গল্প সমগ্র ২

  • সান্ধ্যকালে সূর্যময়ী - আবু রাসেদ পলাশ  

  • স্ফুস্ট আর্তি - আবু রাসেদ  পলাশ

  • গতিময় জীবন - পলাশ দে

  • অমানবিক - কিরণময় দাস 

  • অমানুষ - দীপন জুবায়ের 

  • পাতালপুরী ও আগলি ডাকলিং - অপর্ণা চক্রবর্তী 

         সান্ধ্যকালে

         সূর্যময়ী

                      আবু রাশেদ পলাশ

   জেলা-শেরপুর, বাংলাদেশ

......তারেকের কথা মনে আছে? হামিদ মাস্টারের ছেলে বাবার সাথে রাগ করে একদিন নিরুদ্দেশ হয়েছিল সে। সেই তারেক ফিরে এসেছে পনের বছর পরে। ও নিরুদ্দেশহওয়ার পর বছরে একটা দুটো চিঠি লিখত বাবার কাছে। কিন্তু গ্রামে আসেনি কোনদিন। হামিদ মাস্টার মারা যাওয়ার আগে ছেলেকে দেখার ইচ্ছে হয়েছিল খুব। কত খুঁজেছে ওকে, সন্ধান দিতে পারেনি কেউ।.......

  শ্রাবণের মাঝামাঝি থেমে যাওয়া বর্ষাটা দিন দুই বিশ্রামের পর পূর্বাবস্থায় ফেরত যায়। আজকাল বৃষ্টি শুরু হলে থামে না সহসা। মধ্যাহ্নে সূর্যের দিকে দৃষ্টি গেলে বুড়ো মনে হয় ওকে। দিনমান পাংশুটে মেঘের আড়ালে ডাকা থাকে ওটা। গাঁয়ের পথে আলো আঁধারি খেলা হয় এ সময়। মাঝে মাঝে গুড়ুক গুড়ুক মেঘ ডাকে, বিদ্যুৎ চমকায় না। কর্মহীন গাঁয়ের বউয়েরা মেঝেতে বসে কাঁথা সেলায়। কিশোরীরা দল বেঁধে পুতুল বিয়ের খেলা করে সখীদের সাথে । উলঙ্গ, অর্ধউলঙ্গ উড়নচণ্ডী ছেলেগুলো হৈ হৈ রব তুলে কাদা জলে গড়াগড়ি খায়। দৃষ্টিগোচর হলে ধমক দেয় বাবারা - 'হারুনি, শিগগির উইঠা আয় হারামির পুত। ব্যারাম অইলে পাগারে চুবান দিমু নিজ্জস'।

  আষাঢ়ে বর্ষা হয়। তার জলে বন্যা হয় করাতকান্দি। শ্রাবণে জলের ধারা থৈ থৈ করে গাঁয়ের সর্বত্র। আউসের ক্ষেত ভাসে সাদা জলে। এবারের বর্ষায় আবাদি জমি গেছে চাষিদের। শুকনো মরসুমে অনাহারে থাকতে হবে অনেককে। উত্তরপাড়ার বিনোদ বর্ষায় আবাদি জমি হারালে চিন্তিত হয়। বিকেলে বানের জলে ডুবে যাওয়া চারাগুলো টেনে তুলে সে। আলীনা পাড়ার আহালু বড়শীতে মাছ ধরতে এলে চোখাচোখি হয় দুজনের। তারপর হাঁক দেয় আহালু 

- 'বিনদেনি, চারাগুলান তুলো যে'?

- 'গরুরে খাওয়ামু মিয়া ভাই'।

- 'উঠে আহ বিড়ি খাই। দখিনা বাতাসে শইলে সার পাইনে গো'।

  বর্ষার ধারা থেমে গেলে দখিনা বাতাস বয় গাঁয়ের সর্বত্র। হিমবাতাস আলিঙ্গন করলে বস্ত্রহীন শরীরে কম্পন ধরে সহসা। বড় ব্যাঙের ম্যাগো ম্যাগো শব্দগুলো তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। রাতে ঘরের পাশে ঝিঝি পোকার অবিশ্রাম আওয়াজ শুনা যায়। জানালা খুলে বাইরে তাকালে জোনাকির মিটিমিটি আলো জ্বলে এ সময়। এ আলো গাঁয়ের পথে পথিকের পথ চলা প্রাঞ্জল করে না কখনও। তবে ওর দিকে দৃষ্টি গেলে দিনভর উপোস বেহুলা, জমিলার মত মেয়েরা ক্ষণিকের জন্য পেটের খিদে ভুলে সত্যি।     

  উত্তরপাড়ার হামিদ মাস্টার মারা গেছে পাঁচ বছর হতে চলল। কাছে কুলে কেউ নেই তার। একমাত্র ছেলেটা নিখোঁজ আজও। ইটে তৈরি প্রকাণ্ড বাড়িটার চারপাশে জঙ্গল গজিয়েছে অনেক আগেই। লোকে বলে বড় বাড়ি। রাতে শেয়ালের আওয়াজ শুনা যায় বড়বাড়ির চারপাশে। হামিদ মাস্টারের দ্বিতীয় বউ হাসিনা বেগম স্বামীর মৃত্যুর পর বাপের বাড়ি থাকে। বছর দুই আগেও এ পাড়ার জামাল কাজির সাথে যোগাযোগ ছিল তার। জামাল কাজির বড় ছেলে সমু পর মা বলে ডাকতো তাকে। এখন এ পাড়ায় গত সে। জামাল কাজি হামিদ মাস্টারের বাল্যবন্ধু। মৃত্যুর আগে সে বলেছিল - 'কাছে কুলে কেউ নাই যখন জমিগুলান বউরেই লিখে দেও হামিদ।'

জামাল কাজীর কথায় রাজি হয় নি হামিদ মাস্টার। সে বলেছিল - 'না, পুলা যদি ফেরত আসে জমিগুলান ওরে দিও জামাল।'

হামিদ মাস্টারের কথায় সেদিন আপত্তি করেনি হাসিনা বানু । অসম বয়সের যে মানুষের সাথে সংসার বেঁধেছে সে, আর যায় হোক এখন তো সে সত্তার কেউ। তার কাছে ভালবাসা ছাড়া আর কি বা চাওয়ার আছে? এরপর একদিন বড়ঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি দেয় হাসিনা বানু। হামিদ মাস্টার মারা গেছে একটু আগে। সমু এখন করাতকান্দি প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার। জামাল কাজির কিনে দেওয়া সাইকেলটা এখনো আছে ওর। মোটা ফ্রেমের চশমাটা পড়ে বাইরে বের হলে সমীহ করে সবাই। বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে হামিদ মাস্টারের বাড়িটা পাশ কাটিয়ে আসতে হয় সমুকে।ওদিকে দৃষ্টি গেলে পুরনো মানুষগুলোর কথা মনে হয় তার। দুবছর হতে চলল হামিদ মাস্টারের এক বিধবা বোন এসে বসতি গড়েছে এখানে। সাথে জুয়ান ছেলে তার, নাম ভুলা। বদের হাড্ডি, হাতে একটা ধারালো চাকু নিয়ে সারাদিন পাড়ায় ঘোরাঘুরি করে সে। নিরীহ মানুষগুলোর কাছে নিজেকে ডাকু বলে পরিচয় দেয়। লোকে বলে ভুলা ডাকু। ভুলা ডাকু দুর্ধর্ষ, এ পাড়ার কেউ লাগতে যায় না ওর সাথে। করাতকান্দির বখে যাওয়া ছেলেগুলোর সাথে বন্ধুত্ব করেছে সে। রাতে ওদের সাথে মেথর পাড়ার ভাত পচা মদ খেয়ে পড়ে থাকে রাস্তায়। সংসারের ধার ধারে না। বড়বাড়ির চারপাশে মৌসুমি ফলের বাগান। এগুলো বেচেই সারা বছর সুখে দিনাতিপাত করে মা-ছেলে।

  এর মধ্যে একদিন জ্বরে পড়ে সমু। সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তার কাদায় পড়ে যায় সে। বৃষ্টির পানিতে ভিজলে গায়ে জ্বর আসে ওর। সে জ্বর কমেনা সহসা। দিন দুই প্রায় অচেতন থাকার পর একদিন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে সকালে। কিন্তু শরীরে শক্তি পায় না সে। হাতের চশমাটা চোখে দিলে উঠানে দৃষ্টি পড়ে ওর। ঝম ঝম বৃষ্টি হচ্ছে এখনও। সমু হাঁক দেয়, 

- 'মা, আজ কি বার কও তো?'

রাহেলা বানু বলে - 'বিসসুদবার।'

- 'বিসসুদবার?' সহসা চমকে উঠে সমু। গত দুইদিন প্রায় অচেতন ছিল মনে নেই তার। উত্তরপাড়ার হারেস আলীর ছেলে মনা সমুদের বাড়িতে চুক্তি খাটে। সমুর ডাক শুনলে এক সময় এসে ভেতরে দাঁড়ায় সে। হাতে একটা কাগজ দিয়ে সমু বলে,

- 'কাগজখান তর ঝুমু আপারে দিস মনা।'  উত্তর পাড়ায় হোসেন তালুকদারের বাড়িটা মসজিদের কুল ঘেঁষে। পাড়ায় সচ্ছল গেরস্ত সে। ঘরে বউ ছাড়াও একমাত্র মেয়ে আছে তার। নাম ঝুমু। সমুর সাথে মন দেওয়া নেওয়া করেছে সে।

ওদের সম্পর্কের বয়স হয়েছে বেশ। এখন সম্পর্কে স্থিত হওয়ার স্বপ্ন দুজনের। সময় পেলে গাঁয়ের পথ ধরে হাঁটে ওরা। নিতাই মাঝির ধান ক্ষেতের পাশ দিয়ে যে বড় সড়ক শহরমুখী চলে গেছে তার পাশে বসে গল্প করে দুজন।এরপর একদিন করাতকান্দি গ্রামে অপরিচিত মুখের আগমন ঘটে হঠাৎ। এক বিকেলে হাঁটু সমান কাদা মাড়িয়ে ভেজা কাকের মত নিজ বাড়িতে ফিরে আসে তারেক।

  তারেকের কথা মনে আছে? হামিদ মাস্টারের ছেলে বাবার সাথে রাগ করে একদিন নিরুদ্দেশ হয়েছিল সে। সেই তারেক ফিরে এসেছে পনের বছর পরে। ও নিরুদ্দেশ হওয়ার পর বছরে একটা দুটো চিঠি লিখত বাবার কাছে। কিন্তু গ্রামে আসেনি কোনদিন। হামিদ মাস্টার মারা যাওয়ার আগে ছেলেকে দেখার ইচ্ছে হয়েছিল খুব। কত খুঁজেছে ওকে, সন্ধান দিতে পারেনি কেউ। তারেক ফিরে এলে গাঁয়ের মেয়েরা বলাবলি করে,

- 'হুনছনি বু, হামিদ মাস্টরের পুলানি ফেরত আইচে কাইল।'

- 'হাচানি, বাপের ভিটায় বাতি জ্বলব মালুম অয়।'

  তারেকের ফেরার সংবাদে কিছুদিন জটলা করে গাঁয়ের ছেলে বুড়োরা। কুশলাদি জিজ্ঞেস করে ওর। এতদিন কোথায় ছিল, কি করত এসব কথা জানতে চায় সবাই। এদিকে তারেকের ফেরার খবর মনার মাধ্যমে জানতে পারে জামাল কাজি। তারপর লোক মারফত খবর পাঠায় সে -তারেক যেন একবার দেখা করে ওর সাথে। বয়সের বাড়ে ন্যুব্জ কাজি হাঁটতে পারে না এখন। লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়ালে শরীরটা ঠক ঠক কাঁপে তার। অবশেষে খবর পেয়ে তারেক স্বয়ং একদিন দেখা করতে যায় কাজি বাড়ি। তারেক এলে আহাজারি করে জামাল কাজি,

- 'আইলাগো বাজান? এতদিন পরে যে, বাপ আর নাইগো তোমার'।

সহসা জবাব দেয় না তারেক। এ কথার উত্তর কি হতে পারে জানা নেই তা। ও চুপ করে থাকলে জামাল কাজী আবার বলে - 'মরুন কালে তোমারে দেখুনের সাধ অইচিল তোমার বাপের, কত খুঁজলাম পাইলামনা তোমারে।'

- 'আপনের শরীর কেমুন কাকা?'

- 'ভালা, আইছ যহন যাইও না আর। মিসতিরি খবর দেও, ঘরখান মেরামত কর তাইলে।'

-  'একলা মানুষ ........?'

- 'বউরে নিয়া আহ বাজান। বাপের ভিটা ফেলায় রাখুন ভালানা'।

ঐদিন ফেরার পথে সমুর সাথে দেখা হয় তারেকের। তারপর চোখাচোখি হয় দুজনের। সমু দৃষ্টি সরিয়ে নিলে তারেক হাঁক দেয়,

- 'আমারে ভুইলে গেচিস গুল্লু?'

