• লালচে মাটির রুক্ষতায় - কৃষ্ণতরু বর্মণ  

  • ইগুয়াসু ফলসের কাহিনী - চৈতালী পুরকায়স্থ 

  • ঐতিহ্যের শহর কিয়োতো - অরুন্ধতী ঘোষ

ভ্রমণ সঙ্গী - ৩

 

  - ‘কি রে খিদে পাচ্ছে... ও মা, এই তো খেলি’ – কানে এল মা-ছেলের ফুসর ফুসর। পায়োনিয়র অ্যাম্পিথেয়েটরে সামনে একটু দাঁড়িয়েছি। বিশাল পার্কিং লট প্রায় খাঁ খাঁ করছে। পিছনের উঁচু পাহাড় বেয়ে কয়েকজন উঠছেন। এরা ঐ উৎসাহীদের দলে। ওদের মত উঠা তো দূরের কথা, দেখেই আমার হাওয়া বেড়িয়ে গেল। চারপাশ বেশ মনোরম। মিষ্টি একটা রোদ পাহাড়ের গাঁ বেয়ে নেমে আসছে। এই ফ্যান্সি চনমনে হাওয়ায় আর এই খাই-খাই পরিবেশে বারবার খিদে পেতেই পারে। বললাম – ‘একটু দাঁড়া, একটা আইসক্রিম সপ দেখেছি, এটা দিয়ে একটু ম্যানেজ কর তারপর দেখছি। আর তাছাড়া গাড়িতে তো এটা সেটা তো রয়েছে ঐগুলোই খা না।' বলা মাত্রই হঠাৎই মা-ছেলের চোখে মুখে পাহাড় বেয়ে নেমে এল এক সুন্দরী রোদের ঝিলিক। অ্যাম্পিথেয়েটারের ভিতরে ঢুকলাম। সামনেই প্রচুর দশর্ক আসন। আর ঠিক মধ্যিখানে একেবারে খোলা আকাশের নিচে একটি বিশাল মঞ্চ। পিছনে উঁচু লালচে পাহাড়ের ন্যাচেরাল ব্যাকগ্রাউন্ড। কিন্তু একেবারে জনশূন্য। আমাদের মত গুটিকয়েক লোকজন ঘুরপাক খাচ্ছেন। সত্যি ভাবতে অবাক লাগে যে শো-এর দিন সন্ধ্যাবেলা ঠিক এখানেই কত মানুষের সমাগম। মানুষের ভীড়, কথাবার্তায় গমগম করতে থাকে এই থিয়েটার। প্রায় ৩০ জন অভিনেতা, শিল্পী, মিউশিয়ান নিয়ে এই চমৎকার মিউজিক্যাল ড্রামার সাক্ষী থাকেন অসংখ্য মানুষ। নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় পাহাড়ের কোলে পড়ে থাকা একাকী এই মঞ্চটি, কত ঘটনার নীরব সাক্ষীও বটে। এই মিউজিক্যাল শো দেখতে হলে আগে থেকে দিন-ক্ষণ দেখে অনলাইনে টিকিট কেটে নিতে পারেন, তাতে রথ দেখা আর কলা বেচা দুটোই হতে পারে একই যাত্রায়।  

  পার্ক রোড ৫ ধরে একটু এগোতেই ডান দিকে ‘ওল্ড ওয়েস্ট স্টেবেলস’ নামে একটা জনশূন্য অফিস কেবিনের সামনে দাঁড়ালাম। আশেপাশে কাউকেই দেখতে পেলাম না। পার্ক অপারেটেড গাইডেড ট্যুর এখান থেকেই নিতে হয়। ঘোড়ার পিঠে চেপে নির্জন সরু জঙ্গলের পথে বেড়িয়ে আসার মজা পেতে হলে হাতে কিছুটা সময় রেখে অনলাইন বুকিং সেরে ফেলুন। কাছেই ট্রেডিং পোস্ট বলে একটা ছোট্ট দোকান। ক্যানিয়নের ভিতরে আমাদের মত ভবঘুরেদের সাময়িক বিশ্রামের আদর্শ জায়গা। সুভেনিয়র থেকে আরম্ভ করে গরম কফি, স্যান্ডুইচ, বার্গার, ড্রিঙ্কস সবই মিলল। আরও সব টুকিটাকি দ্রব্যসামগ্রী। কাউন্টারে অল্প বয়েসী মেয়েরা। প্রায় সকলেরই পড়াশোনার সাথে সাথে পার্টটাইম জব। সামনেই টেবিল জুড়ে একটা টিন-এজারদের গ্রুপ।গপাগপ স্যান্ডুইচ গিলছে আর তার সঙ্গে লম্বা কোকের স্ট্র-তে সুখটান। টেবিল জুড়ে বেপরোয়া হাসিঠাট্টা। বেরোনোর একটু আগে সনুকে বললাম – ‘অন্য কোন কাজকর্ম থাকলে এখানেই সেরে নে’। অর্থটা বুঝেই ‘ড্যাডি...’ বলে একগাল হাসি ওর।

  পথে একে একে পড়ল চায়নাবেরী, ফোর্টট্রেস, জুনিপার, ক্যাকটাস, কাউ, মেস্কুইট, ঊলফবেরী ক্যাম্প গ্রাউন্ড। দৃশ্যপট মোটামুটি সব একই রকম। এই নির্জন, নিস্তব্ধ পরিবেশে ছুটি কাটাতে ক্যাম্পিং-এর ব্যবস্থাও একেবারে নিখুঁত। কাছেই একটা ছোট্ট নদী। দূরের পাহাড় আর হাওয়ার ফিসফিসানির মাঝে নদীর জলের মৃদু কল কল ধ্বনি। সাথে তাল রেখে মাথা নাড়ায় নাম না জানা গাছের সারি, কিছু পাখীর খোঁজ মিলল এ ডাল থেকে ও ডালে।

আঁকাবাঁকা পথে, পালো ডুরো ক্যানিয়ন

  দ্যাখ, লাইট হাউস, আরে ওদিকটা দেখ’ – চোখ থেকে ক্যামেরার লেন্স সরিয়ে সনুকে হাত তুলে লোকেশনটা ইশারা করলাম। খুবই এক্সাইটেড হয়ে সনুও রেলিং ধরে ঝুঁকে পড়ল। আকাশ পরিষ্কার থাকলে পার্কের ভিজিটর সেন্টার থেকেই দিব্বি দেখতে পাওয়া যায়। 'লাইটহাউস' নামে একটা মাইল ছয়েকের হাঁটা পথ। ভিজিটরদের অনেকেই ফ্যামিলি নিয়ে দিব্বি ঘুরে আসেন।সনু একটু অবাক চোখে ঘাড় নেড়ে বলে উঠল – ‘বাট, ইট ডাজ নট লুক লাইক এ লাইটহাউস, স্পেশালি ইনসাইড দি ক্যানিয়ন।' হেসে ফেললাম, খুব খারাপ বলে নি, বিশেষ করে ক্যানিয়নের মধ্যে একটা লাইটহাউস ভাবতেই একটু অবাক লাগে।  

