গল্প সমগ্র - ১২

মাইনাস

সুখদেব চট্টোপাধ্যায় 

রহড়া, হুগলী 

 ...দেবেশ ধীরে ধীরে ঘরের দিকে মুখ ফেরাল। না, থাক। কোথাও গিয়ে কাজ নেই। এই মহার্ঘ মুহুর্তগুলো নইলে হারিয়ে যাবে। বাইরে শিউলি ফুলের গন্ধ। সে ভাবার চেষ্টা করল, ফুল কি রাতেই ফুটে যায় নাকি শুধু আজকের জন্য সব যুদ্ধক্ষেত্রেই ফুল ফুটে উঠেছে। 

   দাওয়ায় বসা রমেন আরে... আরে... আরে... শব্দটা করতে করতে ধরতে চেয়েছিল চিত্রাকে কিন্তু তার আগেই চিত্রা পপাত-ধরণীতলে। ধপাস শব্দটার আগে অবশ্য মাগো... বলে চিৎকার করে উঠেছিল চিত্রা।

    একটু আগে গজগজ করতে করতে মেঝেটা মুছছিল নিজেই। কদিন হল কাজের মেয়েটা ডুব দিয়েছে। রাগে তালকানা হয়ে হয়তো একটু বেশিই জল ঢেলে ফেলেছিল মেঝেতে। চোখের সামনে বিড়ালটা পাটিসাপ্টাগুলো সাঁটাচ্ছে দেখে মাথা গরম হয়ে যায় তার। অথচ পিঠেগুলো ঢাকা দেওয়াই ছিল। বিড়ালটাকে তাড়াতে গিয়েই বিপত্তি। সিমেন্টের মেঝেতে প্রথম পড়ে পেছনটা। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হাত দুটো চলে যায় পেছনে। শরীরের সমস্ত ভারটা স্বাভাবিক ভাবে চলে আসে হাতের উপর আর তাতেই কোনও রকমে বেঁচেছে মাথাটা। রমেন চিত্রাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গিয়ে শুইয়েছে বিছানায়। কোমরে বেশ লেগেছে চিত্রার। সমানে আহা, উহু করছে সে। অপরাধীর মতো দরজায় দাঁড়িয়ে রমেনের মা আশালতাদেবী।

আজকে ঘটনাটা যে প্রথম ঘটল তা নয়। এর আগে অনেকবার এমন ঘটেছে, চিত্রা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। কখনও সামলে নিয়েছে নিজেকে আবার কখনও শ্বাশুড়ি বৌমা কথা কাটিকাটি হয়ে সপ্তাহ খানেকের জন্য পাশের গ্রামে বাপের বাড়ি চলে গেছে চিত্রা।

রমেন মাকে বুঝিয়েও কিছু করে উঠতে পারে নি। আসলে মায়েদের মনটা বোধহয় এমনই হয়। সন্তানের ভালো করতে গিয়ে নিজের অজান্তে কত রকমের যে সমস্যা তৈরি হয়ে যায় তা কি আর মাতৃস্নেহ বুঝতে চায়!

বছর তিন আগে, সেদিন ছিল রমেনের জন্মদিন। দিনটা ঘরোয়া ভাবেই পালন করবে বলে প্রস্তুতি নিয়েছিল চিত্রা। গেষ্ট বলতে রমেনের শ্বশুর, শ্বাশুড়ি, শালা আর শালভাজ। বাজার থেকে অসময়ের ইলিশ এনেছিল রমেন। রমেনের শালা আর শালাভাজ যত্ন করে সাজিয়েছিল ড্রয়িংরুমটা। রঙিন আলোয় বেশ একটা উৎসব উৎসব আমেজ। চিত্রার কিনে আনা দামী পাঞ্জাবিটা রমেনের বয়স এক ধাক্কায় কমিয়ে দিয়েছিল বছর দশ। পাশে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে চিত্রা। শালা বাবু ক্যামেরার লেন্সটা ঠিক করছিল।

এমন সময় আশালতাদেবী ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে গৃহদেবতার পা-ছোঁয়ানো ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করলেন ছেলেকে।আর সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেল উৎসব আবহ। ধান-দূর্বায় লেগে থাকা ঠাকুরের পায়ের সিঁদুর ছড়িয়ে পড়ল সারা পাঞ্জাবিতে। হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন আশালতা। পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার জন্য নতুন পাঞ্জাবি পাল্টে বিয়েরটা পরেছিল রমেন। পুরানো স্মৃতি উসকে দিয়ে 

যদি বৌকে ক্ষান্ত করা যায়। চিত্রা সেদিন একটা কথাও বলেনি শ্বশুড়িরসঙ্গে। আশালতা গায়ে পড়া হয়েও বৌমাকে ঠাণ্ডা করতে পারে নি। পরের দিন সাবান-জলে ছেলের পাঞ্জাবি থেকে মাতৃস্নেহের দাগ তুলে ফেলতে পারলেন না আশালতা। সে ঘটনার জের থেকে গিয়েছিল আরও দিন চার। আড়ালে ডেকে মাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল রমেন। মাও বুঝেছিলেন। বলেছিলেন - 'দেখিস আর এমন ভুল হবেই না, তুই বৌমাকে বুঝিয়ে বলিস, আমি খুব কষ্ট পেয়েছি রে খোকা।'

কথাগুলো শুনে মুখ নামিয়ে নিয়েছিল রমেন। মায়ের জন্য কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু আরও বেশি কষ্ট হচ্ছিল চিত্রার জন্য। সে যে মাতৃস্নেহটাকেই বুঝতে চাইল না।রমেনদের সপ্তম বিবাহ বার্ষিকীতেও জল ঢেলে দিয়েছিলেন আশালতা। সকাল বেলা ছেলের মঙ্গলের জন্য তিনি পায়ে হেঁটে দু'কিমি দূরের নারায়ণ মন্দির থেকে নিয়ে এসেছিলেন চরণামৃত। মায়ের এতো কষ্ট করে আনা প্রসাদ সন্তান কি না নিয়ে পারে। সোফায় বসে ড্যাবডেবিয়ে মা-ছেলের আদিখ্যেতা সহ্য করতে না পেরে উঠে চলে গিয়ে ছিল চিত্রা।আর সেই চরণামৃতেই বিকেল থেকে রমেন বাথরুমের বাইরে বেরাতেই পারে নি। শেষকালে একটা ছবিতে যৌবনকালে ভদ্রলোক এবং পাশে মনে হয় ওঁর স্ত্রী, আর দুজনের কোলে দুটি বাচ্চা। আর ওই মহিলারই একটা বড় ছবি পিছন দিকের দেওয়ালে রয়েছে। বেশ সুন্দরী। আর দরজার ঠিক মাথায় মাঝ  বয়সী এক ভদ্রলোকের ছবি। একটু বাদে দু কাপ কফি আর একটা প্লেটে কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন।

---এখানে আপনি একাই থাকেন ?

---হ্যাঁ ভাই, সাথে তো আর কাউকে রাখতে পারলাম না।  

---আপনি কি অবিবাহিত ?

---আমার জীবনটা বড় বিচিত্র ভায়া।

---কি রকম ?

---বাড়ি যাওয়ার তাড়া নেই তো ?

---সেরকম কিছু নেই। সন্ধ্যের দিকে গেলেই হবে।

--- জানি না কেন এই প্রথম কারো কাছে আমার জীবনের ঘটনা বা দুর্ঘটনাগুলো জানাতে মন চাইছে। তুমি তো একটু আধটু লেখালিখি কর, দেখ হয়ত গল্পের কিছু রসদ পেলেও পেতে পার।

এরপর বৃদ্ধ তাঁর অতীতের পাতাগুলো আস্তে আস্তে ওলটাতে শুরু করলেন।

   বাবা-মা আহ্লাদ করে নাম রেখেছিল আনন্দময়। আনন্দময় দাস। ঈশ্বর অলক্ষ্যে হেসেছিলেন। জীবনে কোন আনন্দই তার দীঘর্স্থায়ী হয়নি। বরং দাস পদবীটা অনেক মানানসই। জীবনের অনেকটাই কেটেছে লোকের দাসত্ব করে আর গালমন্দ শুনে। বাবা ছোট একটা বেসরকারি অফিসে কাজ করত। সংসারটা কোনরকমে চলত। সঞ্চয় কিছুই ছিল না। তাই অকালে বাবা মারা যেতে পাঁচ বছরের শিশু মায়ের সাথে দাদুর বাড়িতে গিয়ে উঠতে বাধ্য হয়। দাদু তখন রিটায়ার করেছে। তাঁর তিন মেয়ে আর এক ছেলে। আনন্দর মা সবার বড়। ছেলে ছোটখাট একটা চাকরি করে। মাইনে সেরকম কিছু নয়। ছোট মেয়ের তখনও বিয়ে হয়নি। সংসারের আথির্ক অবস্থা এমনিতেই সঙ্গিন তার ওপর আরো দুটো গলগ্রহ বাড়ল। বাবা তো, তাই কষ্ট হলেও ফেলতে পারেনি। বাড়িতে ঘর মাত্র দুটো। তার মধ্যে একটা বেশ ছোট। ছোট ঘরটাতে ছেলে থাকে, আর অপেক্ষাকৃত বড় ঘরটায় বিপত্নীক বৃদ্ধ আর তার ছোট মেয়ে থাকে। মেজো মেয়ে জামাই এলে আবার ছোট ঘরটা ওদের ছেড়ে দিতে হয়। আনন্দ আর ওর মার ঠাঁই হল সামনের বারান্দার একটা কোণে। ওটাই তখন ওদের কাছে অনেক। মাথার ওপর একটা ছাদ আছে আর দু বেলা দু মুঠো খাবার তো জুটছে।  

আনন্দর মা অনুভার একটা সেলাই মেশিন ছিল। আর সেলাইটাও ভাল পারত। সংসারের কাজের ফাঁকে পাড়া প্রতিবেশীদের জামা কাপড় সেলাই করে দিত। সামান্য হলেও কিছু আয় হত। বছর খানেক এভাবে কাটল।

---অভাবে আর কষ্টে বড় হওয়ার ফলে আমার কখনও কোন চাহিদা বা প্রত্যাশা ছিল না। যখন যতটুকু পেয়েছি তাতেই সন্তুষ্ট থেকেছি। কিন্তু ওই সামান্য পাওয়াটাও বোধহয় বিধাতার পছন্দ হয়নি।

বেল বাজল। আনন্দ গিয়ে দরজা খুলে পিওনের হাত থেকে একটা খাম নিয়ে ঘরে ঢুকে ওটা না খুলেই টেবিলে রেখে দিল।

---ছেলের চিঠি।

---পড়ে নিন না, পরে কথা হবে।

---না না, তেমন দরকারি কিছু নয়। না খুলেই বলতে পারি ভেতরে কি লেখা আছে। পরে পড়ব।

অজয় বুঝল যে চিঠিটা পড়ার সামান্যতম আগ্রহও বুড়োর নেই।

---হ্যাঁ, যা বলছিলাম, আমার কোন সুখই জীবনে বেশিদিন টেকেনি।

আবার শুরু হল এক দুঃখী মানুষের আত্মকথা। এক এক করে বেরিয়ে আসতে লাগল অন্তরে বহুদিন জমে থাকা হতাশা, বেদনা, বঞ্চনা আর ক্ষণিকের সুখের মুহূর্তগুলো।

মামার বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার বছরখানেক বাদে আনন্দর দাদু মারা যায়। আর তখন অনুভা বুঝতে পারে যে মাথার ওপর কংক্রিটের ঢালাই নয়, তার বাবাই ছিল সংসারের আসল ছাদ। কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতির চাপে ছেলেকে নিয়ে ও বাড়ি ছাড়তে হল। এক প্রতিবেশীর দয়ায় ঠাঁই পেল মেয়েদের একটা আশ্রমে। সারাদিন আশ্রমের নানান কাজ করতে হত আর বিনিময়ে জুটত দুজনের দু মুঠো অন্ন। কাজের প্রয়োজনে আর ব্যবহারের গুনে  অল্পদিনেই অনুভা আশ্রমের সকলের প্রিয় হয়ে উঠল। ছেলেকে একটা স্কুলে ভর্তি করল। আনন্দর লেখাপড়ায় আগ্রহ ছিল। এত অভাব অনটনের মধ্যেও ভাল নম্বর পেয়েই পরীক্ষা গুলোয় পাশ করত।

আনন্দ তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখে মা বিছানায় শুয়ে আছে। অনুভা অসময়ে শোওয়ার মানুষ নয়। শরীরটা তার কদিন থেকে ভাল যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে কাশি হচ্ছে। আর কাশি একবার শুরু হলে তা চট করে থামে না। আনন্দ বুঝতে পারল মার শরীরটা খুবই খারাপ হয়েছে। কাছে গিয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল---মা তোমার কি হয়েছে ?

অনুভা ছেলের হাতটা টেনে নিয়ে বলল---সেরকম কিছু না। শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছিল তাই শুয়ে আছি। তুই আমার কাছে একটু বোস তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

---মা, তোমার শরীর এত খারাপ, একবার আশ্রমের মাসিদের ডাক্তার ডাকতে বলি না। 

অনুভা ছেলেকে বাধা দিয়ে বলল---তুই এত ব্যস্ত হোস না বাবা। ডাক্তার  ডাকার মত আমার কিছু হয়নি।

রাতে কাশির সাথে বেরোতে লাগল রক্ত। ডাক্তারকে ডাকতেই হল। কিছু পরীক্ষা করাবার পর ডাক্তার জানালেন যে অনুভার টিবি হয়েছে। যে আশ্রমে অনুভা এত প্রিয় ছিল, রাতারাতি সেখানে অচ্ছুৎ হয়ে গেল। লোক ধরে তাড়াতাড়ি একটা সরকারি টিবি হাসপাতালে পাচার করা 

হল। মা আশ্রম ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আনন্দ বুঝতে পারল যে আশ্রমে তার আর কোন জায়গা নেই। স্কুল যাওয়া শিকেয় উঠল। একটা ব্যাগে কিছু জামাকাপড় নিয়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়, খোলা আকাশের নিচে। দু একদিন কখনও রেল স্টেশনে কখনও ফুটপাতে কাটাল। সঙ্গে আনা চিঁড়ে মুড়ি খেয়ে কোনরকমে পেটের জ্বালা মেটাল। এর মধ্যে মাকেও দেখতে যায়। মায়ের দিকে তাকান যায় না। এমনিতেই রোগা  চেহারা, কয়েকদিনে যেন আরো শুকিয়ে গেছে। ছেলেকে দেখলে শীর্ণ অবসন্ন হাত দুখানি দিয়ে জড়িয়ে বুকে টেনে নিত। সে এক অদ্ভুত মুহূর্ত। রোগের জ্বালা যন্ত্রণা ভুলে অনুভার মুখে ফুটে উঠত এক অসীম প্রশান্তি। আর মায়ের বুকে মাথা রেখে আনন্দও খুঁজত এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়।

   একদিন ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে আনন্দ রাস্তার ধারে একটা গাছের নিচে গিয়ে বসল। খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে। সঙ্গে না আছে খাবার না কিছু কিনে খাওয়ার মত পয়সা। ওর থেকে রাস্তার ভিখারিদের অবস্থা অনেক ভাল। ওরা যখন তখন যার তার কাছে হাত পাততে পারে। কখনও কিছু পায় কখনও বা পায় না। কিন্তু আনন্দর যত কষ্টই হোক ভিক্ষে করার মত মনটা এখনও তৈরি করতে পারেনি।  আনন্দ যেখানে বসেছিল তার সামনেই একটা রেস্টুরেন্ট। খাবারের গন্ধে খিদে আরো বেড়ে গেল। সামনে কাউন্টারে মাঝ বয়সী একটা লোক বসে রয়েছে। লোকের কাছ থেকে খাবারের দাম বুঝে নিচ্ছে আর মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে কর্মচারীদের এটা ওটা বলছে। আনন্দের দিকে  ভদ্রলোক কয়েকবার তাকাল। কিছু পরে ইশারায় ওকে কাছে ডাকল। ওকেই ডাকছে কিনা বুঝতে না পেরে ও এদিক ওদিক দেখছিল।

---তোকেই ডাকছি। এদিকে আয়। 

আনন্দ কাছে যেতে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করল---ওখানে বসে আছিস কেন ? 

---এমনি।

---বাড়ি কোথায় ?

আনন্দ লোকটাকে তার প্রকৃত অবস্থা জানাল।

---সকাল থেকে খাওয়া হয়নি তো! যা, হাতে মুখে জল দিয়ে এসে খেয়ে নে।

আনন্দর বিশ্বাস হচ্ছিল না।

---দাঁড়িয়ে রইলি কেন, যা।

আনন্দ টেবিলে গিয়ে বসতেই একটা ছেলে ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ  সব সাজিয়ে রেখে গেল। কতদিন বাদে একটু ভাল খেতে পাচ্ছে। তৃপ্তি করে খেয়ে ওঠার পর লোকটা আবার ডাকল।

---আমার কাছে এখানে থাকবি ? পড়াশুনোও করবি আর দোকানের কাজে আমাকে টুকটাক সাহায্য করবি।

নিজের কানকে আনন্দর বিশ্বাস হচ্ছিল না। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল।

আবার মাথার ওপর ছাদ জুটল। শুরু হল নতুন জীবন।

      দোকানের মালিকের নাম কানাই সরকার। বিয়ে থা করেনি। আত্মীয় স্বজন সেরকম বলার মত কেউ নেই। যা দু একটা আছে, তাদের সাথে কোনরকম যোগাযোগ নেই। কানাই এর ওই অঞ্চলে বহুদিনের বাস। পুরোনো দিনের দোতলা বাড়ি। অত বড় বাড়িতে থাকার লোক বলতে কানাই ছাড়া নিচের একটা ঘরে দোকানের দুজন কর্মচারী। কানাই যখন খুব ছোট তখন ওর বাবা এই বাড়িটা কেনে। শৈশবেই কানাই মাকে হারায়। এক বিধবা নিঃসন্তান পিসি ওদের কাছে থাকতেন। উনিই বেশ কিছুদিন সংসারটা সামলেছিলেন। লেখাপড়ায় কানাইয়ের তেমন মাথা ছিল না। অনেক চেষ্টায় ম্যাট্রিক পাশ করার পর লেখাপড়ায় ইতি টেনে বাবার সাথে দোকানে বসতে শুরু করে। লেখাপড়ায় মাথা না থাকলেও দোকানদারিতে কানাই অল্পদিনেই পোক্ত হয়ে উঠল। ছিল মুদির দোকান। টিম টিম করে চলত। আশে পাশে কয়েকটা ছোট কারখানা ছিল। ওগুলোতে অনেক লোক কাজ করত। কিন্তু ধারে কাছে কোন খাবারের দোকান ছিল না। এটা মাথায় রেখেই কানাই বেশ কিছুদিন ধরে তালে ছিল একটা রেস্টুরেন্ট খোলার। বাবা প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু শেষে খানিকটা জোর করেই মুদির দোকানের পাশে একতলার বাকি ফাঁকা জায়গাটায় একটা খাবারের দোকান খুলল। নিজের মায়ের নামে নাম রাখল ‘করুণাময়ী রেস্টুরেন্ট’ । নামে রেস্টুরেন্ট হলেও মূলত কারখানার লোকগুলোর জন্য দুপুরে আর রাতে ভাত আর রুটির থালি থাকত। প্রথম কিছুদিন সেরকম না চললেও লোকমুখে ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার পর দুবেলা ভালই ভিড় হতে শুরু হল। একে এলাকায় আর কোন খাবারের দোকান নেই তার ওপর দামও কম। ভিড় তো হবেই। আস্তে আস্তে ভাত রুটি ছাড়াও কানাই মুখরোচক নানারকম ভাজাভুজিও রাখতে শুরু করল। দোকান  থেকে রোজগারও ক্রমশ: বাড়তে থাকল।

     আনন্দ বাড়িতে আসার দু একদিন বাদে কানাই ওর সাথে ওর মাকে দেখতে গেল। হাসপাতালে ঢুকতেই ডাক্তাররা  জানালেন যে মায়ের অবস্থা খুব খারাপ।  ঐ অবস্থাতেও ছেলের মুখে সব শুনে অনুভা একবার কানাইয়ের দিকে তাকাল।  চোখে জল, তবু ঐ চাউনিতে ছিল পরম স্বস্তি। আনন্দ কাছে গিয়ে বসতে মায়ের শীর্ণ হাত দুখানি রোজের মত ওকে বুকে টানার চেষ্টা করল। কিন্তু একটু কেঁপেই তা স্থির হয়ে গেল। ছেলেকে দেখার জন্যই বোধহয় প্রাণটা আটকে ছিল। কিশোর আনন্দ কাঁদতে কাঁদতে মায়ের নিথর বুকে মাথা রেখে অনেকক্ষণ বসে রইল।

কানাই আনন্দকে সান্ত্বনা দিয়ে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে অনুভার শেষ কৃত্যের সব ব্যবস্থা করল।

প্রথম দিন থেকে আনন্দর ওপর কানাইয়ের বড় মায়া  পড়ে গিয়েছিল। একটা রাস্তার ছেলের ওপর কেন যে এত টান এল তা বলা মুশকিল। হয়ত তার জীবনের একাকীত্বই এই অপত্য স্নেহের একটা বড় কারণ।

---এই কটা দিন তুই আমার সাথে এক ঘরেই থাক। মায়ের কাজ মিটে গেলে যে ঘরটা ভাল লাগে সেটাতে থাকিস।

শ্মশান থেকে ফিরে পরম স্নেহে কানাই আনন্দকে কথাগুলো বলল।

পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম মিটে গেলে পূব দিকের বাড়ির সেরা ঘরটাতে কানাই আনন্দর থাকার ব্যবস্থা করল। আবার আনন্দ স্কুলে ভর্তি হল। বই, খাতা, কলম, কোন কিছুর অভাব রইল না। অচিরেই দুজন অপরিচিত  মানুষের মধ্যে গড়ে উঠল পিতা পুত্রের মত এক আত্মিক বন্ধন। পড়াশোনায় আনন্দর বরাবরই আগ্রহ ছিল। অনুকূল পরিবেশ পেয়ে উত্তরোত্তর রেজাল্ট ভাল হতে লাগল।

প্রথম দিকে কানাইকে আনন্দ কাকু বলেই ডাকত।

একদিন কানাই কিন্তু কিন্তু করে বলল---বাবা তোকে একটা কথা বলব ? 

---বল না।

---তুই আমাকে বাবা বলে ডাকতে পারবি না !

আনন্দ সেই মুহূর্তে কোন উত্তর দেয়নি। পরদিন সকালে আনন্দর মুখে ‘বাবা’ ডাক শুনে কানাই ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল।

কানাইকে সাহায্য করতে আনন্দ মাঝে মাঝে দোকানে গিয়ে বসত। লোকের সাথে ওর ব্যবহার খুব ভাল। ও দোকানে থাকলে খদ্দেররাও খুশি হয়। অনেকে তো ওকে দেখতে না পেলে কানাইকে জিজ্ঞেস করে---কিগো,  তোমার ছেলেকে দেখছি না যে ! ‘ছেলে’ কথাটা শুনে কানাইয়ের মনটা ভরে যায়।

গম্ভীর হয়ে বলে---উঁচু ক্লাসে উঠেছে, পড়াশোনার চাপ বেড়েছে, রোজ কখনও আসতে পারে !

বেশ ভাল নম্বর পেয়েই আনন্দ হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করল। কানাই তো আনন্দে আত্মহারা। দোকানে সব খরিদ্দারকে মিষ্টি খাওয়াল। আনন্দকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে একটা ভাল সাইকেল কিনে দিল।

সঙ্গে সাবধান বানী---কখনও জোরে চালাবি না, আর বড় রাস্তায় যাবি না।

আনন্দ খুব বাধ্য ছেলে। নিষেধ অমান্য করেনি।

কেমিস্ট্রিতে অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হল। নম্বর ভাল থাকায় অনেক ভাল কলেজে সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু সেগুলো বাড়ির থেকে দূরে হওয়ায় কানাই রাজি হয়নি। বাড়ির কাছেই একটা কলেজে ভর্তি হল। 

        এর মধ্যে একদিন কানাই আনন্দকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে ওর  নামে ব্যাঙ্কে একটা খাতা খুলে তাতে বেশ কিছু টাকা রেখে দিল।

---মাঝে মাঝে ব্যাঙ্কে গিয়ে প্রয়োজন মত টাকা তুলবি, আবার মাসের প্রথমে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে জমা দিয়ে  দিবি। কিরে, বুঝলি কিছু ?

আনন্দ মাথা নেড়েছিল। ওর কোন চাহিদা নেই। যা পায় তাতেই খুশি। এইজন্য কানাইয়ের ওকে এত ভাল লাগে।

কলেজেও মেধাবী ছাত্র হিসেবে আনন্দ নাম করল। দেখতে দেখতে বিএসসি ফাইনাল পরীক্ষা এসে গেল। আনন্দ অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করে। কানাইও জেগে পাশে বসে থাকে। কখনও মশা তাড়ায়, কখনও আনন্দর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আনন্দ শুতে যেতে বললে বলে---তুই বাচ্চা ছেলে রাত জেগে পড়ছিস আর আমি বাপ হয়ে কখনও শুতে পারি !

ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হল। সবকটা পেপারই খুব ভাল হয়েছে। আর একটা  বাকি। পরীক্ষার আগের দিন আনন্দ রাত জেগে পড়ছে আর কানাই যথারীতি গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কানাইয়ের হাতটা আনন্দর একটু গরম ঠেকল।

---তোমার কি জ্বর হয়েছে ?

---কই না তো।

---তাহলে তোমার হাতটা অত গরম লাগল কেন ? এদিকে এস তো দেখি।

কানাইয়ের গায়ে হাত দিয়ে আনন্দর মনে হল বেশ জ্বর।

---গা বেশ গরম, এখনি শুয়ে পড়। কাল ডাক্তার দেখাতে হবে।

---ও ঠাণ্ডা গরমে একটু হয়েছে হয়ত। শরীর আমার ঠিকই আছে।

যা হোক ছেলের কথায় ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

শেষ পেপারটাও মনোমতই হল। বাপ ব্যাটা দুজনেই খুব খুশি। দুদিনের জন্য দুজনে পুরী বেড়াতে গেল। আনন্দর জীবনে এই প্রথম কোথাও বেড়াতে যাওয়া। সমুদ্র দেখে মুগ্ধ হয়ে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল। দুজনে প্রাণ ভরে সমুদ্রে স্নান করল। কানাইয়ের আরো কদিন থাকার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বাড়ি ফাঁকা আর দোকানটাও তো বেশিদিন বন্ধ রাখা যাবে না, তাই তাড়াতাড়ি ফিরতে হল।

এই বাড়িতে আসার পর থেকে আনন্দর জীবন সত্যিই আনন্দময় হয়ে উঠেছিল। কানাইয়ের স্নেহ ভালবাসা ভুলিয়ে দিয়েছিল তার অতীতের সব দুঃখ, বেদনা। আর কানাইয়ের শূন্য, একাকী, উদ্দেশ্যহীন জীবনে আনন্দ ছিল এক চরম প্রাপ্তি। ও আসার পর থেকে কানাইয়ের জীবনটা আমূল পাল্টে গিয়েছিল। সংসারে যে এত সুখের ভান্ডার আছে তা সে আগে কখনও বুঝতে পারেনি। পরস্পরকে অবলম্বন করে উভয়ে পেয়েছিল এক নতুন জীবনের সন্ধান। কানাই আনন্দকে এতটাই ভালবেসে ফেলেছিল যে একদিন ওকে ডেকে বলল---শোন, এখন তুই বড় হয়েছিস। এবার সময় করে একটা ভাল দিন দেখে বাড়ি আর দোকানটা তোর নামে করে দেব।

আনন্দ বাধা দিয়ে বলল---কেন, নাম পাল্টাবার কি দরকার ?

