গল্প সমগ্র ১৪

  • অর্ধ-শতক - পিয়ালী গাঙ্গুলী 

  • ঘটনা -  কুমার সোম 

  • যাপিত জীবন - পদ্মনাভ অধিকারী 

  • সজিবাবু - প্রদীপ চক্রবর্তী 

  • ট্রেনের সেই লোকটা - সুমন চক্রবর্তী 

  • প্রেমের দহন ​- রণেশ চন্দ্র মজুমদার 

 

অর্ধ-শতক

পিয়ালী গাঙ্গুলী 

শ্যাম্পেন আর আনন্দের ফোয়ারা তখন মিলেমিশে একাকার। বেশ অনেকদিন ধরেই কলকাঠি নাড়ছিল রু। প্রথমে ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ তারপর ফোন। বৌদির মনের কথাটা পরিষ্কার হয়ে গেছিল। কেমিক্যাল রিয়াকশন হওয়ারই ছিল, অভাব ছিল শুধু ক্যাটালিস্টের। ছোটবেলা থেকেই ইঁচড়ে পাকা রু এ কাজটা ভালোই পারে।

    এত রাত্তিরে মোবাইলে টুং টাং। হোয়াটস্যাপ চেক করল রু। ঠিকই আন্দাজ করেছিল। পিসতুতো দাদা। -কি করছিস? ছেলে ঘুমলো? -এই সবেমাত্র। যুদ্ধ করে। তুমি কি করছ? - এডিটিংয়ের প্রচুর কাজ আছে, সেসবই করছি - তা জলপথে নিশ্চয়ই? ক পেগ চলছে? - হিসেব করি নি - অত খাও কেন? - কেউ বারণ করার নেই বলে জবাবটা দুবার টাইপ করেও মুছে দিল রু। এই নিয়ে এখন কথা বলতে গেলে ঘুমের বারোটা বেজে যাবে। সকালে আর উঠতে পারবে না। কি সুন্দর দেখতে ছিল প্রণবদাকে, রীতিমত হ্যান্ডসাম যাকে বলে। আর কি চেহারা হয়েছে এখন। সেই যে বুদ্ধদেব গুহার 'রুহাহা' তে ঋজুদা যেমন বলেছিল রুদ্রকে কোনো জলো জায়গায় ছেড়ে দিলেই তিতিরের হিপ্পো দেখা হয়ে যাবে। ঠিক তেমন। একগাদা অসুখও বাধিয়ে রেখেছে। উশৃঙ্খল জীবনযাপন আর অতিরিক্ত মদ্যপান। সৃষ্টিশীল মানুষগুলো কেন যে এমন হয়? ছোটবেলা থেকেই দারুণ ছবি তোলে। সেটা অবশ্য জেনেটিক, বাবার থেকে পাওয়া। খুব কম বয়সেই প্রেস ফটোগ্রাফার। এখন শুধু ফ্রিল্যান্সিংই করে। ডোনা বৌদিকেও দেখতে খুব সুন্দর ছিল। ভিন্ন ধর্ম নিয়েও বাড়িতে কোনো অশান্তি হয়নি। কদিন পরেই রাজপুত্রর মত ফুটফুটে ছেলে আকাশ। সবই ঠিক চলছিল। কি যে হল কে জানে! রু তখন অনেকেই ছোট। এসব জটিলতা বোঝার বয়স হয়নি।। এখন বয়েস হয়েছে, কিন্তু এখন আর ওসব পুরনো কথা ঘাঁটতে ইচ্ছা করে না। এক যুগের বেশি হয়ে গেল ওরা আলাদা থাকে। কোনোরকম আইনি সেপারেশন বা ডিভোর্স হয়নি। শ্বশুরবাড়ির সাথেও সম্পর্ক 

আছে দাদার। একদিন বৌদির প্রসঙ্গ তুলতে দাদা বলেছিল "তোর বৌদির সঙ্গে এখন আমার সম্পর্কটা অনেকটা গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ডের মত"। বৌদি সপ্তাহে এক দুদিন আসে। ঘর গুছিয়ে, কিছু রান্না বান্না করে, জামাকাপড় কেঁচে দিয়ে চলে যায়। ছেলে বড় হয়ে গেছে। সে এখন অস্ট্রেলিয়ায় সেটেল্ড। বিয়েও হয়ে গেছে। বাবা মা পালা করে গিয়ে ছেলের কাছে থাকে। দুজনেরই দুজনের প্রতি এখনও টান আছে সেটা বোঝা যায়। রু কয়েকবার চেষ্টা করেছে দাদার কাউন্সেলিং করার, বিশেষ লাভ হয়নি। "আমি তো তাকে যেতে বলিনি, সে নিজের ইচ্ছায় গেছে। নিজে থেকে ফিরলে ফিরবে, আমি কিছু বলব না"। বৌদির সাথে বহুদিন যোগাযোগ নেই তাই বৌদির মনের কথা জানার বা বৌদির কাউন্সেলিং করার কোনো উপায় নেই। এই ফেসবুক, হোয়াটস্যাপের যুগে যোগাযোগ করাটা কোনো ব্যাপারই নয়। আসলে রুয়েরই অস্বস্তি লাগে। তিন্নি শেরুকে নিয়ে ভবানীপুর এসেছিল। রু ও টিনটিনকে নিয়ে মায়ের কাছে গেছিল। তিন্নি রুয়ের পিসতুতো বোন, ছোট পিসীর মেয়ে। ওদের ছেলে দুটো পিঠোপিঠি। দুটোতে খুব ভাব। তাই তিন্নি আর রু মাঝে মাঝেই একসাথে ভবানীপুরে আসে। ওদেরও একটু আড্ডা হয়, বাচ্চা দুটোও ছাদে চুটিয়ে খেলতে পারে। রু বলল "এই সামনের ৩০ তারিখে ফ্রি আছিস?" -"হ্যাঁ, কেন রে"? - প্রণবদার ফিফটিয়েথ বার্থডে। ভাবছি ওকে সারপ্রাইজ দেব। তুই আসতে পারবি? - হ্যাঁ, আমি চলে আসব। - কেকটা ভাবছি কিনে নেব। আর পায়েস টা আমি বাড়ি থেকে করে আনব। তুই পারলে নিউ মার্কেট থেকে ফিফটি লেখা 

ক্যান্ডেল আর তিনটে বার্থডে ক্যাপ কিনে রাখিস। একটা ওই বুড়ো ধারি বার্থডে বয়ের আর দুটো তোর আর আমার ছেলের জন্য। না না, ফোনে অর্ডার করে খাবার আনব না। এইখান থেকে তো এইটুকু। 'চাং হোয়া' থেকে গিয়েই খাবার নিয়ে আসব। রু আর তিন্নির দুজনেরই একই দাবী। দাদার আর রাজি না হয়ে উপায় নেই। খাবার দাবার, বোতল টোতল সব কিনে এনে তারপর একেবারে কেক কাটা। তিন্নি একগাদা বেলুনও কিনে এনেছে। সেগুলোও ফোলানো হয়নি। খাবার প্যাক করে সোজা বাড়ি। ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে চাবি বার করে দরজা খুলল প্রণব। আলো জ্বালাতেই তো অবাক। সারা বাড়ি বেলুন দিয়ে সাজানো। টেবিলে কেক রাখা, ফিফটি লেখা মোমবাতি গোঁজা। বোনেদের দিকে তাকিয়ে প্রণব বলল - তোরা কখন এসব করলি? এই তো আমার সঙ্গেই বেরলি। তোদের বরেরাও তো একসঙ্গেই ছিল। - আমরা তো সাজাই নি -তার মানে? - ঘরে যাও, তার মানে টা বুঝবে ওই থপথপে চেহারায় প্রায় উসাইন বোল্টের মত গতিতে প্রণব বেডরুমে ঢুকল -তুমি? তুমি কবে ফিরলে? তোমার তো এখন অস্ট্রেলিয়ায়... একটা গোলাপী শাড়ি পড়েছে ডোনা, মাথায় গোলাপ ফুল গোঁজা। অপূর্ব লাগছে দেখতে। লাগেজ থেকে বার করে আলমারিতে নিজের জামাকাপড় গোছাচ্ছে। আজই ফিরেছে ছেলের কাছ থেকে। এখনও জেট ল্যাগ কাটেনি। "এই সরি, তোমাদের প্রেমালাপে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছি", বলে রু আর তিন্নি ওদের হাত ধরে টানতে লাগল। "চলো চলো, কেক কাটতে হবে। আকাশ ইজ অন স্কাইপ"। ডাইনিং টেবিলে কেকটা সাজানো। মাঝে ল্যাপটপে আকাশের মুখ। "হ্যাপি ফিফটিয়েথ বার্থডে বাবা। নাও এবার কেকটা কাটো"। ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে কেকে ছুরি ঠেকাতেই রুয়ের বর ওপরের বেলুনটা ফুটো করে দিল। ঝরঝর করে ঝরে পড়ল টফি আর চকোলেট। টিনটিন আর শেরুর কি আনন্দ। দুই খুদে তখন মেঝে থেকে চকোলেট কুড়োতে ব্যস্ত। এদিকে তিন্নির বর তখন ফোম স্প্রে করছে। প্রণবের মুখে একটা লজ্জা মেশানো হাসি "কি যে করিস না তোরা! আমায় একেবারে বাচ্চা বানিয়ে দিলি। যা তা!" স্কাইপে এবার আকাশের গলা " কি বাবা, বার্থডে গিফ্ট কেমন লাগল?" প্রণব খানিকটা হতবাক। এখনও বুঝলে না বাবা? মা তোমার কাছে ফিরে এসেছে, শি ইজ ব্যাক। আজ থেকে তোমরা আবার একসাথে থাকবে"। ডোনা ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আলতো করে প্রণবের হাতটা চেপে ধরে বলল "আই স্টিল লাভ ইউ"। "ইয়ে" বলে সকলের একসঙ্গে হাততালি। অনির্বাণ ইতিমধ্যে আকাশের পাঠানো শ্যাম্পেনের বোতল টা খুলে ফেলেছে। শ্যাম্পেন আর আনন্দের ফোয়ারা তখন মিলেমিশে একাকার। বেশ অনেকদিন ধরেই কলকাঠি নাড়ছিল রু। প্রথমে ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ তারপর ফোন। বৌদির মনের কথাটা পরিষ্কার হয়ে গেছিল। কেমিক্যাল রিয়াকশন হওয়ারই ছিল, অভাব ছিল শুধু ক্যাটালিস্টের। ছোটবেলা থেকেই ইঁচড়ে পাকা রু এ কাজটা ভালোই পারে।

 

ঘটনা 

কুমার সোম 

সেদিন রাত্তিরে ঠাকুরের সামনে ঝিমলি খুব কেঁদেছিল, কাঁদতে কাঁদতে সে প্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল। আমার বৌ খুব সেবা শুশ্রূষা করেছিল তার। সেদিন বুঝেছিলাম ঝিমলি তার বরকে কতটা ভালোবাসতো। কেন যে ওর বর ওকে ছেড়ে অন্য মেয়েমানুষের কাছে যেত ও মদ খেতো তার কোনো উওর পাইনি খুঁজে। মনে হয়েছিল বড় বড় মনীষীদের কথা ‘এই জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাওয়া যায় না, এরই নাম জীবন ‘।

     ঘটনাটা ঘটেছিল অনেকদিন আগে ব্রিটিশ আমলে । তখন পার্টিসন হয়নি। আমরা দুদেশে বিভক্ত হইনি। তা আমি সবে ডাক্তারি পাস করে আসামের  একটা চা বাগানে কাজ করবো বলে রেডি হচ্ছি, তখন আমার মা জানালো তারা একজন মেয়েকে ঠিক করে রেখেছে আমার জন্যে। তখন আমার আর বয়স কত, পঁচিশ হবে। বিয়ের জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না।

মা জোর করাতে গেলুম মেয়ে দেখতে নিউ আলিপুরে। বাইরের ঘরে বসে আছি , মেয়েটি চা নিয়ে এল। কি বলবো যেমন রূপ, তেমন গায়ের রং আর তেমন আদব কায়দা, মানুষের মন ভুলিয়ে দেবার মত। এখানেই বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেল।

মেয়ের বাড়ী থেকে আমার ডাক এলো। আমি আসাম যাবার আগে মেয়েটি আমার সাথে দেখা বলতে চায়। আমি মাকে বললুম, ‘ মা আমি এখন কি বলি? কি করে বলি যে কেন এখনই বিয়ে করব না?’ মা বললো ‘যানা দুটি কথা বলতে চায়, বলে আয়। আমার মনে হয় তোকে ওর ভাল লেগেছে, তোকে কথা দিয়ে আসতে হবে কবে বিয়ে করবি ।‘

ওরা বেশ বনেদি ঘর, নিউ আলিপুরে বিরাট বাড়ী। কথায় কথায় মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো আমার তাকে ভালো লেগেছে কিনা। আমি বললাম ভালো লেগেছে। বাড়ীর সবাই বাইরের ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, চা নিয়ে বসে রইলাম আমি আর ঐ মেয়েটি। নানারকম কথা হল। সে জানালো তার বয়স পঁচিশ, বিয়ে সে করতে চায়, আর তার এই একাকী জীবন ভালো লাগে না। সে একটা অফিসে ক্লার্কের কাজ করে, ডালহাউসিতে। বাইরে বেরুলে অনেক পুরুষ মানুষ পেছু নেয়। অফিসের লোকেরা তাকে খুব বিরক্ত করে। আমি বললাম যে আমি আসামে সেটল করে তাকে বিয়ে করে নিয়ে যাব। মেয়েটি তার হাতের ওপর হাত রেখে আমাকে কথা দিতে বললো। সেদিন রাজী হয়েছিলাম তাকেই বিয়ে করব । 

    তারপর আমি পাড়ি দিলাম আসামের ঘন জংগলে একটা বিরাট চা বাগানের রেসিডেন্ট ডাক্তার হিসেবে কাজ করতে। বছর ঘুরে এল, পাপিয়া প্রায়ই আমাকে চিঠি দিত। অনেক কথা লিখত, তার বাড়ীর অনেক খবর দিত। তার মা বাবা ভাইবোনের খবর, আমি কবেই বা আসবো, কবেই বা বিয়ে হবে আমাদের, ইত্যাদি।  আসামের চা বাগানে কাজটা একঘেয়ে লাগতো আমার। চা বাগানের মজুরদের কঠোর জীবন। সকালে উঠে তারা হাড় ভাঙ্গা খাটুনি খাটতো, অসুখ বিসুখ তাদের হত না খুব একটা। তবে হিল ডায়েরিয়া বা ওই ধরনের ছোটো খাটো অসুখ লাগেই থাকতো। বড় অসুখ টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া যে হত না তা নয়। তবে বড় অসুখ করলে আমাদের আসামের উপত্যকা থেকে মাইল চল্লিশ দূরে ডিব্রুগড়ের হাসপাতালে পাঠানো হত তাদের। আমার বাংলো থেকে আমাদের চা বাগানটা দেখা যেত অনেক দূর পর্যন্ত। আমি রাত্তিরবেলা বাংলোতে ফিরে আমার শখের কলকাতার বইমেলা থেকে কেনা বইগুলো নিয়ে পড়তাম।

