প্রবন্ধ

ইংরাজী কবিতার বাংলা অনুবাদ

গল্প 

কাব্য আলোচনা

কবিতা

ভ্রমণ 

নাট্য-আলোচনা

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ ​

এপ্রিল

২০২০

গল্প

শয়তানের

হাসি

সুশোভন দাস

অল্টো ইউনিভার্সিটি, ফিনল্যান্ড

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই জানালার বাইরে চোখ গেল। বৃষ্টি থেমে গেছে কিন্তু মেঘলা হয়ে আছে। রাতের ঘটনাটা মনে পড়তেই রুম থেকে  বেরিয়ে সামনের ফ্ল্যাটে যাওয়ার জন্য দৌড় দিলাম। রাস্তাঘাটে লোকজন বিশেষ নেই। সারা রাত তনিমার কোনও খবর নেই তাই তাড়াতাড়ি করে একটা বুথ দেখে তনিমার নম্বরে ফোন করল। রিং হয়ে কেটে গেল কিন্তু কেউ ফোন তুললো না। রাতের ঘটনা মনের মধ্যে যেন একটু একটু করে সত্যি হতে লাগল। তাড়াতাড়ি রাস্তা পেরিয়ে সামনের ফ্ল্যাটে এসে কোনও কোলাহল বা মানুষের জটলা না দেখে খুব আস্বস্থ হলাম।

     অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে বাইরে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া শহরটাকে যেন মাটিতে মিশিয়ে ফেলতে চায়। আজ সন্ধ্যা থেকেই প্রকৃতি রুষ্ট হয়েছিল। যত রাত বাড়ছে সেই রাগের অগ্নিকুণ্ডে কে যেন আরো বেশি করে আহুতি দিচ্ছে। বিশ তলার উপর থেকে নীচে তাকালে মনে হচ্ছে গোটা শহরটা যেন এক ঘন মেঘের চাদরে ঢাকা পড়েছে। স্ট্রিট ল্যাম্প থেকে কয়েকটা আলোক ধারা সেই মেঘের বুক চিরে বেরিয়ে আসার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রকৃতি যেন আজ তাদেরকেও নিষ্প্রভ করে দিতে চায়। এমন ভয়াবহ দূর্যোগ এর আগে কখনো হয়েছে বলে মনে পড়ে না।  বিছানার পায়ের দিকের জানলাটা খুলে গেছে দমকা হাওয়ায়। বৃষ্টির ঝাপটায় জানলার পর্দাটা একেবারে ভিজে এক পাশে ঝুলছে। ভেজা পর্দা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল মেঝেতে পড়ে একটা সরু জলধারা সৃষ্টি করে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেছে। ঝড়ের দাপটে বৃষ্টির ঝাপটা বেশ কয়েকবার আমার বিছানা পর্যন্ত ছুটে আসে। কিছুটা আগেই ঘুম ভেঙেছে তবু উঠে জানলাটা বন্ধ না করে বিছানায় শুয়ে রইলাম। প্রকৃতির এই রুদ্র রূপ মনের ভিতর একটা চাপা আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও বিছানায় শুয়ে শুয়ে জানলা দিয়ে তা দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল। কিন্তু মনে করতে পারলাম না কাল রাতে ঘুমানোর আগে জানলাটা বন্ধ করেছিলাম না এমন খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন রাত ক'টা বাজে সেটাও ঠিক আন্দাজ করতে পারলাম না। টেবিলের উপর রাখা মোবাইলের নোটিফিকেশন লাইটটা পর্যায়ক্রমে জ্বলছে ও নিভছে। সেই ক্ষীণ আলো ঘরের নিকষ অন্ধকারের সাথে অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। দমকা হওয়াটা যেন হঠাৎ করেই থেমে গেল। ঝমঝম করে অবিরত বৃষ্টির শব্দের মাঝে ঘরের দেওয়াল ঘড়িটার টিক টিক শব্দ হঠাৎ করেই বেশ জোরে শোনা যাচ্ছে। এমনকি জালনার পর্দা থেকে মেঝেতে পড়া জলের ফোঁটার শব্দও পরিষ্কার কানে ভেসে আসছে। জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারটা ঘরের মধ্যের অন্ধকারের মতো এতো গাঢ় মনে হল না। হালকা ফ্যাকাশে ভাব একটা আছে সেখানে। কিন্তু তাতে রাস্তার উল্টোদিকের বাড়ি দেখতে পাওয়া যায় না। উল্টো দিকের বাড়ির ছাদের আলোটা দু-একবার জ্বলা-নেভা করে শেষমেশ জ্বলে উঠল। সাথে সাথে এক রাশ আলো আমার ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। একটু বিরক্তি লাগল। এমন নিবিড় অন্ধকার রাতে প্রকৃতির ভিন্ন রূপ দেখায় হঠাৎ বাধা পড়ল।  নিজের মনেই বললাম,-'' বাধা যখন পড়েছে তখন জানলা বন্ধ করে ভালো করে ঘুমানো যাক বাকি রাত টুকু।''
     বিছানা ছেড়ে উঠতেই মাথাটা হালকা ঘুরে আবার বিছানায় বসে পড়লাম। নাঃ। নেশাটা এখনো মাথা থেকে নামেনি।  নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বিছানা ধরে ধরে জানলার কাছে এলাম। জানলার পাল্লা দুটো বন্ধ করতে যাব ঠিক তখনি উল্টোদিকের বাড়ির ছাদে এক জন এসে দাঁড়ায় ঠিক একটু আগে জ্বলে ওঠা আলোটার নীচে। উল্টোদিকের বাড়িটাও বিশ তলা। কিন্তু আমার বিল্ডিং থেকে প্রায়  মিটার পঞ্চাশ দূরে। মাঝে রয়েছে তিনটে হাইওয়ে। বৃষ্টির মাঝে ল্যাম্পের আলোয় তার মুখ বোঝা যাচ্ছে না। পরনে সাদা শার্ট আর জিন্স। বৃষ্টিতে ভিজে জামাটা একেবারে আটকে আছে শরীরের সাথে। রোগা চেহারার অবয়ব ফুটে উঠেছে আলো-অন্ধকারের মাঝে। অনেকটা আমারই মতো কিন্তু নারী না পুরুষ সেটা বুঝতে পারলাম না। খুব চেনা চেনা লাগছে কিন্তু নিশ্চিত ভাবে কিছু বুঝলাম না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম সেইদিকে। কিছু ভেবে পেলাম না কি কারণে এতো রাতে একা একা সে ছাদে এসে বৃষ্টিতে ভিজছে। আমি তাকে হাত নেড়ে কিছু বলতে যাব এমন সময় সে ল্যাম্পপোস্টের সাহায্যে ছাদের রেলিং-এর উপর উঠে দাঁড়াল। আমি এক মুহূর্তের জন্য আঁতকে উঠলাম। পরক্ষণেই বিদ্যুতের মতো আমার মনে পড়ে গেল তনিমার কথা। গত সন্ধ্যায় আমরা দুজনে এক ড্রেস পড়ে পার্টিতে গিয়েছিলাম।
     তনিমার সাথে আমার সম্পর্ক গত পাঁচ বছর ধরে। যদিও আমরা ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে চিনতাম। আমরা যখন সাত বছর বয়স তখন তনিমার বাবা বদলি হয়ে আমাদের এলাকায় আসেন সাব-ইন্সপেক্টর হিসাবে। স্কুল যাওয়া, খেলাধুলা করা, সাঁতার শেখা -সব কিছু একসাথেই করতাম। পড়াশুনায় ভালো ছিলাম বলে কাকু-কাকিমা আমায় বেশ পছন্দ করত। স্কুলের পর প্রায় প্রতিদিনই তনিমাদের বাড়ি আসতাম। এমনকি মাঝে মাঝে আমি তনিমার সাথে খেলতে খেলতে ওদের বাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়তাম। তারপর কখন মা-বাবা আমাকে বাড়ি নিয়ে আসতো আমি টেরও পেতাম না। কিন্তু এমন ভালো দিন খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হল না। বছর চারেক পর কাকু আবার বদলি হয়ে অন্য জায়গায় চলে যান। তারপর অনেক বছর তনিমার সাথে খুব একটা যোগাযোগ ছিল না। বাবা মাঝে মাঝে কাকুকে ফোনে করলে তখন দুয়েকটা কথা হত তার সাথে। ক্লাস টুয়েলভের পর সৌভাগ্যবশত দুজনে একই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হলাম। তনিমার ছিল আই-টি আর আমার কম্পিউটার সায়েন্স। বাড়ি থেকে কলেজ অনেক দূর। তাই আমাকে হোস্টেলে থাকতে হল। তনিমা কিন্তু রোজ যাতায়াত করতো। কাকু-কাকিমার স্নেহভাজন হওয়ায় ছুটির দিনে মাঝে মাঝে আমায় বাড়ি ডেকে পাঠাতেন। হোস্টেলের একঘেঁয়ে খাবারের মাঝে বাড়ির রান্না অগ্রাহ্য করার দুঃসাহস আমার ছিল না।  শনি রবিবার গুলো নিজের বাড়ি না ফিরলে হয় তনিমাদের বাড়ি না হলে শহর থেকে কিছুটা দূরে খামখেয়ালি ঘুরে বেড়ানোই ছিল আমার ছুটি কাটানোর উপায়। বাইরে ঘুরতে গেলে তনিমা বেশিরভাগ দিনই যোগ দিত তবে অনেক কাঠ-খড় পোড়ানোর পর। তবে আমার এমন খামখেয়ালি ঘুরে বেড়ানোর জন্য মাঝে মাঝে খুব রাগ করতো আমার উপর। দিন তিন-চার আমার সাথে কথাই বলত না তখন। এমন ভাবেই কলেজের দিন গুলো কেটে গিয়েছিল। এরপর এলো চাকরী পাওয়ার তোড়জোড়। পড়াশুনাতে দুজনেই ভালো ছিলাম তাই ক্যাম্পাসিং-এ প্রথম কোম্পানিতেই দুজনের চাকরী হয়ে গেল। দেখতে গেলে মাথার উপর থেকে বিশাল বড় একটা চাপ এক নিমেষে উবে গেল। চাকরী পাওয়ার পর শেষ ছয়টা মাস খুব আনন্দ করেই কেটে গেল। কলেজ ছাড়ার একেবারে শেষ প্রান্তে এসে তনিমার প্রতি আমার অনুভূতির কথা জানাই। আমার অনুভূতির কথায় চোখে জল এনে বুকে জড়িয়ে একসাথে পথ চলার কথা জানায়। কিন্তু তার আগে এতো দিন পর নিজের মনের কথা জানানোর জন্য আমার গালে তার ভালোবাসার পাঁচ আঙুলের ছাপ এঁকে দিল। সেদিন বুঝেছিলাম প্রেম কাঁঠালের আঠা হলেও প্রেম নিবেদন আসলে শাঁখের করাত। 
    কলেজ ছাড়ার দু-মাসের মধ্যে আমাদের চাকরীতে ঢুকতে হল। পোস্টিং এক জায়গায় হলেও এবার দুজনকেই ছাড়তে হল নিজেদের শহর। অন্য শহরে এসে দুজনে একসাথেই থাকতে শুরু করলাম।  দুজনের বাড়ি থেকে আমাদের সম্পর্কের কথা শুনে খুবই খুশি, তাই বিয়ে নিয়ে কারোর বাড়ি থেকেই কিছু চাপ ছিল না। একসাথে ভালো কাজের সুবাদে দুজনেরই ভালো প্রোমোশন হতে থাকে। প্রতিটা প্রোমোশনের সাথে সাথে আমাদের ফ্ল্যাটের ফ্লোরও উপরে উঠতে থাকে। উপর থেকে শহর দেখার ইচ্ছা তনিমার অনেকদিনের। তাই দেখতে দেখতে আমার এই বিশ তলা বিল্ডিঙের একেবারে উপরে উঠে এলাম। কর্ম ব্যস্ততার মাঝে সময় যে কিভাবে পেরিয়ে যায় তা বোঝার উপায় থাকে না। যদিও দুজনে একসাথে থাকি, একই অফিসের একই প্রজেক্টে কাজ করছি, সব সময়ই দুজন দুজনের মুখ দেখছি কিন্তু কোথাও যেন এই দেখা-দেখির মাঝে দেখেও না দেখার একটা অবজ্ঞা ভাব অদৃশ্য ভাবে আমাদের মাঝে ফুটে উঠেছে।

      উপরে ওঠার ইচ্ছাটা কখন যে রক্তে মিশে গিয়েছিল তা নিজেরাও টের পাই নি। বস্তুগত চাহিদাগুলো এতটাই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল যে ব্যক্তিগত সুখ বস্তু ছাড়া অধরা মনে হতে লাগল। সামনের মানুষটা, যে একটা সময় গোটা মন জুড়ে আধিপত্য চালিয়েছে,

বস্তুগত চাহিদার করাল গ্রাসে সেই সাম্রাজ্য প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের দৌলতে একটা পোশাকি ভালোবাসা আমাদের দুজনেকে একটা আলগা সুতোর বাঁধনে বেঁধে রেখে ছিল। অন্তঃসার শূন্য হয়ে যাওয়া একটা সম্পর্ক যেখানে ঠুনকো আঘাতে চুরমার হয়ে যেতে পারে সেখানে পোশাকি ভালোবাসার ভার দিনে দিনে এক অসহনীয় বেদনার উদ্রেক শুরু করে। কিন্তু যতদিনে তা বুঝলাম তখন আমরা নিজেরাই নিজেদের উপর অধীনতা হারিয়ে ফেলেছি। ফিরে যাওয়ার সব রাস্তাই তখন এতটাই সংকীর্ণ ও দুর্গম যে নিজেদের ক্ষত-বিক্ষত করে সে পথের পথিক হওয়ার সাহস বা মানসিকতা কোনটাই এলো না। তাই পোশাকি ভালোবাসার মায়াবী ছায়ায় মনকে ভুলিয়ে একই ছাদের নীচে দুজনে দুজনের মতো আলাদা দুটো পৃথিবী গড়ে নিলাম। কিন্তু যেদিন পোশাকি ভালোবাসাটুকুও খসে পড়বে সেদিন কিভাবে, তার আতঙ্ক দুজনের ভিতরেই জমাট বেঁধেছে।গত বুধবার তনিমার জন্মদিন গেছে কিন্তু সপ্তাহের মাঝে বলে সেলিব্রেশন পার্টি শুক্রবার রাতেই রাখা হল। সকাল থেকে একটা আনন্দ-উত্তেজনার ঝলক তার চেহারায় ফুটে উঠেছে। এতটা প্রাণোচ্ছলতা তনিমার মধ্যে অনেকদিন দেখি নি। তাই তার উৎফুল্ল মনের জলতরঙ্গ ভাবনার শরিক হয়ে গেলাম। ঠিক হল আজ একই পোশাক পরে অফিস করব তারপর পার্টি। তনিমার পছন্দ অনুযায়ী সাদা শার্ট আর গাঢ় নীল জিন্স তার উপর কোট। অফিসে ঢোকার সাথে সাথে দুজনের এক পোশাক দেখে সবাই খুব তারিফ করল, অনেকে 'মানিকজোড়' বলে আখ্যাও দিল। সন্ধ্যায় অফিস কলিগদের নিয়ে কেক কাটার মধ্যে দিয়ে শুরু হল আমাদের পার্টি। তারপর অফিস থেকে বেরিয়ে নাইট ক্লাবে জমে উঠল আসর। ইদানিং বিলাতি মদ সহ নারী সঙ্গ যেন এই পার্টি গুলোর এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। একটার পর একটা মদের গ্লাস খালি করতে লাগলাম। কোনও হিসাব ছিলনা আজ, ছিল না কোনও মাত্রা জ্ঞানের বাধ্যতা। নেশাগ্রস্থ চোখে লাস্যময়ী নারীদের নৃত্য কিছু অতৃপ্ত বাসনাকে হঠাৎ করেই উদ্দীপিত করে তোলে। তাদের কটিদেশ থেকে খামখেয়ালি তরঙ্গায়িত উত্তেজনা গ্রীবা স্পর্শ করে তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠে রূপান্তরিত অদম্য আবেদনকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার মধ্যে ছিল না। ছুটে গিয়েছিলাম সেই আবেদনের ডাকে, ছুঁতে চেয়েছিলাম সেই তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠ, মেটাতে চেয়েছিলাম অতৃপ্ত বাসনার একাংশ। বাসনার সাগরে একটু একটু করে ডুব দিতে দিতে চোখে ভেসে উঠল তনিমার মুখ। আলো -আঁধারের ঘেরা একরাশ ধোঁয়ার মাঝে তার ঠোঁটও খুঁজে নিয়েছিল অন্য এক আশ্রয়। সময় যেন থমকে গেছে তার নিমীলিত নয়নে। স্বপ্ন পূরণ হওয়ার এক আশার আলোক ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখে। আমার পৃথিবী হঠাৎ করে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে তনিমাকে দেখে। এক-ধাক্কায় আমার নেশাগ্রস্থ অবস্থার অবসান হল। দৌড়ে এলাম তনিমার কাছে। নিজেকে সামলাতে না পেরে এক মুষ্টি ছুঁড়ে দিলাম ছেলেটার উদ্দেশ্যে। আচমকা আমার আক্রমণের প্রত্যুত্তরে তনিমা আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল। এমন প্রতিঘাত আমি কল্পনাতেও ভাবিনি। মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বুঝলাম নেশার ঘোর আবার মাথায় চেপে বসেছে। কিছু কোলাহল আর উৎসুক চোখ আমাকে ঘিরে রইল কিছুক্ষণ। সেই উৎসুক চোখগুলোর মাঝে তনিমার ঘৃণা ভরা চোখ যেন আমাকে সমূলে উৎখাত করতে চায়। নীরবে বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপে আমি ক্লাব ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। বুঝলাম, পোশাকি ভালোবাসাটুকুও আজ খসে গেছে।বাইরের আকাশে তখন দুর্যোগের ঘনঘটা। বৃষ্টির মাঝেই রাস্তার ধারে বসে পড়লাম কিছুটা শান্তির আশায়। মনে মনে ভাবলাম - ভিতর থেকে তনিমাকে নিয়ে আসি। আবার হয়তো নতুন করে শুরু করি। কিন্তু তনিমাও কি তা চায় ? আজ সে ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দিয়েছে। হয়তো অনেকদিন আগেই মন থেকে মুছে ফেলেছে।  তবু কি যায় না অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া ডাইরির পাতাগুলোকে সযত্নে রেখে তাতে নতুন কালিতে পুরানো গল্পকে পুনর্জীবন দেওয়া? হঠাৎ করে একেবারে একলা হয়ে যাওয়ার অনুভূতি বাস্তবের সাথে নিজের মিল ও অমিল গুলোকে আরও স্বচ্ছ করে তোলে। স্ট্রিটল্যাম্প গুলোও সব একা একা দাঁড়িয়ে আছে। একের আলো অন্যের সাথে কথা বলে না। শুধু দেখে আর নিজের জায়গায় স্থির থাকে নিজের মতন করে। হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কত রাত হয়েছে। কিন্তু ঝাপসা চোখে সেটাও বুঝতে পারলাম না। কড় কড় শব্দ করে আকাশের বুক চিরে নেমে এলো এক বিদ্যুতের ঝলক। ক্লাবের গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি ফেরার জন্য। ফেরার পথে অনেক অন্য কথা ভাবার চেষ্টা করলাম কিন্তু মাথা থেকে তনিমার আবেগে ভেসে যাওয়া আর ঘৃণা ভরা দৃষ্টি কিছুতেই সরাতে পারলাম না। নেশার প্রভাব অনেকটা কমে গেলেও মাথার মধ্যে এক ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা সারা শরীরকে অবশ করে দিচ্ছে। যন্ত্রণার প্রকোপ আরো প্রবল হচ্ছে যখনি তনিমার কথা মনে পড়ছে। কখন কিভাবে নিজের ফ্ল্যাটে এসেছি আর কিভাবে বিশ তলায় নিজের রুমে এসে বিছানা নিয়েছি তা আর কিছু মনে নেই।    
     জানলার বাইরে মুখ বাড়িয়ে তনিমার নাম ধরে আমি চিৎকার করে উঠলাম। প্রাণপণে দু-হাত নাড়িয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যে আদৌ কি সে আমায় দেখতে পাবে? সঙ্গে সঙ্গে মাথায় এলো মোবাইলের আলো দেখলে হয়তো সে বুঝতে পারবে। ঝুঁকে পড়লাম টেবিলের উপর মোবাইলটা নেওয়ার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে সেটা অফ হয়ে গেছে। হাতের সামনে কিছু না পেয়ে বাধ্য হয়ে আরো জোরে চিৎকার করতে লাগলাম। কিন্তু হঠাৎ মনে হল আমার চিৎকার আমি নিজেই শুনতে পাচ্ছি না। খুব অবাক লাগল নিজেকে। সন্দেহ হল নিজের উপর - তবে কি আমি স্বপ্ন দেখছি ? কিন্তু না। স্বপ্নই যদি হবে তাহলে এমন জানলার সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে যেতাম না। জানলা থেকে শরীরের প্রায় অর্ধেকটা বের করে দু-হাত ছুঁড়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলাম। একটা সময় মনে হল সে যেন আমাকে দেখতে পেয়েছে। এক নির্মল হাসি ফুটে উঠেছে তার ঠোঁটে। এতো দূর থেকে হাসির স্পষ্ট অনুভূতি যেন নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। তার ডান হাত কনুই থেকে উপরে উঠে এলো। আমার দিকে তাকিয়ে অল্প অল্প করে সে হাত নাড়াতে লাগল। মন্ত্র মুগ্ধের মতো আমার ডান হাতও উঠে এলো। আমিও তার দিকে হাত নাড়িয়ে সারা দিলাম। তারপর দু-হাত ছড়িয়ে বৃষ্টিকে বুকে নিয়ে সে মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল। একটা জোরালো বিদ্যুতের ঝলক কালো মেঘের বুক চিরে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে ক্ষণিকের জন্য সমস্ত অন্ধকারকে দূর করে দিল। সেই  তীব্র চোখ ধাঁধানো আলোর সামনে আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। চোখ খোলার আগেই ভেসে এলো এক কর্ণ বিদারী বজ্রপাতের শব্দ। কানে হাত চাপা দিয়ে  আমি জানলার ধরে বসে পড়লাম। শব্দ থামতে উঠে দাঁড়িয়ে আর কিছুই দেখতে পেলাম না। ছাদের আলোটা আবার নিভে গেছে। আমার ঘরটা আবার নিকষ অন্ধকারে ডুবে গেছে। মনে মনে ভাবলাম - ছাদে যে ছিল সে কি তনিমা নাকি অন্য কেউ ? কেন এসেছিল ছাদে কোথায় গেল? কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের কোলাহলে মাথার যন্ত্রণাটা আবার ফিরে এলো। মাথায় হাত দিয়ে বুঝলাম মাথার পিছনের দিকটায় খুব ব্যথা। কোথাও হয়তো খুব জোরে ধাক্কা খেয়েছি বা মেঝেতে পরে যাওয়ার সময় হয়তো লেগেছে। অন্ধকারের মাঝে মাথা ধরে কোনও রকমে বিছানায় এসে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।  
     পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই জানালার বাইরে চোখ গেল। বৃষ্টি থেমে গেছে কিন্তু মেঘলা হয়ে আছে। রাতের ঘটনাটা মনে পড়তেই রুম থেকে  বেরিয়ে সামনের ফ্ল্যাটে যাওয়ার জন্য দৌড় দিলাম। রাস্তাঘাটে লোকজন বিশেষ নেই। সারা রাত তনিমার কোনও খবর নেই তাই তাড়াতাড়ি করে একটা বুথ দেখে তনিমার নম্বরে ফোন করল। রিং হয়ে কেটে গেল কিন্তু কেউ ফোন তুললো না। রাতের ঘটনা মনের মধ্যে যেন একটু একটু করে সত্যি হতে লাগল। তাড়াতাড়ি রাস্তা পেরিয়ে সামনের ফ্ল্যাটে এসে কোনও কোলাহল বা মানুষের জটলা না দেখে খুব আস্বস্থ হলাম। তাহলে তনিমার কিছু হয় নি। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে ভাবতে মনে হল- তনিমার এই বিল্ডিংয়ে আসার কোনও কারণ থাকতে পারে না। তাহলে কাল রাতে যাকে  ছাদের উপর দেখেছি সেটা পুরোটাই কি একটা ভ্রম ? আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে নিজের বিলিডংয়ের সামনে আসতেই একটা ছোট্ট জটলা চোখে পড়ল। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় এই দিকটা লক্ষ্য করিনি। আমি এগিয়ে গেলাম সেই দিকে। এক অজানা আতঙ্ক আমায় ঘিরে ধরল। বৃষ্টি ভেজা শহরের স্যাঁতসেঁতে গন্ধে মাথার ব্যথাটা আবার জেগে উঠল। যত এগিয়ে গেলাম সেই ভিড়ের দিকে মাথার যন্ত্রণা যেন তত বেশি তীব্র হতে লাগল। দু-হাত দিয়ে নিজের মাথাটা চেপে ধরে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। কিছু লোক সেইদিক থেকে সরে আসছে আবার কিছু লোক সেখানে জড়ো হচ্ছে।  কিন্তু কেউ আমায় লক্ষ্যও করছে না। দু-একজনের চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর পর তাদের মুখের ভাব দেখে মনে হল তারা যেন কেউ আমায় দেখতেই পাচ্ছে না। আমি এগিয়ে গেলাম আরো একটু। কিছু শুনে বোঝার চেষ্টা করলাম কিন্তু কিছুই শুনতে পেলাম না। এতোগুলো লোক জড়ো হয়েছে অথচ সবাই নীরব- এটাও কি সম্ভব? আমি সাহস ভরে ভিড় ঠেলে একেবারে সামনে এসে দাঁড়ালাম। নীল জিন্স আর সাদা শার্ট পড়া এক মানুষের সেখানে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আর প্রচন্ড আঘাতে তার মাথার পিছনের দিক থেঁতলে গিয়ে একটা রক্তের ধারা বৃষ্টির জলের সাথে মিশে অনেকটা দূর পর্যন্ত লাল দাগ কেটে গেছে। লোকটার মুখের উপর চোখ পড়তেই আমি আঁতকে উঠে দু-পা পিছিয়ে এলাম। শুয়ে থাকা মানুষটা আর কেউ নয় আমি নিজে। মাথার ভিতরের যন্ত্রণাটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। কিছু ভাবার আগেই সামনের জানলার কাঁচে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাতে দেখতে পেলাম আমার প্রতিচ্ছবি কাল রাতের মতো আমার দিকে তাকিয়ে ডান হাত নাড়াচ্ছে সাথে তার ঠোঁটে লেগে আছে এক অপার্থিব শান্তির  নির্মল হাসি।  

মতামত

ইসমাইল 

অপর্ণা চক্রবর্তী

টালিগঞ্জ, কলকাতা 

গল্প 

জ্বরের সময় চোখের সামনে আম্মুর জংলা ছাপা শাড়ির আঁচল দেখতে পায় মোমিনা। একটানা চুড়ির আওয়াজ ভেসে আসে কানে। আব্বুর ঘামে ভেজা মুখ, চেতকের সিটে বসা আবছা নিজেকেও দেখেছে অনেকবার। কিন্তু, কোন রাস্তা ধরে যে তার আব্বু তাকে সওয়ারি করে নিয়ে যায়, ঘোরের মধ্যে ঠিক চিনতে পারে না । আর একটা স্বপ্ন দেখে মোমিনা -- আব্বুর ঘুড়িটা উড়তে চাইছে। ছটফট করছে সুতো ছিঁড়ে ফেলার জন্য। কিন্তু আব্বু কিছুতেই সুতোয় ঢিলা দিচ্ছে না। আব্বু লাটাই বুকে চেপে দৌড়চ্ছে।

     সেছোট থেকে রিকশা চালায় ইসমাইল। তখন তার বার কি তের বছর বয়স। মধ‍্যবয়সে এসেও- সে রিকশাওয়ালা। এক বগ্গা ঘোড়ার মতো তেজী ইসমাইলের রিকশা। চেন-চাকা-প‍্যাডেল-সিট সব কিছু ঝকঝক করছে। একঘেঁয়ে প‍্যাকপ‍্যাক হর্নটাও একটা বিশেষ তালে বাজায় সে। রিকশাটা তার নিজের নয়। মালিক কে রোজ রিকশা বাবদ পঞ্চাশ টাকা ভাড়া গুনতে হয়। 

রোজ সকালে আজান সেরে, রিকশা নিয়ে স্ট‍্যান্ডে আসে ইসমাইল। সিটের পিছনে অ‍্যালুমিনিয়াম পাতের ওপর  ফুলকারি  নকশায়  নাম লেখা "চেতক"। তেল ঘষা স্টিলের চাকায় সকালের আলো পড়ে, চকচক করে ওঠে।
জুতো বিহীন চওড়া পা- প‍্যাডেলে চাপ ফেললেই, চেতকের শরীরে প্রাণ সঞ্চার হয়। চালকের আসন থেকে ইসমাইলের কোমর উঠে যায়। ডান পা- বাঁ-পায়ের অবিরত ঘূর্ণনে, চেতকের গতি ক্রমে বাড়তে থাকে। 
বড় রাস্তায় - ব্রীজের ঢাল থেকে নামার সময় - দু'হাতে হাতল চেপে ধরে, প‍্যাডেলের ওপর দু'পায়ে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ে ইসমাইল। তীরের বেগে ঢাল বেয়ে  রিকশা আপনি নামতে থাকে। চেন -চাকা- টায়ারের অবিরত ঘর্ষণ  পিচের রাস্তায়- খ‍্যাস্-খ‍্যাসে একটা যান্ত্রিক শব্দ তৈরী হয়। দ্রুত গতির জন্য - ইসমাইলের চুল হাওয়ায় উড়তে থাকে; তখন তাকে ঠিক চেতকের পিঠে সওয়ার রাণা প্রতাপের মতোই মনে হয়। 

এই সময়- পিছনে সিটে বসে, তার আব্বু কে অবাক হয়ে দেখে মোমিনা। গতির সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য রাখতে - প্রাণপণে নিজেকে চেপে বসিয়ে রাখে আসনে। ছাউনির শিক গুলো ছোট্টো হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। তবু একবারও বলে না 
----- আব্বুউউউ আস্তে চলো।-----
পড়ন্ত বিকেলের হলুদ আলোয় আব্বু কে দেখতে বড় ভালো লাগে মোমিনার। তার আব্বুর তেলহীন - রুক্ষ - উড়ন্ত  চুল দেখলে বুকের মধ্যে কিসের একটা অচেনা কষ্ট জমা হয়!  ঠিক বুঝতে পারে  না মেয়েটা, কেন এমন হয়!

ঈদের​ দিন বড় পীরের দরগায় নামাজ পড়া হয়ে গেলে, বাপ মেয়েতে বেরিয়ে পড়ে চেতক কে সঙ্গে নিয়ে। মসজিদের​ মাঠে আজ ঘুড়ির প‍্যাঁচে লড়াই হবে। দু'চোখে রোদ আড়াল করে, আকাশে উড়ন্ত লাল নীল হলুদ সবুজ গোলাপী রঙ দেখবে মেয়েটা। আর বাবা দেখবে তার মেয়ের মুখে পরীর হাসি। আজ, ইসমাইলের 'জন্নত' নেমে আসবে মসজিদের​ মাঠে। 

সেই কোন ছেলেবেলায় রুজি রোজগারের পথে নেমেছে ইসমাইল। যে বয়সে তার মাঠে ঘাটে ছুটে বেড়ানোর কথা, সেই বয়স থেকে সে রিকশা ছুটিয়েছে। ছোট ছোট আহ্লাদ গুলো তুচ্ছ করে, উড়িয়ে দিয়েছে অনায়াসে। কিন্তু, ঘুড়ি আর ওড়ানো হয়নি কোনদিন। ইসমাইল ঘুড়ি ওড়াতে শেখেনি।

মোমিনার খুব ইচ্ছা হয় , তার আব্বুও বড় মসজিদের মাঠে সবার সাথে ঘুড়ি উড়াক। 
এবার ঈদে মেয়ের ইচ্ছা মত ঘুড়ি- লাইট - মাঞ্জা - সুতো সবকিছু কেনা হলো। সুতোয় বাঁধা ঘুড়ির দুই প্রান্ত ধরে, মাথার ওপর ঘষে চেত্তা দিল মোমিনা। তারপর হুশ করে যতটা সম্ভব উঁচুতে উড়িয়ে দিল ঘুড়িটাকে। অনধিকে ইসমাইল আপ্রাণ চেষ্টায় সুতোয় এলোমেলো টান দিচ্ছে। হাওয়ার সঙ্গে কিছুতেই ঘুড়ির তাল মেলাতে পারছে না। বারবার মাটিতে মুখ থুবড়ে গোত্তা খাচ্ছে ঘুড়ি। একবার - দুবার - আরও অনেক বারের প্রচেষ্টাতেও ঘুড়ি বাতাস কেটে আকাশে উড়ল না। 

ব‍্যর্থ হয়ে, চল্লিশোর্ধ ইসমাইল শিশুর মতো অবোধ অসহায় হাসি হাসি মুখ করে, মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। আব্বুর এই অসহায় মুখ দেখলেই  সেই অচেনা কষ্টটা আবার বুকের মধ্যে টের পায়  মোমিনা। মনে হয় যেন - আব্বুকে সে অনেক দিন দেখতে পাবে না। আব্বু দূরে কোথাও চলে যাবে।
 ঘুড়ি ওড়ানোর ব‍্যর্থ প্রচেষ্টার পর, মেয়ের দিকে তাকিয়ে ইসমাইল দেখল -- মা মরা মেয়েটা কেমন দু্ঃখী আনমনা হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তখন হঠাৎই - লাটাইটাকে দু'হাতে আঁকড়ে, মাথার ওপর তুলে বনবন দৌড়াতে লাগল সে। লাটাইয়ের সুতোয় বাঁধা ঘুড়িটা ফরফর করে উড়তে শুরু করল। হাওয়া কেটে কেটে সারা মাঠ দৌড়াচ্ছে ইসমাইল। ঘামে ভিজে-  জামাটা লেপ্টে যাচ্ছে রোগা শরীরে, বুকের ভিতরে নিঃশ্বাসের হাপর পড়ছে। আর ঘুড়িটা যেন ওকে তাড়া করে করে উড়ছে মাথার পিছনে।


 

হঠাৎ, আব্বুর এমন কান্ড দেখে, অবাক হল মোমিনা। হাসিও পেল। আব্বু বুড়ো হয়ে যাবে, তবুও ঘুড়ি আর ওড়াতে শিখবে না!! নিজের থেকে আব্বুকে কমবয়সী লাগে মাঝে মাঝে। মা চলে যাবার পর, তাকে ভোলাতে, মাঝে মাঝেই এমনি সব কান্ড করে তার আব্বু। সব বোঝে সে। ছোট থেকেই মেয়েটা রুগ্ন। জ্বরটা কিছু দিন পর পর ঘুরে ফিরে আসে। মা মারা যাওয়ার পর মেয়েটাও  আনমনা থাকে খুব। জ্বরের ঘোরে মাকে কাছে ডাকে। মা ভেবে কতবার আব্বুকেই ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে!

জ্বরের তাপে মেয়ের মুখটা লাল হয়ে থাকে। বন্ধ চোখের পাতা দুটো কাঁপে। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে, সাদা দাঁত গুলো অল্প দেখা যায়। মোমিনাকে বড় সুন্দর দেখতে লাগে এই সময়। ইসমাইল তাকিয়ে থাকে মেয়ের মুখের দিকে। ভয় লাগে আজকাল। জ্বর হলেই মেয়েটা এতো সুন্দর হয়ে যায় কেন! এই রূপ সে দেখতে চায়না। এই মুখ তার ভালো লাগে না। জ্বর ছাড়ার পর মেয়ের ওই শীর্ণ ক্লান্ত মুখটা দেখার জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে ইসমাইল। 

জ্বরের সময় চোখের সামনে আম্মুর জংলা ছাপা শাড়ির আঁচল দেখতে পায় মোমিনা। একটানা চুড়ির আওয়াজ ভেসে আসে কানে। আব্বুর ঘামে ভেজা মুখ, চেতকের সিটে বসা আবছা নিজেকেও দেখেছে অনেকবার। কিন্তু, কোন রাস্তা ধরে যে তার আব্বু তাকে সওয়ারি করে নিয়ে যায়, ঘোরের মধ্যে ঠিক চিনতে পারে না। আর একটা স্বপ্ন দেখে মোমিনা -- আব্বুর ঘুড়িটা উড়তে চাইছে। ছটফট করছে সুতো ছিঁড়ে ফেলার জন্য। কিন্তু আব্বু কিছুতেই সুতোয় ঢিলা দিচ্ছে না। আব্বু লাটাই বুকে চেপে দৌড়চ্ছে।  লাটাই ছেড়ে দিলেই সব সুতো নিয়ে ঘুড়ি একা একা উড়ে যাবে এক্ষুনি।

সন্ধ‍্যার আজান সেরে এসে ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে দিল ইসমাইল। হলদে বাল্বের ম্লান আলো ছড়িয়ে আছে তার দৈন‍্য সংসারে। তেলচিটে বিছানার একপাশে কুঁকড়ে শুয়ে আছে মেয়েটা। দু'দিন চোখ খোলে নি। এবারের জ্বরটা কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। মেয়ের শীর্ণ, দূর্বল চেহারার দিকে তাকাতে পারে না ইসমাইল। কোন ওষুধই ঠিক মতো কাজ করছে না। সদর হাসপাতালে ডাক্তার বাবুর ওষুধেও জ্বর নামছে না ঠিক মতো। মেয়ের গায়ে চাদর টা টেনে দিয়ে, মাথার কাছে বসল ইসমাইল। আজ সারারাত সে দোয়া পাঠ করবে, পরম করুনাময়ের এর কাছে।

বন্ধ চোখের সামনে হলদে সবুজ আলোর ফুলকি দেখতে পাচ্ছে মোমিনা। আব্বু ডাকছে তাকে। আব্বুর গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে সে -- একটানা দোয়া পাঠ শুনতে পাচ্ছে মৌমিনা। 
------"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল হালীমুল হাকীম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুল আরশিল আজীম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি- ওয়া রাব্বুল আরশিল কারীম।" ------ পরম করুণাময়ের স্তুতি করছে আব্বু।

হালকা হয়ে আসছে মোমিনার শরীর। শীত করছে খুব। দূরে থেকে ভেসে আসা ডানার ঝটফট্ শুনতে পাচ্ছে মোমিনা। বড় মসজিদের ওপর থেকে সব পায়রা গুলোকে একসাথে কেউ ফরফরিয়ে উড়িয়ে দিলো হয়তো। বন্ধ চোখের সামনে হলদে সবুজ আলোর ফুলকিও সরে সরে যাচ্ছে ক্রমশ। এখন শুধুই সাদা আলোয় ভরা আকাশ দেখছে সে। আর সেই আকাশে দূরে অনেক দূরে উড়ছে আব্বুর ঘুড়িটা। আজ খুব খুশি মোমিনা। একবার চিৎকার করে আব্বু কে জানাতে চাইল ---- আব্বু দেখেছ , ঘুড়িটা উড়ছে, অনেক উঁচুতে, আমি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু, গলা বুঝে আসছে তার। আব্বুর গলার আওয়াজও দূরে চলে যাচ্ছে, ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। 
তার কানে তালা লেগে যাচ্ছে কেন! আর কোন কিছুই শোনা যাচ্ছে না কেন! একটানা পিঁ-পিঁ-পিঁ শব্দ কিসের! চোখ খুলতে চাইল মোমিনা। একবার আব্বুকে দেখতে চেষ্টা করল। আব্বু দূরে চলে যাচ্ছে। আর হয়তো দেখা হবে না কখনো।

ইসমাইলের দোয়া কবুল হয়নি। তিন চার দিনের একটানা জ্বরে, চলে গেল মোমিনা। যাবার সময়ও মেয়েটা একবার পরীর মতো হেসেছিল, তার আব্বুর জন্য। 

কবরে শেষ মাটি দিয়ে, চেতকের সঙ্গে একা ফিরে এল ইসমাইল। সিটে মাথা রেখে পাদানীতেই ঘুমিয়ে পড়ল কখন। রোজের মতো ভোরের আজানেই ঘুম ভাঙল তার। চেতক কে সঙ্গে নিয়ে আবার স্ট‍্যান্ডের দিকে চলল সে। 
জীবন তো আর থেমে থাকেনা! 