গুল্লু বললে পুরনো কথাগুলো মনে হয় সমুর। ছোটবেলায় গুলগুলি খাওয়ার নেশা ছিল ওর। তারেকের পকেটের টাকা কতবার ওর পেছনে খরচ হয়েছে তা কি ভুলা যায়? রাতে ঘুমানোর আগে মায়ের সাথে গল্প করে সমু। এক এক করে সবার কথা মনে হয় তখন।

  করাতকান্দি গ্রামে হামিদ মাস্টারের বাড়িটা শহরমুখি সড়কের কূল ঘেঁষে। মস্ত বাড়ি। একপাশে তার মৌসুমি ফলের বাগান, অন্যপাশে প্রকাণ্ড বাঁশঝাড়। গ্রীষ্মের উন্মত্ত সূর্যও এখানে মৃত প্রায়। বাড়িতে দিনের এলো পড়ে না সহসা। হামিদ মাস্টারের গোছান সংসার। স্ত্রী খদেজা বেগম ছেলেকে নিয়ে সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন দেখে। হামিদ মাস্টার খেতে বসলে হাতপাখায় বাতাস করে সে। এরপর একদিন রোগে পড়ে খদেজা বেগম, পচন রোগ।

দেশি-বিদেশি কত কবিরাজ, ডাক্তার দেখানো হয় রোগ ছাড়ে না তার। শরীরের মাংস পচে পোকা ধরে স্বস্থানে। তারপর আর বেশিদিন বাঁচেনি খদেজা বেগম। শেষ মুহূর্তে প্রিয়তমা স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য হামিদ মাস্টার যেন মরিয়া হয়ে উঠেছিল। স্ত্রী শোকে ভেতরে ভেতরে অশ্রু বিসর্জন দিত সে। মরার আগে খদেজা বেগম বলেছিল,   

- 'আপনেরে একখান কতা কমু, রাখবেন নি?'

- 'নিজ্জস, কও হুনি।'

- 'আমি মরে গেলে একখান নিকা কইরেন আপনে, কলানি থাকুন যায়?'

  প্রিয়তমা স্ত্রীকে সেদিন মিথ্যে আশ্বাস দেয় হামিদ মাস্টার। ভালবাসা দেহে হয়, মনেও। সব নারীতেই দেহ ক্ষুধা নিবারণ হয় হয়ত কিন্তু মন ক্ষুধা? খদেজা বেগমের সত্তায় যে রস আস্বাদন করেছে হামিদ মাস্টার, পর নারীতে সাধ্য কই?

খদেজা বেগম মারা যাওয়ার পর হামিদ মাস্টারের সংসারটা বদলে যায় দ্রুতই। মেয়ে মানুষহীন সংসার হয় না। স্নেহপাগল তারেকের দিকে দৃষ্টি গেলে ভেতরটা আঁকুপাঁকু করে তার। কাজিবাড়িতে তখন আনাগোনা বাড়ে হামিদ মাস্টারের। বন্ধু জামাল কাজির সাথে বসে খোশ গল্প করে সে। কাজি বলে,

- 'এবার একখান নিকা কর হামিদ।'

- 'নিকানি? পুলার গোসসা অইব মুনে কয়।'

- 'গসসানি, মিছা কতা। মাইয়া মানুষহীন সংসার অয়না ভাই।' এরপর সত্যি একদিন বিয়ে করে ঘরে দ্বিতীয় স্ত্রী আনে হামিদ মাস্টার। কেন যেন, পিতার এহেন কর্মে খুশী হয় না তারেক। কে জানে, নিজের মায়ের জায়গা হয়তো পর নারীতে দিতে নাখোশ সে। হাসিনা বেগম মানুষ ভাল, দেখতেও বেশ। অসম বয়সের স্বামী, আর অনাকাঙ্ক্ষিত পুত্র - তাদের নিজের বলে মেনে নিতে দেরি হয় না তার। গাঁয়ের মেয়েরা বলাবলি করে,

- 'হুনছনি বুজান, মাস্টারের বউ দেহি বেটির বয়স।'

- 'ছি! ছি! তবা তবা, সুরতে কালি মাখল মালুম অয়।' স্কুলে গেলে গাঁয়ের ছেলেরা ক্ষ্যাপায় তারেককে। ওদের ক্লাসের মতি কালো পাঠার মত চেহারা, সারাদিন তারেকের পেছনে পড়ে থাকে সে। একদিন ওর সাথে কলহ হয় তারেকের। মতি বলে, - 'জুয়ান মায়ের সোহাগ কেমুন কত হুনি।' এরপর মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে নিরুদ্দেশ হয় তারেক। সেবার হামিদ মাস্টার কত খুঁজেছে ওকে, পায় নি কোথাও। মাস দুই পর একটা চিঠি এসেছিল ডাক হরকরার মাধ্যমে। তারেকের চিঠি। তাতে লেখা - 'নিরুদ্দেশ হলাম বাজান, খুঁজো না আমারে।' এরপর শহরে কত কষ্ট করেছে তারেক। বাবার কাছে সহযোগিতা নেয় নি কোনদিন। সেই তারেক ফিরে এল এত বছর পর। কেন এল সে? নিজের প্রাপ্য বুঝে নিতে নাকি অন্য কোন কারণ আছে তার? ব্যাপারটা ভাবায় সমুকে।আজকাল প্রায়ই তারেককে বাবা-মার কবরের পাশে দেখা যায়। সাথে আনা সাদা রঙের চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বসে থাকে সে। শরীর ভাল নেই। চোখগুলো দিনে দিনে শুকিয়ে যাচ্ছে ওর। পুরনো অসুখটা বেড়ে গেছে হঠাৎ। নাকে মুখে ঘা হতে শুরু করেছে এখন। প্রস্রাব হয় না সহসা, প্রস্রাবের রাস্তায় রক্ত আসে মাঝে মাঝে। খদেজা বেগম মারা যাওয়ার আগে এমন হয়েছিল তার। এখানে একাকী জীবনে অরুকেও মনে পড়ে খুব। অরুর কথা মনে আছে?তারেকের বউ। একই কলেজে পড়েছে ওরা। তারপর বিয়ে।করেছে নিজেদের পছন্দে আলীপুর শহরে একটা টিনের দুচালা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতো দুজন। অভাব ছিল, ভালবাসার কমতি ছিল না কোনদিন। সেই অরুকে ছেড়ে এসেছে তারেক। আসার আগে কলহ করে এসেছে সে। কে জানে এখন কেমন আছে অরু? আজকাল ওকে দেখতে ইচ্ছে করে খুব। যেদিন অরুকে ফেলে তারেক চলে আসছিল সেদিন কতনা কেঁদেছে মেয়েটা। ওর দিকে তাকিয়ে দয়া হয় নি পাষণ্ডটার। অরু বলেছিল,

- 'আমাকে সাথে নাও সোনা, তুমি ছাড়া বাঁচব না আমি।'  

ওর কথা শুনে ধমকে ছিল তারেক। বলেছিল - 'ছেড়ে দাও এবার। সংসারে বিতৃষ্ণা এখন।'

  সেদিন বাসা থেকে বেড়িয়ে তারেকও কেঁদেছিল গোপনে। উপায় ছিল না তার। ভঙ্গুর জীবনে অরুকে কোন দিন স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে নি সে। জীবন আকাশে ডুবন্ত সূর্যের বেলায় রৌদ্রজ্জ্বল পৃথিবী দেওয়ার  সামর্থ্য কই? তার চেয়ে কষ্ট পাক অরু, তবু যদি সুখী হয় কোনদিন। সঙ্গী বিহীন জীবন চলে না, সান্ধ্যকালে এসে আজ অন্তত এতটুকু বুঝতে পেরেছে তারেক। সেদিন হাসিনা বেগমের বউ হয়ে আসা এক অর্থে ঠিক ছিল হয়তো। সে না এলে একাকি জীবনে হামিদ মাস্টার কতদিন বাঁচত বলতো?

  এর মধ্যে একদিন ঝুমুর সাথে সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয় সমুর। হোসেন তালুকদার মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজে অনেকদিন ধরে। ঝুমুকে সংসারী দেখে হজে যাওয়ার ইচ্ছে তার। সম্প্রতি পাত্র একটা পেয়েছে সে। ছেলে ভাল, দেখতেও বেশ। তবে রাজি নয় ঝুমু। কারণ জিজ্ঞেস করলে সদুত্তর দেয় না সে। ফলশ্রুতিতে মেয়েকে মারে হোসেন তালুকদার। এরপর একদিন নদীর পাড়ে নৌকার গলুইয়ে বসে কথা বলতে দেখা যায় দুজনকে। ঝুমু বলে,

- 'কিছু কওনা যে সমু ভাই?'

সমু কথা বলেনা সহসা। জামাল কাজির কথা মনে হয় তার । অসুস্থ সে। এ সম্পর্ক সেও মেনে নিবে না এখন। সমু চুপ করে থাকলে ঝুমু আবার বলে,

- 'মুখখান দেখাইওনা আর। পুরুষ মানুষ এমুননি?' 

মন খারাপ হলে তারেকের কাছে আসে সমু। তারেকের শরীর খারাপ বিচলিত করে তাকে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করে না তারেক। সে বলে,

- 'ঝুমুরে এবার ঘরে নে সমু, মেয়েটা ভাল দেখি।'

তারেকের ফিরে আসায় গাঁয়ের সবাই খুশি হলেও মনে মনে হয়তো খুশি হতে পারে না হরবলা বিবি। এতদিন যে সম্পত্তি একা ভোগ করে আসছিল সে, তা হঠাৎ হারানোর আশংকা হয় তার। পাড়ার মেয়েদের সাথে কথা বললে ভাইপোর নামে কুৎসা রটনা করে হরবলা বিবি।

- 'পুলানি, কেমুন পুলা কওতো, বাপ মরলে আহেনা যে? এমুন পুলার মুখে ঝাঁটা।'

তারেক বুঝতে পারে সবই। ভুলাও কেমন চোখ বড় বড় করে তাকায় আজকাল। তারেককে দেখিয়ে চাকু ধার দেয় সে। বখে যাওয়া ছেলেগুলোর সাথে কি সব পরামর্শ করে যেন।

  একদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে অবাক হয় সমু। বাড়িতে ঝুমুকে দেখে রীতিমত চমকে উঠে সে। অন্দরে দৃষ্টি দিলে দেখে দশ বারো জন মানুষ কি সব বলাবলি করছে। রাহেলা বেগম বলে,

- 'ঝুমুরে আমার খুব পচন্দ, তর পচন্দ কস নাই যে?'

পরক্ষণে সবকিছু বুঝতে পারে সমু। সেদিন তারেকের কাছে গেছিল ঝুমু। কি যেন বলে এসেছে তাকে। তারপর তারেক স্বয়ং এ সবের ব্যবস্থা করেছে এখন। দৃষ্টিগোচর হলে তারেক বল্‌

- 'আজ যার হাত ধরেছিস, ছাড়িস না গুল্লু। সঙ্গীহীন মানুষ বাঁচে না রে।'

  এরপর দিনে দিনে তারেকের অসুস্থতা বাড়ে আরও। তাড়াইল বাজারের বিরু ডাক্তার এসে স্যালাইন দিয়ে যায় ওকে। তারপর একদিন সকালে একটা বুনো গন্ধে ঘুম ভাঙে তারেকের। ঘরে কোথাও ইঁদুর মরেছে হয়তো। দিনের এলো তখনও ফুটেনি। বড় ঘরের দরজা খুলে দেখে অরু দাঁড়িয়ে। চোখাচোখি হলে রীতিমত চমকে উঠে তারেক। এ বাড়ির খবর জানার কথানা ওর। তবুও অরু চলে এসেছে কেমন করে যেন। এটা যে সম্পর্কের টান, ভেতরে যে সঙ্গীহীন রিক্ততা। এ ভাবনা কারও মনে আসে না তখন। তারপর মান-অভিমানের একপালা গান হয় দুজনের মধ্যে।

  কয়েক বছর আগের কথা। সেবার খুব অসুস্থ হয়েছিল অরু। তারেকের মত। ডাক্তার বলেছিল কিডনি প্রতিস্থাপনের কথা। সরকারি অফিসের ছাপোষা কেরানি, কত বা বেতন হতে পারে তারেকের। দুবেলা ডাল-ভাত জোগান দেওয়ার সামর্থ্য ছিল হয়ত। স্ত্রীর চিকিৎসা নয়।ভালবাসা পাগল মানুষটা মরিয়া হয়েছিল সেদিন। উপায়ন্তর না দেখে নিজের একটা কিডনি দিয়েছিল অরুকে। সত্যিটা আজও জানা হয়নি অরুর। অবশেষে একদিন সমুর কাছে সত্য উন্মোচিত হয়, ততদিনে ছাড়পত্র এসে গেছে তারেকের। সমু বলে - 'জমিগুলান বেঁচো তারেক ভাই, চিকিৎসা কর নিজের।'

রাজি হয় না তারেক। সে বলে - 'দুর্দিনে যে বাপের কাজে আসি নাই, আজ নিজের জন্য তার সম্পদ ব্যবহার করি কি করে বলত? এত অকৃতজ্ঞও মানুষ হয়?'

তারেকের বউ অরু সন্তানসম্ভবা। আজকাল নিজের সন্তানের মুখ দেখতে ইচ্ছে করে তার। পরক্ষণে সন্দেহ হয় ছাড়পত্রের মেয়াদ কতদিন? তারপর রাতে পুরনো অতীতগুলো মনে করে সুখ-দুঃখের একপালা গান রচনা করে দুজন। পরমুহূর্তে তারেক বলে,

- 'কথা দাও সোনা'। অরু বলে - 'কি? - 'আমি মরে গেলে আবার বিয়ে করো তুমি। সঙ্গীহীন বাঁচা দায়।'

সহসা তারেকের কথার জবাব দেয় না অরু। চোখাচোখি হলে অশ্রু বিসর্জন দেয় দুজনই।     

          অস্ফউষ্ট 

           আর্তি

আবু রাশেদ পলাশ

 

   জেলা-শেরপুর, বাংলাদেশ

........ভাসান চর সংঘর্ষ মামলায় জেল হয় মধুর। খড়ি মণ্ডল ভূমি অফিসের লোকদের হাত করে চরের অধিকার নেয়। পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার সবাই ফিরে আসে চৌহালি। ভাসান চরে নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস শুনা যায়। ওরা মধুর কথা জানে না। মধু এ পাড়ায় অতীত এখন। গ্রামে ফিরে ভোঁদড় দু একবার খুঁজ নিয়েছিল ওর। তারপর আর খুঁজ রাখা হয়নি মধুর.....