  ঝলমলে রোদ। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। গরম নেই বললেই চলে, আর বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাপ গুগুল করতে হবে। ভিজিটর সেন্টারের সামনে একটা ভিউতে দাঁড়িয়ে স্বাতীর সঙ্গে টুকটাক ক্যানিয়ন সংক্রান্ত কথা হচ্ছিল। সকালের ঠাণ্ডা হাওয়া আমাদের চোখ মুখ ছুঁয়ে উত্তরগামী। হঠাৎই ‘দিস ইজ দি পারফেক্ট টাইম টু ভিজিট পালো ডুরো, ইন সামার ইটস টু হট’ – পাশ থেকে একটা গলা ভেসে এল। মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক। পরণে সবুজ রঙের ইউনিফর্ম। তাতে লেখা পালো ডুরো, নানান ছবি আর হাজার ব্যাচ আটকানো। পার্কেরই হয়ত কোন কর্মী হবেন। ক্ষণিকের আলাপ। নাম ডেভিড। ডেভিডবাবু থাকেন ক্যানিয়ন শহরে। খুবই ছোট্ট, এক মুঠো লোকের বসবাস। টুকটাক কথাবার্তায় উঠে এল পালো ডুরোর টুকরো টুকরো ইতিহাস, ভিউ পয়েন্টের মাহাত্ম্য, পরিবেশের খামখেয়ালিপনা, তাপমাত্রা বিষয়ক নানান তথ্য, স্থানীয় মানুষ ও তাদের কথা। বলে বসলেন – ‘এই মনোরম পরিবেশ, আর দেরী না করে ট্র্যাকিং এ বেড়িয়ে পড়ুন।' হায় রে, বেচারা... আর কাউকে পেল না, শেষে কিনা এই বঙ্গ তনয়কে। আমার একটা হাই তোলা ম্যাড়ম্যাড়ে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখেই হেসে ফেললেন। বউকে ইশারায় বললাম – ‘যাবে নাকি?’ ওদিক থেকেও তেমন কোন সাড়াশব্দ পেলাম না। ডেভিডবাবুকে থ্যাংকস জানিয়ে কেটে পড়লাম। বেলা বাড়ার সাথে সাথে একটু একটু করে ভিড় বাড়ছে ঠিকই, তবে নজরে পড়ার মত কিছু না।  

  '– জান তো, পালো ডুরো একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার অর্থ হল হার্ড উড,’ - গরম কফিতে আয়েস করে একটা চুমুক মেরে অরিজিৎ-কে একটু লো ভলিউমে দিয়ে বলে উঠলাম। ধীর গতিতে গাড়ি চলছে। দু-পাশে নানান অজানা গাছপালা, পাথরের উপর অজস্র বুনো ঝোপ আর ফাঁকে ফাঁকে লালচে ঝুরো পাথর। ডালপালা বিহীন রকি মাউন্টেনের জুনিপার গাছ খুব একটা নজরে পড়ছে না। এই গাছের কাঠ একটু সাদাটে ধরনের বেশ শক্ত। বলা বাহুল্য পার্কের নামকরণের উৎসটা এখন আমাদের কাছে জলের মত পরিষ্কার। এর পাশাপাশি রেড বেরি জুনিপার, ওয়ান সিড, ইউলো, কটনউডের হাল্কা জংগল পেরিয়ে চলতে লাগল আমাদের গাড়ি।

  আঁকাবাঁকা রাস্তা ক্যানিয়নের মাঝে হারিয়ে গেছে। মাঝে মধ্যেই দু-একটা ভিউ পয়েন্ট। ‘বাহঃ দারুণ তো’ বলে খচাখচ কয়েকটা ছবি তুলে নেওয়ার মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে আবার পরের ভিউ পয়েন্ট। মাঝখানে গরম কফিতে আলতো চুমুকের সাথে অরিজিতের ইনকমপ্লিট সোলোর দুর্দান্ত কম্বিনেশন। মোটামুটি আমাদের মতো সুখী ভিজিটরদের ঐ একটাই ফরমুলা। ব্যাতিক্রমী উৎসাহীরা অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে নিচে পাথরের খাঁজে বিলীন। তবে ট্র্যাকিং এর এক অদ্ভুত নেশা আছে, যারা করেন তারাই বোঝেন। আমার মত ভাতঘুমে অভ্যস্থ এই বাঙালি সম্প্রদায়ের কেউ কেউ ওদের পাগল বললেও বাস্তবটা অনেকটাই রোমাঞ্চকর। যা আমাদের কাছে কিছুটা হলেও আঙ্গুর ফল টকের মত, যাহা অনস্বীকার্য। 

  কিছুটা এগোতেই ক্যাম্প গ্রাউন্ড। সোজা কথায় খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে ক্যানিয়নের কোলে রাত্রিবাস। পাশেই রয়েছে আর-ভি রাখার কিছু নির্ধারিত স্লট। অদূরেই রিম কেবিন। এক কি দুই বেডের ছোট্ট কেবিন। চওড়া শক্ত পাথরের দেওয়াল, কয়েকটা কাঠের জানলা। ভিতরে বিছানা, টেবিল, চেয়ার সবই আছে। বাথরুম, শাওয়ারেরও ব্যবস্থা চমৎকার। আপনার পছন্দের কেবিনটি অনায়াসেই অনলাইনে বুকিং করে ফেলতে পারেন। এলাকাটি অত্যন্ত নির্জন হলেও বেশ নিরাপদ। দু-পাশে লাল পাথরের রুক্ষতায় নিস্তব্ধ বাতাবরণ। হাল্কা মৃদু মন্দ বাতাস। জয়ের সুরে ‘অ্যাবি সেনের’ গানে রূপঙ্কর, শ্রেয়াকেও দারুণ মানিয়ে গেছে এই পরিবেশে। তাছাড়া পার্কে ঠিক ঢোকার আগেই আমাদের পেট পুজো সাঙ্গ... কাজেই সব কিছু প্ল্যান মাফিক।

  ডালাস থেকে পালো ডুরোর দূরত্ব প্রায় চারশ মাইল, ঘন্টা ছয়েকের পথ। কাজেই দু-দিনের একটা ঝটিকা সফর যখন তখন নামিয়ে দেওয়া যেতেই পারে। সেই ভেবেই কয়েকদিন ধরেই বুদ্ধির গোঁড়ায় ধোঁয়া দিচ্ছিলাম। হঠাৎ করে একটা উইক এন্ডে রাস্তায়।   

  খুব ছোট্ট একটা নির্জন শহর চাইল্ডরেস। মাত্র হাজার ছয়েক লোকের বাস। হাইওয়ে ২৮৭তে ডালাস থেকে ঘন্টা চারেকের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়। শুক্রবার সন্ধ্যায় বেড়িয়ে এই নির্জন চাইল্ড্রেসে রাত কাটিয়ে পরের দিন সকালেই পালো ডুরোর রুক্ষতায় হারিয়ে যাবার প্ল্যান আগে থেকেই ভেঁজে রেখেছিলাম। রিম কেবিন ছাড়িয়ে পাহাড়ি পথে চলছি ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন অফ টেক্সাসের’ মধ্যে দিয়ে। সাধারণতঃ পালো ডুরোকে এই নামেই ডাকা হয়। প্রায় ২৭ হাজার একর জুড়ে লালচে পাথুরে রুক্ষ জমি, ছোট ছোট গাছের সারি আর অসংখ্য বুনো ঝোপ। ১৯৩৩ সালে ‘দি সিভিলিয়ন কঞ্জারভেশন কর্প’ নামে একটি সরকারী সংস্থা সাতটি গ্রুপ বা কোম্পানি তৈরি করে। তারপর এই প্রতিটি কোম্পানিতেই বেশ কিছু সংখ্যক মিলিটারি ভ্যাটারন আর অল্প বয়সী যুবকদের রিক্রুট করে দলবল-শুদ্ধু ‘পালো ডুরোতে’ পাঠিয়ে দেয়। বেশ কয়েকটি ভিজিটর সেন্টার, কেবিন, সেলটার, ভিউ পয়েন্ট, ব্রিজ, রাস্তা আর ট্রেইল বানানোর কাজ খুব দ্রুত গতিতেই শেষ হয়। কাজ চলতে থাকে আরও কয়েক বছর। যদিও এই পার্কের দরজা অফিসিয়ালি খুলে দেওয়া হয় জুলাই ৪র্থ, ১৯৩৪ সালে। গাড়ি চালাতে চালাতে এমনই কিছু তথ্য স্বাতীদের সামনে ঝেড়ে দিলাম।    

