পীড়িতদের কাছ থেকে, রক্ষকনামধারীরা যাদের কণ্ঠস্বরকে নরঘাতক নিষ্ঠুরতার দ্বারা চিরদিনের মতো নীরব করে দিয়েছে।”

বৃটিশ শাসনের বিকৃতি বর্বরতা প্রসঙ্গে তিনি বললেন :

“যখন দেখা যায় জনমতকে অবজ্ঞার সঙ্গে উপেক্ষা করে এত অনায়াসে বিভীষিকার বিস্তার সম্ভবপর হয় তখন ধরেই নিতে হবে যে ভারতে বৃটিশ শাসনের চরিত্র বিকৃত হয়েছে এবং এখন থেকে আমাদের ভাগ্যে দুর্দাম দৌরাত্ম উত্তরোত্তর বেড়ে চলবার আশঙ্কা ঘটল।  যেখানে নির্বিবেচক অপমান ও অপঘাতে পীড়িত হওয়া দেশের পক্ষে এত সহজ অথচ যেখানে যথোচিত বিচারের ও অন্যায় প্রতিকারের আশা এত বাধাগ্রস্ত, সেখানে প্রজারক্ষার দায়িত্ব যাদের পরে সেই সব শাসনকর্তা এবং তাদেরই আত্মীয় কুটুম্বদের শ্রেয়োবুদ্ধি কলুষিত হবেই এবং সেখানে ভদ্রজাতীয় রাষ্ট্রবিধির ভিত্তি জীর্ণ না হয়ে থাকতে পারে না।”

এরপর সতর্কবাণী  উচ্চারিত হল তাঁর কণ্ঠে:

“এই সভায় আমার আগমনের কারণ আর কিছুই নয়,আমি আমার স্বদেশবাসীর হয়ে রাজপুরুষদের এই বলে সতর্ক করে দিতে চাই যে, বিদেশিরাজ যত পরাক্রমশালী হোক না কেন, আত্মসম্মান হারানো তার পক্ষে সবচেয়ে দুর্বলতার কারণ। এই আত্মসম্মানের প্রতিষ্ঠা ন্যায়পরতায়, ক্ষোভের কারণ সত্ত্বেও অবিচলিত সত্যনিষ্ঠায়। প্রজাকে পীড়ন স্বীকার করে নিতে বাধ্য করানো রাজার পক্ষে কঠিন না হতে পারে;

 

কিন্তু বিধিদত্ত অধিকার নিয়ে প্রজার মন যখন স্বয়ং রাজাকে বিচার করে, তখন তাকে নিরস্ত করতে পারে কোন শক্তি?...“আমি আজ উগ্র বাক্য সাজিয়ে সাজিয়ে নিজের হৃদায়াবেগের ব্যর্থ আড়ম্বর করতে চাইনে এবং এই সভার বক্তাদের প্রতি আমার বিশেষ নিবেদন এই যে, তাঁরা যান এই কথা মনে রাখেন, ঘটনাটা স্বতই আপন কলঙ্কলাঞ্ছিত নিন্দার পতাকা যে উচ্চে ধরে আছে তত ঊর্ধ্বে আমাদের ধিক্কারবাক্য পূর্ণবেগে পৌঁছাতেই পারবে না।..... ” [প্রবাসী, কার্তিক, ১৩৩৮] স্যার নীলরতন সরকারের প্রস্তাব অনুসারে হিজলির ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটির আহ্বায়ক জে এম সেনগুপ্ত। সদস্যরা :  আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, স্যার নীলরতন সরকার, বীরেন্দ্রনাথ  শাসমল, সুভাষচন্দ্র বসু,  টি সি গোস্বামী, সুরেশচন্দ্র মজুমদার, অশ্বিনীকুমার গাঙ্গুলী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রভুদয়াল সিংকা, কিরণশঙ্কর রায়, বিমলপ্রতিভা দেবী, ঊর্মিলা দেবী, শান্তি দাস, হেমন্তকুমার বসু, অমরেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জী, সতীন্দ্রনাথ সেন, নরেন্দ্রনারা্যণ চক্রবর্তী, হরিকুমার চক্রবর্তী, অরুণাংশু দে, মৌলানা আক্রম খাঁ, অবিনাশ ভটাচার্য, মৌলভী মুজিবর রহমান।

হিজলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের যে ঘৃণা ও ক্রোধ সৃষ্টি হয়েছিল তাকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করার ব্রত নিয়েছিল দুটি পত্রিকা: ইংলিশম্যান ও স্টেটসম্যান। পরের পত্রিকাটি যখন হিজলির কারারক্ষীদের অপরাধ লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করে তখন, তখন রবীন্দ্রনাথ সেই পত্রিকার উদ্দেশ্যে একটি চিঠি পাঠান অমল হোমের হাতে। পত্রিকা সম্পাদক অমল হোমকে চিঠিটি ফেরত দিয়ে বলেন যে এ চিঠি প্রকাশ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

‘হিজলিকারার যে রক্ষীরা সেখানকার দুজন রাজবন্দীকে খুন করেছে তাদের প্রতি কোন একটি আ্যংলো ইন্ডিয়ান সংবাদপত্র খ্রিস্টোপদিষ্ট মানবপ্রেমের পুনঃপুনঃ ঘোষণা করেছেন। অপরাধকারীদের প্রতি দরদের কারণ এই যে, লেখকের মতে, নানা উৎপাতে তাদের স্নায়ুতন্ত্রের পরে এত বেশি অসহ্য চাপ লাগে যে, বিচারবুদ্ধিসঙ্গত স্থৈর্য তাদের কাছে প্রত্যাশাই করা যায় না । এইসব অত্যন্ত চড়ানাড়িও্য়ালা ব্যক্তিরা স্বাধীনতা ও অক্ষুণ্ণ আত্মসম্মান ভোগ করে থাকে; এদের বাসা আরামের, আহার-বিহার স্বাস্থ্যকর, এরাই একদা রাত্রির অন্ধকারে নরঘাতক অভিযানে সকলে মিলে চড়াও হয়ে আক্রমণ করলে সেই সব হতভাগ্যদেরকে যারা বর্বরতম প্রণালীর বন্ধনদশায় অনির্দিষ্টকালব্যাপী অনিশ্চিত ভাগ্যের প্রতীক্ষায় নুজেদের স্নায়ুকে  প্রতিনিয়ত পীড়িত করছর। সম্পাদক তার সকরুণ প্যারাগ্রাফের স্নিগ্ধ প্রলেপ প্রয়োগ করে সেই হত্যাকারীদের পীড়িতচিত্তে সান্ত্বনা সঞ্চার করেছেন।

