• বোর্ডিং লাউঞ্জ - অরুণ মাইতি 

  • পায়রা  -অরুণ মাইতি 

  • শেষ ইচ্ছা - চন্দ্রানী ভট্টাচার্য্য

  • মনই জানে - কোয়েল দত্ত

  • অর্ধ-শতক - পিয়ালী গাঙ্গুলী

  • সব চরিত্র কাল্পনিক - সঙ্ঘমিত্রা বসু 

গল্প সমগ্র ৬

 

                     বোর্ডিং

    লাউঞ্জ 

অরুণ মাইতি 

.....শ্রেয়সী এগিয়ে গেল। কিন্তু দুই-পা পরেই দাড়িয়ে পড়ল। গৌতমের দিকে ফিরে অভিমানীর সুরে বলল – 'আগে কথাটা কেন বলতে পারলি না গৌতম। আমার Mr. X যে তুই ছিলি বুদ্ধু।'শ্রেয়সী দ্রুতপদে বোর্ডিং গেটের দিকে এগিয়ে গেল।....

'Excuse me!'

কলকাতা এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে শ্রেয়সী একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। বেশ কয়েকদিন খুব ধকল গেছে । খুড়তুত বোনের বিয়ের উপলক্ষে থেকে এসেছিল সে। বিয়েটা খুব আনন্দে কেটেছে, কিন্তু ঘুম হয় নি। আজ ভোরের ফ্লাইট ছিল। রাত শেষ হতে না হতেই বেরিয়ে পড়তে হয়েছে তাকে। ফ্লাইট এক ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ছে। তাই সে চোখ বুজে বসে অপেক্ষা করছিল। কখন যে তন্দ্রা এসে গেছে বুঝতে পারে নি। একটু বিরক্ত হয়েই সে চোখ খুলল।

'Excuse me! Are you Miss Shreyosi Roy?'

কিছুক্ষণের জন্য সে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে রইল – তারপরই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল - 'আরে গৌতম না? What a pleasant surprise!'
গৌতম - 'যাক ভুল করি নি। একটু ডাউট হচ্ছিল। তাই জিগ্যেস করলাম। তুই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলি। ডিস্টার্ব  করলাম?'
শ্রেয়সী – 'একদম না। ভালো করেছিস। আমি তো এখনো ভাবতেই পারছি না তোর সাথে কথা বলছি। কলেজের পর তোর সাথে প্রথম দেখা হল।'
গৌতম – 'হ্যাঁ। প্রায় দশ বছর বাদে।'
শ্রেয়সী – 'তুই সেই যে B.Sc. পরীক্ষার শেষে বাড়ি যাবি বলে উধাও হয়ে গেলি, তারপর তোর পাত্তা পাওয়া গেল না । রেজাল্টের দিনও তোর দেখা পাওয়া গেল না।'
গৌতম – 'জানি। আসলে তখন একটার পর একটা দুর্ঘটনা এমনভাবে ঘটে যাচ্ছিল যে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম।'
শ্রেয়সী – 'সে কী রে! কী হয়েছিল?'
গৌতম – “প্রথমে মা তারপর বাবা দুজনেই কিছুদিনের মধ্যে মারা গেলেন। শোক ভুলতে না ভুলতেই কাকারা সম্পত্তি নিয়ে বিশাল ঝামেলা শুরু করে দিল। সম্পর্কগুলো কেমন যেন অদ্ভুতভাবে চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছিল। জীবনের মানেটাই বদলে গিয়েছিল।'
শ্রেয়সী – 'কী বলছিস! তুই এই রকম পরিস্থিতিতে ছিলি, একবার জানাবার প্রয়োজনও মনে করিস নি!'
গৌতম – 'এখনকার মতো সবার কাছে মোবাইল ফোন থাকলে জানাতাম। কিন্তু তখন মানসিকভাবে এতটাই বিধ্বস্ত ছিলাম যে তোদের জানিয়ে বিব্রত করতে চাই নি। আর চাইলেও জানানো সম্ভব ছিল না। তুই কলকাতায় ছিলি না

আর অর্ণবও চাকরি নিয়ে আসাম চলে গিয়েছিল। আর কারুর টেলিফোন নাম্বার আমার কাছে ছিল না।' শ্রেয়সী – 'হ্যাঁ, তখন মুম্বাই শিফট করে গিয়েছিলাম। বাবা তো আগেই ওখানে বদলি হয়ে গিয়েছিল। পরীক্ষার পর খুব জোরাজুরি করলেন ওখান থেকে ফার্দার স্টাডি করার জন্য। মায়েরও তাই ইচ্ছে ছিল।'গৌতম – 'ছাড় পুরানো কথা। সবই পরিস্থিতি। তা এখন কী করছিস? মুম্বাইতেই আছিস?'

শ্রেয়সী – 'না। আমি এখন ব্যাঙ্গালোরে থাকি। ওখানে একটা স্কুলে পড়াই। তুই?'গৌতম – 'আমি ফ্রিল্যান্সার। আপাতত দিল্লীতে আছি। যখন যেমন কাজ পাই করি।'একটু হেসে গৌতম বলল 'আমি ভাবতেই পারছি না তুই নাকি স্কুল টিচার। তোর থেকে ভীতু বোধহয় কলেজে আর কেউ ছিল না।' তা তোর কথা ক্লাসে কেউ শোনে?'
শ্রেয়সী – 'স্কুলে খোঁজ নিয়ে দেখ, কড়া টিচার হিসেবে আমার বদনাম আছে। দশ বছর আগের আমি আর এখনকার আমি-র মধ্যে অনেক তফাত।'
গৌতম – 'তা ঠিক। মোটা হয়েছিস। দিদিমণি মার্কা একটা চশমাও হয়েছে দেখছি।'
শ্রেয়সী – 'তবে তুই একদম বদলাস নি। যেই রকমটা ছিলি সেই রকমটাই রয়েছিস।'
গৌতম – 'তারপর, বিয়ে করেছিস?'
শ্রেয়সী – 'হ্যাঁ। বিয়ে ছয় বছর হয়ে গেছে।'
গৌতম – 'গ্রেট! তা তোর Mr. X কেমন আছে?'
শ্রেয়সী – 'Mr. X! তোর এখনো মনে আছে সেই কথা?'
গৌতম – 'মনে থাকবে না। তোকে সবাই যা খেপাতো ঐ ভদ্রলোককে নিয়ে। তবে ওকে নিয়ে কবিতাগুলো অসাধারণ লিখেছিলি। আমি কপি করে রেখেছিলাম লেখাগুলো। এখনো থাকে আমার সঙ্গে।'
দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রেয়সী বলল 'না রে, ঐ চ্যাপ্টারটার আর কিছু হল না।'
গৌতম – 'ও, sorry to hear that, ঐরকম তো জীবনে হয়েই থাকে। তা কর্তা কী করে? ছেলেমেয়ে হয়েছে?'
শ্রেয়সী – 'ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ওখানে একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। আর চার বছরের এক দুরন্ত মেয়ে আছে।'
গৌতম – 'অসাধারণ। তা ওরা কোথায়? দেখছি না তো?'
শ্রেয়সী – 'ওরা আসে নি। কাজিনের বিয়ে ছিল। ও ছুটি পায়

