কবি সম্মান

আইভি চট্টোপাধ্যায়

 

গল্প সমগ্র ১০

  • সমুদ্রে সুমাত্রা - মন্দিরা বসু

  • কবি সম্মান - আইভি  চ্যাটার্জ্জী

  

  • শেষ ইচ্ছে - চান্দ্রেয়ী ভট্টাচার্য্য

  • দুটি অনুগল্প - সূর্যাশীষ পাল 

সমুদ্রে

       সুমাত্রা

মন্দিরা মিশ্র

.....বাড়ী ফিরেও বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে সুমি, খালি সমুদ্র সেনের মুখটা চোখের সামনে ভাসছে| নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে আমার এমন হচ্ছে কেন? কি যেন একটা ভালোলাগা অনুভুতি ....

  সেদিনের সেই ছোট্ট ফুটফুটে সুমি‚ আজ সুমাত্রা।সুমাত্রা বসু। স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে এবার ইতিহাসে ফার্ষ্ট ক্লাস ফার্ষ্ট হয়েছে। উঃ‚ কি ভালো লাগছে সুমির। আমার সমস্ত পরিশ্রম আজ সার্থক। সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙ্গতেই ইন্টারনেটে নিজেই দেখেছে। কিন্তু কিভাবে বলা যায়? ডাকবে? নাঃ‚ তার আগে একটু বেরোতে হবে। ব্যাস নিঃশব্দে বাড়ী থেকে বেরিয়ে সোজা নিউমার্কেট। একটা বড় লালগোলাপের তোড়া কিনে একটা ট্যাক্সী করে বাড়ী ফিরল।তাড়াতাড়ি না ফিরলে বাপি আবার অফিসে বেরিয়ে যাবে।সিঁড়ি দিয়ে উঠেই একদম মায়ের মুখোমুখি।
- 'হ্যাঁ, রে সুমি‚ কাউকে কিছু না বলে‚ ফট করে কোথায় বেরিয়েছিলি‚ সক্কালবেলা?' মা বললো।
- 'আজ তোর রেজাল্ট আউট হয়েছে না? রোল নং টাও আমাকে দিস নি যে আমি নেট এ দেখবো। আমাদের তো দারুন টেনশন হচ্ছে।' পৌষালীর গলা পেয়েই সৌমদীপ তাড়াতাড়ি টয়লেট থেকে বেরিয়ে এল।

সুমির মাকে উদ্দেশ্য করে বললো - ‘কি গো, সুমি ফিরেছে আমাকে ডাকনি কেন? নিজে একাই বকে চলেছ? আর সুমি তোর কি ব্যাপার বলতো? সক্কাল বেলাই নিখোঁজ?’
- ‘হা, হা, হা‚ সারপ্রাইজ সারপ্রাইজ’ বলে দুজনের সামনে গোলাপের তোড়াটা তুলে ধরল।'
মা‚ বাপি দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল - 'মানে কি সারপ্রাইজ? গোলাপ কেন‚ তোর রেজাল্ট কি হল?'
- ‘হুঁম‚ গেস করো‚ গেস করো ......| নাঃ পারলে না তো?’
- 'সুমাত্রা বসু ফার্ষ্ট ক্লাস ফার্ষ্ট‚ কি বিশ্বাস হচ্ছে? বলেই বাপি আর মাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল|
বাপি চেঁচিয়ে উঠল - ‘সাবাস‚ ওয়েলডান‚ ওয়েল ডান মাই সুইট বেবি।’ মা কাছে টেনে কপালে একটা চুমু খেল‚ সত্যি আজ এত আনন্দ হচ্ছে বলার নয়। বাপি সঙ্গে সঙ্গে - ‘আজ নো অফিস। আজ নো রান্নাবান্না। চলো সবাই মিলে আজ লংড্রাইভে যাবো। বাইরে খাবো। দ্যাটস ইট।’ ‘ও বাপি‚ দাঁড়াও‚ আমি আগে মার্কশিটটা নিয়ে আসি। কলেজে বন্ধুদের সঙ্গেও একটু সেলিব্রেট করে নি। লক্ষ্মী বাপি‚ তুমি আজ অফিস চলে যাও। কাল আমরা সকালেই বেরিয়ে পড়বো, প্রমিস।’ বাপি বলল ‘বলছিস? মা-ও বললো ‘সত্যিই তো ওকে বন্ধুদের সঙ্গে একটু আনন্দ করতে দাও।মার্কশিটটাও তো আনতে হবে।’ ‘রাইট‚ রাইট ইউ আর।তাহলে ঐ কথাই রইল। কাল সকাল সাতটায় আমরা বেরিয়ে পড়বো‚ ডান?’ সুমি উত্তর দিল ‘ডান।’

  তারপর সুমি কলেজে যেতেই‚ সব্বাই হৈ হৈ করে এসে সুমিকে ঘিরে ধরলো। ট্রিট‚ ট্রিটচাই‚ কোন অজুহাত চলবে না। সুমাত্রা মোটামুটি রেডি হয়েই এসেছিল। বলল দাঁড়া‚ আগে মার্কশিটটা নিই‚ তারপর সবাই মিলে ক্যান্টিনে যাবো।তার আগে রুসা গিয়ে কানাইদাকে স্পেশাল কিছু তোদের যা ইচ্ছা অর্ডারটা দিয়ে আয়‚ বানাতেও তো সময় লাগবে।
রুমেলা বলল  ‘আরে সেটা তোকে ভাবতে হবে না। আমরা অলরেডি অর্ডার দিয়ে দিয়েছি।’
‘না রে‚ তোর খুব বেশী খসাবো না। কোল্ডড্রিন্ক‚ এগডেভিল আর লাষ্টে জমিয়ে এককাপ করে কফি। কি রে অসুবিধা করলাম না তো?’ বললো তুহিন।
সুমি বলল ‘ধ্যাৎ ছাড়তো। আজ তোদের যা মনে হয়েছে তাই খাওয়াবো। রুমি‚ চল তো মার্কশিটটা নিয়ে আসি।’
মায়ের ফোন ‘এই সুমি আমি সবাইকে খবর দিয়ে দিয়েছি| সবাই প্রাণ ভরে তোকে আশীর্বাদ জানিয়েছে।’
সুমি ‘ওঃ মা এখন থাক না‚ প্লিজ। আমাকে একটু সেলিব্রেট করতে দাও। পরে বাড়ী গিয়ে কথা হবে‚ ওকে।’ ফোনটা কেটে দিল। এবার সারাদিন হৈহুল্লোড় করে ক্লান্ত শরীরে সন্ধ্যেবেলা বাড়ী ফিরল সুমি। বাপিও অফিস থেকে এসে গেছে কিছু খাবার দাবার কিনে নিয়ে। সুমি গিয়ে ধপ করে ওদের সামনে বসে পড়ল। ক্লান্তিতে শরীর আর বইছে না।তবু মা‚ বাপির সঙ্গে খানিক গল্প করে উঠে গেল ফ্রেশ হতে| টয়লেট থেকে বেরিয়ে  সামান্য কিছু মুখে দিয়ে বাই করে শুতে চলে গেল। কাল আবার সকালে উঠতে হবে| সৌমরাও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। অবশ্য পৌষালী সকালের জন্যে একটু গুছিয়ে রেখে তার পর শুতে গেল।

  সকাল থেকেই সৌম্য হাঁক ডাক করে সবাইকে জাগিয়ে ঠিক সাতটাতেই বেরিয়ে পড়ল। তারপর সারাদিন যত হৈহৈ মজা করে ঘোরাঘুরি হল। রাস্তাতেই ব্রেকফাষ্ট সেরে নিয়েছিল। কোথায় যাওয়া হবে কোন উদ্দেশ্য নেই গাড়ী ছুটেই চলেছে। অবশেষে ডায়মন্ডহারবারে গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে পড়লো। পুরো সাত ঘন্টা ড্রাইভ করে সৌম্য ওখুব ক্লান্ত। আর সুমিতো লাফ দিয়ে নামল। পেছনে ধীরে সুস্থে পৌষালী।
পৌশালী বলে ‘উঃ তোমার এখনো এতো এনার্জি? বাব্বা‚ সেই কোন সকালে বেরিয়েছ এখনও সুমি জেদ না করলে তুমি থামতে না।’
‘অফকোর্স। আমি আরো কিছুদুর গিয়ে তবে থামবো ঠিক করেছিলাম। ঐ সুমির জন্যেই বাধ্য হয়ে.......’
‘ওঃ বাপি আমি এতো ধকল আর সহ্য করতে পারছিলাম না। জানো তো কাল সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে হৈহৈ করেছি।রাতে কঘণ্টা রেষ্ট। আর পারা যায়?’
‘নাও চল পেটে তো ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে। সামনেই সাগরিকা‚ সরকারী হোটেল ব্যবস্থাও ভালো শুনেছি। চল ওখানে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চটা সেরে নিই।’

‘আবার ফিরতে তো সন্ধ্যে হয়ে যাবে’ বললো সৌম্য। বাপির কথা শেষ হওয়ার আগেই সুমি মায়ের হাত ধরে ঢুকে পড়েছে সাগরিকাতে। ওখানে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে বেরিয়ে গঙ্গার ধারে বসে একটু রেষ্ট নিয়ে আবার শুরু হল যাত্রা।তবে এবার বাড়ীর উদ্দেশ্যে। বাড়ী ফিরে তিনজনেই এতো টায়ার্ড যে সবাই ফ্রেশ হয়ে একটু কফি খেয়ে একেবারে বিছানায়। তারপর আত্মীয়স্বজনের আসা যাওয়া, মামার বাড়ীতে যাওয়া এইসব করে কটা দিন বেশ কেটে গেল।এবার ইউনিভারসিটিতে ভর্তি হওয়ার পালা। সুমির অবশ্য কোন চিন্তা নেই। ওর রেজাল্টই ওর বড় প্রমাণ| তাও নিয়ম মত সবই করতে হল। বাপি ছিল সঙ্গে ফর্ম ফিলাপ করে জমা দিয়ে বাড়ী ফিরল।

  নির্দিষ্ট দিনে এডমিশনও হয়ে গেল। ঐ দিন ওদের কলেজের তিনজনের সঙ্গে দেখাও হল। ওরাও চান্স পেয়েছে কলকাতা ইউনিভারসিটিতে। সুমি খুশিই হল। প্রথম থেকেই বন্ধু দু-একজন থাকলে সুবিধা হয়। ওদের সঙ্গে ঠিক করে নিল প্রথমদিন কটায় মিট করবে। তারপর রুটিন দেখে কোথায় ক্লাশ জেনে তবে সেই ঘরে যেতে হবে। ওদের বাই করে বাড়ী ফিরল সুমি। প্রথমদিন ইচ্ছে করেই সুমি মায়ের একটা শাড়ী পরে একটু সেজেগুজেই ইউনিভারসিটিতে গেল। ছেলেমেয়ে সবারই বেশ নজর পড়ছে সুমির দিকে।দেখতে তো ভালো রংটা অবশ্য একটু চাপা। তবে আজ