  ‘ওয়াইড ভ্যারাইটি অফ ওয়াল্ডলাইফ এর আদর্শ জায়গা হল এই পালো ডুরো, জানতিস এটা?’ - একটা বাদামের টুকরো গোঁফের তলায় ছুঁড়ে দিয়ে বিজ্ঞের সুরে বলে উঠি। ‘রিয়েলি!’ – সনুর চোখে বিস্ময়। ‘হু...হু...তবে আর বলছি কি, শোন মন দিয়ে।' ‘পালো ডুরো মাউসের নাম শুনেছিস?’ সটাং প্রশ্নটা ওকেই ছুঁড়ে দিলাম। চটপট জবাবও এল – ‘না’।  রাস্তার বাঁক আর সাইনগুলোর দিকে নজর রাখতে রাখতে বলে উঠলাম - 'প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীদের মধ্যে পড়ে এই ‘পালো ডুরো মাউস। চেহারাতে একেবারে আমাদের দেশের নেংটি ইঁদুর। ভেবে দেখ, এদেশে নেংটি ইঁদুরও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীদের লিস্টে জায়গা পেতে চলেছে।' পিছন থেকে হাসির রোল উঠল।

'তা তোর এই নেংটি ইঁদুর প্রজাতিকে টেক্সাস প্যান-হ্যান্ডেলের মধ্যে এই পালো ডুরো আর আশেপাশের দু-একটা কাউন্টি ছাড়া দেখতে পাওয়া যায় না। জংগলের আর একটু গভীরে মিউল ডিয়ার, রোডরানার, বন্য টার্কি কিংবা কটনটেইলস এর সঙ্গে দেখা করে আসতে পারিস। আশা করা যায় ওদের আতিথেয়তায় কোন ত্রুটি থাকবে না। তবে আর বেশী না এগোনোই ভাল। তার কারণ হিসাবে ধরে নে, তোর সঙ্গী হতে চাইবে কয়েকটা হোয়াইট টেইল্ড ডিয়ার, দু একটা হিংস্র কায়েটিস কিম্বা ধর কিছু বারবেরী শিপ আর ববক্যাটের দল। অতি উৎসাহী রেকুনের দলের তোকে যদি একবার পছন্দ হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। তোর ঘাড়ে চেপেই জঙ্গল পরিক্রমা সেরে ফেলবে।' এবার থামলাম, কফিও শেষ। আমার অযাচতি ভাষণের ঠেলা সামলাতে ওরা দু-জনেই ব্যস্ত। সনুর কল্পনায় তখন ওর কাঁধে রেকুনের দল। ব্রেকে পা। সামনে একটা দারুণ ভিউ। পিছন থেকে সনু বলে উঠল - ‘লেটস গো, ড্যাডি, লেটস সী সাম আনিম্যালস’। হাতে অনেকটা সময়। তাড়া নেই। ধীরে সুস্থে ঘুরে ঘুরে দেখা যেতেই পারে। এদিকটাতে গাছের ডালে দুএকটা পাখীও নজরে পড়ল। বিভিন্ন প্রজাতির

পাখীদেরও আড্ডা এই ক্যানিইয়নের জঙ্গলে। গোল্ডেন ফ্রন্টেড উডপিকারস, ক্যানিয়ন টোহইস আর রেড টেইল্ড হকস চোখে পড়লে তো আর কথাই নেই। ক্যামেরার খচখচানি বেড়ে যাবে। আড়াল থেকে রোড রানারের নজরদারী চলছে আমাদের ওপর। ফেরার পথে আমাকে শুনিয়ে সনুর ফাজলামি - ‘ইউ নো মামি, দিস ইজ আওয়ার সোশাল স্টাডি ক্লাস'... কন্ডাক্টেড বাই...।'

  এই পালো ডুরোতে পাহাড় আর জঙ্গলের একটা সুন্দর সমন্বয় মানে একটা অ্যাট্মস্ফেয়ার রয়েছে।সাধারণতঃ হয় কি, অনেক পার্কেই ভ্রমনার্থীদের সুবিধার্থে এই নেচার‍্যাল ব্যাপারটাকে অতটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না।কালচারাল রিসোর্সটা বাঁচিয়ে রাখার অতটা তাগিদও থাকে না। তাছাড়া আরকিওলজিক্যাল-ই বলুন কিংবা প্যালিওন্টোলজিক্যাল - এই সাইটগুলো বাঁচিয়ে রাখার  প্রয়োজনীয়তা এক কথায় অনস্বীকার্য। 

  ঘুরতে ঘুরতে সময় যেন কোথায় চলে যায়, পিছনের সারিতে তখন সারাদিনের ফেলে আসা অসংখ্য মুহূর্ত সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে। গাছের সারি, পিছনের পাহাড়, অজানা জঙ্গলের বাঁক, হাওয়ার ফিসফিসানি যেন বলতে থাকে আবার দেখা হবে। ফেরার পথে একটা সহজ ট্র্যাকিংও সেরে নিলাম। একটু হেঁটেই পাহাড়ের ফাটলে একটা অকৃত্তিম গুহা, উৎসাহী কয়েকজনের সঙ্গে পা মেলালাম। সনু সবার আগে। ওপর থেকে কিন্তু বেশ সুন্দর লাগল নীচের সবুজ উপত্যকা। রুক্ষতা তখন উধাও। ছোট ছোট সবুজ গাছের সারি, দূরের লালচে পাহাড়, ছোট্ট নদীর জলে tar লালচে প্রতিচ্ছবি, ব্যস্ত রোডরানার ... আরও কত কি।

  ম্যাক ডিক গ্রুপ প্যাভিলিয়ন এ ফেরার পথে ঢু মারলাম। কাদের একটা বিয়ে-থা হচ্ছে। অতিথি সমাগমে জমজমাট প্যাভিলিয়ন। সবাই সেজেগুজে হাজির। ইচ্ছে ছিল একবার ভিতরে উঁকি মারার। পার্কিং লটেই সিকিউরিটি। ট্রেস্পাসার্স আর নট অ্যালাউডেড। কাজেই আর দেরী না করে ওখান থেকে পাততাড়ি গোটালাম। 

 - ‘কি রে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন অফ টেক্সাস কেমন লাগল।‘ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সনু পিছনের সিটে কাত মেরে।   

- 'ইটস, নাইস ড্যাডি... অসাম... বাট উই ডিড নট সি এনি এনিম্যালস’ বলে নাকের ওপর নেমে আসা চশমাটা একবার উপর দিকে ঠেলে আবার গেমসে ঢুকে পড়ল সনু। 'অনেক হয়েছে বাবা, আর অ্যানিম্যাল দেখে না...' স্বাতীর মুচকি হাসি। সন্ধ্যা নামছে ক্যানিয়ন শহরের অলিতে গলিতে। যেখানে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা। আমাদের গাড়িও এই অন্ধকার, নিস্তব্ধতা চিরে ফেয়ারভিউ এর পথে, আজ ওখানেই রাত্রিবাস।

  পরদিন সকাল। তাড়া নেই, ঘুম ভাঙল একটু দেরীতে। সাধারণতঃ ঝটিকা সফরে চাপ থাকে, আমাদের তার ঠিক উলটো। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরতে বেরতে প্রায় এগারোটা। আজই ডালাস ফিরবো। ফেরার পথে ক্যাপ-রক ক্যানিয়নে একটু ঢুঁ মারব। রাস্তা ঘাট বড়ই নির্জন। একটা দুটো গাড়িও চোখে পড়ছে না। মাইলের পর মাইল ফাঁকা জমি, কিছুটাতে চাষবাস, কয়েকটাতে আবার ক্যাটেল ফার্ম। একটা বাঁকের মুখে সুন্দর একটা দোতালা বাড়ি নজরে এল, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল যে তার আশেপাশে অন্তত আর মাইল খানেকের মধ্যে কোন প্রতিবেশী নেই। স্বাতীকে ইশারায় বললাম – ‘ধর তোমাকে ওই বাড়িতে থাকতে বলা হল, কি করবে...?’। ও হেসে চোখ কপালে তুলে বলল – ‘পাগল!’।

  .... ঘুরতে ঘুরতে সময় যেন কোথায় চলে যায়, পিছনের সারিতে তখন সারাদিনের ফেলে আসা অসংখ্য মুহূর্ত সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে। গাছের সারি, পিছনের পাহাড়, অজানা জঙ্গলের বাঁক, হাওয়ার ফিসফিসানি যেন বলতে থাকে আবার দেখা হবে  ...