নি। শাশুড়িমা মেয়েকে এই গরমে পাঠাল না।' গৌতম – 'তা ভালোই করেছেন। এখানে যা গরম তাতে ওর ভীষণ কষ্ট হতো। ব্যাঙ্গালোরের ওয়েদার তো খুব ভালো।' শ্রেয়সী – 'হ্যাঁ। ওখানে এতটা গরম পড়ে না। প্লেজেন্ট ওয়েদার। তা তোর খবর বল। বিয়ে করেছিস?' গৌতম – 'না।'শ্রেয়সী – 'এখনো বিয়ে করিস নি কেন? গার্ল ফ্রেন্ড আছে নিশ্চয়ই?'গৌতম – 'না না। সে রকম কিছুই নেই।'শ্রেয়সী – 'তাহলে সারাজীবন ব্যাচেলর থাকার প্ল্যান করছিস নাকি?'গৌতম – 'সেইরকমই ইচ্ছে আছে। বিয়ে করব না।'শ্রেয়সী – 'হমম। ডাল মে কুচ কালা হ্যাঁয়। প্রেম ঘটিত কিছু ব্যাপার মনে হচ্ছে। খুলে বল।' গৌতম – 'আরে তেমন কিছু না। একজনকে ভালো লাগতো, তারপর সেইরকম ভাবে আর কাউকে ভালো লাগে নি।'শ্রেয়সী – 'ও, তা কাজের সূত্রে কাউকে পছন্দ হয়েছিল?'গৌতম – 'না। কাজের সূত্রে নয়। তার আগে।'শ্রেয়সী – 'কলেজের সময়?' গৌতম সম্মতিসূচক একটু হাসল।শ্রেয়সী – 'কী সাংঘাতিক! সবাই আমায় খেপাতিস আর তুই নিজে ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিলি। আমরা এক ফোঁটা টের পাই নি। কলেজ মানে তো আমি নিশ্চয়ই চিনি।'গৌতম হাসতে থাকলো।শ্রেয়সী – 'তুই হাসি থামা। তার নাম বল।'গৌতম – 'ছাড় না পুরানো কথা ঘেঁটে কী লাভ?'শ্রেয়সী – 'তুই থাম। দাঁড়া, আমি গেস করি – শর্মিষ্ঠা?'

গৌতম – 'না।'

শ্রেয়সী – 'তাহলে অনন্যা?'
গৌতম – 'না।'
শ্রেয়সী – 'ঋতু?'
গৌতম – 'না। কাটা না।'
শ্রেয়সী – 'চুপ কর। তাহলে কী স্নিগ্ধা, রত্না, নিশা বা অপলার মধ্যে কেউ?'
গৌতম – 'না। ওদের কেউ না?'
শ্রেয়সী – 'তাহলে কে? আমাদের সিনিয়র বা জুনিয়র কেউ?'
গৌতম – 'না।'
শ্রেয়সী – 'আর তো কাউকে মনে পড়ছে না। তুই নামটা বল।'
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে গৌতম বলল – 'আর একজনই তো বাকি রইলো।'
'আর একজন - ' কথাটা অস্ফুটভাবে উচ্চারণ করেই শ্রেয়সী স্তব্ধ হয়ে গেল। স্তম্ভিত হয়ে সে গৌতমের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণের জন্য, তারপর চোখ নামিয়ে নিলো মেঝের দিকে।

নিস্তব্ধ অবস্থায় কেটে গেল কিছুটা সময়। ডিপার্টচার এনাউন্সমেন্ট তাদের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করল। শ্রেয়সী গৌতমের দিকে না তাকিয়েই বলল, 'তুই তো এখানে আছিস, লাগেজগুলোর একটু খেয়াল রাখ। আমি রেস্ট রুম থেকে আসছি।'
সে দ্রুতপদে টয়লেট এর দিকে প্রস্থান করলো। গৌতম খুবই অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে ভাবতে পারে নি শ্রেয়সী এইরকম রিয়াক্ট করবে। তাকে সে কলেজের সময় থেকে ভালবাসে। কিন্তু বলতে পারে নি। এতদিন বাদে দেখা হবার পর আজ তা জানানোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। সে এখন বিবাহিত। এই কথার তো আজ কোন মানে নেই। নিজেকে দোষারোপ করতে থাকল সে।

অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। শ্রেয়সী এখনো ফেরে নি।  বোর্ডিং-এর লাইনটা ক্রমশ ছোট হতে শুরু করেছে। মাত্র সাত-আট জন বাকি। গৌতম চিন্তায় পড়ে গেল। শ্রেয়সী এতই বা দেরী করছে কেন? তার কী একটু এগিয়ে দেখা উচিত? কিন্তু ব্যাগগুলোর কী হবে?
বেশিক্ষণ তাকে ভাবতে হল না। শ্রেয়সী ফিরে এল। তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ থেকে বোর্ডিং পাসটা বার করতে করতে আপনমনে বলল - 'উঃ, বড্ড দেরী হয়ে গেল।'
ভ্যানিটি ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে আর হ্যান্ডব্যাগের ট্রলিটা খুলে হাতে নিয়ে গৌতমের দিকে ফিরে বলল – 'আর কথা হল না। পারলে যোগাযোগ রাখিস। ফেসবুকে আমার নাম দিয়ে সার্চ করলেই পেয়ে যাবি। ছবি দেওয়া আছে তাই চিনতে অসুবিধা হবে না। চল, আজ আসি।'

শ্রেয়সী এগিয়ে গেল। কিন্তু দুই-পা পরেই দাড়িয়ে পড়ল। গৌতমের দিকে ফিরে অভিমানীর সুরে বলল – 'আগে কথাটা কেন বলতে পারলি না গৌতম। আমার Mr. X যে তুই ছিলি বুদ্ধু।'
শ্রেয়সী দ্রুতপদে বোর্ডিং গেটের দিকে এগিয়ে গেল।

                         মনই জানে

কোয়েল দত্ত

 

....কথা বলতে বলতে ভীষণ হাঁপাচ্ছে সুপর্ণা। উদ্ভ্রান্তের মত চেয়ে আছে। কোটোরাগত চোখের নীচে কেউ যেন কয়েক প্রলেপ কালি লেপে দিয়েছে । চোয়ালটা ভিতরে ঢুকে গেছে । শীর্ণ শরীরটাকে কোন রকমে চেয়ার থেকে তুলে দরজার দিকে দু পা এগিয়ে গিয়ে পিছিয়ে আসল। চিৎকার করে বলল' ডঃ তরফদার বলুন না আমি কি করব? '

