গল্প সমগ্র ৩

  • উদরাময়োপাখ্যান - অমলেন্দু ঠাকুর

  • তুমি না থাকলে - অর্ঘ বক্সী 

  • শেষ দেখা  - দীপশিখা তরফদার

  • হিমাদ্রির হিমঘর - ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

  • নূপুরের নূপুর - ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী 

  • লিগাল আওয়ার্স - সুরজিত মণ্ডল 

উদরাময়োপাখ্যান

অমলেন্দু ঠাকুর

.....শরীরটা বেশ আজ ঝরঝরে লাগছে, পেটে আর কোন ব্যথা নেই, ওষুধ, লুচি আর কষা মাংস ভালই কাজ করেছে মনে হচ্ছে। রান্নাঘরে খুটখাট আওয়াজ পেল অম্বর, কড়াইতে গরম তেলে কিছু একটা পড়ল বোধহয়, আজ আবার ছোড়দি অনেক কিছু রাঁধবে বলেছে, তারই বোধহয় তৈয়ারি চলছে।....

  বারে দেশে গিয়ে কিন্তু ওই লোকাল ট্রেনে করে হাওড়া থেকে বর্ধমান যাব, আর যত খাবার দাবার উঠবে সব খাব। খুব মজা হবে‘ - তুলতুলি চোখ বড় বড় করে বলল।

- ‘হুম, কতদিন পরে আবার ওই ট্রেনে চাপব!’ – অম্বরও বলে, একটু থেমে আবার বলে ‘শুধু একটাই অসুবিধা এই ট্রেন এর মধ্যে কোন টয়লেট থাকে না, নিম্নচাপ পেলে একটু কেলো ব্যাপার’।

- ‘দু ঘন্টার ত ব্যাপার! তোমার মাথায় খালি আজেবাজে চিন্তা’ – তুলতুলি বলে।

- ‘চাপ পেলে এক মিনিটই মনে হয় যেন এক ঘন্টা, দু-ঘন্টা তো খুবই বিপজ্জনক। আমি যে ঘরপোড়া গরু, তাই সিঁদুরে মেঘ দেখলে একটু ভয় পাই’ - অম্বর গম্ভীরভাবে বলে। 

ইন্ডিয়া যেতে এখনও দেরি আছে বেশ কয়েকদিন, যদিও এই সময়টাই অম্বরের বেশ ভাল লাগে, বেশ একটা একটা যাব যাব ভাব। গেলেই তো ফিরে আসার পালা। আবার সেই গতানুগতিক জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়া।

সবই ভাল কিন্তু এই সুটকেস প্যাকিং জিনিসটা সাথেই করে। নিজের গা বাঁচাতে অম্বর তাই মাঝে মাঝে বলে 'জানো তো, এই প্যাকিং জিনিসটাও কিন্তু একটা আর্ট! সবাই এটা পারে না!’

- 'এবারে আমরা যেদিন পৌঁছব, সেদিন কি জা্ন ত?’ – তুলতুলি বলে।

- ‘কি? না তো...’

- 'জামাইষষ্ঠী!, মা কিন্তু অনেক কিছু রান্না করবে বলেছে’

- 'ও, তাই নাকি? দারুন ত!’

অম্বর মুখে খুব উল্লসিত দেখালেও ভিতরে অতটা হয় না। দেশে গেলে খাওয়া দাওয়ার যা বহর প্রতেকদিনই মনে হয় জামাইষষ্ঠী। কিন্তু মুখে কিছু বলে না।

  প্লেনটা ভোরের দিক করে কলকাতায় নামল। নামার ঠিক ঘন্টাখানেক আগে একটা ব্রেকফাস্ট দিয়েছিল প্লেনে। দারুন লেগেছিল অম্বরের খেতে, তুলতুলি পুরোটা খেতে পারেনি, অম্বর ওরটাও সাবড়ে দিয়েছে। তার ওপর এক গ্লাস জল মেরে পেটটা বেশ একটু চাপ চাপই লাগছে।

তুলতুলিদের বাড়ী পৌঁছে, চান করে জামাইষষ্ঠীর জন্য রান্না করা লোভনীয় সব খাবার খেয়ে অম্বর শরীরটা একটু এলিয়ে দিল। পেটটা একটু থম্‌ মেরে থাকলেও সুস্বাদু খাবারের লোভ সারাজীবন অম্বরকে পরাজিত করে এসেছে, এবারেও তাই তার ব্যতিক্রম হয় নি, তাই পেটের কথা চিন্তা না করে, নিজের সাধ্যমতো যতটা পেরেছে সাবড়েছে।

হালকা নিদ্রা নিমেষে গ্রাস করে নিল অম্বরকে।

তুলতুলির ধাক্কা আর ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল - ’এই ওঠ, ওঠ, এবার তৈরী হয়ে নাও, বেরোতে হবে, গাড়ী এসে গেছে, হওড়া যাব, ওখান থেকে ট্রেন’

পাঁচ দশ মিনিট লাগল সবকিছু করে তৈরী হতে। তৈরী হতে হতে অম্বর বুঝতে পারল তার পেটের মধ্যে সেই থম্‌ মারা অবস্থাটা এখনো বর্তমান। তলপেটের নিচের দিকে হালকা ব্যাথা। তাই বেরনোর আগে একবার বাথরুমে ঢুকল। ভিতর থেকে শুনতে পেল, তুলতুলি বলছে ‘তোমার এই বেরনোর আগে যত্তসব’

অম্বর বসে বসে কয়েকবার নিচের দিকে ঠেলা মারল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বাইরে থেকে তুলতুলি আবার তাড়া দিচ্ছে। তাই অম্বর আর দেরী না করে শেষবারের মত, একখানা জমপেশ করে ঠেলা মারল, শুধু ‘ঠুস্‌সস..’ শব্দযোগে কিঞ্চিত বায়ু নির্গত হল মাত্র, যেটা অম্বরের একেবারেই মনঃপুতঃ হল না।

  হাওড়া স্টেশন এ পৌঁছে ওরা একটা কর্ড লাইন এর লোকাল ট্রেন এ চড়ে বসল। দারুন লাগছিল অম্বরের, দু একটা স্টেশন পরে, চারিদিকের শহুরে ভাবটা কেটে গেল, এখন জানলার পাশ দিয়ে শুধু মাঠ, ঘাট, খাল, বিল, ছোট ছোট গ্রাম, শহরতলীর দোকানপাট সরে যেতে থাকল।

‘এই মুড়ি এলে নিও কিন্তু দুটো, ট্রেন এর ঝালমুড়ি নাকি দারুন বানায়’ – তুলতুলি বলে।

‘হুঁ, নেবো‘ অম্বর বলে।

একটু থেমে আবার আস্তে আস্তে তুলতুলির কানে কানে বলে ‘একটা কি সুন্দর গন্ধ দেখেছ হাওয়াতে!, এই বাইরে মাটি, ঘাষ, আম, কাঁঠাল, কচি ধান, খালের আধপচা জল, আর তার সাথে ট্রেন এর লাইন আর তার পাশে পাথর, প্রখর রোদ্দুর আর তার উত্তাপ সব মিলে কেমন একটা গন্ধ তৈরী হয়েছে বতাসে, বুঝতে পারছ?’

‘বা...ব্বা! হল কি তোমার? তুমি আবার এসব গন্ধ কবে থেকে পেতে শুরু করলে? এদিকে ঘরে বাথরুম দীর্ঘদিন পরিস্কার না করায় যখন নোংরা গন্ধ বেরোয়, সে গন্ধ ত পাও না! কারণ পরিস্কারটা তোমাকে করতে হবে বলে। তখন ত বল, ‘কই  আমি ত কোন গন্ধ পাচ্ছি না’ তুলতুলি আস্তে চেপে চেপে বলে।

অম্বর আর কথা বাড়াল না। বেশ কিছু লোক ইতিমধ্যে ঢুলতে শুরু করেছে, কিছু লোক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গল্পে মত্ত। একটা ছাত্র ছাত্র দেখতে ছেলে আস্ত একটা বাই সাইকেল নিয়ে উঠে অন্য দিকের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে।

কাঁচা সরষের তেলের গন্ধ নাকে এল অম্বরের।

‘মুড়ি ঝাল, ঝাল মুড়ি, মুড়ি বলেন’ বলতে বলতে একটা রোগা প্যাটকা ছেলে কামরার অপর প্রান্ত এদিকটাতে এল, বুকে ঝালমুড়ি তৈরীর যাবতীয় কাঁচামাল ঝোলান।

‘আমার পেটটা বেশ সুবিধের মনে হচ্ছে না, একটাই নিচ্ছি’ – অম্বর বলল।

‘ধ্যাত্তেরিকা, তোমার এই এক হয়েছে’ – তুলতুলি খুব্ধ হয়ে বলে।

একটা প্যাকেট নিয়ে অম্বর একটু খেল, বাকিটা তুলতুলিকে দিল।

অম্বরের খুশি খুশি ভাবটা ধীরে ধীরে কেমন যেন উবে যেতে থাকল। কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারল, এটা তার পেটের জন্য। পেটের ‘চিনচিনে’ ব্যথাটা এবার মনে হল ‘মোচড়ে’ রুপান্তরিত হচ্ছে। এই ট্রেনে আবার কোন বাথরুম নেই না, কথায় বলে না! ‘যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়’। কিছু বিশ্রী পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে অম্বরের ভিতরে ভিতরে কেমন ভয় লাগল।

‘কি গো, শরীর ঠিক আছে তো? কেমন একটা করে বসে আছ ‘ – তুলতুলি কিছুক্ষণ পরে বলল।

‘না, মানে ওই পেটটা একটু সমস্যা করছে’ – অম্বর বলল, কথা বলতে তার একটুও ভাল লাগছিল না, কথা বললে যেন পেটের মোচড়টা বাড়ছে।

‘সেকি? নেমে যাবে পরের স্টেশনে? তারপর কম্মো সেরে পরের ট্রেন ধরব।‘

‘না, দেখা যাক‘

  এখনো বর্ধমান পৌঁছতে প্রায় তিরিশ থেকে চল্লিশ মিনিট দেরী আছে। এতক্ষণ আটকে রাখা যাবে কি? অম্বর চোখ বন্ধ করে অন্য কিছু চিন্তা করতে চেষ্টা করল। তুলতুলিও একটু আপসেট হয়ে পড়েছে মনে হচ্ছে। বেচারী ট্রেনে কত কিছু  খাবে বলে প্লান করেছিল।

এদিকে যত সময় যেতে শুরু করল অম্বরের অবস্থাও আরও সঙ্গিন হতে থাকল। লোকজনের কথাবার্তা, হকারদের আনাগোনা, ট্রেন স্টেশনে থামলে যাত্রীদের চিৎকার চেঁচামেচি তার কিছুই মাথাতে ঢুকছিল না। বরঞ্চ তাতে আরও পাগল পাগল লাগতে শুরু করল।

ট্রেনটা মাঝে মাঝে উপরে নীচে দুলছে, এই দুলুনিটা কি ভাল লাগত অন্য সময় হলে। এখন এটা মনে হল অসহ্য।বেশি দুললে ভয় হয় এই বুঝি অঘটন ঘটে। ব্যাথাটা ধাপে ধাপে বাড়ছে।

গাংপুর ছাড়ল, এরপরই বর্ধমান। অম্বরের প্রায় দমবন্ধ অবস্থা। তুলতুলিও কোন কথা বলছে না, অম্বর মনে মনে একটা প্লান করে নিল, বর্ধমানে ট্রেন থেকে নেমে কি করবে।

তুলতুলিকে বলল ‘শোন, জানি না কত নম্বর প্লাটফরমে আমাদের ট্রেন দাঁড়াবে, যেখানেই দাঁড়াক না কেন, নেমেই আমি সোজা এক নম্বর প্লাটফরমের দিকে যাব, ওখানে একটা টয়লেট আছে।‘

‘ঠিক আছে’ – তুলতুলি বলে।

‘তুমি ওখানেই অপেক্ষা করো। আমি ওখানেই ফিরে আসব।‘ – অম্বর বলল। পা দুটো কেঁপে কেঁপে উঠছে অম্বরের।

তুলতুলিকে বলল ‘সব লোক আগে বেরিয়ে যাবে, তারপর বেরব, ধাক্কাধাক্কিতে অঘটন হতে পারে‘ পাঁচ নম্বরে ঢুকেছে ট্রেন।ওভার ব্রীজে অসম্ভব ভীড়, পিলপিল করে লোক উঠছে  আর  নামছে,  এক পৌঁছতে পারলে হয়!

মনে পড়ল একবার বিদ্যাসাগর মহাশয় মায়ের সাথে দেখা করার জন্য একটা গোটা নদী সাঁতরে পেরিয়েছিলেন, স্রেফ মনের জোরে, মায়ের টান বলে কথা। তাকেও পারতে হবে। বিড়বিড় করে বলল ‘বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তলপেটের নিচের দিকে তো আর জীবানুতে মরণকামড় দিচ্ছিল না, দিলে উনি বুঝতেন কত ধানে কত চাল’। 

জনসমুদ্রের মধ্যে সাঁতরে যখন এক নম্বরে এল, তখন দেখল প্রায় অক্ষতই আছে। অম্বর সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি টয়লেটের জায়গাটা খুঁজতে শুরু করল। অবশেষে খুঁজে পেল সেই বহু আকাঙ্খিত জায়গা। লেখা আছে ‘এখানে পয়সা দিয়ে পায়খানা ও প্রস্রাব করা হয়’ ঢোকার মুখে পয়সা দিতে যাবে, ছেলেটি জিজ্ঞেস করল - ‘সলিড না লিকুইড?’