বেশ কিছুদিন হল -- কানাঘুষো শুনছিল ইসমাইল। রিকশা মালিক নাকি  তার সব রিকশা, স্ট‍্যান্ড থেকে তুলে নেবে।  বাজার চলতি নতুন দুটো ব‍্যাটারী টোটো  কিনেছে মালিক। 
লাভ-ক্ষতির পাটিগণিত ঠাসা মগজে হিসাব নিকাশ করে - রিকশা মালিক একদিন ইসমাইল কে জানিয়ে দিল -
---- "রিকশায় আর তেমন লাভ দেখছি না রে ইসমাইল। ঈদের পরে রিকশা জমা দিয়ে -  তুই অন‍্য ভাড়া খুঁজে নিস।"

এ' অঞ্চলের রিকশা মালিকরা সবাই চেনে ইসমাইল কে। নতুন ভাড়া পেতে একদিনও সময় লাগবে না তার। কিন্তু, এতো দিনের সুখ দুঃখের সঙ্গী চেতক কে আর কিছুদিন পরেই ছেড়ে দিতে হবে! তার মোমিনার বড় প্রিয় ছিল চেতক। মেয়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে চেতকের সিটে- চাকায়। মালিকের কাছে ওটা তো শুধুমাত্র একটা রিকশা। যা সারাদিনে মাত্র পঞ্চাশ টাকা রোজগার দেয়।

কবরের পাশে শুয়ে আছে ইসমাইল। চেতকও তিন পায়ে দাঁড়িয়ে আছে মোমিনার কবরের কাছেই। হয়তো শেষ বারের মতো। আজ খুশির ঈদ। কাল চেতক কে রেখে আসতে হবে তার আসল মালিকের জিম্মায়।
একটা ভালো চাদর মেয়ের কবরের জন্য এনেছে ইসমাইল। কিছু ফুল, আর লাটাইয়ে বাঁধা লাল  ঘুড়ি। 

চিত হয়ে শুয়ে, আকাশ দেখছে ইসমাইল। বড় মসজিদের মাঠে ঘুড়ি উড়ছে; আলোময় আকাশ জুড়ে - লাল নীল সবুজ পেটকাটি চাঁদিয়ালের মেলা। একভাবে অপলক সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে তার। তবু পলক পড়ছে না। বুক ছেঁচা জল চোখের ধার বেয়ে - কানের পাশ হয়ে- গড়িয়ে পড়ছে কবরের পাশে মাটিতে। 

ছোটবেলার মতো এখনো তাকে হাতছানি দেয় উড়ন্ত ঘুড়ির ঝাঁক। ওই আকাশেই মিশে আছে তার মোমিনার শেষ ইচ্ছা। মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করতে পারেনি ইসমাইল। আকাশের কোণে বিন্দু হয়ে কখনো ওড়েনি তার ঘুড়ি। 
লাটাইয়ের সুতোয় ঘুড়িটাকে বেঁধে নিয়ে, ফুল ছড়ানো মেয়ের কবরের চারপাশে -আজ আবার বনবন দৌড়াচ্ছে ইসমাইল।

 

মতামত

গল্প 

একটি

পাখির প্রেম

সন্দীপ চ্যাটার্জী

ধরত্রিগ্রাম, বর্ধ্মান 

জানিস আজ আমার খুব ইচ্ছা হয় একটি-বারের জন্য যদি মানুষ হতাম কতো ভালো হত, মানুষের মতো কথা বলতে পারতাম। দেখতিস কাউকে সুধীয়ে ঠিক পৌঁছে যেতাম তোর নতুন জানালায়।    

      আজ হঠাৎ ইচ্ছা হল তোকে কিছু বলতে,শুনবি? শুনবি আমার কথা?
আমি? কে আমি? 
আমি হলাম একটি পাখি,কোন দেশের তা জানিনা। কিন্তু আমি উড়ে এসেছিলাম তোর দেশে, তোর শহরে,তোর পাড়ায়। ওই যে সেদিন দুপুরবেলায় বসেছিলাম তোর জানালায়,তুই আমায় দেখে হেসেছিলি, ভালবেসেছিলি আমায়। 
আমি যে ঠিক কখন তোকে ভালবেসেছিলাম তা বলতে পারব না।
কিন্তু....কিন্তু যখন আমার খুব খিদে পেলো আমি খিদের জালায় জোরে জোরে ডাকছিলাম,তখন তুই আমার দিকে সেই রুটির টুকরো টা ছুঁড়েছিলি। তোর ভাষা তো আমি জানিনা, তাই তোকে আমি বলতে পারিনি,খাবার চাইতে পারিনি তোর কাছে । কিন্তু তবু তুই কেমন আমার মনের চাওয়া টা বুঝেছিলি। ঠিক তক্ষনি আমি তোকে আমার  মন টা দিয়ে দিয়েছিলাম....তোকে বড্ড ভাল লেগেছিল আমার। কিন্তু কিভাবে তোকে বলবো বুঝতে পারিনি, আর তাইতো তাইতো আমি তোর হাতে ঠক্কর মেরেছিলাম । তোর খুব ব্যাথা লেগেছিল না রে? অভিমান হয়েছিল আমার ওপর? তাই তুই আমায় ওভাবে সেদিন তাড়িয়ে দিয়েছিলি তোর জানালা থেকে?
জানিস আমি কিন্তু একটুও কষ্ট হয়নি সেদিন। তোর বকুনিটা আমায় তোর প্রতি আমার ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে সাহায্য করেছিল। যখন তুই আমায় তাড়িয়ে দিলি তখন বুঝেছিলাম তোকে ছেরে যাবার ব্যাথাটা। জানিস তারপর থেকে রোজ তোর জানালায় আসি, তোকে দুর থেকে দেখি,খুব ভাল লাগে তোকে দেখতে। তুই হয়তো আর আমায় লক্ষ্য করিস না,আমি কিন্তু রোজ তোর জন্য একটা গোলাপ পাতা তোর জানালায় রেখে আসি। তুই দেখিস রে? দেখিস না?

হয়তো তুই দেখার আগেই বাতাস তোকে দেওয়া আমার সেই উপহারটি উড়িয়ে দেয় । আমি কিন্তু কোনোদিন তাই ভেবে তোকে গোলাপ পাতা দিতে ভুলি না। আমি জানি বাতাস-ও একদিন আমার ভালোবাসার কাছে হেরে যাবে,সেদিন আমার উপহার টি ঠিক তোর কাছে পৌঁছবে।
আচ্ছা তোকে সেদিন অতো মানুষ মিলে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলো রে? তুই ঘুমাচ্ছিলি, তোর খাট-টা কি সুন্দর ফুল দিয়ে সাজানো ছিল। তোকে কি সুন্দর লাগছিলো। সেদিনও আমার বড্ড খিদে পেয়েছিল,তুই বুঝতে পেরেছিলি না রে? তাই তুই সবাইকে বলেছিলি আমায় খেতে দিতে? সবাই রাস্তায় খই ছড়িয়ে দিল, আর ওই খই খেতে গিয়েই তোর দিকে তাকাতে পারিনি কিছুক্ষণ। সেই ফাকেই সবাই তোকে কোথায় একটা নিয়ে চলে গেল। আর তো দেখতে পেলাম না।
জানিস আজও আমি তোর জানালায় আসি। কিন্তু সেদিনের পর থেকে আর তো তোকে ঘরে দেখিনা। আজ দুটি বসন্ত পার হয়েছে,তোর কথা খুব মনে পড়ে। তুই কোথায় রে? তোকে আর আমি দেখিনা কেন? তুই কি আমার ওপর রাগ করেছিস তাই আমায় দেখা দিচ্ছিস না?
কি জানি তুই কোথায়।
জানিস আজ আমার খুব ইচ্ছা হয় একটি-বারের জন্য যদি মানুষ হতাম কতো ভালো হত, মানুষের মতো কথা বলতে পারতাম। দেখতিস কাউকে সুধীয়ে ঠিক পৌঁছে যেতাম তোর নতুন জানালায়।    

মতামত

রবীন্দ্রানুরাগী

রামচন্দ্রন

দিলীপ মজুমদার 

লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক

পর্নশ্রী, বেহালা, কলকাতা 

প্রবন্ধ

আত্মার স্বাধীনতার পাঠ তিনি যেমন নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে, তেমনি নিয়েছিলেন আন্তর্জাতিকটার শিক্ষা । বুঝেছিলেন ‘জাতিপ্রেম নাম ধরি প্রচণ্ড অন্যায় / ধর্মেরে ভাসাতে চাহে বলের বন্যায়’ । রবীন্দ্রনাথের মতো নিখিল মানবের ধ্যান ছিল তাঁর হৃদয়ে । মন্ত্রের মতো হৃদয়ে গুনগুন করত রবীন্দ্রনাথের বাণী : ‘ ও আমার দেশের মাটি তোমার পায়ে ঠেকাই মাথা / তোমাতে বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা’ ।


     জ থেকে একশো বছর আগে দক্ষিণ ভারত থেকে একটি তরুণ এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো করতে। সেই তরুণটির নাম গি রামচন্দ্রন। কেরলের পেরুমাথান্নিতে ১৯০৪ সালে তাঁর জন্ম। এই তরুণটির জীবনের ধ্রুবতারা হলেন এ দেশের দুই মনীষী—রবীন্দ্রনাথ আর গান্ধীজি।
      ১৯২০ সালে রবীন্দ্রনাথ ত্রিবান্দ্রমে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ভারতবন্ধু সি এফ এন্ড্রুজ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রামচন্দ্রনের পরোক্ষ পরিচয় হয়েছিল সেন্ট জোশেপ স্কুলে। সে স্কুলের প্রধান শিক্ষক কুলন্দি স্বামী ছিলেন রবীন্দ্রভক্ত। তাঁর কাছেই রামচন্দ্রন শোনেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা। সেসব কবিতা শুনে তাঁর ‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি’। এন্ড্রূজের সঙ্গে পরিচয় ছিল রামচন্দ্রনের। এন্ড্রুজ রামচন্দ্রকে পরিচয় করিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। জানালেন রামচন্দ্র পড়তে চায় বিশ্বভারতীতে। এত দূরে গিয়ে পড়াশুনোর ব্যাপারে তাঁর বাবার মত ছিল না। কিন্তু নাছোড়বান্দা রামচন্দ্রন। শেষপর্যন্ত রাজি হতে হল বাবাকে। দাদা রঘুবীরনকে সঙ্গে নিয়ে রামচন্দ্রন ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাসের এক শীতের সকালে হাজির হলেন শান্তিনিকেতনে।
       বৃক্ষলতায় ঘেরা শান্তিনিকেতন তাঁর হৃদয়হরণ করে নিল কয়েকদিনের মধ্যে। দেখলেন সুন্দর এক ছন্দে বাঁধা এখানকার আশ্রমজীবন। ভোর সকালে উঠে পড়তে হয় ছাত্রদের। সূর্য ওঠার আগে। তারপরে গান গাইতে গাইতে প্রভাত ফেরি। রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রকৃতি বন্দনামূলক গান । তারপরে প্রার্থনা। সে প্রার্থনাগীতি রবীন্দ্রনাথেরই লেখা। জাতি-ধর্ম-বর্ণের কোন স্পর্শ সে প্রার্থনাগীতিতে ছিল না। প্রাতঃরাশের পরে সকাল সাড়ে সাতটায় শুরু হত ক্লাশ। মাঝে কিছু সময়ের বিরতি। পরের ক্লাশ শুরু হত আড়াইটেতে। তার সময়সীমা ২ ঘন্টা। তারপরে খেলাধুলো। সন্ধ্যের সময় কোনদিন ছাত্রদের সভা, কোনদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অলস বা নিশ্চল থাকতে পারে না ছাত্ররা। আবার এই শ্রম তাদের গায়েও লাগে না, কারণ এর মধ্যে একঘেয়েমি নেই।
       আরও একটা জিনিস অভিভূত করল রামচন্দ্রনকে। শ্রীনিকেতনে তিনি দেখলেন অন্য এক দৃশ্য। আমাদের পল্লিজীবনের বাস্তবতার পাঠ নিলেন তিনি অধ্যাপক পিয়ার্সনের কাছে। দেখলেন পল্লি পুনর্গঠনের কাজ। পরবর্তী জীবনে এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন ‘গান্ধী গ্রাম’। বুঝলেন কৃষিকে দিতে হবে প্রাথমিক গুরুত্ব। তারপরে নজর দিতে হবে পল্লির কুটিরশিল্পের দিকে। এভাবে পল্লির মানুষ হতে পারবে স্বাবলম্বী।
      বিশ্বভারতীতে সাহিত্য, দর্শন, সমাজতত্ত্ব অধ্যয়নের সঙ্গে সঙ্গে সমাজসেবা তথা দেশসেবার পাঠ নিতে লাগলেন তিনি। বিশ্বভারতীর আদর্শ তাঁর তরুণ মনেকে প্লাবিত করছিল। সে আদর্শ যথার্থ মানবতার আদর্শ। সে আদর্শ মনের মুক্তি ও স্বাধীনতার আদর্শ । রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

প্রথমে আমি শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপন করে এই উদ্দেশ্যে ছেলেদের এখানে এনেছিলুম যে, বিশ্বপ্রকৃতির উদার ক্ষেত্রে আমি এদের মুক্তি দেব। কিন্তু ক্রমশ আমার মনে হল যে, মানুষে মানুষে যে ভীষণ ব্যবধান আছে তাকে অপসারিত করে মানুষকে সর্বমানবের বিরাট লোকে মুক্তি দিতে হবে। আমার বিদ্যালয়ের পরিণতির ইতিহাসের সঙ্গে সেই আন্তরিক আকাঙ্ক্ষাটি অভিব্যক্ত হয়েছিল। কারণ বিশ্বভারতী নামে যে প্রতিষ্ঠান তা এই আহ্বান নিয়ে স্থাপিত হয়েছিল যে, মানুষ শুধু প্রকৃতির ক্ষেত্রে নয়, কিন্তু মানুষের মধ্যে মুক্তি দিতে হবে।
    রামচন্দ্রনের মনে গুনগুন করে বাজে রবীন্দ্রনাথের কত কবিতার পঙক্তি। যে সব কবিতায় কবি মানুষের মনের মুক্তির কথা বলেছেন। আবিষ্টচিত্তে রামচন্দ্রন আবৃত্তি করতে থাকেন:
চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর / আপন প্রাঙ্গনতলে দিবসশর্বরী / বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি, / যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে / উচ্ছ্বসিয়া উঠে.............
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গান্ধীজিরও গভীর প্রভাব পড়ছিল রামচন্দ্রনের মনে। তিনি লক্ষ্য করছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজি পরস্পরকে শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু নানা ক্ষেত্রে তাঁদের মতের মিল ছিল না। শান্তিনিকেতনে এইরকম এক বিতর্কের সূত্রপাত হল। রামচন্দ্রন তার প্রত্যক্ষদর্শী।
     তখন শুরু হয়েছে অসহযোগ আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ ‘মডার্ন রিভিউ’ কাগজে সে আন্দোলনের সমালোচনা করছেন। সমালোচনা করছেন চরকা নিয়ে। শান্তিনিকেতনের একদল ছাত্র তখন সে সব আন্দোলনে মেতে উঠেছে। রামচন্দ্রনও তাদের একজন। তিনি তখন ছাত্র সংগঠনের সম্পাদক। রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীর মতামত নিয়ে তিনি আয়োজন করলেন এক বিতর্কসভার। সে সভার বিষয়:  ‘In  this  controversy in  regard  to  the  immediate   tasks  to  be  accomplished    in  India  Mahatma  Gandhi’s  programme  is  the  only   right   programme’ . বিতর্কসভায় রামচন্দ্রন জোরালো ভাষায় খন্ডন করেছিলেন  রবীন্দ্রনাথের মত।
     খবরটা রবীন্দ্রনাথের কানে গেল। তিনি ডেকে পাঠালেন রামচন্দ্রনকে। ডাক পেয়ে রামচন্দ্রন একটু দ্বিধাগ্রস্ত ও ভীত হলেন। গুরুদেবের প্রতিষ্ঠানের ছাত্র তিনি, অথচ সেই গুরুদেবের মতামতের বিরুদ্ধতা করছেন তিনি। কি বলবেন গুরুদেব?
বিতর্কসভার পরের দিনই রামচন্দ্রন গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। মৃদু হেসে তাঁকে অভ্যর্থনা করলেন রবীন্দ্রনাথ। অবাক রামচন্দ্রন। ক্রোধ বা বিরক্তির চিহ্নমাত্র নেই গুরুদেবের মুখে। বললেন, ‘ কালকের বিতর্কসভার কথা শুনেছি। তোমরা যে সাহসের সঙ্গে নিজের মতামত প্রকাশ করেছ সেজন্য আমি আনন্দিত।’ হতবাক রামচন্দ্রন। এতটা ভাবেন নি তিনি। গুরুদেব আরও বললেন, ‘তোমরা কি আরও একটা সভার আয়োজন করতে পারবে? সেখানে আমি আমার কথা আরও একটু খোলসা করে বলতে পারব তোমাদের কাছে?’
     আর একটা সভার আয়োজন করার অনুমতি চাইছেন গুরুদেব? অনুমতি চাইছেন ছাত্রের কাছে? এ যে অভাবিত। তার পরের দিন একটা সভার আয়োজন করা হল। রবীন্দ্রনাথ বললেন তাঁর নিজের জীবনের কথা। বললেল কেন তিনি এ ধরনের আশ্রম বিদ্যালয়ের কথা ভাবলেন। ছোটবেলায় স্কুলকে তাঁর জেলখানা মনে হত। শিক্ষার্থীর কোন স্বাধীনতা ছিল না। তার উপর বড়রা বোঝা চাপিয়ে দিতেন। এটা শিক্ষার্থীর আত্মবিকাশের পক্ষে এক প্রবল বাধা। শিক্ষার্থীর সেই আত্মবিকাশ ও মনের স্বাধীনতার কথা ভেবেই তিনি শান্তিনিকেতনে এরকম বিদ্যালয়ের কথা ভেবেছিলেন। তিনি বললেন গান্ধীজির প্রতি তাঁর নিগূঢ় শ্রদ্ধা আছে, কিন্তু তাঁর কোন কোন মত তিনি মেনে নিতে পারেন নি। তিনি চান আসমুদ্রহিমাচলের মানুষ গান্ধীজিকে অনুসরণ করুক নিজের নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে, কিন্তু তা যেন কখনও অন্ধ অনুসরণ না হয়। অন্ধ অনুসরণে আত্মার স্বাধীনতা পরাজিত হয়।
      রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলি মনে গেঁথে গিয়েছিল রামচন্দ্রনের। শ্রদ্ধাবোধ অক্ষুণ্ণ রেখেও কিভাবে ভিন্নমত প্রকাশ করা যায় সে শিক্ষা তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছেই লাভ করেছিলেন। গান্ধী গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সময় এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি। চিত্তকে ভয়শূন্য রেখে, শিরকে উন্নত করেই রামচন্দ্রন পরাধীন ভারতবর্ষের ইংরেজ শাসকের সমালোচনা করতে পেরেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কস্তুরবা গান্ধীর মৃত্যুর জন্য ব্রিটিশ প্রশাসনকে দায়ী করে তিনি ভাইসরয় লর্ড ওয়েভেলকে বলতে পেরেছিলেন: ‘ An  Empire  afraid  of Kasturaba  Gandhi  was  a doomed Empire‘. স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল গান্ধী গ্রামে এলে রামচন্দ্রন পুলিশ বা নিরাপত্তারক্ষীদের প্রতিষ্ঠানের ভেতর প্রবেশ করতে দেন নি। চিন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের পরে এন সি সি বাধ্যতামূলক করা হয় কিন্তু রামচন্দ্রনের প্রতিষ্ঠানে সে নিয়ম লাগু করা যায় নি।
    আত্মার স্বাধীনতার পাঠ তিনি যেমন নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে, তেমনি নিয়েছিলেন আন্তর্জাতিকটার শিক্ষা। বুঝেছিলেন ‘জাতিপ্রেম নাম ধরি প্রচণ্ড অন্যায় / ধর্মেরে ভাসাতে চাহে বলের বন্যায়’। রবীন্দ্রনাথের মতো নিখিল মানবের ধ্যান ছিল তাঁর হৃদয়ে। মন্ত্রের মতো হৃদয়ে গুনগুন করত রবীন্দ্রনাথের বাণী: ‘ ও আমার দেশের মাটি তোমার পায়ে ঠেকাই মাথা / তোমাতে বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা’।

মতামত

প্রবন্ধ

মধ্য আমেরিকার বৃক্ষ

ক্যান্ডলট্রি ও গুয়াজিলটে

মোহম্মদ জয়নুল আবেদিন

২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে স্থলপথে কলকাতা যাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘সোসাইট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন, ইনডিয়া’-এর বার্ষিক কনফারেন্সে যোগ দেবার জন্য। কনফারেন্স শেষে স্ত্রীর চোখের চিকিৎসার জন্য চেন্নাই যাই “সঙ্কর নেত্রালয়ে’। চিকিৎসা শেষে ফেরার পথে ২দিন কলকাতায় যাত্রাবিরতি ছিল। আমার বহুদিনের ইচ্ছা ছিল উইলিয়াম রক্সবার্গ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের অন্যান্য দিকপালের স্মৃতিবিজরিত ’শিবপুর বোটনিক্যাল গার্ডেন’ দেখা।

(ক্যান্ডলট্রি ও গুয়াজিলটে চারা, Candle tree and Guajilote seedling, at my mini nursery.)

(ছবিঃ ক্যান্ডলট্রি, পাঁকা ফল, Candle tree, Mature Fruits, at AERE Savar Dendrarium)

(ক্যান্ডলট্রি, ফল, Candle tree, Fruits, at AERE Savar Dendrarium)

     ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে স্থলপথে কলকাতা যাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘সোসাইট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন, ইনডিয়া’-এর বার্ষিক কনফারেন্সে যোগ দেবার জন্য। কনফারেন্স শেষে স্ত্রীর চোখের চিকিৎসার জন্য চেন্নাই যাই “সঙ্কর নেত্রালয়ে’। চিকিৎসা শেষে ফেরার পথে ২দিন কলকাতায় যাত্রাবিরতি ছিল। আমার বহুদিনের ইচ্ছা ছিল উইলিয়াম রক্সবার্গ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের অন্যান্য দিকপালের স্মৃতিবিজরিত ’শিবপুর বোটনিক্যাল গার্ডেন’ দেখা। গার্ডেনটি হুগলি নদীর অপর পারে হাওড়া জেলায় অবস্থিত। বৃক্ষগুরু দ্বিজেন শর্মা মহোদয়ের অনুবাদগ্রন্থ ‘হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ডালটন হুকার” পড়ে জানতে পারি যে ১৮৪৮ সালে স্যার যোসেফ ডালটন হুকার যখন এদেশের গাছপালা সরে জমিনে সমীক্ষা করার কাজে ৩ বৎসরের জন্য বৃটিশ ভারতে এসেছিলেন তখন প্রথমেই তিনি এ গার্ডনের আতিথ্য বরণ করেছিলেন। ১৮৪৮-১৮৫১ সময়ে তার সংগৃহীত দার্জিলিং- সিকিম-তিব্বত অঞ্চলের উদ্ভিদের নমুনাগুলি এ গার্ডেনের মাধ্যমেই বিলেতে প্রেরণ করা হত।

       শিবপুর বোটনিক্যাল গার্ডন’ পরিদর্শন করার সময় ওখানে দেখা যে সমস্ত গাছ আমার মনে রেখাপাত করতে পেরেছে তার মধ্যে সসেজট্রি, পালান ও ৩৬০ বছরের পুরানো বট গাছ অন্যতম। সময়টা ছিল ডিসেম্বরের শেষ দিন। এসময় নাম না জানা একটি গাছে মোমবাতির মত লম্বা ইষৎ হলুদাভ সাদা একটি ফল দেখে সেটি সংগ্রহ করে নিয়ে আসি। সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল। আরো দেখা হয়েছিল ’তরুপল্লব’ এর নরম মাংশল এই পাকা ফলটি চিড়ে মরিচের বীজের মত প্রচুর চেপ্টা বীজ পাই। বীজগুলি আমার বাসার ছাদে মাটিভরা প্যাকেটে বপন করার পর যথাসময়ে অনেক চারা গজায়। এর কয়েকটি চারা আমি আমাদের এইআরই সাভার ডেনড্রারিয়ামের কয়েক জায়গায় রোপন করি। পরবর্তীতে এক সময় এ গাছে মোমবাতির মত লম্বা সাদা ফল ধরে। এর পাতা, ফুল, ফল দেখে গাছটি সনাক্ত করতে সক্ষম হই ক্যান্ডলট্রি বা মোমবাতি বৃক্ষ হিসেবে। এটি ছিল আমাদের বৃক্ষ বাগানে নতুন সংযোজন।

বাংলা নামঃ মোমবাতি গাছ

ইংরেজী নাম: Candle Tree

বৈজ্ঞানিক নাম: Parmentiera cereifera Seem

পরিবার: Bignoniaceae

ক্যান্ডলট্রি বা মোমবাতি গাছ মধ্য আমেরিকার ম্যোক্সিকো, পানামা, হণ্ডুরাস ও গুয়াতেমালার ছড়ানো ডালপালাময় ছোট পত্রমোচী বৃক্ষ, উচ্চতা ৬-৮মিটার। কাণ্ডের চারিদিকে শেকড়ের কাছ থেকে অনেক চারা (কুশি) বের হয়। সেগুলি কেটে না দিলে গাছটির ঝোপালো হওয়ার প্রবণতা থাকে। বাকল বাদামী মেটে রংয়ের। পাতা যৌগিক, ত্রিপত্রিক, পত্রবিন্যাস বিপ্রতীপ(opposite), পত্রবৃন্ত পক্ষল, ৫সে.মি লম্বা। পত্রিকা ডিম্বাকার, আগা চোখা, পত্রিকার কিনারা ভোঁতা খাঁজ বিশিষ্ট। এর সবূজাভ সাদা ফুল ও মোমবাতির মত সাদা ফল কাণ্ড বা কাষ্ঠল শাখার গায়ে ধরে বলে এটি কলিফ্লোরা(Cauliflora) জাতীয় ঊদ্ভিদ। ফুল একক বা ৩-৪টির গুচ্ছ, ব্যাস ৪-৫সে.মি, বোঁটা ছোট, ফুলের দল ছড়ানো চোঙ্গাকৃতির, লতিকা ৫টি, পুংকেশর ৪টি সাদাটে বা গোলাপি। ফল মাংশল, ঝুলন্ত, বেলনাকার(cylindrical), ৩০-৫০সে.মি লম্বা, সাদা বা হলদেটে মোমবাতির মত দেখতে। বাহারি ফুল ও মোমবাতির মত ফলের কারণে উষ্ঞমণ্ডলীয় এলাকার বাগানে গাছটি রোপন করা হয়। পাতা ও ফল পশুখাদ্য। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে আমি এগাছ কোথাও দেখিনি। ইতিমধ্যে এ গাছটির ফল থেকে আমি আরো চারা করতে সক্ষম হয়েছি ও বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করেছি ।

গুয়াজিলটে

     ২৫ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে বৃক্ষগুরু দ্বিজেন শর্মা মহোদয়ের ’তরুপল্লব’-এর উদ্যোগে পূর্বাচলের জিন্দা পার্কে এক বৃক্ষচেনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। দুঃখের বিষয় যে ঐ অনুষ্ঠানেই বৃক্ষগুরুর সাথে সাধারন সম্পাদক মোকররম হোসেন, সমাজকর্মী রাজিয়া সামাদ ডালিয়া, প্রকৃতিবিদ বিপ্রদাস বড়ুয়া ও বৃক্ষবিশারদ বোটানিস্ট সামসুল প্রসংশা কুড়িয়েছে। এ সময আমি হক সাহেবের সাথেও। এ অনুষ্ঠানে আমি আমার উত্তোলিত কিছূ অপ্রচলিত গাছের চারা প্রদর্শন করেছিলাম যা উপস্থিত সবারজিন্দা পার্ক ক্যাম্পাসে একটি নতুন গাছ খুঁজে পাই। প্রথমে এর যৌগিক পত্র ও খাঁজকাটা পত্রিকা দেখে একে আমার পূর্ব পরিচিত মোমবাতি গাছই (ক্যান্ডলট্রি) মনে করেছিলাম। কিন্তু গাছের ডালে কিছুটা লম্বাটে কামরাঙ্গার আকৃতির দুটি ফল দেখে বুঝতে পারলাম যে এটি একই পরিবারের কিন্তু অন্য প্রজাতির গাছ। লালচে আভাযুক্ত হলদেটে ফল দেখে পরিপক্কই মনে হল। ঐ গাছ থেকে একটি ’হালাপেনিও’(Jalapeno) মরিচের মত মাংশল ফল যোগাড় করতে সক্ষম হই। বাসায় এসে কেটে দেখি এগুলোও মোমবাতি ফলের মতই নরম মাংশল, বীজও তেমনি চ্যাপ্টা মরিচের বীজের মত। এর বেশীর ভাগ বীজ চিটা হওয়া সত্বেও বীজগুলি আমার ছাদের নার্সারীতে পলিব্যাগে বপন করি। মাস খানেক পর ১টি মাত্র চারা গজায়। তার অনেক পর দ্বীতিয় আর ১টি চারা গজায়। মোমবাতির চারার পত্রিকার তুলনায় এর পত্রিকা আরো চোখা লতিকা বিশিষ্ট। যাক এভাবে ভাগ্যক্রমে আমি গুয়াজিলটের ২টি চারা করতে সক্ষম হই। পরবর্তীতে জুলাই ২০১৭ এর প্রথম দিকে 

        আমি এদেরকে আমার বৃক্ষবাগানে মোমবাতির চারার পাশাপাশি রোপন করি। এগুলো এখন পর্যন্তএগুলো বেঁচে আছে। শীতে এদের পাতা ঝরে যায়। এটিও মোমবাতি গাছের নিকটাত্বীয়, যার আদি নিবাস মধ্য আমেরিকার গুয়াতেমালা।

ইংরেজী নাম: Guajilote

বৈজ্ঞানিক নামঃ Parmentiera edulis DC

পরিবার: Bignoniaceae

গুয়াজিলটে মাঝারী উচ্চতার পত্রমোচী (১৬মি.) বৃক্ষ। পাতা যৌগিক, ত্রিপত্রিক, পত্রাক্ষ পক্ষল। পত্রিকা বিভিন্ন মাপের, ডিম্বাকার, ৮-১৫ সে.মি লম্বা, আগা চোখা।

ফুল সবুজাভ হলুদ, ব্যাস ৫সে.মি, চোঙ্গাকৃতির। ফল মাংশল, সবুজাভ হলুদ, ধারযুক্ত, ৬-১০ সে.মি লম্বা, আগা চোখা ও বাঁকানো। এ গাছের পাতা পশুখাদ্য, ফল খাবার উপযোগী। আমাদের মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানেও এ গাছটি আছে।

মধ্য আমেরিকার গাছ ক্যান্ডলট্রি ও গুয়াজিলটে যে কোন বোটানিক্যাল গার্ডেন বা উদ্ভিদ উদ্যানের সংগ্রহে রাখার উপযোগী। এ গাছদুটি আমাদের এইআরই সাভার ডেনড্রারিয়ামের সংগ্রহে রাখতে পেরে আমরা গর্বিত। গাছগুলির উপযুক্ত যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি অনুরোধ রইল।

স ূত্রঃ

১। T. K. Bose, P. Das & G. G. Maiti, Trees of the World (vol 1), Regional Plant Resources Centre, Bhubeneshwar, India, 2002.

২। দ্বিজেন শর্মা, হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ডালটন হুকার, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।

৩। Parmentiera cereifera and Parmentiera edulis

(ছবিঃ ক্যান্ডলট্রি, ফুল, Candle tree, Flower, at AERE Savar Dendrarium)

(ছবিঃ ক্যান্ডলট্রি, ফুলের কুঁড়ি, Candle tree, Flower buds, at AERE Savar Dendrarium)

ক্যান্ডলট্রি ও গুয়াজিলটে চারা, Candle tree and Guajilote seedling, at my mini nursery.)

মতামত

প্রবন্ধ

ঐতিহ্যের ঠিকানাঃ

নদীয়ার শান্তিপুর

শুভদীপ রায়চৌধুরী

অর্থাৎ যাঁহার প্রাসাদে অতি অজ্ঞ ব্যক্তিও তাঁহার স্বরূপনিরূপণে সমর্থ হয়, সেই অদ্ভূত লীলাশালী শ্রীমৎ অদ্বৈতাচার্য্য প্রভুকে আমি বন্দনা করি। নদীয়া জেলার শান্তিপুর একটি অত্যন্ত সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যপূর্ণ স্থান, বিশেষত গঙ্গার তীরবর্তী জনপদ। মহাপুরুষ চৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষাগুরু অদ্বৈত আচার্যের সাধনপীঠ নিকটবর্তী বাবলাগ্রামে।

"ন্দে তং শ্রীমদদ্বৈতাচার্য্যমদ্ভুতচেষ্টিতম্।

যস্য প্রসাদাদজ্ঞোহপি তৎস্বরূপং নিরূপয়েৎ।।"

(শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত)

       অর্থাৎ যাঁহার প্রাসাদে অতি অজ্ঞ ব্যক্তিও তাঁহার স্বরূপনিরূপণে সমর্থ হয়, সেই অদ্ভূত লীলাশালী শ্রীমৎ অদ্বৈতাচার্য্য প্রভুকে আমি বন্দনা করি। নদীয়া জেলার শান্তিপুর একটি অত্যন্ত সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যপূর্ণ স্থান, বিশেষত গঙ্গার তীরবর্তী জনপদ। মহাপুরুষ চৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষাগুরু অদ্বৈত আচার্যের সাধনপীঠ নিকটবর্তী বাবলাগ্রামে।

"শ্রীলদ্বৈত গুরুং বন্দে হরিণাদ্বৈতমেব তং

প্রকাশিত পরম্ ব্রহ্ম যোহবতীর্ণ ক্ষিতৌ হরিং।।

অন্তঃকৃষ্ণ বহিগৌরং কৃষ্ণচৈতন্য সংজ্ঞ কং।

প্রেমাধিবং সচ্চিদানন্দং সর্ব্বশক্তাশ্রয়ং ভজে।।

শ্রীনিত্যানন্দরামহি দয়ালুম্ প্রেম দীপকং।

গদাধরঞ্চ শ্রীবাসং বন্দে রাধেশসেবিনং।।"

    শ্রীঅদ্বৈত প্রকাশ গ্রন্থের প্রারম্ভে ঈশান নাগর লিখেছেন- কলিকাল ঘোর পাপচ্ছন্ন, জীবের দুর্দশা দেখে বৈষ্ণব চূড়ামণি শঙ্কর কলির জীবকে উদ্ধারের জন্য যোগমায়ার সঙ্গে পরামর্শ ক’রে কারণ সমুদ্রের তীরে উপনীত হন। সেখানে সাতাশ বছর তপস্যায় জগৎকর্ত্তা মহাবিষ্ণু পঞ্চাননকে দর্শন দিয়ে বলেন-"তুমি আর আমি অভেদ নই। তোমার এবং আমার আত্মা এক, দেহ ভিন্ন।" এই বলে মহাবিষ্ণু পঞ্চাননকে আলিঙ্গন করেন, ফলে দুই দেহ এক হয়ে যায়। এই দৃশ্য দর্শনের সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছিল তারা অত্যাশ্চর্য হয়ে যায়। 'শুদ্ধ স্বর্ণ বর্ণ অঙ্গ উজ্জ্বল বরণ' ইহা দর্শন হয়। মহাবিষ্ণু তখন কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে হুঙ্কার ছাড়লেন, সঙ্গে সঙ্গে চমৎকার এক দৈববাণী হয়। "শোন মহাবিষ্ণু তুমি এই মূর্তিতে লাভার গর্ভে অবতীর্ণ হও।"

     অদ্বৈতাচার্যের বংশেই জন্ম আরেক বৈষ্ণবসাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। তাঁরও স্মৃতি মন্দির রয়েছে এই শান্তিপুরে। এছাড়া তন্ত্রসিদ্ধ কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের বংশধর শান্তিপুরে দক্ষিণাকালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন, যা আগমেশ্বরী নামে পরিচিত। এছাড়া বহু প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শনও রয়েছে এই অঞ্চলে। তাদের মধ্যে অন্যতম চাঁদুনীমায়ের প্রাচীন ইতিহাস, খাঁ বংশের ইতিহাস, শ্যামচাঁদ মন্দিরের ঐতিহ্য, জলেশ্বর শিবমন্দির, দক্ষিণাকালীর পঞ্চরত্ন মন্দির, প্রাচীন সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির ইত্যাদি। সেই ইতিহাসের কিছু অংশই গবেষণায় উঠে এল বনেদীয়ানা পরিবারের সদস্যদের হাতে। আজ তাই আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য। ভবিষ্যৎ-এ আরও প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যপূর্ণ তথ্য শান্তিপুর তথা বঙ্গের বহু স্থানের তুলে ধরা হবে।

"জ্ঞান নেত্রং সমাদায় উদ্ধরেদ্ বহ্নিবৎ পরম।

নিস্কলং নিশ্চলং শান্তং তদ্ ব্রহ্মাহ মিতি স্মৃতম।।"

 

    জ্ঞাননেত্র অবলম্বন করে অগিড়বতুল্য পরমজ্যোতি নিয়ে, জ্যোতির্ময় সেই পরমব্রহ্মকে জানতে হবে। অমূল্য নিধির মত সযত্নে তাকে আহরণ করবে। যাঁরা বিদ্বান, তাঁরা সবসময় এই চিন্তাই করবে-"আমিই সেই নিষ্কল(কলাহীন), নিশ্চল(ধ্রুব), শান্ত (নির্বিকার মঙ্গলময়) ব্রহ্ম!"