অনেক বড় বড় ফিলসফারদের জীবনের মানে নিয়ে লেখা। অনেক সাধুপুরুষদের কথা। তারা নতুন নতুন ভাবে জীবনের ওপর তাদের মতামত জানিয়ে আলোকপাত করে গেছেন। ভাবতাম আমাদের এই ছোট্ট জীবনের অর্থটাই বা কি? আমরা এই পৃথিবীতে এসে দুদিনের জন্য সুখ, দুঃখ, ভালবাসা, বিয়ে, সন্তানদের নিয়ে তাদের ভবিষ্যতের পুরোটা না দেখে আবার কোথায় যেন মিলিয়ে যাই। আমার বাড়ীতে ঝিমলি বলে একটি পাহাড়ি মেয়ে এসে আমার ঘর দোর পরিষ্কার করতো, ভাল মন্দ রান্না করে দিয়ে যেত রাত সাতটার আগেই। ও আমাদেরই চা বাগানের মজুর। ওকে দেখে মায়া হত। বয়স কত আর হবে উনিশ কি কুড়ি । খুব হাসি খুশী ছিল ঝিমলি। ওর হাসিটা আমার মনে অনেকদিন দাগ কেটে রেখেছিল। আমাকে দেখলেই ও খিল খিল করে হাসতো আর বলতো ‘বাবু তু শাদি করবি না?’ বলেই পালিয়ে যেত আমার থেকে অনেক দূরে নীচের চা বাগানের দিকে। আমার মনের কোনে ও অনেক আলোড়ন তুলে যেত। এত সুন্দর একটা মানুষের সংস্পর্শে আমি কোনদিন আসিনি। আমি ঝিমলির আসার অপেক্ষায় থাকতাম। এরকম করে বাগানে কাজ করতে করতে বছর দুই কেটে গেল। আমি ভাবলাম এবার আমার বিয়ের ইচ্ছেটা একটু বেড়েছে, এবার কলকাতা গিয়ে বিয়ে করবো। 

    সেদিন কলকাতা যাব বলে বাক্স গুছোচ্ছি, দেখলাম ঝিমলি আমার জন্যে অনেকক্ষণ বাড়ীর বাইরে বসে আছে । আমি বললাম ‘কি রে ঝিমলি কি হয়েছে, আমার জন্যে বসে আছিস কেন রে, কিছু বলবি? ‘ ঝিমলি কাঁদো কাঁদো মুখে বললো ‘ আমার বাড়ীর লোক আমাকে একটা লোকের সঙ্গে বিহা করতি বলতিছে, লোকটা খুব দারু খায়, হামি ওকে বিহা করুম না, বাবু ওই লোকটা ভাল লয়’  বলে আমার পা ধরে কাঁদতে আরম্ভ করে দিল। ‘বল বল বাবু আমি কি করি, আমি এখান থেকে পালিয়ে যাব অনেক দূরে। আপনি আমাকে কিছু টাকা দিয়ে আপনার জীপ গাড়ীতে করিয়া ছাড়িয়া আসুন।‘ অনেক বুঝিয়ে ওর চোখের জল আমার রুমাল দিয়ে মুছে দিলুম সেদিন। 

       শুনলাম ঝিমলির ইচ্ছা না থাকলেও ওর মা ওকে সেই লোকটার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। সে তার জরুর সাথে তিরিশ মাইল দূরে আরেকটা চা বাগানে আছে।  তারপর আমার কলকাতা থেকে মায়ের চিঠি এল। পাপিয়ার খুব অসুখ, ডাক্তাররা ঠিক ধরতে পারছে না। প্রায় দুবছর পর আমি একমাসের জন্যে আসামের জোরহাট স্টেশন থেকে ট্রেনে করে কলকাতা রওনা হলাম পুজোর ছুটিতে। 

    কলকাতায় বাড়ি পৌঁছে বাক্স প্যাঁটরা রেখে গেলাম পাপিয়ার বাড়ি, মার সাথে। নিউ আলিপুরে ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখি পাপিয়া শয্যাগত, চেহারা তার ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে। ভগবান তার মুখের সুন্দর হাসিটা কেড়ে নিয়েছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম তার গা পুড়ে যাচ্ছে। আমি আর থাকতে পারলাম না। আমি মাকে বাড়িতে নামিয়ে আমার খুব পরিচিত ডাক্তার বন্ধুর বাড়ী গেলাম, ট্যাক্সি করে। তাকে নিয়ে পরের দিন পাপিয়ার বাড়ী এলাম ।

সে বললো পাপিয়াকে একটু মেডিকাল কলেজে ভর্তি করা দরকার। আমি আর ডাক্তার বন্ধু প্রবীর পাপিয়াকে মেডিকাল কলেজে ভর্তি করলাম। প্রবীর তার পুরনো চেনা এক হেড অফ দি ডিপার্টমেন্টের আন্ডারে পাপিয়াকে তার ওয়ার্ডে রাখলো। প্রায় মাসখানেকের মধ্যে পাপিয়া সুস্থ হয়ে উঠলো। আমি আমার চা বাগানে তার করে আমার ছুটি আরো দিন পনেরো বাড়িয়ে নিলাম। পাপিয়া ভালো হয়ে যাবার পর মাকে বললাম ঘটা করে বিয়ে দেবার সময় আর নেই, আমরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করবো। বিয়ে করে আমি আর পাপিয়া আসামের চা বাগানে পাড়ি দিলাম। পাপিয়াকে নিয়ে আসামের জংগলে আমার ছোট্ট বাংলোতে নতুন বিবাহিত জীবন শুরু করলাম। চারিদিকে আসামের ঘন জংগলে আমাদের ভালো কাটছিল। আমি পাপিয়ার শরীরের খুব যত্ন নিতাম। আমাদের জীবন ভালো কাটতে লাগলো। আমি পাপিয়াকে একজন খুব বড় ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার বললো, তার আগে যে কঠিন অসুখ করেছিল তার জন্যে তার সন্তান হবার সম্ভাবনা খুব কম।

      আমার আর পাপিয়ার চা বাগানে চা বাগানে গোটা দু বছর সুন্দর কেটে গেল। বাগানের কাজ করে ফিরে এসে আমরা হাঁটতে বেরুতাম, ঘন জংগলে চা বাগানের ভেতর দিয়ে। কত রং বেরং এর পাখী উড়ে বেড়াতো। সেদিন আমি আর পাপিয়া হাঁটছি, হঠাৎ দেখলাম ঝিমলি কোলে একটা সুন্দর মেয়ে নিয়ে, চা পাতা তুলছে। আমাকে দেখে দৌড়ে এসে বললো ‘বাবু তুমি শাদি করিছ, তোমার বৌমা ভারী সুন্দর দেখতে ‘। বলেই সে বৌমাকে জড়িয়ে ধরে বললো ‘ মাজি কাল সামকো হামার বাড়ীতে আসেন না? আমি আপনাকে এসে লিয়ে যাব, হামি আপনাকে রান্না করে খাওয়াবো ‘। ঠিক পরের দিন ঝিমলি আমাদের তাদের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে নিয়ে গেল, তার মার বাড়ীতে। তার মা আমাদের চা বাগানে মজুরের কাজ করে। আমার ফটোগ্রাফির পুরনো শখ। আমি ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলাম। ঝিমলির মিষ্টি হাসি আর তার কোলে তার সুন্দর মেয়ের ছবি তুললাম, আমার বাইরের ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখবো বলে। কথা বলতে বলতে আমি ঝিমলিকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘এই ঝিমলি, কিরে তোর বরের কাছে কবে যাবি রে, না এখানেই মার সাথে থেকে যাবি?’ দেখলাম তার বেয়ে জল পড়লো। বুঝলাম তার বিয়েটাতে কোনো গন্ডগোল আছে। আমি বললাম ‘থাক থাক চোখ মোছতো, আমরা তোর সাথে আনন্দ করতে এসেছি যে ‘। তারপর ঝিমলির কান্না আর থামে না। ওর দুঃখের জীবনী বলতে আরম্ভ করে দিল। 

     যা বুঝলাম কথা শুনে, যে ওর বর খুব দারু খায়। দারু খেয়ে ওকে খুব মারধোর করে। সে অনেকদিন বাড়ীতেই থাকে না রাত্তিরে, অন্য মেয়ে মানুষের সাথে রাত কাটায়। আমাদের ওকে দেখে মায়া হল। আমার বৌ পাপিয়া আমাকে পাশের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললো ‘চলো না আমরা ঝিমলিকে আমাদের বাড়ীতে নিয়ে রাখি, আমাদের কোনো সন্তান হয়নি, আমি ওর মেয়েটাকে দেখবো, ওকে স্কুলে পড়াব‘। আমি ঝিমলির মাকে পাশের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে ওই কথা বললাম। ওর মা রাজি হলো। 

     তারপর আমাদের ঝিমলিকে নিয়ে জীবনটা বেশ ভালোই কেটে গেল তিন বছর। আমাদের ভয় ছিল ঝিমলির জরু এসে আমাদের ওপর হামলা না করে। আমি ডিব্রুগড়ে আসামের বড় হাসপাতালে রেসিডেন্টের কাজ পেয়ে চলে গেলাম ঝিমলিকে সাথে নিয়ে তার জরুর থেকে অনেক দূরে।  

    বেশ কিছুদিন পর আমাকে ঝিমলি বললো সে তার মেয়েটাকে নিয়ে তার মার সাথে দেখা করতে যাবে। আমরা রাজী হলাম। সে তার মার সাথে দেখা করতে গেল। প্রায় পনেরো দিন কেটে গেল ঝিমলি আর আসে না। আমি গাড়ী চালিয়ে শনিবার অফিস থেকে ছুটি নিয়ে, গেলাম তার মার বাড়ী। গিয়ে যা দেখলাম তা কল্পনা করা যায় না। ঝিমলির বর তাকে ভীষণ মারধোর করেছে যেহেতু সে তার কাছে ফিরে যায়নি। আমি ঝিমলি আর তার মেয়েকে আবার আমার কাছে নিয়ে এসে তার শরীরের সমস্ত ঘা গুলো সারিয়ে তুললাম। তার কিছুদিন পর ঝিমলির মার একটা চিঠি এলো। চিঠিতে মা লিখেছে ঝিমলির জরু খুব বেশী মদ খেয়ে মারা গেছে। সেদিন রাত্তিরে ঠাকুরের সামনে ঝিমলি খুব কেঁদেছিল, কাঁদতে কাঁদতে সে প্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল। আমার বৌ খুব সেবা শুশ্রূষা করেছিল তার। সেদিন বুঝেছিলাম ঝিমলি তার বরকে কতটা ভালোবাসতো। কেন যে ওর বর ওকে ছেড়ে অন্য মেয়েমানুষের কাছে যেত ও মদ খেতো তার কোনো উওর পাইনি খুঁজে। মনে হয়েছিল বড় বড় মনীষীদের কথা ‘এই জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাওয়া যায় না, এরই নাম জীবন ‘।

যাপিত জীবন রোমন্থনে রমণী

পদ্মনাভ অধিকারী

       ...দেবেশ ধীরে ধীরে ঘরের দিকে মুখ ফেরাল। না, থাক। কোথাও গিয়ে কাজ নেই। এই মহার্ঘ মুহুর্তগুলো নইলে হারিয়ে যাবে। বাইরে শিউলি ফুলের গন্ধ। সে ভাবার চেষ্টা করল, ফুল কি রাতেই ফুটে যায় নাকি শুধু আজকের জন্য সব যুদ্ধক্ষেত্রেই ফুল ফুটে উঠেছে। 

     পীরের বাড়ী। কিন্তু' সেখানে কোনো ঘরবাড়ী নেই। লোকালয় থেকে বেশ দূরে- ঘন গাছপালা ঘেরা একটা জায়গা। শীত গ্রীষ্ম সব আবহাওয়ায় জায়গাটা উপভোগ্য। দাবন পীরের স'সন্তান। অদ্ভুত ব্যাপার, কোনো কালেও এখানে কোনো রকম ঘরবাড়ী ছিল কিনা তেমন নিশানাও মেলে না। অথচ বছর বছর এখানে মাঘমাসের শেষে লাখো মানুষের ঢল নামে। ভক্তেরা গানে গানে আর বিবিধ পানীয় পানে মাতোয়ারা হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হল পীর বংশের সদস্য যারা আছে, তারা পর্যায়ক্রমে খাদেম ও পীরের স'সন্তান জুড়ে থাকে। গভীর রাত অবধি চলে কেবল ভক্তদেরই মেলা। যারা ভক্ত নয়- তাদের মাঝ রাতের আগেই ফিরে যেতে হয়। এই দাবন পীরের ভক্ত রমেন ঋষি। তার অঞ্চলে সে পীরের খাদেম। তার বাড়ীতেও ভক্তরা যায়। সেখানেও উৎসব চলে সাতদিন। তবে এ স'স্থানে আগেই হয়। সে এসে হাজির হয়েছে দু’দিন আগে।       রাত পোহালেই মেলা শুরু করে। মাঝ রাতে রমেন- লক্ষ্য করে একজন রমণী সারি সারি গাছের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসছে। তার হাতে একটা হ্যারিক্যান। পরণে বকের পালকের মত সাদা বসন। রমেন অবাক বিস্ময়ে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে খোলা জায়গায় ঘাসের উপর। তার মতো অসীম সাহসী মানুষ আজ কেন কুঁচকে যাচ্ছে সে নিজেও বুঝতে পারে না। ধীরে ধীরে রমণী কাছে আসে। রমেন সহসা সরে গিয়ে একটা প্রকাণ্ড বটগাছের গায়ে সেটে দাঁড়ায় আর লক্ষ্য করে। রমণী এসে ঘাসের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে, উঠছে না বহুক্ষণ! রমেন দেখতে  থাকে। এক সময় রমণী বাতাসে ভর করে উপরে উঠতে থাকে। ঠিক যেভাবে শুয়ে ছিল- সেভাবেই ক্রমাগত

পরে উঠতে থাকে। রমেন এবার নিজেকে সামাল দিতে পারে না। সে ভাবে- - একি কাণ্ড। এ রমণী কোন স-রের সাধিকা। নিশ্চয়ই পীরের সান্নিধ্য পেয়েছে সে। রমেন ধীর পায়ে কাছা কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দপ করে হ্যারিকেন নিভে যায়। শিহরে ওঠে রমেন। সে ভাবে কি ব্যাপার! আলো নিভে গ্যালো ক্যানো? তবে কি রমণীটা কোন জেন- পরী হবে। হতেও পারে- পীরের ভক্তের মাঝে বহু জীন-পরী থাকার কথা সে শুনেছে। ভাবনার ভেতর হঠাৎ- বাঘের গর্জন শুনতে পেয়ে ঘাবড়ে যায় সে। সরে পড়ে। 
ভয় ঠেকানে সাথে রাখা গ্যাস লাইটটা জ্বালায়। সে কি! রমণীটা গেল কোথায়। তার সামনেই তো ছিল। কিন্তু' গোল কোথায়। আচমকা রমেন তার কাঁধে নরম হাতের স্পর্শ অনুভব করে। সে বলে ওঠে- কে? 

হ্যারিটা জ্বলে ওঠে। সামনে দাঁড়ানো অপরূপ রমণী মুখে হাসিভরা। সে বলে
- কি রমেন দা- ভাল আছ তো, অবাক হচ্ছো কাণ্ড দেখে? রমেন সাহসের সাথে বলে- 
- না-না, ঘাবড়ানোর কি আছে। তুমিতো ভালই রফতো করেছ। কিন্তু' কিভাবে করলে? 
- আমাকে চিনতে পেরেছ রমেন দা? 
- হ্যাঁ, পেরেছি, তুমি নবিছন না? 

-- হ্যা।  

স্বামীর ঘরে ফিরে যাওনি তাহলে?

- না। - ছেলেটা? 

- ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করে- এখন মস- বড় অফিসার। - তোমার খোঁজ খবর নেয় তো? 

- পত্র মারফৎ। 

- তা হবে ক্যানো, নিজে আসে না? 

- দাদা-চাচাদের বাধ্য কিনা। 

- ও বুঝেছি। তা তুমি কি এ পথেই আছ? 

- হ্যাঁ- আছি। 

- কিন্তু' কিভাবে বল- ? 