‘অ্যাঁ?’ কি বলছে অম্বর হঠাৎ করে বুঝে উঠতে পারল না। পরক্ষণেই বুঝতে পারল কি বলতে চাইছে লোকটি। সেন্স অব হিউমার আছে ছেলেটার বলতে হবে, যাই হোক, হবে তো লিকুইড, কিন্তু যেতে হবে সলিডের জায়গায়, ওকে নিশ্চই অত ভেঙ্গে বলার দরকার নেই।

‘সলিড, ভাই’ – অম্বর বলল।

‘পাঁচ টাকা‘ – লোকটি বলল।

অম্বরের এখন যা অবস্থা, পাঁচ টাকা কি, পাঁচ হাজার টাকাও দিতে রাজী আছে ওই নোংরা তিন ফুট বাই তিন ফুট ঘরে কিছুক্ষণ বসতে পারার জন্য।

টাকা মিটিয়ে ভিতরের দিকে এগোল অম্বর। আর এক সেকেন্ডও মনে হচ্ছে ধরে রাখা যাবে না।

ভিতরে গিয়ে যে দৃশ্য দেখল তাতে অম্বরের মাথায় যেন বজ্রপাত হল।

সে দেখল দুই সারিতে মোট ষোলোটি টয়লেট, প্রতেকটা টয়লেটের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। তার মানে ভিতরে ষোলো জন ভাগ্যবান বসে আছেন। এবং প্রত্যেক টয়লেটের সামনে একজন করে লোক দাঁড়িয়ে, এদের মধ্যে পাঁচটা টয়লেটের সামনে আবার দুজন করে দাঁড়িয়ে।

অনেক আগে এখানে বহুবার এসেছে, কোনদিন এরকম হউসফুল পায় নি, ষোলোটার মধ্যে একটা ত অন্তত খালি থাকবে! যেন অমিতাভ বচ্চনের সদ্য মুক্তি পাওয়া কোনো হিট ছবির টিকিট কাউন্টারেরর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেটা তবু ভাল, ব্লাকএ টিকিট কেনা যেত, এখানে সে উপায়ও নেই।

ব্লাকের কথায় মাথায় এল, ‘যাবে নাকি একবার, ওই মোড়ায় বসা লোকটাকে একবার বলে দেখতে, একটু টাকা দিয়ে যদি আগেভাগে ঢোকার ব্যবস্থা করা যায়, ‘শালা, যেন তিরুপতির মন্দিরে এসেছে, ঘুষ দিয়ে মন্দিরে আগে ঢোকার ব্যবস্থা করছে...’ অম্বর মনে মনে বিড়বিড় করল।

ভাবামাত্র অম্বর ফিরে গেল ছেলেটির কাছে।

‘ভাই, আমি একটু বেশি পয়সা দিচ্ছি, আমাকে একটু আগেভাগে করে দেবার ব্যবস্থা করে দাও না!, আর ধরে রাখতে পারছি না’ – অম্বর কাঁচুমাঁচু মুখ করে বলল। বলতে বলতে অম্বর একটা পাঁচশ টাকার নোট বার করে দেখাল।

‘হবে না দাদা, সরি, আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি, কিন্তু সকলেরই ওই এক সিচুয়েশন...’ – ছেলেটি বলল।

একটু থেমে ছেলেটি আবার বলল - ‘আপনি ওখানে যারা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে কাউকে বলে দেখুন, তারা যদি আপনাকে আগে যেতে দেয়’।

অম্বরের ইচ্ছা হল লোকটার গলাটা টিপে ধরে, কিন্তু কিছু করার নেই। চারিদিকে শোনা যায় দেশটা নাকি অসৎ, লোভী, ঘুসখোর লোকে ভরে গেছে, কই যখন দরকার তখন ত পাওয়া যায় না!

ভগ্ন মনোরথ হয়ে অম্বর আবার আগের জায়গায় ফিরে এল। একটা লোকের পিছনে দাঁড়াল। ভিতরের একটা লোকও এখনো বেরোয় নি। কেউ কেউ আবার সেল ফোনে কথাও বলছে। ‘এবার বেরো না রে বাবা!’ – অম্বর মনে আবার গালি পারতে লাগল। কোনটা যে আগে বেরোবে, কে জানে! সে যে লাইনে দাঁড়িয়েছে, সেটা কি আগে বেরোবে? নাকি অন্যটা? কেউ জানে না, এটাও একটা গ্যাম্বেল, তাদেরই জিৎ হবে, যারা ভাগ্যবান।

বাইরে দাঁড়ান কয়েকজন লোক ইতিমধ্যে অস্থির হয়ে পড়েছে। তাদের চোখমুখ দেখে মনে হল বুঝি ‘এই হয় কি সেই হয়’।

অম্বরের মনে হল যদি পায়খানার যন্ত্রনা মাপার কোনো যন্ত্র থাকলে বেশ হত, কে কোন লেভেলএ আছে এবং সেই লেভেল অনুযায়ী তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হত।

অম্বরের দুই পা আবার কাঁপতে লাগল, অনেকক্ষণ ধরে রেখেছে সে, এবার মনে হল সবকিছু নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাবে।

সে তার সামনে দাঁড়ানো লোকটাকে বলল – ‘দাদা, আমাকে কি একটু আগে যেতে দেবেন, প্লিজ, আমি বেশি সময় নেব না, দু মিনিট নেবো, অবস্থা খুবই সঙ্গিন! ’

‘না দাদা, পারব না, আমার যে কি অবস্থা আমি নিজেই বুঝছি, মুখ দেখে হয়ত বুঝতে পারছেন না, কিন্তু ভিতরে পুরো তোলপাড় চলছে ‘- লোকটি বলল।

‘ও!’ – অম্বর আর কথা বাড়াল না।

‘শুধু আমি না, আমার এক বন্ধুও আছে এখানে‘ – লোকটি আবার বলল।

‘অ্যাঁ ... মানে?’ – অম্বর বলল।

‘আর বলবেন না, সকালে একসাথেই ট্রেন ধরে হওড়া থেকে কলকাতা আসছিলাম, তো সকাল থেকে যাবতীয় খাওয়া দাওয়া একই রকম হয়েছে বলতে পারেন, তাই বোধহয় পায়খানাটাও একই সাথে পেল। তো আমরা যখন এলাম, একটা খালি ছিল, তো আমি আমার বন্ধুকে আগে যেতে দিলাম, হেঁ হেঁ.. বুঝলেন কিনা’ – লোকটি অন্য একটা টয়লেটের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল।

‘তা আপনি ওটার দরজার সামনেই দাঁড়াতে পারতেন, যদি উনি একটু বুঝে সুঝে একটু তাড়াতাড়ি করতেন হয়ত।‘ – অম্বর বলল।

‘ওরে বাবা! বলছেন কি মশাই? জেনেশুনে এই ভুল করব ভেবেছেন?‘ – লোকটি বলে।

‘কেন?‘ – অম্বর একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘আর বলবেন না, একবার ঢুকলে কমপক্ষে আধঘন্টা ধরে রাখুন, পাঁচ বছর ধরে একই মেসের একই রুম এ আছি মশাই... হেঁ হেঁ’ – লোকটি মাথা নাড়তে নাড়তে বলল।

‘বলেন কি দাদা’ – অম্বর চোখ বড়বড় করে বলল।

‘হেঁ, হেঁ, সেজন্যই ত এখানে দাঁড়িয়েছি মশাই, তবে আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আমি কিন্তু ঢুকব আর বেরোব’ – লোকটি একটু চোখ নাচিয়ে বলল।

‘সবাই তাই বলে’ – অম্বর মনে মনে বলল।

লোকটির বন্ধু যে টয়লেটাতে আছেন, তার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, সেই ভদ্রলোকের মুখের দিকে একবার আরচোখে তাকাল অম্বর, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে, চোখেমুখে প্রচুর প্রত্যাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু উনি তো আর জানেন না, কি মোক্ষম জায়গায় তিনি দাঁড়িয়েছেন। 

হঠাৎ ‘ফওওওওশশশশশশশশ...’ করে একটা আওয়াজ হল। 

ফ্লাশের আওয়াজ।

‘আঃ, কি মিষ্টি আওয়াজ! এই আওয়াজের মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে এখানে দাঁড়ানো বাইশজন লোকের দুঃখ, দুর্দশা ও হতাশার অবসানের মঙ্গলধ্বনি!’ – অম্বর চোখ বন্ধ করে সেই আওয়াজ শুনল।

অম্বরের কর্নকুহরে এই মুহুর্তে ফ্লাশের আওয়াজ সুরসম্রাট মিঞা তানসেনের সুরের থেকেও মধুর শোনাল। পরিস্থিতি মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়!

ফ্লাশের আওয়াজ হওয়া মাত্র সবাই একটু সচেতন হয়ে গেল। সবাই দেখতে লাগল কার দরজা খোলে, যেন লটারীর রেজাল্ট বেরিয়েছে, কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে কে জানে।

ছিটকিনি খোলার আওয়াজ হল, অম্বরদের সারির তিন নম্বর দরজাটা খুলল, সেই দরজার সামনে অবশ্য অলরেডি দুইজন দাঁড়িয়ে। চোখেমুখে তৃপ্তির আভাষনিয়ে একজন বেরোল, ঘেমে নেয়ে একশেষ অবস্থা।

তার সামনে যিনি ছিলেন, এই মুহুর্তে তিনিই এখন সবার হিংসার পাত্র। ভিতরের লোকটি বেরিয়ে এলে, ইনি টপ করে ঢুকে ছিটকিনি বন্ধ করে দিলেন।আবার সেই অসীম প্রতীক্ষা! এক সেকেন্ডও আর কাটতে চাইছে না। অম্বরের তলপেটের নীচে জীবানুরা যেন বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে।

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিড়েখুঁড়ে ধংস করে দেবে মনে হচ্ছে। অম্বর পেটের কাছে হাত দুটো চেপে একটু উবু হয়ে বসে পড়ল। আর পারছে না, শেষরক্ষা বোধহয় আর করা গেল না।

হঠাৎ কানে এল সেই সুমধুর আওয়াজ, হ্যাঁ একটা ফ্লাশ হয়েছে। খুব কাছ থেকে আওয়াজটা শোনাল। তাহলে এটা কি তারই লাইনে হল?

যা ভেবেছিল ঠিক তাই, তাদের সামনের টয়লেটের দরজা খুলল, যিনি বেরলেন তাঁর মুখ দেখে মনে হল ঠিক মনের মতো করে হয়নি। সামনের লোকটা তড়িঘড়ি করে ঢুকতে গেল, দরজাটা ঠেলে ভিতরে পা রাখতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।

‘কি ব্যাপার দাদা, যান তাড়াতাড়ি, এরপর তো আমি’ – অম্বর বসে বসেই বলল। 

‘না মানে...ঠিক বুঝতে পারছি না’ – বলে লোকটি ইতস্তত করতে লাগল। 

অম্বর ঝট করে উঠে পড়ল, ব্যাপারটা কি! লোকটির পাশ দিয়ে উঁকি মেরে টয়লেটের মধ্যে যা দেখল, তাতে তার মনে হল,  ‘ভগবান যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন’।

দেখে যা বুঝল, আগেরজন ঠিকঠাক শুট্‌ করতে পারেন নি, তাই বর্জ্যটি নির্দিষ্ট গর্তে না পড়ে দিকভ্রষ্ট হয়েছে, যার ফলস্বরুপ পায়খানার প্যানটার পিছনের দিকে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে একটা গাঢ় হলুদ রঙের সেমি-লিকুইড পদার্থ কায়েম করে বসেছে। কয়েকটা জায়গা অল্প উঁচু হয়ে আছে। ফুলকপি, আলু দিয়ে খিচুড়ী করে বড় থালাতে ঢাললে যেমন দেখতে লাগে, অনেকটা সেরকম। 

লোকটির ইতস্ততা দেখে অম্বর আর মহামুল্যবান সময় আর নষ্ট করল না।

‘আমার কোন অসুবিধা হবে না, দাদা’ - বলে সে লোকটাকে পাশ কাটিয়ে টয়লেটের ভিতরে ঢুকে গেল‘ বেরনোর আগে সব পরিস্কার করে দেব, কোন চিন্তা করবেন না, এই গেলাম আর এলাম’ – বলে অম্বর ভিতর থেকে ছিটকিনি বন্ধ করে দিল।

‘এই, এই, তাড়াতাড়ি বেরোবেন কিন্তু ... কি মুস্কিল!’ – লোকটা হাঁ হাঁ করে উঠল।

এক ঝট্‌কায় যতটা বেরোবার বেরিয়ে গেল, বেশিরভাগটাই মনে হল বায়ু, তার সাথে খলমল করে কিছু খুচরো খাচরা বেরল, তারপর আবার সেই ‘ন যযৌ, ন তস্থৌ’। এবার ঠেলে ঠেলে পাঠাতে হবে। কিন্তু বেশি কিছু করা গেল না, এদিকে বাইরের লোকটা দরজাতে নক্‌ করতে শুরু করেছে।

অম্বরের এখনো যা অবস্থা মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে এখানে বসে থাকলেই বেশ হত।

পরিস্কার হয়ে এবং করে যখন বেরল, দেখল লোকটা বেশ ছটফট করছে, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল অম্বর।

অম্বর বুঝতে পারল, তার পেটের অবস্থা মোটেই ভাল না, যত তাড়াতাড়ি পারা যায় ওষুধটা কিনে নিতে হবে।

বাইরে বেরিয়ে অম্বর দেখল, তুলতুলি ইতিমধ্যে এসে বাইরেটায় দাঁড়িয়ে আছে।

‘কি গো, হল শান্তি? বাব্বা... সেই কখন গেছ, ওখানে অপেক্ষা করতে পারলাম না, তাই এখানে চলে এলাম।‘ - তুলতুলি বলল।

‘হু, হয়েছে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন আবার এখুনি যাই’ – অম্বর বিমর্ষ মুখে বলল।

‘এ বাবা, সে কি গো, ইসস, ওষুধটা আসার সময় খেয়ে নিলে ভাল হত।‘ – তুলতুলি বলে।

‘হ্যাঁ, এখন চল, একটা ট্যাক্সি ধরে রওনা দিই, যাবার পথে বাজারের দোকান থেকে তুলে নেব।‘ - অম্বর বলে।

স্ট্যান্ড থেকে একটা ট্যাক্সি ধরে ওরা অম্বরদের বাড়ীর দিকে রওনা হল। আরও চল্লিশ মিনিট লাগবে ওদের পৌঁছতে। যাবার পথে ওষুধ কিনে খেয়েছে। দেখা যাক কি হয়।

ট্যাক্সিটা শহর ও শহরতলী ছেড়ে ফাঁকা জায়গার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে শুধু ধানক্ষেত, বেলা পরে এসেছে,  অম্বর জানলার কাচটা একটু নামিয়ে দিল, হাল্কা মিষ্টি একটা হাওয়া দিচ্ছে, অম্বর জানলা দিয়ে বাইরের চলমান দৃশ্য দেখতে লাগল।

