থাপ্পড়

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ

... কথা কটা শেষ করে ঘুরে পড়েছিল বিপ্লব কিন্তু সৌখিন টুলের উপর থাকা জলের মগটা দেখে ফের ঘুরে পড়ল সে।কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই সপাটে একটা চড় কসালো লাহিড়ীর গালে। হয়তো এই চড়টা এতো দিন ধরে শক্তি সঞ্চয় করছিল। আজ যে তার কোন পিছুটান নেই, আজ সে ক্ষমতার আস্ফালনের সীমারেখার বাইরে, পদমর্যাদার কাছে...

  ই বয়সে ছেলে, বৌমা, নাতি, পাড়া প্রতিবেশী,কাজের মেয়ে সব্বার সামনে এমনি নেংটো হতে সংকোচ বোধ হয়। আজ একুশে আগষ্ট, বাহাত্তরে পা দিলাম। এর মাঝে একটা মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গেছে। রোগের নামটি বড় গাল ভরা মডারেট এল ভি সিসটোলিক ডিফাংশান। নিয়মিত রেমিপ্রিল, কাডিভাস আর ইকোস্পিন এই তিনটি ঔষধ সকাল ও সন্ধ্যা। হজম শক্তি ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু। একটু বেশি অনিয়মে সাড়া দিয়ে দেয় শরীর। সরকারি চাকরি থেকে অবসর হয়েছে নয় নয় করে বছর দশ। কাগজে কলমে আমার স্কুল মাস্টার বাবা বয়স কমিয়ে রেখেছিল বছর দুই। এটা না হলে লাস্ট পে-কমিশনটা, ওভার ব্রিজ বেয়ে নামতে নামতে ট্রেন মিশ হওয়ার মতো, হুস করে হাতছাড়া হয়ে যেত। কথায় আছে বাপ কা বেটা, কি ভাবে টুকটুক করে উচ্চাশার সিঁড়ি গুলো পার হতে হয় বাবার থেকে জীবনের সে পাঠ নিয়েছি নির্ভুল। অবসরের বছর চার আগে লোকাল নেতার দৌলতে ছেলের একটা হিল্লে হয়েছে। বৌমা প্রাইমারি শিক্ষিকা, একমাত্র নাতি সৌরীনের পরের বছর কলেজ হবে। চাকরি জীবনে দুহাতে সৎ অসৎ দুই রোজগারে কোন ছুঁতমার্গ ছিল না আমার। তমলুক শহর লাগোয়া তিনতলা বাড়ি, গাড়ি আধুনিক জীবনের কোনো স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব নেই সংসারে।

  আজ সারা ঘরময় রঙিন বেলুন,রোলেক্স ঝাড়, বার্থ-ডে রিং,ঝুলে পড়া গালে খুচরো অভ্রে বার্থ-ডে কেকের চটচটে আস্তরণ। রাতের রান্নার কাজ একপ্রস্থ এগিয়ে রেখেছে বৌমা সুলতা,কাজের মেয়ে মিনু বেশ ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক, আজ তার ছুটি। আমার অর্ধাঙ্গিনী বীনা নিজের হাতে পায়েস বানিয়েছে আমার জন্য, পায়েসের সুঘ্রাণ গেঁথে রয়েছে কিচেন লাগোয়া ড্রয়িং রুমে। একটু আগেই বার্থ-ডে মোমবাতি গুলো বেশ কষ্ট করে নিভাতে হয়েছে। এ বয়সে বুকের হাপরে যেটুকু বাতাস সংকুলান হয় তাতে না আগুন জ্বলে আর না নেভে। নরম কেকে ছুরি বসানোর সাথে সাথে সুর করে শাখা-প্রশাখায় বেজে ওঠেছে হ্যাপী বার্থ ডে টু ইউ...

  সৌরীন 'বর্ণময়-বাহাত্তর' নামে একটা ডকু তৈরী করেছে আমাকে নিয়ে। দেওয়াল ভরা এল ই ডি তে সবার চোখ আটকে। এল ই ডি জুড়ে বছর চারেকের শৈশব, লাল রঙের একটা প্লস্টিকের গামলায় স্নান করছে আমার শৈশব, সামাল দিতে হিমসিম আমার মা। গামলার জলে কিলবিল করছে আমার দুরন্তপনা। ঘোলাটে অস্পষ্ট ছবি থেকে চলকে আসতে চাইছে জল। শৈশবের দম কুলিয়ে উঠছে না মাথা ভেঙে নেমে আসা জলে। মাথা ঝাঁকিয়ে, দুহাতে চোখ, মুখের জল সরিয়ে আকুলি বিকুলি অবস্থা আমার। আর তা দেখে ঠোঁট টেপা হাসি উসখুস করছে ড্রয়িং রুমে।

  বুড়ো বয়সে অনেক কিছুই ছেলেবেলার মতো হয়ে যায়। চার বছরের নেংটো শৈশব দেখে ঘোলাটে চোখ আর কুঞ্চিত মুখে শৈশবের লজ্জা। আজ আমি বৃদ্ধ শাহজাহান, সম্রাটের পদতলে সারা পরিবার জো হুজুর জাহাঁপনা। মহম্মদের হাত ধরে বৃদ্ধ আজ অতীত বিহারী, পেরিয়ে আসা জীবন অলিন্দে অলিন্দে আনন্দিত পরিব্রাজন।

পেছন পথে যে এত দ্রুত হাঁটা যায় আগে জানতাম না। শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবন,কখনো দৃশ্য অনুরাগে বয়সটাকে থামিয়ে স্থির-চিত্রে চক্ষু-স্থির।

‌একত্রিশে আগষ্ট দুহাজার ছয়, এল ই ডি জুড়ে আমার আপিসের লোকজন। চশমাটা সামান্য কপালে তুলে বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দিয়ে চোখের কোন উপচানো জল মুছছে কেউ কেউ। ঐ দিন ছিল আমার অবসর। শুধু আমার নয় বিপ্লবেরও।

বিপ্লব আমার অতি নিকট জন। চাকরি জীবনের শুরুতে হাতধরে শিখিয়েছে সব।

অথচ কর্মজীবনের শেষ দিকটায় তার সঙ্গেই কিনা! কি জানি কেমন আছে সে। এতদিনেও সে কি পারবে আমাকে ক্ষমা করতে!

‌এল ই ডি তে বিপ্লবের হাতে মানপত্রসহ স্মারক তুলে দিচ্ছেন লাহিড়ী স্যার। স্মারকের ঝলকানি চোখটা পুড়িয়ে দিল যেন। মুহূর্তে ঘাড়টা ছিটকে গেল ডান থেকে বামে,স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বাম হাত আলতো স্পর্শ রাখলো ডান গালে। স্পষ্ট শুনতে পেলাম একটা শক্ত চড়ের শব্দ। সারা শরীর যেন বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট। এল ই ডি থেকে চোখ ছুটে গেল কেরানীতলার আপিসে।

‌লোহার বাঁকানো সিঁড়ি পথ বেয়ে উপরে উঠছি আমি। এই প্রথম বাড়ির বাইরে একা একা পা রাখা। মাকড়সার ফাঁদ ঘিরে নিয়েছে দেয়ালের কোন, উত্তরের দেওয়ালে নিচের দিকটায় কালচে লাল পান পিক, পুরানো কাঠের চেয়ারের

কচকচ, টাইপরাইটার এর খটা-খট , খটা-খট, মাথার উপর প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে ঘুরতে থাকা ফ্যানটার ক্যাঁচর ক্যাঁচর -এসব নিয়ে সারা আপিসের কোথাও কৌলীন্যের "ক" টুকু নেই। তবে লাহিড়ী স্যারের কাঁচ ঘেরা হিমশীতল চেম্বারে আভিজাত্যের অভাব নেই। জয়েন করার পর লাহিড়ী স্যার সকলের সঙ্গে পরিচয় করে দিচ্ছিলেন আমার। সবার সঙ্গে পরিচয় হলেও পূর্ব দিকের কোনে বসা রোগা ফর্সা মতো যে লোকটি কম্পিউটারে টাইপ করছিলেন তার সঙ্গে পরিচয় হলো না। আসলে লাহিড়ী স্যারই নিয়ে গেলেন না ওনার কাছে। আপিস শেষে বাস স্টপে আবার মুখোমুখি হয়ে গেলাম লোকটার। লোকটার চোখে মুখে অদ্ভুত একটা আকর্ষণ আছে, এড়িয়ে থাকা যায় না। নিজেই এগিয়ে এলেন আমার দিকে -

‌'নমস্কার, আমি বিপ্লব, বিপ্লব মিত্র, এ্যাকাউন্টস দেখি।'

‌পাল্টা নমস্কার জানিয়ে, আমার নাম জানিয়েছিলাম আমি ।

‌‌কয়েক দিনের মধ্যেই বিপ্লবের সঙ্গে আমার বেশ সখ্যতা হয়ে গেল। এবং এটুকু বুঝতে সময় লাগল না কেন সেদিন লাহিড়ী বিপ্লবকে এড়িয়ে ছিল।

‌এখানে এসে থেকে দেখছি চেয়ারের খোশামোদ খিদে একটু বেশি। আসলে এটাই হয়তো নিয়ম, যখন কোনো মানুষ উপরের দিকে উঠতে থাকে তখন নিচের মানুষজনকে আরো বেশি করে ছোট দেখে। মন প্রস্তুত থাকে না কোনো কিছুতে না শোনার জন্য। আগ্রাসী ক্ষুধায় সব কিছু মুঠোবন্দী করে নিতে চায় - এমন কি নারীকেও। আমাদের মতো একদল, বাঁকা মেরুদণ্ড নিয়ে লাহিড়ীদের আরো অতি ঈশ্বর করে তোলে।

‌বিপ্লবের কাছে প্রথম শুনেছিলাম পূর্ণেন্দু পত্রীর 'একটি উজ্জ্বল ষাঁড়'- যারা প্রতিনিয়ত মনে করে 'ভূ-মধ্যসাগর এসে পায়ে পড়ে হবে পুষ্করিণী।' আর আমরা নাকি বিশ্বস্ত বাদুড়ের দল লেজের চামরে আরতি করে যাই।

‌কাজের ব্যাপারে বিপ্লব বড় পরিপাটি, বড় সৎ - তার বাম হাত পূতোদক ধৌত। অহেতুক সুবিধের নেশা কখনো পেয়ে বসেনি তাকে।

‌বাদুড় দলে ঐ এক বিপ্লব অসহ্য হয়ে উঠছিল লাহিড়ীর কাছে। ক্ষমতার ধরনটাই এমন সে চায় বাকি সব ইঁদুরের গর্তে ঢুকে যাক।

‌মুষ্টি যত শক্তিশালী হোক যারা সৎ তাদের মুষ্টিবদ্ধ করা যায় না, আঙুলের ফাঁক গলে তারা ঠিক বেরিয়ে যায়, সে তুমি যত কৌশলই নাও না কেন।

‌আর এটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল লাহিড়ীর জেদ।

কথায় কথায় ইগনোর করা শুরু হয়েছিল বিপ্লবকে,যে কারণে আমি জয়েন করার দিন ইচ্ছাকৃত ভাবেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় নি বিপ্লবের সঙ্গে।

‌আমি আপিসে বরাবর মধ্যপন্থা নিয়েছি, না ছিলাম বাদুড় দলে আর না নিয়েছিলাম বিপ্লবের পক্ষ। সকলকে দিয়ে বিপ্লব হয় না। তবে বড় বোঝাপড়া ছিলো দুজনের। সেটা হয়েছিল বোধহয় দুজনের রিটায়ারমেন্ট এক দিনে বলেই হয়তো।

‌চাকরি জীবনে বিপ্লবকে নানা ভাবে হেনস্তা হতে দেখেছি। আমারা কেউ কিছুই করে উঠতে পারি নি। প্রতিবাদের জন্য একটা মুষ্টিবদ্ধ হাতের দরকার পড়ে। হাত আমার ছিল বটে তাতে আঙুল ছিল না একটাও। কর্মচারী ইউনিয়ন একটা ছিল যদিও, সেটা হয়ে উঠেছিল দালালের জরায়ু।

  ‌সেবার বিপ্লবের কম্পিউটারটা বেশ গড়বড় করছিল।লাহিড়ীস্যারের কাছে বারবার নতুন একটা কম্পিউটার কেনার দরবার করে বিফল বিপ্লব ভেতরে ভেতরে বেশ তেতে ছিল। শেষ পর্যন্ত পুরানো কম্পিউটার মেরামতির ব্যবস্থা হয়েছিল। এপর্যন্ত সব ঠিক ছিল কিন্তু দিন দুই পর লাহিড়ী গ্রুপ ডি কে দিয়ে একটা বিল পাঠালো বিপ্লবের কাছে। বিলটা দেখা মাত্র একটা হাঁফ ওঠা পুরানো কম্পিউটারে তার নিজের গলদঘর্ম ছবিটা ভেসে উঠল। রোগা পাতলা শরীরে কুলিয়ে উঠল না উত্তেজনা।

‌বিলটা নিয়ে বিপ্লব সোজা উঠে যায় লাহিড়ীর চেম্বারে। কাঁচের দেওয়াল ভেঙে দুজনের চিৎকার ছড়িয়ে পড়েছিল সারা আপিসে। বিলটা লাহিড়ীর সামনে ফেলে দিয়ে রীতিমতো টেবিল চাপড়ে বিপ্লব বলছে - ‌'এটা কত নম্বর ফ্রডজারি, মেরামত করে বিল তৈরী হচ্ছে - নিউ কম্পিউটার এন্ড ইনস্টলেশন কস্ট...'

‌এহেন অপমানে লাহিড়ীর মুখ ঝুলে গেছিল নিচের দিকে। দু-একজন স্টাফের কৌতূহলী চোখ গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো বাড়িয়ে তুলছে অপমানের মাত্রা।

‌লাহিড়ীরা সব সময়ই সঞ্চয়ী। তারা তাদের সকল অপমান, অসম্মান এমনি কি তাদের প্রতি ছোটো খাটো অসচেতন অবজ্ঞার খুঁটিনাটিগুলিও সযত্নে ধরে রাখেন, পুষে রাখেন।

কোন ঘটনা কালের স্রোতে ভেসে যায় না, যায় না ক্ষয়ে। বরং ঘটনা গুলোকে দৃশ্যপটে সাজিয়ে প্রতিমুহুর্তে চলে কাপালিকের সাধনা - প্রতিশোধের সাধনা। কামার যেমন আগুনে নিয়ত ইন্ধন জোগায়,জাগিয়ে রাখে আগুন আর সময় মতো শক্ত, সোজা লোহাকে বাঁকানোর জন্য আঘাতের পর আঘাত করে পাশবিক। লাহিড়ীও ছিল সুযোগের অপেক্ষায়।

‌ইয়ার এন্ডিং - এর পরের দিন, বেলা দুটো নাগাদ আমি বসে বিপ্লবের পাশের টেবিলে, বাকিরা দুপুরের টিফিন নিতে গেছে ক্যান্টিনে। গত কয়েক দিন ইয়ার এন্ডিং এর কাজ সেরে বেশ রাত করেই ফিরেছে বিপ্লব। কাজের চাপ,টানা কম্পিউটার স্কিনের আলোয় চোখ রাখা, রাত্রি জাগরণ এসবের জন্য হয়তো চোখের পাতা দুটো লেগে আসছিল তার।

‌লাহিড়ী স্যার পান চিবাতে চিবাতে এগিয়ে যান উত্তরে, পুচ করে পিকটা ফেলেন দেওয়ালে, জলের মগ থেকে জল নেন মুখে। মুখের পেশী আর জিভ দিয়ে জলটা ঠেলে দেন বাঁ দিকে, পরে ডান দিকে - কুলিকুচি করেন। জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দেন মুখের জল।

তারপর সোজা এগিয়ে যান পূর্বে। মগের মুখটা খুলে মগটা উপোড় করে দেন বিপ্লবের মাথায়। টেবিলে ঠক করে মগটা নামিয়ে বলেন -

‌'এটা আপিস, কাল থেকে একটা বালিশ নিয়ে আসবেন। শরীর না টানলে অবসর নিয়ে নিন।'

‌আমার চোখ কপালে, মুখ হাঁ হয়ে গেছে।

‌বিপ্লবের জামা কাপড় ভিজে সপসপ করছে, মাথার পাতলা চুল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল নেমে আসছে ফোঁটা ফোঁটা এসিড এর জ্বালা নিয়ে। চেয়ারে মুখ নিচু করে বসে আছে সে, থরথর করে শরীরটা কাঁপছে অপমানের যন্ত্রনায়। এরমধ্যে ফিরে এসেছে বাকিরা। ঘিরে আছে বিপ্লবকে। বিপ্লবের গলা বেয়ে উঠে আসছে কান্না, অপমানের কালো জল আর কান্না একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার, তাদের আর আলাদা করা যাচ্ছে না।

‌পরেরদিন লাহিড়ীর চেম্বারে সালিশি সভা বসেছিল। ইউনিয়নের লোকজন সহ স্থানীয় এক নেতা উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে ডাক পড়ল আমার। সমস্ত বিচার ব্যবস্থা আমার দিকে তাকিয়ে। এই বাদুড়ের দলে বিপ্লবের সাহসের সবটুকুই আমি। দীর্ঘদিনের সহকর্মীর কাছে এ তো খুব সামান্য চাওয়া। কতদিন ছেলে অসুস্থ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে গেছি একা হাতে দুজনের কাজ সামলে দিয়েছে বিপ্লব। সৌরীন যেদিন জন্মালো এক কথায় কুড়ি হাজার টাকা হাতে গুঁজে দিয়েছিল বিপ্লব বিনা সুদে। বিধাতা এই জীবনেই মানুষকে তার ঋণ পরিশোধের একটা সুযোগ করে দেয়। সুযোগ আমার সামনেও।

‌প্রত্যয়ী বিপ্লবকে পথে বসিয়ে আমি বলেছিলাম জল খেতে গিয়ে মগের আলগা মুখ খসে পড়ে, তাতেই ভিজে যায় বিপ্লব।

সেদিন আর একটু বেশি রোজগার, আর একটু বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের লোভে আমার প্রতি বিপ্লবের বিশ্বাস, ভরসা, আস্থাকে কোন পিছুটান ছাড়া ভাসিয়ে ছিলাম স্রোতে।

প্রতিশ্রুতি রেখেছিল লাহিড়ী। অবসরের দু বছর আগে প্রমোশন জুটেছিল আমার। তারপর থেকে বিপ্লবের সঙ্গে আর কথা হয় নি, আসলে বলতে পারি নি। বিপ্লবের থেকে একধাপ বেশি উপরে উঠেও বন্ধুত্বের মুখ তুলে দাঁড়াতে পারি নি কোনোদিন।

একত্রিশে আগষ্ট দুহাজার ছয়, সারা আপিস গুম মেরে ছিল। লোক দেখানো কিনা জানি না, সকলের চোখে মুখে যেন অঙ্গ-হানি যন্ত্রণা। লাহিড়ী স্যার নিজেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন একটা বিদায় সভার।

পাশাপাশি বসেছিলাম দুজন তবুও যেন কত দূরে। তাকে ছোঁয়া যায় না। তার চোখে চোখ রাখা যায় না।

বিপ্লব যে এতো ভালো বলতে পারে তা আগে কখনো শুনি নি। যখন তাকে দুকথা বলতে বলা হল, ধীর গলায় একটা গল্প বলেছিল বিপ্লব, উপনিষদের গল্প -

'আরুনি তার পুত্র শ্বেতকেতুকে একটা বড় বট গাছ দেখিয়ে বলল, ঐ বিশাল বট গাছের একটা বীজ নিয়ে এসো। বীজ নিয়ে এল শ্বেতকেতু। আরুনি বলল - ঐ বড় গাছটি এই সামান্য বীজটা থেকে উৎপন্ন। অর্থাৎ এই ছোট্ট বীজটার কি অসীম ক্ষমতা, তার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ঐ অসীম। তাই পুত্র শ্বেতকেতু বড় নয় শ্রদ্ধাবান হও।'

অনুষ্ঠান শেষে বিষণ্ণ মনে হাঁটছিলাম লাহিড়ী স্যারের চেম্বারের দিকে। দরজায় থমকে দাঁড়ালাম।

ভেতর থেকে বিপ্লবের কথাগুলো দরজার ফাঁক গলে চুঁইয়ে আসছিল -

'এ উপহারগুলো আমি বইতে পারব না। এগুলো রাখুন। সবার সামনে আপনার সম্মানার্থে সানন্দে নিয়েছি। এ স্মারক, এ উৎকোচ আমাকে আমার কর্মজীবনের প্রতিটি অপমান প্রতিমুহুর্তে মনে করাবে। তাই এগুলো রইলো। ভালো থাকুন।'

কথা কটা শেষ করে ঘুরে পড়েছিল বিপ্লব কিন্তু সৌখিন টুলের উপর থাকা জলের মগটা দেখে ফের ঘুরে পড়ল সে।কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই সপাটে একটা চড় কসালো লাহিড়ীর গালে। হয়তো এই চড়টা এতো দিন ধরে শক্তি সঞ্চয় করছিল। আজ যে তার কোন পিছুটান নেই, আজ সে ক্ষমতার আস্ফালনের সীমারেখার বাইরে, পদমর্যাদার কাছে, নেই সামান্যতম সৌজন্যের অবকাশ। লাহিড়ী মহুর্তে বাতাস বেরিয়ে যাওয়া বেলুনের মতো চুপসে গেল।

বিপ্লব আমার সামনে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল চেম্বার থেকে।স্মারক, উপহার এগুলো কেমন যেন পাথরের চেয়ে ভারী ঠেকছিল হাতে, ভারে নুয়ে যাচ্ছিল মেরুদণ্ড। নিজের গালটাও যেন গুলগুল করে উঠল।

আমি অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম তার চলে যাওয়ার দিকে। আর মনে মনে ভাবলাম এ চড়টা কি কেবল লাহিড়ীকেই বাজল। এ চড়কি আমাদের মতো মেরুদণ্ডহীন সমস্ত বাদুড়কে দিয়ে গেল না বিপ্লব।

  কতক্ষণ আগে ডকুমেন্টারিটা শেষ হয়েছে ঠাওর করতে পারি নি। সবাই সৌরীনের কাজে খুব খুশি। ততক্ষণে আমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করছে সৌরীন। সুলতা পাশ থেকে ছেলেকে মনে করিয়ে দিচ্ছে - 'আশীর্বাদ চেয়ে নে, যেন দাদুর মতো বড় হতে পারিস।'

সৌরীনের মাথায় হাত রেখে, মনে মনে বললাম - 'বিপ্লব দাদুর মতো বড় হও বাবা। শ্রদ্ধাবান হও।'

  অনিকেত

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ

 

...স্পেশাল চায়ের গ্লাস হাতেই ধরা রইল দুজনের। পাঁচু বাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন গোবিন্দের মুখের দিকে। গোবিন্দ কিছুটা লজ্জায় কিছুটা ভয়ে তাড়াতাড়ি করে নিজেকে সরিয়ে নিল।পাঁচু বাবু, চাকদহে তিন পুরুষের দেওয়ালে আছড়ে পড়া ঢেউ এর শব্দ শুনতে পেল......

  সকাল থেকে পাঁচু বাবু গোবিন্দের চা দোকানে বসে আইঢাই করছে। বাঁশের খুঁটিটায় ঠেস দিয়ে বসেছে বুড়ো আর ঘাড়টা বাঁকিয়ে বারবার বাইরের পথটা দেখছে। তিন নম্বর চা টেবিলে রেখে গোবিন্দ বলল--
-- ছ্যার আজ বোধহয় আর উকিল বাবু এলেন না।
পাঁচু বাবুর এতোক্ষনে টনক নড়ল তাকে তিন নম্বর চা দেওয়া হয়েছে। লেড়ো বিস্কুটা সাবধানে দাঁতের তলায় রাখল পাঁচু বাবু। মাথা ভাঙা দাঁত কটা প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ভিতের মতো জেগে আছে। অনেক দিন ধরে পাঁচু বাবু আর নৃপেন্দ্র নারায়ন গোবিন্দর ধরা কাস্টমার। তাই তাদের আলাদা গ্লাস। গোবিন্দ আগে কাপেই চা দিত কিন্তু দুই বুড়োর পোষালো না। চা'টাকে বড্ড কম কম মনে হতো। তাই গ্লাসের বন্দোবস্ত।

  পাঁচু বাবু বছর দুই হলো রিটায়ার্ড করেছেন বিধুবিনোদ স্কুল থেকে। আদি বাড়ি চাকদহে। তবে সে এখন গঙ্গায় তলিয়ে গেছে। এখন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে ইঙ্গিত করে বলতে হয়, ঐ, ঐতো বাড়িটা।
ভাঙনের শক্তি এতোটাই বেশি, তার ধ্বংস লীলা এতো অনিবার্য,যে তিন পুরুষের স্মৃতিটাও কল্পনায় একে নিতে হয়। প্রথম যেদিন সাপের মতো ফণা তুলে ঢেউটা তিন পুরুষের ভিতে ছোবল বসিয়েছিল সেদিন রাতে পাঁচুগোপালনস্কর দু'চোখের পাতা এক করতে পারে নি।

একটার পর একটা ঢেউ ভাঙনের হুঙ্কার নিয়ে আছড়ে পড়ছিল পশ্চিমের দেওয়ালে। দেওয়ালে কান পেতে থেকে থেকে শিউরে উঠছিলেন পাঁচু বাবু। তিনটি নাবালক সন্তানকে নিয়ে পাঁচু বাবু আর তার বৌ সারাটা রাত কাটিয়ে দিয়েছিল রাস্তায়। দিন তিনেকের মধ্যে সংসারের সব বাঁধাছাঁদা করে উঠে এসেছিল ভাড়ার ঘরে। পাঁচুগোপালের চোখের সামনেই টুপ করে গঙ্গার গভীর জলে খসে গিয়েছিল বাড়িটা। সেদিন থেকে নিজের একটা বাড়ির বড় সাধ পাঁচু বাবুর। ফুলিয়ায় স্কুলের কাছাকাছি চার কাঠা জায়গা কিনেছিলেন তিনি। ফুলিয়ায় উঠে আসার পর নৃপেন্দ্র নারায়নের সঙ্গে আলাপ গড়ে ওঠে তাঁর। নৃপেন্দ্র নারায়ন হালদার অকৃতদার। পেশায় উকিল। পাঁচু বাবুর জীবনের কম বেশি সব সিদ্ধান্তে নৃপেন্দ্র নারায়নই শেষ কথা। বন্ধু শব্দটাকে নৃপেন্দ্রকে দিয়েই সঠিক ভাবে বুঝেছে পাঁচু বাবু। অবশ্য এই অনুভুতিটা একতরফা নয়। পাঁচু বাবু ও তার পরিবার নৃপেন্দ্রকে তাদের বাড়ির একজন বলে মনে করে।

  অবসরের পর গ্রাচ্যুইটি, প্রভিডেন্ড ফান্ড, আর চাকরি জীবনের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে তিন ছেলের জন্য দোতলা বাড়ি বানিয়েছেন পাঁচুবাবু। বিপত্তি হয়েছে কে কোন তলায় থাকবে তা নিয়ে। এক তলায় সবার নজর। সিঁড়ি ভাঙার ধকল, গরমকালে ছাদের তাপ এসবের জন্য দোতলায় কেউ যেতে চাইছে না। বড় ছেলেকে অনেক বুঝিয়ে গ্রাউন্ডফ্লোরের জন্য রাজি করানো গেলেও, বড়বৌমা ঘাড় পাতছে না। তাই

পাঁচুবাবু সকাল থেকে তীর্থের কাকের মতো চা দোকানে বসে কখন মুশকিল আসান নৃপেন্দ্র নারায়ন হাজির হয়। নৃপেন্দ্রর প্রতি তাঁর ভরসা অগাধ। বিয়ে থা না করলেও উকিলি বিদ্যা দিয়ে কত বার সংসারের সুরাহা করে দিয়েছে সে।

  তিন নম্বর চায়ের গ্লাসে শেষ চুমুক দিতে না দিতে নৃপেন্দ্র নারায়ন পেছন ঠেকিয়ে দিল গোবিন্দর বেঞ্চে। গোবিন্দও ঠকাস করে গরম চায়ের গ্লাসটা টেবিলে রেখে দুটো ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট এগিয়ে দিল উকিল বাবুর দিক। গুম হয়ে আছে পাঁচু বাবু,দেরির কারন সবিস্তারে বলে যাচ্ছে নৃপেন্দ্র নারায়ন। হাতে ধরা চায়ের গ্লাস ঠান্ডা হতে না হতে পাঁচু বাবুর রাগ গলে জল। 
চায়ের দোকান প্রায় ফাঁকা, গোবিন্দকে আড়াল করে চাপা গলায় পরিস্থিতিটা নাগাড়ে বলে গেল পাঁচু বাবু। বাধ্য ছাত্রের মতো সবটুকু শুনল নৃপেন্দ্র। একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেটের ধোঁয়ায় সাদা বলয় তৈরী করে ভাসিয়ে দিল বাতাসে। বলয় গুলো সেকেন্ড কয়েক পরে ভেঙে একটা রেখা হয়ে সাপের মতো বাতাসে ভেসে রইল।
নৃপেন্দ্র দোল খাচ্ছে হ্যাঁ ও না এর ভিতর। তার মাথায় দোলা দিচ্ছে নানা সিদ্ধান্তের বিকল্প।
হঠাৎ নৃপেন্দ্র বলে উঠল--
--- লটারি। তিনটি কাগজ -শূন্য, এক,দুই।
ফ্ল্যাট বাড়ি কেনার মতো লটারি করে ফেল। লটারিতে যে , যে কাগজটা তুলবে সে পাবে সেটাই। পক্ষপাতিত্বের কোনো প্রশ্নই নেই।
নৃপেন্দ্র নারায়নের কথা শুনে পাঁচু বাবুর মুখে চকচক করে উঠল হাসি। ঘাড় ঘুরিয়ে গোবিন্দকে বলল--
--- একটু আাদা দিয়ে, দুটো স্পেশাল চা বানা কড়া করে।
চায়ের গ্লাস দু'টো ভর্তি করে চা দিল গোবিন্দ। এতক্ষণ সব কথা সে কান পেতে শুনেছে। দোকানে কাস্টমারও নেই। সে পাঁচু বাবুর গা ঘেঁসে বসল। একটু আমতা আমতা করে পাঁচু বাবুকে উদ্দেশ্য করে বলল---
--- ছ্যার একটা কথা বলব?
--- একটা কেন রে গোবিন্দ, দশটা বল।
--- না ছ্যার আমার ঐ একটা কথাই ছিল।
--- বলে ফেল।
--- বলছিলাম কি, উঠা-নামার সেই যন্ত্রটাকি ঘরে লাগাইছেন?
--- উঠা-নামার যন্ত্র! ওহঃ লিফট্। না তো।
---লাগিয়ে ফেলেন তাড়াতাড়ি। 
---- কেন রে!
--- তিন তলা তিন জনকে দিয়ে ফেল্লে আপনার তো আর ঘর নেই। মাসে দশ দিন অন্তর উপর নিচ করতে পারবেন? বয়স তো কম হল না।

  স্পেশাল চায়ের গ্লাস হাতেই ধরা রইল দুজনের। পাঁচু বাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন গোবিন্দের মুখের দিকে। গোবিন্দ কিছুটা লজ্জায় কিছুটা ভয়ে তাড়াতাড়ি করে নিজেকে সরিয়ে নিল।
পাঁচু বাবু, চাকদহে তিন পুরুষের দেওয়ালে আছড়ে পড়া ঢেউ এর শব্দ শুনতে পেলেন।

 

   উত্তরাধিকার

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ

 

...কল্যাণ, অনিন্দ্য, রূপমরা পাথরের মতো নিশ্চল। এতক্ষণে মনে হয়েছে আজ পয়লা এপ্রিল তো শুধু প্রগতি সংঘের জন্মদিনই নয়, আরও একটা বিশেষ দিন যে। নয়ন মঞ্চের বাঁ দিকের উইংসের আড়ালে দাঁড়িয়ে। পরম মুগ্ধতা নিয়ে সে অপলক তাকিয়ে তার স্বপ্নের গায়কের দিকে।

ডান দিকের ফলোটার আলোক রশ্মি ছিটকে পড়েছে তার মুখে। তার দু'চোখ থৈ, থৈ করছে আনন্দ আর অনুতাপের অশ্রুতে।...

