• ইংকাদের দেশ পেরু- চৈতালি পুরকায়স্থ  

  • কলম্বিয়া - চৈতালি পুরকায়স্থ 

ভ্রমণ সঙ্গী - ৪

  • ইনকাদের দেশ পেরু - চৈতালী পুরকায়স্থ 

  • কলম্বিয়া - চৈতালী পুরকায়স্থ

  • অ্পরূপা সুইজারল্যান্ড - শর্মিষ্ঠা ভট্টাচার্য্য

 

  বার আপনাদের বলি দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর পশ্চিমে পেরু দেশের কথা। ইংকা সম্রাট পাচাকুতির কাহিনী। দক্ষিণ আমেরিকার ইংকা সাম্রাজ্যের কথা আপনারা সকলেই শুনেছেন। পেরু দেশের কুস্‌কো শহরে ছিল ইংকাদের রাজধানী। যদিও তাদের রাজত্ব ছড়িয়ে পড়েছিল বহুদিকে। ১১ হাজার ফুট উঁচু আন্দিজ পর্বতমালার উপত্যকায় কুস্‌কো শহর উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে পুরাতন শহর।

বর্তমানের মাচু পিচু শহর

  দক্ষিণ আমেরিকায় মানুষের বসবাস অনেক হাজার বছর ধরেই। ইংকাদের পূর্বে দু-হাজার বছর ধরে অন্যান্য সভ্যতার কথাও শোনা যায়। ইংকাদের সভ্যতা ৭০০ বছরের পুরনো। তাদের রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন পাচাকুতি। আমরা তাঁর মূর্তি দেখতে পেলাম শহরের কেন্দ্রস্থলে। ইংকারা ছিল খুবই উন্নত, তবে তাদের পূর্বসূরিদের অনেক অবদান ছিল, সন্দেহ নেই। জানা গেছে যে এদের পূর্বপুরুষরা এসেছিল চীন দেশ থেকে। 

  ষোড়শ শতাব্দীতে স্প্যানিশরা যখন এদেশে এসে পৌঁছোয় তখন ইনকা সম্রাট পাচাকুতির মৃত্যু হয়েছিল। সম্রাটের দুই রাণীর দুই পুত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল রাজত্ব নিয়ে। তাদের মধ্যে এক রাজপুত্র স্প্যানিশদের ডেকে নিয়ে এল ভাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধে সাহায্য পাবার জন্যে। ফলে খুব সহজে কুস্‌কো শহর অধিকার করে নিল স্প্যানিশদের দলনেতা ফ্রান্সিস্কো পিজারো, অতি অল্প সৈন্য নিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে সমস্ত রাজত্বটাই চলে গেল তাদের দখলে! প্রথম দিকে স্পেনের রাজার শাসনে চলত এদেশ। তারপর স্বাধীনতা আসে ১৮৩১ সালে। পেরু পরিণত হয় স্বাধীন রাষ্ট্রে।

  পেরুতে আসার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার ২০১১ সালে, এপ্রিল মাসে। আমার স্বামী সুবীর ও আমাদের বন্ধু বন্দনা চ্যাটার্জীর সঙ্গে যাত্রা শুরু হল আটলান্টা এয়ারপোর্ট থেকে, পেরুর রাজধানী লিমা অভিমুখে। এসে পৌঁছলাম প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে লিমা শহরে। এলাম ম্যারিয়ট হোটেল এ যেখানে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করা ছিল। ১৫ তলার ওপর আমাদের ঘর, সামনে অপূর্ব দৃশ্য, সমুদ্র এবং সমুদ্রতীরের। সামনে যে বাগানটি দেখা যাচ্ছিল তার তলা দিয়ে নীচের level এ রাস্তা নেমে গেছে, যেন তলার রাস্তাকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে বাগান দিয়ে। অর্ধ গোলাকৃতি সমুদ্র, নানারকম গাছ, ক্যাকটাস ধরনের ফুল এবং সমুদ্রতীর পাহাড়ি। চারিদিকের দৃশ্য এত সুন্দর যে মনে হল এখানে যদি কটা দিন থাকা যেত! কোথাও কোথাও উঁচু চূড়া তুষারাবৃত। কুস্‌কোতে বেশীরভাগ লোকের চেহারা দেখলাম অন্যরকম। লিমা শহরে লোকেদের দেখে মনে হয়েছিল 

এরা ইউরোপিয়ান। কিন্তু এখানকার লোকেদের চেহারার সঙ্গে ভারতবর্ষের পাহাড়ি অঞ্চলের লোকেদের চেহারার খুব মিল দেখলাম। তাদের হাঁটা চলা, কথাবার্তা সবই যেন অন্যরকম। শুনলাম এখানকার ৬০% লোকেদের মধ্যে স্প্যানিশ ও ইংকাদের মিশ্রণ রয়েছে। সত্যিকারের ইংকা যারা এখনও, তারা মাত্র ৫%। কুস্‌কো শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি হোটেলে এসে পৌঁছে দিয়ে গেল ট্যাক্সিচালকটি। দেখে মনে হল এ যেন একটা বাড়ী, তাকে করা হয়েছে হোটেল। নীচে একটা উঠোন, ছোট্ট একটা ফোয়ারা সেখানে, আর বারান্দার মধ্যে করা হয়েছে অফিস। দেখে বেশ ভালই লাগলো।

