ভ্রমণ সঙ্গী - ৬

  • দক্ষিনায়ণ - সনোজ চক্রবর্তী

  • বারানসীর ঘাটে ঘাটে - সনোজ চক্রবর্তী

  • একটি ভ্রমণ কাহিনী - সনোজ চক্রবর্তী

  • ফতেপুর সিক্রির আনাচে কানাচে - সনোজ চক্রবর্তী 

দক্ষিনায়ণ

সনোজ চক্রবর্তী 

(পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা)

মূর্ত্তিজি কি ধর্মভীরু? 

নাকি সে সত্যিকার সারথি! যে পথে মন্দির গিয়েছিলাম ফেরার সময় সে পথেই একটু এগিয়ে পথের বাঁ দিক ঘেঁষে দাঁড়াল গাড়িটা। গাড়ির জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি পথের বাঁ দিকে সাদা পাথর বাঁধানো একটা চত্বর তার ঠিক মাঝ বরাবর একটা বেদী। বেদীতে একটা ফলক।  ফলকে লেখা  The body of tippu sultan was found here....

FB_IMG_1533620404702.jpg

পর্ব - ১

   লক্ষ্মীপুজোর রাতে চেপে বসলাম ১২৮৬৩ হাওড়া যশবন্তপুর ট্রেনে। গন্তব্য যশবন্তপুর। শরীর আজকাল আর মহাশয় নয়। তেলমশলা অনেক কাল ধরে বুক-পেট জ্বালাচ্ছিল গ্যাস-অম্বল-চোঁয়া ঢেঁকুর এমন সব নানান উপসর্গে। বেদনার বিরাম নেই। বপুর ক্রমবর্ধমান ভারে হাঁটুর হাঁসফাঁস দশা। বুক-পেট তো ছিলই, ব্যথা এখন বাসা বেঁধেছে হাঁটুতেও। পুজোর লম্বা ছুটিতে দক্ষিণে ডাক্তার দেখাতে বেরিয়ে পড়লাম।

এখানে!

এখানে পুজোর থিমে ডাক্তার ডাকাত হলে ভরসা তেরচাভাবে চায়। শুধু যে ডাক্তার দেখানোর জন্যই দক্ষিণযাত্রা তা নয়। এরই ফাঁকে খানিক দখিনা বাতাস মেখে নেওয়া যাবে। নাকি দক্ষিণভ্রমনের অবসরে কিঞ্চিৎ ডাক্তার দেখানো! সে তর্ক সাপেক্ষ।

      আমাদের ভ্রমণপথ বড় দীর্ঘ। ব্যাঙ্গালোর - মহীশূর -উটি - কুন্নুর - কোদাই - কন্যাকুমারী - রামেশ্বরম -মাদুরাই - ব্যাঙ্গালোর। প্রায় দু-হাজার পাঁচশ কিমি যাত্রাপথের সারথিটি বড় ভালো মানুষ। আটই অক্টোবর সকাল সকাল আমরা তৈরি। সকালের নরম ও উজ্জ্বল আলোকে হার মানিয়ে তার চেয়ে বেশি কোমল ও চকচকে হাসি মিশিয়ে গুডমর্নিং বলল মূর্ত্তি রাও। মূর্ত্তি রাও আমাদের দক্ষিণযাত্রার সারথি।

      মূর্ত্তিজি আদতে মারাঠি হলেও এখন আদ্যন্ত কর্ণাটকী। প্রশ্ন করলাম - "কত পুরুষ হল আপনারা চলে এসেছেন কর্ণাটকে?" কপালে ভাজের সংখ্যা বাড়ে কিন্তু তার হিসাব পায় না মূর্ত্তিজি।

   গাড়ি ছুটল মহীশূর রোড ধরে। ব্যাঙ্গালোর অনেকটা পাহাড়ি শহর। সমতল থেকে সাতশ আটশ মিটার উঁচু। সারা শহর জুড়ে বাড়িগুলো নানান উচ্চতায় ছড়ানো যেন ঢেউ খেলানো। বাড়িগুলোর এধরনের অবস্থানের জন্য একটু উঁচু থেকে দেখলে শহরটাকে বড় সুন্দর লাগে। যেন অট্টালিকার স্থাপত্য। রাস্তার দুপাশে নানা ধরনের ফুল পথকে আরো মোহময়ী করে তুলেছে।

    আমাদের কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল ফুল এখানে ওখানে আগুন ছড়িয়ে জেগে আছে। নাম জানতে চেষ্টা করেছিলাম, জানা যায় নি। হয়তো নাম না জানাটাই ওকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

একটা রেস্টুরেন্টে গাড়ি দাঁড় করাল মূর্ত্তিজি। রেস্টুরেন্টে থকথকে ভিড়। এখানকার ইডলি ধোসা দারুণ। কাউন্টারের সামনে নোটিস লটকানো-কন্নড় ও ইংরাজী ভাষায়-

"আজ বরিবার তাই টেবিলে খাওয়ার সার্ভ করার লোক নেই, নিজেকেই খাওয়ার কাউন্টার থেকে নিয়ে নিতে হবে "

   লক্ষ্মীপুজোর রাতে চেপে বসলাম ১২৮৬৩ হাওড়া যশবন্তপুর ট্রেনে। গন্তব্য যশবন্তপুর। শরীর আজকাল আর মহাশয় নয়। তেলমশলা অনেক কাল ধরে বুক-পেট জ্বালাচ্ছিল গ্যাস-অম্বল-চোঁয়া ঢেঁকুর এমন সব নানান উপসর্গে। বেদনার বিরাম নেই। বপুর ক্রমবর্ধমান ভারে হাঁটুর হাঁসফাঁস দশা। বুক-পেট তো ছিলই, ব্যথা এখন বাসা বেঁধেছে হাঁটুতেও। পুজোর লম্বা ছুটিতে দক্ষিণে ডাক্তার দেখাতে বেরিয়ে পড়লাম।

এখানে!

এখানে পুজোর থিমে ডাক্তার ডাকাত হলে ভরসা তেরচাভাবে চায়। শুধু যে ডাক্তার দেখানোর জন্যই দক্ষিণযাত্রা তা নয়। এরই ফাঁকে খানিক দখিনা বাতাস মেখে নেওয়া যাবে। নাকি দক্ষিণভ্রমনের অবসরে কিঞ্চিৎ ডাক্তার দেখানো! সে তর্ক সাপেক্ষ।

      আমাদের ভ্রমণপথ বড় দীর্ঘ। ব্যাঙ্গালোর - মহীশূর -উটি - কুন্নুর - কোদাই - কন্যাকুমারী - রামেশ্বরম -মাদুরাই - ব্যাঙ্গালোর। প্রায় দু-হাজার পাঁচশ কিমি যাত্রাপথের সারথিটি বড় ভালো মানুষ। আটই অক্টোবর সকাল সকাল আমরা তৈরি। সকালের নরম ও উজ্জ্বল আলোকে হার মানিয়ে তার চেয়ে বেশি কোমল ও চকচকে হাসি মিশিয়ে গুডমর্নিং বলল মূর্ত্তি রাও। মূর্ত্তি রাও আমাদের দক্ষিণযাত্রার সারথি।

      মূর্ত্তিজি আদতে মারাঠি হলেও এখন আদ্যন্ত কর্ণাটকী। প্রশ্ন করলাম - "কত পুরুষ হল আপনারা চলে এসেছেন কর্ণাটকে?" কপালে ভাজের সংখ্যা বাড়ে কিন্তু তার হিসাব পায় না মূর্ত্তিজি।

   গাড়ি ছুটল মহীশূর রোড ধরে। ব্যাঙ্গালোর অনেকটা পাহাড়ি শহর। সমতল থেকে সাতশ আটশ মিটার উঁচু। সারা শহর জুড়ে বাড়িগুলো নানান উচ্চতায় ছড়ানো যেন ঢেউ খেলানো। বাড়িগুলোর এধরনের অবস্থানের জন্য একটু উঁচু থেকে দেখলে শহরটাকে বড় সুন্দর লাগে। যেন অট্টালিকার স্থাপত্য। রাস্তার দুপাশে নানা ধরনের ফুল পথকে আরো মোহময়ী করে তুলেছে।

    আমাদের কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল ফুল এখানে ওখানে আগুন ছড়িয়ে জেগে আছে। নাম জানতে চেষ্টা করেছিলাম, জানা যায় নি। হয়তো নাম না জানাটাই ওকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

একটা রেস্টুরেন্টে গাড়ি দাঁড় করাল মূর্ত্তিজি। রেস্টুরেন্টে থকথকে ভিড়। এখানকার ইডলি ধোসা দারুণ। কাউন্টারের সামনে নোটিস লটকানো-কন্নড় ও ইংরাজী ভাষায়-

"আজ বরিবার তাই টেবিলে খাওয়ার সার্ভ করার লোক নেই, নিজেকেই খাওয়ার কাউন্টার থেকে নিয়ে নিতে হবে "

 