- প্রথমে দ্যাখা শোনা, তারপর আলাপ পরিচয়, তারপর দেহদান- দিদার- সবশেষে অর্জন। 

- কি বলছো তুমি, এযে আজগুবি কথাবার্তা! না-না- তুমি ধাপ্পা দিচ্ছো। তুমি যা বল্লে- তা কি করে সম্ভব। 

- অবশ্যই সম্ভব। তুমি তো পীরের ভাবানুসারী মাত্র। 

- হ্যাঁ, সেভাবেই তো সব ভক্তেরা আছে ও থাকবে। 

- দীদার না হলে মীনারে চড়বে কি করে? মীনারে না উঠলে বেহেশতের পথ দেখবে কি করে? পীরের সাথে মিলন না ঘটলে- তুমি কার সাথে সাথী হয়ে সেখানে পৌঁছাবে? 
- কর্মের মাধ্যমে। 
- পীরের সাথে দৈহিক মিলনের ফলে যে বন্ধন সৃষ্টি হবে- সেই বন্ধনের মাধ্যমেই মহাজাগতিক বন্ধন ছিন্ন করে দোহে মিলে একাকার হয়ে- ঐ একই স'স্থানে গিয়ে উপস্থিত'ত হওয়া যায়। 
- তা কি করে হবে, গুরুজি তো তেমন কথা বলেনি কোনদিন?
- ক্যানো? পীরের গান আছে না। দাবন গেয়েছে- 

প্রেমের রসে হয়ে মাতাল 
গুরু পদে দেরে পাতাল 
পাতাল ছুঁয়ে দিলে গুরু 
তোর হবেরে সবই সামাল ॥ 

ও সে চাম আটুলির মত 
থাকবি সাথে তুই অবিরত 
ফেলতে তোরে পারবে না সে 
থমকে রবে এই মহাকাল। 

গুরুপদে ভক্তি মতি 
তারই সাথে রতিপ্রীতি 
আবার, তারই সাথে ঘর-বসতি 
তবেই মেলে নূর-মহাল ॥ 

রমেন বলে- কি শোনালে তুমি নবিছন!! তুমি কি সত্যিসত্যিই পীর পরবর্তী খাদেমের খাদ্য হয়েছ? 
- হ্যাঁ, তবেই তো- আমার মত কতশত সেবিকা শেষ রাতে এখানেই আসবে বলে আমিও এলাম। অবাক হলে বুঝি? 
- না- মানে- তোমার পক্ষে যা সম্ভব হয়েছে, সে কাজটা পুরুষ ভক্তদের পক্ষে কি করে সম্ভব। তা করতে গেলে তো- ভোগ বাসনা বাড়বে। সেটা বাড়লে- 
নবিছন বলে- বোকার মত কথা বোলো না রমেন দা। যাকে ধরে চলবে তাকে বাদ দিলেও মরবে। জগতে সব নাগরের নগরী পরিক্রমার বাসনা ছিল। একাজটা বিপরীতে সম্ভব। সম মেরুতে তা হয় না। 
রমেন বলে- তা হলে- গুরু পরম্পরা একাজটা চলে আসছে, কই এ কথা আমরা তো জানতে পারিনি! ভোর হতে থাকে, বাড়তে থাকে বনানীর ভিতর ভক্তদের ভীড়। বাজতে থাকে বাদ্যযন্ত্র। রমেন মাথা নিচু করে পীরের দরবার ছাড়ে। পিছ থেকে ডাকতে থাকে নবিছন। দাদা- দাদা যেও না। 

 

 

সজিবাবু

প্রদীপ চক্রবর্তী

   দত্ত পুকুরের পাড় দিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। দেখলো, বিস্তর পুকুরের হাঁটু সমান পানিতে একটা শিশু সাঁতার কাটছে । আর তার বোন দত্ত পুকুরের এপার ওপাড় দৌড়াচ্ছে , অনুরোধ করছে উপরে উঠে আসার জন্য। সুজন সজিনাবুকে দেখতে পেল যেন। অবচেতন মনে ডেকে উঠলো, বুবু...

    এত বড় লেজওয়ালা পাখি ইদানীং বেশি চোখে পড়ে না। পাখিটির নাম সাহেব। এই পাখির অন্য কোন নাম আছে কিনা তা তরাব আলীর জানা নেই। মাঠের কোনের ঘন বন থেকে ধরেছে সে। আগ্রহ নিয়ে দেখতে আসছে অনেক লোক । পাখিটিকে রাখা হয়েছে খাঁচায়। আর ঠেলে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে নানা রকমের খাবার। ভালো একটা দামও হাঁকিয়েছেন তরাব আলী। কিন্তু' দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়-য়া সুজন এই পাখিটাকে কোথাও বিক্রি হতে দিতে চায় না। যত দামই হোক সে আনতে চায় নিজের বাড়িতে। এক্ষেত্রে তাকে একমাত্র সহযোগিতা করতে পারে তার থেকে আট বছরের বড় একমাত্র বোন সজিনা। যাকে ছাড়া সে দুনিয়ার কিছু চিন্তাও করতে পারে না। ঠিক যেন গাছ কে গাছ আর গরু কে গরু বলতে শিখিয়েছে তার সজিনাবু। সজিনাবু সুজনের আবদারের কথা শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। যেকোন কিছুর বিনিময়ে তার ভাইয়ের আবদার পূরণ করতে চান। কিন্তু' পরের জমিতে রাত-দিন হাড়ভাঙা খাটুনি করে সংসার চালানো বাবা খলিল মিয়ার কাছে এ আবদার করা বেশ বিলাসিতা হবে। মাও এটা মেনে নেবেন না। তাই সজিনাবু তার হাতের রূপার বালাটা পাশের বাড়ির পাচুবিবির কাছে গোপনে বন্ধক রাখলেন। আর তার বিনিময়ে খাঁচা সহ পাখিটা আসলো সুজনদের বাড়িতে। সুজনের যেন আনন্দের সীমা রইলো না।  মা ঠিকই বুঝেছিলেন যে কিসের বিনিময়ে তার এই শখ মিটলো। তবে কিছুই বললেন না। এমনি ভাবে সুজনের সব শখ কিম্বা ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণ করতে থাকে সজিনাবু। বাবা-মা আর সজিনাবুকে নিয়ে সুজনদের দিন কাটতো অভাব-অনটনে। তবে হাঁড়িতে ভাত না থাকলেও সুজনের থালায় কখনো ভাতের কমতি পড়তো না। 

    হঠাৎ কেন জানি বাবা সজিনাবুর বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সজিনাবুর জন্য সুন্দর একটা বর খোঁজা হচ্ছিলো। সজিনাবু সবাইকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে না। 

এগিয়ে আসতে লাগলো মাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষা । আর এদিকে সুজনের দুষ্টুমি বেড়েই চললও।  দত্ত পুকুর থেকে বার বার গিয়ে নানা রকম অজুহাতে তুলে আনলেও হঠাৎ জ্বর বাঁধিয়ে বসলো। জ্বর সারতেই আবার সাঁতরাতে শুরু করলো দত্ত পুকুরে। একদিন সজিনাবু জোর করে তুলে আনতেই সুজন রেগে গিয়ে বলল, তোর বিয়ে হলে আমি বাঁচি। তখন দেখবো কে আমায় ঠেকায়। সকালে নামবো আর রাতে উঠবো। সজিনাবু আঁচল দিয়ে সুজনের মাথা মুছাতে মুছাতে খিল খিল শব্দে হেসে উঠলেন। মুহূর্তে তা আবার মিলিয়েও গেল। 

সজিনাবুর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া হলো। বিয়ের দিন ঠিক হলো। বিয়ের দিন এগিয়ে আসতেই সজিনাবু সুজনকে আদর করতে করতে বললেন, আমার তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এখন আর তোকে কেউ দত্ত পুকুরে নামতে বাঁধা দেবে না। কি ভালো! না? সুজন সজিনাবুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। 
    ঠিকই বিয়ে হয়ে গেল সজিনাবুর । কিন্তু' জীবন সম্পূর্ণ পাল্টে গেল যেন। বিয়ের পর পরই তার মুদি দোকানদার স্বামী মতিন সময়ে অসময়ে টাকার দাবি করতে থাকে। কৃষক বাবার পক্ষে মতিনের সব দাবি মেটানো সম্ভব হয় না। সজিনাবুকে তার স্বামী খুব মারতো। মতিনের উপর ওর খুব রাগ হতো সুজনের। 
    একবার সজিনাবু যখন বাড়িতে আসলো তখন কানের দুল, নাকের নোলক এগুলো না দেখতে পেয়ে মা বললেন, তোর রাক্ষস স্বামী কি ওগুলো খেয়ে ফেলেছে। সজিনাবু কেঁদে উঠে বলেন, আবার টাকা চেয়েছে। বিক্রি করে দিয়েছে তার দোকানটা। 
    সজিনাবু বাড়ি ফিরে এলেই কেমন জানি নিস্তব্ধতা নামে বাড়িটাতে। এখন প্রকাশ্যেই কাঁদতে দেখা যায় তাকে। সুজন ভাবে যেভাবেই হোক সে সজিনাবুর মুখে হাসি ফুটাবে। তাদের বাড়ির পিছনের ছোট্ট জায়গাটাতে ঠেলে গুঁজে অনেক গুলো গাছ লাগালো। গাছগুলো যত্ন করে

আর সজিনাবুকে বলে, বুবু দেখ! মার গাছগুলো কত তাড়াতাড়ি বাড়ছে। আর কখনো কেঁদো না বুবু। দেখো, আমি দুলাভাইকে অনেক টাকা দেব। তোমার কানের দুল, নোলক সব কিনে দেব। সজিনাবু সুজনকে জড়িয়ে ধরে। সজিনাবুর চোখে একটা আলোক ঝলকানি দেখা যায় যেন ,তা আবার মিলিয়েও যায়। 

    সুজনের ছোট গাছগুলো বড় হতে থাকে। বাড়তে থাকে সুজনের স্বপ্ন। কিন্তু' সজিনাবুর বাড়িতে আসা আর শ্বশুর বাড়িতে ফিরে যাওয়া পূর্বের মতোই চলতে থাকে। সুজন একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখে, উঠোনের এককোণে মানুষের ভীড়। কান্নার শব্দ আর চাপা দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ঘুরপাক খেতে খেতে ছড়িয়ে যাচ্ছে বহুদূর। সাদা কাপড়ে ঢাকা ছিল সজিনাবু। তাদের ছোট্ট উঠোন পুরো গ্রামের আংশিক মানুষকেও আশ্রয় দিতে পারছিলো না। তাই সারি ধরে সবাই আসছিলো। তাদেরকে কেউ অন্য সময় খোঁজ না নিলেও এখন অবশ্য সব শ্রেণীর মানুষকেই দেখা যাচ্ছে। সজিনাবুর গলায় দড়ির দাগটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো। সুজন বুঝতে পারলো তার বুবু চলে গেছে না ফেরার দেশে। তার গগনবিদারী চিৎকার সবার চোখে পানি আনলো কিন্তু' বুবু কোন সাড়া দিলেন না। 

আজ এতবছর পর বুবুর মুখটা মনে পড়তেই চোখ ভিজে উঠলো সুজনের। তার ছোট গাছগুলো এখন অনেক বড় যা কাটতে পাশের বাড়ির দবির শেখ বাবার সাথে অনবরত তর্ক করে চলেছেন। দবির শেখ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, এ গাছ গুলো আমার। বাবা করুন স্বরে বললেন, এ গাছগুলো আমার সুজন লাগিয়েছিল। দবির শেখ বললেন, তুমি একটা মুরব্বি মানুষ হয়ে মিথ্যা কথা বলো কি ভাবে? এ গাছগুলো এমনিতে হয়েছে। আমি কামলা খাটিয়ে, যত্ন আদ্দি করে এত বড় করেছি। তাছাড়া এটাতো আমার জমির ভেতর পড়েছে।
বাবা আবার বললেন, না ! এটা আমার জমির ভেতর।
দবির শেখ একটু উপহাসের ভঙ্গিতে বললেন, আরে ভাই, যদি মাপো, তবে দেখবা সব গাছ আমার জমির ভেতর পড়েছে। তাছাড়া আমি তো আর সব গাছগুলো কেটে নিচ্ছি না। দশটার ভেতর দুইটা তোমার জন্য রেখে দিচ্ছি। 

সুজন এখন আইন নিয়ে শহরে পড়াশোনা করে। আর কিছুদিন গেলেই তার পড়াশোনা শেষ হবে। সুজন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল দবির শেখের কান্ড। হঠাৎ অসুস' মা পাশের ঘর থেকে কাতর স্বরে বললেন, সুজন... বাপ তোর গাছ সব কেটে নিয়ে যাচ্ছে। থামা বাপ থামা। 
    সুজন বাইরে বেরিয়ে আসতেই দবির শেখ আর বাবা চুপ করে গেলেন। এরপর বাবার হাত ধরে বাড়ির ভেতর আনতেই বাবা বললেন, না এটা চরম অন্যায়। তোর লাগানো গাছ ওরা নিজেদের দাবি করছে। সুজন বলল, থাক বাবা। যার জন্য আমার এই স্বপ্নের গাছ সে-ই যখন নেই তখন মিছে তর্ক কেন? আমার বোনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি, ধরে রাখতে পারিনি তার হাসি মুখ। আর কয়েকটা দিন গেলেই ঠিক চিনে নেব সীমানা , অধিকার । এমন হাজার বোনের স্বপ্ন পূরণে পাশে থাকবো বাবা। বাবার চোখের পাতা ভিজে ওঠে। শহরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় সুজন।  
   দত্ত পুকুরের পাড় দিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। দেখলো, বিস্তর পুকুরের হাঁটু সমান পানিতে একটা শিশু সাঁতার কাটছে । আর তার বোন দত্ত পুকুরের এপার ওপাড় দৌড়াচ্ছে , অনুরোধ করছে উপরে উঠে আসার জন্য। সুজন সজিনাবুকে দেখতে পেল যেন। অবচেতন মনে ডেকে উঠলো, বুবু...
    মুহূর্তেই বিদ্যুৎ চমকে শুরু হলো বৃষ্টি। চোখের জল আর বৃষ্টি মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল। আবার দ্রুত গতিতে এগিয়ে চললও সুজন। শহরে যাবার শেষ গাড়িটা তাকে যে ধরতেই হবে। 

 
 

ট্রেনের সেই লোকটা

সুমন চক্রবর্তী 

লোকটি চলে যাওয়ার পর আমি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। প্রথমে ওনার দিকে তারপর অন্ধকারের দিকে। এরপর মাঝে মাঝেই আমি ঐ ট্রেনে ফিরতাম। খুঁজে বার করতাম লোকটিকে, শুনতাম তার গল্প। কি পেতাম জানিনা, কিন্তু শুনতে ভালো লাগতো। লোকটির নাম না জানলেও, ওনার কথা শুনে আমিও যেন মনের জোর পেতাম। ট্রেনের সেই লোকটার গল্পটা শুনে......।