---বাঃ তোকে এবার আস্তে আস্তে সব বুঝে নিতে হবে না। আমি মরে গেলে সব দেখবে কে ? 

আনন্দ কানাইয়ের মুখে হাত চাপা দিয়ে বলেছিল---অমন কথা আর বলবে না। আমার ভাল লাগে না। 

কানাই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর করল। পুরী থেকে ফিরে আসার  পর থেকেই কানাইয়ের শরীরটা তেমন ভাল যাচ্ছিল না। মাঝে মাঝেই শরীর ম্যাজম্যাজ করে জ্বর হয়। প্রথমদিকে আনন্দ বার বার বলা সত্ত্বেও একেবারেই গা করেনি। ধীরে ধীরে শরীর আরো কাহিল হয়ে পড়ল। অর্ধেক দিন দোকানে বসতে পারে না। আনন্দ গিয়ে সামাল দেয়। পাড়ার ডাক্তার দেখিয়ে কোন লাভ হল না। আনন্দর এক সহপাঠীর বাবা বড় ডাক্তার। একদিন কানাইকে নিয়ে তার কাছে গেল। তিনি ভালভাবে দেখার পর রক্তের কিছু পরীক্ষা করাতে দিলেন। রিপোর্ট আসার পর জানা গেল ব্লাড ক্যানসার। অনেক চেষ্টা করেও আনন্দ খবরটা কানাইয়ের কাছ থেকে লুকোতে পারেনি। মনে মনে ভেঙ্গে পড়লেও আনন্দকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল---ওরকম গুম মেরে থাকিস কেন ? একটু আধটু শরীর খারাপ হবে না! কয়েক মাস ওষুধ  খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার অত সহজে কিছু হবে না।

মুখে যাই বলুক, সময় যে তার ঘনিয়ে এসেছে তা কানাই বিলক্ষণ বুঝতে পারছিল। তাই আবার বাড়ি হস্তান্তরের প্রসঙ্গটা  তুলল।

---উকিলের সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি ভাল দিন আছে, রেজিস্ট্রিটা করিয়ে নেব।

কিন্তু সময় যে হাতে এত কম তা কানাই বুঝতে পারেনি। ঘোরাঘুরি করা আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যে বিছানায় উঠে বসার শক্তিটাও চলে গেল। আর তারপর ধীরে ধীরে চলে গেল কোমায়। আনন্দ সারাক্ষণ কানাইয়ের মাথার কাছে বসে থাকে। অসম্ভব জেনেও আশায় থাকে যদি কানাই আবার ভাল হয়ে যায়। না ভাল সে আর হয়নি। দুদিন বাদেই মারা গেল। শেষ বেলায় বোধহয় একটু জ্ঞান এসেছিল। চোখ চেয়ে বিড়বিড় করে আনন্দকে কিছু বলার চেষ্টা করেছিল। নিজের বাবাকে মনে নেই। খুব অল্প বয়সে হারিয়েছে। কানাই প্রকৃত অর্থে তার বাবার জায়গাটা নিয়েছিল। আনন্দর দ্বিতীয়বার পিতৃ বিয়োগ হল। 

      মারা যাওয়ার খবরটা জানাজানি হতেই শকুনের মত বেশ কিছু আত্মীয় পরিজন এসে হাজির হল। এতদিন আনন্দ এই বাড়িতে আছে কিন্তু এই মানুষগুলোকে সে কখনও দেখেনি বা কানাইয়ের কাছেও এদের কথা কখনও শোনেনি। বাড়িতে ঢুকে একটু চোখের জল ফেলে নিয়ে যে যার মত খবরদারি করতে শুরু করে দিল। আনন্দ যে এ বাড়িতে আশ্রিত ছাড়া

আর কিছু নয় তা ওইটুকু সময়ের মধ্যেই ওকে ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিল। আনন্দ চিরকালই একটু নম্র প্রকৃতির। তাছাড়া অভাব অনটনের মধ্যে বড় হওয়ায় কোন ব্যাপারে প্রতিবাদ করার মত মনের জোরও তার ছিল না। তবে একটা ব্যাপার বেশ জোরের সঙ্গে সকলকে জানিয়ে দিল।

---বাবার মুখাগ্নি ও পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম সব আমিই করব। 

দু একটা টিপ্পনী ভেসে এল। ‘আশ্রিতের আবার বাবা। রঙ্গ দেখে আর পারিনা, বাব্বা।‘ তবে ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ যাই হোক শ্রাদ্ধশান্তিতে খরচ আছে বলে এ কাজে কেউ এগোয়নি। আর শকুনদের নজর তো কানাইয়ের সম্পত্তিতে। ওটা বেহাত না হলেই হল। শ্মশান থেকে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। রাতে কানাইয়ের ঘরের মেঝেতে 

কম্বল পেতে আনন্দ শুল। ঘুম আর আসে না। খালি বিছানার দিকে তাকিয়ে ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

---সারাদিন এত ধকল গেল, রাত জাগিস না বাবা, শুয়ে পড়।  

চমকে উঠে আনন্দ ঘরের চারদিকটা দেখল। খাটের ওপর থেকে কানাই ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। কানাইয়ের কিনে 

দেওয়া ক্যামেরায় আনন্দই কয়েক মাস আগে ছবিটা তুলেছিল। এতদিনের স্মৃতি, কথা, সব যেন চারদিক থেকে ভেসে আসছে। নিজের সমস্ত ভালবাসা উজাড় করে দিয়ে তার জীবনটা ভরিয়ে দিয়েছিল ঐ মানুষটা।

---যেন ভায়া, সুখ এক একজনের কপালে থাকে না। অমন মানুষটাকে হারাবার কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম যে ও বাড়িতে আমার পক্ষে আর থাকা সম্ভব নয়। শ্রাদ্ধের কাজকর্ম মিটে যেতেই সবাই নিজেদের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সকলেই সকলের প্রতিপক্ষ। তবে নিজেদের মধ্যে যতই মারামারি করুক, আমার বিরুদ্ধে কিন্তু সকলে একজোট। কারণ, আমাকে রাস্তা থেকে সরাতে না পারলে কাজ হাসিল করা সহজ হবে না। রুখে দাঁড়াবার মত মনের জোর বা ইচ্ছে কোনটাই আমার ছিল না। আমার এক বন্ধু অমলের সাহায্যে কয়েক দিনের মধ্যেই আমার জিনিসপত্র নিয়ে ও বাড়ি ছেড়ে কলেজ স্ট্রিটের এক মেসে গিয়ে উঠলাম। জিনিসপত্রের সঙ্গে এনেছিলাম আমার তোলা কানাই সরকারের ছবিটা। দরজার ওপরে যে ছবিটা টাঙান রয়েছে, ওইটাই সেই ছবি। আমার নিজের বাবা বা মা কারোরই ছবি নেই। মায়ের মুখ অস্পষ্ট হলেও মনে আছে, বাবার তাও নেই। জ্ঞানত উনিই  আমার বাবা, আমার গুরুজন, আমার সবকিছু।

---আর ঐ ছবি দুটো কাদের ? 

---একটা আমার স্ত্রীর আর অন্যটা আমার ছেলে মেয়ের সাথে আমি ও আমার স্ত্রী।

---আপনার স্ত্রী তো বেশ সুন্দরী ! 

আনন্দ কোন উত্তর করল না।

---অনেকক্ষণ তো হল। আর এক রাউন্ড চা করে আনি, কি বল ?

আবার বেল বাজল। দরজা খুলতেই একটা বাচ্চা মেয়ে দৌড়ে এসে আনন্দকে জড়িয়ে ধরল। 

---দাদু আজ বেড়াতে নিয়ে গেলে না?

---কাল যাব দিদিভাই। আজ কাকুটার সাথে একটু কথা বলছি তো।

উত্তরটা শিশুটির একেবারেই মনঃপুত হল না। এ ঘর ও ঘর খানিক ঘোরাঘুরি করে চলে গেল। 

---আমার নাতনি। স্কুল থেকে ফিরে এলে রোজ বিকেলে একবার বেড়াতে  নিয়ে যেতে হবে। আর ছুটির দিনে কতবার যে আসে তার ঠিক নেই।

---বাঃ, আপনার একজন দারুণ সঙ্গী বলুন।

---তা বটে।

অজয় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ছটা বেজে গেছে। শনিবারের সন্ধ্যায় ক্লাবের আড্ডাটা বেশ জমে। আজ আর যাওয়া হল না। এমন এক কাহিনীর মাঝপথে ছেড়ে চলে যাওয়া যায় না।

কিচেনের দিকে যেতে যেতে আনন্দ জিজ্ঞেস করল---ভাই, বোর হচ্ছ না  তো? আর হলেও এই বুড়োটার কথা ভেবে আর একটু না হয় থাক। কতদিন বাদে মনটা বড় ভাল লাগছে।

এবার চায়ের সাথে এল অমলেট। খিদেও পেয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে প্লেট খালি হয়ে গেল।

টি ব্রেকের পর আবার শুরু হল আনন্দর বিচিত্র জীবনকথা।

    প্রথম জীবনটা খুবই কষ্টের ছিল। কিন্তু মাঝে এতগুলো বছর সুখে, স্বাচ্ছন্দ্যে কাটার ফলে কলেজ স্ট্রিটের মেসের ছোট পলেস্তারা খসে যাওয়া ঘরে প্রথম কদিন বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। আনন্দর বন্ধু অমলও একই মেসে থাকত। অমলদের বাড়ি বর্ধমান  জেলার দাইহাটে। বয়সে আনন্দর থেকে একটু বড়। ও বি.কম. পাশ করে চাটারড পড়ছে। অমল আনন্দর খুব ভাল বন্ধু। আনন্দর বাড়িতে মাঝে মাঝেই যেত। আর ছুটি ছাটাতে গিয়ে থেকেওছে। কানাইও অমলকে পছন্দ করত। ও সঙ্গে থাকায় নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া আনন্দর পক্ষে অনেক সহজ হল। মাস খানেক পর বি.এস.সির রেজাল্ট বেরল। হাই ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে আনন্দ পাশ করেছে। এই খবর শুনে যে মানুষটা সব থেকে খুশি হত সেই আজ নেই। ঘরে ফিরে মাকর্শিটটা কানাইয়ের ছবির সামনে রেখে বাচ্চা ছেলের মত কেঁদেছিল।

      এম.এস.সি তে চান্স পেতে কোন অসুবিধে হল না। বাড়ি আর দোকান রেজিস্ট্রি করে যেতে না পারলেও, কানাই নিজের জমানো টাকার প্রায় সবটাই আনন্দর অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিয়েছিল। ঐ টাকার পরিমাণটা যথেষ্ট ছিল বলে খরচ খরচা নিয়ে আনন্দকে চিন্তা করতে হয়নি। এম.এস.সি পাশ করার পর আনন্দ বেশ কটা সরকারী, আধা সরকারী চাকরির সুযোগ পেল। কিন্তু পড়াশোনা ভালবাসত বলে ওগুলোতে না ঢুকে কাছাকাছি একটা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করে। কয়েক মাস কাটার পর মেস ছেড়ে পাশেই দু কামরার একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে ও আর অমল চলে আসে।  অমলের বাবা-মা কোলকাতায় এলে ওদের ভাড়া বাড়িতে এক আধ দিন থেকে যেতেন। কেবল ছেলের বন্ধু বলেই নয়, ধীর, শান্ত স্বভাবের জন্য ওঁরা আনন্দকে খুব পছন্দ করতেন। সংসারে একা বলে ওর প্রতি একটা সহানুভূতিও ছিল। আনন্দকে অনেকবারই ওঁরা দাইহাটে যাওয়ার জন্য বলেছেন কিন্তু নানা কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। সেবার গরমের ছুটিতে অমল প্রায় জোর করেই ওকে নিজের দেশের বাড়িতে নিয়ে গেল। বদ্ধির্ষ্ণু গ্রাম। স্টেশনের পাশেই বড় খেলার মাঠ। মাঠের ধারেই স্কুল। অমলের বাবা ঐ স্কুলে শিক্ষকতা করেন। স্কুলের পাশ দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। রিকসায় মিনিট দশেক লাগল অমলদের বাড়ি পৌঁছতে। পুরনো ধরনের বড় বাড়ি। সামনে অনেকটা বাগান।

বাইরে থেকেই অমল চিৎকার পাড়ল--ও মা আ আ আ। কাকে এনেছি দেখ।

অমলের মা সামনের বারান্দায় এসে ছেলের সাথে আনন্দকে দেখে খুব খুশি হলেন।

---এস বাবা ভেতরে এস। তুমি এসেছ খুব ভাল লাগছে। খোকা আনন্দকে তোর ঘরে নিয়ে যা। আর হ্যাঁ, সাড়ে বারোটা বাজে। একটু জিরিয়ে নিয়ে চান করে ভাত খেয়ে নে। সেই কখন বেরিয়েছিস, নিশ্চই খুব খিদে পেয়ে গেছে।

অমল বাবা মার একমাত্র সন্তান, তার ওপর বাইরে থাকে, ফলে বাড়িতে ওর আদর আবদারটা স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি। বন্ধু হিসেবে এই স্নেহ ভালবাসার অংশীদার হয়ে আনন্দরও খুব ভাল লাগছিল। পাশেই লাগোয়া অমলের কাকার বাড়ি। দুই ভাইয়ে সম্পর্ক খুব ভাল। বহুদিন একসাথে সবাই এ বাড়িতেই ছিল। কয়েক বছর আগে পাশের ফাঁকা জমিতে কাকারা বাড়ি করে চলে গেছে। এখনও ভাল মন্দ কিছু রান্না হলে এবাড়ি ওবাড়ি চালান হয়। কাকার নিজস্ব ব্যবসা আছে।

ঘরে গিয়ে জামাকাপড় পাল্টে দুজনে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে, এমন সময় বছর পনেরর একটা ছেলে ঘরে ঢুকল।

---দাদা, কখন এলি রে ?

---এইতো খানিকক্ষণ হল। তুই আজ স্কুলে যাসনি ?

---টেস্ট হয়ে গেছে, স্কুল তো ছুটি।

---ও, তাইতো। আমার একদম খেয়াল ছিল না।

তারপর গুরুজন সুলভ গম্ভীর স্বরে বলল---পড়াশোনা ঠিকমত হচ্ছে তো ?

বোঝা গেল প্রসঙ্গটা তার একেবারেই পছন্দের নয়।

সংক্ষিপ্ত উত্তর এল---হ্যাঁ।

---এ আমার বন্ধু আনন্দ। তোর আর একটা দাদা। আর আনন্দ, ও আমার ছোট ভাই অয়ন।

পায়ে হাত দেওয়াটা যুক্তিযুক্ত হবে কিনা বুঝতে না পেরে অয়ন আনন্দের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। বয়সে অনেকটা তফাৎ থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আনন্দর সাথে 

অয়নের সম্পর্কটা বেশ জমে গেল। যে কয়দিন আনন্দ ওখানে ছিল, অয়ন সারাক্ষণই ওর সাথে ঘুরেছে।

নিচে থেকে অমলের মার গলা পাওয়া গেল---কিরে তোদের স্নান হল ?

আর বেলা করিস না, খেতে আয়। খেয়ে দেয়ে যত পারিস গল্প কর।

খাওয়ার ঘরটা বেশ বড়। মাঝে টেবিল পাতা। আটজন একসাথে খেতে বসতে পারে। ঘরে কিছু অপরিচিত মুখ। অমল একে একে পরিচয় করাল।

---আমার কাকা, কাকিমা আর আমাদের একমাত্র আদরের বোন তনিমা।

কাকা-কাকিমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আর তনিমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে আনন্দ খেতে বসল। অমলের মা রান্নাঘরে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন, কাকিমা আর তনিমা পরিবেশন করছে। এলাহি আয়োজন।

মনে হয় আনন্দর আসার খবরটা এঁরা জানতেন।

কাকিমা বললেন---নিজের বাড়ি মনে করে চেয়ে নেবে, একদম লজ্জা করবে না।

এত সুস্বাদু রান্না এত আন্তরিকতার সঙ্গে আনন্দকে কেউ কোনদিন খাওয়ায়নি। মনটা ভরে গেল, সঙ্গে পেটটাও। তনিমা অয়নের থেকে বছর তিনেকের বড়। উনিশ কুড়ি মত বয়স। স্থানীয় কলেজে পড়ে। এদের ভাই বোন সবকটিকেই দেখতে ভাল। খাওয়া দাওয়ার পর আনন্দ দুপুরে গুছিয়ে একটা ঘুম দিল।

---উঠুন, চা এনেছি। মিষ্টি সুরেলা কন্ঠে ঘুম ভাঙল। তনিমা চায়ের কাপ হাতে সামনে দাঁড়িয়ে।

---আমায় ডাকলেই তো হত, কষ্ট করে আনতে গেলে কেন ?

মুচকি হেসে তনিমা বলল---কষ্ট করে এনে যখন ফেলেছি তখন একটু কষ্ট করে খেয়ে নিন।

ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেল---চা খাওয়া হলে নিচে আসবেন। দাদা অপেক্ষা করছে, আপনাকে নিয়ে ঘুরতে যাবে।

বিকেলে অমলের সাথে অনেক ঘোরা হল। বেশ ভাল লাগছিল। সন্ধ্যাবেলায় কাকার বাড়িতে জোর আড্ডা বসল। অয়নের সামনে পরীক্ষা, তাই ইচ্ছে থাকলেও বেশিক্ষণ থাকার অনুমতি পায়নি। গল্প, ঠাট্টা, মস্করার মধ্যে সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হল।

---এবার ওঠ, সকলে খেতে চল। অমলের মা তাড়া লাগালেন।

রাতের খাওয়া কাকার বাড়িতে। কাকার বাড়িটা অমলদের থেকে একটু ছোট হলেও অনেক ঝাঁ চকচকে। রাতেও  ভুরিভোজ।

আনন্দ খাবারের দিকে তাকিয়ে বলল---কাকিমা, আমি এত খেতে পারব না।

অমলের কাকা মিষ্টি ধমকে বললেন---বাচ্চা ছেলে, খেতে বসার আগেই ওরকম না না করবে না। তোমাদের বয়সে আমরা...

লোহা খেয়ে হজম করতাম---তনিমা বাক্যটা সম্পূর্ণ করে দিল। 

তবে রে মেয়ে—জেঠি বকা লাগাল।

অমল তো ভাল বন্ধু ছিলই, এখানে আসার পর ওর পরিবারের সকলকেই খুব ভাল লাগল। এদের আতিথেয়তা, আন্তরিকতা, ভোলার নয়। হয়ত নিজের বলতে কেউ নেই বলেই এদের পরিবারের স্নেহের বাঁধনটা ওকে এতটা অভিভূত করেছিল। ফিরে আসার সময় অমলের মা আর কাকিমা বাদে গোটা পরিবার ওদের স্টেশনে ছাড়তে এসেছিল।

---আবার আসবেন।

ট্রেন ছাড়ার মুখে তনিমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল। আসবে বৈকি। এত ভালবাসাকে কি কখনও উপেক্ষা করা যায় !

কিছুদিন পর স্কুল ছেড়ে আনন্দ কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেয়। মাইনেও কিছুটা বাড়ে।

অমল চাটারড পাশ করে বড় একটা ফার্মে চাকরি করছে। এখনও ওরা একসাথেই থাকে তবে বাড়ি পাল্টেছে। । এ বাড়িটা আগের থেকে অনেক বড় আর ভাল।

এক রবিবার দুপুরে গল্প করতে করতে অমল বলল---আনন্দ, এবার বিয়ে  করে সংসারী হ।

---তা আমায় পরামর্শ না দিয়ে তুই নিজে করছিস না কেন ?

---আমার বাড়িতে তো দেখাশুনো জোর কদমে শুরু করে দিয়েছে।

---ঠিক আছে, আগে তোর বিয়েতে মজা করি, তারপর না হয় আমারটা নিয়ে ভাবব।

---আনন্দ একটা কথা বলব ?

---তুই আবার কবে থেকে আমার সাথে কথা বলার আগে পারমিশান নেওয়া শুরু করলি? 

---তনিমাকে তোর পছন্দ ?

আনন্দ একটু চুপ করে রইল। ভাবতেই পারছে না যে ওর মত চালচুলোহীন মানুষের সাথে তনিমার মত ভাল বংশের এক সুন্দরী মেয়ের সম্বন্ধ আসতে পারে।

---কিরে, চুপ করে রইলি যে !

---আমার তো তুই সবই জানিস। তোর বাড়ির অন্যদের কি এতে মত আছে?

---বাড়িতে না জিজ্ঞেস করে কি আর তোকে বলছি ।

প্রথম দেখার পর থেকেই তনিমার প্রতি আনন্দর একটা দুর্বলতা জন্মেছিল। তবে সাহস করে সে কথা তনিমাকেতো  নয়ই এমনকি যে অমলের সাথে সে সব কথা শেয়ার করে তাকেও সংকোচে কিছু বলতে পারেনি।

---তনিমাকে জিজ্ঞেস করেছিস, ও রাজি আছে তো ?

হেসে অমল বলল---তনিমার মনের খবর বাড়ির মধ্যে সবথেকে ভাল আমিই রাখি।

---ঠিক আছে। তবে আমাকে তৈরি হওয়ার জন্য একটু সময় দিতে হবে। 

       প্রায় বছর খানেক বাদে তনিমা আনন্দর ঘরে এল। বাড়িতে আনন্দ একাই থাকে। অমল চাকরি সূত্রে তখন পাটনাতে। সমস্ত ঝক্কি সামলে আনন্দর বিয়েটা অমল একাই উৎরে দিয়েছিল।

তনিমা খুব গোছান মেয়ে। কয়েকদিনের মধ্যে ঘরদোরের চেহারাটাই পাল্টে দিল। আনন্দর শ্রীহীন জীবনে তনিমা এল  পূণির্মার জ্যোৎস্না হয়ে। যার স্নিগ্ধ আলোয় সে খুঁজে পেয়েছিল জীবনের অনেক সুখের সম্ভার। তখন হানিমুনের সেরকম চল না থাকলেও সুযোগ পেলেই আনন্দ সস্ত্রীক বেড়াতে চলে যেত। ওই কয়েকটা বছর ছিল তার জীবনের সেরা সময়। বিয়ের বছর ঘুরতেই তনিমার কোলে এল ‘আশা’। দুজনেই চেয়েছিল মেয়ে হোক। মেয়েকে প্রথম দেখার পর আনন্দর সেকি আহ্লাদ। বাচ্চা হওয়ার কিছুদিন আগে থেকে তনিমা বাপের বাড়িতে ছিল। মেয়ে দু তিন মাসের হতেই ওদের নিয়ে আনন্দ কোলকাতায় চলে আসে। এখানে অতটুকু বাচ্চা নিয়ে একা থাকতে হবে বলে বাড়ির লোকেরা আপত্তি করলেও আনন্দ খানিকটা জোর করেই তনিমাকে নিয়ে আসে। ওদের ছেড়ে ও আর একা থাকতে পারছিল না। তনিমার মা মেয়েকে ঐ অবস্থায় একা ছাড়তে ভরসা পাননি তাই সঙ্গে এসে কোলকাতায় কিছুদিন রইলেন।

আনন্দর জীবনের ধারাটাই বদলে গেছে। সে এখন আর এই সংসার সমুদ্রে সহায়সম্বল, আত্মীয় পরিজনহীন এক দিগ্ ভ্রষ্ট নাবিক নয়। আনন্দময় দাস ছাড়াও তার আরো পরিচয় আছে। সে একাধারে স্বামী, বাবা, শিক্ষক ও পরিবারের দায়িত্ববান একজন কর্তা।

---জানো ভায়া, বিয়ের পর কয়েক বছর আমাদের একটা ঘোরের মধ্যে কেটেছে। সে এক অদ্ভুত ভাললাগা। যার আবেশে ছকে বাঁধা দৈনন্দিন জীবনের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। তবে আশাকে কোলে নিয়ে যে অনুভূতি, যে শিহরন, যে ভাললাগা অন্তরে উপলব্ধি করতাম তার সাথে অন্য কোন জাগতিক সুখই তুলনীয় নয়। আমার রক্ত, আমার সৃষ্টি, আমার সন্তান- --সে এক স্বর্গীয় তৃপ্তি।

একদিন গল্প করতে করতে তনিমা আবদার করে বলল--- হ্যাঁগো, আমাদের নিজেদের ছোটখাট একটা বাড়ি করার কথা একটু ভাব না। এখনি বলছি না। একটু টাকা পয়সা জমিয়ে তারপর।

আনন্দরও একটা বাড়ি করার কথা কিছুদিন থেকেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।

বলল—হ্যাঁ, আমারও মাথায় আছে। দু একজনকে বলেওছি ভাল জায়গায় দু এক কাঠা জমির সন্ধান পেলে খবর দিতে।

কিছুদিন বাদে ভবানীপুরে আদি গঙ্গার দিকে দুকাঠার মত পছন্দসই একটা জমি পাওয়া গেল। কলেজের মাইনে ছাড়াও টিউশনি করে আনন্দ ভালই রোজগার করত। সংসারে যথেষ্ট খরচ করার পরেও উদ্বৃত্ত থাকত। এ ছাড়া কানাই এর দেওয়া টাকাটার অনেকটাই তখনও ছিল। ফলে জমি কিনে ছোট একটা বাড়ি করতে কোন অসুবিধে হয়নি। পুজো দিয়ে নিজের বাড়িতে যখন ঢুকল তখন আশার বয়স আড়াই বছর। নতুন বাড়িতে এসে সেও বেশ মজা পেয়েছিল। ‘আমার বালি’ আমার বালি’ বলে ধেই ধেই করে খানিক নেচে নিল।

বাড়িটা ছোট হলেও সুন্দর প্ল্যান করে করা। দুটো বেড রুম, দুটো টয়লেট, একটা কিচেন, একটা ছোট ড্রইং রুম আর একটা স্টাডি। সামনে কিছুটা ফাঁকা জমি। তনিমা ধীরে ধীরে নিজের পছন্দমত জিনিসপত্রে ঘরদোর সাজিয়ে ফেলল। দোতলায় সিঁড়ির পাশে ফাঁকা জায়গাটায় ঠাকুরঘর। সামনের ফাঁকা জমিটাও আর ফাঁকা নেই। নানারকম ফুলের গাছ লাগিয়েছে। তনিমা খুব খুশি।

অন্তরঙ্গ মুহূর্তে বলেছিল— আমার আনন্দের ঘরে এসে জীবন আমার আনন্দে ভরে গেছে। আচ্ছা, আমাদের বাড়ির একটা নাম থাকবে না ?

---কিছু ভেবেছ ?

---‘সোনার সংসার’ নামটা কেমন ?

---তুমি যখন চাইছ তখন ঐ নামই হবে।

কয়েক দিনের মধ্যেই পাথরে খোদাই করে বাড়ির নাম গেটের সামনে লাগান হল। কলেজের সহকর্মী থেকে আত্মীয় পরিজন যারাই বাড়িতে আসে তারা সকলেই একবাক্যে বাড়ির আর এত সুন্দর করে সাজিয়ে রাখার জন্য তনিমার  প্রশংসা করে।

বিজয় তো একদিন বলেই ফেলল—আনন্দদা, বৌদি ছিল বলে তরে গেলে। রান্নাবান্না করে, এতটুকু বাচ্চা সামলে, সারা বাড়িটা কি সুন্দর চকচকে রেখেছে বলতো !

