top of page
সূচীপত্র
Saraswati3.jpg
মার্চ ২০২২
girl.JPG

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা

 মার্চ ২০২২ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

Sudipta-Biswas.jpg
কবিতাঃ সুদীপ্ত বিশ্বাস
touch.jpg

বাউল

 

কলা বেশ তো আছি, একলা থাকাই ভালো
দুপুরে ডিস্কো নাচি, রাতে পাই চাঁদের আলো।
কোনো এক নিঝুম দুপুর, কিংবা গভীর রাতে
মনে আর পড়েই না তো, টান দিই গঞ্জিকাতে।
পরোয়া করব কেন? সমাজটা দিচ্ছে বা কী?
ছোট্ট জীবন আমার, তাইতো নাচতে থাকি।
পলকা এই জীবনে, কী হবে দুঃখ এনে?
চল্ না উড়াই ঘুড়ি, সুতোতে মাঞ্জা টেনে।
লাফিয়ে পাহাড় চড়ে, সাঁতরে নদীর বুকে
কবিতা দু'এক কলি আসলে রাখছি টুকে।
এভাবে কাটছে তো দিন, তোমাকে আর কী খুঁজি?
জানিনা কোথায় তুমি, আমাকে ভাবছো বুঝি?
ভাবলে কী হবে আর, নদীতে জল গড়ালে
চাঁদটা বন্ধু আমার, গভীর এই রাত্রিকালে 
গাছেরা আগলে রাখে, পাখিরা গাইতে থাকে
ঘরে আর যায় কী ফেরা? ওই যে বাউল ডাকে !

 

 

জল


সেতু? হ্যাঁ গো, সেতুই পাতো তোমার আমার বুকে
চিরটাকাল ভালবাসা থাক না বাঁধা সুখে।
সুখের বাঁধন আলগা হলেই নামব আবার জলে
জলে জন্ম, জলে মৃত্যু, জলেই বাঁচতে বলে।
জল হয়ে তাই তোমার পাশে যেই না আমি নামি
ভালবাসার অতলতলে যাই তলিয়ে আমি!
জল তো মুছে ফেলে সবই সাঁতরে যাবার পরে
তাই বিরহ দেয় না উঁকি জলের কোনও স্তরে।
ভুলে যাওয়া বরং ভালো, ভুলতে কি আর জানি?
তাইতো শুধু হৃদয় সেঁচে দুঃখ তুলে আনি।

বিপ্রলব্ধ

ত্রাহ্যস্পর্শে তিথিক্ষয়ে চাঁদের দেখা নেই
মঞ্জুষাতে লক্ষ্মীকে নয়, চাইছি তোমাকেই।
তামরসের মতোই তুমি, মুগ্ধ হয়ে থাকি
ধৈবতহীন আরোহণে তিলক কামোদ রাখি।
অনিকেত শব্দচাষী বন-পাহাড়ে ঘুরি
স্মিত হাসির ময়ূখছটায় মন করেছ চুরি।
ভৈরবের ওই বিরহী সুর পাখির ডাকে ঝরে
বিপ্রলব্ধ, বিহানবেলায় বড্ড মনে পড়ে।

শব্দার্থ


তিথিক্ষয় ~ একদিনে দুই তিথির ক্ষয় হয়ে তৃতীয় তিথির সংযোগ; ত্রাহ্যস্পর্শ; অমাবস্যা।
মঞ্জুষা ~ লক্ষ্মীর ঝাঁপি।
তামরস ~ পদ্ম।
তিলক কামোদ হল একটা রাগ।

এই রাগে অবরোহণে সাতটি সুর থাকলেও আরোহণে ধা বা ধৈবত সুরটি থাকে না।
অনিকেত ~ গৃহহীন পথিক।
শব্দচাষী ~ কবি।
ময়ূখ ~ রশ্মি।
ভৈরব হল প্রভাতকালীন একটা রাগ।ভোর বেলা গাওয়া হয় এই রাগ।
বিপ্রলব্ধ অর্থ বঞ্চিত বা প্রতারিত।
বিহানবেলা মানে সকালবেলা।

 


জলছবি

 

বেঁচেই আছি    বাঁচছি বেশ
চশমা এঁটে     পক্ক কেশ।
জীবনটা কী?   জানি কী কেউ?
মিথ্যে শুধু      গুনছি ঢেউ।
বাড়ছে যত      বাঁচার আশা
যাচ্ছে বেড়ে    ক্ষুৎপিপাসা ।
কীসের খোঁজে  ইঁদুর দৌড় 
ছুটছে লোকে   ছুটছে জোর।
দিনটা আসে    দিনটা যায়
চমকে খসা     ঝরাপাতায়
কলকলানো    নদীর পাশে
চুপটি করে      মৃত্যু আসে।

দ্বন্দ্ব


ল আগে না পানি?
আমরা কী তা জানি?
ওসব জানতে গেলে আগে
পেতে হয় জলপানি।

গড বড় না আল্লা?
কার যে ভারি পাল্লা?
পরনে তাদের হ্যাট-কোট-বুট
না কি আলখাল্লা?

হিন্দু না মুসলিম?
উচ্ছে না কী নিম?
মরার পরের ভয় না পেয়ে
বাঁচ্ না ভীতুর ডিম।

আল্লা হরির ভক্ত?
এদের মেলা শক্ত?
কাটলে পরেই দেখতে পাবে
লাল দুটোরই রক্ত।

 


কাঁটাতার


মরা পাখিরা উড়ে যাই কতদূরে
কত দেশ-গ্রাম ইয়ত্তা নেই তার
মানুষেরা শুধু ঝগড়া-বিবাদ করে
মানুষের শুধু দেশভাগ কাঁটাতার।

আমরা নদীরা বয়ে যাই কত দূরে
পাহাড়ের থেকে দূর সাগরের পার
মানুষেরা শুধু দ্বন্দ্ব-বিবাদ করে
মানুষের শুধু দেশভাগ কাঁটাতার।

আমরা আলোরা সূর্যের থেকে এসে
ভেদাভেদ ভুলে ঘোচাই অন্ধকার
মানুষেরা শুধু দ্বন্দ্ব-বিবাদ করে
মানুষের শুধু দেশভাগ কাঁটাতার।

আমরা মেঘেরা হাওয়ার ডানায় ভেসে
কত পথ চলি হিসেব থাকে না তার
মানুষেরা শুধু দ্বন্দ্ব-বিবাদ করে
মানুষের শুধু দেশভাগ কাঁটাতার।

মানুষেরা কেন কাঁটাতার ভালোবাসে?
হিংসা বা দ্বেষে কেন যে বিবাদমান!
কেন যে শেখেনি ভালোবেসে বেঁচে থাকা,
নদী বা বাতাস, মেঘ-পাখিদের গান।

 

কবিতা

পার্থ সরকার 

কবিতাঃ পার্থ সরকার

 মার্চ ২০২২ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

বড় বেশি শব উৎসবে

 

ড় বেশি শব উৎসবে 

নাকচ হয়ে যায় প্রধান শব্দসমূহ 

ক্ষরণ অফুরান 

আনাচেকানাচে লোলুপ স্তাবকতা 

কোথাও ঘৃণার সরু রেখা 

অগ্নিনদ! 

হয়তো 

হয়তো নয় 

তবু, একদিন শেষ 

উৎসবে 

শবের আনাগোনা 

একদিন সত্যই শেফালী 

একদিন সত্যই  কাশ 

 

আমি 

যতটা পারি 

গঠনে আছি 

গৈরিক মাটিতে 

এক সড়ক 

 

তোমার জন্য...। 

ক্লান্ত প্রচ্ছদ  গল্পের

ক্লান্ত প্রচ্ছদ গল্পের  
আচ্ছাদন সরিয়ে ঘরে আসে 
অলীক খাসমহল 
ব্যবধানে ধ্বস্ত মরুৎ 
মরুতেজ 
অবধারিত বিতাড়িত বায়স... 
 