‘অধিকাংশ অপরাধেরই মূলে আছে স্নায়বিক অভিভূতি এবং লোভ-ক্লেশ-ক্রোধের এত দুর্দম উত্তেজনা যে তাতে সামাজিক দায়িত্ব ও কৃতকার্যের পরিণাম সম্পূর্ণ ভুলিয়ে দেয়। অথচ এরকম অপরাধ স্নায়ুপীড়া বা মানসিক বিকার থেকে উদ্ভূত হলে আইন তার সমর্থন করে না; করে না বলেই মানুষ আত্মসংযমের জোরে অপরাধের ঝোঁক সামলিয়ে নিতে পারে। কিন্তু করুণার পীযূষকে যদি বিশেষ যত্নে কেবল সরকারি হত্যাকারীদের ভাগেই পৃথক করে যোগান দেওয়া হয় এবং যারা প্রথম হতেই অন্তরে নিঃশান্তির আশা পোষণ করছে, যারা বিধিব্যবস্থার রক্ষকরূপে নিযুক্ত হয়েও বিধিব্যবস্থাকে স্পর্ধিত আস্ফালনের সঙ্গে ছারখার করে দিল, যদি সুকুমার স্নায়ুতন্ত্রের দোহাই দিয়ে তাদেরই জন্য একটা স্বতন্ত্র আদর্শের বিচার পদ্ধতি মঞ্জুর হতে পারে, তবে সভ্যজগতের সর্বত্র ন্যায়-বিচারের যে মূলতত্ত্ব স্বীকৃত হয়েছে তাকে অপমানিত করা হবে এবং সর্বসাধারণের মনে এর যে ফল ফলবে তা অজস্র রাজদ্রোহ প্রচারেও সম্ভব হবে না।

‘বে-আইনি অপরাধকে অপরাধ বলেই মানতে হবে এবং তার ন্যায়সঙ্গত পরিণাম যেন অনিবার্য হয় এইটেই বাঞ্ছনীয়। অথচ এ কথাও ইতিহাস বিখ্যাত যে  যাদের হাতে সৈন্যবল ও রাজপ্রতাপ অধবা যারা এই শক্তির প্রশ্রয়ে পালিত, তারা বিচার এড়িয়ে এবং বলপূর্বক সাধারণের কণ্ঠরোধ করে ব্যাপকভাবে ও গোপন প্রণালীতে দুর্বৃত্ততার চূড়ান্ত সীমায় যেতে কুণ্ঠিত হয় নি। কিন্তু মানুষের সৌভাগ্যক্রমে এরূপ নীতি শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারে না।’ [ প্রবাসী, অগ্রহায়ণ, ১৩৩৮]

হিজলিতে গুলি চালনার পরের দিন থেকে বন্দিরা অনশন করেছিলেন। কোন নেতার কথায় তাঁরা অনশমন ভঙ্গ করতে রাজি হন নি। বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথের মর্মস্পর্শী আবেদনে তাঁরা সাড়া দিলেন। সেই কারণে ঊর্মিলা দেবী হিজলি গিয়েছিলেন। ফিরে এসে তিনি জানালেন যে বন্দিরা রবীন্দ্রনাথের কথায় অনশন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

মাস দুয়েক পরেই ছিল ২৫শে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। হিজলির বন্দিদের পক্ষ থেকে সুধীরকিশোর বসু কবিকে পাঠান এক অভিনন্দন পত্র:

                  

হিজলি রাজবন্দিগণের অভিনন্দন

বাংলার একতারায় বিশ্ববাণীর ঝংকার তুলিয়াছ তুমি, হে বাউল কবি, তোমার জন্মদিনে আজ তোমাকে প্রণাম করি।

সংকীর্ণ-স্বার্থ-সংকুচিত দ্বন্দ্বপর বিশ্বসমাজকে মৈত্রী করুণা ও কল্যাণের মন্ত্র দান করিয়াছ তুমি, হে বিশ্বকবি, তোমার জন্মদিনে আজ তোমাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করি।

বন্ধন-বিমূঢ় অবমানিতের মর্মবেদনাকে ভাষা দান করিয়াছ তুমি, হে দরদী, তোমার জন্মদিনে আজ তোমার কল্যাণ কামনা করি।

বিশ্বদেবতার চরণে গীতাঞ্জলি দান করিয়া বিশ্বের বরমাল্য লাভ করিয়াছ তুমি, হে গুণী, তোমার জন্মদিনে আজ তোমাকে অভিনন্দিত করি।

এই শ্রদ্ধাঞ্জলি তুমি গ্রহণ কর।

ইতি

রাজবন্দীগণ

হিজলির রাজবন্দীদের অভিনন্দনপত্রের প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ লেখেন:

কল্যাণীয়েষু,

কারান্ধকার থেকে উচ্ছ্বসিত তোমাদের অভিনন্দন আমার মনকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছে। কিছুতে যাকে বদ্ধ করতে পারে না, সেই মুক্তি তোমাদের অন্তরে অবারিত হোক, এই কামনা আমি করি।

ইতি

সমব্যথিত

শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২২ জানুয়ারি, ১৯৩২

এই প্রসঙ্গে কবির বিখ্যাত ‘প্রশ্ন’ কবিতাটির কথা উল্লেখ করা যায়। কবিতাটি লিখিত হয়েছিল ১৩৩৮ সালের পৌষ মাসে।  ১৮ লাইনের এই কবিতায় আক্রান্ত জাতির সংবেদনশীল প্রতিনিধির প্রশ্ন যেন বিশ্ববিধানকে বিদ্ধ করেছে।

