আলাপ

     '৭০ - '৮০ এর দশকে কলকাতার ময়দানে ফুটবল পাগল দর্শকের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছিলেন যে সকল খেলোয়াড় তাদের মধ্যে সুরজিৎ সেনগুপ্তের নাম একেবারে যে ওপর সারিতে থাকবে তা নিয়ে আর বলার কোন অবকাশ থাকে না।  সিনিয়ারদের মুখেই শুনেছি - 'কি যে খেলা খেলা করিস, সুরজিৎ সেনগুপ্তের খেলা দেখেছিস!' হ্যাঁ আজও প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ বছর বাদেও এই নামটি বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলে মহা সমারোহে টেবিলজুড়ে আড্ডায়, ঐকান্তিক আলোচনায় কিংবা কোলাহলরত ধূমায়িত কাপে স্থান পেয়েছে। যারা ওনার খেলা দেখেছেন তারা সত্যিই কত ভাগ্যবানই না ছিলেন! আজও তাই অনেককেই বলতে শুনি - ইশ! ওনার খেলা দেখা হয় নি'।  ভারতের সর্বসেরা উইঙ্গার হিসাবে সুরজিৎ সেনগুপ্তের খ্যাতি নিয়ে কিছু উপস্থাপনা করাটা আমার পক্ষ থেকে অনেকটাই ধৃষ্টতা হয়ে দাঁড়ালেও একবার মুখোমুখি বসার লোভ সংবরণ করা

আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই আমারই এক দাদা-সম (অশোক) ও বৌদির (ঐন্দ্রিলা) সহযোগিতায় যখন এই সুযোগটা পেয়ে গেলাম তখন আমার এক কথায় 'হ্যাঁ'। 

    বেশ খোলামেলা আড্ডায় সুরজিৎবাবুর সঙ্গে অনেকটা সময় কাটলো। অত্যন্ত বিনয়ী, মৃদুভাষী এই শ্রদ্ধেয় মানুষটির সঙ্গে ভবিষ্যতে আবার আড্ডায় ফিরবো এই আশা রাখি।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

  • সুরজিৎ সেনগুপ্ত

  • স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত

  • অশোক দে

  • ঐন্দ্রিলা ব্যানার্জ্জী দে

কিংবদন্তী ফুটবলার

সুরজিৎ সেনগুপ্ত

ছোটবেলা  ও স্কুল...

      থাকতাম কলকাতা শহরতলী থেকে অনেকটা দূরেই হুগলী জেলার শহর হুগলীতে। সেখানে আমার স্কুল 'হুগলী ব্রাঞ্চ স্কুল' ছিল বাড়ি থেকে হাঁটা পথ। সেখানেই আমি ছোটবেলা থেকে পড়েছি। দৈনন্দিন রুটিনও ছিল আর পাঁচজনের মতই। সকালে পড়াশোনা, তারপর স্কুল, আর স্কুল থেকে ফিরেই মাঠ। মাঠে গিয়ে ক্রিকেটের সময় ক্রিকেট আর ফুটবলের সময় চুটিয়ে ফুটবল, সব রকম খেলাই চলত। পাড়ার মাঠে ফুটবল খেললেও স্কুল টিমে আমি অনেক পরে খেলার সুযোগ পেয়েছি।  তার কারণ আমার খেলার বুট ছিল না। একদিন ফিজিক্যাল এডুকেশনের টিচার বাবাকে ডেকে বললেন যে আমাকে একটা বুট কিনে দিতে। তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। সেই প্রথম আমার বুট পড়া আর তার সাথে সাথে স্কুল টিমে খেলার সুযোগ। 

   আমাদের বাড়িতে খেলাধূলার পাশাপাশি পড়াশোনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। তাছাড়া গান বাজনারও চল ছিল। হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবার পর প্রায় মাস তিনেকের একটা লম্বা ছুটি ছিল আমার হাতে। তখনকার দিনে জয়েন্ট এন্ট্রান্স বলে কিছু ছিল না। নাম্বারের ভিত্তিতে ডাক্তারী বা ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি করা হত। এই সময় আমি  শ্রদ্ধেয় ভোলাদার কাছে ফুটবল শিখেছি, উনি ঐ মাঠেই খেলতেন। পরে সিনিয়র হয়ে যাবার পর আমাদের কোচিং করাতেন, ভুল ভ্রান্তি ধরিয়ে দিতেন। তবে খুব সিরিয়াসলি খেলাটা শেখার চেষ্টা করতাম। আমি বাঁ পায়ে সট নিতে পারতাম না। বাঁ পাটা খুব আড়ষ্ট ছিল। তা আমার শিক্ষাগুরু ভোলাদা আমাকে বাঁ পাটা তৈরি করে দিয়েছিলেন। তার জন্য অনেক কানমোলা বরাদ্দ ছিল এবং বকাঝকাও শুনতে হয়েছে। হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার পর ভোলাদাই জোর করে কলকাতার একটা সেকেন্ড ডিভিশন টিম 'রবার্ট হাডসন-এ' খেলতে পাঠিয়ে দেয়। সেই টিমেই খেলতে খেলতে হঠাৎই মাঝপথে 'খিদিরপুর স্পোর্টিং ক্লাব' থেকে আমাকে ডেকে পাঠায়। সেখানেই আমি ১৯৭০ সালে সই করলাম। '৭০ আর '৭১ এ আমি খিদিরপুর স্পোর্টিং ক্লাবের হয়েই খেলি। তারপর '৭১ সালের শেষের দিকে একদিন হঠাৎই কলকাতার এক দোতালা বাসের দোতালায় শৈলেন মান্নার সঙ্গে দেখা হয়। শৈলেনদাই  বললেন - ' খেলবি আমার ক্লাবে? '  

কোচ  অচ্যুত ব্যানার্জী ...

