• দশগ্রীবের সাথে - বিভাবসু দে

  • ভাইফোঁটা - রূপা মণ্ডল  

  • আমি, সে ও সখা - গৌতম দাস 

  • ছবিঘর স্টুডিও - রমেন্দ্রনারায়ণ দে 

  • এমনও হয়ে যায় - ইন্দ্রাণী  ভট্টাচার্য্য 

গল্প সমগ্র ৪

                               আমি, সে

        ও সখা

গৌতম দাস

.....ক্লাস নাইন, প্রথম কবিতা লিখল অবনী। ওর সেই কবিতা ও আমায় ওদের চিলেকোঠার ঘরটায় ডেকে নিয়ে গিয়ে শোনালো। নদী, পাখী, আকাশকে নিয়ে লেখা অবনীর কবিতা আমি আমার আলাপচারিতায় সবাইকে ডেকে ডেকে শোনালাম। শুধু শোনানোই নয়, কবিতাটা আমি আমাদের স্কুল ম্যাগাজিনেও দিয়ে দিলাম।....

  অবনীর আর আমার বাড়ির মাঝে শুধু পাঁচিলের ব্যবধানই ছিল না, আরও অনেক ব্যবধান ছিল আমাদের মাঝে। আমি লম্বা, গায়ের রঙ পাকা গমের মত, বাদামী কটা চোখের সাথে আমার একমাথা এলোমেলো চুল, অন্য দিকে অবনী বেঁটে, তার গায়ের রঙ কালো, চোখে মুখে একটা যেন দুঃখের ভাব সব সময় লেগে থাকে, তবু আমাদের এক স্কুল, এক ক্লাস, এক টিফিন বাক্স, এক ঘুড়ি, এক লাটাই, আমি হাসলে ও-ও হাসে, আমি কাঁদলে, ওর চোখের কোনেও জলের ফোঁটা টলোমলো করতে থাকে।পড়াশুনাতে অবনী ভালো, প্রতি পরীক্ষায় ও ক্লাসে প্রথম পাঁচ জনের মধ্যে থাকে, পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট বার হলে আমি পাড়ার সব বন্ধুদের ডেকে ডেকে অবনীর রেজাল্টের খবর দেই আর রাতে পড়ার বইটাকে সামনে রেখে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করি, আমি কেন পারি না অবনীর মতো পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে?

 

২  

  ক্লাস নাইন, প্রথম কবিতা লিখল অবনী। ওর সেই কবিতা ও আমায় ওদের চিলেকোঠার ঘরটায় ডেকে নিয়ে গিয়ে শোনালো। নদী, পাখী, আকাশকে নিয়ে লেখা অবনীর কবিতা আমি আমার আলাপচারিতায় সবাইকে ডেকে ডেকে শোনালাম। শুধু শোনানোই নয়, কবিতাটা আমি আমাদের স্কুল ম্যাগাজিনেও দিয়ে দিলাম। সবাই যখন ওর কবিতা পড়ে ভবিষ্যতের এক তুর্কি কবির সন্ধান পেলো আমি তখন অনেক রাত অবধি সাদা কাগজের বুকে চাঁদ তারাকে নিয়ে কবিতা লেখার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। 

 

  স্কুলের পড়া শেষে আমরা এখন মফঃস্বলের কলেজে, দুজনার বাবা আমাদের দুজনকে আলাদা আলাদা দুটো সাইকেল কিনে দিলেও আমরা একটা সাইকেলেই যাতায়াত করি। যাওয়ার সময় আমি পিছনে, অবনী তখন সাইকেল চালায় আর ফেরার সময় আমার পিছনে বসে অবনী রাস্তা দেখে। দূরের ইটভাটার চিমনি থেকে বেরতে থাকা কালো ধোঁয়া দেখে গভীর ভাবে নজর করে আমাদের পাশ কাটিয়ে চলতে থাকা মানুষের স্রোতটাকে। অবনীর কবিতায় এখন প্রকৃতির থেকে মানুষের কথাই বেশী, শাসন শোষণ সাম্যবাদ গণতন্ত্র, ভারী ভারী শব্দে তার কবিতা এখন মোড়া থাকে রাতে সবাই ঘুমিয়ে পরলে কলেজের ইউনিয়ন ঘর থেকে নিয়ে আসা ‘লাল লন্ঠন’ বইটা খুলে আমি পড়তে শুরু করি, অচেনা নামের বিদেশী নেতাদের বিবৃতি বুঝে ওঠবার ব্যর্থ চেষ্টা করি, অনেক চেষ্ঠা করেও আমি কিন্তু ঐ সব নাম আর বিপ্লব মাখা শব্দগুলি নিয়ে একটাও কবিতাও লেখার সাহস করে উঠতে পারি না।

  কলেজ শেষ, রেল স্টেশনের চায়ের দোকানে এখন সিগারেটের ধোঁয়ায় আমাদের দিন কাটে, অবনীর কবিতায় আবার প্রকৃতি ফিরে এসেছে, তবে রূপক হয়ে, আকাশ এখন তার কবিতায় পুরুষ, সমুদ্রের জলে এখন সে ইলোরার চোখ খুঁজে পায়। ইলোরা আমাদের গাঁয়ে থাকে না, দূরের শহরে তার বাস। কবে যেন কেমন করে অবনীর সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে, ক্রমশ সেই আলাপ পরিণত হয়েছে প্রেমে।ইলোরার সঙ্গে আমার এখনও আলাপ হয়নি। তবে অবনীর কবিতার মধ্য দিয়ে ইলোরাকে আমি চিনি, দিনান্তের আলোর রঙে অবনী তার শাড়ির আঁচলের বর্ননা করে, মেঘদের ভাষায় ইলোরার খুনসুটির কথা বলে, আর যখন অবনীর কবিতায় আমি বৃষ্টিকে দেখি তখন বুঝি, ইলোরার মন বুঝি খারাপ।

 

  কলেজ স্ট্রীটের কফিহাউসের টেবিলে ত্রিভুজ আমরা এখন। ত্রিভুজের শীর্ষ বিন্দুর পাদদেশে হলুদ শাড়ি, সঙ্গে মানান সই টিপ, চুড়ি, কানের দুল, কাঁধের শান্তিনিকেতনের ঝোলাটা টেবিলের ওপর রাখা। কফির কাপ সামনে রেখে অবনী শোনাচ্ছে তার নতুন কবিতা 'এসো সূর্য, পুড়ে মরবার জন্য আমরা তৈরি', মরবার জন্য আমি তৈরি নই, কারণ, আমি মরে গিয়েছি, তবে একা মরিনি, আমার সঙ্গে টেবিলের ওপারের হলুদ দ্বীপটাও পুড়ে গিয়েছে আজ। 

বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ আজ আয়নার সামনে দাঁড়ালাম আর আয়নার আমিটাকে ইলোরা মনে করে তার সেই চোরা চাহনিগুলির মানে খুঁজতে থাকলাম। আর তারপর একটা হারিয়ে যেতে থাকা হলুদ দ্বীপের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পরলাম।

 

  অবনী এখন বঙ্গ সমাজের প্রতিষ্ঠিত কবি, তার লেখা নিয়ে শহরে প্রায়ই সাহিত্য সভা হয়। কবি অবনী বেশীরভাগ সময়ই অবশ্য সেই সব সভায় যেয়ে উঠতে পারে না, সে এখন খুব ব্যস্ত, ইলোরার সঙ্গে আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে আমি কখনো কখনো ঐ সভাগুলোতে হাজির হই। ইলোরা এখন আর আমার দিকে চুরি করে তাকায় না, আমাদের মধ্যে এখন আর কোনো কবিতার আলো-ছায়া নেই, অনেকদিন আগেই স্বচ্ছ গদ্যে আমরা নিজেদের-নিজেদের মনের কথা একে অন্যকে জানিয়েছি। গ্রামের পাঁচিলের ব্যবধান পার করে অবনী কখনও আমার ঘরে এসে খেলত না, আমাকেই যেতে হতো ওর সেই চিলেকোঠার ঘরে। শহরের রাস্তার ব্যবধান মুছে আমিই যাই ওদের ফ্লাটে, বেশীরভাগ সময়ই তখন অবনী বাড়ি থাকে না, ওর বেডরুমের বিছানা থেকে আমি আর ইলোরা তখন কবিতার সব বই সরিয়ে দেই, আর