তুলতুলি ফোনে কথা বলছে, ফোনের কথপোকথন শুনে অম্বর বুঝল, অনেক কিছু নাকি রান্না হচ্ছিল, সেসব নাকি নাকি এখন বন্ধ, পেট খারাপের খবর শুনে। অম্বর ঠিক খুশি হল না শুনে। 

কথাবার্তায় শুনল, অম্বরের ছোড়দি এসেছে। ছোড়দির সাথে অনেকদিন বাদে দেখা হবে ভেবে অম্বর মনে মনে খুশি হল। ছোড়দিও নাকি অনেক কিছু রান্নাবন্না করার প্লান করেছিল, এসব শুনে সে নাকি আজ সব বন্ধ রেখেছে, ঠিক থাকলে কাল করবে বলেছে।

‘নাঃ যেভাবেই হোক কালকের মধ্যে ভাল হতেই হবে’ – অম্বর মনে মনে বলে। হঠাৎ পেটটা বেশ একটু মোচড় দিল,তারপর একটা ‘খলখল’ করে শব্দ, যেন পেটের মধ্যে একটা ‘ঝর ঝর ঝর্না’। তুলতুলিও শুনেছে, মুখ ঘুরিয়ে ওকে দেখল, অম্বর ভাবল এটা আবার না ফোনে বলে দেয়, তাহলে আর রান্নাবান্নাই চড়বে না। শুধু ট্যাবলেট, জল, গাঁদাল পাতার ঝোল আর মুড়ি খেয়ে থাকতে হবে।

গিয়েই একবার বাথরুমে ঢুকতে হবে, পেট ব্যাথাটা আবার বাড়ছে। আর ভাল লাগছে না, কিভাবে যে নিস্তার পাওয়া যাবে কে যানে, অম্বর ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে পড়ে, মঝে মাঝে মনে হচ্ছে, ডাক্তারের কাছে গিয়ে বলে যে তলপেটের ভিতরে নীচের দিকটা যদি কেটে বাদ দেওয়া যায়, এরকম বেয়ারা জীবানু অম্বর জম্মে দেখে নি।

বাড়ী পৌঁছে অম্বর সোজা বাথরুমে ঢুকল। প্রথম ঝটকায় ‘ফলাৎ’ করে তরল পদার্থটা বেরিয়ে গেল। শুরু হল আবার ঠেলাপর্ব। একটাই শান্তি যে, বাইরে থেকে কেউ নক্‌ করবে না বেরিয়ে আসতে বলার।

ভিতরে বসে অম্বর শুনতে পেল, তার পেটের অবস্থার কিভাবে ভাল করা যায় সে নিয়ে বেশ জোর কদমে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। কেউ বলছে সারাদিন মুড়ি ভেজানো জল খেয়ে থাকতে, কেউ বলছে একটু ভাতের সাথে গাঁদালের ঝোল খেতে, কে একজন আবার বলল কষা মাংস দিয়ে গরম গরম ভাত খেলে নাকি পায়খানা এঁটে যায়। কে বলল এটা? তুলতুলির মত গলাটা শোনালো, যেই বলুক, অম্বরের বেশ মনে ধরল দাওয়াটি।

অম্বর বেরিয়ে এল। অনেকটা স্বস্তি লাগছে, সলিড কিছু বেরিয়েছে। ওষুধটা ভাল।

ছোড়দি বলল‘ তাহলে একটু লুচি ভাজি? কয়খানা ফুলকো লুচি আর কষা মাংস খা আজ’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ সেই ভাল...’ বলে অম্বর ভিতরে চলে গেল। একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। অম্বর একটু ভাল বোধ করতে লাগল। রাত্রে যখন খেতে বসল, বেশ ভাল খিদে পেয়েছে, তৃপ্তি করে খেয়ে অম্বর ঘুমোতে গেল।

  ...মাঝ রাতের দিকে অম্বরের পেট ব্যাথায় আবার ঘুম ভেঙ্গে গেল, ঠিক বুঝতে পারল না কোথায় সে, এক্ষুনি বাথরুমে যাওয়া দরকার, বেরিয়ে এসে খুব আশ্চর্য হয়ে গেল, একি? এ কোথায় সে, এটা ত বর্ধমানের সেই নবাবের হাটের ১০৮ শিব মন্দির এর জায়গাটা, বাথরুম এ যেতে গিয়ে এখানে কি করে এল, সামনে সারি সারি মন্দির, অম্বর আরও আশ্চর্য হল, যখন দেখল, মন্দির গুলির ভিতরে কোনো শিবলিঙ্গ নেই, তার পরিবর্তে রয়েছে একটা পায়খানার প্যান, একটা জলের কল আর একটা প্লাস্টিকের মগ। অম্বর মনে মনে ভীষণ খুশি হল, ১০৮ টা টয়লেট! এবং দু একটা ছাড়া সবই প্রায় ফাঁকা! অম্বর দৌড়ে একটা মন্দিরে ঢুকল, মনে মনে ভাবল ‘ইসস! এত ফাঁকা টয়লেট আর সে কিনা শুধু একটা তে করেই ক্ষ্যান্ত থাকবে? সে কি করে হয়?’ তাই কিছুটা করে সে ব্রেক মেরে দিল, তারপর বেরিয়ে এসে আবার একটাতে ঢুকল, ...তারপর আবার একটাতে... তারপর আবার একটা... ...বাতাসে একটা গানের সুর ভেসে আসছে ‘আহা কি আনন্দ, আকাশে বাতাসে...’, আজ অম্বরের সত্য সত্যই খুব আনন্দ হচ্ছে, এইভাবে একটার পর একটা টয়লেটে সে হানা দিতে লাগল... প্রায় দশটা টয়লেটে ঢোকার পর, সে পেট ফাঁকা করল... আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে উঠল অম্বর...

  অমনি অম্বরের ঘুমটা গেল ভেঙ্গে। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষন বসে রইল, মনে মনে হাসল স্বপ্নটার কথা ভেবে। তিন বছর আগে যখন এদেশে এসেছিল, তখন বর্ধমানের নবাবহাটে ১০৮ মন্দিরে গিয়েছিল, আর সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন বলেছিল ‘Build toilet first, temple later’, অম্বরের কথাটা বেশ মনে ধরেছিল। স্বপ্নটা এ দুটোরই খিচুরী।

  অম্বর চোখ খুলল, ভোর হয়ে এসেছে। জানলার ফাঁক দিয়ে হাল্কা আলো ঘরের মধ্যে এসে পড়েছে। তুলতুলি এখনো ঘুমিয়ে রয়েছে। জানলার পাশেই একটা পেয়ারা গাছ, কয়েকটা চড়াই পাখি সেখানে কিচিরমিচর করছে, ওরা বোধহয় খুব সকাল সকাল ওঠে। জানলার পাশ দিয়েই চলে গেছে লাল মাটির রাস্তা সোজা স্টেশনের দিকে। লোকজনের যাতায়াতের শব্দ ভেসে আসছে। প্যাঁক, প্যাঁক শব্দ করতে করতে একটা রিক্সা চলে গেল। হঠাৎ একটা রাস্তার কুকুর কেঁউ কেঁউ করে উঠল, নির্ঘাত রিক্সার চাকা কুকুরটার লেজে বা পায়ের ওপর দিয়ে গেছে। বাইরের কোথাও  থেকে উনুনের ধোঁয়ার ও তার সাথে তেলেভাজার গন্ধ নাকে এল। অম্বর ভাবল, এইসব কিছুর আস্বাদন পেতেই এই দেশে বার বার আসা যায়। এই জিনিসগুল ওখানে ভীষণভাবে মিস করে। যদিও এটা অনেকটা ‘নদীর ওপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস...’ এর মত।

  শরীরটা বেশ আজ ঝরঝরে লাগছে, পেটে আর কোন ব্যথা নেই, ওষুধ, লুচি আর কষা মাংস ভালই কাজ করেছে মনে হচ্ছে। রান্নাঘরে খুটখাট আওয়াজ পেল অম্বর, কড়াইতে গরম তেলে কিছু একটা পড়ল বোধহয়, আজ আবার ছোড়দি অনেক কিছু রাঁধবে বলেছে, তারই বোধহয় তৈয়ারি চলছে। বরাবরের পেটুক অম্বরের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। চোখটা ধীরে ধীরে আবার বুজে এল। অম্বর আবার ঘুমিয়ে পড়ল। 

                                তুমি না

       থাকলে

অর্ঘ বক্সি

  .... তার সাথে পূর্বপরিচয় আছে নাকি তোমার? তার পরিচয় আছে পুঁজির জন্ম ছকে, বেস কি সুপার স্ট্রাকচার, নির্ণয় ও নির্মিতিতে আয়না কখনো কি ভুলও দেখায় অস্তিত্ববাদী – মানুষের তরে খাটা সুদের প্রথম টাকায়, পরিযায়ী পরীদের শরীরচর্চায়।....

  তিনি মারা গেছেন। খবরটা এখনও পৌঁছোয়নি সবার কানে।  তিনি তো মারাই গেছেন। একাই মারা গেছেন ক্লান্তির কোন এক সাময়িক বিরতির মাঝখানে। শুনতে ভালবাসতেন হংসধবনি। করতে ভালবাসতেন হঠাৎ করে ফেলা কাজ। মাপতেন জল মাটি পৃথিবীর। বলতেন মহামায়া সততঃ গর্ভিণী। হরি তোমার সর্বরূপে মাতৃরূপ সার। ভেবে সংকুচিত হতেন, এই ভেবে কতখানি প্রাকৃতিক অপচয় জীবনধারণে, শূন্য করে অনেক ভাঁড়ার। নিজেকে খুঁজতেন, আশ্বস্ত করতেন সুখনাগরদোলাতে। ওহো নাগর নাগর হে শনিবার। খুঁজতেন জেগে থেকে ঘুম পর্যন্ত, ক্লান্তির বিরতিতে দুধকলা খেতেন। অঙ্গে প্রত্যঙ্গে একা তার বসে বসে থাকা। বলতেন মনে থাকে কি থাকে না ফেয়ারি জিয়নমালা জাদুকরী অ্যালিসিয়া, মৌমাছি দেহচর্যায় রত কস্মিনকাল, রোদকে বারবার এড়িয়ে যেতে চাওয়া বিকেলবেলায় ক্রমশঃ পূর্বদিকে সরে যেতে যেতে নির্বোধ প্রয়াসে, দুলে দুলে মহাকাব্যের মত। বিষবৃক্ষের ঝুড়ি গল্প             

বলে ও নীল ঘোড়ে কা সওয়ার, হেঁকে যায় হরকরা নিয়ে তার রণপা বিভূতি, সে উড্ডান বালকের তালপাতা ব্যতিরেকে নিরাশ্রয়। দেবনাগরী হিতপোদেশ ঝুমুরেও রয়েছে, এক একাকার ও অবিকৃত, গথাম শহরে ঝোলে   উল্লম্ব উল্লম্ব সব বাদুড়, ভার্টিকাল অপেরা-অ্যান্টেনা, চোখ খোঁজে আরাম খোঁজে ত্বকে ত্বকে গ্রীন চকমকি মেঘমল্লার, তাহার সন্তান প্রাক্তন বিশেষ্যতে নেইকো জিরিয়ে, ভেঙ্গে দেয় বৃত্ত ইতিহাস, সব ভেসে গেলে প্রজাতির মত সামানুষ হয়ে ওঠে কামানুষ জিভ, সে কলহপ্রবণ জিভ তবে হত হোক, কখনো কখনো শব্দভেদী এক ভাষ্য-‘হত্যা’-নতুন এক  শব্দ  প্রজনন - স্থানু  হয় - গদ্যে  বসে  আলো করে।  অনেক কিছু করতেন দুধকলায়, খেতেন, কালসাপ পুষতেন যতনবিলাসী, সেই কলাকৈবল্য মিশে থাকে ব্যপন হয়ে রিংকেলে রিংকেলে আর ঘটনা জমে পেসিফিটেড চায়ের কাপে ইস্কাবনের টেক্কায়, তেপায়ার মেহগনি ফিগারে। ত্বক খুঁজতো জামা জামা চাদর চাদর বাতাস বাতাস বৃষ্টি বৃষ্টি ঋতু ঋতু গতি গতি কারখানা গলা হাত

হাতমোজা পায়জামা দড়ি দড়ি শিমূল শিমূল মানবায়ব কোটর গর্ভ মানুষ শ্বাসপ্রশ্বাস গলা গলা খাঁকাড়ি। একরকম কাগজে শিকলি বানাতেন ঘর সাজানোর, কেক আন্দাজমত মোমবাতি অথচ দেখো কেউ বলবার নেই হ্যাপি বার্থ ডে, আর্চিস নিজেই নিজেকে, মাতুন মাতুন একজোড়া হাততালি কেক কাটবার। বলতেন মানুষ তো নয়, সুস্বাদু একাকীত্ব রান্না করে যারা মানবক, কুলীন সাধক।

তার সাথে পূর্বপরিচয় আছে নাকি তোমার? তার পরিচয় আছে পুঁজির জন্ম ছকে, বেস কি সুপার স্ট্রাকচার, নির্ণয় ও নির্মিতিতে আয়না কখনো কি ভুলও দেখায় অস্তিত্ববাদী –মানুষের তরে খাটা সুদের প্রথম টাকায়, পরিযায়ী পরীদের শরীরচর্চায়। ভোট উত্তেজনা তাকে দেখো বারবার আলোড়িত করে, গণতান্ত্রিক পুরাণিয়া কৃষ্ণ যাদব, ফির সচ্ কো বিগল যায় হাঁ আসে, যে যার মতো বসে এঁকে বানাও নিজেকে।তিনি মারা গেছেন জানা গেল দরজার থেকে। বলা ভাল দরজার প্রতিধবনিতে বোঝা গেল চলে যাওয়া সন্দেহাতীত নয়। তবে কি সুইসাইড? এখন এই যে দীর্ঘভণিতার গদ্যালাপ তিনি যে চলে গেছেন তা ধীরে ধীরে বোধগম্য করে। বুঝে নিতে পারা যায় তিনি গেছেন গিয়ে। বাসিবাস ছাড়তে ছাড়তে ভাবে, মড়া চামড়া ফেসিয়ালে চেঁচে ভাবে কোথায় গেলেন,  এই  তো  ছিলেন  খেয়ালে, এভাবে  চলে যাওয়া যায়? বেঁচে থাকলে বাজার যেতেন, সাড়ে আটটায় মৃগেল পুঁটি ধনেলঙ্কা, সন্ধেবেলা প্রিয় হংসধবনি ক্যাসেটে হাল্কা ছিমছাম। লোকটা কি তবে বিবাহিত নয়? তিনি যে মারা গেছেন কথকতা নিজেই তা বোঝে হস্তাক্ষর গতির থেকে খানিক পিছিয়ে।

