• নির্বাসন - ফরিদা হোসেন

  • উপভোগ - ফয়জল আব্দুল্লা 

  • ছেড়া কাগজ - দীপন জুবায়ের

  • মধুমিতা সংবাদ  - সঞ্জীব গোস্মামী 

  • ক্যাশ বাক্স - সঞ্চিতা চৌধুরী 

  • চিত্ত বিনোদন - অদিতি ভট্টাচার্য্য

গল্প সমগ্র ৫

 

     মধু – মিতা

    সংবাদ

             সঞ্জীব গোস্বামী

...কিন্তু জীবনের অদ্ভুত কিছু খেলায় দুজনেই মানসিক ভাবে হেরে যাওয়ায় ওরা আবার যা যার নিজের বৃত্তে ফিরে গেল। আবার কোনদিন দেখা হওয়ার কোন সুযোগ আসবে কিনা জানা নেই। ওরা যেন দুটো জীবন্ত ধূমকেতু, কোন দৈবিক নিয়মে কিছুক্ষণের জন্য কাছাকাছি এসেছিল, আবার যে যার নিজের পথে চলে গেল। দুজনের কাছেই রয়ে গেল নতুন কিছু স্মৃতি...

হাওড়া স্টেশান থেকে বোম্বে মেল ছেড়ে দিল। ট্রেন ছেড়ে দেবার আগে যা হয়, প্রথমে রিসার্ভেশান লিস্টের সামনে বিরাট ভিড় তার কিছু পরেই আস্তে আস্তে ভিড়টা ট্রেনের দিকে ঘুরে গেল। কেউ কুলির মাথায়, কেউ নিজেরাই জিনিস পত্র নিয়ে সবাই প্রায় একই সঙ্গে যে যার কামরার দিকে যাবার প্রচেস্টা শুরু করলো। প্রত্যেকবার কোন দূর পাল্লার ট্রেন ছাড়ার সময় যা হয়, এবারও তাই কেউ কুলিকে ডাকছে, কেউ সঙ্গের বাচ্চাকে সামলাচ্ছে, কেউ বা বিরক্ত হয়ে কোন আত্মীয়কে সাবধান করছে। ভিড়টা এবার আস্তে আস্তে সরে এসে কামড়ার দরজার বাইরে যে লিস্টটা আঠা দিয়ে সেঁটে দেওয়া তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পরলো। আবার ঠিক সেই আগের মতো ধাক্কাধাক্কি খানিকটা কথা কাটাকাটি, এগুলো পার হয়ে কিছু লোক আস্তে আস্তে নিজের টিকিটের নাম্বার অনুযায়ী সঠিক গেটের দিকে এগুলো। এখানেও প্রতিবার যা হয় কুলিরা মাথায় করে আনা লাগেজ দুম দাম করে ঠিক ট্রেনের গেটের সামনে ফেলতে লাগলো মানুষের যাতায়াতের পথ প্রায় বন্ধ সুতরাং আবার মানব জট। আর শুধু মাত্র প্যাসেঞ্জারের ভিড় তো নয়, প্রত্যেক প্যাসেঞ্জারের বন্ধু বান্ধব বা অন্য আত্মীয়রা সবাই সি. অফ. করতে এসেছে, কাজেই প্ল্যাটফর্মে অসংক্ষ্য মানুষের এই ক্ষণিকের অবস্থান।

  মধুমন্তীর লাকটা ভালো এ. সি. টু টায়ারের একটা ছোট কুপে একটা সিট পেয়ে গেছে, মাত্র চারটে সীট, তার মধ্যে একটা তার। সঙ্গে বেশী জিনিস পত্র নেই, কাজেই গেটের সামনের ভিড় এড়িয়ে কোনক্রমে সে নিজের কুপে ঢুকে পরলো। ভাই লোকেশ সঙ্গে এসেছিল, সে হাতের সুটকেসটা দুটো সীটের মাঝখানে রাখলো, এখনও এই কূপে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। মধুমন্তী জানলার কাছে নিজের হ্যান্ড ব্যাগটা রেখে তার পাশেই নিজের ভারি শরীরটা নিয়ে বসল একটু তাড়াতাড়ি নড়াচড়া করলেই তার এখন হাঁপ লাগে। ট্রেন ছাড়তে এখন মিনিট পনের দেরি কাজেই লোকেশও কূপের দরজাটা বন্ধ করে এসে একটা ফাঁকা সীটে বসে পরল।

লোকেশ - 'কি রে দিদি, চা খাবি নাকি? বলি এক কাপ?'

মধুমন্তী - 'দূর, এই তো বাড়ী থেকে খেয়ে এলাম'। বলে হ্যান্ড ব্যাগ থেকে একটা বই বার করে রাখল, ট্রেনের এই ট্রাভেলগুলো সে বই না পড়ে কাটাতে পারে না। বইটা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস পার্থীব।

লোকেশ - 'আরে ছাড় তো, সে তো প্রায় দের ঘন্টা আগে'।

মধুমন্তী - 'তোর খেতে ইচ্ছে হলে খা না'।

লোকেশ - 'আমিও খাব, তুইও'।

এই বলে সে দরজার কাছে মুখটা নিয়ে গেল, বাইরে তখন ভিড়টা একটু পাতলা। বাইরের ভিড়টা তখন কামরার ভিতরে গমগম করছে। নানা রকম কন্ঠস্বরে নানা প্রকার সাংসারিক কথা বার্তা ভেষে আসছে।

ঠিক পাশের কোন কিউবিকল থেকে কোন ভদ্রলোক চিৎকার করে বলে উঠলেন – 'এ্যাই পাপাই, রাত্রে কিন্তু তুই ওপরে উঠে যাবি, মা ওপরে উঠতে পারবে না। ঘুম পাবার আগেই বলবি'।

পাতলা কন্ঠে উত্তর এল – 'ঠিক আছে, ঠিক আছে, এখন তো জানলার ধারে একটু বসতে দাও'।

আবার অন্য কোন ধার থেকে ভেষে এল – 'শোন মিলু, রাত্রে কি খাবে? ভেজ না ননভেজ'? মহিলা উত্তর দিলেন – 'ভেজ ভেজ, ট্রেনে আমি মাংস একদম খেতে পারি না'। একটা বাচ্চা পাশ থেকে বলে উঠল – 'বাবা, আমি কিন্তু মাংস খাব'। সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রমহিলার জবাব এলো – 'না বাপ্পা, তুই ওই সব ঝাল মসলা একদম খাবি না। পেট খারাপ হলে কি হবে? গতবার মাসির বাড়ী যাবার সময় কি হয়েছিল মনে নেই? বরঞ্চ নেমে হোটেলে উঠে যত ইচ্ছে মুরগী খাস, কেউ মানা করবে না'।

মধুমন্তী বুঝতে পারলো কামরাটা প্রায় ভরে এসেছে, এখন পর্যন্ত অবশ্য এই কুপে কারো পদার্পন ঘটে নি। বছরের এই সময় অবশ্য ট্রেনে খুব একটা ভিড় হবার কথাও নয়। লোকেশ বাইরের দিকে তাকিয়ে চাওয়ালা খুঁজছিল, ওকে মুখ বাড়াতে দেখে একজন এগিয়ে এল, হাতে একটা বড় কেটলি, একটা ব্যাগে বেশ কিছু প্লাস্টিকের গ্লাস, চায়ে গরম ।

লোকেশ - 'এই যে ভাই, দুটো'।

লোকটা দুটো ছোট্ট কাপে গরম চা এগিয়ে দিল। লোকেশ কাপ দুটো ভেতরে নিয়ে জানালার কাছে ছোট্ট কাঠের স্ট্যান্ডে রাখল, তারপর একটা দশ টাকার নোট বারিয়ে দিল... লোকটা ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়েই পাশের অন্য কোন কিউবিকলের দিকে দৌড়াল, হয়তো অন্য কোন যাত্রী ডেকেছে চায়ে গরম। মধুমন্তী একটা কাপ নিজের দিকে টেনে নিল। এমন নয় যে তার এখন ভীষণ চা তেষ্টা পেয়েছে

কিন্তু কেনা হয়ে যাবার পর নাটক করার কোন মানে হয় না। আর তাছাড়া সে বরাবরই দেখেছে যে বাড়ীর চা থেকে এই সব বাইরের দোকানের চা খেতে তার বেশী ভালো লাগে, বেশ কষা কষা, একটু বেশী গাঢ়, একটু তেতো ভাব, বাড়ীতে এমন চা কিছুতেই করা যায় না। প্ল্যাটফর্মের চায়ের একটাই প্রবলেম, বড্ড কম দেয়, ভাঁড়টা এতোই ছোট যে দুটো আঙ্গুল একসাথে ঢোকান যায় না। লোকেশ এই সামান্য চা টুকু বেশ ছোট ছোট চুমুক দিয়ে তৃপ্তি করে খাচ্ছিল, মধুমন্তী তিন চুমুকে মেরে দিয়ে কাগজের কাপটা সিটের তলায় রেখে দিলো, এখন বাইরে ফেলার কোন উপায় নেই, প্ল্যাটফর্মে মানুষ গিজগিজ করছে, পরে ট্রেন চলতে শুরু করলে একসময় ফেলে দিতে হবে।

মধুমন্তী তার হাত ব্যাগ থেকে চশমাটা বার করলো। আর কয়েক মিনিট পরেই ট্রেন ছাড়বে, তখন কামরা ফাঁকা হয়ে গেলে জমিয়ে বইটা পরা শুরু করবে, এটাই আজ রাত্রের প্ল্যান।

আর চোখে একবার লোকেশকে দেখল, এখন বেশ বিনিত হয়ে দিদি দিদি করছে, চা খাওয়াল, কিন্তু বাবা মারা যাবার পর থেকেই তার এই ভাই এবং ভাইয়ের বউয়ের সাথে তার সম্পর্ক মোটেই ভাল না। মূলত সম্পত্যি নিয়েই যত গণ্ডগোল, যদিও আরো সাংসারিক ব্যাপারও আছে।

মধুমন্তীর বিয়ের আগে ঠিকই ছিল, ভাই বোন বেশ ভালোই সম্পর্ক ছিল। প্রথমে মধুমন্তীর বিয়ে হোল, ভালো চাটার্ড অ্যাকাউনটেণ্ট পাত্র, বেশ বড় ফার্মে চাকরী। সে সময়ও সম্পর্ক ঠিক ছিল। লোকেশ খুব অ্যাভারেজ ছিল পড়াশুনায়, গড়িয়া কলেজ থেকে কোন রকমে বি.এ. পাশ করে বেকার হয়ে বসে ছিল। ওই সময় থেকেই বোধহয় প্রেম ট্রেম চলছিল কলেজেরই কোন মেয়ের সাথে। বছর দুয়েক কোন চাকরী জোটে নি, এই সময় বাবার বন্ধু সুবোধকাকুর রেফারেন্সে বজবজের বাটা কোম্পানিতে একটা ছোট চাকরী হয়ে গেল। চাকরী হবার পর এক বছরও হয়নি লোকেশ বিয়ে করলো হঠাৎ-ই। মধুমন্তী তখন বিয়ের পরে দিল্লীতে, সবটা ভালো জানা নেই, তবে সম্ভবত মাকে বলেছিল, আর মা বাবাকে। বাবা আগেকার দিনের পিউরিটার্ন মানুষ। লোকেশের বউ, মানে তখনকার বান্ধবী বনানী তাকে দ্বারিকবাবুর পছন্দ হোল না। ওনার বক্তব্য দুই ফ্যামিলিতে মানাচ্ছে না। দ্বারিকবাবু আগেকার দিনের গ্র্যাজুয়েট চমৎকার ইংরাজী লিখতেন, সরকারী কর্মচারি ছিলেন, সারা জীবন সততার সঙ্গে চাকরী করে বেশ কয়েক বছর রিটায়ার করেছেন। আর বনানীরা একাত্তরের দেশ বিভাগের পর ভারতে আসেন। বহুদিন ঢাকুরিয়ার লাইনের ধারে জবর দখল জমির ওপর মাটির বাড়ীতে থাকতেন। পরে যাদবপুরের ওদিকে একটা টালি দেওয়া একতলা বাড়ীতে চলে যেতে হয়। বনানীর দুই ভাইয়ের কেউই স্কুলের গন্ডি পেরোতে পারে নি, বনানী নিজে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করে কোন এক সময় গড়িয়া কলেজে ভর্তি হয়েছিল, অবশ্য শেষ অবধি ডিগ্রি কমপ্লিট করতে পারে নি। এই রকম পরিস্থিতিতে বাড়ীতে বেশ অশান্তিই চলছিল এই বিয়ের ব্যাপার নিয়ে। এই সময় মধুমন্তী কলেজের শেষ ধাপে অবশ্য এর পরেই তার বিয়ে হয়ে যায় জয়ন্তর সাথে, রীতিমত কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেখে শুনে, যাকে বলে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। বিয়ের পরে মধুমন্তী আরো মাস পাঁচেক ছিল, শেষ পরীক্ষাটা কমপ্লিট করে সোজা দিল্লিতে, জয়ন্ত তখন ওখানেই পোস্টেড। যাই হোক, এই রকম পরিস্থিতিতে লোকেশ দুম করে একদিন বনানীকে সিঁদুর পড়িয়ে সোজা বাড়ীতে এনে হাজির, ভায়া কালীঘাট।

  দ্বারিকবাবু এমনিতেই লোকেশের পছন্দের ব্যাপারে ভয়ংকর চোটে ছিলেন। দুপুরে খাবার ঠিক আগে হঠাৎ দুজনকে দেখে তিনি প্রথমে রেগে বাঘের মতো চিৎকার করে উঠেছিলেন, কিন্তু ওনার স্ত্রী মনিদীপা সামলে দিলেন, তাছাড়া গন্ডগোল দেখে পাড়ার কিছু মানুষও এগিয়ে এলেন। পাড়ায় একটা কেলেঙ্কারির ভয়ে দ্বারিকবাবুও সামলে গেলেন। কিন্তু সেই যে চুপ করলেন, তারপর সবার সাথেই কথা খুব কম বলতেন, তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। ছেলের বউ বনানীর সাথে তাঁর কোনদিনই বনেনি। এহেন দ্বারিকবাবুও একটা ভুল করলেন, নিজে একটা উইল করলেন, তাও রীতিমত উকিলের পরামর্শ নিয়ে কিন্তু কোর্টে গিয়ে রেজিস্ট্রি করালেন না। তাঁর দেহান্তের পর এই নিয়ে বিরাট গন্ডগোল, উকিলবাবু দ্বারিকবাবুর শেষ উইল নিয়ে বাড়ীতে এলেন, সব পড়াপড়ি হোল কিন্তু ওই রেজিস্ট্রি না করা নিয়ে লোকেশ এবং তার শ্বশুরবাড়ি একেবারে তুলকালাম। দ্বারিকবাবু ছেলে এবং মেয়েকে সমান ভাগ করে দিয়ে গেছিলেন, কিন্তু লোকেশ মানতে চাইল না। একটু বেশী সম্পত্তির লোভে তার শালারা এসে

উপস্থিত, তাদের বোনের দৌলতে তাদেরও যদি কিছু প্রাপ্তি হয়। এই নিয়ে কোর্ট অবধি গরাল, জয়ন্ত অবশ্য এসব চায়নি কিন্তু মধুমন্তী ব্যাপারটা ছারল না কোর্টে গেল এবং মামলার রায় খুব পরিস্কার, সম্পত্তি সমান দু ভাগই হবে। অবশ্য মা মনিদীপা বেঁচে থাকতে তিনিই সমস্ত সম্পত্তির মালিক থাকবেন। বনানী অবশ্য সেই চরিত্রের মেয়ে যারা হাতে কিছু ক্ষমতা এলে আরো বেশী কিছুর জন্য ঝাঁপিয়ে পরে। এদের চরিত্রের আরো একটা দিক হোল মানুষ যত নরম বা ভদ্র হয় এরা ততই নখ দন্ত বিস্তার করে। গরীব ঘরে মানুষ হওয়ায় মানুষের তাচ্ছিল্য বা অপমান বনানীদের অনেক সহ্য করতে হয় তাই মনের মধ্যে একটা আগুন ছিলোই। দ্বারিকবাবু যতদিন জীবিত ছিলেন, বাড়ীতে তাও কিছু নিয়ম ছিল, তাঁর চলে যাবার পর বনানী একছত্র হয়ে পরলো এতদিন দ্বারিকবাবুর সরব বীতস্পৃহা তার মনে যে হলাহলের সৃস্টি করেছিল তার ছোবল এখন মনিদীপার ওপর পরতে শুরু করলো। মধুমন্তী পুরো ব্যাপারটা জানত না, তবে কিছুটা শুনেছিল। বছর তিনেক আগে হঠাৎ একবার কলকাতায় এসে পুরো ব্যাপারটা জানতে এবং বুঝতে পেরে আর দেরি করেনি, পরের দিনই উকিল ডেকে ইঞ্চি মেপে বাড়ী এবং সামনের সামান্য জমি ভাগ করিয়েছিল। তারপর নিজের ভাগে মা মনিদীপার থাকার ব্যাবস্থা করে দিয়েছিল। রাত দিনের কাজের লোক এখন সর্বদা মনিদীপার সাথে থাকে, যখন কলকাতায় আসে মধুমন্তীও তখন মার সাথেই থাকে।

মধুমন্তী প্ল্যাটফর্মের দিকে ফাঁকা চোখে তাকিয়ে ছিল, আসলে কিছুই দেখছিল না, অতীতের এই সব ভাবনা মনের মধ্যে মেঘের মতো উড়ে যাচ্ছিল, এমন সময় কামড়ার বাইরে রেলের গার্ড আর টিকিট কালেক্টর এসে দাঁড়ালেন। ধড়মড় করে লোকেশ উঠে পরল,

- 'দিদি, উঠি রে... এবার ট্রেন ছাড়ছে বোধহয়।'

মধুমন্তী - 'হ্যাঁ, আয়, ভাল থাকিস। বনানীকে আর বাচ্চাটাকে আমার ভালোবাসা দিস।'

লোকেশ - 'সাবধানে যাস। মোবাইলটা খোলা রাখিস, মাঝখানে ফোন করব।'

মধুমন্তী - 'অত ব্যাস্ত হবার কিছু নেই, বহুবার তো যাতায়াত করলাম, ফোন খোলাই থাকবে'।

লোকেশ নেমে গেল, তারপর দারুন দায়িত্ববান ভাইয়ের মতো জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। আরো মিনিট খানেক পরে ট্রেন সত্যিই নরে উঠল। মধুমন্তী একটা শান্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল, এতো সব ভনিতা তার ভালো লাগে না। মধুমন্তী খুব ভালো মতোই জানে যে লোকেশ অভিনয় করছে, গত পনের দিন, যতদিন সে কলকাতার বাড়ীতে মার সাথে ছিল ততদিন বনানীর সাথে খুব ভালো করে কথা কোন দিন হয় নি। লোকেশ যে দিন ঠিক সময়ে বাড়ীতে ফিরত সেদিন ঘরে বসে চা খেয়ে টিভির মধ্যে ডুবে যেত। তবে লোকেশের এখন আবার নেশা করার অভ্যাস হয়েছে যেটা আগে ছিল না। ছাত্র অবস্থায় যেটা ছিল তা হোল ঐ পূজার সময় লুকিয়ে চুরিয়ে প্যান্ডেলের পিছনে গিয়ে চোঁ করে কিছুটা চোলাই মেরে দেওয়া, ওটা সবাই ঐ বয়সে করে থাকে, লোকেশও করতো। চাকরি পাবার পর বোধহয় সেটা রেগুলার হয়ে গিয়েছে। লোকেশ মাইনে বেশী পায় না, গত দশ বছরে একটা মাত্র প্রমোশান পেয়েছে, কাজেই দেশী চোলাইয়ের পেছনে জলের মতো টাকা ওরানোয় বনানীর সাথে তার তুমুল লাগে, সন্ধ্যা বেলায় বাড়ীতে তান্ডব লেগে যায়। আর রাগলে বনানীর মুখ দিয়ে একেবারে ঢাকুরিয়ার লাইনের ধারের বস্তির ভাষা বেরিয়ে আসে, তখন কানে হাত চাপা দেওয়া ছাড়া কোন গতি থাকে না। কিছুই আর গোপন নেই, সারা পাড়াই বেপারটা জানে। এই পরিবেশে মনিদীপা সারাক্ষন পূজোর ঘরেই কাটিয়ে দেন। এখানে থাকে না বলে মধুমন্তী বেঁচে গেছে। আজকে হাওড়া স্টেশানে দিদিকে নিয়ে আসার পেছনে লোকেশের হয়তো কোন মতলব ছিল, অন্তত মধুমন্তীর তো তাই মনে হয়। আগে লোকেশ মাঝে মাঝেই জয়ন্তর কাছে টাকা চেয়েছে, হয়তো আজকেও চাইত.

তবে সে সারাক্ষণ ট্যাক্সিতে অন্য দিকে তাকিয়ে বসে থাকায় লজ্জায় কথাটা পারতে পারে নি। আর কারণ তো একটাই, সারাক্ষণ ভ্যান ভ্যান করে সেই একই কথা – 'দিদি, ছেলেটাকে মানুষ করতে হবে, এই আয়ে কি করে করবো' এই সব। ওই সব কথা মধুমন্তী গত দশ বছরে অনেক শুনেছে, মাঝে মাঝে জয়ন্তকে বলে কিছু টাকাও দিয়েছে। কিন্তু লোকেশের স্বভাব পাল্টায় নি, তার নেশার খরচ আরো বেড়ে গেছে, তাই সে এখন আর টাকা দেয় না। লোকেশের ছেলে পাপাই, সে মা আর বাবার লড়াই, চিৎকার, গালিগালাজ এই সবের মাঝে পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, গত বছর সে ক্লাসে ফেল করেছে এবং তার কোন দোষ না থাকা সত্তেও প্রবল পেটানি খেয়েছে। মধুমন্তী সবই বোঝে কিন্তু লোকেশের ফ্যামিলিতে তার আর কিছু করার নেই। শুধু তাই নয়, আরো আছে বনানীর বাপের বাড়ী। বনানীর ভায়েরা মাঝে মাঝেই এসে দিনের পর দিন থেকে যায়, লোকেশের কাছ থেকে মাঝে মাঝেই টাকাও নেয়। এই রকম গন্ডগোলের ফ্যামিলি থেকে মধুমন্তী দূরেই থাকতে চায়, তার ছেলে মেয়েদের সে কোন দিনই কলকাতায় আনে না। আর যদিও বা আসে, তারা তাদের মামার বাড়ীতেই থাকে। রাতের খাওয়ার বা শোয়ার এখনও অনেক দেরি, তাই পাশে রাখা শীর্ষেন্দুর বইটা পরবে কিনা ভাবছিল। ঠিক এমন সময় কূপের দরজাটা হড়াম করে খুলে গেলো আর একজন ভদ্রমহিলা হাতের দুটো মাঝারি মাপের স্যুটকেস দরজার সামনে ট্রেনের মেঝের ওপর রেখে হাঁপাতে লাগল। মধুমন্তী ভালো করে মহিলার দিকে তাকাল, আন্দাজে মনে হয় মহিলার বয়স প্রায় তারই মতো, এই মধ্য চল্লিশের কাছাকাছি বা একটু বেশী, তবে পঞ্চাশের নিচে। মুখটা দেখে একটু বেশি প্রৌঢ় বলে মনে হয়, যেন জীবনের অনেক ওঠা পরার মধ্যে দিয়ে গেছেন। মহিলা একটু স্থুলাঙ্গী, মধুমন্তী একবার অপাঙ্গে নিজের দিকে তাকাল, বয়সের সাথে সাথে তার নিজের ওজনও বেড়েছে। মহিলা একটা মাঝারি দামের সুন্দর কাজ করা ছাপা শাড়ি পরে আছে, মোটামুটি ভাল পছন্দের পরিচায়ক। গলায় একটা বেশ পাতলা হার আসল না নকল বোঝা মুশকিল।

ভদ্রমহিলা এবার দু পা এগিয়ে এসে মধুমন্তীর ঠিক বিপরিত চেয়ারে বসলেন, তারপর একটা রুমাল নিয়ে মুখের আর গলার ঘাম মুছলেন। তারপর মধুমন্তীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন, 

- 'একটু দেরি হয়েছিল, তাই অন্য কামড়ায় উঠে পড়েছিলাম। তারপর খুঁজে এই দুই হাতে দুটো স্যুটকেস নিয়ে আসতে একটু দেরি হোল'।

মধুমন্তী লক্ষ্য করল যে এই বয়সেও ভদ্রমহিলার হাসিটা অনবদ্য, ঝিকমিকে সাদা দাঁতের সারি দিয়ে সাজানো, এক কথায় মনোমুগ্ধকর। 

মিতালী নিজের সিটে জমিয়ে বসলো। স্যুটকেস দুটো এখনও দরজার পাশেই রয়েছে, থাক, দরজাটা তো বন্ধই আছে। সে সিটে বসেই বসেই একটু হাঁপিয়ে নিল, তার বয়স এখনও পঞ্চাশের নিচে, কিন্তু হার্টে ট্রাবল আছে, হাঁটুতে একটু বাতও ধরেছে। বেশ কিছু দিন হোল ডাক্তারের উপদেশে নি-ক্যাপ ব্যাবহার করছে, তাতে হাঁটতে কিছুটা সুবিধা হয়। বয়সের সাথে সাথে শরীর ভারি হয়েছে, একটু পরিশ্রম করলেই বুক ধক ধক করে... আজকেও করছে, তবে একটু বসলেই সামলে যায়।

একটু বসতেই শরীরটা সামলে গেল। মিতালী আর চোখে সামনের মহিলার দিকে তাকাল। মহিলাও বোধহয় তার দিকেই তাকিয়ে ছিল, দুজনার চোখাচোখি হতে দুজনাই একটু লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে তাকাবার ভান করল। মিতালী লক্ষ্য করলো যে সামনের ভদ্রমহিলা বেশ দামি একটা সিনথেটিক সিল্কের শাড়ী পড়ে আছে, গলায় একটা মোটা হার, বেশ পয়সা ওয়ালা ঘরের বউ বলে মনে হয়। বয়স তো দেখে তার কাছাকাছি বলেই মনে হয়, তবে বলাও যায় না। গায়ের রঙ এক সময় বোধহয় বেশ ফর্সাই ছিল, এখন বয়সের চাপে একটু ময়লা হয়েছে, তবুও বাঙ্গালী সমাজে একে ফর্সাই বলা যায়। মুখের কাটিং বেশ ভালোই ছিল একসময়, বয়সের তারনায় মুখটা একটু ভারি হয়ে গেলেও গালের কাছে সুন্দর স্পটে একটা তিল যেন মুখটাকে বেশ শ্রীময় করে তুলেছে। ঠোঁটে হাল্কা ন্যাচারাল কালারের লিস্টিক, চোখ দুটো বড় বড়, তাতে যত্ন করে কাজল দেওয়া। ভদ্রমহিলা একটা বই নিয়ে একটা পাতা খুলে বসে আছেন অনেকক্ষণ ধরে, কিছুই পড়ছেন বলে মনে হয় না। হয়তো একটু আনমনা, মনে হয় মিতালীকে দেখেই কিছু ভাবার চেস্টা করছেন।

মধুমন্তী নিজের সিটে বসেছিল, বইয়ের পাতায় মন বসছে না। বার বার সমনে বসে থাকা মহিলার দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। এই সুন্দর গালে টোল পরা হাঁসি, একটু তাকালেই মনে হয় হাঁসিটা যেন ঠোঁট থেকে আস্তে আস্তে চোখের মধ্যে ছড়িয়ে পরেছে, এ যেন বড় চেনা। কিন্তু কার? এই মুখ কি সত্যিই চেনা? কোথায়, কবে দেখা হয়েছিল? অল্প বয়সে এই মুখ নিশ্চিত আকর্ষনিয় ছিল বহু মানুষের কাছে, বয়সের সাথে সাথে মুখে একটু চর্বি জমে গেছে, কিন্তু এই বয়সেও চিবুকের চমৎকার ভাঁজ, ভাসা ভাসা হাল্কা বাদামি রোম্যান্টিক চোখ, অল্প কোঁচকান চুল, এ যেন তার ভীষণ চেনা, বহু আগেকার কোন চেনা মানুষ কিন্তু কে? মধুমন্তী ডুবুরীর মতো তার অতীত স্মৃতির সমুদ্রে ডুব দিয়ে কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের মুখ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। ভদ্রমহিলাও কি কিছু মনে করার চেষ্টা চালাচ্ছেন? মাঝে মাঝে তার দিকেই তাকাচ্ছেন যেন?

এতক্ষণে ট্রেনটা হাওড়া স্টেশানের চৌহদ্দি পেরিয়ে গেছে কিন্তু এখনও বেশ ঢিকির ঢিকির করেই চলেছে। মধুমন্তী এই সময় একটু রিফ্রেশ হবার প্রয়োজন ফিল করল, সেই প্রায় শেষ বিকেলে বাড়ী থেকে বের হওয়া, ট্যাক্সি করে হাওড়া স্টেশান, তারপর আবার অপেক্ষা, কখন ট্রেন প্ল্যাটফর্মে লাগে, তারপর এতক্ষণ ধরে বসে থাকা, এখন একবার যেতেই হবে। তারও তো বয়স গুটি গুটি পঞ্চাশের দিকে পা বাড়িয়েছে, রক্তে চিনির পরিমান বেশ বেশী, মাঝে মাঝেই টয়লেটের দিকে যেতে হয়, বয়সের ধর্ম। ডাক্তার বলেই দিয়েছে যে সুগার কন্ট্রোলে রাখার জন্য ওষুধ খেয়ে যেতে হবে সারা জীবন, এ রোগের কোন পার্মানেন্ট কিওর হয় না। মধুমন্তী কোলের বইটা পাশে রেখে উঠে দাঁড়াল – -- 'সরি, আমি  একটু  বাইরে থেকে ঘুরে আসছি, তারপর আপনার সাথে আলাপ করব'।

মিতালী - 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি আসুন, আমি আর একটু গুছিয়ে বসি। স্যুটকেস্টা সরিয়ে দেব'?