সকালের টিফিন সেরে গরম চা নিয়ে গাড়ির সিটে ফিরে গেলাম। আবার ছুটল গাড়ি। একটু এগিয়ে সারি সারি পাহাড়, ঠিক পাহাড় নয় টিলার মতো। জায়গাটা সম্ভবত রামনগর।

মূর্ত্তিজি বলল এখানেই নাকি শোলে সিনেমার শুটিং হয়েছিল। কথাটা শুনে আমাদের উঁকি ঝুঁকি গেল বেড়ে। যে টিলাগুলোকে অবহেলা করছিলাম খানিক আগে, গাড়ি থামিয়ে সেগুলোই হল ক্যামেরা বন্দী। হঠাৎ চোখ চলে গেল গাড়ির জানালায়, দেখি বাবদা(আমার বছর ছয়ের ছেলে) দু'হাতের মুদ্রায় বন্ধুক তৈরি করে তাক করেছে আমাকে।

উঁচু টিলা থেকে যেন ভেসে এল গব্বরের কন্ঠ-

"আব গুলি খা।"

       ঘড়ির কাঁটা সকাল দশটা ছুঁইছুঁই পৌঁছলাম শ্রীরঙ্গপত্তনে। আমাদের ভ্রমণ শুরু হল মন্দির দর্শন করে।

শ্রীরঙ্গপত্তনে রয়েছে শ্রীরঙ্গনাথস্বামী মন্দির।

এ মন্দির নির্মাণ করেন গঙ্গারাজাদের গভর্নর থিরুমালায়। দক্ষিণী শৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরের ভাস্কর্যে ধরা পড়েছে বিষ্ণুর নানা অবতার। মূল বিগ্রহটি শ্রীরঙ্গনাথের। শ্রীরঙ্গনাথ আসলে দেবতা বিষ্ণু। বিষ্ণু এখানে কুনুইএর উপর ভর দিয়ে নিদ্রাভিভূত। শিরদেশে পঞ্চমুখী নাগের ছত্রছায়া। কালো পাথরে তৈরি মূর্তির সামনে দাঁড়ালে ভরসা ও ভয় দুই কেমন যেন আচ্ছন্ন করে ফেলে। বিশাল মন্দির ও তার অভ্যন্তরের ভাস্কর্য আপনার পায়ে শিকল পরিয়ে দেবে। পুজো দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। পুরোহিতরা খুব ভাল মানুষ তাদের কোন উৎপাত চোখে পড়ল না। মন্দিরে কোনো প্রবেশ দক্ষিণা নেই তবে গর্ভগৃহে ছবি তোলা বারণ

চিড়িয়াখানায় প্রায় সাত-আট কিলোমিটার ঘুরে পা আর চলতে চাইছিল না। তিন ক্ষুদে সঙ্গী আর আমার শ্বাশুড়িমাতা তো কাহিল।

প্রায় চারহাজার বর্গমিটার জুড়ে প্যালেস, প্যালেসের চারপাশটা ঘুরতে কমবেশি কিলোমিটার দুই-তিন হাঁটতে হতো। সে ধকল নেওয়ার মতো মানসিক জোর কিঞ্চিত অবশিষ্ট থাকলেও শারীরিক ক্ষমতা তখন তলানিতে। শেষপর্যন্ত জনপ্রতি পঞ্চাশ টাকা দিয়ে সেল(ব্যাটারি) চালিত শকটে সওয়ারি হলাম আমরা।

ব্যাটারি চালিত গাড়িটাতে প্যালেসের বাইরের চারদিকটা ঘোরার সময় দেখে নিলাম গায়ত্রী, ভুবনেশ্বরী ও নবগ্রহ মন্দির। মিনিট দশ-পনেরোতে প্যালেসের চৌহদ্দি ঘুরিয়ে গাড়ি নামিয়ে দিল বামাবর্ত্তে, ওটাই প্যালেসের ভেতরে যাওয়ার পথ।

পাশেই বাগিচা।

রংবেরং-এর ফুল ফুটেছে বাগিচা জুড়ে। প্যালেসের চূড়াটি ১৮ ক্যারেট সোনায় গিলটি করা। প্রকান্ড সে চূড়া সূর্যের আলোয় আরো বেশি করে দীপ্যমান।

ড্রাইভারের থেকে জেনেছিলাম এখানকার রাজারা হিন্দু হলেও সব ধর্মকে সমাদর করতেন। তাই প্যালেসের মাথায় মন্দিরের চুড়ার সঙ্গে মসজিদের আদলে বেশ কয়েকটি গম্বুজের সহাবস্থান।

মহীশূর প্যালেসের দর্শনী জনপ্রতি ষাট টাকা। এরা ছোটোদের হাইট মেপে টাকা নেয় তাই ঝামেলা এড়াতে বাবদাদেরও টিকিট নেওয়া হল।

প্রবেশ পথ বেশ সংকীর্ণ। নিজেদের কষ্ট করে প্যালেসের মধ্যে ঢুকতে হল না। দর্শনার্থীদের ভিড়টাই বয়ে নিয়ে গেল ভেতরে।

 বৈভব মানুষের বাসস্থানকে কত বিচিত্র করে তোলে। এ প্যালেসে প্রতিটি পদক্ষেপে বিপুল বিস্ময় অপেক্ষা করে থাকে আপনার জন্য।

যেকোনো রবিবার বা দশেরা উৎসবের দিনগুলি হল এই প্যালেস দেখার সবচেয়ে ভাল সময়। ঐ দিনগুলিতে প্যালেসের সব দ্বার উন্মুক্ত।

ঢোকার মুখেই একতলায় ডলস মিউজিয়াম শ্বেতপাথরের মূর্তি,মহারাজার হাওদা,পুরানো প্রাসাদের মডেল।

পুরানো প্রাসাদটি ছিল দারু নির্মিত।১৮৯৭ এর ভয়াবহ আগুনে তা পুড়ে যায়। বর্তমান প্রাসাদটি হেনরি আরউইনের নকসায় নির্মাণ করেন ২৪ তম ওডিয়ার। এ প্রাসাদ ইন্দো-সেরাসেনিক শৈলীতে তৈরি।

আটকোন বিশিষ্ট কল্যাণ মন্ডপে রয়েছে রবি ভার্মার আঁকা দশেরা উৎসবের ছবি। ১৬১০ সাল থেকে ওডিয়াররা দশেরা উৎসবের প্রচলন করেন। যে উৎসব ঘিরে আজও দেশ বিদেশের পর্যটক সমাগম ঘটে আজকের মাইসোরে।

কল্যাণ মন্ডপে রয়েছে দু'টি রুপোর চেয়ার একটি মহারাজের অন্যটি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের- যা অলঙ্করণ ও আভিজাত্যে উপমাহীন।

শ্বেতপাথরের সিঁড়ি আমাদের নিয়ে এল দরবার হলে। এই দরবার হল আজও বিত্ত বৈভবে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। এখানেই রয়েছে ২৮০ কেজি ওজনের রত্ন সিংহাসন- এ সিংহাসন নাকি বিজয়নগর জয়ের স্মারক। এছাড়াও রয়েছে সোনার হাতি।

পিতলের স্তম্ভ,ঝাড়লন্ঠন,অলঙ্কৃত কাঠের দরজা,রুপোর দরজা, চন্দন ও মেহগনির আসবাব, মূল্যবান পাথরের চাকচিক্যময় অলঙ্করণ,মোজাইক মেঝে, সিলিং- এ প্রাসাদকে ইন্দ্রপুরী করে তুলেছে।

     সেকালে প্যালেসের মধ্যেই বসত মল্লযুদ্ধ। স্পাইরাল সিঁড়ি বেয়ে রাজা নেমে আসতেন সেই দেহসৌষ্ঠব আর মল্লের প্যাঁচপয়জার দর্শনে। এখনও একটা বৃত্তাকার জায়গা বালি দিয়ে চিহ্নিত রয়েছে মল্ল যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসাবে।

প্যালেসের আর্ট গ্যালারিটি তৈলচিত্রে অনবদ্য। ছবি আঁকিয়েদের কাছে সে যেন মৃগয়াভূমি।

 বইয়ের পাতায় পড়া টিপুর তরবারি,শিবাজীর বাঘনখ নিজের চোখে দেখার পর দু'হাতে চোখ কচলে নিলাম। সত্যি দেখছি তো!

