মার্চ ২০২১ 

প্রচ্ছদঃ সুরজিৎ সিনহা, হলদিয়া 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

কবিতা

 
 

কবিতা

দেবাশিস পট্টনায়েক

জন্ম ১৯৬৭ সালে মেদিনীপুর জেলার (বর্তমান পূর্ব মেদিনীপুর) তমলুক মহকুমায়। চাকরি সূত্রে দিল্লী নিবাসী, গবেষণা ও অধ্যাপনায় নিযুক্ত। কবিতা লেখা শখ।

ভাটিয়ালি গান


পাশাপাশি, জলের ধারে, খুব কাছে -
নদীর দিকে মুখ করে তুমি, তোমার দিকে তাকিয়ে আমি।
ভেসে আসছে তোমার থেকে বেলফুলের গন্ধ,
আর খুব চেনা প্রেম-পর্যায়ের একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর।
নেচে বেড়াচ্ছে গাছের উপর পাগল দুটি পাখি,
মনের রঙ চুরি করে অকারণে ঝরে পড়ছে কৃষ্ণচূড়া।
আটকে পড়া ফুলের দলকে সরিয়ে দেওয়ার অছিলায়
খেলছে খোলা চুল নিয়ে আমার পথহারা আঙুল.
মনের তরঙ্গের দোলাতে থমকে দাঁড়ানো গানের কলি,
নদীর জলে, কুন্তলে রোদের ছটা, নত মুখে অস্ফুট হাসি।
এলোমেলো হয়ে উড়ছে কথা মনের ঝোড়ো হাওয়ায়,
সময়ের ধারা বয়ে চলেছে নীরবতার দাঁড় টেনে।
লোভীর মতো জোয়ারের জল ছুঁতে চাইছে তোমার পা,
ছুঁড়ে মারলাম এক টুকরো পাথর প্রতিদ্বন্দ্বীর উদ্দেশ্যে,
নদী এমনি বয়ে গেল, ঢেউ উঠল আমার মনে।
সাহসের দেউড়ি পেরিয়ে রাখলাম হাত তোমার হাতে,
সলাজ অনুমতি মুখ ঘুরিয়ে আরক্ত চোখের উপর চোখ রেখে,
হারিয়ে গেল দৃষ্টি ওপারের ঘন সবুজ আভায়।
জলের কুল-কুল, ঝাউয়ের শনশন, মৌমাছির গুনগুন -
বকুলের গন্ধে মাদক চৈতালী হাওয়া;
খেয়ার নৌকা মুখর অচেনা যাত্রীর কলরোলে।
মন্দিরে পূজার ঘণ্টায় কি যেন আকুল মিনতি -
ঢেকে যাক রুষ্ট রোদ, থেমে যাক চঞ্চল বেলা,
নীল আকাশে উড়ন্ত গাংচিলের সোনালী ডানায়।

সারথী

মেলেনি ক্লেশিত ডানার অধিকার,
বহু শত বছরের উপেক্ষা,
রক্ত শোষণ,
উপেক্ষিত সাম্যের দাবি,
পেষিত বিবর্তনের চাকায়;
বহুরূপী চায়নি রাজার কাছে
দুপা জমি ওদের জন্য।
চিনতে পারিনি অবতারের রূপ 
ধূলার মাঝে।
সেই কবে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে
দুর্গম মরুভূমি অতিক্রম করে
বাঁধা পড়েছিলাম শস্যের বাঁধনে,
ধীরে ধীরে অনুশাসনের শৃঙ্খলে,
অবশেষে আবদ্ধ 
ধূসর পিঞ্জরের মায়াজালে।
হারিয়ে ফেলেছি সংগ্রামের মনোবল,
শরীর শুধু ব্যস্ত
আগুন নেভানোর কাজে।
তবুও থামতে দেয়নি রথের গতি,
অসংবেদনশীল সাথীকে নিয়ে
মাথা নিচু করে আত্মগোপনের ছলনায়
দক্ষ নিপুণ হাতে 
লাগাম ধরে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল 
সভ্যতার রথ, রণভূমির মধ্য দিয়ে
মহাকালের দিগন্ত রেখার পানে।
 

আজ যখন ঝড় উঠল,
ডমরু বাজিয়ে শুরু হল
মহারুদ্রের প্রলয় নাচন,
অদৃশ্য আণুবীক্ষণিক শক্তিশেল
আঘাত হানল জীবন দ্বারে -
নেচে উঠল উষ্ণ শোণিত
ঘনশ্যামের শিরায় শিরায়,
বাজিয়ে পঞ্চাজন্য
রথ ছেড়ে নেমে দাঁড়াল পথে,
রুদ্রের নাচের তালে তাল মিলিয়ে
সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে
পদক্ষেপ পিছন পানে।
দৃঢ় প্রতিজ্ঞা,
কোদাল কাস্তের ছোঁয়ায়
আবার আঁকতে হবে সবুজের ছায়া,
ধরিত্রীর জঠরে।
চয়ন করতে হবে বিশল্যকরনি,
লাগাতে হবে প্রলেপ 
মানবতার ক্ষতস্থানে।
দুখের মেঘ ভেদ করে
উদিত হবে আসার সূর্য;
মানব গঙ্গাধারা
উচ্ছল কলস্রোতে রবে প্রবহমান;
উড়িয়ে জয়ধ্বজা
স্থাবর বিবর্তনের রথ
আবার গতিশীল হবে
হয়তোবা নূতন পথ ধরে।

বাণিজ্য

লিখব একগুচ্ছ প্রেমের কবিতা
মনে জোয়ার এনে,
তোমার সান্নিধ্য, তোমার ছোঁয়া,
যদি থাকে দিনে রাতে।
যদি দাও যুদ্ধের সাজ,
কেড়ে নাও ভয় আলো হারানোর,
বন্দুকের বাণীতে শত্রু শোণিতে
লিখে দেব প্রেমের জয়।
বৈশাখের রোদ শরীরে মেখে,
শ্রাবণের ধারা বুকে পেতে,
হাল কষবো -ছড়াব ফসলের বীজ,
তুলির ছোঁয়ায় আঁকব
নীল আকাশ -ঘন সবুজ বন,
ঝরিয়ে দাও যদি
শুকনো পাতা ঝড়ের হাওয়ায়।
সাজাবো মনের রঙে,
দেব আভরণ সকল সঞ্জয়ের,
যদি এঁকে দাও স্নেহ চুম্বন
তপ্ত কপালে আমার।
ভাটার টানে পাল তুলে,
ভাটিয়ালি গান গেয়ে
যেতে পারি সঙ্গমে,
ভরিয়ে দাও যদি
আমার ছোট্ট ভেলা 
শুধু সাদা ফুলে।
হাত ধরে নিয়ে যাও যদি
দূর আদিগন্ত ফেনিল সলিলে,
শোনাও যদি ঘুম পাড়ানি গান,
চার বেহারা পালকির সুর,
হাসব বিজয়ীর হাসি
সব হারানোর গর্বে।

 

মানসী

তুমি আমার -
বকুল ছায়ে নিদাঘ দুপুর,
নিশীথ রাতে নিদ্রাহারা
অচিন পাখি বেদনা মুখর।

তুমি আমার -
সুরঞ্জনা মনের সাদা খাতায়,
রুদ্ধ দুয়ার, ঘূর্ণি আবেগ,
নীরব বাণীর দীর্ঘশ্বাস কবিতায়।

তুমি আমার -
গোপন চিঠি, অলখ ব্যথা,
নিঝুম রাতে স্বল্প আলোয়
আশ না মিটা চোখের ক্ষুধা।

তুমি আমার -
একলা পথের গুনগুন
পাঁপড়ি বোজা গানের কলি,
চৈতী হাওয়ায় মনের দোলন।

তুমি আমার -

সুরভি ভরা কুহেলী সকাল,
শিশির ভেজা স্নিগ্ধ মলয়
হিন্দোলিত দোলন চাঁপা ফুল।

তুমি আমার -
তপ্ত মরু শরীর পরে 
নীলাঞ্জনা বাদল ছায়া,
বিন্দু বারি চাতক নীড়ে।

তুমি আমার -
পদ্মদীঘি অতল গহীন,
বুকের মাঝে সাঁতার কাটা 
ইচ্ছা কোরক অসিত গোপন।


তুমি আমার -
কাজল আঁখি অশ্রু মেদুর,
মুক্ত কবরী অভিমানী মেঘ
অবুঝ নীরব বৃষ্টি অঝোর।

তুমি আমার -
যাত্রা বেলায় থমকে যাওয়া 
কি যেন হায় ভুল,
দুয়ার থেকে ফিরে আসা -

মৃদুল চুম্বন প্রেমের।

সবুজ দ্বীপের আহ্বান


বন্ধু রে-
তোর মনের ফাগুনি হাওয়ায় 
আশার পাল উড়াইলাম
উথাল -পাথাল জীবন দরিয়ায়।
ভাঙা আমার পারের তরী
আঁধার ঘেরা দুই কিনারা 
দিতে হবে পাড়ি স্মরি ভবের কান্ডারী।


ও বন্ধু  রে -
মনের খামে যখন হে নূতন দিলি নিমন্ত্রণ 
দেহের বীণার প্রতিটি তারে তারে
উঠল বেজে মধুর মধুর ভাটিয়ালি গান।
ছিন্ন পালে লাগল বুঝি রঙের ছোঁয়া 
মাঝি হেঁই সামালো, হেঁই সামালো
কালস্রোতে এই অবেলায় তরী বাওয়া।


ও বন্ধু রে -
অতল সাগর আবেগ জোয়ার, 
বারে বারে দেয় যে হানা
রাশি রাশি ঊর্মি অলীক ব্যথার,
টলমল এ ছোট্ট তরী,
যত অলখ স্বপন তোর লাগিয়া 
সে যে হাল, সে মোর পারের কড়ি।


ও বন্ধু রে
তোর মুখের অরূপ হাসি
তিমির মন আকাশে 
জোছনা হয়ে সদাই পরকাশি।
কাজল কালো চোখের পারা
মমতা মাখা অমিয় ভরা
হিয়ার মাঝে ভাসে হয়ে নীল ধ্রুবতারা।


ও বন্ধু রে
ছড়িয়ে দে তোর মনের সুবাস
উড়িয়ে দে তোর প্রেমের আঁচল 
লাগুক প্রাণে তোর সুরেরই পরশ।
জীবন নদে খুশির দোলা 
মরমে মরমে মায়ার বাঁধন 
বাঁধুক নগর আমার ভেলা -

তোর সবুজ মনের চরে।।

স্মৃতি  ও নীড় 

লো আঁধারী সকাল,
হাওয়ার গলা জড়িয়ে 
আবেশে নিদ্রামগ্ন শীতলতা।
আকাশে সাদা রেখা -
বক পঙক্তি নীড় ছেড়ে 
অনির্দেশ্য খাল বিলের পানে।
সুর সাধার আগে
গলা ভিজিয়ে নিচ্ছে কোকিল 
পাকা বকুলের রসে।
পুকুর ঘাটে আনমনে 
ছাই দিয়ে বাসন মাজছে
খড়ের লুটি হাতে
এলোকেশে নবোঢ়া বধূ।
পোষা হাঁস মুনিয়া
চরে বেড়াচ্ছে আপন মনে।
খাঁচায় বাঁধা হাঁস দুটো
ব্যথায় ছটপট।
লাঙ্গল ধরা কড়া পড়া হাত,
সারাদিনের জমে থাকা আগুন,
রাতে হ্যারিকেনের আলো নিভতেই
দপ করে জ্বলে উঠে।
ঝলসে যাওয়া শরীরে 
ঘামের জ্বালা ঘুম চাতক চোখে
খুলে দেয় স্মৃতির জানালা।

‘চৈ চৈ, মুনিয়া, আয় আয়’ -
হাঁস ধরার নামে খালের ধারে
বকুল তলায় সন্ধেবেলা;
সযত্নে গাঁথা হিজল ফুলের মালা,
নীরব প্রত্যয় ভরা চোখ;
দুটি কম্পিত হাত অন্ধকারে 
খুঁজে বেড়ায় ভীত কোমল হাঁস।
তড়িৎ শিখা -
উন্মুক্ত আবেগের গিরিমুখ,
অনাবিল সুখের আবেশে
থর থর শরীর 
ডানা মেলে মেঘের দেশে।
'পোড়ামুখী, ওলাউঠি,
নম করবি না হরি মন্দিরে?!'
মুনিয়াকে জড়িয়ে ধরে
লজ্জা জড়ানো পা,
মনে শিহরন,
মন্দিরে সন্ধ্যা আরতির ঘণ্টা।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ,
বিধির বিধান  -
এক রাস্তা কারখানার কড়িকাঠে,
অন্য রাস্তায় হলুদের ছিটে।
গোধূলি বেলায় নীরব দীর্ঘশ্বাস 
বকুলের পাতায় পাতায়।

ধান সেদ্ধ করার হাঁড়ি
সামনেই জলে ডোবানো,
কোমরে জড়ানো গামছা -
হাতে মুনিয়ার ছোঁয়া, 
ব্যথার মলম।
চোখের জলে সিক্ত হাত
করুন বেদনায় মুনিয়ার গায়ে।
প্যঁক প্যঁক -
'এই যাস কুথায়!'
লেজ নাড়িয়ে মুনিয়া
দূরের ঘাটের পানে
নূতন বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে।
গাছের ফাঁকে আলোর উঁকি,
পাতার আড়ে বৌ কথা কও।
ধোয়া বাসন হাতে
রাস্তায় বিছানো হিজল ফুল মাড়িয়ে 
ঘোমটা টেনে
ঘরের পানে বধূ।

গান্ধারীর প্রতি পত্রালিকা 

জানতে ইচ্ছে করে 
কেমন লেগেছিল 
স্বেচ্ছা অন্ধত্ব?
ঘন তমিশ্রায়
দীর্ঘ বন্ধুর পথ
অতিক্রম করা!
মনে কি হয়নি 
এ যেন একাকী পথ হাঁটা
ঘন জঙ্গলের রাস্তায়!
প্রতিটি পদক্ষেপে
ওঠেনি কি বুক গুমরে -
এই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়ল
তীক্ষ্ণ দন্তক হিংস্র শ্বাপদ
ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে,
বা পেছন থেকে!
কি করে অতিক্রম করলে
এ দূর্গম জীবনপথ
মাথা উঁচু করে হেঁটে?

তোমার মত 
আমিও অন্ধকারের পথিক;
অন্ধকার বরন করেছিলে তুমি,
আমি নিক্ষেপিত অন্ধকূপে।
চার দিগন্তে অন্ধকারের কালি,
নেই কোন আলোর রেখা
চোখের সামনে।
জীবন নদের চরে
পথহারা পথিক,
যেতে হবে মোহনার বাঁকে।
হাতড়ে হাতড়ে হোঁচট খেয়ে 
অনির্দিষ্ট পথে চলতে চলতে 
মনে হয় যেন কোন
মায়াবিনী মরীচিকার মোহে
পথভ্রষ্ট ঘুরপাক খাচ্ছি
একই বৃত্ত পথে।
সময়ের জালের ফাঁকে
রঙিন প্রজাপতিরা
পাখনায় মেখে ফাগের রঙ 
কখন হারিয়ে গেছে চুপিচুপি!
বর্ষণ শেষে 
সোনালী আলোয় ঝিকিমিকি মুক্তো
কদম্বের বুক থেকে 
ঝরে গেল বুঝি একে একে!
ঝাউয়ের পাতায় 
দীর্ঘশ্বাসের ঢেউ 
তুফান হানে বুকে,
হাবুডুবু খাই
চাঁদ সওদাগরের মত।
সকল সঞ্চয় হারানোর ব্যথা,
তার থেকে বেশি 
না হারিয়ে যেতে পারার ব্যথা
উত্তাল বিশাল অন্ধকার 
সমুদ্রের মাঝে।
উড়ে আসা সুবাসের পানে
হাত বাড়াতে গিয়ে 
সংশয়ে থমকে যাই -
আত্মগোপন করে নেইতো
বিষধর কাল সর্প
ভেসে আসা শতদলে!

পশ্চিমের ঝঞ্ঝাকে 
সমাহিত করে মনে
জ্বলালে ত্যাগের দিব্য জ্যোতি;
যুগ, কাল অতিক্রম করে
তার স্নিগ্ধ শিখা 
ভারতের ঘরে ঘরে
আজও নীরবে জ্বলে 
অদৃশ্য কালো কাপড়ে বাঁধা
ভাষাহীন আঁখির পলে।
ইচ্ছা, অনিচ্ছা, ত্যাগের 
সূক্ষ্ম গন্ডির  বাইরে 
শুষ্ক, নিরুপায়, অপলক
মনের আয়নার হিম শীতলতায়
মাথা কুটে মরে
স্বপ্নের আগুন।
তোমার মত কি তারা পারেনা 
একবার, শুধু একবার
চোখ খুলে তাকাতে!
স্নেহ কাতর মায়ের 
কল্যাণ প্রলেপ আঁকতে নয়;
বিদ্যুতের আঘাত হানতে,
উড়িয়ে দিতে কালো কুয়াশা,
জ্বালিয়ে দিতে 
ওই ছদ্মবেশীদের,
যারা খেলা করে
অন্যের ভাগ্য নিয়ে
দেবতার দোহাই দিয়ে।


নিশীথ  অভিসারিণী

ঝিলের নীলে         চাঁদনি খেলে,
শশীর খেয়া          ইন্দুলেখা,
মৃদুলা গামিনী        কুহকী যামিনী।
মৌমিতা ঝুমে        মহুয়া চুমে,
কানন দোলে         হাওয়ার তালে।
ডাকিছে ডাহুক,     কাঁদিছে চাতক,
মত্ত দাদুরী,           মদির বিভাবরী।
তুলির ছোঁয়া          অলীক কায়া,
কুহেলী কবিতা      নিশীথ ঈশিতা ।
বসি একাকিনী      ভীরু কামিনী
হিজল কোলে       ঝিলের নীলে ।
নীলাঞ্জনা,            মৃগ নয়না,
কাহার দুহিতা       চম্পক শোভিতা!
কুঞ্জিত কুন্তল,      কুমুদ কুন্ডল,
কুমকুম চর্চিতা     তনু ললিতা,
সুচন্দ্র্রা,             মৌন পারমিতা ।
মন কস্তুরী           হয়েছে অভিসারী,
আঁখির কাজল     ছড়ায় আঁচল,
কাহার লাগি         আজ বিবাগী!
মঞ্জু চাঁদ,          চাঁদনি দূত 
যাচিছে প্রেম,        জোছনা কুসুম 
লাজুক কপোলে    ঝিলের নীলে।


ইচ্ছা প্রজাপতি


পাগল মনের চাওয়া
হয়ে বাদল হাওয়া,
মিথ্যা খেয়ায় শ্রাবণ ছায়া আনে
হরিণ আঁখি কাজলা দীঘির উপর অকারণে।
রাতুল অধর, চোখে  সৌদামিনী,
তপ্ত কায়া মরুতে যাচ্ছে বারে বারে হানি।
রিমঝিম রিমঝিম তানে কুন্ডলিত কানে
মন্দ্র মধুর ভাষ - আজ নিভৃত গোপন বরিষণে।
অভিমানীর মৃণাল বাহুর পাশে,
লতায়িত দিঘল কেশের সুবাসে,
মাদল রাগ গোপন অভিসারে
দেহের শিরায় শিরায় নাচবে চুপিসারে।
জানি বৃষ্টি থেমে যাবে,
মেঘের ফাঁকে চাঁদ হাসবে,
আকাশে নয়, বঁধুর কাজল ধোয়া চোখের
তারায় জোছনা শত খুশির !
রামধনুগো তোমার সাতরঙা রঙ ছড়িয়ে দাওনা,
হৃদয় কাননে ফুলের কোরক মেলুক পাখনা।

Comments

Top

 

কবিতা

ডাঃ উজ্জ্বল মিশ্র

আসানসোল, পঃ বঙ্গ

কবিতা

ভাস্বতী মন্ডল

সোনারপুর, কলকাতা

 

অজানা অসুখবোধ
                              

পিঠময় খোলা চুল কোমর ছুঁয়েছে,
পৌষের বিকেলের শীতমাখা রোদ
জানালার আলপনা পিঠেতে এঁকেছে।
হাঁটুতে রেখেছো মুখ, যতো দুঃখ বোধ।

সে বিষাদ ছড়িয়েছে পৃথিবীর বুকে,
বাতাসেরও নিশ্বাসে, অদ্ভুত সময়।
যে আলো মাখানো ওই আকাশের মুখে -
প্রভাহীন, নিষ্প্রাণ কী বিষাদময়।

সে আলো মেখেছো গায়ে, মননে ও বোধে।
‘ভালো নেই’ অনুভূতির সংক্রামক জ্বরে -
ভেঙে চুরে বসে আছো বিকেলের রোদে।
অজানা অসুখবোধ গভীর শিকড়ে।

          
       

দূষণ 

রাধীন হচ্ছে মনন–
বাড়ছে স্বৈরী রিপুর শাসন;
জঞ্জালের কায়েমে মানসপুরী:
দুর্গন্ধে বন্দী মনুষ্যত্ব
হারাচ্ছে মানবিকতায় কর্তৃত্ব;
মানসিকতা কুড়চ্ছে কলুষের নুড়ি।

ধরছে ফাটল মানসপুরীর প্রাচীরে,
উপচে পড়া আবর্জনার ভীড়ে–
ওই ছুটে আসছে ওরা, আলেয়ার দল!
ছোঁয়াচে রোগ, ছড়াচ্ছে ওদের উল্লাসে;
নামছে ত্রাস সমাজের চারপাশে!
সংসার শীর্ণ হচ্ছে, হারাচ্ছে বল।

জমছে পাঁক পৃথিবী জুড়ে;
উঠে আসছে কীট পাতাল ফুঁড়ে–
মর্ত্যে পড়ছে নরকের ছায়া!
অসুস্থ আবহ, বিষাক্ত দংশনে;
মুকুলেই নষ্ট পঙ্কজ, মালিন্যের বাড়নে;
দুনিয়া দমিয়ে বাড়ছে দূষণের দানবীয় কায়া!