হালকা গোলাপী শিফনটাতে দারুণ লাগছে ওকে। রুমেলা আর রুশার সঙ্গে রুটিন দেখে চলল তেরো নম্বর রুমে। ফার্ষ্ট পিরিয়ড প্রফেসর সমুদ্র সেনের। উনি খুবই গুণী মানুষ‚ গোল্ডমেডালিষ্ট। তাই শুধু নয় নিয়মিত ওনার লেখা আর্টিকেল পত্রপত্রিকাতে ছাপা হয়। তাই উনি স্বনামধন্য।সুমিও ওঁর লেখা কিছু কিছু পড়েছে ভালো লাগে ওনার লেখার ষ্টাইলটা। কিন্তু কোনদিন চাক্ষুষ দেখেনি শুধু ফটো দেখেছে। তাই মনে মনে একটু এক্সাইটেড ছিল। কারণ ছবিতেই ওনাকে দারুণ লেগেছে সুমির। স্যার ক্লাশে ঢুকতে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানালো। উনি সবাইকে বসতে বললেন। সুমি কিন্তু ওনার মুখের দিকে চেয়ে বসার কথা ভুলেই গেল। পাশ থেকে রুমেলা হাত ধরে টান দিল ‘কিরে বস‚ সবাই হাসাহাসি করছে তো’।
এবার সুমির খেয়াল হতেই ধপ করে বসে পড়লো। কিন্তু চোখ ওনার দিকে। কি সুপুরুষ চেহারা। লম্বা‚ দোহারা চেহারা‚ বয়েসটা বোধহয় ফর্টির কাছাকাছি হবে। চুলে দু-একটা রুপালীরেখা উঁকি দিচ্ছে। সবচেয়ে আকর্ষক ওঁর চোখদুটি| চোখে সত্যিই সমুদ্রের গভীরতা। সুমি তো ওঁর চোখের থেকে আর চোখ সরাতেই পারছে না। এপাশ থেকে রুশা লক্ষ্য করে ওকে ধাক্কা দিয়ে বলল ‘এই সুমাত্রা কি করছিস? স্যার কি ভাববেন বলতো?’ সুমির সম্বিত ফেরে তাইতো, ছি ছি‚ কি করছেও।

  বাড়ী ফিরেও বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে সুমি। খালি সমুদ্র সেনের মুখটা চোখের সামনে ভাসছে। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে আমার এমন হচ্ছে কেন? কি যেন একটা ভালোলাগা অনুভুতি। একেই কি বলে লাভ এট ফার্ষ্ট সাইট? ধ্যাৎ, আমি এসব কি ভাবছি? উনি একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। হয়তো ওনার স্ত্রী‚ পুত্র আছে। না না আমার এরকম ভাবা উচিৎ নয়। সারারাত বিছানায় এপাশ ওপাশ করেই কেটে গেল‚ একটুও ঘুম এল না। নাঃ কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না। ঐ টানাটানা চোখ দুটি যেন ওকে আকর্ষণ করে চলেছে। অসম্ভব আমি কিছুতেই ওঁকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারবো না| সকালে ঘর থেকে বেরিয়েই মায়ের মুখোমুখি| মায়ের নজরে পড়েছে চোখে মুখে অনিদ্রার ক্লান্তি|
‘হ্যাঁ,রে সুমি, একি চেহারা তোর? সারা রাত ঘুমাসনি? আয়নায় চোখ মুখের অবস্থা দেখেছিস?’ শুরু হল মায়ের জেরা| ‘না না‚ মা কিছুই হয়নি তো| এমনি কাল ইউনিভারসিটির প্রথম দিন ছিল‚ তাই খুব এক্সাইটেড লাগছিল তো রাতেও গুলো ভেবেই ভালো ঘুম হয়নি’ বলে পাশ কাটিয়ে টয়লেটে ঢুকে গেলাম| সমুদ্র সেনের ফার্ষ্ট পিরিওড কিছুতেই মিস করা চলবে না| তাই চট করে অল্প ব্রেকফাষ্ট করেই বেরিয়ে পড়ল সুমি| মনে সেই একজনের চিন্তাই ঘোরাফেরা করছে| ওনার পড়ানোর ভঙ্গিটাও খুব সুন্দর| আর কি দরাজ গলার পরিস্কার উচ্চারণ সত্যি সবাই মুগ্ধ হয়ে শোনে|
ক্লাশে গিয়ে সুমি পড়া শুনবে কি শুধু ওনার মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে কিছুই তার কানে ঢুকছে না| দু-একবার স্যারের নজর পড়ে যাচ্ছে ওর দিকে| স্যার নিজেই যেন অপ্রস্তুত হয়ে যাচ্ছেন| নাঃ এভাবে হবে না| সুমি এবার সমুদ্র সেনের খবর নিতে শুরু করল| কোথায় বাড়ী‚ বাড়ীতে কে কে আছেন‚ সব জানা হয়ে গেল| নাঃ যা ভেবেছিল সেটা নয়| বাড়ীতে উনি বিধবা মাকে নিয়ে একাই থাকেন| নিউআলিপুরে নিজেদের দোতলাবাড়ী ওনার বাবাই করে গেছেন|এবার শুরু হল বাপির কাছে বায়না| বাপি‚ আমি সমুদ্র সেনের কাছে টিউশন নেব তুমি ব্যবস্থা করে দাও| অগত্যা বাপি গেলেন খোঁজ নিতে| কিন্তু বিধি বাম| উনি টিউশনি করেন না| সমুদ্র বললেন ‘দেখুন‚ আমি একটু লেখালেখি করি। এইসব নিয়েই ব্যাস্ত থাকি| সেইজন্য আমি কাউকে ঠিক সেভাবে পড়াতে পারি না| যার যা কিছু জিজ্ঞাস্য থাকে‚ আমি ক্লাসেই বারবার বলে বুঝিয়ে দিয়ে থাকি| তাও সবাইকে বলি যদি কারো কোন অসুবিধা হয় ক্লাসেই সমাধান করে নিতে|’ কিন্তু বাপি তো নাছোড়বান্দা। জানে সুমি যখন বলেছে যে করেই হোক রাজী করাতেই হবে| নাহলে সুমির মুখের দিকে তাকানো যাবে না‚ হয়তো খাওয়া বন্ধ করে দেবে| উঃ ভাবতে পারছি না|
বার বার রিকোয়েষ্ট করতে শেষে উনি বললেন দেখুন ও একটা কাজ করতে পারে| ছুটির পরে আমার সঙ্গে চলে যেতে পারে আমার বাড়ীতে যেদিন ওর সম্ভব হবে| আমি ওকে ঘণ্টাখানেক সময় দিতে পারি| তবে সেটা রোজ নয়‚ আর এর জন্যে কোন পারিশ্রমিকও আমি নিতে পারবো না| সুমিতো শুনে আহ্লাদে আটখানা| পরদিনই শুরু করলো যাওয়া|
ওখানেই স্যারের মায়ের হাতে বানানো জলখাবার দুজনে মিলে খেয়ে তারপর পড়তে বসা| বলেছিলেন এক ঘণ্টা কিন্তু বোঝাতে গিয়ে কোথা দিয়ে দুঘণ্টা কেটে যেত কেউই বুঝতে পারতো না| সুমি তো বরাবরই সিনসিয়ার ষ্টুডেন্ট তাই মন্ত্র মুগ্ধের মত ওনাকে ফলো করতো| সমুদ্রও ওর একাগ্রতা দেখে খুব খুশি| ওনার সব নোটস সব সুমিকে দিয়েছেন জেরক্স করে নিতে| কিন্তু সুমি যতক্ষণ সমুদ্রের সামনে থাকে ও যেন সমস্ত জগৎ সংসার ভুলে যায়| কেবল হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে| পড়া বোঝাতে গিয়ে সমুদ্রের ও মাঝে মাঝে ওর চোখে চোখ পড়ে যায়| সমুদ্রও বোধ হয় মনে মনে দুর্বল হয়ে পড়ছে সুমির প্রতি| কিন্তু নিজের আদর্শতাকে আবার বাস্তবে ফিরিয়ে আনে| ভাবে ও আমার ছাত্রী অল্প বয়েস এসব আমার ভাবাই ঠিক নয়|

  সমুদ্রের মা ব্যাপারটা কিছুটা আঁচ করেছেন| একদিন ছেলেকে বলেও ফেললেন ‘দেখ সমু‚ সুমাত্রা মেয়েটি কিন্তু বেশ| পড়াশুনায় তো ভালো বটেই ব্যবহারও বেশ নম্র| আর দেখতেও মোটামুটি সুন্দরীই বলা চলে‚ বল?’‘হ্যাঁ মা‚ কিন্তু তুমি এসব কথা বলছো কেন বলত?’‘না‚ এমনি বলছি| তুই যখন ফ্রেশ হতে যাস ও তখন রোজ আমার কাছে আসে| কি বানাচ্ছি‚ কেমন করে করছি আগ্রহ নিয়ে দেখে আমার সঙ্গে হাতও লাগায়| কদিনেই মেয়েটা বড় আপন করে নিয়েছে|’এবার সমুদ্র উত্তর দেয়  ‘দেখ মা‚ তুমি যে সম্পর্কের কথা ভাবছো মনে মনে সেটা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও ওকে টের পেতে দিও না| মা তোমার ছেলের বয়েস হয়েছে আর সুমাত্রা সদ্য যুবতী|’‘জানি রে সবই জানি| কিন্তু ওনিজেই তো হাবেভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে ও তোকে ভালোবেসে ফেলেছে সত্যি সত্যি| এক ফাঁকে টুক করে তোর ঘরে ঢুকে তোর ঘরটা একটু গুছিয়ে রেখে আসে| আমার চোখে কিছুই এড়ায় না|’ সমুদ্রও তো সত্যিই মনে মনে ওকে ভালোবেসে ফেলেছে| কিন্তু কিছুতেই প্রকাশ করতে পারে না| বয়েসটা ওর সামনে একটা ভারী পাথরের দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়|এমন করেই কেটে গেল তিনটে বছর|

পরীক্ষা হয়ে গেছে| এখন আর সমুদ্রের বাড়ী যাওয়ার কোন ছুতো খুঁজে না পেয়ে  শেষে মায়ের কাছে টুকটাক রান্না শিখে সেটা স্যারকে দেওয়ার অছিলায় রোজই হাজির হয়ে যায় সমুদ্রের খাওয়ার সময়| নিজে বসে স্যারকে খাওয়ায় আবার মায়ের জন্য রেখেও আসে| দেখতে দেখতে রেজাল্ট আউটের সময় এসে গেল|রেজাল্ট বেরোতে দেখা গেল সুমাত্রা দারুণ রেজাল্ট করেছে| সব স্যারেরাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ| 

কিন্তু সুমি কারোর প্রশংসাকেই পাত্তা দেয় না ওর একজনের মুখের কথাটুকুই দরকার| বিকেলে কিছু খাবার আর একগোছা রজনীগন্ধা নিয়ে গেলো স্যারের বাড়ী| খাবার কিছুটা প্লেটে সাজিয়ে আর ফুলের গোছাটা হতে নিয়ে দাঁড়ালো সমুদ্রের সামনে| খাবারটা টেবলে রেখে ফুল হাতে নিয়ে নিচু হয়ে স্যারকে প্রণাম করতে যেতেই ‘এই কি করছো‚ ওঠ ওঠ’ বলে সুমির হাত ধরে দাঁড় করালো সমুদ্র|  এবার একটা গিফ্ট প্যাক সুমির হাতে দিয়ে বললো ‘তোমার ভালো রেজাল্টের পুরস্কার|’ সুমি তাড়াতাড়ি খুলে দেখে একটা ডায়মণ্ডের নেকলেস| দারুণ খুশি| এবার আবদার নিজে হাতে পরিয়ে দিতে হবে|

সমুদ্র বলে ‘আমি তো এসব পরাতে হয় কিভাবে জানি না’|
‘ও সব জানি না পরিয়েই দিতে হবে‚ নইলে আমি নেব না| থাক তাহলে রেখেই দিন|’
‘উঃ‚ তুমি আমাকে মহাঝামেলায় ফেললে তো সুমি| আচ্ছা