লিখেছেন... কৃষ্ণতরু বর্মণ  

(ডালাস, টেক্সাস) 

            লালচে মাটির 

     রুক্ষতায়

ক্যানিয়ন ভিউ, পালো ডুরো

ক্যাম্প গ্রাউন্ড, পালো ডুরো

ক্যানিয়ন ভিউ, পালো ডুরো

 পার্কে ঢুকে একটা নির্জন জায়গা দেখে দাঁড়ালাম।অভ্যর্থনায় এগিয়ে এল একটা স্লিম চেহারার রোডরানার। জিম ছাড়াই দিব্বি ছিপছিপে চেহারা। একটু দূর থেকেই আমাদের গতিবিধি লক্ষ্য করছে। কাছেই বোর্ডে সাবধানবানী ‘বাইসন হইতে সাবধান’। দু-দিকে বিস্তীর্ণ ফাঁকা ঘাসের জমি। বাইসনদের মুক্ত বিচরণ ক্ষেত্র। একটু এগিয়েই বাঁ দিকে ছোট্ট লেক ‘থিও’। শান্ত জলে দূর পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি। পাশে ছোট্ট একটা ফিশিং ডেক। চেয়ারে বসে বছর পাঁচেকের একটা বাচ্চা, একটা হাতে ছিপ, আর অন্যটাতে বড় সাইজের একটা চকলেট কুকি। আমাদের দেখে একটা মিষ্টি হাসি ছুঁড়ে দিল।  

  আমারিলো থেকে প্রায় একশ মাইল দঃ পূর্বে ব্রিস্কো কাউন্টির বুক চিরে এই ক্যাপ-রক ক্যানিয়ন। সাইজে পালো ডুরোর থেকে ছোট। প্রায় হাজার ১৫ একর জুড়ে রুক্ষ জমি, বাইসনের তৃণ-ভূমি আর পাহাড়-নদী। লেক পেরিয়ে রাস্তা ঘুরল ডান দিকে। - ‘ড্যাডি, সি প্রেইরি ডগস’ সনু খুব এক্সাইটেড। গাড়ি গেল থেমে। হনি ফ্ল্যাট ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডের ঠিক পাশেই রাস্তার গা ঘেঁষে অসংখ্য কাঠবিড়ালি প্রজাতির প্রেইরি ডগস। রাস্তার গাঁ ঘেঁসে সমানে নাচন কোঁদন করছে। একটু হাওয়া খারাপ বুজলেই আবার গর্তের মধ্যে ধাঁ। ছবি তোলার ধুম পড়ে গেল। পথে পড়ল ওয়াইল্ড হর্স, লিটিল রেড টেন্ট, সাউথ প্রং টেন্ট ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড। একই রকম, তফাৎ কিছুই নেই। অদূরেই বোর্ডে আপার ক্যানিয়ন ট্রেইল ম্যাপ। এই ট্রেইল ধরে তিন হাজার একশো ফুট উঁচুতে একটা ভিউ পয়েন্টে চলে যাওয়া যায়। তবে এখানে এক্সপেরিয়েন্স ম্যাটারস। প্রচণ্ড কষ্টকর ও অত্যন্ত ঝুঁকিবহুল এই পথ। বিপদ ডাকে সংকীর্ণ খাড়াই, আর পায়ের তলায় ঝুড়ো লালচে পাথর। সনুকে নিয়ে এগিয়ে গেলাম কিছুটা। পড়ল একটা শুকনো নদী, টুকরো টুকরো পাথর নদীর বুক জুড়ে। নাম সাউথ প্রং রিভার। পাহাড়ে হঠাৎ বৃষ্টি এলে এই পথে না হাঁটাই ভাল, আচমকা হড়কা বানের প্রবল সম্ভাবনা থাকে। নির্জন এই ট্রেইল-এ লোকজনের দেখা মেলা ভার। তবে এক ভদ্রলোকের দেখা মিলল। স্থুল চেহারা, ম্যাপ হাতে হন-হন করে হেঁটে চলেছেন। একাই এসেছেন অস্টিন থেকে। মিনিট দুয়েক দাঁড়ালেন, টুপি খুলে টাক মাথার ঘাম মুছে দু-একটা কথা সেরে আবার হারিয়ে গেলেন লালচে পথে। সামনেই উঁচু পাহাড়, আর তাকে আলিঙ্গন করতে একটুকরো কালো মেঘের অহেতুক দস্যিপনা। পড়ন্ত বিকেলের হাতছানি। তা ঐ অস্টিনবাবুটি মেঘের সাজসজ্জাকে পাত্তা না দিলেও আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম – ‘সুবিধের ঠেকছে না রে, ঝড় বৃষ্টি আসার আগেই চল কেটে পড়ি, নইলে আবার ফিরতে দেরী হয়ে যাবে। ’      

 - ‘নে এবার শুয়ে পড়।' ল্যাপটপটা সাটডাউন  করে সনুকে বলে উঠলাম। ও প্রায় আমার ঘাড়ের ওপরই বসে, গত দু-দিনের গাদা-গুচ্ছের ছবি দেখে চলেছি দু-জনে। ছবিগুলোর মধ্যেই বেঁচে থাক আমাদের এই ঝটিকা সফরের কিছু বিক্ষিপ্ত স্মৃতি। একটু আগেই বাড়ি ফেরেছি। ক্লান্তি জড়ানো চোখে ‘শুভ রাত্রি' জানিয়ে সবার আগে আমি চললাম আবার একটা ভোরের অপেক্ষায়। আবার যদি কাল কোথায় বেড়িয়ে পড়তে পারতাম, কি ভালই না হত!

ক্যাপরকের অন্দরে

ছবিঃ লেখক 

ছবিঃ লেখক 

ছবিঃ লেখক 

ছবিঃ লেখক 

ছবিঃ লেখক 

ফটো গ্যালারী - পালো ডুরো ক্যানিয়ন

ফটো গ্যালারী - ক্যাপরক ক্যানিয়ন

  • লালচে মাটির রুক্ষতায় -  কৃষ্ণতরু বর্মণ

  • ইগুয়াসু ফলসের কাহিনী - চৈতালি পুরকায়স্থ  

ছবিঃ লেখক 

ইগুয়াসু ফলসের দৃশ্য 

  .... ইগুয়াসু নদী  কি  আশ্চর্য  ভাবে নেমেছে  উঁচু  থেকে  নীচুতে - কি  অপূর্ব দৃশ্য। প্রায়  দু-মাইল  ধরে  জল  নেমেছে, বাঁ পাশে অশ্বখুরাকৃতি হয়ে, তারপর নেমেছে  উঁচু  থেকে  নীচুতে  নানান  স্তরে ...