Comments

Top

 

কবিতা

সপ্তর্ষি গাঙ্গুলী

খড়দা, কলকাতা

প্রেম প্রতীতি


নের কোণে আসে করে ভিড়
কুয়াশালিঙ্গনে আবিষ্ট শীতের সেই মনোহর প্রভাতগুলি।
যখন দুজনার অনাবৃত চরণপটে 
অবিরত বুলিয়ে যেত কুহেলিসিক্ত তৃণদল এক স্নেহের তুলি।
বর্ণাঢ্য এক জীবনকক্ষে ছিল হর্ষালোকের অবাধ আনাগোনা,
বিষাদের আঁধার কেমনে তারে করল গ্রাস থাক সে উপাখ্যান সকলের অজানা।
কার ছিলো ভুল!? দিলো কে মাশুল!?
মেলেনি কভু সেই সমাধান।
কি নাম দেবে!? ঠুনকো প্রণয়,
পাবে না খুঁজে প্রেমের কোনো অভিধান।
আপন প্রেম পরিহারে অনভিলাষী
যে ছিল এক স্বার্থপর —
অমাবস্যার এক রজনীতে সে 
তার ভালোবাসার মাল্যটি করল অন্যের পাত্রে দান।
দিলো তার হৃদয়ে রচিত 
স্নিগ্ধ ভালোবাসার অপরূপ রূপের নিঠুর বলিদান।
সুখাবশিষ্টের আচ্ছাদনে ভালোবাসাকে সযতনে মুড়িয়ে শেষ বিদায় জানিয়ে সেদিন সে হয়ে উঠল প্রথম 'পরার্থপর'।
একদিন সহসা মনের অলিন্দে
অগোচরে ঢুকে খুলে দিলে তুমি 
অনেকদিনের রুদ্ধ এক বাতায়ন।
তোমার হাতের কোমল পরশে
আজ এক নবীনালোকে সেজে উঠল
আমার তমসাচ্ছন্ন হৃদয়প্রাঙ্গন।
মৃদুল পবন উড়িয়ে জীমূত
ঠিক যেমন ভাঙায় গগনের সুপ্তি
কেশপুঞ্জের অন্তরাল সরিয়ে তোমার
নিদ্রাতুর আনন দর্শন এ যেন এক পরম প্রাপ্তি।
                                          —


          
        

প্রাণের দোসর 
                              

চাওয়া পাওয়ার দীর্ঘ যোজন মাঝে,
প্রত্যাশার এই বেহালার তারে বিষাদের সুর বাজে,
হৃদয়ে আজ জমেছে তোমার অনুরাগের এক বালুচর,
বিভেদের মাঝে বলো তবে দেখি কে আপন আর কে পর!
উথাল পাথাল জীবন জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়ে কল্পনারে,
একদিন ঠিক পাড়ি দেবে মন উজ্জ্বল এক আলোকমিনারে।
সেই আলোকে ঘুচে যাবে জেনো তোমার অতীতের সকল আঁধার,
অভিমানী হৃদয়কে জিগায়েই দেখোনা তুমি বৈ আমি অন্য কাহার!?
সংকোচের বেড়াজাল সরিয়ে; করি তবে চলো প্রণয়পুরী বিচরণ,
চলার পথে কুড়োবো তোমার সকল হারানো মর্যাদার আভরণ।
একে অপরের পাশে থেকে তিলে তিলে গড়ি ভালোবাসার এক অটুট পাহাড়,
সব ব্যবধান মুছে একসুরে তবে গাই  'তুমি আমার, আমি তোমার'।।


          
        

স্নেহময়ী মা 
                              

টুকরো টুকরো শৈশব স্মৃতিগুলি আজ ভিড় করে আসে মনের ফ্রেমে
পাই না ভেবে ব্যস্ত কর্মসূচীতে তারে কেমনে বন্দী করব পর্যায়ক্রমে! 
ভাগ্যতটিনীর প্রবহমান ধারায় ভেসে যেতে যেতে পেয়েছিলাম গিয়ে তোমার গর্ভে নিরাপদ ঠাঁই
ধরিত্রীর আলোয় বিস্মিত নয়ন মেলে প্রথম যারে দেখেছিলাম সে আর কেউ নয়, আমার 'মা'-ই।
বক্ষমাঝের শীতল ছায়ায় রেখেছিলে মোরে আগলে অপার স্নেহসুখে
দিবানিশি তখন‌ হতে না কি ব্যাকুল প্রথম 'মা' বুলিটা শুনতে আমার মুখে!? 
সুমিষ্ট এই বুলির মাধুর্যে একদিন হয়ে উঠল এই বসুধা আলোময়ী 
জানি না কেমনে শুধিব তোমার অগণিত ঋণ ওগো মমতাময়ী!
সংসার ধর্মপালনে নিবৃত্ত তোমারে প্রত্যহ দেখেছি দিবাশেষে বড় ক্লান্ত
তবু্‌ কতিপয় পরিজন প্রত্যাশা আর চাহিদার কণ্টকে তোমারে বিঁধতে হয়নি কভু এতটুক ক্ষান্ত।
জীবনে তোমার সকল অবদান ভুলে যেন আজ তোমার‌ই সুখদুঃখের ভাগীদার না হবার হাজারো ছল
অথচ জীবনের ঘোর দুর্দিনেও জানি জীবনসংগ্রামে জয়ী হবার এই 'মা' ডাকটাই একমেবাদ্বিতীয়ম বল।


          
        

বিত্তদনুজ
                              

হৃদয় নীরবে সইবে কত 
সযতনে তোমাদের নিক্ষেপিত লাঞ্ছনার বাণ যত!
পথের ধার ধরে খসে পড়ে থাকা ফুলের যত পাঁপড়ি
হাতে তুলে ধরে লালন করে দেয় কি বলো কেউ আজ তাদের হারানো প্রাপ্য স্বীকৃতি?
অর্থস্তূপের উদ্ধত আস্ফালনে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত হতে থাকা
আমারও ন্যায় এমন অগণিত সব জীবন চেয়ে দেখো নিরন্তর চাইছে কেবল একটু নিষ্কৃতি।
অর্থসম্পদমাপক দাঁড়িপাল্লায় শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণায়ক প্রতিযোগীতায় সকলের চোখের তারা যেন আজ হয়েছে এসে স্থির ঐ পাল্লা কার তরফে রয়েছে‌ ঝুঁকে!?
সেই ভীড়ে মাথা খুঁজে পাবে না কেউ আমার ; আমি আপনসৃষ্টি হরণের ভয়ে সন্তর্পণে ঘরের এককোণে বসে আঁকড়ে তারে রেখেছি ধরে নিজেরই বুকে।
যতই করো হেয়; না হয় আমারে এভাবেই দমিয়ে রাখতে চেয়ো,
বিষবিত্তের এই চাবুক বিজলির মতন ঘুরিয়ে যত করবে অন্তরে আমার নির্মম প্রহার
জেনে রাখা শ্রেয় ; সইবে না আর অন্তরাত্মা তোমাদের এই আঘাত,
নীরব প্রতিবাদের ভাষাস্বরূপ বলিষ্ঠ লেখনীতে ততই হতে থাকবে আমার এই অমূল্য কলমটি ক্ষুরধার।

Comments

Top

কবিতা

সুব্রত মিত্র 

 

তলদেশের তলায় চির অপরিণত ভাষায়

মাপব নিরবধি তোমার মুক্ত বাসনার তৃপ্তি 

ক্ষমা করো;ক্ষমা করো;ক্ষমা করো বনলতা,

প্রকাশের পাহাড় এসেও ঠোঁটে

তবু তুমি রয়েছ যতনে হৃদয় কোণে

পৃথিবীর মানুষ বোঝেনি;জানতে চায়নি মোটে, 

 

কলহের সমারোহে কাল হতে কালান্তরে

অস্পৃশ্য দেবতার মতো করে তোমার স্মরণ হয় বারেবারে

আমি কৌতুহল ভেঙে দিলেও প্রশ্নরা ছুটে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে

প্রকৃতির সাথে যেন প্রকৃতির মায়া-লতা চলমান জীবনের ঘূর্ণি পথের বাঁকে 

 

দেখি সেই বনলতা নামক দেবতার অনুভূতিটাকে

এভাবেই হয়ে সুপ্ত থেকো লিপ্ত

আত্মবিলিন পথের সাথী আমিই সেই অভিন্ন প্রদীপ্ত।

অনুকম্পপ্রবণ পরিধেয়

গোছালো প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির মাঝে

তোমাকে মিলিয়ে নিতে পারিনি এখনো,

শতবছর পর পৃথিবীর বয়স বেড়ে যাবে

আমি অনীহার প্রকট মাখা

কোন দুর্নিবারের আচ্ছাদনে তোমাকে ঢাকব না কখনো। 

 

পিছিয়ে আসা বালুচর সমুদ্রের কাছে ঋণী থাকে আজীবন

ঋণী থাকে আকাশ মেঘের কাছে প্রাণপণ;

পরিশ্রান্ত পৃথিবীর আমি এক ক্লান্ত পথিক

দুটি মাপকাঠির সমরেখার প্রান্ত হতে

ভিন্ন সমরেখার পাইনি নাগাল;তাই তোমায় পারিনি ছুঁতে 

 

পরিপাটি বলে কিছু নেই আমাতে এখন

এখন নেহাৎ জীবন যাপন সঙ্গ হয় নিত্য

গহীন জলের তলানিতে গিয়েও তৃষ্ণা গ্রহণ অসহ্য 

 

এই অব্যক্ত ভাষার ব্যাপ্তি যদি হয় সমাপ্তি

আমি শিহরণ জাগানো পৃথিবী রেখে যাবো

Comments

Top

 

কবিতা

মিজানুর রহমান মিজান

বিশ্বনাথ, সিলেট, বাংলাদেশ

নির্মল স্মৃতি 
 

নুতাপের মালা কণ্ঠে পরে     
কত নিশি ভিজে শিশিরে 
ভাঙ্গিলাম অনুরাগের প্রাচীর।। 
দু’হাতে মুছিলাম আঁখি জল 
অষ্ট প্রহর ভাবনার ফল 
হিসাব মিলাতে গন্ডগোল সুগভীর।। 
অবিশ্রান্ত কত না কেঁদেছি 
আপন করতে শত চেষ্টা করেছি 
চেষ্টা বিফল প্রতিফল পাতায় স্মৃতির।। 
স্বপ্নের জাল বুনি অবিরত 
বাস্তবে রূপ দানে মগ্ন সতত 
ব্যথার কাটা উপড়ে ফেলে নিষ্ফলা আবির।। 
জয়ের মালা হল না পরা 
শূণ্যতার বইছে শ্রাবন্তী খরা 
ভাবান্তর উদাসী স্তূপীকৃত নির্মল স্মৃতির।। 

অহংকার পতনের মুল 


বুঝে না বুঝে নারে ভাই কথার মর্মার্থ 
বুঝে বুঝে বুঝেরে ভাই সে-ই যথার্থ।। 
বুঝে নাতো গাধা, খায় পানি মিশিয়ে কাদা 
রসবিহীন যেমন আদা, ফল অনর্থ। 

যৌবনে বাহাদুর, রূপের ঝলক সুর 
শক্তি কিছুদূর, ক্ষমতা অচিনপুর 
সময়ান্তে নেই কোন অর্থ।। 
জোয়ার এল, ভাটা হল 
ক্ষমতার দাপট গেল, কদ‌র্যতা র’ল 
অবশেষ ফলাফল নেই সতীর্থ।। 
অহংকার পতনের মুল 
ভেবে দেখ নহে ভুল 
ঝরে পড়ে বাসি ফুল 
বিষণ্ণতায় করে কান্না মর্ত্য। 

বিষে অঙ্গ জ্বলে 

ষ্টের বুকে ভাসি জলে 
বারে বারে দাও গো টেলে 
আর যাব কই ছেড়ে দিলে।। 
তুমি বিনে নাহি আশ্রয় 
বিন্দু জলে পাথরও ক্ষয় 
অন্যত্রতো নেই যে অভয় 
সর্বত্র বিরাজ দেখি চক্ষু মেলে।। 
ধরার যথাতথা তোমারই একক রাজত্ব 
খেয়ে পরে দেখে শুনে সবই সত্য 
দুর্বল মারে, অসহায়ের নেই গুরুত্ব 
দেখে সহ্য করি দু’হাত তোলে।। 

লোভ হিংসা স্বার্থের ধান্ধায় 
অহরহ নির্মম মিথ্যা নির্যাতন চালায় 
বল তুমি ভাল করতে, তবু জলে হিংসায় 
নিন্দার কাটা অবিরত বিষে অঙ্গ জ্বলে।। 
তুমিতো সবারই মালিক 
নাম রেখেছ প্রচারে খালিক 
তবে কেন ঘুরাও দিক-বিদিক 
যতই হোক আশায় আছি আশ্রয় তলে।। 

স্বপ্নাশা 

রতো নাই কোন আশা 
শুধু চাই তোমার ভালবাসা।। 
দুর করে মনের কালিমা 
বাজাতে চাইলাম দামামা 
প্রতারণায় ছাড়ায় সীমা 
জুলুমে বানায় বেদিশা।। 
দাও করে মানুষ 
ফিরে আসুক হুশ 
কিবা ছিল তাতে দোষ 
বুঝার তওফিক হারাল বেদিশা।। 
যাবার ইচ্ছা অনেক দুর 
পথের বাঁধায় উঠে না রোদ্দুর 
হয়ে দাড়ায় মহিসুর 
মনের সুখে গাইতে গান স্বপ্নাশা।। 

 

 

ভ্রমণ

সমুদ্রমন্থন

সৌমেন্দ্র দরবার

বাগুইআটি, কলকাতা

Comments

Top

র্মব্যস্ত জীবন। একটু বিরতি হলে মন্দ হয় না। রোজকার অফিসের দিনগত পাপক্ষয়, বসের লাল চোখ, সংসারের প্রাণান্তকর ব্যস্ততা কিংবা পড়শির পি এন পি সি। কি দুর্বিসহ জীবন। মন চায় একটু ছুটি, একটু বিরতি ----- দু - তিন দিন! বনানীর সবুজ, আকাশের নীল আর উত্তাল ঢেউ। সমুদ্র আলিঙ্গন করে বলে "এসো মোর কাছে, একান্ত নিভৃতে", সবুজ ঝাউ হাত নেড়ে বলে "অবগাহন করো মোর রূপ", নির্মল আকাশ ডাক দেয়" ডানা মেলো খোলা হাওয়ায়, হে পথিক"। 
সবুজের মধ্যে দিয়ে আঁকা বাঁকা রাস্তায় পায়ে পায়ে যেতে যেতে মনে পড়বে ছোট্টবেলার দিনগুলো। রাস্তার দুপাশে প্রজাপতি, মথ শরীর ছুঁয়ে অভিবাদন জানাবে।  তাদের কত রং, কি বাহার। 
গাছের ডালে নাম না জানা পাখির কুজন মন কে নিয়ে যাবে কল্পলোকে। এরই মধ্যে হঠাৎ পায়ের সামনে কাঠবেড়ালি প্রণাম ঠুকলে বুকটা ভোরে যাবে গর্বে।
দূরে ভোঁ বাজিয়ে ট্রলারেরা পাড়ি দেয় অতল সমুদ্রে। অন্বেষণ শেষ হলে ফিরে আসে রুপোলী মাছের ডালি নিয়ে। 
স্থানীয় জেলেদের সরলতা সত্যি মন কেড়ে নেয়। সমুদ্রে গা ভেজানোর আগে সবুজ ডাবের মিষ্টি জল তৃষ্ণা আরো বাড়িয়ে দেবে বই কমবে না।  
সমুদ্রতটে ছোটদের বালিয়াড়ি আর ঝিনুক সংগ্রহ মনকে শৈশবে নিয়ে যেতে বাধ্য। বালির ওপর অতি  যত্নে লেখা নিজের অথবা প্রিয় মানুষটির নামকে সমুদ্র ভরিয়ে দিয়ে যায় ওষ্ঠের চুম্বনে। সমুদ্রগাহনে পায়ের তোলার ছোট্ট ছোট্ট নুড়িগুলো এঁকে দেয় আদরের রেখা। আদুল গায়ে লেগে থাকে নোনতা তরল, সাক্ষী থাকে উন্মুক্ত আকাশ আর একরাশ ঝাউ। 
মৎস্যবন্দরের অবিরাম কর্মব্যস্ততা, দুপুর রোদে মাঠের ধরে জেলেদের জালবোনা কিমবা সমুদ্রে নৌকা বাওয়া আর জাল টেনে তটে তোলা - সে যেন এক অন্য জগৎ। কুলিং টাওয়ারের অবিরাম জলধারায় সূর্যের আলোয় তৈরি রামধনু থেকে চোখ ফেরানো ভার। 
ভোরের আবছা আলো আঁধারিতে সমুদ্র থেকে সুয্যিমামার উত্থান অথবা রঙিন বিকেলে সূর্যের বাড়ি ফেরা তুলতে তুলতে ক্যামেরার স্টোরেজ ফুল হয় যাওয়া। পড়ন্ত বিকেলে লাল পাথরের ওপর বসে সাদা ক্যানভাসে পেন্সিল ড্রয়িং নতুবা ডাইরির পাতায় দু কলম কবিতা লিখতে মন্দ লাগবে না! ঝাউয়ের দোলায় দোল খেতে খেতে নির্জন সৈকতে

ভ্রমণকালে গলায় গুনগুন করে উঠতেই পারে "আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি, আর মুগ্ধ হয়ে শুধু চেয়ে থেকেছি"। সন্ধ্যার আলো ঝলমল সমুদ্রতটে উষ্ণ চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে সান্ধ্য ভ্রমণ আর ক্লান্ত হয়ে পাড়ে বসে শুক্লপক্ষের চাঁদের আলোয় রুপোলী ঢেউয়ের অবিরাম আস্ফালন। রাত আহারের পর নির্জন সমুদ্রসৈকতে সমুদ্র গর্জন মন ভালো করার আর এক নৈবেদ্য। মৎস্যবিলাসীদের রসনায় এখানের সমুদ্র জীবেরা সদা দণ্ডায়মান। স্থানীয় মানুষদের সরলতা আর আন্তরিকতায় দু তিন দিন কোথা দিয়ে চলে যাবে বোঝাই যায় না। অমৃত  না উঠলেও এ ভ্রমণের স্বাদ মনের তৃষ্ণা মিটিয়ে দেবে। না এবার বলেই ফেলি গন্তব্য - কলকাতার খুব কাছে মাত্র ১৬৬ কিলোমিটার দূরের সমুদ্রতট - শঙ্করপুর আপনারই পথ চেয়ে। মনস্থির করে ব্যাগ গুছিয়ে চলুন পাড়ি জমাই দুদিনের নিশ্চিন্ত অবকাশে। সাধ্যের মধ্যে স্বপ্নপূরণ।

পথের ঠিকানা:

দিঘাগামী যেকোনো বাসে বা গাড়িতে ১৪ মাইল। সেখান থেকে বাঁদিকে ৪ কিলোমিটার। ট্রেনে রামনগর স্টেশন থেকে গাড়িতে, অটোতে বা টোটোতে ১৫-২০ মিনিট।

গৃহের ঠিকানা:

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বেনফিশএর অথিতি নিবাস কিনারা ও তটিনী। ছিমছাম এ সি অথবা নন এ সি ঘর সাধ্যের মধ্যে। অনলাইন বুকিং করে নেওয়াই ভালো। দূরভাষ - ০৩২২০ ২৬৪ ৫৭৭। আর আছে পশ্চিমবঙ্গ মৎস্য দপ্তরের অথিতি নিবাস মৎস্যগন্ধা। এখানেও এ সি অথবা নন এ সি ঘর সাধ্যের মধ্যে। দূরভাষ - ৮৭৫৯৬২০৩৬৭ বিলাসবহুল থাকতে আছে হোটেল নেস্ট। এছাড়া নিউ শঙ্করপুরে বেশ কয়েকটি সমুদ্র লাগোয়া হোটেল আছে।রাসনাবিলাস:

ইলিশ, চিংড়ি, পমফ্লেট, পার্শে, ভেটকি - টাটকা তাজা খেতে মজা। চাইলে খেতে পারেন কাঁকড়ার কষা।

কেনাকাটা:

বেশকিছু দোকান আছে সামুদ্রিক গিফট আইটেমের। পকেট পারমিট করলে মন খুলে কেনাকাটা করুন। 

ভ্রমণকাল:

সারাবছর

গল্প

 

গ্রস্তপ্রকাশনী

দেবার্ঘ্য মুখার্জী

Comments

Top

রে রাখুন মশাই, এমন লেখা রোজ রোজ কত মানুষ যে নিয়ে আসে আমাদের কাছে, তার মনে তো এটা নয়  লেখা আনলেই সেটা ছেপে বের করতে হবে, আরে বাবা বাজার খাবে তবে না, মোদ্দা কথা হলো বাজারে  বই এর কাটতি  কেমন সেটাই বড়ো কথা। আর আজকাল তেমন ইন্টেলেক্টওলা লেখাটেখা মানুষ এতো পড়ে না মশাই। এই তো ধরুন না সেদিন সাইফুল হকের এত বড়ো একটা আর্টিকেল আমরা বের করলাম আমাদের মাসিক পত্রিকাতে তা লেখাটা কটা মানুষ পড়েছে শুনি? হাঃ? ওনার নাম আছে তাই ছাপতে হয়, তাই বলে সব্বারটা নাকি? প্রকাশকের ঘরের পুরনো পাখাটা খটাস খটাস শব্দ করে ঘুরছিলো, সামনের মানুষটার কথা গুলো নাকি ওই পাখার শব্দ কোনটা কানে বেশি লাগছিলো, তাই রবীন্দ্রনাথবাবু বুঝতে পারছিলেন না, শেষের কথাটা যেন, একটু বেশিই কানে লাগলো, শুরুর দিকে লেখক কবিদের কপালে সম্মান-তোম্মান বিশেষ যে জোটেনা সেটা তিনি জানেন, তাবলে এভাবে পত্রপাঠ অপমান করে বের করাটা মেনে নিতে পারলেন না, একটা তীব্র অভিমান আর চোখ ফেটে বেরিয়ে আসা কান্নাটা চেপে অস্ফুট হাসি দিলেন, চ্যানেল ফাইলে বাংলা হরফে কাল রাতে ডিটিপি করা লেখাটা হাতে তুলে শুকনো নমস্কার জানালেন। 
প্রকাশকমশাই সরু সোনালী ফ্রেমের চশমার ওপর থেকে তাকিয়ে দেখে বললেন, “ও মশাই, এই দেখো, আপনি তো আবার রাগ করে ফেললেন দেখছি”, আর এই কথাটাতে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না রবীন্দ্রবাবু, বললেন, “কি করবো বলুন আমার নাম রবীন্দ্রনাথ সরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো নয়, তাই এত ভালো প্রবন্ধটা শুধু প্রথম অংশটুকু পড়েই আপনি রিজেক্ট-এর খাতায় ফেলে দিলেন”। 
এবার মুচকি হাসলেন প্রকাশক, আরে না না, ব্যাপারটা তেমন নয়, রবিঠাকুর হতে হবে না, আমি বলি কি সামান্য কিছু খরচাপাতি করুন, একটা দুটো বই আমরাই বের করে দেব, একটু এ স্টল ও স্টল বলে শোকেসের সামনের দিকে সাজিয়ে রাখলেই কেল্লা ফতে, তখন দেখবেন আপনার ঘরে আমার মতো কত প্রকাশক লাইন দিয়েছে এমন সব লেখার বায়না নিয়ে. হেহে করে হেসে উঠলেন তিনি।
“ও বুঝলাম”, উত্তর দিলেন রবীন্দ্রনাথ, আচ্ছা দেখি।
আরে দেখা-টেখার দিন শেষ, সামনের বইমেলার জন্য কিছু লিখে ফেলুন না, আমরা তো ৪-টে স্টল দি ফি বছর, কোনো একটার সাইড এ আপনার লেখার ফেস্টুন ঝুলিয়ে দেবখনে ।
 আসলে ব্যাপার খানা হলো, বই আজকাল কেও তেমন পড়ে না, বুঝলেন না, বই কেও পড়েনা, সবাই সাইজ মতো খাপে খাপ বসিয়ে রাখে। 
এমা ছি কিসব কথাবার্তা, বলে ওঠে রবীন্দ্রনাথ;
মুখ থেকে কেমন একটা চুকচুক শব্দ বের করে প্রকাশক মশাই বলেন, ধুস, ওসব না, শুনুন বুঝিয়ে বলি ব্যাপারটা। ধরুন বালিগঞ্জ প্লেসের ওপর ১২০০ স্কোয়ার ফুট এর ফ্লাট, সাইড এ রাখা আছে বুকশেলফ, অল্প জায়গা। সেখানটা বই দিয়ে সাজাতে হবে। তো কি বই কিনবো, কি বই কিনবো, ভাবনা নেই, মাপ দেখে নিয়ে, বুক স্টল গিয়ে, মনের মতো কালার ম্যাচ করে কিছু কিনে নাও। তবে এসব ক্ষেত্রে বিদেশী বই বেশি জায়গা করেছে। কারণটা বুঝতে পারছেন তো, বাঙালি তো, তাই সব সময় নিজের সাহিত্য বাদ দিয়ে অন্যের সাহিত্য পড়েছি, এটা যদি বন্ধুবান্ধবদের দেখাতে পারে, অনেক বেশি মান-ইজ্জত বাড়বে, এই আরকি।
মুখের হাঁ টা আরো বড়ো হলো রবীন্দ্রনাথের, বললেন, এমন হয় নাকি আবার?
আলবাত হয়, হচ্ছে তো এটাই, ওই যে বলে, "যো দিখতা হয় ও বিকতা হায়" তাই তো আমাদের প্রতিটা বইয়ের প্রচ্ছদটা ঝাঁ চকচকে করা থাকে, খদ্দের দেখলেই কিনে সাজিয়ে রাখবে। আমি তো আলাদা করে গ্রাফিক্স সাইকোলজিস্ট দিয়ে কালার সিলেকশন করাই মশাই, এখন কম্পিউটার এ সব কালার পাওয়া যায়, এটার পাশে ওটা বসিয়ে দারুণ ডিজাইন করে দেয় ওরা।
আর কথা না বাড়িয়ে প্রকাশক এর অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লেন রবিবাবু, বাইরে লেখা আছে রেবতী প্রকাশনী সাইড এ আবার ক্যাপশন আছে "মানে গুনে সবার সেরা ", মনে মনে ভাবলেন, হা সেরাই বটে, গুনে গুনে পয়সা নিতে সেরা, মান গুণ চুলোয় গেছে, যত্তসব।
যতীন আরো ৩-৪ টা প্রকাশকের ঠিকানা দিয়েছে বটে, এই আসে পাশেই হবে কোথাও।এগিয়ে যাচ্ছিলেন হঠাৎ চোখে পড়লো, "বর্ণহীন প্রকাশনী", মনে মনে ভাবলেন, নামেই যারা বর্ণহীন, হয়তো বা তার মতো সাদা কালো নতুন লেখককে পাত্তা দিলেও দিতে পারে, ঠাকুর নাম করে ঢুকে পড়লেন, কাঁচের দরজা ঠেলে।
সামনের চেয়ার এ বসে আছে একটি কম বয়েসের ছেলে, এগিয়ে গিয়ে রবিবাবু নিজের আসার হেতু জানাতেই, ছেলেটি বললেন, ওই সোফাতে বসুন, একটু পরেই স্যার একজন একজন করে ডাকবেন। সোফায় বসে এদিক ওদিক দেখে বুঝলেন, এই আশপাশের ছেলে ছোকরা তার মতোই প্রকাশকমশাই এর কাছে এসেছে, তা ভালো দশটা মানুষ আসছে যখন এদের  কাজ কর্মও হয় ভালোনিশ্চই।
বসে থেকে থেকে কিছু ঢুলুনি এসে গেছিলো রবিবাবুর, ছেলেটি বললো, এবার আপনি যেতে পারেন। বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে ঘুম ভাবটা তাড়িয়ে নিলেন তিনি, তারপর সোজা পাশের চেম্বারেএসে ঢুকলেন।
সামনের চেয়ার অলংকৃত করে বসে আছেন, বিশাল বপু পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব প্রকাশকমশাই।পাশেই একটি সুন্দরী মেয়ে, হয় তো ওনার সেক্রেটারি। অফিসের দেওয়াল সু-সজ্জিত, এদের বিক্রিবাটা ভালোই হয় বেশ বোঝা যাচ্ছে।
ভদ্রলোক কোনো কথা বলছেন না, মেয়েটি সব কথা বলছে, ছোট ছোট চোখ করে রবি বাবু কে শুধু ওয়াচ করছেন ভদ্রলোক। একটু অস্বস্তি হচ্ছিলো বটে ওনার, কিন্তু মানিয়ে নিচ্ছিলেন।।
সব লেখা মেয়েটি খাপছাড়া ভাবে পড়লো। তারপর বললো আপনি কি আমাদের প্রকাশনীর আগের কিছু লেখা পড়েছেন বা শুনেছেন?
না সেভাবে পড়া হয়নি, বললেন রবিবাবু।
মেয়েটি সাইড ড্রয়ারের থেকে বের করে দিলো ৪-৫ টা বই।
আর বললো, এগুলো আমাদের লেটেস্ট এডিশন, আমাদের বইমেলার স্টল এর সামনে পুলিশ রেখে ভিড় কন্ট্রোল করতে হয়, মেলা শেষ হবার আগেই, বই শেষ হয়ে যায়, তবে আমরা এখন তো অনলাইন অর্ডার নিচ্ছি, তাই আমাদের ক্রেতা দের তেমন অসুবিধা হয় না, আপনি একটু পড়ে দেখুন, যদি এমন লেখা কিছু থাকে, আমরা কিনে নেবো।
প্রথম বই এর মলাটে অতি স্বল্প পোশাক পরা একটি মেয়ে শুয়ে আছে, আর টাইটেল আছে "নিষিদ্ধি রজনীর সুবাস"। এই একটা বই দেখেই রবিবাবু বুঝে গেলেন, এ জায়গা তার জন্য না।
বইগুলি মেয়েটির দিকে সামান্য এগিয়ে দিয়ে বললেন, না থাক ম্যাডাম, আমি এরকম লেখা তো ঠিক লিখি না।
ঠোঁটের কোনে ফিঁক করে হেসে মেয়েটি বললো চেষ্টা করেই দেখুন না, আপনার মতো বয়েসের কত মানুষ আমাদের সাথে রেগুলার কাজ করেন, শুরুতে একটু অসুবিধা হলেও ধীরে ধীরে দেখবেন, লেখার ফ্লো এসে যাবে। 
এবার মুখ খুললেন প্রকাশক ভদ্রলোক, আপনারা হলেন, গুণী মানুষ, এসব লেখা তো জলভাত আপনাদের কাছে, বাংলাদেশে খুব ডিমান্ড এসব লেখার, জানেন তো। আর কাঁচা পয়সা আছে, ভেবে দেখুন। আমাদের সাথে কাজ করলেন, টাকা এল, পরে না হয়, আমার বন্ধুকে দিয়ে কিছু কবিতা গল্প যা বলবেন তেমন বই ছাপিয়ে দেব। প্রেস মিটিং করবেন, সভাঘরে লোক হাততালি দেবে, আপনিও খুশি আমরাও খুশি।
মাথাটা গুলিয়ে যাচ্ছিলো রবিবাবুর।
মেয়েটা চামড়ার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ওনার দিকে তাকিয়ে হাসছিলো মিটিমিটি, রবিবাবুর শরীরে অস্বস্তি লাগছিলো, উঠে পড়তে পারলে বাঁচেন। নমস্কার জানিয়ে উঠে বললেন, একটু ভেবে দেখি।
বাইরে বেরিয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। বাপরে বাপ্!
বাড়ি এসে শান্তি করে এক কাপ চা খেয়ে নিজের ছোট্ট সাজানো বাগানটাতে বসে থাকলেন বেশ কিছুক্ষণ।  নিজের মনকে  প্রশ্ন করতে লাগলেন, এই যে সবাই বলে গেছে "চেষ্টা করে যাও ফলের আসা না করে, ফল ঠিক আসবেই" কথাটা কতটা সত্যি? শালা, চেষ্টার কোনো ত্রুটি রেখেছি? হাঁটুর বয়েসী ছোকরা প্রকাশককে স্যার স্যার করে তেল দেওয়া থেকে লিটল ম্যাগাজিনের ইন্টেলেক্চুয়াল প্রকাশক এর সস্তা বুর্জোয়া সমাজ শত্রুর আসরে গল্প শোনা, চা খাওয়ানো সবই তো করলেন, ফল কি মিললো? আর আজকের অভিজ্ঞতা তো কহতব্য না। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বেঁচে থাকলে তার টেনিদার ভাষাতে বলতেই পারতেন তোমার কেসটা পুড়িছেরী।