  ঘরে গিয়ে বিশ্রামের পর আমরা হেঁটে শহর দেখতে বেরলাম। কেন্দ্রস্থলে একটা বড় গির্জা, ঠিক যেন ইউরোপের একটি ছোট পুরাতন শহর, খুব খোলামেলা। রাস্তা ঘাট পাথরের তৈরি। এ অংশ তৈরি করেছিল স্প্যানিশরা। শুনলাম খুব কাছেই রয়েছে ছোট একটি গির্জা, তার নীচে আবিষ্কার হয়েছে ইংকাদের তৈরি একটি মন্দির। অর্থাৎ স্প্যানিশরা এসে মন্দিরের ওপর দিয়ে গির্জা তৈরি করেছিল। আমরা দেখতে গিয়ে জানলাম গির্জাটি বন্ধ, দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের দুর্ভাগ্য হল না দেখা। পরে জানলাম বড় গির্জাটিও তৈরি হয়েছিল ইংকাদের রাজপ্রাসাদ ভেঙ্গে, তার ওপর। এই শহরের আশে পাশে রয়েছে ইংকা রাজত্বের অনেক ধ্বংসাবশেষ। এক জায়গায় মৃতদেহ রাখা হত, ঠিক যেমন মিশরে প্রচলিত ছিল। 

  রাত্তিরে আমরা পায়ে হেঁটে হোটেলের কাছেই একটা রেষ্টুরেন্টে গেলাম খেতে। সেখানে দেখি তিনজন পেরুভিয়ান ছেলে বাজনা বাজিয়ে গান গাইছে। আমরা আসলে ভারতবর্ষের লোক জেনে তারা খুব খুশী হল। বলল আমরা তোমাদের শাহরুখ খানের খুব ভক্ত, তার সব সিনেমা দেখি। আমরা হিন্দী গানও জানি। বলে সত্যিই বাজনা বাজিয়ে একটা হিন্দী গান গেয়ে শুনিয়ে দিল। আমরা তো অবাক, জানতাম না দূর বিদেশে হিন্দী গান আর সিনেমার এত জনপ্রিয়তা! দেখলাম waitress-দের ব্যবহার চমৎকার, আমাদের কত যত্ন করে খাওয়ালো! এমনটা সত্যিই আশা করিনি!

  কিন্তু আমাদের টিকিট কাটা ছিল। তাই পরের দিন রওনা হতে হল পুরনো রাজধানী কুস্‌কো অভিমুখে। ১১ হাজার ফুট উঁচুতে এই শহরকে ঘিরে রয়েছে

আন্দিজ পর্বতমালা।  পরদিন সকালে ইংকাদের হারিয়ে যাওয়া শহর মাচুপিচু দেখার জন্যে রওনা হলাম গাড়ী নিয়ে।মাচুপিচু শব্দের ইংরাজি অনুবাদ হল ‘The Great Peak’। এ শহর তৈরী হয়েছিল পঞ্চদশ শতাব্দীতে সম্রাট পাচাকুতির রাজত্বকালে। পাহাড়ের ওপর এক দুর্গম অঞ্চলে। ছোট্ট শহর, বাড়ীগুলো তৈরি হয়েছিল পাথরের টুকরো দিয়ে। পাথরের টুকরো বয়ে আনত ইলামারা। ইলামা হল এ অঞ্চলের এক জন্তু, যাদের গা লোমে ভরা। পাহাড়ি অঞ্চলের শীতের উপযুক্ত তারা। শহরের বাসিন্দা ছিল শিক্ষিত ও বিত্তশালী লোকেরা। আর থাকত তাদের বাড়ী যারা দেখাশুনো করত তারা। পাহাড়ের অংশ কেটে ক্ষেত করা হত। পাহাড়ের ওপর যে রাস্তাঘাট তৈরি করা হয়ে ছিল তা ছিল উন্নত মানের। আশ্চর্য হতে হয় দেখে যে পাথরগুলোকে দেওয়ালের গায় এমন করে বসানো হত যে ভূমিকম্প হলেও কোন বাড়ী ভেঙ্গে পড়তো না! এ যুগের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের মানাতো ইংকারা। এমনকি নদীর ওপর দিয়ে  সেতুবানাতেও জানত তারা, মোটা দড়ির সাহায্য নিয়ে।

  এরপর হল স্পেনের লোকেদের আগমন। কুস্‌কো শহর অধিকার করে নিল তারা। ইংকারা বুঝতে পারছিল তাদের এমন সাধের শহর চলে যাবে শত্রুদের হাতে। তাই তারা এ শহরকে বিচ্ছিন্ন করে দিল অন্যান্য শহর থেকে। এখানকার অধিবাসীরা যে কোথায় চলে গেল কেউ জানে না! বছরের পর বছর ধরে পরিত্যক্ত শহরের ওপর নতুন নতুন গাছপালার আগমন শহরটাকে লুপ্ত করে দিল সভ্যতার থেকে!

  অনেক বছর পরে ১৯১১ সালে হিরাম বিংহাম নামে এক আমেরিকান প্রত্নতাত্ত্বিক এই শহরকে আবিষ্কার করলেন একটি ছোট ছেলের সাহায্য নিয়ে। তারপর শুরু হয় খননকার্য। অনেক চেষ্টায় ফিরিয়ে আনা হয় ভগ্ন শহরটিকে।

  আমাদের গাড়ী এসে পৌঁছোল একটা ট্রেন স্টেশনে। সেখান থেকে ট্রেন নিয়ে রওনা হলাম মাচু পিচুর পথে। ট্রেন চললো উরুবাম্বা নদীর ধার দিয়ে। অনেক পাহাড়, উপত্যকা এবং গ্রাম পেরিয়ে কুস্‌কোর চেয়ে দু হাজার ফুট নীচুতে বর্তমানের মাচু পিচুতে এসে পৌঁছলাম।

