ভ্রমণ সঙ্গী - ৬

ছবি ঃ সনোজ চক্রবর্তী

অ্যামট্র্যাক

ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত 

কলকাতা, পশ্চিমবাংলা)

    ৩১শে মে যখন কলেজ স্টেশনের বাড়ি থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস তথা হলিউড দেখার জন্য রওনা দিচ্ছি তখন ঘড়িতে  দুপুর পৌনে একটা। হন্ডা সিআরভি গাড়িটি একটি ছিমছাম বাহুল্য বর্জিত এস ইউ ভি। রাজীবের বিশ্বস্ত হাতে মাইলের পর মাইল চলেছে এই গাড়ি। দেবলীনাও লম্বা ড্রাইভ করে, তবে রাজীবের আত্মবিশ্বাস বেশি। আমরা একশো দশ  মাইল দূরে Austin - Bergstrom International Airport এ পৌঁছে গেলাম ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে। পথে পড়লো ক্যাল্ডোয়েল, ব্যাস্ট্রপ ইত্যাদি ছোট শহর। যেতে হল স্টেট হাইওয়ে দিয়ে- ইন্টার স্টেট নয়। এয়ারপোর্টের লাগোয়া লংটার্ম পার্কিং লটে গাড়ি রেখে লট থেকে এয়ারপোর্টের শাটল বাস চেপে এয়ারপোর্টে পৌঁছে আমরা ট্যাক্সি নিয়ে অস্টিন রেলস্টেশনে পৌঁছে গেলাম বেলা চারটের একটু পরেই। বলা বাহুল্য, কলেজ স্টেশন আর অস্টিন একই রাজ্যের দুটি শহর। রাজ্যটির নাম টেক্সাস। অস্টিন টেক্সাসের রাজধানী। আমরা অ্যামট্র্যাকের ট্রেনে দুরাত্তির কাটিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছব। আমার দীর্ঘদিনের সখ অ্যামেরিকার রাতের গাড়ি চাপার। ট্রেন আমার প্রিয় বাহন। মেয়ে জামাই- দেবলীনা রাজীব আমার সখ পূরণ করল। আমার আর কিছু চাইবার নেই- মার্কিন মুলুকের অনেকটাই ঘুরেছি। ক্যালিফোর্নিয়া আর ফ্লোরিডা যাওয়া হয়নি কেবল। আলাস্কা আর হাওয়াই তো বটেই। তবে আমার চাইবার কিছু নেই, কপালে থাকলে হবে।

      আমি, গিন্নি, রাজীব আর নাতি ত্রিজ্ঞ- এই চারজন অস্টিন থেকে ট্রেনে উঠবো। দেবলীনার হঠাৎ কাজ পড়ে গেল। মাঝে মাঝে ওয়াশিংটন ডিসিতে যেতে হয়, অ্যামেরিকার রাজধানী। ৩১শে মে ও যখন ফিরবে তখন অস্টিন থেকে ট্রেনটা রওনা হয়ে যাবে। তবে পরের বড় স্টেশন স্যান অ্যান্টনিওতে আমাদের বগিটা থাকবে রাত দশটা থেকে পরের দিন ভোর পৌনে তিনটে পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে দেবলীনা স্যান অ্যান্টনিও পৌঁছলে ট্রেন ধরতে পারবে। 

    টিলার মত উচ্চতায় ২৫০ নর্থ ল্যামার ব্যুলেভার্ডে অস্টিন স্টেশন। একেবারে আমাদের আমোদপুর লাভপুর লাইনের গ্রামের স্টেশন। ফাঁকা। হবে না কেন? সারাদিনে একটি দুটি গাড়ি চলে। যে গাড়িতে চড়বো আমরা তা আসছে শিকাগো থেকে। নাম  টেক্সাস ঈগল। স্যান অ্যান্টনিওতে অন্য গাড়ির সঙ্গে জুড়ে যাবে আমাদের কামরা। সে গাড়ি আসবে নিউ অর্লিয়ান্স থেকে, যাবে লস অ্যাঞ্জেলেস। গাড়িটির নাম সানসেট লিমিটেড।

    ফাঁকা ষ্টেশন অবশ্য কিছুটা জমজমাট হলো সময় গড়ানোর সাথে সাথে। সবমিলিয়ে কত প্যাসেঞ্জার হবে? জনা তিরিশেক। ওয়েটিং হলেরই এক কোনে স্টেশন মাস্টার কাম বুকিং ক্লার্ক কাম ট্রেন অ্যানাউন্সার কাম আরও কত কিছু কে জানে। সাকুল্যে দুতিনজনের বেশী কর্মচারী দেখলাম না। ওয়েটিং হল আরামদায়ক। গোটা অ্যামেরিকাটাই বাতানুকূল, খোলা আকাশের নিচের অংশ এবং কার পার্ক ছাড়া, গাড়ি বাড়ি সব এসি। সেন্ট্রালি এসি। সুন্দর টেরাকোটার টালি লাগানো ছাদ ষ্টেশন বিল্ডিঙের। অবশ্যই একতলা। উলটো দিকে একটাই লাইন গাড়ি যাওয়া আসার। ষ্টেশনে ঢোকার আগে লাইনটা দুভাগ হয়েছে। প্রয়োজনে ক্রসিং করানো হতে পারে।

     লাইনের ওপারেই একটু ঢালু পরিখা। শুকনো। ওপারে লোকালয়। লোকের যাতায়াত আছে হাঁটা পথে। পাশেই বিশাল এক পরিত্যক্ত বাড়ি। তার দরজা জানালা নেই। দেয়ালে অদ্ভুত আর্ট। গ্র্যাফিটি। শহরের হাইরাইজ গুলো দেখা যাচ্ছে ডানদিকে। প্ল্যাটফর্ম বলে কিছু নেই। ছটা বাইশে যে ট্রেন ঢোকার কথা সে ট্রেন এলো প্রায় সন্ধে সাতটায়। ঝকঝকে স্টেনলেস স্টিল দোতলা ট্রেন। গায়ে নীল রঙের ছাপা অ্যামট্র্যাক। প্ল্যাটফর্মের ওপর টুল দিয়ে ট্রেনে উঠতে হয়। পাদানি অনেক নিচুতেই। আমাদের অবশ্য র্যা ম্প করে দেওয়া হল কারণ এক হইলচেয়ার ভদ্রলোক আমাদের সহযাত্রী। বলতে ভুলে যাব, অ্যামেরিকার প্রায় সর্বত্রই সিঁড়ির পাশাপাশি র্যানম্প আর লিফটের এমন ব্যবস্থা আছে যাতে প্রতিবন্ধীদের কোন অসুবিধেই না হয়। ট্রেনে উঠে চোখ জুড়িয়ে গেল। ঠিক প্লেনের কায়দাতেই অ্যাটেনড্যান্ট স্বাগত জানালেন। সুন্দর হাতল দেওয়া কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। একতলা দোতলা মিলিয়ে অনেকগুলো বাথরুম। একতলায় একটি স্নানের ঘরও আছে। শাওয়ার- ঠাণ্ডা গরম জল। দোতলায় আমরা তিনটি ছোট কামরা ভাড়া করেছিলাম। একেক কামরায় দুজন করে থাকা যায়। নাম রুমেট। 

      শিকাগো থেকে আসা টেক্সাস ঈগল সাড়ে ছটার বদলে রাত সাড়ে আটটার সময়ে অস্টিন ষ্টেশন ছাড়ল। ট্রেনে ঢোকার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই খাবার ঘরে যাবার ডাক পড়লো। লাগোয়া কম্পার্টমেন্টটাই খাবার রেস্তোরাঁ। দেবলীনার খাবারটা পাওয়া গেল না। ও অবশ্য ততক্ষণে ডালাস চলে এসেছে। আর একটা প্লেন ধরে স্যান অ্যান্টোনিও আসবে। আমরা বলে দিলাম, ট্রেনের ডিনার জুটবে না। কেননা ডাইনিং কার তখন বন্ধ হয়ে যাবে। দেবলীনা ডালাসেই এয়ারপোর্টে খেয়ে নেবে।

      ডাইনিং কারে আসতেই মেনু ধরিয়ে দিলেন ওয়েটার। রীতিমত মেনু কার্ড- স্টার্টার, ডিনারের যে কোন আইটেম আর ডেসার্ট ফ্রি, মানে টিকিটের মধ্যেই দাম ধরা আছে। মদ্যপান করতে গেলে পয়সা দিতে হবে কেবল।

     ট্রেন অস্টিন শহরের মধ্যে দিয়ে চলতে শুরু করল। রাস্তা, উড়ালপুল, দোকান, গাড়িবাড়ি ছাড়িয়ে, ক্রমশ গ্রামাঞ্চলে ঢুকে যাচ্ছে, বাইরে অন্ধকার নেমে আসছে। অন্ধকার হতে দেরি হয়, রাত আটটাতেও আলো থাকে। তবে গ্রামাঞ্চল হলেও সর্বত্রই চওড়া রাস্তা অ্যামেরিকার বৈশিষ্ট্য। প্রচুর গাছ আর জনহীন পথে কয়েকটি গাড়ি চলে। মাঝে মাঝে লোকালয়। দোতলা ট্রেন টেক্সাস ঈগল ছুটে চলে। দোতলাতেই কড়িডোর দিয়ে এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যাওয়া যায়।

      রাত সাড়ে দশটায় স্যান অ্যান্টোনিও শহরে ঢুকছে গাড়ি। দেবলীনা দাঁড়িয়েছে কামরার সামনে। ওঁর পরিচিতি নিশ্চিত করে কামরায় ঢোকার অনুমতি দেওয়া হল। ত্রিজ্ঞ মাকে পেয়ে খুশী হবার অবকাশ পায় নি। ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে সে। দেবলীনা কিছু খেয়ে এসেছিল। আমাদের উদ্বৃত্ত খাবার ডাইনিং কার থেকে প্লেট র্যা পার বন্দী করে নিয়ে এসেছিলাম। সেগুলোও খেল সে। কিছু গল্প গুজবের পর তিনটে ঘরে আমরা পাঁচজন শুয়ে পড়লাম। একটিতে আমি রাজীব। একটিতে ত্রিজ্ঞ দেবলীনা। অন্যটিতে অজন্তা। সারারাত ঘুমের বারটা। আধমাইল জুড়ে আমাদের বগির শান্টিং। জুড়ে দেওয়া হল নিউ অর্লিয়ান্স থেকে আসা সানসেট লিমিটেড গাড়ির সঙ্গে। বাইরে দেখছি স্যান অ্যান্টোনিও শহরের রেল ইয়ার্ড আর আলোর কারুকাজ। এ শহরে বেড়িয়ে গেছি আগে, বিখ্যাত অ্যালামো দুর্গ দেখেছি। এখন দূরে ওই আলো অন্ধকারে কোথাও আছে। হোটেল আর সুরম্য অট্টালিকার গায়ে ঝলমলে আলো। শহরের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে স্যান অ্যান্টনিও নদী। তার ওপর দিয়ে অজস্র ছোট ছোট পুল। দুধারে রিভার ওয়াক রেস্তোরাঁ। নৌকো করে ঘুরে গেছি সেই পথে কিছু দিন আগে। সে সব হোটেলগুলোর চুড়ো আর আলো দেখা যাচ্ছে ট্রেনের জানালা দিয়ে।

     আধোঘুমে ছেড়ে দিল ট্রেন। টেক্সাস বিশাল রাজ্য, যাত্রাপথের অধিকাংশটাই এই রাজ্যের ওপর দিয়ে প্রসারিত।                   ভোরবেলায় ডেল রিও ষ্টেশন। ছটা বাজেনি তখনও। একটু পাশ ফিরে আবার কম্বল মুড়ি দিলাম। ঘুম ভাঙল বেশ দেরীতে। পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে মৃদু ঘোষণা ব্রেকফাস্ট শুরু হয়ে গেছে। রেস্তোরাঁ কামরাটা পাশেই ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। রাত্তিরে শান্টিংয়ের সময় ট্রেনের মানচিত্রটাই বদলে গেছে। চেপেছিলাম টেক্সাস ঈগলে,

এখন সে গাড়ি সানসেট লিমিটেড। গাড়িটা চলছেও উলটো দিকে। বিশাখাপত্তনম বা হাওড়াতে থ্রু ট্রেনগুলোর যা হয় আর কি। রাতের অ্যাটেনড্যান্ট পালটে গেছেন।

    আরে ছোট ছোট- ব্রেকফাস্টের সময় পেরিয়ে যায়। পাঁচ ছটা বসা যাত্রীদের কোচ- ২X২ মাঝখানে প্যাসেজ। সেসব পেরিয়ে দেখা মিলল রেস্তোরাঁর। চলন্ত রেস্তোরাঁর মজা