ভালো সরকারি অফিসার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, স্ত্রীর অসুস্থতাতে ভি.র.স. নিয়ে নিলেন, যা ছিল সবটাই ডাক্তার আর হাসপাতালে চলে গেল, তাও বাঁচাতে পারলেন না স্ত্রী মাধবীকে, সন্তানাদিও নেই, তাই একদম একা হয়ে গেলেন, আর সঙ্গী হলো সাহিত্য, কিন্তু তাতেই আর সাফল্য কোথায়! রোজই প্রকাশক এর দোরে দোরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, আরে বাবা নিজের টাকাতে বই ছাপাবার সামর্থ্য থাকলে তোদের আমি তেল দিতাম!!, কবে বের হয়ে যেত আমার বই। লেখা লেখির অভ্যাসটা ছোটবেলাতে ছিল। স্কুল কলেজের নানা পাত্র-পত্রিকাতে ওনার লেখা বেরোতো, তারপর যা হয়, সংসার সামলে কটা বাঙালি আর লাইফ এ যা হতে চেয়েছিলো সেটা হতে পারে। সেইদিক থেকে বাপু সাহেবগুলো আমাদের থেকে এগিয়ে, এই তো সেদিন কোন এক সাহেবের কথা পড়ছিলেন যেন কাগজে, ৯০ বছর বয়েসে কি এক নাটক না নভেল লিখে খুব বিখ্যাত হয়েছেন, আগে নাকি কেও তাকে চিনতো না, তারপর যতীন বলছিলো, কি এক KFC না কি আছে, তার মালিক নাকি অনেক বুড়ো বয়েসে এসে কোটিপতি হয়েছে। তা সে কোটিপতি হবার শখ ওনার নেই। বিধু চৌধুরী লেনের এই পৈতৃক বাড়িতে তিনি সুখেই আছেন, অত টাকার শখ ওনার কোনো কালেই ছিল না, নাহলে কত কোটি টাকার টেন্ডার পাস হয়েছে যার হাত থেকে, একটা পয়সা ঘুষ নিতেন না বলে আজ সামান্য বই ছাপাবেন সেই সামর্থ্য হচ্ছে না। রবিবাবুর ছোটবেলাটা কেটেছে, গ্রামের বাড়িতে। বাবা ছিলেন প্রাইমারি স্কুলএর হেডমাস্টার। সংসারে অভাব ছিলনা কোনো কালেই, বাবার কাছেই বাংলাটা পড়েছেন ছোটবেলাতে। ছোটবেলার কথা মাঝেমাঝেই মনে পড়ে ওনার। বাবা বলতেন, নিজের ভাষাটা না শিখতে পারলে, নিজের শিকড়কে চেনা যায়না। কতই না সুন্দর ছিল সেসব দিনগুলো, তারপর বড় হলেন, চাকরি নিয়ে চলে এলেন কলকাতা শহরে, ধীরে ধীরে এই শহরের কত রূপ এর রং পাল্টাতে নিজের চোখে দেখলেন।বাবা নিজেই আর থাকতে চাইতেন না গ্রামের বাড়িতে, নিজের টাকাতে, এই বাড়িটা করলেন। আশেপাশে কত ফাঁকা জায়গা ছিল তখন। বাড়ির সামনের এই বাগানটা তো বাবার উৎসাহেই করা। বিয়ের পর মাধবী অনেকটা সামলে দিয়েছে। স্ত্রী মাধবীর অভাবটা কেমন যেন তাড়িয়ে বেড়ায় ওনাকে। কথা বলার মানুষ টানেই। তাই ভেবেছিলেন, মনের কথাগুলো কাগজের পাতায় লিখে লোকের সাথে মনের ভাবের আদানপ্রদান করবেন। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, এসব না করে, ধর্মচর্চাতে মন দিলেই হতো। সেদিনও মিত্তিরমশাই বলছিলো, রবি, আসতে পারো তো আমাদের ধর্মপাঠের আসরে। যাবো ভেবেও গেলেন না। আসলে ধর্ম নিয়ে কোনোদিনও সেভাবে মাথা ঘামান নি উনি, ধর্মের পরিবর্তে কর্মকেই প্রাধান্য দিয়েছেন । এমন সময় কলিং বেল বাজলো, শ্রীমান যতীন উপস্থিত। যতীন হলো রবিবাবুর শালা, নানান ধরণের ব্যবসা আছে, আর হালফিলে ধরেছে কনসাল্টেন্সি ব্যবসা। কোনোটাতেই তেমন সুবিধা করতে না পারলেও, উৎসাহের খামতি নেই কিছুতে, এক কথায় যতীনই তাকে এই লেখালেখিতে উৎসাহ দিয়ে শুরু করিয়েছে। "দেখুন জামাইবাবু, সময় কিছুর জন্য থেমে থাকে না, দিদি নেই, আমাদের সব্বারই খুব কষ্ট, কিন্তু এভাবে একা একা কি করে বাঁচবেন! কিছু একটা করুন, কিছু শিখতেও পারেন" বলেছিলো যতীন "শিখবো? এই বুড়ো বয়েসে কি শিখবো? না না বাবা, ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের ভিড়ে শিখতে গেলেই বলবে, বুড়োটা শিঙ ভেঙে বাছুরের দলে নাম লিখিয়েছে রে" উত্তর দিয়েছিলেন রবিবাবু তখন অনেক ভেবে চিনতে এই লেখা লেখির পালা শুরু হয়। তবে মন্দ তিনি লেখেন না। ওনাদের পাড়ায় বেশ কয়েকবার কবি সংবর্ধনাতে কবির জন্য সম্মান পত্র লিখে দিয়েছেন, একবার ওনারই লেখা ছোটদের নাটক নিয়ে কত হইহই হলো বিজয়া সম্মিলনীতে। কিন্তু সব লেখকের ইচ্ছা থাকে, তার বই বের হোক, দশটা লোক পড়ুক, চিঠি দিক, মুখোমুখি হলে বলুক, আপনার অমুক লেখাটা পড়লাম, বা আমি আপনার ফ্যান। তাই সেই চেষ্টাটাই চালাচ্ছেন কটা দিন ধরে। "তুই কি চা খাবি?" যতীনকে বলেন রবি বাবু। তবে করে নিয়ে আয়, আমি এই ফিরে এসে বসলাম। না না, খাবো না, এই তো ঝুলঝুনওয়ালার অফিস থেকে এক পেট খেয়ে এলাম, শোনো না রবিদা, এই প্রজেক্টটা যদি পেয়ে যাই, তোমার বই আমি ছাপাবো, কোনো প্রকাশককে আর তেলাতে হবে না। আমি তো ভাবছিলাম ছোট করে একটা পাবলিকেশন বিসনেস খুললে কেমন হয়, এই যেমন ধরো, কলেজ স্ট্রিট চত্বরে, ৪০০ স্কোয়ারফুট ...“থাক”, থামালেন রবিবাবু। তোর এই গাছে কাঁঠাল আর গোঁফে তেল স্বভাব গেলো না।আগে টাকাটা পা, আগে থেকেই এত কিছু না ভাবলেও চলবে, কোথায় কিছু নেই

পাবলিকেশনের ব্যবসা করবে, কি বুঝিস তুই এই ব্যবসার! আর পাবলিকেশনের যা অবস্থা দেখে এলাম আজ। আরে ওসব নিয়ে কিছু ভেবো না, "Be positive" সব ব্যবসার টাল-মাটাল আছে, হয় তো তুমি যাদের পাবলিকেশন দেখে এসেছো, ওদের খারাপ সময় চলছে, টা বলে তো আর সবার এমন হাল না।  বললো যতীন খারাপ হাল? না না মোটেও না, বেশ ফুলে ফেঁপে উঠছে ওদের ব্যবসা, তবে কি জানিস সাহিত্যটাই হারিয়ে যাচ্ছে, একজন বললো চকমকে কভারের মাপ মতো বই লিখুন, আর একজন তো বাংলা পর্নোগ্রাফির বই লিখতে বললো রে। 
ছ্যাছ্যা, কি বলবো তোকে, বছর ২২ বয়সের একটা মেয়ে, আমার হাঁটুর বয়েস, সে আমাকে চিবিয়ে চিবিয়ে ওসব কথা বললো, মুখে বাধলোনা এতটুকু'।
যতীন ফিঁক করে হেসে বললো, রবিদা, টাকা আর শরীর দুটোই এখন ট্রেডিং ট্রেন্ড।
ক্ষমা কর ভাই, ওসব উত্পটাং কিছু লিখে আমি বই ছাপাতে পারবো না। বিরক্ত স্বরে বলেন রবিবাবু।
আচ্ছা শোনো না, আমি আজ আরও কয়েকটা ঠিকানা পেয়েছি, দেখো একটু কথা বলে।
হুম, কাল যাবো না হয়, আমি উঠলাম দাদা, গুড নাইট, যতীন উঠে পড়লো।
পরদিন সকালে আবারও নিজের ব্যাগপত্তর নিয়ে বেরোলেন, যাবার আগে স্ত্রী মাধবীকে ছবির মধ্যে থেকে বলে গেলেন, তুমি মনে হয়তো ঐ পারে বসে আমার পাগলামো দেখে হাসছো বলো! কিন্তু মনে প্রাণে বড়ো একা লাগে গো, তাই বেরিয়ে পড়ি।
ওনার কাজের মাসি লক্ষীদি এসে গেছে ততক্ষণে, ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে বললেন, রাতে বাড়ির ফেরার সময় একটিবার এস দিদি, তোমার এই মাসের টাকাটা নিয়ে যেও, আর তালাটা দেখে লাগিও, ডুপ্লিকেট চাবি আমার কাছে আছে, বলেই বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে
যতীনের দেওয়া ঠিকানাগুলি দেখে দেখে সব কটায় ভিজিট হয়ে গেলো তার। শেষ জনের থেকে বেরিয়ে ঘড়িতে দেখলেন, ১২টা ০৫ বাজে। মনে মনে ভাবলেন, হা আজকের মতো তার বারোটা বেজেছে, এবার বাড়ি ফিরলেই হয়। 
কলেজ স্কোয়ার থেকে একটু এগিয়ে বাম দিকে যে চা-এর দোকানটা আছে, ওখানে বসে চিনি ছাড়া চা এর অর্ডার দিয়ে, লোকের যাওয়া আসা দেখছিলেন তিনি। এই এক স্বভাব তার, লোক দেখা, অনেক ছোটবেলাতে, কেও তাকে বলেছিলো, প্রতিটা মানুষের জীবন একটা করে আলাদা আলাদা গল্প। তাই লোক দেখেন তিনি, বুঝতে চান, হাসি মুখে যে মানুষটা হাঁটছে, সে হয়তো অফিসে বসের থেকে গালি খেয়ে বাড়ি ফিরছে, কিমবা বউটার অসুখ, কারো বা শরীরে মরণ রোগ বাসা বেঁধেছে, সে জানে বা জেনেও না জানার ভান করে হাঁটছে।
“বাবু চা” ,দোকানের ছেলেটা কাঠের টেবিলে চায়ের কাপটা রেখে বললো। ভাবনায় বাধা পড়ে তার।
গরম চাতে চুমুক দিতে দিতে লক্ষ করলেন, হালকা শ্যাম বরণ রোগা পাতলা একজন মানুষ ওনার দিকেই তাকিয়ে আছে, চোখে চোখ পড়তেই হেসে উঠলেন, 
ভদ্রতার খাতিরে রবি বাবুও হাসলেন, মনে মনে ভাবছিলেন, এর আবার কি মতলব কে জানে, কলকাতা মানেই তো মতলববাজদের আড্ডাখানা, হয় ইন্সুরেন্সের দালাল আর নাহলে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং করতে বলবে, লোকটি উঠে এসে বললেন, একটু বসি আপনার পাশে?
ঈষৎ সরে এলেন, রবিবাবু, বুঝিয়ে দিলেন, বসলেও তার আপত্তি নেই।
কিছু সময়, চুপচাপ। লোকটি নিজেই তারপর বললেন "যাক বাঙালি তাহলে আজ কাল ইন্টেলেক্চুয়াল নিবন্ধ লিখতে পারে," পাশের ওই লোকটির  কেমন একটা মেয়েলি টাইপ পুরুষ কণ্ঠ, চা এর দোকান এর বেঞ্চ এ তার ফেলে রাখা লেখাটার দিকে তাকিয়ে কথাটা বলছিলো। "আমাকে কিছু বললেন?" প্রশ্ন করলেন রবীন্দ্রনাথ, উত্তর এল হা, বেশ কিছুটা চুপ থেকে ব্যক্তিটি আবার ও প্রশ্ন করলেন " ছাপছে না বুঝি?", বিরক্ত স্বরে রবীন্দ্রনাথ এর জবাব এল, না। 
ছাপবে কি করে, এসব লেখা এর মর্ম বোঝে যারা তাদের কাছে পৌঁছতো হবে, তবে না।ঘাড়টা ঘুরিয়ে রবীন্দ্রনাথ লোকটিকে একটা শ্লেষ জড়িয়ে বললেন “তারা কারা শুনি? ইহো জগৎ না অন্য জগৎ এর কোনো কেও?” মুচকি হেসে এবার আগুন্তুক বললেন, “১৩ নম্বর বনমালী এভিনিউ এ যান একবার, গিয়ে বলবেন দিগন্ত সান্যাল পাঠিয়েছে,"।
প্রকাশনীর নাম "গ্রস্ত"
গ্রস্ত? এটা তো শুনিনি, কেমন লেখা নেন ওনারা? আগের দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতার স্মৃতি এখনো ভোলেননি রবিবাবু তাই আজ আর রিস্ক নিতে পারছেন না।
লোকটি জানায়, নতুন পুরানো সব লেখাই ছাপায় ওনারা, পয়সাওয়ালা মানুষ মশাই, বইয়ের কাটতি নিয়ে মাথা ঘামান না, প্রকাশকের কথা হলো সাহিত্য সৃষ্টিটাই মূল, পয়সা দিয়ে তার বিচার হয়না। আমি বলি কি যান একবার।
কথাটা মনে ধরলো রবিবাবুর। ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে ঠিকানাটা আরো একবার ভালো করে জেনে নিয়ে চলে এলেন প্রকাশকের ঠিকানাতে।
হা ১৩ন তো এটাই, কিন্তু এটা তো বাড়ি মনে হচ্ছে, ঠিক তখনই খেয়াল করলেন, পাশেই "গ্রস্ত প্রকাশনী" লেখা  সাইনবোর্ড। গেট খুলে ভিতরে এসে, ডান দিকের অফিস রুমের দিকে চললেন। কাঁচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখলেন একজন বসে আছেন, রবিবাবুকে দেখেই নমস্কার জানিয়ে সামনের চেয়ারে বসতে বললেন। 
আমাকে দিগন্ত সান্যাল আপনার ঠিকানা দিয়েছে। ওই কলেজ স্ট্রিট এ ওনার সাথে দেখা হয়েছিল, বললেন, আপনি নতুন লেখকদেরকেও সুযোগ দেন। 
'হা নিশ্চই, লেখার আবার নতুন পুরানো কি, আমি শুধু দেখি লেখার মান। আর সেটা যদি ঠিক থাকে, আমার তা ছাপার কোনো আপত্তি নেই। দেখি আপনি কি লিখেছেন।
বর্তমান যুব সমাজ আর চাকুরিমুখী শিক্ষার ওপর রবিবাবুর লেখা প্রবন্ধটি, প্রকাশককে বাড়িয়ে দিলেন উনি।
বেশ বেশ, বলে মন দিয়ে লেখাটি শুরু থেকে পড়তে লাগলেন প্রকাশক মশাই ,ডান হাতটি চেয়ারের হাতলে রেখে, কপালের একদিকে চাপ দিয়ে পড়ছিলেন, আর মাঝে মাঝে সম্মতি মুলুক কিমবা প্রশংসা মূলক মাথা নাড়ছিলেন, এটা দেখে রবিবাবুর বুকে যেন একটু ভরসা এল। ছাপা হোক বা না হোক, মন দিয়ে লেখাটা পড়েছেন তো অন্তত।
মিনিট ২০ পরে বললেন, লেখার মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই কিন্তু আমাদের সিলেকশন কমিটিকে একবার দেখিয়ে নিতে চাই আমি লেখাটা।
“অবশ্যই” রবিবাবু সম্মতি মুলুক মাথা নেড়ে জানালেন।
তবে আপনি এটার জেরক্স কপি রেখে যান, বললেন প্রকাশক। আপনি এটাই রেখেদিন, আর কপি নেই, আপনাকে দেখে ভরসা আছে আমার, বলে উঠে পড়লেন রবিবাবু।
আজ বাড়ি ফিরে বেশ একটা স্বস্তি অনুভব করছেন তিনি। দিনের পর দিন যে অবহেলা নিয়ে বাড়িতে ফেরেন, সেটার অভাব আজ, বরং কিছুটা হলেও আশার আলো লেগে আছে মনে।
যতীন আজ এসেছিলো সন্ধেবেলা, সব কিছু শুনে বললো, হয়ে যাবে সিলেকশন, কি দাদা আপনাকে বলেছিলাম না, একদিন মূল্য পাবেনই আপনি, দেখুন মিললো তো!
বেশ একটা হাসি মুখে বললেন, রোসো ভায়া ওদের কমিটি কি বলে দেখা যাক।
কিছু ভাববেন না বলে যতীন।
পর পর ৩-৪ তে দিন বেশ ভালোই কাটলো, শুধু সামান্য অপেক্ষার উদ্দীপনা লেগেছিলো ওনার মনেতে, তবে যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন মনে মনে তিনি নিজেও।
গত রবিবার ফোন করেছিলেন প্রকাশক, বললেন, লেখাটা কমিটি সিলেকশন করেছে, আর ওনারা চান যে রবিবাবু নিজে একবার আসুন আজ সন্ধেবেলা, প্রতি রবিবার কমিটি মেম্বার ছাড়াও অনেক প্রকাশক আর বাঙালি সাহিত্যের দিকপালরা আসেন ওনার ওখানে, সবার ইচ্ছা একবার লেখাটা পড়ে শোনান রবিবাবু নিজে, এ লেখা সেখানে খুবই সমাদর পাবে প্রকাশক নিজে মনে করেন”। কথাটা শেষ করে,ভদ্রলোক বললেন “এবার তাহলে রাখি?”,
“আপনার নামটা জানা হলো না!! বললেন রবিবাবু। 
“আমার নাম পরিতোষ পাঠক, আমারই বাড়িতে সভাটা বসে, আপনি ওই সন্ধে ৭টা নাগাদ আসুন, আমরা অপেক্ষা করবো”. বলেই ফোনটা রেখে দিলেন ভদ্রলোক।
উফফ সে যে কি আনন্দ, একবার ভাবলেন যতীনের মোবাইলে ফোন করে জানাবেন, তারপর ভাবলেন না, দেখা হলেই বলবেন। 
সকালটা যেন কিছুতেই আর কাটছে না তার, ঠিক বিকাল ৬টা নাগাদ এক কাপ চা আর দুটো বিসকুট খেয়ে রবীন্দ্রনাথ বেরিয়ে পড়লেন, ঠিক সন্ধে ৭টা ১০এ প্রকাশকের বাড়ি পৌঁছে গেলেন, অফিস বন্ধ দেখে সোজা এগিয়ে এসে বাড়ির কলিং বেল বাজাতেই একজন কম বয়েসী ছোকরাচাকর দরজা খুলে দিলো, আর নিয়ে গেল এক প্রকান্ড হল ঘরে, ইতিমধ্যে অনেক মানুষ বসে আছেন, কারোর মুখ ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না, আলো আর অন্ধকারে শুধু অবয়বটি বোঝা যাচ্ছে, তাদের কেউকেই তেমন চেনা লাগছে না তাঁর।একজন মানুষ এর মুখটা একটু শুধু চেনাচেনা লাগছে, তরুণ বয়েস, কবি কবি চেহারা, একজন বেশ লম্বা হালকা দাড়ি আছে সুপুরুষ, আর একজন এর বেশ বলিষ্ঠ চেহারা সরু গোঁফ, ঘরের  আলো খুব কম, একটি করে চেয়ার তার পাশে একটি করে ছোট টেবিল. তারই ওপর রাখা টেবিল ল্যাম্প, কাগজ পেন রাখা, রবীন্দ্রনাথকে চাকরটি একটি টেবিল দেখিয়ে দিলো, কয়েক মিনিটে বসে থাকার পরেই ওই পাশের বড়ো দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকলেন, পরিতোষবাবু। সকলকে নমস্কার করে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় দিলেন, সভা শুরু হলো, সভার শুরুতে, আগামী মাসের পত্রিকাতে কি কি প্রকাশ পাবে, পাঠকরা কি চিঠি দিয়েছে, কোনো অভিযোগ এসেছে কিনা, এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো| তারপরে শুরু হলো আলোচনা সভা, সেই সভার নিয়ম সহজ, সকলে একটি মাত্র নিজ রচনা পাঠ করতে পারবেন, লেখা পাঠ শেষ হলে অন্যরা সমালোচনা করতে পারবেন। কেও কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেন, কেও বা প্রবন্ধ, কেও বা গল্প, পাঠের শেষে, সকলেই মন্তব্য রাখছেন. রবীন্দ্রনাথবাবু তার নিবন্ধটি পাঠ করলেন আর ভূয়সী প্রশংসা পেলেন সকল এর থেকে, একজন তো জানালেন সভা শেষে তিনি যেন তার সাথে কথা বলেন, তিনি তার পত্রিকাতে এমনই কিছু সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখা বের করবেন|
সবই ঠিক চলছিল কিন্তু হঠাৎ সেই তরুণ কবিটি, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এর কবিতা পড়াশোনাতে লাগলেন, অবাক হলেন রবীন্দ্রনাথ, এত পুরো টুকে দিয়েছে, তার পাঠ শেষ হলে সকলে মন্তব্য করলো প্রশংসাও করলো, আরো অবাক হলেন এরপরের জন এর লেখাটা শুনে "হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে" এইটুকু বলতেই রবীন্দ্রনাথ আর থাকতে না পেরে বললেন, থামুন মশাই, এ কেমন সভা, বিখ্যাত লেখকদের লেখা নিজের নাম দিয়ে পাঠ করছেন, আর আপনারা কেমন সাহিত্যিক মশাই, কেও কোনো প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তো নাই, উল্টে আবার প্রশংসা। সভা সকলে সবাই` চুপ, রবীন্দ্রনাথ বলে চললেন আর পরিতোষ বাবু, আপনি আমাকে বললেন এটা নাকি স্বরচিত লেখা পাঠ এর আসর এ তো পুরোটাই টোকা, আমার এখন খেয়াল হচ্ছে, ওই যে উনি যে কবিতা পড়লেন ওটা তো রবিঠাকুর এর লেখা, ওনারটা সুকান্ত ভট্টাচার্য্য আর উনি পাঠ করছেন জীবনানন্দ এর বনলতা সেন, মশাই টোকাটুকির একটা লিমিট থাকে, হাত তুলে থামতে বললেন পরিতোষ পাঠক আর তার পাশের দেওয়ালে  ইলেকট্রিকের  সুইচ বোর্ড এর আলোটা জ্বেলে দিলেন, সাথে সাথে ভীষণ চমকে গেলেন রবীন্দ্রনাথ, এ তিনি কাদেরকে দেখছেন? কারা বসে আছে সামনে?, প্রতিটা টেবিলের সামনে চেয়ার আলো করে বসে আছেন তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যী, তরুণ বয়েসে ররবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ আরো কত কত নামি মানুষ, মাথাটা বন বন করছে, এ তিনি কোথায় এসেছেন, ছুটে বেরিয়ে আসতে গেলেন ঘর থেকে, বাইরের দরজা ঠেলে খোলার চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না, কিছুতেই সামনে পিছনে টেনে ঠেলে খোলা যাচ্ছে না, তবে কি দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে রাখা!
“আমি চলে যেতে চাই, খুলে দিন দরজাটা”, চিৎকার করে বললেন রবিবাবু, আমাদের সভায় যিনি একবার আসেন, আর কোনোদিন চলে যেতে পারেনা রবিবাবু,বলেন পরিতোষ পাঠক, আপনি হয়ে গেলেন আজীবনের সদস্য।
না না আমার বই আপনাকে ছাপাতে হবে না শুধু আমাকে যেতে দিন।
শান্ত গলাতে পরিতোষবাবু উত্তর দিলেন কাদের কাছে ফিরতে চাইছেন আপনি?যারা আপনার কাজের মর্যাদা কোনোদিনও দেয়নি? দিনের পর দিন রাত জেগে, কত ভেবে, কত অভিজ্ঞতা দিয়ে লিখেছেন আপনি, কোনো মর্যাদা তো দেয়নি আপনাকে, পরিবর্তে কতকগুলো অপদার্থ মানুষ, নিজেদের নিম্নরুচির পরিচয় দিয়ে অপমান করে বের করে দিয়েছে। তাহলে কিসের জন্যই বা ফিরতে চান, আসুন না, আমাদের সাথে সাহিত্য করবেন, যেখানে একজন গুণীকে তার কাজের জন্য তার সৃষ্টিশীলতার যোগ্য সম্মান দেওয়া হবে।একবার তাকিয়ে দেখুন, আপনি বসে আছেন আপনারই চেয়ারে। রবিবাবু ঘাড়টা ঘুরিয়ে নিজের চেয়ারের দিকে তাকালেন, আর অবাক হয়ে দেখলেন, তিনি বসে আছেন, শুধু ঘাড়টা ইষৎ বাম দিকে হেলানো।
ঘরের অন্য সদস্যরা যেন বলে উঠলো, সুস্বাগতম।