তারপর রূপক ছাড়াই আমরা প্রথমে আলাদা-আলাদা করে, শেষে একসঙ্গে নিজেদের শরীর দুটো চিনে নেই। ইলোরা তার রাতের অতৃপ্তি দিনের আলোয় আমার কাছে নিঃশেষ করে পূরণ করে নেয়।

  অবনীর মৃতদেহ দাহ করে কিছুক্ষণ হল আমি আর ইলোরা ওদের ফ্লাটে ফিরে এসেছি। সকালের খবরে কাগজে কবি অবনী সেনের অনেকগুলি ঘুমের ওষুধ খেয়ে মারা যাওয়ার খবরটা প্রকাশ পাওয়ার পর ওর অসংখ্য গুণমুগ্ধ ভক্তবৃন্দ এতক্ষণ ভিড় করে ছিল। পঞ্চভূতে ওর শরীরটা বিলীন হওয়ার পর একে একে তারা সবাই বিদায় নিয়েছেন। আমি আর ইলোরাও ফিরে এসেছি, আমার আজ আর বাড়ি ফিরে যাওয়ার তাড়া নেই, অবনী নেই, তাই আজ রাতে আয়নার সামনে আমাকে আর দাঁড়াতে হবে না, নিজের কাছে আজ আমার আর হেরে যাওয়া নেই, ইলোরার পাশেই সারা রাত আজ আমি থাকব। ইলোরাকে বলবো ও যেন ওর সব হলুদ শাড়ি পুড়িয়ে ফেলে আর তার সঙ্গে সেই শান্তিনিকেতনের ব্যাগটাও যেটা অবনী ওকে প্রথম উপহার হিসেবে দিয়েছিল।

  ইলোরার   শরীরটা   এখন  থেকে  প্রতি  রাতে  শুধু আমার পুরুষ হাতটাই জড়িয়ে থাকবে, কবিতার অক্ষম শব্দগুলি আর কখনো তা স্পর্শ করবে না।

  আমার কলকাতার সাহিত্য মঞ্চের ডাকা স্মরণ সভায় দুজনার কথাই এক সঙ্গে উচ্চারিত হল আজ। কবি অবনী এবং তার ধর্মপত্নী ইলোরার মৃত্যুতে সমগ্র সাহিত্য সমাজ আজ শোকাচ্ছন্ন, ইলোরার আত্মহত্যা যে স্বামীর প্রতি তার অখণ্ড ভালোবাসারই নিদর্শন আর সেই ভালবাসাই যে অবনীর কবিতায় বারবার ভাষা আর শব্দের মোচড়ে ফুটে উঠত, সেই নিয়ে সভায় উপস্থিত কারোর কোন দ্বিমত ছিল না। অবনীর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু হিসেবে আমাকেও আজ অনেক গুণীজনের মাঝে বসে থাকতে হয়েছিল, কিন্তু কেউ খেয়াল করেনি, অনেকের মাঝে থেকেও আজ আমায় একটা ভয় যেন বারবার জড়িয়ে ধরছিল। খালি মনে হচ্ছিল আজ রাতে আবার অবনী ফিরে আসবে আর তার হাতে ধরা থাকবে ইলোরাকে লিখে যাওয়া তার শেষ কথাগুলি - না, কবি অবনী তার জীবনের শেষ লাইনগুলি কবিতায় লিখে যায়নি, শেষ অবধি দিনগুলির মৃত্যু হল। আকাশের বুকে সন্ধ্যা নামল, মাটির পৃথিবীতে সন্ধ্যা নামল, আমি তোমার হাত দুটো ধরলাম। বললাম - 'আমাকে আর একবারের জন্যও কি তুমি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারো না কবে কার সেই শেষ হয়ে যাওয়া চুম্বনে?' তুমি মাথা নাড়লে, ওপাশ ফিরে শুলে, ঘুমোলে না, বালিশে গড়িয়ে পড়লো না তোমার চোখের জল। আশ্লেষের অতৃপ্তি ভরা তোমার সেই চোখের জল টলমল করতে থাকলো, সযত্নে তুমি তাকে তুলে রেখে দিলে দিনের আলো ফোটার জন্য। দিনের আলোয় আমি যখন আবছা তখন তুমি বৃষ্টি, তুমি তখন হাসি, তুমি তখন কান্না, তুমি তখন অয়নের পৌরুষে উচ্ছল জল তরঙ্গ হয়ে বাজতে থাকা প্রেমের কবিতা, তোমার সেই বসন্ত উৎসবে আমি যেন নিতান্তই এক অনাহূত অতিথি।

  আমার ইলোরা, মৃত্যু নিয়ে ভাবছি এবার একটা কবিতা লিখব, আসন্ন মৃত্যুর অদ্ভুত শিহরণকে বেঁধে ফেলব শব্দের বাঁধনে, কবিতাটা কিছুটা লেখার পর একদিন আবার আমরা তিনজনে গিয়ে বসব কফি হাউসটায়। স্কোয়ার শেপের টেবিলে আমাদের যে ত্রিভুজ গড়ে উঠবে তার শীর্ষ বিন্দুতে থাকব আমি সেদিন, অর্ধ সমাপ্ত কবিতাটা তোমাদের শোনানোর পর আমি দেখতে থাকব তোমার আর অয়নের চোখে ভেসে ওঠা অনুভূতি, যদি দেখি তা ভয়ার্ত তবে বুঝব কবি হিসেবে আমি ব্যর্থ কিন্তু যদি দেখি তোমাদের চোখেও আমার মত অদেখা মৃত্যুর রোমাঞ্চ ফুটে উঠেছে তবে বুঝব প্রেমিক হিসেবে ব্যর্থ হলেও আমিই সেই কবি যাকে তুমি একদিন ভালো বেসেছিলে আর হাত ধরে বলেছিলে 'এ হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে (চলো) এক সঙ্গে (দুজনে) জ্বলে পুড়ে ছাই (হয়ে যাই)'।        

 

                 ছবিঘর

     স্টুডিও

রমেন্দ্র নারায়ণ দে

লরেল, ম্যারিল্যান্ড

...মুখ তুলে বিভাসের দিকে তাকিয়ে সজল চোখে শুভেন্দু বলল - 'আর কোন ছবির দরকার আমার নেই বিভুদা। অন্যসব ছবি তো আমার মনের ভিতরে আছে। আজ আপনি এমন দুটো ছবি দিলেন যা আমার দেখা ছিল না, জানা ছিলো না। এ ছবিদুটো আমার কাছে মিলিকে নতুন রূপে ফিরে পাওয়া। এ ছবি দুটো খুঁজে দেবার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ বিভুদা, অসংখ্য ধন্যবাদ।...' 

  আমি কী বাচ্চুদার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি? উনি এখন দোকানে আছেন কী?  

সামনের দুটো সিঁড়ি ভেঙে দোকানটায় ঢুকে কাউন্টারের সামনে গিয়ে শুভেন্দু জিজ্ঞাসা করল। কাউন্টারের পিছনের ছেলেটির চোখেমুখে কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা কৌতুক। সে বললv- 'আপনি কোন বাচ্চুদার সঙ্গে কথা বলতে চান?'

বাচ্ছুদা মানে সুভাষ মিত্র, শুভেন্দু বলল - 'এই ছবিঘর স্টুডিও যিনি খুলেছিলেন সেই প্রভাস মিত্রের ছেলে'।

- 'ও', কাউন্টারের ছেলেটি মুচকি হেসে বলল - 'অনেকদিন পর এদিকে এলেন কী?'

