গল্প সমগ্র ৭

  • বাতিক - অদিতি ভট্টাচার্য্য

  • নেপথ্যে - অদিতি ভট্টাচার্য্য  

  • নীড়ে ফেরা - সঞ্চিতা চৌধুরী 

  • এ অনুভুতির পরিমাপ কত - মিজানুর রহমান মিজান

  • এই মেডেল আমার মায়ের - মোঃ শামিম মিয়া 

  • বুকের ব্যাথা - আবু আফজল মোহাঃ সালে

  • পথভোলা - সপ্তর্ষি রায়বর্ধন

বাতিক

অদিতি ভট্টাচার্য্য

.....হঠাৎ অরিন্দমের দৃষ্টি পড়ল একটা ছোট টেবিলের ওপর। আরো কয়েকটা খেলনার মধ্যে চোখ আটকে গেল একটা পুতুলে। গোলাপী ঝালর দেওয়া ফ্রক পড়া সোনালী চুলের বড়সড় একটা ডল, গলায় লাল নীল পুঁতির মালা। অরিন্দমের মনে হল তার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেছে। পুতুলটা যে তার বড্ড চেনা। ....

  ন্দনপুর একটি অখ্যাত ছোট শহর। এই শহরের সরকারী হাসপাতালে বদলী হয়ে এসেছে অল্প বয়সী ডাক্তার অরিন্দম সেন। অরিন্দম কলকাতার ছেলে। ডাক্তারী পাশ করার পর এত দিন পর্যন্ত সব পোস্টিংই হয়েছে কলকাতার আশেপাশের কোন না কোন শহরে। এই বারই প্রথম এত দূরে হল। চন্দনপুরের নাম সে প্রথম শুনল বদলীর অর্ডার আসার পর। অনিচ্ছুক মনে সে গেল বটে কিন্তু গিয়ে তার মনের ভাব পালটে গেল। দেখল চন্দনপুর ছোট হলেও বেশ জমজমাট শহর। দোকানবাজার, স্কুল, কলেজ সবই আছে এবং ভালোই আছে। কিছুদিনের মধ্যেই একটা বাড়ি ঠিক করে ফেলে সে সপরিবার বাস করতে শুরু করল। পরিবার বলতে স্ত্রী শ্রেয়া আর বছর তিনেকের ছোট্ট মেয়ে তিতলী।অরিন্দমদের প্রতিবেশীরা দেখা গেল খুব ভালো। নতুন জায়গায় অরিন্দমদের কোন অসুবিধে হতে দিলেন না। তা সে তিতলীর স্কুলে ভর্তির ব্যাপারই হোক বা কাজের লোক ঠিক করাই হোক। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল তিতলী নিজের বাড়িতে কম, আশেপাশের বাড়িতে বেশী থাকছে। আশেপাশের বাড়ির জেঠু, জেঠীমা, দাদা, দিদিরা তার খুবই প্রিয় হয়ে উঠেছে। আস্তে আস্তে অরিন্দম, শ্রেয়ার জায়গাটা ভালো লেগে গেল। তিনজনে মিলে শহরটা প্রায় পুরো ঘুরেই ফেলল।

  ঘুরতে গিয়েই চোখে পড়েছে শহরের এক প্রান্তে লেকের ঠিক উল্টোদিকে বিরাট জায়গা জুড়ে পাঁচিল ঘেরা সুদশ্য রায়চৌধুরী নিবাস। এই রায়চৌধুরীদের সম্পর্কে নানান কথা সারা শহরে ছড়িয়ে আছে। হাসপাতালে কলিগদের কাছ থেকে, পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছ থেকে প্রায় সবই একদিনে জেনে ফেলেছে অরিন্দমরা। রায়চৌধুরীরা ছিল এ অঞ্চলের জমিদার। চন্দনপুর তখন গ্রাম ছিল। আশেপাশের আরো কয়েকটা গ্রামও অদের জমিদারীর অন্তর্গত ছিল। ধীরে ধীরে সময় বদলাল, চন্দনপুর জমজমাট শহর হয়ে গেল, জমিদারীও আর রইল না, কিন্তু শহরের লোকের কাছে রায়চৌধুরী নিবাস জমিদার বাড়ি হিসেবেই বেশী পরিচিত। অবশ্য চন্দনপুর শহরে রায়চৌধুরীদের প্রচুর সম্পত্তি এখনো আছে। পুরোনো বাড়ি সংস্কার করে রায়চৌধুরী নিবাস এখন হাল ফ্যাশনের এক প্রাসাদোপম বাড়ি। কাজের লোকজন বাদ দিলে এই বিশাল বাড়িতে এখন বাস করেন রায়চৌধুরী পরিবারের মাত্র দুজন, সমরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী মণিকুন্তলা।

  যে কোন জমিদার পরিবার সম্পর্কেই নানান কথা শোনা যায়। তাদের অত্যাচার, বিলাস বৈভব, শখ শৌখিনতা, কখনো কখনো কোন কোন প্রজাবৎসল জমিদারের দানধর্মের কথাও। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তবে রায়চৌধুরীদের সম্পর্কে যা সবচেয়ে বেশী লোকের মুখে মুখে প্রচারিত ছিল, শহরে নতুন কেউ এলেই পুরোনো বাসিন্দারা যার গল্প করতে ভালোবাসেন তা হল এই বংশের লোকেদের অদ্ভুত অদ্ভুত সব বাতিকের কথা। এই বাতিক যে কোনো এক নির্দিষ্ট পুরুষেই সীমাবদ্ধ তা নয়। দেখা গেছে রায়চৌধুরীদের প্রতি জেনেরাশনের মানুষ কম বেশী কোনো না কোনো বাতিকে আক্রান্ত ছিলেন। আরো অদ্ভুত ব্যাপার শুধুমাত্র পুরুষ সদস্যরাই বাতিকগ্রস্ত ছিলেন, কোন মহিলা নন।

  উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। সমরেন্দ্রনাথের বাবা সুরেন্দ্রনাথের কথাই ধরা যাক। নানান সমাজসংস্কারমূলক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গানবাজনা ভালোবাসতেন। প্রতি বছর শীতকালে চন্দনপুরে যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর বসে তার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন সুরেন্দ্রনাথই। বাতিক ছিল তাঁর পোশাক আশাকের ব্যাপারে। তাঁর মতে ধুতি, উত্তরীয়ই সনাতন হিন্দু পোশাক, তাই তা ছাড়া আর কিছু পরিধান করা উচিত নয়। সঙ্গে খড়ম। খড়মের যুগ সেটা ছিল না, তাই জমিদার বাড়িতে ছুতোর মিস্ত্রী আসত খড়ম তৈরী করতে। সারা বছর, সব সময়ে, ঘরে বাইরে এই এক পোশাক। শুধু শীতকালে এর ওপর একটা শাল জড়াতেন। সুযোগ পেলে অন্যদেরও এই পোশাক পরার জন্যে বলতেন। চন্দনপুরের বয়স্ক বাসিন্দারা

এখনো মনে করতে পারেন ধুতি উত্তরীয় পরা সুরেন্দ্রনাথ খড়মের খটখট আওয়াজ তুলে জলসায় প্রবেশ করছেন।সমরেন্দ্রনাথের পিতামহের ব্যাপারটা আবার একটু অন্যরকম। তিনি পবিত্র অপবিত্র, শুদ্ধ অশুদ্ধ এসব নিয়ে বড় বেশী মাথা ঘামাতেন। পানীয় জলে গঙ্গাজল মিশিয়ে তবেই তিনি তা পান করতেন, তাঁর রান্নাও হত গঙ্গাজলে। তাঁর সঙ্গে সবসময় একজন লোক থাকত যে গঙ্গাজল ছেটাতে ছেটাতে তাঁর আগে আগে চলত আর তিনি কোনো অপবিত্র স্পর্শের ভয়ে নাক মুখ কুঁচকে তার পেছনে পেছেনে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, দোকানবাজার কোথাওই এর ব্যতিক্রম হত না। লেকের ধারে সান্ধ্যভ্রমণের সময়েও একই নিয়ম বলবৎ থাকত।  সমরেন্দ্রনাথের  প্রপিতামহের  ধারণা ছিল যে তিনি একজন অত্যন্ত প্রতিভাময় সংস্কৃত কবি। এই ধারণা থেকেই তিনি সবসময় সংস্কৃতে কথা বলতেন। সঙ্গে দোভাষী থাকত তাঁর কথা অন্যদের বুঝিয়ে দেবার জন্যে। একান্ত বাধ্য হলে বাড়ির মধ্যে স্ত্রী ছেলেমেয়ের সঙ্গে আকারে ইঙ্গিতে মনের ভাব প্রকাশ করতেন কিন্তু ভুলেও মুখে একটাও বাংলা শব্দ উচ্চারণ করতেন না। শেষ বয়সে বাড়াবাড়িটা এমন পর্যায়পৌঁছয় যে তিনি নিজেকে মহামুনি বাল্মীকির সমকক্ষ ভেবে নিজেদের বাগানের এক প্রান্তে একটি কুটির বানিয়ে সেখানেই বসবাস করতে শুরু করেন এবং সংস্কৃত কাব্য রচনায় মন দেন। যদিও তিনি ঠিক কি রচনা করেছিলেন তা কেউ বলতে পারে না।

  অরিন্দমরা এসবই লোকমুখে শুনেছে এবং একাধিকবার শুনেছে। কখনো কখনো সমরেন্দ্রনাথের প্রপিতামহের বাতিক সমরেন্দ্রনাথের পিতামহের ঘাড়ে চেপেছে কিন্তু বাতিকের গল্পগুলো বদলায় নি। অরিন্দমরা শুনেছে আর ভেবেছে সত্যিই এরকম হয়! সঙ্গে সঙ্গে সমরেন্দ্রনাথকে দেখার ইচ্ছেও প্রবল হয়েছে। হাজার হোক উনিই রায়চৌধুরী বংশের একমাত্র জীবিত পুরুষ। ওনার কোনো বাতিক আছে কিনা সেটা জানার কৌতুহলও আছে।

  সেদিন এক রবিবার সন্ধ্যেবেলা। অরিন্দমদের বাড়িতে ওদের প্রতিবেশী মাখন দাস আর তাঁর স্ত্রী গৌরী গল্প করতে এসেছেন। চা টা-এর সঙ্গে গল্প ভালোই জমে উঠেছে এমন সময় তিতলী কাঁদো কাঁদো মুখে এসে বলল, ‘দেখো না মামমাম, আমার ডলটা পাচ্ছি না।’

‘কোন ডলটা?’ জানতে চাইল শ্রেয়া।

‘যেটা পিঙ্ক ঝালর দেওয়া ফ্রক পরা। যেটার গলায় লাল নীল পুঁতির মালা পরিয়ে দিয়েছিলে তুমি।’

‘কাল তুমি ওটা নিয়ে পার্কে খেলতে গিয়েছিলে না? আমি তখনই বারণ করেছিলাম, কিন্তু তুমি শোন নি। ডলটা ফেরত এনেছিলে পার্ক থেকে? আজ সকালে খেলেছ ডলটা নিয়ে?’

‘মনে নেই মামমাম,’ তিতলীর দুচোখ ভরা জল।

‘কাল সন্ধ্যে গেল, আজ সকাল গেল, এখন তোমার ডলের কথা মনে পড়ল?’ শ্রেয়া বেশ বিরক্ত, ‘পার্কে কত লোক থাকে, কে নিয়ে নিয়েছে।’

‘কেঁদো না, কেঁদো না। আমি ওরকম ডল আবার তোমায় কিনে দেব,’ অরিন্দম মেয়েকে আদর করতে করতে বলে।

‘আজকালকার বাচ্ছাদের এই এক ব্যাপার। এত খেলনা যে কখন কোনটা হারাচ্ছে, কোনটা কোথায় রাখছে খেয়ালও থাকে না। পরে যখন খুঁজে পায় না, তখন মন খারাপ। মহুয়ার ছেলেটাও সেদিন কোথায় কি বল হারিয়ে মুখ গোমড়া করে ছিল,’ বললেন গৌরী।

‘হ্যাঁ পার্কেই হারিয়েছে মনে হয়। না হলে যাবে কোথায়? কমলাকে তো বেশ বিশ্বাসী বলেই মনে হয়,’ শ্রেয়া বলল।

‘না, না কমলাকে সন্দেহ কর না। এখানে যারা কাজ করে তাদের কারুরই ওরকম স্বভাব নেই। তোমার একটা ছুঁচও এদিক থেকে ওদিক হবে না। কিছু দরকার হলে ওরা চাইবে, কিন্তু চুরি করবে না। আমার ছেলে মেয়ে যখন ছোট ছিল তখন মিনতি বলে একজন কাজ করত। সে তো আমার বাচ্ছাদের পুরানো জামা কাপড়, খেলনা চেয়েই নিত। ওদেরও তো ইচ্ছে করে।’

‘এই দেখো বলতেই ভুলে যাচ্ছি, সামনের রবিবার চন্দনপুরের বাসিন্দাদের একটা মিটিং আছে ঊষারানী মেমোরিয়াল হলে। চন্দনপুরের সুবিধে অসুবিধে নিয়ে।

অরিন্দম তুমি যেয়ো। সমরেন্দ্রনাথবাবুও আসবেন, এই সুযোগে আলাপ হয়ে যাবে’ প্রভাত বললেন। ‘সমরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী? ওই রায়চৌধুরী নিবাসের?’ অরিন্দম প্রশ্ন করল।

‘হ্যাঁ সমরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী' প্রভাত হাসলেন, ‘অবাক হচ্ছ যে? রায়চৌধুরী বংশের লোক বলে?’

‘যেখানে যাচ্ছি সেখানেই তো নতুন লোক দেখে ওই গল্পই শোনাচ্ছে সবাই। একেক জনের একেক পিকিউলিয়ারিটিজ,’ বলল অরিন্দম।

‘পিকিউলিয়ারিটিজই বলো কি বাতিকই বলো, সত্যিই অদ্ভুত লোক ছিল সব। আর এসব গল্পর এক বর্ণও মিথ্যে ভেব না কিন্তু, সব সত্যি।’

'সমরেন্দ্রনাথবাবুরও কি?’

‘না না সমরেন্দ্রনাথবাবুর কোন বাতিক-টাতিক নেই। একেবারে আর পাঁচটা স্বাভাবিক লোকের মতই তিনি, অরিন্দমের কথার মাঝখানেই বলে উঠলেন প্রভাত - ‘খুব আশ্চর্য ব্যাপার, একেবারে যেন দৈত্যকূলে প্রহ্লাদ! সমরেন্দ্রনাথবাবুই বোধহয় রায়চৌধুরী বংশের একমাত্র পুরোপুরি স্বাভাবিক লোক। অথচ ভাগ্যের কি পরিহাস দেখো, উনি নিঃসন্তান। ওনার মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রায়চৌধুরী বংশও লুপ্ত হবে।’

‘ওনার কোন ভাই-টাইও নেই?’ শ্রেয়ার প্রশ্ন।

‘না, কেউ নেই। সুরেন্দ্রনাথের ছয় মেয়ের পর এই এক ছেলে। সুরেন্দ্রনাথের ছোট দুই ভাই ছিল। একজন তো অল্প বয়স থেকেই সংসার ত্যাগী। দীর্ঘদিন কোথায় উধাও হয়ে যেত, আবার কিছুদিনের জন্যে বাড়ি ফিরে আসত। শেষে কোন সাধুর আখড়ায় পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করে। আরেকজনের ধারণা ছিল যে ঘরের বাইরে বেরোলেই বাইরের পরিবেশ, বাইরের লোকের সংস্পর্শে এলেই অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই নিজের ঘর থেকেই বেরতো না। চন্দনপুরে কেউ তাকে কোনদিন দেখেছে কিনা সন্দেহ। বলা বাহুল্য সে বিয়েও করে নি’ প্রভাত উত্তর দিলেন।

‘মানুষ হিসেবেও সমরেন্দ্রনাথবাবু আর ওনার স্ত্রীর কোন তুলনা হয় না। যে কোন কাজে ওনাদের সাহায্য পাওয়া যায়। কলোনীর লোকেদের জন্যে কম করেছেন ওনারা? ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোর পড়াশোনার ব্যবস্থা করা, কলোনীর ভেতর জল, আলোর ব্যবস্থা করা, রাস্তাঘাট পাকা করা, সবই তো ওনাদের জন্যে হয়েছে। কার অসুখে ডাক্তার বদ্যির খরচ জোগান, কার মেয়ের বিয়েতে গয়না দেওয়া, সব ওনারা। কমলারা কি সাধে জমিদারবাবু আর গিন্নীমা বলতে অজ্ঞান? ওনাদের জন্যে বোধহয় ওরা প্রাণও দিতে পারে’ গৌরী বললেন।

  রবিবার মিটিং-এ যাবার কোন ইচ্ছে না থাকলেও সমরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরীকে দেখার আগ্রহেই অরিন্দম গেল। মিটিং শেষ হবার পর পরিচয়ও হল। প্রভাতই আলাপ করিয়ে দিলেন। ধুতি পাঞ্জাবী পরা সুন্দর সুপুরুষ সমরেন্দ্রনাথকে প্রথম দর্শনেই অরিন্দমের ভালো লেগে গেল। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।

প্রথম আলাপেই সমরেন্দ্রনাথ সহাস্যে অরিন্দমকে বললেন ‘কি আমাদের বংশের সব গল্প শোনা হয়ে গেছে তো?’

অরিন্দম একটু অপ্রস্তুতে পড়ল, তারপর সামলে নিয়ে বলল, ‘এই শহরের উন্নতির পেছনে আপনাদের কত অবদান তাও শুনেছি।’

বাড়ি ফিরে আসার আগে ফোন নম্বর বিনিময় হল। সমরেন্দ্রনাথ অরিন্দমকে স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে রায়চৌধুরী নিবাসে যাবার আমন্ত্রণ জানালেন।

অরিন্দম ফিরে এসে শ্রেয়াকে বলল, ‘সত্যিই কি ভালো ভদ্রলোক। কত গল্প শুনেছি রায়চৌধুরী বংশের সম্পর্কে এই কদিনে। ওনাকে দেখলে মনে হয় না যে উনিও ওই বংশের একজন।’

  কয়েক মাস কাটল। একদিন হঠাৎ রাত ন’টা নাগাদ সমরেন্দ্রনাথের ফোন এল অরিন্দমের মোবাইলে। মণিকুন্তলা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ওনাদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান শহরে নেই, যদি অরিন্দম এসে মণিকুন্তলাকে দেখে যায়। অরিন্দম সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেল। এই প্রথম সে রায়চৌধুরী নিবাসে গেল। সমরেন্দ্রনাথই অরিন্দমকে দোতলায় নিজেদের ঘরে নিয়ে গেলেন। সেদিন সমরেন্দ্রনাথ যেন একটু বেশী গম্ভীর। হয়ত স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে। অরিন্দম মণিকুন্তলাকে দেখতে শুরু করলে সমরেন্দ্রনাথ ‘আপনি দেখুন, আমার একটা জরুরী কাজ আছে’ বলে উঠে চলে গেলেন। অরিন্দম একটু অবাক হল, স্ত্রী অসুস্থ বাড়িতে ডাক্তার ডাকতে হয়েছে, এই অবস্থায় কি এমন জরুরী কাজ থাকতে পারে? সে আবার নিজের কাজে মন দিল। ঘরে একজন পরিচারিকা ছিল আর ঘরের বাইরে একজন চাকর দাঁড়িয়ে ছিল। অরিন্দম ওষুধ লিখে তাকে ডেকে সেগুলো তাড়াতাড়ি কিনে আনতে বলল। অরিন্দম ওঠার উপক্রম করছে এমন সময় মণিকুন্তলা কিছু বলতে চাইলেন।

অরিন্দম বাধা দিয়ে বলল, ‘আপনি কথা বলবেন না, বিশ্রাম করুন। ওষুধগুলো ঠিক মতো খাবেন। আমি এখন আসছি, দরকার হলে আবার ফোন করবেন।’ সে বাইরে বেরিয়ে এল। করিডোরের একপাশে সারি সারি ঘর, বেশীর ভাগই বন্ধ। একটা ঘরের সামনে এসে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। যখন এসেছিল তখন এই ঘরটাও বন্ধ ছিল। এখন খোলা, দরজার পর্দা অল্প টানা। ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঘরে আলো জ্বলছে আর ঘরের ভেতর সমরেন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে আছেন। ঘর ভর্তি বাচ্ছাদের খেলনায়। সমরেন্দ্রনাথ একটা করে খেলনা তুলছেন, পরম মমতায় তার ওপর হাত বোলাচ্ছেন, তারপর আবার যথাস্থানে রেখে দিচ্ছেন। হঠাৎ অরিন্দমের দৃষ্টি পড়ল একটা ছোট টেবিলের ওপর। আরো কয়েকটা খেলনার মধ্যে চোখ আটকে গেল একটা পুতুলে। গোলাপী ঝালর দেওয়া ফ্রক পড়া সোনালী চুলের বড়সড় একটা ডল, গলায় লাল নীল পুঁতির মালা। অরিন্দমের মনে হল তার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেছে। পুতুলটা যে তার বড্ড চেনা। 

 

 নেপথ্যে 

অদিতি ভট্টাচার্য্য

...অপলক ব্যাগ থেকে নেমতন্ন কার্ড বার করে ওদের দুজনের হাতে ধরাল, ‘খুব অবাক হচ্ছ তো? কি করব বলো। এমন চাকরী করি যে লোককে বোঝানোই মুশকিল। একমাত্র তোর্সাই দেখলাম এসব ব্যাপার শুনে খুব এক্সাইটেড হয়ে উঠল। বলল, এসব কাজে বেশ মজা আছে, অন্য সব জবের মতো মনোটোনাস নয়। আমিও তাই আর দেরী না করে ঝুলে পড়লাম!...’