Comments

Top

 

গল্প

অনুগল্প

শ্রেয়া বাগচী

অঞ্জলি

পাসনা পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার শাড়িটা আলাদা করে সরিয়ে রেখেছে। কাল সকালে উঠে তাড়াতাড়ি রেডি হতে হবে। এইবার অষ্টমীর অঞ্জলি খুব তাড়াতাড়ি। সকাল এ উঠেই পামেলা মেয়েকে ডাকতে থাকে" উপু উঠে পড় তাড়াতাড়ি। এ কি এত বেলা করে শুয়ে আছিস। স্নান করে কখন আর শাড়ি পড়বি কখনই বা আর অঞ্জলি দিবি। "উপাসনা ডুকরে কেঁদে ওঠে মা এর সামনে। "মা তোমরা যাও। আমার আর এই বছর হলো না অঞ্জলি দেওয়া"। পামেলা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে "কেন মা। এতে কিসের লজ্জা? এই বিশ্ব সংসারে তুমি সৃষ্টির উৎস হয়ে পরিচিত হলে। স্বয়ং মহামায়া যার অঞ্জলি তুমি দিতে যাচ্ছ যিনি সকল সৃষ্টির উৎস তিনিও তো প্রকৃতির এই নিয়মেই বাধা। তবে কুণ্ঠা কিসের। মা এর কাছে মেয়ের কিসের আড়াল? তাড়াতাড়ি অঞ্জলি দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নাও। উপু সংস্কার জিনিসটা গাছ এর শিকড় এর মত গেঁথে বসতে চায়। তাকে উপরে ফেলবে নাকি রোজ জল দিয়ে গাছে পরিণত করবে তা তো তোমার উপর। পঁচিশ বছরের উপাসনা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তিপ্পান্ন বছরের মা এর দিকে। মাইকে তখন বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের গলায় মাতৃ রূপেন সংস্থিতা........                                                                                   
বিজয়া দশমী                                                                                         রিহরবাবু আর কালিপদবাবুর বংশ পরম্পরায় জমি জায়গা নিয়ে ঝামেলা অশান্তির কথা গ্রামে সবাই জানে। গ্রামের বিজয়া সম্মেলন এ সপরিবারে এসেছেন দুজন ই। মিষ্টি মুখ কোলাকুলি হচ্ছে সবার সাথে সবার শুধু ওনাদের দুই পরিবার পারস্পরিক দূরত্ব রাখছে। হঠাৎ করে হরিহরবাবুর একমাত্র নাতনি ছোট্ট পিউ একটা গোটা রসগোল্লা নিয়ে কালিপদ বাবুর নাতনি দেবযানীর মুখে পুড়ে দিয়ে বলে "সবাই সবাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে শুধু আমাকে তোমাদের কাছে বড়রা যেতে দিচ্ছে না কেন বলোতো?" তবে যে মা বললো "আজ বিজয়া দশমী আজকে সবাইকে মিষ্টি মুখ করিয়ে ভালোবাসার দিন"। দূর থেকে সব কিছুই দেখছিলেন কালিপদ আর  হরিহর। কালিপদবাবু এগিয়ে এসে ছোট্ট পিউর সাথে কোলাকুলি করে বললেন "ঠিক বলেছ দিদি আজ কে সবার সবাইকে সব ভুলে আপন করে নেওয়ার দিন আমাদের ভারী ভুল হয়ে গেছে"। পাশ থেকে হরিহরবাবু বলেন "দিদিভাই বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে হয় বিজয়ার দিনে। দাদুকে প্রণাম করো। কোলাকুলিটা বরং আমি করি।"                                                                                                              

প্রতিযোগিতা                                                                             

য়ন্তিকা আর পারমিতার কম্পিটিশন এর কথা স্কুলে জানে না এমন কেউ নেই। প্রতি ক্লাসেই ওরা পালা করে ফার্স্ট হয়।                                                                     কোর্টে ডিভোর্সের কেসটা ফাইনালি জিতেই যান ডাঃ পারমিতা চ্যাটার্জি।আর জিতবেনই না বা কেন। বিখ্যাত উকিল অয়ন্তিকা সেনগুপ্ত যে তার কেসটা হ্যান্ডেল করলেন যার কিনা হারার রেকর্ড নেই একটাও। হারার রেকর্ড তো তার ও নেই তাইতো অয়ন্তিকা আজ ক্যান্সার কে জয়ী করে কোর্টে আসতে পারছে। তবে কি পালা করে জেতাটা এখনো চলছে ওদের?           

আসলে জয়ী ওরা দুজনেই নিজের নিজের পথে। শুধু মাঝখানের বছরগুলো শিখিয়ে দিয়েছে প্রেরণা একজন আর একজনের হওয়া যায় তবে প্রতিযোগিতাটা একেবারেই নিজস্ব, সেখানে অন্যের আনাগোনা ভিত্তিহীন।

নাম-অন্নপূর্ণা                                                                          

চুমকির মা এর মুখে হাসি আজ আর যেন ধরে না। মেয়ে শহরে চাকরি করে অনেকদিন।এমনই কাজ এর চাপ যে একবার এই পুজোতেই বাড়ি আসতে পারে। বছরে এই একবার চুমকির মা এর নতুন তাঁত এর একটা শাড়ি হয় আর অন্ধ বাবার একটা ধুতি। বছরে এই কটা দিনই একটু মাছভাত খাওয়া হয়। চুমকির মা বলে পুষ্পা "মা আমার সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা, টাকা এনে সংসার এর মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছে।" নিজের কানেই নিজের নামটা খুব অচেনা লাগে চুমকির। হালকা হাসিও আসে ভেতরে। বহু বছর আগেই নিষিদ্ধ পল্লী পুষ্পাকে চুমকি তে পরিণত করে দিয়েছে। সত্যি পুজোর দিন গুলো ছাড়া আর কোনো রাতেই তার ছুটি নেই।।                             

গ্লো                                                                                                       জ প্রতীতির বৌভাত। দুপুরবেলা ভাত-কাপড় এর অনুষ্ঠান, অপেক্ষা করছে সবাই।প্রতীতি তৈরি হচ্ছিল। হালকা তুঁতে রং এর তাঁত বেনারসিটা পড়েছে সে। সাথে মানানসই গয়না, হালকা লিপস্টিক। বেশ লাগছে তাকে। আয়নায় চোখ পড়তেই মনটা খুশি আর আত্মবিশ্বাস এ ভরে ওঠে। দরজা ধাক্কা দেন শাশুড়ি মা। "ও প্রতীতি হল তোমার সবাই অপেক্ষা করছে যে"। "আসছি মা" বলে আরো একবার শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নেয়।দরজা খুলেই জিজ্ঞেস করে "মা কেমন সেজেছি দেখুন"। শাশুড়ি মা বলেন "বেশ সেজেছ মা। তবে এই রং টা দিন এর বেলা না পড়লেও পারতে। আসলে চাপা গা এর রঙে সব রং সবসময় পড়া যায় না। যাকগে বড্ড দেরি হয়ে গেল। আসো তাড়াতাড়ি।" এক মুহূর্ত থমকে যায় প্রতীতি। ভাবে ফেয়ার এন্ড লাভলীর ফেয়ার কেটে গ্লো করা যায় কিন্তু মানুষ এর মনের ভেতরের গ্লো সেটা আসবে কেমন করে?                                                                                                                                                                       


ডিমভাত                                                                                    

ঝিলিক পাঁচ টাকা দু টাকার কয়েনগুলো আলাদা করে রাখছিল। এমন সময় একটা গাড়ি থেকে নেমে আসেন এক ভদ্রমহিলা। খুব বেশি করে ঝাল দিয়ে মাখতে বলেন আলুটা ঝিলিককে।দাঁড়িয়ে থেকে খান আর নিয়েও যান অনেক টাকার প্যাক করে। ঝিলিক গুনে দেখে পঞ্চাশ টাকা হয়েগেছে। এতে তো হয়ে যাবে। বাবার টিবি হওয়ার পর থেকে ডাক্তার যে বলেছে রোজ একটা অন্তত ডিম। তাড়াতাড়ি গুটিয়ে ফেলে ঝিলিক ফুচকার প্লাস্টিকটা। রাত হয়ে গেলে ডিম এর দোকান বন্ধ হয়ে যাবে যে। হাতের লংকা বাটার জ্বলুনিটা তখন অনেক কমে গেছে। আজ যে বাড়ির সবার ডিমভাত এর দিন গো.........

চোখবেড়াল

তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য

সন্তোষপুর, কলকাতা

 

গল্প

Comments

Top

লেখক পরিচিতি: তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য, জন্ম কলকাতা উনিশশো ঊনআশি সালের ছয়ই জুন। পড়াশোনা কলকাতায়। বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয় এবং তারপরে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে স্নাতক। তারপর ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর এবং পেশায় প্রবেশ। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির অভ্যাস পারিবারিক উৎসাহে। ছোটবেলায় সন্দেশ পত্রিকায় রচনা প্রকাশ। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখালিখি। বহুজাতিক সংস্থায় বর্তমানে কর্মরত এবং নিজস্ব ব্যবসার সাথে যুক্ত এবং অধ্যাপনার কাজেও জড়িত।

পাশের গলির ফ্ল্যাটের দোতলায় ভোর না হতেই হুড়োহুড়ি কাণ্ড। চিৎকার, ধোঁয়া, লোকজন। বাড়ির বুড়োটা গায়ে আগুন দিয়ে পুড়ে মরে গেছে। দমকল এসেছে। পুলিশও চলে এল। আত্মহত্যার কেস শোনা যাচ্ছে। মই দিয়ে উঠে ফ্ল্যাটের পিছনদিকে দেয়ালের বড় জানালাটা ভেঙে ফেলেছে দমকলের লোকেরা। ঘরে ঢুকে পাইপ দিয়ে নেভাচ্ছে আগুনটা। এখন শুধু ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আরও ভোরে নাকি বুড়োটা চিৎকার করে উঠেছিল পুড়ে যাওয়ার যন্ত্রণায়। নেতাইদের বস্তিতে আশেপাশের লোকেরা ছুটে গিয়েছিল বাঁচাতে। বুড়োর ছেলে আর গিন্নী নাকি বাধা দিয়েছে। দরজা খুলছিল না। ওরা বাধা দিয়ে বলছিল ‘এখন আগুন লেগে গেছে, ওদিকে যাওয়া যাবে না’।
নেতাই অবশ্য এত সব টের পায় নি। কাল রাতে নেশাটা বেশিই হয়ে গিয়েছিল। দুটো মুরগি ছাপের প্যাকেট কিনে এনে একটার অর্ধেক রাত্তিরে বেশ তরিবৎ করে গলায় দিয়েছে। মাথাটা যেন অনেক হালকা লাগছিল। এই লকডাউনের বাজারে উপায়-রোজগার বন্ধ; বৌ এর ডাক্তার দেখানো, ভাড়াটের ভাড়া আদায়-যে সব চিন্তাগুলো মাছির মত ভন ভন করে সেগুলো কোথায় লুকিয়ে পড়ল। কর্পোরেশনের গাড়ি মাছি তাড়াবার ওষুধ দিলে মাছিগুলো যেমন কোথায় কেটে পড়ে, ঠিক সেরকম। নেশাটাও আস্তে আস্তে জমে গেল। এখনো পুরো কাটে নি।
জানালা দিয়ে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে দেখতে লাগল। ধোঁয়া এখনো বেরোচ্ছে। দমকলের উর্দি পরা লোকগুলো এক এক করে বেরিয়ে আসছে। আরও লোকজন জড় হচ্ছে। বুড়োর গিন্নীটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে হাউ হাউ করে হাত নেড়ে নেড়ে। এরপর পুলিশ আশেপাশের লোকগুলোকে আর জড় হওয়া লোকগুলোকে জিজ্ঞাসা করল। লাশটা ধরাধরি করে বের করে এনে প্যাকেটে ভরে নিল। বুড়োর ছেলেকে ধরে জিজ্ঞাসা করতে লাগল।
আদ্ধেক খালি হওয়া মুরগি ছাপ প্যাকেটটার দিকে নেতাই একবার তাকাল। এই মুরগি ছাপের দিন ত কম গেল না। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে। ওর বাবা মুরগি ছাপ খেত। তখন মুরগি ছাপের সাঙ্ঘাতিক কাটতি ছিল। বস্তিশুদ্ধ সকলে এটাই খেত। থানার পুলিশরা অবধি এসে নিয়ে যেত রাতে। জিনিসটার মধ্যে কিছু ছিল। সাউধ গুণিন বলেছিল ওটার নাকি আলাদা গুণ আছে। আত্মাটাকে বাইরে বের করে এনে দিতে পারে। সেই আত্মাটা নাকি তখন বেরিয়ে অনেক দামী কথা বলে দেয়। তখন নেতাই খুব ছোট। সাউধ গুণিন নামকরা গুণিন ছিল। কবে মরে গেছে। লোকটার হাতযশ ছিল। গলায় কাঁটা আটকালে মন্ত্র পড়ে বের করে দিতে পারত। নেতাই এর বোনকে একবার দিয়েছিল। অসুখ বিসুখ করলে ওষুধ-পাঁচন দিত। শ্রাদ্ধে কীর্তন গাইত। কালীপুজোয় ঢাক বাজাত। বস্তির লোকেদের তাবিজ-মাদুলি দিত। কারো বাচ্চার অসুখ সারছে না, কারও বাচ্চা হচ্ছে না, কারও ঘরে কোঁদল- সবার ভরসা ছিল সাউধ গুণিন। একবার সুন্দরবন থেকে একটা বুড়ি এসেছিল। তার বেটা মধু আনতে গিয়ে আর ফিরছিল না- হারিয়ে গিয়েছিল। সাউধ গুণিনের কাছে গোণাতে এসেছিল। নেতাইয়ের নিজের চোখে দেখা।

এমনিই পুলিশের গাড়ি করে চোঙা নিয়ে বাইরে বেরোতে নিষেধ করে গেছে। এখন কাজকর্মও তেমন নেই। নেতাই সারাদিন আর বেরোয় নি। সারাদিন দুয়োরধারে বসে বসে বিড়ি খেয়ে কাটিয়ে দিল। পাশের ঘরে বৌ রান্না করে খাওয়া গুছিয়ে দিয়েছিল। এখন আর তেমন গালমন্দ করে না। চুপচাপ কাজ করে যায়। বয়সে আর রোগে শরীরটা তেমন নেই যে তেজ দেখাবে। গা ছেড়ে দিয়েছে।
সন্ধ্যা হলে পরে গেঞ্জিটা গলিয়ে একবার শম্ভুর সেলুনের দিকে পা বাড়াল নেতাই। সেলুনের জটলায় সেদিন জোর গুজব। সকালে যে বুড়োটা মরল সেটা কী খুন না আত্মহত্যা। পুলিশ নাকি গিন্নীকে আর ছেলেটাকে তুলে নিয়ে গেছে। বুড়োটা নাকি লোক খুব ভাল ছিল। ডেকে ডেকে কথা বলত অনেকের সাথে। ওর ঘরের দরজা নাকি বাইরে থেকে বন্ধ ছিল আগুন ধরার সময়ে। এমনিধারা কত কি। দাড়ি কামানো হয়ে গেলে নেতাই বেরিয়ে এল। পথে একবার বাড়িটার দিকে তাকাল। ফ্ল্যাটের পিছন দিকে ঘরটা। দোতলায়। পিছন দিকটা একটা ফাঁকা জমি। সেখানে বড় বড় গাছ আর খাগড়ার ঝোপ। পাঁচিল ঘেরা। এইখানে দিয়েই দমকলের পাইপ নিয়ে এসেছিল বাবুরা। জানালার গ্রিল কাটা, দেয়াল ভাঙা। ভিতরটা অন্ধকার হয়ে আছে। এদিকটা অত আলো নেই। নেতাই ফিরে এল। রাতটা একটু চিন্তা করতে হবে।

অনেক বছর আগে জোয়ান বয়সে চিন্তা করতে আর ছক কষতে দারুণ উত্তেজনা ছিল। ওরা ছিল দলে তিনজন। এখন সেই দল আর নেই। পুরনো হাতযশটা একবার চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করাই যায়। একটা কিছু হয়েই যাবে। রুজি রোজগারের অবস্থা যখন এমনিই খারাপ- গলাটা অল্প ভিজিয়ে নিয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল নেতাই। একটা বেড়াল সন্ধ্যা থেকে একটানা একই সুরে বেশ জোরে কেঁদে চলেছে। রূপার মা বলছিল বুড়ো টার আত্মা বুঝি বেড়ালটায় ওপর চলে এসেছে। আরও অনেকে সায় দিয়েছিল। কে জানে বাবা।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল দেরিতে। রাতে বেশি খায়নি নেতাই, ঐ গলাটাই যা ভিজিয়েছিল। অনেক বিষয়কর্মের চিন্তা ছিল। বৌ যখন ডেকে ডেকে শেষে গাল দিতে থাকল, তখন নেতাই উঠেছিল রাতের খাবার খেতে। খেয়ে ঘুমোতে ঘুমোতে দেরি হল। বেড়ালের কান্নায় আরও অসুবিধা হয়েছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল নেতাই। সামনের আস্তাকুঁড়ের পাশেই

বেড়ালটা। থেকে থেকে ডেকে উঠছে। ওর দুঃখটা কিসের? সাদার ওপর পাটকিলে ছোপ। এরকম বিড়াল অনেক আছে। একবার যেন এদিকে তাকাল না বেড়ালটা? কিছু বোঝা গেল? ধুত্তেরি। মুখ ঘুরিয়ে কয়েক পা সরে এসে একটা বিড়ি ধরাল নেতাই।
বর্ষা এখনো পড়ে নি। মেঘ করে থাকে কিন্তু বৃষ্টি হয় না। বৃষ্টি পড়েছিল গত সপ্তাহে। নেশাটা জমেছিল ভালো। রাস্তায় এখনো জল জমে আছে। সামনের জুয়ার আড্ডাটা বন্ধ। বৃষ্টি হলে ওটা বন্ধ থাকে কদিন। সন্ধ্যা হলে বসে। এখন কয়েকটা ছেঁড়া তাস পড়ে আছে। ফিরে এল ঘরে নেতাই। আজ রাতেই সারতে হবে কাজটা।
রাত্রি বেলা কাউকে কিছু না জানিয়ে খুট করে চুপি চুপি বেরিয়ে পড়ল নেতাই। চারপাশটা দেখে নিল একবার। বেড়ালটা চুপ মেরে গেছে। লাইটপোস্টের আলোগুলো জ্বলছে। রাস্তায় লোকজন কেউই নেই। ফ্ল্যাটগুলোতে আলো জ্বলছে কোনো কোনোটাতে এখনো। আস্তে আস্তে এগোতে লাগল সে। শুয়ে থাকা কুকুরটা একবার জেগে উঠেই তাকাল ওর দিকে একবার। তারপর ফের ঘুমিয়ে পড়ল। নেতাই এগিয়ে গেল সেই ফ্ল্যাটটার দিকে। পুরোটা ঘুরে একবার চক্কর দিয়ে দেখে নিল। সব ঠিক আছে। পিছন দিকের ফাঁকা জমির পাঁচিলটাতে দুই হাতে ভর দিয়ে উঠে পড়ল। ঝোলাটা কাঁধে ভাঁজ করা। পাঁচিলের ওপর দাঁড়িয়ে নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। একদম পৌঁছে গেল গ্রিল খোলা জানালাটার তলায়। গাছটাকে হাতে ধরে একটা ডালে পা দিয়ে উঠে পড়ল গাছটাতে। পরের উঁচু ডালটাতে উঠে পড়ে তারপর কার্নিশটা নাগালে পেয়ে গেল। ঝোলাটা কার্নিশে রেখে কার্নিশে উঠে পড়ল নেতাই। তারপরে হাঁচোড় পাঁচোড় করে চলে এল জানালাটায়। একটু আওয়াজ হয়েছিল, কিন্তু ও কিছু না। নেতাই ওস্তাদ লোক। তারপরে আস্তে লাফিয়ে নেমে পড়ল ঘরের মধ্যে। ঝোলা থেকে সরু টর্চবাতি বের করে জ্বালাল। ঘরে আলো পড়ছে বাইরে থেকে, কিন্তু খোঁজাখুঁজির ব্যাপার আছে। নেতাই ভাল করে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে ঘরটা দেখতে লাগল। আলমারি আর আলমারির চাবি পেতে হবে। ঘড়ি ল্যাপটপ বা মোবাইল হাতিয়ে ঝোলায় ভরতে হবে।
হঠাৎ তার চোখ চলে গেল সামনের দেওয়ালটায়। এ কি, এই চোখদুটো কার? এক সেকেন্ড আগেও ত এখানে ছিল না। নেতাই ওদিকে টর্চটা মারল। টর্চের আলো ওখানে পড়ল না-যেমন কে তেমন। দেখতে দেখতে চোখ দুটো বড় হয়ে উঠল। নেতাই হাঁ করে তাকিয়ে রইল সে দিকে। হাত পা পুরো শক্ত কাঠ হয়ে গেল। পুরো মুখটা ফুটে উঠল দেওয়ালে। অল্প আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেল নেতাই। সেই বেড়ালটার মুখ। হুবহু যেমন সকালে আজ ওর দিকে তাকিয়েছিল। ভয়ে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল ওর। পরিষ্কার টের পেল হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। টর্চবাতিটা  ঠক করে নিচে পড়ে গেল।
বেড়ালটা এবার বলে উঠল ‘ কি রে, আবার সেই কাজে নেমেছিস? বুড়ো বয়সেও শিক্ষা হয় নি? সেই যে বাঘাযতীনে মার খেয়েছিলি মনে নেই?’
বেড়াল মানুষের গলায় কথা কইছে। নেতাই বেদম তাজ্জব হয়ে গেল। বলেছে ঠিকই। বাঘাযতীনে পিটুনি খেয়ে থানার লক আপে দুই রাত কাটাবার পর থেকে এ লাইনে আর সে নামে নি। নাক কান মুলে ছেড়ে দিয়েছিল। কোনমতে হাত জোড় করে বলল ‘ হ্যাঁ হুজুর, ভুল হয়ে গেছে’। বেড়ালের চোখ দুটো রেগে গেল। বলে উঠল ‘এত বয়স হল এখনো হাতটান দিতে মন হাঁকুপাঁকু করছে, তাই না? এইবারে তোর কর্ম্ম সারা।‘ গলাটা চেনা লাগল। ভীষণ চেনা। কিন্তু মনে পড়ল না কার। হাত দুটো ঠেলেঠুলে কোনমতে আবার জোড়া করে বলল ‘ হুজুর এবারের মতন মাপ করে দিন আজ্ঞে। কিছু সরাব না এখান থেকে, একটা জিনিসও ছোঁব না।‘ গলাটা কার কিছুতেই চিনতে পারল না, খটকা লেগে রইল। গলাটা বলে চলল ‘খবরদার এ কাজে আর হাত দিবি নে। কাজ পারিস, গায়ে গতরে আছিস, দু পয়সাও হয়েছে, এখন আবার এত কিসের রে?’ ‘ আজ্ঞে, আজ্ঞে’ বলে হাত দুটো কপালে ঠেকাল নেতাই। ‘তবে কিনা এখন রুজি রোজগার বন্ধ আর তার ওপরে হাতে পয়সাকড়ি নেই ত, তাই ভুলচরিত্র হয়ে গেছে। যদি মাপ করে দেন।‘ বেড়াল বলে উঠল ‘তাই বলে চুরি করবি? চুরি করা ভাল? ধরা পড়লে এই বয়সে পুলিশের তাড়া খেতে পারবি? আর কেউ তোকে কোনো কাজে লাগাবে যদি জানতে পারে?’ কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপরে হেঁট মাথায় মনে সাহস এনে নেতাই বলল ‘আজ্ঞে তবে আজ আসি? অনুমতি করেন।‘ – ‘ঠিক আছে, সোজা বাড়ি যাবি। আর নেশাভাঙ কমিয়ে দিবি। বুঝলি?’ - ‘আজ্ঞে আজ্ঞে‘ বলে নেতাই কোনমতে ঘামতে ঘামতে হামাগুড়ি দিয়ে জানালার সামনে এসে পড়ল। নিজের জিনিসগুলো ঝোলায় ভরে সেটা কাঁধে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে লাফিয়ে নামতে গেল দোতলা থেকে। কার্নিশ থেকে নামার সময়ে হাতে পায়ে ছড়ে গেল আর পাঁচিলে কোমরের পিছনদিকটা দড়াম করে বেদম লাগল। কোন রকমে গড়াগড়ি খেয়ে উঠে পড়ে পিছন দিকের ফাঁকা জমিতে নেমেই দে দৌড়। রাস্তায় লাইটপোস্টের নীচটায় দাঁড়িয়ে সাহস ফিরল। হ্যাঁ হ্যাঁ করে হাঁফাতে লাগল নেতাই নীচু হয়ে। টর্চবাতিটা একবার জ্বালিয়ে দেখল। ঠিকই আছে। একবার ওদিকটা তাকিয়ে দেখে নিল। যে কে সেই। একদম আগের মতই।  আজ সন্ধ্যায় আবার খানিকটা মুরগি ছাপ খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সাউধ গুণিনের কথাটাই বুঝি সত্যি করে খেটে গেল। আত্মাটা বেরিয়ে এসে অনেক দরকারি কথা শুনিয়ে দিয়েছে-চোখ খুলে দিয়েছে আরেকবার। চুরিটা ভাল কাজ নয় মোটেই। গলাটা কার ছিল এতক্ষণে মনে পড়েছে নেতাইয়ের। গলাটা ত ওর নিজেরই।