  মিয়া বাড়ির মসজিদে ফজরের আযান ধ্বনিত হলে নিশিতে নিদ্রিত মানুষগুলোর নিদ্রা ভাঙে। রাতের গায়ে জোছনা শোভিত অন্ধকার তখন আরেকটি নতুন প্রভাতের ডাক শুনে দিনের আলোয় মুখ লোকায়। গেরস্ত বাড়ির মোরগটাও নিদ্রা ভাঙার গান জুড়ে এ সময়। শব্দ শুনে ঘুমকাতর শিশুগুলোকে মায়েরা ঠেলা দিয়ে তুলে দেয়। আধো ঘুমে ঢল ঢল শিশুগুলো বাইরে এসে ছাইয়ের গাঁদি থেকে পুড়া কাঠের কয়লা তুলে মাজন করতে করতে পুকুরের দিকে চলে যায়। একসময় প্রভাত কাকলীর মধ্যে আগমন ঘটে দিনের সূর্যটার।

  গ্রামের নাম চৌহালী। তার জন্মের ইতিহাস কালগর্ভে বিলীন । ওর বুক জুড়ে বহমান কালীনদির স্রোত প্রবাহ এ গ্রামকে হিন্দু-মুসলমান পাড়ায় বিভাজিত করেছে। নদী নারী পুরুষের মিলনস্থল। স্থান, কাল নির্বিশেষে একই নদীর স্রোত জলে স্নান করে শুদ্ধ হয় সবাই। মুসলমান পাড়ার উত্তরে মিয়াদের বাস। অপেক্ষাকৃত জনবহুল এ জায়গাটা গায়ে টুগিপাড়া নামে পরিচিত। এখানে ভূমিহীন ঐসব মানুষেরা বসবাস করে নিম্নবিত্তের দৃষ্টিতেও যারা ছোটলোক। ছোটলোকদের থাকার জায়গাও সামান্য। ঘরগুলো একটার সাথে আরেকটা লাগানো। উঠানে তিল ধারণের জায়গা পাওয়াও  মুশকিল।

  বুড়ো বাহারুদ্দিন মিয়াবাড়িতে বয়োজ্যেষ্ঠ। সংসারে স্ত্রী ছাড়াও একমাত্র মেয়ে আছে তার। নাম জরি। কয়েক বছর আগে উজানতলীর হাশেমের সাথে বিয়ে হয়েছিল ওর। সংসার টিকে নি সেখানে। স্বামী তালাক দিলে এখন বাপের বাড়ি এসে থাকে সে। বাহারুদ্দিনের ঘরের সাথে লাগানো ছোট ছোট ঘরগুলো যথাক্রমে আহালু, আরজ আর মধুর ।

শুকনো মরসুমে মধু ভাঙ্গুরা বাজারে বড়কর্তার আরতে কাজ করে। সাথে ভোদরও। কাজ শেষে একই পথে বাড়ি ফিরে ওরা। রাতে মধু যখন বাড়ি ফিরে মিয়া বাড়ির প্রতিটি ঘরে তখন পিদিমের শেষ আলোটা নিভু নিভু করে। ভেতরে ডুকে ম্যাচের কাঠি জ্বালালে জরির রেখে যাওয়া কিছু একটা চোখে পড়ে তার। আনন্দে চোখগুলো জ্বলজ্বল করে তখন। খেতে বসলে জরির কণ্ঠ শুনা যায়।

- 'মধু ভাই আইলা'?

- 'হ,ঘুমাস নাই অহনো'?

- 'চইত মাসের গরমে পুইড়ে মরি'।

- 'হাচানি? গায়ে সার পাইনে আইজ জার করে কেবল'।

- 'কি কও, জরনি আহে দেহি'?

মধুর কপালে হাত দিয়ে শিউরে উঠে জরি। কখন যেন জ্বর এসেছে ওর। পরক্ষণে রসুন সমেত তেল গরম করে এনে দেয় তাকে। রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবনায় পড়ে মধু। ভাবনার জগতে সমস্ত জায়গা জুড়ে বিচরণ করে জরি। শেষ রাতে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে ওর। সকালে বাইরে এসে জরিকে খুঁজে সে। দেখা পায় না কোথাও। আহালুর মেয়ে বুচি জানায় ভোরে মামার বাড়ি গেছে সে, আসবে ভর সন্ধ্যায়।মুসলমানপাড়ার খড়িমণ্ডল সচ্ছল গেরস্ত। ঘরে জোড়া বউ তার, সন্তান নেই। এ পাড়ায় সালিশ করে বেড়ায় সে। বাহারি পণ্যের ব্যবসা আছে বাজারে। একই পাড়ার শুলাই মণ্ডলের খাস লোক। মণ্ডলের ব্যবসা দেখাশুনা করে সে। বিকেলে ভাঙ্গুরা বাজারে নিজের আরতে বসলে লাভের টাকাগুলো শুলাই তুলে দেয় তার হাতে। সন্ধ্যায় ভাঙ্গুরা বাজারে সওদা করতে যেয়ে এক অচেনা রমণীকে দেখলে খড়িমণ্ডলের চোখ আটকে থাকে সেদিকে। মাঝে মাঝে ডানে বামে তাকায় মেয়েটি। সন্ধানী চক্ষুযুগল পরিচিত কাওকে খুঁজে ফিরে হয়তো। ব্যর্থ হলে আবার সস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে সে। ফেরার পথে খড়িমণ্ডল নিজের নৌকায় তুলে নেয় তাকে। মণ্ডল বলে,

- 'কাগো বাড়ির বেটি তুমি'? 

- 'টুগি পাড়া মিয়া বাড়ি'।

- 'গেছিলা কই'?

- 'ধানশাইল মামুগো বাড়ি'।

- 'একলানি গেচিলা,ডরাও না'?

মণ্ডলের কথার জবাব দেয় না জরি। ও কথা না বললে মণ্ডলও চুপ হয়ে যায় একসময়। পরক্ষণে নৌকার পাটাতনের উপর একজোড়া সাদা পা দৃষ্টিগোচর হলে চক্ষু পড়ে থাকে সেদিকে। সে পা সহসা চোখের আড়াল হয় না, জরির প্রস্থানেও।

  কর্তার আরতে কাজ না থাকলে বাড়িতে অলস সময় কাটায় মধু। ও বাড়ি থাকলে ট্রাঙ্কে রাখা আসমানি রঙা শাড়িটা পড়ে জরি, মাথায় জপজপে তেল দেয়। তারপর ওর সামনে পায়চারী করে অনেকবার। মধু নিজের ঘরের দাওয়ায় বসে হুঁকা টানে। মাঝেমাঝে আড়চোখে জরিকে দেখে সে। এরমধ্যে একদিন কালবৈশাখী ঝড় হয় গ্রামে। টুগি পাড়ায় আহালুর ঘর পড়ে যায় ঝড়ে। সে উছিলায় একদিন মিয়া বাড়িতে আগমন ঘটে খড়ি মণ্ডলের। মণ্ডল এলে বাহারুদ্দিনের ঘরের দাওয়ায় বসতে দেওয়া হয় তাকে। মনে মনে জরিকে খুঁজে সে। দৃষ্টিগোচর হলে পুলকিত হয় মণ্ডল । যাওয়ার সময় বলে যায়,

- 'আহালু একবার আইয়ো আমার বাড়ি, কিছু টেহা দিমুনি। ঘরখান তুলো শিগগির'।      

  রাতে বাড়ি ফিরে ভাবনায় পড়ে মণ্ডল। নৌকার পাটাতনে দেখা একজোড়া সাদা পা আর বাহারুদ্দিনের বাড়ির দহলিজে দেখা একটা মেয়ে মানুষের মুখশ্রী ভেতরে জ্বালা ধরায় তার। মনে মনে ঘরে তৃতীয় স্ত্রী আনার পাঁয়তারা করে

সে। হ্যাঁ, আরেকটা নিকা করবে খড়িমণ্ডল। নিকা করবে নৌকার পাটাতনে দেখা সেই সাদা পায়ের রমনিকেই। এরপর মাঝেমাঝেই শুলাইকে মিয়া বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। জরিকে খুঁজে সে। দৃষ্টিগোচর হলে খড়ি মণ্ডলের দেওয়া জিনিসগুলো তুলে দেয় ওর হাতে । জরি নিতে না চাইলে শুলাই বলে,

- 'ডরাও ক্যান, আমিনা তোমার কাহা অই'?

  বৈশাখ মাসের শেষের দিকে ব্যস্ততা বাড়ে ছেলেদের। ব্যস্ত হয় মেয়েরাও। সামনে আগত বর্ষাকে কেন্দ্র করে হিন্দু - মুসলমান পাড়ার ঘরে ঘরে জাল তৈরির সরঞ্জাম শোভা পায়। বড়  ঘরের  দাওয়ায়  বসে দিনমান জাল বুননের কাজ

করে সবাই। আরজের ছেলে হুলু বাজার থেকে সুতা আর বঁড়শি কিনে এনে মধুর জন্য অপেক্ষা করে। মধুর কাছে মাছ ধরার ছিপ বানিয়ে নিবে সে। কিন্তু সহসা সময় হয় না মধুর। ও এখন হিন্দু পাড়ায় নৌকা মেরামতের কাজে ব্যস্ত । ভোদড়কে সাথে নিয়ে আগামী বর্ষাটা বড়কর্তার নৌকায় কাটানোর ইচ্ছে তার। রাতে বাড়ি ফিরলে দেখা হয় জরির সাথে। জরি বলে,

- 'হারাদিন কই থাহ মধু ভাই, দেহিনা যে?'

- 'কর্তার নাওয়ে কাম নিছি, বানের মসুম নাওয়ে থাকুম।'

- 'হলু হুতা,বশি কিননে আনছে। হেরে বশি বানায় দিও একখান।'

  আরজের বউ জুলেখা মারা গেছে একবছর হতে চলল। মরার সময় কলেরা হয়েছিল মেয়েটার। স্ত্রী শোকে এখনো বিয়ে করেনি আরজ। মা মরা হুলু সারাদিন পুষা কুকুরের ন্যায় এ বাড়ি ও বাড়ি আনাগোনা করে। ওর দিকে দৃষ্টি গেলে ভেতরটা হাহাকার করে আরজ আলীর। মেয়ে মানুষহীন সংসার হয় না। যে ব্যাঘ্র একবার মাংসের সন্ধান পায়, পরমুহূর্তে লোভ সংবরণ করতে পারে না সে। আজকাল একাকি বিছানায় শুয়ে মেয়ে মানুষের অভাববোধ করে আরজ। নারী সত্ত্বার যে স্বাদ পেয়েছে সে, তার লোভ সামলানোর সাধ্য নেই তার। এখন ঘরে বউ দরকার।

  এরই মধ্যে হঠাৎ শুলাইয়ের সাথে কলহ হয় মধুর। একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে জরিকে হেসে কথা বলতে দেখে সে। শুধু কথা বললে হয়তো কলহ করত না মধু। শুলাইয়ের দেওয়া জিনিসগুলো যখন জরি নিল তখনই রেগে গেল সে। পরক্ষণে শুলাইকে একটা ঘুষি মেরেছে মধু। তারপর চিৎকার করেছে ওর সাথে,

- 'হারামিরপুলা ইনু কি?'

- 'আমি আইছিনি, তোমার বইন আইতে কয় যে?' তারপর যাওয়ার সময় শাসিয়ে যায় শুলাই। 'ছাড়ুম না,  মণ্ডলরে কয়ে শাস্তা করুম তরে।'

সেদিন জরির সাথে কথা বলে না মধু। বড়ঘরের দাওয়ায় থ মেরে বসে থাকে অনেকক্ষণ। খড়ি মণ্ডলের কথা মনে হলে অজানা আশংকা এসে ভীর করে নিজের মধ্যে। মুসলমানপাড়ায় এ মানুষটাকে যমের মত ভয় পায় সবাই । শুলাইকে মারার খেসারত দিতে হবে নিশ্চয়। শুলাই কি আর যে সে মানুষ। স্বয়ং খড়ি মণ্ডলের খাস লোক সে। এ পাড়ায় সবাই সমীহ করে তাকে। মধু বসে থাকলে এগিয়ে আসে জরি, মান ভাঙানোর চেষ্টা করে তার।

- 'গোসসা অইছেনি মধু ভাই'? মধু সহসা জবাব না দিলে জরি আবার বলে - 'শুলাইরে হগল ফিরত দিমু, গোসসা ছাড়ান দেও অহন'।

এরপর ভাঙ্গুরা বাজারে গেলে ভয়ে ভয়ে থাকে মধু। সহসা খড়ি মণ্ডলের সামনে পড়ার সাহস করে না সে। হঠাৎ একদিন আচমকা ডাক পড়ে মধুর। পরক্ষণে খড়ি মণ্ডলের আরতে গিয়ে বসতে হয় তাকে। মণ্ডল বলে,

- 'মধু মিয়া যে, ভালা আছ মুনে কয়?'

- 'হ, ভালাই। জলদি কয়ে ছাড়ান দেন কাম আছে মেলা।'

- 'বহ মিয়া তাড়া কিয়ের? মনা একখান বিড়ি দে মধুরে। শুলাইরে মারছ হুনলাম, বিবাদ ছাড়ান দেও। হেতো তোমার কাহা অয়।'

- 'কাহানি? আরেকদিন আইলে ঠ্যাং খান ভাঙে দিমু।'

তারপর আর কথা বাড়ায় না মধু। সোজা গাঁয়ের পথ ধরে সে। আরতে বসে রাগে ফোঁপায় শুলাই। খড়ি মণ্ডল ধমক দেয়,

- 'চেতস ক্যান হারামির পুলা, গোসসানি তর একলা অয়। ছাড়ুম না নিজ্জস।'

  বর্ষা মরসুমের হিন্দু, মুসলমান পাড়ার ছেলেরা কাজে ব্যস্ত হয়। কালি নদীর উত্তাল ঢেউয়ের সাথে তখন সম্পর্ক গড়ে ওরা। মধুকে মালবোঝাই নৌকা নিয়ে যেতে হয় ইছামতী। বর্ডারে পণ্য চোরাচালানের ব্যবসা করে বড়কর্তা। এদিকে হিন্দু, মুসলমান পাড়ায় কোন কাজ না পেলে বিপাকে পড়তে হয় আরজকে। নৌকা, জাল কোনকিছুই নেই তার। হিন্দু পাড়ার যোগেশ ওর নৌকায় কাজ দিতে চেয়েছিল তাকে, গতকাল এসে না করে গেছে সে। অবশেষে উপায় না দেখে গণেশের নৌকায় দিনমজুরির কাজ নেয় আরজ। একদিন সন্ধ্যায় সওদা করে ফেরার পথে খড়ি মণ্ডলের সাথে দেখা হয় তার । মণ্ডল বলে,

- 'কার নাওয়ে কাম নিছ আরজ, ভালানি?'