শান্তিপুর পূণ্যতোয়া ভাগীরথীর তীরস্থ একটি নগর, বৈষ্ণব ও শাক্তের মিলনক্ষেত্র এবং শৈব ধারারও প্রাচীনত্ব দেখা যায় এই অঞ্চলে। শুরুতেই শ্রীশ্যামচাঁদ জীউ- প্রাচীন ইতিহাস।

শ্যামচাঁদ জীউঃ

     শান্তিপুরের প্রাচীন মন্দিরের মধ্যে অন্যতম এই শ্যামচাঁদ মন্দির। এই মন্দিরের ইতিহাস বললেন শ্রী অলোক দাস(মন্দির পরিচালন কমিটির সদস্য) এবং শান্তিপুরে বিগ্রহবাড়ি সমন্বয় সমিতির পত্রিকা। অদ্বৈতপ্রভুর দ্বাদশ বছর বয়েসে যখন শান্তিপুরে আসে, সঙ্গে আসেন গোবিন্দ দাস। এই গোবিন্দদাস সহ অন্যান্য ভাইয়েরা অদ্বৈত পরিবারে দীক্ষিত। গোবিন্দদাসের পুত্র ব্যবসা সূত্রে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। তিনি "ভাগ্যবস্তু" খ্যাতি লাভ করে "ভাগ্যবন্ত" নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর পুত্র শ্রীমন্ত সম্মানসূচক খাঁ উপাধি লাভ করেন। এঁরা ৮টি দেব বিগ্রহ এবং ১০৮টি পুষ্করিণী স্থাপন করেন। শ্রীমন্ত খাঁ-র তিন পুত্রসন্তান, যথাক্রমে রঘুনাথ, কৃষ্ণবলভ ও বিশ্বেশ্বর। বিশ্বেশ্বরের পুত্র রঘুনাথ। রঘুনাথের পুত্র জগন্নাথ এবং জগন্নাথের পুত্র চার, যথাক্রমে রামগোপাল, রামজীবন, রামভদ্র এবং রামচরন। এই শ্যামচাঁদ মন্দির তৈরী হয় ১৬৪৮ শতাব্দে। মন্দির তৈরী হওয়ার দুইবছর আগে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয়। রামগোপাল খাঁ চৌধুরীর মাতা স্বপ্ন দেখেছিলেন রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। এঁরা এতটাই প্রতিপত্তিশালী ছিলেন যে শিল্পী নিয়ে এসে রামগোপাল মূর্তি তৈরী করান, কিন্তু তাঁর মা বলেন এই মূর্তি সেই স্বপ্নাদেশে যে মূর্তি দেখেছিলেন সেই মূর্তি নয়। যে মূর্তি রামগোপাল তৈরী করিয়েছিলেন সেই মূর্তি কালাচাঁদ মন্দিরে রয়েছে। অবশেষে আবার মূর্তি তৈরী হল এবং সেই বিগ্রহ দেখেই রামগোপাল খাঁ চৌধুরীর মা বলেন, “এই বিগ্রহই আমার স্বপ্নে দেখা মূর্তি”। তখন দুইবছর এই শ্যামচাঁদ জীউ কালাচাঁদ মন্দিরে সেবা পেতেন। তারপর ১৬৪৮ শতাব্দে রামগোপাল খাঁ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই শ্যামচাঁদ মন্দির তৎকালীন সময় ৮-৯ লক্ষ টাকার ব্যয়ে। শ্যামচাঁদ মন্দিরটি আটচালা শ্রেণীর। উচ্চতা ১১০ ফুট, দৈর্ঘ্যে এবং প্রস্থে ৬৮ ফুট। কৃষ্ণনগরের কৃষ্ণচন্দ্রের পিতা রাঘুরাম রায়কে মন্দির উদ্বোধনের জন্য আহ্বান করা হয়েছিল। বাংলার স্থাপত্য গৌরবে এই মন্দির অদ্বিতীয়। সুউচ্চ চুড়োয় ত্রিশূল ও ধাতু নির্মিত পতাকা। নদীয়া রাজ রঘুরাম শান্তিপুরে আসেন এবং খাঁ বাড়ির বিশাল সভায় শীর্ষ স্থান অলংকৃত করেন। মহারাজের অভ্যর্থনায় লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করায় প্রতিষ্ঠাতারা খাঁ উপাধিতে ভূষিত হন।

     বর্তমানে বিধায়ক শ্রী অজয় দে তিনি একটি মন্দির কমিটি গঠন করেন, এবং সেই কমিটির মাধ্যমেই বর্তমানে শ্যামচাঁদ মন্দির পরিচালিত হয়। এই বিগ্রহ রাসের সময় শোভাযাত্রায় যান না। রাস উৎসবে বিগ্রহ মন্দিরের দালানে উপস্থিত হন একমাত্র দোলেই শ্যামচাঁদ নগর পরিক্রমায় যান। এছাড়া পৌষ মাসের শুক্লপক্ষের দ্বাদশীতিথিতে এই মন্দিরে ১৫ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান হয় এবং প্রায় ২০,০০০ ভক্তবৃন্দের জন্য মহোৎসবের আয়োজন করা হয়। এই বিগ্রহের চরণপদ্মে দাস চৌধুরী লেখা আছে, রামগোপাল দাস চৌধুরী পরবর্তীকালে "খাঁ" উপাধি পান। নবাব মুর্শিদকুলি যখন গঙ্গাবক্ষে যুদ্ধজয় করে মুর্শিদাবাদে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন তাদের খাদ্য সংকট দেখা যায়। তখন নবাব জানতে পেরেছিলেন এই শান্তিপুরে গ্রামে একজন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি ছিলেন। নবাব যোগাযোগ করেন এবং নবাব ও তঁর সৈন্যদের পর্যাপ্ত খাদ্য প্রদান করেন এই শান্তিপুরের প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি। পরবর্তীকালে নবাব তাঁদের দরবারে ডেকে পাঠালেন এবং "খাঁ" উপাধি দিলেন। বর্তমানে এই শ্যামচাঁদ মন্দিরে নিত্যভোগ, পূজাপাঠ নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।

শ্রীকালাচাঁদ জীউঃ

    শ্রীকৃষ্ণের রাসযাত্রা প্রসঙ্গে মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বলেছিলেন,"শান্তিপুরের রাস, ঢাকার জন্মাষ্টমী এবং বৃন্দাবনের ঝুলন দেখার মতন"। প্রায় ৩০০ বছর আগে এই জাঁকজমকপূর্ণ রাস উৎসব দেখা যায় শান্তিপুরের খাঁ চৌধুরীর বংশে। এই পরিবারের প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহগুলির মধ্যে অন্যতম শ্যামচাঁদ, কালাচাঁদ, গোপীকান্ত, কৃষ্ণরায় উল্লেখযোগ্য। তাই কালাচাঁদ মন্দিরের ইতিহাসের সন্ধান দলেন পরিবারের দৌহিত্র বংশের বংশধর শ্রী রাজীব সেন মহাশয় (দৌহিত্র বংশের সপ্তমপুরুষ)। রাজীব সেনের কথায় কালাচাঁদ মন্দির প্রায় ২৫০-৩০০ বছর প্রাচীন। এই মন্দিরে শ্রীশ্রীরাধা কালাচাঁদ জীউর পূজার্চনা হয়। নিত্যপূজা ছাড়াও জন্মাষ্টমী, নন্দোৎসব, ঝুলনযাত্রা, দোলযাত্রা অতি ধুমধামের সহিত পালিত হয়। রাস উৎসবে কালাচাঁদ বিগ্রহ ঠাকুরদালানে উপস্থিত হন এবং তিনি সেই রাসের সময় শোভাযাত্রায় নগর পরিক্রমায় যান। দোলের দিন শ্যামচাঁদ আসেন এই মন্দিরে কারণ কথায় কথায় জানা গেল শ্যামচাঁদের আদিভিটে এই কালাচাঁদ মন্দির। কালাচাঁদ হলেন শ্যামচাঁদের বড়ভাই। তাই লোককথায় তিনি দোলের সময় দাদার সাথে দেখা করতে আসেন এই কালাচাঁদ মন্দিরে। রাজীববাবুর কথায় এই কালাচাঁদ মন্দিরে অন্নভোগ হয় না। এই মন্দিরে চিরে, খই, দই, মিষ্টি, ফল ইত্যাদি ভোগ দেওয়া হয়। নিত্যভোগ নৈবেদ্য সহযোগে হয়।

    বর্তমানে মন্দিরের পৌরোহিত্য করছেন শ্রী পার্থ মুখোপাধ্যায়। বর্তমানে ২০০৯ সালে আবারও মন্দির সংস্কার করা হয়। বাংলার প্রচীন মন্দিরের অন্যতম এই মন্দির যেখানে নিষ্ঠার সঙ্গে পূজা হয়।

শ্রীশ্রীরাধামদনগোপাল জীউঃ

     শান্তিপুরের আরও একটি প্রাচীনতম মন্দির এই মদনগোপাল মন্দির। এই মন্দিরের ইতিহাসের সন্ধান দিলেন শ্রী স্বরূপ গোস্বামী (পরিবারের সদস্য)। সংগ্রহ করলেন শ্রীমান্ শুভদীপ রায় চৌধুরী। ১৪৩৪ খ্রীঃ শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্য্য শ্রীহট্টের লাউর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কুবের মিশ্র, মাতার নাম লাভাদেবী। অদ্বৈতাচার্যের বাল্যকালের নাম শ্রীকমলাক্ষ। বারো বছর বয়েসে তিনি শান্তিপুরে আসেন। স্মৃতি শাস্ত্র ও ন্যায়শাস্ত্র পড়ার জন্য। অদ্বৈতাচার্য্য মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পাঁচ বেদ সমাপন করে বেদ পঞ্চানন উপাধি পান। পিতামাতার পরলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য গয়ায় পিণ্ডদান করে বৃন্দাবনে উপস্থিত হন। উল্লেখ্য যে তিনি সারা ভারতবর্ষ পরিক্রমা করেছিলেন সেই পরিক্রমা শেষ করতে সময় লাগে প্রায় পঁচিশ বছর। বৃন্দাবনে রাতে বটবৃক্ষের তলায় অবস্থানকালে গভীর রাতে তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হন মদনমোহন বলেন, "হে অদ্বৈত, আমার অভিনড়ব বিগ্রহ পূর্বে কুব্জা দেবী সেবা করতেন, তাহা নিকুঞ্জবনে টিলার তলায় আছে, তাহা তুমি তুলিয়া সেবার ব্যবস্থা করো”। বলাবাহুল্য যে মদনমোহন সাক্ষাতে এসেছিলেন অদ্বৈতপ্রভুর কাছে রাখালরূপ ধরে। পরের দিন সকালে অদ্বৈতাচার্য্য সে কথা সকলকে জানিয়ে একজন বৈষ্ণব ব্রাহ্মণকে সেবার জন্য আহ্বান করেন। অদ্বৈতাচার্য্য গোবরধন পরিক্রমা করে এসে দেখেন সেই মদনমোহন মন্দিরে নেই। অনেক অনুসন্ধান করেও সেই খোঁজ পেলেন না। তারপর তিনি স্বপ্ন দেখলেন যে মদনমোহন তাঁকে বলছেন, "অভক্তের অত্যাচারে আমি ফুলের তলায় লুকিয়ে আছি”। তখন মথুরার চৌবে ব্রাহ্মণ আসলেন এবং তাঁকে সমস্ত বৃত্তান্ত বলে মদনমোহনকে তুলে দিলন। এরপর অদ্বৈতাচার্য্য আকুল আহ্বানে শ্রীশ্রীমদনমোহনের আদেশ পেলেন যে, “আমা অভিন্ন যাহা পূর্বে শ্রীমতী রাধারণী সখী বিশাখা দেবী অঙ্কিত চিত্রপট নিকুঞ্জবনে আছে, তা নিয়ে তুমি শান্তিপুরে ফিরে যাও ও আমার সেবাপূজা করো”। স্বরূপবাবুর কথায় এই মন্দিরের বহুবার সংস্কার হলেও মন্দির প্রথম তৈরী হয় প্রায় আনুমানিক ৪৩৫ বছর আগে এবং অদ্বৈতাচার্য্য নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই মন্দির। অদ্বৈতাচার্য্য চারভাই ছিলেন এবং তিনিই ছিলেন কনিষ্ঠ বাকি তাঁর তিন ভাই পরিভ্রমণ করতে গিয়ে ফিরে আসেননি। অদ্বৈতপ্রভু নিজের বাড়ি শান্তিপুরে ফিরে এলেন এবং চিত্রপটের সঙ্গে নিয়ে এলেন গণ্ডকী থেকে শালগ্রামশিলা। কিছুকাল পরে অদ্বৈতাচার্য্যের গুরুদেব মাধবেন্দ্র পুরীপাদ, তিনি বাংলাদেশে থাকতেন সেখানে তাঁর স্ত্রী পরলোকগমনের পর তিনি শান্তিপুরে চলে এলেন। তিনি তখন অদ্বৈতপ্রভুকে বললেন  

 

গোপিভাবে সেবা করো। তখন মাধবেন্দ্র পুরীপাদ বললেন,"তুমি বিবাহ করো, কৃষ্ণের কৃপায় তোমার সন্তান হবে। কৃষ্ণনাম প্রচার সেইভাবেই হবে।" মাধবেন্দ্র পুরীপাদ ছিলেন সাক্ষাৎ চলমান জগন্নাথ এবং তিনি অদ্বৈতাচার্য্যের গুরুদেব। অদ্বৈতপ্রভুর বয়স যখন ১০০ বছর তখন মহাপ্রভু পরলোকগমন করলেন। অদ্বৈতপ্রভু ১২৫ বছর জীবিত ছিলেন। অদ্বৈতপ্রভু তাঁর প্রতিষ্ঠিত মদনগোপালে বিলীন হয়েছিলেন। অদ্বৈতপ্রভুর ছয় সন্তান। জ্যেষ্ঠপুত্র শ্রীঅচ্যুতানন্দ তিনি গৃহত্যাগ করেছিলেন। দ্বিতীয় সন্তান শ্রীকৃষ্ণ মিশ্র (মদনগোপাল বাড়ি), তৃতীয় পুত্র শ্রীগোপাল এবং চতুর্থপুত্র শ্রীবলরাম মিশ্র (এই বলরাম মিশ্র থেকেই শান্তিপুরে অন্যান্য গোস্বামীবাড়ির সৃষ্টি), পঞ্চমপুত্র শ্রীস্বরূপ এবং ষষ্ঠপুত্র শ্রী জগদীশ।

    শ্রীকৃষ্ণ মিশ্র ছিলেন উচ্চমার্গের। অদ্বৈতপ্রভু এবং মহাপ্রভুর আদেশে মদনগোপাল কৃষ্ণ মিশ্রকে দান করেন। তিনদিন ধরে রাস উৎসব হয়। প্রথম দিন মদনগোপাল রাসমঞ্চে ওঠেন। দ্বিতীয় দিনও রাসমঞ্চে ওঠেন প্রভু। তৃতীয় দিন ভাঙারাস পালন হয়। এই পরিবারের বহু কুলতিলক ছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম শ্রী রাধাবিনোদ গোস্বামী (শ্রেষ্ঠভাগবত ভাষ্যকার এবং পণ্ডিত), শ্রী রাধিকানাথ গোস্বামী (পণ্ডিত ও চৈতন্যচরিতামৃত এবং মহাপ্রভুর সময়ে যে গ্রন্থ রচিত হয়েছিল তার সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার ছিলেন)। এছাড়া পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র গোস্বামী এবং কৃষ্ণগোপাল গোস্বামী ১৩০৫ বঙ্গাব্দে পি.এইচ.ডি করেছিলেন। পণ্ডিত বিশ্বেশ্বর গোস্বামী ছিলেন দর্শনশাস্ত্রে সুপণ্ডিত এবং সংক্ষিপ্ত মহাভারত কাব্য প্রণেতা। শ্রী জিতেন্দ্রনাথ গোস্বামী ছিলেন ভাগবত ভাষ্যকার। পরিবারে নিত্যভোগ দেওয়া হয়। আজও শ্রীশ্রীরাধামদনগোপাল মন্দিরে নিষ্ঠার সঙ্গে পূজাপাঠ হয়।

শ্রীশ্রীকৃষ্ণ রায় জীউ ও শ্রীশ্রীকেশব রায় জীউঃ

    শান্তিপুরের প্রাচীন মন্দিরের অন্যতম এই দুই মন্দির এবং বিগ্রহ। এই মন্দিরের ইতিহাসের সন্ধান দিলেন শ্রী তপন গোস্বামী (পরিবারের বংশধর-১৪তম)। পাগলা গোস্বামী বাড়ির দুই বিগ্রহ কৃষ্ণ রায় ও কেশব রায় জীউ। এই পরিবারের পুর্বপুরুষ অদ্বৈতাচার্য্যের চতুর্থপুত্র শ্রী বলরামের দশম পুত্র কুমদানন্দ গোস্বামী ছিলেন পণ্ডিত ও সাধক। কথিত আছে কৃষ্ণনগর রাজ কর্তৃক প্রদত্ত সম্পত্তি প্রত্যাখ্যান বা নষ্ট করায়, তাঁহার "আউলিয়া" নামে খ্যাতি রটে এবং সেই জন্যই এই শাখার নাম আউলিয়া বা পাগলা গোস্বামী। কুমদানন্দের দ্বারা "কৃষ্ণরাই" প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাঁচ বছর পর পুনরায় "কেবশরাই" প্রতিষ্ঠিত হন। এই পরিবারে রাস উৎসব, দোলউৎসব, ঝুলনযাত্রা, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি হ’ত। বলরামের কনিষ্ঠপুত্র কুমদানন্দ গোস্বামী, তাঁকে নারায়ণ শিলা দিয়েছিলেন অদ্বৈতাচার্য্য। রাসের সময় রাসমঞ্চে একই সাথে দুই বিগ্রহ পূজিত হন। বিগ্রহের বয়স প্রায় আনুমানিক ৪৫০ বছর। কথায় কথায় জানতে পারলাম রাসমঞ্চে বিগ্রহ স্বর্ণালংকারে সাজানো থাকে। বিগ্রহ তৈরীর পাঁচবছর বাদে তৈরী হয় গৌরনিতাই। বংশের হরিনাথ গোস্বামীর স্ত্রী অদ্বৈতমহাপ্রভু ও তাঁর স্ত্রী সীতাদেবীকে মূর্তি আকারে প্রতিষ্ঠা করেন। পরিবারে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। সকালে মঙ্গলারতি হয় এবং বাল্যভোগে ক্ষীর, মাখন, মিষ্টি, ছানা, নাড়ু ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। দুপুরে শাক, শুক্তনি, ডাল, মোচার ঘন্ট, পটলের তরকারি, ফুলকপির তরকারি, পোলাও, পরমান্ন, দই, চাটনি ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। সন্ধ্যায় আরতি হয়। কথায় কথায় জানতে পারলাম রাসের সময় রাসমঞ্চে বিগ্রহের সামনে রৌপ্যপাত্রে ভোগ নিবেদন করা হয় - যার আকার বিশাল। ভাঙারাসের দিন নগর পরিক্রমায় যান। প্রথমে বড়গোস্বামী বাড়ির বিগ্রহের পরই এই পাগলাগোস্বামী বাড়ির বিগ্রহ নগর পরিক্রমায় যান। ভাঙারাসের শোভাযাত্রায় দুই বিগ্রহের হাওদা প্রদর্শন এক অনন্য নান্দনিকতার আবেশ সৃষ্টি করেন। চতুর্থ দিন বিগ্রহদ্বয় কুঞ্জভঙ্গ শেষে নিজ নিজ মন্দিরে অধিষ্ঠান করেন। এই ভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে পূজিত হন দুই বিগ্রহ।

ঐতিহ্যমণ্ডিত বড় গোস্বামী বাড়িঃ

     শান্তিপুরের প্রতিটি ধুলিকণা যাঁর লীলার সাক্ষী, বহুভক্ত এখনও শান্তিপুরের বাতাসে যাঁর সেই ধ্বনি কর্ণগোচর করার চেষ্টা করেন সেই শান্তিপুরনাথ, শান্তিপুর পুরন্দর শান্তিপুরের শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্য্যের পুত্র বলরাম মিশ্রের পুত্র মথুরেশ গোস্বামীর প্রথমপুত্র রাঘবেন্দ্র গোস্বামী থেকে সৃষ্টি হয় বড়গোস্বামী। পরিবারের বংশধর শ্রী সুদেব গোস্বামী আমাদের সেই ইতিহাসের খোঁজে দিলেন, তার ফলে শান্তিপুর নিয়ে প্রথম গবেষণার কাজ আরও এগিয়ে গেল। শ্রীঅদ্বৈতাচার্য্য নেপালের গণ্ডকী নদী থেকে একটি নারায়ণ শিলা পান। তিনি অপ্রকটের পর সেই শিলার সেবাভার অর্পণ করেন বলরাম মিশ্রের হাতে। বলরাম মিশ্রের পর সেই শিলার সেবাভার পরম্পরায় মথুরেশ গোস্বামীর প্রাপ্ত হয়। মথুরেশ গোস্বামী বর্তমানে বাংলাদেশের যশোহর থেকে শ্রীশ্রীরাধারমন বিগ্রহ শান্তিপুরে এনে প্রতিষ্ঠা করেন। শান্তিপুরের ভাঙারাসের পুরোধা বিগ্রহ শ্রীশ্রীরাধারমন জীউ প্রথমে পুরীতে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের আমলে দোলগোবিন্দ নাম পূজিত হতেন। কালা পাহাড়ের মন্দির ও শ্রীবিগ্রহ ধ্বংস যজ্ঞে আতঙ্কিত হয়ে রাজা বসন্ত রায় যশোহরে নিয়ে আসেন এই দোলগোবিন্দকে। বসন্তরায়ের গৃহে বেশ কিছুকাল পূজিত হন। রাজা বসন্ত রায়ের শ্রীগুরুদেব ছিলেন সীতানাথের পৌত্র মথুরেশ গোস্বামী। তখন ভারত মোঘল শাসনাধীন এবং রাজা মানসিংহের অত্যাচারে অবিভক্ত বাংলা ভয়ে জর্জরিত। শ্রীবিগ্রহের রক্ষনাবেক্ষনের জন্য বসন্তরায় গুরুদেবের হাতে তাঁকে সমর্পণ করেন। প্রভুপাদ মথুরেশ গোস্বামী শ্রীবিগ্রহ পদব্রজে শ্রী বিগ্রহ নিয়ে আসেন ও বড় গোস্বামী বাটীর মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। শান্তিপুরে এনে বিগ্রহের নতুন নামকরণ হয় "রাধারমণ জীউ"। শ্রীশ্রীরাধারমনকে নিয়ে বেশ আনন্দে কাটতে থাকে, হোঠাৎ ছন্দপতন হয়, বড় গোস্বামী বাটী থেকে বিগ্রহ অপহৃত হল। তৎকালীন প্রভু ও তাঁদের স্ত্রীদের নাওয়া খাওয়া বন্ধ হল। অনেক চিন্তার পর মাথায় এল যে শ্রীধাম বৃন্দাবনে গোপীরা "কাত্যায়নী ব্রত" করে লীলাপুরুষোত্তমকে পেয়েছিলেন। তাই এই ব্রত করেন শ্রীশ্রীরাধারমনকে পাওয়ার জন্য। চিন্তানুযায়ী দুর্গাপূজর সময় শ্রীশ্রীকাত্যায়নী মাতার পূজা শুরু হল। পূজার তৃতীয় রাত্রে স্বপ্নাদেশে জানেন যে দিগন-গরে একটি জলাশয়ে তোমাদের ইষ্টদেবকে ফেলে রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট জলাশয়ে পেয়ে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হল। রাধারমণ যাঁর কাছে বাঁধা সেই রাধারমণকে চিরদিনের জন্য বড় গোস্বামী বাটীতে রাখতে তৎকালীন প্রভুপাদ রাধারমণের পাশে রাধারাণীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কারণ পুরী থেকে যশোহর হয়ে শান্তিপুরে রাধারমণের একম মূর্তি এসেছিলেন। শান্তিপুরে শোভাযাত্রা করে ঘোরানো হয় রাধারমণের পাশে রাধারাণীকে প্রতিষ্ঠা করা হয় রাস উৎসবের সময়। খাঁ চৌধুরীরা ছিলেন বড় গোস্বামী বাটীর শিষ্য। ভাঙারাসের পরের দিন বড় গোস্বামী বাড়ীর যুগল বিগ্রহকে নানালঙ্কারে সজ্জিত করে অনুষ্ঠিত হয় "কুঞ্জভঙ্গ" বা ঠাকুর নাচ একটি খুবই মনোরম অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষে বিগ্রহকে অভিষেক করে মন্দিরে প্রবেশ করানো হয়। মথুরেশ গোস্বামীর সময়ে বড়গোস্বামী বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ। পরবর্তীকালে খাঁ চৌধুরী পরিবার থেকে শ্রীশ্রীরাধা গোপাল রায় জীউ বিগ্রহ নিত্যসেবার ভার বড় গোস্বামী বাটীতে দেওয়া হয়। তৎকালেই প্রতিষ্ঠিত হয় নদীয়া জেলার সর্বপ্রথম মহাপ্রভুর ষড়ভুজ বিগ্রহ। অযোধ্যাপতি রামচন্দ্রের বিশাল বিগ্রহ পূজিত হয় এই মন্দিরে। বড় গোস্বামী বাড়িতে ইদানীং প্রতিষ্ঠিত হয় "শ্রীশ্রী শিবেশ্বর"। বৈশাখ মাসের বৈশাখী পূর্ণিমায় শ্রীশ্রীরাধারমনের ফুলদোল হয়। শ্রীশ্রীরাধারমন জীউর "জামাই ষষ্ঠী" অনুষ্ঠান হয়। রথযাত্রা উৎসবও হয়। এইভাবে বিভিন্ন উৎসব নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাটীতে।

শ্রীশ্রীবংশীধারী জীউঃ

    এই বংশীধারী জীউ সম্পর্কে ইতিহাসের সন্ধান দিলেন শ্রী সুশান্ত কুমার হালদার (মন্দিরের সেবাইত)। শান্তিপুরের কাঁসারী পাড়া নিবাসী ভক্তিমান কৃষ্ণচন্দ্রনাথের একমাত্র পুত্র রাম যদু নাথ যিনি কাঁসারী নামে পরিচিত ছিলেন, অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ব্যবসা সূত্রে বহু অর্থ উপার্জন করেছিলেন এবং বহু সম্পত্তি থাকায় ১৮৬৫ সালে বহ দক্ষ কারিগর নিয়োগ করে বংশীধারীর মন্দির স্থাপন করেন। শকাব্দ ১৭৮৭-২০শে আষাঢ়। দেববিগ্রহের কথা উল্লিখিত আছে। পূর্বমুখী এই মন্দির প্রাঙ্গনের উত্তর ও দক্ষিণে দুইটি আটচালার শিবমন্দির আছে। মন্দিরগুলিতে প্রাণবন্ত পোড়ামাটির মূর্তিগুলির অনুপম ভাস্কর্যের অসামান্য নিদর্শন। শিবমন্দিরের গর্ভে উত্তরদিকে যাদবেশ্বর ও দক্ষিণে কেশবেশ্বর নামের কষ্টিপাথরের শিব এবং মধ্যে বংশধারী ও রাধিকার আকর্ষণীয় যুগলমূর্তি সদা জাগ্রত। বংশীধারী জীউর রাস উৎসব, দোল, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি সমারোহে পালিত হয়। রামযদুনাথের আরাধ্য শীলার নাম বংশীবদন বলে অনেকেই বংশীবদন ঠাকুর বাড়ি বা মন্দির বলে থাকেন। বহু নিষ্ঠার সঙ্গে আজও বংশীধারী জীউ পূজিত হয়ে আসছেন। ঐতিহ্যের মেলবন্ধন যেন শান্তিপুরে পাওয়া যায়।

শান্তিপুরের বিখ্যাত সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরঃ

    শান্তিপুর বৈষ্ণব ও শাক্তদের মেলবন্ধনের পীঠস্থান। তাই এই অঞ্চলের অন্যতম মন্দির সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির। এই মন্দির তৈরী করা হয় ১৬০৬ সালে, যা আজ প্রায় ৪০০ বছর অতিক্রান্ত। তৎকালীন রাজা ভবানন্দ মজুমদার (কৃষ্ণচন্দ্রের ঠাকুরদাদা) তিনি পার্বতীচরণ মুখোপাধ্যায় অথবা মতান্তরে ফকিরচাঁদ মুখোপাধ্যায়কে এই মন্দিরের দায়িত্ব তুলে দেন। এই মুখোপাধ্যায় পরিবারের আদি পদবী ওঝা (কৃত্তিবাসের বংশধর)। এই মন্দিরের বার্ষিক পূজা হয় দীপান্বিতায়। এছাড়া অক্ষয়তৃতীয়া বা বিভিন্ন পূজায় মন্দিরে দর্শনার্থীদের ভীড় দেখবার মতন। দীপান্বিতায় দেবীকে পোলাও, খিঁচুড়ি, মাছভোগ দেওয়া হয়, মিষ্টি, পরমান্ন, ক্ষীর ইত্যাদি ভোগ নিবেদন করা হয়। কথায় কথায় জানা গেল শান্তিপুরে যে কটি কালীপূজা হয় এই সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজা দিয়ে শুরু হয়। সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের সামনে নাটমন্দির তৈরী করা হয় পরবর্তীকালে। তৈরী করেছিলেন মালদা’র সরকার পরিবারের সদস্য। আগে সিদ্ধেশ্বরী কালীমূর্তি আগে মাটির ছিল পরবর্তীকালে পাথরের মূর্তি করা হয় (১৩৮৭ বঙ্গাব্দে)। কাশী থেকে নিয়ে আসে হয়েছিল। সবথেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দীপান্বিতায় পূজা ১১.৪০ মিনিটেই হবে পূজা। কোন কোন সময় যদি দীপান্বীতার সময় কিছুটি এগিয়ে থাকে তাও রাত ১১.৪০ মিনিটেই পূজা শুরু করার রীতি রয়েছে।

শ্রীশ্রী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বাটীঃ

    শান্তিপুরের প্রাচীন মন্দিরের অন্যতম শ্রীশ্রী শ্যামসুন্দর জীউ-এর মন্দির। এই শ্যামসুন্দর মন্দিরের ইতিহাসের সন্ধান দিলেন শ্রী প্রশান্ত গোস্বামী (এই পরিবারের ১৪তম বংশপুরুষ)। কথিত আছে অদ্বৈতাচার্য্য বলরাম আর দেবকীনন্দনের শ্রীশ্রী রাধাশ্যামসুন্দর শ্রীবিগ্রহের প্রতিষ্ঠা কার্য স্বহস্তে করেছিলেন এবং দেবকীনন্দনের সেই নির্দেশ মতন এখনও বিগ্রহের সেবাপূজা হয়ে আসছে। দোলপূর্ণিমা, ঝুলন পূর্ণিমা, জন্মাষ্টমী এই বাড়িতে সাড়ম্বরে হলেও এই বাড়ির বিশেষত্ব রাস উৎসব। রাসের তৃতীয় দিন যুগল মূর্তি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে শান্তিপুরের পথে নগর পরিক্রমায় অংশ নেয়। এই বংশে শ্রীশ্রীঅদ্বৈতপ্রভুর নবম পুরুষ আনন্দ কিশোর গোস্বামী নামে এক পরম ভাগবত পুরুষ জন্ম নেয়। আনন্দ কিশোর গোস্বামী ছিলেন শ্যামসুন্দর অন্তপ্রাণ। প্রশান্তবাবুর কথায় শ্যামসুন্দর মন্দির প্রায় আনুমানিক ৪৫০ বছর প্রাচীন। শ্রীশ্রীঅদ্বৈতপ্রভুর নাতি দেবকীনন্দন গোস্বামী এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। কথায় কথায় জানা গেল এই বিগ্রহের সাথে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী খেলা করতেন, মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন স্বয়ং শ্রীশ্রীঅদ্বৈতপ্রভু পৌরোহিত্য করেছিলেন। রাস উৎসবের দিন দরিদ্রনারায়ণ সেবা হয়।এছাড়া এই পরিবারে রাসের প্রথম দুইদিন গুণিজনের উদ্দ্যেশ্যে সম্মান প্রদান করা হয়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম জগৎগুরু কাশীর শঙ্করাচার্য, স্বনামধন্য শ্রী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, শ্রীমতী হৈমন্তী শুক্লা ইত্যাদি মানুষের আগমন ঘটেছে এই পরিবারে। রাস উৎসবের জন্য কলকাতা থেকে সমস্ত ধরনের ফল আনা হয়। ভোগে থাকে পোলাও, পঞ্চব্যঞ্জন,পরমান্ন, দই, মিষ্টি ইত্যাদি প্রদান করা হয়। এই পরিবারের কুলপুরোহিত ছিলেন শ্রী অমূল্য ভট্টাচার্য্য। আজও এই বাড়িতে নিষ্ঠার সঙ্গে পূজিত হন শ্রীশ্রী শ্যামসুন্দর জীউ। শান্তিপুরের প্রাচীন মন্দিরের মধ্যে অন্যতম এই গোপীকান্ত জীউ। শান্তিপুরের গোস্বামী বাড়ীগুলির শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার যুগল বিগ্রহের রাসীলীলা অনুষ্ঠানের নগর পরিক্রমানুষ্ঠানের প্রচলনের খাঁ বংশের পূ্র্বপুরুষ। এই বংশের রামগোপাল খাঁর তিন ভাই, রামজীবন, রামচরণ ও রামভদ্র। রামচরণ খাঁ শ্রীশ্রীগোপীকান্ত জীউ নামে কৃষ্ণ রাধিকা বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। মতান্তরে কৃষ্ণবল্লভ (শ্রীমন্ত খাঁর দ্বিতীয় পুত্র) এই জীউ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গোপীকান্তের নিত্যসেবার জন্য অনুকূল চন্দ্রকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। রাস উৎসব, দোল, জন্মষ্টমী ইত্যাদি উৎসব পালিত হয় এই মন্দিরে। আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পূজিত হন শ্রীশ্রী গোপীকান্ত জীউ।

   শান্তিপুরপর্বের প্রাথমিক গবেষণায় ছিলেন শ্রীমান্ বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীমান্ সৌমজিৎ মাইতি এবং শ্রীমান্ শুভদীপ রায় চৌধুরী। 

    শান্তিপুরের ইতিহাসচর্চার পর্ব ভবিষ্যৎ-এ আরও বিস্তারিত হবে। ইতিহাসের সাথে থাকুন, ঐতিহ্য, ধারাবাহিকতা, মেলবন্ধন এবং সঠিক তথ্যের অনুসন্ধান করাই বনেদীর-বনেদীয়ানা পরিবারের মূল লক্ষ্য।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ সমস্ত মন্দিরের সদস্যদের, পরিবারের সদস্যদের এবং শান্তিপুরের বহু মানুষ যারা বিভিন্ন ভাবে গবেষণায় সাহায্য করেছেন ।

তথ্যসূত্র গবেষণায়ঃ শ্রীমান্ শুভদীপ রায় চৌধুরী

 

মতামত

গল্প

মেঘবালিকা
মৈত্রেয়ী মুখোপাধ‍্যায়

রঙিন স্বপ্ন চোখে সাজিয়েছিল মেয়েটি তিল তিল করে, আজ সেই স্বপ্ন তুরুপের তাসের মতো ভেঙে গেল প্রত‍্যাখ‍্যাত হয়ে। ছেলেটি কথাই বলেনি, তার মা ই স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে তার ছেলের জীবন এক অন্ধ মেয়ের জন‍্য নষ্ট হতে দিতে পারেননা।সে তার সুগভীর কাজল কালো চোখদুটি থেকে গড়িয়ে পড়া জল লুকোতে চলে এসেছিল তার সবচেয়ে প্রিয়স্থানে।

      টুপটাপ করে গাছের পাতায় জল পড়বার শব্দ। ওমা বৃষ্টি পড়ছে যে! জানলার গরাদ ছেড়ে ছোট্ট মেয়েটি এক ছুট্টে বাইরে। বৃষ্টিও এই ছোট্ট মেয়েটির সাথে খেলায় মেতে উঠল যেন।
মেয়েটির চোখের পাতা ভিজিয়ে, গাল ভিজিয়ে বৃষ্টি আদর করছে। দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করছে যেন বারিধারাকে। চঞ্চল মেয়েটির পায়ের নিচে জল থৈ থৈ। মেঘও যেন মেয়েটির কাজল কালো চোখের কাজল মেখে নিয়েছে।
তাদের সঙ্গে সঙ্গ দিতে গাছগুলিও নাড়ছে মাথা। তাল মিলিয়ে ডাকছে ব‍্যাঙ। জুঁই- করবীর গন্ধে মাতোয়ারা চারিদিক।প্রকৃতি সেজেছে বর্ষারাণীর সাজে।
মেয়েটি নিজেকে ভাবে মেঘবালিকা। তার কল্পনালোকে অবাধ বিচরণ। মন‌‌‍স্চক্ষে দেখা দৃশ‍্যের নেই কোন পরিসীমা।
দরজার পাশ থেকে মা দেখে তার পাগলি মেয়ের কান্ড "ওরে ঘরে আয়,আর ভিজিস না, ঠান্ডা লাগবে তো।" মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ছোট্ট মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলে,"তুমিও এসোনা মা।" ছুট্টে এসে মায়ের হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসে। "কি সুন্দর চারিদিক!না মা?" কোনো গোপন ব‍্যথা চেপে রেখে মা হেসে বলল," ঠিক তোর মতো মিষ্টি।" মাকে জড়িয়ে ধরল সে,মায়ের স্নেহচুম্বন স্পর্শ করল তার ললাট।
     

আজো জানলার গরাদ ধরে দাঁড়িয়েছিল 'মেঘবালিকা', সদ‍্য যুবতী সে। টুপটাপ নয়,অঝোর ধারে চলছে বর্ষন। তার মনখারাপের খবর মেঘ রাখে! অবাক হয় সে। বেরিয়ে আসে বাইরে, ছুটে নয়, ধীর পায়ে। চোখের কাজল আজ ধুয়ে যাচ্ছে চোখের জলেই, বৃষ্টি তো উপলক্ষ মাত্র। দুই হাত মেলে যেন আহ্বান করে বৃষ্টিকে। "আরো জল ঢালো মেঘ, তোমার মেঘবালিকার চোখের জল শুধু তুমি দেখবে, আর কেউনা, কেউনা।" উচ্ছ্বসিত কান্নায় ফুলে ফুলে উঠতে লাগল তার শরীর। প্রকৃতিও আজ যেন বিমর্ষ, মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিতে ব‍্যস্ত। মেয়েটি সুন্দরী, সবচেয়ে আকর্ষনীয় ওর দুটি কালো গভীর চোখ। মেয়েটি ছিল বাগদত্তা। তার বাবার বাল‍্যবন্ধু চেয়েছিলেন তার বড় ছেলের সাথে বিয়ে দেবেন মেয়েটির। কয়েকবছর আগে আকস্মিক অসুস্থতায় উনি গত হয়েছিলেন। তার সাথেই তাঁর দেওয়া কথাও হারিয়ে গিয়েছে সেটা বোঝেনি মেয়েটি।ছেলেটি বিদেশে উচ্চপদে চাকুরিরত, তার মাও ভুলে গেছে তাঁর স্বামীর দেওয়া কথা তার অন্তরঙ্গ বন্ধুকে।
     রঙিন স্বপ্ন চোখে সাজিয়েছিল মেয়েটি তিল তিল করে, আজ সেই স্বপ্ন তুরুপের তাসের মতো ভেঙে গেল প্রত‍্যাখ‍্যাত হয়ে। ছেলেটি কথাই বলেনি, তার মা ই স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে তার ছেলের জীবন এক অন্ধ মেয়ের জন‍্য নষ্ট হতে দিতে পারেননা।সে তার সুগভীর কাজল কালো চোখদুটি থেকে গড়িয়ে পড়া জল লুকোতে চলে এসেছিল তার সবচেয়ে প্রিয়স্থানে।

     কখন বসে পড়েছিল খেয়ালই করেনি মেয়েটি। হঠাৎ পিঠে এক হাতের আস্বস্ত ছোঁয়ায় বুঝল মায়ের উপস্থিতি। জড়িয়ে ধরল তার গর্ভধারিনীকে। পরম মমতায় বুকে টেনে নিল মা‌। উভয়ে নির্বাক। মায়ের স্নেহচুম্বন ভেঙে দিল তার চোখের জলের বাঁধ। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে মা বলল, "ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন‍্য মা।সব ঠিক হয়ে যাবে, তোর উপযুক্ত কাউকে ভগবান ঠিক পাঠিয়ে দেবেন। কাঁদিসনা আর ,চল ঘরে চল।" "মা,সবাই কেন বাইরের চোখের উপস্থিতি খোঁজে? মনের চোখে যা দেখা যায় তা তো চোখে দেখার তুলনায় অনেক স্পষ্ট, অনেক খাঁটি।" কান্না ভেজা গলায় বলল 'মেঘবালিকা'।

"হ‍্যাঁ মা,তুই ঠিকই বলেছিস। মানুষকে তো চেনা যায় মনের চোখ দিয়েই। যারা সেটা বোঝেনা,যাদের কাছে বাহ‍্যিক চোখই প্রধান তারা তোকে বুঝবেনা, সেটা তাদের বোধের পরাজয়।", মেয়েকে বোঝায় মা।

প্রকৃতিও সহমত।আনন্দের হিল্লোল যেন উঠেছে পাতায়-পাতায়,ফুলে-ফুলে। মেঘও যেন খুশিতে আরো মুক্তো ছড়িয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টিও সানন্দে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাদের আদরের মেঘবালিকার চোখ,মুছিয়ে দিচ্ছে অশ্রুজল।আর তার সাথে তাল মিলিয়ে ব‍্যাঙ ও উঠল ডেকে। জুঁই-করবী ফুলে ফুলে আবার সাজল প্রকৃতি।

নতুন করে স্বপ্ন সাজানোর পালা যে!

মতামত

কবিতা

সহজ

সুমিতাংশু দোয়শী


হজ পথে সহজ ভাবে সহজ কথা চাই

রূপক কথা ভুল বুঝিয়ে দ্বন্দ্ব যে বাড়াই।

সহজ মতে সহজ রূপে মানুষ ভজন করো

সোনার মানুষ আসে পাশে খুঁজে নিয়ে ধরো।

তত্ব কত ঘাটবে বলো সময় কোথা পায়?

সহজ কথা আপন হয়ে হৃদে গো সিঁধায়।

কঠিন বলে সহজ কে ভাই মুখোশে লুকোলে,

কি লাভ হবে যারে দিলে সেই যদি না পেলে?

চালক অতি, জ্ঞানের বোঝা, বন্ধ গো মন করো

সব জনাকে আপন করে সবার সাথে ঘোরো।

মানুষ সনে মিশলে পরে রসিক পাওয়া যায়,

রসিক যেজন, আসল চতুর, লালন বলে তাই।

সহজ পথের মজা অনেক, চিন্তা কেনো করো?

পথ আছে ওই সামনে খোলা,যাত্রা শুরু করো।

সহজ অতি খাঁটি গো ভাই,সহজ কথা চাই,

সহজ মানুষ ছাড়লে পরে লাভ তো কিছুই নাই।

সহজ কথার মজা ভারী,সবে বুঝতে পারে,

মনের মানুষ নিজে আসেন হৃদ্মাঝারের ঘরে।

সহজ কথা মিষ্টি ভারি,মনে প্রবেশ করে,

ভাবনা ভরা মনকে গো ভাই অতি শান্ত করে।

সহজ খুঁজে, সহজ বুঝে সহজ চলি তাই,

বিপাসনায় মুগ্ধ হয়ে ধ্যান এ বসা চায়।

চিন্তা যত মুক্তধারা আপনি বয়ে চলে,

ভক্তি পদ্ম আমি গো ভাই তাই পরেছি গলে।

মূর্খ আমি অজ্ঞানি এক বিদ্যা কিছুই নাই

লালন, কবীর তাই শুনি গো,শান্তি বড়োই পাই।

মানুষ গুরুর করতে ভজন লালন এ কহিল,

সহজ কথা, কী সুন্দর, ছন্দে বেঁধে দিল।

এসো গো ভাই সকল মিলে মানব সাধন করি

অতি সহজ,সরল অতি,গুরুর চরণ ধরি।

অশান্ত সব জীবন যত শান্ত হওয়া চাই।

দ্বন্দ্ব বিভেদ ভুলে সবে মিলন হবে তাই।

মিলবে সবাই সবার সনে এই টুকুনি আশা

বইবে বুকে মিলন বাণী মধুর হবে ভাষা।

এপার সাথে ওপার মিলন নিজের চোখে দেখা

সুরের ছন্দে মিল হয়েছে,হিংসা মরুক একা।

যেজন বলে প্রেমের বাণী,সেজন একলা কভু নয়,

সবাই যে তার বন্ধু গো তার পর তো কেহই নয়।

মানুষ প্রেমে পড়লে গো ভাই সহজ বোঝা যায়

ভজলে মানুষ গুরুর চরণ শান্তি পাওয়া যায়।

শান্তি নামুক বিশ্ব ’পরে এই কামনা করি

মিলন হবে,বিভেদ যাবে,বিশ্বাসে ভর করি।

সবার মাঝে মিলে মিশে থাকতে সবাই চায়

সহজ হলেই মিলবে সবে, এই তো গো উপায়।

__________________________________________________

 

আমার ছেলেবেলা 

পীযূষ কান্তি দাস 

জন্ম -অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম । ইচ্ছা ছিলো সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে নেওয়া । কিন্তু বাস্তবতা আর নিয়তি টেনে নিয়ে গেল অন্যপথে আর পেশা হল স্বাস্থ্যকর্মী । দীর্ঘ চল্লিশ বছর পেশার চাপে সব রকমের সাহিত্য থেকে বহুৎ দূরে । 

যাবি বন্ধু নিয়ে আমায় সেই সে সোনার গাঁ,

সবুজ যেথা আলপনা দেয় প্রতীক্ষায় রয় মা ।

চৈত্র শেষে চড়ক পূজা কিংবা রথের মেলা  , 

স্বপ্নেভরা দিনগুলো সেই আমার ছেলেবেলা । 

ধুলোমাখা লুটোপুটি চালতেগাছে ঝোলা ,

বলনা সখা বলনা আমায় যায় কী সেসব ভোলা ?

 

নদীর ধারে জল পি পি ডাক - পানকৌড়ির ডুব ,

ছিপের ফাতনা উঠলে নড়ে  ঠোঁটে আঙুল "চুপ " ।

ধরতে ছানা টিয়াপাখির শিরিষগাছে চড়া ,

ভয়ে ভয়ে স্কুলে যাওয়া হয়নি যেদিন পড়া ।।

 

গরমকালে দুপুরবেলা একসাথে সব মিলে ,

পাড়ের থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া ময়নামতির ঝিলে ।

মনে পড়ে এক রবিবার গিয়ে নদীর ঘাটে ,

নৌকা খুলে নিরুদ্দেশে বক্সীগঞ্জের হাটে !