  ছোটো কাজ? ফোটো তোলা? সুদর্শনের ফোটোশুট ছোটো কাজ? কিরকম ফোটোগ্রাফার আপনি?’ তোর্সার গলায় বিস্ময়।

‘এটা সেরকম ফোটো শুট ছিল না। এই লাইনে আছেন, এখনো কিছুই জানেন না দেখছি। বড় বড় হিরো হিরোইনদের দু-একটা অনেক ছোটোখাটো অ্যাডট্যাডেও ইউজ হয়। সেইরকম দু একটা স্টিল তুলতে আসা,’ অপলক ব্রেকফাস্ট ফেলেই উঠে যাওয়ার চেষ্টা করে।

কিন্তু তোর্সা যেতে দিলে তো, ‘আরে খাবার ফেলে রেখে পালাচ্ছেন কেন? ঠিক আছে, আমি সুদর্শনের ব্যাপারে কোন কথা জিজ্ঞেস করব না। বসতে পারি তো এখানে?’

এরপর আর যাওয়াও হল না, তোর্সাকে বসতে বলতেও হল।

না, সুদর্শনকে নিয়ে আর কোন কথা হয় নি। তোর্সার সিরিয়াল, বনধ, কলকাতার ট্র্যাফিক জ্যাম এসব নিয়ে কথাবার্তাতেই ঘন্টা দুয়েক কেটে গেল। এরপর যে যার ঘরে ঢুকে গেল, আর দেখা হয় নি, শুধু মোবাইল নম্বর বিনিময় হল। পরের দিন তো অপলক কলকাতায় ফিরে এল।অপলকের বিশেষ খবর পাবলিক ভালোই খেল। শুধু তোমাকে চাই হইহই করে চলছে। হাউসফুলের পর হাউসফুল।

  এই সময় একদিন তোর্সার ফোন এল, ‘কি আমাকে মনে পড়ছে তো? রায়চকে সুদর্শন আর কুহেলিকার ছবিগুলো কিন্তু ভালই তুলছিলেন। অনেকে আবার এর মধ্যে অন্য গন্ধও পাচ্ছে। শুধু তোমাকে চাই হিট করেছে তো, তাই অনেকের হিংসে হচ্ছে। সুদর্শন যে ফাটাফাটি অভিনয় করল সেটা দেখছে না। আর আপনিও তো ছবি তুলেছেন শুধু ছোটোখাটো অ্যাডের জন্যে, তাই না?’

সর্বনাশ! অপলক কি বলবে ভেবে পেল না, আবার ফোন কেটে দিতেও পারল না। কলকাতায় ফিরে এসে তোর্সাকে ফোন না করলেও ওকে বেশ ভালো লেগেছিল অপলকের। এর মধ্যে ফেলে আসা দিনগুলোর একটা এপিসোডও মিস করে নি। কি করি কি করি ভেবে শেষ পর্যন্ত তোর্সার সঙ্গে দেখা করতে চাইল।

  এরপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। অপলকের কাজে এস.কে খুব খুশী। অপলককেও খুশী রাখার ব্যবস্থা করেছেন। খুব শিগগির মুম্বাইতে ট্রান্সফারও হয়ে যাবে। এহেন সময়ে অপলক একদিন অফিসে ঢুকতেই ঋষি আর ইলিনা এল ওর কাছে। ঋষির হাতে একটা খাম। ‘কি ব্যাপার বস? কি চালাচ্ছ তুমি?’ চোখ নাচিয়ে ঋষি জিজ্ঞেস করল, ‘হঠাৎ যেন খুব বিজি হয়ে গেছ মনে হচ্ছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে দেখলাম সিটি সেন্টার থেকে বেশ অনেক কিছু খরিদ্দারি করে বেরোচ্ছ, সঙ্গে একটা মেয়ে। আমাকে দেখে হেসে হাত নেড়ে চলে গেলে, খুব তাড়া ছিল মনে হয়! মনে পড়ছে তো? পরশু দিন দেখলাম রেস্টুর‍্যান্টে আরেকজনের সঙ্গে খুব সাঁটাচ্ছ? বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখো, ফোটো দেখো,’ ঋষি খামটা থেকে গোটা তিনেক ছবি খামটার ওপর ছড়িয়ে দিল।

অপলক আর তোর্সার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে তোলা ছবি।

অপলক অবাক হয়ে গেল, ঋষি ওকে এভাবে ফলো করে ছবি তুলেছে!

‘কি ব্যাপার অপলক? কন্ট্রোভার্সি তৈরী করতে করতে নিজে কোন কন্ট্রোভার্সিতে জড়াচ্ছ? এ মেয়েটা তো সিরিয়াল করে। একে কোথা থেকে পাকড়ালে?’ এবার প্রশ্ন ইলিনার।

‘কোন কন্ট্রোভার্সি নেই। অ্যাবসলিউটলি নো কন্ট্রোভার্সি,’ হেসে বলল অপলক, ‘নিজের জীবনে কোন কন্ট্রোভার্সি পছন্দ করি না আমি। ঋষি যাকে দেখেছে আমার সঙ্গে সিটি সেন্টারে সে আমার বোন। ঠিকই বলেছে ঋষি, খরিদ্দারিটা বেশীই হয়ে গেছিল সেদিন। কি আর করা যাবে! ছোটো বোনেরা বরাবরই দাদাদের পকেট কাটতে ভালোবাসে। আর যদি সামনে দাদার বিয়ে থাকে তাহলে তো কথাই নেই!’‘বিয়ে?’ ঋষি আর ইলিনা একসঙ্গে বলে উঠল।‘হ্যাঁ বিয়ে। বললাম না কোন কন্ট্রোভার্সি নেই। তোর্সার সঙ্গে আমার বিয়ে, সামনের মাসের ফিফথ। এই যে তোমাদের দুজনের কার্ড,’ অপলক ব্যাগ থেকে নেমতন্ন কার্ড বার করে ওদের দুজনের হাতে ধরাল, ‘খুব অবাক হচ্ছ তো? কি করব বলো। এমন চাকরী করি যে লোককে বোঝানোই মুশকিল। একমাত্র তোর্সাই দেখলাম এসব ব্যাপার শুনে খুব এক্সাইটেড হয়ে উঠল।

বলল, এসব কাজে বেশ মজা আছে,

অন্য সব জবের মতো মনোটোনাস নয়। আমিও তাই আর দেরী না করে ঝুলে পড়লাম!’  সুদর্শন আর কুহেলিকা রায়চকের রিসর্টে গেছে। শুটিং এ নাকি খুব ধকল গেছে, একটা ব্রেকের দরকার ছিল ওদের। অপলককেও অবিলম্বে যেতে হবে রায়চকে, এটাকে বেশ মুখরোচক খবর হিসেবে পরিবেশন করার জন্যে। এটার জন্যে অপলক প্রস্তুত ছিল না, কিন্তু কি আর করা যাবে, যেতে তাকে হলই। যদিও একথাটা তাকে বলার জন্যে স্টুডিওতে কেন ডাকা হল সেটা ঠিক বুঝতে পারল না।

  রায়চকে পৌঁছে দেখল তার জন্যেও ঘর বুক করা আছে।চেক ইন করে সুদর্শন আর কুহেলিকার সঙ্গে দেখা করল।ব্যাপারটা তাদেরও জানা ছিল, কাজেই সুইমিং পুলের ধারে, বাগানে দুজনের একসঙ্গে দু চারটে ছবি নিয়ে দিব্যি একটা খবর তৈরী করে যথাস্থানে পাঠিয়ে দিতে অপলকের কোনো অসুবিধেই হল না। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পুরো দুনিয়া জেনে যাবে যে শুধু তোমাকে চাই আর শুধুমাত্র অভিনয়েই সীমাবদ্ধ নেই, সুদর্শন আর কুহেলিকা একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। এ নাকি শুধু তোমাকে চাই তে স্বামী স্ত্রীর ভূমিকায় মন প্রাণ ঢেলে অভিনয় করার ফল। ব্যাস সিনেমা হিট হওয়া আটকায় কে! অপলকের হাইকও পাক্কা।

  কাজ সেরে অপলক বাইরে বেরোল। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। রাতটা এখানে কাটিয়ে সে কাল ভোরে কলকাতা ফিরবে। দেখল রিসর্টের সামনে বেশ হট্টগোল। কি না অত্যন্ত জনপ্রিয় সিরিয়াল ‘ফেলে আসা দিনগুলো’র পুরো ক্রু এখানে এসেছে। আগামী কয়েকটা এপিসোডের শুটিং নাকি রায়চকেই হবে। আশপাশ থেকে লোক তাই ঝেঁটিয়ে এসেছে তাদের প্রিয় চরিত্রদের দেখতে। প্রতি সন্ধ্যেবেলা আটটা থেকে সাড়ে আটটা যারা তাদের টিভির সামনে আটকে রাখে, এত কাছ থেকে তাদের দেখার সুযোগ কি কেউ হাতছাড়া করতে চায়? তাছাড়া এত গোপনীয়তা সত্ত্বেও কি করে যেন রটে গেছে যে  সুদর্শন এখানে আছে। তাই তাকে দেখার জন্যেও লোক হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। যদিও  সুদর্শনের টিকিটিও দেখতে পাবে বলে মনে হয় না।

  কিছুক্ষণ বাইরে ঘুরে টুরে রাত ন’টা নাগাদ রিসর্টে নিজের ঘরে ঢুকে একটা নিউজ চ্যানেল চালাতেই অপলকের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল। হুগলীর একটি গ্রামে দুজন কর্মী খুনের প্রতিবাদে রাজ্যের প্রধাণ বিরোধী দল আগামী কাল চব্বিশ ঘন্টার বাংলা বন্ধ ডেকেছে। যদিও শাসক দলের পক্ষ থেকে বন্ধ ব্যর্থ করার আহ্বান জানানো হয়েছে কিন্তু বিরোধী দলের লোকজন তাদের শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়েও বন্ধ সফল করবে বলেছে। অতএব কাল রাস্তায় বেরোলে গোলমালে পড়ার আশঙ্কাই বেশী। এখন বাধ্য হয়েই কাল গোটা একটা দিন এখানে আটকে থাকতে হবে। অপলক বেশ বিরক্ত হল। কিন্তু করারও কিছু নেই।

  পরের দিন সকালে অপলক ঘুম থেকে বেশ দেরী করে উঠল। চা আর ব্রেকফাস্ট নিয়ে রিসর্টের বাগানে গিয়ে বসল। আজ তো সারাদিন চুপচাপ বসে থাকা আর টিভি দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। সবে গরম চা এ একটা চুমুক দিয়েছে এমন সময় এক মহিলা কন্ঠের আওয়াজ ভেসে এল, ‘একটু শুনবেন?’

অপলক তাকাল। একটি অল্প বয়েসী সুন্দরী মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, মুখটা যেন চেনা চেনা।

‘আমাকে বলছেন? বলুন?’

‘আমি তোর্সা, তোর্সা মিত্র।’

তোর্সা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু অপলক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনাকে কোথাও দেখেছি, আপনি কি টিভি সিরিয়ালে’

তোর্সা হেসে বলল,‘হ্যাঁ ফেলে আসা দিনগুলোয় আমি চুমকির রোল করি। তাছাড়া দু একটা অ্যাডও করেছি।’

‘আই সি, তাই জন্যে চেনা চেনা লাগছে। আমার খুব একটা সিরিয়াল টিরিয়াল দেখা হয় না, তবে মোটামুটি খবরাখবর রাখি।’

‘আমার তো এন্ট্রি সবে হয়েছে, লাস্ট কয়েকটা এপিসোডে।’

‘কি বলতে এসেছিলেন বলুন,’ অপলক জানতে চাইল।‘শুনছিলাম আপনার সঙ্গে  সুদর্শনের চেনাশোনা আছে। আপনি নাকি সুদর্শন আর কুহেলিকার ছবি তুলেছেন

এখানে। আমি  সুদর্শনের খুব ফ্যান, যদি একটু দেখা করার

সুযোগ করে দেন।  সুদর্শন আর কুহেলিকার নাকি কড়া ইনস্ট্রাকশন আছে কাউকে দেখা না করতে দেওয়ার।’ অপলক সতর্ক হল। সুদর্শন যে এখানে আছে এ খবরটাই যথেষ্ট গোপন রাখতে বলা হয়েছে।

সে বলল, ‘আপনাকে কে বলল এসব কথা?’ ‘রিসর্টেরই একজন বলেছে। প্লীজ বলুন না দেখা করিয়ে দেবেন?’ তোর্সা নাছোড়বান্দা। ‘না না আমার সঙ্গে সেরকম কিছু চেনাশোনা নেই। একটা ছোটো কাজ ছিল তাই আসা,’ অপলক এড়ানোর চেষ্টা করে।

যে শাশুড়ির প্রতিটি কথায় শ্যামলী গায়ে জ্বালা ধরত, ফোস্কা পড়ত, তাকে আজ নিজের বড় আপনজন বলে মনে হল। মনে হল জিজ্ঞেস করে- ‘মা, আমি চলে গেলে আপনি কার সম্বন্ধে ছেলের কাছে অভিযোগ জানাবেন?’ কিন্তু, কিছু না বলে চুপ করে চায়ে চুমুক দিল।

শাশুড়ি যেন কিছু বুঝতে পেরেছেন, চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কিছু হয়েছে বৌমা? তোমার কি শরীর খারাপ?'

আজ শাশুড়ির প্রশ্ন যেন এক বন্ধুর মত শোনাল। শ্যামলী জবাব দিল, 'না মা, কিছু হয় নি। চলুন আজ বিকেলে আমরা শপিং করতে যাই।' শাশুড়ি আরও অবাক হলেন, যার কদিন পরে ডিভোর্স হবে, যে কদিন পরে চলে যাবে, যাকে নিয়ে শাশুড়ির মন খারাপ, সে বলছে শপিং করার কথা।

‘ছোটো কাজ? ফোটো তোলা? সুদর্শনের ফোটোশুট ছোটো কাজ? কিরকম ফোটোগ্রাফার আপনি?’ তোর্সার গলায় বিস্ময়।

‘এটা সেরকম ফোটোশুট ছিল না। এই লাইনে আছেন, এখনো কিছুই জানেন না দেখছি। বড়ো বড়ো হিরো হিরোইনদের দু একটা অনেক ছোটোখাটো অ্যাডট্যাডেও ইউজ হয়। সেইরকম দু একটা স্টিল তুলতে আসা,’ অপলক ব্রেকফাস্ট ফেলেই উঠে যাওয়ার চেষ্টা করে।

কিন্তু তোর্সা যেতে দিলে তো, ‘আরে খাবার ফেলে রেখে পালাচ্ছেন কেন? ঠিক আছে, আমি সুদর্শনের ব্যাপারে কোনো কথা জিজ্ঞেস করব না। বসতে পারি তো এখানে?’

এরপর আর যাওয়াও হল না, তোর্সাকে বসতে বলতেও হল।

না, সুদর্শনকে নিয়ে আর কোনো কথা হয় নি। তোর্সার সিরিয়াল, বনধ, কলকাতার ট্র্যাফিক জ্যাম এসব নিয়ে কথাবার্তাতেই ঘন্টা দুয়েক কেটে গেল। এরপর যে যার ঘরে ঢুকে গেল, আর দেখা হয় নি, শুধু মোবাইল নম্বর বিনিময় হল। পরেরদিন তো অপলক কলকাতায় ফিরে এল।

অপলকের বিশেষ খবর পাবলিক ভালোই খেল। শুধু তোমাকে চাই হইহই করে চলছে। হাউসফুলের পর হাউসফুল।

এই সময় একদিন তোর্সার ফোন এল, ‘কি আমাকে মনে পড়ছে তো? রায়চকে সুদর্শন আর কুহেলিকার ছবিগুলো কিন্তু ভালোই তুলছিলেন। অনেকে আবার এর মধ্যে অন্য গন্ধও পাচ্ছে। শুধু তোমাকে চাই হিট করেছে তো, তাই অনেকের হিংসে হচ্ছে। সুদর্শন যে ফাটাফাটি অভিনয় করল সেটা দেখছে না। আর আপনিও তো ছবি তুলেছেন শুধু ছোটোখাটো অ্যাডের জন্যে, তাই না?’

সর্বনাশ! অপলক কি বলবে ভেবে পেল না, আবার ফোন কেটে দিতেও পারল না। কলকাতায় ফিরে এসে তোর্সাকে ফোন না করলেও ওকে বেশ ভালো লেগেছিল অপলকের। এর মধ্যে ফেলে আসা দিনগুলোর একটা এপিসোডও মিস করে নি। কি করি কি করি ভেবে শেষ পর্যন্ত তোর্সার সঙ্গে দেখা করতে চাইল।

  এরপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। অপলকের কাজে এস.কে খুব খুশী। অপলককেও খুশী রাখার ব্যবস্থা করেছেন। খুব শিগগির মুম্বাইতে ট্রান্সফারও হয়ে যাবে। এহেন সময়ে অপলক একদিন অফিসে ঢুকতেই ঋষি আর ইলিনা এল ওর কাছে। ঋষির হাতে একটা খাম।

‘কি ব্যাপার বস? কি চালাচ্ছ তুমি?’ চোখ নাচিয়ে ঋষি জিজ্ঞেস করল, ‘হঠাৎ যেন খুব বিজি হয়ে গেছ মনে হচ্ছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে দেখলাম সিটি সেন্টার থেকে বেশ অনেক কিছু খরিদ্দারি করে বেরোচ্ছ, সঙ্গে একটা মেয়ে। আমাকে দেখে হেসে হাত নেড়ে চলে গেলে, খুব তাড়া ছিল মনে হয়! মনে পড়ছে তো? পরশু দিন দেখলাম রেস্টুর‍্যান্টে আরেকজনের সঙ্গে খুব সাঁটাচ্ছ? বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখো, ফোটো দেখো,’ ঋষি খামটা থেকে গোটা তিনেক ছবি খামটার ওপর ছড়িয়ে দিল।

অপলক আর তোর্সার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে তোলা ছবি।

অপলক অবাক হয়ে গেল, ঋষি ওকে এভাবে ফলো করে ছবি তুলেছে!