  তিনি চলে গেলে কনডাক্টর বৈশাখীকে বলে দেবে ১০নং ট্যাঙ্ক, বাস খালির তাড়ায়। চলে গেছেন বলে কিছুদিন ফোনে অহেতুক রিং রিং অপেক্ষা। স্বচ্ছন্দে তারপর ফুটিয়ে জল খাবে পিলেজ্বর। তার আগে এক্ষণে বুঝিয়ে দেওয়া হল তিনি গেছেন, আর ফিরবেন না, ফেরা যায় না অসমাপিকা। এ তো স্বাভাবিক বড়, স্টক এক্সচেঞ্জ ঠিক করে দুর্গাপুজোর দিনক্ষণ। অবাক লাগে না আর yourself contradictory। তবুও কারোরই চলে যাওয়া ভাল নয়, বিশেষ করে শূন্য থেকে পূর্ন করে দিয়ে যায় যারা, তাদের মরণে কদিন অঘোষিত কার্ফিউ হ্রদয়বীণাতে। প্রতিমার কাঁচামাটি শুকোতে চায় না আর। আঙুলের টিপসই ললাটে নয়নে রয়ে যায় ফসিলের মতো। তিনি চলে গেলে প্রভু ক্রমশঃ স্বাধীন দাস দর্শন বুঝে হিংসুটে হয়ে ওঠে। দাসভক্ত। জ্ঞানের গুঁতোয় পার্থ তুলে নেয় গাণ্ডীব। মাটি তিন আঙুল উপরে উঠে আসে, সংগঠক একত্র করে ৪৯ অভিমন্যু আস্তাবলে, অত্যন্ত বিরহে।

  তিনি নেই জেনে গদ্যও অবাধ্য হয়ে শেষ হতে চায় না কখনো।  

 
 

              শেষ

         দেখা

দীপশিখা তরফদার

....একসাথে হাত ধরে চলেছি। যেখানে আমি প্রথম ওর কাঁধে হাত দিয়েছিলাম। আর ও আমার হাতে হাত। আজ সেই চিরপরিচিত প্রাণশক্তিহীন রাস্তাগুলোর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার ঘটল। তারা হঠাৎ এক অস্তিত্ব লাভ করল.....।

  টোতে উঠলাম। আজ ও খুব সুন্দর করে সেজেছে তা বলব না। কিন্তু আজকে ওকে একটু আলাদা রকম সুন্দর লাগছে। ঠোট দেখে মনে হচ্ছে বলবে বলবে করেও অনেক কথা আটকে আছে সেখানে। চোখ দেখে মনে হচ্ছিল নিস্প্রাণ, ম্রিতপ্রায়, যেন হাজারো যন্ত্রনা বয়ে নিয়ে বেরচ্ছে চোখ দুটি। আর তার ভারেই সে শীর্ণপ্রায় হয়ে পড়েছে। মুখটা বেশ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। অটোতে উঠে ও বসল জানলার ধারে আর আমি ঠিক তার পাশে। কিন্তু ও যেন এখানে ছিলই না। মনে হচ্ছিল ও হয়তো স্বপ্নের জগতে ওর ভাঙ্গা ছড়ানো স্বপ্নগুলো জড়ো করতে ব্যস্ত ছিল।

  অটো স্টার্ট দিল। কিন্তু সেই শব্দেও ওর ঘুম ভাঙল না। আমিও কিছু বলার চেষ্টা করলাম না। আস্তে আস্তে অটোর গতি বাড়ল। ওর দু একটা খোলা চুলে ঢেউ খেলে যাচ্ছিল বাতাস। হাওয়াকে কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা। কিন্তু ও টু শব্দ পর্যন্ত করল না। শুধুমাত্র বাইরের দিকে আলো গুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। কে জানে সেখানেই হয়ত সে জীবনের হারিয়ে যাওয়া আলোকে খুজে বেরাচ্ছিল। কিন্তু আমি খুঁজে ছিলাম সেই মেয়েটাকে যাকে আমি দেখছি, সেই হাসি ঠাট্টায় মজায় দিন কাটানো মেয়েটাকে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও আমি তাকে খুঁজে পেলাম না। মনে হচ্ছিল

মেয়েটা কোন বন্ধ কুঠুরিতে বসে আমাকে বারবার করে ডাকছে। কিন্তু আমি ছিলাম নিরুপায়। এবার অটো ব্রিজে উঠল। বড় বড় দোকান আর বিল্ডিং এর রঙিন আলোতে কাউকে দেখানোর সাহস নেই তার। সেগুলো বাইরে বার করতেও রাজি নয় সে। তার পরিমাণটা এত বৃহৎ যে মাঝে মাঝেই তার মলিন মুখটা কুঁকড়ে উঠছে। আর আমার এই ভেবে ভয় লাগছিল যে তার মধ্যে কিছু কিছু আমারই দেওয়া।আস্তে আস্তে আমি ওর জল ভরা চোখটাও আবিস্কার করলাম ওই রঙিন আলোতে। ছোট্ট ছোট্ট চোখ দুটো জলের ভার আর বইতে পারল না, তাই  দু-ফোটা জল নেমে এল গাল বেয়ে। কিন্তু কেউ জানতে পারল না কোথায় পড়ল সেই জল। শুধু আমি দেখলাম হাতের উপর পড়ে থাকা জলের ফোটাগুলোকে মুছে ফেলল সালয়ারে। হাতের পেছন দিক দিয়ে দুটো গাল। যাতে কেউ কিছু না দেখতে পায়, যাতে কেউ কিছু না বুঝতে পারে। কিন্তু কিছুই লোকাতে পারল না, না আমার থেকে না নিজের কাছ থেকে। ওর নিস্তব্ধতা অনেক না বলা কথা বলল আমায়। নিজের ভুলটা হঠাৎ আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। ঝকঝকে ঝলঝলে নীল লাল সবুজ আলোর রোশনাই বার বার পড়ছিল ওর দুটো মলিন চোখে। কিন্তু সেই সাদা কাল

চোখে তারা কোন স্থায়িত্ব খুঁজে পাচ্ছিল না। অটো এসে এবার স্ট্যান্ডে দাঁড়ালো। আমরা নামলাম। আর অটো থেকে নেমেই মনে হয় আমরা ঠিকমতো দুজনের চোখে চোখ রাখলাম। আর তখনই ওর অবর্ণনীয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম ওর মুখটা। যেন মনে হচ্ছে জীবনের সমস্ত যন্ত্রনা নিজের মধ্যে নিয়ে নিয়েছে। তা মুখটা দেখে আমার মনের ভেতর এক অজানা যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল।  হাঁটতে শুরু করলাম দুজন রাস্তার দুদিক দিয়ে। সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম ও নিজেকে কেন একলা বলত। এত মানুষের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, কিন্তু প্রচণ্ড একা ও সবার থেকে আলাদা মনে হচ্ছিল ওকে। আমার হঠাৎ মনে হচ্ছিল ওর সমস্ত দুঃখকে নিয়ে নিই।ওকে ভারমুক্ত করি। কিন্তু ও যেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। তাই চেয়েও তাকে খোলসমুক্ত করতে পারলাম না। আমি আর ওর এই খামখেয়ালিপনাকে সহ্য করতে পারলাম না। ওকে আস্তে করে নিজের দিকে হ্যাঁচকা টান কাছে আসার জন্য। কিন্তু ও আরও দূরে সরে গেল। আমি বুঝতে পারলাম ওর যন্ত্রণাটা। কারণ তার কিছু অংশ হয়তো আমার বুকেও বিধছিল। ধীর গতিতে সেই চেনা রাস্তায় হাঁটছিলাম। কিন্তু আজ যেন সব কিছু পালটে গেল। সেই চেনা রাস্তাগুলো  অচেনা  অচেনা  মনে  হচ্ছিল। যেখানে আমরা একসাথে হাত ধরে চলেছি। যেখানে আমি প্রথম ওর কাঁধে হাত দিয়েছিলাম। আর ও আমার হাতে হাত। আজ সেই চিরপরিচিত প্রাণশক্তিহীন রাস্তাগুলোর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার ঘটল। তারা হঠাৎ এক অস্তিত্ব লাভ করল। তারা যেন ওর মতই পালটে যেতে থাকল। আমার দিকে তাকিয়ে ওঁরা সমস্ত দুঃখের জবাব চাইতে থাকল। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই আমার কাছে কোন প্রশ্নের সঠিক উত্তর ছিল না। তারা আমার দিকে এক ঝাঁক প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত লেকের গেটে এসে আমাদের পা থামল। এই সেই জায়গা যেখানে আসার জন্য আমাদের দুজনকে কত অসুবিধার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। আমাদের জীবনের রঙিন ঘটনার স্মৃতি হয়েছিল এই জায়গাটা। এখানেই আমরা প্রথম সবচেয়ে কাছে এসেছিলাম ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম।

হঠাৎ দেখলাম ও হাঁটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তখন আমার মনে পড়ল এই রাস্তাটিই আমাদের হাজারও স্মৃতির সাক্ষী হয়ে রয়েছে। তার মধ্যে কিছু কান্না ভেজানো, কিছু হাসি মাখানো। আমি ওর স্থিরতার  কারণ বুঝতে পারলাম।

  ও আর দাঁড়িয়ে না থেকে হাঁটতে শুরু করল সঙ্গে আমিও। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে ওর সাথে মেলাতে পারছিলাম না। নিজেকে একদম আলাদা মনে হচ্ছিল। এবার আমি ওর এই নিস্তব্ধতা আর সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি ওর হাতটা টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এলাম। এখন ও আর ছাড়ানোর চেষ্টা করল না। আমি ওকে করলাম জিজ্ঞেস, 'তুমি কি সত্যি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?'

উত্তরটা খুব চেনাশোনাই ছিল। 

নূপুরের

         নূপুর

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর এ দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি যেমন অবদান রেখে চলেছেন তেমনি সৃষ্টিশীল লেখার ক্ষেত্রেও তাঁর পদচারণা। তিনি মনে করেন বিজ্ঞান চর্চা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি একে অন্যের পরিপূরক। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, গবেষক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, কবি, গীতিকার, নাট্যকার, সমাজ সংস্কারক ও সাংস্কৃতিক কর্মী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শনে বিশ্বাসী এই মানুষটির ছোটবেলা থেকেই লেখায় হাতেখড়ি। কৈশোর ও তারুণ্যে তিনি বাংলা একাডেমি, খেলাঘর,  কঁচিকাচার মেলা সহ বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করেছেন। এই সময় তাঁর প্রবন্ধ, কবিতা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকৌশল বিদ্যা অধ্যায়নের সময় তিনি প্রগতিশীল কর্মী হিসেবে কাজ করে সহিত চর্চা করে গেছেন। এ সময় তাঁর লেখাগুলো বিশ্ববিদালয়ের ম্যাগাজিনে এখনও সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও অনেকদিন ধরেই তিনি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। বাংলা ও ইংরেজি দুই সাহিত্যেই তাঁর সমান দক্ষতা রয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্র, প্রকৃতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, পরিবর্তন, সম্ভাবনা ও মানুষ তাঁর লেখার মূল উপজীব্য বিষয়।  তিনি একজন ভাল বক্তা। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক্ শো সহ বিভিন্ন সৃজনশীল অনুষ্ঠানে তাকে অতিথি হিসেবে দেখা যায়। ভারতরে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী অজিত কুমার পাঁজা কলকাতা দূরদর্শনের একটি প্রতিযোগিতায় তাঁর প্রেরিত প্রবন্ধে মোহিত হয়ে নিজ হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সে সময় সম্প্রচারিত হয়। এই খবরটি আজকাল, সংবাদ, বাংলাবাজার সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া তিনি ফিলিপিন্স, চীন, বি-টিভি  সহ দেশ বিদেশের বিভিন্ন পুরুস্কারে ভূষিত হন। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একজন কর্মী হিসেবে তিনি কাজ করে চলেছেন। 

   ...রুমঝুম করে নূপুর বাজছে। নূপুরের নূপুর। দাদি বললেন, 'সাবধান, শব্দ যেন বাইরে না যায়"। নূপুর এ কথা শুনে আরো জোরে নূপুরের শব্দ করতে থাকলো। মা রান্নাঘর থেকে বললেন, 'নূপুর, শব্দ করে নেচে চলার বয়স তোমার নেই। এখন থামো।...'