মধুমন্তী - 'না, না, পাশ দিয়ে অনেক জায়গা আছে'।

মধুমন্তী উঠে আস্তে আস্তে হেঁটে সাবধানে স্যুটকেসটা পেরিয়ে কূপ থেকে বেরিয়ে এসে আবার দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। মিতালী আনমনে ঘাড় ঘুরিয়ে মধুমন্তীর দিকে তাকিয়ে ছিল, ভদ্রমহিলার গা থেকে ভারি সুন্দর একটা পাউডারের সুবাস আসছে। মহিলা পেছন ফিরে দরজার দিকে যেতেই সুন্দর করে বাঁধা মাথার খোঁপাটা দেখা গেল, আটকান মাথার কাঁটা গুলো যে বেশ দামি এটা বুঝতে মিতালীর কোন অসুবিধা হোল না, আঙ্গুলের নখে চমৎকার নেল পলিশ। ভদ্রমহিলার সুন্দর ভাবে পরা শাড়ী নতুন বলে কোথাও একটু ভাঁজ পরেছে, বা হাত দিয়ে কামরার দরজাটা টানতেই আঁচলটা একটু সরে গেল, বাঁ কাঁধের ওপর একটা ছোট্ট ট্যাটু, বহু দিনের পুরনো কিন্তু ভালো করে দেখলে আজও বোঝা যায়। এটা দেখে মিতালীর একটা লম্বা শ্বাস পরল, স্বস্তির না অন্য কিছুর কে জানে। মিনিট দশেক পড়ে মধুমন্তী ফিরে এল, মুখে হাতে জল টল দিয়ে বেশ ফ্রেস লাগছে, ততক্ষণে কামরার ভেতরটা একটু অন্যরকম হয়ে গেছে, স্যুটকেস দুটো এখন মহিলার সীটের পাশে রাখা রয়েছে তাতে যাতায়াতের অনেকটা জায়গা বেরেছে।মধুমন্তী ভেতরে ঢোকার পর অন্য মহিলা তাঁর সুন্দর সাদা দাঁতের ঝলকানি দেওয়া হাঁসি হেসে 

বললেন, মিতালী - 'কি, এবার একটু ভালো লাগছে'?

মধুমন্তী - 'উফ, সেই বিকেল থেকে বসে আছি স্টেশানে, ভীষণ চাপ লাগছিল, আমার তো আবার সুগার আছে, বার বার যেতে হয়, এখন অনেক হাল্কা ফিল করছি।

মিতালী - 'সুগার তো তবু ভালো, আমার আবার হার্টে গন্ডগোল, তার ওপর আবার হাঁটুতে বাত, খুব জোরে হাঁটতেও পারি না। আজকে একটু দেরি করে স্টেশানে ঢুকেছিলাম, আর একটু হলে ট্রেনটাই ছেড়ে যাচ্ছিল। সেই জন্য একটু জোরে হেঁটেছি আর তারপর তো দেখলেন, কামরায় ঢুকে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে হাঁপালাম।

মধুমন্তী রুমাল দিয়ে মুখটা মুছতে মুছতে সীটের ওপর বসলো, তারপর পায়ের ওপর একটা পা তুলে দিয়ে আরাম করে হ্যালান দিয়ে বসে প্রশ্ন করলো, 

মধুমন্তী - 'আপনিও একদম শেষ অবধি তো'?

মিতালী - 'না না, আমি নাগপুর পর্যন্ত'।

মধুমন্তী - 'তাহলেও তো অনেকটা দূর, আলাপের অনেক সময় আছে। নাগপুর তো কাল দুপুরে, তাই না'?

মিতালী - 'হ্যাঁ, দুপুর দুটোর পরে'।

মধুমন্তী - 'তাহলে আসুন, বেশ জমিয়ে বসে গল্প করি। এখনই শুয়ে পরছেন না তো? নেক্সট স্টেশান তো সেই খড়গপুর'।

মিতালী - 'এতো তাড়াতাড়ি তো ঘুমোই না। তাছাড়া খড়গপুরে একবার চা তো খেতেই হবে। আমার তো আবার রাতে কিছু খেতেও হবে'।

মধুমন্তী - 'সে তো বটেই। আমার আবার ট্রেনে একদম ঘুম আসে না, একটু ইনসমনিয়া আছে, রেগুলার রাতে ওষুধ খেতে হয়, তবে ট্রেনে খাই না, সকালে খুব শরীর খারাপ লাগে'।

কামরার দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, হঠাৎ কারোর ঢুকে পরার সম্ভাবনা নেই। ট্রেন এখন বেশ জোরেই চলছে, খড়গপুর আস্তে এখনও অনেক দেরি। ওরা দুজনে চুপচাপ বসে আছে, কে প্রথমে শুরু করবে বোধহয় তারই প্রতিক্ষা।

দুজনারই বোধহয় মনের কোথাও একটা খটকা লেগে আছে একটু চেনা চেনা লাগছে কিন্তু কিছুতেই মনে পরছে না।

দুত্তেরিকা বলে মিতালীই শুরু করলো

মিতালী - 'আচ্ছা, আপনি, মানে কোলকাতাতেই মানুষ তো'?

মধুমন্তী - মানে? এখানেই জন্ম, লেখা পড়া, সমস্ত কিছু। বিয়ের পর তো কলকাতার বাইরে চলে গেলাম'।

মিতালী - 'কোথায় পড়াশুনো করেছেন?'

মধুমন্তী - 'যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে, বাংলা অনার্স। আপনি?'

মিতালী - 'ওমা সে কি, আমিও তো। আচ্ছা আমি একটা আন্দাজ করি, আপনি কি মধু, মানে আমাদের মধুমন্তী'

মধুমন্তী দুই হাত সামনে এনে মুখ ঢাকলো, উত্তেজনায় চোখ দুটো বড় বড়, একটু কাঁপা গলায় সে প্রায় চিৎকার করে উঠলো – 'আর তুই আমাদের মিতু, মানে মিতালী, রাইট!'

মিতালী একটু হাসলো, আবার সেই ঝকঝকে দাঁতগুলো ঝলকে গেল।

মিতালী - 'আমি কিন্তু আগেই তোকে চিনেছিলাম। মানে তোর মুখের হয়তো কিছু পরিবর্তন হয়েছে তবু চেনা যায়। তুই যখন ওয়াশরুমে যাচ্ছিলি তখন তো পিঠের ওই ছোট্ট উল্কিটা দেখলাম, সেই যে কলেজের থার্ড সেমেস্টারে আমরা কয়েকজন পুরী বেড়াতে গিয়েছিলাম তখনই তো ওটা করালি।' 

মধুমন্তী - 'ওমা ওটা এখনও আছে? ওটার কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম, ওটার কথা এখন তো আমার এখন তো আমার বাড়ীতে আর কেউ বলে না।'

মিতালী - 'আর ওই বইটা, কলেজে পড়ার সময় শীর্ষেন্দু তোর কি ভীষণ ফেভারিট ছিল, আমরা তো সবাই জানতাম।'

মধুমন্তী - 'আমারো কিন্তু তোর মুখটা ভীষণ চেনা লাগছিল, কিন্তু সেই কলেজের পর তো আর দেখা হয়নি তাই একটু কনফিউসড ছিলাম। তোর হাঁসিটা একদম সেই রকম সুন্দর আছে, সেই স্মাইল যার জন্য যাদবপুরের কতো ছেলে ফার্স্ট সেমেস্টার থেকে তোর প্রেমে পরেছে, আমরা কয়েকজন তো তোর এই হাঁসির জন্য কি জেলাস ছিলাম।'

মিতালী - 'বাপরে! সে সব কতকাল আগেকার কথা। এখন তো পুরনো ছবির অ্যালবাম নিয়ে বসলে নিজেকে আর নিজেই চিনতে পারি না, মুখ টুখ সব কি চেঞ্জ হয়ে গেছে।'

মধুমন্তী - 'আর তোর ওই ছোট্ট জড়ুলটা, কানের ঠিক নিচে। ওটাও তো কি ভীষণ ফেমাস ছিল, ওটা নিয়েও তো কে যেন কবিতা লিখেছিল, নামগুলো সব ভুলে গেছি, কি যেন ... আমল না বিমল কি একটা নাম ছিল।'

মিতালী একটু লাজুক হাসলো। একটু যেন দীর্ঘশ্বাসও পরলো পুরনো কথা ভেবে – 'বাদ দে ওসব কথা, কত কাল আগের। আয় একটু পাশে বসে সেই কলেজের মতো গল্প করি। তোর সাথে কত বছর পড়ে দেখা, তা প্রায় বাইশ তেইশ বছর তো হোল, তাই না।'

মধুমন্তী আস্তে করে উঠে এসে মিতালীর পাশে বসলো, তারপর বললো – 'হ্যাঁ ওই রকম তো হবেই। সেই বিয়ের পর তো এই প্রথম দেখা।'

ট্রেন তখন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে তীব্র বেগে ছুটে চলেছে।

এ. সি. কামরার জানলা বন্ধ, তার বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, মাঝে মাঝে দুরের কোন গ্রামের বাড়ীর বা রাস্তার আলো কয়েক মুহুর্তের জন্য জানলায় এসেই আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। কখনো দূরের কোন টাউনশিপের আলো কালো আকাশের পটভূমিতে অসংখ্য তারার মতো দেখা দিয়েই খানিক পরে দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। একটা ইনটারস্টেট হাইওয়ে অনেকক্ষণ ধরে একটা উজ্জ্বল সরিসৃপের মতো রেল লাইনের পাশে লেপটে ছিল, খানিক পড়ে সেটাও যেন বিরক্ত হয়ে বাঁ দিকে বেঁকে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। দূর থেকে স্ট্রীট লাইট গুলো অন্ধকারে অনেকটা মোমবাতির মতো দেখাচ্ছিল, বোম্বে মেল তাদের হেলায় পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেল।

মিতালী আর মধুমন্তী দুজনে পাশাপাশি বসে জানলার দিকে তাকিয়েছিল। তাদের মন কিন্তু হারিয়ে গিয়েছিল তেইশ বছর আগের কোন সময়ে। জীবন তো বড়ই ছোট, আর তেইশ বছর অনেকটা সময়।

হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে মধুমন্তী সোজা যাদবপুরের বাংলা অনার্সে ভর্তি হয়ে গেল। এই ব্যাপারে বাড়ীতে বিশেষ কোন ডিসকাসান হোল না, বাবা সোমনাথ ঘোষ যাদবপুরের মেকানিকালের ছাত্র ছিলেন। ব্যাস, বাড়ীতে ফতোয়া জারি মেয়েকে ওই যাদবপুরেই পড়তে হবে, যা পাওয়া যায়। আর তাছাড়া বাড়ীও লর্ডস বেকারির কাছে, ওখান থেকে রোজ কলেজে যাতায়াত করতে শুবিধাই হবে।

মধু ভর্তি হোল এবং রোজ যাতায়াত শুরুও করল। প্রথমে যা হয়, কারুর সাথেই বিশেষ আলাপ নেই, কাজেই ক্লাস আর বাড়ী, মাঝে একটু চা আর ভেজিটেবিল চপ। কিন্তু সাত দিন যেতে না যেতেই প্রায় ছ সাত জনের একটা গ্রুপ হয়ে গেল। মধু আর মিতু একই গ্রুপে ছিল। তারপর কয়েক মাস এই রকম ভাবেই কেটে গেল। বাড়ীর শাসন থেকে মুক্ত হয়ে কোএড কলেজে এসে এদের সবাই একটা নতুন জীবন পেয়েছে। এই ভাবে প্রথম সেমেস্টার এলো এবং গেলো। কারো রেসাল্ট ভালো হল কারও বা বাজে, কিন্তু কেউ খুব একটা মাথা ঘামাল না। এর মধ্যে কারও কারও বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়েছে। সেদিন অ্যামিনিটি সেণ্টারে বসে কথা হচ্ছিল,

- 'কি রে, ক্লাস কেমন চলছে?'

- 'দূর বাদ দে, ওই একই, বাংলার পদাবলী। ওই দিকটা দ্যাখ।'

- 'ওয়াও! ওটা শতাব্দী নয়, ও কি সত্যিই প্রেম ট্রেম করছে নাকি?'

- 'ওই যে দ্যাখ, নীল সার্ট পরা ছেলেটা। ওর নাম বানীব্রত, ওর সাথেই তো কয়েকবার দেখেছি।'

- 'ধুর, আরো কয়েক মাস যাক, তারপর দেখিস। ওরকম বন্ধুত্ব তো কলেজে কতোই হয়।'

- 'তাছাড়া শতাব্দী জেভিয়ার্সের মেয়ে, ওর ওরকম টুকটাক বন্ধু প্রচুর আছে।'

- 'আচ্ছা মধু, তোর সেই প্রেমিকের কি হোল?'

- কে, চিতু মানে চিত্য? আরে দূর! ওতো আমার পাঠভবনের বন্ধু, অনেক দিন থেকে চিনি। ভীষন ভাল ছেলে, ওকে ওরকম বলিস না।

- 'আরে খারাপ কি বললাম, আর প্রেম করা কি খারাপ কিছু নাকি? ওর যদি তোকে ভালো লাগেই, তো সেটা খারাপ কিছু নাকি?

- তোরা না ভীষণ বাজে কথা বলিস। আমি অনেক দিন থেকেই কো-এডে পড়ছি... ঠিক আছে? প্রেম আমার কাছে নতুন কিছু নয়। ও সব আমরা ক্লাস টুয়েলভে সিনেমা দেখতে যাবার নাম করে একটু আধটু করেছ্‌, ওই ঢাকুরিয়া লেকে। কাজেই আমাকে প্রেমের নামে আওয়াজ দিও না, কোন লাভ নেই। ফ্যাক্ট হচ্ছে, চিত্য শুধুই বন্ধু, পিরিয়ড।

এই সময় মিতালী হুড়মুড় করে টেবিলে এসে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে লাগলো। মধু ওর দিকে ফিরে একবার দেখল।

- 'কি রে, তোর আবার কি? এতো দেরী কেন? তোদের কি আবার এক্সট্রা টাইম নিয়ে পড়াচ্ছে নাকি?'

- 'না না, ক্লাসের পর একবার লাইব্রেরীতে ঢুকেছিলাম একটা বইয়ের ব্যাপারে, কিন্তু পেলাম না। যাক তোরা তো শুরু করে দিয়েছিস দেখছি, কি খাওয়া যায় বলতো? আমার আবার আজকে মাত্র দশ টাকা বাজেট।'

- 'দূর, রোজ যা খাস তাই খা। গোটা দুই ভেজিটেবিল চপ আর চা।'

- 'হ্যাঁ, দাঁড়া কাউন্টারে বলে আসি।'

মিতালী উঠে গেল কাউন্টারের দিকে। মিনিট পাঁচেক বাদে খাবারের প্লেট হাতে আবার টেবিলে এসে বসলো। অবশ্য ওদের টেবিলে অনেকেরই প্লেটে তখনও আধ খাওয়া খাবার পরে আছে।

মিতালী - 'ওফ, যা খিদে পেয়েছে না। দুটো চপে পেট ভরবে কিনা কে জানে।'

শ্রীপর্না - 'এই মিতু, তোর চপ দুটো একটু বড় কেন? আমাদেরটা দ্যাখ কেমন ছোট্ট ডিমের মতো আর তোরটা কেমন ক্রিকেট বলের মতো, চেঞ্জ করবি? আমারটাও গরম।'

মিতালী - 'অ্যাই, একদম নজর দিবি না। এই খিদের সময় খাচ্ছি তোদের জন্য পেট খারাপ না হয়।'

ঝুমুর - 'অ্যাই মিতু, কাল তোকে সন্ধ্যাবেলায় এইট বি-তে একটা ছেলের সাথে দেখলাম। নতুন কলেজে ঢুকেই প্রেম ট্রেম করছিস নাকি?'

মিতালী চপে একটা বড় কামড় বসিয়ে খানিকক্ষণ চিবাল, তারপর সুরুত করে একটু চা খেয়ে ঝুমুরের দিকে ফিরলো।

মিতালী - ঝুম, বড্ড গোয়েন্দাগিরি করছিস দেখছি। তুই ওখানে কি করছিলি শুনি?'

ঝুমুর - 'আমার আবার কি, ক্লাসের পর একটু আড্ডা দিতে আমরা কয়েকজন একটা চায়ের দোকান খুঁজছিলাম, হাঁটতে হাঁটতে ওদিকে চলে যাই। কথা ঘোরাস না, তোর ব্যাপারটা বল।'

মিতালী - 'কিছুই নয়। আমি লোকনাথ স্টোরে গিয়ে একটা নোটসের খাতা কিনছিলাম, হঠাৎই পুলকের সাথে দ্যাখা, ব্যাস, আবার কি?'

ঝুমুর - 'এই আবার চেপে গেলি, বাজারের পাশের ওই চায়ের দোকানে তোরা চা খাচ্ছিলি আর মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে হাসাহাসি করছিলি, ঠিক কি না?'

মিতালী - 'উফ! হ্যাঁ। কিন্তু তাতে কি? পুলকের সাথে আমার দিনে পাঁচবার দ্যাখা হয়, পাশের জিওলজী বিল্ডিঙে ওদের ক্লাস, রাস্তায় দেখা হলে কথা বলবো না? আর আমি কি রাম গরুরের ছানা যে হাসবো না।'

মধুমন্তী - 'আঃ এবার চাপ। আচ্ছা ঐ ছেলেটাকে দেখেছিস । ঐ যে সবুজ জামা পরা, কেমন আনমনা ভাবে মোগলাই খেয়ে যাচ্ছে, ওর নাম জানিস?

ঝুমুর - 'কেন... প্রেম করবি?'

মধুমন্তী - 'তোর মাথাতে শুধু ঐ। জিজ্ঞাসা করছি কারণ সেদিন দেখলাম গড়িয়াহাট দিয়ে কেমন ক্যাবলার মতো একা হেঁটে যাচ্ছে, বোধহয় ফিজিক্সে ভর্তি হয়েছে।

মিতালী - 'তা গড়িয়াহাটে দেখলি যখন তখন কথা বললি না কেন? ডেকে আলাপ করলেই তো পারতিস।

মধুমন্তী - 'আরে সেরকম কিছু নয়। একা একা ঘুরে বেড়ায় তাই জানতে চাইছিলাম। আর তোরা তো সব টেলিফোন ডাইরেক্টরি সবার ফোন নাম্বার আর বাড়ীর অ্যাড্রেস মুখস্থ।'

শ্রীপর্না - 'বাবা শুধু কি আমরাই, তোকেও তো সেদিন দেখলাম ওই এস. এফ. আই. এর তরুন লীডার নীলুদার সাথে দারুণ আড্ডা মারতে, তারপরে বোধহয় চাও খাওয়াল, ঠিক না?'

মধুমন্তী - 'আরে সেটা ভোটের ব্যাপারে, ক্লাসে এবার হাওয়া কোন দিকে সেটাই জানতে চাইছিল।'

ঝুমুর - 'আর বিমল, ওই যে ঐ পাশে বসে আছে? ওর সাথেও তো তোর বেশ হুঁ হুঁ চলে।'

মধুমন্তী এবার একটু হাঁসলো, তারপর চোখ দিয়ে মিতালীকে দেখিয়ে বললো – 'ওটা ওর জন্য। বিমল মিতালীর সাথে আলাপ করতে চায়। আমি তো মিতুকে বলেইছি, ও তো লজ্জাতে আলাপই করতে চাইছে না।'

মিতালী - 'দ্যাখ তা নয়, সবে তো সেকেন্ড সেমেস্টার, এরপর আরও দু বছর আছে। তাছাড়া বাংলা নিয়ে পড়ছি... এম. এ. না করলে ইভেন টিচিং চাকরীও জুটবে না। কাজেই অনার্স তো পেতে হবে। ও বন্ধুত্ব করতে চাইলে করতে পারে কিন্তু এখনই প্রেম ট্রেম করতে চাই না।'

ঝুমুর - 'আহা একবার আলাপ করে দেখতে পারতিস কেমন ছেলে, ও কুইক কোন ডিসিশান নিতে চাইলেই তো হল না তোরও তো একটা ওপিনিয়ান আছে।'

এই রকম কথা হতে হতেই হঠাৎ বিমল তার টেবিল ছেড়ে এদিকেই এগিয়ে এল।

বিমল - 'হাই, তোরা সব এখানে গল্প করছিস, আমাদের ওই টেবিলে চল না, আমরা অনেকে আছি।

মধুমন্তী - 'আমাদের বেশী টাইম নেই রে, খেয়েই উঠে পড়ব, খুব ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে। চারটের পর আমি ফ্রি, তারপর আর ক্লাস নেই, তখন জমিয়ে আড্ডা দিতে পারি।

বিমল - 'আমি সাড়ে চারটেতে ফ্রি, তাহলে পৌনে পাঁচটায় এখানেই? কি রাজি? ঝুমুর, মিতালী, শ্রীপর্না, তোদের কি অবস্থা? কতক্ষণ ক্লাস আছে? ঝুমুর। আমরা সবাই  বাংলা   অনার্স  যদিও স্পেশালাইজেশান আলাদা 

আলাদা, আর এখন তো সবই কমন সাবজেক্ট, কাজেই আমরাও সবাই এসে যাব।

বিমল - 'ঠিক আছে, তাহলে ঐ কথাই রইল।'

সে আবার নিজের টেবিলে ফিরে গেল। ওরাও যে যার চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে পড়ল।

আবার বাস্তবে। মধুমন্তী বা মিতালীর সেই উনিশ কুড়ি বছর বয়সের স্মৃতি ছেড়ে এই প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই জীবনে। ট্রেন মাঝে মাঝে কর্কশ শব্দে হর্ন দিতে দিতে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে সামনের দিকে ছুটে চলেছে। অনেকটা মানুষের জীবন যেমন ভবিষ্যতের দিকে ধেয়ে যায়, সেই রকম। জানলার বাইরে শুধু অন্ধকার, মাঝে মাঝে রেলওয়ের পোস্ট থেকে আলোর তীর এসে কামড়ার মধ্যে ঢুকছে আবার মুহুর্তে ট্রেন সেই আলোর রেখাকে পিছনে ফেলে রেখে অন্ধকারে ঢুকে পরছে। ওরা দুজনে চুপচাপ পাশাপাশি বসে আছে, কিন্তু দুজনার মন আজ হঠাৎ যেন কোন ফেলে আসা অতীতে হারিয়ে গেছে, এ যেন বস্তবে থেকেও সময়ের নদীতে উজান বেয়ে চলা।

আরো কত স্মৃতি। ওরা দুজনে এবার আস্তে করে দুজনার দিকে ফিরলো। দুজনার চোখে এক অদ্ভুত দুতি।

মিতালী - 'আচ্ছা মধু, তোর সেই সব দিনের কথা মনে পড়ে?'

মধুমন্তী - 'এখন বড়ই পড়ছে জানিস, কিন্তু বাড়ীতে এত ব্যস্ত থাকি যে এসব কথা ভাবার মতো সময় বার করতে পারি না, তোর সাথে আমাদের পুরনো কারোর যোগাযোগ আছে?'

মিতালী - না, সেই যে বিয়ে হয়ে কলকাতার বাইরে চলে গেলাম। ব্যাস, হয়ে গেল। শ্রীপর্না বলেছিল যে রেগুলার ফোন করবে, কিন্তু কোথায়? বোধহয় বার দুয়েক করেছিল সেই সময়। তারপর আর কি হল, কোন ফোন পাই নি। আর তখন তো মোবাইলের যুগ ছিল না। পাশের বাড়ী থেকে ফোন করতাম বা রিসিভ করতাম। ওকে ফোন করার ইচ্ছা থাকতো কিন্তু লজ্জায় আর পাশের বাড়ীতে গিয়ে করা হয়ে ওঠে নি। তাছাড়া তখন প্রথম বিয়ে হয়েছে একটু মানিয়ে চলার ব্যাপারও ছিল। তারপর যখন একটু গিন্নি হলাম, ততদিনে পর্নার ফোন নম্বর কোথায় হারিয়ে গেছে। তোর কি অবস্থা?

মধুমন্তী - 'ওই একই অবস্থা। তখন তো চিঠির যুগ, বাড়ীতেও চিঠিই লিখতাম। তোদের সবার অ্যাডড্রেস তো ছিল না। হঠাৎ বিয়ে ঠিক হল, তাড়াতাড়িতে যাদের কাছে পেয়েছিলাম তা সঙ্গে ছিল, তোর ও তো প্রায় আমার এক মাসের মধ্যেই ঠিক হল। তুই তো আবার ওই সময় ম্যালেরিয়ায় ভুগছিলি, তোর সাথে কলকাতা ছেড়ে যাবার আগে আর দেখাই হল না। ঝুমুরকে কয়েকটা চিঠি দিয়েছিলাম, ও উত্তরও দিয়েছিল। ওর চিঠিতেই শুনেছিলাম যে পর্না আর অভিষেকের মধ্যে একটা সিরিয়াস প্রেম চলছে। ওরা বিয়ের জন্যও রেডি, কিন্তু পর্নার বাবার নাকি ভীষন আপত্তি। তারপর কি হল জানি না, কারণ গোটা তিনেক চিঠির পর ঝুমুর উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দিল, বোধহয় ওর ও বিয়ের কথা চলছিল কোন এক এন. আর. আই. ফ্যামিলির সাথে, ও বোধহয় বিয়ের পর আমেরিকা চলে গিয়েছিল। আর কারোর কথা জানি না।

মিতালী - 'তোর ওই উল্কিটা দেখে মনে পরলো, আমাদের সেই পুরী ট্রিপটার কথা মনে আছে? ওখানেই তো তুই ওটা করালি, তারপর তোর সে কি ভয়। বাবা রেগে যাবে!

মধুমন্তী একটু হাসলো – 'বাবাঃ, মনে থাকবে না। আমরা বোধহয় পাঁচ কি ছয়জন মেয়ে আর প্রায় সাতজন ছেলে একসাথে ট্রেনে, সে কি হল্লা। পাশের কামড়ার লোকজন তো রেগে অস্থির। তোর মনে আছে হোটেলে গিয়ে রাত্রে ওরা কি করেছিল?

মিতালী - 'তা আর থাকবে না। রাত্রে সমুদ্রের ধারে বসে ড্রিঙ্ক করার ফন্দিটা তো অজয়ের ছিল। তা এতো খেলো যে পুলক আর অত্রীকে তো পাঁজাকোলা করে হোটেলে নিয়ে আসতে হয়েছিল। তাও একটা গার্ড সমুদ্রের ধারে এসে না পরলে ওরা তো ওই অবস্থায় জলে চান করতে নাবতো, আমার যা ভয় করছিল, ওই অবস্থায় নাবলে নিশ্চয়ই পুলকটা ডুবে যেতো।

মধুমন্তী - 'হু... আর একটা ব্যাপার কিন্তু বাদ দিয়ে গেলি। বিমলের প্রেম নিবেদন?

মিতালী। ওর কথা ছাড়, ওটা একটা পাগল ছিল। বলে তুমি বললেই কালীঘাটে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করবো। বাবার কাছে যাবার সাহস নেই কারণ ডিগ্রি পেতে অনেক দেরী, চাকরিই বা কে দেবে। বাবা তো এক কথায় হাঁকিয়ে দিত, তাই কথায় কথায় কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, এই সব।

মধুমন্তী - 'সে তুই যাই বল, ও কিন্তু তোকে সত্যিই ভালবাসত।'

মিতালী - 'হতে পারে, কিন্তু ভেবে দ্যাখ তখন আমাদের সবে সেকেন্ড ইয়ার, অত তাড়াতাড়ি কোন ডিসিশান নেওয়া যায় না। সবে তো তখন কলেজে ঢুকেছি। আর বাবা আগেকার দিনের রাশভারী লোক, তার ওপর স্কুল টিচার পড়াশুনো শেষ না করে বিয়ের কথায় কান দিতেন না।

মধুমন্তী - 'সে তো ঠিকই, বাদ দে ওসব কথা, কবে চুকে গেছে। আচ্ছা তোর সেই স্প্রিং ফেস্টটার কথা মনে আছে, সেটাও তো বোধহয় সেকেন্ড ইয়ারেই, সেকেন্ড সেমেস্টার। যেবার স্টুডেন্টস ইউনিয়ন থেকে আমাদের ভলান্টিয়ার করেছিল?