লিখেছেন... চৈতালি পুরকায়স্থ  

(ডালাস, টেক্সাস) 

       ইগুয়াসু ফলসের

                      কাহিনী

  পনারা সকলেই গেছেন উত্তর আমেরিকার নায়েগ্রা ফল্‌স দেখতে। কেউ কি শুনেছেন দক্ষিণ আমেরিকার ইগুয়াসু ফল্‌স-এর কথা? যদি দেখতে যান আশ্চর্য হবেন,  ভাববেন কেন নায়েগ্রা ফল্‌সকে বলে সবচেয়ে বড় ফল্‌স? ইগুয়েসু ফল্‌স এর সঙ্গে কোন তুলনাই হয় না নায়েগ্রার। জলপ্রপাত চলছে তো চলছেই প্রায় দুমাইল ধরে, শেষ খুঁজে পাওয়াই যায় না কোন।

  এবার বলি কেমন করে দেখার সুযোগ পেলাম।আমরা তিনজন - আমি, সুবীর এবং অনিল লাড (যিনি  এসেছিলেন ভারত থেকে) রওনা হয়েছিলাম ব্রেজিল ও  আর্জেন্টিনা অভিমুখে। সুবীর ও মিস্টার লাডের ছিল অফিসের কাজ  ও  বেড়ানো আর আমার ছিল শুধুই নতুন দেশ দেখার সখ।

  আমাদের যাত্রা শুরু হল রিও ডিজেনেরো শহর থেকে।অপূর্ব সুন্দর শহর, মানুষকে মুগ্ধ করার মত। সেখানে দুদিন থেকে রওনা হলাম ইগুয়াসুফল্‌স এর পথে। আমাদের প্লেন যখন নামলো চারিদিকে ঝম্‌ঝম্‌ করে নেমেছে বৃষ্টি। ভাবলাম ছোট্ট এয়ারপোর্ট, প্লেন থেকে নেমে হেঁটে যেতে হবে, নিশ্চই ভিজে একসা হব। আমাদের অবাক করে দিয়ে চলে এল একটা ছোট ট্রাকের মত গাড়ী, গাড়ীর চালক নেমে পড়ে যাত্রীদের সকলকে দিতে লাগলেন একটা করে লাল রং এর ছাতা, এমন কি খুলে প্রত্যেকের হাতে এগিয়ে দিতেও ভুল হল না। আমি চমৎকৃত, এমন ব্যবহার কোন এয়ারপোর্টে কোনদিনও পাইনি!

  এয়ারপোর্টের ভেতর ঢুকে দেখলাম আমাদের গাইড  মার্কো দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জন্যে। সে জানালো  দুপুর হয়ে  গেছে,  সময়  বেশী  নেই, এক্ষুনি  চল ফল্‌স

দেখতে। আমরা চললাম ফল্‌স অভিমুখে।চারিদিক সবুজ, ফল্‌সকে ঘিরে  রয়েছে  ন্যাশানাল পার্ক।ফল্‌সের সৃষ্টি হয়েছে ইগুয়াসু নদী থেকে ব্রেজিল ও আর্জেন্টিনার সীমারেখায়। ব্রেজিলের দিক থেকে দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর, তাই আমাদের সেই দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।  মার্কো জানালো  গত  এক  সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি  চলছে  তাই  জল  অনেক  বেশী  রয়েছে এখন। যখন ফল্‌সের সামনে এসে পৌঁছোলাম বৃষ্টি তখনও থামেনি।সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখতে পেলাম ইগুয়াসু নদী কি আশ্চর্য 

ভাবে নেমেছে উঁচু থেকে নীচুতে কি অপূর্ব দৃশ্য! প্রায় দু-মাইল ধরে জল নেমেছে বাঁ পাশে শ্বখুরাকৃতি হয়ে, তারপর নেমেছে উঁচু থেকে নীচুতে নানান স্তরে। এক স্তর নেমে কিছু দূর নদীর মত বয়ে আবার নেমেছে আর একটা স্তরে। পর পর কত যে ছোট -বড় জলপ্রপাত, মধ্যে মধ্যে রয়েছে গাছপালা। যেখানে নদীর মত অংশ সেখানে রয়েছে Cat walk অর্থাৎ কাঠের তৈরী সরু হাঁটার রাস্তা। Cat walk দিয়ে হেঁটে এসে পৌঁছোলাম জলের খুব কাছে। মনে হল এমন দৃশ্য তো নায়েগ্রাতে দেখিনি। সেখানে তো নৌকো বা জাহাজ নিয়ে জলের কাছে যেতে হয়! ইগুয়াসু সত্যিই অন্যরকমের জলপ্রপাত। যত দিকে চোখ যায় শুধু জল আর জল, শেষ দেখতে পেলাম না কোন।

  জলপ্রপাত ছাড়িয়ে কিছু দূরে ইগুয়াসু নদীর জল এসে  মিশেছে পারানা নদীর সঙ্গে। পারানা নদীর ওপারে অন্য  দেশ - প্যারাগুয়ে। এই মিলনস্থলের খুব কাছে যেখানে  একদিকে ব্রেজিল আর অন্য দিকে প্যারাগুয়ে, সেখানে  তৈরী হয়েছে ইতাইপু ড্যাম। এই ড্যাম তৈরী করেছিলেন  ব্রেজিল ও ইটালীর ইঞ্জিনীয়াররা, কাজ শেষ হয়েছিল ১৯৯১ সালে। তৈরী হয়েছিল বিশাল Hydroelectric power plant। ব্রেজিল ও প্যারাগুয়ে দুই দেশকে ভাগ করে নিতে হয়েছে electricityর অংশ। যদি আপনারা কখনও যান ইগুয়াসু দেখতে আরও দুই শহরের কথা মনে রাখবেন। ব্রেজিলের রিও ডিজেনেরো আর আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসরিও ডি জেনেরোর প্রাকৃতিকসৌন্দর্য অবর্ণনীয়। আর বুয়েনস আইরেস, যাকে বলা হয় আমেরিকার প্যারিস, তার কাহিনীর শেষ নেই।আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম কবরস্থান দেখে।কিন্তু আমার মনকে সবচেয়ে বেশী নাড়া দিয়েছিল ট্যাংগোনাচের জন্ম কাহিনী। সে কাহিনীর শুরু  দূর  দেশ  থেকে  আসা immigrant-দের জীবন এবং নিজেদের দেশকে ফেলে আসার দুঃখের ইতিহাস থেকে। যদি আপনারা জানতে চান পরে লিখতে পারি সে সব কথা।

ইগুয়াসু ফলসের দৃশ্য 

ছবিঃ লেখিকা 

ছবিঃ লেখিকা 

ছবিঃ লেখিকা 

অশ্বক্ষুরাকৃতি অংশ 

 

       ঐতিহ্যের শহর কিয়োতো

 ৭৯৪ সালে কিয়োতোতে রাজধানী স্থানান্তরিত হবার পর শহরের দক্ষিণে এর প্রধান প্রবেশপথের দুপাশে দুটি বিশাল মন্দির স্থাপিত হয়- পূর্বদিকের মন্দিরটি হল অধুনা তোজি মন্দির, আমাদের পরবর্তী দ্রষ্টব্য। পশ্চিমদিকের মন্দিরটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কালের নিয়মে। কুকাই ছিলেন শিনগন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একজন বিশিষ্ট সন্ন্যাসী।

লিখেছেন... অরুন্ধতী ঘোষ  

(পিট্‌সবার্গ, ইউ এস এ) 

ছবিঃ লেখিকা 

ইগুয়াসু ফলসের দৃশ্য 

ফুশিমি ইনারি শিন্তো মন্দির

   জাপানের দোশিশা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুমাসের জন্য পড়তে আমাদের মেয়ে গেছে জাপানে। একান্ত ইচ্ছা, তার পড়ার শেষে আমরা ঘুরে আসি। কিন্তু যাওয়া মানে তো হাজার ঝক্কি। হলই বা, মেয়ের ইচ্ছাপূরণ করতে এটুকু তো করতেই হয়।