প্রণম্য এই বিষাদ কেন ? 
হয়তো জানে মেরুক্ষেত 
হয়তো বিশদে আছে আরো খেদ 
তবু... 
পুনশ্চ... 
যদি কোনদিন 
শস্যের অন্য কারুকাজে... 
তবে... 

গল্পের ক্লান্ত প্রচ্ছদ 

হোক... 

আজ সারাবেলা আমার কাজের শেষ নেই। 

women.jpg

ভাবি, এক চক্কর দিলেই

ভাবি, এক চক্কর দিলেই তোমার আমার 

সোনালি ডানা... আর প্রতিবারেই ভাবনার 

মাঝপথে জলসত্রের আধখানা বাড়ি আর 

প্রতিবারেই মুখ থুবড়ে পড়ে একগোছা প্রজাপতি।   

এক নিভৃতচারী

প্রবন্ধ

 মার্চ ২০২২ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

Mijanur Rahman.jpg

এক নিভৃতচারী সমাজ সেবক

সংগঠক জনাব আব্দুল হান্নান

মিজানুর রহমান মিজান 

village3.jpg

পৃথিবীর বুকে আমাদের তথা মানব সমাজের আগমনের সহিত মৃত্যুর আলিঙ্গন রয়েছে মিতালী সমতায়। অর্থাৎ জন্মিলে মৃত্যু অবধারিত। একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনির গুণ গান, তিনির প্রদত্ত নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়, ভাল কাজের প্রতি মনোযোগী হওয়া, মন্দ বা নিষিদ্ধ কাজকর্ম পরিহার করে সুন্দর ও ভাল কাজে নিজকে উৎসর্গিত করা। আমরা পথ ভুলা হয়ে গেলে আলো ছড়াতে, সঠিক পথে চলতে, দিকনির্দেশনার নিমিত্তে পাঠিয়েছেন নবী ও রাসুল যুগে যুগে। ক্ষণস্থায়ী এ জীবনে আমরা যতটুকু সম্ভব ভাল কাজ করা উচিত বলে মনে করি। কারণ পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ কেহই করতে পারেননি, পারবেনও না। তবে অমরত্ব লাভের সুযোগ রয়েছে ভাল কাজ করে যেতে পারলে। কাজের মধ্যেই রয়েছে অমরত্বের সুযোগ। “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” এ বাক্যের অন্তর্নিহিত মর্মবাণীতে। মানুষের কল্যাণ করতে পারলে মানুষ চিরদিন কর্মকে মূল্যায়ন করে। অমরত্বের সুযোগ সৃষ্টি হয়। মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়া সম্ভব হয়। অপরদিকে কিছু কিছু কাজ রয়েছে তা করতে হলে চিত্তের সহিত বিত্তের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যম্ভাবী। কারণ হিসাবে এখানে উল্লেখ করতে চাই, কোন কোন সময় দেখা যায় অনেকের টাকা আছে। কিন্তু ভাল কাজ করার মন মানসিকতার অভাব। কারো মন মানসিকতা ভাল কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও অর্থের অভাবে সম্ভব হয়ে উঠে না। তাই শুধু চিত্ত বা বিত্ত হলেই সম্ভব নয় অনেক ক্ষেত্রে। সেক্ষেত্রে চিত্ত-বিত্তের সমন্বয় অপরিহার্য। 

একটি আদর্শ, সুন্দর ও সুষ্ঠু সমাজ গঠন করতে হলে সহানুভূতি, সহমর্মিতা একে অন্যের প্রতি ভালবাসার সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের বিকল্প নেই। পরস্পর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সকল সৃষ্টি কুলের অধিকার সংরক্ষণ অবশ্যম্ভাবী। “মহান রাব্বুল আলামীন ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দিয়েছেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেছেন”। হিংসা-বিদ্বেষ সমাজের সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মারাত্মক অন্তরায়। সমাজে জ্বলে উঠে অশান্তির আগুন। পানির অপর নাম জীবন। পানির দ্বারা শুধু মানুষ পিপাসা নিভৃত করে না, জীবন-ধারণ করে অন্যান্য জীব-জন্তু, পশু পাখিও। ফসল ফলাতেও পানির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আবার অধিক পরিমাণে পানি হলে বন্যা হয়ে যায়। তাতে সকল দিকে ক্ষতির সমূহ কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভাসিয়ে যেমন নেয়, পচাতেও সাহায্য করে। সুতরাং সমতা, সুষ্ঠু, সুষম ও পরিমিত পরিমাণ ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন। প্রত্যেক মানুষের উপার্জিত বৈধ অর্থ বৈধ খাতে ব্যয় করার মধ্যে রয়েছে আলাদা তৃপ্তি, মনের প্রশান্তি। পরিবার পরিজনের ব্যয় নির্বাহিত করে উদ্ধৃতাংশ থেকে সমাজের অসহায় বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা ও সমাজের কল্যাণার্থে ব্যয় করার তাগিদ রয়েছে ইসলামিক দিক থেকে যেমন, তেমনি সামাজিক ও সামাজিকতার দিক থেকেও। অপব্যয় করা, কৃপণতা করা নিষিদ্ধের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।সর্বক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অবলম্বন বাঞ্ছনীয়। একজন মানুষ এ সকল চিন্তায় সামান্যতম প্রভাবিত হলেই তিনি হয়ে উঠেন অনায়াসে হৃদয়জ মানুষ হিসাবে। যে মানুষের হৃদয়ে মানুষের নির্মল ভালবাসায় কিঞ্চিৎ পরিমাণ হলেও মানুষের কল্যাণ কামনা করেন বা জাগ্রত হয়, সে মানুষ অল্প বিস্তর হলেও মানুষ, সমাজ ও সামাজিকতা অনুধাবন করে থাকেন যদিও তার পরিমাণ কম বেশী হয়। আমার আজকের লিখার শেষের দিকে এ কথাগুলি বলার কারণ অবশ্যই আমি ব্যাখ্যা করব সবিস্তারে। 

সকল প্রশংসা মহান রাব্বুল আলামিনের যিনি আমি/আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষকে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা দিয়েছেন এ পৃথিবীর বুকে। আল্লাহর অপার দয়ামায়া, করুণার মাধ্যমে আমাদেরকে হেদায়েতের ও আলো দেখিয়েছেন সর্বশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (স:)এর মাধ্যমে। পথহারা মানুষ পেয়েছে পথের দিশা, হয়েছেন আলোর দিশারী।গড়ে উঠেছে আদর্শ পরিবার, সুষ্ঠু সমাজ, সুষম অর্থনীতি। আমাদের মধ্যে ভুলের পরিমাণ থাকা স্বাভাবিক। তারপর ও আমাদের আন্তরিকতা যদি থাকে তবে শুধু টাকা পয়সা দিয়ে মানুষ বা সমাজের উন্নয়ন সাধন হয় না বা করা যায় না। মানুষ এবং সমাজের উন্নয়ন বা কল্যাণার্থে কাজ করার রয়েছে বহুবিধ পন্থা। অনেক সময় কথা দিয়ে, আচার আচরণ ইত্যাদি দিয়েও কল্যাণ করা সম্ভব। প্রয়োজন আন্তরিকতা, ভালবাসা, মন মানসিকতার। আমি সম্পূর্ণ নির্ভরশীল মহান আল্লাহ তওফিক দিলে এ লেখাটি সম্পূর্ণ করার। আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। 