খিদিরপুরে জয়েন করার পরেও মাঝেমাঝে আমি ভোলাদার কাছে যেতাম। ভোলাদাও যত্ন সহকারে আমাকে দেখিয়ে দিতেন। খিদিরপুরে থাকার সময় আমি অচ্যুত ব্যানার্জী নামে এক বিখ্যাত কোচকে পেলাম। আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে আমার পরিচিতি ঘটে এই অচ্যুত ব্যানার্জ্জীর হাত ধরেই। উনি শিখিয়েছিলেন কিভাবে আধুনিক ফুটবল এগোচ্ছে, কিভাবে আমি আমার ক্ষমতা আমি কাজে লাগাবো। অনেক খুঁটিনাটি ভুল ভ্রান্তি উনিই ধরিয়ে দিতেন, যেগুলো আমাকে পরবর্তী সময় ইষ্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানে খেলতে অনেক সাহায্য করেছে, সম্মৃধ্য করেছে। এরপর আমি দু-বছর মোহনবাগানে খেলি তারপর ১৯৭৪ সালে ইষ্টবেঙ্গলে যোগ দিই। 

ছোটবেলার শিক্ষাগুরু

ভোলাদা - অশ্বিনীকুমার বরাট

- ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত 

ফুটবল ও বই পড়া এই দুই নেশাকে পাশাপাশি সময় দেওয়া...

আমার বই পড়ার নেশাটা বলতে পারো ঐ হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার ঠিক পর থেকেই।তার আগে স্কুলের পড়াশোনা, খেলাধূলা আর আড্ডা ছাড়া খুব একটা কিছু করি নি। তেমন একটা তাগিদও ছিল না। বাড়িতে আমার মা, দিদা খুব গল্পের বই পড়তেন। দাদা লাইব্রেরীর সদস্য হয়ে প্রচুর বই আনতেন। সেই থেকেই বইএর নেশা চেপে ধরে। তবে বাংলা সাহিত্যই বেশী পড়েছি। বিভুতিভূষণ পড়ে বলতে পারো ওনার ফ্যান হয়ে গেলাম। তারপর শরদিন্দু, পরবর্তীকালে সুকুমার রায়ের কবিতা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছি। সঙ্গে ছিল রবীন্দ্র সাহিত্য, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গান। এই সব নিয়েই ছিলাম। পরিবারের থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছি বলেই আজও সেই বাতাবরণের মধ্যেই আমার সময় কাটে। 

 

আপনার দেখা সেরা বিদেশী কোচ...

আমার সময় যদি বলো তাহলে বলব একমাত্র বিদেশী কোচ এসেছিলেন ইংল্যান্ডের রন মিডস, তাও মাত্র সাত দিনের জন্য।

রন মিডসের রণকৌশল...

 

খুবই ভাল। খুব ভাল কোচ ছিলেন। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই আমাকের ভালবেসে ফেলেছিলেন। এত অল্প সময় কিন্তু তার মধ্যেও একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তুমি যার কথা ভাবছো মিলোভান এসেছিলেন তারও পরে।

 

মাত্র সাত দিন কেন...

ফিফার একটা একটা প্রোজেক্ট-এ রনকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল।বিভিন্ন দেশ, শহর ঘুরে ঘুরে কোথাও সাত দিন কোথাও পনেরো দিন উনি কোচিং করাতেন। আমাদের ভাগে পড়েছিল মাত্র সাত দিন। উনি যদি আরো কিছুদিন থাকতেন তাহলে খুবই ভাল হত। আরো কিছুদিন ওনাকে পেলে... 

কোচ মিলোভান...

কোচ মিলোভানকে আমি দূর থেকে দেখেছি। আমি তখন দেশের হয়ে খেলা ছেড়ে দিয়েছি। মিলোভান ছেলেদের সঙ্গে একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরী করে ফেলেছিলেন। আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে আমাদের ছেলেদের একটা পরিচিতি ঘটিয়েছিলেন। তার ফলস্বরূপ সেই সময়ে ভারতীয় ফুটবলের তুলনামূলকভাবেও কিছুটা সাফল্য এসেছিল। আমাদের ভারতীয় ফুটবলের সাফল্য বলতে গেলে '৬২তে এশিয়াড জেতা, আর ৭০ সালের এশিয়ান গেমস এ ব্রোঞ্জ, আর তো উল্লেখযোগ্য বিশেষ কিছুই নেই। তবে মিলোভানের সময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারত যে ফুটবল খেলতে পারে সেই পরিচয়টা জনসমক্ষে আনতে উনি সক্ষম হয়েছিলেন। তাই আমাদের দেশে আসা সমস্ত বিদেশী কোচেদের মধ্যে আমাকে মিলোভানকেই সবচেয়ে সেরা মনে হয়। 

বাংলার ফুটবল...

বাংলার ফুটবল ব্যাপারটা একটু ডিফাইন করা দরকার। বাংলার ফুটবল বলতে কি বোঝাতে চাইছো যে কতজন 'বাঙালি' ফুটবলার খেলছে আর ফুটবলার হিসাবে তাদের মান কতটা উঠেছে বা নেমেছে। ধরো, এটা হল একটা ডেফিনেশন। আর একটা দিক হল বাংলায় যে খেলাই হচ্ছে সেটাই বাংলার ফুটবল। সেক্ষেত্রে আমরা দুই জাতীয় দল ইষ্টবেঙ্গল বা মোহনবাগান এদের পারফর্মেন্সের ওপরই সব বিচার করি। 

সন্তোষ ট্রফি - ১৯৭৭ - মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর  সঙ্গে

- ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত 

সেইখানে বাঙালি ফুটবলার আর নেই বললেই চলে। নর্থ ইষ্টের ছেলেরা কলকাতায় এসে ভীড় করছে। তাছাড়া নানা জায়গা থেকে ছেলেরা এসে খেলছে। আর তা না হলে বিদেশীরা খেলছে। চার-পাচঁজন বিদেশী তো খেলতেই পারে। কাজেই বাঙালি হিসাবে যে ফুটবল খেলা ছিল সেটা উঠে যেতে বসেছে। তুমি একবার আমাদের দুই দল ইষ্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের খেলোয়াড় লিস্ট দেখো তাহলেই বুঝতে পারবে আমি কি বলতে চাইছি।আমাদের বাঙালিদের মধ্যে খেলাধূলার থেকে পড়াশোনার গুরুত্ব চিরকালই ছিল। আর ফুটবল খেললেই তো হবে না, সেটাকে তো পার্সু করতে হবে, খুব সিরিয়াসলি নিতে হবে।সেক্ষেত্রে কিছুটা পড়াশোনার ক্ষতি করেই করতে হবে। খেলার জন্য সময় দিতে হবে। সেটা আর এখনকার দিনে কোন বাড়ি থেকেই বা সমর্থন করবে। কিছু খেলোয়াড় হয়ত আসে, যে কোন কারণেই হোক পড়াশোনার সুযোগ ওদের কাছে হয়ত কম, তাই ফুটবল খেলাটাকে একটা পেশা হিসাবে বেছে নেওয়ার একটা তাগিদ আছে। তবে সে সংখ্যা খুবই কম। কাজেই বাংলার ফুটবল যে খুব একটা ভাল জায়গায় আছে, তো আমার মনে হয় না। 

আপনি তো সর্বকালের সেরা উইঙ্গারদের মধ্যে পড়েন। এখনকার দিনের খেলায়  স্কিলের তুলনামুলক বিচারে আপনার ধারে কাছে যাওয়া তো দূরের কথা, কোন উইঙ্গারই তো খেলার মাঠে চোখে পড়ে না ...... 

একটা ভাল বিষয় তুলে ধরলে। আমরা ধীরে ধীরে আধুনিক ফুটবলের সাথে পরিচিত হচ্ছি। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের যে মূল উপাদান, সেগুলোকে গ্রহণ করতে পারছি না। তার মধ্যে একটা হল উইং প্লে। আমরা যদি আন্তর্জাতিক ফুটবল বা বিশ্বমানের ফুটবলের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে আজকের বিখ্যাত খেলোয়াড়রা উইং থেকে মুভ করছে। সাম্প্রতিককালে রোনাল্ডো, নেইমার বা মেসিরা কিন্তু উইং থেকেই অপারেট করে, কেউ ডানদিক থেকে কেউ বা আবার বাঁ দিক। উইং প্লে-টা কিন্তু বিশ্বমানের ফুটবলে আছে, আমরাই কিন্তু অ্যাডপ্ট করতে পারছি না। আমরা সেই মাঝখানটা ব্যবহার করে বলটা পেনাল্টি বক্সের মুখে তুলে দি, উদ্দেশ্য থাকে কাউকে দিয়ে বক্সের মধ্যে হেড করানো, এর বাইরে উইংএর ব্যবহার তো করাই হয় না। উইংটা ব্যবহার করে সেন্টার করা, ড্রিব্লিং করে পেনাল্টি বক্সে মারাত্বক পাস বাড়ানো আজকাল এগুলো দেখতে পাচ্ছি না।  তার একটা কারণ হল সেই রকম ফুটবল প্রতিভাও চোখে পড়ছে না। যারা আছেন তাদের দিয়ে করানোর চেষ্টাও করা হচ্ছে না। উইং থেকে খেলা মানে একটা দিকে মাঠ, অন্য দিক তখন ফাঁকা। খেলাটাকে একদিকে নিয়ে আসার টেকনিক। এট কিন্তু বেশ আক্রমনাত্বক, যদি পরিকল্পনা মাফিক খেলা যায়। 

আপনার পরে বিদেশ বসু, উলাগানাথন, হারজিন্দার সিং, সুভাষ ভৌমিক পরে চিবুজার... উইং দিয়ে দৌড়ে এসে বিপক্ষের রক্ষণভাগে কাঁপুনি লাগিয়ে ছাড়তেন? এখন আর নজরে পড়ে না।কিছুদিন আগেও ইষ্টবেঙ্গলের দু-ঘন্টার অনুশীলনে আমার এই ধরণের একটা মুভও নজরে পড়ে নি...

উইংটা তো ব্যবহার করতে হবে। কখনো দৌড়ে, কখনো ড্রিবিল করে ভিতরে কেটে ঢুকে আসা এই ধরনের কিছু পদ্ধতি তো আমাদের সময় দেখা যেত, এখন আর কোথায়। আমাদের সময় বিদেশ, মানস যেভাবে দেখিয়েছে তা এই সাম্প্রতিককালের খেলায় আর দেখতে পাই না। আসলে এখন পৃথিবী জুড়ে প্লেসিং ফুটবল বা পাসিং ফুটবল চলছে সেইটা আমরা রপ্ত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু এই পদ্ধতিটা রপ্ত করতে গেলে এক বিশেষ ধরণের প্রস্তুতি বা অনুশীলনের প্রয়োজন আছে। দলের প্রত্যেককেই কম বেশী সম প্রতিভাধর হতে হয়। কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বল ছাড়লে সেই বলকে সঠিকভাবে সতীর্থদের কাছে পৌঁছে দিতে হয়, এটা কিন্তু মোটেই সোজা না। খুব অল্প জায়গার মধ্যে অসম্ভব বল কন্টোল আর নিখুঁত পাস দেবার ক্ষমতা রাখতে হয়। এটা আমরা ভেবে দেখছি না। শুধু ফলো করলেই তো হবে না, তাতে সাফল্য আসছে কিনা দেখতে হবে তো। আর এতেই আমরা ব্যর্থ হচ্ছি।  

 

মারডেকার অভিজ্ঞতা...