      অনেক পরিকল্পনা করে, পোষা কুকুর আর বেড়ালের ভরণপোষণের যথাযথ ব্যবস্থা করে আমরা স্বামী-স্ত্রী এয়ার কানাডার জাপানগামী প্লেনে চড়ে বসলাম। এই যাত্রায় আমার মাতৃদেবীও আমাদের সহযাত্রী। গন্তব্যস্থল – কিয়োতো শহর। অনেক লম্বা পথ (প্রায় ১১০০০কিমি)। ওসাকার কেনসাই এয়ারপোর্টে যখন পৌঁছলাম,- তখন রাত আটটা। এয়ারপোর্ট থেকে বাসে চড়ে রাত নটায় কিয়োতোর হোটেলের লবিতে পৌঁছে গেলাম। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল মেয়ে - দেখে দৌড়ে এল। আশ্চর্য লাগলো হোটেলের রোবট দারোয়ানকে দেখে- জাপানী ভাষায় সে যে কত কি বলে গেল! একবর্ণ বুঝলাম না, শুনতে কিন্তু ভালই লাগল।

     হোটেলে মালপত্র রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম খেতে। আশেপাশেই অনেক খাবার জায়গা- রামন নুডল (জাপানে ফাস্ট ফুড), টেম্পুরা, ইত্যাদি। আমরা একটা রামনের জায়গায় ঢুকলাম। কাউন্টারের সামনে খাবার ব্যবস্থা। মেয়ে জাপানীতে খাবারের অর্ডার দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে এসে গেল ধূমায়িত পাত্রে মাছের ব্রথে রামন নুডল, অল্প সবজি, তাতে একটা আধসিদ্ধ ডিম ভাসছে (এটাই প্রথা)। খিদের মুখে খেতে ভালই লাগল। আমাদের হোটেল সিজো স্ট্রিটের (একটি অন্যতম প্রধান রাস্তা) পাশেই। এখানে বলে রাখি কিয়োতোর সবথেকে আকর্ষণীয় রাস্তা কাওরামাচি, সিজো, তেরামাচি আর সিন-কিওগোকু (দোকানপাট, ক্লাব ইত্যাদি)।

     পরের দিন সকালে দ্রষ্টব্য কামো-গায়া নদীর পাশে রাজপ্রাসাদে (কিয়োতো গিয়োয়েন)। ১৩৩১-১৮৬৪ অবধি এই প্রাসাদটি ছিল সম্রাটের বাসস্থান- এরপরে অবশ্য টোকিও তে স্থানান্তরিত হয়। বহু সংস্করনের পর বর্তমান প্রাসাদটি তৈরী হয় ১৮৫৫ সালে। একঘণ্টার গাইডেড ট্যুর থাকা সত্ত্বেও  আমরা নিজেরা প্রাসাদটিকে ঘুরে দেখবো বলে মনস্থির করলাম। গেট পেরিয়ে প্রাসাদ চত্বরে ঢুকে পড়লাম- সংলগ্ন বাগানটি দেখবার মতো- একদিকে পাইনগাছ ও হিগাসিয়ামা পাহাড়, অন্যদিকে রাজপ্রাসাদ এখনো শান্তিপূর্ণ হেইয়ান সাম্রাজ্যর  সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। আমার মা খানিকক্ষণ ঘুরে ক্লান্তি বোধ করলে, তাঁকে বাগানে গাছের ছায়ায় বসিয়ে আমরা তিনজনে বাকিটা ঘুরে দেখলাম।

নাঞ্জেনজি জেন বৌদ্ধমন্দির

    প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে মেট্রো চড়ে আমরা এলাম নিশিকি বাজারে। সিজো স্ট্রিটের  উত্তরে একটি গলিতে অবস্থিত বাজারটিতে সবচেয়ে উন্নতমানের রান্নার উপকরণ পাওয়া যায়। আমাদের সবথেকে ভালো লাগলো নানারকমের খাদ্যদ্রব্য যেভাবে সাজিয়ে দোকানিরা বিক্রি করছে তা দেখে। সব ই সুন্দর প্যাক করা-নানারকমের মাছ, সবজি, স্যালাড উপকরণ, পিকলস্‌ ইত্যাদি। দোকানিরা সামনে দাঁড়িয়ে সুর করে ডেকে ডেকে বিক্রি করছে। এখানে কায়সেকি (কিয়োতো অঞ্চলের রান্নার স্টাইল) সেফরা বাজার করতে আসেন। এছাড়াও আশেপাশের গলিতে অনেক স্থানীয় শিল্পকলার দোকান-হাতপাখা, বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ- ছোট-বড়, বৌদ্ধ জপমালা, পোশাকের মধ্যে য়ুকাতা (সুতির কিমোনো) ইত্যাদি। আমরা তিন-প্রজন্ম ভালোই টুকটাক বাজার করে নিলাম। মাঝে মাঝেই দেখতে পাচ্ছি অল্পবয়সী মেয়েরা দলবেঁধে য়ুকাতা পরে মাথায় ফুল গুঁজে গল্প করতে করতে চলেছে। বেশির ভাগ লোক জনের ওয়েস্টার্ন পোশাক (পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে)। মেয়ের কাছে জানলাম যে এখন জুলাই মাস- এখানে গিয়ন উৎসব - তাই লোকে য়ুকাতা পরেছে।

গিয়ন উৎসব - বিভিন্ন অঞ্চলের শোভাযাত্রা 

গিয়ন উৎসব কিয়োতোর সবচেয়ে বড় ও পুরোনো উৎসব। আগেকার দিনে রোগের প্রকোপ, খরা, বন্যা ইত্যাদি থেকে উদ্ধারের জন্য স্থানীয় লোকেরা তাদের অঞ্চলের দেবদেবীর (বৌদ্ধ বা সিন্তো বা দুইই) কাছে সাহায্য চাইত এই উৎসবের মাধ্যমে। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বংশানুক্রমে তাদের এলাকার দেবতাকে সুসজ্জিত কাঠের উঁচু ঠেলাগাড়িতে বসিয়ে দড়ি দিয়ে টানতে টানতে শোভাযাত্রা করে নিয়ে যায়। এর জন্য অনেক উদ্যম, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম লাগে। আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল সেদিন হোটেলে ফেরার পথে সিজো স্ট্রিটে দশটি বিভিন্ন অঞ্চলের শোভাযাত্রা দেখার। পুরুষরাই বেশি-সবাই য়ুকাতা পরেছেন, বাচ্চারাও আছে। শোভাযাত্রা খুব শান্তিপূর্ণ ভাবে এগিয়ে চলল।

     পরের দিন “দার্শনিকের পথ” দেখতে গেলাম। অদ্ভুত নাম না? কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক শ্রী নিশিদা কিতারো এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতেন রোজ -তাই রাস্তার এই নাম। এই রাস্তাটি একটি নয়নাভিরাম চেরীগাছ পরিবেষ্টিত ক্যানালের পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে পূর্বদিকে হিগাসিয়ামা পাহাড় থেকে গিংকাকুজি হয়ে দক্ষিণদিকে নিয়াকিওজি জিঞ্জা অবধি চলে গেছে- মাঝে নাঞ্জেনজি সংলগ্ন রাস্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আমরা নাঞ্জেনজি থেকে গিংকাকুজি পর্যন্ত গেছিলাম। রাস্তার ধারে ধারে সুন্দর ছোটো ছোটো বাড়ি, কাফে, খাবারের ও বিভিন্ন শিল্পকলার দোকান। মাঝে মাঝে রাস্তার ধারে গাছের নিচে বেঞ্চি পাতা- দুদণ্ড বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য। কিয়োতোর প্রধান পাঁচটি জেন মন্দিরের একটি নাঞ্জেনজি জেন বৌদ্ধমন্দির। মন্দিরের বিশাল দুতলা গেটটি তৈরী হয়েছিল ওসাকা প্রসাদের অবরোধে নিহত সৈন্যদের স্মরণে। গেট পেরিয়ে ভিতরে তিনটি উপ-মন্দির- কন্‌চি ইন, তেন্‌জু ইন (সুন্দর শুষ্ক বাগান  ও সবুজ বাগান) এবং নাঞ্জেন ইন। এখানে বলে রাখি- ‘শুষ্ক বাগান’ হল জেন বৌদ্ধধর্মের এক বৈশিষ্ট্য। বাগান মূলত বালি, পাথর দিয়ে সাজানো। বালির ওপরে লাইন টানা -কোথাও লম্বা, সমান্তরাল কোথাও বৃত্তাকার। খুব ভোরে উঠে জেন সন্ন্যাসীরা নিজে হাতে এটি করেন। বালির মধ্যেমধ্যে বিভিন্ন আকার ও আয়তনের পাথর বসানো। জেন বৌদ্ধদের বিশ্বাস বাগান শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখার জন্য নয়, এটি আত্মনিমগ্ন হবার স্থান। তাই এরা সীমিত জায়গার মধ্যে অতি সামান্য উপকরণ দিয়েই বিশালতা আনার প্রচেষ্টা করেন যা হয়ে ওঠে অসামান্য। এই ‘সীমার মাঝে অসীমের’ সুর বাজানোর প্রচেষ্টা সত্যিই অনবদ্য। প্রতি বছর দেশ, দেশান্তর থেকে অসংখ্য মানুষ আসেন এই বাগান দেখতে।

