গল্প সমগ্র ৮

  • চড়ুই পাখি ও জ্যৈষ্ঠকথন - আবু রাসেদ পলাশ 

  • পুরস্কারের মূল্য - দিলীপ ঘোষ

  • তিলোত্তমা - সুব্রত মজুমদার 

  • বিবর্ণ কৃষ্ণচূড়া - বিবেক পাল

  • আমার দ্বৈত জীবন - সুব্রত মজুমদার

  • জন্মদিনের পায়েস - অয়ন দাস  

                                 চড়ুই পাখি

                                    ও জ্যৈষ্ঠকথন

আবু রাশেদ পলাশ

.....অবশেষে মৃদুলের কাছে দোলার চিঠি আসে শেষবার। হলুদ খামে মোড়ানো নীলরঙা চিঠি। চিরকুট সদৃশ, তাতে লেখা - 'আমি অপেক্ষায় আছি মৃদুল, এসে নিয়ে যাও শিগগির'। সম্পর্কে দীর্ঘবিচ্ছেদ মানুষে মানুষে দূরত্ব সৃষ্টি করে ক্রমাগত। আজ অনেকদিন দোলার বিশেষ খোঁজ জানে না মৃদুল। ....

বশেষে মৃদুলের কাছে দোলার চিঠি আসে শেষবার। হলুদ খামে মোড়ানো নীলরঙা চিঠি। চিরকুট সদৃশ, তাতে লেখা - 'আমি অপেক্ষায় আছি মৃদুল, এসে নিয়ে যাও শিগগির'। সম্পর্কে দীর্ঘবিচ্ছেদ মানুষে মানুষে দূরত্ব সৃষ্টি করে ক্রমাগত। আজ অনেকদিন দোলার বিশেষ খোঁজ জানে না মৃদুল। ও যেদিন অভিমান করে ঘর ছেড়েছিল, তারপর কতবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে মান ভাঙেনি দোলার। বারংবার বিভিন্ন অজুহাতে এড়িয়ে গেছে তাকে। এক এক করে দিন গেছে। পথিমধ্যে চশমাবিহীন খোলা চোখে চশমা এঁটেছে একজন। দোলা কি জানে, বিচ্ছেদের দীর্ঘসুত্রিতায় মৃদুলের জীবনে পরিবর্তন কতটুকু?

  আজ অফিসে যায় নি মৃদুল। সকালে একবার কালবৈশাখী হয়েছে নিজের মধ্যে। দোলার চিঠি হাতে পেতেই বুকে চিনচিন ব্যথা হয়েছে তার। একদিন বিশ্বনাথপুর একটা ছোট দু-চালা ঘর নিয়ে সংসার পেতেছিল দুজন। চড়ুই পাখি সদৃশ উনিশ বছর বয়সী একটা কিশোরী মেয়ের অগোছালো সংসার। বাড়ির উঠানে ফুলের বাগান, ভেতরে অকারণ অভিমান আর আড়ালে স্বামীভক্তি। কত সুখী ছিল ওরা! দোলার লাগানো ফুল গাছগুলো মরে গেছে এখন। মাহীন নবজাতক নিরাপদ কতখানি? দোলার অবর্তমানে এগুলোকে বাঁচাতে পারেনি মৃদুল। এবার ফিরে এলে এ দৃশ্য হয়তো মর্মাহত করবে ওকে। অভিমান করে হয়তো হাতের কাছে থাকা কাঁচের প্লেটটা ছুঁড়ে দিবে মৃদুলের দিকে। তারপর আহত মৃদুল আর্তনাদ করলে হয়তো সেই কেঁদে একাকার হবে তখন। মন্দ কি, এর আগেও এমন হয়েছে। তখন তো খারাপ লাগে নি মৃদুলের। এমনই কিছু অগোছালো ভাবনা এলে অন্যমনস্ক হয় মৃদুল । তারপর মোবাইলের রিংটোন বাজলে সম্বিত ফিরে পায় সে । ওপারে কণ্ঠ শুনা যায়, 

- 'অপেক্ষা করো মৃদুল, বাইরে যাব দুজন।'

  আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আপাদমস্তক পাতাঝরা বৃক্ষের ন্যায়। বিশেষ কোন সৌন্দর্য নেই এদের। দৃষ্টি গেলে কেমন হাহাকারবোধ হয় নিজের মধ্যেই। আমাদের মৃদুল আগাগোড়া মধ্যবিত্তের প্রতিচ্ছবি। কর্মজীবনে উপজেলা শিক্ষা অফিসে স্বল্প বেতনে চাকরি শুরু করেছিল সে। সম্প্রতি সেখানে পদন্নতি হয়েছে তার কিন্তু বেশভূষায় পরিবর্তন ঘটেনি তেমন। উঁচুদরে কেনা কাপড়গুলো আলনাতে সাজানো থাকে তদ্রুপ। মাঝেমাঝে শখে পরে আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে কেমন বেমানান ঠেকে তার। মৃদুল এমনই।

  ধনুয়া গ্রামে উসমান সাহেবের বাড়িটা হাটখোলা বাজারের কূলঘেঁষে। লোকে বলে তালুকদার বাড়ি। মেয়ে দোলা মৃদুলের সংসার থেকে ফেরার পর বাবার বাড়ি এসে থাকে। স্থানীয় একটা স্কুলে বাচ্চাদের পড়ায় সে। দুরন্ত শিশুগুলো চোখের সামনে আনাগোনা করলে মাতৃত্বের সাধ জাগে নিজের মধ্যে। অভিমানের বিষবাষ্পে পুড়ে যে মৃদুলকে একদিন ত্যাগ করেছিল সে, আজকাল তারই অভাববোধ হয় খুব। পিদিম নেভা রাতে একাকি বিছানায় শুয়ে থাকলে ওর স্পর্শ অনুভব করে সে। যাকে নিজের দেহ মন সঁপে দিয়েছে দোলা তাকে কি ভুলা যায়? বারংবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে সে। পরদিন আতিয়া বানু কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে দেয় - 'মৃদুলরে আসতে বলছি মা । ও এলে ফিরে যাব কিন্তু?' আতিয়া বানু আপত্তি করে না তাতে । মেয়ের সুবুদ্ধিতে বরং খুশি হয় সে।

  বিশ্বনাথপুর সরকারি কলেজে পড়ার সময় বড়বাজারের কাছে একটা মেসে থাকত মৃদুল। পনের-বিশ জন উড়নচণ্ডী ছেলেদের অগোছালো জীবন ছিল ওটা। মৃদুলদের সংসারে অভাব ছিল তখন। নিজের খরচ জোগাতে টিউশনি করত সে। স্নাতকোত্তর পড়ার সময় একই কলেজের দিনার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল মৃদুলের। সাদা-কালো জীবনে ঐ একজনের সাথেই মিশেছে সে। তখন কত সুখময় মুহূর্ত ছিল ওদের! দিনাদের সচ্ছল পরিবার ছিল। ওর ছোটভাই শিহাব অংক পড়তো মৃদুলের কাছে। সুযোগ পেলে শহরের রাস্তা ধরে হাঁটত দুজন। এ নিয়ে বন্ধুদের কাছে একবার বিপাকে পড়তে হয়েছিল মৃদুলকে। শরতের কোন এক বিকেলে গাঁয়ের পথ ধরে হেঁটেছিল দুজন। শহরমুখি যে সড়কটা ধনুয়া গ্রামের দিকে চলে গেছে সে সড়কের পাড় ধরে হেঁটেছিল ওরা।  

টনাচক্রে মেসের ছেলেদের সামনে পড়েছিল মৃদুল। সন্ধ্যায় মেসে ফিরলে শত সহস্র প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল তাকে - 'মেয়েটা কে রে মৃদুল?'

- 'কেউ না, পরিচিত।'

- 'পরিচিত? তাই বল।'

  সেদিন সবাই হেসেছিল ওদের নিয়ে। তারপর নানা অজুহাতে দিনাকে নিয়ে ক্ষেপাত সবাই। মৃদুলের অস্বস্তি হত মাঝেমাঝে। দিনাকে ভাল সে বাসেনি কখনই। অথবা ওকে ভালবাসা সম্ভবও ছিল না তার। মৃদুল খুব ভাল করেই জানত অন্তরঙ্গতা ওদের যতই হোক দূরত্ব ওদের আকাশচুম্বী। কিন্তু মন? তাকে বাঁধার সাধ্য কার? স্নাতকোত্তর পাশ করার পর মৃদুল বুঝেছিল দিনাকে হয়তো ভালবাসে সে।

ততদিনে দিনা সংসার পেতেছে অন্য কোথাও। স্নাতকোত্তর শেষ করে বেকার বসে থাকার উপায় ছিল না মৃদুলের। ওদের সংসারে তখন নিদারুণ অভাব। সেবার বিশ্বনাথপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসে চাকরিটা দিনার তদবিরে পেয়েছিল সে। সে সুত্রে দিনার প্রতি কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই তার। চাকরি পাওয়ার পর মৃদুলের মধ্যে পরিবর্তন আসে সামান্য। ওদের সংসারে সচ্ছলতা আসে ধীরে ধীরে। মাস শেষে বাড়ি গেলে বিয়ের তাগিদ দেয় মা। ছেলেকে সংসারি দেখার ইচ্ছে তার । মা বলে - 'চাকরি অইচে অহন একখান বিয়া কর বাপ।'

- 'বিয়ানি ? দিলে সবুর দেও কয়দিন।'

- 'উসমান সাবরে কইয়ে থুইচি, মাইয়া দেখ শিগগির।'

আক্তিয়ারা বেগম পীড়াপীড়ি করলে পাকা কথা দিতে হয় মৃদুলকে। দোলা মেয়ে ভাল, দেখতেও বেশ। ওর সাথে বিয়ে হলে অসুখি হবে না মৃদুল। তারপর একদিন স্বাভাবিক নিয়ম মেনে বিয়ে হয়ে যায় দুজনের। উঠতি যৌবনে দিনার প্রতি ভাললাগা হয়তো দিনকে দিন নিজের মধ্যে পোষে রাখে মৃদুল। কিন্তু সংসার ধর্মের মোহে পড়লে সত্য অব্যক্তই থেকে যায় দোলার কাছে।

  বিয়ের পর দোলাকে নিয়ে একটা ভাড়া বাসায় উঠে মৃদুল। একটা ছোট সংসার হয় ওদের। সংসারে সচ্ছলতা সামান্যই, কিন্তু সুখবোধ ষোল-আনা। সেখানে দোলার কৈশোরিক চপলতাগুলো বর্তমান। মাঝেমাঝে ছোট ছোট ব্যাপার নিয়ে খুনসুটি হয় ওদের। তারপর অকারণ কেঁদে চোখ ভাসায় কিশোরী। ও অভিমান করলে সহসা কাছে আসার সাহস করে না মৃদুল। তবুও একসময় ভয়ে ভয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় সে। তারপর বলে - 'অভিমান ভুলো পাখি, খিদে পাইছে যে।' তাৎক্ষনিক কথা বলে না দোলা। ও কথা না বললে উল্টো রেগে যায় মৃদুল। তারপর মান অভিমানের একপালা গান হয় দুজনের মধ্যে। অবশেষে বশ্যতা স্বীকার করে দোলা। তারপর বলে - 'খেতে আস আমারও খিদে পাইছে খুব।'

অবসরে দোলাকে নিয়ে পাড়া ঘুরে মৃদুল। বিশ্বনাথপুর ছোট থানা শহর। দুরন্ত যৌবনের বেশিরভাগ সময় এখানে কেটেছে তার। এ শহরের প্রতিটা গলি মুখস্ত ওর। দোলা আবদার করলে গাঁয়ের মেঠোপথ ধরে হাটে দুজন। সুবিস্তৃত ধানক্ষেতের আইল ধরে হাটে ওরা। দূর্বাঘাসে তখন কিশোরীর নরম পায়ের চিহ্ন পরে। সময় ধরে ওর নিগুঢ় মুগ্ধতায় মেতে থাকে মৃদুল। কথা বলে না সহসা। দোলা বলে - 'কি দেখ অমন করে?' মৃদুল বলে - 'কিছু না, চল যাই।' সেদিন একটু দেরি করে বাড়ি ফিরে ওরা।

  মৃদুলের সংসারে মানুষ ওরা দুজন। সুযোগ পেলে আক্তিয়ারা বেগম এসে ঘুরে যায় এখান থেকে। দোলার ব্যস্ততা বাড়ে তখন। অগোছালো সংসারে স্থিরতা আসে দুজনের মধ্যে। আক্তিয়ারা বেগম মেজাজি মানুষ। কড়া করে কথা বলেন তিনি। দোলার খারাপ লাগে না। একাকি সংসারে কথা বলার মানুষ পেলে খুশি হয় সে। সপ্তাহ খানেক থেকে বিদায় নেন আক্তিয়ারা বেগম। যাওয়ার আগে দোলাকে নিভৃতে ডেকে বলে যায় - 'আর কতদিন একলা থাকবা গো নাতির মুখ দেখাও শিগগির।' দোলা কথা বলে না সহসা। আক্তিয়ারা বেগম বিদায় নিলে অদ্ভুত ভাবনায় পরে সে। মৃদুল এলে শিহরণ হয় নিজের মধ্যে। চড়ুই পাখি সদৃশ যে চপলমতি কিশোরী অল্পপরিচিত একজনের হাত ধরে এখানে এসে সংসার পেতেছে, সে যে ইতোমধ্যেই পাকাপোক্ত গৃহিণী হয়ে উঠেছে দোলাকে দেখে সহজেই তা অনুমান করা যায়। মৃদুলের ভালবাসাপূর্ণ দায়িত্বশীলতা মুগ্ধ করে তাকে। তারপর রাতে একই বিছানায় শুয়ে স্বপ্ন বুনে দুজন। ভাঙা ভাঙা অগোছালো স্বপ্ন, রুপকথার ন্যায় যেখানে না বলা কত কথা ভাষা পায়।

  চৈত্র মাসের গোঁড়ার দিকে ব্যস্ততা বাড়ে মৃদুলের। চাকরির অজুহাতে রাত করে ঘরে ফিরতে হয় তাকে। একাকি সময়ে ঘরে বিড়াল পোষে দোলা। ওর পোষা বিড়ালটা চারপাশে আনাগোনা করে সারাদিন। উঠানে লাগানো ফুলগাছগুলো পরিচর্যা করে সময় ধরে। রাতে ক্লান্ত মৃদুল বাড়ি ফিরলে আহ্লাদিত হয় সে। নিজের কৈশোরিক চপলতাগুলো প্রকাশ করতে গেলে ধমক দেয় মৃদুল। আবার মনক্ষুন্ন হয় দোলা। তবে অভিমান ওদের দীর্ঘস্থায়ী হয়না কখনই।

আশ্বিনে ভরা পূর্ণিমা হয়। চাঁদের আলো এসে মৃদুলের বাড়ির উঠানে আশ্রয় নেয়। মৃদুল আর দোলা উঠানে বসতি গড়ে তখন। ঝি ঝি পোকার আওয়াজগুলো ক্রমশ ম্লান হতে হতে থেমে যায় একসময়। দুজনের ঘোর কাটে না সহসা। ওরা জেগে থাকে রাতের শেষ অবধি।মৃদুল আর দোলার সংসার হয়তো সারাজীবন এমনই হতে পারতো যদি ওদের জীবনে অযাচিতের মত দিনার আগমন না হত। একদিন ভালবেসে যে মানুষটার হাত ধরে ঘর ছেড়েছিল দিনা সম্প্রতি তার সাথেই সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটেছে তার। জীবনের এ কঠিন সময়ে নিজের বাবা-মার কাছেও উপেক্ষিত সে। শিহাবটাও কেমন পরিবর্তন হয়ে গেছে এখন। অবশেষে নিরুপায় দিনা মৃদুলের সংসারে এসে উঠে। দোলা আপত্তি করে না তাতে। শহুরে জীবনে দিনা নামে মৃদুলের বন্ধু ছিল কেউ এটা দোলা শুনেছে ওর কাছেই। আপনজনের কাছে বিতাড়িত দিনা মৃদুলের সংসারে আশ্রয় পেলে স্বস্তি আসে ওর।

মৃদুলের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ভেতরে ভেতরে বাঁচার প্রেরণা দেয় তাকে। সবুজের কথা মনে হলে দুঃখ পায় সে । মৃদুল বলে -'আবার সংসারে ফিরে যা দিনা।'

দিনা বলে - 'সাধ্য কই, জোর করে ঘর হয় কি?' 

এরপর দিনে দিনে পরিবর্তন হয় মৃদুল স্বয়ং। দিনার আগমনের পর কাজে মনোযোগ কমে ওর। সুযোগ পেলে দিনাকে সময় দেয় সে। দিনার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তার। দুঃসময়ে দিনা কি না করেছে ওর জন্য! বিশ্বনাথপুর শহরের কূলঘেঁষে যে নদীটা অজানার উদ্দেশ্যে বহমান তার পাড় ধরে হাটে ওরা। 

পরিচিত কেউ দৃষ্টিগোচর হলে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে দুজনই। তারপর ফেরার পথে হয়তো রাতের খাবার খেয়ে বাড়ি ফিরে দুজন। চপলমতি দোলা মৃদুলের জন্য অপেক্ষা করে বাড়িতে। নিশীথের অন্ধকার ঘনতর হলে তাড়া দেয় '- খেতে এসো মৃদুল।                       

মৃদুল বলে - 'খেয়ে আসছি চড়ুই পাখি। খেয়ে নাও তুমি।'

আজকাল মৃদুলের কথায় সহজেই মন খারাপ হয় দোলার। এটা নতুন নয়। ওদের সম্পর্ক হাটখোলার আচারের ন্যায়, টক-ঝাল। সেখানে অভিমান কতবারই তো হয়েছে। তবে দোলার আজকের এ মন খারাপ অন্য কারণে। মৃদুলের পরিবর্তনটা সহজেই বুঝতে পারে সে। অথচ এমন সে কখনই ছিল না। রাতে একই বিছানায় শুয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয় দোলা, মৃদুলের কাছে সেটা অজানায় থেকে যায় দিনের পর দিন। এরপর মৃদুলের কাছে নিজেকে কেমন অস্তিত্বহীন ঠেকে দোলার। সম্পর্কে হয়তো সন্দেহ ডুকে তখনই।পালপাড়ার অবিনাশ মৃদুলের বাল্যবন্ধু। দোলাদের পাশের গ্রামে থাকে সে। দোলার সাথে পরিচিত বিয়ের আগে থেকেই। এখন নিউমার্কেটে কাপড়ের ব্যবসা করে সে। এর মধ্যে একদিন কোন কাজে বাইরে গেলে দোলার সাথে দেখা হয় অবিনাশের। অবিনাশ জোড়াজুড়ি করলে একটা কফি হাউজে গিয়ে বসে দুজন। অবিনাশ বলে,

- 'মৃদুলরে দেখলাম সেদিন দিনার সাথে।'

দোলা বলে - 'ওর বন্ধু, তোমারো বোধহয়?'

- 'না, আমার না।'

একই কলেজে পড়ার সুবাদে দিনা পরিচিত অবিনাশের কাছে। তবে ওদের বন্ধুত্ব হয়নি কোন কালেই। পরক্ষণে দোলা ফিরতে আগ্রহী হলে অবিনাশ বলে, 

- 'সংসারে বারোমাস জ্যৈষ্ঠমাস। সামাল দিস দোলা।'

অবিনাশের কথার অর্থ বুঝে না চপলা। বাড়ি ফিরলে অজানা আশংকায় ভেতরে বিনাভাষী আর্তনাদ হয় তার। তারপর একদিন মৃদুলের দৃষ্টির অগোচরে ওর পুরনো বইপত্র ঘাঁটতে গেলে সত্যি আবিষ্কৃত হয়। কোনকালে দিনার প্রতি ভাললাগা ছিল মৃদুলের। এ সত্য আজও দোলার কাছে প্রকাশ করেনি মৃদুল। এরপর সম্পর্কে বিষ ঢুকে দুজনের। মৃদুলকে সহসা বিশ্বাস করতে পারে না দোলা, কেমন নপুংসক মনে হয় যেন!

  এর কিছুদিন পর এক রাতে ঘুম ভেঙে যায় দোলার। মৃদুল তখন নিজ শয্যায় অনুপস্থিত। সন্ধানী চক্ষুযুগল কৌতূহলি হলে দিনার ঘরে মৃদুলের অস্তিত্ব আবিস্কার করে সে। ওরা কি যেন ব্যাপার নিয়ে কথা বলে সময় ধরে। মৃদুল আর দিনার কথাগুলো স্পষ্ট বোঝা যায় না দোলার ঘর থেকে । সত্য সন্ধানে অপারগ দোলা ভেতরে ভেতরে অশ্রু বিসর্জন দেয়। মৃদুল ঘরে ফিরলে সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয় দুজনের মধ্যে। দোলা বলে,

- 'আসলা যে, পুরনো প্রেম তাই না?'