১৯৭৪ এ মালয়েশিয়া খেলতে যাই। মালয়েশিয়ার সঙ্গে খেলা ছিল। সচিনান নামে বিপক্ষের একজন খেলোয়াড় অবৈধভাবে আমাকে আঘাত করে। আমাকে ধরে রাখতে পারছিল না। কানে আঘাত পাই, পরে অপারেশ করতে হয়। অনেক্ষণ ধরেই আমাকে আটকানোর চেষ্টা করছিল। এর পরেই ঘটনাটি ঘটে যায়। আমার খুব ভাল লেগেছিল যে প্রচুর ভারতীয় সমর্থকরা খেলার মাঠে ভীড় করেছিলেন। প্রচুর সমর্থনও পেয়েছিলাম আমরা। আমাকে ভালবেসে ওরা "আলফা রোমিও" বলে একটা নামও দিয়েছিল। "আলফা রোমিও" নামে একটা ইটালিয়ান গাড়ি ছিল, খুব দ্রুত চলত। যেহেতু আমি খুব দ্রুত ছুটতাম, তাই ওরা আমাকে ঐ নামে ডাকতে আরম্ভ করে। যদিও আমরা সেমিফাইনালেই পৌঁছতে পারি নি, পাঁচ-কিংবা ছয় নম্বরে শেষ করেছিলাম, কিন্তু ওদের অফুরন্ত ভালোবাসা পেয়েছিলাম। এই অভিজ্ঞতাটা খুবই ভাল ছিল।

আপনাদের সময় দল-বদল মানেই ছিল প্রচন্ড উত্তেজনাপূর্ণ একটা অধ্যায়।খেলোয়াড় ছেনতাই, মাঝপথে তাদের গাড়ি হাওয়া করে দেওয়া, শহরের আসেপাশে লুকিয়ে রাখা, কখনো বাংলার বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার রীতি ছিল... এই রকম নানা লৌমহর্ষক ঘটনার সাক্ষী আপনাদের মত নামী খেলোয়াড়রা কোন না সময় হয়েছেন...তারই কিছু স্মৃতি।

এখনকার সময় অনেকটা আলাদা। টাকা বেশী পেলেই চলে যাবে। আগে তো আর তা ছিল না, টাকা পয়সাও খুব একটা ভাল ছিল না। তাই তখনকার দিনে কর্মকর্তারা যে খেলোয়াড়দের রাখতে চাইতেন তাদের বড্ড কড়া নজরে রাখতেন। যাতে অন্য রাইভেল ক্লাব তাদের নিয়ে না চলে যেতে পারে। তাই তাদের লুকিয়ে রাখা, তাদের খবর কাউকে না দেওয়া এই সব চলত। নানা চার্ম ছিল, থ্রিল ছিল, লুকোচুরি ছিল। আই এফ এ অফিসের সামনে যেখানে দল বদল হত প্রায় দু-সপ্তাহ ধরে সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত প্রচুর সমর্থকের ভীড় লেগে থাকত। একটা গাড়ি ঢুকলেই সবাই চিৎকার করে উঠত, সে এক দারুন রোমাঞ্চকর উন্মাদনা। আমি যখন মোহনবাগান ছেড়ে ইষ্টবেঙ্গলে এলাম তখন মোহনবাগান আমাকে রাখতে চেয়েছিল। ডায়মন্ডহারবারে সাগরিকা বলে একটা হোটেলে আমাকে নিয়ে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল এক মোহনবাগান কর্মকর্তার নির্দেশে। তখন আমি বম্বেতে রোভার্স কাপ খেলতে যাচ্ছিলাম। 

তখন মোহনবাগান কর্মকর্তা কে ছিলেন... শৈলেন মান্না?

হ্যাঁ। শৈলেনদাই ছিলেন। রোভার্সকাপে আমাকে না নিয়ে গিয়ে আটকে দেওয়া হল হাওড়া স্টেশনে। সেখান থেকেই আমাকে নিয়ে ডায়মন্ডহারবারে সাগরিকা হোটেলে লুকিয়ে রাখলেন। পরদিন বিকেলবেলা আমাকে ছাড়া হল কারণ আমি হাঙ্গার স্ট্রাইক করে বসলাম। বললাম একদম বাড়ি গিয়েই খাব। তাছাড়া বাড়ি থেকে শৈলেনদার বিরুদ্ধে থানায় একটা ডাইরিও করা হয়েছিল। এটা ১৯৭৪ সালের ঘটনা। মোহনবাগান আমার সঙ্গে আমাকে রাখার ব্যপারে কথাই বলছিল না, তাই বাধ্য হয়েই আমি ইষ্টবেঙ্গল যোগাযোগ করায় ওদের কথা দিয়ে ফেলি। কাজেই ব্যাপারটা একদম ফেয়ার ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ব্যাপারটা ঘটে। শৈলেনদা স্নেহপ্রবণ মানুষ ছিলেন, ব্যাপারটা বুঝে উনি পরের দিন নিজেই বললেন - "ঠিক আছে। বাড়ি চলে যাও। "

শৈলেন মান্নাকে আপনি স্নেহপ্রবণ মানুষ বললেন... 

ভাল, ভাল মানুষ ছিলেন। মোহনবাগান অন্ত প্রাণ। মোহনবাগানের জন্য যে কোন কাজ ভাল হোক, খারাপ হোক শৈলেনদা নিঃস্বার্থ ভাবে করবেন। মোহনবাগানের জন্য খারাপ কাজও আর দ্বিতীয়বার ভাববেন না। 

এবার আসি  ইষ্টবেঙ্গলে ... জীবনবাবু, ল্টুবাবু, স্বপন বাবু (স্বপন বল), এদের অবদান কতটুকু... 