ধনে-জনে আলোকিত (সিলেটের) বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চী ইউনিয়ন একটি ঐতিহ্যবাহী কৌড়িয়া পরগণার অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়ন। যেখানে জন্ম নিয়েছেন অনেক কীর্তিমান মানুষ। যাঁদের মধ্যে কয়েকজনের নাম না নিলে কৃপণতার সামিল হয়ে যাবে। অথবা একটা দায়বদ্ধ ঋদ্ধতার অনুশোচনায় পড়ে যাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে। সুতরাং আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমার একেকটি লেখায় সকল গুণীজনের নাম স্মরণ করতে। এখানে উল্লেখ করতেই হয়, অবসর প্রাপ্ত কর্ণেল মরহুম তৈয়বুর রহমান পাখিচিরী, মরহুম মাওলানা আব্দুল বারী ইসলামাবাদ, মরহুম মাওলানা ওলিউর রহমান (র:) তেলিকুনা, সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুল মজিদ ইসলামাবাদ (যিনি খাজাঞ্চী ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন স্থানেই পোষ্ট অফিসের ভূমি দাতা এবং পোষ্ট অফিসের নামকরণ করেন ইসলামাবাদ, (এ বিষয়ে অন্য লেখায় আলোচনা করার প্রত্যয়ী প্রত্যাশা রাখি), অবসর প্রাপ্ত সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা শফিকুর রহমান পাখিচিরী, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সুপরিচিত মরহুম ডা: আবুল লেইছ ইসলামাবাদ, সালিশ জগতের ব্যক্তিত্বময় ব্যক্তি মরহুম সাবেক চেয়ারম্যান পীর লিয়াকত হোসেন হোসেন পুর, শিক্ষাবিদ ও সাউথ-ইস্ট ব্যাংকের ডিজি মরহুম আলতাফুর রহমান ঘাসিগাঁও প্রমুখ খাজাঞ্চীবাসীর আলোকবর্তিকা। এবার মুল বক্তব্যে যাবার চেষ্টায় হচ্ছি নিমজ্জিত। 

খাজাঞ্চী ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত হোসেন পুর একটি গ্রাম। যে গ্রামে ১৯৪০ সালের সাত ডিসেম্বর পিতামৃত আবরু মিয়া ও মাতামৃত পাখি বিবি দম্পতির কোল আলোকিত করে মোল্লাবাড়ি খ্যাত বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন পিতামাতার তৃতীয় সন্তান আলহাজ আব্দুল হান্নান। অত্যন্ত আদর যত্নে শিশুকাল অতিবাহিত করেন নিজ বাড়িতে পারিবারিক সুদৃঢ় বন্ধনের মধ্য দিয়ে।কিন্তু ১৯৪৭ সালের পূর্বে অত্রাঞ্চলের মানুষ লন্ডন, আমেরিকার মত চাকুরী, অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিমিত্তে চলে যেতেন কলিকাতা। তখন গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ছিল কলিকাতার অপর নাম কালিমাটি। কালিমাটি থেকে কেহ ফিরে আসলে তিনিকে দেখার জন্য মানুষের ভীড় লেগে যেত। চাকুরী সূত্রে জনাব আব্দুল হান্নানের চাচা হাজী আছলম আলী ছিলেন কলিকাতার বাসিন্দা। তাই আদরের ভাতিজা আব্দুল হান্নানকে কলিকাতা নিয়ে যান চাচা আছলম আলী লেখাপড়া করানোর জন্য।সেখানে কলিকাতার জামসেদ পুর জেলার গুলমুরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। প্রায় দু’বৎসর আব্দুল হান্নান সেখানে থেকে চলে আসেন নিজ বাড়িতে। অত:পর তিনি ভর্তি হন স্থানীয় ফুলচন্ডি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পাঠশালার লেখাপড়া সমাপন করে তিনি কৃষিকাজে আত্মনিয়োগ করেন। এক সময়ে তিনি ব্যবসাকে ভালবেসে মুফতির বাজারে রাইছ মিল স্থাপন করেন। কিছুদিন তা পরিচালনা করে ১৯৭০ সালে সিলেট শহরের হাছন মার্কেটে ব্যবসা শুরু করেন। সে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তিনির ভাই কর্তৃক দীর্ঘদিন হয়েছে পরিচালিত। বর্তমানে ভাই অসুস্থতাজনিত কারণে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। 

১৯৫৪ সালে রাজনীতির সহিত সম্পৃক্ত হন যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনকালীন সময়ে। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আসেন সিলেটের রেজিস্টারি মাঠে এক জনসভায়। শেখ মুজিবের ঐদিনের

ভাষণ শুনে হান্নান সাহেব অভিভূত হয়ে যোগ দেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। হয়ে উঠেন আওয়ামীলীগের একজন দক্ষ সংগঠক, কর্মী ও সমর্থক হিসাবে। আসে ১৯৭০ সালের নির্বাচন। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ নৌকা প্রতীক নিয়ে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানের ইয়াহিয়া-ভুট্রো শেখ মুজিবের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বিভিন্ন কুট-কৌশলের আশ্রয় নেয়। বাঙ্গালীর ন্যায্য দাবীকে দমিয়ে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালায়। তাই ২৫শে মার্চ রাতে সশ্রস্ত্র ও সুসজ্জিত একটি বাহিনীকে অতর্কিতে নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর লেলিয়ে দেয়। ওরা নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। কি বিভীষিকাময় পরিবেশ! সারা দেশ জুড়ে আতংক, হতাশা ও শঙ্কায় শঙ্কিত পুরো জাতি। যে যেভাবে পারে শুরু হয় প্রতিরোধ। পাকবাহিনী শুরু করে ধরপাকড়, অত্যাচার, নির্মম নির্যাতন। এপ্রিলের প্রথমার্ধে পাকবাহিনী কর্তৃক খাজাঞ্চি রেলওয়ে ব্রীজের পূর্ব তীরে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান, মরহুম লিলু মিয়া, মরহুম ডা: আব্দুল করিম, মরহুম তোয়াহিদ মিয়া গং আরো লোকজনের মাধ্যমে খনন করাতে থাকে ব্যাংকার। পশ্চিম তীরেও অনুরূপ ব্যাংকার, বাঁশ আনয়ন ও ব্রীজকে সুরক্ষিত রাখতে বাঁশের বেড়া দিতে অর্ডার করে প্রত্যেক গ্রামের প্রতিটি পরিবার আস্ত বাঁশ প্রদান করতে। দেয়া হয় নির্দেশ। মত না দিলে মেরে ফেলার ভয়। তাছাড়া চতুর্পাশ্বস্থ গ্রামের মানুষ দিয়ে পালাক্রমে ব্রীজ পাহারা দেয়ানো হত। একদিন রাতের বেলা দুই ঘটিকার সময় হানা দেয় পাকবাহিনী কিছু সংখ্যক রাজাকার সঙ্গে নিয়ে হোসেন পুর গ্রামে। খুঁজতে থাকে আব্দুল হান্নান, পীর লিয়াকত হোসেন গং আওয়ামীলীগ নেতা, কর্মী ব্যক্তিবর্গকে। ঐদিন ঘর থেকে লুকিয়ে বের হয়ে একত্রিত হন আব্দুল হান্নান, পীর লিয়াকত হোসেন ও বরই কান্দির রইছ আলী হোসেন পুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিকটে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিকে পারেন বিচ্ছিন্ন হয়ে দৌড়াতে থাকেন। আব্দুল হান্নান ও রহিম পুর নিবাসী জহুর আলী কাটা-খালি গোরস্তানে আশ্রয় নিয়ে রাত কাটান। গোরস্তানে থেকে ফজরের নামাজের পর পরই শুনতে পান দু’টি গুলির শব্দ। পাক সেনারা চলে গেলে এসে দেখেন হোসেন পুর গ্রামের খলিল উল্লাকে (পিতা রসিদ আলী) মসজিদের প্রস্রাব খানায় বসা অবস্থায় এবং ছোরাব আলীকে (পিতা কটু মিয়া) ধরে নিয়ে খাজাঞ্চী রেলস্টেশন সংলগ্ন স্থানে স্থাপিত টিউবওয়েলের নিকটে বুকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। ছোরাব আলী ছিলেন হাজী মকরম আলীর গৃহে চাকুরীতে। অন্য একদিন রমজান মাসে দুপুরবেলা আব্দুল হান্নানের ৬নং ভাই আব্দুল ছমদকে রেলস্টেশনে ধরে মারপিট করে। তখন সাবেক চেয়ারম্যান (খাজাঞ্চী ইউ/পি) আছকির মিয়া, কারী ইছাক আলী, তাদের বড় ভাই আব্দুল মন্নান অনেক কাকুতি মিনতি করে ছাড়িয়ে আনেন। অপর একদিন পীর লিয়াকত হোসেনসহ আরো দুই ভাইকে ধরে নিয়ে যায় সিলেট ক্যাডেট কলেজে। পীর লিয়াকত হোসেনের বড় ভাই ছিদ্দেক আলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন। অনেক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ যাত্রায় ও রক্ষা পান। ঐদিন পাকসেনারা জনাব আব্দুল মন্নানকে বলে যায়, আব্দুল হান্নান সাহেব সিলেট সার্কিট হাউজে যাবার জন্য। নতুবা তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হবে। তাদের কথামত পরদিন সিলেট সার্কিট হাউজে যান, সারেন্ডার করেন ও রাজাকারদের সহযোগিতা করার কথা বলে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে তারা মিয়া নামক একজন ব্যক্তির সহযোগিতায় মুক্তি পান। এ ঘটনার কয়েকদিন পর লিলু মিয়া, আলহাজ ছমরু মিয়া, মজমিল আলী, ডা: আব্দুল করিম ও রন দাসকে ধরে নিয়ে যায়। এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে ঐদিন অনেক মানুষকে ধরেছিল। এখানে ঘাসি গাঁও এর ছাদ মিয়াও (আলতাফুর রহমান) ধৃত ছিলেন। কিন্তু ছাদ মিয়ার স্কুল, কলেজের সকল কাগজপত্রে আলতাফুর রহমান নাম থাকায় তিনিকে ছেড়ে দেয়। এরূপ বিভিন্ন উপলক্ষ্য দেখিয়ে পাঁচজন ব্যতীত সবাই ছাড়া পান। বিজয় দিবসের কয়েকদিন পূর্বে লামাকাজী থেকে পাকসেনা এবং ভুলাগঞ্জ গ্রাম থেকে মুক্তিবাহিনী উভয়দলের গুলি ছুড়াছুড়ি সন্ধ্যার সাথে সাথে আরম্ভ হলে ভুলাগঞ্জ গ্রামের সাবেক মেম্বার মন্তাজ আলীর স্ত্রী উরুতে গুলিবিদ্ধ হন।৩/৪ মাস পর তিনি মারা যান। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন হয়। 