প্রথম ৬ লাইনে সভ্যতার ইতিহাসকে সামনে রেখে কবি  মানুষের বর্বরতার কারণ খুঁজতে চেয়েছেন। যুগে যুগে  প্রীতি ও প্রেমের বাণী নিয়ে এসেছেন মহামানবরা। বিপর্যস্ত বর্তমানে দাঁড়িয়ে কবির মনে হয় সেসব বাণীর উত্তরাধিকার অবলুপ্ত। নরঘাতক নিষ্ঠুরতার নীরন্ধ্র অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছে তার শেষ আলোকরশ্মি। দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত বাতাসকে কলুষিত করে দিয়েছে স্বার্থ, লোভ আর লালসার বিষ:

      ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে

      দয়াহীন সংসারে,

      তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল ‘ভালোবাসো’   

      অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো।

      বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির দ্বারে

      আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।

পরবর্তী ছয়টি লাইনে কবি শাসকশক্তির অত্যাচারের ইঙ্গিতগর্ভ বিবরণ দিয়েছেন। স্তবকটি শুরু হয়েছে ‘আমি যে দেখেছি’ বলে। প্রত্যক্ষদর্শীর নির্ভীক উচ্চারণ যেন। নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা নেই:

আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে

হেনেছে নিঃসহায়ে;

আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে

বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে;

আমি যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে

কি যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।

এই নিষ্ঠুরতা আর বর্বরতা কবিকেও ক্ষত-বিক্ষত করেছে। মানবতার চরম অবমাননায় কবি যন্ত্রণাদগ্ধ:

কন্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সঙ্গীতহারা,

অমাবস্যার কারা

লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে-

বিশ্ববিধান কি এই অন্যায়-অবিচার, এই নরঘাতন নিষ্ঠুরতা মেনে নেবে?

সেটাই কবির প্রশ্ন:

তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে—

যাহারা  তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, 

তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

গল্প 

  নয়নতারার

সাজিদ

রীণা নন্দী

নয়নতারা আজকাল মাঝে মাঝেই স্বপ্ন দেখে, নীল আকাশের বুক চিরে উড়ছে সাজিদ। তার চিত্র-বিচিত্র দুই ডানা বাতাস কেটে কেটে ভাসিয়ে নিয়ে আসছে তাকে।  মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নয়নতারার দিকে উড়ে আসছে সে। তাকে তুলে নেবে পিঠে। দুই ডানার আড়াল দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে তাকে মেঘের মধ্যে দিয়ে। নয়নতারা উন্মুখ অপেক্ষায় উপর দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

    আস্তাবলটায় এতগুলো ঘোড়া রয়েছে – প্রায় চল্লিশ বিয়াল্লিশটা। তবে ছটফটে কালো ঘোড়াটার কদরই আলাদা। কত লোক যে এসে খোঁজ করে মাহাতোর কাছে। উমানাথ মাহাতো দেখভাল্‌ করে এইসব রেসের ঘোড়াদের।

     মাহাতো জানে ঘোড়ার দলের মধ্যে সটান চেহারার ঘন কালো চিকন চামড়ার সাজিদের দর আছে। ও যখন পিঠে জকির বোঝা নিয়ে তীব্র বেগে দৌড়য় নাক মুখ দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোয়। জকির চাবুকের এক এক মারে পিঠ টান হয়ে যায়। মাহাতো বোঝে, দু’পাশ আঁধার, শুধু সামনের দৌড় শেষ করার জায়গাটা চোখে ভাসে ঘোড়াটার।

     সুন্দর সাজগোজ করা, জুতো খট্‌খটিয়ে মেমসাহেবরা আসে। ফটর ফটর ইংরিজি বলে, এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে চিকনদার ঘোড়াটাকে দেখে। ওদের পছন্দ হয় ঘোড়াটাকে। সাহেবরা বুঝতে চেষ্টা করে ; টাকা ঢাললে কতটা দিতে পারবে ঘোড়াটা।

     আগে লোকজন কাছে ঘেঁষলে ভয় পেতো ঘোড়াটা। মাহাতো বোঝে, সাজিদ আজকাল আগের মত আর ভয় পায়না। উদাসিন চোখে দেখতে থাকে এইসব বাবু বিবিদের। শুধু একটা লেড়কি আছে – সে এলে সাজিদ খুশি হয়। খুরে আওয়াজ তুলে খট্‌ খট্‌ খট্‌ খট্‌ – নাচের বোল তোলে। ও এই ভাবে খুশি জানায়। মাহাতো ঘোড়াদের মন বুঝতে পারে। কতকাল হয়ে গেল ওদের সঙ্গে রয়েছে !

     প্রায় আসে মেয়েটা। মাহাতো জানে, রেসের ঘোড়া খুঁজতে আসে না ও। ওইসব পকেটে রূপিয়া ভরতে আসা বাবু - বিবিদের মত নয় ও লেড়কি। লেড়কিটা মন বোঝে। মাহাতোকে সবাই এলেবেলে এক মানু্ষ মনে করে। নিজেদের প্রয়োজনে কথা বলে শুধু। নয়তো কথাই বলে না। যেন কথা বলবার মত মানুষই নয় ।  ঐ লেড়কিটা কিন্তু মাহাতোর সঙ্গে কত ভালোভাবে কথা বলে। ওর ঘরের খোঁজ নেয়। সপ্তাহের মধ্যে একদিন কি দু’দিন আসে। মাহাতোর থেকে সাজিদের কথা জানতে চায়। – ‘ ওর তবিয়ত ভালো আছে তো চাচা ? ঠিকঠাক দানাপানি খায় ? না কি নখ্‌রা দেখায় ? ’

     – ‘ না গো দিদি, তবিয়ত ভালো আছে। তবে দানাপানি খেতে যেন মন নেই ক’দিন।

     – ‘ মন ভালো নেই না কি ! ’

    মাহাতো বোঝে, লেড়কির সাজিদের উপর মন পড়ে গেছে। একটু অবাকও হয় ভেবে। আসলে এমন তো বড় একটা দেখা যায় না।

      নয়নতারার ঘুরে ঘুরে কাজ। কোম্পানীর ওষুধ নিয়ে দোকানে, দোকানে, ডাক্তারখানায় যাওয়া, অপেক্ষা করা। দোকানদারদের সঙ্গে ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে কথা বলা। তবু সে ঠিক সময় বার করে নেয়। ঘোড়াদের আস্তাবলটা টানে তাকে। বলা ভালো কালো ঘোড়াটার সুতীব্র টান সে এড়াতে পারে না। আস্তাবলটায় সকালের দিকে যায় নয়নতারা। ঝিমোয় তখন সাজিদ। প্রথমদিকে নয়নতারা অবাক হয়েছিল – কেমন মানুষের মত নাম ঘোড়াটার ! মাহাতো বলেছিল, ‘ ঘোড়াদের ডাক্তারবাবু ওর জন্মের সময় নামটা রেখেছিল। ’