   রুমঝুম করে নূপুর বাজছে। নূপুরের নূপুর। দাদি বললেন, 'সাবধান, শব্দ যেন বাইরে না যায়"। নূপুর এ কথা শুনে আরো জোরে নূপুরের শব্দ করতে থাকলো। মা রান্নাঘর থেকে বললেন, 'নূপুর, শব্দ করে নেচে চলার বয়স তোমার নেই। এখন থামো।'

   নূপুর নাছোড়বান্দা। এবার আরো জোরে শব্দ করে করে নূপুর নূপুরের ঝংকার তুললো। নূপুরের বাবা জানালার পাশ থেকে উঁকি মেরে মিটি মিটি হেসে বললো, 'বাজা মা, যত জোরে পারিস, বাজা।' কথাটা শুনে নূপুরের মা অনেকটা রাগতস্বরে বললো, 'তোমার আস্কারা পেয়ে পেয়ে মেয়েটা দিনে দিনে বেহায়া হয়ে যাচ্ছে। মেয়ে তো আর ছোট নেই। ওর বিয়ের একটা ব্যবস্থা করো।' বাবা এবার মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। কচি মুখ। দুধে আলতা মাখানো গায়ের রং আর মুখে লজ্জা ভরা জড়তা। বয়সের চেয়ে বেড়েছে বেশি। বাবার মনে পড়লো কিছুদিন আগেও তো ও গাঁয়ের ছেলে মেয়েদের সাথে একসাথে খেলতো। সন্ধ্যে হবার আগেই তিনি খুকি খুকি বলে সারা গায়ে খুঁজে বেড়াতেন। নূপুর খুব দুষ্টুমি করতো। কখনও সবুজ ধানক্ষেতে, কখনও ঝোপেঝাড়ে আবার কখনও পুকুরে ডুব দিয়ে কচুরিপানার আড়ালে লুকাতো। বাবার মন অজানা আশংকায় আতংকিত হতো। এরপর মেয়ে যখন বাবাকে এসে জড়িয়ে ধরতো তখন বাবার মনে হতো স্বর্গ যেন তার হাতে এসেছে। বাবা আর মেয়ে কোরাস গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরত। আজ কিনা তার বিয়ের বয়স হয়েছে।  অনেকদিন পর বাবার বুকটা ধপ করে উঠলো। তার আদরের ধন তাকে ছেড়ে চলে যাবে। চোখ দিয়ে ক'ফোঁটা জল মনের অজান্তে ঝরে পড়লো।

   ভালো পাত্র সন্ধানের জন্য ঘটককে খবর দেওয়া হলো। বুড়ো ঘটক শক্ত লাঠিতে ভর করে নূপুরদের বাড়িতে এলো। তারপর একটার পর একটা সুপাত্রের গুণকীর্তনের কাহিনী। কেউ যেন কারো চেয়ে কম নয়।  যে পাত্র যত বড় তার দাম তত বেশি। বড় মানে বয়স বড় না। বড় মানে যার ধন

সম্পদ বেশি। বাবার চোখ বড় বড় হয়ে উঠে। আরও বড় ঘর চান তিনি। একটা পাত্রকে নূপুরের বাবার মনে ধরলো। ঢাকায় নাকি বড় ব্যবসা করে। আর চার পাঁচটা বাড়ি। বিয়ে ঠিক হয়। বাবা মায়ের আবেগী বিরহ ব্যথায় চোখ ভিজে আসে। বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না। কষ্টের মাঝে হাসি ধরে রাখা যে আরও কষ্টের তা তারা বুঝতে পারে। আর নূপুর কতইবা বয়স তার ষোলো কিংবা সতেরো। বিয়ের মানেই সে বুঝেনা। সে শুধু জানে বিয়ে করলে মা হওয়া যায়। যেমন ছোটবেলায় সে পুতুলের মা হত। বিয়ে দিতো আরেক পুতুলের সাথে। ওর কাছে বিয়ে একটা খেলা। পুতুল খেলার মতো।

   বর আসলো। মাথায় পাগড়ি। আর মুখে রুমাল চেপে আছে। যেন দুনিয়ার যত লজ্জা ঢাকার চেষ্টা। নূপুর পায়ে আলতা দিয়েছে। মাথায় গাঁদা ফুল। বরপক্ষ সোনার গয়না দিয়েছে। কে জানে আসল নাকি নকল। নূপুর শখ করে তার নূপুর দুটো পায়ে দিয়েছে। তার দাদির বিয়ের নূপুর। দাদি বৌকে নূপুর দেননি কিন্তু নূপুরকে দিয়েছেন। বৌ অধিকার আদায় করতে পারেনি কিন্তু নাতনি অধিকার আদায় করে নিয়েছে।

   কাজী সাহেব বিয়ে পড়াতে আসলেন। বিয়ে হলো। এবার বিদায়ের পালা। আর ভিতরের জমাট বাধা কান্না ধরে রাখতে পারল না মা বাবা। মা বাবার কান্না দেখে নূপুর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মা বাবাকে ছেড়ে অন্য লোকের সাথে যেতে হবে। কথাটা শুনে নূপুর মন ভেঙে পড়লো। নূপুরের শব্দ থেমে গেলো। জোর করে বর নূপুরকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুললো। পুরুষের শক্ত হাতের কব্জির নির্মম আঘাতে নূপুরের কোমল আর নরম হাতের চামড়া থেকে ছিটকে বের হলো ক'ফোঁটা নিষ্পাপ রক্ত। রাতের রাস্তা দিয়ে হিমঘরের লাশের মতো নূপুর চলছে বরের সাথে। চোখের পাতাগুলো আগের মতো লুকোচুরি খেলছে না। ওদিকে নেশায় মাতাল বর। নূপুরের এই প্রথম মনে হলো বিয়ে তো পুতুলের বিয়ে নয় গাড়িটা একটা বড় শহরে ঢুকলও । রং

বেরঙের বাতি । শহরটা যেন কোনও এক নর্তকীকে বরণ করার জন্য জলসা ঘরের মতো সেজেছে। মাটি ফুঁড়ে রংবেরঙের পানি বের হয়ে যাচ্ছে। গাড়ির বাইরে থেকে মানুষগুলোকে নেশায় বুদ হওয়া মরা লাশের মতো লাগছে নূপুরের। ওর মনে হ”যাচ্ছে মানুষের শব দেহগুলো হাঁটছে কিন্তু সেখানে কোনও প্রাণ নেই। এটা শহর নাকি মৃত্যুপুরী। গাড়িটা একটা অভিজাত বাড়ির সামনে থামলও। নূপুরকে আবার টেনে নামাল তার বর। কলিং বেল টিপতেই বাড়ির দরজাটা খুলে গেলো।

   নূপুর দেখলো বড় বড় বোতল হাতে ছেলেগুলো কি যেন যাচ্ছে। খুব দুর্গন্ধ মনে হলো তার। দমটা বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। সবাই যেন রঙিন জগতে প্রবেশ করেছে আর তাস খেলছে। নূপুরকে দেখে ছেলেগুলোর চোখ বড় বড় গোল গোল হয়ে গেলো। বর নূপুরকে বললো শিল্পপতির ছেলে।

প্রথমে শিল্পপতির ছোট ছেলে এগিয়ে এলো। মাতাল ছেলেটা নরপশুর চোখ নিয়ে বরকে বললো,

'কাঁচা মালটা কার জন্য এনেছিস। আজ একে আমি ভোগ করবো।'

বর বললো, 'এটাতো আপনার বাবার জন্য।'

শিল্পপতির সেজো ছেলেটা ছোট ভাইকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। সেও কামুক চোখে নূপুরের দিকে তাকিয়ে বললো, 'এটাকে আজ আমি ভোগ করবো।'

একথা শুনে শিল্পপতির বড় ছেলে সেজো ভাইকে ঘুসি মেরে সরিয়ে দিয়ে বললো, 'এটা আমার ভোগের জন্য আর কারো জন্য নয়।' তিন ভাইয়ের বন্ধুদের মধ্যে মারামারি শুরু হয়ে গেলো। নূপুর খুব শঙ্কিত আর আতংকিত। এতটা অসহায় নিজেকে সে কখনো ভাবেনি। তার মনে হলো বিয়ে মানে কি বিক্রি হওয়া। আর সেকি পণ্য যে সবাই তাকে ভোগ করবে। সে আজ নিলামের পণ্য হয়ে গেছে। নিথর দেহটা বইবার শক্তি ছিল না তার শুধু কষ্ট আর ঘৃণা কাজ করছিলো কোনও একটা আবেগের জায়গায়। বাবা মায়ের সম্পকের্র কথা মনে পড়লো। পরস্পরের মধ্যে ছিল বোঝাপড়া, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সম্মানবোধ। চার পাঁচজন গানম্যান নিয়ে মাতাল শিল্পপতি দোতালার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

তিনি বেসামাল হয়ে ছেলেদের চিৎকার করে বললেন, 'এটা আমার ভোগের জন্য। তোরা কেউ ভাগ পাবিনা।'

এবার নূপুরকে ভোগ নিয়ে তিন ছেলে, তাদের বন্ধু আর শিল্পপতির  মধ্যে  মারামারি শুরু হলো। সবাই টেনে হিঁচড়ে নূপুরকে তাদের অধিকারে নিতে চাইছে। যেন আজ ভোগের সাথে ভোজ হবে। মহাভোজ। আর নূপুরের মুখটা বোবা হয়ে গেছে কিন্তু নূপুরের নূপুর যেন আকাশ পাতাল ভেদ করে বাজছে ।

   এরপর গোলাগুলির শব্দ। নিঃশব্দ সবকিছু। নূপুর অচেতন হয়ে পড়েছে। এরপর কিছু মনে নেই। একটা হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। বাবা মা আর দাদি কাঁদছে। দুধে আলতার মুখটা ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। শরীর পরতে পরতে ছোপ ছোপ রক্ত। চোখ দুটোর নিচে কালো দাগ আর স্থির। কি যেন ওই নিষ্প্রাণ দেহটা বলতে চায়। পারেনা। হাসপাতালের ফটকের বাইরে পুলিশ প্রহরা। আর সাংবাদিকদের উৎসুখ চোখ । সরকার তিন সদস্য বিশিষ্ট একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে । সবাই যেন নড়েচড়ে বসেছে। সব দোষ যেন নূপুরের। সবাই চোখে যেন রঙিন চশমা পড়েছে। পাপীদের বানিয়েছে মহাপুরুষ আর নিষ্পাপ অবলা মেয়েটাকে বানিয়েছে পাপী। বিচিত্র বিচার। বিচিত্র সমাজ। সমাজপতি আর উচ্চবিত্তরা  যেভাবে দেখেন সেভাবে সবকিছু নিজের মতো বানিয়ে দেখাতে চান সমাজ আর মানুষকে। কেননা ওদের খুঁটির জোর খুব শক্ত । বড় বড় পত্রিকায় নূপুরকে খল নায়িকা বানিয়ে নূপুরের ছবি এসেছে। পত্রিকা লিখেছে, কলগালের্র ভোগের জের হিসেবে শিল্পপতিসহ তার তিন ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। একটা নিষ্পাপ মেয়ে নূপুর আজ হয়ে গেলো কলগার্ল। সে হয়তো কলগালের্র মানেই বুঝেনা। বাবা মায়ের দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়লো আর চোখ বুজে পানি এলো। এই সমাজ নূপুরকে কি আর গ্রহণ করবে। বেজে উঠবে কি আর নূপুরের নূপুরের ঝংকার। নূপুরের পায়ের নূপুরগুলোও কি যেন বলতে চায়। পারেনা। কারণ তাদের তো জীবন নেই। যেমন নূপুরের জীবন বলে আজ কিছু নেই। 

 

              হিমাদ্রির

         হীমঘর

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর এ দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি যেমন অবদান রেখে চলেছেন তেমনি সৃষ্টিশীল লেখার ক্ষেত্রেও তাঁর পদচারণা। তিনি মনে করেন বিজ্ঞান চর্চা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি একে অন্যের পরিপূরক। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, গবেষক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, কবি, গীতিকার, নাট্যকার, সমাজ সংস্কারক ও সাংস্কৃতিক কর্মী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শনে বিশ্বাসী এই মানুষটির ছোটবেলা থেকেই লেখায় হাতেখড়ি। কৈশোর ও তারুণ্যে তিনি বাংলা একাডেমি, খেলাঘর,  কঁচিকাচার মেলা সহ বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করেছেন। এই সময় তাঁর প্রবন্ধ, কবিতা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকৌশল বিদ্যা অধ্যায়নের সময় তিনি প্রগতিশীল কর্মী হিসেবে কাজ করে সহিত চর্চা করে গেছেন। এ সময় তাঁর লেখাগুলো বিশ্ববিদালয়ের ম্যাগাজিনে এখনও সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও অনেকদিন ধরেই তিনি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। বাংলা ও ইংরেজি দুই সাহিত্যেই তাঁর সমান দক্ষতা রয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্র, প্রকৃতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, পরিবর্তন, সম্ভাবনা ও মানুষ তাঁর লেখার মূল উপজীব্য বিষয়।  তিনি একজন ভাল বক্তা। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক্ শো সহ বিভিন্ন সৃজনশীল অনুষ্ঠানে তাকে অতিথি হিসেবে দেখা যায়। ভারতরে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী অজিত কুমার পাঁজা কলকাতা দূরদর্শনের একটি প্রতিযোগিতায় তাঁর প্রেরিত প্রবন্ধে মোহিত হয়ে নিজ হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সে সময় সম্প্রচারিত হয়। এই খবরটি আজকাল, সংবাদ, বাংলাবাজার সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া তিনি ফিলিপিন্স, চীন, বি-টিভি  সহ দেশ বিদেশের বিভিন্ন পুরুস্কারে ভূষিত হন। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একজন কর্মী হিসেবে তিনি কাজ করে চলেছেন। 

...দূরে একটু আবডালে পুকুর পাড়ের ভেজা শেওলারগুলোর দিকে তার চোখ পড়ে। খুব অযত্নে পড়ে আছে পুকুরটা। কচুরিপানা আর ধসে পড়া ইটের গাঁথুনি। ইতিহাসের সাক্ষীর মতো। ওদিকটাতেই কে যেন  বেলফুল হাতে বসে আছে। ধীরে ধীরে রোমাঞ্চ নিয়ে সে সেদিকে হাঁটতে থাকে। একি! মাথায় হাত হিমাদ্রির। দুপাটি ফোকলা দাঁত চেপে চেপে একটি বৃদ্ধ কিলিয়ে হাসছে।...।

  অভিনয় করার খুব ইচ্ছে ছিল হিমাদ্রির। চেহারাটাও খারাপ ছিলোনা। ছিমছাম গড়নের। মুখটা গোলগাল আর শ্যাম বর্ণের।কিন্তু 'পরিবার থেকে বরাবরই একটা বাঁধা কাজ করেছে। এটাকে রক্ষণশীলতা বলা ঠিক হবে না কিন্তু' অভিনয়ে গিয়ে মেয়েরা ভালো থাকে না। পাল্লায় পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। এই ভয়টা কাজ করতো সব সময়।

  হিমাদ্রির মা বাবা দুজনেই উচ্চ শিক্ষিত। মেয়ে লেখাপড়া করে বড় হবে। এরপর একটা ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিবেন। মেয়েকে সুখে থাকতে দেখবেন। এতটুকুই।মানুষ অনেক কিছু আশা করে। আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু' সব আশা পূরণ হবে এটাও ঠিক নয়।

   সময় গড়ায়। ইদানীং হিমাদ্রি ফেসবুকে বেশ সময় দিচ্ছে। অনেকটা নেশার মতন। বয়স কম। আবেগের বয়স। ভালো লাগা আর ভালোবাসার বয়স। সুদর্শন ছেলেদের খুঁজে খুঁজে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। আবার পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন এগুলো থেকে সিনেমার নায়কদের ফেসবুক এড্রেস খুঁজে বের করে। তাদের স্পেশাল রিকোয়েস্ট পাঠায়। সাথে মেসেঞ্জারে রোমান্টিকতায় ভরা মেসেজ লিখে। টুইটারে হলিউড, বলিউড আর টলিউড নায়কদের ফলোয়ার হয়। মনে মনে একটা আশা । যদি কেউ ফেসবুক বন্ধু হয়। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো হিমাদ্রি মেয়ে হলেও ফেসবুকে ওর কোনো মেয়ে বন্ধু নেই।