    সুপর্ণা আজ বেশ সকাল সকালই রান্নাটা সেরে ফেলেছে। শুধু এক তরকারি ডাল ভাত করতে আর এমন কি সময় লাগে? কয়লার উনুন বলে যা সমস্যা। অনেক দিন বাদে আজ নৈহাটির বাইরে যাচ্ছে, সময়ে পৌঁছানোটা খুব জরুরী। এখন শুধু স্নান করে পাপানকে তৈরী করতে পারলেই কাজ শেষ। পাশের বাড়ির রমা বৌদিকে বলে রেখেছে কয়েক ঘণ্টার জন্য পাপানকে একটু সামলে দিতে। সকাল বেলা কাজের সময় এ রকম প্রতিবেশীর বাচ্চা দেখতে হলে যে বেশ মুশকিল হয় সুপর্ণা সেটা বোঝে। তাই পাপানকে নিয়েই সব জায়গায় যায়। কিন্তু আজ একেবারেই তা সম্ভব নয়। সকালের ভীড় ট্রেনে একা ওঠানামা করাটা বেশ কঠিন। তার উপর অনেক বছরের অনভ্যাস। বৌদির মেয়ে রূপূর আজ কলেজ ছুটি, ওই পাপানকে সামলে দেবে বলেছে, তাই একটু নিশ্চিন্ত সুপর্ণা। রূপূ, শ্বশুর মশাই এর সাথে গল্প করতে খুব পছন্দ করে। বাবা মানে সুপর্ণার শ্বশুর মশাই ভাটপাড়ার এক জুট মিলের সুপার ভাইজর ছিলেন। পাট জাত জিনিসের চাহিদায় ঘাটতির ফলে কর্মী ছাঁটাই, বেতন হ্রাস এসব নিয়ে শ্রমিক আন্দোলন চলে অনেকদিন ধরে। অবশেষে দুবছর আগে পাকাপাকি ভাবে তালা ঝুলে যায় কারখানায়। উনার গল্পের বই পড়ার খুব নেশা, খুব সুন্দর করে গল্প বলেনও।  রূপূ কলেজের ছুটি ছাটাতে মাঝে মাঝে এসে বাবার সাথে গল্প করে যায়। বাবার শরীরটা খারাপ নাহলে আজ পাপানকে উনিই সামলে দিতেন। আজকাল পাপানের সাথে ছুটোছুটি করতে পারেন না, অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠেন। আগে তো মাঝে মাঝে সুপর্ণার সকালে স্কুলে যাবার দেরী হয়ে গেলে বাবা রান্নার কাজেও হাতে হাতে সাহায্য করতেন। সুপর্ণা বাড়ির কাছেই একটা প্রাইভেট প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার, তাই চাকরিটা করতে পারে। মর্নিং স্কুল, পাপান ওই সময় ঘুমোতো, ওর ঘুম থেকে উঠতে উঠতে সুধাদি চলে আসত। পাপানকে সুধাদি খাবার খাইয়ে দিত। তারপর বাবার কাছে বসে খেলা করত কিছুক্ষণ। তারমধ্যেই সুপর্ণা বাড়ি ফিরে আসত। শ্বশুর মশাই এত ভাল বলেই বোধহয় সুপর্ণা এখনও সংসারটা করতে পারছে। এখন অবশ্য রুটিনটা একটু বদলেছে। সুধাদিকে কিছুদিন হল আসতে বারণ করেছে। সুপর্ণা এখন পাপানকে ওর সাথে স্কুলে নিয়ে যায়। ও কমন রুমে বসে নিজে নিজে খেলে। কখনও ক্লান্ত হয়ে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়ে।

     ইন্দ্রনীল আর সুপর্ণা নৈহাটি কলেজে পড়াশোনা করত। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিল ইন্দ্র, সুপর্ণার এক বছরের সিনিয়র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তরের পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় রেকর্ড মার্কস পেয়ে তখন কলেজে বেশ জনপ্রিয়।

বেশ ভালো ডিবেট করত আর সাথে অল্প সল্প ছাত্র রাজনীতি। লম্বা, তামাটে গায়ের রঙের সুদর্শন ছেলেটির জন্যে কলেজের মেয়েদের বেশ সম্ভ্রম মিশ্রিত ভালোলাগা ছিল। স্নাতকোত্তর করে কলেজে ছাত্র পড়াবে এমনি স্বপ্ন ছিল ওর। অন্যদিকে সুপর্ণা, বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। ওর বাবা কলকাতা হাইকোর্টের  বিচারপতি। বেশ সচ্ছল পরিবারে ওর বেড়ে ওঠা। ওর বাবার ইচ্ছে ছিল বি এ পাশ করে আই এ এস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিক সুপর্ণা।  ওদের সম্পর্কের কথা বাড়িতে জানাজানি হতেই শুরু হয় তুমুল অশান্তি। ইন্দ্রনীলের যতই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থাক না কেন ওর নিম্নবিত্ত পরিবারকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি সুপর্ণার বাবা। আবেগ তাড়িত সুপর্ণা গোপনেই তৃতীয় বর্ষে পড়তে পড়তে  বিয়ে করে নেয় ইন্দ্রকে। সুপর্ণার বাপের বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায় চিরদিনের মত। নব্বই এর দশকের অস্থির সমাজ জীবন ইন্দ্রকে নাড়া দেয় ভীষণভাবে। একের পর এক কল কারখানা বন্ধ হচ্ছে, কোন নতুন শিল্প সংস্থান নেই, চাকরীর পরীক্ষায় চরম দূর্নীতি, সর্বত্র অযোগ্যদের জয়গান। অল্প অল্প করে রাজনীতিতে যুক্ত হতে শুরু করে ইন্দ্র। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন তখন ওর চোখে। নবীন প্রজন্মের রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ বাড়ানোই তখন ওর একমাত্র ধ্যান জ্ঞান।পড়াশোনা প্রায় বন্ধের পথে। মিটিং - মিছিল দিয়ে শুরু হল- তারপর পাড়ার দাদা - আর শেষে এলাকার গুণ্ডা। রোজগার বলতে তোলাবাজি  আর রাজনীতির কিছু কালো টাকা। সুপর্ণার সে সব অসৎ পথে রোজগার করা টাকা ছুঁয়ে দেখতেও ঘেন্না করে। অথচ বিয়ের পর পর যখন ইন্দ্র আস্তে আস্তে রাজনীতির চোরা স্রোতে গা ভাসাচ্ছে, বাড়িতে মা, বাবা, সুপর্ণার সাথে সেই নিয়ে নিত্য দিন অশান্তি, সুপর্ণার শ্বশুর মশাই বারবার ওকে এ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে বলতেন' শুরুতেই সব শেষ করে দিলে কষ্টটা কম হয় রে মা। তোর অনেকখানি জীবন এখনো বাকি।' বাপের বাড়ির অমতে বিয়ে না করলে হয়তো সুপর্ণা ভেবে দেখত বিয়ে ভাঙ্গার কথা। কিন্তু সে পথও বন্ধ। বি এ পাশ করে একটা চাকরি যোগাড় করতে হবে এটাই ছিল তখন ওর একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু পরিবারে এক বিপর্যয় ঘটে গেল, হঠাৎই স্ট্রোকে শ্বাশুড়ী মারা গেলেন। সংসার তখন অথৈ  জলে। পার্ট টু পরীক্ষা দেওয়া হল না। তার পরের বছর সুপর্ণা নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা,  পরীক্ষা সেবারও দেওয়া হল না। এখন মাঝে মাঝে পরীক্ষা দেওয়ার কথাটা ভাবলেও সংসারের সব দিক সামলাতে সামলাতে পড়াশুনাটা আর করা হয়ে ওঠে না। 
   

গত আট মাস হল শ্বশুর মশাই এর প্রস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়েছে, প্রাথমিক ষ্টেজ, ডাক্তার বলেছেন ঠিক মত চিকিৎসা হলে ভাল হয়ে ওঠবেন। চিকিৎসা বেশ খরচ ও সময় সাপেক্ষ। এর জন্য নিয়মিত বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা আছে। সম্বল বলতে শ্বশুর মশাই এর জুট মিল বন্ধ হবার সময় পাওয়া এক কালীন কিছু অর্থ আর সুপর্ণার স্কুল থেকে পাওয়া সামান্য বেতন। তাছাড়া একটা বাচ্চারও অনেক খরচ, সামনের বছরেই আবার পাপানকে স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। এখন তো মোটা টাকা ডোনেশন ছাড়া কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলই ভর্তি নেয় না। সুপর্ণা এসব ভেবে কিছু কুল কিনারা করতে পারে না। শ্বাশুড়ী মারা যাবার পর থেকে এ বাড়িতে ওর একমাত্র বন্ধু শ্বশুর মশাই । বিনা দ্বিধায় সবকিছু এতদিন উনার সাথেই শেয়ার করে এসেছে। বাবা কি না করেছেন সুপর্ণার জন্য, অন্তঃসত্ত্বা থাকা কালীন প্রত্যেক মাসে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, সময়ে সময়ে খাবার দেওয়া, এমনকি কখনো কখনো উনি সুপর্ণার জন্য ওর পছন্দ মত কিছু খাবারও নিজের হাতে বানিয়ে ওকে খাইয়েছেন। পাপান জন্মানোর পর ইন্দ্র যখন রাতের পর রাত বাড়ির বাইরে কাটাত, বাবা পাপানকে নিয়ে সারারাত জেগে বসে থাকতেন।  