তারপর এক-দুই কথায় কলহ করে দুজন। সকালে মৃদুল ঘুম থেকে উঠে দেখে ঘরে নেই দোলা। ধলপ্রহরে বাপের বাড়ি গিয়ে উঠে সে।

এরপর বেশ কয়েকবার দোলাকে ফেরানোর চেষ্টা করেছে মৃদুল। রাজি হয় নি মেয়েটা, রীতিমত অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে তাকে। এরপর আশাহত মৃদুল আর কোনদিন আনতে যায়নি দোলাকে। মাঝখানে কেটে গেছে দুটো বছর।

প্রথম জীবনে দোলার অনুপস্থিতি বিধ্বস্ত করেছিল মৃদুলকে । আশাহত দিনগুলোতে দিনার ভালবাসাপূর্ণ হাতের স্পর্শ ছিল ওর উপর। সে দিনগুলোতে দিনা কি না করেছে ওর জন্য! ওর অগোছালো সংসারকে বাঁচিয়েছে সে। দিনে দিনে দিনার প্রতি নির্ভরতা বেড়েছে মৃদুলের। এরপর কখন যে বিবাহ বহির্ভূত একটা নিষিদ্ধ সম্পর্কে জরিয়েছে দুজন জানা হয়নি আজও। সে সম্পর্ক শয্যা অবধি আসতে সময় নেয়নি বেশিদিন। এখন ওরা আত্মার আত্মীয়। সম্পর্ক ওদের দেহ-মন মিলেই। কি এক উদ্ভট বিশ্বাসে বেঁচে আছে দুজন! যেখানে দুজনের মনের মিল সেখানে বিয়ের গুরুত্ব কি?

  দোলা যে এতদিন পর ফিরতে চাইবে মৃদুলের জীবনে ভাবেনি মৃদুল। আচমকা ভাবনার দোলাচলে পড়লে পিষ্ট হয় সে। যেন করাত কাঁটার মত করে নিজেকে ফালাফালা করে কেউ। দিনার কাছে সত্যি অপ্রকাশিত। এখন সম্পর্কে দুজন স্ত্রী তার। একজন ধর্মমতে অন্যজন মৌনসম্মতিতে। আজকাল মৃদুল অন্যমনস্ক থাকলে দৃষ্টি এড়াই না দিনার। একদিন যেচে জানতে চায় সে,

- তুমি কেমন বদলে গেছ, কিছু হয়েছে কি?'

দিনার কথার সদুত্তর দেয় না মৃদুল। এরপর একদিন ধনুয়া গ্রামে দেখা যায় তাকে। ও এলে আহ্লাদিত হয় দোলা। তারপর বড় পুকুরের পাড়ে বসে গল্পের ঝাঁপি খোলে সে। 

- 'চোখে চশমা নিছ কতদিন হল?'

- 'অনেকদিন।'

- 'হাতের কবজটা ফেলে দিছ তাই না?'

- হুম, বিশ্বাস নেই আমার।'

- আমার যে আছে। বিড়ালটা এখনও আছে, আমার ফুলগাছগুলো?'

সহসা জবাব দেয় না মৃদুল। দোলার ছেলে মানুষীতে নিজেকে বেমানান ঠেকে তার। সে বলে,

- 'কিছু বলব আজ, ভুল বুঝো না পাখি। অবশেষে সত্যি প্রকাশিত হয় দোলার কাছে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে দিনাকে নিয়ে সুখী হতে চায় মৃদুল। এ জীবনে মৃদুল ব্যতিত দোলার হয়তো সব আছে। কিন্তু দিনার জীবনে মৃদুল ছাড়া কেউ নেই আর। মনের অগোচরে যে মানুষকে নিজের সহচর ভেবেছে দিনা, অকস্মাৎ তার প্রস্থান হয়তো মৃত্যুর কারণ হবে ওর। 

মৃদুলের বলা সহজ সত্যিগুলো বাকরুদ্ধ করে দোলাকে। উসমান সাহেবের কাছে সত্য উন্মোচিত হলে হুংকার করে সে। তাতে বাঁধ সাধে দোলা। সে বলে,

- 'ওরে যেতে দেও বাবা, আমি ভাল থাকব নিশ্চয়।'

মৃদুল বেড়িয়ে এলে বাঁশের দেউরির পাশে এসে দাঁড়ায় দোলা। প্রিয়তমের প্রস্থান দৃশ্যে অশ্রু বিসর্জন দেয় সে। দোলাদের বড়ঘরের কোণায় চড়ুই পাখি বাসা করেছে সম্প্রতি। একদিন ওদের দিকে দৃষ্টি গেলে নিজের কথা মনে হয় দোলার। মৃদুলের চড়ুই পাখি বাপের বাড়িই আশ্রিতা। ওর চোখের পানি চোখে শুঁকিয়েছে কবেই, এখন সেখানে শুধুই জ্যৈষ্ঠের খরা।      

                                পুরস্কারের

                                                     মূল্য

দিলীপ ঘোষ, সিঙ্গাপুর

...সারা হল যখন হাততালিতে ফেটে পড়ছে, প্রিন্সিপ্যাল মাইকটা ভোলানাথ বাবুর হাতে দিয়ে বলেন “আমাদের স্কুলের ছাত্রদের জন্য কিছু বলুন।” কোন মতে চোখের জল মুছে বলেন “মানুষ হও মানুষের জন্য।”  

  সুরঞ্জনবাবু প্রিন্সিপ্যাল হবার পর থেকেই ‘কলকাতা ভ্যালু স্কুলে’ একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যেন একটা নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে স্কুলের শিক্ষা পদ্ধতিতে। কেবলমাত্র পুঁথিগত শিক্ষা ছাড়াও উনি চান ছাত্রদের নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন। সুরঞ্জনবাবু মনে করেন আজকের সমাজের মানবিক অবক্ষয়ের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় নতুন প্রজন্মকে সঠিক ভাবে গড়ে তোলা। ওনার নির্দেশমতোই ‘ভ্যালু এডুকেশনের’ ওপর যোগ করা হয়েছে একটা ক্লাস, তাছাড়া শুরু হয়েছে ছাত্রদের দিয়ে সমাজের বিভিন্ন সেবামূলক কাজ।   
  এবছর প্রিন্সিপ্যাল ঘোষণা করেছেন যে বাৎসরিক পুরস্কার প্রদানের দিন পরীক্ষায় কৃতি ছাত্রদের পুরস্কৃত করার সাথে আর একটি বিশেষ পুরস্কারপ্রদান করা হবে, তবে কি ভাবে হবে সেই নির্বাচন তার কোনও উল্লেখ করা হয় নি। সেই থেকেই ছাত্র এবং অভিভাবকদের মধ্যে বেশ কৌতূহল জন্মেছে – কি সেই বিশেষ পুরস্কার?

প্রতি বছর পুরস্কারপ্রদানের এই অনুষ্ঠানটা বেশ ঘটা করে অনুষ্ঠিত হয়। এবছরও ফাংশন হল ভিড়ে ঠাসা এবং প্রতিটা অনুষ্ঠানের শেষে হাততালির শব্দই বলে দিচ্ছে যে অনুষ্ঠানটা সকলেই বেশ উপভোগ করছেন। কিন্তু প্রথম থেকেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে আজ শতচ্ছিন্ন গেঞ্জি এবং লুঙ্গি পরা এক বৃদ্ধ মানুষ প্রিন্সিপ্যালের সাথে এসেছেন এই অনুষ্ঠান দেখতে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শেষে প্রিন্সিপ্যাল যখন ওই মানুষটাকে মঞ্চে নিয়ে গিয়ে ঘোষণা করেন যে আজকের অনুষ্ঠানের স্কুলের বিশেষ অতিথি ভোলানাথ নস্কর, সকলের বিস্ময় আরও বেড়ে যায়। সংক্ষিপ্ত ভাষণের শেষে প্রিন্সিপ্যাল ঘোষণা করেন 'অনুগ্রহ করে শুনবেন, এক বিশেষ কারণে এবছর ক্লাস ফাইভের প্রথম পুরস্কারটি কোন ছাত্রকে প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না, এর জন্য আমরা দুঃখিত।'
কথাটা ঘোষণার সাথেই এক চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে  'সে কি কথা? সায়ন্তন প্রাইজ পাবে না, তা কি করে হয়? প্রতিবছর সে যে শুধু স্কুলে প্রথম স্থান পায় তাই নয়, স্কুলের বাইরের প্রতিটা প্রতিযোগিতা জিতে স্কুলের নাম উজ্জ্বল করে - সে পুরস্কার কি করে না পায়?' সায়ন্তনের বাবা-মা যেন নিজেদের কানকেই বিশ্বাসই করতে পারেন না,

সায়ন্তনকে জিজ্ঞেস করতে থাকেন 'হ্যাঁ রে, তুই কি জানিস কিছু?' সায়ন্তন মাথা নেড়ে বোকার মত থাকিয়ে থাকে বাবা-মায়ের দিকে। বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই আশপাশে বসে থাকা অভিভাবকদের প্রশ্ন শুরু হয়ে যায় 'আমাদের তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে অমন ভালো ছেলে সায়ন্তন আজ কোনও পুরস্কারই পাবে না? আপনারা কি খবরটা আগে জানতেন?' সায়ন্তনের বাবা একটু মুচকি হেসে জবাব দেন 'আপনারা সকলে যে সায়ন্তনকে এত ভালোবাসেন, সেটাই তো আমাদের কাছে সবথেকে বড় পুরস্কার।' এই অল্প বয়সেই সায়ন্তন নিজের স্কুল ছাড়াও বিভিন্ন আন্তঃ স্কুল প্রতিযোগিতায় এত পুরস্কার পেয়েছে যে একটা পুরস্কার না পাওয়ার জন্য ওর বাবা-মায়ের এতটা বিচলিত হবার কথা নয়, কিন্তু তবুও মনে হয় স্কুলের এই বাৎসরিক পুরস্কারটার যেন একটা অন্য বৈশিষ্ট্য আছে। অফিসে যতই কাজ থাকুক, আজ পর্যন্ত সায়ন্তনের প্রতিটা পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে ওর বাবা উপস্থিত থেকেছেন। এবারও অনেক চেষ্টা করে দিল্লির ট্যুরটা একদিন পিছিয়ে তবে আসতে পেরেছেন এই অনুষ্ঠানে, তবে এমনটা স্বপ্নেও ভাবেননি যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেও ছেলের প্রাইজ নেওয়া দেখা হবে না। কথাটা শোনার পর থেকেই বেশ বিব্রত বোধ করছেন সায়ন্তনের বাবা-মা, ছেলের প্রাইজ না পাওয়ার থেকেও তার কারণটা না জানার জন্য বেশী অস্বস্তি লাগছে তাঁদের। মনে হচ্ছে অনুষ্ঠানটা কখন শেষ হবে।     

পুরস্কারপ্রদান শুরু হয়ে গেছে, এক এক করে ছাত্ররা মঞ্চে উঠে প্রিন্সিপ্যালের হাত থেকে পুরস্কার নিচ্ছে। ক্লাস ফাইভের পুরস্কার পর্বে প্রথম পুরস্কার বাদ দিয়ে সরাসরি দ্বিতীয় স্থানাধিকারির নাম ‘সঞ্জয় দত্ত’ ঘোষণা করতেই দর্শকাসন থেকে দাঁড়িয়ে উঠে সঞ্জয়ের মা প্রিন্সিপ্যালের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন 'আপনার কথামতো এবছর যদি কোন ছাত্র প্রথম স্থান না পেয়ে থাকে, তবে নিয়মমতো সঞ্জয়ের প্রথম পুরস্কারটা পাওয়া উচিত।' একটু চুপ করে থেকে প্রিন্সিপ্যাল বলেন 'প্রথম পুরষ্কারের ব্যাপারে হয়তো একটু বোঝার ভুল হয়েছে, আমি শুধু এইটুকুই জানিয়েছি যে এবছর প্রথম পুরস্কারটি কোন ছাত্রকে প্রদান করা হবে না, তবে তার অর্থ এই নয় যে প্রথম স্থান কেউ পায় নি। সঞ্জয় আমাদের খুবই প্রিয় ছাত্র এবং প্রতি বছরের মতো এবারও সঞ্জয় ভালো ফল করে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে। আশা করি ও নিজের যোগ্যতায় আরও ভালো ফল করবে ভবিষ্যতে।'

পুরস্কারবিতরণ শেষ করে প্রিন্সিপ্যাল দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন 'অনুষ্ঠানটি ধৈর্য সহকারে দেখার জন্য উপস্থিত সকলকে জানাই আমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। বাৎসরিক পুরস্কারপ্রদানের এখানেই সমাপ্তি। এবার অনুষ্ঠানের অন্তিম পর্বে প্রদান করা হবে পূর্বঘোষিত সেই বিশেষ পুরস্কার, তবে সেটি ঘোষণার আগে আমি একটি ছোট্ট কাহিনী বলতে চাই।দৈনন্দিন জীবনে কত ঘটনাই তো ঘটে, কিন্তু কটা আঁচড় কাটে আমাদের মনে? আসলে  আকর্ষণীয় ঘটনা ছাড়া অন্য কিছু চোখ মেলে দেখার প্রয়োজনই বোধ করি না আমরা। বয়স বাড়ার সাথে আমরা নিজ ভাবনায় এতটাই বিভোর হয়ে যাই যে অন্য কিছুই আর আমাদের সেভাবে ভাবায় না। কিন্তু পথচলতি রাস্তায় একটা সামান্য দৃশ্য এড়ায় নি এক কিশোরের দৃষ্টি। গাড়িতে বসে ওই দৃশ্য দেখে বাবাকে আবদার করেছিল যে এরপর বাড়ি থেকে স্কুল যাবার ওই দশ মিনিটের পথ হেঁটেই যেতে চায় সে। ছেলের এই সামান্য আবদার এক কথায় মেনে নিয়েছিলেন ওর বাবা ও মা। তারপর থেকে বাবা-মায়ের হাত ধরে স্কুল যাবার পথে সে করুণ চোখে তাকিয়ে দেখত এক বয়স্ক মানুষের পিঠে মস্ত এক ভারি বস্তা চাপিয়ে দোকান থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক অবধি মাল বহনের বেদনাদায়ক সেই দৃশ্য। বস্তার ভারে নুয়ে পরা শীর্ণকায় মানুষটিকে দেখে জলে ভরে উঠত তার দুচোখ, মনে মনে ভাবতো কি ভাবে সে এই মানুষটার কষ্ট লাঘব করতে পারে?  হ্যাঁ, আমি অত্যন্ত গর্বের সাথে জানাচ্ছি যে এই কিশোরটি আমাদের স্কুলেরই এক অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র, যার মেধার পরিচয় আমরা সকলে আগেই পেয়েছি। আজ আমরা জানবো সমাজে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার কাহিনী, যা আমরা জানতে পেরেছি স্কুলে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক রচনা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। সায়ন্তনের লেখা ওই অনবদ্য রচনাটি শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়েছে। আমি এখন অনুরোধ করছি সায়ন্তনকে মঞ্চে আসার জন্য এবং আহ্বান জানাচ্ছি সায়ন্তনের বাবা-মাকে মঞ্চে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের অনুষ্ঠানের এই বিশেষ পর্বে তাঁদেরকে সামিল করতে। বাবা-মায়ের হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে মঞ্চে এসে ওঠে সায়ন্তন, এগিয়ে এসে ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন ওই বয়স্ক মানুষটা। দর্শকাসনে তখন এক চাপা গুঞ্জন 'একটা সামান্য রচনার জন্য এতো ঘটা করে পুরস্কারের পালা?'
প্রিন্সিপ্যাল আবার বলতে শুরু করেন 'এবার আমাদের সেই বিশেষ পুরস্কারের সময়। আপনাদের অবগতির জন্য জানাই যে এই পুরস্কারটি আমার মায়ের দশম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নিবেদিত আর পুরস্কারের অর্থমূল্য নগদ দশ হাজার টাকা। আমার মা ছিলেন এক উদারমনা ব্যক্তিত্ব, তাঁর মহানুভবতার কথা মাথায় রেখেই এই পুরস্কার। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রতিযোগিতার দ্বারা মানুষ জয় করতে পারে অনেক কিছু, কিন্তু তা দিয়ে চরিত্র গঠন করা যায় না। তাই এই পুরস্কারটি এক মহান উদ্দেশ্যে সৃষ্ট, যা কোনও প্রতিযোগিতার সাথে যুক্ত নয়।
পুরস্কার পেলে খুশী কে না হয়? ‘পুরষ্কারের মূল্য’ নামক ওই রচনা প্রতিযোগিতায় সায়ন্তন লিখেছিল যে প্রতিটা পুরষ্কারের মূল্যই তার কাছে অপরিসীম, তাকে দেয় এক অনাবিল আনন্দ, যোগায় এক বিশেষ অনুপ্রেরণা। কিন্তু অন্যকে দুঃখী দেখেও কি কেউ আনন্দে থাকতে পারে? না, আমাদের সায়ন্তনও তা পারে না, আর তাই সে ইচ্ছা প্রকাশ করে ‘যদি আমার কোনও পুরস্কার ঘোচাতে পারে অন্যের দুঃখ, তবে তাই হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।’ তার একান্ত ইচ্ছা যদি সে এবছর কোনও পুরষ্কারের জন্য মনোনীত হয়, তা দিয়ে ও একটা মাল বহনের ট্রলি গাড়ি কিনে দিতে চায় ওই মানুষটিকে। সায়ন্তনের এই সিদ্ধান্তে আমরা সকলেই অভিভূত। আমার মায়ের নামাঙ্কিত এই পুরস্কারটির এর চেয়ে ভালো সদ্প্রয়োগ আর কি বা হতে পারে? তাই আসুন আমরা সবাই মিলে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানাই সায়ন্তনকে এই ট্রলিটি শ্রীযুক্ত ভোলানাথ নস্করের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।     
সারা হল যখন হাততালিতে ফেটে পরছে, প্রিন্সিপ্যাল মাইকটা ভোলানাথ বাবুর হাতে দিয়ে বলেন 'আমাদের স্কুলের ছাত্রদের জন্য কিছু বলুন।' কোনোমতে চোখের জল মুছে বলেন 'মানুষ হও মানুষের জন্য।' 

 

  তিলোত্তমা

সুব্রত মজুমদার

সুব্রত মজুমদারের জন্ম কলকাতায়। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এন্ড টেক্নলোজি, থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে তিনি পাড়ি দেন সুদূর আমেরিকায়। সেখানেই তাঁর পেশাগত জীবনের পাশাপাশি চলতে থাকে লেখালেখি। নানা ধরেনের ওয়েবজাইনে তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে এবং তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা ও ভিন্ন স্বাদের লেখাগুলি অগণিত পাঠকদের মনোরঞ্জন ও প্রশংসা অর্জন করেছে। লেখকের মূল বৈশিষ্ট্য তাঁর ভ্রমন ও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়তা।

...আমি আশাকে প্রেমপত্র লিখতে শুরু করলাম। না খামের ভিতরে পোরা, সুন্দর রঙ্গিন কাগজে লেখা স্ট্যাম্প আটকানো চিঠি নয়। খাতার পাতা থেকে ছেঁড়া ছোট চিরকুটে লেখা প্রেমপত্র। আমি শুধু তিনটে কথা লিখতাম চিরকুটে - '‘আমি তোমায় ভালবাসি'...