আলাদা। রেস্তোরাঁর লাগোয়া অবজারভেশন কোচ। গদি আঁটা চেয়ার সোফা পাতা আছে। বিশাল বিশাল জানালা। ছাদের অনেকটা কাচ ঢাকা। ব্রেকফাস্ট সেরে কফি নিয়ে বসে গেলাম সেখানে। রুক্ষভূমি- ছোট ছোট পাহাড় দূরে। সারাদিনে কত ষ্টেশন এলো। স্যানডারসন, অ্যালপাইন, এল পাসো, (টেক্সাস) ডেমিং, লর্ডসবার্গ, (নিউ মেক্সিকো), বেনসন, টাসকন, ম্যারিকোপা (অ্যারিজোনা)। রাত বারটা নাগাদ এল ইউমা (অ্যারিজোনা)। পেরিয়ে গেল পয়লা জুন। দোসরা জুন ভোর রাতে পেরিয়ে গেল পাম স্প্রিং, অন্টারিও, পামোনা ষ্টেশন (ক্যালিফোর্নিয়া)। ভোর পাঁচটার আগেই পৌঁছে গেলাম লস অ্যাঞ্জেলেস (ক্যালিফোর্নিয়া) ষ্টেশন। নির্দিষ্ট সময়ের আধ ঘণ্টারও আগে।

    বলা বাহুল্য, বন্ধনীর মধ্যে রাজ্যগুলোর নাম রেখেছি। মোট যাত্রাপথের দীর্ঘতম এলাকা টেক্সাস রাজ্যে অবস্থিত, আগেই বলেছি। ষ্টেশনের নামগুলোর মধ্যে স্প্যানিশ প্রভাব। রুক্ষভূমি। কোথায় যেন সেই ফিল্ম প্রসিদ্ধ ওয়াইল্ড ওয়েস্ট। চোখের সামনে চলচ্চিত্র দেখি কল্পনায়। ঘোড়ায় চেপে ছুটে আসছে ডেস্প্যারেডো। কোমরে ঝুলছে রিভলভার- ঘোড়ার গাড়ির ওয়াগনে ড্যামসেল ইন ডিসট্রেস। ছুটে আসছে নায়ক। ক্ষিপ্র পদক্ষেপ- শরীর, নায়িকাকে বাঁচাবেই। স্প্যানিশ প্রভাব সমস্ত ল্যাটিন অ্যামেরিকা জুড়ে। ইংরেজি থেমে গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই। দক্ষিণে আর নামতে পারেনি। এল পাসো শহরের লাগোয়া দেখতে পেলাম মেক্সিকো আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা – কাঁটাতার। মেক্সিকো দেশটিও একটি ফেডারেল দেশ। অনেক প্রদেশ সেখানেও। তবে ভারতের সঙ্গে মার্কিন মুলুক বা মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রের তফাৎ এই যে সে দেশগুলো মোটামুটি মনোলিথিক। ভাষা এবং ধর্ম দুটোতেই। অবাক লাগে এতো বিবিধতা নিয়েও ভারত আজও একটা দেশ হিসেবেই রয়েছে। জনবিস্ফোরণ সত্ত্বেও ভারতের অগ্রগতি অভাবনীয়। 

     ভাবছিলাম ভারতের অগ্রগতি নিয়ে। পাকিস্তান দেশটি এখনও বস্তাপচা কাশ্মীর সমস্যা জিইয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। গঙ্গা পদ্মা ঝিলম বিয়াস দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গেছে। ওই দেশটার হিংসুটেপনা আর গেল না। শ্রীহরিকোটা থেকে ভারতে রকেটে সার্কের দেশগুলো তো বটেই- সারা পৃথিবী স্যাটেলাইট পাঠালো আকাশে। পাকিস্তান পাঠালো না। ভারতের ডাক্তারেরা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত পাকিস্তানি আবালবৃদ্ধ বনিতাকে সার্জারি করে, নানা চিকিৎসা করে সুস্থ করে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। সেদেশের মায়েরা চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলে ইন্ডিয়াতে এসে বলে মনেই হচ্ছে না বিদেশ- এতো ভালোবাসা পেয়েছি এখান থেকে। আর পাকিস্তান কেবল বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে। কতগুলো বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ের মাথা চিবোচ্ছে, হাতে অস্ত্র দিচ্ছে- ইন্ডিয়ান আর্মির বিরুদ্ধে পাথর ছোঁড়ার জন্য পয়সা দিচ্ছে। আরে কাশ্মীর জিতলেও তো পাকিস্তানের লাভ হবে না কিছু। কাশ্মীরীরা স্বাধীনতা চায়- পাকিস্তানের অংশ হয়ে তারা থাকতে চাইবে না। উপমহাদেশ চার টুকরো হবে তাহলে। ইসলামের হেফাজত? পাকিস্তানকে তার জিম্মাদারি দিয়েছে কে? বাংলাদেশ আলাদা হয়েছে। ইসলামের নামে বঞ্চনা সহ্য করেনি। বালুচিস্থান জ্বলছে। সেসব না ভেবে যেন তেন প্রকারেণ ভারতের ক্ষতি সাধন করার চেষ্টা করা ছাড়া এই দেশটার আর কোন কাজ নেই। অথচ সহযোগিতা হলে কত ভালো হত। ভারতের বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাকিস্তানি ছাত্র ছাত্রীরা পড়ার সুযোগ পেত, মেডিক্যাল ট্যুরিজম বাড়ত, পাকিস্তানের খাইবার অঞ্চল পাহাড়ি অঞ্চলে, মন্দির মসজিদ গুরুদ্বার মহেঞ্জোদারো হরাপ্পায় ভারতীয়রা বেড়াতে যেতে পারত। লাহোরের ফুড স্ট্রিট উপচে পড়ত ভারতীয় খাদ্যপ্রেমীদের ভিড়ে। বিজ্ঞান আর কারিগরি সহযোগিতা ব্যবসা বাণিজ্যে সহযোগিতা পৃথিবীর এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্রই বদলে দিতে পারত। কবে যে সুবুদ্ধির উদয় হবে, পাকিস্তানের বিদেশ নীতি কবে পাল্টাবে। দেশে বিদেশে উগ্রপন্থার চাষ আর রপ্তানির বাইরে বেরিয়ে পাকিস্তানকে অন্য কিছু ভাবতে হবে, যদি সত্যিই সে নিজের অধিবাসীদের মঙ্গল চায়। ভারত ভালো থাকলে পাকিস্তানও ভালো থাকবে।  এক আবেগের বশে দেশভাগ হয়েছে, দ্বিজাতি তত্ত্ব যার নাম। কিন্তু তার পরেও অনেক ঘটনা ঘটেছে। বার্লিন প্রাচীর ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। রাশিয়া ভেঙেছে। বিশ্বায়ন হয়েছে। বিশ্ব বাজার তৈরি হয়েছে। ইয়োরোপের দেশগুলো কাছাকাছি এসেছে। এক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ব্রেক্সিট ঘটেছে বটে তবে সেটাই শেষ কথা নয়।

        লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিয়ন ষ্টেশনে অ্যামট্র্যাক থেকে নেমে বেশ খানিকটা হাঁটতে হলো ওয়েটিং হলে পৌঁছতে।  অবশ্য সামান্য অপেক্ষা করলেই ব্যাটারির গাড়িতে চাপা যেত। ট্রেন ষ্টেশনে ঢোকার আধঘণ্টা আগেই অ্যাটেনড্যান্ট বলে দিয়েছেন টেবিলে কফি, কাগজের ব্যাগে কুকিস, এবং জলের বোতল রাখা আছে। প্রয়োজন মত সেসব নিয়ে আমরা নামতে পারি। বলা বাহুল্য এই ট্রেনটির প্রতিটি কামরায় একজন করে অ্যাটেনড্যান্ট আছেন।  তাঁদের কাজ হলো যাত্রীস্বাচ্ছন্দ্য দেখা, বার্থ পেতে দেওয়া, বিছানা ঠিক করে দেওয়া, যে কোন রকম জিজ্ঞাসার উত্তর দেওয়া। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনারের সময়ে ডেকে দেওয়া, প্রয়োজনে ডাইনিং হল থেকে খাবারে এনে দেওয়া। দুপুর আর রাতের খাবারের সময় ঠিক করা যাত্রীর ওপর নির্ভর করে। ঘণ্টা দুয়েক সময়ের পরিসর দেওয়া হয়। যাত্রী তার পছন্দের সময় জানিয়ে দেন। আধঘণ্টা বাদে বাদে সেই সময়ে যাত্রীকে ডেকে নেওয়া হয়।

       একটি বড় সুটকেস আমরা গাড়িতে ওঠার আগেই অস্টিনের ষ্টেশন মাস্টারের কাছে জিম্মা করেছিলাম। সেটিকে ছাড়িয়ে নিয়ে লটবহর সমেত যৎসামান্য বিশ্রাম নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলাম পাতালরেল ধরতে। এখানেও তার নাম মেট্রো। সাবওয়েও বলা হয়। ১৫ মিনিটের পাতালরেল যাত্রার পরে পৌঁছে গেলাম হলিউড হাইল্যান্ড ষ্টেশনে। পরপর ষ্টেশনগুলোর নাম Civic Center  / Grand Park, Pershing Square, 7th St / Metro Center,  Westlake / MacArthur Park, Wilshire / Vermont, Vermont / Beverly, Vermont / Santa Monica, Vermont / Sunset,  Hollywood / Western,  Hollywood / Vine, Hollywood / Highland।

       হলিউড হাইল্যান্ড ষ্টেশন থেকে বেরিয়েই একটা শপিং মল।তার মধ্য দিয়ে কিছুটা গেলেই আমাদের হোটেল। ছিমছাম বাহুল্যহীন – কোন বড় লাউঞ্জ নেই। নাম হলিউড অর্কিড স্যুইটস। আমাদের বুকিং ছিল বেলা তিনটে থেকে। কিন্তু সঙ্গে ত্রিজ্ঞ আর মালপত্তর। তখনই ঘর দিয়ে দেওয়া হল অতিরিক্ত কোন খরচ ছাড়াই। সাড়ে সাতটা থেকে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টের নেমন্তন্নও জুটে গেল। বিশাল ঘর, ডাইনিং স্পেস, রান্নাঘর, টয়লেট সমেত স্যুইট।

     খরচের খুঁটিনাটিতে ঢুকি না। যেটুকু শুনি অনেকটাই ভুলে যাই। যতটুকু মনে আছে বলি। আমাদের পাঁচজনের ট্রেনভাড়া ১৭০০ ডলারের কাছাকাছি। আমরা যে হোটেলে উঠেছি তার ঘরভাড়া পাঁচজনের যথেচ্ছ ব্রেকফাস্ট সমেত দৈনিক দুশো ডলার। অস্টিনে গাড়ি রেখে ট্রেনে উঠেছিলাম আমরা। ফিরতেও হয়েছে সেই অস্টিনে। প্লেনভাড়া একেকজনের দেড়শো ডলারের মত।

 

অ্যামট্র্যাক ট্রেনে – ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত

 

আমার মুগ্ধবোধ, চৈতন্যের সহজ হাতছানি;

সে আমাকেই ফেলে রেখে ছায়া ছুটে যাচ্ছে

বনানীতে বিপরীতে, আমার থেকেও বেশি জানে?

 

 

দ্রুতগতি ট্রাকের হেডলাইট ছুঁড়ে দেয় মায়া-

প্রিয়তমা এমন দিনে আমাকে রেলরোডে রেখে

তুমি কি চলে যাচ্ছ অতল গহ্বরে?