‘কি ব্যাপার অপলক? কন্ট্রোভার্সি তৈরী করতে করতে নিজে কোন কন্ট্রোভার্সিতে জড়াচ্ছ? এ মেয়েটা তো সিরিয়াল করে। একে কোথা থেকে পাকড়ালে?’ এবার প্রশ্ন ইলিনার।

‘কোনো কন্ট্রোভার্সি নেই। অ্যাবসলিউটলি নো কন্ট্রোভার্সি,’ হেসে বলল অপলক, ‘নিজের জীবনে কোনো কন্ট্রোভার্সি পছন্দ করি না আমি। ঋষি যাকে দেখেছে আমার সঙ্গে সিটি সেন্টারে সে আমার বোন। ঠিকই বলেছে ঋষি, খরিদ্দারিটা বেশীই হয়ে গেছিল সেদিন। কি আর করা যাবে! ছোটো বোনেরা বরাবরই দাদাদের পকেট কাটতে ভালোবাসে। আর যদি সামনে দাদার বিয়ে থাকে তাহলে তো কথাই নেই!’

‘বিয়ে?’ ঋষি আর ইলিনা একসঙ্গে বলে উঠল।

‘হ্যাঁ বিয়ে। বললাম না কোনো কন্ট্রোভার্সি নেই। তোর্সার সঙ্গে আমার বিয়ে, সামনের মাসের ফিফথ। এই যে তোমাদের দুজনের কার্ড,’ অপলক ব্যাগ থেকে নেমতন্ন কার্ড বার করে ওদের দুজনের হাতে ধরাল, ‘খুব অবাক হচ্ছ তো? কি করব বলো। এমন চাকরী করি যে লোককে বোঝানোই মুশকিল। একমাত্র তোর্সাই দেখলাম এসব ব্যাপার শুনে খুব এক্সাইটেড হয়ে উঠল। বলল, এসব কাজে বেশ মজা আছে, অন্য সব জবের মতো মনোটোনাস নয়। আমিও তাই আর দেরী না করে ঝুলে পড়লাম!’

 

নীড়ে

ফেরা

সঞ্চিতা চৌধুরী

.....যে শাশুড়ির প্রতিটি কথায় শ্যামলী গায়ে জ্বালা ধরত, ফোস্কা পড়ত, তাকে আজ নিজের বড় আপনজন বলে মনে হল। মনে হল জিজ্ঞেস করে- ‘মা, আমি চলে গেলে আপনি কার সম্বন্ধে ছেলের কাছে অভিযোগ জানাবেন?’ কিন্তু, কিছু না বলে চুপ করে চায়ে চুমুক দিল। ....

  হরের নামকরা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ চৌধুরী খসখস করে নিজের প্যাডে প্রেসকিপশন লিখতে লিখতে বললেন, 'এই ঔষধ গুলো আপনাকে আরো ছয় মাস খেয়ে যেতে হবে। আপনার স্ট্রেস লেভেল একটু কমান। প্রেশার বেড়ে গেছে, সেই সঙ্গে হাইপো থাইরয়েড। ঔষধ ছাড়া চলবে না।'

  গত কয়েবছর ধরে শ্যামলীকে গাদাগুচ্ছের এন্টি ডিপ্রেশন, এন্টি স্ট্রেস এর ঔষধ খেয়ে যেতে হচ্ছে।চাকরিতে পজিশনের জন্যে মারকাটারি শীতল যুদ্ধ, এগিয়ে যাওয়ার লড়াই, কর্পোরেট দুনিয়ার চোরা রাজনীতি শ্যামলীকে ক্লান্ত করে দিয়েছে।

শ্যামলী ডাক্তারের চেম্বার থেকে শুকনো মুখে বেড়িয়ে নিজের ঝা চকচকে নতুন গাড়ী চালিয়ে আবার অফিস মুখো রওনা দিল।

    এখন অফিসে অনেক কাজ। একটা বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যাবে, কথাবার্তা চলছে। তার জন্যে প্রোজেক্ট লেখার কাজ শেষ করতে হবে, প্রেজেন্টেশন বানাতে হবে, বিদেশী ডেলিগেটদের সামনে লেকচার দেবার জন্যে তৈরি হতে হবে, শ্যামলীর উপরে সমস্ত দায়িত্ব। এই কাজের সাফল্যের উপরে শ্যামলীর চাকরির ঊর্ধ্বমুখী ভাগ্য নির্ভর করছে। এইটা উৎরে গেলে একধাপে অনেক উঁচুতে ওঠা যাবে, হয়তো বিদেশেও যেতে হতে পারে। কাছের প্রতিদ্বন্দ্বী নীতাকে হারিয়ে এই কাজের দায়িত্ব পাওয়াতে শ্যামলী খুব খুশি। তাই গত কয়েক মাস ধরে শ্যামলী নিজেকে নিংড়ে কাজ করে চলেছে।

উপরে, আরও উপরে ওঠার তীব্র নেশা শ্যামলীকে কলেজ জীবন থেকেই তাড়া করত। শ্যামলী কোনদিনই থামতে জানে নি। পড়াশোনায় শ্যামলী যে খুব ভাল ছিল তা নয়, মাঝারি মেধার শ্যামলী জেদ আর পরিশ্রমের জোরে বরাবর ভালই রেজাল্ট করেছিল। টাকার নেশা পেয়ে বসেছিল কলেজেই, তাই অন্যান্য বন্ধুরা যখন তৈরি হচ্ছিল উচ্চশিক্ষার জন্যে শ্যামলী তখন এক ভাল কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে যায় এবং যথারীতি কলেজের পরেই শ্যামলীর চাকরি জীবন শুরু হয়।

  যুগটা তখন ছিল বেকারত্বের যুগ, সেই যুগে একটা ভাল চাকরি যোগাড় করা সবার কাছেই ঈর্ষনীয় ছিল, শ্যামলীকে তাই কলেজের বন্ধুরা অনেকেই ঈর্ষা করেছিল।

বিকাশ তখন বেকার ছিল, কিন্তু বিকাশ শ্যামলীর প্রেম আরও ঘন হয়েছিল তখন। বিকাশকে নিজের টাকায় সিনেমা দেখিয়ে, রেস্তরাঁতে খেয়ে নারী স্বাধীনতার মূর্ত পূজারি শ্যামলীর দিন ভালোই কাটছিল।

বিকাশ-শ্যামলীর কাছের বন্ধু অনন্যা এম এস সি আর পি এইচ ডি করতে চলে গেল, ওর বাবা মিলিটারির কর্নেল ছিলেন। অনন্যার সঙ্গে মাঝে মাঝে চিঠি পত্রের আদান প্রদান হত, কখনও ফোনেও যোগাযোগ হত।

উন্নতিশীল দেশে উন্নতির হাওয়া খুব তাড়াতাড়ি লাগে। অনেক বিদেশী কোম্পানি আর বিদেশী ব্যঙ্ক ঢুকে পড়ল দেশে। আমেরিকা নিজেদের কাজ এই দেশের মানুষদের দিয়ে করাবে বলায় চাকরির মন্দার বাজারে জোয়ার এলো। চাকরির বাজারে তখন আই টি, ম্যানেজমেন্ট ছাত্র ছাত্রিদের ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা। বিকাশ ততদিনে ম্যানেজমেন্টের কোর্স পাশ করে একটা বিদেশী ব্যঙ্কে উচ্চ পদে জাঁকিয়ে বসেছে।

শ্যামলী দেখল ম্যানেজমেন্টের কোর্স করা নেই বলে পিছিয়ে পড়েছে, তাই পুরোন চাকরি ছেড়ে ম্যানেজমেন্টের কোর্স করতে চলে গেল ব্যঙ্ক থেকে লোন নিয়ে। তারপর শ্যামলীকে আর পিছু ফিরে দেখতে হয় নি, সামনেই ছিল খাড়া সিঁড়ি, সেই সিঁড়ি ধরে উঠে পড়তে খুব বেশী সময় লাগে নি জেদি, পরিশ্রমী শ্যামলীর।

  ততদিনে বিকাশের সঙ্গে বিয়েও হয়ে গেছে। আজ চার বছরের ছেলেও আছে শ্যামলীর। ছেলে সারাদিন শাশুড়ির কাছে থাকে। শাশুড়িই ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে আসে, স্কুলে পৌঁছে দেয়।

শ্যামলীর শাশুড়ি প্রমীলাদেবী একটু পুরোন ধাঁচের মানুষ। নারী স্বাধীনতা, মেয়েদের চাকরি ব্যপারটাকে খুব বেশি যে ভালো নজরে দেখেন তা নয়। প্রমীলাদেবী নিজের সংসারেও ঘর সংসারের কাজকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। শ্যামলীর দেরী করে বাড়ি ফেরা, রাত জেগে কাজ করা ইত্যাদি নিয়ে প্রায়ই কথা শোনান।

প্রমীলাদেবী প্রায়ই বলেন, “আমার নাতি সুকুটার একদম যত্ন আত্তি হচ্ছে না বৌমা। বিকাশেরও যত্ন চাই বৌমা, সংসারের প্রতি একটু নজর দাও। শুধু চাকরি করে গেলে চলবে?”   

অফিস ফেরত ক্লান্ত, বিধ্বস্ত শ্যামলী শাশুড়ির কথায় বিরক্ত হলেও ঝামেলা না বাড়িয়ে মলিন হাসি হেসে বলে, “আপনি তো আছেন মা।”'

শ্যামলীর কথায় শাশুড়ি আরো তেতে পুড়ে তেজের সঙ্গে বলে ওঠেন, “আমি কি আর চিরদিন? নিজের সংসারের দায়িত্ব নিতে না শিখলে তো বিয়ে কেন করলে, বাচ্চা কেন নিলে? এতোকাল নিজের সংসারে খেটে এলাম এখন ছেলের। বুড়ো বয়সে যে একটু বিশ্রাম নেবো উপায় নেই। কালে কালে যে 

আর কত দেখতে হবে কে জানে।” গ্রামে বড় হয়ে ওঠা প্রমীলাদেবী শহুরে পালিশ দিয়ে কথা বলতে শেখেন নি।

প্রমীলাদেবীর কথায় শ্যামলীর গায়ে যেন ফোস্কা পড়ে গেল, তাঁর কথার কোন জবাব না দিয়ে তাড়াতাড়ি নিজের রুমে গিয়ে কিছু খেয়ে অফিসের কাজ নিয়ে বসল। অনেক কাজ, মাথা একেবারে গরম হয়ে আছে, আজ শ্যামলীকে রাত জাগতেই হবে। বিকাশ এখনো ফেরে নি।

ঐ ঘরে সুকু শাশুড়ির সঙ্গে বসে পড়ছে। সুকুটাও হয়েছে তেমনি, একদম মায়ের কাছে ঘেঁসে না, এইটুকু বাচ্চাও বোঝে মা ব্যস্ত অফিসের কাজ নিয়ে, মাকে বিরক্ত করতে নেই, হয়তো শাশুড়িই বুঝিয়েছে।

 

শ্যামলী জানে আজ আবার শুরু হবে ছেলের কাছে শাশুড়ির গাদাগুচ্ছের অভিযোগ। বিকাশ অফিস থেকে ফিরলেই শাশুড়ি শ্যামলীর সংসারের প্রতি অমনোযোগের হাজার ফর্দ মেলে ধরবেন। বিকাশও তালে তাল মেলাবে, শ্যামলীকে বোঝাতে আসবে। তারপরে ব্যপারটা ঝগড়ায় পরিণত হবে, অবশেষে স্বামী স্ত্রীতে কথা বন্ধ হবে। শ্যামলী আবার ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমোবে। স্ট্রেস কমাতে ডাঃ চৌধুরীর ঔষধ গুলো খেয়ে যেতে হবে। শ্যামলী আর বিকাশের সেটা প্রায় নিত্য দিনের ঘটনা।অন্যান্য সময়ে বিকাশের সঙ্গে কথা বলার কোন বিষয় খুঁজে পায় না। অফিসের  রেষারেষি,  ইনকাম  ট্যাক্স  ছাড়া  যেন  দুজনের

কাছে অন্য কোন কথা নেই।

বিকাশ দেরী করে অফিস থেকে এসেও অফিসের কাজ নিয়ে বসে, শ্যামলীও বসে। মায়ের কথায় বিরক্ত বিকাশ শ্যামলীকে বলে, “অফিসের কাজ অফিসেই সেরে নাও না কেন? ঘরে তো সুকুকে একটু সময় দাও।”

শ্যামলী জবাব দেয়, “দেখো উন্নতি করতে হলে কিছু তো কম্প্রোমাইজ করতে হবে। তুমিও তো সময় দিতে পারো। সবকিছু কি আমাকেই করতে হবে?”

বিকাশ রাগের মাথায় পরামর্শ দিল, “তুমি তো এই চাকরি ছেড়ে অনন্যার স্কুলে চাকরি করতে পারো। সময় কম লাগবে, ছেলের পেছনে সময় দিতে পারবে। আমি বলছি না যে তুমি চাকরি কোর না, কর চাকরি কিন্তু বাড়িতেও একটু সময় দাও। মা কত আর করবেন।”

“ইইসস, ম্যাগ্যোঃ! ছিঃ, স্কুলের চাকরি একটা চাকরি হল? আমি স্কুলের চাকরি ঘৃণা করি।” শ্যামলী মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল।

উচ্চাকাঙ্ক্ষী শ্যামলীর আঁতে ঘা লাগে। এত ভালো চাকরি ছেড়ে শেষে কিনা বিকাশ স্কুলের সামান্য চাকরি করার কথা বলছে সামান্য সংসারের জন্যে। শ্যামলীর স্ট্যাটাস, পজিশনের কোন মূল্য নেই বিকাশের কাছে?

“হ্যাঁ, তা তো বটেই। যারা তোমাকে বাচ্চা বেলায় হাতে ধরে ধরে শেখালো, যারা তোমাকে সারাজীবনের শিক্ষা দিল, যাদের প্রেরণায়, পরিশ্রমে তুমি আজ এখানে তাদের চাকরিকে তুমি ঘৃণা করবে বই কি। তোমার শিক্ষকেরা তোমাকে শিক্ষা না দিলে আজ তুমি কোথায় দাঁড়াতে স্বার্থপর নারী?” বিকাশ বেশ ঝাঁজালো সুরে বলল।

“তোমার শিক্ষকদের প্রতি তোমার কোন শ্রদ্ধা নেই, না থাকুক। তাদের ঘৃণা করার অধিকারও তোমার নেই। যে মানুষেরা তোমার জন্যে করেছে তাদের প্রতি নূন্যতম কৃতজ্ঞতা বোধ টুকুও তোমার নেই। থাক, তোমার মত মানসিকতার মেয়ে আমার ছেলের শিক্ষার দায়িত্ব নাই বা নিলে। তুমি আর কি শেখাবে? শেখাবে তো অশ্রদ্ধা, অকৃতজ্ঞতা, স্বার্থপরতা। একদিন তোমার ছেলেই তোমাকে অশ্রদ্ধা করবে। থাক আমি আমার ছেলেকে নিজে সময় দেবো। তুমি থাকো  তোমার সিঁড়ি ভাঙ্গা চাকরি নিয়ে।” রাগান্বিত উচ্চ স্বরে বিকাশ যোগ করল।

ঘরে বাইরে মানসিক চাপে শ্যামলীর মনে হচ্ছে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে না।

  সম্পর্কের শীতলতা এমন এক জায়গায় পৌঁছল যে দুজনেরই মনে হল, দূরে সরে যাওয়াই ঠিক। এই সম্পর্ক ভেঙ্গে ফেলাই ঠিক। ঠিক হল ডিভোর্স হবে পারস্পরিক বোঝাপড়ায়। যেহেতু, শ্যামলীও উচ্চ পদে চাকরি করে, খোরপোষ নিয়ে কোন ঝামেলা করবে না। বিকাশ কিছুতেই সুকুর স্বত্ত্ব ছাড়তে রাজী নয়, তাই শ্যামলীও সুকুর বাবার কাছে থাকার ব্যপারটা মেনে নিল। স্থির হল কিছুদিনের মধ্যে শ্যামলী এক আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করে চলে যাবে।

প্রমীলাদেবী কত বোঝালেন বিকাশকে, বললেন, “স্বামী স্ত্রীতে ঝগড়া তো কত হয় তা বলে ডিভোর্স দিতে হবে, এ কেমন কথা। তুই সুকুর কথা ভাবলি না?”

বিকাশ জবাব দিয়েছিল, “তুমি বুঝবে না মা। তাছাড়া ও থেকেও কি সুকু কে সময় দিয়েছিল?”

শ্যামলীকেও প্রমীলাদেবী বোঝালেন, “মেয়েদের এতো রাগ ভালো নয় বৌমা। বিকাশ না হয় না বুঝল, তুমি তো মানিয়ে নিতে পারো! তোমার জেদ ছেড়ে দাও বৌমা। সংসারের জন্যে কিছু তো আত্মত্যাগ করতে হয়।”

প্রমীলাদেবীর কথায় আবার শ্যামলীর গায়ে জ্বালা ধরল, ধমনী-শিরা উপশিরায় রক্ত চলাচল দ্বিগুণ হল, মুখে তার আঁচ টের পেল। কাঁধ নাচিয়ে শাশুড়ির সামনে থেকে সরে গেল নিতান্তই অবজ্ঞা ভরে। মনে মনে বলল, 

“আপনিও তো ছেলের কাছে আমার নামে অনেক অভিযোগ করতেন, ভালোই তো হয়েছে। এখন আবার বোঝাতে আসা কেন?”