  মনে আছে মেয়েটিকে প্রথম দেখেছিলাম যখন আমি কলেজের ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়তে ঢুকেছিলাম। কলকাতার আশেপাশের কোন একটা ছোট জায়গা থেকে এসেছিল।মনে আছে এই কারণে নয় যে মেয়েটি ডাকসাঁইটে সুন্দরী বা অসাধারন ভালো পড়াশুনায় ছিল বলে। বরঞ্চ উল্টোটাই বলা যেতে পারে। মেয়েটির চেহেরার মধ্যে ছেলেদের আকর্ষণ করার মত বা মেয়েদের হিংসে করার মত কিছু ছিল না। সাধারন সাজ পোষাক পরে সাধারন চেহেরাটাকে আরও সাধারন করে রাখত। মাথার চুলকে টেনে বেঁধে একটা বড় খোঁপা আর সাদা পোষাকেই সবসময়ে দেখতাম তাকে।   কপালে দিত না টিপ ঠোঁটে মাখত না কোন রং।আমাদের ক্লাসে মেয়েদের সংখ্যা ছিল এগারো, ওই মেয়েটি আসার পর হল বারো। আমরা ছেলেরা আড়ালে বলতাম দ্যা ডার্টি ডজন। আমরা লক্ষ্য করলাম যে মেয়েটি কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলে না, নিজের মনে চুপচাপ উদাস হয়ে বসে থাকে। জোর করে প্রশ্ন করলে শুধু হাঁ বা না বলে উত্তর দেয়। কথা বাড়াবার কোনরকম চেষ্টা করেনা। ওকে আমরা হাসতেও কখন দেখিনি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ যেচে আলাপ করতে গিয়েছিল কিন্তু মেয়েটির ঠান্ডা বরফের মত স্বভাবের জন্য বেশি দুর এগোতে পারেনি। অবশেষে সবাই একসময়ে আমরা হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। মেয়েরা বলত ওর নাকি ভীষণ দেমাক, আমরা ছেলেরা সেকথা মানতাম না। মেয়েটির নাম জেনেছিলাম আশা। আমরা অনেক রকম নাম দিয়েছিলাম মেয়েটির। কেউ বলত যোগিণী, কেউ বলত সরস্বতী ঠাকুর আবার কেউ কেউ ডাকতো মাস্টারনী বলে। মেয়েটির ডানদিকের গালের ঠিক মাঝখানে ছিল একটা ছোট্ট কলো রংয়ের তিল। আমি মেয়েটির নাম দিয়েছিলাম তিলোত্তমা।

  খবরটা প্রথম এনেছিল অনন্যা। ওর এক আত্মীয়ের সঙ্গে নাকি আশার বাড়ির লোকেদের চেনাশোনা আছে। ওনারা আশাকে ছোট থেকে বড় হতে থেকে দেখেছেন। ছোটবেলার থেকে আশা নাকি খুব হাসিখুশি স্বভাবের মেয়ে। চেহেরাতেও একটা লালিত্য ছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকে সব কিছু ওলট পালট হয়ে গিয়েছিল আশার জীবনে। জেনেছিলাম আশার বয়স উনিশ। বিয়ে হয়েছিল গ্রামাঞ্চলের এক উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে। বরের বয়স ছিল আশার থেকে অনেকটা বেশি। উপায় ছিল না। একে অভাবের সংসার, তারপর দেখতে ভালো না, রং ময়লা, বিয়ে হচ্ছিল না। বাবা আর মা অনেক ধার দেনা, অনেক পনের বিনিময়ে জামাইকে কিনেছিলেন। কিন্তু সুখ আশার কপালে লেখা ছিল না। বিয়ের প্রথম সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই আশার বর মারা যায় মোটর সাইকেল একসিডেন্টে।শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আশাকে দোষ দেয় তাদের ছেলের মৃত্যুর জন্য। অপয়া আর রাক্ষুসী বলে তাকে অপবাদ দেয়। অনেক কান্নাকাটি অনেক হাতেপায়ে ধরাধরি করেছিল আশা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু কোন কাজ হল না। অবশেষে একদিন শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আশাকে তার বাপের বাড়ি তুলে দিয়ে গেল। অসহায় বাবা মা আর কি করবে, মেয়েকে তো আর ফেলে দিতে পারে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আশাকে তাঁরা আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়ে ছিলেন। জীবনের ওপর বিতৃষ্ণায় আশা একবার আত্মহত্যা করবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সময়মত  

আমার খেলা চলতে লাগল। আমার চিরকুটে লেখা কথার সংখ্যা ধিরে ধিরে বাড়তে লাগল আর সেই সঙ্গে পরিবর্তন হতে সুরু করল আশার ব্যবহারের। আশা আজকাল অন্যদের সঙ্গে কথা বলে, পিছন ফিরে ছেলেদের দিকে তাকায়। ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পায় না, ঠাট্টা ইয়ার্কিতেও যোগদান করে। আমার  কেন যেন মনে হত ধরা পড়ে যাওয়ায় বেঁচে যায়। অবশেষে এক কাকিমার প্রশয়ে আশা ঠিক করে ও পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কাকিমাই সব খরচা বহন করার ব্যবস্থা করেন। সব শোনার পর আশার ওপর আমাদের মন দুঃখ আর সহানুভুতিতে ভরে উঠেছিল। আমার সব বন্ধুরাই কোন না কোন ভাবে আশাকে তার অজান্তে সাহায্য করার চেষ্টা করত। কেন জানিনা আমি আশাকে কোন সাহায্য করিনি, উলঠে আমি তার সঙ্গে ভয়ানক এক খেলায় মেতে উঠেছিলাম কাউকে না জানিয়ে।

  আমি আশাকে প্রেমপত্র লিখতে শুরু করলাম। না খামের ভিতরে পোরা, সুন্দর রঙ্গিন কাগজে লেখা স্ট্যাম্প আটকানো চিঠি নয়। খাতার পাতা থেকে ছেঁড়া ছোট চিরকুটে লেখা প্রেমপত্র। আমি শুধু তিনটে কথা লিখতাম চিরকুটে - '‘আমি তোমায় ভালবাসি'। তক্কে তক্কে থাকতাম এবং সুযোগ পেলেই সবার অজান্তে আমার লেখা চিরকুটটা আশার বইয়ের দুটো পাতার মাঝখানে গুঁজে দিতাম। তারপর অনামি এক লেখকের চিরকুটে লেখা ওই তিনটি কথা পড়ে আশার কি প্রতিক্রিয়া হয় সেটা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। আদি অনন্ত কাল ধরে চলে আসা পৃথিবী বিখ্যাত এই তিনটি কথায় ঘায়ল  হয়নি এমন মানুষ দুনিয়ায় কোথাও আছে কি না আমার জানা ছিল না। প্রথম চিঠিটা লেখার পর প্রায় তিনদিন উদগ্রিব হয়ে অপেক্ষা করার পরেও আশার মধ্যে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম না। ধরে নিলাম যে তার মানে হয় আশা বইটার ভিতরে রাখা চিরকুটটা দেখার সুযোগ পায়নি অথবা আশা মানুষ নয়। আমিও হেরে গিয়ে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। একদিন সুযোগ বুঝে আবার একটা চিরকুট রেখে দিলাম দুটো পাতার মাঝখানে। প্রফেসর ক্লাসে আসার আগে আমরা ছেলেরা আর মেয়েরা নানারকম হাসি আর ঠাট্টায় মসগুল হয়ে থাকতাম। আর উনি ক্লাসে প্রবেশ করার সাথে সাথে সব বন্ধ হয়ে যেত। আশা কোনদিন আমাদের এই হাসিঠাট্টায় যোগ দিত না। একটা বইয়ের মধ্যে মাথা গুঁজে বসে থাকত। আজ আমি শুধু আশাকে লক্ষ্য করছিলাম। আজ যেন আশাকে একটু অন্যমনস্ক লাগছে। মনের ভুল কিনা জানিনা, একটা পরিবর্তনও আশার মধ্যে মনে হল লক্ষ্য করলাম। সবসময়ে প্রথম সারির বেঞ্চে বসা আশাকে এর আগে কখন ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের সারিতে বসা ছেলেদের দিকে তাকাতে দেখিনি। আজ দুবার দেখলাম আশা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকাল। একবার তো প্রায় আমার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গিয়েছিল। আমার বুকের ভিতরটা ধক্‌ করে উঠেছিল। ধরা পড়ে গেলাম নাকি? না দেখলাম ঘাড়টা ঘুরিয়ে আশা আবার সামনের দিকে ফিরে মাথা নিচু করে বসে পড়ল। আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। কোন ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে প্রফেসরকে প্রশ্ন করলে আশা আজকাল মাথা ঘুরিয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। আশা যেন একটা কিছু খুঁজছে ওর চোখ দেখে আমি বুঝতে পারতাম।

আশার চোখদুটো সবসময় কাকে যেন খুঁজে বেড়ায়। আমি যত আশার ব্যবহারের পরিবর্তন দেখতাম ততো মনে মনে খুশি হতাম। একবার একটা পরিক্ষা করার ইচ্ছে হল। চিরকুটে লিখলাম তোমায় হাল্কা নীল রং এর শাড়ী আর খোলা এলো চুলে দেখতে চাই। যদি একটা টিপ পরতে পার তো আরও ভাল হয়। পরের দিন ক্লাসে ঢুকে আশাকে দেখলাম না। লাস্ট বেঞ্চে বসে আগের দিনের হোমওয়ার্কটা তন্ময় হয়ে চেক্‌ করছিলাম শেষ বারের মত, জমা দেওয়ার আগে। অর্ণবের কনুইয়ের ধাক্কায় চমক ভাঙ্গল। অর্ণব আঙ্গুল দিয়ে সামনের দিকে তাকাতে বলল। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম এক অদ্ভুত ব্যাপার। যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ক্লাসের সব ছেলেরা আর মেয়েরা অবাক হয়ে তাদের সামনে দাঁড়ানো আশার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে বলে আশার সারা মুখে একটা লজ্জা মেশানো সুন্দর হাসি। সব থেকে অবাক হলাম আমি। আশার পরনে আজ হাল্কা নীল রঙ্গের শাড়ী আর চুলটা খোলা। কপালে পরেছে একটা বড় টিপ আর ঠোঁটে লাগিয়েছে একটা পাতলা রং। আশাকে আজ সত্যি সুন্দর লাগছে দেখতে। মেয়েটা এত সুন্দর দেখতে আগে কখনো লক্ষ্য করিনি তো।

  ভাগ্যের চক্র কাকে কখন কোথায় নিয়ে যায় কেউ জানে না। আমার সুযোগ এল এক নামকরা কলেজে এনজিনীয়ারিং পড়তে যাওয়ার। একদিন সবাইকার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে আমি আমার নতুন কলেজ জীবনের জন্য যাত্রা শুরু করলাম। আশার কাছ থেকেও বিদায় নিয়েছিলাম অন্যদের মতই। অল্পদিনের আলাপে আলাদা করে আমাকে মনে রাখার কথা নয় আশার। আমাকে বিদায় জানিয়েছিল অন্যদের মতই। তাতে আন্তরিকতা হয়ত ছিল, ছিল না কোনরকম ঘনিষ্ঠতা। আমি শুধু মনে মনে বলেছিলাম তিলোত্তমা তুমি ভালো থেকো, তোমার ভালো হোক। তারপর অনেক যুগ কেটে গেছে। আমার জীবনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। আমি দেশ ছেড়ে আমেরিকায় বসবাস শুরু করেছি। এখানে সাজানো অথচ একটি ছোট্ট নির্জন শহরে আমার  বসবাস। এখানে আমার নিজের বলে কেউ নেই। একাকি নিঃসঙ্গতায় আমার জীবন কাটে। প্রায় দুটো যুগ কেটে গেছে দেশ ছেড়ে এসেছি। ফেলে আসা দেশের কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। যখন মন খারাপ লাগে তখন মাঝে মাঝে দেশে গিয়ে স্পঞ্জের মত ভিজিয়ে নিয়ে আসি যতটা পারি দেশের সব কিছুকে নিজের দেহে আর মনে। একবার দেশে যাওয়ার একটা সুযোগ এলো যখন আমন্ত্রন পেলাম আমার এক নিকট আত্মীয়ের বড় মেয়ের বিয়েতে আসার জন্য। অনেক দিন দেশের কোন বিয়ে বাড়ি আমার যাওয়া হয়নি, তাই সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না।

  দেখলাম বিয়ের ব্যাপারে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে আবার অনেক কিছু একই রকম আছে। আমার ওপর ভার পড়েছিল ছেলের বাড়ির লোকেদের আদর আপ্যায়নের যেন ত্রুটি না হয় তার খোঁজখবর রাখার জন্য। দেখলাম ছেলের বাড়ির লোকজন খুবই ভদ্র, তাঁরা অল্পেই খুশী, তাই আমার কাজ অনেক কম মনে হচ্ছিল। হঠাৎ ছেলের বাড়ির একজন আমাকে দেখে এগিয়ে এল। আমার নাম ধরে ডাকল। আমি চিনতে পারলাম। আমার সেই ছেলেবেলার বন্ধু অর্ণব। দুই বন্ধু ফিরে গেলাম অনেক বছর আগের সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে। এক ভদ্রমহিলা একসময়ে অর্ণবের কাছে এসে দাঁড়াল। অর্ণব আলাপ করিয়ে দিল। চিনতে পারলাম অনন্যাকে। আমরা তিনজনে মিলে গল্প জুড়ে দিলাম। আমাদের সব বন্ধুদের কথা শুনছিলাম অনন্যার কাছে। আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল আশার কথা জানার জন্য। কিন্তু ভিতর থেকে কে যেন আমায় বাধা দিচ্ছিল। হঠাৎ অনন্যাই আশার কথা ওঠাল। জানতে পারলাম যে আশা ডক্‌টোরেট করেছে মাইক্রোবায়োলজিতে। নামকরা বিলিতি কম্পানিতে উচ্চপদে কাজ করে আশা। বিয়ে করেছে, দুটি সন্তান, একটি ছেলে একটি মেয়ে। খুব সুখের সংসার আশার। তাছাড়া নানারকম সমাজ কল্যান প্রতিষ্টানের সঙ্গেও নিজেকে ব্যস্ত রাখে সে। এত হাসিখুশি আমুদে আর এত পপুলার যে আমি নাকি দেখলে চিনতেই পারব না যে এই আশাই আমাদের সেই আশা।

  একটু বাদে ওরা দুজনেই আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে গেল। আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে। মনে মনে খুশি হলাম আমার তিলোত্তমা ভাল আছে জেনে। আজ এতদিন বাদে এতগুলো বছর পেরিয়ে আসার পর আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল ছেলেবেলায় আশাকে লেখা আমার সেই প্রেমপত্রের কথা। সেই চিরকুটে লেখা প্রেম প্রেম খেলার কথা। অনেক ছোট ছোট ঘটনা সিনেমার ফ্লাসব্যাকের মত ফিরে এল আমার মনের আয়নায়। আশার সচেতনতাকে জাগিয়ে তোলার জন্য আমার নিজের তৈরি সেই ভয়ঙ্কর খেলার ফল যে কিছুটা সাহায্য করেছে আশার জীবনে, জেনে আমার মনটা খুশিতে ভরে গেল।

 
 

  বিবর্ণ কৃষ্ণচূড়া

বিবেক পাল

নেতাজি পল্লী ,সোনারপুর ,কলকাতা

আমি  জীবনে সেই যেন  প্রথম মানুষের মুখের ছবি মুহুর্তে পাল্টে যেতে দেখেছিলাম। মঞ্জুলাদি, শুভদা  কোন কথা না বলে সেই আলো আঁধারিতে আমার মুখের প্রতিটি রেখাকে যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে  পড়ছিল। আর ততই আমি জোরে ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম।

বেদনাদ্যূতি গাহিছে ওরে প্রাণ

তোমার লাগি জাগেন ভগবান,

নিশীথে ঘন অন্ধকারে

ডাকেন তোরে প্রেমাভিসারে

দুঃখ দিয়ে রাখেন তোর মান

তোমার লাগি জাগেন ভগবান"

    অফিস থেকে ফেরার পথে এই  বাঁশতলার নীচ দিয়ে যাবার সময় রোজ  যে এই লাইন গুলি মনে পড়ে এ কথা বলব না। তবে যেদিন তাড়া থাকে না  বা সঙ্গে কেউ থাকে না, এক কথায় একটু নির্জনতা থাকলেই আমার কানের কাছে বাজতে থাকে। আজ যেন বেশি করে অনুরণিত হচ্ছে লাইন কটা। 

      তখন ও আমার গোঁফের উপর কালো রেখা স্পষ্ট হয় নি। বিছানায় পড়লেই সটান নিদ্রা দেবীর কোলে মাথা রাখতে পারি, নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভাবনা মনের মধ্যে স্থান পায় নি। হাঁটার সময় নিজেকে বার বার দেখার অভ্যাস তৈরী হয় নি। এক কথায় আমি আমাতে আছি, আমি বিভক্ত হই নি। সেই সময় এক মুখ আঁধারী সন্ধ্যায় ফুটবল খেলে  বাবার ভয়ে পা টিপে টিপে বাড়ি ফেরার পথে এ বাঁশতলা থেকে কবিতার লাইন শুনে ঘাড় ফেরাতেই এক সাদা পোশাক পড়া ব্রহ্মদত্যি সাঁ করে বাঁশ গাছের আড়ালে অদৃশ্য হতে দেখে ছুটে এক্কেবারে আছাড় খেয়ে পড়েছিলাম সটান বারান্দার উপর। তারপর মূর্ছা, মূর্ছা ছাড়তে পাক্কা তিনদিন কি ধুম দিয়ে জ্বর!

    এরপরের দিন সন্ধ্যা হবার আগেই মাঠ ছেড়ে দৌড় লাগাতে দেখে ঘনাদা  তো ধরল চেপে হাত দুখানা। “কি হল তুই পালাচ্ছিস যে বড় জানিস আমরা এক গোলে এখনও পিছিয়ে আমরা, স্টাইকার মাঠ ছাড়ালে গোল করবে কে”?  কিছুতেই বলতে পারছিলাম না আসল কারণটার কথা।

ঘনাদার চাপে রয়ে তো গেলাম, কিন্তু কিছুতেই আর বাড়ি ফিরতে পা তুলছি  না দেখে ঘনাদা জিজ্ঞেস করল-- কিরে বাবলা  আজ বাবা নেই বাড়িতে?

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

--তবে ?

আমি চুপ করে আছি দেখে ঘনাদা যেন অন্য কিছুর গন্ধ পেল, বলল – ও চাঁদু তোমার ও জুট গেছে এই বয়সে, চাঁদ উঠলেই বুঝি রাস্তার পাশে আসবে?

আমি চমকে উঠি, কি বলছে ঘনাদা!

রঞ্জনদা বলে -- হবে না দুই বুড়ো দামড়া দামড়ি যদি রোজ সন্ধ্যা বেলা কৃষ্ণলীলা করে বাঁশতলায়, তাহলে ওই টুকু ছেলের আর কি দোষ বল।

সেই প্রথম যেন আমার মাথায় কমপ্লেক্স থিংকিং এর  যেন উদয় হয়েছিল। ও তাহলে ওদিন বাঁশ তলায় ভূত ছিল না, দামড়া দামড়ি মানে -- নারীপুরুষ ছিল। কিন্তু কে হতে পারে আমাদের পাড়ার, বেশি সময় ভাবতে হয় নি তাহলে কি...

একছুটে মাঠ ছেড়ে আবিস্কারের নেশায় একেবারে বাঁশতলা ,যা ভেবেছিলাম তাই মঞ্জুলাদির কোলে মাথা দিয়ে শুভময় মানে শুভদা  শুয়ে আছে Iবাঁশ গাছের ফাঁক দিয়ে শুভদার মুখে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। মঞ্জুলাদি শুভদার মুখে ঝুঁকে পড়েছে আর শুভদা এই লাইনগুলো বলছে  - 

“আমি তো ছিলাম ঘুমে

তুমি মোর শির চুমে

গুঞ্জরিলে কি উদাত্ত মহা মন্ত্র  মোর কানে কানে ,

চলরে অলস কবি

ডেকেছে মধ্যাহ্ন রবি

হেথা নয় হেথা নয় অন্য কোনখানে।”   

আমি একবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম এই দৃশ্য দেখে। আমি তো এর আগে কোনদিন কোন নারী পুরুষকে এই ভাবে এত কাছাকাছি  দেখিনি। তাই নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। আমার পায়ের চাপে মনে হয় বাঁশের শুকনো পাতার খসখসে আওয়াজে ওরা টের পেয়েছিল।শুভদা ধরপর করে উঠে বসে পিছন ফিরে আমাকে দেখে ঠিকরে উঠেছিল একেবারে। মঞ্জুলাদি আমাকে একনজরে দেখে চিনতে পেরেছিল  বোধহয়, একদম কোন ব্যস্ততা না দেখিয়ে খুব শান্ত গলায় বলেছিল -- কিরে  বাবলা তুই এখানে এত রাত্রে? 

আমার গলাটা শক্ত আঠায় যেন আটকে যাচ্ছিল। কথা বলতে পারছিলাম না চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মঞ্জুলাদি আমার কাছে উঠে এসে আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিল তুই পড়তে না বসে এখানে কি করছিস ভাই?

শুভদা আমাকে দেখে বোধহয় ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সে ধীরে ধীরে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতে আমি ওর পাঞ্জাবি টেনে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে ফেলেছিলাম।

মঞ্জুলাদি ওই সামান্য চাঁদের আলোয় আমার চোখের জল দেখতে পেয়ে বলেছিল -- তুই কাঁদছিস কেন ভাই?

শুভদা ও আমার পাশ ঘেসে দাঁড়িয়ে বলেছিল -- দোষ তো আমরা করেছি তুই কাঁদছিস কেন?

আমি খুব কাঁদছিলাম। মঞ্জুলাদি তার আঁচল দিয়ে আমার চোখের জল মুছিয়ে দিতে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে বলেছিলাম -- তোমাদের লোকে খারাপ কথা বলে তোমরা জান না ?

কি খারাপ কথা বলে? শুভদা জানতে চায়। আমি আবার কাঁদতে কাঁদতে বলি -- তোমাদের আমি খুব ভালবাসি, তোমাদেরকে কেউ খারাপ কথা বললে আমার খুব কষ্ট হয়’। 

আমি  জীবনে সেই যেন  প্রথম মানুষের মুখের ছবি মুহুর্তে পাল্টে যেতে দেখেছিলাম। মঞ্জুলাদি, শুভদা  কোন কথা না বলে সেই আলো আঁধারিতে আমার মুখের প্রতিটি রেখাকে যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে  পড়ছিল। আর ততই আমি জোরে ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম।

মঞ্জুলাদি আমার হাত ধরে বাঁশ তলা থকে সোজা রাস্তায় চলে এসেছিল। তারপর আমার বাড়ির সামনে এসে আমার হাত ছেড়ে ঢলে পড়া চাঁদের আলো আঁধারে কখন মিলিয়ে গিয়েছিল আমি বুঝতে পারিনি। তারপর থেকে নাকি মঞ্জুলাদি আর শুভদাকে ওখানে সন্ধ্যা কেন দিনে-রাত্রে কেউ দেখেনি।

    একদিন ঠিক পুজোর আগে এক খুব সকালে মঞ্জুলাদি আমার বাড়িতে এসে বলল -- বাবলা চল একটু বাঁশ তলাতে যাব। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে রইলাম, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস হল না –‘কেন এত  সকালে বাঁশতলাতে যাব ’কেমন ভয় লাগছিল মনে শুভদার কিছু হয়নি তো।

কিন্তু না ওখানে গিয়ে মঞ্জুলাদি আমাকে জড়িয়ে অনেক সময় কাঁদল, তারপর একটা কাগজ আমার হাতে দিল।

আমি বললাম -- তোমার সাথে শুভদার ঝগড়া হয়েছে, কাগজটা আমি শুভদাকে দিয়ে আসব?

মঞ্জুলাদি বলল – না আমি আজ পাঁশকুড়া চলে যাচ্ছি ওখানে একটা স্কুলে আমি চাকরি পেয়েছি।

-- তবে এ কাগজটা নিয়ে আমি কি করব?

-- তুই বড় হলে পড়বি।

-- আমি এখন তো পড়তে পারি।

-- পারিস, কিন্তু এর মানে বুঝতে পারবি না। আরো একটু বড় হলে এটা পড়ে আমাকে লিখে জানাবি।

আমি হেসে ফেলেছিলাম – তোমার মাথা খারাপ হয়েছে মঞ্জুলাদি তাহলে আমি বড় হলে  নাহয় দিতে।

-- তখন যদি তোর সাথে  আমার দেখা না হয়।

-- কি বলছ মঞ্জুলাদি তুমি কি কক্ষনো এখানে ফিরবে না ?

মঞ্জুলা দি মাথা নাড়ে।

--কেন?

--সে তুই বুঝবি না।

 নিশ্চয়ই তোমার কারুর উপর রাগ হয়েছে। এই কাগজটা যে বোঝে তাকে দাও সে বুঝলে কাজ হবে।

--কাকে দেব বল, তোর মতো আমাকে যে কেউ এত ভালবাসে না।

আমি কেন জানি না কিভাবে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলাম –শুভদাও না?

মঞ্জুলাদি আমার গালটা আলতো করে টিপে দিয়ে বলেছিল -- দূর পাগলা তুই শুধু আমাকে ভালবাসিস না তোর শুভদাকে ও তুই আমার মত ভালবাসিস। আমি এখন যাই রে আমার সকাল নটায় ট্রেন ,তুই খুব ভাল থাকিস।তোকে অনেক বড় হতে হবে ভালো করে পড়াশোনা করিস।

মঞ্জুলাদিকে পা বাড়াতে দেখে আমি বলেছিলাম —শুভদাও কি তোমার সাথে যাচ্ছে মঞ্জুলাদি?

--নারে। আমার সেই  বয়সেও কেন জানি না মনে হয়েছিল মঞ্জুলাদি আর শুভদা  যে অভিন্ন।

--তবে তুমি চলে গেলে তার কি হবে?

--আমি কি করে বলব  তুই তোর শুভদাকে জিজ্ঞেস করিস –বলে আর দাঁড়ায়নি মঞ্জুলাদি যেন ছুটতে ছুটতে চলে গিয়েছিল।

সেই কাগজটা হাতে নিয়ে আমার তখন মনে হয়েছিল যেন আমি অনেকটা বড় হয়ে গেছি। এটা কাগজ নয় একটা চিঠি। চিঠিটা আমাকে মঞ্জুলাদি নয় আমার কোন প্রেমিকা আমার হাতে দিয়েছে। এটাকে সংগোপনে লুকিয়ে রাখতে হবে। এ আমার কাছে স্মৃতি। হাত পা কাঁপছিল। কি লিখেছে মঞ্জুলাদি একবার খুলে দেখব? না মঞ্জুলাদি যে আমাকে বারণ করেছে পড়তে। আবার মনে হয়েছিল মঞ্জুলাদি খারাপ কিছু করতে যাচ্ছে না তো! আমার কাছে তার মনের কথাগুলো লিখে রেখে যাচ্ছে যাতে ....

কিন্তু আমি পারিনি পড়তে কাগজটা রোল করে প্যান্টের দড়ির ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। কেউ যেন জানতে  না পারে। তারপরে স্নানের আগে ওটাকে খুব সন্তর্পনে আমাদের খড়ের চালের ফাঁকে লুকিয়ে রেখেছিলাম, যাতে ...

তারপরে মঞ্জুলাদির  আর কোন খবর  পাইনি।

মঞ্জুলাদির কথা রেখে ছিলেম ক্লাস এইটে ওঠার পর কাগজটা বের করে পড়ে আমি চমকে উঠেছিলাম। এত রবীন্দ্রনাথের কবিতার অংশ। কেন এই লাইন কটা লিখে আমাকে দিলেন মঞ্জুলাদি। বারবার পড়েও আমি সেদিন  অর্থ বুঝতে পারিনি।

শুধু তখন মনে হয়েছিল কত গভীরতা ছিল এই সামান্য গ্রাম্য  মেয়েটির। কত সামান্য বয়সে অসামান্য  সংস্কৃতি ও শৈল্পিক  বোধ তার জীবনে জাগ্রত হয়েছিল। এই অঞ্চলের যত সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শিল্প চর্চা বলতে তো ছিল মঞ্জুলাদি সেই মঞ্জুলাদির জন্যে ....

মঞ্জুলাদি তো মানুষ ছিল, তার শরীর মন চাহিদা কি অন্য দশটা মানুষের মত হতে পারতো  না!   আর  এই গ্রামের যদি একটা সঠিক মানুষ বলতে কেউ থেকে থাকত সে শুভদাই ছিল।

শুভদা মঞ্জুলাদি বোধ হয় মনে করত তারা গ্রামের মানুষের চোখের মনি ছিল। শিক্ষা, দীক্ষা, সংস্কৃতি, সুস্থ চেতনার যে প্রবাহ মানুষের মনে বইয়ে দিয়েছে তাতে গ্রামের মানুষ তাদেরকে অন্য চোখে দেখবে।

তবু একটা কথা অনেকবার মনে হয়েছিল আমার কথাতে যদি শুভদা মঞ্জুলা দির তাদের ধারনার  চমক।  তাহলে কেন মঞ্জুলাদি শুভদার উপর  অভিমান করল কেন তাকে সঙ্গে নিল না -- উত্তর পাই নি।

আমার মনের মধ্যে অভিমান বাসা বেঁধেছিল শুভদা মঞ্জুলাদির উপর। আমি সেই বয়সে তাদের কাছে মুখ ফুটে না বললেও হাবেভাবে বোঝাতে  পেরেছিলাম  তোমরা আমার জীবনের রোল মডেল। অথচ লোক দুটো একটুকরো কাগজ  দেওয়া ছাড়া আর কিছু করেনি এমন কি আমাকে মনে ও রাখে নি ...

তেমনি এই গ্রামের অনেক মানুষের উপরও আমার ক্ষোভ ছিল যারা অন্যায় ভাবে এমন দুটো ভাল মানুষকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করেছিল।

       আজ অনেকদিন পর সেই মঞ্জুলাদি গ্রামে ফিরেছে । আমি  সেই বাঁশতলা দিয়ে চলেছি অফিস থেকে ফিরে সংবাদটা পেয়েই। আমার হাতের মুঠোয় মঞ্জুলাদির দেওয়া সেই কাগজের টুকরো। কেমন হলদেটে হয়ে গেছে , একটু জোরে চাপ পড়লে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যাবে তথাপি খুব আলতো করে ধরে রেখেছি একবুক জিজ্ঞাসা নিয়ে।

অনেকদিন মঞ্জুলাদির বাড়িতে যাই নি। ওদের বাড়ির সামনে  কৃষ্ণচূড়া গাছটা একদিন লাল ফুলের আভায় যেন চারিদিক মাতিয়ে রাখত। কতদিন আমি শুভদা আর মঞ্জুলাদিকে কৃষ্ণচূড়া ফুলের পরাগ দন্ড নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করতে দেখেছি। মঞ্জুলাদি হেরে গিয়েও কেমন হেসে খোলা চুলে শুভদার গায়ে লুটিয়ে পড়ত। সেই কৃষ্ণ চূড়া গাছটাকে এমন বিবর্ণ দেখে  মনে হল  তাহলে কেমন দেখব মঞ্জুলা দিকে। আজ প্রায় কুড়ি বছর পর  নিশ্চয়ই মঞ্জুলাদির চুলে রুপোলি ঝিলিক ধরেছে। আর শুভদার নিশ্চয়ই সারা মাথা, গালভর্তি কাঁচা পাকা চুলের প্রলেপ। কি মোটা হয়েছে না রোগা? তেমনি টকটকে গায়ের রং আছে তো নাকি তাদের?

মঞ্জুলাদিকে  ডাকতে  ডাকতে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলাম  Iবারান্দায় একটা ষাট ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে। কাউকে দেখতে পেলাম না। খাঁ খাঁ করছে বাড়িটা  কাউকে তো দেখছি না তবে কি মঞ্জুলাদি ফেরেনি যা শুনেছি সব মিথ্যা।বড় ইচ্ছা ছিল....

শোবার ঘরগুলো অন্ধকার। সেই একটা ঘর থেকে অত্যন্ত ক্ষীন শব্দ এলো --আয় বাবলা এই ঘরে আয়।

সেই পরিচিত কন্ঠস্বর  কিন্তু এত নিস্প্রভ কেন !

--তুমি কোথায় মঞ্জুলা দি?

---আমি এই ঘরে, তোর সামনে।

--অন্ধকারে বসে আছ কেন মঞ্জুলাদি? কখন এলে গ্রামে তোমার স্কুল ছুটি?

মঞ্জুলাদি কি উত্তর দিল বোঝা গেল না। আমার গলার আওয়াজ পেয়ে মঞ্জুলাদির ছোট ভাগ্নে ঘরের সুইচটা অন করে দিতে বিছানার উপর বসে থাকা একটা নারী মূর্তিকে দেখে  ভয়ে শিউরে উঠলাম। কে বসে ওখানে? মঞ্জুলাদি! বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল না ওই কঙ্কাল সার বিধবাকে দেখে। এ কি  বিভৎস চেহারা হয়েছে মঞ্জুলাদির! দুহাত কখন আমার চোখের উপর পড়েছে জানি না।

--তোর সেই চেনা মঞ্জুলা দিকে বড় অপরিচিত লাগছে নারে বাবলা?                                      

আমার দুচোখ জলে ভর্তি হয়ে গেল। কথা বলতে পারছিলাম না  খুব কষ্টে বললাম - শুভদা কতদিন আগে মারা গেছে  মঞ্জুলা দি?

কোটরাগত দুটো চকচকে চোখ দিয়ে  আমার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল মঞ্জুলাদি তারপর খুব ধীর গলায় বলল শুভদা মারা গেছে মানে?

আমি কথা বলতে  পারছিলাম না  কি বলছে দি? মঞ্জুলা দি  বিধবা অথচ বলছে শুভদা মারা গেছে মানে তাহলে ....

আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েও থাকতে পারছিলাম না আমি যেন ক্রমান্বয়ে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছিলাম নীরবতা ভাঙ্গার জন্যে বললাম  তুমি ভালো আছ  তো মঞ্জুলাদি?

 --কথা এড়িয়ে যাস না বাবলা তুই যেন আমাকে কিছু বলতে গিয়ে ও থেমে গেলি?

যেন হাতেনাতে ধরা পরে গিয়ে কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে বলি --কই আমি তোমাকে তো কিছু  জিজ্ঞাসা করিনি।

এই মুহুর্তে কিছু বলতে হয়ত চাইছিস না, কিন্তু বলতে তো চাস-- জানতে তো চাস। নাহলে আমি এসেছি শুনেমাত্র এই রাত্রিতে ---

দুটো প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য কতদিন ধরে আকুলিবিকুলি করছি মঞ্জুলা দিকে সামনে পেলে আমার সে জিজ্ঞাসার উত্তর নেব। কিন্তু এখন আমি কোনটা জিজ্ঞেস করব আগে-- রবীন্দ্রনাথের লাইন কটা  কেন তুমি  আমাকে দিয়ে দিয়ে গিয়েছিলে মঞ্জুলাদি কি বলতে চেয়েছিলে ওই লাইন কটার মধ্যে দিয়ে। আমি আজ পর্যন্ত  যে বুঝে উঠতে পারিনি ...

পরের প্রশ্নটা করতে পারছি না, এই প্রশ্নটা আমার কাছে যেন ক্রমশঃ বিভীষিকা হয়ে উঠছে বুকের কাছে এসেও গলার কাছে দলা পাকিয়ে যাচ্ছে।  

  ক্লিক ক্যামেরা

অমিতাভ মৈত্র

সুজনকে কথা দিলাম আমি যাবো। নিজের গাড়িতে সুজনকে ইস্টার্ন বাইপাসের ওপরে নির্দিষ্ট বাস স্টপে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। সারা রাস্তাই সুজন আমার ভাবনা জুড়ে রইলো। কি এমন ঘটেছে ওর জীবনে যার জন্যে ওকে ওর পরিবারকে ছেড়ে যেতে হয়েছে। কি সমস্যা ওকে এই বিপাকে ফেলেছে। সমস্যাটা কি অর্থনৈতিক, শারীরিক না মানসিক।

     সাউথ সিটি মলের একটা জুতোর দোকান থেকে বেরিয়েই চোখ চলে গেল উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভদ্রলোকের দিকে। লোকটি একগাল দাড়ি সমেত ঘাড়টাকে ডান দিকে একটু কাত করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ভাবছি তাকাবো কি তাকাবো না। হয়তো অন্য কারুর দিকে তাকিয়ে আছে। না, দেখছি আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। একটু এগিয়ে যেতেই মনে হলো দাড়িটা বাদ দিলে লোকটা হয়তো চেনা কিন্তু কি তাঁর নাম, কি ভাবে চেনা বা কোথায়, কবে দেখেছি মনে পড়ছে না। কাছাকাছি পৌঁছতে যে নামে আমাকে ডাকলেন তাতে বোঝা গেলো আমি না চিনতে পারলেও ভদ্রলোক আমাকে চেনেন। 
আগন্তুক: কি রে চিনতে পারছিস না?  তুই ডাকু তো, নাকি ভুল করলাম। আমি বললাম, “নামটা তো ঠিক আছে। কিন্তু আমি তো ঠিক…”   আগ: সেকি, আমাকে চিনতে পারছিস না?      
বললাম, “ঠিক মনে করতে পারছি না। অথচ চেনা চেনা লাগছে।”                                                            
আগ: মিত্র স্কুলে পড়তিস তো…সেই পূরবী সিনেমার উল্টো দিকে?                                                                বললাম, “হ্যাঁ… পড়তাম।”                                         আগ: সুজনকে চিনতে পারছিস না? শেষ চার বছর এক সঙ্গে ছিলাম সব ক্লাসে… মনে কি পড়ছে? এবার আমার সব মনে পড়ে গেলো। সুজন ক্লাস সিক্স-সেভেন পর্যন্ত পড়াশুনোয় খুব একটা ভাল ছেলে ছিল না। বেশ কয়েক বার ফেল করার ফলে ক্লাস এইটে যখন আমার সেকশনে এলো তখনই সে আমার থেকে বয়েসে তিন বছরের বড়। ক্লাস এইটে উঠে সুজন ক্রমশঃ একদম বদলে গেল। অঙ্কে মাথাটা ওর এতো ভাল হয়ে উঠলো যে সব সেকশন মিলিয়ে সুজনের নম্বর থাকতো সবার ওপরে। হায়ার সেকেন্ডারীতেও সুজন ভাল রেজাল্ট করেছিল।
ক্লাস টেন থেকেই ও আমাকে অঙ্ক করাতো, যদিও দুজনেই আমরা একই ক্লাসের ছাত্র ছিলাম। আমার আর এক বন্ধু ও আমি সপ্তাহে দুদিন সুজনের কাছে অঙ্কের তালিম নিতাম। অঙ্ক করাতে ও আমাদের বাড়িতেই আসতো। তিন বন্ধুতে আমরা বাড়ির ছাতের ঘরে নির্ঝামেলায় পড়াশুনো করতাম। অন্য গল্প বা আড্ডা যে হতো না তা নয়। যথেষ্টই হতো। কিন্তু অঙ্কের মাস্টার হিসেবে সুজন ছিল বেশ কড়া…বেশী অন্য কথা বা আড্ডা ও পছন্দ করতো না। 
মাঝে মাঝে সুজনের কোলুটোলার বাড়িতেও আমরা পড়তে যেতাম। ওর বাড়ি ছিল কোলুটোলার এক ঘিঞ্জি গোলিতে। বাড়িতে পড়তে যাওয়ার সুবাদে সুজনের বাবা, মা ও ছোট ভাই-এর সঙ্গেও আমার বেশ আলাপ হয়ে গিয়েছিল। 
সুজনকে এতদিন পরে দেখে একটু বেশী উত্তেজিত হয়ে হাত বাড়ালাম।                                               
বললাম, “কি আশ্চর্য! তুই আমাকে চিনতে পেরেছিস? আমি তো চিনতে পারতাম না। তার ওপরে এক গাল বিচ্ছিরি দাড়ি রেখেছিস। কয়েদী কয়েদী দেখতে লাগছে।”  
সুজন কিন্তু হাত বাড়ালো না, বললো, “হ্যান্ড সেক করবো কেন? তোর আমাকে প্রণাম করা উচিৎ। একে তোর থেকে আমি বয়েসে বড়, তার ওপর তোর অঙ্কের টিচার ছিলাম।” আমি বললাম, “বাজে বকিস না তো, চল কোথাও একটু বসি।” 
ফুড কোর্টে গিয়ে মুখোমুখি দুটো চেয়ারে দুজনে বসলাম। চা আর সামান্য স্ন্যাক্সের সঙ্গে বহু পুরনো কথা ফিরে ফিরে আসছিলো। আমার বাবা, মা এমন কি দাদাও মারা গেছেন শুনে খুব অবাক হলো। সুজন ভুলে গিয়েছিল আমার বাবা বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়েস হতো একশো পাঁচ আর মা আটানব্বই। আমার ছেলে ও মেয়ে আছে শুনে খুব খুশী হলো। হঠাৎ মাথাটা এগিয়ে দিয়ে নীচু গলায় জিজ্ঞেস করলো, “যার সঙ্গে স্কুল জীবনে প্রেম করতিস তাকেই বিয়ে করেছিস তো, নাকি অন্য কাউকে?” আমার স্কুল জীবনের প্রেমিকাই আমার বর্তমান স্ত্রী এই কথা শুনে আরো খুশী হলো। হঠাৎ খেয়াল করলাম সুজন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টে, কি যেন ভাবছে ও। জিজ্ঞেস করলাম, “কি ভাবছিস এতো?”                
প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে আমাকেই জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা ডাকু, তোর এখনও ফটোগ্রাফির শখ আছে? এখন ছবি তুলে বেড়াস?” বললাম, “ছবি তুলি কখন কখন, যেমন সবাই তোলে। শখ বলতে যা বোঝায় সেই রকম কিছু নেই। তবে দুখানা ভাল ক্যামেরা আছে। আর আছে কিছু প্রয়োজনীয় লেন্স।” তাই শুনে বললো, “স্কুল জীবনে তো খুব ছবি তুলে বেড়াতিস। মাঝে মাঝে পড়াশুনো ছেড়ে কলকাতার বাইরেও যেতিস ছবি তুলতে।” অবাক হয়ে বললাম, “তোর এতো কথা মনে আছে? আমি তো সবই প্রায় ভুলে গেছি।”
সুজন বলল,  “সব ভুলেছিস কিন্তু একটা ভীষণ সুন্দর ক্যামেরার কথা তোর ভোলার কথা নয়।”                       
আমি বললাম, “কোন ক্যামেরার কথা বলছিস?”              
সুজন: সেকি রে! সেই ছোট্ট ক্লিক ক্যামেরাটা, যেটা এতো ছোট ছিল যে হাতের মুঠোর মধ্যে চলে আসতো। তোর দাদা সিঙ্গাপুর থেকে এনেছিলেন তোর জন্যে।                      আমি: ওরে বাবা! সেটার কথাও তোর মনে আছে? সিঙ্গাপুর নয় হংকং থেকে এনে দিয়েছিলেন। ছোট্ট ছোট্ট ফিল্ম রোল ছিল। একটা রোলে দশটা সাদা-কালো ছবি উঠতো। দশটা ফিল্ম রোল প্রায় এক মুঠোয় চলে আসতো। দাদা দশটা রোলের দুটো বাক্স এনেছিলেন। অর্থাৎ আমার কাছে কুড়িটা এই রকম ছোট্ট ফিল্ম রোল ছিল। ক্যামেরাটার ভারি সুন্দর একটা চামড়ার ছোট্ট ব্যাগ ছিল। ক্যামেরার শাটারে আঙুলের হালকা চাপে একটা শব্দ হতো, ক্লিক!”                        সু: যাক তোর সব মনে আছে তাহলে।                           আমি: মনে থাকবেনা কেন। তবে অনেক কাল আগের ঘটনা তো। জানিস সুজন ক্যামেরাটা আশ্চর্য রকম ভাবে হারিয়ে গিয়েছিল। কোথাও আর কোনদিন খুঁজে পাইনি। মাঝে মাঝে ক্যামেরাটার কথা খুব মনে হয়। খুব বেশীদিন ওটা ব্যবহার করার সুযোগই হলো না। মাত্র দুটো ফিল্ম রোল ব্যবহার করেছিলাম। আটটা রোলের সেই ফিল্মের ব্যবহার করা বাক্সটাও ক্যামেরার সঙ্গেই উধাও হয়ে যায়। যাকগে ওসব কথা, তোর কথা বল।       

সু: আমার কথা আর কি বলবো। নবদ্বীপ কলেজে সারা জীবন পড়িয়েছি। একটি ছেলে আমার। বউ মেয়েটা ভাল কিন্তু আমার সঙ্গে খুব একটা বনিবনা নেই। আমার ছেলে আর বৌ, থাকেনা আমার সঙ্গে।                                 আমি: তোর বউ মানুষ ভাল অথচ তোর সঙ্গে বনিবনা নেই, এটা কি রকম? তোকে যতোটা চিনেছিলাম, তাতে এইটুকু বুঝি, তুই নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ।                              সু: না রে ডাকু, সমস্যাটা আমাকে নিয়েই।                   আমি: সে আবার কি? সমস্যাটা যখন তোকে নিয়েই, সেটা মিটিয়ে ফেললেই হয়। তুই তো জানিস তোর সমস্যাটা কি। এমন কোন সমস্যা কি যা তুই চেষ্টা করেও মেটাতে পারছিস না? পরকীয়া প্রেম-ট্রেম না তো?                     সুমন এক গাল হেসে বলল, “আরে না রে বাবা, ওসব কিছু নয়। ব্যপারটা আর একটু জটিল ছিল।”                         আমি বললাম, “জটিল ছিল কেন বলছিস? এখন কি ব্যপারটা মিটে গেছে?”                                           সু: এখন কিছু নিয়েই আর কিছু ভাবি না। আমি এখন সব সমস্যার বাইরে।                                     

আমি: কি সব হেঁয়ালি মার্কা কথা বলছিস বুঝতে পারছি না। একটু খোলসা করে বলতো।                                 সু: বলবো বলেই তো তোর জন্যে এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তোকে আমি অনেকদিন যাবৎ খুঁজেছি একটা পরামর্শের জন্যে। তোর কোন খবর পেলাম না। পুরনো বন্ধু-বান্ধবদের কাছে তোর অল্প স্বল্প কিছু বিচ্ছিন্ন খবর ছাড়া তোর বর্তমান ঠিকানা বা কার্যকলাপ সম্বন্ধে কিছুই জানতে পারলাম না। তারপর অনেক ভেবে সমস্যা সমাধানের একটা পথ খুঁজে পেলাম। Decide করে ফেললাম আমাকে কি করতে হবে। এখন আর আমার ততো অশান্তি নেই। কিন্তু তোকে কয়েকটা কথা না জানিয়ে আমি পুরোপুরি শান্তি পাচ্ছি না। আমি বললাম,  “বল না, কি বলবি।”            

সুজন বলল,  “এখানে বলা যাবেনা।”                           হঠাৎ আমার হাত দুটো চেপে ধরে বলল, “আমাকে কথা দিতে হবে ডাকু একবারের জন্যে আমার বাড়িতে একদিন আসবি। আর কখন তোর কাছে কিছু চাইবো না। কথা দে                              

ডাকু। সুজনের হাতদুটো কন কন করছে ঠান্ডা, আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,  “তুই এই রকম করছিস কেন? আমি তোর বাড়িতে যাবো, এটা কি এমন একটা ব্যাপার। নিশ্চয়ই যাবো। আমি কি তোর বাড়িতে কখন যাইনি?”      

সু: হ্যাঁ গিয়েছিস, অনেক কাল আগে। তখন পরিবেশ ছিল অন্য রকম। এখন সব বদলে গেছে। সময় বদলে দিয়েছে এই শরীর আর মনটাকে। রাগ, দুঃখ, অভিমান সবকিছু শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।                                     সুজন একটু থামলো। কিছুক্ষণ চুপ করে কি যেন ভাবলো। তারপরে ভীষণ করুণ মুখে বললো, “তোর কাছে কথাটা না বলতে পেরে আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি। কাল একবার আয় না সন্ধ্যের দিকে। আমার বাড়ি নিউ টাউনে, নস্কর পাড়ার হরি মন্দিরের কাছে। আসবি তো। তোর হাতে একটা জিনিস তুলে না দিয়ে আমি শান্তি পাচ্ছি না।”                           জিজ্ঞেস করলাম, “জিনিসটা কি?”                           একটু ম্লান হেসে সুজন বললো, “কালকেই তো আসছিস, কালকেই দেখিস।”                                                       সুজনকে কথা দিলাম আমি যাবো। নিজের গাড়িতে সুজনকে ইস্টার্ন বাইপাসের ওপরে নির্দিষ্ট বাস স্টপে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। সারা রাস্তাই সুজন আমার ভাবনা জুড়ে রইলো। কি এমন ঘটেছে ওর জীবনে যার জন্যে ওকে ওর পরিবারকে ছেড়ে যেতে হয়েছে। কি সমস্যা ওকে এই বিপাকে ফেলেছে। সমস্যাটা কি অর্থনৈতিক, শারীরিক না মানসিক। নাকি সুজন কোন গর্হিত কর্মের নায়ক, যার জন্যে সমাজ তাকে ত্যাগ করেছে। কিন্তু আমি যে সুজনকে চিনতাম সে অতি ভাল মানুষ। তার পক্ষে সেই রকম কোন গর্হিত কর্ম করা সম্ভব বলে আমি মনে করি না।পরের দিন সল্টলেকে আমার অফিস থেকে বিকেল পাঁচটা নাগাত বেরিয়ে পড়লাম। শীতের সন্ধ্যে যেন সন্ধ্যে থেকেই লেপ মুড়ি দেবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। রাজারহাট ছেড়ে নিউটাউন রোডের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি সুজনের নির্দেশিকা মতো। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ড্রাইভ করার পর নিউটাউন রোডের ওপরে ডান দিকে গাড়ি ঘোরালাম। নস্করপাড়া জায়গাটা শহর নয় বরং বলা যায় শহরতলি। আগে থেকেই সুজনের সঙ্গে কথা বলা ছিল, ফলে নিউটাউন রোডের একটা মোড়ে ও আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল বাকী পথটা আসতে, আমার যাতে কোন অসুবিধে না হয়। কলকাতার বাইরে শহরতলিতে এলে ছেলেবেলায় কলকাতার শীতের কথা মনে পড়ে। সুজন একটা মাফলারে মাথা, কান, মুখ আর গলা ঢেকে রাস্তায় অপেক্ষা করছিল। শুধু চোখ দুটোকে শীতের সন্ধ্যে উপভোগের সুযোগ দিয়েছিল। গাড়ির নম্বর দেখে দূর থেকে হাত না নাড়লে ওকে আমি নির্ঘাৎ চিনতে পারতাম না।এখানে একটা বাড়ির পাঁচতলার ওপরে দু কামরার একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট নিয়ে সুজন থাকে। বাড়িতে ঢুকেই সামনে সিঁড়ি। প্রতি তলায় সিঁড়ির দুদিকে দুটো করে ফ্ল্যাট। বাড়িতে কোন লিফ্ট থাকবে এটা আশা করাটাই অন্যায়। পাঁচ তলায় উঠে বাঁদিকের ফ্ল্যাটটাই সুজনের। এতোগুলো সিঁড়ি ভেঙে একটু হাঁপিয়ে গেছি। বহুদিন লিফ্টের ভরসায় থাকতে থাকতে আর সিঁড়ি ভাঙার পরিশ্রম এড়াতে এড়াতে শরীর হঠাৎ এই বেয়াড়া পরিশ্রমটাকে খামোখা একটা বাড়াবাড়ি অত্যাচার হিসেবে গণ্য করে আজকাল। সুজন চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই বুঝলাম বাড়িতে কোন দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই। দরজার পিছনে হাত বাড়িয়ে সুইচ টিপতেই টিমটিমে একটা আলো জ্বললো। এক চিলতে ডাইনিং রুমের ডানদিকে একটা ঘর। সুজনের সঙ্গে সেই ঘরে ঢুকলাম। ঘরে দুখানা টিনের চেয়ার ছাড়া আছে একখানা পালিশ ওঠা টেবিল। এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে আছে অসংখ্য বই আর পুরনো খাতা। ঘরের কোণে একটি টোল খাওয়া স্টিলের থালা তার ওপরে উল্টে রাখা একটি তুবড়োনো স্টিলের গ্লাস। ঘরের বাঁদিকে একটি দরজা আধ খোলা। মনে হলো এটা বারান্দায়  যাওয়ার দরজা।সুজন আমাকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রেখে বেশ কিছুক্ষণ হলো বাড়ির ভেতোরে গেছে। চা-টা করছে নাকি। বারান্দার দিক থেকে একটা ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে ঘরে। রাস্তায় আলো কম ফলে বাইরেটা কেমন যেন আলো আঁধারি। ঘরের একটা স্যাঁত স্যাঁতে গন্ধ ঠান্ডা হাওয়ায় ভর করে ঘরে ভেসে বেড়াচ্ছে। সুজন এখনও এলো না। কি করছে কে জানে। রান্না বান্না করতে বসে গেল নাকি। বাড়িতে বলে এসেছি বাইরে খাবো, রাত হবে ফিরতে। সুজনের এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে এই আশা আমি করিনি। কিন্তু সুজনের সঙ্গে কথা বলে এতোটা রাস্তা গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরতে রাত হবে জানি। পরিবারের সবাইকে জাগিয়ে রেখে বসিয়ে রাখাটা অস্বস্তিকর। তাই এইটুকু মিথ্যের আশ্রয় নিতে হয়েছে। পরে সব খুলে বললে পাপটা আর পাপ থাকেনা। এবার ধৈর্য হারিয়ে যে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেছিলাম সেইদিকে একটু এগিয়ে গিয়ে সুজনের নাম ধরে ডাকলাম। সাড়া পেলাম, “এক্ষুনি আসছি…একটু বোস।” বসে থাকা মানে ফিরতে রাত হওয়া। সুজনকে বোঝাতে হবে আমি কিন্তু বেশীক্ষণ বসতে পারবো না। বাইরে এবার সুজনের পায়ের শব্দ পেলাম। ঘরে ঢুকলো সুজন।                                                             বললাম, “শোন, আমাকে তো বাড়ি ফিরতে হবে। কি বলবি বলছিলি বল।”                                                     “হ্যাঁ, এইবার বলবো।” বললো সুজন। এক সময় সুজন বলতে শুরু করলো, “দেখ ডাকু আমি M.Sc. complete করার পরই নবদ্বীপ কলেজে পড়ানোর একটা চাকরী পেয়ে যাই। বছর দুয়েক পরেই বিয়ে করি। নবদ্বীপ থেকে সপ্তাহের শেষে যাতায়াত সহজেই করা যেতো বলে বৌকে নবদ্বীপে আমার কাছে রাখতাম না। ও কলকাতার কোলুটোলায় আমাদের পৈতৃক বাড়িতে মা-বাবা, ভাই ও অন্য সবার সঙ্গে থাকতো। তুই তো জানিস আমাদের পরিবারে তখন অনেক লোকজন। কাকা, জ্যেঠা সবাই একসঙ্গে থাকতাম। স্কুল জীবন থেকেই আমার একটা বদ অভ্যাস ছিল। তুই হয়তো কোনদিন টের পাসনি। আসলে স্কুলে পড়াকালীন এই বদ অভ্যেসটা আমার ততোটা বাড় বাড়ন্ত ছিল না। কলেজে পড়তে পড়তে এটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।”                                             

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বদ অভ্যেসটা কি?”                      সুজন চুপ করে থাকে। ওকে একটু সময় দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে বল। তোর কথা শুনতেই তো এলাম।” এবারেও চুপ করে আছে। কিন্তু কি যেন এক যন্ত্রণা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। হঠাৎ বলতে শুরু করলো, “জানিস ডাকু, যেদিন ধরা পড়লাম প্রথম, ঠিক করলাম এবারে যদি কোন মতে বেঁচে যাই আর কখন এ কাজ করবো না। কয়েকজন জানলেও ছেলে-বউ জানতে পারলো না। কলেজের প্রিন্সিপাল কথা দিয়েছিলেন তিনি কাউকে বলবেন না। কিন্তু আমাকে কথা দিতে হয়েছিল তাঁকে…এ কাজ আমি আর কখন করবো না।”                                 সুজন বলে যাচ্ছিল। আমি বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করিনি অপরাধটা কি ছিল।   

সুজন বলতে থাকে, “কি করেছিলাম জিজ্ঞেস করবি না? জিজ্ঞেস না করলেও তোকে আজ শুনতে হবে। ডাকু আমি চুরি করেছিলাম….আমার colleague এর দামী পেন। ধরা পড়ে গেলাম। যখন আমার colleague এর পেন চুরি যায় সেই ঘরে দ্বিতীয় ব্যক্তি একমাত্র আমিই ছিলাম। পরের ঘন্টায় আমার ক্লাস ছিল। চুরি করা পেন সমেত ধরা পড়ার ভয়ে একটু বেশী সাবধান হয়ে ছিলাম। পেন সমেত আমার ব্যাগটা আলমারির মধ্যে তালা দিয়ে রাখলাম। যা কেউই সাধারণতঃ করেনা।  আমার colleague-এর সন্দেহ এতে আরো বাড়ে। আমি ক্লাসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রিন্সিপালকে তাঁর বদ্ধমূল সন্দেহের কথা জানান। প্রিন্সিপালের কাছে ছিল ওই আলমারির দ্বিতীয় চাবি। দিনের শেষে আমাকে প্রিন্সিপাল ডেকে পাঠান। হাতেনাতে ধরা পড়ে স্বীকার করতে বাধ্য হই আমি চুরি করেছি। আমার অনুরোধে সমস্ত ব্যাপারটা একমাত্র আমি, কলেজের প্রিন্সিপাল আর আমার colleague শুধু জানলো । কিন্তু বুঝতে পারতাম আমাকে প্রিন্সিপাল ও আমার শিক্ষক বন্ধু তার পর থেকে সাধারণতঃ এড়িয়ে চলেন এবং একটু ঘৃণা মেশানো করুণার চোখে দেখেন।  তারপর কিছুদিন আমি এই প্রবূত্তিকে জোর করে মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা

করি…পারিনি। আমার স্ত্রীর দাদা, বিদেশ থেকে তার বোনের জন্যে নিয়ে এলো সোনা, রূপোয় কাজ করা একটা সুন্দর গয়না রাখার বাক্স। বাক্সর ডালা খুললেই একটি ছোট্ট পুতুল-মেমসাহেব বেরিয়ে এসে নাচের ভঙ্গিতে ঘুরতে থাকে আর তালে তালে বাজতে থাকে সুন্দর, মিষ্টি বাজনা। দেখেই মনে হলো এটা আমার চাই। একেবারে আমার নিজের করে এটাকে আমায় পেতেই হবে। তখন আমার মাথায় এর বিপদজনক ফলাফল নিয়ে ভাবার কোন ক্ষমতা ছিল না। সুযোগ খুঁজছিলাম…..সুযোগ পেয়েও গেলাম। আমার স্ত্রী এবং ছেলের বেশ কয়েক ঘন্টার অনুপস্থিতিতে গয়নার বাক্সটা সরিয়ে ফেললাম। সেটাকে লুকিয়ে রাখলাম আমার পড়ার ঘরে এক গোপন জায়গায়। আমার স্ত্রী তার সুন্দর গয়নার বাক্সের খোয়া যাওয়াটা টের পেলো সাতদিন পরে। অনেক খোঁজ করেও না পেয়ে নিশ্চিত হলো বাড়ির কাজের মাসি নিশ্চয়ই এ কাজ করেছে। তাকে সরাসরি দোষারোপ না করেও নানা অন্য কথায় আমার স্ত্রী তার সন্দেহের কথা ঝিকে শোনাতে থাকলো। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। প্রবল ঝগড়া-ঝাঁটির মধ্যে দিয়ে সে কাজ ছেড়ে চলে গেল। মেয়েটি কাজ ছেড়ে চলে যাওয়ায় আমার স্ত্রীর সন্দেহটা আরো দৃঢ় হলো যে এই চুরি কাজের মাসিই করেছে। আমি নিশ্চিন্ত হলাম। আবার আমার চুরির এই প্রবৃত্তি ক্রমশঃ বেড়েই চললো। নিজেকে আটকাবার সমস্ত ক্ষমতা আমার লোপ পেলো। যখনই মনের মতো কিছু দেখতাম, সেটা যারই হোক, আমার নিজের করে পাওয়ার জন্যে এবং চুরি করার জন্যে ফন্দি আঁটতাম।আমার এক ছাত্রীকে পড়াতে যেতাম তার বাড়িতে। ভাল পারিশ্রমিক পেতাম। সপ্তাহে দুদিন যেতাম সেখানে। বিদেশ থেকে আনা অপূর্ব সব Curio-তে সাজানো ঘর থেকে গোটা তিনেক বাছাই করা Curio ও দামী হাত ঘড়ি বেশ কিছুদিনের ব্যাবধান রেখে রেখে সরিয়ে ফেললাম। এখানেও সাধারণ নিয়মে চাকরী খোয়ালো বাড়ির পুরনো চাকর। আমি আলোচনাতেও এলাম না। এইভাবে সবার অলক্ষ্যে লুকিয়ে রাখা চুরি করা জিনিষের সংখ্যা বেড়েই চলেছিল। শেষ চুরিটা করেছিলাম এক শিক্ষক বন্ধুর বাড়িতে তার মেয়ের জন্মদিনের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে। জিনিসটা ছিল একটা বিদেশী রিমোট কন্ট্রোল খেলনা গাড়ি। একটু বিশেষ রকম আকর্ষণীয় ছিল এই খেলনাটা।   আমি টের না পেলেও আমার শিক্ষক বন্ধুরা কোথাও কখন একত্রিত হলেই এই অদ্ভুত চুরির ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁরা লক্ষ্য করেছিলেন এবং পরে গভীর অনুসন্ধান করে দেখলেন প্রত্যেকটা চুরিতে আমিই উপস্থিত ছিলাম। আমার প্রিন্সিপাল যে কথা গোপন রেখেছিলেন এতদিন, পরে তা আর গোপন ছিল না। প্রিন্সিপাল গোপনীয়তা ভাঙতেই আমার ওপর সন্দেহটা বন্ধুদের আরো দৃঢ় হলো আমার অজান্তে। আমার স্ত্রীর কানে কথাটা কবে কিভাবে পৌঁছেছিল আমি জানিনা। মাঝে মাঝে আমার চুরি করা জিনিসগুলো নাড়া ঘাঁটা করে এক অনাবিল আনন্দ অনুভব করতাম। আর সেইটাই আমার কাল হলো। আমার স্ত্রীর কানে নানা কথা পৌঁছনোর পর থেকে তিনি আমাকে গোপনে লক্ষ্য রাখতেন। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে পরীক্ষার খাতা দেখার নাম করে আমি পড়ার ঘরে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটাতাম। অসতর্ক হয়ে পড়েছিলাম আর সেই সুযোগে স্ত্রী ও আমার ছেলে গোপনে দেখে ফেলেছিল আমার লুকোনোর জায়গাটা। যে রাত্রে ধরা পড়লাম সেই রাত্রে রাত দশটা নাগাত পড়ার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেছিলাম। গোপন জায়গায় খোঁজ করতে গিয়ে দেখলাম সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। কোন জিনিসই সেখানে নেই। কেউ সরিয়ে নিয়েছে আমার অজান্তে। আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। সারা শরীর আমার কাঁপছে। একটা সমূহ বিপদ আমার সামনে। দরজায় টোকা দিয়ে আমার ছেলে আমাকে ডাকছে। বলছে দরজা খুলতে। খুললাম দরজা। বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল ছেলে আর তার মা। দুজনের মুখ ছিল থমথমে। আমার স্ত্রীর নির্দেশে পাশের ঘরে গেলাম। স্ত্রীর চোখে জল। নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম কিছুক্ষণ। খাটের ওপর ছড়িয়ে আছে আমার চুরি করা সমস্ত সামগ্রী। কথা বললো আমার ছেলে, “বাবা একবার তাকিয়ে দেখ। এই জিনিসগুলো তোমার কাছ থেকে পাওয়া গেছে। আমরা দুজনেই পর পর বেশ কয়েক রাত তোমাকে লক্ষ্য করেছি এবং দুজনেই নিজেদের চোখে যা দেখেছি তা অবিশ্বাস্য। মার গয়নার বাক্সটা পর্যন্ত তুমি…..। তুমি একি করলে বাবা। তুমি বন্ধুদেরও বাদ দাওনি। তোমার বন্ধু ও ছাত্রীদের বাড়ি থেকে তাদের অজান্তে তুমি যা যা লুকিয়ে এনেছো সব আমি সবাইকে ফেরৎ দেবো কথা দিয়েছি। তোমার কলেজের বন্ধুরা পুলিশে যাচ্ছিল। মার অনুরোধে তাঁরা তোমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেননি। আমরা কি করবো তুমিই বলো। বাড়ি থেকে বেরোনোর মুখ নেই আমাদের।” ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল আমার স্ত্রী। এক সর্বহারার কান্না আমাকে যেন এক ঘোর থেকে টেনে বার করলো। ডাকু আমি দেখলাম এক ভয়াবহ সর্বনাশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি আমি। বাইরের সুস্থ পৃথিবী আমাকে বর্জন করেছে। কয়েক দিন পড়ার ঘর থেকে আর বেরতে পারলাম না। খেতে ডাকতো কখন ছেলে, কখন স্ত্রী। ওদের সামনে যাওয়ার মুখ ছিল না আমার। গ্রহের ফেরে আমি একি করলাম!তোর কথা খুব মনে হতে লাগলো। কয়েক জনের কাছে সাবধানে ফোন করলাম তোর খোঁজ নিতে….কোন খোঁজ পেলাম না। কিন্তু আমার কাছে যে একটা চোরাই জিনিস রয়েই গেছে, সেটার খবর কেউ পায়নি। সেটা তোর কাছে রাখবো। আজ তোকে খুঁজে পেয়েছি। সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এবার তুইও যাবি। এই প্যাকেটটা তোর কাছে রাখ ডাকু। বাড়ি গিয়ে খুলে দেখিস।” আমি নিতে আপত্তি করায় হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো সুজন। দৌড়তে আরম্ভ করলো বারান্দার দিকে। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার দিকে হাত তুলে বিদায় জানিয়ে লাফিয়ে পড়লো নীচে। সুজন, বলে চিৎকার করে ডাকলাম। একটা বীভৎস শব্দ শুধু কানে এলো।। বারান্দা থেকে অন্ধকার ভেদ করা সামান্য আলোয় যন্ত্রণায় ছটফট করা সুজনের দেহটা এক পলক দেখেছিলাম।কতো সময় কেটে গিয়েছিল জানিনা। দূর থেকে কার একটা ডাকে কষ্ট করে তাকালাম। ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখলাম অনেকগুলো চোখ ঝুঁকে আমাকে দেখছে। আমি তাকাতেই সবাই চেঁচিয়ে উঠলো, “ডাক্তারবাবু…উনি তাকিয়েছেন।” ভীড়ের মধ্যে থেকে একজন চশমা পরা ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন আমার দিকে। এবার খেয়াল করলাম মাটিতে শুয়ে আছি। ডাক্তার ভদ্রলোক আমার পাল্স দেখলেন। হাত দুটো সোজা করে ওপরে তুলতে বললেন। চোখ দুটো পরীক্ষা করলেন ভাল করে। তারপরে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন লাগছে এখন?” বললাম, “ভাল।” যদিও মনে হলো মাথাটা খুব ভার হয়ে আছে। আমার স্ত্রী আমার হাতটা চেপে ধরলো…চোখে তার জল। অনেক প্রশ্ন মনে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল পাশে আমার ছেলে আর মেয়ে। মনে পড়ছে গতকালের ঘটনা। ছেলেকে কাছে ডেকে ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, “সুজনের কি খবর জানিস? কেমন আছে সুজন?” ছেলে বলল, “কে সুজন? তুমি কার কথা বলছো?” ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম আমি একটা নির্মানাধীন বাড়ির সম্ভবতঃ দোতলার মেঝেতে শুয়ে আছি। যতদূর মনে পড়ে সুজনের ফ্ল্যাট ছিল পাঁচ তলার ওপরে আর সেটা Under construction ছিল না। ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি এইখানেই শুয়েছিলাম?” উত্তর পেয়েছিলাম “হ্যাঁ”। আমাকে এই বাড়িতে কাজ করতে আসা মিস্ত্রিরা অজ্ঞান অবস্থায় সকালে আবিষ্কার করে। গত রাত্রের গোটা ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলাম ডাক্তারের কাছে। আমার গল্প ডাক্তার বিশ্বাস করেনি। তাঁর ধারনা হয়েছিল কোন বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ওই বাড়িতে সেই রাত্রের কোন নেশার আড্ডায় আমি একজন শরীক ছিলাম । তখনও ঘোর কাটেনি তাই সুজন নামে সেইদিন রাত্রের কোন সাকরেদকে খুঁজছিলাম। ছেলে, মেয়ে কেউই সুজনকে চিনতো না কিন্তু গল্প শুনেছে অনেক আমার কাছে। আমার স্ত্রীর সঙ্গে সুজনের অবশ্য আলাপ ছিল। তাদের পক্ষেও সুজনের গল্প বিশ্বাস করা কঠিন হয়েছিল।  বাড়িতে ফিরে আমার ছেলে হঠাৎ একটা কাগজের মোড়ক আমার হাতে দিয়ে বললো, “এইটা তোমার মাথার কাছে পড়ে ছিল। কেউ খুলতে ভয় পাচ্ছিল।” এই মোড়কটা আমার চেনা। কাল রাত্রে জোর করে সুজন তার শেষ চোরাই জিনিসটা আমার কাছে রেখে গেছে। মোড়কটা খুলতে এবার আমার কেমন অস্বস্তি লাগছে।  খুলে ফেললাম মোড়ক। ভেতরের চোরাই জিনিসটি দেখে আমার চক্ষু স্থির। মলিন হয়ে যাওয়া ছোট্ট চামড়ার ছেঁড়া ব্যাগ থেকে উঁকি মারছে হংকং থেকে পঞ্চাশ বছর আগে দাদার আনা ছোট্ট সেই ক্লিক ক্যামেরা।  কাগজের মোড়ক থেকে বেরিয়ে এলো সেই ব্যবহার করা ফিল্মের বাক্স। রাংতায় মোড়া আটটা ফিল্ম রোলে একটা স্যাঁত স্যাঁতে প্রাচীন গন্ধ। ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে শাটার দিলাম। আশ্চর্য! ক্যামেরা বলল, “ক্লিক”।নিজের আগ্রহে আর একদিন নস্কর পাড়ায় গিয়ে, সুজনের খোঁজ করেছিলাম। জেনেছিলাম সুজন সেন নামে একজন ভদ্রলোক সস্ত্রীক তাঁর ছেলেকে নিয়ে যে বাড়িতে বছর পাঁচেক আগে থাকতেন সেই বাড়িটা ভাঙা পড়েছে। আর শোনা যায় সুজন সেন তাঁরই বাড়ির পাঁচতলার বারান্দা থেকে এক রাত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন, বেশ কয়েক বছর আগে। সেই জমিতেই এই নতুন ফ্ল্যাট বাড়িটা তৈরী হচ্ছে। এখন সুজন বোধহয় এই ভয়ঙ্কর প্রবৃত্তিমুক্ত। নস্কর পাড়ার হরি মন্দিরের আনাচে কানাচে, অশ্বত্থ গাছের ঝুরি নামা অন্ধকারে, দাড়ি মুখো যে লোকটিকে, মাঝে মাঝে শীতের সন্ধেবেলায়, মাফলারে সারা মুখ আর মাথা ঢেকে ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়, সে যে সুজন সেন তা আমার থেকে ভাল কেউ জানেনা।  

 
 

  আমার দ্বৈত জীবন

সুব্রত মজুমদার

সুব্রত মজুমদারের জন্ম কলকাতায়। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এন্ড টেক্নলোজি, থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে তিনি পাড়ি দেন সুদূর আমেরিকায়। সেখানেই তাঁর পেশাগত জীবনের পাশাপাশি চলতে থাকে লেখালেখি। নানা ধরেনের ওয়েবজাইনে তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে এবং তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা ও ভিন্ন স্বাদের লেখাগুলি অগণিত পাঠকদের মনোরঞ্জন ও প্রশংসা অর্জন করেছে। লেখকের মূল বৈশিষ্ট্য তাঁর ভ্রমন ও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়তা।

যদিও মাছের ঝোল আর ভাত আমাদের সবথেকে প্রিয় তবে আমেরিকান খানাদানার ধারকাছ দিয়ে যে একেবারে যাইনা তা নয়।  আমেরিকান স্যান্ডউইচ্‌ আমাদের খুবই প্রিয়। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও আমরা অবশ্য ওটার একটা ইন্ডয়ান ভার্সানও বানিয়ে ফেলেছি। দুটো রুটির ভিতরে আমরা লাগাই  একটা পাতলা লেয়ার, কখনো সেটা হয় শসা টমেটো আর পেঁয়াজ, কখনো বা ঘুগনির আবার কখন বা পাওভাজির। 

    কালবেলায় আরাম করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। মেয়ের ডাকে খবরের কাগজের পাতা থেকে চোখটা তুলে তাকালাম ওর দিকে। দেখলাম মেয়ের হাতে একটা ময়লা ভাঙ্গাচোরা সুটকেস্‌। বড়বড় চোখদুটোকে  ঘুরিয়ে সে তার হাত পা নেড়ে অনেক কথা আমাকে বলে গেল। এইটুকু বুঝলাম যে সে বলতে চাইছে যে সুটকেসটা পুরনো আর এখনো তার ভিতর থেকে মশলার গন্ধ বেরোচেছ। আরো জানতে পারলাম যে সুটকেসের ভিতরে শীলনোড়া আর কিছু বাসন ছিল সেগুলো সে নিচে বেস্‌মেন্টে রেখে দিয়েছে। আমরা কেন এত পুরনো জিনিস এতদিন ধরে ফেলে না দিয়ে রেখে দিয়েছি এই নিয়ে আমাকে বেশ ভালো রকমের একটা লেক্‌চার দিল। পরিষ্কার আমায় জানিয়ে দিল যে সে রিসাইকেল্‌ করার গাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসবে সুটকেসটা আর এই ধরনের আরো অনেক জঞ্জাল। মেয়ে এখন বড় হয়েছে। এককালে আমি হুকুম করতাম ও শুনত এখন ও হুকুম করে আমি শুনি।

     দেখতে দেখতে তিরিশটা বছর কেটে গেল আমেরিকায়। একদিন এই দেশেই থুড়ি এই বিদেশেই হয়ত আমার মৃত্যু হবে। যখন আমি দেশে ছিলাম তখন আমার একটাই পরিচয় ছিল। আমি ছিলাম ইন্ডিয়ান্‌। এই দেশে আসার পর আমার সেই পরিচয়ের সঙ্গে যোগ হল আর একটা পরিচয়।  আমার নতুন পরিচয় হল-ইন্ডিয়ান আমেরিকান্‌। অনেকটা দাঁড়কাকের  ময়ূর পুচেছর মত। গত তিরিশ বছর ধরে এই পরিচয়ের তাৎপর্য্য উপলব্দি করার চেষ্টা করে চলেছি। ফেলে আসা জগৎটাকে আঁকড়ে ধরে থাকার যেমন আপ্রাণ চেষ্টা করেছি আবার নতুন জগৎটাকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য যা যা করার তারও কোন ত্রুটি রাখিনি। হেমন্ত মুখার্জীর  গানের  সাথে সাথে শুনেছি লাওনেল্‌ রিচির গাওয়া গান। প্রথম প্রথম আমার নিজেকে মনে হত সদ্য বিবাহিত কনে বৌয়ের মত। বাপের বাড়ি ফেলে এসে শশুরবাড়ির সবকিছুকে মানিয়ে নেওয়ার মত অনেকটা। সাটল্‌ককের মত দুটো জগতে ঘোরা ফেরা করতে করতে কেন জানিনা আমার মনে হয় দুটো জগৎকেই আমি বোধহয় ফাঁকি দিয়ে এলাম। গাছেরও পেলেম না আবার তলারও পেলেম না। ইংরেজও হতে পারলাম না আবার বাঙালীয়ানাটাও ভুলে গেলাম।

 সদর দরজার সাথে আমার জীবনের একটা গভীর সম্বন্ধ আছে। সদর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যখন বাড়ির ভিতরে

ঢুকি তখন বুঝতে পারিনা যে আমি আমেরিকায় আছি। বাড়ির ভিতরটাকে আমরা ফেলে আসা কলকাতার বাড়ির মত করে রাখি যাতে ঘুনাক্ষরেও যেন আমরা ভুলে না যাই আমাদের উৎপত্তি কোথা  থেকে। বাড়ির ভিতরে আমরা বা-লায় ছাড়া কথা বলিনা। মাছের ঝোল, মাংস, ডাল তরকারি হাত দিয়ে ভাতের সঙ্গে মেখে কব্জি ডুবিয়ে খাই। চাটনি বা অম্বল হলে আমরা আঙ্গুলেরও ব্যবহার করে থাকি। ঘুনাক্ষরেও কিন্তু আমরা আমাদের এই আচার ব্যবহার আমাদের আমেরিকান বন্ধুবান্ধবদের জানাই না, গোপন করে রাখি।  প্রথম প্রথম ভয় হতো যদি ওরা জানতে পারে তাহলে হয়ত ওরা আমাদের দেশে ফেরৎ পাঠিয়ে দেবে রিটার্ন ভিসা দিয়ে। অবশ্য আমরা যখন ওদের সঙ্গে লাঞ্চ করি তখন কে বলবে আমাদের দেখে যে আমরা আমরা কাঁটা চামচ ছাড়া শুধু হাত দিয়ে সব কিছু সাবাড় করে দিতে পারি। তখন আমরা বনে যাই পাক্কা সাহেব। বা-ালীয়ানা তখন মনে হবে সঙ্কুচিত ভীত কৃতদাসের মত লুকাইয়েছে ছদ্মবেশে। 

     যদিও মাছের ঝোল আর ভাত আমাদের সবথেকে প্রিয় তবে আমেরিকান খানাদানার ধারকাছ দিয়ে যে একেবারে যাইনা তা নয়।  আমেরিকান স্যান্ডউইচ্‌ আমাদের খুবই প্রিয়। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও আমরা অবশ্য ওটার একটা ইন্ডয়ান ভার্সানও বানিয়ে ফেলেছি। দুটো রুটির ভিতরে আমরা লাগাই  একটা পাতলা লেয়ার, কখনো সেটা হয় শসা টমেটো আর পেঁয়াজ, কখনো বা ঘুগনির আবার কখন বা পাওভাজির। বানানোর সুবিধা ছাড়াও আমার ধারণা হার্ডকোর এই আমেরিকান্‌ সোসাইটির সাথে, এই শেভ্রলে আর অ্যাপেল্‌পাইয়ের দেশে এই একটা স্যান্ডউইচ্‌ এর মধ্যে দিয়ে আমরা ওদের সঙ্গে ব্লেন্ড করে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছি।

     আমেরিকায় আসার আগে আমার গর্ব ছিল যে যেহেতু দেশে আমি ইংলিশ্‌ মিডিয়াম্‌ স্কুলে পড়াশোনা করেছি আমার জন্মগত ভাবে ইংরিজি ভাষাটার ওপর একটা দখল একটা অধিকার আছে। ভুলটা ভাঙ্গতে বেশী সময় লাগল না এদেশে আসার পরে। ধাক্কাটা খেলাম যখন দেখতাম কলেজ, অফিস আর দোকানের লোকেরা হাঁ করে আমার দিকে  তাকিয়ে আছে আমি কিছু বলার পরে। ‘লেডি ফিংগার’ যে ‘ওকরা’,

 

ব্রিন্‌জল্‌’ যে ‘এগ্‌প্ল্যান্ট’ আর ‘সিডিউল্‌’ যে ‘স্কেডুল্‌’ এই সব শিখতে সময় লেগেছিল।  মনে আছে ভুলে বাবাকে চিঠিতে এইসব নতুন বানানে চিঠি লিখলে উনি পরের চিঠিতে সেই সব বানান কারেক্ট করে আমায় পাঠাতেন। বাবা নিশ্চই অবাক হয়ে ভাবতেন যে ছেলে বিদেশে গিয়ে কি করে এরকম বানান ভুল করছে। আমি বাবার চিঠিটা পড়ে মনে মনে হাসতাম, আর খুব মজা পেতাম।  ইংরিজি ভাষাটাও যে অন্য সব ভাষার মতই খটমট এই ব্যাপারে বাবাকে একটা চিঠি দেব ভেবেছিলাম কিন্তু দেওয়া আর হয়ে ওঠেনি। যখন এই দেশে আসি তখন এদেশে অর্থাৎ আমেরিকায় দেশী মানে আমাদের ভারতবর্ষের কোন জিনিস বড় একটা পাওয়া যেত না। অতএব বলা বাহুল্য বৌয়ের শাড়ী থেকে শুরু করে , দেশের বড়ি, সরষের তেল, নানা রকমের মশলা, পাটালি গুড় এমন কি লেড়ো বিস্কুট আর ডালমুট্‌ হয়ে উঠেছিল অমুল্য। কালোবাজারীদের মত আমরা সেইসব জিনিসকে আঁকড়ে রাখতাম। তিল তিল করে খরচা করা হত তাদের, কারণ পরের বার দেশে যাওয়ার আগে ওসব জিনিস আর পাওয়া যাবে না। তখনই কিনেছিলাম ওই সুটকেসটা। ওত বড় সুটকেস সচারাচর চোখে পড়ে না। তাই চোখে পড়া মাত্র আমার আর আমার  স্ত্রীর মধ্যে চোখাচোখি হয়ে গেল।কিনে ফেললাম কোন দ্বিধা দ্বন্দ না করে। আমরা ওই সুটকেসটার মধ্যে পুরে কত শত জিনিস নিয়ে আসতাম আজ ভাবতে বসে অবাক লাগছে। আমার স্ত্রীর কাজ ছিল কেনা আমার কাজ ছিল সজত্নে সেগুলোকে ওই সুটকেসের মধ্যে ঢোকানো। শুধু ঢোকানো বললে বোধহয় ভুল বলা হবে। কাস্টমস্‌ এর চোখে ফাঁকি দিয়ে কি করে  পাটালি গুড়, সর্ষের তেল আর মশলাপাতি নিয়ে আসা যায় এই নিয়ে বোধহয় একটা গবেষণা মুলক বইও লিখতে পারতাম।             মনে আছে আমরা একবার একটা নারকেল কোরা যায় এমন একটা বঁটি  আর একটা শীল নোঁড়াও এনেছিলাম ওই সুটকেসটার মধ্যে করে । ফুড্‌প্রসেসর আসার পরে ওগুলোর দিকে আমরা আর ফিরেও তাকাইনি  বহু বছর। অতি বড় সাহসী হওয়া সত্তেও কোন রকম সবজি কখন আনতাম না। ওটা ছিল একেবারে নো নো কাস্‌টমস্‌ কাছে। মনে পড়ে একবার দেশ থেকে ফিরে সুটকেস্‌ খুলে দেখলাম কয়েকটা পটল এক কোনে উঁকিঝুঁকি মারছে। প্রথমটায় একটু হকচকিয়ে গেলাম।  তারপরেই বুঝলাম যে ঠাকুমা লুকিয়ে তার প্রিয় নাতির অতি প্রিয় পটল অজান্েত কখন ঢুকিয়ে দিয়েছে সুটকেসের মধ্যে।  চোখের জল সেদিন চেপে রাখতে পারিনি। আজকাল সবকিছুই এদেশে পাওয়া যায়, দেশ থেকে আনার আর দরকার হয় না। তবু ফেলে আসা সেইদিনগুলোর কথা ভোলা যায় না।

       সুটকেসটা একটানা দশ বছরের ওপর ধরে আমাদের কোলকাতা যাতায়াতের ধকল বয়েছে। বিগত বেশ কয়েক বছর আমরা কেউ আর ওর দিকে ফিরেও তাকাইনি।  এক জায়গায় পড়ে থাকতে থাকতে আর ধুলো ময়লা লেগে লেগে ওর চেহেরার পরিবর্তন হয়েছে। আগের মত আর চক্‌চকে চেহারাটা নেই। ওকে আমরা ভুলে গেছি, ওর প্রয়োজন আমাদের কাছে ফুরিয়ে গেছে। ও আজ বাতিল। কিন্তু ওর সারা শরীরে এখনও মশলার গন্ধটা লেগে আছে। শীলনোড়া আর পুরনো বাসনগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম অনেক্ষন। ওরা আমায় স্মরণ করিয়ে দিল পিছনে ফেলে আসা অনেক স্মৃতি, অনেক স্নেহের স্পর্শ, অনেক আদর, অনেক ভালোবাসার কথা।  তাদের অনেকেই আজ  আর ইহলোকে নেই।  আজ অনেকদিন পরে তাদের কত্থা ভেবে আমার দুটো চোখ জলে ভরে এল। আমি চিৎকার করে মেয়েকে ডাকলাম ‘‘ওরে সুটকেস্‌টা রিসাইকেল্‌ করার গাড়িতে নিয়ে যাস্‌ না। ওটাই যে এখন আমার সব। ওটা ছাড়া নিজের বলে আমার যে আর কিছুই নেই। ওটা জঞ্জাল নয়, ওটা আমার সবথেকে প্রিয়। ওটাকে আমি যক্ষের ধনের মত আগলে রাখব,  যত্ন করে রাখব এবার থেকে আমার জীবনের শেষ দিন পর্য্যন্ত। ’’

     সাড়া পেলাম না মেয়ের, জানতে পারলাম সে রওনা দিয়েছে সুটকেসটাকে নিয়ে রিসাইকেল্‌ করার গাড়ির উদ্দেশে।  

 

  বৃন্দাবন কুঠি

তাপস কিরণ রায়

বৃন্দাবন প্রাণ ফাটা চীৎকার দিয়ে উঠলো...এবার যেন বৃন্দাবনের সত্ত্বা হারিয়ে যেতে লাগলো--কোথায় যেন হারিয়ে যেতে লাগলো--কোন গভীর অতলে! এ কি চারি দিক অন্ধকার কেন! আমি কোথায়,আর, এই কি সেই পড়ো বাড়ী! সেই বাড়ী! তপন ভয় পেল। ধড়ফড় করে ও উঠে বসলো--ছুটে বের হল সে ওই পড়ো বাড়ী থেকে।বৃন্দাবন কুঠিতে সে কি করে এলো!আর ও যা স্বপনের মত দেখল সেটা কি শুধুই স্বপ্ন ছিল!

     রানাঘাট চুর্নী নদীর ধারে গোল গোল গম্বুজ আকারের বড় বড় পড়ো দুটো ঘর ছিল।আমরা ওগুলোকে গোলঘর বলেই জানতাম। ছোটবেলায় আমরা তা দেখেছি।পালচৌধুরী জমিদারের সময়কার সে সব পড়ো ঘর বাড়ি জানি না এখনো আছে কি না!

    ওই গোলঘর ছাড়িয়ে সদর রাস্তা পেড়িয়ে এক কোনায় ছিল পড়ো পুরনো জমিদার বাড়িরই এক অংশ।বাড়ির সামনে ছিল দু দুটো বিরাটাকার প্রবেশ দ্বার--এক কালে নাকি তাতে বড় বড় লোহার দরজা ছিল। গেটের ওপরের দিকে রঙ চটা দেয়াল,ভাঙাচোরা,খসা প্লাস্টারের ভিতরেও ভালো ভাবে নজর করলে দেখা যাবে কোন এক কোণের দিকে লেখা আছে--বৃন্দাবন কুঠি। ওর সঙ্গে প্রায় লাগোয়া হাড় জির জির কঙ্কালের মত দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল জমিদার বাড়িটা।ছোট বেলায় বন্ধুরা মিলে ভয়ে ভয়ে ঢুকেছি ওসব ঘরে।ভিতরের ঘরগুলি থাকত অন্ধকার।দিনের বেলাতেই তাতে আলো ছায়া খেলা করত, একটা গা ছমছম পরিবেশ ছিল--প্রায় আধ কিলোমিটার জুড়ে পড়ে থাকা বাড়িটা লোক শূন্য খা খা করত!

     আমি তখন ছোট ছিলাম--ন দশ বছরের। ভূতপ্রেত দত্যি দানার গল্প শুনে মনে বড় ভয় ঢুকে গিয়ে ছিল। রাতের বেলা পথে একা চলতে পারতাম না। সঙ্গে বন্ধু বান্ধব থাকলে ঠিক আছে--নতুবা ঘর থেকে বেরোবার প্রশ্নই ওঠে না।

   সেদিন রাতের পড়া করছিলাম। জয়দেব এলো আমার কাছে। ও আমার স্কুলে পড়ে। এক ক্লাসেই পড়ি আমরা, বলল, তপন তোকে  শীলাদি ডেকেছেন, বলেছেন, খুব

দরকার, আজই একবার দেখা করতে। কথা কটা বলে ও নিজের ঘরে চলে গেলো।

শীলাদি আমার স্কুলের মেডাম, আমি ও জয়দেব তাঁর কাছে টিউশনিও পড়ি। স্কুলে তাঁকে আমরা,মেডাম আর স্কুলের বাইরে, দিদি ডাকি। গত দুদিন আমি স্কুলে যাই নি টিউশনিতেও যেতে পারি নি। কারণ শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না--সর্দি কাশি,জ্বর-জ্বর ভাব চলছিল।

   হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা সামনে ছিল। এ সময় স্কুল কামাই, টিউশনিতে অনুপস্থিতি এসব কারণেই বোধহয় শীলাদি ডেকে পাঠিয়েছেন। শীলাদির বাড়ী যাবো বলে তৈরি হলাম।পথে বের হবার আগে মনে হল,আরে একা যেতে পারবো তো!পথে ভয় পাবো না তো? আগে মনে হলে জয়দেবের সঙ্গেই চলে যেতে পারতাম। ভাবলাম রাস্তায় তো লাইট আছে। আর তা ছাড়া পথে লোকজনের যাতায়াত এখনো থাকবে। রাত বেশী হয় নি। সাহস জুটালাম মনে। পা বাড়ালাম রাস্তার দিকে। শীলাদির বাড়ি বেশী দূরে না--যেতে পাঁচ সাত মিনিটের বেশী লাগে না। সোজা পথে হাঁটলাম দু মিনিট,এবার রাস্তা দুদিকে মোড় নিয়ে চলে গেছে। সামনেই পড়ে গম্বুজ আকারের গোলঘরগুলি। ও দিকে আলো নেই,অন্ধকারে গোলঘরগুলি  ভূতের আস্তানার মত দাঁড়িয়ে ছিল। ওর পাশ থেকেই আমায় যেতে হবে।

  গোলঘর পার হোয়ে সামান্য এগোলে ছোট একটা মাঠ, সেখানে প্রায় রোজই আমরা খেলতে আসতাম। না, দিনের বেলা, না ভয়, না ভুতের কোন কথা মনে পড়ত না, কিন্তু রাতের বেলা! ওগুলোর কথা ছাড়া আর অন্য কিছুই মনে পড়ে না! পড়বি তো পড়, ঠিক আমার চোখ গিয়ে পড়ল বৃন্দাবন কুঠির গেটের দিকে। গেটের দিকে চোখ পড়ায় আলাদা কিছু মনে পড়ছিল না, মনে পড়ল, সামনে আমার মস্ত বড় ভূতুড়ে রাজ প্রাসাদ--যেন ঘুমিয়ে আছে।ভয়ের সময় দেখেছি-- এমনি ভয়ের কথাই সব মনে পড়ে! তবু কেন যেন আর একবার চোখ গিয়ে পড়ল বৃন্দাবন কুঠির দিকে!আর,আর একি! দেখলাম সুন্দর একটা মেয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে! আশ্চর্য অন্ধকারেও তাকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম! ও আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আর আমিও ওই

দিকে তাকিয়ে আছি, চোখ সরাতে ইচ্ছে হচ্ছিল না-- অদম্য ইচ্ছা নিয়ে কেবল তার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।দেখলাম, পরমা সুন্দরী এক রমণী, যার শরীর ভরা আভরণ, চকমকে শাড়িতে যার দেহ মোড়া। আমায় ইশারাতে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল!

    আমি চমকে উঠলাম, শরীরের মধ্যে দিয়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো--দেহে কেমন যেন ঝিমঝিম অনুভব করতে লাগলাম! মনে করতে পারছিলাম না--আমি কে? আমি যেন ঠিকানা বিহীন কেউ--কোথায় যাচ্ছি, কোথায় যাবো, সব, এক সময়, সব ভুলে গেলাম!

বৃন্দাবন কুঠির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি মা! হ্যাঁ,দেখি মা আমার হাতছানি দিয়ে ডাকছেন। আমি তখন অন্য আমি! মনে হল ওই তো আমাদের বাড়ি--বৃন্দাবন কুঠি--আমি,হ্যাঁ,আমি বৃন্দাবন।

--বৃন্দাবন! বৃন্দাবন!--মা আমায় ডেকে উঠলেন। মার কাছে এগিয়ে গেলাম।

--কোথায় গেছিলি বাবা,তোকে যে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি !

--নৌকা বিহারে মা!কেন তুমি জানো না মা! মামা আমায় সকালেই নৌকা বিহার করাবেন বলেছিলেন, বৃন্দাবন বলে উঠলো।

তখন ভোরের কাক ডাকা সকাল ছিল। কুঠির রোশনদানে তখন মোমের শেষ অংশটুকু জ্বলছিল।

--মামার সঙ্গে !

বৃন্দাবনের কথা শুনে আঁতকে উঠলেন মা, তোকে বলেছিলাম না খোকা, তুই মামার সাথে কোথাও যাবি না!

--কেন,মা! মামা তো আমায় খুব ভালবাসেন। আমায় নতুন পরিচ্ছদ কিনে দেন, আমার জন্যে অনেক অনেক মিষ্টি কিনে আনেন। আমাদের বাড়ি যখন এলেন ঝুড়ি ঝুড়ি ফল মিষ্টি নিয়ে এসেছিলেন!

--না, ই বুঝিস না, মামার কাছে যাবি না।ও তোকে--

--কি মা--আমাকে--

এমনি সময় বৃন্দাবন মামাকে দেখল দূরের নদীর পারের রাস্তা ধরে আসছেন। ধোপদুরস্ত হোয়ে বৃন্দাবনের দিকে এগিয়ে এলেন তিনি। হাসলেন, বললেন, কেমন লাগলো, বৃন্দাবন? নৌকা বিহার ভালো লেগেছে?

--খুব ভালো, মামা! আরও কিছু বলতে চাইছিল বৃন্দাবন, বলতে চাইছিল, রোজ ভোরে এমনি নৌকো বিহার করবো,মামা! কিন্তু থেমে গেলো ও,মার কথা মনে হোয়ে গেলো। একটু আগেই মা তার বলেছেন, মামার সঙ্গে কোথাও যাবে না। ও কিছুতেই বুঝতে পারলো না,কেন ওর মা বাবা এমনি বলেন!

বৃন্দাবনের মামা, সংঘাত, বললেন, কি হল কি বলবে বল?

মামার দিকে তাকাল বৃন্দাবন, বলল, না,কিছু বলব না।

বৃন্দাবনের বাবা আদিত্য রায় চৌধুরী,জমিদার। বর্তমানে বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ তিনি। শয্যাগত। দু বেলা ডাক্তার এসে দেখে যাচ্ছেন তাঁকে। তবু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে আদিত্য পালচৌধুরীর দিন ফুরিয়ে আসছে!বুঝতে পারছেন তিনি,আর বেশী দিন তিনি বাঁচবেন না।

    তাঁর এক মাত্র ছেলে বৃন্দাবন, তাঁর মৃত্যুর পর একমাত্র উত্তরাধিকারী ও। কিন্তু ও খুব ছোট--দশ বছর মাত্র ওর বয়স!ও কি করে বুঝে নেবে তাঁর বাবার সম্পত্তি? সে তো এসবের কিছুই বোঝে না!চিন্তায় চিন্তায় আরও ক্ষয়ে যাচ্ছিলেন আদিত্য। চিন্তার ওপর দুশ্চিন্তা তাঁর মাথায় আরও বোঝা হোয়ে দাঁড়িয়েছে। সে তাঁর একমাত্র শ্যালক! সংঘাত।ওর মতিগতি তাঁর ঠিক লাগে না। ওপরে ওপরে আদিত্যকে শ্রদ্ধা দেখাবার ভান করে। কিন্তু সেটা যে অতিরিক্ত--শুধু মাত্র দেখানো—তা আদিত্য বুঝতে পারেন। সংঘাত ঘরভেদী বিভীষণ বললে ভুল হবে না। ও বহুদিন ধরে এখানেই আছে--নিজের ঘর বাড়ি থাকলেও কোন দিন যাবার নাম করে না।

সংঘাত ঘরে ঢোকেন, কেমন আছেন এখন? ফল পথ্যি ওষুধ পত্র খাচ্ছেন তো ঠিক মত? আদিত্যের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে বললেন, সত্যি আপনার দিকে আর তাকাতে পারছি না! দিন দিন শরীরের গতি ভাঁটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

চুপ করে থাকেন আদিত্য।

--চিন্তা করবেন না জামাইবাবু, আমি আছি, সবকিছু আপনার মত করেই দেখে নিতে পারব।

--জানি কিন্তু মনে রেখো, বৃন্দাবন আছে--আর--

--আরে সে চিন্তা আপনি করবেন না, ওকেই বুঝিয়ে শুনিয়ে দেবো আমি। আপনি নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করতে পারেন!

আদিত্য ভাবেন,বলে কি সংঘাত! সে যে তাকে এখনি চোখ বন্ধ করিয়ে দিতে চায়! 

বৃন্দাবনকে কাছে ডাকেন মা, মায়াবতী--গলার স্বর নিচু করে বলেন, বৃন্দাবন,বাবা! তুমি ছোট, বোঝো না। তোমার মামা কিন্তু তোমার ভালো চান না। তাঁর কাছে কম যাবে।একা কখনো তাঁর সাথে কোথাও যেও না,বাবা!

--ঠিক আছে আর যাবো না, মা--কিন্তু মা,মামা তো আমায় খুব ভালোবাসেন!

মায়াবতীর রাগ হয়,না, তোমায় বলেছি না, তুমি ওঁর সঙ্গে কোথাও যাবে না!

বৃন্দাবন বুঝতে পারে না। তার মনে হয়, মামা তো তার কত ভালো, দেখা হলেই মিষ্টি হেসে কত কথা বলেন! খাবারের কথা,ঘুরতে যাবার কথা, শিকারে নিয়ে যাবার কথা বলেন, আর আজই তো নৌকা বিহারে নিয়ে গেলেন! তবু সে মাকে বলল, ঠিক আছে মা, তুমি বলছ,আমি আর কোথাও যাবো না--মামার কথা শুনব না--মামার সঙ্গে কথাও বলব না।

এমনি এক দিনের কথা, বেশ রাত তখন--বৃন্দাবন তখন তার মা, মায়াবতীর সঙ্গে ঘুমাচ্ছিল। মামা সংঘাত ওদের ঘরে  ঢুকলেন, দেখলেন, বৃন্দাবন আর মায়াবতী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সংঘাত বৃন্দাবনকে ধাক্কা দিয়ে জাগাবার চেষ্টা করলেন, কয়েকবার চেষ্টায় বৃন্দাবন জাগল না। সংঘাত পাঁজা কোলে করে ওকে বাইরের ঘরে নিয়ে এলেন। গেটে তখন দুই প্রহরী জাগ্রত। কিন্তু তাদের সংঘাত বশ করে নিয়ে ছিলেন। হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গল বৃন্দাবনের।দেখল, এ কি!সে কি করে এ ঘরে এলো!

--তোমার সঙ্গে কথা আছে বৃন্দাবন!--সংঘাত হেসে বলে উঠলেন, তোমায় আমিই নিয়ে এলাম,আমি নৌকা বিহারে যাচ্ছি--মনে হল তুমিও যেতে পারো--নৌকা বিহার তোমার খুব ভালোলাগে।

বৃন্দাবনের মার কথা মনে পড়ে গেলো--ও বলে উঠলো,কিন্তু মা--

--মাকে আমি বলেছি তো,তোমার মা বললেন,ঠিক আছে এবারটা ঘুরে আসুক বৃন্দাবন,আর কখনো যাবে না--তুমি যাবে তো আমার সঙ্গে?

বৃন্দাবনের মন নেচে উঠলো। মা তাকে যেতে বলেছেন। ঠিক আছে সে এবারের মত ঘুরে আসুক,আর না হয় যাবে না।ভোরের নৌকা বিহার খুব, খুব সুন্দর লাগে ওর--নদীর বয়ে যাওয়া স্রোত, পারের দু ধারের গাছ পালা। বাড়ি ঘর ফসলের খেত, জেলেদের মাছ ধরা, আকাশের লালিম ছটা, সত্যি বৃন্দাবনের খুব ভালোলাগে!

বৃন্দাবন গিয়ে বজরাতে উঠে বসলো। সাজানো বড় নৌকো--তাতে ঘর বানানো,তার জানালাতে রঙ্গিন পর্দা,ভেতরটায় দুটো ঘর তাতে ঝালর সাজানো!

--আমি ওপরে গিয়ে বসব,মামা?উচ্ছল বৃন্দাবন বলে উঠলো।

--হ্যাঁ,হ্যাঁ,তোমার জন্যে ওপরেই ব্যবস্থা আছে, বাঁকা ভাবে ঈষৎ হেসে সংঘাত বলে উঠলো।

বজরা তখন মাঝ নদীতে, চুর্নী নদীর খরা স্রোত নিয়ে বয়ে যাচ্ছে অথই জল রাশি।

মামা ডাকলেন, বৃন্দাবন দেখে যা,দেখে যা!

বৃন্দাবন তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এলো বাইরে। ঘরের বাইরে,ছইয়ের বাইরে।

--দেখ,দেখ কত বড় মাছ! সংঘাত নৌকোর এক কিনারায় ঝুঁকে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো। বৃন্দাবন পড়িমরি করে ছুটে গেলো মামার পাশে মাছ দেখতে।

--ওই, ওই দেখ কত বড় মাছ !

বড় মাছ দেখতে বৃন্দাবন ঝুঁকে পড়ল নদীর দিকে আর সেই মুহূর্তে সংঘাত আচমকা বৃন্দাবনের দুটো পা তুলে ধরে ঠেলে দিলো জলের দিকে।

--মামা! একটা মাত্র চীৎকার শোনা গেলো বৃন্দাবনের, ও গভীর জলের মধ্যে পড়ে গেলো। খরস্রোত জল তাকে আরও কিছুটা দূরে ঠেলে নিলো। ও জলের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছিল। আর একটিবার ওর মাথার কিছু অংশ মুহূর্তের জন্যে ভেসে উঠে নদীর অতল জলে তলিয়ে গেলো।

বৃন্দাবন প্রাণ ফাটা চীৎকার দিয়ে উঠলো...এবার যেন বৃন্দাবনের সত্ত্বা হারিয়ে যেতে লাগলো--কোথায় যেন হারিয়ে যেতে লাগলো--কোন গভীর অতলে! এ কি চারি দিক অন্ধকার কেন! আমি কোথায়,আর, এই কি সেই পড়ো বাড়ী! সেই বাড়ী! তপন ভয় পেল। ধড়ফড় করে ও উঠে বসলো--ছুটে বের হল সে ওই পড়ো বাড়ী থেকে।বৃন্দাবন কুঠিতে সে কি করে এলো!আর ও যা স্বপনের মত দেখল সেটা কি শুধুই স্বপ্ন ছিল!

                                 

 

  জন্মদিনের 

পায়েস

অয়ন দাস 

লোকে বলে, বয়স বাড়লে না কি নোলা বাড়ে! সত্যি কি তাই? তবে কি শেষের দিন এগিয়ে এলো বলেই শুধু খাই খাই ভাব আমার?

পাঁচ বছর আগে পর্যন্ত যে ছিল আমার সব সময়ের ছায়াবর্তিনী, সে আবার এসব শুনলেই মুখ-ঝাপটা দিত। একটু আগেই যেন সেই চেনা মিঠে গলায় শুনলাম,- “বুড়ো বয়সে ভীমরতি! বয়স হলে সুখী মানুষের না কি দুঃখবিলাসী ভাবনা দানা বাঁধে মনের মধ্যে। আজকের এই শুভ দিনে অনাছিষ্টি ভাবনা কেন? সুখে থাকতে কি ভুতে কিলোয়

    দূরে কোথাও একটা ডাহুক পাখি ক্লান্ত স্বরে একটানা ডেকেই চলেছে। দূরের সীমানা কতটা হতে পারে, এটা ভাবতে ভাবতেই এক অদ্ভুত সমাপনে ঠিক এই সময়েই দোতলার কোনও ঘর থেকে রেডিওতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় "দূরে কোথায়, দূরে দূরে" গানটা মন্মথবাবুর কানে ভেসে এল। ধূপের গন্ধের মত সুরের রেশ ছড়িয়ে পড়ছে মনের আনাচে কোনাচে। মন কেমন করা ভালো লাগা আর একই সাথে অচেনা এক নিরাসক্তির বৈপরীত্যের অনুভূতিতে মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। ক্লান্তিতে আনমনে চোখ বুজতে যেতেই টেবিলের উপর রাখা গত রাতের লেখা সদ্য কবিতাটায় চোখ পড়ল।

 

 ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৫

সোমবার রাত,

  

                  || ছেলেবেলা ||

 

 আমার যা কিছু মূল্যবান, দূর্লভ, দুষ্প্রাপ্য

সবই সেই ছেলেবেলার;

যা কিছু প্রাচীন, গভীর, গোপন,--- সবকিছুই 

প্রত্নতাত্ত্বিকের জমা ডাকটিকিটের মত

ছেলেবেলার পোস্টকার্ডে সেঁটে আছে।

 

ঘন্টা, মিনিট, সেকেন্ড এর কাঁটা 

স্থবির হয়ে

হঠাৎ থেমে গেছে;

জানলার ফাঁক দিয়ে চুইয়ে আসা 

ছোটবেলার এক-চিলতে রোদ্দুরের টাইমফ্রেমে।

 

আইসক্রিমের মত গলে গলে যায় সময় 

টুপটাপ করে খসে পরে, ঝরে পরে মুহূর্ত 

পল, অনুপল.....

ধাবমান সময়যানের দিকে 

এগিয়ে আসা প্রতিটা দিন 

আর আলোকিত নয়।

 

ছেলেবেলার চৌকাঠ পেরিয়ে 

বড় হয়ে আমি

নতুন কিছুই শিখিনি, জানিনি;

ধার করা আলো, আর 

প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় 

যা কিছু চিনেছি, তা 

অভ্যস্ত চোখ ও মনের 

দ্রুত গাণিতিক সমীকরণ।

আমার আবিষ্কারের, সবকিছুই জমা হয়ে আছে

আবছা ফেলে আসা, ছোট্ট

ছেলেবেলার উঠোনে।

স্মৃতির কোটরে যা কিছু ছিল

সবই বদলে গেছে

ক্ষয়ে, নুয়ে, ভেঙ্গে গেছে;

রোদে জলে ধুয়ে গেছে, মুছে গেছে।

 

মনের কোনায়, ল্যাম্পপোস্টের খুটেতে 

আজও ছেঁড়া ঘুড়ির মত 

আটকে আছি হারিয়ে যাওয়া 

ছেলেবেলার সেই ছোট্ট ‘আমি’।

  

টেবিলে রোজনামচা লেখার মোটা খাতাটা পরে আছে।
মন্মথবাবু তেমন ভাবে বিখ্যাত না হলেও, যৌবনে খুব একটা অপরিচিত ছিলেন না সাহিত্যের পরিমন্ডলে। বেশ কিছু উপন্যাস, কয়েকটি গল্প আর কবিতা বই-এর  সুবাদে পাঠক-পাঠিকাদের মাঝে নামডাকও হয়েছিল। এখন সব কিছুই অতীত। সারাদিনই অবকাশ; অখন্ড অবসর নিয়ে লিখতে গেলেও শব্দ, অক্ষর ধরা দেয় না।  সময়ের চোরাস্রোতে ভাটার টানে পিছিয়ে পড়েছেন। আধুনিক লেখার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন না নিজেকে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হীনমন্যতায় অপাংতেয় মনে হয় নিজেকে। 

নামেই রোজনামচা, রোজ তো দূরের কথা, সপ্তাহান্তেও দু-পাতা লেখা হয় কি না সন্দেহ! মাঝে মাঝে হঠাৎ স্মৃতির

 

 

 

সরোবরে ঘাই মারে পুরোনো অতীত, ফেলে আসা নানা টুকরো ঘটনা। বেলাশেষে ছায়ারা দীর্ঘ হয়। বৃত্ত পরিক্রমায় জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে মন্মথবাবু অনুভব করেন, সময়ের গতিপথে, ভাবনার দৃষ্টিভঙ্গিও পালটে যায়। আজ থেকে কুড়ি-পঁচিশ বছর আগের ঘটনাও আজকের প্রেক্ষাপটে অন্য রকম ভাবে ধরা দেয় মনের ক্যানভাসে। ছেঁড়া ছেঁড়া এই অনুভূতি গুলিই ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই খাতায় লিখে রাখেন মন্মথবাবু। শুধু লেখা নয়, এ যেন নিজের সাথে নিজের কথা বলা; আত্মকথন। মানুষের জীবনে কথা বলার লোকের বৃত্ত যখন ছোটো হয়ে আসে, নিজের সাথে নিজে কথা বলাই কি একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে?

 

১৪ই আষাঢ়, ১৪২৫

মঙ্গলবার সকাল,

       গতকাল সারা রাত বৃষ্টি হয়েছে। ভোর হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। বেলা বাড়লেও দিনের আলো ম্লান। বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধ। ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে দিন, একটু শীত শীত করছে। বারান্দায় এক-চিলতে রোদ সোনালী নরম মিঠে রোদ্দুর এসে পায়ের পাতায় লুটিয়ে পড়েছে। তেমন তেজ নেই, একটু বাদেই মিলিয়ে যাবে সুউচ্চ অট্টালিকার আড়ালে। মানুষ এখন পাশে বাড়তে পারে না, মাথায় বাড়ে। দু বছর আগেও সামনে একটু সবুজের ছোঁওয়া ছিল, প্রোমোটারদের দৌলতে সেটুকুও আর নেই। দুপুর বেলায় সূর্যের প্রখর তাপে নিজের ছায়া যখন ছোটো হয়ে আসে, তখন অনুভূত হয় এই ছায়ার মতই আমিও খুব দ্রুত ছোটো হয়ে ফুরিয়ে আসছি। জীবনের প্রয়োজনে জন্মের পর থেকে ছোটো থেকে বড় হয়েছিলাম, এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় থেকে ক্রমশ ছোটো হচ্ছি। জীবনের দীর্ঘ চলার পথে এখন শুধু অতীতের স্মৃতিটুকুই সম্বল। ভাবনা গুলো মাকড়সার জালের মত এলোমেলো হয়ে যায়,  তার মাঝেই আচমকা হঠাৎ করে মনের কোন অতল গহ্বর থেকে ফেলে আসা নানা মূহুর্ত জলছবির মত ভেসে ওঠে দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

      অনন্ত সময় নিয়ে বসে আছি। আমি কি স্বার্থপর? আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও কেন দেখতে পাই না নিজের সন্তানদের মুখ! একি স্মৃতিভ্রষ্টতা? তাহলে কেন চোখ বন্ধ করলেই যা কিছু দেখি, সেই শৈশবের ঘটনা এসে পড়ে বারে বারে? কত পুরোনো, অথচ আজও স্পষ্ট! কিন্তু কই, ওরা যে এই এত বড় হল, বিদ্বান হয়ে স্কলারশিপ পেল বাইরে পড়তে যাবার সময়, সেই স্মৃতি কেন আবছা? দুই ছেলেমেয়ের দুজনেই বাইরে কর্মরত। চাকরি আর বিবাহসূত্রে দুজনেই গ্রীন-কার্ড পেয়ে বিদেশেই থেকে যাবে বাকি জীবন। নতুন বছরের প্রথমে নিয়ম করে রঙিন পোষ্টকার্ডের মধ্যে দাদুভাই আর দিদুনের ছবি দেখতে পাই। আমারই মত অশক্ত সত্বেও দু-এক জন এখনও যারা পায়ে হেঁটে চলতে সক্ষম, তারা এলে বইয়ের ফাঁকে গুঁজে রাখি তাদের দেখাবো বলে। তারা চলে গেলে মনে হয়, যাহ্‌, কিছুই তো বলা হল না! নিজেকেই প্রশ্ন করি, “কি হে জ্ঞানপাপী, সত্যিই কি ভুলে গেলে; না কি ইচ্ছাকৃত ভোলার অভিনয় করলে?” অবাক হয়ে ভাবি, স্বার্থপরতার সঙ্গে এও কি আমার আত্ম-প্রবঞ্চনা? 

১৮ই আষাঢ়, ১৪২৫

শনিবার সকাল,

মানুষের ছায়া তাঁর গায়ের সঙ্গে লেপটে থাকে বলে সে তাঁর নিজের ছায়ার স্বরূপ বুঝতে পারে না। ভুল বললাম; বুঝতে পারে তখন, যখন বেলাশেষে সূর্য ঢলে পড়ে পশ্চিম আকাশে। নিজের ছায়া যতটা লম্বা হয়ে ওঠে, অতীতের প্রবল পরাক্রান্ত সেই মানুষটা সংকুচিত হয়ে ক্রমেই ততটা খাটো হতে থাকে।  

সময়ের প্রবাহ স্রোতে ঘটমান অসংখ্য মুহূর্ত তৈরী হয়, আবার পরক্ষণে তা অতীতে পর্যবসিত হচ্ছে অতি দ্রুত। এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একটা ছোট্ট গ্রহ এই সবুজ পৃথিবী। তাঁর মধ্যেও কোটি কোটি প্রাণের সমষ্টিতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটাণুকীট নগণ্য আমার এই অস্তিত্ব। মহাবিশ্বে অপরিমেয় অনন্তের মধ্যে আমার এই বিন্দুসম জীবনের তাৎপর্য কতটুকু?

প্রতি দিনের মত আজকের দিনটাও অতি সাধারণ। তবু একটু আলাদা বিশেষত্ব আছে বোধহয়। গত পাঁচ বছর আগে এই দিনটা আমার কখনই মনে থাকত না, অথচ যে

মনে রাখত সবসময়, সে ছুটি নিয়ে চলে গিয়েছে পুরোপুরি অনেক দূরের দেশে। দেওয়ালের গায়ে ছেঁড়া ক্যালেন্ডারের পাতায় দাগ দিয়ে রেখে অপেক্ষা করে এখন এই দিনটা শুধু মনে রাখি, সৌজন্যে এই ওল্ড-এজ হোমের আথিতেয়তা।যেদিন এই বুড়ো-বুড়িদের স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম, সেদিন এখানের নিয়ম অনুযায়ী আমার ঠিকুজি কুষ্ঠি সব কিছু এরা নিয়ে রেখেছিল। প্রথম দিকে এক বছর ধরে মোটা লাল চালের ভাত আর ট্যালট্যালে নানা রকম সব তরকারির ঝোল খেতে খেতে যখন জিভের টেস্ট বাড্‌গুলি তাঁদের কাজকর্ম ভুলে গিয়েছিল, সেই সময় হঠাৎ একদিন এর অন্যথা ঘটল। যত্ন করে দুপরে খাবার পাতে রোজকার সু(!)খাদ্যের সঙ্গে ওই একটা আলাদা প্লেটে অল্প একটু দুধ গোলা ভাত, সঙ্গে কয়েকটা ভাঙ্গা চিনে বাদাম আর দু/চারটে কিশমিশ। সে-দিন না কি আমার পৃথিবীতে আবির্ভাব ঘটেছিল। তাই এই মহাভোজ! খাবার পর আমার হাতে ছয় ইঞ্চি মাপের একটা ক্যাডবেরি আর হ্যাপি বার্থ-ডে লেখা পোষ্টকার্ড সাইজের একটা সুদৃশ্য খাম আমার হাতে দেওয়া হল। কয়েকজন আমায় ঘিরে ধরে হ্যাপি বার্থ-ডে গানটা গাইলো কয়েক লাইন। আমায় হাসি হাসি মুখ দাঁড়াতে বলা হল, আর একজন এই অনুষ্ঠানের ফটো তুলে নিল ক্যামেরায়। বিদেশে আমার ছেলে– মেয়েকে পাঠাবে বলে। 

ওহ্‌, বলা হয় নি আর একটা কথা; ফটো তুলে ওরা চলে যাবার সময় আমার দাঁত নেই বলে ক্যাডবেরিটাও নিয়ে গেল। আমারও বলিহারি। লজ্জার মাথা খেয়ে চাইতে গিয়ে আরো লজ্জা পেলাম। দোষের মধ্যে বলেছিলাম, দাঁত নেই তো কি হয়েছে! আমাকে দাও না; আমি চুষে চুষে খাবো! 

হায় ভগবান! তারপর কত কথাই না শুনতে হল! চুষে খাবো বলাতে, সেটা অশ্লীলভাবে হাত নেড়ে কত ভাবেই না বোঝানো হল আমায়! আমি না কি বুড়ো ভাম, রসের নাগর! তিনকাল ঠেকে মরার সময় হল, এখনও রস কমলো না!  

ছিঃ ছিঃ,  লজ্জায় মাটিতে মিশে যাই! ধিক্‌!

ঘর ছেড়ে সবাই বেড়িয়ে গেলে, চৌকিতে শুয়ে চোখ বুঝে বিধাতার কাছে বললাম, কি প্রয়োজন ছিল এই নাটকের? আমার জন্মদিনটা কি ঘটা করে ওদের মনে করিয়ে দেবার এতটাই দরকার ছিল তোমার? তারপর থেকে আর ওদের কাছে কিছু চাই নি। পরের বছরেও আবার সেই পায়েসের প্লেট। তবে এবার আর আগের বারের মত ভুল করি নি। ওরা যা যা করতে বলেছিল, লক্ষী ছেলের মত শুনে তাই তাই করেছি। সেই দিনের পর থেকে ঐ পায়েস টুকুর স্বাদটা যেন জিভে লেগে থাকে সবসময়। বহুমুত্র রোগের প্রকোপে আক্রান্ত বহুদিন আগে থেকেই, মিষ্টি যে খুব ভালোবাসি তাও নয়; তবু ওই মিষ্টি পায়েসের স্বাদটা ভুলতে পারি না কেন? 

লোকে বলে, বয়স বাড়লে না কি নোলা বাড়ে! সত্যি কি তাই? তবে কি শেষের দিন এগিয়ে এলো বলেই শুধু খাই খাই ভাব আমার?

   পাঁচ বছর আগে পর্যন্ত যে ছিল আমার সব সময়ের ছায়াবর্তিনী, সে আবার এসব শুনলেই মুখ-ঝাপটা দিত। একটু আগেই যেন সেই চেনা মিঠে গলায় শুনলাম,- “বুড়ো বয়সে ভীমরতি! বয়স হলে সুখী মানুষের না কি দুঃখবিলাসী ভাবনা দানা বাঁধে মনের মধ্যে। আজকের এই শুভ দিনে অনাছিষ্টি ভাবনা কেন? সুখে থাকতে কি ভুতে কিলোয়?” 

প্রথমে বুঝতে পারি নি; চমকে গিয়েছিলাম। তারপর বুঝতে পেরে একগাল হেসে বললাম, “না গো, তা নয়। আমার এই নিস্তরঙ্গ জীবনে কি কোনো ঢেউ আছে? তোমায় কত ডাকি, তোমার তো আমার কাছে এসে আগের মত গল্প করার সময়ই হয় না। আমায় কি তুমি কখনও দুখী দেখেছো, বল? তোমায় বিয়ে করে ঘরে আনার পর থেকে সেই শেষের দিন অবধি তো দুজনের খুনসুটিতেই সংসারে এত বছর কাটিয়ে দিলাম! তুমি চলে যাবার পর আমার কথা বলার, শোনার লোক কই আর!”

- “ধ্যাত, তুমি ঠিকমত আমায় ডাকোই না, তাই তো আমি আসি না; আজ আমায় ভাবছিলে বলেই না এলাম!”

- “তুমি আর যাবে না তো আমার কাছ থেকে? “বল, থাকবে সব সময়?”

- “হ্যাঁ রে বাবা থাকবো, থাকবো, থাকবো। তিন সত্যি! এবার বিশ্বাস হল তো?”

- “হ্যাঁ, হল। তুমি তো মিছে কথা বল নি কখনও আমার সঙ্গে! তোমার কথা বিশ্বাস না করে উপায় আছে!”

- “ঠিক। এবার থেকে আর যাবো না তোমায় ছেড়ে কখনও। এখন থেকে তোমার কাছেই থাকবো আমি।”

- “বাহঃ, খুব ভালো হবে তাহলে। তুমি যখন এসেই গিয়েছো, তখন একটা কাজ করবে?”

- “কি বল?”

- “আজ তো আমার জন্মদিন, তাই আজ ওরা খাবারের সঙ্গে আলাদা করে একটু পায়েস দেবে আমায়। আমি চাইলে ঠাট্টা করে, মস্করা করবে; তুমি ওদের বলে দেবে, আমায় যাতে আর একটু বেশি করে পায়েস দেয়?”

- “আচ্ছা, ঠিক আছে; বলে দেব। সকাল থেকে কত কথা বলে চলেছে! আজ তুমি খুব ক্লান্ত। আজকের দিনে মন খারাপ করতে নেই। তুমি চোখ বোজো এখন। এসো, আমি আগের মত তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিই। ঘুম থেকে উঠে পায়েস খাবে।”

রান্নার মাসি সুরমা, খাবারের থালার সঙ্গে অতিরিক্ত পায়েসের প্লেটটা নিয়ে ২১ নম্বর ঘরে কাউকে না পেয়ে বারান্দায় এসে দেখে, দাদু হাঁ করে ঘুমিয়ে আছে। মাথাটা গাছের ছায়ার দিকে হেলে আছে, হাসি হাসি মুখ। বুড়ো বয়সের এই এক রোগ! গাল তোবড়ানো ফোকলা দাঁতে নিজের মনে কি যে বিড়বিড় করে কথা বলে, তা ভগবানই জানেন!

খাবারটা ঘরের টেবিলে রেখে, কাঁধ ধরে নাড়াতে গিয়েই কাঠের মত শক্ত দেহটা সশব্দে টুল থেকে দড়াম করে আছড়ে পড়লো নিচে শান বাঁধানো মেঝের উপর।

বিরক্তিভরা মুখে নিচের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে সুরমার অভিজ্ঞ চোখ বুঝলো, আজ আর তাড়াতাড়ি কাজে ফাঁকি দিয়ে বাড়ি যাওয়া যাবে না।

...কাজের ফ্যাঁকড়া বাড়লো; কারণ, বুড়োটা মারা গিয়েছে অনেকক্ষণ আগেই! 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?