     কিছু দিন হল সকালের খবরের কাগজ আর কেবল কানেকশন বন্ধ করে দিয়েছে। এরকম দুঃসময়ে মেয়েদের গয়নাগাটি কাজে আসে কিন্তু সুপর্ণার সেসবেরও কোন বালাই নেই কারণ ওর আর ইন্দ্রের বিয়েটাই হয়েছিল মন্দিরে। বাপের বাড়ির কেউ আসেনি সেখানে। আর গয়না বলতে শ্বাশুড়ীর দেওয়া লোহা বাঁধানো আর কানের একটা দুল। সুপর্ণা টাকা রোজগারের পথ খুঁজে পায় না। বাড়িতে কিছু বাচ্চাকে পড়ানো শুরু করেছে ইদানিং। কিন্তু সেতো সামান্য কটা টাকা। এদিকে বাবার ওষুধের খরচ মাসে দশ হাজার টাকার উপরে। নিরুপায় হয়ে ছ’মাস আগে ইন্দ্রকে টাকার কথা বলেছিল। দু’হাজার টাকা ও সাথে সাথে দিয়েছিল। কিন্তু তারপর একবারও খবর নেয়নি বাবার অসুস্থতার। সকাল বেলা বেরোয় আর অনেক রাতে বাড়ি ফেরে। সুপর্ণা রাতের খাবার ঢাকা দিয়ে রাখে। কখনও খায়, কখনও আবার খায় না। সারাদিন কি খায় কে জানে? পাপান নিজের বাবাকে ঠিক মতো চেনে কিনা সুপর্ণার সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। ইন্দ্র অবশ্য বিয়ের পর পর অনিয়মিত হলেও নিজে থেকেই সুপর্ণাকে টাকা  দিতে চাইত। সুপর্ণা প্রতিবারই সেই টাকা ফেরত দিয়ে দিয়েছে। ইন্দ্রও সেই থেকে চিরদিনের মতো টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। সুপর্ণা আর যাই করুক দ্বিতীয়বার ইন্দ্রকে টাকার কথা বলবে না।
     এই আট মাসে এক লাখ চল্লিশ হাজার মতন খরচ হয়ে গেছে। সবই বাবার পি এফ, গ্রাচুইটির টাকা। এভাবে খরচ হতে থাকলে এ ভান্ডার ফুরোতে আর কিছু মাস মাত্র। গত মাসে বাবার দুটো ওষুধ ইচ্ছে করে কেনেনি সুপর্ণা। এ মাসের টেস্ট রিপোর্ট তাই বেশ খারাপ। ডাক্তারের কাছে ওষুধ না খাওয়ানোর ব্যাপারটা পুরোপুরি গোপন করে গেছে সুপর্ণা। ডাক্তারবাবুও রিপোর্ট খারাপ আসায় খুব অবাক হয়ে গিয়েছেন। পাড়ার ওষুধের দোকানে কিছু ওষুধ পাওয়া যায় না। এডভান্স দিলে তবেই কলকাতা থেকে আনিয়ে দেয়। ধার বাকিতে দিতে চায় না। বাবা বুঝতে পেরেছেন যে উনি একটা ওষুধ উনি কম খাচ্ছেন। কিন্তু সুপর্ণাকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি। বাবার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না।
     বাবার প্রেসক্রিপশন আর ওষুধের বিলগুলো টেবিলের উপর রাখল সুপর্ণা।' বাবাকে আমি একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি। আমি পরিকল্পনা করে খুন করছি।  আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে, কিন্ত সাহস নেই। বিশ্বাস করুন আমি চেষ্টা করেছিলাম দুবার কিন্তু পারিনি। আমি না থাকলে পাপানকে দেখার কেউ থাকবে না। ইন্দ্রনীলকে ছাড়া আমার চলে যাবে কিন্ত বাবাকে ছাড়া - - । আমি কাকে মারব ডাক্তারবাবু? বিশ্বাস করুন আমি মানসিক বিকারগ্রস্ত নই। হ্যাঁ, আমি ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি। এ অন্যায় নয়। '
     কথা বলতে বলতে ভীষণ হাঁপাচ্ছে সুপর্ণা। উদ্ভ্রান্তের মত চেয়ে আছে। কোটোরাগত চোখের নীচে কেউ যেন কয়েক প্রলেপ কালি লেপে দিয়েছে । চোয়ালটা ভিতরে ঢুকে গেছে । শীর্ণ শরীরটাকে কোন রকমে চেয়ার থেকে তুলে দরজার দিকে দু পা এগিয়ে গিয়ে পিছিয়ে আসল। চিৎকার করে বলল' ডঃ তরফদার বলুন না আমি কি করব? '
     মনোবীদ ডঃ তরফদার এ গল্পের চরিত্রগুলোকে বেশ কিছুদিন ধরেই চেনেন। ইন্দ্রনীল রায় গত কয়েক  মাস হল উনারই চিকিৎসাধীন। কোন ভালোবাসা অন্যায়? তাহলে ইন্দ্রনীলের সন্দেহটাই কি ঠিক?

 

                         পায়রা 

অরুণ মাইতি 

.....ভীষণ বৃষ্টির মধ্যে পরদিন সকালে রচনার ঘুম ভাঙে। তার দুঃখে সমব্যথী হয়েই বোধহয় আকাশটা এত কাঁদছে। বিল্টুকে আজ স্কুলে পাঠানো যাবে না। রান্নাঘরে ব্রেকফাস্ট বানাতে গিয়ে অবিনাশের ডাকে সে বসার ঘরে ছুটে আসে । টেলিভিশনের পর্দায় তাজা খবরটা তাকে হতভম্ব করে দেয়। ....