  অবাক হবার মত শহর! উঁচু খাড়া পাহাড়ের গায়ে এমন শহর যে কেমন করে তৈরি করেছিল ইংকারা, কে জানে! এখনও ঠিক আগের মতই রয়েছে সূর্য মন্দির, যেখানে দিনের বিশেষ সময়ে এক উঁচু পাথরের চূড়ার ছায়া দেখে বৈজ্ঞানিকরা বুঝতে পারত সূর্য এখন পৃথিবীর কোন গোলার্ধে আছে। আমাদের ছেলেমানুষ গাইডের খুব উৎসাহ তাদের শহরটাকে ভাল করে দেখাবার জন্যে। আমি ভাঙ্গা চোরা পাথরের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে চাচ্ছি না দেখে সে নিয়ে গেল নীচু দিয়ে একটি অংশে, সেখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে শহরটি। দেখলাম বসে আছেন কয়েকজন আমেরিকান বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। বুঝলাম এরা আমারই মত ভয় পেয়েছেন ওপরে যেতে! মুগ্ধ হয়ে দেখলাম এ শহর। ইংকাদের বুদ্ধি আর সাহসের সত্যিই তুলনা নেই! ছশো- সাতশো বছর আগে তারা যে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এত উন্নত ছিল তা দেখে বিস্ময় জাগে আমাদের মতো এ যুগের লোকের। তাও তো এ শহর ধংসস্তুপ, কত কিছু হারিয়ে গেছে চিরদিনের জন্যে! ইউরোপিয়ানরা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে ইংকারা তাদের চেয়েও অনেক উন্নত ছিল এ ব্যাপারে।

  এবার বলি আর একটি শহরের কথা। তার নাম ছিল 'এল ডোরাডো'। শোনা যায় এ শহরে সোনা দানা লুকিয়ে রেখেছিল ইংকারা। এ শহর সম্বন্ধে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। আন্তর্জাতিক পর্যটকরা কয়েকশো বছর ধরে চেষ্টা করে চলেছেন এল ডোরাডো-কে খুঁজে বার করতে। কিন্তু সফল হন নি তারা। ২০০২ সালে একদল পর্যটকের ধারণা হয় শহরটি আমাজন নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ইংকাদের রাজত্ব অনেকদূর বিস্তৃত ছিল। বর্তমানের কলম্বিয়া যেখানে সোনা ছিল বিখ্যাত, ছিল ইনকাদের দখলে। এ শহর সত্যি থাকলেও কোথায় যে ছিল, তা এখনও অজানা। কে জানে হয়তো বা শুধুই কল্পনা!

  .... মাচুপিচু শব্দের ইংরাজি অনুবাদ হল ‘The Great Peak’। এ শহর তৈরী হয়েছিল পঞ্চদশ শতাব্দীতে সম্রাট পাচাকুতির রাজত্বকালে। পাহাড়ের ওপর এক দুর্গম অঞ্চলে। ছোট্ট শহর, বাড়ীগুলো তৈরি হয়েছিল পাথরের টুকরো দিয়ে। পাথরের টুকরো বয়ে আনত ইলামারা ...

  লিখেছেন... চৈতালি পুরকায়স্থ

(ডালাস, টেক্সাস)

                      ইংকাদের দেশ  

     পেরু

বর্তমানের মাচু পিচু শহর 

পেরু  ইঞ্জিনিয়ারিং 

ছবিঃ লেখিকা 

ছবিঃ সংগ্রহিত 

পেরু ইঞ্জিনিয়ারিং 

ছবিঃ সংগ্রহিত 

ছবিঃ লেখিকা 

ইলারার সঙ্গে পেরুর মহিলারা

 

                কলম্বিয়া

 .... বোগোটা শহরের পুরোনো নাম ‘স্যান্টা ফে ‘। এই শহরের পওন করেছিল স্প্যানিসরা ১৫৩৮ সালে, মন্সারেট আর গুয়াডালুপ পাহাড়ের পাদদেশে। এখানে ছিল তখন মুইস্কাস উপজাতিদের বাস। তাদের ভাষা ছিল 'চিবচা' ...

  লিখেছেন... চৈতালি পুরকায়স্থ

(ডালাস, টেক্সাস)

ছবিঃ লেখিকা 

মুইস্কাস  চীফের  সাজ পোষাক

ছবিঃ লেখিকা 

প্রেসিডেন্ট নাকি কলম্বিয়াতে বহু বছর দেখেনি কেউ।প্রেসিডেন্ট উরিবে নাকি এদেশে এনেছেন যুগান্তকারী পরিবর্তন, কলম্বিয়া দিনে দিনে এগিয়ে চলেছে উন্নতির  পথে কলম্বিয়ার কুখ্যাত ড্রাগ কার্টেলের প্রভাব অনেক কমেছে, মানুষ নির্ভয়ে হাঁটা চলা করতে পারে রাস্তা দিয়ে। পুলিশকে আর পাহারা দিতে হয় না প্রতি রাস্তায়। কলম্বিয়াতে এসে যে আমার এত ভাল লাগবে আগে ভাবতে পারি নি। সবচেয়ে ভালো লাগলো যখন দেখলাম এরা তিন হাজার বছরের পুরোনো আমেরিকান ইন্ডিয়ানদেরসভ্যতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে শ্রদ্ধার সঙ্গে।এদেশের মানুষদের মধ্যে বহু মিশ্রণ দেখা যায় অর্থাৎ স্প্যানিস বা ইউরোপীয়ানদের সঙ্গে স্থানীয় লোকেদের।লোকেদের চেহারা দেখলেই তা বোঝা যায় কিন্তু সবাই মনে করে কলম্বিয়া তাদের নিজেদের দেশ। রাতে  বোগোটার লোকেদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে  একথা বুঝতে পারলাম।