জীবনদা, পল্টুদাকে জীপ বলে ডাকা হত। জীবনের 'জী' আর পল্টুদার 'প'। জীবনদা অ্যাক্টিং, একজিকিউটিং এর ব্যাপারটা দেখতেন আর পল্টুদার ছিল প্ল্যানিং, কাকে কোথায় রাখা হবে, কিভাবে নিয়ে যাওয়া হবে, কিভাবে প্রোটেক্ট করা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অনুশীলনের পর খেলোয়াড়রা কি খাবেন, কিভাবে অফিস যাবে, কে কিভাবে বাড়ি ফিরবেন এইসব খুঁটিনাটি প্ল্যানিং পল্টুদা করতেন। ক্লাবের সেক্রেটারী নৃপেন দাসের মানে ডঃ দাসের সময় থেকেই জীবনদা, পল্টুদা তাদের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এরা দুজনেই ক্লাবের জন্য যে কোন ঝুঁকি নিতে রাজী ছিলেন। পরে পল্টুদা ক্লাবের অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি হয়েছিলেন। আজ যে ক্লাব আধুনিকতার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তার পিছনে পল্টুদার অবদান অনস্বীকার্য। তিনিই প্রথম ইষ্টবেঙ্গল ক্লাবের সঙ্গে ইউ বি গ্রুপের চুক্তি ব্যপারে বিশেষ ভুমিকা গ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে ক্লাবের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে যতটুকু আধুনিকিকরণ সম্ভব হয়েছে তা কিন্তু পল্টুদার জন্যই। আর স্বপন বল টিমের সঙ্গে থাকতেন, খেলোয়াড়দের সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সুখে দুঃখে ওদের পাশে থাকতেন। ফলে সমর্থকদেরও খুব কাছের হয়ে গিয়েছিলেন।  তবে তিনি ক্লাবের কর্মী হিসাবেই ছিলেন, কখনও অ্যাডিমিস্ট্রেশনে ছিলেন না।

 

ফুটবল উন্মাদনার নিন্মমুখী  প্রভাব...

তখনকার দিনে ইষ্টবেঙ্গল, মোহনবাগানের যে কোন খেলাতেই খুবই ভীড় হত। এমন কি প্র্যাক্টিস দেখতেও সমর্থকরা আসতেন। এখন শুধুমাত্র ইষ্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান খেলাতেই ভীড় হয়, আর কোন খেলাতেই হয় না। কারণ বাঙালি তো আর ফুটবল খেলে না, তাই উৎসাহ অনেকটাই কমে গেছে। আর এমন কোন প্রতিভাও নজরে পড়ে না যে তাকে দেখতে মাঠ ভরবে। তাই কেউ আর মাঠে যায় না। 

"সাউথ কোরিয়ার বিরুদ্ধে যে ম্যাচটা খেলেছিলাম সেটা মনে পড়ে। আই এফ এ শিল্ড খেলার জন্য ন্যাশেনাল টিমের নাম নেওয়া তখনকার দিনে ইলিগ্যাল ছিল। ন্যাশেনাল টিমটাই এসেছিল, নাম দেওয়া হয়েছিল "কম্বাইন্ড ইলেভেন"। সেই ম্যাচে করা আমার একটা গোল যেটা তিন দশক হয়ে গেল মানুষের মনের মধ্যে রয়েছে। সেটা একটা সুখকর অভিজ্ঞতা বা স্মৃতি আমার। তারপরে '৭৮ সালে ব্যঙ্ককে 'এশিয়ান গেমসে' কুয়েতের বিরুদ্ধে আমি একটা গোল করেছিলাম।" - সুরজিৎ সেনগুপ্ত 

"খিদিরপুর স্পোর্টিং ক্লাব আমাকে ডেকে পাঠায়।সেখানেই আমি ১৯৭০ সালে সই করলাম। '৭০ আর '৭১ এ আমি খিদিরপুর স্পোর্টিং ক্লাবের হয়েই খেলি। তারপর '৭১ সালের শেষের দিকে একদিন হঠাৎই কলকাতার এক দোতালা বাসের দোতালায় শৈলেন মান্নার সঙ্গে দেখা হয়। শৈলেনদাই  বললেন- 'খেলবি আমার ক্লাবে?'" 

- সুরজিৎ সেনগুপ্ত

ইষ্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের তরফ থেকে আপনাকে কোচ হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে  আপনার স্ট্র্যাটিজি ...

আমরা যে ধরণের প্র্যাক্টিস করতাম সেই ধরনের প্র্যাক্টিসে গুরুত্ব দেব। জিমে যাওয়া বা ফিজিক্যাল ট্রেনিং যে রকম হচ্ছে হোক, কিন্তু ফুটবল মাঠে যে প্র্যাক্টিস, যেগুলো আমরা করতাম, সেইগুলোই করতে চাইব। সবচেয়ে বড় কথা ইষ্টবেঙ্গল বা মোহনবাগান যে ক্লাবই হোক না কেন, তাদের জার্সির রঙএর মূল্য বোঝানোর চেষ্টা করব। সবুজ মেরুন বা লাল হলুদ দুটোর রঙেরই মূল্য বুঝতে হবে। ধর আমি ইষ্টবেঙ্গলের কোচ হলাম, তাহলে লাল-হলুদ সেই রঙের মহিমা বোঝানোর সাথে সাথে টিমকে মোটিভেট করার খুব চেষ্টা করব। এটা খুব জরুরী, টিমের যে ক্ষমতাই থাক না কেন, একবার মোটিভেট করতে পারলে টিমের চেহারা কিন্তু পালটে যায়। যেটা প্রদীপদাকে কাছ থেকে দেখে শিখেছি। 

আপনার দেখা বাংলার সেরা কোচ...