হান্নান সাহেবের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া কম হলেও তিনি স্বশিক্ষিত। হোসেন পুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে এ পরিবার থেকে ১৮ শতক ভূমি প্রদান করা হয় এবং বাকি ১২ শতক ভূমি দান করেন মরহুম আলহাজ মখরম আলী। তাছাড়া আধুনিক শিক্ষার সাথে সমন্বয় রেখে সৎ ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষে এবং উদ্দেশ্য নিয়ে ২০০৪ সালের ১ লা জানুয়ারি বর্তমান ভূমি দাতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আলহাজ্ব আব্দুল হান্নানের নিজ বাড়িতে খাজাঞ্চি একাডেমীর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে উক্ত প্রতিষ্ঠান ২০০৫ সালে তার নিজস্ব ভূমিতে এসে শিক্ষাকার্য পরিচালনা করে আজ অবধি সফলতার সাথে শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০০৯ খ্রীষ্টাব্দে খাজাঞ্চী একাডেমী জুনিয়র স্কুলের মর্যাদা লাভে সক্ষম হয় লেখাপড়ার মানোন্নয়ন ও প্রতি বৎসর কৃতিত্ব পূর্ণ ফলাফলের কারণে। ২০১২ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ সফলতা অর্জিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ও ভুমিদাতা জনাব আব্দুল হান্নানের একক উদ্যোগ ও উদ্যমে অর্থাৎ অর্থায়নে ৫০ জন গরিব, অসহায় ছাত্র-ছাত্রী সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পড়ার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। 

২০১২ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ সফলতা অর্জিত হয়। শুরু থেকে এ পর্যন্ত সবক’টি পরীক্ষায় শতভাগ সফলতা অর্জন করে দেশ বিদেশে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে খাজাঞ্চি একাডেমী এন্ড উচ্চ বিদ্যালয়। স্কুলটি কলেজে উন্নীত হলে এলাকার শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখতে পারবে বলে বিজ্ঞজনদের ভাবনা। সুতরাং কলেজে উন্নীত করতে জনাব আব্দুল হান্নান ও তিনির বড় ছেলে যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুল শহিদ আপ্রাণ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তাছাড়া এ পরিবার থেকে বিভিন্ন সময় গরীব ও অসহায় মানুষ বিভিন্ন প্রকার সাহায্য, সহযোগিতা পেয়ে থাকেন। তিনির প্রবাসী ছেলেরা শিক্ষানুরাগী হয়ে গড়ে উঠেছেন পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে। যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমরা পেয়েছি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার মধ্য দিয়ে। অপরদিকে তিনির প্রতিষ্ঠিত খাজাঞ্চী একাডেমী এন্ড উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন নামকরণের ক্ষেত্রে জনাব আব্দুল হান্নান মহৎ ও উদার হৃদয়ের আরেকটি পরিচয় তিনির নামে বা কারো নামে নামকরণ না করে তিনি খাজাঞ্চী ইউনিয়নের নামে নামকরণ করে তা প্রতিষ্ঠিত করতে। তিনি পারতেন ব্যক্তি বা অন্য কোন নামকরণ করতে। অত্যন্ত সহজ, সরল, মহৎ, সৎ, উদার, নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ।আমি তিনির সম্পর্কে একটু অধিক সময় ও সান্নিধ্য পেয়েছি বিভিন্ন রূপে পরিচিত থাকার ফলে। কারণ আমি যখন উত্তর বিশ্বনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলাম। তখন তিনির বড় ছেলে জনাব আব্দুস শহিদ ছিলেন সে স্কুলের ছাত্র। যে কারণে তিনি স্কুলে যেতেন বিভিন্ন সময়ে। অপরদিকে আমি মদন মোহন কলেজে লেখাপড়া করতে ট্রেন যোগে যেতাম প্রতিদিন খাজাঞ্চী স্টেশন থেকে যাত্রী হয়ে। সিলেট যেতে এক মাত্র রাস্তা ছিল সিলেট-ছাতক রেললাইনের ট্রেন। প্রায়ই তিনিকে পেতাম ট্রেন যাত্রী রূপে। তিনির সান্নিধ্য এবং দুর থেকে দেখার সুমিষ্ট ফলাফল অত্যন্ত হৃদয়জ অনুভূতি পূর্ণ ছিল এবং রয়েছে। আমি বরাবরই তিনির আচার আচরণে পেয়েছি হৃদ্যতা, প্রীতি, স্নেহ, আদর ও ভালবাসার অতুলনীয়তা। 

আমি মহান আল্লাহর দরবারে তিনির সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি বিনয়াবনত চিত্তে। সেই সাথে তিনির পরিবার পরিজনকেও আল্লাহ সুখ, শান্তিতে রাখুন এবং শিক্ষা বিস্তারে অবদান রেখে খাজাঞ্চীবাসীর আলোকবর্তিকা রূপে চির জাগরূক থাকুক প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলি। 
 

