গল্প সমগ্র ১৩

সূর্যাশীষ পাল গল্পঃ-

  • লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড
  • দেহের কামনা 
  • অভিমন্যু
  • সত্য ঘটনা অবলম্বনে 
  • চেনা সুর 
  • শিকার
  • কালো কাক
  • ভুতের ভ্যাকেশন
  • বিজয় 
  • ম্যাগাজিন

                লস্ট এন্ড ফাউন্ড

সূর্যাশীষ পাল 

নয়ডা, উঃ প্রদেশ

...পরের স্টেশনে নেমে গিয়েছে ভেতো। একটি সিগারেটের দোকানের পাশে চা নিয়ে বসেছে সে। এক হাতে চা, অন্য হাতে সিগারেট। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কলকাতা শহরটা আস্তে আস্তে ভিজে যাচ্ছে। গরম পৃথিবীটা অনেক দিনের অপেক্ষার পর আজ যেন ঠান্ডা হবে। ভেতোর সামনে দু একটা রাস্তার ছেলে ছুটে চলে গেলো।

    সকাল বেলার প্রথম আলো ইতিমধ্যে রোদ্দুরে পরিণত হয়েছে। মাস্টারদা সূর্য্য সেন মেট্রো স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লুচির সঙ্গে ছোলার ডাল সাঁটাচ্ছিল ভেতো। ভেতোর আসল নাম সুনীল চ্যাটার্জী। তবে এই নামে আর কেউ ডাকে না তাকে। রোজকার ঝালমুড়ি খেয়ে খেয়ে তার মুখ পঁচে গেছে। স্বাদের বদল দরকার, তাই এই রাস্তার পাশের লুচির দোকানের আশ্রয় নিয়েছে সে। মোটামোটি খাওয়া শেষ করে, হাত ধুয়ে, সিগারেটের অভবাবে বিড়ি ধরাল সে। সকালের এই শান্ত শান্ত মুহূর্তগুলো খুব ভালোবাসতো সে। এখুনি ছুটতে হবে মেট্রো রেল ধরতে। আজকাল ধান্দা খুব একটা ভালো চলছে না। লোকজন আজকাল পার্সে, ওয়ালেটে বেশি টাকা রাখে না। এই ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড আর নেট ব্যাংকিংয়ের জন্য ভেতোর মতো 

পকেটমারের হেব্বি লোকসান হয়ে যায়। খাটনির মূল্য পাওয়া যায়না ঠিকঠাকভিড়ের মধ্যে ভেতো দেখতে পেল একটি পাঁচ বছরের বাঁচাকে তার মা বাবা হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ছোট শিশুটির গায়ে ধাক্কা খাচ্ছে। সুনীলের সেই দিনের কথা মনে পড়ে। চন্দননগরে সেদিন প্রচুর ভিড়। জগদ্ধাত্রী পুজো। লোকে, লোকারণ্য। হঠাৎ ভিড়ের মাঝখানে হাত ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছিলো। অদূরে সে মায়ের চিৎকার শুনতে পেয়েছিল। লোকজনের স্কাইস্ক্রেপারদের মাঝখানে সে মাকে ঠিক দেখতে পারেনি। ছোট ছোট পায়ে সে ভিড়ের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। অন্ধকার গলি, হঠাৎ নাকের ওপর একটা রুমাল। তারপর আর কিছু মনে নেই । মায়ের নামটা এখনো মনে আছে তার, সোমা। চিবুকের ওপর কালো তিল। এই স্মৃতিটুকুই বাকি ছিল তার কাছে। সুনীল কিছুদিনের মধ্যেই ভেতো হয়ে উঠলো। পার্ক সার্কাসের গাঙ্গের দক্ষ পকেটমার। অবশ্য চুরি, ছিনতাই কিছুই বাকি রাখেনি সে। তবে সে কোনদিন মেয়ে মানুষের ওপর হাত তোলেনি। ওই সব সাতে পাঁচে সে নেই। সর্দারের কাছে ট্রেনিং নিয়েছে। মোবাইল লোপাট, ওয়ালেট লোপাট এসবে সে এক্সপার্ট ছেলে, ছোকরাদের ট্রেনিং দেয় মাঝে। যাকগে, পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করে তো আর লাভ নেই। কর্মই ধর্ম। মেট্রো স্টেশন এ ঢুকে গেল। তার টিকেট কাটতে হয় না, এই সব কাজের লাইনে পুলিশ কনস্টেবলেদের হাতে রাখলে এই লাভ। একটু দক্ষিনা দিয়ে দিলেই আর ধরা পড়বার ভয় থাকেনা। এই গাড়ি আসবে লোকজন যখন তাড়াহুড়ো করে উঠবে, তখন ভেতো ছোবল মারবে। যা পাবে তা দিয়ে দুপুরের খাবার হবে অন্তত বেশি পেয়েগেলে নিজের ভাগ রেখে সর্দারকে চালান করে দেবে। ট্রেন আসল

ট্রেনের ভিড়ে একজন মাঝবয়েসী মহিলাকে লক্ষ করল। তার হাতে একটা বড় ব্যাগ, সম্ভবত কাপড় চোপড় রাখার জন্য। এর মধ্যে থেকে জোখের ধন পার্সটা খুঁজে পেলেই কেল্লা ফতে। ভেতোর জন্যে এসব বাঁ হাতের খেল। কখন যে ভেতো ব্যাগের চেনের সমান্তরালে এক সুক্ষ ছিদ্র বানিয়ে, পার্সটা বের করে নিল ভদ্রমহিলা জানতেই পারলেন না। পরের স্টেশনে নেমে গিয়েছে ভেতো। একটি সিগারেটের দোকানের পাশে চা নিয়ে বসেছে সে। এক হাতে চা, অন্য হাতে সিগারেট। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কলকাতা শহরটা আস্তে আস্তে ভিজে যাচ্ছে। গরম পৃথিবীটা অনেক দিনের অপেক্ষার পর আজ যেন ঠান্ডা হবে। ভেতোর সামনে দু একটা রাস্তার ছেলে ছুটে চলে গেলো। ওদিকে সারি সারি স্কুল বাস ছুটছে। ইতিমধ্যে চা শেষ করে উঠল। টাকা দিতে হবে । কিন্তু তার কাছে তো খুচরো বিশেষ নেই, খালি দুটো পাঁচশো টাকার নোট। পাঁচশো টাকার নোট দোকানদারকে দেয়াও যাবে না। মহিলার পার্স তা খুলে নিল সে, যদি টাকা পাওয়া যায়। খুলে দেখল যে পার্স খালি। শুধু একটা ডেবিট কার্ড, একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স। আর একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স জাতীয় কিছু। পুরো দিনের খাটুনিটা মাঠেই মারা গেল। ভগবান কে খিস্তি দিতে দিতে, সে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ওপর চোখ রাখে, নাম সোমা চ্যাটার্জী, প্রৌঢ় মুখের চিবুকে তিল, বাড়ির ঠিকানাটা আবছা হয়ে গেছে। চায়ের দোকানদারকে পাঁচশো টাকা দিয়ে আর খুচরো ফেরত চাইনি। সেই প্রথমবার সে "লস্ট এন্ড ফাউন্ড" সেক্শনে গিয়েছিল। অনেক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ভিড়ের মধ্যে কার যেন হাতছানি সে দেখতে পেল

               দেহের

কামনা

সূর্যাশীষ পাল 

নয়ডা, উঃ প্রদেশ

    রোডের সাইডে বিহারি ভাইয়ার দোকানে একটা নোনতা বিস্কুটের, একটা গজা এবং চায়ের সাথে বিকেলে চা পর্ব শেষ করছে। আজ পনেরো দিন পেরিয়ে গেলো, কোন লাশ ডেলিভার হয়নি। ফোনের পর ফোন আসছে দ্বিজেন বাবুর কাছ থেকে। দ্বিজেন বাবু দেখতে সাধাসিধে, মাথায় সাদা চুল । উনি যে লাশের অঙ্গ কালো বাজারে বিক্রি করেন, কে বলবে?

প্রথম অধ্যায়ঃ

    কানকাটা বিশুর লাইফে বিশাল চাপ। চারদিন হয়ে গেল ডেলিভারি দিতে পারেনি। আজকাল মর্গে প্রচুর সিকিউরিটি। একেবারে ফাটিয়ে দিচ্ছে। আগের বারের খদ্দেরটা তবুও একটু বিন্দাস ছিল। লাশ পাচার করতে একটু সময় লাগলেও কিছু বলতো না। এবারের মালটা ঢ্যামনা, সময়ে মালনা পেলে হেব্বি দেমাগ দেখায়, দ্বিগুন পয়সা দেয় বলে তাই। কানকাটা বিশুকে হাওড়া থেকে বাঁশদ্রোণী, হুগলী থেকে খিদিরপুর সবাই একডাকে চেনে এবং ভয় পায়।

    রোডের সাইডে বিহারি ভাইয়ার দোকানে একটা নোনতা বিস্কুটের, একটা গজা এবং চায়ের সাথে বিকেলে চা পর্ব শেষ করছে। আজ পনেরো দিন পেরিয়ে গেলো, কোন লাশ ডেলিভার হয়নি। ফোনের পর ফোন আসছে দ্বিজেন বাবুর কাছ থেকে। দ্বিজেন বাবু দেখতে সাধাসিধে, মাথায় সাদা চুল। উনি যে লাশের অঙ্গ কালো বাজারে বিক্রি করেন, কে বলবে? অবশ্য বিশু জানেনা উনি লাশগুলো কি

ভাবে বেচেন, কেমন করে এবং কার কাছে বেচেন। ওর কাজ লাশ ডেলিভার করা, ও করে দেয়। প্রত্যেক ১৫ দিনেকুড়ি হাজার টাকা। গান্ধীজির বন্যা বইছে জীবনে। আর এমনিতেও এতে সমাজ কল্যাণ হয়, লাশের অঙ্গ প্রত্যঙ্গকোনো অন্য মানুষের কাজে লাগে। কত বেওয়ারিশ লাশতো আসে মর্গে, ওদের দিয়ে যদি কারুর প্রাণ বাঁচে, এতে কার আপত্তি থাকতে পারে। অথচ কর্তৃপক্ষের যত চুলকানি, এখন রাতেও কড়া পাহারা। লাশ বাঁচিয়ে কি হবে, এই পাহারা যদি রাস্তা ঘাটে দেয়া হতো তাহলে কি এতো ধর্ষণ হতো? মিছিমিছি গরিবের পেটে লাথি মারা ছাড়া আর কিছু নয়। আজ আবার দ্বিজেন মালটা দেখে পাঠিয়েছে। কে জানি কি বলবে। রাস্তার ওপর চেয়ে দেখলো, পুরো রাস্তাতে পায়রা পায়খানা করার দাগ সাদা সাদা। মাঝখানে কোথাও পড়ে যাওয়া পাতা এলোমেলো। চায়ের কাপটা রেখে বেরিয়ে এলো। বিহারি ভাইয়া বললো, "আপকা কালকা বাকি থা"

"এখন কেচিওনা মামা, কাল এক সঙ্গে দিয়ে দেব। অভি হামকো জানা পড়েগা, রাশবিহারী জানা পড়েগা।" 

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ       

দ্বিজেন বাবুর বাড়িটা বেশ বড়। দেখেই মনে হয় বিশাল সম্পত্তির মালিক। নইলে কলকাতার এই এলাকায় এরকম পেল্লাই বাড়ি তাও আবার তিনতলা। আসে পাশে বাগান। একলা মানুষ, তবে তিনটে তালাই সুসজ্জিত। কাওকে ভাড়া দেন নি। বিশু ভেবেছিলো যে মালটা খোঁচে বোম হয়ে থাকবে। কিন্তু বেশ অমায়িক ভদ্রলোক। তাকে সোফায় বসতে বলে কি সব আয়োজন করতে গেছেন। তার ফাঁকে বিশু পেইন্টিংসগুলো দেখছে। কিছুই বুজছে না। কিন্তু বাড়ি তে কি একটা চাপা গন্ধ, সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছে। রাত্রি তিনটে বাজার ঘন্টা পড়লো। সকালে তো এসব কাজ হয় না, তাই ভদ্রলোকের সঙ্গে রাত্রিতেই দেখা করতে হয়।