- 'তা বলতে পারেন' সন্মতির মাথা নাড়িয়ে শুভেন্দু বলল - 'বেশ অনেকদিন পর।'

- 'সেটা বুঝেছি।' কাস্টমারের জন্য পাতা চেয়ার দেখিয়ে ছেলেটি বলল  - 'বসুন একটু। আমি দেখে আসছি।'

ছেলেটি দোকানের ভিতরে চলে গেল। চেয়ারে বসে চারদিকে তাকাতে তাকাতে শুভেন্দু ভাবল দোকানটা বোধহয় আগের মত অত ভাল আর চলে না। আগের মত রমরমা চললে এমন হতশ্রী চেহারা হত না।

বাইরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আশে পাশের দোকানপাটের হাল দেখে ভাবনাটা আরও জোরদার হল। টাউনের পুরো এদিকটাই কেমন যেন পুরোনো ঝরতি-পরতি শ্যাবি হয়ে গেছে। আগে এদিকটাই তো টাউনের মূল সেন্টার ছিল। ঝকঝকে সব দোকানপাট, সিনেমা হল, রেস্টুরেন্ট এ সবে ভরা আলো ঝলমলে মফঃস্বল টাউন। মনে আছে ওদের জন্মদিনের ছবি তুলবার জন্য কত আগে থেকে বাবাকে এখানে এসে বাচ্চুদাকে বলে রাখতে হত।

এতটা এসে ভাবনাটা আটকে গেল শুভেন্দুর। তাই তো, বাবা ওঁকে বাচ্চুদা বলে ডাকতেন। মনে পড়ল চেনাজানা সবাই ওঁকে বাচ্চুদা বলে ডাকত। মুখের ফস্কে তাই ও একটু আগে দোকানের ছেলেটাকে বাচ্চুদার সঙ্গে দেখা করতে চায় বলে ফেলেছে। আসলে ওর বলা উচিৎ ছিল বাচ্চু জেঠুর সঙ্গে দেখা করতে চায়।

  এর মধ্যে ছেলেটি দোকানের ভিতর থেকে একজন বয়স্ক লোককে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ভাবনায় রত শুভেন্দুকে ডেকে বলল - 'ইনি হলেন বিভাস মিত্র, আমার কাকা, আপনি যে বাচ্চুদার সঙ্গে দেখা করতে চান তাঁর মেজো ছেলে। বাচ্চুদা, মানে আমার ঠাকুরদা গত হয়েছেন প্রায় বারো বছর হল।'

প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠে লজ্জিত গলায় শুভেন্দু বলল - 'আমিও এই একটু আগে সেটা খেয়াল করেছি। আমার বলা উচিৎ ছিল বাচ্চু জেঠুর সঙ্গে দেখা করতে চাই।'

হাসি হাসি মুখে বিভাস মিত্র বলল - 'সে আমরা বুঝতে পেরেছি।' একটু থেমে আবার বলল - 'আচ্ছা, আপনি কী জয়নগর পাড়ার নবকাকু মানে নবেন্দু মুখার্জীর ছেলে?' হাসি মুখে শুভেন্দু বলল - 'ঠিক ধরেছেন, আমার নাম  শুভেন্দু।'

- ' হুম, ঠিক ধরবো তো বটেই।' বিভাস মিত্রের হাসি আরো বড় হল। বলল - 'আপনি হলেন আমাদের এ শহরের রত্ন ছেলে, আমেরিকায় থাকা শুভ।'

- 'আমাকে আপনি আঁজ্ঞে করবেন না প্লিজ' শুভেন্দু তাড়াতাড়ি বলল - 'আমিও আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনি তো বিভুদা, আমাদের স্কুলের ফুটবল টীমের স্টার প্লেয়ার।'

প্রথম দেখা ছেলেটি বিভাস মিত্রের ভাইপো এবার কথার মধ্যে ঢুকে পড়ল। বলল - 'কাকামনি, তুমি এঁর সঙ্গে কথা বল। আমি ভিতরে গিয়ে তোমাদের জন্য চা-টা কিছুর ব্যবস্থা করি।'

ছেলেটি ভিতরে চলে গেলে বিভাস বলল - 'আমার বড়দার ছেলে প্রকাশ। দোকানটা আজকাল ওই চালায়।'

  তারপর এ কথা সে কথা। পুরোনো দিনের কথা, নতুন দিনের কথা। এখানকার হালচালের কথা, আমেরিকার নানা কথা। বিভাস বলল -'তোমরা তো এখানের পাট চুকিয়েই দিলে। আমাদের স্কুলের স্টার স্টুডেন্ট তুমি দারুন রেজাল্ট করে কলকাতায় পড়তে গেলে, তারপর সেখান থেকেই আরো পড়তে সেই যে আমেরিকায় গেলে আর এ মুখো হলে না।'

শুভেন্দু বলল - 'কপালে যেমন লেখা।'

- 'তোমার কপালে লেখা তো ভালোই ভাই। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশে সুখে সাচ্ছন্দে আছো।'

ওর সৌভাগ্যকে সাধারণ বোঝাতে শুভেন্দু বলল - 'ওই আর কী। নদীর ও পাড়টা যত সবুজ মনে হয়, আসলে অতটা সবুজ না বিভুদা।'

বিভাস বলল - 'সে আমরা যারা সে দেশটা দেখি নি তারা কিছুটা বেশি করে ভাবি হয়তো, তবুও আমেরিকা ইজ আমেরিকা।'

শুভেন্দু কী আর বলবে হাসিমুখে চুপ করেই রইল। একটু বাদে বিভাস আবার বলল -'তোমার ছোট বোন মিলির বিয়ে হয়ে যাবার পরই তোমাদের বাড়িটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। নবকাকু কাকীমাও একে একে চলে গেলেন।' 

কথায় কথায় প্রসঙ্গটা মনখারাপের জায়গায় এসেই গেল। ওদের বাড়িটা ফাঁকা এমনি এমনি হয়নি। শিবু গুণ্ডার কবলে পড়ে বাবা একে একে হারালেন প্রথমে জামাইকে, তারপরে মেয়েকে। এসব ভাবতে বসলে একদিকে যেমন মনখারাপ হয়, অন্যদিকে তেমনি আসে ভীষণ এক অপরাধবোধ। নিজের ছেলেকে দরকারের সে সময় কাছে পেলে বাবা শিবু গুণ্ডার পাল্লায় যেতেন না।

  এসব বুকে মোচড় মারা কথা শুভেন্দু মনে আনতে চায় না, কিন্তু না এনে তো উপায়ও নেই। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে আজ যখন স্ত্রী গত হয়েছে, ছেলেমেয়েরা তাদের নিজেদের জীবনে, তখন একা শুভেন্দুকে অতীত ধরেছে প্রবল টানে। আজ শুভেন্দু সেই পুরোন দিনকে ফিরে পেতে চায় যাকে ও অবহেলা করেছে বছরের পর বছর।

  বিদেশিনীকে বিয়ে করার পর জীবনের ধারা বদলে গিয়েছিল শুভেন্দুর। বাবা মা এমন কি এত আদরের ছোট বোন মিলিকেও কী করে যেন দূরে সরিয়ে রেখেছিল সে। যে সব দিনের কথা ও ইচ্ছে করে ভুলে থাকত, সে সব দিনগুলো আজকাল ওকে তাড়িয়ে বেড়ায় সারাক্ষণ। কেমন

যেন একটা আকুল ইচ্ছায় ও সঞ্চয় করতে চায় হারিয়ে যাওয়া সে সব দিনের সব ছবি। তাই তো আজকে ওর এই ছবিঘর স্টুডিওতে আসা। ওদের ছোটবেলায় ওর আর মিলির প্রত্যেক জন্মদিনে বাবা এই ছবিঘর স্টুডিওতে এসে ছবি তোলাতেন। তাছাড়াও বছরের অন্যসব অনুষ্ঠানের দিনগুলোতেও ছবি তোলা হত। ওদের কত কত ছবি এই স্টুডিওতে উঠেছিল। যদি সেগুলোর কিছু কোন রকমে পাওয়া যায়। 