   নাঞ্জেনজি  দেখে রাস্তা দিয়ে হেঁটে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে আমরা পৌঁছলাম গিংকাকুজি বা সিলভার প্যাভিলিয়নে। তাঁর পাহাড়ের ওপর ধর্মচিন্তার আবাসস্থল হিসেবে এটি নির্মাণ করেছিলেন আশিকাগা দলপতি ইয়োশিমাসা (১৩৫৪-১৪০৪)। নিজের পিতামহের (কিংকাকুজির প্রতিষ্ঠাতা) প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মনস্থির করেন গিংকাকুজি রুপোর পাতে মুড়ে দেবেন। কিন্তু যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যাওয়ায় কাজ বন্ধ রাখতে হয়। ইয়োশিমাসার মৃত্যুর পর বাসস্থানটি মন্দিরে পরিণত হয় কিন্তু রুপোর পাত আর লাগানো হয় নি। প্যাভিলিয়নের প্রথমতলা বাসস্থান, দ্বিতীয়তলা প্রাথর্নাকক্ষ। সংলগ্ন শুষ্ক বাগানটি বিশেষ দ্রষ্টব্য। কিছুক্ষণ বসে থাকলে মন শান্ত হয়ে যায়। এছাড়াও আছে সবুজ বাগান- ঘুরে বেরানোর জন্য। বাগানে সাদা পাথর বসানো হয়েছিল রাতে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হবার জন্য। এটি প্রকৃতি নির্জনে ধর্মচিন্তার আদর্শ জায়গা।

     এরপর গন্তব্যস্থল কিংকাকুজি বা গোল্ডেন প্যাভিলিয়ন। আমাদের মতো পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। ইয়োশিমাসার পিতামহ ইয়োসিমাত্‌সু তৈরী করেন তাঁর অবসর বাসস্থান হিসেবে। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন তাঁর উত্তরসূরিকে সাম্রাজ্য দিয়ে এবং কিংকাকুজি সমাপ্ত করেন। তাঁর মৃত্যুর পর গুরু সোসেকি এর প্রধানপদে নিযুক্ত হন। গাছের ছায়ায় ঢাকা পথ দিয়ে মন্দিরের প্রবেশপথ পেরিয়ে একটি সুন্দর বাগানের পাশেই সোনার পাতে ঢাকা মন্দিরটি বিশেষ নজর কাড়ে। বাগানে পুষ্করিণীর জলে সোনার মন্দিরের ছায়া বিশেষ দ্রষ্টব্য। এখানে একটি বাড়িতে আমরা জাপানি প্রথায় চা পান করলাম। ভিতরে ঢুকে জুতো ছেড়ে, একটি ঘরে তাতামি ম্যাটের ওপর বসলাম। একজন মহিলা কিমোনো পরে চা পরিবেশন করলেন। সবুজ মাচা চা, সংগে মিষ্টি।

৭৯৪ সালে কিয়োতোতে রাজধানী স্থানান্তরিত হবার পর শহরের দক্ষিণে এর প্রধান প্রবেশপথের দুপাশে দুটি বিশাল মন্দির স্থাপিত হয়- পূর্বদিকের মন্দিরটি হল অধুনা তোজি মন্দির, আমাদের পরবর্তী দ্রষ্টব্য। পশ্চিমদিকের মন্দিরটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কালের নিয়মে। কুকাই ছিলেন শিনগন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একজন বিশিষ্ট সন্ন্যাসী। ৮২৩ সালে

হোটেলের সম্মুখভাগ

প্রাসাদ চত্ত্বরে

সম্রাট সাগা তাঁকে এই মন্দিরের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন। তোজি মন্দির এখনো শিনগন বৌদ্ধদের হেড-কোয়ার্টার। শিনগন বৌদ্ধরা তান্ত্রিক বৌদ্ধ। এরা বিশ্বাস করে নির্বাণলাভ সম্ভব জীবনে প্রকৃত শিক্ষা এবং দেহ, মন ও বাক-সংযমের সাহায্যে।

      তোজি মন্দিরে ঢুকলেই প্রথমে কন্ডো বা প্রধান কক্ষ। কাঠের একটি বিশাল বাড়ি। ভিতরে বুদ্ধ (ইকুশি নোরাই), এঁর হাতে পথ্য- যা দয়া ও ক্ষমা দিয়ে মানুষের শরীর, মন কে সারিয়ে তোলে। কোডো- ভাষণ কক্ষ, এটিও কাঠের। ভিতরে গিয়ে মন শান্তিতে ভরে গেল। একটি প্রায়ান্ধকার কক্ষ- তার ভিতরে বিশাল বড় বাতি জ্বলছে -তাতেই বেশ দেখা যাচ্ছে। স্টেজের উপর বুদ্ধ এবং তাঁর সহচররা রয়েছেন মন্ডলার আকারে।

         ২১টি মূর্তি দিয়ে মন্ডলা তৈরী হয়- মাঝখানে বুদ্ধ, দুইপাশে দুই বোধিসত্ত্ব (যাঁরা নির্বাণলাভ না করে মানুষের সেবার জন্য নিযুক্ত), আটজন মিয়ো বা বিচক্ষন রাজা- যাঁরা জনগণকে কঠোর সংযমের সাহায্যে পরিচালিত করেন, দশজন তেন্বু বা রক্ষক- যাঁরা বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব ও মিয়োদের রক্ষা করেন। স্টেজের সামনে বেঞ্চি পাতা- বসে প্রার্থনা করার জন্য। বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। স্বল্প আলোয় প্রায় ফাঁকা ঘরে মন্ডলা এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মূর্তিগুলিও অসামান্য। কন্ডো থেকে বেরিয়ে গেলাম প্রাচীন পাঁচতলা প্যাগোডা দেখতে। কাঠের তৈরী এই সুবিশাল (১৮৭ ফিট উঁচু) প্যাগোডার সামনে কিছুক্ষণ মাথা নত করে সেই অজানা স্থপতিদের মনে মনে প্রণাম জানালাম যাঁরা এই বিশাল কীর্তি রেখে গেছেন।

      তোজি মন্দিরের উত্তরে কিয়োতো স্টেশনের কাছে আছে আরো দুটি বৌদ্ধমন্দির- নিশি (পূর্ব) হোংগান্জি এবং হিগাসি (পশ্চিম) হোংগান্জি। নিশি হোংগান্জি আগে তৈরী করেছিলেন সম্রাট তয়োতমি হিদেহসি বৌদ্ধধর্মের অন্তর্গত জোডো-সিন্সু উপসম্প্রদায়ের জন্য। ভিতরে আছেন আমিডা বুদ্ধ- যাঁকে আমরা বলি “তথাগত বুদ্ধ”। অন্যদিকে হিগাসি হোংগান্জি তৈরী হয়েছিল পরে তোকুগাওয়া দলপতি লেয়েসুর নেতৃত্বে। এখানকার বৈশিষ্ট্য হল ভক্তদের দান করা মাথার চুল দিয়ে দড়ি বানিয়ে মন্দির তৈরীর কাজে ব্যবহার হয়। এখনও এই দড়ি মন্দির মেরামতের কাজে ব্যবহার হয়। দুটি মন্দির ই বেশ ভাল লাগলো আমাদের।