দেখি‚ এদিকে এস’ বলে অনেক চেষ্টা করে পরিয়ে দিল নেকলেসটা| এবার সুমি ঢিপ করে একটা প্রণাম করে দৌড়ে চলে গেল মায়ের কাছে| ‘কিরে‚ খুব খুশি লাগছে‚ কি ব্যাপার? রেজাল্ট তো ভালো হয়েছে জানি কিন্তু এটাতো অন্য খুশির খবর মনে হচ্ছে’ বলেন সমুদ্রের মা| সুমি কিছু বলার আগেই ঢিপ করে একটা প্রণাম করেই জড়িয়ে ধরে খুব আদর করতে লাগলো সমুদ্রের মাকে|
‘দেখ মেয়ের কাণ্ড| আরে কি ব্যাপার সেটাতো বলবি|’
‘এই দেখো মা তোমার ছেলে আমায় নিজে হাতে পরিয়ে দিয়েছে আমার ভালো রেজাল্টের পুরস্কার’ ‚বলে নেকলেসটা দেখায়|
মা বলে‚ ‘তাই? বাঃ ভারী সুন্দর মানিয়েছে তোকে|’

এবার খুব খুশিখুশি মুখে বাড়ী ফেরে সুমি|
‘কিরে সারাদিন কোথায় ছিলি? তোর বাপিও জানতে চাইছিল’ বলে পৌষালী|
কোথাও না মা‚ স্যারের বাড়ীতেই ছিলাম|
যদিও মেয়ে কিছুই শেয়ার করে না‚ তবু পৌষালীর মনে একটু খটকা লাগছে কিছুদিন ধরেই|
সব সময় স্যারের কথা‚ তার মায়ের কথা ছাড়া মেয়ের মুখে আজকাল আর কোন কথা নেই| বন্ধুদের কথাও কিছুই শোনা যায় না| মায়ের মন মেয়ের হাবেভাবে চলাফেরায় কিছুটা তো আন্দাজ করেই নিয়েছে| কিন্তু বয়সের ফারাকটা তো একটা বড় বাধা কি করে মেনে নেবে ভেবেই পায় না পৌষালী| এমনিতে তো সবই ঠিক আছে| অমন স্কলার ছেলে‚ বাড়ী‚ গাড়ী সবই আছে| বাড়ীতে শুধু মা ছাড়া কেউ নেই| সবদিক থেকেই ভালো| কিন্তু ওর বাপি কি মেনে নিতে পারবে? একমাত্র সন্তানকে ওরকম একজনের হাতে তুলে দিতে?
সুমি মাকে ধাক্কা দিয়ে বললো ‘হ্যালো কোথায় হারিয়ে গেছ তুমি? আমি সামনে দাঁড়িয়ে অথচ তুমি কোন অতলে তলিয়ে গেছ আমার দিকে নজরই নেই’| পৌষালীর উত্তরের অপেক্ষা না করে সুমি নিজেই বলল ‘তুমি বসো আমি চেঞ্জ করে আসছি|’ জামা পাল্টিয়ে এসে মায়ের মুখোমুখি বসলো সুমি|
এবার মায়ের চোখ পড়ল ‘হ্যাঁ রে, তোর গলায় ওকি? অমন সুন্দর ডায়মণ্ড নেকলেস কে দিলো তোকে?
‘সমুদ্র দিয়েছে মা| ও নিজে হাতে পরিয়ে দিয়েছে| ও‚ দাঁড়াও’ বলে উঠে গিয়ে মাকে একটা প্রণাম করল|

‘জানো মা ওর মাকেও প্রণাম করেছি| তারপর নেকলেসটা হাত দিয়ে ধরে বলে ‘ওর দেওয়া আমার জীবনের প্রথম গিফ্ট| এ যে আমার কাছে অমুল্য মা, তাইতো তোমাদের আশীর্বাদ নিয়ে তোমাদের স্বীকৃতি চেয়ে নিচ্ছি| মা তো হাঁ করে কথাগুলো শুনছে আর ভয়ে বুক শুকিয়ে যাচ্ছে| ওর বাপি শুনে কি বলবে? কিন্তু আর তো দেরী করা চলে না| আজই সব বলতে হবে ওর বাপিকে|
সুমি মায়ের মনের অবস্থা আন্দাজ করে বললো ‘মা‚ তুমি বাপিকে ভয় পাচ্ছো? তুমি কিছু চিন্তা করো না আমি আজই খাওয়ার সময় বাপিকে সব বুঝিয়ে বলবো|’
‘দেখো বাপি কিন্তু আপত্তি করবে না| বয়েস একটু বেশী তো কি হয়েছে মা| আগের দিনে তো এরকম বয়েসের ফারাকেই বিয়ে হত| আর সমুদ্রকে দেখলে মোটেই বোঝা যায় না ওর বয়েস চল্লিশ পেরিয়েছে।মায়ের মনের দ্বিধা তবু কাটতেই চায় না|রা তে খাওয়ার সময় ঠিক বাপির নজর পড়েছে নেকলেসটার দিকে|‘বাঃ ওয়াণ্ডারফুল! এটাকে চয়েস করেছে রে? আমার মামনি না তোর মা?’‘না বাপি‚ আমরা কেউই নই| আমার এমএর রেজাল্টের জন্যে সমুদ্র আমাকে গিফ্ট করেছে| নিজেই চয়েস করে এনেছে |’‘তাই? বাঃ, পছন্দ আছে তো ছেলেটার| তোকে মানিয়েছেও খুব সুন্দর|‘হুম ‚ তাহলে........ এবার আমাদের বাড়ীতে ডাক একদিন ওকে| ভালো করে আলাপ করি|’‘বাপি শুধু ওকে বললে তো হবে না ওর মাকেও বলতে হবে|’‘ও হ্যাঁ নিশ্চয় নিশ্চয়| এসব ক্ষেত্রে মা-বাবাদের তো প্রয়োজন হয়ই|‘তুই এক কাজ কর মা| নেক্স্ট সানডেতে লাঞ্চে ওদের বলে দে| না না থাক এটা আমারই কর্তব্য| আমি নিজে ওদের বাড়ীতে গিয়ে বলে আসবো‚ আর ওর মায়ের সাথেও আলাপ করে আসব|’ সুমির তো আনন্দ আর ধরে না| বাপিকে কিছুই বলতে হল না| বাপি সবটা বুঝেও নিয়েছে একসেপ্টও করেছে| মা চুপ করে দুজনের কথা কেবল শুনেই গেল| কোন উত্তর করেনি| এবার ঘরে গিয়ে সৌম্যকে চেপে ধরল| তোমার কি ব্যাপার বলতো? তুমি যেন আগে থেকেই সব জানতে মনে হচ্ছে| আর সব কিছু বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে ও নিলে| একটা অতবয়স্ক ছেলে আর আমাদের সুমির কিই বা বয়েস?‘দেখ চোখ কান খোলা রাখলেই সব বোঝা যায়| তুমি প্রথম থেকেই ধর না| সুমির জেদ ধরা সমুদ্রের কাছে পড়বেই সে| তারপর অমন সুপুরুষ চেহারা‚ অতো কোয়ালিফায়েড| নির্ঝঞ্ঝাট ফেমিলি| যদি বয়েসের বাধা নিয়ে তুমি আপত্তি কর‚ তাহলে আমাদের একমাত্র আদরের সন্তানকে হারাতে হবে জেনে রেখ|‘তার চেয়ে মেয়ে যা চাইছে সেটা মেনে নাও| এতে সুমি আর আমরাও সুখে থাকবো|’পরের রবিবার সমুদ্র তার মাকে সঙ্গে নিয়ে এল| মায়ের হাতে একটা বড় মিষ্টির প্যাকেট|সৌম্য বললো ‘এটার কি কোন দরকার ছিল দিদি?’‘অবশ্যই ছিল| শুভ কাজের কথা বলতে গেলে মিষ্টি তো মাষ্ট|’সবাই হো হো করে হেসে পরিবেশটা হালকা করে ফেলল| একেবারে সবাই মিলে খাওয়ার টেবলেই বসা হল| প্রচুর আয়োজন| খেতে খেতেই সৌম্য কথাটা পাড়লেন| সমুদ্রের মায়ের তো হাতে চাঁদ পাওয়ার অবস্থা| সুমি লাল শাড়ীতে আর লজ্জায় আরো লাল| আর সমুদ্র জানি বারণে ঈষৎ নত বদন| খাওয়া মিটলে একেবারে পঞ্জিকা দেখে সবচেয়ে কাছের দিনটাই ঠিক করা হল|ওরা চলে যাওয়ার পরে সুমি বাপির গলা জড়িয়ে ধরে আমার সুইট বাপি বলে খুব আদর করল| কারণ সুমি এতোটা আশাই করেনি একেবারে বিয়ের দিন পর্যন্ত ঠিক| ‘ওরে ছাড় ছাড় এখন কত কাজ আমার’ বলে বাপি বেরিয়ে গেল|বিয়ের জন্য বাড়ী বন্দোবস্ত করেই দুটো সুইজারল্যাণ্ডের টিকিট বুক করে তবে ফিরলেন সৌম্য| কিন্তু টিকিটের ব্যাপারটা গোপনই রইলো| মাত্র পনের দিনের মধ্যে দুই বাড়ীতেই জোগাড় যন্ত্র সব সারা| অবশ্যও বাড়ীতেও বেশীর ভাগ দায়িত্বই সৌম্য কাঁধে তুলে নিয়েছিল| নির্বিঘ্নে বিয়ে বৌভাত সব মিটে গেল| সুমিতো খুশিতে ঝলমল করছে| ওদিকে সমুদ্র আর তার মাও খুব খুশি| আর পৌষালীর মনে এখনো একটু দ্বন্দ তাই পুরোপুরি সবার তালে তাল দিতে পারছে না|বৌভাতের দিন ফিরে আসার ঠিক আগে সৌম্য আড়ালে সমুদ্রকে ডেকে বললো ‘এই নাও তোমাদের সারপ্রাইজ গিফ্ট| জানি তোমার ছুটি বেশী নেই তাই সাতদিনের সুইজারল্যাণ্ডের ছোট্ট টুর কাম হানিমূন| এটা কিন্তু আমার মামনিও জানে না|’পরদিন সকালে দুবাড়ীর সবাই এয়ারপোর্টে| ওদের চেক ইন হয়ে গেছে| ভিতর থেকে এসে একবার দেখা করে বাই করে হাত ধরাধরি করে চলে গেল| সৌম্যরা আর সমুদ্রের মা সবাই আনন্দাশ্রু মুছতে মুছতে গাড়ীতে উঠে বাড়ীর দিকে রওনা দিল।                                                                                                                      

কবি

       সম্মান

আইভি চ্যাটার্জ্জী

...দেখেশুনে ভোলারামের গলা শুকিয়ে এল। তার তো কুল্লে সাড়ে পাঁচখানা লাইন। শোনাতে পারবে তো মন্ত্রীমশাইকে?

মন্ত্রীর ডানদিকে লম্বা টেবিলে দশজন বিশিষ্ট কবি। নানা দেশ থেকে আমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে। তাঁরা কেউ কারো সঙ্গে কথা বলেন না। কেবলই ঘাড় নাড়েন, আর কাগজে কি সব লেখালেখি করেন....