প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে চললাম বৃন্দাবন গার্ডেনে।

এম বিশ্বেসরাইয়ার পরিকল্পনায় কাবেরী নদীর উপর সিমেন্ট ছাড়াই পাথর দিয়ে তৈরি হয়েছে তিন কিমি দীর্ঘ ও চল্লিশ মিটার উঁচু কৃষ্ণরাজ সাগর বাঁধ। তারই নিচে বৃন্দাবন গার্ডেন। আমারা যখন পৌঁছলাম তখন কাবেরীর জল অস্ত রবির আভায় টলটলে লাল।

      ফেরার পথে দেখি মহীশূর প্রাসাদ আলোয় আলোয় সেজে উঠেছে।  তখনই মনে পড়ল ড্রাইভারটা বলেছিল ছিয়ানব্বই হাজার বিজলি বাতি দিয়ে সাজানো প্রাসাদ রাতে অন্য রূপ পায়।

হোটেলে ফিরেও চোখ বন্ধ করলে বারেবারে ফিরে আসছে মহীশূরের অহংকার, মহীশূরের বিস্ময় ওডিয়ারদের প্রাসাদ।

বুঝতে পারছি এই ঘোর থেকে এই ইন্দ্রজাল থেকে না বেরাতে পারলে সমূহ বিপদ।

রাত বাড়ছে। বাড়ছে পেটের দায়।

আদিম মানুষ যেমন বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াত ফল-মুল, পশু-পাখির খোঁজে।

চিড়িয়াখানায় প্রায় সাত-আট কিলোমিটার ঘুরে পা আর চলতে চাইছিল না। তিন ক্ষুদে সঙ্গী আর আমার শ্বাশুড়িমাতা তো কাহিল।

প্রায় চারহাজার বর্গমিটার জুড়ে প্যালেস, প্যালেসের চারপাশটা ঘুরতে কমবেশি কিলোমিটার দুই-তিন হাঁটতে হতো। সে ধকল নেওয়ার মতো মানসিক জোর কিঞ্চিত অবশিষ্ট থাকলেও শারীরিক ক্ষমতা তখন তলানিতে। শেষপর্যন্ত জনপ্রতি পঞ্চাশ টাকা দিয়ে সেল(ব্যাটারি) চালিত শকটে সওয়ারি হলাম আমরা।

ব্যাটারি চালিত গাড়িটাতে প্যালেসের বাইরের চারদিকটা ঘোরার সময় দেখে নিলাম গায়ত্রী, ভুবনেশ্বরী ও নবগ্রহ মন্দির। মিনিট দশ-পনেরোতে প্যালেসের চৌহদ্দি ঘুরিয়ে গাড়ি নামিয়ে দিল বামাবর্ত্তে, ওটাই প্যালেসের ভেতরে যাওয়ার পথ।

পাশেই বাগিচা।

রংবেরং-এর ফুল ফুটেছে বাগিচা জুড়ে। প্যালেসের চূড়াটি ১৮ ক্যারেট সোনায় গিলটি করা। প্রকান্ড সে চূড়া সূর্যের আলোয় আরো বেশি করে দীপ্যমান।

ড্রাইভারের থেকে জেনেছিলাম এখানকার রাজারা হিন্দু হলেও সব ধর্মকে সমাদর করতেন। তাই প্যালেসের মাথায় মন্দিরের চুড়ার সঙ্গে মসজিদের আদলে বেশ কয়েকটি গম্বুজের সহাবস্থান।

মহীশূর প্যালেসের দর্শনী জনপ্রতি ষাট টাকা। এরা ছোটোদের হাইট মেপে টাকা নেয় তাই ঝামেলা এড়াতে বাবদাদেরও টিকিট নেওয়া হল।

প্রবেশ পথ বেশ সংকীর্ণ। নিজেদের কষ্ট করে প্যালেসের মধ্যে ঢুকতে হল না। দর্শনার্থীদের ভিড়টাই বয়ে নিয়ে গেল ভেতরে।

 বৈভব মানুষের বাসস্থানকে কত বিচিত্র করে তোলে। এ প্যালেসে প্রতিটি পদক্ষেপে বিপুল বিস্ময় অপেক্ষা করে থাকে আপনার জন্য।

যেকোনো রবিবার বা দশেরা উৎসবের দিনগুলি হল এই প্যালেস দেখার সবচেয়ে ভাল সময়। ঐ দিনগুলিতে প্যালেসের সব দ্বার উন্মুক্ত।

ঢোকার মুখেই একতলায় ডলস মিউজিয়াম শ্বেতপাথরের মূর্তি,মহারাজার হাওদা,পুরানো প্রাসাদের মডেল।

পুরানো প্রাসাদটি ছিল দারু নির্মিত।১৮৯৭ এর ভয়াবহ আগুনে তা পুড়ে যায়। বর্তমান প্রাসাদটি হেনরি আরউইনের নকসায় নির্মাণ করেন ২৪ তম ওডিয়ার। এ প্রাসাদ ইন্দো-সেরাসেনিক শৈলীতে তৈরি।

আটকোন বিশিষ্ট কল্যাণ মন্ডপে রয়েছে রবি ভার্মার আঁকা দশেরা উৎসবের ছবি। ১৬১০ সাল থেকে ওডিয়াররা দশেরা উৎসবের প্রচলন করেন। যে উৎসব ঘিরে আজও দেশ বিদেশের পর্যটক সমাগম ঘটে আজকের মাইসোরে।

কল্যাণ মন্ডপে রয়েছে দু'টি রুপোর চেয়ার একটি মহারাজের অন্যটি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের- যা অলঙ্করণ ও আভিজাত্যে উপমাহীন।

শ্বেতপাথরের সিঁড়ি আমাদের নিয়ে এল দরবার হলে। এই দরবার হল আজও বিত্ত বৈভবে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। এখানেই রয়েছে ২৮০ কেজি ওজনের রত্ন সিংহাসন- এ সিংহাসন নাকি বিজয়নগর জয়ের স্মারক। এছাড়াও রয়েছে সোনার হাতি।

পিতলের স্তম্ভ,ঝাড়লন্ঠন,অলঙ্কৃত কাঠের দরজা,রুপোর দরজা, চন্দন ও মেহগনির আসবাব, মূল্যবান পাথরের চাকচিক্যময় অলঙ্করণ,মোজাইক মেঝে, সিলিং- এ প্রাসাদকে ইন্দ্রপুরী করে তুলেছে।

     সেকালে প্যালেসের মধ্যেই বসত মল্লযুদ্ধ। স্পাইরাল সিঁড়ি বেয়ে রাজা নেমে আসতেন সেই দেহসৌষ্ঠব আর মল্লের প্যাঁচপয়জার দর্শনে। এখনও একটা বৃত্তাকার জায়গা বালি দিয়ে চিহ্নিত রয়েছে মল্ল যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসাবে।

প্যালেসের আর্ট গ্যালারিটি তৈলচিত্রে অনবদ্য। ছবি আঁকিয়েদের কাছে সে যেন মৃগয়াভূমি।

 বইয়ের পাতায় পড়া টিপুর তরবারি,শিবাজীর বাঘনখ নিজের চোখে দেখার পর দু'হাতে চোখ কচলে নিলাম। সত্যি দেখছি তো!

প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে চললাম বৃন্দাবন গার্ডেনে।

এম বিশ্বেসরাইয়ার পরিকল্পনায় কাবেরী নদীর উপর সিমেন্ট ছাড়াই পাথর দিয়ে তৈরি হয়েছে তিন কিমি দীর্ঘ ও চল্লিশ মিটার উঁচু কৃষ্ণরাজ সাগর বাঁধ। তারই নিচে বৃন্দাবন গার্ডেন। আমারা যখন পৌঁছলাম তখন কাবেরীর জল অস্ত রবির আভায় টলটলে লাল।

      ফেরার পথে দেখি মহীশূর প্রাসাদ আলোয় আলোয় সেজে উঠেছে।  তখনই মনে পড়ল ড্রাইভারটা বলেছিল ছিয়ানব্বই হাজার বিজলি বাতি দিয়ে সাজানো প্রাসাদ রাতে অন্য রূপ পায়।

হোটেলে ফিরেও চোখ বন্ধ করলে বারেবারে ফিরে আসছে মহীশূরের অহংকার, মহীশূরের বিস্ময় ওডিয়ারদের প্রাসাদ।

বুঝতে পারছি এই ঘোর থেকে এই ইন্দ্রজাল থেকে না বেরাতে পারলে সমূহ বিপদ।

রাত বাড়ছে। বাড়ছে পেটের দায়।

আদিম মানুষ যেমন বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াত ফল-মুল, পশু-পাখির খোঁজে।

 

বৈচিত্র্য আর বৈভবে এ হল উটির অলংকার। মুগ্ধ করল পাহাড়ের ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা রোজ গার্ডেন। উটি লেকে বোটিং সেরে আমরা চললাম কুন্নুরের উদ্দেশ্যে।যাওয়ার পথে ক্যাথি ভ্যালি চোখ জুড়াল। উটি থেকে কুন্নুর প্রায় কুড়ি কিমি। যাত্রীরা সাধারণত ট্রয় ট্রেনে লোয়ার কুন্নুর পৌঁছায় তারপর সেখান থেকে গাড়িতে আপার কুন্নুর। কুন্নুরের আসল সৌন্দর্য আপারে।

লোয়ার কুন্নুর গাড়ি, ধুলো,ধোঁয়ায় বিরক্তিকর। আমরা ট্রয়-ট্রেন পেলাম না।

তাই গাড়িতেই পৌঁছলাম কুন্নুরে। লোয়ার কুন্নুর থেকে একটু এগিয়ে সীমস পার্ক।প্রথমে ভেবে ছিলাম ওটাতো একটা পার্ক, না গেলেও চলে। মূর্ত্তিজি পিড়াপিড়ি করল। তাই চললাম সীমস পার্ক।  সীমস পার্কের কাছে ছোট্ট একটা বাজার নানা ফল বিক্রি হচ্ছে। মুলসিতা নামে একটা ফল দেখলাম। ওটা নাকি ক্যানসারে বড় উপকারী।

পাহাড়ের ঢালে সীমস পার্কে নানা ফুলের বাহার,  গাছে গাছে পাখির কাকলি - এ কেবল দুটো কথা নয়,এক অনির্বচনীয় দর্শন। যতই আপারের দিকে এগোচ্ছি ততই কুন্নুর যেন স্বর্গের কিন্নরদল হয়ে উঠছে। পথের দুপাশে নাম না জানা রং-বেরঙের ফুল, চা ও কফির বাগিচা, দীর্ঘল ঝাউে বাতাসের শনশন আপনাকে একা করে দিতে চাইবে।ইউক্যালিপটাস,সিলভার ওকগুলোকে যেন কেউ মাপা হাতে রোপণ করেছে এখানে। আপার কুন্নুরে পায়ে পায়ে বেশ খানিক চড়াই পেরালে ল্যাম্বস রক। হঠাৎ মেঘ ঘনিয়ে আসায় ওখানে গিয়ে কেবল কষ্টই হল। দ্রুত নেমে, চললাম ডলফিন নোজ। অসাধারণ এখান থেকে উপত্যকা আর সমতলের সৌন্দর্য। দূরে ক্যাথেরিন ফলস যেন পাহাড়ের গায়ে সাদা উপবীত।

বেলা দু'টা নাগাদ পেট ভরে ভাত খেলাম শ্রীবাবা রেস্টুরেন্টে। ধীরাজ ভরদ্বাজ শিলিগুড়ির লোক হোটেল করেছে ওখানে। নিজের হাতে পাকানো ভাত, মুগডাল, আলুপোস্ত খাওয়ালো আমাদের। অনেক দিন পর বাংলায় বলতে পারলুম...আর একটু ভাত দিন...

     পথে নামার ইচ্ছেটাই শেষ কথা। একটিবার পথে নেমে পড়তে পারলেই সামনের পথ আপনা হতেই পায়ের তলায় চলে আসে।

পথ চলাতে উৎকণ্ঠা থাকলেও তা কখন যে রোমাঞ্চে বদলে যায় তার টের পাওয়া যায় না। অজানা অচেনা পথের সুলুক-সন্ধানের মধ্যে লুকিয়ে থাকে আবিষ্কারের আনন্দ। পথ চলাতে সম্মোহন আছে। একটা নেশা নেশা ঘোর আছে। তা যদি না হতো তবে দুপুর  দু'টার পর একজন সত্তরোর্দ্ধ মহিলা আর তিনটি বছর ছয়-সাতেকের বাচ্চা নিয়ে দু'শ কুড়ি-ত্রিশ কিমি পথ-যাত্রা শুরু করা যায়! যেখানে এক'শ-র বেশি পাহাড়ি পথ!

দুপুর আড়াইটা নাগাদ কুন্নুর থেকে চললাম কোদাইকানালের দিকে। আজ আমাদের রাত্রি বাস কোদাইকানালে। কাল সকাল থেকে কোদাই দেখে নেওয়া। যেহেতু পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে যেতে পারে তাই আলগা সময় পেয়ে বাবা রেস্টুরেন্ট থেকে মূর্ত্তিজী ফোন করেছিল ওর পরিচিত এক হোটেল মালিককে। থাকার ব্যাপারে একটা আগাম কথা হয়ে যাওয়ায় বেশ নিশ্চিন্ত লাগছে। পাকদন্ডী বেয়ে নামছে গাড়ি। সারি সারি পাহাড়, গাছ-গাছালি পিছলে যাচ্ছে পিছনের দিকে।  রাস্তার দু'পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো রঙ-বেরঙের ফুলের ডালি সাজিয়ে যেন বিদায় জানাচ্ছে আমাদের। উপর্যুপুরি পাহাড়ি বাঁকে শক্ত হাতে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করছে মূর্ত্তিজী। একটা পাহাড়ি বাঁকে চা ও চকলেট কেনা হল। উটির হোম-মেড চকলেট ভারি সুস্বাদু। ঠান্ডা বেশি বলেই এখানে চকলেট তৈরি হয়। নিচের দিকে এই চকলেট পাওয়া যায় না। কুন্নুর থেকে কোদাই আসার পথে মেট্রুপালিয়ামে আমরা সমতলে এসে পড়লাম।  ঠিক সমতল নয় প্রায়-সমতল।

এই সমতলে যত কম সময়ে যত বেশী পথ চলে নেওয়া যায় ততই ভাল। তাই গাড়ির বেগ ক্রমশ বাড়াতে থাকল মূর্ত্তিজী। আঙুলে গাঁট গুনে যা হিসাব পেলাম তাতে যদি সব ঠিকঠাক চলে তবে রাত্রি দশটার আগে কোনো ভাবেই কোদাই পৌঁছতে পারব না আমরা।

​মেট্রুপালিয়াম থেকে পালনি এক'শ আশি কিমি সমতল পথে গাড়ি ছুটল তীব্র গতিতে। পালনি হল কোদাই-এর প্রবেশদ্বার। আমাদের যাত্রাপথ কোয়েম্বাটুর,অবিনাশি, দারাপুরম হয়ে ছুটে চলল পালনির দিকে। কোয়েম্বাটুরে আকাশ কালো হয়ে এলো। ওখান থেকে অবিনাশি চুয়াল্লিশ কিমি পথ পেরোতে না পেরোতেই শুরু হল ঘন বর্ষা।  ছয় লেনের সড়ক বর্ষার জলে সাদা ধবধব করছে। ওয়াইপার দ্রুত হাতে কাঁচ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে জল।

অবিনাশি হয়ে দারাপুরম যাওয়া যায়। আবার অবিবাশির থেকে দশ-বারো কিমি আগে আন্নুর থেকে অন্য একটা পথ চলে গেছে দারাপুরম হয়ে পালনি। আমরা দ্বিতীয় পথটা নিলাম। অবিনাশি গেলাম না। যদিও জানতাম অবিনাশিতে একটা শিব মন্দির আছে,তবুও টাইম ম্যানেজমেন্ট করতে গিয়ে ওখানে গেলাম না। এর মধ্যে বর্ষা থেমেছে। ঠান্ডা বাতাসে আয়েশি ফরমান।

পিছন ঘুরে দেখি বাকিরা প্রায় সকলেই সিটে গা এলিয়ে দিয়েছে। আমার না জেগে উপায় নেই। মূর্ত্তিজীকে তো জাগতে(লক্ষ্য রাখতে) হবে। ওর দু'চোখের পাতা এক হলে সমূহ বিপদ।

মাঝে মধ্যে মূর্ত্তিজীর হাত স্থির হয়ে যাচ্ছে অর্থাৎ চোখ জুড়ে আসছে ওর। স্বাভাবিক কদিনের টানা পরিশ্রম তার উপর ভাত খাওয়ার পর বর্ষা আবহাওয়াকে বিশ্রামের উপযুক্ত করে তুলেছে। পরিস্থিতিকে একটু হলেও আড়াল করার চেষ্টা করছে সে। যেন আমার নজরে না আসে। আমি এলোমেলো দু-চার কথা জুড়ে দিলাম ওর সঙ্গে যাতে ওর ঘুম না আসে। খানিক বাদে মূর্ত্তিজী গাড়ির সাউন্ড সিস্টেমটা অন করল...

 

মিলিয়ে পরিবেশটা বেশ গা ছমছম করার মতোই। জানলাম এখানেই নাকি কমাল হাসানের বিখ্যাত সিনেমা "গুনা"- এর শুটিং হয়েছিল। পিলার রক কোদাই এর অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু মেঘের কারণে আমরা পিলার রক এর সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত রইলাম। ধানো পথের দু'দিকে সারি সারি দোকান। চকলেট,আইসক্রিম,উপহার সামগ্রী কি নেই এ গলিতে। তবে অদ্ভুত কান্ড এমন একটা গলি পথ শেষ হয়েছে সুইসাইড পয়েন্টে। প্রায় পাঁচ হাজার ফুট উঁচু এ জায়গাটা লোহার রড দিয়ে ঘেরা। নিচে উপত্যকা যেন স্বর্গের মতো অপরূপ। খুব ইচ্ছে হল আইসক্রিম খাই কিন্তু চারপাশে অসংখ্য বাঁদর। বিষয়টা বুঝিয়ে বলতেই দোকানদার রাজি হল আমাদের গাড়িতেই সে আইসক্রিম পৌঁছে দেবে। সত্যি পাহাড়ে আইসক্রিম কেমন যেন পাল্টে যায়। কোদাই-এ গল্ফ ক্লাব আছে, ইচ্ছে হলে খেলে নিতে পারেন। হাতের আইসক্রিম হাতেই গলছে। চোখ বিস্ময়ে গোলগোল। গলগল করে নেমে আসছে রুপোর ধারা। সূর্যের আলোতে ঠিকরে পড়ছে তার বিচ্ছুরণ। সশব্দে দু'শ ফুটের বেশি উচ্চতা থেকে নেমে আসছে সিলভার ক্যাসকেড। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম রূপসী সেই জলপ্রপাতের দিকে। 

রবিঠাকুর বলেছিলেন- "যদি ভারতকে জানতে চাও, তবে বিবেকানন্দের রচনাবলী পড়ো। তাঁর মধ্যে যা কিছু আছে সবই ইতিবাচক; নেতিবাচক কিছুই নেই।" দেশ গড়ার জন্য বিবেকানন্দ মানুষের উপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর গুরুবাক্যই তো ছিল-“যত্র জীব তত্র শিব”। বিবেকানন্দের এই ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠেছিল সারা ভারতবর্ষকে খুব নিবিড় ভাবে দর্শনের মধ্যে দিয়ে। তিনি ভারতের গ্রাম,শহর, ধর্মস্থান, পাহাড়,পর্বত,নদী- আসমুদ্রহিমাচল পায়ে হেঁটে জেনেছেন। সে ছিল তার পরিব্রাজন। হিমালয়ে তিনি যেমন বারবার ছুটে গিয়েছেন তেমনি ভারতের দক্ষিণতম শেষ স্থানটিতে ধ্যানস্থ থেকেছেন টানা তিন দিন।

    কোদাইকানাল থেকে আমরা চললাম আপামর ভারতবাসী তথা বাঙালীর আবেগের দর্শন 'কন্যাকুমারীর' অভিমুখে।বিবেকানন্দ রক,কন্যাকুমারী এই শব্দ দুটি প্রতিটি বাঙালী-ভ্রমণকারীর হৃদয়ে নিহিত থাকে ধ্যানমগ্ন হয়ে। তাই সময় সুযোগ পেলেই তার পথ ছুটে চলে দক্ষিণতম শেষ বিন্দুটিতে। আর এ পথে পা বাড়ালেই সে আপনা হতেই ভ্রমণকারী থেকে হয়ে ওঠে পরিব্রাজক। কোদাই থেকে আমরা বের হলাম দুপুর দুটো নাগাদ। পথে একটা হোটেলে দুপুরের খাওয়ার খেলাম। গাড়ি ছুটল তিন'শ কিমি দূরের কন্যাকুমারীর উদ্দেশ্যে। পথে বেশ ভারি বৃষ্টি নামল। মাদুরাই শহরকে পাশে রেখে গাড়ি চলল তিরুনেলভেল্লি হয়ে কন্যাকুমারী। আগে থেকেই স্থির ছিল কন্যাকুমারীতে আমরা কোনো হোটেলে উঠবো না। আমরা রাত্রিবাস করব ভারতসেবাশ্রমে। বৃষ্টির জন্য আমরা নিদিষ্ট সময়ে আশ্রমে পৌঁছতে পারলাম না। তার উপর মূর্ত্তিজী ভারতসেবাশ্রমের লোকেশন জানত না। জি. পি.এস-এ মুশকিল আসান হল। যখন আশ্রমে পৌঁছলাম তখন রাত্রি আটটা বেজে গেছে। আশ্রমে সন্ধ্যাকালীন পুজো চলছে।  আমরা গিয়ে পুজোস্থলে বসলাম।

পুজো শেষে আমাদের থাকার জায়গা দেওয়া হল। কিন্তু রাত্রির খাওয়ার পাওয়া যাবে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেল না।আশ্রম থেকে জানানো হল রাতের রান্নার প্রস্তুতি অনেক আগেই হয়ে গিয়েছে আপাতত কিছু বলা যাচ্ছে না

 

বারাণসীর

ঘাটে ঘাটে....

     সব মানুষের মধ্যে একটা করে নদী থাকে। সে নদী কুলকুল করে বইতে থাকে অবিরত। ঐ যে স্পন্দন, ঐ বহমানতা ওটাই তো জীবন। যদি স্রোত রুদ্ধ হয়,যদি গতি বাধা পড়ে তবে জীবন থেমে যায়। হয়তো তাই মানুষ বারে বারে ফিরে গেছে নদীর কাছে, স্রোতের সান্নিধ্যে। তার সঙ্গে মেলাতে চেয়েছে জীবনকে।

  লিখেছেন... সনোজ চক্রবর্তী 

(পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা)

     সব মানুষের মধ্যে একটা করে নদী থাকে।
সে নদী কুলকুল করে বইতে থাকে অবিরত।
ঐ যে স্পন্দন, ঐ বহমানতা ওটাই তো জীবন।
যদি স্রোত রুদ্ধ হয়,যদি গতি বাধা পড়ে তবে জীবন থেমে যায়।
হয়তো তাই মানুষ বারে বারে ফিরে গেছে নদীর কাছে, স্রোতের সান্নিধ্যে।
তার সঙ্গে মেলাতে চেয়েছে জীবনকে।
রাস্তায় এসে দেখি নদীর কাছে যাওয়ার কোন ব্যবস্থাই নেই।
থাকবে কি করে!
মোবাইলে এলার্ম দেওয়া ছিল ভোর চারটায়।
তৈরি হতে মিনিট দশ।
রাস্তায় নেমে মোবাইলে সময় দেখলাম--
চারটে কুড়ি।
পথ-ঘাট সব শুনশান।
না আছে রিকসা্ না অটো।
শীত শীত করছে....
এদিকে নদী ডাকছে....
নদীর কুলকুল শব্দ টানছে....
অগত্যা হাঁটা। 
সূর্যোদয়ের আগেই পৌঁছতে হবে ঘাটে।
শিথিল সে প্রত্যুষে গলিতে গলিতে যে লোকজনের দেখা মিলল তারা সবাই চলেছে নদীর জন্য।
সবাই চলেছে বারাণসীর পুণ্যতোয়া গঙ্গার উদ্দেশ্যে।


ঐ দুই নদী যেহেতু ঐ স্থলে মিলিত হয়েছে তাই নগরটির নাম বারাণসী।

ঘাটের পাট ভেঙে পায়ে পায়ে নেমে এলাম নদীর কাছে।
ভোরের আবছা আলোয় জেগে উঠছে দশাশ্বমেধ ঘাট।
বৈদিক ঐতিহ্য আর নানান স্তোত্রপাঠে সে এক স্বর্গীয় পরিবেশ।
গঙ্গা এখানে পবিত্রতার, পরিত্রাতার প্রতীক।
এখানে স্নান করলে নাকি সর্বরোগ দূর হয়, সর্বপাপ ক্ষয় হয়।
এক গন্ডূষ গঙ্গাজল পানে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল মেলে।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মত্ত অবগাহনে।

 

খ্রিস্টের জন্মের ১২০০ বছর আগে সুহোত্র পুত্র কাশ্য একটি নগরী নির্মাণ করেন। কাশ্যর নাম অনুসারে নগরীটির নাম হয় কাশী।
পরবর্তীকালে কাশীরাজ বরণা বারাণসী নামে এক দেবীর প্রতিষ্ঠা করেন।
কাশীর নাম পাল্টে হয়ে যায় বারাণসী।
আবার বামনপুরাণে বলা হচ্ছে--
বিষ্ণুর অংশসম্ভূত অব্যয় পুরুষের দক্ষিণ পা থেকে সর্বপাপহরা মঙ্গলদায়িনী বরুণা ও বাম পা থেকে অসি নদীর উদগম।

মন্দিরের চারপাশের বাড়ি ভাঙা হচ্ছে যাতে মন্দির দূর থেকে প্রতীয়মান হয়। চারপাশে ধুলো আর তার সঙ্গে ষন্ড ও পান্ডাদের উৎপাত।
বিশ্বনাথ দর্শন সেরে রাস্তায় পৌচ্ছে দেখি ভোরের সে পথ এখন অন্য এক চেহারা নিয়েছে।
অগনিত মানুষ, অটো, রিকসা্, হেলেদুলে ষাড়েদের যাতায়াত, ফুটপাথ উপচে দোকানপাট -- বেসামাল ট্রাফিক ব্যবস্থা।

বিকেলে বেরালাম নৌকায় চেপে গঙ্গা ঘুরতে।
সে এক আনন্দময় পরিভ্রমন।

অসি ঘাট থেকে শুরু হল নৌ-বিহার।
তারপর একে একে জানকী ঘাট, তুলসী ঘাট, হনুমান ঘাট পেরিয়ে হরিশ্চন্দ্র ঘাট।
রাজা হরিশ্চন্দ্র-শৈবা-রুহিতাস্য স্মৃতিমন্ডিত হরিশ্চন্দ্র ঘাটে শব দাহ হচ্ছে দেখলাম। নৌ-চালক জানালো, লোকালয় থেকে এ ঘাট দূরে বলে দাহ হয় কম।
তারপর কেদার ঘাট, নারদ ঘাট, ধোবী ঘাট, অহল্যাবাঈ ঘাট, প্রয়াগ ঘাট, দশাশ্বমেধ ঘাট মান ঘাট, মীরা ঘাট ও সব শেষে মনিকর্নিকা ঘাট। এ ঘাটে নাকি শিব-জায়া পার্বতীর কুন্ডল পড়ে। তাই বেনারস একান্ন সতী পীঠের একটি। মনিকর্নিকা ঘাট হল মহাশ্মশান, এখানে শবদহ চলে অবিরত।
নৌ-বিহারের শেষ দিকে সন্ধ্যা নামল।
সূর্যাস্থের লাল আলো মিশে যাচ্ছে গঙ্গার স্রোতে। সে এক অপরূপ দৃশ্য।

বারাণসীর আরো এক আকর্ষণ হল সন্ধ্যাকালে দশাশ্বমেধ ঘাটে গঙ্গারতি।
সাতজন পুরোহিত এক সঙ্গে আরতি করেন।
স্তোত্রপাঠের সঙ্গে সঙ্গে চলে সে আরতি।
নদীর জলে আলোর আলপনা।
আরতি শেষে পুরোহিতের সুললিত কন্ঠে বেজে ওঠে ঈশোপনিষদের শান্তি পাঠ--
"ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাং পূর্ণমুদচ্যতে;
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ "
গঙ্গারতি শেষে ভিড় ঠেলে এগিয়ে চলে ছি।
চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে বহমান গঙ্গা। কানে বাজছে শান্তি পাঠ--
"উহা পূর্ণ(অদৃশ্য ব্রহ্ম), ইহা পূর্ণ(এ দৃশ্য জগৎ)
পূর্ণ(ব্রহ্ম) থেকেই পূর্ণের( দৃশ্য জগতের) উৎপত্তি। পূর্ণ(দৃশ্য জগৎ) -এর পূর্ণত্ব সরিয়ে নিলে পূর্ণ(ব্রহ্ম)-ই মাত্র অবশিষ্ট থাকেন।
মনে মনে ভাবলাম এই যে গঙ্গারতি এ তো জীবনের বন্দনা, এতো স্রোতের উপাসনা।
এ ভ্রমন তো নিছক ভ্রমন নয়-
এ যে জীবনবোধের পাঠ।
এ যে জীবনের মূলমন্ত্রটির উচ্চারণ।

অস্ফুটে কে যেন বলে উঠল--
" শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ।"
তোমরা অমৃতের সন্তান--
জীবনকে... জীবনের গতিকে....
জীবনের প্রবাহকে.....
অশিব থেকে শিবে, অকল্যান থেকে কল্যানে প্রবাহিত কর।

 

একটি ভ্রম(ন)

কাহিনী

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় ইংরেজ সৈন্য-রা তাজমহলের শরীর থেকে মূল্যবান রত্ন খুলে নেয়।
এখন তাজমহলকে চোখ রাঙাছে দূষণ।
তার শরীরে থাবা বসাচ্ছে অ্যাসিড বৃষ্টি।
যমুনায় আর কেউ জল আনতে যায় না। যমুনায় জল নেই।
যমুনা বয়ে চলেছে বিষ।
যমুনায় আর তাজের ছায়া পড়ে না।

  লিখেছেন... সনোজ চক্রবর্তী 

(পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা)

     বুরহানের যুদ্ধ প্রান্তরে বসে খুরম মিঞা তোলার এক দিকে বুরহান জয় ও গৌহর বেগম ভূমিষ্ঠ হওয়ার আনন্দ আর অন্য দিকে দ্বিতীয় স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগমের অকাল প্রয়াণ লাগিয়ে বুঝলেন দ্বিতীয় দিকটার ভার অনেক বেশী।
বিচ্ছেদ-বিষাদ ছাপিয়ে যাচ্ছে সকল আনন্দকে।

খুরম মিঞা আরজুমান্দ বেগমকে প্রথম দেখেছিলেন আগ্রার বাজারে ১৬১২ তে।
প্রথম দর্শনেই কুপোকাত।
তখন দুজনের বয়স ১৫ বছর ও ১৪ বছর।
জ্যোতিষী বাদ সাধলেন সাদীতে, সময় ভাল নয়।
হয়ে রইল বাকদান।
কিছুকাল পরে জাকজমকে বিয়ে।
আরজুমান্দ হলের মিঞায় দ্বিতীয় স্ত্রী (কেউ বলেন ৩য়, কেউ ৪র্থ- আসলে রাজা বা সম্রাটদের স্ত্রীর সংখ্যা ধরতে নেই)।

 

তৈরী করলেন নকসা্।
মুল স্থপতির দায়িত্ব নিলেন উস্তাদ আহমেদ লাহোরী।
কাজিম খান, চিরঞ্জীলাল, আমানত খানেরা ভাগ করে নিলেন দায়িত্ব।

যমুনা নদী দূর্গের নিচ থেকে পশ্চিমদিকে যেখানে বড় বাঁক নিয়েছে স্থির হল সেখানেই তৈরি হবে সৌধ।
রাজস্থান থেকে এল সাদা পাথর, লাল-বাদামী-হলুদ পাথর এল পাঞ্জাব থেকে, চীন থেকে সবুজ,তিব্বত থেকে নীল আর নীলমনি রত্ন এল শ্রীলঙ্কা থেকে।
নির্মাণ শুরু হল ১৬৩২ এ, মূল নির্মাণ শেষ হল ১৬৪৮ এ।
তবে সৌধের চারপাশ, প্রবেশপথ এসব ধরলে নির্মাণ শেষ হয় ১৬৫৩ তে, অর্থাৎ ২১ বছর ধরে চলে সেই নির্মাণ-সংগ্রাম।
খুরম অর্থাৎ সম্রাট সাহাবুূদ্দিন মহম্মদ শাহজাহান নির্মাণ করলেন এক অমর কীর্তি "তাজমহল"।

 

১৬৩১ সালে আরজুমান্দ ১৪ তম সন্তান গৌহর বেগমের জন্মদিতে গিয়ে মারা গেলেন।
মাত্র ১৮ বছরের মধ্যে নিভে গেল দাম্পত্য জীবনের আলো।
জয়নাবাদ বাগানে সাময়িক সমাহিত করা হল আরজুমান্দকে।
কিন্তু এ তো আর যে সে প্রেম কাহিনী নয় যে ফুস করে শেষ হয়ে যাবে।
খুরম মিঞা তাঁর প্রেমকে অমর করে রাখতে শুরু করলেন এক অনন্ত যুূদ্ধ।
সে যুদ্ধে সামিল হল ২০০০০ মানুষ,১০০০ হাতি।
খরচ হল আনুমানিক ৬৪৩৮ কোটি টাকা।
পারস্য থেকে তলব হল ঈশা আফেন্দীর।

 

পরবর্তীকালে ওখানেই আরজুমান্দ বানু বেগম ওরফে মমতাজ মহলের সমাধীর পাশেই সহাহিত হন সম্রাট শাহজাহানও।

১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ রাজার রাজদূত ও পর্যটক এডওয়ার্ড লিয়ার তাজমহল দেখে বলেলেন--
" আজ থেকে বিশ্ববাসীকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হলো, প্রথমশ্রেণী যারা তাজমহল দেখেছে আর দ্বিতীয় যারা তা দেখে নি।"
১৯৯৯ এ, আমি প্রথম শ্রেণীতে ঢুকে পড়ি। সেবার আমরা বি.এড. কলেজ থেকে গিয়েছিলাম তাজমহল।
এবার আমরা একজন দর্শক বাড়িয়েছি।

তাজমহলের প্রবেশ পথ ১০০ফিট উচুঁ।
যেমন প্রাণী তার মলও তেমন।
হাতির মলের সঙ্গে আরশোলার পটির তুলনা চলে না।

পুরো তাজমহল ১৮০ফিট উচুঁ। তাজমহলের গম্বুজের উচ্চতা ২১৩ফিট।
পুরো চৌহুদ্দী ১৯০২x ১০০২বঃফিট। চারপাশে রয়েছে চারটি মিনার।
মিনার এর উচ্চতা ১৬২.৫ফিট।
তাজমহলে বিভিন্ন ধর্মের নিদর্শন মেলে। গম্বুজের উপর চুঁড়াটি শিবের ত্রিশুল(অনেকে মনে করেন তাজমহল আসলে রাজা জয় সিংহের শিব মন্দির) মিনার ও গম্বুজ ইসলাম ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে।
সারা সৌধ জুড়ে অপরূপ সব স্থাপত্য, ভাস্কর্য যা বর্ণনা করা যায় না।
পারস্য,তুরস্ক,ভারতীয় ও ইসলামী স্থাপত্য শিল্পের সম্মিলন তাজমহল।
সূর্যোদয়,সূযাস্ত এমন কি পূর্ণিমায় চাঁদের আলোয় রং পাল্টে পাল্টে যায় তাজমহলের।

তাজমহলের দার্শনী জন প্রতি ৫০টাকা পনেরো বছরের নিচে শিশুদের ফ্রি। প্রবেশ পথে নানা জিনিসের উপর নিষেধ আছে। মুড়ি-বিড়ি-গুটখা এসবে আটকে যেতে পারেন। সরকারি পরিচয় পত্র দাখিল করে ভেতরে যেতে হয়। বাইরে অটো চালক, ফেরিওয়ালা আপনার পকেট কাটতে তৈরি ফলে সাবধানে এগানো ভালো।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় ইংরেজ সৈন্য-রা তাজমহলের শরীর থেকে মূল্যবান রত্ন খুলে নেয়।
এখন তাজমহলকে চোখ রাঙাছে দূষণ।
তার শরীরে থাবা বসাচ্ছে অ্যাসিড বৃষ্টি।
যমুনায় আর কেউ জল আনতে যায় না। যমুনায় জল নেই।
যমুনা বয়ে চলেছে বিষ।
যমুনায় আর তাজের ছায়া পড়ে না।

অপরূপ তাজমহল দেখতে দেখতে আপনার চোখ বারবার আটকে যাবে আমার মতো কাঁচা ফটোগ্রাফারদের দিকে।
যারা বৌ-বাচ্চার হাতে তাজমহল ঝুলিয়ে দিতে গিয়ে নিজেই উদয়শংকর হয়ে উঠেছে।
ফটো তোলার ভঙ্গীর নানা বিভঙ্গ।
তাছাড়া নিজস্বী তোলার বিচিত্রতা আপনাকে বিনোদন দেবেই। সরাসরি তাজমহল তো দেখবেনই তার সঙ্গে আগ্রা ফোর্ট থেকে তাজমহল'কে সত্যি অন্য রকম লাগে। শাহজাহান বন্দী অবস্থায় ফোর্টের ঐ অংশ দিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকতেন তাজের দিকে।

তাজমহল দেখছি।
গাইড নাগাড়ে বলে যাচ্ছে তাজমহলের ইতিবৃত্ত। মোবাইলে রেকর্ড করে নিচ্ছি সেসব।
এক পর্যটক তার ক্যামেরা নিয়ে নিবিষ্ট আমার বিকচ শিরদেশে।
খচাখচ শব্দে ছবি হয়ে গেলাম তাজমহলের সঙ্গে।
অনেক চেষ্টা করেও জানা গেল না ব্যাটা কি নিলো ক্যামেরায়--
আমার টাকে তাজের প্রতিবিম্ব না তাজমহলের পাশাপাশি ধরা রইল আর একটি চকচকে গম্বুজ।

 

ফতেপুর সিক্রির

আনাচে-কানাচে

ইতিহাসের আনাচ-কানাচে ঘুরতে ঘুরতে বেলা ফুরিয়ে এসেছে। সূর্যাস্তের লাল আভায় ধুয়ে যাচ্ছে ফতেপুরের প্রান্তর।আরো মোহময়ী হয়ে উঠেছে নির্মাণ। অন্ধকার নামার আগেই ফিরে যেতে হবে গন্তব্যে।শেষবারের মতো চোখ আটকে গেল 'বুলন্দ দরওয়াজায়' যেন একটা ছায়া মতো সরে গেল আচমকা চোখের সামন থেকে। গাইড বলে ছিল আজও গভীর রাতে দরওয়াজায় কে যেন দাঁড়িয়ে থাকে।হ  তো মাধবী দাঁড়িয়ে থাকে জেরিনার অপেক্ষায়। জেরিনার কাছে তার ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটুকু হয় নি যে।

  লিখেছেন... সনোজ চক্রবর্তী 

(পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবাংলা

ছবিঃ লেখক)

তানসেন গান গাইতেন এইখানে, দূরে হাওয়া মহল

 

    দুপুরের রোদে তেমন তেজ নেই।
গাড়ির জানালা দিয়ে বাতাস আসছিল হু হু করে আর তাতেই চোখ বুজে আসছিল আলতো ভাবে।
গাড়ি ফতেপুর সিক্রি পৌঁছানোর আগে আমাদের ড্রাইভার ফতেপুর সিক্রি কি আর কি তার ইতিহাস তা সংক্ষেপে জানিয়ে দিল আমাদের।
এবং এও জানলাম এখানে গাইড না নিলে কিছুই বোঝা যাবে না।
সরকার স্বীকৃত গাইড নিতে হবে।
ওরা চাইবে সাড়ে ছয়'শ টাকা, তবে দর-দস্তুর করে এগানো উচিত কাজ হবে।
ফতেপুর সিক্রিতে পাইভেট গাড়ি যায় না। বাসস্ট্যান্ড থেকে আগ্রা ডেভলাপম্যান্টের গাড়ি ধরতে হয়।
ভাড়া জন প্রতি দশ টাকা।
তবে অটোও যাচ্ছে কিছুটু আগে পর্যন্ত।
একজন গাইডের সঙ্গে কথা হল,
চার'শ তে রাজি হল লোকটি।

১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে খানুয়ার যুদ্ধে জয় লাভ করে বাবার আল্লাহকে সুক্রিয়া জানিয়ে নির্মান করেন সিক্রি নগর।
পরবর্তীকালে মুঘলই - আজম- জাল্লাউদ্দিন - মহম্মদ আকবর গুজরাট জয়ের স্মারক হিসাবে লাল বেলে পাথরে নির্মান করেন ফতেপুর সিক্রি।
ফতে অর্থাৎ বিজয়।
আসলে আকবর ছিলেন নিঃসন্তান।
পুত্র সন্তানের আশায় দরবেশ শেখ সেলিম চিস্তির কাছে প্রার্থণা করেন।

যোধাবাঈ প্যালেস

 

দরবেশের আশীর্বাদে আকবরের পাদসা বেগম যোদ্ধাবাঈ এর সন্তান হয়।
যোধাবাঈ ছিলেন আমের(জয়পুরের) রাজকন্যা।
রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করার জন্য সম্রাট রাজপুতদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।
কিন্তু ভারত সম্রাট সন্তানহীন হওয়ায় উত্তরাধীকারীর ভাবনায় চিন্তিত হয়ে পড়েন।
দরবেশ সেলিম চিস্তির ভবিষ্যত বানী মিলে যায়।
আকবরের তিন বেগম সন্তান সম্ভবা হন।
       একদিকে গুজরাট জয় অন্য দিকে সেলিম চিস্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা হেতু চিস্তির গ্রামে শৈলশিরায় ১৫৬৯ -এ নির্মান করেন রাজধানী।
হিন্দু আর মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন যার নাম ফতেপুর সিক্রি। 
এই ফতেপুর সিক্রিতে আকবরের রাজধানী ছিল দীর্ঘ ষোল বছর।
পরবর্তী কালে জলের অভাবে তিনি আবার ফিরে যান আগ্রায়।
অবশ্য ফতেপুর সিক্রির পতনের অন্য এক গাঁথা শুনলাম গাইডের কাছে।
জেরিনা নামে এক নর্তকী স্থান পায় সম্রাটের হারেমে। জেরিনা ছিল সিক্রি গ্রামের অখ্যাত নর্তকী। তার ইচ্ছা ছিল সম্রাটের নর্তকী হওয়ার। তার সেই ইচ্ছা পূরণের সুযোগ তৈরি হয়ে যায় কাকতালীয় ভাবে। 
একবার সম্রাটের ইচ্ছে হয় তানসেনের সঙ্গীতের সঙ্গে একজন নর্তকী নাচুক। সে সময় নর্তকী মিলল না। এক দাসী মারফৎ সুযোগ পেয়ে যায় জেরিনা। জেরিনার নৃত্যে মুগ্ধ হন সম্রাট।ক্রমে জেরিনা আকবরের প্রিয় পাত্রী হয়ে উঠেন। আর তাতেই ঈর্শান্বিত হয়ে পড়েন যোধাবাঈ তথা মরিয়ম-উজ-জামানীর( প্রতি যুগের আনন্দ ) দাসী মাধবী।

দেওয়ানী খাস

 

দেওয়ানী আম

 

চক্রান্ত করে মাধবী চোর সাবস্ত্য করে জেরিনাকে।
সম্রাট বিশ্বাস ভঙ্গে আঘাত পান।
জেরিনা বারবার করে সম্রাটকে জানায় যে সে চুরি করে নি।

কিন্তু রাজধর্ম পালনে আকবর বাধ্য হন শাস্তি প্রদানে।পরদিন বিচার সভা বসার আগেই ভোর থেকে আর জেরিনার দেখা মেলে না। বিচারের আগেই অাত্মহত্যা করে জেরিনা। ভেঙে পড়েন সম্রাট। জেরিনার বাবা অভিশাপ দেয় তার মেয়ের আকাল মৃত্যুতে শেষ হয়ে যাবে সম্রাটের স্বপ্নের নগর ফতেপুর সিক্রি। কিছু কাল পরে পুর নগরে জল কষ্ট দেখা দেয়। মৃতের নগরী হয়ে যায় ফতেপুর। সম্রাট ফিরে যান আগ্রায়।

ইবাদতখানা

 

ফতেপুরের দুটি ভাগ রাজবাড়ি আর গুরুবাড়ি। পূর্ব দিকের রয়েল গেট থেকে রাজবাড়ি তে প্রবেশ করতে হয়।
ঢুকেই সবুজ মখমল বিছানো 'দেওয়ানী আম'
প্রতি দিন সকালে সম্রাট দেখা দিতেন প্রজাদের।

একটু উচুঁতে সম্রাটের বসবার জায়গা। 'দেওয়ানী আম' পেরিয়ে 'তোলা-দান' এখানে সম্রাট আকবর তার সন্তান সেলিম তথা জাহাঙ্গীরকে তোলার একদিকে রেখে অন্য দিকে সোনা দিয়ে ওজন করেছিলেন। ঐ সোনা দান করেছিলেন গরীব প্রজাদের মধ্যে। তোলাদানের পাশে জ্যোতিষ পরুষোত্তম দাসের কার্যালয়। পাশেই 'ইবাদতখানা'। এখানে ধর্ম নিয়ে আলোচনা হত। সম্রাট আকবর সর্বধর্ম সমন্বয়ের চেষ্টা করেছিলেন। আকবরের 'দীন ইলাহির' প্রচার হয় এই 'ইবাদতখানা' থেকে।

রুকাইয়া বেগমের মহলের স্থাপত্য

 

সংলগ্ন 'পাঁচ-মহল'। পাঁচতলা বিশিষ্ট 'হাওয়া মহল'।কোন দেওয়াল ছাড়া পিলারের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই 'হাওয়া মহল'। আকবর জয়পুরের হাওয়া মহলের আদলে নির্মান করেন এই 'হাওয়া-মহল'। মোট পিলার সংখ্যা ১৭৬টি । সব চেয়ে নিচে ৮৪টি, তারপর ৫৬, ২০, ১২ ও সবচেয়ে উপরে ৪টি। ওখানে হাওয়া খেত সম্রাট আকবর ও তার পাটরানী যোধাবাঈ। সবথেচে নিচের তালায় আর্বি ও পার্সী শিক্ষা দেওয়া হত। সে কাজে যুক্ত ছিলেন আবুল ফজল ও আবুল ফৌজী। সম্রাট আকবরের লাইব্রেরী ছিল ওখানে।

    সম্রাট লেখাপড়া না জানলেও সভাসদরা পাঠ করে শোনাতেন। সম্রাট আকবরের খাস সভা বসত 'দেওয়ানী খাসে'। বড় পিলারের আসনটিতে বসতেন সম্রাট, চারদিকে তার নয় সভাসদ। 'দেওয়ানী খাস' এর স্থাপত্য আজও অম্লান। দেওয়ানী খাস সংলগ্ন চাতালে সম্রাট দাসীদের ঘুঁটি করে দাবা খেলতেন। চাতালের পাশে 'অনুপ তালাও'। 'অনুপ তালাও'-এ বসে গান গাইতেন তানসেন।

ফতেপুরে সূর্যাস্ত

 

'অনুপ তালাও'-এর চারপাশে গোলাপ জলের জলকেলি।
সঙ্গীতের সঙ্গে মুজরাও বসত সেকালে।
সম্রাট আকবরের প্রধান তিন মহিষী ছিলেন হিন্দু (যোধাবাঈ জয়পুর থেকে), মুসলিম (রুকাইয়া তুর্কীর সুলতানা), খ্রিস্টান (মারিয়াম গোয়া থেকে)।
তিন পত্নীর পৃথক পৃথক মহল ছিল।
রুকাইয়া বেগম মুসলমান হলেও তার মহলের স্থাপত্যে তুলসীগাছ, মঙ্গল ঘট, স্বস্তিক চিহ্ন নজরে পড়ে।
মহামতি আকবরের আরামখানা ঢোকার মুখে প্রকান্ড এক জলপাত্র। যা আজ ভগ্নাবশেষ মাত্র। ঐ পাত্রে নাকি পানের জল থাকত সম্রাটের। 

জল আসত ঘটা করে হরিদ্বার থেকে।
সম্রাটের শয়ন কক্ষটিও রাজকীয়। আকবরের উচ্চতা ছিল ৫ফুট-৪ইঞ্চি কিন্তু পাথর নির্মিত খাটটির বহর ছিল- ১৮x১৫ বঃ ফুট।
দেখে নিলাম রাজকীয় ভোজনালয়।
পাথরের কোটরে কোটরে থাকত মোগলাই খানা।
আরামখানার প্রবেশ পথটি উচ্চতায় বেশ ছোট।
ছোট কেন তা জানা গেল গাইডের থেকে।
সম্রাটের এক মন্ত্রী মহেশ দাসের পরামর্শ ক্রমে নির্মান হয় প্রবেশ পথের।
মহেশ দাস বলেন প্রবেশ পথ এমন হোক যাতে যে কেউ মাথা নিচু করে প্রবেশ করবেন সম্রাটের কাছে।
গাইড ফেললেন ঝামেলায়।

জামি মসজিদ

 

প্রশ্ন করে বসলেন --
--কে এই মহেশ দাস? আপনি তো বাঙালী বলুন?
মাথা চুলকে, ঠোঁট কাঁমড়ে সে এক যা তা অবস্থা।
পরে জানা গেল এই মহেশ দাস হলেন--
"বীরবল"।
সম্রাটের পাটরানীর রন্ধনশালায় ১৫৬টি ঝুমকোর নকসা্।
যোধাবাঈয়ের পচ্ছন্দ মাফিক সম্রাট নকসা্ -র আদলে সোনার ঝুমকো গড়ে দিতেন।
গাইড বেশ মজার মানুষ।
হঠাৎ ভাঙা ভাঙা বাংলায় জানতে চাইলেন--
-- যোধাবাঈ কি আছেন?
আমি বললাম--
-- সে কত যুগ আগের কথা, কি করে থাকবে?
আমার গিন্নীর দিকে ইশারা করে বলল--
-- বলেন কি! এই তো যোধাবাঈ।
আমি বললাম--
-- না এটি আমার যা তাইই যোধাবাঈ হতে যাবে কেন! যোধাবাঈ হতে গেলে রুকাইয়া,মারিয়াম দরকার হয়ে পড়ে যে।
পুরো চত্তরে ভেঙে পড়ল হাসি।
যোধাবাঈ-এর মহলটি 'যোধাবাঈ প্যালেস' নামে পরিচিত।
নির্মান রীতি রাজস্থানী হাভেলীর মতো।
ভেতরে কৃষ্ণ মন্দির ছিল উপাসনার জন্য।
এখন তুলসীমঞ্চে জবা গাছ দেখলাম। ঝরোখার কাজ চোখে পড়ার মতো।
রাজবাড়ি ছেড়ে চললাম গুরুবাড়ি।
এর প্রবেশ পথে এশিয়ার বৃহত্তম দরজা 'বুলন্দ দরওয়াজা' এ দরজা নির্মিত হয় গুজরাট জয়ের স্মারক হিসাবে। উচ্চতায় ৪১ মিটার।
ভিতরে মক্কার আদলে হিন্দু ও পারসীক শৈলীতে 'জামি মসজিদ'। মসজিদে এক সঙ্গে ১০০০০ নামাজী নামাজ আদায় করতে পারে।
গুরুবাড়ির অন্যতম আকর্ষণ 'সেলিম চিস্তির দরগা' তথা 'মকবারা'।
অনন্য তার স্থাপত্য।
পাথরের জালি বা জাফরির কাজে চোখ আটকে যায়।
তবে এ দরগা ধর্মীয় মাহাত্ম্য আজও অম্লান। আজও নিঃসন্তান দম্পতি দরগায় সন্তান কামনায় দাগা বাঁধেন অনন্ত বিশ্বাসে।
ইতিহাসের আনাচ-কানাচে ঘুরতে ঘুরতে বেলা ফুরিয়ে এসেছে।
সূর্যাস্তের লাল আভায় ধুয়ে যাচ্ছে ফতেপুরের প্রান্তর।
আরো মোহময়ী হয়ে উঠেছে নির্মাণ।
অন্ধকার নামার আগেই ফিরে যেতে হবে গন্তব্যে।
শেষবারের মতো চোখ আটকে গেল 'বুলন্দ দরওয়াজায়' যেন একটা ছায়া মতো সরে গেল আচমকা চোখের সামন থেকে।
গাইড বলে ছিল আজও গভীর রাতে দরওয়াজায় কে যেন দাঁড়িয়ে থাকে।
হয়তো মাধবী দাঁড়িয়ে থাকে জেরিনার অপেক্ষায়।
জেরিনার কাছে তার ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটুকু হয় নি যে।

 

সেলিম চিস্তির দরগা বা মকবারা

 

দেওয়ানী খাস

 

বুলন্দ দরওয়াজা, সস্ত্রীক লেখক

 

জলপাত্র 

 

 

Please mention the "name of the articles" you would like to comment in the following box... Thank you.

Email : maadhukariarticles@gmail.com

​​​

© 2017 by Maadhukari.com

Bengali Online Magazine