যাইহোক, শ্যামলীর প্রেজেন্টেশন মোটামুটি তৈরি। পরের সপ্তাহে বিদেশি ডেলিগেটদের সামনে শ্যামলীর চাকরির ঊর্ধ্ব মুখী ভাগ্য পরীক্ষা।

সেদিন অফিসে গিয়ে শুনল বিদেশি ডেলিগেটদের সামনে প্রেজেন্টেশন দেবে নীতা, শ্যামলী নয়। শ্যামলীর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, হঠাৎ এই শেষ মুহূর্তে কেন প্রার্থী বদল ঘটল, শ্যামলী কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না। বসকে জিজ্ঞাসা করেও কোন সদুত্তর পাওয়া গেল না।

জেদি, আত্মবিশ্বাসী, অহংকারী শ্যামলী কিছুতেই এই হার মেনে নিতে পারলো না। কোন ঘৃণ্য চোরা রাজনীতিতে ওকে সরিয়ে নীতাকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হল কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না।  

  হঠাৎ করে শ্যামলীর নিজেকে খুব একাকী মনে হল। ইন্টারনেটে এখন কত সামাজিক নেটওয়ার্ক- অর্কুট, ফেসবুক, টুইটার তৈরি হয়েছে মানুষের একাকীত্ব কাটানোর জন্যে, কিন্তু সত্যি কি মানুষের একাকীত্ব কাটাতে পেরেছে? নাকি মানুষ আরও একা হয়ে গেছে? কাছের যারা ছিল তারা মনের দিক থেকে দূরে সরে গেছে। আজকাল আর কেউ কাউকে মনের দিক থেকে জানার চেষ্টা করে না। সবাই শুধু নিজের মনকে রক্তাক্ত করে একে অপরের সঙ্গে তুলনা

করে। এক নির্জন একাকীত্ব শ্যামলীকে ধীরে ধীরে ঘিরে ধরছে। অফিসের জন্যে কত কি ত্যাগ করতে হয়েছে শ্যামলীকে। ছোট্ট সুকুর বেড়ে ওঠার সঙ্গী হতে পারে নি, শুধু অন্ধ ভাবে এগিয়ে যাওয়ার, উপরে ওঠার পথ খুঁজেছে। অফিসের অতিরিক্ত কাজের চাপের জন্যেই বিকাশের সঙ্গে মনোমালিন্য ডিভোর্স পর্যন্ত গড়াচ্ছে, শ্যামলীর উপরে ওঠার অদম্য বাসনা তাতে একটুকুও দমে নি, বরং শ্যামলী ভেবেছে এবার আরো ভালো করে কাজ করে একদিন এই কোম্পানির ম্যানেজার হবে।

আর, আজ? গত দীর্ঘ কয়েক মাসের রাতজাগা পরিশ্রম সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে গেল। অফিসে কত সহজেই ওকে সরিয়ে শূন্যস্থান পূর্ণ হয়ে গেল।

শ্যামলীর সংসারেও কি তাই? ছোট্ট সুকু কি মায়ের জায়গা অন্য কাউকে দিতে পারবে? আর বিকাশ? বিকাশও কি ওকে ছাড়া থাকতে পারবে? নাকি অন্য কাউকে বিয়ে করবে? বিকাশ-শ্যামলীর সংসার, একদা শ্যামলী নিজের হাতে বড় ভালোবেসে সাজিয়েছিল, সেখানে অন্য কেউ এসে শ্যামলীর জায়গা নিয়ে নেবে? শ্যামলীর মনে হল নিজের সংসার থেকেও ওর উপস্থিতি আবছা হয়ে যাচ্ছে, ওর  প্রয়োজনীয়তা  কমে যাচ্ছে ,  নিজের  আপনজনেরাই

ওকে ভুলে যাচ্ছে। এতোই সহজ শ্যামলীকে সরিয়ে ফেলা?মানুষ ভালোবেসে অপরের কাছে নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তোলে, আর শ্যামলী কি করেছে? নিজেকে ওদের কাছে অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে? ওদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? শ্যামলীর নিজেকে নিঃস্ব, রিক্ত, ক্লান্ত, পরাজিত বলে মনে হচ্ছিল।

  সেদিন শ্যামলী খুব তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে এল। শাশুড়ি খুবই অবাক হয়ে গেলেন। শ্যামলী ফিরেই দুই কাপ চা বানিয়ে শাশুড়ির সামনে এক কাপ রেখে নিজেও চা খেল।

যে শাশুড়ির প্রতিটি কথায় শ্যামলী গায়ে জ্বালা ধরত, ফোস্কা পড়ত, তাকে আজ নিজের বড় আপনজন বলে মনে হল। মনে হল জিজ্ঞেস করে- ‘মা, আমি চলে গেলে আপনি কার সম্বন্ধে ছেলের কাছে অভিযোগ জানাবেন?’ কিন্তু, কিছু না বলে চুপ করে চায়ে চুমুক দিল।

শাশুড়ি যেন কিছু বুঝতে পেরেছেন, চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কিছু হয়েছে বৌমা? তোমার কি শরীর খারাপ?”

আজ শাশুড়ির প্রশ্ন যেন এক বন্ধুর মত শোনাল। শ্যামলী জবাব দিল, “না মা, কিছু হয় নি। চলুন আজ বিকেলে আমরা শপিং করতে যাই।”

শাশুড়ি আরও অবাক হলেন, যার কদিন পরে ডিভোর্স হবে, যে কদিন পরে চলে যাবে, যাকে নিয়ে শাশুড়ির মন খারাপ, সে বলছে শপিং করার কথা।

শ্যামলী জানে শাশুড়ির বয়স হলেও শপিং করতে খুব ভালোবাসেন। সংসারের টুকিটাকি জিনিস, নাতির জন্যে খেলনা ইত্যাদি দরকারি-অদরকারি জিনিস কিনতে খুব ভালোবাসেন।

বিকাশ অফিস থেকে ফিরে শ্যামলীকে সুকুর সঙ্গে বসে পড়াতে দেখে খুবই অবাক হলেও কিছু বলল না।

পরের দিন শ্যামলী সারাদিন ঘরে থাকল। সংসারের নানান ছোটখাট কাজ শাশুড়ির সঙ্গে মিলে মিশে করল। শাশুড়ি কোন অপ্রীতিকর প্রশ্নই করলেন না। সুকুকে স্কুলে পৌঁছে দিল, সময় মত নিয়ে এল স্কুল থেকে। সুকুও মা’কে পেয়ে খুব খুশি, লাফাতে লাফাতে স্কুল থেকে ফিরল।

বিকাশ কয়েকদিন ধরে শ্যামলীর এই পরিবর্তন লক্ষ্য করছিল, কিন্তু কিছু বলছিল না। শেষে আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “শ্যামলী তোমার কি হয়েছে?”

শ্যামলী বলল, “কিছু না।”

বিকাশ বলল, “মনে আছে তো সামনের মাসে উকিলের কাছে যেতে হবে। কেস ফাইল করতে হবে।”

“হ্যাঁ মনে আছে।” শ্যামলী জবাব দিল।

কিছুক্ষণ উভয়পক্ষের নীরবতা, শ্যামলী বলে উঠল, “আচ্ছা, ডিভোর্সের পরে তুমি আবার বিয়ে করবে নাকি? মানে এই সংসারে আমার জায়গা অন্য কেউ নেবে? সুকু অন্য কাউকে মা বলে ডাকবে?”

তেতো মুখে বিকাশ জবাব দিল, “জানি না।”

“ডিভোর্সটা কি জরুরি? আমি যদি স্কুলে চাকরি করি, বাড়ীতে সুকুকে সময় দি?” শ্যামলী জানতে চাইল।

বিকাশ অসম্ভব অবাক হয়ে শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি করবে স্কুলে চাকরি? তুমি না স্কুলের চাকরি ঘৃণা কর? তাছাড়া তোমার সিঁড়ি ভাঙ্গা চাকরি তুমি এতো সহজে ছেড়ে দেবে?” নিতান্তই ব্যাঙ্গের সুরে বিকাশ বলল।

শ্যামলী মাথা নাড়ল, বলল, “সিঁড়ি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে সাপের মুখেও পড়তে হয়, বিকাশ, তখন আবার শুরু থেকে শুরু করতে হয়। আমি ঐ চাকরি ছেড়ে দিয়েছি।”

“কেন?” বিকাশ অবাক সুরে জানতে চাইল। ওর কৌতূহল যেন বাঁধ মানছিল না।

শ্যামলী মাথা নেড়ে বলল, “এমনিই। থাক না অফিসের কথা।”

আবার নীরবতা, শ্যামলীর চোখে জল দেখে বিকাশ নীরবতা ভাঙ্গল, জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে?”

“আমি তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারবো না। তোমাদের আমি হারাতে চাই না।” কান্না মেশানো গলায় শ্যামলী জবাব দিল। আবার বলল, “তোমরা কি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে?”

জেদি, আত্মবিশ্বাসী, অহংকারী শ্যামলীর এইভাবে ভেঙ্গে পড়া দেখে বিকাশের মনে পড়ে গেল প্রথম দিকের সদ্য পরিচিত শ্যামলীর কথা, যাকে প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গেছিল বিকাশ, যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। সত্যি বিকাশেরও কষ্ট হবে শ্যামলীকে ছেড়ে থাকতে।

এতোদিনে সংসারের চড়াই উৎরাই পার হতে গিয়ে দুজনেই যেন ভুলে গিয়েছিল নিজেদের রঙ্গিন প্রেমের দিনগুলোর কথা। আজ যেন এক দমকা হাওয়ায় দুজনেরই মনে পড়ে গেল সেই দিনগুলোর কথা।

  এতোদিন দুজনেই যেন অহংবোধের দূর্গের ঘেরাটোপে নিজেদের বন্দী রেখেছিল। দুজনেই যেন চাইছিল সেই অহংবোধের দূর্গ থেকে কেউ একজন আগে বেড়িয়ে এসে সন্ধির হাত বাড়াক। শেষ পর্যন্ত শ্যামলীই সেই অহংবোধের চাদর সরিয়ে সন্ধির হাত বাড়াল।

শ্যামলী অনন্যার স্কুলে যোগ দিয়েছে। অনন্যা স্কুল খুলেছিল বাবার নামে, সেই স্কুল এখন অনেক বড় হয়েছে। অনন্যার স্কুলে সুকুও পড়ে। এখন মা আর ছেলে এক সঙ্গে স্কুলে যায় আর ফিরে আসে।  

ছোটবেলা লাভ ক্ষতির অঙ্কে ভুল হলে শিক্ষকেরা লাল কালির দাগ দিয়ে অংক শুদ্ধ করে দিতেন। আজ যেন জীবনের খাতায় লাভ ক্ষতির অঙ্কের হিসাব জীবনরূপী শিক্ষক শুদ্ধ করে দিলেন। অঙ্কে শূন্য পেতে পেতে পাইয়ে দিলেন একশোয় একশো। সেই মহান শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধায় শ্যামলীর মাথা নিজের অজান্তেই নত হয়ে যায়।

চিল অথবা বাজপাখিও তো আকাশে অনেক উঁচুতে ওড়ে। এতো উঁচুতে ওড়ে যে আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। নিজেকে অনেকটা ভগবানের কাছাকাছি মনে করে, কিন্তু ক্লান্ত ডানায় যখন সোনালী রোদ্রের গন্ধ মুছে যায়, ঠিক তক্ষুনি তাকে এই পৃথিবীর বুকে খড়কুটো দিয়ে বানানো নীড়ে ফিরতে হয়। সেখানেই তার প্রকৃত শান্তি, তার প্রকৃত বিশ্রাম, তার সন্তানদের বেড়ে ওঠা।

এ অনুভুতির

পরিমাপ কত

মিজানুর রহমান মিজান

      বিশ্বনাথ, সিলেট

রায়হান অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। এস. এস. সি নিয়মিত কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে পাশ করলে ও পরবর্তীতে আর নিয়মিত হওয়া সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। অর্থ্যাৎ দিবাভাগে চাকুরী এবং নৈশ বিভাগে কলেজে পাঠ এ তার নিয়মতান্ত্রিকতা হয়ে দাড়ায়। এভাবে একদিন এইচ. এস. সি পাশ করে। পূর্বের দু’বৎসর এগার মাইল দুরবর্তী শহরের কলেজে যাতায়াতের মাধ্যমে উভয়কুল সঞ্চালিত হত। কিন্তু এইচ. এস.সি পাশের পর পল্লীর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী গ্রহণের ফলে যাতায়াতের পরিশ্রমটুকু হয় বন্ধ। এটাই বা কম কিসে?

   রীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে পাঁচ দিন অতিবাহিত হলে ও রায়হান কলেজে যাওয়া থেকে বিরত। ফলাফল জানার আগ্রহ যেন একেবারেই নেই। উদাসী মনোভাব দর্শনে অনুভুত হয় সে যেন পরিক্ষা দেয়নি। এ উদাসী ভাব যে কারো আসা স্বাভাবিক বলে বিবেচ্য অতি সহজে। অনেকের ক্ষেত্রে কল্পনাতীত ব্যাপার হয়েই থাকবে চিরদিন, চিরকাল। বাস্তব হিসেবে গণ্য করতে সময় ও মেধা ব্যয়িত হবে অনেক। তাহলে বিষয়টি পরিস্কার করা যাক এক্ষণে।

      রায়হান অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। এস. এস. সি নিয়মিত কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে পাশ করলে ও পরবর্তীতে আর নিয়মিত হওয়া সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। অর্থ্যাৎ দিবাভাগে চাকুরী এবং নৈশ বিভাগে কলেজে পাঠ এ তার নিয়মতান্ত্রিকতা হয়ে দাড়ায়। এভাবে একদিন এইচ. এস. সি পাশ করে। পূর্বের দু’বৎসর এগার মাইল দুরবর্তী শহরের কলেজে যাতায়াতের মাধ্যমে উভয়কুল সঞ্চালিত হত। কিন্তু এইচ. এস.সি পাশের পর পল্লীর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী গ্রহণের ফলে যাতায়াতের পরিশ্রমটুকু হয় বন্ধ। এটাই বা কম কিসে? অন পক্ষে অর্থনৈতিক দৈন্যতার কবলে জর্জরিত আপাদমস্তক রায়হানদের। সুতরাং এ চাকুরী অনেক অনেক প্রশান্তির ছোঁয়া সমৃদ্ধি ঘটে রায়হানের ক্ষেত্রে।

      লেখাপড়ার প্রতি তীব্র আকর্ষণবোধ রায়হানের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা চেতনায় সর্বক্ষণ। তা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধকতা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আছে জড়িয়ে ভালবাসায়। ভর্তির টাকাটা এক জনের নিকট থেকে ধার হিসেবে প্রাপ্তিতে মনের আকাঙ্খা এ মুহুর্তে পূর্ণতা পায়। ডিগ্রি প্রথম বর্ষে পনের দিন অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে ক্লাস করে। অত:পর দারিদ্রতার কষাঘাত আঘাত হানে সাইক্লোনের ভয়াবহতায়। হৃদয় বন্দরে ছুটির ঘণ্টা ধবনি তোলে তরঙ্গায়িত হিল্লোলে। 

      একটি রাত্রের আরাধনা মহান প্রভুর দরবারে রায়হানের ”আমার পড়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে, আমি পরাজিত জীবন যুদ্ধের এক সৈনিক, ধৈর্য ও সহনশীলতায় যাব এগিয়ে এ মোর আর্তি, আক্ষেপ”।

     শহরে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। চাকুরী নিয়ে ব্যতিব্যস্ত- জীবন যাপন এবং সঙ্গে টুকটাক ব্যবসা করে পরিচালনা পরিবার পরিজনের একমাত্র পুত্র সন্তান হবার সুবাদে। দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ তাড়া করে অহরহ এ পরিবারের একমাত্র অবলম্বন ভেবে। দিন যায়, মাস যায়, আসে বছর ঘুরে। রায়হান এক প্রকার সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছে লেখাপড়ার কথা। প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হবার পরিক্ষা অনুষ্টিত হয় যথা নিয়মে। রায়হান থেকে যায় তা থেকে অনেক দুরের বাসিন্দা হয়ে। আবারো দিনে দিনে মাস , বছর শেষে আসে ঘুরে নির্বাচনী পরীক্ষা। এ পরিক্ষার মাত্র পনের দিন পূর্বে এক বন্ধুর সাথে জরুরী প্রয়োজনে সাক্ষাৎ প্রার্থী রূপে যেতে হয় কলেজ প্রাঙ্গনে। কিছুক্ষণ করে অবস্থান। রায়হানের মনের বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ে ধীরে ধীরে লেখাপড়ার ধ্যান-ধারণা। মনটা আনচান করে সঙ্গী সাথীরা পরীক্ষা দেবে, পাশ করবে, উন্নত জীবন যাপনসহ জ্ঞানের পরিধি হবে বিস্তৃত। আসবে অনেক অনেক ......।

     এ ধারণাবোধ থেকেই পরিক্ষায় অংশ গ্রহণের পন্থা অবলম্বনে নেমে পড়ে। আসে না বাড়িতে থেকে যায় শহরে। সন্ধ্যার পর বয়োজৈষ্ট পরিচিত এ ব্যক্তিকে নিয়ে চলে যায় অধ্যক্ষের বাস ভবনে। রায়হানের পরীক্ষা দেবার দৃঢ় মনোবল, ইচ্ছা, প্রত্যয়ের কথা শুনে অধ্যক্ষ মহোদয় হতবাক। কারণ ডিগ্রি পরিক্ষা, ক্লাসে উপস্থিতি বিহীন, বেতন দু’বৎসরের বাকি, বার্ষিক মান্নোয়ন পরিক্ষা ব্যতীত দ্বিতীয় বর্ষে কিভাবে উত্তীর্ণ ইত্যাদি চিন্তায় বিভোর হন অধ্যক্ষ সাহেব। সর্বোপরি কোন বই ক্রয় করে ও রায়হানের হাতে রক্ষিত নয়।

অধ্যক্ষ সাহেব ছাত্র হিসেবে রায়হানকে মেধাবী জ্ঞাত হলে ও সুন্দর একটি উপমার মাধ্যমে না সুচক সম্মতি প্রদান করেন। উপমাটি হচ্ছে - রায়হান তুমি সাগরের ওপারে যেতে চাও বা প্রয়োজন। কিন্তু তোমার হাতে কোন বৈঠা নেই, মাঝি নেই, আছে শুধু নৌকা। এমতাবস্থায় সাগর পাড়ি দেয়া কি সম্ভব? প্রতি উত্তরে রায়হান গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতায় জানায় স্যার, তা সম্ভব নয় জানি। কিন্তু আমার একান্ত ইচছা পরিক্ষা দেয়া। এক্ষেত্রে আমার এক মাত্র সম্বল, সম্পদ আপনার মত শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক মহোদয়ের দোয়া। আপনার দোয়াই আমার পরম ও চরম অতুলনীয় সম্পদ পরীক্ষা নামক ক্ষেত্রে। স্যার একটু গভীর চিন্তায় হন নিমগ্ন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে জানান নির্বাচনী পরিক্ষায় অংশ গ্রহণের অনুমতি প্রদান করা হল। বাকি অংশ পরবর্তীতে বিবেচ্য। অধ্যক্ষের সম্মতি পেয়ে রায়হানের আনন্দ যেন উপচে পড়ে। এ আনন্দের প্রকাশ সম্ভব নয়। শুধু অনুভুতিতে ধারণা করা যায়। রায়হান সব কিছু ভুলে যায়। এখন একটিই ধ্যান-ধারণা লেখাপড়া। শুরু করে বন্ধু ও পরিচিত জনদের নিকট থেকে বই সংগ্রহ। একেকটি বই দু’তিন দিন রেখে দিয়ে আসে ফিরিয়ে। এভাবেই পাঠ গ্রহণ চলে রায়হানের। পাঁচ বিষয়ের নির্বাচনী পরিক্ষায় চার বিষয়ে পরিক্ষা দেয়। একটি বিষয়ের বই সংগ্রহার্থে অক্ষমতাহেতু সে বিষয়ে পরিক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি। ফলাফল প্রকাশিত হলে অধ্যক্ষ মহোদয় চার বিষয়ের নম্বর দেখে চুডান- পরিক্ষায় অংশ গ্রহণের সুযোগ প্রদান করেন স্বত:স্ফুর্ত ভাবে এবং সঙ্গে থাকে তিনির দোয়া।

           রায়হান যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সেখানে তারই এক সহপাঠি ও কর্মরত। সহপাঠি নিয়মিত ক্লাস এবং কোচিং করেছেন। তাছাড়া পরিক্ষার নিমিত্তে দু’মাসের ছুটি ও নেন। কিন্তু রায়হান যে ক’দিন পরিক্ষা সে ক’দিনের অর্থ্যৎ দশ দিনের ছুটি নেয়। পরীক্ষা হয় সমাপ্ত।

        ফলাফল প্রকাশের তারিখ জ্ঞাত হলে ও রায়হান সন্দিহান হয়ে দেখতে বা জানতে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, এ ভেবে যদি ফলাফল মন্দ হয়। পাঁচ দিন অতিক্রান্তে- ঘনিষ্ট বন্ধুর পীড়াপীড়িতে সন্ধ্যার পর চলে যায় কলেজে। লোক চক্ষুর অন্তরালে। সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রথমেই পেয়ে যায় পূর্বে অধ্যক্ষের সহিত যে শিক্ষক সহায়তা করেছিলেন তিনিকে। রায়হানকে দেখে ঐ শিক্ষক উদগ্রীব হয়ে পড়েন ফলাফল জানার প্রত্যাশায়। তিনি নিজে গিয়ে ফলাফল দেখে রায়হানকে জানান শুভ সংবাদ। রায়হান কৃতজ্ঞতার অপূর্ব আবেশে সশ্রদ্ধ সালাম জানিয়ে চলে অধ্যক্ষের নিকট সুখবর পৌছাতে। অধ্যক্ষ মহোদয় সুসংবাদ বপেয়ে সস্নেহে মাথায় বুলিয়ে দেন হাত এবং প্রাণ খোলে করেন দোয়া প্রভুর দরবারে। রায়হান কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা হারিয়ে বাক শক্তি রহিত। তারপর অনুসন্ধান চালায় সহপাঠি সম্পর্কে জানার। সেখানে প্রাপ্তি সংযোগ ঘটে বিফলতার। এ পরিক্ষা পাশের অনুভুতি রায়হানের ক্ষেত্রে কি পরিমাণ তা কি পরিমাপ করা সম্ভব? অথবা রায়হানের ক্ষেত্রে ভূবনের শ্রেষ্টতম অর্জনের উৎকৃষ্ট অনুভুতি হয়ে রয়েছে চির জাগরুক, অম্লান ও অক্ষয়।