মিতালী - 'ওঃ মাই গড! দারুণ মনে আছে। কি এনজয়ই না করেছিলাম। লেডিস হস্টেলে সারারাত জেগে নানা পোস্টার লেখা। আর ঘন্টায় ঘন্টায় বাইরে এসে ওই ছেলেদের গ্রুপে বসে চা খাওয়া আর আড্ডা। ওরা তো ইউনিয়ান রুমে রীতিমতো পার্টি করছিল কিশোর কুমারের গান আর নাচ। অবশ্য কাজও ছিল অনেক ওই পোস্টার গুলো টাঙানো সারা ইউনিভার্সিটি জুড়ে, কোথায় কি অনুষ্ঠান তার সুচি লিখে সেঁটে 

দেওয়া। তাও আবার সারা ক্যাম্পাস জুড়ে, আর্টস, সায়েন্স আর ইঞ্জিনীয়ারিং সব প্রমিনেন্ট জায়গায়। তার পরের দিন যখন গেলাম তখন বাবা ভয়ঙ্কর রেগে গিয়েছিল।

মধুমন্তী - 'আমার বাবা তো দুদিন কথাই বলে নি। তবে মা সামলে দিয়েছিল।'

মিতালী - 'আর যূথীর জন্মদিনের পার্টি? মনে আছে? বাপ সে কি নাচ! সৈকত আর প্রশান্ত তো টেবিলের ওপর উঠে নাচতে শুরু করলো। তাও সেদিন শনিবার, কোন ক্লাস নেই। আমরা ভেবেছিলাম কোন প্রফ ডিপার্টমেন্টে আসে নি। ও বাবা স্বয়ং হেড এসে হাজির । মঞ্জুলীকাদি কিন্তু একদম রাগেন নি। সব দেখে একটু হেসে চলে গেলেন, শুধু বলেছিলেন – শব্দটা একটু কম করিস।'

মধুমন্তী - 'ভীষণ ভাল টীচার ছিলেন মঞ্জুলীকাদি, আর কি ভাল মানুষ। ওনারা নিশ্চয়ই কবেই মারা গেছেন।'

মিতালী মধুমন্তীর দিকে তাকিয়ে একটু মাথা নাড়ল, তারপর নিজের স্যুটকেসের বাইরের ফ্ল্যাপটা খুলে একটা ছোট্ট টিফিন বক্স বার করলো।

মিতালী - 'আয় মধু, সেই কলেজের মতো আমরা খাবারটা ভাগ করে খাই।'

এই বলে মিতালী বক্সটা খুললো। ভিতরে খুব সাধারণ কিছু

খাবার। গোটা তিনেক পরোটা আর আলু পেঁয়াজের তরকারি। মধুমন্তী একটু হাসলো – 'তোর সেই পরোটা ভালোবাসা আর গেল না । তোর মনে আছে, সেই যে যাদবপুরের সায়েন্স ফ্যাকাল্টীতে ঢোকার গেটের ঠিক অপোসিটে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান ছিল, সেখানে আরও অনেক কিছুই পাওয়া যেত।'

মিতালী - 'হ্যাঁ হ্যাঁ, জানি কেস্টদার দোকান। আমরা মজা করে কেস্টদার কেবিন বলতাম। ওখানে সেই পরোটা আর একটু ঝোল ঝোল আলুর তরকারি, ওঃ এখনও মুখে লেগে আছে।'

মধুমন্তী - 'সেই কতবার যে খেয়েছি, বসার তো জায়গা ছিল না, ছোট্ট দোকান কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়েই মেরে দিতাম। বিকাল পাঁচটার পর গরম পরোটা ভাজত, ওখানে দাঁড়াবার জায়গা থাকত না।'

মিতালী এক টুকরো পরোটা ছিঁড়ে তরকারির সাথে মুখে দিল, তারপর বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে চিবতে চিবতে মুখের ফাঁক দিয়ে বললো – 'তবে এই পরোটা কিন্তু একদম ঠান্ডা ,আয় আর দেরি করিস না। হাত লাগা, ভালোই লাগবে, আজ দুপুরে নিজেই বসে বসে রান্না করেছি।

মধুমন্তীর একটু অসুবিধে হচ্ছিল, ট্রেনে হাত ধোবার অসুবিধা থেকে বলে সে খুব কিছু খায় না, খেলেও শুকনো কিছু সঙ্গে রাখে। এখন আবার ওয়া রুমে যেতে তার ভালো লাগছিল না, সে বোতলের জলে হাতটা একটু ভিজিয়ে নিল।

মধুমন্তী - 'মিতু, আমার কিন্তু একটুও খিদে নেই, বাড়ী থেকে প্রচুর কিছু খেয়ে এসেছি, তাই সামান্যই খাব। শুধু তোর অনারে, তোর হাতের রান্না বলে।'

মধুমন্তী খানিকটা পরোটা ছিঁড়ে তরকারির সাথে মুখে দিল। বেশ ভালো স্বাদ। পরোটাটা ময়েন দেওয়া, বেশ ঝুরঝুরে, খানিকটা নিমকির মত, তরকাড়িটায় টক, ঝাল আর মিষ্টির সুন্দর ব্যালান্স, তার ওপর ধনে পাতার গন্ধটা দারুণ ম্যাচ করছে।

মিতু গোগ্রাসে কিছুক্ষণ খেল, তারপর মধুর দিকে তাকিয়ে বললো – 'কি রে, আর নিলি না যে? ভালো লাগলো না?'

মধু চুপচাপ জানলার বাইরে গাঢ় অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বসেছিল। তার বার বার মনে পড়ছিল যাদবপুরে ও আর মিতু কতবার এই পরোটা বা ভেজিটেবিল চপ এক প্লেট থেকে ভাগ করে খেয়েছে। মিতুর কথায় সে ঘার ফেরাল, তারপর আর এক টুকরো পরোটা আর তরকারি নিয়ে মুখে পুরলো।সত্যিই দারুণ রেঁধেছে মেয়েটা, ওর নিজের হাতের রান্না অতটা ভালো নয়। পরোটাটা আরামে পেটোস্থ করে মধু মিতুর দিকে তাকিয়ে বললো – 'আর নয় মিতু, আমার পেটে আর জায়গা নেই, তুই বাকিটা শেষ কর। আমি হাতটা ধুয়ে আসি।'

মধুমন্তী ওয়াস রুমের দিকে চলে গেল। মিনিট দশেক পড়ে মিতালীরও খাওয়া শেষ। সে বাথরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে এসে আবার সিটে বসলো। আবার দুই বন্ধু মুখোমুখি দুই চেয়ারে।

মিতালী - 'এসব তো অনেক হল, আচ্ছা এবার তোর কথা কিছু বল। আমি তো তোর খবর কিছুই জানি না। কোথায় আছিস, কেমন বর্‌, কেমন সংসার!

মধুমন্তী খানিক্ষণ চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। যাদবপুরের জীবন শেষ হবার পর তার জীবন অনেকটা বয়ে গেছে। স্বচ্ছল ফ্যামিলির জয়ন্তর সাথে বিয়ে হবার পর তার জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু। তারপর নানা চড়াই উৎরাই পার হতে হয়েছে। এখানে, এই ট্রেনের কামরায় সমস্ত কিছু উজাড় করে বলা হয়তো সম্ভব নয়।

মধুমন্তী - 'আর কি, সবার যেমন যায়। বিয়ে হল, তুই তো এলি না, মানে তোর তো আসার মত শরীরের অবস্থা ছিল না। তারপর পরীক্ষা, যদিও তোর সাথে ঐ সময় কয়েকবার দেখা হয়েছিল কিন্তু তখন তো আমরা সবাই এম. এ. ফাইনালের জন্য দারুণ ব্যাস্ত। পরীক্ষা যেই শেষ হল, ব্যাস, ওর সাথে সোজা দিল্লী মানে ওর কর্মক্ষেত্রে। ওদের ফ্যামিলির ফার্ম, সারা ভারতে নানা ফার্মে অডিট করে বেড়ায়, ওটাই ওদের বিসনেস। সেই রকম এখনো চলছে, এখন অবশ্য আমরা কয়েক বছর বোম্বেতেই আছি।

মিতালী - 'আর অন্য সব, বাচ্চা কটা?'

মধুমন্তী। একটা ছেলে, একটা মেয়ে, মেয়েই বড়।'

মিতালী একটু মুচকি হাসল। তারপর বললো - 'বাঃ, বেশ গুছিয়ে নিয়েছিস তাহলে। খুব ভাল। আমি কিন্তু পরে তোর বিয়ের সব খবর শুনেছিলাম, ঝুমুর, শ্রীপর্না ওদের কাছ থেকে। দারুণ হিংসে হয়েছিল জানিস, হ্যান্ডসাম বর, স্বচ্ছল শ্বশুরবাড়ি, একটা মেয়ে আর কি চায়। মধুমন্তী একটু  হাসল,  মিতু  ব্যাপার গুলো  একটু বেশী সরল করে নিচ্ছে। এটা ঠিকই যে তার বিবাহিত জীবনের 

শুরুটা হয়েছিল বেশ ভালোভাবে, ঐ যে বাংলায় যাকে বলে সোনায় সোহাগা, মুখে কানে মধু দেওয়ার পর যেন সব কিছুই মিষ্টি। কিন্তু আজ জীবনের এই জায়গায় এসে সে বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না যে তার জীবনের সব কিছুই হিংসে করার মতো। একটু থেমে সে বললো – 'মধুমন্তী, আচ্ছা আমারটা তো শুনলি, এবার তোর কথা কিছু বল। তোরও তো আমার বিয়ের একমাসের মধ্যেই বিয়ে হল। যদিও আমি নতুন বিয়ে হওয়ায় যেতে পারিনি।' 

মিতালী এবার একটু বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। একদিকে মধু, যার জীবন ফুলে ফলে ভরানো, স্বামী, সন্তান, হাই সোসাইটিতে ঘোরাফের্‌ তাছাড়া গাড়ী বাড়ী তো বহুদিন থেকেই আছে। তার নিজের ফ্যামিলি যদিও মোটের ওপর স্বচ্ছল। বাবা নিজে খোঁজ খবর নিয়েই বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটাও ঠিকঠাক গেল না, জীবনটা শুরু তাও মন্দ হয়নি। কিন্তু মাঝ বয়সে আসার আগেই কেমন ওলট পালট হয়ে গেছে।

মিতালী - 'আমার ব্যাপারটাও প্রায় তোরই মতো। বাবা সব ঠিকঠাক করলো, দুম করে বিয়েটা হয়ে গেল, আমার তো নিজের কোন মতামত ছিল না। আমাদের ফ্যামিলি একটু সেকেলে, মেয়েদের মতামত খুব একটা নেওয়া হয় না।'

মধুমন্তী - 'ওই পরীক্ষার ব্যস্ততায় তোকে তো কিছু জিজ্ঞাসা করা হয় নি, কিন্তু রিক্তা, শম্পা, এদের তো জানিস, মোটামুটি গেজেট। ওদের কাছ থেকেই শুনেছিলাম যে তোর বরও বেশ বড় ইঞ্জিনীয়ার, বেশ বড় ফার্মে চাকরী করে। কিছু তো বল।'

মিতালী -'বড় ফার্ম আর কি, সিভিল ইঞ্জিনীয়ারিং ডিসিপ্লিনে গ্র্যাজুয়েট করে কলকাতায় মোটামুটি একটা চাকরী করছিল। কয়েক বছর এক্সপেরিয়েন্স হয়ে গেলে কলকাতার বাইরে চলে যায়। ততদিনে অবশ্য আমার সাথে বিয়ে হয়েছে, তাই আমিও ওর সাথে চলে গেলাম।'

মধুমন্তী - 'তারপর, আর কি? ইস্যু কটা?'

মিতালী - 'একটাই, মেয়ে, শর্বরী। এই তো হায়ার সেকেন্ডারী পাস করে কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে।'

এই সব কথা বলতে বলতে ওরা খেয়াল করে নি যে ট্রেনের গতি কমে আসছিল। গাড়ী ক্রমশ আরও স্লো হয়ে এল। খড়গপুর জাংশান। গাড়ী খড়গপুরের বিশাল লম্বা প্ল্যাটফর্মে ঢুকে আস্তে আস্তে স্থির হয়ে দাঁড়াল। রাত বেশ হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও প্ল্যাটফর্মে বেশ কিছু যাত্রী রয়েছে, গাড়ী ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। প্রত্যেক কামড়ার এনট্র্যান্সের সামনে ছোটখাট একটা করে লাইন তৈরী হল। একই সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে নানা ভেন্ডার নানা রকম জিনিস বিক্রির জন্য কামড়ার মধ্যে ঢুকে এল। সেই সঙ্গে সেই মধুর ডাক – চায় গরম।

মিতালী আর মধুমন্তী এর জন্যই বসেছিল, ওরা কামড়ার দরজা খুলে করিডোরে উঁকি মারলো। মিতালীই প্রথমে ডাক দিল – 'এই চা, এদিকে এসো,এই যে এদিকে।'

দুজনে দু কাপ চা নিয়ে আবার দরজা বন্ধ করে বসল। এই সব স্টেশানের চায়ের একটা বেশ আমেজ আছে যেটা বাড়ীর চায়ে পাওয়া যায় না, বেশ গাঢ় এবং একটু কষা, বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাওয়ার মতো।

এর মধ্যে আবার গাড়ী ছেড়ে দিয়েছে। আস্তে আস্তে খড়গপুর স্টেশান পিছনে পড়ে রইল। ট্রেন আবার তার গতি বাড়িয়ে অন্ধকারের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

তারপর আর বেশী কথা হল না, দুজনাই একটু ক্লান্ত বোধ করছিল, তাছাড়া আবার কালকে সকালে উঠতে হবে। চা খাওয়া হয়ে গেলে ওরা আরো কিছুক্ষণ সেই যাদবপুরের স্মৃতি চারণ করে একবার করে টয়লেটে গেল। তারপর কালকে আরও কথা বলার প্রতিজ্ঞা করে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। 

শুয়ে পড়ে মধুমন্তীর তখনই ঘুম এল না। একে তো তার ঘুমের একটা প্রবলেম আছেই, তার ওপর আবার কোন ওষুধ খাওয়া হয়নি। ট্রেনে সে এমনিই ওষুধ খায় না যদি সকালে উঠতে কোন অসুবিধা হয়। আজ আবার মনের মধ্যেও হাজার জোনাকির উড়াউড়ি। আজ এতদিন পড়ে সেই কলেজ জীবনের এক হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর দেখা। তার কত খুশী হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে কেমন যেন সব পানসে লাগছে, কেমন যেন একটা হেরো হেরো ভাব। মিতালী বোধহয় তার দামি শাড়ী, মোটা সোনার চেন দেখে তাকে দারুণ হ্যাপী ভেবেছে। তার ফ্যামিলিতে বড় গাড়ী, টাকার কোন অভাব নেই কিন্তু সেটা বড় চাদর, তার তলায় ঢাকা অনেক ময়লা।

প্রথম যখন তার বিয়ে হল তখন বড়ই ভালো লেগেছিল।. বড় লোক শ্বশুরবাড়ী, গাড়ী, বাড়ী। সারা ভারতের নানা জায়গায় ফ্যামিলি বিসনেস ছড়ানো। প্রথম প্রথম স্বপ্নের মত দিন কাটছিল। বিয়ের পরে অবশ্য মাত্র দিন দশেক শ্বশুরবাড়ীতে ছিল, তারপর আবার কলেজে যাতায়াত কারণ পরীক্ষা সামনে এম. এ. ফাইনাল। সে যাই হোক, মাস চারেকের মধ্যে সব মিটে গেল আর তারপর সে তার স্বামী জয়ন্তর সাথে দিল্লী। তখন সেটাই তার কর্মস্থল। বিয়ের প্রথম কয়েকটা বছর কিন্তু কেটেছিল চমৎকার হাসিখুশি স্বাস্থবান স্বামী, অঢেল ফ্যামিলি ইনকাম, দিল্লীর বাঙালী সারকেলে এই ফ্যামিলির বেশ সুনাম। উইক এন্ড হলেই গাড়ীতে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, মাসে একটা দুটো গেট টুগেদার বা পার্টি তো লেগেই থাকত, এছাড়া কারো জন্মদিন বা কারো ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি, এসব ইনভাইটেশান প্রায়ই আসত। কিন্তু সম্ভারের সাথে সাথে এল আরো অনেক কিছু। সেই হ্যান্ডসাম স্বাস্থবান জয়ন্ত একটু একটু করে পালটে যেতে লাগল। আগে যেমন অফিসের কাজ হয়ে গেলেই গাড়ী চালিয়ে সোজা বাড়ী আসতো তা আস্তে আস্তে পালটে গেল। অফিসের পর কোথাও আড্ডা মেরে জয়ন্ত ফিরত। মাঝে মাঝে সেটা রাত দশটা পেরিয়ে যেতে লাগল। তখন মধুমন্তীর ছোট্ট দুটো বাচ্চাও হয়ে গেছে। বড় মেয়ে পার্বতী আর তার থেকে বছর দেড়েকের ছোট ছেলে বিশ্বজিৎ। যতদিন যেতে লাগল ততই কিন্তু জয়ন্ত বেপরোয়া হয়ে যেতে লাগল। প্রথমে শুধু বন্ধুদের সাথে আড্ডা, তারপর তাস আর মদ। ফিরতে ফিরতে মাঝরাত পেরিয়ে যেতে লাগল। বাবা মা সবাই কলকাতায়, কাজেই লাগাম দেওয়ার কেউ নেই। মধুমন্তীর শাসন, বকুনি, চোখের জল কিছুই কোন কাজে এল না। অ্যাকাইন্টস আর অডিটিং এর ব্যবসা যতই ফেঁপে উঠছিলো ততই জয়ন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠতে লাগলো। বাচ্চাদের খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পারিয়ে ক্লান্ত দুটি চোখে রাত জাগা আর অন্ধকারে চোখের জল ফেলা, এটাই তখন মধুমন্তীর রোজকার কাজ। আর মাঝ রাত্রে নেশায় সম্পূর্ন মাতাল হয়ে তার ভেরী সাকসেসফুল স্বামীর টলতে টলতে অ্যাপার্টমেন্টের সিড়ি দিয়ে ওপরে ওঠায়

সাহায্য করা যাতে বেশী শব্দে পড়শীদের ঘুম না ভাঙে। এটাও না হয় মানা যেত। কিন্তু জয়ন্তর নিচে নামার আরও বাকি ছিল। সেটাও ঘটলো। তার নামে অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক রাখার কথা দিল্লীর বাঙালী মহলে ছড়িয়ে পড়ল। তাও আবার নিজের অফিসের সেক্রেটারির সাথে।অবাঙালী মিষ্টি একটা মেয়ে, নাম প্রিয়াঙ্কা। মিষ্টি কিন্তু বোধহয় একটু বেশী মিষ্টি, বড় বেশী উজ্জ্বল আর ডেয়ারিং। মাঝে মাঝে অফিসের কাজে দিল্লীর বাইরে তো যেতেই হত, কাজের এক্সকিউস দিয়ে সেক্রেটারিও যেত।সেখানেই সম্পর্কটা খুব কাছের হয়ে দাঁড়িয়েছিল, শারীরিক হয়ে গিয়েছিল। নিজেদের ফ্যামিলির ফার্ম কাজেই কারুর কোন বাধা দেওয়ার ব্যাপার ছিল না। মধুমিতা প্রথম প্রথম খুব একটা পাত্তা দেয় নি। ওরকম তো কতই শোনা যায়, তার ওপর হাই ফ্লাইং কনসাল্ট্যান্ট,নলোকের জেলাসি তো থাকবেই। কিন্তু ব্যাপারটা ওখানেই শেষ হল না। যখন একটা ট্যুরে গিয়ে তিন দিনের কাজের শেষে ওরা দুজন সিমপ্লি ভ্যানিস করে গেল একটা উইক এন্ডে। সোমবার জয়ন্ত ফিরেও এল। মুখে সেই এক কথা – আরে, কাজের ব্যাপারে কি আর অত দিন মেপে চলা যায়, এক দু দিন এক্সট্রা লাগতেই পারে। কিন্তু ততদিনে মধুমন্তীও অনেক সেয়ানা হয়ে গেছে, দুই বাচ্চার মা, তার ওপর বয়স প্রায় চল্লিশ ছুঁইছুঁই। জয়ন্তর গালের, গলার আর ঠোঁটের ছোট কাটা দাগ, জামা কাপড়ে লেগে থাকা মেয়েদের লম্বা চুল সব কিছুই এক দিকেই ইঙ্গিত করছে। মধুমন্তী সেই দিনই কলকাতায় তার শ্বশুর শাশুড়ির সাথে যোগাযোগ করল। ওনারা অবশ্য কিছুই জানতেন না। পনের দিনের মধ্যে ওনারা কলকাতা থেকে দিল্লী এলেন। অফিসের অন্যান্য এক্সিকিউটিভদের সাথে ডিসকাস করে ওনারা জয়ন্তকে ইমিডিয়েটলি মুম্বাইতে পাঠিয়ে দিলেন, ওখানেও একটা অপেক্ষাকৃ্ত ছোট অফিস ছিল। সেটা মধুমন্তীর জীবনে একটা বিশাল দিকদর্শন। সমস্ত জীবনটা ওলট পালট করে দেবার মতো। সেই থেকে মধুমন্তী এবং জয়ন্ত সঠিক অর্থে আর স্বামী স্ত্রী রইল না, কিন্তু তারা এক ছাদের তলায় বাস করতে লাগল, সংসারটা ভাঙল না শুধুমাত্র বাচ্চা দুটোর জন্য, তাদের বয়স তখন প্রায় চোদ্দ আর বারো বছর। অবশ্য এতো ঘটনার পরেও জয়ন্ত খুব একটা পালটাল না, অফিসের পড়ে তার তাস আর ড্রিঙ্কসের আসর চলতেই থাকল, মুম্বাই তো নাইট লাইফের জন্য বিখ্যাত যদি পকেটে টাকা থাকে আর ঐ একটা জিনিস জয়ন্তর পকেটে প্রভূত পরিমানেই ছিল।

আজকে মিতালীকে দেখে মধুমন্তীর বড় ভাল লাগলো। কি সুন্দর মাথায় বড় করে সিঁদুর দিয়েছে, মুখের মধ্যে এখনও কেমন একটা খুশীর জ্যোতি। সেই কথায় কথায় এক মুখ হাঁসি। সাদা দাঁতগুলো এত সুন্দর যেন বাঁধানো, নিশ্চয় স্বামী সংসার নিয়ে দারুণ সুখী মিতালী। এতদিন পরে প্রিয় বন্ধুর সাথে দেখা হওয়া সত্ত্বেও মধুমন্তীর মনে কিসের যেন একটা শুন্যতা। কোথাও একটা হেরে যাবার বেদনা, আজ সত্যি সত্যিই তার ঘুম এল না। 

ঘর অন্ধকার। ট্রেন সমানে কোন অন্ধকারের হাতছানিতে এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলেছে। এই রকম সময় মিতালীর দারুণ একটা আমেজ আসে। তাকে ঘুমের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ঘুম নিজেই এসে তার চোখে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু আজ তার ব্যতিক্রম। মিতালী চোখ বুজে অনেকক্ষণ ধরে ঘুমের আরাধনা করে গেল কিন্তু আজ আর ঘুমের দেখা নেই। মাথাটা যেন একটু দপ দপ করছে, প্রেসারটা বেড়ে গেল কিনা কে জানে।

আজ এতদিন পরে মধুমন্তীকে দেখে এত ভালো লাগল।সে আর মধু যাদবপুরে ভীষণ ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল। মধুর বিয়ের সময় সে অসুস্থ ছিল তাই যেতে পারে নি, কিন্তু বিয়ের পর যখন মধু ফিরলো তখন জোর একটা আড্ডা মারার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এম.এ. ফাইনাল ঘাড়ের ওপর এসে যাওয়ায় সেরকম কোন সুযোগ পাওয়া যায় নি। তা সে পরীক্ষাও শেষ হল। কিন্তু ও হরি, পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই মধু হাওয়া,প্রথমে কয়েকদিন শ্বশুরবাড়ী তারপর সোজা দিল্লী একবার জানিয়েও গেল না, ঠিকানা তো নয়ই। এই শেষের দু সপ্তাহের কথা তো সে ওই শ্রীপর্না, ঝুমুর এদের কাছ থেকে শোনা অথচ মধু তার কত কাছের বন্ধু। ভীষণ অভিমান হয়েছিল। আর রাগ। ভেবেছিল আর সারাজীবন ওর সাথে কোন রকম যোগাযোগ রাখবে না। মধুর শ্বশুরবাড়ীর আর দিল্লীর ঠিকানা সে শ্রীপর্নার কাছ থেকে জোগাড় করেছিল কিন্তু কোন চিঠি লেখেনি। আজ অবশ্য এই ঠিকানার কথা সে মধুকে বলেনি, সে সব অনেক দিনের কথা, এখন এইসব রাগ অভিমানের কথা এখন এই বয়সে আর তুলতে ইচ্ছে করে না।

আর তার জীবনও তো অনেক ওঠা-পড়ার মধ্যে দিয়ে গেছে।

বাবা বিয়ে ঠিক করেছিলেন। অনেক দেখে শুনে, ছেলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনীয়ার। মোটামুটি ভালো অবস্থা, কলকাতায় একটা ছোট বাড়ী, একটা চাকরী। এই রকম পাত্র মিতালীদের বাড়ীর যা অবস্থা তাতে ভালোই বলতে হবে কারণ মিতালীর বাবা একজন স্কুল টীচার, তাঁর পক্ষে এর থেকে বেশী সম্ভ্রান্ত কোন ফ্যামিলির সাথে মেয়ের বিয়ে ঠিক করা সম্ভব ছিল না। মিতালী কোন আপত্তি করে নি, সেটা তার স্বভাবও না। বিয়ের প্রথম বছরগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। প্রবীর কলকাতার বিড়লা টেকনিক্যাল সার্ভিসেস – এ জয়েন করেছিল। মল্লিক বাজারের মোড়ে অফিস, প্রথম কয়েক মাস সেখানেই ছিল। তারপর তাকে দূর্গাপুরে সাইটে পাঠিয়ে দিল। এই সময় তার সবে বিয়ে হয়েছে। মিতালী প্রথম প্রথম তার কলকাতার শ্বশুরবাড়ীতেই রয়ে গেল, প্রতি শুক্রবার প্রবীর বাড়ী আসত আবার সোমবার সকাল পাঁচটায় সোজা হাওড়া হয়ে দূর্গাপুর। এই ভাবে মাস পাঁচেক যাওয়ার পর প্রবীর দূর্গাপুরেই একটা ছোট্ট বাড়ী ঠিক করল আর মিতালী খুশির ভেলায় ভাসতে ভাসতে প্রবীরের সাথে থাকতে ওখানে সিফট করে গেলো। শুরুটা ভালোই হল। ওখানে প্রবীরের নানা কলীগের সাথে আলাপ। তাদের ফ্যামিলির সাথে জানাশোনা, প্রায় প্রতি উইক এন্ডেই কোথাও না কোথাও পার্টি, খাওয়া দাওয়া, ওয়েদার ভালো থাকলে কারো বাগানে বা পার্কে গ্রিল এন্ড স্টেক পার্টি। দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো, যাদবপুরের কলেজ লাইফ থেকে আলাদা কিন্তু তাও দারুণ। মিতালী নিজেকে সত্যিই বড় সুখী ভাবতে শুরু করেছিল। কিন্তু এত সুখ কি আর সয়। প্রবীর সাইট ইঞ্জিনীয়ার ছিল, সেটাই তার অফিসিয়াল

ডেসিগনেশান, কিন্তু কেমন করে যেন তার ইনকাম বাড়তে লাগলো। মাইনে তো আছেই সেই সঙ্গে মাসের নানা সময়ে টাকার বাণ্ডিল বাড়ীতে আসতে শুরু করলো। সেই সঙ্গে জীবনে এল লাক্সারি আর অন্যান্য অনুসংগ। প্রবীর টাকার বাণ্ডিল এনে যে সবসময় ব্যাঙ্কে রাখতো তাও তো নয়, আলমারির ভিতরে ঠেসে বা কোন স্যুটকেসের মধ্যে রেখে দিত। মিতালী অতশত বোঝেনি প্রথম দিকে, তার প্রশ্নের উত্তরে প্রবীর বলেছিল যে সে কিছু প্রাইভেট কনসালটেন্সি করে, এটা তারই টাকা। মিতালী তাতেই খুশি ছিল, ছ মাসের মধ্যে তারা বড় বাড়ীতে উঠে গেল। বাড়ীতে এলো দামি টেলিভিশান, ভি. সি. আর., ওয়াসিং মেশিন ইত্যাদি, দামি সেন্ট, সোনার গয়না, বছরে তিন চারটে দামি শাড়ি এগুলোও বাড়ীতে ঢুকে পড়ল। সুখী গৃহিনী হিসাবে মিতালী প্রায়ই বাড়ীতে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করত। বেশীর ভাগ সময়ই প্রবীরের কলীগদের, সেই সঙ্গে পাড়া প্রতিবেশী। এই ভাবে বেশ কিছুদিন গড়িয়ে গেল। এল তাদের প্রথম সন্তান, শর্বরী। ঘটা করে অন্নপ্রাশন হল। বাচ্চা সুস্থ্য ভাবে বেড়ে উঠছিল কিন্তু হঠাৎ ঝড় এল। তাতে মিতালীর সুখে আর গর্বে সাজানো সংসার ভেসে গেল।