  এক দেশে এক রাজা ছিলেন। উঁহু, রাজা নয়, রাজা নয়। এখন আবার রাজা কোথায়! এখন মন্ত্রীরাই রাজা। এক দেশে এক মন্ত্রী ছিলেন। মন্ত্রী খুব কবিতা ভালোবাসেন। রাজদরবারে নিত্য নতুন কবির আগমন। কবিকে সম্মান-প্রদর্শন,বিশেষ দক্ষিণা সহযোগে আপ্যায়ণ, নানা উত্‍সবে আমন্ত্রণ .. এমন সব রাজকীয় নিয়ম আছে। রাজকার্যে মন্ত্রী দেশে বিদেশে গেলে জনা দু’ তিন কবি, একজন আবৃত্তিকার, জনা দুই গাইয়ে সঙ্গে থাকেন।

  মন্ত্রী নিজেও কবিতা লেখেন। দুর্জনেরা অবশ্য সেগুলোকে কবিতা বলতে নারাজ। নেহাত বাল্যখিল্য ছড়া। তবে ছড়া বলে কি আর কবিতা নয়! কে না জানে, ছন্দে লিখলেই কবিতা। মন্ত্রীর ছড়ার বই থুড়ি কবিতার বই দেশজুড়ে পাঠ্যপুস্তক হয়েছে। দুলে দুলে শিশুরা সে সব কবিতা মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে আসে। মন্ত্রী নিজে সর্বক্ষণ ছড়া কেটে কেটে ছন্দে কথা বলতে ভালোবাসেন। স্বভাবকবি মন্ত্রী রোজই নতুন নতুন কবিতা থুড়ি ছড়া তৈরী করেন। সেসব কবিতা মন্ত্রীর সভাসদদের মুখে মুখে আরো প্রচার হয়। নিজের কবিতা ছাড়াও মহাকবিদের কবিতার লাইন মন্ত্রীর ঠোঁটস্থ। কবি জাতটার ওপর তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। দ্যাখ না দ্যাখ, কেমন টপাটপ কবিতা লিখে ফেলেন তাঁরা। রাজকার্যের বিপুল চাপ, রাজকর্মের নানা পরিকল্পনা, দেশের নানা সমস্যা। কম টেনশন! মন্ত্রী সে থেকে মুক্তি পাবার জন্যে কবিতা পড়েন। কবিতা তাঁকে সব টেনশন, সব সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। নানা দপ্তরের কাজের জন্যে অনেকগুলো কমিটি তৈরী করেছেন মন্ত্রী। প্রতি কমিটিতে একজন কবি থাকবেনই। বিশেষ সম্মান-দক্ষিণায় তাঁরা বিশেষভাবে নিয়োজিত। কর্ম-সংক্রান্ত মিটিং-এর শুরুতেই একটি কবিতাপাঠের ব্যবস্থা আছে। যাতে কাজ শুরুর আগে দপ্তরের সব কর্মীর মাথা টেনশন-মুক্ত হয়।

  তবু মন্ত্রীর মনে সুখ নেই। নিত্য রাজসভায়, জনতার সভায় কবিতা উদ্ধৃতি দিতে গেলে নিত্যসঙ্গী একজন কবি চাই। তিনি মন্ত্রীর বক্তৃতা লিখে দেবেন, রাজসভায় কবিতা পাঠ করে সবার মাথা ঠান্ডা রাখবেন। তাছাড়া রাজদরবারে একজন সভাকবি না হলে চলে? এখন মুশকিল এই যে, মন্ত্রীর প্রিয় কবিরা সবাই এক এক দপ্তরের উপদেষ্টা পদে আছেন। কোনো একজনকে সভাকবির পদ দেওয়া যায় না। ইতিমধ্যেই মন্ত্রী একটা কবিতা অ্যাকাডেমি তৈরি করেছেন। বছরে একবার কবি-অ্যাকাডেমি-অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। আর কী করা যায়!ভেবেচিন্তে মন্ত্রী এক কবিতা প্রতিযোগিতার আয়োজনের আদেশ দিলেন। প্রথম পুরস্কার পাওয়া কবিকে হাজার স্বর্ণমুদ্রা দক্ষিণার সঙ্গে ‘কবিকিঙ্কণ’ উপাধি দিয়ে সভাকবি পদে অভিষেক করা হবে। চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। অনেককাল দেশে এমন সংস্কৃতিমনস্ক রাজা, থুড়ি মন্ত্রী পাওয়া যায় নি। মানুষের উন্মাদনার সীমা নেই।

  সেই দেশে থাকে এক ভোলারাম। চাষবাসই হোক, আর সংসারে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠই হোক, ভোলারামের নিষ্ঠার অভাব নেই। তবু ভোলারামের কপালে কেবল নিন্দেমন্দ জোটে। সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছনা বউয়ের কাছে। ভোলারামের বউ সর্বদাই নিজের ভাইদের সঙ্গে তুলনা করে ভোলারামকে নিষ্কর্মা অকর্মণ্য বলে বলে গঞ্জনা দেয়। বেচারা কিছুতেই আর বউ এবং শ্যালকদের খুশি করতে পারে না।

পুকুরঘাটের পড়শিনীদের জটলা থেকে খবর পেল বউ, একহাজার স্বর্ণমুদ্রার খবর। ব্যস, একবার সভাকবি হতে পারলেই হল। ‘খেটে রোজগার করার মুরোদ নেই, এবার ঘরে বসে রোজগারের সুযোগ এসেছে। আর কোনো অজুহাত শুনব না। একখান মাত্র কবিতা। তা পারবে না?’

শ্যালকরা বলল,‘এই একটা কাজ করে দেখাও তো বুঝি। আমাদের বোনটার কথা তো ভাবতে হবে তোমায়। একবার ভাবো দেখি, হাজার স্বর্ণমুদ্রা। আর তোমায় ক্ষেতের কাজে, ঘরের কাজে খাটাতে পারবে না কেউ। পায়ের ওপর পা তুলে জমিদারি করবে কেবল ।‘

বৌও বোঝালো,‘তা নয়ত কি? প্রথমেই তো কয়েক বিঘে জমি কিনে ফেলব। একটা মাত্র কবিতা লিখেই জমিদারি। এমন সুযোগ আর আসবে?’

শুনতে শুনতে ভোলারামের মনেও ঘোর লেগে গেল। জেগে জেগেও সভাকবি হবার স্বপ্ন। আহ, তাহলে আর বউয়ের গঞ্জনা শুনতে হবে না। আসতে যেতে শ্যালকরা কুর্নিশ করবে। সারা দেশে নাম ছড়িয়ে পড়বে। আহা, সত্যি সত্যি যদি এমনটা হয়!

তিনটে খাতার তিন দিস্তে কাগজ শেষ হয়ে গেল। কবিতা হল না। এক ডজন কলম খারাপ হয়ে গেল। দেখেশুনে বউ এক বাক্স পেনসিল এনে দিল। আর একখানা মোটা খাতা। লেখা পছন্দ না হলে মুছে মুছে লিখবে। খাতার ওপর ‘ওম সরস্বত্যই নম:’ লিখে মন্দির থেকে ফুল বেলপাতা এনে পুজো করে নিল ভোলারামও। 

কিছুতেই কিছু হয় না। কবিতা লিখতে গেলে রচনা হয়ে যায়। কিংবা তাল দিয়ে দিয়ে গান। এমন কবিতা চলবে না। বেশ অন্যরকম লিখতে হবে, যা একবার শুনলেই সবার

তাক লেগে যাবে। হাজার স্বর্ণমুদ্রা তো আর এমনি এমনি দেবে না।গ্রামের স্কুলের মাষ্টারমশাই কবিতার ক্লাস খুলেছেন। উপসর্গ হল মাথায় টনটনে ব্যথা। দাঁতে কনকনে যন্ত্রণা। কবিতার অ আ ক খ, কবিতার ব্যাকরণ, ছন্দ লয় মাত্রা সব শিখছে ছেলেরা। বউ ভোলারামকে কবিতা-ইশকুলে ভর্তি করে দিল।

কবিতার ক্লাসে গিয়ে কিন্তু ভোলারাম কিছুতেই জুত করতে পারে না। কবিতার ব্যাকরণ শুনতে গিয়ে ঘুম এসে যায়। ঘুমিয়ে পড়লে তো চলবে না। রাত জেগে জেগে নতুন নতুন শব্দ মুখস্থ করতে হয়। নতুন  এদিকে বোসপাড়ার দুলো, নবীনগরের তুলো, মৌহাটির কুলো সব্বাই টপাটপ কবিতা নামিয়ে ফেলছে রোজ। মাষ্টারমশাই বলে দিয়েছেন, অন্তত একশ’টা কবিতা লিখে ফেলতে হবে। তার মধ্যে থেকে সেরা কবিতাখানা বেছে দেবেন তিনি।

পুকুরপাড়ে গিয়ে বউ সব খবরই পায়। এত কবিতা লিখে ফেলছে সবাই, অথচ নতুন মোটা খাতার পাতায় একটা পেন্সিলের আঁচড় কাটা হয় নি ভোলারামের। বউ বাড়িতে তুলকালাম করছে রোজ। কোনোদিন খাওয়া বন্ধ, কোনোদিন ঘুমোনো বন্ধ, কোনোদিন কথা বন্ধের শাস্তি চলছে।

  একদিন মাষ্টারমশাইয়ের কাছে বেশ কান্নাকাটি করে ফেলল ভোলারাম। মাষ্টারমশাই বোঝালেন,‘শোনো বাবা ভোলারাম, কবিতা লেখা কিন্তু যার তার কম্মো নয়। শুধু গুটিকয় শব্দ সাজিয়ে দিলেই হবে না। প্রথমে শব্দটা মাথায় খেলাতে হবে। শব্দের এক একটা অক্ষর বেশ গভীরে প্রবেশ করবে, কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হবে, শিরশির করবে সারা শরীর, সেই হল সৃষ্টির বিশেষ ক্ষণ। পাত পেড়ে বসে পড়লাম আর হাপুসহুপুস ভাত খেয়ে ফেললাম, তেমন তো নয়। কবিতা ছাড়া জীবন পানসে, এমন একটা গভীর অনুভুতি চাই। সাধনা চাই। অন্তরের প্রেরণা চাই। প্রেরণা বলতে কিন্তু রক্তমাংসের মানুষ নয়। অন্য একটা কিছু। গভীর একটা বোধ। সব সময় যা জাগিয়ে রাখবে। চেতনাকে জাগ্রত রাখা, ঘুমের মধ্যেও জেগে থাকা, অত সহজ নয়।‘ ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে ভোলারাম, আর যা-ই হোক, কবিতা হবে না। বুকের মধ্যে টনটনে কষ্ট, মাথার মধ্যেটা ভার। একলা একলা হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে এসে পৌঁছল। ‘কবিতাই হল না, আমার আর বেঁচে থেকে কি লাভ, এ জীবন লইয়া কি করিব’ নদীর জলে ঝাঁপ দিল ভোলারাম। শীতের বিকেল। কনকনে ঠান্ডা জল। সারা শরীর শিরশির করে উঠল। চমকে উঠল ভোলারাম। এই তো সেই অপার্থিব অনুভুতি! সারা শরীর শিরশিরিয়ে উঠে কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হওয়া একেই বলে নাকি! ঠিকই তো। কবিতা ছাড়া জীবন পানসে, এ অনুভুতিটা বেশ চিনতে পারছে। আর একটা কি যেন বলছিলেন মাষ্টারমশাই? ওহো, চেতনাকে জাগ্রত রাখা। চোখ খোলা রাখো হে ভোলারাম, জেগে থাকো। ঠান্ডা জলে গলা পর্যন্ত শরীর ডুবিয়ে রেখে কাঁপতে কাঁপতে চারপাশে তাকাল।

কই, কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। চারদিকে জনমনিষ্যি নেই। নদীর ধারের দিক থেকে গাছের একটা লম্বা ডাল এঁকেবেঁকে এসে পড়েছে জলের মধ্যে। সেই ডালে বসে একটা কাক অলস ভঙ্গীতে এক একবার জলে ঠোঁট ডুবোচ্ছে, আবার মাথা তুলে এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখছে। ফের ঠোঁট ডুবোনো, ফের মুখ তুলে চারদিকে চাওয়া। নিরাসক্ত দার্শনিক ভঙ্গী। একহাত দূরে জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে একটা জলজ্যান্ত মানুষ ঠকঠকিয়ে কাঁপছে, সেদিকেও দৃষ্টি নেই কাকের।

হঠাত্‍ সত্যিই নাভিমূল পর্যন্ত শিউরে উঠল ভোলারামের। ‘রক্তমাংসের মানুষ হলে হবে না, প্রেরণা চাই’

তবে কি এই কাকই সেই ঈশ্বরপ্রেরিত প্রেরণা? তাহলে এখনই কবিতা আসবে? হে ভগবান, হে মা সরস্বতী, দাও দাও কবিতা দাও! দয়া করো ভগবান! আশীর্বাদ করো!