ইতিমধ্যে, দ্বিজেন বাবু একটু কুচো নিমকি আর ভদকার গ্লাস নিয়ে চলে এসেছে।"আরে এসবের কি দরকার ছিল?",

বিশু বললো "আছে, আছে, দরকার আছে", দ্বিজেনবাবু এলিয়ে বসলেন।"আচ্ছা এ বাড়িতে কোনো চাকর বাকর নেই?"
"আমি একলা মানুষ  নিজের কাজ নিজেই করি। চাকর বাকর আজকাল পাওয়া মুশকিল"।

ভদকার গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন দ্বিজেনবাবু। 

"বলছেন যখন", বিশু বলে একেবারে খেয়ে নিল। গলাটা কেমন জ্বালা জ্বালা করল তার। আসলে এই লেভেলের মাল তো কোনোদিন খায়নি তাই কিরকম জ্বালা করে কে জানে ।ও তো খালি বাংলা টেনেছে, বিলেতির স্বাদ কি ও জানবে।
"আছা, স্যার কিছু মনে না করেন একটা প্রশ্ন করব?" 
"কর কর"
ইতিমধ্যে আরেক পেগ বানিয়ে দিয়েছেন দ্বিজেনবাবু। কি ভদ্দরলক মায়রি নিজে না খেয়ে আতিথিকে প্রথমে দিচ্ছেন ।
"আছা আপনি লাশগুলোর কি করেন  এই পাড়ায় থেকে তো আঙ্গ পাচার করা সহজ বেপার নয়।" বিশুর মাথা এবার ঝিম ঝিম করছে। 
"লাশের যে আঙ্গ বেচতেই হবে তার কোন মানে আছে?" 
"মানে আপ, আপনি কি বলতে চাইছেন? আপনি কি করেন এই লাশগুলোকে নিয়ে" এবার কথাগুলো জড়িয়ে আসছে।
"সময় এলে সব বুঝবে" 
"অরে ধুর মশাই, খুলে বলেন" মাথার ঝিমুনিতে বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল বিশু।"

ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে "নেক্রোফিলিয়া", মানে বোঝো ?" 
এবার মাথার ব্যাথা অনেক বেড়ে গেছে। সোফার নিচে ঢোলে পড়ে, রাগে বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বললে উঠলো,
"ধুর শালা, জ্ঞান আওড়াচ্ছে, গদা বাংলায় বল না"
"লাশের সঙ্গে যৌন... " তারপর কি একটা যে বললেন দ্বিজেনবাবু কিছুই বুঝতে পারলো না বিশু। মাটিতে লুটিয়ে মুখের থেকে ফেনা বেরিয়ে আসছে বিশুর।

 

শেষ অধ্যায়ঃ 

মর্গে নতুন বেওয়ারিশ লাশ এসেছে। গলায় লাল রঙের মাদুলি ছাড়া সম্পূর্ণ নগ্ন। মর্গের নতুন কর্মী সুমন, যৌনাঙ্গে ক্ষত চিহ্ন দেখেও গ্রাহ্য করল না। তার হাতে সময় নেই, লাশ ডেলিভার করতে হবে তো |

 

              অভিমন্যু

সূর্যাশীষ পাল 

নয়ডা, উঃ প্রদেশ

  নিজের দেহটি সোফায় পড়ে আছে।| ঠিক যেমন ছেড়ে এসেছিলেন। ঘুমন্ত অবস্থায়, কানে কানে ফিসফিস করে কিছু আফিরমেশন দিলেই জেগে উঠবে। নিজের দেহের কানের কাছে হাটু গেড়ে বসলো সৌমিলির দেহে অধিষ্টিত অভিমন্যু। আফিরমেশন ফিসফিস করতে লাগলো। সময় একটু বেশি লাগছে, সে লাগতেই পারে। কিন্তু অভিমন্যুর দেহ বিন্দুমাত্র রেস্পন্ড করছে না।

প্রথম অধ্যায়ঃ

   আর কোনো উপায় ছিল না অভিমন্যুর কাছে। অভিমন্যু মানে অভিমন্যু হালদার। কলকাতার নামকরা মনোচিকিৎসক। মানুষ কতটা বিকৃত হতে পারে সেটা তিনি জানেন।তএব কাওকে সহজে বিশ্বাস তিনি করেন না। তাই বোধ হয় বন্ধুবান্ধব  আত্মীয়-সজ্জন নেই বললেই চলে। বিয়ে করেছেন। ছেলে মেয়ে হয়নি। মিথ্যে সংখ্যাবৃদ্ধি করে কোন লাভ নেই, ছেলে পুলে হলে টাকা পয়সার শ্রাদ্ধ হবে। এতো আগেকার জামানা নয়। এখন ছেলে মেয়েরা বাপের পয়সায় ফুর্তি করে। আর বাপ্ বুড়ো হলে লাথি মারে। বিয়েটাও তিনি অনেক লেট করেছেন। ছোকরা বয়েসে বান্ধবী টান্ধবী ছিল। কিন্তু চল্লিশের ঘরে যখনি পা দিলেন, তখনি বুঝলেন যে সে সব আর কপালে জুটবে না। হঠাৎ এক দিন তার ইন্টার্ন সৌমিলির প্রেমে পড়বার ভান করলেন । সৌমিলিও ভান করলো। দিয়ে বিয়ে করে নিলেন। কিছুদিন একাকিত্ব কাটল। সৌমিলি কিন্তু মিডলাইফ ক্রাইসিসের মোক্ষম ওষুধ। রাত্রি অনেক ঘনিয়ে এসেছে। অভিমন্যু সাধারণত এই সময় ঘুমিয়ে যায়। শীতের

মৌসুমে লেপের মুড়ি তার ভীষণ প্রিয়। কিন্তু আজ তার মন ছুটে যাচ্ছে সেই দিনে। বছর তিনেক আগে অধীরথি সরকার ঢুকেছিলো তার হাসপাতালে। গৌরবর্ণ, দীর্ঘকায়, চোখে মুখে একটা বুদ্ধির ছাপ। সৌমিলির সাথে বন্ধুত্বও পাতিয়ে ফেললো ছেলেটি। আসলে সৌমিলি একদম সেকেলে নয় , অভিমন্যুর জীবনে অসংখ্য মেয়ে এসেছে গেছে। সৌমিলি এই অবাধ আনাগোনার হিসেব রাখেনি। তা ছাড়া অধীরথি আর সৌমিলির মধ্যে বন্ধুত্বের বিস্তার কতদূর ছড়িয়েছে সে তো নিজেও জানেনা। তাই এব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে জল ঘোলা করা যায়না |কিন্তু ঈর্ষার আগুন যে জ্বলে উঠেছে। সেই ঈর্ষার আগুনে ঘি ঢালছে সন্দেহ। অধীরথির গৌরবর্ণ চেহারা, দীর্ঘকায় দেহ সব যেন হিংসের ইন্ধন। নাহ, বেপারটা তাকে জানতেই হবে। ডিটেক্টিভ, টিকটিকি, খোঁচরের এ কাজ নয়। মিছিমিছি অর্থ ব্যয়, এবং লোক জানাজানি। তাকেই কিছু করতে হবে| ঠিক তখনি মনে পড়েছিল ফ্রান্সের স্ট্রাসবোর্গ শহরের সেই ওয়ার্কশপের কথা। তখন অভিমন্যু ফ্রান্সেই তার পোস্ট গ্রাডুয়েশন কমপ্লিট করছিল, মনোচিতসক অভিমন্যু হালদারের জন্ম হয়নি। সাইকোটিক হিপ্নোটিজমের ওপর ওয়ার্কশপ, কলেজেই হচ্ছিলো বলে এটেন্ড করেছিল। সাইকোটিক হিপ্নোটিজমের মূল সিদ্ধান্ত হলো ট্রান্সফার অফ কোন্সসিয়াসনেস। যিনি হিপ্নোসিস করেন, তিনি নিজের কোন্সসিয়াসনেস অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন। যিনি হিপ্নোসিস করেন তার শরীর থেকে চেতনা লোপ পায়  কিন্তু অবচেতন মনে রয়ে যায়। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় যেন তিনি গভীর নিদ্রায় মগ্ন, কিন্তু আসলে তার চেতন মন কোন অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করেছে। তার শরীর সব অনুভূতিই এই নতুন চেতনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

সাইকোটিক হিপ্নোসিসের পদ্ধতি খুব একটা কঠিন নয়। মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন সে সব থেকে দুর্বল। তার চেতন মন তখন নিষ্ক্রিয়, কিন্তু তার অবচেতন মন সব কিছু শুনতে পারে, বুঝতে পারে। সেই সময় মানুষের কানে ফিসফিস করে হিপনোটিক আফিরমেশন বলতে থাকলে তার চেতন মনে প্রবেশ করা যায়। নিজের শরীর তখন আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কাজ শেষ হয়ে গেলে নিজের শরীর মধ্যে একই রকম ভাবে ফিরে যাওয়া যায়।

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ

অসংখ্য বার, অসংখ্য রোগীর সাথে এই হিপ্নোটিজমের খেলা খেলেছিলেন। রোগীর জীবনের অজানা তথ্য, কালো সত্য না জানলে কি আর প্রপার ট্রিটমেন্ট হয়। কিন্তু সেদিন বেপারটা অন্যরকম ছিল, মানুষের সম্মতি ছাড়া হিপ্নোসিস করা উনএথিক্যাল। ডাক্তারি পেশার সাথে বেয়াদবি। কিন্তু তাকে যে ইটা জানতেই হবে। তার ব্লাড প্রেসার বেড়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে তার একবার হার্ট স্ট্রোক হয়েছে। সৌমিলির বেপারে সব কিছু না জানলে যে তিনি মারা যাবেন।

     সেদিন শনিবার। সৌমিলির ছুটি, রাত্রে বেলায় বন্ধুদের সঙ্গে বেরোবে। এই অজুহাত দিয়ে বেরোয়, তার পর চলে যায় সে অধীরথির কাছে। পুরোটা অনুমান, কিন্তু কিছু অনুমানের প্রমাণ লাগে না। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো অভিমন্যু কিছুক্ষণ। বিছানায় ঘুমিয়ে, শান্ত চেহারা । এটাই কারেক্ট টাইমিং, যা ভাবা তাই করা। পারফেক্ট এক্সেকিউশন।

     আজ দু দিন হল অভিমন্যু সৌমিলির শরীরে। না কিছুই সন্দেহ জনক লাগেনি। ইতিমধ্যে তিনবার দেখা হয়েছে অধীরথির সাথে। কিন্তু সে অভিমন্যুর অনুপস্থিতে প্রেম নিবেদন রাখেনি। সে তো বলেছে জয়িতার কথা। জয়িতার সঙ্গে তার খুব অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। জয়ীতা মেডিকেলটা পাশ করলেই তারা বিয়ে করবে। শুধু শুধু সন্দেহ করেছিল অভিমন্যু তার ভাবতেও লজ্জা করে। না এবার ফিরে যেতে হবে নিজের দেহে। 

     নিজের দেহটি সোফায় পড়ে আছে।| ঠিক যেমন ছেড়ে এসেছিলেন। ঘুমন্ত অবস্থায়, কানে কানে ফিসফিস করে কিছু আফিরমেশন দিলেই জেগে উঠবে। নিজের দেহের কানের কাছে হাটু গেড়ে বসলো সৌমিলির দেহে অধিষ্টিত অভিমন্যু। আফিরমেশন ফিসফিস করতে লাগলো। সময় একটু বেশি লাগছে, সে লাগতেই পারে। কিন্তু অভিমন্যুর দেহ বিন্দুমাত্র রেস্পন্ড করছে না। অভিমন্যু দেহটার হাতটা ধরল। হাতটা এতো ঠান্ডা কেন। অভিমন্যু নাকের কাছে হাত নিয়ে গেল। না এ হতে পারে না। আরেকবার ভালো করে দেখে নিল, না এবার আশঙ্কা নেই। অভিমন্যুর দেহের মৃত্যু ঘটেছে। সে আর কোনোদিন ফিরে যেতে পারবে না। সৌমিলির নারী শরীর সেদিন যেন চক্রব্যূহ।