গল্প

হালদারদের হানাবাড়ি

 মার্চ ২০২২ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

হালদারদের

হানা বাড়ি

চন্দন চ্যাটার্জি

banglow.jpg

শ্চিমবঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার একদম শেষ প্রান্তে রেলস্টেশন আছে যার নাম ধুলিয়ানগঙ্গা। এখানে উত্তরবঙ্গগামী কোন এক্সপ্রেস ট্রেন খুব একটা থামে না, তবে সাহেবগঞ্জগামী এবং মালদাগামী লোকাল ট্রেন কিছু থামে। ধুলিয়ান মুলত বিড়ি শিল্পে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। বিড়ি শিল্পের বাদশা যে কোম্পানি, “পতাকাবিড়ি” তার অনেক কারখানা এখানে আছে। তাছাড়া ছোট-বড় অনেক বিড়ি কোম্পানির কারখানা এখানে আছে।
এলাকাটি মুলত মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম, এই গ্রামের এক পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ভাগীরথী নদী এবং তার ওপারে বাংলাদেশ। অন্যদিকে ন্যাশনাল হাইওয়ে, এনএইচ ১২। ধুলিয়ান বাস স্ট্যান্ড এই হাইওয়ের উপরে। ধর্মতলা থেকে উত্তরবঙ্গ যাবার সমস্ত বাস এখানে থামে। এছাড়া অটো, টোটো ও আর একটা যান এখানে খুব বিখ্যাত সেটা হল ঘোড়ারগাড়ি। ঘোড়ারগাড়িতে ভাড়া কম, তবে ঝাকুনি বেশি। আমি একবার লালগোলা থেকে এখানে গিয়েছিলাম সেই অভিজ্ঞতার কথাই বলব।আগেই বলেছি আমি একজন আমি কলকাতার একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে আভ্যন্তরীণ হিসাব পরীক্ষক হিসাবে কাজ করতাম। এই কোম্পানির কলকাতার বাইরে অনেক জায়গায় শাখা অফিস ছিল। এই শাখা অফিসে আমাকে মাঝে মধ্যে ফিজিক্যাল স্টক ভেরিফিকেশনে যেতে হত। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এটা সঠিকভাবে না করতে পারলে কোম্পানীর অনেক ক্ষতি হতে পারে, বিশেষ করে এফ.এম.সি. কোম্পানিগুলোতে। 
যাইহোক, মঙ্গলবার ২৫শে জুলাই অফিসের পর শিয়ালদা স্টেশন থেকে লালগোলা প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরে লালগোলার উদ্দেশ্যে রওনা হই। বিকাল ৩.৪৫ মিনিটের গাড়ি ছাড়লো পাঁচটায়। শিয়ালদা থেকে লালগোলার দূরত্ব প্রায় ২৩৪ কিলোমিটার, সময় লাগে ৫ ঘণ্টা ৫০ মিনিট। প্রায় এগারোটা কুড়ি মিনিটে ট্রেনটি লালগোলায় পৌঁছাল। এইটি একটি সীমান্ত স্টেশন এরপর রেললাইন নেই। এখান থেকে ধুলিয়ান যেতে হলে বাই রোড যেতে হবে, কোন ট্রেন লাইন নেই। আমার লালগোলাতে আসবাব কারণ হলো ধুলিয়ানের অফিসের ম্যানেজার এর বাড়ি লালগোলায়, আমি তার সঙ্গে মোটর সাইকেলে করে চলে যেতে পারবো । 
যাইহোক ৫/৬ ঘণ্টা ট্রেন যাত্রা করে আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। ‘হোটেল প্রিয়াঙ্কা’ আগে থেকেই বুকিং ছিল তাই চেক ইন করে একবারে খাবারের অর্ডার দিয়ে নিজের রুমে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে স্নান করে এসে দেখলাম রুম বয় খাবার দিয়ে গেছে। খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। পরের দিন, ধুলিয়ানের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বিশ্বনাথ দাস সকালবেলায় হোটেলে এল, এবং আমি তার মোটর সাইকেলে চড়ে ধুলিয়ানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। লালগোলা থেকে ধুলিয়ান প্রায় ৫৫ কিলো মিটার রাস্তা, যেটা  জঙ্গিপুর রঘুনাথগঞ্জ হয়ে এন এইচ ১২ সঙ্গে মেশে। কিন্তু একটা শর্টকাট রাস্তা আছে গ্রামের মধ্যে দিয়ে যেটা জঙ্গিপুর হয়ে অরঙ্গবাদ, সুতি, আয়রন ব্রিজে উঠবে, তারপর মালদার দিকে কিছুক্ষণ গেলে ধুলিয়ান বাস স্টেশন পড়বে। এটা মুলত গ্রামের রাস্তা। আমরা এই গ্রামের রাস্তাটা ধরেছিলাম। প্রথমত দূরত্ব কিছুটা কম হবে এবং গ্রামের রাস্তা বলে ট্রাফিক অনেক কম হবে।
আমরা সকাল আটটায় বের হয়ে প্রায় ১০টা ৩০ মিনিটে ধুলিয়ান অফিসে পৌঁছালাম। সারাদিন অফিসের কাজ করে দুপুরবেলা একটা হোটেলে লাঞ্চ করলাম এবং গঙ্গার ধারে একবার ঘুরেও আসলাম। বিশাল বড় গঙ্গা, এপার অপার দেখা যায় না। তারপর আবার বিশ্বনাথের মোটর সাইকেলে চেপে বিকেল পাঁচটা নাগাদ ধুলিয়ান থেকে লালগোলার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। জুলাই মাস, বেলা বড়, তাই কোন অসুবিধা নাই। ধুলিয়ান থেকে অরঙ্গাবাদ, নিমতিতা পার হয়ে যখন সাজিনা পাড়ায় ঢুকলাম এমন সময় প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হল। যদিও আমরা গ্রামের রাস্তা ধরেছিলাম তথাপি এই এলাকায় লোকবসতি খুবই কম। কারণ এখানে খুব বেশি আফিং চাষ হয়। যদিও আফিং চাষ করা বেআইনি তথাপি লুকিয়ে চুরিয়ে অনেক জায়গাতে এখনও তার চাষ হয়। এই আফিং গাছে যে ফল হয় তার ওপরের আবরণটা আফিং বা লোকাল ভাষায় ডেড়ি ফল এবং তার বীজ থেকে তৈরি হয় পোস্ত। 
যাইহোক, আমরা যে গ্রাম্য রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, তার আসে পাশে কোন দাঁড়াবার জায়গা ছিল না, তাই মোটর সাইকেলে চেপে ভিজতে ভিজতে যাচ্ছিলাম। বৃষ্টিতে আমার চশমা ঝাপসা হয়ে গেল তাই সেটা খুলে পকেটে পুরলাম।
খানিক বাদে বিশ্বনাথ বলল, “দূরে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে ওখানে গিয়ে একটু দাঁড়াব, বৃষ্টিতে আর মোটর  সাইকেল চালান যাচ্ছে না”। 
আমি বললাম, “ঠিক আছে চল ওখানে একটু দাঁড়ানো যাক তারপর আবার যাওয়া যাবে”।
সেই মতো বিশ্বনাথ মোটর সাইকেলটাকে আস্তে আস্তে বাড়ির কাছে নিয়ে এসে থামালো। আমরা মোটর সাইকেল থেকে নেবে বাড়ির কাছে এসে দেখলাম এটা আসলে একটা ভাঙ্গাবাড়ি। বাড়ির সামনে একটা দরজা আছে। সেটা অল্প চাপ দিতেই খুলে গেল। আমরা আস্তে আস্তে ভিতরে ঢুকলাম। দোতলাবাড়ি, গেটের পর একটু বাগান, নানান গাছ আছে বটে, কিন্তু তা আগাছায় ভরে গেছে, যত্নের অভাব। পথ চলার রাস্তাটাও ঘাসে ভর্তি। নিচে সম্ভবত দুটি ঘর আছে। সামনে একটা বড় দালান আছে, উপরে দুটো ঘর আছে, একটা ঝুল বারান্দা আছে বাইরের দিকে। আমরা আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে দালানে উঠে দাঁড়ালাম। আমি চশমাটা পকেট থেকে বার করে মুছে সেটা আবার পরলাম। বিশ্বনাথ রুমাল বার করে মাথা, মুখ মুছতে লাগল। 
এমন সময় ভেতর থেকে একটা বয়স্ক লোকের আওয়াজ এল, “কে”?
আমি বললাম, “আজ্ঞে আমরা ধুলিয়ান থেকে আসছি, যাবো লালগোলা। রাস্তায় বৃষ্টি এসেছে তাই এখানে এসেছি। একটু বৃষ্টি কমলে আমরা চলে যাব”। 
ভেতর থেকে আবার উত্তর আসলো, “ঠিক আছে, ভেতরে আসুন, কোনো অসুবিধে নেই”। 
আমি বললাম, “না ঠিক আছে, এখানে দাঁড়াই”। 
আবার উত্তর আসলো, “আসুন না এখানে একটু বসতে পারবেন, বাইরে ঝাপটা দিচ্ছে ভিজে যাবেন”।
আমি বিশ্বনাথকে বললাম, “কথাটা ঠিক, একে আধভেজা হয়েছি, এখানে দাঁড়ালে পুরো ভিজে যাব। চল ভিতরে গিয়ে বসি”। কোন উপায়ন্তার না দেখে বিশ্বনাথ আমার পিছু পিছু এল। ভেতরে ঢুকে দেখলাম ঘরটি প্রায় অন্ধকার, কোন আলো নেই। পিছন দিকে একটা জানলা খোলা আছে সেটা দিয়ে অল্প আলো ভেতরে আসছে। তাতে দেখা যাচ্ছে ঘরের কোনে একটা চৌকিতে একজন শুয়ে আছে, মনে হয় তিনি অসুস্থ। আপাদ মস্তক কালো কম্বলে ঢাকা। আর একজন ভদ্রলোক একটা চেয়ারে বসে আছেন। সামনে একটা ভাঙা টেবিল তাতে কিছু প্লেট গ্লাস। একদিকে একটা ফটো ফ্রেম তাতে একজন ভদ্রমহিলার ছবি বাঁধানো আছে খুব সম্ভবত বিয়ের সময়কার ফটো, আবছা ধুলোয় ভর্তি আর একটা পুরান আমলের পেন্ডুলাম ঘড়ি বন্ধ হয়ে আছে। ঘরের ভেতরে কিছু আসবাবপত্র আছে এদিক ওদিক। ভদ্রলোক আমাদের দুটো মোড়া দিয়ে বসতে বললেন। আমরা সেখানে বসলাম। 