দুপুর গিয়ে বিকেল হলো ফিরি যখন বাড়ি ,

বেঁচেছিলাম তাড়াতাড়ি  ধরে মায়ের শাড়ি ॥ 

 

জানাদের সেই পুকুরে ভাই কেমন মাছের ঘাই ,

চোখ বোজালে আজও যে হায় দেখতে আমি পাই । 

অমল কমল কোথায় আছে কোথায় শ্যামলী তারা ,

একলা বসি বারান্দায় আর দুই চোখে বয় ধারা ॥ 

 

আজকে আছে বাড়ি -গাড়ি জামা -কাপড় দামী ,

নাম হয়েছে যশ পেয়েছি নই রে সুখী আমি ।

শেষ হলো প্রায় দিনগুলো হায় সাঙ্গ ভবের খেলা ,

আজও আমায় কেমন কাঁদায় আমার ছেলেবেলা ॥

_____________________________________________

দুর্গাপুজোর দিনগুলি

রূপা মন্ডল

কাশের দোলায় সাজছে মাঠ, 

ঢ্যাং কুড়কুড় বাজছে ঢাক |

সেজে উঠেছে পুজো-বাড়ি,

খুকুর মায়ের নতুন শাড়ি |

খোলা চুলে আঁধার ঘনায়,

জল-পদ্ম রয়েছে থালায় |

পুজোর গন্ধে মাতোয়ারা,

ঠাকুর দালানে মন্ত্র পড়া |

শিউলি ফুলে গাঁথা মালা,

পঞ্চ-ব্যঞ্জন ভোগের থালা |

সবার মনে আনন্দ খুব |

কলা-বৌ দিলো ডুব |

ধান-দূর্বা, ফুল-চন্দন,

ঢাকের তালে খোকার নাচন !

সন্ধ্যাবেলা ধুনুচি নাচ,

আরতির প্রদীপের আঁচ |

রাত পর্যন্ত গল্প-গুজব,

পুজোর আনন্দে ভরা পরব |

সুন্ধিপুজোয় একশো-আট,

পদ্ম-মালা, ফুলের হাট |

সারি সারি প্রদীপ জ্বেলে,

ভক্তিভরে পুজো চলে |

দালান কোণে চন্ডীপাঠ,

হোমাগ্নিতে বেলের কাঠ |

হোমের টিপ্, হাতে প্রসাদ |

তুলনাহীন ভোগের স্বাদ !

দশমীতে মনটি ভার !

কৈলাসে মা যাবে আবার |

ফিরবে উমা বছর পরে,

ঢাকের বাদ্যি করুণ সুরে |

সিঁদুর খেলা, মা-কে বরণ,

স্পর্শ করি মায়ের চরণ ||

__________________________________________

দুই  রাত্রির উপাখ্যান 

অনর্ঘ

 

একটা রাতঃ

ধোঁয়াটে স্পর্শ খুঁজে মূহুর্তগুলো কেটে যায। 

শাব্দিক স্বপ্নেরা বদলে যায় উপমায়, 

আকাশচারণ করা লাল-নীল কল্পনায়।

নীরর পৃথিবী বাঁচে রাত্রির নিঃসঙ্গতায়।

আরেকটা রাতঃ

নিয়ন্তা অপ্সরা বেছে নিয়ে বেহেশতে যায়;

লাল আলো মিশে যায় সৃষ্টির কোণায় কোণায়।

মানুষের বেঁচে থাকা নিষিদ্ধ আদেশনামায়,

প্রগতির পইরহাসে কেউ ভেসে যায় নর্দমায়।

প্রলয়

তনুশ্রী রায়

বিনাগুরি, জলপাইগুড়ি, পঃ বাংলা 

সীমাহীন, বহুদূর, অজানা শপথ 

সবই নাকি মাফ, যার হৃদয় বৃহৎ 

এতো সংকীর্ণা! দেখে লাগে ঘেন্না!

বাড়াবাড়ি দাবি? নাকি হদ্দ অবোধ? 

 

বহুবার মোচড়ায়, আঁচড়ায় বুক 

হাতছানি দিয়ে হাসে না দেখা চাবুক 

কেন একাকিত্ব! অপ্রিয় সত্য!

হাড়হিম রাত? নাকি fantasy সুখ?

 

কটকটে লাল চোখ, কেঁদে ম্রিয়মাণ 

ফোটে হুল, নাকি শুল, শুষে খায় প্রাণ

কানফাটা শান্ত! লেখা পড়ে ক্লান্ত! 

tipsy তাকানো? নাকি নেকামোর ভান?

 

প্ররোচনা, মন্ত্রণা, যন্ত্রনা সয়

casual, নির্বাক, এড়ানো সময়

গা গরম করা peg! কবচ দেওয়া আবেগ!

উপড়ে ফেলবে? নাকি থামবে প্রলয়?

__________________________________________________

অপেক্ষা

বিদ্যার্থী দত্ত

ডিপার্ট্মেন্ট অফ লাইব্রেরী অ্যান্ড ইনফরমেশন সাইন্স 

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়, মেদিনীপুর, পঃ বাংলা 

পেক্ষায় আছি,
গল্পের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা
ঘটনার ঘনঘটা
কালো বাদুড়ের মত ঝুলে আছে,
পুকুরের আয়নায় দোদুল দোলায়
কলাগাছের সারি।

অপেক্ষায় আছি,
কবিতার ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে পড়া
ছন্দের কথকতা
চড়ুই পাখির মত ধুলো ঘাঁটছে,
আকাশের ইশারায় পাখা মেলে দেয়
মহাশ্বেতার হাসি ।

অপেক্ষায় আছি,
নাটকের অঙ্কে অঙ্কে ঝিকিয়ে ওঠা
আবেগের অস্মিতা
মাতালের লাল চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছে,
ঈশানের কালো মেঘ ঝাঁকুনি দিয়ে যায়
আগন্তুকের ছুরি ।


অপেক্ষা অন্তহীন

সামগান রাত্রিদিন,
আকস্মিকের ফুলকি
অপেক্ষার অন্তরীপে
ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি।

__________________________________________________

কোল

দীনেশ দাস

 

দিনতো শুধু তরী বারই তরে,

কতো নিশি সাথে চলে যায়,

জীবনের প্রভাত সূর্য্য আজও,

দেখিলাম না এ চোখেতে হায়।

 

শুধু পথে বেসুরো একতারা হাতে,

আনন্দ সব কবেই গিয়েছে পাটে,

কোল খুঁজে বেড়াই আমি কাঁদবো শুধু,

তবে কি সারা জীবনে ঘুমাবো না কভু।

 

নিয়তির এই পরিহাস বেদনা রূপে অপরূপ,

যে যে জন ঘুড়িতেছ প্রেমের পিয়াসার তরে,

কেউ কি পেয়েছ দেখা তার এই মায়ার সংসারে।।

__________________________________________________

কথা দিলাম

মৌমিতা দান 

বকিছু পরিপূর্ণ হওয়ার পর 

কোনো এক বৃষ্টিমুখর দিনে বিকেলবেলা ধোঁয়া উঠতে থাকা কফিমগ নিয়ে যদি কোনোদিন জানলার পাশে বসিস-

কথা দিলাম- আমি আসব। 

তোর ঘরে তখন স্পিকারে হালকা রবীন্দ্রসংগীত বা কোনো ইংরেজি গান চলবে... ঠিক তখুনি আমি আসব; তাল কাটতে কিংবা ওই সুরে ভেসেই তোর কানে বাজব।

তখনও কি বিরক্ত হবি? 

বা ধর ওই ঠান্ডা হাওয়ায় যদি মিশে আসি? 

কিংবা বৃষ্টিছাটে! 

ঠিক কীভাবে গেলে চিনবি আমায়? 

আমি বরং আশ্রয় চাইতে যাব-

এক বৃষ্টিভেজা মাছরাঙা হয়ে...

তুই যত্ন করে খেতে দিবি, 

আগুনের ওমে ভেজা শরীর শুকনো হবে। 

ফেরার সময়, ফিরব না হয় ধূসর নিয়ে। 

কথা দিলাম- তবুও যাব;

বৃষ্টিমুখর দিনে। 

__________________________________________________

অন্তরাল

কুশল চক্রবর্তী

 

ঠাৎ হয়তো থেমে যাবে ছন্দ

আলো আঁধারির গভীর অন্তরালে

গোধূলীর রক্তিম সূর্যের খানিক ছটা এসে পড়বে

নিস্তব্ধ নদীর কোলে

মিশে যাবে সব রঙিন আবেশ

কঠিন সত্যের অনুসন্ধানে

 

হঠাৎ হয়তো শুরু হবে স্তব্ধতার আগের হাসি

স্বপ্নে বিভোর নতুন সকালে

স্নিগ্ধতার কিরণে ভেসে ওঠা খুশির খেয়া

বহমান নদীর কোলে

সীমাহীন নীরবতায় মুগ্ধ সুরের রেশ

পূর্ণতা পাওয়া সুখের অনুসন্ধানে

____________________________________________

এভাবেই গোলাপি বাগান পুড়ে ছাই হয়

দীপক মান্না  

বজবজ, কলকাতা 

 

বাঁ-দিকটা পুড়ছে ক্রমশ 

ছাই হয়ে যাচ্ছে জমানো ধনসম্পত্তি

প্রাচীর ভেদ করে ঢুকে পড়ছে -

আগুনের লেলিহান শিখা  

গোলার ভিতর সযত্নে রাখা বাসনাগুলো

উচ্চস্বরে চিৎকার করে দগ্ধ হতে থাকে  

কংক্রিট স্তম্ভের মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকি

বন্ধ চোখের ভিতর সরস্বতী বয়ে যায়

কানের পর্দায় আছড়ে পড়ে আর্তনাদ    

তিল তিল করে জমানো ইচ্ছেরা  

আগুন মেখে সংঞ্জাহীন লুটিয়ে পড়ে। 

এভাবেই তবে আগুন লাগে বুঝি

এভাবেই  গোলাপি বাগান পুড়ে ছাই হয়। 

মতামত

কাব্য আলোচনা

মার্গারেট নোব্‌ল্‌-এর নবমূল্যায়ন

ড. রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায় লিখিত ‘কাগুজে সিংহী’

শ্রী সৌরভ দাশগুপ্ত, নিমতা বাসী, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ-অভেদানন্দ বিষয়ে লেখক।

ভারতবর্ষে ও বিশ্বের অন্যান্য কয়েকটি দেশে ২০১৭ সালে যখন ভগিনী নিবেদিতার জন্মের পর ১৫০ বছর পূর্তি মহা উৎসাহে পালিত হচ্ছিল, তার একটু আগেই জুন ২০১৭ অধ্যাপক রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায়ের লেখা “কাগুজে সিংহী” : মার্গারেট নোব্‌ল্‌ (বাঙলার মুখ প্রকাশন) আত্মপ্রকাশ ক’রে দাবী জানিয়েছে তাঁর নবমূল্যায়নের।

    ভারতবর্ষে ও বিশ্বের অন্যান্য কয়েকটি দেশে ২০১৭ সালে যখন ভগিনী নিবেদিতার জন্মের পর ১৫০ বছর পূর্তি মহা উৎসাহে পালিত হচ্ছিল, তার একটু আগেই জুন ২০১৭ অধ্যাপক রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায়ের লেখা “কাগুজে সিংহী” : মার্গারেট নোব্‌ল্‌ (বাঙলার মুখ প্রকাশন) আত্মপ্রকাশ ক’রে দাবী জানিয়েছে তাঁর নবমূল্যায়নের। একদিকে ভক্তি আপ্লুত জনমানসে নিবেদিতা সম্বন্ধে বহুভাষিত অতিকথন, অন্যদিকে লেখকের সত্যান্বেষণ ও বিশ্লেষণের ক্ষমতায় রচিত হয়েছে এই চমকপ্রদ জীবনীটি। সমগ্র বইটিতে ড. চট্টোপাধ্যায়, যিনি ১৯৮১-১৯৯৩ মার্কিন দেশে গবেষণান্তে পরে কলকাতার বসু বিজ্ঞান মন্দিরে গবেষক-অধ্যাপক ছিলেন, মার্গারেট নোব্‌ল্‌ (১৮৬৭-১৯১১) সম্বন্ধে গজিয়ে ওঠা মিথ্‌গুলিকে অপনয়নে ব্রতী।

বর্তমান প্রবন্ধে এই চমকপ্রদ জীবনীটির কিছু কিছু চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণ / সিদ্ধান্ত-গুলির উল্লেখ করছি।

১) বহুল প্রচলিত ‘সিসটার নিবেদিতা’ নামটির মধ্যে ‘Sister’ উপাধিটির উৎপত্তি-প্রসঙ্গে রাজাগোপালের আবিষ্কার, ওই উপাধিটি তৎকালীন কলকাতার সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান মিররেই সৃষ্টি (পৃ.৭-৮)।

২) নিবেদিতার ব্যক্তিজীবনে তিনি কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথা-মাফিক পড়াশোনা করেন নি। তাঁর লেখা-পড়া স্কুল জীবনেই শেষ হয়, যদিও রাজাগোপাল দেখিয়েছেন, ১৮৭৪ থেকেই ইংল্যান্ডে কেম্ব্রিজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় দুটিতেই মহিলাদের জন্য নতুন কলেজ শুরু হয়েছিল (পৃ.৩৩-৪০)। যদিও, পরবর্তীকালে মার্গারেট বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে এস নিজেকে পরিশীলিত করার সুযোগ পেয়েছিলেন (পৃ.৭৬-৯৪)। এনারা সকলে মার্গারেটের গুরুতুল্য। রাজাগোপালের দৃষ্টিতে, ‘সপ্তগুরু’।

৩) কলকাতা পৌরসংস্থার ‘পুরশ্রী’ পত্রিকার সম্পাদক হরিহর প্রসাদ মন্ডল তাঁর ‘ভগিনী নিবেদিতা – সার্ধশত জন্মবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি’ (ফেব্রুয়ারী, ২০১৮) বিশেষ সংখ্যাটির ভূমিকায় লিখেছেন, “স্বামী বিবেকানন্দের এই সুযোগ্যা শিষ্যা যে কেবল নারীশিক্ষা বিস্তারেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তা-ই নয়, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা সহ জীবনের সর্বত্র তাঁর বিচরণ বিস্ময়কর”। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে, এই ধরনের বক্তব্য থেকে নিবেদিতাকে ভারতের স্ত্রী-শিক্ষার পথিকৃৎ ভাবলে ভুল হবে। কারণ, ভারতে তাঁর আগমনের অনেক আগে থেকেই স্ত্রী-শিক্ষার সূচনা হয়েছিল। যেমন, Chandramukhi Basu – A pioneering Daughter of India, সুনন্দা ঘোষ লিখিত বইটিতে চন্দ্রমুখী বসু (১৮৬০-১৯৪৪) নামে এক বিদুষী বাঙালী মহিলার কথা আছে। চন্দ্রমুখী ১৮৮৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম এম.এ. পাস করেছিলেন ইংরেজীতে। পরে চন্দ্রমুখী বেথুন কলেজের অধ্যক্ষ পদে নির্বাচিত হন ও ১৯০১ সাল অবধি তিনি ঐ পদে আসীন ছিলেন। পরে তিনি স্থায়ীভাবে দেরাদুনে বসবাস করতেন। চন্দ্রমুখী বর্তমানে আলোচিত ড. কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর (১৮৬১-১৯২৩) বেথুন কলেজের সহপাঠিনী ; কাদম্বিনী ছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করা প্রথম লেডী-ডাক্তার। বেথুন কলেজে অধ্যাপক পদে থেকে চন্দ্রমুখী বসু ছাত্রীদের জন্য যে নির্দেশিকা (Guideline) প্রস্তুত করেছিলেন, শতাব্দীর অধিক অতিক্রান্ত হলেও তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কাজেই, শুধু শিক্ষাবিদ হিসেবে নয়, প্রশাসনিক দক্ষতায়ও চন্দ্রমুখী ছিলেন অত্যুজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব অথচ প্রচারের আলোক থেকে চিরবঞ্চিত ! এছাড়াও সময়ের বিচারে, কলকাতার বুকে বেথুনের পরেই স্থাপিত হয়েছিল ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়, সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের আয়োজনে(১৮৯০)। বেথুনের স্ত্রীশিক্ষা বা ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের কথা রাজাগোপাল তাঁর বইটিতে উল্লেখ না করলেও, মার্গারেটের অবদান বিচার করার তাগিদে শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতমা স্ত্রীভক্ত গৌরীমার বিষয়ে একটি গোটা অধ্যায় লিখেছেন, সেটির শিরোনাম : ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্যা মৃড়ানী চট্টোপাধ্যায় (১৮৫৮-১৯৩৮) বা গৌরীমা : রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপিত হবার আগেই সারদেশ্বরী আশ্রমের প্রতিষ্ঠাত্রী’ (পৃ.৯৫-১০১)। সন্ন্যাসিনী গৌরীমা কলকাতার অনতিদূরে ব্যারাকপুরে গঙ্গাতীরবর্তী শ্রীশ্রী সারদেশ্বরী আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৮৯৪/১৮৯৫, তখনও মার্গারেট ভারতে পা দেন নি। রামকৃষ্ণ মিশনের তরফ থেকে কোনও আর্থিক সাহায্য ছাড়াই, গৌরীমা ১৯১১ সালে তাঁর কলকাতার শ্যামবাজারের আশ্রমটির জন্যও অর্থসংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, ‘যা মার্গারেট নোব্‌ল্‌-ও পারেন নি’ (পৃ.১০১)।

৪) ড. রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায় ‘মার্গারেটের শিক্ষাচিন্তা ও বাগবাজারে স্কুল’ নামে একটি অধ্যায় লিখেছেন (পৃ.১৯২-২০৪)। খুব সংক্ষেপে বলা যায়, রাজাগোপাল দেখিয়েছেন, শিক্ষা সংক্রান্ত নিবেদিতার অনেকগুলি প্রবন্ধ অতি সুন্দর এবং আজও প্রাসঙ্গিক। এরপর আছে বাগবাজার পল্লীতে মার্গারেটের জীবনের কিছু বর্ণনা। শেষে আছে, বিদ্যালয় রূপায়ণে মার্গারেটের ব্যর্থতা (পৃ.২০২-২০৪), কারণসমেত ও প্রমাণসমেত।

৫) পূর্ণবয়স্কা নারী হিসেবে মার্গারেট নোব্‌ল্‌-এর চরিত্র, দোষ-গুণ সবকিছু বুঝতে হলে তাঁর জন্মভূমি আয়ারল্যান্ডে কাটানো বছর পাঁচেক ও শিক্ষাভূমি ইংল্যান্ডে কাটানো পরবর্তী ২৫ বছর, বিশদভাবে জানতে হবে। ড. রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায় সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন চারটি অধ্যায় – ‘মার্গারেটের ছেলেবেলা’ (পৃ.১১-২৩), ‘মার্গারেটের কৈশোর’ (পৃ.২৪-৩১), ‘মার্গারেট উচ্চশিক্ষায় যাননি’ (পৃ.৩২-৪০) এবং ‘মার্গারেটের চাকরী, সাহিত্যচর্চা ও প্রেম’ (পৃ.৪১-৫৭)। প্রধানত লিজেল রেমঁর লেখা The Dedicated : A Biography of Nivedita (নিউ ইয়র্ক, ১৯৫৩) ও শঙ্করীপ্রসাদ বসুর লেখা ‘লোকমাতা নিবেদিতা’ (১ম খন্ড ২য় পর্ব) ব্যবহৃত হয়েছে, তবে রাজাগোপালের নতুন বিশ্লেষণের সাহায্যে এগুলির অন্তর্নিহিত সত্যগুলি ফুটে উঠেছে। এই অধ্যায়গুলি ভালো ক’রে বোঝার জন্য ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রচুর রঙিন তৈলচিত্র, সাদাকালো চিত্র ও ফটোগ্রাফের সমাবেশ ছাপা হয়েছে, যা রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ-নিবেদিতা সাহিত্যে বিরল।

৬) বালিকা বিদ্যালয় রূপায়ণে মার্গারেট পুরোপুরি ব্যর্থ হলেও, জগদীশচন্দ্র বসুকে নানাভাবে সাহায্য করে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করার ব্যাপারে জগদীশচন্দ্রের একজন এজেন্টের মত কাজ করেছিলেন। রাজাগোপালের অভিমত, এগুলি ‘তাঁর শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানকেও অতিক্রম করেছিল’ (পৃ.২২৬)।

৭) রাজাগোপাল একটি আলাদা অধ্যায় লিখেছেন ‘মার্গারেটের বক্তৃতা সফর : পাশ্চাত্যে ও ভারতে’ (পৃ.২৬৬-২৮৭) শিরোনামে। ১৮৯৯-১৯০০ আমেরিকায় তাঁর বক্তৃতাসফরের নীট ফল ছিল শূন্য, কারণ বিষয়বস্তু না শিখেই তিনি বক্তা হিসেবে নিজেকে জাহির করতে গিয়েছিলেন (পৃ.২৭১)। ১৯০২ থেকে তাঁর ভারতের বক্তৃতাগুলির সফলতাও বেশ সীমিত ছিল (পৃ.২৮৬)। কাজেই, এরপর তিনি বক্তৃতার বদলে তাঁর লেখনী-প্রতিভার গুরুত্ব বুঝলেন (পৃ.২৮৭)।

৮) যেমন, শতধারায় বর্ষিত বৃষ্টির জলকে পৃথিবী ধারণ করতে হলে নদী-নালা বা পুষ্করিনীতে শূন্যতার প্রয়োজন, তেমনই, শিষ্য/শিষ্যার হৃদয়েও শূন্যতা আবশ্যক আপন গুরুর কৃপা-বারি হৃদয়ে ধারণ করার জন্য। নিবেদিতা যদিও বহু গুণে গুণান্বিতা, নানা বিচিত্র কর্মে সদা ব্যস্ত, কিন্তু বিশেষ করে প্রথম দিকে বক্তৃতায় স্বামীজী কিছু বললেই মার্গারেট তৎক্ষনাৎ আপত্তি প্রকাশ করতেন (পৃ.৬৬-৬৭)। পরে অবশ্য তিনি ভক্তে রূপান্তরিত হয়েছিলেন (পৃ. ১৭৬-১৭৭)। বর্তমান লেখকের ধারণা, ভারতীয় আধ্যাত্মচিন্তার রাজ্যে মার্গারেট যুক্তি-বুদ্ধির উপর নির্ভরশীল ছিলেন বলে, স্বামীজীর কিছু কিছু বাণীর মর্মস্থলে প্রবেশ করতে পারেন নি।

৯) স্বামী বিবেকানন্দের মহাপ্রয়াণের (জুলাই ৪, ১৯০২) ১৮ দিন পরে মার্গারেট রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিন্ন করেন, তা তৎকালীন সংবাদপত্রগুলিতে প্রকাশিত হয়। এই বিষয়ে স্বামী ব্রহ্মানন্দ এবং স্বামী সারদানন্দ মার্গারেটের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করেছিলেন। রাজাগোপাল এই বিষয়টি বহু তথ্যসহ উপস্থাপন করেছেন (পৃ.২৪৬-২৫৭), তবে তাঁর বক্তব্য, মার্গারেটের রাজনৈতিক কার্যকলাপ নয়, মিশনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গিই এই বিচ্ছেদের কারণ ছিল। এই প্রসঙ্গে বিবেকানন্দের মার্গারেটকে লেখা ১২/২/১৯০২-এর একটি চিঠিতে স্বামী ব্রহ্মানন্দের ন্যায়বিচারের প্রতি বিবেকানন্দের গভীর আস্থা প্রমাণিত হয় (“I recommend you none – not one – except Brahmananda. That old man’s judgement never failed mine always do.”)। ড. চট্টোপাধ্যায় তাঁর বইটির উৎসর্গে ও অন্যত্র (পৃ.২৫৭) স্বামী ব্রহ্মানন্দের সিদ্ধান্তটিকে যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন।

১০) সমগ্র জীবনীটি লেখার ফলে, রাজাগোপাল জানিয়েছেন, নারায়ণী দেবীর The Dedicated-এর বাংলা অনুবাদটি খুবই নীচু মানের এবং উৎস হিসেবে ত্যাজ্য (ভুমিকা, পৃ.ড)।

১১) সচিত্র ‘শাস্ত্র অনুযায়ী মার্গারেটের দৈহিক লক্ষণের তাৎপর্য’ নামে ৬ষ্ঠ অধ্যায়টি (পৃ.৫৮-৬৩) কোনও কোনও পাঠকের কাছে বিরক্তির কারণ বা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু দৈহিক লক্ষণ বিশ্বের সব প্রাচীন সভ্যতাতেই মানুষের বিশ্বাস, লোকমুখে প্রচারিত ও লোকচরিত্র বিশ্লেষণে সহায়ক। শ্রীরামকৃষ্ণদেব এবং তাঁর শিষ্যরা এই সুপ্রাচীন পদ্ধতিতে আস্থাশীল ছিলেন। ভারতীয় শাস্ত্র, বিশেষ করে শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী ও সামুদ্রিক শাস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে আলোচ্য নারী নিবেদিতার ফটোগ্রাফগুলিতে বিধৃত দৈহিক লক্ষণগুলির উপর। শুধু তাই ন

১২) দশম অধ্যায়ে অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর তিন বিখ্যাত সন্তান – সরোজিনী, বীরেন্দ্রনাথ ও হারীন্দ্রনাথের কথা লিখেছেন (পৃ.১০২-১১৯)। বিশেষ করে যখন আত্মবিস্মৃত বাঙালীর স্মৃতিতে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পথপ্রদর্শক অঘোরনাথ, তাঁর সুযোগ্য কন্যা সরোজিনী নাইডুও চর্চার বিষয় বলে গণ্য হন না, দশম অধ্যায়টি আপাতদৃষ্টিতে প্রক্ষিপ্ত বলে য়, পাঠকরা এটি তাঁদের প্রাত্যাহিক জীবনেও প্রয়োগ করতে পারেন (পৃ.৬৩)।

মনে হতে পারে। অঘোরনাথ প্রথম ভারতীয়, যিনি এডিনবরো বিশ্ববিদ্যালয়ে D.Sc. পান ও ন্যায়পরায়ণ-দেশপ্রেমিক এই মানুষটি হায়দ্রাবাদের নিজাম কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন। স্মৃতি শাস্ত্র বলেছে, ‘বংশো দ্বিধা, জন্মনা বিদ্যয়া চ’। বংশধর দু’ভাবে চিহ্নিত হয় – বিশিষ্ট ব্যক্তির বংশে জন্মের দ্বারা অথবা বিদ্যার সাগরে অবগাহন ক’রে। সমকালীন ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে সরোজিনী নাইডু ছিলেন একটি উজ্জ্বলতম নক্ষত্র – তাঁর বিদেশ পরিক্রমা, কবি হিসেবে স্বীকৃতি ও জাতীয় কংগ্রেসের সর্বপ্রথম মহিলা সভাপতি হিসেবে (১৯২৫-১৯২৭)। ১৯০৬ সালে সর্বভারতীয় কনফারেন্সের কলকাতায় অনুষ্ঠিত সভায় সরোজিনীর উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মহিলাদের শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠ করার জন্য (পৃ.১০৭)। সরোজিনী তাঁর চমৎকার ইংরাজী উচ্চারণ, অপূর্ব কণ্ঠস্বর এবং বিশ্লষণী ক্ষমতার সুবাদে গোখেলসহ তৎকালীন নেতৃবৃন্দদের মুগ্ধ করেন। তাঁর কবিসত্বার জন্য, সাহিত্যরচনার জন্য এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে সরোজিনী অনন্যা। মহাত্মা গান্ধীর সহকারী হিসেবেও তাঁর অসাধারণ অবদান ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে। সরলাদেবী চৌধুরানী (১৮৭২-১৯৪৫)স্বামীজীর আশীর্বাদ ধন্যা স্বর্ণকুমারীর পুত্রী। সরলাদেবী ১৮৯০ তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ; সংস্কৃত, ফরাসী ভাষায় দক্ষ ; মহিলাদের মধ্যে বীরত্বব্যঞ্জক ভাবনার প্রবর্তন করেন প্রতাপাদিত্য উৎসব ও বীরাষ্টমীর ব্রত পালনের মাধ্যমে। কাজেই এই দুই বঙ্গ-তনয়ার অবদান নিবেদিতার অনুরূপ অবদানের অভাবকেই প্রকট করছে।

সরোজিনীর ছোট দুই ভাই বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও হারীন্দ্রনাথের কথাও দশম অধ্যায়ে জানা গিয়েছে (পৃ.১০৩-১০৬,পৃ.১১২-১১৯)। এর মধ্যে বীরেন্দ্রনাথের কাহিনী মাত্র ২০০৪ সালেই বেশ বিস্তারিতভাবে একটি ইংরাজী বইয়ের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে (পৃ.১১২)। স্বাধীন ভরতে এই বিশিষ্ট বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথের বিষয়ে খুব অল্পই আগে জানা ছিল, তাই রাজাগোপাল ইংরেজী বইটি থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি ও অনুবাদ করে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন (পৃ.১১২-১১৯)।

১৩) জনসাধারণের মনে একটি ভ্রান্ত ধারনার সৃষ্টি হয়েছে যে মার্গারেট ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন, যেখানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আন্দোলনে বিরত ছিলেন। যেমন, মার্গারেটের জীবনের দুটি ঘটনা – কার্জনের কনভোকেশন বক্তৃতায় ভারতীয়দের অবমাননার প্রতিবাদ ও স্বদেশী প্রসঙ্গে একটি প্রবন্ধ রচনা। প্রথম রচনাটি তাঁর স্বাক্ষরবিহীন বা রচয়িতার নাম উহ্য (পৃ.৩২৩), যদিও কবি তাঁর লেখায় নাম দিয়েছিলেন (পৃ.৩২৪)। স্বদেশী প্রসঙ্গে যেখানে রবীন্দ্রনাথ ও ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় আলাদা আলাদাভাবে ১৯০৪ সাল থেকেই অনেক কিছু লেখেন, মার্গারেটের ১টি মাত্র প্রবন্ধ ১৯০৬-তে বের হয়, তাও স্বাক্ষরবিহীন। রাজাগোপাল লক্ষ্য করেছেন, ভারতে নিবেদিতার জীবন প্রায়শই বিশিষ্ট ও অতি বিশিষ্টদের মধ্যেই কেটেছে, শিলাইদহে তাও রবীন্দ্রনাথের অতিথি হিসেবে গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটেছিল। রাজাগোপাল মনে করেন, ‘গোরা’ উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ায় মার্গারেট খুবই দুঃখিত ও আতঙ্কিত হন, যদিও রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপর্যুপরি অনুরোধে ‘প্রবাসী’তে ছাপা ওই উপন্যাসটি বিয়োগান্তকের বদলে মিলনান্তক করেন। ‘গোরা’ প্রবাসীতে বের হবার পর, বছর দেড়েক মাত্র মার্গারেট বেঁচেছিলেন। তাই মার্গারেটের অল্প বয়সে মৃত্যু ঘটায়, কবির মনে নিশ্চয়ই এক ধরণের অনুশোচনা কাজ করেছিল (পৃ. ৩০২, ৩৪৯), যার প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখা শোক-সংবাদটিতে সদ্যপ্রয়াতা নিবেদিতাকে ‘লোকমাতা’ বিশেষণ দিয়ে ফেলেছিলেন (পৃ.৩৪৯)। রাজাগোপাল এও লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতার মনের গভীরের খবর না জেনেই তাঁর মন্তব্য করেছিলেন (পৃ.৩৪৯), কারণ তাঁর চিঠিপত্র তখনও ছাপা হয়নি। কাজেই রবীন্দ্রনাথ নিজেই যখন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মার্গারেটের কিছু কিছু নিন্দা করেছিলেন (পৃ.৩৫০), এই সাময়িক উচ্ছ্বাস-উদ্ভুত বিশেষণটিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া অনুচিত। রাজাগোপাল লিখেছেন, ‘লোকমাতা’ বিশেষণটি একমাত্র রাণী রাসমণির ক্ষেত্রেই মানানসই (পৃ.৩০২)।

রবীন্দ্রনাথ-নিবেদিতা প্রসঙ্গে ড. চট্টোপধ্যায় যেমন দেবাঞ্জন সেনগুপ্তের বইটি ব্যবহার করেছেন, তাঁর অনেকগুলি ভুল সিদ্ধান্তও দর্শিয়েছেন (পৃ.২৮৯-৩০২), অনেকগুলি ক্ষেত্রে সমস্যাগুলির সমাধানও করেছেন যা দেবাঞ্জনবাবু পারেন নি।

১৪) ত্রয়োবিংশ অধ্যায়ের নাম ‘দ্বিতীয়বার ইংল্যান্ড যাত্রার পূর্বে বিবিধ ঘটনা, রাজনীতির ছোঁয়া’ (পৃ.৩০২-৩২৭)। মাদ্রাজে বক্তৃতাসফর বা জানুয়ারী ১৯০৩ থেকে আগষ্ট ১২, ১৯০৭ এই পর্বটি বিস্তৃত। মার্গারেটের চিঠিপত্র, মুক্তিপ্রাণা-লিখিত জীবনী, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তাতে নিবেদিতার ভূমিকা নিয়ে দুই বিখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার (পৃ.৩০৭-৩১০) ও বিমানবিহারী মজুমদারের (পৃ.৩১০-৩১৪) দুটি বইয়ের বিস্তারিত আলোচনা, ব্রিটিশ সরকারের গোপন রিপোর্ট (পৃ.৩০৬-৩০৭) ইত্যাদি থেকে দেখিয়েছেন, মার্গারেট কখনই তেমনভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেননি। পরন্তু শ্রীঅরবিন্দ, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ও দেবব্রত বসু এনারা তাঁকে বিপ্লবীদের অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার দেন নি (পৃ.৩১৪-৩১৫) তাই দেখা যাচ্ছে। রাজাগোপাল সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, হয়ত এনারা নিবেদিতাকে রাজশক্তির গুপ্তচরই মনে করতেন (পৃ.৩১৫)। গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরীর বই থেকেও বহু উদ্ধৃতি লেখক এই অধ্যায়ে ব্যবহার করেছেন, কেবল রাজাগোপাল মনে করেন নিবেদিতার আন্দোলনে কোনও সক্রিয় ভূমিকা ছিল না (পৃ.৩২৫)। শঙ্করীপ্রসাদের ২য় ও ৩য় খন্ড ঘেঁটেও তেমন কোনও প্রমাণ মেলেনি, রাজাগোপাল জানিয়েছেন।

লেখকের অনালোচিত দুটি আরও মন্তব্য ফিরে দেখা যায়, দুই ভিন্ন মেরুর স্বাধীনতা সংগ্রামীর লেখা থেকে। কলকাতায় ফেব্রুয়ারী ১৯০২ মার্গারেটের স্মৃতি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর লেখায় - ‘I then ascertained the place of residence of Sister Nivedita, and met her in a Chowringhee mansion. I was taken aback by the splendour that surrounded her, and even in our conversation there was not much meeting ground. I spoke to Gokhale about this, and he said he did not wonder that there could be no point of contact between me and a volatile person like her.’ (An Autobiography, M. K. Gandhi, Ahmedabad, 1999, p198)। গান্ধী পরে এও লিখেছেন যে, ‘volatile’ বিশেষণটি অপেক্ষাকৃত মৃদু বলে লিখেছিলেন, যদিও গুজরাটি থেকে অনুবাদের সময় ‘violent’ ও ‘fanatical’ শব্দদুটির কথাও ভেবেছিলেন।

অন্যদিকে শ্রীমতী জীন হার্বার্ট (লিজেন রেমঁ)-কে পাঠানো ইংরাজী চিঠিতে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ১৮/৮/১৯৩৯ লিখেছিলেন - ‘… We used to meet only very occasionally, she being more connected with the open outer movement and I with the underground one. She had been connected with several abortive attempts at starting secret revolutionary societies here, specially the one started by Baron Okakura. She was connected with ours too as an ardent sympathiser but not as an actual worker. To my knowledge she did not send anybody to France [for gun/explosives training]. Our society sent Hem Chandra Das to France for that purpose & Madame Kama [Cama] …’। মাডাম কামার সঙ্গে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ১৯০৯-১৯১০ Talvar পত্রিকা চালাতেন প্যারিসে (পৃ.১১৭)।

বিশদ জীবনীটির কিছু কিছু বিষয় এই লেখায় আলোচিত হল, তবে অনেক ইন্টারেস্টিং বিষয় অনালোচিতই থেকে গেল।

১৫) ‘কাগুজে সিংহী’ : মার্গারেট নোব্‌ল্‌ জুন ২০১৭ প্রকাশের ১৬ মাস পরে, ২০১৮ অক্টোবরে ড. রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায় ইংরাজীতে ‘Paper Lioness’ : Margaret Noble প্রকাশ করেছেন। ইংরেজী জীবনীটি তুলনায় সংক্ষিপ্ত, ২৫৬ পাতার, যেখানে ‘কাগুজে সিংহী’ ৩৭৬ পাতার। এছাড়া, ইংরেজী জীবনীটির ৮০ পাতার আর্ট পেপারে ছাপা আছে, বাংলা বইটিতে যেখানে ছিল ৯৬ পাতার আর্ট পেপার। ইংরেজী বইটিতে ২১টি অধ্যায়, যেখানে বাংলা বইটিতে ২৪টি। এর মধ্যে আর্ট পেপারে ৪৮ পাতায় ছাপা রঙিন ছবিগুলি অবশ্য দুটি বইতে একই, তফাৎ সাদা-কালো ছবিগুলিতে।

ইংরেজী বইটির ভুমিকায় ড. চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, লিজেল রেমঁ-জীন হার্বার্টের The Dedicated অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হলেও, এই আদি জীবনীটির মধ্যে ভুলও প্রচুর। মুক্তিপ্রাণা রচিত ‘ভগিনী নিবেদিতা’ (১৯৫৯ ও পরবর্তী সংস্করণগুলি) শ্রেষ্ঠ জীবনী হলেও, ইংরেজীতে সব তথ্য তখনও জীবনীর আকারে লভ্য ছিল না, তাই ‘Paper Lioness’ সময়োচিত। অন্যদিকে, ইংরেজীতে প্রব্রাজিকা আত্মপ্রাণার Sister Nivedita (১৯৬১ থেকে) থাকলেও প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণার লেখাটির তুলনায় অনেক সংক্ষিপ্ত। আত্মপ্রাণা জন্মসূত্রে অবাঙালী ছিলেন, তাই বাংলায় ছাপা তথ্যাদি পড়ে ওঠা তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল। মোটের উপর ইংরেজী জীবনীটি আকারে ছোট হলেও, কিছু তথ্য এখানে নতুন, যা ‘কাগুজে সিংহী’-তে নেই।

নতুন সংযোজনগুলির মধ্যে প্রধান, ১৯১১ সালের জানুয়ারীতে আমেরিকায় সারা চ্যাপম্যান বুলের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার জন্য সারার কন্যা ওলিয়ার আনা কোর্ট কেসে মার্গারেটের অপরাধী সাব্যস্ত হওয়া। মার্কিন কোর্টে চারজন সাক্ষীই মার্গারেটের বিরুদ্ধে একই কথা বলেছিলেন যে তিনি দু’মাস ধরে তাঁর বান্ধবী সারা চ্যাপম্যান বুলকে ভারতবর্ষ থেকে না আয়ুর্বেদিক ওষুধ মকরধ্বজ জোর করে খাইয়েছিলেন রোগীর বিস্তর আপত্তি ও মার্কিন ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও। রাজাগোপাল দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, কেন মকরধ্বজ ঠিক-ঠাকভাবে প্রস্তুত না হয়ে থাকলে, একটি বিষাক্ত পদার্থ। সারার দেহে ওই ওষুধ সেবনে যে লক্ষণগুলি দেখা গিয়েছিল, তা এই বিষক্রিয়ার ফলেই ঘটেছিল। গ্রেপ্তার হবার প্রবল ভয়ে মার্গারেট ফেব্রুয়ারী ৮, ১৯১১ নিউ ইয়র্ক বন্দরে জাহাজে চড়ার মুখে ধরা পড়ে যান। কারণ ইতিমধ্যে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদপত্রে সারা চ্যাপম্যান বুলের মৃত্যু এবং গুলিয়ার অভিযোগ রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল, এবং মার্গারেট নোব্‌ল্‌ যে সম্ভাব্য দোষী তাও জাহাজের অভিবামন দপ্তরের লোকেরা জানতো। তাই কাগুজে সিংহী এরপর বসটন বন্দর থেকে ছাড়া একটি জাহাজে মার্চ ১, ১৯১১ একটি ধনী মহিলার চাকরানী সেজে ভীত সন্ত্রস্ত খরগোশের মত পালিয়ে গ্রেপ্তারী এড়ান। তখনকার দিনে ভৃত্য-ভৃত্যাদের পাসপোর্ট লাগত না, তবে মার্কিন কোর্টের আদেশে এই তথ্য জানা যায় ও সংবাদপত্রগুলিতে ছাপা হয়। ‘কাগুজে সিংহী’ যখন রাজাগোপাল লেখেন এই অত্যাশ্চর্য খবরগুলি তাঁর জানা ছিল না, এগুলি তিনি প্রব্রাজিকা প্রবুদ্ধপ্রাণা-সংকলিত Sister Nivedita in Contemporary Newspapers (জুলাই, ২০১৭, সারদা মঠ) পড়ে তাঁর ইংরেজী বইটিতে সন্নিবিষ্ট করেন।