      নয়নতারা ভাবে, ও মানুষের থেকে কম কি ! কেমন নাম ডাক। নিজের কাজে কি পারফেকশন্‌ ! আবার মেজাজিও বেশ। ভালবাসলে কেমন বোঝে। ভেতরে ভেতরে গলে যায় আহ্লাদে। যারা আসে শুধুই রেস খেলে নিজেদের পকেটের টাকা বাড়াতে কিংবা রোমাঞ্চের স্বাদ নিতে – তাদের সামনে কেমন গুমোর দেখায়। তখন দেখবেই না ওদের দিকে। একমনে ঘাস খেয়ে যায়। জকিগুলো টেনে সামনে আনতে চাইলে জেদি পুরুষের মত ঘাড় বেঁকিয়ে রাখে অন্যদিকে। যেন বুঝিয়ে দিতে চায়, তার মর্জিটাই আসল। ইচ্ছে না হলে এক চুলও নড়বে না।

       অথচ নয়নতারা দেখেছে, সে কাছে গেলে কি খুশি। চোখগুলো জ্বলজ্বল করে তখন। কখনো আবার তেরছা চোখে তাকায় নয়নতারার দিকে। তার কপালে ঘাড়ে মুখ ঘসবে। আদরে আহ্লাদে হাতে জিভ বুলিয়ে দেবে। নয়নতারা যখন আসে ওর গা ঘেঁষে বসে থাকে অনেকক্ষণ। ঘাস খেতে খেতে দেখে তাকে সাজিদ। একটুখানি দূরে গিয়ে আবার ফিরে আসে ও তার কাছে। লেজের চামর গায়ে বুলিয়ে দেয়। আরামে নয়নতারার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয় নয়নতারা।

    কোন কোনদিন দেখে ওর মসৃণ চামড়ায় চাবুকের কেটে বসে যাওয়া দাগ। দৌড়ের উত্তেজনায় পিঠে বসা জকির ছিপ্‌টির সজোরে আঘাত ওগুলো। আঙুলের ছোঁওয়ায় বুঝতে পারে সে ; কোন্‌টা পুরনো আর কোন্‌টা সদ্য তৈরী হওয়া ক্ষত। নয়নতারার হাতের স্পর্শে চোখ বেয়ে যেন জল গড়িয়ে পড়বে – এমনই ছলছল করে সাজিদের চোখ দু’টো।

      নয়নতারার মন চায় সেই মুহূর্তে কোন জাদুবলে সব যন্ত্রণার নিরসন করে দিতে। কিন্তু পারে না। তার তো কোন জাদু জানা নেই। রাগে, দুঃখে, হতাশায় চোখে জল এসে যায় নয়নতারার। সাজিদের গালে গাল ঠেকায়। ফিস্‌ফিস্‌ করে বলে, ‘ খুব কষ্ট হচ্ছে সাজিদ ? ’

        ঘাড় নাড়ায় মাঠের কালো বিদ্যুৎ। নয়নতারার আদরে কেমন স্নিগ্ধতা নেমে আসে ওর মুখ চোখে। মৃদু হ্রেস্বাধ্বনিতে নয়নতারাকে নিজের খুশি বোঝায়। পাক খায় ওকে ঘিরে। মুখে মুখ ঘসে ভালবাসা জানায়।

      নয়নতার সাজিদের কানে কানে বলে, ‘ আমি একদিন ঠিক তোমাকে এই রেসের মাঠের আস্তাবল থেকে মুক্তি দেব। তখন আর তোমাকে মুখে ফেনা তুলে ছুটতে হবে না। পাই পাই চুকিয়ে দেব ওদের ।  তোমার জন্য দিন রাত এক করে রোদ জল মাথায় নিয়ে খাটছি সাজিদ । ’ নয়নতারা যেন প্রতিশ্রুতি দেয়। এক বন্দি প্রাণকে মুক্তির স্বপ্ন দেখাতে চায়।

     সে আজকাল সত্যিই সারাক্ষণ মুখে ফেনা তুলে ছুটে বেড়ায়। এক ওষুধের দোকান থেকে আর এক দোকান, সে দোকান থেকে অন্য দোকান, ডাক্তারবাবুদের চেম্বার। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। আরো বাড়াতে হবে টার্গেট। অনেক টাকা চাই তার। চড়া রোদ, অঝোরে বৃষ্টি – কিছুই আটকাতে পারে না তাকে। হাওয়ায় উড়তে থাকা চুল, লাল হয়ে যাওয়া চোখ মুখ, কাঁধে ভারি ব্যাগ – যেন এক পাগলাটে অশ্ব-নারী ছুটে বেড়ায়।

     নয়নতারা আজকাল মাঝে মাঝেই স্বপ্ন দেখে, নীল আকাশের বুক চিরে উড়ছে সাজিদ। তার চিত্র-বিচিত্র দুই ডানা বাতাস কেটে কেটে ভাসিয়ে নিয়ে আসছে তাকে।  মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নয়নতারার দিকে উড়ে আসছে সে। তাকে তুলে নেবে পিঠে। দুই ডানার আড়াল দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে তাকে মেঘের মধ্যে দিয়ে। নয়নতারা উন্মুখ অপেক্ষায় উপর দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

প্রবন্ধ

সোমেন চন্দের জীবন সম্বন্ধে

তথ্যচিত্রের খসড়া শিল্পী আক্রান্ত

দিলীপ মজুমদার 

পর্ণশ্রী, কলকাতা 

বিভিন্ন ভঙ্গিমায় সোমেন । বইপত্র নাড়ছে, পড়ছে, লিখছে । ভাষ্য : শুধুমাত্র সাহিত্যের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চাননি সোমেন । মানুষের মুক্তিপথের সন্ধানই ছিল তাঁর সাধনা । গভীর অধ্যবসায়ের সঙ্গে রাত জেগে পড়তেন মার্কসবাদী সাহিত্য, জানার চেষ্টা করতেন চাষি-মজুরের সমস্যা । কৃষাণের মজুরের জীবনের শরিক হতে চাইতেন

এক

[ সন্ধ্যা । নদীর তীর । জলের শব্দ ।   অস্পষ্ট চলমান নৌকো । সোমেন চন্দের ছায়ামূর্তি । রবীন্দ্রনাথের ‘সুপ্রভাত’ কবিতা আবৃত্তি করছে  । আর এক ছায়ামূর্তি পেছনে এসে দাঁড়ায় । সোমেনের কাঁধে হাত রাখতে সে চমকে ওঠে ।]

সোমেন : আরে, সতীশদা কখন এলেন ?