প্রদীপদাই - প্রদীপ বন্দোপাধ্যায়। প্রদীপদার কোচিং এ আমি অনেক কিছু শিখেছি। উনি টেকনিক্যালি যতটা স্ট্রং ছিলেন তার পাশাপাশি ম্যান ম্যানেজমেন্টে অসাধারণ দক্ষ ছিলেন। টিমকে অসম্ভব মোটিভেট করতে পারতেন। সাধারণ মানের খেলোয়াড়ের কাছে থেকে ঠিক সেরা খেলাটাই বার করে আনার চেষ্টা করতেন। আসলে কোচিং এর দুটি ভাইটাল দিক থাকে একটা টেকনিক্যালিটি আর ম্যান ম্যানেজমেন্ট। দুটোতেই উনি সেরা ছিলেন তাই কোচিং করাটা ওনার কাছে বেশ সহজ ছিল। 

 

আপনার সমসাময়িক  খেলোয়াড়...

ইষ্টবেঙ্গলে খেলার সময় পিন্টুদা - সমরেশ চৌধুরীর কথা বলতে হয়। পিন্টুদার সঙ্গে আমি অনেকদিন খেলেছি। অসাধারণ দক্ষতা ছিল তার। অসাধারণ পাসিং করতেন, ওর পাস থেকে অনেক গোলও করেছি। সুধীর কর্মকারের কথা না বললেই নয়। আমার সময়কার আমার দেখা এশিয়ার সেরা ডিফেন্ডারের নাম হচ্ছে সুধীর কর্মকার। এ নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। একটা ঘটনার কথা বলি। ১৯৭০ সালে ইরানের টিম 'পাস' ক্লাবের সঙ্গে খেলাতে শেষ হবার তিন মিনিট আগে গোল করে ইষ্টবেঙ্গলকে আই-এফ-এ শিল্ড এনে দিয়েছিল পরিমল দে। এই ম্যাচে সুধীর কর্মকার অসাধারণ খেলেছিলেন। বিপক্ষ দলে 'আসগার সরাফি' নামে একজন নামী খেলোয়ার ছিলেন। সরাফি, তখন ইউরোপের খুব দামী খেলোয়াড়। ম্যাচে ওনাকে আটকানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সুধীরকে। অসাধারণ দক্ষতায় ও ম্যাচে সরাফিকে নড়াচড়া করতে দেয় নি। অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল তুলেছিল সুধীর।  

কৃশানু দের সঙ্গে আলোচনায়

- ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত 

টি ভির পর্দায় আন্তর্জাতিক ফুটবল দেখা অনেক সহজলভ্য, তাই দু -পা এগিয়ে ইষ্টবেঙ্গল - এরিয়ান কিংবা মোহনবাগান - চার্চিল দেখার আগ্রহ দর্শকদের  মধ্যে  এখন অনেকটাই কম ... আপনার মতামত... 

হ্যাঁ, অনেকটাই। আন্তর্জাতিক ফুটবল আমাদের কাছে যত এসেছে ততই আমরা বুঝতে পেরেছি আমরা কতটা পিছিয়ে,  তাতে উৎসাহে ঘাটতি হবে অনস্বীকার্য। কাজেই পিছিয়ে থাকা দলগুলোর খেলা দেখে সময় নষ্ট করব কেন। তবুও যাদের মধ্যে ইষ্টবেঙ্গল - মোহনবাগানের বংশানুক্রমিক ক্রেজটা রয়ে গেছে তারাই পাগলের মত মাঠে আসেন। তবে এদের সংখ্যাটা নেহাতই নগণ্য। মনে আছে গড়িয়াহাটের দোকানিরা খেলার সময় দোকান বন্ধ করে মাঠে যেতেন, খেলা শেষ হলে আবার দোকান খুলতেন। ঐ সময় ব্যবাসায়ীরা নিজের ব্যবসার ক্ষতি করে ফুটবল খেলা দেখতে যেতেন, এখন আর তো সে সব ভাবাই যায় না। আর যাবেই বা কেন। 

আপনি যখন উইঙ্গারের খেলতেন তখন  বিপক্ষের কোন খেলোয়াড় আপনাকে  চ্যলেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিতেন...

দিলীপ পালিত। উনি বাঁ পায়ের খেলোয়াড় ছিলেন, যেহেতু আমি রাইট আউট ছিলাম। বিপক্ষে দিলীপ পালিত থাকলে ও লেফট ব্যাক খেলত। ও বাঁ পাটা অসম্ভব স্ট্রং ছিল। আমাকে আটকানোর জন্য নানা বিধ উপায়, এমন কি অবৈধ উপায় অবলম্বনেও পিছ পা হতেন না। রেফারির নজর এড়িয়ে লুকিয়ে চু্রিয়ে মারতে পারত। ম্যাচে ও থাকলে আমাকে একটু আলাদা করে ভাবতে হত। অনেক বেশী কন্সেন্ট্রেট করতে হত, না হলে ওকে টপকাতে পারতাম না। ওর পর আর বিশেষ করে তেমন কেউকে মনে পড়ছে না।  

১৯৭৪  থেকে ১৯৭৯ এ ইষ্টবেঙ্গলে, তারপর  ৮১  থেকে ৮৩ পর্যন্ত মোহনবাগানে ... এরপর খেলা থেকে অবসর। আপনার পরবর্তী সময়ে কোন কোন খেলোয়াড় আপনার মনে দাগ কেটেছে। 

অবশ্যই কৃশানু দে। শুধু আমার কেন প্রত্যেক ফুটবল অনুরাগীর মনের মণিকোঠায় ও থাকবে। তাছাড়া বিকাশ পাঁজি, সুদীপ চ্যাটার্জি, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। তরুনও (তরুন দে) ভাল তবে মনার মত নয়। হাফে সুদীপের খেলা খুব ভাল লাগত। পারমিন্দর, গৌতম সরকার, সত্যজিৎ চ্যাটার্জি, মানস ভট্টাচার্য্য ওদের খেলাও খুব ভাল লাগত। আরও অনেকই  ভাল খেলতেন। অনেক ভাল খেলোয়াড় ছিলেন সেই সময়। 

ইষ্টবেঙ্গল বা মোহনাবাগানে যারা খেলছেন তাদের গুনগত মান এক খারাপ কেন? কর্মকর্তাদের খেলোয়াড় নির্বাচনে কোথায় একটা চূড়ান্ত গাফিলতি নজরে পড়ছে... 