 

এই মেডেল

আমার মায়ের

 মোঃ শামিম মিয়া 

সাঘাটা,জেলা, গাইবান্ধা দেশ,বাংলাদেশ)

...এবার মায়ের হাতে সভাপতি মেডেলটা দিল মতিকে দেওয়ার জন্য। মতির হাতে তার মা মেডেল তুলে দিলো। টিওনো স্যারের পক্ষ থেকে অন্য শিক্ষকরা মতিকে দুই লক্ষ টাকা দিল। যাতে মতি পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে অনেক বড় হয়। অনুষ্ঠান শেষ করে মতি ও তার মা-বাবা সবাই চলে এল বাড়িতে। মতির ওই দুই লক্ষ টাকা দিয়ে বাবা একটা ব্যবসা শুরু করল। তাদের দিন এখন ভালো যাচ্ছে।

    ভীতি আর মতি আমদিরপাড়া গ্রামে থাকে। ওরা দেখতে ফুটন- গোলাপের মতো। ছোটবেলা থেকেই ওরা দুজন একসাথে খেলাধুলা করে আসছে। মতিরা ভীষণ গরীব। মতির প্রতি সবার ছিল অগাধ ভালোবাসা। কারণ মতি দেখতে শুনতে খুব ভালো ছিল। আর ভীতি তো ধনীর দুলালি। তার ভালোবাসার কোনো অভাব ছিল না। একদিন মতি আর ভীতি মাটির পুতুল দিয়ে বর-বউ খেলছিল। মতির বর আর ভীতির বউ। তারা দুজন ঠিক করল এর সাথে ওর বিয়ে দিবে। তাই করলো তারা। কিন' মতি ভীতিকে বলল, আমি তো গরীবের ছেলে। ভীতি তোর বাবা যদি শোনে তোর পুতুলের সাথে আমার পুতুলের বিয়ে হয়েছে তাহলে আমাকে মারবে না তো। ভীতি বললো ধুর পাগল বাবা জানবেই না। তাছাড়া বাবা তোকে কত আদর করে। মতি বললো তাহলে আরেকটা কথা আছে। ভীতি বললো কি কথা বল। মতি বলল- বউ তো বরের বাড়িতে থাকে তাই না। তো আমি বরের সাথে বউকে নিয়ে যাব। ভীতি বলল, ঠিক আছে নিয়ে যা। তবে আবদালি যেন দেখে না। নইলে কিন' বর বউ দুটোকেই নিয়ে যাবে। বুঝিস আবার। মতি বলল- না না আবদালি টেরই পাবে না। আমি কোথায় রাখবো। ভীতি বলল- তুই যদি পারিস তোর মার কাছে রাখিস। তাই তো এই কথা আমার মনেই ছিল না। আমি মায়ের কাছেই রাখবো। আমার মা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মা। ভীতি হ্যাঁ, তাই বলছি।

        কয়েকদিন পর ভীতি আর মতি গ্রামের এক প্রাইমারী স্কুল থেকে আসছে। হঠাৎ ভীতি বলল মতি আমার পুতুলটা কেমন আছেরে? মতি বললো ভালো আছে। ভীতি বললো কয়েকদিন পর আমি কিন' আমার পুতুলগুলো আমার বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে আসবো। মতি বললো ঠিক আছে তবে বেশি দিন রাখতে দেব না। চল আমাদের স্কুল আজ এক ঘণ্টা ছুটি দিয়েছে। আমরা তোদের বাড়ির পেছনে যে ঘরটা আছে সেখানে গিয়ে খেলবো। ভীতি রাজি হয়ে গেল। পরে তারা আসল ঘরের পেছনে। এসে মতি বললো কী খেলবি বলতো? ভীতি বললো- আমাদের চাচা ছমির আলী একটা মেশিনের ঘর দিয়েছে এখন সেখান থেকে পানি জমিতে দেয়। সেই রকম একটা মেশিন তুইও বানাবী। মতি বললো তারপর? ভীতি বললো- চাচী সেখানে চাচার জন্য থালায় গামছা দিয়ে খাবার নিয়ে যায়। আমিও তেমনি তোর জন্য চাচীর মতো খাবার নিয়ে যাব এমনি এমনি। মতি বললো তাহলে তাই করি চল। তারা যেন তার চাচা-চাচীর চাইতে ভালোভাবে ওই রকমই করলো। ভীতি অবশেষে তার ওড়না দিয়ে মতির মুখটা মুছে দিল। আর বললো তোর মা যদি দেখে তোর গায়ে বালি তাহলে তোকে বকা দিবে। সেইদিন ভীতির এক ফুফু এলো তার স্বামীর বাড়ি থেকে বেড়াতে। আজকেই চলে যাবে সে। তিনি কি যেন কাজে বাড়ির পেছনে এলো। এসে দেখলো ভীতি ওড়না দিয়ে মতির মুখটা মুছে দিচ্ছে। মতিকে তিনি বললেন, এই ছোট লোকের বাচ্চা। তোর এত বড় সাহস তুই ভীতির ওড়না দিয়ে মুখ মুছে নিচ্ছিস। ভীতি বললো ফুফু আমিই তো ওড়না দিয়ে ওর মুখ মুছে দিচ্ছি। আমার জন্যই মতির সুন্দর মুখে বালি লেগেছে। ফুফু বললো চল, তুই ওর সঙ্গে কেন খেলিস? তোর চাচাতো ভাই সানুর সাথে খেলতে পারিস না। মতি ভালো না। তোর সাথে মিল দিয়ে ঘরের কোনটা চুরি করবে। মতি মাথা নিচু করে সব শুনছে। ফুফু মতিকে বললো এখনো দাঁড়িয়ে আছিস যা এখান থেকে। মতি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো ওদের বাড়ি। মতিকে ভীতি অনেক বার ডাকলো তুই যাসনে। মতি ঘুরেও তাকালো না ভীতির দিকে। মতির মা মতির এই অবস'া দেখে দৌড়ে এলো। এসে মতিকে বুকে নিয়ে বলছে বাবা তোর এই অবস'া হলো কী করে? মতি কেঁদে বললো সব। মতির মা বললো বাবারে তুই কেন ভীতিদের ওখানে যাস? ওরা ধনী। তোকে তো দেখতে পারবে না তারা। তুই আজকে থেকে ভীতিকে আমাদের বাড়ি আসতে বলবি এবং আমার ঘরের সামনে খেলবি। মতি মার মুখে একটা চুমু দিয়ে বললো আসলেই তুমি আমার ভালো মা। মতিকে মা বুকের মধ্যে নিয়ে বললো বাবারে তুই আমার অনেক কষ্টের সন-ান। তোকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। তুই একদিন অনেক বড় হবি। তখন আমার কোনো দুঃখ থাকবে না বাবা। মতি মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মা চোখ মুছে বললো যা বাবা হাত মুখ ধুয়ে আয় খাবি। মতি বললো মা তুমি আবার অন্যের বাড়িতে গিয়েছিলে কাজ করতে তাই না? মতির মা বললো বাবা কি আর করি বল। তোর বাবা অনেকদিন ধরে ঢাকা চলে গেছে। আজ পর্যন- একটা টাকাও পাঠালো না। ঘরে যা চাল ছিল তা তো দুই দিন আগেই শেষ। তাছাড়া বাবা কোনো ক্ষতি হবে না। যা তাড়াতাড়ি আয়। মতির চোখ পানিতে ছলছল করছে। আর মনে মনে বলছে আল্লাহ গো তুমি আমারে তাড়াতাড়ি বড় করে দাও। আমি আর আমার মায়ের দুঃখ সহ্য করতে পারছি না। মতি খাবারের জন্য এলো। এসে বললো মা ভাত দাও। মা ভাত এনে মতির সামনে দিয়ে পাতিলটা ঢেকে রাখলো। মতি তার মাকে বললো মা তুমি খেয়েছো? মা বললো, খেয়েছি বাবা তুই খা। মতি বললো আমি সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি তুমি আমাকে না খাওয়ায়ে খাও না। আজ আগেই খেয়েছো? মা বললো, বাবারে আমি খাবো একটু পরে। তাছাড়া পাতিলে তো ভাত আছে। পরে খেয়ে নেবো। মতি মনে মনে বললো, পাতিলটাতো দেখতে হয়। কিন' কিভাবে দেখবে? তাই সে পানির জগটা ফেলে দিলো মাটিতে। পরে মাকে বললো, পানি আনো তো পানি খাব। মা পানি আনতে গেলে মতি পাতিল দেখলো। পাতিলে কোনো ভাত নেই। মনে হয় দুই দিন ধরে পাতিলে ভাত রান্নাই হয় না। মতির মাথার মধ্যে যেন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো। মা ঘরে আসার সাথেই মতি মায়ের পায়ের উপর পড়ে গেলো আর কাঁদতে লাগলো। মা বললো আরে পাগল কী হয়েছে? মতি বললো মাগো তুমি দুই দিন ধরে কিছু খাও না। আমাকে খেতে দাও কেন? আমি ভাত খাব না। মা বললো আরে বাবা আমি তো খেলাম সকালে। মতি বললো না মা তুমি খাওনি। ওই ভাত রেখেছো অন্য ভাবে যাতে আমি বুঝতে না পারি। তাই না? তুমি খাও এখন। আমি কাল ভাত খাবো। মা বললো চল আমিও খাব, তুইও খাবি। মতির মা মতির চোখ মুছে দিলো আর বললো তুই আমার লক্ষ্মি ছেলে। মতি বললো তুমি আমার এ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সেরা মা। তোমার তুলনা হয় না। মা ছেলে দুজনেই ভাত খেলো। সেইদিন বিকালে ভীতি এলো মতিদের বাড়ি। এসে দেখলো মতি পড়তে বসেছে। ভীতি বললো মতি তুই আজ আমাদের বাড়িতে গেলি না কেন? মতি বললো আর কিছুদিন পর আমাদের পরীক্ষা তাই একটু পড়ছিলাম। ভীতি বললো তুই কি রাগ করেছিস আমার ফুফুর কথায়। মতি বললো নারে। তাছাড়া তিনি তো ঠিকই বলেছেন। ভীতি বললো কচু বলেছে। শোন একটা খুশির খবর আছে। মতি বললো কি খুশির খবর বল। ভীতি বললো আমার আগামী মাসের ২০তারিখে জন্ম দিন। মতি বললো তাই নাকি ভালো তো। তবে জানিস, মা বলেছিলো আমরাও নাকি এই  মাসে জন্ম। তবে তোদের মতো যদি আমাদের টাকা পয়সা থাকত তাহলে হয়ত ভালো করে তোর মতো জন্মদিন আমারও পালন করতো আমার বাবা-মা। ভীতি বলল, মন খারাপের কোনো কারণ নেই। আমি সর্বপ্রথম তোকে দাওয়াত দিয়ে গেলাম। তুই যাবি। আগামী শুক্রবারে কিন'। আর আগামীকাল তুই আমাদের বাড়িতে যাবি ফুফু চলে গেছে। তাছাড়া আমি বাবাকে সব বলবো। আজ তাহলে আসি। মতি মাথা নাড়িয়ে বললো ঠিক আছে।

      আজ শুক্রবার ভীতির জন্মদিন তাই তাদের বাড়িটা সাজাইয়াছে অনেক সুন্দর করে। ভেতরে ঢুকতে হলে গেইট পাস লাগে। মতিকে তো ভীতি গেইট পাস দেইনি। সেখানে কোনো গরিবের দাওয়াত নেই। গ্রামের অনেক এতিম অনাদ শিশুরা গেইট সোজা দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো অনুষ্ঠান শেষে কিছু খেতে দিবে সেই আশায়। মতিও ভীতিকে এক নজর দেখার জন্য গেইটে দাঁড়িয়ে রইলো। মতির গায়ে তেমন ভালো কোনো শার্ট নেই। ছেড়া একটা শার্ট পরে মতি এসেছে। শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখাও যাচ্ছে। আসলে ভীতি জানেনা ভেতরে ঢুকতে গেইট পাস লাগবে। তাই সে মতিকে বারবার ডাকছে ভেতর থেকে। কেউ যেন বুঝলো না  মতির দুঃখ। মতি বাহিরে অনাথ এতিমদের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলো। ভীতি এখন কেক কাটলো। কেক কেটে প্রথম অংশটুকু হাতে নিল। নিয়ে রাখলো তার কাছে। ভীতির মা টের পেল ভীতি কেক রেখেছে। অনুষ্ঠান শেষে কিছু খাবার বাঁচলো। তা এতিম অনাথদের দিচ্ছে। ভীতি তখন মতির খোঁজে বাহিরে এলো। এসে দেখলো তার বাবাই খাবার দিচ্ছে। মতি বসেছে সব শেষে। মতির কাছে গিয়ে খাবারগুলো শেষ হয়ে গেল। ভীতি শুধু দেখছে কিন' করার কিছু নেই। মতি খাবারও পেল না। ক্ষুধা নিয়েই বাড়িতে গেল। মা মতিকে দেখেই বুঝতে পারল। মা মতিকে বললো বাবা আমি জানি কী হয়েছে তোর। মতি মায়ের বুকে মাথা রেখে বললো, মা তুমি আমাকে মাফ করে দাও। তুমি যেতে মানা করেছিলে। তারপর ও আমি গিয়েছিলাম।

    শুক্রবার রাত দশটার দিকে ভীতি ও তাদের বাড়ির কাজের মেয়ে আতিয়া এসেছে ভাত নিয়ে মতির কাছে। মতি তো ঘুম। মতির মা ওঠে দরজা খুলে দিল। ভীতি বললো চাচী এগুলো নেন এবং মতিকে ডাক দেন। মতির মা বললো, মা ভীতি ও যদি না নেয়। ভীতি বললো চাচী, আমি জানি এবং আতিয়া আমাকে বলেছে আপনি আজ রান্না করেননি। মতি না খেয়ে ঘুমিয়েছে। তাছাড়া মতি আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল। সেখানেও তো খাওয়া পাইনি। আসলে আমি জানতাম না যে, গেইট পাস ছাড়া ভেতরে ঢুকতে দিবে না। মা বললেন ঠিক আছে। আমি মতিকে পরে খাওয়াবো। তুমি যাও অনেক রাত হয়েছে। ভীতি মনে মনে বললো, কেকটা চাচীকেই দিয়ে যাই। তাই দিলো। দিয়ে চলে গেল ভীতি। ভীতি যাচ্ছে আর আতিয়াকে বলছে, এই কথা যেন কেউ না জানে। আমি তোমাকে টাকা দিব। তুমি শুধু দেখবে মতিদের কোনো দিন ভাত রান্না ছাড়া থাকে কিনা? আতিয়া বললো ঠিক আছে। সকালে মতি ওসব খেলো এবং স্কুলে গেল। সেখানে ভীতির সাথে দেখা মতির। মতির কাছে ভীতি বললো, মাফ চাই। আমাকে মাফ করে দিও। মতি ভীতির হাত ধরে বললো ঠিক আছে। চল বাড়ি যাই, স্কুল ছুটি। তারা আসতেই গ্রামের এক বয়স্ক লোক একটু জোরেই বলছে, মতির সাথে ভীতির একদম মিলে গেছে। যদি মতিরা একটু স্বচ্ছলতা থাকতো তাহলে হয় তো ধনী গরীব বোঝাই যেত না।

     ওরা এবার বৃত্তি পরীক্ষা দিবে। এরমধ্যে ওরা অনেকবার পুতুল নিয়ে আসা-যাওয়া করছে। মতি ভীতি এবার বৃত্তি পরীক্ষা দেবে একসাথে। তবে মতি পরিক্ষার ফি পাবে কোথায়? আর  মাত্র দুইদিন বাকি আছে। এরমধ্যে পরিক্ষা ফির টাকা জমা দিতে হবে। পরিক্ষার ফি মাত্র একশত টাকা। মতিদের কাছে এই একশত টাকা মানেই দশ হাজার টাকার মতো। মতি সেদিন ওর মাকে পরিক্ষার ফিসের কথা বললো। মা শুনে চোখের পানি ফেলেছেন। কোথায় পাই