    "দাদা আপনার কাছে পাঁচ মিনিট সময় হবে?", আমি লোকটার দিকে অবাক হয়ে হতচকিত দৃষ্টিতে তাকালাম। এই তো কিছুক্ষণ আগে তার সাথে আলাপ হয়েছে। তাও আলাপ বলতে সেরকম কিছু নয়। সন্ধ্যে শেষ হয়ে রাতের দিকের ট্রেন, সেরকম একটা ভিড় কিছু না, তবে কিছু লোকজন তখনও দাঁড়িয়ে আছে। ভদ্রলোক আমি যেখানে বসে আছি ঠিক তার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমায় হঠাৎ একবার জিগ্যেস করলেন, "আচ্ছা আপনি কি কাছাকাছি নামবেন?" আমি কর্কশ গলায় 'না' বলায় বললেন, "কিছু মনে করবেন না। সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পা দুটো বড্ড ব্যথা, তাই জানতে চাইলাম আর কি।" আমি লোকটির আত্মপক্ষ সমর্থনে তেমন একটা পাত্তা দিলাম না। যাইহোক আমার ডানদিকে বসা লোকটা দেবদূতের মত, "আমি সামনেই নামবো।", বলায় লোকটি আমার সামনে থেকে সরে ঐ লোকটির মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ বাদে আমার পাশে বসা লোকটি উঠে যেতেই একগাল হাসি মুখে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে পাশে এসে বসলেন। আমিও ভদ্রতার খাতিরে তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। ব্যাস তার সঙ্গে আমার এইটুকুই আলাপ। এই আলাপের সূত্র ধরে যখন কেউ, "আপনার কাছে পাঁচ মিনিট সময় হবে?", কিনা জানতে চায় তখন কিছুটা হলেও অবাক এবং বিরক্ত লাগে। প্রথমতঃ আমি বরাবরের কম মিশুকে। তাই অপরিচিত কারুর সাথে যেচে আলাপ করা বা কেউ করতে চাইলেও প্রশ্রয় দেওয়া আমার ধাতে নেই। এবং আমার ধারণা যারা কথার শুরুতেই অল্প মাত্রার একটা সময় নির্দিষ্ট করে, তারা আদতে বেশি কথা বলে। আমি কিছু উত্তর না দিয়ে, শুনেও না শোনার ভান করে, পিঠটা সিটে সেঁটে দিয়ে দুচোখ বন্ধ করলাম। সাধারনতঃ আমার এরকম ব্যবহারে লোকটি নিজের উত্তর পেয়ে যাবেন ভেবেছিলাম। কিন্তু দেখলাম উনি বরং উল্টো বুঝলেন। বা হয়তো আমার উত্তরের সেরকম তোয়াক্কা করলেন না। একটু আগে কেনা বাদামের প্যাকেট থেকে কয়েকটা বাদাম মুখে ঢেলে লোকটি বললেন, "আপনি বোধহয় খুব বিরক্ত হচ্ছেন আমার কথায়। নিতান্ত অপরিচিত একজন মানুষ গায়ে পরে যেচে কথা বললে বিরক্ত লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যাটা কি বলুন তো এখন আমার মন চাইছে কিছু কথা বলতে। মনে যা আসছে সেগুলো বলতে ইচ্ছে করছে। ট্রেনে লোক বলতে আপনার সাথেই আলাপ। তাই আর কি।" আমি খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললাম, "বলুন কি বলবেন।" মনে মনে ভাবলাম - 'আজ কি কুক্ষণে যে আগের ট্রেনটা হাতছাড়া হয়ে গেল।' সাধারনতঃ আমি এর আগের ট্রেনেই রোজ ফিরি। আজও সেটাই ধরতে আসছিলাম কিন্তু ট্র্যাফিক জ্যামে সব ভেস্তে গেল। ভদ্রলোক বাদাম চিবোতে চিবোতে বলতে শুরু করলেন,

"আসলে আমার আপনার কাছে একটা পরামর্শ নেওয়ার ছিল।" মনে যতই বিরক্তি থাকুক, কেউ নিজে যেচে আমার কাছে পরামর্শ নিতে চাইছে শুনে বেশ ভালো লাগলো। মনে মনে ভাবলাম - 'তাহলে হয়তো আমায় দেখে লোকটির বেশ পরিণত মনে হয়েছে, তাই পরামর্শ চাইছে'। লোকটির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। দেখতে বেশ সুন্দর। মাথার চুলগুলোতে অল্প পাঁক ধরেছে। চোখে চশমা। পরনে সাদা সুতির জামা আর খয়েরি রঙের প্যান্ট। লোকটি বলতে শুরু করলেন, "আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতক। তারপর পড়াশোনা শেষ হলে একটা ছোট কোম্পানিতে কেমিস্টের চাকরিতে ঢুকি। খুব বিশাল কিছু মাইনে না হলেও খুব খারাপও ছিলো না। বছর কয়েক বাদে বিয়েও করলাম। বাড়িতে তখন আমরা চারজন। আমি বাবা মা আর আমার বউ। কয়েক বছর বাদে আমার একটা ছেলে হলো। সে এখন ক্লাস সিক্সে পড়ে।" পরামর্শ দেবার আশায় শুনতে বসে লোকটির আত্মজীবনী আর সালতামামি শুনে খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললাম, "তা এখানে অসুবিধেটা কি আছে? পরামর্শই বা কি নেবেন?" লোকটি বোধহয় বুঝতে পারলেন যে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে। বললেন, "সে কথায়ই আসছি। রাগ করবেন না। আমি পাঁচ মিনিটের বেশি নেব না আপনার।" লোকটি চোখ থেকে চশমাটা খুলে পকেট থেকে রুমাল বার করে মুছতে মুছতে আবার বলতে শুরু করলেন, "কয়েক বছর পর বাবা মারা গেলেন। মা ও বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লো। সময়ের সাথে সাথে বুঝলাম আমার স্ত্রীয়ের একটু মানসিক রোগ আছে। ডাক্তার দেখানোর চেষ্টা করেও ফল হলো না। আমার মায়ের সাথে তার নিত্য ঝামেলা। আসলে আমার মাকে দেখাশোনা করা তার পছন্দ নয়। আদপে আমার বউটি অত্যন্ত একাসারে এবং সন্দেহপ্রবণ। আমার মেয়ে-বন্ধু এবং সহকর্মীদের সাথে কথা বলা নিয়েও সে আমার উপর সন্দেহ করতে শুরু করলো। বাড়িতে রোজ অশান্তি লেগেই থাকতো। ক্রমশঃ মা আরও অসুস্থ হয়ে পড়লো। আমার বন্ধুমহল বলেও বিশেষ কিছু রইলো না। বছর কয়েক আগে, আমি যে কোম্পানিতে চাকরি করতাম সেটা বন্ধ হয়ে যায়। আমার বউ মোটেই মিতব্যয়ী নয়। ফলে কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় সব জমানো টাকা শেষ হয়ে গেল। সবশেষে পেটের দায়ে হকারি শুরু করলাম। যদিও বাড়িতে কাউকে কিছু বলিনি।" লোকটির কথা শুনে এবার আমার বেশ করুণা হলো। বললাম, "তা আপনি কি আমার কাছে চাকরি-বাকরির ব্যাপারে পরামর্শ চান?" লোকটি বললো "না। ঠিক তা নয়।" আমি বললাম, "তাহলে?" লোকটি বললো, "মায়ের অসুখ, বউয়ের মাথার দোষ, ছেলের পড়াশোনা, অনেক টাকার দরকার। কিন্তু আমার তো সে ক্ষমতা নেই। তাহলে কি আমার আত্মহত্যা করা

উচিত?" লোকটির কথা শুনে আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। যেন একটা ঠান্ডা শিহরণ বয়ে গেল শরীরের ভিতর। বললাম, "ছি ছি। কি বলছেন? আত্মহত্যা মহাপাপ। আপনি তো এতদিন লড়াই করে এসেছেন। এবারও পারবেন। হাল ছাড়বেন না। আর ওসব কথা কখনও মাথায় আনবেন না।" আমার কথা শুনে লোকটাকে যেন সামান্য হলেও ফুরফুরে লাগলো। লোকটিবললো, "অনেক ধন্যবাদ। আমি এই পরামর্শটাই চাইছিলাম। আমার ষ্টেশন এসে গেছে। ভালো থাকবেন।" বাইরে তাকিয়ে দেখলাম ট্রেন তখন অনেকটা ধীরগতিতে স্টেশনে এসে ঢুকছে। ট্রেন দাঁড়াতেই লোকটি নেমে গেল। নামার আগে একবার হাসিমুখে আমার দিকে তাকালো। লোকটি নেমে যাবার পর প্রথমে লোকটার উপর যেরকম রাগ হচ্ছিলো, এবার বেশ মায়া হল, লোকটির পরিস্থিতির কথা ভেবে। প্রায় মাসখানেক পর, সেদিনও আমি আমার রোজকার ট্রেনটা পাইনি। পরের ট্রেন ধরেছি। ট্রেনে আজ তুলনামূলক বেশি ভিড়। আমি তাই ভিতরে না ঢুকে দরজার পাশে দাঁড়িয়েছি। ট্রেনে উঠতেই অদ্ভুতভাবে কেন জানিনা লোকটার কথা একবার মাথায় এলো। যদিও চারপাশে তাকিয়ে তাকে দেখতে পেলাম না। ট্রেন ছাড়বার কিছুক্ষণ পর, হঠাৎ করে একটা গলা কানে এলো। "আপনার কাছে পাঁচ মিনিট সময় হবে?", কণ্ঠস্বরটা খুব চেনা। পিছনে ফিরে দেখি ঐ লোকটা। আসলে আমি আগে খেয়াল করিনি, লোকটি আমার ঠিক পিছন দিকে বসে ছিলো। যদিও আমি মুখ না ফেরালে উনি আমায় দেখতে পারবেন না। যাইহোক কিছুক্ষণ ধরে কান পেতে রইলাম লোকটি আর তার পাশে বসা লোকটির কথোপকথনে। তারপর যা শুনলাম সব কিছুই একদম একভাবে উনি অনর্গল বলে গেলেন। এবং সবশেষে আবার আজকের লোকটিও আমার মতো ওনাকে আত্মহত্যা না করবার পরামর্শ দিলেন। আমার খুব অদ্ভুত লাগলো। মনে মনে ভাবলাম লোকটা কি পাগল? রোজ এক কথা সবাইকে কেন জিগ্যেস করে বেড়ায়। অদ্ভুত রকম একটা রাগ হলো। এরপর বেশ কয়েকদিন ধরে আমি রাতে ঐ ট্রেনেই ফেরা শুরু করলাম। খেয়াল করে দেখলাম লোকটি কোনো নির্দিষ্ট কামরায় ওঠেন না। তবে রোজ একজন করে নতুন লোকের কাছে পরামর্শ অবশ্যই চান। এবং রোজই সবাই তাকে সেই একই পরামর্শ দেয় যা আমি তাকে দিয়েছিলাম। খুব সাধারণ ব্যাপার, কেউ আত্মহত্যা করতে চাইলে যেকোনো সুস্থ মানুষই তাকে মানা করবে। কিন্তু এরকম করবার কারণ কি? আমার কৌতূহল হলো। কেন লোকটি এরকম রোজ করেন। একদিন ঠিক করলাম ওনাকে জিগ্যেস করবো। সেরকম ভেবে ট্রেনে উঠে কিছুক্ষণ ওনার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রইলাম। লোকটি হয়তো আমায় চিনতে পারলেন না, বা চিনেও না চেনার ভান করলেন। স্টেশন আসতেই লোকটি নেমে গেলেন। আমিও তার পিছু নিলাম। অন্ধকার স্টেশনে লোকটিকে "দাদা শুনছেন!" বলে ডাকতেই পিছন ফিরে তাকালেন। আমি বললাম, "চিনতে পারছেন? সেদিন ট্রেনে আলাপ হলো। আপনি আপনার পরিস্থিতি আমায় বললেন। আমি আপনাকে আত্মহত্যা না করার পরামর্শ দিলাম।" লোকটির ফ্যালফ্যাল করা চাহনি বলে দিলো যে উনি আমায় চিনতে পারেননি। তবে খানিকটা ভদ্রতা রক্ষার খাতিরেই বললেন, "হ্যাঁ পারছি। বলুন কেমন আছেন?" আমি কোনো রাখঢাক না করেই বললাম, "আমি লক্ষ্য করেছি আপনি রোজই ফেরবার সময় আপনার পরিস্থিতির কথা কাউকে না কাউকে শোনান এবং কি করা উচিত তার পরামর্শ চান। তা আপনি এটা কেন করেন। কি পান? এটা কি আপনার খুচরো বিনোদন?" লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমি আপনাকে যে যে কথাগুলো বলেছি প্রতিটাই সত্যি। আসলে রোজই বাড়ি ফেরার আগে, নিজের পরিস্থিতির কথা মাথায় আসলে, মনে হয় আজ আর ফিরবো না, রেল লাইনে গলা দিই। আপনাদের মত কাউকে মনের কথা বলে বেশ হাল্কা লাগে। তারপর আপনাদের দেওয়া পরামর্শতে মনে জোর পাই। এভাবেই একটা একটা দিন নিজেকে শক্ত করি, বেঁচে থেকে লড়াই করি। আপনারা না থাকলে কবেই হয়তো মরে যেতাম? আর কি জানেন তো - ব্যক্তিগত সমস্যা চেনা লোকের থেকে অচেনা লোককে বলা অনেক সহজ। তাতে কোনো দ্বিধাবোধ হয় না। আচ্ছা আমি আসছি। আমার ছেলে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।"
লোকটি চলে যাওয়ার পর আমি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। প্রথমে ওনার দিকে তারপর অন্ধকারের দিকে। এরপর মাঝে মাঝেই আমি ঐ ট্রেনে ফিরতাম। খুঁজে বার করতাম লোকটিকে, শুনতাম তার গল্প। কি পেতাম জানিনা, কিন্তু শুনতে ভালো লাগতো। লোকটির নাম না জানলেও, ওনার কথা শুনে আমিও যেন মনের জোর পেতাম। ট্রেনের সেই লোকটার গল্পটা শুনে......।

 

প্রেমের দহন

শ্রী রণেশ চন্দ্র মজুমদার

শহরের আদিম ঘিঞ্জি এলাকায় আজন্ম বাস। ঘোষনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবীবিদ্যায় প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে প্রথম ক্যাম্পাস দর্শনেই মোহিত। এ তো কল্প লোক! দিগন্ত বিস্তীর্ণ ক্যম্পাস। ঘাসের কার্পেট । বিশাল গম্ভীর ছায়াঘন প্রাচীন সব গাছ বেয়ে উঠেছে হাতির কানের মত পাতাওয়ালা মানিপ্লান্ট। আরো কত ধরণের লতা! আবার জায়গায় জায়গায় ফুল্লকুসুমিত বাগানের হিন্দোল।

     নায়িকার নাম প্রথমে ভেবেছিলাম শঙ্খমালা। কিন্তু তার ঘন, ভ্রমর কালো, যুগল ভুরু। বিশাল চোখ দুখানা। কৌতুকে, বুদ্ধিতে, জীবনানন্দে সদা ঝিলমিল। স্বচ্ছসলিলা অতল হ্রদের হাল্কা ঢেউয়ের উপর যেন সূর্যের কিরণ। এই চোখ দুখানার জন্য নায়িকার নাম দিয়েছি সুলোচনা। কিন্তু আপনি তো ওর সুলোচন যুগল দেখেননি। কাজেই আপনি ইচ্ছামত অন্য যে কোনো নাম দিতে পারেন। আপনার মনের পরম মমতার ঘরটিতে যেসব আহ্লাদি, দুলালী, রাঙা মাথায় চিরুনি রাজকন্যাদের স্থায়ী বসত, তাদেরই যে কোনো একজনের নাম।
     শহরের আদিম ঘিঞ্জি এলাকায় আজন্ম বাস। ঘোষনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবীবিদ্যায় প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে প্রথম ক্যাম্পাস দর্শনেই মোহিত। এ তো কল্প লোক! দিগন্ত বিস্তীর্ণ ক্যম্পাস। ঘাসের কার্পেট । বিশাল গম্ভীর ছায়াঘন প্রাচীন সব গাছ বেয়ে উঠেছে হাতির কানের মত পাতাওয়ালা মানিপ্লান্ট। আরো কত ধরণের লতা! আবার জায়গায় জায়গায় ফুল্লকুসুমিত বাগানের হিন্দোল। কত রং বাহার! কাঠবিড়াল আর হরেক পাখির ফুড়ুক-ফাড়ুক। স্বচ্ছ জলের ঝিল। মাছরাঙা। পানকৌড়ি। হাঁসগুলো নিশ্চয় বুনো । সুনীল আকাশ। উড়ন্ত চিল গুলোর ডানায় যেন সোনালী রোদের গন্ধ। ছেলেরা মেয়েরা ঘুরছে ফিরছে হাসছে বকবক করছে। হাত ধরাধরি। কোমর, গলা জড়াজড়ি। ঝিল ধারের কুঞ্জ ছায়ায়, ফাঁকা ক্লাস রুমে, সিঁড়িতে আশ্লিষ্ট যুগল।