 

 

লক্ষ্যবস্তু ভেদ করে চলে যাচ্ছে অগোছালো তির,

পৃথিবীর পরিচিত গুঞ্জন যেন দূরাগত ফুলবাস

ভেসে আসে নিশীথ উদ্যান থেকে।

 

 

দ্রুত সরে যায় যাবতীয় গ্রামীণ প্রহর

রাত্রির মধ্যযামে; অ্যামট্র্যাক মার্কিন ট্রেনে

তরঙ্গ আসে কানে,

যেন নদীর ঢেউ ডেকেছে ছলাৎ আহ্বানে।

ঝান্ডি-কথা

নিলাদ্রী দেব

(উত্তরবংগ, পশ্চিমবাংলা)

ছবিঃ সুচিস্মিতা দেব শর্মা 

 

   শহরের ব্যস্ততার ঘাম পাহাড়ের কাছাকাছি এসে শুকিয়ে গেল। তেমনটাই চেয়েছিলাম যদিও লাভা, লোলেগাও এর রাস্তাকে ডান হাতে রেখে খাড়াই সাপ-রাস্তা বেয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেলে গন্তব্যে পৌছনোর কিছুটা আগে দাড়িয়ে গেলাম হঠাৎ বৌদ্ধ গুম্ফাটির ঠিক পাশে।গুম্ফাটি ছোট হলেও অদ্ভুত সুন্দর। এর বাঁয়ে পাথুরে সমতল, একেবারে পাহাড়ের পায়ে এসে মিলিয়ে গেছে।সেখানে চড়ে বেড়াচ্ছে গবাদির দল। মাঠে সবুজ ঘাস-কার্পেটের মাঝে বেশ বড় বড় কালো পাথর মাথা তুলে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।

   কিছুটা এগিয়ে এলাম। আবার বাধ্য হলাম দাড়াতে। প্রকৃতির চুম্বকটি যেন বারবার টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে আনছে প্রকৃতিরই কোলে। এখানে বাঁয়ে খাদ. ডানে পাহাড় প্রাচীর। রাস্তার দুপাশে বসবার মত ছোট দুটো জায়গা। ওরই একটাতে বসে খাদের ওপারের পাহাড় দেখছিলাম। এ পাহাড়ে সূর্যালোকের বাহারি আস্তরণ। রাস্তার কালো পিচের ওপর নেমে আসা সূর্য রেখা কাটাকুটি খেলছে আসেপাশের ডালপালা কিংবা পাতাদের সাথে।

     এগুলো পেরিয়েই এলাম ছোট্ট একটা গ্রামে। সে গ্রাম আধুনিকতার প্রলেপে অপূর্ব সাজে সেজে উঠেছে। গড়ে উঠেছে ইকো হাটস্। এখানে পৌছেই নিজের মধ্যে হারিয়ে 

গেলাম। হারিয়ে গেলাম পুরো পুরি। পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ি।তা বেয়ে নেমে এলে পাহাড়-বাড়ির প্রবেশ পথ। আশ্রয় জুটিয়ে দৌড়ে পৌছলাম এ বাড়ির মাথায়, ছাদে। জড়িয়ে ধরল মেঘের দল। এরপর অনেকক্ষণ চুপ। ছাদের ঠিক মাঝে একদম চুপ করে বসে দেখছি মেঘ রাজ্যের কার্যকলাপ। এ রাজ্যে সীমান্ত বলে কিছু নেই। মেঘের দল এখানে আপন মনে ভেসে যায় দেশ, কালের গন্ডী ভুলে।       এখানে সূর্য কখনো মুখ ঢাকে, কখনো মুখ তুলে চায়। মেঘ পর্দার মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো, অনেকটা ঈশ্বরের আলোর মত চোখে এসে লাগল। এক ঐশ্বরিক আবহ যেন ঘিরে আছে পুরো পরিবেশকে। ধোঁয়ার মত উঠে আসা মেঘ-ঢেউয়ে দূরের পাহাড়গুলো নিজেদের লুকিয়ে নিচ্ছে ক্রমশ। আবার জেগে উঠছে. এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলে বোঝা যায়, আকাশ আর পাহাড় মিলে একটা বিরাট ক্যানভাস গড়ে তুলেছে। তার মাঝে কিছু অপরিচিত মুখের মত. প্রথমবারের জন্য চিনে নিতে চেষ্টা করি। এ চেষ্টাতেই দুপুর গড়িয়ে যায় নিজের খেয়ালে।

   মোবাইলে কোনো নেটওয়ার্ক নেই। নেই কোনো ফোনকল। যোগাযোগহীন ভাবে বেঁচে থাকা যে কত শান্তির, তা হয়তো বলে বোঝানোর নয়। অনুভব-ই বুঝে ওঠার একমাত্র পথ।  এমন অজস্র সব অনুভূতি, মেঘেদের গল্পগাঁথা আর অনেক অনেক দৃশ্য-ভিড়ের মাঝে আমি যেন ডানাহীন ভাবেও ভাসছি। নস্টালজিয়ায় বেসামাল হয়ে পড়ছি।  

ছোটবেলার ভাবনাগুলো যেন ঘুরে ফিরে আসছে।

"আচ্ছা, মেঘেদের কি ডানা থাকে? 

তাহলে ওরা উড়ে বেড়ায় কীভাবে?"

এতসব প্রশ্ন-ভিড়ই স্বপ্নপথ তৈরী করছে। যে পথ ধরে সেকেন্ডে সেকেন্ডে সৃষ্টি হচ্ছে - গল্প নয়, এক একটি উপন্যাস যার প্রতিটি পাতায় স্বপ্নের আনাগোনা। যে স্বপ্ন খানিকটা স্বপ্ন বটে। বাকিটা বাস্তব।

    দুপুরে ছুঁয়ে দেখা স্বপ্নকে ঘিরেই বিকেল এল। খুব তাড়াতাড়ি নেমে এল সন্ধ্যেও. চারপাশে মেঘেদের কুয়াশাচ্ছন্ন মুখ। পাহাড়ের ঢালে বাড়িগুলোর ছাদ, ঘরের টিন বেয়ে মেঘেরা ওপরে উঠে আসছে। সাথে হিমেল হাওয়া। এবার ঠান্ডা লাগছে। আর রোমাঞ্চ চেপে আছে সোয়েটারের মত। মাথার ওপরে তিব্বতি পতাকাগুলো উড়ে চলছে। উড়েই চলছে। ওতে অজানা সব মন্ত্রের স্ক্রিপ্ট।অজানা হলেও মূল বোধটা খুবই পরিচিত। আসলে এমন সবটাই যে জীবনের কথা বলে। বলে সম্প্রীতির কথা, ভালবাসার কথা। যে ভালবাসাকে কেন্দ্র করে বৃত্ত আঁকে অনেক সম্পর্ক, যাকে ঘিরেই আমাদের প্রতিদিনের এই বেঁচে থাকা।

    এতসব চিন্তা ভাবনার মাঝেই কখন যে দূর পাহাড়ের বাড়িগুলোতে আলো জ্বলেছে, ঠিক চোখে পড়েনি। হঠাৎ দেখে সেগুলোকে তারা বলে মনে হল। মনে হল আকাশের তারাদের থেকে পাহাড়ের তারারা যেন অনেক কাছে এসে দাড়িয়েছে। কোজাগরীর প্রায়-পূর্ণচাঁদ এদিকে আলোর জোয়ার এনেছে। সে জোয়ারে ডুব দিলাম। ডুবে গেলাম আনন্দে, উচ্ছলতায় আর স্বপ্নময়তায়।

     ভেসে উঠলাম ভোরে। আধঘুমে বিছানায় এলিয়ে ছিলাম। পর্দা তুলতেই 'গুড মর্নিং' বলে উঠল কাঞ্চনজঙ্ঘা।এরপর আবার ঘুম-লেপের ভেতরে। 

হাতঘড়ি জানান দিল ফিরে আসার সময়।

        গতরাতের স্বপ্ন, গল্প, কবিতা, গান, আড্ডা, রাত-ঘরের বিছানা, বালিশ, সাত সকালের চা, স্থানীয় মোরগের ডাক, পাথরের ওপর পাথরে সাজানো রান্না ঘরের দেয়াল, খানিক লালচে মাটি দিয়ে লেপে রাখা দুয়ার আর হঠাৎ পরিচিত হয়ে ওঠা সেই মুখগুলোকে মনের অ্যালবামে তুলে রেখে, পাহাড়ি ফুল আর ঝর্ণায় নেমে আসা নুড়িদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে চেনা রাস্তা ধরে চেনা ঠিকানার দিকে রওনা হলাম। 

বাম হাতে বিশাল ভ্যালি। সমতলের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলছে গাড়ি। পেছনে আমার একদিনের জীবন।

 

ঝান্ডি। দার্জিলিং। 06,07/10/2017

(শহরে এসে জ্বর জ্বর ভাব. জ্বরের উষ্ণতার সাথে মিলে যাচ্ছে ঝান্ডি উপাখ্যানের বন্ধুত্বের উষ্ণতা. ভীষণরকম মনে পড়ছে দাদাকে, প্রবীর দা'কে, তন্ময় আর পান্না পাহাড়কে।)

রূপকথার শহর

প্যারিস ডিজনিল্যান্ড  শর্মিষ্ঠা ভট্টাচার্য্য

নেদারল্যান্ড

 

ভারসেইলেস রাজপ্রাসাদের বাইরের দৃশ্য (সংগৃহীত)

  বিগত কয়েক দশক ধরে সারা পৃথিবীতে ভ্রমণ রসিকদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছুটির গন্তব্যের তালিকায় শীর্ষস্থানে ছিল প্যারিস শহর। এই শহর টুরিস্টদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় প্রধানত তার প্রাচীন ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, মনোরম চিত্রকলা ও স্থাপত্যশিল্প,এবং আকাশচুম্বী আইফেল টাওয়ারের শোভার জন্য।আর ছোটদের পছন্দের তালিকায় প্রথম নাম হল প্যারিস ডিজনিল্যান্ডের। এই জনপ্রিয়তার প্রধান আকর্ষণ হোল কার্টুন ছবির চরিত্র ‘মিকি মাউস’, ‘ডোনাল্ন্ডডাক’, ইত্যাদির উপস্থিতি, আর আধুনিক যন্ত্রচালিত নানারকম রোমাঞ্চকর “রাইডস”। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে শেষ তিন চার বছরে এই জনপ্রিয়তায় কিঞ্চিত ভাঁটা লেগেছে ফ্রান্সের বুকে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কালের কয়েকটি ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী ঘটনায়।

     গত বছরের শীতের ছুটিতে ক্রিসমাসের সময়ে প্যারিস আর ডিজনিল্যান্ড বেড়িয়ে এলাম। এই সময়ে সবাই খুশির মেজাজে থাকে কারণ ক্রিসমাস ইউরোপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনন্দের উৎসব। সারা ইউরোপের সব বড় শহরগুলোতে বসে ক্রিসমাসের বাজার, বিক্রি হয় রকমারি ঘর সাজানের জিনিস, জমকালো পোশাক, সুস্বাদু খাবার, বিভিন্ন ধরণের অ্যালকোহলের পানীয়, ইত্যাদি। থাকে অনেকরকম মনোরঞ্জনীয় খেলার সরঞ্জামও। বড় শহরগুলোকে সাজানো হয় রংবেরঙের আলো দিয়ে, থাকে সুসজ্জিত ঝকমকে ক্রিসমাস ট্রি। এই সময়ে প্যারিসের মতো শহরে ঘুরে বেড়ানো দারুনই মজার। বড়দিনের ঠিক দুদিন আগে পৌঁছলাম প্যারিস শহরে। ঘর নিলাম একদম শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে যাতে শহর জীবনের স্বাদটা বেশী করে উপভোগ করতে পারি। প্রথমদিন আমরা পায়ে হেঁটে শহরের কিছুটা অংশ দেখলাম। প্যারিস শহরের বুক জুড়ে বয়ে চলেছে অপূর্ব সুন্দর সিন নদী। আর নদীর দুই প্রান্তকে যুক্ত করেছে কিছু দূরে দূরে বানানো সেতু। প্রতিটি সেতুই তার নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে সুদৃঢ় ভাবে দৃপ্তমান। আর সিন নদীর দুইপ্রান্ত জুড়ে রয়েছে সুদৃশ্য ঐতিহাসিক ভবন, রাজকীয় প্রাসাদগৃহ, স্মৃতিস্তম্ভ। এইসব দৃশ্যাবলীর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য সিন নদীবক্ষ জুড়ে চলে সারা দিনব্যাপী নৌকাভ্রমণ। অবশ্য নদীর পাস ধরে শহরের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে হেঁটে বেড়াতেও বেশ লাগে।

ক্রিসমাসের রাতের আলোয় রঙিন নোত্রদাম গির্জার দৃশ্য

  সিন নদীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত“নোত্রদাম”গির্জা যেটি পর্যটকদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় তার গগনচুম্বী উচ্চতা আর নান্দনিক গোথিক স্থাপত্যশৈলীর কারণে। এই গির্জাটি প্রায় ৮৫০ বছরের পুরনো। প্রতি বছর লক্ষ কোটি মানুষজন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসে এইটি দেখতে। জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে দেখতে গেলে এইটি সমগ্র ইউরোপের পর্যটকদের কাছে সর্বাধিক জনপ্রিয় ক্যাথেড্রাল। নোত্রদাম ছাড়াও প্যারিসের আরও একটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এবং ফ্রান্সের সর্বাধিক পরিচিত প্রতীক হোল “আইফেল টাওয়ার”। গুস্তাভো আইফেল নির্মিত (১৮৮৯) জগৎবিখ্যাত এই টাওয়ারটি উচ্চতায় ৩২০ মিটার।বিভিন্ন আকৃতির ছোট-বড় লোহনির্মিত কাঠামো জোড়া দিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। টাওয়ারের পাদদেশ থেকে লিফট নিয়ে দুইটি বিভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছানো যায়। এখান থেকে দেখা যেতে পারে পুরো প্যারিস শহর এবং সিন নদীর অতি মনোরম দৃশ্য। সন্ধ্যাবেলায় প্রতি ঘণ্টায় আইফেল টাওয়ার ঝিকিমিকি আলোক সজ্জায় সজ্জিত হয় শুধুমাত্র ৫ মিনিটের জন্য। টাওয়ারের উপর থেকে রাতের প্যারিস শহরের দৃশ্য সত্যিই অপূর্ব।

রাতের আলোয়

আইফেল টাওয়ার

paris12.jpg

ল্যুভরে মিউজিয়ামের ভিতরের স্থাপত্যের নিদর্শন

সেক্রে কেউর গির্জারদৃশ্য (সংগৃহীত)