     সেদিন সকালে প্রবীর যেমন অফিসে যায় বেরিয়ে গেল। মিতালী দুপুরে শর্বরীকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে খাটে শুয়েছিল। এই সময় ফোনটা এলো, প্রবীর জানাল যে তার অফিসে আজ একটু কাজ বেশী আছে তাই ফিরতে একটু দেরি হবে। এরকম প্রায়ই হয়, সাইটে অনেক সময়ই কাজ সন্ধ্যের পরও চলে কাজেই মিতালী খুব বেশী চিন্তিত হয়নি। প্রায় সাড়ে পাঁচটার সময় প্রবীরের এক কলীগ এসে খবরটা জানাল। সাইটে ধুন্ধুমার কান্ড, একটা ট্রেসেল পুরো ভেঙে পড়েছে সেই সঙ্গে কনভেয়ার বেল্টের একটা বিরাট সেকশান, দুজন ওয়ার্কার স্পট ডেড, আরো পাঁচ জন জখম। তার মধ্যে তিনজন মারাত্মক ভাবে। পুলিশ এসেছে দুপুরের দিকেই, প্রবীর ছাড়াও আরো পাঁচজন সাইট ইঞ্জিনীয়ারের অ্যাকটিভিটির ওপর ইনটারোগেশান চলছে, প্রবীর আজ রাতে নাও ফিরতে পারে। ছেলেটা চলে গেল, মিতালী একা ঘরের মধ্যে থম মেরে বসে রইল, বাচ্চা শর্বরী কিছুই না বুঝে তার রঙিন বলটা নিয়ে সারা ঘর দাপিয়ে খেলে যেতে লাগলো।

তার পরের দিন সকালেও প্রবীর এল না। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে যাচ্ছিল। প্রায় চারটের সময় প্রবীর ঢুকলো, সেই সঙ্গে আরো অনেকে। পুলিশের লোক অনেকেই ছিল, কেউ প্রপার পুলিশের বেশে কেউবা প্লেন ড্রেসে। সারা বাড়ী সার্চ হল। সারা বাড়ী মানে বাথরুম, কিচেন, সমস্ত ড্রয়ার, আলমারি , বুক সেলফ, বাক্স, ট্রাঙ্ক, বিছানার তোষকের তলা ইত্যাদি তন্ন তন্ন করে খোঁজা। পাওয়াও গেল। প্রবীরের আনা সেই সব টাকার বান্ডিল অনেক কটাই পুলিশের হাতে পড়লো। পুলিশ আবার প্রবীরকে নিয়ে চলে গেল। যাবার আগে প্রবীর কি অসহায় ভাবে একবার মিতালীর দিকে তাকাল। চোখ দুটো কেমন ছল ছল করছে অপমানে।বাচ্চাটার দিকে একবার তাকিয়ে সে চলে গেল। তখন প্রায় সন্ধ্যা সাতটা, অন্ধকারে পুলিশের গাড়ীর লাল আলোটা দূরে মিলিয়ে গেল। মিতালী আগের দিনের মত আবার বাচ্চাটাকে নিয়ে একা বাড়ীতে বসে রইল।

তারপর কয়েকদিন যেন মিতালীর ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। প্রবীর পুলিশের কাস্টডিতেই রইল, সেই সঙ্গে তার আরও তিন-চার জন কলীগ। তবে অফিসের অন্যন্য কলীগেরা মিতালীর খোঁজ খবর রাখছিল, তাদের কাছ থেকেই মিতালী জানতে পারল সব। ওই কন্সাল্ট্যান্সির ব্যাপারটা সব বাজে কথা। প্রবীর ঘুষ খেত, তবে সে একা নয়, তার একটা দল ছিল। তারা কন্ট্র্যাকটারদের কাছ থেকে বাজে কোয়ালিটির মাল পাস করে দিত এবং তার জন্য মোটা টাকা পেত, সেই সব টাকা চার জন কলীগের মধ্যে ভাগ হত আর মিতালী ওই সব টাকাই প্রবীরকে বাড়ীতে আনতে দেখেছে। বিড়লা টেকনিক্যাল সার্ভিসেস ব্যাপারটা খুব সিরিয়াসলি নিল। পুলিশ তাদের ইনভেস্টিগেশান খুব প্রম্পটলি এগিয়ে নিয়ে গেল। স্টীল সাপ্লায়ারদের লগ আর মেটেরিয়াল মিলিয়ে খুব তাড়াতাড়ি ব্যাপারগুলো পরিস্কার হয়ে গেল কারা ব্যাপারটার মধ্যে জড়িত ছিল। কত টাকা কার কার কাছে গিয়েছে এবং কোন সাপ্লায়ার কোম্পানির কোন কোন অফিসার এর মধ্যে জড়িত তাও জানা গেল। মূল ঘটনার মাস খানেক পরে মামলা কলকাতায় চলে গেল। মিতালীও তার বাচ্চা এবং কিছু জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ী ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় শ্বশুরবাড়ী চলে গেল। মামলা প্রায় একবছর চলল। যারা অপরাধী তাদের অবশ্য কোন ডিফেন্স নেই কারণ সবারই বাড়ী থেকে আন-একাউন্টেড টাকা পাওয়া গেছে, অপরাধ স্বীকারও করেছে ওরা সবাই। এই অবস্থায় একটা পারডন পাওয়া গেল। বিড়লা কোম্পানি জেল টার্ম ডিম্যান্ড করল না কিন্তু যারা এই চক্রে জড়িত তাদের চাকরী গেল। প্রবীর আবার বেকার এবং এবার গায়ে একগাদা ময়লা নিয়ে। প্রবীর প্রায় দুবছর কোন চাকরী পায় নি। তারপর পাড়ার একজন রিটায়ার্ড অফিসারের ইঞ্জিনীয়ার ছেলের দয়ায় একটা ওভারসিয়ারের চাকরী পেল।তাও এই ধ্যারধ্যারে সাইটে, নাগপুর থেকে আরো দেড়শ কিলোমিটার ইন্টিরিয়ারে। দুবার বাস পালটে যেতে হয়। স্কুল কলেজের প্রচন্ড অসুবিধা, কোনক্রমে হায়ার সেকেন্ডারী পাশ করার পরই শর্বরীকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছে কলেজে পড়ার জন্য। এখানে সে একটা ছোট্ট কোয়ার্টারে প্রবীরের সাথে থাকে। একবার ধাক্কা খেয়ে প্রবীর কিছুদিন সোজা পথে ছিল। এখানে আসার প্রায় বছর দুই অবধি সব ঠিকঠাক। কিন্তু তারপর আবার কিছু ধরিবাজ অবাঙালি লো লেভেল কলীগের সাথে মেশা শুরু করল। সন্ধ্যাবেলাগুলো ওদের সাথেই কাটায়, কি করে কে জানে। শোনা যায় একটা সোসাল ক্লাবের মত আছে, সেখানে তাস টাস খেলা হয়, মাঝে মাঝে মদটদও চলে। বাড়ীতে আর টাকা আনে নি এটাই মিতালীর কাছে একটা শান্তি, অন্য যা কিছু করে মিতালী বিশেষ জিজ্ঞাসা করে না। ওরা শুধু এখন এক বাড়ীতে থাকে, এই পর্যন্ত। এই হচ্ছে মিতালীর এখন পর্যন্ত জীবন চড়িত। কিন্তু একথা কি আর মধুমন্তীকে বলা যায়। মেয়েটা কি হ্যাপী, পাশের বাঙ্কে কেমন শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে, এতদিন পড়ে হঠাৎ দেখা, ওকে এসব একদম বলা যাবে না। আর তাছাড়া, এতদিন পরে যাদবপুরের সেই ক্লোজ ফ্রেন্ডশিপও যেন কোথায় ফিকে হয়ে গেছে। সময় সব কেড়ে নিয়েছে। এপাস ওপাস করতে করতে মিতালী কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লো। পাশের বাঙ্কে

চোখ বুজে জেগে থাকা মধুমন্তীর একটা দীর্ঘ্যশ্বাস পড়লো। সকাল এল। মধুমন্তী একটু চোখ পিটপিট করে একবার চোখ খুললো। ঠিকই তো ,সকাল হয়ে গেছে। ট্রেনের একঘেয়ে দোলানি অবশ্য রয়েইছে। ওপাশের বাঙ্কে অবশ্য মিতালী এখন পা গুটিয়ে দলা পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। আর চোখে একবার ঘড়ি দেখল। প্রায় আটটা কুড়ি তার মানে ভাটপাড়া জাস্ট পেরিয়েছে, তাই ট্রেনটা বোধহয় একটু আস্তেও চলছে। একবার আড়মোড়া ভেঙে মধুমন্তী উঠে পড়লো। নাঃ, একবার বাথরুমে যেতেই হবে। রাতে তাকে মাঝে মাঝে উঠতেই হয় কিন্তু কাল রাতে যাওয়া হয়নি।

বাথরুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে বেশ করে মুখে চোখে জল দিয়ে ফিরে এসে মধু দেখলো যে মিতালীও উঠে বসে আছে। চোখে এখনো একটু ঘুম ঘুম ভাব, চোখ মুখ ঘুমের জন্য একটু ফোলা। মধুকে দেখে একটু হাসলো, 

মিতালী - 'কি... বাথরুম কি ফাঁকা?'

মধুমন্তী - 'ও, তুই আগেই উঠে পড়েছিস। মটকা মেরে পড়েছিলি। যা, বাথরুম এখনও ফাঁকা।'

মিতালী আবার তার ট্রেডমার্ক হাসিটা দিয়ে বাইরে চলে গেল।

মধুমন্তী ভালোভাবে বসতে না বসতেই মিতালী ফিরে এল, মুখে চোখে জলের ছাপ, কপালের ঠিক ওপরের চুলটাও একটু ভিজে রয়েছে। ফিরে এসেই ধপাস করে সিটে বসে বলল – 'মিতালী। এইবার জমিয়ে একটু চা দরকার।'

মধুমন্তী -  'তোর সেই চা চা বাতিক আর গেল না, সেই যাদবপুর থেকে দেখে আসছি। আগে তো কিছু মুখে দিবি। দাঁড়া, আগে কিছু ব্রেকফাস্ট অর্ডার দিই।'

ওরা কামড়ার দরজাটা খুলে একটু উঁকি ঝুঁকি মারতেই একজন উর্দ্দি পরা ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন, ওরা ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিল – ডাবল ডিমের ওমলেট, ব্রেড বাটার আর কফি।

তারপর ওরা আবার দুজনে গল্পে ডুবে গেল কারণ খাবার আস্তে অন্তত মিনিট পনের লাগবে।

মিতালী - 'প্রায় সাড়ে আটটা বাজে, তার মানে একটু পরেই বোধহয় রায়পুর আসবে।'

মধুমন্তী - 'তা তো আসবে, কিন্তু দুপুর এসে গেলেই তো তুই নেবে যাবি। আমার এত খারাপ লাগছে না, এত দিন পড়ে দেখা অথচ তোকে যে বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে বেশ আরাম করে একটু গল্প করবো তার উপায় নেই।'

তারপর দুই বন্ধু আবার সেই পুরাণ দিনের গল্পে মেতে উঠল। ওরা দুজনে যেন সেই পুরাণ যাদবপুরের দিনে ফিরে গেছে। আরতীদির সেই লিটারেচারের ক্লাস করতে করতে হঠাৎ হঠাৎ লেকচার টপিক ভুলে যাওয়া, স্প্রিং ফেস্টের সময় ব্রাত্যর নাটকের পাঠ ভুলে হঠাৎ স্টেজ থেকে পালিয়ে যাওয়া, নীলেশ আর জয়তীর ঢাকুরিয়া লেকে প্রেম করতে গিয়ে সোজা বাবার সামনে পরে যাওয়া এবং তারপর না চেনার ভান করে চলে যেতে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে চড় খাওয়া, এই সব কথা মনে করে দুজন যেন আবার কলেজ পড়ুয়া তরুণী হয়ে গেছে। অমলিন হাসির মাঝে দুজনাই যেন কোথায় বর্তমানকে ভোলার নাটক করে যাচ্ছে।

এর মধ্যে সকালের ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয়েছে, অমলেট, ব্রেড আর কফি খাওয়া চলেছে সেই সঙ্গে গল্প। বেশীর ভাগ বন্ধু বান্ধব আজ কোথায় ছড়িয়ে ছিটকে গেছে। তাদের খবর আর পাওয়া বোধহয় সম্ভব নয়, তাছাড়া তাদের দুজনার বয়সও প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, কাজেই নিজের সংসার ছেড়ে নতুন করে পুরানো সহপাঠিদের খোঁজার সময় নেই। সময় বোধহয় এই রকমই, জীবনে নতুন অনেক কিছু দেয় কিন্তু পুরানো অনেক কিছু ভাসিয়ে নিয়েও যায়। কাবেরীর কথাটা অবশ্য ওরা দুজনেই কোথাও শুনেছে। ওর বোধহয় ওদের ব্যাচে সব থেকে ভাল বিয়ে হয়েছে। স্বামী হলিউডের মুভি প্রোডাকশান লাইনে আছে, দেদার পয়সা, এল. এ.-তে বেশ বড় বাংলোতে থাকে। কিন্তু কলকাতায় এলেই পুরনো যাদের সাথে যোগাযোগ আছে তাদের সবার সাথে কলকাতায় দেখা করতে যায়, ভীষণ সাধাসিধে স্বভাবের, একদম যাদবপুরের মতোই রয়ে গেল, আর হাজব্যান্ড ভাস্করও ভীষণ মজার লোক। কথার কোন শেষ নেই, বিশেষ করে দুই বন্ধুর যখন প্রায় বাইশ বছর পড়ে দেখা।

     

কিন্তু ট্রেন বেগে সামনের দিকে চলেছে, ঘড়ির কাঁটাও ঘুরে চলেছে। সময় কখনও থেমে থাকে না। কারো ভালো লাগালাগির ধার ধারে না।সময়ের কোন বন্ধু নেই, হয়তো কোন শত্রুও নেই। একটা সময় ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘরে পৌঁছাল। ওদের দুজনারহুঁশ ছিল না, কিন্তু গার্ড এসে লাঞ্চের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করল। ওদের মন আবার বাস্তবে ফিরে এল। আর মাত্র দুটি ঘণ্টা, তারপর মিতালী তার গন্তব্যস্থল নাগপুরে নেমে যাবে। ওদের দুজনের মনেই কোথায় একটা সুর বেজে উঠল, প্রায় একই সঙ্গে। লাঞ্চ আসার আগেই ওরা যা করার করল। সঙ্গে তো লেখার মত কিছু নেই, মিতালী একটা পুরনো সাদা খাম বার করল আর মধুমন্তী একটা শাড়ীর ব্রাউন পেপারের প্যাকেট। এই মুহুর্তে এর থেকে ভালো কিছু পাওয়া গেল না। একটা লেখার পেন অবশ্য দুজনার কাছেই ছিল, তাড়াতাড়ি করে দুজনে তাদের ঠিকানা আর মোবাইল নাম্বার এক্সচেঞ্জ করল। আবার কবে দেখা হয় কে জানে, আর দেখা নাও হতে পারে। এর মধ্যেই লাঞ্চ এসে গেল। ডিমের ঝোল আর ভাত।

খাওয়ার মধ্যেও কথার ছুটি নেই। ভাত আর তরকারি চিবুতে চিবুতেও সেই পুরনো হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর মধ্যে ওরা ভেসে যাচ্ছিল। কিন্তু খানিক পরেই গার্ড এসে জানিয়ে গেল যে গাড়ী রাইট টাইমেই আছে এবং আর আধ ঘন্টা বাদে নাগপুর এসে যাবে।

ব্যাস, দুজনার সব কথাই হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। আর মাত্র তিরিশ মিনিট, ব্যাস, তারপর আবার দুজনে দুজনার ছোট্ট বৃত্তের মধ্যে হারিয়ে যাবে। সেই বর, বাচ্চা, শ্বশুর শাশুরী আর কিছু কাছের লোক, আর কেউ নেই। পুরনো দিনের কলেজের বন্ধু বান্ধবরা সেই বৃত্তের মধ্যে নেই। তারা যেন অন্য কোন প্ল্যানেটে বাস করে। এটা অনেকটা কসমিক তত্তের মতো, তাদের অস্তিত্ব জানা আছে কিন্তু বাস্তব জীবনে দেখাশোনার কোন উপায় নেই। 

ট্রেন প্রায় ঠিক টাইমেই নাগপুর স্টেশানে পৌঁছাল। ওরা দুজনেই তার আগেই পাশাপাশি বসেছিল। সেই যাদবপুরেরই মতো, আরতীদির ক্লাস করার সময় যেমন বসতো। দুজনেরই মনে বরষার ঘন কাল মেঘ। চোখের কোনগুলোও যেন একটু ভিজে। গাড়ী থামার একটু আগেই মিতালী নামার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিল, পাশে তার প্রিয় বন্ধু মধুমন্তী। গাড়ী থামলে মধু ওর স্যুটকেস গুলো নামাতে সাহায্য করল। মিতালীর হাঁটুর অবস্থা এমনিতেই ভাল না। প্ল্যাটফর্মে নেমে মিতালী একটু সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, দরজার সামনে মধুমন্তী। ওরা দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করছিল যদিও ওদের মুখগুলো বড়ই করুণ দেখাচ্ছিল। চোখ দুটো ছলছল করছে।

মিনিট কয়েক পরে ট্রেনের বাইরে গার্ড সিটি দিল, মধুমন্তী হাত নেড়ে চিৎকার করল –

মধুমন্তী - 'মিতু, চিঠি দিস কিন্তু। মাঝে মাঝে ফোন করিস।'

মিতালী - 'দেব, দেব। তুইও ফোন করিস। নাম্বার আর ঠিকানাটা হারাস না যেন।'

মধুমন্তী - 'না না, আমার হ্যান্ড ব্যাগে রেখে দেব।'

গাড়ী আস্তে আস্তে প্ল্যাট ফর্ম ছাড়িয়ে এগিয়ে এল। মিতালী চিৎকার করে কি একটা বললো কিন্তু মধুমন্তী শুনতে পেল না। সে শুধু হাত নাড়লো। দূর থেকে মিতালীও হাত তুললো । তারপর গাড়ীটা একটা বাঁকে এসে গেল আর মিতালী আর স্টেশানটা কিছু বড় গাছ আর ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেল।

আনমনে মধুমন্তী নিজের সিটে এসে বসল। ট্রেন তখন আবার ফুল স্পীডে দৌড়চ্ছে। মিতালীর দেওয়া অ্যাড্রেস আর মোবাইল নাম্বার এখনো তার হাতে ধরা। সে আস্তে করে সেটা তার নিজস্ব হ্যান্ডব্যাগে ভরে রাখল।

তার মনটা একটা বিতৃষ্ণায় ভরে আছে। নিজের ওপরই একটা রাগ। এতদিন পরে তার কলেজের বন্ধু মিতালীর সাথে দেখা, কত ভালো লাগার কথা। ভালো তো লাগছিলও, কত কথা হল, কত পুরনো স্মৃতি, সেই সঙ্গে আবার সারা জীবনের যোগাযোগ রাখার সুযোগ, যে বন্ধুত্ব জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থেকে যায়। কিন্তু যখন

ওরা অ্যাড্রেস লিখে দিল তখন মধুমন্তী তার কোয়ার্টার নাম্বারটা ভুল লিখল, তার মুম্বাইয়ের পুরনো কোয়ার্টার নাম্বার যা তার এখনকার বাড়ী থেকে অনেক দূরে, মুম্বাইয়ের সম্পূর্ন অন্য এরিয়ায়, ফোন নাম্বারটা দুটো নাম্বার ভুল লিখল যাতে মিতালী তাকে কোনদিন ফোন করতে না পারে। কিন্তু তার কি বা করার ছিল? তার জীবনে স্বাচ্ছন্দ এসেছে, তার বাড়ীতে দুটো গাড়ী, বেশ বড় সি ভিউ অ্যাপার্টমেন্ট, সেটাই কি সব? মদ্যপ হাসব্যান্ড, ছেলে মেয়ে দুটোর হাতে পয়সা মেয়ের নীরব কথোপকথন, এর মধ্যে হঠাৎ মিতালী এসে পরলে সে কি দেখবে? মধুমন্তী জানে তার বিয়ে নিয়ে বহু বন্ধুর মধ্যেই একটু জেলাসি ছিল কিন্তু এই তার পরিণতি? না, এটা তার পরাজয় আর মধুমন্তী তার জীবনের ট্র্যাজেডি সবার সামনে উজার করতে চায় না। মিতালী বড় মিষ্টি আর স্বচ্ছ মেয়ে, তাকে সব কিছু বলা যায় না। তার থেকে মিতালীর অ্যাড্রেস আর নাম্বারটা থাক, হয়তো কোনদিন সে ফোন করবে দুপুরের দিকে যখন বাড়ীটা একটু ফাঁকা থাকে। 

  স্টেশান থেকে বার হয়ে মিতালী একটা বাস স্টপে এসে দাঁড়াল। তার জার্নি এখনো অনেক দূর, বেশ কয়েক ঘন্টার। বাসে লাইনটা একটু বড় কিন্তু তাও মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বাসে উঠে একটা জানলার পাশের সিট পেয়ে গেল। স্যুটকেস দুটো সিটের ওপরের লফটে তুলে দিয়ে বেশ হাত পা ছড়িয়ে বসল। বাইরের দিকে তাকাল, এখনো বেশ লম্বা লাইন। বাস ছাড়তে আরো মিনিট কুড়ি বাকি, তবে এই পথ তার ভীষণ চেনা কাজেই চিন্তার কিছু নেই। তার মধুমন্তীর কথা মনে পড়ল, কত সুখী মেয়ে, তার বহুদিনের প্রিয় বন্ধু। সেই বন্ধুকে সে তার জীবনের সব কিছু বলতে পারে নি। তার স্বামী ঘুষ খেয়ে ধরা পরেছিল, চাকরী চলে যায়, কোনক্রমে জেলে যেতে হয়নি। নতুন চাকরীতে গিয়েও তার স্বভাব পালটায় নি, অত্যন্ত নিম্ন মানের সন্দেহ জনক বন্ধুদের গ্রুপে থাকে। তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে মিতালীর কোন শ্রদ্ধা নেই, কোথাও না কোথাও বাজে কাজকর্ম চলছে। টাকার কারবারও হয়ত আছে, সাইটে এই ব্যাপারগুলো থেকেই যায়। মিতালী মনে মনে জানে যে সে জীবনে হেরো, মধুমন্তীর কি সুন্দর পবিত্র মুখটার দিকে চেয়ে সে নিজের জীবনের সত্যি কথাগুলো বলতে পারে নি। সে মিষ্টি হেসে ঠিকানা আর ফোন নাম্বার লিখে দিয়েছিল।কিন্তু সেটাও সঠিক ছিল না। ঠিকানাটা পুরনো কোয়ার্টারের যেটা মিতালীরা প্রায় দেড় বছর আগে ছেড়ে নতুন সাইটে চলে এসেছে, মোবাইল নাম্বারটাও পুরনো সিমের যেটা ওরা আর ইউজ করে না। কাজেই মধুমন্তী সত্যি সত্যি চেষ্টা করলেও তার সাথে আর যোগাযোগ করতে পারবে না। মিতালী পুরনো বন্ধুর সাথে ছাত্র জীবনের গল্প করতে পারে কিন্তু মধুমন্তী যদি হঠাৎ এসে পরে আর তার জীবনের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে সেটা সে সহ্য করতে পারবে না। আর মধুমন্তীরা পয়সাওয়ালা লোক, হঠাৎ এদিক সেদিক কোথাও বেড়াতে যাবার পথে চলেও আসতে পারে, সঙ্গে ফ্যামিলী কার তো থাকেই। তাই মিতালী সে পথ চিরদিনের মত বন্ধ করে দিয়েছে। এতক্ষণে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে মধুমন্তীকে নিয়ে। সেই সঙ্গে বোধহয় এ জীবনের মত মিতালীর জীবন থেকে মধুমন্তী হারিয়েও গেল।

  জানলার কাচের ফাঁক দিয়ে একটু একটু হাওয়া মিতালীর গালে মুখে এসে লাগছিল, মুখের ঘামে সেই হাওয়া লেগে বেশ একটু ঠান্ডা লাগছিল। বেশ আরাম দায়ক অনুভূতি।কিন্তু তার মনের মধ্যে আগুন থামবার নয়।

মানুষ মাঝে মাঝে দ্বিতীয়বার সুযোগ পায়। মধুমন্তী আর মিতালীও কলেজ ছাড়ার বাইশ বছর পর একবার সুযোগ পেয়েছিল দুজনের জীবনকে কাছাকাছি আনার, বন্ধুত্বের শিকল দৃঢ় করার। কিন্তু জীবনের অদ্ভুত কিছু খেলায় দুজনেই মানসিক ভাবে হেরে যাওয়ায় ওরা আবার যা যার নিজের বৃত্তে ফিরে গেল। আবার কোনদিন দেখা হওয়ার কোন সুযোগ আসবে কিনা জানা নেই। ওরা যেন দুটো জীবন্ত ধূমকেতু, কোন দৈবিক নিয়মে কিছুক্ষণের জন্য কাছাকাছি এসেছিল, আবার যে যার নিজের পথে চলে গেল। দুজনের কাছেই রয়ে গেল নতুন কিছু স্মৃতি।

                                ক্যাশ

      বাক্স 

সঞ্চিতা চৌধুরী 

....জীবনের পথে চলতে চলতে রিমলি বুঝেছে বৃহত্তর ক্ষেত্রে সারাটা পৃথিবী ক্যাশবাক্সের পেছনে ছুটছে, কেউ  ছোট ক্যাশবাক্সের পেছনে কেউ বা বড় ক্যাশবাক্সের পেছনে, সবাই চায় নানান মাপের ক্যাশবাক্সের মালিকানা, এবং পেয়েও যায় তবে কি মূল্যে তা পাওয়া হল তার হিসাব অনেকেই রাখে না। ....