   অনেক সুদর্শন ছেলেরা ওর ফেসবুক বন্ধু। হিমাদ্রি আসলে এতটাই সহজ সরল আর বোকা, সে জীবনের অনেক কিছুই জানেনা আর বোঝে না। মনটা খেজুরের রসের মতো মিষ্টি আর কোমল। অনেক কদাকার চেহারার বয়স্ক মানুষও যে সুদর্শন মানুষের ছবি ফেসবুকে নিজের চেহারা বলে চালায় এটা বোঝার বয়স এখনো তার হয়নি।

    বসুন্ধরার স্টার সিনেপ্লেক্সে কোনো নূতন ছবি আসলেই প্রথম শো’টা তার দেখতেই হবে। এখানে তার একটা ছেলেমানুষি আছে। নায়িকারা নায়কের যে যতই ভালো অভিনয় করুক না কেন তার মতামত সব সময় নায়কের পক্ষে। এ নিয়ে বন্ধু বান্ধবীদের সাথেও তার মাঝে মাঝে তর্ক  হয়। ওরা বলে তুই খুব একচোখা। কিন্তু ' হিমাদ্রি অনড়। নাহ্‌ যতই বলো নায়ক যদি ভালো অভিনয় না করতো তাহলে নায়িকার জন্য সিনেমাটা সুপার ফ্লপ হতো। আবার নায়কদের জন্য তার খুব কষ্ট হতো। খুব বিষণ্ণ হয়ে সে বন্ধুদের বলতো অমুক সিনেমায় মোটা ধুমসি নায়িকাকে কোলে নিতে ওর খুব কষ্ট হয়েছে। আর যখন ও কষ্ট করে দৌড়চ্ছিল তখন আমার ওর কষ্টে চোখে পানি এসে গিয়েছিলো। ইদানীং বন্ধুরা এসব দেখে শুনে তার সাথে আর তর্ক করে না। বরং এটা নিয়ে সবাই মজা করে। রাত হয়। জানালার বাইরে ঝলমলে তারা। সোনালী চাঁদ। জোনাকিদের  আলো আঁধারের খেলা।  প্রতীক্ষা করে হিমাদ্রি। বাড়তে থাকে রাত বাড়তে থাকে প্রতীক্ষা। যদি কোন সুপার স্টার তার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করে। এভাবে রাত যায়। দিন যায়। স্বপ্নগুলো ডানা মেলে। আবেগ বাড়ে। কষ্ট বাড়ে। নিজেকে ঘুড়ির মতো মনে হয়। তার মন উড়ছে, প্রাণ উড়ছে কিন্তু'সেই পিপাসার্ত মনের টান যে রয়েছে অন্যজনের হাতে। মাঝে মাঝে ওর মনে হয় ঘুড়ি হয়ে ঐ নাটাইয়ের কন্ট্রোলটাও যদি তার হাতে থাকতো।

  খুব শীত পড়েছে এবার। হিমালয়ের জমাট বাধা ঠান্ডা বাতাস শরীরের চামড়া ভেদ করে যেন হৃৎপিন্ড কাঁপিয়ে দিচ্ছে। শরীরের সাথে মনেও পড়েছে শীতের জড়তা। জড়তা বা তীব্রতা । সালমান শাহ, জাফর ইকবাল, মান্না ওদের জন্য হু হু করে মন কাঁদে। চোখ ফেটে পানি বের হয়ে আসে একটা চাপা কষ্টে । সেই চোখের পানি শীতের তীব্রতায় বরফ হয়। আবার শিশির বিন্দু  হয়ে খোলা  ঘাসে দোল খায়। কচুর পাতার উপর আছড়ে পড়ে তীব্র আর্তনাদে। হাহাকার করে দখিনা বাতাস রোদের উত্তাপে।

     রাজ্জাক, ফারুক, আলমগীর এদের বুড়ো চেহারা দেখে বুকটা কষ্টে আঁতকে উঠে হিমাদ্রির। কত মেয়ের দিন কেটেছে তাদের স্বপ্ন দেখে। আবার তাদের না পেয়ে বুক ভেঙেছে। মন ভেঙেছে। ঘর ভেঙেছে। কপাল পুড়েছে। অনেকে পাগল হয়ে এখনও হেমায়েতপুরে। মাঝে মাঝে হিমাদ্রির মনে হয় সুচিত্রা সেনই ভালো করেছেন। নিজের নায়িকা ইমেজ ধরে রাখার জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছিলো। আর মৃত্যুর পরেও যাতে কেউ তার মুখ দর্শন না করে সে কথাও বলে গিয়েছিলেন। এই না নায়িকা। চির সবুজ নায়িকা কিন্তু 'অন্যরা তা করতে পারেনি বলে ব্যথাটা হিমাদ্রিরই যেন বেশি। এই অভিমান থেকে তাদের উপর ওর খুব রাগ ও ক্ষোভ হতো।

    এরপর আসে বসন্ত। মনে রং লাগে। প্রকৃতি যেন জানালা দিয়ে বুকের গহীনে কড়া নাড়ে। গুন গুন করে হিমাদ্রি গায় রবি ঠাকুরের গান 'আহা আজি এ বসন্তে, এত ফুল ফোটে,এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়'। হাবুডুবু খায় প্রেম জলে। স্বপ্নে উঁকি মারে নায়কের দুটি প্রেমিক চোখ। প্রাণের দোলায় দুলতে থাকে বাসন-ী রঙের প্রেম। পাগল মন জ্বলে পুড়ে মরে প্রেম যাতনায়। কথা বলে সুর  ‘শোন গো দখিনা হাওয়া, প্রেম করেছি আমি"। বসন - যে প্রেমিক হৃদয়কে তীর মারতে পারে তা হিমাদ্রি বুঝতে পারলো। খুব আনন্দ লাগছে তার। মনে হলো গোটা পৃথিবীর রানী মহারানী হয়ে গেছে সে। তুলোর মতো কচি কচি গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠলো তার আবেগে শিহরণে।

    দারুণ একটা ঘটনা ঘটে গেছে হিমাদ্রির জীবনে। রোমাঞ্চিত হলো যেন চার দেয়ালের খসে পড়া রং। আর পুরনো টেবিলটা ভাঙা চেয়ারের গায়ে লেগে চটকে পড়লো যেন কাঠের কিছু অংশ। হিমাদ্রি মাকে জড়িয়ে ধরে। মাকে বলে,  জান আজ কি হয়েছে ।

মা বলে, কি হয়েছে বল না পাগলী মেয়ে।

কিন্তু মুখের আনন্দ যেন কথা বেরুতে দিচ্ছে না।

ছুটে যায় বাবার কাছে। বাবাকে বলে বাবা ওগো বাবা কি হয়েছে আজ জান।

বল না মাগো কি হয়েছে, বাবা বলে।

হিমাদ্রি বলে কিছু না। আমাকে আজ খুব আনন্দ লাগছে।

কথাটা বলে দৌড়ে ছুটে যায় নিজের ঘরে।

বাবা মনে মনে বলে, পাগলী মেয়েটা আমার ছোটই রয়ে গেলো।

বাবা  নিজের কাজে মন দেয়।

ঘটনা আর কিছু না তবে ঘটেছে অঘটনের মতো। তিনজন সুপার ডুপার হিট টলিউডের নায়ক ফেসবুক ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করেছে।

চাঁদের হাসির আজ তাই বাঁধ ভেঙেছে। নায়কদের তারকা বলে । হিমাদ্রি জানে ওরা থাকে আকাশে। আজ আকাশ থেকে তারারা ঝরে পড়ে হিমাদ্রির হাতের মুঠোয় এসেছে। থ্রি পিসটা বদলে টি শার্ট আর টাইট জিনসের প্যান্ট পড়ে নেয় হিমাদ্রি। অনেকটা শ্রীলংকান আর কেরালার স্মার্ট মেয়েদের মতো লাগছে তাকে।

এখন  তো আর  যেন তেনো জিনিস পরা যায় না।

পারফিউমটা একটু বেশি করেই স্প্রে করে। লম্বা কুঁচ কুঁচে কালো চুলগুলো আঁটোসাঁটো করে বেঁধে নেয়। এবার বসে পড়ে ফেসবুকে। বর্তমান সময়ের শাকিব খান, ফেরদৌস, অনন্ত, আরিফিন শুভ, বাপ্পি, সাইমন, ইমন, নিরব, জায়েদ সবাইকে রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল। কিন্তু অন্যরা মন ভাঙলেও ওদের মধ্যে তিনজন মন গড়েছে। ওদের চেয়ে তিনজনের প্রতি মায়াটা বেড়ে গেলো হিমাদ্রির। যেন হিমালয়ের বরফগলা মায়া। মায়াবতীর মায়া। এদের প্রত্যেকের সিনেমা সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে। আর প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্যগুলো ডিজিটাল নোটবুকে সযত্নে নোট করে রেখেছে। খবর প্রত্যেকের সাক্ষাৎকারের ছবিসহ খবর কাঁচি দিয়ে কেটে কেটে এলবামে সংরক্ষণ করেছে। কে বেগুনের চড়চড়ি পছন্দ করে। কে সরপুঁটি খেতে ভালোবাসে। কে কলিজা দিয়ে সিঙ্গারা খেতে ওস্তাদ। এরকম খুঁটিনাটি সবকিছুর  বিন্দু  বিসর্গ  হিমাদ্রির মুখস্থ। 

  হিমাদ্রি চাই ওদের চমকে দিতে। চমকের পর চমক দেখাতে । ওরা হিমাদ্রীকে না দেখলেও ওদের যে হিমাদ্রি প্রতিদিন কাছ থেকে দেখছে এটা সে তাদের বলতে চায়। ওরা তিনজনই ফেসবুকে একটিভ আছে। একটু সংকোচিত আর লজ্জা লজ্জা চোখে ও লিখে ধন্যবাদ বন্ধু তোমাকে। অপেক্ষা করতে থাকে ওদের উত্তরের। অপেক্ষা আর অপেক্ষা । কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে সাড়া মেলে। একজন লিখে তোমাকেও হে লজ্জাবতী।অন্যজন লিখে তোমাকেও।

আরেকজন লিখে থ্যাংকস, মাই ডিয়ার।

বসন্তের লজ্জার লাল রং চর জাগার মতো যেন দুই গালে জেগে উঠে।  

  সময় গড়ায়। বসন্ত শেষে গ্রীষ্ম। মনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে ওদের পরস্পরের মনোজগতে। সম্পর্কের ভীত গড়ে উঠে।এরপর বর্ষা আসে। মাঝে মাঝে ওদের সাথে মান অভিমানের পালা চলে। অভিমানী বর্ষা জল ঝরায় হিমাদ্রির মায়াবী নীল চোখে। অভিমান বিরহ চলতে থাকে অদেখা দুই ভুবনের সাথে । আসে শরৎ। কাশফুল, নীল আকাশ আর সবুজের চঞ্চলতা কাজ করে সবার মনের ভিতরের আরেক মনে। সাদা মেঘের মতো সম্পর্কগুলো আরো গভীর হয়। হিমাদ্রির সাথে ওদের রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা চলে। লুকোচুরি মানে এই কান্না এই হাসি। ঝরা পাতার বেদনার সুর নিয়ে দেখা মেলে হেমনে-র। বেদনা তবু কোথায় যেন একটা আনন্দ। মহানন্দ। কবি জর্জ এলিয়ট মতো প্রিয়  প্রিয়তমারূপে কল্পনা করে ওরা পরস্পরকে। যেন কল্পিত সময়ের নায়ক নায়িকা হয়ে সম্পর্কগুলো বলে উঠে ‘হে অপরূপা সুন্দরী ঋতু হেমন্ত/তোমার সঙ্গে আমার অন্তরাত্মা এখন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ!'

  আবার আসে শীত। একটি বছর গত হয় সম্পর্কের। অদেখা মনোজগৎ যেন দেখতে চায় অদেখাকে। হিমাদ্রির মন ব্যাকুল হয়ে উঠে। আকুল হয় ওদের একবার দেখবার জন্য দুটি উদগ্রীব চোখ। ও লিখে তোমাদের সাথে দেখা করতে মন যে বড় চাইছে। আমার আশা কি তোমরা পূরণ করবে না। ওরা কিছু বলে না। হিমাদ্রি চোখে কুয়াশা দেখে। শীতের  বিড়ম্বিত কুয়াশা। যাতে দূরের যাত্রীর আশা নেই আছে দুরাশা। বরফের মতো কষ্টে কঠিন হয় বুকের ভিতরটা। শব্দহীন আবেগ তাড়িত হয় সে। ও খুব ইমোশনাল হয়ে উঠে । এবার সে লিখেই ফেলে তোমরা যদি দেখা না করো তবে আমি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবো। আর চিরকুটে তোমাদের কথা বলে যাবো। এবার ওপাশ থেকে উত্তর আসে ওকে, চলে এসো এই ঠিকানায়। তিনজনের তিন ঠিকানা। এবার হিমাদ্রির চোখ মুখ নেচে উঠে । খরার পরে বৃষ্টি  যেমন মাটির তৃষ্ণা মেটায়। মিট মিট করে জ্বলা মোমবাতির আলো যেন সূর্যের আলো হয়ে যায়। পতঙ্গরা যেমন জীবনের মায়া ভুলে আগুনে ঝাঁপ দেয়। তেমনি হিমাদ্রি অদেখা ভুবনকে দেখতে চায়। ওটা আলো না আলেয়া সেটা বোঝার মতো সময় তার নেই প্রথম নায়কের দেওয়া ঠিকানায় সে রওনা হয়। একটা ট্যাক্সি ভাড়া নেয়। দুরু দুরু ভয় তার মুখের মধ্যে ছাপ ফেলে। একটা চিন্তা আর অনিশ্চয়তার ভাঁজ কপালে পড়ে তার। এতো বড়মাপের নায়কের কাছে যাচ্ছে সে । তাও একা। মা বাবাকে বলে আসেনি। একটা অপরাধ বোধও কাজ করে তার মধ্যে। আর মোবাইলটাও  আনতে ভুলে গেছে।