  মায়ের সাথে ভাল করে কথা শেষ না করেই রচনা মোবাইল ফোনটাকে বিছানার এক কোনে ছুঁড়ে ফেলে দিল। রাগে, হতাশায় তার শরীর কাঁপতে থাকল। নিমেষের মধ্যে চোখ থেকে জল বেরিয়ে এল। বিছানায় আছড়ে পড়ে, বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকলো সে।

    মা কী করে তার সঙ্গে এইরকমটা করতে পারল? এক মাস ধরে যে প্ল্যানটা সে করেছিল, মা সেটা শেষ মুহূর্তে নষ্ট করে দিল। তাও কি না একটা তুচ্ছ পায়রার জন্য! এই কী একমাত্র সন্তানের প্রতি মায়ের ভালবাসা নিজের মেয়ের থেকে একটা অজানা পায়রা মায়ের কাছে বড় হল? আর কোথাকার কোন পায়রা, উড়ে এসে জুড়ে বসলো আর তার সমস্ত প্ল্যান বানচাল করে দিল। তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল ঐ পায়রাটার ওপর।

   রচনার স্বপ্নভঙ্গ মনের কথা বর্ণনা করতে গেলে জটিলতাই বাড়বে। তাই পাঠকদের সুবিধার জন্য ঘটনার প্রেক্ষাপট আমি যথাসম্ভব সংক্ষেপে বলছি।

রচনা তার স্বামী অবিনাশের সঙ্গে হায়দ্রাবাদে থাকে। তাদের দুই বছরের ছেলে শুভ (ডাকনাম বিল্টু) কিছুদিন যাবত প্লে-স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। অবিনাশ একটা অ্যাকাউন্টিং ফার্মে অডিটের এর কাজ করে। কর্মী সংখ্যা কম বলে অফিসে তার কাজের চাপ প্রচুর। সে বেশ সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় এবং দেরীতে ফেরে। হপান্তগুলোতেও রেহাই নেই। প্রায় প্রতি শনিবার অফিস যেতে হয়। রচনা বাড়িতে বিল্টুকে নিয়ে একাই থাকে। বিল্টু ভীষণ দুরন্ত ছেলে, ফলে তাকে সারাদিন সামলে আর সংসারের বাকি কাজ করে সে বেশ ক্লান্ত থাকে। অবিনাশ বাড়ি ফিরলে তকে সে ভাল করে সময় দিয়ে পারে না। অবিনাশ যদিও এই নিয়ে নালিশ করে না, তবু এই ব্যাপারটা নিয়ে সে বেশ

বিষণ্ণ থাকে।   রচনার মা কলকাতায় থাকেন। তার বাবা সাত বছর হল গত হয়েছেন। মা কাকাদের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকেন। কিন্তু সম্পত্তির ঝামেলার জন্য তাদের সঙ্গে মুখ দেখাদেখি 

বন্ধ। বিয়ের পর থেকেই বিধবা মা একাই সংসার চালান। যদিও উনার একজন সঙ্গী ছিল – একটি পোষা বিড়াল। কিন্তু দুই মাস হল সে মারা গেছে। রচনার মা পশুপাখি খুব ভালবাসেন। রচনা ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে কুকুর, বিড়াল দেখে অভ্যস্ত। তার ছোটবেলা থেকে বিয়ে পর্যন্ত কোন সময়ে এমন হয়নি যে তাদের বাড়িতে কোন পশুপাখি ছিল না। এক এক সময় তার মায়ের উপর ভীষণ রাগ হতো এই নিয়ে। তার মা এত বেশি সময় ওদের দিতেন যে সে নিজেকে অবহেলিত মনে করত। এই ব্যাপারে মাকে বললে উনি বলতেন যে ওরা কথা বলতে পারে না বলে ওদের অনেক বেশি যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। অক্টোবর মাসের শেষের দিকে একদিন অবিনাশ রচনাকে এসে জানায় নভেম্বরের শেষের দিকে সে এক সপ্তাহের জন্য ছুটি পাবে। এত কম দিনের ছুটিতে কলকাতায় যাওয়া সম্ভব নয়। তাই সে প্রস্তাব দেয় কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জন্য। রচনার মন খুশিতে ভরে যায়। বিল্টু জন্মাবার পর থেকে তাদের কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় নি। সে মনে মনে ঠিক করে কেরালা যাওয়ার। কেরালার ব্যাকওয়াটারে তার যাবার ইচ্ছে অনেকদিনের। অবিনাশও রাজি হয়ে যায়। রচনার মা তার বাবার মৃত্যুর পর কোথাও ঘুরতে যান নি। বহুদিনের বিড়ালটা মারা যাবার পর মায়ের মনটা খুব ভালো থাকে না । এছাড়া বিল্টু মায়ের কাছে খুব ভালো থাকে। তার বিল্টুকে একেবারে সময় দিতে হয় না। তাই মা তাদের সাথে বেড়াতে গেলে সে অবিনাশকে পুরো সময়টাই দিতে

পারবে। এই কথা ভেবে সে অবিনাশকে রাজি করায় তার মাকে আনবার জন্য। সেই মতো যাবার এক সপ্তাহ আগে তার মায়ের ট্রেন এর টিকিট কাটা হয়। উদ্দীপ্ত রচনা মনে মনে ঠিক করতে থাকে কোন দিন তারা কোথায় ঘুরতে যাবে, কোন পোশাকটা পরবে। উত্তেজনায় কেটে যায় বেশ কিছু দিন। মায়ের রওনা হবার হপ্তাখানেক আগে হঠাৎ এক সমস্যার উদয় হয় – সেই পায়রা। তার মা বিকেলে ছাতে হাঁটতে গিয়ে দেখতে পান একটি পায়রা পড়ে আছে। ডানায় আঘাত পাবার জন্য উড়বার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। তার মা তাকে ঘরে নিয়ে এসে সেবা শুশ্রূষা করতে থাকেন। রচনা আপত্তি জানায় – কিন্তু উনি আশ্বাস দেন যে রওনা হবার আগেই পায়রাটা সুস্থ হয়ে উঠবে। পাখিরা তাড়াতাড়ি সেরে উঠে। কেটে যায় আরো কিছুদিন। কিন্তু পায়রাটি সুস্থ হয়ে ওঠে না। দুদিন আগে তার মা গড়িমসি শুরু করেন। পায়রাটি সুস্থ না হলে তিনি যাবেন কী করে। রচনা উনাকে পশু চিকিৎসালয়ে যেতে পরামর্শ দেয়। সেই মতো তার মা গিয়ে কিছু ওষুধ নিয়ে আসেন। কিন্তু তবু পায়রাটি উড়বার মতো সক্ষমতা পায় না।

    আজ তার মায়ের রওনা হবার কথা ছিল। অবিনাশ ও বিল্টু বেরিয়ে যাবার পর সে মাকে ফোনে করেছিল। কিন্তু তার মা জানান যে তিনি যেতে পারবেন না। পায়রাটা এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে নি। একটা অবলা প্রাণী ঘটনাক্রমে ওনার আশ্রয়ে এসে পড়েছে। উনি চলে এলে পায়রাটা কোন ভাবেই বাঁচবে না আর সেই মৃত্যুর জন্য উনিই দায়ী হবেন। বৃদ্ধ বয়েসে এতবড় পাপ উনি করতে পারবেন না। রচনা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু উনি সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। এটাই রচনার আশাভঙ্গের উপাখ্যান। বিছানার বালিশটা তার কান্নায় ভিজে গেছে। মনটাকে শক্ত করার চেষ্টা করে সে। সে তার মাকে চেনে। সিদ্ধান্তের নড়চড় কোন ভাবেই হবে না। ওদিকে বিল্টুর ফেরার সময় হয়ে আসছে। অবিনাশকেও জানাতে হবে। কী মুখ নিয়ে সে তাকে এই কথা বলবে? সাময়িক কান্নায় আবার ভেঙে পড়ে সে। বাকি দিনটা তার কেটে যায় দুঃখ, অভিমান ও কান্নার মধ্যে দিয়ে। রাতে অবিনাশের বুকে অনেকক্ষণ কেঁদে হালকা হয় সে।