কিছুটা হতে পারে। বিশেষ করে বিদেশীদের ক্ষেত্রে আমরা সঠিক খেলোয়াড় নির্বাচন করতে পারছি না। তবে অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে, যেমন টাকা পয়সা সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। তাছাড়া গাফিলতি তো আছেই। শুধুমাত্র নেটে প্রোফাইল দেখে কি আর ভাল খেলোয়াড় নির্বাচন করা যায়! প্রোফাইলে তো আমি আমার সম্মন্ধে অনেক কিছু লিখতেই পারি। তার ভেরিফিকেশন কোথায়, তার ভিত্তিতে খেলোয়াড় নিলে সেটা ফাঁকিবাজিই বলব। বিদেশী খেলোয়াড় নির্বাচনে বেশ ভুলভ্রান্তি বা গাফিলতি নজরে পড়ছে। এটা বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। আর একটা সিরিয়াস ব্যাপার হল যে এত বছর ধরে আই-লীগ পাচ্ছি না, তার জন্য নূন্যতম লজ্জাবোধ করছি না। তাগিদটা অনুভব করছি না যে এবার পেতেই হবে। এটা খুব সিরিয়াসলি ভাবা উচিত। 

মজিদ বাস্কারের সঙ্গে 

- ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত 

নতুন স্পন্সর , কোটি টাকার হাতছানি... এর পরেও কি সাফল্যে তাবুতে উঁকি মারবে আশা করা যায়... 

কোটি কোটি টাকাই এলে যা আই লীগ আসবে এমন কোন কথাই নেই। টিমটা ওয়েল ডিসিপ্লিন্ড ও ডেডিকেটেড হতে হবে। ব্যাংগালুরু টিমটার কথা ভাবো। ওরা খুব ডিসিপ্লিন্ড ওয়েতে টিমটাকে চালানোর চেষ্টা করছে। এটা ইষ্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানেও সম্ভব। ইষ্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রে নীতু বা কল্যাণবাবুরা যতটা সিনসিয়ারলি ক্লাব চালান তাতে খেলোয়াড় বা কোচের মধ্যে একটা শৃংঙ্খলা নিয়ে আসতেই পারেন। অসম্ভব কিছু না, শুধু সদিচ্ছা বা মানসিকতার প্রয়োজন। মানসিকতার পরিবর্তন না হলে শুধু কোটি কোটি টাকা খরচা করলেই যে আই লীগ আসবে তা কিন্তু মনে হয় না। তাবুর পরিবেশ খেলার উপযুক্ত হলে কিন্তু সাফল্য আসতেই পারে। তবে খেলোয়াড় নির্বাচনটাও মাথায় রাখতে হবে, যেটা একটু আগে বললাম। 

আপনাদের সময়ে যে ক্লাব পরিচালন পদ্ধতি ছিল, তার সঙ্গে এখনকার পরিচালন পদ্ধতি একটা তফাৎ থেকে যাচ্ছে... কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি নজরে আসছে যাতে সমর্থকরা ডিপ্রেসড হয়ে পড়ছেন... 

হয়ত থেকে যাচ্ছে। ম্যাচ হেরে গেলেই একে অপরকে দোষারোপ করছে। এটা একটা খুব খারাপ দিক। ব্যর্থ হলেই কোচদের ভুগতে হচ্ছে কিন্তু খেলোয়াড়দের কিছু হচ্ছে না। একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। কর্মকর্তারা খেলোয়াড়দের প্রতি একটু বেশী স্নেহ প্রবণ হয়ে পড়ছেন।কাজেই শৃঙ্খলা থাকা খুব জরুরী। না থাকলে কিছুই হবে না। দুই দলের কর্মকর্তারা কিন্তু চেষ্টা করছেন না তা কিন্তু নয়। একটু মোটিভেশন আর প্ল্যানিং ঠিক হলে আই লীগ যে কোন দলই পেতে পারে। তবে ইষ্টবেঙ্গলের কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যে ঝামেলা তুলনামুলকভাবে অনেক কম মোহনবাগানের থেকে। এদের বন্ধন অনেক শক্ত। এই তো কয়েকদিন আগে মোহনবাগান তাবুতে কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে হাতাহাতি, মারামারিতে জড়িয়ে পড়লেন। এগুলো সত্যি দূর্ভাগ্যজনক। আর ফুটবলের ক্ষেত্রে বেশ ক্ষতিকর। 

 

ইষ্টবেঙ্গল ক্লাবে খালিদ ও সুভাষ ভৌমিকের মধ্যে দূরত্ব ...

খালিদ - আমি যেটা করছি সেটাই ঠিক এই মনোভাব নিয়ে চলত। এই অ্যাচিটিউডটাকে ক্লাব কর্তাদের উচিত ছিল নিয়ন্ত্রণ করার। আমাদের সময় যখন পি কে ব্যানার্জী কোচ ছিলেন তখনও থঙ্গরাজ, শান্ত মিত্র, প্রশান্ত সিনহা এরা সবাই মিলে প্রদীপদাকে পরামর্শ দিতেন। আর প্রদীপদা সেই পরামর্শও নিতেন। ফলে সবাই মিলে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সিদ্ধান্ত  গ্রহণ করা হত। ওতেই সাফল্য আসত। আজ খালিদ শুধু একাই কেন সিদ্ধান্ত নেবেন? কর্মকর্তারা তো ভাস্কর, মনোরঞ্জন আর তুষার রক্ষিতকে দিয়েছিল পরামর্শ দেবার জন্য। পরে সুভাষকে দেওয়া হল। ওদের কোন কথাই তো খালিদ শুনলো না। এরকম তো আর হতে পারে না। এটা সত্যি খুবই দূর্ভাগ্যজনক। তাই টাকা পয়সার সঙ্গে সঙ্গে যদি একটা সুন্দর সম্পর্ক ক্লাবে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে সাফল্য আসতেই পারে। অবাক হব না। 

আন্তর্জাতিক ফুটবলে আপনার কিছু সেরা মূহুর্ত... 

সাউথ কোরিয়ার বিরুদ্ধে যে ম্যাচটা খেলেছিলাম সেটা মনে পড়ে। আই এফ এ শিল্ড খেলার জন্য ন্যাশেনাল টিমের নাম নেওয়া তখনকার দিনে ইলিগ্যাল ছিল। ন্যাশেনাল টিমটাই এসেছিল, নাম দেওয়া হয়েছিল "কম্বাইন্ড ইলেভেন"। সেই ম্যাচে করা আমার একটা গোল যেটা তিন দশক হয়ে গেল মানুষের মনের মধ্যে রয়েছে। সেটা একটা সুখকর অভিজ্ঞতা বা স্মৃতি আমার। তারপরে '৭৮ সালে ব্যঙ্ককে 'এশিয়ান গেমসে' কুয়েতের বিরুদ্ধে আমি একটা গোল করেছিলাম। সেই গোলটা নিয়ে অমলদা (অমল দত্ত) বহু জায়গায় বলেছেন কিংবা লিখেছেন। কুয়েত খুব ভাল টিম ছিল। সেই টিমে ওয়ার্ল্ড কাপ খেলে আসা দলের সবাই ছিলেন। আমরা হেরে গিয়েছিলাম কিন্তু গোলটার কথা মনে আছে। যদি স্টিল ছবি দেখতে তাহলে দেখতে গোলটার সময় আমি তিনজনকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলাম। 

আপনার সময় ভারতীয় দলের কোচ... 

পি কে ছিলেন। গোলাম মহম্মদ বাসা বলে একজন ছিলেন। কখনও কখনও মিঃ হোসেন বলে একজন, এক সময় ভারতীয় দলের স্টপারে খেলতেন, তিনি ছিলেন। তারপর রন এসেছিলেন সাত দিনের জন্য, তখন কোচিং করছেন মেওয়ালাল। প্রায় প্রত্যেকের কাছেই কিছু না কিছু আমি শিখেছি। 

আপনার স্মরণীয় গোলটাতে আবার ফিরে আসি... শুনেছি এই সট মারার টেকনিকটা নাকি কোচ  অচ্যুত ব্যানার্জী আপনাকে শিখিয়েছিলেন। 

ঠিক তাই। আমি ওনার কাছে শিখেছিলাম। এই ম্যাচের আগের দিন আমি অচ্যুত ব্যানার্জ্জীর ক্যম্পে গিয়ে প্রায় একশোটা শট মেরেছিলাম। উনি বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন যে ম্যাচে এই ধরনের সটের সুযোগ আমার আসতেও পারে। কাজেই ম্যাচে সুযোগ পেতেই কাজে লাগানোর জন্য মুখিয়েছিলাম, আর ঠিকঠাক ডান পায়ের সট-টাও গোলকিপারকে পরাস্ত করে জালে জড়িয়ে যায়। 

 

যখন খেলতেন পরিবারের জন্য সময়...

কিছুটা পারতাম। বলতে গেলে খুব কম সময়ই দিতে পারতাম। একটা কমিট্মেন্ট থাকত তো। তবে পরিবারের সকলের কাছে থেকে সহযোগিতা না পেলে এটা কিছুতেই সম্ভব হত না। 

এখন ভারতীয় ফুটবলের কার খেলা ভাল লাগছে...

সুনীল ছেত্রী। ও সত্যিই আমাদের সম্পদ। শুধু খেলোয়াড় হিসাবে নয়। ওর মধ্যে একটা লিডারশিপের দক্ষতা নজরে পড়ে। একটা জেতার তাগিদ ওর মধ্যে দেখি। একটা খিদে আছে। যেটা এই মুহুর্তে ভারতীয় ফুটবলে খুব দরকার। আর খুব ভাল খেলে, ওর কাধেঁই ভর করে ভারতের খেলার অনেক উন্নতি হচ্ছে। ও ছাড়া জে জে আছে। বেঙ্গালুর টিমে দু-একজন ভাল খেলোয়াড় আছেন।  এই মূহুর্তে নামগুলো মনে পড়ছে না। 

অবসর..

সাংবাদিকতা করছি আজকাল কাগজে। এখন বিশ্বকাপ চলছে, তাতে ফুটবল বিশেষজ্ঞের কলামে কিছু লিখি। বই পড়ি, গান শুনি। মাঝে মাঝে টি ভি দেখি, এইসব করেই দিন কেটে যায়। 

২০১৮ এর ওয়ার্ল্ডকাপে আপনার ফেবারিট কে ছিল...

ব্রাজিল। এখন মনে হচ্ছে বেলজিয়াম না পড়লেই বোধহয় ভাল হত। হারার আগেই কেমন যেন মনে হচ্ছিল। মনটা খুঁতখুঁত করছিল। আমি যেহেতু ব্রাজিলের সমর্থক তাই কোয়ার্টার ফাইনালে যখন বেলজিয়ামকে পেলাম তখন থেকেই মনটা একটু ভারী ছিল। শুধু তাই না আমি "২৪ ঘন্টার" একটিই অনুষ্ঠানে বলেও ছিলাম যে বেলজিয়াম না পড়লেই ভাল হত।সেটা খেলার আগেই। তবে ঐ দিন হারতাম না। সেকেন্ড হাফে অনেক গোলের সুযোগ নষ্ট হয়েছে।  না হলে তো আমরাই অনায়াসে জিততাম। 

মাধুকরীর সকল পাঠকদের তরফ থেকে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। 

ধন্যবাদ তোমাকেও। তোমার ওয়েবসাইট ও তার পাঠকদের অনেক ভালবাসা ও শুভেচ্ছা জানাই। ভাল থেকো।  

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?