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি এখানে একাই থাকেন আশে পাশে তো কোন বাড়ি দেখছি না” ভদ্রলোক একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে খানিকটা আক্ষেপের সুরে বললেন তার নাম সৌমেন হালদার। পূর্ববঙ্গে তাদের বাড়ি ছিল। দেশভাগের পর তারা এখানে চলে আসেন। চৌকিতে যিনি শুয়ে আছেন, তিনি তার স্ত্রী। তার দুটো ছেলে আছে তারা বহরমপুরে থাকে। আমি বললাম, ”তাহলে তো আপনাদের বহরমপুরে থাকলে ভালো কারণ এখানে এইভাবে সমস্ত কাজ তো নিজেকেই করতে হয়। ছেলেদের কাছে থাকলে সুবিধে”। ভদ্রলোক বললেন, “এখানে কিছু জমি আছে তা একজন ভাগে চাষ করে, সেখান থেকে যা আয় হয় তাতেই আমাদের চলে যায়। নিজের হাতের গড়া বাড়ি তাই ছেড়ে যেতে পারছি না। ছেলেরা অনেকবার আমাদের নিয়ে যেতে চেষ্টা করে ছিল আমরা যায় নি”। এ ছাড়াও তিনি আরো কিছু নিজের কথা বলতে লাগলেন। আমরা আন মনে শুনছিলাম কিন্তু মনটা পড়েছিল বাইরে বৃষ্টির দিকে। কখন বৃষ্টি থামবে তারপর আমরা বের হতে পারব। কারণ ঘরের আবহাওয়াটা এত গুমোট লাগছিল যে এখানে কিভাবে দুজন জীবন্ত প্রাণী বসবাস করে সেইটা আমার একটু আশ্চর্য লাগছিল। এমন সময় বিশ্বনাথ বলল, “স্যার একটু চা হলে ভালো