  রিমলির বাবার একটা ক্যাশবাক্স আছে। রিমলির খুব পছন্দ ওই ক্যাশবাক্সটা। ভাবে যে ওর কাছেও এমনি এক ক্যাশবাক্স থাকে। কী সুন্দর ক্যাশবাক্সটা - ভেতরে অনেক রকম মাপের খোপ খোপ করা আছে। বাইরেটা দারুন ভাবে কারুকাজ করা। রিমলির বাবা কাশ্মীর থেকে এনেছিলেন। পাইন কাঠের  ক্যাশবাক্স।

রিমলির বাবার কাশ্মীরে দোকান এবং হোটেল ছিল কাশ্মিরে যখন গন্ডগোল লাগল রিমলির বাবা পরিবার নিয়ে এই পশ্চিমবাংলার গ্রামে পৈত্রিক বাড়িতে চলে আসেন, সঙ্গে নিয়ে আসেন ওই ক্যাশবাক্স, রিমলি তখন অনেক ছোট।রিমলির কিছুই মনে নেই। রিমলি মা'র মুখে শুনেছে কাশ্মিরের গল্প। মা কাশ্মীরের গল্প করতে খুব ভালবাসেন। যখনই রিমলি গল্প শুনতে চায় মা কাশ্মীরের গল্প বলতে শুরু করেন, কেমন করে বাবা আর মা বিয়ের পরে কাশ্মীরে বেড়াতে গেছিলেন, বাবা কাশ্মীরের সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হয়ে থেকে যান কাশ্মীরে। বাড়ি কেনেন এক পাহাড়ি বন্ধুর সাহায্য নিয়ে। পশ্চিমবাংলার শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়ে কাশ্মীরে ছোট হোটেল এবং দোকানের ব্যবসা ফেঁদে বসেন।

পাহাড়ের নীচে ঢালু জমিতে ছিল ওদের বাড়ি, মা বাবা মিলে ছাগল, মুরগি পুষতেন, বাড়ির সামনে ছোট জমিতে মরশুমি সব্জি ফলাতেন। খুব ঠাণ্ডার সময় আগুন জ্বালিয়ে উত্তাপ নিতেন বাবার পাহাড়ি বন্ধুরা মিলে - এইসব গল্প করতে করতে মা স্মৃতিমেদুর হতেন, মা’য়ের স্বপ্নিল চোখ যেন কাশ্মীরের উঁচুনিচু পাহাড়ি পাকদণ্ডী ধরে ঘুরে বেড়াত। পশ্চিমবাংলার গ্রামে বসে গ্রীষ্মের কাঠফাটা দুপুরে, গল্প শুনতে শুনতে রিমলির চোখের সামনেও যেন ঠাণ্ডা পাহাড়ি কাশ্মীরের ছবি ফুটে উঠত।

রিমলি এখানে এসে নতুন স্কুলে ভর্তি হল। গ্রামের স্কুল, বেশ দূরে। বাবা বলেছেন একটা সাইকেল কিনে দেবেন - নতুন দোকানটা একটু সুন্দর করে গুছিয়ে নেওয়ার পরে।

বাবা এখানে এসে একটা মনিহারী দোকান খুলেছেন, খুব বেশি জিনিষ নেই দোকানে, আসলে বাবার মূলধনও তো কম, তবে ধীরে ধীরে দোকানে জিনিষ আনবেন বাবা। সবে তো এসেছেন, সময় লাগবে দোকান ভরে উঠতে।

রিমলি স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে হাতে হাতে সাহায্য করে। রিমলির খুব ভালো লাগে বাবাকে সাহায্য করতে।

সেদিন বাবা রিমলিকে বললেন যে মা হসপিটাল গেছেন একটা ছোট ভাই কিনে আনতে, শুনে রিমলি খুব খুশি হল, সত্যি তো রিমলির খেলার সঙ্গী নেই, অনেকদিন ধরেই মাকে বলছিল একটা ভাই কিনে আনতে, আজ মা কথা রেখেছেন। উফ্‌, মা যে কি ভাল। খুশিতে রিমলি দু-পাক নেচে নিল ঘুরে ঘুরে, আর ভাইকে নিয়ে কি কি খেলবে তার ফর্দ করতে লাগল।

মা ভাইকে নিয়ে যখন এলেন, রিমলি খুব হতাশ হল, আরে এত ছোট্ট! শুধু ঘুমচ্ছে আর ঘুমের মধ্যে মুচকি মুচকি হাসছে, একে নিয়ে আর কিই বা খেলা যাবে! বাবা অবশ্য বলেছেন কিছুদিনের মধ্যে খেলার উপযোগী হয়ে উঠবে, ঠিক আছে রিমলি অপেক্ষা করবে, তবে একটু ছুঁয়ে নেড়ে তো দেখাই যায়  ভাইয়ের ছোট ছোট হাত পা দেখে রিমলির হাসি পায়।

  ইতিমধ্যে রিমলির নতুন সাইকেলও চলে এসেছে।  এখন রিমলির খুশির সীমানা নেই। স্কুল থেকে ফিরেই কিছু খেয়ে নিয়ে সাইকেল শিখতে হয়। সাইকেলটা বড়, হাফ প্যাডেল করে করে চালাতে হয়। বাবা বলেছেন আগে ব্যালেন্স করা শিখতে। কতবার যে সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে হাত পা কেটে  গেছে তার ইয়ত্তা নেই, তবু রিমলি দমে নি।বাবা রিমলির সাইকেল শেখার মনোযোগ দেখে মুচকি হাসেন। রিমলি বাবাকে খুব ভালোবাসে আবার ভয়ও পায়। বাবার

হাসিমুখ দেখে রিমলির উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। বাবাকে খুশি করতে রিমলি যা খুশি করতে পারে। রিমলির মনে হয় বাবা বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে বড়, ভালো, সুন্দর মানুষ। রিমলির বাবা প্রায় ছয় ফুট লম্বা, বড় বড় চোখ, গম্ভীর গলার আওয়াজ, হাসলে দাঁতের সুন্দর সাজানো সারি দেখা যায়। রিমলিরও দাঁতের পাটি বাবার মতই সাজানো।বাবার দোকান এখন খুব সুন্দর হয়ে গেছে, অনেক জিনিষ এসেছে দোকানে। ভাই বড় হয়ে গেছে, হামাগুড়ি দিচ্ছে, ছোট্ট দুটো দাঁত বেড়িয়েছে, যা হাতের কাছে পাচ্ছে তাতেই একবার করে কামড় বসাচ্ছে। রিমলির স্কুলের বন্ধুরা ভাইকে দেখতে চেয়েছিল, রিমলি ওদের নিয়ে এসে ভাইকে দেখিয়েছে। ভাই সবাইকে চিমটি কেটে দিয়েছিল, ওরা ভাইয়ের কাণ্ড দেখে খিল খিল করে হেসেছে। বন্ধুদের ভাইকে দেখাতে পেরে রিমলির গর্বে বুক ফুলে গেছিল। বাবা নিজের দোকান থেকে বন্ধুদের সবাইকে চকোলেটদিয়েছিলেন। ক্লাস সিক্সে রিমলি স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হলে বাবা টাকা দিয়েছিলেন নিজের ইচ্ছেমত গল্পের বই কেনার। রিমলি মা আর ভাইয়ের সঙ্গে গিয়ে শহর থেকে কিনে এনেছিল লীলা মজুমদারের দশটা বড় গল্পের সংকলন ‘দশ দিগন্ত’।

রিমলির জীবন সমস্ত আনন্দে কানায় কানায় পুর্ণ ছিল, সময় বয়ে চলছিল মন্দাক্রান্তা ছন্দে।

ধীরে ধীরে রিমলির মাধ্যমিক পরীক্ষা চলে এল। রিমলির ভাইও অনেক বড় হয়ে গেছে, স্কুলে গিয়ে বেশ দুষ্টুমি করা শিখেছে। রিমলি পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এখন আর ভাইয়ের সঙ্গে খেলার সময় পায় না, তবে ভাই কে পড়াতে বেশ লাগে রিমলির, কেমন যেন একটা দিদিমণি ভাব জাগে মনে।

রিমলিদের বাড়িতে সন্ধ্যে হতে না হতেই রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ হয়ে যায় তারপর বাবা দোকানের হিসাব পত্র নিয়ে বসেন বসার ঘরে, মা বোনা নিয়ে বসেন, রিমলি নিজের ঘরে বসে ক্লাসের পড়াশুনা নিয়ে, ভাই সারাদিনের দুষ্টুমির পরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

কিছুদিন ধরে রিমলির আবার অভ্যাস হয়েছে রাত জেগে পড়ার, বন্ধুদের মুখে শুনেছে ওরা রাত জেগে পড়ে তাই রিমলিও শুরু করেছে।

শীতের সন্ধ্যে, রিমলিদের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে, যে যার নিজের কাজে ব্যস্ত। রাত প্রায় সাড়ে বারটা, মা রিমলির পড়ার ঘরে উঁকি মেরে দেখলেন রিমলি টেবিলে ঝুকে বই পড়ছে। এগিয়ে এসে মা রিমলির কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'যা মা, ঘুমতে যা, অনেক রাত হয়েছে।' রিমলি বলল, 'যাচ্ছি।' মা চিন্তিত সুরে বললেন, 'রিমলি, দেখ না, বাবা কেমন করছে, কেমন যেন টলতে টলতে বিছানার দিকে গেল। কিছুই বুঝতে পারছি না।'

রিমলি মায়ের কথা কিছু বুঝল না, আলো নিবিয়ে শুতে গেল।

  সকালে মায়ের উৎকণ্ঠিত চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গল, 'রিমলি রিমলি, ওঠ্‌ ওঠ্‌। আয় এদিকে।' ঘুমচোখে উঠে মায়ের চিৎকারের উৎস বুঝে উঠতে সময় লাগল কয়েক সেকেন্ড। মায়ের চিৎকার আসছে বাথরুম থেকে, কিছু বুঝতে না পেরে রিমলি দৌড়ে গেল বাথরুমের দিকে, মায়ের কাছে।

বাবা বাথরুমে পরে আছেন হাঁটু মুড়ে, মা কোনরকমে ধরে আছেন বাবাকে তোলার চেষ্টা করছেন, বাবার মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ আসছে না, চোখ আধবোজা। রিমলি তাড়াতাড়ি গিয়ে বাবাকে ধরল। বাবাও অর্ধ অচেতন অবস্থায় আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন ওঠার, তাই দুজনে মিলে কোনরকমে ধরাধরি করে বিছানায় আনতে পারল বাবাকে। মা রিমলিকে বললেন, 'সাইকেলটা নিয়ে এক্ষুনি

যা, ডাক্তারবাবুকে ডেকে নিয়ে আয়, আর শিবুকে খবর দে।' শিবু বাবার দোকানে কাজ করে, কিছুদিন হল নতুন এসেছে, খুব ভাল কাজের ছেলে।   

রিমলি যন্ত্রের মত সাইকেল বের করে প্রথমে ডাক্তারবাবুকে ডেকে পরে শিবুকে খবর দিতে গেল।

ডাক্তার এবং শিবু দুজনেই খবর শোনা মাত্র দেরী না করে পৌঁছে গেল রিমলিদের বাড়ি।

ডাক্তারবাবু বাবাকে দেখলেন, ছোট হাতুড়ি দিয়ে হাঁটুতে মেরে মেরে সচেতনতা পরীক্ষা করলেন, বললেন, 'মনে হচ্ছে সেরিব্রাল হেমারেজ, এক্ষুনি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।' শিবু সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির বন্দোবস্ত করে বাবাকে নিয়ে গেল হসপিটালে সঙ্গে গেল মা। রিমলি রয়ে গেল বাড়িতে ভাইকে নিয়ে।

বাবাকে হসপিটালে ভর্তি করে মা ফিরে এসে রিমলি আর ভাইকে নিয়ে গেল।

হসপিটালে বাবাকে রিমলি দেখল, অক্সিজেন, স্যালাইন ইত্যাদির আড়ালে বাবাকে যেন অচেনা মনে হচ্ছিল।

নার্স এসে বললেন বাবার পোশাকটা পাল্টাতে হবে, ঘামে ভিজে গেছে। মা, শিবু আর দুজন নার্স মিলে বাবাকে ঘিরে পোশাক পাল্টাচ্ছিলেন, রিমলি কেবিনের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে করুণ ভাবে দাঁড়িয়েছিল, বাবাকে দেখা যাচ্ছিল না ওরা আড়াল করে রেখেছিল বাবাকে, হঠাৎ বাবা চোখ খোলে আর বাঁ হাত দিয়ে অক্সিজেন, স্যালাইন খুলে ফেলতে চায়, হাতের ধাক্কা দিয়ে ওদের সরিয়ে দেয়, মুহুর্তের জন্যে ওরা একটু সরে যায়, ওদের শরীরের ফাঁকদিয়ে বাবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে রিমলির করুণ মুখে। বাবার সঙ্গে রিমলির চোখাচোখি হয়, বাবা চোখ নাচিয়ে যেন প্রশ্ন করেন, কি ব্যাপার, এত করুণ কেন মামনি, কি হয়েছে, সবার চোখের আড়ালে হয়ে যায়, কারণ ওরা ব্যস্ত পুনরায় অক্সিজেন, স্যালাইন লাগানোতে। বাবা আবার অচেতন হয়ে পড়েন।

    পুরো একদিন কেটে যাওয়ার পরেও বাবার শরীরের কোন উন্নতি না হওয়াতে ডাক্তার বললেন, শহরের বড় হসপিটালে নিয়ে যেতে। বড় হসপিটালের ডাক্তাররা বললেন, ‘চব্বিশ ঘণ্টা না কাটলে কিছুই বলা যাবে না।’ মা শুরু থেকেই দিন রাত বাবার কাছেই থাকছেন, মা রিমলিকে শহরের বড় হসপিটালে নিয়ে যান নি, ভাইয়ের কাছে থাকতে বলেছিলেন। শিবুর মা রিমলিদের সঙ্গে এসে থাকছিলেন।

পরের দিন মা আর শিবু ফিরে এল বাবার মৃতদেহ নিয়ে, ডাক্তারদের কথামতো চব্বিশ ঘণ্টা কাটার ঠিক এক ঘণ্টা  আগে বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাবা নীরবে চলে গেলেন, কোন কথা বলতে পারেন নি।

অসময়ের মৃত্যু বুঝি বা এমনি নীরবে আসে, জীবনের পরিপুর্ণতার কোন পরোয়া না করে। সব কাজ, অকাজ, স্বপ্ন, বাস্তব, আশা, আকাঙ্খাকে মুলতুবি রেখে হাত ধরতে হয় মৃত্যুর। শূন্য থেকে এসে শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া, এই হয়ত জীবনের পরিণতি।

     প্রত্যেক মৃত্যুই এক দর্শনের জন্ম দেয় - জীবনদর্শন। বাবার মৃত্যু রিমলির জীবনে কি দর্শনের জন্ম দিল কে জানে, তবে মা বোবা হয়ে গেছেন, ভাই তো এতো ছোট যে কিছুর মানেই বুঝতে পারছে না, রিমলিকে জিঙ্গেস করছে, “দিদি, বাবা কোথায় রে?” রিমলি কোন জবাব দিতে পারে না, শুধু জলভরা চোখে ভাইকে জড়িয়ে ধরে, এক বিরাট শূন্যতা ঘিরে ধরে।

বর্তমান জীবনের চাহিদা এত তীব্র যে মানুষকে সমস্ত শোকের উপরে প্রলেপ লাগাতে বাধ্য করে।

   দুই সপ্তাহ পরে রিমলিকে শিবুর সাহায্যে বাবার দোকানের এবং ক্যাশবাক্সের দায়িত্ব নিতে হল, মা এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। রিমলি এখন বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না যে বাবা নেই, মনে হচ্ছে এই তো কোথাও বেড়াতে গেছেন, চারিদিকে বাবা থাকার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে, বাবার ব্যবহারের দাড়ি কামাবার রেজার, ছোট আয়না, পাজামা, কুর্তা, চশমা, ঘড়ি, বাবার লেখা হিসাবের খাতা সবকিছু যেমনকার তেমনি পড়ে আছে শুধু মানুষটা নেই। রিমলির বুকটা দুঃখে মুচড়ে ওঠে, ক্যাশবাক্সের দিকে তাকিয়ে চোখ ঝাপসা হয়।

দোকানে খদ্দের আসতে শুরু হলে দ্রুত হাত চালিয়ে জিনিষ পত্র মেপে দিতে হয় রিমলিকে, সমস্ত হিসাব বুঝে নিতে হয় পাই পাই করে, ঐ সুন্দর ক্যাশবাক্সের মালিকানার যে এত কঠিন দায়ভার, এত পরিশ্রম তা ছোট রিমলি জানত না। রিমলি চেয়েছিল ঐ রকম ক্যাশবাক্স, কিন্তু এইভাবে চায় নি।

জীবন থেমে থাকে না, শত ব্যাথা, বেদনা, কষ্ট, শোক বুকে নিয়ে জীবন চলেছে তার পরিণতির দিকে, পূর্ণতার দিকে।মা এখন দোকানের দ্বায়িত্ব নিয়েছেন, মা চান রিমলি পড়াশুনা করে বড় হোক, রিমলিও তাই চায়।

ধাপে ধাপে সিঁড়ি চড়তে চড়তে রিমলি আজ জীবনের মধ্য বেলায়। রিমলি আজ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইনান্সিয়াল কনসালটেন্ট, আজ রিমলি আরও বড় ক্যাশবাক্স সামলায়। বাবার পাইন কাঠের ক্যাশবাক্স আজও রিমলির কাছে সযত্নে রাখা আছে বাবার স্মৃতি হিসাবে।

    জীবনের পথে চলতে চলতে রিমলি বুঝেছে বৃহত্তর ক্ষেত্রে সারাটা পৃথিবী ক্যাশবাক্সের পেছনে ছুটছে, কেউ  ছোট ক্যাশবাক্সের পেছনে কেউ বা বড় ক্যাশবাক্সের পেছনে, সবাই চায় নানান মাপের ক্যাশবাক্সের মালিকানা, এবং পেয়েও যায় তবে কি মূল্যে তা পাওয়া হল তার হিসাব অনেকেই রাখে না। রিমলিও চেয়েছিল, তবে রিমলি ভাবে তার কাছে ক্যাশবাক্সের মূল্যটা যেন খুব বেশি হয়ে গেল, এত বেশি মূল্য দিয়ে তো রিমলি চায় নি ক্যাশবাক্সটা।

হয়তো কোন কোন জিনিষের মূল্য তার আসল দামের চেয়েও  অনেক বেশি অথবা অমূল্য।

 

                       চিত্ত

বিনোদন

অদিতি ভট্টাচার্য্য

- ‘আনেক কিছু করি। গান শুনি, ইচ্ছে মতো সিনেমা দেখি, নেট সাফিং করি। তাছাড়া উমার ছোট ছোট ছেলে মেয়ে দুটোকে পড়াই। আমার সময় বেশ কেটে যায়,’ বললেন সোনালী

   ‘স্ একটুর জন্যে মিস্ট্রি এগটা হাতছাড়া হয়ে গেল, সবাই একেবারে তক্কে তক্কে থাকে দেখছি। পাবলিশ হতে না হতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে’ নিজের মনেই বললেন সোনালী। বলেই আবার নিজের ছেলে-মানুষীর কথা ভেবে হেসেও ফেললেন।

-  ‘না এবার ল্যাপটপটা বন্ধ করি, কোমরটা ব্যথা করছে, একটু শুতে হবে' ল্যাপটপ অফ করে শুয়ে পড়লেন সোনালী। শুয়ে শুয়ে কত কথা মনে পড়তে লাগল, ‘বুড়ো বয়েসের এই এক দোষ, খালি পুরোনো কথা মনে আসে,’ ভাবলেন তিনি।

তবে এই ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট তাঁকে নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি দিয়েছে তা স্বীকার করেন তিনি, তা নইলে একা ফ্ল্যাটে সময় কাটতে চাইত না। দেখেন তো অনেককে। ল্যাপটপটা তাঁর মেয়ে সর্বাণীর কিনে দেওয়া। সে আর তার হাজব্যাণ্ড দুজনেই শিকাগোর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে। যমজ ছেলে মেয়ে নিয়ে বহুদিন থেকেই ওখানে সেটল্ড। ডেস্কটপ একটা সোনালীর ফ্ল্যাটে আগেও ছিল, তাঁর হাজব্যাণ্ড সমরেশ কিনেছিলেন। মেয়ের পাঠানোই মেইলও পড়া যেত, ইন্টারনেটে অনেক কিছু করাও যেত। তিনিই সোনালীকে কম্পিউটার হ্যাণ্ডল করা শিখিয়েছিলেন, ই মেইল পাঠানো, চ্যাট করা, কথা বলা সব কিছু। কিন্তু তিনি হঠাৎ মারা যেতে এসবে ভাঁটা পরে গেল, ডেস্কটপটাও গোলমাল শুরু করল।

     এরপর সর্বাণী একরকম জোর করেই মাকে শিকাগো নিয়ে গেল ওখানে থাকবার জন্যে। কিন্তু সোনালীর কেন জানি না ওখানে থাকতে ভাল লাগত না, খুব একাকীত্বে ভুগতেন। এর আগেও সমরেশের সঙ্গে এসেছেন, কিন্তু দু তিন মাসের বেশী থাকতে পারেন নি। তাও তখন সমরেশ সঙ্গে থাকতেন, কিন্তু এখন তো মেয়ে, জামাই, নাতি, নাতনী বেরিয়ে গেলেই পুরো অ্যাপার্টমেন্টে একা হয়ে যান, কথা বলারও কেউ নেই।

শেষ পর্য্যন্ত তিনি যখন আর ওখানে থাকতেই চাইলেন না তখন সর্বাণী এই ল্যাপটপটা কিনে আনল আর তাঁর দুই নাতি নাতনী পিকু আর পিয়া মহা উৎসাহে দিম্মাকে আবার সব কিছু নতুন করে শেখাতে বসল। নিজের মেইল চেক করা থেকে নেট সার্চ করা কিছুই বাদ গেল না। দিম্মারও শেখার উৎসাহ বরাবরই আছে তাই পিকু পিয়ার কাছ থেকে আনেক কিছু শেখা হয়ে গেল।

    কলকাতায় ফিরে আসার পর ল্যাপটপ নিয়ে আরো বেশী সময় কাটাতে লাগলেন। তাঁর প্রতিবেশী বন্ধুরা তাঁর উৎসাহ দেখে বলেছিল, ‘নতুন খেলনা তো, প্রথম প্রথম উৎসাহ থাকবে, কদিন যাক, আর ভাল লাগবে না।’

কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো হল। সোনালী ইন্টারনেটে এটা সেটা খুঁজতে লাগলেন। একদিন ফেসবুকের সন্ধান পেলেন, নামটা শোনা ছিল নাতি নাতনীর কাছ থেকে, ভাসা ভাসা কিছু ধারণাও ছিল। সাহস করে সোনালী বন্দ্যোপাধ্যায় নামে অ্যাকাউন্ট খুলে ফেললেন। প্রথম প্রথম যেন থই পেতেন না, কি করবেন, কোথায় ক্লিক করবেন, কোথায় করবেন না। এই করতে করতে একদিন ফার্মভিল খেলা শুরু। শুরুতে ঠিকঠাক ম্যানেজ করতে পারতেন না, মাউসও বাগ মানত না, কিন্তু হাল ছাড়েন নি। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখ লেগে এসেছিল বুঝতেও পারেন নি। ঘুম ভাঙল কাজের মেয়ে কল্পনার ডাকে। সে বিকালের চা তৈরী করে ডাকছে।চা খেতে খেতেই তাঁর বন্ধু মিসেস দত্ত এসে গেলেন।

- ‘কি ব্যাপার, আপনার তো আর দেখাই পাওয়া যায় না, শরীর টরীর ঠিক আছে তো?’ জানতে চাইলেন মিসেস দত্ত।

‘- হ্যাঁ হ্যাঁ সব ঠিক আছে। আসলে আর বেরোনো হচ্ছে না। এই বই, টিভি, ইন্টারনেট এইসব নিয়েই সময় কেটে যাচ্ছে।’

- ‘ও সেই ল্যাপটপ নিয়েই পড়ে আছেন এখনো? কি করেন আপনি ইন্টারনেটে? ভাল লাগে এসব আপনার এই বয়েসে?’

- ‘না,না ইন্টারনেটে অনেক কিছু জানা যায় জানেন তো? কত রকম রান্নার রেসিপি, ঘর সংসারের দরকারী কাজের কথা।’

- ‘হ্যাঁ দিদা তো এখন ওই কম্পিউটার দেখে উমাদিকে রান্না করতে বলে, ওতে নাকি সব লেখা আছে, ’ কল্পনা চা, বিস্কুট, চিপস্ নিয়ে এসেছিল, সেও কথায় যোগ দেয়।

- ‘ধন্যি মানুষ বটে আপনি। বুড়ো বয়েসে যে কেউ এসব নিয়ে পড়ে থাকতে পারে তা বাপু জানতাম না। যাক্ গে বলতেই ভুলে যাচ্ছিলাম, সরমাদির ছেলে বউ অন্য ফ্ল্যাটে চলে গেল, জানেন তো? সরমাদি একাই থাকছেন, অসুস্থ মানুষ, ভাবছেন ওল্ড এজ হোমে চলে যাবেন,’ মিসেস দত্ত কথা শেষ করে পট্যাটো চিপস্ মুখে দিলেন।

সেই চিপস্ দেখে সোনালীর খেয়াল হল যে তিনি ফার্মে আলু লাগিয়েছিলেন, তুলতেই ভুলে গেছেন, নষ্ট না হয়ে যায়। মনে পড়া মাত্রই তাঁর উশখুশানি শুরু হল। কিন্তু মুখে কিছু বলতেও পারছেন না, মিসেস দত্তর কথায় হুঁ হাঁ করে যাচ্ছেন। অবশেষে আশেপাশের প্রতিবেশীদের সব খবর জানিয়ে, নিজের শরীরের খবর, নিজের স্বামী, ছেলে মেয়েদের খবরাখবর সব দিয়ে দেড় ঘন্টা পরে মিসেস দত্ত বিদায় নিলেন।

তিনি ওঠা মাত্রই কল্পনা বলে উঠল, ‘আমি কিন্তু এখন কাজলনয়না দেখব। কাল রাতে দেখা হয় নি, এখন রিপিট হবে।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ তুই দেখ,’ সোনালী নিজের বেডরুমের দিকে রওনা দিলেন।

- ‘তুমি কি এখন আবার ওই কম্পিউটার নিয়ে বসবে? কি যে কর বাবা বুঝি না। ভালোও লাগে তোমার ঘরে বসে খালি কম্পিউটার করতে নয় বই পড়তে,’ কল্পনা নিজের মনেই গজ গজ করতে থাকে। সোনালী কোন দিকে কান না দিয়ে ল্যাপটপ খুলে ফেসবুকে লগ ইন করলেন। করতেই দেখলেন যে বারবারা তাঁকে মেসেজ দিয়েছেন যে তাঁর ফসল নষ্ট হতে শুরু করছিল, তিনি আনউইদার করে দিয়েছেন। সোনালী তাড়াতাড়ি নিজের ফার্মে গিয়ে সব আলু হারভেস্ট করে সোনালী কোনোদিকে কান না দিয়ে ল্যাপটপ খুলে ফেসবুকে লগ ইন করলেন। করতেই দেখলেন যে বারবারা তাঁকে মেসেজ দিয়েছেন যে তাঁর ফসল নষ্ট হতে শুরু করছিল, তিনি আনউইদার করে দিয়েছেন। সোনালী তাড়াতাড়ি নিজের ফার্মে গিয়ে সব আলু হারভেস্ট করে ফেললেন। তারপর ফাঁকা প্লটে সোয়াবিন লাগিয়ে বারবারাকে একটা থ্যাংক ইউ মেসেজ পাঠালেন। বারবারা ফার্মভিলে তাঁর নেবার, ইংল্যাণ্ডে থাকেন, তাঁর চেয়েও বছর দুয়েকের বড়। সোনালীর আনেক নেবারই সোনালীর সমবয়স্ক বা বড়। সত্যি কথা বলতে সোনালী এদের দেখেই উৎসাহ পান। এরা যদি খেলতে পারে তিনি নয় কেন?

খেলতে খেলতে এ সব ভাবতে ভাবতেই দেখলেন এমিলি অনলাইন আছেন, চ্যাট করতে চান। সোনালী এখন আস্তে আস্তে এসবে অভ্যস্ত হচ্ছেন।

- ‘হাই, হাও আর ইউ?’ চ্যাট উইনডোতে এমিলির মেসেজ ফুটে উঠল।

- ‘আই অ্যাম ফাইন, থ্যাংকস্।’

- ‘ডু ইউ নীড এনি গিফট? টেল মি।’

- ‘ক্যান ইউ সেন্ড মি আ স্যাডল্? আই নীড টু কমপ্লিট দ্য প্যাডক।’ 

- ‘ও সিওর, এনিথিং এলস্? লেট মি নো।’

- ‘নো, নট নাও, থ্যাংকস্। এমিলি, ডু ইয়োর ফ্যামিলি মেমবারস নো দ্যাট ইউ প্লে?’

- ‘ইয়া মাই হাজব্যাণ্ড, সান, ডটার, ইভেন মাই লিটিল গ্র্যাণ্ড ডটার নো দ্যাইট আই অ্যাম অ্যাডিক্টেড টু ইট। নাও মাই লাইফ রিভলভস অ্যারাউণ্ড ফার্মভিল। বাট হোয়াই?’