- 'হিন্দু পাড়ার গনশা দিনমজুরি জুত নাইগো।'

- 'তাইলে আমার নায়ে আহ মিয়া, ভালা মজুরি দিমু নিজ্জস।'  হিন্দু, মুসলমান পাড়ার দরিদ্র জেলে সম্প্রদায়

বর্ষার এ সময়ে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন দেখে। চৈত্র মাসের ধরুন অভাবে জমানো অর্থ খরচ করতে হয় তখন। আজকের এই দুঃসময়ে খড়ি মণ্ডলের প্রস্তাবটা মনে মনে পুলকিত করে আরজকে। অবশেষে মণ্ডলের নৌকায় কাজ নেয় সে। বর্ষার মওসম শেষ হলে অলস সময় কাটাতে হয় সবাইকে। পানি কমলে কর্তার আরতে কাজ পাবে মধু। কালিনদীর পশ্চিমে দ্বীপসদৃশ খানিকটা জায়গা। বহুকাল ধরে চর জাগার পাঁয়তারা চলে সেখানে। নদীতে যখন থৈ থৈ পানি তখনো ওটা সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকে স্বস্থানে। লোকে বলে ভাসান চর। অবসরে মধু জরিকে নিয়ে ভাসান চরে সময় কাটায়। অস্ফুট আর্তিগুলো দিনমান প্রকাশ করে না কেউ, মনে মনে নিজেদের সহচর ভাবে ওরা। এক এক করে দিন যায়। না বলা পিছুটান গভীর থেকে গভীরতর হয়। 

  টুগি পাড়ার আরজ আলী বর্ষা মওসমে বড়কর্তার নৌকায় কাজ করে মোটা টাকার মালিক হয়। বাড়িতে টিনের দুচালা ঘর উঠে তার। এ পাড়ার সবাই এখন সমীহ করে তাকে। পলিসটার কাপড়ের একটা শার্ট আর সাদা লুঙ্গিটা পড়ে বাইরে বেড় হলে সালাম দেয় কেউ কেউ। এগুলো ভাল লাগে আরজের। এখন পাড়ায় নিজেকে বড় মানুষ ভাবে সে। ভাববেই তো খড়িমণ্ডলের খাস লোক সে। এ সম্মান টুগি  পাড়ায়  একমাত্র  তারই।  বর্ষা   মওসম  শেষ  হলে

খড়ি মণ্ডলের আরতে আবার কাজ পায় আরজ। বিকেলে মণ্ডল এলে খোশ গল্প করে দুজন। মণ্ডল বলে,

- 'এবার একখান নিকা কর আরজ, একলানি থাহুন যায়?'

খড়ি মণ্ডলের কথা শুনে লজ্জা পায় আরজ। কথার জবাব দেয় না সহসা। পরক্ষণে বলে,

- 'নিকানি? মাইয়া দেহেন তাইলে মিয়া ভাই।'

- 'মাইয়া একখান দেহা আছে, মত দেও মিয়া।'

- 'কে ডা, খুললে কন হুনি?'

- 'বাহারুদ্দিনের বেটি জরি। সুরতখান দলা দেহি?'

- 'হাচা। তই কাহা রাজি অবনি?'

- 'অবো নিজ্জস। মত দেও কতা কই।'

  খড়ি মণ্ডলের কথায় মত দেয় আরজ। জরি মেয়ে ভাল, দেখতেও বেশ। মেয়ে মানুষহীন সংসারে আরজের স্ত্রীর পাশাপাশি হুলুর জন্য একজন মা দরকার। অপরিচিত মেয়ে মানুষের মা হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? জরি থাকলে সে সন্দেহ নেই। বাড়ি ফিরে জরিকে নিয়ে ভাবে আরজ। ভেতরে কামনা তৈরি হয় তখন। অথচ জরির প্রতি এ ভাললাগা কয়েকদিন আগেও ছিল না তার। খড়ি মণ্ডলের বলা আচমকা কথাটা যেন প্রেমিক বানিয়ে দেয় তাকে। চোখের সামনে আনাগোনা করলে আড়চোখে জরিকে দেখে সে। বাড়ন্ত শরীরের প্রতিটি ভাজেভাজে উত্তাল যৌবন খেলা করে ওর। দেখলে জ্বালা করে চোখে।

  অবশেষে একদিন খড়ি মণ্ডল স্বয়ং নিকার প্রস্তাব নিয়ে যায় বাহারুদ্দিনের কাছে। বাহারুদ্দিন আপত্তি করে না তাতে। অভাবের সংসারে যেখানে দুমুঠো ভাত জোগাড় করার সামর্থ্য নেই তার, সেখানে আরজ সচ্ছল গেরস্ত। প্রস্তাব মন্দ নয়। সুখি হবে জরি। বিয়ে আগামী মাঘ মাসে হোক তাহলে। রাতে বাড়ি ফিরে বুচির মুখে সব শুনে মধু। জরিকে দেখা যায় না কোথাও। পরদিন ধলপ্রহরে আচমকা মধুর ঘরে এসে হাজির হয় সে। জরি বলে,

- 'হুনছনি হগল?' তৎক্ষণাৎ জবাব দেয় না মধু । ও জবাব না দিলে রেগে যায় জরি। তারপর আবার বলে - 'চুপ মাইরে আছ যে, বোবা অইছ মুনে কয়।'

মধুর মধ্যে অস্ফুট আর্তনাদ তৈরি হয় তখন। মনে মনে জরির জন্য ভালবাসা উতলে উঠে ঠিকই কিন্তু সত্যি বলার সাহস পায় না সে। সত্যি বলে লাভ কি, যন্ত্রণা ছাড়া? মধু খুব ভাল করে জানে যেখানে খড়ি মণ্ডল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, সেখানে ওর কথা শুনবে না বাহারুদ্দিন। বিয়ে জরির ঠিকই হবে। বিয়ে হবে আরজের সাথেই। পরক্ষণে মধু বলে দেয়,

- 'আমার কিছু কওনের নাই, হুলুর মা অ তুই।'

মধুর কথা মনে ধরে না জরির। ভেতরে দুঃখের ফোয়ারা বয় হয়তো। সেও বলে দেয়,

- 'দিলে ঘা দিলা মধু ভাই? ভুলুম না তোমারে নিজ্জস।'

  অগ্রহায়ণ - পৌষ মাসে কালি নদীর পানি শুকায়।স্রোতস্বিনী নদী তখন কৃপণ হয়। ঢেউ থাকে না কোথাও, দু একটা মাছ ধরার ডিঙ্গি নৌকা চোখে পড়ে শুধু। সওদাগরের নাও ভাসে না আর। নদীর উপর জেগে থাকা ভাসানচর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় দিনে দিনে। চর দখলকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষ বিভক্ত হয়। লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করে বড়কর্তা আর খড়ি মণ্ডল দুজনই। লাঠি চালনায় বিশেষ দক্ষতা থাকায় হিন্দু পাড়ার দায়িত্ব নিতে হয় মধুকে। এ নিয়ে একদিন আরজের সাথে বেশ কলহ হয় তার। আরজ বলে - 'লাঠি চালন ছাড়ান দে মধু। চরের দহল মণ্ডলরে দিমু।' আরজের কথায় রাজি হয় না মধু । সেও বলে দেয় - 'জান দিমু, চর দিমুনা মণ্ডলরে।'

  এরপর একদিন টুগি পাড়ায় শোকের মাতম উঠে ঘরে ঘরে। মাতম উঠে মিয়া বাড়িতেও। বুড়ি হবিরন বিবি অভিসম্পাত করে মধুকে – 'দিলে সবুর নাই হারামির, ভাইডারেই খাইল আইজ।' চর দখলকে কেন্দ্র করে কর্তা বাহিনী আর মণ্ডল বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয় চৌহালিতে।ক্ষুদ্র ভাসান চর রঞ্জিত হয় মানুষের রক্তে। আরজ আলী চর দখলে বাঁধা দিলে মধুর সাথে কলহ হয় তার। ক্ষুব্ধ মধু নিজের কাছে থাকা ধারাল কোঁচটা ছুড়ে দিলে ওটা গিয়ে পিঠে বিঁধে ওর। পরক্ষণে খুন খুন রব উঠে উপস্থিত সবার মুখে মুখে। মধু মিয়া খুন করেছে ওর ভাইকে। তারপর জেলে পড়ার ভয়ে গ্রামটা পুরুষশূন্য হয়ে যায় চোখের পলকে। হিন্দু পাড়ার ভোঁদড় পালানোর সময় মধুকে সাথে নিতে চাই তার। সে বলে,

- 'মধু বইনের বাড়ি পলামু, ল যায়।'

অকস্মাৎ কথা বলে না মধু। স্বস্থানে থ মেরে বসে থাকে সে। তারপর বলে দেয়,

- 'যামু না, ছাড়ান দে আইজ।'

ভাসান চর সংঘর্ষ মামলায় জেল হয় মধুর। খড়ি মণ্ডল ভূমি অফিসের লোকদের হাত করে চরের অধিকার নেয়। পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার সবাই ফিরে আসে চৌহালি। ভাসান চরে নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস শুনা যায়। ওরা মধুর কথা জানে না। মধু এ পাড়ায় অতীত এখন। গ্রামে ফিরে ভোঁদড় দু একবার খুঁজ নিয়েছিল ওর। তারপর আর খুঁজ রাখা হয়নি মধুর।

  এরপর একদিন খড়ি মণ্ডলের ঘরে নবজাতকের ক্রন্দন শুনা যায়। খুশিতে জোড়া বলদ জবেহ করে চৌহালি ভোগ দেয় সে। টুগি পাড়ার মেয়েরা বলাবলি করে,

- 'হুনছনি, মণ্ডলের ঘরে পুলা আইছে। পুলার দেহি চাঁদরূপ ।'

- 'কার কুলে অইলোগো বুচির মা?'

- 'আমাগো জরির।'

জরি এখন সংসার করছে খড়ি মণ্ডলের ঘরে। মধুর খোঁজ আর সবার মত তারও অজানা।    

 
 

   গতিময়

       জীবন

 পলাশ দে 

.... 'বুঝবে যেদিন আমি মরে যাব সেদিন যখন  তোমাকে  বোঝানোর  কেউ থাকবে না। তখন তুমি কপাল থাপ্‌ড়াবে। তখন আমেকে নিয়ে তোমার যা গর্ব সব মাটিতে মিলে যাবে। তখন দেখবে মজা, সেই সময় না - আমি আসব দেখতে, নাই বা তোমাকে বলবো এই সব ছালিমাটি ছাড়ার কথা।'......

  বিজয় কুমার পেশায় কুলি। গুয়াহাটী প্লেটফর্মে বসে মদের নেশায় একের পর এক গলা ছেড়ে রফি ও কিশোরের পুরনো হিট গানগুলো গেয়ে যাচ্ছে। আর মাঝে মধ্যেই আবল তাবল বোকছে। কী যে সে বলে সে নিজেই জানে না।তাকে ষ্টেশনের টি-টি, গার্ড এমন কী ষ্টেশন মাষ্টার মাঝে মধ্যেই ডেকে বোঝান, সে তা কর্ণপাত করে না। তার সবচেয়ে বড় অভিমান, সে নেশাগ্রস্থ অবস্থায় কবুল করে।তার অভিমান এই তার স্ত্রী জয়া সে এই ষ্টেশনে এ. সি. ডিপার্টমেন্টে ক্লার্কের কাজ করে। বিজয়ের অভিমান সে একজন পুরুষ হয়ে সে তার স্ত্রীর অধীনে থাকতে পারে না। তাছাড়া সে যে ষ্টেশনের কুলি, তার স্ত্রী কি না সেই ষ্টেশনের একজন কর্মচারী। এই তার মনের বিরাট বিধুরতা। এদিকে কোন যাত্রীর মাল বোঝাই করার সময় সে তার স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে নিজের বক্ষ স্বাস্থ্য করতে এক ফোঁটাও হেরফের করে না। সকলে আবার বিস্মিত ভাবে বোলে উঠে - 'এই কুলিটা বলে কি এর স্ত্রী কিনা এই ষ্টেশনের কেরানী।' কেউই বুঝে উঠতে পারেনি ব্যপারটা। আর নেশাগ্রস্ত এই বাতুলতার জন্য তার স্ত্রী জয়া তাকে বাড়ীতে অনেকবার বুঝিয়েছে। কত

ভালোবাসা দিয়ে তাকে এই ব্যপারে পদভ্রষ্ট করতে চেয়েছে কিন্তু সে তার জায়গায় অটুট। মাঝে মধ্যে যখন ডিভর্সের কথা এসে যায় তখন কিছুদিন সে কাবু করে রাখে কিন্তু এ তার উল্কা প্রায় ন্যায়। এর কিছুদিন যেতে না যেতে সে সমস্ত শপথের পান্ডু লিপিগুলো অতীতের কাছে জমা রেখে সে আবার মাদক দ্রব্যে নিজেকে ডুবিয়ে ফেলে।  তখন তার স্ত্রী তাকে বলে - 'বুঝবে যেদিন আমি মরে যাব সেদিন যখন  তোমাকে  বোঝানোর  কেউ থাকবে না। তখন তুমি কপাল থাপ্‌ড়াবে। তখন আমেকে নিয়ে তোমার যা গর্ব সব মাটিতে মিলে যাবে। তখন দেখবে মজা, সেই সময় না - আমি আসব দেখতে, নাই বা তোমাকে বলবো এই সব ছালিমাটি ছাড়ার কথা।' স্ত্রী জয়াকে বিজয় খুব ভালোবাসে।যখন তার নেশাঘোর কাটিয়ে ওঠে তখন সে চিরজীবনের জন্য মদ ছেড়ে দেবে বলে যে সে আজ পর্যন্ত কত ব্রত তার স্ত্রীর সম্মুখে বলে পালন করে যায় তার কোন ইয়ত্তা নেই। কিন্তু যেই ঘরের বাইরে কর্মের রণক্ষেত্রে নেমে পরে তেমনি সব কর্ত্তব্য থেকে বিমুর হয়ে সে লুটিয়ে পরে মদ্যপানে। এভাবে করে বেশ কিছুদিন কাটে। এদিকে

দুটি-মেয়ে সন্তান রয়েছে বাড়ীতে, তারা স্কুলে পড়াশুনা করে। তাও আবার ইংরাজ়ী মাধ্যমে। তাদের পড়াশুনার সম্পূর্ণ খরচ জয়া নিজেই চালায়। জয়া পিউ পাশ। সে পিউ পাশ করার পর্‌ বিভিন্ন সার্কুলারের মাধ্যমে এদিকে সেদিকে চাকুরীর চেষ্টা করতে করতে গুয়াহাটী ষ্টেশনের একটা কেরানীর চাকুরী জুটে যায়। আর কুলি বিজয়ের সাথে বিবাহ বন্ধন তাদের প্রেমের জুড়িতে সাফল্য। তাদের এই প্রেমের যুগল ঘটেছিল পাড়ার প্রতিবেশির সময়ে। একদিন হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত হল বিজয়ের জীবনে। বিজয়ের স্ত্রী জয়া বাড়ী ফেরার পথে, পথ দূ্র্ঘটনায় মারা যায়। এরপর থেকে বিজয়ের জীবনে নেমে আসে এক অপ্রতাশিত অভিশাপ। যা সে স্বপ্নেও ভাবেনিই। প্রত্যেকদিন সে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় যেভাবে টোল হয়ে থাকত, সে আর সেভাবে থাকে না, মুখ দিয়ে তার আর গানও বের হয় না। সবাই দেখে আসে আর স্বান্তনা দেয়, তার স্ত্রীর মৃত্যু শোকে একেবারে মুর্ছিয়ে গেছে। যাত্রীদের মাল বহন করে পৌঁছিয়ে দেয়, কিন্তু এর বিনিময়ে সে তাদের কাছ থেকে পয়সা নেই না, আর কোন কথাও বলে না। সে স্বরণ করছে তার স্ত্রীর কথাগুলো। যখন বলত - 'আমাকে নিয়ে তোমার যা গর্ব সব মাটিতে মিলে যাবে।' সে এই কথাগুলো স্বরণ করে আর একা একা বসে কাঁদে। জয়ার মৃত্যুর পর যে সমস্ত গ্রাচুইটির টাকা থেকে শুরু করে যা যা পাওনা সেগুলো মিলে প্রায় দু-লক্ষ টাকা জয়ার সহকর্মীরা বিজয়ের হাতে দিয়ে দেয়। তখন বিজয়ের এক অসাধ্য সাধন দেখে সকলের তাক লেগে যায় বিজয় জয়ার সহকর্মীদের জানায় যে সে তার স্ত্রীর টাকাগুলো সরকারকে দান করে দেবে। আর এই টাকাটা দিয়ে সে তার স্ত্রীর স্মৃতি কামনার জন্য একটি বিদ্যালয় খুলতে চান, যা তে সেই বিদ্যালয়ে গরীব ছেলে মেয়েরা পড়াশুনার সুযোগ পায়। এ খবর উপর মহল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সবাই অবাক, কেউ কেউ বলছে - 'তোমার মাথা কি খারাপ হয় নি তো বিজয়। তুমি জানো তুমি কি বলছো, তোমার ভবিষ্যত তোমার দুই-মেয়ের কথা কি ভুলে যাচ্ছ। তাদের ভবিষ্যত কি হবে'। বিজয় বলল - 'আমি ঠিক বলছি এবং আমি এটাই চাই। আমি আমার মেয়েদের তাদের মামার বাড়ীতে রেখে দিয়ে এসেছি। আর আমার কথা সে ব্যবস্থা আমি করে ফেল্‌বো'। এরপর অবশেষে তার জবরদোস্তিতে তার ইচ্ছা অনুযায়ী একটা বিদ্যালয় খোলা হল এবং সেখানে বিভিন্ন গরীব ছেলে - মেয়েরা পড়াশুনার সুযোগ পেল। এদিকে কুলি বিজয় সে গুয়াহাটী ছেড়ে দিয়ে তার স্ত্রী ও সন্তারদের স্মৃতি রেখে সে তার স্বদেশে চলে যায়।

  এই ঘটনার পর থেকে সে মদ খাওয়া ছেড়ে দেয় আর গান তার স্ত্রী জয়ার স্মৃতিতে নীরবতা পালন করার জন্য নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়।

অমানবিক

কিরণময় দাস

...ছোকরা ড্রাইভারের শেষ কথাগুলো তখনো কানে বাজছে সুরেশের। সুবৃহৎ এই মহানগরী কলকাতা এখনও তবে ‘শুয়োরের খোঁয়াড়’ হয়ে যায় নি। মানবিকতার নমুনা এখানে আজও পাওয়া যায়, ভবিষ্যতেও নিশ্চয়ই যাবে। প্রত্যক্ষ প্রমানকে অস্বীকার করার তো কোনো উপায় নেই। আসলে মানুষ নিজের নিজের চোখ দিয়েই জগৎকে বিচার করে, ভুলটা সেখানেই।...

   পকেট থেকে রুমাল বের করে চশমাটা একবার মুছে নিল সুরেশ। সেপ্টেম্বর মাস, তবু বৃষ্টি নামবার কোনো লক্ষণ নেই। গুমোট গরমে ট্রাম বাসে যাতায়াত করা বড়ই কষ্টকর হয়ে উঠছে আজকাল। বয়সও বাড়ছে ধীরে ধীরে, তাই সত্য শক্তিও অনেক কমে এসেছে।

   অন্যদিকে এমন সময়ে অফিসেই থাকে সুরেশ। আদর্শ স্কুলমাষ্টারের ছেলে হওয়ায় ফাঁকি দেওয়ার বদভ্যাস কখনও নেই তার। গত পনের বছরের চাকরি জীবনে কোনোদিনই সকাল সাড়ে নটার পর অফিসে ঢোকেনি সুরেশ। এখন সোয়া এগরোটা বাজে। সিনিয়ার ম্যনেজার শিখাদিকে ফোন করে সুরেশ তার আজকের অবস্থার কথা অলরেডি জানিয়ে রেখেছে ।

   পাশের রুমে ডঃ সেনশর্মা ডেথ সার্টিফিকেটের কাগজ পত্র তৈরি করছেন। আজকের মত এমন ঘটনা আগে দুবার ঘটেছে সুরেশের জীবনে। তবে ডেথ সার্টিফিকেট হাতে নেওয়া এই প্রথমবার। আগে দুটো কেসেই শেষ অঙ্কটা সুখের ছিল, এবার ট্রাজেডি দিয়েই শেষ হল নাটকটা। নাটকই তো! বাস্তবের নাটক সবসময়েই মঞ্চের নাটকের থেকে বেশি রোমাঞ্চকর হয়।

   আজকের মানুষ সবাই কি খুব আত্মকেন্দ্রিক? স্বার্থপর ? নিজের স্বার্থের বাইরে কিছুই ভাবতে অভ্যস্ত নয়?  অনেকদিন ধরে এই প্রশ্নটা মাথায় আসছে সুরেশের। একদিন ডিনার টেবিলে শোভার সাথে এই নিয়ে কিছুক্ষণ কথা হয়েছিল  তার। শোভা বলেছিল - ‘স্বার্থপর নয়, আজকের দুনিয়ায় সবাই আসলে খুব অসহায়। ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন, গ্লোবালাইজেশানের সাথে সাথে সবার অলক্ষ্যে মানুষ ধীরে ধীরে বড় বেশী পরজীবী হয়ে পড়েছে। হৃদয় বৃত্তি চাইলেও আজ বোধহয় সবসময় দেখানো যায় না'। 

   পাশের বাড়ীর মিত্তিরবাবু এক রাতে মত্ত অবস্থায় চিৎকার করে বলছিলেন ‘দুনিয়ায় শালা মানুষ নেই রে আজ, সবই শুয়োর। ভবিষ্যতে পৃথিবীটাই হবে শুয়োরের খোঁয়াড়। শুয়োরের বাচ্চারা তো শুয়োরই হবে।‘ কথাগুলো শুনতে অশ্রাব্য লাগলেও একেবারে পাগলের প্রলাপ বলে মনে হয়নি সুরেশের। যে কারণেই হোক না কেন, ব্যাক্তিগত জীবনে হাজার ব্যাবস্থার মাঝে আজকের মানুষ নিজেদের মানবিক দায়-দায়িত্ব নিয়ে ভাববার সময়ও বোধহয় পায় না। আর এ সমস্যা তো উওরোওর বেড়েই চলেছে। তাহলে আগামী দিনের দুনিয়ায় মানুষ কি অসামাজিক হয়ে যাবে? পুরোপুরি অসামাজিক?

   নিজের মনের এইসব নেগেটিভ চিন্তাভাবনা নিয়ে আজকাল বড়ো বেশী ভাবে সুরেশ। মাঝে মাঝে শোভা বলে, ‘তুমি আজকাল নেগেটিভ জিনিষপত্র নিয়ে বেশী ভাবছো, এবার পজিটিভ কিছু ভাবো। জীবনের নেগেটিভ দিকগুলো তুলে ধরার দায়িত্ব কবি-সাহিত্যিকদের, যারা হাবিজাবি চিন্তাভাবনাকেও শুধু ভাষার মাধুর্য দিয়ে পাঠকদের মন ভরায়। তোমার মত এইচ এস বি সি ব্যাঙ্কের প্রজেক্ট ম্যানেজার সারাক্ষণ নেগেটিভ চিন্তায় ডুবে থাকলে কাস্টমারেরা বিপদে পড়বে।‘  

‘মিঃ গুপ্ত, এই নিন ডেথ সার্টিফিকেট’। ডঃ সেনশর্মা এগিয়ে এসে সুরেশের হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা খাম। ‘আপাতত এটি নিয়ে আপনি থানায় যান। পুলিশের হাতে

   ব্যাপারটা হ্যান্ড-ওভার করে দিন। এই ভদ্রলোকের বাড়ির লোক যদি কেউ থাকে, তবে পুলিশই তাদের সাথে যোগাযোগ করবে। ডেড বডিটা আপাতত আমাদের হেপাজতেই থাক।‘

‘ও-কে ডক্টর, থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ ফর ইয়োর টাইম,’ প্রফেশন্যাল ভয়েসেই বললো সুরেশ। প্রথা মতো হ্যন্ডশেক করে আবার নিজের চেম্বারে ঢুকে গেলেন সেনশর্মা। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে নিজের মনেই একটু হাসলো সুরেশ। কলকাতার রাস্তার হাজার যাত্রীর সাথে এই ডাক্তারের কোনো তফাত নেই। সময়ের অভাব কি তবে সকলের?

   বছর পনেরো আগে তার নিজেরও মনে হতো সময়টা সত্যিই কম। দিনের মধ্যে নয় ঘন্টা যায় অফিসের কাজে। যাতায়াতে আরও ঘন্টা দুয়েক। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক দিন চলে যায় পেশাগত কাজকর্মে। তারপর নিজের স্নান-আহার-বিশ্রাম ইত্যাদি ধরলে দিনের মাত্র কয়েকটা মুহূর্তই পড়ে থাকে নতুন কিছু চিন্তা করার জন্যে।

   বাসে ভিড়টা সেদিন একটু অস্বাভাবিক ভাবেই বেশী ছিল। খিদিরপুর ফাঁড়ি পেরিয়ে বাসটা থামলেই কোনো রকমে বাস থেকে নেমে পড়েছিল সুরেশ। রাস্তা পেরিয়ে অটো ধরতে যাবে, এমন সময়ে রাস্তার পাশে দাঁড় করানো ট্যাক্সি থেকে এক বয়স্কা মহিলার গলা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল সে। ‘এসো তো বাবা, আমাকে একটু হেল্প করো’। সারাদিনের ক্লান্তি ঘাম হয়ে ভিজিয়ে দিয়েছে তার শার্ট। সামনে এগিয়ে সুরেশ দেখেছিল, ট্যাক্সিতে বসে মাদার টেরিসা। তাদের পাড়ার রঘুদাদা অগিয়ান অবস্থায় শুয়ে আছেন ট্যাক্সির ভেতর।

‘আমি ওনাকে নিয়ে হসপিটালে যাচ্ছি, তুমি একটু সাথে যাবে?’,পরিষ্কার বাংলা উচ্চারণ ছিল মাদারের। যুগজননীর ডাকে সাড়া না দিয়ে সেদিন পারেনি সুরেশ। পরের দিন বিকেলে যখন অফিস ফেরত হাসপাতালে এসেছিল সুরেশ, মাদার সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন তার মাথায়। প্রায় স্বগতোক্তির মতো করে বলছিলেন, ‘লাভ ইজ লাইফ, লাভ ইজ গড, লাভ ইস পীস।‘

   পরবর্তী কালে বহুবার রঘুকাকা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন সুরেশের কাছে। বলেছেন, ’সেদিন তুই না থাকলে মারাই যেতাম আমি। তোর দেওয়া রক্তই আমাকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। জন্ম-জন্মান্তরে আমি তোর কাছে ঋণী হয়ে রইলাম।‘

‘আসলে আজকের মানুষ সবসময় একরাশ ভয় বুকে নিয়ে বাঁচে’, শোভা বলেছিল একদিন। ‘পুলিশ থেকে প্রশাসন, সবাই যদি নিজের দায়িত্বটুকু ঠিক মতো পালন করে, দুনিয়ায় তাহলে আর সমস্যা থাকে না ‘।

‘না সমস্যা তবু রয়েই যাবে,‘ সুরেশ এক মত হয়নি শোভার সাথে। ‘দায়িত্ব শব্দটাই যে ওয়েল-ডিফাইন্ড নয়। পেশাগত দায়িত্ব, সাংসারিক দায়িত্ব না চাইলেও আমাদের করতে হয় কিছুটা বাধ্য হয়েই। কিন্তু মানবিক দায়িত্বে কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তাই সেখানেই আমরা যত খুশী ফাঁকি দিতে পারি।‘ 

কিছুক্ষণ আগেও ট্যাক্সিতে আসতে আসতে সুরেশ ভাবছিল সে কথা। আজকের অভিজ্ঞতা মাত্র মিনিট পঞ্চাশের। কিন্তু কি ভয়াবহ ! পুলিশ থেকে ট্যাক্সিওয়ালা সবাই খালি উপদেশ দিয়েই গা বাঁচাতে চায়! তিলোওমা কলকাতার এই কি তবে আসল রূপ?

মাঝবয়সী পুলিশ অফিসার সুরেশকে বলেছিল - ‘আপনার বয়স অল্প। কেন এসব বেকার ঝামেলায় নিজেকে জড়াতে চাইছেন? ঘরের খেয়ে বনের মোষ কি না তাড়ালেই নয়?’

তর্ক করার মত মনের অবস্থা তখন ছিল না সুরেশের। সে শুধু বলেছিল ,’স্যার, দয়া করে একটা জীপের ব্যাবস্থা করে দিন। এই ভদ্রলোকের যে অবস্থা, আর বেশী দেরি করলে হয়ত বাঁচানো যাবে না।‘

‘তাতে আপনার কি ক্ষতি হবে মশায়‘ টিপ্পনি কেটেছিল এক ছোকরা পুলিশ। ‘থানায় জীপগুলো পুলিশের কাজে ব্যাবহার করার জন্যে। রোগীকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হলে আম্বুলেন্স ডাকুন।‘

সে চেষ্টা আগেই করেছে সুরেশ। অন্ততঃ আট-দশটা আম্বুলেন্সকে ধরার চেষ্টা করেছে মোবাইল ফোনে। কোনোটা এনগেজড , কোনোটা ইন ডিউটি। ১০০ ডায়াল করেছে বার কুড়ি। সে চেষ্টা যে সফল হয় নি তা বলাই বাহুল্য।

দাড়িওয়ালা ট্যাক্সি ড্রাইভার জানালার কাঁচ নামিয়ে বলেছিল, ‘আপনার নিজের পেশেন্ট হলে তুলে নিতাম। এসব অচেনা লোককে গাড়িতে তুলবো না মশায়। মালিক জানতে পারলে আমার চাকরি যাবে।‘

তিনটে ড্রাইভার রিফিউজ করলেও চেষ্টার ত্রুটি করেনি সুরেশ। অজ্ঞান সওরোর্ধ বৃদ্ধটিকে একরকম পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে বার বার অনুরোধ করে চলেছিল সব ড্রাইভারকে। অবশেষে এই ছেলেটি আসতে রাজী হল।

মানিব্যাগে মাত্র দুটো পঞ্চাশ টাকার নোট। ক্যাশমানি কাছে রাখার ভরসা পায় না সুরেশ। বাসে ভাড়া মাত্র সাড়ে ছটাকা, ট্রেনে মানথলি পাস কাটা থাকে তার।  তাই শতখানেকের বেশি টাকা সাথে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই তার। এ টি এম কার্ড আছে সাথে, দরকার হলে টাকা তুলে নেওয়া যাবে।

 খামের মধ্যে মুড়ে রাখা ডেথ সার্টিফিকেট টিকে নিজের হ্যান্ডব্যাগে রাখলো সুরেশ। এখন প্রায় বারোটা বাজে। লোকাল থানায় নিয়ে অসি কে ডেথ সার্টিফিকেট দেখাতে হবে। সদ্যমৃত ভদ্রলোকের নামটিও তার জানা নেই। পুলিশকে কেসটা হ্যান্ড ওভার করে তারপর অফিসে যাবে সে। যদিও এখন অফিসে যেতে খুব একটা ইচ্ছে করছে না, তবু যেতে হবে। বাড়িতে এখন কেউ নেই। একা একা সারাদিন বাড়িতে থাকা আরো বোরিং।

সিঁড়ি দিয়ে দোতলা থেকে নীচে নেমে এল সুরেশ। এটা এমার্জেন্সি সেকশান। সামনে অনেক আম্বুলেন্স, ট্যাক্সি, অনেক লোকজন। ধীরে ধীরে হাসপাতাল থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার সময় হঠাৎ সুরেশ শুনলো কেউ যেন তাকেই বলছে ,’কি হল স্যার?’

চমকে পেছনে ফিরলো সুরেশ। ছোকরা ট্যাক্সি ড্রাইভারটি তার পেছনে দাঁড়িয়ে। এতক্ষণ অর্থাৎ প্রায় একঘন্টার উপর সে কি তাহলে এখানেই অপেক্ষা করছে? হঠাৎ খেয়াল হল সুরেশের, তাড়াহুড়ো করে নেমে যাবার সময় ট্যাক্সির ভাড়া মেটানো হয়নি। আসলে সেই মুহূর্তে ভাড়া দেওয়ার কথা মাথায় ছিল না তার।

‘স্যার উনি কেমন আছেন?’ যুবকটির প্রশ্নে ঘোর কাটলো সুরেশের। ‘না বাঁচানো গেলো না । যাক গে, তোমার ভাড়া কত হল ভাই ?  মিছিমিছি তোমাকে এখানে এতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখলাম।‘

‘আমি ভাড়ার জন্যে দাঁড়িয়ে নেই স্যার। রোগীকে হসপিটালে নিয়ে এলাম, আর খোঁজ না নিয়েই চলে যাবো? ভাড়া আর লাগবে না স্যার, রোগীই যখন বাঁচলো না, ভাড়া নিয়ে কি হবে? আমি সামান্য ট্যাক্সি ড্রাইভার, আমার সামর্থ্য আর কতটুকু! মানুষ হিসেবে মানুষের জন্য নয় এটুকু করলাম।‘

নিজের গালে যেন সজোরে থাপ্পড় খেলো সুরেশ। ড্রাইভারটি দূরে পার্ক করান ট্যাক্সিটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। চাবি দিয়ে দরজা খুলে গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে। আজান্তেই একবার তার দিকে হাত নাড়াল সুরেশ। একটু আগেই সে ভাবছিলো, কলকাতার মানুষমাত্রই বোধহয় অমানবিকতার নমুনা। দারোগা থেকে ডাক্তার সবাই মনুষ্যত্বের সারসত্যটুকু গা থেকে ধুয়ে মুছে ফেলেছে!

ছোকরা ড্রাইভারের শেষ কথাগুলো তখনো কানে বাজছে সুরেশের। সুবৃহৎ এই মহানগরী কলকাতা এখনও তবে ‘শুয়োরের খোঁয়াড়’ হয়ে যায় নি। মানবিকতার নমুনা এখানে আজও পাওয়া যায়, ভবিষ্যতেও নিশ্চয়ই যাবে। প্রত্যক্ষ প্রমানকে অস্বীকার করার তো কোনো উপায় নেই। আসলে মানুষ নিজের নিজের চোখ দিয়েই জগৎকে বিচার করে, ভুলটা সেখানেই। এই অসীম অনন্ত পৃথিবীর কাছে মানুষ অতি ক্ষুদ্র, অতি সামান্য। তাই সামান্যের সীমিত জ্ঞানে বিচিত্র মানবচরিত্রের বৈচিত্রকে মূল্যায়ন করা অসম্ভব।

রুমালে চশমাটা মুছে নিয়ে অটো স্ট্যান্ডের দিকে এগোতে লাগলো সুরেশ।

 
 

অমানুষ 

দীপন জুবায়ের 

ঢাকা, ধানমন্ডী, বাংলাদেশ

 

.....মোসলেম অতিভদ্র লোকের মত বিনাবাক্যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ডাক্তার মাহমুদ লক্ষ্য করলেন ফুলস্পিডে এসি চলা সত্ত্বেও তিনি ঘামছেন। ভীষণ অসুস্থ' লাগছে। সিদ্ধান্ত- নিলেন আজ আর একজন রুগী দেখবেন না। একটু পর তিনি চেম্বার ছেড়ে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। গাড়ীর ড্রাইভার ছুটিতে। তিনি নিজেই ড্রাইভ করে রওনা দিলেন। এরপর কি হলো কারও জানা নাই।.....

- পনার নাম?

- স্যার বাবার দেওয়া নাম মোসলেম উদ্দিন। এখন সবাই “অমানুষ” নামে ডাকে।

ডাক্তার মাহমুদ রোগীর চোখের দিকে তাকালেন। মানুষটার ভেতর কোন অস্বাভাবিকতা আছে বলে তার মনে হল না। আর দশটা সাধারণ মানুষের মতই। তবে চোখের ভেতর কি যেন একটা আছে, যেটা চট করে ধরা যায় না। ডাক্তার চোখ নামিয়ে নিলেন।

- অমানুষ তো কোন মানুষের নাম হতে পারে না। আপনার খারাপ লাগে না নামটার জন্যে?

এবার মোসলেম একটু নড়েচড়ে বসল। গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল-স্যার, প্রথম প্রথম খারাপ লাগতো। এখন ভালো লাগে।

- আপনার বাড়ীতে কে কে আছে? আমি বলতে চাচ্ছি আপনি কাদের সাথে থাকেন?

মোসলেম বোধহয় কথাটায় আনন্দ পেল। বেশ উৎফুল্ল গলায় বলল,- স্যার এই দুনিয়ায় আমার কেউ নাই। আমি একলা থাকি।

- আপনার একা থাকতে খারাপ লাগে না?

- জিনা স্যার। একলা থাকতেই ভালো লাগে।

- আপনার বাবা-মা-ভাই-বোন?

- স্যার সবাই অনেক আগে ইনে-কাল করেছে।

- কোন দুর্ঘটনায়?

এবার মোসলেম একটু সময় নিল। হাত কচলাতে কচলাতে বলল- না স্যার, কোন দুর্ঘটনা না।

- তাহলে?

মোসলেম কোন জবাব দিল না। ডাক্তার মাহমুদের চোখে চোখ রেখে একটু মুচকি হাসি দিল। তারপর চট করে চোখ নামিয়ে নিল।

- আচ্ছা ঠিক আছে, আপনাকে কিছু বলতে হবে না। এখন বলেন চা না কফি খাবেন?

মোসলেম কোন জবাব দিল না। ডাক্তার মাহমুদ দু-কাপ কফির অর্ডার দিলেন। সাথে সাথে কফি চলে আসল।

- নিন কফি খান। খেতে খেতে আমরা গল্প করি।

মোসলেম যেন ভীষণ লজ্জা পেল। ঘরের মেঝেতে চোখ রেখে বলল- স্যার আপনার সামনে বসে কফি খাওয়া বিরাট অভদ্রতা হবে। আমি ছোট মানুষ।

ডাক্তার মাহমুদ কিছুটা অপ্রস্তুত'ত হলেন। লোকটাকে তিনি বুঝতে পারছেন না। অথচ তার বোঝা উচিত এই মানুষটাকে।

- আপনি লিখতে-পড়তে পারেন?

- জি স্যার। মেট্রিক দিয়েছিলাম। পাশ করতে পারি নাই।

ডাক্তার মাহমুদ একটা প্যাড আর কলম এগিয়ে দিলেন তার দিকে।

- আমি পাঁচ মিনিটে কফিটা শেষ করব। এই পাঁচ মিনিটের ভেতর আপনি আপনার সমস্যাগুলো প্যাডে লিখে ফেলুন।

মোসলেম চিলের মত ছো মেরে প্যাড আর কলমটা লুকে নিল। ঘজঘজ করে প্যাডের পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলো। তারপর প্যাডের মাঝামাঝি একটা পৃষ্ঠা বের করে কলম হাতে নিল। ডাক্তার মাহমুদ একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন আর ঘন ঘন কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন। লোকটাকে বুঝতে না পারলে তিনি স্বস্তি- পাবেন না। এ রকম অদ্ভুত রোগী তার কাছে হর হামেশাই আসে। কিন্তু' এই মানুষটাকে তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না। অন্যদের থেকে একটু না অনেকটা আলাদা যেন। তিনি দেখলেন লোকটা নিমগ্ন হয়ে লিখে যাচ্ছে। কোনদিকে তার খেয়াল নাই।

মাহমুদ সাহেবের কফি শেষ। তবু তিনি খালি কাপে চুমুক দিচ্ছেন- বেশ শব্দ করে। এখন লোকটাকে দেখতে ভালো  লাগছে। মনে হচ্ছে যেন কোন ধ্যানি ঋষি। তার ধ্যান ভাঙা ঠিক হবে না। মাহমুদ সাহেব ঘড়ি দেখলেন। পাঁচ মিনিটের জায়গায় এগারো মিনিট শেষ। আর সময় দেওয়া যায় না। তিনি কাশির মত শব্দ করলেন।

- আপনার লেখা কি শেষ?

মোসলেম চট করে মুখ তুলে চাইল। ঘরের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। যেন সে এতক্ষণ এ ঘরটার ভিতর ছিল না। অন্য কোন জগৎ থেকে হঠাৎ এসে 

উপসি'ত হয়েছে এখানে।

- কই, দেখি কি লিখলেন। প্যাডটা দিন আমাকে।

মোসলেম অতি দ্রুততার সাথে প্যাডটা ডাক্তারের হাতে তুলে দিল। প্যাডের লেখা দেখে ডাক্তার ভীষণ অবাক হলেন। মানুষের হাতের লেখা এত সুন্দর হয়! ঝকঝকে লেখা, একটাও কাটাকুটির দাগ নাই। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, “স্যার, আমার রাইতে ঘুম আসে না। সারারাত জেগে থাকি। একসময় ঘুমের ওষুধ খাওয়া শুরু করলাম। তবুও ঘুম আসে না। একটার জায়গায় দুইটা, তিনটা। এভাবে বাড়াতে লাগলাম। কিন্তু' ঘুম আসে না। ওরা সারারাত বিরক্ত করে। আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আত্মহত্যা করি। কিন্তু' আত্মহত্যা করবার মত সাহস আমার নাই। আমি আর পারতেছি না স্যার। আমার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় এর থেকে মৃত্যুই ভালো।”

লেখা শেষ। ডাক্তার মাহমুদ লক্ষ্য করলেন মানুষটা পুরোপুরি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে না, কিন্তু' লে প্রতিটি লাইন শুদ্ধ ভাষায় লেখা। তিনি চোখ তুলে মোসলেমের দিকে তাকালেন।

- আপনাকে রাতে কারা বিরক্ত করে? প্রশ্ন শুনে মোসলেম যেন কিছুটা উৎসাহ পেল।

- স্যার কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে না। তবে আপনারে বলি। আমার বাবা-মা-ভাই-বোন সবাই বিরক্ত করে। বেশী ঝামেলা করে বাবা।

- বলেন কি। তারমানে আপনার মৃত বাবা-মা আপনাকে বিরক্ত করে?

- জি, স্যার। ডাক্তার সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,

- আপনি যেটা বলছেন সেটা খুবই হাস্যকর ব্যাপার, এটা বুঝতে পারছেন? কোন মৃত মানুষ কখনও জীবিত মানুষকে বিরক্ত করতে পারে না।

মোসলেম আবার মুখে কলপ এঁটে দিল। কোন কথা নেই। মুখে সেই মুচকি হাসিটা লেগে আছে।

- আপনি কথা বলেন। চুপ করে থাকলে আমি আপনার সমস্যাটা ধরবো কিভাবে?

- স্যার আমার গল্পটা কিন্তু' বড়। আপনি কি আমাকে এত সময় দিবেন?

- আপনি সংক্ষেপে বলুন। আমি বুঝবো।

মোসলেম চেয়ারটা ডাক্তারের  আর একটু কাছাকাছি টেনে নিয়ে আরাম করে বসল। তারপর শুরু করলো তার গল্প।

- স্যার শুনেন তাহলে। আমি বাড়ীর বড় ছেলে। ভাই বোন তিন জন। বাবা একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করত। স্যার আমার মা ছিল এই পৃথিবীর সবথেকে নিরীহ মানুষ। তার মত ভালো মানুষ আমি আমার জীবনে দেখেনি। বাড়ীতে থাকতো চোরের মত ভয়ে ভয়ে। বাবা প্রতিদিন বাড়ী ফিরে মার সাথে ভীষণ খারাপ ব্যবহার করত। কুৎসিত সব গালাগালি। প্রায় রাতে মাকে মার খাওয়া লাগতো। কিন্তু' স্যার বিশ্বাস করেন একদিনের জন্যেও একটু শব্দ করেনি মা। আমার মায়ের ৯০% ভালোবাসা ছিল তার বড় ছেলের জন্যে, মানে আমার জন্যে। আমি যখন ক্লাস নাইনে উঠলাম তখন হঠাৎ বাবা টাকা-পয়সা দেওয়া বন্ধ কর দিল। স্যার আমি কিন্তু' মোটের উপর ভালো ছাত্রই ছিলাম বলা যায়। মা ভীষণ আঘাত পেল। আমার উপর  অনেক বেশী ভরসা করতো তো? মা প্রায়ই বলতো তুই পড়াশুনা শেষ করে একটা চাকরি জোগাড় কর বাবা। আমি আর এই সংসারে থাকতে পারতেছি না। আমি তোর সাথে চলে যাব। স্যার আমি কিন্তু' সিরিয়াসভাবে পড়াশুনা শুরু করে দিলাম। দুর্ভাগ্য, বাবা টাকা বন্ধ করে দিল। তবুও মা কোথা থেকে কিভাবে যেন অল্প কিছু টাকা প্রায়ই আমাকে দিত। আমার এত খারাপ লাগতো স্যার। আমি ভালো করে মার মুখের দিকে তাকাতে পারতাম না। ও, স্যার, আপনাকে বলাই হয়নি, আমার বাবা ছিল মদ্যপ। মদ খেয়ে বাড়ী এসে প্রায়ই মাকে পিটাতো বিনা কারণে। তার যত রাগ সব যেন মায়ের উপর। এই পর্যন্ত- বলে মোসলেম থামলো।- স্যার আমি কি এক গেলাস পানি খেতে পারি?

- অবশ্যই। মোসলেম পানি খেয়ে আবার শুরু করলো। “-স্যার এবার আসল গল্পে ঢুকবো। একদিন সকালে ঘুম ভেঙে দেখি বাবা ঘরের মেঝেতে বসে হাউ-মাউ করে কান্নাকাটি করতেছে। আমি দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকলাম। যা ভেবেছিলাম তাই। মা সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলছে। বাবা

বিলাপ করতেছে- তোর মা এইটা কি করে- করতে পারল? এখন আমাদের কি হবে? স্যার আমি কিন্তু' আসল ঘটনা বুঝে ফেললাম। বাবার হাতেই যে মায়ের মৃত্যু হবে এটা আমি কিভাবে যেন বুঝে ফেলেছিলাম। না, না, স্যার, আমি একটুও কাঁদিনি। ওই মুহুর্তে আমি মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত- নিয়ে ফেললাম। বাবাকে আমি নিজের হাতে খুন করবো।

- স্যার আপনি বিরক্ত হচ্ছেন নাতো?

- না,না, আপনি গল্প শেষ করুন। গল্পের বাকীটা শুনতে আগ্রহবোধ করছি। আপনি বলুন।

- ধন্যবাদ স্যার। এরপর থেকে আমার মাথায় নানান ফন্দি ভর করলো। কিভাবে বাবা নামের পশুটাকে খুন করা যায়। স্যার বয়স বেশী ছিল না তখন। কিন্তু' খুব ঠান্ডা মাথায় যে কোনো কাজ করতে পারতাম। শেষমেশ একটা প্ল্যান বের করলাম, সহজ-নিরাপদ। কোন রিস্ক নাই। মা মারা যাবার পর বাবা প্রতিদিন মাতাল হয়ে বাড়ী ফিরতে। আগে মায়ের উপর যে অত্যাচার চলতো এখন সেটা আমাদের উপর চলতে লাগলো। মাতালের মার, স্যার বুঝেন তো। কোন হুশ-জ্ঞান থাকে না। ভীষণ কষ্ট হত। আমি দেখলাম, এভাবে চলতে থাকলে আমার ছোট ভাই দুটোও কোনদিন বাবার হাতে মারা যাবে। আমি আর দেরি করতে পারলাম না। সে রাতে ছিল অমাবস্যা। রাত বারোটার দিকে চারদিকে অন্ধকার। আমার মনে হল আজকেই মোক্ষম সময়। বাবা বাড়ী ফেরে রাত করে। আমি জেগে বসে থাকলাম বাবার ফেরার অপেক্ষায়। সেদিন অনেক রাতে ফিরল বাবা। আমি বাবার ঘরের সামনে একটা চেয়ারে বসে আছি । ও স্যার, আপনাকে তো বলতে ভুলে গেছি। আমরা একটা দুতলা বাড়ীর নীচতলায় ভাড়া ছিলাম। মাত্র দুটো ঘর, খুপরির মত। আমার মাতাল বাবা এতরাতে আমাকে বসে থাকতে দেখে ভীষণ অবাক হলো। তারপর কুত্তার মত হুংকার ছেড়ে বলল- এই শুয়োরের বাচ্চা, তুই এখানে কেন। যা, দুর হ, দুর হ। আমি কিন্তু' স্যার চুপচাপ বসে থাকলাম। আমি চাচ্ছিলাম ওই পশুটা আরো রেগে যাক। পশুটা টলতে টলতে কোথা থেকে একটা রোগা- পটকা কাঠের টুকরা নিয়ে আসল। আমি কিন্তু' সাবধান ছিলাম স্যার। আমারে লক্ষ্য করে যেই লাঠি চালাল আমি চট করে সরে গেলাম। বাবা হুড়মুড় করে চেয়ারের উপর পড়ে গেল। আমি একটু দুরে দাড়িয়ে তাকে বলতে লাগলাম,- তুমি কুত্তা, পশু, জানোয়ার। তুমি আমার মায়ের খুনি। আমিই তোমাকে খুন করবো, আজ। টলতে টলতে কোনরকমে উঠে দাড়িয়ে পশুটা আমাকে বলল, কি বললি শুয়োরের বাচ্চা। তোকেও তোর মায়ের কাছে পাঠাব আজ। এই বলে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। আমি তো এটাই চাচ্ছিলাম। ছাদের সিঁড়ি দিয়ে ধাপে ধাপে ছাদে পৌঁছে গেলাম। আমার পেছন পেছন পশুটাও আসল গোঁঙাতে গোঁঙাতে। আমার ছাদের কার্নিশে গিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে রইলাম। সেদিন অমাবস্যার অন্ধকার। কিন্তু' রোড লাইটের  অল্প আলো এসে পড়েছিলো ছাদে। পশুটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি পাথর হয়ে দাড়িয়ে আছি। যেই না আমার পাশে পৌঁছে গেল, আমি এক লাফে তার পেছনে চলে গেলাম। তারপর শরীরের সমস্ত- শক্তি এক করে ধাক্কা দিলাম পশুটাকে। কাজ হলো। একটা পতনের শব্দ শুনতে পেলাম। আমার কাজ শেষ। বিশ্বাস করেন স্যার, ঐ রাতে আমি একটানা ঘুমলাম, নিশ্চিত মনে। ঘুম ভাঙল সকালে লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচিতে। স্যার আর এক গেলাস পানি খাব।

মোসলেম থামলো। কিছুক্ষণ নীরবতা। ডাক্তার মাহমুদ নীরবতা ভাঙলেন কেউ বুঝতে পারেনি আপনিই খুনি?

- না, না স্যার। একদম না। সবাই ভাবল মাতাল মানুষ। অসাবধানে পড়ে গেছে। স্যার গল্প এখনও শেষ হয়নি। আমি কি আর বলব?

- হ্যাঁ বলুন। শেষ করুন। বাবা মারা যাওয়ায় আমাদের আর কেউ থাকলো না। আমার ছোট ভাই-বোন দুটো সারাক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকলো খাবারের জন্যে। একদিন আমার যে কি হলো, মাথায় আবার খুন চাপল। রাতে ঘুমের মধ্যে ওদেরকে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেললাম। তারপর ঐ রাতেই বাড়ী ছেড়ে পালালাম।

- কোথায় গেলেন?

- কোথাও যেতে পারিনি। দুই দিন এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করলাম। কিন্তু' যেখানেই যাই, সেখানে দেখি আমার ভাই-বোন দুটো আমার দিকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে। আমি অনেক চেষ্টা করেও ওদেরকে তাড়াতে পারলাম না। আমি আবার ফিরে গেলাম আমার বাড়ীতে। বাবার ঘর থেকেই পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেল। মারধোর করার দরকার হয়নি। আমিই নিজেই সব বলে দিলাম। তখন নাবালক ছিলাম বলে জীবনে বেঁচে গেলাম স্যার। যাবজ্জীবন হয়ে গেল। আমার সাজা শেষ। এখন আমি স্বাধীন স্যার। আমার গল্প শেষ।

ডাক্তার মাহমুদ আর এককাপ কফি নিলেন। মোসলেম এখন আবার মুখ নীচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

- হু, আপনার গল্প শুনলাম। এখন বলেন আমি আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি?  আমার কাছে কেন এসেছেন?

মোসলেম কোন কথা বলল না। চুপচাপ বসে থাকলো, যেন ডাক্তারের কথা শুনতেই পায়নি সে। মাহমুদ সাহেব কফি শেষ করলেন। তারপর বললেন, ঠিক আছে আপনি চলে যান। আমার কাছে আর আসবার দরকার নাই।

মোসলেম অতিভদ্র লোকের মত বিনাবাক্যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ডাক্তার মাহমুদ লক্ষ্য করলেন ফুলস্পিডে এসি চলা সত্ত্বেও তিনি ঘামছেন। ভীষণ অসুস্থ' লাগছে। সিদ্ধান্ত- নিলেন আজ আর একজন রুগী দেখবেন না। একটু পর তিনি চেম্বার ছেড়ে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। গাড়ীর ড্রাইভার ছুটিতে। তিনি নিজেই ড্রাইভ করে রওনা দিলেন। এরপর কি হলো কারও জানা নাই। পরদিন সকালে একটি বিখ্যাত দৈনিকের প্রথম পাতায় সবার চোখ আটকে গেল। বক্সের মধ্যে বড় বড় করে লেখা “বিখ্যাত মনোচিকিৎসক ডাক্তার মাহমুদ হাসানের রহস্য জনক মৃত্যু।”

পাতালপুরী ও

আগলি ডাকলিং

অপর্ণা চক্রবর্তী

কলকাতা 

 

.... 'বুঝবে যেদিন আমি মরে যাব সেদিন যখন  তোমাকে  বোঝানোর  কেউ থাকবে না। তখন তুমি কপাল থাপ্‌ড়াবে। তখন আমেকে নিয়ে তোমার যা গর্ব সব মাটিতে মিলে যাবে। তখন দেখবে মজা, সেই সময় না - আমি আসব দেখতে, নাই বা তোমাকে বলবো এই সব ছালিমাটি ছাড়ার কথা।'......

   প্রতিমা, ওফেলিয়া, মোনরমা, অপরূপা, সালোনী। এমন আরও দু'চারটে পাতালপুরীর সন্ধান জানি। মাঝে মাঝে এর কোন একটায় আমিও ঘুরে আসি। সবগুলোই আমাদের পাড়ায়, আর আসে পাশে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্তের বিউটি পার্লার। এখনকার গাল ভরা নাম 'স্যোলন্'। আমি বলি পাতালপুরী। একবার পাতাল প্রবেশ করলে আর চিন্তা নেই। পাতাল ফুঁড়ে বাইরে এলেই সক্কলকে তাক লাগিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি।

   এ যেন "যাদুকর বরফি"-র কর্মশালা। তাকের ওপর শিশি-বোতল-কৌটোয় সাজানো ক্রীম-পাউডার-তেল-পালিশ। আরো কতো কি "সাপ-- ব্যাঙ -- শকুনির ঠ্যাং"। কড়ি ফেলুন, মালিশ করুন। মা-মাসীমা-প্রেমিকা-নায়িকা, সবার জন্য পাতালপুরীর অবারিত দ্বার।

ভিতরে সব সময় জটিল রাসায়নিক গবেষণা চলছে।

জন্মগত কোঁকড়া চুল সোজা হয়ে যাচ্ছে। আবার সোজা সোজা চুল -- "টং হেয়ার স্টাইল" নাম দিয়ে গুটিয়ে টঙে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ওইরকম গরম রড চুলে প্যাঁচালে, চুলের বাবারও সোজা হয়ে থাকার সাধ্য থাকে না!

আপনার চোখের ওপর ভ্রুপল্লব জোড়া কি আকৃতিগতভাবে শুঁয়োপোকার যমজ ভাতৃদ্বয়? আঙুলে সুতোর পাক দিয়ে, সেই পাকের ফাঁকে ভুরুর চুল জড়িয়ে নিয়ে, এমন হ্যাঁচকা টান দেওয়া হবে! দেখবেন মিনিট কয়েকের মধ্যেই বাপ বাপ বলে মোটা ভুরু স্লীম হয়ে গেছে।

এবার চুলের রঙ বাহারের কথাই ধরা যাক! কমলা-বেগুনি-হলুদ এমন কি চুলে ঘাসের মতো সবুজ রঙও করাতে দেখেছি। মাথা না এশিয়ান পেইন্টসের শেড্ কার্ড, বোঝা দুষ্কর।

খসখসে গাল তুলতুলে বেড়াল বানাতে চান? চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ুন পাতালপুরীর আরাম চেয়ারে। মুখের ওপর তাল তাল ক্রীম এসে পড়বে। তারপর ময়ান দিয়ে ময়দা মাখার মতো, সেই ক্রীম সহযোগে, কষে আপনার মুখমন্ডল দলাই-মলাই করা হবে। এরপর গরম-ঠান্ডা-বরফ ঠান্ডা, যেমন তাপমাত্রার জল চান, ঠিক তেমনটি দিয়ে মুখ ধোয়ানো হবে। তারপরের পর্বটা আরও মজার। কেবলমাত্র নাসারন্ধ্র বাদ রেখে, সমস্ত মুখে গোবরের মতো ফেসপ্যাক লেপে, দু'চোখে শসার চাকতি অথবা ভেজা তুলো লাগিয়ে দিয়ে, প্রায় আধঘন্টা আপনাকে ম্যাফরিনেটেড মুরগির মতো বিশ্রাম দেওয়া হবে।

একবার পার্লারের একটি মেয়েকে বলেছিলাম --

- শসার জায়গায় তুলসী পাতা দে' না; আমার ইহকাল পরকাল এক হয়ে যাক।

সে কি বুঝল আমি জানি না। উত্তর দিল -

- তুলসী পাতা তো নেই দিদি! তুলসী কোলন্ আছে। দেব?

আজকাল পুরুষরাও নিয়মিত পাতাল প্রবেশ করছেন। ত্বকের যত্ন, চুলের কায়দা, গোঁফ দাড়ির সাথে - কিছু অবাঞ্ছিত লোমও কামিয়ে ফেলেন শুনেছি। যদিও পুরুষের শরীরে কোন লোমই অবাঞ্ছিত নয় বলেই জানি। আর লোমহীন শরীরের পুরুষ!! আমার চোখে, - ''একটি রোমহর্ষক দৃশ্য''।

বাবুঘাটে গিয়ে, মুক্ত বাতাসে উপুড় হয়ে খাটিয়ার শুয়ে তেল মালিশ করাতে দেখেছেন? মালিশওয়ালা হাত পা দুমড়েমুচড়ে,  পিঠের ওপর কিলিয়ে কাঁঠাল পাকিয়ে দিলেও; মালিশ যিনি হজম করছেন, তিনি চোখ বন্ধ করে, মুখে- "এ আরামের ভাগ হবে না" - ভাব বজায় রেখে শুয়ে থাকেন। একবার, এমন ভাবে খোলা হাওয়ায় শুয়ে, পালোয়ানি মালিশ হজম করার খুব ইচ্ছা আমার।

যারা রাস্তায় ইঁট পেতে বসে, একমুখ ফেনা মেখে, আকাশে দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে নাপিতের কাছে দাড়ি চাঁচেন, তাদের দেখেও আমরা খুব হিংসা হয়। উপায় থাকলে আমিও ওইভাবে, খোলা আকাশের নীচে বসে ক্ষৌরকর্ম করিয়ে নিতাম। আর গোঁফ-দাড়ি কামানোর অছিলায়, ঠোঁটটাকে একবার বাঁদিকে, একবার ডানদিকে বেঁকিয়ে, অচেনা পথ চলতি সবাইকে মুখ ভেংচাবার সুযোগ হাতছাড়া করতাম না।

কিন্তু, মহিলা জন্মের জন্য, আমার আর দাড়ি গজালো না। তাই কমানোর দরকারও পড়ল না। অন্যক স্বপ্নগুলো পূরণের আশাও চিরতরে অস্তমিত হল। বাধ্য হয়ে আমি চারদিকে আয়না ঢাকা মহিলা বিউটি পার্লারে যাই। আয়নার ভিতরে আয়না, তার ভিতরে আয়নার প্রতিবিম্ব গুনি; আর সংসারের বলি হওয়া, মাসিমারা বলিরেখা লুকোতে এলে, তাদের সাথে জমিয়ে গল্প করি।

কয়েক দিন আগে, পার্লারের কর্মী মেয়েদের মধ্যে একটা অচেনা নতুন মুখ দেখলাম। ছোটখাটো চেহারার কালো মেয়েটিকে, সহকারীর কাজে বহাল করা হয়েছে।

ছড়ানো শিশি-বোতল, ক্রীমের কৌটো সে খুব ভয়ে ভয়ে তাকে তুলে রাখছে, নামাচ্ছে। সামান্য ঠোকাঠুকিও হতে দিচ্ছে না। প্রতিটা শিশির অস্তিত্ব যেন তার নিজের অস্তিত্বের থেকেও অনেক বেশী দামী।

কারো মাথায় শ্যাম্পু করে দেওয়ার সময় বারবার কাস্টমারদের সুবিধা অসুবিধা জিজ্ঞাসা করছে। যেন একটা চুল ছিঁড়ে গেলে তার হাজতবাস হবে। নেলপলিশ পরানোর সময় নিজের কাঁপা হাত সামলাতে গলদঘর্ম হচ্ছে। তেষ্টার জলটুকু গলায় ঢালতে গিয়েও শঙ্কিত চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।

অতি সাবধানী হওয়া সত্ত্বেও মাঝে মধ্যে কাজে সামান্যা ভুল করে, উচ্চপদস্থদের কাছে প্রবল বকা খাচ্ছে মেয়েটা।

ওকে দেখে ভাবলাম - প্রথম প্রথম সবাই সব কাজে একটু

থতমত খায়। এরপরে আরো দু'তিন বার পার্লারে গেছি। কিন্তু মেয়েটার অবস্থায় কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করি নি। অথচ, সে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েই কাজ করে।

এর মধ্যে ওর নামও জেনেছি - পূর্ণিমা।

অমাবস্যার রঙ মাখা মুখের দিকে ভালো করে দেখলে, ওর নামটা বেমানান লাগে না।

পার্লারের চড়া আলোয়, চারদিকের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে, নিজের অজান্তেই ও মাঝে মাঝে চমকে ওঠে। ভীতু মুখটা লুকোতে, ঠোঁটে সব সময় একটা বোকা হাসি লেপ্টে রেখেছে। সে হাসির কদর করতে সবাই জানে না।

শীর্ণ - দুর্বল - দলছুট মেয়েটা যেন, - "হান্স অ্যাসন্ডারসন" - এর ফেয়ারীটেলের পাতা থেকে উঠে আসা, আমার ছেলেবেলার -

"আগলি ডাকলিং"- এর মানসরূপ।

- গল্পের ছোট্ট হাঁস শাবকের মতনই, কোন আনন্দযজ্ঞে সে অংশগ্রহণ করতে পারে না। সবার থেকে বিতাড়িত হয়ে, বিপন্ন বোধ করে। তবুও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই থামায় না।

আমার পাড়ার কাছের বস্তিতেই পূর্ণিমারা থাকে।

একদিন রাস্তার পাশের কলপাড়ে ওকে দেখলাম। একই রকম মনোযোগ দিয়ে, হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে থালা বাটি মাজছে।

- তুই এখানে থাকিস ?

আমাকে দেখে এক গাল চাঁদের হাসি হেসে বলল-

- হ্যাঁ  দিদি। ওই বস্তিতে। চলো না একবার আমাদের ঘরে।

কথাটা বলেই বুঝতে পারে হয়তো কিছু ভুল বলে ফেলেছে। আবার সেই ভীতু মুখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

আমি হেসে বললাম - চল। চা খাওয়াতে হবে কিন্তু।

ছয় বাই দশের ছোট্ট ঘর। কিন্তু বেশ পরিপাটি। আসবাব বলতে একটা তক্তপোশ, দু'তিনটে টুল, একটা ট্রাঙ্ক, আর দরমার গায়ে একটা ছোট তাক ঝোলানো। তাতে নানান টুকিটাকি জিনিস। ঘরের সামনে একচিলতে বারান্দা। বারান্দার একপাশে প্লাস্টিক ঘিরে রান্নার ব্যবস্থা।

- বাড়িতে কে কে থাকিস পূর্ণিমা ?

- আমি আর মা থাকি দিদি। মা দু'বাড়িতে বাসন মাজার কাজ করে। মার শরীর ভালো থাকে না গো। হাঁপের রোগ আছে। বেশী কাজ করতে পারে না। ঘর ভাড়া, খাওয়ার খরচ, মায়ের ওষুধ। তাই আমি কাজে লেগে পড়লাম।

কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে গেল। আগে কখনো ওকে এত কথা বলতে শুনিনি।

- তুই সব সময় এতো ভয়ে ভয়ে থাকিস কেন?

আমার প্রশ্ন শুনে করুন হাসি হাসল মেয়েটা । তারপর মুখ নামিয়ে স্টোভে চায়ের জল বসালো।

নিজেকে সব সময় ভাষায় প্রকাশ করতে হবে এমন তো কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। ওর এই স্বলাজ করুন হাসিটাই আমার প্রশ্নের উত্তর। মেয়েটার মধ্যে একটা সুক্ষ্ম আভিজাত্য আছে, যেটা ওর চারপাশের সব কিছু থেকে, ওকে আলাদা করে রেখেছে।

চা ফুটছে। কেরোসিনের স্টোভ নেভানোর গন্ধের সঙ্গে চায়ের সুঘ্রাণ মিশে, এই দরিদ্র বিকেলের একটা বিশেষ গন্ধ তৈরী করেছে।

দারিদ্রতার মধ্যে যে দুঃখ, তারও বোধহয় একটা নেশা আছে। সেই দুঃখের খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসা খুব কঠিন। ক্রীম-পাউডারের মেকী বৈভব সেই নেশা কাটাতে পারে না। দৈন্যতা - দারিদ্রতা - ব্যর্থতা মানুষের জীবনে পরম ঐশ্বর্য। এই সম্পদ কখনো হেলাফেলা করতে নেই। দুঃখহীন জীবনের মূল্যবোধ বড়ো কম।

বিলাস - প্রাচুর্যের মেকী চাকচিক্যে সহজেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আমরা যেন সেই মিথ্যা জৌলুসকে ভয় করতে শিখি।

এই মেয়েটা দুঃখী বলেই সবথেকে সুন্দর।

তবু কোন দিন গল্পের "ডাকলিং"- এর মতোই ও যেন রাজহাঁসের দলে মিশে যেতে পারে। দৈন্যকতাই ওকে সেই শক্তি যোগাবে।

চা খেয়ে উঠে পড়লাম।

- চলি রে "আগলি ডাকলিং"

অবাক হয়ে প্রশ্ন করল.

- "আগলি ডাকলিং" কি দিদি?

​- পরের দিন যখন চা খেতে আসব, তোর জন্য একটা বই আনব। গল্পের বই। তোর মতো সুন্দর একটা হাঁসের গল্প। "আগলি ডাকলিং"--এর গল্প।

শিশুর মতো একদিকে মাথা ঝাঁকালো ও। উজ্জ্বল চাঁদের হাসিতে ভেসে গেল দরিদ্রের কুঁড়ে ঘর।

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?