               সত্য ঘটনা

অবলম্বনে

 সূর্যাশীষ পাল 

নয়ডা, উঃ প্রদেশ

কিছুটা কল্পনার রং ঢেলে উপন্যাস লিখত। কখনো বা এই সত্য, কল্পনার খিচুড়ি দিয়ে কবিতা লেখা হত। এর দুটো বিশেষ লাভ ছিল, এক সত্যকে যদি গল্পের রূপ দেওয়া তখন গল্প হয়ে উঠে আরো বিশ্বাস যোগ্য। দ্বিতীয়, এতে প্লাগিয়ারিজমের দোষ ও চাপে না।

   ব্যাপারটা সৌমিককে তাক লাগিয়ে গেছে। এরকম কি হয়। টিভির দিকে অনোমনস্ক হয়ে তাকিয়ে সে এই কথাটাই ভাবছে। সৌমিক পেশায় ডাক্তার হলেও ডাক্তারির ফাক ফোকরে গল্প লিখে থাকে। আগের সপ্তাহে যেমন একটা ডিটেক্টিভ থ্রিলার লিখে ফেলেছে। গল্পের নায়ক তার বৌ এবং চার বছরের বাচ্চা কে খুন করে উধাও হয়ে যায়। রান্না ঘরে কড়াইশুঁটি কচুরি ভাজছে রিনা। এই গন্ধটা পেলে, অন্য দিনে সে পাগল হয়ে যেত সৌমিক। কোথায় বলে, "the way to man's heart is through his stomach"। এই প্রবাদটা বোধ হয় সৌমিককে মনে করেই লেখা হয়েছে। অন্যদিন হলে কড়াইশুঁটির কচুরির আগে বৌয়ের ঠোঁটের চুমু দিয়ে ভোজন শুরু করত সৌমিক।

      কিন্তু আজ দিনটা একটু আলাদা। গরমের সাথে বৃষ্টির কম্বিনেশন মিলিয়ে বিশ্রী একটা আবহাওয়া। সৌমিক এখনো হতবাক। আসলে সব সময় যে নতুন চিন্তা 

মানুষের মাথায় আসে না, আর গল্পের লেখকরা মানুষ বই ভগবান নয়। তাই সৌমিক তার চারিপাশে, পাড়ায়, ট্রামে, বাসে, হসপিটালে যে ঘটনা ঘটে চলেছে, তার ওপরেই কিছুটা রং চড়িয়ে, কিছুটা কল্পনার রং ঢেলে উপন্যাস লিখত। কখনো বা এই সত্য, কল্পনার খিচুড়ি দিয়ে কবিতা লেখা হত। এর দুটো বিশেষ লাভ ছিল, এক সত্যকে যদি গল্পের রূপ দেওয়া তখন গল্প হয়ে উঠে আরো বিশ্বাস যোগ্য। দ্বিতীয়, এতে প্লাগিয়ারিজমের দোষ ও চাপে না।

রিনা হন্ত দন্ত করে এসে টেবিলে কচুরির থালাটা নিয়ে এসে ডাক দিলো,
"খেয়ে নেবে এসো, তোমার হাসপাতালে দেরি হয়ে যাবে "
"আহা আসছি তো"

সামনে ছোলার ডাল আর কড়াইশুঁটির কচুরি। একটা পাশে নামনাজানা মিষ্টি। সৌমিক খেতে খেতে ভাবতে থাকল। সমস্যাটা দেখা গেছিলো আগের মাসে। তার ড্রাইভার হীরালাল, তাকে শিয়ালদহে হাসপাতাল পৌঁছে দেয়। লোকটি বেশ ইন্টারেষ্টিং ক্যারেক্টার। গায়ের রং তামাটে, বেশি লম্বা হবে না, পেটে হালকা ভুড়ি থাকলেও বেশ তাগড়া শরীর। হাসি ঠাট্টাই রোজদিন অফিসের সফরটাকে ইন্টারেষ্টিং করে তোলে। সৌমিক ভেবেছিলো যে হীরালালকে নিয়ে একটা গল্প লেখাই যায়। লিখেও ফেললো, গল্পে হীরালাল ট্যাক্সি চালায়, রং তামাটে, বেশি লম্বা হবে না, পেটে হালকা ভুড়ি। সে রোজ রাত্রে মদ খেয়ে বৌকে পেটায়। আসলে বৌকে পেটানোর ব্যাপারটা পুরোটাই কল্পনা। সৌমিক যতদূর জানতো হীরালাল সৎ চরিত্রের ভালো মানুষ। কিন্তু এরকম সৎ চরিত্রের মানুষের গল্প পাবলিক খাবে না। তাই একটু কল্পনার রং দিয়ে হোলি খেলা। গল্প প্রকাশিত হল লিটিল ম্যাগাজিনে, ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে।

সেদিন রবিবার। হাসপাতাল ছুটি। চায়ের কাপে আর ব্রেড টেস্টের দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারছে সৌমিক। রিনা কিন্তু একদণ্ড স্থির হয়ে এদিক ওদিক করে যাচ্ছে। চিন্তিত এবং কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা সৌমিক বলল 
 

"তোমার কি হয়েছে বল? সারাদিন এধার ওধার করলে কোন সমস্যার সমাধান হবে না"।
"আর কি বলবো বল দেখিনি, মালতির বর হীরালাল কালকে রাতে মদ খেয়ে মারধর করেছে। দু তিন দিন কাজে আসবে না। আশ্চর্য বেপার লোকটা এক মাস আগে পর্যন্ত মদ মাংস কিছুই খেত না। হঠাৎ মাতাল হয়ে বৌ কেলাচ্ছে।"
সৌমিক কি একটা জিজ্ঞাসা করবে করবে করেও, করল না।

খাওয়া শেষ হয়েছে। এগারোটা বাজছে এবার বেরোতে হবে । একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে লাগল।  কমপ্লেটেলি কোইন্সিডেন্সও হতে পারে তো। তাছাড়া হয়তো লোকটা গোপনে মদ খেত, মাতলামি করত, কেও জানতে পারত না । ইবার জিনিসটা প্রকাশ্যে এল। এরকম একটা বাজে কোররিলেশনের ওপর মাথা ঘামানোর কোন মানে হয় না।

      তবুও ফালতু রিস্ক নেওয়ার কোন মানে নেই। পরের গল্পটা প্রকাশিত হওয়ার আগে, মিলিয়ে দেখে নিতে হবে যে কোন চেনা জানা লোকের নাম, বিবরণ যেন না ব্যবহার করা হয় ।গলিতে কিছু লোকের জমায়েত, হৈ হট্টগোল দেখা যাচ্ছে বারান্দার জানলা দিয়ে।

সৌমিক রিনাকে ডেকে বললো,"আচ্ছা আমার নতুন গল্পের মানুস্ক্রিপ্ট কোথায় রেখেছো গো? আর এই নিচে ইটা কি হচ্ছে?"
"তুমি জানো না? নিচের তলার সমাদ্দারবাবু বৌ এবং চার বছরের বাচ্চাকে খুন করে উধাও হয়ে গেছে। লোকটা নিপাট ভদ্রলোক, হঠাৎ কি যে ব্যামো হল। যাকগে, তোমার মানুস্ক্রিপ্ট আমি সুধীনদাকে দিয়ে দিয়েছিলাম আগের শনিবার। যখন তুমি ছিলে না, তখন উনি এসে ছিলেন। বলছিলেন এই সংখ্যায় প্রকাশ করবার মতো ছোট গল্প নেই, তার কাছে। আমিও তখন .............."
সৌমিকের দেহ হীম হয়ে গেল। তার নায়কের পদবীটা কি ছিল যেন বেশ?

 
 
 

  চেনা সুর 

সূর্যাশীষ পাল 

নয়ডা, উঃ প্রদেশ

 

  সৌমিলির সাথে দেখাও এই সময়ে হয়েছিল। কলেজর প্রথম বছরের ফ্রেশারস পার্টিতে গান গেয়ে মাতিয়ে দিয়েছিল, সেকেন্ড ইয়ারের সন্দীপন। আনেক মেয়ে বান্ধবীর প্রস্তাব জোটে। কিন্তু পকেট খালি থাকলে প্রস্তাব গ্রহণ করার যোগ্যতা থাকে না। সউমিলি কিন্তু এদের দলে ছিল না, একটু চাপা স্বভাবের, অন্তর্মুখী প্রকৃতির মেয়ে সৌমিলি।

প্রথম অধ্যায়ঃ 

 

    সেদিন রেকর্ডিং এ মন লাগছিলো না সন্দীপনের। সে রুপেনদাকে বললো , "দাদা আজ আর ঠিক হচ্ছে না। আমি বরং কাল চেষ্টা করে দেখবো।"

রুপেনদা একটু গম্ভীর স্বরে বললেন  " হ্যাঁ , একটাও নোট তো  ধরতে পারছ না  দেখছি। ডেডলাইন কিন্তু সামনে আসছে, পুজোতে রিলিজ করতে হলে পরের সপ্তাহের মধ্যে এগুলো সেরে ফেলতে হবে। আমি তোমায় চাপ দিচ্ছি না ... "।

এই হলো রূপেনদার স্বভাব। চাপ দিয়ে বলবেন, "আমি তোমাকে চাপ দিচ্ছি না .."। যাকগে এবার বেরোতে হবে, কাঁচের জানলা থেকে কলকাতার আবহাওয়ার অবস্থা জরিপ করে নিল সে। আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। না এবার বেরোতে হবে, যে কোনো সময় বৃষ্টি আস্তে হবে। রতন কে একটা ফোন করতে হবে। 

       রতনকে ফোন করার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে গাড়ি নিয়ে চলে এলো রতন। গাড়ির মধ্যে বসে সেই রবীন্দ্র সঙ্গীত। অসহ্য লাগছে। 

"আঃ থামাও না, গানটা বন্ধ করো। এতো ট্রাফিকের মধ্যে এসব ভালো  লাগে না", সন্দীপন চেঁচিয়ে উঠলো। 

"লেকিন আপ তো হামেশা যেহি গানা শুনতে থে সাহেব।" , রতন বললো।

"জ্যাঠামি করো না। জো বোলা হয় বহ করো।", সন্দীপনের গলায় হুকুম করার সুর। বেচারা রতনের  ওপর সে রুক্ষ হতে চাইনি। কিন্তু কি করবে সে আসল কথা বললে কি আর ও বুঝবে। বুঝবে না, উল্টে পাগল ভেবে বসবে। অবশ্য ওকেও দোষ দেয়া যায় না। যে কোন মানুষকে বোঝানোই কষ্টকর, তার সাইকাট্রিস্ট  মানে  ডক্টর রায় বেপার্টাকে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। 

       এতক্ষণ এ রুবি ক্রস করে গাড়ি ছুটেছে। ডক্টর রায় এই পসিবিলিটিটাকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সন্দীপন নিজে তো এই পসিবিলিটিটাকে উড়িয়ে দিতে পারছে না। হাজার হোক, কান্ডগুলো হচ্ছে তো তার সামনে তার সঙ্গে। প্রথমে সন্দীপনের মনে হতো যেন কেউ তার সঙ্গে রসিকতা করছে। একটা প্রাকটিক্যাল জোক, একটা জঘন্য, কদর্য প্রাকটিক্যাল জোক| কিন্তু না, এটা জোক নয়। সে নিজেই বোঝে সে কি বিপদেই পড়েছে। আসলে প্রত্যেক মানুষই শুধু নিজেরটা গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত। তারা অপরের কষ্ট বুঝবার ভান করে মাত্র। যে ভোগে, সেই বোঝে।

গাড়িটা থামলো  তার বাড়ির গেটের  সামনে। নাম্বার আগে রতনের পকেটে একটা পাঁচশো টাকার নোট ঢুকিয়ে দিলো সে। বেচারার সঙ্গে রুক্ষ ভাবে কথা বলা উচিত হয়নি। 

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ  

 

     দুতলার ড্রয়িংরুমে  বসে আছে সন্দীপন।  ধিরুদা জেন আজকাল ভীষণ স্লো হয়ে গেছে, একটা কফি বানাতে কত সময় লাগে। সোফায় একটু এলিয়ে বসল সে। মাথাটা যেন টিপটিপ করছে। কালকে আবার  ডাক্তার রায়ের সঙ্গে দেখা করার কথা। ভদ্রলোককে সব খোলাখুলি বলেছিল সন্দীপন। বস্তুত, সন্দীপন নৈহাটির ছেলে। তার বাবা দোকানে কাজ করতেন। সন্দীপন যখন স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজ উঠল । তখন সে বুঝল যে ইতিহাসের স্নাতক হয়ে সে তেমন কিছুই করতে পারবে না। বাড়ির দেনা পাওনা সব একি রকম থেকে যাবে। বাবার শরীর খারাপ, বুকে ভীষণ যন্ত্রণা হয় মাঝে মাঝে। দোকানে গিয়ে কাজ তিনি আর বেশি দিন পারবেন না। প্রাইভেট টিউশন করে যে কটা টাকা রোজগার করে তাতে সংসার চলার মত অবস্থা হয় না। আবশ্য এতে তার কলেজর ফিস আর হাত খরচ চলে যায়। সৌমিলির সাথে দেখাও এই সময়ে হয়েছিল। কলেজর প্রথম বছরের ফ্রেশারস পার্টিতে গান গেয়ে মাতিয়ে দিয়েছিল, সেকেন্ড ইয়ারের সন্দীপন। আনেক মেয়ে বান্ধবীর প্রস্তাব জোটে। কিন্তু পকেট খালি থাকলে প্রস্তাব  

      

গ্রহণ করার যোগ্যতা থাকে না। সউমিলি কিন্তু এদের দলে ছিল না, একটু চাপা স্বভাবের, অন্তর্মুখী প্রকৃতির মেয়ে সৌমিলি। কিন্তু ফার্স্ট ইয়ারের রাগ্গিং নেয়ার সময় যখন সৌমিলি রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়েছিল তখনই সন্দীপন বুঝেছিলো যে সৌমিলির কি অসীম প্রতিভা। তারপর মাঝে মধ্যেই ক্যান্টিনে, সুলেখা ম্যাডামের নোটস দিতে দেখা হতো তাদের। সন্দীপন অনেকদিন ধরে বলবো বলবো করে একদিন বলেই দিয়েছিলো তার মনের কথা। সৌমিলি অবশ্য কিছুটা সময় নিয়েছিল।  তারপর কত রিহার্সাল, কত শো করলো এক সাথে। স্টেজ এ উঠতে সৌমিলিকে সন্দীপন শিখিয়েছিলো। 

     সেদিন বৃষ্টি পড়ছে ঝম ঝমিয়ে। সন্দীপন রবীন্দ্র সদন পৌঁছে গেছে, কিন্তু সৌমিলির ফোন পাওয়া যাচ্ছে না। এই আদিকালের ফোনে অর্ধেক সময় টাওয়ার ধরে না। শেষে সৌমিলিকে ফোন পেলো।

"হ্যালো, আমি আজ আস্তে পারবো না আজ। জল জমে বাস আটকে গেছে"।, সৌমিলির গলার আওয়াজ।

"ঠিকাছে। সাবধানে থাকিস। ভালোবাসি কিন্তু।", বলে ফোনটা রেখে দিল সন্দীপন। সৌমিলি আসবে না তাই একলাই পারফর্ম করতে হয়েছিল। "ভালোবেসে সখি" গানটায় হাততালির কলরবে অডিটোরিয়ামের ছাদ যেন ভেঙে যায়। ইতিমধ্যে কফি চলে এসেছে। সঙ্গে কুচো নিমকি। 

 

তৃতীয় অধ্যায়ঃ

কফির স্বাদটাও কেমন অতিরিক্ত তেতো তেতো লাগছে। বারবার সেদিনের কথা মনে  পরে যায়, সেদিন রবীন্দ্র সদনের পারফরম্যান্সের কত ফোন কালে অভিনন্দন পেয়েছিল। কিন্তু শুধু অভিনন্দন পেয়েছিল তা নয়, একটি প্রস্তাব ও পেয়েছিল সে। সোনার তরী অডিও কোম্পানির মালিক শশিভূষণ পাকড়াশী  তার গান রেকর্ড করতে চায়। আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে গেলো সন্দীপন, প্রথমে  সৌমিলিকে তারপর মা বাবাকে ফোন করলো। পরের দিন মা কালীর পায়ে পুজো দিয়ে টালিগঞ্জ ছুটেছিল সে। পর পর কিছুদিন ফাটিয়ে গান করেছিল। কিন্তু বুঝতে পারছিলো যে শুধু গান গাইলেই হবে না, শশিভূষণবাবুর মেয়ে মন্দাকিনী প্রায় তার সঙ্গে কথা বলে। সুযোগ পেলেই কাছে ঘেঁষতে চায়, শশিভূষণবাবু দেখেও যেন দেখেন না। ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে যে গডফাদার না থাকলে এ ইন্ডাস্ট্রিতে খুব চাপ। বাবার অসুখ, মা ও বুড়ি হচ্ছে, সংসারের বোঝা পুরোটাই তার ঘাড়ে।  এই সময়ে সন্দীপন যা করেছিল, যে কোনো প্রাকটিক্যাল মানুষ তাই করতো। 

     সৌমিলি কখনো ফোন  করেনি আর। ফোন করলো সে তাকে বুঝিয়ে বলবার চেষ্টা করতো তার জীবনের কঠিন বাস্তবের কথা। বাড়িতে একবেলা খেয়ে থাকার যন্ত্রণার কথা । হয়তো ঠিক বুঝিয়ে উঠতে পারতো না। কালের স্রোতে ভেসে গেলো কত প্রতিশ্রুতি। সাথে গান গাওয়ার সাথে জীবন কাটানোর অঙ্গীকার।  মন্দাকিনীর সাথে বিয়ে করেছিল সে। পরের পর অনেক রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম বের করেছিল। বাংলা, হিন্দি মিলিয়ে মিশিয়ে অনেক ছবিতেই গান করেছিল। নৈহাটির দোকানের কর্মচারীর ছেলে সন্দীপন কবে যে স্যান্ডই  হয়ে উঠলো সে নিজেও জানে না 

গাড়ি হলো। বাড়ি হলো। হলো প্রেয়সী, বান্ধবী। সুখ সাচ্ছন্দে  কিছুই বাকি ছিল না সন্দীপনের। বাবার সার্জারি। মায়ের তীর্থদর্শন কিছুই বাকি থাকলো না। জীবিকা  খুঁজে পেলেও, জীবন কিন্তু  সহজ হলো না সন্দীপনের। প্রেমের আঠা না থাকলে বিয়ে টেকে না, মন্দাকিনীর সাথেও টেকে নি। স্বেচ্ছায় ডিভোর্স দিয়ে এখন সম্পূর্ণ একলা একলা একটা রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িতে কারাগারের মতো বন্দি হয়ে রয়েছে। সঙ্গী বলতে ওই ধীরুদা, মাঝে মাঝে আশা কিচ্ছু ভাড়াটে মেয়ে। কিছু মিথ্যে বন্ধুবান্দব ইত্যাদি ইত্যাদি । হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো।

 

চতুর্থ অধ্যায়ঃ

    ফোনটা তুলে দেখলো যে ডাক্তার রায়ের ফোন। "হ্যালো, ডক্টর রায় বলুন?", সন্দীপন  বললো

"কেমন আছো সন্দীপন? আপনি কি কালকে ফ্রি?", ডক্টর রায় বললেন। " আসলে পরশু  বৌকে নিয়ে একটু বেরোবো । আপনি কালকে এসে গেলে ভালো হয়।"

"হ্যাঁ  কোন অসুবিধা আমি ষ্টুডিও থেকে ছুটি নিয়েছি এই জন্যেই। তাহলে কাল দেখা হবে।", সন্দীপন বলতে বলতে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলো।

"থ্যাংক ইউ সো মাচ সন্দীপন, রাখছি" বলে ফোনটা কেটে দিলেন ডাক্তার রায়। 

ডাক্তার রায়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল অভিকের সূত্রে। জীবনে অনেক সত্যি মিথ্যে বন্ধু দেখেছে সন্দীপন কিন্তু অভিকের মতো বন্ধু দেখেনি। তাকে সব কথা খুলে বলা যায়

। নিজের সব থেকে দুর্বল মুহূর্তে পাশে পেয়েছিল সে অভিককে। যখন এই ব্যাপারটা হওয়া শুরু করলো তখনও কিন্তু অভিককেই খুজেছিলো সে।

      ব্যাপারটা প্রথমে সে গ্রাহ্য করেনি। যখনি সে একলা গান গাইতে যায়, তখনই মনে হয় একটি মহিলা কণ্ঠস্বর ভেসে উঠছে। হয়তো মনের ভুল। এটি চেনা পরিচিত গানের সুর, মেয়েলি গলার কণ্ঠস্বর। তার সঙ্গে প্রত্যেক গানে তাল মিলিয়ে গান গাইছে। ডুয়েট গান একলা গাইলে, ফিমেল পার্টটা গেয়ে দিচ্ছে ওই একই কণ্ঠস্বরে। প্রথমে মনে হয়েছিল  কেউ  যেন তার সঙ্গে হেয়ালি করছে। হয়তো সে যখন গান গায়, তখন তখন এই মেয়েটি গান গেয়ে তাকে বোকা বানাবার চেষ্টাতে আছে। কোন রিয়ালিটি শো হতে পারে। কিন্তু নিজের বাড়ির সাউন্ডপ্রুফ রেকর্ডিং রুমে যখন এই বেপারটা হলো, তখন মনে খটকা লাগলো। তারপর মনে হতে লাগলো এ যেন মনের ভুল। কেও নেই আসে পাশে, তবুও গানের সুর। একই কখনো বাস্তবে হয়না । দিনের পর দিন আওয়াজটা শুনতে পেয়েছে সে। আওয়াজটা হয়ে উঠেছে আরো সুস্পষ্ট।

     হ্যাঁ নিঃসন্দেহে এটা সৌমিলির গলার কণ্ঠস্বর। সৌমিলির সাথে সন্দীপনের কোন যোগাযোগ নেই আর। কিন্তু এবার তাকে সৌমিলিকে খুঁজে বার করতে হবে। সৌমিলি অনাথ  তার তিন কূলে কেও ছিল না। অনাথ আশ্রম থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। এবার সন্দীপন সৌমিলি কে খুঁজে বের করবে। তারপর তার সঙ্গে গান গাইবে। অ্যালবাম বের করবে। তার ফেলে আশা ঋণ না শোধ করতে পারলে তো তার রেহাই নেই।

 

পঞ্চম অধ্যায়ঃ

 

তারপর সে কত চেষ্টাই করেছিল। অনাথ আশ্রমে ফোনের জবাব পায়নি সে। তারা বলেছিলো সৌমিলি কোথায় আছে তারা জানে না। ফেসবুকেও নেই সৌমিলি। টিভিতে, নিউসপেপার এ বিজ্ঞাপন পর্যন্ত দেওয়া হলো। আমলা বন্ধুদের দ্বারা পুলিশ দ্বারা তল্লাশি চালিয়েছে, কিন্তু সৌমিলি কে পাওয়া যায়নি। 

 তাহলে কি সৌমিলি মারা গেছে। একদিন শীতের সন্ধ্যায় পার্ক এ  চুমুর ঠিক পরমুহূর্তে বলেছিলো সে, "তুমি ছেড়ে গেলে কি আমি আত্মহত্যা করবো। "অনাথাশ্রমেও থাকা কালীনও সে এই চূড়ান্ত  চেষ্টাটি করেছিল। তার পক্ষে এটা করা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাহলে কি তার প্রেতাত্মা সন্দীপনের সঙ্গে সঙ্গে সুর মেলায়।

ডাক্তার রায় এসব কিছু মানতেই চাননি। বলেছিলেন এটা মনের ভুল। মানুষ কি দিনের পর দিন একই মনের ভুল করতে পারে? ডাক্তার রায় বলেছিলেন যে তার গিল্ট কংসাইন্স  তাকে এসব শোনাচ্ছে। সে জীবনে আগে বেড়ে গেলেও, তার অবচেতন মন ওখানেই থেকে আছে।

 

ষষ্ঠ অধ্যায়ঃ

 

গায়কদের গান গাওয়াটা স্বভাবের মধ্যে তারা জানতে অজান্তে গেয়ে ওঠেন। এই যেমন এই বারে সন্দীপন গেয়ে উঠলো, "যদি তোর ডাক শুনে কেও না আসে ....।, গেয়েই শুনতে থাকলো।

কিছুক্ষন একটা মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে উঠলো , " তবে একলা চলো রে .."

"কে তুমি  কাছে এস? সামনে এস? সামনে এস বলছি?", পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকে সন্দীপন।

কোন সাড়া পাওয়া যায়না। ধীরুদা বেরিয়ে গেছে। বাড়ি ফাঁকা। আজ একটা হেস্তনেস্ত  করেই ছাড়বে সে। দেরাজের  কোনে  লুকিয়ে রাখা পিস্তলটা হাতে নিয়ে চিৎকার করলো - 

"কে তুমি? সামনে এস?" একটা ব্লাইন্ড শট  ফায়ার করলো কোন সাড়া শব্দ নেই, যেন সৌমিলির প্রেতাত্মা তার সঙ্গে বিদ্রুপ করছে। 

না এরকম বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না। তার জীবনের দ্বিতীয় সৌমিলি যদি তার প্রথম ভালোবাসা গানকে কেড়ে নিতে চায়, তাহলে কি করে বাঁচবে সে। এ সে কখনোই হতে দেবে না। পিস্তলের একটি গুলি চালালো সে নিজের ওপর মাথার ওপর। রক্তাত্ব  দেহ  মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।

 

সপ্তম অধ্যায়:

 

কানাডার দুপুর। বর অফিস গেছে। বছর চারেক আগে একটি  গানের শোতে  দেখা হয়েছিল অরিন্দমের সাথে। তারপর তার সাথেই বিয়ে করে বিদেশে পাড়ি। একটিমাত্র বাংলা চ্যানেল ধরে এখানে, দেশের সাথে এই একটি যোগাযোগ রাস্তা। নিউস চ্যানেলের হেডলাইন সেদিন, " বিখ্যাত সংগীত শিল্পী সন্দীপন প্রয়াত। "হঠাৎ শীতের রাতে পার্কে দেওয়া একটি হুমকির কথা মনে পড়েগেলো সৌমিলির

  শিকার

সূর্যাশীষ পাল 

নয়ডা, উঃ প্রদেশ

 

......থাবার আকৃতি দেখে বুঝলাম যে এ জন্তু বাঘ ছাড়া আর কিছু নয়। বাঘ শিকার একদিনের বেপার নয়। বাঘ সাধারণত সপ্তাহে একবার কিম্বা দুবার খায়। অতএব মাচা বেঁধে বসে থাকতে হবে। বস্তুত বাঘ মানুষকে খুব ভয় করে, তাই বাঘের কানে যদি গুলির শব্দ একবার যায়, তাহলে সে আর কোনদিন গ্রামের মুখ দেখবেনা। রক্তব্যয় ছাড়াই কাজ হাসিল। 

       খুলনা  জেলায় জঙ্গলে বাঘ, ভালুক মেরে বেশ নাম করেছিলাম। কিন্তু আমার নাম যে একেবারে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে গেছে সে কথা কোনোদিন অনুমান পর্যন্ত করিনি। সিপাহী বিদ্রোহের দরুন মীরাট, কানপুর, হাজারীবাগ সব জায়গায় ঘুরে এসেছি। তবে শিকার করিনি তবে কি করে জানতে পারলেন মহারাজাধিরাজ রাজেশ্বর হোলকার সিন্ধিয়া? কে জানে। সিপাহী বিদ্রোহে আমি লড়েছিলাম ভারতের সৈনিকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। আসলে সিপাহী বিদ্রোহে শুধু সিপাহীরা নয়, ভারতবর্ষের জন সাধারণ হিন্দু ,মুসলমান, ব্রাহ্মণ, কুমোর, তাঁতি সবাই একসাথে লড়েছিলাম। কত মুসলমান কুমারীই তো আমার সামনে বেওয়া হয়ে যায়, কিন্তু একটা হিন্দু পুরুষ তাদের ওপর খারাপ নজর দিয়ে দেখেনি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন  ভারতের কিছু রাজা রাজড়াদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিদ্রোহটাকে থামিয়ে দিলে। সেই রাজা রাজড়াদের মধ্যে একজন মহারাজাধিরাজ রাজেশ্বর হোলকার সিন্ধিয়া।অবশ্য রাজেশ্বর সাইন্ডিয়ার তাতে লাভ হয়েছিল প্রচুর।আসলে যুবরাজ রাজেশ্বর সিন্ধিয়ার অবস্থা তখন খুব নড়বড়ে। তার চার ভাই, চারজনই বয়েসে বড় এবং জনপ্রিয়। মসনদে বসার সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু সিপাহী বিদ্রোহের আগুন দমিয়ে তিনি হয়ে গেলেন ব্রিটিশ সরকারের খাসম খাস। ব্যাস প্রথমে রাজা, তারপর রাজাধিরাজ এবং শেষে মহারাজাধিরাজ হয়ে বসলেন।

     আর এদিকে আমি শশীভূষণ দত্ত। খুলনা জেলায় বাবার মুদির দোকান ছিল। লেখাপড়া পাঠশালায় চুকিয়ে দিয়ে, কেরানির চাকরিতে ঢুকেছিলাম খুলনা সদর দফতরে। কিন্তু মন তো ছুটে যেত বনে বাদাড়ে, জঙ্গলে জঙ্গলে। সুন্দরী গাছের গাছের মাঝখানে মাঝখানে। মোহনার জলে, পাখির ডাকে। খোলা  আকাশের পাখি কে কি খাঁচায় পুরে রাখলে প্রাণ তার ওষ্ঠাগত হয়। ফতরের চাকরিতেও আমার সেরকম অবস্থা। 

  তবে দফতরের বড় বাবু হালদার মশায় ভীষণ ভালোবাসতেন । তবে সেটা শুধুই ভালোবাসা না ছটি কন্যার দায়গ্রস্ত পিতার চাতুরী সেটা বুঝতাম না। যাই হোক, একদিন বাড়িতে নেমন্তন্ন। গরম ভাত, দল, আলু পোস্ত আর মৌরলা মাছ দিয়ে খাওয়া শেষ করেছি। এ সময় পান চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, "শোনো শশী, তোমায় একটা জিনিস দেব। যত্ন সহকারে রাখবে কেমন'  এই বলে হাতে তুলে দিলেন কি একটা। হাতের দিকে তাকিয়ে চক্ষু ছানাবড়া। লোহার ভারী কালো পিস্তল। 
"এর মধ্যে গুলি নেই, তবে ওপাড়ার ভানু সরকারি অস্ত্রাগারে কাজ করে। ওকে দু পাঁচ আনা দিয়ে দিলে .." , বলতে বলতে পানটা আরেকবার চিবিয়ে নিলেন" কিন্তু এদিয়ে আমি কি করবো? " আমি বললাম।
"মানুষ মেরো না। বাকি সব কিছু করতে পারো।", উনি বললেন। 

এইভাবেই আমার শিকারে হাতে খড়ি হয়। প্রথমে পাখি, ছাগল ইত্যাদি দিয়ে শুরু পরে শেয়াল ও মেরেছিলাম। কিন্তু বড় কিছু করবার সুযোগ তখনও পায়নি। পেতে বেশি দেরি হলো না।


দ্বিতীয় অধ্যায় 

      বটিয়াঘাটা গ্রাম থেকে খবর এলো, যে ওখানকার  জন্তু হঠাৎ উধাও হয়ে যাচ্ছে। কখনোবা তাদের রক্তাত্ব লাশ পাওয়া যাচ্ছে। ইতিমধ্যে একজন বাঁচাকেও তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু এসব হচ্ছে রাতের অন্ধকারে। গ্রামে হাহাকার।সদর দফতরের থেকে পাঁচ দিনের ছুটি পাওনা ছিল, তড়িঘড়ি দরখাস্ত করে। বেরিয়ে গেলাম বটিয়াঘাটা গ্রামে।লালমাটির রাস্তা, ধারে ধানের খেত। গ্রীষ্মকালে গুরুর গাড়িতে চললাম, ওখানে মনোহর বাঁড়ুজ্জের ভিটেতে থাকবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন হালদার মশাই। 

     মনোহর বাঁড়ুজ্জের বাড়িতে পৌঁছে অতিথি আপ্যায়ন বেশ ভালোই হলো। মনোহর বাঁড়ুজ্জে গ্রামের মোড়ল। বিয়ে থা করেননি। তবে বাসায় ভৃত্য আছে। তার রান্নার হাত খুবই উঁচু মানের।     

খেয়েদেয়ে দুপুরের ঘুমটা জমিয়ে হলো। বিকেলে বাঁড়ুজ্জে মশাই গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন। সে সময় লক্ষ্য করলাম যে জঙ্গলের পাশে একটা জায়গায় ঘাস দুমড়ে গেছে।কাদামাটিতে থাবার চাপ দেখে বুঝলাম না ভুল হয়নি , যা আন্দাজ করেছিলাম তাই ঠিক।

    আসলে ব্রিটিশ সরকার আর রাজা রাজড়ারা মিলে দেশের জঙ্গলের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। বন্য পশু প্রাণীদের  আস্তানা ধ্বংস তারা বেরিয়ে আসছে গ্রামাঞ্চলে।বাঘ ও এদের মধ্যেই একজন। সাধারণত বাঘ মানুষের ওপর শিকার করে না। মানুষের মাংস তার বিশেষ পছন্দ নয়।কিন্তু বাঘ যখন বুড়ো হয় তখন সে আর অন্য শিকার করতে পারে না। তখন মানুষ হয় তার জন্য সব থেকে সহজ শিকার।

      থাবার আকৃতি দেখে বুঝলাম যে এ জন্তু বাঘ ছাড়া আর কিছু নয়। বাঘ শিকার একদিনের বেপার নয়। বাঘ সাধারণত সপ্তাহে একবার কিম্বা দুবার খায়। অতএব মাচা বেঁধে বসে থাকতে হবে। বস্তুত বাঘ মানুষকে খুব ভয় করে , তাই বাঘের কানে যদি গুলির শব্দ একবার যায়, তাহলে সে আর কোনদিন গ্রামের মুখ দেখবেনা। রক্তব্যয় ছাড়াই কাজ হাসিল। 

সেই রাতটা আমি কোনদিন ভুলতে পারবোনা। তখন মাঝরাত ঘুম ভেঙে গেলো  এক ভয়ঙ্কর গর্জন শুনে। সে গাছটির ওপর মাচা বেঁধেছিলাম সেটি কাঁপছে। নিচে তাকিয়ে দেখলাম, জ্বলন্ত দুটি চোখ আমার দিকে তাকিয়ে গেছে।ক্ষীণ আলোয় দেখতে পেলাম গাছটিকে একটি প্রকান্ড বাঘ আক্রমণ করেছে। সে বারবার গাছটিকে ধাক্কা মারছে।গাছটির ডাল গুলো ধাক্কার জ্বরে নড়চড়ে উঠছে। তার সঙ্গে ম্যাচটাও দোলানি খাচ্ছে। টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়লাম। আমার সামনে হলুদ রঙের জ্বলন্ত দুটি চোখ, ক্রমশ এগিয়ে আসছে। আমার অজান্তেই পিস্তলের গুলি গগনভেদী হুঙ্কার ভোরে বাঘের পাঁজরাই গিয়ে লাগলো।বাঘটি শেষবারের মতো গর্জন করে,মা টিতে লুটিয়ে পড়লো।

পরেরদিন গ্রামে হৈহৈ কান্ড। নোহবৎ বাজছে, ভোজ রান্না হচ্ছে। আমি যেন গ্রামের নায়ক। কত উপহার দেওয়া হচ্ছে , কত মিষ্টি খাওয়ানো হচ্ছে। তবে আমি মনে মনে জানতাম যে প্রাণে বাঁচাটাই আমার সব থেকে বড় প্রাপ্য।


তৃতীয় অধ্যায়

       আমার নাম শশীভূষণ দত্ত থেকে "বাঘমারা শশী" হয়ে যায়। ডুমুরিয়া, দিঘলিয়া, খালিশপুর ইত্যাদি অঞ্চলে বাঘ, ভালুক, সিংহ, নেকড়ে ঢুকে পড়লেই আমার ডাক পড়তো।অভিজ্ঞ হাত না থাকলে এসব শিকার অত্যন্ত নির্মম মৃত্যুর রূপ নিতে পারে। 

এবার ডাক পড়েছে সুদূর বিদেশে গয়ালিওরে।মহারাজাধিরাজ রাজেশ্বর হোলকার সিন্ধিয়া ডেকে পাঠিয়েছেন। মানুষ পেটের দায়ে আর টাকার লোভে সব কিছু করতে পারে। আমিও মেনে গেলাম যেতে। নাহলে আমার মতো সিপাহী বিদ্রোহের যোদ্ধাকে এই কদর্য, বেইমান, ইংরেজের চাম্পচার  স্মরণে যাওয়া শোভা দেয়না।চিঠির সঙ্গে একটা থার্ড ক্লাস রেলের টিকিট ও পাঠিয়েছেন।সে নিয়েই বিদায় জানালাম প্রাণের বঙ্গভূমিকে। 

রেল যাত্রা এই প্রথম। প্রকান্ড দৈত্যাকার রেল ট্রেন। তার থার্ড ক্লাসের কামরায় ব্রাহ্মণ, বনিয়া, মুসলমান গরু মোষের মতো ঠেলা। তবু অন্য পথের তুলনায় জলদি পৌঁছে গেলাম| ঢাকা হতে গবলিৰ যেতে লাগলো মাত্র ৬ দিন।স্টেশন থেকে মহারাজার নিজের লোক আমায় নিয়ে গেলো রাজপ্রাসাদে। পেল্লাই বাড়ি। রাজা এবং তার পাটরানীদের জন্য খান পঞ্চাশেক কামরা। বাবুর্চি, পরিচারক সব আছে।আমাকে রাখা হলো অতিথি নিবাসে। সকাল বিকেলে লোকজন শরবত, দুধ, দই এনে দেয়। বিকেলে রাজপ্রাসাদ, খামান দুর্গ ইত্যাদি ঘুরে আসি। এরকম করেই কেটে গেলো দুদিন। কিন্তু রাজামশাই আমায় ডেকে কেন পাঠালেন, সেটা চিঠিতেও স্পষ্ট বলেননি। এখানেও জানতে পারলাম না। শুধু বলেছেন একটা জরুরি কাজে আমাকে নিযুক্ত করবার জন্য মাসিক বেতন দুটাকা বেতন দিয়ে আমায় রাখতে চান। আট আন্নার চাকরি সদর দফতরে। দুটাকা বেতন পাবো কোনদিন জীবনে ভাবতেও পারিনি। তাই চলে এসেছি।

তবে রাজার যে শিকারের শক আছে সেটা আমি আগেই শুনেছি। তাই ভেবেছিলাম শিকার জাতীয় কিছুই নিশ্চয়ই করাবেন। কিন্তু আসল অভিপ্রায়টি সন্দেহের ঘেরাটোপে থেকে গেলো।
 

চতুর্থ অধ্যায় 

      সকালে কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে রাম সিংহ বললো, "সাহেব, অপক মহারাজাধিরাজ বুলা রেহে হায়।" সকালে স্নান টান সেরে। চলে গেলাম মহারাজাধিরাজ মহারাজাধিরাজ রাজেশ্বর হোলকার সিন্ধিয়ার বেঠক খানায়। সাহেবি আমলে সাজানো। দেওয়ালে দেওয়ালে পেইন্টিং।  

"অরে আসুন আসুন সাশি সাহেব", রাজা সাহেব বলে উঠলেন। মাঝবয়েসী লোক। পেটে মেদ। পাগড়ির ওপর সোনা জহরত। হালকা হিন্দি মিশ্রিত বাংলায় কথা বলেন আমার সঙ্গে।
"আপনার ব্যাপারে হুম খুব শুনেছি? আপনি নাকি বাঘ, ভালুক প্রায়ই মেরে থাকেন?", ঠোঁটের কোন মৃদু হাসি নিয়ে বললেন। লোকটা মুখে মিষ্টি স্বরে কথা বললেও ওর চোখ ছিল লাল, নৃশংসতার ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় ওই দুটি চোখে ।
"ওই আর কি। গ্রামে মাঝে মাঝে বাঘ, ভালুক ঢুকে গেলে ....", বিনম্র ভাবে উত্তর দিলাম। 
"যাকগে , হুম আপনাকে এক চীজ দেখাবো। আমার সঙ্গে আসুন।", উঠে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গেলেন। আমিও পিছু নিলাম।  দরদালান পেরিয়ে একটা কামরায় ঢুকে গেলেন।  আমিও সঙ্গে ঢুকলাম। 

ঘরে জন্তু জানোয়ারের ফটোগ্রাফ বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে।আসলে জন্তু নয় লাশ। লাশের পাশে  মহারাজাধিরাজ মহারাজাধিরাজ রাজেশ্বর হোলকার সিন্ধিয়া বাহাদুর, কখনো রিভলভার হাতে, কখনোবা পিস্তল, কখনোবা রাইফেল। 
"এসব আমার শিকারের ছবি ", রাজাজি বলে উঠলেন।
"এই জন্তুটিকে তো চিনতে পারলাম না?" , আমি জিজ্ঞেস করলাম। 
"এটার নাম পান্ডা। এটা দক্ষিণ চীনে পাওয়া যায়। আমি ওখানে যখন বেড়াতে যাই। তখন চীনের  যুবরাজ তও যেন লাই এর সঙ্গে শিকার করি", উনি বলে উঠলেন।
"বেশ বেশ। আপনি তো দেখছি জাত শিকারী", মিথ্যে প্রশংসা জুড়ে দিলাম আমি। 
"তবে একটা জানভারের শিকারী হুম এখনো করেনি", উনি বললেন।
"কোনটা রাজা সাহেব। আপনি বলুন আমি সেটাকে ধরে বেঁধে পেশ করবো আপনার সামনে" , আমি বললাম। " হা হা হা। ওসবের দরকার নেই। ওতে শিকারের মজা নেই।শিকারের মজা জঙ্গলে হয়। যখন শিকার জানে যে সে পালতে পারে। সে প্রাণের ভয়ে পালায়, তার চোখে দেখা যায় মৃত্যুর ভয়। তার মুখে মৃত্যুর আর্তনাদ। এরকম সময় এ শিকারী করলে শিকারের আসল মজা পাওয়া যায়। আর সেই শিকার যদি নিজেই দক্ষ শিকারী হয় তাহলে তো কথাই নেই", রাজা সাহেব বললেন। 
"কিন্তু আপনি কোন জানোয়ার কে মারতে চান?" , আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"বলবো বলবো। সে এক অতি হিংস্র জানোয়ার। তুমি বরং কালকে একলা গিয়ে পাশের শিবপুরির জঙ্গলটা ভালো করে জরিপ করে নাও। আমি কালকে একটু বেরোবো ভোপালের দিকে, তাই আমি থাকতে পারবো না।"

 

পঞ্চম অধ্যায় 

     রাজার আদেশ অমান্য করার জো নেই। পরেরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে গেলাম শিবপুরির জঙ্গলের দিকে। বেশি দূরে নয়, ৩০ মিনিটের হাটা পথ। জঙ্গল ঠিক বলা যায়না তৃণভূমির মাঝখানে মাঝখানে লম্বা লম্বা গাছ। ঘাসের উচ্চতা এতো যে একটা মানুষ ঢেকে যেতে পারে। শিকার করবার উপযুক্ত জায়গা। পশুর সামনে ঘাপটি মেরে বসে থাকলেও বুঝবার জো নেই।   

হঠাৎ দূরে লতাপাতাগুলো একটু নেড়ে চেড়ে। যেন কোন পশু ওর মধ্যে লুকিয়ে আছে। আমি সামনে এগিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতে লাগলাম। কিন্তু সেই সময়েই এক গগনভেদী আওয়াজ আমি শুনতে পেলাম। আমার পায়ের পাশ দিয়ে কি একটা জিনিস দ্রুতবেগে বেরিয়ে গেলো।আমি কিছু ভাবার আগেই আবার সেই আওয়াজ এবার আমার কানের পাশদিয়ে  গেলো। বুলেটের শব্দ আমি চিনতে ভুল করিনা। ভাববার অবসর নেই। ছুটতে  হবে। আতঙ্কে, ত্রাসে আমি ধাবা দি। পেছনে ঘুরে দেখতে পাই সেই পাগড়ি, তার মধ্যে জহরত গাঁথা। দুটি লাল নৃশংস চোখ আস্তে আস্তে বটিয়াঘাটার বাঘের চোখের মতো হলদে হলদে হয়ে আসছে । তবে কি মহারাজ মানুষ শিকার করতে চেয়েছিলেন। হঠাৎ আরেক গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। এবার মহারাজা  লক্ষ্য ভেদ করলেন।  আসে পাশের লতাপাতায় রক্তের দাগ ছড়িয়ে গেল।

 

ষষ্ঠ অধ্যায় 
     মহারাজ শিকার ফটোগ্রাফের কালেকশন একটি নতুন ফোটো যোগ হলো। আমি এখন ওখানেই থাকি, শিবপুরির তৃণভূমির মাঝখানে, হালদার মশাইয়ের পিস্তল নিয়ে, ঘাপটি  মেরে। শুনেছি মহারাজ আবার শিকারে আসছেন, সঙ্গে ষোলো বছরের যুবরাজও থাকবেন।

 

দুটি গল্পঃ 

কালো কাক / ভুতের ভ্যাকেশন

সূর্যাশীষ পাল 

নয়ডা, উঃ প্রদেশ

 

আজ সকালেই উঠে এলাম কবর থেকে। কতদিন আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে থাকবো বলুন। সেই ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে মারা গেছিলাম সিপাহী বিদ্রোহে। সে এক অপূর্ব গাঁথা, রাজা কুঁয়ার সিংহের নেতৃত্বে ইংরেজে শাসকদের সাথে লড়াই করে যাচ্ছি। মুসলিম, হিন্দু সবাই এক সাথে মিলে সংগ্রাম করছি গোরাদের বিরুদ্ধে। গোরাদের কাছে আছে অঢেল টাকা, অস্ত্র, শস্ত্র। 

কালো কাক 

     গাড়ি চলেছে লালমাটির রাস্তায়, রতনের মন কিন্তু অন্য দিকে। আজকাল কেমন যেন অচেনা অচেনা লাগে রতনের। যাদবপুরের ফেস্ট এ যে রিয়ার সাথে দেখা হয়েছিল প্রথমবার, যার সঙ্গে প্রেমে পড়েছিল সে, সেই রিয়া কোথায় হারিয়ে গেছে। ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিসেস এর পরীক্ষা পাস করবার পরেই বিয়ে করেছিল তারা।| রিয়া নিজের ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ক্যারিয়ার ছেড়ে ফুল টাইম রাইটার হবার সিদ্ধান্ত নেয়। পুরুলিয়ার ব্যারান্টি অঞ্চল এ প্রথম পোস্টিং। লালমাটির রাস্তা, সারিসারি সাল গাছের বন, দূর থেকে ভেসে আসা ছৌ সংগীত, ঝি ঝি পোকার মাদক আওয়াজ। তার মাঝখানে ফরেস্ট বাংলো।

     কতবছর কাটিয়ে দিয়েছে এই জঙ্গল বাংলোয়। বন্য পরিবেশে রিয়া বেশ নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। ভ্রমণ কাহিনী লিখে যথেষ্ট নাম করেছে। রতনের ফরেস্ট বাংলো এখন ওয়ার্ডে সারিসারি। রতন প্রমোশন পেয়ে এখন এরিয়া ম্যানেজার।

    কিন্তু তারপর শুরু হল রিয়ার সমস্ত আজগুবি অন্ধবিশ্বাস। সেদিন হারুর মা কাজ করতে এসে বলেছিলো, " জানেন কালো কুচ কুচা কাকটা সালেম চাচার বাড়িতে এসে বসেছিল। তখনই বুঝেছিলাম যে রাতে কিছু একটা ঘটতে চলেছে"।  
      আসলে এখানকার এক অন্ধবিশ্বাস যে কালো কাক হল দুঃসংবাদের বাহক। যে কালো কাককে দেখে তার আত্মীয় পরিজনদের মধ্যে কেও একজন মারা যান। তার কিছুদিন পর রিয়া উঠোনের ওপর কালো কাক দেখে, পরের দিন তার একমাত্র কাকার মৃত্যু হয়। বস্তুত তার কাকা অনেকদিন ধরেই যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত তার মারা যাওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। কালো কাকের বিষয়টা নেহাত কাকতালীয়। কিন্তু রিয়াকে এসব কি আর বোঝানো যায়। ওঝা ডেকে ফরেস্ট বাংলো ঝাড় করিয়েছে। এখন ফরেস্ট বাংলোর আনাচে কানাচে ঝোলে লেবু আর লঙ্কা। 

      এ নিয়ে কত তর্ক বিতর্কই তো হল। কিন্তু রিয়াকে বোঝানো গেলো না। আজ প্রমাণ হাতে পেয়েছে রতন। দফতরে মধ্যে একটা কদর্য কুঁচকুঁচে কালো কাক তার ডেস্ক এসে বসে। সজোরে ক্যাঁক ক্যাঁক করে উঠলো। রতন কিন্তু

     
 

কাক তাড়াবার কোন চেষ্টাই করলো না। ফোনটা তুলে একটা ছবি তুলে নিল। আজ সে ঘরে ফিরে রিয়াকে এই ফটো দেখাবে। ভুল ভাঙবে তার। রাতের গভীরে টর্চের আলোকপাত। ইতিমধ্যে গাড়ি থেমেছে। গাড়ি থেকে নেমে "রিয়া , রিয়া করে চিৎকার করতে করতে  দোতালায় উঠে গেলো রতন"। রিয়ার কোনো সাড়া শব্দ নেই। বেডরুম এ ঢুকে দেখে রিয়া ঘুমিয়ে পড়ে আছে। নিদ্রায় মগ্ন, চোখে মুখে শান্ত আভা। রতন গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। কিন্তু একি রিয়ার দেহ তো হিমের মতো শীতল। রতন রিয়াকে নাড়া চাড়া করলেও অসাড় হয়ে পড়ে থাকে। সেদিন গাছে বসে থাকা কাকগুলো শুনতে পেল, ফরেস্ট বাংলো থেকে আসা একটি মানুষের গগনভেদি আর্তনাদ।  

ভূতের  ভ্যাকেশন


প্রথম  অধ্যায়

আজ সকালেই উঠে এলাম কবর থেকে। কতদিন আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে থাকবো বলুন। সেই ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে মারা গেছিলাম সিপাহী বিদ্রোহে। সে এক অপূর্ব গাঁথা, রাজা কুঁয়ার সিংহের নেতৃত্বে ইংরেজে শাসকদের সাথে লড়াই করে যাচ্ছি। মুসলিম, হিন্দু সবাই এক সাথে মিলে সংগ্রাম করছি গোরাদের বিরুদ্ধে। গোরাদের কাছে আছে অঢেল টাকা, অস্ত্র, শস্ত্র। আমাদের কাছে মুষ্টিমেয় কিছু লোকজন আর ঢাল তরোয়াল। মৃত্যু অনিবার্য। তবুও লড়ে যাচ্ছিলাম।তখন আমি বিহারের আররাহ অঞ্চলে যুদ্ধ করছি। মধ্যে গ্রীষ্মের দুপুর। হঠাৎ আমি গুলিবিদ্ধ হলাম। ও সে কি কষ্ট।হাঁকিয়ে উঠলাম। আমার গগনভেদী আর্তনাদকেও শুনল না। মৃত্যুর কোলে শান্তি পেলাম। অনেক নাম না জানা শহীদদের মতোই আমায় লোকজন ভুলে গেছে। তবু একটা কবর দেওয়া হয়েছিল। সেদিক থেকে আমি ভাগ্যবান, আমার কত সহকর্মীদের তাও জোটেনি কপালে। তাদের দেহ চিলে, শেয়ালে খেয়েছিলো।

দ্বিতীয়  অধ্যায়

     সময় অনেক এগিয়ে গিয়াছে। কুঁয়ার সিংহ যুদ্ধ হেরেছে।ইংরেজ শাসক কড়া হাতে দমন করেছে সিপাহী বিদ্রোহ।আরো শতবছর শাসন করেছে তারা। ভারতকে কাঙাল করে ছেড়ে গেছে। তারপর ভারত স্বাধীন হয়েছে।এখন আমাদের দেশ একটি সফল গণতন্ত্র। এখন গরু গাড়ির জায়গা নিয়েছে মোটর গাড়ি। সবই শোনা কথা।আমার পাশের কবরের আলম যখন আগের বছর ভ্যাকেশন নিয়ে গেছিলো তখনই বলেছিলো। আমারো কত ইচ্ছে যে আমার প্রাণের দেশে একটু ঘুরে আসবো।
ভূত হবার অনেক অ্যাডভান্টেজ। আপনি সবাই কে দেখতে পাবেন, কেউ আপনাকে দেখতে পাবেন না। এক মুহূর্তের মধ্যে কাশ্মীর হতে কন্যাকুমারী যাওয়া যায়। কোথাও ঢুকতে পারমিশন লাগে না। মন্দির, মসজিদ, চার্চ সব জায়গায় যাওয়া যায়। তাই ভাবলাম একবার ঘুরেই আসি না।   

তৃতীয়  অধ্যায়

    উঠলাম কবর থেকে। ভাবলাম ভারত দর্শন কলকাতা থেকেই শুরু করবো। আমাদের কালের রাজধানী। শুনেছি
     

নাকি উন্নয়নের দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে অনেকটাই। যাকগে , এই সেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, আমাদের সময় এসব ছিল না। দেখলাম সামনের মাঠের ওপর কত ছেলে মেয়ে বসে প্রেম করছে। আমাদের সময় কি এসব সম্ভব ছিল।আমারও ছোটবেলায় এরকম একজনকে ভালো লেগে গেছিলো। তার চোদ্দ বছরে বিয়ে হয়ে যায়, আশি বছরের এক বামুনের সাথে। যাকগে পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। এবার বেরোলাম দিল্লির দিকে। আমাদের সময় বাহাদুর শাহ জাফরের এবং মুঘল রাজ্যের কেন্দ্র ছিল এই দিল্লি।এখন স্বতন্ত্র ভারতের রাজধানী। ঝাঁ চকচকে রাস্তা, শপিং সেন্টার, দ্রুত বেগে ছুটছে মেট্রো আহা এতো স্বর্গ।বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, এই ভারতের জন্যই তো প্রাণ দিয়েছিলাম আমরা। গর্বে বুক ভোরে গেলো।ভাবলাম একবার পার্লামেন্ট ঘুরে আসবো। আমাদের সময়ও সভা হতো, রাজা তার মন্ত্রীদের পরামর্শে দেশকে শাসন করতেন। আজকাল আবার গণতন্ত্র এসেছে। এসব আমাদের সময় ভাবাই যেত না। ভাবলাম, একবার দেখেই আসি না আজকালকার ছেলে ছোকরারা কিরকম ভাবে দেশ শাসন করে। ঢুকে গেলাম লোক সভাতে। ভূত হওয়ার কারণে কেউ আটকাতে পারলে না। ও মা এ কিরকম সভা। সভার মাঝখানে এক মহিলা বসে আছেন। তিনি ক্রমাগত বাদবাকিদের শান্ত থাকতে বলেছেন। কিন্তু বাকিরা কেউ তার কথা শুনছে না। সমানে চিৎকার, চেঁচামেচি, গালাগালি। পিছনে ফিরে দেখি একজন লোক এই কোলাহলের মধ্যেই দিব্বি ঘুমোচ্ছে। আরেকজন আবার বেমালুম ফোনে কি সব দেখছে। নাহ, এবার উঠি নইলে কানের বারোটা বেজে যাবে।

শেষ  অধ্যায়

বেরিয়ে পড়লাম কাশ্মীরের দিকে। এই জায়গাটি নাকি পৃথিবীর জান্নাত বলে মনে করা হয়। জীবিত কালে কোনোদিন দেখা হয়নি, মরণের পর জান্নাত ও নাসিবে হলো না। তাই ভাবলাম যখন বেরিয়েছি তখন কাশ্মীর দেখে আসতেই হবে।
আমি ভূত। গায়ে ঠান্ডা গরম কিছু লাগেনা। সুন্দর ঘুরে বেড়াচ্ছি। কাশ্মীরের বরফে, গাছের মাঝখানে। মরণের পর মনে হচ্ছে, এই না হলে জীবন। হাঁটতে হাঁটতে পথ গুলিয়ে কোথায় চলে এসেছি, শ্রীনগরের থেকে অনেক দূর কাঠুয়া গ্রামে। কিভাবে, যে ফিরে যাবো জানি না। যাকগে দুপুর হয়েছে, একটা আস্তানা পেলেই হলো। সামনেই একটা মন্দির আছে ভাবছি দুপুরটা একটু জিরিয়ে নিয়ে, বিকেলে বেরোবো। মন্দিরেই কিছু ভোগ প্রসাদ পেলে মন্দ হয় না।উনি দেবতা হলে আমি অপদেবতা। যথাযত সম্মানতো পাওয়া উচিত।
মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম মন্দিরের সিংহদ্বার রুধ। এই দরজা বন্ধ করে, মানুষকে বাইরে রাখা যায় কিন্তু ভগবান এবং ভূতকে রাখা যায় না। ঢুকে গেলাম ভেতরে।শুনতে পেলাম একটি শিশুর আর্তনাদ। মন্দিরের এক কোন থেকে আসছে। অচিরেই সেখানে পৌঁছলাম আমি। দেখলাম একি, চার পাঁচটি নগ্ন পুরুষ, তার মধ্যে একজন বোধ হয় মন্দিরের পূজারী আর একটি ছোট বালিকা। পেছন থেকে জয় শ্রীরামের জয়ধ্বনি। না থাক বাকিটা আর বললাম না।কবরে ফিরতে হবে।

 

 

দুটি গল্পঃ

বিজয় / ম্যাগাজিন

সূর্যাশীষ পাল 

নয়ডা, উঃ প্রদেশ

 

  সৌমিলির সাথে দেখাও এই সময়ে হয়েছিল। কলেজর প্রথম বছরের ফ্রেশারস পার্টিতে গান গেয়ে মাতিয়ে দিয়েছিল, সেকেন্ড ইয়ারের সন্দীপন। আনেক মেয়ে বান্ধবীর প্রস্তাব জোটে। কিন্তু পকেট খালি থাকলে প্রস্তাব গ্রহণ করার যোগ্যতা থাকে না। সউমিলি কিন্তু এদের দলে ছিল না, একটু চাপা স্বভাবের, অন্তর্মুখী প্রকৃতির মেয়ে সৌমিলি।

     হঠাৎ, ফোনটা বেজে উঠলো।
"স্যার , পাঠিয়ে দেব? "
"হা মিনিট ১৫ পরে, পাঠিয়ে দিন।"

ফোনটা রেখে, বিন বাগে এলিয়ে বসে, জানালার দিকে তাকাল আর কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
তখন সে গ্রাম থেকে প্রথম কলকাতায় এসেছে। ক্লাসের মধ্যে অনেক মেয়ের মধ্যেই রিয়া একজন। চোখ কেড়ে নেওয়া সৌন্দর্য্য নেই তার মধ্যে, অত্যন্ত সাধারণ দেখতে।তবে বিজয় গ্রামের ছেলে, ড্রেসিং সেন্স বলতে কিছুই নেই।সাদামাটা দেখতে, একটু কুৎসিত বলা যেতে পারে।পড়াশোনায় মাঝারি।  
ঠিক বাংলা উচ্চারণ করতে পারে না। নজর কাড়ার মতো কিছুই নেই।

তবুও ক্লাসের মাঝখানে, টিফিনে কেমন বন্ধুত্ব গড়ে উঠল রিয়ার সাথে। সস্তা রেস্টুরেন্টে খাওয়া, সিনেমা দেখা। মাঝে মাঝে হাত ধরে রাস্তা পার হওয়া। ক্রমশ কলেজের গন্ডি পেরিয়ে গেল দুজনে। দুজনেই তখন কাঠ বেকার, বিজয় তখন টিউশন পড়িয়ে নিজের হাত খরচ চালায়। কিছু টাকা  গ্রামেও পাঠায়।

       কলকাতায় তখন বিশ্বায়নের জোয়ার। অলিতে গলিতে শপিং সেন্টার, ফাইন ডাইনিং  রেস্টুরেন্ট। সস্তার রেস্টুরেন্টগুলো যেন হারিয়ে গিয়েছিল হঠাৎ। পরের সিগারেট ধরিয়ে বিজয়ের জীবনের প্রথম সিগারেটের কথা মনে পড়ে গেল।

     প্রথম টিউশন শেষ করে, দ্বিতীয় টুইশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে  বিজয়। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, টি-শার্ট ভিজে গায়ে চিটে গেছে। এসপ্ল্যানেডের রাস্তা, পথের ধারে সারি সারি দোকান। পাশেই একটা কোল্ড ড্রিংক, সিগারেটের ঠেক| আজ মাইনে পেয়েছে সে, একটা কোল্ড ড্রিংক মারাই যেতে পারে।

কোল্ড ড্রিঙ্কের দোকানে গিয়ে দেখল, রিয়াকে। একটা ছেলের সাথে। রিয়া তাকে চিনেও না চিনবার ভান করল।দোকানদারের কাছে সিগারেট চেয়ে প্রথম সিগারেট ধরিয়েছিল বিজয়।

       পরে জানতে পেরেছিল, যে রিয়া অনেককেই এরকম স্বপ্ন ফেরি করে বেড়িয়েছিল। তার মধ্যে  একজনের সাথে তার বন্ধুত্ব অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে প্রেমে পরিণত হয়। সে পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বিজয়ের খারাপ লেগেছিল বটে, কিন্তু সে রিয়ার মুখোমুখি হয়নি কোনোদিন।কান্নাকাটিও করেনি। তিন মাসের একটা ইন্টার্নশীপ জোগাড় করেছিল। দিয়ে সেখানেই পার্মানেন্ট হয়ে যায়।কর্পোরেট লাইফ এ ওভারটাইম খেটে একের পর এক প্রমোশন পেয়ে এখন ম্যানেজার এন্ড চিফ রিক্রুটের। বিয়ে করেনি। তবে জীবনে অগুনতি নারীর আশা যাওয়া লেগে আছে। ইতিমধ্যেই দুয়েক জায়গায় তার কবিতা ছাপিয়ে সুনাম করেছে। রিয়া এর মধ্যে কোথায় তলিয়ে গিয়েছিল, আজ যেন আবার ভেসে উঠেছে।

দ্বিতীয়   আধ্যায়

রিয়া কেবিনের দরজাটা ঠেলে  বললো, "আস্তে পারি স্যার ?"
মুচকি হেসে বিজয় বললো "হ্যাঁ আসুন।"
মানুষ আসলে গিরগিটি। কখন সে কাওকে প্রেমিক বানায়, কখন স্যার বলে সম্মান দেয়, কখনোবা এমন ভাব করে যে চিনতেই পারেনি। সুবিধের জন্য যেটা শ্রেষ্ঠ, সেটাই মানুষের ধর্ম।
কথোপকথন শুরু হল। রিয়ার গলায় মিনতির স্বর, তার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বর চাকরি হারিয়েছে।
কথাটা শুনে বিজয় কেমন যেন একটু খুশিই হল, কিন্তু পরের মুহূর্তের মধ্যে সে নিজের ওপর ঘৃণা করল। সে কথা ঘুরাবার জন্য কিছু কাজ জড়িত কিছু প্রশ্ন করল। রিয়া আমতা আমতা করে মিনিয়ে মিনিয়ে কি যে জবাব দিল শুধু আন্তর্জামীই জানলেন।  
ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার আগে রিয়া বললো, "আপনার কবিতা গুলো পড়েছি স্যার দারুন হয়েছে।" শেষ চেষ্টা করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল রিয়া।
বিজয় মনে মনে মুচকি হাসল। পার্সোনাল লাইফ আর ওয়ার্ক লাইফ বিজয় মেলায় না। আজ কিন্তু সে দুটোকে আলাদা রাখতে অসমর্থ হল। এক্সেল শীটে রিয়ার  নামের আগে "সিলেক্টেড"  লিখল। বিজয় কি তার পুরোনো প্রেম ফিরে পেয়েছিল? না সে জিতে যাওয়ার স্বাদের আমেজ নিতে চেয়েছিল আরেকবার, কে জানে?

ম্যাগাজিন

প্রথম আধ্যায়

       মিস্টার পাকড়াশীর কাছ থেকে লাস্ট কনফার্মেশন পেয়ে গেল মিস্টার সরকার। এবার সে ফ্রি। আরাম কেদারায় শুয়ে আপন মনে কি একটা ভাবছে। রিনা কিচেন চা বানাচ্ছে।সন্ধ্যে বেলায় চা খাবার পুরোনো অভ্যেস এখনো ছাড়তে পারেনি মিস্টার সরকার।
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, হোস্টেলের সেইদিনটির কথা।মনে পড়ে গেল যখন সে প্রথম সেই ম্যাগাজিন পেয়েছিল।তখন প্লেসমেন্টের বাজার। একের পরেক কোম্পানি আসছে আর চলে যাচ্ছে। কিন্তু ভুবনেশের প্লেসমেন্ট আর হচ্ছে না।মা বাবার সঙ্গে রোজ ফোনে কথা হয়, সব কথা বললেও ভুবনেশ তার চাকরির কথা এড়িয়ে যায়। সারাদিন বই পাল্টানো আর সিগারেটের টান। জুনিয়রদের মুখ দেখতে চাইনা সে। মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে ভুবনেশ সরকার। প্লেসমেন্ট এ চাকরি না পেলে চাপের শেষ থাকে না। হঠাৎ এক দুপুরে, হোস্টেলের রুমের দরজার তলায় এই ম্যাগাজিন পায় সে। সাধারণ ম্যাগাজিন, কিন্তু আশ্চর্য বেপার ম্যাগাজিনের কোনো শীর্ষক নেই, কোন নাম নেই।শুধু একটা তারিক আছে, তৃতীয় অক্টোবর ২০১৩। আশ্চর্য আজ তো সবে মাত্র কুড়ি জুলাই ২০১৩। ম্যাগাজিনটা বেশ ইন্টারেষ্টিং লাগল ভুবনেশের। পড়ার মাঝে মাঝে প্রত্যেকটা আর্টিকেল পড়ে নিল সে। পড়ে তাকে আরো আশ্চর্য হতে হয়। ম্যাগাজিনের একটা কোনে তার কলেজের প্লেসমেন্ট আপডেট বের হয়েছে। তার মধ্যে সফল ছাত্রছাত্রীদের তালিকা দেওয়া। তারা কে কোন কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে তাও দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে ভুবনেশের নাম।ভুবনেশ বুঝলো কেউ বুঝি ওর সঙ্গে রসিকতা করেছে। কে করেছিল এই রসিকতা তা জানবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছ ছিল না ভুবনেশের। কিন্তু পরের মাসে সত্যি সত্যিই ভুবনেশ চাকরি পেল। এবং সেই কোম্পানিতেই পেল যা ম্যাগাজিনে লেখা আছে। সন্দীপন কে যখন সে এই ম্যাগাজিনের কথা বললো , তখন সন্দীপন বললো যে সে ঢপ মারছে। কিন্তু ভুবনেশের মনে হল ব্যাপারটা ঢপ না হলেও নেহাত কাকতালীয়।

 

 

 

দ্বিতীয়  অধ্যায়

      ইতিমধ্যে একটা সিগারেট জ্বালিয়েছে মিস্টার সরকার।কলেজের দিনগুলির কথা জীবনের অপরাহ্নে যখন মনে পড়ে, তখন সিগারেটের দু একটা টান না লাগালে মনটা যেন শান্তি পায় না। রিনার ভীষণ সময় লাগছে চা বানাতে।ভালোবেসে বিয়ে করেছিল রিনাকে। তবে হুট্ করে ভালোবেসে নয়। তখন ভুবনেশ ময়সুরের এক কোম্পানিতে পোস্টেড্। সদ্য একটা রুমের ফ্লাট নিয়েছে। হঠাৎ একদিন অফিস থেকে ফিরে এসে দেখে যে তার ফ্ল্যাটের দরজার নিচে একটা ম্যাগাজিন। হুবহু, অবিকল সেই কলেজের ম্যাগাজিনের মতো। সেই ডিসাইন, নাম নেই, তারিক আছে । তখন ডিসেম্বর ২০১৪, ম্যাগাজিনের ডেট মার্চ ২০১৫।কোথাও কোন কন্টাক্ট ইনফরমেশন নেই, আছে শুধু আর্টিকেল আর ছবি। একটি ছবি তাকে আকৃষ্ট করল। " শহরের বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের মেয়ে রিনা মহাপাত্রের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে ভুবনেশ সরকারের।" ছবিতে ভুবনেশ দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা মায়াবী সুন্দরীর সাথে। এবার যেন ভুবনেশের ম্যাগাজিনের ওপর বিশ্বাস জন্মাতে শুরু হল।সে ফেসবুকে গিয়ে সে রিনা মহাপাত্রকে সার্চ করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিল। সাধারণত মেয়েরা অচেনা ছেলেদের রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করে না। কিন্তু এ যেন গল্পের মতো সব হয়ে গেল। কখন যে সে রিনার প্রেমিক এবং স্বামী হয়ে উঠলো সে নিজেও জানতে পারলোনা।

তৃতীয় অধ্যায় 

    এরপর থেকে এই ম্যাগাজিন প্রায়ই আস্তে লাগল।শেয়ার বাজারের ইনফরমেশন আগে হতেই পেয়ে যেত ভুবনেশ।সঠিক জায়গায় শশুরের টাকা ইনভেস্ট করে, ভুবনেশ। অচিরেই শহরের সবচেয়ে বড় উদ্যোগপতি হয়ে দাড়িয়েছে জীবনে যা চেয়েছে, যখন চেয়েছে তাই পেয়েছে। লোকজন তাকে ফিনান্সিয়াল জেনিয়াস বললেও, ভুবনেশ জানত যে ম্যাগাজিন ছাড়া সে পঙ্গু।
পুরো জীবনটা যেন ধুয়ার শিখায় ভেসে উঠতে শুরু করল তার সামনে। কিন্তু সব পেলেও একটা জিনিস পাইনি ভুবনেশ। রিনা কোনদিন মা হয়নি। এ নিয়ে কত ঝগড়া কত জন্ঝাট। ডাক্তার, বদ্যি কিছুই বাকি রাখেনি ভুবনেশ। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। শুধু রিনা দূরে সরে গেছিল কয়েক যোজন। 

 

শেষ অধ্যায়

     পরশু যে ম্যাগাজিনটা পেয়েছিল, তার তৃতীয় পৃষ্ঠাটি পড়ে মিস্টার সরকার আশ্চর্য হলেও ভীত হয় নি। জীবনের যা পাওয়া ছিল, সবই মোটামোটি পেয়েছেন। এখন মারা গেলেও তেমন একটা দুঃখের কোন কারণ নেই।
চা এসে গেছে। রিনা এসে বসেছে, সোফায়। দুজনেই নির্বাক। চায়ের প্লেটটা হাথে নিয়ে মনে মনে ম্যাগাজিনের শিরোনামটা আরেকবার মনে করে নিল মিস্টার সরকার," শহরের সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট মারা গেছেন, মৃত্যুর কারণ ঠিক জানা যায়নি।" তারিক ২১শে জুলাই ২০১৮।অবশ্য, মিস্টার সরকারের এক বার স্ট্রোক হয়ে গেছে।আরেকবার স্ট্রোক হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয়।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এলিয়ে বসল। আজকেই উকিল মিস্টার পাকড়াশী বলে সব সম্পত্তি রিয়ার নামে করিয়ে দিয়েছে সে। অহা বেচারি কি কষ্টই না পেয়েছে। এক সময় কত কদর্য, কুৎসিত, আশ্রাব ভাষায় তিরস্কার করেছিল সে, আজ রিনার ওপর সব চেয়ে বেশি মায়া লাগে। রিনা এতো বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের মেয়ে হয়েও তার সঙ্গে মানিয়ে চলেছে। আছে ছেলেমেয়ে না হওয়া কি কোন মহিলার চারিত্রিক দোষ?  ভেবেও নিজে কিরকমের পাষানের মতো সমবেদনাহীন মনে হয় মিস্টার সরকারের।
গলাটা কিরকম জ্বালা করতে লাগল মিস্টার সরকারের।ক্রমশ বুক জ্বালা করতে লাগল। হাতের কাপটা হাত থেকে পড়ে গেল। ধীরে ধীরে যেন সব মিলিয়ে যাচ্ছে, চোখের কোন দিয়ে মিস্টার সরকার দেখতে পেলেন যে রিনা মুচকি হাসছে  মিস্টার সরকার লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।
পরেরদিন খবরের কাগজে বেরোলো,"শহরের সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট মারা গেছেন, মৃত্যুর কারণ ঠিক জানা যায়নি" ।

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?