পরিক্ষার টাকা। মা কিছুক্ষণ পর বললো, বাবা তুই চিন-া করিস না। আমি টাকার ব্যবস'া করছি। মতি বুঝতে পারলো মার কাছে টাকা নাই। মা কোথায় পাবে। আবার ভাবছে আমি পরিক্ষাই দিব না। দুপুরবেলা আযান দিয়েছে। মা নামায পড়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে মোনাজাত করে বলে, আল্লাহ গো, তুমি তো রহমানের রাহিম; তুমি এর একটা ব্যবস'া করে দাও। মতি আমার অনেক কষ্টের ধন। আল্লাহ তায়ালা যেন তার মোনাজাত কবুল করে নেন। মোনাজাত শেষ হতেই মার মনে হলো তিনি আজ থেকে তিন বছর আগে একটা মাটির ব্যাংক কিনেছিলেন। সেটাতে তিনি টাকা রেখেছেন কিনা সেটা মনে করতে পারছেন না। তবুও মা খুঁজতে লাগলেন মাটির সেই ব্যাংকটি। অবশেষে পেয়েও যায়। মা আর মতি দুজনে মিলে আল্লাহর নাম নিয়ে ব্যাংকটা ভাঙলো। ব্যাংকের মধ্যে ছিলো একশত পঞ্চাশ টাকা। মা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, আল্লাহ তুমি সত্যিই মহান। মতির পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস'া হয়ে গেল। আগামী বুধবার মতির পরীক্ষা শুরু। ভীতিও প্রস'ত পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। মতির কলম কেনারও আর কোনো সমস্যা হলো না। মতির বাবা মঙ্গলবারে এসেছে ঢাকা থেকে। মতির বাবা একজন পেশাদার জুয়া খেলোয়ার। মতি তার বাবাকে পছন্দ করে না। বাবা মতিকে একটি টাকাও দেয় না। মতির পড়ার খরচের সম্পূর্ণ টাকা তার মা দেয়। বাবা বলে মতির পড়াশোনা কিছুই হবে না। আমি টাকা দিতে পারব না। অথচ তার বাবা হাজার হাজার টাকা খরচ করে জুয়াতে। মা সেদিন বাবাকে বলেছিল মতির পরীক্ষা এই উপলক্ষে না হয় গাড়ি ভাড়ার টাকাটা দাও। তাও দিল না। মা বলল, মতির বাবা তুমি কত কষ্ট করে টাকা রোজগার কর। অথচ সেই টাকা জুয়া খেলে শেষ করে আস। আমাদের ছেলে মতি বড় হচ্ছে ওর কি কোন ভবিষ্যৎ আছে? আমরা যদি ওর ভবিষ্যৎ গড়ে না দেই তাহলে কী হবে বুঝতে পারছো? মতি ভালো ছাত্র। এক থেকে কোনো দিন দুই এ যায়নি। যদি ওকে পড়াশোনা করাই তাহলে মতি একদিন অনেক বড় হবে। বাবা যেন এক কান দিয়ে শুনছে আরেক কান দিয়ে বের করে দিচ্ছে। কোনো কাজ হলো না। মা চলে গেলো বাহিরে। কিছুক্ষন পর মা ঘরে এলে বাবা বললো ভাত দাও। ভাত খাবো। মা বললো, ঘরে দুইদিন ধরে কোনো চাউল নেই। আমি মণ্ডলের বাড়িতে কাজ করে এনে মতিকে খাওয়ালাম। তুমি তো গিয়েছো জুয়া খেলতে, সেখানে ভাত পাওনি। এই কথা শুনে বাবা মতির মার গালে একটা চড় মারলো। মা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে অন্য ঘরে চলে গেলো। মতি স্কুলে গেছে। স্যার আজ পরীক্ষা নিল। তাই আসতে দেরি হলো। ভীতির সাথে মতি এলো আগের মতোই। মতি এসেই মা মা বলে ডাক শুরু করলো। মার চোখে পানি তাই মা ঘরের মধ্যেই চোখ মুছে বাহিরে এলো। মা ভাঙ্গা গলায় বললো আয় বাবা। মতি বুঝতে পারলো কোনো কিছু হয়েছে। ঘরে গিয়ে মতি মাকে বললো বাবা বুঝি আজও তোমাকে মেরেছে। মার চোখ ছলছল করছে। মতি বললো দেখো মা, বাবা একদিন ভালো হয়ে যাবে। মা ভাত দাও বড্ড ক্ষিদে লেগেছে। মার চোখে আবারও পানি। মা বললো বাবারে আমি তো কারো বাড়িতে কাজ করতে যাইনি। তুই পড়তে বস, আমি দেখি কোথাও খাবার পাই কিনা। মতি বললো মা আসলে আমার কোনো ক্ষিদে নেই। খাবো পানি আর হঠাৎ করে ভাতের নাম মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলো। মা বললো আমি তো মা আমি বুঝি তোর কী হয়েছে? যা বাবা আজ আর খেলতে যাস না পড়তে বসিস। মতি মাথা নাড়িয়ে বললো ঠিক আছে মা। আমি আজ খেলতে যাব না। এদিকে মন্টু, ঝন্টু, আবদালী আর ভীতি এসেছে মতির কাছে। এসে বললো আয় মতি খেলবি। মতি বললো না না আমি আজ আর খেলতে যাবো না ভাই, তোরা যা। যদি পারিস পরীক্ষার কয়টা দিন ভালো করে পড়। আবদালী বললো- মতি, তোর মা তো এইট পাস। তিনি কি জানেন না? না খেললে মন ভালো থাকে না, পড়াতে মন বসে না। মতি বললো অবদালী তোর কথা শেষ। আবদালী বললো, হ্যাঁ আমার কথা শেষ। মতি বললো তাহলে শোন আমার মা আমার শিক্ষাগুরু। মার কাছ থেকেই আমি এইসব পড়া শিখেছি আর তুই বলছিস মা কিছুই জানে না। মা সব জানে আর জানে বলেই আমাকে পড়তে বললো। তাছাড়া মা তো এর আগে আমাকে খেলতে মানা করেনি। মা বলেছে পড়ার সময় পড়া আর খেলার সময় খেলা। এখন তোরা যা। রাতেও মা খাবার জোগাড় করতে পারলো না। মতি ক্ষুধার জ্বালায় আর পড়তে পারছে না। মা পাগলের মতো হয়ে গেলো খাবার কোথায় পাবে। আতিয়া খবর দিয়েছে ভীতিকে। মতিদের আজ খাবারের কোনো ব্যবস'া নেই। দুপুর থেকে না খেয়ে আছে। ভীতি চুরি করে ভাত আনলো মতির জন্য। মতি ভীতিকে দেখেই বললো ভীতি আয় তাড়াতাড়ি ক্ষিদে লেগেছে আমার। মা ভীতিকে দরজা খুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন সেখানে। ভীতি মতির তাড়াহুড়া দেখে অবাক হয়ে গেলো এতো ক্ষিদে লেগেছে মতির। মতির সামনে থালায় ভাত তরকারী হাত দিয়ে মাখছে মতি। এখন মুখে দিবে। ওমনি মনে হলো মা তো এখনো খায়নি। মতি ডাকছে ওমা, মাগো তুমিও আস খাবে। মা বললো বাবা তুই খা। তোর বাবা তো এখনো আসেনি। তাছাড়া তোর বাবাও তো খায়নি। মতি বললো সে নিশ্চয় কোথাও খেয়েছে। তুমি আস তো। অবশেষে মতি মার হাত ধরে ভাত খাওয়ালো। খাওয়া শেষ হলে মতি বললো, ভীতি আল্লাহ যেন তোর ভালো করে। ভীতি বললো নেকামি করতে হবে না। মতির মাকে ভীতি বললো আজ আসি চাচী। মতির মা ভীতির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললো ঠিক আছে মা।

সকালে মা ফযরের সময় ওঠে নামায পড়ে কিছুক্ষণ কোরআন তিলাওয়াত করলেন। পরে মন্টুর মায়ের কাছ থেকে এককেজি চাউল এনে রান্না করলো। মতি আজ পরীক্ষা দিতে যাবে। খাওয়া-দাওয়া করে মতি তৈরি হলো পরীক্ষা দিতে যাওয়ার জন্য কিন' বাবাকে তো বলতে হবে। মতি মাকে বললো বাবা কোথায়? বাবাকে তো বলতে হবে। মতির মা বললো মণ্ডলের বাগানে জুয়া খেলছে। মতি সেখানে গেল এবং বললো বাবা আজ আমি বৃত্তি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি আমার জন্য দোয়া করবেন। মতির বাবা বললো ঠিক আছে যাও এখন। মতি মন ভার করে চলে গেলো পরীক্ষা দিতে। বাবার সাথে যারা জুয়া খেলতে বসেছে তাদের মধ্যে একজন বললো তুই এটা কি করলি এতো সুন্দর ছেলে তোর আর তুই তাকে একটা টাকাও দিলি না। তুই কেমন রে। তোর মনে কি একটু দয়া নেই। মতির বাবা শুধু শুনছে। আরেকজন বললো আমি শুনেছি মতি নাকি ভালো ছাত্র। কোনো দিন দুই করেনি। তুইও তো মানুষ হতে পারিস নি। তোর ছেলেটাকেও মানুষ হতে দিলিনা। তুই কেমন পিতারে। মতির বাবার মাথার মধ্যে যেন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। আমি তো সত্যি ভুল করছি। না আজ থেকে আমি আর জুয়া খেলবো না। বাড়িতে আসতেই একটা সিএনজি এর সাথে ধাক্কা খেলো মতির বাবা। অজ্ঞান হয়ে গেল মতির বাবা। তাকে গ্রামবাসি ধরাধরি করে তার বাড়িতে আনলো। মা দেখেই তো কাঁদতে শুরু করলেন। পরে আশেপাশের মুরব্বীরা বললেন মতির মা কেঁদে কোনো লাভ হবে না। যদি পার ডাক্তার দেখাও। মতির মা তার গহনা বিক্রি করে ডাক্তার আনলো। মতি পরিক্ষা দিচ্ছে। দেওয়া শেষ প্রথম পরিক্ষা। মতি সবার আগে পরিক্ষার খাতা দিয়ে বের হলো। টিওনো স্যার মতিকে সন্দেহ করলো। এই ছেলে এক ঘণ্টা আগে বের হলো কেন জানতে চাইলো। তারপর এক শিক্ষককে বললো মতিকে ডাক দিতে। মতি এসে সালাম দিল। স্যার মতিকে বলল তুমি এতো আগে বের হলে যে? মতি বললো স্যার আসলে পরিক্ষা শেষ। সবগুলো প্রশ্নই দিয়েছি। তবে একটু তাড়াহুড়া করেই লিখেছি। স্যার বললো কেন? মতি বললো স্যার এখান থেকে আট মাইল দূরে আমাদের বাড়ি। আমরা খুব গরিব তো। আমার মা আমাকে যাওয়া আসার গাড়ি ভাড়া দিতে পারে না। আসার টাকা দেন দশ টাকা। কিন' যাওয়ার টাকা দিতে পারে না। আমি পরিক্ষা দিয়ে হেঁটেই যাই। স্যার এক শিক্ষককে মতির খাতাটা আনতে বললো এবং শিক্ষক সেই খাতাটাও এনে দিল। স্যার মতির খাতাটা দেখলো এবং সাথে সাথে নাম্বার দিল। খাতা দেখার শেষে নাম্বার যোগ করে দেখলো মতি একশর মধ্যে একশই পেয়েছে। স্যার খুশি হয়ে নাম্বার দিল নিরানব্বই। মতি পাশেই ছিল। স্যার মতিকে বললো বাবা তুমি বৃত্তি পাবে ট্যালেন্টপুলে আমি লিখে দিলাম। মতি বললো স্যার আমি তাহলে আসি। স্যার বললো তুমি প্রতিদিন আমার কাছ থেকে দশ টাকা করে নিবে যদি বেশি লাগে তাহলে আমাকে বলবে। মতি বললো ঠিক আছে স্যার। তবে মাকে না বলে তো নিতে পারি না। স্যার বললো তোমার মা কিছু বলবে না। মতি বেশি নিল না। দশ টাকাই নিল এবং বাড়ির দিকে আসল। মতি আর স্যারের ব্যাপারটা সারা স্কুলের ছাত্র ও শিক্ষকরা জেনে গেল। এদিকে মতি বাড়ি এসে দেখলো বাবার এই অবস'া। মা মতির মাথায় হাত রেখে বলছে বাবারে একি হয়ে গেল। মা মতি দু’জনে কাঁদছে। তখনি এলো ভীতির মা। এসে বললো মতির মা এইভাবে ভেঙ্গে পড়লে তো হবে না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখো দেখবে আল্লাহ ভালো করবে মতির বাবাকে। আর মতি পরিক্ষা দিয়ে এলো তাকে কিছু খেতে দাও। মতির মা বললো বোন আমার ঘরে চাল নেই, ভাত নেই তার মধ্যে এই অবস'া। ভীতির মা বললো ঠিক আছে আমি দেখছি। মতিকে সঙ্গে নিয়ে গেল ভীতির মা। মতিকে খাওয়াবে এবং মতিকে কয়েক কেজি চাউল দিবে। ভীতির মা মতিকে বললো বাবা আজ পরিক্ষা কেমন হলো তোমার? ভীতি তো এখনো এলো না। মতি ভাঙ্গা গলায় বলল খুব ভালো হয়েছে আমার পরিক্ষা। আমি আজ এক ঘণ্টা আগে খাতা জমা দিয়েছি। তারপর মতি টিওনো স্যারের ঘটনাটা খুলে বললো। ভীতির মা খুশি হয়ে বললো বাবা তুমি একদিন অনেক বড় হবে। এই কথা বলতেই এলো ভীতি। এসেই মতিকে বললো তুই আচ্ছা স্বার্থপর। আমাকে রেখে একাই চলে এসেছিস। মতি বললো ভীতি আমি তোকে পরে সব খুলে বলবো। এখন যাই। ভীতির মা মতিকে চাউল দিল। মতি চাউল নিয়ে চলে এলো। আগামীকাল মতির পরিক্ষা আছে। রাতে একটু পড়লো। রাতভর মতি বাবার পাশে বসে ছিল। বাবার সন্ধ্যার দিকে জ্ঞান ফিরেছে। কিন' কথা বলতে পারছে না। কথা বলার চেষ্টা করছে। মতির মা সকালে মতিকে বললো বাবা আজ সেই দশ টাকা দিয়ে ঔষধ এনেছি। মতি তখন টিওনো স্যারের কথা খুলে বললো। মতি তার মাকে বললো আমার কাছে দশ টাকা আছে যদি লাগে তাও বাবার জন্য ঔষধ নিয়ে এসো। আমি হেঁটেই যেতে পারবো। মতির বাবা ঘরের মধ্যে থেকে শুনছে আর চোখের পানি ফেলছে। কথা তো বলতে পারছে না। মতির এভাবেই বৃত্তি পরিক্ষা শেষ হলো। বাবা কোনো মতে হাঁটা চলাফেরা করতে পারে। কথাও বলতে পারে তবে একটু কম। মা জননীর জন্য আজও বেঁচে আছে এই অবনীতে। নইলে কবে যে আমার ঘরে কান্নার ঢল নেমে আসত। সেদিন একটা গাছের নিচে বসে বলছে তার গ্রামের এক চাচা আলী ছমিরকে। আলী ছমির বললো বাবা

মতি আসলে তোর মায়ের মতো মহিলা এই এলাকাতে কয়জন আছে বল? মতি বললো চাচা আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আজ তাহলে আসি। মতি হাঁটছে। হঠাৎ দেখলো ভীতি যাচ্ছে ওই রাস-া দিয়ে মতিদের বাড়ির দিকে। মতি মনে করলো ভীতি ওর কাছে যাচ্ছে। তাই মতি ভীতি বলে ডাক দিলো । এই ভীতি আমি এখানে আয়। ভীতি বললো না আমি তোর কাছে যাচ্ছি না তো, সাব্বিরের কাছে যাচ্ছি। একটা দরকার আছে। মতি বললো ঠিক আছে যা। একটু মন ভার করেই বললো। ভীতি চলে গেল। মতি আর সামনের দিকে এগুলো না।ওখানেই দাঁড়িয়ে ভাবছে সাব্বিরের কাছে কি দরকার ভীতির? মতি আবার ভাবছে আর একাএকা বলছে ও যাক আর না যাক কি করুক আর নাই করুক আমি কি করবো? আমারইবা কি করার আছে? তাছাড়া ওর সাথে তো আমার তুলনা হয় না। ওরা কী আর আমরা কী? হঠাৎ ওই রাস-া দিয়ে যাচ্ছেন এক শিক্ষক। মতিকে দেখে তিনি বললেন বাবা মতি আগামী মাসের এক তারিখ রেজাল্ট বের হবে। তুমি তো বাবা এই এলাকার নাম করেছো। মতি বললো স্যার সব আপনাদের দোয়া স্যার। স্যার বললো এবার মেডেলটা তুমি পাবে ইনশাআল্লা। মতি বললো স্যার আমি আসি । মতি চলে গেল।

    আজ এক তারিখ পরিক্ষার রেজাল্ট দিবে এবং যে এই থানার মধ্যে প্রথম হবে তাকে একটা মেডেল দিবে থানার শিক্ষক সমিতি থেকে। মতি ভীতি সবাই গেল রেজাল্ট আনতে। মতি তার মায়ের দোয়া নিয়ে গেল। বাবাকেও বলে গেল। আজ মতির রেজাল্ট দিবে। বাবা মা বললো বাবা মতি তুই যেন কোনো চিন-া করিস না। আমাদের দোয়া আছে তোর সাথে। মতি বললো ঠিক আছে। আমি গেলাম।