  ট্যাক্সি এগুতে থাকে গন্তব্যের দিকে। ড্রাইভার গাড়ির আয়না দিয়ে বার বার তার দিকে তাকাচ্ছে। লোলুপ দৃষ্টি আর একটা চোরা চোরা ভাব। ভাল লাগছে না হিমাদ্রির। মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়াই খুব কষ্টের। নাকি পাপ। সবাই মধু খুঁজে। বয়সের বালাই নেই।

ট্যাক্সিটা থামতে বলে হিমাদ্রি। হাতে লাল গোলাপ। সামনে একটা বস্তি। ছোট ছোট নোংরা ছেলে মেয়েরা মাটিতে গড়াগড়ি গড়ি খাচ্ছে। মহিলাদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি। আবার কয়েকটা মাতালও টালমাটাল। এদিক ওদিক থেকে ময়লার দুর্গন্ধ নাকে আসছে। রুমালটা মুখে চেপে রাখে সে।

লাল গোলাপ হাতে নায়কের এই জায়গায়ই আসার কথা। বস্তির ওদিকটা থেকে মুখোশ পড়ে একটা মানুষ গোলাপ হাতে এগিয়ে আসে হিমাদ্রির দিকে। খুব উত্তেজনা হিমাদ্রির মধ্যে। এবার তাহলে স্বপ্ন পুরুষের দেখা মিলবে।

ফুল বিনিময় হয় পরস্পরের মধ্যে। লাল কোট আর সবুজ প্যান্ট পড়েছে লোকটা। আর একটা চটাইয়া রঙের টাই। হাতে ব্রেসলেট। ঢাকাইয়া সিনেমার নায়করা যা পড়ে।

কথা হয়। কথার পর কথা। লোকটার কথার ধরণ দেখে সন্দেহ হয় হিমাদ্রির। ও লোকটাকে বলে তোমার মুখোশটা এখন খোলো। লোকটা খুলতে চায় না। জেদ বাড়ে হিমাদ্রির। টেনে খুলে ফেলে মুখোশটা।

আঁতকে উঠে। এতো সেই নায়ক নয়। তবে কে। রেগে উঠে হিমাদ্রি। চোখ দুটো রক্ত বর্ণ। প্রতারক বলে লোকটাকে গালি দেয় সে।

লোকটা এবার বলে থামুন। আপনি ভদ্র ঘরের মেয়ে। এভাবে চেঁচালে লোকজন জমা হয়ে যাবে। অনূর্ধ্ব করে বলে আমার কথাটা একটু শুনুন। তারপর যা করার করবেন।

হিমাদ্রি মাটির দিকে তাকায়। মনে হয় মাটিটা দু'ফাঁক হয়ে যাক আর তাতে সে ঢুকে পড়বে। অপমান বোধ হয়, নিজের চুল নিজে ছিঁড়তে ইচ্ছে করে। এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে ঠান্ডা হয়। যেন ঝড়ের পরে গভীর নিস্তব্ধতা।

লোকটার দিকে মাথা তুলে তাকায়। লোকটা মাথা নিচু করে। চোখাচোখি হতে চায় না বোধহয়। বিব্রতকর অবস্থা। লোকটা বলে ওটা আমার একটা ফেক আইডি। নায়কের ছবি দিয়ে নায়কের নামে খুলেছি।

আমি একটা ছোটখাটো সরকারি চাকুরী করি। খুব সামান্য বেতন পাই। বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। মা শয্যাশায়ী। দুটো কিডনিই নষ্ট। প্রতি সপ্তাহে ডায়ালাইসিস করাতে হয়। পাঁচটা বিবাহযোগ্য বোন। টাকার অভাবে তাদের বিয়ে হচ্ছে না । অনেকে এখন ওদের আইবুড়ি বলতে শুরু করেছে। ওদের চরিত্র নিয়েও কথা বলছে। ভয়ে থাকি যদি ওরা আত্মহত্যা করে । দুটো ভাই। ঐ যে মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে।আমার আজকের পোশাক আশাক সব ভাড়া করা।

 আমি বড়লোকদের মেয়েদের ফেক আইডি খুলে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করি। খারাপ কিছু নয়। আমার অবস্থা দেখে তো আর আমার সাথে কেউ বন্ধুত্ব করবে না। তাই নায়কের ছবি দিয়ে আমার দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করি। যদি কেউ আমাকে ভালোবেসে ফেলে। আমার পরিচয় জানার পরও আমাকে বিয়ে করে। তাহলে এভাবে প্রতারণা করে হলেও আমার ভাগ্য ফিরবে। আমার পরিবারটাকে বাঁচাতে পারবো। এটাকে আমি অন্যায় মনে করি না। জাস্ট গিভ এন্ড টেক। আপনি যেমন আপনার বন্ধুত্বের স্বার্থে নায়কের সাথে সম্পর্ক গড়তে  চেয়েছিলেন। আমি তেমনি আমার পরিবারের স্বার্থে আপনার সাথে সম্পর্ক গড়তে চেয়েছিলেন। হিমাদ্রির মাথা এবার নিচু হয়ে আসে। ও বুঝতে পারে পৃথিবীকে জানার ওর আরও অনেক বাকি আছে। এটাও একটা অভিজ্ঞতা। খারাপ ভালো বিষয় না। এটাই জীবন এটাই হয়তো বাস্তবতা।

  সে নিঃশব্দে জায়গাটা ত্যাগ করে। আকাশের দিকে তাকায় । একটা রিকশা ভাড়া করে। গন্তব্য দ্বিতীয় নায়ক। ক্রিং ক্রিং শব্দ করে রিকশা গলির রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তায় উঠে। কুঁচকানো চামড়ার একটা শীর্ণকায় একটা বৃদ্ধ টেনে চলেছে ওটা।  টানছে তো টানছে। যেন মরণের সাথে জীবনের লড়াই। জয়নুল আবেদিনের ছবির মতো। যেন গরুর গাড়িটা ঠেলে নিয়ে চলেছে একজন রক্ত মাংসের মানুষ। রিকশা আর মানুষের চেয়ে ওর ওজন কম। প্রতি পদে পদে লড়ায়ের পর লড়াই। হিমাদ্রি বুঝতে পারে কিন্তু করার তো কিছু নেই। একটা বৃদ্ধাশ্রমের কাছে থামতে বলে রিকশাটা।

হিমাদ্রি ভাবে। নায়করা জনসেবাও করে। তার প্রিয় নায়ককে সে বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের সেবা করতে দেখবে নিজ চোখে। আনন্দ আর কৌতূহল বাড়ে। বৃদ্ধাশ্রমে একগুচ্ছ সাদা বেলি ফুল নিয়ে ঢুকে পড়ে হিমাদ্রি। এদিক ওদিক তাকায়। প্রাণহীন শশ্মান কিংবা গোরস্তান। ওই অসহায় মুখগুলো কার প্রতীক্ষায় যেন বসে আছে। আপনজনেরা যদি কখনও ফিরে আসে।ক্লান্তিহীন সকালে কিংবা নির্জন দুপুরে। মা বাবার মুখগুলো ভাসে হিমাদ্রির প্রচ্ছন্ন চিন্তায়। তার বিয়ে হয়ে গেলে হয়তো বৃদ্ধ বয়সে তার বাবা মাকে এখানে কেউ রেখে যাবে। পুরুষশাসিত সমাজ। তার বাবা মাকে তার কাছে রাখার অধিকার দিবে কিনা সে জানে না। তবে সে অধিকারের জন্য লড়বে। এটা তার বিশ্বাস। বিড়বিড় তার কুন্ঠিত কণ্ঠ থেকে বের হয় নচিকেতার আক্ষেপের গান:

ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার

মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার।

নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামী দামী

সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি।

ছেলের আমার আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম

আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম!

দূরে একটু আবডালে পুকুর পাড়ের ভেজা শেওলারগুলোর দিকে তার চোখ পড়ে। খুব অযত্নে পড়ে আছে পুকুরটা। কচুরিপানা আর ধসে পড়া ইটের গাঁথুনি। ইতিহাসের সাক্ষীর মতো। ওদিকটাতেই কে যেন  বেলফুল হাতে বসে আছে। ধীরে ধীরে রোমাঞ্চ নিয়ে সে সেদিকে হাঁটতে থাকে। একি! মাথায় হাত হিমাদ্রির। দুপাটি ফোকলা দাঁত চেপে চেপে একটি বৃদ্ধ কিলিয়ে হাসছে। আর বলছে হ্যালো বিউটিফুল ইয়াং লেডি আমি তোমার সেই ফেসবুকের হিরো নাম্বার ওয়ান। আমার চেহারা কি সেরকম লাগছে না। রাগ হয় হিমাদ্রির। আবার প্রতারণা।

  এবার হিমাদ্রি ধমকের স্বরে বলে বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে? বুড়ো থেবড়া কোথাকার।

না মাগো না,  বুড়ো বলে আদর আর আবদারের স্বরে।

অনেক কষ্ট নিয়ে ফেক ফেসবুক খুলেছি। একাকীত্ব আর ভালো লাগে না গো মা, ভালো লাগে না।

এবার শান্ত হয় হিমাদ্রি। তবু মনের উত্তাপ কমে না। একটু উদ্ধত হয়ে বলে নিজের ছবি দিয়ে নিজের নামেই তো একটা আসল ফেসবুক আইডি খুলতে পারতেন। আ মোর জ্বালা সেটা ভাবেন নি। বুড়ো হয়েছেন। এক পা কবরে চলে গেছে। তারপরও ভন্ডামি।

বুড়ো এবার কোমরের আলগা হওয়া লুঙ্গিটা শক্ত করে বাঁধে। বুড়োর দেহে যেমন ভাঙ্গন ধরেছে, লুঙ্গিটাতেও তেমনি পচন ধরেছে। মুখটা বিমর্ষ করে বুড়ো বলে আমি যদি আমার ছবি দিয়ে ফেসবুক আইডি খুলতাম। তবে তো মা কেউ এই বুড়োর বন্ধু হতো না। তুমি কি হতে মা। জানি হতে না। তাই এই প্রতারণা। শুধু একাকীত্ব দূর করার জন্য। তোমার মতো এখন আমার অনেক বন্ধু। তাই সময় কেটে যায় ফেসবুকে। ছেলে ফেলে চলে গেলো। আর কোনোদিন আসলো না। তোমাকে সাদা বেলফুল আনতে বলেছি। কারণ আমার জীবনের রং নেই রস নেই রূপ নেই। রঙিন যৌবন আজ সাদা হয়ে গেছে।

এবার হিমাদ্রি কিছুটা হালকা হয়। একটু দরদের সুরে বলে তোমার বুড়ি নেই। বুড়ো ককিয়ে কেঁদে উঠে বলে আছে, তবে বেঁচে নেই। অন্তরের গভীরে আছে। এখন তুমি যা বিচার করো । হিমাদ্রি ভাবে আর ভাবে। কুল পায় না কিনারাও পায় না। একটা গভীর কষ্টের অনুশোচনা ভিতর থেকে দুমড়ে মুচড়ে উঠে। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা। কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে যায় সে। এটা অভিজ্ঞতা না অনুভব বুঝে উঠতে পারে না হিমাদ্রি ।

  হাঁটতে হাঁটতে রমনা পার্কের বটগাছটার নিজে কালো গোলাপ হাতে দাঁড়ায় হিমাদ্রি। এরপর অপেক্ষা আর অপেক্ষা। সময় গড়ায়। নির্জনতা নেমে আসে। মনে নানান চিন্তা ভর করে। স্বপ্ন খুঁজে বাস্তবতাকে। আবার ভয়ে সারা গা ঝম ঝম করে উঠে। এটা আবার অদৃশ্য কোন আত্মার ফেসবুক আইডি না তো! অশরীরী একটা রহস্যময় আত্মার ছায়া খুঁজতে থাকে হিমাদ্রি। বটগাছটার নিচে পুরাতন আঁকা বাঁকা খানদানি শেকড় শক্ত করে ধরে রেখেছে গাছটাকে। বটগাছটার নিচে বসতে গিয়ে শেকড়ের চাপায় আটকে পড়া একটা কালো গোলাপ আর চিরকুট চোখে পরে হিমাদ্রির। শঙ্কিত হয়ে চিরকুট আর গোলাপটা হাতে নেয়। নিজের গোলাপটা ওখানে সযত্নে রেখে দেয়। চিরকুটের অক্ষরগুলো কথা বলে। সেখানে লেখা আছে আমি অন্ধকার জগতের একজন মানুষ। তাই কালো গোলাপ আনতে বলেছিলাম। আমি তোমার সেই স্বপ্নের নায়ক নই আমি খল নায়ক। একজন পেশাদার খুনি। আমি লুকোচুরি খেলছি আমার এই পাপের জীবনটা নিয়ে। আমার ঘর নেয় আপনজনও নেয়। আমাকে না দেখায় ভালো না চেনাই ভালো । আমি প্রতারণা করতে চাইনি। কিন্তু 'আমিও তো মানুষ। সমাজে আমার জায়গা নেই। এই সন্ত্রাসীর সাথে কেউ বন্ধু হতে চাইবে না। এটা জানি বলেই শুধু মানুষ বলে মানুষের আলোকিত জীবনটাকে অনুভব করবো বলে এই ফেক ফেসবুক আইডি খোলা এর বেশি কিছু নই। ক্ষমা করবেন সুখী হন। ভালো থাকুন।  আঁধারের খোঁজ না করাই ভালো।

লোকটার জন্য ঘৃণা হয় হিমাদ্রির। আবার ভাবে আর ভাবে। ভাবনা যেন চেতনাকে ক্ষত বিক্ষত করে। হিমাদ্রি ভাবে কে এই মানুষটাকে মানুষ থেকে অমানুষ বানালো। এর উত্তর তার জানা নেই। আর মনে মনে ভাবে পাপ কে ঘৃণা করো পাপীকে নয়। তবে অদেখা মানুষের যে ফেসবুক আইডি থাকে আর কোথাও না কোথাও একটা ভালো মন একটু হলেও অবশিষ্ট থাকে। তার বোধ তৈরী হলো তার মধ্যে। এটা কি সমাজের রূপ নাকি বিবেক বুঝে উঠতে পারলো না হিমাদ্রি।

সামনে এগুতেই মানুষের শোরগোল শুনতে পায় হিমাদ্রি। শুটিং হচ্ছে। অনেক মানুষ বৃত্তের মত্ত গোল করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বিন্দুতে কি আছে? জানতে চায় সে। সবাই বলছে আজ খুব স্মরণীয় দিন তাদের জন্য। তিনজন সুপার ডুপার হিট নায়ক একই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য শুটিংএ এসেছে। হিমাদ্রির ওই তিনজন।