  মিলির বিয়ে হয়েছিল বাবা মা-র অপছন্দে। আশিস ওদের পাড়ার লাগোয়া বস্তির ছেলে। একে নিচু জাত নস্কর, তার ওপর ওর মা বাবুদের বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে। যদিও ছেলেটি পড়াশুনায় খুব ভাল, ক্লাসের প্রথম সারির ছাত্র, তবুও বস্তিতে থাকা বাসার কাজের ঝিয়ের ছেলে। বাবা মা মানতে পারেনি কিছুতেই। 

  শুভেন্দু তখন শিকাগোতে নিজের লাইফের নানা সম্ভাবনা নিয়ে ব্যস্ত। তখন না ছিল ফোনের এমন সুদিন, না ছিল ওদের এখানের বাড়িতে কোন ফোন। বাবা চিঠি লিখেছিলেন বার বার। শুভেন্দুকে বলেছিলেন একবার দেশে এসে মিলির সঙ্গে কথা বলতে, ওকে বোঝাতে। বাবা মার বিশ্বাস ছিল দাদার কথা মিলি অত সহজে ফেলে দিতে পারবে না, সে দাদাঅন্ত প্রাণ। কিন্তু শুভেন্দু আসতে পারেনি। পড়াশুনা আর নানা কাজের দোহাই দিয়েছে। তখন তার জুলিয়ার সঙ্গে কোর্টশিপের চূড়ান্ত পর্যায়, তখন শিকাগো ছেড়ে কোথাও ক’দিনের জন্য যাওয়াও তার পক্ষে সম্ভব না। বরং মিলির এ ঘটনার কথা শুনে শুভেন্দু নিজে পড়ে গিয়েছিল নতুন ভাবনায়, জুলিয়ার কথা বাবা মাকে বলবে কী করে!

  অনেক ভেবেচিন্তে শুভেন্দু বড় করে একটা চিঠি লিখেছিল মিলিকে। সেটাতে সে কিছুতেই লিখতে পারেনি মিলি তুই এই অসম প্রেম থেকে বেরিয়ে আয়। বার কয় শুভেন্দু সেটা লিখেছিল, কিন্তু লিখেই কেটে দিয়েছে। মনের ভিতরের কী একটা তাড়নায় মনে হয়েছিল সে নিজে যা করতে পারবে না সেটা ছোট বোনকে করতে বলে কী করে! চিঠিটার ছত্রে ছত্রে কেবল লিখেছিল, মিলি, তুই বাবা মার মনে কষ্ট দিস না। পাড়ার মাস্তান ছেলেদের পাণ্ডা শিবুর চোখ ছিল দেখতে ভাল আকর্ষনীয়া মিলির ওপর, কিন্তু গুণ্ডা ছেলে বলে মিলি ওকে পাত্তা দিত না। মিলির এই দেমাক শিবুর কাছে অসহ্য। অবাধ্য মেয়ের সমস্যায় ছেলেকে কাছে না পাওয়া বাবাকে সুযোগ বুঝে কব্জা করেছিল শিবু। সকালবেলা বাজার থেকে ফেরার পথে নবেন্দু মুখার্জীর পাশে পাশে চলতে চলতে শিবু বলেছিল - 'কাকু, ভারী ব্যাগটা আমাকে দিন, আপনার বেশ কষ্ট হচ্ছে।'

- 'না না, তার দরকার নেই।'

 - 'আরে দিন না' শিবুর বিনয় বচন, 'আমরা ছোটরা থাকতে আপনারা বাবা কাকা জেঠারা মোট বইবেন কেন?'

  সেই শিবুর নবেন্দু মুখার্জীর বাড়িতে ঢুকে পড়া। তারপর শুরু হয়েছিল বাবাকে সাহায্য করার ছলায় মেয়েকে কব্জা করার ধান্ধা। সেটা কিছুতেই না পেরে শুরু হয়েছিল মেয়েকে হেনস্থা করতে রাস্তাঘাটে আশিসের ওপর অত্যাচার। দু দুবার বেধরক মারধোর করা হল আশিসকে। ওর মার বাসার কাজ চলে যেতে লাগল একের পর এক। বস্তির ঘরে এসে ভাঙচুরও হল।

তারপর বাবা কি শিবু যা ভাবতে পারেনি তাই হয়েছিল। মিলি আর আশিস মন্দিরে গিয়ে মালা বদল করে বিয়ে করে এসেছিল। মিলি গিয়ে উঠেছিল আশিসের বস্তির ঘরে। এতে একদিকে নবেন্দু মুখার্জীর অপমান, অন্যদিকে শিবুর মাস্তানির ইগোতে চড়ম আঘাত। শিবুর মাথায় তখন খুন চেপে গেছে। বাবার কাছে এসে বলেছিল - 'কাকু, ব্যাপারটা আপনি আমার হাতে ছেড়ে দিন, আমি শালা আশিসকে এবার দেখাব কত ধানে কত চাল।'

ছেলের ওপর অভিমানে বাবা কিছু জানান নি বলে শুভেন্দু এসবের কিছুই জানত না। বাবাও তখন অত বুঝতে পারেন নি। চার মাসের মাথায় পুলিশ আশিসকে এরেস্ট করল, ওর ব্যাগে পাওয়া গেল কোকেনের পুরিয়া ভরা বাক্স। রাগে দুঃখে ঝলসানো মিলি এসে বাবা মাকে বলল - 'এসব নোংরামি করে তোমরা আশিসকে আটকে রাখতে পারবে না। যে করেই হোক আমি ওকে ছাড়িয়ে আনবো।'

এই বলে রণচণ্ডী মূর্তি ফিরে যাবার মুখে ঘুরে দাঁড়িয়ে গমগমে গলায় বলল - 'আর একটা কথা জেনে রাখো, যদি আশিসের কিছু হয়, তাহলে তোমরা আমার মরা মুখ দেখবে।'

শেষরক্ষা তবুও হয় নি। শিবুর চেলারা হাজতে গিয়ে আশিসকে ড্রাগ পুশার বলে গালাগাল দিত। মিলির নামে বলত নানা নোংরা কথা। অপমানে জর্জরিত আশিস আর পারেনি, কোর্টে কেস চলাকালিন হাতের শিরা কেটে নিজের জীবন নিয়ে নিল। আঘাতের পর আঘাত, আশিসের মা এ ধাক্কা নিতে পারল না। এত কষ্ট করে মানুষ করা ছেলের অকালে জীবনাবসানের শোকে জ্ঞান হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। তিনদিনের মাথায় হার্টফেল করে সকল সুখ দুঃখের ঊর্ধে চলে গেল।

মিলির উন্মাদ অবস্থা, মাথার ওপর আকাশটা ভেঙে পড়েছে। রাগে দুঃখে চোখে নেই একবিন্দু জল। বাবা মা দেখা করতে এলে চূড়ান্ত ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। তারপর উধাও। কোথায় যে মেয়েটা চলে গেল কেউ জানে না।

বিভসের কথার পিঠে শুভেন্দু বলল - 'মিলির বিয়ের পর আমাদের বাবা শিবুর খপ্পরে পড়েছিল, আপনারা নিশ্চয়ই সেসব জানেন।'

'জানি' - বিভাস বলল, 'পুরোটা না হলেও অনেকটাই জানি। তোমাদের মত আরো কতজনের যে ক্ষতি করেছে এই শিবু সেসব আমাদের জানা।'

অথচ আজ সে কোথায়, আর আমরা কোথায়, শুভেন্দু আক্ষেপ করল - 'আজ পারবো তাকে গিয়ে এ নিয়ে কিছু বলতে! পারবো তাকে বলতে যে আমার একমাত্র বোনটি কোথায় হারিয়ে গেলো ওর নষ্টামির জন্য।'

- 'সে চেষ্টা কর না, ফল ভালো হবে না।'

- 'না  না, সে চেষ্টার কথা আমি ভাবছিও না। দলবাজি আর রাজনীতির দৌলতে শিবু গুণ্ডা আজ মাননীয় মন্ত্রী শিবপ্রসাদ। তার দাপট বেড়েছে বই কমেনি, সে আমি জানি।' প্রকাশ এসে দুকাপ চা আর বিস্কিট দিয়ে গেল। হাতের ভঙ্গিতে শুভেন্দুকে চায়ের কাপ নিতে অনুরোধ জানিয়ে নিজের কাপটা হাতে তুলে নিল বিভাস। চায়ের কাপে হাল্কা চুমুক দিয়ে বলল - 'এসব কথা আলোচনা করে এতদিন বাদে দেখা হওয়ার ভালো সময়টুকু নষ্ট করে দিও না শুভ।'

একটু থেমে আবার বলল - 'কী আর বলবো, এই যে টিকিস টিকিস করে দোকানটা চালাচ্ছি, তার জন্যও মাসে মাসে তোলা দিতে হয় শিবুর তহবিলে।'

- 'বলেন কী!'