অজ্ঞাত যৌবনা সুলোচনা সহসা সুপ্তোত্থিতা।                         মানবীবিদ্যা বিভাগে করিডোরে দেওয়াল ভর্তি ছবি আর ছবি। সবথেকে  নজরকাড়া বিশাল ছবিটির ফোরগ্রাউন্ডে রাজা রামমোহন। চোখে জল টলটল। ব্যাকগ্রাউন্ডে, তলার লেয়ারে, পুরোহিত, বাজনদার, উৎসাহী দর্শক বৃন্দের মাঝখানে একটা গনগনে চিতার দিকে এক মানবীকে ঠেলে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কম্প্যুটার গ্রাফিক শিল্পীর কুশলতায় সব জীবন্ত। মানবীটির আর্তনাদ দর্শকের যেন কানে বাজে। সুলোচনা প্রথম ক’দিন ঐ ছবির সামনে দিয়ে চলতে শিউরে উঠতো। নির্ধারিত দিনে মানবাধিকারীর তত্ত্বাবধানে, নবাগতা মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করার অধিকার নিলাম হলো। সুলোচনার সঙ্গে প্রেম করার অধিকার নিলামে পেয়েই, কাগজ পত্র নিয়ে, তার অভিসারক , দয়িতাকে ভোগদখল করার জন্য খুঁজে পেতে করিডোরে পেয়ে প্রেমের প্রস্তাবটি দিল। তার চোখে তাকাতেই সুলোচনার মনের চোখে চিতা লেলিহান। সে কোন কথা না বলে, ধীর পায়ে  সরে গেল ।
       কিন্তু পিরীতি কাঁঠালের আঠা। এবং দস্তুর মত নিলামে পাওয়া। অভিসারক লেগে থাকলো। করিডোরে, ক্যান্টিনে, লাইব্রেরিতে, অটো স্ট্যান্ডে, সর্বত্র, বিভিন্ন আঙ্গিকে, নানা ঘরানায় প্রেমের প্রস্তাব পেশ করেই চল্লো। হস্টেলের ঘরে, এমনকি পুরী নিয়ে যেতে চাইল। দয়িতার বাড়িতেও ধাওয়া করলো। প্রেমিক আরকি করতে পারে? ওর পাগল

পাগল ভাব। অথচ, সুলোচনা কদাপি, ওর সঙ্গে একটা কথাও বলে না। ক্যাম্পাসে গবেষণা: মেয়েটা তো লেসবিয়ানদের রামধনু রাঙা ব্যাজ পরে না। স্ট্রেট। তবে বেচারা অভিসারককে এত ল্যাজে খেলাচ্ছে কেন? নিলামের মর্যাদা ধুলোয়! ঐকমত – মহা ঠ্যাঁটা। ছেছড়ি। অভিসারকের উপর সমস্ত ক্যাম্পাসের পরিপূর্ণ সহানুভূতি।       একদিন ক্যাম্পাস জানলো সুলোচনা মাইগ্রেশান নিয়ে চলে যাচ্ছে। ক্যাম্পাস অধীর আগ্রহে সমাপ্তি অনুষ্ঠানের প্রতীক্ষায়। শেষের আগের দিন। এক বান্ধবীর আমন্ত্রণে সুলোচনা ক্যান্টিনে বিদায়ী ভোজ খেতে গেল। আজ অস্বাভাবিক ভিড়। ও পৌছতেই ভিড় দুভাগ হয়ে ওকে রাস্তা করে দিল। ওরই জন্য একটা খালি চেয়ার। ও বসতেই উলু।শাঁখ। বিয়ের গান।গাল বাদ্য। এসবের মাঝে ক্যান্টিন পরিচালক স্বয়ং মুচকি হাসি মুখে, বিশাল একটা কাঁসার থালায় অনেক ক’টা বাটি সাজিয়ে  সামনে নামিয়ে দিল। সুলোচনা দেখে: সুক্তো, ডাল, আলু ভাজা, গলদা, পাকা মাছ, মাংস, চাটনি, পায়েস, পোলাও। অবিশ্রান্ত উলু, শাঁখ, গানের মাঝে বিমূঢ়া, স্থানু সুলোচনার বান্ধবী আর ক’টা মেয়ে সমস্বরে কলকলিয়ে বল্লো: “আজ তোর আইবুড়ো ভাত। খেয়ে নে”। 
     সুলোচনা ফ্যালফ্যাল করে এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ দেখে টেবিলের ওপারে তার দিকে তাকিয়ে অভিসারক। অজানা  তীব্র ত্রাসে সুলোচনার মুখ কড়ির মত সাদা, হাত পা হিম। না খেয়ে উঠে যাচ্ছিল। সবার চিৎকারে বাধ্য হয়ে একগ্রাস মুখের কাছে আনতেই নিমতলা শ্মশানের মানুষ পোড়ানোর উৎকট গন্ধে প্রবল বিবমিষা। ওয়াক করতেই, “পেট ”আর “মাস” নিয়ে ইতি উতি ছোড়া ছোড়ি হওয়া রসিক মন্তব্যগুলো তো আন্দাজ করতেই পারছেন। সুলোচনা  কোনোমতে  চেয়ার ছেড়ে  টলমল করতে করতে , চুপচাপ উঠে গেল।    
     পরদিন সুলোচনা মাইগ্রেশান নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। দলবল আর ব্যান্ড পার্টিনিয়ে অভিসারক গেটে আটকালো। “এতদিন নাচালি! আজ তোর গায়ে হলুদ দিয়ে তবে যেতে দেবো”। সুলোচনা ওর চোখে নিজের সর্বনাশ দেখে প্রবল কম্পমানা। উৎসুক দর্শক গিজগিজ। ব্যান্ড, শাঁখ, উলু। সুলোচনাকে পিছমোড়া করে অভিসারক গেটের সঙ্গে বাঁধলো। হাঁটুর উপরে সর্বাঙ্গ নির্বসনা করে নতুন গামছা জড়িয়ে দিলো। তারপর  অভিসারক, সুলোচনার মাথা থেকে জঘন অ্যাসিড-ধৌত করলো। ব্যান্ডে বাজছিল: পরান যায় জ্বলিয়া রে।
     সুলোচনার দুটো সুলোচনই গলে গেলো। মুখমন্ডল থেকে জঘন—জ্বলে,গলে,দলা দলা পাকিয়ে গেলো। অনেক হাড় বেরিয়ে গেলো। মিনিট দুই/তিনের মধ্যেই সব মিটে গেল।
       বাজারী কাগজের রিপোর্টের শিরোনামা দিল: প্রেমের দহ।

বিবাহ উৎসব

জয়দীপ চক্রবর্তী

(বেলঘোরিয়া, কলকাতা)

সুসজ্জিত বিয়ের কার্ড তৈরি হল। একটি সুদৃশ্য ফিতে বাঁধা বাক্স। যার মধ্যে অনেকগুলো কার্ড। একটিতে ইংরাজিতে লেখা আমন্ত্রণ পত্র, একটিতে বাংলায়, আর একটি রয়েছে হিন্দিতে। একটি কার্ডে ইংরাজি হরফে রয়েছে অনুষ্ঠান বাড়ির যাওয়ার পথ নির্দেশ। এছাড়া প্রতিটি আমন্ত্রণ বাক্সে একটি ফর্ম রয়েছে।

    রিমোট কন্ট্রোল চিরদিন একজনের হাতে থাকে না। ছেলেকে এক সময়ে খেলার মাঠ থেকে টেনে প্রাইভেট টিচারের পাঠ নিতে বাধ্য করেছে যে বাবা, সেই বাবাকেই এখন ছেলের কথা মেনে শক্তিগড়ের ল্যাংচা ছেড়ে নিম-বেগুন বা উচ্ছের তরকারি খেতে হয়। নিজের শরীরের ভালোর জন্য সে নয় খাওয়া যায়, কিন্তু নিজের একমাত্র ছোটো-মেয়ের বিয়ে কখনই পঞ্জিকা না মেনে দেওয়া যায় না। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়ার জন্যও যুক্তি খাড়া করল ছেলে সৌরজ্যোতি।

-         পঞ্জিকা মেনে বিয়ের ডেট ঠিক করা যাবে না বাবা। তাতে অসুবিধে অনেক। বিয়ের ডেটটা আমাদের সুবিধে মতই ফেলতে হবে।

-         বিয়ে আবার নিজেদের ইচ্ছেমত ডেটে হয় নাকি? কালে কালে আর কত শুনবো!

-         অবাক হওয়ার কিছু নেই বাবা। বিদেশে এই কনসেপ্টেই দুর্গাপূজা হয়। ওদেশে পাঁজি মেনে চার-পাঁচদিন ধরে দুর্গাপূজা করার কারো সময় নেই। যে ডেটেই পূজা পড়ুক না কেন, ওরা উইক এন্ডেই করে। তাছাড়া দিন, ক্ষণ, লগ্ন মেনে বিয়ে হলেই যদি সবার ম্যারেজ লাইফ সুখের হয়ে যেত, তবে  এতো ডিভোর্স হোতো না, আর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এতো ঝগড়া বিবাদও সব সময় লেগে থাকতো না।

-         তাহলে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করলেই হয়। এতো ঘটা করে নিয়ম মেনে বিয়ে দেওয়ার কি দরকার আছে।

-         না,না। রেজিস্ট্রি ম্যারেজে ভিডিও শুটের স্কোপ কোথায়? তাছাড়া মাম্পির বিয়ে বলে কথা। শুধু তো বিয়ে, বৌভাত নয়, আইবুড়ো ভাত, মেহেন্দি, সঙ্গীত, তত্ত্ব সাজানো, প্রি-ওয়েডিং ভিডিওগ্রাফি, হাজারও অনুষ্ঠান। এতো ছুটি তো পাওয়া যাবে না। আমি পেলেও পাত্র নিজেই পাবেনা। দেবসুর্যই তো ফোন করে আমাকে বলল, বিয়েটা স্যাটার ডে ফেললে ওর সুবিধে হয়। ফ্রাইডে গুড ফ্রাইডে। ওর তিন দিন পরপর ছুটি আছে। সোম,  মঙ্গল দুদিন ছুটি নিলেই তবে হয়ে যাবে। আমি গ্রিন সিগন্যাল দিলে ও ফ্রাইডে ফ্লাইটের টিকিট কাটবে।

-         ও, সবকিছু ঠিকই করে ফেলেছ। তাহলে আমাকে জিজ্ঞাসা করছ কেন?

-         বাবা, তুমি রাগ না করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর। বিয়ের পাঁচ ছয়মাস আগে বিয়ের ডেটে কোনও বিয়ে বাড়ি পাবে না। মাম্পির বিয়েতে প্রায় হাজার খানেক নিমন্ত্রিত থাকবে। যে সে বিয়েবাড়ি ভাড়া করলে চলবে? তাছাড়া বিয়েটা তো ঐ বৈশাখ মাসেই হচ্ছে। শুধু কয়েকটা দিন আগে পরে এই যা।

মনে না নিতে পারলেও ছেলের যুক্তিকে মেনে নিতেই হল সৌম্যজিতকে। অবসর-প্রাপ্ত ব্যাঙ্ক ম্যানেজার সৌম্যজিত গোস্বামীর দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ে দেবস্মিতার বিয়েটা স্ত্রী মহামায়ার আপত্তি সত্ত্বেও একটু তাড়াতাড়িই দিয়েছিলেন উনি। দেবস্মিতা তখন সবে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। ছেলে সৌরজ্যতি চাটার আকাউন্টেন্ট। বেশ নামকরা একটি বেসরকারি কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত। ছোটোমেয়ে মাম্পি ওরফের ত্রিপর্না ছোটো থেকেই পড়াশোনায় বেশ ভালো। প্রাথমিক পড়াশোনার গণ্ডি কৃতিত্বের সাথে পেড়িয়ে ট্রান্সলেশনাল মেডিসিন নিয়ে পড়ার জন্যে লন্ডনে যায়। ওখানেই প্রবাসী বাঙালী দেবসুর্যের সাথে ওর পরিচয় হয়। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে আপাতত নিজের দেশে ফিরে এলেও বিয়ের পর ঐ দেশের কোনও রিসার্চ সেন্টারের সাথে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে আছে মাম্পির।

দেবসুর্য ও ত্রিপর্ণার বিয়ের দিন স্থির হয়ে গেল। অকাল বোধনের মতো অকাল বিয়েই ঠিক হল। আর সেই সঙ্গে চলল নানা রকম প্রস্তুতি পর্ব। ইভেন্ট ম্যানেজার নখদর্পণ ধরের উপর সম্পূর্ণ দায়িত্বটা থাকলেও প্রতিটি বিভাগ তত্বাবধনের দায়িত্ব বাড়ির লোকজনদের উপরই রইল।

বেশ বড়সড় একটা রিসোর্ট ভাড়া করা হল। সামনে অনেকটা জায়গা নিয়ে একটা উদ্যান রয়েছে। তার কিছুটা অংশে রকমারি খাওয়ারের স্টল বসবে। আর কিছুটা ছাড়া থাকবে অতিথিদের গাড়ি রাখার জন্য। বিয়েবাড়িটির সবকিছু মনমতো হলেও এটা সৌরজ্যতিদের বাড়ি থেকে পাঁচটি স্টেশন পড়ে, একটি পাণ্ডব বর্জিত জায়গায়। আশেপাশে দোকানপাট তেমন নেই। তাই প্রয়োজনীয় সবকিছু আগের থেকে গুছিয়ে নিয়ে বিয়ে বাড়িতে যেতে হবে। বাড়ি থেকে ঘন-ঘন যাতায়াত করাত কোনও উপায় নেই।   

সুসজ্জিত বিয়ের কার্ড তৈরি হল। একটি সুদৃশ্য ফিতে বাঁধা বাক্স। যার মধ্যে অনেকগুলো কার্ড। একটিতে ইংরাজিতে লেখা আমন্ত্রণ পত্র, একটিতে বাংলায়, আর একটি রয়েছে হিন্দিতে। একটি কার্ডে ইংরাজি হরফে রয়েছে অনুষ্ঠান বাড়ির যাওয়ার পথ নির্দেশ। এছাড়া প্রতিটি আমন্ত্রণ বাক্সে একটি ফর্ম রয়েছে। ঐ ফর্মে আমন্ত্রিতের সংখ্যা, উপস্থিত হইবার সম্ভাব্য আমন্ত্রিত, কার পার্কিং দরকার কিনা, ড্রাইভার সাথে যাবে কিনা, প্রভৃতি লেখার জায়গা রয়েছে। নিমন্ত্রণ করার সময় যিনি নিমন্ত্রণ করছেন, তিনি ফর্মটা বের করে নিমন্ত্রণ বাক্সটি আমন্ত্রিতের হাতে দেবেন। এবং আমন্ত্রিতের সাথে কথা বলে ফর্মটি পূর্ণ করবেন। এই ফর্ম থেকেই বিয়ের দিন সম্ভাব্য উপস্থিত আমন্ত্রিতের সংখ্যা, ড্রাইভারদের জন্য প্রয়োজনীয় পার্সেলের একটা ধারনা পাওয়া যাবে।

আমন্ত্রিতের তালিকায় পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়, কিছু