 

প্রবন্ধ

মেনকা ও উমা –

বাঙালি মা ও মেয়ের স্নেহ-

ভালবাসাকে জীবন্ত

করে তোলে

ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত 

সোদপুর, কলকাতা

Comments

Top

যিনি পূর্ণ ব্রহ্মময়ী, যিনি সর্বভূতশ্বরী, যিনি ত্রিগুণের কারণ অর্থাৎ ত্রিগুণাতিতা, যিনি সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের কারণভূতা, যিনি সর্ব আনন্দের উৎসের আনন্দময়ী সেই মহা চৈতন্যের আধার চৈতন্য রূপিনী সুকঠিন স্নেহের টানে গিরিরাজ হিমালয় এবং মেনকার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। উমারূপে মেনকার কোল আলো করে সমগ্র গিরিপুর আনন্দে ভরিয়ে দেন – এই পৌরাণিক কাহিনীর মানবিক পাঠ উচ্ছ্বলিত হয়েছে বাল্যলীলা, আগমনী ও বিজয়ার গানে।উমা সামান্য মেয়ে নয় তা মেনকা অনুভব করেছেন স্বপ্ন দর্শনে। চতুর্ভূজ নারায়ণ, পঞ্চমুখ শিব সকল দেবতারাই তাকে মাথায় করে রাখেন। তিনি স্বপ্নে দেখেছেন গড়ুর বাহন-নারায়ণ জোড় হাত করে তার কাছে বিনয় প্রার্থনা করছেন। ‘মুনিগন ধ্যানে যারে না পায়’ এই পরমারাধ্যাকেই তিনি গর্ভে ধারণ করেছেন, -আর এই উমাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জনমানসের তথা বাঙালি মাতৃ হৃদয়ের কন্যা সন্তানের জন্য সুগভীর স্নেহ মমতা-বাৎসল্য উৎকন্ঠা মিলন বিচ্ছেদের সুখ ও আর্তি সুচিহ্নিত হয়ে আছে।

আমার উমা সামান্যা মেয়ে নয়!

গিরি তোমারি কুমারী তা নয়, তা নয়!

স্বপ্নে যা দেখেছি গিরি কহিতে মনে বাসি ভয়

ওহে কারো চতুর্মুখ, কারো পঞ্চমুখ, উমা তাঁদের মস্তকে রয়!...

প্রসাদ ভনে মুনিগণে যোগ-ধ্যানে যাঁরে না পায়,

তুমি গিরি ধন্য, হেন কন্যা-পেয়েছ কি পুণ্য উদয়!

এহেন কন্যাকে নিয়ে মেনকার ব্যস্ততার অন্ত নেই। মেয়ে কথায় কথায় অভিমান করে। অসম্ভব সব বায়না ধরে। কিছুতেই স্তন্যপান করতে চায়না, এমনই দুরন্ত, এমনই চঞ্চলা গিরিবালা, -

উমা কেঁদে করে অভিমান, নাহি করে স্তন্যপান,
নাহি খায় ক্ষীর ননি সরে ॥
অতি অবশেষে নিশি, গগনে উদয় শশী,
বলে উমা ধরে দে উহারে।

শেষে তার সামনে আয়না ধরলে তবে সে শান্ত হয়, -

সানন্দে কহিছে হাসি, ধর মা এই লও শশী,
মুকুর লইয়া দিল করে ॥
মুকুরে হেরিয়া মুখ, উপজিল মহা-সুখ,
বিনিন্দিত কোটি শশধরে ॥

মায়ের আদরে, বাপের সোহাগে, পাড়া প্রতিবেশীদের ভালবাসা গায়ে মেখে বালিকা উমা দিনে দিনে বড় হতে থাকে। কন্যা বড় হলে ভাবী জীবনে স্বামী গৃহে সুখ সমৃদ্ধি যেন পায়, তাই মায়েরা বাল্যকাল থেকেই মেয়েদের নানাব্রত পালন করতে শেখান। উমা রাজকন্যা হলেও তাকে পরের ঘরে দিতে হবে। তাই রানী মেনকা, বালিকা উমাকে ছোট বয়স থেকেই নানাব্রত করতে শেখান। -

নানা ফুল তুলি, চিত্তে কুতুহলী,

গমন কুঞ্জর গমনে।

করুণাময়ী, সঙ্গে সহচরী, প্রেমানন্দে গৌরী,

স্নান মন্দাকিনীর জলে ॥

তারপর ভক্তি সহকারে শঙ্করের পূজা করে এবং শিব যে বিল্ব পত্রে তুষ্ট হয় তাই উমা - …. ‘পূজেন শঙ্কর করবী বিল্বদলে’। তারপর শঙ্করকে প্রণাম করে তাঁর করুণা প্রার্থনা করেন এবং পরে দেখা যায় বালিকা উমা যত বড় হতে থাকে ততই ভাবী জীবনের জন্য সাধারণ বালিকার মত সচেতন হয়ে ওঠে এবং শিবকে স্বামীরূপে পাবার জন্যে কঠোর সাধনা শুরু করে। রাজকন্যা উমার এই অনশন ব্রত দেখে মা মেনকার প্রাণ স্নেহে কাতর হয়ে পড়ে কারণ উমা রাজকন্যা কত আদর যত্নে লালিত পালিত সেই বালিকা, -

ব্রত অনশন, স্বস্তিক আসন,

মান সে শঙ্কর ধ্যান।

দিনকরকরে, শ্রম বারিঝরে,

মলিন সে চাঁদবয়ান॥

কবি রামপ্রসাদের বাণী, কান্দে মেনকা রানী

কি কর কি কর মা এটা।

শিবকে স্বামীরূপে পাবার জন্যে রাজকুমারী উমার এমন কঠোর অনশন ব্রত দেখে জননী মেনকার মন তো চিন্তায় ব্যাকুল। কারণ উমা যার জন্যে এ সাধনা করছে সে তো তার মতো রাজ রাজ্যেশ্বর নয়, তবু উমা যদি তাঁকেই পতি রূপে বরণ করতে চায় তার জন্য তাকে এমন কঠোর তপস্যা করতে হবেনা কারণ তার পিতা গিরিরাজ হিমালয় – সেই হিমালয় – সে সেই হিমালয়েই সকলের আবাসস্থল, সুতরাং বিনা তপস্যায়-উমার মনের বাঞ্ছা পূর্ণ হতে পারে। এখানে রানী মেনকা সব মায়েদের মত আপন ঐশ্বর্যের দিকে তাকিয়ে কন্যা উমাকে সাধারণ শিবের জন্য দেহ পাত করে সাধনা করতে নিষেধ করেন। তবু জননী মেনকার কথায় উমা সাধনা ত্যাগ করেনি। তারপর ব্রত শেষ হলে জননী মেনকা অতি আদরে কন্যাকে কোলে তুলে নেন। তার সোনার পুতলি উমার মলিন মুখ দেখে মায়ের প্রাণ দুঃখে দুনয়নে জল ভরে ওঠে। তিনি আবার তার স্নেহের দুলালীকে রাজকন্যার মত নানা অলঙ্কারে ভূষিত করে তার দিকে চেয়ে আনন্দে বলেন, -

আপন অঙ্গে যখন পড়ে গো আঁখি

উমার অঙ্গ আপন অঙ্গে গো দেখি॥

কি গুণে এ গুণ জন্মিল অঙ্গে।

ওগো পাষাণ প্রকৃতি আমার নাহি কোন গুণ গো।

কাঞ্চন দৰ্পণ উমার অঙ্গ বটে।

প্রতিবিম্ব দেখা যায় দাঁড়ালে নিকটে।

এই উমা যে শক্তিরূপিনী, জগজ্জননী, মেনকার বাৎসল্য প্রেমে তা আবৃত হয়ে পড়ে। তাই সব মায়ের মত তিনিও কন্যাকে সাজিয়ে নিজেরই প্রতিরূপ তার মধ্যে দেখে আনন্দে বিভোর। কারণ উমা তাঁরই তো কন্যা। তারপর একদিন জননী মেনকা কন্যা উমার সম্পর্কে কুস্বপ্ন দেখে অত্যন্ত বিচলিত। তিনি স্বপ্নে দেখেন, -

রাহু গ্রাস করে যে শশীরে,

সেই শশী রাহুর [শিরে]

কোথা গেলে গিরিবর, শিব স্বস্ত্যয়ন কর,

গঙ্গা জল বিল্বদল আনি।

এখানে যশোদা পুত্র কৃষ্ণের প্রতি কোনও অশুভ সংকেত দেখে যেমন বিচলিত হয়ে নানা দেবতার পূজা পাঠের আয়োজন করে পুত্রের কল্যাণ কামনা করেছেন, এখানে মেনকাও উমাকে সাধারণ কন্যা ভেবে তার কল্যাণ কামনার জন্যে গিরিরাজের কাছে প্রার্থনা জানান। তারপর প্রতিদিনের মত তিনি কন্যাকে প্রভাতে শয্যা থেকে তুলে, -

হিমগিরি সুন্দরী, স্নান করাইয়া গৌরী,

পুনঃ বসাইল সিংহাসনে। :

তখন গদগদ ভাব ভরে, ঝরঝর আঁখি ঝরে,

‘সাজাইল যেমন উঠে মনে ॥

সুচারু বকুল মালে, কবরী বান্ধিল ভালে,

হরি চন্দনের বিন্দু দিল ।

উপরে সিন্দুর বিন্দু, রবি করে যেন ইন্দু

হেরি হেরি নিমিষ তেজিল ॥

কবি রামপ্রসাদ বলে এইভাবে জননী মেনকা কন্যাকে নানা সাজে সাজিয়ে নিজেই কন্যার রূপ দেখে অবাক। বকুলের মালা দিয়ে তার কবরী বেঁধে দিলেন, চন্দনের ছোট বিন্দু কপালে দিয়ে তার মধ্যে ছোট একটি সিন্দুরের বিন্দু দেন। গলায় মুক্তার হার। এ রূপ যেন চাঁদকেও হার মানায়। যশোদা যেমন বালক কৃষ্ণকে নানা সাজে সাজিয়ে তার মুখের দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকে আবার তাকে নাচতে বলেন – তখন বালক মায়ের কথায় নুপূরের রুনুঝুনু শব্দ করে আনন্দে নাচতে আরম্ভ করে। এখানে মেনকাও সেইরকম ভাবে, -

রাণী বলে, আমি সাধে সাজাইলাম, বেশ বানাইলাম,

উমা একবার নাচো গো ।

একবার নেচেছে ভবে, তেমনি কোরে আবার নাচিতে হবে,

নুপুর দিয়াছি পায়, সুমধুর ধ্বনি [তায় গো !]

এরপর সমাজ নীতি মেনে তার বিবাহের তোড়জোড় চলতে লাগল। শেষে নারদের পরামর্শে দেবাদিদেবের সঙ্গেই উমার বিয়ের ব্যবস্থা পাকা করলেন গিরিরাজ। কিন্তু এই অসমবর্ষীয় বিবাহে বাদ সাধলেন মা মেনকা।
শিব হিমালয়ের প্রাসাদে এসে পৌঁছাতেই মেনকা বেরিয়ে এলেন। বললেন, 'কই, শিব কই? দেখি আমার জামাই কেমন; যাকে পেতে মেয়েটা আমার এমন কঠোর তপস্যা করলে। সে নিশ্চয় পরম সুন্দর।'
তারপর একে একে মেনকা দেখলেন বরুণ, যম, ইন্দ্র, সূর্য, চন্দ্র, ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও বৃহস্পতিকে। প্রত্যেকেই পরম সুদর্শন পুরুষ। কিন্তু নারদ মেনকাকে বললেন, এঁরা কেউই শিব নন, শিবের অনুচর মাত্র। শুনে মেনকার আনন্দ আর ধরেনা। এমন সুদর্শন দেবতারা যদি শিবের অনুচর মাত্র হন, তবে শিব নিজে কতনা সুদর্শন। কিন্তু কোথায় শিব? শেষে এলেন শিব। নারদ মেনকাকে বললেন, 'ইনিই শিব।' জামাইয়ের অমন ভীষণ মূর্তি দেখে মেনকা তো মূর্ছা গেলেন।
মূর্ছা যাবেনই বা কেন? ষাঁড়ের পিঠে চড়ে এসেছিলেন শিব। তিনটে চোখ, পাঁচটা মাথা, দশটা হাত, গায়ে মাখা ছাই, কপালে চন্দ্র, পরনে বাঘ ছাল, গলায় খুলির মালা। সঙ্গী ভূত প্রেতেদের যেমন চেহারা, তেমনই ভয়ানক তাদের চিৎকার।
জ্ঞান ফিরতে মেনকা বিলাপ করতে লাগলেন। এমন লোক কে পাত্র নির্বাচনের জন্য তিনি হিমালয়, নারদ ও উমাকে তিরস্কার করতে লাগলেন। ব্রহ্মা, অন্যান্য দেবগণ ও ঋষিরা মেনকাকে শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন।
মেনকা বললেন, 'আমি এমন শিবের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেব না। বরং মেয়েকে বিষ দিয়ে মারব, কুয়োয় ফেলে হত্যা করব, টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলবো, সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দেবো। আমি আত্মহত্যা করব। কিন্তু উমার বিয়ে আমি অন্য কারোর সঙ্গে দেবো।' উমাও বেঁকে বসলেন। বললেন, 'শিব ছাড়া আমি আর কাউকেই বিয়ে করব না’। বিষ্ণু মেনকাকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মেনকা কোনো কথাই শুনলেন না। শেষে নারদ শিবকে মনোহর রূপ ধারণ করার অনুরোধ করলেন। শাশুড়িকে শান্ত করতে শিবকে তাই করতে হল। শিবের শরীর সহস্র সূর্যের প্রভাময় হল, মস্তকে শোভা পেল দিব্য মুকুট, অঙ্গ আবৃত হল বহুমূল্য বস্ত্রে, কণ্ঠের অলংকাররাজি নক্ষত্রদেরও লজ্জা দিতে লাগল। শিবের সেই মনোহর রূপ দেখে সবাই মোহিত হলেন। এমনকি মেনকাও। নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য ক্ষমা চাইলেন মেনকা। শিব ও পার্বতীর বিবাহে তাঁর আর কোনো আপত্তি রইলনা। ব্রহ্মার পৌরোহিত্যে শিব ও উমার বিবাহ সম্পন্ন হল।

উমা বছরে মাত্র তিন দিনের জন্য বাপের বাড়িতে আসেন। মেনকার কাছে এই দিনগুলি পরম আনন্দের দিন হয়ে দেখা দেয়। উমার আগমনে বাংলার ঘরে ঘরে, বাংলার আকাশ বাতাস প্রকৃতিতে আনন্দময়ীকে বরণের বার্তা রটে যায়। দৈবী ভাবকে আশ্রয় করে এ এক অনির্বচনীয় মানব রসের উদ্ভাসন। এ এক মহা কব্যিক রস ব্যঞ্জণার আস্বাদ।

যাই হোক, এদিকে মেনকা শুনেছেন, বিয়ের পরে হরের ঘরে উমা দুঃখে আছেন। মেয়ের দুঃখের কথা শুনে অবধি মেনকার রাত্রে ঘুম নেই। দুঃস্বপ্ন দেখেন, -

কুস্বপন দেখেছি গিরি উমা আমার শ্মশান বাসী

অসিত-বরণা উমা মুখে অট্ট অট্টহাসি॥

এলোকেশী বিবসনা, উমা আমার শবাসনা,

ঘোরাননা ত্রিনয়না, ভালে শোভে বাল শশী;

ঘুম ভেঙে যায় মেনকার। কন্যাকে দর্শনের জন্য অধীর হয়ে ওঠেন। দুঃস্বপ্নের কথা গিরিরাজকে জানান

আমি কি হেরিলাম নিশি-স্বপনে!
গিরিরাজ, অচেতন কত না ঘুমাও হে!
এই এখনি শিয়রে ছিল,

গৌরী আমার কোথা গেল হে,
 

আদরের কন্যা স্বপ্নে দেখা দিয়ে আবার হারিয়ে গেলে মায়ের উদ্বেগ কাতরতা আরও বাড়ে। মা জানেন তার আদরের দুলালী কুলীন পাত্র শিবের ঘরে গেছে,– তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। এই দুর্ভাবনা থেকেই মেনকা স্বপ্নে দেখেন, -

বাছার নাই সে বরণ, নাই আভরণ,

হেমাঙ্গী হইয়াছে কালীর বরণ,

হেরে তার আকার, চিনে উঠা ভার,

সে উমা আমার, উমা নাই হে আর

স্বামীর ঔদাসীন্য দেখে মেনকার অভিমান আরও বৃদ্ধি পায়। সেই আশঙ্কায় তিনি স্বামীকে বলেন, -

কবে যাবে বল গিরিরাজ, গৌরীরে আনিতে ।

ব্যাকুল হৈয়েছে প্রাণ উমারে দেখিতে হে ।।

গৌরী দিয়ে দিগম্বরে, আনন্দে রোয়েছো ঘরে;

কি আছে তব অন্তরে, না পারি বুঝিতে।

কৈলাশে উমার অবস্থান করার সময় মেনকা যখন উদ্বিগ্ন ও উৎকন্ঠিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন তখনই আকাশে বাতাসে শরৎ ঋতুর আগমনী বার্তা ঘোষিত হয়। তাই শরতের আভাস পাওয়া মাত্রই মেনকা চঞ্চল হয়ে ওঠেন, -

'শরতের 'বায়ু যখন লাগে গায়,উমার স্পর্শ পাই, প্রাণ রাখা দায়,যাও যাও গিরি আন গে উমায়উমা ছেড়ে আমি কেমন করে রই।'স্বামী-স্ত্রীর সহযোগিতায় যেমন বাস্তব সংসার জীবন সুখের হয়ে ওঠে, তেমনি উমা ও শিবের সংসার কল্পনার মধ্যেও কবি দেখিয়েছেন তাঁদের পরস্পর নির্ভরশীলতার চিত্র।

দেবতাদের উপকার করতে গিয়ে শিব বিষপান করে বিষের স্পর্শে তিনি সে যন্ত্রণা ভুলে যান। তাই শিব গৌরীকে কখনো ছেড়ে থাকতে চান না। এ কথাটি গিরিরাজ ভালোই জানেন, তিনি বললেন-'বারে বারে কহ রাণী গৌরী

আনিবারে জানতো জামাতা রীত অশেষ প্রকারে।

রাখি অমরের মান হরের গরল

পানদারুণ বিষে জ্বালা না সহে শরীরে।

উমার অঙ্গের ছায়া শীতলে শঙ্কর কায়াসে অবধি শিব জায়া বিচ্ছেদ না করে।'

মেনকার মন মেয়ের জন্য ছটফট করছে। তিনি হিমালয়কে বারেবারে অনুরোধ করছেন, মেয়ে উমাকে কৈলাশ থেকে নিয়ে আসার জন্যে। হিমালয় আজ নয় কাল করে করে মেনকাকে ভুলিয়ে রেখেছেন। স্ত্রীর এই অনুরোধেও গিরিরাজ হিমালয় যখন কন্যা আনার জন্যে তৎপরতা দেখান না, তখন মেনকা গিরিরাজকে অভিযোগ করে বলেন, -

আজি কালি করে দিবস যাবে, প্রাণের উমারে আনিবে কবে?

প্রতিদিন কি হে আমায় ভুলাবে এ কি তব অবিচার?

এদিকে মল মাসের জন্য পঁয়ত্রিশদিন দেরি হয়ে গেছে। মা মেয়েকে বারবার স্বপ্নে দেখেছেন উমা ‘মা মা’ বলে কেঁদেছে মায়ের কাছে আসবেব লে।

যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী,
উমা কেমন রয়েছে।
আমি শুনেছি শ্রবণে, নারদ-বচনে,
মা মা বলে উমা কেন্দেছে॥

এরপর উমা আনার সময় হলে স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে গিরিরাজ হিমালয় উমাকে আনার জন্য কৈলাশে যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করেন। এই সময় মেনকা গিরিরাজকে তার মনের একান্ত আকাঙ্খা জানিয়ে বলেন, -

গিরি ! এবার আমার উমা এলে, আর উমা পাঠাব না।

বলে বলবে লোকে মন্দ, কারো কথা শুনব না৷

যদি আসে মৃত্যুঞ্জয়, উমা নেবার কথা কয়,

এবার, মায়ে বিয়ে করব ঝগড়া, জামাই বলে মানব না৷

শেষ পর্যন্ত মেনকার অনুরোধে গিরিরাজ কন্যাকে আনবার উদ্দেশ্যে কৈলাশে রওনা দিলে মেনকার হৃদয় নানা ভাবনায় ব্যকুল হয়েছে, -

গিরিরাজ গমন করিল হরপুরে ।

হরিষে বিষাদে, প্রমোদ প্রমাদে

ক্ষণে দ্রুত, ক্ষণে চলে ধীরে।

মেনকা গিরিরাজকে বারবার কন্যা আনবার তত্ত্বকথা মনে করিয়ে দেন যাতে করে জামাইয়ের কোনও অসম্মান না হয়, -

শিবকে পূজিবে বিল্বদলে, সচন্দন আর গঙ্গাজলে, ভুলবে ভোলার মন

অমনি সদয় হবেন সদানন্দ, আসিতে দিবেন হারাতারা ধন।

উমা সাধারণত বাঙালি মেয়েদের মত পিতার গৃহে যাবার জন্য স্বামীর অনুমতি প্রার্থনা করেন। তিনদিন পর সে ফিরে আসবেন, পতির কাছে সে কথা জানাতেও ভোলেননা। শিবও সাধারণ স্বামীর মতই উমাকে পিতৃগৃহে যাবার অনুমতি দেন। কবি ঈশ্বর গুপ্ত পদ সৃষ্টি করেছেন শিবের জবানিতে, -

জনক-ভবনে যাবে, ভাবনা কি তার?
আমি তব সঙ্গে যাব, কেন ভাব আর!
আহা আহা, মরি মরি, বদন বিরস করি,
প্রাণাধিকে প্রাণেশ্বরি, কেঁদোনাকো আর।

উমা এবার গিরিপুরে এলেন। সারা গিরিপুর জুড়ে আনন্দের সাড়া পড়ে গেছে। উমা বরণের আয়োজন চলতে থাকে সাড়ম্বরে, -

মৃদঙ্গ মোহিনী, দুন্দুভি দরপিণী,

বাজিছে বিবিধ প্রকার গো গিরি-পুরে।

নগর রমণী, উলু উলু ধ্বনি,

আনন্দে দিছে বারেবার॥
বিজয়া হেন কালে, আসি রাণীরে বলে,

বিলম্ব কেন কর আর, গো রাণি।

কমলা কান্তের, জননী ঘরে এলো,

প্রাণের গৌরী তোমার।

নগরবাসী ছুটে চলে নগরদ্বারের দিকে। মেনকাও ছুটে চলেন তাদের সঙ্গে কন্যা বরণের জন্য, -

আমার উমা এলো বলে, রাণী এলোকেশে ধায়।
যত নগর নাগরী, সারি সারি, দৌড়ি, গৌরী পানে চায়।
কার পূর্ণ কলসী কক্ষে, কার শিশু বালক বক্ষে,
কার আধশিরসী বেণী, কার আধঅলকা শ্রেণী,
বলে চল চল, অচল তনয়া, হেরি উমা দৌড়ি আয়।

দু-হাত বাড়িয়ে দেন কন্যার দিকে। তৃষিত মাতৃ হৃদয় শান্ত হতে চায় কন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, -

উমা গো যদি দয়া কোরে হিমপুরে এলি, আয় মা করি কোলে।
বর্ষাবধি হারায়ে তোরে, শোকের পাষাণ বক্ষে ধরে, আছি শূন্য ঘরে।
মেয়েকে কোলে বসিয়ে আদরে আদরে ভরিয়ে দেন মেনকা। মুখ চুম্বনে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন। হাজারো প্রশ্নে চকিত করে তোলেন উমাকে,

কেমনে মা ভুলে ছিলি এ দুঃখিনি মায়?