হতো” পাছে ভদ্রলোক শুনতে পেয়ে আমাদের জন্য চা বানাতে বসেন তাই আমি বললাম, “চুপ করো এখানে চা কোথায় পাবে বাহিরে দোকানে থেকে চা খাব”। ভদ্রলোক কিন্তু আমাদের কথা শুনতে পেয়েছেন। তিনি বললেন, “চা তো আমি দিতে পারবো না তবে লেবুর সরবত খেতে চান তো দিতে পারি। আমাদের উঠানে যে লেবুর গাছ আছে সেটা আমি বাংলাদেশ থেকে এনে বসিয়ে ছিলাম এখনো ফল দিচ্ছে”।
আমি বললাম, ”না না তার দরকার নেই,  আপনি ব্যস্ত হবেন না”।
উনি বললেন, ”ঠিক আছে কোন অসুবিধে নেই, আপনারা বসুন, আমি লেবু তুলে আনছি”।
আমি দেখলাম ভদ্রলোক আমাদের সামনে দিয়ে আস্তে আস্তে উঠে বারান্দা দিয়ে বাইরের দিকে গেলেন লেবু আনতে। এখানে একটা কথা বলা দরকার ঘরের ভিতর ধুলোর মধ্যে আমাদের পায়ের ভিজে জুতোর ছাপ পড়ছে। কিন্তু ভদ্রলোকের পায়ের ছাপ পড়লো না, অথচ তিনি আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেন। এটা বিশ্বনাথ না লক্ষ্য করলেও আমি লক্ষ্য করেছি তাতেই আমার একটু সন্দেহ হল, কিন্তু বিশ্বনাথকে কিছু বললাম না।
প্রায় এক মিনিটেরও কম সময়ে মধ্যে ভদ্রলোক চলে এলেন হাতে তিনটে চারটে লেবু। তারপরে একটা ছুরি দিয়ে সেই লেবু কেটে একটা বড় ঘটিতে দিলেন। তারপর তাতে নুন চিনি দিয়ে গুলিয়ে দুটো গ্লাসে ভর্তি করে আমাদের দিলেন।
যখনই আমি গ্লাসটা মুখের কাছে তুললাম তখনই একটা বিকট পচা গন্ধ লাগলো, মনে হল গ্লাসের ভেতরে পচা ডিম ছিল, বা গ্লাসটা ডিমের অমলেট বানানোর জন্য ব্যবহার করা হতো এবং ভালো করে ধোয়া  হয় নি, তাই গন্ধ ছাড়ছে। আমি একটুও খেতে পারলাম না। কিন্তু বিশ্বনাথ একটুখানি মুখে দিল তারপরে আবার গ্লাসটা রেখে দিল। ভদ্রলোক দুটো লেবু আমাদের হাতে দিলে দিয়ে বললেন এগুলো আপনারা নিয়ে যান বাড়িতে গিয়ে সরবত খাবেন। আমাদের গাছের লেবুতে অনেক রস আছে। এইটা আমার মনে ধরল দুটোই আমি নিয়ে প্যান্টের পকেটে রাখলাম। 
এতক্ষণে আস্তে আস্তে বৃষ্টি কমেছে আর আমাদের যেতে হবে এখনও অনেকটা পথ। তাই বিশ্বনাথ বলল,” স্যার চলুন আর দেরী করা ঠিক হবে না”।
আমিও তাই ভাবছিলাম, অতএব ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা মোটরসাইকেলে চেপে লালগোলার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। জঙ্গিপুরে পোঁছে একটা চায়ের দোকান দেখতে পেয়ে আমি বিশ্বনাথকে বললাম, ”তুমি চা খাবে বলছিলে সামনের চায়ের দোকানে দাঁড়াও”।
আমরা চায়ের দোকানে ঢুকে বেঞ্চিতে বসে দোকানদারকে বললাম, “দুটো চা দেবেন”।
দোকানদার দুটোকে গেলাসকে ভালো করে গরম জলে ধুয়ে তাতে চা দিয়ে আমাদের দিলেন। বাহিরে বৃষ্টি  থামলেও ঠাণ্ডা আমেজটা আছে। তাই গরম চা টা বেশ তৃপ্তি লাগলো। আমি বিশ্বনাথকে বললাম, ”হালদারবাবু যে লেবু দিয়েছে তা তোমার কাছে রাখো আমি হোটেলে থাকব আমার দরকার নেই”। এই বলে পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম লেবু নেই। এ পকেট, ও পকেট, ব্যাগ সব দেখলাম কোথায় লেবু পেলাম না। বিশ্বনাথ বলল, “বোধহয় রাস্তায় পড়ে গেছে”।
হঠাৎ দোকানদার আমাদের কথা শুনতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপনারা কোন হালদারবাবুর কথা বলছেন”।
আমি বললাম, ”এই একটু দূরে মাঠের মাঝখানে একটা বাড়ি আছে, ওইখানে আমরা গিয়েছিলাম। বৃষ্টি পড়ছিল তাই  আমরা অল্প সময়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম”।
দোকানদার বলল, ”আপনারা কি বাড়ির মধ্যে গিয়েছেন”।
আমি বললাম, ”হ্যাঁ গিয়েছিলাম। ওখানে সৌমেন হালদার বলে এক বয়স্ক ভদ্রলোক আছেন, তার স্ত্রী ও আছেন। তারা আমাদের লেবু শরবত খেতে দিয়েছিলে। এছাড়া গোটা দুটো লেবু আমাকে দিয়েছিলেন বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য। সেই দুটো রাস্তায় পরে গেছে বোধহয়”।
ভদ্রলোক বললেন, “আপনারা কি লেবুর জল খেয়েছেন?”
আমি কিছুটা ইতঃস্তত করে বললাম, ”হ্যাঁ মানে, গেলাস খুব পচা গন্ধ ছাড়ছিল বলে আমি খাইনি, কিন্তু আমার সহকর্মী বিশ্বনাথ একটু খেয়েছে”।
তখন ভদ্রলোক একটু মাথা চুলকে বললেন, ”বসুন”।
এইবলে তিনি দুটো কাগজে একটু করে নুন নিয়ে তাতে মন্ত্র বলে তিনি আমাদের দিয়ে বললেন এটা আগে খেয়ে নিন, তারপর জল খাবেন। তারপরে চা খাবেন।
আমি বললাম, “কেন কি হয়েছে?”
সে বলল, ”আপনি আগে এটা করুন তারপর আপনাকে বলছি পুরো ঘটনা”।
পেট খারাপ হলে আমার মা মাঝে মধ্যে আমাকে জোয়ান আর নুন মিশিয়ে খেতে দিতেন। এটা আমি জানি পেটের গোলমালের খুব ভালো ওষুধ নুন আর জোয়ান। তাই এটা খেতে আমার আপত্তি হল না, আমি খেলাম, তাই দেখে বিশ্বনাথ ও খেলো।
একটু পরে ভদ্রলোক একটু নিছু স্বরে আমাদের বললেন, “আপনারা যেখানে গিয়েছিলেন সেটা হালদারের বাড়ি ঠিকই, কিন্তু ওটা হানাবাড়ি, বসতবাড়ি নয়। ওখানে কেউ জীবিত থাকে না। যে সৌমেন হালদার আপনাদের লেবুর জল দিয়েছিল সে মারা গিয়েছে আজকে পাঁচ  বছর হল। তার দুজন ছেলে আছে ঠিকই তারা বহরমপুরে থাকে, ব্যবসা করে। এখানে কেউ আসে না। এই বাড়িটা এলাকার লোকের কাছে হানাবাড়ি হিসেবেই খ্যাত। এখানে দিনের বেলাতেও কেউ যায় না। অনেকেই নাকি রাত্রিবেলায় ওই ভদ্রলোককে সাদা কাপড় মুড়ি দিয়ে লেবু গাছ থেকে লেবু তুলতে দেখেছে। সৌমেনবাবুর স্ত্রী মারা যায় এক অজানা জ্বরে। তারপর ছেলেরা অনেকবার বাবাকে নিজেদের কাছে রাখতে চেয়ে ছিল, কিন্তু তিনি যান নি। স্ত্রী বিয়োগের ছয় মাসের মধ্যে তিনি মারা যান। ছেলেরা বাড়ীটা ভাড়া দেবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোন ভাড়াটে পুরো একমাস থাকেনি। সবাই বলত রাত্রিবেলায় কে যেন পুরো বাড়ি দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে। মাঝে মধ্যে ঘরের জিনিসপত্র এদিক ওদিক সরে যায়। “
খানিকটা দম নিয়ে ভদ্রলোক আবার বললেন, “আমি গুণিন ভুতের উপস্থিতি বুঝতে পারি। আপনাদের দেখে আমার মনে হয়েছে কোন কালো ছায়া আপনাদের পিছে পিছে আসছে। তাই আমি নুন পরা দিয়েছি ও কোন ক্ষতি করতে পারবে না।“
আমি দোকানদার ভদ্রলোককে সমর্থন করে বললাম, “এটা হতে পারে, কারণ দুটো বিষয়ে আমার সন্দেহ হয়েছিল। প্রথমত ঘরে কোন আলো নেই কেন, এত অন্ধকারের মধ্যে লোক থাকে কি করে, এবং ঘরটা ভীষণ স্যাঁতসেঁতে। কোন রোগীর পক্ষে এই রকম ঘর ভালো নয়।
দ্বিতীয়তঃ যখন আমাদের সামনে দিয়ে ভদ্রলোক লেবু তুলতে গেলে তখন তার পায়ের ছাপ কিন্তু মাটিতে পরছিল না। অথচ আমরা যখন ঘরে ঢুকি তখন আমাদের পায়ের ছাপ এদিকে-ওদিকে ছিল”। 
বিশ্বনাথ বলল, “আপনি এটা দেখেছেন কিন্তু আমাকে বলেননি”।
আমি বললাম, ”আমার অডিটরের চোখ কাজেই কোন কিছুই আমার চোখে ফাঁকি দেওয়া যায় না। তাছাড়া ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে তারপর উঠনের লেবু গাছ থেকে লেবু তুলে ফিরে আসতে প্রায় তিন মিনিট সময় লাগার কথা। অথচ ভদ্রলোক এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ফিরে এলেন কি করে, তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল”।
দোকানদার ভদ্রলোক বললো, “তাহলে আপনাদের সাহস আছে বলতে হবে আপনারা জেনে শুনে ওর কাছ থেকে লেবুর সরবত খেয়েছিলে। তবে ভয় নেই আমি নুন পোরা দিয়ে দিয়েছি আপনাদের কোন ক্ষতি হবে না”। এর পর আমরা চায়ের কাপটা রেখে পয়সা দিয়ে আবার মোটর সাইকেলে উঠে পড়লাম। যখন হোটেলে পৌছালাম তখন রাত্রি সাতটা।
আমি বিশ্বনাথকে বললাম, ”তুমি রাত্রি দশটা-এগারোটা নাগাদ একবার আমাকে ফোন করবে কিরকম আছো তা জানাবে। তোমাদের বাড়িতে এ বিষয়ে কোন কথা না বলাই ভালো “। 
ও ঠিক সাড়ে দশটায় আমাকে ফোন করেছিল। আমরা দুজনেই ভালো আছি, কোন অসুবিধা হয়নি।  এরপরে দুদিন পরে আমি আমার কাজ শেষ করে কলকাতায় আবার ফিরে আসি। এটা আমার জীবনের একটা ঘটনা।