আত্মীয়ের আত্মীয়, যেমন দেবস্মিতা, সৌরজ্যতির মামা শ্বশুর, কাকা শ্বশুর, কাছের বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, সৌরজ্যতির অফিস কলিগ, বন্ধু-বান্ধব, সৌম্যজিত বাবুর এক্স অফিস কলিগ, বন্ধু-বান্ধব, মহামায়া, ত্রিপর্নার বন্ধু-বান্ধব, কেউই বাদ পড়ল না।   দেবস্মিতার মেয়ে ঐন্দ্রিলা ক্লাস এইটে পড়ে। আঁকার হাত ভীষণই ভাল। তাই আলপনার দায়িত্ব ওকে দেওয়া হয়েছে। অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মাসির বিয়ে। তাই পড়াশোনার চাপ নেই। নিশ্চিন্তে বিয়ে এনজয় করতে পারবে। কিভাবে আলপনা দেবে তা এখন থেকেই ভেবে রেখেছে ঐন্দ্রিলা। সাধারণ রঙ নয়। বিভিন্ন রঙের আবীর, হলুদের গুঁড়ো, চকের গুঁড়ো, প্রভৃতি দিয়ে রঙ তৈরি হবে। দোলের সময় অনেক রকম আবীর কিনে বিয়ের জন্য সরিয়ে রাখতে হবে ঐন্দ্রিলাকে।  

আলপনার সঙ্গে তত্ত্ব সাজানোর টিমেও ঐন্দ্রিলা রয়েছে। তত্ত্ব সাজানোর মুল দায়িত্বে রয়েছে সৌরজ্যতির স্ত্রী দেবাঞ্জনা। অনেক তত্ত্ব। একার হাতে করা সম্ভব নয়। দেবাঞ্জনা তাই চার-পাঁচ জনের একটা টিম করে নিয়েছে।

বিয়ের কেনাকাটা অনেক আগে থেকে শুরু হলেও কিছু জিনিষ বাদ থেকেই যায়। কোনের গয়না, বড় কোনের পোশাক, দেবাঞ্জনার ডিজাইনার ল্যাহেঙ্গা প্রভৃতি কেনা হয়ে গেলেও কিছু প্রণামী শাড়ি সহ তত্ত্বের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু বাকি থেকে গেল। বিয়ের একমাসও বাকী নেই। প্রতিটি দোকানেই চৈত্র সেলের ভিড়। তার মধ্যেই কেনাকাটা সারতে হল ত্রিপর্না, দেবাঞ্জনাদের।

বিয়ের এক সপ্তাহ আগে থেকেই অতিথিদের আগমন শুরু হয়ে গেল। দেবস্মিতার পরিবার, ওদের মাসি, পিসির পরিবার, ত্রিপর্নার স্কুল লাইফের এক বন্ধু, এক এক করে সকলেই এসে উপস্থিত হল। বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল করে এক সপ্তাহ ধরে খাওয়া দাওয়া চলল। এতো লোকের থাকার ব্যবস্থা ঐ বাড়িতে করা সম্ভব নয়। তাই পাড়া প্রতিবেশীর সাহায্যের আশ্রয় নিতে হল।

বিয়ের ঠিক আগের রবিবার, বাড়ির কাছে একটি অনুষ্ঠান বাড়ি ভাড়া করে ত্রিপর্নার আইবুড়ো ভাত অনুষ্ঠিত হল। শ-তিনেক লোক আমন্ত্রিত হল এই অনুষ্ঠানে। মাংস না থাকলেও তিন রকমের মাছ সহ অনুষ্ঠান বাড়ির নিয়মিত বিভাগের সকল মেনুই খাদ্য তালিকায় স্থান পেয়েছে। ফটোগ্রাফি, সেলফিগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফির মধ্যমে অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত পিঞ্জরিত হল। এই অনুষ্ঠান যেন মুল বিয়ের অনুষ্ঠানের ট্রেলার। মুল অনুষ্ঠানটি কেমন হবে, তা এই ট্রেলার দেখে সহজেই অনুমেয়।

বাড়ির সামনে সুসজ্জিত প্রবেশ দ্বার ও কৃত্রিম জোনাকি বাল্বের আলোক সজ্জা সৌরজ্যতিদের বাড়িটাকে আর পাঁচটা বাড়ি থেকে আলাদা করে রেখেছে। সমবয়সী মহিলা পুরুষদের আড্ডা, ইয়ার্কি, হাসাহাসি, খুনসুটি বাড়িটাকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে। এখন যেকোনো কারণেই কারণ-সুধা উপস্থিত থাকে। এখানেও তার কোনও ব্যতিক্রম নেই। বাড়ির এক কোনে একটা আড়াল খুঁজে সোমরসের আসক্ত, ভক্তরা তা সেবন করছে। কচিকাঁচারা বাবা-মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে কেউ গেম খেলছে, কেউ বা ইউটিউবে নানা ধরনের ভিডিও দেখছে। এভাবেই মুল অনুষ্ঠানের দিন এগিয়ে আসছে।      

বিয়ের দুদিন বাকি। বিয়ে বাড়িতে মেহেন্দি উৎসব চলছে। পার্লার থেকে দুইজন ভদ্রমহিলা এসে মেহেন্দি পরাচ্ছে, আর পাত্রী সহ সব মেয়েরাই লাইন দিয়ে দুহাত পেতে মেহেন্দি পরছে। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় সজনের অনেকেই রয়েছে সেই মেহেন্দি পরার দলে। দুজনে পরিয়ে কুল করতে পারছে না। পরিস্থিতি সামলাতে ঐন্দ্রিলাও নেমে পড়ল মেহেন্দি পড়াতে। পেশাদারীদের চেয়ে কোনও অংশে কম হল না ওর শিল্প। বরং নতুনত্বের স্বাদ মিশে হস্ত শিল্পগুলি আলাদা করে সকলের নজর কাড়ল। সকল হাতের শিল্পকলাই ক্যামেরা-বন্দী হল।    

বিয়ের আগের দিন মহামায়ার মনে পড়ল যে খুকুকে বলা হয়নি। খুকু হল সৌম্যজিতের খুড়তুতো বোন। ডিভোর্সি। ছেলেকে নিয়ে একাই থাকে। কারো সাথেই তেমন যোগাযোগ নেই। এদিকে দেবসুর্য আসছে। ত্রিপর্ণাকে নিয়ে দেবসুর্যকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে যাবে সৌরজ্যতি। সঙ্গে থাকবে ভিডিও ফটোগ্রাফার। সবাই মিলে ইকোপার্কে যাবে প্রি-ওয়েডিং স্যুট করতে। তাই খুকুদিকে নিমন্ত্রণ করা সৌরজ্যতির পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক কষ্টে নম্বর যোগার করে ফোন করলেন সৌম্যজিত। খুকুর ছেলে ধরল।

-         খুকু আছে?

-         না, আপনি কে বলছেন?

-         আমি ওর সৌম্যদা বলছি।

-         ও, বড়মামু। মা তো নার্সিংহোমে ভর্তি। হিমোগ্লোবিন খুব কমে গেছে। ডাক্তার ই 

মিডিয়েটলি রক্ত দিতে বলেছে। মাকে কিছু বলতে হবে?

-         না, অনেকদিন কোনও খবর পাইনা, তাই ফোন করেছিলাম।

-         আমি তো এখন ব্লাড ব্যাঙ্কে আছি। নার্সিংহোমে গিয়ে মাকে তোমার কথা বলব। তুমি ফোন করেছ শুনলে মা খুশি হবে।

-         ঠিক আছে। এখন তবে রাখি। পড়ে ফোন করে খবর নেব।

ফোন রেখে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন সৌম্যজিত।

শুটিং শেষ করে দেবসুর্যকে ওর মামা বাড়ি পৌঁছে দিল সৌরজ্যতিরা। মামাবাড়ি থেকেই বিয়ে করতে আসবে ও। ভিডিও ফটোগ্রাফাররা আজ সন্ধ্যে বেলাতেই মেয়েদের

জলভরা, গঙ্গা নিমন্ত্রণের ভিডিও তুলবে। কাল অতো সকালে তাদের পক্ষে আসা সম্ভব নয়। বাড়ির কাছাকাছি পুকুর নেই। তাই একটি সুইংপুলে অধিকর্তাদের অনুমতি নিয়ে প্রক্সি   জলভরা, গঙ্গা নিমন্ত্রণ হল এবং তা চলমান ক্যামেরায় বন্দী হল। ত্রিপর্নাকে বাড়ি পৌঁছে, সৌরজ্যতি রিসোর্টে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে গেল। ত্রিপর্না বাড়ি ফিরে দেখল মা, বৌদিরা জল ভরার পর্ব শেষ করে বাড়ি ফিরেছে। ফটোগ্রাফাররা ত্রিপর্নার দধি-মঙ্গলের ভিডিও ও স্টিল ফটোগ্রাফিও ঐ দিনই সেরে নিলো। 

নখদর্পণ ধরের তত্ত্বাবধানে দশকর্মা সহ বিয়ের সমস্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী রিসোর্টে পোঁছে গিয়েছে। রিসোর্টটি সুসজ্জিত হয়ে উঠছে। পেশাদার শিল্পীদের দিয়ে তত্ত্ব সাজানো হয়েছে। বিয়ের কুঞ্জ প্রস্তুত হচ্ছে। দুই একটা ছোটোখাটো সংশোধন, পরিবর্তন করতে বলে একটু রাত করেই বাড়ি ফিরল সৌরজ্যতি।

পরের দিনের গোছ-গাছ ও গল্পগুজব করে সবাই এতো রাতে ঘুমল যে বিয়ের দিন কেউই ভোরে উঠতে পারল না। তাই ত্রিপর্নার দধি-মঙ্গলটা আর হল না। তবে আগের দিনই ফটো-স্যুট হয়ে যাওয়াতে কেউই তেমন চাপ নিলো না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে বাড়ির নানা কাজকর্ম ও ব্যস্ততা শুরু হল। অনুষ্ঠান বাড়ি ও এদিক সেদিক যাওয়ার জন্য বাড়ির গাড়িটি যথেষ্ট নয়। আরও দুটো গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। প্রথমে ঐন্দ্রিলা সহ আরও কয়েকজনকে প্রাতঃভোজন করিয়ে একটা ভাড়াগাড়িতে অনুষ্ঠান বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ওখানে পোঁছে ঐন্দ্রিলা বিবাহ-কুঞ্জে নিজের আলপনা শিল্পকর্ম শুরু করল। এরপর একে একে সকলেই অনুষ্ঠান বাড়িতে পৌঁছল।

যথা সময়েও ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদের তত্ত্ব এসে উপস্থিত হল। পাত্রপক্ষ প্রবাসী হওয়ায় বিয়ের নিয়ম-কানুনের সাথে অতোটা অভ্যস্ত নয়। তবে আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর পরামর্শ মত যতটা সম্ভব প্রচলিত নিয়ম মেনেই ছেলের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন ওনারা। গায়েহলুদ, স্নান, খাওয়া-দাওয়া প্রভৃতি সেরে ত্রিপর্না, সাজতে বসল। একটি নামকরা পার্লার থেকে বিউটিশিয়ান আনিয়েছে নখদর্পণ। ত্রিপর্না সহ সবার সাজগোজ সম্পূর্ণ হতে সন্ধ্যে গড়িয়ে গেল। ধীরে ধীরে আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করল। ক্রমশই বাড়টি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল। বিভিন্ন খাবারের স্টলের একপাশে একটি অস্থায়ী মঞ্চে অর্কেস্ট্রা সহযোগে কণ্ঠি সঙ্গীত পরিবেশিত হচ্ছে। তারই তালে তালে মঞ্চের সামনে কিছু আমন্ত্রিত অতিথি কোমর দোলাচ্ছে। এই কারণেই বিয়ের লগ্ন একটু রাতে ঠিক করেছে সৌরজ্যতিরা। 

সুসজ্জিত, অতিসজ্জিত, স্বল্প-বাসিত মহিলারা কখনও একক, কখনও বা সমবেত ভাবে সেলফী তুলে মোবাইল বন্দী করছে। ত্রিপর্নার সাথে ছবি তোলার জন্যও সকলে ব্যাকুল। ত্রিপর্নার এই চাপ এড়াতে ফটোগ্রাফাররা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছে। ওর কিছু ছবি তারা আগেই তুলে রেখেছে। এবারে যার ছবির সাথে জোড়ার দরকার তার ছবি তুলে ক্যামেরাতেই জুড়ে দিচ্ছে তারা। ছবি দুটি যে আলাদা ভাবে তোলা, তা ছবি দেখে একদমই বোঝা যাচ্ছে না। পুরো অনুষ্ঠানটি ফেসবুক লাইভ হচ্ছে। যে সকল আত্মীয় বন্ধুবান্ধবরা দূরে থাকার জন্যে, বা অন্য অসুবিধের জন্যে বিয়েতে আসতে পারেনি, তারাও অনুষ্ঠানটি দেখতে পাচ্ছে।

একটু দেরীতেই বর এসে উপস্থিত হয়েছে। বর বরণ, বর ও বরযাত্রীর আপ্যায়ন, ফটোগ্রাফির পর বরকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হল। সৌম্যজিত সম্প্রদান করবেন। নির্ধারিত মন্ত্রপাঠ চলল। নাচ গান, খাওয়া-দাওয়া সেরে বিয়ে দেখতে ভীর করেছে সবাই। নির্ধারিত সময়ে কনেকে আনা হল। সাত-পাঁক, শুভদৃষ্টি, মালাবদলের পর কন্যা সম্প্রদান হল। সবকিছু প্রথা মতোই চলছে। তবে একটু সংক্ষিপ্ত। ফটোগ্রাফির প্রয়োজনে ফটোগ্রাফারের নির্দেশে পাত্রপাত্রীদের  মাঝেমাঝেই স্ট্যাচু হতে হচ্ছে। যজ্ঞ শেষে সিঁদুর-দান পর্ব। পুরোহিতের নির্দেশে লজ্জ্বাবস্ত্র দিয়ে ঢাকা হল কনেকে। কিন্তু সিঁদুর কোথায়? পুরোহিতের ফর্দ অনুযায়ী নখ-দর্পণ যা যা এনেছে, তারমধ্যে সিঁদুর নেই।

সিঁদুর তো ছেলের বাড়ির তত্ত্বের সাথে আসে। বললেন মেয়ের এক আত্মীয়া। কিন্তু সেই তত্ত্বেও সিঁদুর নেই। ছেলের বাড়ির লোক বলল, আমাদের এইসব নিয়ম কানুন ভালো জানা নেই। আমাদের সিঁদুর পাঠানোর ব্যাপারে কিছু তো বলা হয়নি।

এখন কার দোষ সেটা না খুঁজে, কিভাবে সমস্যাটার সমাধান করা যায়, সেটা ভাবতে হবে।  সৌরজ্যতির বক্তব্য।

-         আশে পাশে কোনও দোকানও নেই। আর এতো রাতে কোন দোকানই খোলা থাকবে?

-         এখন বাড়িতে গিয়ে নিয়ে আসতেও বড্ড দেরী হয়ে যাবে।

-         একদম পাণ্ডব বর্জিত জায়গা। আশে পাশেও কোনও বাড়ি নেই।

-         আর বাড়ি থেকেই কি কোনও লাভ হোতো? এখন কোনও মহিলারাই গুঁড়ো সিঁদুর ব্যবহার করেনা। সিঁদুর স্টীক বা লিকুইড সিঁদুর দিয়ে কাজ সারে।

উপস্থিত সকলেই নানা রকম মন্তব্য করতে লাগলো। কিন্তু কারো কথাতেই সমাধান বেরিয়ে এলো না।

পুরোহিত মশাই বললেন, সিঁদুর স্টীক বা লিকুইড সিঁদুরই দেখুন না উপস্থিত কোনও মহিলার কাছে পাওয়া যায় কিনা। অগত্যা ওটা দিয়েই কাজ সারি।

না, না। ওসব চলবে না। ওতে ফটো ভালো উঠবে না। নাকে সিঁদুর না পড়লে আবার সিঁদুর-দান হল নাকি? ফটোগ্রাফার অসম্মতি প্রকাশ করল।

না না। লিকুইড সিঁদুর ফিদুর চলবে না। ফেসবুক লাইভ হচ্ছে। আমার বিদেশের বন্ধুরাও বিয়ে দেখছে। লোকে দেখে বলবে কি? কিন্তু কোনও উপায়ও তো দেখছি না। সৌরজ্যতির কথায় চাপা উত্তেজনা।               

বাড়ির বড় জামাই অংশুজিত এতক্ষণ চুপচাপ বসে কি যেন ভাবছিল। হঠাৎ মেয়ে ঐন্দ্রিলাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, তুই যা যা দিয়ে আলপনা দিয়েছিস, তার কি কিছু অবশিষ্ট আছে?