    ভীষণ বৃষ্টির মধ্যে পরদিন সকালে রচনার ঘুম ভাঙে। তার দুঃখে সমব্যথী হয়েই বোধহয় আকাশটা এত কাঁদছে। বিল্টুকে আজ স্কুলে পাঠানো যাবে না। রান্নাঘরে ব্রেকফাস্ট বানাতে গিয়ে অবিনাশের ডাকে সে বসার ঘরে ছুটে আসে । টেলিভিশনের পর্দায় তাজা খবরটা তাকে হতভম্ব করে দেয়। কলকাতা হায়দ্রাবাদগামী ট্রেন ওড়িশাতে লাইনচ্যুত হয়েছে। কমপক্ষে পঞ্চাশ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে । অসংখ্য মানুষ আহত। এই ট্রেন-এই তার মায়ের আসার কথা ছিল। শিহরিত হয়ে সে সোফায় ধপ করে বসে পড়ে। চোখ বুঝে হাতজোড় করে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে। যে পায়রাটাকে কাল সারাদিন ধরে শাপশাপান্ত করেছে, তার জন্য মা এতবড় বিপদের হাত থেকে বাঁচল। অবলা প্রাণীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার মন ভরে যায়। মায়ের প্রতি সব অভিমান নিমেষের মধ্যে উধাও হয়ে যায়। একটু ধাতস্থ হবার পর মাকে ফোন করে। মায়ের ক্রন্দনরত কণ্ঠস্বর শুনে সে ভয় পেয়ে যায়। মায়ের এলোমেলো কথোপকথন থেকে সে জানতে পারে যে – কাল রাতে একজন প্রতিবেশী এসেছিলেন। তাই বসার ঘরের জানলাটা খোলা হয়েছিল। রাতে উনি সেটা বন্ধ করতে ভুলে যান। এই সুযোগে পাশের বাড়ির হুলো বেড়ালটা ঘরে ঢুকে পায়রাটাকে হত্যা করেছে। নিজেকে অপরাধী মনে করে পড়ে থাকা পালকগুলোর পাশে বসে ভীষণ কাঁদছে তার মা ।

 

                         অর্ধ

 শতক

পিয়ালী গাঙ্গুলি

 

...কি সুন্দর দেখতে ছিল প্রণবদাকে, রীতিমত হ্যান্ডসাম যাকে বলে। আর কি চেহারা হয়েছে এখন। সেই যে বুদ্ধদেব গুহার 'রুহাহা' তে ঋজুদা যেমন বলেছিল রুদ্রকে কোনো জলো জায়গায় ছেড়ে দিলেই তিতিরের হিপ্পো দেখা হয়ে যাবে। ঠিক তেমন। একগাদা অসুখও বাধিয়ে রেখেছে। উশৃঙ্খল জীবনযাপন আর অতিরিক্ত মদ্যপান। সৃষ্টিশীল মানুষগুলো কেন যে এমন হয়?

    এত রাত্তিরে মোবাইলে টুং টাং। হোয়াটস্যাপ চেক করল রু। ঠিকই আন্দাজ করেছিল। পিসতুতো দাদা।

- কি করছিস? ছেলে ঘুমলো?

- এই সবেমাত্র। যুদ্ধ করে। তুমি কি করছ?

- এডিটিংয়ের প্রচুর কাজ আছে, সেসবই করছি

- তা জলপথে নিশ্চয়ই? ক পেগ চলছে?

- হিসেব করি নি - অত খাও কেন?

- কেউ বারণ করার নেই বলে জবাবটা দুবার টাইপ করেও মুছে দিল রু। এই নিয়ে এখন কথা বলতে গেলে ঘুমের বারোটা বেজে যাবে। সকালে আর উঠতে পারবে না। কি সুন্দর দেখতে ছিল প্রণবদাকে, রীতিমত হ্যান্ডসাম যাকে বলে। আর কি চেহারা হয়েছে এখন। সেই যে বুদ্ধদেব গুহার 'রুহাহা' তে ঋজুদা যেমন বলেছিল রুদ্রকে কোনো জলো জায়গায় ছেড়ে দিলেই তিতিরের হিপ্পো দেখা হয়ে যাবে। ঠিক তেমন। একগাদা অসুখও বাধিয়ে রেখেছে। উশৃঙ্খল জীবনযাপন আর অতিরিক্ত মদ্যপান। সৃষ্টিশীল মানুষগুলো কেন যে এমন হয়? ছোটবেলা থেকেই দারুণ ছবি তোলে। সেটা অবশ্য জেনেটিক, বাবার থেকে পাওয়া। খুব কম বয়সেই প্রেস ফটোগ্রাফার। এখন শুধু ফ্রিল্যান্সিংই করে। ডোনা বৌদিকেও দেখতে খুব সুন্দর ছিল। ভিন্ন ধর্ম নিয়েও বাড়িতে কোনো অশান্তি হয়নি। কদিন পরেই রাজপুত্রর মত ফুটফুটে ছেলে আকাশ। সবই ঠিক চলছিল। কি যে হল কে জানে! রু তখন অনেকেই ছোট। এসব জটিলতা বোঝার বয়স হয়নি।। এখন বয়েস হয়েছে, কিন্তু এখন আর ওসব পুরনো কথা ঘাঁটতে ইচ্ছা করে না। এক যুগের বেশি হয়ে গেল ওরা আলাদা

থাকে। কোনোরকম আইনি সেপারেশন বা ডিভোর্স হয়নি। শ্বশুরবাড়ির সাথেও সম্পর্ক আছে দাদার। একদিন বৌদির প্রসঙ্গ তুলতে দাদা বলেছিল "তোর বৌদির সঙ্গে এখন আমার সম্পর্কটা অনেকটা গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ডের মত"। বৌদি সপ্তাহে এক দুদিন আসে। ঘর গুছিয়ে, কিছু রান্না বান্না করে, জামাকাপড় কেঁচে দিয়ে চলে যায়। ছেলে বড় হয়ে গেছে। সে এখন অস্ট্রেলিয়ায় সেটেল্ড। বিয়েও হয়ে গেছে। বাবা মা পালা করে গিয়ে ছেলের কাছে থাকে। দুজনেরই দুজনের প্রতি এখনও টান আছে সেটা বোঝা যায়। রু কয়েকবার চেষ্টা করেছে দাদার কাউন্সেলিং করার, বিশেষ লাভ হয়নি। "আমি তো তাকে যেতে বলিনি, সে নিজের ইচ্ছায় গেছে। নিজে থেকে ফিরলে ফিরবে, আমি কিছু বলব না"। বৌদির সাথে বহুদিন যোগাযোগ নেই তাই বৌদির মনের কথা জানার বা বৌদির কাউন্সেলিং করার কোনো উপায় নেই। এই ফেসবুক, হোয়াটস্যাপের যুগে যোগাযোগ করাটা কোনো ব্যাপারই নয়। আসলে রুয়েরই অস্বস্তি লাগে। তিন্নি শেরুকে নিয়ে ভবানীপুর এসেছিল। রু ও টিনটিনকে নিয়ে মায়ের কাছে গেছিল। তিন্নি রুয়ের পিসতুতো বোন, ছোট পিসীর মেয়ে। ওদের ছেলে দুটো পিঠোপিঠি। দুটোতে খুব ভাব। তাই তিন্নি আর রু মাঝে মাঝেই একসাথে ভবানীপুরে আসে। ওদেরও একটু আড্ডা হয়, বাচ্চা দুটোও ছাদে চুটিয়ে খেলতে পারে। রু বলল "এই সামনের ৩০ তারিখে ফ্রি আছিস?"

-"হ্যাঁ, কেন রে"?