- 'হ্যাঁ ভাই। এ দেশ ছেড়ে চলে গিয়ে কত ঝামেলা থেকে যে বেঁচে গিয়েছো সে তোমরা জান না। মাথা নাড়িয়ে শুভেন্দু বলল - 'কষ্ট কোথায় জানেন বিভুদা, মিলি বড় আদরের ছিল আমাদের সবার, বিশেষ করে আমার। আমাকে জিজ্ঞাসা না করে ও তো কোন কিছু করতো না। দাদা যা বলবে তাই ঠিক। এতো ডিপেনডেন্ট ছিল আমার ওপর যে আমি বাড়ি থেকে চলে যাবার পর মিলি নিশ্চয়ই নানা সময়ে নানা বিষয়ে দিশেহারা ফিল করত। জানেন বিভুদা, প্রত্যেক বছর ভাইফোঁটার চন্দন আর রাখী ও চিঠিতে করে আমার কাছে পাঠাতো আমেরিকায়।'

  সত্যিই, মিলিটা যে কোথায় চলে গেল। দঃখ ভরা গলায় বিভাস বলল - 'এসব কথা না পারবে ভুলতে, না পারবে গিলতে। কষ্ট তো হবেই।' ধক করে ধাক্কা লাগল শুভেন্দুর বুকে। ভুলেই তো ছিল ও এসব কথা, তা নইলে আদরের বোনের জীবনের চরম সঙ্কটের সময়ও তো সে আসে নি পাশে দাঁড়াতে। কী করে! কী করে শুভেন্দু এমন স্বার্থপর হয়েছিল! নিজের ওপর ধিক্কারে ক্ষতবিক্ষত শুভেন্দুর চোখেমুখে ব্যথার ছায়া দেখে বিভাস বলল - 'থাক এসব কথা শুভ, অন্য কথা বলো। আজকে আমাদের এই স্টুডিওতে কী কোন কাজে এসেছ, না জাস্ট এমনি বেড়াতে।'

ছোট একটা কাজ আছে মাথায়, প্রকাশের দিয়ে যাওয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শুভেন্দু বলল - 'আচ্ছা বিভুদা, আপনার কী মনে আছে আমাদের প্রত্যেক জন্মদিনে বাবা মা আমাকে আর মিলিকে নিয়ে এই স্টুডিওতে এসে ছবি তোলাতো। 

- 'কেন মনে থাকবে না, মনে আছে সব। বাবা খুব যত্ন করে সেসব ছবি তুলতেন। মনে আছে বাবা মজা করে বলতেন - আর কিছু হোক না হোক, আমার একটি খদ্দের বাঁধা। নব ওর ছেলে মেয়ের জন্মদিনে ছবি তুলতে আসবেই।'

-'বলছিলাম কী' শুভেন্দু ঢোক গিলে বলল - 'সেসব ছবি আপনারা ফাইলে রাখেন কী?'

- 'রাখা হতো, তবে প্রিন্ট না। আমরা নেগেটিভগুলো ফাইলে রাখতাম।'

- 'আছে? আমাদের সেই ছোটবেলার জন্মদিনের ছবিগুলোর নেগেটিভ আছে?'

নেতিবাচক মাথা নাড়াল বিভাস। বলল - 'এতো পুরোনো নেগেটিভ মনে হয় আর নেই ভাই। আসলে কী জানো, এই জোলো আবহাওয়ায় নেগেটিভ স্টোর করা খুব সমস্যার। ফাঙ্গাস পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। তার ওপর এখন তো ডিজিটাল ক্যামেরা এসে গেছে, নেগেটিভের টেগেটিভের কোন ব্যাপার আর নেই। এখন তো ইমেজ ফাইল কমপিউটারে আর্কাইভ করি।' 

- 'হ্যাঁ, সে তো জানি। বলছি পুরোনো কোন নেগেটিভই নেই, সব ফেলে দিয়েছেন?'

- 'কিছু আছে একটা ডেসিকেটারের মধ্যে, তবে সেগুলো কী, না দেখে সেটা বলতে পারবো না।'

আবেদনের গলায় শুভেন্দু বলল - 'বিভুদা, আমাদের পুরোনো কিছু ছবি যদি পাওয়া যায় এই আশায় আপনার কাছে এসেছি। দেখুন না একটু যদি সে রকম কোন নেগেটিভ থাকে এই ডেসিকেটারের মধ্যে'।

- 'দেখবো অবশ্যই', সহৃদয় স্বরে বিভাস বলল, 'তুমি এতো দূর থেকে এসেছো এই আশায়, দেখবো বটেই। তবে একটু সময় দাও ভাই। তুমি তিন চার দিন পরে আবার এসো। যদি কোন নেগেটিভ পাই, তাহলে আমি প্রিন্ট করে রাখবো।'

তিনদিন পরে সহাস্যে শুভেন্দুকে আহ্বান করে বসাল বিভাস। শুভেন্দুর মনে হল ওর ভাগ্য বোধহয় ভাল, নিশ্চয়ই নেগেটিভ পাওয়া গেছে, তা নইলে বিভাসের এমন উৎসাহ হত না। আশা ভরা গলায় জানতে চাইল - 'পাওয়া গেছে কিছু নেগেটিভ বিভুদা? আমার কপালটা কী তাহলে ভালো?'

কিছুটা আশা কিছুটা ক্ষোভের গলায় বিভাস বলল - 'পাওয়া গেছে, তবে অনেক না। খুব পুরোনোগুলো তো এমনিতেই

ছিল না। তোমাদের জন্মদিনের ছবিগুলো পাওয়া গেলো না ভাই।'

- 'কী, কী পেয়েছেন তাহলে?'

- 'পেয়েছি পরে তোলা দুটো ছবি, এই দুটো ছবি' বলে টেবিলের ওপরে সাদাকালো দুটো ছবি রাখল বিভাস।

সিঁথিতে সিঁদুর পরা, মাথায় ঘোমটা দেয়া, হাসিমুখ মিলি। চোখে আনন্দঘন চাহনি। পাশে চোখে চশমা পরা, মাথার চুলে মাঝখানে সিঁথি, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার ছেলে, মুখে সাবলিল হাসি।

এ নিশ্চয়ই আশিস। আশিসকে শুভেন্দু কখনো দেখেনি, কিন্তু ছবি দুটো দেখে এ আন্দাজটা সহজেই করতে পারল। শুভেন্দুর মনের ভিতরের ভাবনার স্রোত অনুমান করে বিভাস বলল - 'মিলি আর আশিস। বিয়ের পর দুজনে ছবি তুলতে এসেছিল এই স্টুডিওতে।'

ছবিদুটো হাতে তুলে নিল শুভেন্দু, কিন্তু দেখবে কী করে, চোখ দুটোই যে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। পুরোনো দিনের ছবি ও চেয়েছিল, কিন্তু এমন ছবি যে পাবে সেটা ভাবতে পারেনি। এই দুটো মানুষই যে শুভেন্দুর বুকে ধাক্কা মারে আজকাল। কেবল মনে হয় ও যদি সময়মত আসত তাহলে এই দুটো মানুষের জীবন এভাবে অকালে শেষ হয়ে যেত না। কোথায় আছে মিলি? আছে কী কোথাও? আর আশিস, সে কী ওপর থেকে দেখতে পায় কী অপরিসীম অপরাধবোধ নিয়ে সারাটা জীবন কাটাচ্ছে শুভেন্দু। বুকের ভিতরের কষ্টটা যেন ওপরে উঠে গলার কাছে আটকে গেছে। শুভেন্দু না পারছে ছবি দুটো ভাল করে দেখতে, না পারছে কোন কথা বলতে।

শুভেন্দুর এই অবস্থা দেখে সমমর্মিতার গলায় বিভাস বলল - 'আর কোন ছবি পাওয়া গেল না, জাস্ট এ দুটো ছাড়া'।

চোখের জল মুছে শুভেন্দু বলল - 'এমনই দুটো ছবি দিলেন বিভুদা যা আমি এই প্রথম দেখলাম।'

- 'তাই! এ ছবি তুমি আগে দেখোনি?'