-         আছে তো। আমি গুছিয়ে যত্ন করে রেখে দিয়েছি।

-         ওখানে দ্যাখ তো একটু লাল আবির আছে কিনা।

-         হ্যাঁ আছে তো। অনেকটাই আছে। আমি এখুনি নিয়ে আসছি।

ঐন্দ্রিলা আবীর নিয়ে এলে অংশুজিত ওটা সৌরজ্যতির হাতে দিয়ে বলল, নেও এটা দিয়ে কাজ সারো। তোমার ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি বা ফেসবুক লাইভ, কোনটাতেই কিছু বোঝা যাবেনা।

দারুণ আইডিয়া। সৌরজ্যতি যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেল।

আবীর দিয়েই সিঁদুরদান পর্ব সাঙ্গ হল। খুব সুন্দর ফটো ও ভিডিও উঠল। সোশাল মিডিয়ায় কোনও ত্রুটিই প্রকাশ পেল না। শুধু  সৌম্যজিত ও মহামায়ার মনের কোথায় যেন একটা অতৃপ্তি রয়েই গেল।

শেষ থেকে শুরু

মৈত্রেয়ী মুখোপাধ্যায়

শহরের আদিম ঘিঞ্জি এলাকায় আজন্ম বাস। ঘোষনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবীবিদ্যায় প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে প্রথম ক্যাম্পাস দর্শনেই মোহিত। এ তো কল্প লোক! দিগন্ত বিস্তীর্ণ ক্যম্পাস। ঘাসের কার্পেট । বিশাল গম্ভীর ছায়াঘন প্রাচীন সব গাছ বেয়ে উঠেছে হাতির কানের মত পাতাওয়ালা মানিপ্লান্ট। আরো কত ধরণের লতা! আবার জায়গায় জায়গায় ফুল্লকুসুমিত বাগানের হিন্দোল।

     অনিতা দেবীর বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই। বারো বছর হলো তাঁর স্বামী গত হয়েছেন। দুই ছেলে মেয়েকে নিজের হাতে মানুষ করেছেন। ছেলে প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার।মেয়েও এই বছরই এক নামকরা কলেজের শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিয়েছে। শিক্ষকতা তাঁর ভালোবাসা ছিল, আর গান তাঁর প্রেম। সেতার বাজাতে পারেন চমৎকার। দশ বছর আগেই যদিও বিসর্জন দিয়েছেন গান।সংসারের চাপে তা আর ফিরে আসেনি অনিতা দেবীর জীবনে। 
তিনদিন আগে তাঁর ছেলের বিয়ে হয়েছে,প্রেমের বিয়ে।যদিও দেখাশোনা করেই হয়েছে।বৌমা কেমন ব্যবহার করবে তাঁর সাথে, ছেলেও কি পাল্টে যাবে? দূরে সরে যাবে মায়ের থেকে?...এসব ভাবনা বিচলিত করছে অনিতা দেবীকে। যা সব শোনা যায়...পাশের বাড়ির বৌদিও বলেছিলেন..নাঃ কিসব ভাবছেন,নিজের ছেলের ওপরেও ভরসা নেই? রুমিকেও নিজের মেয়ের চোখেই দেখবেন,সে ও তো অন্যৌ পরিবেশে এসেছে..গুছিয়ে দিতে হবে এদের সংসার...মেয়েটারও বিয়ে দিতে হবে..তবে ছুটি আমার।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন অনিতা দেবী। ছাদে গাছগুলোকে জল দিতে দিতে এসব ভাবছিলেন। হঠাৎ পিছন থেকে বৌমার গলা শুনে চমকে উঠলেন।

(২)

কয়েক দিন পর খেতে খেতে অরুন হঠাৎ বলল,"মা, তুমি

এতো সুন্দর সেতার বাজাও,আবার তো শুরু করতে পারো। তোমার জন্য এক ছাত্রী আছে।"
-"এতো বছর পর! কতদিন অভ্যা স নেই বলতো! গান বল,পড়াশুনো সবটাই সাধনা। আমি কি আর পারব?"
-"কেন পারবেনা মা? তুমি তো আমায় বলোনি তুমি সেতার -"মা, হলো তোমার?চলো চলো নিচে। একটা জিনিস আছে তোমার জন্য। চলো।"-"কি জিনিস?"-" চলো না দেখবে।সে, সুমি সবাই অপেক্ষা করছে।"-"আচ্ছা বাবা চল চল।"-"কেক! পায়েস!"-"Happy birthday to you ma" তিনজনে একসাথে বলল,আর সাথে হাততালি।-"আমার জন্মদিন মনে আছে তোদের!"-"মায়ের জন্মদিন সন্তানরা ভুলতে পারে, কেকটা কাটো জলদি।"বাচ্চাদের মতো বলে উঠল সুমি।-"পায়েসটা মা বৌদি বানিয়েছে,কেকটা আমি, আর এই গিফটটা আমাদের সকলের তরফ থেকে।"চোখে জল এসে গেল অনিতা দেবীর। সামলে নিলেন নিজেকে।-"বাঃ বেশ হয়েছে শালটা।"-"তোমার পছন্দ হয়েছে মা?" জিজ্ঞেস করল অরুন।-"হ্যাঁ রে বাবু। চল তোরা খাবি চল।" দিনটা ভালোই

কাটলো। রাত্রে শুয়ে ভাবছিলেন অনিতা দেবী। নাঃ,মেয়েটি যত্নশীলা,নিজের মায়ের মতোই আমায় দেখে..ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লেন। জানো? আমার খুব ইচ্ছে শিখবার। তোমার কাছে শিখব।"-"হ্যাঁ  মা , বৌদি ঠিক বলছে। কেন তুমি পারবেনা? আজকালকার দিনে কজন জানে?"-"না,না, তোরা বলিসনা আমায় এই নিয়ে।আর বৌমাকে আমার পরিচিত একজনের কাছে পাঠিয়ে দেব,যত্ন করে শেখাবে।"-"না আমি তোমার কাছে শিখব।please মা, না কোরোনা। তুমি practice করো পারবে অবশ্যই। এমনিও তুমি বলো সময় কাটেনা ঘরে বসে, এতে তোমার মনও ভালো থাকবে আর কিছুজন শিখতেও পারবে।" এক নিঃশ্বাসে বলল রুমি।-"মা, সবাই এতো করে বলছে,আর সৌরভ বলেছে তার মেয়েকে সেতার তোমায় শেখাতে হবে। না কোরোনা মা।" অনুনয় করে বলল অরুন।-"ঠিক আছে, ভেবে দেখছি। তোরা যা জেদ ধরেছিস।"পরের দিন ভোর বেলা সবার ঘুম ভাঙল. রাগ ভৈরবীর সুরে। সকলে বাইরের ঘরে এসে অবাক হয়ে গেল। চোখ বন্ধ করে নিবিষ্ট মনে তাদের মা সেতারে সুর তুলছেন! এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরী হয়েছে যেন! মায়ের সামনে এসে ওরাও বসে পড়ল। আস্তে আস্তে আকাশ অরুন আভায় রাঙা হয়ে উঠল, পাখিদের কাকলিতে চঞ্চল হয়ে উঠল যেন প্রকৃতি। রাগ শেষ হতে অনিতা দেবী জিজ্ঞাসা করলেন স্মিত হেসে,"কেমন?""অসাধারণ মা!" সবাই একসাথে বলে উঠল।-"যাক পাশ করেছি তবে।" -"আমাদের মা ফেল করতেই পারেনা।" মাকে জড়িয়ে ধরে বলল সুমি।-"একদম ঠিক। চলো খাবার ব্য বস্থা করি।" রুমি বলল।

        (৩) দেখতে দেখতে এক বছর কাটল। এখন অনিতা দেবী ব্য স্ত থাকেন। সেতার শেখার ক্লাসে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা  ক্রমশ বাড়ছে, এখনই ১২ জন। রুমিও শেখে, খুব উৎসাহ তার। তাছাড়া অবসরের সঙ্গী বই তো আছেই। বিকেলে ছাদে হাঁটা অনিতা দেবীর অভ্যে স। হাঁটতে হাঁটতেই ভাবছিলেন রুমিকে আর সকলের মতো ভেবে ভুল করতে যাচ্ছিলেন। বৌমা তাঁর কাছে মেয়ের চেয়ে কম নয়। তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে ভগবানকে ধন্যবাদ দেন এমন বৌমা পাওয়ার জন্য। এদের সবার উৎসাহেই তো আবার সব শেষ থেকে শুরু করতে পেরেছেন।তাঁর প্রথম 'প্রেম' ফিরে এসেছে জীবনে। জীবন সায়ান্থে দাঁড়িয়েও আজ নিজেকে সুখী বলতে তাঁর কোনো রকম দ্বিধা আসেনা। শান্তির শ্বাস ফেলে নিজের মনেই বলে উঠলেন,"সবার জীবনই যেন এরকম হয় ঈশ্বর।"
দিনের শেষে শ্রান্ত কুঁড়িটিও বেঁচে ওঠে নতুন উদ্যোগে বিকশিত হওয়ার অদম্য ইচ্ছায়। মানুষ কেন পারবেনা?

গ্রাহামের বেল 

পলাশ দাস (সত্যাকি)

নোয়াপাড়া, বারাসাত, পঃ বঙ্গ

সমস্ত স্বপ্নকে বাক্সবন্দি  করে বাস্তবের লড়াই-এ নেমেছে সুবিমল। এখন তার কাছে কাজ বাঁচিয়ে রাখাই বড় কাজ । পুরানো সেই মানুষকে ভুলিয়ে দিয়ে চলছে নতুনের আবিষ্কার । সে পথ সহজ নয় , তবুও লড়াই চলবে চলছে । যেখানে অতীত  জীবন পড়ে থাকবে উদাহরণ হয়ে , গ্রাহামের বেলের মতো ...  

...  কাল তখন দশটা - এগারোটা , বারাসাতের ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে সরু গলিপথ ধরে এগিয়ে চলেছে একটা লোক।  পরনে ছাপোশা  জামা প্যান্ট, কাঁধে ঝোলানো আধপুরানো ব্যাগ, ব্যাগের পেটটা বেশ মোটা, লোকটার চেহারা ততটাই খারাপ, পায়ে বেল্ট দেওয়া ধুলো মাখা জুতো, চুল উস্কোখুস্কো, গালে দু-একদিনের না কামানো দাঁড়ি , পাল্লা দিয়ে মুখটা শ্রাবণের আকাশের মতো গম্ভীর।শহরতলির সমস্ত শব্দ, ব্যস্ততা পিছনে ফেলে শান্ত গলিপথে লোকটা এগিয়ে চলেছে। রাস্তার পাশে সারি দেওয়া গাছ, তাতে বসে থাকা পাখিদের কথা বলার আওয়াজে মুখরিত হচ্ছে গলিপথ। দেখতে দেখত ধেয়ে আসে তাদের আশীর্বাদ।  কোনোরকমে নিজেকে বাঁচিয়ে নেয় সে।

      শহরতলিতে ব্যস্ততা খুব একটা  চোখে পড়ে না, তবে এখন অনেকটাই ব্যস্ত বলা যায়। এই গলিপথে কিন্তু সে ব্যস্ততা চোখে পড়েছে না। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি, তাদের গায়ে পাখিদের প্রাতকিত্যের উজ্জ্বল উপস্থিতি।গাছের পাতায় মুড়ি দেওয়া রাস্তা আর পাশের উঁচু বাড়ির গ্রিলের ফাঁক থেকে ক্লিপে উড়ন্ত পোশাকর রিমঝিম দোলাদুলি।  

একটা মোড় ঘুরতেই পায়ের কাছে ক্যাম্বিশের একটা বল গড়িয়ে এল। নিচু হয়ে কাঁধের  ব্যাগটা সামলে বলটা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দেয় খেলতে থাকা ছেলেগুলোর দিকে। ছেলেগুলো বলটা নিয়েই আবার শুরু করে দেয় খেলা। দাঁড়িয়ে ছেলেগুলোর খেলা দেখে কয়েক মিনিট। তারপর ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে এগিয়ে যায়। পাশ থেকে ছেলেগুলোর খেলার চিৎকার কিছু ধুলোপড়া স্মরণীয় মুহূর্ত হয়তো মনে করায়...  

খানিক পরে এক বড় গেটের সামনে এসে হাঁটা থামিয়ে গেটের পেট ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে। বেশ বড়  ভিতেরর জায়গাটা। বাইরে থেকে মনে হয় না এতটা বড় ভিতেরর অংশ। বেশ বড় একটা গ্যারাজ রয়েছে ভিতরে। সদর দরজার পাশে এক বৃদ্ধ টুলে বসে পা দোলাচ্ছে। সেদিকে না তাকিয়েই পাশের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায়।আলো আধারিতে মেশা পথ পার করে এসে পৌঁছায় একটা ঘরের সামনে।  ঘরটি বেশ অন্ধকার। জানালার কাঁচের

থেকে পিছলে আসা আলোতে দেখা যাচ্ছে - একটা টেবিল, দুপাশে দুটো চেয়ার। টেবিলে কাঁধের ব্যাগটা রেখে জানলা খুলে দেয়। বিদ্যুৎ চমকের মতো একঝটকায় বেশখানিকটা আলো আসে। গ্লাসের জল পাল্টে ফেলে জানলার পর্দা সরিয়ে দেয়। ফ্যান চালিয়ে চায়ারে হেলান দিয়ে বসে পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম  মুছতে মুছতে জল খায়, জিরিয়ে নেয়। কাপড় দিয়ে টেবিলে রাখা ফাইলের ধুলো পরিষ্কার করে। ব্যাগ থেকে টিফিন  বক্সটি বার করে মুখটা আলগা করে রাখে। পকেট থেকে বের করে মোবাইল টেবিলে রাখে। বাইরের রোদ ঝলমলে আকাশটা দেখতে দেখতে ব্যাগ থেকে হাতে তোলে বিখ্যাত কবির একটা কবিতার বই। বাইরের রোদ্দুরের মতো এতক্ষনের গুমোটভাব কেটে যায় মুখের।  

আয়েশ করে জানলায় ঠেস দিয়ে লোকটা বিড়বিড় করে লাইনগুলো পড়তে থাকে। ঠিক সেই সময় ফোন বেজে ওঠে, আলো নিভে যায়...

ফোনটা তুলে বলে, হ্যালো...!

ফোনের ওপারে থেকে বেশ ভারী একটা গলা ভেসে আসে , অফিসে ঠিক সময়ে এসেছেন তো?