সতীশ : একটু আগে । তোমার আবূত্তি শুনতে শুনতে এলাম ।

সোমেন : আপনার জন্য বিকেল থেকে অপেক্ষা করছি ।

সতীশ :  একটু দেরি হয়ে গেল সোমেন ।

সোমেন :  মিটিং ছিল ?

সতীশ : হ্যাঁ । নতুন আদর্শ নিয়ে ফিরে এসেছি আন্দামান থেকে । এখন শুধু কাজ আর কাজ ।

সোমেন : নতুন আদর্শ ?

সতীশ :  সাম্যবাদের আদর্শ । আন্দামানের বন্দিজীবনে এটাই তো ছিল নতুন আলো, নতুন পথের দিশা ।

[ অনেকের কথাবার্তার শব্দ । তার মধ্যে ‘লেনিন’ ‘নভেম্বর বিপ্লব’ ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ এসব ভেসে আসে ]

সতীশ : আন্দামানে নবজন্ম হল আমাদের । ত্যাগ করলাম সন্ত্রাসবাদের পথ । বুঝলাম অস্ত্র নয় , ক্ষমতার উৎস হল মানুষ । সেই মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে ।

সোমেন : এসব বিষয়ে আরও জানতে ইচ্ছে করে সতীশদা ।

সতীশ : সেই জন্যই তো এসেছি তোমার কাছে । চলে এসো আমাদের প্রগতি পাঠাগারে ।

সোমেন : যাব, নিশ্চয় যাব ।

সতীশ : শুনেছি গল্প-কবিতা লেখ , লেখক হতে চাও । জানো স্পেনের কথা ? কি ঘটছে সেখানে জানো কি ?

সোমেন : শুনেছি কিছু কিছু ।

সতীশ : ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে জনগণের লড়াই ।

[ পর্দায় ভেসে ওঠে স্পেনের গৃহযুদ্ধের ছবি--- র‍্যালফ ফক্স আর কডওয়েলের ছবি ]

সতীশ : সে লড়াইতে যোগ দিয়েছেন কবি আর লেখকরা । মৃত্যুবরণ করেছেন বিপ্লবী লেখক র‍্যালফ ফক্স ।

সোমেন : লেখকও মরণের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ল ?

সতীশ : অত্যাচার যখন চরমে ওঠে, মানবতার বিকাশ যখন রুদ্ধ হয়, তখন কলম ছেড়ে ধরতে হয় তরবারি, বুকের রক্তে তৈরি করতে হয় নতুন সাহিত্য । তাই তো ফ্যাসিস্ট অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বাহিনীতে ষোগ দিয়েছেন কবি-লেখকরা ।

সোমেন : এঁরাই সত্যিকারের লেখক ।

দুই

[ বিশ শতকের তিরিশের দশকের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নানা টুকরো ছবি । সঙ্গে ভাষ্য : ১৯৩৭-৩৮  সাল । আন্দামানসহ নানা জেল থেকে বহু নেতৃস্থানীয় বন্দি মুক্তিলাভ করে ঢাকায় আসেন । কারাগারে এঁরা গ্রহণ করেছিলেন কমিউনিজমের আদর্শ । এঁদের মধ্যে ছিলেন জীতেন ঘোষ, জীবন চ্যাটার্জী, সত্যেন সেন, সুশীল ঘোষ, প্রবোধ গুপ্ত, নেপাল নাগ, বিনয় বসু, বঙ্গেশ্বর রায়, জ্ঞান চক্রবর্তী, অনিল মুখার্জী, ব্রজেন দাস, বারীন দত্ত, সতীশ পাকড়াশি, সতীন রায়, অন্নদা পালিত । এঁদের চেষ্টায় ১৯৩৮ সালের মধ্যে ঢাকা প্রেস শমিক ইউনিয়ন, ইলেকট্রিক সাপ্লাই ওয়ার্কাস ইউনিয়ন, লক্ষ্মীনারায়ণ টেক্সটাইল মিল ওয়ার্কাস ইউনিয়ন গড়ে ওঠে । মানিকগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ কৃষক সমিতি গড়ে ওঠে । ছাত্র ফেডারেশন শক্তিশালী হয় ।]

তিন

[ ছোট মাটির ঘর । লেনিনের ছবি । চারদিকে প্রচারেপত্র ছড়ানো । লন্ঠনের চারদিকে গোল হয়ে

বসে কয়েকজন আলোচনা করছে ]

রণেশ ; সোমেন চন্দের সঙ্গে দেখা হল সতীশদা ?

সতীশ : হ্যাঁ , বুঝলে রণেশ সোমেন খাঁটি হিরে ।

রণেশ : নিরঞ্জনবাবু তার পরিবারের অনেক খবর এনেছেন । তার বাবা নরেন চন্দ ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের স্টোর্স বিভাগে কাজ করেন । সামান্য মাইনে । কোনোরকমে সংসার চলে । ম্যাট্রিক পাশ করেছে সোমেন ।

সতীশ : আমার কি মনে হয় জানো ! মনে হয় প্রগতি লেখক সঙ্ঘ গড়ার কাজে সোমেন হাতিয়ার হয়ে উঠবে ।

নিরঞ্জন : রণেশ পাবে তার যোগ্য সহকর্মী ।

সতীশ : ঠিক কথা । তবে খেয়াল রেখো, সোমেনের শরীরটা ভালো নয়, সবে প্লুরিসি থেকে উঠেছে ।

চার

[ ঘরের সামনে সাইনবোর্ড ‘প্রগতি পাঠাগার’ । ১০/১২ জন যুবক । একজন লেনিনের লেখা থেকে কিছু পড়ছে । এমন সময় এসে দাঁড়ায় সোমেন চন্দ ]

সোমেন : ভেতরে আসব রণেশদা ?