- ‘উই আর ওল্ড এনাফ, স্টিল উই প্লে………’

- ‘সো হোয়াট? দেয়ার ইজ নো রুল দ্যাট ওল্ড পিপল কান্ট প্লে। ইউ আর নট মার্ডারিং পিপল হানি, ইউ আর ওনলি প্লেইং গেমস। ডোন্ট থিংক অ্যাবাউট আদারস, ডু হোয়াট ইউ লাইক।’

- ‘ইয়েস ইউ আর রাইট।’

- ‘আই অ্যাম রেইসিং দ্য বার্ন, প্লীজ হেল্প। আই হ্যাভ পোস্টেড ইট অন মাই ওয়াল।’

- ‘আই উইল।’

‘থ্যাংকস্। আইহ্যাভ টু লীভ নাও, সি ইউ লেটার, বাই।’

‘বাই’

এমিলি অফ লাইন হয়ে গেলেন। সোনালী ভাবলেন সত্যিই তো তিনি তো কোনো অন্যায় কাজ করছেন না। তাহলে কেন তিনি  তিনি তাঁর এই খেলা প্রীতির কথা বলতে লজ্জা পান? এমিলি কত সহজে বলে দিল, ‘ডু হোয়াট ইউ লাইক।’ কিন্তু তিনি এটাও জানেন এখানকার লোকেদের মানসিকতাই আলাদা, তিনি কখনোই কাউকে একথা বলতে পারবেন না। যাক্ গে, কাউকে বলতে না পারলেও নিজেতো খেলতে পারবেন, সময়ও বেশ ভাল কেটে যায়, এই যথেষ্ট।সোনালী আবার খেলায় মগ্ন হয়ে গেলেন। অর্চার্ডের জন্যে আরো ছ’টা ব্রিক আর তিনটে নেইল লাগবে। এসব করতে করতেই সারা সন্ধে কেটে গেল।

কল্পনা এসে ডাকল, ‘এবার তোমার এ সব বন্ধ করে খেতে এস দিদা। তোমায় খেতে দিয়ে আমি খুন কা রিস্তা দেখব, সাড়ে ন’টায় শুরু হবে।’

সোনালী তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ বন্ধ কতে খেতে উঠে গেলেন।খুন কা রিস্তার একটা সিনও মিস হলে কল্পনার মুড অফ হয়ে যাবে। খেতে খেতে সোনালীর মনে হল মিসেস দত্তকে ফার্মভিলের কথা বললে ওনার কি প্রতিক্রিয়া হবে। ভাবতে গিয়ে নিজেই হেসে ফেললেন। ভাগ্যিস কল্পনা দেখে নি, সে খুন কা রিস্তায় মগ্ন।

পরের দিন সকালবেলায় সোনালী ডাইনিং টেবিলে বসে জলখাবার খাচ্ছেন, কানে এল উমা আর কল্পনার কথা।রান্নাঘরে দুজনের জোর গল্প চলছে, কোন সিরিয়ালে শাশুড়ি তার ছেলের বউ-এর রান্না করা তরকারীতে একগাদা নুন মিশিয়ে দিয়েছে।

- ‘এসব করেছে মুস্কানকে নীচা দেখাবার জন্যে,’ কল্পনার মন্তব্য।

আগে এসব কথা শুনে সোনালী অবাক হতেন, এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।

- ‘এই নাও তোমার চা,’ উমা চা নিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলে রাখল।

- ‘হ্যাঁ রে তোরা যে এইসব সিরিয়াল দেখিস, কে কার রান্নায় নুন মিশিয়ে দিয়েছে জব্দ করার জন্যে এসব তোদের ভালো লাগে দেখতে?’ সোনালী আর না জিজ্ঞেস করে থাকতে পারলেননা। ‘ভালো লাগে না মানে? সিরিয়াল দেখতে ভালো লাগবে না? শুধু তোমারই এক দেখি ভালো লাগে না।’

- ‘হ্যাঁ রে তোর ছেলে মেয়ে দুটো তো দু দিন ধরে পড়তে আসছে না। কি ব্যাপার? স্কুলেও যাচ্ছে না?’ চা-এ চুমুক দিয়ে সোনালী জানতে চাইলেন।

উমার ছোট ছোট ছেলে মেয়ে দুটোকে তিনি পড়ান। একজন ক্লাস টু আর একজন কেজি ওয়ানে পড়ে।

- ‘পাশের বাড়িতে বিয়ে আছে, সেখানেই পড়ে আছে।কোনরকম ধরে বেঁধে ইস্কুলে পাঠাচ্ছি,’ উমা বলল।

ব্রেকফাস্ট শেষ করে উঠতে না উঠতেই মিসেস দত্তর ফোন এল যে আজ বিকেলে মিসেস সেনের ফ্ল্যাটে বৈকালিক আড্ডা বসবে। শুনেই সোনালীর যেটা প্রথম মনে হল সেটা হল সাড়ে ছ’টায় সোয়াবিন হারভেস্ট করার টাইম। তার মানে সাতটা সাড়ে সাতটার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হবে।ব্রেকফাস্ট খেয়ে খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে তিনি ল্যাপটপ নিয়ে বসলেন খেলার জন্যে। দেখলেন গিফট বক্সে যা যা জমা হয়েছে তাতে প্যাডকটা কমপ্লিট হয়ে যায়। তিনি প্রথমেই তাই সেটা কমপ্লিট করে তার মধ্যে গোটা ছ’য়েক ঘোড়া ঢুকিয়ে দিলেন।

খেলতে খেলতে নেবারদের সঙ্গে টুকটাক চ্যাটিংও চলছে।সোনালীর সব নেবারই যে বয়স্ক তা নয়,কিছু অল্প বয়সী ভারতীয়ও আছে। অল্প বয়সী মানে বাইশ তেইশ যমন আছে তেমন ত্রিশ একত্রিশও আছে। তাদেরই একজন রূপমের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। রূপম সোনালীকে মডার্ণ দিদা বলে ডাকে। সেই থেকে সোনালী তাঁর অল্প বয়সী নেবারদের মধ্যে এই নামেই পরিচিত এবং জনপ্রিয়ও বটে। তাঁর এই খেলা প্রীতির জন্যে তাঁকে এরা খুব ভালোবাসে। তিনি কিছু বুঝতে না পারলে যথেষ্ট হেল্পও করে, আবার নিজেদের অনেক কথা তাঁর সঙ্গে শেয়ারও করে।

- ‘তুমি তো দেখছি প্যাডক কমপ্লিট করে ফেলেছ।’

- হ্যাঁ, এই মাত্র করলাম।’

- ‘চলো আমি তোমাকে একটা ঘোড়া গিফট পাঠাচ্ছি।’

- ‘শুনতে বেশ লাগছে, ঘোড়া গিফট।’

- ‘এখানে তুমি হাতী, ঘোড়া সব পেতে পারো।’

- ‘সত্যি সত্যি তো আর কোনোদিন নিজের এরকম ফার্ম হবে না, তাই খেলেই দিব্যি শখ মেটাচ্ছি।’

- ‘এক্স্যাক্টলি। একদম ঠিক বলেছ। তুমি যে এই বয়েসেও এত সিরিয়াসলি খেলো, উই অ্যাপ্রিশিয়েট দ্যাট।’

- ‘থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ!’

- ‘আচ্ছা আমার একটা প্রব্লেম সল্ভ কর তো। নেকস্ট শনিবার আমার মার বন্ধুর মেয়ের বিয়ে। মার হুকুম সকাল থেকে রাত অবধি আমাকে ওখানে থাকতে হবে। মার খুব ক্লোজ ফ্রেণ্ড। বাবা, বোন তো যাচ্ছেই কিন্তু আমিও না গেলে নাকি মার প্রেস্টিজ থাকবে না। অথচ ওই শনিবারই আমার এক বন্ধুর দাদার বিয়ে। সন্ধেবেলায় বরযাত্রী যাবার কথা, সব বন্ধুরা মিলে কিরকম মস্তি হবে বলো তো। এদিকে মা কিছুতেই রাজী হচ্ছে না।’

- ‘হুঁ খুব গুরুতর সমস্যা। তুমি এক কাজ কর। সকাল থেকে মার বন্ধুর মেয়ের বিয়ে অ্যাটেণ্ড কর। শুধু গেস্ট হিসেবে যেও না, গিয়ে বেশ কাজকর্ম কর, নিজের বাড়ির মতো, বুঝলে। সন্ধেবেলা নিজের বন্ধুর বাড়ি চলে যাও।তাহলে দু-দিকই রক্ষা হবে। আর ইতিমধ্যে মাকেও বুঝিয়ে বল যে তুমি তো একেবারে যাবে না বলছ না, শুধু একটা দিনকেই ভাগ করে নিতে হবে। কি এই সলিউশন চলবে?’

- ‘চলবে মানে? দৌড়বে। তুমি আমাকে যা রিলিফ দিলে।’

- ‘যাক্, বুড়ির সলিউশন পছন্দ হল।’

- ‘আরে তুমি বুড়ি কোথায়? তুমি তো মডার্ণ দিদা। বুড়ি হলে তুমি ফার্মভিল খেলতে?’

- ‘তা ঠিক মনটাকে আমি বুড়ি হতে দিই নি।’

ইতিমধ্যে মোবাইল বেজে ওঠাতে রূপমের সঙ্গে চ্যাট করা বন্ধ করতে হল। ফোন শেষ করে আরও কিছুক্ষণ খেলে তখনকার মত ল্যাপটপ বন্ধ করলেন সোনালী।

বিকালবেলায় মিসেস সেনের ফ্ল্যাটে সবাই জড়ো হয়েছেন।পরস্পর পরস্পরের সংবাদ সংগ্রহ করা চলছে। দেখতে দেখতে আড্ডা জমে উঠল। আড্ডার বিষয় নিজেদের খবর থেকে টিভি সিরিয়াল, বাজার দর, শাড়ী, জামা কাপড় কেনা কিছুই বাদ যাচ্ছে না। এই করতে করতে উঠল সময় কাটানো, রিক্রিয়েশনের প্রসঙ্গ।

- ‘আমাদের আর রিক্রিয়েশন কি আছে? এই গল্প আর টিভি দেখা,’ বললেন মেসেস দস্তিদার।

- ‘তাও একেক সময় মনে হয় যেন সময় আর কাটতে চাইছে না। ছেলেমেয়েরা সব বাইরে, যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত,’ মিসেস মিত্রর মন্তব্য।

- ‘এখন তো কত কিছু করার আছে। কত রকম সিডি পাওয়া যায়, গান শোনা যায়, নিজের পছন্দ মতো সিনেমা দেখা যায়,’ সোনালী বললেন।

- ‘ধুর, সিডি লাগাও, দেখো, অত ঝামেলা পোষায় না। কোথায় কোন মেশিন খারাপ হয়ে গেল, তখন আবার মেকানিক ডাকো। আমার এসব একদম পোষায় না। এসব কি আমাদের করার বয়স?’ মিসেস দত্ত সোনালীকে একদম নস্যাৎ করে দিলেন।

- ‘ঠিক বলেছেন। আমরা কোথায় একটু গল্প গুজব করব নিজেদের মধ্যে, তবে না ভালো লাগে। আমি তো বলি সবাইকে যখন ইচ্ছে আমার ফ্ল্যাটে চলে এসো, আড্ডা মারব,’ বললেন মিসেস সেন।

- 'আপনি অবশ্য ল্যাপটপ নিয়ে অনেকক্ষণ সময় কাটান, আপনি মনে হয় বোর ফিল করেন না,’ সোনালীর উদ্দেশ্যে বললেন মিসেস দত্ত।

- ‘আরে হ্যাঁ, আপনার রান্না করে যে উমা সে বলছিল যে দিদা নিকি সব সময় ঘরে বসে কম্পিউটারে কি করে, বেশী টিভিও দেখে না।কি করেন আপনি এতক্ষণ ল্যাপটপ নিয়ে?’ মিসেস সেনের জিজ্ঞাসা।

- ‘আনেক কিছু করি। গান শুনি, ইচ্ছে মতো সিনেমা দেখি, নেট সাফিং করি। তাছাড়া উমার ছোট ছোট ছেলে মেয়ে দুটোকে পড়াই। আমার সময় বেশ কেটে যায়,’ বললেন সোনালী

- ‘ভাল লাগে এসব নেট টেট দেখতে? দেখেনই বা কি ইন্টারনেটে?’ আবার জিজ্ঞাসা কলেন মিসেস সেন।

- ‘দেখার তো কত কিছুই আছে, সে রান্নার রেসিপি বলুন কি সেলাই-এর ডিজাইন। সবই পাওয়া যায়। মেয়ে, জামাই, নাতি, নাতনীর সঙ্গে চ্যাটও করি,’ সোনালীর উত্তর।

মুখে এইটুকু বললেন আর মনে মনে ভাবলেন আমি তো আর এমিলির মতো জোর গলায় বলতে পারলাম না 'মাই লাইফ নাও রিভলভস্ অ্যারাউণ্ড ফার্মভিল।' বললে তোমরা আমায় পাগল ভাবতে। তাছাড়া তোমরা কেউ জানোই না ফার্মভিল কি।

- ‘আপনার পোষায় ওই পুঁটকে পুঁটকে বাচ্ছা দুটোকে পড়াতে? ধৈর্য্য থাকে?’ এবার প্রশ্ন মিসেস দত্তর।

- ‘হ্যাঁ, বাচ্ছাদের পড়াতে বেশ লাগে। তবে মেয়েটা রোজ আসতে চায় না, ছোট তো’ সোনালী বললেন।

- ‘এই দেখুন জিজ্ঞেস করতেই ভুলে যাচ্ছি মিসেস ব্যানার্জ্জী, পরশু আপনার বাড়িতে কে এসেছিল? এই সন্ধে সাতটা নাগাদ? আমি বাইরে যাচ্ছিলাম, দেখলাম অল্প বয়সী একটি ছেলেকে সিকিউরিটি আপনার ফ্ল্যাট চেনাচ্ছে,’ মিসেস মিত্র জানতে চাইলেন।

- ‘পরশু সন্ধেবেলা’ সোনালী মনে করার চেষ্টা করলেন, ‘ও পরশু সন্ধেবেলা অভিষেক এসেছিল। ও ও শিকাগোতে থাকে। সর্বাণী ওর হাত দিয়ে কয়েকটা জিনিস পাঠিয়েছিল, সেইগুলো দিতে এসেছিল।’

- ‘ও তাই বলুন, মেয়ে জিনিসপত্র পাঠিয়েছে। কি কি এল?’ মিসেস মিত্রর অদম্য কৌতুহল।

 

- ‘তেমন কিছু নয়, টুকটাক কয়েকটা জিনিস।’

- ‘টুকটাকটা কি তাই শুনি,’ মিসেস মিত্র নাছোড়বান্দা।

- ‘ওই তো কয়েকটা বডি লোশন, ক্রীম, দুটো শো পিস আর নাতি নাতনীর ফাংশনের একটা সিডি।’

- ‘নাতি নাতনীর সিডি একলাই দেখলেন, আমাদের বললেন না?’ মিসেস দস্তিদারের অনুযোগ।

- ‘আসবেন, যে কোন সময়ে আসবেন, দেখাব,’ সোনালী হাসলেন।

- ‘ঠিক আছে, কাল সন্ধে সাতটা নাগাদ যাবো। কতক্ষণের সিডি? সাড়ে আটটার আগে ফিরে আসতে হবে।’

- ‘কেন সাড়ে আটটায় কি আছে?’

- ‘ও আপনি তো আবার সিরিয়াল দেখেন না। সাড়ে আটটা থেকে ভালোবাসা কারে কয় হয়,’ মিসেস দস্তিদার উত্তর দিলেন।

- ‘এই দেখেছেন মোহনা কিন্তু সন্দেহ করতে শুরু করেছে যে ছেলেটা আসলে অন্ধ নয়, সেজে আছে,’ মিসেস সেন বলেউঠলেন।‘ আজ মনে হয় মোহনা সবার সামনে বলে দেবে,’ বললেন কিছুক্ষণ বাকী সবার আলোচনা শোনার পর তিনি বললেন, ‘এবার আমি উঠি।’ সোনালী চুপ করে রইলেন, কারণ তিনি ভালোবাসা কারে কয় দেখেন না, তাই আলোচনায় যোগ দিতে পারলেন না।

- ‘কি করবেন বাড়ি গিয়ে? একলা মানুষ, বাড়িতে তো আর কেউ নেই। বসুন, বসুন,’ মিসেস দস্তিদার বলে উঠলেন।

সোনালী ইঙ্গিতটা বুঝলেন। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘না, আপনি যার কথা বলছেন সে সঙ্গী নেই। কিন্তু সেই আমাকে আরো কিছু সঙ্গীর সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছিল যারা আছে, থাকবে। তাদের সঙ্গে সময় কাটাতেও আমার খুব ভালো লাগে।’

- ‘আরও সঙ্গী?’ মিসেস দস্তিদার হতবম্ব।

- ‘হ্যাঁ। বই, ইন্টারনেট, গান এইসব। আমি এখন আসি, পরে আবার দেখা হবে,’ সোনালী আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন। 

- ‘অদ্ভুত মানুষ বাবা। গল্প গুজব ভাল লাগে না,

ভাল লাগে ঘরে বসে ইন্টারনেট দেখতে। কি করে বলুন তো?’ মিসেস সেন বললেন। - ‘বাদ দিন তো। আসলে আমাদের সঙ্গে বসে গল্প করবে না, তাই ওসব বলে চলে গেল,’ মিসেস মিত্রর মন্তব্য।

ক্রমশ সোনালীই ওঁদের গল্পের খোরাক হয়ে উঠলেন।

এই রকম ভাবে বেশ কয়েক মাস কোথা দিয়ে কেটে গেল সোনালী বুঝতেও পারলেন না। এই ক’মাসে তিনি খেলায় আরো বেশী রপ্ত হয়েছেন, কথোপকথনে আরো স্বচ্ছন্দ হয়েছেন। দেখতে দেখতে ডিসেম্বর মাস এসে গেল।সোনালীর মেয়ে সপরিবার দেশে আসছে দু বছর পর।সোনালীও তার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ঠিক করলেন খেলা এবার কিছুদিন বন্ধ রাখবেন। বন্ধুদের সেই মর্মে মেসেজও পাঠিয়ে দিলেন।

সোনালীর ফ্ল্যাট জমজমাট। পিকু, পিয়া বড় হয়ে গেলেও দিম্মার সঙ্গে তাদের খুব ভাব। তাদের মা বাবা মার্কেটিং-এ গেছে, তারা যায় নি, দিম্মার কাছে রয়েছে। পিকু ল্যাপটপ নিয়ে বসে মেইল চেক করছে। করতে করতেই বলল,      

- ‘দিম্মা, তুমি তো খালি বলতে তুমি নাকি আনেক কিছু করো ল্যাপটপে, কি কর?’

- ‘ওই তো জিজ্ঞেস কর না উমাকে, কত দিন রান্নার রেসিপি বলে রান্না করিয়েছি।’

---‘ও শুধু রান্নার রেসিপি?’ পিয়া বলল।

- ‘আমি আর কত কি করব?’ সোনালী হাসলেন।

- ‘দিম্মা তোমাকে বলেছি না কত কিছু করা যায়, তুমি শুধু রান্নার রেসিপি দেখলে?’ পিকু হতাশ।

- ‘দেখ, কত গেমস খেলা যায়। এই পিকু দিম্মাকে কতগুলো ভালো গেমস দেখা তো,’ পিয়া উঠে গিয়ে পিকুর পাশে বসল।

সোনালীর হাসি পাচ্ছিল, শেষে আর থাকতে না পেরে বললেন, ‘সেদিন কি হল সায়ন, সব ক্রপ উইদার করে গেল, ঠিক সময় হারভেস্ট করলে না কেন আর সাদৃতা তোমার প্লে পেনের জন্যে বেবী ব্ল্যাংকেট পেয়েছ তো?’

পিকু, পিয়া চমকে উঠে দিম্মার দিকে তাকাল।

- ‘কি বলছ তুমি? তার মানে তুমি’ পিকুর মুখে আর কথা যোগাচ্ছে না।

- ‘হ্যাঁ তার মানে আমি ফার্মভিল খেলি আর তোমাদের দুজনেরই নেবার,’ মিটিমিটি হাসছেন সোনালী।

- ‘তুমি আমাদের নেবার! আমাকে ব্ল্যাংকেট কে কে দিয়েছিল?’ পিয়া মনে করার চেষ্টা করে, ‘ও ইয়া সোনালী ব্যানার্জ্জী সেন্ট মি মোস্ট অফ দেম।’

- ‘তুমি সোনালী ব্যানার্জ্জী? কিন্তু তোমার নাম তো নীহারিকা,’ পিকু আবাক।

- ‘নীহারিকা ব্যানার্জ্জী নামে খুলি নি। প্রথমে লজ্জা করছিল, সবাই বুঝে যাবে, ভাববে বুড়ো বয়েসে এ সব করে।তাই সোনালী ব্যানার্জ্জী নামে অ্যাকাউন্ট খুললাম। তারপর ফার্মভিল এতো ভাল লেগে গেল যে একদিনও খেলা বাদ দিই নি।’

- ‘হঠাৎ সোনালী নাম চুজ করলে কেন?’ পিয়ার প্রশ্ন।

- ‘হঠাৎ নয় রে, একেবারেই হঠাৎ নয়,’ একটু থেমে সোনালী আবার বললেন, ‘নীহারিকা নাম তোদের দাদুভাই-এর, কেন জানি না ভাল লাগত না। সোনালী বলে ডাকত আমায় বাড়িতে। তোদের মাকে জিজ্ঞেস করিস, মাও জানে। কিন্তু আমার জন্মদিন তো প্রোফাইলে দেওয়া ছিল, সিক্সটিনথ্ জুন। তোরা তো বার দুয়েক আমার সঙ্গে চ্যাটও করেছিস। অবশ্য আমিও ডিসক্লোজ করি নি। আমি খুব মজা পেতাম জানিস তো? তোরা বোধহয় ভাবতেও পারিস নি যে আমি ফার্মভিল খেলব তাই না?’

- ‘একদম না। আমরা ভাবতাম তুমি একটু আধটু মেইল চেক কর আর আমাদের সঙ্গে কথা বলো। কিন্তু এখন জেনে দারুন লাগছে যে আমাদের দিম্মা ফেসবুকে চ্যাট করে, ফার্মভিল খেলে। ট্রুলি মডার্ণ। উই আর প্রাউড অফ ইউ দিম্মা।’

পিকু, পিয়া দিম্মাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরল।

 

                       নির্বাসন

ফরিদা হোসেন

....জীবনের প্রথম যৌবনের সন্ধিক্ষণ থেকে আজ পর্যন্ত- বহু ঘাত-প্রতিঘাত, আর বহু চড়াই-উৎরাই পার হয়ে বর্তমানে একটা স্থায়ী মঞ্চে এসে অবস্থান করছেন তিনি। পুরোন ঢাকার এক চিলে কোঠায় তৈরী করেছেন আপন নিবাস।

মাঝারি আকারের ঘরটিতে রয়েছে বুক সেলফ ভর্তি বই আর পত্র-পত্রিকা। রয়েছে টিভি, ফ্রিজ, আর ক্যাসেট প্লেয়ার। চমৎকার লোভনীয় একটা ঘর নিঃসন্দেহে।

  অন্ধকার থাকতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল কামরান সাহেবের। অন্যদিনও ভাঙ্গে। একই সময়ে, একই নিয়মে ফজরের আযানের ধ্বনিতে।

    তিন তলার চিলে কোঠায় থাকেন বিখ্যাত সাংবাদিক কামরান হোসেন। পুরোন ঢাকায় নিজেদের বাড়ি। নীচের দুই তলায় থাকে ছোট দুই ভাই স্ব-পরিবারে। ছাত্র জীবনের অভ্যেস ওর খুব ভোরে ওঠা। একেবারে আযানের সাথে সাথে। তারপর নামাজ পড়ে সামনের বড় ছাদে যোগ ব্যায়াম করেন অনেক্ষণ ধরে। পঞ্চাশের কামরান সাহেবের সুঠাম, সজীব আর প্রাণবান সৌন্দর্যের কথা অনেকেই আলোচনা করে। অনেক মেয়ের চোখের ঘুম কেড়ে নেয়া কামরান আজ ঘুমাতে পারছিলেন না একেবারেই। অনেক রাতে যাও আসলো তাও অল্পক্ষণের জন্যে। আযানের আগেই ঘুম ভেঙ্গে গেল আবার।

     টেবিল ল্যাম্পটা তখনো জ্বলছে। ঘুম আসবার জন্যে একটা বই নিয়েছিলেন হাতে। চোখ লেগে আসায় বাতিটা আর নেভানো হয়নি। বাইরের দিকে তাকালেন কামরান।ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে। বাতি নিভিয়ে পাশ ফিরলেন। একটু পর আবার জ্বালালেন বাতিটা। বুকের ভেতরটায় কি যেন এক অস্থিরতা। গত কালকের ঘটনাটা কিছুতেই যেন ভুলতে পারছেন না তিনি। এরকম হওয়ার তো কোন কারণ নেই। উচিৎও নয়।

    জীবনের প্রথম যৌবনের সন্ধিক্ষণ থেকে আজ পর্যন্ত বহু ঘাত-প্রতিঘাত, আর বহু চড়াই-উৎরাই পার হয়ে বর্তমানে একটা স্থায়ী মঞ্চে এসে অবস্থান করছেন তিনি। পুরোন ঢাকার এক চিলে কোঠায় তৈরী করেছেন আপন নিবাস। মাঝারি আকারের ঘরটিতে রয়েছে বুক সেলফ ভর্তি বই আর পত্র-পত্রিকা। রয়েছে টিভি, ফ্রিজ, আর ক্যাসেট প্লেয়ার। চমৎকার লোভনীয় একটা ঘর নিঃসন্দেহে।

পা বাড়ালেই চমৎকার একটা ছাদ। ঝুলন- বাগানের মতো একেবারে। নীচে থেকে উঠে এসেছে বিভিন্ন রং-এর বাগুন ভেলিয়ার ঝাড়। এখানে দাঁড়িয়ে কামরান একটু একটু করে আঁধার কাটিয়ে ভোর হওয়া দেখেন। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে স্বাদ বদলানো হাওয়ার স্পর্শ নেন।

      প্রেস ক্লাবে এক লেখকের পুস্তক প্রকাশনা উৎসব শেষে বাইরে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে ছিলেন কামরান। অনুষ্ঠানের বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন তিনি। চমৎকার আর মূল্যবান বক্তব্যের জন্যে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সুখ্যাতি ছড়িয়েছে ওঁর। আজকেও সাহিত্য ও জীবন নিয়ে এতো সুন্দর বলেছেন তিনি যে সবাই খুব বিমোহিত হয়ে গিয়েছিল। ওর চমৎকার সুনাম সৌন্দর্য, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, বাচনভঙ্গি নিঃসন্দেহে দৃষ্টি আকর্ষণ করবার মতো।

এমনি সময় পাশে এসে দাঁড়ালো এক তরুণী। বয়স ২৫ কি ২৬ হবে। কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগ। লম্বা বেণী।

বলল-

- আপনি কি যাচ্ছেন?

কামরান একটু অবাক হয়ে বললেন 

- আমাকে কিছু বলছেন?

মেয়েটি চোখে চোখ রেখে বলল

- জী। এতো নাম শুনেছি আপনার।

- নাম ! হাসলেন কামরান

-  সুনাম না দুর্নাম?

কিন্তু' হাসলো না মেয়েটি।

বলল- কার্ডে আপনার নাম দেখে আর একবার দেখতে এলাম।

- দেখতে এলেন? আমাকে? রিয়েলী?

কামরান যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না।

মেয়েটি বলল- আমার নাম রুমানা। একটা কলেজে পড়াচ্ছি।

কামরান বললেন- 'বেশ ভালো কথা। কিন্তু' আমি তো এসব জানতে চাইনি।'

- চাননি। কিন্তু' আমি জানালাম।

কামরান যেন একটু ভাবলেন।

তারপর বললেন- 'ও আচ্ছা। কিন্তু' আপনাকে এর আগে কখনো দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। রুমানা বলল-

- দেখেছেন। লক্ষ্য করেনি। প্রয়োজন হয়নি তাই। আমি আপনার সব অনুষ্ঠানেই যাই।

কামরান এবার গভীরভাবে দেখলেন রুমানাকে।

তারপর বললেন-

'বা ! আপনি তো ভারী চমৎকার করে কথা বলতে পারেন।

রুমানা এর কোন উত্তর দিল না।

ছোট একটা ডাইরী মেলে ধরলো কামরানের সামনে।

বলল-

- একটা অটোগ্রাফ দেবেন ?

এবার যেন একটু অপ্রস্তুত'ত হলেন কামরান-রুমানার চোখের দৃষ্টি আর কণ্ঠস্বরে।

বললেন- অটোগ্রাফ ?

রুমানা বলল- আমার অনেক দিনের ইচ্ছে। আজ আপনার সাথে কথা বললাম। অটোগ্রাফটিও থাকবে আমার কাছে। প্লীজ-

কামরান তাকালেন রুমানার মুখের দিকে। তারপর একসময় ডাইরিটা হাতে নিয়ে লিখলেন- “শুভেচ্ছা রইলো-কামরান হোসেন।”

রুমানা বলল- ধন্যবাদ। বিরক্ত করলাম। কিছু মনে করবেন না।

না, না, মনে করবার কি আছে-

কামরানের কথা শেষ হবার আগেই রাস-রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল রুমানা। তেমনি দাঁড়িয়ে রইলেন কামরান।

এক বিস্মিত অনুভূতি যেন কিছুক্ষণের জন্যে আচ্ছন্ন করে রাখলো ওকে। কি স্পষ্ট আর দৃঢ় দৃষ্টিভঙ্গি মেয়েটির !

কি চমৎকার আত্ম পরিচিতির ধরন! কতো প্রাঞ্জল !

কামরান হোসেনের মতো অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ আর ঝানু সাংবাদিককে যেন ভাবিয়ে দিলে গেল।

জীবনের চলার পথে কতো মানুষ এসেছে গেছে। চুলে পাক ধরেছে। আজ এই অবেলায় কেন চিত্তের এই অস্থিরতা! যদিও কামরানের সমাধিস' বুকের ভেতরটা একেবারেই স'বির বহু বছর থেকে। এখন আর কোন দক্ষিণা হাওয়া খুলে দেয় না আচমকা ভোরের দুয়ার। সংযত পরিমিত আর মার্জিত জীবন-যাপন ও কর্ম জগতের সুখ্যাতি কামরান হোসেনের জন্যে তৈরী করেছেন এক বিশেষ সম্মানিত আসন। সাংবাদিকতা জগতে যা সত্যি বিরল। দেশ বিদেশের রেডিও টিভিতেও আছে যার একটি আলাদা পরিচিতি।

       বাড়ি ফিরে রুমানা নামের মেয়েটির কথা বারবার মনে পড়তে লাগলো কামরানের। বয়সে তাঁর অর্ধেক হবে মেয়েটি। উজ্জ্বল শ্যামলা, চমৎকার চোখ মুখের গড়ন। ব্যক্তিত্বময় চেহারা। রুচিশীল মার্জিত আচরণ। কথা বলার সেই ভঙ্গি-

‘এতো নাম শুনেছি আপনার-’

- আশ্চর্য ! পাগল নাকি মেয়েটি!

নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করলেন তিনি। ছাদে পায়চারী

করতে করতে নিজের মনকে বার বার শাসন করতে চেষ্টা করলেন কামরান। ছিঃ ছিঃ! যে পাঠ চুকিয়ে দিয়ে মনের দুয়ার বন্ধ করে দিয়েছে বহু বছর আগে, সেখানে কন আজ এই অনাহুত করাঘাত?