  পরদিন ট্রাভেল এজেন্সি থেকে একজন ইংরিজি  জানা বয়স্ক গাইড এসে আমাকে নিয়ে গেলেন এখানকার গোল্ড মিউজিয়াম দেখাতে। স্প্যানিসদের এখানে এসে  উপনিবেশ স্থাপন করার আগে আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের  তৈরী সোনার নানারকম জিনিষ রয়েছে এখানে। কলম্বিয়ার  সোনা এবং পান্না খুব বিখ্যাত। বোগোটার আদিম অধিবাসী  মুইসকাসরা শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিল। জ্ঞানে এবং বিদ্যায়  তারা খুবই উন্নত ছিল। তাই তাদের অস্ত্রসস্ত্র বা সৈন্য  সামন্তের প্রয়োজন হয় নি। তাদের সমাজে পুলিশ বলে  কিছু ছিল না। এদের প্রধান বা চীফরা খুব জ্ঞানী লোক হত  । চীফদের কানে, নাকে ও বুকের ওপর সোনার গহনা  পরার প্রথা  ছিল। ভগবানের কাছে অর্ঘ্য হিসেবে এরা দিত  সোনা বা পান্নার তৈরী ছোট ছোট মূর্তি। প্রায় সমস্ত অর্ঘ্য  দান করা হত লেকের বা পুকুরের জলে। কারণ লেককে  এরা মনে করতো পৃথিবীর জরায়ু, যেখানে সন্তানের জন্ম  হয়। চীফদের অভিষেক হত লেকের জলের মধ্যস্থলে  গিয়ে। মানুষের আত্মিক উন্নতিই ছিল এদের প্রধান লক্ষ্য।

  কলম্বিয়া স্পেনের রাজার অধীনে থাকাকালীন বহু  আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের মৃত্যু ঘটে। আমার গাইডের  মতে সব মিলিয়ে ৫ মিলিয়ান লোককে মেরে ফেলা হয়  ঐ সময়। স্পেনের লোকেদের ছিল উন্নত ধরনের অস্ত্রসস্ত্র   , এদের তা একেবারেই ছিল না। আমার গাইড একজন  জার্মান ভদ্রলোক, অনেকদিন ধরে কলম্বিয়াতে বসবাস।  বললেন উনি আর খ্রীস্টান নন, ওঁর গুরু হলেন একজন  আমেরিকান ইন্ডিয়ান সাধু, যিনি উওর কলম্বিয়ার এক  পাহাড়ী অঞ্চলে থাকেন। গুরুর ছবি দেখলাম এই মিউজিয়ামে। তাঁবুর সামনে বসে থাকা গুরুর ছবি দেখে  মনে হল খুব সরল এঁর জীবন। প্রত্যেক বছর গুরুকে  দর্শন করতে এই ভদ্রলোক যান উওরের পাহাড়ী অঞ্চলে।  কয়েক দিন গুরুর সঙ্গে কাটান। সব শুনে আমি অবাকই  হলাম। একজন ইউরোপীয়ানের কাছে এমন কথা শুনবো  এদেশে এসে, ভাবিনি কোনদিন। মনে হল,পৃথিবীতে   কত কিছু জানার আছে , আর আমি কত কম জানি!

  ক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়ার কথা আমার জানা ছিল  না বিশেষ, হঠাৎ যাবার সুযোগ এসে গেল ২০০৬ সালের  অগাস্ট মাসে। গিয়ে যা অভিজ্ঞতা হল তা আশা করিনি  কোনদিন। 

  আমাদের যাত্রা শুরু হল কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটা  অভিমুখে ডালাস থেকে মায়ামি শহর হয়ে। মায়ামি এয়ারপোর্টে আন্দ্রেসের সঙ্গে দেখা হল, আমাদের  তিনজনের একই ফ্লাইটে রওনা হবার কথা ছিল। টার্মিনাল ডি থেকে এ-তে যেতে হবে,  হাঁটছি তো হাঁটছিই, ঠিকমত সাইন দেওয়া নেই, ভাগ্যিস আন্দ্রেসের রাস্তা চেনা ছিল তা না হলে কতক্ষণে পৌঁছোতাম কে জানে!

  কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটাতে এসে পৌঁছোলাম  অনেক রাতে। যে হোটেলে এলাম তার নাম হোটেল লা ফন্তানা এসটেলার, শহরের উওরে বর্দ্ধিষ্ণু এলাকাতে।হোটেল তৈরী হয়েছিল স্প্যানিশ ডিজাইনে। ভেতরে পথ চলার রাস্তা পাথরেরও ইঁটের। চারিদিকে ফুল, বাইরে এবং ভেতরে। শুনলাম এখানে ঋতু পরিবর্ত্তণ বলে কিছু নেই। শুধু বর্ষাকালেরই পরিচয় পাওয়া যায়, বলা যায় প্রায় চির বসন্তের দেশ।

  পরদিন সকালে হোটেলের ব্রেকফাষ্ট লাউঞ্জে যাবার পথে দেখি এক বিশাল কোর্ট ইয়ার্ড, তার  মধ্যে  কি সুন্দর একটা চার্চ। চারিদিকে তাকিয়ে মনে হল যেন ইউরোপে এসেছি।আন্দ্রেস জানালো এখানকার লোকেরা খুব ধার্ম্মিক, ৯৫%  রোমান ক্যাথলিক। সুবীর আর আন্দ্রেস এখানে এসেছে কাজ করতে,  আর আমার কোন কাজ নেই, অঢেল সময় বেড়াবার। ঠিক হল আমি ইংরিজি জানা একজন গাইড নিয়ে শহর দেখতে বেরোব। পাওয়া গেল একজনকে, দুপুর দুটোর সময়।