হ্যাঁ।  মৃদু স্বরে বলে লোকটি।

অফিসে থাকবেন আমি দরকারে ফোন করব। আর কোথাও বেরিয়ে যাবেন না।  

ঠিক আছে। ছোট্ট উত্তর দেয়।

ফোন করলে যেন পাই। আমি ফোন করলে কাজ শুরু হবে। বেশ ধমকের সুর ভেসে আসে ওপার থেকে।

ঠিক আছে। মনে থাকবে। 

মনে থাকলেই ভালো। সবে এক সপ্তাহ হয়েছে তাতেই কাজের যা ছিরি দেখছি...... মনে রাখবেন কথাটা। আপনার কাজ বিশেষ নেই আমার ফোনটা পেলে কাজ শুরু করবেন। কাজট মন দিয়ে করুন। নাহলে আপনার জন্য আমি  ডুবব।

মাথা নেড়ে জবাব আসে, ঠিক আছে। 

ওকে, রাখছি। ফোনটা কেটে যায়।

সব তান কেটে গিয়ে লোকটার মুখটা গম্ভীর হয়ে আসে। আচমকা আলো নিভে যাওয়ার পর যেমন হয়, ঠিক তেমন। বই স্বশব্দে ঢুকে পড়ে ব্যাগে। ঘাম মুছতে মুছতে

আবার চেয়ারে এসে বসে। আর গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে গ্রাহামের বেলের দিকে। হয়তো সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভীষণ রাগে ফেটে পড়তে চায়। বাইরের টুকটাক শব্দ বেশ জোরেই ভেসে আসতে থাকে।

ভেসে আসতে চেয়ারে বাসা বাঁধা কাঠপোকার করর... করর... শব্দ।

এখন দীর্ঘ অপেক্ষা গ্রাহামের বেলের বেজে ওঠার...

এতক্ষণ  যে কথাগুলি পড়লেন, সেটা আজকের গল্প। এই আজকের গল্পের পিছনে একটা গতকাল আছে। সেই গল্পটা এখন বলা যাক। যে লোকটাকে জানলেন তার নাম সুবিমল পাল।

নদী উদ্দাম গতিতে ছোটার পর মুহূর্তের বাঁক পরিবর্তনে যেমন খানিকটা থমকে যায়, তেমনই এতদিন ধরে চলা জীবনের গতিপথ পরিবর্তন ঠিক মানানসই হয় নি সুবিমলের। সবসময় মনমরা একটা ভাব,  না পাওয়ার  দুঃখ তাকে সবসময় তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। 

মধ্যবিত্তের দুর্দশা চিরকালীন, দুঃখ তার চিরদিনের সাথী। যার অন্যতম কারণ তার অপূরনযোগ্য স্বপ্নের ভিড়। রাতে  চোখ বুজলেই যে স্বপ্নেরা ভিড় জমায় চোখের পাতায়। সুবিমলেরও চোখে এমনই ভিড় করেছিল স্বপ্নরা । অনেক বড়ো হওয়ার স্বপ্ন। নিজের ছায়াকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। চারপাশের থেকে নিজেকে আলাদা করে দেখার স্বপ্ন।  

একটা সময় হন্যে হয়ে খুঁজেছে সরকারি চাকরি। কিন্তু এই প্রবল কম্পিডিশনের বাজারে নিজেকে  উপযুক্ত করে নিতে পারে নি ফলে চাকরি হয় নি। তারপের বেঁচে থাকার তাগিদে ও সংসার বাঁচানোর কর্তব্যে চলেছে বেসরকারি  চাকরি খোঁজার লড়াই। কিন্তু  সেখানেও হাতে মিলেছে নাকোচ করে দেওয়ার পত্র। বয়স বেড়ে যাওয়ার দোহাই দিয়ে তারাও নিতে  চায় নি। প্রত্যেক ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়ে এসে তার মনে হয়েছে সে কি আন্যায় করেছে,  না ভুল করেছে, আর ততই তলিয়ে গেছে দুশ্চিন্তার অন্ধকার গলির ভাঁজে। রাতজাগা স্বপ্নগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে পথের  কাঁটা ।

এইসময়েই এক পরিচিতের মাধ্যমে মিলেছে এই কাজ। কাজ এখানে বিশেষ নেই, সারাদিন থাকতে হবে,  মালিকের ফোন আসলে গাড়িতে প্লাই ওঠানোর তদারকি করতে হবে । সে ছাড়া মাত্র দুজন লোক এখানে কাজ করে। তবুও কেমন গা ছমছমে একটা ভাব। এখানে এসে বুঝেছে  কেউ  তার আপনার নয়, সবাই  তার  প্রতিপক্ষ। সবটাই তার কাছে অনভিপ্রেত। সে এতদিন যে দৃষ্টিতে দেখেছে মানুষকে , আজ দেখছে সম্পূর্ণ অন্যরূপে। এখানে সে মানাচ্ছে, অভ্যস্ত হচ্ছে বাস্তবের সাথে। এই মানানো আর  মানিয়ে নেওয়ার খেলাতে যুজতে যুজতে সকাল থেকে রাত আবার রাত থেকে সকাল অতিবাহিত হচ্ছে।

অনেক অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুবিমল এই কাজটা নিয়েছে। জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন নিজের অনিচ্ছাতে মানুষকে এমন অনেক কিছু করতে হয় যা তার ভালো লাগে না। সুবিমলও ব্যতিক্রম নয়। সেও এই  সমাজের মধ্যবিত্ত মধ্যবর্তী প্রাণ, তাকেও সাড়া দিতে হয়েছে। আর সেই সাড়া দেওয়াতে যত রক্তই ঝরুক সে ঝরবে একান্ত মনের গভীরে, সাবার অলক্ষে। সেখানে শুধু আমার আমি থাকবে চারপাশের ভাগিদার কেউ নেই, ফাঁকা হাটের শূন্যতা ব্যঙ্গের হাসি হাসবে।  

সমস্ত স্বপ্নকে বাক্সবন্দি করে বাস্তবের লড়াই-এ নেমেছে সুবিমল। এখন তার কাছে কাজ বাঁচিয়ে রাখাই বড় কাজ । পুরানো সেই মানুষকে ভুলিয়ে দিয়ে চলছে নতুনের আবিষ্কার । সে পথ সহজ নয়, তবুও লড়াই চলবে চলছে। যেখানে অতীত জীবন পড়ে থাকবে উদাহরণ হয়ে , গ্রাহামের বেলের মতো ...   

নয়নতারার সাজিদ

রীনা নন্দী

নয়নতারার ঘুরে ঘুরে কাজ। কোম্পানীর ওষুধ নিয়ে দোকানে, দোকানে, ডাক্তারখানায় যাওয়া, অপেক্ষা করা। দোকানদারদের সঙ্গে ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে কথা বলা। তবু সে ঠিক সময় বার করে নেয়। ঘোড়াদের আস্তাবলটা টানে তাকে। বলা ভালো কালো ঘোড়াটার সুতীব্র টান সে এড়াতে পারে না।

স্তাবলটায় এতগুলো ঘোড়া রয়েছে – প্রায় চল্লিশ বিয়াল্লিশটা। তবে ছটফটে কালো ঘোড়াটার কদরই আলাদা। কত লোক যে এসে খোঁজ করে মাহাতোর কাছে। উমানাথ মাহাতো দেখভাল্‌ করে এইসব রেসের ঘোড়াদের।

     মাহাতো জানে ঘোড়ার দলের মধ্যে সটান চেহারার ঘন কালো চিকন চামড়ার সাজিদের দর আছে। ও যখন পিঠে জকির বোঝা নিয়ে তীব্র বেগে দৌড়য় নাক মুখ দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোয়। জকির চাবুকের এক এক মারে পিঠ টান হয়ে যায়। মাহাতো বোঝে, দু’পাশ আঁধার, শুধু সামনের দৌড় শেষ করার জায়গাটা চোখে ভাসে ঘোড়াটার।

    সুন্দর সাজগোজ করা, জুতো খট্‌খটিয়ে মেমসাহেবরা আসে। ফটর ফটর ইংরিজি বলে, এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে চিকনদার ঘোড়াটাকে দেখে। ওদের পছন্দ হয় ঘোড়াটাকে। সাহেবরা বুঝতে চেষ্টা করে; টাকা ঢাললে কতটা দিতে পারবে ঘোড়াটা।

   আগে লোকজন কাছে ঘেঁষলে ভয় পেতো ঘোড়াটা। মাহাতো বোঝে, সাজিদ আজকাল আগের মত আর ভয় পায়না। উদাসিন চোখে দেখতে থাকে এইসব বাবু বিবিদের। শুধু একটা লেড়কি আছে – সে এলে সাজিদ খুশি হয়। খুরে আওয়াজ তুলে খট্‌ খট্‌ খট্‌ খট্‌ – নাচের বোল তোলে। ও এই ভাবে খুশি জানায়। মাহাতো ঘোড়াদের মন বুঝতে পারে। কতকাল হয়ে গেল ওদের সঙ্গে রয়েছে !

   প্রায় আসে মেয়েটা। মাহাতো জানে, রেসের ঘোড়া খুঁজতে আসে না ও। ওইসব পকেটে রূপিয়া ভরতে আসা বাবু - বিবিদের মত নয় ও লেড়কি। লেড়কিটা মন বোঝে। মাহাতোকে সবাই এলেবেলে এক মানু্ষ মনে করে।

নিজেদের প্রয়োজনে কথা বলে শুধু। নয়তো কথাই বলে না। যেন কথা বলবার মত মানুষই নয় ।  ঐ লেড়কিটা কিন্তুমাহাতোর সঙ্গে কত ভালোভাবে কথা বলে। ওর ঘরের খোঁজ নেয়। সপ্তাহের মধ্যে একদিন কি দু’দিন আসে। মাহাতোর থেকে সাজিদের কথা জানতে চায়। – ‘ওর তবিয়ত ভালো আছে তো চাচা? ঠিকঠাক দানাপানি খায়? না কি নখ্‌রা দেখায়?

– ‘না গো দিদি, তবিয়ত ভালো আছে। তবে দানাপানি খেতে যেন মন নেই ক’দিন। ’

– ‘মন ভালো নেই না কি! ’

     মাহাতো বোঝে, লেড়কির সাজিদের উপর মন পড়ে গেছে। একটু অবাকও হয় ভেবে। আসলে এমন তো বড় একটা দেখা যায় না।

    নয়নতারার ঘুরে ঘুরে কাজ। কোম্পানীর ওষুধ নিয়ে দোকানে, দোকানে, ডাক্তারখানায় যাওয়া, অপেক্ষা করা। দোকানদারদের সঙ্গে ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে কথা বলা। তবু সে ঠিক সময় বার করে নেয়। ঘোড়াদের আস্তাবলটা টানে তাকে। বলা ভালো কালো ঘোড়াটার সুতীব্র টান সে এড়াতে পারে না। আস্তাবলটায় সকালের দিকে যায় নয়নতারা। ঝিমোয় তখন সাজিদ। প্রথমদিকে নয়নতারা অবাক হয়েছিল – কেমন মানুষের মত নাম ঘোড়াটার ! মাহাতো বলেছিল, ‘ঘোড়াদের ডাক্তারবাবু ওর জন্মের সময় নামটা রেখেছিল।’  

নয়নতারা ভাবে, ও মানুষের থেকে কম কি ! কেমন নাম ডাক। নিজের কাজে কি পারফেকশন্‌ ! আবার মেজাজিও বেশ। ভালবাসলে কেমন বোঝে। ভেতরে ভেতরে গলে যায় আহ্লাদে। যারা আসে শুধুই রেস খেলে নিজেদের পকেটের টাকা বাড়াতে কিংবা রোমাঞ্চের স্বাদ নিতে – তাদের সামনে    

কেমন গুমোর দেখায়। তখন দেখবেই না ওদের দিকে। একমনে ঘাস খেয়ে যায়। জকিগুলো টেনে সামনে আনতে চাইলে জেদি পুরুষের মত ঘাড় বেঁকিয়ে রাখে অন্যদিকে।  যেন বুঝিয়ে দিতে চায়, তার মর্জিটাই আসল। ইচ্ছে না হলে এক চুলও নড়বে না।    

অথচ নয়নতারা দেখেছে, সে কাছে গেলে কি খুশি। চোখগুলো জ্বলজ্বল করে তখন। কখনো আবার তেরছা চোখে তাকায় নয়নতারার দিকে। তার কপালে ঘাড়ে মুখ ঘসবে। আদরে আহ্লাদে হাতে জিভ বুলিয়ে দেবে। নয়নতারা যখন আসে ওর গা ঘেঁষে বসে থাকে অনেকক্ষণ। ঘাস খেতে খেতে দেখে তাকে সাজিদ। একটুখানি দূরে গিয়ে আবার ফিরে আসে ও তার কাছে। লেজের চামর গায়ে বুলিয়ে দেয়। আরামে নয়নতারার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয় নয়নতারা।

       কোন কোনদিন দেখে ওর মসৃণ চামড়ায় চাবুকের কেটে বসে যাওয়া দাগ। দৌড়ের উত্তেজনায় পিঠে বসা জকির ছিপ্‌টির সজোরে আঘাত ওগুলো। আঙুলের ছোঁওয়ায় বুঝতে পারে সে; কোন্‌টা পুরনো আর কোন্‌টা সদ্য তৈরী হওয়া ক্ষত। নয়নতারার হাতের স্পর্শে চোখ বেয়ে যেন জল গড়িয়ে পড়বে – এমনই ছলছল করে সাজিদের চোখ দু’টো।

         নয়নতারার মন চায় সেই মুহূর্তে কোন জাদুবলে সব যন্ত্রণার নিরসন করে দিতে। কিন্তু পারে না। তার তো কোন জাদু জানা নেই। রাগে, দুঃখে, হতাশায় চোখে জল এসে যায় নয়নতারার। সাজিদের গালে গাল ঠেকায়। ফিস্‌ফিস্‌ করে বলে, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে সাজিদ? ’

       ঘাড় নাড়ায় মাঠের কালো বিদ্যুৎ। নয়নতারার আদরে কেমন স্নিগ্ধতা নেমে আসে ওর মুখ চোখে। মৃদু হ্রেস্বাধ্বনিতে নয়নতারাকে নিজের খুশি বোঝায়। পাক খায় ওকে ঘিরে। মুখে মুখ ঘসে ভালবাসা জানায়।

      নয়নতার সাজিদের কানে কানে বলে, ‘আমি একদিন ঠিক তোমাকে এই রেসের মাঠের আস্তাবল থেকে মুক্তি দেব। তখন আর তোমাকে মুখে ফেনা তুলে ছুটতে হবে না। পাই পাই চুকিয়ে দেব ওদের।  তোমার জন্য দিন রাত এক করে রোদ জল মাথায় নিয়ে খাটছি সাজিদ। ’নয়নতারা যেন প্রতিশ্রুতি দেয়। এক বন্দি প্রাণকে মুক্তির স্বপ্ন দেখাতে চায়।

        সে আজকাল সত্যিই সারাক্ষণ মুখে ফেনা তুলে ছুটে বেড়ায়। এক ওষুধের দোকান থেকে আর এক দোকান, সে দোকান থেকে অন্য দোকান, ডাক্তারবাবুদের চেম্বার। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। আরো বাড়াতে হবে টার্গেট। অনেক টাকা চাই তার। চড়া রোদ, অঝোরে বৃষ্টি – কিছুই আটকাতে পারে না তাকে। হাওয়ায় উড়তে থাকা চুল, লাল হয়ে যাওয়া চোখ মুখ, কাঁধে ভারি ব্যাগ – যেন এক পাগলাটে অশ্ব-নারী ছুটে বেড়ায়।

          নয়নতারা আজকাল মাঝে মাঝেই স্বপ্ন দেখে, নীল আকাশের বুক চিরে উড়ছে সাজিদ। তার চিত্র-বিচিত্র দুই ডানা বাতাস কেটে কেটে ভাসিয়ে নিয়ে আসছে তাকে।  মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নয়নতারার দিকে উড়ে আসছে সে। তাকে তুলে নেবে পিঠে। দুই ডানার আড়াল দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে তাকে মেঘের মধ্যে দিয়ে। নয়নতারা উন্মুখ অপেক্ষায় উপর দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?