আলাপ

     'চলে এস কথা হবে' - ছোট্ট কতগুলো কথা। সে কি আজকের কথা! বেশ কিছু বছর পিছিয়ে যেতে হবে। এক রবিবারের দুপুরে জমিয়ে আড্ডা হল শ্রীকান্তদার বাড়িতে। ছিমছাম পরিবেশে বাগান আর পাঁচিল ঘেরা শ্রীকান্তদার বাড়িতে বসল জমজমাটি আসর। সঙ্গে এক মাসতুত দাদা অশোকদা। 

     নানা গল্প, আড্ডা, হাসি মজার মধ্য দিয়ে দিব্বি কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়। 'কথায় কথায় রাত হয়ে যায়' না, রাত হয়ে যায় নি ঠিকই তবে এই দুষ্টূ দুপুর কখন যে তার সময় পেরিয়ে প্রায় বিকেলে কোলে ঢুলে পড়েছিল তা খেয়াল করি নি। 

    শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য্য কি নিয়ে কিছু উপস্থাপনা করার দুঃসাহস আর নাই বা দেখালাম।সেই নব্বইএর মাঝামাঝি থেকে শ্রীকান্তদা সবসময়ই আমাদের কাছাকাছি আছেন,  সে জি বাংলার 'সা রে গা মা' তে বিচারকের পদে গৌরব,

নোবেল, অঙ্কিতার গানের কাটাঁছেঁড়ার জন্যই হোক কিংবা আপনার ঘরের খোলা জানলা দিয়ে পাড়ার জলসাতেই হোক। আবার কখনও শ্রীকান্তদার দেখা মেলে কবিতার আসরে কলকাতার নামী ব্যাক্তিত্বদের সঙ্গে নানান মঞ্চে। 

    অশোকদার সহযোগিতায় অত্যন্ত অমায়িক এই শ্রদ্ধেয় শিল্পীর সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা তাই ভাবলাম আর একবার তুলে ধরি মাধুকরীর পাঠকদের সামনে।  ভুল ত্রুটি মার্জনীয়। 

এই সাক্ষাৎকারটি পুনঃ প্রকাশিত। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

  • শ্রীকান্ত আচার্য্য

  • অশোক দে

  • ঐন্দ্রিলা ব্যানার্জ্জী দে

সংগীত শিল্পী

শ্রীকান্ত আচার্য্য

যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুলের দিনগুলো...

স্কুলের দিনগুলো খুব ভালো কেটেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি গান বাজনা থেকেও খেলাধুলায়ও পাগল ছিলাম। স্কুলে একটু গান, নাটক এগুলো খুব সিরিয়াসলি হত।  একবার একটা প্রোগ্রামে যোগেশ দত্তের এক সিনিয়র ছাত্র নিরঞ্জনগোষ্মামীর মাইম শো দেখেছিলাম। তা ঐটা দেখে স্কুলের একটা কালচারাল প্রোগ্রামে ঠিক ঐরক্ম মেকাপ করে মাইম শো করেছিলাম এবং সেটা হাইলি আপ্রিসেয়েটেড হয়ে ছিল। মনে আছে আমাদের অ্যসিস্টেন্ট হেডমাষ্টার পুষ্পেনবাবু ‘প্রফিয়েন্সি ইন ড্রামা’ বলে একটা বই প্রেজেন্ট করেছিলেন। তুমি একজন খুব নাম করা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদারের নাম শুনে থাকবে। তেজেন আর আমি হচ্ছি খুব ছোটবেলাকার বন্ধু। ও খুব ভাল সরোদ বাজায়। তেজেনের বাবা শ্রী রঞ্জন মজুমদার প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন অনুষ্ঠানে মিউজিশিয়ানদের একটা টিম নিয়ে আসতেন। আমি টিমের সঙ্গে গাইতাম। কিছু স্পেশিফিক গান ছাড়াও থাকত রবীন্দ্রসংগীত। তেজেনের আর এক বন্ধু প্রবুদ্ধ রাহা তবলা বাজাতো আর আমি গাইতাম। তেজেনও তবলা ছাড়াও খুব ভাল ম্যান্ডোলিন বাজাতো। এইভাবেই কয়েকজন মিলে আমাদের গান বাজনা চলত।