     এতক্ষণ বৌদ্ধমন্দিরের গল্প বলছিলাম। এবার বলব শিন্তো মন্দিরের কথা। ফুশিমি ইনারি শিন্তো মন্দির। কিয়োতো স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেন ধরে দু স্টেশন পরে জে আর ইনারি স্টেশন-এর খুব কাছেই এই মন্দির। জাপানের অন্যতম প্রধান শিন্তো মন্দিরের মধ্যে একটি। ৭১১ সালে তৈরী এই মন্দিরটি ধানের দেবীর উদ্দেশে উৎসর্গিত হয়। আগেকার দিনে ধান বা চাল দিয়ে কর দিতে হত। সেইজন্য ব্যবসায়ীরা  এখানে আসত উন্নতি এবং অর্থাগমের জন্য পুজো দিতে। এখনও মানুষ আসে – উদ্দেশ্য - ব্যবসা-বাণিজ্যের সাফল্যের জন্য প্রার্থনা। আমরা হাত ধুয়ে মন্দিরে ঢুকলাম। বিভিন্ন রকমের পুজো দেবার ব্যবস্থা, দামও আলাদা। ভগবানের সামনে তিনবার হাতে তালি দিয়ে প্রণাম করার নিয়ম। চোখে পড়ল আশেপাশে শিয়ালের মূর্তি-গলায় লাল বিব্‌ বাঁধা। শিয়াল এই দেবীর অনুচর-এদেশের মানুষ মনে করে যে বিব্‌-এর মধ্যে শস্যভাণ্ডারের চাবি আছে। মন্দিরের পিছনে প্রায় আড়াই কিলোমিটার রাস্তা পাহাড়ের উপর উঠে গেছে। ১০,০০০ লাল তোড়ন দিয়ে রাস্তা ঢাকা। অভূতপূর্ব অনুভূতি হল- কারণ এই রকম তোড়ন ঢাকা রাস্তা আমরা কখনো আগে দেখিনি।  বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর দানে নির্মিত তোড়ন ঢাকা পথে পাহাড়ের উপরে উঠে আমরা আবার কিয়োতো শহরকে নতুন করে দেখলাম। পথে জাপানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তীর্থযাত্রীদের দেখলাম। 

    জাপানীরা জন্মসূত্রে সবাই শিন্তো কিন্তু এদের জীবনে বৌদ্ধধর্ম ঢুকে গেছে কারণ দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বৌদ্ধধর্মের প্রাধান্য রয়েছে। আবার বর্তমান প্রজন্ম খৃষ্টধর্মের রীতিনীতিকে মেনে চলছে। তাই এরা জন্মায় শিন্তো হয়ে, বিয়ে করে খৃষ্টমতে আর মৃত্যুকালে সৎকার হয় বৌদ্ধমতে। বেশিরভাগ লোক জাপানেই থাকতে পছন্দ করে। সবাই চুপচাপ, জোরে কথা বলে না, ঝগড়া-ঝাঁটি তো দূরের কথা। এদেশে জাপানী ভাষাই চলে, কিন্তু ট্যাক্সিচালক, ট্রাফিক পুলিস, কনভেনিয়েন্ট স্টোরের কর্মী -সবাই ইংরেজি বলতে পারে। তবে বিদেশী যদি জাপানী ভাষায় কথা বলে তবে আন্তরিক ব্যবহার পাওয়া যায়। কনভেনিয়েন্ট স্টোরে দু-তিন টি করে এ টি এম মেশিন থাকে- যা আমাদের মতো পর্যটকদের পক্ষে খুব সুবিধাজনক।

     যাদের কাছে জাপান-মানে বহুতল বাড়ি, সাঁ সাঁ করে ছুটে চলা গাড়ী, বুলেট ট্রেন, ঝাঁ চকচকে এক দেশ, কিয়োতো তাদের জন্য নয়। কিয়োতো শহর আধুনিক শহর, কিন্তু এখনও প্রাচীন রাজধানীর ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। তার চিহ্ন সর্বত্র বর্তমান,- এদের পুরোনো কাঠের বাড়ি, প্রাসাদ, প্রাচীন শিল্পকলার দোকান, রাস্তায় য়ুকাতা পরা মহিলা-পুরুষ এবং অসংখ্য বৌদ্ধ ও শিন্তো মন্দিরে। বহুতল বাড়ি এখানে তুলনামূলক ভাবে কম। কিয়োতো শহরে কাঠের বাড়ির প্রচলন বেশী, রাজপ্রাসাদ, মন্দির সবই কাঠের তৈরী। কিন্তু এর জন্য তাদের মূল্য দিতে হয়েছে, অনেক বিপদ এসেছে। বারংবার গোটা শহর পুড়ে গেছে, আবার সব নতুন করে তৈরী হয়েছে- প্রাসাদ, মন্দির সব- অবিকল আগের মতো। এর থেকেই বোঝা যায় এই শহরের মানুষ নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রাখতে কতটা দৃঢ়সঙ্কল্প। তাই তো কোনো প্রাসাদ, মন্দির দেখলে মনে হয় পুরোনো দিনের জাপানে ফিরে গেছি। ঐতিহ্যের সৌন্দর্যের প্রতি এদের নিষ্ঠা সত্যিই বিস্ময়কর। মনে পড়ে যায় রবি ঠাকুরের জাপান যাত্রী -র একটি অংশ-

     “জাপান আপনার ঘরে বাইরে সর্বত্র সুন্দরের কাছে আপন অর্ঘ নিবেদন করে দিচ্ছে। এ দেশে আসবা-মাত্র সকলের চেয়ে বড়ো বাণী যা কানে এসে পৌঁছয় সে হচ্ছে, “আমার ভালো লাগল, আমি ভালোবাসলুম।” এই কথাটি দেশসুদ্ধ সকলের মনে উদয় হওয়া সহজ নয়, এবং সকলের বাণীতে প্রকাশ হওয়া আরো শক্ত। এখানে কিন্তু প্রকাশ হয়েছে। প্রত্যেক ছোটো জিনিসে, ছোটো ব্যবহারে সেই আনন্দের পরিচয় পাই। সেই আনন্দ ভোগের আনন্দ নয়, পূজার আনন্দ। সুন্দরের প্রতি এমন আন্তরিক সম্ভ্রম অন্য কোথাও দেখি নি। এমন সাবধানে, যত্নে, এমন শুচিতা রক্ষা করে সৌন্দর্যের সঙ্গে ব্যবহার করতে অন্য কোনো জাতি শেখে নি। যা এদের ভালো লাগে তার সামনে এরা শব্দ করে না। সংযমই প্রচুরতার পরিচয় এবং স্তব্ধতাই গভীরতাকে প্রকাশ করে, এরা সেটা অন্তরের ভিতর থেকে বুঝেছে। এবং এরা বলে, সেই আন্তরিক বোধশক্তি বৌদ্ধধর্মের সাধনা থেকে পেয়েছে।”

      অনেক কিছু লিখলাম, আবার অনেক কিছু না লেখা রয়ে গেল। সবচেয়ে যা বেশী শিখলাম,-‘ সুন্দরের প্রতি এমন আন্তরিক সম্ভ্রম’ । ফিরে এলাম মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে যা দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দেয়। 

তোজি মন্দির - শিনগন বৌদ্ধদের হেড-কোয়ার্টার।

রাস্তায় খাবার দোকানের সম্মুখে 

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?