কিন্তু বাস্তবের নায়ক খলনায়কদের দেখতে দেখতে সিনেমার নায়কদের প্রতি নেশা কেটে যায় হিমাদ্রির। ফিরে যায় বাবা মায়ের বুকে। আর কাঁদে আর কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে ভাবে। ভাবে আর ভাবে।

মা বাবা সব শুনেন। বলেন এটাই জীবন। আর জীবনে দেখার অনেক কিছু বাকি আছে তোমার।

হিমাদ্রি ওই পাঁচ বোনের বিয়ে দিবে বলে ঠিক করে। ছোট দুটো ছেলের লেখাপড়ার ভার নেই সে। প্রতি সপ্তাহে বৃদ্ধাশ্রমে যায় ওদের সেবা করতে। আর অন্ধকার জগতের মানুষগুলোকে আলোকিত হবার পথ দেখায়।

     বিশ বছর পর। সমাজকে নিজের মতো সাজাতে পেরেছে কিনা জানে না হিমাদ্রি। তবে চেষ্টা  করে যাচ্ছে। যাবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। সমাজ আর মানুষের ভিতরে ঢুকার চেষ্টা করে সে । তাদের বুঝতে , চিনতে  আর বদলাতে চেষ্টা করে। সে আজ পরিণত একজন মানুষ। জীবন তাকে অনেক শিখেয়েছে এখন সে জীবনকে শেখাতে চায়। এখন সে আর নায়কদের পিছনে ঘোরে না। নায়করা তার সিনেমায় অভিনয় করার জন্য তার পিছনে পিছনে ঘুরে। সে অভিনেতা অভিনেত্রী বানায়। এখন তার চোখে সবাই সমান। আর তাদের পরিচয় হলো মানুষ।

    তারপরও হিমাদ্রি ভাবে আর ভাবে। একদিন ভাবতে ভাবতে কোথায় যাবে সে নিজেও জানে না। ভাবনার হিমঘরের ঠিকানায় তাকে পৌঁছুতেই হবে। ভাবনাকে বাস্তব করার জন্য।

 

              লিগ্যাল 

         আওয়ার্স

সুরজিত মণ্ডল

জলঙ্গি, পশ্চিমবাংলা

...অ‍্যাশলের কাছে যখন ছুটে এসে মুখটা নীচু করে বসে পড়েছিলো লোটো, তখন অ‍্যাশলে প্রথমে আঁচ করতেই পারেনি ঘটনা কি। থরথর করে কাঁপছিলো ছোট্ট লোটো। অবাক অ‍্যাশলে বকবে কি, লোটো মায়ের মুখের দিকেই তাকাচ্ছেনা একবার। গলাটা নামিয়ে অ‍্যাশলে লোটোর মুখের কাছে যেতেই চমকে ওঠে,আরে!...

   বড় বড় উঁচু ঘনসবুজ সেন্টিপিড ঘাসগুলোর মাঝে লালচে খয়েরী মসৃণ ছোট লোমআলা শরীরটা পড়ে ছিলো; দেখলে প্রথমে মনে হবে দেহে প্রাণ নেই। অ‍্যাশলেরা এভাবেই বিশ্রাম নেয় .... হরবখত্ই নেয়। কখনো কখনো অকস্মাৎ কোনো শব্দে ছুঁচলো মুখটা তুলে ডাইনে বাঁয়ে দেখে, ঘাড় নাড়ায়; সাদা লেজটা উঁচিয়ে ভবিতব‍্যর সন্ধান করে ... নাহ্। কিছুই নেই দেখে আবার শুয়ে পড়ে।

মনে পড়ে হঠাৎ করেই, কাছেই লোটো ছিলো একটু আগেও - গেলো কোথায় এখন?

   সোনার টুকরো একটাই ছেলে তার। বাপে বেশীরভাগ সময়েই গভীরে গিয়ে গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও অ‍্যাশলে গত এক-দেড় বছরে কখনো চোখের আড়াল করেনি লোটোকে; ছুটে ছুটে বেড়াতে বেড়াতে কখন যে বড় হয়ে উঠেছে একটু করে খেয়ালই করেনি সে। ঝুপসি আঁধার রাতে মায়ের পেটের কাছে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতো লোটো, কানটা খাড়া করে। স্নেহ বশতঃ গা চেটে দিয়ে অদ্ভুত তৃপ্তি পেতো অ‍্যাশলে; খুব যত্ন করে রাখতে হয় ছোটদের। মায়ের কথা মনে পড়ে যায় তার; একপায়ে একটু খুঁড়িয়ে চলতো। অ‍্যাশলে কত বড় হয়ে যাওয়ার পরেও মা কেমন শাসন করতো, চোখে চোখে রাখতো ... যেন বখে না যায়। মা তাকে ছেড়ে চলে গেছিলো লিগ্যাল আওয়ার্সে; কতজনেই যায় যদিও।

   লুইজিয়ানা স্টেটের এই আলেকজান্ডার স্টেট ফরেস্ট সাদা লেজওয়ালা হরিণের বাসভূমি .... উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুইটগাম, ব্ল‍্যাকগাম, পীচ আর পাইনের ভীড়ে অবাধ বিচরণ তাদের। স্বপ্নের মতো লাগে ...মাঝে মাঝে নিঃসঙ্গ রাস্তাগুলো, এল ডি এ এফ এর কর্মীরা যাতায়াতের সুবিধার্থে চলে গেছে বহুদূর। কড়া নিরাপত্তায় থাকে অ‍্যাশলে, লোটোরা।

   হঠাৎ একটা শব্দে কানখাড়া হয়ে যায় অ‍্যাশলের। দূরে কিছু একটা নড়লো না? সমস্ত ইন্দ্রিয় সচকিত হয় তার .... পাইন গাছের যে সারিটা আড়াআড়ি দৃষ্টিকে বাধা দেয়, সেখানে দুটো গাছের মাঝে একটা ছোট্ট লালচে খয়েরী শরীর উঁকি দিলো। ঐ তো লোটো! অনাবিল আনন্দে ভরে যায় অ‍্যাশলের সারা শরীর; সামনে দৌড়ানোর সময় সাদা,

   

অপেক্ষাকৃত বড় লেজটা উঁচিয়ে ছুটে যায় সে ... লোটো অনুসরণ করে। শীতকালের ধূসর রংটা এখন আর গায়ে মাখেনা অ‍্যাশলে; গরম পড়তে শুরু করলেই লালচে খয়েরী লোম ফিরে পাবে,সে জানে। এখন কিছু নতুন পাতার প্রয়োজন; লোটো ছটফট করতে করতে মায়ের পেছনে চলে। এখন বেলা পড়ে এসেছে, এর পর আর কোথাও যাবে না সে। নিশ্চিন্ত ‌শান্তিতে মায়ের পেটের কাছে শুয়ে থাকতে চায় ... আহ্। অ‍্যাশলে তাকিয়ে তাকিয়ে লোটোকে দেখে; বীর সাহসী পুঙ্গব আর কি দুরন্ত এই ছোট্ট হোয়াইট টেল হরিণটা। সাতমাসের গর্ভধারণ সার্থক অ‍্যাশলের, মুখটা উজ্জ্বল আর যথানিয়মে কানটা আন্দোলিত হয় তার।

***************************

 

খবরটা ছিলোই আগে থেকে, লুইজিয়ানা ওয়াইল্ডলাইফ অ‍্যান্ড ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের কাছে। কিন্তু সঠিক সময়ে, তৈরী হয়ে না গেলে ধূর্ত, শেয়ালের মতোই সতর্ক চোরাশিকারি কে ধরা জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার সামিল। তাই,অনুসন্ধানরত এনফোর্সমেন্ট ডিভিশনের লংগিনো আর রজার জনসন খুব সাবধানেই ব‍্যালার্ড রোডে নৈশ পথচারী হয়েছিলেন। অনুমান নির্ভুল। একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে​ আছে, রাস্তার ধারেই। এতরাতে এসময় কেউ ট্রাক নিয়ে দাঁড়াবেনা, যদি না তার অসৎ উদ্দেশ্য থাকে; পূর্ব অভিজ্ঞতা অন্ততঃ তাই বলে মিঃ লংগিনোকে। একটু ভেতরের দিকেই ঢোকা যাক, দেখতে হবে ব‍্যাপারটা কি।

   পাইন আর বীচের সারিতে ঘন গম্ভীর অন্ধকার দেখাচ্ছে রাস্তার দুপাশটাই। বামদিকে চওড়া বিস্তীর্ণ তৃণভূমিকে পেছনে রেখে দুইজনে ডানদিকে যেখানে ট্রাকটা দাঁড় করানো আছে, সেদিকে এগোতে শুরু করেন। পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো‌ কোন সমস‍্যা নয়; সে দিনে রাতে যখনি হোক। রজার জনসন যখন ইশারায় লংগিনোকে থামতে বললেন, তখন তিনি বুঝে ফেলেছেন ঘটনা কি ঘটেছে .... হ‍্যাঁ, স্পষ্ট চারচাকা গাড়ির আওয়াজ একটা; গুড়গুড় শব্দটা চাপা, কিন্তু দিব‍্যি শোনা যাচ্ছে। সামনে হাত বিশেক দূরে

একটা চলাচলের রাস্তা আছে বটে; সেখানে এত রাতে চারচাকা গাড়ি ... চড়াৎ!!

   বুল-ব‍্যারেল রাইফেলের শব্দটা শুনেই মিঃ লংগিনো ছুটতে শুরু করলেন সামনের রাস্তার দিকে ... এরাস্তায় ছোটা একেবারে নতুন না তার কাছে, কাজে এসে এসেই প্রথম দিকে একবার হান্টিং সিজনেও ফ্রীকোয়েন্ট ভিজিট করতে হয়েছিলো। তুলনায় স্থূলকায় রজার জনসন একটু পিছিয়ে গেলেন। রাস্তার কাছে আসতেই চোখে পড়ে গেলো; দাঁড়িয়ে আছে আবছা মত একটা প্রাইভেট কারের আদল। হাঁচোড়-পাঁচোড় দৌড়ে হাঁফিয়ে গিয়েছিলেন মিঃ লংগিনো, নাগালের মধ‍্যেই গাড়িটাকে দেখে চীৎকার করে উঠলেন,

- "হল্ট!!"

গুমরে উঠল আলো নিভে থাকা অন্ধ দৈত‍্যটা ...একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল প্রবল গর্জনে। দূরে সরে যাচ্ছিলো যন্ত্রটা, হাঁফাতে হাঁফাতে উত্তেজিত রজার জনসন মিঃ লংগিনোর দিকে ফিরে বললেন, -"স‍্যার, হারি আপ! কল এমার্জেন্সি ... রাইট নাউ! দে আর পোচারস্!"

 

***************************

 

অ‍্যাশলের কাছে যখন ছুটে এসে মুখটা নীচু করে বসে পড়েছিলো লোটো, তখন অ‍্যাশলে প্রথমে আঁচ করতেই পারেনি ঘটনা কি। থরথর করে কাঁপছিলো ছোট্ট লোটো। অবাক অ‍্যাশলে বকবে কি, লোটো মায়ের মুখের দিকেই তাকাচ্ছেনা একবার। গলাটা নামিয়ে অ‍্যাশলে লোটোর মুখের কাছে যেতেই চমকে ওঠে,আরে! পোড়া পোড়া একটা গন্ধ! এটা তার চেনা গন্ধ ... মা কে নিয়ে যাওয়ার আগে মায়ের গায়েও পেয়েছিলো অ‍্যাশলে, তখন সে ছোটো ছিলো, অনেক। ঐ দুপেয়ে গুলো নিয়ে আসে লাঠি একটা, কখনো কখনো বা অনেক... তারপরই এই গন্ধটা আসে।

 

গলার সাদা লোমগুলোর মাঝে একটা বিসদৃশ কালচে পোড়া ভাব ... ছোট্ট সোনাটা বেঁচে গিয়েছে বরাতজোরে, অ‍্যাশলে ভাবে। লোটোর গলায় মুখ ঘষে অ‍্যাশলে। গলাটা ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে মরণ। হতভাগা ছোঁড়ার বাপটার জন‍্য রাগ হয় অ‍্যাশলের, কোনো কাজেই আসেনা, লিগ্যাল আওয়ার্সে ওকেও নিয়ে গেছে কিনা কে জানে ... চিকি চিকি শব্দে লোটো চমকে চমকে ওঠে; মা ডাকছে, মা কাঁদছে।

 

                         শেষকথাটুকু 

***************************

 

     সকাল দশটা। মিঃ লংগিনো বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন উঠতি শখের শিকারীদের নতুন নিয়মকানুন গুলো ... তারা উজ্জ্বল চোখে শুনছিলো। ওকডেল থেকেই এসেছে বেশীরভাগ। অ‍্যালান পারিসেরও দু-একজন আছেন। ট‍্যাগিং সিস্টেম নিয়ে বলছিলেন তিনি। অ‍্যান্টলার্স ট‍্যাগ যে আলাদা ভাবে করতে হবে, সেটা এদের জানা দরকার; থাকে কিছু আনপড়্ একেবারেই।

-"ডীয়ার হান্টিং ট‍্যাগ উইল বি অ‍্যলাউড আপ টু সিক্স ইন্ডিভিজুয়ালি। উই প্রিজার্ভ দেম হিয়া ফর গেম হান্টিং, নট ফর পোচিং ইন ইন ইল্লিগাল আওয়ার্স ... ইকুইপড্ উইথ নাইট ভিশন অর এনিথিং এলস্।" কথার শেষটুকু বলার সময় কোঁচকানো সাদা ধবধবে মুখে বিরক্তি স্পষ্ট বোঝা যায়।

 

***************************

আজ অ‍্যাশলে তার পাঁজরার হাড় লোটোটাকে কোত্থাও বেরোতে বারণ করে দিয়েছে ... সবে কাল যমের ঘর থেকে ফিরেছে, ওরা যে এখনো নেই, কে বলবে! এমনিতে তেমন কোন ভয় নেই ... এখন সকালবেলা মানে লিগ্যাল আওয়ার্স। ঐ ছুটকো- ছাটকা দু-একটা যা পড়ে, তাই ...

 

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?