  সবেমাত্র প্রভাতফেরি শেষ হল। পাতলা পাঞ্জাবিটা ঘামে লেপটে গেছে শরীরের সঙ্গে। ছোট ছোট ছেলেদের কেক আর একটা করে লাড্ডু দেওয়া হচ্ছে। টিফিনটা হাতে পেয়ে মুখগুলো থেকে মুহুর্তে উধাও ক্লান্তি। লাইনটাকে ম্যানেজ করতে হিমশিম খাচ্ছে কল্যাণ। শহিদবেদীতে জাতীয় পতাকার পাশে পতপত করে উড়ছে প্রতিষ্ঠানের পতাকা। পতাকার নকশাটা করেছিলেন কল্যাণের বাবা। পঁচিশ বছর আগে তাস খেলার আড্ডাটাকে কল্যাণের বাবা আর তার বন্ধুরা চাঁচ দিয়ে ঘিরে মাথায় একটা ত্রিপল চাপিয়ে শুরু করেছিল প্রগতি সংঘ। বছর ঘুরতে না ঘুরতে ইটের দেওয়াল আর মাথায় এ্যাজবেসটার পেয়ে গেল প্রগতি সংঘ। ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া কলোনির এই মানুষগুলোর একটা সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের দরকার হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে উঠে আসা মানুষগুলোকে আঁটসাঁট বাঁধনে বেঁধেছিল প্রগতি সংঘ।

শুরু থেকেই সিদ্ধান্ত পাক্কা, সংঘের বাইরে জুতোর সঙ্গে খুলে আসতে হবে রাজনৈতিক সত্তা। পঁচিশ বছরের জীবনে দু'এক বার হয়তো সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়েছ কিন্তু তা স্থায়ী হয় নি।

  জন্ম থেকেই ফি-বছর প্রতিষ্ঠা দিবসের সকালে প্রভাতফেরি, তখন ছোট ছোট ছেলেদের মুড়ি, বাতাসা আর বাদাম দেওয়া হত। স্থানীয় হাসপাতালে রোগীদের ফল বিতরণ আর সারাদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বছর তিন চার হল অনুষ্ঠানের চাকচিক্য বেড়েছে। ভাড়া করা শিল্পী আসছে। কোথায় যেন সেই আন্তরিকতাটা নেই। অথচ আগে নিজেরাই বাঁশ-বাটামে মঞ্চ বেঁধেছে অপটু হাতে। কলোনীর ছেলে মেয়েরা রং মেখে নাটক করেছে, সুরে-বেসুরে গান গেয়েছে। দর্শক বলতে কলোনীর লোকজন,যারা গাইছে, নাচছে, অভিনয় করছে তাদের মা-বাবা, পাড়া প্রতিবেশী। হঠাৎ করে কলোনীর কালচারে ঢুকে পড়ল বাইরের হাওয়া। শুরু হল পয়সা খরচ করে কলকাতার বক্স আর্টিস্ট দিয়ে ফাংশন।

  এবার যে রজতজয়ন্তী তাই আরও বড়ো শিল্পী এসেছেন।

মাস তিনেক হাড় ভাঙা পরিশ্রম করেছে সদস্যরা। রজতজয়ন্তী বলে কথা, কালেকশন, সুভেনিয়রের বিজ্ঞাপন, লেখাপত্তর সব কিছুই এক হাতে সামলেছে কল্যাণ। নিজেরা চাঁদা করে ক্লাবের ছাতটাকে স্থায়ী করার ঝুঁকিও নিয়েছে। দিন কুড়ি হলো ঢালাই ছাত হয়েছে, হয়েছে ছোট্ট একটা বাথরুম। সকাল থেকে কল্যাণের বছর বারোর ছেলে, নয়ন বার চারেক জল ভরে ফেলল বাথরুমে।

কলকাতা থেকে বিকর্ণ রায়তালুকদার এসেছেন গান গাইতে। ভদ্রলোক এখনকার প্রথম শ্রেণীর শিল্পী। রবীন্দ্র সংগীতের লোক হলেও সব রকমের গান গাইতে পারেন। বিকর্ণবাবু চলে এসেছেন গত কাল রাত্রে। সেই থেকে নয়ন পোষা কুকুর ছানার মতো বিকর্ণবাবুর পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাত সকালে রেওয়াজ সেরে এক গ্লাস ত্রিফলার জল, তারপর লিকার চা, বাথরুমের জল, শহরে তো পাওয়া যায় না তাই দাঁতে দেওয়ার নিমকাঠি, জলখাবার ফাই-ফরমাশের বিরতি নেই। নয়নের খুব পছন্দের গায়ক

বিকর্ণবাবু। যার গান এতো দিন রেডিও, রেকর্ডে শুনে এসেছে নয়ন, আজ তাকে সামনে পেয়ে সে আনন্দে আত্মহারা। কত দিন এ গলা সে তন্ময় হয়ে শুনেছে আর কল্পনায় ছবি এঁকেছে তার প্রিয় শিল্পীর।এতদিন যে ছবি সে এঁকেছে তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর বিকর্ণবাবু।

নয়নও গান গায়,তার গানের গলা মন্দ নয়। প্রিয় শিল্পীকে পেয়ে তার যেমন আনন্দ হচ্ছে, তেমনি কোথাও যেন ছোট্ট একটা কাঁটার খচখচও জেগে আছে। তাদের কলোনীর কালচারটা হঠাৎ করে পাল্টে না গেলে আজ সেও হয়তো মঞ্চে গাইতে পারত। তার গানও তো শুনত কলোনীর মানুষজন, হাততালি পড়ত। অনুষ্ঠান শেষে গ্রীনরুমে খোঁজ নিতে আসত কেউ কেউ।

  বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকর্ণবাবুর সঙ্গে ভাব জমে উঠেছে নয়নের। তিনি একদিন আগে এসেছেন গ্রাম দেখবেন বলে। নয়ন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে গ্রামের পথে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে বসেছেন চন্ডীতলায়। কথায় কথায় বিকর্ণবাবু এও জেনে নিয়েছেন নয়ন গান গায়। অনেক জেদাজেদির পর নয়ন খালি গলায় গান শুনিয়েছে তার স্বপ্নের গায়ককে। গান শেষ করে লজ্জায় মুখ তুলতে পারে নি নয়ন, এ যেন সমুদ্রের সামনে গোষ্পদের আস্ফালন। গান শেষের পর সারা চন্ডীতলায় শ্মশানের নীরবতা। তখনও নয়নের মুখ নিচের দিকে নামানো। মুখটা লজ্জায় লাল, যেন শরীরের সব রক্ত এসে জমা হয়েছে মুখে। বিকর্ণবাবুই জড়িয়ে ধরলেন নয়নকে। নয়নের দু'চোখ জলে থৈ, থৈ।

  বিকেল থেকে মন্টু দখল নিয়েছে মাইকের। বারবার মাইকে ঘোষণা হচ্ছে অনুষ্ঠানের কথা, ফলাও করে বলা হচ্ছে বিকর্ণ বাবুর নাম। আজ সারাদিন প্রগতি সংঘে যে কি কি ঘটে গেল তার কিছুই জানে না নয়ন। সে তো সারাদিন লেগেপড়ে আছে তার স্বপ্নের সাথে। সন্ধ্যের দিকে নয়ন চা নিয়ে বিকর্ণবাবুর দরজায় দাঁড়াল। নয়নকে দেখা মাত্র কিছু একটা লুকিয়ে ফেলতে চাইল বিকর্ণবাবু। তারপর কোন কথা না বলে হাতের ইশারায় নয়নকে চলে যেতে বলল। যে মানুষটার সঙ্গে সারাটা দিন সে লেগে পড়ে রয়েছে, তাঁর এই অবজ্ঞায় নয়ন খুব ব্যথা পেল মনে। সবচেয়ে বড় কথা যে মানুষটা কথা বলতে পারে সে যখন হাতের ইশারায় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে চলে যেতে বলে তখন খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। কৌতূহলকে শিকল পরাতে পারল না নয়ন, জানালার ফুটোতে চোখ রাখল সে। ভেতরে যা দেখতে পেল তাতে সে নিজের চোখটাকে বিশ্বাস করতে পারল না। দু'হাতে চোখ দুটো কচলে ফের চোখ বসাল গুপ্ত পথে। দেবতা যখন রক্ত মাংসের সাধারণ মানুষে নেমে আসে যখন সাধারণ জীবন যাপনের ক্লেদ ছুঁয়ে ফেলে তাকে তখন পূজার ফুল কাঁটা হয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় হৃদয়।

  জরুরি ভিত্তিতে কোর কমিটির মিটিং ডাকা হয়েছে। কল্যাণ, অনিন্দ্য, রূপম সহ আর জনা ছয়েক রয়েছে। সিনিয়র হিসেবে রয়েছেন কল্যাণের বাবা আর রাধারমণ বাবু। পুরো পরিস্থিতি সকলের সামনে সংক্ষেপে বলল কল্যাণ। 'আমি কিন্তু বারবার তোমাদের এই

রেনটেড আর্টিস্ট আনার বিরোধীতা করেছি। কতবার বলেছি এ প্রবণতা ভাল নয়, তখন তোমরা আমল দাওনি।' পান চিবাতে চিবাতে বেশ শ্লেষ মিশিয়ে কথাগুলো বললেন রামবাবু।

মাথাটা যেন ধরে আছে। দু'হাতে রগ দু'টোকে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে চেপে ধরেছে কল্যাণ। কি ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় তার কোনও সূত্রই খুঁজে পাচ্ছে না সে। তার উপর শুরু হল পুরানো কাসুন্দি চটকানো। কল্যাণের কাজটাকে সহজ করে দিল রূপম -

- 'দেখুন কাকাবাবু, আমরা আপনার মতামতকে এরপর অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে ভাবব কিন্তু এখন তো আগে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাক।'

- 'হ্যাঁ, রে কল্যাণ ভদ্রলোককে কি কোনও ভাবেই মঞ্চে আনা যাবে না?'

- 'না বাবা, লোকটা গলা অবধি মদ গিলে একেবারে বেহুশ। নয়নকে গ্লাস ছুঁড়ে মেরেছে, কপাল ভাল নয়নের লাগে নি। অনিন্দ্যকে যাতা খিস্তি করেছে।'

নয়নের নামটা আসতেই রূপমের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। কল্যাণের হাতটাকে শক্ত করে ধরে বলল -

- 'উপায় একটা আছে কল্যানদা, নয়ন। নয়নই পারে এ যাত্রায় বাঁচাতে।'

- 'দর্শককে কি করে বোঝাবি!'

- 'বলতে হবে বিকর্ণ বাবু সিরিয়াস অসুস্থ।'

অনিন্দ্য বলল - 

- 'রূপমের সঙ্গে আমি একমত। বাকিরা কি বলেন?'

সভা এক কথায় সহমত হয়ে গেল।

মন্টু দুঃখ দুঃখ গলায় ঘোষণা করতে থাকল - 

'অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি আমাদের প্রিয় শিল্পী বিকর্ণ বাবু গতকাল থেকে আমাদের মধ্যে আছেন কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা বেশ উদ্বেগজনক। তাই তাঁর পক্ষে......'

কানাঘুষো সত্যটা ততক্ষণে চাউর হয়ে গেছে।

  দর্শক আসনে শুরু হয়েছে রসালো আলোচনা। যারা শালীনতা শব্দকে বিশেষ রকম পাত্তা ফাত্তা দেন না তাঁরা কেউ কেউ খিস্তি-খেউরও করছেন। মঞ্চে হারমোনিয়াম রাখা হয়েছে। বুকের ভিতর চাপা কষ্ট নিয়ে মঞ্চে এল নয়ন।

নাগাড়ে গোটা ছয় সাত গান গেয়ে গেল সে। এরপর আর লোকে নয়নকে নিতে চাইছে না।

আশাহত হয়ে দর্শকরা আসন ছাড়তে শুরু করেছে। কেউ কেউ নয়নকে নেমে যেতে বলছে চিৎকার করে।

এবার কি হবে! কি ভাবে সামাল দেওয়া যাবে এই অগণিত জনতার আক্রোশ। মঞ্চের পিছনে লম্বা লম্বা পা ফেলে পায়চারি করছে কল্যাণ।

এমন সময় দর্শক আসন থেকে চিৎকার আরও তীব্র হল। চড়তে থাকল গালি-গালাজ। কল্যাণ উঁকি মেরে দেখে টলতে টলতে মঞ্চে উঠছে বিকর্ণ বাবু। শরীরের এতোটাই ভারসাম্য হীন অবস্থা যে যে কোন মুহুর্তেই মঞ্চে আছাড় খেয়ে পড়তে পারেন তিনি।

দর্শকরা এটুকু বুঝে গেছে বিকর্ণবাবুর পক্ষে পারফর্ম করা সম্ভব নয়। মঞ্চের সামন থেকে আওয়াজ উঠছে গো ব্যাক, গো ব্যাক।

বিকর্ণবাবু স্থির ভাবে দাঁড়িয়েছেন মাইকের সামনে। তার উদাত্ত কণ্ঠ ছড়িয়ে যাচ্ছে আকাশে বাতাসে -

'নমস্কার, মদ আমি যে পান করি না তা নয়। তবে মাতাল হয়েছি খুব কম বারই। বিশ্বাস করুন আজ আমি মদ ছুঁই নি।'

দর্শক আসনের বিশৃঙ্খলা এই কটা কথাতেই উধাও। মাইকের শব্দ যতদূর যায় ততদূর ছড়িয়ে গেল বিকর্ণবাবুর পরের কথাগুলো - 'সারাটা দিন নয়নের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমি আমার শৈশবটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম নয়নের মধ্যে। সে সময় আমারও তো ইচ্ছে হতো আমাকেও একটা মঞ্চ দেওয়া হোক। আমার গান শুনেও লোকে হাততালি দিক। তখন সুযোগ দেবে কে! সবাই তো প্রতিষ্ঠিতের পেছনে ছুটছে। ভাবলাম আমার শৈশবের অতৃপ্তিটা অনন্ত আজকের দিনের জন্য নয়নকে যেন না ছোঁয়। তার জন্যই মাতলামি।'

দর্শক আসনে তখন পিন পড়ার নীরবতা।

মঞ্চের সমস্ত আলো এসে পড়েছে বিকর্ণবাবু উপর। হারমোনিয়ামটা টেনে নিয়ে তিনি গেয়ে উঠলেন - 

'তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী'

আসন ছেড়ে চলে যাওয়া দর্শকেরা আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে।

কল্যাণ, অনিন্দ্য, রূপমরা পাথরের মতো নিশ্চল। এতক্ষণে মনে হয়েছে আজ পয়লা এপ্রিল তো শুধু প্রগতি সংঘের জন্মদিনই নয়, আরও একটা বিশেষ দিন যে।

নয়ন মঞ্চের বাঁ দিকের উইংসের আড়ালে দাঁড়িয়ে। পরম মুগ্ধতা নিয়ে সে অপলক তাকিয়ে তার স্বপ্নের গায়কের দিকে।

ডান দিকের ফলোটার আলোক রশ্মি ছিটকে পড়েছে তার মুখে। তার দু'চোখ থৈ, থৈ করছে আনন্দ আর অনুতাপের অশ্রুতে।

 

                 অপত্যস্নেহ

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ 

সনোজ চক্রবর্ত্তী পেশায় স্কুল শিক্ষকতা। বানিজ্য বিভাগে স্নাতকোত্তর। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি। মুলত গল্পকার হলেও কবিতাও লিখেছেন বেশ কিছু। প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে। লেখালেখি ছাড়া অন্যতম নেশা অভিনয় ও নাটক পরিচালনা।

.....রমেন মাকে বুঝিয়েও কিছু করে উঠতে পারে নি। আসলে মায়েদের মনটা বোধহয় এমনই হয়। সন্তানের ভালো করতে গিয়ে নিজের অজান্তে কত রকমের যে সমস্যা তৈরি হয়ে যায় তা কি আর মাতৃস্নেহ বুঝতে চায়!....

   দাওয়ায় বসা রমেন আরে... আরে... আরে... শব্দটা করতে করতে ধরতে চেয়েছিল চিত্রাকে কিন্তু তার আগেই চিত্রা পপাত-ধরণীতলে। ধপাস শব্দটার আগে অবশ্য মাগো... বলে চিৎকার করে উঠেছিল চিত্রা।

    একটু আগে গজগজ করতে করতে মেঝেটা মুছছিল নিজেই। কদিন হল কাজের মেয়েটা ডুব দিয়েছে। রাগে তালকানা হয়ে হয়তো একটু বেশিই জল ঢেলে ফেলেছিল মেঝেতে। চোখের সামনে বিড়ালটা পাটিসাপ্টাগুলো সাঁটাচ্ছে দেখে মাথা গরম হয়ে যায় তার। অথচ পিঠেগুলো ঢাকা দেওয়াই ছিল। বিড়ালটাকে তাড়াতে গিয়েই বিপত্তি। সিমেন্টের মেঝেতে প্রথম পড়ে পেছনটা। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হাত দুটো চলে যায় পেছনে। শরীরের সমস্ত ভারটা স্বাভাবিক ভাবে চলে আসে হাতের উপর আর তাতেই কোনও রকমে বেঁচেছে মাথাটা। রমেন চিত্রাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গিয়ে শুইয়েছে বিছানায়। কোমরে বেশ লেগেছে চিত্রার। সমানে আহা, উহু করছে সে। অপরাধীর মতো দরজায় দাঁড়িয়ে রমেনের মা আশালতাদেবী।

   আজকে ঘটনাটা যে প্রথম ঘটল তা নয়। এর আগে অনেকবার এমন ঘটেছে, চিত্রা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। কখনও সামলে নিয়েছে নিজেকে আবার কখনও শ্বাশুড়ি বৌমা কথা কাটিকাটি হয়ে সপ্তাহ খানেকের জন্য পাশের গ্রামে বাপের বাড়ি চলে গেছে চিত্রা।

রমেন মাকে বুঝিয়েও কিছু করে উঠতে পারে নি। আসলে মায়েদের মনটা বোধহয় এমনই হয়। সন্তানের ভালো করতে গিয়ে নিজের অজান্তে কত রকমের যে সমস্যা তৈরি হয়ে যায় তা কি আর মাতৃস্নেহ বুঝতে চায়!

বছর তিন আগে, সেদিন ছিল রমেনের জন্মদিন। দিনটা ঘরোয়া ভাবেই পালন করবে বলে প্রস্তুতি নিয়েছিল চিত্রা। গেষ্ট বলতে রমেনের শ্বশুর, শ্বাশুড়ি, শালা আর শালভাজ। বাজার থেকে অসময়ের ইলিশ এনেছিল রমেন। রমেনের শালা আর শালাভাজ যত্ন করে সাজিয়েছিল ড্রয়িংরুমটা। রঙিন আলোয় বেশ একটা উৎসব উৎসব আমেজ। চিত্রার কিনে আনা দামী পাঞ্জাবিটা রমেনের বয়স এক ধাক্কায় কমিয়ে দিয়েছিল বছর দশ। পাশে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে চিত্রা। শালা বাবু ক্যামেরার লেন্সটা ঠিক করছিল।

এমন সময় আশালতাদেবী ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে গৃহদেবতার পা-ছোঁয়ানো ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করলেন ছেলেকে।আর সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেল উৎসব আবহ। ধান-দূর্বায় লেগে থাকা ঠাকুরের পায়ের সিঁদুর ছড়িয়ে পড়ল সারা পাঞ্জাবিতে। হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন আশালতা। পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার জন্য নতুন পাঞ্জাবি পাল্টে বিয়েরটা পরেছিল রমেন। পুরানো স্মৃতি উসকে দিয়ে

যদি বৌকে ক্ষান্ত করা যায়। চিত্রা সেদিন একটা কথাও বলেনি শ্বশুড়িরসঙ্গে। আশালতা গায়ে পড়া হয়েও বৌমাকে ঠাণ্ডা করতে পারে নি। পরের দিন সাবান-জলে ছেলের পাঞ্জাবি থেকে মাতৃস্নেহের দাগ তুলে ফেলতে পারলেন না আশালতা। সে ঘটনার জের থেকে গিয়েছিল আরও দিন চার। আড়ালে ডেকে মাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল রমেন। মাও বুঝেছিলেন। বলেছিলেন - 'দেখিস আর এমন ভুল হবেই না, তুই বৌমাকে বুঝিয়ে বলিস, আমি খুব কষ্ট পেয়েছি রে খোকা।'

কথাগুলো শুনে মুখ নামিয়ে নিয়েছিল রমেন। মায়ের জন্য কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু আরও বেশি কষ্ট হচ্ছিল চিত্রার জন্য। সে যে মাতৃস্নেহটাকেই বুঝতে চাইল না।

  রমেনদের সপ্তম বিবাহ বার্ষিকীতেও জল ঢেলে দিয়েছিলেন আশালতা। সকাল বেলা ছেলের মঙ্গলের জন্য তিনি পায়ে হেঁটে দু'কিমি দূরের নারায়ণ মন্দির থেকে নিয়ে এসেছিলেন চরণামৃত। মায়ের এতো কষ্ট করে আনা প্রসাদ সন্তান কি না নিয়ে পারে। সোফায় বসে ড্যাবডেবিয়ে মা-ছেলের আদিখ্যেতা সহ্য করতে না পেরে উঠে চলে গিয়ে ছিল চিত্রা।আর সেই চরণামৃতেই বিকেল থেকে রমেন বাথরুমের বাইরে বেরাতেই পারে নি। শেষকালে নার্সিংহোম পর্যন্ত করতে হয়েছিল। বিবাহ বার্ষিকীর বিরিয়ানি ফেলে নার্সিংহোমে স্যালাইন নিয়ে শুয়েছিল রমেন।

বাড়ি ভর্তি অতিথিদের কাছে চিত্রার মুখরক্ষাই হয়ে উঠেছিল কঠিন। অত খাওয়ার-দাওয়ার, আলো-আনন্দ মাটি হয়ে গিয়েছিল সে রাতে।

সারারাত না খেয়ে, না ঘুমিয়ে নার্সিংহোমের ওয়েটিংরুমে কেটেছিল আশালতার।

আশালতার মাতৃস্নেহ প্রায়ই নানান ঝামেলা ঘটিয়ে ফেলত সংসারে। আসলে সাদা মনে আশালতা যাই করতে চান তাই কেমন পাল্টে যেত অশান্তিতে। আর সে অশান্তির চূড়ান্ত হয়েছিল রমেনের প্রমোশন নিয়ে।

  মায়ের জন্য যে দিন রমেনের প্রমোশনটা আটকে গেল সেদিনই শনির দশা কটাতে সংসার আলাদা করে নিয়েছিল চিত্রা। প্রমোশনটা বাঁধা ছিল রমেনের। কিন্তু বাদ সাধল মায়ের দেওয়া তাবিজটা। খুব ছোটবেলায় পিরের দরগা থেকে রূপোর তাবিজ বানিয়ে ছেলের বাঁ হাতে কালো কারে পরিয়ে দিয়েছিলেন আশালতা। তখন রমেনের বয়স বছর তেরো। রাতে ঘুমের মধ্যে থেকে থেকে কেঁদে উঠত রমেন, আর ভয় পেয়ে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরত মাকে।পাশের বাড়ির বড় বৌ হদিশ দিয়েছিল দরগার। ওর ভাইয়েরও নাকি ঐ ব্যারাম ছিল, বলেছিল - 'খরচ একটু আছে, রূপোর তাবিজ তো, তবে একবার হাতে

ঠলে সারা জীবনে কোনও বিপদ ছুঁতে পারবে নি।'

তা সেই বিপদহরা তাবিজের মধ্য এতকাল ধরে এতবড় বিপদ ওৎ পেতে আছে তা কি করে জানবে রমেন!

কোম্পানির পার্সোনাল ম্যানেজার মিঃ সাক্সসেনা ছিলেন ঘোর নাস্তিক। তিনি তাবিজ, মাদুলি, মন্দির, দরগা এসব শুনলেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতেন। ইন্টারভিউর সময় সাক্সসেনার নজর গিয়ে পড়ে রমেনের বাঁ হাতে। হাফ হাতা শাটের বাইরে তখন পেন্ডুলামের মতো ঝুলে পড়েছে রূপোলী রং-এর তাবিজটা। মিঃ সাক্সসেনা চশমাটাকে নাকের ডগায় নামিয়ে কপালে চোখ তুলে বলেছিলেন -

'দেখেন মিঃ রোমেন বাবু আপনি আপনার ভোবিষ্যোতের লিয়ে যদি তাবিজ - ফাবিজ লাগান, তোবে আপনি কোম্পানির ভোবিষ্যোত কি ভাবে দেখবে।'

এক তাবিজে মোটা মাইনে হাতছাড়া হয়েছিল রমেনের। আশালতার মুখের উপর তাবিজটা ছুঁড়ে মেরেছিল চিত্রা।

রমেনের অবস্থা না কুল না শ্যাম। সে মাকে না পারছে ফেলতে আর চিত্রাকে না পারছে বোঝাতে।

  আজ যেমন কত সামান্য ঘটনায় এমন একটা বিশ্রী পরিস্থিতি হয়ে গেল। সকাল বেলা চিত্রা একটা বাটিতে পাটিসাপ্টা পিঠে দিয়েছিল রমেনকে। পিঠেগুলো এসেছে রমেনের শ্বশুর বাড়ি থেকে। স্থানগুণে বস্তুর মূল্য বাড়ে। একে পিঠে, তার উপর তা বৌ-এর বাপের ঘরের, স্বাভাবিক ভাবেই খাদ্যটি ফাইভস্টার না হোক থ্রিস্টারের মর্যাদা পাবে।রমেন দাড়ি সেভ করছিল দেখে, চিত্রা আর একটা বাটি দিয়ে ঢাকা দিয়ে দেয় পিঠেগুলোকে। এর মধ্যে আশালতা এসে হাজির, তাঁর দু'হাত ভরা কালোজাম। পেকে একেবারে টসটস করছে। ছেলের জন্য যত্ন করে গাছের তলায় পড়ে থাকা জামগুলো তুলে এনেছেন তিনি। গাছটা লাগিয়ে ছিলো রমেনের বাপ। মানুষটা নেই কিন্তু ঘর-বাড়ি, গাছ-গাছালি সবকিছুতেই তিনি না থেকেও আছেন। ছেলের জন্য আনা জামে পাছে মেঝের নোংরা লেগে যায় তাই পিঠেতে ঢাকনা দেওয়া বাটিটা নিয়ে তার মধ্যে জামগুলো রেখে দেন আশালতা।

  কত দিন ছেলের দিকে ভালো করে তাকায় নি আশালতা। রমেনের মাথার চুলে পাক ধরেছে, গোঁফটা তো কবেই সাদা। কাজের চাপে খুব রোগা হয়ে গেছে ছেলেটা। আশালতা রমেনের পাশটিতে বসেন। স্নেহের হাত বোলাতে থাকেন মাথায়। পাছে ব্লেড বসে যায় তাই থেমে যায় রমেন। কতদিন পর সে মায়ের আদর পাচ্ছে! এতো বড় বয়সে তো আর মায়ের কোলে শুয়ে পড়া যায় না। যদি তার ছেলে রাতুল দেখে ফেলে কি হাস্যকর ব্যাপার হবে! একটা ঘোর কাজ করছিল রমেনের মধ্য। সে কখন যেন পৌঁছে গেছে তার শৈশবে।

আর এই সুযোগে বিড়ালটা মুখে তুলে নিয়েছিল খান-দুয়েক পাটিসাপ্টা। বেড়াল তাড়াতে গিয়েই আছাড়। বাটিটা ঢাকা থাকলে এমনটা হতো না। আর তার ফলেই সব রাগ গিয়ে পড়েছে আশালতার উপর।

ডাক্তার বাবু এসেছিলেন, সব দেখেশুনে বললেন 'তেমন কিছু হয় নি, কোমরে একটু ব্যথা লেগেছে।' দুটো ঔষধ দিয়েছেন একটা খাওয়ার অন্যটা মালিশের। ব্যথাটায় একটু গরম সেঁক আর সপ্তাহ দুই বেডরেষ্টের কথা বলেছেন।

যন্ত্রণায় বিছানাটাকে একেবারে এলোমেলো করে ফেলেছে চিত্রা। বিছানার পাশে রাখা টুলটাতে বড় বাতিতে জ্বলছে একটা হারিকেন। সেঁক দেওয়ার জন্য হারিকেনটার মাথায় একটা কাপড়ের টুকরো চাপানো। টিউবটার পেছন দিকটা বাম হাত দিয়ে টিপে ডান হাতের আঙুলে মলমটা নিলেন আশালতা। ডাক্তার বাবু যেমনটি বলেছেন তেমন ভাবেই ম্যাসেজ করতে থাকলেন চিত্রার কোমরে। আবেশে দু'চোখের পাতা জুড়ে এল চিত্রার। নিরাময়ের অমোঘ মন্ত্র নিয়ে ব্যথাটার উপর খেলা করে যাচ্ছে আশালতার আঙুলগুলো।

  একটু একটু করে কমতে থাকল ব্যথাটা! মায়েদের হাতে কি ম্যাজিক থাকে! হঠাৎ করে পড়ে যাওয়ার আগের মুহূর্তটা মনে পড়ে গেল চিত্রার। পড়ে যাওয়ার আগে শেষবার সে মা বলেই চিৎকার করে উঠেছিল। ঠোঁটে জিভে অন্য কোনও শব্দ তো এসে বসে নি। ম্যাসেজটা হতেই সারা কোমরে ছড়িয়ে পড়েছে শীতলতা। চিত্রা তার গালটাতেও ভেজা ভেজা ভাব টের পেল। ততক্ষণে দু'চোখের জলে বালিশটাকে যে ভিজিয়ে ফেলেছে সে।

গল্প সমগ্র ১১

  সনোজ চক্রবর্ত্তীর গল্পঃ-

  • অপত্যস্নেহ 

  • থাপ্পড় 

  • উত্তরাধিকার 

  • অনিকেত

  • সংস্কার 
  • লিপইয়ার 
  • উৎসর্গ
  • অপাদপ
  • আব  
  • এক্সচেঞ্জ অফার

 দুটি গল্পঃ 

চাপরাশি ও জয়নগরের মোয়া

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ

 

...এ যুগের ধর্ম এটাই, প্রযুক্তির হাত ধরে সারা পৃথিবী যখন ঢুকে পড়ছে আমাদের বাড়ির উঠোনে তখন আমরা নিজেদের লক্ষ্মণরেখাকে আরো সংকীর্ণ করে নিচ্ছি। এ গতির যুগে অন্যের পানে ফিরে তাকাবার সময় কোথায়!এর মধ্যে একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে, পথ শ্রমের ক্লান্তি, তাই মিনিট দশেক ঝিমিয়ে ছাড়বে।...