আচ্ছা, কাকের ভালো নামটা কি যেন! বায়স। বাহ, সারসের সঙ্গে মিল হয় বেশ। শ্বেত শুভ্র সারস, আর কালো কাক। না না কালো নয়, কালো নয়। কৃষ্ণ। ‘হে কালো কাক’ না বলে ‘অহো কৃষ্ণ বায়স’ বলা বেশি ভালো।

কাকটা ঠোঁট ডুবিয়ে একখানা জ্যান্ত মাছ তুলে আনল এ সময়। আপাদমস্তক শিউরে উঠল ভোলারাম। কৃষ্ণ বায়স। তীক্ষ্ণ ঠোঁট। ঠোঁটের ভালো প্রতিশব্দটা কি যেন! মনে পড়ল না। যাকগে, শব্দ মনে করতে গিয়ে কবিতাটা ছেড়ে গেলে মুশকিল। কৃষ্ণ বায়স কেমন হাঁ করে মাছ ধরছে দ্যাখো! ছটফটে মাছটাকে গপ করে গিলে নিল কাক! কৃষ্ণ বায়সের হাঁ মুখ। হাঁ নয়, হাঁ নয়। ভালো একটা শব্দ চাই। মুখের ভেতর। গহ্বর। ভাবতে ভাবতেই মাথায় কবিতার লাইন:

                    জলের মধ্যে ডুবিয়ে দাও

                    ডুবিয়ে দাও জলের গভীরে

                    তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর

                    হে কৃষ্ণগহ্বর

                    চঞ্চলা চপলকে গ্রাস করো

                    হে স্থিতধী কৃষ্ণ

                    আমি যে তোমার মন পড়তে পারি

নাচতে নাচতে বাড়ি এল ভোলারাম। মগ্ন ভাব, উদ্দীপ্ত দৃষ্টি।রকম সকম দেখে বৌও আর ঘাঁটাতে ভরসা পায় না। এমন মেজাজ না হলে কবিকে মানায়! মনে গভীর পুলক, বউ চিড়ে-মুড়ি বেঁধে পুঁটুলিতে খাতা-কলম ঢুকিয়ে দিল, রাজসভায় যাবে ভোলারাম।

‘ওসব খাতা ফাতা লাগবে না’, জোরে জোরে হাত নাড়ে কবি ভোলারাম, ‘কবিতা আমার মাথায় আছে।‘ বউ তো বটেই, শ্যালকদেরও সপ্রশংস দৃষ্টি। আহা, সরস্বতীর বরপুত্র বুঝি এমনই হয়! রাজসভার দৃশ্য টিভিতে লাইভ দেখানো হবে আজ। মন্ত্রীর শ্বেতশুভ্র বসন, মঞ্চের চারদিকে সাদা চাদর। সঞ্চালক বিগলিত হাস্য, মন্ত্রীর সিংহাসনের পাশেই বসার অধিকার যে আজ। পারিষদরা গম্ভীর মুখে সচেতনভাবে টিভি ক্যামেরার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আছেন। সামনে সারি সারি টেবিলে সারি সারি মাইক্রোফোন। সারি দিয়ে বসে আছেন দেশের নামী দামী কবিরা, তাঁরা সকলেই আজ বিচারক।

  বিশাল হলঘরের পেছনে একদিকে নীল রঙের অর্ধবৃত্তাকৃতি চাঁদোয়া। এক এক চাঁদোয়ার নিচে অন্তত তিনশ কবির বসার ব্যবস্থা। আরেকদিকে ফুল ফুল সিল্কের ছাউনির নিচে দর্শকের আসন। মঞ্চ, হলঘর, বসার সব জায়গা সাজানো হয়েছে সাদা রজনীগন্ধা, হলুদ গাঁদা আর নীল অপরাজিতায়। দরজার পাশে পাশে মঙ্গলঘটে ঘন সবুজ আম্রপল্লব। মঞ্চ জুড়ে সাদা আল্পনা, দেশের নামী চিত্রকর এঁকেছেন। মঞ্চের পেছনের দেয়াল জুড়ে চিত্রকররা ছবি এঁকেছেন। সবুজ মাঠ, লাল সূর্য, সোনালী তোরণ, নীল পতাকা।নামী অনামী সব কাগজ থেকে, পত্রিকা থেকে সাংবাদিক সমালোচক এসেছেন, একবাক্যে ঘাড় নাড়লেন। হ্যাঁ, জম্পেশ ব্যবস্থা হয়েছে বটে।

  দেখেশুনে ভোলারামের মুখ শুকিয়ে গেল। কত কবি। কত দূর দূর থেকে এসেছে।  শীর্ণমুখো, চশমাচোখো, হুঁকোমুখো। কেউ লম্বা দাড়ি, কেউ খোঁচা দাড়ি। কারো কাঁধে ঝোলা, কারো পরনে জোব্বা। কেউ লিখেই চলেছে। কেউ ল্যাপটপ নিয়ে একমনে টাইপ করে চলেছে। কেউ ফিসফিস করে কবিতা বলছে। কেউ বক্তৃতার মত একনাগাড়ে আবৃত্তি করে চলেছে। কোথাও বা পাঁচ সাতজনের এক একটি দল, তারা আবার বুড়ো কবি দেখলেই নাক কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। দশ বারোজন কবির একটা দল জোরে জোরে কবিতার আধুনিক ব্যাকরণ নিয়ে আলোচনা করছে। লম্বা সাদা দাড়ি, কাঁধে ঝোলা এক কবি মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে জোরে জোরে কবিতা আন্দোলনের ইতিহাস শোনাচ্ছেন। তাঁকে ঘিরে কবিতা-বিপ্লবীদের একটা বড় দল। সেদিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন বাউল-কবি। মাঝে মাঝে খোলা গলায় গানের সুরে কবিতা বলে উঠছেন। দর্শক আসন থেকে মুহূর্মুহু হাততালি। টিভির ক্যামেরা নিয়ে ছেলেমেয়েরা এদিক সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। এত মজা, কাকে ছেড়ে কাকে ধরি ভাব। হাজার হাজার কবি। লক্ষ লক্ষ কবিতা। লম্বা কাগজে, মোটা খাতায়, ছবির মতো পোস্টারে, পতাকার মত নিশানে। দেখেশুনে ভোলারামের গলা শুকিয়ে এল। তার তো কুল্লে সাড়ে পাঁচখানা লাইন। শোনাতে পারবে তো মন্ত্রীমশাইকে?

মন্ত্রীর ডানদিকে লম্বা টেবিলে দশজন বিশিষ্ট কবি। নানা দেশ থেকে আমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে। তাঁরা কেউ কারো সঙ্গে কথা বলেন না। কেবলই ঘাড় নাড়েন, আর কাগজে কি সব লেখালেখি করেন। কারো কবিতা শুনে গম্ভীর মুখে এ ওর দিকে তাকান। সভার দর্শক জনতা হয়ত হাসতে হাসতে হাততালি দেওয়া শুরু করেছিল, কবিদের মুখ দেখে তাড়াতাড়ি শোকস্তব্ধ নীরবতা পালন করে। মন্ত্রীর বাঁ দিকে লম্বা লম্বা পাঁচখানা টেবিল। পাঁচখানা টেবিল রাখার জন্যে এদিকটা সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে। এক এক সিঁড়িতে এক একখানা টেবিল। যাতে সবাইকে বেশ দেখা যায়। এঁরা বিশেষ অতিথি। মন্ত্রীমশাইয়ের যে কোনো সভার আয়োজনে এঁরা উপস্থিত থাকেন। দর্শকদের বিশেষ চাহিদার কথা মাথায় রেখে এই ব্যবস্থা।

  সিনেমা - অভিনেতা, নাট্য - অভিনেতা থেকে শুরু করে আবৃত্তিকার সঙ্গীতশিল্পী গাইয়ে বাজিয়ে গীতিকার চলচ্চিত্র -পরিচালক টিভি সিরিয়াল - পরিচালক প্রযোজকদের মস্ত দল। আছেন বিশিষ্ট খেলোয়াড়, ফুটবল ক্রিকেট টেনিস ব্যাডমিন্টন থেকে দাবা সাপলুডো খেলোয়াড়রাও। টিভিতে রিয়েলিটি শো করে উঠে আসা নতুন মুখের পাশাপাশি বিগত যুগের অভিনেতা সাহিত্যিক কবি গায়ক। সেকালের রাজাদের নবরত্ন - সভার কথা মাথায় রেখে মন্ত্রীর এই বিশেষ রত্নসভা। অন্তত নব্বই রত্ন। দর্শকের মূল আকর্ষণ।বিচারক কবিরা কবিতা শুনে গম্ভীর হয়ে পড়লে এই রত্নসভা মাথা নিচু করেন। কবিরা মুচকি হাসলে হাততালি দিয়ে হাসেন। কোন কবিতায় বিচারক কবিরা দন্ত - বিকশিত করে হাসেন। তখন রত্নসভার কেউ কেউ মুখের মধ্যে হাত দিয়ে বিশেষ আওয়াজ করেন। ভোলারাম আজ জেনেছে,এই বিশেষ মুদ্রাকে ‘সিটি মারা’বলে। এই মুদ্রাটি ব্যবহার হলে দর্শক আসন থেকে লোকজন উঠে নৃত্য প্রদর্শন করেন। রত্নসভাও তাতে যোগ দেন। মন্ত্রী হাততালি দিয়ে ঘাড় নাড়েন। নামী রঙ্গকৌতুক শিল্পী এ সভায় বিদূষকের পদে আছেন। তিনি তখন একটি শিঙা বাজিয়ে কবিকে সম্মান প্রদর্শন করেন।

  এক একবার বিচারক কবিদের মধ্যে কবিতার ব্যকরণ ছন্দ মাত্রা বৃত্ত নিয়ে তর্ক লাগে। দর্শক শ্রোতারা উন্মুখ হয়ে জ্ঞানগর্ভ সেসব তথ্য শোনে। একসঙ্গে এতজন তত্ত্বজ্ঞানী সর্বজ্ঞানী কবির দেখা পাওয়া ভাগ্যের কথা। আবেগপ্রবণ কেউ কেউ জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে ফেলে। নবীন কবিরা ডায়েরির পাতায় নোট নিতে ব্যস্ত। প্রবীণ কবির দল গম্ভীর মুখে কখনো মাথা দুলিয়ে সায় দেন, কখনো রাগ করে মুখ ফিরিয়ে থাকেন। মন্ত্রীমশাই কবিতা শোনেন এক মনে। মাঝে মাঝে হাই তোলেন, তখন পাঠরত কবিকে সভা থেকে বার করে দেওয়া হয়। কবিতা শুনে মন্ত্রী মুচকি হাসলে কবিকে রৌপ্যমুদ্রা পুরষ্কার দেওয়া হয়। মন্ত্রীমশাইয়ের দন্তবিকশিত হলে স্বর্ণমুদ্রা পুরষ্কার। তারিফ করে মন্ত্রী ডানদিকে ঘাড় দোলান, তখনই কবিকে একটি কমিটিতে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। মন্ত্রীর ঘাড় যদি বাঁ দিকে দোলে, তখন কবিকে আগামী পূর্ণিমায় কবিসভার জন্যে আগাম দক্ষিণা দিয়ে নিমন্ত্রণপত্র দেওয়া হয়।

  কবিতা শুনতে শুনতে মন্ত্রী পেছনপানে চাইলে রত্নসভার সবাই হাততালি দিয়ে ওঠেন। একজন বা দুজন বিশিষ্ট রত্ন পাঠরত কবিকে নিয়ে নৃত্য প্রদর্শন করেন। মন্ত্রী যদি সামনের দিকে ঝুঁকে চক্ষু মুদিত কারেন, কবিকে উজ্জ্বল তাম্রপাত্রে বিশেষ উপঢৌকন দেওয়া হয়। দেশের নামী অনামী ছোট বড় হাজার খানেক অ্যাড-এজেন্সি এই উপঢৌকন দেওয়ার জন্যে উন্মুখ অপেক্ষায় রাজসভার বাইরে সারি দিয়ে বিপণী খুলে রেখেছেন।