- 'না বিভুদা। ছবিঘর স্টুডিওর কল্যাণে আমার আদরের বোন মিলিকে আজ বধু বেশে দেখতে পেলাম। আর ওর ভালোবাসার আশিসকে তো আমি দেখিনি কোনদিন, আজ এই প্রথম দেখতে পেলাম।'

শুভেন্দুর ঘাড়ে সৌহার্দের হাত রেখে বিভাস বলল - 'শুভ, এ ভগবানেরই ইচ্ছা। সে জন্যেই বোধহয় শুধু এই দুটো নেগেটিভই পাওয়া গেল।'

মুখ তুলে বিভাসের দিকে তাকিয়ে সজল চোখে শুভেন্দু বলল - 'আর কোন ছবির দরকার আমার নেই বিভুদা। অন্যসব ছবি তো আমার মনের ভিতরে আছে। আজ আপনি এমন দুটো ছবি দিলেন যা আমার দেখা ছিল না, জানা ছিলো না। এ ছবিদুটো আমার কাছে মিলিকে নতুন রূপে ফিরে পাওয়া। এ ছবি দুটো খুঁজে দেবার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ বিভুদা, অসংখ্য ধন্যবাদ।' 

                            এমনও

       হয়ে যায়

ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য 

.....আর আরও বেশি রাগ হয়েছিল বোকা মেয়েটার ওপর। আত্মসম্মান বলে কিছুই কি তোর নেই রে? এ কি রকম মোহ যা এত অনায়াসে মানুষকে নিজের অস্তিত্ব সম্মন্ধেও মূল্যহীন করে তোলে? কিন্তু অক্ষম  ক্রোধে, হতাশায় মনে মনে রিয়ার চতুর্দশ পুরুষ উদ্ধার করলেও, শীর্ষর সাথে ওর কথা হয়েছে বলা দূরে থাক.....

  ফেসবুকে খোলা চ্যাট উইন্ডোটার দিকে তাকিয়ে আপনা আপনি ভ্রূ কুঁচকে গেল দেয়ার। ‘উফফ, আবার সেই এক বায়না!' মেয়ে বটে একখানা। যখনি দেখ এক কথা, কি চাপ রে বাবা। কি কুক্ষণে যে দীপের এই বন্ধুকে লিস্টে অ্যাড করেছিল সে। শনিবার, ল্যাবে কেউ নেই-ই প্রায়, কাজের ফাঁকে তাই ফেসবুকে লগ ইন করেছিল দেয়া, যদি কোনও বন্ধুকে পেয়ে যায়, আগড়ম বাগড়ম বকবে একটু। তা না এই পাগলীর পাল্লায় পড়বে কে জানত!

  উত্তর দেবে না চুপচাপ অফ লাইন হয়ে যাবে ভাবতে ভাবতে আনমনে ল্যাবের জানলার বাইরে চোখ রাখে দেয়া। যে দিকে তাকাও শুধু বরফ। গত সাতদিন অবিশ্রান্ত তুষারপাত হচ্ছে মন্ট্রিয়ালে। এরকম সময়ে কি যে ভয়ঙ্কর বিষাদময় হয়ে যায় জীবনটা, কলকাতার জনতা যদি বুঝত। তার বন্ধুরা যখন গদগদ হয়ে ‘ইসস কি লাকি তুই’, ‘ আহহ বরফ পড়লে কি রোমান্টিক লাগে বল, আমি তো সিওর হানিমুনে তোর কাছে মন্ট্রিয়ালে আসব’, রাগে হাড় জ্বলে যায় তার। মুখে প্লাস্টিক হাসি সেঁটে সবাইকে সাদর আমন্ত্রণ জানায় সে আর মনে মনে বলে ‘আয় না, দেখে যা দিনের পর দিন মাইনাস তিরিশ ডিগ্রি সইতে কি রকম জান নিকলে যায়, বরফ নিয়ে আদিখ্যেতা ওই প্রথম কদিনই ভাল লাগে, একটু রোদ্দুরের জন্য হাপিত্যেস করে বসে থাকার আকুতি আর কলকাতা কি করে বুঝবে! দেয়াই  কি আর সেকথা এ দেশে আসবার আগে বুঝত ছাই! হানিমুন! এই ঠাণ্ডায়! হুহ। দীপের সাথে প্ল্যান করাই আছে তার, বরফ দেখে দেখে ঘেন্না ধরা আঁখি আর দিল দুটোকেই একটু বিশ্রাম দিতে, বিয়ের পরে কোনও সমুদ্র সৈকতে যাবে তারা, দেশ বিদেশ যেখানেই হোক, পকেট বুঝে ফাইনাল করবে সেটা।  

  হ্যালো ইউ দেয়ার?', এই নিয়ে তৃতীয় বার একই মেসেজ উইন্ডোতে ব্লিঙ্ক করতে দেখে চিন্তার তার ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হল সে। ‘ডু ইউ নো ইফ দীপ স্পোক টু হিম?' এ তো আচ্ছা জ্বালা হল! কবে কোন স্মরণাতীত কালে রিয়ার সম্পর্ক হয়েছিল দীপেরই বন্ধু শীর্ষর সাথে। ওরা সবাই একসাথে টিউশন পড়তে যেত রাসবিহারীতে না কোথায়। দেয়া সিনেও ছিল না তখন। তবে দীপের কাছে শুনেছে তুমুল প্রেম হয়েছিল রিয়া আর শীর্ষর।

অধিকাংশ টিন এজ লাভের পরিণতি যা হয়, রিয়া-শীর্ষর কাহিনীও তার ব্যতিক্রম নয়। স্কুল শেষ করেই লন্ডন পাড়ি দেয় শীর্ষ, অবধারিত ভাবেই ভেঙ্গে যায় সম্পর্কটা। এক এক করে দশটা বছর কেটে গেছে তারপর, গঙ্গা, টেমস দিয়ে বয়ে গেছে বহু কিউসেক, লন্ডন থেকে ফ্লোরিডা হয়ে শীর্ষ আপাতত থিতু হয়েছে নিউজার্সিতে, অজস্র মেয়ের সাথে মন দেওয়া নেওয়া হয়েছে তার, দীপের জীবনে এসেছে দেয়া,  পি-এই-ডি করতে একসময় দেশ ছেড়েছে তারাও, বদলায়নি শুধু রিয়া।

  কি করে আজকালকার একটা শিক্ষিত স্মার্ট মেয়ে দশ বছর আগেকার প্রেম আঁকড়ে বসে থাকতে পারে, কিছুতেই মাথায় ঢোকে না দেয়ার। শুরুর দিকে মেয়েটার জন্য মায়ায় মনটা ভরে গিয়েছিল তার। কিন্তু যত দিন গেছে ততই দেয়া বুঝতে পেরেছে কি পরিমাণ সময় রিয়ার কাউন্সিলিং করে নষ্ট করেছে সে। এই মাথাটাই নিজের রিসার্চ এ ঘামালে আরেকটা পেপার নামিয়ে দেওয়া যেত অনায়াসে। ভাল হয়েছে। দীপের সাবধান বাণী কানে না নেওয়ার ফল। ও পইপই করে দেয়াকে না করেছিল। কিন্তু দেয়া তখন সুপার কনফি! বলে কত বিগড়া হুয়া বন্ধুকে সৎ পথে ফিরিয়ে এনেছে সে, আর এটুকু পারবে না!  