চিত্তদহন

গল্প

 মার্চ ২০২২ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

চিত্তদহন

অভিজিৎ দাস

girl1.jpg

মলুক রেলওয়ে স্টেশান থেকে কুন্তল একা-একা হেঁটে চলল অয়নের বাড়ির উদ্দেশ্যে। স্টেশান থেকে অয়নের বাড়ি পায়ে হেঁটে পনেরো-কুড়ি মিনিট লাগে। এর আগে কুন্তল বহু বার এসেছে অয়নের বাড়ি; তাই এখানকার পথ- ঘাট সব কুন্তলের চেনা। কুন্তলের যত দূর মনে পড়ে সে তার বন্ধু অয়নের বাড়িতে শেষ বার এসেছিল প্রায় তিন বছর আগে। তারপর তার আর আসা হয়নি। কারণ, অয়ন জার্মানে একটা চাকরি নিয়ে ওখানেই সেটেল হয়েছে। তিন বছর বাদে অয়ন দেশে ফিরেছে; জন্মভূমিতে দিন কয়েক কাটিয়ে আবার সে ফিরে যাবে জার্মানে। যাইহোক, ফুরফুরে বাতাস গায়ে মেখে হাঁটতে কুন্তলের বেশ ভালোই লাগছিল। হঠাৎ তার মনের সাগরে ভেসে ওঠে জয়তির মুখ। কুন্তল হেঁটে চলেছে, হেঁটেই চলেছে! আর তার সঙ্গে রয়েছে জয়তির স্মৃতি। কেমন আছে ও? ভালো আছে তো? ও কি এখন আর গান গায়? কুন্তল যে অয়নের বাড়িতে আগে প্রায় আসতো, সে তো শুধু জয়তির গান শোনার টানে। কী সুমধুর কণ্ঠ জয়তির! ওর গান শুনলে মনে হয় জীবনের যত সংঘর্ষ, দুঃখ, যন্ত্রণা সব যেন এক নিমেষেই দূরে সরে যায়। জয়তির বাড়ি অয়নদের গ্রামেই। অয়ন একবার কুন্তলকে জয়তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে কুন্তল প্রায় যেত জয়তির বাড়িতে। যখনই সে অয়নের বাড়িতে আসতো, তখনই জয়তির কণ্ঠ নিঃসৃত গানের সুর তাকে পাগলের মত আকর্ষণ করত। তাইতো সে বার-বার ছুটে যেত জয়তির বাড়ি! কোনো-কোনো সময় তো অয়ন সঙ্গেই যেত না, কুন্তল একাই যেত। জয়তি একদিন কুন্তলকে বলেছিল, "বাবু, আমাকে কোথাও একটা গান গাওয়ার সুযোগ করে দেবেন? দুটো পয়সা ঘরে আনবো! আমরা খুব গরীব, সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়! মা সেই কবে মরে গিয়েছে! আর বাবা--- বাবা এখন অসুস্থ, কাজে বেরোতে পারছে না!"
কথাগুলো বলতে বলতে ঝর-ঝর করে কেঁদে উঠেছিল জয়তি। সেদিন কুন্তল মনে খুব ব্যথা পেয়েছিল জয়তির দুর্দশার জন্য! জয়তির হাতে দু-শ টাকা গুঁজে দিয়ে কুন্তল বলেছিল, "দেখো জয়তি, সংগীত মহলে আমারতো তেমন কেউ জানা- শোনা নেই। তবে আমি চেষ্টা করে দেখবো একবার। আপাতত এই টাকাটা রাখো।"
জয়তি কোনো মতে টাকা নিতে চাইছিল না; কুন্তল এক প্রকার বাধ্য হয়েই বলেছিল, "তুমি যে আমায় গান শোনালে, তার পারিশ্রমিক হিসেবে রাখো না হয়।"
এই রকম নানান কথা ভাবতে ভাবতে কুন্তল হেঁটেই চলল। এরই মধ্যে কখন যে বিকেল গড়িয়ে ঝপ্ করে সন্ধ্যে নামল, কুন্তল টেরই পেল না।

হাঁটতে হাঁটতে কুন্তল ভাবছিল কত দিন পর অয়নের সাথে আজ তার দেখা হবে--- আঃ! কী মজাটাই না হবে! কিন্তু তারপর আবার তাকে জয়তির স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরল। সে মনে-মনে স্থির করল অয়নকে সঙ্গে নিয়ে সে একবার যাবে জয়িতর বাড়িতে। তিন বছর পর কুন্তল আবার জয়তির গান শুনবে। ভাবতেই তার মনে কেমন যেন একটা রোমাঞ্চ জেগে উঠল। কিন্তু, জয়তির যদি বিয়ে হয়ে থাকে, তবে তো তার শ্বশুরবাড়িতে থাকার কথা। জয়তির সঙ্গে কি দেখা হবে? আচ্ছা, সে কি নিজের অজান্তে জয়তিকে ভালোবেসে ফেলেছিল! না শুধুই গানের টানে সে বার-বার ছুটে যেত জয়তির কাছে! এ যদি গানের আকর্ষণ হয়, তবে কেন জয়তির মায়া মাখানো মুখ খানা বার-বার ফুটে ওঠে তার মনের দর্পণে! কেন সে তার হৃদয়ের অন্তঃপটে ব্যথা অনুভব করে! সে ভাবে তার বড্ড ভুল হয়ে গেছে! কারণ, সেদিন সে জয়তির আবছা উদ্গ্রীব আবেদনে সাড়া দেয়নি। সেদিন জয়তি অশ্রু ভেজা চোখে কুন্তলকে বলেছিল, "বাবু, আমাকে নিয়ে যাবেন আপনার বাড়ি? আমি সব কাজ করে দেবো। ঘর মোছা, বাসন মাজা, রান্না-বান্না, সব পারি আমি!"
হঠাৎ দোটানার মধ্যে পড়ে গিয়ে কুন্তল বলেছিল, "আমি বাড়িতে কথা বলে দেখি; পরে তোমায় জানবো।"
সেদিন কুন্তল জয়তির মনের ভাষা বুঝতে পারেনি। শুধু পকেট থেকে তিনশ টাকা বের করে জয়তিকে দিয়ে বলেছিল,- "এটা তোমার কাছে রেখে দাও জয়তি।"
জয়তি বলেছিল, "বারবার আমি আপনার কাছে টাকা নেব কেন? আমার বুঝি অন্তরে বাধে না!"
"সে কী, অন্তরে বাধবে কেন। এই যে আমি তোমার বাড়িতে এলে, তুমি সমস্ত কাজ-কর্ম ফেলে রেখে আমায় গান শোনাও, তা কি এমনি-এমনি। বলি তোমারও তো সময়ের দাম আছে, না কি ? সেইজন্য ভালোবেসে আমি যদি কিছু টাকা দিই, তাতে ক্ষতিটা কী।"
"বেশ, নিলুম না হয়, ঐ যা! কথায়- কথায় অনেক রাত হয়ে গেল, বাবাকে খাওয়ার দিতে হবে।"
"আমাকেও ফিরতে হবে। আজ যাই, আবার পরে আসবো।"
"এতক্ষণ যখন রই