চাপরাশি

  এক পশলা বৃষ্টি পিছিয়ে দিল পাক্কা এক ঘন্টা। বৃষ্টির জন্য বেরাতে পারলাম না। ফলে যে গাড়িটায় ফিরব ভেবেছিলাম সেটাতে ফেরা হল না। পরের গাড়ি এক ঘন্টা পর। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। দুপুরের বাস স্ট্যান্ড, তাই লোকজন খুব একটা নেই বললেই চলে। টাইম মাস্টার চেয়ারে গা এলিয়ে খুচরো একটা ঘুম দেওয়ার চেষ্টা করছে। বট গাছের নিচে পান-বিড়ি দোকানটা অবাধ-বন্ধ, ছোকরাটাকে একটা সিগারেট চাইতে মুখের উপর না করে দিল। মাথাটা নিচু করে দেখি, ঘুপচি দোকানেই দুপুরের ভাত তরকারি সাজিয়ে বসেছে সে।
  বট গাছের ছায়াটা দখল করে তেলচিটে শরীর, মাথা ভর্তি রুক্ষ বাদামী চুল আর শত ছিন্ন অবাধ-ময়লা জামা কাপড়ে একটা পা নিয়ে যে ছেলেটা রোজদিন ভিক্ষা করে তাকে তো আজ দেখতে পাচ্ছি না। বৃষ্টির জন্য বোধহয় বেচারা বাড়ি ফিরে গেছে।
ছেলেটার কথা মনে আসতেই একটা বিষণ্ণতা ঘিরে ধরল আমাকে। একটা পা না থাকা জীবন বয়ে বেড়ানো বড্ড কষ্টের।
আবার ঐ না থাকা পা'টাই ওর বেঁচে থাকার একমাত্র হাতিয়ার। ওটাই যতটুকু অনুকম্পা এনে দেয় তাতে শুধু ওর নয় হয়তো ওর পরিবারেও দু'বেলা দু'মুঠো জোটে। রোজদিন কত গুলোইবা টাকা পায় বেচারা। আজ তেমন ভাবে কিছুই পেল না, কি খাবে আজ! 
প্রতিদিন যাতায়াতের পথে দেখি কিন্তু ওর সম্পর্কে তেমন করে জানাই হয় নি কোনো দিন। 
এ যুগের ধর্ম এটাই, প্রযুক্তির হাত ধরে সারা পৃথিবী যখন ঢুকে পড়ছে আমাদের বাড়ির উঠোনে তখন আমরা নিজেদের লক্ষ্মণরেখাকে আরো সংকীর্ণ করে নিচ্ছি। 

  এ গতির যুগে অন্যের পানে ফিরে তাকাবার সময় কোথায়!এর মধ্যে একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে, পথ শ্রমের ক্লান্তি, তাই মিনিট দশেক ঝিমিয়ে ছাড়বে। খাঁ খাঁ করছে গাড়িটা। হাতে গোনা জনা পনেরো সিট দখল করে বাপ বাপান্ত করছে ড্রাইভার, কনডাক্টটরের।

বাস কর্মচারীদের জীবনটাই অদ্ভুত, এরা বাড়ি থেকে বেরানোর সময় চোখ-কান খুলে রেখে আসে। হাজার কথায় এরা রা কাড়ে না। গাড়িতে উঠে বসলাম। জানালা দিয়ে বট গাছের দিকটা নজরে আসতে দেখি একটা ঝাঁ চকচকে গাড়ি সেই খোঁড়া ছেলেটাকে বট তলায় সামনে নামাচ্ছে। এক পায়ে মাটি ঘঁষটে ঘঁষটে শরীরটা এগিয়ে যাচ্ছে গাছ তলার দিকে। শরীরের সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে অক্ষমতার বাধাটাকে অতিক্রম করার এক প্রাণান্তকর চেষ্টা। হাত দুটো দিয়ে প্রবল প্রতাপে ছুঁড়ে দিচ্ছে শরীরের নিচের অংশ।ঈশ্বর যাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যাহত করেন, নিজের থেকেই তাদের সংগ্রামের শক্তি দেন অনেক।কাচের আড়ালে বসে থাকা লোকটি সুদর্শন, পোশাক পরিচ্ছদে পরিপাটি। ভাবতে ভালো লাগে এ ধরণের মানুষজনের জন্য পৃথিবীটা আজও সুন্দর। কে চায় এমন নোংরা ময়লা মাখা মানুষকে গাড়িতে লিফট্ দিতে।খোঁড়া শরীরটা নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বসেছে গাছের ছায়ায়।গাড়ির ভিতর থেকে তার কোলের উপর এসে পড়ল একটা ভিক্ষা পাত্র। তারপর গাড়িটা অতি দ্রুত গতিতে হারিয়ে গেল।পিছনের সিট থেকে শুনতে পেলাম--" শালা, হারামির বাচ্চা অনাথ আশ্রমের নামে খোঁড়ার কামাইয়ে চার-চাকার ফুটুনি!"চমক লাগল কথাটা কানে আসতে। সত্যি আত্মসুখের লক্ষ্মণরেখার বাইরে বেরোবার সময়টুকুই আজ বাড়ন্ত। পৃথিবীতে দু'হাত বা দু'পাওয়ালা কত শত খোঁড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে তার কতটুকুই বা জানি!

জয়নগরের মোয়া

  স্বেচ্ছায় রক্ত দান, শীতের রাত বারোটা বা একটায় গামছা কাঁধে প্রতিবেশীর সৎকার করতে যাওয়া, পাশের বাড়ির মেয়েটাকে শহরের কলেজ চিনিয়ে দেওয়া কিংবা রাস্তায় এক্সিডেন্টে আঘাত পাওয়া অচেনা লোকটাকে নিয়ে হসপিটালে মশার কামড় খেয়ে দু-রাত জেগে কাটানো, এধরনের আরও বেশ কিছু কাজের জন্য চাকরি পাওয়ার আগের জীবনটার নাম হয়ে যায় 'বেকার জীবন'। সে অর্থে এ কাজ গুলোকে কাজ বলে মনেই করা হয় না। ব্যাপার খানা অনেকটা ঐ নেই কাজ তো খৈ ভাজ টাইপের আরকি।

অথচ সকলকে দিয়ে এধরনের কাজ হয় না, সবাই এসব কাজ করতে পারে না। এ সমস্ত কাজের জন্য যে মনটা দরকার সকলের তা থাকে না।

  সব ধরনের কাজের জন্য একটা সংগঠন লাগে। সংগঠন বলতে কিছু সমস্বার্থ মানুষের লিখিত বা অলিখিত ভাবে একত্রিত হওয়া। একটা প্রাতিষ্ঠানিক বা আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক। বেকার জীবনে তথাকথিত ঐ অকাজগুলিরও একটা সংগঠন থাকে। ক্লাব। লোকে বলে কতকগুলো বাপে তাড়ানো, মায়ে খেদানো ছেলের অসামাজিক কাজের আস্তানা।

পাড়ার দুস্থ ও মেধাবী ছেলেটির স্কলারশিপের ব্যবস্থা, শীতে কম্বল বিতরণ, কবিতা-গান-বাজনার আসর বসানো, কালচারাল প্রমোশন, নিদেনপক্ষে বছরে একটা দুগ্গা পূজা-- এ গুলোকে আর যাই হোক অসামাজিক কাজ বলা চলে না।

তাই নিন্দুকেরা বলে বেড়ায় এই কাজ গুলোই নাকি নামাবলী, এগুলোই নাকি আড়াল। আসল খেলাটা চলে ওর তলায়।

  আমার বেকার জীবন ছিল দীর্ঘ। তাই অনেকদিন ধরে এ ধরনের কাজে যুক্ত থেকেছি। এখনো নেই তা নয়, তবে আগে এ সব কাজ মিটিয়ে সময় হলে অন্য কাজ করতাম আর এখন ঠিক উল্টো, অন্য সব কাজ সামলে সময় উদ্বৃত্ত হলে তথাকথিত ঐ অসামাজিক কাজ গুলো করার চেষ্টা করি।

অভিজ্ঞতায় দেখেছি একমাত্র পাড়ার পুজো কমিটির

সেক্রেটারি বা ক্যাশিয়ার হওয়ার মধ্যে একটা কেতা ছিল। সেক্রেটারি হলে নিজেকে একটা কেউকেটা কেউকেটা বলে মনে হত। ফাংশানে সুযোগ পাওয়ার জন্য পড়ার মামনিরা তেল দিত, যে কাকুটা বরাবর নিন্দামন্দ করে বেড়িয়েছে সে পর্যন্ত মঞ্চে মাউথ অর্গান বাজানোর জন্য, লোক দেখানো প্রশংসা করত ---"তুমি বলে পার বাপু, তুমি না দায়িত্ব নিলে, 'জলসা' একেবারে জলসা হয়ে যেত। আমি হলফ করে বলে দিতে পারি..... "

অবশ্য ক্যাশিয়ার হলে কটাদিন নিজেকে বেশ জমিদার জমিদার মনে হত। এর বাইরে বাকি সব কাজগুলোতে আত্মসন্তুুষ্টি ছাড়া আর বিশেষ কোন প্রাপ্তিযোগ ঘটে নি কখনো। বরং বদনাম জুটেছে বেদম।

স্বেচ্ছায় রক্ত দান।

আবডালে লোকে বলে বেড়িয়েছে-

--- " ও তো কসাই, চড়া দামে রক্ত বিক্রি করে।" ---- " আরে না না, এক বোতল হরলিক্সের লোভে রক্ত দেয়।"

শবদাহ করতে যাওয়া নাকি লোক দেখানো 'সুভাষ খুড়ো' সাজা আসল আকর্ষণ 'বিপিন বাবুর কারনসুধা'।

পাশের বাড়ির মেয়েটাকে শহরের কলেজ চিনিয়ে দেওয়ার মধ্যে, শরীরের গন্ধ খুঁজে পায় কেউ কেউ।

অচেনা লোকটা সুস্থ হয়ে, ট্যাক্সিতে উঠে টা টা করতে করতে চলে যায়।

দু-রাত জেগে বাসে ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি ফিরে আসতে হয় গাঁটের কড়ি খরচ করে।

কথায় আছে কাজ ফুরালে ছাপড়ায় লাথি।

বেকার জীবনে এই সব কাজের অর্থনৈতিক মূল্য কোনদিন নিরূপিত হয় নি। সামাজিক মূল্য নির্ধারণের প্রশ্নই ওঠে না কারণ বেকার জীবন সমাজের বাইরের অংশ

আমি তখনও চাকরি-বাকরি পাই নি। ঐ রকম একটা অকাজের দুপুরে আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরতে মা বলল--

-- বাড়িতে তো বলে যাবি, যে মোয়ার টাকা দিয়ে রেখেছিস। একটা লোক এসেছিল জয়নগরের মোয়া দিয়ে গেছে। আমরা খেয়েছি দারুণ। ফ্রিজে রাখা আছে খেয়ে নিস্। দামের কথা বলতে, বলল তুই দিয়ে রেখেছিস।

-- আ... আ... আমি!

--- তাই তো বলল।

কথা কটা বলে মা রান্না ঘরে চলে গেলেন।

হাত মুখ ধুয়ে ফ্রিজ খুলতে যতটা সময় লাগে তার মধ্যে লোকটাকে মনে করতে পারলাম না। মিষ্টিতে আমার খুব লোভ। আর দেরি না করে একটা মোয়া তুলে নিয়ে দিলাম মুখে।

বাঃ অসাধারণ। কি তুলতুলে! মুখে দিতেই মিলিয়ে যাচ্ছে, কি স্বাদ!

আবার একটা তুলে নিলাম।

খুব আয়েশ করে খাচ্ছি। সত্যি এতো ভালো মোয়া আগে কোন দিন খাই নি।

  হঠাৎ মনে হল সেই মোয়া ফেরিওয়ালাকে। সপ্তাহ দুই আগে যে ফেরি করতে করতে দুপুরের চড়া রোদ সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। আমরা তাস খেলছিলাম ক্লাবে।

ধরাধরি করে নিয়ে গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারবাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন তাকে নিয়ে, টপাটপ গোটা দুই ইনজেকশন গেঁথে দিলেন। সাময়িক অক্সিজেনের বন্দোবস্ত করতে হল। তাড়াতাড়ি চিকিৎসা না হলে লোকটার স্ট্রোক হয়ে যেতে পারত। সারা দুপুর পড়ে রইল লোকটা। আমরা না খেয়ে বসে রইলাম।

পরিশ্রমী লোক তাই খুব তাড়াতাড়ি ধকলটা কাটিয়ে উঠল।ফোন করে খবর দিতে বাড়ির লোক চলে এলো বেলার দিকে।

বিকেলে সুস্থ হতে ওকে ডায়মন্ডহারবার লঞ্চে তুলে দিয়েছিলাম আমি।

সেদিন লোকটার ব্যবসা মার খেয়েছিল। ঝাঁকায় মোয়ার বেশ কয়েকটা প্যাকেট পড়ে ছিল।

আমি কিনতে চাইতে লোকটা বলেছিল-

-- তুমি এতো করলে বাবু, এ মোয়া তত ভালো নয়। তোমাকে একদিন জয়নগরের আসল মোয়া খাওয়াবো।

এখন একটা স্কুলে পড়াই। বেকারত্ব ঘুচেছে, হাতে একটু টাকা পয়সাও এসেছে। কিন্তু বেকার জীবনের সেই মোয়ার স্বাদ, আর কোন দিন পাই নি।

 

 অসুখ

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ

 

....ব্যাপারটা বুঝি পুরানো ভাবধারার সঙ্গে সংঘাত,ছেলে-মেয়ের স্কুলিং, ফাস্ট লাইফ, নগরজীবনের সুখ-সুবিধা এসবের জন্য পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। ঔষধ-পত্তর লিখে দিলাম। দেখুন কতটা কি হয়। তবে সবচেয়ে ভাল হয় ও যা চায়... বুঝতে পারছি সমস্যা আছে। তবে আর একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। সেন্ট পার্সেন্ট গ্যারেন্টি দিলাম অসুখটা সারবেই।....

বাড়ির মুখেই দাঁড়িয়ে আছে সুতনুকা। না বাড়িটা সুতনুকাদের নিজস্ব বাড়ি নয় ভাড়ার বাড়ি। এখন বিকেল চারটা বাজে, প্রতিদিন এই সময়টায় সুতনুকা বাড়ির সামনের রাস্তাটার উপর এসে দাঁড়ায়। গাড়িটা এসে থামে। বিথি গাড়ি থেকে নেমে, বন্ধুদের হাত নেড়ে টাটা করে দেয়, ততক্ষনে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে সুতনুকা। মেয়ের কাঁধ থেকে ভারি স্কুল ব্যাগটা নিয়ে নেয় সে। বিথি একটা চঞ্চল প্রজাপতির মতো নাচতে নাচতে চলতে থাকে মায়ের সাথে। আজ গাড়িটা লেট করছে। গাড়িটার অবস্থাও খুব একটা সুবিধার নয়। দু'দিন ছাড়া যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যায়। এমনও হতে পারে মাঝ পথে টায়ার পাংচার হয়ে ফেঁসে গেছে। ভাবনাটা মাথায় আসা মাত্র উদ্বিঘ্ন হয়ে পড়ল সুতনুকা। মেয়েটার শরীরটা ক'দিন ধরেই বিশেষ ভাল নয়। কেমন যেন মনমরা। প্রায় সময় গুম মেরে বসে থাকে। গেল সপ্তাহে নাচের ক্লাসেও গেল না মেয়েটা। এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে গাড়িটা যে কখন তার সামনে থেকে চলে গেল প্রথমটায় টের পায় নি সুতনুকা। গাড়িটা খানিকটা এগিয়ে যেতে তার খেয়াল হল আজ বিথিকে নামাতে ভুলে গেছে হেল্পপার। একটু এগিয়ে বাকিদের নামিয়ে মিনিট দশ পরে এপথেই ফিরবে গাড়িটা। ততক্ষন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ফেরার পথে বিথিকে নামিয়ে হেল্পপার তার ভুলের জন্য এমন ভাবেই আকুতি মিনতি করবে যে আর রাগ পুষে রাখা যাবে না। এর আগে বার কতক ঘটেছে এমন। আসলে বেসরকারি স্কুলগুলো চলে অভিভাবকেদের টাকায় তাই তাদের মতমতকে বেশ গুরুত্ব দেয় স্কুলগুলো। দেবেই না বা কেন আজকের এই তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে কনজিউমার স্যাটিসফ্যাকশানই হল টিকে থাকার মুলমন্ত্র। একটা অভিযোগেই বেচারার চাকরি ঘচাং। ফিরতি পথে গাড়িটা আরো বেশি গতিতে সুতনুকাকে অতিক্রম করল। গাড়িটা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুতনুকার ভাবনাটা মুহুর্তে বদলে গেল এক গভীর দুশ্চিন্তায়। অনেকগুলো যদি কিন্তু নিয়ে মনের ভিতর ডালপালা মেলে দিল দুশ্চিন্তাটা।
" তাহলে কি গাড়িটা বিথিকে না নিয়েই চলে এসেছে!" 
সুতনুকার মাথার মধ্যে তাপ ছড়াচ্ছে। 
" যদি তাই হয়, তবে কিভাবে ফিরবে মেয়েটা! নাহঃ এমন ইরেসপনসিবল্ স্কুল থেকে মেয়েকে তুলে নেওয়াই ভাল।"
মনের এ এক বিচিত্র খেয়াল একটা আশঙ্কার সঙ্গে সে অন্য আর এক ভরসার আশ্বাস জুগিয়ে দেয় নিপুন হাতে।
" এমনও তো হতে পারে বিথি গাড়িতে উঠেছিল, পথে কোনো বন্ধুর সঙ্গে নেমে গেছে। যদি তাই হয় তাও মঙ্গল কিন্তু যদি গাড়িতেই না উঠে!" 

আশঙ্কাটা অস্থির করে তুলল সুতনুকাকে।পায়েরতলা থেকে ঝুর ঝুর করে সরতে লাগল মাটি, বুকের ভিতর ভুমিকম্পের দুলুনি টের পেল সে। এখুনি স্কুলে একটা কল করা দরকার। রাস্তা থেকে বাড়ি, ছুটে এল না উড়ে এল তা বুঝে উঠতে পারল না সুতনুকা। বাড়ি ফিরে, ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল পাঁচটা মিসড কল। স্কুল থেকেই। আরো চাপ বাড়িয়ে দিল মিসড কলগুলো
ঘুরিয়ে কল করল সুতনুকা। 
ফোনের অন্য প্রান্তে মহিলা কন্ঠ-
--হ্যালো...
--হ্যাঁ আমি ক্লাস সিক্স-এর বিথিকা সেনের মা বলছি...
-- ওঃ মিসেস সেন। আমরা কল করেছিলাম আপনাকে...
-- বিথিকা আজ স্কুল থেকে...
-- ওই বিষয়েই আমরা ফোন করে ছিলাম। গাড়িটা চলে যাওয়ার পর আমরা জানতে পারি ওকে ছাড়াই চলে গেছে গাড়িটা। দুশ্চিন্তা করবেন না, একটা মোটর সাইকেলে ওকে বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। মিনিট পনের আগে ওরা স্টাট করেছে। হয়তো এতোক্ষনে পৌঁছে গেছে। কাইন্ডলি একটু বেরিয়ে এসে রাস্তা থেকে পিক-আপ করে করে নিন।
-- বাঁচালেন,ওহঃ যা চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। থ্যাঙ্কস্ মেনি মেনি থ্যাঙ্কস্।
-- এখানে থ্যাঙ্কস্-এর কি আছে, ওঃ আর একটা কথা ছিল,মিস্টার সেনকে কাল একটিবার সময় করে স্কুলে আসতে বলবেন।
-- ঠিক আছে ম্যাডাম, কাল যাবেন উনি।ওকে, রাখছি তাহলে।
কথাগুলো বলতে বলতেই বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে সুতনুকা। একটা মোটর সাইকেল এসে থামল তার কাছে। বিথিকে নামিয়ে মোটর সাইকেলটা যে পথে এসেছিল ফিরে গেল সেই পথে। বিথির মুখটা শুকিয়ে গেছে, কেঁদে কেঁদে ফুলে গেছে চোখ দুটো। মেয়েকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরেছে সুতনুকা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বিথি। অজানা আশঙ্কার দোলাচল শেষে আবেগে ভেসে যাচ্ছে সুতনুকা। তার যে এখন রাস্তায় তা ভুলে গিয়েছে সে। দু'হাতে বিথির মুখটা ধরে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিচ্ছে অশ্রুভেজা গাল দু'টো। চোখের একেবারে সামনে গ্লাসটা নিয়ে এসে পেগটা মাপার চেষ্টা করছে সিতেশ। মুখে ব্যাসন মেখে বসে আছে সুতনুকা। পাশের ঘর থেকে বিথির পড়ার শব্দ চুইয়ে চুইয়ে আসছে। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জলের বোতলটা দিতে বলল সিতেশ। সুতনুকা মুখে শব্দ না করে হাত দিয়ে সরিয়ে দিল সিতেশের ফরমাশটা। অগত্যা নিজেই ফ্রিজ খুলে বোতল বের করল সিতেশ। গ্লাসে জলটা ঢেলে আর একবার অনুপাতটা বোঝার চেষ্টা করল সে। অফিস থেকে ফিরে প্রতিদিন রাতে দু'পেগ মদ নেয় সিতেশ। তার ফলে তার ফিতে মাপা হাত। মদ আর জলের নির্ভুল অনুপাত কষে নিতে পারে সে। গলা দিয়ে নেমে গেল পরপর দু'পেগ। মুখটা সামন্য একটু বাঁকল এই যা। সুতনুকার ব্যাসন মাখা মুখ এতক্ষনে ছুটি পেয়েছে। মুখটা ধুয়ে নরম কাপড়ে মুখটা মুছতে মুছতে বলল---- কি হল কিছু বললে না যে?-- কিসের কি বলব!-- বিথির বিষয়ে। কাল একবার স্কুলে দেখাতো করতে যাবে নাকি?-- আমি!-- হ্যাঁ তুমি, তুমি নয়তো কি আমি?-- ইমপসিবল্। আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়।-- তা নয়টা কেন শুনি?-- ঘর-বাইর, দু'টো

আমার পক্ষে সম্ভব নয়।-- স্কুলটা কিন্তু বাইরেই পড়ে সিতেশ।-- মা-বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছাড়ার সময় আমি কিন্তু পইপই করে বলেছিলাম "বাড়ি ছাড়তে চাইছো ছাড়ো বাবা-মা যে দায়িত্বগুলো নেন তা কিন্তু তোমাকেই সামলাতে হবে।"
-- সামলাচ্ছিতো, কিন্তু স্কুলে অভিভাবক তুমি।
-- হাসালে তুমি, আমি অভিভাবক! 
-- হু, তাছাড়া এখানে হাসির কি আছে!
-- আছে, আছে। আমি মানছি, আমি বিথির অভিভাবক কিন্তু আমার অভিভাবকতো তুমি। বিয়ের পর থেকে কোন জায়গাটায় আমাকে আমার মতো করে ভাবতে দিয়েছ!
-- তা আমার ভাবনাটা যদি ভুল না হয় তবে কষ্ট করে না ভেবে আমারটাই না হয় নিলে।
-- তোমার ভাবনায় চলতে গিয়ে তো বুড়ো বাপ-মাকেও ছেড়ে এলাম।
-- এটা কিন্তু এক তরফা হয়ে গেল। ওদের যে প্রথম থেকেই আমাকে অপচ্ছন্দ ছিল তা কি করে অস্বীকার করো! তাছাড়া বিথির স্কুলিংটা ওখানে থাকলে হতো?
-- বেশ হতো। আমার হয় নি?
-- সে জন্যই তো তোমায় যেতে বলছি। কত বিচক্ষন তুমি।
সুযোগ পেলে খোঁচা দিতে ভুল করে না সুতনুকা।
পাশের ঘরে বিথির পড়ার শব্দ অনেক সময় বন্ধ হয়েছে। সে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে মা-বাবার কথা শুনছিল। মা-বাবার এই ঝগড়া-ঝাঁটি তার একদম ভাল লাগে না। বাবা-মায়ের ঘর থেকে আর কোনো কথা কানে আসছে না। তার মানে মা হয়তো এখুনি এসে পড়বে। তাই
মা-বাবার কথা বন্ধ হতে বিথি তাড়াতাড়ি নিজেকে সরিয়ে নিল পড়ার টেবিলে।

এইমাত্র রিসেস-এর ঘন্টা বাজল। ছেলে-মেয়েরা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বই-পত্তরের বাঁধন আলগা হতেই দল বেঁধে সব ছোটাছুটি করছে ছোট্ট পার্কটাতে। খাঁচা ছাড়া পাখি যেভাবে ছড়িয়ে পড়তে চায় আকাশে ঠিক তেমনই প্রাণহীন শৈশবগুলো দাপিয়ে বেড়াছে সবুজ মাঠ। 
বারান্দায় দাঁড়িয়ে কঁচি-কাঁচাদের ভিড়ে বিথিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল সুতনুকা। মিনিট কুড়ি হল এখানে এসেছে সে। সিতেশ বলেছে সে সরাসরি অফিস থেকে চলে আসবে। বাম হাত উল্টে সময় দেখল সুতনুকা। হয়তো আর মিনিট দশেকের মধ্যে এসে পড়বে সিতেশ।
স্কুল যে কেন ডেকে পাঠাল কাল থেকে অনুমানের অলিগলি ঘুরেও কারণটা অনুসন্ধান করে উঠতে পারে নি সুতনুকা। বিথির বাড়ি ফেরার বিষয় হলে ফল্টটাতো ওদের, তার জন্য নিশ্চিত ডাকবে না। তবে আর কি কারণ থাকতে পারে!
" কতক্ষন এসেছ?"
সিতেশের জিজ্ঞাসায় ছেদ পড়ল ভাবনায়।
"মিনিট তিরিশ।"

" চলো প্রিন্সিপ্যালের চেম্বারে যাওয়া যাক।"
এই প্রথম সিতেশের পেছন পেছন হাঁটতে লাগল সিতনুকা।

রিনা রায় এই স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল। ছোটদের সঙ্গে বেশ বন্ধুর মতো মিশে যান কিন্তু অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসাবে বেশ কড়া ধাতের। মাথার চুলগুলো সব সাদা হয়ে গেছে। রং-এর গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসিয়ে দেন নি চুলগুলোকে। চুলটা বব করে সাজানো। মাথার ভেতর ও বাইর দু'টো দিকই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে প্রবল ভাবে মানান সই। মহিলা বেশ শৌখিন। চেম্বারটা সুন্দর করে সাজানো। চেম্বারের কোথাও ফাইল-পত্তর এলোমেলো ভাবে পড়ে নেই। দরজা ঠেলে ঢুকলেই দাঁড়ানো রবীন্দ্রনাথ। দেওয়াল জুড়ে নানান মনীষীর ছবি। বাঁ দিকের আলমারিতে ছোটদের খেলনা। তারই পাশে টুলের উপর রাখা আছে চকলেট ভর্তি কাঁচের বয়াম।
রিনা রায়ের উল্টো দিকের চেয়ারে বসেছে সিতেশ ও সুতনুকা। পাশের চেয়ারে গাড়ির হেল্পার। সিতেশরা সবে মাত্র চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়েছে। সামনে রাখা খাতা থেকে মুখ তুলে রিনা ম্যাডাম প্রশ্নটা সরাসরি ছুঁড়ে দিলেন সিতেশের দিকে-
-- বলুন কি জেনেছেন?
-- কি ব্যাপারে ম্যাডাম?
-- ঐ যে বিথিকার..
রিনা ম্যাডামের মুখের কথাটা কেড়ে নিয়ে সুতনুকা বলল-
-- ও তো খুব চাপা ম্যাডাম সহজে বলতে চায় না। অনেক চাপাচাপিতে বলল- ছুটির পর ও বাথরুমে গিয়েছিল ফিরে এসে দেখে গাড়িটা নেই।
-- মিথ্যা কথা বলেছে আপনার মেয়ে।
কথাকটা কেটে কেটে বলল রিনা ম্যাডাম।
তারপর ঘাড়টা সামান্য কাত করে পালান বাবুকে বললেন --
-- বলুন তো কি হয়েছিল কালকে।
পালান বাবুর বেশ বয়স হয়েছে। নিজে ভালমতোই জানেন দোষ তার নয় তবুও দু'কথা শোনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছেন। গলায় জড়িয়ে থাকা কফ নিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় শুরু করলেন পালান বাবু--

-- ম্যাডাম গত কাল ছেলে-মেয়েরা যখন গাড়িতে ওঠে তখন ঐ মেয়েটিকে গাড়িতে দেখেছি তারপর...-- তারপর--- তারপর আসলে আ... আ...--- আ... আ... না করে বাকিটা বলুন।কথাগুলো বেশ ভারি করে বললেন রিনা ম্যাডাম।-- গত কাল আমি গাড়ির সামনের গ্লাসটা মুছতে ভুলে গিয়েছিলাম ম্যাডাম, তাই ড্রাইভার আমার উপর চড়াও হয়। আমাকে ধাক্কা মেরে নামিয়ে দেয় গাড়ি থেকে। আমি গ্লাসটা পরিস্কার করার সময় খেয়াল করিনি কখন মেয়েটি নেমে গেছে। -- আগে থেকে কাজগুলো সেরে রাখেন নি কেন? তাছাড়া একটি মেয়ে কখন নেমে গেল তার খেয়াল থাকবে না। যদি আমাদের নজরে না আসত। যদি দরজা লাগিয়ে চলে যেত সবাই। তখন কি হত! মিডিয়া ছিঁড়ে খেত। এমনিতেই স্কুলের উপর গর্ভনম্যান্টের চাপ বাড়ছে। কি যে সব করেন আপনারা! ঠিক আছে আপনি এখন আসুন।পালান বাবু চলে যাওয়ার পর রিনা ম্যাডাম চশমাটাকে আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন---- এরপর আমরা দিদিমনিরা যখন স্কুল ছাড়ছি দেখি বিথিকা

সিঁড়ির কোনে দাঁড়িয়ে। ভয়ে ও থরথর করে কাঁপছিল, কাঁদছিল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।-- বিশ্বাস করুন ম্যাডাম বিথি আমাদের এতো সব কিছু বলে নি।-- দেখুন মিস্টার সেন আপনারা বোধহয় বিষয়টার গভীরে যেতে পারছেন না। বেশ কয়েক মাস ধরে ও কেমন যেন মনমরা। রিসেসে বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে মেলামেশা করে না। বাগানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। বুড়ো মালির সঙ্গে কথা বলে। বেশ কিছুদিন ওয়াচ করার পর মালির কাছে জানতে চেয়েছিলাম ওর সঙ্গে কি কথা বলে বিথিকা।
মালি বলেছিল 
" সে কত কথা ম্যাডাম, জানতে চায় গাছ-পালার নাম, আমার বাড়িতে আর কে কে আছে, আমি কেন গাছ লাগাই, কি লাভ গাছ লাগিয়ে, আমি বলি সে তুমি বুঝবে না। কত পাখি এসে বাসা বাঁধে, কত রকমের ফুল-ফল ধরে। তা শুনে মেয়েটি বলেছিল তুমি পরের জন্য এসব করো তাহলে, তুমি বড্ড বোকা লোক।"
দেখুন মিস্টার সেন আপনারা ওর বাবা-মা, আপনারা আরো ভালো বুঝবেন। আমি বলতে চাইছি যে বয়সটা হাসি-খুশির বয়স সেই বয়সে এতো বিষন্নতা এতোটা ফ্রাসট্রেশন আমার কিন্তু ভাল লাগছে না।
একটা ভালো কোথাও গিয়ে কাউনসিলিং করান। এভাবে চলতে থাকলে পুরো বিষয়টা কিন্তু একসময় হাতের বাইরে চলে যাবে।
কিছু মনে করবেন না প্লিজ। অনেক দিন ছেলেপুলে নিয়ে আছি তো, তাই কেমন যেন ভয় হয়। এখন তাহলে আসুন আপনারা। আর চাইলে কিন্তু আপনারা ওর সঙ্গে দেখা করে যেতে পারেন। বাগানের আসেপাশে কোথাও থাকবে।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানাল সিতেশরা। প্রতিনমস্কার জানালেন রিনা ম্যাডামও।
স্কুলের বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেওয়াল জুড়ে রবি ঠাকুরের একটা লেখার কাছে থমকে দাঁড়াল সিতেশ...
" শিশু প্রকৃতির সৃজন। কিন্তু বয়স্ক মানুষ বহুলপরিমাণে মানুষের নিজকৃত রচনা।"
লেখাটা পড়তে পড়তে তার চোখ দু'টো ভারি হয়ে এল।

রাস্তাঘাটের যা অবস্থা তাই হাতে অনেকটা সময় নিয়ে বেরিয়েছে সিতেশরা। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বিথির জন্য ডাঃ সেনগুপ্তের একটা অ্যাপয়েন্টম্যান্ট পেয়েছে সিতেশ।একটা ফিটার না নিয়ে ছাড়বে না গাড়িটা। তাই বসে বসে ঘামে ভেজা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
থ্রি-টু সিট হওয়ায় বাসটাতে দাঁড়ানোর জায়গাটা কম। সিতেশরা একটা থ্রি-সিটে বসেছে, বিথি মা-বাবার মাঝে। ফিটারটা ঢোকা মাত্র ভরে গেল বাসটা। একটা যুবক একজন বৃদ্ধকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে দখল নিল ফাঁকা সিটের। ধাক্কাটাকে কোনো প্রকারে সামলে নিলেও হাতের লাঠি পড়ে গেল বৃদ্ধের। তিনি লাঠিটা তুলে নিয়ে, যুবকের সামনে মুখটা ঝুলিয়ে বললেন--
" তুমি কি করলে তুমি তা জান না। যেদিন আমার মতো বয়স হবে তোমার আর তোমার সঙ্গে এমনটাই ঘটবে, সেদিন বুঝবে আজকে কি করলে।"
সিতেশদের সামনেই ঘটনাটা এতো দ্রুত ঘটে গেল যে সিতেশের কি করা উচিত তা সে বুঝে উঠতে পারল না। বিথি কিন্তু পুরো ঘটনা ওয়াচ করেছে। বড় অস্থির লাগছে তার। গা গোলাচ্ছে। উত্তেজনায় বমি করে ফেলল বিথি।

ডাঃ সেনগুপ্তের চেম্বার যেন আস্ত একটা পাগলা গারদ। একবার এখানে এলে জীবন সম্পর্কে ধারণাই পাল্টে যেতে বাধ্য। ষন্ডা মার্কা দু'টো লোক গেটের কাছে বসে। কোনো মানসিকরুগি ডাক্তার বাবুর কাছে না এসে পালিয়ে যেতে চাইলে এরা জোরজবরদস্তি ধরে আনে বোধহয়। মানসিক ডাক্তাররা যে পাগলদের চিকিৎসা করে সেটা বোঝার মতো বয়স এখনো বিথির হয় নি, আর সেটাই বাঁচোয়া।
ডাক পড়তে তিনজন ঢুকে পড়ল চেম্বারে। ডাক্তার বাবু মন দিয়ে সমস্ত ঘটনা শুনলেন। বিথিকে খেলনা দেখাবেন বলে নিয়ে গেলেন পাশের রুমে। ডাক্তার বাবু মিথ্যা বলেন নি,
সত্যি সত্যি পাশের ঘরে নানা রকমের খেলনা দেখে বেশ আনন্দ পেল বিথি। ডাক্তার সেনগুপ্ত বিথির সঙ্গে শিশুর মতো মেতে উঠলেন খেলায়। ডাক্তার বাবুর সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গেল বিথির। খেলার ছলে কথা শুরু করলেন ডাক্তার সেনগুপ্ত--
-- আচ্ছা বিথি তোমার কতগুলো খেলনা আছে?
-- আমার? আমার... অনেক... অনেকগুলো।
--- দেবে আমায় একটা?
--- সে তুমি নিতেই পারো কিন্তু তোমারও তো অনেক আছে!
--- তা আছে। আচ্ছা খেলনা গুলো কে দিলো তোমায়?
-- বাবা,মা,দাদুও দিয়েছে।
-- কে তোমায় সবচেয়ে বেশি ভালবাসে?
-- সব্বাই। তুমিও।
-- সে তো বাসে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কে?
-- সবচেয়ে বেশি... এ্যা.. সবচেয়ে বেশি.. দাদু।
-- তবে দাদু এলো না কেন?
-- বারে দাদু আসবে কেমন করে! সে তো আমাদের সঙ্গে থাকেই না।
-- কেন থাকে না?
-- থাকবে কেমন করে! মা যে সব সময় ঝগড়া করে।
ডাক্তার সেনগুপ্ত লক্ষ্য করলেন দাদু-ঝগড়াঝাঁটি এসব প্রসঙ্গ আসতেই বিথি কেমন যেন বদলে গেল। বেশ ঘাম দিচ্ছে তাকে। ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে সে। অসুখটা যে কোথায় তা বুঝতে বাকি রইল না ডাঃ সেনগুপ্তের। যেহেতু সে দাদুকে খুব পচ্ছন্দ করে তাই দাদুর সঙ্গে মায়ের ঝগড়ার প্যানিকটা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সেকারণে ঝগড়াঝাঁটি দেখলেই ভয় পেয়ে যায় সে। পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্য ডাঃ সেনগুপ্ত আরো একটা নতুন খেলনা দিলেন বিথির হাতে। বললেন তুমি একটু খেল আমি এক্ষুনি ফিরে আসছি।
ডাক্তার বাবু চেম্বারে ফিরে পরিস্থিতিটা বোঝালেন বিথির মা-বাবাকে। কাগজে কতকগুলো ঔষধ-পত্তর লিখে দিয়ে বললেন
" ব্যাপারটা বুঝি পুরানো ভাবধারার সঙ্গে সংঘাত,ছেলে-মেয়ের স্কুলিং, ফাস্ট লাইফ, নগরজীবনের সুখ-সুবিধা এসবের জন্য পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। ঔষধ-পত্তর লিখে দিলাম। দেখুন কতটা কি হয়। তবে সবচেয়ে ভাল হয় ও যা চায়... বুঝতে পারছি সমস্যা আছে। তবে আর একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। সেন্ট পার্সেন্ট গ্যারেন্টি দিলাম অসুখটা সারবেই।

একটু আগে সুতনুকা রাতের ঔষধটা দিয়ে গেছে বিথিকে। কিন্তু জল দিতে ভুলে গেছে সে। ঔষধটা খাওয়ার জন্য জল নিতে গিয়ে দরজায় থমকে গেল বিথি। পাশের ঘরে বাবা মাকে বোঝাচ্ছে--
--শুনলে তো ডাক্তার বাবুর কথা। চল আমরা ফিরে যাই।
-- মেয়ের লেখাপড়ার কথাটা একবারও ভাববে না!
-- কিছুদিন পরে তো লেখাপড়ার পরিস্থিতিই থাকবে না।
-- সময় সবসময় এক রকম যায় না সিতেশ। হয়তো পরে পরে ও ঠিক হয়ে গেল, তাছাড়া ঔষধগুলো নিয়মিত খেলে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
সিতেশ আর কথা বাড়াতে চাইল না। কারন এর পর কথা চালালে সেটা আর আলাপ আলোচনার মধ্যে থাকবে না। আর এই ঝগড়াঝাঁটিটাই মানসিক ভাবে বড় বেশি চাপে ফেলে দিচ্ছে বিথিকে।
মা-বাবার কথাগুলো শোনার পর জল না নিয়েই দরজা থেকে ফিরে এল বিথি। বাড়ির পিছনের জানালা দিয়ে অন্ধকারে ফেলে দিল ঔষধটা। 
অসুখটা থাকলে তবেই তো সে ফিরে পাবে দাদু-ঠাকুরমাকে।

 দুটি গল্পঃ 

আলোর পথযাত্রী ও বড় হ বুঝবি

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ

 

....বড় হয়ে আমি বাবার মতো মাস্টার হতে পারি নি, একটা অফিসে হিসাবের কাজ করি। কিশলয় কিন্তু জেঠুর মতোই কলেজে ইকনমিকস পড়ায়। বাবা জেঠু দুজনেই নেই। আমার আর কিশলয়ের শৈশবের সেই সখ্যতা আজও আছে। আড্ডাও হয় মাঝে মাঝে।

একবার কিশলয়ের বাড়ি গিয়েছি।

কিশলয় কলেজ থেকে ফিরে ল্যাপটপে শেয়ার ট্রেডিং করছে। কিশলয়ের বউ ফ্রিজ খুলে প্লেট ভর্তি মিষ্টি দিয়ে গেল।...

আলোর পথ যাত্রী

  আকাশে আলোর বিন্দুটুকুও নেই। কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। গাছের পাতা তো দুরঅস্ত, শরীরের রোম গুলো নড়ে চড়ে তেমন বাতাস টুকুও নেই। চারপাশ থমথমে। হয়তো শেষবারের মতো শক্তি সঞ্চয়। হয়তো কিছু সময় পর প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়বে সে। এবারে মান রেখেছে কালবৈশাখী। এখনো বার আট দশেক দেখা মিলেছে তার।দ্রুত পা না চালালে এ যাত্রায় সমূহ বিপদ। বাসটাতে যখন উঠলাম বাসটা পুরো ফাঁকা, যথারীতি জানালা লাগোয়া একটা সিটও পেয়ে গেলাম। এখন মনে মনে এটাই চাওয়া যেন বসন্ত বিলাপের চিন্ময় রায় সাইজের একটি সহযাত্রী পাশে এসে বসে। আমার আশি ছুঁই ছুঁই ওজনের সঙ্গে সংগতি রেখে সেটিই হবে আদর্শ সহযাত্রী সমন্বয়।
  সারা রাজ্য জুড়ে যজ্ঞ ছিল আজ। বেকারত্বমেধ যজ্ঞ। লক্ষহীন চব্বিশ লক্ষ বেকার তারাই যজ্ঞের হব্য। অজানা পরীক্ষাকেন্দ্র তাদের গন্তব্য, চাকুরীপ্রার্থী ও সঙ্গে লোক লস্কর সব মিলিয়ে পঞ্চাশ লক্ষ লোকের একশ কোটি পা, পাল তোলা জাহাজ হয়ে নেমেছে পথে। 
মনে হয় একটা লোকাল একটু আগে প্লাটফর্মে উগরে দিয়েছে কয়েক শ যাত্রী। তারাই কাঁকড়ার মতো ছড়িয়ে পড়ছে দিগ্বিদিকে। কাঁকড়ার মতো একে অপরকে টেনে ধরে একজন অন্যজনের বাসরোহনকে করছে বিপর্যস্ত।
বাড়ি এমন এক গন্তব্য, ব্যর্থ-সফল সকলেই দিনশেষে ফিরতে চায় সেখানে। 

  একটি রোগা পাতলা সুন্দরী বাসের সামনের দরজা ভেঙে উঠল। তার চোখ জোড়া একটা যুতসই জায়গা খুঁজছে যাতে পথ-স্বস্তি মেলে। আমি তাকিয়ে আছি তার কৃপা প্রত্যাশায়। পাশে বসলে রোগা হওয়ায় গুঁতোগুঁতি কম হয় সর্বোপরি সহযাত্রী মহিলা হলে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত স্পর্শ সুখে পথ-শ্রম বিস্মৃত হওয়া সুযোগ থাকে। মহিলাটি তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। একজন পুরুষ যত সহজে এইসব পরিস্থিতি সামলে নিতে পারেন, একজন মহিলা পারেন না। একটা ব্যাগ উড়ে এসে পড়ল আমার পাশের জায়গাটিতে। পেছন ফিরে দেখি আমার থেকে কিঞ্চিত বেশি ওজনের একটি লোক ব্যাগটি ছুঁড়ে আমার পাশের জায়গাটিতে তার দখল নিশ্চিত করে ফেলেছে।
একটু একটু করে ভরে গেল বাসটা।
বাসে আর লোক নেওয়ার মতো স্থান নেই তবুও নির্ধারিত সময়ের জন্য অপেক্ষা। এখনো মিনিট দশেক পর বাসটা ছাড়বে।
কনডাক্টর বাসের ভিতর যাত্রী সাজাচ্ছে যত্ন করে। আগুপিছু করে, বাম ডান ফিরিয়ে, লোক ঢোকাচ্ছে, যেন এতটুকুও ফাঁক না রয়ে যায়। ভিড়ের মধ্যে এক রসিক যাত্রী বলে উঠল "যে ভাবে লোক নিচ্ছেন এবার তো দুজনের ফাঁকে বরফ দিতে হয়। না হলে তো পচে গন্ধ বেরোবে।"
এধরন কথাগুলো এমন কষ্টকর সময়গুলোতে চিত্তের প্রশান্তি সাধন করে। ঘড়ি ঘুরতে চাইছে না। আমার সামনের সিটে জানলা লাগোয়া যে ছেলেটি বসে তার এক মাথা সোনালী চুল। মাথার উপর বাসের বাতিটার অনুজ্জ্বল আলোয় চকচক করছে চুলগুলো। বাম হাতে একটা রবার ব্যান্ড, ডান হাতে ঝুলে রয়েছে ছোট ছোট রুদ্রাক্ষের মালা। বাসে উঠা থেকে দেখছি ছেলেটি হাতে কুলিয়ে উঠছে না এত্তো বড় একটা মোবাইল নিয়ে সমানে ঘষা

মাজা করছে। বারবার আড় চোখে দেখছে মেয়েটিকে। চশমার পাওয়ার এতোটাই বেশি যেন মনে হয় চোখ দুটো বেরিয়ে আসতে চাইছে ছিটকে। ছেলেটির পাশে হেলিপ্যাডের মতো মস্ত টাক নিয়ে মধ্য চল্লিশের এক অফিস যাত্রী। এ পথে প্রায় প্রতিদিন দেখা মেলে তার। মিনিট কুড়ির নিশ্চিন্ত ঘুম সেরে পাঁচ নম্বর স্টপেজ তার অবতরণ। ছিপছিপে সেই সুন্দরী আপাতত তীর্থের কাক হয়ে ঐ সিটটির প্রত্যাশায় দাঁড়িয়ে। কমলা রঙের গেঞ্জি তার শরীরে লেপটে বসেছে। কাঁধ থেকে বারবার নেমে আসছে ব্যাগ। সেই ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে দুধসাদা অন্তর্বাস, জিনসের প্যান্টটা হাঁটুর কাছে ছেঁড়া। আগে বুঝতাম না এখন বুঝি ওটা ফ্যাশন। কয়েক জোড়া চোখ ঘুরঘুর করছে মেয়েটার কাঁধে। মেয়েটিও তার জায়গায় দাঁড়িয়ে মোবাইলে নিমগ্ন। এই মোবাইলে বাঙালীর মেনিয়া এখন অনেকটা পেচ্ছাবের মতো হয়েছে। একজন খুললেই অন্যজন খুলে বসে, এ যেন অনেকটা প্রদর্শন প্রভাব। যারা মোবাইলে নেই কেবল তাদেরই পোড়াচ্ছে এই অস্বস্তিকর গরম। মাথা থেকে গড়িয়ে পড়া ঘাম শিরদাঁড়ার নালা পথ বেয়ে, শরীরের অস্থান কুস্থান পেরিয়ে মিশছে পায়ে। যেন ওটাই মোহনা। কষ্ট মানে যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলা, এ যে কত বড় সত্য তা যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের থেকে আর কেউ বেশি বুঝবে না। বারবার ওরাই উগরে দিচ্ছে বিরক্তি। যারা মোবাইলে রয়েছেন তারা এ জগতে নেই ফলে এই প্যাচপ্যাচে গরম তাদের কাছে কোন অস্বস্তির কারণই নয়। মেয়েটির কপাল গড়িয়ে এক ফোঁটা ঘাম নেমে আসছে নাকে এই বুঝি ভিজিয়ে দিল মোবাইলের স্কীন। ডান হাতের মুঠোয় রাখা রুমালে মেয়েটি কাপলটা মুছল, সেই কারণে হাত বদল হল মোবাইল। ঘামের ফোঁটা সোজা গিয়ে পড়ল হেলিপ্যাডে। হঠাৎ করে টাকে এক বিন্দু জল পড়লে মনে হয় কে যেন পেরেক ঠুকল। শিউরে উঠল লোকটি। জলের উৎস সন্ধানে ঘুমঘুম চোখে তাকাল উপরের দিকে। কিন্তু উৎস সন্ধানে ব্যর্থ হয়ে আবার চোখ বুজল।ততক্ষণে বাস ছাড়ার সময় হয়েছে। বছর আশির এক বুড়ো কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়েছে বাসের পা দানিতে। হেলপার লোকটাকে ঠেলেঠুলে চালান করে দিল ভেতরে। বাসের অস্পষ্ট আলোয় দেখি বুড়োটা একেবারে সুবোধ কাকুর মতো দেখতে।সুবোধ কাকু আমাদের পাড়ায় থাকত। নিজে বেশি লেখাপড়া না জানলেও একমাত্র ছেলেকে পড়িয়েছিল ইংরাজী অনার্স। অনেক জমি জমা ছিল কাকুর। সে সব সরকার নিয়ে নিল কারখানা হবে বলে। অনেক টাকা পেয়েছিল কাকু,সে টাকা হাতিয়ে নিল একমাত্র ছেলে। দুবেলা খেতে দিত না ছেলে। সেবার পরপর তিন দিন সুবোধ কাকুর খাওয়ার জোটে নি। সন্ধ্যে বেলা দাওয়ায় বসে ছিল কাকু। হঠাৎ অন্ধকারে কাকে যেন সিঁড়ি বেয়ে উপরের ঘরে উঠে যেতে দেখল। তার হাতে দুলছিল একটা প্যাকেট। তার চলে যাওয়ার পরও বাতাসে পাক খেতে লাগল মাংসের সুঘ্রাণ। চুপিচুপি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল সুবোধ কাকু।শরীরের সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে ধাক্কা মারল দরজায়। ঘরের মধ্যে ছেলে বসেছে মদ আর মাংস নিয়ে। লাথি মেরে ফেলে দিল সবকিছু।একটা ভোঁতা ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলের উপর। ছেলে থানা পুলিশ করতে পারে নি লজ্জায়। তবে তার পর থেকে এলাকায় আর দেখা যায় নি সুবোধ কাকু কে। ভাল করে না দেখলে যে কেউ লোকটাকে সুবোধ কাকু মনে করে ভুল করবে।বুড়ো কে দাঁড়াতে দেখে সামনের সিটের ছেলেটি তার সিটটা ছেড়ে দিতে চাইল। বুড়ো বলল-" না না বাবা তুমি পরীক্ষা দিয়ে ফিরছ। সারা দিন কতো ধকল গেলো, তুমি বসো বাবা। আমি এটুকু দাঁড়াতে পারব।"ছেলেটি একপ্রকার জোর করে বসিয়ে দিলো বয়স্ক মানুষটাকে নিজের সিটে। নিজে দাঁড়াল ভিড়ে মিশে গিয়ে।বাসটার অনুজ্জ্বল আলোতেও এত বেশি চকচক করছিল তার মুখ খানি যে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করা যাচ্ছিল তাকে। বাসটা গতি বাড়িয়ে এগোচ্ছিল সামনের দিকে। জানালা গলে আসা ঠান্ডা বাতাস ধুয়ে দিচ্ছিল পথ-শ্রম।

বড় হ' বুঝবি 

  রমের ছুটিতে তেমন করে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়ে উঠল না। বাইরে সূর্যের দাপট প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। রবিবারের আড্ডায় হাজির হওয়া বেশ কঠিন এটা বুঝে সময় কাটানোর জন্য বিছানায় এলোমেলো কতক গুলো বই-পত্তর নিয়ে বসলাম। সব গুলোই কম বেশি একাধিক বার পড়া। তাই একাধিক নিয়ে বসা, কোনটা মনোযোগকে প্রভাবিত করতে পারবে তার আগাম খবর নেই যে।

একটু আগে গিন্নি বিছানাটা গোছগাছ করে দিয়ে গেছে।

তার মধ্যে বিছানার এই হাল দেখা মাত্র বাইরের তাপ ছড়িয়ে গেল গোটা ঘরে।

খসে যাওয়া আঁচলটাকে কোমরে গুঁজতে গুঁজতে গিন্নি বলে উঠল--

--- তোমাকে শোধরানো গেলো না!

বই-এর পাতায় মুখ ডুবিয়ে গিন্নিকে বললাম---

---- সে কম্ম তোমার নয়, তুমি ডাল সাঁতলাও গিয়ে।

হলুদ মাখা হাতে গিন্নিকে টেবিলে ছড়ানো বই গুলোর দিকে

আগুয়ান হতে দেখে, জোড়হাত করে বললাম ---

--- দেখ বাপু তোমার যেমন ঠাকুর দেবতা আছে, ঐ পুথি-পত্তর গুলোই আমার ঠাকুর দেবতা। দোহাই তোমাকে, আমিষ হাতে আমার দেবতার দেবত্ব নষ্ট করে দিও না।

আমি জানি এই ব্রহ্মাস্ত্রে গিন্নি কুপোকাত হবেই। ঠাকুর দেবতা নিয়ে কথা উঠলে গিন্নি রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য। হলও তাই গিন্নি গজগজ করতে করতে হেঁশেলের পথ ধরল।

আমি আমার খসে যাওয়া মনোযোগ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করলাম।

মাথার উপর পাখাটা যে ঘুরছে তা তার বাতাসে নয়, শব্দে বুঝে নিতে হয়। গরমের সময় সব পরিবারের ইলেকট্রিক কনজামশান চরচর করে বেড়ে যায়, তার ফলে ভোল্টেজের ভন্ডুল দশা।

এই বয়সে ছেঁদা দিয়ে একবার মনোযোগ হড়কে গেলে তার পুনরুদ্ধার বড় কঠিন। তাই শেষ পর্যন্ত এই সাব্যস্ত হল বই পড়ায় বিরাম চিহ্ন দিয়ে রবিবাসরীয় সকালটা পুথি-পত্তর গোছগাছে বরাদ্দ হোক।

আলমারি ভর্তি বই। কোনো নিদিষ্ট নিয়মে সাজানো নেই। যখন যেমন পড়েছি সে ভাবেই তুলে রেখেছি তাকে। কোথাও আবার ডাই করে রাখা। অগোছালো বই-পত্তর গুলোর দিকে তাকিয়ে আছি আর দৃষ্টি সরে গেছে সেই কোন শৈশবে।

হাঁটছি বাবার হাত ধরে। পথে যেতে যেতে বাবা গাছ চেনাচ্ছেন,পাখি চেনাচ্ছেন, চেনাচ্ছেন ফুল। বাবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমি ছোটো ছোটো পায়ে গঙ্গা ফড়িং এর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছি।

বাবা মাঝেমধ্যে অশেষ জেঠুর বাড়ি যেতেন। অশেষ জেঠু বাবার খুব বন্ধু, যেমন অশেষ জেঠুর ছেলে কিশলয় আমার। অশেষ জেঠু, লম্বা, ফর্সা,মাথা ভর্তি জট পাকানো চুল, চোখে মোটা কাচের চশমা, কলেজে ইকনমিকস্ পড়াতেন। নানা বিষয়ে তার পাণ্ডিত্য। বাবা যেতেন জেটুর সঙ্গে আড্ডা দিতে।

তবে সে আড্ডাকে আমার চা দোকানের আড্ডা বলা চলে না।

বাবা বেরোলেই আমি ছুট্টে এসে ধরে নিতাম বাবার আঙুল।

আমিও যে আড্ডা দিতাম কিশলয়ের সঙ্গে।

কিশলয়ের খেলনা দেখতাম, সেই যে দম দেওয়া পুতুল। পুতুলের পেছনের দিকে চাবি ঘুরিয়ে দম দিলে খত্তাল বাজাত ঝাই-চিকি- চাই, ঝাই-চিকি-চাই। কিশলয়ের অনেক বই ছিল, চাঁদমামা, আবোলতাবোল,পঞ্চতন্ত্র। আমি কিশলয়ের 'ঠাকুমার ঝুলি'- তে হাত বোলাতাম। 'ছোটোদের মহাভারত'- এর পৃষ্ঠা উল্টে ছবি দেখতাম।

জেঠুদের বাড়িটা ছিমছাম। খুব সুন্দর করে সাজানো-গোছানো,ছবির মতন।

জেঠিমা নকশা করা কাচের প্লেটে করে নারকোল নাড়ু দিতেন।

এলাচের গন্ধ থাকত সেই নারকোল নাড়ুতে।

এক সময় আড্ডা দিতে বিরক্তি আসত। মন কেমন করত বাড়ি ফেরার জন্য।

গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যেতাম বাবা আর জেঠুর আড্ডার দিকে। জেঠুর বসার ঘরে তখন কুয়াশার মতো সিগারেটের ধোঁয়া। আমাকে দেখা মাত্র বাবা আর জেঠু সিগারেট গেঁথে দিত এ্যাসট্রেতে।

জেঠুর ঘরে আলমারি ভর্তি অগোছালো বই, ছড়ানো ছিটানো খবরের কাগজ, টেবিলের উপর খোলা বইটার পাতা গুলো যেন প্রজাপতির ডানা ঝটপট।

একদিন ফেরার সময় বাবাকে বলেছিলাম---

---- জেঠুটা বড্ড নোংরা, বই-পত্তরগুলো কেমন এলোমেলো করে রাখা! একটু সাজিয়ে রাখা যায় না?

বাবা আঙুল দিয়ে আমার মাথার চুল গুলো ঘেঁটে দিয়ে বলেছিল---

--- বড়'হ, বুঝবি।

বড় হয়ে আমি বাবার মতো মাস্টার হতে পারি নি, একটা অফিসে হিসাবের কাজ করি। কিশলয় কিন্তু জেঠুর মতোই কলেজে ইকনমিকস পড়ায়। বাবা জেঠু দুজনেই নেই। আমার আর কিশলয়ের শৈশবের সেই সখ্যতা আজও আছে। আড্ডাও হয় মাঝে মাঝে।

একবার কিশলয়ের বাড়ি গিয়েছি।

কিশলয় কলেজ থেকে ফিরে ল্যাপটপে শেয়ার ট্রেডিং করছে। কিশলয়ের বউ ফ্রিজ খুলে প্লেট ভর্তি মিষ্টি দিয়ে গেল।

সেদিন অনেক সময় ধরে আড্ডা হল, গল্প হল, সংসারের টুকিটাকি কথাও হল।

ওঠার সময় একবার মনে হল জেঠুর বসার ঘরটা ঘুরে যাই।

একটা চেয়ারে সাদা তোয়ালের উপর রাখা জেঠুর ছবিটা আগের মতোই বুদ্ধিদীপ্ত। শুকনো মালার ফুল গুলো গেছে ঝরে।

আলমারি ভর্তি নানান বই, ছবির মতো সুন্দর করে সাজানো।

কত দিন বইগুলোতে কেউ হাত দেয় নি, কত কাল কেউ ছুঁয়ে দেখেনি বইগুলোকে।

আচমকা কেউ যেন মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দিল। স্পষ্ট শুনতে পেলাম--

" বড়'হ বুঝবি।"

হাতে ধরা বইটা ধপ করে পড়ল টেবিলের উপর।

গিন্নি আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল---

--- ঢের হয়েছে, আর গুছিয়ে লাভ নেই, স্নানে যাও। দু'দিন পরই তো আবার টেনে বার করবে সব।

 

 আঁশ

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ

 

....বড় হয়ে আমি বাবার মতো মাস্টার হতে পারি নি, একটা অফিসে হিসাবের কাজ করি। কিশলয় কিন্তু জেঠুর মতোই কলেজে ইকনমিকস পড়ায়। বাবা জেঠু দুজনেই নেই। আমার আর কিশলয়ের শৈশবের সেই সখ্যতা আজও আছে। আড্ডাও হয় মাঝে মাঝে।

একবার কিশলয়ের বাড়ি গিয়েছি।

কিশলয় কলেজ থেকে ফিরে ল্যাপটপে শেয়ার ট্রেডিং করছে। কিশলয়ের বউ ফ্রিজ খুলে প্লেট ভর্তি মিষ্টি দিয়ে গেল।...

   দই আর আম আনতে না আনতে পাত খালি। সুলতা খাওয়ার টেবিলে টক দই আর দু-ফালি হিমসাগর নামিয়ে উগরে দিল বিরক্তিটা। " পার বটে, মাছটাও খেলে বিড়ালের মতো। কাঁটা-টাঁটা বেছে খেলে তো? কত সময় নিয়ে, যত্ন করে রান্না-বান্না করি। খাওয়াটা অন্তত ধীরে হোক! এটা কি কোন কম্পিটিশন" সুলতার মুখের কথা টেনে নিয়ে বললাম- " আজকের সমাজে প্রতিটি সেকেন্ডই তো কম্পিটিশন সুলু। তাছাড়া দ্রুত খাওয়ার কম্পিটিশন হলে, সে প্রতিযোগিতায় তোমার বরের পুরস্কারটা বাঁধা ছিলো বুঝলে।"
   কিছু দিন আগে পর্যন্ত আম খাওয়ার জন্য আন্দোলন করতে হতো, এতোটাই বেশি সুগার ছিলো। তার উপর কোলোস্টরেল। কোলোস্টরেলের আবার গুড, ব্যাড আছে।আমার গুডটা ব্যাড,মানে পরিমানে কম, আর ব্যাডটা গুড। বছর দুই সুলতা পাক্কা ডায়েটেশিয়ানের মতো চোখে চোখে রেখে, সামলে দিয়েছে অনেকটা। হিমসাগরে দাঁত ডুবিয়ে বললাম- " জানো সুলু,কোনো কোনো নিমন্ত্রন বাড়িতে আমার উল্টো দিকের খাওয়ার টেবিলের লোকজন খায় যতটা সময় তার থেকে বেশি সময় আমার খাওয়ায় তাকিয়ে থাকে। এতো তাড়াতাড়ি পাত খালি হয়! জানি না অন্য সব চাকুরেদের সঙ্গে এমনটা হয় কিনা! লোকজন ভাবে শালা কত দিন যেন খায় নি! তুমি তো জানো, স্কুল বেরানোর আগে হাতে এতো কম সময় থাকে,আর তার ফলেই এ রাক্ষুসে অভ্যাস তৈরী হয়ে গেছে।"

হিমসাগরে আমার বরাবরের লোভ। সেটা সুলতার অজানা নয়। তাই শেষ হওয়ার আগে আরো এক টুকরো বাড়তি আম দিয়ে গেলো সুলতা। এটা ঠিক বাড়তি নয়। বরাদ্দের। একসঙ্গে তিনটি দিলে পরে আবার একটি দিতে হত। তাই আগে থেকে বরাদ্দের একটি কায়দা করে সরিয়ে রাখা। সত্যি নিয়মিত হাঁটাহাঁটি,হাল্কা শরীর চর্চা,একটু ঘাম ঝরনো আর সুলতার লীস্ট অনুযায়ী সংযমী খাদ্যাভ্যাসে চরচর করে নেমেছে সুগার লেভেল,মধ্য-প্রদেশ কমানোর ক্ষেত্রে বেল্টে দু-গাঁট উন্নতি হয়েছে। জামাটা প্যান্টের উপর ফেলে পড়ি তাই বাঁচোয়া নাহলে সব প্যান্ট বাতিল হয়ে যেত। তাড়াহুড়ো করে স্কুল বেরাচ্ছি, সুলতা মৌরীর কৌটা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে। বেল্টটাকে কষে বাঁধছি, কোমরে টান লাগছে।

ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘুমের মধ্যে লুঙ্গি আলগা হয়ে বুক অবধি উঠে এসে ছিল। সুলতা লুঙ্গিটা কষে বাঁধছে, আমার উপর ঝুঁকে। সকাল সকাল স্নান সেরে নিয়েছে সুলতা,তার ভেজা চুল নেমে এসেছে আমার মুখে, চোখে-মুখে সদ্য স্নানের সতেজতা, শরীরে লেপ্টে রয়েছে সাবানের সুগন্ধ, অর্ন্তবাস ছাড়া তরল বুক দুটোর দোলুনী আমার নেতিয়ে পড়া মধ্য বয়সী পৌরুষকে প্রকটিত করতে চাইছে। দুহাতের দুষ্টু আদরে বুকের উপর টেনে নিলাম সুলতাকে।

প্রশ্রয় কন্ঠে সুলতা বলল-
" এ্যাই কি হচ্ছে কি! ছাড়ো,ছাড়ো বলছি। এ্যাই এ.. এ. এ্যাই দুষ্টুমি করো না, লক্ষ্মীটি, কটা বাজে দেখো, এক্ষুনি কাজের মেয়েটা ঘর মুছতে এসে পড়বে।"
অগত্যা কি আর করা যায়। যদিও আজ রবিবার,সাতটা বাজে। আমাকে বাজার বেরাতে হবে। আজকাল অনেক রাত পর্যন্ত এর ওর দেওয়াল ধরে হাঁটা হাঁটি তে ঘুমাতে দেরি হয়ে যায়। তার ফলে সুলতার দিন শুরুর পাক্কা ঘন্টা খানেক পর আমার সকাল আসে। ঠিক আসে না সুলতাই জোর জবস্তি আনে।
বিছানা ছেড়ে নামার আগে আমার স্ফীত মধ্য-প্রদেশেটা হাত দিয়ে দুলিয়ে, সুলতা বলল-
টেবিলে করলার সরবত রাখা আছে মনে করে খেয়ে নিও।
নাক টিপে, চোখ কুঁচকে, খানিক ওয়াক ওয়াক করে গ্লাসটা খালি করলাম। এ শালা শুয়ার সুগারকে ব্লকই করতে পারছি না।
সাতটা পনেরো, কোনো রকমে দাঁতে দু পাক দিয়েই বাজার ছুটতে হবে,নইলে ভাল মাছ পাওয়া যাবে না। বড় কাতলা তো নয়ই।

মাছের দোকান থেকেই মাছ ড্রেসিং করে দেয়। আঁশ তুলে কেটে কুটে একেবারে ফিট। শুধু কড়াই এ তোলার অপেক্ষা। সুলতা বড় খুঁতখুঁতে, নিজে একবার থেকে যাওয়া আঁশ গুলো খুঁজে খুঁজে বের করে। একটা আঁশও যেন না থাকে। 
অদ্ভুৎ বিষয় যতদিন মাছটা বেঁচে ছিল ততদিন রূপোলী আঁশের বিন্যাস তার সৌন্দর্য হয়ে ছিল,শুধু সৌন্দর্য নয় সে আঁশ ছিল তার বর্ম। তার বেঁচে থাকার কবচ। আঁশের উপর পিচ্ছিল লালায় মানুষের হাত হোড়কে, ছড়ানো জাল ফসকে্ পালিয়ে বাঁচা। আশ্চর্যজনকভাবে আজ যখন সেই মাছ পন্য, তখন তার আঁশ উদ্বৃত্ত, অপ্রয়োজনীয়। নিখুত হাতে সে আঁশ সরিয়ে ফেলা। সেই উদ্বৃত্ত,অপ্রয়োজনীয় পড়ে থাকা আঁশের সীমাহীন দুর্গন্ধ মাছ বাজারের বাতাসকেও এনে দেয় ভিন্নতা।আগে বেশ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়তে পারতাম। তখনো স্কুলে চাকরি পাই নি। সকাল থেকে দুটো ব্যাচ পড়ানো। পড়ানো মানে আহামরি গোছের কিছু নয়। বাপ-দাদার কাছে হাত পাতার লজ্জা থেকে মুক্তি, নিজের থেকে নিজের পকেট খরচ চালানো। যেহেতু পড়াই, কিছু লোকজন মাস্টার, মাস্টার করে আর তার বদান্যতায় সামাজিক অবস্থা আঁশের থেকে এক সুতো ভালো।

   বেকার জীবন মনে পড়লেই বিফল এর মুখটা ভাসে, মুহুর্তে মুখটা ছোটো-বড়ো, সোনালী-রূপালী আঁশে মাখামাখি হয়ে মাছবাজারের চেনা গন্ধ হয়ে যায়। তখন রাগ হয়, সে রাগের তীব্রতা ছড়িয়ে যায় সাংসারিক পরিমন্ডলে। পচ্ছন্দের কাতলার টুকরো দাঁতে শিরশিরানি আনে, জিভ বেঁকে গিয়ে ছোট হয়ে যায়, স্বাদ কোরক গুলো হাত গুটিয়ে নেয়, যতটুকু যা উদরস্থ করেছিলাম সে গুলো তালগোল পাকাতে থাকে পেটের ভিতর, উঠে আসতে চায় গলা পথ বেয়ে।

বিফল আমার থেকে বছর তিনের ছোটো। আমার প্রথম অনার্স ব্যাচ। ব্যাচ বলতে ও একাই। খুব সহজ সরল আর লেলাক্ষ্যাপা টাইপের ছিল। আমি মাছ খেতে ভালবাসি বলে একবার ঝড়-জল মেখে কতক গুলো কৈ মাছ নিয়ে হাজির। সেগুলো নাকি নিজের হাতে ধরেছে ও। পরের দিন পড়ানোর সময় দেখি হাত দুটো কৈ-এর কাঁটায় চেরা চেরা। কলম ধরতেও কষ্ট হচ্ছিল যেন।
বয়সের ব্যবধান কম বলেই হয়তো বন্ধু হয়ে উঠেছিল বিফল, যদিও সে আমাকে দাদা, দাদাই করত। কতদিন একসঙ্গে বিড়ি ভাগ করে খেয়েছি দুজন, কত অলস দুপুর গল্প গাছায় গড়িয়েছে সন্ধ্যায় বুঝতেই পারিনি।
হিসাবটা আমার মতো কাঁচা মাস্টারের থেকে বেশ কম সময়ে শিখে নিয়েছিল বিফল।
প্রফিট এন্ড লস এ্যাকাউন্ট, ব্যালেন্স শীট সব সবই। 
জীবনটা তো আর মেলানো অতো সহজ কাজ নয়। হওয়া না হওয়া, পাওয়া না পাওয়ার হিসাব করতে গিয়ে জীবনের ব্যালেন্স শীটে মস্ত অঙ্কের সাসপেন্স। জন্ম থেকেই বোধহয় বিফলের ভবিতব্য স্থির হয়ে ছিল।
ব্যর্থতার বাতি কেউ বোধহয় জ্বেলে দিয়েছিল অজান্তে,না হলে কেনই বা নাম হবে বিফল বাগ।

মাছবাজার ঢোকার মুখে দু- ডগ কচি পুঁই শাক ভরে নিয়েছি থলে তে। এখন একখানা সাইজের কাতলা পেলেই চলে। মাথা দিয়ে ঘন্ট, জমে যাবে রবিবারের মধ্যাহ্ন ভোজ।
আমাদের মাছ বাজারে নদীর মাছ পাওয়া যায় কিন্তু সে সব খেয়ে খেয়ে জিভ অসাড়।
খুব কি দেরি হয়ে গেল! বাজার পুরো ফরসা। কারো পাতাতেই ভালো মাছ নেই। যার থেকে নিয়মিত মাছ নেই তার পাতায় রবারের মতো থলথলে নিহাড়া মাছ জেগে আছে যা দেখে মাছ খাওয়ার ইচ্ছেটুকু শুকিয়ে যায়।
শুধু পশ্চিমের কোনে নীলা মাসির পাতায় তখনো একটা কেজি দেড়েকের কাতলা হাঁফ টানছে। শেষ বারের মতো বাঁচার চেষ্টা। লেজ ঝাপটে প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেগে দিচ্ছে ক্ষোভ। সে বিদ্রোহও সাময়িক, সেও এক বিফল-বিদ্রোহ। ঐ ক্ষোভ একসময় হতবল,হতোদ্যম হয়ে যাবে।
মাছটা চড়বে পাল্লায়, রূপালী চকচকে শরীর চালান হয়ে যাবে মাসির পিছন দিকটায়। কিছু বাদে ফিরে আসবে আঁশহীন পন্য হয়ে।
নীলা মাসি ধারালো চকচকে বটিতে টুকরো টুকরো করে কাটবে মাছটাকে, গড়িয়ে পড়া রক্ত মাখিয়ে দেবে পড়ে থাকা অন্য টুকরো গুলোতে যাতে সেগুলোকে বেশি করে তরতাজা দেখায়। যত বেশী তরতাজা তত দামি পন্য।
আমি নীলা মাসির কাছে কোনো দিন মাছ কিনি নি। এ কথা সবাই জানে। নীলা মাসিও। 
তাই আর পাঁচ জন দোকানির মতো আমাকে কোনো দিন মাছ কেনার আহ্বান জানায় নি মাসি। হয়তো সে সেটুকুর পিছনে ছিল পিছনের অন্ধকার সালটে থাকা আঁশটে দুর্গন্ধের অনুনয়।
আজ ফাঁকা মাছবাজারে আমার অসহায়তা, মাসির পাতায় ছটকাতে থাকা কাতলার প্রতি আমার লোলুপ তাকিয়ে থাকা, থলে থেকে বেরিয়ে পড়া লকলকে পুঁই পরিবেশটাকে দিল পাল্টে। মাসি হাত বিছিয়ে ডাকল আমাকে। মাসির আহ্বানে জেগে উঠল স্বপ্ন দৃশ্য।
আমার রবিবারের পাতে হলুদ রঙা ঘন্টে কালচে সবুজ পুঁই দেখতে পেলাম, গন্ধ পেলাম নিরিহ জিরা ঝোলের, ঝোলের মধ্যে স্পষ্ট ফুটে উঠল রোগা পাতলা পেপের টুকরো, লেতিয়ে পড়া বেগুন, আর সব কিছু ছাপিয়ে ঘাড় উচুঁ করা কাতলামাছের দশাসই পেটিটা।আমি পশ্চিমে এগানোর জন্য বাঁ পা তুললাম, আর মুহুর্তে আমার অনার্স পড়ানোর প্রথম ব্যাচটার মুখ ভেসে উঠল- ছোটো-বড়, সোনালী-রূপালী আঁশ মাখা মাছবাজারের চেনা গন্ধ হয়ে।
সরিয়ে নিলাম বাঁ পা। বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। 
একটা রবিবার খুব সাদামাটা কাটবে! 
কাটুক। 
প্রিয় কাতলা মাছ ছাড়া কাটবে! 
হোকনা।
আঁশের মতো মূল্যহীন কাটবে সেও স্বস্তিকর।
মাসির থেকে মাছ নেওয়া যাবে না।
মাসির পেছনের অন্ধকারটা সহ্য করা যাবে না।
ঐ অন্ধকারে মাছের আঁশগুলো নিখুত হাতে সরিয়ে, মাছ গুলোকে পন্য বানিয়ে তুলছে লেলাক্ষ্যাপা বিফল। নীলা মাসির দোকানের দীর্ঘ দিনের ডেলি লেবার সে।কি জানি! হয়তো অনার্স পাস আঁশ হয়েই বেঁচে থাকার ভবিতব্য নিয়েই জন্মেছিল বিফল।

 
 

 তাহাদের কথা

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ

 

..'প্রকৃতি,পরিবেশ, সমাজ ভোগের নৈবেদ্য সাজিয়ে রেখেছে। ভোগ তৃপ্তিকর তাই ভোগে আমাদের আগ্রহ বেশি। তাইতো পড়াশোনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, ফাঁকি দেওয়া। পড়াশোনা হল ভোগ বিরতি, ভোগ বিরতি হল সঞ্চয় যা ভবিষ্যতকে দৃঢ় করে সুন্দর করে। এখন নিজেকে তৈরীর সময়, এখন ভোগের নেশা পেয়ে বসলে সঞ্চয়ের ঘরে শূন্য, তার ফলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, অন্ধকারময়। দেখবে তখন জীবনের সব মুহূর্ত গুলো পিছলে যাছে শক্ত করে ধরার আগেই...

  অনেকক্ষণ একভাবে বসেছিলাম, নিধু কাকাকে বসিয়ে দোকান ছেড়ে বাইরে এলাম। নিধু কাকা আমাদের দোকানের সর্বক্ষণের সঙ্গী (কর্মী নন) বাবার সময় থেকে। একটু আড়াল খুঁজে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেললাম, আজ কাল সিগারেট খেলে একটুতেই হাঁপ ধরে। হাতের সিগারেট একটু একটু করে হাতে পুড়ছে। দেখতে দেখতে মাথার উপর কালো মেঘটা ভারি হয়ে এল। দুপুর বারোটা, চারপাশে অকাল আঁধার। অস্থায়ী দোকানগুলো আজকের মতো ব্যবসা গোটাতে তৎপর, স্থায়ী দোকানগুলো বর্ধিত বিপণীতে বৃষ্টি নিরোধক পলিথিন চাপাচ্ছে।

     'অম্লান দত্তের লেখা বিকল্প সমাজের সন্ধানে, আনন্দ পাবলিশার্স, আউট অফ প্রিন্ট, বইটার কোনো কপি আছে আপনাদের কাছে?'

কাঁপা-কাঁপা কন্ঠের কথা কটি কানে আসা মাত্র শিথিল হয়ে গেল আঙুল দুটো, আপনা আপনি খসে পড়ল সিগারেট।

মাথা ভরা পাকা চুল,বয়সের ভারে ঈষৎ ঝুঁকে পড়া চেহারা, কাঁধে ঝোলা, চোখে মোটা কাঁচের চশমা, মোটা সুতোর ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এ কাকে দেখছি আমার দোকানের সামনে! আমাদের ইকনমিক্স এর স্যার বিপ্রবাবু না?  হ্যাঁ, একদম তাই বিপ্রবাবুই তো।

    বিপ্রপদ পাত্র, আমাদের স্কুলে ইকনমিক্স পড়াতেন। ছাত্র-ছাত্রীদের মনের বাগান কর্ষণই ছিল তাঁর একমাত্র সাধনা। আর সেই সাধনায় তিনি সতত আত্মনিষ্ঠ। আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে শিক্ষকতাকে জীবন যাপনের আনুপূর্বিক আরাধনা হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন স্যার।

     সমাজ-সংস্কৃতির সব দিকে তাঁর অবারিত অনুরাগ। তাই পুঁথির সঙ্গে সমাজ-সভ্যতা, ভুত-ভবিষ্যৎকে  মিলিয়ে ফেলার এক অদ্ভুত রসায়ন জানতেন তিনি। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। মাঝে মাঝে আমাদেরই বুঝতে অসুবিধা হত আসলে তিনি কি পড়াচ্ছেন- অর্থবিদ্যা, সমাজবিদ্যা নাকি মনুষ্যত্বের আণবিক গঠন।

   একবার ভারতের ভারী শিল্প নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন -  ''শুনলে আশ্চর্য হতে হয়, খ্রিষ্টের জন্মের ১৫০০ বৎসর আগে যখন কিনা আজকের সাহেবরা, ইউরোপিয়ানরা পশুর ছাল পরছে তখন ভারতীয়রা পোশাকের ব্যবহার জানত। কিংবা এ আমার কথা নয়, কোনো এক পর্তুগীজ লেখকের কথা, Cape of good hope to chaina was clothed from head to foot in Indian maid garment. আমাদের শিল্প এতোটাই পুরানো। "

''কুতুব মিনারের যে লোহার স্তম্ভ গুলো আছে প্রায় আটশো বছরের রোদে জলে মরিচা আজও থাবা বসাতে পারেনি - এমনই উন্নত শিল্পের উত্তরাধিকার আমাদের।''

      গ্রন্থলোকের মহাবিশ্বে তাঁর ক্লান্তিহীন পদচারণা, স্মৃতির সরণি সতত সুস্পষ্ট - তাই তিনি পড়াচ্ছেন ভারতের শিল্প, তাঁর অসাধারণ উপস্থাপনার গুণে অবলীলায় এসে পড়ছে মধ্য যুগের ইতিহাস, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য।

বিষয়ের গভীরতা, শব্দ চয়ন ও প্রক্ষেপণ, নাটকীয়তা এমন এক ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করত যে আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে থাকতাম চিত্রার্পিত।

আসলে স্যারের বিদ্যাদান যেন এক সমুদ্রযাত্রা। নিদিষ্ট পথ নেই আছে স্থির লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যে অবিচল থেকে অনাবিল আনন্দে পথ চলা। কখনো ঢেউ তো কখনো বাতাসকে সঙ্গী করে চলা। কখনো পাল আবার কখনো দাঁড়ের সাহচর্য।

বৈচিত্র্য আর বিভিন্নতার বৈভবে বিদ্যার বিপুল বিকিরণ।

     স্যার খুব সহজেই আমাদের মনটা পড়ে নিতে পারতেন। আমাদের বলার আগেই আমাদের অভাব-অভিযোগ, দুঃখ-যন্ত্রণা সব সব বুঝে নিতেন তিনি। একবার দেখেছি মিনহাজের কপালে অমৃতাঞ্জন ঘষে দিচ্ছেন।

অপেক্ষাকৃত অমনোযোগী যারা তাদের বোঝাতেন অর্থবিদ্যার পরিভাষায় -

''প্রকৃতি, পরিবেশ, সমাজ ভোগের নৈবেদ্য সাজিয়ে রেখেছে। ভোগ তৃপ্তিকর তাই ভোগে আমাদের আগ্রহ বেশি। তাইতো পড়াশোনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, ফাঁকি দেওয়া। পড়াশোনা হল ভোগ বিরতি, ভোগ বিরতি হল সঞ্চয় যা ভবিষ্যতকে দৃঢ় করে সুন্দর করে। এখন নিজেকে তৈরীর সময়, এখন ভোগের নেশা পেয়ে বসলে সঞ্চয়ের ঘরে শূন্য, তার ফলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, অন্ধকারময়। দেখবে তখন জীবনের সব মুহূর্ত গুলো পিছলে যাছে শক্ত করে ধরার আগেই।''

আত্মদর্শী আচার্যের অনুপম অনুসঙ্গ আজও আমোদিত করে আমাদের।

       পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম স্যারকে। সাল, ক্লাস, মিনহাজ, মনতোষ টুকরো টাকরা নানান সুতোর সূত্র ধরে স্যার খুব সহজেই আবিষ্কার করে ফেললেন আমাকে। গায়ে মাথায় স্নেহের হাত বোলাতে লাগলেন। সারা কলেজ স্ট্রিট হাঁ করে দেখছে আমাদের দুজনকে। স্যার তখন পিছিয়ে গেছেন অনেক কটা বছর - স্কুলের প্রশস্ত দালান, ক্ষয়াটে বিকেলের নরম আলো আর ফাঁকা ক্লাস রুমে আমরা কজন আর স্যার। আমি প্রত্যক্ষ করছিলাম স্যারের চোখে মুখে ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

খুব সহজেই জিজ্ঞাসা করে বসলাম-

'এখনো পড়াচ্ছেন?'

স্যার ঘষা কাঁচের দৃষ্টি নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন -

''আমার মননের আদ্যকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে অনেক আগেই, আমি কেবল শরীরটা বয়ে বেড়াচ্ছি। জানো পড়ানো আমি ছেড়ে দিয়েছি।''

কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন গলাটা বুজে আসছিল কান্নায়।

তারপর হঠাৎই স্যারের চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল অভিমানের এক অনন্ত আগুন।

''জানো আজকাল ছেলেমেয়েরা সীমাবদ্ধতার সীমানার বাইরে জানতে চায় না, তাদের চাই নোটস্ চাই সাজেশনস্। একটা ছক বাঁধা, ছাঁচে ঢালা শিক্ষা। অনেকটা যেন ট্রেন জার্নি - প্রয়োজনের বাঁধা পথে অসংলগ্ন উপাগম।''

আমার হাতের মধ্যে স্যারের হাত দুটো ধরা ছিলো, আমি খুব বুঝতে পারছিলাম স্যার থরথর করে কাঁপছেন।

''অনেক সময় অশিষ্ট কিছু অভিভাবক নির্দেশ দেন, কি পড়াতে হবে, কতটা এমনকি কিভাবে। ভাবটা এমন - গরু যে একটা প্রাণী সে না জানলেও চলে, গরু যে দুধ দেয় এ অতিরিক্ত তথ্যের বদহজম, শুধু ক্ষীরটুকুই চাই। তাই রাগে পড়ানো ছেড়ে দিয়েছি।''

তাঁর রাগ অভিমান দলা পাকিয়ে চারপাশের আকাশ বাতাসকে আরো একটু ভারি করে তুলল। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। আর স্যার বৃষ্টি মাখতে মাখতে মিলিয়ে গেলেন বইয়ের ভিড়ে, অসংখ্য বই অনুরাগী মানুষের মধ্যে।

তাহাদের কথা- ২

স্কুল ফেরত বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক বাসের অপেক্ষায় বলা যাবে না আবার না বলারও কোনো কারণ নেই। দাঁড়িয়ে আছি আর একটার পর একটা বাসের চলে যাওয়া দেখছি। ঠিক চলে যাওয়া দেখছি না, দেখছি বাসের গায়ে, পেছনে লেখাগুলো। ঐ লেখাগুলো বেশ লাগে। যেমন - হিংসা করো না চেষ্টা করো কিংবা জন্ম থেকেই জ্বলছি অথবা দেখবি আর জ্বলবি লুচির মতো ফুলবি আবার কেউ লিখেছে, বললে হবে সতীন নিয়ে ঘর করছি নয়তো মদন বাড়ি ফিরবেই অন্য দিকে রবিঠাকুরের - আমার পথ চলাতেই (আসলে চাওয়াতেই) আনন্দ, বা পদাতিক কবির, ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ  আনন্দ (বসন্ত নয়) অথবা পথে হল দেরী, রাস্তা কারো বাবার নয় নানা ধরনের লেখা। বেশ মজা লাগে। কদিন হল মনটা বিশেষ ভাল নয়, কিন্তু কাউকেই তার হদিশ পেতে দিই নি এমন কি গিন্নিকেও নয়। আজ স্কুলে শিক্ষারত্ন নিয়ে বেশ বললাম -

'ওভাবে কেউ নিজেকে রত্ন হিসাবে দাবী করে? একি সরকারি ব্যবস্থা! আবেদন করে জানাতে হবে, আমাকে রত্ন হিসেবে বিবেচনা করা হোক।'

       অথচ নিজে আগে ভাগেই আবেদন জমা করেছিলাম। সিল.এল  নিয়ে ছোটা - ছুটিও করছিলাম, ও প্রান্ত থেকে আশ্বাসও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিকা ছিঁড়ল না। মন খারাপের বোঝা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, একটা লুলে যাওয়া, গলে যাওয়া বুড়ি এসে হাত পাতল। বাঁ হাত নিজের কপালে ছুঁইয়ে, আমার কাছে যে কিছু জুটবে না তা জানিয়ে দিলাম। ব্যাগের মধ্যে শিক্ষক দিবসের প্যাকেট ছিল, যদিও ভাল আইটেমগুলো আগেই সাবাড় করে রেখেছি। একবার ভেবে ছিলাম দেই, পরে মনে হল বাড়িতে নিয়ে গেলে কাজের মেয়েটা পাবে, খুশি হবে। অন্তত আজকের জন্য বাড়তি পরিসেবা জুটবে, এমনিতে কাজের ক্ষেত্রে ওরা একেবারে মাপা হাত। বুড়িটা আমাকে মাপতে মাপতে চলে গেল। আমি তেমনি দাঁড়িয়ে রইলাম। আমাদের লাইনের গাড়ি গুলোর ডেনসিটি একটু কম তাছাড়া আমার তো তেমন কোনো তাড়া নেই। আগে যদিও পড়ানোর হোম ডেলিভারি ছিল, এখন আর যাই না। না শরীরে কুলোয় নি তা নয়, কেমন যেন একটা আত্মসম্মানে বাঁধল। একদিন এক বাড়িতে পড়াচ্ছি। ছাত্রের মা ফোনে অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলছে-

"আর বোলো না দিদি খরচের কি শেষ আছে - মাছ, মাংস, সবজি, ডাল, চাল, তেল, ডাক্তার, ইলেট্রিক, ফোন, কুকুর, মাস্টার।"

ঝটকা লাগল। আমরা মাস্টাররা কুকুরেরও পরে! ব্যস সেদিন থেকেই পড়ানোর হোম ডেলিভারি বন্ধ।

      এখন দুএকটা পড়াই নাম মাত্র পয়সায় বা বিনা পয়সায়। ওগুলো আমার ভাল মানুষীর বিজ্ঞাপন। দেখতে দেখতে আমার বাস এসে গেল। জানলার ধার ঘেঁষে বসার একটা সিটও জুটে গেল কপালে। বাস ছুটছে। বাইরের পৃথিবীটা উল্টো মুখে ছুটছে। দ্রুত অতি দ্রুত সরে যাচ্ছে বাইরের গাছ-পালা, ঘর- বাড়ি, মানুষ-জন। এই ছুটে চলাটাই জীবন। নাহলে পিছিয়ে পড়তে হয়, হারিয়ে যেতে হয়। অন্যকে ছাড়িয়ে, অন্যকে মাড়িয়ে এগিয়ে চলার নামই জীবন।বাইরের ঠান্ডা বাতাসে একটু তন্দ্রা মতো আসছিল, হঠাৎ সজোর ব্রেকে জেগে উঠলাম। জানালা দিয়ে যেটুকু বুঝলাম, একটা মানুষ গাড়ির ধাক্কায় দলা পাকিয়ে গেছে, রক্তাক্ত শরীরটা ছিটকে গেছে পথের প্রান্তে। লোকটা কাতরাচ্ছে মৃত্যু যন্ত্রণায়। লোকটা আমার চেনা তবুও আমি নিজেকে গুটিয়ে নিলাম পাছে জড়িয়ে পড়ি অবাঞ্ছিত ঝামেলায়। গাড়ি ছুটছে, আরো, আরো দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে নিশ্চিন্ত নিরাপদের আশায়।

    আমার স্টপেজ এ নেমে পড়লাম। আমাকে ছেড়ে গাড়িটা বাতাসের বেগে ছুটে গেল সামনের দিকে। আর আমি চকিতে লক্ষ্য করলাম বাসটার পেছনে লেখা - বিশ্বাসের মা মারা গেছে। আমার শরীরটা একটু টাল খেল। বুকের ভেতরটা যেন খালি হয়ে গেছে। আমি হাঁটছি আমার পা দুটো জড়িয়ে যাচ্ছে, আমার গতি শ্লথ হয়ে আসছে। আমার মস্তিষ্কে দাপাদাপি করছে সেই বুড়ি মানুষটা, শিক্ষারত্ন, রক্তাক্ত দলাপাকনো পরিচিত মুখটা। কোথা থেকে ভেসে আসছে সেই চেনা সুর... আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে। কি অসহ্য সেই সুর, যেন কেউ আমার কানে গরম সিসা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমি যতই আমার বাড়ির কাছাকাছি হচ্ছি সে সুর হয়ে উঠছে তত তীব্র।

       বাড়ি পৌঁছে দেখি সে সুর ছড়াছে আমারই বাড়ি থেকে। দেখি আমারই দরজায় আমার বিনা পয়সার ছাত্ররা, আমার ভাল মানুষীর বিজ্ঞাপন, আমার জন্য ফুল, মালা, আর চন্দনের বরণ ডালায় সাজিয়ে রেখেছে শিক্ষক দিবসের অর্ঘ।

ওদেরই একজন বলল-

"আজ বড় আনন্দের দিন, স্যার তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিন।"

        আমি সাওয়ারের তলায় বিবস্ত্র দাঁড়িয়ে আছি। গলা বেয়ে কান্না উঠে আসছে, আজ যে এক কলসি গঙ্গা জলের বড় প্রয়োজন।

 

 অর্ধ-বৃত্ত

সনোজ চক্রবর্ত্তী

মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ

 

...এই প্রথম শ্যামলের মনে হল সে ক্র্যাচ ছাড়াই দাঁড়িয়ে আছে আর হিয়াও যেন এতোদিনে খুঁজে পেয়েছে সোনার হরিণ। দর্শক অাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন সবাই। করতালিতে ভেঙে পড়ছে পুরো অডিটোরিয়াম। মঞ্চের মাঝে দু'টি আলোকিত অর্ধবৃত.........

    মিতালিপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে ঘড়ি দেখল শ্যামল। ঘড়িটা দেখতে গিয়ে বগল থেকে সরে গেল ক্র্যাচটা। ক্র্যাচটা সরে যেতে শরীরটা সামান্য টাল খেল। মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল শ্যামল। ক্র্যাচটা তুলতে গিয়ে রাস্তার উল্টোদিকে অনেক গুলো হোডিং চলে এলো শ্যামলের চোখে। তার মধ্যে "একটু ভালবাসা"-এর হোডিংটা নজরে পড়ার মতোই। পথ-নির্দেশিকা অনুযায়ী "একটু ভালবাসা" এখান থেকে সাত কিমি পথ। হিসাব মতো সহেলীর এখনো ঘন্টা দুই লাগবে। অথাৎ আরো ঘন্টা দুই এখানেই অপেক্ষা করতে হবে তাকে। সকাল থেকে ভারি কিছু খাওয়া হয় নি। এবয়সে বাইরের খাওয়ার আজকাল আর সহজে হজম হয় না। তবুও রাস্তা পার হয়ে উল্টো পিঠের রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ল শ্যামল।
     খাওয়া শেষে হাত-মুখ ধুতে গিয়ে বেসিনের উপরে লাগানো আয়নায় একটা মুখ দেখে চমকে উঠল সে। রেস্টুরেন্টের মাঝে মোটা থাম লাগোয়া টেবিলটার তিনটি চেয়ার ফাঁকা কিন্তু চতুর্থটিতে ও কে বসে! এক মাথা পাকা চুল আর চশমাটা খসিয়ে নিলে একদম হিয়া না! 
হ্যাঁ, কোনো ভুল নেই, হিয়াই তো। 
শ্যামলের বুকের ভেতর কো যেন ধামসা-মাদল পেটাচ্ছে। শ্যামল অনেক যদি কিন্তু মাড়িয়ে এগিয়ে গেল টেবিলটার কাছে--
- কিছু মনে করবেন না, আ.. আ.. আপনি কি হিয়া বিশ্বাস ?
ভদ্রমহিলা মুখ তুলে তাকালেন শ্যামলের দিকে। আঙুল দিয়ে ঠিক করে নিলেন নেমে আসা চশমাটাকে। কপালে তৈরি হওয়া ভাজগুলোকে মাথার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন -
- হি... হিয়া বিশ্বাস! না না আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি হিয়া বিশ্বাস নই।
- আসলে হয়েছে কি আমার এক বান্ধবীর নাম হিয়া, বিশ্বাস করুন আপনাকে একদম তারই মতো দেখতে। এমনকি এই যে আপনি কথা বলছেন, কন্ঠস্বরটাও যেন..
- এক সুরে বাঁধা তাইতো? না মশাই আমি তো হিয়াই নই আর সে অর্থে আমার কোনো যমজ বোনও নেই, যার নাম হিয়া।
- স্যারি ম্যাডাম। খুব স্যারি। বছর পঁচিশ আগের দেখাতো। হিয়া আমার ভীষন বন্ধু ছিলো।

- ভেরি ইন্টারেস্টিং! পঁচিশ বছর আগে শেষ দেখা। তার মানে তখন...আরে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন! বসুন না। তখন আপনি কত আর..
- না ঠিক আছে, আমি ত-খ-ন বছর তেইশ, আর হিয়াও...ঠিক তাই। আমরা এক ক্লাস ছিলাম যে।
- এই একমাথা সাদা চুল, নড়বড়ে দাঁত, ঘোলাটে চোখে ভারি চশমা, সব মিলিয়ে আমাকে দেখে তো মশাই কখনই ষাটের কম মনে হয় না।
- সে তো আমিও কম বুড়ো হই নি ম্যাডাম।
- হুম.. বুঝলাম। তা মশাই স্পেশ্যাল কেউ ছিল নাকি?
- হু... একটু স্পেশ্যালতো ছিলই।
-  আচ্ছা। আসুন না, ভুল করে যখন এসেই পড়েছেন, তখন আজকের দিনের জন্য আমিই না হয় আপনার হিয়া হলাম।
- না ম্যাডাম, তা হয় না। এই তঞ্চকতাটা এ বুড়ো হৃদয় সইতে পারবে না। নমস্কার। ভাল থাকবেন।

শ্যামল রেস্টুরেন্টের বিল মিটিয়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়। অনেক দিনের সেই না মেলা অঙ্কটা আজ বড় অস্থির করে তুলল তাকে। চিনচিন করে ব্যথাটা বাড়ছে। ব্যথারাও ঘুমিয়ে যায় কিম্বা ঘাপটি মেরে থাকে অবচেতনে। একটু নাড়া পেলেই জেগে ওঠে। আর তখন সব কিছুকে গুঁড়িয়ে দিতে চায়।

একসময় যে চাওয়াটা ছিল অনিবার্য আজ সেই না-পাওয়ার সামনে স্বেচ্ছাকৃত সব নির্মান যেন হয়ে যায় মিথ্যে। অসীম শূন্যতা অনতিক্রম্য হয়ে ওঠে। মৃত্যুকেও বড় তুচ্ছ বলে মনে হয়।
ভদ্রমহিলাকে দেখার পর থেকে শ্যামলের বুকের ভিতর উন্মত্ত দাপাদাপি শুরু হয়ছে।
ক্র্যাচটার উপর শরীরটাকে টানতে টানতে সে এসে পড়েছে বাসস্টপে। 
"একটু ভালবাসা" সব ব্যবস্থা করে দেবে বলেছিল। নিজে থেকেই না করেছে শ্যামল। অবশ্য মেয়ের সঙ্গে কথা বলেই না করেছে। মেয়ে ফ্লাইট থেকে নেমে সোজা চলে আসবে এখানে। তারপর বাপ-বেটি দু'জন রওনা দেবে।

- শ্যাম...

চমকে উঠল শ্যামল। বুকের ভিতরটাকে কে যেন শক্ত হাতে নিঙড়াচ্ছে। শুকিয়ে গেছে মনের আনাচ-কানাচ। শুধু দূর থেকে শুকনো পাতা উড়িয়ে শনশন বেগে ছুটে আসছে এক উন্মত্ত ঝড়।

    শ্যামলের একেবারে কাছটিতে এসে দাঁড়িয়েছেন সেই ভদ্রমহিলা। শ্যামল এবার নিশ্চিত এই সেই হিয়া। শ্যামল নামটাকে ছোটো করে একমাত্র হিয়াই শ্যাম বলত। উত্তেজনায় সারা শরীরের সঙ্গে ক্র্যাচটাও কাঁপছে তার। সে বিশ্বাস করতে পারছে না তার সামনে সত্যি সত্যি হিয়া দাঁড়িয়ে।

- কি রে বোকার মতো হাঁ করে কি দেখছিস!
- না মানে আমি বিশ্বাস...
- বিশ্বাস করতে পারছিস না, হিয়া বিশ্বাস তোর সামনে।
- ঠিক তাই। এদ্দিন পর এমনটা হবে, ভাবতেই পারি নি। প্রথম প্রথম মনে হতো- হয়তো কোনো না কোনো দিন দেখা হয়ে যাবে তোর সঙ্গে। খুঁজতামও পথ-ঘাট। তারপর হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম।
- 'হাল ছেড়ে আজ বসে আছি আমি, ছুটিনে কাহারও পিছুতে। মন নাই মোর কিছুতেই, নাই কিছুতেই। '
- তোর আজও মনে আছে! 
 এই কবিতাটাইতো আমি বলেছিলাম সোশালে।
- কেন মনে থাকবে না! মন থেকে বলছি বেশ সুন্দর বলতিস কবিতাটা। তা আজ যখন তুই তোর হিয়াকে রিকগনাইজ করলি, হাল ছাড়লি কেন?
- বারে তুইতো বারবার মিথ্যে বলে সব গুলিয়ে দিলি।
- মানছি গুলিয়েছি, তাহলে কিন্তু তোকে মেনে নিতে হয় তোর চেনাতে প্রত্যয় ছিল না?
- তাই যদি হয়, সেটাকি তোরও ছিল না কি? তাহলে এভাবে ছেড়ে চলে যেতে পারতিস?
- এদ্দিন পর দেখা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া করবি?

বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে একটা শান বাঁধানো গাছের তলায় বসল শ্যামল আর হিয়া। শ্যামল খুব ভাল করে নজর করল হিয়ার সিঁথিতে সিঁদুর নেই, হাতে নেই শাঁখা। তারমানে কি আজও বিয়ে করে নি হিয়া ! কথাটা মনে হতেই শ্যামলের বাঁ হাতটা আটকে গেল তাঁর হাঁটু থেকে কাটা বাম পায়ে। তারপর মনেমনে ভাবল আজকাল মেয়েরাতো এসব নেয় না। এমনটাও তো হতে পারে হিয়ার স্বামী মারা গেছেন। 
হিয়া অনেক দিন পর দেখছে শ্যামলকে। নীল রং-এর পাঞ্জাবিতে বেশ মানিয়েছে তাকে। 
শ্যামল পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরাল। সিগারেটটায় লম্বা টান দিয়ে বলল,
- তারপর বাড়িতে কে কে আছেন তোর?

- বাড়িতে আমরা তিনটি প্রাণী। আমি ও আর ছেলে। তবে পিতা-পুত্র প্রায়ই বাড়ি থাকে না।

- কি করেন তোর কত্তা?

- একটা কোম্পানীর জেনারেল ম্যানেজার।

- তা হলে তো সোনার হরিণ পেয়ে গেছিস।

- বাঃ বেশ দিলি তো খোঁচাটা।

- খোঁচা বলিস না। তোর মনে আছে আমাদের প্রথম আলাপ?

- থাকবে না আবার! সেদিন ক্লাস ছিল না তুই গান গাইছিলি 'তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই।' আর টেবিল বাজাচ্ছিল ফিঁচকে রমেশ।

- সঙ্গে সঙ্গে তুই পাল্টা গাইলি' আমার সে রেস্তো নাই আমার সে রেস্তো নাই।'

- গানটা কিন্তু তুই বেশ গাইতিস।

- গাইতিস কিরে এখনও গাই, রীতিমত সাধা গলা। হবে নাকি একটা ডুয়েট?

- রাস্তায় লোক জড়ো করবি নাকি? তা তোর ছেলে কি করে?

- ছেলে কানপুর আই আই টি পাশ আউট, বিদেশ থেকে অনেক ভাল ভাল অফার আছে কিন্তু ও এদেশেই থাকবে। একেবারে বাপের ছাঁচে গড়া। ভাত ডাল আলুপোস্ত ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। বছরে একটা বেড়াতে যাওয়া ব্যাস আর কিচ্ছু চাই না। ছেলের নাম রেখেছি হর্ষ।

- তা হর্ষ নামের ব্যাক গ্রাউন্ডটা কি ছেলের বাবা জানে?

- ওকে আমি আমার সবটুকুই বলেছি। তাছাড়া ও খুব লিব্যারেল। তখন থেকে আমিই তো নাগাড়ে বকে যাচ্ছি। তোর কি খবর বল?

- আমার! আমার আর কি খবর থাকতে পারে বল? একটা পা নিয়ে কোনো রকমে চলে যাচ্ছে। একটা স্কুলে পড়াই। শ্বশুর কুলের কেউ নেই ওখানেই থাকি। একমাত্র মেয়ে ব্যাঙ্গালোরে অধ্যাপক।

- পা'টার কি কোনো ভাবেই কিছু করা গেল না?

- ডাক্তার পত্তর তো অনেক হয়েছে, আসলে আমি না মন থেকে চাই নি পা'টা ভালো হোক।

- কেন! চাস নি কেন?

- আমরা যতটা যা চাই তাতটা কি হয়?

- তবুও তো মানুষ চায়। আমিও তো চেয়েছিলাম তোকে নিয়ে সারাটা জীবন চলতে।

- কিন্তু যখন দেখলি একটা খোঁড়া মানুষকে সারাজীবন বয়ে বেড়ানো সহজ কাজ নয়, তখন পালিয়ে বাঁচলি।


 

- ওভাবে বলিস না। শেষ পর্যন্ত তুইতো আর কোনো যোগাযোগ রাখতে চাস নি।

- এখনও ট্রেনের ধাতব শব্দটা শুনলে ভয়ে থেকে থেকে খাঁমচে ধরি বাঁ পা'টাকে।
তোর মনে আছে কিনা জানি না, সেদিন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন।
- আমি হোষ্টেল থেকে ফিরছিলাম বেডিং পত্তর নিয়ে..
- বোঝাটা বইবার জন্য পথে একটা ভ্যান রিক্সাও তুই পেলি না..
- লাইনন দড়ি বাঁধা বোঝাটা তুই নিজের থেকেই নিলি হাতে ঝুলিয়ে
- হু, খুব কষ্ট হচ্ছিল বোঝাটা বইতে। কিন্তু তখন কষ্ট করার নেশাটা পেয়ে বসেছিল আমাকে। এরপর তো তোর সব বোঝা আমাকেই বয়ে বেড়াতে হবে।
স্টেশন পৌচ্ছে দেখি দড়িটা কেটে বসে গেছে আমার হাতে । হাতটা ভীষন জ্বালা করছিল। তার মধ্যে তোর নজর পড়তে তুই কাঁদতে কাঁদতে স্থান কাল ভুলে চুমু খেতে থাকলি দু'হাতে। তোর চোখের নোনা জলে জ্বালাটা আরো বেড়ে যাচ্ছিল।
- এর মধ্যে ট্রেন এসে ঢুকে পড়ল প্লাটফর্মে..
- তোকে ট্রেনে তুলে আমি চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইলাম। ট্রেনটা ছাড়ল, গতি বাড়তে থাকল। আমার বুকের ভিতরটা কেমন যেন ভারি হতে থাকল। শূন্যতারও যে কি ভীষন ওজন থাকতে পারে সেই প্রথম টের পেলাম। ট্রেনের সঙ্গে ছুটতে থাকলাম তোর জানালাটা ধরে। তারপর হঠাৎ ইচ্ছে হল তোর সঙ্গে যাওয়ার। ট্রেনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ল গতি। হঠাৎ পা'টা গেল ফসকে্ আমার শরীরটা তখন প্লাটফর্মে ঘষটাচ্ছে। সারা প্লাটফর্ম জুড়ে তখন একটাই শব্দ গেল গেল গেল...
তারপর আর কিচ্ছু মনে নেই।
- দু'দিন পর তোর সেন্স ফিরেছিল। টানা দেড় মাস পড়েছিলি হসপিটালে।হসপিটাল থেকে ফেরার পর তুই কেমন যেন পাল্টে গেলি।
- হসপিটাল থেকে যখন একটা পা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম তখন আমার জগৎটাই কেমন যেন বদলে গেল। দাদা-বউদির সংসারে একটা বাড়তি বোঝা হয়ে উঠলাম। তখন আমার সম্বল বলতে তুই। বাকি জীবনটা কেবল তোর ভরসায় বাঁচা।
- আমিও তো তাই চেয়ে ছিলাম, পাশে থেকে সাহস দিতে।
- বাঁধ সাধল তোর বাবা।
- বাবা!
- হ্যাঁ। একদিন উনি এলেন আমাদের বাড়ি।বললেন যেন কোন ভাবেই এই পঙ্গু জীবনটা না চাপিয়ে দেই তোর জীবনে।
- ওঃ তাই তুই আমাকে অস্বীকার করে গেলি বারবার।
- এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না যে আমার। তবে বিশ্বাস কর আমার এই পঙ্গু জীবনটা বেশ বয়ে বেড়াচ্ছে আমার স্ত্রী ও মেয়ে।
- তাহলে আমাকে না পেয়ে ভালো হয়েছে বল।
- সেটা বলতে পারব না।
- এখন কোথায় যাবি?
- এই তো সামনের দু'টো স্টপেজ পেরিয়েই আমার বাড়ি।
- আমার কাজের বেশ দেরি আছে চলনা তোর বাড়িটা ঘুরে আসি। আলাপ হবে তোর বউ মেয়ের সঙ্গে।
- আসলে আমার বউটা বেশ সন্দেহ বাতিক। তোকে দেখলে আবার না অন্য কিছু ভেবে বসে।
- ওঃ তাই নাকি! 
এমন সময় রাস্তায় একটা ছোট গাড়ি এসে থামল। গাড়ির জানালায় সহেলী। মেয়েকে কিছু মাত্র বুঝতে না দিয়ে গাড়িতে চেপে বসল শ্যামল।
হিয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল সে এক ছুট্টে উঠে পড়ে শ্যামলদের গাড়িতে কিন্তু তার সে জোর যে আজ আর নেই।

মঞ্চটা সুন্দর করে সাজানো। মঞ্চে বসে রয়েছেন অতিথিরা। সামনের সারিতে কঁচি-কাঁচারা বসে। অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ পর্যায় চলছে। "একটু ভালবাসা" এ বছরও বিগত বছরের মতো সম্মান জানাচ্ছে সেরা বাবাকে , আর সেই সঙ্গে এবারে সম্মানিত হচ্ছেন সেরা মা। ঘোষক বিষয়টা ঘোষনা করা মাত্র পুরো অডিটোরিয়াম ভেঙে পড়ল করতালিতে। করতালির শব্দে ঘোষক তার কথা আপাতত বন্ধ রেখেছেন। দর্শকাসন নিয়ন্ত্রনে নিয়ে এসে ঘোষক আবার শুরু করলেন।
"এবছরের সেরা বাবা ও সেরা মা হলেন শ্রী শ্যামল সেনগুপ্ত ও শ্রীমতি হিয়া বিশ্বাস।
আজ এঁদের দু'জনের সন্তানই সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত।
বিগত বছরগুলোর সঙ্গে এবারের উৎসবের তাৎপর্যপূর্ণ তফাৎ এতোটুকুই- এঁদের দু'জনের জীবনে, এঁদের সন্তান ছাড়া আর কোনো বাঁধন নেই। অনেক বিবাহিত দম্পতি আমাদের এই অনাথ আশ্রম থেকে দত্তক নিয়েছেন। তাঁদের সেই সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়ে বলছি, মিস্টার সেনগুপ্ত ও মিস বিশ্বাস কোনো এক অজ্ঞাত কারনে জীবনে দ্বিতীয় জনকে গ্রহন করেন নি। তবুও তবুও তাঁরাই আজকের সেরা বাবা ও সেরা মা।
একাই যে একটা সংসার নির্মান করা যায় তা এঁরা একক ভাবে করে দেখিয়েছেন।
এঁদের এই নিঃসঙ্গ জীবনের সার্থকতা এখানেই, এই জীবন পূর্ণ করেছে আর এক রিক্ত জীবনকে।
একটু ভালবাসায়, না-হয়ে ওঠা জীবনকে বর্ণময় করেছেন এঁরা।
মঞ্চে ডেকে নিচ্ছি এবছরের 
"একটু ভালবাসা- সেরা বাবা ও মা'কে"
আজ কোনো অতিথি নন আজ তাঁরা সম্মানিত করবেন একে অপরকে।
মঞ্চের সমস্ত আলোর তলায় এসে দাঁড়িয়েছেন শ্যামল আর হিয়া। একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাঁসছে মিটমিট করে। 
একটু আগে শান বাঁধানো গাছটার তলায় নিজেদের তৈরি করা মিথ্যে সংসারটা ভেঙে ধুয়ে যাচ্ছে "একটু ভালবাসা"- এর মঞ্চে।
       এই প্রথম শ্যামলের মনে হল সে ক্র্যাচ ছাড়াই দাঁড়িয়ে আছে আর হিয়াও যেন এতোদিনে খুঁজে পেয়েছে সোনার হরিণ। দর্শক অাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন সবাই। করতালিতে ভেঙে পড়ছে পুরো অডিটোরিয়াম। মঞ্চের মাঝে দু'টি আলোকিত অর্ধবৃত্ত।

 

                         সংস্কার

সনোজ চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা  

...ডাক্তারবাবু মায়ের হাতটা নিয়ে কি যেন একটা বোঝার চেষ্টা করলেন। সেই খোঁজার চেষ্টাটা আরো বেশি করে মনযোগী হয়ে উঠল। তারপর নিজের নিচের ঠোঁটকে উপরের ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে, ঘাড়টাকে বার দুই দোলালেন। কাচের দেওয়াল ভেদ করে ডাক্তার বাবুর দীর্ঘশ্বাস ফুটল আমার বুকে। অপ্রার্থিত পরাজয়ের গ্লানিতে তাঁর মুখখানি কালো দেখালো বোধহয়। মায়ের শরীরের উপরে রাখা সাদা কাপড়টাকে ডাক্তার বাবু টেনে দিলেন মার মুখ পর্যন্ত। আমি টাল খেয়ে বসে পড়লাম মেঝেতে।

     হাসপাতালের কিরকম যেন একটা গন্ধ আছে। গন্ধটা নাকে এলে বুকটা শুকিয়ে যায়। একটা শুকনো খসখসে বাতাস পাক খেতে খেতে হঠাৎ করেই বুকের ভিতরটা বায়ু শূন্য করে দেয়। তখন জোরে জোরে শ্বাস হাতড়াতে হয়। কি যেন এক অজানা আশঙ্কায় বুকের সব ঘুলঘুলি গুলো বন্ধ হয়ে গিয়ে অদ্ভুত এক দমবন্ধ অবস্থা তৈরী করে।

পাশ থেকে চলে যাওয়া স্ট্রেচারের ঘরঘর আওয়াজ বহু দূর পর্যন্ত বুকে হাতুড়ি পিটতে থাকে। তখন নিজেকে সরিয়ে নিতে ইচ্ছে জাগে। মনে হয় পায়ে পায়ে আলগা একটু সময় কাটিয়ে আসা যাক।

কদিনের আনাগোনায় মুখ চেনা হয়ে গেছি দোকানির। চকলেটের বয়ামের উপর পাঁচ টাকার কয়েন রাখতেই, হাতে ধরিয়ে দেয় দশটা বিড়ি। কলাপাতা ভাঙা হাওয়ায় বিড়ি ধরিয়ে নিই দু-হাতের আড়াল তৈরী করে। গাল চুপসে লম্বা টান লাগাই, মুখ ভর্তি ধোঁয়ায় চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে বিড়ির কটু গন্ধ।

এখানে মানুষের স্বার্থ চক্র ভিন্ন পথে চলে। আমি চাইছি মা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুক, হাসপাতাল বা ঔষধ দোকান গুলোর চাওয়া ঠিক এর বিপরীত। তেল চিটে চেহারা, কোটরে ঢুকে থাকা চোখ, মাথা ভর্তি ঝোড়ো চুল, ময়লা জিনস পরে শব-বাহী গাড়িটায় হেলান দিয়ে যে ছেলেটা দাঁড়িয়ে, সে হয়তো সকালে স্নান সেরে যমের ফটোতে প্রণাম করে বেরিয়েছে রোজদিনের মতো।

এ এমন এক পরিস্থিতি এখানে অর্থবান, শক্তিমান সকলেই অসহায় হয়ে চেয়ে থাকে ঈশ্বরের পানে। আর আমার ভরসা ঠিক সেই খানটিতে, মা-আমার, ব্রত ও উপাসনায় খরচ করেছে জীবনের বেশির ভাগ সময়। তার সেই উন্মুখ উপাসনা বিফলে যাওয়ার নয়। ঈশ্বর তাঁর এতো বড়ো সেবাইতের এতো বড় অনিষ্ট করবেন না। আর তাই যদি হয় তবে সে হবে ঘোর অনাচার।

চারটা বাজতে মিনিট পনেরো বাকি, একটু একটু করে ভিড় ঘন হতে শুরু করেছে। চারটা থেকে পাঁচটা ভিজিটিং আওয়ার্স, সে সময় মনে হয় কোথাও যেন আমরা একা নই, আমাদের চরাচর যাপনে জড়িয়ে আছে কত আপনজন, কত আশা-আকাঙ্ক্ষা,কত শুভেচ্ছা।

ঘন্টা খানেক আগে আমার দাদু,মায়ের বাবা এসেছেন মেয়ের খোঁজে। যদিও বয়সের ভারে তিনি প্রায় চলচ্ছক্তিহীন,তবুও সন্তানের শুভকামনা- সঙ্গে নিয়ে এসেছেন গৃহ দেবতার প্রসাদি ফুল-বেলপাতা। কোন ছোটবেলা থেকে ঐ গৃহদেবতার সান্নিধ্যেই মায়ের বড় হয়ে ওঠা।

দাদু ছিলেন পন্ডিত ব্রাহ্মণ,আশেপাশের পাঁচ গ্রাম তার যজমান। খুব ছোটবেলা থেকে মা সংস্কার মনস্ক। পূজা-পার্বণ,ছোঁয়াছুঁয়ি,জাত-পাত এসব খুব নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে এসেছেন আজীবন।

তখন আমার ক্লাস সেভেন কি এইট,মায়ের সঙ্গে মামা বাড়ি যাচ্ছি। আনন্দ একটা রঙিন প্রজাপতি হয়ে অস্থির করে তুলেছে যাত্রাপথ। প্রথমে বাস তারপর বেশ খানিক হাঁটা পথ। বাসের মন্থর গতিতে চুকচুক শব্দ এসে পড়ছে জিভে-ঠোঁটে। বাস থেকে যখন নামলাম তখন রোদ চাঁটি বসাচ্ছে মাথায়। এরপর প্রায় মাইল খানেক গ্রামের পথ ধরে হাঁটা। সারা পথের সবটাই মনোহর প্রাকৃতিক শোভা,পুরোটাই গাছ-গাছালির ছায়া পথ।

 পুকুরের স্থির জলে আম,জাম,খয়ের, অশ্বত্থের ঘনছায়া, হাত ধরে দাঁড়ানো সার বাঁধা সুপুরি গাছে বাতাসের শনশন। গুটিকয় বক পুকুরের উপর ঝুঁকে পড়া কলাগাছে ভাঙা পাতায় চুপটি করে বসে শিকারের অপেক্ষায়। দূরে বাঁশ বনে শুকনো বাঁশ পাতা পাক খায় নিজের খেয়ালে। মাটির পথ খানি কোথাও বা ক্ষীণ হয়ে গেছে মানুষের মলে। ছেলে বুড়ো লজ্জাকে সিন্দুকে ভরে ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রাতঃক্রিয়া সেরে নেয় পথের দুধারে।

ঝুলে থাকা শাড়িটাকে সামান্য তুলে সাবধানী মা হাঁটছেন তার স্বভাব জাত শুচিগ্রস্ততা বাঁচিয়ে, আর বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যাতে আমি নোংরা মাড়িয়ে না ফেলি।

মামা বাড়ি ঢোকার মুখেই শীতলার মন্দির, সামনে নাটমন্দির,পাশে পুকুর। ঐ পুকুরটি ছিল সদর পুকুর। মা বাড়ি ঢোকার আগেই পুকুরে স্নান করে নিতেন, যাত্রা-পথের নোংরায় মা যে তখন অশুচি। স্নান সেরে ভিজে কাপড়ে শীতলার প্রণাম সেরে তবেই বাড়ি ঢুকতেন।

সেবার মামা বাড়ি সবেমাত্র ঢুকেছি। দাদু বেরচ্ছেন যজমান বাড়ি,শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে। আমাকে সঙ্গে নিলেন।

বাড়ি ফিরে মার সঙ্গে তর্ক করেছিলাম খুব। বলেছিলাম-

" যে পথ মাড়িয়ে তুমি স্নান করো, সেই পথ হেঁটে দাদু যজমান বাড়ি গেলে ওরা পিতলের থালায় দাদুর পা রেখে,পা ধোয়া জল খায়! ছিঃ। "

পরে আরো বড় হয়ে মাকে বলেছিলাম-

"ধরো তুমি অসুস্থ হলে, রক্ত চাই। হিজবুল তোমাকে রক্ত দিলো। সে রক্তে কি তুমি বাঁচবে না মা?"

মা হাসতে হাসতে বলেছিল-

"আমি যেদিন মরবো সেদিন তুই চিকিৎসার সুযোগই পাবি না। টুক করে গড়িয়ে পড়বো যমের কোলে।"

ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হয়েছে অনেক ক্ষণ, একে একে সবাই গেছে চলে। ডাক্তার বাবু বলেছেন কাল মাকে রক্ত দিতে হবে,পরশু অপারেশন। তারপর আর দিন পাঁচ রেখে মাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। মায়ের রক্ত আর হিজবুলের রক্তের গ্রুপ এক। হিজবুলকে কাল সকাল সকাল আসতে বলেছি।

দিন কয়েকের টানা ধকলে শরীর আর পেরে উঠছে না। ওয়েটিং রুমের চেয়ার গুলো প্রায় ফাঁকা। গোটা তিনেক

চেয়ার নিয়ে একটু গা এলিয়ে দিলাম। মুহূর্তে ক্লান্তিতে বুজে এল চোখ। হঠাৎ বেজে উঠল ফোনটা। এক দৌড়ে মায়ের কেবিন। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে,কাচের দেওয়ালের ওপারে ডাক্তার,নার্স সবাই খুব ব্যস্ত। ডাক্তার বাবুর চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল হল্টার মনিটরে। প্রেসার ক্রমশ নিচের দিকে নামছে, আশি-একশকুড়ি থেকে সত্তর-নব্বই। অক্সিজেন সেচুরেশন কমে আঠাত্তর পার্সেন্ট। মাকে অক্সিজেন দেওয়ার তোড়জোড় চলছে।

অপারেশনের পর আজ দিন তিন হয়ে গেল মায়ের কোনো ইমপ্রুভমেন্ট নেই,বরং আরে অবনতি হচ্ছে যেন। ডাক্তার বাবুর কথা মতো দু বোতল রক্ত দেওয়া হয়েছে, যা যা ঔষধ প্রয়োজন সবটাই। ডাক্তার বাবু বলেছিলেন অপারেশন সাকসেসফুল। হয়েছিলও তাই, অপারেশনের পরের দিন মা আমাদের সঙ্গে কথা বলল, নিজের হাতে ঔষধ নিল নার্সের থেকে। আর সেই পেসেন্ট কিনা আজ হল্টার মনিটরিং- এ।

তাহলে কি অপারেশনে কোনো ত্রুটি থেকে গেল! এ-কদিন ডাক্তার বাবুর সঙ্গে কথা বলতে গেলে একটু যেন গা-ছাড়া ভাব। আই সি ইউ এর বাইরে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামছি। অজান্তে মায়ের ফ্যাকাসে দৃষ্টি চলে এলো চোখে।

তবে কি হিজবুলের রক্তটা!

হিজবুল যেদিন রক্ত দেয় ও চেয়েছিল মার সঙ্গে দেখা করতে। আমি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু কি ভাবে বলি। শেষ পর্যন্ত মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে হিজবুল বলেছিল-

" চিন্তা করবেন না আমরা সবাই আছি, ছোট্ট একটা অপারেশন, ঠিক সুস্থ হয়ে ওঠবেন।"

মা কেমন যেন একটা ফ্যাকাসে দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে।

আমি মায়ের চোখে চোখ রাখতে পারি নি। একটা অপরাধ বোধ কাজ করছিল ভেতরে ভেতরে। ফোন ধরার ভান করে বেরিয়ে এসেছিলাম চেম্বার থেকে।

কদিন যাবৎ এই চিন্তাটা আমাকে অস্থির করে তুলছে।

 মায়ের পালস্ ফ্লাকচুয়েট করছে। ডাক্তার বাবু আরো বেশি অস্থির হয়ে উঠছেন। কি একটা ইনজেকশন গেঁথে দিলেন। হল্টার মনিটরের সংখ্যাগুলো পাল্টে যাচ্ছে সেকেন্ডে সেকেন্ডে।

ডাক্তার বাবু মায়ের হাতটা নিয়ে কি যেন একটা বোঝার চেষ্টা করলেন। সেই খোঁজার চেষ্টাটা আরো বেশি করে মনযোগী হয়ে উঠল। তারপর নিজের নিচের ঠোঁটকে উপরের ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে, ঘাড়টাকে বার দুই দোলালেন। কাচের দেওয়াল ভেদ করে ডাক্তার বাবুর দীর্ঘশ্বাস ফুটল আমার বুকে। অপ্রার্থিত পরাজয়ের গ্লানিতে তাঁর মুখখানি কালো দেখালো বোধহয়। মায়ের শরীরের উপরে রাখা সাদা কাপড়টাকে ডাক্তার বাবু টেনে দিলেন মার মুখ পর্যন্ত। আমি টাল খেয়ে বসে পড়লাম মেঝেতে।

বাইরে আমার বন্ধুরা এসে জটলা পাকাচ্ছে একটা কিছু গন্ডগোল হবেই। যা হয় হোক আমার আর কিছু ভাল লাগছে না। মায়ের মাথার কাছে বসে আছি। এখনো বাবাকে এ খবর দেওয়া হয় নি। এসময় মনটাকে শক্ত করতে হবে। ছোট বোন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মায়ের মাথাটা গড়িয়ে গেছে বালিশের নিচে। মাথাটা বালিশের উপর রাখলাম। হাতে কি সব যেন লাগল। মায়ের বালিশের তলায় দেখি এক গাদা ঔষধ। তার মানে মা একটাও ঔষধ খায় নি অপারেশনের পর। নিজেকেই নিজের শেষ করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। এ তো মায়ের ইচ্ছা-মৃত্যু,আর এ মৃত্যুতো কেবল আমার জন্য। আমি যদি হিজবুলের রক্তটা!

ততক্ষণে বাইরের জটলাটা বেশ জটিল আকার নিয়েছে। ঝনাৎ করে একটা কাঁচ ভাঙল।

কাচ ভাঙার শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। ধড়পড়িয়ে উঠে বসলাম। অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে চলছে হৃৎপিন্ড। কপালে ছড়িয়ে রয়েছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রুমাল বের করে মুছে নিলাম ঘাম। ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগল। দারোয়ানের নজর এড়িয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম মায়ের কেবিনের দিকে। উঁকি দিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলাম। মা বেডে বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। নার্সটা মোবাইলে হাবিজাবি বকে চলেছে সমান তালে।

পকেট থেকে ফোনটা বের করে হিজবুলের নাম্বারটা সার্চ করলাম। গুটিগুটি পায়ে বেরিয়ে এলাম ওয়েটিং রুমে।

 হিজবুলকে বললাম মা ভাল আছে, রক্ত লাগবে না। ফোনটা রেখে পা বাড়ালাম ব্লাড ব্যাঙ্কের দিকে।

 

                         লিপ-ইয়ার

সনোজ চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা  

......হাতের দলাপাকা কাগজটাকে ঋতব্রত ছুঁড়ে মারল বাবা নিকুঞ্জর দিক। নেশায় তা লক্ষ্য ভ্রষ্ট হল। কাগজটা তুলে নিয়ে ঋতব্রত ফের ছুঁড়ল নিকুঞ্জের দিকে। এবার কাগজটা গিয়ে লাগল নিকুঞ্জের মুখে। কাগজটা মুখে লাগার সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল চোখ-মুখ।

সরাসরি ঋতের দিকে প্রশ্ন করল নিকুঞ্জ-

-- কি চাই?

-- কাগজটা খুলে দেখ্

    কালবেলা রোজকার দিনের মতো স্নান সেরে শুদ্ধ চিত্তে গুরুদেবের চরণে ফুল দিয়ে প্রণাম সারল নিকুঞ্জ। গুরুদেব নিশ্চলানন্দের কাচ বন্দী মুখটা হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে নিকুঞ্জর দিকে। তার সিদ্ধান্তে যেন গুরুদেবও সুপ্রসন্ন। নিকুঞ্জ দাস বড় আশায় ছেলের নাম রেখেছিল ঋতব্রত দাস। আশা ছিল তার নিজের জীবন যেমন সত্যের চরণে নিবেদিত তার সন্তানও তেমনটাই হবে। হয় নি ঋতব্রত নামটাই হয়েছে ব্যর্থ। তাই নিকুঞ্জ যে ভাবে আজকের নিকুঞ্জ হয়েছে সেভাবেই সে তার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চায়। আর সেই কারণে বিজ্ঞাপন।

     নিকুঞ্জ বিজ্ঞাপনের রিপ্লাইগুলো বিছানায় ছড়িয়ে বসেছে। সব গুলোই যে কাজের হবে এমন নয়। এধরনের বিজ্ঞাপনে অনেকে খিস্তি করেও রিপ্লাই করবে, সেগুলোকে সবার আগে সরিয়ে ফেলা চাই। বাকিদের মধ্যে থেকে খুঁজে নিতে হবে সঠিক সন্ধান। সামনা সামনি দেখা সাক্ষাৎ, বংশ- পরিচয়, কথোপকথন সে এক দীর্ঘ পথ।

     একটা দলা পাকানো কাগজ নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকল ঋতব্রত। খুব ভাল করে না দেখলেও বোঝা যায় আকণ্ঠ নেশায় সে আচ্ছন্ন। পা-দুটো ঠিকঠাক ফেলতেও পারছে না। দরজায় একটা ধাক্কা খেয়ে, বাঁ-দিকে টাল খেয়ে দু-হাত এগিয়ে, আলনার জামা-কাপড় গুলো ধরে কোন রকমে স্থিত হল সে। নিকুঞ্জ চোখ তুলে একবার দেখল ছেলেকে। অবাক লাগল এটা ভেবে এতো তাড়াতাড়ি তো ঋতের ফেরার কথা নয়। দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার সময় দেখল, তারপর আবার নিজের কাজে ডুবে গেল।

    এখন ঘরটা থমথমে। হয়তো একটু পরেই এখানে সংসারের অতি নিবিড় সম্পর্ক পিতা-পুত্রের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হতে চলেছে, সেটা বর্তমান পরিস্থিতি দেখে আন্দাজ করা মুশকিল। এটাই হয়, প্রলয়ের আগে চরাচরে নেমে আসে চরম শান্তি। থমথমে আর গুমরে থাক ছাই চাপা আগুনেই গর্ভস্থ থাকে চরম বিপর্যয়ের ভ্রূণ।

    হাতের দলাপাকা কাগজটাকে ঋতব্রত ছুঁড়ে মারল বাবা নিকুঞ্জর দিক। নেশায় তা লক্ষ্য ভ্রষ্ট হল। কাগজটা তুলে নিয়ে ঋতব্রত ফের ছুঁড়ল নিকুঞ্জের দিকে। এবার কাগজটা গিয়ে লাগল নিকুঞ্জের মুখে। কাগজটা মুখে লাগার সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল চোখ-মুখ।

সরাসরি ঋতের দিকে প্রশ্ন করল নিকুঞ্জ-

-- কি চাই?

-- কাগজটা খুলে দেখ্

এটা নতুন কিছু ঘটনা নয়, এর আগে বহুবার নিকুঞ্জকে তুই তোকারি করেছে ঋত। দলা পাকানো কাগজটায় তেলের ছপছপ দাগ। কাগজটা খুলে নিকুঞ্জ বুঝতে পারল কেন একটু আগে চোখ-মুখ জ্বালা করছিল। কাগজটায় ঝাল-মটরের লঙ্কা গুঁড়ো লেগে রয়েছে। সম্ভবত এই কাগজটাতে ঝাল-মটর রেখে মদ্য পান হচ্ছিল সাগরেদদের সঙ্গে।

    কাগজটার ভেতরে নিকুঞ্জর দেওয়া সেই বিজ্ঞাপন। এতক্ষণে ঋতের তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কারণটা বুঝতে পারল নিকুঞ্জ। কাগজটা সরিয়ে নিজের কাজে ফের ফিরে গেল সে।

বাবাকে নিরুত্তাপ দেখে ঋত ঝাঁঝিয়ে উঠল-

- কি হল? ওটা কি?

- তুমি ঠিকই ধরেছ, এটা একটা বিজ্ঞাপন।

- বিজ্ঞাপন! না আমার সুইসাইড নোট? এর চেয়ে জন্ম দিয়েই কেন আমাকে মেরে ফেলা হয় নি?

- কোন বাবা-মা তাদের সন্তান কে মেরে ফেলতে চায়? তুমি তো জানো তোমাকে জন্ম দিতে গিয়েই তোমার মা মারা গিয়েছিলেন।

- আমাকে! আমি যতটুকু জানি সে তো চিররুগ্না।

- বাঃ। সাবাস। আমি অবাক হচ্ছি..

- আমি অবাক হচ্ছি,তার কথা আসছেই বা কেন! দাঁত দাঁত চেপে কথা কটা বলল ঋত, অভিযোগ করল --

- জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যে মা ছেলেকে অনাথ করে! মাতৃস্নেহ যে কি, সে তো আমি বুঝলামই না।

মদের নেশায় ঋতব্রতের কথা গুলো স্পষ্ট হচ্ছিল না। তবে নিকুঞ্জের বুঝে নিতে খুব একটা কষ্টও হচ্ছিল না। লম্বা একটা শ্বাস ফেলে সে বলল---

- আমি একটুও অবাক হচ্ছি না, একথা তোমার পক্ষেই বলা সম্ভব। আমি মানছি তোমার মা ছিলেন না কিন্তু আমি তো আমার সবটুকু দিয়ে তোমার মা-বাবা দুই হওয়ার চেষ্টা করে গেছি।

- হুঁঃ, চেষ্টা করে গেছ, ঐ পর্যন্ত।

- হ্যাঁ চেষ্টা, চেষ্টাটাই শেষ কথা ঋত। তুমি তো কোনোদিন সেটুকুও করলে না। মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেছ কোনোদিন! মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে হয়। এই যে তোমার নাম ঋতব্রত, অর্থাৎ সত্য বলাই যার ব্রত। ঐ নামটি একদিনে হয়ে ওঠা যায় না। ওটাও একটা চেষ্টা। এমনকি সন্তান হয়ে ওঠাও একটা চেষ্টা।

--- যেমন বাবা হয়ে ওঠাও একটা চেষ্টা। হুঁঃ আর সে চেষ্টায় তুমি "কলম্বাসের কলকে"। যখন তুমি তোমার সম্পত্তি আমাকে দিতে চাইছ না তখন কিসের বাবা,কিসের চেষ্টা!

--- তুমি ভুল করছ ঋত, এ সম্পত্তি আমার নয়। আমার গুরুদেবের। তিনি বুঝেছিলেন তার সারা জীবনের সঞ্চয়কে সঠিক ভাবে মানুষের জন্য ব্যবহার করতে পারব আমি। তাই তিনি সেই গুরুদায়িত্ব আমাকে দিয়ে গেছেন। তিনি যে পথে আমাকে দিয়ে গেছেন আমি সেই পথে আর একজন সৎ মানুষের সন্ধান করেছি মাত্র।

--- তা সেই পথটি কি?

--- সে তোমার জেনে লাভ কি!

---তুমি তো লাভ লোকসানের কারবারি নয় বাবা। না কি আদপে পথ-টথ সব ঢপের চপ।

--- গুরুদেব বলেছিলেন লিপ ইয়ারের ঊনত্রিশে ফেব্রুয়ারি, রাত তিনটে পনের মিনিট একুশ সেকেন্ডে যে জন্মগ্রহণ করে সে সত্যবাদী হয়, পরকল্যানকামী হয়। কারণ ঐ লগ্নে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান হেতু এক অমৃতযোগ সৃষ্টি হয়। তার প্রভাবে জাতক অন্যদের থেকে অনন্য হয়। তার হঠাৎ করে প্রভূত সম্পদ প্রাপ্তি ঘটে এবং তার জন্মগত গুন দিয়ে সে সেই সম্পদকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করে। তাই বিজ্ঞাপনে ঐ লগ্নের জাতকের খোঁজই একমাত্র পথ।

--- আমি গ্রহ-নক্ষত্র, লগ্ন-তিথি এসব বুঝি না।আমি একটি সহজ সত্য বুঝি পিতার সম্পদে পুত্রের অবারিত অধিকার। তা তুমি কি তোমার ঐ গুরুদেবের অবাঞ্ছিত সন্তান? আমার ঠাকুমার শয্যায় কোন লগ্নে তার আগমন?

--- ঋতব্রত আমি তোমাকে অনেক সহ্য করেছি, আমার মা বা গুরুদেব সম্পর্কে আর একটি কথা বললে..

--- ঠিক আছে তোমার যখন আপত্তি আমি ঠোঁটে আঙুল দিলাম। তা পিতৃদেব বিজ্ঞাপনের নামে আমার কত নম্বর ভাই এর খোঁজ চলছে এটা। মানে তোমার কত নম্বর অবৈধ সন্তানের?

--- ছিঃ ছিঃ ছিঃ! তুমি এতো নিচে নামতে পারলে! তোমার জন্মের পর যখন তোমার মা মারা গেলেন তখন আমার পূর্ণ যৌবন,স্বচ্ছন্দে অন্য কাউকে জীবনে গ্রহণ করতে পারতাম। করি নি তোমার কথা ভেবে। পরিবার পরিজনের সব অনুরোধ সরিয়ে রেখেছিলাম এই ভেবে যে আসবে সে যদি তোমাকে সহজ ভাবে না নেয়। আমারও শরীর ছিল,তারও চাহিদা ছিল। আমি সবকিছু ত্যাগ করেছিলাম সে কি শুধু এ জন্য!

--- ওসব ভারি ভারি কথা তোলা থাক বাবা। তুমি ঐ সব রিপ্লাইয়ের কাগজ গুলো আমাকে দাও। আমি তোমার একমাত্র সন্তান এটাই একমাত্র কথা, তোমার সব সম্পত্তি আমার এটাই শেষ কথা। দাও কাগজ গুলো দাও।

ঋতব্রত কাগজগুলো ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য হামলে পড়ল নিকুঞ্জের উপর। নিকুঞ্জ অতি দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে ফেলতে চাইল কাগজপত্তর গুলোকে। বাপ বেটার চোর পুলিশ খেলা দিকে তাকিয়ে আছে নিশ্চলানন্দের ছবিটা। মদের নেশায় শরীর অশক্ত ও অবশ তবুও সাধ্য মতো চেষ্টা করছে ঋত। হঠাৎ টাল সামলাতে না পেরে পড়ল ধপাস্ করে।

নিকুঞ্জ চেয়ে দেখে সে মশারি ভেঙে সোজা পড়েছে মেঝেতে। মাটির মেঝে তাই বিশেষ আঘাত লাগে নি। হাত লেগে কাল সকালের জন্য রাখা পান্তা ভাত ছড়িয়ে গেছে চারপাশে। বৌ-টা ঘুমিয়ে আছে বেঘোরে। হারিকেনের বাতিটাকে একটু বাড়াল নিকুঞ্জ। দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা বলছে এখন রাত তিনটা বেজে পনের মিনিট হয়ে একুশ সেকেন্ড। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে কোমরে হাল্কা ব্যথা পেল নিকুঞ্জ। ব্যথাটা সামলে কোন রকমে তক্তপোশর নিচ থেকে বের করল বিয়েতে পাওয়া ট্রাংকটাকে। বাপের তৈরি কোষ্ঠীটা আজ পর্যন্ত ভালো করে কোন দিন দেখা হয় নি। শুনেছিল তার লিপ ইয়ারে ঊনত্রিশে ফেব্রুয়ারি তবে জন্ম লগ্নটা জানা নেই।

 

                        উৎসর্গ

সনোজ চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা  

...ডাক্তারবাবু মায়ের হাতটা নিয়ে কি যেন একটা বোঝার চেষ্টা করলেন। সেই খোঁজার চেষ্টাটা আরো বেশি করে মনযোগী হয়ে উঠল। তারপর নিজের নিচের ঠোঁটকে উপরের ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে, ঘাড়টাকে বার দুই দোলালেন। কাচের দেওয়াল ভেদ করে ডাক্তার বাবুর দীর্ঘশ্বাস ফুটল আমার বুকে। অপ্রার্থিত পরাজয়ের গ্লানিতে তাঁর মুখখানি কালো দেখালো বোধহয়। মায়ের শরীরের উপরে রাখা সাদা কাপড়টাকে ডাক্তার বাবু টেনে দিলেন মার মুখ পর্যন্ত। আমি টাল খেয়ে বসে পড়লাম মেঝেতে।

    আজ সিধু বাউরির ছুটি। নিদিষ্ট কোন ছুটি নয় হঠাৎ করে পাওয়া ছুটি। আজ সে রোদে রোদে ফেরি নিয়ে বার হবে না। সিধুর ঝাঁকায় সব পাবেন, একটা সংসারের টুকিটাকি যা যা দরকার চামচ, চাটু, হাতা, হাঁড়ি, বাটি, ঘটি, বটি, ছানতা, ছুরি, চুলের ক্লিপ, মাথার চিরুনি, মশলার ডিবে, সাবান কৌটো সব সবই।

অদ্ভুত একটা সুরে হাঁক পেড়ে গাঁ-গঞ্জে ফেরি করে বেড়ায় সিধু।

সেই ফেরিতে মাথায় অভ্যস্ত পাগড়ি, রোদে পুড়ে-আমা ইঁটের মতো কালচে লাল গায়ের রং, পায়ের জুতো ক্ষয়ে ক্ষয়ে গোড়ালি ছুঁয়ে যায় মাটি।

গাছের ছায়ায় ঝাঁকা নামিয়ে এক মুহূর্তের বিশ্রাম।

তারপর আবার সেই সুর দিয়ে হাঁক-

"সংসারের সোব জিনিস ছেলো, ভালো ভালো জিনিস ছেলো, হাতা ছেলো, মাথায় দেওয়া ফিতে ছেলো,মেয়ে মানসের আলতা ছেলো...।"

আজ একটু বিশ্রামের আশা জেগেছে সিধুর মনে। তার বারবার মনে হচ্ছে এবার একটু বিশ্রাম মিলবে, মিলবেই।

কমলা, সিধুর বউ। রগ উঠা, হাড়সার শরীরে একটা কাপড় জড়ানো অবয়ব। রোজ সকালে হাটপাড়ায় যায় ব্যাঙ্ক বাবুদের রান্না করতে। 

আজ সিধু বাউরির ছুটি। নিদিষ্ট কোন ছুটি নয় হঠাৎ করে পাওয়া ছুটি। আজ সে রোদে রোদে ফেরি নিয়ে বার হবে না। সিধুর ঝাঁকায় সব পাবেন, একটা সংসারের টুকিটাকি যা যা দরকার চামচ, চাটু, হাতা, হাঁড়ি, বাটি, ঘটি, বটি, ছানতা, ছুরি, চুলের ক্লিপ, মাথার চিরুনি, মশলার

ডিবে,সাবান কৌটো সব সবই।

অদ্ভুত একটা সুরে হাঁক পেড়ে গাঁ-গঞ্জে ফেরি করে বেড়ায় সিধু।

সেই ফেরিতে মাথায় অভ্যস্ত পাগড়ি, রোদে পুড়ে-আমা ইঁটের মতো কালচে লাল গায়ের রং, পায়ের জুতো ক্ষয়ে ক্ষয়ে গোড়ালি ছুঁয়ে যায় মাটি।

গাছের ছায়ায় ঝাঁকা নামিয়ে এক মুহূর্তের বিশ্রাম।

তারপর আবার সেই সুর দিয়ে হাঁক-

" সংসারের সোব জিনিস ছেলো, ভালো ভালো জিনিস ছেলো, হাতা ছেলো, মাথায় দেওয়া ফিতে ছেলো,মেয়ে মানসের আলতা ছেলো...।"

আজ একটু বিশ্রামের আশা জেগেছে সিধুর মনে। তার বারবার মনে হচ্ছে এবার একটু বিশ্রাম মিলবে, মিলবেই।

কমলা, সিধুর বউ। রগ উঠা, হাড়সার শরীরে একটা কাপড় জড়ানো অবয়ব। রোজ সকালে হাটপাড়ায় যায় ব্যাঙ্ক বাবুদের রান্না করতে।

আর একটু পরেই অনুষ্ঠান শুরু হবে। মা-বাবা বাড়ির সবাই মঞ্চে গিয়ে বসবে শুধু দিদিটাই যা থাকল না- কথাটা মনে হতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল বুধনের।

অবশ্য উজ্জ্বলা বলেছে,রান্না সেরে যত তাড়াতাড়ি ফেরা যায় তার চেষ্টা সে করবে।

মাঠ ভর্তি লোকজন। সারা বাউরি পাড়াতো বটেই, পাশের দু দশটা গ্রাম থেকে মেয়ে মদ্দ এসে হাজির হয়েছে পলাশচক সত্যসরণ হাইস্কুলের মাঠে।

মঞ্চে গণ্যমান্য অতিথিদের মধ্যে জড়সড় হয়ে বসে রয়েছে বুধনের মা-বাপ।

বুধনের জীবন সংগ্রামকে ভাবে-আবেগে কাব্যময় করে তুলছেন মাস্টার মশাইরা। সে সব কথা বুধনের কানে এসে পৌঁছচ্ছে না। তার চোখ দুটো মাঠের ভিড়ে হারিয়ে গেছে।

সাংবাদিকরা বুধনকে প্রশ্ন করল-

- কেমন লাগছে এই সাফল্যে?

- ভালো।

- তোমার লক্ষ্য কি?

- দিদির একটা সুন্দর বিয়ে।

- না মানে,বড় হয়ে কি হতে চাও?

- সেটা তো ভাবা হয় নি।

- এই সাফল্যের পেছনে কারা?

- সব্বাই। বাবা-মা-দিদি, মাস্টার মশাই, দিদিমণি সব্বাই।

- সবচেয়ে বেশি অবদান কার?

আশুবাবুর মুখ চকচক করছে, চেয়ারে বসা নেতাটি বুধনের মায়ের রান্নার কাজ ঠিক করে দিয়েছিল, সে ও আশায় বুক বেঁধেছে। হেডমাস্টার মশাই সারা বছর ফি নেন নি, তিনি আশায় আছেন। বুধন তার নাম বলুক। তা হলে আগামী বছরে শিক্ষারত্ন বাঁধা।

বুধনের চোখ দুটো মাঠের ভিড়টাকে হাতড়াচ্ছে। চোয়ালটা ধীরে ধীরে শক্ত হচ্ছে। হঠাৎই কি যেন একটা খুঁজে পাওয়ার আনন্দে তার মুখটা খুশিতে ডগমগিয়ে উঠল। হাতটা লম্বা করে তুলে ভিড়ে মিশে যাওয়া একটা মুখকে নির্দেশ করল বুধন। তার তর্জনীর নির্দেশে সেই মুখ, যে মুখ- দিদি হয়েও মায়ের, আত্মত্যাগের আবার অনুপ্রেরণার, সাধারণ হয়েও অনন্য, কিম্বা শুধুই উৎসর্গের।

ততক্ষণে বুধনের হাতে মাইক দেওয়া হয়েছে, সে বলছে-

- এই সাফল্য আমার নয় আমার দিদির। আমি যখন খুব ছোটো তখন দেখেছি লন্ঠনের আলোয় আমার দিদি লেখাপড়া করত। তখন তো নিষ্ঠা বুঝিনি, অভাব বোঝার বয়স হয় নি তাই সংগ্রামও বুঝিনি।

আসলে সে ছিল আমার দিদির এক নীরব সংগ্রাম। আজ আপনারা আমাকে সংগ্রামের সৈনিক বলছেন, সংগ্রামের প্রথম পাঠ আমি ওর থেকেই নিয়েছি, আমার দিদিই বুঝিয়েছে নিষ্ঠা কি।

অভাবের সংসারে দিদির আর আমার লেখাপড়ার খরচ বাবা আর কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। শরীরের সবটুকু পরিশ্রম সে সামর্থ্য জোগাড়ে হয়েছিল ব্যর্থ।

দিদি বাবাকে বলেছিল-

-" আমি লেখাপড়া বন্ধ করে দিচ্ছি বাবা। তুমি বুধনকে পড়াও। ওর মাথাটা বড্ড ভাল। দেখো একদিন ও পলাশচকের নাম উজ্জ্বল করবে।"

একজন সৈনিক যুদ্ধ করতে করতে নিশ্চিত জয় জেনেও যখন যুদ্ধ বিরতি মেনে নেন, তার যে মানসিক কষ্ট সেই কষ্টই আমি সেদিন দেখেছিলাম আমার দিদির চোখে-মুখে।

সেদিন আমার দিদি তার লেখাপড়াকে বলি না দিলে আমি এখানে আসতেই পারতাম না।

বুধনের শেষকথা গুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল কান্নায়।

উজ্জ্বলার এতোবড় একটা উৎসর্গ,এই মহান ত্যাগ, আকাশের মতো বিশাল মনটার খোঁজ পেয়ে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে ভিড়টা। জয়ধ্বনি দিচ্ছে সবাই সমস্বরে। হাতে হাতে সে উঠে এসেছে ভিড়ের মাথায়,শোভা পাচ্ছে মুকুটের মতো। লজ্জা আর অহংকার দুই মিলেমিশে অনন্য করে তুলেছে তার মুখখানি।

যে মুখখানি ভিড়ের মধ্যে আলাদা করা যায় না। সাধারণের থেকেও সাধারণ। শুধু চিনে নিতে হয়, খুঁজে নিতে হয়।

 
 

                       আব

সনোজ চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা  

...পুকুরের ডান পাড়ে দাওয়ায় বসে আছে বাবলু। উল্টো দিকের জ্বলতে থাকা প্যান্ডেলের আগুনে তার ছায়া ফুটে উঠেছে দেওয়াল জুড়ে। সে ছায়ামূর্তি তে আবটাকে আরো বড়ো দেখাচ্ছে।আগুনের আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বাবলুর মুখ। বিড়ির আগুনে সে মুখ জ্বলছে নিভছে আশার দোলাচলে। শ্রীতমাকে লগ্ন ভ্রষ্টার অপবাদ থেকে মুক্তি দিতে একটু পরেই যে বর সাজে সাজতে হবে তাকে।

‌   ট, ত্রিপল,বাঁশ,বাটাম,দড়ি-দড়া আলগোছে পড়ে। ফুলওয়ালা ছাদনা তলা সাজাচ্ছে। একটা হলদেটে রঙের পলিথিন পেপারে ডাই করে রাখা রজনীগন্ধা। গোলাপ ফুল গুলো কাঁটা জাগিয়ে পলিথিনের একটা কোনে নির্লিপ্ত পড়ে। মোবাইলের হেডফোন কানে গুঁজে কাজ করতে করতে ফুল গুলোর উপর জলের হালকা ঝাপটা মারল ফুলওয়ালা ছোকরাটা। একটা ধোগড়া ছু্ঁচে পরপর ফুল গুলোকে গাঁথছে ছোকরা।
বাঁশের মাচার উপর বসে বিড়ি ফুঁকছে বাবলু।
ধীমান চোখ থেকে চশমা নামিয়ে,চশমাটা কাপড়ের খুঁটে মুছছে। এরই ফাঁকে চোখ জোড়া পায়চারি করে এল চারদিক। দায়িত্ব নেয়াটাই শেষ কথা নয়,কাজটাকে চোখে চোখে রাখা সবচেয়ে বড় কথা।
ধীমান শ্রীতমার বড় কাকা। সপ্তাহ খানেক তার ব্যস্ততার শেষ নেই। আর হবেই না বা কেন, তিন ভাইয়ের ঘরে একমাত্র মেয়ে শ্রীতমা।
কত দেখা দেখি,পছন্দ অপছন্দের বেড়া টপকে পাত্র পাওয়া গেছে। পাল্টি ঘর, ওরাও খুঁজছিল বনেদী পরিবার। হিজলপুরের পাশের ব্লক নেতাইচকে পাত্রের আদি বাড়ি। সুবিমল বাবুর জলপাইগুড়িতে চা বাগান আছে। রীতেশ সুবিমল বাবুর একমাত্র ছেলে। তিন বারের চেষ্টায় বি.এ পাশ দিতে পারে নি বটে। তবে তাতে কি যায় আসে, মস্ত বড় বড়লোক রীতেশরা। রীতেশের সঙ্গে শ্রীতমার ঠিকুজির মিলও হয়েছে রাজযোটক। হাতের কাছে এমন সুযোগ কোনো পক্ষই হাতছাড়া করতে চায় নি। তাই চটজলদি বিয়ের বন্দোবস্ত।
- 'বাবলু বাবা একটু তাড়াতাড়ি কর, এভাবে এগোলে বউ ভাতের পরের দিনেও কাজ শেষ হবে না।'
‌চশমাটাকে নাকের আগায় রেখে,ভ্রু-জোড়া কপালে তুলে কথাগুলো বলল ধীমান।
বিড়িতে একটা লম্বা টান দিল বাবলু, ধোঁয়াটা গোল গোল করে ভাসিয়ে দিল বাতাসে।
বাঁশের মাচা থেকে ঝুপ করে নামল ধীমানের গায়ের কাছে। নিজেকে একটু সরিয়ে নিল ধীমান। বাবলুর পা দুটো নরম মাটিতে সামান্য বসে গেল।
সে দিকে ইঙ্গিত করে বাবলু বলল-
- 'কাকা দেখছো তো অবস্থা- পা বসে যাচ্ছে, সকালে ঐ বৃষ্টিটা না হলে এতক্ষণে কাজ কমপ্লিট হয়ে যেতো।'

বাবলুর গলায় গামছাটা শৌখিন ভাবে জড়ানো। নয় নয় করে বছর সাত হয়ে গেল এই লাইনে। এখন ডেকোরেশন এর পাশাপাশি রান্নার সাজ সরঞ্জামও ভাড়া দেয় কাত্যায়নী ডেকোরেটার্স। মায়ের নামে নাম রেখেছে বাবলু। নেই নেই করে আরো পাঁচ-ছয়টা বাড়ির হাড়ির দায় কাত্যায়নী ডেকোরেটার্স এর ঘাড়ে। হারুন,মন্টা,ঝড়ু, নান্টু এরা বাবলুর পারমান্যান্ট এমপ্লয়ি। কাজ নিয়ে আজ পর্যন্ত কারো কাছে কথা শুনতে হয় নি বাবলুকে। সময়ের আগে কাজ শেষ করে দড়ি-দড়া গুছিয়ে পাটিকে নিশ্চিন্ত করেছে বরাবর।শুধু তার নিজের গ্রাম হিজলপুর নয় পাঁচ গ্রামে তার কাজের সুনাম আছে। নিজে মালিক হলেও হেড মিস্ত্রি সে। কোথায় ভাল কাপড় লাগাতে হবে, কোন জায়গাটা খুব একটা লোক জনের নজরে আসবে না অথাৎ পুরানো, রং চটা কাপড়ে ম্যানেজ হয়ে যাবে মেশিনের মতো নির্ভুল কষে নিতে পারে বাবলু। ধীমানদের বড় পুকুরের ডান পাড়ে মাটির বাড়ি ছিল বাবলুর বাপের। ধীমানের ঠাকুরদা বাবলুর ঠাকুরদার বাপকে পুকুর পাড়ে বসিয়েছিল কোর্ফা প্রজা 

হিসাবে। বছর পাঁচ হল মাটির বাড়ি ফেলে পাকা বাড়ি বানিয়েছে বাবলু।

ধীমানরা তিন ভাই। বড় ধীরেশ-শ্রীতমার বাবা, মেজ ধীমান আর ছোট ধৃতেশ।
এককালে হিজলপুরের জমিদার ছিল ধীরেশদের ঠাকুরদা। সেই জমিদারির ভাগ বাটোয়ারায় ধীরেশদের বাপও পেয়েছিল বিঘা সত্তর। বামফ্রন্টের ভূমি সংস্কার কেড়ে নিল সব জমি জমা।
এখন নামেই তালপুকুর, ঘটি ডোবে না অবস্থা। পুরানো দালান গুলো বিপদজনক ভাবে ঝুর ঝুর করে ঝরছে। অবস্থার ফের, শরিকি ঝামেলায় জেরবার অবস্থা।
ধীমান বিয়ে থা করে নি। একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। তিন ভাইয়ের জোড়া সংসার,তবে সংসারের সব দায় এক প্রকার ধীমানের। শ্রীতমাকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছে ধীমান, লেখাপড়া আদর আবদার সবই পূরণ করেছে সে। সে দিক থেকে ধীমানই কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা বললে কম বলা হবে।
এর মধ্যে ছেলের বাড়ি থেকে হলুদ নিয়ে ছেলের বাড়ির লোক এসে হাজির।
হাতের কাজ ধরা রইল হাতে, বাবলু লোক গুলোকে দেখতে থাকল উল্টে পাল্টে।
- 'আসুন, আসুন। পথ চিনতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো?'

ধীমান আদুরে গলায় কথা গুলো বলতে বলতে ওদের নিয়ে সোজা চলে গেল অন্দরমহলে।বাবলুর নির্লজ্জ চোখ দুটো জানালা-দরজা টপকে সোজা চলে গেছে শ্রীতমাদের ভিতর বাইরে। এ বাড়ির প্রতিটা ইঁটের খবর সে জানে।গায়ে হলুদ ব্যাপারটাই কেমন যেন অসভ্য অসভ্য। এবার তুমি অন্যের শয্যা সঙ্গিনী হবে তার জন্য শরীরের আনাচ কানাচের ময়লা,গন্ধ গুলো সরিয়ে ফেলো। তাও নিজে সরালে কথা ছিল না। শ্রীতমার শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর পাঁচ জনের দশটা হাত। লালপাড় শাড়িটা হাঁটু পর্যন্ত উঠে এসেছে। কাঁচা হলুদে পায়ের গোছ দুটো হয়ে উঠেছে আরো আকর্ষণীয়। ফর্সা চওড়া পিঠে লেপ্টে গেছে হলুদ, ঘাড়ের কাছের চুল গুলোতেও হলুদের ছোপ। যতবার ঘাড়ের কাছে হলুদ মাখা হাত যায় ততবারই শিহরণে শ্রীতমার ঘাড় বেঁকে যাচ্ছে বারে বারে। নিজের অজান্তে গামছার তলা দিয়ে হাত চলে গেছে ঘাড়ে। সরে গেছে গামছা। হাতটা উঁচু ঢিবির মতো আবটার উপরে যেতে সম্বিৎ ফিরে পায় বাবলু।ঘাড়ের কাছে কুমড়োর মতো ঝুলে থাকা আবটা সবসময় গামছার আড়ালে লুকিয়ে রাখে বাবলু। জন্মের সময় থেকে বাপ দুটো জিনিস দিয়ে গেছে তাকে অনটন আর ঘাড়ের উপর জন্ম বোঝা ঐ আবটা।শৈশব থেকে দুটোই বাড়তে শুরু করে। বড় হয়ে নিজের চেষ্টায় অনটনকে বাগে আনতে পারলেও আবটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি বাবলু। শরীরবৃত্তীয় এসব জিনিস কতটাই বা মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব খাদ্যগুণ বোধহয় একাই শুষে নিয়েছে আবটা। একটু একটু করে বড় হয়েছে আর তাকে করে তুলেছে বিকৃত দর্শন। এই আবটাতে তার তো কোনো হাত ছিল না অথচ আবটার জন্য ছোটবেলা থেকে ব্যঙ্গ,বিদ্রূপ পিছু ছাড়ে নি তার। কতবার বন্ধু বান্ধবের কাছে খোরাক হয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে কেঁদেছে বাবলু। মা মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেছে-- 'সবাই তো আর রাজপুত্তুর হয়ে জন্মায় না বাবা। ভগবান গনেশকেও তো হাতির মতো দেখতে। তবুও তো সবাই তাঁকে পুজো করে। দেখবি একদিন তোকেও সবাই ভালবাসবে।'

সে সব সময় মায়ের কথায় বাঁচবার শক্তি পেয়েছে বাবলু।
আজ অবস্থা ফিরেছে। পাকা ঘর,কিছু জমি জমাও হয়েছে কিন্তু ভালবাসার মানুষটি জোটে নি। মাঝেমাঝে বাবলুর মনে হয়, কি লাভ এতো খাটা-খাটুনি করে?
এতো টাকা পয়সা কার জন্য, কিসের জন্য রোজগার করা!
কত বিয়ের মণ্ডপ সাজিয়ে ফেলল সে। অথচ তার বিয়েটাই হলো না। শুধু মাত্র বিকৃত আবটার জন্য তাকে কেউ পছন্দ করে নি আজ পর্যন্ত। এমনকি তার ছোটবেলার খেলার সঙ্গীও কদিন আগে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল আতঙ্কে।
ছোটবেলা বাবলুর খেলার সঙ্গী ছিল শ্রীতমা। কাত্যায়নীদেবী যখন জমিদার বাড়ি মুড়ি ভাজতে যেত তখন বাবলুর বয়স ছয় বা সাত। অতো ছোটো বাচ্চাকে তো আর ঘরে ফেলে আসা যায় না। সঙ্গে নিয়ে যেত কাত্যায়নী। মা যত সময় মুড়ি ভাজত তত সময় বাবলুই ছিল শ্রীতমার খেলার সঙ্গী। শৈশব তো আর রাজা-প্রজা বোঝে না, সুন্দর-অসুন্দর দেখে না। শৈশব ছেলেখেলার সময়। মন যাকে ধরে তার কাছে সব সময় থাকতে চায়। কখনও কখনও জমিদার কন্যা চলে আসত বাবলুদের মাটির ঘরে।
বাবলু ও শ্রীতমার ভালবাসা শৈশব পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল কৈশোরে। বাবলুর লেখাপড়া না হলেও শ্রীতমার স্কুল গেটে রোজদিন সাইকেল নিয়ে হাজির হয়ে যেত সে।
সে দিন সন্ধ্যা গাঢ় হয়েছে, ধীমান ইষ্ট দেবতাকে ঠাকুর শীতল দিতে যাচ্ছিল। নাটমন্দিরের অন্ধকার ভেঙে কার যেন গলা শুনতে পেল ধীমান। এগিয়ে গিয়ে প্রদীপের নরম আলোয় যা দেখেছিল তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করত না ধীমান। তার স্নেহ ভালবাসাকে নোংরা করছে তাদেরই আশ্রিত কোর্ফা প্রজা।
সেদিন রাতে বাপ মরা বাবলুকে ধীমানরা তিন ভাই মেরেছিল বেদম। ঘরের খড়ের চালে আগুন লাগিয়ে বেঘর করতে চেয়েছিল ওদের। কাত্যায়নীদেবী হাতে পায়ে ধরে শেষ রক্ষা করেন। তবে ধীমান বুঝিয়ে দিয়েছিল তারা আজও জমিদার আর ওরা কোর্ফা প্রজা।
তারপর থেকে আর কোনো দিন বাবলু জমিদার বাড়ির আনাচ কানাচ দেখেনি। পথে ঘাটে আর পাঁচ জনকে এড়িয়ে খুব সতর্কতায় কখনো সখনো দেখে নিয়েছে শ্রীতমাকে। রাজা, প্রজা এই শব্দগুলো ডিঙিয়ে তার মন থেকে থেকে ভেসে বেড়িয়েছে তার ফেলে আসা শৈশবে। সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে- ঝুপ করে সন্ধ্যা নামল তাদের উঠোনে,ছোট্ট একটা ঘোমটা শরীর শাঁখ বাজাচ্ছে তুলসীতলায়। প্রদীপের আলোয় সেই ঘোমটা ভেঙে বারবার ফুটে উঠেছে শ্রীতমার মুখ।
আবটা যতই একটু একটু করে বড় হয়েছে আর ততই স্বপ্নদৃশ্য গুলো অস্থির করেছে বাবলুকে।
একদিন বাবলু স্নান করছিল বড় পুকুরে, শ্রীতমা যাচ্ছিল স্কুল। অসাবধানতায় গামছা সরে যায় আবের উপর থেকে আর তা দেখে আঁতকে উঠেছিল শ্রীতমা।
তারপর থেকে শ্রীতমা যত সুন্দরী হয়েছে ততই গামছার আড়ালে আবটাকে ঢাকতে তৎপর হয়েছে বাবলু।
আজ সেই শ্রীতমার বিয়ের প্যান্ডেল সাজাতে হচ্ছে তাকে। অনিচ্ছায় আচ্ছন্ন সে, হাত চলছে না তবুও একপ্রকার জোর করেই করতে হচ্ছে।
ঝলমল করছে সন্ধ্যা। অতিথি অভ্যাগতরা আসতে শুরু করেছে। মাচায় বসে সানাই বাজাচ্ছে জন তিনেক লোক। জমিদারের মেয়ের বিয়ে বলে কথা। আলোকিত প্যান্ডেল ফুটে উঠেছে বড় পুকুরের জলে। পুকুরের ডান পাড়ে দাওয়ায় বসে আছে বাবলু।
তার দুচোখ ভরা স্বপ্ন-
পান দিয়ে ঢাকা শ্রীতমার মুখ। বেনারসী, গা ভরা গহনা, ফুলের সাজ, রঙীন আলো অপরূপা করে তুলেছে তাকে। তসরের ফিনফিনে পাঞ্জাবির উপর থেকে স্পষ্ট প্রতীয় মান আবটা। শ্রীতমার পরিয়ে দেওয়া রজনীগন্ধার মালায় ঢাকা পড়ে গেছে বাবলুর আবটা। হোমের আগুনকে প্রদক্ষিন করছে বাবলু ও শ্রীতমা। আশীর্বাদী ধান দূর্বা ছুড়েছে ধীমান, ধীরেশ আর ধৃতেশ।
একটা বিড়ি বের করল বাবলু। বিড়িটাকে ধরানোর আগে দু- আঙুলে হাল্কা দোলে নিল বাবলু। নেমে এল দাওয়া থেকে। বিড়িটা ধরিয়ে আগুনটা গুজে দিল প্যান্ডেলের কাপড়ে। আর দ্রুত নিজেকে সরিয়ে নিল দাওয়ায়।
দাউদাউ করে জ্বলছে প্যান্ডেল। বড় পুকুরের জলে ধরা পড়া আলোকিত ছবিটা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। বালতি,কলশি,গামলা যে যেভাবে পারে জল ছুড়ে দিচ্ছে আগুনে। দানবের মতো দাউদাউ করে জ্বলছে প্যান্ডেলের সিন্থেটিক কাপড়, কাঠ -কাঠামো। উদভ্রান্তের মতো ছোটাছুটি করছে ধীমান। শ্রীতমার চন্দন সাজ ধুয়ে গেছে চোখের জলে। রক্ষণশীল পাত্র পক্ষ এই অশুভ ঘটনাকে আরো বড় কিছু দুর্ঘটনার পূর্বাভাস ধরে নিয়ে ফেরার তোড়জোড় শুরু করছে। সুবিমল বাবুর হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করছে ধীরেশ।
পুকুরের ডান পাড়ে দাওয়ায় বসে আছে বাবলু। উল্টো দিকের জ্বলতে থাকা প্যান্ডেলের আগুনে তার ছায়া ফুটে উঠেছে দেওয়াল জুড়ে। সে ছায়ামূর্তি তে আবটাকে আরো বড়ো দেখাচ্ছে।
আগুনের আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বাবলুর মুখ। বিড়ির আগুনে সে মুখ জ্বলছে নিভছে আশার দোলাচলে। শ্রীতমাকে লগ্ন ভ্রষ্টার অপবাদ থেকে মুক্তি দিতে একটু পরেই যে বর সাজে সাজতে হবে তাকে।

 

                        অপাদপ

সনোজ চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা  

... আসলে তার জীবনে যে রং-এর কোনো অর্থই নেই।সন্তানহীন জীবন তো অনেকেরই, তবুও তাদের জীবন সৃজার মতো এতো ভয়ংকর বিবর্ণ নয়। বেঁচে থাকা কি কেবল ভাত-কাপড়ে বেঁচে থাকা! এ ভাবনায় আজকাল আর একটুও অস্থির হয় না সৃজা। একটু একটু করে ভালবাসাহীন, অযত্নের যাপনে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে সে।

    বাথরুমের বড় আয়নাটায় শরীরটা ধরা পড়তেই লজ্জা পেয়ে গেল সৃজা। 
উন্মত্ত উল্লাসে শরীরের ভাজে ভাজে পরম যত্নে মেখে নিল আবির। 
তার শরীরও তো রঙীন হতে চায়। 
পেতে চায় রং-এর আবেশ।
যদিও বরাবরের মতো আজও হোলি এসেছিল তাদের পাড়ায়। 
পাগল করা হোলি।
পাশের বাড়ির মিত্র বৌদি, দোস্তিদার মাসিমারা অনেক ডাকাডাকি করে শেষ পর্যন্ত ফিরে গিয়েছিল হাত ভরা রং নিয়ে।
হাজার ডাকেও দরজা খোলে নি সৃজা।
আসলে তার জীবনে যে রং-এর কোনো অর্থই নেই।
সন্তানহীন জীবন তো অনেকেরই, তবুও তাদের জীবন সৃজার মতো এতো ভয়ংকর বিবর্ণ নয়। 
বেঁচে থাকা কি কেবল ভাত-কাপড়ে বেঁচে থাকা! 
এ ভাবনায় আজকাল আর একটুও অস্থির হয় না সৃজা। একটু একটু করে ভালবাসাহীন, অযত্নের যাপনে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে সে।
সাত সকালে সুপ্রতিম রং খেলতে বেরিয়ে যাওয়ার পর একবার মাত্র দরজা খুলে ছিল সে।
দরজা খুলেছিল ব্রত ঠাকুরপোর জন্য।
ব্রত ঠাকুরপো রং দিয়ে ফিরে যাওয়ার পর সেই যে ছিটকিনী দিয়েছিল আর দরজা খোলে নি।
দরজা বন্ধ করে ফিরিয়ে দিয়েছিল সবার সব রং।
অথচ রং খেলবে বলে হলুদ, সবুজ আরও কত রং-এর আবির আনিয়েছিল সুপ্রতিমকে দিয়ে।
মাঝেমাঝে কি যে হয়!
সমস্ত অন্ধকার করে নিজেকে গুটিয়ে নেয় সৃজা। 
জীবনের সব আচার-বিচার, আয়োজন-প্রয়োজন থেকে মুখ ফিরিয়ে বৈরাগ্যের হাত ধরতে সাধ হয় তার।


 

তাইতো সকাল থেকে নিজেকে একা করে রেখেছে সে।
কিন্তু এখন হঠাৎ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার শরীর মেতে উঠেছে রং-এর নেশায়।
নিজে নিজেই পাগলের মতো মাখছে রং। 
নিচ্ছে রং-এর আদর।

শাওয়ার থেকে ঝমঝম করে নেমে আসছে জল আর সেই জলে একটু একটু করে ধুয়ে যাচ্ছে সব রং। যেমন করে বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতে ফ্যাঁকাশে হয়ে গিয়েছিল তাদের দাম্পত্যের রং। 
এখন লাল-হলুদ-সবুজ জলে মিশে বয়ে চলেছে শরীর উপত্যকা ধরে।

শাওয়ারের শব্দ পেরিয়ে ডোর বেলটা তার কানে বাজতেই শরীর থেকে হোলীর সমস্ত রং গুলোকে সরিয়ে ফেলল সে। 
দ্রুত গুছিয়ে নিল নিজেকে।
ততক্ষনে দরজা ধাক্কাতে শুরু করেছে সুপ্রতিম।

তড়িঘড়ি দরজা খুলে চমকে উঠল সৃজা। 
এক মুখ রং মেখে দরজায় দাঁড়িয়ে সুপ্রতিম। মদের নেশায় পা' দুটো টলছে। 
চোখ দু'টো কুঁকড়ে গিয়ে দৃষ্টি হয়ে গেছে সরু। বাঁ হাতে শক্ত করে ধরা দরজার ডান চৌকাঠ আর ডান দিকের কোমর ধনুকের মতো বেঁকে ছুঁয়েছে বাঁয়ের চৌকাঠ। 
নেশার ভারে ঝুঁকে পড়েছে মাথা। 
- দরজাটা খুলতে দেরি হল যে বড়!
তা কি রাজকার্য হচ্ছিল মহারানীর?
নেশা জড়ানো গলায় কথাকটা বলল সুপ্রতিম। কথাগুলোর সঙ্গে বেরিয়ে এল মদের কটু গন্ধ।
এ গন্ধে এখন আর গা গুলিয়ে ওঠে না।
বিবমিষা আসে না সৃজার।
সুপ্রতিম ঘরে ঢুকতেই আরার দরজায় ছিটকিনী তুলে দিল সৃজা।

দেওয়ালে শরীর দিয়ে সৃজার দিকে নেশাতুর চোখে তাকিয়ে সুপ্রতিম।

সৃজার ভেজা চুল গামছায় পাক লাগানো। গম রঙা খোলা পিঠে বিন্দু বিন্দু জল। ভেজা কাপড়ের আড়াল ভেঙে জেগে ওঠা বুক। শরীর জুড়ে সাবানের মিষ্টি গন্ধ। 
চেনা শরীরও মদের নেশায় অচেনা আনন্দ আনে বোধহয়। 
সদ্যস্নাত সৃজা মদের নেশা ছাপিয়ে মাতাল করে তুলল সুপ্রতিমকে। 
কতদিন যে সৃজার শরীরে ডুব দেয় নি মনে করতে পারল না সে।
রং মাখা শরীর নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সৃজাকে।

মাতাল স্বামীর কাছে সহজ আত্মসমর্পণই যে একমাত্র উপায় দিনে দিনে ক্ষত বিক্ষত হতে হতে এই চরম সত্যটাকে বুঝে ফেলেছে সৃজা। সুপ্রতিমের কামনায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার অর্থ অসহনীয় অত্যাচার। তবুও সে যন্ত্রনা সহ্য করা যেত যদি প্রতিরোধ করে পার পাওয়া যেত। 
মদ খেলে মানুষ বোধহয় বিকৃতকাম হয়। 
এর আগে বারবার সৃজার অনিচ্ছায় যৌবনযাপন হয়েছে ধর্ষণের নামান্তর।
তাই আজকাল সৃজা আর প্রতিরোধ করে না।
সৃজার পাথর শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে সুপ্রতিমের উষ্ণ নিশ্বাস। 
বিনা বাধায় সৃজার অসাড় শরীরটা অনায়াসে চলে এসেছে সুপ্রতিমের নাগালে।
হোলির রঙ গিয়ে লাগছে বুকে,পিঠে,উরুতে।
যা কিছু সহজে মেলে সে তো পৌরুষের অবমাননা।
কে যেন সপাটে চড় কষাল সুপ্রতিমের পৌরুষে।
শক্ত হাতে সৃজার মুখটা ধরে তার ঠোঁটে ঠোঁট ডোবাতে চাইল সুপ্রতিম।
মদের কটু গন্ধ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল সৃজা।
ততক্ষনে দাঁতে রক্ত লেগেছে সুপ্রতিমের।
দু'আঙুলে সৃজার গালটাকে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত দিয়ে বলল-
- এখন আমর এই শুকনো বিড়ি খাওয়া ঠোঁট দু'টো আর রুচে না, না?
ব্রতর কচি ঠোঁট চাই?
ব্রতকে নিয়ে অনেক কালের সন্দেহ সুপ্রতিমের। 
শুধু সুপ্রতিমের একার হয়তো নয় আরো অনেকের। 
কথাটা শোনা মাত্র ছিঃ ছিঃ করে উঠল সৃজা।
ছিঃ শব্দটার যে আঘাত তা ছুঁতে পারল না সুপ্রতিমকে।
তার দাঁত ততক্ষনে গভীর কামড় বসিয়েছে সৃজার বুকে।
হঠাৎ বুকে রং- এর দাগ দেখে সুপ্রতিম উঠে বসল সৃজার হাঁটুর উপর।
বুক দু'টোয় অবিরাম কিল-ঘুষি মারতে মারতে বলল-
- ওঃ সাত সকালে নাগর এসে রং দিয়ে গেছে তা হলে!
খ্যা্ঁক খ্যা্ঁক করে হাসতে হাসতে বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল
" তোমারই রং তোমায় দিলাম.."
লজ্জায় অপমানে ঘৃণায় সুপ্রতিমকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল সৃজা।
বালিশে মুখ গোঁজা হয়ে পড়ে রইল সে। থেকে থেকে নেশা জড়ানো গলায় গাইতে রইল
" তোমারই রং তোমায় দিলাম.."

বিছানার একটা কোনে বসে কাঁদছে সৃজা।
তার কান্নার দমকে দমকে কেঁপে উঠছে খাট।
নাকি লজ্জায় থরথর করে কাঁপছে চরাচর।
অপমান-লজ্জা-ঘৃণা-রাগ আড়াল করার জন্য
শক্ত হাতে দু'টো হাঁটুকে চেপে ধরেছে শরীরে।
হাঁটুর উপর রয়েছে থুতনি।
দু'চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল।
দু'চোখের দৃষ্টি আটকে রয়েছে পায়ের পাতায়।
সকাল বেলা ঐ পায়েই আবির দিয়ে প্রণাম করেছিল ব্রত ঠাকুরপো।

 

                        এক্সচেঞ্জ অফার

সনোজ চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা  

বাবার কাছে আজ তার অনুনয়, সেদিনের সাত কোলকের কোন এক কোলকের প্রার্থনা বাবা পূর্ণ করুন আজ। সেদিনের প্রতিযোগীদের হারিয়ে, হেসেছিল ঊর্মী। আজ তাদেরই একজনকে নিজের থেকে জয়ী করিয়ে আর একবার হাসতে চায় সে। এ বোঝা সে আর বইতে পারছে না। এক্সচেঞ্জ অফারে তার এমন এক বর জুটুক যে বাদামের ঠোঙায় ঊর্মীর হাত থাকলেও নিজের হাতটা ঠোঙায় ডোবাবে যাতে ঊর্মীর আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে যায়, সেনেমা হলের আলতো আলোয় ঊর্মীর নায়ক হয়ে উঠবে, জ্বর তপ্ত কপালে রাখবে প্রশান্তির হাত।

    ভীড়টা এড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল ঊর্মী। এখন শুধু জোড়হাত করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সময়ের অপেক্ষা।
এই মন্দিরের পুরোহিত মোহিত মুখুজ্জে ঊর্মীর বাবার বন্ধু।
একবার চোখাচোখি হলেই আগে পূজো দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে ঊর্মী।
এভাবে সুযোগ নিতে চায় নি সে, মনের ভেতরে একটা আশঙ্কা প্রশ্রয় পাচ্ছিল থেকে থেকে।
কৃচ্ছ সাধন ছাড়া কি তিনি তুষ্ট হবেন! নাটমন্দিরে থকথকে ভিড়টা দেখে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল ঊর্মীর।
এমনিতেই সকাল থেকে নির্জলা।
সোজাপথে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছতে কমপক্ষে আরো ঘন্টা চার লাগবে।
অতটা সময় সে এঁটে উঠতে পারবে কি!
তাছাড়া গতবার কি এমন কষ্ট করেছিল সে। তবুওতো কোলকেনাথ তার প্রার্থনা পূরণ করেছিলেন।
সুযোগ যখন তার সামনে নিজে থেকে হাজির তাকে অবহেলা করা উচিত হবে না।
এইসব যুক্তি নির্মান করতে করতে ঊর্মী আপাতত কোলকেনাথের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।

কোলকেনাথ এ অঞ্চলের জাগ্রত দেবতা। শুদ্ধচিত্তে শিবচতুর্দশীতে যে বাবার মন্দিরে কোলকে চড়ায় বাবা তাকে নিরাশ করেন না। বাবা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী তাই বাবার চাহিদাও সামান্য। একছিলিম গাঁজা, কোলকে, বেলপাতা আর কাঁচা দুধ এই সামান্য নৈবেদ্যতেই তুষ্ট কোলকেনাথ।মাঝে বছর তিনেকের ইন্টারভ্যাল, 
এই তিন বছর বাবার কাছে আসে নি ঊর্মী।
আসার প্রয়োজন হয় নি।
অভাব বোধ প্রবল হয় নি। 

তার আগে পরপর চার বছর বাবার মন্দিরে হোত্যে দিয়েছে সে।বাবাও খালি হাতে ফেরায় নি তাকে। আজ সেই ভরসায় বুক বেঁধে আবার হাজির ঊর্মী। 
বাবার কাছে মেয়ে আসবে এ আবার নতুন কি কথা।

প্রথম বার ঊর্মী যখন বাবার কাছে এসেছিল তখন সে ক্লাস এইটে পড়ে।

পরপর চারটে শিবরাত্রির কোলকে নিয়ে শীতলের সঙ্গে ঊর্মীকে ফিট করে দিয়েছিলেন কলকেবাবা। 
পাত্র হিসেবে সে বাজারে শীতল চক্কত্তি হেলাফেলা করার মতো ছিল না। 
ঊর্মীর নিজস্ব সোর্সের খবর অনুযায়ী, ঊর্মী ছাড়া আরো জনা সাতেক কোলকে কিনেছিল শীতল চক্কত্তির জন্য।
সেবারও ভিড় এড়িয়ে মায়ের হাত ধরে মোহিত জেঠুর তদবিরে অনেকের আগে পূজো দিয়েছিল ঊর্মীরা। 
হয়তো ঐ সাত জনের আগে।
নাহলে হয়তো হাত থেকে জল গলে যাওয়ার মতো, ঊর্মীর সব বাঁধন ফস্কে বেরিয়ে যেত শীতল।

ঊর্মী যখন ক্লাস এইট, শীতলদার তখন ক্লাস নাইন। সব ক্লাসেই বরাবর ফাস্ট শীতল।
ভালো আঁকে, গানের গলাও মন্দ নয়। 
গ্রামের ক্ষিরোদ মোহন স্কুলের জুয়েল ইন ক্রাউন। 
এমন ছেলেকে বর হিসেবে কে না চায়।
তার উপর শীতলরাও ঊর্মীদের মতো কুলীন বামুন।

পরপর চার বছর কোলকে চড়ানো হয়ে গেছে ঊর্মীর কিন্তু কোনো ফল নেই!
এদিকে একটা কিছু ব্যবস্থা না হলে শীতল বেহাত হতে বাধ্য। 
তখন শীতলের টুয়েল্ভ চলছে। 



 

মাস দু- একের মধ্যে পাখি গিয়ে বাসা বাঁধবে কলেজে। সে অভয়ারন্যে নাকি হরিন-সিংহরা একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়!এক অজানা আশঙ্কায় বুক ভেঙে যাচ্ছিল ঊর্মীর।সেদিন ছিল ক্লাস টুয়েল্ভের বিদায় সভা। বারো ক্লাসের ছাত্র- ছাত্রীরা যতটা কষ্টে ছিল তার থেকে অনেক বেশী ছিল ঊর্মীর কষ্ট। এযেন দেশভাগের যন্ত্রনা। 'একই ক্ষিরোদ মোহনে বেড়ে ওঠা শীতলদার দেশটাই পাল্টে যাচ্ছে!'

বিদায় সভা শেষে বিষন্ন মনে স্কুলের লম্বা বারান্দা ধরে হাঁটছিল শীতল।
নাছোড় জেদ নিয়ে পথ আগলে দাঁড়ায় ঊর্মী। চারপাশটায় ভালো করে চোখ বোলায় সে।
না কেউ নেই।
সেদিন শীতলের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে মনের কথাটা এক নিশ্বাষে বলেছিল ঊর্মী। 
না বোঝা অঙ্কের বিষ্ময় নিয়ে শীতল তাকিয়ে ছিল ঊর্মীর মুখে। 
ঊর্মীর চোখের পলক পড়ছিল না।

দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছিল রক্ত চলাচল। মুখটা সামান্য হাঁ করা, তিরতির করে কাঁপছিল ঊর্মীর ঠোঁট।

আকস্মিকতা কাটিয়ে শীতল ঐ ঘটনার দিন দুই পরে দেখা করে ঊর্মীর সঙ্গে। 
একে অপরকে একটু একটু করে বোঝার চেষ্টা শুরু হয়। 
কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতে ঊর্মী বুঝেতে পারল, ভুল নামে কোলকে চড়িয়ে ফেলেছে সে।
প্রথম প্রথম ঊর্মী ভেবেছিল শীতলকে সে তার নিজের ছাঁচে ফেলে নিজের মতো করে গড়ে নেবে। চেষ্টাও যে করে নি তা নয়। কিন্তু শীতল ছিল অন্য ধাঁচার মানুষ।
মোটা দাগের হিন্দি সিনেমা একদম না পচ্ছন্দ ছিল শীতলের।
কখনো কখনো জোর খাটিয়ে হলে নিয়ে গেছে ঊর্মী। 
নায়ক নায়িকা ঘনিষ্ঠ হচ্ছে পর্দায়।
ঊর্মী ভেবেছে সেনেমা হলের আলো-ছায়ায় এই বুঝি তার হাতে হাত রাখল শীতল। বারবারই ঊর্মীকে হতাশ করে নাক ডাকিয়ে হলে বসে ঘুমিয়েছে শীতল। 
সেদিন গঙ্গার পাড়ে বসে হাওয়া খাচ্ছিল ঊর্মীরা। বাদামের ঠোঙাটা ছিল ঊর্মীর হাতে। খবরের কাগজে তৈরী ঠোঙাটার দিকে অপলক তাকিয়ে শীতল।
আসলে ঠোঙার ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছিল অমর্ত সেনের একটা আর্টিকেলস্। 
সব চেষ্টাই বিফল হয়েছিল ঊর্মীর।
সে যাত্রায় ঊর্মীর জীবনটা যেন শিব গড়তে বাঁদর অবস্থা।

আজ আবার সে বাবার শরণাগত। সুযোগ বুঝে বাবার কাছে চেয়ে নিতে হবে বর। বাবাকে নিজের অসহায়তা বোঝাতে ভরসা সেই কোলকে। আজ শিবচতুর্দশী, আজও নির্জলা ঊর্মী।
বাবার কাছে আজ তার অনুনয়, সেদিনের সাত কোলকের কোন এক কোলকের প্রার্থনা বাবা পূর্ণ করুন আজ। সেদিনের প্রতিযোগীদের হারিয়ে, হেসেছিল ঊর্মী। আজ তাদেরই একজনকে নিজের থেকে
জয়ী করিয়ে আর একবার হাসতে চায় সে।এ বোঝা সে আর বইতে পারছে না। এক্সচেঞ্জ অফারে তার এমন এক বর জুটুক যে বাদামের ঠোঙায় ঊর্মীর হাত থাকলেও নিজের হাতটা ঠোঙায় ডোবাবে যাতে ঊর্মীর আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে যায়, সেনেমা হলের আলতো আলোয় ঊর্মীর নায়ক হয়ে উঠবে, জ্বর তপ্ত কপালে রাখবে প্রশান্তির হাত।
কোলকেবাবা তাকে নিরাশ করবেন না এতোটাই আশাবাদী ঊর্মী। কারন সব বাবাই চায় তার মেয়ে মনের মতো বর পাক।

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?