পাষাণ নন্দিনী তুইও কি পাষাণীর প্রায়?

সম্বৎসর হল গত, তোর বিরহে অবিরত

কেঁদেছি কহিব কত, আমি মা তোমায়।

কন্যা পিতৃগৃহে এসেছে। সাধারণ বাঙালি মায়ের মতই মেনকারও জানার ইচ্ছা উমা পতিগৃহে কেমন আছে বা জামাই আছে কেমন?

কেমন করে হরের ঘরে, ছিলি উমা বল মা তাই।
কত লোকে কত বলে, শুনে প্রাণে মরে যাই ৷৷
চিতা ভস্ম মেখে অঙ্গে, জামাই বেড়ায় মহা রঙ্গে।
তুই না কি মাতারই সঙ্গে, সোনার অঙ্গে মাখিস ছাই ৷৷

এবার মেনকার পরিবর্তে উমার মনোবেদনা। মায়ের প্রতি তার অভিমান ফুটে ওঠে, -

তুমি তো মা ছিলে ভুলে,
আমি পাগল নিয়ে সারা হই।
হাসে কাঁদে সদাই ভোলা,

জানে না মা আমা বই।
ভাং খেয়ে মা সদাই আছে,
থাকতে হয় মা কাছে কাছে,
ভাল-মন্দ হয় গো পাছে,

সদাই মনে ভাবি ওই॥

সাধারণ বাঙালি ঘরে দেখা যায় বিয়ের পর বাপের বাড়ির প্রতি মেয়ের আকর্ষণ দিন দিন কমে আসে। মেয়ে স্বামীর ঘরে সন্তান ও সংসারের বিভিন্ন কাজকর্মে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে বাপের বাড়িতে সময় অতিবাহিত করার অবকাশ পায় না। তাছাড়া নববধূরসুলভ ভীতিও বাপের বাড়িতে আসার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা যায় নিজের সংসার ফেলে রেখে বাপের বাড়িতে বেশিদিন থাকতেও চায়না। শ্বশুর বাড়িতে প্রত্যাবর্তনের জন্য নানা ছলনারও হয়ত আশ্রয় গ্রহণ করে। উমাও তার ব্যতিক্রম নয়, -
এসেছিস্ মা – থাক্ না উমা দিন-কত।
হয়েছিস্ ডাগর-ডোগর, কিসের এখন ভয় এত?
বলিস যদি আনি মা, জামাই,
সকালে লোক কৈলাসে পাঠাই,
সবাই মিলে করবো যতন  

যোগাব তার মন্-মত।

মা-মেয়ের এই মিলন বাস্তবিক স্বর্গীয় সুষমা মন্ডিত। আমাদের প্রতিদিনের ধূলি-ধূসরিত পৃথিবীর দিকে চোখ পাতলে যে চির অমলিন দৃশ্যটি আমাদের মুগ্ধ করে তা এই মিলন বাৎসল্য। তবু বিয়ের পরবর্তীকালে মেয়ের উপর মায়ের আর কোনও জোর থাকে না। বাঙালি মায়ের পক্ষে এই নির্মম করুণ সত্যটি কাব্যে উপস্থিত করার ফলে পদটি জীবন্ত ও মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে। গার্হস্থ্য ভাব প্রধান হওয়ার জন্যে মহাদেব, উমা, হিমালয়, মেনকা সব চরিত্রই মানবিক গুণে সমৃদ্ধ। সাধারণ গৃহস্থ ঘরের পত্নী ও কন্যা রূপে মহামায়ার চরিত্রটি অলৌকিকত্ব ও দৈবী মহিমা বিবর্জিত হয়ে একান্ত পরিচিত বস্তু জগতের মানবী হয়ে উঠেছে।

সপ্তমীর প্রভাতে মা-মেয়ের প্রভাত রাগিণী বেজে ওঠে। তারপর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী তিন দিন হাসি, আনন্দে উচ্ছ্বাসে মা মেয়ের কেটে যায়। “দেখিতে দেখিতে নবমী-নিশীথ আসিয়া পড়িল, এই রজনী প্রভাতেই বিদায় লগ্ন, হিমালয় অন্ধকার করিয়া উমা অন্তর্ধান করিবে। তাই এই রজনীকে বিলম্বিত করিবার জন্য মায়ের  সে কি আকুল মিনতি, সকরুণ প্রার্থনা। এখনও গৃহে স্বর্ণদ্বীপের আলো কিন্তু রাত্রি প্রভাতেই সে সব অন্ধকার হইয়া যাইবে…। মাতৃ হৃদয়ের কন্যা বিশ্লেষ জনিত আর্তি পৃথিবীর করুণতম বেদনার স্মারক। শরৎ সপ্তমীর দিনে সমস্ত বঙ্গভূমির ভিখারী-বধূ কন্যা মাতৃগৃহে আগমন করে এবং বিজয়ার দিনে সেই ভিখারী ঘরের অন্নপূর্ণা যখন স্বামী গৃহে যায় তখন সমস্ত বাংলার চোখ যেন অশ্রুপূর্ণ হয়ে ওঠে। শাক্ত কবিরা লিখছেন, -

রজনী, জননী, তুমি পোহায়ো না ধরি পায়,
তুমি না সদয় হ'লে উমা মোরে ছেড়ে যায়।
সপ্তমী অষ্টমী গেল, নিষ্ঠুর নবমী এল,
শঙ্করী যাইবে কাল, ছাড়িয়ে দুখিনী মায়।

ওদিকে মা মেনকার করুণ আর্তি

শুনগো রজনি, করি মিনতি তোমারে।

অচলা হও আজকের তরে, অচলারে দয়া করে।

সাধে কি নিষেধে দাসী, তুমি অস্তে গেলে নিশি,

অস্তে যাবে উমা শশী, হিমালয় আঁধার করে।

দেখতে দেখতে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী দিনগুলি পেরিয়ে যায়। নেমে আসে নবমী নিশি। বিচ্ছেদের কাল রাত্রি। রাত পোহালেই উমা বিদায় নেবেন। নবমীর রাত থেকেই বাদ্যির সুরটা বেসুরো বাজছিল। ঢাকের আওয়াজ যেন বিলাপ করছিল, “ওগো নবমীর নিশি আর পোহাইয়ো না”।

ওরে নবমী নিশি! না হৈও রে অবসান।
শুনিছে দারুণ তুমি, না রাখ সতের মান॥
খলের প্রধান যত, কে আছে তোমার মত;

আপনি হইয়ে হত, বধ রে পরেরই প্রাণ॥
সকাল হলেই যে গিরিরাজ প্রাসাদ শূন্য করে দিয়ে আবার কৈলাশে ফিরে যাবে উমা। আবার আসবে এক বছর পর। চারদিন গিরি রাজপ্রাসাদ আলো করে এসেছিল শিবের ঘরণী উমা, পার্বতী। এই চারটে দিনের জন্য অপেক্ষা করে থাকে মা মেনকা। নবমীর বিকেল থেকেই বুকের ভিতরটা থেকে থেকে কেমন যেন ডুকরে উঠছিল মেনকার। মেয়েকে বিদায় দেওয়ার লগ্ন যেন আর একটু পিছিয়ে যায়, কর জোড়ে দেবী উষার কাছে প্রার্থনা করছিল মা মেনকা।

কিন্তু সব আশার, সব কামনার সমাপ্তি ঘটিয়ে দশমী প্রভাতের আবির্ভাব হয়- মেনকাকেও বাস্তব সত্য মেনে নিতে হয়। দশমী প্রভাতে মা মেনকার মনোবেদনা ব্যক্ত হয়েছে নিম্নলিখিত পদে যেখানে মেনকার মাতৃরূপ বিকশিত, দৈব ভাবনার বিন্দুমাত্র প্রকাশ নেই,-

কি হল নবমী নিশি হইল অবসান গো।
বিশাল ডমরু ঘনঘন বাজে ধ্বনি বিদরে প্রাণ গো।
কি কহিব বল দুঃখ, গৌরী পানে চেয়ে দেখ
মায়ের মলিন হয়েছে অতি সুবিধু বয়ান–
তা সত্বেও সখী বিজয়া কে মেনকা বলে দেন যে, সে যেন হর কে বলে দেয় যে উমাকে পাঠানো যাবে না,-

জয়া বল গো! পাঠান হবে না,
হর মায়ের বেদন কেমন জানে না॥
তুমি যত বল আর, করি অঙ্গীকার, ও কথা আমারে বোলো না॥
মেনকার এই প্রার্থনা বিফলে যায়। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে নবমীর নিশি অবসান ঘটে এবং বিজয়া এসে হাজির হয়। বিজয়ার সাথে কৈলাশ থেকে শিব ডমরু বাজিয়ে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে শ্বশুর বাড়ি হিমালয়ে এসে উপস্থিত হন। এতে মেনকার বুক আরও ফেটে যায়। শেষ পর্যন্ত মেনকা তাঁর কন্যাকে আটকে রাখতে পারেন না, শিব উমাকে নিয়ে কৈলাশের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এই সময় মেনকা গিরিরাজকে তাঁর দুঃখ জানিয়ে বলেন,-

আমার গৌরিরে লয়ে যায় হর আসিয়ে
কী করি হে গিরিবর রঙ্গ দেখ বসিয়ে?
বিনয় বচনে বুঝাইলাম নানা মতো
শুনিয়া না শুনে কানে ঢলে পড়ে হাসিয়া।
তবুও উমাকে বিদায় দিতে হয়। পথ ছেড়ে দাঁড়াতে হয় কন্যার। শেষবারের মত কন্যা মুখ দর্শন করতে চান, উমাকে পথের মধ্যে দাঁড় করিয়ে দেন মেনকা, -

ফিরে চাও, গো উমা! তোমার বিধু মুখ হেরি।
অভাগিনী মায়েরে বধিয়ে, কোথা যাও, গো!॥

কন্যার কাছে আবার আসবার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেন, -

এসো মা এসো মা উমা বলো না আর যাই যাই

মায়ের কাছে হৈমন্তী ও কথা মা বলতে নাই

এ যেন বাঙালি মাতার কন্যা বিচ্ছেদ বেদনাকেই ধ্বনিত করে। মা মেনকা চোখের জলে বিদায় দান কালে অনুরোধ করেন, -

বৎসরান্তে আসিস্ আবার, ভুলিস না মায়, ও মা আমার

চন্দ্রাননে যেন আবার মধুর মা বোল শুনতে পাই

উমা চলে যান। মেনকা ঘরে ফিরে আসেন। ঘরের অন্ধকার আজ তার কাছে বেশি জমাট জমাট লাগে, -

রতন ভবন মোর আজি হৈল অন্ধকার,
ইথে কি রহিবে দেহে এ ছার জীবন।

এই দেবী দুর্গাই যে শিবের স্ত্রী উমা একথা নিশ্চিত ভাবে বলা না গেলেও, লৌকিক ও পৌরাণিক আখ্যান মিশে গিয়ে সত্যি সত্যি দুর্গা বা শিব-পার্বতী, এঁরা সকলেই প্রতি বছর শরতের শিউলি তলায় – আম-কাঁঠালের ঘেরা পানা পুকুরের ঘাটে নেমে আসেন আর অখিল বিমানে ধ্বনিত হয় মর্তের আনন্দ বাণী। যেখানে ভক্তির সাথে মিশে যায় লৌকিক আবেগ আর বাৎসল্য-প্রতি বাৎসল্যের অনুভূতিতে দেবী হয়ে ওঠেন ঘরের মেয়ে।

 

প্রবন্ধ

ঘুড্ডি দিয়াছে উড়াই,

হাতে রাখিয়া নাটাই

মিজানুর রহমান মিজান

বিশ্বনাথ, সিলেট, বাংলাদেশ

Comments

Top

মানুষ সৌন্দর্য পিপাসু এবং চিত্তের বিত্তশালী হতে বিভিন্ন প্রকার কর্মকান্ড পরিচালনা করে। আনন্দ ও সৌন্দর্য পরস্পর সম্পর্কিত। আনন্দ উপভোগ করার সাথে জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃতি লাভ করে। তাই আনন্দ উপভোগের বিভিন্ন প্রকার উপকরণ দ্বারা আনন্দ প্রাপ্তির প্রচেষ্টা থাকে অব্যাহত। মানুষের রুচির সাথে বিনোদনও পরিবর্তিত হয়ে থাকে। আজ যা সর্বাধিক জনপ্রিয়, কালের চাকায় আবর্তিত হয়ে নিত্য নুতন আনন্দের উপকরণ সংগ্রহে তা বদলে ফেলে বা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শুধুমাত্র স্মৃতি পরায়ণতার এ্যালবামে দৃশ্য হয়, জাগরিত থাকে, ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে একাকী রোমন্থনে ফিরে যায় সোনালী অতীতে।বলছিলাম শিশু-কিশোর ও যুব সম্প্রদায় এক সময় বিনোদনের হাতিয়ার রূপে গণ্যে নীলাকাশের বুকে উড়াতো ঘুড়ি। মনের আনন্দে আর সৌন্দর্যবোধের অপূর্ব আকর্ষণে হতো উদ্বেলিত। প্রেক্ষাপটে আজ গ্রাম বাংলার মাঠ-ঘাট ফাঁকা ধূঁ ধূঁ বালুচর। 

গ্রাম প্রধান বাংলার আকাশ-বাতাস হত মুখরিত নবান্নের পর পরই শুরু হত ঘুড়ি উড়ানো।গ্রামের মানুষ অগ্রহায়ণ মাসে ক্ষেতের ধান উত্তোলন করে প্রায় চৈত্র মাস পর্যন্ত অবসর জীবন যাপন ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। স্বভাবতই মানুষ পরিশ্রমের পর ক্লান্তি দূরীকরণে, অবসর সময় অতিবাহিত করার মানসে নিমগ্ন থাকতো বিনোদন প্রাপ্তির প্রত্যাশায়। বিনোদনের তখনকার একটি প্রধান হাতিয়ার ছিল ঘুড়ি উড়ানো। গ্রামের মাঠে দলবেঁধে প্রতিযোগিতা হত ঘুড়ি উড়ানোর। সে মুহূর্তগুলি কত আনন্দ উচ্ছ্বাসের তা অনেকটা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শুধু মাত্র অনুভব আর অনুভূতিতেই জন্ম লাভ সম্ভব। একান্ত নিজস্ব অনুভূতির অন্তর্ভুক্ত। 

ঘুড়ি ছিল কয়েক প্রকার। যেমন চিলা ঘুড়ি, সাপ ঘুড়ি, বাক্স ঘুড়ি ইত্যাদি। চিলা ঘুড়ির প্রচলন ছিল সর্বত্র। যে কেহ ঐ ঘুড়ি উড়াতে সহজ সাধ্যতাবোধ করতেন। অনেকে স্বল্প সুতার দ্বারা ঘুড়ি উড়াতেন এবং ছোট শিশুদের কম সুতার সাহায্যে উড়ানোর ব্যবস্থা করে দিতেন। শিশুদের অপেক্ষাকৃত বড় তথা কিশোর যুবকরা উড়াতেন অনেক সুতার নাটাই তৈরীর মাধ্যমে ঘুড়ি। ঘুড়ির নাটাই এ যে সুতা ব্যবহৃত হত তাতে প্রয়োগ করা হত বিশেষ কৌশল। কৌশলটি ছিল খালি কাঁচের বোতল বা পরিত্যক্ত ভাঙ্গা গ্লাসকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে গমের সাহায্যে সুতায় হত লাগানো। গ্লাসের বিচূর্ণ অংশ লাগানো সুতার নাটাই দ্বারা উড়ন্ত ঘুড়ি অপর ঘুড়িকে কৌশলে নাটাইয়ে লাগিয়ে টান দিলে নাটাই কেটে বা ছিঁড়ে গিয়ে ঘুড়ি হত

পতিত। অনেক সময় কেটে যাওয়া ঘুড়ি অনেক দুর চলে যেত মালিকের নাগালের বাইরে। মালিক ঐ ঘুড়ির আশা ছেড়ে, পরিত্যাগ করে আবারো নুতন ঘুড়ি তৈরীর কাজে হত ব্যস্ত। উন্নত ঘুড়ি এবং নাটাই তৈরী করে পরাজিত হবার দুর্নাম ঘুচানোর চিন্তা-চেতনা থাকত মন ও মননে। হত তৈরী একের পর এক ঘুড়ি প্রস্তুত বা ক্রয়ের। অনেক সময় সুতা কাটা ঘুড়ি আটকা পড়ত উঁচু কোন গাছের ডালে বা বাঁশ ঝাড়ের সর্বোচ্চতে। থাকত অনেক দিন ঝুলন্ত অবস্থায়। যা দেখে ঘুড়ির মালিক আপসোস করতেন দীর্ঘদিন পর্যন্ত।অনেকে মালিককে উপহাসের পাত্র বানিয়ে করতেন হাসি তামাসা। অবশেষে একদিন বৃষ্টি বা ঝড়ের কবলে পড়ে হত নিশ্চিহ্ন। চিলা ঘুড়ি তৈরীতে ছোট ছোট বাঁশের মাত্র দুটি শলাকা এবং প্রয়োজন ছিল রঙ্গিন কাগজের। সাপ ঘুড়িতে শলাকার পরিমাণ যেমন ছিল বেশি, তেমনি শলাকা হত অপেক্ষাকৃত লম্বা। কাগজের পরিমাণ ও হত অধিক। অনেক লম্বা সাপের আকৃতি পূর্ণ বলে সাপ ঘুড়ি নামকরণ ছিল প্রসিদ্ধ। সাপ ঘুড়ি উড়াতেন সাধারণত চিলা ঘুড়ির সৌখিনতার থেকে অধিক সৌখিন ও সৌন্দর্য পিপাসুরা। উহার নাটাই সাধারণত নৌকা টানার গুণ দ্বারা হত পরিচালিত। ঐ ঘুড়ি আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় এক প্রকার শব্দ হত যা ছিল আকর্ষিক। ঘুড়ির মালিকসহ দর্শকরা হতেন তম্ময়াচ্ছন্ন। বাক্স ঘুড়ি বাক্সের অনুরুপ বলে এ নামে ছিল অভিহিত বা পরিচিত। সে জাতীয় ঘুড়ি উড়াতেন শক্ত সামর্থ্য যুবক শ্রেণী এবং ব্যয়বহুল হেতু উচ্চাভিলাসীরাই আনন্দের উৎস রূপে গণ্য করতেন। 

ঘুড়ি নিয়ে অনেক মজাদার ও রসালো কাহিনী, উপাখ্যান ছিল বিরাজমান। অনেকে হতেন মর্মাহত ছিঁড়ে যাওয়ায় বা প্রতিযোগিতায় পরাজয় বরণ এর দুর্নামের অংশীদার হয়ে। কার্তিক মাসে মাঝে মাঝে আকাশে ঘুড়ি দৃষ্ট হলেও পৌষের শীতল ও মৃদু মন্দ বাতাসে দেখা যেত ঘুড়ির সংখ্যাধিক্যতা। ভারী ঘুড়ির সহিত থাকত ঘুংঘুর সংযুক্ত। উহার রিনিঝিনি শব্দ মনে লাগাতো দুল, হৃদয়ে জাগাতো স্পন্দন। অনেকে ঘুড়ি তৈরী করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে সাংসারিক আয়ের উৎস রূপে করতেন ব্যবসা। বাজারে পাওয়া যেত প্রচুর পরিমাণে। আজ ঘুড়ির সাথে বর্তমান প্রজন্ম অজ্ঞাত, অজানা, অচেনা থেকেই যাচ্ছে। কারণ ঘুড়ি উড়ানোর সংস্কৃতি উধাও হয়েছে বদলের আবহাওয়ায়। ‍ঘুড়ি নিয়ে অনেক উপাখ্যান রয়েছে বয়োজৈষ্টদের স্মৃতির জানালায়।হয়েছে রচিত অনেক কবিতা, গান আধ্যাত্মিক চিন্তা চেতনার বহি:প্রকাশ রূপে। যেমন - ঘুড্ডি দিয়াছে উড়াই, হাতে রাখিয়া নাটাই, বেলা শেষে আনে সুতা টানি।       

 

প্রবন্ধ

Comments

Top

বিচ্ছেদ 

মিজানুর রহমান মিজান 

বিশ্বনাথ, সিলেট, বাংলাদেশ

নিমেষেই টুটে গেল দীর্ঘ দিনের ভালবাসার বন্ধন, মমত্বের শৃঙ্খল, বন্ধুত্বের নিদর্শন। বহু দিনের তিলে তিলে গড়া, সঞ্চিত আবেগ আর অনুভূতির অপমৃত্যু হল ছোট একটি সংবাদ, ফিসফিস কথাবার্তাকে উপলক্ষ্য করে। হায়রে জগত সংসার-ধ্বংস করা যত সহজ, গড়া কিন্তু বড় কঠিন, কষ্টসাধ্য অত্যন্ত পরিশ্রমের ফসল। 

১৯৭৪ সালে আমি অষ্টম শ্রেণিতে পাঠরত। নভেম্বর মাসের এক বিকেলে স্কুল ছুটির পর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিয়েছি অত্যন্ত দ্রুতলয়ে। উদ্দেশ্য পেটের ক্ষুধা নিবারণের পরবর্তী পর্যায়ে যৌবনের বা কৈশোরের স্বভাবসিদ্ধতায় খেলাধুলায় অংশ গ্রহণ। আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহপাঠী ঐ দিন স্কুলে যায় নাই বলে আমি ছিলাম একাকী। হঠাৎ পিছন থেকে শুনতে পেলাম আমাকে যেন কে ডাকছেন অত্যন্ত আদরজড়িত কণ্ঠে। তাকাতেই হাতের ইশারায় দাঁড়াবার সংকেত দিলেন এলাকার একজন বর্ষীয়ান ব্যক্তি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাঁড়ালাম।যেহেতু আমি বরাবরই বর্ষীয়ানদের উপেক্ষার অপবাদ থেকে রেহাই এবং মনের গভীর অনুভূতি থেকে সমীহ, শ্রদ্ধা প্রদর্শন করি। কারণ আমাদের সমাজ উভয়কুলে আপনার সমালোচনায় মুখরিত হবে। তবে মন্দটা একটু বেশি বৈ কি? 