আনন্দ অকপটে স্বীকার করল---সে আর বলতে ভাই।

বিজয় ঐ পাড়াতেই কিছুটা দূরে ভাড়া থাকে। একাই থাকে। বাবা মা অনেক কাল আগে মারা গেছে। পৈতৃক বাড়ি ডায়মন্ড হারবারের কাছে কোন এক গ্রামে। সরকারি কোন একটা অফিসে কাজ করে। ভাড়াটে হলেও এ পাড়ায় অনেকদিন আছে। জমি দেখতে আসার সময় রাস্তাতেই আনন্দর সাথে আলাপ হয়। পাড়াতে বেশ পপুলার। পরোপকারী ছেলে। সকলের প্রয়োজনে পাশে থাকে। আনন্দর সাথে তো মাত্র কদিনের আলাপ, তাতেও নতুন বাড়িতে মালপত্র নিয়ে আসার সময় সারাক্ষণ সাথে থেকেছে।

বলেও রেখেছে--- আনন্দ দা নতুন পাড়া, কোন সমস্যা হলে ছোট ভাইকে ডাকতে সংকোচ কোর না।

আনন্দ তখন প্রকৃত অর্থেই সুখী। ভাল চাকরি, মনের মত বাড়ি, ঘরে অমন ভাল বৌ, ফুটফুটে মেয়ে, আর এত ভাল পাড়া প্রতিবেশী। আর কি চাই ? সুখের পাত্র অবশ্য তখনও ভরেনি। পাওয়া আরো বাকি ছিল। বছর খানেক বাদে ঘরে এল ‘আলোক’। ছেলে মেয়েদের নাম সব তনিমার দেওয়া। ভাইকে দেখে সাড়ে তিন বছরের দিদির সে কি আনন্দ। নাওয়া খাওয়া ভুলে সারাদিন কেবল ভাইয়ের কাছে বসে থাকে। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পর নিজের ভরা সংসার দেখে আনন্দর মন জুড়িয়ে যায়। সেরকম আড্ডাবাগীশ না হলেও আগে পাড়ার ‘আমরা কজন’ ক্লাবে গিয়ে মাঝে মাঝে গল্প গুজব করত। বিজয়ই সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এখন কলেজ আর বাজার করা ছাড়া সারাক্ষণ বাড়িতেই কাটায়। শিশুদের কলকাকলি, স্ত্রীর সোহাগ, তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। যদিও বাড়িতে সর্বক্ষণের জন্য একটা কাজের মেয়ে আছে তবু তনিমাকে একটু হাতে হাতে সাহায্য করার চেষ্টা করে। ভাল লাগে। তনিমা উদ্যোগী হয়ে মেয়েকে পাড়াতেই একটা ভাল গার্লস স্কুলে ভর্তি করল। প্রথম দিন স্কুলে গিয়ে মেয়ের সে কি কান্না। তারপর ধীরে

ধীরে অভ্যাস হয়ে গেল। সাদা জামা আর লাল টুকটুকে ফ্রক পরে পিঠে বইখাতার ব্যাগ নিয়ে ওইটুকু মেয়ে মাকে আর ভাইকে টা টা করতে করতে বাবার সাথে স্কুলে যেত। অন্য সময়ে বাবার কোলে চড়ে ঘুরলেও স্কুলে কিন্তু হেঁটেই যেত। একটু বড় হওয়ার সাথে সাথে পাকা গিন্নি হয়ে উঠল। কোনদিন আনন্দ কলেজ থেকে একটু দেরী করে বাড়ি ফিরলে বকুনি খেত---কি ব্যাপার, এত দেরী কেন ? এতক্ষণ কি করা হচ্ছিল ?

আনন্দ হাত বাড়ালেই লাফিয়ে বাবার কোলে উঠে অনেক আদর করত।

তনিমা ভেঙিয়ে বলত---ওরে আমার বাপ সোহাগী মেয়ে রে ।

আলো হামা দিয়ে কাছে এলে ওকেও কোলে তুলে নিত। একদিন ছেলে মেয়ে দুজনেই বাবার কোলে, এমন সময় বিজয় বাড়িতে ঢুকল।

---আরে ব্বাস। এমন সুন্দর দৃশ্য, দাঁড়াও দাঁড়াও একটা ছবি তুলি।

বিজয়ের হাতে ক্যামেরা। ওর ছবি তোলার খুব শখ।

---বৌদি, তুমি দূরে কেন ? দাদার পাশে দাঁড়াও...একটু গা ঘেঁসে..আর একটু..আর একটু.. হ্যাঁ, পারফেক্ট। যা একখানা ছবি হবে না। ছবি তুলে  দিলাম, এবার কড়া করে একটু চা কর তো বৌদি। 

---তোমরা গল্প কর আমি চা বসাচ্ছি।

তনিমা আর আনন্দের ব্যবহারের গুনে পাড়া প্রতিবেশী অনেকের সাথেই বেশ বন্ধুত্ব হয়েছে। বাড়িতেও যাতায়াত হয়। তবু তার মধ্যে পাশের বাড়ির তপন ব্যানাজীর্দের পরিবার আর বিজয়, এরা একরকম ঘরের লোক হয়ে গেছে। ছুটি ছাটার দিনে মাঝে মাঝেই একসাথে খাওয়া দাওয়া হৈ হুল্লোড় হয়।

       দেখতে দেখতে আলোর বয়স চার বছর হল। ওর স্কুলটা একটু দূরে। আনন্দ ছেলে মেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসে আর বাড়ি আনে তনিমা। দুজনেরই পড়াশোনায় আগ্রহ আছে। আনন্দ ওদের জন্য একজন মাষ্টার রাখার কথা বলতে তনিমা আপত্তি করে বলেছিল—এইটুকু বাচ্চাদের আবার মাষ্টার কিসের? আমি তো রোজই ওদের পড়াই।

---না আসলে তোমার একার ওপর বড্ড চাপ পড়ে যাচ্ছে তাই।

---আমার কোন অসুবিধে হচ্ছে না। আর তুমি নিজেও তো একটু পড়াতে পার।

---ঠিক আছে, কাল থেকেই শুরু করছি। এই আশা, এই আলো, কাল সন্ধ্যে বেলা থেকে তোমাদের নতুন মাষ্টার মশাই পড়াবেন।

---কে বাবা, কে বাবা ?

---আমি ই ই ই।

---ছেলেমেয়ে তো হেসেই খুন।

তনিমা কপট রাগ দেখিয়ে বলল—অমন ফাজলামো করলে ওরা আর তোমার কাছে পড়েছে।  

নির্মল আনন্দে সময়টা ভালই কাটছিল। কিন্তু কোন সুখই আনন্দর কপালে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ছেলে মেয়ে দুটো তখন একটু বড় হয়েছে। মেয়ে ক্লাস সিক্স আর ছেলে থ্রীতে 

পড়ে। কয়েক মাস হল তনিমার আচরণে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। অমন হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল মেয়ে কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। প্রায়ই অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন ভাবে। অল্পেতেই 

রেগে যায়। ব্যাপারটা  লক্ষ্য করার পর আনন্দ নানাভাবে বহুবার তনিমাকে জিজ্ঞেস করেও কারণটা কি তা জানতে পারেনি। কিন্তু সমস্যাটা ক্রমশ বাড়তে থাকায় আনন্দ একদিন তনিমাকে বলল—তোমার শরীরটা নিশ্চয় ভেতরে ভেতরে খারাপ হয়েছে। চলো একটা ভাল ডাক্তারকে দেখাই।

উত্তর না দিয়ে তনিমা চুপ করে রইল। কিন্তু আনন্দ ডাক্তার দেখাবার জন্য পীড়াপীড়ি করাতে বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে তনিমা বলল—আমি ঠিক আছি। আর আমাকে নিয়ে তোমার অত না ভাবলেও চলবে।

এই তনিমা আনন্দর একেবারে অচেনা। এতদিন যে মানুষটার সাথে ঘর করেছে এ যেন সে নয়। আনন্দ চুপ করে গেল। আগে কখনও মনমালিন্য হলে কিছুক্ষণের মধ্যেই তনিমা তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করত। সে চেষ্টা দূরে থাক, আনন্দর সাথে কথা বলাই কমিয়ে দিয়েছে। ছেলে মেয়েদের সাথে একটু আধটু যা কথা বলে। তাও যে ছেলে মেয়ে ওর প্রাণ তাদেরও কারণে অকারণে বকাবকি করে। বাড়ির কাজকর্ম, বাগান, কোনকিছুতেই আর মন নেই। আচরণে মানসিক বিকারের লক্ষণ স্পষ্ট। আনন্দ খুব চিন্তায় পড়ে গেল। বাড়িতে কোন গোলমাল বা অশান্তি হয়নি। কেন এমনটা হল তার

কোন কারণই মাথায় আসছে না। ডাক্তারের কাছেও যেতে চাইছে না। কি করবে বুঝতে না পেরে পাশে তপনদের বাড়িতে গিয়ে সব কিছু খুলে বলল।

---বিজয় আর তোমরা আমার অত্যন্ত কাছের লোক। বিজয়ের তো আজকাল দেখাই পাওয়া যায় না। তোমরা একটু চেষ্টা করে দেখ, যদি বুঝিয়ে সুঝিয়ে তনিমাকে কোন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পার।

-- ব্যাপারটা আমাদেরও চোখে পড়েছে। আগে আপনারা অফিস চলে গেলে আমি আর বৌদি কত গল্প গুজব করতাম।  ইদানীং বৌদি তো আসেইনা আর আমি আপনাদের বাড়ি গেলেও দায়সারা ভাবে দু একটা কথা বলে। ফলে আমিও আর যাওয়ার আগ্রহ পাই না।

আনন্দকে আশ্বস্ত করে অনিতা বলল—আমাদের পক্ষে যতটা সম্ভব আমরা চেষ্টা করব। তপন ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করবে আর বৌদিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার ভার আমার। আপনি অত চিন্তা করবেন না, আমরা পাশে আছি।

আনন্দ খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়িতে ফিরল। এই অদ্ভুত আচরণ শুরু হওয়ার পর থেকে তনিমা আনন্দের সাথে খুব প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। আনন্দও আর ঘাটায় না। বাচ্চা দুটোকে নিয়ে যতটা পারে সময় কাটায়।

তপন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করেছে। সামনের রবিবার সন্ধ্যায় সময় দিয়েছে। এখনও তনিমার কানে যায়নি, গেলেই একটা অশান্তি বাধাবে।

     সেদিন কলেজে ক্লাস কম ছিল। শরীরটাও ভাল লাগছিল না, তাই লাইব্রেরি বা অন্য কোথাও না গিয়ে আনন্দ সোজা বাড়ি ফিরে এল। বাড়িতে ঢোকার সময় দেখে তপন সামনের বারান্দায় পায়চারি করছে। ডাক্তার দেখাবার ব্যাপারে তনিমাকে রাজি করাতে এসেছে বোধহয়। ইশারায় তপনকে জিজ্ঞেস করলে ও আনন্দকে বাড়ির ভেতরে যেতে বলল। শোওয়ার ঘরের খাটের ওপর অনিতার কোলে মাথা রেখে দুই ছেলে মেয়ে অঝোরে কাঁদছে। আনন্দ কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। বাবাকে দেখতে পেয়ে বাচ্চা দুটো দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলল—বাবা, মা নেই।

--- সেকি, কোথায় গেল ?

অনিতা চুপ করে বসে আছে।

অনিতা তুমি কিছু জান ?

অনিতা তখনও চুপ।

চুপ করে থেক না, তনিমার কি হয়েছে বল।

অনিতা আমতা আমতা করে বলল—আপনি ওর সাথে কথা বলুন।

আনন্দ ছুটে গিয়ে তপনকে জিজ্ঞেস করল—আমাকে খুলে বল কি হয়েছে।

তপন ছেলেমেয়েদের থেকে একটু আড়ালে সরে গিয়ে কোনরকম রাকঢাক না করে জানাল—তনিমা তোমার ঘর ছেড়ে বিজয়ের সাথে চলে গেছে।

আনন্দ স্তম্ভিত, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এতক্ষণ এতরকম দুশ্চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেলেও এটা একবারের জন্যও ভাবতে পারেনি। তপন টেবিল থেকে একটা খাম এনে আনন্দকে দিল। ভেতরে তনিমার লেখা একটা চিঠি।

 ‘ জানি যা করছি সমাজের চোখে তা চরম পাপ। নিজের মনের সাথে এই ক মাস অনেক যুদ্ধ করেছি। কিন্তু কি করব, অনেক চেষ্টা করেও বিজয়ের আকর্ষণকে উপেক্ষা করতে পারলাম না। ছেলে মেয়ে দুটোর জন্য কষ্ট হচ্ছে। ওদের নিয়ে যেতাম। কিন্তু ওরা তো তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। আমার এ কাজ ক্ষমার অযোগ্য তাই ক্ষমা চাইছি না। ছেলে মেয়ে দুটোকে দেখ। ওরা তোমার কাছে ভাল থাকবে। আমাকে ভুলে যেও।  ভাল থেক।-- তনিমা’

চিঠিটা পড়ে আনন্দর চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। মনটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। হায় রে সংসার। নিজের হাতে তিল তিল করে গড়ে তোলা সোনার সংসারকে কত সহজে ছারখার করে দিয়ে চলে গেল। সে নিজের কথা না হয় বাদই দিল, কিন্তু তনিমা তো একজন মা। কি করে পারল ছেলেমেয়েদের ওপর এতটা নিষ্ঠুর হতে। আর যে ছেলেটাকে সে নিজের ভাইয়ের মত দেখত, বিশ্বাস করত, তার কাছেই পেল এমন চরম আঘাত। মানুষকে ভালবাসা আর বিশ্বাস করার কি নির্মম পরিণতি। আনন্দ  অবাক হয়ে ভাবে যে সংসারে সম্পর্কগুলো এত ঠুনকো হলে সমাজটা এখনও টিকে  আছে কি করে ! মনের ভেতরের দুঃখ কষ্টটা আস্তে আস্তে চরম রাগ আর ঘৃণায় পরিণত হল। নিজের মনকে বোঝাল যে ভেঙে পড়লে চলবে না। বাচ্চা দুটোর জন্য ওকে শক্ত হতে হবে। ওদের যে ও ছাড়া আর কেউ নেই।

খবরটা শ্বশুর বাড়িতেও পৌঁছল।

--প্রাথমিক সংকোচ কাটিয়ে শ্বশুর শাশুড়ি বাড়িতে এসে আমার ছেলে মেয়ে  দুটোকে নিজেদের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। আমার মাথার ঠিক ছিল না। ওদের সকলের মধ্যেই তখন আমি তনিমাকে দেখতে পাচ্ছি। ওদের সঙ্গে সঙ্গে বিদায় করে দিই। এমনকি এক সময়ের আমার প্রাণের বন্ধু অমল সান্ত্বনা দিতে এলে ওকেও দূর দূর করে তাড়াই।

--কিন্তু একা দুটো বাচ্চাকে সামলাতেন কি করে? যখন কলেজে যেতেন তখন তো ওরা একেবারে একা থাকত।

-- ওটাই তখন আমার সবথেকে বড় চিন্তা ছিল অজয়। প্রথমে বেশ কিছুদিন কলেজে যেতে পারিনি। তারপর সারাক্ষণের জন্য একজন মাঝবয়সী মহিলাকে রেখেছিলাম। ওই বাচ্চাদের দেখত। এছাড়া তপন আর ওর স্ত্রী ওই দুঃসময়ে সারাক্ষণ পাশে ছিল। বাচ্চা দুটোকে যতটা সম্ভব আগলেছে। সমস্যা আরো ছিল। ততদিনে খবরটা চারিদিকে বেশ চাউর হয়ে গেছে। পাড়ায়, কলেজে, বাজারে, সর্বত্র একই প্রশ্ন। কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে, কেউ পরামর্শ দিচ্ছে, আবার কেউ কেউ শুধু মজা লুটছে। 

আমার তখন উন্মাদের অবস্থা। পরিচিত মানুষ দেখলেই আতঙ্ক হচ্ছে। কেউ কিছু বলতে এলেই, তা ভাল মন্দ যাই হোক, রাগ হচ্ছে।

ফোন বাজল। আনন্দ গিয়ে খানিকক্ষণ কথা বলে আবার এসে বসল।

রাত তখন প্রায় নটা। অজয় আগেই বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে যে ফিরতে একটু দেরী হবে। কিন্তু সেই একটুটা যে এতক্ষণ হয়ে যাবে তা ভাবতে পারেনি। এখন পুরোটা না শুনে উঠতেও মন চাইছে না। দুজনেরই তখন নেশা ধরেছে। একজনের শোনাবার নেশা আর অপরজনের শোনবার নেশা।

লোকলজ্জার যন্ত্রণায় আনন্দ ভবানীপুরের ‘সোনার সংসার’ ছেড়ে অনেক দূরে দমদমে একটা ভাড়া বাড়িতে এসে উঠল। এখানে সকলেই তার অপরিচিত। সারাক্ষণ অন্তত: তনিমাকে নিয়ে নানা কুরুচিকর প্রশ্নের উত্তর তো দিতে হবে না। মা চলে যাওয়ার পরে আশা কয়েকদিন ভাইয়ের সাথে খুব কান্নাকাটি করেছিল। তারপরে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে ওইটুকু মেয়ে বাড়ির সকলকে সামলেছে। ভাইকে সারাক্ষণ সামলানোর সাথে সাথে বাবাকেও নানাভাবে ভুলিয়ে রেখেছে। ছোট্ট আশা মানসিক ভাবে অনেক বড় হয়ে গেছে। মায়ের জাত তো। মেয়েরা বোধহয় এমনই হয়। তনিমা কি তবে ব্যতিক্রম ! হয়ত।

শুধু বাড়ি পাল্টেই সমস্যা মেটেনি। একই কারণে চাকুরিস্থলও পাল্টাতে হল। শহরের ভাল কলেজ ছেড়ে মফস্বলের একটা কলেজে চাকরি নিল। রেজাল্ট ভাল, অধ্যাপক ভাল, ফলে কলেজ পাল্টাতে অসুবিধে হয়নি।জীবনে তনিমার মধুর স্মৃতি আর তার কাছে পাওয়া চরম আঘাত, কোনটাই আনন্দর পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। তবু সময়ের

সাথে সাথে অনেক কিছুই স্বাভাবিক হয়ে এল। তনিমা এখন এই সংসারে অতীত। স্ত্রী অথবা মা, কোনরূপেই সে আর এখন এই সংসারকে কাঁদাতে পারবে না। ছেলেমেয়েদের মনে এখন মার জন্য আছে কেবল ঘৃণা আর আক্রোশ। আনন্দর মনে তাও নেই। তনিমার প্রতি ভালবাসা, ঘৃণা, ক্রোধ, কোনটাই সে অনুভব করে না।

দেখতে দেখতে আশা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হল। লেখাপড়ায় ছেলেমেয়ে দুজনেই ভাল। আনন্দই ওদের গাইড করে। শুধু পড়াশোনা কেন, জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে বাবাই ওদের পরামর্শদাতা, বন্ধু, সবকিছু। 

আনন্দর শ্বাশুড়ি তখন খুব অসুস্থ। নাতি নাতনিকে একবার দেখার জন্য অনেক কান্নাকাটি, অনুনয় করে চিঠি লিখে ছেলেকে আনন্দর কাছে পাঠালেন। সেবার আনন্দ আর কোন বাধা দেয়নি। ছেলেমেয়েরা যাবে না বলে বেঁকে বসলেও আনন্দই ওদের বুঝিয়ে রাজি করায়। মা চলে যাওয়ার পর এই প্রথম ওদের মামার বাড়িতে যাওয়া। আশার তবু কিছু মনে আছে। আলোকের কাছে জায়গা, মানুষজন সবই নতুন। আদর ভালবাসা সব পেলেও ওরা একবারের জন্যও ভুলতে পারছিলনা যে এরা সকলেই মায়ের লোকজন। কোনক্রমে একদিন থেকে জোর করেই দুজনে বাড়ি ফিরে আসে।

--স্যার, এবারের বড়দিনের ছুটিতে কিন্তু আমার দেশের বাড়িতে যেতেই হবে।

-- ঠিক আছে যাব।

-- প্রত্যেক বারেই যাব যাব বলেন কিন্তু যান না।

-- নারে বিশু, এবার ঠিক যাব।

-- মনে থাকে যেন স্যার।

বিশু মানে বিশ্বনাথ টুডু, আনন্দর কলেজের পিওন। পুরুলিয়ার একটা গ্রামেতে ওর বাড়ি। আনন্দকে খুব ভালবাসে। আনন্দকে একবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ওর অনেক দিনের ইচ্ছে । প্রায়ই বলে কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

--আমি দু তিন দিনের জন্য পুরুলিয়ায় বিশুর বাড়িতে যাব ভাবছি। এমন ভাবে ধরেছে। তোরা কদিন একা থাকতে পারবি?

-- কেন পারব না । আমরা কি এখনও বাচ্চা আছি নাকি ? বেশ প্রত্যয়ের সঙ্গে আশা জানাল।

ঠিকই তো। ওইটুকু দুটো বাচ্চা দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল। আশা মাস্টার্স করছে আর আলো কলেজে পড়ে। আশা অনেকটা বাবার মতন। কোন চাহিদা নেই। বাবা যা দেয় তাতেই খুশি। আলোর ধরণটা একেবারে আলাদা। আবদার লেগেই আছে। আর কখনও অভিমান করে, কখনও বা বাবার গলা জড়িয়ে আদর করে কাঙ্ক্ষিত জিনিস সে আদায় করেই ছাড়বে। আনন্দও ছেলেমেয়েদের কোন দিক থেকে কোন অভাব রাখেনি। সব সময় নানাভাবে চেষ্টা করেছে যাতে সন্তানেরা মায়ের অভাব বুঝতে না পারে।

আলো এমন সুযোগ হাতছাড়া করল না। রসিকতা করে বলল—যাওয়ার পারমিশান দিচ্ছি, কিন্তু বাবা একটা শর্ত আছে।

--এতে আবার শর্ত কিরে ?

-- আছে, আছে।  একটা ভাল রেস্টুরেন্টে দুজনের খাওয়ার পয়সা দিয়ে যেতে হবে।

-- কি হচ্ছে ভাই ? আশা ধমক দিল।

-- কিছু না দিদি। সোজা হিসেব। বাবা বেড়াতে যাবে আর আমরা খেতে যাব।

আনন্দ ছেলের গাল টিপে প্রস্তাবে সম্মতি দিল।

ডিসেম্বর প্রায় শেষ। ঠান্ডা ভালই আছে। আর কোলকাতা থেকে গ্রামের দিকে ঠান্ডা অনেক বেশি হবে। দুদিনের মত জামা, প্যান্ট, টুকটাক জিনিস আর একটা শাল ছোট একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগে পুরে সকালে একটা ট্রেন ধরে আনন্দ পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হল। বিশুর বাড়ি যে স্টেশনে সেখানে কয়েকটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন ছাড়া আর কিছুই দাঁড়ায় না।

তাই পুরুলিয়ায় নেমে ট্রেন পাল্টাতে হবে। পুরুলিয়ায় নেমে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর একটা লোকাল ট্রেনে উঠল। বিকেল চারটে নাগাত পৌঁছল বিশুর স্টেশন বাগালিয়া হল্টে। একেবারেই ছোট স্টেশন। যাত্রীও হাতে গোনা কয়েকজন। গাড়ি এক মিনিট দাঁড়াবে। বিশুই মালপত্র নামিয়ে আনন্দকে নিয়ে একটা রিকশায় চেপে বসল। স্টেশনের পাশে দু একটা দোকানপাট ঘরবাড়ি রয়েছে। একটু এগোতেই চারিদিক সব ফাঁকা হয়ে গেল। রাস্তার ধারে মাঝে মাঝে কয়েকটা বাড়ি

আর বাকি ধু ধু প্রান্তর। কোথাও কোথাও কিছু চাষবাস হচ্ছে। এত রুক্ষ লাল মাটিতে চাষও সেরকম ভাল হওয়ার কথা নয়। স্টেশনের কিছুটা পর থেকে রাস্তাও কাঁচা আর এবড়ো খেবড়ো। 

একটা মাটির বাড়ি দেখিয়ে বিশু বলল—ওটা স্যার একটা ছোটদের  স্কুল। লেখাপড়া ছাড়াও ওখানে একটু আধটু হাতের কাজও শেখান হয়। কালকে আপনাকে এখানে নিয়ে আসব স্যার। আপনার মত মাস্টারমশাইয়ের পদধূলি পড়লে আমাদের ছেলেমেয়েগুলো ধন্য হয়ে যাবে।

-- বাজে বোকো নাতো। তোমার বাড়ির বাচ্চারা কি এই স্কুলেই পড়ে ?  

--হ্যাঁ স্যার, শুধু আমার বাড়ি কেন, আমাদের মহল্লার প্রায় সব বাড়ির ছেলেমেয়েরাই এখানে পড়তে আসে।

বাড়ির বাইরে দু একটা বাচ্চা দৌড়াদৌড়ি করছে। গেটের সামনে স্কুলের নাম বড় বড় করে লেখা “আশালোক বুনিয়াদী বিদ্যালয়”।

বেশ নতুন ধরণের সুন্দর নাম।

আর একটু যেতেই বিশু বলল—স্যার এসে গেছি। 

সামনে অনেক ঘরবাড়ি। অধিকাংশই মাটির। কিছু পাকা বাড়িও রয়েছে। একটু এগিয়ে বাঁ ধারে একটা পাকা বাড়ি দেখিয়ে বিশু জানাল—স্যার ওটা আমার বাড়ি।

রিকশাওয়ালা জিনিসগুলো ঘরে পৌঁছে দিল। আনন্দ ভাড়া দিতে গেলে কিছুতেই নিল না। বিশু নিশ্চয় মানা করেছে। রিকশাওয়ালার বাড়িও  ওই পাড়াতেই। এর মধ্যে ওদের দেখতে লোক জমে গেছে। দু একজন আনন্দর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে গেল। ব্যাপার স্যাপার দেখে মনে হল বিশু এ পাড়ার একজন কেউকেটা। আর সেটাই স্বাভাবিক। কোলকাতায় চাকরি করে, একটা পাশ দিয়েছে, তার ওপর তুলনামূলক ভাবে অবস্থাও ভাল। একটা ঘর আনন্দর জন্য সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। এদের আতিথেয়তা আর আন্তরিকতায় আনন্দ অভিভূত হয়ে গেল।

খানিক বাদে বিশু আনন্দকে নিয়ে বের হল। ঘোরা বা দেখার সেরকম কিছু নেই। আদিবাসী পাড়াটা পার হলে চাষের জমি আর ফাঁকা মাঠ। অনেক আদিবাসী এলাকা আনন্দর ঘোরা। এদের নিয়ে ওর গবেষণা মূলক কিছু লেখা বিভিন্ন সময়ে নানান পত্রিকায় বেরিয়েছে। অন্যান্য জায়গাগুলোর মত বিশুদের পাড়ায় অভাব অনটন সেরকম চোখে পড়েনি। প্রত্যেক বাড়িতেই বড়রা কিছু না কিছু উপার্জন করে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানর একটা আগ্রহও আছে। আর সর্বোপরি পাড়ার লোকেদের মধ্যে বেশ সদ্ভাব আছে। দেখে আনন্দর খুব ভাল লাগল। পাশেই রয়েছে একটা স্বাস্থ্য কেন্দ্র। একটু এগোতেই একটা শিব মন্দির দেখিয়ে বিশু বলল—স্যার, বাবা খুব জাগ্রত। বাবার কাছে মন থেকে কিছু চাইলে ঠিক পাওয়া যায়।

তুমি কি কি পেয়েছ ?