রণেশ : এই দ্যাখ, সোমেন এসেছে । এসো, এসো সোমেন ।

[ লাজুকভাবে সোমেন ঘরে ঢুকে এককোণে বসে ]

রণেশ : সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই । এই হচ্ছে সোমেন চন্দ । বাড়ি বিক্রমপুর । এখন অবশ্য দক্ষিণ মৈশুন্ডির বাসিন্দা । গল্প-কবিতা লেখে । কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তার গল্প ‘শিশুতপন’ । কাঁচা বয়েস কিন্তু পাকা হাত ।

সোমেন : আঃ রণেশদা-

রণেশ : বড্ড লাজুক । আমাদের একজন হয়ে উঠলে অবশ্য কেটে যাবে লজ্জা । এখন থেকে সোমেন প্রগতি পাঠাগারের সদস্য ।

সকলে : আমরা নতুন সদস্যের লেখা শুনব ।

রণেশ : এ দাবি যে উঠবে তা জানতাম । সোমেনকে বলেও রেখেছিলাম ।

সোমেন: ‘শিশুতপন’ গল্পটাই পড়ি !

রণেশ :  বেশ ।

[ সোমেন গল্প পড়তে শুরু করে । শেষ হতে সকলে হাততালি দিয়ে ওঠে ]

সোমেন : আমি কিন্তু জানতে আর শনতে এসেছি । শুনতে চাই মার্কসবাদের কথা, রুশবিপ্লবের কাহিনি, গরিব মানুষের মুক্তিপথের  দিশা...

পাঁচ

[ বিভিন্ন ভঙ্গিমায় সোমেন । বইপত্র নাড়ছে, পড়ছে, লিখছে । ভাষ্য : শুধুমাত্র সাহিত্যের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চাননি সোমেন । মানুষের মুক্তিপথের সন্ধানই ছিল তাঁর সাধনা । গভীর অধ্যবসায়ের সঙ্গে রাত জেগে পড়তেন মার্কসবাদী সাহিত্য, জানার চেষ্টা করতেন চাষি-মজুরের সমস্যা । কৃষাণের মজুরের জীবনের শরিক হতে চাইতেন ।]

ছয়.

[ শীতের সকাল । কুয়াশা । রেলওয়ে ওয়ার্কশপ । শিফট চেঞ্জের সময় । নাইট শিফটের শ্রমিকরা বেরিয়ে আসছে । গেটের ওধারে সোমেন ।গায়ে বিবর্ণ উলের চাদর, পায়ে বিদ্যাসাগরী  চটি ।কথা বলছে শ্রমিকদের সঙ্গে ]

সোমেন : আপনি ইউনিয়নের সভ্য হয়েছেন ?

শ্রমিক১ : না ।

সোমেন : আপনি ?

শ্রমিক২ : গত বছর ছিলাম ।

সোমেন : আপনি ?

শ্রমিক৩ : সভ্য ! নাতো ।

সোমেন : আচ্ছা, আপনারা কি মনে করেছেন বলুন তো ! ইউনিয়নের  সভ্য না হয়ে একা একা বাঁচতে পারবেন ? ওরা শক্তিমান । ওদের সঙ্গে একা পারবেন লড়াই করতে ! পারবেন আপনার দাবি আদায় করতে !

[ আরও শ্রমিক ভিড় করে আসে । সকলে উৎসুক হয়ে শোনে সোমেনের কথা ]

সোমেন : না, একা একা বাঁচা যায় না । মালিকের সঙ্গে লড়াই না করে আপনারা আপনাদের দাবি আদায় করতে পারবেন না । মালিক তো মেরতে মেরে গায়ের রঙ ফ্যাকাসে করে দিল । তবু আপনাদের চৈতন্য হচ্ছে না !

সাত

[ প্রগতি পাঠাগারের সামনে সোমেন ও সতীশ]

সোমেন : আমি শ্রমিক ইউনিয়নে কাজ করতে চাই সতীশদা ।

সতীশ :  না, না-

সোমেন : কেন ?

সতীশ : তোমার শরীর দুর্বল । তাছাড়া সে যে বড়ো পরিশ্রমের কাজ ।

সোমেন : পরিশ্রমই তো করতে চাই ।

সতীশ : তুমি বরং প্রগতি লেখক সংঘটা ভালো করে গড়ে তোল ।

সোমেন : তা তো করছি ।

সতীশ : দুটো একসঙ্গে—

সোমেন : কিন্তু একটার জন্যে আর একটা দরকার যে !

সতীশ : কি বললে !

সোমেন : শ্রমিক জীবনের অভিজ্ঞতা না থাকলে প্রগতি সাহিত্য লিখব কি করে ! এ যুগের পালাবদলে প্রোলেটারিয়েটের ভূমিকাই প্রধান । তাদের মধ্যে যদি কাজ না করতে পারলাম তাহলে শৌখিন কমিউনিস্ট বনে লাভ কি !

আট

[ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে সোমেন লাভ করেছিল তার লেখার উপকরণ । তার বিখ্যাত ‘ইঁদুর’ গল্পের কথা ধরা যাক । গল্পের নায়ক সুকুমার আসলে সোমেনের আত্মপ্রতিকৃতি । সুকুমার ছিল মেহেনতি মানুষের আপনজন । রেলওয়ে ইয়ার্ডের পাশ দিয়ে আপন মনে হেঁটে যাচ্ছে সুকুমার।

শশধর নামক এক শ্রমিক তাকে ডাকে ]

শশধর : ও সুকুমারবাবু-

সুকুমার : আরে শশধর যে !

শশধর : কাছে আসুন কথা আছে ।

[সুকুমার আসে । দুজন পাশাপাশি বসে । শশধর বিড়ি ধরায় ]

সুকুমার : কি ব্যাপার শশধর !

সুকুমার : সেদিন কারখানার সাহেব আমাকে ডেকেছিলেন ।

সুকুমার : কেন !

শশধর : শালা বলে কিনা : ড্রাইভার ইউনিয়ন ছেড়ে দাও, নইলে মুশকিল হবে ।

সুকুমার : আপনি কি বললেন ?