- প্রণবদার ফিফটিয়েথ বার্থডে। ভাবছি ওকে সারপ্রাইজ

দেব। তুই আসতে পারবি?

- হ্যাঁ, আমি চলে আসব।

- কেকটা ভাবছি কিনে নেব। আর পায়েসটা আমি বাড়ি থেকে করে আনব। তুই পারলে নিউ মার্কেট থেকে ফিফটি লেখা ক্যান্ডেল আর তিনটে বার্থডে ক্যাপ কিনে রাখিস। একটা ওই বুড়ো ধারি বার্থডে বয়ের আর দুটো তোর আর আমার ছেলের জন্য। না না, ফোনে অর্ডার করে খাবার আনব না। এইখান থেকে তো এইটুকু। 'চাং হোয়া' থেকে গিয়েই খাবার নিয়ে আসব। রু আর তিন্নির দুজনেরই একই দাবী। দাদার আর রাজি না হয়ে উপায় নেই। খাবার দাবার, বোতল টোতল সব কিনে এনে তারপর একেবারে কেক কাটা। তিন্নি একগাদা বেলুনও কিনে এনেছে। সেগুলোও ফোলানো হয়নি। খাবার প্যাক করে সোজা বাড়ি। ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে চাবি বার করে দরজা খুলল প্রণব। আলো জ্বালাতেই তো অবাক। সারা বাড়ি বেলুন দিয়ে সাজানো। টেবিলে কেক রাখা, ফিফটি লেখা মোমবাতি গোঁজা। বোনেদের দিকে তাকিয়ে প্রণব বলল - তোরা কখন এসব করলি? এই তো আমার সঙ্গেই বেরলি। তোদের বরেরাও তো একসঙ্গেই ছিল।

- আমরা তো সাজাই নি

-তার মানে?

- ঘরে যাও, তার মানে টা বুঝবে ওই থপথপে চেহারায় প্রায় উসাইন বোল্টের মত গতিতে প্রণব বেডরুমে ঢুকল

-তুমি? তুমি কবে ফিরলে? তোমার তো এখন অস্ট্রেলিয়ায়... একটা গোলাপী শাড়ি পড়েছে ডোনা, মাথায় গোলাপ ফুল গোঁজা। অপূর্ব লাগছে দেখতে। লাগেজ থেকে বার করে আলমারিতে নিজের জামাকাপড় গোছাচ্ছে। আজই ফিরেছে ছেলের কাছ থেকে। এখনও জেট ল্যাগ কাটেনি। "এই সরি, তোমাদের প্রেমালাপে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছি", বলে রু আর তিন্নি ওদের হাত ধরে টানতে লাগল। "চলো চলো, কেক কাটতে হবে। আকাশ ইজ অন্য স্কাই"। ডাইনিং টেবিলে কেকটা সাজানো। মাঝে ল্যাপটপে আকাশের মুখ। "হ্যাপি ফিফটিয়েথ বার্থডে বাবা। নাও এবার কেকটা কাটো"। ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে কেকে ছুরি ঠেকাতেই রুয়ের বর ওপরের বেলুনটা ফুটো করে দিল। ঝরঝর করে ঝরে পড়ল টফি আর চকোলেট। টিনটিন আর শেরুর কি আনন্দ। দুই খুদে তখন মেঝে থেকে চকোলেট কুড়োতে ব্যস্ত। এদিকে তিন্নির বর তখন ফোম স্প্রে করছে। প্রণবের মুখে একটা লজ্জা মেশানো হাসি "কি যে করিস না তোরা! আমায় একেবারে বাচ্চা বানিয়ে দিলি। যা তা!" স্কাইপে এবার আকাশের গলা " কি বাবা, বার্থডে গিফ্ট কেমন লাগল?" প্রণব খানিকটা হতবাক। এখনও বুঝলে না বাবা? মা তোমার কাছে ফিরে এসেছে, শি ইজ ব্যাক। আজ থেকে তোমরা আবার একসাথে থাকবে"। ডোনা ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আলতো করে প্রণবের হাতটা চেপে ধরে বলল "আই স্টিল লাভ ইউ"। "ইয়ে" বলে সকলের একসঙ্গে হাততালি। অনির্বাণ ইতিমধ্যে আকাশের পাঠানো শ্যাম্পেনের বোতল টা খুলে ফেলেছে। শ্যাম্পেন আর আনন্দের ফোয়ারা তখন মিলেমিশে একাকার। বেশ অনেকদিন ধরেই কলকাঠি নাড়ছিল রু। প্রথমে ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ তারপর ফোন। বৌদির মনের কথাটা পরিষ্কার হয়ে গেছিল। কেমিক্যাল রিয়াকশন হওয়ারই ছিল, অভাব ছিল শুধু ক্যাটালিস্টের। ছোটবেলা থেকেই ইঁচড়ে পাকা রু এ কাজটা ভালোই পারে।

 

                         সব চরিত্র

 কাল্পনিক

সঙ্ঘমিত্রা বসু

 

...এরপর ও আমার নজরে এসেছে সে বেশ কয়েকবার। কখনও বারান্দায় বসে আছে। কখনও বা জানালা ধরে দাঁড়িয়ে আছে অবিন্যস্ত শরীর নিয়ে। চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক শূন্যতা।কার ভুলে যে নষ্ট হয়ে গেল তার জীবন সে হিসেব বোধহয় কোনদিন আর মেলাতে পারল না আমাদের পথ হারানো সেই “ইরানি সুন্দরী”।

    আশির দশকের মাঝের কোলকাতা। কম্পিউটার সবে হাঁটি হাঁটি পা পা। ইন্টারনেটের জালে মানুষ তখনও জড়িয়ে যায় নি। বইমেলা, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, কফি হাউসের আঁতলামিতে মাখামাখি কলেজ জীবন।এসপ্ল্যানেড চত্বর ছিল কলেজ পালিয়ে সিনেমা দেখার একমাত্র ঠিকানা। ঠিক সেই সময় কলেজের অ্যানুয়াল ফেসটের রিহার্সাল চলছে পুরোদমে।“চিত্রাঙ্গদা”।রাজ্যপাল আসছেন প্রধান অতিথি হয়ে। সাজোসাজো রব চারিদিকে। অনেক বাছাবাছির পর ফাইনাল সিলেকশন হয়েছে। অর্জুনের ভূমিকায় কলেজের ডাকসাইটে সুন্দরী দেবাংগনা। সুরূপা হবে আরেক সুন্দরী শ্রীরূপা। হালকা লালচে কোঁচকানো চুলে আপেল রঙা মেয়ে। আমরা তাকে ‘ইরানি কন্যা’ বলে ডাকি।নাচে সে অনবদ্য।কিন্তু সমস্যা তাকে নিয়ে অন্য জায়গায়। রিহার্সালে তাকে নিয়ম করে আনাটাই এক সমস্যা। একে তার অসংখ্য বয়ফ্রেন্ড, তার সঙ্গে ঘনঘন মুড অফ। বড় বেশি খামখেয়ালি সেই মেয়ে। মুড অফ হলে রিহার্সাল ছেড়ে কোনায় গিয়ে মাথা গুজে বসে পড়ে। ম্যাম এর তাড়া খেলে খুব অনিচ্ছা সহকারে উঠে আসে। ওর বিকল্প পাওয়া না যাওয়ায় আমাদের হাত পাও বাঁধা। আমি ছিলাম গানের গ্রুপে। তাই শ্রীরূপার রোজকার নাটক দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যেতাম।
    বিনা ঝামেলায় নির্দিষ্ট দিনেই শেষ পর্যন্ত “চিত্রাঙ্গদা” মঞ্চস্থ হল। অনুষ্ঠানের পরই শুরু হয়ে গেল পুজোর ছুটি। কারো সাথেই বিশেষ যোগাযোগ থাকতো না ওই একমাস। হোস্টেল এর মেয়েরা যে যার বাড়ি ফিরে গেল। শ্রীরূপা ও ফিরে গেল