আর খেলাধুলা বলতে আমি স্কুল টিমের গোল কিপার ছিলাম। আর আমরা সাউথ ক্যালকাটা ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্ট স অ্যাসোসিয়েশন নামে একটা বোর্ডের পরিচালনায় ইন্টার স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় খেলতাম। এর পাশাপাশি ক্রিকেটও চলত। সেন্টজেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময় সি এ বি আয়োজিত সামার স্কুল ক্রিকেট কলেজের টিমেও খেলেছি।

 

আপনি তো তবলা বাজানো শিখেছিলেন ওস্তাদ আলি আহমেদ খানের কাছে...

ছোটবেলায় রোল মডেল হিসাবে কেউ ছিল না। খুব সিরিয়াসলি গান বাজনা কেউ করেনি। আমাদের পরিবারে পড়াশোনা করে চাকরি করতে হবে এটাই গুরুত্ব পেত। যেহেতু ছোটবেলা থেকেই আমি আর আমার দিদি একটু গান বাজনা করতাম, আর মা চাইতেন একটু আধটু গান বাজনা শিখুক, তাই আমাকে দক্ষিণীতে ভর্তি করে দিলেন। আমার তবলাটাই বেশী ভাল লাগত। বাবা আলাউদ্দিন সঙ্গীত সমাজে ভর্তি করে দিলেন। এখানে তবলা ও শাস্ত্রীয় সংগীতের ওপর ক্লাস হয়। ওখানেই ওস্তাদ আলি আহমেদ সাহেব শেখাতে আসতেন। উনি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের আত্মীয় ছিলেন। মূলত সেতার বাজাতেন। ওনার কাছে মাত্র চার মাস শিখেছিলাম। তারপর উনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে উনি মারা যান। আমার তবলা শেখা একদম বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক গান করবো কখন ভাবিনি তো তাই এখন মনে হয় ছোটবেলা থেকে যদি একটু পিওর শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম থাকত তাহলে খুব ভাল হত।

 

রবীন্দ্রসংগীতের ওপর ফরম্যাল ট্রেনিং বলতে যেটা ঐ দক্ষিনীতেই করেছেন। পরে রবীন্দ্রসংগীতও গেয়েছেন। তাহলে কি রবীন্দ্রসংগীতে আপনার স্পেশালাইজেশন ছিল।

 

না, একদম উলটো। দক্ষিনীতে গান শিখলেও মহঃ রফির গানে প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলাম। আমার মামা খড়্গপুর আই আই টিতে পড়তেন। তা মামা একটা এইচ এম ভি রেকর্ড প্লেয়ার কিনে দিয়েছিলেন। রেকর্ডটাতে রফির গাওয়া ‘কোহিণুর’,’দিল দিয়া দর্দ দিয়া’, গ্যাম্বলার প্রভৃতি ছবির গান ছিল। একটু বড় হবার পর সবসময় বিবিধ ভারতী শুনতাম। যা শুনতাম তার আশি ভাগই রেডিও তে। ছোটবেলা থেকেই আমি সবই শুনি। কিশোর, রফি, মুকেশ সব। রবীন্দ্রসংগীত যতটুকু ভাল লাগে ঠিক ততটুকুই গাইছি। তার বেশী নয়।

কথার ফাঁকে টি ব্রেক... 

গান কে পেশা...