মতি এখন স্কুলে। সেখানে গিয়ে দেখা হলো তার বন্ধুদের সাথে। অন্য ছাত্রছাত্রীর মা-বাবা এসেছে। প্রায় ছয়হাজার লোক আজ স্কুল মাঠে উপসি'ত। এই ছয়হাজার লোকের মধ্যে এই মেডেল পুরষ্কার দিবে। কে পাবে সবার মুখে মুখে এই কথা। শিক্ষক সমিতির সভাপতি এখনো আসেনি। তাই মতি ভাবলো একটু ঘুরে আসি। এখন অন্যসব শিক্ষক বক্তব্য দিচ্ছে। মতি একটু রাস-ার দিকে লক্ষ্য করে দেখছে সভাপতি স্যার আসছে কী না। দেখতেই মতির চোখে পড়লো ভীতিকে। ভীতি সাব্বিরের সাথে রাস-ায় কী যেন খাচ্ছে আর হাসাহাসি করছে। মতি ভেজা চোখে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে। মতি ভাবছে ভীতি আমাকে দেখলে খুশি হতো আর আজ আমার আর ওর রেজাল্ট দিবে ভীতি আমার সাথে কথা বললো না। ভীতি কেন এমন হলো আমি কী দোষ করেছি ভীতির কাছে? আল্লাহই জানে। মন ভার করে মতি চলে গেলো মঞ্চের সামনে। গিয়ে ঘাসের উপর বসে পড়লো মতি। আজ এই অনুষ্ঠানে টিওনো স্যার আসবেন। মতি এই খবরটা জানতো না। মন্টু এসে বলে গেলো মতিকে। মতি শুনে খুশি হলো এবং মনে মনে বললো স্যারের সাথে দেখা করতে হবে। তিনি আমার অনেক উপকার করেছেন। তার তুলনা হয় না। মতি স্যারের সঙ্গে দেখা করবে কিন' কোথায় পাবে। তাই পাগলের মতো খুজতে শুরু করলো স্যারকে। টিওনো স্যার আধঘণ্টা হলো এসেছেন। তিনিও মতিকে খুঁজছেন কিন' মতিকে খুঁজে পাচ্ছেন না। অবশেষে মতি ও স্যার সামনা সামনি পড়ে গেল। স্যার মতির দিকে তাকিয়ে আছে, মতিও তাকিয়ে আছে স্যারের দিকে। মতির চোখে পানি ছলছল করছে। মতি স্যারের পায়ে সালাম করল। স্যার মতিকে তুলে বললো বাবা কেমন আছো? মতি বললো ইনশাআল্লাহ ভালোই আছি। স্যার আপনি কেমন আছেন? স্যার বললো আমি ভালো আছি বাবা। তোমার বাবা-মা আসেননি। মতি বললো না স্যার বাবা এখনো পুরোপুরি ভালো হয়নি। তবে এই সপ্তাহের মধ্যেই ভালো হবে ইনশাআল্লাহ। মতিকে স্যার বললো সামনে থাকতে। সভাপতি এলো ১২টার দিকে। এসেই পুরো অনুষ্ঠান শুরু করে দিলেন। এক থেকে বিশ পর্যন- পুরস্কার দেওয়া হবে। সভাপতি বিশ থেকে পুরস্কার দেওয়া শুরু করলেন। ১৯ পর্যন- দেওয়া শেষ হলো। এরমধ্যে মতির নাম বলা হলো না। মতি কখন যেন মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায়। মতির চোখ লাল হয়ে গেলো। মাথা ঘেমে উঠলো। সভাপতি মাইকে বললেন যে প্রথম হবে অর্থ্যাৎ হয়েছে তাকে একটু হলেও তার জীবনী বলতে হবে। এবং এই পুরস্কারটা সে তার ইচ্ছে মতো একজনের কাছ থেকে নিতে পারবে। এদিকে ভীতির নাম না বলায় সে মন খারাপ করে বসে আছে রাস-ার এক পাশে। সভাপতি স্যার বললেন এইবার আমি বলছি, আমাদের এই সাঘাটা থানা থেকে যে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে এই পুরস্কার হাতে নিবে তার নাম। কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন তিনি। মাঠের মধ্যে আবারো মুখে মুখে বলছে কে পাবে এই মেডেল। সভাপতি স্যার আবারো বললেন কী আপনারা হতাশ হয়েছেন। আর হতাশ হতে হবে না। জোরে বললেন আমি বলে দিচ্ছি এবার এবার আমাদের থানার পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষার সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছে মতি। ও আমাদের গর্ব, আমাদেও অহংকার। মাঠের সবাই চিৎকার দিয়ে উঠলো হুররে। আমদির পাড়ার গ্রামের ছেলে মতি। সভাপতি বললেন আসো মতি তুমি কোথায়? মতি বসে কাঁদছে খুশিতে। টিওনো স্যার চারদিকে তাকিয়ে দেখছে মতি কোথায়। টিওনো স্যার মঞ্চে ওঠে মাইকে মতি মতি বলে ডাকছে, কিন' মতিকে খুঁজে পাচ্ছে না। ভীতি খুঁজছে কোথাও পাচ্ছে না। টিওনো স্যার যেন রাগে কাঁপছেন। কারণ তিনি মতিকে সামনে থাকতে বলেছিলেন। সভাপতি আবারো ডাকলেন মতি এসো তুমি কোথায়? কিছুক্ষণ পর মতি আসছে মঞ্চের দিকে। এদিকে তো মাঠে হৈ হৈ উঠে গেছে। পরে সভাপতি স্যার বললেন বাবা তুমি কোথায় ছিলে এতোক্ষণ। মতি বললো স্যার আমার মা আমাকে বলেছেন যদি কোনোদিন ভালো কোনো খবর পাই যেন দুই রাকআত নামায পড়ি। তাই মসজিদে গিয়ে নামায পড়ে এলাম। সভাপতি বললো বাবা তুমি ঠিকই করেছো। এবার মাইক নিয়ে তোমার জীবনী বলো। মতি মাইক হাতে নিতেই চোখের পানি ঝড়তে লাগলো। সবাই অবাক হলো মতি কেন কাঁদে? ভীতিও সামনে এসেছে। টিওনো স্যার বললো কী হলো বাবা বলো। মতি মাঠের উপসি'ত সবাইকে প্রথমে সালাম দিলো। বললো আমার এখানে উপসি'ত বড় ভাই, বাবার মতো, মায়ের মতো, বোনের মতো, বন্ধু অনেকেই আছেন। প্রত্যেক মানুষের জীবনে গল্প আছে আমারও আছে। তবে আমারটা অন্যরকম। আমি এই আমদিরপাড়া গ্রামের এক দরিদ্র ঘরের সন-ান। শুধু দরিদ্র নয়, অতি দরিদ্র। আমি জানিনা আমাদের ঘরে খাবারের জন্য আজ চাউল আছে কিনা। আমি অনেক কষ্টের মধ্যে পড়াশুনা করি। চোখের পানি দিয়ে বুকটা ভিজে যাচ্ছে মতির। মতি বলছে আমি এই মেডেল পেয়েছি তা ঠিক; তবে এই মেডেল আমার নয় আমার মায়ের। আমার মায়ের তুলনা হয়না। আমি যদি আমার শরীরের চামড়া তুলে দেই, মনে হয় একদিনের ঋণ শোধ করতে পারবো না। আমি মাকে লক্ষ লক্ষ সালাম করি। বাবার কথা বলতে পারেন আপনারা আমি বাবার কথা কেন বললাম না? আমার বাবা একজন পেশাদার জুয়া খেলোয়ার ছিলেন। প্রায় তিন মাস ধরে বাবা আর জুয়া খেলেন না। ভালো হয়েছেন। এই কথা বলতেই চোখে পড়লো ভীতিকে। মতি বললো আমার একটা পুতুল খেলার বন্ধু ছিলো সে আমার জন্য অনেক করেছে। আমি ওকে কোনোদিন ভুলবো না। আমি যখন না খেয়ে থাকতাম ওই মেয়েটি আমাকে ভাত চুরি করে এনে দিত যাতে তার মা-বাবা না দেখে। সে বুঝি আর নেই। সে অন্য একজনকে বন্ধু বানিয়েছে। এই কথা শুনে ভীতি মনে মনে বলছে মতি এইসব কী বলে আমি অন্য একজনকে বন্ধু বানিয়েছি। ভীতি ওখান থেকে ঈশারা দিচ্ছে না না। মতি চুপ হয়ে গেলো। তখন সভাপতি বললো বাবা তুমি কথা বলছো না কেন? তুমি আর কিছু বলবে না। আর তুমি মেডেল কার হাত থেকে নিতে চাও? মতি বললো স্যার আমি মায়ের হাত থেকেই পুরস্কারটা নিতে চাই। সভাপতি বললো তোমার মা কোথায়? মতি বললো মা তো এখানে নেই। বাবা অসুস' তাই আসেনি। সভাপতি একজন শিক্ষককে বললেন মতির মাকে বাড়ি থেকে আনতে। তার মাইক্রো নিয়ে যেতে বললেন। তাই করলো শিক্ষক। মতিদের বাড়ি গেলো। এই দিকে মঞ্চে অন্য অনুষ্ঠান চলছে। মতি ভীতির কাছে গিয়ে বসলো। মাঠের মানুষ মতিকে দেখার জন্য ঠেলাঠেলি করছে। তাই মতি মাঠে থাকতে পারল না। টিওনো স্যার মতিকে আর ভীতিকে নিয়ে এল লাইব্রেরীতে। তাদের দুজনকে রুমে রেখে স্যার মঞ্চের দিকে এলেন। এসে অন্য অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। রুমের মধ্যে মতি ভীতিকে বললো ভীতিরে তুই আমাকে তোর বন্ধু করে রাখবি। আমি তোর বন্ধু হয়ে থাকতে চাই। এদিকে মতিদের বাড়িতে গাড়ি এল। বাড়ির লোকজন অবাক মতির জন্য গাড়ি এসেছে মতির মাকে নিতে। মা গাড়ি দেখে সামনে এসে বললো, আমার মতির কিছু হয়েছে নাকি। ওই শিক্ষক মায়ের পায়ে সালাম করলো। মা বললো একি করলেন? আপনি যে শিক্ষক। শিক্ষক বললো আমি শিক্ষক, তবে আপনি শিক্ষাগুরু। আপনার এই হাত দিয়ে মতিকে সর্বপ্রথম লেখা শিখিয়েছিলেন তাই না। মা বললো হ্যাঁ। তবে কেন কী হয়েছে। বাড়ির লোকজন ঘিরে নিল শিক্ষক ও মতির মাকে। বাবাও এলেন ঘুরে ঘুরে। শিক্ষক বললো আপনাদের মতি আজ এই সাঘাটা থানার মধ্যে সেরা ছাত্র। তাকে সাঘাটা থানা শিক্ষক সমিতি থেকে একটা মেডেল দেওয়া হচ্ছে। যার মূল্য টাকা দিয়ে পাওয়া যায়না। আপনাদের মতি সেই পুরস্কার পাচ্ছে। মা-বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছে আল্লাহ গো তুমি এতদিনে আমার দিকে বুঝি মুখ ফিরে তাকালে। মা খুশিতে চোখের পানি দিয়ে বুক ভাসালেন। বাবাও চোখের পানি মুছলেন। শিক্ষক বললো মা মতি আপনাকে ছাড়া মেডেল নিবে না। তাই আপনাকে নিতে এসেছি। আপনি আসেন। মতির বাবা বললো আমিও যাবো। মতির বাবা-মা গাড়িতে যাচ্ছে। বাড়ির লোকজন দৌড়ে আসছে মতিকে দেখার জন্য। মা এসে পৌঁছে গেল মাঠে। ছয়হাজার লোক যেন মাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। মা মতিকে দেখার জন্য ব্যাকুল। মন্টু আর ঝন্টু মতিকে ডাকলো তার মা এসেছে। মতি দৌড়ে এলো মায়ের কাছে। এসে মা-বাবার পায়ে সালাম করতে লাগলো। সভাপতি তার পিতা-মাতাকে মঞ্চে আসার জন্য অনুরোধ করলো। মা-বাবা মঞ্চে আসার পর মতি বললো স্যার আমি কী আর কিছু কথা বলতে পারি। স্যার বললেন হ্যাঁ বল কী বলবে। মতি বললো ভাইসব উনারা আমার মা-বাবা। দেখেন আপনারা, আমার মায়ের শাড়িটা ছেঁড়া ও পুরাতন। কাঁদছে আর মতি বলছে। এই মা আমার জন্য অন্যের বাড়িতে কাজ করে এনে আমাকে খাওয়ায়। এই মা আমি অসুস' হলে রাতের পর রাত আমার পাশে থাকে। সেবা যত্ন করে। মতি কাঁদছে আর বলছে। বাবা-মায়ের চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। সভাপতি টিওনো অন্যসব শিক্ষক মাঠের ছয়হাজারের মতো মানুষের চোখে পানি এসেছে। মতি বলছে এই মা কাপড় কিনতে পারে না। অনেক রাতে পানি খেয়ে ঘুমিয়ে যায়। আমাকে না খাইয়ে রাখেনি কখনো। আমি যখন বৃত্তি পরীক্ষা দিব তখন আমার মায়ের কাছে টাকা ছিলো না। বাবা তো জুয়া নিয়ে তখন মাতাল। মাকে এসে যখন আমি বললাম মা আমার পরিক্ষার ফিসের দরকার। কালকের মধ্যে না দিলে পরিক্ষা দিতে পারবো না। তখন মা একটা মাটির ব্যাংক বের করলো। ব্যাংকটি ভাঙলাম। ১৫০টাকা ছিল তার মধ্যে। আমি মাকে বললাম মাগো তোমার পরনে তো শাড়ি নাই, তুমি শাড়ি কিন। মা বললো বাবারে শাড়ি কিনার দরকার নাই। তুই ভালোভাবে পরিক্ষা দে। আমি আমার মাকে কোনো কিছু দিয়ে ছোট করবো না। তাই আমি এই মেডেলটা আমার মাকে দিলাম। পৃথিবীর মধ্যে সেরা মা হওয়ায়। ভীতি, মন্টু, ঝন্টু চোখ মুছে তাকালো মঞ্চের দিকে। সভাপতিও চোখ মুছলো। আর বললো আমাদের সবার ঘরে ঘরে এমন মা থাকা উচিত। আমরা সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে মতির মাকে সম্মান জানাই। মতির বুকটা ভরে গেলো মা-বাবার জন্য। এবার মায়ের হাতে সভাপতি মেডেলটা দিল মতিকে দেওয়ার জন্য। মতির হাতে তার মা মেডেল তুলে দিলো। টিওনো স্যারের পক্ষ থেকে অন্য শিক্ষকরা মতিকে দুই লক্ষ টাকা দিল। যাতে মতি পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে অনেক বড় হয়। অনুষ্ঠান শেষ করে মতি ও তার মা-বাবা সবাই চলে এল বাড়িতে। মতির ওই দুই লক্ষ টাকা দিয়ে বাবা একটা ব্যবসা শুরু করল। তাদের দিন এখন ভালো যাচ্ছে। বাবাও জুয়া খেলা ছেড়ে দিল। মতি এখন গ্রামের লোকদের চোখের মনি। সবাই দোয়া করে মতি যেন একদিন অনেক বড় হয়।  

 
 

বুকের

 ব্যাথা 

আবু আফজাল মোহাঃ সালেহ

ইব্রাহিমের সাথে খোলামেলা কথা হ’ত আরিফের। লাজুক কিন্তু গম্ভীর ভাবের মানুষ আরিফ। তবে বলতো, চাকুরি পেতেই হবে। চাকুরি জীবনের মাপকাঠি।আমার কি নেই!মা নুষজন আমাকে অন্যভাবে দেখে।গুরত্ব দেয়না। আব্বা চাকুরে ছিলেন।সবাই তাকে সম্মান করতেন, মানতেনও।অতএব পড়াশুনা করে চাকুরি করতে হবে। তাহলে সেদিনকার জেবু আপুর কথায় ব্যথিত হয়েছিল আরিফ

    লাজুক প্রকৃতির ছেলে আরিফ। বুকে প্রচন্ড ব্যথা।মাঝে মধ্যে বুকের ব্যথা প্রচন্ড হয়। তখন ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ খেতে হয়। কিন্তু কিসের ব্যথা? কীভাবে ব্যথা হ’ল বুকে? বাড়ির কিংবা আশেপাশের কেউ-ই বলতে পারে না। বুকের ব্যথার জন্যে হাসপাতালে ভর্তির সময় আরিফ’কে চেনা যায় না। শরীর আর চেহারা বিদঘুটে আকার ধারণ করে। পাশের রুম থেকে আরিফের ছোট ভাই

ইব্রাহিম দীর্ঘ নিঃস্বাসের শব্দ পায়। কিন্তু সেও ভেবে পায়না তার ভাই আরিফের আসল অসুখটা। বেশ কয়েক বছর আগে ওপাড়ার এক বিয়ে অনুষ্ঠানে জেবার সাথে তার পরিচয়। দেখতে সুন্দর, সুঠামো, চোখদু’টি কাজল কালো।কথা কাটাকাটি হচ্ছিল জেবা আর আরিফের মধ্যে। ইব্রাহিমের বয়স ছিল দশ কি বারো।বোঝার ক্ষমতা হয়েছিল যথেষ্ট। বেকার, লাজুক ইত্যাদি কথা ভেসে উঠছিল।তার ভাই আরিফ বেকার-সে কথা কি বারবার বলছিলো জেবা? ‘আমার ভাইতো চোখতুলে কথা বলেনি কোনদিন! তাহলে কবিতা লেখা যার নিয়ে তিনি কি এই জেবা? মিলাতে কষ্ট হয়! বেকার বলেই কি বারবার প্রত্যাখান করছিলো জেবা? তবে মনে আছে বুকের ব্যথা সেদিন-ই পেয়েছিল আরিফ। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিলো সেদিন। 

      ইব্রাহিমের সাথে খোলামেলা কথা হ’ত আরিফের। লাজুক কিন্তু গম্ভীর ভাবের মানুষ আরিফ। তবে বলতো, চাকুরি পেতেই হবে। চাকুরি জীবনের মাপকাঠি। আমার কি নেই! মানুষজন আমাকে অন্যভাবে দেখে। গুরত্ব দেয়না।আব্বা চাকুরে ছিলেন। সবাই তাকে সম্মান করতেন, মানতেনও। অতএব পড়াশুনা করে চাকুরি করতে হবে।

তাহলে সেদিনকার জেবু আপুর কথায় ব্যথিত হয়েছিল আরিফ ভাইয়া! জেবার মতো বউ পোষা তো ভাইয়ার পক্ষে কিছুই না।যা সম্পদ-সম্পত্ত্বি আছে তাতে রাজার হালে থাকতে পারবে তারা।তাহলে প্রত্যাখান কেন? না অন্য কিছু!-ভেবে পাইনা ইব্রাহিম। কীসব চিন্তা করছি!আমার কথাতো ঠিক নাও হতে পারে। আরিফ ভাই তো সব কথায়-ই খুলে বলে তাকে।একবার এক সুন্দরী-ধনাঢ্য মেয়ে ভাইয়াকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল-সে কথা পর্যন্তও বলেছিলো! এবং বলেছিল প্রেম-ট্রেম বুঝিনা। ---তাহলে আজ? কয়েক বছর পর টেম্পুতে এক সুন্দরী মহিলা সাথে হ্যাংলা আর বিশ্রী এক পুরুষ। পুরুষটাকে আমি ভালোভাবেই চিনলাম।ওপাড়ার বাউন্ডেলে ছেলে, কয়েকবার এস,এস,সি পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেছে। লোকে তাকে বখাটে হিশেবে জানে এবং চেনে। তার বাবা শ্রম বিক্রি করে থাকে। তাদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে ভাইয়া। মনে মনে ভাবি প্রেম মনে হয় জেগে উঠেছে ভাইয়ার।এবার ভাবি পাব নিশ্চয়! অনেকদুর যাওয়ার পর ভাইয়া বলল-সুন্দরীরা কি হ্যাংলা আর বখাটেদের প্রেমেই পড়ে!মনে মনে ভাবি, বখাটে ঐ ছেলের সাথে মহিলাটি কি জেবা, জেবু আপু? আস্তে আস্তে ভাইয়ের বুকের ব্যথা যায় বেড়ে!

পথভোলা

সপ্তর্ষি রায়বর্ধন

সুরজিত চলেছে তার পক্ষীরাজে রাতের হাওয়া এসে চাবুক মারছে তার কানের পাশে। কে যেন লিখেছিল সেই গানটা “মগজে কারফিউ”? চলন্ত দ্ধিচক্রমানের চাকার ঘর্ষণে সেখানে যে ঠেলে উঠেছে স্মৃতির চকমকি। পেরিয়ে যাচ্ছে সে তালডাঙার পুকুর, মেটে মসজিদ, নিয়ন রাঙানো ফ্যাক্টরি গেট, গলফক্লাবের মাঠ – আর একটু পড়ে শেষ হবে যাত্রাপথ। ফেলে আসা পথ ভুলে যেতে চায় সে।

    কিচেনের দিক থেকে মাইকেলের গলা ভেসে এল “হ্যালো – ফোর, এক্সট্রা চিজ্ চিকেন ওয়ালা লার্জ পিৎজা – যাদবপুর ৮বির কাছে – হু ইস্ গোয়িং”?

বাইকের ওপর বসে সুরজিত মাত্র ঝিনুকের হোয়াটস্অ্যাপ মেসেজটা পড়ছিল – “কখন আসছ তুমি” ? অভ্যস্ত আঙুলগুলি টুকটুক করে বিদ্যুৎগতিতে লিখল – “এই তো আর ঘণ্টাখানেক বাদেই হয়ে যাবে”। “তাড়াতাড়ি এসো, আমি অপেক্ষা করব। আজ তোমার জন্য পোস্তবাটা, আরেকটা ভাল জিনিস রান্না করে রেখেছি”। “হুমম্” – এটা লিখে তার সঙ্গে কতগুলো স্মাইলি জুড়ে দিল সুরজিত। ঝাপসা লাগল মোবাইলের পর্দাটা। সারাদিন ধরে দৌড়োদৌড়ি চলে ওর মত ছেলেদের। দম ফেলবার সময় নেই। খালি হই হই করে দৌড়ে চলা। কখনো এই বাড়ি কখনো ওই বাড়ি। হাতের তালুর মত করে তারা চিনে নিয়েছে দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলটাকে। রাস্তা, গলি, তস্য গলি, পুকুরের পাড়, মিলন সংঘের মাঠ, হাফ ডজন কালী আর শনি মন্দির, স্কুল বাড়ি, বউদির দোকানের মোড়, যাদবপুরের হস্টেল, সুকান্ত সেতু, সন্ধ্যাবাজার, শ্রীরামপুর, তালতলা – বটতলা মার্কা একগাদা রিক্সা স্ট্যান্ড, বান্টি পেট্রোল প্যাম্প, হিন্দুস্থান মোড় – অমুক ব্যাঙ্কের তমুক এটিএম এরকম শত সহস্র ল্যান্ডমার্ক তাদের মুখস্ত। 

     এরা হল ‘পিৎজা কিংস’ নামে বিখ্যাত এক সংস্থার হোম ডেলিভারি এক্সিকিউটিভ। বাড়িতে বসে সুস্বাদু পিৎজা খাবার ব্যবস্থা – তাও আবার গরমাগরম। ক্রেতার কাছে এরা খাবার পৌঁছে দেবার প্রতিশ্রুতি দেয় কখনও সাত কখনও বা পনের মিনিটে। দেরী হলে বা ঠাণ্ডা হলে সে খাবার ফেরত দেবার গ্যারান্টিও থাকে। ক্রেতাস্বার্থে তাই এদের বিদ্যুৎগতিতে ধাবমান হতে হয় মোটরসাইকেলে – এ গলি সে গলি দিয়ে, ট্রাফিক জ্যাম এড়িয়ে, লাল আলোর সিগন্যালের ভ্রুকুটি বাঁচিয়ে কখনও বা অমান্য করে। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে সুরজিত এখনে চাকরি যোগাড় করেছিল। যদিও তার বিএ ইংলিশের বিদ্যেবুদ্ধিটা খুব একটা কাজে লাগেনি, আসল চাহিদা ছিল তার বাইক চালাবার লাইসেন্স আছে কিনা। একটা ছোটখাট পরীক্ষাও দিতে হয়েছিল – ঐ দ্ধিচক্রমানের সওয়ারী হয়ে – এক কিলোমিটার রাস্তা তাও কত কম সময়ে ঘুরে আসা যায়।

সুরজিতের চাকরিটা হয়ে গেছিল। দরকারও ছিল খুব টাকাপয়সার সে সময়। কলেজ ছাড়বার পর বাইকটা বিক্রি করে দিতে হয়েছিল পয়সা যোগাড় করবার তাগিদে। বাবা মারা যেতেই আসলে সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল সুরজিতকে। মাঝখানে বছরগুলো বড়সড় যুদ্ধের। কলেজের রঙীন দিনগুলো কখন হারিয়ে গেছে। বন্ধু, বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা, খাওয়া দাওয়া, সিনেমা – সব মিলিয়ে বেশ কেটে যাচ্ছিল। সেই বয়সে প্রেমও এসেছিল নিয়ম মেনে। অতগুলো মেয়ের মাঝে পিকু কেন যে বেশী ভাল লাগত – সে বোঝেনি প্রথমে। যেদিন বুঝল – সেদিন পিকু কলেজ আসেনি। একে তাকে জিজ্ঞাসা করেও ঠিক আন্দাজ করা গেলনা পিকু কোথায় – তার কি হয়েছে। সারাদিন অস্থিরতায় কাটিয়ে শেষে আর থাকতে না পেরে হাজির হয়েছিল পিকুদের পেল্লায় বাড়ির সামনে। কলেজে বন্ধু হিসেবে অতি অনায়াসেই সুরজিত পৌঁছে গেল বাড়ির অন্দরমহলে।