কেন জগদ্দল পাথরের দেয়াল কাঁপতে যাচ্ছে অজানে-।

না, না এ হয় না।

এ হওয়া উচিত নয়।

      কামরান সংসারে বাবা-মার তিক্ততা দেখেছে শৈশব থেকে। প্রায় খুঁটিনাটি জিনিষ নিয়ে লেগে যেতেন দু’জনে। কখনো কখনো একে অপরকে গালাগালি করতেন অকথ্য ভাষায়। এক-একদিন স্কুল থেকে এসে এইসব দেখতেন কামরান।

ছোট তাই বোনগুলো এখানে সেখানে বসে কাঁদতো।

স্কুলের ব্যাগটা দাওয়ায় ফেলে রেখে বাইরে চলে যেতেন তিনি। খুব খারাপ লাগতো এই সব। বাড়িতে দূর সম্পর্কের এক চাচা থাকতো। খুব ফর্সা ছিলেন দেখতে। কাপড় পড়তেন খুব আঁটসাঁট করে। কথায় কথায় হাসতেন প্রচুর।

মানুষের গায়ে হাত দিয়ে কথা বলার অভ্যেস ছিল তার।

চাকরির খোঁজে ওদের বাড়িতে এসে সেই যে থেকেছেন-আর নড়বার নামও নেই।

বাবা ইশারা ইঙ্গিতে অনেকবার বলেছেন। তবুও-

মায়ের সাথে চাচার সম্পর্কটা একেবারেই ভালো লাগতো না কামরানের। বাবা যখন বাড়িতে থাকতেন না, কামরান বহুদিন দেখেছে, মাকে চাচার ঘর থেকে বের হতে। এসবে অসহ্য হয়ে-না খেয়ে, এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতেন কামরান। কিন্তু' মাকে কিছু বলার সাহস হতো না। কতদিন ভেবেছে বাবাকে বলে দেবে চাচার কথা। চাচা যেন অন্য কোথাও চলে যায়। কিন্তু' বলার সুযোগ আর আসেনি ওর।

তার আগেই ওদের পাঁচ ভাই বোনকে রেখে ওই চাচার সাথে পালিয়ে গিয়েছিলেন মা। দু’বছরের ছোট বোনটা খুব কেঁদেছিল সেদিন- 

মায়ের ওপর অসম্ভব রাগ হলেও ছোট বোন মুন্নীর কথা ভেবে মায়ের ফিরে আসাটা খুব চাচ্ছিলেন কামরান।

সংসারের বড় সন্তান হয়ে ওই বয়সেই অনেক কিছু বুঝতে শিখেছিলেন তিনি। এক একদিন রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতেন কামরান।

কেন মা এমন করলেন ?

চাচাকে নিয়েই না হয় এ বাড়িতে থাকতেন।

বই এ পড়েছে- “মায়ের তুলনা নেই এ জগতে”।

কিন্তু' এ কেমন মা ওর?

বই এ কি তাহলে মিথ্যে কথা লেখা আছে?

স্কুলের ছেলেরা নানা কথা বলে।

ক্লাস শেষ হলে মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরে আসতে হয় তাকে।

মা চলে যাওয়ার পর থেকে বাবাকে কখনো হাসতে দেখেন নি কামরান।

উদয়াস্ত পরিশ্রম করেছেন পাঁচটি ছেলেমেয়েকে মানুষ করবার জন্যে।

বাড়ির বুড়ী দাইমার কাছেই থাকতো মুন্নী আর বুলা।

সব ভাই বোনদের খুব যত্ন করতো সেই দাইমা।

ওই দাইমাকে একেক সময় মা ডাকতে ইচ্ছে করতো কামরানের।

সেই প্রথম সুন্দরী মেয়েদের ওপর থেকে মন বিষিয়ে উঠেছিল তাঁর।

      এরপর বাবা আর বিয়ে করেন নি। বন্ধু বান্ধবরা অনেক বুঝাতেন। বলতেন- এতোগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে সামলানোর জন্যে ঘরে একটা বউ আনা দরকার।

বাবা বলতেন- 

- নিজের সন্তানদের ফেলে রেখে চলে গেছে একজন। আর পরের সন-সন্তানদের সামলাবার জন্যে আরেকজন আসবে কোন দায়ে ঠেকে ? খুব শিক্ষা হয়েছে আমার।

শিক্ষা হয়ে গেছে কামরানেরও। কিন্তু' সেটা আরো পরে।বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে একটা স্কলারশীপ নিয়ে বিদেশে যাবার চেষ্টায় খুব ব্যস- হয়ে পড়েছিলেন কামরান।

এরই মধ্যে ওর জীবনে এলো নীলা। অল্প কদিনের মধ্যেই জয় করে নিল কামরানের মতো ছেলেকে।

নতুন করে আশার আলো দেখলো কামরান।

রাতটুকুন ছাড়া সবসময় সবকাজের সঙ্গী এখন শুধু নীলা।

ভালোবাসার কাঙ্গাল কামরানও নিজেকে ধন্য মনে করলো নীলার মতো মেয়ের ভালোবাসা পেয়ে।

একদিন সুযোগ বুঝে নীলা বলেই বসলো যে-

কামরানকে ছেড়ে তার পক্ষে এখানে একা থাকা কোন রকমেই সম্ভব নয়।

কাজেই-

তারও যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কামরানও একেবারে মরিয়া হয়ে উঠলো নীলাকে সাথে নিয়ে আমেরিকা যাবার জন্যে।

বহু খাটাখাটনি আর আনুষ্ঠানিকতার পর দু’জনার যাওয়ার প্রস্তুতি'তি পর্ব  সারা হলো।

ছোট ভাই দুটি মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছে।

বিয়ে হয়ে গেছে বোন দুটির। দু’টো বাড়ির একটি ভাড়া দিয়ে, অন্যটিতে সবাই থাকে।

কামরান এখন অনেকটা দায় মুক্ত। নিজেকে নিয়ে ভাববার সময় এসেছে ওর। বাবা সবই জানতেই।

ওদের যাবার আগে কলমা পড়িয়ে বিয়ে দিলেন ঘরোয়াভাবে। ঘনিষ্ঠ দু’একজন ছাড়া বাইরের কেউ জানতো না। নীলার কোন গার্জেন ছিল না। বাড়িতে সৎ মা।

বাবা কিছু কিছু হাত খরচ দেন বটে; কিন্তু তাতে কিছুই হয় না। 

বিকেলের দিকে পারটাইম কিছু কাজ ও টিউশনি করে চলতো ওর। ঢাকায় হলে থাকতো। কাজেই ও নিজেই নিজেই গার্জেন ছিল। কামরানের জীবনের যত গ্লানি, হতাশা আর দুঃখকে অল্প কদিনের মধ্যে ভুলিয়ে দিল নীলা, ভালোবাসার প্লাবনে। এবং একদিন দু’জনেই চলে গেল আমেরিকা, প্রায় দুই বছরের জন্যে।

       প্রায় বছর খানেক পরের কথা। একদিন কামরান বাইরে থেকে এসে দেখে-ব্যাগ গোছাচ্ছে নীলা।

জিজ্ঞেস করতেই বলল-

- আমার এক বান্ধবীর সাথে দেখা হঠাৎ একটা ষ্টোরে, খুব ধরেছে- ওর বাড়িতে দুদিন থাকতে। আমাদেরও তো দেশে ফেরার সময় হয়ে এলো। তাই ভাবছিলাম-

এক কথায় রাজী হয়ে গেলেন কামরান।

বললেন-

- বেশ তো থাকো। কিন্তু' ডার্লিং দুদিনের বেশী নয়। তোমাকে ছাড়া আমার অবস্থান বুঝতেই পারছো-

- অফ কোর্স-

হাসলো নীলা।

পরদিন সকালে বের হবার আগে কামরান বললেন-

- চল তোমায় আগে তোমার বান্ধবী  বাসায় পৌঁছে দিয়ে তারপর একটু এ্যাম্বিসিতে যাব।

নীলা কামরানের গলা জড়িয়ে ধরলো আহ্লাদে।

বলল-- নো থ্যাঙ্কস। তোমাকে কষ্ট করতে হবে না ডার্লিং। আমার বান্ধবী নিজে এসে নিয়ে যাবে আরো ঘন্টা খানেক

পরে। ততক্ষণে আমি তোমার দু’দিনের রান্নাটা রেডি করে ফ্রীজে রাখি। বাকি কাজও গুছিয়ে রেখে যাচ্ছি সব। আমার এ্যাবসেন্সে যেন তোমার কোন কষ্ট না হয়।

নীলাকে কাছে টেনে আদর করলেন কামরান।

বললেন-

- ‘ও’ কে’ । সত্যি নীলা তুমি আমার জীবনে আছো বলেই-

কামরানের মুখে হাত চাপা দিল নীলা।

বলল-

- আর একটিও কথা নয়। তোমার কাজের দেরি হয়ে যাচ্ছে। এসব আবেগের কথা বলার জন্যে সারাটা জীবন তো পড়েই রয়েছে।

হেসে বেরিয়ে গেলেন কামরান। নীলা ওকে গেট পর্যন্ত- এগিয়ে দিল।

    এরপর দুদিন অতিবাহিত হয়ে তৃতীয় দিন ভোরে টেলিফোন বেজে উঠলো। কামরান ঘুম চোখেই রিসিভার তুলে নিল। হ্যালো বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো নীলার কণ্ঠ।

- গুডমর্নিং ডার্লিং। সরি এতো ভোরে তোমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলাম। কামরান বালিশটা টেনে নিল বুকের কাছে।

ঘুম জড়ানো চোখে বলল-

- গুডমর্নিং নীলা- কই কখন আসছো তুমি? ভীষণ মিস করছি তোমাকে।

ওদিক থেকে নীলার কণ্ঠ হেসে উঠলো জল তরঙ্গের মতো।

বলল-

- সরি ডার্লিং। আমি আসছি না।

কামরান বললেন-

- ইয়ার্কি রাখো। প্লীজ লক্ষ্মীটি- বড় তাড়াতাড়ি।

নীলা আবার হাসলো।

বলল-

- বিশ্বাস হচ্ছে না? আলমারীটা খুলে দেখ। আমি আমার সব কিছু নিয়ে চলে এসেছি। আর কখনই আমি তোমার কাছে ফিরে যাব না। কোন বান্ধবী নয়- বন্ধু এখানে চমৎকার বয়ফ্রেন্ড পেয়েছি আমি জীবনকে উপভোগ করবার জন্যে। অনেক বড় চাকরি করে।

কামরান বলল-

- নীলা তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? আমাদের ভালোবাসা, বিয়ে এতো দিনের দাম্পত্য জীবন-

নীলা বলল-

- সব মিথ্যে। তুমি দেশে ফিরে গিয়ে আরেকটা বিয়ে করে নিও প্লীজ। বাই

ওপাশ থেকে রিসিভার রেখে দিল নীলা।

কামরান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না।

ও স্বপ্ন দেখছে নাতো?

হাতে মুখে বার কয়েক চিমটি কেটে দেখলেন-

না। জেগেই আছে সে।

কিন্তু' এ কি করে সম্ভব?

নীলার মতো মেয়ে.......?

উঠে আলমারীটা খুললেন কামরান। এবং স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ভেতরটা একেবারে ফাঁকা। নীলার কোন চিহ্ন নেই কোথাও । সব শূন্য।

আবার বিছানায় এসে বসে পড়লেন কামরান। মাথাটা ঝিম ঝিম করতে লাগলো। কামরান ভেবে পান না কেন নীলা এমন করলো।

কি দরকার ছিল এই প্রতারণার? কিসের অভাব ছিল ওর?

প্রাচুর্য্যের? এতদিনের প্রেম, ভালোবাসা, দাম্পত্য জীবন-সব মিথ্যে হয়ে গেল আরেকজনের অর্থের কাছে?

কি করে এই প্রলোভনে পড়ে গেল নীলা? কি করে ছেড়ে যেতে পারলো সে কামরানকে।

একটু পরেই আবার ফোন বেজে উঠলো।

রিসিভার তুলেই নীলার কণ্ঠ শুনলেন কামরান।

- এতক্ষণে তোমার নিশ্চয়ই বিশ্বাস হয়ে গেছে যে আমি সত্যি তোমাকে ছেড়ে চলে এসেছি।

শোন, তোমার টাকা পয়সা আমি কিছুই আনিনি। কারণ ওটা আনলে তোমার দেশে ফিরে যেতে কষ্ট হবে।

তুমি এতো ভালো যে, তোমাকে আর কষ্ট দিতে চিনে। শোন, আমাকে ফিরে পাবার কোন রকম চেষ্টা চালাবে না। তাহলে বিপদে পড়বে। আমি চাই, তোমার কাজ শেষ করে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও।

লাইনটা কেটে গেল ওপাশ থেকে। রিসিভার হাতে বসে রইলেন কামরান। একটি কথাও বলতে পারলেন না। হঠাৎ করে ওর অসতী মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। নীলা আর মায়ের মুখটা যেন মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। মাথাটা আবার ঝিমঝিম করতে লাগলো। মনে হলো চারদিকে কারা যেন অসংখ্য কাঁসর বাজাচ্ছে। আর সেই অসহ্য ঝনঝনানি শুনতে শুনতে ক্রমশ কোথায় যেন তলিয়ে যাচ্ছেন কামরান। সে যেন হারিয়ে যাচ্ছে এতদিনের পরিচিত লোকালয় থেকে। তলিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের অতল গভীরে........। এই দুর্ঘটনার অল্প কিছুদিন পরেই দেশে ফিরে এলেন কামরান একেবারে অন্য মানুষ হয়ে । কথা বলেন কম।

     লোক জনের সাথে মেলামশো করেন একেবারেই হিসেব করে। কাজ ছাড়া যেন আর কোন কিছুরই প্রবেশ নিষেধ ওঁর জীবনে। এতো বড় বাড়ির চিলে কোঠাটাইা বেছে নিলেন নিজের জন্যে। সেখানে তৈরী করে নিলেন আপন ভুবন। এরপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর-

বাবা মারা গেছেন। সব ভাইরা সংসারী হয়েছে। সবার শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর নিজের কর্মব্যস্ততা'তা নিয়ে কেটে যাচ্ছিল জীবন। দেশের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিষ্ট হিসেবে প্রচুর সুখ্যাতি সর্বত্র। এক নামে চেনে সবাই। বুদ্ধিজীবী মহলে এমন শিক্ষিত, জ্ঞানী, মার্জিত, রুচিবান আর সুদর্শন ব্যক্তিত্ব খুব কমই চোখে পড়ে। পরিবারের লোকজন ছাড়া বাইরের কেউ জানো না তার জীবনের গভীর দুর্ঘটনার কথা। বেশীর ভাগ মানুষ জানে কনফার্ম ব্যাচেলার হিসেবে। জানে না তার অতীতের ইতিহাস।

দেশে আসার পর এতোটা বছর পথ চলতে বহু মেয়ের সাথেই পরিচয় হয়েছে কামরানের ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছে কেউ কেউ। কিন্তু' অত্যন্ত-সতর্কতার সাথে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছে কামরান।

বারবার মা আর নীলার মুখটা মনে পড়েছে শুধু। একেক সময় মনে হয়েছে সব মেয়েরাই বোধহয় কম বেশী একরকম হয়।

অসতী-দ্বিচারিণী-নষ্টা আর ছলনাময়ী।

কখনো কখনো সুখী দম্পতিকে দেখে কামরানের বুকটা খুশীতে ভরে যেতো প্রথমে এবং পরক্ষনেই আবার মনে হতো ভেঙ্গে যাবে না তো ও ঘর?

বন্ধু-বান্ধব ও ভাইবোনের ছেলে মেয়েরা বড় হয়েছে এখন। কারো কারো বিয়েও হয়েছে। মাঝে মাঝে ওরাই পাকড়াও করে কামরানকে বিয়ের জন্যে। ওদের আবদারে হেসে জোড়হাত করেন কামরান।

বলেন-

-'আমার এতো ছেলে মেয়ে। ওদের দেখা শোনা করা এখন আমার সবচে বড় কাজ। বিয়ের ঝামেলায় আর যেতে চাইনা।

সবাই বোঝে এ হচ্ছে কামরানের এড়িয়ে যাওয়ার কায়দা।

সেই কামরান হোসেন দেখতে দেখতে প্রায় পঞ্চাশের কোঠায় এসে পৌঁছেছেন কদিন আগে। পরিবারের ছেলে মেয়েরা খুব ধুমধামের সাথে ছাদে কামরানের জন্ম দিনও পালন করেছে অত্যন্ত- আন-আন্তরিকতার সাথে।

ছেলেমেয়েদের এই নির্মল ভালোবাসার গভীরতায় আবেগে আপ্লুত হয়ে যান কামরান। আর তখনই ওঁর বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে এক অব্যক্ত ব্যথায়।

কি যেন একটা থাকার কথা ছিল...........

কোথায় যেন একটা ক্ষত রয়ে গেল। কিছুতেই যেন আর হিসেবে মেলাতে পারেন না কামরান।

এরই মধ্যে এলো সেই হঠাৎ হাওয়ার ঝটকা-

হঠাৎ আলোর ঝলকানি।

এতদিনের বন্ধ দুয়ারে আঘাত হানলো আবার।

অন্ধকার আকাশে আলো ফুটি ফুটি করছে একটু একটু করে। ভোরের ভেজা ঠান্ডা হাওয়ায় চোখের পাতা আর অবিন্যাস- চুলগুলো কেমন ভেজা ভেজা।

অভিমানী।

কামরানের মনে হলো শেষ রাতের জোছনা চুইয়ে শিশির স্নাত হয়েছে হয়তো-বা কতক্ষণ?

অনেকক্ষণ একাকী আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কোথাও কেউ নেই, চারদিকের মহাশূন্যতা ছাড়া।

                      উপভোগ

ফয়সল আবদুল্লাহ

কারওয়ান বাজার, ঢাকা, বাংলাদেশ

....বিচ্ছেদের পর রঞ্জিত সুপ্রভার ছাপা হওয়া কোনো কবিতা পড়েনি। কবিতা এখন আর তার ভালই লাগে না। তবে দৈনিকের পাতায় সুপ্রভার নাম সে আগ্রহভরেই খোঁজে। সেই নামের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়েও থাকে। আর রাতে যেটুকু অবসর মেলে, তখন পুরনো ডায়রিটা বের করে। ডায়রির ভেতর অনেকগুলো টুকরো কাগজ। প্রতিটিতে সুপ্রভার হাতে লেখা কবিতা।

    সুপ্রভার মনে হলো তার উপমাগুলো ব্যাগে পুরে তালা লাগিয়ে দেয়ার দিন এসে গেছে। এ যুগে নাকি এসব অচল। রিজুর ভাষায় এ নাকি সেকেলে গন্ধ ছড়ায়। রঞ্জিতকে আদর করে রিজু ডাকে সুপ্রভা। এই রিজু তার কবিতার সমঝদার। মাপ মতো প্রশংসা সমালোচনা দুটোই করে। তবেই ইদানীং রিজুর সবকিছুতে কেমন যেন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কবিতা-গদ্য সবই এড়িয়ে চলছে।

   সুপ্রভা বিজ্ঞানের ছাত্রী। তার সবকিছুতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তি আসবেই। রঞ্জিতকে সে মাঝে মাঝে বোঝানোর চেষ্টা করে, কবিতায় কাল ব্যাপারটা অন্যরকম। সুপ্রভার কাছে কবিতার সংজ্ঞা হলো, কালকে আলগোছে একপাশে সরিয়ে পরিচ্ছন্ন কিছু অনুভূতি। রঞ্জিত আবার এসব শুনতে পছন্দ করে না। ভ্রূ কুঁচকে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। আজও যেমনটি আছে।

সুপ্রভা বলল, এই যে তুমি এখনকার ভিজুয়াল প্রডাকশনগুলোকে অতিমাত্রায় মেলোড্রামাটিক বলছ, এটা ভুল। রঞ্জিত রিকশাওয়ালার পিঠে মৃদু স্পর্শ করে বলে, আসে- চালান, সামনে স্পিডব্রেকার। সামনে যাই থাকুক তাতে সুপ্রভার মাথা ব্যথা নেই। সে বলেই যা”যাচ্ছে, ‘দুই হাজার কোটি বছর আগের কথা ভেবে দেখ, কী ছিল? দুচার রকম গ্যাস, সেই গ্যাসের তৈরি তারা সূর্য। আর এখন? সৌরজগত, পৃথিবী, চাঁদ.. আবার সেই চাঁদকে প্রিয়ার মুখের সঙ্গে মেলানোর মতো কবি- সাহিত্যিকও ঝটপট গজিয়ে গেলো। প্রকৃতির চেয়ে বড় মেলোড্রামাটিক কিছু আছে আর!

এই যে আমি তুমি রিকশায়, এটাও এক রকম অতিরঞ্জিত। কী দরকার ছিল বল!’ রঞ্জিত এবার কথা বলার পয়েন্ট খুঁজে পায়। ‘হ্যাঁ সুপু ঠিকই বলেছ, যথার্থ, অতিরঞ্জিত, ভালোই’। ‘সব কিছুতে বেঁকে বস কেন!’ সুপ্রভা ভ্রূ কোঁচকায়। রঞ্জিত তা খেয়াল করে না। দুজন দুদিকে চেয়ে থাকে। কিন্তু' সুপ্রভা বেশিক্ষণ চুপ থাকতে পারে না। অল্প কিছু সময়ের জন্য রঞ্জিতকে কাছে পায়। বাকি সময় ছেলেটার কাজের শেষ নেই। কিছুদিন নাটকের পেছনে তো আবার সিনেমা। পড়াশোনা লাটে উঠেছে অনেক আগে। কাজ নিয়ে রঞ্জিতের সঙ্গে কথা বলে সুপ্রভা তাই সস্তি- বোধ করে না। কিন্তু' আর কীই বা বলে! কবিতা শুনিয়ে আর কদিন! আলগোছে রঞ্জিতের হাতের উপর হাত রাখে সুপ্রভা। কিছুটা চমকে ওঠে রঞ্জিত। ব্যাপারটা সুপ্রভা বেশ উপভোগ করে।

- রজু

- কী?

রঞ্জিতের কণ্ঠ বেশ শান। মনের সঙ্গে তার গলার স্কেল কখনো পাল্টায় না।

- কেমন আছ?

- ভালো, কেন?

- এমনি, কিছু না।

সুপ্রভা হাত সরিয়ে নিঃশব্দে হেসে সামনে তাকায়। রঞ্জিতের দৃষ্টিও সামনে। তবে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ।

 

সাদার উপর হাল্কা নীল ফুল। এ শাড়িটায় সুপ্রভাকে বেশ সরল দেখায়। আয়নায় শুধু চুলটা ঠিকাছে কিনা দেখে। ড্রইং রুমে এক তরুণ সাংবাদিক অপেক্ষা করছে। বেচারা একজন শখের ফটোগ্রাফারও। কম্বিনেশনটা অদ্ভুত। সুপ্রভার পছন্দেই বিয়ে হয়েছে। আর রঞ্জিত? তার সঙ্গে সবচে ভালো মেলানো যাবে প্লুটোর সঙ্গে। সমঝোতার মাধ্যমেই সুপ্রভার জীবন হতে সে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু' কক্ষপথ থেকে হারিয়ে যায়নি। এখনো সেই ডকুড্রামা, অ্যাডফার্মে খেটে বেড়ায়। তেমন একটা পরিচিতি পায়নি। আবার অখ্যাতও নয়। বিয়ে করেনি। তাই যখন তখন কাজের সময় তৈরি হয়ে যায়।

সুপ্রভার ইন্টারভিউ শেষ হয়। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সে। মনে মনে ধন্যবাদ দেয় সাংবাদিককে। প্রথম প্রেম সংক্রান্ত- বিব্রতকর প্রশ্নটা না করার জন্য। হয়তো তরুণ বলেই জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি।

সুপ্রভার স্বামী আড্ডা থেকে ফিরেছেন। যথারীতি আজও তার হাতে গোটা দশেক পত্রিকা। ছুটির দিনে একসঙ্গে সবগুলো পত্রিকায় তার স্ত্রীর কবিতা ছাপা হয়। কবিতা খুব একটা বোঝেন না। তারপরও বন্ধুদের দেখানোর জন্য তিনি নিজেই আবৃত্তি করে শোনান। এ নিয়ে সুপ্রভা বেশ রাগ দেখিয়েও সুবিধে করতে পারেনি। আজও নিশ্চয়ই সবাইকে শুনিয়ে এসেছে। সবাই কি আর অতো কবিতা পছন্দ করে! এ জিনিসটাই বোঝানো গেলো না তাকে। তবে সুপ্রভা ব্যাপারটা এক অর্থে উপভোগও করে।

‘পত্রিকাগুলো দয়া করে জায়গামতো রেখো, টেবিলে ছিটিয়ে রেখো না।’ সুপ্রভার স্বামী দেবব্রত চক্রবর্তী। তিনি কখনোই পত্রিকা ছিটিয়ে রাখেন না। বিশেষ করে শুক্রবারের পত্রিকাগুলোর কপালে যত্নআত্তি একটু বেশিই জোটে। আস- পত্রিকাই তিনি তুলে রাখেন। সুপ্রভা সব জেনেও এ কথা বলবে। আসলে এ বলাটাও সে বেশ উপভোগ করে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় কিনা এ প্রশ্নটা এদের বেলায় অবসান-র। দেবব্রত যথেষ্ট মনযোগী শ্রোতা আর সুপ্রভাও গুছিয়ে কথা বলে।

এভাবে বছর-খানেক চললে তাদের সংসারটাকে অনায়াসে গ্রহের মর্যাদা দেয়া যায়। কক্ষপথ থেকে কখনো চুল পরিমাণ সরবে না। অন্যদিকে আবেগময় দুটো প্রান্তও আছেই।

 

প্রতিথযশা একটি দৈনিকের আয়োজনে কবিতা পাঠের আসরে কী করে যেন সুপ্রভার সঙ্গে রঞ্জিতের দেখা হয়ে গেল। মাঝে কয়েকবার রাস-রাস্তায় শুধু চোখাচোখি হয়েছিল। এখন একেবারে সামনাসামনি। সুপ্রভাই প্রথম বলে।

- কেমন আছ রজু?

রঞ্জিত কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্থ। রজু সম্বোধনের জন্য নয়। সুপ্রভাকে সে মনে মনে খুঁজছিল।

সে কারণেই তাৎক্ষণিকভাবে উত্তরটা দিতে পারে না। মৃদু হাসে। মাথা ঝাঁকায়। সুপ্রভাও হাসে।

সেই হাসিতেও দুর্বোধ্য সরলতা। রঞ্জিত হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠে।

- হ্যাঁ, এই তো! তারপর, এদিকে হঠাৎ?

সুপ্রভা উত্তর দেয় না। রঞ্জিত আবার বলল, অনেকদিন পর তাই না? সুপ্রভা সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকায়। রঞ্জিতের বিব্রতবোধ বুঝতে সে কিছুটা দেরি করেছে। তবে কথা বলায় তার একটুও দ্বিধা নেই।

- কী করছো এখন?

- কিছু না। ভাবছি আগে বিয়ে করবো, তারপর সব কাজ।

- বেশ তো, তাই কর।

- তোমার জলবালিকাটা বেশ ভালো হয়েছে।

সুপ্রভা শব্দ করে হাসে। রঞ্জিত কেমন যেন বোকা বোকা চোখে সুপ্রভার হাসি দেখে।

- তুমি আগের মতোই আছ রঞ্জিত। ঠিকমতো না পড়েই বল কিনা ভালো।

রঞ্জিতের ভেতরটা অতি ক্ষুদ্র সময়ের জন্য পুলকিত হয়। মুহূর্তে মনে পড়ে যার সঙ্গে দেখা করতে সে এখানে এসেছে সে যে কোনো মুহূর্তে অফিস ছেড়ে বের হয়ে যেতে পারে। কিন্তু' মন থেকে খুব একটা তাড়া অনুভব করছে না। সুপ্রভার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, শোনো, আমি কিন্তু' পড়ি, সত্যিই পড়ি!

তাই! সুপ্রভার চোখে অস্পষ্ট কৌতুক। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, চলো চা খাই। অনেকদিন রাস্তায়দাঁড়িয়ে চা খাওয়া হয়নি। সুপ্রভার সাংসারিক বিষয়ে প্রশ্ন করতে রঞ্জিতের ইচ্ছে করলো না।

সময় বড্ড কম। এ সময় অহেতুক কোনো আলাপ নয়।প্রসঙ্গক্রমে সুপ্রভা তার স্বামীর প্রসঙ্গ টেনে আনলো।

- বাচ্চা নেয়ার সিদ্ধান্তটা-ও আমার উপর ছেড়ে দিয়েছে। ক্যামেরা পাগল মানুষ। সংসার নিয়েও তার ভাবার সময় নেই।

রঞ্জিতের মনে হলো, এ মুহূর্তে তার কিছুটা হলেও ঈর্ষা অনুভব হওয়ার কথা। নাটকের পেছনে দৌড়ে জীবনটাই হয়তো তার কাছে নাটকের মতো হয়ে গেছে। তাই হয়তো সুপ্রভার কথাটা নিছক একটা ডায়ালগের মতোই মনে হয়েছে।

- তুমিও কি ব্যস-?

- নাহ্‌, এই যে দেখছো না!