কিন্তু রিয়া যে কি চীজ সেটা তো আর মালুম ছিল না! সব চেষ্টা  বৃথা করে দিয়ে রিয়ার সেই এক কথা, দীপ-দেয়া কি পারে না আবার শীর্ষকে তার কাছে ফিরিয়ে দিতে? আরে, শীর্ষ কি সুইস চকলেট নাকি যে  তাদের কথায় গলে গিয়ে রিয়ার মুঠোয় চলে আসবে? এরকম মারাত্মক প্রেমের কথা নিজে করা তো দূরে থাক, দেয়া বাবার জন্মেও শোনে নি কোনদিন।

  সবাই খুব হিসেবী বলে জানে দেয়াকে। তার সবকিছুই খুব

মাপা। প্রেম ভালবাসা আবেগের ক্ষেত্রেও নিজস্ব একটা ফর্মুলা মেনে চলে সে। সতের বছর বয়সে বাড়ি ছাড়বার পর জীবন তাকে অনেক কিছু দেখিয়েছে, শিখিয়েছে। একটা কথা কখনই নিজেকে ভুলতে দেয় না দেয়া, ঠিক মুহূর্তে দাঁড়ি টানতে পারলে অনেক অনভিপ্রেত সংঘর্ষ এড়িয়ে  যাওয়া যায়। নিজের একটা ছোট দুনিয়া বানিয়ে নিয়েছে সে আর সেখানে যারা আছে তাদের নিয়ে ছাড়া আর বিশেষ কিছু নিয়ে ভাবে না দেয়া। এজন্য তার বন্ধুবান্ধবরা তাকে ‘রবো দিদি’  বলে খ্যাপালেও  দেয়া তাতে থোড়াই কেয়ার করে। হু-হু বাবা, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। যত বেশি লোককে হৃদয়ের কাছাকাছি আসতে দেবে তত ঝাড় খাবে, এটা একেবারে সার সত্য। ভুল জায়গায় ইনভেস্ট করবার মত এক্সট্রা ইমশন তার কোন কালেই ছিল না, ভবিষ্যতেও হবার চান্স নেই। সেই দেয়াও যে রিয়াকে নিয়ে এত মাথার চুল ছিঁড়েছে তার প্রধান কারণ কিন্তু দীপ। শীর্ষর সাথে ওরকম আকস্মিক বিচ্ছেদে প্রবল ধাক্কা খেয়েছিল রিয়া, অন্ধের মত নির্ভর করেছিল দীপের ওপরে। আর দীপ ও প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল ওর ক্ষতবিক্ষত মনটায় খানিকটা হলেও সান্ত্বনার প্রলেপ দিতে। কিন্তু এতকিছুর পরেও রিয়াকে বোঝাতে না পেরে হাল ছেড়ে দেয় সে। দীপের হাত ধরবার পর, অসম্ভব বুদ্ধিমতী দেয়া যেদিন বুঝতে পেরেছিল দীপ আর রিয়ার ভেতরের ইকুয়েশনটা ঠিক কি রকম, সেদিন থেকেই নিজের মত করে রিয়াকে আপন করে নেবার চেষ্টা করেছে সে। অনেক অনেক কথা বলে নিজেকে বোঝানোর প্রচেষ্টায় বিশ্বাস করে না দেয়া, কিন্তু দীপ যাকে নিজের বোনের সম্মান দিয়েছে, তাকে আপন করে নিতে কোনও ত্রুটি রাখতে চায়নি সে।

একটা সময় দীপই তাকে বলে রিয়া কোনদিনই বুঝবে না, ওর বয়স ষোল বছরেই আটকে আছে। কেউ বুঝতে না চাইলে তাকে কখনো জোর করে এসব কথা বোঝানো যায় না। দীপ দশ বছরে যেটা পারেনি সেটা দেয়া কি করে ছয় মাসে করে দেখাবে ভাবছে? বছর ঘুরে যাবার পর দেয়াও ক্লান্ত এখন। এই রিয়ার জন্যই এতদিনের পার্মানেন্ট এগনি আন্ট পোষ্টটায় ডাহা ফেল দেয়া। জীবনে প্রথমবার। বন্ধুদের কাছে তার প্রেস্টিজটা এখন থাকে  কোথায়? নাহ, রিয়াটা বিচ্ছিরি রকমের হোপলেস কেস। যন্তর জিনিস মাইরি। দশ বছরে আরেকটা কাউকে জোটাতে পারলি না? শরৎচন্দ্র লেডি দেবদাস লিখলেও এতখানি কল্পনা করতে পারতেন না দেয়া বাজি রেখে বলতে পারে। একি যা তা অবসেশন রে বাবা।

  আরেকটা ব্যাপারে অবাক না হয়ে পারে না দেয়া। রিয়া পর্ব কিন্তু ফাটল ধরাতে পারেনি শীর্ষ-দীপের বন্ধুত্বে। এত কিছুর পরেও অম্লান আছে দুজনের পারস্পরিক বোঝাপড়া। মাস তিনেক আগে শীর্ষ মন্ট্রিয়ালে এসেছিল অফিসের কাজ নিয়ে, পাঁচতারা হোটেলের বুকিংকে গুলি মেরে উঠেছিল দীপের কাছে। দেয়ার সাথে সেই প্রথম মোলাকাত। দুই বন্ধুর বোতল খুলে বসে ননস্টপ আড্ডা আর পার্টিবাজির মাঝে একটু নিরালা পেয়ে, দীপের ভয়াল ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে, রিয়ার বর্তমান মানসিক অবস্থা বর্ণনা করেছিল সে। একটু চুপ থেকে আবেগহীন গলায় জানিয়ে দিয়েছিল শীর্ষ, লরা বলে আমেরিকান মেয়েটির সাথে তার সম্পর্কের কথা। গত দুবছর ধরে একসাথে থাকে ওরা, বিয়ে করবে যে কোনদিন। রিয়া তার জীবনে এক ধুসর স্মৃতিমাত্র। তাকে নিয়ে আলোচনা করবার ইচ্ছা কি সময় কোনটাই যে শীর্ষর নেই সেটাও রাখঢাক না করেই স্পষ্ট করে দিয়েছিল সে। সামান্য হলেও অপমানিত বোধ করেছিল দেয়া শীর্ষর এই ব্যবহারে, তাকে কি রিয়ার উকিল মনে করে কথাগুলো শোনাল শীর্ষ?