পিকু জ্বরে গৃহবন্দি। খাটের পাশে বসে প্রায় একঘণ্টা গল্প হল দুজনের। সেই রাতে সুরজিত বুঝল পিকুর সঙ্গে তার সম্পর্কটা একটু অন্য সুরে তালে বাঁধা পড়েছে।

    যেদিন পিকু সুস্থ হয়ে ফিরে এলো সেদিন থেকে সুরজিত যেন কিরকম দলছুট হয়ে পড়েছিল। দুজনের একসঙ্গে থাকা, ঘোরাফেরা নিয়ে কম মন্তব্য শুনতে হয়নি। তবু ওদের আশেপাশের বন্ধুরা জেনে গিয়েছিল সব।

এ সবের সাক্ষী ছিল আরেকজন। সে হল সুরজিতের সেই মোটরবাইক। আহা, বড় যত্নে রেখেছিল তাকে। আর যেদিন পিকুর সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া – কাছাকাছি অথবা দূরে, সেদিন সেই যন্ত্রযানের গায়ে যেন পুলকের বাতাস। খুব ভালবাসত পিকু ওটায় চড়তে। আর সুরজিতের হাতে ওটা হয়ে উঠত রূপকথার পক্ষীরাজ।

    তারপর একদিন এল সেই ভয়ঙ্কর দিনটা ৬ই ডিসেম্বর। কিছু ধর্মান্ধ লোক শাবল গাঁইতি মেরে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় গুঁড়িয়ে দিল একটা শতাব্দী প্রাচীন মসজিদ। দিনটা ছিল রবিবার। কি একটা কথা বলবার জন্য পিকু সেদিন সুরজিতকে দুপুরবেলা যেতে বলেছিল তার বাড়িতে।

সুরজিত চটপট দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে বেরিয়ে গেছিল তার বাহন নিয়ে। কিন্তু, সে পৌঁছতে পারেনি পিকুর বাড়ি। কারণ মাঝরাস্তাতে তাকে পুলিশ আটকায়। শহরে কারফিউ জারি হয়েছিল সেদিন।

    বাড়ি ফিরে সুরজিত এঘর সেঘর করল। পিকুর সঙ্গে দেখা হলনা – কথা বলতে গেলে যেতে হবে পাড়ার মোড়ের টেলিফোন বুথে। কিন্তু সেও আজ বন্ধ। টিভির সামনে বসে বসে দেখছিল সেই দৃশ্য বারবার – দুই হাত তুলে পতাকাধারী কিছু লোকের এক অদ্ভুত উন্মাদনা।

শীতের সন্ধ্যায় ফাঁকা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল সুরজিত। কি

বলতে চেয়েছিল পিকু ? প্রশ্নটা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল তার মাথায়। পৃথিবীতে সমস্যার সমাধান কখনো কখনো হয় অকস্মাৎ। এ ক্ষেত্রেও তাই হল। পথে দেখা হল তড়িৎদার সাথে। কয়েকটা বাড়ি পরেই তড়িৎদাদের বাড়ি। “আরে তুই এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিস রাস্তায় কি ব্যাপার” ? “তুমিও তো বেড়িয়েছ” – শুকনো হাসি হেসে বলল সুরজিত। “আর বলিস না – সিগ্রেটের খোঁজে গেছিলাম রে। একটাও নেই, মাধবের দোকান বন্ধ। সেই রায়পুরের মোড়ে গিয়ে পেলাম। “তড়িৎদা – শোন না গো – তোমাদের বাড়ির ফোনটা কাজ করছে ? একটা ফোন করা যাবে খুব জরুরী” – “কেন করা যাবে না ? চল আমার সঙ্গে – বউদির হাতে একটু চা খেয়ে যাবি। শোন একটাই শর্ত – ঢুকেই তুই বলবি – বউদি চা খেতে এলাম – তাহলে আমিও পাব এক কাপ”।

   বারান্দা পেরিয়ে তড়িৎদার বৈঠকখানায় ঢুকেই কালো ফোনটার দিকে এগিয়ে গেল সুরজিত। “বিশাখা – কোথায় তুমি” – বলে একটা হাঁক ছাড়ল তড়িৎদা। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল “শোন তুই ফোন মেরে দে, আর বিশাখা এলে ওই ডায়লগটা দিতে ভুলবিনি ভাই, আমি চট করে একটু বাথরুম ঘুরে আসি”। এই বলে তড়িৎদা চলে গেল।

এই মুহূর্তে এই দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরটায় সুরজিত একা। তার চোখ টেলিফোনের দিকে। কিরকম একটা অজানা আশঙ্কা বুকে নিয়ে টেলিফোনের সাতটা নম্বর ডায়াল করল সুরজিত। ফোনের ওপারে মাসিমার গলা পাওয়া গেল। পিকুকে চাইতেই তিনি বলে উঠলেন “আরে সুরজিত তোমরা ঠিক আছ তো ? যা অবস্থা শহরটার – ধর ধর দিচ্ছি” – সমান্তরাল লাইনে পাওয়া গেল পিকুর গলা।

    “কেমন আছিস তুই জিৎ - কোথা থেকে ফোন করছিস” ? “তড়িৎদার বাড়িতে আমি – আজ যেতে পারলাম না তোদের ওখানে – তাই – কি ব্যাপার বলত – কি বলবি বলছিলি” ? পিকুর গলায় কেমন একটা হতাশার সুর টের পেল সুরজিত। বুকের কাঁপুনিটা বাড়ল। ফোনের রিসিভারটা আরও জোরে সে চেপে ধরল কানের পাশে। ও প্রান্তে পিকু কাঁদছে মনে হল। “জিৎ ফেব্রুয়ারিতে বিয়ে ঠিক হয়েছে আমার”। নিজের কান কে বিশ্বাস হল না সুরজিতের। মনে হল কে যেন একটা ভারী জিনিস ফেলে দিল তার বুকের ওপর। “কেন কার সঙ্গে” ? আছে কেউ একজন, তুই এর চেয়ে বেশী কিছু জানতে চাস না – তুই ভালো থাকিস জিৎ ...............” ওপাশে কট্‌ করে ফোন কেটে যাবার শব্দ হল। সুরজিত বুঝল একটা অসম্ভব কষ্ট অনুভব করছে সে। আরও যেন ঘরটা চেপে ধরছে তাকে। কাউকে কিছু না জানিয়ে অন্ধকার রাস্তায় নেমে এল সে।

     বাড়িতে গিয়ে নিজের ঘরে শুয়ে পড়ল সুরজিত। কান্নাটা দলা পাকিয়ে গলার কাছে এবার সেটা চোখ ভেঙে নেমে এল অঝোরে। পরের কিছুদিন সুরজিতের জীবনেও যেন কারফিউ নেমে এসেছিল। রাস্তাঘাট খালি – বাতাসে ফিসফিস – এক অন্তহীন নিস্তব্ধতা। সুরজিতের মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল, যদি একবার কথা বলত পিকু। দেখতে দেখতে ফেব্রুয়ারি মাসটা চলে গেল। পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের কাছে জানতে পেরেছিল পিকুর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে কৃষ্ণেন্দুর। বিয়ের পর তারা চলে যায় দিল্লীতে।

বাবাকে যেদিন হাসপাতালে ভর্তি করেছিল সুরজিত, সেদিন কলকাতার বুকে আকাশ ভেঙে পড়েছিল। এ্যাম্বুলেন্স বাবাকে নিয়ে চলেছে, পিছনে তার বাইকে সুরজিত। অঝোর বৃষ্টিধারায় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। জামাকাপড় সপসপে ভিজে। ঘটনার আকস্মিকতায় রেইনকোট পড়তেও ভুলেছে সে।

     তারপর বছর তিনেকের একটা যুদ্ধ লড়তে হল সুরজিতকে। বাবার চিকিৎসার বিল মেটাতে সুরজিত আর তার মা হিমসিম খেত। যেদিন কল সেন্টারে প্রথম চাকরি পেল, সেদিন সুরজিতের অনেক বছর বাদে মনে হল ভাগ্য হয়ত এবার সদয় হল। বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে অনেকদিন পর সে হঠাৎ দেখল পিকুকে।

সজোরে কেউ একটা ধাক্কা মারল সুরজিতকে। “আরে এই জিৎ, ৮বির কাস্টমার তো তুই যাবি না কি – অলরেডি সাত মিনিট ধরে ফুড রেডি, প্যাক হয়ে আছে – তুই শালা ঘুমোচ্ছিস। বস্‌ ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে তোরা যদি এভাবে ডিউটি করবি – তবে কাজ ছেড়ে দে” – মাইকেলের উদ্ধত ভঙ্গি দেখে সুরজিত খুবই বিব্রত হয়ে পড়ল সত্যিই তো ঝিনুকের টেক্সট্‌ মেসেজ পড়তে পড়তে সে একটু ঘুমিয়েই পড়েছিল। “না না বস্‌, তুমি চিন্তা কোর না – আমি বেরিয়ে যাচ্ছি – টাইমের মধ্যে পৌঁছবো”। কার্ডবোর্ডের বাক্সটা বাইকের পিছনে লাগানো ধাতব কেরিয়ারের মধ্যে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল সুরজিত। ঘড়িতে রাত সোয়া নটা। অর্থাৎ হিসেব মত নটা বেজে পঁচিশ মিনিটে পৌঁছতে হবে। দশ মিনিটে এতটা রাস্তা যাওয়া যায় কিনা তা ভাববার, বিচার করবার সময় নেই সুরজিতের। কারণ তার কাছে কোন বিকল্প নেই। যদি না পৌঁছতে পারে এবং কাস্টামার যদি বলে পিৎজা ঠাণ্ডা, তাহলে তার দায় বইতে হবে সুরজিতকে – “পিৎজা কিংস” এর মালিক কে নয়। একরাশ কালো ধোঁয়া ছেড়ে বাইকটা অদৃশ্য হল এক অন্ধকার গলির ভেতর। সুরজিতের সামনে এখন শুধুই দ্রুত ধাবমান কালো রাস্তা। যানবাহন, পথচারীদের নিপুণহাতে কাটিয়ে সে এগিয়ে চলেছে তার গন্তব্যের দিকে। তাই তো আজ যে ভ্যালেন্টাইন্স ডে ! এতক্ষণে ঝিনুকের মেসেজের মানে বুঝল সে। সারপ্রাইস আইটেম বোধহয় ওই জন্যই। ঝিনুকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কল সেন্টারে কাজ করতে গিয়ে। ভীষণ সাদাসিধে মেয়ে কল সেন্টারের যে আবহ-আচার – তার বাইরে ছিল ঝিনুক। পিকুর ছেড়ে যাওয়াটা যেমন মেনে নিতে পারেনি সুরজিত, ঝিনুকের সঙ্গেও স্বাভাবিক হতে তার সময় লেগেছিল অনেক। কিন্তু, ধীরে ধীরে ওরা বুঝতে পারছিল পরস্পর নির্ভরতা।

অবশেষে একদিন পিকুর শূন্যতা কাটিয়ে তার জীবনে সম্পূর্ণভাবে এলো ঝিনুক। যেদিন “পিৎজা কিংস” এর চাকরিটা পেল সুরজিত, ঝিনুক খুব ভয় পেয়েছিল। কারণ সে কোনদিন সুরজিতের বাইকে চড়েনি, তার আগেই বাইকটা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিল সে। সুরজিত বুঝিয়েছিল ঝিনুককে “আরে দূর, অত চিন্তার কি আছে, আর আমার সাথে তো মোবাইলও থাকে। যখন ইচ্ছে ফোন বা মেসেজ কোর আমায়”। 

“আরে ও ভাই – আস্তে যান না – লোক মারবেন নাকি” ? সুরজিতের সম্বিত ভাঙল, এক গম্ভীর গলার হঠাৎ চীৎকারে। বিক্রমগড়ের ওই রাস্তাটা ধরে গেলে যাদবপুর তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যাবে – তাই সুরজিত বাইক নিয়ে তড়িঘড়ি ঢুকে পড়েছিল ওই রাস্তায় গলফগ্রীণ থেকে। কে জানত এখানে জনসভা করে দেশোদ্ধার করবে কোন এক রাজনৈতিক দল। রাস্তায় চেয়ার পেতে চায়ের কাপ হাতে লোকজন বসে মাথা নেড়ে শুনছে লম্বা চওড়া বুকনি।

তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়েই এই বিপত্তি। কি আর করা, বাইক থেকে নেমে স্টার্ট বন্ধ করে হাঁটতে হল বেশ কিছুটা পথ। ঘড়ির কাঁটা বোঝাল চার মিনিট নষ্ট হয়েছে। আবার সুরজিত সওয়ার হয়। প্রচণ্ড গতিবেগে সে ধাবিত হয় গন্তব্যের দিকে। হিসেব মত ডান হাতের গলির দ্বিতীয় সাদা বাড়িটার সামনেই শেষ হবে তার যাত্রাপথ। বাইকের স্টার্ট বন্ধ করে পিৎজার গরম বাক্সটা বার করতে গিয়ে চোখ পড়ল ঘড়ির দিকে – সাড়ে নটা ছুঁই ছুঁই। মনে হল তার পকেটে রাখা মোবাইল ফোনে টুংটাং করে বোধহয় একগাদা এসএমএস ঢুকল। কিন্তু সেদিকে দেখবার সময় নেই। দরজার বেল বাজাতেই একটি মিষ্টি মধুর পিয়ানোর সুর বেজে উঠল ওপারে। এক বুক শঙ্কা নিয়ে সুরজিত কেতাবী ঢংয়ে বলে উঠল “স্যার – পিৎজা এ্যাট ইউর ডোর স্টেপ – গুড ইভনিং!!” দরজা খুলে গেছে। “কটা বাজে আপনার ঘড়িতে ভাই”, ঠাণ্ডা গলায় বললেন সেই ভদ্রলোক – যিনি ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন সুরজিতের সামনে। “আপনি এই ডেলিভারিটা ফেরত নিয়ে যেতে পারেন – ইউ আর বিয়ন্ড টাইম, ঐ ঠাণ্ডা খাবার আমরা খাব না”।

এরকম ছোটখাট দেরী মাঝেমাঝেই হয় কিন্তু আজ পর্যন্ত কখনো সুরজিতকে এভাবে ফিরে আসতে হয়নি। “ স্যার – খুবই দুঃখিত, আসলে রাস্তাটা একটু ক্রাউডেড ছিল – আর আজকের দিনটা তো একটা বিশেষ দিন – সো সার্ভিস ইস্‌ লিটল স্লো ............” সুরজিত বলিষ্ঠ ভাবে বলবার চেষ্টা করে। “দ্যাটস্‌ ইউর প্রবলেম – নট মাইন, আপনি ফেরত নিয়ে যান ওগুলো”। মুহূর্তের মধ্যে সুরজিত বুঝতে পারে এতগুলো দামী খাবার এভাবে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া মানে এ মাসের মাইনে থেকে একটা বড় ধাক্কা। ঝিনুকের মুখটা মনে পড়ে। ও মুখ ফুটে চায়নি, কিন্তু ভেবেছিল আজ বাড়ি যাবার পথে একটা উপহার কিনে নিয়ে যাবে। সেটাও কি কিনতে পারবে সে ? সাহস করে এবার সুরজিত শেষ চেষ্টা করল। “স্যার – আপনি একটু বোঝবার চেষ্টা করুন ............”।

“জিৎ” –

পরিচিত গলাটা হঠাৎ যেন বিদ্যুতের শিহরণ খেলিয়ে দিয়ে গেল সুরজিতের সারা শরীরে। তার খুব চেনা এ গলার স্বর – ডাকবার ভঙ্গী, সম্ভাষণ। ততক্ষণে আলো আঁধারি ভেদ করে সে দেখতে পেয়েছে পিকুকে। বয়স বেড়েছে পিকুর; একটু স্থুলকায় “তুমি কেমন আছ ? ভেতরে এসো”। সুরজিত দাঁড়িয়ে। প্রায় এক যুগ আগে যে সময় হঠাৎ দাঁড়িয়ে, পড়েছিল তার মতই। বোঝা গেল অন্দরমহলে একটা ছোট খাট পার্টি চলেছে। সুরজিত কোনরকমে শুকনো গলা থেকে আওয়াজ বার করল” পিকু তোমরা এখানেই থাক ? শুনেছিলাম যে দিল্লী চলে গেছ। “গেছিলাম। একবছর হল কলকাতা ফিরে এসেছি। ভেতরে এসো জিৎ - প্যাকেটগুলো দাও – কত হয়েছে” ? যান্ত্রিক মানবের মত প্যাকেটগুলো হাতে দিল সুরজিত, সঙ্গে রঙীন বিল “পিৎজা কিংস” এর। “আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী। কৃষ্ণেন্দুর বন্ধুবান্ধব এসেছে। তাদের জন্যই এগুলো”। সুরজিত মুহূর্তের মধ্যে পাকা সেলসম্যান হয়ে ওঠে, “ম্যাডাম, একবার দেখে নিন – গরম আছে কিনা আর সবরকম স্পাইস আর সসের প্যাকেটগুলো দিয়েছে কিনা – প্লিজ দেখে নিন”। “জিৎ তুমি বস আজ এতদিন পরে দেখা আমাদের – তুমি রাতে খেয়ে যাবে। পিকু ঠিক আগে যে ভাবে সিদ্ধান্ত নিত নিজের মত করে – ঠিক সেভাবেই কথাগুলো বলল সুরজিতের মাথায় হঠাৎ যেন পাথরের ইমারতে শাবল মারার শব্দ হতে লাগল। একটা অন্ধকার রাস্তায় মনে হল সে দৌড়ে চলেছে, কালো আকাশের ক্যানভাসে তারায় তারায় কিছু দিগ নির্দেশ। কোনরকমে টাকাগুলো পকেটে গুঁজে, একছুটে বেরিয়ে এলো সে রাস্তায়। ফুটপাতের ছাতিম তলার নীচে দাঁড়িয়ে তার বাইক – পেছনে জ্বলজ্বল করছে লাল রঙে লেখা “পিৎজা কিংস”। যেন ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। এক মুহূর্তে সময় নষ্ট না করে সে চেপে বসল তার উপর। ধাতব স্টার্ট তুলে রওনা হল তার বাহন।

     সুরজিত চলেছে তার পক্ষীরাজে রাতের হাওয়া এসে চাবুক মারছে তার কানের পাশে। কে যেন লিখেছিল সেই গানটা “মগজে কারফিউ”? চলন্ত দ্ধিচক্রমানের চাকার ঘর্ষণে সেখানে যে ঠেলে উঠেছে স্মৃতির চকমকি। পেরিয়ে যাচ্ছে সে তালডাঙার পুকুর, মেটে মসজিদ, নিয়ন রাঙানো ফ্যাক্টরি গেট, গলফক্লাবের মাঠ – আর একটু পড়ে শেষ হবে যাত্রাপথ। ফেলে আসা পথ ভুলে যেতে চায় সে। এখন তার লক্ষ্য একটাই – দশটা বেজে দশ মিনিটে বাড়িতে ঢুকে তাকে দাঁড়াতে হবে ঝিনুকের সামনে – শুকনো হাসি আর চলতে চোখের জল নিয়ে বলবে “খেতে দাও খিদে পেয়েছে খুব” ...........................

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?