--আমার ছেলে, মেয়ে, বৌ, চাকরি, বাড়ি সবই বাবার দয়ায়।

আনন্দ একটু হেসে বলল—তাহলে তোমার চেষ্টায় কিছুই হয়নি বলছ।

ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে বিশু একটু লজ্জা পেল। ঝাঁ চকচকে মন্দির। বিশুর কাছে জানতে পারল যে বছর কয়েক আগে একটা ট্রাস্ট পুরোনো মন্দিরটাকে সংস্কার করে এখনকার অবস্থায় এনেছে। আনন্দ নাস্তিক না হলেও জীবনে নানা ঘাত প্রতিঘাতের সম্মুখীন হতে হতে তার ঈশ্বরে বিশ্বাসটা ফিকে হয়ে গেছে। এখনও সে ঠাকুর দেবতাকে প্রণাম করে ঠিকই, তবে তার অধিকাংশটাই এতকালের অভ্যাসের ফলে, বিশ্বাসে নয়। চটি খুলে দুজনে মন্দিরে ঢুকল। এখানে শিব হিসেবে  যা পুজো করা হয় তা কোন শিবলিঙ্গ নয়। একটা গোল মত কালো পাথর শ্বেত পাথরের সিংহাসনে বসান আছে। বিশু হাত জোড় করে বিড় বিড় করে কিছু বলতে শুরু করল। বোধহয় শিব ঠাকুরের কাছে নতুন কোন চাহিদা জানাচ্ছে।

মন্দিরে ঢুকে আনন্দরও বেশ ভাল লাগছে। অভ্যাসবসে ছেলে-মেয়ে দুটোর ভাল চেয়ে চোখ বন্ধ করতেই মনের জানালা দিয়ে তৃতীয় একজন কখন যেন ঢুকে পড়ল। অনেক চেষ্টা করেও তাকে আলাদা করে সরান গেল না। অতবড় আঘাত সত্ত্বেও এতকাল পরেও আনন্দর অবচেতন মনে তনিমা এখনও রয়ে গেছে। সন্ধ্যা হওয়ার একটু আগে ওরা ফিরে এল।

 --স্যার কাল আমাদের রাতে গাড়ি। সকালবেলা স্কুলে যাব।

--তোমার জায়গায় এসেছি, যেখানে নিয়ে যাবে যেতে হবে।

-- গিয়ে দেখবেন ভাল লাগবে।

রাতে বিছানায় শুয়ে কেবলই তনিমার কথা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। এতদিন বেশ ভুলে ছিল। ওই শিব মন্দিরে গিয়ে সব কেমন গোলমাল হয়ে গেল। 

সকালবেলা স্কুল দেখতে যাওয়ার আগে আনন্দ বাচ্চাদের জন্য কিছু লজেন্স আর বিস্কুট কিনে নিল। বিশুও চান টান  করে রেডি।

--তোমাদের স্কুলে কোন ক্লাস পর্যন্ত আছে ?

-- ক্লাস ফাইভ অব্দি স্যার। ঘর খুব কম। পলিথিন, টিন, এসব দিয়ে ঢেকে কোনরকমে ম্যানেজ হচ্ছে। বর্ষাকালে খুব অসুবিধে হয়। আসলে স্যার পয়সার বড় অভাব। এবার আমাদের এম.এল.এ. কথা দিয়েছেন স্কুলটার জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন।

-- রাজনীতির কারবারিদের প্রতিশ্রুতি কর্পূরের থেকেও তাড়াতাড়ি উবে যায় এটা জান তো।

-- তা ঠিক। তবে অনেককেই ধরেছি, এবার একটা কিছু ব্যবস্থা করেই ছাড়ব।

সমাজকল্যাণ মূলক কাজে বিশুর এই উৎসাহ আনন্দর খুব ভাল লাগল।

বেরোবার সময় সাথে চেক বইটা নিয়ে নিল। সঙ্গে তেমন টাকা নেই, যদি কিছু ডোনেট করতে ইচ্ছে হয় চেক কেটে দেবে। স্কুলটা বিশুর বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেকের পথ। তখনও স্কুল শুরু হয়নি। বাচ্চারা সব একে একে আসছে। বিশুর মহল্লার বাচ্চারা সংখ্যায় বেশি হলেও আশে পাশের গ্রাম থেকেও ছেলে মেয়েরা এখানে পড়তে আসে। স্কুলে আসার কথাটা বোধহয় বিশু আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছে। বেশ কয়েকজন  সার দিয়ে আনন্দকে অভ্যর্থনার জন্য স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিশু এক এক করে সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে আনন্দকে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল।

--স্যার একটু বসুন, বড় দিদিমণি এখনই আসছেন।

বসার সাথে সাথেই একজন চা আর বিস্কুট দিয়ে গেল। তারপর শুরু হল পেন্নামের পালা। মাস্টার, পড়ুয়া, কেউ বাদ যাচ্ছে না। অল্প সময়ের মধ্যেই বড় দিদিমণি ঘরে ঢুকলেন। আনন্দকে তখন দেখা যাচ্ছে না। কৌতূহলী ছাত্র শিক্ষক সব ওকে ঘিরে রয়েছে। কেউ ওর পা ছুঁয়ে কেউ একটু কথা বলে ধন্য হচ্ছে। আর আনন্দ তখন সঙ্গে আনা লজেন্স বিস্কুটগুলো বাচ্চাদের মধ্যে বিলোচ্ছে।

--নমস্কার স্যার। একটু দেরী হয়ে গেল, মার্জনা করবেন। বাচ্চারা, স্যারকে আর বিরক্ত কোরো না। তোমরা এবার ক্লাসে যাও। 

--গলাটা শুনেই আনন্দ চমকে উঠল। প্রতি নমস্কারের জন্য উঠে দাঁড়িয়ে সামনের মানুষটাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে তনিমা। একটা হাল্কা আকাশি রঙের শাড়ী পরা। এতগুলো বছর পরেও চেহারাটা প্রায় একই আছে।

বিস্ময়ের ঘোর কাটার পর অস্ফুট স্বরে আনন্দ জিজ্ঞেস করল—তোমরা এখানে থাক ?

--আমি একাই থাকি। 

শিক্ষক ছাত্র সবাই ক্লাসে চলে গেছে। ঘরে তখন শুধু ওরা দুজন। আনন্দর মনের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। কত কিছু বলতে আর জানতে ইচ্ছে করছে। অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করল। 

--কাল বিশুর কাছে নাম আর পেশায় অধ্যাপক শুনে মনে হয়েছিল যে মানুষটা তুমিই হবে। তবে এক নামে তো একাধিক মানুষ থাকে তাই  নিশ্চিত হতে পারিনি। 

আনন্দ নিজের আবেগকে লাগাম দিয়ে চুপ করে রইল।

--ছেলে মেয়ে দুটো কত বড় হয়ে গেছে। ওদের খুব দেখতে ইচ্ছে করে। ওরা এখন কি করছে ?

আনন্দ সংক্ষেপে জানাল।

--এতদিন বাদে দেখা হল, আমায় ভাল মন্দ কিছুতো বল।

-- সব  সম্পর্কেই তো বহুকাল আগে ইতি টেনে দিয়েছ তনিমা। এতদিন বাদে আর কি বা বলার থাকতে পারে ! 

কথার মাঝে বিশু আর একজনের সাথে এক প্লেট জলখাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল।

--খেয়ে নিন স্যার। 

-- তুমি কি পাগল, এত কে খাবে বলত ?

কিছু খেতেই হল।

আনন্দকে থামিয়ে অজয় জিজ্ঞেস করল—এতকাল পরে দেখা, ওভাবে মুখ ফিরিয়ে থাকলেন কি করে ? ভাল কথা যদি নাও বলা যায়, মনের ভেতর জমে থাকা রাগ দুঃখটা তো প্রকাশ করতে পারতেন।

-- ওর প্রতি তখন আমার মনে রাগ, দুঃখ বা ঘৃণা কিছুই নেই। ওটা আমার জীবনে ঘটা অনেক দুর্ঘটনার মধ্যে একটা বলে মনে করি। আর সেদিন কম কথা বলেছি কারণ তা না হলে নিজেকে সামলাতে পারতাম না। 

চলে আসার আগে আনন্দ চেক বইটা  খুলে এক লাখ টাকার একটা বেয়ারার চেক তনিমাকে দিয়ে বলেছিল—টাকাটা বিরাট কিছু নয়, তবু এতে যদি কোন উপকার হয় ভাল লাগবে।

তনিমা না করেনি।

উপকারটা কার তনিমার না স্কুলের তা উহ্য ছিল। তাই চেকে পে র জায়গাটাও ফাঁকাই রাখা ছিল।

ফিরে আসার সময় তনিমা খুব আস্তে বলেছিল—সকলে ভাল থেক।

 অনেক চেষ্টা করেও সে আনন্দের কাছ থেকে চোখের জল লুকোতে পারেনি।

--চেকটা তাহলে আপনি স্কুল নয়, তনিমাকেই দিয়েছিলেন।

-- বলতে পার। আমাকে এক সময় স্বামী রূপে অস্বীকার করলেও আমার সন্তানের মা হিসেবে তো আমি ওকে অস্বীকার করতে পারি না। 

 তনিমার সামনে সব আবেগ, কৌতূহল, চেপে রাখলেও স্কুল থেকে বেরিয়ে এসে বিশুকে আনন্দ জিজ্ঞেস করল—তোমাদের দিদিমণি কি বরাবরই এখানে থাকেন ?

-- না স্যার। বেশ কয়েক বছর আগে কয়েকজন লোক কোন প্রতিষ্ঠানের হয়ে  আমাদের এখানে লেখাপড়া আর চিকিৎসার উন্নতির জন্য কাজ করতে এসেছিল। দিদিমণিও ওই দলে ছিল। ওনাদের চেষ্টাতেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর এই স্কুলটা হয়েছে। বছর দুয়েক বাদে অন্যরা চলে গেলেও দিদিমণি এখানেই থেকে গেলেন। আসলে আমাদের ভালবেসে ফেলেছেন। স্কুলেরই একটা মাটির ঘরে থাকেন আর সারাদিন বাচ্চাগুলোকে নিয়েই মেতে থাকেন।  মানুষটা খুব ভাল স্যার। এখানে সবাই ওনাকে খুব ভালবাসে আর মান্য করে।

-- দিদিমণির ঘরবাড়ি, পরিবার পরিজন, কেউ নেই ?

-- সেও একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম স্যার। বললেন “চলতে চলতে একদিন হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম। আর তখনই না আমার জীবনের সব থেকে দামী জিনিসগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল”। উনি কি যে বললেন স্যার কিছুই বুঝলাম না। তবে আর ওই নিয়ে কখনও কিছু জিজ্ঞেস করিনি।

-- স্কুলের নামটা দিদিমণি রেখেছে তাই না ?

-- স্কুলের সব কিছুই ওনার মতে হয়েছে স্যার।

সন্তানদের নামেই স্কুলের নামটা রেখেছে।

বাড়ি ফিরে এসে তনিমার ব্যাপারটা ছেলে মেয়েদের জানাবে কিনা তাই নিয়ে আনন্দ একটু দোটানায় ছিল। কিছুদিন বাদে দুজনকেই সব কিছু জানায়। কিন্তু ছেলে বা মেয়ে কেউই মায়ের ব্যাপারে সামান্যতম আগ্রহও দেখায়নি।

আশা এম.এ. পাশ করে অল্প সময়ের মধ্যেই একটা ভাল চাকরি পেয়ে গেল। প্রথম মাইনের টাকায় বাবা আর ভাইয়ের জন্য কতকিছু এনেছিল। সেই কোন ছোটবেলায় মা চলে যাওয়ার পর থেকে বিয়ের আগে পর্যন্ত আশা বাড়িটাকে সব দিক থেকে আগলে রেখেছিল। 

কমল ওর স্ব নির্বাচিত। সম্পর্কটা জানার পর আনন্দ একদিন ছেলেটিকে  বাড়িতে ডেকে পাঠাল। ছেলেটার কথাবার্তা ভাল। দেখতে শুনতেও খারাপ নয়। বয়স আশারই গায়ে গায়ে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ভাল প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। বাড়িতে মা আর ছেলে থাকে। বাবা বছর কয়েক আগে মারা গেছেন। আনন্দ কোন আপত্তি করেনি। আপত্তি করার কথাও নয়। আশা চলে যেতে বাড়িটা একদম ফাঁকা হয়ে গেল।

     কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আলোর একটা আলাদা পরিমণ্ডল, আলাদা জগৎ তৈরি হতে শুরু হয়। সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ছেলেপুলে বড় হলে তার নিজস্ব একটা স্পেস তো থাকবেই। আশারও ছিল। কিন্তু একসাথে বসে খাওয়াদাওয়া, অবসর সময়ে সকলে মিলে গল্প গুজব ইত্যাদি করার মধ্যে দিয়ে ও বাড়ির সম্পর্কের বাঁধনটাকে কখনও আলগা হতে দেয়নি। ওর নিজস্ব সম্পর্কগুলো কখনই পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হয়নি।

কিন্তু আলোর নতুন সম্পর্কগুলো ওকে ধীরে ধীরে আনন্দের থেকে দূরে আরো দূরে নিয়ে যেতে থাকে। বাবার সাথে ছাড়া যে কোনদিন খেতে বসত না সেই ছেলের কাছে এখন বাড়ির এইসব ছোটখাট সেন্টিমেন্টের কোন মূল্য নেই। কতদিন আনন্দ রাতে একসাথে খাবে বলে ছেলের অপেক্ষায় বসে থেকেছে। অনেক রাতে ছেলে যখন মাতাল হয়ে ঘরে ফিরেছে তখন তার আর খাওয়ার অবস্থা ছিল না। একদিন পাকাপাকিভাবে ব্যাপারটায় ইতি টেনে বলে দিয়েছে—বাবা তুমি রোজ আমার জন্য বসে থেক না। তুমি তোমার মত খেয়ে নিও। আমি আমার সুবিধে মত খাব।কিছু বলার নেই। বড় হয়েছে। ছেলেবেলার অভ্যাসগুলো তো পাল্টাবেই। আনন্দ খবর নিয়ে জেনেছে যে ছেলে অসৎ সঙ্গে পড়েছে। কয়েকবার বোঝাবার চেষ্টা করেছে কিন্তু কোন লাভ হয়নি। যৌবনের উদ্দাম স্রোতে নৌকো তখন বাঁধন ছিঁড়ে ভাসতে ভাসতে ঘাটের থেকে অনেক 

দূরে চলে গেছে। আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। একটা সময়ের পরে একই বাড়িতে থাকলেও, বাবা আর ছেলের মধ্যে মানসিক যোগাযোগটা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। অথচ এমনটা হওয়ার কোন কারণ ছিল না। আনন্দ সব সময় স্নেহ ভালবাসা দিয়ে তার দুই সন্তানকে আগলে রেখেছিল। ওদের কোনদিন কোনকিছুর অভাব বুঝতে দেয়নি।

--বুঝলে অজয়, এরপর মাঝে মাঝেই একটা মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে আসতে শুরু করল। থাকতে না পেরে একদিন মেয়েটি কে তা জানতে চাইলাম। বেশ উত্তেজিত হয়ে জানিয়েছিল যে ওটি ওর গার্ল ফ্রেন্ড। আমারও সহ্যের সীমা  তখন পার হয়ে গেছে। বলেছিলাম যে আমার বাড়িতে এসব চলবে না। এর কয়েকদিন বাদে আলো বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বলে গিয়েছিল ‘তুমি কি ভেবেছ তোমাকে ছাড়া আমার চলবে না’!

এরপর বাবার সাথে অনেকদিন কোন যোগাযোগ রাখেনি। আনন্দ ছেলের খবর কিছু কিছু রাখত। লেখাপড়ার পাঠ আগেই সাঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। কোথায় একটা ছোটখাট কাজ করত। রোজগার সামান্যই, তাই বস্তি এলাকায় একটা ঘর ভাড়া করে ছিল। এরমধ্যে বিয়েটাও সেরে ফেলেছে। নিজের ছেলের বিয়েতে আনন্দ একজন সাধারণ নিমন্ত্রিত ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর নিমন্ত্রণটাও হয়েছিল অত্যন্ত দায়সারাভাবে। আত্মসম্মানবোধ আছে এমন মানুষ নিজের ছেলের বিয়েতে এভাবে যেতে পারে না। আনন্দও যায়নি। দুঃখ, কষ্ট, আঘাত, আনন্দর জীবনে নিত্য সঙ্গী। তবু ছেলের কাছে পাওয়া আঘাত বোধহয় সবকিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছে।

মেয়ের ইচ্ছেয় আর চেষ্টায় মেয়ের ফ্ল্যাটের সামনা সামনি এই ফ্ল্যাটটা কিনে বহুদিন কাটান দমদমের ভাড়া বাড়িটা  ছেড়ে একসময় এখানে চলে আসে। এখানে মেয়েরও বাবাকে দেখাশুনার একটু সুবিধে হয় আর আনন্দরও নাতি নাতনির সাথে সময়টা ভালই কাটে। আলোর বউ অনেকবার এই ফ্ল্যাটে এসেছে। কয়েকবার আলোও সঙ্গে ছিল। মেয়েটি খারাপ নয়। 

স্বামীর আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়ে আবার বাপ ছেলের সম্পর্কটা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এমনকি আলোকে দিয়েও তার কৃতকর্মের জন্য বাবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করিয়েছে।

আনন্দ যেমন জীবনে কখনও কোন কিছুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারেনি, তেমনই আঘাত জর্জরিত জীবনে সব আঘাত

সামলে অচিরেই জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ওর মধ্যে ছিল। কিন্তু আলোর আচরণের এই কুৎসিত পরিবর্তনের পর থেকে ওকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দিতেও ঘৃণা বোধ করে। তাই বৌমার শত চেষ্টাতেও বাবা ছেলের সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হয়নি। তা ছাড়া আনন্দর মনে হত আলো বা তার বউএর তার ফ্ল্যাটে আসাটার পিছনে একটা অভিসন্ধি ছিল। তা হল অর্থ।

-- ছেলের চিঠি না পড়ে কেন রেখে দিয়েছি জানো অজয় ? কারণ খামের ভেতর কি লেখা আছে তা আমার জানা। নয় নিজে নয় বউমাকে দিয়ে টাকা চেয়েছে। চাকরি তো সেরকম কিছু করে না। ভাঁড়ারে টান পড়লেই বাপকে স্মরণ করে।

-- চাইলেই টাকা দিয়ে দেন ?

-- অধিকাংশ সময়েই দিই। কি করব ছেলে ত। যত বদই হোক পয়সার অভাবে খেতে পাবে না বাপ হয়ে তা কি দেখতে পারি!

-- তা সামনা সামনি না এসে চিঠি লিখে চায় কেন ?

-- সামনে এসে চাইবার তো আর মুখ নেই। আর তাছাড়া এখন এখানে নেই। বিহারে কোথায় যেন কাজ করে। অবশ্য কাজ সেরকমই করে, না হলে ফি মাসে হাত পাততে হয় !

 

যাক ওসব কথা ছাড়। সব ঘটনা তো শুনলে। এবার বল, আমার মত জীবনে এত বিয়োগ, এত হারানো, এত কষ্ট, আর কখনও শুনেছ ? কেবলই মাইনাস।

--বাবা কখন খাবে ? কত রাত হল বল তো! আজকাল একদম কথা শুনছ না। আর তুমি না খেলে বাচ্চা দুটোও খাবে না। 

কথাগুলো বলার পর মহিলা ঘরে অজয়কে দেখতে পেয়ে লজ্জা পেয়ে যায়।

--তুই খাবার বাড় আমি এখনই আসছি। 

ভদ্রমহিলা চলে যাওয়ার পর আনন্দ অজয়ের দিকে চেয়ে বলল—আমার মেয়ে। 

--আন্দাজ করেছি। এর পরেও বলবেন আপনার পাওয়ার ঘরে কিছুই নেই। কানাইয়ের মত একজন অপরিচিত মানুষের নিজেকে উজাড় করে দেওয়া ভালবাসা, সান্নিধ্য ও অসীম নির্ভরতা পাওয়া কজন মানুষের কপালে জোটে। আর আপনার মেয়ে আশা। বিয়ের আগের কথা বাদই দিলাম, বিয়ের এতকাল পরেও বাবার জন্য এত ভাবে, এটা কি কম বড় পাওয়া। সন্তানের এই ভালবাসা আর উৎকণ্ঠায় ভরা শাসন, নাতি নাতনির সঙ্গ, আজকের এই বৃদ্ধাশ্রমের যুগে এক বৃদ্ধের কাছে এর থেকে বড় পাওয়া আর কি থাকতে পারে ! জীবনে আপনি যতবার সমস্যায় পড়েছেন তা থেকে বেরিয়ে আসার পথও কিন্তু কোন না কোন ভাবে পেয়ে গেছেন। জীবনের অঙ্কটা বড় জটিল। কোথায় কি চিহ্ন বসাচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করবে এর উত্তর।

কিছু সময় চুপ করে থাকার পর বৃদ্ধ বললেন—তোমার মত করে অবশ্য কোনদিন ভাবিনি। দেখি তোমার প্রসেসে অন্য  কোন উত্তর পাই কি না।

এতদিনের জমে থাকা ব্যাথা বেদনাকে উগরে দিতে পেরে মানসিকভাবে মানুষটাকে অনেকটাই ভারমুক্ত মনে হচ্ছে। এখন একে ভরসা করে বলাই যায় “ভাল থাকবেন”।

অজয় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত এগারটা। আর নয়, এবার উঠতে হবে।

 

প্রেমপত্র 

সুব্রত মজুমদার 

       ...দেবেশ ধীরে ধীরে ঘরের দিকে মুখ ফেরাল। না, থাক। কোথাও গিয়ে কাজ নেই। এই মহার্ঘ মুহুর্তগুলো নইলে হারিয়ে যাবে। বাইরে শিউলি ফুলের গন্ধ। সে ভাবার চেষ্টা করল, ফুল কি রাতেই ফুটে যায় নাকি শুধু আজকের জন্য সব যুদ্ধক্ষেত্রেই ফুল ফুটে উঠেছে। 

   মনে আছে মেয়েটিকে প্রথম দেখেছিলাম যখন আমি কলেজের ফার্ষ্ট  ইয়ারে পড়তে ঢুকেছিলাম।  কোলকাতার আশেপাশের কোন একটা ছোট জায়গা থেকে এসেছিল।  মনে আছে এই কারণে নয় যে মেয়েটি ডাকসাঁইটে সুন্দরী বা অসাধারন ভালো পড়াশুনায় ছিল বলে। বরঞ্চ উল্টোটাই বলা যেতে পারে। মেয়েটির চেহেরার মধ্যে ছেলেদের আকর্ষণ করার মত বা মেয়েদের হিংসে করার মত কিছু ছিল না। সাধারন সাজ পোষাক পরে সাধারন চেহেরাটাকে আরও সাধারন করে রাখত। মাথার চুলকে টেনে বেঁধে একটা বড় খোঁপা আর সাদা পোষাকেই সবসময়ে দেখতাম তাকে।  আমাদের ক্লাসে মেয়েদের সংখ্যা ছিল এগারো, ওই মেয়েটি আসার পর হল বারো। আমরা ছেলেরা আড়ালে বলতাম দ্যা ডার্টি ডজন। আমরা লক্ষ্য করলাম যে মেয়েটি কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলে না, নিজের মনে চুপচাপ বসে থাকে  উদাস হয়ে। জোর করে প্রশ্ন করলে শুধু হাঁ বা না বলে উত্তর দায়। কথা বাড়াবার কোনরকম চেষ্টা করেনা। ওকে আমরা হাসতেও কখন দেখিনি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ যেচে আলাপ করতে গিয়েছিল কিন্তু মেয়েটির ঠান্ডা বরফের মত স্বভাবের জন্য বেশি দুর এগোতে পারেনি।  অবশেষে সবাই একসময়ে আমরা হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। মেয়েরা বলত ওর নাকি ভীষণ দেমাক, আমরা ছেলেরা সেকথা মানতাম না। মেয়েটির নাম জেনেছিলাম আশা। আমরা অনেক রকম নাম দিয়েছিলাম মেয়েটির। কেউ বলত যোগিণী, কেউ বলত সরস্বতী ঠাকুর আবার কেউ কেউ ডাকত  মাস্টারনী বলে। মেয়েটির ডানদিকের গালের ঠিক মাঝখানে ছিল একটা ছোট্ট কলো রংয়ের তিল। আমি মেয়েটির নাম দিয়েছিলাম তিলোত্তমা।

      খবরটা প্রথম এনেছিল অনন্যা। ওর এক আত্মীয়ের সঙ্গে নাকি আশার বাড়ির লোকেদের চেনাশোনা আছে। ওনারা আশাকে ছোট থেকে বড় হতে থেকে দেখেছেন। ছোটবেলার থেকে আশা নাকি খুব হাসিখুশি স্বভাবের মেয়ে। চেহেরাতেও একটা লালিত্য ছিল।  কিন্তু বিয়ের পর থেকে সব কিছু ওলট পালট হয়ে গিয়েছিল আশার জীবনে। জেনেছিলাম আশার বয়স উনিশ। বিয়ে হয়েছিল গ্রামাঞ্চলের এক উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে। বরের বয়স ছিল আশার থেকে অনেকটা বেশি।  উপায় ছিল না। একে অভাবের সংসার, তারপর দেখতে ভালো না, রং ময়লা, বিয়ে হচ্ছিল না।  বাবা আর মা অনেক ধার দেনা, অনেক পনের বিনিময়ে জামাইকে কিনেছিলেন। কিন্তু সুখ আশার কপালে লেখা ছিল না। বিয়ের প্রথম সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই আশার বর মারা যায় মোটর সাইকেল একসিডেন্টে।  শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আশাকে দোষ দেয় তাদের ছেলের মৃত্যুর জন্য। অপয়া আর রাক্ষুসী বলে  তাকে অপবাদ দেয়। অনেক কান্নাকাটি অনেক হাতেপায়ে ধরাধরি করেছিল আশা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু কোন কাজ হল না। অবশেষে একদিন শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আশাকে তার বাপের বাড়ি তুলে দিয়ে গেল। অসহায় বাবা মা আর কি করবে, মেয়েকে তো আর ফেলে দিতে পারে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আশাকে তাঁরা আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়ে ছিলেন। জীবনের ওপর বিতৃষ-ায় আশা একবার আত্মহত্যা করবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সময়মত ধরা পড়ে যাওয়ায় বেঁচে যায়। অবশেষে এক কাকিমার প্রশয়ে আশা ঠিক করে ও পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কাকিমাই সব খরচা বহন করার ব্যবস্থা করেন। সব শোনার পর আশার ওপর আমাদের  মন দুঃখ আর সহানুভুতিতে ভরে উঠেছিল। আমার সব বন্ধুরাই কোন না কোন ভাবে আশাকে তার অজান্েত সাহায্য করার চেষ্টা করত। কেন জানিনা আমি আশাকে কোন সাহায্য করিনি, উলঠে আমি তার সঙ্গে ভয়ানক এক খেলায় মেতে উঠেছিলাম কাউকে না জানিয়ে। আমি আশাকে প্রেমপত্র লিখতে শুরু করলাম। না খামের ভিতরে পোরা, সুন্দর রঙ্গিন কাগজে লেখা স্ট্যাম্প আটকানো চিঠি নয়। খাতার পাতা থেকে ছেঁড়া ছোট চিরকুটে লেখা প্রেমপত্র। আমি শুধু তিনটে কথা লিখতাম চিরকুটে - ‘‘আমি তোমায় ভালবাসি’’। তক্কে তক্কে থাকতাম এবং সুযোগ পেলেই সবার অজান্েত আমার লেখা চিরকুটটা আশার বইয়ের দুটো পাতার মাঝখানে গুঁজে দিতাম। তারপর অনামি এক লেখকের চিরকুটে লেখা ওই তিনটি কথা পড়ে আশার কি প্রতিক্রিয়া হয় সেটা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। আদি অনন্ত কাল ধরে চলে আসা পৃথিবী বিখ্যাত এই তিনটি কথায় ঘায়ল হয়নি এমন মানুষ দুনিয়ায় কোথাও আছে কি না আমার জানা ছিল না। প্রথম চিঠিটা লেখার পর প্রায় তিনদিন উদগ্রিব হয়ে অপেক্ষা করার পরেও আশার মধ্যে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য