শশধর : বললাম ছাড়ব না । আপনার যা ইচ্ছা হয় করুন । বলেই এই রকম গটগট করে বেরিয়ে এলাম-

[ শশধর বীরদর্পে হাঁটার ভঙ্গি করে । সুকুমার হাসে । দুজনে উঠে দাঁড়ায় । কথা বলতে বলতে পথ চলে । দূরে এঞ্জিনের সাঁ সাঁ শব্দ । চিৎকার । কয়েকজন শ্রমিক সুকুমারকে দেখে আনন্দে হৈ হৈ করে ওঠে ]

সুকুমার : আরে ইয়াসিন,  দেশ থেকে কবে ফিরলেন ?

ইয়াসিন : দিন দুই হল ।

শঙ্কর : দেশে গিয়ে ইয়াসিন খুব বীরত্ব দেখিয়ে এসেছে জানেন সুকুমারবাবু-

ইয়াসিন : খালি ইয়ার্কি-

শশধর :  তাহলে নিজেই বল না ইয়াসিন ।

সুকুমার : হ্যাঁ বলুন না ইয়াসিনভাই ।

ইয়াসিন : তেমন কিছু নয় । তবে কিনা গাঁয়ের চাষিরাও জাগছে । তাদের একটা বৈঠকে হাজির ছিলাম । একজন আমাকে ইউনিয়নের কথা জানতে চাইল । আমি পকেট থেকে রসিদ বের করে দেখাতে তারা আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল-তুমি যে আমাদেরই একজন ।

শশধর ; জানেন সুরেন কি বলছিল ?

সুকুমার : কি ?

শশধর : বলছিল আপনি ব্যারিস্টার হলেন না কেন !

সুকুমার : তার মানে !

শশধর : আপনাকে কথায় হারানো যায় না । বিরোধীলোকেরা হেরে ভূত হয়ে যায় আপনার কাছে।

[ সকলে হেসে ওঠে ]

নয়

[ একতলা মাটির ঘর । সাত-আট জন শ্রমিকের মধ্যে সোমেন । দরখাস্ত লিখছে । দরখাস্ত নিয়ে তারা চলে গেল । দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন অনিল মুখার্জী । দেখতে পেয়ে সোমেন ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এল]

সোমেন : আরে কি সৌভাগ্য, অনিলবাবু যে!

অনিল:  সে কি কথা ! সৌভাগ্য তো আমার ।

সোমেন:  এ কি বলছেন!

অনিল:  পাঁচ পাঁচবার চেষ্টার পরে দেখা পেলাম ।

সোমেন :  বসুন বসুন ।

[ অনিলকে মাদুরে বসিয়ে সোমেন উঠে দাঁড়ায়]

অনিল : আবার উঠলেন যে!

সোমেন : এই আসছি, একটু বসুন ।

[সোমেন চলে যায় । স্টোভ জ্বালানোর শব্দ শোনা যায় । একটু পরে সোমেন চা নিয়ে ঢোকে]

অনিল : আবার এসব কেন ?

সোমেন :  অতিথি সৎকার আর কি!

অনিল : সরলানন্দ সেদিন বলছিল আপনার কথা ।

সোমেন : আমার কথা! আমার আবার কি কথা!

অনিল : ঘর-সংসারের কাজেও আপনি এক্সপার্ট ।

সোমেন : বাবা আর আমি এখানে থাকি । বাবা সময় পান না । তাই-

অনিল : সরলা বলছিল তাকে নাকি আপনি নিজের হাতে রান্না করে মুসুরির ডাল আর ইলিশমাছের ঝোল খাইয়েছিলেন ।

সোমেন : হ্যাঁ সরলা এসেছিল একদিন ।

অনিল : নতুনকিছু লিখলেন?

[সোমেন একটা পত্রিকা এগিয়ে দেয় । ওতে ‘মহাপ্রয়াণ’ গল্প ছাপা হয়েছে । পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে অনিল বলেন ]

অনিল : এত কাজ করার পরে লেখেন কখন? আপনি তো দেখছি অসাধারণ লোক । সমীন্দ্র বলছিল শুধু লেখা নয়, আপনি পড়াশুনোও করেন সময় পেলে !

সোমেন : কোথায় আর পড়তে পারি ! বিদ্যে তো ম্যাট্রিক । ইংরেজি বই ভালো করে বুঝতে পারি না । দেখুন না কডওয়েলের ‘ইলিউশন আ্যন্ড রিয়েলিটি’ পড়ার চেষ্টা করলাম । অনেকটাই বুঝতে পারলাম না ।

দশ

[ কলকাতার বালিগঞ্জের দোতলা বাড়ি । জানালার গরাদে হাত রেখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে সোমেন । নিচের তলায় নির্মল ঘোষের অফিস ঘর । ‘বালিগঞ্জ’ পত্রিকার অফিস । একটু বাদে নির্মল ঘরে ঢুকলেন ]

নির্মল : এ কি তুমি! এমন হঠাৎ!

সোমেন : হ্যাঁ । ঢাকা মেইলে চলে এলাম । এসে দেখি বাড়ি ফাঁকা ।

[ নির্মল হাসেন । কালো কোট হ্যাঙ্গারে ঝোলান । পরিচারককে চা আনতে বলেন]

নির্মল : কদিন আগেই তোমার চিঠি পেলাম । তুমি তো বড়োদিনের বন্ধে আসবে লিখেছিলে!

সোমেন : আগেই চলে এলাম । আমার উপর আবার একটা দায়িত্ব দিয়েছে কিনা!

নির্মল : কি দায়িত্ব !

সোমেন : এখানে তো প্রগতি লেখক সংঘের সম্মেলন শুরু হচ্ছে । সে সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে হবে। ঠিক হয়েছে ঢাকাতেও আমরা প্রগতি লেখক সংঘ গড়ে তুলব ।

নির্মল : সম্মেলনে যোগ দেবে ?

সোমেন: হ্যাঁ ।

নির্মল : বেশ । নিয়ে যাব । কিন্তু তোমার প্রতিশ্রুতির কথা মনে আছে তো! সেই যে বিত্তহীন মধ্যবিত্তদের নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবে!