কলকাতাতে একটা কন্সাল্টেন্সি ফার্মে মার্কেট রিসার্চের ফিল্ড ওয়ার্ক করতাম। পরে একটা চাকরি নিয়ে গেলাম নর্থ বেঙ্গলে। ওখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর কাটিয়েছিলাম। সেলসের কাজ ছিল, প্রচুর ঘুরতে হত। ৯৫ এ শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় চলে এসেছি। হঠাৎই আমার সাথে এইচ এম ভির এক অফিসিয়াল সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে যোগাযোগ হয়ে গেল। ইস্কনের ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট শ্রী শ্রী প্রভুপাদচরণাগোবিন্দ গীতার অষ্টাদশ অধ্যায় পর্যন্ত বাংলাতে অনুবাদ করেছিলেন। তা ইস্কনের এই প্রজেক্টটা ছিল ঐ বাংলা অনুবাদগুলিকে সুর করে গান হিসাবে বার করা। সোমনাথবাবু একদিন আমাকে ওনার সল্টলেকের বাড়িতে ডেকে পাঠালেন। আমার গান শুনে আমাকে গান করার অফার দিলেন। তখনও আমার সেলসের কাজ চলছে। সবচেয়ে বড় কথা হল এই কাজের সুত্রে সংগীত জগতের খুবই জনপ্রিয় কিছু ব্যাক্তিত্বের সঙ্গে আমার আলাপ হল। সেই আলাপের সুত্রে আর একটা কাজের অফার। কলকাতাতে ইন্ডিয়া লাইফ সেভিং সোসাইটির ব্যবস্থাপণায় ওয়াটার ব্যলেতে গান গাইবার ডাক পড়ল। সেই বছর শ্রীকুমারদা মানে শ্রীকুমার বন্দোপাধ্যায় এইটির ব্যবস্থাপক ছিলেন। ওনার কথাতেই গান গাইলাম। কো আর্টিষ্ট ছিলেন ইন্দ্রানী সেন। এই দুটো কাজ করার পর চাকরিটা ছেড়ে দিলাম।

      একদিন রাসবিহারী মোড়ে মেলোডিতে গেলাম। মেলোডির মালিক ছিলেন উৎপলদা। আমরা দুলালদা বলে ডাকতাম। ওনার বলাতেই আমার একটা গানের ডেমো ক্যাসেট নিয়ে এইচ এম ভিতে গেলাম। এইচ এম ভি থেকে পাঁচদিন পর যোগাযোগ করতে বলা হল। কিন্তু কিছু হল না। ঐ দুলালদার কথাতে একবার গেলাম সাগরিকার মতিশীল স্ট্রিটের অফিসে। ওখানকার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার অনুপমদা পাঁচ বছরের কন্ট্র্যাক্টে আমার অ্যালবাম করতে রাজি হলেন। দুটো অ্যালবাম হল, একটি রবীন্দ্রনাথের গান, অপরটি বাংলা আধুনিক গানের। সত্যি বলতে কি আমার ‘মনের জানালা’ অ্যালবামটা যে লোকে শুনছে ভাবতেই পারছিলাম না।

     টাইমস এফ এম এ প্রতি রবিবার টপ টেন লিস্ট করত। মনের জানালা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই টপে চলে গেল।ইন্দ্রনীলের অ্যালবামটা দুই নম্বরে চলে গিয়ে আমারটা এক এ চলে এল। কয়েকদিনের মধ্যে আনন্দবাজার থেকে ফোন, আপনার গান খুব চলছে একটা রাইট আপ চাই। তারপর সপ্তমীর দিন রাণীকুঠিতে আমার প্রথম পাবলিক শো, তারপরের দিনই তালতলায়। পুজোর পর ও প্রোগ্রাম চলতে লাগল। এদিকে সাগরিকা বলল পরের অ্যালবাম নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করুন। এইভাবেই শুরু হল।

আপনার প্রথম অ্যালবাম তো রবীন্দ্রসংগীতের ‘হে বন্ধু হে প্রিয়’ আর ‘মনের জানালা’ তো আপনার মাইলস্টোন, এটাতে আপনি গোল্ডেন ডিক্স থেকে আরম্ভ করে প্লাটিনামও পেয়েছেন...

 

এগুলো সব বিক্রির ওপর হয়। মনের জানালা প্রচুর বিক্রি হয়েছিল। এমন কি এখনো বিক্রি হয়। তারপর ৯৭ এ করলাম ধ্রুবতারা। সেটাও চলেছিল। আর এই দুটোই ছিল পুরোনো বাংলা গানের রিমিক।

৯৭এ আপনি অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে গীতবিতান ও পূজা প্রজেক্ট করেছিলেন...

খুবই প্রেস্টিজিয়াস প্রজেক্ট। গীতবিতানের সমস্ত গান স্বরলিপিবদ্ধ করে বিভিন্ন শিল্পীদের দিয়ে গাইয়ে একটা আর্কাইভ করেছিল। কলকাতার অনেক শিল্পীর পাশাপাশি ডঃ বালমুরারী কৃষ্ণ, জগজিৎ সিং, চিত্রা সিং, অনুপ জলোটা এতে গান গেয়েছেন। আমারও প্রায় ৬-৭ টা গান আছে। ঠিক মত পাব্লিসিটি করতে না পারার জন্য শ্রোতারা জানতেই পারলেন না।

 

আপনি কবীর সুমন সম্মন্ধে বলেছেন – এ ট্রায়াল ব্লেজার ফর কন্টেম্পোর‍্যারি বেঙ্গলি সং। কেন বলেছিলেন?

আমার গানের মোটিভেশন কিন্তু সুমনদা। সুমনদার সঙ্গে আলাপ আমার ৮৯-এ। সুমনদা বিদেশ থেকে পাকাপাকি ভাবে চলে এসেছেন। আলাপের পর ভেবেছিলাম দুজনে মিলে একটা দল করব। নানা কারণে সেটা আর হয় নি। আমি মনে করি মৌলিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে একটা সময় এসেছিল যে লোকের কৌতূহলটাই চলে যাচ্ছিল। সুমনদা একক প্রচেষ্টায় একটা নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছেন। সুমনদার গান যখনই শুনি আমরা মোহিত হয়ে যাই। সুমনদাকে যেখানে রাখি সেখানে আর কাউকে রাখি না। একমাত্র সুমনদাই আমাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত মোটিভেশন তৈরী করেছিলেন। তুমি রূপঙ্কর, লোপামুদ্রাকে জিজ্ঞাসা কর ওরাও একই কথা বলবে। সুমনদা কিন্তু একটা জেনারেশনকে ইন্সপায়ার করেছে। আমার গান করার পিছনে কোথাও না কোথাও সেই ইনফ্লুয়েন্সটা রয়েছে।

 

৯৯ এ করেছিলেন ‘মা আমার’ - 

সেই বছরটা কাজী নজরুল ইসলামের বার্থ সেন্টিনারি ছিল। তাই ক্যসেটার সব কটা গানই ছিল কাজী নজরুল ইসলামের শ্যামাসংগীত।

পথের পাঁচালী বাড়ির দেওয়ালে...

"আমার গানের মোটিভেশন কিন্তু সুমনদা। সুমনদার সঙ্গে আলাপ আমার ৮৯এ। সুমনদা বিদেশ থেকে পাকাপাকি ভাবে চলে এসেছেন। আলাপের পর ভেবেছিলাম দুজনে মিলে একটা দল করব। নানা কারণে সেটা আর হয় নি। আমি মনে করি মৌলিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে একটা সময় এসেছিল যে লোকের কৌতূহলটাই চলে যাচ্ছিল। সুমনদা একক প্রচেষ্টায় একটা নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছেন। সুমনদার গান যখনই শুনি আমরা মোহিত হয়ে যাই।"

সাধনা সরগমের সঙ্গে –

সাধনার সঙ্গে আমি দুটো অ্যালবাম করেছিলাম। একটাতে সমস্ত পুরোনো ডুয়েট গান আর একটাতে পুরোনো হিন্দি গানের বাংলা ভার্সান।

 

বৃষ্টি তোমাকে দিলাম – লীলাময় পাত্রে কথায় ও জয় সরকারের সুরে আপনার এই গানটির কথা তো আমরা জানি। অন্য গানগুলিও বেশ সাবলীল। আপনি এরজন্য আনন্দবাজার অ্যাওয়ার্ড ও ন্যাশেনাল কলাকার অ্যাওয়আর্ড পেলেন...

 

৯৬এ আমার প্রথম অ্যালবাম ‘মনের জানালা’ ছিল পুরোনো বাংলা গানের একটা রিমিক। ৯৭ এর গোড়াতে ‘এক ঝাঁক পাখি’ আমার নিজের প্রথম বাংলা গানের অ্যালবাম। মনের জানালা আর নীল ধ্রুবতারা এই দুটোই গানের রিমিক, আমার নিজের গান ছিল না। ৯৯এ ‘স্বপ্ন দেখাও তুমি’ নামে আমার নিজের দ্বিতীয় বাংলা গানের অ্যালবামটি করি। সে অর্থে হিট করল কিন্তু ‘বৃষ্টি তোমাকে দিলাম’ ২০০০ সালে। ‘বৃষ্টি তোমাকে দিলাম’ গানটার মুখরা কিন্তু অনেকদিন আগেই হয়ে পড়েছিল। অনেক সময় খুব ক্যাজুয়াল তৈরী করা গান লোকের খুব ভাল লাগে। আমি কিন্তু কথার ব্যাপারে একটু খুঁতখুঁতে। আর এই জন্মের গীতিকার, সুরকারদের নিয়েই কাজ করতে চাই। কারণ তাদের সঙ্গে আমার চিন্তা ধারার একটা ভাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়। আগেই সব ভাল ভাল কথা বা সুর হয়ে গেছে তা আমি মনে করি না। সুমনদা এমন সব গান লিখেছেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় না গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারও লেখেন নি। সুমনদার কথার মধ্যে একটা স্ট্রেন্থ থাকে তা অন্যের গানের মধ্যে পাই না। কিছু কিছু নচির গানও আমার খুব ভাল লাগে। ওর কথার মধ্যে একটা পাওয়ার আছে। একটা অসম্ভব বোল্ডনেসের জায়গা আছে। সেই সময় নচি আর সুমনদা কিন্তু অনেককেই ইন্সপায়ার করেছে।

যুক্তি তক্কো আর গপ্পো... বাড়ির দেওয়ালে

"পাঁচটায় সন্ধ্যাদি স্টেজে এলেন। বিশ্বাস কর, লোকে বলে না ক্রেজ, ক্রেজ কাকে বলে সেদিন দেখলাম। বিশ্বাস করবে, শ্রোতারা এসেছেন দিল্লী, বম্বে, আমেদাবাদ, ব্যাঙ্গালোর, মাদ্রাজ থেকে। তা ভুট্টোর (সৈকতের) গান শেষ। এবার আমার পালা। আমি প্রচন্ড টেন্সড। দিদিকে প্রনাম করে ওনার পাশে বসলাম। সন্ধ্যাদির দিকে তাকালাম। উনি একবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এক সেকেন্ডে আমার টেনশন উধাও। আই ফেল্ট সো রিল্যাক্সড যে তোমার কি বলব। সামথিং সুপার ন্যাচারাল ইন দ্যাট স্মাইল।" 

- শ্রদ্ধেয়া শিল্পী সন্ধ্যা মুখার্জ্জী সম্মন্ধে...

নচির ‘বৃদ্ধাশ্রম’ লেখাটি...

অসাধারণ! খুব ভালো। গায়ক হিসাবে তো খুবই ভালো। আবার দারুন লেখে। 

 

আপনার পরের অ্যালবাম ‘নদীর ছবি আঁকি’ ...

সেটা ২০০১ এ। বৃষ্টি তোমাকে দিলাম এর ঐ একই ফ্লেবার নিয়ে করেছিলাম ‘নদীর ছবি আঁকি’। ওতে ‘ভালবাসা’ বলে গানটা আমার নিজের সুর করা প্রথম গান। কয়েকটা গান শ্রোতাদের ভাল লেগেছে। কোন প্রোগ্রামে গেলে ওনারা শুনতে চান।

 

‘তিতলির কথায় আসি –

তিতলির সংগীত পরিচালক ছিলেন দেবজ্যোতি মিশ্র। দেবু একজন অসাধারন ভায়লিন প্লেয়ার। ও একসময় সলিল চৌধুরীর অ্যাসিস্টেন্ট হিসাবে কাজ করেছে। নিজেও ইন্ডিভিজুয়ালি প্রচুর কাজ করছে। খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে মাত্র ঘন্টা পাঁচেকের মধ্যেই গানটা তৈরী করতে হয়। ঋতুর লেখা গানটা খুব সুন্দরভাবে ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে বি এফ যে অ্যাওয়ার্ড সারা ভারতবর্ষের ফ্লিম ও ফ্লিম সংক্রান্ত অন্য সব কাজে একটা অ্যাপ্রিসিয়েশনের মূল জায়গা। তাই অনেক অ্যাওয়ার্ড পেলেও এই অ্যাওয়ার্ডটার মুল্য আমার কাছে অনেকখানি।

 

মৃনাল সেনের ছবি ‘আমার ভুবন’ –  

এটা দেবুর কাজ। মৃনালদা ডেকেছিলেন। পুরো ডিটেলসে গল্পটা বললেন। গানটার কি সিগ্নিফিকেন্স, কেন আসছে, কি ফিলিংস থাকবে সব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন। গানটা ছিল একটা রবীন্দ্রসংগীত ‘মম চিত্তে নিতি নিত্তে’। কারোর লিপে থাকছে না। ছবির দৃশ্যে কৌশিকের রেডিওতে গানটা বাজবে আর তার মধ্যে দিয়ে যেন ঐ দরিদ্র কৃষকের সামনে সারা পৃথিবীটা খুলে যাছে। এটা একটা বিরাট সুযোগ আমার কাছে।

ঋতুর আর একটা ছবি ‘খেলা’ তেও থিম গান গাইবার সুযোগ পেয়েছি। কিছুদিন আগেই রেকর্ডিং হয়েছে। সুর করেছে সঞ্জয় ও রাজা বলে দুটি অল্প বয়স্ক মিউজিশিয়ান। ভারী সুন্দর গান লিখেছে ঋতু।

 

বিদেশের প্রোগ্রাম ..

খুব ভাল লাগে। বিদেশের নানা রকমের অডিয়েন্সের সামনে গান গাইবার সুযোগ পেয়েছি। যারা বয়স্ক তারা পুরনো গান শুনতে চান। ওনারা খুব বেশী নতুন গানের সঙ্গে পরিচিত নন। আমার বয়সী যারা আছেন তারা আবার নতুন গান খোঁজেন।  বাংলাদেশের শ্রোতাদের সামনে গান গেয়ে সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছি। কারণ ওনারা শুধু যে বাংলাদেশের গান শোনেন তা নয়, কলকাতার বাঙালিদের থেকে অনেক বেশী গানের খোঁজ খবর রাখেন। ওনারা গান সম্মন্ধে এতটাই পরিচিত যে আমি সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছি ওনাদের সামনে গান গাইতে। এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার কানাডা, সিডনি, মেলবোর্নে।

 

ক্যাসেট, সিডি বিক্রি, টিভি তে প্রোগ্রাম আর ফাংশান কোনটা আর্থিকভাবে লাভ জনো ফাংশানে গান। অন্য গুলিতে আয়ের আর কোন উৎস নেই। সময় পাল্টেছে। সাত আট বছর আগেও ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল।

এখন পাইরেসির যুগে সব কিছু ধবংস হয়ে গেছে। সি ডি বার করি মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য। কোন আর্থিক সুরাহা হয় না। টেলিভিশনে খুব একটা কন্সট্রাকটিভ ওয়েল ডিজাইন্ড প্রোগ্রাম ছাড়া কোন অর্থনৈতিক লাভ হয় না।

 

উত্তম সিং এর সুরে আপনার প্রথম হিন্দী ক্যাসেট ইয়ে চাহত...

আমার একটা হিন্দী অ্যালবাম করার ইচ্ছা ছিল। যখন সাগরিকাতে ছিলাম তখনই আমাকে অফারটা করা হয়েছিল। সুরকার উত্তম সিং সুরে গানগুলো হয়েছিল। তবে এই কাজটা করে খুব একটা স্যাটিস্ফাইড হতে পারিনি। আমার পছন্দ, অপছন্দ নিয়ে বলার মত স্কোপও ছিল না। সেইজন্য এই অ্যালবামটা কেমন রেসপন্স পেল সেই নিয়ে মাথা ঘামাইনি। তবে ভবিষ্যতে হিন্দী অ্যালবাম নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে যেখানে নিজের ইচ্ছাটা একটু জানাতে পারব।

 

গানের জনপ্রিয়তার পিছনে মার্কেটিং, ডিস্ট্রি বিউশনের প্রয়োজনীয়তা বা দক্ষতা...

গানবাজনার একটা বিনোদনের দিক নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু যদি বিনোদনটাকেই গুরুত্ব দি তাহলে প্রজেক্টটা পুরোটাই একটা কমার্শিয়াল ভেঞ্চার হতে থাকে। কাজেই পুরো একশ ভাগ কমার্শিয়াল ইন্টারেস্টটাই ভাবা হয় তাহলে হয় মুশকিল। গান বাজনা তোমার মনের একটা শান্তির জায়গা, এটা কে খালি চোখে দেখা যায় না। অনুভব করতে হয়। যদি অনুভবের জায়গাটাই না থাকে তাহলে আর কি রইল। টেলিভিশনকে দায়ী করা যেতে পারে। ওরা শুধু দেখাবে, শোনাবে না, অনুভবও করাবে না। এরকম চলতে থাকলে আমার তো মনে হয় গান বাজনার কোন লাভ হবে না। 

শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য্যের সঙ্গে অশোক দে 

প্রবীণদের মতে বাংলা গানে মান নিন্মমুখি...

সর্ব যুগে এটা সব সময় হয়ে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ যখন যুবক ছিলেন তখন প্রবীণরা তার সমালোচনা করেছিলেন। কাজেই এটা কোন ব্যাতিক্রমি ঘটনা নয়। এখনকার প্রবীণরা আমাদের সমালোচনা করেন। একটা বয়েসের পর মানুষের মন বিশেষ কিছু বিশ্লেষণ করতে চায় না। প্রবীণদের সময় গানের কথা খুব সুন্দর ছিল, আবার তার পাশাপাশি অতি সাধারণ মানের গান হয়েছিল। যেমন আমার প্রাণাধিক শিল্পী শ্যামল মিত্রের ‘বাজ পড়লে চমকে উঠে জড়িয়ে ধর আমায় তুমি’ কিংবা ‘পিয়াল শাখার ফাঁকে বাঁকা চাঁদ ওঠে ঐ, তুমি আমি বাসর জেগে রই’ ইত্যাদি ইত্যাদি। খুব অ্যভারেজ কথা। অনেক সাদামাঠা লেখা শুধু বেরিয়ে গেছে অসাধারণ সুর আর গায়কীর ওপর বেস করে। পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে সেভেন্টি আর-পি-এম দুটি দিকে দুটি করে গান থাকত। সারা বছর শিল্পীকে চারটে গান গাইতে হত। আর এখন একটা সিডিতে কম করে দশটা গান। যদি গানের সংখ্যা কমনো যেত তাহলে হয়ত গানের মান আরো বাড়ত। দশটা দুর্দান্ত সম মানের গান করে দেওয়া সোজা নয়। কিন্তু খারাপ লাগে যে এখনও কিছু ভাল গান ঐ সব সাধারণ গানের তলায় চাপা পড়ে যাচ্ছে। গান বাজনা কোন স্থবির স্ট্যাগনেন্ট হতে পারে না। ভাঙাচোরা চলবেই। সুমনদা বলতেন যে প্রত্যেক যুগ তার আধুনিকতাকে ভয় করে। সত্তর দশকে একবার সলিল চৌধুরী বলেছিলেন আমরা যে গানবাজনা করে গেলাম সেটাই  গান বাজনার শেষ কথা এটা ভেবে নেওয়ার কোন কারণ নেই। এক সময় আসবে আমরা থাকব না, আমাদের গান বাজনাও থাকবে না, নতুন যুগের মানুষ আসবে, নতুন গান তৈরী হবে, নতুন ভাবে সে তার ভাব প্রকাশ করবে। নতুন যুগের মানুষ যে গান শুনবে।

 

আপনার প্রিয় গায়ক বা সুরকার কে?