রাজাগোপালের মতে, মার্গারেটের তুলনায় সারা চ্যাপম্যান বুলের অবদান অনেক বেশী (‘কাগুজে সিংহী’ পৃ.৩৩৯), কারণ বেলুড় মঠ তৈরীর আদি লগ্নে তাঁর দেওয়া ১ লক্ষ টাকাই ছিল সর্বোচ্চ দান। আবার বসু বিজ্ঞান মন্দির স্থাপনাতেও সারা বুল ছিলেন সবচেয়ে বড় দাতা (পৃ.২২৫-২২৬)। সারা বুল উত্তরাধিকার সূত্রে প্রভূত অর্থ তাঁর প্রয়াত স্বামী, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বেহালা-বাদক ওলি বুলের কাছ থেকে (ছবি, পৃ.২২৪) পেয়েছিলেন। ওলি বুলের আরও কয়েকটি ছবি তাঁদের Lysoen এর দ্বীপ ও তারমধ্যে Villa-র ছবির উপর সাঁটা হয়েছে ফটোশপ ব্যবহার ক’রে (পৃ.১৮৫-এর কাছে)। মিঃ ওলি বুলের (১৮১০-১৮৮০) বিষয়ে রামকৃষ্ণ মিশন প্রকাশিত গ্রন্থাবলীতে তেমন কিছু জানা যায় না, যদিও তাঁর বিধবা পত্নী সারা চ্যাপম্যান বুল সম্বন্ধে অনেক কিছু তথ্য আছে। তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর সারা কিভাবে হিন্দুধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হলেন, সেই কাহিনীও রামকৃষ্ণ মিশন সম্পূর্ণ জানান নি – রাজাগোপালের এই বইটির ছবির বর্ণনা (পৃ.১৬৮-এর পরে) থেকে ও অন্যত্র (পৃ.২৯০) জানা যায়, ১৮৮৩ থেকেই ঠাকুর বাড়ির জামাই মোহিনী মোহন চ্যাটার্জীর কথা সারা জেনেছিলেন এবং ১৮৮৬ থেকেই তাঁর বক্তৃতা শুনে সারা হিন্দুধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। এমনকি, মার্গারেটও এই মোহিনীবাবুকে পছন্দ করতেন, তা নিয়ে জগদীশচন্দ্রের ফষ্টিনষ্টির উল্লেখ আছে (ভূমিকা, পৃ.ঢ)।

১৬) তাঁর ভূমিকার শেষে রাজাগোপাল লিখেছেন, মার্গারেট ও ক্রিস্টিন সম্বন্ধে শ্রী অরবিন্দের একটি মন্তব্যের কথা। অরবিন্দ বলেছিলেন, বিবেকানন্দের এই দুই শিষ্যা হিন্দুধর্ম ও স্বামীজীর শিক্ষায় প্রভাবিত হলেও, আচার-ব্যবহারে খাঁটি ইউরোপীয়ই থেকে গিয়েছিলেন (পৃ.ণ)। মার্গারেট ভারতে এসে কতদূর ভারতীয় হতে পেরেছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। স্বামী নির্লেপানন্দের প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ‘রামকৃষ্ণ-সারদামৃত’ বইটিতে আছে, মার্গারেটের ‘বাংলা ভাঙা ভাঙা কোঁতানো। কৃষ্টিনের বাংলা বলা আরও উঁচুদরের, শুনেছি।।...কৃষ্টিন চাপা মানুষ, অধিকতর সাত্ত্বিক। মার্গারেট রজোগুণী মর্দনা মেয়ে। দুটি আলাদা ছাঁচ, ধাঁচ’। রাজাগোপালের সিদ্ধান্তের সঙ্গে স্বামী নির্লেপানন্দের বর্ণনার যথেষ্ট মিল পাওয়া যাচ্ছে, যদিও নির্লেপনন্দের বইটি তিনি ব্যবহার করেন নি। নির্লেপানন্দের স্মৃতিগুলিতে রাজাগোপালের সিদ্ধান্তগুলির সমর্থন মিলছে।

এইভাবে, সারা বই জুড়েই রাজাগোপাল নিবেদিতার তথাকথিত গুণাবলী বা খ্যাতির কাহিনীগুলিই যে ‘গোড়ায় গলদে’ পরিপূর্ণ, পরাধীনতার  ফলে সাদা চামড়ার মেমসাহেবদের ভূমিকাকে স্ফীত করে দেখা নেটিভদের রোগবিশেষ, ইংরেজ ঔপনিবেশিকতা মার্গারেটের মাধ্যমে এখনও ভারতীয়দের মধ্যে বর্তমান, তা দেখিয়েছেন। ‘কাগুজে সিংহী’ বা ‘Paper Lioness’ শব্দযুগল বিভিন্নভাবে মার্গারেটের চরিত্র ব্যাখ্যা করে, এমন ৫টি ব্যাখ্যা রাজাগোপাল হাজির করেছেন।

‘কাগুজে সিংহী’ : মার্গারেট নোব্‌ল্‌, রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায়, প্রকাশক : প্রদীপকুমার চক্রবর্তী, বাংলার মুখ প্রকাশন, মূল্য ৮৯৯ টাকা। বিক্রি : আদি দে বুক স্টোর, কলকাতা – ৭০০০৭৩ এবং ভারতের মধ্যে Amazon মারফৎ। ISBN 978-93-84108-45-8, মে ২০১৭ প্রকাশিত।

‘Paper Lioness’ : Margaret Noble, Rajagopal Chattopdhyaya, Publisher : Pradip Kumar Chakraborty, Banglar Mukh Prakashan, Price Rs.700/-, sold at Adi Dey Book Store, 13, Bankim Chatterjee Street, Kolkata – 700073 and through Amazon within India. ISBN 978-93-84108-16-8, published September 2018. Overseas prices $35 and $32 for the 2 books respectively ; add $8 per copy for delivery by Registered Air Mail, send requests to author at rchatto2001@yahoo.co.in

মতামত

গল্প

অকপট

চৈতালী সরকার,

বিদ্যাসাগর পল্লী,

সার্কাস ময়দান, পূর্ব বর্ধ্মান 

কেউ লক্ষ্য করেনি শেষ বেঞ্চে মাথা গুঁজে বসে আছে সুজাতা। বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা ওর চিবুক গড়িয়ে ড্রেসে ঝরে পড়ছে। ড্রেসের কিছুটা অংশ ভিজে উঠেছে। এত মেয়ের মধ্যে নিজেকে ওর একা মনে হল। মনে হল চারিদিকের মুখগুলি ভেংচি কেটে বলছে, "তুমি, তুমি ..."ঠিক সেইসময় সুজাতার পিঠে হাত রাখল সুমনা। ফিসফিস করে বলল, " আমি জানি তুই টাকা নিসনি। ওদের ভুল হয়েছে।

   টিফিনের পর মাত্র দুটো পিরিয়ড, তারপর ক্লাস  ছুটি। দুপুরে মিডে মিলে গরম ভাত, তরকারীতে খাওয়া ভালোই হয়। তবু বন্ধুদের সাথে টুকিটাকি চিপস, চানাচুর, আইসক্রিম না হলে চলে! এইজন্যই তো বায়না করে দশটাকা এনেছে দিশা।

স্কুলে ঢোকার পারমিশন পেয়েছে দুজন। রামদা আনে চিপস, কুড়কড়ে আরও কত কি ! আইসক্রিমের গাড়ি নিয়ে মতিকাকু হাজির হয় ঠিক দেড়টায়। শুধু ঘন্টা পড়ার অপেক্ষা, তারপরই গেটের মুখে অনাবিল আনন্দের স্রোত! নাইন টেনের  দিদিদের টপকে জিনিস কেনার অধিকার অন্য ক্লাসের নেই। জিনিস কেনা নিয়ে কখনও ধাক্কাধাক্কি, কখনও মুখবর্ষণ দিয়ে সেদিনকার মতো মিটে যায়। ঠিক এই সময় স্টাফরুমও মেতে ওঠে দ্বিপ্রাহরিক ভোজনে। 

    ব্যাগেই তো ছিল! টয়লেট যাবার আগেও দেখে গেছে দিশা। পাশ থেকে পল্লবী বলল, "বই বের করে  দেখ তো। টাকাটা হয়তো ভেতরেই আছে।" দিশা বই বার করে ঝাড়তে লাগল। না, কোত্থাও নেই। হতাশার কালো ছায়ায় ভরে গেল দিশার ফর্সা মুখ। ঘরময় শুরু হল খোঁজাখুঁজির বাতাবরণ। ক্লাসরুম রীতিমতো পুলিশি প্রহরায়। 

     দেবিকার উদ্যোগই সবচেয়ে বেশি। ও এই ক্লাসের মনিটর। দেবিকা প্রত্যেকের ব্যাগ সার্চ করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ও আবিষ্কার করল টাকা। খুব দূরে নয়, দিশার বেঞ্চেই বসে ছিল সুজাতা। ওর ব্যাগের জ্যামিতি বক্স থেকে পাওয়া গেল পরিষ্কার দশটাকা। ক্লাসের সবাই জানে সুজাতার বাড়ির অবস্থা ভালো নয়। ওর বাবা কোন একটা দোকানে কাজ করে। সংসার চালাতে মাকেও কাজ নিতে হয়েছে। পড়াশোনায় সুজাতা ভালো বলেই এই স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছে। প্রায় দু বছর হয়ে গেলেও  সুজাতা বন্ধুদের সাথে মিশতে পারে না। বেশিরভাগ সময় শামুকের মতো গুটিয়ে থাকে। চোখে চোখ রেখে কথা বলতেও যেন ওর ভয়!

সুজাতা হঠাৎ দৃঢ়তার সাথে বলে উঠল, "এই টাকা আমি বাড়ির থেকে এনেছি। আমার টাকা কেন দেবো?" 

দেবিকা নাছোড়বান্দা, এই টাকা সে আদায় করবেই। মনিটর হওয়ার কৃতিত্ব ওকে দেখাতেই হবে। একদল মেয়ে সুজাতাকে ঘিরে ধরেছে। দিশা অপেক্ষা করছে কখন দশ টাকা নিজের মালিকানায় আসে। সুজাতা কিছুতেই দেবে না। ও নিজের ব্যাগ চেপে ধরল। পল্লবী বলল, "চল বড়দির কাছে যাই। বড়দি শাস্তি দিলেই সুজাতা টাকা দিয়ে দেবে।" দোতলায় ছিল বড়দিদিমণির ঘর। নামীদামি স্কুল না হলেও এখানে ডিসিপ্লিন আছে। ইচ্ছেমতো ছাত্রীদের স্কুলের বাইরে যাওয়ার অধিকার নেই। কোনো ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে ফোনে বাড়ির লোক ডেকে তবে ছাড়া হয়। শিক্ষিকাদের হাজিরার ক্ষেত্রেও

নিয়ম বেশ কড়াকড়ি । সাড়ে দশটায় অ্যাটেনডেন্স, অন্যথা হওয়ার উপায় নেই।

বড়দিদিমণি সামনের টেবিলে রাখা কাগজপত্রে চোখ বোলাচ্ছেন। দিশা, দেবিকা গুটিগুটি পায়ে দরজার সামনে এল। 

ভয়মিশ্রিত গলায় দিশা বলল, " বড়দি সুজাতা আমার টাকা দিচ্ছে না।"

বড়দি চোখ তুলে বললেন, " কিসের টাকা "।

এবার সোজাসুজি দেবিকার উত্তর, " দিশা বাড়ি থেকে দশটাকা এনেছিল। ও যখন টয়লেট গেছে, সুজাতা সেটা নিয়ে নিয়েছে।" 

ঝোড়ো হাওয়ার মতো দেবিকা এক নিশ্বাসে বলে চলল। কথাগুলো আত্মস্থ করে বড়দি সুজাতাকে ডেকে পাঠালেন। তারপর জেরা শুরু হল। ভীত হরিণী যেন বাঘের সামনে এসেছে! ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল সুজাতা। সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। কথাগুলো ওর কন্ঠ থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে। দিশা, দেবিকা,  পল্লবীদের সাবলীল বর্ণনায় হার মানল সুজাতা।

ইতিমধ্যে অন্যান্য টিচার্সরা এসে গেছে। সুলেখাদি তো বলেই বসলেন, "সুজাতা এই কাজ করতেই পারে না।" 

ছন্দাদি অবশ্য বললেন "কাউকে ওভাবে চেনা যায় না। ছোটো মেয়ে একটা ভুল করে ফেলেছে। " 

বড়দিরও মনে হল সুজাতাই টাকা নিয়েছে। তিনি বললেন, " সুজাতা তুমি আর একাজ কোরো না। অন্যের জিনিস কখনো নিতে নেই। যাও দিশাকে টাকাটা দিয়ে দাও।" হুড়রে বলে দেবিকা ক্লাসে ধ্বনি তুলল। এই জয় যেন সম্পূর্ণ ওর। দিশার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ক্লাসের অন্যান্য মেয়েরা হাফ ছেড়ে বাঁচল। যেভাবে জেরার মধ্যে ওদের পড়তে হয়েছিল!  

কেউ লক্ষ্য করেনি শেষ বেঞ্চে মাথা গুঁজে বসে আছে সুজাতা। বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা ওর চিবুক গড়িয়ে ড্রেসে ঝরে পড়ছে। ড্রেসের কিছুটা অংশ ভিজে উঠেছে। এত মেয়ের মধ্যে নিজেকে ওর একা মনে হল। মনে হল চারিদিকের মুখগুলি ভেংচি কেটে বলছে, "তুমি, তুমি ..."ঠিক সেইসময় সুজাতার পিঠে হাত রাখল সুমনা। ফিসফিস করে বলল, " আমি জানি তুই টাকা নিসনি। ওদের ভুল হয়েছে। " সুমনার কথায় মুখ তুলে চাইল সুজাতা। তখনও চোখে জল টলমল করছে। ওর মনে পড়ল কতদিন মাকে বলেছে, মা, জানো স্কুলে সবাই আইসক্রিম খায়! তাইতো মা বাবার আড়ালে টাকাটা দিয়েছিল। 

দিশা বইগুলো ঠিকমতো সাজাতে লাগল। ব্যাগটার ভেতরে ছেঁড়া জায়গাটায় হাত যেতেই কি যেন বাঁধল। কাগজের মতো লাগছে। টেনে বার করতেই বেরিয়ে এল পরিষ্কার দশটাকার নোট। যার জন্য আজ তোলপাড় হল স্কুল। দোষী প্রমাণিত হল সুজাতা। দিশার মনে হল একটু ভালো করে দেখলেই হয়তো টাকাটা পাওয়া যেত। খুব খারাপ লাগল দিশার কিন্তু প্রকাশ করল না। ও তাড়াতাড়ি ব্যাগে পুড়ে নিল টাকা। একজোড়া চোরা চাহনি চারিদিক দেখে দিল কেউ দেখছে কিনা! দিশা ঠিক করল, একথা ও কাউকেই জানাবে না!

স্থির হতে পারছে না দিশা। কেমন অস্বস্তি লাগছে!

সুজাতার দিকে তাকিয়ে মনে হল ও যেন ধরা পড়ে গেছে। কোথায় লুকাবে? ব্যাগের ভেতরের চেন থেকে ও টাকাটা রাখল জ্যামিতি বক্সে। তবু ধরা পড়ে যাচ্ছে! দিশার মনে পড়ল দিদিমণিদের কথা। দিদিরা প্রায়ই বলেন, "সব সময় সত্যি বলবে। কোনো ভয় করবে না।"  দিশার ভীষণ ভয় করছে। মা,বাবা, স্কুলের দিদিদের কথা বারবার মনে পড়ছে। সবসময় সত্যি কথা সব সত্যি...... ....! ওর মনে হল একদম ভয় করবে না, সব সত্যি কথা বলবে।

ক্লাসরুম প্রায় শান্ত হয়ে এসেছে। মেয়েরা নিজের জায়গায় টুকিটাকি কথা বলায় ব্যস্ত। ঠিক সেইসময় দিশা দশটাকা তুলে বলল, " আমার টাকা পেয়ে গেছি, এটা সুজাতারই টাকা। " সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। 

দেবিকা বিরক্তির সাথে বলল, " না দেখে মিথ্যে বল্লি কেন? " 

থিতিয়ে যাওয়া বিষয়টি নিয়ে শুরু হল শোরগোল। সুজাতার চোখের জল বাঁধ মানল না। সত্যি বলতে পেরে দিশার মনের গুমোট কেটে চোখে জল গড়িয়ে এল। ক্লাসে ততক্ষণে শর্মিলাদি এসে গেছেন। দিশার স্বীকারোক্তিতে তিনি প্রশংসা করলেন। সত্যি বলার মধ্যে এতো আনন্দ থাকে দিশা প্রথম বুঝতে পারল। 

ভয়হীন সেই ছোঁয়ায় কেটে গেল বাকি দুটো পিরিয়ড।  

মতামত

ভ্রমণ

রোমান হলিডে

সুব্রত মজুমদার

রোম দেখার শখ ছিল ছেলেবেলার থেকে। সেই যখন ছোটবেলায় স্কুলে ইতিহাসের ক্লাসে রেনেসাসের কথা পড়তাম, লীয়নার্দোর কথা পড়তাম, মাইকেল অন্জেলোর কথা পড়তাম। ইচ্ছেটা আরও বেড়ে গেল যখন পড়া শেষ করলাম ড্যান ব্রাউনের লেখা “এঞ্জেলস এন্ড ডিমন্স” বইটি। লেখক এই বইটিতে বেশ জমজমাট একটা রোমাঞ্চকর গা ছমছম করা গল্পের মধ্যে দিয়ে রোমের নানান জায়গা দিয়ে পাঠককে দৌড় করিয়েছেন। তাই সুযোগটা যখন এসে গেল রোমে যাওয়ার গত বছরের শেষের দিকে সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। তল্পিতল্পা গুছিয়ে সোজা হাজির হলাম ডিট্রয়ট থেকে প্লেনে চেপে রোমের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এয়ারপোর্টে।

কলিসিয়ামের ধ্বংসাবশেষ বাইরে থেকে

   রোম দেখার শখ ছিল ছেলেবেলার থেকে। সেই যখন ছোটবেলায় স্কুলে ইতিহাসের ক্লাসে রেনেসাসের কথা পড়তাম, লীয়নার্দোর কথা পড়তাম, মাইকেল অন্জেলোর কথা পড়তাম| ইচ্ছেটা আরও বেড়ে গেল যখন পড়া শেষ করলাম ড্যান ব্রাউনের লেখা “এঞ্জেলস এন্ড ডিমন্স” বইটি। লেখক এই বইটিতে বেশ জমজমাট একটা রোমাঞ্চকর গা ছমছম করা গল্পের মধ্যে দিয়ে রোমের নানান জায়গা দিয়ে পাঠককে দৌড় করিয়েছেন।তাই সুযোগটা যখন এসে গেল রোমে যাওয়ার গত বছরের শেষের দিকে সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। তল্পিতল্পা গুছিয়ে সোজা হাজির হলাম ডিট্রয়ট থেকে প্লেনে চেপে রোমের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এয়ারপোর্টে।

    এয়ারপোর্ট থেকে কাস্টমস ও ভিসা চেক হওয়ার পর যখন হোটেলে পৌঁছলাম তখন বেলা একটা বাজে। দেখলাম শহরটা ঘুরে দেখার বেশ কিছু সময় এখনো হাতে আছে।জেট ল্যাগকে গুলি মেরে ব্যাগগুলোকে কোনমতে ঘরের মধ্যে রেখে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্ল্যান করে রিক স্টিভের, রোমের ওপর লেখা একটা গাইড বই, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। খুব সুবিধে হয় এই ধরনের একটা বই সাথে থাকলে। ভেবে দেখলাম যা সময় আছে তাতে কলিসিয়ামটা ভালোভাবেই দেখা হয়ে যাবে। মেট্রো রেলে চেপে কলিসিয়ামের খুব কাছাকাছি পোঁছে গেলাম। স্টেশন থেকে বেরিয়েই অভূতপূর্ব ও বিশাল পাথর দিয়ে বানানো সেই আম্পিথিয়েটার ওপর চোখ পড়ল, যার নাম কলিসিয়াম। চিত্রার্পিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ আইকনটির দিকে তাকিয়ে। গ্রীষ্ম কালে এখানে সব থেকে বেশি ভিড় হয়। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। শীতকালে আসতে লাইনটা খুব বড় বলে মনে হল না। টিকিটটা কেটে অপেক্ষা করছিলাম টুর গাইডের জন্য। যদিও শীতকাল কিন্তু ঠান্ডা খুব একটা লাগছিল না। রিক সাহেবের লেখা বইটা আরেকবার ঝালিয়ে নিলাম। প্রায় ৭০-৮০ ক্রির্স্টাব্দ নাগাদ ফ্লেভিয়ান সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট ভেস্পিয়ান রোমের নগরবাসীদের আনন্দ বিনোদনের জন্য অর্ধচন্দ্রাকারে সাজানো ক্রমোচ্চ আসন শ্রেণী সহ এই মুক্ত অঙ্গন রঙ্গমঞ্চটি উপহার দেন। শুরুতে রঙ্গমঞ্চটি খুবই জনপ্রিয় ছিল। লাগাতার একশ দিন ধরে একনাগাড়ে চলত নানাধরনের কান্ডকারখানা। তার মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় ছিল গ্ল্যান্ডিয়েটদের অথবা পশুদের সঙ্গে আমরণ যুদ্ধ। প্রায় চারশ বছর ধরে চলছিল এইসব। তখন ছিল রঙ্গমঞ্চটির রমরমা বাজার । তারপর যা হবার তাই হল। রোম সাম্রাজ্যের অথনৈতিক মন্দার কারনের সাথে আরো অনেক কারনের ফলে রঙ্গমঞ্চটি অবহেলা, অযত্ন, অনাদর, অবজ্ঞার শিকারে পড়ে আবর্জনার অস্তাকুপে পরিনত হল। যদিও দুই ত্রিতিয়াংশ সময়ের কবলে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে তবুও এই ভগ্নদশাতেও রঙ্গমঞ্চটি আজও ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশৃঙ্খল ও কোলাহলপূর্ণ রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিভু হয়ে সেই বিগত দিনগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। কত ঘটনা, কত দুঃখ, কত সম্রাঠের উত্থান আর

 

কলিসিয়ামের ভিতরে

পতন দেখেছে এই কলিসিয়াম নিরব দর্শক হয়ে। মনে হল ওর বুকটা ফেটে যাচ্ছে সবকিছু আমাকে বলার জন্য।

    আমার সাথীদের কলরবে ফিরে এলাম বাস্তবে। আমাদের গাইড হাজির, আমাদের টুর শুরু হবে এখনই। আমাদের গাইড একটি অল্পবয়সী মেয়ে, নাম আলিসিয়া। দেখতে সুন্দর, অনেকটা সোফিয়া লরেনের মতো। আমার যাত্রার সঙ্গী ভদ্রমহিলাদের কথাটা বলাতে তাদের কাছে থেকে খুব একটা সমর্থন পেলাম না। উল্টে কেউ কেউ ফিরে গিয়ে একটা ভালো চোখের ডাক্তার দেখানোর উপদেশও দিয়ে দিলেন। একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। আমাদের গ্রূপে আমরা প্রায় তেরজন ছিলাম। আলিসিয়া আমাদের সবাইকে একটা করে ওয়াকিটকির মতো জিনিস ধরিয়ে দিল। এটার সঙ্গে লাগানো আছে একটা হেডসেট যেটা কানে সব সময় লাগিয়ে রাখতে হবে। এটা ওয়ারলেসে কাজ করে।ওয়াকিটকির সঙ্গে এটার তফাৎ হল এটা ওয়ান ওয়ে, অর্থাৎ আলিসিয়া যখন কথা বলবে আমরা সবাই একই সঙ্গে শুনতে পারব কিন্তু আলিসিয়া আমাদের কারো কথা শুনতে পাবে না। যার ফলে যখন আলিসিয়া আমাদের কলিসিয়ামের ইতিহাস বর্ননা করছিল আমরা হাঁটতে হাঁটতেই ওর সব কথা শুনছিলাম, কোন একটা জায়গায় সবাইকে দাঁড়িয়ে শুনতে হচ্ছিল না। আমার মনে হল এতে সময় অনেকটা বাঁচে।

   আলিসিয়ার কোথায় জানা গেল যে কলিসিয়াম সমন্ধে যা যা পড়েছিলাম আর শুনেছিলাম সবই সত্যি। যেমন গ্ল্যাডিয়েটারদের যুদ্ধ, চোরেদের সিংহের মুখে ফেলে দেওয়া, রক্তারক্তি ব্যাপার – সব সত্যি। মনে পড়ে গেল “গ্ল্যাডিয়েটর” মুভিটার কথা।কলিসিয়ামের ভিতরে ঢোকার পর থেকেই মনে হল ৫৫০০০ লোক চারিদিক থেকে একসঙ্গে চিৎকার করছে “মাক্সিমাস মাক্সিমাস”। ঠিক আজকের দিনে যেমন লোকে ফুটবল খেলার মাঠে চিৎকার করে “মেসি মেসি” করে। শুধু তফাৎ আজকের দিনে লায়নেল মেসির জীবন মরণের সমস্যা নেই কিন্তু তখনকার দিনে হলে হতো। একটা ব্যাপার নতুন জানলাম যে ক্রিস্টানদের এখানে সিংহের মুখে ফেলা হত না, শুধু ছিঁচকে চোরদের ফেলে দেওয়া হত। ছিঁচকে চোর এখনও আছে রোমে কিন্তু বাজেটে কুলোয় না বলে আজকাল আর তাদের সিংহের মুখে ফেলে দেওয়া হয় না। ক্রিস্টানদের অদৃষ্ট অপেক্ষা করত কাছাকাছি “সার্কাস মাম্ক্সিমাস “ নামের একটা জায়গায়। অদৃষ্টের পরিহাস কিনা জানিনা ওই জায়গাটার ওপরেই এখন ভ্যাটিকানের জমিদারী।

ভ্যাটিকান মিউজিয়ামের ভিতরে

যে সব জন্তু জানোয়ার বা গ্ল্যাডিয়েটররা অংশ নিত তারা অপেক্ষা নিচের তলায়, যতক্ষণ না তাদের ডাক পড়ত। এখন সব যদিও ধংস হয়ে গেছে তাই নিচের তলাটা ওপর থেকে পরিস্কার দেখা যায়, কিন্তু তখনকার দিনে সেটা দর্শকরা দেখতে পেত না। অনেকটা ভোজবাজির মতই অংশগ্রহণকারীরা হঠাৎ উঠে আসত নিচের তলা থেকে ওপরে, এলিভেটরের সাহায্যে। হাততালিতে ফেটে পড়ত এই মুক্ত অঙ্গন রঙ্গমঞ্চটি। আজকের দিনের গিয়ারের মতই মেশিনের ব্যবস্থা ছিল। শুধু ইলেক্ট্রিসিটির বদলে ব্যবহার করা হত ক্রীতদাসদের। ওদের পরিশ্রম দিয়ে ওরা ঘোরাত ওই গিয়ারগুলিকে, আর এলিভেটরটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠত। আজকের দিনের পার্ফফরমারও যখন কনসার্ট করেন তখন তাঁদের মধ্যে অনেকেই এইভাবে নিচ থেকে ওপরে আভির্ভূত হয়ে দর্শকদের চমক দেন।শুধু তফাৎ এই যে তাঁরা বেঁচে থেকে আরও বড় অংকের কন্ট্রাক্ট সই করার সুযোগ পান।

     জানতে পারলাম যে আমজনতা দর্শকদের কোন পয়সা দিতে হত না কলিসিয়ামে ঢোকার জন্য। একেই বলে ফ্রি এন্টারটেনমেন্ট। রাত্রিবেলায় কলিসিয়ামটিকে আলো দিয়ে সাজানো হয়। আমাদের আর সেটা দেকার সুযোগ হয় নি। ফেরার সময় রাস্তা পার হতে গিয়ে ভেস্পা স্কুটার, স্মার্ট কার এবং অন্য অনেক গাড়ির ড্রাইভারদের গালিগালাজ খেতে হল। পুরনো কলকাতাবাসী হওয়াতে ব্যাপারটা মন্দ লাগল না, বেশ মিল পেলাম।

 

পোপের প্রহরী

পোপ জুলিয়াসের দাবি ছিল সিস্টিন চ্যাপেলের সবকিছু হবে ছুবি এঁকে, কোন মূর্তি থাকবে না। জুলিয়াসের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে মাইকেল কাজ শুরু করার কিছু দিনের মধ্যেই হাল ছেড়ে দেবেন। যেহেতু ছবি তাঁর আঁকায় তাঁর পারদর্শিতা তেমন ছিল না।জুলিয়াসের আগে থেকেই ঠিক করা ছিল যে কাজটা তিনি তখনকার দিনের বিখ্যাত আর্টিস্ট ব্রামানটিকে দিয়ে করাবেন। তখন তিনি সবাইকে ডেকে বলবেন দ্যাখো তোমরা তো বল মাইকেল খুব বড় আর্টিস্ট তাই কাজটা ওকে দিয়েছিলাম, কই ও তো পারল না।আসলে তোমরা যা ভাব তা নয়, মাইকেল তেমন বড় কিছু আর্টিস্ট নয়, আমি আগেই জানতাম। আরও জানা গেল যে কাজ চলাকালিন পোপ নাকি যে কোন সময় চ্যাপেলে ঢুকে পড়ে মাইকেলকে জিজ্ঞাস করতেন “এত দেরী হচ্ছে কেন?”। মাইকেল তার উত্তরে কি করেছিলেন? উনি পরিস্কার পোপকে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চ্যাপেলে ঢুকতে মানা করে দিয়েছিলেন। ভগবানের ছেলের সঙ্গে এরকম ব্যবহার। বুকের পাটা ছিল বলতে হবে। পোপ জুলিয়াসের দাবি ছিল সিস্টিন চ্যাপেলের সবকিছু হবে ছুবি এঁকে, কোন মূর্তি থাকবে না। জুলিয়াসের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে মাইকেল কাজ শুরু করার কিছু দিনের মধ্যেই হাল ছেড়ে দেবেন। যেহেতু ছবি তাঁর আঁকায় তাঁর পারদর্শিতা তেমন ছিল না।জুলিয়াসের আগে থেকেই ঠিক করা ছিল যে কাজটা তিনি তখনকার দিনের বিখ্যাত আর্টিস্ট ব্রামানটিকে দিয়ে করাবেন। তখন তিনি সবাইকে ডেকে বলবেন দ্যাখো তোমরা তো বল মাইকেল খুব বড় আর্টিস্ট তাই কাজটা ওকে দিয়েছিলাম, কই ও তো পারল না।আসলে তোমরা যা ভাব তা নয়, মাইকেল তেমন বড় কিছু আর্টিস্ট নয়, আমি আগেই জানতাম। আরও জানা গেল যে কাজ চলাকালিন পোপ নাকি যে কোন সময় চ্যাপেলে ঢুকে পড়ে মাইকেলকে জিজ্ঞাস করতেন “এত দেরী হচ্ছে কেন?”। মাইকেল তার উত্তরে কি করেছিলেন? উনি পরিস্কার পোপকে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চ্যাপেলে ঢুকতে মানা করে দিয়েছিলেন| ভগবানের ছেলের সঙ্গে এরকম ব্যবহার। বুকের পাটা ছিল বলতে হবে |সিসটিন চ্যাপেলের থেকে বেরোনোর পরেই মুক্ত অঙ্গন, অনেকক্ষণ বাদে বদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে মুক্ত নীল্ আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ভালো লাগল। পাশেই পোপের থাকার বাড়ি আর একটু এগোলেই সেন্ট পিটার্সবার্গ স্কোয়ার। পোপের বাড়ির গেটের সামনে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত রকমের পোশাক পরা জনাকয়েক প্রহরী। পোশাকটা কেমন যেন আজকালকার দিনের সার্কাসের জোকারদের মত। জানলাম এই প্রহরীদের পোশাক নিজে হাতে ডিজাইন করে ছিলেন স্বয়ং মাইকেল এঞ্জেলো। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে, বদলায় এতটুকু| এই প্রহরীরা সবাই হলেন সুইস অর্থাৎ সুইজারল্যান্ডবাসী। এরা ছাড়া আর কেউ প্রহরী হতে পারবে না। একে যদি ড্রিসকৃমিনেশন না বলি তো কাকে বলব। স্বয়ং পোপ যাঁর কাছে সব মানুষই সমান, তিনিই কিনা তাঁর নিজের নিরাপত্তার জন্য সুইস ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করেন না। অবাক কান্ড। পোশাক যেমনই হোক না কেন, এদের দক্ষতা, ক্ষিপ্রতা , বাহাদুরি ও কর্মক্ষমতার ব্যাপারে কারো কোন প্রশ্ন নেই। তবে প্রশ্ন হবেই বা কেন? অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পরেই তো এদের বাছাই করা হয়।

   কিছুক্ষন ঘুরে বেড়ালাম সেন্ট পিটার্সবার্গ স্কোয়ারে। চত্বরটা ইলিপ্টিকাল আকারের, চারদিকটা বড় বড় কলাম দিয়ে ঘেরা। জানা গেল মোট যে মোট ২৮৪টা কলাম স্কোয়ারটিকে ঘিরে।

    হাঁটতে হাঁটতে সোজা চলে এলাম সেন্টপিটার্স ব্যাসিলিকাতে। যে রাস্তা বা পথটা দিয়ে হাঁটছিলাম জানা গেল রোমান এম্পারার নিরো নাকি ওই রাস্তার ওপরেই তাঁর বিখ্যাত চ্যারিয়েট রেসের দৌড় করাতেন। আরও জানতে পারলাম যে ঠিক এই জায়গাতেই সেন্টপিটার্সকেও হত্যা করা হয়| সিকুরিটির চেকপয়েন্ট পেরিয়ে বেশ কয়েকটা কলাম ছাড়িয়ে এসে ঢুকলাম বেসিলিকার ভিতরে। পৃথিবীতে যত চার্চ আছে তার মধ্যে সবথেকে বড় হল এই সেন্টপিটার্স ব্যাসিলিকার চার্চ। এই চার্চটি সম্পূর্ণ করতে সময় লেগেছে প্রায় ১৭৬ বছর। চার্চটি দৈর্ঘে ৬৯৩ ফুট, প্রস্থে ৯০ ফুট আর উচ্চতায় ১৫১ ফুট। এর ডোমটি ডিজাইন করেন মাইকেল এন্জেলো। চার্চটিতে ঢোকার মুখেই পড়বে মেকেল এন্জেলোর তৈরী মূর্তি “পিয়েটা”। মূর্তিটি গ্লাসকেসের ভিতরে রাখা। একটু “এগোতেই চোখে পড়ল বারনিনির তৈরী ২৯ মিটার উচ্চতার চারটে পিলার যার নাম “বান্দাচিনি”।

সেন্ট পিটার্সবার্গ স্কোয়ার

ডোমের গর্ত

     গাইডের মুখে শুনলাম এই বান্দাচিনির নিচেই নাকি সেন্টপিটার্স এর কবর ।বান্দাচিনি পার হয়ে সোজা এগিয়ে গেলাম একদম শেষের যে দেওয়াল সেটার কাছাকাছি।মুখোমুখি দাঁড়ালাম বার্নিনির “ক্যাথেড্রা পেট্রি” সামনে|। অনেকটা সিংহাসনের মোট দেখতে তাই বোধহয় এর আর একটা নাম সেন্টপিটার্স এর সিংহাসন। ক্যাথেড্রা পেট্রির ওপর দিকে তাকালে পিছন দিকের দেওয়ালে চোখে পড়বে একটা হলুদ রঙের কাঁচের জানলা। সেই জানলায় আছে স্টেন গ্লাসের ওপর আঁকা একটি সাদা পায়রা, শান্তির দূতের প্রতীক। হলুদ রঙের জানলার ভিতর দিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে সূর্যের আলো পড়ে সাদা পায়রাটিকে মনে হচ্ছিল জীবন্ত। কি অপূর্ব সেই দৃশ্য।

    এইসব দেখার পর আর এত ঘোরাঘুরি করার পর যা হওয়ার তাই হল, খিদে পেয়ে গেল। বসে পড়লাম ছাদবিহীন একটা রেস্তরায়। এখানে পাস্তা আর পিজ্জা সবথেকে জনপ্রিয়।

     পরের দিন দেখতে গেলাম আর একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য যার উচ্চারণ “প্যান্ -থিওন“। এম্পারার হেড্রিয়ান এটিকে বানিয়েছিলেন ১২০ ক্রিস্টাব্দে। জানা না থাকলে খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত। রোমের রাস্তাঘাট একেবেঁকে ঘোরাফেরা করে, গোলকধাঁধার মতো। চেনাশোনা লোকজন ছাড়া যাওয়া উচিত নয়। তাছাড়া আছে ছিচকে চোরের ভয়।ওরা যে কোন সময় পকেট কেটে সবকিছু নিয়ে যেতে পারে। একা একা বেরোলে পকেটটাকে একটু সামলে রাখতে হবে। আমাদের কপালটা ভালো ছিল। হোটেলের থেকেই আমাদের ব্যবস্থা করে দিল প্যানথিয়নে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার ও নিয়ে আসার। বয়স দুহাজার বছর হলেও বেশ পাকাপোক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। আরো দুহাজার বছর অনায়াসে টিকে থাকতে অসুবিধে হবে বলে মনে হল না। প্যানথিয়নের সব থেকে বড় বিশেসত্ব হল যে ডোমের মাঝখানে একটা নয় মিটারে গর্ত। দিনের বেলায় এই গর্ত দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকে প্যানথিয়নের ভিতরটাকে উজ্জ্বল করে রাখে। বৃষ্টির সময় যখন ওই গর্ত দিয়ে জল নিচে পড়ে তখন সেই জল ড্রেন করার ব্যবস্থাও আছে দেখলাম।

সিসটিন চ্যাপেলে মাইকেল এঞ্জেলোর আঁকা ছবি

 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

     পরের দিন খুব ভোর ভোর উঠে দেখতে গেলাম ভ্যাটিকান শহরটি। অত ভোরে গিয়েও দেখি লম্বা লাইন। রোমের টুরিস্টদের মধ্যে বেশিভাগই আসেন এই শহরটিকে দেখার জন্য| লাইন অবশ্যই তাড়াতাড়ি এগোচ্ছিল। একটু অপেক্ষা করার পরেই আমরা ভিতরে ঢুকতে পারলাম। গাইডের ব্যবস্থা আগেই করা ছিল। যদিও ভ্যাটিকান একটি সম্পূর্ণ দেশ কিন্তু একটি নতুন দেশে ঢুকতে গেলে যেমন পাশপোর্ট ভিসা এসব লাগে বা দেখাতে হয় এখানে সেরকম কিছু করতে হল না, কোনো কাউন্টারও দেখলাম না।

     প্রথমে ফাঁকা জায়গা দিয়ে প্রবেশ পথ তারপর বেশ কয়েকটা ঘর পার হবার আমরা প্রবেশ করলাম একটি হলের মধ্যে। দেখলাম দেয়ালে দেয়ালে ঝুলছে ছবি আর নান ধরনের স্ট্যাচু। বুঝলাম আমরা ভ্যাটিকান মিউজিয়ামে ঢুকে পড়েছি। ছবি ও মূর্তিগুলির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। খুঁটিয়ে পড়তে চেষ্টা করলাম বৃতান্তগুলি। আর্টিস্ট ও ভাস্করদের নাম, পরিচিতি, কোন সালে তৈরী এবং তাদের ইতিহাস সবই দেওয়া আছে সংক্ষেপে নিচের দিকের ফলকে।  বেশির ভাগই ইটালির রেনেসাস যুগের কলাকার। কয়েকজনের নাম চেনা লাগল যেমন লিওনার্দো, মাইক্যান্জলো, রাফয়েল, ব্রামানটি। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যে দেওয়াল ছাড়া অনেক ছবি ছাদেও আঁকা হয়েছে। কি সুন্দর আঁকা সব ছবি।তুলির টানে আঁকা কিন্তু কি জীবন্ত সেই সব ছবি। কিছু ছবি দেখলে মনে হবে থ্রি-ডিমেন্স্যানাল। তখনকার দিনে এইধনের অপটিক্যাল ইলিউসন এর সৃষ্টি কি করে করেছিলেন, কে জানে? তারপর মনে হল ওঁরা তো রেনেসাস যুগের শিল্পী। ওঁরা তো যুগপুরুষ, পরের প্রজন্মকে পথ দেখানোর জন্যই তো মানবসমাজের দূত হিসেবে ওনাদের জন্ম নিতে হয়েছিল।

     প্রায় দুমাইল এইভাবে হাঁটা পথে যাবার পর একটা বিরাট ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। গাইড আমাদের জানালো যে আমরা সিষ্টিন চ্যাপেলের ভিতরে ঢুকেছি। গাটা কেমন জানি শিরশির করে উঠল নামটা শুনে। এত নামডাক শুনেছি এই চ্যাপেলের। সেই বিখ্যাত সিষ্টিন চ্যাপেলের মধ্যে আমি দাঁড়িয়ে আছি এটা ভাবতেই আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। নিজেকে একটা চিমটি কেটে পরখ করে নিলাম সব সত্যি কিনা। জানা গেল ঘরটি দৈর্ঘে প্রায় ৪০ মিটার, প্রস্থে প্রায় ১৩ মিটার আর উচ্চতায় প্রায় ২০ মিটার। যদিও ঘর বলছি কিন্তু আমার মনে হল যেন একটা বড়সড় গুহার ভিতরে আমরা ঢুকে পড়েছি। সমস্ত দেওয়াল জুড়ে এমনকি সমস্ত ছাদেও ছবিতে ছয়লাপ। এতটুকু জায়গাও খালি নেই।পনের শতকের গোড়ার দিকে পোপ সিক্সটাসের আদেশে এই চ্যাপেলের কাজ শুরু হয়। তাঁর নামের সঙ্গে মিলিয়েই এই চ্যাপেলের নাম রাখা হয়েছে। এই চ্যাপেলের দেওয়ালের ছবিগুলি যাঁরা একেঁছেন তাঁদের মধ্যে স্বনাম ধন্য আর্টিস্ট হলেন বটেচেলি, ঘিরল্যান্দিও, পেরুজিনো নামক শিল্পীরা। তবে সিস্টিন চ্যাপেলের সবথেকে নামডাক যে শিল্পীর জন্য, এবং যাঁর জন্য দর্শকদের এত ভিড় তিনি হলেন মাইকেল এন্জেলো। এই সিস্টিন চ্যাপেলের আঁকা ছবির মধ্যেই তিনি অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেনও। তাঁর শিল্প কলার অপূর্ব সব নমুনা রেখে গেছেন এই চ্যাপেলে। একদিকের দেওয়ালে যেমন আছে শিল্পীর আঁকা প্রখ্যাত ছবি “লাস্ট জাজমেন্ট “ আবার অন্যদিকের দেওয়ালে আর ছাদে আছে গল্পচ্ছলে আঁকা কৃষ্টিও যুগের নানন কীর্তিকলাপ। একটা কথা বলতে ভুলে গেছি যে আমাদের গাইড সাবধান করে দিয়েছিল যে এই চ্যাপেলের ভিতরে কোনরকম ছবি তোলা নিষেধ। জানা গেল এই চ্যাপেলের ডোমটি নাকি পৃথিবীতে যত ডোম আছে তার মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে পড়ে। জায়গাটা এত বড় যে এত লোক জমায়েত হওয়া সত্বেও মনে হচ্ছিল না যে গায়ে গায়ে লাগছে| উঁচু হয়ে তাকাতে তাকাতে ঘাড়ে ব্যথা লাগছিল। একটা ফাঁকা বেঞ্চ দেখে বসে পড়লাম। বসে পড়ার পর মনে পড়ল গাইডের কাছে শোনা তখনকার দিনের কিছু মজার মজার ঘটনার কথা। মাইকেল এঞ্জেলো আর তখনকার পোপ জুলিয়াসের মধ্যে ভাব ভালোবাসা খুব একটা ছিল না। উনিই জোর করে মাইকেলকে ঘাড়ে চ্যাপেলের ছবি আঁকার কাজটি ধরিয়ে দেন। তার করন তিনি জানতেন যে মাইকেল কাজটা শেষ করতে পারবেন না। মাইকেলের না পারার কারণ হল যে তিনি পেশায় ছিলেন স্থপতি। স্থপতি হিসাবে ওনার সবথেকে বড় কাজ হোল পৃথিবী বিখ্যাত “ডেভিডের” মূর্তি। মাইকেল আবার ছবি আঁকা তেমন পছন্দ করতেন না।

পিয়াজা নভানোর বসে খাবার রেস্টুরান্ট

ট্রেভি ফাউন্টেন

     এই চার্চটি যে কিভাবে বার্বেরিয়ানদের আক্রমন আর সময় ও মাধ্যাকর্ষণের কবল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে আজও মাথা ঊচু করে দাড়িয়ে আছে সেটাই অবাক বিশ্বয়। গবেষকদের ধারণা যে জড়ো উপাদান দিয়ে এই স্থাপত্য নির্মিত হয়েছিল সেটি অনেকটা আমাদের বর্তমান কালের কনক্রিটের মতোই। তফাৎ হল এটিতে কোন লোহা ব্যবহার করা হয় নি।বিখ্যাত আর্টিস্ট রাফ্যায়েলকে এখানে কবর দেওয়া হয়। আর একটি বিশেত্ব হল প্যানথিয়নের দরজার মাথায় ওপর একটি মেটালের গ্রিল বসানো আছে, সেই গ্রিলটির ওপর যখন মধ্যাহ্ন সূর্যের আলো এসে পড়ে তখন সেই প্রতিফলিত আলো সামনের উদ্যানটিকে উজ্বল আলোয় আলোকিত করে দেয়। ২১শে এপ্রিল হল রোমানদের স্মরণীয় দিন, রোম শহরের জন্মদিবস। ওই দিনটিতে রোমের এম্প্রারাররা এসে গ্রিলের নিচের ভিত্তিবেদির ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতেন তখন তাঁদের মাথার পিছনে মনে হত হাজার হাজর পাওয়ারের বাতি জ্বলছে। হাততালিতে উদ্যান ফেটে পড়ত, রোমানরা মনে করত তাদের এম্পারার হল ভগবানের পাঠানো দেবদূত। অতএব আর কোন কিছু চিন্তা না করে কায়েমনবাক্যে তাঁরা সম্রাঠের পায়ে নিজেদের সমর্পণ করে দিতেন। বুঝলাম ভোটের জন্য তখনকার দিনেও ব্যবস্থা করতে হত। যে জায়গাটি না দেখলে রোমে আসা সার্থক হয় না সেইদিকে পা বাড়ালাম। দেখতে গেলাম “ট্রেভি ফাউন্টেন”। তখনকার দিনের অনেক তাবড় স্থপতির নাম জড়িয়ে আছে এই ট্রেভি ফাউন্টেনের সঙ্গে। তবে সবথেকে বেশী নাম হল গিউসেপ পাণিনির ও নিকোলা সালভি।গিউসেপ পাণিনির বানানো নেপচুনের রথে অবস্থিত অবস্থায় বড়সড় মূর্তিটি জগৎ বিখ্যাত। এই ফোয়ারাটি রোমের সবথেকে পুরোনো, ক্রিস্টর জন্মের প্রায় ১৯ বছর আগে।তিনটি রাস্তার সন্ধিস্থলে এই ফোয়ারাটি অবস্থিত, তাই এই নামকরণ। আমরা বাঙালিরা হয়ত এর নামকরণ করতাম ত্রিবেনী প্রস্রবণ। এটি ছিল জনসাধারণের জন্য খোলা জায়গায় জল সরবরাহের ফোয়ারা।

    এই ফোয়ারাটিকে লা দলচে ফিদা, রোমান হলিডে ছাড়াও আরো অনেক মুভিতে দেখানো হয়েছে। ট্রেভি ফাউন্টেনের সঙ্গে একটি কিংবদন্তি জড়িয়ে আছে। এই ফোয়ারাটির দিকে পিছন ফিরে কেউ যদি পয়সা ছোঁড়ে ওই ফোয়ারার জলে, তাহলে সে রোমে আবার ফিরে আসবেই। আমার মনে হয় রোমের টুরিজিম ডিপার্টিমেন্ট এই কিংবদন্তি সঙ্গে বেশ ভালভাবে জড়িত।

    অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত লাগছিল তাই একটু বিশ্রাম নিলাম স্পানিস সিড়ির ওপর বসে। স্পানিশ এম্বাসির পাশে বলেই হয়ত এই নামকরণ। সিড়িটা দুধের মত সাদা রং আর রংবেরঙের ফুল দিয়ে সাজানো। লোকে এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে, গল্প করে, আড্ডা মারে। সিড়িটার একদম মাথার ওপর আছে ট্রিনিটি দে মনটি নামের একটি চার্চ। এই সিড়িটার আশেপাশেই হল নামিদামি ডিজাইনারদের দোকান। গাইড আমাদের সাবধান করে দিয়েছিল এখানকার জামাকাপড়ে কোন প্রাইস ট্যাগের লেবেল নেই। তার কারণ জিগ্যেস করাতে বলেছিল যে যারা এখান থেকে কেনে তাদের কাছে দামটা বড় কথা নয়। কাপড়ের কোয়ালিটি, ডিজাইন, রং এইসব দেখেই তাঁরা কেনাকাটি করেন।অর্থাৎ বড়লোক আর তাদের বৌদের জন্যই এইসব দোকান। আমি একটু উইন্ডো শপিং করে এলাম।

    সর্বশেষে যে জায়গাটাতে গেলাম তার নাম “পিয়াজা নভানো কোয়াটার“। সুন্দর সাজানো গোছানো একটা বেড়ানোর জায়গা। এখানে মুক্ত অঙ্গনে বসে খাবারের রেস্টুরান্ট অনেক আছে দেখলাম। এককালে এখানে কলিসিয়ামের থেকেও বেশি ভিড় হত| এম্পারার দেমিশিয়ানের আমলে (৮১-৯৬ ক্রিস্টাব্দে) এটি বানানো হয়। বারনিনির বানানো এই ফোয়ারাটি পৃথিবীর চারটি নদীর সমন্বয় বা প্রতিক –দানিউব, গঙ্গা, নাইল আর রিও ডি লা প্লা তে।

     একটা রেস্টুরান্টের চেয়ারে বসে এক কাপ কফি নিয়ে অলস চোখে দেখছিলাম সবকিছু। আর্টিস্টরা ছবি আঁকছে, তাদের আঁকা ছবি বিক্রি হচ্ছে, বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে, কিছু লোক আমারই মতো বসে চা বা কফি পান করছে। বেশ ভালো রকম আঁতেলর মতো দেখতে কয়েকজন দাড়িওয়ালা লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। শান্ত সুন্দর নিরিবিলি মনোরম পরিবেশ। 

     আমার রোমের যাত্রা এখনই শেষ হল। রেনেসাসের যুগের শিল্পী ও বুদ্ধিজীবিরা পরবর্তী কালের মানুষের জন্য যা রেখে গেছেন তার সম্বদ্ধে যতই বলি না কেন কম বলা হবে। যেটা জেনে ভালো লাগল তাঁরাও আমাদের মতই রক্ত মাংসের মানুষ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হিংসা, ক্রোধ, ভাব, ভালোবাসা সবই ছিল সাধারণ মানুষের মতো, কিন্তু একটা বিশেষত্ব তাঁদের ছিল আর সেটা হল ভবিষ্যতের কথা বর্তমানে বসে চিন্তা করা।লোকে বলে যখন রোমে আসবেন তখন রোমানরা যা করে আপনিও তাই করবেন। কথাটা সত্যি – রোমে না এলে, বুঝতে পারতাম না।

 

মতামত

সামনে ফোয়ারা পিছনে স্পানিস স্টেপস

গল্প

রাতের অতিথি

বিবেকানন্দ পণ্ডা

ডুমুরজোলা, হাওড়া, পঃ বাংলা

সেদিন রাতটা হসপিটালেই কাটালাম। পরদিন সকালেও বিনোদের অবস্থা যথেষ্ট খারাপ, জ্ঞান ফেরে নি। খবর পেয়ে হরিদেও দুপুরবেলা হসপিটালে হাজির হল। সব শুনে কি বুঝল জানি না, চিৎকার করে আমায় বলল, "বসন্ত, তুই আমার সঙ্গে শত্রুতা করে বিনোদের এমন দশা করলি!" আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। হরিদেও কিছুই শুনল না, হন্‌হন্‌ করে বেরিয়ে গেল আর যাওয়ার আগে বলে গেল "তোকে আমি পুলিশে দেবো।" কিছু পরেই হরিদেও পুলিশ নিয়ে উপস্থিত হল। পুলিশকে আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম।

     সে প্রায় বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমার অফিস তখন দেরাদুনে। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখনো উত্তরাখণ্ড রাজ্য তৈরি হয় নি। সেবার জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে উত্তরের মুসৌরি পাহাড়ে নাগাড়ে তুষারপাত শুরু হল, আর দেরাদুনে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। শনিবার সকালে আকাশ পরিষ্কার হয়ে রোদ্দুর উঠতেই হাড়কাঁপান ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে পৌঁছে গেলাম সহস্রধারা ক্রসিং এর কাছে সুপ্রিয়দার বাসায়। দুজনেই দেরাদুনে একা একা থাকি, তাই শনি ও রবিবারটা একসঙ্গে আড্ডা দিয়ে খাওয়া দাওয়া করা আমাদের অনেকদিনের অভ্যেস। সুপ্রিয়দার বাসায় যখন পৌঁছলাম তখন সকাল ৯ টা, দেখি সুপ্রিয়দা ঘুমোচ্ছে! অনেক ডাকাডাকির পর দরজা খুলল। বললাম "কি ব্যাপার, এখনো ঘুমোচ্ছো? শরীর ঠিক আছে তো!" সুপ্রিয়দা ঘুম ঘুম চোখে বলল, "না না শরীর ঠিক আছে, তবে কাল রাতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। তুমি বোস, আমি হাত মুখ ধুয়ে চা বানিয়ে আনছি, তার পর বলছি।" সুপ্রিয়দা যখন চা বানাচ্ছিল তখন আমি খাটের ওপর বসে খবরের কাগজটা নাড়াচাড়া করতে করতে দেখতে পাচ্ছিলাম রান্নাঘরের লণ্ডভণ্ড অবস্থা। সুপ্রিয়দা খুব গোছানো ছেলে, সমস্ত কিছু পরিপাটি করে রাখে। তাই ওর রান্নাঘরের এমন করুণ অবস্থা দেখে বুঝলাম রাতে গুরুতর কিছু ঘটেছে। একটু পরে সুপ্রিয়দার আনা গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে সুপ্রিয়দার মুখে সমস্ত ঘটনা শুনলাম।

    "গতকাল অফিস থেকে যখন বেরোলাম তখন সন্ধ্যে সাড়ে পাঁচটা, টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। কন্‌কনে ঠাণ্ডার মধ্যে কোনরকমে বাসায় ফিরে দরজা ভেজিয়ে বসলাম। গত দুদিন কাজের মাসিও আসছে না ঠাণ্ডার জন্য, তাই বাধ্য হয়ে রান্না করার মত কয়েকটা বাসন ধুয়ে নিলাম। চা বানিয়ে একটু মুড়ি খেলাম। খুব ঠাণ্ডা লাগছিল, ভাবলাম পরে রান্না করব। বিছানায় শুয়ে শুয়ে লেপমুড়ি দিয়ে টিভি দেখছিলাম। তুমি ত জান আমার গেটে কখনো তালা লাগাই না, তবে বাড়ির দরজায় ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে শুই। সেদিন মনে হয় দরজাটা ভেজিয়েছিলাম তবে ভেতর থেকে লাগাতে ভুলে গিয়েছিলাম। গরম লেপের তলায় কখন ঘুম ধরে গিয়েছিল জানি না, হঠাৎ থালাবাসন পড়ার শব্দে ঘুম ভাঙলে উঠে বসলাম। ঘড়িতে তখন রাত ১টা, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। গত কয়েকদিন নাগাড়ে বরফ পড়ছে মুসৌরিতে, দেরাদুনেও তুমুল বৃষ্টি সঙ্গে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। সন্ধের পর পথঘাট শুনশান, লোকের দেখা পাওয়াই দায়, এ সময় আবার কিসের শব্দ হল! ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। রাতে কিছু না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তাই খিদেও পেয়েছে। রান্না ঘরের দিকে এগুতে গিয়ে দেখি বাড়ির দরজাটা হাট করে খোলা, বৃষ্টির ছাঁটে জল ঢুকছে ঘরের ভেতরে। তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে রান্নাঘরে গিয়ে আলোটা জ্বালাতেই আঁতকে উঠলাম। একটা লোক, পুরো সাদা মুখমণ্ডল, ছেঁড়া জামাকাপড় পরা, মুখ হাতের জায়গায় জায়গায় ছড়ে গিয়ে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। সারা শরীর ভেজা, জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে মেঝেতে পড়ছে আর লোকটা ঠাণ্ডায় ঠক্‌ঠক্‌ করে কাঁপছে। আমি আর একটু হলে জ্ঞান হারাতাম, ওরকম ধবধবে সাদা মুখের মানুষ হ্য় নাকি! ভুতে যদিও বিশ্বাস করি না, ওই পরিবেশে সাদা মুখের লোকটাকে দেখে কি এক অজানা ভয় পেয়ে বসল। এর মধ্যেই হঠাৎ লোকটা বলতে লাগল 'ডরিয়ে মৎ বাবু, ম্যায় এক ভুখা আদমি হুঁ। বহত ভুখ লাগা থা, অওর বাহার বহত ঠাণ্ডা লাগরাহা থা, আপকা দরওয়াজা খুলা দেখকে ঘুস গিয়া।' লোকটার বিচলিত গলার স্বরে কিছুটা সাহস পেলাম, বুঝলাম লোকটা মানুষ। দেখলাম সারা রান্নাঘরে আটা ছড়ান। এবার ওর সাদা মুখের রহস্যও বুঝতে পারলাম। সন্ধ্যের সময় রুটি বানাব বলে আটার কৌটোটা নামিয়ে রেখেছিলাম, লোকটা খিদের জ্বালায় অন্ধকারে কৌটোতে মুখ ঢুকিয়ে আটা খেয়েছে। লোকটা হাত জোড় করে অনুনয়ের সুরে বলল, 'আমায় পুলিশে দেবেন না, আমি চোর নয়, আমি এখুনি চলে যাব।'

    আমি বললাম, 'তুমি এই ঝড় বাদলের রাতে খিদের জ্বালায় আমার বাসায় ঢুকেছ, এটা আমায় বিশ্বাস করতে হবে?' তার উত্তরে লোকটা যা বলল তা এই রকম...... লোকটার নাম বসন্ত ডিমরি, বাড়ি চামোলি জেলায়। হিমালয়ের কোলে ছোট্ট গ্রামে বৌ সুমনা আর বারো বছরের ছেলে নগেনকে নিয়ে ওর সংসার। পাহাড়ের কোলে একফালি জমিতে যে গম, আলু বা শাকসবজি হয় তাতে ওদের কোন রকমে চলে যায়। এছাড়া বসন্ত জন মজুর খাটে, তাই সংসারে প্রাচুর্য্য না থাকলেও রুটি কাপড়ের কোন অভাব নেই। ওর বাড়ির পাশেই গ্রামের সরপঞ্চ হরিদেও ক্ষেত্রীর বাড়ি। ধারে ও ভারে বসন্তর চাইতে হরিদেও অনেক শক্তিশালী হলেও দুই পরিবারের মধ্যে খুব সুসম্পর্ক আছে। হরিদেও সাহায্য না করলে সরকারি সাহায্যে বসন্ততার বাড়িটাই বানাতে পারত না বসন্ত। হরিদেওর বৌ অম্বিকা আর বসন্তর বৌ সুমনা দুই বোনের মত। এক বাড়িতে ভাল কিছু রান্না হলে পৌঁছে যেত অন্য বাড়িতে। শীতের সময় যখন বরফে ঢেকে যেত পথঘাট, তখন কোন কোন দিন

বসন্তর পুরো পরিবার গল্প করতে করতে রাত কাটিয়ে দিত হরিদেওর বাড়িতে। বসন্তর কথা থামিয়ে আমি বললাম, 'তোমার তো খুব খিদে পেয়েছিল বলছিলে, আমারও কিছু খাওয়া হয় নি। আগে কিছু রান্না করে খেয়ে নি, তারপর তোমার কথা শুনবো।' বসন্ত ভেজা পোশাকে ঠাণ্ডায় কাঁপছিল। আমি ওকে আমার পুরোন জামা কাপড় আর চাদর দিলাম। রাত একটার সময় ভাত আর আলুসেদ্ধ বানালাম। সেই ঠাণ্ডাতে খিদের মুখে ঘি দিয়ে গরম ভাত আর আলুসেদ্ধ যেন অমৃত মনে হচ্ছিল। বসন্তকে দেখলাম কোনদিকে না তাকিয়ে গোগ্রাসে ভাত খাচ্ছে, মনে হল বেশ কয়েকদিন কিছু খায় নি।খাওয়া শেষ হলে বসন্ত আবার ওর কথা শুরু করল। 'বাবু, হরিদেওর ছেলে আর আমার ছেলে নগেন গ্রামের স্কুলে একসাথে পড়ে, ওরা খুব ভালো বন্ধু। ভালমন্দ মিলিয়ে আমাদের জীবন এগিয়ে যাচ্ছিল স্বাভাবিক ছন্দে। তাল কাটল বছর দুই আগে, যখন হরিদেও এসে আমাকে বলল "বসন্ত, তোমার কাছে একটা সাহায্য চাইছি, আশা করি তুমি না করবে না।" আমি অবাক হয়ে বললাম, "তুমি হলে গ্রামের সরপঞ্চ, তোমার অনেক ক্ষমতা, আমি তোমাকে কি ই বা সাহায্য করতে পারি?" হরিদেও ইতস্তত করে বলল "আমাদের গ্রামে তো কোন ইংরাজী স্কুল নেই, তাই তোমার জমিটা যদি আমায় দাও তাহলে আমি ছোটদের জন্য একটা স্কুল গড়ে তুলতে পারি। এতে আমাদের গোটা গ্রামের ছেলেমেয়েদের উপকার হবে। আমি অবশ্য এর জন্য তোমায় উপযুক্ত দাম দেব।" আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম, কিছু সময় চুপ করে থেকে বললাম, "আমাদের তো ওইটুকু জমিই সম্বল, ওটা দিয়ে দিলে খাবো কি করে?" কথাটা হরিদেওর মনঃপুত হল না, বলল "টাকাটা নিয়ে তুমি ব্যবসা করতে পার, তাতে তোমাদের আরো উন্নতি হবে। চাষ করে ক পয়সা পাও? দ্যাখো আলোচনা করে তোমার গিন্নীর সাথে, তারপর আমায় জানিও।" এই ঘটনার পর থেকে দুটো পরিবারের সম্পর্কে কেমন একটা শীতলতা চলে এল। সুমনাকে দেখলে অম্বিকা কেমন যেন না দেখার ভান করে চলে যেত। হরিদেও আমার মুখোমুখি হলে কোন কথা খুঁজে পেত না। দুটো বাড়ির মধ্যে যোগাযোগ আগের চাইতে অনেক কমে গেল, তবে নগেন আর বিনোদের মধ্যে বন্ধুত্ত্বটা আগের মতই রইল।

    এ বছর গত এক সপ্তাহ ধরেই তুষারপাত হচ্ছিল সমগ্র গাড়োয়াল এলাকাতে। গত মঙ্গল বার কিছু জিনিস কেনাকাটার জন্য বেরিয়েছিলাম গ্রামের মুদির দোকানে। দেখলাম চারিদিক পেঁজা তুলোর মত বরফে ঢেকে গেছে, পথের অবস্থা খুব খারাপ। নগেনকে স্কুলে যেতে বারণ করলাম। বিনোদকে অবশ্য ছাতা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরুতে দেখলাম, জিজ্ঞেস করে জানলাম ওর বাবা শহরে গেছে, পরদিন ফিরবে। বললাম "এত খারাপ আবহাওয়ায় বেরিয়েছিস কেন? সাবধানে যাস।" কেনাকাটা করে ফিরতে ফিরতে প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গিয়েছিল, তখন তুমুল তুষারপাত হচ্ছে, কয়েকহাত দুরের জিনিসও ভাল করে ঠাওর করা যাচ্ছে না। পাহাড়ের বাঁকটা পেরিয়ে চড়াইটার কাছে গিয়ে আঁৎকে উঠলাম, দেখি পাহাড়ের ঢালে মোটা পাইন গাছটার তলায় পিঠে স্কুলের ব্যাগ নিয়ে বিনোদ বরফের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, আর চারিদিক রক্তে ভেসে যাচ্ছে। জ্ঞান নেই, বুঝলাম পাহাড় থেকে পিছলে পড়েছে। কোন রকমে কোলে করে ওকে হরিদেওর বাড়িতে নিয়ে গেলাম। ওর মা দেখে কেঁদে ফেলল, বলল "দাদা কি করে এমন হল?" আমি ওকে সব বুঝিয়ে বলে গ্রাম থেকে আরো দুজন লোক সংগ্রহ করে বিনোদ কে কোলে করে তুষারপাতের মধ্যেই ছুটলাম ৪ কিমি দূরে গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। বিকেল পর্য্যন্ত জ্ঞান না ফেরায় গাড়ি ভাড়া করে রাত ১০ টা নাগাদ ওকে নিয়ে এলাম দেরাদুনের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, সঙ্গে অম্বিকাও ছিল।

   সেদিন রাতটা হসপিটালেই কাটালাম। পরদিন সকালেও বিনোদের অবস্থা যথেষ্ট খারাপ, জ্ঞান ফেরে নি। খবর পেয়ে হরিদেও দুপুরবেলা হসপিটালে হাজির হল। সব শুনে কি বুঝল জানি না, চিৎকার করে আমায় বলল, "বসন্ত, তুই আমার সঙ্গে শত্রুতা করে বিনোদের এমন দশা করলি!" আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। হরিদেও কিছুই শুনল না, হন্‌হন্‌ করে বেরিয়ে গেল আর যাওয়ার আগে বলে গেল "তোকে আমি পুলিশে দেবো।" কিছু পরেই হরিদেও পুলিশ নিয়ে উপস্থিত হল। পুলিশকে আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম। পুলিশ আমার কথা শুনল না, আমায় হিড়হিড় করে টেনে থানায় নিয়ে গেল। থানায় দুদিন ধরে চলল চরম অত্যাচার। বিনোদের অবস্থা কেমন তা জানতে পারলাম আজ সন্ধ্যায়। দারোগাবাবু বলল "তোর ভাগ্য ভাল, ছেলেটার জ্ঞান ফিরেছে, বলেছে সে নিজেই পড়ে গিয়েছিল। এখন তুই এখান থেকে বিদেয় হ।" সেই রাতে বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাব! পকেটে কানাকড়ি নাই, বাস ধরে বাড়ি ফিরব কি করে! দুদিন কিছুই খাই নি। বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে এখানে পৌঁছেছি। ঠান্ডা আর খিদের চোটে কি করব বুঝতে পারছিলাম না, আপনার দরজা খোলা দেখে ঢুকে পড়েছি। আপনি ভাল মানুষ, এত রাতে আমায় খাইয়েছেন, আর আপনাকে কষ্ট দেব না, আমি এখুনি চলে যাব।'

    বসন্ত কথা শেষ করলে আমি বললাম 'তুমি এখন কোথায় যাবে, ভোর হতে ঢের বাকি, সকাল হলে যাবে। ভোরের আলো ফুটতে দেখি বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে, বসন্ত বাস ধরার জন্য বেরিয়ে গেল। আমি ওকে ফেরার জন্য কিছু বাস ভাড়া দিলাম। সারারাত না ঘুমোনোর জন্য সকালে আমার চোখ দুটো একটু লেগে গিয়েছিল।' "

আমি বললাম "তোমার কি মনে হল? লোকটা বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলে নি তো!"

"মনে হয় না ওরকম ঝড় বাদলের রাতে কেউ চুরি করতে আসবে। তাছাড়া আমার দরজা তো খোলাই ছিল, চোর হলে অনেক আগে সব লুটে পালাত। লোকটার শরীরের অবস্থাও খুব খারাপ ছিল। ওর কথা শুনে খারাপ লাগছিল, কোন দোষ না করেও কেমন শাস্তি পেতে হল। বলছিল 'বিনোদ আমার ছেলের মত, ওর ক্ষতি আমি কেন করব? আমার এতদিনের বন্ধু হরিদেও আমায় অবিশ্বাস করে পুলিশে দিল, এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কি আছে?' "

"চা শেষ সুপ্রিয়দা, কি করবে এখন?"

সুপ্রিয়দা বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বলল "কন্‌কনে ঠাণ্ডা, অনেকদিন পর রোদ্দুর উঠেছে, চল মাছ কিনে আনি। দুপুরে জমিয়ে খিচুড়ি আর মাছ ভাজা খাওয়া যাবে।"

মতামত

পাতাঝরা পান্না

সব্যসাচী বসু

বর্ধমান,পশ্চিমবঙ্গ

ভ্রমণ

সপরিবারে প্রথমবারের জঙ্গল ভ্রমণের জন্যে তাই হয়তো মধ্যপ্রদেশের পান্নাকেই বেছে নিয়েছিলাম রবিকবির কবিতারই সূত্রে।কিন্তু বড়দিনের কনকনে ঠান্ডার ঘনকুয়াশামাখা প্রভাতে জঙ্গলে প্রবেশ করে একটু যেন ধাক্কা খেল মন।এ কেমন জঙ্গল !এখানে কোথায় গেল ঘন সবুজ !পাতাঝরা অরণ্যানি চারপাশে।কোথাও বা বাদামি-হলুদ শুষ্ক তৃণাঞ্চল।ইতিউতি উঁকি দিচ্ছে বেণুবন।

“আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ...”

সপরিবারে প্রথমবারের জঙ্গল ভ্রমণের জন্যে তাই হয়তো মধ্যপ্রদেশের পান্নাকেই বেছে নিয়েছিলাম রবিকবির কবিতারই সূত্রে।কিন্তু বড়দিনের কনকনে ঠান্ডার ঘনকুয়াশামাখা প্রভাতে জঙ্গলে প্রবেশ করে একটু যেন ধাক্কা খেল মন।এ কেমন জঙ্গল !এখানে কোথায় গেল ঘন সবুজ !পাতাঝরা অরণ্যানি চারপাশে।কোথাও বা বাদামি-হলুদ শুষ্ক তৃণাঞ্চল।ইতিউতি উঁকি দিচ্ছে বেণুবন।

ক্রমে মনকে মানিয়ে নিলাম।ভারতের জঙ্গলের কত না রূপ!দক্ষিণ ভারতের ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় শুষ্ক চওড়া-পাতার বন এখানে এসে মিশেছে গাঙ্গেয় সমভূমির আর্দ্র পর্ণমোচী বনের সাথে।সুতরাং পরিচিত সেগুনের পাশে অপরিচিত কুমীরের আঁশের মতো ছালের চিরহরিৎ বৃক্ষের সহাবস্থান।

মধ্যপ্রদেশ পর্যটনবিভাগের মাদলা জঙ্গল ক্যাম্পের আধুনিক তাঁবুতে রাত্রিবাসের পর কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে হাজির হয়েছিলাম কর্ণাবতী টিকিট কাউন্টারে।অন্তর্জালের মাধ্যমে আমি-তুমি-সে:তিনজনের মাদলা দ্বার দিয়ে জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ নিশ্চিত ছিলই।বাকি ছিল জিপসির ছয় সদস্যের বাকি তিনজনাকে সংগ্রহ করে পথপ্রদর্শক ঘাড়ে লটকে জিপসিতে চেপে বসা।

আধাঘণ্টার প্রতীক্ষার পর সচিন তেন্ডুলকারের রাজ্যের এক আমি-তুমি-সে পরিবারের সাথে ৮১৫ নং জিপসির শিশিরসিক্ত আসনে চড়ে বসা।যথারীতিযযযযযযযযপপ

মাঝে অবসরে ক্ষুদ্র কিন্তু চমৎকার বনদপ্তরের প্রদর্শনশালা দর্শনে বিনোদন ও জ্ঞানার্জন--বাঘ-বাঘিনীর ‘পাগ-মার্কের’ তফাৎ জানা।অন্তর্জালের তথ্যের সাথে মিলিয়ে নেওয়া­­—৫৪৩ বর্গকিমির জঙ্গলটির দুটি দ্বার-মাদলা ও হিনাউটা ;চারটি রেঞ্জ-মাদলা,পান্না,হিনাউটা ও (কেন নদীর পশ্চিমপাড়ে)চন্দ্রনগর ;তিনটি বনবিভাগ-উত্তর ও দক্ষিণ পান্না এবং ছত্রপুর ;দুটি জেলা-পান্না ও ছত্রপুরে ছড়িয়ে আছে পান্না,ছত্রপুর ও বিজাওয়ার রাজাদের অতীত মৃগয়াক্ষেত্র যা ১৯৭৫ সালে অভয়ারণ্য থেকে ১৯৮১ সালে জাতীয় উদ্যানে পরিণতা হয়ে ১৯৯৪ সালে ‘প্রজেক্ট টাইগারের’ অন্তর্গত হয়েছে।যদিও মাঝে ২০০৯ সালে সম্পূর্ণ বাঘশূণ্য হয়েছিল,তবু বর্তমানে মধ্যপ্রদেশের অন্যান্য জঙ্গল থেকে বাঘ-বাঘিনী নিয়ে আসায় শাবকের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান।২০১১ সালে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভে পরিণতা।

বাঘিনীর গ্রাম্য মোষ সদ্য শিকারের খবর থাকায় মড়িসংলগ্ন তৃণপ্রান্তরে হাজির হলাম।দদদুদিকদঅঅদদদটিভিতে দেখা দৃশ্যের অবতারণা-সবকটা জিপসি থেকে দর্শকের তথা ক্যামেরার নজর সামনে কুয়াশা পাতলা হতে থাকা প্রান্তরে।আয়েসী বাঘিনী আর চার বছরের ভ্রাম্যমান ছানার(যদিও একই আকার) নানা পোজ চক্ষু ও ক্যামেরার লেন্সবন্দী।একদল বুনোশুয়োরের দিকভ্রান্ত দৌড়,ভরপেট বাঘিনী ও ছানার উদাসীনতা,বাঘিনীর অলস রোদে গড়াগড়ির দৃশ্যাবলী উপভোগ।‘আর কতক্ষণ ব্যাঘ্রলীলা দেখব!’,ভেবে পিছু ফেরা।

পাহাড়ি পথে আতঙ্কিত শম্বরের ডাক,চিতার আগমন প্রতীক্ষা,বুকের মাঝে গুরুগুরু করবেট-অভিজ্ঞতা,ঝর্ণার ঝিরিঝিরি বয়ে যাওয়া,বুনোপাতার নিঃশব্দ খসে পড়া,চিতল হরিণ-হরিণী-বাচ্চার ঘাস খাওয়া,নীলগাইদের বিড়িপাতা ছেঁড়া,শুষ্ক ডালে নীলকণ্ঠপাখীর নিশ্চুপ বসে থাকা,বাঘের দাঁত থেকে মাংস-খুঁটে-খাওয়া কমলা-হলুদ Rufaus treepie পাখীর ওড়াউড়ি,বৃক্ষসওয়ারী একদল বিজ্ঞ লেঙ্গুর,ছুটন্ত বেঁজি,খয়েরগাছের গুঁড়িতে আটকে থাকা হরিণের শিং,কেন নদীর জলে ময়ূরদ্বয়ের জলপান ও পাড়ে কুমীরের অলস রোদপোয়ানোর দৃশ্যাবলীকে মনের মণিকোঠায় চিরসঞ্চয় করে ফিরতি পথ ধরা।

মধ্যপ্রদেশের কাটনি জেলার কাইনুর রেঞ্জে উৎপন্ন কর্ণাবতী নদী (ইংরেজদের দেওয়া নাম-কেন) ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ বেয়ে (মধ্যপ্রদেশে ২৯২,উত্তরপ্রদেশে ৮৪ ও দুই রাজ্যের সীমান্ত বরাবর ৫১)উত্তরপ্রদেশের ফতেপুর জেলার চিল্লাগ্রামে যমুনানদীতে মিশেছে।পান্না জাতীয় উদ্যানের পশ্চিমাঞ্চলে ৭২ কিলোমিটার এর অন্তর্ভূক্ত।

সকালের কুয়াশামাখা পান্না জাতীয় উদ্যানে বাঘ-চিতল-সম্বর-নীলগাই-বুনোশুয়োর দর্শনের পর পৌঁছেছিলাম কেন্ নদীতীরে।দূরবীণ আর ক্যামেরার লেন্স খুঁজে নিয়েছিল নদীতে জলপানরত ময়ূরদ্বয় আর পাড়ে আলসেমিমাখা কুমীর।

দুপুরে এসেছি মন্দিরনগরী খাজুরাহো।আহার সেরে পূর্ব ও উত্তর অঞ্চলের মন্দিরগুচ্ছ দেখেই রওনা দিয়েছিলাম একই অটোয় পান্না জাতীয় অরণ্যেরই উত্তরের অঞ্চল কেন্ ঘড়িয়াল অভয়ারণ্যে।অটোর প্রবেশমূল্য ও বাধ্যতামূলক গাইডমূল্যের বিনিময়ে অরণ্যে প্রবেশ।

বর্ষীয়ান -অভিজ্ঞ গাইডের বর্ণনা আর তথ্যপরিবেশন চললো।সকালের অলসরোদে যার সাথে প্রথম দেখা গোধূলিবেলায় তার সাথে পুনর্বার সাক্ষাৎ।একইরকম অরণ্যপথে একইরকম বন্যপ্রাণী দর্শন।তবে এ পথ পাহাড়ি ।ইতস্তত ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা ছোটবড় প্রস্তরখন্ড।

অটো থামলো একটা ঘেরা জায়গায়।দুটি দোকান,একটি প্রদর্শনশালা;কয়েকজন মানুষ।

এগিয়ে গেলাম সাদা ভূতবৃক্ষের পাশ কাটিয়ে রেলিংঘেরা অঞ্চলে।বহুনীচে ক্ষীণা কেন নদী বয়ে চলেছে লক্ষকোটি বছর পূর্বে সৃষ্ট ক্যানিয়ন বেয়ে।ভূগর্ভস্থ আগ্নেয় বিস্ফোরণে চৌচির হয়ে যাওয়া উপলভূমি সেই ক্ষতচিহ্ণ বহন করে রেখেছে তার দেহে।বিস্তীর্ণ শুষ্ক নদীখাতে গ্রানাইট,ডলোমাইট,কোয়ার্জ তাদের নানা রঙের বাহারে দৃষ্টিশক্তিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

বিজাওয়ার-পান্না পাহাড় পেরিয়ে ৬০ কিলোমিটার লম্বা ও ১৫০-১৮০ মিটার গভীর গর্জ সৃষ্টি করে বয়ে যাওয়া কেন্ নদী বর্ষায় এইস্থানে এসে সৃষ্টি করে সুবিখ্যাত Raneh Falls.সেই কল্পিত অপরূপ রূপ বাহার দেখতে না পাওয়ার আক্ষেপ থাকলেও এই শুষ্ক নদীখাতের রঙবাহার মনকে প্রাক্-ঐতিহাসিক যুগে নিয়ে গিয়ে ফেললো।

Sterculia urens বৃক্ষের শ্বেতত্বক নাকি প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্যপুনরুদ্ধারে কাজ করে।মারাঠিতে ভূতবৃক্ষ,ইংরেজিতে white kulu অদ্ভুত-মায়াময় পড়ন্ত রোদের ছোঁয়া মাথায় নিয়ে একা প্রহরারত এই আগ্নেয় প্রেক্ষাপটে।

গরম চায়ে শৈত্য কাটিয়ে আবার অটোয় আরোহণ--ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা মাপের উপলখন্ড উচ্চাবচ পথের দুপাশে।ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসা আলোয় পৌঁছালাম ক্যানিয়নের সেই অংশে--যেখানে নদী বেশ চওড়া--পুরোটাই স্বচ্ছ জলে পূর্ণ--ঘড়িয়ালদের অভয়ারণ্য--যদিও তাদের নিঃশ্বাসের বুদ্বুদ আর দূরে মিলিয়ে যাওয়া দেহরেখা ছাড়া প্রবল শৈত্যে একটিরও দেখা মিললো না।অথচ সকালের রোদে এরাই পাড়ে ওম্ উপভোগ করে।

একঝাঁক নাম-না-জানা পাখীর নদীবক্ষের প্রস্তরখন্ডে নিশ্চুপ বসে থাকা মনে গেঁথে ফিরতি পথ ধরলাম।

কীভাবে যাবেন ?

হাওড়া-মুম্বই মেল(ভায়া-এলাহাবাদ)।পরদিন বিকেলে সাতনায় নেমে গাড়িতে ১১২ কিমি দূরের মাদলা।

কোথায় থাকবেন?

মধ্যপ্রদেশ সরকারের মাদলা জঙ্গল ক্যাম্পে তাঁবু বা রুম।

কখন যাবেন?

পান্নার জঙ্গল মূলতঃ পর্ণমোচী প্রকৃতির হওয়ায় শরৎ থেকে শীত পশুদেখার জন্য আদর্শ।

করবেন না

প্লাস্টিকের ব্যবহার,ধূমপান।

সঙ্গে রাখুন

সরকারী গাইড,জলের বোতল,টুপি ও মাস্ক।

২০০৯ পরবর্তী ব্যাঘ্র-ইতিহাসের সূচনা

বান্ধবগড় জাতীয় উদ্যান(২০০৯) - 

বাঘিনী : T1

বাঘ : T3(পালিয়ে যাওয়া স্বভাব ছিল)

T1 + T3 = চারটি শাবক (২০১০);জীবিত-২

পেঞ্চ জাতীয় উদ্যান(২০০৯)

কানহা জাতীয় উদ্যান(২০০৯)

বাঘিনী : T2

T2 + T3 = চারটি শাবক

২০১১

বাঘিনী : T4(মৃত্যু-১৯.০৯.১৪;রেডিও কলারের আঘাতে বিষক্রিয়া)

T4 + T3 =চারটি শাবক

২০১১(T4 এর বোন)

বাঘিনী: T5

পেঞ্চ জাতীয় উদ্যান(২০১৭)

বাঘিনী: T6

শাবক--ক্রমবর্ধমান

মতামত

ইংরাজী কবিতার বাংলা অনুবাদ

প্রদীপ সরকার 

।তুমি হয়ত চেয়েছিলে ফুল কিনতে।।

(PERHAPS YOU’D LIKE TO BUY A FLOWER? – by Emily Dickinson)

 

তুমি হয়ত দরদ ভরে চেয়েছিলে এই ফুলটি কিনতে!

আমি কিন্তু বিক্রি করতে চাইনি সেটা কখনওই!

কিন্তু, তুমি যদি একবার ধার চাইতে সে ফুল -

সবুজ বৃন্ত সহ করঞ্জলে দিয়ে দিতাম তোমায়,

বৃন্ত থেকে হলুদ পাপড়ি, আর কিছু গুঁড়ো করা হলদ পরাগরেণু –

ত্রিবেণী সঙ্গম নেই – তবু কিছু হলুদ বিকেলে

সুঘ্রাণ ছড়িয়ে দিতাম - সমস্ত সুবাস,

ততক্ষণে এসে পৌঁছত বেশ কিছু পিয়াসী ভ্রমর -

তাদের পাখনায় দ্রুত মিশিয়ে দিতাম আরো ঘন্টাখানেকের স্বপ্ন। (০১/১৫/২০১৮)

।।মরু ঊষ্ণ দিগন্তিকা।।

(I WALKED IN A DESERT – Stephen Crane)

 

মরুভুমির মধ্যে দিয়ে কেন জানিনা হেঁটে চলেছি -

সম্বিত ফিরতেই

আর্তনাদ করে উঠলাম –

“হে ভগবান – আমাকে বাঁচাও -

এখুনি এখান থেকে নিয়ে চলো দূরে”।

নেপথ্যে ভেসে এলো হাওয়া - কন্ঠস্বর –

“ না, এ মরুভূমি নয়”

“তবে কী এ?”

নেপথ্যে –

“এই ভূমি বালুকাবেলার ঢেউ, উষ্ণতা, আর প্রসারিত দিগন্তবেলা”

“না, এ তো মরুভূমি নয় –

এ জন্মভূমি”। (মার্চ ১৬, ২০১৮)

।।আমার মজুরি।।

(MY WAGE - Jessie B. Rittenhouse)

 

আমি জীবনের সাথে কষেছি দারুন দরকষা -

শুধুমাত্র একটু কিছুর জন্যে -

জীবন দেয়নি এতটুকু কিছু তার বেশি,

হতাশ সাঁঝেতে চেয়েছি আমার ভিক্ষা

যখন দেখেছি ভাঁড়ার আমার শূণ্য,

গৃহকোণে আর কিছু নেই, কিছু নেই, সব রিক্ত।

 

জীবন যখন শুধুই অন্নদাতা -

তুমি তাই পাবে, যা কিছু চাইবে তুমি -

কিন্তু যখনই পারিশ্রমিক নেবে

কাজ দিতে হবে – ফোকোটে কিছুই হয়না -

দাম বুঝে পাবে - দেনাপাওনার অংক।

 

কেন জানো আমি ভাড়ায় খেটেছি গতরে?

শ্রমের স্বেদেতে গড়েছি নিজের সত্তা

অলস বিবশ ভেঙ্গেছি -

তিল তিল করে দক্ষ করেছি নিজেকে -

পৃথিবীর কাছে পারিশ্রমিক চেয়েছি -

জীবন দিয়েছে ততটুকুই যা পাই আমি।

।।একাকী পথ চলে একাকী ভালোবাসা।।

(LOVE WALKED ALONE – Stephen Crane)

 

একাকী পথ চলে একাকী ভালোবাসা,

পাথরে কাটে তার নরম পা।

 

প্রেমের মণিদীপা বেদনা ছড়ালেই,

ঝোপের কাঁটা কাটে সোহাগী হাত।

 

“বন্ধু, একসাথে আয় না পথ চলি -

কাজে কী লাগবে না আমার সাথ?”

 

“হৃদয়ে ব্যথা নিয়ে তুমিও চলে এলে?”

পেছনে পড়ে থাক শূণ্যতা।

।।আকাশ গোপনে রাখেনা তার সব কথা।।

(THE SKIES CAN’T KEEP THEIR SECRET – Emily Dickinson)

 

আকাশ কখনও পারেনা রাখতে গোপনতা,

উপত্যকার কাছে বলে দেয় তার সব কথা।

উপত্যকা বাতাসের সাথে কথা বলে,

ফুলের বাগানে বাতাসেরা হাসে কলরোলে।

 

পাখির ঝাঁকেরা বীথিপথে খেলে গাইছিল,

ফুলের বাগানে ড্যাফোডিল কিছু নাচছিল,

তারা কি শুনেছে দখিনা বায়ের সিম্ফনি?

বসন্তে না কি আসেনি এবার বুলবুলি!

 

তুমি কি গোপনে রাখতে পেরেছ সব কথা? – সব কথা!

ফুলসঙ্গিনী।।

(WITH A FLOWER – STEPHEN CRANE)

 

যখন গোলাপ ফুটবেনা, প্রিয় বন্ধু,

চড়া রৌদ্রেরা গনগন করে জ্বলবে-

ভায়োলেটস সব বিবর্ণতায় ভুগবে,

ভ্রমরেরা কেউ আসবেনা ফিরে কোনোদিন -

গুনগুন ডানা সাঁঝ-সূর্য্যেতে হারাবে।

 

যে হাত কখনও সঙ্ঘবদ্ধ হয়নি -

প্রখর গ্রীষ্মে মরে যাবে সেও কোনদিন -

বসন্তে ফুল নাও যদি পাও বন্ধু -

আমার ফুলেরা তোমার জন্যে থাকবে – তোমার জন্যে থাকবে।

তুমি ধীর ধীরে মৃত্যুর পথযাত্রী

(YOU START DYING SLOWLY – Publo Neruda)

 

(গবেষকেরা এই কবিতাটিকে পাবলো নেরুদার লেখা বলে মনে করেন না। মনে করেন কোন একজন পাবলো নেরুদার নাম ভাঁড়িয়ে লিখেছিলেন - এই লেখা তবুও অনবদ্য)

 

তুমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে চলেছ -

যদি না তুমিও ভ্রমণ বেসেছ ভালো,

যদি না তুমি পুঁথিকে করেছ সঙ্গী -

তুমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথযাত্রী।

 

তুমি কি এখনো শোনোনি গানের লহরী!

কিংবা -

দেখনি এখনও গোধূলি-সাঁঝেতে চন্দ্র!

গাঢ় শাদা মেঘ নীলবন হয়ে উঠছে -

ভোর ভীরুভাবে কাকলি পাখনা মেলছে!

কী ভাষা জীবন রেখেছে প্রেমের ছায়ারূপে -

বালুচরে কাঁপে কোন্ হিন্দোলে নৈঋত -

জলতরঙ্গ বয়ে যায় কোন জলসায়!

এখনও দেখনি হৃদয়ে প্রাণের জ্বালামুখ!

এখনও কি তুমি তারিফ করোনি নিজেকে!

সেতারের তারে জোছনার চাঁদ পেলে কি!

ভন্ড জন্মে অশ্লীল সুখ পেলেনা,

বেদিত শরীরে প্রিয়তমা নাম লেখেনি!

শোনোনি – দেখোনি - পেলেনা রুপোলি লজ্জা -

লজ্জা - লজ্জা -

তুমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথযাত্রী।

 

যখন বেদনে ধীরে মেরে ফেলো নিজ আত্মা,

তুমি যুবরাজ, তুমি নীলিমায় – নীল অভিসার -

ধূলায় লুটাও তোমার আত্ম-সম্মান।

যখনই তুমি ঠেলে ফেলে দাও সাদরে বাড়ানো হাতকে-

কপোলে দেখনা কত আশ্বাস – কত অক্ষর! স্বেদবিন্দু – স্বেদবিন্দু -

চুপে চুপে দ্যাখো স্বপ্ন লুকোনো গুন্ঠন -

লবন-মাটিতে কান্না অর্থ শেখাবে?

মোমের আলোতে ভেসে চলে যায় ভাসমান -

তুমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথযাত্রী।

 

যদি তুমি হও পরাধীন স্বর, স্বভাবের -

রোজ যদি হাঁটো একই একঘেঁয়ে পথ ধরে -

যদি না ফেললে পুরোনো তালিকা, জঞ্জাল -

প্রতিদিনকার জীবনের রঙ ছুঁলে না -

তুমি যদি কোনো কথা বলনিকো তার সাথে -

অপরিচিতার সঙ্গকে ভালোবাসোনি –

অবশেষে তুমি শরীরে নিয়েছো ক্লান্তি,

আড়ালে রেখেছো ভয়াল শঙ্খ শিয়রে,

স্পর্ধা হারালে – অলিন্দে আলো দেখোনি,

তুমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে চলেছ -

তুমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথযাত্রী।

 

অবহেলা ভরে দূরে সরিয়েছ বাসনা?

উত্তাল ঝড়ে ভাসিয়ে হারালে অনুভূতি?

দেখেছো কি যারা তোমার আঁখিতে দিল আলো -

তাদের জন্যে তোমার হিয়া কি দ্রুততর!

দ্রুততর – দ্রুততর ?

না যদি হয় এমন একটি স্পন্দনও -

তুমি ধীরে ধীরে অজানা অঘোরে মৃত্যুর দিকে চলেছো –

তুমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথযাত্রী।

 

অজানা স্বপ্ন আগলে রেখেছো বুকেতে?

ঝুঁকিকে করেছ নিজের আপন সঙ্গী?

আকাশে সাজানো সমস্ত সাজ এঁকেছো?

অনুমতি দিলে অস্ফুটে কিছু বলেছো?

একলা শুয়েছ- বুকে স্পৃহা নিয়ে অনামিকা?

যদি না এখনও স্বপ্নের পিছে ছোটোনি -

একবার - শুধু একবার- এই জীবনে

দৌড়ে পালানো আঁধারের কোলে যেও না -

কোমল আলোতে দৃশ্যরা সব ঝর্ণা।

 

ভালবাসো এই সুন্দরতম তুমিকে – ভালোবাসো এই সুন্দর প্রাণ-শঙ্খ,

গ্রীবা তুলে ধরো লুকোনো স্বেদের নাভিতে। (আগস্ট ১-১০, ২০১৮)

মতামত

ভ্রমণ

চেনা পথ,

অচেনা পথিক

ড।অতনু সাহা

ভাষা ও ভাষাতত্ব বিভাগ

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

অবশেষে ফোর্স পৌঁছে গেলো রিম্বিক বাজার-এ , রিম্বিক দার্জিলিং এর পুলবাজার ব্লক-এর অন্তর্গত, উচ্চতা ৭৫00 ফিট। বাঁদিকে সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যান, ডানদিকে রাম্মাম নদী। নদীর ওপাশে সিকিম এর পশ্চিম সীমানা সোমবাড়ি। সিঙ্গালিলা ১৫ ই জুন বন্ধ হয়ে যায়, সান্দাকফু-র রাস্তাও বন্ধ। চারিদিকে মেঘ বৃষ্টির ধংস লীলা। আমি এসেছি না বরফ ঢাকা সান্দাকফু দেখতে না সিঙ্গালিলার কালিপোখরির রেড পান্ডা দেখতে। এগুলোর কোনোটাই এই সময়ে দেখতে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে?

    পথ খুঁজতে বেরিয়ে পড়া.. চেনা কেউ এ যাত্রায় সঙ্গে নেই, এরকম যাত্রায় একটা আশা থাকে নিজেকে যদি কিছুটা চিনে নেওয়া যায়। মনে কিছু প্রশ্ন নিয়ে, পরিচিত জনের উপরোধ উপেক্ষা করে, এমনকি দার্জিলিং মেল এর জেনারেল কম্পার্টমেন্ট-এর দুরূহ অবস্থা ভেবেও মন যুদ্ধ ঘোষণা করলো। অতএব এই জরুরী যাত্রা! দার্জিলিং মেল এ সিট পাওয়া মানে অতি বড় নাস্তিক ও কপালে হাত ঠেকায়. আমি তো কোন ছাড়! সিট একটি পাওয়া গেলো ট্রেন ও সময় মতোই ছাড়লো।আমি আমার গন্তব্য সকালে এনজেপি স্টেশন-এ পৌঁছে ঠিক করব ভাবলাম! মন পাহাড় পাহাড় করছে এটুকু নিশ্চিত। সকালে নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টা পর যখন ট্রেন পৌঁছল তখন পড়ে আছে দীপুদার দা আর গ্যাংটক-এর গা। পথ খুঁজতে আর যাই করি ভিড় ঠেলতে আমি বরাবর নারাজ! অগত্যা অটো নিয়ে সিন্ডিকেট মোড়। কিন্ত যাকে বলে কপাল, আছে দুটি দার্জিলিং এর গাড়ি একটি গ্যাংটক আর একখানি মিরিক-এর গাড়ি। একজন পরামর্শ দিলেন ঘুম চলে যান না? দেন ডিসাইড। উপায় না দেখে সোজা ঘুম পাড়ি জমালাম। ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। ড্রাইভার এর হাঁক ডাক এ নেমেই দেখলাম একটা ছোট্ট স্টিম ইঞ্জিন , পাশে লেখা দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়েজ – অ্যা ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট । ঘুম থেকে সোজা এগোলে দার্জিলিং, ভিড় এবং ন্যাকামি । দাঁড়ালাম বাঁদিকে । একের পর এক গাড়ি আসছে সুখিয়া পোখরালাবং, বাঁশবটে, মিরিক ।কোনো গাড়িতে জায়গা নেই। অবশেষে একটা ফোর্স গাড়ি এলো ফিফটিন সিটার। ড্রাইভার দেখিয়ে দিলো একদম পেছনের সীট। হোক। বসলাম... আমি একমাত্র বাঙালী আর সবাই কেউ প্রধান কেউ ছেত্রী কেউ চামলিং.. তাদের মধ্যে একদল আবার গ্রাম থেকে দার্জিলিং দেখতে এসেছিল ওই এক্সপো মেলা দেখতে আসার মত। দুজন লামা এবং আমি । গাড়ি ছুটছে সুখিয়া হয়ে ধোত্রে । পাইন আর রডোডেন্ড্রন মেঘেদের সঙ্গে খেলছে লুকোচুরি। ছুটি নিয়ে এসেছি ফিরতে তো হবেই কাজ হোক বা ভালো লাগা... আপাততঃ এই অদৃশ্য অন্ত:পুরচারিণী যাকে খুঁজতে আসা ফোর্স গাড়িটি ছুটছে সেদিকে.. গন্তব্য রিমবিক।

।২।
     অবশেষে ফোর্স পৌঁছে গেলো রিম্বিক বাজার-এ , রিম্বিক দার্জিলিং এর পুলবাজার ব্লক-এর অন্তর্গত, উচ্চতা ৭৫00 ফিট। বাঁদিকে সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যান, ডানদিকে রাম্মাম নদী। নদীর ওপাশে সিকিম এর পশ্চিম সীমানা সোমবাড়ি। সিঙ্গালিলা ১৫ ই জুন বন্ধ হয়ে যায়, সান্দাকফু-র রাস্তাও বন্ধ। চারিদিকে মেঘ বৃষ্টির ধংস লীলা। আমি এসেছি না বরফ ঢাকা সান্দাকফু দেখতে না সিঙ্গালিলার কালিপোখরির রেড পান্ডা দেখতে। এগুলোর কোনোটাই এই সময়ে দেখতে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে? খোলা পথ দুটি, একটি আজ বেছে নিলাম। রিম্বিক থেকে সিরিখোলা বা  শ্রীখোলা ৭ কিমি রাস্তা। সকাল সকাল চা খেয়ে নাস্তা করে বেরিয়ে পড়লাম। গাড়ি চলে সুতরাং হাঁটার কোনো অসুবিধে নেই। এ রাস্তা সম্পূর্ন অপরিচিত। কিন্তু থাক আজ গুগল ম্যাপ কিংবা গাইড। ঝিমঝিম বৃষ্টি কে জেদ দেখিয়ে খানিক এগুতেই নিচে জলের খুব জোর শব্দ. পাহাড়ে মেঘ আর কুয়াশা এত নিবিড় যে কোনটা কি বোঝা দায়। চোখ ও বেগতিক বুঝে কানকে ছেড়ে দায় মনের দায় দায়িত্ব। তা হঠাৎ একটি ছোট্ট বাড়ির পাশে যেখানে মেঘ আর কুয়াশা ঢাকতে ব্যর্থ হয়েছে এক নর্তকী কে জানলাম তার নাম রাম্মাম ফলস। মন নাচতে চাইলো তার সঙ্গে, আরো এগোলাম। একটা জড়াজীর্ণ ভাঙা সেতু, সিরিখোলা সেতু। অজস্র মানুষ গাড়ি ঘোড়া যা কিছুই সান্দাকফু বা ফালুট যেতে চায় এই পথে, জীর্ণ সেতুর নিচে বয়ে যাওয়া শ্রীখোলা নদী তাদের ডাকে ইশারায়, ইঙ্গিত অ্যাডভেঞ্চার-এর, ইঙ্গিত জীবন জিজ্ঞাসার। ব্রীজ পেরিয়ে দুটি রাস্তা, ইতস্তত করছি কোনদিকে যাবো এমন সময় একটি গাড়ি ও কিছু মানুষের আবির্ভাব, না সাজ পোষাকে তাদের কাউকেই আমার ট্রেকার্স মনে হলোনা। সকলেই বেশ সেজেগুঁজে এবং একজনের হাতে একটি ডিশটিভির এর

এন্টেনা। কি ভেবে এদের সঙ্গে এগোনই করলাম। ডানদিকে কালো রঙের বোর্ড লেখা শ্রীখোলা টু দারাগাও । শুরু হল একটু দুর্গম রাস্তায় হাঁটা। এক পাদ্রী ভদ্রলোক এর সঙ্গে আলাপ হতে বুঝলাম.. এরা সব বিয়েবাড়ি যাচ্ছে দারাগাও তে। আমি তো নিশ্চিত কিছু দেখতে আসিনি আজ পথই আমার সাথী, পথের সঙ্গীরাই হয়ে গেছে বন্ধু। চলতে চলতে বুঝলাম আমি আসলে সান্দকাফু নয় ফালুট যাওয়ার রাস্তায় চলে এসেছি. প্রথম হল্ট এই দারাগাও। একদম ছোট্ট গ্রাম কিন্তু ছবির মতো সুন্দর। মেঘের চোখ রাঙ্গানি উপেক্ষা করে দিব্বি সদ্য স্নাত রমণীর মত অস্থির। অথবা হতে পারে আমার মন অস্থির বলে আমি অনুভব করছি এই চাঞ্চল্য! বিয়েবাড়িটা আসলে আর একটু ওপরে রাম্মাম গ্রামের কিছুটা কাছে খারকা বলে এক জায়গায়। নেপালি পরিবার। একদিকে ভদ্রবেশি জড়তা অন্যদিকে আমার গবেষনা যা আমাকে সবসময় শিখিয়েছে অন্যকে আপন করে নিতে বা অন্তত এরকম অভূতপূর্ব ঘটনা গুলো পর্যবেক্ষণ করতে। দু-এর দ্বন্দ্ব অবশ্য মিটিয়ে দিলো প্রচণ্ড খিদে আর তাদের সাদর আপ্যায়ন । ক্যামেরা সঙ্গী করে একটা গম্ভীর বিনয় নিয়ে ঢুকে পড়লাম। ঢালাও খানা পিনা। লজ্জার মাথা খেয়ে গোগ্রাসে ভাত, ভাজা, ডাল , মুরগি এবং খাসি দিয়ে দুর্দান্ত একটি লাঞ্চ সেরে ফেললাম। খেতে খেতে অবশ্য আর একটি তথ্য পাওয়া গেলো। বর নেপালি আর কনে আমেরিকান। টপাটপ কিছু ছবি তুলে ফেললাম নব দম্পতির আর শুনলাম পুরো গল্পটি। এলিজা নামের এই মহিলা কিছুকাল ধরে এখানে স্কুল-এ পড়াচ্ছেন আর এখানেই তিনি জীবন সঙ্গী নির্বাচন করে থাকবেন হয়তো আজীবন এই দারাগাও , এই খারকা আর এই মানুষ গুলো কে নিয়ে। কি বলবেন একে ত্যাগ না ভালোবাসা? ফিরছি খারকা থেকে, বিপজ্জনক বৃষ্টি আর সঙ্কুল রাস্তা। সাজে আমি ট্রেকার হলেও জুতো পড়েছি বিয়েবাড়ির মানে লেদার-এর. ফল যা হওয়ার তাই প্রত্যেক মুহূর্তে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। ফিরতি পথে আলাপ হল টিম্ব্রের এক যুবক এর সঙ্গে, ভালই হল তিনি দার্জিলিং এর গ্রাম জীবনের অনেক কিছু শোনালেন। শ্রীখোলার একটু আগে তিনি বিদায় জানালেন দেখালেন তার নিজের গ্রাম। বাকি পথ জনমানবহীন । একটু ভাবুক হচ্ছি এবার। শহুরে ব্যস্ততায় যারা একাকীত্ব-এ ভোগেন

বা নিঃসঙ্গতায় তারা আমার সঙ্গে শ্রীখোলার এই বাকি পথ টুকু চলুন না একবার । পায়ে চলা পথ বৃষ্টিতে অধিকাংশ জায়গা ক্ষত বিক্ষত মনের মত, এই বৃষ্টি আপনার বুকের জ্বালা বাড়িয়ে দেবে শতগুন। চারদিকে মেঘ আর মন খারাপ করা মেঘ, কান পাতুন । শ্রীখোলা নদীর শব্দ, নাম না জানা পাখির শব্দ. অজস্র ভুট্টার ক্ষেত, ঘাসে ঘাসে সকালে হয়ে যাওয়া বৃষ্টির ফোঁটা,, ভালবেসে ঘাসগুলোও ধরে রেখেছে ফোঁটা গুলোকে। একদম উল্লম্ব রেখায় ধরে রাখা জলকণা, বিশ্বাস হচ্ছেনা? ছবি তুলেছি সেই মুহূর্তের ও। এত সবুজ সব মেঘ হার মানবে। নামতে নামতে ধস। বন্ধ রাস্তা বোল্ডার ফেলতে হবে শ্রীখোলা নদীতে, হাত লাগাবেন ? ওপাশে কিছু স্কুল ছাত্র ছাত্রী বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়! পারবেন ফেরাতে? আমি হাত লাগালাম . আবার সেই শ্রীখোলার নিস্তব্ধ সেতু r নিচে খরস্রোতা নদী আবহমান। শুনলাম শ্রীখোলার বাঁদিকের রাস্তা সান্দকাফু যাওয়ার প্রথম হল্ট গুরদুম । বাঙালি হোটেল মালিক বললেন গেলে স্যার আজ আর ফিরতে পারবেন না.. আমি বললুম পথ পাই না পাই, ফিরতে আমাকে হবেই। গুরদুম অতি খাঁড়াই একটি পথ.. গাড়ির রাস্তা বসে গেছে আগেই। পায়ে চলা

পথটি বৃষ্টি শ্যাওলা, আর বাঁশ পাতা পড়ে যে অবস্থা তৈরি করেছে তাতে আছাড় খেয়ে পড়লে আর রিম্বিক ফিরে মোমো খাওয়ার আশা নেই।তার ওপর আমার বিয়ে বাড়ির জুতো। কিন্তু ওই যে অন্ত:পুর এ একজন চারণ করে চলেছে তার কাছে আমার কিছু পরীক্ষা দেওয়া বাকি। এগোলাম তাকদা পেরিয়ে আরো অনেকটা. যতো এগোচ্ছি জঙ্গল আর অন্ধকার বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। বারবার পথ ভুল হচ্ছে, সেই ঘন জঙ্গল আমাকে অবশ করে দিচ্ছে..গুরদুম আমি যেতে পারবোনা কিন্তু ফিরব কখন? একটা অজানা বাঁকে এসে আবার এক নদী নর্তকীর শব্দ। শ্রীখোলা। মনে পড়ে গেলো ফিরতে হবে তার কাছে। লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোচ্ছি চারিদিকে অন্ধকার । শুধু দেখতে পাচ্ছি সেই ভাঙা সেতুটি তার জরাজীর্ণতা ক্রমশ বাড়ছে। পৌঁছলাম সেই বাঙালী হোটেল এ, এক কাপ চা আর উল্টোদিকে সেপি বস্তি থেকে ভেসে আসা বাঁশির সুর.. কে জানে এই সুর পার্থিব না অপার্থিব? আমার অর্ধ মৃত অবস্থা দেখে ভদ্রলোক বললেন একটি গাড়ি আসবে এখুনি। আপনাকে ছেড়ে দেবে রিম্বিক, খুব জোর বৃষ্টি নামলো... শ্রীখোলা থেকে রিম্বিক ৭ কিমি পথ.. ড্রাইভারকে বললাম কি ভয়ো? (নেপালি) বাংলায় যার অর্থ কেমন আছো? স্মিত হেসে সে জানালো রামরো ভয়ো মানে সব ভালো।... অপেক্ষার আর একদিন....

।৩। ..  
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বর্ষাস্নাত আর এক সকাল, আজ বাকি একটি পথ। যেদিন রিম্বিকে নেমেছিলাম সেদিন ফোর্স গাড়ীটা আমাকে ছাড়বার পর একটা উঁচু অচল রাস্তা বেয়ে ওপরে উঠে গেছিলো. এমনিতে আমি নেপালি ভালো বুঝিনা কিন্তু তখন শুধু এটুকু বুঝেছিলাম যে সেই রাস্তাও চলে যায় শিরিখোলার দিকে. দারাগাও হয়ে খারকা ঘোরা শেষ, গুরদুমের পথও কিছুটা ঘুরেই এসেছি। বাকি পথ এই একটি। ইউরোপীয়ান কবল রোড ভাবছেন এটা সেরকম নয়। কোন এককালে গুছিয়ে পাথর বিছিয়ে তৈরি করা পাথুরে রাস্তা এখন এবড়ো খেবড়ো বিক্ষুব্ধ। খানিক হেঁটে বুঝলাম পথ ভুল হচ্ছে কারণ ভূগোল বলছে এই রাস্তা সিঙ্গালিলা যাওয়া পথ সুতরাং আমার পৌছনো উচিত কোন এক বন্ধ ওয়াচ গেটের সামনে। কিন্তু সামনে দেখি একটা ছোট্ট মনাস্ট্রি ।.. প্রাত্যহিক প্রার্থনার শব্দ ভেসে আসছে আর তার পাশেই একটি শিব মন্দির। সমন্বয়ের আশ্চর্য নিদর্শন রিম্বিক। পাশাপাশি মনাস্ট্রি, শিব আর শনি মন্দির। একজন ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম কোঠি যাব । বললেন পথ যেরকম উঠে গেছে সেভাবে হাটতে থাকুন। পৌঁছে যাবেন কোঠি । না কোন হাভেলি নয় কোঠি হল জংগলের রাস্তা যেখান দিয়ে সান্দাকফু যাওয়া যায় । জঙ্গল খোলা থাকলে যেতে পারতাম কালিপখরি আর হয়ত দেখা মিলত রেড পান্ডার। যাহোক ১১.৩০ টায় গাড়ী এখন সকাল ৮ টা , যতদুর পাড়ি দিতে পাড়ি ভেবে হাঁটা শুরু করলাম। এই অচেনা রাস্তায় আমি বড় বেমানান। তখন কেউ বা আসছে বাজার করতে রিম্বিকে, কেউ কাজে, খানিক বাদে আবার দুটি স্কুল ছাত্র ছাত্রী হাত ধরে আর হোমওয়ার্ক মুখস্থ করতে করতে ভাবখানা "সবেরে সবেরে ইয়ারও সে মিলনে স্কুল চলে হাম " ... দেখলাম খাতাটা, বিষয় জি.কে.। ' what do we grow in red soil ? জোয়ার বাজরা আর গ্রাউন্ড নাট। তারপর শুরু হল জঙ্গল । আজ একটু রোদ উঠেছে এই যা বাঁচোয়া। তবে সেই রোদই যে বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে ভাবিনি, আজ জল আনা হয়নি , পথ চলার শ্রমে খানিকবাদেই মন চাতক হয়ে উঠল । কিন্ত এটা ঠিক রিম্বিক থেকে শ্রীখোলা যাওয়ার রাস্তা নয় যে কোন বাড়ি থেকে জল চেয়ে খাব বা পথের পাশে কোন একটা ছোট্ট ঝোরায় ভিজিয়ে নেব অন্তরদেশ! যেহেতু জঙ্গলের পথ একটা অজানা ভয় আমাকে পেয়ে বসল, একটানা ঝি ঝি পোকার ডাক , সকালের পাখিরা ডাকছে অলস কন্ঠে, কোন বিপজ্জনক পশুর হাত থেকে তারা আমায় আগাম সতর্ক করবে তেমন কোন আশা অনুভব হলনা। তেস্টায় যখন দিশেহারা এবং কেন জল আনিনি বলে বাপান্ত করছি এমন সময় দুটি কুকুর তীব্র হাঁকডাকে আমার দিকে ছুটে এল। আমি তখন " আ ব্যাল মুঝে মার" গোছে পালানোর চেষ্টা করলাম না। ফল মিলল হাতে নাতে, তাদের যারপনাই আদরে আমি সামান্য বল পেয়ে সামনে দেখলাম একটি নেপালি মেয়ে বাড়ির নিত্য কাজে ব্যস্ত। খুব নিচু স্বরে ডেকে বললাম 'ভইনি পানি ছউ'? জল! সে কি বুঝল আমি বুঝলাম না কিন্তু তারপর সে নিয়ে এল একটি আস্ত কাচের গ্লাস, কানায় কানায় ভর্তি জীবন। খেয়ে বুঝলাম জল ঈষদুষ্ণ, তাত পানি বা সেই হাল্কা গরম জল যেন মনে হল স্বপ্নের রাম্মাম ফলস। আমার গন্তব্য অনিশ্চিত। কিন্তু আর একটু এগোতেই দেখলাম একটা বোর্ড ,লেখা 'monastery' । কাল ফিরেছিলাম শিরিখোলার কাছে নিজের না জানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। আজ আরও নিশ্চিত হলাম পরীক্ষার এই সবে শুরু। অনেক ব্যথার আড়ালে জমে থাকা ত্যাগ ফেরাতে পারে আমাকে সভৃতে। পৌঁছলাম সামতেন মনাস্ট্রি, মানেদারায় অবস্থিত ১৯১৭ সালে এটির প্রতিষ্ঠা। ২০১১র ভূমিকম্পে মূল মন্দিরটি বিপর্যস্ত হলেও আবার নতুন আঙ্গিকে সেজে উঠছে। নিচে উপাসনা ঘর ওপরে মিউজিয়াম. ঢুকে পড়লাম ইতিহাসে। সামতেন মনাস্ট্রি তৈরি করেছিলেন জনৈক লাকপা শেরপা। মূল গুরু রিনপোচে বা পদ্মসম্ভব যিনি সবচেয়ে প্রাচীন মত বজ্রযানের প্রবর্তক ও প্রচারক। তিব্বতি ভাষায় এখানে ন্যিংমা ধারায় বুদ্ধকে উপাসনা করা হয়। সবচেয়ে উল্লেখ্য এই অঞ্চলের মানুষদের পশুপাখি প্রীতি। অ্যাঞ্জেল নামে একটি ঘোড়া যে এক সময় দারজিলিং -এর চৌরাস্তায় ক্ষত নিয়ে অনাহারে ভুগছিল তখন এক বেলজিয়ান দম্পতির কল্যানে তাকে এই মনাস্ট্রিতে আনা হয়। সকলের আদর ও ভালবাসায় অ্যাঞ্জেল সুস্থ হয়ে ওঠে। তারপর কোন এক দুর্যোগের রাতে পাহাড়ের শিখর থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়। মিউজিয়াম-এ ধরে রাখা এই ইতিহাস আমাদের প্রশ্ন করে আমরা কোনদিন কোন জীব জন্তুর প্রতি কি এই আবেগ দেখাতে পেরেছি? অ্যাঞ্জেলরা মরেনা। তাকে বিদায় জানিয়ে ফিরছি, মন ভার। হঠাত সামনে এক প্রৌঢ় পাকা দাড়ি ও মাথায় নেপালি টুপি। জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি রিম্বিক এর দিকে নামবেন? যেন অ্যাঞ্জেল উত্তর দিল "হ্যাঁ, আমরা যাব শর্টকাট রাস্তায়" সময় লাগবে অর্ধেক মানে ২০ মিনিট! রিম্বিক নামার বাকি রাস্তাটা সব ঠিক ছিল শুধু এক জায়গায় আমার জুতো হার মানায়, আমাকে সজোরে একটি আছার খেতে হল। অলিগলি সিঁড়ি পথে যখন নামলাম রিম্বিক বাজারে , এই বিশেহ মুহূর্ত টিকে মিস না করতে দেওয়ার তাগিদে স্বভাব বিরুদ্ধ ভাবে বললাম –আঙ্কল এক সেলফি প্লিজ' প্রৌঢ় মুচকি হাসলেন, হয়ে গেল খ্যাচাক। 

আর সময় নেই । ১১.৩০ টায় রিম্বিক থেকে গাড়ি ছাড়বে দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে। ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে যেতে পারলে একটি ডাইরেক্ট শিলিগুড়ির গাড়ি পাওয়া যেত কিন্তু তাতে অধরা থেকে যেত সামতেন আর অ্যাঞ্জেল-এর গপ্পটা। এসেছিলাম ঘুম থেকে সুখিয়া, মানেভঞ্জন, ধোত্রে হয়ে এবার গাড়ি খানিক বাদে বাঁক নিল রাম্মাম নদীর দিকে, লোঢমা, সিম্বুক, করঞ্জইল, বিজনবাড়ি হয়ে দার্জিলিং। সেই ভিড় ঠাসা লেবং কার্ট রোডের ওল্ড সুপার মার্কেট থেকে সুমো নিলাম। গাড়ি ছাড়ল প্রথম গন্তব্য #ঘুম ,সেই ঘুম যেখান থেকে আমার এই অনির্দিষ্ট যাত্রার শুরু ! বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন যে এজগতে বুদ্ধের বাণী আর কেউ যখন শুনবেনা তখন তিনি পুনর্জন্ম নেবেন মৈত্রেয় হিসেবে। তিনি হবেন পরম মিত্র এবং ভালোবাসার মুর্ত প্রতীক। অন্তঃপুরচারিণী আসলে কি চায়?? মিলল উত্তর! "মৈত্রেয়"। শিলিগুড়িগামী গাড়িটিতে আমার সঙ্গে বসেছিল একটি কিশোর একদম পেছনের সিট এ। ঘুম পৌঁছতেই সে ড্রাইভারকে বলল ' দাজু, এক মিনিট' - বিরক্তিভরে সকলে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখলাম একটি কিশোরী ছুটে এল খুব দ্রুতপায়ে, কাচের দরজার ওপর থেকেই সে রাখল তার একটি হাত, ছেলেটিও তাই করল। বড়জোর ৩০ সেকেন্ড । গাড়ি ছুটতে শুরু করল সুনাদার দিকে। না আজ আর বৃষ্টি হচ্ছেনা। চারপাশ আলো ঝলমল। আজ মেঘেদের ছুটি ।

লকডাউন ও অন্যান্য

সনোজ চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুর, পঃ বাংলা

মাঝে মধ্যে শরীরের কোন কোন অঙ্গে যে আকস্মিক অননুভুতি তৈরি হয় তখন প্রবল অস্বস্তির সঙ্গে মনে হয় এ যেন আমার শরীরের অংশ নয়। সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে ঠিক তেমনই মনে হচ্ছে থেকে থেকে। সভ্যতার জন্য, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সভ্যতার চাকা পক্ষকালের জন্য আটকে গেছে মাটিতে। জীবন জীবিকার নিরবিচ্ছিন্ন আহ্নিকগতি স্তব্ধ। সময় আর কাটতে চায় না। বারে বারে মনে হচ্ছে পৃথিবীর গতিবেগ কি কমে গেল! ওজন কমানোর সকাল হাঁটা স্থগিত। চায়ের দোকানের অধিবেশনে মুলতুবি। চা-দোকানই বন্ধ। ফলত তর্জা করার অঢেল টপিক খাবি খাচ্ছে। ক্লাব,ঠেক,পাটি সবই মাটি।

 

১)

লক ডাউন ও এক গ্লাস চিরতার জল

মাঝে মধ্যে শরীরের কোন কোন অঙ্গে যে আকস্মিক অননুভুতি তৈরি হয় তখন প্রবল অস্বস্তির সঙ্গে মনে হয় এ যেন আমার শরীরের অংশ নয়।
সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে ঠিক তেমনই মনে হচ্ছে থেকে থেকে।
সভ্যতার জন্য, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সভ্যতার চাকা পক্ষকালের জন্য আটকে গেছে মাটিতে।
জীবন জীবিকার নিরবিচ্ছিন্ন আহ্নিকগতি স্তব্ধ।
সময় আর কাটতে চায় না।
বারে বারে মনে হচ্ছে পৃথিবীর গতিবেগ কি কমে গেল!

ওজন কমানোর সকাল হাঁটা স্থগিত।
চায়ের দোকানের অধিবেশনে মুলতুবি।
চা-দোকানই বন্ধ।
ফলত তর্জা করার অঢেল টপিক খাবি খাচ্ছে।
ক্লাব,ঠেক,পাটি সবই মাটি।
এখন কেবল অলস গৃহ-যাপন।
বই পড়ার অভ্যাস গেছে বহু দিন।
দীর্ঘ লেখা পাঠের ধৈর্যই অপ্রতুল।
টিভির খবর?
সে যেন চর্বিত চর্বন।
একই সংবাদের মোড়ক পাল্টে দেওয়া।
সংসারের খিটিমিটি এড়িয়ে একমাত্র টাইম পাশ সোশাল মিডিয়া।

আগে টুকটাক ফেসবুক করতাম।
অপচ্ছন্দের পোষ্টগুলো এড়িয়ে যেতে পারতাম সহজেই।
এখন এই দীর্ঘ ফেসবুক যাপনে রিপিট খবরের মতো অপচ্ছন্দের লেখাগুলোও বারবার এসে পড়ছে।
ফলত ফেসবুক হয়েছে বড় বিড়ম্বনার।
পাড়ার সদ্য গোঁফ গজানো ছেলেটার কবিতা আমার একদম পচ্ছন্দ নয়।
পচ্ছন্দ নয় মানে পচ্ছন্দ নয়।
মানে পড়ে দেখিনি কখনও।
তবে আমি নিশ্চিত ওর কবিতা ভাল হবে না। ও আবার কি কবিতা লিখবে!
আবার ধরুন রমেন।
আমারই ক্লাসমেট রমেন, ফিচার লেখে।
কারা যে পড়ে ওর লেখা!
এই লাইক কমেন্টেরও বোধহয় একটা বোঝাপড়া থাকে।
যাকে বলে ফেসবুক সাহিত্যের অলিগোপলি।
মানে আমার পিঠ তুমি চুলকাও আমি তোমার।
সহজ কথায় পারস্পরিক বোঝাপড়া।
তা না হলে রমেনের লেখা এতো লোক পড়ে বলে মনে হয় না। স্কুলে কোনদিন রমেন বাংলায় আমার থেকে বেশি পায় নি।
কখনও কখনও মনে হয় নি এমন নয়। হয়েছে, মনে হয়েছে দেখি তো রমেন কেমন লেখে।
শেষ পর্যন্ত হয় নি।
ঐ যে, বাংলায় রমেন আমার থেকে বেশি পায় নি। এই আত্মশ্লাঘায় রমেনের ফিচার এড়িয়ে গেছি সন্তর্পণে।
বিধুদা গল্প লেখে।
গেল বই মেলায় প্রকাশিত বিধুদার গল্প সংকলন ' গাল গপ্প নয়' - এর দ্বিতীয় মুদ্রণ নাকি শেষের পথে।
বিধুদার ছাইপাঁশ গল্প আমি গিলি নি কোন দিন।
মাস চার আগে আমারই এক সহকর্মী বলছিলেন ওর পাড়ার ক্লাব ' যুব চেতনা'-য় এবার বিশেষ অতিথি হচ্ছেন ' বিধেশ পতুতুন্ডি'।
প্রথমটায় বুঝতে পারি নি বিধুদার কথা হচ্ছে। ঐ সহকর্মী বোধহয় আন্দাজ করে ফেলেছিলেন আমি ঠিক রিকগনাইজ করতে পারি নি বিধুদাকে।
পরে পরে বলেছিলেন-
' আরে বিধেশ বাবু আপনার পাড়ার লোক, উনি তো আমার আপনার কমন ফ্রেন্ড'।
অস্বস্তি সরিয়ে বলেছিলাম--
' চিনি তো, আসলে বিধেশ বলতে একটু ঘেটে গিয়েছিল,আমরাতো বিধু নামেই চিনি। দারুন সিলেকশন। সোনার কলম বিধুদার, বলেনও ফাটাফাটি'।

লক ডাউনের এই অখন্ড অবসরে বসে বসে গিলতে হচ্ছে বিধুদাকে, পড়তে হচ্ছে রমেনকে
সদ্য গোঁফ গজানোর আঁতলামিও এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না।
রমেনের লেখায় ভাল কিছু লিখতে গেলে বাংলার নম্বারটা সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।
ভেতর ভেতর সমালোচনা করার ইচ্ছেটা প্রবল হলেও, গুটিয়ে নিতে হচ্ছে পাছে উন্মুক্ত হয়ে যায় অসূয়া।

_______________________________________________________

২)

জনতার কার্ফু#


না আজ ঘরের বাইরে যাই নি।
যাবও না।
জনতা কার্ফু এই নতুন শব্দ বন্ধই তো একটু হলেও বাড়তি সচেতনতা তৈরি করে দিয়েছে।
জানি না এর আগে কোনো রাষ্ট্র প্রধান এমন শব্দ বলেছেন কিনা।
কাল যখন ফিরছিলাম বাসের ভিড়ে কত কথা।
কি প্রবল দায়িত্ববোধ মানুষের।
আসলে কাজটা তো খুব সামান্য, একটা দিন নিজেকে শামুকের খোলে আটকে নেওয়া।
মানুষের কি ভীষণ ভরসা।
বাস ছিল কম, তার উপর দলে দলে মানুষ ফিরছে ঘরে।
চার ঘন্টার পথ পেরাতে কাল লেগে গেল ঘন্টা ছয়।
সিট তো দূরস্থ একটু ভালো ভাবে দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও নেই।

আশা ভরসার শত দেলাচল#
দুর্গা পুজোর সময় এমন করে বাড়ি ফেরে আনন্দিত লোকজন।
হ্যাঁ ভিড়ের অধীকাংশটাই ছিল আনন্দিত।
যুদ্ধ জয়ের আনন্দ।
ভিড়টা জিতবেই করোনাকে হারিয়ে।
বাসস্ট্যান্ডে, বাসে,ভিড়ে কানে এসেছে নানা কথা।
কেউ বলছে কাল বাড়ি থাকতে হবে বাড়ির বাইরে বেরানো যাবে না কারন কাল হেলিকপ্টার থেকে ভাইরাস মারার ভ্যাকসিন স্প্রে করা হবে।
কেউ কেউ বলছেন ট্রাম্প আমেরিকা থেকে মোদিজিকে একটা বিশেষ বোম দিয়েছেন সেটা দিয়ে খাল্লাস হয়ে যাবে করোনা।
এসবের সঙ্গে পুরীর পতাকা পুড়ে যাওয়া, বাড়ির ইশান কোনে কয়লা খুঁজে পাওয়া এসবও মিশে যাচ্ছিল দ্রুত।

প্রচার প্রপাগন্ডা#
শিক্ষিত মানুষের ভরসা নিজের উপর আর ঈশ্বরে।
অশিক্ষিতের ভরসা ঈশ্বর ও শিক্ষিত সমাজে।
এর মাঝে যারা রইলেন তারা অর্ধশিক্ষিতের দল।
বিপদটা এদের নিয়েই।
কম জেনে কম বুঝে এরাই বিপদকে মহাবিপর্যয়ে পরিনত করেন।
এই দলটা এখন আড়াআড়ি কেন্দ্র-রাজ্যে বিভক্ত।
করোনা রোধে মমতা-মোদী কে বেশি সক্রিয় কে বেশি এগিয়ে তার তুল্যমূল্য বিচার চলছে।
একদল অন্য দলের নির্দেশ উপেক্ষা করছে।
অনেক ক্ষেত্রে কাজের কাজ যতটা হচ্ছে প্রচার হচ্ছে উল্টো।
আজ সকাল থেকেই সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার হচ্ছে জনতার কার্ফু কার্যকর হলে সংক্রমনের চেন নাকি নষ্ট হয়ে যাবে।
কেউ কেউ আবার সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন আজ ২২ তারিখ একজন আক্রান্ত মানুষ গৃহবন্দী হলে কাগজওয়ালা, সব্জীওয়ালা,মুদীদোকানী, বাস যাত্রী, দুধওয়ালা.... এই ভাবে কত জনকে সংক্রমন থেকে রক্ষা করা যাবে।
কাগজওয়ালা, সব্জীওয়ালা,মুদীদোকানী, বাস যাত্র.... এর প্রতি একজন আরো তত জনকে সংক্রামিত করবে।
২৩ তারিখে.... ২৪ তারিখে....২৫শে...
সংখ্যা কোথায় যাবে।
তাহলে জনতার কার্ফু কার্যকর হলে,
২২ তারিখ মানুষ গৃহবন্দী হলে আর সংক্রমন হল না। তাছাড়া রবিবার মানুষ বেশি বাইরে বের হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এক চালেই করোনা কুপোকাত।
কি বোকা বোকা বিশ্লেষন।
আরে বাবা ২২ এর সংক্রমনটা ২৩ থেকে শুরু হবে তো!
যারা এই তথ্যগুলো গিলে নেবেন তারা ২৩ থেকে আরো বেপরোয়া ভাবে বাইরে বেরাবেন।
বিশেষত দিন আানি দিন খাই মানুষজন আজকের গৃহবন্দী হওয়ার ঘাটতিটুকু পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
সামাজিক যোগাযোগ সাধারন দিনের তুলনায় জনতা কার্ফুর পরের দিনগুলোতে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক।

তাহলে উপায়#
রাষ্ট্রের তরফে আবার প্রচার হওয়া প্রয়োজন
জনতার কার্ফু সচেতনতার প্রতীক মাত্র।
ওটাই সব নয়।
জনতার কার্ফু নিয়ে মিথ্যে প্রচারগুলো তুলে ধরা উচিত যাতে মানুষ বিভ্রান্ত না হন।
মানুষজনকে প্রতি মুহুর্তে মনে করানো দরকার যতটা সম্ভব গৃহবন্দী থাকুন।
আরো ভালো হয় রাষ্ট্র দায়িত্ব নিয়ে পক্ষ কালের জন্য মানুষকে গৃহবন্দী করুক।
তারজন্য লক্ষ লক্ষ গরীবগুর্বোদের আর্থিক নিরাপত্তাও দিক রাষ্ট্র।

টাকা দেবে গৌরীসেন#
নোটবন্দীর সুফল মিলবে কি মিলবে না এ সংশয় নিয়েই নোট বন্দী হয়েছিল।
কেউ কেউ বলেছিলেন ওটা অমুলক।
তবুও নোটবন্দী করেছিল রাষ্ট্র।
তার জন্য রাষ্ট্রকে বাড়তি ব্যায় বরাদ্দ নিতে হয়েছিল।
এক্ষেত্রে পক্ষ কালের জন্য নাগরিকদের গৃহবন্দী করলে ও তার ব্যায় রাষ্ট্র বহন করলে সুফল কিন্তু নিশ্চিত।
রাজনৈতিক দলগুলো তো মানুষের জন্য কাজ করে। দলগুলো তাদের ফান্ড থেকে ৭০% টাকা দিয়ে দিক।
আইন করে আমজনতার ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্ট থেকে ১০% টাকা কেটে নেওয়া হোক।
কর্পোরেট সেক্টর বেসরকারি পুজিপাতিদের জমা টাকার ৩০% নেওয়া হোক।
এমন জরুরী পরিস্থিতি তে একা গৌরীসেন কিছু করতে পারবেন না।
এটা আমার মনে হয়েছে।
যাইহোক পরিস্থিতি যা তাতে পুরো দেশটাকে গৃহবন্দী না করে উপায় নেই।
মদ্দা কথা আজ রাষ্ট্রের নির্দেশে থালা বাজুক
কাল থেকে থালায় অন্নের নিরাপত্তা দিক রাষ্ট্র।

______________________________________________________

৩)

শনিবারও জানতে পারি নি রবিবার দিনটা পরম গুরুর সান্নিধ্যে অতিবাহিত হবে।
শনিবার গিয়ে ছিলাম কাঁথি রামকৃষ্ণ আশ্রমে।
গিয়েছিলাম বিশেষ এক আলোচনায় শ্রোতা হিসাবে।
"মূল্যবোধের শিক্ষা শীর্ষক শিক্ষক-অভিভাবক আলোচনা সভা"।
সভায় অনেকেই বললেন।
কাঁথি হিন্দু হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা শ্রীমতি ছবিরানী দাস মহাপাত্র মহাশয়ার বক্তৃতায় ঋদ্ধ হলাম।
উপনিষদের কথা দিয়ে আদ্যোপ্রান্ত ভরা ছিল তাঁর আলোচনা।
সহজ সরল ভাবে তুলে ধরলেন মূল্যবোধ তথা পরা বিদ্যার নানা দিক।
বললেন.....
গ্রুপ ডি একটা কাঁচের গ্লাস ভেঙে ফেলেছেন...
এক চেয়ার বলে উঠলেন....
" দিলেন তো, একটা কাজও যদি ঠিক মতো করতে পারেন"।
কিম্বা আর এক চেয়ার....
" একটা কাজও যদি......!"
আবার অন্য কোন এক চেয়ার....
" আহা, কিছু হয় নি আপনার...."
তৃতীয় জনারই মূল্যবোধ প্রবল।
চমকিত হলাম।
আশ্চর্য এ তো আমাদের জীবন থেকেই নেওয়া।

টিচার শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ গুরু।
গুরু শব্দে দুটি অক্ষর....এক 'গু' আর অন্যটি 'রু'।
'গু' অর্থাৎ যা অন্ধকারকে চিহ্নিত করে আর 'রু' যা অন্ধকারকে দূরীভুত করে।
রবিবার কাকতালীয় ভাবে পৌঁচ্ছে গিয়েছিলাম কামারপুকুর।
পরম গুরুর সান্নিধ্যে।
কামারপুকুর একজন রক্ত-মাংসের মানুষের জন্মস্থান কেবল তাঁর কর্মগুনে হয়ে উঠেছে দেবস্থান।
কামারপুকুর গ্রামটির নাম হয় কামারদের পুকুরের নাম থেকে।
ধনী কামারিণীর পিতৃপুরুষ খনন করেন এই পুকুর।
ধনী কামারিণী ছিলেন গদাধরের(বালক রামকৃষ্ণের) দাইমা।
ঠাকুর যখন জন্মাচ্ছেন তখন তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ধনী কামারিণীই তাঁকে প্রথম খুঁজে বের করে উনুনের মধ্য থেকে ছাঁই মাখা অবস্থায়।
সেই থেকে তিনি দাইমা।
ঠাকুরের যখন উপনয়ন হয় তখন তাঁর ভিক্ষামায়ের খোঁজ শুরু হয়।
ঠাকুর বলেন ধনী মা-ই হবে তার ভিক্ষা মা।
ঠাকুরের বাবা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় তো একদম রাজি নন, বামুনের ভিক্ষা-মা হবে কামার!
ঠাকুর বললেন মায়ের আবার জাত কি!

ছেলেবেলায় সীতানাথ পাইনের বাড়ি ঠাকুর প্রায়ই যেতেন।
ধর্মপ্রাণ পাইনবাবু বড় স্নেহ করতেন বালক গদাধরকে।
একবার শিবরাত্রিতে যাত্রাপালায় শিবের ভুমিকায় যিনি অভিনয় করেন তিনি অনুপস্থিত।
বালক গদাধর হলেন শিব।
তাঁকে সমাধিমগ্ন হতে দেখে সবাই শঙ্খ ধ্বনি ও উলু ধ্বনি করেছিলেন।

লাহাদের পাঠশালায় গদাধর যেতেন লেখাপড়া করতে। পাঠশালায় বিয়োগের অঙ্ক দিলেই বালক গদাধর পালিয়ে যেতেন লাহাদের বিষ্ণু মন্দিরে। সেখানে কালি মায়ের মূর্তি আঁকতেন গদাধর।

মা চন্দ্রমনি দেবী বালক গদাধরের দিব্যোন্মত্ত অবস্থায় বিচলিত হয়ে গোপেশ্বর শিব মন্দিরে হত্যে দেন।

মঠ দর্শন শেষে কিছু বই কিনে বেরিয়েছি।
বাইরে জুতো খোলা।
এক মহারাজ জল নিয়ে দাঁড়িয়ে।
জুতো হাতে বই নেওয়া যায় না যে।
ও তো শুধু বই নয়।
ও যে আলোকবর্তিকা।
সত্যি কত কিছুই জানি না।
কত কিছুই মানি না।
নতুন এক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মঠ ছাড়লাম।

_______________________________________________________

৪)

উপনিষদের অমৃত

"যদিদং কিঞ্চ জগৎ সর্বং প্রাণ এজতি নিঃসৃতম"- উপনিষদ বলে, এ জগৎ, এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড শব্দময়, কম্পনময়। শব্দ থেকেই সকল সৃষ্টি উদগত। শব্দের মুলে রয়েছে স্পন্দন বা কম্পন। আবার প্রাণের প্রধান লক্ষনই হল স্পন্দন- একটা দোলা, একটা কম্পন। উপনিষদ অনুযায়ী সৃষ্টির মুলে দুটি মৌলতত্ত্ব- আকাশ ও বাতাস।
আকাশ স্পন্দনহীন, শুন্য।
বাতাসে সেই শুন্যতার পূর্ণতা।
বাতাস যেহেতু গতিশীল তাই তা স্পন্দিত। বায়ুর মধ্যেকার এই যে কম্পন এ হল সৃষ্টির আদি কম্পন।
এই আদি কম্পন এসে রূপ ধরে অগ্নিতে- বাতাস ছাড়া আগুন জ্বলে না।
আবার তা শীতল হয়ে ঝরে পড়ে জলে বা অপে।
এই যে স্থবির পৃথিবী তাও কম্পমান।
পৃথিবী তো পঞ্চভূতের।
পঞ্চভূত-ক্ষিতি,অপ,তেজ,মরুৎ,ব্যোম-- এদের বিবর্তনের সকল খানে যেহেতু কম্পন বিরাজমান, তাই পৃথিবীর সর্বত্র কম্পন। আগুনের শিখা কম্পমান।
জল প্রবাহ যে নামছে বা ঝরে পড়ছে সেখানেও কম্পন- সকল স্থবিরেই এই কম্পন রয়েছে।
আমাদের শরীর তো পঞ্চভূতের শরীর, তাই সেই পঞ্চভূতে কম্পন থাকলে আমাদের শরীরেও তা আছে।
যতক্ষন কম্পন আছে ততক্ষণ প্রাণও আছে।
আবার এও সত্য প্রাণের সেই স্পন্দন বাতাসেরই স্পন্দন। বাতাসের মাধ্যমে আমাদের দেহের মধ্যে প্রাণ সঞ্চারমান। একবার তার অন্তঃপ্রবেশ, পর মুহুর্তে তার বহিঃসঞ্চার। একটায় ভরা বা পূর্ণ করা অন্যটায় রেচন বা রিক্ত করা।
কঠোপনিষদে যমরাজ নচিকেতাকে বলছে-
জীবদেহ বায়ু ভরা। যতক্ষন বায়ু আছে ততক্ষন প্রান আছে। এই বায়ু পাঁচ প্রকার- প্রাণ,অপান, সমান, উদান, ব্যান।
নাক দিয়ে আমরা যে বায়ু গ্রহন করি বা বের করি তা হল প্রাণ, মল, মুত্র ত্যাগে যে বায়ু সাহায্য করে তা অপান, ঢেকুর এর সঙ্গে যে বায়ুর উদগার হয় তা উদান, সারা শরীরে যে বায়ু ছড়িয়ে আছে তা হল ব্যান, আর প্রাণ ও অপান বায়ু সমান হলে তাকে বলে সমান বায়ু।
প্রাণ-অপান এর এই টানা, ফেলার মধ্য দিয়ে বায়ু আমাদের দেহে অগ্নিকে বা শক্তিকে সন্দীপিত করে।
প্রাণ বায়ুর গতি উপরের দিকে অপান বায়ুর গতি নিচের দিকে, আর এই দুয়ের মাঝে রয়েছে হৃদয় আর সেখানে রয়েছে আত্মা।
পদার্থকে ভেঙে গেলে যেমন তার সবচেয়ে ক্ষুদ্র অংশ মেলে, সে কনার অসীম শক্তি। তেমনই ব্রহ্ম বা আত্মা এ পৃথিবীর সকল কিছুতে অতি সূক্ষতায় অবস্থান করে, অসীম তার শক্তি।আকাশ থেকে বাতাস, বাতাস থেকে অগ্নি, অগ্নি থেকে জল, জল থেকে পৃথিবী- এই পঞ্চভূতের সর্বত্র আত্মা বা ব্রহ্ম বিরাজমান।

আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়- চোখ, কান,নাক,ত্বক, জিহ্বা আত্মার শক্তিতে কাজ করে। তারা বাইরের পৃথিবী থেকে যে উপহার এনে দেয়- সেও আত্মার নির্দেশে।
আত্মা যখন দেহ ছেড়ে চলে যায় তখন এই প্রাণ অপান বন্ধ হয়ে যায়। স্পন্দন বা কম্পন স্তব্ধ হয়ে যায়। বুকের ধুকপুকিটাও থেমে যায়-একে মৃত্যু বলে। মৃত্যু হল ইন্দ্রিয় দিগের মৃত্যু, দেহের মৃত্যু- আত্মা অমর সে কেবল দেহ ত্যাগ করে।
যেহেতু আত্মা সর্ব শক্তিমান ও তার নির্দেশে সকল কাজ হয়, তাই দেহে সে না থাকায় দেহের সকল কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
ইন্দ্রিয় আর আত্মা এক বস্তু নয়।
চোখ, কান, নাক, জিহ্বা,ত্বক- আবার মন, বুদ্ধি,অহংকার এগুলো সবই ইন্দ্রিয়।
পঞ্চভূত থেকে এই ইন্দ্রিয় দিগের উৎপত্তি। যার উদয় আছে তার অস্ত আছে।
যার উৎপত্তি আছে তার বিনাশ আছে।
প্রাণী যখন জেগে থাকে তখন ইন্দ্রিয় গুলি জেগে থাকে, যখন প্রাণী ঘুমোয় তখন ইন্দ্রিয় গুলি ঘুমোয়।
আত্মা আপনা থেকে আপনি হয়েছেন, কেউ তার স্রষ্টা নেই। তিনি নিজেই নিজের স্রষ্টা- তিনি স্বয়ম্ভু।
তার বিনাশ নেই, তিনি অনন্ত।

মানুষের বা জীবের দেহ হল একটা দূর্গ।
বহু তার দ্বার- চোখ, কান, নাক,ত্বক,জিহ্বা। বাইরের জগতের সঙ্গে জীবের সকল যোগাযোগ ঐ দরজা গুলি মারফৎ।
আবার এই দূর্গের একজন মালিকও রয়েছেন।
তার মহিমার শেষ নেই - তিনি সূর্যের মতো ভাস্মর- তিনি আত্মা।
" আত্মানাং রথীনং বিদ্ধি
শরীরং রথমেব তু
বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি
মনঃ প্রগ্রহমেব চ।"
রথ আর রথীতে যে পার্থক্য শরীর আর আত্মায় সেই পার্থক্য। আমাদের শরীর হল রথ, আর আত্মা হল রথী।
আত্মানাং রথীং বিদ্ধি- আত্মা হল রথী, যে রথে চড়ে বসে, যাকে রথ গন্তব্যে নিয়ে যায়।
শরীরং রথমেব তু- শরীর হল রথ, অথাৎ রথ যেমন রথীর বাহন তেমনি শরীর আত্মার বাহন।
বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি- বুদ্ধি হল সারথি, যে রথ চালনা করে।
মন প্রগ্রহমেব চ- মন হল লাগাম।
রথ বলতে চাকা বিশিষ্ট একটা যান বোঝায়। আবার চাকা হল গতিশীলতার প্রতীক।
অথাৎ রথ দাঁড়িয়ে থাকার জন্য নয়, তাকে পথে নামতে হয়।
পথে নামতে হয় তার মালিকের জন্য, রথীর জন্য।
রথীকে গন্তব্যে পৌচ্ছে দেওয়া জন্য।
এখানে আত্মার গন্তব্য পরমাত্মা।
রথকে টানে ঘোড়া, সেই ঘোড়া সু বা কু দুই রকমের হয়।
শরীর রথ হলে ইন্দ্রিয়গুলি ঘোড়া।
পৃথিবীতে মানুষের হাতে দু-ধরনের খেলনা আছে। একটা শ্রেয়- একেবারে সাদামাটা, পরিস্কার, ঝকঝকে স্ফটিক পাথর। অন্যটা প্রেয়- সেটা রং বাহারি। শ্রেয় বলে যদি আমাকে নিয়ে খেল তবে তুমি আমার মতো হবে সাদাসিধে,দিলখোলা। প্রেয় বলে আমার সঙ্গে খেললে আমারর মতো চটকদারি, রঙীন হবে। শ্রেয় হল মোক্ষ, প্রেয় হল পার্থিব সুখ আর ঐশ্বর্য। মানুষ প্রেয়ই প্রতি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে।
তাই দুষ্টু ঘোড়া গুলো কে সঠিক পথে চালনা করতে পারে দক্ষ সারথি। আমাদের বুদ্ধি হল সারথি। সারথির হাতিয়ার হল লাগাম। মন যে হেতু ইন্দ্রিয় গুলিকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে তাই মন হল লাগাম। তাই যার মন ইন্দ্রিয়গুলিকে বশীভুত করতে পারে তার আত্মা পরমাত্মার সন্ধান পায়।
সৎ দর্শন, সৎ শ্রবন,সৎ ঘ্রান, সৎ আস্বাদ,সৎ স্পর্শেই জীবনের আনন্দ, বেঁচে থাকার সার্থকতা।
" অপ্রতিরুপং বদতি,
অপ্রতিরুপং জিঘ্রতি, অপ্রতিরুপং পশ্যতি, অপ্রতিরুপং শৃণোতি, অপ্রতিরুপং সংকল্পয়তি-
স এব পাপমা।"
যথাযথ না বলা, যথাযথ আঘ্রান না করা,যথাযথ না দেখা,যথাযথ না শোনা, যথাযথ না ভাবা- মৃত্যুরই সমান।

_______________________________________________________

৫)

তখন দুপুর দুটো হবে।
সবে খিচুড়ি, আলু ভাজা আর টমাটোর চাটনি সাটিয়ে বিছানায় কাত হয়েছি।
তখন আর কত!
ক্লাস ফাইভ হবে হয়তো।
সরস্বতী পুজো মানে যে স্কুলে স্কুলে ঘোরা...
পাড়ায় পাড়ায় সাইকেল নিয়ে টো টো....
এসব বোঝার জ্ঞান-কেশ তখনও গজায় নি..
মানে মাথা থেকে নামা শুরু করে নি।
উঠোনে মায়ের সঙ্গে মায়ের ভক্তদের(আমার মার নয় সরস্বতী মায়ের) তুমুল বাদ বিসংবাদ।
মা তো কিছুতেই এন্ট্রি নিতে দেবে না।
মা আমার খুবই ছুত মার্গ।
অবস্থা এমনই পারলে সপ্তাহে সে আট দিন উপবাস করে। । আচার নিষ্ঠ ব্রাহ্মণ বংশের আত্মজা।
তার অবস্থান খুবই স্পষ্ট --এ অনাচার তার পক্ষে কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
এদিকে ভক্তরা সংখ্যায় বাড়ছে।
বড়দের সঙ্গে মিশে থাকা শুকিয়ে যাওয়া কচি মুখগুলো দেখলে মায়া হবে যে কারো।। কিন্তু মা আমার আচার নিষ্ঠ ব্রাহ্মণ বংশের সন্ততী তাই এসবে তার নেই কোনো হেলদোল।
পুজো আচ্চায় শালগ্রাম শিলার মতো খাঁটি।
ভক্তদের পুরোহিত আসে নি তখনও, আসার সম্ভাবনাও দূর-অস্ত।
ঠাকুরকে ফুল না দিয়ে কচি-কাঁচাগুলো দাঁতে কিছু কাটবে না।
পড়ুয়াদের কাছে মা সরস্বতী হেড স্যারেরও হেড স্যার।
সব সার্টিফিকেট নাকি গচ্ছিত থাকে মায়ের জিম্মায়।
একই পাড়ায় থাকার সুবাদে ওদের কাউকে কাউকে পানা পুকুরে ভাসতে থাকা হাসকেও গড় ঠুকতে দেখেছি।
সব জায়গাতেই তো চ্যালাকে ধরে উপরে যেতে হয়।

মার দুর্বল প্রতিরোধ ডিঙিয়ে স্রোতের মতো ভিড়টা ঢুকে পড়ল ঘরে। বিছানা থেকে আমাকে এক প্রকার চ্যাঙ দোলা হয়ে চালান হয়ে গেলাম ভিড়টার মাথায়।
মা পেছন থেকে চিৎকার করছে...
"ওরে ও মুখপোড়ার দল... ওর যে এখনো পৈতে হয় নি রে হারামজাদারা... এ অনাচার সইবে না দেবী। তোদেরও আর পাশ দেওয়া হবে না আর আমার ছেলেটাও ক্লাস ফাইভ ডিঙাতে পারবে না.… ওরে ছেড়ে দে রে ওকে ছেড়ে দে.….."
কে কার কথা শোনে।
তখন তারা ট্রফি পেয়েছে যেন।
উন্মত্ত উল্লাসে আমাকে চাগিয়ে দে ছুট।
পেছন থেকে কেউ যেন চিৎকার করে জানিয়েছিল...
" এতো আর ইচ্ছাকৃত ত্রুটি নয়। এ যে নাচারে পড়ে পরিত্রাণের চেষ্টা। মা অতো নির্দয় হবেন না। সন্তানের এ অনিচ্ছাকৃত অপরাধের দোষ ধরবেন না মা"।
ভক্তের দল বাড়ি ছাড়ার আগে সুযোগ মতো আলনা থেকে বাবার একটা ধুতি নিয়েছিল হাতিয়ে। মন্ডপে আগে থেকে আনা ছিল পৈতের সুতো। আমার দু হাঁটুতে পাক খেয়ে তৈরি হল পৈতে।
পুজো শেষে দক্ষিণা হিসাবে জুটল দশ টাকার একটা নোট।
সে দক্ষিণায় সেদিন আনন্দ পেলেও পরে বুঝেছিলাম পৈতে হীন পুরোহিত বলে দক্ষিণায় একটা সমঝতা ছিল।
বাড়ি ফিরে জীবনের প্রথম রোজগার
গামছার পুটুলি ভরা কেজি দেড়েক আতপ চাল গোটা কতেক আলু আর কাঁচকলা সহ খান সাত আটেক সিকি পয়সা মায়ের কাছে রাখতেই মা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন সে সব।
মায়ের হাতে ঘা কতক জুটল বকশিস হিসাবে।
রাতে বাবা ফিরে সব শুনে হাসলেন।
আর তাতেই মায়ের রাগের পারদ চড়ল আরো। তারই রেশ রইল, দিন তিনেক মা আর কথা বলল না আমার সঙ্গে।
তবে সে ঘটনার বছর ঘুরতে না ঘুরতে মেজ পিসি অনেক খরচ পাতি করে আমার গলায় দিলেন সত্যি কারের ধবধবে সাদা একখান পৈতা।

৬)

এ শুধু লক ডাউন নয় শুদ্ধিকরণ।


গাড়ি-ঘোড়া বন্ধ। কলকারখানাও তাই।
নিত্য দিনের মতো বাতাসে গলগল করে বিষ মিশছে না।
একটু একটু করে নির্মল হচ্ছে বাতাস।
পার্থিবসুখ-সাচ্ছন্দ্য- সমৃদ্ধির সঙ্গে আবর্জনার সমানুপাতিক সম্পর্ক।
আমরা যত সুখ খুঁজেছি তত জমিয়েছি আবর্জনা।
তাই সুখ সমৃদ্ধির দৌড় থমকে যাওয়ায় নতুন করে আর আবর্জনা জমছে না।
আর প্রকৃতি যেহেতু নিজেই নিজেকে শুদ্ধ করে নিতে সক্ষম তাই এই লক ডাউনটা কেবল করোনার জন্য নয় শুদ্ধ পৃথিবীর জন্যেও।
এটা আমার নিশ্চিত ভাবেই মনে হয়েছে লক ডাউনের ফলে চুরি সহ অনান্য অপরাধ কমবে, কমবে নেশাও।

আজ সকাল থেকে আমার এক শিক্ষক বন্ধুকে যতবার ফোন করেছি প্রতিবারই ফোনটা গেছে তার স্ত্রীর হাত ফেরতা হয়ে।
এবং ফোনে ভদ্রমহিলার গলায় বেশ বিরক্তি দেখলাম।
প্রথম বার মনে হল হয়তো ভদ্রমহিলা ফোন করছিলেন এমন সময় ফোন করে ফেলেছি বলে বিরক্ত।
হওয়াটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু পরপর একই ঘটনা ঘটায় শেষ পর্যন্ত বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম।
আসলে বন্ধুটির একটি পরিকীয়া রয়েছে এ আমাদের অনেকেরই জানা।
গত দিন থেকে গৃহবন্দী হয়ে বেচারা খুব একটা সুবিধা করতে পারে নি।
তাই সকাল বেলা বাথরুমে ঢুকে ছিল ফোন নিয়ে।
কোমটে বসে চলছিল চ্যাট।
অনেক ডাকাডাকিতে সে আর বের হয় না।
এদিকে ওর ছেলের বেগে এসেছে প্রবল।
শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর কাছে বামাল(ফোন,হোয়াটসঅ্যাপ -চ্যাট) ধরা পড়ে বেচারা।
ফোনটা সেই থেকে স্ত্রীর হস্তগত।
শ্লা লক-ডাউনে সংসারও বিশুদ্ধ হচ্ছে এ ভাবনাতীত।

_____________________________________________________

৭)

শনিবার যখন ঘাটাল যাচ্ছিলাম তখনও জানা ছিল না লক ডাউন হয়ে যাবে ঘাটাল।
বাসে ভিড় ছিল বেজায়।
ভয় ছিল ভিড়ে।
কোথাও মিশে নেই তো করোনার বীজ।
সতর্ক হয়ে বারবার দেখছিলাম চারপাশ।
কেউ হাঁচল না তো।
কারো কাশি নেই তো।
কাউকে কি বাড়াবাড়ি রকমের অসুস্থ মনে হচ্ছে।
কাউকে এতটুকু সন্দেহ হলে....
ভিড়ের মধ্যেও তৎক্ষণাৎ খুঁজে নিতে হবে নিরাপদ ব্যবধান।
হ্যাঁ ভয়।
ভয় একটু একটু করে গিলে নিচ্ছিল অজগরের মতো।

ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ছেলে ছুটে এসেছিল জড়াতে,ব্যাগে কি আছে হাতেনাতে চাই তার..
না ছেলের জন্য কিছুই নিয়ে যাই নি।
বিপদ কোথায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে কে জানে!
নিজে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে দিয়েছিলাম আদর।
রাতে ঘুমানোর সময় ছেলের দিকে পেছন করে শুয়ে ছিলাম।
জড়ালো বাবদা।
বলল--
"আমার দিকে ঘুরে শোও না বাবা"।
আকস্মিকতায় ঘুরেও পড়লাম।
নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেল বাবদাকে।
ভয় পেয়ে গেলাম।
বাসে-ঘাটে কিছু বয়ে আনি নি তো!
দ্রুত সরিয়ে নিলাম নিজেকে।
বাথরুমের অজুহাতে সাময়িক ছাড়লাম বিছানা।

সকাল থেকে যুদ্ধ কালীন তৎপরতা।
দিন কুড়ির চাল-ডাল-আলু তুলে নিতে হবে।
সঙ্গে বেশ কিছু ডিম,মাখন,ঘি।
হোক চড়া তবুও চাই।
পরে যদি না মেলে।
সবার আগে লাইন দেওয়া চাই।
এ পরিস্থিতিতে নিজেরটা না বুঝে নেওয়াই বোকামি।
জিনিস পত্রের দাম বাড়ছে হু হু।
স্যানিটাইজার,মাক্স মিলছে না।
মিললেও দাম তিন চার গুন।
কিছু মানুষ এর মধ্যেও মুনাফাখোর হয়ে উঠেছে।
যখন করোনা সারা বিশ্ব সংসারকে চোখ রাঙাচ্ছে।
যখন সমগ্র মানুষ জাতিটাই বাঁচা আর মরার মধ্যে দুলচ্ছে পেন্ডুলামের মতো।
যখন আগামীটাই ঘোর অনিশ্চিত।
তখন বাড়তিটুকুর জন্য কি প্রানান্তকর চেষ্টা।
যদি ঝাড়েবংশে না থাকি তবে কার জন্য রেখে যাব লোক ঠকানো সম্পদ।
কেবল লোভ।
ঐ লোভটুকুর জন্যই প্রকৃতিকে, পরিবেশকে, প্রতিবেশিকে উপেক্ষা করেছে মানুষ।
নিজের আখের গুছিয়েছে শাইলকের মতো।
সোশালি ক্লোজ থেকেও থেকেছে একে অপরের থেকে আলোকবর্ষ দূরে।
হয়েছে চুড়ান্ত আনসোশাল।
আজ এই চুড়ান্ত বিপদের দিনে সোশাল ডিসট্যানসিং ই আমাদের সোশাল করে তুলবে- কি অদ্ভুৎ সমাপতন।
হয়তো। হয়তো কেন নিশ্চিত ভাবে ফাইন্যালি করোনাকে হারিয়ে জিতবেই মানুষ।
তারপর....
তারপর আবার লোভ...
আবার প্রকৃতিকে নিংড়ে নেওয়া।
আবার পরিবেশ প্রতিবেশিকে মাড়িয়ে এগিয়ে চলা।
এগিয়ে চলা অন্য কোন এক করোনার হাতছানির দিকে।

_______________________________________________________

 

৮)

শনিবার যখন ঘাটাল যাচ্ছিলাম তখনও জানা ছিল না লক ডাউন হয়ে যাবে ঘাটাল।
বাসে ভিড় ছিল বেজায়।
ভয় ছিল ভিড়ে।
কোথাও মিশে নেই তো করোনার বীজ।
সতর্ক হয়ে বারবার দেখছিলাম চারপাশ।
কেউ হাঁচল না তো।
কারো কাশি নেই তো।
কাউকে কি বাড়াবাড়ি রকমের অসুস্থ মনে হচ্ছে।
কাউকে এতটুকু সন্দেহ হলে....
ভিড়ের মধ্যেও তৎক্ষণাৎ খুঁজে নিতে হবে নিরাপদ ব্যবধান।
হ্যাঁ ভয়।
ভয় একটু একটু করে গিলে নিচ্ছিল অজগরের মতো।

ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ছেলে ছুটে এসেছিল জড়াতে,ব্যাগে কি আছে হাতেনাতে চাই তার..
না ছেলের জন্য কিছুই নিয়ে যাই নি।
বিপদ কোথায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে কে জানে!
নিজে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে দিয়েছিলাম আদর।
রাতে ঘুমানোর সময় ছেলের দিকে পেছন করে শুয়ে ছিলাম।
জড়ালো বাবদা।
বলল--
"আমার দিকে ঘুরে শোও না বাবা"।
আকস্মিকতায় ঘুরেও পড়লাম।
নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেল বাবদাকে।
ভয় পেয়ে গেলাম।
বাসে-ঘাটে কিছু বয়ে আনি নি তো!
দ্রুত সরিয়ে নিলাম নিজেকে।
বাথরুমের অজুহাতে সাময়িক ছাড়লাম বিছানা।

সকাল থেকে যুদ্ধ কালীন তৎপরতা।
দিন কুড়ির চাল-ডাল-আলু তুলে নিতে হবে।
সঙ্গে বেশ কিছু ডিম,মাখন,ঘি।
হোক চড়া তবুও চাই।
পরে যদি না মেলে।
সবার আগে লাইন দেওয়া চাই।
এ পরিস্থিতিতে নিজেরটা না বুঝে নেওয়াই বোকামি।
জিনিস পত্রের দাম বাড়ছে হু হু।
স্যানিটাইজার,মাক্স মিলছে না।
মিললেও দাম তিন চার গুন।
কিছু মানুষ এর মধ্যেও মুনাফাখোর হয়ে উঠেছে।
যখন করোনা সারা বিশ্ব সংসারকে চোখ রাঙাচ্ছে।
যখন সমগ্র মানুষ জাতিটাই বাঁচা আর মরার মধ্যে দুলচ্ছে পেন্ডুলামের মতো।
যখন আগামীটাই ঘোর অনিশ্চিত।
তখন বাড়তিটুকুর জন্য কি প্রানান্তকর চেষ্টা।
যদি ঝাড়েবংশে না থাকি তবে কার জন্য রেখে যাব লোক ঠকানো সম্পদ।
কেবল লোভ।
ঐ লোভটুকুর জন্যই প্রকৃতিকে, পরিবেশকে, প্রতিবেশিকে উপেক্ষা করেছে মানুষ।
নিজের আখের গুছিয়েছে শাইলকের মতো।
সোশালি ক্লোজ থেকেও থেকেছে একে অপরের থেকে আলোকবর্ষ দূরে।
হয়েছে চুড়ান্ত আনসোশাল।
আজ এই চুড়ান্ত বিপদের দিনে সোশাল ডিসট্যানসিং ই আমাদের সোশাল করে তুলবে- কি অদ্ভুৎ সমাপতন।
হয়তো। হয়তো কেন নিশ্চিত ভাবে ফাইন্যালি করোনাকে হারিয়ে জিতবেই মানুষ।
তারপর....
তারপর আবার লোভ...
আবার প্রকৃতিকে নিংড়ে নেওয়া।
আবার পরিবেশ প্রতিবেশিকে মাড়িয়ে এগিয়ে চলা।
এগিয়ে চলা অন্য কোন এক করোনার হাতছানির দিকে।

______________________________________________________

৯)

বিজ্ঞাপন

গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে উলঙ্গ--
পাতা সব ঝরে পড়েছে।
ঝরা পাতা পাক খাচ্ছে ঘুর্ণি হাওয়ায়।
হাওয়ায় পাতাগুলো সরে গেলে একটা পথ রেখা জেগে উঠে।
যতদূর অনুমান করা যায় সে পথ চলে গেছে গভীর জঙ্গলে।
শীর্ণ পথ রেখা ধরে তীব্র গতিতে এগিয়ে চলেছে জীপটা।
লোকটা জীপটাকে ছোটাচ্ছে উন্মত্ত গতিতে।
গতিই বলে দিচ্ছে লোকটা হাতের তালুর মতো চেনে জঙ্গলটাকে।
জঙ্গলের পথে নিখুঁত গাড়ি ছোটাচ্ছে সে।
জীপের মধ্যে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চিৎকার করছে বছর তেইশের তরুনী।
তার সেই আর্তনাদ জঙ্গলের বিষন্নতায় মিশে যাচ্ছে দ্রুত।
লোকটা এক হাতে স্টিয়ারিং সামলে অন্য হাতে ঘুষি মারছে মেয়েটিকে থেকেথেকে।
মেয়েটির আর্তনাদ আর জীপের ধাতব শব্দে ভয় পেয়ে ফড়ফড় উড়ে যাচ্ছে পাখ-পাখালি।

একটা সময় জীপটা দাঁড়াল ঝা চকচকে বাংলোর সামনে। লোকটা মেয়েটাকে কোল-পাঁজা করে নিয়ে গেল বাংলোর মধ্যে।
না বাংলোটা বাইরের দিক থেকে রংচঙে মনে হলেও ভেতরটা পোড়ো বাড়ির মতো-ভুতুড়ে।
লোকটা মেয়েটিকে ছুঁড়ে দিল বিছানায়।
নরম তুলতুলে বিছানায় গেঁথে গেল মেয়েটি।
সে ভয়ার্ত কন্ঠে আর্তনাদ করতে চাইল কিন্তু ততক্ষণে তার শরীরে সেই শক্তিটুকু অবশিষ্ট ছিল না।
সে কেবল লোকটাকে হাত জোড়ো করে রিকোয়েস্ট করে যাচ্ছিল....
লোকটা খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠল।
তার চোখে মুখে উন্মত্ত যৌন লালসা।
মুহুর্তে ঝাপিয়ে পড়ল মেয়েটির উপর।
লোকটার পাশবিক শক্তির কাছে নস্যাৎ হয়ে গেল মেয়েটির সব প্রতিরোধ।

এটা যে আসলে একটা বিজ্ঞাপন তা এতক্ষণ অনুমানই করতে পারে নি এনাক্ষী।
বিজনেস মিটিং সেরে তৃনাংশুর ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা হবে হয়তো।
তাই টিভি খুলে জেগে বসে ছিল এনাক্ষী।
চেনেল সার্ফ করতে করতে তার চোখ আটকে গিয়ে ছিল স্ক্রিনে।
টানটান হয়ে অপেক্ষা করছিল নায়কের জন্য।
এনাক্ষীর বিশ্বাস ছিল শেষ পর্যন্ত এক সুপুরুষ এসে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে মেয়েটিকে।
পুরুষ জাতির প্রতি মেয়েটির সমস্ত ঘৃনা ঘুঁচে যাবে সেই সুপুরুষের সান্নিধ্যে।
জিতে যাবে ভালবাসা।
না কোনো সুপুরুষ আসে নি।
আসলে সবটাই তো এ্যারেন্জ্ড।
বিজ্ঞাপনের বিষয়টাই তো ঐ হাত পা বাঁধা মেয়েটা।
মেয়েটা আসলে মেয়েই নয়, সিলিকনের তৈরি একটা সেক্স ডল।
একটা যৌন প্রোডাক্ট।
সবটাই প্রোগ্রামিং করা আগে থেকে।
ঐ চিৎকার, আর্তনাদ,হাত-পা বাঁধা অসহায়তা এ সবই আসলে আরোপিত।
নারী-পুরুষের আদি অকৃত্রিম সম্পর্কের মধ্যে প্রযুক্তি!
সেক্স ডলের ইউটিলিটি ফলাও করে বলা হচ্ছে বিজ্ঞাপনে।

কোনো রক্ত মাংসের মানুষ নয়,নেই কোনো ব্যাক্তিগত চাহিদা।,দায়বদ্ধতার দায় নেই অথচ মিটিয়ে দিচ্ছে যৌন প্রয়োজন-- চমকে গেল এনাক্ষী। বাজারে এ ধরণের প্রোডাক্ট পাওয়া যায় এ জানা ছিল না তার, তাও মাত্র পনেরো হাজারে!
বিজ্ঞাপনটা এনাক্ষীকে যতটা না অবাক করেছে চেয়ে ঢের বেশি অবাক হয়েছে সে তৃনাংশুর অজ্ঞতায়।
সারা বছর হিল্লি দিল্লি করে বেড়ায় অথচ এই খবরটুকু জানে না।
জানলে আজীবনের এই অসুস্থ দাম্পত্য বয়ে বেড়িয়ে, এনাক্ষীকে আর আত্মীয় পরিজনের কাছে 'মেড ফর ইচ আদার্স' এর মিথ্যে বিজ্ঞাপন দিতে হত না।

______________________________________________________

১০)

মেছোগ্রামের দিক থেকে যারা পাশকুড়ায় ট্রেন ধরেন তারা প্রায়শই কনকপুর মোড়ে বাস থেকে নেমে পড়েন।
বাসের হেল্পার বা কন্ডাকটররাই বলে দেন নেমে পড়তে।
না নামলে সামনের রেলগেটে গাড়ি ধরা পড়ে রেলগাড়ি ফস্কে যাওয়ার সম্ভাবনা সতেরো আনা।
কনকপুরে না নেমে রেল গেটে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেন হারিয়েছি অনেক বার।

কনকপুরে নেমে বামদিক ডানদিন দেখতে দেখতে এগিয়ে চলা লোকজন রেল লাইন টপকে দু ভাগে ভাগ হয়ে যায়।