“পাছে লোকে কিছু বলে” এ তাড়া সর্বক্ষণ, সর্বক্ষেত্রে বিহ্বল চিত্তে শঙ্কিত করবে। যাহোক তিনি কাছে এসে আমার মনে আনন্দ দানের বৃথা চেষ্টা করে শুরু করলেন একটা গল্প। পূর্বেই বলেছি শঙ্কার ভয়ে না শুনে উপায় নেই গোলাম হোসেন। কিন্তু আমার কোন কথা শুনার আগ্রহ নেই মোটেই। অনুরোধে ঢ়েঁকি গেলার মত শুনতে লাগলাম। তিনি শুরু করলেন গল্প বলা। একদিন আমার কাজে লাগবে বলে। গল্পটি হল-রহিম করিম দুই বন্ধু। শিশু কাল থেকে পূর্ণ যৌবন পর্যন্ত গলায় গলায় ভাব। এ দৃশ্য তিনির মোটেই পছন্দ হচ্ছিল না। সুতরাং ভাঙ্গাতে হবে। শুরু করলেন ভাঙ্গার কাজ। তাই একদিন কায়দা করে রহিমের সঙ্গ থেকে করিমকে ডেকে আনলেন। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে চাইলাম ডাটার (ডেঙ্গা) চারটে বীজ। করিম হ্যাঁ-সূচক জবাব দিয়ে কয়েক হাত দুরে যাবার পর উচ্চ:স্বরে

এবার বললাম স্মরণ থাকবে তো এবং দেবার জন্য প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিলাম। করিম রহিমের সঙ্গে চলে গেল ইত্যকার মতো। স্বাভাবিক প্রকৃতি প্রদত্ততায় আন্দাজে অনুমিত হল, রহিম অবশ্যই জিজ্ঞেস করবে চুপিচুপি বলা কথা জানার উদগ্রীবতা আগ্রহ সহকারে। ডাটার বীজ শুনে সন্দেহ প্রবণতার বীজ অঙ্কুরিত হবে চুপিসারে এ সাধারণ দ্রব্য চাওয়ার হেতু সম্পর্কে। ঝড়ের পূর্বাভাস যন্ত্রে ইঙ্গিত শুরু।  

পরের সপ্তাহে অনুরূপ কায়দায় একই সঙ্গ থেকে করিমের পরিবর্তে রহিমকে ডেকে সামান্য তোলা (শিমুলের) প্রদানের কথা ফিসফিস করে বললাম। করিমের নিকটবর্তী হতেই এখন জোরে স্মরণ থাকা এবং দেবার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিলাম। অদ্য যখন করিম জিজ্ঞেস করবে চুপিসারে কি বলা হল? প্রতি উত্তরে রহিম বললেই করিম ধরে নেবে যে, সে সেদিন ডাটার কথা বলায় আজ তার পরিবর্তে তোলার (শিমুলের) কথা বলা হচ্ছে। প্রকৃত পক্ষে সেদিনের প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা বা বদলা নেয়া হচ্ছে। “সন্দেহ প্রবণ মন, আঁধার ঘোচে না কখন” তুল্য। এ বীজ যখন একবার বপন করা হয়, অতি দ্রুত তার ডাল-পালাসহ পরিপূর্ণ বৃক্ষে রূপান্তর অনায়াস লব্ধ। ডাল-পালা ছড়াবেই, বিস্তৃতি লাভে সক্ষম। অনুরূপ মানুষের ক্ষেত্রে সন্দেহের বীজ একবার মনের দ্বার প্রান্তে হাজির হলেই যথেষ্ট। অতিরিক্ত নিষ্প্রয়োজন।এর প্রভাব ও ফলাফল প্রাপ্তি সন্দেহাতীত। তিনি বললেন পরবর্তী সপ্তাহে আর দু’জনকে একত্রে দেখি নাই। কৌশল প্রয়োগে সফলতা অর্জিত হয়েছে বলে, তিনি বিজয়ের হাসি হাসলেন। আমার ক্ষুধার্ত অবশতা পাল্টা প্রশ্ন করে অযথা বাক্য ব্যয়ে জানার আগ্রহ ছিল না বিধায়, “কেটে পড়লে বাঁচি অবশতা।” যাহোক আমার মনের গহীনে বিস্মৃতির অতলান্তে জমায়িত কথাগুলি মাঝে মধ্যে স্মরণ করে আয়নায় প্রতিচ্ছবি দর্শনে বা রোমন্থনে শুধু বিস্মিত হই। এ মন মানসিকতা মানুষের মন থেকে ধুয়ে মুছে সাফ হোক। আবর্জনা মুক্ত হোক। সুস্থ, সুন্দর পরিবেশের মাধ্যমে পরিপুষ্টতা লাভ করুক এ দৃপ্ত প্রত্যয় ঘোষণা করছি কায়মন বাক্যে স্রষ্টার বরাবরে। 

প্রবন্ধ

Comments

Top

 

সংগ্রাম স্বাধীনতায় একাকার

শেখ মুজিবুর রহমান

মিজানুর রহমান মিজান 

বিশ্বনাথ, সিলেট, বাংলাদেশ

পৃথিবীর ইতিহাসে মানব মুক্তি ও স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে যে কয়েকজন বিশ্বখ্যাত নেতা রয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন নেতা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বাংলা, বাঙালী ও বাংলাদেশের ইতিহাসে নামটি যুক্ত থাকবে উদীয়মান সোনালী সূরের মতো দেদীপ্যমান।বঙ্গবন্ধু শুধু মাত্র একটি নাম নয়, ব্যক্তি নয়। তিনি জাতি সত্ত্বার, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ব্যপ্ত একটি বৃহৎ একটি সুবিশাল প্রতিষ্ঠান সমতুল। একটি সার্থক জনযুদ্ধের অবিসংবাদিত রাষ্ট্রনায়ক। যিনি বঙ্গবন্ধু উপাধিতে হয়েছিলেন ভূষিত।কারণ তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ও বাঙালীর প্রাণ। যার সাতই মার্চের ভাষণে একটি জাতি হয়েছিল একত্রিত মোহময়ী যাদুকরের যাদু মন্ত্রের ন্যায় উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত। এদেশের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শ্রমিক, মজুর, কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবি, ফকির, যুবক, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ, সংস্কৃতি কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষকে যিনি আন্দোলন মুখী ও মুখর করে তোলার সক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। বাঙালী জাতি সত্ত্বাকে অনুপ্রাণিত, উজ্জীবিত ও জাগ্রত করে মুক্তিকামী মানুষে করেছিলেন পরিণত।যে প্রেমে মুক্তিকামী মানুষ দেশকে শত্রু মুক্ত করতে অস্ত্র হাতে নিয়ে নির্ভীক চিত্তে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে স্বাধীনতা আনতে সক্ষম হয়। 

আমরা যে বাঙালী, আমাদের রয়েছে স্বতন্ত্র ভাষা, স্বতন্ত্র কৃষ্টি, স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ও সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জাতি সত্ত্বা। সে সাথে সব কিছুই ছিল ভিন্নতর। একটি মননশীল ব্যক্তির দর্শন ও চিন্তাভাবনা দিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই এ সম্পর্কে ছিলেন অতি যত্নবান ও সচেতন। যে কারণে আমরা বাঙালী পরিচয় দিতে হলাম অগ্রযাত্রার পথিক, তখন থেকেই আমরা/আমাদের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা ও হল জাগ্রত মহিরূপে। সেজন্য আমরা যদি বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি না বলি, তবে তা হবে কৃপণতার সামিল। সত্যিকার অর্থেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি। বাংলাদেশকে

অনেকেই চিনত না, কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সকলেই চিনত।যিনি সারাটি জীবন সংগ্রাম করে, এমন কি নিজের জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা ও আত্মমুক্তির মহাকাব্য রচনা করে গেছেন তা অবিনাশী। মুক্তি যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ দেয় আত্মাহুতি। অনেক মা-বোনের সম্ভ্রম হয় লুণ্ঠিত। অসংখ্য মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে গৃহহারা করে। স্বাধীনতা অর্জনের অন্তিম মুহূর্তে ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করে একটি জাতিকে করতে চেয়েছিল পাক হানাদাররা উজ্জীবনী শক্তির বিনাশ। সর্বোপরি ১৫ই আগষ্টে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাস পাল্টানোর পায়তারা করে কিছু সংখ্যক মীরজাফর।ওরা কেড়ে নিতে চেয়েছিল সবটুকু আলো, সব সম্ভাবনা, সকল দৃষ্টিভঙ্গি। তা আমাদেরকে ভুলে গেলে চলবেনা। থাকতে হবে সজাগ ও সচেতন। বঙ্গবন্ধুকে পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরা, তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয় যে কারো পক্ষে অতি সহজে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেকে অনেক লেখা লিখেছেন। বিখ্যাত কবি লিখেছেন কবিতা, গীতিকার লিখেছেন গান, চিত্রকর এঁকেছেন চিত্র। 

আজ ১৫ই আগস্ট। মর্মান্তিক ও বেদনাবিদুর একটি দিন। ইতিহাসের শোকাবহ সাক্ষী ও স্বাক্ষরতার দিন। জাতীয় শোক দিবস।এদিনে জানাই বঙ্গবন্ধুকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসা, কামনা ও প্রার্থনা করি আল্লাহর দরবারে এদিনে সকল শহিদদের আত্মার মাগফেরাত।  

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। বাঙালী একটি স্বাধীন জাতি। এদেশের সংগ্রাম ও স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর সত্যিকার অর্থেই একাকার। বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক ও অভিন্ন। বাংলাদেশ, এ দেশের সংগ্রাম, এদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, লাল সবুজের পতাকার সাথে, সকল কিছুর সাথে বঙ্গবন্ধুর নাম স্বপ্রতিভ নাম ও স্মৃতি বিজড়িত, ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত।  

Comments

Top

কবিতা

সাত্যকি

বারাসত, কলকাতা

 

মলাটে আবছা নাম

১.

খনও ধূসর যা কিছু আছে

তার সবটার নাম যদি ফাঁকি হয়

তাহলে তারা মাঠের শরীরের পাশ দিয়ে

যে পথ বয়ে গেছে সেই পথে প্রবাহিত হতে হতে

আমার উঠোনে এসে নোঙর ফেলে

মাঘের এই ফ্যাকাশে হলুদ রোদে এসে বসে

আকাশের গায়ে ধোঁয়াটে রঙের মেঘ দ্যাখে

আর আমার দিকে চোখ ফেলে

কি যেন জিজ্ঞেস করতে চায়

আমি এদিক ওদিক যাই ব্যস্ততার বাহানা করি

এখন এড়িয়ে যেতে শিখে গিয়েছি...


.

ভিড়ের ভিতর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে

কোথাও পথ হারিয়ে ফেলি না

মানুষের পাশে মানুষ তার পাশে আমি

গায়ে ঘষা লাগে কত মুখ দেখি রোজ

নতুন বলেই মনে হয়

খুব কম কালকের চেনা মুখ দেখি

কালকের যে মানুষটার সাথে ধাক্কা লেগেছিল

স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে

আমি বিরক্তি প্রকাশ করেছিলাম বা সে

তার সাথে আর দেখা হয় না দিন মাস বছর পর

মুখ মনে রেখে রেখে পথ হাঁটি

তবুও দেখা নেই সব নতুন মানুষ

তাদের ভিন্ন কথা ভিন্ন আলাপ

তারা কোথায় হারিয়ে যায়?

Comments

Top

 

অনুগল্প

যাচিঞা

কোটিপতি

স্বরূপ মণ্ডল

বাগডাঙ্গা, কান্দি, মুর্শিদাবাদ

যাচিঞা

টিং টং …

দরজা খুলে দেখলেন একজন মাঝবয়সী লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। “কী চাই?” জিজ্ঞেস করতেই লোকটি একটানা বলে গেল, “আমার নাম ভুলু, রিক্সা চালাই, আমার মেয়ের বে, কিছু সাহায্য করুন।” দিনকয়েক আগে একই কথা বলে একজন পঞ্চাশ টাকা হাতিয়েছে। মুহূর্তে মেজাজ সপ্তমে চড়ল গিন্নির, বললেন, “খেটে খেতে পার না!” লোকটিও এক চোট নিয়ে বলল, “দেখুন, উপদেশ ঝাড়বেন না, হয় কিছু দেন নয় বলুন পারবেন না, চলে যাব।” কথাগুলো শেলের মতো বিঁধল বুকে। কটমট করে তাকিয়ে দুড়ুম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। কর্তা জিজ্ঞেস করলেন, “কে এসেছিল?” ফুঁসে উঠে গিন্নি বললেন, “বলে কিনা উপদেশ ঝাড়বেন না! এইসব ধাপ্পাবাজদের একটা পয়সাও দেবে না, এই বলে দিলুম।”

কর্তা শান্তভাবে বললেন, “লোকের দোরে দোরে ঘোরা, মিথ্যা বলা, হাত পেতে চাওয়া এসবের মধ্যে কি কোনোই কষ্ট নাই, গিন্নি?” গিন্নির সারা অঙ্গ জ্বলছিল। মুখ ভেংচে বললেন, “না, নাই! তোমাদের মতো ভালমানুষের জন্যই তো ওরা দিব্যি লোক ঠকিয়ে বেড়াচ্ছে!” গিন্নির রাগটা ঠিক কোনখানে বুঝতে পেরে স্মিত হেসে বললেন, “তা ঠিক!”

কোটিপতি

-“ক হাজার টাকা ধার দেবে, দাদা?”

-“কেন রে?”

-“খুব দরকার!”

-“তা হঠাৎ করে কি এমন দরকার হল শুনি?”

-“আজ সাত দিন হল মিনসেটা বিছানায় পড়ে আছে। এখন ছেলেপুলে নিয়ে কি করে চলে বলো দেখি!”

হাজার টাকা দিতেই খুশি হয়ে বলল, “কী যে উপকার করলে! ভগবান তোমার মঙ্গল করবে।”

 

বাজার যাওয়ার পথে লটারির দোকানে কাজের মেয়েটাকে দেখে কৌতূহল বশে এগিয়ে গেলেন। ফ্লেক্সে লেখা রয়েছে- দুর্গাপুজো বাম্পার, প্রথম পুরস্কার- পাঁচ কোটি টাকা, টিকিট মূল্য- ১০০০/-, মাত্র দু’ লাখের মধ্যে থেকে লাকি ড্র।

রেগেমেগে বললেন, “এটা বুঝি তোর খুব দরকার!”

মেয়েটি লাজুক হেসে বলল, “কোটিপতি হতে বড় সাধ হয় গো, দাদা!”

Comments

Top

গল্প

প্যারাসাইট

সনোজ চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুর, পঃ বাংলা

 


-- না মানে আপনাদের রেটটা অনেকটাই বেশি।
-- এটা আপনার ভুল ধারনা মিস্টার বসাক,  আজকের সময়ে মার্কেট যা হাই আছে সেখানে এর থেকে কমে --
-- দেখুন আমি আরো দু-এক জায়গায় বুঝেছি ওরা কিন্তু অনেক লো-কস্টে ইকুয়েল প্রভিশন রাখছে।
-- এটা হয় না, ও ইকুয়েল আপনার মনে হচ্ছে,  আসলে কি আমাদের হোসপিটালিটির ধারে  কাছে কেউ আসবে না।
হসপিটালিটি শব্দটায় বেশ জোর দিলেন মিস্টার তোগাড়িয়া আর এই শব্দটা না এলে বিপুল বুঝতেই পারত না, সে একজন অবাঙালির সঙ্গে কথা বলছে।
অনেক দিন ধরে থাকতে থাকতে অনেক অবাঙালি অনেক বেশি বাঙালি হয়ে যান --
মিস্টার তোগাড়িয়ার কপালে কমলা রঙের তিলকটুকুই তাকে বিপুলের থেকে আলাদা করেছে - এই যা, বাকি সবটাই তো একই।
-- একই তো ব্যাপার মশাই ফুডিং-লজিং-  এন্টারট্রেন্টমেন্ট-জেনারেল মেডিশিন এর  বাইরে কিছু তো দেখছি না।
মিস্টার তোগাড়িয়া ল্যাপটপে আঙুলের আঁকিবুঁকি কাটছিলেন, কিছু একটা ভেবে তার চোখটা স্ক্রিনে সরু হল। একটা কিছু না মেলাতে পেরে ঘাড়টা বার দুই তিন দোলালেন, তারপর শ্লেষ নিয়ে বললেন -
-- এর বাইরে যেটা আছে সেটা দেখা যায় না  মিস্টার বসাক, সেটা রিয়েলাইজ করতে হয়--
--  রিয়েলাইজ! ব্যবসায় আবার  রিয়েলাইজেশন?
-- ঠিক তাই। হ্যাঁ মানছি এটা আমাদের ব্যবসাই  হল-- প্রোকারান্তরে আমরা অন্য একরকম  প্রোডাক্টই সেল করি--
-- তবে!
-- আচ্ছা এই প্রোডাক্টটার ডিমান্ড রাতারাতি এতোটা বাড়ল কেন? আরো পরিস্কার করে  বললে এই যে ইনক্রিজিং ট্রেন্ড --
-- পোষ্ট-মর্ডান সোসাইটিতে এটাই ন্যাচারাল। লাইফ ফাস্ট হচ্ছে- এর বাইরে আরো  অনেক কারন থাকতে পারে।
--দেখুন মশাই আমরা রীতিমত রিসার্চ করেই মার্কেটে নেমেছি তাই আমাদের হোসপিটালিটিটাও অন্য রকম আছে।
--ঠিল বুঝলাম না!
--আচ্ছা মিস্টার বসাক আপনি আপনার  বাবাকে আমাদের এখানে রাখতে চাইছেন কেন? মানে বাড়িতে কি অসুবিধা রইল?
এতক্ষণে মিস্টার তোগাড়িয়া মুখ তুলে তাকালেন বিপুলের দিকে। প্রশ্নটায় এমন একটা কাঠিন্য ছিল যে বিপুল চোখ সরিয়ে নিল।
মিস্টার তোগাড়িয়া বেশ ভালই বাংলা বলেন। সৌখিন ডিবা থেকে সুগন্ধী মসলা মুখে ফেলে বললেন-
-- দেখুন মিস্টার বসাক ও ইকোনোমিকসে একটা কথা আছে -- ইউটিলিটি যা সেটিশফ্যাকশন জেনারেট করে।  তবেই তো প্রোডাক্ট সেলেবল হয় আর এর উল্টোটা হল ডিসইউটিলিটি যেখান থেকে  ডিসসেটিশফ্যাকশন আসে- ও প্রোডাক্ট সেল  করা যায় না।
-- বুঝলাম না!

-- না বুঝার তো কিছু হল না মিস্টার বসাক এটা তো খুব সহজ হল। আপনার বাবার  বয়স হল, তো ওর আর কোনো ইউটিলিটি  থাকলো না উপরন্তু ওল্ড এজ হ্যাজাডস্ এর কারণে ফ্যামিলিতে পিস আই মিন শান্তি নস্ট  হতে চালু হল। আমাদের কারবারটা শুরু হল এখানেই -- সোজা কথায় আমরা আপনার লাইবিলিটিটা নিয়ে আপনাকে শান্তি প্রোভাইড করলাম। বিপুল এতক্ষণে খেয়াল করল তোগাড়িয়া কতকগুলো শব্দতে এমন একটা অনাবশ্যক জোর দেন যাতে শুধু তার ব্যবসার প্রোমশনই হয় না উল্টে বিপুলদের মতো ক্লায়েন্টদের খোঁচা দেওয়াটার উদ্দেশ্যেও হয়তো থাকে। লাইবিলিটি শব্দটা বিপুলকে ধাক্কা দিল জোর। তোগাড়িয়া হাসতে হাসতে বললেন --

-- এটা তো গেল আমাদের দিক থেকে, আপনার দিক থেকে একটা নামুমকিন ভি  মুমকিন হয়ে গেল! বসাক কিছু না বলে তোগাড়িয়ার দিকে তাকিয়ে রইল আসলে সত্যিই সে তোগাড়িয়ার কথা বুঝে উঠতে পারছিল না! তোগাড়িয়ার উল্টো দিকের চেয়ারে থেকে বিশ্রী

রকম হাসতে হাসতে বললেন ---- আপনি আপনার ঐ ডিসইউটিলিটি-  ডিসসেটিসফ্যাকশন কো ভি সেল করে   দিলেন!
-- সেল করে দিলাম!
-- এটা তো ঠিক নয় যে আপনি আপনার বাবাকে দেখতে পারবেন না-- খুবই পারবেন লেকিন যে কস্টে আপনি সুযোগ নিলেন, তাতে আপনার সুবিধা হল-- আপনার সময় বাঁচল। ঐ সময়ে আপনি আরো বেশি কামাতে পারলেন- অবশ্য আপনার এ্যাফিশিয়েনশিকে খাঁটো করছি না। এই যে বাড়তি ইনকামের সুযোগ পেলেন এটাকে ইকোনমিকসে ওপারচুনিটি কস্ট  বলে-- আপনি বাড়তি আয় পেলেন মানে আপনার ডিসসেটিশফ্যাকশন সেল করে   দিলেন।
বিপুল রাগটা সামলে নিল- এছাড়া তার সামনে অন্য কোনো পথও খোলা ছিল না। "ছোটো লোক"--. ব্যবসার সঙ্গে সাইকোলজির দ্বন্দ্বটা কি নিখুঁত মেলাতে পারে এরা। তাছাড়া তোগাড়িয়াদের বাদ দিয়ে অন্য বৃদ্ধাশ্রমের উপর তেমন একটা ভরসা নেই বিপুলের- বাবাকে রাখতে হলে এদের এখানেই রাখতে হবে তাকে। এদের পরিসেবা সত্যিই ভাল।
আসলে সে একটু বারগেনিং-এ যেতে চেয়েছিল-- এতো সব তত্ত্ব আসবে জানলে এপথ নিত না।
মিস্টার তোগাড়িয়া একটা বড় কাগজে রুম লেআউট টেবিলে ফেলে বললেন--
-- এবার আসি কস্ট এ্যানালাইশিসে--
-- না, না তার কোনো দরকার নেই।
-- সেকি! ওটাই তো আমাদের কি-ফ্যাক্টর। এই একশ-ন নম্বর রুমটা আপনার বাবাকে অ্যালট করা হবে। দেখুন এখানে দুটো বেড -- দুজন একসঙ্গে থাকবেন?
-- হ্যাঁ দুজন একসঙ্গে-
-- সে ভাল,দুজন বয়স্ক মানুষ একসঙ্গে থাকলে নিজেদের শেয়ার করতে পারবেন।
-- না দুজন বয়স্ক মানুষ একসঙ্গে থাকবেন না আসলে আমরা আপনার বাবার সঙ্গে আরো একজনের  ফুডিং-লজিং কস্ট অ্যাডিশ্যানালি ট্যাগ করে রেখেছি।
--সেকি! কেন?
--আমরা একজন অনাথ ছেলেকে রাখছি যে আপনার বাবাকে মেইনটেইন করবে। সে বুঝছে এই মানুষটার ভালমন্দের সঙ্গে আমার খাওয়া-থাকা-পরা-লেখাপড়া ডিপেন্ডেন্ট। অনেকটা আপনাদের লাইফ সায়েন্সের প্যারাসাইটের মতো। আপনার  বাবা হচ্ছেন হোষ্ট আর অনাথ ছেলেটি  প্যারাসাইট। এই প্যারাসাইটিজিমই হচ্ছে  আমাদের হোসপিটালিটির কেমিস্ট্রি। দেখুন আপনি যতদিন ছোটো ছিলেন  ডিপেন্ডেন্ট ছিলেন ততদিন আপনার কাছে
আপনার বাবার ইউটিলিটি ছিল। এখন আপনার ফ্যামিলিতে প্যারাসাইটিজিম  ব্রেক করেছে-- এজন্যই তো বাবাকে  নিজেদের সঙ্গে রাখতে পারছেন না!প্যারাসাইটিজিম কথাটায় এমন একটা বিদ্রুপ ছিল যে তোগাড়িয়ার কথা শেষ না হতেই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল বিপুল।তোগাড়িয়া ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিয়ে বললেন--
--খরচ পত্তর নিয়ে আর একবার ভাবুন মিস্টার বসাক, তারপর না হয় সময় করে  ডিসিশনটা ফোনেই জানাবেন।
বিপুলের বুকের ভিতরটা কেমন যেন ভারি হয়ে এল। ইউটিলিটি-ডিসসেটিশফ্যাকশন প্যারাসাইট শব্দগুলো মাথার মধ্যে দাপাদাপি শুরু করেছে।অপমানে শরীর থরথর করে কাঁপছে -- এখানে আর এক মুহুর্ত নয়।
সে টলতে টলতে নেমে এল পথে। অপমানটা সঠিক জায়গায় পৌঁচ্ছে দিয়ে বেশ রেলিশ হচ্ছিল তোগাড়িয়ার। তিনি বিপুলের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন স্থির।
"স্যার একশ-ন নম্বর রুমটা কি আজই গোছ-গাছ করে দেবো?"রতনের কথায় সম্বিত ফিরল তোগাড়িয়ার।
"তার বোধহয় দরকার পড়বে না, ভদ্র-লোককে লাইফ সায়েন্স আর ইকোনমিকসের যে শিক্ষা দিয়েছি, মনে হয় না আর ফিরে আসবেন।" রতন মুচকি হেসে, অন্য কাজে ফিরে গেলে-
তোগাড়িয়া ল্যাপটপে আঙুলের আঁকিবুঁকি করে আবার চোখ সরু করলেন--
"এটাই কি বাবা? না, হচ্ছে না!"
প্রত্যেক অনাথ ছেলে যেমন করে কল্পনায় নিজের বাবার ছবি এঁকে মুছে ফেলে, তেমনি করে ল্যাপটপের ছবিটা আবার মুছে ফেললেন মনু তোগাড়িয়া।

 

অনুগল্প

Comments

Top

অনুগল্প

সনোজ চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুর

সে বছর ঠান্ডা পড়েছিল বেশ জাকিয়ে। স্কুল যাওয়ার জন্য স্নান করব কিন্তু কারেন্ট নেই। অগত্যা ঠান্ডা জলেই কাক স্নান।  গায়ে শীতের জামা কাপড় চাপিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েছি।

হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে গেল। কতদিন পর দেখা। চিনে নিতে অবশ্য কোনো অসুবিধা হয় নি। নিজের থেকেই এগিয়ে গেলাম।

কাঁপতে কাঁপতে বললাম--

-- কেমন আছ?

অভিমান মেশানো গলায় সে বলল--

-- যাক তবু মনে রেখেছ দেখছি, আছি এক রকম।

-- তোমাকে ভুলি কেমন করে! আসলে কি জানো...

-- তুমি কিন্তু আরো সুন্দর হয়েছ।

-- সু.. ন্দ...র। হ্যালিপ্যাডের মতো মস্ত একটা  টাক নিয়েও তুমি সুন্দর দেখছ!