কাকে ছেড়ে কাকে বলি বলত। সিনিয়ারদের মধ্যে মহঃ রফি আর মান্নাদা। এই দুজনের মধ্যে হলে মান্নাদা প্রথম। এছাড়া কিশোরকুমার, মুকেশ। মহিলাদের মধ্যে আশা আর লতা। সুরকারদের মধ্যে অনেকই আছেন। রাহুলদেব বর্মণ, মদনমোহন আমার খুব পছন্দ। আর একজন সুরকারকে আমি প্রচন্ড শ্রদ্ধা করি, তিনি হলেন সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আমি সুরকার হেমন্ত মুখার্জীকে গায়ক হেমন্ত মুখার্জীর থেকেও একটু উঁচুতে রাখি। উনি এমন কিছু গানের সুর করেছেন যা আউটস্ট্যান্ডিং, তার তুলনা হয় না।

 

এই সময় বাংলার সুরকারদের মধ্যে-

জয় সরকার। জয়ের কাজ আমার অত্যন্ত ভাল লাগে। চিরদীপ দাশগুপ্তও ভাল কাজ করছে। রূপঙ্কর সুগায়ক, তার পাশাপাশি সুরটাও ও খুব ভাল বোঝে। অবশ্যই নচির গানের সুরও আমার খুব ভাল লাগে ।

 

ব্যান্ডের গান...

ব্যান্ড মিউজিক হল একটা নিউ ফর্ম অফ এক্সপ্রেশন। তরুন তরুনীরা তার মনের কথা এই নিউ ফর্মের মধ্যে পাচ্ছে তাই যাচ্ছে ওদের কাছে। আর সব সময় যে একাই গাইতে হবে এমন কোন কথা নেই। কিছু ব্যান্ড তো ভালই, বিশেষ করে আমি চন্দ্রবিন্দুর অসম্ভব ভক্ত। ভূমির কিছু গান আমার ভালই লাগে।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ...

কিছুই নেই। যদি কিছু করি তার মধ্যে যেন কিছু বিষয়বস্তু থাকে।

 

কোন মজার ঘটনা...

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ২০০৫ সালে একটা প্রোগ্রামে পর এক ভদ্রলোক একটা টিফিন বক্স দিয়ে বললেন এখন খুলবেন না, বাড়ি গিয়ে খুলবেন। সিডনিতে আমার বন্ধু শোভনের বাড়িতে ছিলাম। তা শোভনের বাড়িতে গিয়ে বক্স খুলে দেখি ওর মধ্যে রয়েছে পিস করে কাটা একদম ফ্রেস বাংলাদেশের ইলিশ। গান গাইতে গিয়ে যে ইলিশ পেলাম এটা ভুলতে পারিনি।

 

কোন বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা ...

 

২০০৫ এ কলকাতার সাইন্স সিটিতে বিশাল একটা প্রোগ্রামের আয়োজন হয়েছিল। আমার ধারণা সেইটাই সন্ধ্যাদির মানে সন্ধ্যা মুখার্জীর শেষ একক অনুষ্ঠান। আমার আর সৈকতের দুটো করে গান করার কথা। আমি গাইব অ্যান্টনী ফিরিঙ্গির ‘চম্পা চামিলী গোলাপের বাগে’ আর চিরদিনের ছবি থেকে ‘আমাকে চিরদিনের তুমি গান বলে দাও’। সন্ধ্যাদির বাড়িতে রিহার্সল। ভীষণ টেনশনে আছেন, শরীরটাও খুব একটা ভাল নেই। আমরা চারটেতে সাইন্স সিটি পৌঁছে গেলাম। পাঁচটায় সন্ধ্যাদি স্টেজে এলেন। বিশ্বাস কর, লোকে বলে না ক্রেজ, ক্রেজ কাকে বলে সেদিন দেখলাম। বিশ্বাস করবে, শ্রোতারা এসেছেন দিল্লী, বম্বে, আমেদাবাদ, ব্যাঙ্গালোর, মাদ্রাজ থেকে। তা ভুট্টোর (সৈকতের) গান শেষ। এবার আমার পালা। আমি প্রচন্ড টেন্সড। দিদিকে প্রণাম করে ওনার পাশে বসলাম। সন্ধ্যাদির দিকে তাকালাম। উনি একবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এক সেকেন্ডে আমার টেনশন উধাও। আই ফেল্ট সো রিল্যাক্সড যে তোমার কি বলব। সামথিং সুপার ন্যাচারাল ইন দ্যাট স্মাইল। পর পর দুটো গাই গাইলাম। তবে ঐ হাসির কথা আমি জীবনেও ভুলতে পারব না।

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?