  প্রথম তিন দিন ভোলারাম বসার জায়গাই পায় নি। দাক্ষিণাত্যের কবিরা বিদায় নেবার পর চারদিনের অপরাহ্নে সভায় বসার জায়গা পেল। কবিতা পড়ার ডাক পেল আরো তিনদিন পরে।

খালি হাত, কাগজ কলম নেই। কবিকে দেখে সভা অবাক।

 

ভুল লোক মঞ্চে উঠে পড়েছে ভেবে টিভি ক্যামেরাগুলো রত্নসভার ছবি দেখাতে লাগল। জীর্ণ পোষাক, গলায় একটা উড়নি পর্যন্ত নেই, রুক্ষ চুল, শীর্ণ মুখ, খালি পা। অজানা শঙ্কায় পা দুটো কাঁপছে। মন্ত্রী বিগলিত হলেন। গরীব গুরবো মানুষ দেখলেই তাঁর চোখে জল আসে। উত্তরীয় তুলে চোখের জল মুছে অভয়মুদ্রায় হাত তুললেন,‘ মাটির গন্ধ বয়ে আনা কবি, আপনি কবিতা পড়ুন।‘ টিভি ক্যামেরা তাড়াতাড়ি সে ছবি তুলে নিল।

আলোর জোয়ারে ভোলারামের পায়ের কাঁপুনি শরীর জুড়ে। কাঁপা কাঁপা গলায় আবৃত্তি করল,

          জলের মধ্যে ডুবিয়ে দাও

          ডুবিয়ে দাও জলের গভীরে

          তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর

          হে কৃষ্ণগহ্বর

          চঞ্চলা চপলকে গ্রাস করো

          হে স্থিতধী কৃষ্ণ

          আমি যে তোমার মন পড়তে পারি

জনতা নিশ্চুপ। সভা নি:শব্দ। আগামী লাইনগুলো কি হবে সেই ভাবনায় উত্‍কণ্ঠ। উদগ্রীব। ভোলারাম সবিনয়ে জানালো, তার পাঠ শেষ হয়েছে। জনতা অট্টহাস্য করে উঠল। বিচারক কবিরা বঙ্কিমহাস্যে একে অন্যের দিকে চাইলেন। রত্নসভা থেকে জোরে হুল্লোড় আর হাসির শব্দ ভেসে এল। প্রতিষ্ঠিত কবিরত্নরা স্বস্তির শ্বাস ফেলে হাসলেন। আরো একজন কবির উত্থানের ফাঁড়া কাটল।

কবিতা-বিপ্লবের সংগ্রামী কবিরা ভ্রু কুঁচকে চাইলেন। দীর্ঘদিনের কবিতা আন্দোলনের পর এ কি অনাসৃষ্টি! নবীন কবিরা তর্ক তুলল, কবিতাপাঠের আসরে কবির মিনিমাম একটা স্ট্যান্ডার্ড থাকা উচিত কিনা। পারিষদের দল ধমকে উঠলেন,‘ওহে ছোকরা, এখানে রসিকতা করতে এসেছে? একে কবিতা বলে?’

  মন্ত্রীমশাই চুপ করে বসে রইলেন। তাঁর অন্যরকম মনে হচ্ছে। এ তো কবিতা নয় শুধু, এ যেন এক গভীর অর্থবাহী সঙ্কেত। সম্প্রতি পশ্চিম সীমান্তের গুপ্তচর সংবাদ এনেছে, একদল বিদ্রোহী প্রজা আন্দোলনে নেমেছে। উত্তর সীমান্তের বন্ধুরাষ্ট্রের গুপ্ত সমাচার, প্রাণ সংশয় পর্যন্ত হতে পারে তাঁর। এ কবিতা কি তারই সঙ্কেত? এ কবি কি প্রাণঘাতী গুপ্তচর, নাকি প্রাণদায়ী দেবদূত? এ কবিতা বুঝতে হলে বিশেষ রাজনৈতিক জ্ঞান চাই, নাকি এ সঙ্কেত বোঝার জন্যে বিশেষ আধ্যাত্মিক জ্ঞান?

  কবিতাবোদ্ধা হিসেবে দেশ তথা বিশ্বের সাংস্কৃতিক মহলে ইদানিং বেশ সুনাম হয়েছে তাঁর। সাম্প্রতিক অতীতে একদল বিদেশী বণিক তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ ত্রিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়ে গেছে। এই নিয়ে প্রচ্ছন্ন একটু অহঙ্কারও আছে তাঁর। তিনি বুঝবেন না, এমন কবিতাও হয় নাকি!

গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কবি, এ কবিতা বোঝাতে পারবে তুমি? ’বিচারক আসনের দিকে ফিরলেন, ‘আপনারা কেউ বোঝাতে পারবেন?’

পারিষদের দল নড়েচড়ে বসলেন। রত্নসভা গম্ভীরমুখে সমর্থনের ভঙ্গিমায় মাথা দোলাতে লাগলেন। বিচারক প্রবীণ কবিরা মন্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে ঘাড় ঝাঁকাতে লাগলেন। তার অর্থ ‘আমি বুঝেছি’ নাকি ‘আমি বুঝি নি’ তা বোধগম্য হল না। প্রবল উত্‍কণ্ঠায় কবিরা সবাই মঞ্চের দিকে চেয়ে রইলেন।

ভোলারাম কেবল মিটিমিটি হাসে।

মন্ত্রী নিশ্চিত হলেন। এ কবিতা যে সে কবিতা নয়। এর গূঢ় অর্থটা জানতেই হবে। কবিতা - সভার নিয়ম ভেঙে মন্ত্রী ঘোষণা করলেন, ‘এ কবিতার অর্থ যে ঠিক ঠিক বোঝাতে পারবে, তাকে পুরষ্কার হিসেবে সহ-সভাকবি পদ দেওয়া হবে।‘ এ পদটি আগে ছিল না। কবিসভা উল্লসিত। দর্শক উজ্জীবিত। মন্ত্রীর এহেন কর্মসূচীর জন্যে রাজসভা গর্বিত। রত্নসভার সদস্যরা টিভি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন, মন্ত্রীমশাইয়ের এমন বিপ্লবী চিন্তার জন্যে অতি শীঘ্রই তাঁকে ‘অনলস সংগ্রামী কাণ্ডারী’ আখ্যা দিয়ে একটি সম্বর্ধনা দেওয়া হবে।

এবার অর্থ বোঝার পালা। নবীন কবিরা স্পষ্টত দুই দলে বিভক্ত।

একদল বলে, ‘তীক্ষ্ণ’ আঘাত। জেহাদের ডাক এ কবিতায়। তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর। ডু অর ডাই। মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন। জেহাদ চাই।

আরেক দল বলে, না না। এ আসলে প্রেমের কবিতা। ওই যে ‘মন পড়তে পারি’ এর মধ্যেই এ কবিতার গভীর ভাব।

কবিতা - আন্দোলনের কবিরা বললেন, আসল কথাটা হল ওই ‘কৃষ্ণগহ্বর’। ব্ল্যাক হোল। পৃথিবীর ধ্বংসের বার্তা এ কবিতায়। জীর্ণ পুরাতনকে ভাসিয়ে ডুবিয়ে বিদায় করার অপূর্ব দর্শন।

অধ্যাত্মবাদী কবিরা বলেন, উঁহু। ‘হে স্থিতধী কৃষ্ণ’.. এটিই কবিতার মূল। মুলাধার চক্রের মত গভীর চিন্তা।

ভোলারামের হয়েছে মুশকিল। সকাল সন্ধ্যা তাকে পালা করে নানা দলের কবিদের সঙ্গে সিটিং দিতে হয়। একদল কবি ভোলারামকে সভাপতি করে একটি ‘কবিতা ওয়ার্কশপ’ শুরু করেছেন। সেখানে রোজ শব্দ ছন্দ মাত্রা তাল অক্ষরবৃত্ত নিয়ে ক্লাস হয়।

বসে বসে ঢুলুনি এসে গেলেও সেখানে উপস্থিত থাকতে হচ্ছে। টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে ভোলারামকে নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান, তাতে নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে। ইন্টারনেটে ‘বাক - বিপ্লব’ নামে একটি ওয়েবসাইট হয়েছে, তাতে বিশেষজ্ঞ মতামত দিতে ডাক পড়ছে।

দীর্ঘ আলোচনা। সুদীর্ঘ বিশ্লেষণ। দীর্ঘতর ব্যাখ্যা।

দিনের শেষে রোজই দেখা যাচ্ছে, অবন্তী মথুরা কন্যাকুব্জ দাক্ষিণাত্য উত্তরাঞ্চল কামরূপ তিব্বত যত জায়গা থেকে আসা কবিই হোক না কেন, সব কবি এবং সব কবিতা -বিশেষজ্ঞ দাবি করছেন যে তাঁদের মতের সঙ্গেই একমত হয়েছেন বিশিষ্ট কবি ভোলারাম।

ভোলারামকে প্রশ্ন করা হলে তিনি ভীরু চোখে তাকিয়ে থাকেন।শরীর আরো শীর্ণ হয়েছে, অনিদ্রাজনিত কারণে চোখের কোণে কালি। রোজ দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে থেকে কোমরে ব্যথা, ঘাড়ে স্পণ্ডিলাইটিস। কবি ভোলারাম কেন আর হাসেন না, এ নিয়ে খবরের কাগজে কাগজে দীর্ঘ সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। কেন এখনো কেউ কবিতার মর্মোদ্ধার করে খুশি করতে পারে নি তাঁকে, সে নিয়ে ইন্টারনেটের ব্লগে ব্লগে বিস্তর লেখালেখি চলছে।

  এমনই সিটিং চলছে একদিন। টিভিতে লাইভ দেখানো হচ্ছে। ইন্টারনেটে এবং মোবাইলে দেশ বিদেশ থেকে মতামত আসছে। ‘ডুবিয়ে দাও জলের গভীরে’ নিয়ে তর্ক জমেছে। প্রবীণ কবি বললেন, ‘এখানে জলমানে জল নয়। জল মানে আত্ম - অনুসন্ধান।‘

  কবিতা আন্দোলনের পথিকৃত বিশিষ্ট কবি, সম্প্রতি কবি-অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পেয়েছেন, দীর্ঘ দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘আত্ম নয়, আত্ম নয়। আত্মা। সেই বিশেষ আত্মা,

যা কেবল মানুষ নয়, বৃক্ষ এবং লতাগুল্মে বাস করে। পশু পাখি পাহাড় নদী সর্বত্র বিরাজ করে।‘ নবীন কবি বললেন, ‘একেবারেই না। এখানে জল হল একটা সিস্টেম। জটাজুটধারী গভীর শিকড় সে সিস্টেমের। গভীর অনুপ্রবেশ চাই, তবেই চঞ্চলা চপলকে গ্রাস করা সম্ভব।‘

বিশিষ্ট গবেষক কবি, মন্ত্রীর সবগুলো কমিটির মাথায় আছেন, বললেন, ‘জলের গভীরে, তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর, বিশেষ ব্যঞ্জনা এখানেই। গভীর অর্থ। তীক্ষ্ণতর শব্দটি এখানে বিশেষ অনুধাবন করা দরকার।‘

সম্মানিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সম্প্রতি রাজ দরবারে বিশেষ সম্মানে প্রধান পরামর্শদাতা পদ পেয়েছেন, বললেন, ‘না হে না। এখানে জল হল দেশ। দ্রাঘিমা আর বিষুবরেখার আলিম্পনে দেশ - মার্তৃকার আরাধনার কথা বলা হয়েছে।‘