আর আরও বেশি রাগ হয়েছিল বোকা মেয়েটার ওপর।আত্মসম্মান বলে কিছুই কি তোর নেই রে? এ কি রকম মোহ যা এত অনায়াসে মানুষকে নিজের অস্তিত্ব সম্মন্ধেও মূল্যহীন করে তোলে? কিন্তু অক্ষম  ক্রোধে, হতাশায় মনে মনে রিয়ার চতুর্দশ পুরুষ উদ্ধার করলেও, শীর্ষর সাথে ওর কথা হয়েছে বলা দূরে থাক, দেখা যে হয়েছিল সেটুকু অব্দি বলে মেয়েটাকে আরও অতল খাদের

দিকে ঠেলে দেবার কথা ভাবতেও পারেনি দেয়া।  এভাবেই কেটে গেছে আরও একটা বছর। দেয়া পুরোপুরি নির্লিপ্ত করে নিয়েছে নিজেকে রিয়া সংক্রান্ত গল্প থেকে। রিয়াও কোন অলীক কারণে যখন তখন শীর্ষ-শোকগাথা প্রকাশ করা থেকে বিরত হয়েছে। হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে দেয়া। খুব কমই কথা হয় তার রিয়ার সাথে এখন। আর হলেও কেমন আছ, ভাল আছির বেশি টানতে দেয় না সে।বিশেষত শেষ কটা মাস পাগলের মত ব্যস্ত ছিল দীপ-দেয়া। অবশেষে এসেছে সেই বহু প্রতীক্ষিত সময়। এই নভেম্বরে কলকাতাতে বিয়েটা সেরে ফেলবে দুজনে। কিন্তু তার আগে বসদের দিমাগ ঠাণ্ডা রাখবার উপযোগী ডেটা সাপ্লাই করা, শপিং, ছুটির দরখাস্ত, টিকিট কাটা সব মিলিয়ে একেবারে নাকানিচোবানি খেয়েছে তারা।

  একেবারে প্লেনে উঠে বসে সেই সাঙ্ঘাতিক চিন্তাটা স্ট্রাইক করল দেয়াকে। ওহ মাই গড! কি হবে এখন? দীপ সবে ওয়াইনটা খতম করে খোশমেজাজে কম্বল মুড়ি দেবার মওকায় ছিল, ধড়মড় উঠে বসেছে দেয়ার খোঁচায়। ‘কিসের কি হবে’? দীপের প্রশ্নে গলা কেঁপে যায় দেয়ার। এত তালগোলে মগজে এটা রেজিস্টারই করেনি যে তাদের বিয়ে উপলক্ষে  মর্ত্যলোকে এই প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎকার হতে চলেছে শীর্ষ – লরার সাথে রিয়ার। তাদের বউভাত কাম রিসেপশনের আগের দিন স্টেট্‌স থেকে এসে পৌঁছচ্ছে শীর্ষরা আর দীপের বোন হিসেবে রিয়া তো এই বিয়েতে খুবই সম্মানীয় অতিথি। কেসটার গুরুত্ব বুঝে ততক্ষণে দীপও থতমত। রিয়াকে কোনও ভরসা নেই, হাইপার হয়ে কি যে করে বসবে এই আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে কেটে যায় বাকি পথটা। অবশেষে গত্যন্তর না দেখে সবটাই ভগবানের ওপর ছেড়ে দিয়ে দমদমে নামে দেয়ারা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই জেট ল্যাগ, অজস্র ব্যস্ততা আর বাঙালি- বিয়ের হট্টগোলে প্রায় নিজেদের নামগুলোই পরের কদিনে ভুলতে বসেছিল ওরা। রিয়াকেও বিয়ের দিন যেটুকু দেখেছিল, যথেষ্ট উচ্ছল এবং প্রাণবন্ত বলেই মনে হয়েছে দেয়ার। কিন্তু তা বলে নিশ্চিন্ত হতে পারেনি এতটুকু। বিয়েতে তো আর শীর্ষরা ছিল না!

  ভালয় ভালয় চুকে গেছে বিয়ে। প্রথমবার শ্বশুরবাড়িতে আসবার অভিজ্ঞতাটা খুব অদ্ভুত লাগছে দেয়ার। কলকাতাতে থেকেও মা-বাবার কাছে বাড়িতে নেই। দীপ, ওর মা-বাবা, ওদের বাড়ির আর সকলেই তার অত্যন্ত পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও মনটা কেমন যেন ভারভার হয়ে আছে। শ্যামবাজার থেকে তাদের বাড়ি পনের মিনিটও লাগে না, সকালেই কথা হয়েছে মা-বাবা-বোনের সাথে। কিন্তু তাও কিরকম যেন  মনে হচ্ছে সে কোথায়ও একটা আলাদা হয়ে গেছে। ভীষণই হুজুগে বাড়ি দীপদের। কিন্তু এই মজাদার মানুষগুলোর কারুরই সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না এই মুহূর্তে। সকলেই গড়িয়ে নিচ্ছে একটু ইভনিং শোতে বেস্ট পারফরমান্স করবে বলে। আর দীপের তো টিকিটির ও দেখা মিলছে না। উফফ, কিছু বন্ধু আছে বটে ছেলেটার। কোন মতে বিয়েটা সেরে সারাক্ষণ টইটই করে বেড়াচ্ছে সে। এই একলা দুপুরে কি করে এখন দেয়া। ধুত। সন্ধ্যেবেলাতেই তো দেখা হবে বাড়ির সবার সঙ্গে, খামখা এরকম করছে কেন সে। মন খারাপটাকে পাত্তা দেবে না বলে একরকম জোর করেই নিজেকে ঘর থেকে টেনে বার করল দেয়া।

  বারান্দা পেরিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে সামনের ছোট ঘরটাতে ঢুকেই স্থাণু হয়ে গেল সে। এটা কি দেখছে ও? ভাল করে চোখ দুটোকে কচলে নিয়ে আবার তাকাল দেয়া। নতুন ইক্কতের আঁচল কাঁধে ফেলে আড়ষ্ট দাঁড়িয়ে লরা আর কি পরম যত্নে ওর শাড়ির কুঁচি সাজাচ্ছে রিয়া। তার সাথে চোখাচোখি হতেই উচ্ছসিত হাসির ঝড়ে রিয়ার প্রশংসায় মেতে ওঠে লরা।  বলতে থাকে ‘লুক দেয়া, রিয়া আর আমি কিরকম বন্ধু হয়ে গেছি, হোয়াই টু ব্রিং আ ম্যান বিটউইন আওয়ার ফ্রেন্ডশিপ? ক্যান ইউ টেক ওয়ান পিকচার  অফ আস নাও, ইট উড বি ফান!' বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ দেয়ার মুখ কোনও এক অদৃশ্য বলে ফিরে যায় রিয়ার দিকে, স্তব্ধ হয়ে দেখতে থাকে সেখানেও লরার ভাবনারই প্রতিচ্ছবি। সদ্য খুঁজে পাওয়া বন্ধুত্বের দৃঢ় প্রতিশ্রুতিতে উজ্জ্বল মুখ দুটোকে শীর্ষর ছায়া কোনওখানে ছিটেফোঁটা মেঘলা করতে পারেনি। পাশাপাশি হাত রেখে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা দুই নারীকে ক্যামেরাবন্দী করতে করতে অনেক ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিল দেয়ার। একবার কালীপূজোর সময় বাবা এক রকমের রংমশাল নিয়ে এসেছিলেন, যেগুলো জ্বালালেই লাল-নীল-সবুজ-গোলাপি আলো একসাথে বিচ্ছুরিত হতে দেখে বিমোহিত হয়ে গিয়েছিল দেয়া সমেত বাকি সব বন্ধুরা। ভালবাসা, মমতার যে এত অন্যরকম রঙ হতে পারে, জানা ছিল না দেয়ার। সঙ্গে সঙ্গে কেন জানে না তার মনে হচ্ছিল মায়ার বাঁধন নামক ঝাড়লন্ঠনটার যে একটা অপূর্ব দ্যুতি থাকে সেটা এরকম অবলীলায় জাগিয়ে তোলার জাদুকাঠিটা বোধহয় একমাত্র মেয়েদেরই আয়ত্তে। হাজার চেষ্টাতেও এ রহস্য আজীবন অজানাই থেকে যাবে পুরুষের কাছে।

  শীর্ষ অধ্যায়কে এভাবে পেছনে ফেলে বেরিয়ে আসতে পারবে রিয়া, কোনদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি দেয়া। কান্নাকাটি সহজে আসে না তার। কিন্তু আজ এই আশ্চর্য দুর্লভ পলের সাক্ষী হয়ে নিজের অজান্তেই কখন চোখ ভরে উঠেছে জলে বুঝতেও পারেনি সে। তাদের বিয়েতে সবচেয়ে বড় উপহারটা দেওয়ার জন্য লরা আর রিয়া দুজনের কাছেই আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে তারা। 

  নির্ভার হৃদয়ে আনন্দের খবরটা দিতে দীপের মোবাইল নাম্বার ঘোরায় দেয়া।

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?