-- হ্যাঁ দেখছি।

-- এতো দীর্ঘ অদর্শনের পর এ হেন রসিকতাআমার কিন্তু একদম ভাল লাগছে না।

-- রসিকতা হতে যাবে কেন! সত্যিই তোমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে।

-- এতো দিন পর তুমি কি আমার ফেলে আসা বেদনায়..

-- বেদনা! আমার খুব মনে আছে সে সময় সবে তোমার চুল উঠতে শুরু করেছে।

-- সেই ক্ষয় মেরামতি তে হোমিওপ্যাথি.... এলোপ্যাথি.. চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখি নি।

খরচ হচ্ছিল জলের মতো...

-- শুধু কি পয়সা? যে যা বলছে তাই করছ-- আজ এ তেল তো কাল ও তেল....পেয়াজ

বাটা, আমলকির রস নিয়ম করে মাথায় মাখছ.... সে দিনগুলোতে কি করনি তুমি!

-- আসলে সেদিন ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম।

-- ভয়!

-- হ্যাঁ ভয়। থেকে থেকেই মনে হতো এবেলাই যদি এ ক্ষয়কে আটকে দিতে না পারি তবে

তোমার আমার বিচ্ছেদ নিশ্চিত।

-- আশ্চর্য! কেন...কেন এমনটা মনে হোতো তোমার?

-- সে কি! সেকথাও তুমি ভুলে গেলে?

-- আ...মি?

-- হ্যাঁ তুমি। সে সময় তুমি টাক নিয়ে আশ্চর্য রকম বিরক্তি প্রকাশ করতে দুবেলা।

-- না গো ঠিক বিরক্তি নয়,আসলে অস্বস্তি... চুল ছাড়িয়ে যখন আমার আঙুলগুলো পৌঁছে যেত টাকে তখন খুব ভয় পেয়ে যেতাম। হঠাৎ করে উষ্ণতা হারিয়ে মৃত্যুর শীতল স্পর্শ অনুভব করতাম।

-- অথচ দেখ সে মৃত্যু ভয় কত অর্থহীন। আজ যখন কুড়ি বছর পর আমরা আবারমুখোমুখি হলাম,আমরা কিন্তু কেউ মরে যাইনি!

-- ভুলেও যাই নি। শুধু অবস্থা আমাদের বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে এই যা।

-- আমার কিন্তু আজকের অবস্থায় আরো বেশি করে মনে পড়ে তোমাকে... মাথার দিকে তাকালে চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাই তোমাকে।

-- বিশ্বাস করি না।

-- স্বাভাবিক, দূরত্ব বিশ্বাসকেও পাতলা করে দেয়।

-- কথা কিন্তু তুমি আগের মতোই বলো।

-- মানে!

-- মানে কথা দিয়ে তুমি আজও জাদু করতে..

-- তার মানে তুমি বলতে চাইছ আমি মিথ্যে কথার ফানুস...

-- আমি কিচ্ছু বলতে চাই নে...

-- আজ না হয় প্রয়োজন ফুরিয়েছে কিন্তু এটা  তো অকপট সত্যি একটা সময় তোমায়

মাথায় তুলে রাখতাম।

-- সেটা তো অস্বীকার করি নে.…. কিন্তু মাঝে সেতুর মতো ঐ প্রয়োজনটুকু  ছিল যে।

-- সখ্যতা... ভালোবাসা সেও কিন্তু প্রয়োজনের বাইরে নয়। মঙ্গল গ্রহের কথা নয়।

-- তুমি কিন্তু রেগে যাচ্ছ।

-- না একদম নয়।

-- আয়নায় তাকিয়ে দেখো টাকটাও তেতে কেমন লালটি হয়েছে।

-- দেখ আমার ঐ দুর্বলতা নিয়ে মশকরা...

-- আচ্ছা বাবা আর কেনো দিন মশকরা করব না। সত্যি সত্যি সত্যি.... তিন সত্যি।

-- আর আদিখ্যেতা করতে হবে না। আমার স্কুলের দেরী হয়ে যাচ্ছে।

-- জানি তো আমাদের গেছে যে দিন তা একেবারেই গেছে।

★ধৈর্য সহকারে এতক্ষণ যা পড়লেন

তা আসলে একজন 'টাকমাথা লোক' ও তার ড্রেসিং টেবিলের এক কোনে অযত্নে পড়ে থাকা 'চিরুনির' মধ্যে সংলাপ।

শীতের জুবুথুবু পোশাক, করোনা প্রতিহারী মুখাবরণ এসব এড়িয়ে অতি পরিচিতকেও চিনতে ধন্দ লাগে এখন।
আমি নিশ্চিত ছিলাম কে? কেন?
এবংবিধ নানা প্রশ্নসূচক শব্দ পেরিয়ে একটু লাজুক লাজুক হাসি নিয়ে বলে উঠবেন----
" ওঃ শ্রী চক্রবর্ত্তী? দেখুন তো মাক্সের দূরত্ব ঘোঁচাতে বেমক্কা কতগুলি সময় চলে গেল!"
তাই মাস্ক সরিয়ে বলতে যাচ্ছিলাম----
-- স্যার মনে পড়ল কি?
তার আগেই চাকা দেওয়া চেয়ারে গতি নিয়ে দূরত্ব কমিয়ে,আমাকে মিথ্যে করে তিনি বলে উঠলেন--
--- সনোজ চক্রবর্ত্তী।
আমি তো রীতিমত 'থ'। এটা আমাদের তৃতীয় বার সামনাসামনি হওয়া। হ্যাঁ তিন বার-- পঁনেরো বছরে। হিসাব বলছে স্ট্রাইক রেট পাঁচ বছরে এক।
ফলত চিনে নেওয়াটা আদপেই সহজ ছিল না। তাছাড়া আমি তো আর তুলসি কিম্বা শিবরাম অথবা নচি বা অন্য কোনো সেলিব্রিটি চক্কত্তি নই- যে দেখলেই লোকে চিনে ফেলবে!
হ্যাঁ এটাই অবজারভেশন-- বাংলায় যাকে বলে পর্যবেক্ষণ, আমি বলব অন্ধের ছুঁয়ে দেখা।একজন অন্ধ কোনো কিছুকে একবার ছুঁলে এতটা ভেতর থেকে ছোঁয় যেন দ্বিতীয় বার চিনতে ভুল না হয়। তিনি এমন ভাবে ছুঁয়ে থাকেন, এমন নৈকট্য তৈরি করেন, যাতে যে কোন দূরত্ব থেকেই তিনি আপনজনদের চিনে নিতে পারেন--
তিনি "আমিনুল আহসান"।
সবচেয়ে আশ্চার্যের তিনি প্রশাসক-- তিনি আমার উপরওয়ালা। সে বিধায় উপর থেকে সবকিছুই তো তুলনায় ছোট দেখার কথা! মুখের মাস্ক মুখেই রইল ধরা, কোবিড বিধি মেনে আমরা বসলুম নিদিষ্ট চেয়ারগুলিতে। আমরা বলতে আমাদের স্কুলের প্রাক্তন হেড মাস্টারমশাই, পিন্টুু বাবু আর আমি। নতুন বছরের শুরুর দিকে, খালি হাতে যাওয়া যায়?
তাই একটু মিস্টি। ফিরছিলাম ঘাটাল থেকে, ব্যাগে লেদুর স্পেশাল রাজভোগ তিন প্যাকেট।
একটা বাড়ির,একটা আজাদ দা আর একটা.... প্রস্তাব মাত্র প্রত্যাখ্যান-- " ভেট টা ব্যাগেই রাখুন।"
'ভেট' শব্দটা কষ্ট দিল বেশ। আমি তো ওভাবে নিয়ে যাই নি! করোনা অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। এখন মোবাইল ছাড়া অফিস কাচারি ভাবাই যায় না। মোবাইলে মিটিং, মোবাইলে নির্দেশিকা.... নতুন এক ওয়ার্ক কালচার। এর মধ্যে শুরু হল ভি সি। আমাদের থেকে সময় নিয়ে চোখ রাখলেন মোবাইলে। টুকরো কাগজে নোট।
সেগুলো দফায় দফায় বিলি হয়ে গেল, দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার আনন্দে---
হ্যাঁ আনন্দে, আনন্দেই --- যাদের কাজগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হল তাদের কাউকেই আদেশ করা হল না অথচ তাদের জানিয়ে দেওয়া হল এ হেলাফেলার নয়।
এর মধ্যেও আমাদের স্যারের পেনশন সংক্রান্ত সমস্যায় মনযোগী হলেন। দ্রুত ডেকে পাঠালেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারীকে। তাকে বুঝিয়ে দিলেন সমাধানের পথ। এক ম্যাডামের ইনক্রিমেন্ট আটকে দিয়েছিলেন তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষক--
অপরাধ ম্যাডাম একটি অ্যাডিশন্যাল ক্লাস নিতে আপত্তি রেখেছিলেন। দ্রুত তা চালুর নির্দেশ হল। হোক প্রাক্তন উল্টো দিকে একজন প্রধান শিক্ষক বসে তাই লঘু পাপে গুরু দন্ড-- ইনক্রিমেন্ট বন্ধের এই অমানবিক পদক্ষেপকে নিন্দা করলেন এমন আড়াল রেখে যেখানে পদমর্যাদাকে এতোটুকু লঘু না করেও মহত্তর হয়ে উঠল মানবতা-- সংবেদনশীলতা।
ঐ স্কুলের যে শিক্ষক ম্যাডামের অধিকার নিয়ে অফিসে হাজির তাঁকে কুর্নিশ জানিয়ে-- এগিয়ে রাখলেন কাজের পরিবেশে সহকর্মীর প্রতি সহমর্মিতাকে।
চা এল।
শীতের জড়তা কাটিয়ে চায়ের পেয়ালা নিয়ে প্রশাসক তখন পাঠক। আমাকে লজ্জা দিয়ে আমার টুকিটাকি লেখা নিয়ে নানা প্রশংসা। বুঝে নিলাম একজন অগ্রজ কলমচি তাঁর অনুজকে উৎসাহ দিচ্ছেন। প্রাণিত করছেন আগামীর জন্য।
আমি ওনার একটা বক্তৃতার উল্লেখ করে নিজের ভালোলাগাটুকু জানাতে উনি জানালেন--- এ বিষয়ে নাকি ওনার তেমন কোন ভূমিকাই নেই সবটুকুই মানিকচক শিক্ষানিকেতনের হেড স্যারের।
তিনি শুধু একজন প্রধান শিক্ষক নন, তিনি ঐ এলাকাটকে পাল্টে দিয়েছেন একক প্রচেষ্টায়-- তাঁর কথা যেন শেষ হয় না।
একটু আগেও একজন প্রধান শিক্ষকের অসংবেদনশীলতায় যিনি একটু হলেও অস্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন এখন তিনি অন্য এক প্রধান শিক্ষকের উৎসাহ উদ্দীপনা থেকে শিক্ষা নিতে চাইছেন-- উদগত হচ্ছে দ্বিধাহীন প্রণতি।
এস আই এবং এ আই-রা একে একে আসছেন তাঁর ঘরে-- এখুনি শুরু হবে জরুরী সভা। বুঝতে পারছি এবার আমার উঠা উচিত কিন্তু ওনার সঙ্গে কথা বলা, সময় কাটানোর যে মাদকতা সেটাকে উপেক্ষা করা বড়, কঠিন।
"ফের একদিন আসব" -- এই বলে চেয়ার ছাড়লাম।
উনি বললেন---
"ভেট শব্দটার কাঠিন্যটা ভুলে যান-- আসলে আমি আমার অফিস থেকে উৎকোচ নামের উৎপাতটি  শিকড় সহ উপড়ে ফেলতে চাই। সে তো আর আমি চাইলেই হল না-- আপনাদের দেওয়ার অভ্যাসটির পরিবর্তন প্রয়োজন।"  --- এই বলে হাসলেন তিনি।
একটু আগে ' ভেট' শব্দে যে কষ্ট ছিল এখন তা উধাও-- আজকের সময়ে এমন সংস্কার( উৎকোচ মুক্ত পরিবেশ) শুধু যে বড় কাজ তা নয়,  এ বড় সাহসী পদক্ষেপ।
হাসিটা একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ল সারা অফিস ঘরটায়। ভারি সুন্দর হয়ে উঠল চারপাশ।
বুঝলাম একজন প্রশাসক সত্যিকার হাসতে জানলে, হাসতে পারলে-- আটপৌরে অফিসটাও ঝাঁ-চকচকে হয়ে যায়, টেবিলে ডাই হয়ে ফাইলের পাহাড় তৈরি হয় না, সারা অফিসটাই হয়ে ওঠে আনন্দলোক।

রো একবার পিছন ফিরে দেখল বিরোচন----

দু'দিক থেকে ঝাপিয়ে পড়া বাঁশে অর্ধবৃত্তকার পথ শেষ হয়েছে বামুন পাড়ার মাঠে।

দুপুরের রোদে ঝলসে যাচ্ছে মাঠ-- শ্মশানের অশ্বত্থের ডালে তখনও পেন্ডুলামের মতো দুলছে হলুদ ঘুড়িটা। মাঝ দুপুরের সূর্যও বাঁশ পাতার অলিগলি টপকে ঘোচাতে পারে নি দুপুর পথের আপাত আঁধার। পথের পাশের ডোবায় নুয়ে পড়া বাঁশের ডগে একটা নিবিষ্ট বক ছাড়া আর কিছুই নজরে আসে না বিরোচনের।

অথচ সে স্পষ্ট শুনেছে বাঁশ পাতায় পা ফেলার মচমচ শব্দ। প্রথমটায় আমল না দিলেও সে শব্দ রীতিমতো তাড়া করছে তাকে।

এই পথটা শুরু হয়েছে বর্মন পল্লীর নাটমন্দিরে, তারপর সত্যেশ্বর আত্যয়িক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিমের দেওয়াল ছুঁয়ে মিতালি সংঘের খেলার মাঠটা বাঁ'হাতে ফেলে ঢুকে পড়েছে হালদারদের বাঁশ বাগানে। নদী যেমন মোহনায় ফুরায়-- তেমনই এ পথ শেষ হয়েছে বর্মন পল্লী আর বামুন পাড়ার মাঝের মাঠে।

মাঠটা এতো বড় যেন মনে হয় সূর্যটা বামুন পাড়ায় টুপুস করে ডুবে যায় সন্ধে হলে।বিরোচন প্রায়দিন বাড়ি থেকে পালিয়ে মাঠের ধারে বসে থাকে, শীতের রোদ গায়ে আরাম দেয়। বামুন পাড়ার ঘুড়িগুলো আকাশে পাখির মতো উড়তে থাকে, ঘাড় উঁচিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে বিরোচন।

রং বেরং-এর ঘুড়ি সব বামুন পাড়ার আকাশটাকে রঙীন করে দেয়। রঙীন করে দেয় বিরোচনের মনটাকেও। হলুদ রঙের ঘুড়িটায় বড্ড মায়া বিরোচনের, মনে মনে ভাবে ওটা তারই। সবুজ,কমলা, লাল-কালো ঘুড়িগুলোকে হারিয়ে হলুদটা যখন সব্বার উপরে তখন খুব আনন্দ হয় তার।

একসময় লাল-কালো ঘুড়িটা কেটে দেয় হলুদ ঘুড়িটাকে-- পাক খেতে খেতে তলিয়ে যেতে থাকে বিরোচনের হলুদ। বামুন পাড়ার শ্মশানে অশ্বত্থ গাছে জড়িয়ে যায় ঘুড়ি- মন খারাপ হয়ে যায়।

বিরোচন বাড়ি ফেরার পথ নেয়। খানিকটা এগানোর পরই তার মনে হয়ে-- কে যেন আসছে তার পেছনে পেছনে। শ্মশানের অশ্বত্থে নাকি ভুতেরা বাস করে। খালি চোখে দেখা যায় না অশরীরীদের। তবে কি তার হলুদ ঘুড়িটা একটু হলেও বিরক্ত করল ওদের!

হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় বিরোচন। বাঁশ পাতা মাড়ানোর শব্দটা আরো স্পষ্ট হয় তার কানে।

আর একবার পিছন ফিরে দেখবে বলে ভাবে সে কিন্তু সাহসে কুলিয়ে উঠে না। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে সামনের দিকে দৌড় লাগায় সে-- যে দৌড়টা ছেলেবেলায় আমি আপনি আমরা অনেকেই দৌড়েছি, নিজের পায়ে বাঁশ পাতা মাড়িয়ে।

শুভ সকাল। বিন্যাসটাই আসল। ঠিকমতো সাজাতে পারলেই সহজ হয়ে যায় যাপন। জীবন তো আসলে ঠিকঠাক সাজানোর খেলা- নির্ভুল সাজিয়ে নিতে পারলেই মিলে যায় অঙ্ক।

আপাত জটিল, সহজ ও সুন্দর হয়ে ধরা দেয়। সাজানোর মজাটাও অদ্ভুত ধরনের--

আশ্চর্য এই যে ছয়'কে(6)উল্টে দেখলে অনেক বড় কিছু উলটপালট না ঘটে সে অর্থবহ নয়(9) হয়ে ওঠে। আসলে সজ্জাটা সকলের কাছে হুবুহু এক হয় না। আপনি যেভাবে সাজালেন অন্য কেউ উল্টো পথে হেঁটেও সমান আনন্দ নিতে পারে সময়ের থেকে।

সময় যেখানে বহমান সেখানে তার বিন্যাস ধ্রুবক না হওয়াটাই দস্তুর। তাই জীবনকে,সময়কে ভিন্ন ভিন্ন রঙে রাঙিয়েও অভিন্ন আনন্দের অনুসারী হয়ে যায় নানা জন।

এসবের মধ্যে আর এক দল-- অবিন্যাসেই আনন্দ পায়। তারা অবিন্যাসের মধ্যে খুঁজে পায় ভিন্নতর এক বিন্যাসের অনুভব।

তারা সবখানেই অগোছালো-- জীবনকে চোখ রাঙিয়ে বাঁচে তারা। বাঁচে মহানন্দে। তবে সেই আক্ষেপ! আটপৌরে জীবনের আর্তি- "হিসেব মেলেনি।" গোলমালটা কোথায়?

গোলমালটা গোলমালেই। একবার একটা বিন্যাসে এগিয়ে বিকল্প বিন্যাসের জন্য আঙুল কাঁমড়ানোতেই যত গন্ডগোল। সব সমস্যার শুরু সেখানেই--

ঐ আফসোসেই লুকিয়ে থাকে অনতিক্রম্য যন্ত্রণা। যার গোলকধাঁধায় আঁটকে যায় সময়। যদি প্রশ্ন থাকে ছবির সূর্য কবেকার?

মানে-- অস্তের নাকি উদয়ের? বিশের না একুশের?   

"এতো সহজ প্রশ্ন।"  এক-দুই-তিন-চার-পাঁচ..... ঠিক ধরেছেন, এভাবে ভাবলে এ দু'হাজার কুড়ির শেষ সূর্য।অপ্রাপ্তির হতাশা,কষ্ট,যন্ত্রণার চির বিদায়।

আবার উল্টো পথে-- পাঁচ-চার-তিন-দুই-এক........

"আরিবাস্!"

"আশ্চর্য! ঐ তো সম্ভাবনা!" দু'হাজার একুশ আমাদের দুয়ারে।

তার প্রথম সূর্য বলছে---

" ওঠ,জাগো... আমি এসেছি, হাতে আমার আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ কিন্তু জ্বালতে হবে তোমাকেই।"

পুনশ্চঃ শুভ নববর্ষ।

তুন বছর নিয়ে আদিখ্যেতা থাকে, থাকে অদ্ভুত সব প্রত্যাশা। অনেকটা সেই ছেলেটার মতো যার বাবা অনেক খেটেখুটেও যা হতে চেয়েও হতে পারে নি।

এখন ছেলেকেই স্বপ্ন পূরণের ঘোড়া বানিয়ে ছুটিয়ে দিয়েছে অশ্বমেধের পথে।

অনেকে বলেন নতুন বছর সরকারের মতো, সরকারি ব্যবস্থার মতো-- অনেকটা চাইলে সামান্য মেলে,সামান্যে কিছুই নয়। তাই নতুন বছরের কাছে চাইতে হয় অনেকটা। চাওয়াটা

তো আর এক রকম হয় না। প্রতিস্পর্ধী স্বার্থ বরাবরই বিপরীতে হেঁটেছে। তাই নতুন বছর একজনের হাত ভরে দিলে অন্য জনকে ফিরেয়েছে রিক্ততায়।অর্থ, যশ, সম্মান, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা মনে মনে এসব চাইলেও উপর উপর ভালবাসা, সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা এসবও চেয়ে নিতে হয় মুক্তমনে। অন্তত এভাবেই চাওয়ার একটা অভ্যাস তৈরি হয়েছে আমাদের। নতুন বছর তো আর অন্য কিছু নয় --- সময়। তাই চাওয়াটা সময়ের কাছে-- দাবিটা সময়ের কাছে।

তারপর একসময় সময় ফুরিয়ে আসে-- বছর শেষে চাওয়া পাওয়ার হিসেবে বসলে ফুরিয়ে আসা সময় আলতো আদর মাখিয়ে বলে--- 'আমি যতটা সাধ্য করলুম, বাকিটা সামনের সময়ের থেকে চেয়ে নিও বাপু'।

অপ্রাপ্তি নিয়েও ফুরিয়ে আসা বছরের জন্য জেগে থাকে বুক চাপা কষ্ট, থাকে বিদায়ের ব্যথা। এবারটা একেবারেই অন্য রকম--

পাঁচজনের প্রতিস্পর্ধী চাওয়া এক সুতোয় মিলেছে। সেই চাওয়াটাও আবার অনেকটা নয়।

দাবীমতো নতুন বছরের কাছে প্রত্যাশা সামান্যই-- করোনা মুক্তি। প্রত্যাশা--একটা নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত ভ্যাকসিন যাতে অখন্ড বিশ্ব ফিরে যেতে পারে স্বাভাবিক যাপনে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ফুরিয়ে আসা বছরের জন্য কারোরই নেই কোন অনুকম্পা।

বিদায়ে নেই কোন বেদনা,বরং রয়েছে বিদায়ের সতঃস্ফুর্ত আয়োজন-- মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেটিয়ে বিদায় কর।

টোটো থেকে যখন বরদা স্টেশনের মুখটায় নামলাম তখন দু কাঁধে ব্যাগ, বাঁ হাতের পলিক্যারিয়ারে মিস্টি, চকলেট, কেক এসবের হাবিজাবি, ডান হাতে ফোন। গলা বন্ধ সয়েটারের কারনে জামার পকেটে ফোন চালান করা সময় সাপেক্ষ।

প্যান্টের ডান পকেটে স্যানিটাইজারের বোতল। ওদিকে মাইকিং হচ্ছে হাওড়া যাওয়ার লোকাল বাসুলিয়া ছেড়েছে -- হাতে সময় পাচ্ছি মিনিট পাঁচেক।

আসলে যাওয়ার কথা ছিল বিশ তারিখ ভোরের বাসে, ছেলের কান্নাকাটিতে হঠাৎ করেই পরিকল্পনা গেল পাল্টে-- বরদা থেকে পাঁচটা সাতচল্লিশের ট্রেনে পাশকুঁড়া ওখান থেকে বাসে ঘাটাল।

আমাদের এখানের থেকে ঘাটালের টেম্পারেচার ডিগ্রি দুয়েক কম। রাত নটা নাগাদ যখন পৌঁছব তখন ঠান্ডায় জমে যেতে হবে-- তার উপর করোনার জন্য অত রাতে জীবাণু মুক্ত স্নান এটা ভাবেই কেঁপে কেঁপে উঠছিলাম থেকে থেকে।

রাত নটার হিসাব তখনই মেলা সম্ভব যদি পাশকুঁড়া থেকে ঠিকঠাক বাস মেলে-- ওদিকে যে "শাহী সভা" -- বাস না পাওয়ার বাড়তি একটা চিন্তা থেকেই যায়। হোক টোটো ড্রাইভার তাকে তো আর বাঁ হাতে ভাড়া দেওয়া যায় না। ফোনটা ওর সিটের পাশে রেখে দশ টাকার একটা কয়েন পকেট হাতড়ে দিলাম ওকে। এসব তৎপরতার মাঝে মাথার টুপি গেল পড়ে।

কপাল ভাল টিকিট কাউনন্টারের লাইনে আমি একাই-- পনেরো টাকায় পাশকুঁড়া যাওয়ার টিকিট এগিয়ে দিয়ে স্টেশন মাস্টার বললেন-- " একটু পা চালিয়ে যান ট্রেন ঢুকছে, এক নম্বরে মাল ট্রেন ওভার ব্রিজ নিয়ে দুয়ে যেতে হবে।"

মাইকিং হচ্ছে-ট্রেন দু নম্বর প্লাটফর্মে ঢুকছে। ওভার ব্রিজে পা দিয়ে খেয়াল হল-- "ফোন নেই!" মানে তাড়াহুড়োয় সিটে রাখা ফোন তুলে নিতে ভুলে গেছি বেমালুম। বুক মাড়িয়ে চলে গেল ট্রেন, ভোরের বাসেই যাব এই ভেবে দ্রুত ফিরে এলাম স্টেশনের বাইরে।

না, টোটোটা নেই!

শীতকালে তাড়াতাড়ি অন্ধকার নামে,ফোন হারিয়ে সে অন্ধকার এখন বড় ঘন- জমাট।শরীরে রক্ত চলাচল বোধহয় বুলেট ট্রেনের গতি নিয়েছে, একটু আগে যে শীত কাঁপন লাগিয়েছিল এখন তাকে মনে হচ্ছে তুচ্ছ।