  হঠাত্‍ জানলার গরাদে একটি কাক এসে বসল। কৃষ্ণ বায়স। মাথাটা অনেকখানি ঝুঁকিয়ে কাক কি যেন দেখতে লাগল ঘরের মধ্যে। একবার ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে নিল গরাদের গায়ে। গম্ভীর গলায় ডেকে উঠল, ‘ক্ব: .. ক্ব:’। তারপর উড়ে গেল।

সেদিকে তাকিয়ে হঠাত্‍ হেসে ফেললেন কবি ভোলারাম। হাততালি দিয়ে উঠলেন।

সঙ্গে সঙ্গে সারা ঘর হাততালিতে ভরে উঠল। ঠিক কোন ব্যাখ্যায় কবি প্রসন্ন হয়েছেন তা না বুঝলেও এটুকু বোঝা গেল যে, আজকের সিটিং ফলদায়ী হয়েছে। সম্ভবত সব শেষের অর্থবাহী ব্যাখ্যাটি কবির মুখে হাসি ফুটিয়েছে।

মন্ত্রীমশাই খুশি হয়ে হাসিমুখে টিভি ক্যামেরার সামনে হাত নাড়তে লাগলেন।

রাজ্যসুদ্ধ লোক, পুরুষেরা পথেঘাটে অফিস - কাছারিতে হাটেবাজারে কফিহাউসের আড্ডায়, মেয়েরা পুকুরঘাটে শপিংমলে অফিসে বিউটি পার্লারে, নব্য যুবক যুবতীরা টুইটার ফেসবুকে, ছেলেমেয়েরা কলসেন্টারে নাইটক্লাবে ডিস্কে, বিদ্যালয়ে কিশোর ছাত্রছাত্রীরা, পাড়ার চায়ের দোকানে অলস যুবকরা, মর্নিং ওয়াকের বৃদ্ধ বৃদ্ধারা সবাই একযোগে বলতে লাগল, এমন কবি আগে হয় নি। কাব্যপ্রতিভার সঙ্গে সুগভীর দেশপ্রেম, অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে দর্শনের মেলবন্ধন, জেহাদ এবং শৃঙ্খলার সহাবস্থান এমনটি এই দিকপাল কাব্যের বিশেষ দিক।

অতিথিশালা থেকে রাজকীয় মর্যাদায় ডেকে এনে মন্ত্রীমশাই কবি ভোলারামকে যথোচিত সম্মান সহকারে রাজ - সভাকবির পদে অভিষেক করলেন। আজ থেকে তিনি আর কেবল কবি নন,‘কবিকিঙ্কণ ভোলারাম’।

ভোলারামের বউ অবশ্য শব্দটা উচ্চারণ না করতে পেরে ‘কবিকিঙ্কর’ বলে ফেলছে। দুর্মুখ কিছু দুর্জন সে নিয়ে হাসাহাসিও করছে। তাতে কি? কবিকিঙ্কণ এখন সাধারণের ধরাছোঁয়ার অনেক দূরে। হাজার স্বর্ণমুদ্রা ছাড়াও পুরষ্কার এবং সম্মান হিসেবে মন্ত্রী একটি বড় মহল দিয়েছেন। নোবেল পুরষ্কারের জন্যে নাম পাঠানো হয়েছে। কবিকিঙ্কণ ভোলারামের আপ্তসহায়ক হিসেবে নবীন কবিদের একটি দল নিযুক্ত হয়েছে। কবির হয়ে রাজস্তুতি-স্তোত্র ও রাজসভা-গীতি লিখে দেওয়া তাঁদের কাজ। রাজসভায় নিত্য হাজিরা দেওয়া ছাড়া কবিকিঙ্কণের আর বিশেষ কাজ নেই।

কবিতাবোদ্ধা রাজনীতিক বিজ্ঞ সজ্জনকে সহ-সভাকবি পদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর নামটি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডের জন্যে পাঠানো হয়েছে।

অবশেষে মন্ত্রীমশাইও পরিতৃপ্তির শ্বাস ফেলে রাজকার্যে মনোনিবেশ করেছেন।

শেষ

      ইচ্ছে

চান্দ্রেয়ী ভট্টাচার্য্য 

...প্রায় মাইল সাতেক দূরে আম-জাম-কাঁঠালে-ঘেরা গ্রাম মৌবনি। গ্রামের বেশির ভাগ ঘরের লোকই চাষবাস করে থাকে। কয়েক ঘর ছোটো - খাটো দোকান দানিও করে। একদিন সকালে অপ্রত্যাশিত ভাবে এক ভদ্রমহিলা বুড়ো বাঁড়ুজ্জে দাদুদের বাড়িতে আসে। সেই মহিলা নিজের পরিচয় দেয়, সে নাকি বাঁড়ুজ্জে দাদুর সেজ মেয়ের শ্বশুর বাড়ির কোন আত্মীয়া।...

  বড় রাস্তার থেকে লাল ধুলোয় ভরা মোরামের রাস্তা ধরে প্রায় মাইল সাতেক দূরে আম-জাম-কাঁঠালে-ঘেরা গ্রাম মৌবনি। গ্রামের বেশির ভাগ ঘরের লোকই চাষবাস করে থাকে। কয়েক ঘর ছোটো - খাটো দোকান দানিও করে। একদিন সকালে অপ্রত্যাশিত ভাবে এক ভদ্রমহিলা বুড়ো বাঁড়ুজ্জে দাদুদের বাড়িতে আসে। সেই মহিলা নিজের পরিচয় দেয়, সে নাকি বাঁড়ুজ্জে দাদুর সেজ মেয়ের শ্বশুর বাড়ির কোন আত্মীয়া।

  বাঁড়ুজ্জে দাদুদের বাড়ির বাইরের ঘরের একপাশে একটি ছোট্ট মুদী-দোকান। অনেক বছর আগে তিনি কোলকাতার কাছে কোথাও কোন-এক চটকলে বেশ কয়েক বছর কাজ করেছিলেন দাদু। চার মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর যে কয়েক বিঘা জমি ছিল সেগুলি তিনি দেখাশুনা করেন, সেই গ্রামেরই একজন কে দিয়ে চাষবাস করাতেন।

  সুখে দুঃখে জীবন একরকম কেটে যায়। কথায়-বার্তায় তিনি কিন্তু মৌবনি গ্রামের লোকজনের থেকে বেশ আলাদা, সেটা দশ মিনিট যে কেও তাঁর সাথে কথা বললেই তা সহজেই বুঝে যায়।   

  সেই ভদ্রমহিলা যখন বাঁড়ুজ্জে দাদুদের বাড়িতে আসে, সেসময় দাদুর দোকানে দু চার জন খদ্দের দাঁড়িয়ে। সেই মহিলা তার পরিচয় টুকু দেওয়ার পরই, দাদুকে টুক করে একটি প্রণাম করে। ভদ্রমহিলা তার নাম বলেছিল রমা। খদ্দেরদের জিনিসপত্র দিয়ে বাঁড়ুজ্জে দাদু দোকানের ভেতরের দরজা দিয়ে ঘরের উঠোনে আসে আর দাদুর সাথে সাথেই ভেতরে আসে সেই রমাও। দাদুর বৌ অর্থাৎ দিদিমা, আর তাদের এক নাতনি, বাঁড়ুজ্জে দাদুর বড় মেয়ের ছোট-মেয়েটি, এই তিন জনাই সেসময় বাড়িতে। বাঁড়ুজ্জে দাদু দের এক ছেলে আর চার মেয়ের সংসার, মেয়ে গুলির বিয়ে হয়ে গেছিল অনেক দিন আগেই। ছেলেটি মিলিটারির কর্মসূত্রে বাইরে বাইরেই থাকতো। এই রমা কথায় কথায় বাড়ির সকলকে জানিয়ে দেয় যে তারা সবাই তার খুবই পরিচিত, সে সবাইকেই জানতো, এমন কি দাদুর কোন মেয়ের কোথায় বিয়ে হয়েছে, সেখানের সব আত্মীয়-স্বজন দের নামও তার জানা। সরল মানুষ দাদু দিদার মনে সন্দেহের কোন অবকাশই রইল না। দাদুর নাতনিটি যার নাম রত্না সে স্কুলে পড়ত। কয়েক দিনের ছুটিতে সে এসেছিল মামাবাড়ি। তার মাথায় এই ভদ্রমহিলার হুট করে কাওকে কিছু না বলে আসাটা একটু কেমন যেন অদ্ভুত লাগে।

  প্রথম থেকেই রত্নার কিন্তু এব্যাপারে সন্দেহ একটু একটু করে ভাল মতই হয়। যাই হোক, সেই রমা, বাড়ির মেয়ের মতই দু দুটি দিন বাঁড়ুজ্জেদের বাড়িতে কাটিয়ে দেয় বহাল তবিয়তেই। শুধু একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আর তা ছাড়া তেমন বিশেষ কিছুই ছিল না সেই গ্রামে। সব থেকে কাছের পাকা রাস্তায় বাস ধরতে যাওয়ার জন্যেও গরুর গাড়িতে করে যেতে হোতো গ্রামের লাল ধুলো ভরা রাস্তা ধরে।

  তৃতীয় দিন সকাল বেলা দিদার তো খেয়ালই নেই, তিনি যথারীতি ভোর ভোর বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছেন আর তার নিজের কাজের মধ্যে ব্যস্ত। রত্না সেসময় কোঠার উপরের ঘরে শুয়ে, সে রাত জেগে কিছুক্ষণ পড়াশুনা করে, ভোরের দিকে একটু বেশীই জমিয়ে ঘুমটা ধরে যায়। প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেছে তখন। দাদু যথারীতি, প্রাতঃকৃত্য সেরে, মুখ ধুয়ে, চা খেয়ে, পান মুখে দিয়ে, দোকান খুলে বসে ছিলেন তার নিজের জায়গায়। ইতিমধ্যেই দু একজন খদ্দেরও এসে গেছে তখন। সুতরাং দাদু তার নিজের কাজেই বেশ ব্যস্ত। ঘুম থেকে উঠেই রত্না লক্ষ্য করে তাদের গোয়ালের দিকে যাওয়ার দরজার পাল্লা দুটো ঠেসান, মানে

দরজা খোলা। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় টনক নড়ে, সে তাড়াতাড়ি ঘরের সব জায়গা গুলোকে একবার খুঁজে নেয়।ব্যাস, যা ভেবেছিল ঠিক তাই। সেই অপরিচিতা মহিলা, যার নাম রমা, তাকে সে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না।

সে তার দাদুকে জিজ্ঞাসা করে, 'গোয়ালের দিকের দরজাটা কি কাল রাত্রে বন্ধ করা হয় নি?' তার দাদু দোকানের ভিতর থেকেই সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেয় যে সে নিজে সেই দরজাটা বন্ধ করেছিল শুতে যাওয়ার আগে। 'তাহলে এই দরজাটা এখন খোলা কেন?' নাতনি জানতে চায়। উত্তরে দাদু বলে, 'দেখ হয়তো তোর দিদা ভোর বেলাতেই খুলে দিয়েছে ওই দরজা।' একটু পরেই তারা তিন জনাই বেশ ভালো করেই বুঝতে পারে যে ভোর হওয়ার অনেক আগে রমাই ওই দরজা খুলেছিল। রত্না এরপর দৌড়ে-দৌড়ে আশেপাশের সব বাড়িতেই খোঁজ নিয়ে আসে এবং ধীরে ধীরে গ্রামের অন্যান্য লোকজনও জানতে পারে যে রমা নামের সেই মহিলাকে সেসময় গ্রামের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আশেপাশের বাড়ির অনেকেই তখন তাদের প্রথম থেকেই সেই মহিলার বিষয়ে সন্দেহ হওয়ার কথা দিদা আর দাদুকে জানায় বার বার করে। 'মানুষ একটু সুযোগ পেলেই কেমন কথার ফুলঝুরি ছাড়তে থাকে!' রত্না মনে মনে ভাবে। দিদা বাড়ির সব জিনিসপত্র সব ঠিকঠাক আছে কি নেই তা দেখতে শুরু করে দেয়। দাদু বা দিদার থেকে রত্নাই অবিশ্যি বাড়ির সব কিছু কোথায় কি থাকে তার খেয়াল রাখত বেশী। সেও তাই সব কিছু ভাল করে দেখতে শুরু করে দেয় । বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর বোঝা গেল যে সেই অনাহুত মহিলা এক জোড়া কানের দুল আর কিছু টাকা পয়সা নিয়ে চম্পট দিয়েছিল।

বাঁড়ুজ্জে দাদু সব শোনার পর একটা বড় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠেন, 'যাক খুব কমের উপর দিয়েই গেছে।'

  রত্না প্রথম থেকেই সন্দেহ হয়, তাই সে তার মামার শোবার ঘরের দরজায় দুটো তালা দিয়ে চাবি গুলো লুকিয়ে রাখে। দাদু আর দিদা খুব প্রশংসা করে, এতটুকু মেয়ের উপস্থিত বুদ্ধি দেখে। দিদা বলে উঠে, 'হ্যাঁ গো সে মেয়ে তো সবার ঠিকানা গড়গড় করে বলে যাচ্ছিল, এখান থেকে বেরিয়ে আবার সেখানের কোথাও গেল না তো?'