রলাম না। ধরে নিলাম যে তার মানে হয় আশা বইটার ভিতরে রাখা চিরকুটটা দেখার সুযোগ পায়নি অথবা আশা মানুষ নয়। আমিও হেরে গিয়ে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। একদিন সুযোগ বুঝে আবার একটা চিরকুট রেখে দিলাম দুটো পাতার মাঝখানে। প্রফেসর ক্লাসে আসার আগে আমরা ছেলেরা আর মেয়েরা নানারকম হাসি আর ঠাট্টায় মসগুল হয়ে থাকতাম। আর উনি ক্লাসে প্রবেশ করার সাথে সাথে সব বন্ধ হয়ে যেত। আশা কোনদিন আমাদের এই হাসিঠাট্টায় যোগ দিত না। একটা বইয়ের মধ্যে মাথা গুঁজে বসে থাকত। আজ আমি শুধু আশাকে লক্ষ্য করছিলাম। আজ যেন আশাকে একটু অন্যমনস্ক লাগছে। মনের ভুল কিনা জানিনা, একটা পরিবর্তনও আশার মধ্যে মনে হল লক্ষ্য করলাম। সবসময়ে প্রথম সারির বেঞ্চে বসা আশাকে এর আগে কখন ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের সারিতে বসা ছেলেদের দিকে তাকাতে দেখিনি। আজ দুবার দেখলাম আশা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকাল। একবার তো প্রায় আমার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গিয়েছিল। আমার বুকের ভিতরটা ধক্‌ করে উঠেছিল। ধরা পড়ে গেলাম নাকি? না দেখলাম ঘাড়টা ঘুরিয়ে আশা আবার সামনের দিকে ফিরে মাথা নিচু করে বসে পড়ল।  আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। কোন ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে প্রফেসরকে প্রশ্ন করলে আশা আজকাল মাথা ঘুরিয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। আশা যেন একটা কিছু খুঁজছে ওর চোখ দেখে আমি বুঝতে পারতাম।

     আমার খেলা চলতে লাগল। আমার চিরকুটে লেখা কথার সংখ্যা ধিরে ধিরে বাড়তে লাগল আর সেই সঙ্গে পরিবর্তন হতে সুরু করল আশার ব্যবহারের। আশা আজকাল অন্যদের সঙ্গে কথা বলে, পিছন ফিরে ছেলেদের দিকে তাকায়। ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পায় না, ঠাট্টা ইয়ার্কিতেও যোগদান করে। আমার  কেন যেন মনে হত আশার চোখদুটো সবসময় কাকে যেন খুঁজে বেড়ায়।  আমি যত আশার ব্যবহারের পরিবর্তন দেখতাম ততো মনে মনে খুশি হতাম। একবার একটা পরিক্ষা করার ইচ্ছে হল। চিরকুটে লিখলাম তোমায় হালকা নীল রং এর

শাড়ী আর খোলা এলো চুলে দেখতে চাই। পরের দিন ক্লাসে ঢুকে আশাকে দেখলাম না। লাস্ট বেঞ্চে বসে আগের দিনের হোমওয়ার্কটা তন্ময় হয়ে চেক্‌ করছিলাম শেষ বারের মত, জমা দেওয়ার আগে।  অর্ণবের কনুইয়ের ধাক্কায় চমক ভাঙ্গল। অর্ণব আঙ্গুল দিয়ে সামনের দিকে তাকাতে বলল। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম এক অদ্ভুত ব্যাপার। যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ক্লাসের সব ছেলেরা আর মেয়েরা অবাক হয়ে তাদের সামনে দাঁড়ানো আশার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে বলে আশার সারা মুখে  একটা লজ্জা মেশানো সুন্দর হাসি। সব থেকে অবাক হলাম আমি। আশার পরনে আজ হালকা নীল রঙ্গের শাড়ী আর চুলটা খোলা। আশাকে আজ সত্যি সুন্দর লাগছে দেখতে। মেয়েটা এত সুন্দর দেখতে আগে কখনো লক্ষ্য করিনি তো।

      ভাগ্যের চক্র কাকে কখন কোথায় নিয়ে যায় কেউ জানে না। আমার সুযোগ এলো এক নামকরা কলেজে এনজিনীয়ারিং পড়তে যাওয়ার। একদিন সবাইকার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে আমি আমার নতুন কলেজ জীবনের জন্য যাত্রা শুরু করলাম। আশার কাছ থেকেও বিদায় নিয়েছিলাম অন্যদের মতই। অল্পদিনের আলাপে আলাদা করে আমাকে মনে রাখার কথা নয় আশার। আমাকে বিদায় জানিয়েছিল অন্যদের মতই। তাতে আন্তরিকতা হয়ত ছিল, ছিল না কোনরকম ঘনিষ্ঠতা।  আমি শুধু মনে মনে বলেছিলাম তুমি ভালো থেকো, তোমার ভালো হোক। তারপর অনেক যুগ কেটে গেছে। আমার জীবনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। আমি দেশ  ছেড়ে আমেরিকায় বসবাস শুরু করেছি। এখানে সাজানো অথচ একটি ছোট্ট নির্জন শহরে আমার  বসবাস। এখানে আমার নিজের বলে কেউ নেই। একাকি নিঃসঙ্গতায় আমার জীবন কাটে। মাঝে মাঝে মনে হয় সম্পর্কের নিস্তব্ধপুরে কোন উদ্দাম নাস্তিকের পদচারনা বুঝিবা জীবনেরই অস্তিত্ব জানান দিয়ে যায়।  প্রায় দুটো যুগ কেটে গেছে দেশ ছেড়ে এসেছি।  ফেলে আসা দেশের কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। স্পঞ্জের মত দেশে গিয়ে মাঝে মাঝে ভিজিয়ে নিয়ে আসি যতটা পারি দেশের সব কিছুকে নিজের দেহে আর মনে। একবার দেশে যাওয়ার একটা সুযোগ এলো যখন আমন্ত্রন পেলাম আমার এক নিকট আত্মীয়ের বড় মেয়ের বিয়েতে আসার জন্য। অনেক দিন দেশের কোন বিয়ে বাড়ি আমার যাওয়া হয়নি, তাই সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না।

      দেখলাম বিয়ের ব্যাপারে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে আবার অনেক কিছু একই রকম আছে। আমার ওপর ভার পড়েছিল ছেলের বাড়ির লোকেদের আদর আপ্যায়নের যেন ত্রুটি না হয় তার খোঁজখবর রাখার জন্য। দেখলাম ছেলের বাড়ির লোকজন খুবই ভদ্র, তাঁরা অল্পেই খুশী, তাই আমার কাজ অনেক কম মনে হচ্ছিল। হঠাৎ ছেলের বাড়ির একজন আমাকে দেখে এগিয়ে এল। আমার নাম ধরে ডাকল। আমি চিনতে পারলাম।  আমার সেই ছেলেবেলার বন্ধু অর্ণব।  দুই বন্ধু ফিরে গেলাম অনেক বছর আগের সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে। এক ভদ্রমহিলা একসময়ে অর্ণবের কাছে এসে দাঁড়াল। অর্ণব আলাপ করিয়ে দিল। চিনতে পারলাম অনন্যাকে। আমরা তিনজনে মিলে গল্প জুড়ে দিলাম। আমাদের সব বন্ধুদের কথা শুনছিলাম অনন্যার কাছে। আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল আশার কথা জানার জন্য। কিন্তু ভিতর থেকে কে যেন আমায় বাধা দিচ্ছিল। হঠাৎ অনন্যাই আশার কথা ওঠাল। জানতে পারলাম যে আশা ডক্‌টোরেট করেছে মাইক্রোবায়োলজিতে। নামকরা বিলিতি কম্পানিতে উচ্চপদে কাজ করে আশা। বিয়ে করেছে, দুটি সন্তান, একটি ছেলে একটি মেয়ে। খুব সুখের সংসার আশার। তাছাড়া নানারকম সমাজ কল্যান প্রতিষ্টানের সঙ্গেও নিজেকে ব্যস্ত রাখে। এত হাসিখুশি আর এত পপুলার যে আমি নাকি দেখলে চিনতেই পারব না যে এই আমাদের সেই আশা।

      একটু বাদে ওরা দুজনেই আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে গেল। আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম একটা ফাঁকা জায়গা দেখে। মনে মনে খুশি হলাম আমার তিলোত্তমা ভাল আছে জেনে। আজ এতদিন বাদে এতগুলো বছর পেরিয়ে আসার পর আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল ছেলেবেলায় আশাকে লেখা আমার সেই প্রেমপত্রের কথা। সেই চিরকুটে লেখা খেলার কথা। অনেক ছোট ছোট ঘটনা সিনেমার ফ্ল্যাসব্যাকের মত ফিরে এল আমার মনের আয়নায়। একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে ভিড় করে এল। আচ্ছা ওই খেলাটা কি আমার ছোটবেলাকার ছেলেমানুষি ছিল? নাকি আমি কি জেনেশুনে আশার সঙ্গে ওই খেলা খেলেছিলাম? আমি কি আশাকে ভালোবাসতাম? নাকি আমার  আরো গূঢ় কোন উদ্দেশ্য ছিল?

 

রাশিফল 

রূপা মন্ডল 

নিত্যগোপাল ঘোষাল রোড, কলকাতা 

       ...দেবেশ ধীরে ধীরে ঘরের দিকে মুখ ফেরাল। না, থাক। কোথাও গিয়ে কাজ নেই। এই মহার্ঘ মুহুর্তগুলো নইলে হারিয়ে যাবে। বাইরে শিউলি ফুলের গন্ধ। সে ভাবার চেষ্টা করল, ফুল কি রাতেই ফুটে যায় নাকি শুধু আজকের জন্য সব যুদ্ধক্ষেত্রেই ফুল ফুটে উঠেছে। 

  বহুদিন থেকেই আমার অভ্যেস খবরের কাগজটা প্রথমে খুলেই রাশিফলটা দেখে নেওয়া। আজকেও সাইকেলের ক্রিং ক্রিং আওয়াজ পেয়েই বুঝলাম খবরের কাগজ দিতে এসেছে। বন্ধ দরজার ওপারে কড়া নাড়ার আওয়াজ পেলাম, কলিং বেলটা খারাপ। দরজা খুলে দেখলাম কাগজটা কড়ার সাথে আটকে দিয়ে গেছে।কাগজটা নিয়ে ভিতরে ঢুকেই আগে রাশিফলের পাতাটা খুললাম। দেখলাম কন্যারাশিতে লিখেছে -

     "বুদ্ধির ভুলে কর্মের পরিকল্পনায় ব্যাঘাত আসতে পারে। সঙ্গীতচর্চায় অগ্রগতির সুযোগ আসতে পারে। দিনের শেষভাগে প্রতিকূল অবস্থা কাটবে। আজ ব্যবসায় কর্মচারীর জন্য অবনতির যোগ দেখা যাচ্ছে। শ্বশুরকুল থেকে সম্পত্তি পাওয়ার একটা আশা রাখতে পারেন। পরিবারে কারও সঙ্গে অশান্তি বাঁধতে পারে। সন্তানদের কর্মের সুযোগ আসতে পারে। আজ রাস্তায় যানবাহনের যোগাযোগের জন্য ভোগান্তি হতে পারে। কর্মে অন্যরকম বদল দেখতে পারেন।"

     আমি দেখেছি আমার রাশিফল মোটামুটি মিলে যায়। তাই রোজ রাশিফল না দেখে আমি বাড়ি থেকে বেরোই না। কাগজের খবরে মোটামুটি চোখটা বুলিয়ে নিয়ে স্নান করতে যাবো ভাবছি, এমন সময় আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো, "হ্যাল্লো" বলতেই ওপাশ থেকে আমাদের "যুগের ঢেউ" ক্লাবের ন্যাপ্লা ওরফে নেপাল চন্দ্র বলে উঠলো, "নাড়ুদা, আমাদের বিজয়া দশমীর ফাংশানে এবারে তোমাকে গান গাইতেই হবে। কোনো কথা শুনছি না ! তুমি গাইবে কিন্তু!" আমি কিঞ্চিৎ অবাকই হ'লাম - গত দু'বছর আমি পাড়ার ফাংশানে গান গাই নি! বছর তিনেক আগে গলাটা একটু ধরা ছিল বলে অনেকে কটূক্তি করেছিল ! হুঁ হুঁ বাবা, আজ আমার রাশিফলে লেখা আছে- "সঙ্গীতচর্চায় অগ্রগতির সুযোগ আসতে পারে।" হতেই হবে ! 

আজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটাও রিক্সা পাচ্ছিলাম না।অনেক্ষণ বাদে একটা রিক্সা পেলাম। যাত্রী নামিয়ে ফিরে যাচ্ছিল। ভাড়াও একটু বেশিই নিলো।তা নিক, অফিস টাইম। কিছু করার নেই! উঠতেই হবে। পাওয়া গেছে এই ঢের! রিক্সা থেকে নেমে স্ট্যান্ডে অনেক্ষণ দাঁড়াবার পর বাস এলো। ওখানেও দেরি হলো খানিকটা !

শ্যাম বাজার মেট্রো স্টেশন-এ গিয়ে দেখলাম বেজায় ভিড় ! অনেক্ষণ ট্রেন আসছে না! বেলগাছিয়া স্টেশনে নাকি সুইসাইড হয়েছে! কপালের ভোগান্তি আর কি! মেট্রো স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে একটা ওলা ভাড়া করলাম।শেয়ার ওলা! এদিক-সেদিক যাত্রী নামিয়ে সব শেষে আমাকে ড্রপ করলো। অফিস পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে গেলো! আজ তো আমার রাশিফলে লেখাই ছিল - "আজ রাস্তায় যানবাহনের যোগাযোগের জন্য ভোগান্তি হতে পারে।"

আজ একজন ক্লায়েন্টের সাথে মিট করতে যাওয়ার কথা ছিল ঠিক দুপুর তিনটের সময়। তাকে অনেক কষ্টে একটা মিউচুয়াল ফান্ড করবো বলে রাজি করিয়েছি। হঠাৎ আমার শ্যালক ফোন করলো, "দাদা, আমাদের ওই জমিটা কালকেই রেজিস্ট্রি হবে, একবার আসুন না ডালহৌসিতে, আমাদের ল'ইয়ারের অফিসে! কাগজপত্রগুলো একটু দেখে নিলে ভালো হতো!"

শ্বশুরমশাই অনেকদিন ধরেই একটা জমি বিক্রি করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু ভাইয়েদের বিরোধিতায় পেরে উঠছিলেন না। এবারে একটা হেস্তনেস্ত হবে! আমারও ওদিক থেকে কিঞ্চিৎ প্রাপ্তিযোগ হতে পারে! হুঁ হুঁ মনে পড়ছে, রাশিফলে লেখা ছিল - "শ্বশুরকুল থেকে সম্পত্তি পাওয়ার একটা আশা রাখতে পারেন।" তাই তখনি "ক্লায়েন্ট ভিজিট করতে যাচ্ছি" বলে বেরিয়ে পড়লাম অফিস থেকে।ঠিক দুটো দশে পৌঁছে গেলাম এটর্নি অফিসে। কিন্তু হায়!

তিনি তখন কোর্টে কেস করতে বেরিয়ে গেছেন - ফিরবেন সাড়ে চারটে নাগাদ! অতএব বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই! এদিকে আমার তিনটের সময় ক্লায়েন্ট ভিজিট - ডালহৌসি থেকে নিউ আলিপুরে যেতে হবে। একটা ট্যাক্সি নিলাম।কিছুদূর গিয়ে ট্যাক্সি খারাপ হয়ে গেলো! নেমে গিয়ে ওলা ভাড়া করে যখন নিউ আলিপুরে পৌঁছলাম তখন বাজছে তিনটে পঞ্চান্ন! আমার ক্লায়েন্ট কোনো জরুরি ফোন পেয়ে বেরিয়ে গেছেন! ফোনে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পেলাম না! মনে পড়ছে, আমার রাশিফলে লেখা ছিল -"বুদ্ধির ভুলে কর্মের পরিকল্পনায় ব্যাঘাত আসতে পারে।"

     পৌনে পাঁচটার সময়ে এটর্নি অফিসে ফিরে এসে দেখলাম আমার শ্যালক একটু বেজার মুখে বসে থাকতে দেখলাম, আমাকে দেখেই বললো, "আর এখন এসে কি হবে? উকিলবাবু এই একটু আগে এসে কাগজটা নিয়ে চলে গেলেন! বললেন, কালকেই রেজিস্ট্রি হবে, ঠিক দশটার সময়ে রেজিস্ট্রি অফিসে পৌঁছে যাবেন!"

অফিসে পৌঁছতে না পৌঁছতেই গিন্নির ফোন, "তোমাকে কি একটা দরকারে পাওয়া যায় না! আমার ভাই তোমাকে বলেছিলো, বাবার জমির কাগজপত্রগুলো একটু দেখে নিতে, তা না করে তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে? এখন ওতে কোনো ভুলভ্রান্তি থাকলে কি হবে? তুমি কি একটাও কাজ করতে পারো না ? অপদার্থ একটা!" বলেই ফোন কেটে দিলো! বুঝলাম, দিদির কাছে কমপ্লেন করেছে আমার শ্যালক! ভয়ঙ্কর রাগ হচ্ছিলো বৌয়ের দাঁতখিঁচুনি খেয়ে! কিন্তু সামলে নিলাম, এখন মাথা গরম করলে চলবে না! আজ আমার রাশিফলে লেখাই ছিল - "দিনের শেষভাগে প্রতিকূল অবস্থা কাটবে। পরিবারে কারও সঙ্গে অশান্তি বাঁধতে পারে।"

অফিসে ঢুকতেই ব্যানার্জি বললো, "তোমাকে বস খুঁজছিলো !"কে জানে কি আবার বলবে! বোধহয় ওই মিউচুয়াল ফান্ডটা করাতে পেরেছি কি না তাই জিজ্ঞাসা করবে! এদিকে ক্লায়েন্ট ফোন ওঠাচ্ছে না! এক জ্বালা হয়েছে! বসের চেম্বারের সামনে গিয়ে একটু কপালে হাত ঠেকিয়ে নিলাম, 

- আসব স্যার?

- আসুন!

একটা কগজ দেখছিলেন, মুখ তুলে বললেন,

- কি খবর মিত্র বাবু ? আপনার ক্লায়েন্ট কি রাজি হচ্ছে না ? আপনি তো আজ দেড়টার সময়ে অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন? কিন্তু আপনার ক্লায়েন্ট বললো, আপনি না কি চারটের সময়ে ওনার বাড়িতে গিয়েছিলেন? এতক্ষণ লাগলো ? কিসে করে গিয়েছিলেন? হেঁটে?

- না স্যার! মানে! একটা অসুবিধা হয়ে গিয়েছিলো, তাই!

- দেখুন, আমাদের বিজনেসে সময়ের একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে! আপনার খেয়াল খুশি মতো ক্লায়েন্ট ভিজিট করলে চলবে না! এখন যদি তিনি অন্য কারোকে দিয়ে মিউচুয়াল ফান্ড খুলে নেন, তাহলে কিন্তু আপনার খুব মুশকিল হয়ে যাবে, বলে দিলাম!

- স্যার, শুনুন, মানে আমি ওনাকে অনেকদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু উনি.... 

- উনি কি? ক্লায়েন্টরা এরকমই হবে! আপনাকে তাদের লাইনে আনতে হবে! আর সেটা যদি না পারেন....তাহলে আমাদের ভাবতে হবে আপনাকে ঠিক কি ধরণের কাজ দিলে আপনি করতে পারবেন! এখন আপনি যান!

হা ঈশ্বর! এটাও মিলে গেলো, "কর্মে অন্যরকম বদল দেখতে পারেন।" নাঃ, কাল থেকে ভাবছি রাশিফল দেখা ছেড়েই দেব !

 

শব্দহীন 

বিবেকের কঙ্কাল 

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, বাংলাদেশ 

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর এ দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি যেমন অবদান রেখে চলেছেন তেমনি সৃষ্টিশীল লেখার ক্ষেত্রেও তাঁর পদচারণা। তিনি মনে করেন বিজ্ঞান চর্চা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি একে অন্যের পরিপূরক। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, গবেষক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, কবি, গীতিকার, নাট্যকার, সমাজ সংস্কারক ও সাংস্কৃতিক কর্মী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শনে বিশ্বাসী এই মানুষটির ছোটবেলা থেকেই লেখায় হাতেখড়ি। কৈশোর ও তারুণ্যে তিনি বাংলা একাডেমি, খেলাঘর,  কঁচিকাচার মেলা সহ বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করেছেন। এই সময় তাঁর প্রবন্ধ, কবিতা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকৌশল বিদ্যা অধ্যায়নের সময় তিনি প্রগতিশীল কর্মী হিসেবে কাজ করে সহিত চর্চা করে গেছেন। এ সময় তাঁর লেখাগুলো বিশ্ববিদালয়ের ম্যাগাজিনে এখনও সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও অনেকদিন ধরেই তিনি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। বাংলা ও ইংরেজি দুই সাহিত্যেই তাঁর সমান দক্ষতা রয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্র, প্রকৃতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, পরিবর্তন, সম্ভাবনা ও মানুষ তাঁর লেখার মূল উপজীব্য বিষয়।  তিনি একজন ভাল বক্তা। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক্ শো সহ বিভিন্ন সৃজনশীল অনুষ্ঠানে তাকে অতিথি হিসেবে দেখা যায়। ভারতরে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী অজিত কুমার পাঁজা কলকাতা দূরদর্শনের একটি প্রতিযোগিতায় তাঁর প্রেরিত প্রবন্ধে মোহিত হয়ে নিজ হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সে সময় সম্প্রচারিত হয়। এই খবরটি আজকাল, সংবাদ, বাংলাবাজার সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া তিনি ফিলিপিন্স, চীন, বি-টিভি  সহ দেশ বিদেশের বিভিন্ন পুরুস্কারে ভূষিত হন। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একজন কর্মী হিসেবে তিনি কাজ করে চলেছেন। 

       ......সময়টা ঠিক মনে নেই। বাংলার এক অখ্যাত জনপদ। বিরূপ প্রকৃতির মুখোমুখি হল সে ভূখন্ডের বাসিন্দারা। পালাবদলের বিচিত্র ধারায় সবল জনপদটিতে নেমে এল দুর্ভিক্ষের অশনি সংকেত। পথে ঘাটে অনাদরে পড়ে থাকত অস্থিমজ্জা সমৃদ্ধ বুভুক্ষু মাংসহীন লাশ- এ যেন দুমড়ে মুচড়ে পড়া আদম সন্তানদের লাশ। আর সেই লাশগুলোর উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ত শকুন, কুকুর, শিয়াল আর কাকেরা।

     সময়টা ঠিক মনে নেই। বাংলার এক অখ্যাত জনপদ। বিরূপ প্রকৃতির মুখোমুখি হল সে ভূখন্ডের বাসিন্দারা। পালাবদলের বিচিত্র ধারায় সবল জনপদটিতে নেমে এল দুর্ভিক্ষের অশনি সংকেত। পথে ঘাটে অনাদরে পড়ে থাকত অস্থিমজ্জা সমৃদ্ধ বুভুক্ষু মাংসহীন লাশ- এ যেন দুমড়ে মুচড়ে পড়া আদম সন্তানদের লাশ। আর সেই লাশগুলোর উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ত শকুন, কুকুর, শিয়াল আর কাকেরা। কাড়াকাড়ির এই নগ্ন লড়াইয়ে শরীরের শক্ত চামড়াটা বিদীর্ণ হয়ে ভিতরের কংকালটা বেরিয়ে আসত। কী বীভৎস ছিল সেই দৃশ্য! ডাষ্টবিনে পচন ধরা খাবার নিয়ে চলত বিবেকবান মানুষ আর বিবেকহীন পশুদের ভারসাম্যহীন সংগ্রাম। বুঝা যেতনা কোনটা মানুষ আর কোনটা পশু। মানুষের জীবনটা হয়ে উঠেছিলো কাচের আয়নার প্রতিচ্ছবির মতো। কাচের আয়নাটা ভেঙ্গে গেলে জীবনের প্রতিচ্ছবিটা মিলিয়ে যেত- দেহ থেকে মুক্ত হতো ক্ষুধার্ত আত্মারা। আগ্নেয়গিরির অসহিষ্ণু লাভায় ভোরের সুন্দর শিশিরবিন্দু যতটা তীব্র দহনে দগ্ধ হতে পারে ততখানি জীবন যন্ত্রণায় দগ্ধ হত মানুষের জীবন। উত্তর দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম জুড়ে চলত আর্তনাদ, আহাজারী আর চাপা দীর্ঘশ্বাসের দুঃসহ জীবনযুদ্ধ। জীবনের ঘাতক সত্যগুলো যে কত ভয়ংকর; যারা ভুক্তভোগী কেবল তারাই বুঝতে পারে। যেমন বুঝেছিল সেই জনপদের মানুষ।