- হুঁ

দ্রুত শেষ হয়ে আসে চা-পর্ব। রঞ্জিতের মনে হলো, এর বেশিক্ষণ থাকাটা উচিৎ হবে না। সুপ্রভা তাকে বিদায় জানাবে, এটা সে কেন যেন মেনে নিতে পারছে না। তাই সে-ই আগে বলল, বিয়ের পর তোমাকে একদিন বাসায় নিয়ে যাব। আমার বৌকে নিয়ে একটা কবিতা লিখে দিয়ে আসবে।

সুপ্রভা বালিকার মতো দ্রুত উপর-নিচ মাথা ঝাঁকায়। রঞ্জিত চলে যায়। রঞ্জিতের হুট করে চলে যাওয়াটাও বেশ উপভোগ করে সুপ্রভা।

 

দেবব্রতকে এখন আর পত্রিকা যত্ন করে তুলে রাখতে হয় না। সুপ্রভার একটা ঢাউস সাইজের বই বেরিয়েছে। বইয়ের গোটা দশেক কপি শোকেয়ে সাজিয়ে রেখেছেন। নিকট বা দুঃসম্পর্কের যেই আসুক না কেন, একটা কপি ধরিয়ে দেবেন। সুপ্রভা এ জন্য প্রায়ই বলে, তোমার মতো ক্রেতারখোঁজ পেলে প্রকাশকরা দরজায় লাইন দেবে। দেবব্রত তার স্বভাবসুলভ হাসি হাসেন। মূলত, এ হাসিটার জন্যই সুপ্রভা কথাটা বলে।

বিচ্ছেদের পর রঞ্জিত সুপ্রভার ছাপা হওয়া কোনো কবিতা পড়েনি। কবিতা এখন আর তার ভালই লাগে না। তবে দৈনিকের পাতায় সুপ্রভার নাম সে আগ্রহভরেই খোঁজে। সেই নামের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়েও থাকে। আর রাতে যেটুকু অবসর মেলে, তখন পুরনো ডায়রিটা বের করে। ডায়রির ভেতর অনেকগুলো টুকরো কাগজ। প্রতিটিতে সুপ্রভার হাতে লেখা কবিতা। রঞ্জিত কখনো পড়ে, কখনো শুধুই হাত বুলোয়। কবিতাগুলো বড় বেশি সরল, তবে দুর্বোধ্য নয়। এখনকার চেয়ে অনেক কাঁচা হাতে লেখা। মিনিট দশেক পর ডায়রিটা কাপড়ে মুড়িয়ে ড্রয়ারের ভেতর গুঁজে রাখে রঞ্জিত। স্মৃতিকাতরতা স্মৃতিকাতরতা  নয়, ব্যাপারটা সে বেশ উপভোগ করে। 

 

 

 
 

                  ছেঁড়া   

কাগজ

দীপন জুবেয়ার

ধানমন্ডি, ঢাকা

- ‘আনেক কিছু করি। গান শুনি, ইচ্ছে মতো সিনেমা দেখি, নেট সাফিং করি। তাছাড়া উমার ছোট ছোট ছেলে মেয়ে দুটোকে পড়াই। আমার সময় বেশ কেটে যায়,’ বললেন সোনালী

       বাড়ির চারপাশ এখন ফাঁকা। কদিন আগেও চারদিকে গাছ-গাছালিতে ভরা ছিল। রাজ্জাকের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতেই গাছ-গাছালি সব বিক্রি করা হয়েছে। মৃত্যুশয্যায় শুয়েও রাজ্জাক ভীষণ প্রতিবাদ করেছিলো, গাছগুলো যেন বিক্রি করা না হয়। কিন্তু' তার প্রতিবাদ শোনবার মত অবসর ছিল না তখন তার হতদরিদ্র পরিবারের। তার চিকিৎসার টাকা জোগাতে শেষমেশ ওই গাছগুলোই বিক্রি করতে হলো। রাজ্জাকের ছোট টিনশেডের বাড়িটা এখন কেমন যেন শ্মশানের মত লাগছে। গাছ বিক্রির টাকায় ডাক্তারের কথামত তার সিটিস্ক্যান করা হলো। সিটিস্ক্যান করে দেখা গেল মাথার ভেতর বড়-সড় এক টিউমার বাসা বেধেছে। ডাক্তার গম্ভীর মুখে বলল, রুগীর অবসর বেশি ভালো না। কোন আশা দেখছি না। বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যান। যে কদিন বাঁচে ভালো কিছু খেতে দিন। ওনার মনের ইচ্ছেগুলো পূরণ করবার চেষ্টা করেন, সময় শেষ। অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন আর আমোদেরও কিছুই করবার নেই।

ডাক্তারের কথামত রাজ্জাককে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হল। লাভের লাভ কিছুই হলো না, মাঝখান দিয়ে এত শখের গাছগুলো গেল। রাজ্জাকের বউ মরা কান্না শুরু করে দিলো, তার সাথে ছেলে মেয়েরাও। যখন সুস্থ' ছিলো রাজ্জাক, তখন যে কতকিছু খেতে চাইত মন, কিন্তু' যাকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়, দিন আনা- দিন খাওয়া অবস্থা তার শক কি আর পূরণ হবার এই সংসারে? কোনদিন একটা ভালো কিছু খেতে পারেনি সে, কিছু খেতে গেলেই ছেলে - মেয়েগুলোর কথা মনে পড়ে যেত। কিন্তু' সবার জন্যে ভালো কিছু কেনার সামর্থ্য তার ছিল না।

      নিয়তির কি খেলা! এখন সে কিছুই খেতে পাওে না অথচ তার চারপাশে কত-কত ভালো-ভালো খাবার পড়ে আছে। কিছুই মুখে দিতে পারে না রাজ্জাক। জোর করে যা কিছু খাওয়ানো হয়, কিছুক্ষণ পর সব উগরে দেয়। দুদিন ধরে কথা বন্ধ হয়ে গেছে তার, কারও সাথে কথা বলতে পারে না। সারাদিন-রাত মরার মত পড়ে থাকে তেল চিটচিটে বিছানার উপর। হঠাৎ দেখলে বোঝাই যায় না, মরা না জীবিত। অতি:ক্ষীণ নিশ্বাস নেওয়ার জন্যে বুকের সামান্য ওঠানামার দিকে খেয়াল করলেই শুধু বোঝা যায়, না এখনও মরে নি, বেঁচে আছে। হঠাৎ হঠাৎ উঠে বসে চারদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। কাউকে সামনে পেলে তার দিকে তাকিয়ে নিজের মাথায় হাত দিয়ে আঘাত কওে আর হু হু করে কাঁদে। মাথায় আঘাত কওে বোঝাতে চায় ভীষণ যন্ত্রণা। কিন্তু' কারও সাধ্য নেই তার যন্ত্রণা কমাবার। শুধু তাকিয়ে থেকে চোখের পানি ফেলা ছাড়া কারও যে কিছু করার নেই।

     রাজ্জাকের দুই মেয়ে। দু-জনেরই বিয়ে হয়েছে। বাবার মাথায় টিউমার ধরা পরবার পর তারা এসে উপস্থিত'ত হয়েছে বাচ্চা-কাচ্চা স্বামী সহ। রাজ্জাক যখন একটা প্রায়ান্ধকার ঘরে শুয়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে ঠিক তখন ঘরের বাইরে দুই মেয়ে-জামাই আর ছেলের তুমুল গন্ডগোল হচ্ছে সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে। কেউ কারও ভাগ ছাড়তে চায় না একফোঁটাও। হতদরিদ্র রাজ্জাকের অল্প কিছু জমিজমা আছে, সারা জীবনের হাড়ভাঙা খাটুনির ফল। ওইগুলো নিয়েই এই গন্ডগোলের সূত্রপাত। উচ্চকন্ঠে গন্ডগোলের শব্দে আশ-পাশের বাড়ির কিছু মানুষ জমে গেছে। গন্ডগোলের একপর্যায়ে রাজ্জাকের একমাত্র ছেলে হায়দার ভীষণ উত্তেজিত কন্ঠে ঘোষণা করলো, বাবার যেখানে যা আছে সব আমার, এর এককনাও আমি কাওরে দেব না। 

হায়দারের বড় বোনও কোন অংশে কম যায় না। সেও গলা ফাটিয়ে চিৎকার কওে বলল, বড্ড লায়েক হয়েছিস তুই না ? আমিও দেখে নেব কি কওে জমিজমা আদায় করতে হয়। তার স্বামী যদিও একটু মিনমিনে স্বভাবের, কিন্তু' বউ এর কথা শুনে চট করে অন্যরকম হয়ে গেল। সে তার বউকে লক্ষ্য কওে বলল, তোমার আব্বা ছেলে জন্ম দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু' মানুষ করতে পারেনি। বিরাট অমানুষ হইছে।

দুলাভায়ের কথা শুনে হায়দার সত্যিই যেন অমানুষ হয়ে গেল। বয়স-সম্পর্কের ভুলে সে আরও উচ্চকন্ঠে গলা ফাটিয়ে বলল, তোরা যা পারিস করিস, আমিও দেখে নেব কার কত ক্ষমতা। আব্বা সব কিছু আমার নামে লিখে দেছে। এর এককনাও আমি কাউরে দেব না।

ধীরে ধীরে আশপাশে লোকজন বাড়তে লাগলো। সবাই নীরব দর্শক। এ ধরনের পারিবারিক গন্ডগোল বাইরের মানুষের কাছে বেশ উপভোগ্য হয়। বেশীরভাগই মহিলা , মুখে কুলুপ এঁটে দাড়িয়ে আছে। কারও মুখে টু শব্দ নেই। কিছুক্ষণের ভেতর গাঁয়ের দু-চারজন বয়ষ্ক লোক এসে গের রাজ্জাকের বাড়ির আঙিনায়। এরা কিন্তু' নীরব দর্শক না। এসব ক্ষেত্রে এরা নিজেদেরকে জাহির করবার একটা সুযোগ পায়। সবার থেকে বয়স্ক জব্বার মোল্লা সামনে এগিয়ে এসে বলল, কি শুরু করলে তোমরা? তোমাদেরও বাপের কতটুক জমি আছে? এই নিয়ে এত কামড়া-কামড়ি ! ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ, বাপটা মৃত্যুশয্যায় আর ছেলে-মেয়েদেরও কান্ড দেখ! ঘোর কলিকাল।

এতক্ষণ যারা চুপ ছিলো তাদের ভেতর এখন মৃদু গুনগুন শুরু হলো। এতক্ষণ সাহস করে কেউ কথা বলতে পারেনি। জব্বার মোল্লার সায় পেয়ে নানা মুখে নানা মন-ব্য শুরু হলো। একজন তার পাশের জনকে লক্ষ্য করে বলল বেশ হতাশ গলায় বলল, সারাজীবন এত কষ্ট কওে এত সব জমিজমা-টাকাপয়সা করে লাভ কি বলেন? আপনি চোখ বুজলেই সব শেষ। ছেলে-মেয়েদের অবস্থা দেখলেন ভাই ? দুনিয়ার হালচাল দিনদিন কি যে হচ্ছে! আগে তোর বাপের জীবন না জমি ভাগাভাগি? এসব অপগন্ড মানুষ করে লাভ কি?

বাইরের লোকজনের কথাবার্তায় হায়দারদের গন্ডগোল কিছুটা ঝিম ধরে গেল। হাজার হলেও গাঁয়ের মুরুব্বি মানুষ। মাথা যতই গরম হোক, তাদেও মুখের ওপর কথা বলতে গেলে দশবার ভাবতে হয়। হায়দার বারান্দায় উঠে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল, মুখ থমথমে। মুখ দেখেই বোঝা যায় ভীষণ বিরক্ত। আছে সেটা বোঝা যাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে তার বুকের ক্ষীণ ওঠানামা দেখে। মুখে কোন কথা নেই, মাঝেমাঝে যখন একটু চোখ খোলে নিজের হাত দিয়ে মাথায় আঘাত করে।

কিছুই খেতে চায় না, মুখের সামনে খাবার ধরলেই হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়। বেশী সমস্যা হয়েছে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ায়। সে যে কখন কি বলতে চায়, কিছু দরকার কিনা কিছুই বোঝা যাচ্ছে  না। এক এক করে ঘরে লোক জমতে শুরু করেছে। যারা বাইরে দাড়িয়ে ভাই-বোনের ঝগড়া দেখছিল তারাই এখন রাজজাকের ঘরে ভীড় জমাতে শুরু করেছে। সবাই আসছে ঘরে কিন্তু' তার নিজের ছেলে-মেয়েদের কোন খোজ নেই। তারা বাইরে দাড়িয়ে আছে থমথমে মুখে। তাদের মাথায় এখন বাবার চিন্তা না, জমির চিন্তা। কিভাবে কে কতটা দখল করবে সেই চিন্তায় অস্থির, বাবাকে নিয়ে ভাববার সময় কই ? আর তাছাড়া বাবাকে তো তারা খরচের খাতায় তুলে দিয়েছে। এখন শুধু অনর্থক ঘন্টা-দিন গোনা, মরার অপেক্ষা। মরলেই হয়, তারপর শুরু হবে আসল খেলা। কার কতটুকু ক্ষমতা দেখা যাবে।

     হায়দারের মাথার ভেতর নানান ফন্দি ঘুরপাক খাচ্ছে, সে থম মেরে বারান্দায় বসে ছিল, কিন্তু' বাবার ঘরে যতই হৈ চৈ বাড়ছে তার বিরক্তিও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। একসময় প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে হায়দার উঠে দাঁড়ালো। নাহ্ এখানে আর বসা যাবে না। একলাফে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির সীমানা থেকে বেরিয়ে আসল সে। হনহন করে হাটা দিলো রসুলপুর বাজারের দিকে। রাগে সর্ব-শরীর জ্বলছে। এখন একটা সিগারেট টানার দরকার। পকেটে নেই এক পয়সা! আগে যা টুকটাক হাত খরচ মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিত, এখন সে উপায়ও নেই। বাবার পেছনে হাজার হাজার টাকা জলের মত খরচ হয়ে গেল। রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে হঠাৎ তার সব রাগ বাবার উপর গিয়ে পড়লো। মনে মনে বলে ফেলল- শালার বুড়া মরেও না। রাগ তো হবেই, মুখে মুখে বোনদের সাথে যতই  হম্বিতম্বি করুক সে তো জানে বাবা কিছুই তার নামে লিখে দেয়নি। দেবেই বা কি করে? দেবার সময় পেল কই? সুস্থ' মানুষ আচমকা বেডে পড়ে গেল। এখন তো কথাও বলতে পারে না। কথা বলতে পারলেও একটা ব্যবস্থা করা যেত, সবার সামনে মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া যেত।

     হায়দারের ভীষণ অস্থির অস্থির লাগছে। বাবা মরার পর সে পারবে তো বোনদের সাথে টেক্কা দিতে? মাধার ভেতর দুঃচিন্তার ঝড় নিয়ে সে বজলুর চায়ের দোকানে ঢুকল। ঢুকেই বজলুকে বলল, একটা সিগারেট দে।

বজলু বিরক্ত গলায় বলল, আর বাকী দিতে পারব না। তোর আগের টাকা শোধ কর আগে।

হঠাৎ কি যে হলো হায়দারের মাথার ভেতর, সে হিংস্র বাঘের মত একলাফে বজলুর গলা চেপে ধরল। অনর্গল গালিগালাজ করতে করতে বলল, তুই দিবি না মানে? তোর বাপ দেবে।

চায়ের দোকানে সবসময়ই কিছু অলস খরিদ্দার বসে থাকে। তাদের একজন হায়দারকে টানতে টানতে দোকানের বাইরে নিয়ে গেল, কি হইছে তোর? তুই কি পাগল হলি? বাকী টাকা শোধ করতে পারিস না আবার গায়ে হাত তুলিস?

এবার যেন হায়দার কিছুটা স্বাভাবিক হল। কোন কথা না বলে হনহন করে আবার বড়ির দিকে হাটা দিল। পেছন থেকে বজলুর রাগান্বিত কন্ঠস্বর ভেসে এলো , ফুটানি মারাস না? বাকী টাকা ক্যামনে আদায় করি দেখিস। হায়দার বজলুর কথায় কর্ণপাত করে না। সে বাড়ির দিকে হাটতে থাকে ধীরে ধীরে। এখন আর সেই ভীষণ উত্তেজিত ভাবটা নেই তার। এখন তাকে অনেকটা অসহায় বিধ্বস্ত লাগছে। নাহ্, মাথা গরম করে এমন একটা কাজ করা ঠিক হয়নি তার। বজলু তার কতকালের পুরনো বন্ধু। বিপদে-আপদে তাকে দেখেছে অনেকবার। বাড়ির আঙিনায় পৌঁছে সে দেখল, আরো বেশী লোকজন জমে গেছে। আচমকা তার মনের ভেতর একটা ধাক্কার মতো লাগলো। বুড়ার কিছু হয়ে গেল নাকি? হায়দার এক ছুটে তার বাবার অন্ধকার-জীর্ণ-মলিন-গুমোট ঘরে ঢুকে গেল।  একে তো ছোট ঘর , মহিলাদের ভীড়ে ঘরে ঢোকাই মুশকিল। সে দেখল, বাবাকে দুজন পিঠে হাত দিয়ে বসিয়েছে আর মা বাবাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু' সে হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে সবকিছু, মুখ দিয়ে একটা গোঙানোর মত শব্দ হচ্ছে শুধু। কিছুই খেতে চাচ্ছে না, নিজের হাত দিয়ে বারবার মাথায় আঘাত করছে। ঘরের ভেতর ফল-মুল আরো কত কি খাবার জমে গেছে।হায়দার বাইরে বেরিয়ে আসল। আচ্ছা তার বুকের ভেতর এমন ধাক্কার মত লাগলো কেন! সে একটু আগেই বুড়ার মৃত্যু কামনা করছিল। তাহলে বুকের ভেতর এমন করে মোচড় দিয়ে উঠলো কেন? এটাই কি রক্তের টান? হবে হয়ত। তার মনটা ভীষণ খারাপ হলো বাবার কথা চিন্তা করে। আহারে, যে মানুষ সুস্থ থাকতে একটা ভালো কিছু কিনে খেতে পারেনি কোনদিন।

    সংসার চালাতেই সারাজীবন হিমশিম খেয়েছে শুধু। অথচ আজ তার সামনে দেখ সব ভালো ভালো খাবার পড়ে আছে, কিন্তু একবিন্দুও মুখে দিতে পারছে না। নিয়তির কি আজব বিচার !

অভাবের সংসারে হায়দারের লেখাপড়া হয়নি বেশিদূর। কোনরকমে ক্লাস সেভেন উঠতেই বন্ধ হয়ে গেল। তার বাবাও সামান্য লেখাপড়া জানে, এটা তার জানা আছে। বাবার হাতের লেখা ছিল অদ্ভুত সুন্দর, যেটা নিয়ে মানুষের মুখে কত কথা শুনেছে সে, ছোটকাল থেকে। আপদ-মস-ক খেটে-খাওয়া, একজন কৃষকের এমন মুক্তার মত হাতের লেখা দেখে করো বিশ্বাস হয় না প্রথম প্রথম। তারপর একসময় বাবার হাতের লেখার কথা ছড়িয়ে পড়লো জনে জনে। হায়দার ছোটবেলা থেকে দেখছে তার বাবার কাছে কত লোক আসত একটা চিঠি লিখে নেবার জন্যে। বাবা বিরক্ত হতো না। হয়ত মনে মনে একটু গর্বও ছিল তার এজন্যে। একজন হতদরিদ্র মানুষের আর কিই বা থাকে একজীবনে গর্ব করার মত? নুন আনতে পান-া ফুরোয় যার সংসারে তার গর্ব আসবে কোথা থেকে? ছোটবেলার কথা মনে পড়তেই আরো মন খারাপ হলো হায়দারের। বাবার পিঠে চড়ে সমস্ত- এলাকা ঘুরে বেড়াত সে। পুকুরের এমাথা থেকে ওমাথা সাঁতার দিত।

কি মনে করে সে আবার বাবার ঘরে ঢুকল। তাকে এখনও জোর করে খাওয়াবার চেষ্টা চলছে। বাবাকে ওষুধগুলো পর্যন্ত খাওয়ানো যাচ্ছে না। হায়দার একদৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে রইল। একটু পর সে খেয়াল করলো বাবা হাত নেড়ে তাকে কি যেন বোঝাবার চেষ্টা করছে।

কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে হায়দারের মনে হলো, হ্যাঁ সে বোধহয় বুঝতে পেরেছে বাবার ইঙ্গিত। বাবা কাগজ-কলম চাচ্ছে। সে একছুটে তার ঘর থেকে অনেক খুঁজে কাগজ-কলম নিয়ে আসল। কলমটা ভালো না, দাগ পড়ে না ভালো । মহিলাদের ভীড় ঠেলে বাবার সামনে যেয়ে কাগজ-কলম রাখল সে। বাবা তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো, যেন চিনতে পারছে না। তারপর শুকনো-চিমসানো মুখে একটুকরা মৃদু হাসি দেখা গেল। হ্যাঁ, তারমানে সে কাগজ-কলমই চাচ্ছিল। কাঁপা-কাঁপা হাতে সে কোনরকমে লিখলো, “বাবা তুই ওদেরও বল আমি কিছুই খাব না এখন। আমারে একটু শানি-তে ঘুমাতে দে তোরা। ঘরের থাইকে সবাইওে চাইলে যাতি বল।” অনেক কষ্টে এটুকু লিখেই শুয়ে পড়লো বাবা। হায়দারের হাতে কাগজের লেখা অংশটুকু দিয়ে বাকি কাগজটা ছিঁড়ে নিজের কাছে রাখলো বাবা। কলমটাও। হায়দার সকলকে ঘর থেকে হটিয়ে দিল। মাকে জোর করে বাইরে নিয়ে গেল। গম্ভীর গলায় বললো, “সে ঘুমাইতে চায়, তোমরা তারে যন্ত্রণা দিয়ো না, কেউ ঘরে ঢুকবা না এখন।” মা কান্নাজড়িত কন্ঠে বললো, “ কিন্তু' সকাল থেইকে তো কিছুই খাইলো না তোর বাপে, ওষুধও খায় না। হায়দার রাগি গলায় বললো, “এখন তার খাবার ইচ্ছা নেই, যখন ইচ্ছা হবে কাগজে লিখে জানাবে। তোমরা কেই যেন ঘরে ঢুগবানা। ”লোকজন এবার যার যার বাড়ির পথ ধরলো, একটু একটু করে ফাঁকা হলো বাড়িটা। তারপর শুনশান নীরবতা।

হায়দার থমথমে মুখে চেয়ারের উপর বসে পড়লো ঠিক তার বাবার ঘরের সামনে। কিছুক্ষণ আগেও তার মধ্যে যে হিংস্র ভাবটা ছিল এখন তার বিন্দু মাত্র নেই। বরং, একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে তার দু-চোখে এখন এক অদ্ভুত শূণ্যতা বিরাজ করছে। ফাঁকা দৃষ্টিতে দুরের মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। একসময় তার অজানে- চোখ দুটো জ্বালা করে উঠলো।  সে দ্রুত তার ঘরে ঢুকে দরজা টেনে দিলো। দ্রুত হাত দিয়ে ভেজা দু-চোখ মুছে ফেলল। তার এমন হচ্ছে কেন? বাবা যে আর বাঁচবে না এটা তো এখন সবাই জানে। তাহলে এই শেষ সময়ে এসে তার চোখ ভিজে যাচ্ছে কেন? হায়দার তার খাটের ওপর শুয়ে পড়লো । শরীরে কুলানো যাচ্ছে না আর। তবু বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। কিন্তু' তাকে তো এখন দুর্বল হলে চলবে না, সংসারের সব দায়িত্ব এখন তার। না আর কাঁদতে না হায়দার। তাকে শক্ত হয়ে দাড়াতে হবে, এছাড়া যে আর উপায় নেই তার। বাবা যতদিন সুস্থ- ছিলো ততদিন কাউকে একটুও বুঝতে দেয়নি কিভাবে চলে যাচ্ছে সংসারটা।

     দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। বাড়িতে রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া একরকম বন্ধ। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে । উথাল-পাতাল চিন্তা করতে করতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে।

উচ্চরো কান্নার শব্দ আর হৈ-চৈ না হলে আরো কতক্ষণ ঘুমাতো জানে না হায়দার। কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙলো তার। গভীর ঘুমের ঘোর কাটতে একটু সময় লাগলো তার। তারপর একলাফে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসলো হায়দার। বাড়ি লোকে - লোকারণ্য। মহিলারা সব মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কান্না সামলাচ্ছে যেন। হায়দার বাবার ঘরে ঢুকতে যাবে এমনসময় তার সেই ঝগড়াটে বড়বোন দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে। “ভাইরে আব্বা আর নাইরে ভাই”। হায়দার ফ্যালফ্যাল করে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলো তার বোনের দিকে। তারপর সে যেন সম্বিত ফিরে পেল। ঘুমের রেশ কেটে গেছে পুরোটাই। তার বুকের ভেতর থেকে একটা লম্বা দীর্ঘ:শ্বাস বেরিয়ে আসল। “বাবা নেই?” সে আর বাবার ঘরে ঢুকলো না, আস্তে করে চেয়ারে বসে পড়লো। চারদিকে শুধু কান্নাকাটি আর বিলাপের আওয়াজ , কিন্তু কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করছে না। সে আবার সেই শূন্য দৃষ্টিতে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বসে থাকলো । সন্ধ্যা নেমেছে অনেক আগেই। তারমানে সে লম্বা সময় ঘুমিয়েছে। ধীরে ধীরে বাড়িতে লোকজনের ভীড় আরও বাড়ছে।

এখন অনেক কাজ। বাবাকে দাফন করতে হবে। কিন্তু' পাথরের মত শক্ত হয়ে বসে থাকলো। বাবার মৃত মুখ দেখতে ইচ্ছে করছে না তার। সময়ের হিসাব নাই। এভাবে কতক্ষণ বসে থাকলেও সে জানে না। একসময় গ্রামের মুরুব্বিরা বাবার লাশ নিয়ে উঠনে বেরিয়ে আসলো। এখানে এখন তার বাবাকে গোসল করানো হবে। শেষবারের মত। মানুষের ভীড় এখন লাশকে ঘিরে। বাবার ঘর মুহুর্তের ভেতর শূন্য-ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু ঘরের এককোনে মা একা বসে আছে মৃতের মত। তার বোধহয় আর কান্নার শক্তিটুকুও নেই।

পায়ে পায়ে সে বাবার বিছানার কাছে যেয়ে দাড়ায়। এখানেই একটু আগে তার জীবিত বাবা শুয়ে ছিল। সেই মানুষ কোথায় চলে গেল। বাবার খাটের ওপর জীর্ণ-মলিন চাঁদর। ঘরে একটা অল্প পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে, যেটা গোটা পরিবেশটাকে আরও করুন করে তুলেছে। মা মরার মত বসে আছে, মাঝে মাঝে শুধু বুক চেরা দীর্ঘ:শ্বাস ফেলছে। এটা-সেটা ভাবতে ভাবতে হায়দারের চোখ আটকে গেল একটা লাল কলমের উপর, যেটা আজ সে বাবাকে দিয়েছিল। বাবার বালিসের পাশে পড়ে আছে ওটা। কি মনে করে সে কলমটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো। আর ঠিক তখনই তার মনে পড়ে গেল, বাবা কাগজের একটা ছেড়া অংশ তার কাছে দিয়েছিল। বাকিটুকু নিজের কাছে রেখেছিল। মুহুর্তেই হায়দারের মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল। সে একলাফে খাটের উপর উঠে কি যেন খুঁজতে লাগলো। বাবার চিটচিটে বালিশটা তুলে ধরতেই সে জিনিসটা পেয়ে গেল, যেটা সে খুঁজছিল। একটুকরা ছেড়া কাগজ। কাগজটাতে কাঁপা-কাঁপা হাতে কিছু লেখা আছে। কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরে প্রবল উত্তেজনায় সে পড়া শুরু করলো, “বাজানরে, আমি সারাজীবন তোদেরে ভালো কিছু খাওয়াইতে পারি নাই, এখন আমার চারপাশে অনেক অনেক ভালো খাবার। তোদেরে না দিয়ে আমি এইগুলান কেমনে খাই, তুই বল? আমি চাইলে যাবার পর তোরা এইগুলান খাস বাপজান। তোর মারে দেখিস।”

হায়দার একবার, দুবার, তিনবার, বারবার লেখাগুলো পড়তে লাগলো। তার দু-চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে কাগজের টুকরাটা ভিজে ন্যাতান্যাতা হয়ে গেল। একসময় হায়দার গলা ছেড়ে কেঁদে উঠলো “বাজানরে”। সাথে সাথে ঘরের ভেতর ছুটে আসলো অনেক মানুষ, পুরুষ-মহিলা আর মুরুব্বিরা প্রায় সবাই, যেন এতক্ষণ কারও মনে ছিল না হায়দারের কথা। একজন হায়দারের মাথায় হাত রেখে সান-নার সুরে বললো, “বাবারে কান্দিস না, কারও বাপ-মা চিরদিন বাঁচে না। কিন্তু হায়দারের কানে তখন কারও কথাই ঢুকছে না, তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই ছোটবেলার একটা দৃশ্য, বাবা কাঠ-ফাটানো রোদে সমস্ত- শরীর পুড়িয়ে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরেই হাঁক দিতো, “কই, বাজান তুই কই? আয় গা ধুয়ে আসি”। হায়দারও অপেক্ষায় থকত, কখন বাজান বাড়ি ফিরবে। সে ছুটে এসেএকলাফে বাজানের কাঁধে উঠে বসতো। তাকে পিঠে নিয়ে পুকুরের এপাশ থেকে ওপাশ যেয়েই বাজান বলতো, “চল বাপ, গরম-গরম ভাত খাই।”

হায়দার আরেকবার “বাজান” বলে ফুঁপিয়ে উঠলো। তার সমস্ত শরীর কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগলো। সে তার হাতের ছেড়া কাগজটা কাউকে দেখতে দিলো না। ঝাপসা চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখল, অনেক অনেক খাবার সেখানে। সত্যিই বাজান কিছুই খায়নি। সব রেখে গেছে তাদের জন্যে । হায়দারের বুকটা যেন ভেঙে যাচ্ছে।

মা উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। হায়দার মাকে জোর করে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “বাজানওে আমার কিচ্ছু লাগবে না । শুধু তুমি ফিরে আসো আমার কাছে।”

বাইরে তখন রাজ্জাকের মৃতদেহের গোসল শেষ করে জানাজার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।  

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?