বুড়ো বুড়ি তখন আলোচনা শুরু করে দেয়, 'ছোট জামাই পুলিশ অফিসার, সেখানে মনে হচ্ছে যাওয়ার সাহস হবেনা তার', দিদার অনুমান। দাদু এবং রত্না দুজনেও তাই মনে করে। 'তুমি বরঞ্চ সেজ মেয়ের শ্বশুর বাড়িতেই একটা খবর নাও, সে তো নিজেই বলেছে সে নাকি তাদের বাড়ীরই কোন আত্মীয়।' দিদার পরামর্শ। সুতরাং তাই ঠিক হল। দাদু তাদের দোকানে যে ছেলেটি কাজ করতো তাকে বাড়িতে রাত্রে থাকার ব্যবস্থা করে, সংগে সংগেই রওনা হয়ে যান সেজ মেয়ের শ্বশুর বাড়ি আসানসোল যাওয়ার জন্য। 

সেখানে যাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন যে, তাদের সেজ মেয়ের শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় স্বজন দের মধ্যে রমা নামের যে, সে তো তখন হাসপাতালে ভর্তি এবং মৌবনিতে আসা যে রমার বর্ণনা তাদেরকে তিনি দেন তার সাথে তাদের বাড়ীর রমার কোন মিলই নেই। দাদুর মাথায় তখন বার বার একটি কথাই আসে যে এরপর সেই মেয়েটি কোথায় যেতে পারে। দাদু সেখানে শুধু একটি মিষ্টি আর এক গ্লাস জল খেয়েই বেরিয়ে পড়েন তার বড় মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার জন্য। বাঁড়ুজ্জে দাদুর মেজ মেয়ের শ্বশুর বাড়িটি বেশ দূরে আর ছোট মেয়ের বিয়ে হয় সবে কিছুদিন আগেই, তার উপর জামাই সে তো পুলিশ অফিসার। দাদুর তখন সোজা সেখান থেকে বড় মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার কথাটাই মাথায় আসে। ভগবানের নাম নিয়ে তিনি সেটাই ঠিক করেন।

  সন্ধ্যে উত্তীর্ণ, দাদু বাস স্ট্যান্ড থেকে নেমে খুব জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করেন। মন খুবই অস্থির। শ্বাস জোরে জোরে নিতে হচ্ছে, পা যেন ঠিক-ঠাক ভাবে পড়ছে না,

এক রিকশাওয়ালা দাদুকে দেখেই চিনতে পারে। দাদুকে সে আগেও দেখেছিল তাঁর বড় মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে, সে তার রিক্সায় দাদুকে বসিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে। বাইরের দরজাটা তখন খোলাই ছিল। দাদু প্রায় চিৎকার কোরে বড় মেয়ের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে বাড়িতে ঢুকেন। মেয়ে রান্না ঘর থেকেই শুনতে পায় বাবার গলা। সে সোজা ছুটে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাঁড়ুজ্জে দাদু তাঁর মেয়ের বাড়ির সবার খবরাখবর নেওয়ার আগেই সেই রমা নামের মহিলার হুট কোরে তাদের গ্রামের বাড়ি মৌবনিতে আসা আর ঠিক তেমনই অপ্রত্যাশিত ভাবে চলে যাওয়ার সমস্ত কথার বর্ণনা দিতে শুরু করে দেন। তখন তাঁর মন এতো দিশেহারা, শরীর এতো ক্লান্ত, যে তিনি সাজিয়ে সব কিছু ঠিক মত করে, বলতেও পারছেন না। আর তিনি তাঁর মেয়েকেও কিছু বলতে দেওয়ার সুযোগই দিচ্ছেন না।

   এরমধ্যে বাঁড়ুজ্জে দাদু যতটুকু ততক্ষণে বলেছিলেন, তা শুনেই, মেয়ে বলে উঠে, 'দাঁড়াও দাঁড়াও বাবা, এই ‘রমা’ বলে তুমি যার কথা বলছ, সে তো এখানে এসেছে, আজই এসেছে। দুপুরে সে এখানে ভাতও খেয়েছে' ...

  এবং দাদু আরও জানতে পারেন, তারপর সে, মানে ‘রমা’, বাজারে গেছিল দাদুর বড়-নাতনি স্বপ্নার সাথে; টুকিটাকি কেনাকাটাও করেছে; আর তারপর, মানে কিছুক্ষণ আগেই তো, সেই অজানা ‘কুটুম’কে রেল-স্টেশনে পৌঁছে দিতে গেছে দাদুর বড়-নাতি রঞ্জন।

   দাদু এটুকু শোনার পর শান্ত হয়ে সোফা-কাম-বেড টাতে বসে একটা লম্বা স্বস্তির-নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, 'যাক, রাত তো কাটায় নি সে এখানে...' মেয়ে সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠে, 'না না বাবা, তারা তো বেশ কিছুক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেছে, এতক্ষণ বোধহয় স্টেশনে পোঁছেও গেছে।'

   এরপর দাদু বাইরের ঘরে রাখা সোফা-কাম-বেড-টার উপর বসে আরও একটি ছোট্ট স্বস্তির-নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েকে বলেছিলেন, 'শোন তবে বলি, আমি কেন এত দৌড়ে এলাম, তবে বলি সেই কথা...'

   তিন দিন পর দাদু যথারীতি মৌবনিতে ফিরে আসেন। জীবন আবার চলতে থাকে ঠিক আগের মতই।

   বিবিধ জানা অজানা সব পাখিদের কিচিরমিচির দিয়ে শুরু হয় মৌবনির সকাল-বেলা। দিদা ভোর হওয়ার অনেক আগেই উঠে শুরু করে দেন নিজের কাজ। কখনোবা গোয়ালের দিকের দরজাটা ভোর বেলাতেই খুলে দেন, খেয়ালই থাকে না বুড়ীর। কখনো আবার নিজেই গোয়াল পরিষ্কার করতে থাকেন, দোকানে কাজ করে যে ছেলেটা সে হয়ত কোন কোন দিন একটু দেরিতে আসে, 'আহা, ছোট ছেলে, বোধহয় কালকের খাটুনিতে ক্লান্ত হয়ে গেছে, ...' দিদা নিজের মনে মনেই কত কথাই যে বলতে থাকেন । কখনো বা কাল-রঙের গরুটা আর তার সদ্যজাত লালচে - রঙের বাছুর টাকে নিয়েই কথা বলতে থাকেন। দোকানে বসে পান চিবোতে চিবোতে দাদু সেসব কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসেন।

   বেশ কিছু দিন পর, আচমকা আবার এক সকালে, অপ্রত্যাশিত ভাবে একটি ছেলে আসে মৌবনির বাঁড়ুজ্জে দাদুদের বাড়িতে। সেদিনও দাদুর দোকানে দু চার জন খদ্দের দাঁড়িয়ে, ছেলেটি দোকানে ঢুকে দাদুরই নামটি বলে জিজ্ঞাসা করে বাঁড়ুজ্জে দাদুর বাড়িটি কোথায়।

   দাদু মুচকি হেসে বলে, 'যার বাড়ি তুমি খুঁজছ সেই আমি,' এবার সেই বাইশ-চব্বিশের ছেলেটি দাদুকে টুক করে একটি প্রণাম করে, এবং বলে, 'আমি কি এখানে একটু বসতে পারি, আপনার সাথে অনেক কথা আছে।' দাদু তাকে ইশারায় পাসে রাখা কাঠের তক্তার উপর বসতে বলেন। 

   সামনে দাঁড়িয়ে থাকা খদ্দেরদের জিনিসপত্র দিয়ে বিদায় করে, দাদু ছেলেটির সাথে কথা বলা শুরু করেন । 'দেখ বাবা এমনি করেই একদিন একটি মেয়ে হটাত করে আসে আমাদের বাড়িতে...' কথা বলতে বলতেই দাদু লক্ষ্য করেন ছেলেটি কাপড়ে বাঁধা একটি ছোট্ট পুঁটুলি খুলতে খুলতে দাদুর দিকে তাকিয়ে যেন সে কিছু বলতে চায় । দাদু বলেন, 'কি আছে বাবা ওর মধ্যে?' ... 'আগে এগুলি ভাল করে দেখে নিন এই সবই আপনাদেরই জিনিস, সব কিছু ঠিক ঠাক আছে তো? আমি আসছি আসানসোল থেকে আমাকে আজই ফিরে যেতে হবে,' ... জিনিস গুলির দিকে নজর পড়তেই দাদু ঠিক চিনতে পারেন কানের দুল জোড়াটিকে । মাথাটি তুলে দাদু অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন ছেলেটির দিকে, কি বলবেন, কোন কথাটা আগে বলবেন, চিৎকার করে গ্রামের লোক ডাকবেন, কি করবেন ... ঠিক তখন ছেলেটি বলে উঠে, 'জানি আপনি খুব অবাক হয়েছেন, কি ভাবছেন আমি জানি না, তবে এগুলি দেওয়ার সাথে-সাথে আমাকে একটি খারাপ খবরও দিতে হবে আপনাদের...'

   চমকে উঠে দাদু বলেন, 'আবার কি খারাপ খবর বাবা?” আমাদের আত্মীয়া যে রমা হাসপাতালে ভর্তি ছিল, আপনি শুনে এসেছিলেন, সে... সে... আর নেই...' দাদু সাথে সাথে বলে উঠেন, 'আর নেই...' 

    ...রমারই ইচ্ছেতে রমারই এক বন্ধু, যার নাম প্রীতি, খুব ডানপিটে মেয়ে সে, সেই প্রীতি নামের মেয়েটিই আপনাদের বাড়িতে আসে, আর তারই সাথে রমার কথা হয়েছিল, এমন কিছু একটা কাজ, রমার পরিচয় দিয়ে, প্রীতি করে আসবে, যা নিয়ে বহু দিন অনেক আত্মীয়স্বজন রমার নামটা অন্তত করবে। ছোটর থেকেই রমার শরীর প্রায়ই খারাপ থাকত, তাই রমা অন্য সব মেয়েদের মত দুষ্টুমি কিম্বা মজা করার কোন সুযোগ কখনই তেমন ভাবে জীবনে সে পায়নি, তাই এটাই হয়তো ছিল তার... একরকম মজা করার ‘শেষ ইচ্ছে’ ...  

  দাদু অবাক চোখে তাকিয়েই থাকেন ছেলেটির দিকে।  

 

 

:: এই ঘটনা যে সময়ের তখনকার দিনে ‘মোবাইল-ফোন’ নামক বস্তুটি ছিল না, থাকলে হয়ত এ-ঘটনা ঘটতো না ।

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?