     ছেলে বউ নিয়ে রহিম শেখের ছিল সুখের সংসার। দু’কিশোর ছেলে ছিল তার এই সুখের সাম্রাজ্যের প্রাণ। এদের মধ্যে একজনের মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়াটা তাদের দু:খ দিত কিন্তু সুখের প্রবল ঝড়ে তা হয়ে উঠত বিলুপ্ত প্রায়। রহিম শেখ তার বাড়ীর সামনের বাজারটায় কসাইয়ের কাজ করত। তবে দুর্ভিক্ষের সর্বগ্রাসী পাষন্ড দানবের ক্ষুধার্ত থাবার নিচে পড়ে তাকে হতে হলকর্মচ্যূত। মালিক কিছু টাকা গুজে দিয়ে তাকে বিদায় দিলেন। কড়কড়ে টাকার শব্দে রহিম শেখ যেন পেল মৃত্যুর প্রতিধ্বনি। একদিন যে মানুষ ছিল বাজারের কসাই; নিজেকে বাঁচাবার অন্ধ আকুলতা নিয়ে বাস্তব জীবনে তার কসাই চরিত্রের খোলসটা বেরিয়ে এল। রহিম শেখ তার নিষ্পাপ-প্রতিবন্ধী ছেলেটার দিকে আঙ্গুলী নির্দেশ করে বলল,‘ওরে খ্যাওন দ্যাওনের দরকার নাই; ঐ আপদ খান দূর হইলে আমরা বাঁচুম; ও মইরা গেলে অন্তত: একখান বেকার খানেওয়ালা তো কমবো।’ তারপর মোটা একটা রশি দিয়ে তার হাত-পা গুলো ঘরের শক্ত খুঁটিটার সাথে আটকে দিল। যেন পরাধীনতার শৃঙ্খলে তাকে শৃঙ্খলিত করল। একটা আহত অবুঝ পাখি শিকারীর ফাঁদ থেকে মুক্তির নেশায় যেমন ছটফট করে; তেমনি করুণ আর্তনাদে বাকশক্তিহীন ছেলেটির বেদনা যেন নীরব বিস্ফোরণে পৃথিবীতে এক অন্যরকমের নিস্তব্ধতা নিয়ে এল।রহিম শেখের বউ পাথরের মতোনির্বাক হয়ে অনুভব করল সেই বেদনার অন্তহীন চাপা কান্নার সুর। কেননা সে যে মমতাময়ী মা। নিজেকে সে স্থির রাখতে পারল না। তার সমস্ত শক্তি দিয়ে তার সন্তানকে বন্ধন মুক্ত করতে চাইল। আসলে তার মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তানটি মানুষের পৃথিবীতে মূল্যহীন হতে পারে; কিন্তু মাতৃত্বের নিবিড় বন্ধনে সে ছিল মহামূল্যবান। মানুষ পথের কুকুর-বিড়ালকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখে- আর এতো ছিল জলজ্যান্ত রক্ত মাংসের মানব সন্তান। মাতৃত্বের গভীরতা রহিম শেখের বোধশক্তিকে জাগাতে ব্যর্থ হল। আর ব্যর্থ তো হবেই কারণ রহিম শেখকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে গিয়ে তার মাকে গ্রহণ করতে হয়েছিল পৃথিবীর চরমতম সত্য নির্মম মৃত্যুকে। ফলে শৈশবে মাতৃহীন রহিম শেখ পরিমাপ করতে পারলনা বেদনা হত মায়ের মন। রহিম শেখের বউ উন্মাদের মতো ছুটে গেল খুঁটিটার কাছে। রহিম শেখ এতে বাধ সাধল। জ্ঞানশূন্য রহিম শেখ রাগে থরথর করে কেঁপে উঠল।ঠিঁকরে যেন বের হয়ে আসতে চাইল তার রক্তবর্ণ চোখ দুটি। বিদ্রোহী হয়ে উঠা মায়ের অস্ত্রহীন বাহুর আবেগময় বিপ্লবকে আপন বাহুর জোরে ম্লান করে দিল রহিম শেখ। ঘরের অন্য একটা খুঁটির সাথে তার বউকে আটকে রাখল।রহিম শেখের অন্য ছেলেটি তার বাবাকে যেন আবিষ্কার করল নুতন করে- অবিশ্বাসীর কৃত্রিম চোখে। একদিন যে বাবাকে দেখে তারা জীবনের কথা ভাবত; আজ সেই চোখে সে দেখছে এক বুভুক্ষু শকুনিকে। ডারউইনের বিবর্তন বাদে চেহারা পরিবর্তনের সাথে সাথে আচরণ পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দিন বদলের পালায় মানুষের চেহারায় যতটা না পরিবর্তন ঘটে তার চেয়েও বেশী রূপান্তর ঘটে তার আচরণে। কঠিন বাস্তবতার যাঁতাকলে মানুষের মুখোশটা খুলে পড়ে যায়; যা থাকে তা শুধু মাংসহীন কংকালের নিরেট অবয়ব। ফলে আতঙ্কের বন্ধুর পথে চলৎশক্তি হারিয়ে রহিম শেখের অন্য ছেলেটিও শয্যা নিল। রহিম শেখ তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত পৈত্রিক ভিটাটুকু বন্ধক রাখল। কড়া সুদে মহাজনের কাছে ধার নিলসিন্দুক থেকে সদ্য মুক্ত উৎকট গন্ধের কিছু টাকা। সেই সিন্দুকে মরচে ধরা টাকায় মরচে ধরা রহিম শেখ অন্ন এনে দিত তার শয্যাশায়ী সন্তান আর বউকে। নিজের আকন্ঠউদর পূর্তি করে সে যেন একটা স্বার্থপর আত্মতৃপ্তি লাভ করত। বঞ্চিত হত তার প্রতিবন্ধী সন্তানটি। রহিম শেখের বউ ক্ষুধার্ত সন্তানের শোকে বোবা কান্নায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ত। তাকে দেখে মনে হত ঝড়ের রাতে উত্তাল সমুদ্রে হাল বিহীন এক নায়ের মাঝি-যে নায়ের যাত্রী ছিল তার প্রতিবন্ধী সন্তানটি। সন্তানের নিশ্চিত মৃত্যু বুঝতে পেড়ে সে নিজেকেও খাদ্য থেকে বঞ্চিত করল। সেও মৃত্যুর পথে পা বাড়িয়ে হতে চাইত তার সন্তানটির সহযাত্রী।      মা ও সন্তানটির দেহ থেকে একদিন আত্মারা বেরিয়ে গেল। রাতের আঁধার কেটে প্রতিদিনের মতো আরও একটা আলোকিত ভোর এল। তবে শষ্যাশায়ী ছেলেটির জন্য সেই ভোর আলো নিয়ে এল না, নিয়ে

এল অনাহারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া তার মা ও ভাইয়ে বীভৎস লাশের বাস্তবতা। ছেলেটির জন্য সেই দিনটি ছিল সবচেয়ে বেদনার দিন। আর রহিম শেখ সেদিন কি অদ্ভুত অমানুষের হাসি হেসেছিল! চীৎকার করে বলছিল,‘আমার আরও দু’জন খানে ওয়ালা পটল তুলল; অহন আমি পেট পুইড়া খামু; আমি আর মরুম না! বহুত মজা হইব।’ লাশগুলোর দাফন-কাফন আর হলনা। দাফন-কাফন করতে গেলে অর্থের অপব্যয়- রহিম শেখের উর্বর মস্তিষ্কে এই বিকৃত চিন্তার অভ্যুদয় ঘটল। মানব থেকে সে হয়ে গেল যেন হিং¯্র দানব। দানবীয় শক্তির উৎশৃঙ্খল উৎসবের অসংলগ্ন মাতমে মেতে উঠে লাশ দুটোকে টানতে টানতে নিক্ষেপ করল রাস্তার পাশের ডাষ্টবিনটাতে। আর সঙ্গে সঙ্গে তীর্থের কাকের মতো রাস্তার শিয়াল কুকুর আর শুকুনীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ল মাংস বিহীন ঐ পচা গন্ধের লাশগুলোর উপর। কিন্তু তারা বেশীক্ষণ ওগুলোর উপর তাদের লড়াই চালিয়ে যেতে পারল না। তারা অনুভব করল তাদের মতোই দুটিমাংস বিহীন দেহ। পার্থক্য শুধু এটুকু তাদের দেহে এখনও প্রাণ আছে কিন্তু ওদের দেহে তা নেই। সন্ধ্যায় আলো-আঁধারের লুকোচুরি খেলার সময় শয্যাশায়ী ছেলেটা পেল ডাষ্টবিন থেকে উঠে আসা পঁচা লাশের গন্ধ; তবে তার কাছে সেই গন্ধটা মনে হল অমৃতের মতো; সেই গন্ধে অবগাহন করল তার চেতনা আর অস্তিত্ব। সেই গন্ধের সাথে সে তার জীবন্ত শরীরের গন্ধকে পৃথক করতে পারলনা বরং তার মধ্যে নিজেকে সে দেখতে পেল। টাকা ফেরত পেতে মহাজনের চাপ বাড়ে রহিম শেখের উপর। রহিম শেখ তার শয্যাশায়ী ছেলেটাকে নিয়ে ব্যবসার ফন্দি আটে। তার টাকা চাই আরও টাকা; তাকে বাঁচতে হবে; মূল্য যাই দিতে হোক না তাকে। ছেলেটাকে সে বিক্রি করে দেয় এক ইংরেজ ভদ্রলোকের কাছে। সেদিন টাকা পেয়ে রহিম শেখ অতিরিক্ত খায়। তার উদর ছিল অস্বাভাবিক ভাবে পূর্ণ। কিন্তু সব হারিয়ে সে নিজের অস্তিত্বের অভাব অনুভব করে। সে দৌড় দিয়ে রাস্তার ওপারে যেতে চায়; তার বিকৃত বিবেকে সপ্রতিভ বিবেকেরা যেন আঘাত হানে; তার মনে হয় ওপারে গিয়ে সে খুঁজে পাবে তার হারানো জীবনকে; কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনা। একটা দ্রুতগামী ট্রাক এসে মধ্যরাস্তায় তার ঐ বিকৃত দেহটা খন্ড-বিখন্ড করে দেয়। তার মস্তক থেকে বিকৃত মগজটা বেরিয়ে আসে; অক্ষি কোটর থেকে বিচ্যুত হয় তার বিশ্বাস ঘাতক চোখ; তার দুষিত রক্ত ঝাঁঝালো রোদের উষ্ণতায় রাস্তাটাকে আঁকড়ে ধরে। অনেকে এটাকে দূর্ঘটনা বলে; অনেকে বলে আত্মহত্যা। আর আমি বলি এটাকে কর্মফল।

কথাটা বলে কঠিন নিস্তব্ধতায় ডুবে যায় আকাশ।

তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,‘মানুষ নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে এতটাই স্বার্থপর হয়ে যায় তখন রক্তের বন্ধনগুলোও তার কাছে শিথিল হয়ে পড়ে। কিন্তু অন্যের জন্য মৃত্যুখাদ খনন করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সে নিজেই সেই খাদে পড়ে যায়। পতঙ্গেরা জ্বলন্ত প্রদীপের আলোয় বিভ্রান্ত হয়ে যেমন সেই আগুনে ঝাপদেয়; রহিম শেখও তেমনি আগুনে ঝাপ দিয়েছিল। ওটা আলো ছিল না, ছিল আলেয়া। আর এটাই চরম বাস্তবতা।’

সামনে বসা পুলিশ কমিশনার মনসুর মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল গল্পটা। বিশ্বাস-অবিশ্বাসে যেন দোল খেল তার কোমল মন। বিস্ময়ে বিহ্বলতায় তার স্বরথলিতে আটকে থাকা কথা মুখ দিয়ে যেন বেরুবার পথ পাচ্ছিল না। তবুও অস্ফুট স্বরে বলল,‘এটা কি গল্প?’
‘গল্প! না এটা গল্প নয়-নির্ভেজাল সত্য ঘটনা’। বলল আকাশ। মনসুর ততক্ষণে নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে। নির্মম সত্যের যে ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাসটা তার দিকে ধেয়ে আসছিল তা সাময়িক ভাবে থামিয়ে খুঁজে ফিরছিল সে উত্তরণের পথ। অন্তহীন তৃষ্ণার্ত মন নিয়ে সে বলল, ‘আচ্ছা ইংরেজ ভদ্রলোকের কাছে বিক্রি হওয়া ছেলেটার কি হয়েছিল।’

হাঃ হাঃ করে বিদ্রূপের অট্টহাসিতে ফেটে পড়লে আকাশ। ওটা ওর স্বভাবের আওতায় পড়ে না। এ ধরণের অস্বাভাবিক আচরণের সম্মুখীন হয়ে মনসুর কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়ল। আকাশের কাছে এ ধরণের আচরণ ছিল তার চিন্তার বাইরে।

আকাশ দ্রুত স্বাভাবিকতা এনে বলল, ‘আমি সেই ছেলে।’ ইংরেজ ভদ্রলোক তাকে পুত্রস্নেহে মানুষ করেছে; বিজ্ঞানে সে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়েছে ঐ মানুষটির দৌলতে, তার সামনে মানুষটা খুলে দিয়েছে বিজ্ঞানের অন্তহীন জিজ্ঞাসার অনুসন্ধিৎসু জগত; তারপর মানুষটার মৃত্যুর পর তিনি প্রত্যাবর্তন করেছেন দেশের মাটিতে- এসব কথাও অবলীলায় বলে গেল আকাশ।

মুনসুর জানতে চাইল আজকের পরিণতআকাশের কাছে তার বাবার প্রতি তার অনুভূতির কথা।

আকাশ উত্তরে বলল,‘তার প্রতি আমার করুণা হয়; শ্রদ্ধা জাগে না। করুণা হয় এ কারণে তিনি ছিলেন কাপুরুষ; জীবনযুদ্ধে পরাজিত এক মানুষ। তিনি ছিলেন আমাদের সংসারের সেনাপতি আর আমরা ছিলাম তার সৈন্য। তিনি নিজেই নিজের সৈন্যদের মেরেছিলেন কিন্তু তারও শেষ রক্ষা হয়নি।’
‘আর আপনার মায়ের প্রতি’- জিজ্ঞাসা করল মনসুর।
মৃদু হেসে আকাশ বলল,‘তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা হয়, সেখানে করুণা ধারার ঝরেনা সিক্ত বর্ষণ। আমার মা-তো বীর ছিলেন। নিজের সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারেননি বলে তিনি নিজেও অন্ন তুলে নেননি। মরে গিয়েও তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। তিনি সৈন্য ছিলেন কিন্তু তার আচরণ ছিল সেনাপতির মতো।’
‘আপনার ভাইয়ের ………..’

মনসুরের অসমাপ্ত কথাটা কেড়ে নিয়ে আকাশের মুখ থেকে নি:সৃত হল,‘ঐ যে আপনি বলেছিলেন না সত্যের পিছনে আরেক সত্য থাকতে পারে না। আর যে কারণে আপনাকে গল্পটা বলা, জীবনের নির্মম সত্য গল্পটা। আসলে কি জানেন আমার অক্ষম ভাইটিই ছিল সত্যের নির্মম প্রকাশ। সে মানসিক প্রতিবন্ধী ছিল এটা যেমন সত্য। তার চেয়েও বড় সত্য সে তার অক্ষমতা দিয়ে আমার বাবার অক্ষমতার জ্বলজ্বলে সত্য গুলো সামনে এনেছিল। আমার জীবনে সে ছিল অসাধারণ মানুষ। একফালি নি:শ্বাস ফেলে ও বলল আবার, ‘বাবা হারম্যানের উপহার দেয়া কম্পাস যন্ত্র যেমন বোকা আইনষ্টাইনের জীবনে এনেছিল অনুসন্ধানী চেতনা; আমার ভাইটি ছিল যেন সেই কম্পাসযন্ত্র-যা আমাকে সত্য-সন্ধানী করেছে। আর সেই সূত্রেই তো আপনাদের সাথে আমার যোগাযোগ।’ তারপর বিড়বিড় করে আবৃত্তি করল-

‘চলছে আজও অস্থিমজ্জা-মাংসহীন সত্যের অসত্য লড়াই

সত্যের নির্মম কংকালটায় জীবন্ত মাংসপিন্ড চড়াই

মেঘলা আকাশ ছিঁড়ে অসহিষ্ণু সূর্যের জ্বলন্ত আলো চাই

তবেই লেখা হবে সত্যের সুতীব্র অধ্যায়।’

 
 

 

কৃতিত্ব 

সুখদেব চট্টোপাধ্যায়

রহড়া, পশ্চিমবাংলা

......সকালে উঠেও গতকালের ঘটনা অমূল্যর মনকে আচ্ছন্ন করে রাখল। স্কুলে যেতে ভাল লাগছে না। টেবিলের ওপর আলমারির চাবিগুলো পড়ে রয়েছে। কতদিন সে নিজে আলমারি খোলেনি। দরকারই পড়ত না। সব বিমলাই হাতে হাতে যোগান দিত। ধীরে ধীরে উঠে আলমারিটা খুলল। জামাকাপড় সব পরিপাটি করে সাজান রয়েছে। শাড়ী গুলোয় হাত বুলিয়ে বিমলাকে অনুভব করার চেষ্টা করল।

দেবার কথা বলেছিল কিন্তু বিমলার কষ্ট হবে বলে সত্যেন  রাজি হয়নি। সংসারের অন্যান্য দায়িত্বের সাথে সাথে শ্বশুরকে ভোরের চা থেকে আরম্ভ করে রাতের খাবার দেওয়া পযর্ন্ত সমস্ত কিছু বিমলা খুব আন্তরিকতার সঙ্গে করে। এখন টুকটাক কিছু কাজ ছাড়া মলিনাকে প্রায়  কিছু করতেই হয় না। সবই বৌমা করে। কাজের ভার কমলে খারাপ লাগার কথা নয়। কিন্তু সমস্যা তো অন্য যায়গায়। সারা জীবন এই সংসার একা চালিয়েছেন। যা উচিৎ মনে করছেন তাই হয়েছে। সেই সংসারেই কাজ কমার সাথে সাথে কমে যাচ্ছে কতৃর্ত্ব। এখন তাঁর ইচ্ছে অনিচ্ছেটাই শেষ কথা নয়, বৌমার মতটাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। আর সব থেকে বিরক্তির ব্যাপার হল যে, এতে সত্যেনের প্রচ্ছন্ন আশকারা আছে।শাশুড়ি বউএর মনমালিন্য নতুন কিছু নয়। হয় না এমন বাড়ি খুব কমই আছে। কিন্তু এই তরজার কিছু নিয়ম আছে। শ্বশুরের জীবিতাবস্থায় শাশুড়ি যতদিন কমর্ক্ষম থাকে ততদিন এই দ্বৈরথে বিজয় তিলক তাঁর কপালেই থাকে। তারপর ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবতর্ন হয়। কিন্তু এ তো সময় দিল না। আসার কিছুদিনের মধ্যেই মলিনাকে নক্ -আউট  করে দিল। বৌমা চিৎকার চেঁচামেচি করে না।  যা করবে ঠিক করে তা করে ছাড়ে। যেটা মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। তাই চেঁচামেচি তাঁকেই করতে হয়। প্রথম দিকে অল্প ছিল কিন্তু বৌমার দখলদারি বাড়ার সাথে সাথে অশান্তিও পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল। সেবা যত্ন করে শ্বশুরকেও হাত করে নিয়েছে। সেবা তাঁকেও যে করেনা তা নয়। কিন্তু সেটাই তো স্বাভাবিক। যা স্বাভাবিক নয় তা হল বৌমার মাতব্বরি। স্বামীকে বলে লাভ নেই, তাই ছেলের কাছেই বিমলার নামে বেশ কয়েকবার নালিশ করেছে। অমূল্য বউকে অল্প স্বল্প বকেওছে। কিন্তু মলিনার ধারণা ওটা লোকদেখানো কারণ, বিমলার আচরণ এতটুকু পাল্টায়নি। এভাবে নরমে গরমে কয়েকমাস কাটল।

একদিন ‘জিনিসপত্রের যা দাম বেড়েছে এই টাকায় আর সংসার চালান যাচ্ছে না’ —মলিনার  এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিমলা অত্যন্ত শান্ত ভাবে বলল—মা, জিনিসপত্রের দাম আমরা কমাতে পারব না আর আয়ও আমাদের বাঁধা। তাই সবাই মিলে চেষ্টা করে সংসার খরচটা একটু কমাতে হবে।

ব্যাস, আগুনে ঘি পড়ল। সংসার খরচের টাকা মলিনার কাছে থাকে, তাই এ আক্রমণ সরাসরি তাঁকেই।

ছেলে বাড়ি ফিরতেই তার কাছে কেঁদে পড়লেন—তোর বউএর কাছে আর কত অপমান সহ্য করতে হবে রে ? আমি তো এখন তোদের বাড়ির কাজের লোকের থেকেও অধম হয়ে গেছি রে।

রোজ অভিযোগ শুনতে শুনতে সে বিরক্ত। ক্লান্ত হয়ে সবে বাড়ি ফিরেছে। বাড়ি ঢোকার সাথে সাথেই অভিযোগ শুনে মেজাজ বিগড়ে গেল। মাকে ধমক দিয়ে চুপ করতে বলে পুরো ঘটনাটা না শুনেই চেঁচিয়ে সকলের সামনে বিমলাকে বলল—এ বাড়িতে থাকতে হলে এখানকার মত করে থাকতে হবে। না পারলে থাকার দরকার নেই। যেখান থেকে এসেছ সেখানে গিয়ে থাক।

কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলেই অমূল্য বুঝতে পারে যে রাগের মাথায় সে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। বিমলা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। দুচোখ বেয়ে নেমে আসে জলের ধারা।

      নিজের ব্যবহারের জন্য অনুতপ্ত অমূল্য রাতে বিমলার কাছে বারে বারে দুঃখপ্রকাশ করে। বিমলা কোন উত্তর দেয়নি। বালিশে মুখ গুঁজে চুপ করে শুয়ে ছিল। পরের দিন সকালে বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম সেরে অমূল্য স্কুলে চলে যাওয়ার পর শ্বশুর-শাশুড়িকে প্রণাম করে বিমলা কোলকাতায় তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইল। মলিনা মুখ ঘুরিয়ে চুপ করে রইলেন। সত্যেন প্রথমে

বৌমাকে খানিক বোঝালেন। তারপর কদিন বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে এলে  মনটা ঠাণ্ডা হবে এই ভেবে এক ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীকে ডেকে বিমলাকে কোলকাতায় পোঁছে দিয়ে আসতে বললেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বিমলাকে দেখতে না পেয়ে অমূল্য মাকে জিজ্ঞেস করল। মলিনা প্রথমে পাশ কাটিয়ে গেলেও পরে আসল ঘটনাটা জানাতেই হল। এতটা অমূল্য ভাবেনি। মেয়েটা খুবই কষ্ট পেয়েছে। মনের দুঃখে ঘরে গিয়ে চুপচাপ বসে রইল। হঠাৎ চেয়ারের ওপর কয়েকটা চাবি আর একটা খাম চোখে পড়ল। খামটা খুলে দেখে বিমলার লেখা কয়েক লাইনের একটা চিঠি—

“ আমি এই বাড়িকে নিজের বাড়ির মতই ভাবি। বাপের বাড়ির লোকেদের থেকে তোমাদের কক্ষনো আলাদা চোখে দেখিনি। তাই সংসারের মঙ্গলের জন্য যা উচিৎ মনে হয়েছে তা করার পুরনো অভ্যাসটাও ছাড়তে পারিনি। পারলে ক্ষমা কোরো।“--- বিমলা।

চিঠিতে কাউকে সম্বোধন করা না থাকলেও বোঝাই যাচ্ছে এ চিঠি তাকেই লেখা। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এ সবের জন্য সেই দায়ি। সামনে পূজো। এ সময় লোকে বাড়ির কুকুর বেড়ালকেও তাড়ায়না আর সে কিনা নিজের বউকেই তাড়িয়ে দিল। কেন যে মার কথায় মাথাটা গরম করল। এই কয়েক মাসে বিমলাকে সে বড্ড ভালবেসে ফেলেছিল। স্বাবলম্বী সে কখনই ছিল না, কিন্তু বিয়ের পর থেকে তার জীবনটা পুরপুরি বৌ নির্ভর হয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে একটু শাসন করে এই যা। তা তার মত আনাড়ির ওটা দরকার।

           রাতে মায়ের শত অনুরোধ সত্ত্বেও অমূল্য কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ল। সত্যেনও খেতে বসে প্রায় কিছুই না খেয়ে উঠে গেলেন। স্বামী, সন্তান যখন অভুক্ত তখন মলিনাই বা খান কি করে। রাতে শোয়ার পরেও দুচোখের পাতা এক করতে পারলেন না। সারাদিনের ঘটনা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। ছেলের কাছে বৌমার হেনস্থায় তিনি খুশি হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু বিমলা যে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে তা ভাবতে পারেননি। যাওয়ার সময় যখন কাছে এল তখন রাগের মাথায় কথা না বলাটা ঠিক হয়নি। মেয়েটাকে আটকান উচিৎ ছিল।

       সকালে উঠেও গতকালের ঘটনা অমূল্যর মনকে আচ্ছন্ন করে রাখল। স্কুলে যেতে ভাল লাগছে না। টেবিলের ওপর আলমারির চাবিগুলো পড়ে রয়েছে। কতদিন সে নিজে আলমারি খোলেনি। দরকারই পড়ত না। সব বিমলাই হাতে হাতে যোগান দিত। ধীরে ধীরে উঠে আলমারিটা খুলল। জামাকাপড় সব পরিপাটি করে সাজান রয়েছে। শাড়ী গুলোয় হাত বুলিয়ে বিমলাকে অনুভব করার চেষ্টা করল। হঠাৎ চোখে পড়ল কয়েকটা খাম। এক একটা খামে এক এক জনের নাম লেখা আর তার পাশে লেখা “পূজোর জন্যে।“  প্রত্যেকটার ভেতরে অল্প কিছু টাকা রাখা আছে। এই কয়েক মাসের হাত খরচের টাকা থেকে তিল তিল করে জমিয়ে বাড়ির প্রত্যেকের পূজোর কেনাকাটার জন্য আলাদা করে রাখা। কেবল নিজের জন্য কিছু নেই। পূজোর সময় স্বামীর কষ্ট যাতে কিছুটা লাঘব হয় তার জন্যই এই সঞ্চয়। অমূল্য নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে চোখের জলে ভেজা খামগুলো মায়ের সামনে রেখে বলল—মা, বিমলা কি খুবই খারাপ ছিল ?

        বিমলা চলে যাওয়ার পর সংসার আবার মলিনার একার হাতে ফিরে এসেছে। এখন তাঁর ইচ্ছে অনিচ্ছেটাই শেষ কথা। প্রশ্ন করার কেউ নেই। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই মলিনা বুঝতে পারলেন যে তাঁর সাধের সংসারের স্বাভাবিক ছন্দটাই কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বাড়িতে তিনটে মানুষ, কিন্তু কেউ কাউকে যেন চেনে না।  সারাদিন সংসারের জন্য পরিশ্রম করেও কারো মন পান না। ছেলে শুধু বাড়িতে খেতে আর শুতে আসে। তাও অধের্ক দিন শরীর খারাপের অছিলায় রাতে খায় না। দিনের যতটা সময় পারে বাইরে কাটায়। স্বামী এমনিতেই কম কথার মানুষ, এখন একেবারেই কথা বলেন না। যে সংসার একদিন তাঁকে ছাড়া অচল ছিল এখন সেখানে নিজেকেই অবাঞ্ছিত মনে হচ্ছে। সমস্যার এখানেই শেষ নয়। বয়স অনুপাতে তাঁর শরীর স্বাস্থ্য যথেষ্ট ভাল। তাই বাড়ির কাজ করতে তাঁর কোনদিন কষ্ট হত না। কিন্তু মেয়েটা আসার পর থেকে সব কাজ নিজে করতে শুরু করে মলিনার কাজ করার অভ্যাসটাই নষ্ট করে দিয়েছে। এখন সামান্য কাজ করতেও আর শরীর চলে না।

এই কদিনে আর একটা উপলব্ধি মলিনার হয়েছে। যেখান থেকে যাবতীয় বিবাদের সূত্রপাত, সেই সংসারের খুঁটিনাটি ব্যাপারে বিমলার নজরদারিতে আখেরে লাভই হয়েছে। খরচ এখন বেশ কম হয়। আগে মাসের শেষে প্রায়ই ছেলের কাছে টাকা চাইতে হত। এখন দু পাঁচ টাকা বরং বেঁচে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে স্বীকার করা সম্ভব না হলেও এটাই বাস্তব।

দুপুরবেলা একা বসে বিমলা ভাবেন... মেয়েটা বাড়ির সকলকে সেবা যত্ন করত। কোন কাজে কক্ষনো না করেনি। একমাত্র সমস্যা, সংসারে কোথাও কোন কিছু ঠিক হচ্ছে না মনে হলেই বলত বা নিজেই তা শুধরোবার চেষ্টা করত। ওইটুকু মেয়ে তাঁর মত গিন্নিকে সংসার চালানোয় জ্ঞান দিলে রাগ হবে না ? তবে তিনি যতই চেঁচামেচি করুন না কেন বৌমা কিন্তু কক্ষনো ঝগড়া করেনি।

কিছুটা অনুতাপ আর কিছুটা বিমলা চলে যাওয়ার পর বাড়ির অস্বস্তিকর পরিবেশ, এই দুটো কারণে মলিনা মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলেন।

দিন দশেক বাদে এক রবিবার বিমলার বাবা পূজোর তত্ত্ব নিয়ে পাতিহাল এলেন। ব্রজেনকে দেখেই সত্যেন আর মলিনা খুবই লজ্জিত হয়ে পড়লেন।

প্রথমেই ব্রজেন মেয়ের জন্য বেয়াই বেয়ানের কাছে ক্ষমা চেয়ে বললেন—আমাদের জন্য মন কেমন করছে বলে বিমলা মার অমন করে হঠাৎ করে চলে যাওয়াটা উচিৎ হয়নি। আপনারা খুব ভাল বলে ওকে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। আমি আজই ওকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতাম কিন্তু ও আর কটা দিন থাকতে চাইল।

যারা চরম অপমান করে তাকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করল, নিজের বাবার কাছে সে কিন্তু তাদের ছোট হতে দেয়নি। কত ভালবাসা থাকলে তবেই এটা সম্ভব। মলিনার এখন নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে।

সত্যেন বললেন—বৌমার যে কদিন মন চায় আপনাদের কাছে থাকুক। শুধু বলবেন যে এই বুড়টার মায়ের জন্য বড্ড মন কেমন করছে।

মলিনা ততক্ষনে বেয়াইয়ের জন্য চা, জলখাবার নিয়ে এসেছেন। অনেক আদর আপ্পায়ন হল। নানা অছিলায় ব্রজেন রাতে থেকে যাওয়ার অনুরোধ কোনোরকমে কাটালেন। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর এই প্রথম তাঁর শ্বশুরবাড়িতে আসা। এদের যত্ন আর আন্তরিকতায় ব্রজেন আপ্লুত। অনেক ভাগ্য করে এমন ঘর পাওয়া যায়। বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। জামাই এসে বাসে তুলে দিয়ে গেল। বাড়ি পোঁছতে রাত দশটা বাজল। বাড়ির সকলে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে ব্রজেনের অপেক্ষায় বসে ছিল। বিমলার উদ্বেগ ছিল সবথেকে বেশি। বাবার ফিরতে দেরী হচ্ছে মানে এখানে করা তার সব নাটকের ওপর যবনিকা পড়ে গেছে। শেষ হয়ে গেছে তার নিজের সংসার ঘিরে গড়ে তোলা সব সোনালী স্বপ্ন।

ব্রজেনকে দেখতে পেয়েই বিমলা দৌড়ে বেরিয়ে এসে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল—বাবা এত দেরী হল ?

-- ভেতরে চল সব বলছি।

বিমলার উৎকণ্ঠা আরো বাড়ল। ঘরে বসে বিমলার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে স্ত্রীকে বললেন—অনেক ভাগ্য করে অমন বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিয়েছ। যা আপ্যায়ন করল ভাবা যায় না। কিছুতেই ছাড়ছিল না। অনেক কষ্টে রাতে থাকাটা এড়িয়েছি।

বেয়াই বিমলার অভাবে কতটা কাতর তাও জানালেন।

যে বাড়ি থেকে সে একপ্রকার বিতাড়িত, সেই বাড়ির প্রশংসা নিজের বাবার মুখে শুনে বিমলার খুব আনন্দ হল। তার এখানে চলে আসার আসল কারণটা অন্তত বাড়ির সকলের কাছে গোপন রইল। না হলে বাবা,মা খুবই কষ্ট পেতেন। তা ছাড়া শ্বশুর বাড়িকে সে সত্যিই ভালবেসে ফেলেছিল। তবু তখনও সে দ্বিধাগ্রস্ত। কি করবে না করবে এইসব নিয়ে যখন তার মন তোলপাড় হচ্ছে তখনই ব্রজেন পকেট থেকে একটা ছোট খাম বার করে মেয়েকে দিয়ে বললেন—ভুলেই গিয়েছিলাম, এটা বেয়ান তোকে দিয়েছেন।

আবার আতঙ্ক। বিমলা জানে না ওর ভেতর কিসের পরোয়ানা আছে। কোন রকমে খাম খুলে চিঠিটা বার করল। ছোট্ট দু লাইনের চিঠি। --- মা বিমলা, ফিরে এসে নিজের সংসারের হাল ধরো। এই বুড়ি যে আর সামলাতে পারছে না মা।  

চিঠিটা পড়ে বিমলার অন্তর জুড়িয়ে গেল। মনে আর কোন দ্বন্দ নেই।   

--- মা, আমি কাল সকালে পাতিহাল যাব।

ব্রজেন  বললেন—সে কিরে, এই যে বললি আরো কটা দিন থাকবি! আমি সেইমত তোর শ্বশুরবাড়িতে বলে তাঁদের মত নিয়ে এলাম।

বিমলা বলল—না বাবা, আমাকে যেতেই হবে।

মা ভাবলেন বরের জন্য মেয়ের মন কেমন করছে। মেয়েকে আদর করে বললেন—পাগলী ।

বিমলার থেকে সুখী এ সংসারে এই মুহুর্তে আর কেউ নেই। শাশুড়ির দু লাইনের চিঠিতে সে পেয়ে গেছে তার ইপ্সিত স্বীকৃতি। তাই আর বিলম্ব করা সম্ভব নয়।

 

     বেশ কিছুকাল আগের কথা। হাওড়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম “পাতিহাল”। গ্রামে কিছু যায়গায় বিদ্যুৎ এলেও অনেকটাই তখনও লণ্ঠনের কবলে। রাস্তাঘাট প্রায় সবই কাঁচা। মণ্ডলদের মত কিছু ভূস্বামী বাদ দিলে বাকিরা অধিকাংশই গরিব চাষি। শহরের বিভিন্ন অফিসে কাজ করেন এমন মানুষও কিছু আছেন। পাতিহালের ক্ষেত্রে তাঁরা একপ্রকার অনাবাসী। শহরের মেসে থাকেন আর সপ্তাহান্তে একবার পরিবার দশর্নে আসেন। মারটিন রেল উঠে গেছে। কোলকাতা যাতায়াত করার জন্য কেবলমাত্র কিছু বাসই ভরসা। এখনকার মত এত বাসও তখন ছিল না। তাই রোজ যাতায়াত করা একপ্রকার অসম্ভব ছিল। 
      অমূল্য এই গ্রামেরই বাসিন্দা। বছর চব্বিশ পঁচিশ বয়স, রং ফরসা, সুপুরুষ। উপরোক্ত কোন পেশাই তার নয়। সে পাশের গ্রামে একটা স্কুলে মাস্টারি করে। কিছু জমি জমাও আছে। স্কুলে যা পায় আর চাষের আয় মিলিয়ে সংসার মোটামুটি চলে যায়। ছোট  সংসার। তারা স্বামী-স্ত্রী আর মা-বাবা। তার এক বোন আছে। বিয়ে হয়েছে মেদিনীপুরের এক গ্রামে। যাতায়াত কষ্টকর হলেও বাড়ির টানে মাঝে মাঝে আসে। 
      কিছু উচ্চবিত্ত পরিবার ছাড়া তখন গ্রামের বউ বা জামাই সাধারণত: আর একটা গ্রাম থেকেই আসত। আসলে অপেক্ষাকৃত সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করা শহুরে মানুষেরা সচরাচর গ্রামেতে ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দিতেন না। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল। অমূল্যর স্ত্রী বিমালাই এমন এক ব্যতিক্রম। অমূল্যর পিসেমশাই রমাকান্ত আর বিমলার বাবা ব্রজেন কোলকাতায় একই অফিসে চাকরি করতেন। দুজনের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব ছিল। সেই সুবাদে ব্রজেন বারকয়েক পাতিহালে এসেছেন। কিন্তু একা, পরিবার নিয়ে নয়।  পিসিমার অনুরোধে একবার শীতকালে স্ত্রী আর তিন মেয়েকে নিয়ে বন্ধুর বাড়িতে এলেন। রমাকান্তর বাড়ির পাশেই একটা বড় বাগান ছিল। ওই বাগানে সেদিন পারিবারিক চড়ুইভাতির আয়োজন করা হয়েছিল। অমূল্যরাও ওখানে নিমন্ত্রিত ছিল। পিসিমার বাড়ি খুব একটা দূরে নয়, পাশের গ্রামেই।

        বিরাট বাগান। আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেল গাছের ফাঁকে বেশ খানিকটা জায়গা রান্না আর খাওয়ার জন্য পরিষ্কার করা হয়েছে। পাশেই বড় পুকুর। এগুলো সব রমাকান্তর নিজের। এছাড়া শরিকি জমিজমাও কিছু আছে। জেলেরা পুকুর থেকে ধরে দুটো বড় কাৎলা মাছ দিয়ে গেছে। কয়েক কাঁদি ডাবও গাছ থেকে পাড়িয়ে মাথা কেটে রাখা আছে। যার যত ইচ্ছে খাও। নামে চড়ুইভাতি হলেও রান্নার জন্য লোক রাখা হয়েছে। কারণ, রান্নায় সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়লে আড্ডাটা জমবে না। বাড়ির মেয়েরা ঠাকুরকে টুকটাক সাহায্য করবে। বিমলাদের সকলকে নিয়ে পিসিমারা সকালবেলাই বাগানে চলে এসেছেন। অমূল্যর পিসিমার একটাই মেয়ে। বছর চোদ্দ পনের বয়স। বিমলার মেজো বোনের বয়সী। কোলকাতায় অল্প যায়গায় থেকে অভ্যাস তাই এখানে এত ফাঁকা জায়গা, পুকুর, বাগান পেয়ে বিমলার বোনেরা আনন্দে চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে পিসিমার মেয়ে। বিমলা আঠেরোয় পা দিয়েছে। ফ্রক ছেড়ে অনেকদিনই শাড়ি পরছে। মনে ইচ্ছে থাকলেও বাচ্চাদের সাথে হুড়োহুড়ি তার সাজেনা, তাই মায়েদের পাশে বসে গল্প করতে করতে রান্নায় টুকটাক সাহায্য করছে। রমাকান্ত চড়ুইভাতির সব  যোগাড় যন্তর সেরে বন্ধু ব্রজেনের সাথে বসে গুছিয়ে আড্ডা মারছেন আর মাঝে মাঝে গিন্নিদের উদ্দেশ্যে রঙ্গ করে টিপ্পুনি কাটছেন। প্রত্যুত্তরে ওপাশ থেকেও ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ ভেসে আসছে।

   সকাল নটা নাগাৎ  অমূল্যরা বাগানে পৌঁছল। জলখাবারের আলুরদম তৈরি। লুচি ভাজা হচ্ছে। শালপাতার থালায় করে গরম লুচি তরকারি  বিমলা এক এক করে সকলের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। তারই মধ্যে মায়ের ইশারায় এক ফাঁকে অমূল্যর বাবা-মাকে নমস্কার করে গেল। বাচ্চারাও খেলায় একটু বিরতি দিয়ে মা-কাকিদের পাশে বসে আয়েশ করে জলখাবার খাচ্ছে। আসলে ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন পাচকের হাতে তৈরি একই পদ অনেক সুস্বাদু লাগে। অমূল্যর মা মলিনা মহিলা মহলে খোশ গল্পে মত্ত। আর তার বাবা সত্যেনও জলখাবার খেয়ে রমাকান্ত আর ব্রজেনের সাথে আড্ডায় যোগ দিলেন। অমূল্য পড়ে গেল একা। সে খুবই শান্ত আর লাজুক স্বভাবের। অপরিচিত লোকজনের সামনে পড়ে আরো গুটিয়ে গেল। পিসিমা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ওকে ডেকে এনে সকলের সাথে আলাপ করিয়ে দিয়ে একটু স্বাভাবিক করে দিলেন। লাজুক হলেও এর মধ্যেই আড়চোখে বেশ কয়েকবার বিমলাকে তার মাপা হয়ে গেছে। কাছ থেকে আবার দেখল। ডানাকাটা পরী না হলেও বিমলা বেশ সুশ্রী। বারে বারেই চোখ চলে যাচ্ছে। গুরুজনদের দৃষ্টি বাঁচিয়ে বিমলাও কয়েকবার সদ্য পরিচিত ছেলেটাকে দেখেছে। ভাল যে লাগেনি তা নয়। উভয়ের অগোচরে আরো কয়েক জোড়া চোখ তাদের লক্ষ্য করেছে।

      পিসিমাই প্রথম কথাটা পাড়লেন—বৌদি, আমাদের অমূল্যর সাথে বিমলাকে বেশ মানাবে। পালটি ঘর। মেয়ে লেখাপড়াও জানে, ম্যাট্রিক পাশ।

অমূল্যর মায়েরও বিমলাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। ননদের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে বিমলার মাকে দেখিয়ে বললেন—আগে ওনাদের মতটা জান।

গ্রামেতে মেয়ের বিয়ে দিতে ব্রজেনের মনটা খুঁত খুঁত করছিল। কিন্তু তার রোজগার তেমন কিছু নয়। তিন তিনটে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। ছেলেটা স্বভাব চরিত্রে আর দেখতে শুনতে ভালই। আর সব থেকে বড় কথা কোন দাবি দাওয়া নেই। ফলে এ সুযোগ তিনি হাতছাড়া করলেন না।

বিমলাকে ভাল লাগলেও একটা ব্যাপার সেদিন অমূল্যর চোখে পড়েছিল। তা হল কারণে অকারণে নিজের ছোট বোনেদের শাসন করা। এমনকি একবার কি একটা কথায় মাকেও ইশারায় ধমক দিল। তার শান্ত সুন্দর চেহারার সাথে যা একেবারেই বেমানান। এইসব ছোটখাট ব্যাপার অন্যদের চোখ এড়ালেও অমূল্যর এড়ায়নি কারণ, ওর নজর যে  ঘুরে ফিরে বিমলার দিকেই ছিল।

এর কয়েক মাস বাদেই কোলকাতার মেয়ে বিমলা অমূল্যর বউ হয়ে পাতিহাল গ্রামে এল। বিমলার সান্নিধ্যে এসে অমূল্যর মনে হল তার জীবনে বোধহয় আর কিছু পাওয়া বাকি নেই। তার বাবা-মাও বৌমার সেবা যত্নে তৃপ্ত। আত্মীয় পরিজনেরাও নতুন বৌ এর নম্র মধুর ব্যবহারে খুশি। রেখা তো বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েও বৌদির পিড়াপীড়িতে আরো কদিন থেকে গেল। সত্যি, এই কদিনেই বৌদি বাড়ির সকলকে বড় আপন করে নিয়েছে। শ্বশুর বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় রেখা বাবা-মার থেকে বৌদিকে জড়িয়ে ধরে বেশি কাঁদল। নতুন বৌ, অমূল্যর তো ভাল লাগবেই, কিন্তু পাঁচ জনের প্রশংসা শুনে তার বুকটা ভরে গেল।

স্কুলে না গেলেই নয় তাই যেতে হয়। কোনরকমে ক্লাসগুলো নিয়েই অমূল্য বাড়ি পালিয়ে আসে। টিউশনিতেও প্রায়ই ফাঁকি পড়ছে।

মলিনা থাকতে না পেরে একদিন ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন—হ্যাঁরে, আজকাল আর টিউশনি করিস না ?

কোনরকমে হুঁ হাঁ করে অমূল্য পাশ কাটিয়েছিল। মাকে কি করে বোঝাবে যে বিমলার সান্নিধ্যের চেয়ে তার কাছে আর কোন কিছুই বড় নয়। শরীর খারাপের অছিলায় দু এক দিন স্কুলও কামাই করল।

বিমলা কপট ধমকের সুরে একদিন বলল—যা শুরু করেছ তাতে এবার লোকে তোমায় বৌ পাগলা বলবে।

আদর করতে করতে অমূল্য বলেছিল—বলুগ গে।

একটা জিনিস অমূল্যকে মাঝে মাঝে হজম করতে হয়। তা হল বিমলার শাসন। সকালে দেরী করে ঘুম থেকে ওঠার 

উপায় নেই। তারপর সারাদিন কত যে এটা কোরো না ওটা কোরো না শুনতে হয় তার শেষ নেই। মাস্টারি তার নয় বিমলারই করা উচিৎ ছিল। বিমলার এই মাতব্বরি অবশ্য সে উপভোগই করে কারণ, তাতে থাকে অনুরাগের ছোঁয়া। সে দেখেছে বিমলা তাকে অযৌক্তিক কিছু বলে না। তা ছাড়া স্বামীর ওপর জোর খাটাবেনাতো খাটাবে কোথায়! বেশ কটা দিন ঘোরের মধ্যে কাটল।

প্রথম ছন্দ পতন হল অমূল্য যেদিন স্কুলের মাইনে নিয়ে ঘরে এল। মার কাছে সংসার খরচের টাকাটা দিয়ে ঘরে এসে সোহাগ করে বউএর হাতে একশ টাকা দিয়ে বলল—এটা তোমার হাত খরচের জন্য। ইচ্ছেমত খরচ কোরো।

তখনকার বাজারে বিশাল কিছু না হলেও একশ টাকা একেবারে ফেলনা ছিল না। বিশেষতঃ অমূল্যর মাইনের অনুপাতে ওটা অনেক। বউকে ওই হাতখরচ দেওয়ার ফলে তাকে কিছুটা খরচ কমাতে হবে অথবা আরো এক আধটা টিউশনি যোগাড় করতে হবে। তবু আদরের বিমলার খুশির জন্য এটুকু কৃচ্ছসাধন এমন কিছু নয়। বিমলার মুখে যে খুশির ঝলক দেখতে পাবে তাতেই তার মন প্রাণ জুড়িয়ে যাবে। এইটুকু সময়েই অমূল্য বিমলাকে বড্ড ভালবেসে ফেলেছিল।

টাকা হাতেই বিমলা জিজ্ঞেস করল—মাইনের বাকি টাকাটা কি করলে ?

যা আশা করেছিল তার বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখে অমূল্য একটু থতমত খেয়ে গেল।

একটু সামলে নিয়ে বলল—সংসার খরচের টাকাটা মার কাছে দিয়ে বাকি অল্প কিছু আমার হাত খরচের জন্য রেখেছি। তুমি কি খুশি হওনি ?

উত্তরে বিমলা শুধু বলল—বিয়ের আগে সংসার খরচের টাকা বাবা আমার কাছে দিতেন। তাতে আমাদের  সংসার কিন্তু কোনদিন খারাপ চলেনি।

অমূল্য একেবারে চুপ করে গেল।

কথাটা বলেই বিমলা বুঝতে পারে যে ভুল হয়ে গেছে। বাপের বাড়ির মত স্বামীর সংসারও নিজের মত করে চালানোর বাসনাটা ওভাবে প্রকাশ করা উচিত হয়নি। তাও এত তাড়াতাড়ি।

অমূল্যর গলা জড়িয়ে দুঃখপ্রকাশ করে বলল—আসলে সংসার চালানোটা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। সেই অভ্যাসের বসেই কথাগুলো বলে ফেলেছি। তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।

বিমলা আরো বলল—সংসারের টাকা মার কাছেই থাক। আমাদের রোজগার তো বেশি নয় তাই মাকে বোলো একটু হিসেব করে খরচ খরচা করতে।

কথাগুলো শুনে অমূল্যর মনটা ঠাণ্ডা হল। সে একেবারেই সংসারী নয়। সংসারের ভালমন্দর ব্যাপারে তার জ্ঞান খুবই কম। তাই বিমলাকে কাছে টেনে আদর করে বলল--- ও সব যা বলার তুমিই বোলো।

ওই বলা থেকেই শুরু হল যাবতীয় বিপত্তি।   

অমূল্যর বাবা অমূল্যর মতই শান্ত প্রকৃতির মানুষ। মলিনাই এতদিন ছিলেন এই পরিবারের নিয়ন্তা। দৈনন্দিন সংসার পরিচালনার ক্ষেত্রে সব সিদ্ধান্ত তিনি একাই নিতেন। এইখানেই সংঘাতের শুরু। কোন বিশেষ একটা ঘটনা হয়ত তেমন কিছু বড় নয়। কিন্তু বিমলার সাথে ছোট খাট মতপাথর্ক্য গুলো দিনে দিনে বাড়তে লাগল আর তার সাথে তাল মিলিয়ে বাড়তে লাগল অশান্তি।

শাশুড়ি চাইতেন বৌমা রান্নার যোগাড় যন্তর করুক কিন্তু রান্নাটা তিনিই করবেন। প্রথম প্রথম তাই হচ্ছিল। কিন্তু বিমলা এক আধটা করে পদ রাঁধতে শুরু করল আর রান্নার প্রশংসাও পেল, বিশেষ করে শ্বশুরের। আর পায় কে। ধীরে ধীরে রান্নাঘরের পুরো দখলটাই নিয়ে নিল। এতে পরিশ্রম বাড়লেও পরোয়া নেই। মহানন্দে নিত্য নতুন রান্না করে সবাইকে খাওয়ায়। সংসার খরচের ব্যাপারেও মাঝে মাঝেই বিমলা নাক গলায়। মলিনার যেটা একেবারেই পছন্দ নয়। একবার তো খরচ কমাবার জন্য বাড়ির কাজের লোককেও ছাড়িয়ে

 

ক্যানভাস 

মিঠুন মন্ডল

       ......সময়টা ঠিক মনে নেই। বাংলার এক অখ্যাত জনপদ। বিরূপ প্রকৃতির মুখোমুখি হল সে ভূখন্ডের বাসিন্দারা। পালাবদলের বিচিত্র ধারায় সবল জনপদটিতে নেমে এল দুর্ভিক্ষের অশনি সংকেত। পথে ঘাটে অনাদরে পড়ে থাকত অস্থিমজ্জা সমৃদ্ধ বুভুক্ষু মাংসহীন লাশ- এ যেন দুমড়ে মুচড়ে পড়া আদম সন্তানদের লাশ। আর সেই লাশগুলোর উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ত শকুন, কুকুর, শিয়াল আর কাকেরা।

   সন্দীপ রায় মন দিয়ে পেপার পড়ছে। না, কোন রাজনীতির বা খেলার খবর নয়। শেয়ার মার্কেটে বেশ কয়েকশো সূচক পড়েছে, সেটাই মন দিয়ে পড়ছে। দুতিনটে বড়ো কোম্পানির শেয়ার পড়ায় সন্দীপ একটু চিন্তিত। রাইমা চায়ের গ্ল্যাসটা টেবিলে রেখে জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়াট হ্যাপেনড? এনি থিং রং?’ রাইমা কনভেন্টে পড়া  মেয়ে। কথায় কথায় ইংরাজী বলে ফেলে। তবে নিজেকে জাহির করতে নয়, নিতান্তই অভ্যাস বশত বলে ফেলে। না, কিছু হয়নি বলে সন্দীপ চায়ের গ্লাসে চুমুক দিল। ‘বাটার টোস্ট, ডিম সেদ্ধ কিছুই তো খেলে না? কাল অনেক রাত্রে খেয়েছি তো, মনে হয় অ্যাসিড হয়ে গেছে। রাইমা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কি মনে করে কিছু বলল না হয়তো উত্তরটা জানা। অফিসে পার্টি ছিল কিংবা কোন বন্ধুর বাড়ী থেকে খেয়ে এসেছে। সন্দীপ একটা অ্যাড এজেন্সির ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। গত বছর একটা ফেয়ারনেস ক্রিমের অ্যাড বানিয়ে এওয়ার্ড পেয়েছিল। সন্দীপ আনমনে কিছু ভাবছিল। রাইমা টাই পরাতে থাকে। সন্দীপের ফোনটা বেজে উঠল। সন্দীপ হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গেই ফোনের ওপার থেকে ভেসে এলো, ‘ শুনেছেন মুখার্জী আবার মুম্বাই থেকে ব্যাক করছে। আমি কালকেই শুনেছিলাম আপনাকে বলা হয়নি’। ‘ও তাই ! ভালো তো! ‘মুম্বাই এ যে বেশিদিন টিকবে না সেটা আমি আগেই জানতাম। বাঙালী ছেলেদের মাছ ভাত- মাংস ভাত না হলে চলে’। ‘আপনি বলতে চাইছেন মুম্বাই এ মাছ, মাংস পাওয়া যায় না’? সন্দীপ একটু গম্ভীর ভাবে বলল। ‘না, না সেটা বলছি না, আসলে কলকাতায় থাকার যে মজা সেটা কি অন্য কোথাও পাওয়া যায়’? ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি বেড়চ্ছি বাকি কথা অফিসে হবে। সন্দীপ রায় মোবাইলটা পকেটে পুড়লে, রাইমা বলে, বুবলাইয়ের জন্মদিন ওর জন্য কি একটা ড্রয়িং সেট কিনে নেবো? ‘কোন বুবলাই’? ‘বুবলাইকে ভুলে গেলে? রঞ্জুদার ছেলে? তোমার তো কিছুই মনে থাকে না দেখছি’? ‘ও আচ্ছা, মনে পড়েছে। ওকে একটা খেলনা কিনে দাও। ‘কেন ড্রয়িং সেট কিনে দিলে কি হবে? ‘কিছু হবে না, বুবলাইতো পাবলো পিকাসো হবে না’? রাইমা সন্দীপের মুখের দিকে চেয়ে আছে। সন্দীপ কি কিছু মিন করতে চাইছে? রাইমা কে অন্যমনস্ক দেখে, সন্দীপ বলে, তোমার যা ইচ্ছে তাই কিনে নিয়ে যেও, আমি চললুম দেরি হয়ে যাচ্ছে।

*******

    সন্দীপ অফিস চলে গেলে, রাইমা টবে লাগানো গাছ গুলোতে জল দিল। হঠাৎ করেই মনে পড়ল, চিলে কোঠার ঘরটা অনেকদিন পরিষ্কার করা হয়নি। দরজা খুলেই একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ অনুভব করল রাইমা। একটা সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সন্দীপ এই ঘরে থাকত। প্রায় ৫ বছর হয়েগেল সন্দীপ এই ঘরে আর ঢোকে না। চারিদিকে সন্দীপের আঁকা পোট্রে। কোনটা শুধু পেনসিল দিয়ে স্কেচ করা কোনটা জল রং। বছর আটেক আগে গগনেন্দ্র ভবনে এই রকমই এক পেনসিল দিয়ে স্কেচ করা পোট্রে দেখে মুগ্ধ হয়েছিল রাইমা। অনেকটা গায়েপরেই আলাপ করেছিল রাইমা। একটা ডাইরি বার করে অটোগ্রাফ চাইলে সন্দীপ বলে, ‘অটোগ্রাফ চাইছেন, দিচ্ছি কিন্তু আমি কোন বড় শিল্পী নই, মনের খেয়ালেই ছবি আঁকি। আপনি সারাজীবন মনের খেয়ালেই ছবি এঁকে যান সন্দীপদা, আপনার ছবি আন্তর্জাতিক মানের। এরপর সন্দীপের প্রায় প্রত্যেকটা প্রদর্শনীতেই রাইমা থাকত।  সন্দীপের বাবা অনেকদিন আগেই মারা গিয়েছিলেন। মায়ের পেনশন আর নিচের তলার ঘর ভাড়ার টাকায় সংসার চলত। রাইমার সাথে যখন বন্ধুত্ব এক বছর গড়িয়েছে হঠাৎ করেই সন্দীপের মা হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।সন্দীপ আরও বেশি করে রাইমার উপর নির্ভরশীল হতে থাকে। সন্দীপের মা মারা যাবার তিন মাস পর একদিন সন্ধ্যাবেলায় রাইমা সন্দীপের বাড়ী আসে। হাতে একটা বড়ো ব্যাগ। সন্দীপ কিছু বুঝে উঠার আগেই রাইমা বলে, ‘আমি আজ থেকে এখানেই থাকব’। ‘মানে কি? তোমার বাড়ির লোক জানে? ওরাতো এক্ষুনি পুলিশে খবর দেবে’। ‘না দেবে না, আমি বাড়িতে বলে এসেছি’ রাইমা ধীর গলায় উত্তর দেয়। কিন্তু তুমি তো জানো, আমি তেমন কিছু করিনা, কি করে...। উফ! তোমাকে কিছু করতে হবে না, আমি একটা জব পেয়েছি, যা মাইনে পাবো আমাদের চলে যাবে।