  বোগোটা শহরের পুরোনো নাম ‘স্যান্টা ফে‘। এই শহরের পওন করেছিল স্প্যানিসরা ১৫৩৮ সালে, মন্সারেট আর গুয়াডালুপ পাহাড়ের পাদদেশে। এখানে ছিল তখন মুইস্কাস উপজাতিদের বাস। তাদের ভাষা ছিল 'চিবচা'।তাদের উন্নতমানের সোনার কাজ, পটারি এবং বস্ত্রশিল্প এখনও বিখ্যাত হয়ে রয়েছে কলম্বিয়াতে।      

  কলম্বিয়া বহুদিন স্পেনের রাজার অধীনে ছিল, পুরোনো  নাম ছিল ‘নিউ গ্র্যানাডা‘। স্বাধীনতা প্রাপ্তি ঘটে ১৮১৯ সালে, বহু যুদ্ধের পর। প্রথম প্রেসিডেন্টের নাম হল 'সাইমন বলিভার'। সাইমন বলিভার এক বিখ্যাত নাম  দক্ষিণ আমেরিকাতে। এই বীর দেশপ্রেমিক স্পেনের সঙ্গে  যুদ্ধ করে নিউ গ্র্যানাডাকে পরিণত করেন স্বাধীন দেশ  কলম্বিয়াতে। তারপর ধীরে ধীরে স্যান্টা ফে নামের  পরিবর্তন হয়, সৃষ্টি  হয় বোগোটা নামের।       

  আমার গাইড গাড়ী চালিয়ে আমাকে নিয়ে গেল কেবল কার স্টেশনে, মন্সেরাটে পাহাড়ের নীচে। পথে যেতে যেতে পরিচয় পেলাম পাহাড় ও উপত্যকায় ছড়ানো এই শহরের।                

উদ্দেশ্য কেবল কার নিয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠে শহর এবং প্রাকৃতিক শোভা দেখা। পাহাড়ের চূড়ায় একটা পুরোনো স্প্যানিস গির্জা, পাথর দিয়ে বাঁধানো চত্বর ও সিঁড়ি। চূড়া থেকে দেখা যায় এক বিশাল উপত্যকায় ছড়িয়ে রয়েছে বোগোটা শহর গত পাঁচশো বছরের  ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধুনিকতার নিদর্শন নিয়ে। অন্যদিকে শুধুই পর্বতমালা, জনবসতি আপাততঃ নেই।দেখতে পেলাম একটু দূরে গুয়াদালুপে পাহাড়ের চূড়ায় এক বিশাল মূর্তি  যীশুখৃষ্টের, ধব্‌ধবে সাদা রং এর।

  পাহাড়  থেকে  নেমে অনেক উঁচু  নীচু  রাস্তা পেরিয়ে  গেলাম শহরের মধ্যস্থলে। আমার গাইড মহিলা হলে কি  হবে গাড়ী চালানোতে দক্ষতা এতটুকু কম নয়! আমাকে  প্রথমে দেখাতে নিয়ে এল ওখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয়।প্রাণবন্ত সব ছাত্রছাত্রীর দল, তাদের হৈ হল্লা দেখে নিজের  কলেজ জীবনের কথা মনে পড়ল অনেকদিন পরে।সেখান থেকে অল্প হেঁটে গেলাম বলিভার স্কোয়ারে, যেখানে রয়েছে এখানকার পার্লামেন্ট ভবন, বিখ্যাত গির্জা  এবং সুপ্রিম কোর্ট ইত্যাদি। পার্লামেন্ট ভবনের সামনে রয়েছে সাইমন বলভারের মূর্তি। মধ্যিখানে পাথরে বাঁধানো বিরাট চত্বর যা অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী।তবে এখন পায়রাদের  রাজত্ব হাজার হাজার পায়রা বসে আছে চত্বরে, বোধহয় খাবার আশায়। এখনকার প্রেসিডেন্টের নাম আল্ভারো উড়িবে, তাঁর অফিস পার্লামেন্ট ভবনের পেছনে প্রেসিডেন্টের  প্রশংসায়  সবাই  পঞ্চমুখ, এমন ভালো

বলিভার  স্কোয়ার 

ছবিঃ লেখিকা 

মন্সেরাটে পাহাড়ের ওপর থেকে 

ছবিঃ লেখিকা 

অপরূপা

সুইজারল্যান্ড

 নের সব গ্লানি, দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপ, সাংসারিক জীবনের ক্লান্তি আর একঘেরেমি দূর করে আবার নতুন উদ্যমে জীবনী শক্তি খুঁজে পেতে হলে এই গ্রিন্দেলওয়াল্ড ভ্রমণ অবশ্যই দরকার। তাই আর দেরি না করে আপনার পরবর্তী বিদেশের মাটিতে ভ্রমণে গন্তব্যের ঠিকানা হতে পারে সুইজারল্যান্ডের এই স্বপ্ন-সুন্দর গ্রিন্দেলওয়াল্ড অঞ্ছল।

  লিখেছেন...   শর্মিষ্ঠা ভট্টাচার্য্য

(নেদারল্যান্ড)

ছবিঃ লেখিকা 

ছবিঃ লেখিকা 

যেতে আপনাকে একবারে পর্বত শিখর থেকে উপত্যকায় চলে আসতে হবে, তারপর আবার উত্তরনের পালা। এইভাবে নিউফেন পাস হয়ে আমরা পৌঁছলাম ফুরকা পাসে। প্রতিটি ‘পাসেরই’ একটা নিজেস্বতা আছে, আছে একবারে স্বকীয় সৌন্দর্যতা। কিছু কিছু পাহাড়ি পথ বেশ সঙ্কীর্ণ, বিপদের হাতছানি আছে প্রতি মুহূর্তে - তাই অসতর্কতা চলবে না। আমাদের অন্তিম গন্তব্য ছিল গত্থারদ পাস। এটিতে যাবার পথটিও বেশ বিপদসঙ্কুল। রাস্তায় ছিল অসংখ্য পাহাড়ি ঝর্ণার ধারা। এই অপূর্ব যাত্রার অভিজ্ঞতা সারাজীবন স্মৃতির মণিকোঠায় সযত্নে সাজানো থাকবে।

  শেষদিনে আমরা গ্রিন্দেলওয়াল্ড এর আশপাশের আকর্ষণীয় জায়গাগুলো ঘুরে দেখলাম। এখানে আছে অনেক পুরনো এইগার পর্বতের গুহা গহ্বর, যার উৎস স্থলে আছে ক্যানন হিমবাহ। এই হিমবাহর বরফ গলা জলে সৃষ্টি হয়েছে খরস্রোতা নদী লুটসাইন। বৈজ্ঞানিকদের মতে আমাদের পৃথিবীর তাপমাত্রার বৃদ্ধি এই হিমবাহের স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতি অনেক পরিবর্তন করে দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে শীতের সময় বরফ গলা জল স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কম আর গরমের সময় বেশি হবার কথা। কিন্তু এখন শীতের সময় তাপমাত্রা বেশি হওয়ায়ে অনেক বেশি পরিমানে হিমবাহ গলে যাচ্ছে। এইরকম চলতে থাকলে আগামী শতাব্দীর মধ্যে এই হিমবাহের অস্তিত্ব মুছে যাবে। ভাবতে খুবই কষ্ট বোধ হয় যে এই সুন্দর প্রাচীন হিমবাহ তিলেতিলে ক্ষয় হয়ে চলেছে পৃথিবীর ক্রমশ বর্ধমান তাপমাত্রা জন্য। পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো এইসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার সুখ থেকে বঞ্চিত হবে।

      দুপুরের খাওয়া সেরে আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল “ফার্স্ট ক্লিফ ওয়াক”। এই অভিযান করতে হলে প্রথমে আকাশ পথে গণ্ডলা চড়ে যেতে হবে বেশ কিছুটা পথ। রাস্তাতে দেখতে পাওয়া যাবে চোখ জুড়ানো আল্পস এর ঘন সবুজ উপত্যকা, দিগন্ত বিস্তৃত আল্পস পর্বতমালার সারি, অগুন্তি পাহাড়ি ঝর্ণা, টুকরো টুকরো সুইস ভিলেজ। গণ্ডলা আপনাকে পৌঁছিয়ে দেবে ফার্স্ট স্টেশনে। এখান থেকে পায়ে হেঁটে যাওয়া যেতে পারে ৩ কিলোমিটার দূরত্বের ‘বাখাল্প সি’তে, এটি ছোট একটি প্রাকৃতিক ঝিল। এখানে পৌঁছলে এইগার পর্বতশিখরকে মনে হবে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।

     বাখাল্প সি দেখে আবার ফার্স্ট স্টেশন ফিরে আসলে ওখান থেকেই শুরু হবে ক্লিফ ওয়াক এর রাস্তা । প্রায় ৮০০ মিটার লম্বা এই ভাসমান সেতু তৈরির পিছনে প্রসিদ্ধ সুইস ঘড়ির সংস্থা ‘টিসট’ এবং সুইস সরকারের আর্থিক অবদান আছে। এই ক্লিফ ওয়াক করতে অবশ্যই দৃঢ় মনের প্রয়োজন, তা না হলে এটি করা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে। তবে মনে জোর নিয়ে যদি অন্তিম বিন্দু পর্যন্ত পৌঁছতে পারা যায়, তবে ঐশ্বরিক সৌন্দর্য নিজের চোখে দেখার সাক্ষী হতে পারবেন। 

      এই অসাধারন ভ্রমণ শেষে এবার ঘরে ফেরার পালা। গত পাঁচ দিনের অভিজ্ঞতা মনের খাতায় চিরকালের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকলো। প্রকৃতি এখানে তার অগাধ উজার করা সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে বসে আছে। মনের সব গ্লানি, দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপ, সাংসারিক জীবনের ক্লান্তি আর একঘেরেমি দূর করে আবার নতুন উদ্যমে জীবনী শক্তি খুঁজে পেতে হলে এই গ্রিন্দেলওয়াল্ড ভ্রমণ অবশ্যই দরকার। তাই আর দেরি না করে আপনার পরবর্তী বিদেশের মাটিতে ভ্রমণে গন্তব্যের ঠিকানা হতে পারে সুইজারল্যান্ডের এই স্বপ্ন-সুন্দর গ্রিন্দেলওয়াল্ড অঞ্ছল। আর যাদের সেই উপায় নেই তারা অন্তত এই ভ্রমণ কাহিনী পড়তে পড়তে একটু হলেও কল্পনায় আমার সাথে বেড়িয়ে এলেন এই আশা রাখি।

    দীর্ঘদিন হোল আমি হল্যান্ডে থাকি, চাকরির সুবাদে। এখান থেকে পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশ ঘোরাই বেশ সুবিধের। এখানের বেশিরভাগ মানুষেরই ছুটির পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায় ইংরাজি নতুন বছর শুরু হতে না হতেই। সুইজারল্যান্ড বোধকরি সব মানুষেরই অন্যতম পছন্দের ভ্রমণের গন্তব্যস্থল। রূপসী আল্পস পর্বতমালাকে কাছে থেকে উপভোগ করতে চাইলে গ্রিন্দেলওয়াল্ড নামের এই সুইস পাহাড়ি অঞ্চলের জুড়ি মেলা ভার।

    গ্রিন্দেলওয়াল্ডের স্কিন্দি নামের একটি ছোট্ট গ্রামে আমরা এবার ঘর ভাড়া নিলাম। মধুচন্দ্রিমার জন্য সুইজারল্যান্ড যে সদ্য বিবাহিতদের প্রথম পছন্দ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উঁচুনিচু পাহাড়, গভীর উপত্যকা, ছোট ছোট রোমান্টিক গ্রাম, চারিদিকে সবুজের সমারহ, গরুর বাছুরের গলায় বাঁধা ঘণ্টার টুংটাং মিষ্টি আওয়াজ, মাঝে মধ্যে পাহাড়ি ঝর্ণার কুলুকুলু শব্দ- সবমিলিয়ে এখানে প্রকৃতিতেই ভালবাসা ছড়িয়ে আছে আনাচে কানাচে। পরন্তবেলার সূর্যের আলোতে এইগার (উচ্চতা ৩,৯৭০ মিটার) শিখরের চোখ জোড়ানো অপূর্ব রূপের মাধুরী মনে মেখে প্রথম দিনের যবনিকা নামলো।

    পরদিন সকালে গ্রিন্দেলওয়াল্ড থেকে ট্রেন নিয়ে চললাম জুংফ্রউ-জহ দেখতে। সুইস সরকার পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে খুবই সতর্ক। অনর্থক পরিবেশ দূষণ যাতে না হয় তাই বেশিরভাগ প্রসিদ্ধ পাহাড়ের চূড়াগুলোতে পৌঁছাতে পারবেন ট্রেন ধরে, অথবা পায়ে হেঁটে ট্র্যেকিং করে।  ট্রেনে করে প্রথমে ক্লেইনে স্কাইদিগে পৌঁছিয়ে সেখান থেকে কগ ট্রেন নিতে হবে যা আপনাকে পৌঁছিয়ে দেবে জুংফ্রউ এর পর্বত শিখরে।

   এই যাত্রায় বেশিরভাগ পথই পাহাড়ের সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে। গ্রিন্দেলওয়াল্ড থেকে জুংফ্রউ যাবার পুরো ট্রেন যাত্রাটি মোটামুটি আড়াই ঘণ্টার মতো।

    জুংফ্রউ-জহ তে পৌঁছয়েই হাতের কাছে পেয়ে যাবেন মুঠো মুঠো বরফরাশি আর মনোরম বরফের স্থাপত্য শিল্প। এই পর্বত শিখর ইউরোপের সব চেয়ে উঁচু স্থান যেখানে ট্রেন ধরে পৌঁছানো যায়। আল্পসের এই পর্বতচূড়ার উচ্চতা ৪,১৫৮ মিটার। এখানে বানানো রয়েছে পায়ে চলার উপযোগী বরফে ঢাকা রাস্তা, আছে নানারকম বরফের উপরে খেলার আয়োজন - যেমন স্কি, স্নো-বোর্ড, কেবেল-কার ভ্রমন, প্যারা গ্লাইডিঙ, আর পর্বতারোহীদের জন্য রোমাঞ্চকর আকর্ষণীয় সব অভিযানের আয়োজন। জুংফ্রউ স্টেশন থেকে লিফট নিয়ে আরও কিছুটা উপরে উঠলে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো যাবে।  রোদ উজ্জ্বল ঝকঝকে দিনে এখান থেকে আল্পস পর্বতমালার উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট ব্লাঙ্ক (৪,৮১০ মিটার) দেখা যেতে পারে, যেটি ফরাসী আল্পেসের অংশ। সাদা পাহাড়ের এই অলৌকিক রূপে মন্ত্রমুগ্ধ না হয়ে পারা যাবে না, সৃষ্টিকর্তাতে মনে মনে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতে হবে তাঁর এই দৃষ্টিনন্দন সৃষ্টির জন্য। জুংফ্রউ স্টেশনে আপনার রসনা তৃপ্ত করতে পাবেন বলিউডি রেস্টুরেন্ট এবং অনেক দেশের খাবার। এখানে পাবেন বিখ্যাত সুইস চকলেট “লিন্দ” এর দোকান যেখানে রয়েছে বিভিন্ন স্বাদের চকলেটের বিপুল সম্ভার। এক কথায় পুরো দিন কেটে যাবে প্রকৃতির বুকে, তার শোভাকে আলিঙ্গন করে।

       দ্বিতীয় দিনে ইন্তেরলাকেন শহর ঘুরে দেখতে সিদ্ধান্ত নিলাম। এটা সুইজারল্যান্ডর অন্যতম প্রসিদ্ধ শহর বিশেষত এখানকার মনোরম প্রকাণ্ড দুটি ঝিলের শোভার জন্য। পূর্বদিক জুড়ে রয়েছে ঝিল ব্রিঞ্জ আর পশ্চিমে ঝিল থুন – একসাথে এসে মিলিত হয়েছে এই শহরের বুকে। এখানে নৌকা ভ্রমণ ছাড়াও নানারকম জলক্রিয়া খুবই জনপ্রিয়। কিছু উৎসাহী মানুষজন ঝিলের ঠাণ্ডা জলেও ঘণ্টার পর ঘন্টা সাঁতার কাটতে অথবা আধ খোলা গায়ে সূর্য-স্নান করতেও দ্বিধা বোধ করে না। এছাড়া ইন্তারলাকেন ট্রেন স্টেশন এর কাছ থেকে কেবেল কার চড়ে পৌঁছিয়ে যাওয়া যেতে পারে হারডার কুলাম নামের জায়গায় যেটা ইন্তেরলাকেন শহরের উচ্চতম স্থান। এখান থেকে ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক শোভা দেখতে পাবেন ব্রিঞ্জ আর থুন

ঝিলদ্বয়ের। ফেরার পথে লাউটারবানেন ঘুরে আসা যেতে পারে। এখানে আছে অনেকগুলো সুন্দর পাহাড়ি ঝর্ণা যেইগুলোর একবারে উৎস স্থল পর্যন্ত পৌঁছিয়ে যাওয়া যেতে পারে পাহাড়ি রাস্তার বাঁক ধরে।

      পরেরদিন আমাদের গন্তব্য হোল সাইনিগে প্লাতে, যেটা জুংফ্র অঞ্ছলের মধ্যেই অবস্থিত। এখানে যেতে পারেন শুধুমাত্র “কগ” ট্রেনে অথবা পায়ে হেঁটে ট্র্যাকিং করে। পুরো যাত্রায় দুই চোখ ভরে দেখে নিন অগুন্তি প্রজাতির পাহাড়ি বনানী, অপূর্ব সুন্দর বরফে ঢাকা পর্বতমালা, আর জঙ্গলি ঝর্ণার অবিশ্রান্ত ধারা। মুঠো মুঠো প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে এখানকার আকাশে বাতাসে। এখানে পৌঁছিয়ে পাহাড়ের পথ ধরে আধঘণ্টার আরোহণে পৌঁছিয়ে যাওয়া যাবে আল্পস এর আরও একটি পর্বতশিখর চূড়ে, পথে শোনা যাবে অবিরাম গো-বাছুরের গলায় বাঁধা ঘণ্টার রুনুঝুনু শব্দ। লক্ষণীয় হোল এখানে সব গোবাদির গলাতেই নানামাপের ঘণ্টা বাঁধা থাকে তাদের নিজস্ব পরিচিতির জন্য। এই ঘণ্টাই আবার বিক্রি হয় সুইস ‘সুভিনিওর’ হিসেবে। গ্রীষ্মের রোদ্দুজ্জল দিনে এই স্থানটি  থেকে আল্পস এর অনেকগুলো চূড়া যেমন মঞ্ছ, জুংফ্রউ, এইগার, ইত্যাদির দৃশ্য অতীব মনোরম। এই স্থানটিতে রাখা আছে এই দেশের কাঠের তৈরি বাদ্যযন্ত্র আল্প-হর্ন, যেটি পাহাড়ের বাসিন্দারা আগেকারদিনে পস্পরকে বার্তা পাঠানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতো। আধুনিক যুগে এটি অবশ্য কেবলমাত্র মনোরঞ্জনের জন্য ব্যবহৃত হয়। চারিদিকে প্রকৃতির সৌন্দর্যের রস আস্বাদন করার ফাঁকে বিরতির জন্য রসনা তৃপ্ত করতে পাবেন লোভনীয় নানারকম সুইস বেকারির তৈরি কেক, বা অন্য প্রদেশের মুখরোচক খাবার।

       চতুর্থ দিনে আমরা আল্পসের বিখ্যাত পাহাড়ের বুকের সুদৃশ্য “মাউণ্টেন পাস” দেখতে বেড়িয়ে পরলাম। এটি মোটামুটি একটি বৃত্তাকার যাত্রাপথ যেটি চারটি পর্বত বক্ষ জুড়ে বিস্তৃত। গ্রিন্দেলওয়াল্ড থেকে বেরিয়ে প্রথমে এলাম গ্রিমসেল পাস। এখানে পৌঁছাতেই প্রথমে চোখে পড়লো স্নিগ্ধ একটি প্রাকৃতিক ঝিল যেটি হিমবাহের জলে তৈরি। চারিদিকের স্নিগ্ধতা মনে প্রশান্তির স্বাদ এনে দেবে এক নিমেষে। এখান থেকে বেরিয়ে চললাম আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য স্থল নিউফেন পাস। একটি ‘পাস’ থেকে পরেরটিকে

আলোকচিত্র - শর্মিষ্ঠা ভট্টাচার্য্য 

ছবির উপর ক্লিক করুন

কোলকাতায় জন্ম আর বড়ো হওয়া। যাদবপুর থেকে বিদ্যুৎ বিভাগে এঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরী জীবন শুরু। তারপর বিয়ে আর কিছুদিন বাঙ্গালরে বাস। ওখান থেকেই নতুন চাকরী নিয়ে  সপরিবারে বিদেশের মাটিতে পাড়ি। প্রায় দু’দশক ছুঁতে গেল হল্যান্ডে বাস। পরদেশে এসে নতুন ভাষা, সংস্কৃতি, মানুষজন, উচ্চশিক্ষা, চাকরী, সংসার সবকিছু মানিয়ে নিতে গিয়ে অনেকটা সময় চলে গেল। তবে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ হয়েছে। সেইসঙ্গে ঘোরা হয়েছে অনেক দেশ। তাই ভ্রমণের গল্প লেখার ভাবনাটা হঠাৎই মাথায় এলো। আজকাল ইন্টারনেটের যুগ, নিজের ভাবনাগুলো লেখার আর অন্য মানুষের কাছে সহজে পৌঁছিয়ে দেবার একটা খুব ভালো জায়গা আছে। তাই চাকরীর ফাঁকে ফাঁকে অনেকদিনের এই সুপ্ত বাসনাটাকে একটু জাগিয়ে তোলার প্রচেষ্টা যাতে মন আর মস্তিষ্ক দু’ই নবীন আর প্রফুল্ল থাকে।

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?