নিজের বাড়ি, বর্ধমানের কাছে কোথায় যেন। সবাই বলল, যাক একমাস একটু মাথা টাকে বিশ্রাম দিক। পুজোর ছুটিটা কেটে যায় কেমন যেন পলক ফেলার আগেই। খোলার সাথে সাথে লাইব্রেরি, পড়ার চাপ, বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা, ক্লান্তি সব মিলিয়ে ব্যতিব্যস্ত দিনপঞ্জি। অফ পিরিয়ডেও আড্ডা মারার সময় নেই। হটাত একদিন কানে এলো শ্রীরূপা ছুটি র পর আর কলেজে আসে নি। ডিপার্টমেন্ট আলাদা হওয়ায় এতদিন জানতেই পারিনি। হাওয়ায় উড়ল খবর, কোন এক দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো আরও রোমহর্ষক রূপ নিয়ে। শোনা গেল, শ্রীরূপা নাকি পালিয়ে গেছে কোন এক কাশ্মীরি শালওয়ালার সাথে। উচ্চবিত্ত অধ্যুষিত সেই মহিলা কলেজে খবরটা বেশ মুখরোচক চাটনি হিসেবে কদিন ধরে সবাই বেশ তারিয়ে তারিয়ে খেল। সামনে পরীক্ষা, আস্তে আস্তে যে যার জগতে ফিরে গেল। শ্রীরূপা ও চাপা পড়ে গেল বিস্মৃতির অতলে। 
     কাজের সূত্রে দূর্গাপুর এসেছি। মাঝে কেটে গেছে বেশ কিছু বছর। উঠেছি এক আত্মীয়র বাড়িতে। সকালে চা খেতে খেতে নজর গেল উল্টো দিকের বাড়ির বারান্দার দিকে। হুইল চেয়ারে বসা এক বয়স্ক মানুষকে দেখাশোনা করছে একজন আয়া শ্রেণীর মহিলা। ঠিক তাদের পাশেই বারান্দার পিলারে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে অবিন্যস্ত পোশাকের আরেক জন অল্পবয়সী মহিলা। সাইড প্রোফাইলটা ভীষণ চেনাচেনা লাগলো। কিন্তু কিছুতেই মেলাতে পারলাম না কারো সঙ্গে। পরদিন সকালে ফিরে

এলাম কলকাতায়। মাথায় রয়ে গেল একটা জিজ্ঞাসা চিহ্ন।     কিছুদিন পর কাজের সূত্রে যেতে হল আবার সেই দূর্গাপুরে। এবার হটাতই সামনা সামনি পড়ে গেলাম সেই মহিলার। আত্মীয়া আলাপ করিয়ে দিলেন। আমায় চিনতে পারল কিনা বুঝতে না পারলেও আমি কিন্তু চিনে ফেলেছি সেই ইরানি সুন্দরী কে। কেমন এক ঝাপসা দৃষ্টির ঘোর লাগা এক নারী । অপরিচিতির আবছা হাসি হেসে চলে গেল।
      এবার আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েক বছর। আমেরিকা প্রবাসী বড় কন্যাটি সন্তানসম্ভবা। দিদিকে দেখাশোনার জন্য পাঠানো হল সদ্য মাধ্যমিক দেওয়া কিশোরী বোনটিকে। মা বাপের উদ্দেশ্য তো মহৎই ছিল। কিশোরী তো খুশিতে আটখানা। স্বপ্নের মত দিন কেটে যাচ্ছে দিদি আর নতুন জামাই বাবুর সাথে। নতুন নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, নতুন ধরনের জীবনযাপন পদ্ধতি। এরমধ্যে শুরু হল দিদির কিছু শারীরিক সমস্যা। ডাক্তারের পরামর্শে দিদিকে ভর্তি করা হল হাসপাতালে। জামাই বাবু নিজেও ডাক্তার। বিরাট অনিশ্চয়তার শেষে ফুটফুটে এক কন্যা সমেত দিদি বাড়ি ফিরল।
     বাড়ি ফেরার দু চার দিনের মধ্যে সহজাত মেয়েলি প্রবৃত্তির বশে দিদি বুঝল তার সংসারের ছন্দটা কোথায় যেন কেটে গেছে। যে কিশোরী বোনটা তার কাছে এসেছিল তাকে যেন আর ফিরে পাওয়া যাচ্ছে না। জামাইবাবুটি কিন্তু দিব্যি নির্বিকার। দিদি ব্যস্ত হয়ে পড়ল বোনকে দেশে পাঠানোর জন্য। স্বতঃ প্রণোদিত হয়ে সে দায়িত্বটিও লুফে নিলেন দায়িত্ববান জামাইবাবু।
      বাড়ি ফিরে এলো বিভ্রান্ত সেই কিশোরী। যুগটা আশির দশক। ডোমেস্টিক ভায়লেন্সের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ব্যাপার টা সেযুগে তেমন সোচ্চার হয়ে ওঠে নি। অন্য দিকে এন আর আই জামাইকে বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করার সাহস বা ক্ষমতা ও তার মধ্যবিত্ত মা বাপের মোটেই ছিল না। দুটি মেয়ের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করে দিব্যি পার পেয়ে গেল সেই এন আর আই জানোয়ারটা। দিদির জোড়া তাপ্পি দেয়া সংসারটা টিকিয়ে রেখে ছোট বোন ফিরে এল তার পুরনো জীবনে। স্বভাবের এক বিচিত্র পরিবর্তন এল তার মধ্যে। পুরুষ সঙ্গ তার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। এই ব্যাপারে কোন বাছবিচার পর্যন্ত করত না সে। শরীরকে হাতিয়ার করে সেই সুন্দরী নতুন এক খেলায় মেতে উঠল। লেখা পড়া কিন্তু এর সাথেই দিব্যি চালিয়ে যেত। প্রথম গণ্ডগোল বাঁধল বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় পড়তে এসে। সামান্য পরিচিত এক কাশ্মীরি ছেলের সঙ্গে অন্তর্ধানটাই ছিল ওর জীবনের শেষ ভুল। বহু সন্ধানের পর শ্রীনগরের চল্লিশ কিমি দূরের এক গ্রাম থেকে যখন ওকে উদ্ধার করা হল তত দিনে ও সম্পূর্ণ নার্ভাস ব্রেকডাউনের শিকার। বহু চিকিৎসাতেও সাড়া দিল না তার শরীর। আংশিক স্মৃতিভ্রংশ নিয়ে বাতিল মানুষের দলে পড়ে গেল সেই মেয়ে।
      এরপর ও আমার নজরে এসেছে সে বেশ কয়েকবার। কখনও বারান্দায় বসে আছে। কখনও বা জানালা ধরে দাঁড়িয়ে আছে অবিন্যস্ত শরীর নিয়ে। চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক শূন্যতা। কার ভুলে যে নষ্ট হয়ে গেল তার জীবন সে হিসেব বোধহয় কোনদিন আর মেলাতে পারল না আমাদের পথ হারানো সেই “ইরানি সুন্দরী”।

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?