প্যারিস শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে সুবিখ্যাত বিশালাকার ভারসেইলেস রাজপ্রাসাদ । এই মহাকায় প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছিল ১১শ শতাব্দীতে মূলত রাজ বাসস্থান  হিসেবে। রাজা লুইস ১৪ এবং তার পরবর্তী কয়েক পুরুষ বংশধরেরা এই প্রাসাদে বাস করেছেন ফরাসী বিপ্লবের আগে পর্যন্ত। বিংশ শতাব্দী থেকে এই প্রাসাদটি মূলত জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে সংগৃহীত আছে ফরাসী সম্রাটদের বংশপরম্পরায় সঞ্চিত শিল্পকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, গৃহসজ্জা, রাজকীয় দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক সরঞ্জাম। এই বিপুলাকার প্রাসাদভবনটি ঘুরে দেখতে পুরো দিন কেটে যাবে। তবে এই রাজপ্রাসাদ পর্যবেক্ষণ থেকে নিঃসন্দেহে আঘ্রাণ করা যাবে ফরাসী রাজাদের জীবনশৈলী। ভারসেইলেস প্রাসাদের চারিদিক জুড়ে রয়েছে অতি মনোরম সুসজ্জিত বাগিচা, পুষ্করিণী আর পায়ে হেঁটে বেড়ানোর পথ।

ভারসেইলেস রাজপ্রাসাদের ভিতরের দৃশ্য (সংগৃহীত)

ডিজনি পার্কের রূপকথার দুনিয়া-দিনের এবং রাতের আলোয়

 ডিজনি পার্কে ঢুকতেই চোখে পরবে অপূর্ব সুন্দর ক্যাসেল, যেটি ওয়ার্ল্ড ডিজনির সিনেমার প্রতীকী। সন্ধ্যের সময় এখানে আলো আর সঙ্গীতের সমন্বয়ে খুব সুন্দর ফোয়ারার খেলা প্রদর্শিত হয়। তাছাড়া প্রতি সন্ধ্যাবেলা এই পার্কে প্যারেড শো হয় যেটিতে ডিজনি সিনেমার সব চরিত্র এবং মডেল গুলোকে একই সঙ্গে দেখা যায়। এই প্যারেড শোটি অসম্ভব জনপ্রিয়। এইটি চলাকালীন হাজারে হাজারে গুণমুগ্ধ দর্শক আর উৎফুল্ল  ছোট-বড় বাচ্চারা অধীর আগ্রহে রাস্তার দুইধারে দাড়িয়ে হর্ষধনি করতে থাকে।

ডিজনি পার্কের সন্ধ্যাবেলার প্যারেড শো

ক্রিসমাসের সময়ে ডিজনি পার্কে আরও একটি বিশেষ প্যারেড শো দুপুরবেলায় আয়োজিত হয়। এই বিশেষ সময়ের কথা মনে রেখে ক্রিসমাসের মূলভাবে সজ্জিত হয় এই প্রদর্শনীটি। সান্তাক্লজ আর তার সঙ্গী সাথীরা ক্রিসমাসের গানের ছন্দে তাল মিলিয়ে রঙিনযানে চরে আনন্দের ঢেউ নিয়ে আসে আকাশে বাতাসে, মনে হয় যেন কোন এক স্বপ্নের রাজ্যে পৌঁছিয়ে গেছি আমরা সবাই যেখানে দুঃখের লেশ মাত্র নেই। ছোটোদের খুশীর সীমা থাকে না এই আনন্দের ছন্দে তাল মিলিয়ে নিজেদের ভাসিয়ে দিতে।

ডিজনি পার্কের ক্রিসমাসের বিশেষ  প্যারেড শো

লক্ষণীয় যে বিশেষত ছোটো ছোটো মেয়েরা অনেকেই আসে রূপকথার রাজকন্যার সাজে, আর শরীক হয় এক অবর্ণনীয় অনাবিল আনন্দের।
ডিজনিল্যান্ডের দ্বিতীয় পার্কটি হোল ডিজনি স্টুডিও। এখানেও অনেকগুলো রোমহর্ষক রাইডস আছে। মিকি মাউসের সাথে নিজের ছবি তোলার ইচ্ছে থাকলে সেটিও মিটতে পারে এই স্টুডিও চত্বরে, তবে তার জন্য ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করতে হতে পারে। এই ডিজনি স্টুডিওর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এখানে সিনেমা বানানোর  গুপ্ত রহস্য সহজ ভাবে প্রদর্শন করা আছে। কিভাবে অ্যানিমেশেন ছবি বানানো হয়, সিনেমায় কি ভাবে বিভিন্ন স্টান্ট অথবা অ্যাকশন দৃশ্য দেখানো হয়, কিভাবে তৈরি করা হয় ভূমিকম্প, আগুণ বা বন্যার দৃশ্য, স্টুডিয়োতে বসেই কি ভাবে বিভিন্ন দেশকে ক্যামেরা বন্দি করা হয়, তৈরি করা হয় সিনেমার সব বিন্যাসক্রম- এই সবকিছু কারুকলা সুন্দরভাবে বর্ণিত এবং প্রদর্শিত করা আছে। তাছাড়াও আছে কিছু লাইভ পারফরমেন্স শো যেগুলো তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন ডিজনি সিনেমার সংকলন দিয়ে। তাই এক কথায় পুরো সিনেমা জগতের গোপন তথ্য জানা যাবে, আর জনপ্রিয় ডিজনি নির্মিত ছবিগুলোর টুকরো টুকরো ঝলক দেখা যাবে এই পার্কের অভিযানে।

টাওয়ারের উপর থেকে প্যারিস শহরের শোভা

প্যারিসের আরও একটি দৃষ্টব্য বস্তু হোল“আর্ক দ্য ট্রায়ম্ফ” (উচ্চতা ৫১ মিটার)।এই স্মৃতিস্তম্ভটি ফ্রান্সের সৈনিক বাহিনী যারা ফরাসি বিপ্লবের সময় দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত। এটি নেপোলিয়নের বিজয় স্তম্ভ হিসাবেও পরিচিত।এই স্তম্ভের পাথরের বুকে খোঁদাই করা রয়েছে সমস্ত ফরাসি সৈনিকদের জয়লাভের ইতিহাস এবং সেনাপতিদের নাম। এই বিখ্যাত স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়েছে ১৮৩৬ সালে এবং অবস্থিত অভিজাত শঁম-জে-লিজে মহারাস্তার পশ্চিম প্রান্তে এবং প্লাস দ্য লেতোয়াল এর কেন্দ্রে। এর একদিকে রয়েছে বিখ্যাত ল্যুভরে মিউজিয়াম, অন্যপাশে ফ্রান্সের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এই স্মৃতিস্তম্ভটি পুরাতন প্যারিস এবং নতুন প্যারিসের সংযোগস্থল। আর প্রসিদ্ধ শঁম-জে-লিজে রাস্তার দুই ধার জুড়ে রয়েছে পৃথিবী বিখ্যাত “ব্রান্ডেড”জমকালো দোকানের মহাসমাবেশ। স্বনামধন্য ডিজাইনারদের তৈরি বিলাসবহুল জামাকাপড়ের দোকান, জুতো, সুগন্ধি, ঘড়ি, ব্যাগ, ঘর সাজানোর সরঞ্জাম- কি নেই এখানে। পৃথিবীর ধনী ক্রেতাদের স্বপ্নরাজ্য এই জায়গা। আর ক্রিসমাসের সময়ে এই পুরো অঞ্চলটি সুসজ্জিত হয়  চোখ জুড়ানো রংবেরঙের আলো দিয়ে। তাই এক কথায় সন্ধ্যেবেলার প্যারিস শহর অনবদ্য এবং দৃষ্টি মধুর।

ডিজনিল্যান্ডের দুটো পার্ক ঘোরার পরে এখানকার দোকান থেকে কিছু প্রতীকী কেনা যেতে পারে স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ। পার্কের বাইরে রয়েছে বিশালাকার চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর রঙ্গশালা। এখানে একসাথে দশটির বেশি সিনেমার প্রদর্শনী চলতে থাকে। 
প্যারিস আর ডিজনিল্যান্ডের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার পরে এবার বাড়ি ফেরার পালা। এই যাত্রায় অনেক দৃষ্টিনন্দনীয় স্থাপত্য, অপূর্ব শিল্পকলা, রোমাঞ্চকর রাইডস, রূপকথার দুনিয়া দেখা হল। কিন্তু তার ফাঁকে আরও কিছু দেখলাম যার কথা না উল্লেখ করলে এই ভ্রমণ কথা সম্পূর্ণ হবে না। রাতের প্যারিসের রাস্তায় দেখেছি অনেক গৃহহীন মানুষ জনকে যারা তাদের ছোটো বাচ্চাদের নিয়ে দোকানের বাইরের ছাদের নীচে নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছে। এই মানুষজনেরা অনেকই এসেছে সিরিয়া, ইয়মেন বা আফ্রিকার যুদ্ধ বিদ্ধস্থ দেশগুলো থেকে। 

একফালি ছাদ আর এক টুকরো রুটির জন্য তারা টুরিস্টদের কাছে হাত পাততে বাধ্য হচ্ছে। হিমশীতল রাতে তারা কতটা অসহায় সেটা চোখে না দেখলে উপলব্ধি করা যায় না।ফরাসী সরকার এবং ইউরোপের অন্য দেশগুলো সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে ঠিকই, তবে সব সাহায্যপ্রার্থীর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছনো বোধহয় অসম্ভব। আরও একটি ব্যাপার এবার বেশ নজর কেড়েছে সেটা হল বন্দুকধারী পুলিশের টহলদারি। সাম্প্রতিক কালে নোত্রদামগির্জা, আইফেল টাওয়ার বা ল্যুভরে মিউজিয়াম প্রবেশপথে চলছে সব দর্শনার্থীর শরীরের চিরুনি তল্লাশি। প্যারিসের মহারাস্তায়, স্টেশন চত্বরে এবং শহরের বিভিন্ন প্রান্তে চলছে সারা দিনরাত্রি জুড়ে সশস্ত্র পুলিশের তটস্থ পাহারা। তাই প্যারিস শহর বেড়ানোর মজায় কিছুটা ঘাটতি অবশ্যই পড়েছে। আশারাখি আগামী দিনগুলোতে আমাদের পৃথিবী থেকে সন্ত্রাসের অবসান ঘটবে এবং ভ্রমণপ্রিয় মানুষজন দেশে বিদেশের সব জায়গায় নিঃসঙ্কোচে যেতে পারবে এবং এই সুন্দর পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ পুরোমাত্রায় পুনরায় উপভোগ করতে পারবে।

ল্যুভরে মিউজিয়ামের ভিতরের স্থাপত্যের নিদর্শন

paris11.jpg

আর্ক দ্য ট্রায়ম্ফ

প্যারিসের ল্যুভরে জাদুঘরের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। এইটি হল পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ, পুরাতন এবং সুবিখ্যাত শিল্প প্রদর্শনশালা। এই ঐতিহাসিক কলাভবনটি সিন নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। ল্যুভরে মিউজিয়াম বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্প সংগ্রহালয়, যেটিতে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ দর্শক আসেন এই অসাধারণ ভবনটি পরিদর্শন করতে। বহু প্রাচীন ব্যবিলিওন, মিশরীয়, চীন দেশের প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ, ইসলামি শিল্পকলা, গ্রিক রোমান স্থাপত্য,ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা ও এশিয়ার চিত্রকলা, ফরাসী সভ্যতার ইতিহাস – এক কথায় পৃথিবীর নানা দেশের ইতিহাস, কলা আর স্থাপত্য শিল্পের অপরিসীম গুপ্ত ভাণ্ডার এই ল্যুভরে মিউজিয়াম। আর এই জাদুঘরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল লিওনার্দো  দা ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা। 

মোনালিসা 

ল্যুভরের ভিতর থেকে তোলা বাইরের দৃশ্য

এই মনোরম প্যারিস শহরের আরও একটি প্রসিদ্ধ দ্রষ্টব্য স্থান হল শ্বেতশুভ্র ক্যাথলিক গির্জা “সেক্রে কেউর”, যেটি রোমান এবং বাইজেনতাইন স্থাপত্যের নিদর্শন। এটি প্যারিসের সেক্রেড হার্টের বেসিলিকাতথা যীশু খ্রীষ্টের পবিত্র হৃদয়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত।এই গির্জাটি তৈরি করা হয়েছিলো ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে মূলত যুদ্ধ বিরোধী মনোভাব জাগিয়ে তোলার জন্য এবং সমগ্র মানবজাতির প্রতি ঐশ্বরিক ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে।এই গির্জাটি একটি পাহাড়ের উপরে নির্মিত এবং এখান থেকেও প্যারিস শহরের অভূতপূর্ব সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করা যেতে পারে। প্যারিস শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে সুবিখ্যাত বিশালাকার ভারসেইলেস রাজপ্রাসাদ । এই মহাকায় প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছিল ১১শ শতাব্দীতে মূলত রাজ বাসস্থান  হিসেবে। রাজা লুইস ১৪ এবং তার পরবর্তী কয়েক পুরুষ বংশধরেরা এই প্রাসাদে বাস করেছেন ফরাসী বিপ্লবের আগে পর্যন্ত। বিংশ শতাব্দী থেকে এই প্রাসাদটি মূলত জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে সংগৃহীত আছে ফরাসী সম্রাটদের বংশপরম্পরায় সঞ্চিত শিল্পকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, গৃহসজ্জা, রাজকীয় দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক সরঞ্জাম। এই বিপুলাকার প্রাসাদভবনটি ঘুরে দেখতে পুরো দিন কেটে যাবে। তবে এই রাজপ্রাসাদ পর্যবেক্ষণ থেকে নিঃসন্দেহে আঘ্রাণ করা যাবে ফরাসী রাজাদের জীবনশৈলী। ভারসেইলেস প্রাসাদের চারিদিক জুড়ে রয়েছে অতি মনোরম সুসজ্জিত বাগিচা, পুষ্করিণী আর পায়ে হেঁটে বেড়ানোর পথ।

ডিজনি স্টুডিও চত্বর

paris10.jpg

ল্যুভরে মিউজিয়ামের ভিতরের স্থাপত্যের নিদর্শন

ল্যুভরে মিউজিয়ামের ভিতরের স্থাপত্যের নিদর্শন

ক্রিসমাসের সাজে শঁম-জে-লিজে মহারাস্তা

ঐতিহ্যময় কিয়োতোর

আশে পাশে

অরুন্ধতী ঘোষ, পিটসবার্গ 

(পিটসবার্গ, ইউ এস এ)

   গের লেখাতেই জানিয়েছি, আমাদের একমাত্র মেয়ে কিয়োতোর দোশিশা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিল। তার একান্ত ইচ্ছায় আমরা স্বামী-স্ত্রী ও আমার মা-তিনজনে কিয়োতো বেড়াতে গেছিলাম ২০১৭ সালের জুলাই মাসে। যদিও সময়টা ছিল গরমকাল- প্রচন্ড গরমেও কিন্তু আমাদের বেড়ানোর আনন্দ বিন্দুমাত্র কমেনি। সেই অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা কিছুটা লিখেছি আগের লেখায়।
আগের লেখাটিতে ছিল কিয়োতো বেড়ানোর বিস্তারিত অভিজ্ঞতা। কিয়োতো সত্যিকারের ঐতিহ্যময় শহর, কিন্তু তার আশেপাশে  ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জায়গাগুলির মাধুর্য কম নয়। এই লেখাতে থাকছে সেকথা। 


আরাসিয়ামা
  বাঁশবাগান ও হোজু-গাওয়া নদী ঘেরা আরাসিয়ামা জেলা,অনেকটা আমাদের মফস্বল শহরের মত। এটির অবস্থান কিয়োতো শহরের একটু পশ্চিমে। ভোর ভোর জে আর (J R) স্টেশন থেকে ট্রেনে করে আরাসিয়ামা এলাম। স্টেশন সংলগ্ন কাফেতে চা-জলখাবার খেয়ে যখন আরাসিয়ামার প্রধান আকর্ষণ তেনরিউজি বৌদ্ধমন্দিরের দিকে যাচ্ছিলাম, ছবির মত পথের দুদিকে চোখে পড়ছিল সুন্দর,ছোট ছো্‌ট বাড়ি দোকান।  দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে চললাম তোগেৎসু-কিও ব্রিজের দিকে।হোজি-গাওয়া নদীর ওপরের এই ব্রিজটি শহরের একপ্রান্তকে আরেকপ্রান্তের সঙ্গে যুক্ত করেছে। 

kiyoto3.jpg

বাঁশবাগানের মধ্যে (আরাসিয়ামা)

 
Kiyoto1.jpg

আরাসিয়ামার পথে 

বোঝাই যায়, বসন্ত বা শরতকালে এই ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটলে অন্য অনুভূতি, কারণ ব্রিজের দুপাশেচেরী গাছের সারি। আমরা গেছিলাম জুলাই-এর শেষে, তাও আমাদের বেশ ভালোই লাগল। ব্রিজ পেরিয়ে দোকানপাট-শিল্পকলা, খাবার ইত্যাদি। অনতিদূরেই তেনরিউজি মন্দির।সম্রাট কামেয়ামার (১৩শ শতাব্দী)পল্লীনিবাশ এই বাড়িটি ১৪শ শতাব্দীতে মন্দিরে রূপান্তরিত হয়।মন্দিরের প্রধান বাগান (শুষ্কবাগান)- জল, বালি ও পাথর দিয়ে সাজানো পাহাড়ের প্রেক্ষাপটে- এক অপূর্ব দৃশ্য।বিভিন্ন দিক থেকে বাগানটিকে দেখার জন্য বাগানের সামনে ও পাশে দুটি বাড়ির মধ্যে বসার জায়গার ব্যবস্থা আছে।  এক অভূতপূর্ব অনুভূতি হল মনে- ওপরে আকাশ, নিচে পাহাড়, পাহাড়ের সামনে ছোট্ট পুষ্করিণী, তার মধ্যে বিভিন্ন আকার ও আয়তনের পাথর বসানো। পুষ্করিণীর ধারে গাছ ও সামনে তটে বালি ছড়ানো। বালির ওপরে সমান্তরাল লাইন টানা। আবার সেই সীমার মধ্যে অসীম আনার প্রচেষ্টা- যার কথা আমি আগের লেখায় উল্লেখ করেছি।

জাপানী প্রথায় ডিনার রিওকানে

তোডাইজি মন্দিরের বুদ্ধমূর্তি

     নারাপার্কের সেন্ট্রাল আভেনিউ ধরে উত্তরদিকে গেলেই তোদাইজি মন্দির। ৭৪৩ শতাব্দীতে তৈরী এই মন্দির নারার প্রধান আকর্ষণ। মন্দিরের দিকে হাঁটতে শুরু করলে প্রথমেই পরবে নান্দাই-মন গেট। ১৮টি স্তম্ভ দিয়ে তৈরী এই গেটটি তৈরী হয়েছিল কামাকুরা সাম্রাজ্যের সময়। গেটের ভিতরে কাঠের তৈরী মিয়ো (মন্ডলার অংশ) মূর্তিগুলি তৈরী হয়েছিল ১৩শ শতাব্দীতে। নান্দাই-মন গেটের পশ্চিমে ইসুই-এন বাগান তৈরী হয়েছিল মেইজি যুগে। গেট দিয়ে ঢুকে একটু হাঁটলেই পড়বে দাইবুত্‌সু ডেন- এখানে রয়েছেন বিশাল ব্রোঞ্জের ভৈরচেন বুদ্ধ (সিদ্ধার্থ গৌতম)। ৫০০ টনের এই মূর্তিটি উচ্চতায় ৫৫ ফিট। অসংখ্যবার মেরামত হওয়া এই মূর্তিটি পদ্মের পাপড়ির ওপরে উপবিষ্ট। এই পদ্মের পাপড়ির খোদাই করা কাজ দেখে ঐতিহাসিকরা বলেছেন পূর্বতন বুদ্ধমূর্তিটি ছিল শাক্যমুনি বুদ্ধ। মূর্তির মতো বুদ্ধহলটিও অসংখ্যবার ধংস হয়েছে, আবার পুনর্গঠিত হয়েছে। বর্তমান হলটি আগের হল থেকে আয়তনে কম, তবুও এখনো পুরোনো দিনের নারার প্রতিভূ হিসেবে রয়ে গেছে। দাইবুত্‌সু হল থেকে বেড়িয়ে পূর্বদিকে একটি রাস্তা দিয়ে গেলে পাহাড়ের ওপর দুটি মন্দির পড়বে। রাস্তার দুইধারে পাথরের লন্ঠন দিয়ে সাজানো। একটি মন্দিরে দেখলাম ফুকুকেনজাকু ক্যানন (ক্ষমার দেবী)আলো দিচ্ছেন সবদিকে। চারপাশে সহচরীরা ও রক্ষকরা মন্ডলার আকারে সাজানো।এখানে বলে রাখি তোডাইজি মন্দিরে একটি মূর্তি দেখেছি (বোধিসত্য) যে মুর্তির হাতে আঁকা গুহাচিত্র দেখেছি ভারতে অজন্তায়। এর থেকে প্রমাণিত হয় জলপথে এবং স্থলপথে ভারতের সংগে জাপানের যোগাযোগ ছিল।

তোডাইজি মন্দিরের ভৈরচেন বুদ্ধ

এবার নারাতে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতার গল্প বলবো। মেয়ের সংগে পরামর্শ করে আমার স্বামী জাপানী অতিথিশালায় আমাদের রাত্রিবাসের বন্দোবস্ত করেছেন। এইরকম বিশেষ অতিথিশালার নাম “রিওকান”। ঘরে ঢুকেই দেখি মেঝেতে তাতামি ম্যাট পাতা সর্বত্র। ঘরের মাঝখানে নিচু টেবিল পাতা, তার চারধারে মাটিতে তাতামি ম্যাটের ওপর বসে চাপান ও খাবার খাওয়া। কিমোনো পরা দুজন পরিচারিকা এসে আমাদের সামনে মিষ্টি ও সবুজ মাচা চা রেখে গেলেন। আমার মার জন্য গরম হোজি চা। তাদের অন্তরঙ্গ ব্যবহারে আমাদের পরিশ্রান্ত প্রাণ জুড়িয়ে গেল।

তেনরিউজি মন্দিরের বালি-পাথরের বাগান

ওপরে নীল আকাশ আর নিচে পুষ্করিণীর জলে সেই আকাশ,পাহাড়,গাছ ও পাথরের ছায়া পড়েছে।দেখেই কবিগুরুর সেই গান মনে পড়ে গেল “তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে”।কিছুক্ষণ বসে সেই দারুণ দৃশ্য প্রাণভরে উপভোগ করলাম আমরা। সবাই নির্বাক, নিস্তব্ধ। আমাদের সঙ্গে রয়েছেন অনেক পর্যটক ও তীর্থযাত্রী- সবারি এক অবস্থা। সেই মুহূর্তে আমরা বিভিন্ন দেশের মানুষ সবাই একাগ্রচিত্তে এই অপূর্ব বাগানের এবং তৎসংলগ্ন প্রকৃতির মেলবন্ধন দেখতে দেখতে আত্মমগ্ন হলাম।    তেনরিউজি মন্দির থেকে বেরিয়েই একটি বাঁশবাগান-দুপাশে সারি সারি বাঁশগাছ- তার মাঝখান দিয়ে পায়ে হাঁটা মাটির পথ। মন্দির থেকে বেরিয়েই এই ছায়ায় ঢাকা সেই ঠান্ডা মনোরম বাঁশবাগান আমাদের মনে গভীর প্রশান্তি এনে দিল। ফেরার পথে আমরা আরো দুটি বৌদ্ধমন্দির দেখলাম- হোরিনজি ও তেনবুজি। দুটিই আমাদের বেশ ভালো লাগল।


নারা
৭১০-৭৮৪ খৃষ্টাব্দ অবধি, কিয়োতো রাজধানী হবারও আগে, জাপানের রাজধানী ছিল নারা। শহরটি কিয়োতো থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে।কিয়োতোতে রাজধানী স্থানান্তরিত হবার পর নারা রাজনৈতিক গুরুত্ব হারিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ঐতিহাসিক সম্পদ সংরক্ষিত ছিল দীর্ঘদিন ধরে।তাইতো আমাদের মতো পর্যটকরা উপভোগ করি এদের মন্দিরের ও মিউসিয়ামের সংরক্ষিত সম্পদ।
নারাতে আমরা দেখতে পাই ভারতবর্ষ থেকে আগত বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন চিহ্ন, চীনের তাং সাম্রাজ্যের ও কোরিয়ার স্থাপত্য, গ্রীস, টার্কি ও পারস্য থেকে আসা শিল্পকলার সম্ভার।তৎকালীন চীন ও কোরিয়া থেকে জাপানে এসেছিলবৌদ্ধধর্ম।এখানে বৌদ্ধধর্মের প্রতীক বা চিহ্নের ব্যাবহার দেখতে পাই মন্ডলার মধ্যে। মন্ডলার উল্লেখ করেছি আগের লেখায়-কিয়োতোর তোজি মন্দিরে।মণ্ডলা হল ২১টি মূর্তির সমষ্টি। মাঝখানে বুদ্ধ, দুইপাশে দুই বোধিসত্ত্ব (যাঁরা নির্বাণলাভ না করে মানুষের সেবার জন্য নিযুক্ত), আটজন মিয়ো বা বিচক্ষণ রাজা- যাঁরা জনগণকে কঠোর সংযমের সাহায্যে পরিচালিত করেন, দশজন তেন্বু বা রক্ষক- যাঁরা বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব ও মিয়োদের রক্ষা করেন।
এখানেও আমরা দেখতে পাই সেই প্রতীকী মন্ডলা। মন্দিরের মধ্যে মূর্তিসমুহের সাজানো অথবা মন্দিরপ্রাংগনে সাজানো বাড়ীগুলির মধ্যে।পুরোনো নারা শহর তৈরী হয়েছিল প্রাচীন চৈনিক সাম্রাজ্যের শহরের অনুকরণে। যেমন শহরের মধ্যস্থলে স্যাকরেড স্কোয়ার বা পবিত্র স্থান, প্রধানতঃ রাজপ্রাসাদের অবস্থান - যেখান থেকে রাস্তাগুলি বেরিয়ে গেছে তারের জালির মতো।শহরের এই প্ল্যান আমরা আগেও দেখেছি কিয়োতো শহরে। কালের প্রভাবে এবং অযত্নে আস্তে আস্তে প্রাসাদগুলি হারিয়ে গেছে নারায়। শহরের উত্তর পূর্বদিকের বৌদ্ধ ও শিন্তো মন্দিরগুলি রয়ে গেছে। শহরের এক কোনে নারা পার্ক। এখানে অসংখ্য হরিণ দেখতে পাওয়া যায়।

নারাপার্কের হরিণ

এরা নারা পার্কের বিশিষ্ট দ্রষ্টব্য - পরিচয়ে জাপানী হরিণ- লালের ওপর সাদা ছোপ। প্রায় ১২০০ হরিণ আছে এই পার্ক ও সংলগ্ন এলাকায়। হরিণ এই শহরের পবিত্র প্রাণী-কোনো ক্ষতি করা চলবে না। এদের খাওয়ানোর জন্য বিস্কুট কিনতে পাওয়া যায়। দেখলাম সবাই সেইগুলি হরিণদের খাওয়াচ্ছে। হরিণদের কোনো ভয় নেই- তারা দিব্যি কাছে এসে সেইগুলি খাচ্ছে আর আরও পাবার প্রত্যাশায় কাছাকাছি ঘুরঘুর করছে।আমাদের পেনসিলভানিয়ার হরিণরা রাস্তা পেরোবার সময় গাড়ী দেখলে থমকে যায় এবং তড়িঘড়ি করে পালিয়ে যায়। নারার হরিণগুলি অন্যরকম, ভয় তো পায়ই না- বরং গাড়ী দাঁড়িয়ে পড়ে এরা রাস্তা পেরোলে! অবশ্য শহর থেকে সতর্কীকরণ করা হয়েছে- এরা পোষ্য হলেও প্রধানত: বন্য প্রানী-এদের বেশী কাছে না যেতে বা গায়ে হাত না দিতে। হরিণদের নিয়ে একটি গল্প আছে। কথিত আছে এক শিন্তো দেবী “তাকেমিকাজুচি-নো-মিকোতো” (বিখ্যাত নারাস্থিত “কাসুগা তাইসা” মন্দিরের চার দেবীর একজন)এক সাদা হরিণে চড়ে অনেক দূরের হিতাচি অঞ্চল থেকে নারাতে এসেছিলেন। তখন থেকেই যত হরিণ কাসুগা পাহাড়ে (অধুনা নারা পার্কের অন্তর্গত) ঘুরে বেড়ায় তারা সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে।হরিণরা আপাততঃ “জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদ”- অনিষ্টকারীদের ঘোরতর শাস্তি হবে। নারাবাসীদের হরিণপ্রীতির নিদর্শন হল এই শহরের ম্যাস্‌কট্‌ “শেনতো-কুন”-ছোট্ট বুদ্ধ মাথায় হরিণের শিং। ভারী মিষ্টি দেখতে। 

শেনতো-কুন, নারা শহরের ম্যাসকট

স্টেশনের পাশেই বৌদ্ধমন্দির- কোফুকুজি। প্রায় ৫০০ বছর ফুজিয়ারা গোষ্ঠীর অভিভাবকত্বে এই মন্দিরে দুটি প্যাগোডা তৈরী হয়েছিল। তিনতলা ও পাঁচতলা প্যাগোডা। কোফুকুজি মন্দিরের পাশেই “নারা জাতীয় মিউজিয়াম”। এর ইষ্ট গ্যালারী বিশেষ দ্রষ্টব্য। তোডাইজি মন্দিরের অনেক মূর্তি ও শিল্পকলা যা মন্দিরে জনসাধারণের চোখের আড়ালে থাকে, সেগুলি এই গ্যালারীতে প্রদর্শিত হয় আক্টোবর-নভেম্বর মাসে। স্বচক্ষে না দেখলেও অনুভব করতে পারি,- কি অসাধারণ হয় সেই প্রদর্শনী।

ওসাকা দুর্গে ঢোকার পথে

রিওকান

জুতো পরে তাতামি ম্যাটে ওঠা নিষেধ। জুতো খুলে খালি পায়ে বা মোজা পরে হাঁটাচলা করা যেতে পারে। ম্যাটের বাইরে মেঝেতে পরার চপ্পল আছে। বাথরুমের মধ্যে পরার আলাদা চপ্পল। সেই চপ্পল বাথরুমের বাইরে বার করা চলবে না। ঘরের চপ্পল বাথরুমে ঢুকবে না। আমরা হোটেলের দেওয়া য়ুকাতা পরে ডিনারে বসলাম। খাবার পরিবেশন করলেন আমাদের ঘরের জন্য নিযুক্ত পরিচারিকা দুজন। প্রথমে এল সুপ, তারপর একে একে প্রায় চারপ্রস্থ খাবার। প্রত্যেকবার আগের পাত্র তুলে নিয়ে গিয়ে নতুন পাত্রে খাবার আসছে। বেশিরভাগই কাঁচের বাসন, বিভিন্ন আকার ও আয়তনের। আর খাবার? প্রথমে টেম্পুরা, তারপর সুসি, সাসামি, ভাত, টোফু, নানারকমের সবজী।সযত্ন পরিবেশন। কোনো খাবার একটু উপেক্ষা করলেই নম্র স্বরে প্রশ্ন “খাবার কি ভালো হয়নি?” ভরপেট খেয়ে তবেই আমাদের ছুটি মিলল। 

       চান করে লোকে খায়। এখানে খাওয়ার পরই আমরা গেলাম “অনসেন” বা উস্নপ্রস্রবনে চান করতে। আমাদের অনুরোধে একটি প্রাইভেট অনসেন বুক করা হয়েছে। একটি বড় কাঠের চৌবাচ্চা, তাতে রয়েছে গরমজল। বেশ গরম!নামার আগে ভালো করে চান করে পরিস্কার হয়ে এই জলে নামতে হয়।ধীরে ধীরে গায়ে সইয়ে গরমজলে গা ডোবালাম- আস্তে আস্তে গরমজল অভ্যেস হয়ে গেল- বেশ আরাম লাগছিল। একটু বাদে উঠে পড়লাম। ঘরে ফিরে দেখি মেঝেতে ফুটন পেতে বিছানা করে দিয়ে গেছেন পরিচারিকা। বিছানায় শুতেই ঘুম। এক্কেবারে সকাল ঘুম ভাঙলো। তড়িঘড়ি করে প্রস্তুত হয়ে জাপানী প্রথায় তৈরী জলখাবার খেতে গেলাম নীচে। খাবার ঘরে অনেক টেবিল চেয়ার পাতা। আমাদের জন্য নির্দিষ্ট টেবিলে গিয়ে বসলাম। জাপানী জলখাবার হল মিশো সুপ, গ্রিল করা মাছ, ভাত, টোফু ইত্যাদি। আবার সেই তিন-চার প্রস্থ খাবার। রান্নার স্বাদ আর পরিবেশনা দেখলে বোঝা যায় কতটা ভাবনা চিন্তা করে খাদ্যদ্রব্যগুলি প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু সকালে এত খাওয়ার অভ্যেস নেই- তাই সব খেতে পারলাম না। আবার সেই নম্র কন্ঠে ভীতিপ্রদ প্রশ্ন “রান্না কি ভালো হয় নি?” সে এক রীতিমতো লজ্জার বিষয়! একসময় উঠে পড়তে হল। এই অদ্ভুতসুন্দর যত্নময় পরিবেশ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম ওসাকার উদ্দেশে। 

ওসাকা
ষষ্ঠ শতাব্দীতে সম্রাট কোতোকু ওসাকাতে সাম্রাজ্যের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করে। তখন নাম ছিল নানিও।নয় নয় করে প্রায় নয় বছর রাজধানী ছিল এখানে।  তারপরই, পরবর্তী সম্রাটের সময়, রাজধানী স্থানান্তরিত হয় অন্য শহরে। কিন্তু ততদিনে ওসাকার উন্নতির শুরু হয়ে গেছে। সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতায় ওসাকা বাণিজ্যের এক অন্যতম নগরীতে প্রতিষ্ঠিত হয়। সমুদ্রপথের নিকটবর্তী হওয়ায় শুধুমাত্র বাণিজ্য নয়, বৌদ্ধধর্ম সহ সামগ্রিক চৈনিক প্রভাব জলপথে এসে পড়ল জাপানী সভ্যতায়। সেখান থেকে  রাজধানী নারা- ক্রমে ক্রমে সমগ্র জাপানে ছড়িয়ে পড়েছিল।
কিয়োতো ও নারার পর ওসাকাতে এলে মনে হয় পুরোনো জাপান থেকে বর্তমান জাপানে এসে পড়লাম।অত্যাধুনিক জাপানের সবকিছু আকর্ষণ সেখানে উপস্থিত।ওসাকা “কানসাই অঞ্চলের” প্রধান কেন্দ্র মূলত: বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে।বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার এবং উন্নত প্রযুক্তি শিল্পের কেন্দ্রস্থল ওসাকা জাপানের তৃতীয় জনবহুল শহর। এখানকার খাবার, মাটির নীচের শপিং সেন্টার, দুর্গ, বন্দর, বানরাকু পুতুলনাচের জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও একোয়ারিয়াম এবং ইউনিভার্সাল স্টুডিও জনপ্রিয়।
নারা থেকে ট্রেনে যখন ওসাকা পৌঁছলাম, তখন রোদের তাপ তীব্র। কিন্তু মেয়ের স্থির সিদ্ধান্ত, ওসাকা দুর্গ দেখব।অগত্যা!হোটেলে একটু বিশ্রাম সেরেই সেই প্রচন্ড গরমের মধ্যেই যাত্রা শুরু- ওসাকা দুর্গের উদ্দেশে।

চেরী গাছ দিয়ে সাজানো একটি পার্ক, তার মধ্যেই দুর্গ।দুর্গের চারপাশে পাথরের দেওয়াল দেওয়া পরিখা। ফেরো কংক্রিট দিয়ে তৈরী বর্তমান দুর্গটির মেরামত হয় ১৯৯৭ সালে।কপারের ছাদ, কালো ও সোনালী অলংকরণ এবং বিশাল পাথরের দেওয়াল নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।আগের থেকে আকারে অনেক ছোটো-তবুও অধুনা দুর্গটি দেখতে ভারী সুন্দর।এখন দুর্গ প্রধানত: একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ মিউজিয়াম।
দুর্গের ইতিহাস যা জানা যায়,- এই দুর্গ তৈরী করান যোদ্ধা রাজা তয়োতমি হিদেহসি ১৫৯০ খৃষ্টাব্দে। সম্রাট তয়োতমিই প্রথম ওসাকাকে বাণিজ্য নগরী হিসেবে চিহ্নিত করেন।তখন নিকটবর্তী কিয়োতোতে অনেক ক্ষমতালোভী যোদ্ধাগোষ্ঠী মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।এদের সঙ্গে তয়োতমির ঝামেলা লেগেই থাকত। এদের মধ্যেই এক গোষ্ঠীর নেতা তোকুগাওয়া লেয়েসু তয়োতমির মৃত্যুর পর তার সৈন্যদের এবং অন্যান্য গোষ্ঠীদের পরাজিত করে তয়োতমির সাম্রাজ্য ধ্বংস করেন ১৬০০ খৃষ্টাব্দে বিখ্যাত সেকিগাহারা যুদ্ধে। ধীরে ধীরে রাজধানী হিসেবে ওসাকার ক্ষমতালুপ্ত হল কারণ লেয়েসু রাজধানী স্থানান্তরিত করেন ইডোতে (বর্তমানে টোকিও) ১৬০৩ খৃষ্টাব্দে। এসত্তেও ওসাকা কিন্তু বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে থেকে যায়।
দুর্গ-মিউজিয়ামে দেখলাম একটি ফোল্ডিং স্ক্রিনের ওপর বিখ্যাত সেকিগাহারা যুদ্ধের আঁকা ছবি,তাতে অপূর্ব ডিটেলের কাজ। এছাড়াও আছে সম্রাট তয়োতমির সোনালী চা-পান কক্ষ, সামুরাই যোদ্ধাদের যুদ্ধের বর্ম, অস্ত্র ইত্যাদি।তয়োতমি ও তোকুগাওয়ার মধ্যে আদানপ্রদান হওয়া হাতে লেখা অনেক বার্তা সুন্দর করে সংরক্ষিত আছে। তখনকার দিনে হাতে লেখা চিঠি সম্রাটের সীল দিয়ে প্রেরিত হত বার্তাবাহকের মাধ্যমে। চিঠিপত্রের পরিমাণ দেখে মনে হল সম্রাট ও  অন্যান্য গোষ্ঠীপতিরা দিনের বেশীরভাগ সময় ব্যয় করতেন রাজনৈতিক চাল দিতে এবং পত্র আদানপ্রদান করতে।এগুলি সবই তয়োতমি হিদেহসির সময়কার রাজকীয় জীবনযাত্রা, রাজনীতি এবং সেই সময়কার জাপানের পরিচয় বহন করছে।
দুর্গের একদম ওপরতলার একটি ঘর - তার চারদিকে কাঁচের জানলা দিয়ে গোটা ওসাকা শহরকে দেখতে পাওয়া যায়। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, ইতিহাসকে পাশে রেখে দূর থেকে বর্তমানকে দেখা। 

ওসাকা দুর্গ থেকে বেরিয়ে আমরা পার্কের মধ্যে দিয়ে বরফঠান্ডা মাচা চায়ের স্বাদ নিতে নিতে হোটেলে ফিরে এলাম।আপাতত: জাপান ভ্রমণ সমাপ্ত। 
পরেরদিন সকালেই আমাদের প্লেন,- কানসাই এয়ারপোর্ট থেকে ভ্যানকুভারের পথে। টরোন্টো হয়ে পিটস্‌বার্গে নিজের বাড়িতে ফিরে এলাম। একটি অদ্ভুত সুন্দর দেশ, তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার অদম্য প্রচেষ্টা, সুন্দর ও নিয়ামানুবর্তিতার প্রতি দুর্দান্ত ভালোবাসা, তাকে লালন-পালন করার সুদৃঢ় প্রচেষ্টা – এই সবই রয়ে গেল স্মৃতিতে। আশা রইল আবার কখনো যেতে পারবো – অনেক কিছুই যে রয়ে গেল বাকি। 
কৃতজ্ঞতা স্বীকার- পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, নেশায় লেখক শ্রী ভাস্কর বসু- এই লেখাটি ডিটেলে পড়ে মতামত জানানোর জন্য যাতে আরো উন্নতমানের করা যায়।

ওসাকা দুর্গ

ব্রিটিশদের দেশে

কয়েকদিন

শর্মিষ্ঠা ভট্টাচার্য্য

নেদারল্যান্ড

বাকিংহাম প্যালেসের দৃশ্য

      ইংল্যান্ডের নাম শুনলেই সবার আগে মনে আসে লন্ডন শহরের ছবি। তবে এই জনপ্রিয় লন্ডন শহর ছাড়াও আরো অনেক আকর্ষণীয় এবং প্রসিদ্ধ জায়গা আছে ইংল্যান্ডে – যেমন উত্তরের দিকে বারমিংহাম, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার, কেমব্রিজ শহর; মধ্যভাগে অক্সফোর্ড, ব্রিস্টল, বাথ; আর দক্ষিণের দিকে সালিসবেরি, ব্রাইটন ইত্যাদি শহর। প্রায় প্রতিটি শহরেই আছে ঐতিহ্যশালী যাদুঘর আর প্রাচীন অভিজাত অট্টালিকা সমূহ যেইগুলো ইংল্যান্ডের সমৃদ্ধশালী সভ্যতার এবং রাজকীয় গরিমার স্মারক। আবার এইসব বেশীরভাগ শহরে রয়েছে জগৎবিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে নানা দেশ বিদেশের শিক্ষার্থী, গবেষক আর অধ্যাপকদের সমাবেশ। ইংল্যান্ডের আরও একটি অতি জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট গন্তবস্থল হোল “স্টোন হেঞ্জ” যেইটি প্রায় ৫০০০ বছরের পুরনো, কিন্তু এখনো সদর্পে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন বহন করে স্বকীয় মহিমায় দণ্ডায়মান। গ্রেট ব্রিটেন মূলত বৃষ্টি প্রধান শীতল দেশ। তাই প্রাকৃতিক নিয়মেই সবুজ বনানীর প্রাচুর্য এই দেশে। জনবহুল শহর ছাড়িয়ে নির্জন গ্রামের দিকে “লং ড্রাইভ” নিয়ে বেড়াতে গেলে এই দেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের রস উপভোগ করা যাবে- আর মনে পরবে বিখ্যাত ইংরেজ কবিদের লিখে যাওয়া সব কবিতার লাইন। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অতুল সম্ভার নিয়ে স্কটল্যান্ড এর সীমানা ছুঁয়ে সুসজ্জিত আছে দৃষ্টিনন্দন উইনডারম্যার অঞ্চল।

    বিগত উনিবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের ধনী ব্যবসায়ীদের অনেকেরই লক্ষ্য ছিল এই লেক ডিস্ট্রিক্ট অঞ্চলটিতে প্রাসাদোপম বাড়ি অথবা ক্যাসেল বানানোর। পরবর্তীকালে অবশ্য এইরকম বাড়িগুলোর অধিকাংশই হোটেলে পরিবর্তিত হয়েছে। আর ক্যাসেলগুলো টুরিস্টদের পরিদর্শনের তালিকাভুক্ত হয়েছে। এইরকমই একটি ক্যাসেল হল ওয়ারী ক্যাসেল, যেইটি বর্তমানে ন্যাশানাল ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত। এই ক্যাসেলটি গথিক শিল্পের নিদর্শন এবং নির্মিত হয়েছে একেবারে আসল ক্যাসেলের আদলে – যেমন এই ক্যাসেলটিতেও আছে চূড়া, গম্বুজ, দুর্গ, সাধারন এলাকা, এবং গুপ্ত জায়গা ইত্যাদি। 

  গ্রেট ব্রিটেনের বহু প্রখ্যাত লেখক লেখিকা এই উইনডারম্যার অঞ্চলটির স্বর্গীয় প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। বিশেষত উনিবিংশ শতাব্দীর রোমান্টিক লেখক-কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ, থমাস ডি কুইন্সি এবং জন রাস্কিন এই লেক ডিস্ট্রিক্টের রূপে গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁদের সৃষ্টিশীল রচনাতে উইনডারম্যার অঞ্চলটির সৌন্দর্যের ছবি বারংবার ফুটে উঠেছে। 

    উইনডারম্যারের প্রাকৃতিক রূপে মন ভরিয়ে আমরা চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য লিভারপুল শহরে। এই শহরটি অ্যাটলান্টিক এর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। সমুদ্রের তটে বেড়ে উঠা এই বন্দর-শহর ইংল্যান্ডের অন্যতম প্রধান ব্যবসাহিক কেন্দ্র হলেও, এই শহরের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বও যথেষ্ট বেশী।

 
Church.png

সালিসবেরি চার্চ

- বিখ্যাত শিপ স্ট্রিটের জেসাস কলেজ

    গত দু’বছর আগে আমরা গরমের ছুটিতে ৭ দিনের জন্যে বেড়াতে গেলাম ইংল্যান্ডের এইরকম কয়েকটি জায়গায়। হল্যান্ড থেকে জাহাজে করে নর্থ সি এর কোলে ভেসে এক রাত্রির সমুদ্র ভ্রমণে পৌঁছিয়ে গেলাম গ্রেট ব্রিটেনের হারউয়িচ বন্দরে। নর্থ সি হোল অ্যাটলান্টিক মহাসমুদ্রের অংশ এবং অপেক্ষাকৃত কম উত্তাল। সেই কারণে এই সমুদ্র ভ্রমণ বেশ আরামদায়ক, রোম্যান্টিক এবং অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতা। বিলাসের সব বন্দোব্যবস্থাই আছে এই সমুদ্রযাত্রায়। মজার ব্যাপার হোল জাহাজে করে নিজেদের গাড়িও সাথে করে নিয়ে আসার ব্যবস্থা আছে এই সমুদ্র যাত্রায়। পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশেই নিজেদের সঙ্গে গাড়ি থাকলে অথবা গাড়ি ভাড়া করে নিজেরা ড্রাইভ করলে ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়ানো অনেক বেশি সুবিধের। খুব সকালে পৌঁছিয়ে গেলাম ইংল্যান্ডের হারউয়িচ শহরের সমুদ্র বন্দরে। জাহাজ থেকে নেমে প্রথমেই রাস্তাতে প্রাতরাশ সেরে আমরা চললাম সালিসবেরি শহর দেখতে।

সালিসবেরি ক্যাথিড্রালের অভ্যন্তর

     সেদিন সকাল থেকেই অঝরে বৃষ্টি, তাই পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানোর মজাটা কিছুটা কম হলেও আনন্দের ঘাটতি তেমন হল না। সালিসবেরি পৌঁছিয়ে প্রথমেই গেলাম বিখ্যাত গথিক স্থাপত্যের আদলে তৈরি ক্যাথিড্রাল চার্চ আর ম্যাগনা কারটা দেখতে। এই চার্চটি প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো এবং আদি ব্রিটিশ স্থাপত্যের সেরা শিল্পকর্ম হিসাবে বিশেষ সমাদৃত। গির্জাটির চূড়াতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম অতি পুরাতন যন্ত্রচালিত বিপুলাকার ঘড়ি যেইটি এখনো কার্যরত। এই ক্যাথিড্রালে সংগৃহীত রয়েছে “ম্যাগনা কার্টা” চুক্তি যা ১২১৫ সালে স্বাক্ষরিত হয়। ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে ম্যাগনা কার্টা চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই চুক্তি অনুযায়ী দেশের রাজা প্রতিনিধি স্থানীয় লোকদের অনুমোদন ছাড়া দেশের নাগরিকদের কারোর স্বাধীনতায় বা সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এই চুক্তির সুপ্রভাব শুধু ইংল্যান্ডেই নয়, অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছিলো। বিচার বিভাগ অনেকটা নিরপেক্ষ হয়ে উঠেছিলো এই ম্যাগনা কার্টা চুক্তিটির কারনে। বর্তমান যুগেও এইটি ইংল্যান্ডের অন্যতম সাংবিধানিক দলিল হিসাবে ব্যবহিত হয়ে থাকে।

ম্যাগনা কার্টা চুক্তি

    সালিসবেরি শহর থেকে আমরা চললাম স্টোন হেঞ্জ দেখতে। এই প্রাগৌতিহাসিক স্তম্ভগুলো নির্মিত হয়েছে নিওলিথিক এবং ব্রোঞ্জ যুগে। এই স্তম্ভগুল সেই যুগে মানমন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং আধ্যাত্মিক চর্চা ও আনুষ্ঠানিক কার্য উপলক্ষে ব্যবহিত হতো বলে ধারণা করা হয়। অন্য তথ্য অনুযায়ী এই স্থানটি এক সময় কবরস্থান হিসাবেও ব্যবহৃত হতো। এই স্তম্ভগুলো ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ারের অ্যামাসবারির নিকটে অবস্থিত, যার দূরত্ব লন্ডন শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার। স্টোনহেঞ্জ নির্মিত হয়েছে বৃত্তাকারে দণ্ডায়মান বিশালাকার প্রস্থরখণ্ড দিয়ে এবং এইটির গঠনও বেশ জটিল। প্রতিটি দাঁড়ানো পাথর প্রায় ৪ মিটার উচ্চতায়; ২,১ মিটার প্রস্থে এবং ২৫ টন ওজনের। কথিত আছে যে এই পাথরগুলো সেই যুগে ওয়েলসের প্রেসেলি পাহাড় থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরত্ব বহন করে আনা হয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন এই স্তম্ভগুলো নির্মিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ বিসি থেকে ২০০০ বিসি সময়ের মধ্যে। আধুনিক যুগে  স্টোনহেঞ্জ অতীতের প্রাচীন কৃতিত্বের একটি শক্তিশালী স্মারক। বর্তমান সময়ে এই অঞ্চলটির অপূর্ব স্থাপত্য শিল্পগুলি বিভিন্ন গ্রন্থে, সঙ্গীত এবং চলচ্চিত্রে অনেক ব্যবহৃত হয়। ১৯৮৬ সালে ইউনিস্কো এই জায়গাটি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে। আর সেই সময় থেকেই ব্রিটিশ সরকার টুরিস্টদের অডিও গাইড সমেত এই স্থানটি পরিদর্শন করার জন্য বিশেষ অনুমতি দিয়েছে।

লন্ডন শহরের প্রতীক বিগ বেন

    স্টোন হেঞ্জ দেখে আমরা চললাম অক্সফোর্ড শহরের উদ্দেশ্যে। শেষ বেলার আলোতে প্রথম দেখলাম অক্সফোর্ড শহরকে। অভিজাত স্থাপত্যের ঐতিহ্য আর রাজকীয় মহিমার গরিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই অতি প্রাচীন শহরটি। অক্সফোর্ড শহরটি মূলত প্রসিদ্ধ এখানকার মহাবিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জগত জোড়া খ্যাতির জন্য। পুরো শহর জুড়ে ছড়িয়ে আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত নানা কলেজ, নানা বইয়ের দোকান আর প্রচুর ছোটো বড় কফিশপ। এই কফিশপগুলোতে খুব জনপ্রিয় “হাই টি” এর জন্য – যার অর্থ হোল চা অথবা কফির সাথে কেক বা প্যাসট্রি খাওয়া। কিছু কফিশপ দেখলে আমাদের কলেজস্ট্রীটের কফিহাউস এর ছবি মনে আসবে- যেখানে চলে কফির সাথে নানারকম আধুনিক ভাবনার চর্চা আর নতুন আবিষ্কারের অঙ্কুর। অক্সফোর্ড শহরে ছাদখোলা দোতালা বাস করে ঘোরা অথবা পায়ে হেঁটে কলেজ ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ানো বেশ জনপ্রিয়।  

ছাd খোলা দোতালা বাস

     অক্সফোর্ড শহরের অন্যতম আরও একটি আকর্ষণ হল বিখ্যাত সিনেমা হ্যারি-পটার এর শুটিং স্থল। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির যেই কলেজগুলো এই ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে সেইগুলোই বিশেষত জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পট। কিছু কলেজ প্রায় ৮০০-৯০০ বছরের ঐতিহ্য কাঁধে বহন করে এখনও স্বকীয় মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া আছে বিখ্যাত আসমেলিয়ান মিউজিয়াম যেইটি ব্রিটেনের সবচেয়ে পুরনো যাদুঘর। এই মিউজিয়ামটি বিশেষত জনসাধারণের জন্যই বানানো হয়েছিলো ১৬৮৩ শতাব্দীতে। এখানে সংরক্ষিত আছে অনেক মিশরীয় মমি, শাস্ত্রীয় ভাস্কর্য, প্রত্নতত্ত্ব এবং বিশ্বের প্রসিদ্ধ কলাকারদের চিত্রকলা ও শিল্পকর্ম। এই যাদুঘরটি জিজ্ঞাসা পিপাসু গবেষকদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত এখানকার অতুলনীয় দুর্লভ সংগ্রহগুলির কারণে।

আসমেলিয়ান মিউজিয়াম

খ্রিষ্ট-চার্চ কলেজের প্রবেশদ্বার

হ্যারি-পটার ছবির শুটিং স্পট

ওয়েস্ট মিনিস্টার আবে

castle.png

ওয়ারী ক্যাসেল

উইনডারম্যার লেকের কয়েকটি ছবি

   লিভারপুল শহরে রয়েছে অনেকগুলি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধশালী স্থাপত্যের নিদর্শন, যেইগুলি ইউনিস্কো বিশ্বের ঐতিহ্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই শহরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ন্যাশানাল মিউজিয়াম এবং আর্ট গ্যালারি, আর্কিটেকচারের উদাহরণ স্বরূপ রয়েছে লিভারপুল ক্যাথেড্রাল, সেন্ট জর্জ'স হল, রয়েল লিভার বিল্ডিং, ওরিয়েল চেম্বার্স, বিশ্বের প্রথম মেটাল ফ্রেমযুক্ত গ্লাস পর্দার দেওয়াল বিল্ডিং এবং ওয়েস্ট টাওয়ার। গত ২০০৪ সালে লিভারপুল ইউরোপের “সংস্কৃতির রাজধানী” শহরের শিরোপায় ভূষিত হয়।

ন্যাশানাল মিউজিয়াম

আর্ট গ্যালারি

ওয়েস্ট টাওয়ার

    ইংল্যান্ডের আরও একটি বড় শহর হোল বারমিংহাম যেইটি বোধকরি প্রবাসী ভারতীয়দের প্রথম পছন্দের বাসস্থানের জায়গা। এই শহরটি লন্ডন থেকে গাড়িতে প্রায় ২ ঘণ্টার পথ। এই শহরে ঢোকার মুখেই স্থানীয় রেডিওতে বেজে উঠলো হিন্দি গানের সুর। শহরের কিছু অঞ্চলের জনপথে দেখা যাবে সারি সারি ভারতীয় দোকানের স্টল, রাস্তায় মিলবে ভারতের জনপ্রিয় মিষ্টি এবং মজাদার মুখরোচক স্ন্যাক্সের সম্ভার। এই শহরের বুকে রয়েছে অসংখ্য প্রবাসী ভারতীয় এবং পাকিস্তানী মানুষের বাস, তাই অলিতে গলিতে পাওয়া যাবে ভারতীয় রেস্টুরেন্ট এবং দেশী জিনিসের সামগ্রীর দোকান। বারমিংহাম শহরের কিছু রাস্তায় চলতে চলতে মনে হবে ভারতেরই কোনও শহরতলীতে হেঁটে বেড়াচ্ছি। তবে এই শহরের কেন্দ্রস্থলও ইংল্যান্ডের অন্য শহরের মতোই সাজানো গোছানো, দেখা যাবে লাল রঙের দোতালা বাস, লাল রঙের টেলিফোন বুথ, অসংখ্য ফিশ-চিপ্সের দোকান, আর ঐতিহ্যশালী বাড়িঘর। বারমিংহাম শহরের আরও একটি ব্যাপার যা মন ছুঁয়ে যাবে সেটি হোল একই শহরে পাশাপাশি অবস্থান করছে হিন্দুদের উপাসনার মন্দির, মুসলমানদের মসজিদ, শিখদের গুরুদ্বারা আর খ্রীষ্টানদের গির্জা। ইউরোপের একমাত্র শ্রী ভেঙ্কটেসশ্বরা মন্দিরও রয়েছে এই শহরে যেটি তিরুপতি মন্দিরের আদলে তৈরি। তাই প্রবাসী ভারতীয়রা দেশের সব স্বাদই পাবে এই বারমিংহাম শহরে।

বারমিংহাম শহরের ছবি

খ্রিষ্ট-চার্চ কলেজ

     একরাত্রি এই শহরে কাটিয়ে আমরা চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে। অক্সফোর্ড শহর থেকে লেক ডিস্ট্রিক্ট এর উইনডারম্যার অঞ্চলটি বেশ অনেকটাই পথ। প্রায় ঘণ্টা পাঁচ গাড়ির যাত্রায় পৌঁছানো যাবে এই অপূর্ব সুন্দর লেক ডিস্ট্রিক্ট এর শহরতলিতে।  উইনডারম্যার লেকের কোল ঘেঁষে স্কটল্যান্ড এর সীমানা ছুঁয়ে ছড়িয়ে আছে এই দৃষ্টিনন্দনীয় লেক ডিস্ট্রিক্ট জায়গাটি। আর এই উইনডারম্যার লেকটি হোল ইংল্যান্ডের বৃহত্তম প্রাকৃতিক হ্রদ, যেইটি ১০,৫ মাইল দীর্ঘ এবং এক মাইল চওড়া। বাওনেস-অন-উইনডারম্যার হোল লেক ডিস্ট্রিক্ট এর সবচেয়ে জনপ্রিয় টুরিস্ট গন্তব্য যেখানে বিশেষত গরমের ছুটির মরশুমে বিভিন্ন রকমের নৌকায় জলভ্রমণের অফুরন্ত সুযোগ আছে। শোনা যায় যে এখানে অন্তত ১০,০০০ নৌকো সরকারী তালিকাভুক্ত আছে যেইগুলো প্রতি বছর এই দীঘির উপর ভাসমান হয়। পুরো অঞ্চলটির স্নিগ্ধতা, ছোটো-বড় উঁচু-নিচু পাহাড়ি উপত্যকা আর সবুজ বনানীর সৌন্দর্য, বিহঙ্গের কাকলি ধ্বনি মনে এনে দেবে অপার শান্তির আস্বাদ।   

প্যালেস অফ ওয়েস্ট মিনিস্টার

ট্রাফেলগার স্কোয়ারের ময়দান

স্টোন হেঞ্জ

শেক্সপীয়ার হাউস

বারমিংহামের শ্রী ভেঙ্কটেসশ্বরা মন্দির

    আমাদের এই যাত্রায় শেষ গন্তব্য ছিল বিখ্যাত লন্ডন শহর। মায়াময়ী থেমস নদী, পার্লামেন্ট হল “প্যালেস অফ ওয়েস্ট মিনিস্টার”, বিগ বেন, রাজকীয় গির্জা “ওয়েস্ট মিনিস্টার আবে”, টাওয়ার ব্রিজ আর নানারকমের বিখ্যাত যাদুঘরের সম্ভারে সাজানো সেই লন্ডন শহর। এইটি বহু শতাব্দীর ঐতিহ্যময় রাজা-রানির দেশ, যাদের রাজপ্রাসাদ অভিজাত বাকিংহাম প্যালেস। এখানে চলে দিবারাত্রি সুসজ্জিত পাহারাদারের টহল। এই প্যালেসের খুব নিকটে আছে অতি পরিচিত হাইডে পার্ক। এই সুদৃশ্য পার্কটি পায়ে হেঁটে বেড়ানোর জন্য খুবই উপযোগী। চারিদিকে সবুজ বৃক্ষরাশি, সুগন্ধি পুষ্প, স্নিগ্ধ ঝিল, আর পাখীদের কুজনের সমাবেশে এই পার্কটি দারুণ মনোরম। লন্ডন শহরের এত কোলাহলের মাঝেও এই হাইডে পার্ক মনে এনে দেবে চিরকাঙ্ক্ষিত ঐশ্বরিক আনন্দ। এই শহরের আরও একটি অন্যতম আকর্ষণ হোল জগতবিখ্যাত লেখক-নাট্যকার শেক্সপীয়ারের স্মরণে তৈরি শেক্সপীয়ার হাউস তথা মিউজিয়াম। যেখানে সংরক্ষিত আছে এই জনপ্রিয় লেখকের রচিত গ্রন্থের পুঁথি, নাটকের লিপি এবং আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এর ঠিক পাশেই আছে থিয়েটার হাউস যেখানে প্রতিদিন শেক্সপীয়ার রচিত নাটকের প্রদর্শনী চলতে থাকে।

     লন্ডন শহরের সবচেয়ে রোমান্টিক দৃশ্য উপভোগ করতে হলে থেমস নদীর উপরের নৌকা ভ্রমণ অবশ্যই করতে হবে। অবশ্য যন্ত্রচালিত নাগরদোলা “লন্ডন আই” থেকেও দেখা যেতে পারে পুরো লন্ডন শহরের শোভা। আবার থেমস নদীর সীমানা ধরে হাঁটতে অথবা “হপ অন - হপ অফ” ছাদ খোলা দোতালা বাসে করে লন্ডন শহর ঘুরে বেড়াতেও বেশ মজা লাগবে। সারাদিন ঘোরার ফাঁকে খোলা আকাশের নিচে আরাম করে বসার জন্য আছে ট্রাফেলগার স্কোয়ারের ময়দান। এইটি জনসাধারণের জন্য বানানো জায়গা যেখানে সব মানুষজন বসে গল্প করে, নানারকম নামি-অনামি শিল্পীদের চিত্রকলা প্রদর্শন চলতে থাকে, কিছু শিল্পী সামান্য কিছু অর্থ উপার্জনের প্রয়াসে সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্র, নৃত্যকলা পরিবেশনও করতে থাকে। এই স্কোয়ারটি সাধারণ মানুষজন নানারকম প্রতিবাদ, মিছিল এবং সন্মিলনের জন্যও ব্যবহার করে থাকে। একদিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের ছবি আবার অন্যদিকে অপার ঐতিহ্য এবং রয়্যাল আভিজাত্যের সম্ভারে সমৃদ্ধ এই লন্ডন শহরের জাদু মনে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতির জন্ম দেয়। দেখে মনে হয় সারা পৃথিবী জুড়ে জনসাধারণের দিনলিপি আর রোজনামচা প্রায় একই রকম, তা সেই দেশ ইংল্যান্ডই হোক অথবা ইন্ডিয়া।

     ছোট বেলা থেকেই ইংল্যান্ড সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনে বড় হওয়া। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ সরকারের অধীনে থাকার এবং আমাদের দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের গল্প বারবার মনে ভেসে আসছিল এই ইংল্যান্ড সফরে। লন্ডনের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে রাখা কোহিনুর মণি স্মরণ করিয়ে দেয় ভারতবাসীদের উপর ব্রিটিশদের আধিপত্যের কথা। তাছাড়া সবচেয়ে যেটা লক্ষণীয় তা হোল ইউরোপের অন্য শহরগুলোর থেকে ইংল্যান্ড বেশ অনেক দিক দিয়েই আলাদা। যেমন এই দেশে যানবাহন চলে রাস্তার বাম দিক দিয়ে যেটি ইউরোপের অন্য শহরের তুলনায় একেবারেই বিপরীত দিক, আর আমাদের ভারতের জন্যে তা সঠিক দিক। আর ব্রিটিশরা চা পান করে দুধ আর চিনি মিশিয়ে, যা আমাদের অধিকাংশ ভারতীয়দের দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস কিন্তু ইউরোপের বাসিন্দাদের কাছে একেবারেই অনাকাঙ্খিত। আমাদের ভারতীয়দের জীবনযাত্রার মধ্যে ব্রিটিশ সভ্যতার যে সুদৃঢ় প্রভাব রয়েছে সেই কথাই বারবার মনে হচ্ছিল এই যাত্রার প্রতিটি মুহূর্তে।

হাইডে পার্ক থেকে বাকিংহাম প্যালেসের দৃশ্য

বিখ্যাত টাওয়ার ব্রিজ

 

Please mention the "name of the articles and the authors" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Maadhukari explores Bengali Literature Around The World