[সোমেন হাসতে হাসতে ব্যাগ থেকে উপন্যাসের পান্ডুলিপি বের করে নির্মলের হাতে দেয়, তারপর বলে ]

সোমেন : প্লটটা শুনুন ।

[ আলো কমে আসে । বন্যার ছবি ভেসে ওঠে । নৌকায় আসছে স্বেচ্ছাসেবকরা । গ্রামের ধারে জলমগ্ন একটা বাড়ি । জলে পা ডুবিয়ে সেই ঘরের বারান্দায় বসে আছে একটি মেয়ে । সোমেন তন্ময় হয়ে বলে যায়]

সোমেন : এক বন্যাপীড়িত গ্রাম । সে গ্রামের এক মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে মালতী ।ঘরে অভাব, তবু দারুণ স্বপ্নবিলাসী । বারান্দার নিচে জল দেখে, সেই জলে নিজের ছায়া দেখে তার আনন্দ । অথচ পিছনে তার অভুক্ত সংসার, খাবার ভিক্ষা, কান্না । এসবের মধ্যেও স্বপ্ন দেখে চলে সেই মেয়ে। এসময় গ্রামে ফ্লাড রিলিফ কমিটি এল । রজত এসেছে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে । মালতীর অবাস্তব স্বপ্নকে আঘাত করল রজত]

এগারো

[ কলকাতার রাস্তায় কখনও নির্মল ঘোষের সঙ্গে কখনও একা একা ঘুরছে সোমেন ]

বারো

[ আশুতোষ মেমোরিয়েল হল । প্রগতি লেখক সংঘের দ্বিতীয় সম্মেলন । বাইরে ফেস্টুন । বারবুশ, রোলাঁ, রবীন্দ্রনাথের ছবি । যুদ্ধবিরোধী বাণী । সোমেন কথা বলছে একজন স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে]

সোমেন : কে কে এসেছেন ?

স্বেচ্ছাসেবক : মুলকরাজ আনন্দ, শৈলজানন্দ মুখার্জী, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ।

সোমেন : রবীন্দ্রনাথ আসেন নি ?

স্বেচ্ছাসেবক : না, আসেন নি । তবে তিনি বাণী পাঠিয়েছেন ।

[ এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল সত্যেন্দ্রনাথের কন্ঠ । সোমেন শুনছে তন্ময় হয়ে ।

সত্যেন্দ্রনাথ : এবার প্রগতি লেখক সংঘের খসড়া ইশতেহারটি আপনাদের অনুমোদনের জন্য উপস্থিত করছি ।-- ভারতীয় সমাজে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে । প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে । চিরায়ত সাহিত্যধারার অবলুপ্তির পর থেকে ভারতীয় সাহিত্যে জীবনবিমুখতার মারাত্মক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ।.....  সাহিত্যের মান যাদের হাতে অবনমিত হচ্ছিল সেই রক্ষণশীল শ্রেণির হাত থেকে সাহিত্যকে রক্ষা করা এবং জনগণের জীবনের সঙ্গে তাকে বাস্তবজীবনচিত্রণের উপযোগী ও ভবিষ্যতের কান্ডারী করাই  এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ।.... ভারতীয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে গর্ব করার সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে আমরা সমালোচনা করব এবং সৃজনশীল ও পারস্পরিক কাজের মধ্য দিয়ে জাতির নবজীবন সঞ্চারের চেষ্টা করব ।

তেরো

[ চিন্তামগ্ন সোমেন হেঁটে যাচ্ছে শহরতলীর পথ দিয়ে । ভাষ্য : কলকাতার অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকায় ফিরে এল সোমেন । শত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘ গযে তোলার সঙ্কল্প তার । এই সংঘ নতুন চেতনা দেবে দেশবাসীকে । উদ্বুদ্ধ করবে নব ভাবনায় । চিনিয়ে দেবে শ্রেণিশত্রুকে । প্রেরণা দেবে তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ]

চোদ্দ

[ বিকেল । সরুগলি দিয়ে হাঁটছে সোমেন । গলায় গণসঙ্গীতের সুর । পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত]

কিরণ : এতদিন কাটিয়ে এলে কলকাতায় । একটা চিঠি পর্যন্ত পেলাম না ।

সোমেন : বিশ্বাস করো একদম সময় পাই নি ।

কিরণ : উঠেছিলে কোথায় ?

সোমেন : নির্মল ঘোষের বাসায় ।

কিরণ :  বালিগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক ?

সোমেন : হ্যাঁ । জানো কিরণ, ওই পত্রিকার পরের সংখ্যা থেকে ছাপা হবে আমার উপন্যাস ‘বন্যা’।

কিরণ : বাঃ, ভালো খবর । প্রগতি লেখক আন্দোলনের খবর কি ?

সোমেন : অনেক খবর এনেছি । [ ঝোলা থেকে কাগজপত্র বের করে ] এই ইশতেহার, এই সংবিধান ।

কিরণ : আমাদের সংগঠন গড়ার কাজে লাগবে । রণেশদার সঙ্গে দেখা হয়েছে ?

সোমেন : হ্যাঁ । পাঠাগারে মিটিং শুক্রবারে । আর শোন কিরণ, আমরা সোবিয়েতের উপর একটা চিত্র প্রদর্শনী করব । দেবপ্রসাদ আর তুমি হবে সে কমিটির যুগ্মসম্পাদক ।

কিরণ : কোথায় হবে প্রদর্শনী ?

সোমেন : সদর ঘাটের কাছে ব্যাপটিস্ট মিশন হলে ।

পনেরো

[ ব্যাপটিস্ট মিশন হলে চিত্র প্রদর্শনী । সোবিয়েত রাশিয়ার নানা চিত্র । মানুষের ভিড় । সোমেন

ঘুরে ঘুরে ব্যাখ্যা করে বোঝাচ্ছে ।]

ষোলো

 [ হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা । চিৎকার । সরলানন্দের মুখ ভেসে ওঠে । তার কন্ঠে শোনা যায় : বৈশাখের কাঠফাটা রিদ । শহরে দাঙ্গা । রাজপথ দিনে-দুপুরে জনশূন্য । মানুষের পাশ দিয়ে গা ঘেঁষে চলতে মানুষ ভয় পায় । বুক কাঁপে । কিন্তু বিশ্রাম নেই সোমেনের । হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিরাম নেই তার । অনলস শিল্পী তোমাকে নমস্কার ।]