      দেওয়ালের এককোণে রাইমার একটা পোট্রে ঝুলছে। পাহাড়ী মেয়েদের মতো সেঁজে বসে আছে। বিয়ের একমাস পরই দার্জিলিং গিয়েছিল। ঠিক হানিমুন বলা যায় না। সন্দীপ কার্শিয়ং এ একটা স্কুলে ওয়ার্কশপ করাতে গিয়েছিল। একদিন ওয়ার্কশপ থেকে সন্দীপ ফিরলে রাইমা বলে, ‘যদি একসঙ্গে সময়ই না কাটানো যায় তাহলে আর মধুচন্দ্রিমার মানে কি’? সন্দীপ কিছুক্ষণ চুপ চাপ থাকে তারপর বলে, ‘তুমি এক জায়গায় ১ ঘণ্টা বসে থাকতে পারবে? ‘কেন? তুমি কি টাইটেনিকের মতো ছবি আঁকবে’? রাইমা চোখ দুটো বড় করে জিজ্ঞেস করে। হ্যাঁ। তবে উইথ কস্টিউম। তোমাকে আমি আজ পাহাড়ি মেয়ে সাজাবো। প্রথম ১০ মিনিট বসে থাকতে কোন অসুবিধা হয়নি রাইমার। একটু নড়লেই সন্দীপ বলে উঠে, ‘এই একদম নয়, চুপচাপ লক্ষ্মী মেয়ের মতো বসে থাকো’। এর পর রাইমা আর কোনদিন পোট্রে করার কথা বলেনি। মডেলদের অসীম ধর্য্যের জন্য অবাক হয়েছে। একবার সন্দীপকে জিজ্ঞেস ও করে ছিল, ‘তোমার মডেলরা ২-৩ ঘণ্টা বসে থাকে কি করে? এটা ওদের professionalism এবং dedication দুটোর সংমিশ্রণ। ওয়ার্কশপের শেষ দিনে ম্যালে বেড়াতে গিয়েছিল। জানো রাইমা এই বাজারটার পাশে একটা বুদ্ধ মন্দির আছে, তুমি যাবে? তুমি কি করে জানলে? রাইমা বিস্ময় প্রকাশ করল। আর্ট কলেজে পড়ার সময় একবার এসেছিলাম। তাই! তোমারা মন্দির দেখতে এসেছিলে নাকি? তা নয়। আমরা দার্জিলিং বেড়াতেই এসেছিলাম। আমার এক বন্ধু আমাকে নিয়ে এসেছিল। কেন? আমাদের এক ক্লাসমেটকে ওর ভালো লাগতো কিন্তু কিছুতেই বলতে পারছিল না। শেষে আমার দায়িত্ব পড়ল তাকে জানানোর।  তুমি পিয়নের কাজে সফল হয়ে ছিলে? রাইমার মুখে একটা হাসি মাখানো বিস্ময়। মেঘনার সাথে আমার আগে থেকে আলাপ ছিল। আমি ওকে একটা চিরকুট দিলে, সে এক পলক দেখেই সেখানে ফেলে দেয়। তারপর? আমার কি দূরবস্থা! সবার সামনে চিরকুট দেওয়াটা মনে হয় ঠিক হয়নি। সেই সময় মনে হচ্ছিল ধরিত্রী তুমি দ্বিধা হও আমি ঢুকে যায়। এটা বেশি বাড়াবাড়ি! সত্যি বলছি লোকের জন্য এতোটা লজ্জায় কখনও পড়িনি। তোমার চিঠি দেওয়ার সঙ্গে মন্দিরের কি সম্পর্ক? বলছি, একটু সবুর করুন। এই ঘটনার পর আমি বন্ধুকে বললাম ভাই তুই মেঘনাকে ভুলে যা, ওর কাঁদতে বাকী, কোথা থেকে শুনেছিল আমি জানি না, আমাকে টানতে টানতে এই বুদ্ধ মন্দিরে নিয়ে এসেছিল। কিছু দিন পর বন্ধুটা আর্ট কলেজ ছেড়ে দিয়েছিল। আমার সাথে অনেকদিন কোন কন্ট্যাক্ট ছিল না। মাস তিনেক আগে সল্টলেকে একবার দেখা হয়েছিল। একথা সেকথা পর জিজ্ঞেস করলাম কি রে মেঘনাকে ভুলতে পেরেছিস? ও বলল সেটা মনে হয় আর সম্ভব নয়, এক সাথে ঘর করছি তো! আমি না এক মিনিট কোন কথা বলতে পারিনি। বন্ধুটা আমার মনের অবস্থা দেখে বলল, ‘আমরা বুদ্ধ মন্দিরে গিয়েছিলাম তারই ফল পেয়েছি, আমাদের একটা দুবছরের বাচ্চা আছে, নাম 

আয়ুস। আমি কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বললাম বা! কনগ্রাচুলেশনস! কিন্তু কি করে হল। ও তো... । আজ ব্যস্ত আছি একদিন বাড়িতে আয় সব বলব। সন্দীপ ম্যালের বাজার থেকে একটা স্কার্ফ কিনে দেয় রাইমাকে। রাইমা ঘর সাজানোর কয়েকটা জিনিস কেনে। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের কাছে এসে পড়ে। কলকাতার মতো ফল ফুল দিয়ে পুজো করার রেওয়াজ নেই। মন্দিরের ভিতরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। রাইমা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকল। ভগবানের কাছ থেকে কি চাইলে? বলব কেন? সন্দীপ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রাইমার দিকে চেয়ে আছে। রাইমা হেসে বলল, ‘পতি দেবতা যেন আর বেশি সময় দেয় আরও অনেক বেশি ভালবাসে’। তোমাকে একটু কম ভালবাসছি বলছ? রাইমা মুখে হাসি রেখেই ঘাড় নাড়ালো। কেন তোমার এই রকম মনে হচ্ছে? সন্দীপ একটু গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞেস করল। এই ধরো আমি তোমাকে জিজ্ঞেস না করেই তোমার ঘরে এসেছি, তুমি হয়তো কিছুটা বাধ্য হয়ে বিয়েটা করেছ। সন্দীপ কয়েক মুহূর্ত রাইমার দিকে চেয়ে থেকে বলল, ‘মানুষের কিছু আবেগ কে অনুভব করতে হয়, মুখে বললে মাধুর্য্য নষ্ট হয়ে যায়’।

     রাইমা জানলাটা খুললে সূর্যের আলো ঘরের এক কোনে রাখা পোট্রের উপর পড়ে। পোট্রের নিচে ছোটো করে তারিখ লেখা ২৪ শে সেপ্টেম্বর ২০১০। সেই দিন সকাল ৯ টার সময় রাইমা অফিসের জন্য বেড়িয়ে যায়। যাওয়ার আগে বলে যায় ঘরের ইলেকট্রিক বিল জমা দিতে এবং কিছু সবজি নিয়ে আসতে। সন্দীপ একটা পোট্রে আঁকছে মন দিয়ে, কানে কোন কথা ঢুকেছে কিনা বোঝা গেল না।সন্ধ্যে ৭ টার সময় ফিরে এসে রাইমা দেখে  ইলেকট্রিক বিলের কাগজ যেখানে ছিল ঠিক সেখানেই পড়ে রয়েছে। ডাইনিং টেবিলের উপর মুড়ির প্যাকেট, থালা, চায়ের গ্লাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। রাইমা কাঁধের ব্যাগটা খাটের উপর রেখে চিলে কোঠার ঘরে যায়।সন্দীপ তন্ময় হয়ে ছবি আঁকছে, ঘরের ভিতরে একজন এসেছে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ঘরের মেঝেতে রং, তুলি কাগজ ছড়ানো। এই নিয়ে পাঁচ বার চেষ্টা করেও সন্দীপ ঠিক যেমনটা চাইছে ঠিক তেমন ভাবে পোট্রে টাকে ফুটিয়ে তুলতে পারছে না। তিন বছরের এক সাঁওতালি বাচ্চা তার মাকে অর্ধেক বিস্কুট খাওয়াচ্ছে। সন্দীপ চাইছে মায়ের মুখটাতে হাসি এবং একই সঙ্গে ভিতরের একটা কান্না ফুটিয়ে তুলতে। হাসিটা তো ঠিক আছে কান্নাটা আসছে না! ঘরের ছিটকানি টা লাগাওনি কেন? রাইমা জিজ্ঞেস করে।  রঞ্জু আর শ্যামল এসেছিল, তারপর আর লাগানো হয়নি। সন্দীপ ক্যানভাস থেকে মুখ না ঘুরিয়েই উত্তর দিল। ‘ইলেকট্রিক বিল জমা দাওনি কেন’? ‘একবার ভেবেছিলাম যাবো, কিন্তু আর হয়ে উঠল না, থাক আগামীকাল দিয়ে দেব’। ‘আজকে এই মাসে বিল জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল, কাল জমা দিতে গেলে ফাইন দিতে হবে। রাইমা কথাগুলো চিৎকার করে বলল। সন্দীপ চুপ করে থাকে। ঘরটার কি অবস্থা করে রেখেছ, দেখেছ? এখানে কোন মানুষ থাকে? সন্দীপ পরিবেশটা একটু হালকা করার জন্য বলল, ‘আমার মনে হয় ভূত থাকে! আমি ভূত আর তুমি পেত্নী, কথাটা বলেই সন্দীপ হাসার চেষ্টা করল। রাইমা একই রকম গম্ভীর হয়ে আছে। চানাচুরের প্যাকেট শেষ হয়ে গেছে বলনি তো? সন্দীপ বলল। রাইমা আর নিজের নার্ভ কে ধরে রাখতে পারল না। সে চিৎকার করে বলল, ‘সাট আপ! জাস্ট আই কান্ট টলারেট ইউ। দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছ সন্দীপ। তোমাকে সবজি আনতে বলেছিলাম, এনেছ? সন্দীপ জানলার দিকে চেয়ে আছে। রাইমা মেঝের উপর বসে পড়ল। চোখ দিয়ে জল পড়ছে। সন্দীপ কি করবে বুঝতে পারছে না। নিজের আঁকা পোট্রের দিকে একবার চাইল। এতক্ষণ যেটা দেখে কিছুই হচ্ছে না মনে

*******

হচ্ছিল এখন সেটাই এক অসাধারণ ছবি মনে হচ্ছে। রাইমার চোখের জল যেন ছবিটার মধ্যে ফুটে উঠেছে। দিন সাতেক হয়ে গেল সন্দীপ একটা পোট্রে বানাচ্ছে। এই বছর প্যারিসে আন্তর্জাতিক পোট্রেট প্রতিযোগিতা শুরু হবে ২২শে ফেব্রুয়ারী। সন্দীপ অংশ গ্রহণ করতে চায়। এন্ট্রি ফ্রি যাতায়াত নিয়ে প্রায় ১৫০০০০ টাকা খরচ। ব্যাঙ্কে লাখ খানেক টাকা আছে। এদিক ওদিক থেকে হাজার দশেক হয়ে যাবে। বাকি ৪০০০০ টাকা কোথায় পাবে? সন্দীপ চিন্তা করছে রাইমাকে বললে কি দেবে? গত বছর মানালি গিয়েছিল প্রতিলিপি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে। কিন্তু প্রথম দ্বিতীয় বা তৃতীয় কিছুই হতে পারেনি। শুধু পাবলিক চয়েস অ্যায়ার্ড পেয়েছিল একটা মোমেন্টো। এদেশে এতো পলিটিক্স আর লবি চলে যে নতুন কিছু করাই খুব মুশকিল। সেবার রাইমাকে বড়ো মুখ করে বলেছিল, ‘দেখবে প্রথম পুরষ্কার এক লক্ষ টাকা আমিই পাবো। তোমাকে একটা ডাইমন্ডের রিং দেবো’। রাইমা মাঝে মাঝে তার পুরানো রিং টা দেখিয়ে বলে, ‘দেখেছ সন্দীপ আমার ডাইমন্ডের রিং টা কেমন চক্ চক্ করছে। এখন যদি ৪০০০০ টাকা চাই রাইমা কি দেবে? দেখা যাক! রাইমাকে বলার সাথে সাথেই নাকচ করে দিল। কোথা থেকে দেব? তুমি দিয়ে রেখেছ? রাইমা বেশ জোর গলায় জিজ্ঞেস করল। সন্দীপ আস্তে আস্তে বলল, ‘না মানে তোমার নামে ফিক্সড ডিপোজিট আছে না, সেটা যদি ভাঙাতে। আমি ১০০% কনফিডেন্ট এবার...’ থাক্ থাক্ তোমার আত্মবিশ্বাস তোমার কাছেই থাক। গত বছর ডাইমন্ডের রিং দিয়েছিলে না? এবছর না হয় থাক। রাইমা একটু ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল। ‘রাইমা তুমিই তো চাইতে আমি একজন আন্তর্জাতিক মানের শিল্পী হই, এখন যখন সুযোগ এসেছে, অল্প কয়েক টা টাকার জন্য পিছিয়ে যাবো। পিছিয়ে যেতে বলছি না তো? তুমি আর একটু তৈরি হও। সল্টলেকে একটা অ্যাড এজেন্সিতে পোস্ট ভ্যাকান্সি আছে, আমার এক রিলেটিভ আছে, আমি তোমার কথা বলেছি। আরে এই প্রতিযোগিতায় একবার ফাস্ট প্রাইজ পেয়ে গেলে আর চাকরী করতে হবে না। মকবুল ফিদা হুসেন তো... । উফ্ থাক, তোমার মতো কুঁড়ে লোক আর দেখিনি, তুমি তাহলে চাকরী করবে না? তুমি জানো একজন বিখ্যাত লোক কি বলেছিলেন, ‘ শিল্পীদের কখনও ১০-৫ টা বা ৯ টা ৬ টার টাইম লাইনে বেঁধে রাখা উচিৎ নয়’। বিখ্যাত লোকটার নাম কি সন্দীপ রায়? রাইমা জিজ্ঞেস করল। সন্দীপ কোন কথা না বলে দাঁত বার করে হাসতে লাগল। তোমার এই হাসিটা আমার অসহ্য লাগে। কথাটা বলেই রাইমা বেড়িয়ে গেল। সন্দীপ ঘর থেকেই চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, ‘টাকা তাহলে দিচ্ছ না’? বার থেকে উত্তর এল ‘না’।

******

দিন দুয়েক বহু চেষ্টা করে, বন্ধুদের কাছে ধার করে ২০০০০ টাকা জোগাড় করেছে সন্দীপ। সময় তখন ১০ টা ১১ টা হবে, রাইমা অফিসে গিয়েছে। সন্দীপ একবার আলমারির ভিতরের লকারটা খুলল। একটা হার, দুটো বালা, তিনটে নাকের নথ আর হাজার দুয়েক টাকা রয়েছে। সন্দীপ ভাবতে থাকে কি করবে? দিন কুড়ির মধ্যে কি রাইমার হার টা লাগবে? কোথাও তো যাবার প্লান নেই। একবার কম্পিটেশনে জিতে গেলে আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না। তখন এই রকম দু-তিনটে হার কিনে দেবে রাইমা কে। সন্দীপ হারটা বন্ধক দিকে টাকা জোগাড় করে। ঠিক দিন সাতেক পরে রাইমা হারটা খোঁজ করতে শুরু করে। অফিসের এক কলিগের ছেলের জন্মদিনে

নেমন্তন্ন। প্রথমে আলমারি, বিছানার তলা তারপর নিজের দুতিনটে ব্যাগ প্রায় সব জায়গা খুঁজল। কোথাও পেল না।রাত্রে ফিরে এসে সন্দীপকে জিজ্ঞেস করল, তুমি আমার হারটা দেখেছ? তোমার হার! না তো? হারটা আমার দাদু দিয়েছিল, ক্লাস টেন থেকে আমি হারটা আমি পড়ছি। ও ছাড়! পরে আমি বানিয়ে দেবো। রাইমা কোন কথা বলে না, সন্দীপের মুখের দিকে চেয়ে আছে। সন্দীপ একটু অসস্তি বোধ করছে। সন্দীপ বলে, ‘কি হবে জিনিসের জন্য মায়া করে’? রাইমা একটু কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি আমার হারটা বেঁচে দিয়েছ না’? আমি না তো। কথা টার মধ্যে কোন জোর ছিল না। রাইমা বুঝতে পারে সন্দীপ কিছু লুকানোর চেষ্টা করছে। রাইমা সন্দীপের কাছে এসে বলে, ‘আমাকে ছুঁয়ে বলো, তুমি হারটা বেঁচো নি’। সন্দীপ একটু দূরে সরে গিয়ে বলে, ছেলে মানুষী করছ কেন, বলছি তো নিই নি। এবারেও কথার মধ্যে কোন জোর খুঁজে পেল না রাইমা। রাইমা আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। বিছানায় শুয়ে পরে মুখ গুঁজে। বালিশ ভিজতে থাকে। সন্দীপ হারটা বেঁচেছে বলে যত টা না কষ্ট হচ্ছে, সন্দীপ ওর বিশ্বাসে আঘাত করেছে বলে বেশি কষ্ট হচ্ছে। মা-বাবার সাথে ঝগড়া করে ঘর থেকে বেড়িয়ে এসেছে। প্রায় দুবছর হয়ে গেল, একদিনও বাপের বাড়ী যায়নি। যে লোকটাকে বিশ্বাস করে বেড়িয়ে এসেছে সেই যদি বিশ্বাসের মূল্য না দেয়, ভালোবাসার গুরুত্ব না বোঝে তাহলে কার জন্য লড়াই করা। রাইমার আর বেঁচে থাকতে ভালো লাগছে না। রাত্রি ২ টোর সময় একবার ওয়াস রুমে গেল। হঠাৎ করেই যেন মাথায় ভূত চেপে গেল। বাথরুমে রাখা ফিনাইলের বেশ কিছুটা অংশ খেয়ে ফেলে। ভিতরের সব কিছু যেন জ্বালা করতে থাকে। বমি পাচ্ছে কিন্তু হচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ পর সন্দীপ বাথরুমে যায়। দেখে রাইমা ওয়াক ওয়াক করছে, ফিনাইলের বোতলটা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে! রাইমার মুখ দিয়ে লালা ঝরছে। ছুটে নিচের তলার মাসিমাদের ডাকল। ভোর ৪ টের সময়  রাইমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। রাইমা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে রাইমাকে একটু বমি করানোর চেষ্টা করা হল। সকাল ৯ টার সময় পুলিশ এলো। রাইমা জানালো কেউ তাকে বাধ্য করেনি ফিনাইল খেতে। দিন তিনেক পরে রাইমাকে ছেড়ে দিল। তবে সলিড খাবার খেতে মানা করেছে। ডাক্তার আরও বলল , ‘পাকস্থলীর বেশ কিছুটা অংশ পুড়ে গেছে। সেটা রিকভারী করতে সময় লাগবে। মাস খানেক পরে একটা ছোটো অপারেশন করতে হতে পারে’। রাইমার বাবা-মা রাইমাকে বাড়ী নিয়ে যায়। সন্দীপ দিন সাতেক পরে দেখতে গেল রাইমাকে। নিজেকে অপরাধী অপরাধী মনে করছে সন্দীপ। রাইমার হাত ধরে কাঁদতে থাকে। ‘বিশ্বাস করো আমি বুঝতে পারিনি তুমি এই রকম বোকার মতো কাজ করবে’ সন্দীপ ভাঙা গলায় বলে। রাইমা এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে চোখ দিয়ে জল গাল বেয়ে বালিশে পড়ছে। বেশ কিছুক্ষণ পর রাইমা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কবে যাচ্ছ’? আমি যাচ্ছি না, টিকিট ক্যান্সেল করে দিয়েছি। রাইমা বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। সন্দীপ আরও বলে, ‘সল্টলেকের অ্যাড এজেন্সি কোম্পানিতে ইন্টার্ভিউ দিয়ে এসেছি। যাওয়ার আগে রাইমার হারটা বালিশের পাশে রেখে যায়।

******

       সন্দীপ অফিস থেকে ফিরেই ভাবছে রাইমাকে কিভাবে বলবে কথাটা। হাতে খুব বেশি সময় নেই। দিন পনেরোর মধ্যেই কলকাতা ছাড়তে হবে। অফিস থেকে ফিরেই এক কাপ চা বা কফি খায়। রোজ রাইমায় বানায়। এখনও মিনিট ৩০ লাগবে রাইমার ফিরতে। সন্দীপ নিজেই চা বসাল। রান্নার ঘরের দেওয়ালে একটা ছবি দেখে মায়ের কথা মনে পড়ল। তখন সবে মাত্র ছবি আঁকা শিখছে। দেওয়ালে মায়ের ছবি আঁকতে গিয়ে দুর্গা মায়ের ছবি এঁকে দেয়। পরে ঘর রং করার সময় সন্দীপের মা আর ঐ জায়গা টা রং করতে দেয় নি। সন্দীপের বাবা চাইত না, সন্দীপ সারাক্ষণ ছবি আঁকা নিয়ে পরে থাকুক। টার কাছে ছবি আঁকাটা বিলাসিতা। মায়ের প্রচ্ছন্ন মদতেই সন্দীপের আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া। ক্লাস ট্রেনে পড়ার সময় দিল্লীতে এক ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় নিজের কয়েকটা ড্রয়িং পাঠায়। নির্দিষ্ট মূল্যের ডাক টিকিট না দেওয়ায় বেয়ারিং হয়ে খামটা ঘরে চলে আসে। সন্দীপের বাবাকে প্রায় ১০০ টাকা দিয়ে খামটা নিতে হয়। এই নিয়ে দু চার কথা শুনতে হয়েছিল সন্দীপের মাকে। ছেলেকে বোলো পিকাসো হওয়ার স্বপ্ন দেখা ছেড়ে ভালো করে পড়াশুনা করতে, নাহলে একটা পিয়নের চাকরীও জুটবে না। এখনও সময় আছে, ছেলেকে সাবধান করে দিও। ‘তোমারও তো ছেলে, তুমিই বলে দিও। ‘আমার কথা শনে কই! আমার কোন জমিদারি নেই, চাকরী জোটাতে না পারলে গড়িয়াহাটে ছবি ফেরি করতে হবে। আ! কি কথার ছিরি! আমার ছেলে অনেক বড় শিল্পী হবে।‘ ওই স্বপ্নই দেখো’। দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ শুনে সম্বিত ফিরল। ঘরের ভিতর ঢুকেই রাইমা বলল, ‘জানো ড্রয়িং সেটটা পেয়ে বুবলাই খুব খুশি হয়েছে’। ‘এবার তোমাকে একটা খবর দিই, আমি চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি’। মানে? তুমি এখন কি করবে? রাইমা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল। ‘দেখি কি করা যায়’। সন্দীপ গাম্ভীর্য্য বজায় রেখে সকালের পেপার পড়তে লাগল। মিনিট খানেক নিস্তব্ধতা। ‘কেন ছাড়লে চাকরি টা? ‘এমনি ভালো লাগছিল না’। সন্দীপ কথাটা বলেই আড়চোখে রাইমার মুখের দিকে তাকাল। রাইমার মুখে যেন কালো মেঘের ছায়া, মনের ভিতর যেন ঝড় উঠেছে। ‘এখন কি করবে’? ‘জানি না’। সন্দীপ একই রকম উদাস গলায় উত্তর দিল। এবার রাইমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল, জোর গলায় চিৎকার করে বলল, চাকরি ছাড়বে আগে থেকে বলবে না, আমাকে তো একটা চাকরী জোটাতে হবে! দিন দিন তুমি কেমন একটা হয়ে যাচ্ছ। তোমার সাথে ... রাইমা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, সন্দীপ মুচকিয়ে হাসছে দেখে থেমে গেল। সন্দীপের ইচ্ছে হচ্ছিল আরও একটু রাইমাকে রাগাতে কিন্তু ভরসা পেল না। রাগের মাথায় রাইমা যা করেছিল, ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছে। সন্দীপ বলল, ‘ব্যাগ গোছাও দিন ১৫ এর মধ্যে আমরা ব্যাঙ্গালোর যাচ্ছি। রাইমা হাতে ধরে রাখা টাওয়েলটা সন্দীপের মুখে ছুড়ে বলল, ‘এতক্ষণ বলনি কেন? কোন কোম্পানিতে জয়েন করছ? কি পোষ্ট? কতো হাইক দিচ্ছে’? ‘কুল ম্যাম! কুল! আগে কিছু খাদ্যবস্তু দাও পেটটা ঠাণ্ডা করি, তারপর সব বলব’। রাইমা ফ্রিজে রাখা খাবার গুলো মাইক্রোওভেনে  ওভেনে গরম করতে দিল।

******

         সকাল সাড়ে ৮ টা বাজছে। অন্যদিন সন্দীপের এই সময় স্নান হয়ে যায়। ইতিমধ্যে রাইমা দুবার ডেকে গেছে। রাইমা স্নান সেরে হিয়ার ডায়ারে চুল শুকোতে শুকোতে জিজ্ঞেস করে, ‘কি গো আজ অফিস যাবে না’? অফিস! সেটা আবার কি? ধ্যাত! ভালো লাগে না, অফিস যদি না যাও বলো, ভাত বসাবো। এতো তাড়াতাড়ি? আরে সব কিছু গোছাতে হবে তো। একদিনে কি সব কিছু হবে? ও! আজ কি স্পেশাল মেনু হবে শুনি? কেন? রাইমা ডায়ারের সুইচটা বন্ধ করে জিজ্ঞেস করল। না ভালো কিছু রান্না হলে, আজ অফিস যাবো না। রাইমা ড্রেসিং টেবিলের সামনে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল, ‘তেল কই কিংবা সরষে ইলিশ’। বাহ! তাহলে আজ অফিস গিয়ে কাজ নেই! তাড়াতাড়ি উঠে মুখ হাত ধুয়ে বাজারে যাও। থাক! ডাল, আলু সেদ্ধ ভাত করে দাও বলে, সন্দীপ গায়ে চাদর নিয়ে আবার শুয়ে পড়ল। রাইমার বকুনি খেয়ে সকাল ১০ টা নাগাদ সন্দীপ বাজার করে আনল। জলখাবার খেয়ে তিন তলার চিলেকোঠার  ঘরটাতে ঢুকল। একটা সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছে । গত পাঁচ বছরে আর আসেনি। জানলার পাশে রাখা ক্যানভাসটার দিকে চেয়ে আছে সন্দীপ। একটা অসম্পূর্ণ ছবি। পেনসিলে করে স্কেচ করা আছে। দিগন্তরেখা বরাবর সূর্য উঠছে, একটা ছেলে ছুটে যাচ্ছে । সূর্যের রক্তিম আভাটা করা হয়েছিল। রাইমা সন্দীপের পিঠে হাত রাখে। ও তুমি? ডাকও নি তো। সন্দীপ চমকে উঠে বলে। ‘তুমি তন্ময় হয়ে কি ভাবছিলে’? তেমন কিছু না, ছেলেটাও ছুটছে, আমরাও ছুটছি, কোথায় যাবো জানি না। নাম, যশ, টাকার পিছনে ছুটছি। রাইমা সন্দীপের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে, শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, আর ইউ হ্যাপি সন্দীপ? ‘নো ম্যান ইজ হ্যাপি ইন হিস ওন স্টেট’। সন্দীপ বলে। রাইমা আবার জিজ্ঞেস করে ‘ আমি অন্য কারো কথা বলছি না, তুমি সুখী হয়েছে’? হয়তো! হয়তো বা না! রাইমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানলার দিকে চেয়ে থাকে। সন্দীপ এবার জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি সুখী হয়েছে? রাইমা ঘাড় নারে, তারপর বলে , ‘যদি তুমি চাকরীর পাশাপাশি ছবি আঁকাও চালিয়ে যেতে আরও বেশি খুশি হতাম। সন্দীপ আরাম কেদারায় বসে বলে ওঠে, ‘জানো রাইমা আমাদের জীবনটা আমার ওই অসম্পূর্ণ ছবিটার মতো, কিছুটা অংশ কল্পনার রং দিয়ে দেখতে হবে তাহলেই দেখবে আর কোন আক্ষেপ নেই।  

 

Please mention the "name of the articles and the authors" you would like to comment in the following box... Thank you.

Square Stage
Square Stage
Square Stage
Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine