গল্প সমগ্র - ১৪

ঘটনা

কুমার সোম

     ঘটনাটা ঘটেছিল অনেকদিন আগে ব্রিটিশ আমলে । তখন পার্টিসন হয়নি। আমরা দুদেশে বিভক্ত হইনি। তা আমি সবে ডাক্তারি পাস করে আসামের  একটা চা বাগানে কাজ করবো বলে রেডি হচ্ছি, তখন আমার মা জানালো তারা একজন মেয়েকে ঠিক করে রেখেছে আমার জন্যে। তখন আমার আর বয়স কত, পঁচিশ হবে। বিয়ের জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না।

মা জোর করাতে গেলুম মেয়ে দেখতে নিউ আলিপুরে। বাইরের ঘরে বসে আছি , মেয়েটি চা নিয়ে এল। কি বলবো যেমন রূপ, তেমন গায়ের রং আর তেমন আদব কায়দা, মানুষের মন ভুলিয়ে দেবার মত। এখানেই বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেল।

মেয়ের বাড়ী থেকে আমার ডাক এলো। আমি আসাম যাবার আগে মেয়েটি আমার সাথে দেখা বলতে চায়। আমি মাকে বললুম, ‘ মা আমি এখন কি বলি? কি করে বলি যে কেন এখনই বিয়ে করব না?’ মা বললো ‘যানা দুটি কথা বলতে চায়, বলে আয়। আমার মনে হয় তোকে ওর ভাল লেগেছে, তোকে কথা দিয়ে আসতে হবে কবে বিয়ে করবি ।‘

ওরা বেশ বনেদি ঘর, নিউ আলিপুরে বিরাট বাড়ী। কথায় কথায় মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো আমার তাকে ভালো লেগেছে কিনা। আমি বললাম ভালো লেগেছে। বাড়ীর সবাই বাইরের ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, চা নিয়ে বসে রইলাম আমি আর ঐ মেয়েটি। নানারকম কথা হল। সে জানালো তার বয়স পঁচিশ, বিয়ে সে করতে চায়, আর তার এই একাকী জীবন ভালো লাগে না। সে একটা অফিসে ক্লার্কের কাজ করে, ডালহাউসিতে। বাইরে বেরুলে অনেক পুরুষ মানুষ পেছু নেয়। অফিসের লোকেরা তাকে খুব বিরক্ত করে। আমি বললাম যে আমি আসামে সেটল করে তাকে বিয়ে করে নিয়ে যাব। মেয়েটি তার হাতের ওপর হাত রেখে আমাকে কথা দিতে বললো। সেদিন রাজী হয়েছিলাম তাকেই বিয়ে করব ।      তারপর আমি পাড়ি দিলাম আসামের ঘন জংগলে একটা বিরাট চা বাগানের রেসিডেন্ট ডাক্তার হিসেবে কাজ করতে। বছর ঘুরে এল, পাপিয়া প্রায়ই আমাকে চিঠি দিত। অনেক কথা লিখত, তার বাড়ীর অনেক খবর দিত। তার মা বাবা ভাইবোনের খবর, আমি কবেই বা আসবো, কবেই বা বিয়ে হবে আমাদের, ইত্যাদি।  আসামের চা বাগানে কাজটা একঘেয়ে লাগতো আমার। চা বাগানের মজুরদের কঠোর জীবন। সকালে উঠে তারা হাড় ভাঙ্গা খাটুনি খাটতো, অসুখ বিসুখ তাদের হত না খুব একটা। তবে হিল ডায়েরিয়া বা ওই ধরনের ছোটো খাটো অসুখ লাগেই থাকতো। বড় অসুখ টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া যে হত না তা নয়। তবে বড় অসুখ করলে আমাদের আসামের উপত্যকা থেকে মাইল চল্লিশ দূরে ডিব্রুগড়ের হাসপাতালে পাঠানো হত তাদের। আমার বাংলো থেকে আমাদের চা বাগানটা দেখা যেত অনেক দূর পর্যন্ত। আমি রাত্তিরবেলা বাংলোতে ফিরে আমার শখের কলকাতার বইমেলা থেকে কেনা বইগুলো নিয়ে পড়তাম।

      অনেক বড় বড় ফিলসফারদের জীবনের মানে নিয়ে লেখা। অনেক সাধুপুরুষদের কথা। তারা নতুন নতুন ভাবে জীবনের ওপর তাদের মতামত জানিয়ে আলোকপাত করে গেছেন। ভাবতাম আমাদের এই ছোট্ট জীবনের অর্থটাই বা কি? আমরা এই পৃথিবীতে এসে দুদিনের জন্য সুখ, দুঃখ, ভালবাসা, বিয়ে, সন্তানদের নিয়ে তাদের ভবিষ্যতের পুরোটা না দেখে আবার কোথায় যেন মিলিয়ে যাই। আমার বাড়ীতে ঝিমলি বলে একটি পাহাড়ি মেয়ে এসে আমার ঘর দোর পরিষ্কার করতো, ভাল মন্দ রান্না করে দিয়ে যেত রাত সাতটার আগেই। ও আমাদেরই চা বাগানের মজুর। ওকে দেখে মায়া হত। বয়স কত আর হবে উনিশ কি কুড়ি । খুব হাসি খুশী ছিল ঝিমলি। ওর হাসিটা আমার মনে অনেকদিন দাগ কেটে রেখেছিল। আমাকে দেখলেই ও খিল খিল করে হাসতো আর বলতো ‘বাবু তু শাদি করবি না?’ বলেই পালিয়ে যেত আমার থেকে অনেক দূরে নীচের চা বাগানের দিকে। আমার মনের কোনে ও অনেক আলোড়ন তুলে যেত। এত সুন্দর একটা মানুষের সংস্পর্শে আমি কোনদিন আসিনি। আমি ঝিমলির আসার অপেক্ষায় থাকতাম। এরকম করে বাগানে কাজ করতে করতে বছর দুই কেটে গেল। আমি ভাবলাম এবার আমার বিয়ের ইচ্ছেটা একটু বেড়েছে, এবার কলকাতা গিয়ে বিয়ে করবো। সেদিন কলকাতা যাব বলে বাক্স গুছোচ্ছি, দেখলাম ঝিমলি আমার জন্যে অনেকক্ষণ সে বললো পাপিয়াকে একটু মেডিকাল কলেজে ভর্তি করা দরকার। আমি আর ডাক্তার বন্ধু প্রবীর পাপিয়াকে মেডিকাল কলেজে ভর্তি করলাম। প্রবীর তার পুরনো চেনা এক হেড অফ দি ডিপার্টমেন্টের আন্ডারে পাপিয়াকে তার ওয়ার্ডে রাখলো। প্রায় মাসখানেকের মধ্যে পাপিয়া সুস্থ হয়ে উঠলো। আমি আমার চা বাগানে তার করে আমার ছুটি আরো দিন পনেরো বাড়িয়ে নিলাম। পাপিয়া ভালো হয়ে যাবার পর মাকে বললাম ঘটা করে বিয়ে দেবার সময় আর নেই, আমরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করবো। বিয়ে করে আমি আর পাপিয়া আসামের চা বাগানে পাড়ি দিলাম। পাপিয়াকে নিয়ে আসামের জংগলে আমার ছোট্ট বাংলোতে নতুন বিবাহিত জীবন শুরু করলাম। চারিদিকে আসামের ঘন জংগলে আমাদের ভালো কাটছিল। আমি পাপিয়ার শরীরের খুব যত্ন নিতাম। আমাদের জীবন ভালো কাটতে লাগলো। আমি পাপিয়াকে একজন খুব বড় ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার বললো, তার আগে যে কঠিন অসুখ করেছিল তার জন্যে তার সন্তান হবার সম্ভাবনা খুব কম।

আমার আর পাপিয়ার চা বাগানে চা বাগানে গোটা দু বছর সুন্দর কেটে গেল। বাগানের কাজ করে ফিরে এসে আমরা হাঁটতে বেরুতাম, ঘন জংগলে চা বাগানের ভেতর দিয়ে। কত রং বেরং এর পাখী উড়ে বেড়াতো। সেদিন আমি আর পাপিয়া হাঁটছি, হঠাৎ দেখলাম ঝিমলি কোলে একটা সুন্দর মেয়ে নিয়ে, চা পাতা তুলছে। আমাকে দেখে দৌড়ে এসে বললো ‘বাবু তুমি শাদি করিছ, তোমার বৌমা ভারী সুন্দর দেখতে ‘। বলেই সে বৌমাকে জড়িয়ে ধরে বললো ‘ মাজি কাল সামকো হামার বাড়ীতে আসেন না? আমি আপনাকে এসে লিয়ে যাব, হামি আপনাকে রান্না করে খাওয়াবো ‘। ঠিক পরের দিন ঝিমলি আমাদের তাদের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে নিয়ে গেল, তার মার বাড়ীতে। তার মা আমাদের চা বাগানে মজুরের কাজ করে। আমার ফটোগ্রাফির পুরনো শখ। আমি ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলাম। ঝিমলির মিষ্টি হাসি আর তার কোলে তার সুন্দর মেয়ের ছবি তুললাম, আমার বাইরের ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখবো বলে। কথা বলতে বলতে আমি ঝিমলিকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘এই ঝিমলি, কিরে তোর বরের কাছে কবে যাবি রে, না এখানেই মার সাথে থেকে যাবি?’ দেখলাম তার বেয়ে জল পড়লো। বুঝলাম তার বিয়েটাতে কোনো গন্ডগোল আছে। আমি বললাম ‘থাক থাক চোখ মোছতো, আমরা তোর সাথে আনন্দ করতে এসেছি যে ‘। তারপর ঝিমলির কান্না আর থামে না। ওর দুঃখের জীবনী বলতে আরম্ভ করে দিল। 

     যা বুঝলাম কথা শুনে, যে ওর বর খুব দারু খায়। দারু খেয়ে ওকে খুব মারধোর করে। সে অনেকদিন বাড়ীতেই থাকে না রাত্তিরে, অন্য মেয়ে মানুষের সাথে রাত কাটায়। আমাদের ওকে দেখে মায়া হল। আমার বৌ পাপিয়া আমাকে পাশের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললো ‘চলো না আমরা ঝিমলিকে আমাদের বাড়ীতে নিয়ে রাখি, আমাদের কোনো সন্তান হয়নি, আমি ওর মেয়েটাকে দেখবো, ওকে স্কুলে পড়াব‘। আমি ঝিমলির মাকে পাশের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে ওই কথা বললাম। ওর মা রাজি হলো। 

     তারপর আমাদের ঝিমলিকে নিয়ে জীবনটা বেশ ভালোই কেটে গেল তিন বছর। আমাদের ভয় ছিল ঝিমলির জরু এসে আমাদের ওপর হামলা না করে। আমি ডিব্রুগড়ে আসামের বড় হাসপাতালে রেসিডেন্টের কাজ পেয়ে চলে গেলাম ঝিমলিকে সাথে নিয়ে তার জরুর থেকে অনেক দূরে।  

    বেশ কিছুদিন পর আমাকে ঝিমলি বললো সে তার মেয়েটাকে নিয়ে তার মার সাথে দেখা করতে যাবে। আমরা রাজী হলাম। সে তার মার সাথে দেখা করতে গেল। প্রায় পনেরো দিন কেটে গেল ঝিমলি আর আসে না। আমি গাড়ী চালিয়ে শনিবার অফিস থেকে ছুটি নিয়ে, গেলাম তার মার বাড়ী। গিয়ে যা দেখলাম তা কল্পনা করা যায় না। ঝিমলির বর তাকে ভীষণ মারধোর করেছে যেহেতু সে তার কাছে ফিরে যায়নি। আমি ঝিমলি আর তার মেয়েকে আবার আমার কাছে নিয়ে এসে তার শরীরের সমস্ত ঘা গুলো সারিয়ে তুললাম। তার কিছুদিন পর ঝিমলির মার একটা চিঠি এলো। চিঠিতে মা লিখেছে ঝিমলির জরু খুব বেশী মদ খেয়ে মারা গেছে। সেদিন রাত্তিরে ঠাকুরের সামনে ঝিমলি খুব কেঁদেছিল, কাঁদতে কাঁদতে সে প্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল। আমার বৌ খুব সেবা শুশ্রূষা করেছিল তার। সেদিন বুঝেছিলাম ঝিমলি তার বরকে কতটা ভালোবাসতো। কেন যে ওর বর ওকে ছেড়ে অন্য মেয়েমানুষের কাছে যেত ও মদ খেতো তার কোনো উওর পাইনি খুঁজে। মনে হয়েছিল বড় বড় মনীষীদের কথা ‘এই জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাওয়া যায় না, এরই নাম জীবন ‘।

বাড়ীর বাইরে বসে আছে । আমি বললাম ‘কি রে ঝিমলি কি হয়েছে, আমার জন্যে বসে আছিস কেন রে, কিছু বলবি? ‘ ঝিমলি কাঁদো কাঁদো মুখে বললো ‘ আমার বাড়ীর লোক আমাকে একটা লোকের সঙ্গে বিহা করতি বলতিছে, লোকটা খুব দারু খায়, হামি ওকে বিহা করুম না, বাবু ওই লোকটা ভাল লয়’  বলে আমার পা ধরে কাঁদতে আরম্ভ করে দিল। ‘বল বল বাবু আমি কি করি, আমি এখান থেকে পালিয়ে যাব অনেক দূরে। আপনি আমাকে কিছু টাকা দিয়ে আপনার জীপ গাড়ীতে করিয়া ছাড়িয়া আসুন।‘ অনেক বুঝিয়ে ওর চোখের জল আমার রুমাল দিয়ে মুছে দিলুম সেদিন। 

       শুনলাম ঝিমলির ইচ্ছা না থাকলেও ওর মা ওকে সেই লোকটার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। সে তার জরুর সাথে তিরিশ মাইল দূরে আরেকটা চা বাগানে আছে।  তারপর আমার কলকাতা থেকে মায়ের চিঠি এল। পাপিয়ার খুব অসুখ, ডাক্তাররা ঠিক ধরতে পারছে না। প্রায় দুবছর পর আমি একমাসের জন্যে আসামের জোরহাট স্টেশন থেকে ট্রেনে করে কলকাতা রওনা হলাম পুজোর ছুটিতে। 

    কলকাতায় বাড়ি পৌঁছে বাক্স প্যাঁটরা রেখে গেলাম পাপিয়ার বাড়ি, মার সাথে। নিউ আলিপুরে ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখি পাপিয়া শয্যাগত, চেহারা তার ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে। ভগবান তার মুখের সুন্দর হাসিটা কেড়ে নিয়েছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম তার গা পুড়ে যাচ্ছে। আমি আর থাকতে পারলাম না। আমি মাকে বাড়িতে নামিয়ে আমার খুব পরিচিত ডাক্তার বন্ধুর বাড়ী গেলাম, ট্যাক্সি করে। তাকে নিয়ে পরের দিন পাপিয়ার বাড়ী এলাম।

 

যাপিত জীবন

রোমন্থনে রমণী

পদ্মনাভ অধিকারী

     পীরের বাড়ী। কিন্তু' সেখানে কোনো ঘরবাড়ী নেই। লোকালয় থেকে বেশ দূরে- ঘন গাছপালা ঘেরা একটা জায়গা। শীত গ্রীষ্ম সব আবহাওয়ায় জায়গাটা উপভোগ্য। দাবন পীরের স'সন্তান। অদ্ভুত ব্যাপার, কোনো কালেও এখানে কোনো রকম ঘরবাড়ী ছিল কিনা তেমন নিশানাও মেলে না। অথচ বছর বছর এখানে মাঘমাসের শেষে লাখো মানুষের ঢল নামে। ভক্তেরা গানে গানে আর বিবিধ পানীয় পানে মাতোয়ারা হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হল পীর বংশের সদস্য যারা আছে, তারা পর্যায়ক্রমে খাদেম ও পীরের স'সন্তান জুড়ে থাকে। গভীর রাত অবধি চলে কেবল ভক্তদেরই মেলা। যারা ভক্ত নয়- তাদের মাঝ রাতের আগেই ফিরে যেতে হয়। এই দাবন পীরের ভক্ত রমেন ঋষি। তার অঞ্চলে সে পীরের খাদেম। তার বাড়ীতেও ভক্তরা যায়। সেখানেও উৎসব চলে সাতদিন। তবে এ স'স্থানে আগেই হয়। সে এসে হাজির হয়েছে দু’দিন আগে।   রাত পোহালেই মেলা শুরু করে। মাঝ রাতে রমেন- লক্ষ্য করে একজন রমণী সারি সারি গাছের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসছে। তার হাতে একটা হ্যারিক্যান। পরণে বকের পালকের মত সাদা বসন। রমেন অবাক বিস্ময়ে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে খোলা জায়গায় ঘাসের উপর। তার মতো অসীম সাহসী মানুষ আজ কেন কুঁচকে যাচ্ছে সে নিজেও বুঝতে পারে না। ধীরে ধীরে রমণী কাছে আসে। রমেন সহসা সরে গিয়ে একটা প্রকাণ্ড বটগাছের গায়ে সেটে দাঁড়ায় আর লক্ষ্য করে। রমণী এসে ঘাসের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে, উঠছে না বহুক্ষণ! রমেন দেখতে  থাকে। এক সময় রমণী বাতাসে ভর করে উপরে উঠতে থাকে। ঠিক যেভাবে শুয়ে ছিল- সেভাবেই ক্রমাগত পরে উঠতে থাকে। রমেন এবার নিজেকে সামাল দিতে পারে না। সে ভাবে- - একি কাণ্ড। এ রমণী কোন স-রের সাধিকা। নিশ্চয়ই পীরের সান্নিধ্য পেয়েছে সে। রমেন ধীর পায়ে কাছা কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দপ করে হ্যারিকেন নিভে যায়। শিহরে ওঠে রমেন। সে ভাবে কি ব্যাপার! আলো নিভে গ্যালো ক্যানো? তবে কি রমণীটা কোন জেন- পরী হবে। হতেও পারে- পীরের ভক্তের মাঝে বহু জীন-পরী থাকার কথা সে শুনেছে। ভাবনার ভেতর হঠাৎ- বাঘের গর্জন শুনতে পেয়ে ঘাবড়ে যায় সে। সরে পড়ে। 
ভয় ঠেকানে সাথে রাখা গ্যাস লাইটটা জ্বালায়। সে কি! রমণীটা গেল কোথায়। তার সামনেই তো ছিল। কিন্তু' গোল কোথায়। আচমকা রমেন তার কাঁধে নরম হাতের স্পর্শ অনুভব করে। সে বলে ওঠে- কে? 

হ্যারিটা জ্বলে ওঠে। সামনে দাঁড়ানো অপরূপ রমণী মুখে হাসিভরা। সে বলে
- কি রমেন দা- ভাল আছ তো, অবাক হচ্ছো কাণ্ড দেখে? রমেন সাহসের সাথে বলে- 
- না-না, ঘাবড়ানোর কি আছে। তুমিতো ভালই রফতো করেছ। কিন্তু' কিভাবে করলে? 
- আমাকে চিনতে পেরেছ রমেন দা? 
- হ্যাঁ, পেরেছি, তুমি নবিছন না? 

-- হ্যা।  

স্বামীর ঘরে ফিরে যাওনি তাহলে?

- না। - ছেলেটা? 

- ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করে- এখন মস- বড় অফিসার। - তোমার খোঁজ খবর নেয় তো? 

- পত্র মারফৎ। 

- তা হবে ক্যানো, নিজে আসে না? 

- দাদা-চাচাদের বাধ্য কিনা। 

- ও বুঝেছি। তা তুমি কি এ পথেই আছ? 

- হ্যাঁ- আছি। 

- কিন্তু' কিভাবে বল- ? 

- প্রথমে দ্যাখা শোনা, তারপর আলাপ পরিচয়, তারপর দেহদান- দিদার- সবশেষে অর্জন।

- কি বলছো তুমি, এযে আজগুবি কথাবার্তা! না-না- তুমি ধাপ্পা দিচ্ছো। তুমি যা বল্লে- তা কি করে সম্ভব। 

- অবশ্যই সম্ভব। তুমি তো পীরের ভাবানুসারী মাত্র। 

- হ্যাঁ, সেভাবেই তো সব ভক্তেরা আছে ও থাকবে। 

- দীদার না হলে মীনারে চড়বে কি করে? মীনারে না উঠলে বেহেশতের পথ দেখবে কি করে? পীরের সাথে মিলন না ঘটলে- তুমি কার সাথে সাথী হয়ে সেখানে পৌঁছাবে? 
- কর্মের মাধ্যমে। 
- পীরের সাথে দৈহিক মিলনের ফলে যে বন্ধন সৃষ্টি হবে- সেই বন্ধনের মাধ্যমেই মহাজাগতিক বন্ধন ছিন্ন করে দোহে মিলে একাকার হয়ে- ঐ একই স'স্থানে গিয়ে উপস্থিত'ত হওয়া যায়। 
- তা কি করে হবে, গুরুজি তো তেমন কথা বলেনি কোনদিন?
- ক্যানো? পীরের গান আছে না। দাবন গেয়েছে- 

প্রেমের রসে হয়ে মাতাল 
গুরু পদে দেরে পাতাল 
পাতাল ছুঁয়ে দিলে গুরু 
তোর হবেরে সবই সামাল ॥ 

ও সে চাম আটুলির মত 
থাকবি সাথে তুই অবিরত 
ফেলতে তোরে পারবে না সে 
থমকে রবে এই মহাকাল। 

গুরুপদে ভক্তি মতি 
তারই সাথে রতিপ্রীতি 
আবার, তারই সাথে ঘর-বসতি 
তবেই মেলে নূর-মহাল ॥ 

রমেন বলে- কি শোনালে তুমি নবিছন!! তুমি কি সত্যিসত্যিই পীর পরবর্তী খাদেমের খাদ্য হয়েছ? 
- হ্যাঁ, তবেই তো- আমার মত কতশত সেবিকা শেষ রাতে এখানেই আসবে বলে আমিও এলাম। অবাক হলে বুঝি? 
- না- মানে- তোমার পক্ষে যা সম্ভব হয়েছে, সে কাজটা পুরুষ ভক্তদের পক্ষে কি করে সম্ভব। তা করতে গেলে তো- ভোগ বাসনা বাড়বে। সেটা বাড়লে- 
নবিছন বলে- বোকার মত কথা বোলো না রমেন দা। যাকে ধরে চলবে তাকে বাদ দিলেও মরবে। জগতে সব নাগরের নগরী পরিক্রমার বাসনা ছিল। একাজটা বিপরীতে সম্ভব। সম মেরুতে তা হয় না। 
রমেন বলে- তা হলে- গুরু পরম্পরা একাজটা চলে আসছে, কই এ কথা আমরা তো জানতে পারিনি! ভোর হতে থাকে, বাড়তে থাকে বনানীর ভিতর ভক্তদের ভীড়। বাজতে থাকে বাদ্যযন্ত্র। রমেন মাথা নিচু করে পীরের দরবার ছাড়ে। পিছ থেকে ডাকতে থাকে নবিছন। দাদা- দাদা যেও না। 

 

সজিবাবু

প্রদীপ চক্রবর্তী

    এত বড় লেজওয়ালা পাখি ইদানীং বেশি চোখে পড়ে না। পাখিটির নাম সাহেব। এই পাখির অন্য কোন নাম আছে কিনা তা তরাব আলীর জানা নেই। মাঠের কোনের ঘন বন থেকে ধরেছে সে। আগ্রহ নিয়ে দেখতে আসছে অনেক লোক । পাখিটিকে রাখা হয়েছে খাঁচায়। আর ঠেলে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে নানা রকমের খাবার। ভালো একটা দামও হাঁকিয়েছেন তরাব আলী। কিন্তু' দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়-য়া সুজন এই পাখিটাকে কোথাও বিক্রি হতে দিতে চায় না। যত দামই হোক সে আনতে চায় নিজের বাড়িতে। এক্ষেত্রে তাকে একমাত্র সহযোগিতা করতে পারে তার থেকে আট বছরের বড় একমাত্র বোন সজিনা। যাকে ছাড়া সে দুনিয়ার কিছু চিন্তাও করতে পারে না। ঠিক যেন গাছ কে গাছ আর গরু কে গরু বলতে শিখিয়েছে তার সজিনাবু। সজিনাবু সুজনের আবদারের কথা শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। যেকোন কিছুর বিনিময়ে তার ভাইয়ের আবদার পূরণ করতে চান। কিন্তু' পরের জমিতে রাত-দিন হাড়ভাঙা খাটুনি করে সংসার চালানো বাবা খলিল মিয়ার কাছে এ আবদার করা বেশ বিলাসিতা হবে। মাও এটা মেনে নেবেন না। তাই সজিনাবু তার হাতের রূপার বালাটা পাশের বাড়ির পাচুবিবির কাছে গোপনে বন্ধক রাখলেন। আর তার বিনিময়ে খাঁচা সহ পাখিটা আসলো সুজনদের বাড়িতে। সুজনের যেন আনন্দের সীমা রইলো না।  মা ঠিকই বুঝেছিলেন যে কিসের বিনিময়ে তার এই শখ মিটলো। তবে কিছুই বললেন না। এমনি ভাবে সুজনের সব শখ কিম্বা ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণ করতে থাকে সজিনাবু। বাবা-মা আর সজিনাবুকে নিয়ে সুজনদের দিন কাটতো অভাব-অনটনে। তবে হাঁড়িতে ভাত না থাকলেও সুজনের থালায় কখনো ভাতের কমতি পড়তো না। 

    হঠাৎ কেন জানি বাবা সজিনাবুর বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সজিনাবুর জন্য সুন্দর একটা বর খোঁজা হচ্ছিলো। সজিনাবু সবাইকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে না। 

এগিয়ে আসতে লাগলো মাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষা । আর এদিকে সুজনের দুষ্টুমি বেড়েই চললও।  দত্ত পুকুর থেকে বার বার গিয়ে নানা রকম অজুহাতে তুলে আনলেও হঠাৎ জ্বর বাঁধিয়ে বসলো। জ্বর সারতেই আবার সাঁতরাতে শুরু করলো দত্ত পুকুরে। একদিন সজিনাবু জোর করে তুলে আনতেই সুজন রেগে গিয়ে বলল, তোর বিয়ে হলে আমি বাঁচি। তখন দেখবো কে আমায় ঠেকায়। সকালে নামবো আর রাতে উঠবো। সজিনাবু আঁচল দিয়ে সুজনের মাথা মুছাতে মুছাতে খিল খিল শব্দে হেসে উঠলেন। মুহূর্তে তা আবার মিলিয়েও গেল। 

সজিনাবুর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া হলো। বিয়ের দিন ঠিক হলো। বিয়ের দিন এগিয়ে আসতেই সজিনাবু সুজনকে আদর করতে করতে বললেন, আমার তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এখন আর তোকে কেউ দত্ত পুকুরে নামতে বাঁধা দেবে না। কি ভালো! না? সুজন সজিনাবুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। 
    ঠিকই বিয়ে হয়ে গেল সজিনাবুর । কিন্তু' জীবন সম্পূর্ণ পাল্টে গেল যেন। বিয়ের পর পরই তার মুদি দোকানদার স্বামী মতিন সময়ে অসময়ে টাকার দাবি করতে থাকে। কৃষক বাবার পক্ষে মতিনের সব দাবি মেটানো সম্ভব হয় না। সজিনাবুকে তার স্বামী খুব মারতো। মতিনের উপর ওর খুব রাগ হতো সুজনের। একবার সজিনাবু যখন বাড়িতে আসলো তখন কানের দুল, নাকের নোলক এগুলো না দেখতে পেয়ে মা বললেন, তোর রাক্ষস স্বামী কি ওগুলো খেয়ে ফেলেছে। সজিনাবু কেঁদে উঠে বলেন, আবার টাকা চেয়েছে। বিক্রি করে দিয়েছে তার দোকানটা।     সজিনাবু বাড়ি ফিরে এলেই কেমন জানি নিস্তব্ধতা নামে বাড়িটাতে। এখন প্রকাশ্যেই কাঁদতে দেখা যায় তাকে। সুজন ভাবে যেভাবেই হোক সে সজিনাবুর মুখে হাসি ফুটাবে। দের বাড়ির পিছনের ছোট্ট জায়গাটাতে ঠেলে গুঁজে অনেক গুলো গাছ লাগালো। গাছগুলো যত্ন করে আর সজিনাবুকে বলে,

বুবু দেখ! মার গাছগুলো কত তাড়াতাড়ি বাড়ছে। আর কখনো কেঁদো না বুবু। দেখো, আমি দুলাভাইকে অনেক টাকা দেব। তোমার কানের দুল, নোলক সব কিনে দেব। সজিনাবু সুজনকে জড়িয়ে ধরে। সজিনাবুর চোখে একটা আলোক ঝলকানি দেখা যায় যেন ,তা আবার মিলিয়েও যায়। 

    সুজনের ছোট গাছগুলো বড় হতে থাকে। বাড়তে থাকে সুজনের স্বপ্ন। কিন্তু' সজিনাবুর বাড়িতে আসা আর শ্বশুর বাড়িতে ফিরে যাওয়া পূর্বের মতোই চলতে থাকে। সুজন একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখে, উঠোনের এককোণে মানুষের ভীড়। কান্নার শব্দ আর চাপা দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ঘুরপাক খেতে খেতে ছড়িয়ে যাচ্ছে বহুদূর। সাদা কাপড়ে ঢাকা ছিল সজিনাবু। তাদের ছোট্ট উঠোন পুরো গ্রামের আংশিক মানুষকেও আশ্রয় দিতে পারছিলো না। তাই সারি ধরে সবাই আসছিলো। তাদেরকে কেউ অন্য সময় খোঁজ না নিলেও এখন অবশ্য সব শ্রেণীর মানুষকেই দেখা যাচ্ছে। সজিনাবুর গলায় দড়ির দাগটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো। সুজন বুঝতে পারলো তার বুবু চলে গেছে না ফেরার দেশে। তার গগনবিদারী চিৎকার সবার চোখে পানি আনলো কিন্তু' বুবু কোন সাড়া দিলেন না। 

আজ এতবছর পর বুবুর মুখটা মনে পড়তেই চোখ ভিজে উঠলো সুজনের। তার ছোট গাছগুলো এখন অনেক বড় যা কাটতে পাশের বাড়ির দবির শেখ বাবার সাথে অনবরত তর্ক করে চলেছেন। দবির শেখ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, এ গাছ গুলো আমার। বাবা করুন স্বরে বললেন, এ গাছগুলো আমার সুজন লাগিয়েছিল। দবির শেখ বললেন, তুমি একটা মুরব্বি মানুষ হয়ে মিথ্যা কথা বলো কি ভাবে? এ গাছগুলো এমনিতে হয়েছে। আমি কামলা খাটিয়ে, যত্ন আদ্দি করে এত বড় করেছি। তাছাড়া এটাতো আমার জমির ভেতর পড়েছে।
বাবা আবার বললেন, না ! এটা আমার জমির ভেতর।
দবির শেখ একটু উপহাসের ভঙ্গিতে বললেন, আরে ভাই, যদি মাপো, তবে দেখবা সব গাছ আমার জমির ভেতর পড়েছে। তাছাড়া আমি তো আর সব গাছগুলো কেটে নিচ্ছি না। দশটার ভেতর দুইটা তোমার জন্য রেখে দিচ্ছি। 

সুজন এখন আইন নিয়ে শহরে পড়াশোনা করে। আর কিছুদিন গেলেই তার পড়াশোনা শেষ হবে। সুজন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল দবির শেখের কান্ড। হঠাৎ অসুস' মা পাশের ঘর থেকে কাতর স্বরে বললেন, সুজন... বাপ তোর গাছ সব কেটে নিয়ে যাচ্ছে। থামা বাপ থামা। 
    সুজন বাইরে বেরিয়ে আসতেই দবির শেখ আর বাবা চুপ করে গেলেন। এরপর বাবার হাত ধরে বাড়ির ভেতর আনতেই বাবা বললেন, না এটা চরম অন্যায়। তোর লাগানো গাছ ওরা নিজেদের দাবি করছে। সুজন বলল, থাক বাবা। যার জন্য আমার এই স্বপ্নের গাছ সে-ই যখন নেই তখন মিছে তর্ক কেন? আমার বোনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি, ধরে রাখতে পারিনি তার হাসি মুখ। আর কয়েকটা দিন গেলেই ঠিক চিনে নেব সীমানা , অধিকার । এমন হাজার বোনের স্বপ্ন পূরণে পাশে থাকবো বাবা। বাবার চোখের পাতা ভিজে ওঠে। শহরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় সুজন।  
   দত্ত পুকুরের পাড় দিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। দেখলো, বিস্তর পুকুরের হাঁটু সমান পানিতে একটা শিশু সাঁতার কাটছে । আর তার বোন দত্ত পুকুরের এপার ওপাড় দৌড়াচ্ছে , অনুরোধ করছে উপরে উঠে আসার জন্য। সুজন সজিনাবুকে দেখতে পেল যেন। অবচেতন মনে ডেকে উঠলো, বুবু...
    মুহূর্তেই বিদ্যুৎ চমকে শুরু হলো বৃষ্টি। চোখের জল আর বৃষ্টি মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল। আবার দ্রুত গতিতে এগিয়ে চললও সুজন। শহরে যাবার শেষ গাড়িটা তাকে যে ধরতেই হবে। 

 

ট্রেনের সেই

লোকটা

সুমন চক্রবর্তী 

    "দাদা আপনার কাছে পাঁচ মিনিট সময় হবে?", আমি লোকটার দিকে অবাক হয়ে হতচকিত দৃষ্টিতে তাকালাম। এই তো কিছুক্ষণ আগে তার সাথে আলাপ হয়েছে। তাও আলাপ বলতে সেরকম কিছু নয়। সন্ধ্যে শেষ হয়ে রাতের দিকের ট্রেন, সেরকম একটা ভিড় কিছু না, তবে কিছু লোকজন তখনও দাঁড়িয়ে আছে। ভদ্রলোক আমি যেখানে বসে আছি ঠিক তার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমায় হঠাৎ একবার জিগ্যেস করলেন, "আচ্ছা আপনি কি কাছাকাছি নামবেন?" আমি কর্কশ গলায় 'না' বলায় বললেন, "কিছু মনে করবেন না। সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পা দুটো বড্ড ব্যথা, তাই জানতে চাইলাম আর কি।" আমি লোকটির আত্মপক্ষ সমর্থনে তেমন একটা পাত্তা দিলাম না। যাইহোক আমার ডানদিকে বসা লোকটা দেবদূতের মত, "আমি সামনেই নামবো।", বলায় লোকটি আমার সামনে থেকে সরে ঐ লোকটির মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ বাদে আমার পাশে বসা লোকটি উঠে যেতেই একগাল হাসি মুখে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে পাশে এসে বসলেন। আমিও ভদ্রতার খাতিরে তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। ব্যাস তার সঙ্গে আমার এইটুকুই আলাপ। এই আলাপের সূত্র ধরে যখন কেউ, "আপনার কাছে পাঁচ মিনিট সময় হবে?", কিনা জানতে চায় তখন কিছুটা হলেও অবাক এবং বিরক্ত লাগে। প্রথমতঃ আমি বরাবরের কম মিশুকে। তাই অপরিচিত কারুর সাথে যেচে আলাপ করা বা কেউ করতে চাইলেও প্রশ্রয় দেওয়া আমার ধাতে নেই। এবং আমার ধারণা যারা কথার শুরুতেই অল্প মাত্রার একটা সময় নির্দিষ্ট করে, তারা আদতে বেশি কথা বলে। আমি কিছু উত্তর না দিয়ে, শুনেও না শোনার ভান করে, পিঠটা সিটে সেঁটে দিয়ে দুচোখ বন্ধ করলাম। সাধারনতঃ আমার এরকম ব্যবহারে লোকটি নিজের উত্তর পেয়ে যাবেন ভেবেছিলাম। কিন্তু দেখলাম উনি বরং উল্টো বুঝলেন। বা হয়তো আমার উত্তরের সেরকম তোয়াক্কা করলেন না। একটু আগে কেনা বাদামের প্যাকেট থেকে কয়েকটা বাদাম মুখে ঢেলে লোকটি বললেন, "আপনি বোধহয় খুব বিরক্ত হচ্ছেন আমার কথায়। নিতান্ত অপরিচিত একজন মানুষ গায়ে পরে যেচে কথা বললে বিরক্ত লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যাটা কি বলুন তো এখন আমার মন চাইছে কিছু কথা বলতে। মনে যা আসছে সেগুলো বলতে ইচ্ছে করছে। ট্রেনে লোক বলতে আপনার সাথেই আলাপ। তাই আর কি।" আমি খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললাম, "বলুন কি বলবেন।" মনে মনে ভাবলাম - 'আজ কি কুক্ষণে যে আগের ট্রেনটা হাতছাড়া হয়ে গেল।' সাধারনতঃ আমি এর আগের ট্রেনেই রোজ ফিরি। আজও সেটাই ধরতে আসছিলাম কিন্তু ট্র্যাফিক জ্যামে সব ভেস্তে গেল। ভদ্রলোক বাদাম চিবোতে চিবোতে বলতে শুরু করলেন, "আসলে আমার আপনার কাছে একটা পরামর্শ নেওয়ার ছিল।" মনে যতই বিরক্তি থাকুক, কেউ নিজে যেচে আমার কাছে পরামর্শ নিতে চাইছে শুনে বেশ ভালো লাগলো। মনে মনে ভাবলাম - 'তাহলে হয়তো আমায় দেখে লোকটির বেশ পরিণত মনে হয়েছে, তাই পরামর্শ চাইছে'। লোকটির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। দেখতে বেশ সুন্দর। মাথার চুলগুলোতে অল্প পাঁক ধরেছে। চোখে চশমা। পরনে সাদা সুতির জামা আর খয়েরি রঙের প্যান্ট। লোকটি বলতে শুরু করলেন, "আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতক। তারপর পড়াশোনা শেষ হলে একটা ছোট কোম্পানিতে কেমিস্টের চাকরিতে ঢুকি। খুব বিশাল কিছু মাইনে না হলেও খুব খারাপও ছিলো না। বছর কয়েক বাদে বিয়েও করলাম। বাড়িতে তখন আমরা চারজন। আমি বাবা মা আর আমার বউ। কয়েক বছর বাদে আমার একটা ছেলে হলো। সে এখন ক্লাস সিক্সে পড়ে।" পরামর্শ দেবার আশায় শুনতে বসে লোকটির আত্মজীবনী আর সালতামামি শুনে খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললাম, "তা এখানে অসুবিধেটা কি আছে? পরামর্শই বা কি নেবেন?" লোকটি বোধহয় বুঝতে পারলেন যে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে। বললেন, "সে কথায়ই আসছি। রাগ করবেন না। আমি পাঁচ মিনিটের বেশি নেব না আপনার।" লোকটি চোখ থেকে চশমাটা খুলে পকেট থেকে রুমাল বার করে মুছতে মুছতে আবার বলতে শুরু করলেন, "কয়েক বছর পর বাবা মারা গেলেন। মা ও বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লো। সময়ের সাথে সাথে বুঝলাম আমার স্ত্রীয়ের একটু মানসিকরোগ আছে। ডাক্তার দেখানোর চেষ্টা করেও ফল হলো না। আমার মায়ের সাথে তার নিত্য ঝামেলা। আসলে আমার মাকে দেখাশোনা করা তার পছন্দ নয়। আদপে আমার বউটি অত্যন্ত একাসারে এবং সন্দেহপ্রবণ। আমার মেয়ে-বন্ধু এবং সহকর্মীদের সাথে কথা বলা নিয়েও সে আমার উপর সন্দেহ করতে শুরু করলো। বাড়িতে রোজ অশান্তি লেগেই থাকতো। ক্রমশঃ মা আরও অসুস্থ হয়ে পড়লো। আমার বন্ধুমহল বলেও বিশেষ কিছু রইলো । বছর কয়েক আগে, আমি যে কোম্পানিতে চাকরি করতাম সেটা বন্ধ হয়ে যায়। আমার বউ মোটেই মিতব্যয়ী নয়। ফলে কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় সব জমানো টাকা শেষ হয়ে গেল। সবশেষে পেটের দায়ে হকারি শুরু করলাম। যদিও বাড়িতে কাউকে কিছু বলিনি।"  

লোকটির কথা শুনে এবার আমার বেশ করুণা হলো। বললাম, "তা আপনি কি আমার কাছে চাকরি-বাকরির ব্যাপারে পরামর্শ চান?" লোকটি বললো "না। ঠিক তা নয়।" আমি বললাম, "তাহলে?" লোকটি বললো, "মায়ের অসুখ, বউয়ের মাথার দোষ, ছেলের পড়াশোনা, অনেক টাকার দরকার। কিন্তু আমার তো সে ক্ষমতা নেই। তাহলে কি আমার আত্মহত্যা করাউচিত?" লোকটির কথা শুনে আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। যেন একটা ঠান্ডা শিহরণ বয়ে গেল শরীরের ভিতর। বললাম, "ছি ছি। কি বলছেন? আত্মহত্যা মহাপাপ। আপনি তো এতদিন লড়াই করে এসেছেন। এবারও পারবেন। হাল ছাড়বেন না। আর ওসব কথা কখনও মাথায় আনবেন না।" আমার কথা শুনে লোকটাকে যেন সামান্য হলেও ফুরফুরে লাগলো। লোকটিবললো, "অনেক ধন্যবাদ। আমি এই পরামর্শটাই চাইছিলাম। আমার ষ্টেশন এসে গেছে। ভালো থাকবেন।" বাইরে তাকিয়ে দেখলাম ট্রেন তখন অনেকটা ধীরগতিতে স্টেশনে এসে ঢুকছে। ট্রেন দাঁড়াতেই লোকটি নেমে গেল। নামার আগে একবার হাসিমুখে আমার দিকে তাকালো। লোকটি নেমে যাবার পর প্রথমে লোকটার উপর যেরকম রাগ হচ্ছিলো, এবার বেশ মায়া হল, লোকটির পরিস্থিতির কথা ভেবে। প্রায় মাসখানেক পর, সেদিনও আমি আমার রোজকার ট্রেনটা পাইনি। পরের ট্রেন ধরেছি। ট্রেনে আজ তুলনামূলক বেশি ভিড়। আমি তাই ভিতরে না ঢুকে দরজার পাশে দাঁড়িয়েছি। ট্রেনে উঠতেই অদ্ভুতভাবে কেন জানিনা লোকটার কথা একবার মাথায় এলো। যদিও চারপাশে তাকিয়ে তাকে দেখতে পেলাম না। ট্রেন ছাড়বার কিছুক্ষণ পর, হঠাৎ করে একটা গলা কানে এলো। "আপনার কাছে পাঁচ মিনিট সময় হবে?", কণ্ঠস্বরটা খুব চেনা। পিছনে ফিরে দেখি ঐ লোকটা। আসলে আমি আগে খেয়াল করিনি, লোকটি আমার ঠিক পিছন দিকে বসে ছিলো। যদিও আমি মুখ না ফেরালে উনি আমায় দেখতে পারবেন না। যাইহোক কিছুক্ষণ ধরে কান পেতে রইলাম লোকটি আর তার পাশে বসা লোকটির কথোপকথনে। তারপর যা শুনলাম সব কিছুই একদম একভাবে উনি অনর্গল বলে গেলেন। এবং সবশেষে আবার আজকের লোকটিও আমার মতো ওনাকে আত্মহত্যা না করবার পরামর্শ দিলেন। আমার খুব অদ্ভুত লাগলো। মনে মনে ভাবলাম লোকটা কি পাগল? রোজ এক কথা সবাইকে কেন জিগ্যেস করে বেড়ায়। অদ্ভুত রকম একটা রাগ হলো। এরপর বেশ কয়েকদিন ধরে আমি রাতে ঐ ট্রেনেই ফেরা শুরু করলাম। খেয়াল করে দেখলাম লোকটি কোনো নির্দিষ্ট কামরায় ওঠেন না। তবে রোজ একজন করে নতুন লোকের কাছে পরামর্শ অবশ্যই চান। এবং রোজই সবাই তাকে সেই একই পরামর্শ দেয় যা আমি তাকে দিয়েছিলাম। খুব সাধারণ ব্যাপার, কেউ আত্মহত্যা করতে চাইলে যেকোনো সুস্থ মানুষই তাকে মানা করবে। কিন্তু এরকম করবার কারণ কি? আমার কৌতূহল হলো। কেন লোকটি এরকম রোজ করেন। একদিন ঠিক করলাম ওনাকে জিগ্যেস করবো। সেরকম ভেবে ট্রেনে উঠে কিছুক্ষণ ওনার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রইলাম। লোকটি হয়তো আমায় চিনতে পারলেন না, বা চিনেও না চেনার ভান করলেন। স্টেশন আসতেই লোকটি নেমে গেলেন। আমিও তার পিছু নিলাম। অন্ধকার স্টেশনে লোকটিকে "দাদা শুনছেন!" বলে ডাকতেই পিছন ফিরে তাকালেন। আমি বললাম, "চিনতে পারছেন? সেদিন ট্রেনে আলাপ হলো। আপনি আপনার পরিস্থিতি আমায় বললেন। আমি আপনাকে আত্মহত্যা না করার পরামর্শ দিলাম।" লোকটির ফ্যালফ্যাল করা চাহনি বলে দিলো যে উনি আমায় চিনতে পারেননি। তবে খানিকটা ভদ্রতা রক্ষার খাতিরেই বললেন, "হ্যাঁ পারছি। বলুন কেমন আছেন?" আমি কোনো রাখঢাক না করেই বললাম, "আমি লক্ষ্য করেছি আপনি রোজই ফেরবার সময় আপনার পরিস্থিতির কথা কাউকে না কাউকে শোনান এবং কি করা উচিত তার পরামর্শ চান। তা আপনি এটা কেন করেন। কি পান? এটা কি আপনার খুচরো বিনোদন?" লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমি আপনাকে যে যে কথাগুলো বলেছি প্রতিটাই সত্যি। আসলে রোজই বাড়ি ফেরার আগে, নিজের পরিস্থিতির কথা মাথায় আসলে, মনে হয় আজ আর ফিরবো না, রেল লাইনে গলা দিই। আপনাদের মত কাউকে মনের কথা বলে বেশ হাল্কা লাগে। তারপর আপনাদের দেওয়া পরামর্শতে মনে জোর পাই। এভাবেই একটা একটা দিন নিজেকে শক্ত করি, বেঁচে থেকে লড়াই করি। আপনারা না থাকলে কবেই হয়তো মরে যেতাম? আর কি জানেন তো - ব্যক্তিগত সমস্যা চেনা লোকের থেকে অচেনা লোককে বলা অনেক সহজ। তাতে কোনো দ্বিধাবোধ হয় না। আচ্ছা আমি আসছি। আমার ছেলে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।"লোকটি চলে যাওয়ার পর আমি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। প্রথমে ওনার দিকে তারপর অন্ধকারের দিকে। এরপর মাঝে মাঝেই আমি ঐ ট্রেনে ফিরতাম। খুঁজে বার করতাম লোকটিকে, শুনতাম তার গল্প। কি পেতাম জানিনা, কিন্তু শুনতে ভালো লাগতো। লোকটির নাম না জানলেও, ওনার কথা শুনে আমিও যেন মনের জোর পেতাম। ট্রেনের সেই লোকটার গল্পটা শুনে......।

 

প্রেমের দহন

শ্রী রণেশ চন্দ্র মজুমদার

     নায়িকার নাম প্রথমে ভেবেছিলাম শঙ্খমালা। কিন্তু তার ঘন, ভ্রমর কালো, যুগল ভুরু। বিশাল চোখ দুখানা। কৌতুকে, বুদ্ধিতে, জীবনানন্দে সদা ঝিলমিল। স্বচ্ছসলিলা অতল হ্রদের হাল্কা ঢেউয়ের উপর যেন সূর্যের কিরণ। এই চোখ দুখানার জন্য নায়িকার নাম দিয়েছি সুলোচনা। কিন্তু আপনি তো ওর সুলোচন যুগল দেখেননি। কাজেই আপনি ইচ্ছামত অন্য যে কোনো নাম দিতে পারেন। আপনার মনের পরম মমতার ঘরটিতে যেসব আহ্লাদি, দুলালী, রাঙা মাথায় চিরুনি রাজকন্যাদের স্থায়ী বসত, তাদেরই যে কোনো একজনের নাম।     শহরের আদিম ঘিঞ্জি এলাকায় আজন্ম বাস। ঘোষনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবীবিদ্যায় প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে প্রথম ক্যাম্পাস দর্শনেই মোহিত। এ তো কল্প লোক! দিগন্ত বিস্তীর্ণ ক্যম্পাস। ঘাসের কার্পেট । বিশাল গম্ভীর ছায়াঘন প্রাচীন সব গাছ বেয়ে উঠেছে হাতির কানের মত পাতাওয়ালা মানিপ্লান্ট। আরো কত ধরণের লতা! আবার জায়গায় জায়গায় ফুল্লকুসুমিত বাগানের হিন্দোল। কত রং বাহার! কাঠবিড়াল আর হরেক পাখির ফুড়ুক-ফাড়ুক। স্বচ্ছ জলের ঝিল। মাছরাঙা। পানকৌড়ি। হাঁসগুলো নিশ্চয় বুনো । সুনীল আকাশ। উড়ন্ত চিল গুলোর ডানায় যেন সোনালী রোদের গন্ধ। ছেলেরা মেয়েরা ঘুরছে ফিরছে হাসছে বকবক করছে। হাত ধরাধরি। কোমর, গলা জড়াজড়ি। ঝিল ধারের কুঞ্জ ছায়ায়, ফাঁকা ক্লাস রুমে, সিঁড়িতে আশ্লিষ্ট যুগল। অজ্ঞাত যৌবনা সুলোচনা সহসা সুপ্তোত্থিতা।                         মানবীবিদ্যা বিভাগে করিডোরে দেওয়াল ভর্তি ছবি আর ছবি। সবথেকে  নজরকাড়া বিশাল ছবিটির ফোরগ্রাউন্ডে রাজা রামমোহন। চোখে জল টলটল। ব্যাকগ্রাউন্ডে, তলার লেয়ারে, পুরোহিত, বাজনদার, উৎসাহী দর্শক বৃন্দের মাঝখানে একটা গনগনে চিতার দিকে এক মানবীকে ঠেলে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কম্প্যুটার গ্রাফিক শিল্পীর কুশলতায় সব জীবন্ত। মানবীটির আর্তনাদ দর্শকের যেন কানে বাজে। সুলোচনা প্রথম ক’দিন ঐ ছবির সামনে দিয়ে চলতে শিউরে উঠতো। নির্ধারিত দিনে মানবাধিকারীর তত্ত্বাবধানে, নবাগতামেয়েদের সঙ্গে প্রেম করার অধিকার নিলাম হলো। সুলোচনার সঙ্গে প্রেম করার অধিকার নিলামে পেয়েই, কাগজ পত্র নিয়ে, তার অভিসারক , দয়িতাকে ভোগদখল করার জন্য খুঁজে পেতে করিডোরে পেয়ে প্রেমের প্রস্তাবটি দিল। তার চোখে তাকাতেই সুলোচনার মনের চোখে চিতা লেলিহান। সে কোন কথা না বলে, ধীর পায়ে  সরে গেল ।  কিন্তু পিরীতি কাঁঠালের আঠা। এবং দস্তুর মত নিলামে পাওয়া। অভিসারক লেগে থাকলো। করিডোরে, ক্যান্টিনে, লাইব্রেরিতে, অটো স্ট্যান্ডে, সর্বত্র, বিভিন্ন আঙ্গিকে, নানা ঘরানায় প্রেমের প্রস্তাব পেশ করেই চল্লো। হস্টেলের ঘরে, এমনকি পুরী নিয়ে যেতে চাইল। দয়িতার

বাড়িতেও ধাওয়া করলো। প্রেমিক আরকি করতে পারে? ওর পাগলপাগল ভাব। অথচ, সুলোচনা কদাপি, ওর সঙ্গে একটা কথাও বলে না। ক্যাম্পাসে গবেষণা: মেয়েটা তো লেসবিয়ানদের রামধনু রাঙা ব্যাজ পরে না। স্ট্রেট। তবে বেচারা অভিসারককে এত ল্যাজে খেলাচ্ছে কেন? নিলামের মর্যাদা ধুলোয়! ঐকমত – মহা ঠ্যাঁটা। ছেছড়ি। অভিসারকের উপর সমস্ত ক্যাম্পাসের পরিপূর্ণ সহানুভূতি। একদিন ক্যাম্পাস জানলো সুলোচনা মাইগ্রেশান নিয়ে চলে যাচ্ছে। ক্যাম্পাস অধীর আগ্রহে সমাপ্তি অনুষ্ঠানের প্রতীক্ষায়। শেষের আগের দিন। এক বান্ধবীর আমন্ত্রণে সুলোচনা ক্যান্টিনে বিদায়ী ভোজ খেতে গেল। আজ অস্বাভাবিক ভিড়। ও পৌছতেই ভিড় দুভাগ হয়ে ওকে রাস্তা করে দিল। ওরই জন্য একটা খালি চেয়ার। ও বসতেই উলু।শাঁখ। বিয়ের গান।গাল বাদ্য। এসবের মাঝে ক্যান্টিন পরিচালক স্বয়ং মুচকি হাসি মুখে, বিশাল একটা কাঁসার থালায় অনেক ক’টা বাটি সাজিয়ে  সামনে নামিয়ে দিল। সুলোচনা দেখে: সুক্তো, ডাল, আলু ভাজা, গলদা, পাকা মাছ, মাংস, চাটনি, পায়েস, পোলাও। অবিশ্রান্ত উলু, শাঁখ, গানের মাঝে বিমূঢ়া, স্থানু সুলোচনার বান্ধবী আর ক’টা মেয়ে সমস্বরে কলকলিয়ে বল্লো: “আজ তোর আইবুড়ো ভাত। খেয়ে নে”। সুলোচনা ফ্যালফ্যাল করে এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ দেখে টেবিলের ওপারে তার দিকে তাকিয়ে অভিসারক। অজানা  তীব্র ত্রাসে সুলোচনার মুখ কড়ির মত সাদা, হাত পা হিম। না খেয়ে উঠে যাচ্ছিল। সবার চিৎকারে বাধ্য হয়ে একগ্রাস মুখের কাছে আনতেই নিমতলা শ্মশানের মানুষ পোড়ানোর উৎকট গন্ধে প্রবল বিবমিষা। ওয়াক করতেই, “পেট ”আর “মাস” নিয়ে ইতি উতি ছোড়া ছোড়ি হওয়া রসিক মন্তব্যগুলো তো আন্দাজ করতেই পারছেন। সুলোচনা  কোনোমতে  চেয়ার ছেড়ে  টলমল করতে করতে , চুপচাপ উঠে গেল। পরদিন সুলোচনা মাইগ্রেশান নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। দলবল আর ব্যান্ড পার্টিনিয়ে অভিসারক গেটে আটকালো। “এতদিন নাচালি! আজ তোর গায়ে হলুদ দিয়ে তবে যেতে দেবো”। সুলোচনা ওর চোখে নিজের সর্বনাশ দেখে প্রবল কম্পমানা। উৎসুক দর্শক গিজগিজ। ব্যান্ড, শাঁখ, উলু। সুলোচনাকে পিছমোড়া করে অভিসারক গেটের সঙ্গে বাঁধলো। হাঁটুর উপরে সর্বাঙ্গ নির্বসনা করে নতুন গামছা জড়িয়ে দিলো। তারপর  অভিসারক, সুলোচনার মাথা থেকে জঘন অ্যাসিড-ধৌত করলো। ব্যান্ডে বাজছিল: পরান যায় জ্বলিয়া রে।    সুলোচনার দুটো সুলোচনই গলে গেলো। মুখমন্ডল থেকে জঘন—জ্বলে,গলে,দলা দলা পাকিয়ে গেলো। অনেক হাড় বেরিয়ে গেলো। মিনিট দুই/তিনের মধ্যেই সব মিটে গেল।      বাজারী কাগজের রিপোর্টের শিরোনামা দিল: প্রেমের দহ।

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine