• দক্ষিনায়ণ - সনোজ চক্রবর্তী

  • বারানসীর ঘাটে ঘাটে - সনোজ চক্রবর্তী

  • একটি ভ্রমণ কাহিনী - সনোজ চক্রবর্তী

  • ফতেপুর সিক্রির আনাচে কানাচে - সনোজ চক্রবর্তী 

ভ্রমণ সঙ্গী - ৭

 

দক্ষিনায়ণ

মূর্ত্তিজি কি ধর্মভীরু? 

নাকি সে সত্যিকার সারথি! যে পথে মন্দির গিয়েছিলাম ফেরার সময় সে পথেই একটু এগিয়ে পথের বাঁ দিক ঘেঁষে দাঁড়াল গাড়িটা। গাড়ির জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি পথের বাঁ দিকে সাদা পাথর বাঁধানো একটা চত্বর তার ঠিক মাঝ বরাবর একটা বেদী। বেদীতে একটা ফলক।  ফলকে লেখা  The body of tippu sultan was found here....

  লিখেছেন... সনোজ চক্রবর্তী 

(পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা)

ছবিঃ সংগ্রহিত 

   লক্ষ্মীপুজোর রাতে চেপে বসলাম ১২৮৬৩ হাওড়া যশবন্তপুর ট্রেনে। গন্তব্য যশবন্তপুর। শরীর আজকাল আর মহাশয় নয়। তেলমশলা অনেক কাল ধরে বুক-পেট জ্বালাচ্ছিল গ্যাস-অম্বল-চোঁয়া ঢেঁকুর এমন সব নানান উপসর্গে। বেদনার বিরাম নেই। বপুর ক্রমবর্ধমান ভারে হাঁটুর হাঁসফাঁস দশা। বুক-পেট তো ছিলই, ব্যথা এখন বাসা বেঁধেছে হাঁটুতেও। পুজোর লম্বা ছুটিতে দক্ষিণে ডাক্তার দেখাতে বেরিয়ে পড়লাম।

এখানে!

এখানে পুজোর থিমে ডাক্তার ডাকাত হলে ভরসা তেরচাভাবে চায়। শুধু যে ডাক্তার দেখানোর জন্যই দক্ষিণযাত্রা তা নয়। এরই ফাঁকে খানিক দখিনা বাতাস মেখে নেওয়া যাবে। নাকি দক্ষিণভ্রমনের অবসরে কিঞ্চিৎ ডাক্তার দেখানো! সে তর্ক সাপেক্ষ।

      আমাদের ভ্রমণপথ বড় দীর্ঘ। ব্যাঙ্গালোর - মহীশূর -উটি - কুন্নুর - কোদাই - কন্যাকুমারী - রামেশ্বরম -মাদুরাই - ব্যাঙ্গালোর। প্রায় দু-হাজার পাঁচশ কিমি যাত্রাপথের সারথিটি বড় ভালো মানুষ। আটই অক্টোবর সকাল সকাল আমরা তৈরি। সকালের নরম ও উজ্জ্বল আলোকে হার মানিয়ে তার চেয়ে বেশি কোমল ও চকচকে হাসি মিশিয়ে গুডমর্নিং বলল মূর্ত্তি রাও। মূর্ত্তি রাও আমাদের দক্ষিণযাত্রার সারথি।

      মূর্ত্তিজি আদতে মারাঠি হলেও এখন আদ্যন্ত কর্ণাটকী। প্রশ্ন করলাম - "কত পুরুষ হল আপনারা চলে এসেছেন কর্ণাটকে?" কপালে ভাজের সংখ্যা বাড়ে কিন্তু তার হিসাব পায় না মূর্ত্তিজি।

   গাড়ি ছুটল মহীশূর রোড ধরে। ব্যাঙ্গালোর অনেকটা পাহাড়ি শহর। সমতল থেকে সাতশ আটশ মিটার উঁচু। সারা শহর জুড়ে বাড়িগুলো নানান উচ্চতায় ছড়ানো যেন ঢেউ খেলানো। বাড়িগুলোর এধরনের অবস্থানের জন্য একটু উঁচু থেকে দেখলে শহরটাকে বড় সুন্দর লাগে। যেন অট্টালিকার স্থাপত্য। রাস্তার দুপাশে নানা ধরনের ফুল পথকে আরো মোহময়ী করে তুলেছে।

    আমাদের কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল ফুল এখানে ওখানে আগুন ছড়িয়ে জেগে আছে। নাম জানতে চেষ্টা করেছিলাম, জানা যায় নি। হয়তো নাম না জানাটাই ওকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

একটা রেস্টুরেন্টে গাড়ি দাঁড় করাল মূর্ত্তিজি। রেস্টুরেন্টে থকথকে ভিড়। এখানকার ইডলি ধোসা দারুণ। কাউন্টারের সামনে নোটিস লটকানো-কন্নড় ও ইংরাজী ভাষায়-

"আজ বরিবার তাই টেবিলে খাওয়ার সার্ভ করার লোক নেই, নিজেকেই খাওয়ার কাউন্টার থেকে নিয়ে নিতে হবে "

সকালের টিফিন সেরে গরম চা নিয়ে গাড়ির সিটে ফিরে গেলাম। আবার ছুটল গাড়ি। একটু এগিয়ে সারি সারি পাহাড়, ঠিক পাহাড় নয় টিলার মতো। জায়গাটা সম্ভবত রামনগর।

মূর্ত্তিজি বলল এখানেই নাকি শোলে সিনেমার শুটিং হয়েছিল। কথাটা শুনে আমাদের উঁকি ঝুঁকি গেল বেড়ে। যে টিলাগুলোকে অবহেলা করছিলাম খানিক আগে, গাড়ি থামিয়ে সেগুলোই হল ক্যামেরা বন্দী। হঠাৎ চোখ চলে গেল গাড়ির জানালায়, দেখি বাবদা(আমার বছর ছয়ের ছেলে) দু'হাতের মুদ্রায় বন্ধুক তৈরি করে তাক করেছে আমাকে।

উঁচু টিলা থেকে যেন ভেসে এল গব্বরের কন্ঠ-

"আব গুলি খা।"

       ঘড়ির কাঁটা সকাল দশটা ছুঁইছুঁই পৌঁছলাম শ্রীরঙ্গপত্তনে। আমাদের ভ্রমণ শুরু হল মন্দির দর্শন করে।

শ্রীরঙ্গপত্তনে রয়েছে শ্রীরঙ্গনাথস্বামী মন্দির।

এ মন্দির নির্মাণ করেন গঙ্গারাজাদের গভর্নর থিরুমালায়। দক্ষিণী শৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরের ভাস্কর্যে ধরা পড়েছে বিষ্ণুর নানা অবতার। মূল বিগ্রহটি শ্রীরঙ্গনাথের। শ্রীরঙ্গনাথ আসলে দেবতা বিষ্ণু। বিষ্ণু এখানে কুনুইএর উপর ভর দিয়ে নিদ্রাভিভূত। শিরদেশে পঞ্চমুখী নাগের ছত্রছায়া। কালো পাথরে তৈরি মূর্তির সামনে দাঁড়ালে ভরসা ও ভয় দুই কেমন যেন আচ্ছন্ন করে ফেলে। বিশাল মন্দির ও তার অভ্যন্তরের ভাস্কর্য আপনার পায়ে শিকল পরিয়ে দেবে। পুজো দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। পুরোহিতরা খুব ভাল মানুষ তাদের কোন উৎপাত চোখে পড়ল না। মন্দিরে কোনো প্রবেশ দক্ষিণা নেই তবে গর্ভগৃহে ছবি তোলা বারণ।

 দেবতার নামেই এই জায়গার নাম এমনটি হয়ে থাকতে পারে। মন্দিরের লাগোয়া অনেক দোকানপাট নজরে এল। কাঠের কাজ,হাতির দাঁতের কাজ করা পণ্যগুলি বেশ আকর্ষক। তবে দামদস্তুর করে এগানো ভালো। মন্দিরের বাইরে কারুকার্যময় রথ দাঁড়িয়ে। মাঘ মাসে রথযাত্রা হয় এখানে। যখন জানলাম রথটি আসলে হায়দার আলির উপহার তখন অবাক না হয়ে পারলাম না। সত্যি "শক হুনদল পাঠান মোঘল একদেহে হল লীন "।

হায়দার পু্ত্র টিপুও বড় ভক্ত ছিল এই দেবতার। শ্রীরঙ্গপত্তন আসলে কাবেরীর দু'শাখায় একটা দ্বীপ আর এই নামটির সঙ্গে মিশে আছে ইতিহাস।

স্বাধীনতার ইতিহাস,বীরত্বের ইতিহাস, এক সতেরো বছর বয়সী তরুণের বীর গাঁথা।

শ্রীরঙ্গপত্তন মানেই  "সোর্ড অব টিপু সুলতান"।

মন্দির থেকে বেরিয়ে বাবদা বায়না জুড়ল সে হর্স রাইডিং করবে।

অনেক ঘোড়া দাঁড়িয়ে। বড় চকচকে আর নধর তাদের চেহারা। থেকে থেকে লম্বা লেজ ছুঁড়ে মারছে পিঠে, ছু্ঁড়ছে পিছনের পা দু'টি। সহিস চিৎকার করে দর হাঁকছে একশ একশ একশ...

ভয়ে ভয়ে তার বায়না মেটালাম।

টাকাটাই গচ্চা গেল। বাবদা ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এল অতি দ্রুত। আমারও জ্বর ছাড়ল ঘাম দিয়ে।

তবে বড়দের ক্ষেত্রে সমস্যা নেই। কয়েক মিনিটের জন্য ইচ্ছে করলে ঘোড়ায় চড়ে রাজা সেজে নিতে পারেন। আসলে "মেজাজটাই তো আসল রাজা" তাই শ্রীরঙ্গপত্তনে একবার মেজাজটাকে মর্যাদা দিয়ে নকল টিপু হয়ে উঠতে পারেন মাত্র পঞ্চাশ টাকায় বিনিময়ে।

 

  মূর্ত্তিজি কি ধর্মভীরু? 

নাকি সে সত্যিকার সারথি! যে পথে মন্দির গিয়েছিলাম ফেরার সময় সে পথেই একটু এগিয়ে পথের বাঁ দিক ঘেঁষে দাঁড়াল গাড়িটা। গাড়ির জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি পথের বাঁ দিকে সাদা পাথর বাঁধানো একটা চত্বর তার ঠিক মাঝ বরাবর একটা বেদী। বেদীতে একটা ফলক।  ফলকে লেখা  The body of tippu sultan was found here. 

 দেবতার নামেই এই জায়গার নাম এমনটি হয়ে থাকতে পারে। মন্দিরের লাগোয়া অনেক দোকানপাট নজরে এল। কাঠের কাজ,হাতির দাঁতের কাজ করা পণ্যগুলি বেশ আকর্ষক। তবে দামদস্তুর করে এগানো ভালো। মন্দিরের বাইরে কারুকার্যময় রথ দাঁড়িয়ে। মাঘ মাসে রথযাত্রা হয় এখানে। যখন জানলাম রথটি আসলে হায়দার আলির উপহার তখন অবাক না হয়ে পারলাম না। সত্যি "শক হুনদল পাঠান মোঘল একদেহে হল লীন "।

হায়দার পু্ত্র টিপুও বড় ভক্ত ছিল এই দেবতার। শ্রীরঙ্গপত্তন আসলে কাবেরীর দু'শাখায় একটা দ্বীপ আর এই নামটির সঙ্গে মিশে আছে ইতিহাস।

স্বাধীনতার ইতিহাস,বীরত্বের ইতিহাস, এক সতেরো বছর বয়সী তরুণের বীর গাঁথা।

শ্রীরঙ্গপত্তন মানেই  "সোর্ড অব টিপু সুলতান"।

মন্দির থেকে বেরিয়ে বাবদা বায়না জুড়ল সে হর্স রাইডিং করবে।

অনেক ঘোড়া দাঁড়িয়ে। বড় চকচকে আর নধর তাদের চেহারা। থেকে থেকে লম্বা লেজ ছুঁড়ে মারছে পিঠে, ছু্ঁড়ছে পিছনের পা দু'টি। সহিস চিৎকার করে দর হাঁকছে একশ একশ একশ...

ভয়ে ভয়ে তার বায়না মেটালাম।

টাকাটাই গচ্চা গেল। বাবদা ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এল অতি দ্রুত। আমারও জ্বর ছাড়ল ঘাম দিয়ে।

তবে বড়দের ক্ষেত্রে সমস্যা নেই। কয়েক মিনিটের জন্য ইচ্ছে করলে ঘোড়ায় চড়ে রাজা সেজে নিতে পারেন। আসলে "মেজাজটাই তো আসল রাজা" তাই শ্রীরঙ্গপত্তনে একবার মেজাজটাকে মর্যাদা দিয়ে নকল টিপু হয়ে উঠতে পারেন মাত্র পঞ্চাশ টাকায় বিনিময়ে।

মূর্ত্তিজি কি ধর্মভীরু? 

নাকি সে সত্যিকার সারথি! যে পথে মন্দির গিয়েছিলাম ফেরার সময় সে পথেই একটু এগিয়ে পথের বাঁ দিক ঘেঁষে দাঁড়াল গাড়িটা। গাড়ির জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি পথের বাঁ দিকে সাদা পাথর বাঁধানো একটা চত্বর তার ঠিক মাঝ বরাবর একটা বেদী। বেদীতে একটা ফলক।  ফলকে লেখা  The body of tippu sultan was found here.

পাতাঃ ১

FB_IMG_1533620404702.jpg

ছবিঃ সংগ্রহিত 

অর্থাৎ যাওয়ার পথে সচেতন ভাবে এই জায়গাটা এড়িয়ে গেছে মূর্ত্তিজি যাতে মন্দির থেকেই শুরু করা যায়।

একসঙ্গে এতোগুলো মানুষ এতোগুলো দিনের জন্য বেরিয়েছি এতদূর পথ পার হব বলে।

তাঁর সাহচর্য,তাঁর আশীষ ব্যতীত এ পারাপার কি সম্ভব!

 অলৌকিক ভাবে সেই সর্বশক্তিমানের আশীর্বাদই তো পাথেয় হয়ে সুগম করে তোলে যাত্রাপথ। মূর্ত্তিজি তো আমাদের ক্ষণিকের সঙ্গী তবু তার উপলব্ধি তার অনুভব ছুঁয়ে গেল পরমাত্মীয়তায়। এই বোধ থেকেই, এই অনুভব থেকেই বোধহয় একজন চালক উত্তীর্ণ হন সারথিতে।

১৭৯৯ এর ৪ঠা মে এই চত্বরেই দেখা যায় টিপুর গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহ। টিপুরই এক সেনাপতি মীর সাদিকের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজের গুলিতে হত্যা করা হয় টিপুকে। কন্নড় ভাষায় টিপু কথার অর্থ হল বাঘ। গাড়ি থেকে নেমে শ্রদ্ধা জানালাম "শের ই মহীশূর"- কে। আজও যেন ঐ চাতাল সংলগ্ন বাতাস বিশ্বাস আর বিশ্বাসভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস বয়ে বেড়াচ্ছে।

এরপর দরিয়া দৌলত বাগ ও টিপুর গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ দেখে সোজা পৌঁছে গেলাম 'জামিয়া ই টিপু মসজিদ' অর্থাৎ টিপুর সমাধিস্থলে। এটি কালো পাথরের ছত্রিশটি পিলারের উপর একটি ক্রিম রঙের গম্বুজ। প্রবেশে পথে মস্ত তোরণ। তোরণ পেরিয়ে পাথর বাঁধানো পথ সোজা চলে গেছে গম্বুজে। পথের দু'পাশে সবুজ ঘাসের মখমল আর ছোট বড় নানান গাছগাছালির বনসাই পরিবেশে এনেছে অন্য এক মাধুর্য।

এখানে পর্যটক সমাগম তুলনামূলক কম।

পিতা হায়দার আলির সমাধিক্ষেত্র হিসাবে এই গম্বুজ নির্মাণ করেন স্বয়ং টিপু।

কালের কি নির্মম পরিহাস তাঁর নিজের তৈরি গোরস্থানে মাত্র ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সে সমাধিস্থ করা হয় তাকেও। পাশেই রয়েছে মা মদিনা বেগমের সমাধি। ঊনপঞ্চাশের যুবক টিপু এখানে পিতা মাতার সঙ্গে রয়েছেন শান্তির শয়ানে। গম্বুজের দেওয়ালে বাঘছাল নক্সা। টিপুর সমাধির উপর রয়েছে  বাঘছাল ম্যাট্রেস। তার উপর রজনীগন্ধা ও গোলাপ সহ  নানান ফুল।

 এ গম্বুজের দরজা ছিল সোনা নির্মিত। ব্রিটিশরা সে দরজা খুলে নিয়ে যায়। এখন পাথরের জাফরি দিয়ে আটকানো আছে সে পথ। গম্বুজের বাইরের অংশে রয়েছে টিপুর আত্মীয়দের সমাধি। ভেতরে গিয়ে ছবি নেওয়া যায় না।

গম্বুজ থেকে বেরিয়ে তোরণের বাইরে এক খঞ্জকে বসে থাকতে দেখলাম। পাথরের চাতালে শরীরটাকে ঘঁষটাতে ঘঁষটাতে সে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে।

বাঁ পকেটে হাত ভরলাম খুচরোর সন্ধানে।

এতো প্রাসাদ,এতো মন্দির,এতো মসজিদ, এতো রাজা-রাজড়া, ইতিহাসের পাতায় পাতায় শুকিয়ে যাওয়া কালচে-লাল রক্ত- এগুলোই কি   'Incredible india' ! 

  আসলে এগুলো হল অর্ধেক ভারত বাকি অর্ধেকটা হল এই খঞ্জ-অন্ধ দুঃখী মানুষগুলোর জীবন সংগ্রামের বহমান ইতিহাস।

দুপুরের আহারাদি সেরে আমরা চললুম মহীশূর জু তে। কেতাবি নাম চামরাজেন্দ্র জুলজিক্যাল গার্ডেন। ১৮৩২ গড়া এই জু-তে এখন প্রায় পনের'শ প্রাণী রয়েছে। এলাকা চল্লিশ হেক্টরের মতো। প্রাণীগুলো আলিপুরের মতো রুগ্ন নয়। জানলাম বেশ কিছু ধনীলোক দত্তক নিয়েছে কিছুকিছু প্রাণীকে। ঐ প্রাণীর সব খরচ ঐ ব্যক্তির। এখানকার প্রধান আকর্ষণ গৌর-ভারতীয় বাইসন। জু-এর মধ্যে পরিবেশ বান্ধব গাড়ি আছে দক্ষিণা দিয়ে সেটাতেও সওয়ারি হওয়া যায়।

জু-র মধ্যে জলের বোতল,পলিথিন এসব নিয়ে ঢোকা যায় না। ক্যামেরার জন্য আলাদা দক্ষিণা দিতে হয়।

একটা বিষয় বেশ আশ্চর্যজনক মোবাইলে ছবি তোলা যায় কিন্তু ক্যামেরায় মানা!

যাইহোক জু-তেই একটা বড় রেস্টুরেন্ট আছে। সেখানে সব রকম খাওয়ার পাওয়া যায়। এক অবেলায় খাওয়া তার উপর দঃ ভারতীয় খাদ্য। পেট ভর্তি অস্বস্তি।

চারপাশে এতো গাছগাছালি তবুও ক্রমশ গরম বাড়ছে। এই সময়ের সবচেয়ে সুখাদ্য আইসক্রিম, তাই নেওয়া হল।

তাপ এতোটাই বেশি  আইসক্রিম নরম হয়ে নেমে আসছে কনুই বেয়ে।

     ইতিহাসের কাছে যেতে হয় নিঃশব্দে। পায়ে পায়ে তার আনাচ-কানাচ ছুঁয়ে দেখতে হয়। একটিবার তার সাথে নিবিড় হতে পারলে সে আপন খেয়ালে কথা বলা শুরু করে। কোলাহল সরিয়ে ইতিহাসের অঙ্কলগ্ন হতে পারলেই আপনা হতেই তার হলদেটে পাতাগুলো ফরফর খুলে যায়।

ইতিহাস তো দাঁড়িয়ে থাকে।

 দাঁড়িয়ে থাকে আলোক স্তম্ভের মতো।

দাঁড়িয়ে থাকে রোদ জল মেখে আর সময় হলেই তার আশ্চর্য-ঝাঁপিটাকে উজাড় করে দেয়।

শুধু তার কাছে যেতে হয় নিঃসঙ্গ,নিঃশর্ত।  সমর্পণ করে দিতে হয় অপার বিস্ময়ে।

একটা গেটের কাছে গাড়িটাকে দাঁড় করাল ড্রাইভার। কথার মধ্যে দক্ষিণ ভারতীয় একটা টান লাগিয়ে হিন্দি-ইংরাজি মিশিয়ে বলল-

"দ্যা রাইট সাইডো মেএন গেএট। এ গেএট কা নাআম জঅয় মার্তান্ডা। রয়েল ফ্যামিলি এন্ট্রান্স গেএট। দ্যা অনলি রাজ-রানী এন্ট্রান্স গেএট।"

প্রকান্ড প্রবেশপথ তদুপরি বিশাল প্যালেস দেখে কবিগুরুর কথা মনে হল-

"যে লোক ধনী ঘরের চেয়ে তার বাগান বড়ো হইয়া থাকে। ঘর অত্যাবশ্যক; বাগান অতিরিক্ত, না হইলেও চলে। সম্পদের উদারতা অনাবশ্যকেই আপনাকে সপ্রমাণ করে। ছাগলের যতটুকু শিং আছে তাহাতে তাহার কাজ চলিয়া যায়,কিন্তু হরিণের শিঙের পনেরো-আনা  অনাবশ্যকতা দেখিয়া আমরা মুগ্ধ হইয়া থাকি।"

চিড়িয়াখানায় প্রায় সাত-আট কিলোমিটার ঘুরে পা আর চলতে চাইছিল না। তিন ক্ষুদে সঙ্গী আর আমার শ্বাশুড়িমাতা তো কাহিল।

প্রায় চারহাজার বর্গমিটার জুড়ে প্যালেস, প্যালেসের চারপাশটা ঘুরতে কমবেশি কিলোমিটার দুই-তিন হাঁটতে হতো। সে ধকল নেওয়ার মতো মানসিক জোর কিঞ্চিত অবশিষ্ট থাকলেও শারীরিক ক্ষমতা তখন তলানিতে। শেষপর্যন্ত জনপ্রতি পঞ্চাশ টাকা দিয়ে সেল(ব্যাটারি) চালিত শকটে সওয়ারি হলাম আমরা।

ব্যাটারি চালিত গাড়িটাতে প্যালেসের বাইরের চারদিকটা ঘোরার সময় দেখে নিলাম গায়ত্রী, ভুবনেশ্বরী ও নবগ্রহ মন্দির। মিনিট দশ-পনেরোতে প্যালেসের চৌহদ্দি ঘুরিয়ে গাড়ি নামিয়ে দিল বামাবর্ত্তে, ওটাই প্যালেসের ভেতরে যাওয়ার পথ।

 পাশেই বাগিচা।

রংবেরং-এর ফুল ফুটেছে বাগিচা জুড়ে। প্যালেসের চূড়াটি ১৮ ক্যারেট সোনায় গিলটি করা। প্রকান্ড সে চূড়া সূর্যের আলোয় আরো বেশি করে দীপ্যমান।

 

 ড্রাইভারের থেকে জেনেছিলাম এখানকার রাজারা হিন্দু হলেও সব ধর্মকে সমাদর করতেন। তাই প্যালেসের মাথায় মন্দিরের চুড়ার সঙ্গে মসজিদের আদলে বেশ কয়েকটি গম্বুজের সহাবস্থান।

মহীশূর প্যালেসের দর্শনী জনপ্রতি ষাট টাকা। এরা ছোটোদের হাইট মেপে টাকা নেয় তাই ঝামেলা এড়াতে বাবদাদেরও টিকিট নেওয়া হল।

 

 প্রবেশ পথ বেশ সংকীর্ণ। নিজেদের কষ্ট করে প্যালেসের মধ্যে ঢুকতে হল না। দর্শনার্থীদের ভিড়টাই বয়ে নিয়ে গেল ভেতরে।

 বৈভব মানুষের বাসস্থানকে কত বিচিত্র করে তোলে। এ প্যালেসে প্রতিটি পদক্ষেপে বিপুল বিস্ময় অপেক্ষা করে থাকে আপনার জন্য।

যেকোনো রবিবার বা দশেরা উৎসবের দিনগুলি হল এই প্যালেস দেখার সবচেয়ে ভাল সময়। ঐ দিনগুলিতে প্যালেসের সব দ্বার উন্মুক্ত।

ঢোকার মুখেই একতলায় ডলস মিউজিয়াম শ্বেতপাথরের মূর্তি,মহারাজার হাওদা,পুরানো প্রাসাদের মডেল।

পুরানো প্রাসাদটি ছিল দারু নির্মিত।১৮৯৭ এর ভয়াবহ আগুনে তা পুড়ে যায়। বর্তমান প্রাসাদটি হেনরি আরউইনের নকসায় নির্মাণ করেন ২৪ তম ওডিয়ার। এ প্রাসাদ ইন্দো-সেরাসেনিক শৈলীতে তৈরি।

আটকোন বিশিষ্ট কল্যাণ মন্ডপে রয়েছে রবি ভার্মার আঁকা দশেরা উৎসবের ছবি। ১৬১০ সাল থেকে ওডিয়াররা দশেরা উৎসবের প্রচলন করেন। যে উৎসব ঘিরে আজও দেশ বিদেশের পর্যটক সমাগম ঘটে আজকের মাইসোরে।

কল্যাণ মন্ডপে রয়েছে দু'টি রুপোর চেয়ার একটি মহারাজের অন্যটি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের- যা অলঙ্করণ ও আভিজাত্যে উপমাহীন।

শ্বেতপাথরের সিঁড়ি আমাদের নিয়ে এল দরবার হলে। এই দরবার হল আজও বিত্ত বৈভবে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। এখানেই রয়েছে ২৮০ কেজি ওজনের রত্ন সিংহাসন- এ সিংহাসন নাকি বিজয়নগর জয়ের স্মারক। এছাড়াও রয়েছে সোনার হাতি।

পিতলের স্তম্ভ,ঝাড়লন্ঠন,অলঙ্কৃত কাঠের দরজা,রুপোর দরজা, চন্দন ও মেহগনির আসবাব, মূল্যবান পাথরের চাকচিক্যময় অলঙ্করণ,মোজাইক মেঝে, সিলিং- এ প্রাসাদকে ইন্দ্রপুরী করে তুলেছে।

     সেকালে প্যালেসের মধ্যেই বসত মল্লযুদ্ধ। স্পাইরাল সিঁড়ি বেয়ে রাজা নেমে আসতেন সেই দেহসৌষ্ঠব আর মল্লের প্যাঁচপয়জার দর্শনে। এখনও একটা বৃত্তাকার জায়গা বালি দিয়ে চিহ্নিত রয়েছে মল্ল যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসাবে।

প্যালেসের আর্ট গ্যালারিটি তৈলচিত্রে অনবদ্য। ছবি আঁকিয়েদের কাছে সে যেন মৃগয়াভূমি।

 বইয়ের পাতায় পড়া টিপুর তরবারি,শিবাজীর বাঘনখ নিজের চোখে দেখার পর দু'হাতে চোখ কচলে নিলাম। সত্যি দেখছি তো!

প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে চললাম বৃন্দাবন গার্ডেনে।

এম বিশ্বেসরাইয়ার পরিকল্পনায় কাবেরী নদীর উপর সিমেন্ট ছাড়াই পাথর দিয়ে তৈরি হয়েছে তিন কিমি দীর্ঘ ও চল্লিশ মিটার উঁচু কৃষ্ণরাজ সাগর বাঁধ। তারই নিচে বৃন্দাবন গার্ডেন। আমারা যখন পৌঁছলাম তখন কাবেরীর জল অস্ত রবির আভায় টলটলে লাল।

      ফেরার পথে দেখি মহীশূর প্রাসাদ আলোয় আলোয় সেজে উঠেছে।  তখনই মনে পড়ল ড্রাইভারটা বলেছিল ছিয়ানব্বই হাজার বিজলি বাতি দিয়ে সাজানো প্রাসাদ রাতে অন্য রূপ পায়।

হোটেলে ফিরেও চোখ বন্ধ করলে বারেবারে ফিরে আসছে মহীশূরের অহংকার, মহীশূরের বিস্ময় ওডিয়ারদের প্রাসাদ।

বুঝতে পারছি এই ঘোর থেকে এই ইন্দ্রজাল থেকে না বেরাতে পারলে সমূহ বিপদ।

রাত বাড়ছে। বাড়ছে পেটের দায়।

আদিম মানুষ যেমন বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াত ফল-মুল, পশু-পাখির খোঁজে।

দক্ষিণায়নে আমাদের অবস্থাও তাই।

বাঙালী খাওয়ারের খোঁজে এই বিদেশ বিভুঁইয়ে রাত-বিরেতে ঘুরে বেড়াতে হবে পথে-বিপথে।

আর যদি খাওয়ার না মেলে!

 ভাবতেই  কেঁপে উঠলাম!

পড়েছ মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে একসাথে।

কথিত আছে মহিষাসুর থেকে মহীশূর নামের উৎপত্তি। এখানেই নাকি মহিষাসুর বসবাস করত, নাম ছিল মাহিষ্মতি। দেবী চামুন্ডেশ্বরী বধ করেন অসুরকে। সেই থেকে কালক্রমে মহীশূর নামের উৎপত্তি বলে শোনা যায়। দেবী চামুন্ডেশ্বরী পূজিত হন চামুন্ডি পাহাড়ে। চামুন্ডেশ্বরী আসলে দেবী দুর্গা।

      মহীশূর ছেড়ে আমরা চলেছি চামুন্ডি পাহাড়ের পথে। মহীশূর শহর জুড়ে তখনও দশেরার মেরাপ খোলা হয় নি।

মহীশূর শহর থেকে খানিক দূরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ১০৯৫ মিটার উঁচু চামুন্ডি পাহাড়।

     মহীশূর পুলিশ কোয়াটার থেকে পাহাড়ি পথের শুরু। পায়ে হাঁটা পথে সিঁড়িতে একহাজার ধাপ  উপরে উঠে মন্দিরে যাওয়া যায়। ত্যাগ আর কৃচ্ছ্র সাধন ছাড়া তো ঈশ্বরের কাছে যাওয়া যায় না। তাই সিঁড়ি ভেঙে পাহাড় চূড়ায় মন্দিরে পৌঁছাতে পারলে নিবেদন পূর্ণতা পায়। তবে তার জন্য বুকের খাঁচায় দম থাকা প্রয়োজন। আমার কার্বন পূর্ণ কলিজা নিয়ে সিঁড়ি ভাঙা যে হাঁফ ও চাপ দুদিক থেকে বেশ বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে তা আগাম অনুমান করেই গাড়িতে চেপে প্রায় দশ কিমি ঘুর পথে মন্দির চললাম। একটু উপরে উঠলে বায়ুস্তর হালকা হয়ে আসে পাহাড়ে চড়ার মেজাজ পাওয়া যায়। পাকদন্ডি বেয়ে মন্দির পৌঁছতে মন্দ লাগে না। পথ বেশ প্রশস্ত। গাড়ির জানালায় ধরা উপত্যকা ছবির মতো লাগে।

চামুন্ডেশ্বরী ওদিয়ারদের কুলদেবী। পাহাড় চূড়ায় এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন কৃষ্ণরাজা তৃতীয় ওদিয়ার।

প্রায় দু'হাজার বছরের পুরানো মন্দিরে রয়েছে দেবীর কনকমূর্তি।

মন্দিরের প্রবেশ পথে মহিষাসুরের প্রকান্ড মূর্তি। মন্দিরের স্থাপত্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। মন্দিরে সাত তলা গোপুরম রয়েছে। দক্ষিণ ভারতীয় মন্দির গুলিতে সুউচ্চ ও অলংকৃত যে প্রবেশদ্বার দেখা যায় সে গুলোকে গোপুরম বলে। এটি দক্ষিণ ভারতীয় স্থাপত্যের একটি অন্যতম দিক। দেখলাম মন্দিরের পুরোহিতরা বেশ নিষ্ঠার সঙ্গে দর্শনার্থীদের সঙ্গ দেন।

মন্দির চত্বরে বাঁদরের উপদ্রব রয়েছে সে বিষয়ে সাবধান থাকা ভাল।

পাহাড় থেকে নামার পথে এক বিশাল নন্দীমূর্তি। একটা মস্ত বড় পাথর কেটে তৈরি হয়েছে তা।

পাকদন্ডি বেয়ে নামার সময় পথের পাশে পলিথিনের এক চিলতে ছায়ায় এক দেহাতি মানুষ পাথর কুঁদে তৈরি করছে দেবমূর্তি। সে নিবিষ্ট তার নির্মাণে। বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুলে চেপে ধরেছে পাথর, পাথরের উপর ছেনি-হাতুড়িতে রূপ পাচ্ছে গণপতি। অবাক করছিল তার নির্মাণ কৌশল।  পায়ে আটকে থাকা গণপতি  তখন তার কাছে দেবতা নয় একখন্ড পাথর,তার সৃষ্টির উপকরণ। এটিই তার অন্নের সংস্থান,এটি তার কাছে পণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার যিনি এই গণপতি সংগ্রহ করেন, তার কাছে এটি ঈশ্বর।

তবে উভয়ের মধ্যে মিল একটি ক্ষেত্রেই, তা হল দু'জনেই নিষ্ঠাবান।

পাশেই মস্ত টেলিস্কোপওয়ালা ভিউ পয়েন্ট।

এখান থেকে গোটা মহীশূর শহরটাকে পাখির চোখে দেখা যায়। চামুন্ডেশ্বরী যেহেতু ওদিয়ারদের কুলদেবী তাই প্রাসাদ দেবীমুখী। এখান থেকে মহীশূর প্রাসাদের দৃশ্য অনবদ্য।

চামুন্ডি পাহাড় ছেড়ে চললাম উটির পথে।

 

মহীশূর-উটি রোড়ে মধুমালাই জাতীয় উদ্যান। শাল,সেগুন,চন্দন,দেবদারু,আবলুস,

ইউক্যালিপটাস ঘেরা অরণ্যভূমি।

শুনেছি বাঘ,চিতা,ভালুক,হাতি,গৌর, হরিণ, বুনো কুকুর, বুনো শুয়োর কি নেই এ বনে।

আমরা কয়েক দল হরিণ ও একটি চিতা ছাড়া আর কারো দেখা পেলাম না।

তবে বনের ভিতর ময়ার নদীর জলপ্রপাতটি বেশ লাগল।

বেলা দুটো নাগাদ হোটেলে উঠলাম। পেটের মধ্যে ছুঁচোর দাপাদাপি, সামনে ভাতের থালা তবুও ডান হাতে অতৃপ্তির অলসতা।

             চামুন্ডি পাহাড় থেকে নামার সময় মহীশূর- আর.এম.সি-তে যে পাহাড়ি পথ শেষ করেছিলাম  মধুমালাই ফেরত উটি-মহীশূর রোডে বেশ খানিক এগিয়ে গুডালুরের খানিক আগে ফিরে এল সেই পাহাড়ি পথ।

মধুমালাই কার্যত আমাদের হতাশ করেছে ফলত একটা দীর্ঘশ্বাস যাত্রাপথকে বড় একঘেয়ে করে ফেলেছিল।

 কিন্তু গুডালুরের অনেকটা আগে থেকে পথশোভা অস্থির করে তুলেছিল চোখ দুটোকে। রাস্তার দু'পাশে আকাশ ছোঁয়ার স্পর্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইউক্যালিপটাস,

ঝাউ, মেহগনির সবুজে বারবার আটকে যাচ্ছিল চোখ।

দিগন্ত প্রসারিত অনুচ্চ পাহাড়ের শিরদেশ আর তার শরীর জুড়ে সাদা মেঘের আলপনা রোমাঞ্চ জাগাচ্ছিল থেকে থেকে।

 প্রবেশ পথে এই অভ্যর্থনাই বলে দিচ্ছে উটিকে দক্ষিণের রানী বলাটা কোনো মতেই বাড়াবাড়ি নয়।

গুডালুরের নিডিল রক ভিউ পয়েন্টে যখন পৌঁছলাম তখন বেশ রোদ ঝলমলে পরিবেশ। এখান থেকে পুরো নীলগিরিটাকে দেখা যায়। গাছগাছালি ঘেরা নিডিল রক প্রাণ ভরিয়ে দিল। ওখান থেকে আমাদের গাড়ি ছুটল পাইকারার দিকে।

পাইকারাতে বাঁদরের উৎপাত আছে।

আমরা ছাড়া আরো গুটিকয় টুরিস্ট বাঁদর সামলে চললাম পাইকারা শুটিং স্পটের দিকে। একটু একটু করে ঠান্ডা বাড়ছে,হাওয়া দিচ্ছে। জায়গাটার নাম সম্ভবত নাইন মাইলস।

পিচ রাস্তা থেকে সবুজ ঘাসের গালিচা ক্রমশ উঠে গেছে আকাশের দিকে।

ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে সওয়ারির অপেক্ষায়। আমরা উঠে এলাম একেবারে ঢালু গালিচার মাথায়।

এখান থেকে দূরে দূরে উপত্যকা গুলোকে বড় মায়াবী মনে হয়। 

আজকের মতো সূর্যের আলো ফুরিয়ে আসছে।

এখান থেকে পাইকারা জলপ্রপাত প্রায় দশ-বারো কিমি পথ।

সময়ের টানাটানিতে আমাদের আর সে পথে এগানো সম্ভব হল না।

উটি শহরে ঢোকার আগে সবুজে মোড়া পাহাড়, পাহাড়ের ঢালে চা-বাগান, ঘন সবুজ গাছপালা দেখে মন বড় উচাটন হল।

ইচ্ছে করছিল মূর্ত্তিজিকে বলি-

 "গাড়ি রুকিয়ে"।

কিন্তু উপায় ছিল না।

 দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে।

দিন শেষে দূরে বাগিচা থেকে বাড়ি ফিরছে লোকজন।

অন্ধকার নামার আগেই গন্তব্যে পৌঁছানো চাই।

তার উপর আমাদের হোটেল বুক করা নেই।

দরদস্তুর করে হোটেল খু্ঁজে পেতে সময় লাগবে এমন সব অজানা আশঙ্কায় গাড়ি থেকে নেমে প্রকৃতির এমন রূপে দু'দন্ড চুপটি করে থাকার অভিলাষে শিকল দিলাম।

পথে পুলিশ আটকে দিল আমাদের গাড়ি।

 গাড়ি পার্ক করে মূর্ত্তিজি ছুটল কাগজ পত্তর নিয়ে বড় কত্তার কাছে।

আর এই সুযোগে আমরাও নেমে এলাম গাড়ি থেকে- এতক্ষণ ধরে যে অভিলাষটা তাড়া করে বেড়াচ্ছিল তা পূরণের এতো বড় সুযোগ হাতছাড়া করা যায় কি?

গাড়ি থেকে নামতেই শীত শীত করছে। তাতে কি যায় আসে শরীরের শিরায় শিরায় তখন উত্তেজনা ছড়াচ্ছে উটি-সুন্দরী।

মূর্ত্তিজি ফিরল জরিমানা দিয়ে। যদিও সব কাগজ পত্তর ঠিকঠাক ছিল কিন্তু বেচারা কেন জুতোতে মোজা  নেয় নি তার জন্যই জরিমানার আয়োজন।

জায়গায় জায়গায় প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষজন, তাদের পোশাক, পছন্দ,রুচি এসব কিছু বদলে বদলে গেলেও পুলিশ বদলায় না। উলুবেড়িয়া চেকপোষ্টের পুলিশ আর উটির পুলিশ এক।

শোলে সিনেমায় আসরানির সেই সংলাপটা মনে পড়ে গেল--

"লেকিন হামারা ইতনি বদলিওকি বাদমে, হাম নেহি বদলে।"

নীলগিরি পাহাড়ে ২২৮৫ মিটার উঁচুতে চিরবসন্তের দেশ উটি। পোশাকি নাম উটি এসেছে  উটকামন্ড বা উধাগামন্ডলম থেকে। উধাগামন্ডলম হল একটা টোডা শব্দ যার অর্থ হল কুটিরের গাঁও।

 উটি সকলের সঙ্গে সখ্যতা করে না।

আমাদের সঙ্গে উটির তেমন একটা সখ্য গড়ে ওঠে নি।

সকালবেলা আমরা যখন বের হলাম উটির সৌন্দর্যে অবগাহন করব বলে তখন সে মুখ ফিরিয়ে নিল আমাদের থেকে।

থেকে থেকে মেঘের চাদরে আত্মগোপন করল সে।

কুন্নুরের পথ নেওয়ার আগে পর্যন্ত জারি রইল এই লুকোচুরি।

সকাল সাড়ে আটটায় আমরা পৌঁছে গেলাম দোদাবেতার প্রবেশদ্বারে। তখন সবে মাত্র টিকিট কাউন্টার খোলা হয়েছে। দোদাবেতা নীলগিরির সবচেয়ে উঁচুশৃঙ্গ। 

মেঘ সরে যেতেই দোদাবেতা থেকে ক্যাথি

 উপত্যকার শরীরী বিভঙ্গ বিমোহিত করল আমাদের।

 আলো-ছায়ায় সম্পাত চলছে উপত্যকার আনাচে কানাচে। আর তাতেই ক্যাথি ধরা দিচ্ছে নব নব রূপে।

উটির অন্যতম আকর্ষণ বোটানিক্যাল গার্ডেন। গার্ডেন নয় এ যেন গাছ-গাছালির ভাস্কর্য।

পাতাঃ ২

বৈচিত্র্য আর বৈভবে এ হল উটির অলংকার।

মুগ্ধ করল পাহাড়ের ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা রোজ গার্ডেন। 

উটি লেকে বোটিং সেরে আমরা চললাম কুন্নুরের উদ্দেশ্যে।

যাওয়ার পথে ক্যাথি ভ্যালি চোখ জুড়াল।

উটি থেকে কুন্নুর প্রায় কুড়ি কিমি। যাত্রীরা সাধারণত ট্রয় ট্রেনে লোয়ার কুন্নুর পৌঁছায় তারপর সেখান থেকে গাড়িতে আপার কুন্নুর। কুন্নুরের আসল সৌন্দর্য আপারে।

লোয়ার কুন্নুর গাড়ি, ধুলো,ধোঁয়ায় বিরক্তিকর।

আমরা ট্রয়-ট্রেন পেলাম না।

তাই গাড়িতেই পৌঁছলাম কুন্নুরে।

লোয়ার কুন্নুর থেকে একটু এগিয়ে সীমস পার্ক।প্রথমে ভেবে ছিলাম ওটাতো একটা পার্ক, না গেলেও চলে। মূর্ত্তিজি পিড়াপিড়ি করল। তাই চললাম সীমস পার্ক।  সীমস পার্কের কাছে ছোট্ট একটা বাজার নানা ফল বিক্রি হচ্ছে। মুলসিতা নামে একটা ফল দেখলাম। ওটা নাকি ক্যানসারে বড় উপকারী।

পাহাড়ের ঢালে সীমস পার্কে নানা ফুলের বাহার,  গাছে গাছে পাখির কাকলি - এ কেবল দুটো কথা নয়,এক অনির্বচনীয় দর্শন।

যতই আপারের দিকে এগোচ্ছি ততই কুন্নুর যেন স্বর্গের কিন্নরদল হয়ে উঠছে।

পথের দুপাশে নাম না জানা রং-বেরঙের ফুল,

চা ও কফির বাগিচা, দীর্ঘল ঝাউে বাতাসের শনশন আপনাকে একা করে দিতে চাইবে।ইউক্যালিপটাস,সিলভার ওকগুলোকে যেন কেউ মাপা হাতে রোপণ করেছে এখানে।

আপার কুন্নুরে পায়ে পায়ে বেশ খানিক চড়াই পেরালে ল্যাম্বস রক। হঠাৎ মেঘ ঘনিয়ে আসায় ওখানে গিয়ে কেবল কষ্টই হল।

 দ্রুত নেমে, চললাম ডলফিন নোজ।

অসাধারণ এখান থেকে উপত্যকা আর সমতলের সৌন্দর্য। দূরে ক্যাথেরিন ফলস যেন পাহাড়ের গায়ে সাদা উপবীত।

বেলা দু'টা নাগাদ পেট ভরে ভাত খেলাম শ্রীবাবা রেস্টুরেন্টে। ধীরাজ ভরদ্বাজ শিলিগুড়ির লোক হোটেল করেছে ওখানে। নিজের হাতে পাকানো ভাত, মুগডাল, আলুপোস্ত খাওয়ালো আমাদের। অনেক দিন পর বাংলায় বলতে পারলুম...

আর একটু ভাত দিন...

     পথে নামার ইচ্ছেটাই শেষ কথা। একটিবার পথে নেমে পড়তে পারলেই সামনের পথ আপনা হতেই পায়ের তলায় চলে আসে।

পথ চলাতে উৎকণ্ঠা থাকলেও তা কখন যে রোমাঞ্চে বদলে যায় তার টের পাওয়া যায় না। অজানা অচেনা পথের সুলুক-সন্ধানের মধ্যে লুকিয়ে থাকে আবিষ্কারের আনন্দ।

পথ চলাতে সম্মোহন আছে।

একটা নেশা নেশা ঘোর আছে।

তা যদি না হতো তবে দুপুর  দু'টার পর একজন সত্তরোর্দ্ধ মহিলা আর তিনটি বছর ছয়-সাতেকের বাচ্চা নিয়ে দু'শ কুড়ি-ত্রিশ কিমি পথ-যাত্রা শুরু করা যায়! যেখানে এক'শ-র বেশি পাহাড়ি পথ!

দুপুর আড়াইটা নাগাদ কুন্নুর থেকে চললাম কোদাইকানালের দিকে। আজ আমাদের রাত্রি বাস কোদাইকানালে। কাল সকাল থেকে কোদাই দেখে নেওয়া। যেহেতু পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে যেতে পারে তাই আলগা সময় পেয়ে বাবা রেস্টুরেন্ট থেকে মূর্ত্তিজী ফোন করেছিল ওর পরিচিত এক হোটেল মালিককে। থাকার ব্যাপারে একটা আগাম কথা হয়ে যাওয়ায় বেশ নিশ্চিন্ত লাগছে।

পাকদন্ডী বেয়ে নামছে গাড়ি। সারি সারি পাহাড়, গাছ-গাছালি পিছলে যাচ্ছে পিছনের দিকে।  রাস্তার দু'পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো রঙ-বেরঙের ফুলের ডালি সাজিয়ে যেন বিদায় জানাচ্ছে আমাদের।

উপর্যুপুরি পাহাড়ি বাঁকে শক্ত হাতে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করছে মূর্ত্তিজী।

একটা পাহাড়ি বাঁকে চা ও চকলেট কেনা হল। উটির হোম-মেড চকলেট ভারি সুস্বাদু। ঠান্ডা বেশি বলেই এখানে চকলেট তৈরি হয়। নিচের দিকে এই চকলেট পাওয়া যায় না।

কুন্নুর থেকে কোদাই আসার পথে মেট্রুপালিয়ামে আমরা সমতলে এসে পড়লাম।  ঠিক সমতল নয় প্রায়-সমতল।

এই সমতলে যত কম সময়ে যত বেশী পথ চলে নেওয়া যায় ততই ভাল।

তাই গাড়ির বেগ ক্রমশ বাড়াতে থাকল মূর্ত্তিজী।

 আঙুলে গাঁট গুনে যা হিসাব পেলাম তাতে যদি সব ঠিকঠাক চলে তবে রাত্রি দশটার আগে কোনো ভাবেই কোদাই পৌঁছতে পারব না আমরা।

মেট্রুপালিয়াম থেকে পালনি এক'শ আশি কিমি সমতল পথে গাড়ি ছুটল তীব্র গতিতে। পালনি হল কোদাই-এর প্রবেশদ্বার।

 আমাদের যাত্রাপথ কোয়েম্বাটুর,অবিনাশি, দারাপুরম হয়ে ছুটে চলল পালনির দিকে। কোয়েম্বাটুরে আকাশ কালো হয়ে এলো। ওখান থেকে অবিনাশি চুয়াল্লিশ কিমি পথ পেরোতে না পেরোতেই শুরু হল ঘন বর্ষা।  ছয় লেনের সড়ক বর্ষার জলে সাদা ধবধব করছে। ওয়াইপার দ্রুত হাতে কাঁচ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে জল।

অবিনাশি হয়ে দারাপুরম যাওয়া যায়। আবার অবিবাশির থেকে দশ-বারো কিমি আগে আন্নুর থেকে অন্য একটা পথ চলে গেছে দারাপুরম হয়ে পালনি। আমরা দ্বিতীয় পথটা নিলাম। অবিনাশি গেলাম না। যদিও জানতাম

অবিনাশিতে একটা শিব মন্দির আছে,তবুও টাইম ম্যানেজমেন্ট করতে গিয়ে ওখানে গেলাম না। এর মধ্যে বর্ষা থেমেছে।

 ঠান্ডা বাতাসে আয়েশি ফরমান।

 পিছন ঘুরে দেখি বাকিরা প্রায় সকলেই সিটে গা এলিয়ে দিয়েছে। আমার না জেগে উপায় নেই। মূর্ত্তিজীকে তো জাগতে(লক্ষ্য রাখতে) হবে। ওর দু'চোখের পাতা এক হলে সমূহ বিপদ।

মাঝে মধ্যে মূর্ত্তিজীর হাত স্থির হয়ে যাচ্ছে অর্থাৎ চোখ জুড়ে আসছে ওর। স্বাভাবিক কদিনের টানা পরিশ্রম তার উপর ভাত খাওয়ার পর বর্ষা আবহাওয়াকে বিশ্রামের উপযুক্ত করে তুলেছে। পরিস্থিতিকে একটু হলেও আড়াল করার চেষ্টা করছে সে। যেন আমার নজরে না আসে। আমি এলোমেলো দু-চার কথা জুড়ে দিলাম ওর সঙ্গে যাতে ওর ঘুম না আসে। খানিক বাদে মূর্ত্তিজী গাড়ির সাউন্ড সিস্টেমটা অন করল...

কর্ণ-প্রদাহের যন্ত্রণা নিয়ে বাজচ্ছে যন্ত্রটা....

"  উইকিপিডিয়া মে তু চেক করলে, গুগল তু সার্চ করলে.... ইক নম্বর ইক নম্বর..."

মূর্ত্তিজীকে বললাম-

-- মূর্ত্তিজী পাঁচ বাজনে চলা, চা পিনেকি লিয়ে আপকি মন নেহি কর রাহা।

-- ও তো কর রাহা, লেকিন আপনে নেহি বাতায়্যা..

-- আপ হামারা সারথি হ্যাঁয়।  বাতানে কা ক্যায়া কুছ জরুরতি হ্যাঁয়?এক আচ্ছাসা রেস্টুরেন্ট দেখকে গাড়ি রুক দিজিয়ে।

চায়ের কাপে চমুক দিয়ে মূর্ত্তিজী শুরু করল অবিনাশির গল্প।

অবিনাশি কথার অর্থ যার বিনাশ নেই।  অবিনাশি তে একটা শিব মন্দির আছে যার বিনাশ কখনই সম্ভব নয়।  কোন প্রাকৃতিক- অপ্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষয় নেই মন্দিরের।

এই মন্দির হল এমন এক শিব মন্দির কেবল মাত্র এখানে দুর্গা রয়েছেন শিবের ডানদিকে।  অন্য সব মন্দিরে দুর্গা রয়েছেন শিবের বামে।

 মন্দিরের আর এক আশ্চর্য কাহিনী শোনাল মূর্ত্তিজী।

একবার সুন্দরমূর্ত্তি নায়নার নামে এক সাধু মন্দিরের সামনের থেকে যাচ্ছিল। সে সময় ঐ সাধু  দু'টো শব্দ শুনতে পায় বিপরীত মুখী দু'টি বাড়ি থেকে। একটা আনন্দের অন্যটা কান্নার।

সাধু খোঁজ নিয়ে জানতে পারে ঐ দুই বাড়ির দু'টি ছেলে পরস্পর বন্ধু ছিল।  একবার ওরা এক সঙ্গে স্নান করতে যায়। কিন্তু একজনকে কুমির খেয়ে নেয়। যে বেঁচে গেল  তার বাড়িতে আনন্দ কারণ তার পৈতা হচ্ছিল।

অন্য বাড়িতে কান্নার কারণ, ঐ বাড়ির ছেলে বেঁচে থাকলে তারও পৈতা হত।

ঘটনা শুনে সাধু শিবের তপস্যা শুরু করলেন যাতে তিনি ঐ মৃত ছেলেটির পুনঃ জন্মের ব্যবস্থা করে দেন। 

সাধুর গভীর তপস্যায় শিব সন্তুষ্ট হন।  শুকনো পুকুর জলে ভরে যায়। আর কুমির ছেলেটাকে উগরে দেয়।

গল্প শুনে মনে হল অবিনাশিটা দেখে নিলেই ভাল হতো।

পালনি তে যখন পৌঁছলাম তখন গভীর অন্ধকার নেমেছে পাহাড়ে।

আসলে পালনি হল নীলগিরির অংশ।

পালনিতে কোদাইকানাল একটা জনপদ।

পালনি থেকে প্রায় সত্তর কিমি পাকদন্ডি বেয়ে তবেই কোদাই।

গাড়ির আলোয় পাহাড়,গাছপালার অবয়বের একটা আন্দাজ ছাড়া বাকি সব ঘন অন্ধকার। সে অন্ধকার গভীর ভাবে নেমে গেছে পাহাড়ের  ঢাল বেয়ে অনেক নিচে। নিচের দিকে আলোগুলো একটা জোনাকির মতো জেগে আছে। এমন ঝুঁকির জার্নি সত্যি সত্যি ভাবনাতেও ছিল না। বৃষ্টিতে পথ পিচ্ছল হয়ে বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে। 

ভয় পেয়ে বসেছে কিন্তু তবুও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছি। আমি ভয় পেলে বাকিদের ধরে রাখাটা বেশ কঠিন হয়ে উঠবে।

মূর্ত্তিজীকে বলেছি রাত বাড়ে বাড়ুক গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

গাড়িও চলছে ধীর গতিতে। হঠাৎ উল্টো দিক থেকে আসা অন্য একটা গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো ঝলকে দিলো চোখ। বিপদ অনুমান করে কষে ব্রেক লাগাল মূর্ত্তি। গাড়িটা একটু এগিয়ে রাস্তা কামড়ে দাঁড়িয়ে গেল।

চেয়ে দেখি চাকার হাত দুই সামনেই গভীর খাত, অন্ধকারে সে বিপদের মাত্রা বোঝা যায় না।

যখন কোদাইকানাল পৌঁছলাম তখন সারা কোদাই শুনশান। পথের ধারে দোকান পাট সব বন্ধ। হোটেল গুলোতে রাত বাতি জ্বলছে। মোবাইলের আলোয় সময় তখন রাত পৌনে দশ।

আমাদের গাড়িটা একটা হোটেলের সামনে দাঁড়াল। একজন বয়স্ক লোক হাতে টর্চ নিয়ে এগিয়ে এলো আমাদের জন্য।

সুন্দর হোটেল, বেশ গোছানে ব্যাপার কিন্তু অনেক দিন লোকজন না থাকায় কেমন যেন গন্ধ। গন্ধ হোক এতো রাতে মাথা গোঁজার এই বন্দোবস্তটাই না হয়ে থাকলে খুব মুশকিল হতো।

সঙ্গে রুম রিফ্রেশনার ছিল তাড়াতাড়ি বের করে ছড়িয়ে দিলাম সুবাস।

হোটেল থেকেই রাতের খাওয়ার দিল রুটি, সবজি আর ডাল। সবজি আর ডাল এতো বিরক্তিকর যে মুখেই নেওয়া গেল না।

ভোর রাতে  টের পেলাম ঠান্ডা বেশ বেড়েছে

জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি কোদাই এ -এ বৃষ্টি নেমেছে।

সকাল সকাল ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। এখানে হোটেলে ভাড়ার সঙ্গে সকালের টিফিন খরচ ধরা থাকে। একটু বেলার দিকে সকালের খাওয়ার দেয় এরা। আমাদের হাতে অপেক্ষা করার মতো সময় নেই তাছাড়া রাতের খাওয়ারের স্বাদ অপেক্ষা করার সাহস আর ইচ্ছার পূর্ণ-চ্ছেদ দিয়ে রেখেছে।

কোদাই শহর তখনও মেঘ আর কুয়াশার বিছানা ছেড়ে জেগে ওঠে নি। তার সারা শরীরে অদ্ভুত এক আলস্য। কিন্তু আমাদের তো আর আলসেমির অবকাশ নেই।

পাতাঃ ৩

বাইরের দোকান থেকে সকালের খাওয়ার নিয়ে নেওয়া হল। সঙ্গের পলি প্যাকে ভরে নেওয়া হল সে রসদ। দোকানে বসে খাওয়ার সময় নেই ।  আজ কোদাই দেখে রওনা দিতে হবে কন্যাকুমারীর দিকে।

পাইন, ঝাউ,ইউক্যালিপটাস মোড়া রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল গাড়ি। চারদিকে ঘন অরণ্য। রাতের বৃষ্টিতে ভিজেছে মাটি  আর তারই একটা অন্য রকম গন্ধে মত্ত হয়ে আছে বাতাস। শীতের কামড় ধারালো হচ্ছে ক্রমশ। এতো গভীর অরণ্য যে গাছের শির বেয়ে সূর্যের আলো নেমে আসতে পারছে না।

দূরে সারি দিয়ে কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। মূর্ত্তিজী বলল--

-- স্যারজি ও হ্যাঁ কৌশন চেকপোষ্ট। ইস ইলাকামে প্লাস্টিক,দারু,বিড়ি,সিগরেট মানা হ্যাঁ। গাড়িকা অন্দর যো প্লাস্টিক হ্যাঁ ছুপা দি জিয়ে। ও লোগ দেখেগা তো তকলিফ বড় যায়েগা।

দু'জন অাধা-মিলিটারি পিচরাস্তায় ভারি বুটের আওয়াজ তুলে এগিয়ে আসছে আমাদের গাড়ির দিকে।

গাড়ির মধ্যে প্লাস্টিকে ভরা খাওয়ার, পাঁচ লিটারের জলের বোতল,চিপসের প্যাকেট কি নেই।

নানা আশঙ্কা ভিড় করে আসছে...

যদি খাওয়ারটাই কেড়ে নেয়!

খাওয়ার কেড়ে নিলেও তবু রক্ষে, যদি ফিরিয়ে দেয় এখান থেকে!

মুখে একটা ছদ্ম স্মার্টনেস লাগিয়ে, দু'হাত জড়ো করে নমস্কার জানালাম আগন্তুকদের।

হাতের ইশারায় সঙ্গে বললাম--

-- প্লিজ আইয়ে স্যার আইয়ে...

 সাহস দেখানোটা বেশ কাজে দিল।

যদিও টেনশনে কোদাইয়ের আট-নয় ডিগ্রি টেম্পারেচারে ভেতরের গেঞ্জিটা ঘামে ভিজে যাচ্ছিল।

যারা চেক করতে এসেছিল তারা উঁকিঝুঁকি দিয়ে ফিরে গেল। হয়তো আমাদের দলে মহিলা আর শিশুদের আধিক্য তাদের নিশ্চিন্ত করেছিল। অবশ্য তার আগেই জলের বোতল সহ পলিথিনের ব্যাগগুলোকে লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল ঢাউস ল্যাগেজের আড়ালে।

ভারি বুটের আওয়াজ একটু একটু করে ক্ষীণ হতে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।

ঘন অরণ্য পথ ধরে গাড়ি ছুটল।

একটু উপরের দিকে গাছ-গাছালি বেশ পাতলা। তার ফলে সূর্যের আলোয় পথে-প্রান্তরে ধরা পড়েছে গাছের ছায়ার আলপনা।

লম্বা পাইন, ইউক্যালিপটাস বা সিলভার ওকের শির চুঁইয়ে সূর্যের আলো নেমে আসছে কোদাই-এ।

আলো-ছায়ার সে এক মায়াবী মোহ।

নাম না জানা পাখিরা মুখর করে তুলেছে যাত্রাপথ। হয়তো এদিকটায় তেমন কোন বন্যজন্তুর উপদ্রব নেই, তাই বনের ভেতর সরু পথ ধরে একদল মহিলা চলেছে কাঠ সংগ্রহে।

অরণ্য কত ভাবে কতশত মানুষের রুজি- রোজগারের উপায় হয়ে যায়।

আসলে এদের প্রয়োজনটাই এতো কম তাই প্রকৃতি এদের সয়ে নিতে পারে। প্রকৃতির সঙ্গে এদের একটা নিবিড় ভালোবাসার আশ্রয় নির্মাণ হয়ে যায় অজান্তে।

আমাদের মতো ভদ্র সভ্য মানুষেরা কত সহজেই টলিয়ে দেই প্রকৃতির ভারসাম্য।

প্রকৃতির মাঝে আনন্দ নিতে এসে অবলীলায় বিরক্ত করে তুলি তাকে।

সেই কারণেই চেকপোষ্টের ঘেরাটোপ। আবার চালাকি করে ঘেরাটোপ টোপকে যাওয়ার উল্লাস।

গাড়ি গিয়ে যখন ময়ার পয়েন্টে পৌঁছল তখন সকাল দশটা বাজে।  ময়ার পয়েন্টকে টেন মাইলসও বলে।

এখান থেকে পুরো কোদাই-এর ভিউটা দেখা যায়।

ময়ার পয়েন্ট থেকেই কোদাই বেড়ানো শুরু হয়। সরকারি গাড়িতে পূর্ণবয়স্কদের ভাড়া আড়াই'শ টাকা আর ছোটদের দেড়'শ। নিজেদের গাড়ি নিয়েও চলা যায় সেক্ষেত্রে গাড়ির সিট অনুযায়ী ভাড়া দিতে হয়।

আমাদের তিন'শ টাকা ভাড়া দিতে হল।

এ পথে অনেকগুলো ভিউ পয়েন্ট আছে। একটা ভিউ পয়েন্ট এ্যাটেন্ড করার পর যদি পরেরটায় না যান তবে সেটা হবে মস্ত ভুল। সমস্ত ভিউ পয়েন্ট থেকে কোদাই দর্শন পাল্টে পাল্টে যায়।

ময়ার পয়েন্ট থেকে আমরা চললাম পশ্চিমে, বেরিজাম রোড ধরে বেরিজাম লেকের দিকে।

এ পথেই রয়েছে কেদারের দর্শনীয় স্থানগুলো। ময়ার পয়েন্ট থেকে পাঁচ কিমি পথ এগিয়ে

পিচ রাস্তার বাঁ'দিকে গাড়িটা পার্ক করাল মূর্ত্তিজী।

 আমরা নুড়ি-পাথর মেশানো ঢালু পথে পায়ে হেঁটে চললাম 'সাইল্যান্ট ভ্যালি' দেখতে।

ঢালু পথ তাই কোনো ধকল ছাড়াই খুব দ্রুত নেমে এলাম আমরা।

প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকা পাইন, মেহগনি  আর ফার্নে বাতাসের দোলায় কট, কট করে শব্দ হচ্ছে। ঝিঁ, ঝিঁ মতো চেনা কোনো একটা ডাক শোনা যাচ্ছে  গাছগুলোর ডালে ডালে।

পাহাড়টা যেখানে শেষ হয়েছে তার একটু আগে একটা ওয়াচ টাওয়ার। পাহাড়টার শেষ প্রান্ত উঁচু তারের জাল দিয়ে ঘেরা আর তারপর  গভীর খাদ। তারের জাল ধরে নিচের দিকে তাকতেই বুকের ভিতর সাহসের ঘাটতি বোধ করলাম।

ভয়ে সরিয়ে নিলাম নিজেকে।

টাওয়ারের উপর থেকে মেঘের লুকোচুরিতে ভ্যালির যে চোখ জুড়ানো রূপ তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

সাইল্যান্ট ভ্যালি থেকে একটু এগিয়ে রাস্তার ডান দিকে বেরিজাম লেক ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে বেরিজাম লেক দেখা যায়

পথে পড়ল ক্রপস ফ্লাই ভ্যালি।

সবুজ গাছে মোড়া ম্যাথিকেত্তান সোলা। এই ম্যাথিকেত্তানে বন্যজন্তুরা উপত্যকার নিচ থেকে উপর আর উপর থেকে নিচ হয়। ম্যাথিকেত্তান সোলা মুগ্ধ করল আমাদের।

ম্যাথিকেত্তান সোলা থেকে নিচের দিকে দু কিমি নেমে বেরিজাম লেক।

লেকের চারপাশে জেগে আছে সবুজ। পাহাড় ভেদ করে সূর্যের আলো পড়েছে লেকের জলে। চিকমিক করছে লেকের জল। তবে উপর থেকেই লেকটাকে অসাধারণ দেখাচ্ছিল।

যে পথে গিয়েছিলাম ফিরে এলাম সে পথে। ময়ার পয়েন্ট থেকে আগে গিয়েছিলাম পশ্চিমে এবার চললাম পূর্বে।

সামনেই পাইন ফরেস্ট। অবাক করে এ অরণ্য। পাইন ছাড়া আর কোনো গাছ নেই এখানে। পাইন তার ডালপালা ছড়িয়ে সোজা উঠে গেছে আকাশের দিকে। ১৯০৬ সালে এ অরণ্য রোপিত হয় মিস্টার ব্রায়ান্ট-এর উদ্যোগে। এখন এটি দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শুটিং স্পট।

পাইন ফরেস্ট বেশ কিছু খাওয়ার দোকান নজরে এল। খাওয়ারগুলোও বেশ বিচিত্র।

পাইন ফরেস্ট দেখে আমরা এলাম গুনা কেভ-এ।

গুনা কেভ  নাকি শয়তানের রান্নাঘর। মেঘ জড়িয়ে গেছে গাছে গাছে। গাছের ছড়ানো শিকড়গুলো কেমন যেন ফাঁদের আদল নিয়েছে। সব

মিলিয়ে পরিবেশটা বেশ গা ছমছম করার মতোই। জানলাম এখানেই নাকি কমাল হাসানের বিখ্যাত সিনেমা "গুনা"- এর শুটিং হয়েছিল।

পিলার রক কোদাই এর অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু মেঘের কারণে আমরা পিলার রক এর সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত রইলাম।

বাঁধানো পথের দু'দিকে সারি সারি দোকান। চকলেট,আইসক্রিম,উপহার সামগ্রী কি নেই এ গলিতে। তবে অদ্ভুত কান্ড এমন একটা গলি পথ শেষ হয়েছে সুইসাইড পয়েন্টে। প্রায় পাঁচ হাজার ফুট উঁচু এ জায়গাটা লোহার রড দিয়ে ঘেরা। নিচে উপত্যকা যেন স্বর্গের মতো অপরূপ। খুব ইচ্ছে হল আইসক্রিম খাই কিন্তু চারপাশে অসংখ্য বাঁদর। বিষয়টা বুঝিয়ে বলতেই দোকানদার রাজি হল আমাদের গাড়িতেই সে আইসক্রিম পৌঁছে দেবে।

সত্যি পাহাড়ে আইসক্রিম কেমন যেন পাল্টে যায়।

কোদাই-এ গল্ফ ক্লাব আছে, ইচ্ছে হলে খেলে নিতে পারেন।

হাতের আইসক্রিম হাতেই গলছে। চোখ বিস্ময়ে গোলগোল। গলগল করে নেমে আসছে রুপোর ধারা। সূর্যের আলোতে ঠিকরে পড়ছে তার বিচ্ছুরণ।

সশব্দে দু'শ ফুটের বেশি উচ্চতা থেকে নেমে আসছে সিলভার ক্যাসকেড।

ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম রূপসী সেই জলপ্রপাতের দিকে।

রবিঠাকুর বলেছিলেন-

"যদি ভারতকে জানতে চাও, তবে বিবেকানন্দের রচনাবলী পড়ো। তাঁর মধ্যে যা কিছু আছে সবই ইতিবাচক; নেতিবাচক কিছুই নেই।"

দেশ গড়ার জন্য বিবেকানন্দ মানুষের উপর জোর দিয়েছিলেন।

তাঁর গুরুবাক্যই তো ছিল-“যত্র জীব তত্র শিব”।

বিবেকানন্দের এই ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠেছিল সারা ভারতবর্ষকে খুব নিবিড় ভাবে দর্শনের মধ্যে দিয়ে। তিনি ভারতের গ্রাম,শহর, ধর্মস্থান, পাহাড়,পর্বত,নদী- আসমুদ্রহিমাচল পায়ে হেঁটে জেনেছেন।

সে ছিল তার পরিব্রাজন।

 হিমালয়ে তিনি যেমন বারবার ছুটে গিয়েছেন তেমনি ভারতের দক্ষিণতম শেষ স্থানটিতে ধ্যানস্থ থেকেছেন টানা তিন দিন।

            কোদাইকানাল থেকে আমরা চললাম আপামর ভারতবাসী তথা বাঙালীর আবেগের দর্শন 'কন্যাকুমারীর' অভিমুখে।

বিবেকানন্দ রক,কন্যাকুমারী এই শব্দ দুটি প্রতিটি বাঙালী-ভ্রমণকারীর হৃদয়ে নিহিত থাকে ধ্যানমগ্ন হয়ে।

তাই সময় সুযোগ পেলেই তার পথ ছুটে চলে দক্ষিণতম শেষ বিন্দুটিতে।

 আর এ পথে পা বাড়ালেই সে আপনা হতেই ভ্রমণকারী থেকে হয়ে ওঠে পরিব্রাজক।

       কোদাই থেকে আমরা বের হলাম দুপুর দুটো নাগাদ। পথে একটা হোটেলে দুপুরের খাওয়ার খেলাম। গাড়ি ছুটল তিন'শ কিমি দূরের কন্যাকুমারীর উদ্দেশ্যে।

পথে বেশ ভারি বৃষ্টি নামল।

মাদুরাই শহরকে পাশে রেখে গাড়ি চলল তিরুনেলভেল্লি হয়ে কন্যাকুমারী।

আগে থেকেই স্থির ছিল কন্যাকুমারীতে আমরা কোনো হোটেলে উঠবো না।

আমরা রাত্রিবাস করব ভারতসেবাশ্রমে।

বৃষ্টির জন্য আমরা নিদিষ্ট সময়ে আশ্রমে পৌঁছতে পারলাম না। তার উপর মূর্ত্তিজী ভারতসেবাশ্রমের লোকেশন জানত না।

জি. পি.এস-এ মুশকিল আসান হল।

যখন আশ্রমে পৌঁছলাম তখন রাত্রি আটটা বেজে গেছে।

আশ্রমে সন্ধ্যাকালীন পুজো চলছে।

 আমরা গিয়ে পুজোস্থলে বসলাম।

পুজো শেষে আমাদের থাকার জায়গা দেওয়া হল। কিন্তু রাত্রির খাওয়ার পাওয়া যাবে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেল না।

আশ্রম থেকে জানানো হল রাতের রান্নার প্রস্তুতি অনেক আগেই হয়ে গিয়েছে আপাতত কিছু বলা যাচ্ছে না।

রাত্রি দশটা নাগাদ একটি ছেলে এসে কড়া নাড়ল দরজায়।

হলদেটে দাঁত বের করে বলল-

" আসুন, খাবেন আসুন।"

কথায় কথায় জানলাম ছেলেটির বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের গোপীবল্লভপুরে। ও ছাড়াও অনেকেই এসেছে গোপীবল্লভপুর থেকে।

আশ্রমে রান্নাবান্না সহ অন্যান্য কাজ করে ওরা।

টানা জার্নি। শরীরের উপর বেশ ধকল যাচ্ছে। তাই ভোরে উঠতে হবে বলে মোবাইলে এলার্ম  দিয়ে শুয়ে পড়লাম।

 

মনটা বড় অস্থির ছিল।  মোবাইল জাগানোর আগেই ভেঙে গেল ঘুম। শীত শীত করছে। শীতের পোশাক চাপিয়ে চললাম সমুদ্রতীরে।  পথ অচেনা, জি. পি.এস. পথ দেখাল। সমুদ্রের তীরে গিয়ে দেখি গুটিকতক লোক সমুদ্র লাগোয়া কংক্রিটের উঁচু পাড়ে বসে আছে। কেউ বা ধূমায়িত চায়ের কাপে ঠোঁট রেখেছে।

সামনে দিগন্ত প্রসারিত কালো জলরাশি। ঢেউ এর ফণা সাদা বুদবুদ হয়ে ভেঙে পড়ছে সমুদ্র তটে। অনতিদূরে আদিগন্ত নিকষ কালোয় জেগে আছে আলোর স্মারক।

ভারতবাসীর পথ চলার আলোক বর্তিকা।

ঐ আলোতেই আলোকিত হয়েছে ভারত।

ঐ আলোতেই ধরা পড়েছে ভারতের সকল অন্ধকার।

দেখতে দেখতে ভিড়টা ঘন হয়ে গেল। সূর্যোদয়ের সময় এরা আগে থেকে জানত বোধ হয় তাই পুবের আকাশে লালের আভা ফুটে ওঠার আগেই উপস্থিত হল দলে দলে।

 সূর্যোদয় দেখে দ্রুত পায়ে ফিরে এলাম আশ্রমে।

      কন্যাকুমারীর জন্য প্রথম স্টিমার ছাড়ে সাড়ে আটটায়। আমাদের ঐ স্টিমারেই চড়তে হবে। কন্যাকুমারী সেরে আজই আমরা চলে যাব রামেশ্বরম। সন্ধ্যের আগে রামেশ্বরম পৌঁছতে না পারলে পমবন সেতুর মজাটাই নেওয়া যাবে না।

প্রথম স্টিমার পেলাম না আমরা, চললাম পরেরটায়। লাইফ জ্যাকেটে যাত্রীদের বেশ অন্য রকম লাগছিল। সমুদ্র, ঢেউ, স্টিমারে চড়ার রোমাঞ্চ এসব কিছু উপেক্ষা করে মনোযোগ বারবার ছুটে যাচ্ছিল দূরে জেগে থাকা পস্তর খন্ডে। 

স্টিমার স্মারক স্থলে ভিড়তে লাইফ জ্যাকেট ফেলে এগিয়ে গেলাম বিবেকানন্দ মন্দিরে। চারপাশ থেকে নীল জলরাশি আছড়ে পড়ছে শিলাখন্ডে। আজ থেকে প্রায় একশ পঁচিশ বছর আগে এক সন্ন্যাসী সমুদ্র সাঁতরে তিন দিন তিন রাত ধ্যান করেছিলেন এখানেই! ভাবতেই শিউরে উঠলাম।

মৃত্যু ভয় ছিল!

ছিল সমুদ্রজন্তুর বিপদ!

থেকে থেকে আছড়ে পড়া ঢেউ-এর হুংকার!

মনে পড়ল ঋষি-মুনির ধ্যান ভঙ্গ করতে বারে বারে মোহজাল বিছিয়েছে উর্বশীরা।

সেদিন উত্তাল সমুদ্রের বিধ্বংসী তরঙ্গ বিচলিত করতে পারে নি সন্ন্যাসীকে।

বিবেকানন্দ বারে বারে গিয়েছেন হিমালয়ে। পরিশেষে তিনি ভাবলেন-

হিমালয় আর নয় " নির্জনতার আনন্দলোক " আর নয়।

তাঁর পরিব্রাজন তো ঈশ্বরের সন্ধানে নয়।

সে তো মানুষের জন্য।

হিন্দুধর্মের ইতিহাসে সেই প্রথম কোনো সন্ন্যাসী ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে মানুষের সন্ধানে পরিক্রমা শুরু করলেন।

সেই পরিক্রমা শুরু হল দিল্লী থেকে আর সেই পরিক্রমার আপাত সমাপ্তি ঘটল কন্যাকুমারীতে।

বলা বাহুল্য চূড়ান্ত সমাপ্তি শিকাগোতে।

দেবী কুমারীর স্বপ্নে তিনি সাগর সাঁতরে উঠে এলেন "শ্রীপদ পারাই" শিলায়। কথিত আছে ঐ শিলায় দেবী কুমারী তপস্যা করেছিলেন।

ঐ শিলার উপর বিবেকানন্দ ১৮৯২ এর ২৪,২৫ ও ২৬ শে ডিসেম্বর গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হলেন।

১৯৭০ এ সেই ঘটনার স্মারক হিসাবে নির্মাণ হল বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল।

যেখানে শুধু আমি নয় আমার মতো আরো শত শত বাঙালী দাঁড়িয়ে নস্টালজিক হয়ে ওঠে।

গর্বে ফুলে উঠে বুক।

পাতাঃ ৪

সত্যি সত্যি জামায় টান অনুভব করলাম। পায়ে পায়ে ঘুরে নিলাম দেবী কুমারীর মন্দির। যে মন্দিরে ধরা পড়েছে দেবীর পদচিহ্ন।

মন-প্রাণ জুড়িয়ে গেল অনুপম স্থাপত্যে নির্মিত  বিবেকানন্দ মন্দিরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে। মন্দিরে বিবেকানন্দের দণ্ডায়মান মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে অন্তর হয়ে উঠল অঞ্জলিবদ্ধ করপুট।

যে পাথরটিতে ধ্যান করেছিলেন বিবেকানন্দ সেই পাথরটির উপর বর্তমানে গড়ে উঠেছে ধ্যানমন্ডপ। সেখানে দর্শনার্থীরা ধ্যান করেন। সেখানে শিশুদের প্রবেশ মানা।

চোখ বন্ধ করে বসে গেলাম ধ্যানে।

 সে এক অন্য জগত।

আমি যে বেড়াতে বেরিয়েছি সে যেন মিথ্যে। আমি যেন এক অন্য আমি।

মুদিত নয়নে বসে আছি আর...

দিগ্বিদিকে মন্দ্রিত হচ্ছে আদি ধ্বনি ওঁ....

ভেতরে বসে বারবার মনে হচ্ছিল বাইরের সমুদ্রের আস্ফালন তার আছড়ে পড়ার হুংকার ভেতরে এসে কোথায় যেন পাল্টে যাচ্ছে ওঁ - এ।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে থাকল।

ফুরিয়ে এল আমাদের সময়। ফেরার স্টিমারে চড়ে বসলাম। কিন্তু দু'চোখে তখনও ধরা পড়তে চাইছে ফেলা আসা 'আলোর স্মারক'। যতক্ষণ না তা আকারে ছোট হতে হতে বিন্দুতে পরিণত না হয় ততক্ষণ নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলাম বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়ালের দিকে।

      মূল ভূখন্ডে ফিরে আমরা চললাম কন্যাকুমারীর মন্দিরে। এ মন্দিরের পিছনেই মিলিত হয়েছে তিন সমুদ্র। কিংবদন্তির শেষ নেই এ মন্দির ঘিরে। কথিত আছে বহ্মার বরে সর্বশক্তিমান বাণাসুর আক্রমণ করে স্বর্গ। এ বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে বিষ্ণুর নির্দেশে যজ্ঞে বসেন দেবরাজ ইন্দ্র। যজ্ঞের হোমানল থেকে জন্ম হয় এক কন্যার।

আসলে সে কন্যা ছিল পার্বতী।

শুচীন্দ্রম থেকে শিব চললেন কন্যাকে বিয়ে করতে। কিন্তু কন্যার বিয়ে হয়ে গেলে বাণাসুর বধ সম্ভব হবে না। তাই দেবতাদের অনুরোধে নারদ পথ মধ্যে মোরগ ডাক ডাকেন।

এই ডাক শুনে শিব পুনরায় ফিরে এলেন শুচীন্দমে।

বিয়ের লগ্ন পেরিয়ে গেলে কন্যা রইল কুমারী।

দেবী কুমারীর মন্দিরে পুরুষদের প্রবেশ করতে হয় ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত হয়ে। প্রথা মতো জামা, গেঞ্জি খুলে দেবী দর্শন করলাম।

দুপুরের খাওয়া হল কন্যাকুমারীতে। এখানে বেশ কিছু বাঙালী হোটেল আছে।

মিছরি দানা আর মৌরির মুখশুদ্ধি চিবাতে চিবাতে গাড়িতে উঠে বসলাম। 

গাড়ি ছুটল রামেশ্বরমের দিকে।

ততক্ষণে বাবদা আমার কোলে এসে বসেছে।  বিবেকানন্দ সম্পর্কে তার নানা প্রশ্ন। আমিই বা কতটুকু জানি। বিবেকানন্দের ছেলেবেলার কিছু ঘটনা বলতে থাকলাম মজা করে। গল্প শুনতে শুনতে আমার কোলেই ঘুমিয়ে পড়ল বাবদা।

ছোট্ট নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলাম -

"আমার সন্তান যেন সত্যিকারের ভালো মানুষ হয়।"

 কে বড় কে ছোট এ দ্বন্দ্ব কেবল মানুষে মানুষে নয়, এ দ্বন্দ্ব অনেক বেশিকরে ছিল দেবতাদের মধ্যে। একবার বহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যে তুমুল বিবাদ-কে বড় কে ছোট।

বিবাদ বাড়তে থাকে তবুও এ তর্কের সমাধান হয় না। তখন দু'জনেই মহাদেবের শরণাপন্ন হন।  মহাদেবের কাছে দু'জনেই দাবী করেন শ্রেষ্ঠত্বের। অবস্থা বুঝে মহাদেব একটি জ্যোতি বা আলোর স্তম্ভ দিয়ে স্বর্গ-মর্ত-পাতাল বিদীর্ণ করে দেন। এবং বিবাদমান দু-পক্ষকে ঐ স্তম্ভের শেষ সন্ধান করতে বলেন।

অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু ঐ আলোক স্তম্ভের শেষ সন্ধান করতে পারলেন না।

হতোদ্যম হয়ে ফিরে এলেন দু'জন।

ব্রহ্মা মিথ্যে করে বললেন তিনি সন্ধান পেয়েছেন। কিন্তু বিষ্ণু পরাজয় স্বীকার করে নিলেন।

মহাদেব জানতেন দু'জনের কেউই জ্যোতিস্তম্ভের শেষ খু্ঁজে পাবেন না। মিথ্যাচারিতার জন্য মহাদেব ব্রহ্মাকে অভিশাপ দিলেন, কেউ তার পুজো করবে না।

ঐ আলোর স্তম্ভই হল জ্যোতির্লিঙ্গ।

 এবং এই জ্যোতির্লিঙ্গই হল  আলো ও সৃষ্টির মূল।

      উপমহাদেশে বারোটি শৈব তীর্থকে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ বলা হয়। আশ্চর্যের বিষয় এর মধ্যে সাতটি তীর্থ ৭৯ ডিগ্রী দ্রাঘিমায় অবস্থিত।

অর্থাৎ ঐ জ্যোতির্লিঙ্গকে যোগ করলে তীর্থগুলি একটি সরলরেখায় অবস্থান করে।

যে সরলরেখার শুরু হয়েছে উত্তরে কেদারনাথ থেকে আর শেষ হয়েছে দক্ষিণে রামেশ্বরমে।

    কন্যাকুমারিকা থেকে আমরা চলেছি রামেশ্বরমের উদ্দেশ্যে।

এই প্রথম আমাদের যাত্রাপথ পুরোটাই সমতলে। কোনো পাহাড়ি পথ আমাদের অতিক্রম করতে হবে না।

কন্যাকুমারী থেকে তেন্নারভেল্লী বা তিরুনেলভেল্লী হয়ে তুতিকোদী পর্যন্ত সমতল পথে তাল, খেজুর, কলা গাছের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। চারপাশের গাছ-গাছালি দেখে মনে হয় আমরা মেদিনীপুরেই আছি। তুতিকোদী থেকে যতই রামনাথপুরম বা রামনাড়ের দিকে গাড়ি এগিয়েছে ততই পরিবেশ হয়েছে রুক্ষ। গাছপালা বলতে কিছু কাঁটা জাতীয় গাছ। চোখে পড়ার মতো জলাভাব। প্রকট হয়েছে পানীয় জলের জন্য সাধারণ মানুষের সংগ্রাম।

মূর্ত্তিজীর থেকে জানলাম তামিলনাড়ুর দক্ষিণ-পূর্বে মানুষের প্রধান সমস্যা হল জল। উলিপুচিতেই শেষ নদী-ভাইগাই।

 তারপর যতই দক্ষিণে এগানো যাবে পরিবেশ হয়ে উঠবে ততই রুক্ষ আর শুষ্ক।

তবে ঐ শুকনো পরিবেশে ময়ূর দেখলাম। ওরা দলে দলে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাপ আর পোকা-মাকড়ের সন্ধানে।

    তুতিকোদি( তুতিকোরিন) থেকে রামনাড় প্রায় একশ চল্লিশ কিমি পথ গাড়ি ছুটল বায়ু বেগে।

টানা কয়েক ঘন্টা গাড়িতে বসে থেকে পা ধরে আসছিল। রামনাড়ে চা ও জলখাওয়ার খেয়ে একটু এলোমেলো ঘুরে নিলাম।

রামনাড় থেকে মন্ডপম পর্যন্ত প্রায় চল্লিশ কিমি পথ। পথের দুপাশে নুন তৈরীর কারখানা ছাড়া তেমন কোনো ঘন বসতি চোখে পড়ল না।

             আমরা যখন মন্ডপমে পৌঁছলাম তখন বিকেল। দিনের  আলো মরে এসেছে। বাতাসে শীতলতার ছোঁয়া।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমরা ঢুকে পড়লাম পমবন ব্রীজে। আর মুহূর্তে সমস্ত পথশ্রম উধাও। মনের ভিতর তখন জলতরঙ্গের উচ্ছ্বাস।

পমবনের কথা শুনেছিলাম। এখন তাকে প্রত্যক্ষ দেখে মনে হচ্ছে যা শুনেছি তাতো কিছুই নয়। একটা সেতু এতো অপরূপ হতে পারে তা না দেখলে বুঝতেই পারতাম না।

মন্ডপম আর পমবন এই দুটো দ্বীপের মাঝে উত্তাল বঙ্গোপসাগর।

আর সেই নীল তরঙ্গে সুতোর মতো দুটি সেতু। একটি রেল পথ- যা নির্মাণ করেছিল ব্রিটিশরা  ১৯১৪ সালে আর অন্যটি বাস পথ।

বাস পথ জলতল থেকে বেশ উঁচুতে হলেও রেল পথ সমুদ্রের সঙ্গে যেন মিশে গেছে।

 সমুদ্রের ঢেউ থেকে থেকে ফণা তুলে দংশন করতে চাইছে লৌহ-পথকে।

এই পমবন সেতু পৃথিবীর দ্বিতীয় বিপদজনক রেলযাত্রা। সেতুর দু'দিকে কোনো প্রাচীর নেই। দুলতে দুলতে চলেছে ট্রেন। তার উপর এ অঞ্চল নাকি সাইক্লোন প্রবণ।

রেল-পথের আর একটি বিশেষত্ব -এটি ফোল্ডিং অর্থাৎ জাহাজ বা জলযান যাতায়াতের জন্য মাঝের একটি অংশ প্রয়োজনে উন্মুক্ত করা যায়।

ব্রিজের  উপর সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে। ভ্রমণকারীরা ব্রিজের উপর থেকে ছবি তুলছে। দেখছে এক অনন্য নির্মাণ।

আমরাও নেমে এলাম গাড়ি থেকে। দূরে পমবন দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখ জুড়িয়ে দিল। সমুদ্রের নীল যেখানে শেষ হয়েছে সেখানেই শুরু হয়েছে সবুজের শ্যামলীমা। তীরে দাঁড়ানো তরীগুলো আরো অপরূপ করেছে পমবনকে। নীল সমুদ্রের দোলায় থেকে থেকে আদর নিচ্ছে কিছু স্টিমার। আর উপরের নীল মহাশূন্যে বিন্দু বিন্দু বিহঙ্গের দল।

  এমন একটা রেলযাত্রার রোমাঞ্চ নিতে বড় সাধ হল।

  মনে মনে ভাবলাম ফেরার সময় রামেশ্বরম থেকে ট্রেনে চেপে মন্ডপম আসব।

  দিনের আলো এখন বেশ নরম। সে আলো তলানিতে পৌঁছানোর আগেই রামেশ্বরম পৌঁছানোটাই উচিত হবে।

   পমবন দ্বীপের দক্ষিণ দিকটা লেগে রয়েছে রামেশ্বরম দ্বীপের সঙ্গে। পমবন থেকে আমরা পৌঁছলাম রামেশ্বরমের শ্রীরাম পাদম মন্দিরে। এ মন্দিরে রামের পায়ের চিহ্ন রয়েছে। ওখান থেকে চার কিমি দূরে লক্ষণ তীর্থম।

লক্ষণ তীর্থম সারতেই সন্ধ্যা হয়ে এল।রামেশ্বরম ভারতসেবাশ্রমে গিয়ে কোনো রুম পেলাম না। মহারাজ(সাধু) বললেন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় রুম মিলবে।কারণ অনেকেই রাতের ট্রেনে করে ফিরে যাবেন।

 সাতটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল না।

ঘর মিলল তিনটি। সারা আশ্রম ফাঁকা। সবাই চলে গেল। আমাদের পর আরো দু'দল এলো।

লোকজন কম তাই রাত্রে রান্না হল না। আমরা হোটেল থেকে খাওয়ার নিয়ে এলাম।

   আর একটু হলেই ট্রেনটা মিশ হতো। সুবিধা এই যে সঙ্গে কোনো ব্যাগ পত্তর নেই। সেগুলো সব মূর্ত্তিজীর গাড়িতে। তাই ট্রেন ছাড়ার সামান্য আগে তড়িঘড়ি ট্রেনে উঠতে পারলাম।

মূর্ত্তিজী আমাদের জন্য মন্ডপমে অপেক্ষা করবে। কারণ পমবন ব্রীজে ট্রেনের গতি খুবই কম থাকে।

ট্রেনটা চলছিল বেশ, ভয় যে একদম হয় নি তা নয় কিন্তু তাকে লুকানো ছাড়া তো আর কোনো উপায় ছিল না।

হঠাৎ ট্রেনের কালো ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল।  সে অন্ধকার এতো ঘন যে বাইরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

থেকে থেকে সমুদ্র গর্জন ঘিরে ধরছিল আমাদের। তখন ট্রেনের কূপজুড়ে এক অসহায় আর্তনাদ। বাবদা কাঁদছে তার মাকে জড়িয়ে। চরম এক অনিশ্চয়তায় দুলছি আমরা।  আর থেকে থেকে ডাকছি  ঈশ্বরকে। ট্রেনের পাটাতনে  আছড়ে পড়ছে ঢেউ, পায়ে জল লাগা মাত্র পা'টা ঠান্ডা হয়ে গেল।

   ভোরের আলো জানালা ভেঙে ঢুকে পড়েছে আশ্রমের ঘরে। ঘুমের মধ্যে কখন পায়ের নিচের দিক থেকে সরে গেছে বেডশিট। ভোরের ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগছে খোলা পায়ে।

বিশ্রী একটা স্বপ্নে মনটা তেতো হয়ে গেল।

বিছানার উপর চুপটি করে বসলাম। পাশে বাবদা তার মাকে জড়িয়ে শুয়ে।

মনে মনে রাম রাম  বললাম...

স্থির করলাম -মূর্ত্তির গাড়িই ভাল।

 রোমাঞ্চ!

সে গৃহীদের জন্য নয়।

ভোরবেলায় রামেশ্বরমে বঙ্গোপসাগরে সূর্যোদয় এক অনন্য রূপ নেয়। সূর্যোদয় দেখে মন্দির দর্শন। রামেশ্বরমকে দক্ষিণের কাশী বলা হয়। কাশীর বিশ্বনাথ দর্শনে যে পুণ্য রামেশ্বরমের রামনাথ দর্শনে সেই পুণ্য।

বঙ্গোপসাগরে স্নান সেরে মন্দিরে প্রবেশ।  মন্দিরের মধ্যে বাইশটি কুয়ার জলে স্নান তারপর পুজো নিবেদনের বিধান। তবেই পূর্ণাঙ্গ পুজো। তবেই অখন্ড পুণ্য।

এটাই ছিল রামেশ্বরম ভ্রমণের প্রথম পর্ব।  পুজো নিবেদনের পর সিক্ত শরীরে থরথর কাঁপতে কাঁপতে আশ্রমে ফেরা।

আশ্রম থেকে ব্যাগ পত্তর নিয়ে দ্বিতীয় তথা শেষ পর্বের যাত্রা।

পরিকল্পনাতো আর শেষ কথা নয়। পরিস্থিতি যে প্রতিনিয়ত পরিকল্পনায় লাগাম লাগায়।

দীর্ঘ পথশ্রম আর ভোরের অত্যল্প শীতে ব্যাঙ্কেটের ওম বারোটা বাজালো।

বাবদার বাথরুম তাড়নায় ঘুম ভাঙল। ঘড়িতে তখন সাড়ে সাত। সূর্যদেব দিগন্তরেখার অনেক উপরে।

 বিলম্বিত বিছানা বিয়োগে বিঘ্নিত হল বর্গ(পর্ব) বিভাজন।  যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হল বাঁধা-ছাঁদা।

লঙ্কা যুদ্ধে রাম রাবণকে হত্যা করে সীতাকে নিয়ে রামেশ্বরমে পৌঁছলে ঋষি পুলস্ত রামকে বিধান দেন শিব পুজো করার। রাবণ যেহেতু ঋষি পুলস্তের বংশধর তাই তাকে হত্যায় রামচন্দ্রের ব্রহ্ম হত্যার পাপ হয়েছে।

এ অবস্থায় একমাত্র প্রতিকার শিবের আরাধনা। পুলস্তের বিধান মতো রামচন্দ্র হনুমানকে নির্দেশ দেন কৈলাস থেকে শিবলিঙ্গ আনতে।

হনুমানের বিলম্বে সীতা নিজেই বালি দিয়ে শিবলিঙ্গ নির্মাণ করেন। পুজো হয় শিবের। কিন্তু পুজো শেষের অব্যবহিত

পাতাঃ ৫ 

পরেই হনুমান হাজির শিবলিঙ্গ নিয়ে।রামচন্দ্র বুঝতে পারলেন পুজো হয়ে যাওয়ায় হনুমানের অভিমান হয়েছে। তাই তিনি হনুমানকে সীতার তৈরী শিবলিঙ্গ সরিয়ে সেই স্থলে কৈলাস থেকে আনীত শিবলিঙ্গ স্থাপন করতে বলেন।

হনুমান তার সর্বশক্তি দিয়েও সরাতে পারলেন না বালির তৈরী শিব।

সেই থেকে রামেশ্বরমে দুই শিবই পূজিত হয়ে আসছে। কৈলাস থেকে আনীত শিবের নাম বিশ্বলিঙ্গ বা বিশ্বনাথ আর সীতাদেবীর বালি নির্মিত শিব রামলিঙ্গ বা রামনাথ।

তবে রামচন্দ্র হনুমানকে সন্তুষ্ট করতে বিধান দেন রামলিঙ্গের আগে বিশ্বলিঙ্গের পুজো হবে।

আজও তার অন্যথা হয় না।

রামেশ্বরমে আমার বাড়তি খুশির অন্য একটা কারণ আছে। আমার রামেশ্বরম দর্শন হলে ভারতের চারধামের আর একটি মাত্র ধাম দর্শন আমার অবশিষ্ট রইবে।

ভারতের চারধাম - উত্তরে বদ্রীনারায়ণ( ২০১৫ তে গিয়েছিলাম), পূর্বে শ্রীধাম( দু'বার গিয়েছি), দক্ষিণে রামেশ্বরম দর্শন হলে বাকি থাকছে পশ্চিমে দ্বারকা।

      রামেশ্বরম মন্দিরের চারদিকে রয়েছে চারটি গোপুরম( বিচিত্রিত প্রবেশদ্বার)। পূর্বের গোপুরমটি সবচেয়ে উঁচু,১২৬ ফুট। রামেশ্বরম মন্দিরের বারান্দা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ বারান্দা। মন্দিরে মোবাইল, ক্যামেরা নিষিদ্ধ তাই সে সব বাইরে রেখে পূর্ব গোপুরম দিয়ে প্রবেশ করলাম মন্দিরে।

দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দিরের স্থাপত্য আজও বিস্ময়াবহ। পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে কি অদ্ভুত নৈপুণ্যে রচিত হয়েছে ভারত তথা বিশ্বের অন্যতম উপাসনালয়।

২০০৪ সালের ভয়াবহ সুনামিতে আশ্চর্যজনক ভাবে অক্ষত থেকে যায় মন্দির।

মন্দিরের মধ্যে অগণিত ভক্তদল ভেজা কাপড়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে চলেছে তাদের নিবেদন নিয়ে।

এতো বড় মন্দির কে যে কোন পথে আসছে আর কোন পথে বেরিয়ে যাচ্ছে তা ঠাহর করা মুশকিল।

মন্দিরে যে বাইশটি কুয়ো আছে তার প্রত্যেকটির জলের স্বাদ ভিন্ন। কিন্তু আমাদের পরখ করার সুযোগ নেই।

রামনাথ মন্দির, বিশ্বনাথ মন্দির,বরধিনী মন্দির, নন্দীদেবের মন্ডপ দর্শন শেষ করে আমরা চললাম ধনুষকোডির পথে।

রামেশ্বরমের অন্যতম আকর্ষণ হল ধনুষকোডি। মূল দ্বীপ থেকে প্রায় তিরিশ কিমি পথ চলে গেছে দু'দিকে সমুদ্র রেখে। আগে বড় গাড়ি যেত পঁচিশ কিমি পথ এখন পুরোটাই চলা যায় বড় গাড়ি তে।

ধনুষকোডিপয়েন্ট হল দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের শেষ স্থলভাগ।

রোমাঞ্চিত হলাম যখন দু'পাশে সুদূর নীল জলরাশি নিয়ে এগিয়ে চলল কালো পিচ রাস্তা। দু'দিকে উত্তাল সমুদ্র আর তার বুক চিরে এগিয়ে চলেছি তিরিশ কিমি। 

যতই সমুদ্রের শরীরে প্রবেশ করছি ততই সশব্দে ভেঙে পড়ছে সমুদ্র।

শেষ পর্যন্ত আমরা ধনুষকোডিপয়েন্টে পৌঁছলাম।

অশোক স্তম্ভের নিচে দাঁড়িয়ে নিজেকে মস্তবড় পর্যটক মনে হল।

মূর্ত্তিজির থেকে জানা গেল এখান থেকে রাতে শ্রীলঙ্কার আলো দেখা যায়।

গাড়ি থেকে নেমে বালি মাড়িয়ে চললাম সমুদ্রের কাছে। এখানকার বিচ অপ্রসস্থ। স্নান নিষেধ। সমুদ্র ছোঁয়ার জন্য এগিয়ে গেলাম পায়ে পায়ে। হাওয়ায় ঢেউ এর বুঁদবুঁদ উড়ে এসে ছড়িয়ে পড়ছে মুখে-মাথায়, শরীরে। সমুদ্রের ঢেউ এসে ধুয়ে দিচ্ছে পা। তীরে আছড়ে পড়া ঢেউ ফিরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়ের তলা থেকে সরে যাচ্ছে বালি।

সত্যিই এই বিচ বেশ বিপদজনক।

ফেরার পথে দেখে নিলাম কোথান্ডা রাম মন্দির এটাকে বিভীষণ মন্দিরও বলে। যুদ্ধ যাওয়ার আগে এখানেই প্রথম বিভীষণের অভিষেক হয়। যুদ্ধে জয়ের পর লঙ্কায় পুনরায় বিভীষণের রাজ্যাভিষেক হয়। মন্দিরের পুরোহিত আমাদের খুব যত্ন করে বুঝিয়ে দিলেন সে ইতিহাস। ঐ মন্দিরের পাশ থেকেই তৈরি হয়েছিল লঙ্কা যাওয়ার সেতু। সেই সেতুর  অস্তিত্ব নাকি নাসার গবেষণায় ধরা পড়েছে। সেতু ধরে একদল স্থানীয় লোককে এগিয়ে যেতে দেখলাম। একটা শিলা এখনও রাখা আছে ওখানে। জানা গেল ওটা নাকি রামশিলা। জলে ভাসে। পরখ করার জন্য প্যান্ট গুটিয়ে নেমে পড়লাম জলে।

সত্যিই পাথরটা ভাসছে জলে।

হাতে নিলাম পাথরটাকে, বেশ ভারি।

তবে ভাসছে কি ভাবে!

পাথরের শরীরে অসংখ্য ছিদ্র।

ঐ ছিদ্রগুলোতে লুকিয়ে আছে ভাসমান পাথরের রহস্য।

বারাণসীর

ঘাটে ঘাটে....

     সব মানুষের মধ্যে একটা করে নদী থাকে। সে নদী কুলকুল করে বইতে থাকে অবিরত। ঐ যে স্পন্দন, ঐ বহমানতা ওটাই তো জীবন। যদি স্রোত রুদ্ধ হয়,যদি গতি বাধা পড়ে তবে জীবন থেমে যায়। হয়তো তাই মানুষ বারে বারে ফিরে গেছে নদীর কাছে, স্রোতের সান্নিধ্যে। তার সঙ্গে মেলাতে চেয়েছে জীবনকে।

  লিখেছেন... সনোজ চক্রবর্তী 

(পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা)

     সব মানুষের মধ্যে একটা করে নদী থাকে।
সে নদী কুলকুল করে বইতে থাকে অবিরত।
ঐ যে স্পন্দন, ঐ বহমানতা ওটাই তো জীবন।
যদি স্রোত রুদ্ধ হয়,যদি গতি বাধা পড়ে তবে জীবন থেমে যায়।
হয়তো তাই মানুষ বারে বারে ফিরে গেছে নদীর কাছে, স্রোতের সান্নিধ্যে।
তার সঙ্গে মেলাতে চেয়েছে জীবনকে।
রাস্তায় এসে দেখি নদীর কাছে যাওয়ার কোন ব্যবস্থাই নেই।
থাকবে কি করে!
মোবাইলে এলার্ম দেওয়া ছিল ভোর চারটায়।
তৈরি হতে মিনিট দশ।
রাস্তায় নেমে মোবাইলে সময় দেখলাম--
চারটে কুড়ি।
পথ-ঘাট সব শুনশান।
না আছে রিকসা্ না অটো।
শীত শীত করছে....
এদিকে নদী ডাকছে....
নদীর কুলকুল শব্দ টানছে....
অগত্যা হাঁটা। 
সূর্যোদয়ের আগেই পৌঁছতে হবে ঘাটে।
শিথিল সে প্রত্যুষে গলিতে গলিতে যে লোকজনের দেখা মিলল তারা সবাই চলেছে নদীর জন্য।
সবাই চলেছে বারাণসীর পুণ্যতোয়া গঙ্গার উদ্দেশ্যে।


ঐ দুই নদী যেহেতু ঐ স্থলে মিলিত হয়েছে তাই নগরটির নাম বারাণসী।

ঘাটের পাট ভেঙে পায়ে পায়ে নেমে এলাম নদীর কাছে।
ভোরের আবছা আলোয় জেগে উঠছে দশাশ্বমেধ ঘাট।
বৈদিক ঐতিহ্য আর নানান স্তোত্রপাঠে সে এক স্বর্গীয় পরিবেশ।
গঙ্গা এখানে পবিত্রতার, পরিত্রাতার প্রতীক।
এখানে স্নান করলে নাকি সর্বরোগ দূর হয়, সর্বপাপ ক্ষয় হয়।
এক গন্ডূষ গঙ্গাজল পানে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল মেলে।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মত্ত অবগাহনে।

 

খ্রিস্টের জন্মের ১২০০ বছর আগে সুহোত্র পুত্র কাশ্য একটি নগরী নির্মাণ করেন। কাশ্যর নাম অনুসারে নগরীটির নাম হয় কাশী।
পরবর্তীকালে কাশীরাজ বরণা বারাণসী নামে এক দেবীর প্রতিষ্ঠা করেন।
কাশীর নাম পাল্টে হয়ে যায় বারাণসী।
আবার বামনপুরাণে বলা হচ্ছে--
বিষ্ণুর অংশসম্ভূত অব্যয় পুরুষের দক্ষিণ পা থেকে সর্বপাপহরা মঙ্গলদায়িনী বরুণা ও বাম পা থেকে অসি নদীর উদগম।

মন্দিরের চারপাশের বাড়ি ভাঙা হচ্ছে যাতে মন্দির দূর থেকে প্রতীয়মান হয়। চারপাশে ধুলো আর তার সঙ্গে ষন্ড ও পান্ডাদের উৎপাত।
বিশ্বনাথ দর্শন সেরে রাস্তায় পৌচ্ছে দেখি ভোরের সে পথ এখন অন্য এক চেহারা নিয়েছে।
অগনিত মানুষ, অটো, রিকসা্, হেলেদুলে ষাড়েদের যাতায়াত, ফুটপাথ উপচে দোকানপাট -- বেসামাল ট্রাফিক ব্যবস্থা।

বিকেলে বেরালাম নৌকায় চেপে গঙ্গা ঘুরতে।
সে এক আনন্দময় পরিভ্রমন।

অসি ঘাট থেকে শুরু হল নৌ-বিহার।
তারপর একে একে জানকী ঘাট, তুলসী ঘাট, হনুমান ঘাট পেরিয়ে হরিশ্চন্দ্র ঘাট।
রাজা হরিশ্চন্দ্র-শৈবা-রুহিতাস্য স্মৃতিমন্ডিত হরিশ্চন্দ্র ঘাটে শব দাহ হচ্ছে দেখলাম। নৌ-চালক জানালো, লোকালয় থেকে এ ঘাট দূরে বলে দাহ হয় কম।
তারপর কেদার ঘাট, নারদ ঘাট, ধোবী ঘাট, অহল্যাবাঈ ঘাট, প্রয়াগ ঘাট, দশাশ্বমেধ ঘাট মান ঘাট, মীরা ঘাট ও সব শেষে মনিকর্নিকা ঘাট। এ ঘাটে নাকি শিব-জায়া পার্বতীর কুন্ডল পড়ে। তাই বেনারস একান্ন সতী পীঠের একটি। মনিকর্নিকা ঘাট হল মহাশ্মশান, এখানে শবদহ চলে অবিরত।
নৌ-বিহারের শেষ দিকে সন্ধ্যা নামল।
সূর্যাস্থের লাল আলো মিশে যাচ্ছে গঙ্গার স্রোতে। সে এক অপরূপ দৃশ্য।

বারাণসীর আরো এক আকর্ষণ হল সন্ধ্যাকালে দশাশ্বমেধ ঘাটে গঙ্গারতি।
সাতজন পুরোহিত এক সঙ্গে আরতি করেন।
স্তোত্রপাঠের সঙ্গে সঙ্গে চলে সে আরতি।
নদীর জলে আলোর আলপনা।
আরতি শেষে পুরোহিতের সুললিত কন্ঠে বেজে ওঠে ঈশোপনিষদের শান্তি পাঠ--
"ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাং পূর্ণমুদচ্যতে;
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ "
গঙ্গারতি শেষে ভিড় ঠেলে এগিয়ে চলে ছি।
চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে বহমান গঙ্গা। কানে বাজছে শান্তি পাঠ--
"উহা পূর্ণ(অদৃশ্য ব্রহ্ম), ইহা পূর্ণ(এ দৃশ্য জগৎ)
পূর্ণ(ব্রহ্ম) থেকেই পূর্ণের( দৃশ্য জগতের) উৎপত্তি। পূর্ণ(দৃশ্য জগৎ) -এর পূর্ণত্ব সরিয়ে নিলে পূর্ণ(ব্রহ্ম)-ই মাত্র অবশিষ্ট থাকেন।
মনে মনে ভাবলাম এই যে গঙ্গারতি এ তো জীবনের বন্দনা, এতো স্রোতের উপাসনা।
এ ভ্রমন তো নিছক ভ্রমন নয়-
এ যে জীবনবোধের পাঠ।
এ যে জীবনের মূলমন্ত্রটির উচ্চারণ।

অস্ফুটে কে যেন বলে উঠল--
" শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ।"
তোমরা অমৃতের সন্তান--
জীবনকে... জীবনের গতিকে....
জীবনের প্রবাহকে.....
অশিব থেকে শিবে, অকল্যান থেকে কল্যানে প্রবাহিত কর।

একটি ভ্রম(ন)

কাহিনী

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় ইংরেজ সৈন্য-রা তাজমহলের শরীর থেকে মূল্যবান রত্ন খুলে নেয়।
এখন তাজমহলকে চোখ রাঙাছে দূষণ।
তার শরীরে থাবা বসাচ্ছে অ্যাসিড বৃষ্টি।
যমুনায় আর কেউ জল আনতে যায় না। যমুনায় জল নেই।
যমুনা বয়ে চলেছে বিষ।
যমুনায় আর তাজের ছায়া পড়ে না।

  লিখেছেন... সনোজ চক্রবর্তী 

(পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা)

     বুরহানের যুদ্ধ প্রান্তরে বসে খুরম মিঞা তোলার এক দিকে বুরহান জয় ও গৌহর বেগম ভূমিষ্ঠ হওয়ার আনন্দ আর অন্য দিকে দ্বিতীয় স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগমের অকাল প্রয়াণ লাগিয়ে বুঝলেন দ্বিতীয় দিকটার ভার অনেক বেশী।
বিচ্ছেদ-বিষাদ ছাপিয়ে যাচ্ছে সকল আনন্দকে।

খুরম মিঞা আরজুমান্দ বেগমকে প্রথম দেখেছিলেন আগ্রার বাজারে ১৬১২ তে।
প্রথম দর্শনেই কুপোকাত।
তখন দুজনের বয়স ১৫ বছর ও ১৪ বছর।
জ্যোতিষী বাদ সাধলেন সাদীতে, সময় ভাল নয়।
হয়ে রইল বাকদান।
কিছুকাল পরে জাকজমকে বিয়ে।
আরজুমান্দ হলের মিঞায় দ্বিতীয় স্ত্রী (কেউ বলেন ৩য়, কেউ ৪র্থ- আসলে রাজা বা সম্রাটদের স্ত্রীর সংখ্যা ধরতে নেই)।

 

তৈরী করলেন নকসা্।
মুল স্থপতির দায়িত্ব নিলেন উস্তাদ আহমেদ লাহোরী।
কাজিম খান, চিরঞ্জীলাল, আমানত খানেরা ভাগ করে নিলেন দায়িত্ব।

যমুনা নদী দূর্গের নিচ থেকে পশ্চিমদিকে যেখানে বড় বাঁক নিয়েছে স্থির হল সেখানেই তৈরি হবে সৌধ।
রাজস্থান থেকে এল সাদা পাথর, লাল-বাদামী-হলুদ পাথর এল পাঞ্জাব থেকে, চীন থেকে সবুজ,তিব্বত থেকে নীল আর নীলমনি রত্ন এল শ্রীলঙ্কা থেকে।
নির্মাণ শুরু হল ১৬৩২ এ, মূল নির্মাণ শেষ হল ১৬৪৮ এ।
তবে সৌধের চারপাশ, প্রবেশপথ এসব ধরলে নির্মাণ শেষ হয় ১৬৫৩ তে, অর্থাৎ ২১ বছর ধরে চলে সেই নির্মাণ-সংগ্রাম।
খুরম অর্থাৎ সম্রাট সাহাবুূদ্দিন মহম্মদ শাহজাহান নির্মাণ করলেন এক অমর কীর্তি "তাজমহল"।

 

১৬৩১ সালে আরজুমান্দ ১৪ তম সন্তান গৌহর বেগমের জন্মদিতে গিয়ে মারা গেলেন।
মাত্র ১৮ বছরের মধ্যে নিভে গেল দাম্পত্য জীবনের আলো।
জয়নাবাদ বাগানে সাময়িক সমাহিত করা হল আরজুমান্দকে।
কিন্তু এ তো আর যে সে প্রেম কাহিনী নয় যে ফুস করে শেষ হয়ে যাবে।
খুরম মিঞা তাঁর প্রেমকে অমর করে রাখতে শুরু করলেন এক অনন্ত যুূদ্ধ।
সে যুদ্ধে সামিল হল ২০০০০ মানুষ,১০০০ হাতি।
খরচ হল আনুমানিক ৬৪৩৮ কোটি টাকা।
পারস্য থেকে তলব হল ঈশা আফেন্দীর।

 

পরবর্তীকালে ওখানেই আরজুমান্দ বানু বেগম ওরফে মমতাজ মহলের সমাধীর পাশেই সহাহিত হন সম্রাট শাহজাহানও।

১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ রাজার রাজদূত ও পর্যটক এডওয়ার্ড লিয়ার তাজমহল দেখে বলেলেন--
" আজ থেকে বিশ্ববাসীকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হলো, প্রথমশ্রেণী যারা তাজমহল দেখেছে আর দ্বিতীয় যারা তা দেখে নি।"
১৯৯৯ এ, আমি প্রথম শ্রেণীতে ঢুকে পড়ি। সেবার আমরা বি.এড. কলেজ থেকে গিয়েছিলাম তাজমহল।
এবার আমরা একজন দর্শক বাড়িয়েছি।

তাজমহলের প্রবেশ পথ ১০০ফিট উচুঁ।
যেমন প্রাণী তার মলও তেমন।
হাতির মলের সঙ্গে আরশোলার পটির তুলনা চলে না।

পুরো তাজমহল ১৮০ফিট উচুঁ। তাজমহলের গম্বুজের উচ্চতা ২১৩ফিট।
পুরো চৌহুদ্দী ১৯০২x ১০০২বঃফিট। চারপাশে রয়েছে চারটি মিনার।
মিনার এর উচ্চতা ১৬২.৫ফিট।
তাজমহলে বিভিন্ন ধর্মের নিদর্শন মেলে। গম্বুজের উপর চুঁড়াটি শিবের ত্রিশুল(অনেকে মনে করেন তাজমহল আসলে রাজা জয় সিংহের শিব মন্দির) মিনার ও গম্বুজ ইসলাম ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে।
সারা সৌধ জুড়ে অপরূপ সব স্থাপত্য, ভাস্কর্য যা বর্ণনা করা যায় না।
পারস্য,তুরস্ক,ভারতীয় ও ইসলামী স্থাপত্য শিল্পের সম্মিলন তাজমহল।
সূর্যোদয়,সূযাস্ত এমন কি পূর্ণিমায় চাঁদের আলোয় রং পাল্টে পাল্টে যায় তাজমহলের।

তাজমহলের দার্শনী জন প্রতি ৫০টাকা পনেরো বছরের নিচে শিশুদের ফ্রি। প্রবেশ পথে নানা জিনিসের উপর নিষেধ আছে। মুড়ি-বিড়ি-গুটখা এসবে আটকে যেতে পারেন। সরকারি পরিচয় পত্র দাখিল করে ভেতরে যেতে হয়। বাইরে অটো চালক, ফেরিওয়ালা আপনার পকেট কাটতে তৈরি ফলে সাবধানে এগানো ভালো।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় ইংরেজ সৈন্য-রা তাজমহলের শরীর থেকে মূল্যবান রত্ন খুলে নেয়।
এখন তাজমহলকে চোখ রাঙাছে দূষণ।
তার শরীরে থাবা বসাচ্ছে অ্যাসিড বৃষ্টি।
যমুনায় আর কেউ জল আনতে যায় না। যমুনায় জল নেই।
যমুনা বয়ে চলেছে বিষ।
যমুনায় আর তাজের ছায়া পড়ে না।

অপরূপ তাজমহল দেখতে দেখতে আপনার চোখ বারবার আটকে যাবে আমার মতো কাঁচা ফটোগ্রাফারদের দিকে।
যারা বৌ-বাচ্চার হাতে তাজমহল ঝুলিয়ে দিতে গিয়ে নিজেই উদয়শংকর হয়ে উঠেছে।
ফটো তোলার ভঙ্গীর নানা বিভঙ্গ।
তাছাড়া নিজস্বী তোলার বিচিত্রতা আপনাকে বিনোদন দেবেই। সরাসরি তাজমহল তো দেখবেনই তার সঙ্গে আগ্রা ফোর্ট থেকে তাজমহল'কে সত্যি অন্য রকম লাগে। শাহজাহান বন্দী অবস্থায় ফোর্টের ঐ অংশ দিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকতেন তাজের দিকে।

তাজমহল দেখছি।
গাইড নাগাড়ে বলে যাচ্ছে তাজমহলের ইতিবৃত্ত। মোবাইলে রেকর্ড করে নিচ্ছি সেসব।
এক পর্যটক তার ক্যামেরা নিয়ে নিবিষ্ট আমার বিকচ শিরদেশে।
খচাখচ শব্দে ছবি হয়ে গেলাম তাজমহলের সঙ্গে।
অনেক চেষ্টা করেও জানা গেল না ব্যাটা কি নিলো ক্যামেরায়--
আমার টাকে তাজের প্রতিবিম্ব না তাজমহলের পাশাপাশি ধরা রইল আর একটি চকচকে গম্বুজ।

ফতেপুর সিক্রির

আনাচে-কানাচে

ইতিহাসের আনাচ-কানাচে ঘুরতে ঘুরতে বেলা ফুরিয়ে এসেছে। সূর্যাস্তের লাল আভায় ধুয়ে যাচ্ছে ফতেপুরের প্রান্তর।আরো মোহময়ী হয়ে উঠেছে নির্মাণ। অন্ধকার নামার আগেই ফিরে যেতে হবে গন্তব্যে।শেষবারের মতো চোখ আটকে গেল 'বুলন্দ দরওয়াজায়' যেন একটা ছায়া মতো সরে গেল আচমকা চোখের সামন থেকে। গাইড বলে ছিল আজও গভীর রাতে দরওয়াজায় কে যেন দাঁড়িয়ে থাকে।হ  তো মাধবী দাঁড়িয়ে থাকে জেরিনার অপেক্ষায়। জেরিনার কাছে তার ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটুকু হয় নি যে।

  লিখেছেন... সনোজ চক্রবর্তী 

(পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা

ছবিঃ লেখক)

তানসেন গান গাইতেন এইখানে, দূরে হাওয়া মহল

 

    দুপুরের রোদে তেমন তেজ নেই।
গাড়ির জানালা দিয়ে বাতাস আসছিল হু হু করে আর তাতেই চোখ বুজে আসছিল আলতো ভাবে।
গাড়ি ফতেপুর সিক্রি পৌঁছানোর আগে আমাদের ড্রাইভার ফতেপুর সিক্রি কি আর কি তার ইতিহাস তা সংক্ষেপে জানিয়ে দিল আমাদের।
এবং এও জানলাম এখানে গাইড না নিলে কিছুই বোঝা যাবে না।
সরকার স্বীকৃত গাইড নিতে হবে।
ওরা চাইবে সাড়ে ছয়'শ টাকা, তবে দর-দস্তুর করে এগানো উচিত কাজ হবে।
ফতেপুর সিক্রিতে পাইভেট গাড়ি যায় না। বাসস্ট্যান্ড থেকে আগ্রা ডেভলাপম্যান্টের গাড়ি ধরতে হয়।
ভাড়া জন প্রতি দশ টাকা।
তবে অটোও যাচ্ছে কিছুটু আগে পর্যন্ত।
একজন গাইডের সঙ্গে কথা হল,
চার'শ তে রাজি হল লোকটি।

১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে খানুয়ার যুদ্ধে জয় লাভ করে বাবার আল্লাহকে সুক্রিয়া জানিয়ে নির্মান করেন সিক্রি নগর।
পরবর্তীকালে মুঘলই - আজম- জাল্লাউদ্দিন - মহম্মদ আকবর গুজরাট জয়ের স্মারক হিসাবে লাল বেলে পাথরে নির্মান করেন ফতেপুর সিক্রি।
ফতে অর্থাৎ বিজয়।
আসলে আকবর ছিলেন নিঃসন্তান।
পুত্র সন্তানের আশায় দরবেশ শেখ সেলিম চিস্তির কাছে প্রার্থণা করেন।

যোধাবাঈ প্যালেস

 

দরবেশের আশীর্বাদে আকবরের পাদসা বেগম যোদ্ধাবাঈ এর সন্তান হয়।
যোধাবাঈ ছিলেন আমের(জয়পুরের) রাজকন্যা।
রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করার জন্য সম্রাট রাজপুতদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।
কিন্তু ভারত সম্রাট সন্তানহীন হওয়ায় উত্তরাধীকারীর ভাবনায় চিন্তিত হয়ে পড়েন।
দরবেশ সেলিম চিস্তির ভবিষ্যত বানী মিলে যায়।
আকবরের তিন বেগম সন্তান সম্ভবা হন।
       একদিকে গুজরাট জয় অন্য দিকে সেলিম চিস্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা হেতু চিস্তির গ্রামে শৈলশিরায় ১৫৬৯ -এ নির্মান করেন রাজধানী।
হিন্দু আর মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন যার নাম ফতেপুর সিক্রি। 
এই ফতেপুর সিক্রিতে আকবরের রাজধানী ছিল দীর্ঘ ষোল বছর।
পরবর্তী কালে জলের অভাবে তিনি আবার ফিরে যান আগ্রায়।
অবশ্য ফতেপুর সিক্রির পতনের অন্য এক গাঁথা শুনলাম গাইডের কাছে।
জেরিনা নামে এক নর্তকী স্থান পায় সম্রাটের হারেমে। জেরিনা ছিল সিক্রি গ্রামের অখ্যাত নর্তকী। তার ইচ্ছা ছিল সম্রাটের নর্তকী হওয়ার। তার সেই ইচ্ছা পূরণের সুযোগ তৈরি হয়ে যায় কাকতালীয় ভাবে। 
একবার সম্রাটের ইচ্ছে হয় তানসেনের সঙ্গীতের সঙ্গে একজন নর্তকী নাচুক। সে সময় নর্তকী মিলল না। এক দাসী মারফৎ সুযোগ পেয়ে যায় জেরিনা। জেরিনার নৃত্যে মুগ্ধ হন সম্রাট।ক্রমে জেরিনা আকবরের প্রিয় পাত্রী হয়ে উঠেন। আর তাতেই ঈর্শান্বিত হয়ে পড়েন যোধাবাঈ তথা মরিয়ম-উজ-জামানীর( প্রতি যুগের আনন্দ ) দাসী মাধবী।

দেওয়ানী খাস

 

দেওয়ানী আম

 

চক্রান্ত করে মাধবী চোর সাবস্ত্য করে জেরিনাকে।
সম্রাট বিশ্বাস ভঙ্গে আঘাত পান।
জেরিনা বারবার করে সম্রাটকে জানায় যে সে চুরি করে নি।

কিন্তু রাজধর্ম পালনে আকবর বাধ্য হন শাস্তি প্রদানে।পরদিন বিচার সভা বসার আগেই ভোর থেকে আর জেরিনার দেখা মেলে না। বিচারের আগেই অাত্মহত্যা করে জেরিনা। ভেঙে পড়েন সম্রাট। জেরিনার বাবা অভিশাপ দেয় তার মেয়ের আকাল মৃত্যুতে শেষ হয়ে যাবে সম্রাটের স্বপ্নের নগর ফতেপুর সিক্রি। কিছু কাল পরে পুর নগরে জল কষ্ট দেখা দেয়। মৃতের নগরী হয়ে যায় ফতেপুর। সম্রাট ফিরে যান আগ্রায়।

ইবাদতখানা

 

ফতেপুরের দুটি ভাগ রাজবাড়ি আর গুরুবাড়ি। পূর্ব দিকের রয়েল গেট থেকে রাজবাড়ি তে প্রবেশ করতে হয়।
ঢুকেই সবুজ মখমল বিছানো 'দেওয়ানী আম'
প্রতি দিন সকালে সম্রাট দেখা দিতেন প্রজাদের।

একটু উচুঁতে সম্রাটের বসবার জায়গা। 'দেওয়ানী আম' পেরিয়ে 'তোলা-দান' এখানে সম্রাট আকবর তার সন্তান সেলিম তথা জাহাঙ্গীরকে তোলার একদিকে রেখে অন্য দিকে সোনা দিয়ে ওজন করেছিলেন। ঐ সোনা দান করেছিলেন গরীব প্রজাদের মধ্যে। তোলাদানের পাশে জ্যোতিষ পরুষোত্তম দাসের কার্যালয়। পাশেই 'ইবাদতখানা'। এখানে ধর্ম নিয়ে আলোচনা হত। সম্রাট আকবর সর্বধর্ম সমন্বয়ের চেষ্টা করেছিলেন। আকবরের 'দীন ইলাহির' প্রচার হয় এই 'ইবাদতখানা' থেকে।

রুকাইয়া বেগমের মহলের স্থাপত্য

 

সংলগ্ন 'পাঁচ-মহল'। পাঁচতলা বিশিষ্ট 'হাওয়া মহল'।কোন দেওয়াল ছাড়া পিলারের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই 'হাওয়া মহল'। আকবর জয়পুরের হাওয়া মহলের আদলে নির্মান করেন এই 'হাওয়া-মহল'। মোট পিলার সংখ্যা ১৭৬টি । সব চেয়ে নিচে ৮৪টি, তারপর ৫৬, ২০, ১২ ও সবচেয়ে উপরে ৪টি। ওখানে হাওয়া খেত সম্রাট আকবর ও তার পাটরানী যোধাবাঈ। সবথেচে নিচের তালায় আর্বি ও পার্সী শিক্ষা দেওয়া হত। সে কাজে যুক্ত ছিলেন আবুল ফজল ও আবুল ফৌজী। সম্রাট আকবরের লাইব্রেরী ছিল ওখানে।

    সম্রাট লেখাপড়া না জানলেও সভাসদরা পাঠ করে শোনাতেন। সম্রাট আকবরের খাস সভা বসত 'দেওয়ানী খাসে'। বড় পিলারের আসনটিতে বসতেন সম্রাট, চারদিকে তার নয় সভাসদ। 'দেওয়ানী খাস' এর স্থাপত্য আজও অম্লান। দেওয়ানী খাস সংলগ্ন চাতালে সম্রাট দাসীদের ঘুঁটি করে দাবা খেলতেন। চাতালের পাশে 'অনুপ তালাও'। 'অনুপ তালাও'-এ বসে গান গাইতেন তানসেন।

ফতেপুরে সূর্যাস্ত

 

'অনুপ তালাও'-এর চারপাশে গোলাপ জলের জলকেলি।
সঙ্গীতের সঙ্গে মুজরাও বসত সেকালে।
সম্রাট আকবরের প্রধান তিন মহিষী ছিলেন হিন্দু (যোধাবাঈ জয়পুর থেকে), মুসলিম (রুকাইয়া তুর্কীর সুলতানা), খ্রিস্টান (মারিয়াম গোয়া থেকে)।
তিন পত্নীর পৃথক পৃথক মহল ছিল।
রুকাইয়া বেগম মুসলমান হলেও তার মহলের স্থাপত্যে তুলসীগাছ, মঙ্গল ঘট, স্বস্তিক চিহ্ন নজরে পড়ে।
মহামতি আকবরের আরামখানা ঢোকার মুখে প্রকান্ড এক জলপাত্র। যা আজ ভগ্নাবশেষ মাত্র। ঐ পাত্রে নাকি পানের জল থাকত সম্রাটের। 

জল আসত ঘটা করে হরিদ্বার থেকে।
সম্রাটের শয়ন কক্ষটিও রাজকীয়। আকবরের উচ্চতা ছিল ৫ফুট-৪ইঞ্চি কিন্তু পাথর নির্মিত খাটটির বহর ছিল- ১৮x১৫ বঃ ফুট।
দেখে নিলাম রাজকীয় ভোজনালয়।
পাথরের কোটরে কোটরে থাকত মোগলাই খানা।
আরামখানার প্রবেশ পথটি উচ্চতায় বেশ ছোট।
ছোট কেন তা জানা গেল গাইডের থেকে।
সম্রাটের এক মন্ত্রী মহেশ দাসের পরামর্শ ক্রমে নির্মান হয় প্রবেশ পথের।
মহেশ দাস বলেন প্রবেশ পথ এমন হোক যাতে যে কেউ মাথা নিচু করে প্রবেশ করবেন সম্রাটের কাছে।
গাইড ফেললেন ঝামেলায়।

জামি মসজিদ

 

প্রশ্ন করে বসলেন --
--কে এই মহেশ দাস? আপনি তো বাঙালী বলুন?
মাথা চুলকে, ঠোঁট কাঁমড়ে সে এক যা তা অবস্থা।
পরে জানা গেল এই মহেশ দাস হলেন--
"বীরবল"।
সম্রাটের পাটরানীর রন্ধনশালায় ১৫৬টি ঝুমকোর নকসা্।
যোধাবাঈয়ের পচ্ছন্দ মাফিক সম্রাট নকসা্ -র আদলে সোনার ঝুমকো গড়ে দিতেন।
গাইড বেশ মজার মানুষ।
হঠাৎ ভাঙা ভাঙা বাংলায় জানতে চাইলেন--
-- যোধাবাঈ কি আছেন?
আমি বললাম--
-- সে কত যুগ আগের কথা, কি করে থাকবে?
আমার গিন্নীর দিকে ইশারা করে বলল--
-- বলেন কি! এই তো যোধাবাঈ।
আমি বললাম--
-- না এটি আমার যা তাইই যোধাবাঈ হতে যাবে কেন! যোধাবাঈ হতে গেলে রুকাইয়া,মারিয়াম দরকার হয়ে পড়ে যে।
পুরো চত্তরে ভেঙে পড়ল হাসি।
যোধাবাঈ-এর মহলটি 'যোধাবাঈ প্যালেস' নামে পরিচিত।
নির্মান রীতি রাজস্থানী হাভেলীর মতো।
ভেতরে কৃষ্ণ মন্দির ছিল উপাসনার জন্য।
এখন তুলসীমঞ্চে জবা গাছ দেখলাম। ঝরোখার কাজ চোখে পড়ার মতো।
রাজবাড়ি ছেড়ে চললাম গুরুবাড়ি।
এর প্রবেশ পথে এশিয়ার বৃহত্তম দরজা 'বুলন্দ দরওয়াজা' এ দরজা নির্মিত হয় গুজরাট জয়ের স্মারক হিসাবে। উচ্চতায় ৪১ মিটার।
ভিতরে মক্কার আদলে হিন্দু ও পারসীক শৈলীতে 'জামি মসজিদ'। মসজিদে এক সঙ্গে ১০০০০ নামাজী নামাজ আদায় করতে পারে।
গুরুবাড়ির অন্যতম আকর্ষণ 'সেলিম চিস্তির দরগা' তথা 'মকবারা'।
অনন্য তার স্থাপত্য।
পাথরের জালি বা জাফরির কাজে চোখ আটকে যায়।
তবে এ দরগা ধর্মীয় মাহাত্ম্য আজও অম্লান। আজও নিঃসন্তান দম্পতি দরগায় সন্তান কামনায় দাগা বাঁধেন অনন্ত বিশ্বাসে।
ইতিহাসের আনাচ-কানাচে ঘুরতে ঘুরতে বেলা ফুরিয়ে এসেছে।
সূর্যাস্তের লাল আভায় ধুয়ে যাচ্ছে ফতেপুরের প্রান্তর।
আরো মোহময়ী হয়ে উঠেছে নির্মাণ।
অন্ধকার নামার আগেই ফিরে যেতে হবে গন্তব্যে।
শেষবারের মতো চোখ আটকে গেল 'বুলন্দ দরওয়াজায়' যেন একটা ছায়া মতো সরে গেল আচমকা চোখের সামন থেকে।
গাইড বলে ছিল আজও গভীর রাতে দরওয়াজায় কে যেন দাঁড়িয়ে থাকে।
হয়তো মাধবী দাঁড়িয়ে থাকে জেরিনার অপেক্ষায়।
জেরিনার কাছে তার ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটুকু হয় নি যে।

 

সেলিম চিস্তির দরগা বা মকবারা

 

দেওয়ানী খাস

 

বুলন্দ দরওয়াজা, সস্ত্রীক লেখক

 

জলপাত্র 

 

 
 
 
 
 
 
 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine

Share your thoughts!
                                        Questions?