এপ্রিল ২০২০

প্রচ্ছদঃ সুরজিৎ সিনহা, হলদিয়া 

প্রবন্ধ

কবিতা

 

নাট্য-আলোচনা

অভিনেতা: রূপম ভট্টাচার্য্য

কৃতজ্ঞতা

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

ভাবানুবাদ

গল্প

 

শয়তানের

হাসি

সুশোভন দাস

অল্টো ইউনিভার্সিটি, ফিনল্যান্ড

ঝোরে বৃষ্টি ঝরছে বাইরে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া শহরটাকে যেন মাটিতে মিশিয়ে ফেলতে চায়। আজ সন্ধ্যা থেকেই প্রকৃতি রুষ্ট হয়েছিল। যত রাত বাড়ছে সেই রাগের অগ্নিকুণ্ডে কে যেন আরো বেশি করে আহুতি দিচ্ছে। বিশ তলার উপর থেকে নীচে তাকালে মনে হচ্ছে গোটা শহরটা যেন এক ঘন মেঘের চাদরে ঢাকা পড়েছে। স্ট্রিট ল্যাম্প থেকে কয়েকটা আলোক ধারা সেই মেঘের বুক চিরে বেরিয়ে আসার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রকৃতি যেন আজ তাদেরকেও নিষ্প্রভ করে দিতে চায়। এমন ভয়াবহ দূর্যোগ এর আগে কখনো হয়েছে বলে মনে পড়ে না। বিছানার পায়ের দিকের জানলাটা খুলে গেছে দমকা হাওয়ায়। বৃষ্টির ঝাপটায় জানলার পর্দাটা একেবারে ভিজে এক পাশে ঝুলছে। ভেজা পর্দা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল মেঝেতে পড়ে একটা সরু জলধারা সৃষ্টি করে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেছে। ঝড়ের দাপটে বৃষ্টির ঝাপটা বেশ কয়েকবার আমার বিছানা পর্যন্ত ছুটে আসে। কিছুটা আগেই ঘুম ভেঙেছে তবু উঠে জানলাটা বন্ধ না করে বিছানায় শুয়ে রইলাম। প্রকৃতির এই রুদ্র রূপ মনের ভিতর একটা চাপা আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও বিছানায় শুয়ে শুয়ে জানলা দিয়ে তা দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল। কিন্তু মনে করতে পারলাম না কাল রাতে ঘুমানোর আগে জানলাটা বন্ধ করেছিলাম না এমন খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন রাত ক'টা বাজে সেটাও ঠিক আন্দাজ করতে পারলাম না। টেবিলের উপর রাখা মোবাইলের নোটিফিকেশন লাইটটা পর্যায়ক্রমে জ্বলছে ও নিভছে। সেই ক্ষীণ আলো ঘরের নিকষ অন্ধকারের সাথে অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। দমকা হওয়াটা যেন হঠাৎ করেই থেমে গেল। ঝমঝম করে অবিরত বৃষ্টির শব্দের মাঝে ঘরের দেওয়াল ঘড়িটার টিক টিক শব্দ হঠাৎ করেই বেশ জোরে শোনা যাচ্ছে। এমনকি জালনার পর্দা থেকে মেঝেতে পড়া জলের ফোঁটার শব্দও পরিষ্কার কানে ভেসে আসছে। জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারটা ঘরের মধ্যের অন্ধকারের মতো এতো গাঢ় মনে হল না। হালকা ফ্যাকাশে ভাব একটা আছে সেখানে। কিন্তু তাতে রাস্তার উল্টোদিকের বাড়ি দেখতে পাওয়া যায় না। উল্টো দিকের বাড়ির ছাদের আলোটা দু-একবার জ্বলা-নেভা করে শেষমেশ জ্বলে উঠল। সাথে সাথে এক রাশ আলো আমার ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। একটু বিরক্তি লাগল। এমন নিবিড় অন্ধকার রাতে প্রকৃতির ভিন্ন রূপ দেখায় হঠাৎ বাধা পড়ল। নিজের মনেই বললাম - ''বাধা যখন পড়েছে তখন জানলা বন্ধ করে ভালো করে ঘুমানো যাক বাকি রাতটুকু।''
বিছানা ছেড়ে উঠতেই মাথাটা হালকা ঘুরে আবার বিছানায় বসে পড়লাম। নাঃ। নেশাটা এখনো মাথা থেকে নামেনি।  নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বিছানা ধরে ধরে জানলার কাছে এলাম। জানলার পাল্লা দুটো বন্ধ করতে যাব ঠিক তখনি উল্টোদিকের বাড়ির ছাদে এক জন এসে দাঁড়ায় ঠিক একটু আগে জ্বলে ওঠা আলোটার নীচে। উল্টোদিকের বাড়িটাও বিশ তলা। কিন্তু আমার বিল্ডিং থেকে প্রায়  মিটার পঞ্চাশ দূরে। মাঝে রয়েছে তিনটে হাইওয়ে। বৃষ্টির মাঝে ল্যাম্পের আলোয় তার মুখ বোঝা যাচ্ছে না। পরনে সাদা শার্ট আর জিন্স। বৃষ্টিতে ভিজে জামাটা একেবারে আটকে আছে শরীরের সাথে। রোগা চেহারার অবয়ব ফুটে উঠেছে আলো-অন্ধকারের মাঝে। অনেকটা আমারই মতো কিন্তু নারী না পুরুষ সেটা বুঝতে পারলাম না। খুব চেনা চেনা লাগছে কিন্তু নিশ্চিতভাবে কিছু বুঝলাম না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম সেইদিকে। কিছু ভেবে পেলাম না কি কারণে এতো রাতে একা একা সে ছাদে এসে বৃষ্টিতে ভিজছে। আমি তাকে হাত নেড়ে কিছু বলতে যাব এমন সময় সে ল্যাম্পপোস্টের সাহায্যে ছাদের রেলিং-এর উপর উঠে দাঁড়াল। আমি এক মুহূর্তের জন্য আঁতকে উঠলাম। পরক্ষণেই বিদ্যুতের মতো আমার মনে পড়ে গেল তনিমার কথা। গত সন্ধ্যায় আমরা দুজনে এক ড্রেস পড়ে পার্টিতে গিয়েছিলাম।
তনিমার সাথে আমার সম্পর্ক গত পাঁচ বছর ধরে। যদিও আমরা ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে চিনতাম। আমরা যখন সাত বছর বয়স তখন তনিমার বাবা বদলি হয়ে আমাদের এলাকায় আসেন সাব-ইন্সপেক্টর হিসাবে। স্কুল যাওয়া, খেলাধুলা করা, সাঁতার শেখা -সব কিছু একসাথেই করতাম। পড়াশুনায় ভালো ছিলাম বলে কাকু-কাকিমা আমায় বেশ পছন্দ করত। স্কুলের পর প্রায় প্রতিদিনই তনিমাদের বাড়ি আসতাম। এমনকি মাঝে মাঝে আমি তনিমার সাথে খেলতে খেলতে ওদের বাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়তাম। তারপর কখন মা-বাবা আমাকে বাড়ি নিয়ে আসতো আমি টেরও পেতাম না। কিন্তু এমন ভালো দিন খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হল না। বছর চারেক পর কাকু আবার বদলি হয়ে অন্য জায়গায় চলে যান। তারপর অনেক বছর তনিমার সাথে খুব একটা যোগাযোগ ছিল না। বাবা মাঝে মাঝে কাকুকে ফোনে করলে তখন দুয়েকটা কথা হত তার সাথে। ক্লাস টুয়েলভের পর সৌভাগ্যবশত: দুজনে একই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হলাম। তনিমার ছিল আই-টি আর আমার কম্পিউটার সায়েন্স। বাড়ি থেকে কলেজ অনেক দূর। তাই আমাকে হোস্টেলে থাকতে হল। তনিমা কিন্তু রোজ যাতায়াত করতো। কাকু-কাকিমার স্নেহভাজন হওয়ায় ছুটির দিনে মাঝে মাঝে আমায় বাড়ি ডেকে পাঠাতেন। হোস্টেলের একঘেঁয়ে খাবারের মাঝে বাড়ির রান্না অগ্রাহ্য করার দুঃসাহস আমার ছিল না।  শনি-রবিবারগুলো নিজের বাড়ি না ফিরলে হয় তনিমাদের বাড়ি না হলে শহর থেকে কিছুটা দূরে খামখেয়ালি ঘুরে বেড়ানোই ছিল আমার ছুটি কাটানোর উপায়। বাইরে ঘুরতে গেলে তনিমা বেশিরভাগ দিনই যোগ দিত তবে অনেক কাঠ-খড় পোড়ানোর পর। তবে আমার এমন খামখেয়ালি ঘুরে বেড়ানোর জন্য মাঝে মাঝে খুব রাগ করতো আমার উপর। দিন তিন-চার আমার সাথে কথাই বলত না তখন। এমন ভাবেই কলেজের দিনগুলো কেটে গিয়েছিল। এরপর এলো চাকরী পাওয়ার তোড়জোড়। পড়াশুনাতে দুজনেই ভালো ছিলাম তাই ক্যাম্পাসিং-এ প্রথম কোম্পানিতেই দুজনের চাকরী হয়ে গেল। দেখতে গেলে মাথার উপর থেকে বিশাল বড় একটা চাপ এক নিমেষে উবে গেল। চাকরী পাওয়ার পর শেষ ছয়টা মাস খুব আনন্দ করেই কেটে গেল। কলেজ ছাড়ার একেবারে শেষ প্রান্তে এসে তনিমার প্রতি আমার অনুভূতির কথা জানাই। আমার অনুভূতির কথায় চোখে জল এনে বুকে জড়িয়ে একসাথে পথ চলার কথা জানায়। কিন্তু তার আগে এতো দিন পর নিজের মনের কথা জানানোর জন্য আমার গালে তার ভালোবাসার পাঁচ আঙুলের ছাপ এঁকে দিল। সেদিন বুঝেছিলাম প্রেম কাঁঠালের আঠা হলেও প্রেম নিবেদন আসলে শাঁখের করাত। 
কলেজ ছাড়ার দু-মাসের মধ্যে আমাদের চাকরীতে ঢুকতে হল। পোস্টিং এক জায়গায় হলেও এবার দুজনকেই ছাড়তে হল নিজেদের শহর। অন্য শহরে এসে দুজনে একসাথেই থাকতে শুরু করলাম। দুজনের বাড়ি থেকে আমাদের সম্পর্কের কথা শুনে খুবই খুশি, তাই বিয়ে নিয়ে কারোর বাড়ি থেকেই কিছু চাপ ছিল না। একসাথে ভালো কাজের সুবাদে দুজনেরই ভালো প্রোমোশন হতে থাকে। প্রতিটা প্রোমোশনের সাথে সাথে আমাদের ফ্ল্যাটের ফ্লোরও উপরে উঠতে থাকে। উপর থেকে শহর দেখার ইচ্ছা তনিমার অনেকদিনের। তাই দেখতে দেখতে আমার এই বিশ তলা বিল্ডিঙের একেবারে উপরে উঠে এলাম। কর্ম ব্যস্ততার মাঝে সময় যে কিভাবে পেরিয়ে যায় তা বোঝার উপায় থাকে না। যদিও দুজনে একসাথে থাকি, একই অফিসের একই প্রজেক্টে কাজ করছি, সব সময়ই দুজন দুজনের মুখ দেখছি কিন্তু কোথাও যেন এই দেখা-দেখির মাঝে দেখেও না দেখার একটা অবজ্ঞা ভাব অদৃশ্যভাবে আমাদের মাঝে ফুটে উঠেছে।

উপরে ওঠার ইচ্ছাটা কখন যে রক্তে মিশে গিয়েছিল তা নিজেরাও টের পাই নি। বস্তুগত চাহিদাগুলো এতটাই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল যে ব্যক্তিগত সুখ বস্তু ছাড়া অধরা মনে হতে লাগল। সামনের মানুষটা, যে একটা সময় গোটা মন জুড়ে আধিপত্য চালিয়েছে, বস্তুগত চাহিদার করাল গ্রাসে সেই সাম্রাজ্য প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের দৌলতে একটা পোশাকি ভালোবাসা আমাদের দুজনেকে একটা আলগা সুতোর বাঁধনে বেঁধে রেখে ছিল। অন্তঃসার শূন্য হয়ে যাওয়া একটা সম্পর্ক যেখানে ঠুনকো আঘাতে চুরমার হয়ে যেতে পারে সেখানে পোশাকি ভালোবাসার ভার দিনে দিনে এক অসহনীয় বেদনার উদ্রেক শুরু করে। কিন্তু যতদিনে তা বুঝলাম তখন আমরা নিজেরাই নিজেদের উপর অধীনতা হারিয়ে ফেলেছি। ফিরে যাওয়ার সব রাস্তাই তখন এতটাই সংকীর্ণ ও দুর্গম যে নিজেদের ক্ষত-বিক্ষত করে সে পথের পথিক হওয়ার সাহস বা মানসিকতা কোনটাই এলো না। তাই পোশাকি ভালোবাসার মায়াবী ছায়ায় মনকে ভুলিয়ে একই ছাদের নীচে দুজনে দুজনের মতো আলাদা দুটো পৃথিবী গড়ে নিলাম। কিন্তু যেদিন পোশাকি ভালোবাসাটুকুও খসে পড়বে সেদিন কিভাবে, তার আতঙ্ক দুজনের ভিতরেই জমাট বেঁধেছে। গত বুধবার তনিমার জন্মদিন গেছে কিন্তু সপ্তাহের মাঝে বলে সেলিব্রেশন পার্টি শুক্রবার রাতেই রাখা হল। সকাল থেকে একটা আনন্দ - উত্তেজনার ঝলক তার চেহারায় ফুটে উঠেছে। এতটা প্রাণোচ্ছলতা তনিমার মধ্যে অনেকদিন দেখি নি। তাই তার উৎফুল্ল মনের জলতরঙ্গ ভাবনার শরিক হয়ে গেলাম। ঠিক

হল আজ একই পোশাক পরে অফিস করব তারপর পার্টি। তনিমার পছন্দ অনুযায়ী সাদা শার্ট আর গাঢ় নীল জিন্স তার উপর কোট। অফিসে ঢোকার সাথে সাথে দুজনের এক পোশাক দেখে সবাই খুব তারিফ করল, অনেকে 'মানিকজোড়' বলে আখ্যাও দিল। সন্ধ্যায় অফিস কলিগদের নিয়ে কেক কাটার মধ্যে দিয়ে শুরু হল আমাদের পার্টি। তারপর অফিস থেকে বেরিয়ে নাইট ক্লাবে জমে উঠল আসর। ইদানিং বিলাতি মদ সহ নারী সঙ্গ যেন এই পার্টিগুলোর এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। একটার পর একটা মদের গ্লাস খালি করতে লাগলাম। কোনও হিসাব ছিল না আজ, ছিল না কোনও মাত্রা জ্ঞানের বাধ্যতা। নেশাগ্রস্থ চোখে লাস্যময়ী নারীদের নৃত্য কিছু অতৃপ্ত বাসনাকে হঠাৎ করেই উদ্দীপিত করে তোলে। তাদের কটিদেশ থেকে খামখেয়ালি তরঙ্গায়িত উত্তেজনা গ্রীবা স্পর্শ করে তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠে রূপান্তরিত অদম্য আবেদনকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার মধ্যে ছিল না। ছুটে গিয়েছিলাম সেই আবেদনের ডাকে, ছুঁতে চেয়েছিলাম সেই তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠ, মেটাতে চেয়েছিলাম অতৃপ্ত বাসনার একাংশ। বাসনার সাগরে একটু একটু করে ডুব দিতে দিতে চোখে ভেসে উঠল তনিমার মুখ। আলো-আঁধারের ঘেরা একরাশ ধোঁয়ার মাঝে তার ঠোঁটও খুঁজে নিয়েছিল অন্য এক আশ্রয়। সময় যেন থমকে গেছে তার নিমীলিত নয়নে। স্বপ্ন পূরণ হওয়ার এক আশার আলোক ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখে। আমার পৃথিবী হঠাৎ করে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে তনিমাকে দেখে। এক-ধাক্কায় আমার নেশাগ্রস্থ অবস্থার অবসান হল। দৌড়ে এলাম তনিমার কাছে। নিজেকে সামলাতে না পেরে এক মুষ্টি ছুঁড়ে দিলাম ছেলেটার উদ্দেশ্যে। আচমকা আমার আক্রমণের প্রত্যুত্তরে তনিমা আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল। এমন প্রতিঘাত আমি কল্পনাতেও ভাবিনি। মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বুঝলাম নেশার ঘোর আবার মাথায় চেপে বসেছে। কিছু কোলাহল আর উৎসুক চোখ আমাকে ঘিরে রইল কিছুক্ষণ। সেই উৎসুক চোখগুলোর মাঝে তনিমার ঘৃণা ভরা চোখ যেন আমাকে সমূলে উৎখাত করতে চায়। নীরবে বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপে আমি ক্লাব ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। বুঝলাম, পোশাকি ভালোবাসাটুকুও আজ খসে গেছে। বাইরের আকাশে তখন দুর্যোগের ঘনঘটা। বৃষ্টির মাঝেই রাস্তার ধারে বসে পড়লাম কিছুটা শান্তির আশায়। মনে মনে ভাবলাম - ভিতর থেকে তনিমাকে নিয়ে আসি। আবার হয়তো নতুন করে শুরু করি। কিন্তু তনিমাও কি তা চায়? আজ সে ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দিয়েছে। হয়তো অনেকদিন আগেই মন থেকে মুছে ফেলেছে। তবু কি যায় না অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া ডাইরির পাতাগুলোকে সযত্নে রেখে তাতে নতুন কালিতে পুরানো গল্পকে পুনর্জীবন দেওয়া? হঠাৎ করে একেবারে একলা হয়ে যাওয়ার অনুভূতি বাস্তবের সাথে নিজের মিল ও অমিলগুলোকে আরও স্বচ্ছ করে তোলে। স্ট্রিটল্যাম্পগুলোও সব একা একা দাঁড়িয়ে আছে। একের আলো অন্যের সাথে কথা বলে না। শুধু দেখে আর নিজের জায়গায় স্থির থাকে নিজের মতন করে। হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কত রাত হয়েছে। কিন্তু ঝাপসা চোখে সেটাও বুঝতে পারলাম না। কড় কড় শব্দ করে আকাশের বুক চিরে নেমে এলো এক বিদ্যুতের ঝলক। ক্লাবের গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি ফেরার জন্য। ফেরার পথে অনেক অন্য কথা ভাবার চেষ্টা করলাম কিন্তু মাথা থেকে তনিমার আবেগে ভেসে যাওয়া আর ঘৃণা ভরা দৃষ্টি কিছুতেই সরাতে পারলাম না। নেশার প্রভাব অনেকটা কমে গেলেও মাথার মধ্যে এক ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা সারা শরীরকে অবশ করে দিচ্ছে। যন্ত্রণার প্রকোপ আরো প্রবল হচ্ছে যখনি তনিমার কথা মনে পড়ছে। কখন কিভাবে নিজের ফ্ল্যাটে এসেছি আর কিভাবে বিশ তলায় নিজের রুমে এসে বিছানা নিয়েছি তা আর কিছু মনে নেই।    
জানলার বাইরে মুখ বাড়িয়ে তনিমার নাম ধরে আমি চিৎকার করে উঠলাম। প্রাণপণে দু-হাত নাড়িয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যে আদৌ কি সে আমায় দেখতে পাবে? সঙ্গে সঙ্গে মাথায় এলো মোবাইলের আলো দেখলে হয়তো সে বুঝতে পারবে। ঝুঁকে পড়লাম টেবিলের উপর মোবাইলটা নেওয়ার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে সেটা অফ হয়ে গেছে। হাতের সামনে কিছু না পেয়ে বাধ্য হয়ে আরো জোরে চিৎকার করতে লাগলাম। কিন্তু হঠাৎ মনে হল আমার চিৎকার আমি নিজেই শুনতে পাচ্ছি না। খুব অবাক লাগল নিজেকে। সন্দেহ হল নিজের উপর - তবে কি আমি স্বপ্ন দেখছি ? কিন্তু না। স্বপ্নই যদি হবে তাহলে এমন জানলার সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে যেতাম না। জানলা থেকে শরীরের প্রায় অর্ধেকটা বের করে দু-হাত ছুঁড়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলাম। একটা সময় মনে হল সে যেন আমাকে দেখতে পেয়েছে। এক নির্মল হাসি ফুটে উঠেছে তার ঠোঁটে। এতো দূর থেকে হাসির স্পষ্ট অনুভূতি যেন নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। তার ডান হাত কনুই থেকে উপরে উঠে এলো। আমার দিকে তাকিয়ে অল্প অল্প করে সে হাত নাড়াতে লাগল। মন্ত্র মুগ্ধের মতো আমার ডান হাতও উঠে এলো। আমিও তার দিকে হাত নাড়িয়ে সারা দিলাম। তারপর দু-হাত ছড়িয়ে বৃষ্টিকে বুকে নিয়ে সে মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল। একটা জোরালো বিদ্যুতের ঝলক কালো মেঘের বুক চিরে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে ক্ষণিকের জন্য সমস্ত অন্ধকারকে দূর করে দিল। সেই  তীব্র চোখ ধাঁধানো আলোর সামনে আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। চোখ খোলার আগেই ভেসে এলো এক কর্ণ বিদারী বজ্রপাতের শব্দ। কানে হাত চাপা দিয়ে  আমি জানলার ধরে বসে পড়লাম। শব্দ থামতে উঠে দাঁড়িয়ে আর কিছুই দেখতে পেলাম না। ছাদের আলোটা আবার নিভে গেছে। আমার ঘরটা আবার নিকষ অন্ধকারে ডুবে গেছে। মনে মনে ভাবলাম - ছাদে যে ছিল সে কি তনিমা নাকি অন্য কেউ? কেন এসেছিল ছাদে কোথায় গেল? কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের কোলাহলে মাথার যন্ত্রণাটা আবার ফিরে এলো। মাথায় হাত দিয়ে বুঝলাম মাথার পিছনের দিকটায় খুব ব্যথা। কোথাও হয়তো খুব জোরে ধাক্কা খেয়েছি বা মেঝেতে পরে যাওয়ার সময় হয়তো লেগেছে। অন্ধকারের মাঝে মাথা ধরে কোনও রকমে বিছানায় এসে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।  
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই জানালার বাইরে চোখ গেল। বৃষ্টি থেমে গেছে কিন্তু মেঘলা হয়ে আছে। রাতের ঘটনাটা মনে পড়তেই রুম থেকে  বেরিয়ে সামনের ফ্ল্যাটে যাওয়ার জন্য দৌড় দিলাম। রাস্তাঘাটে লোকজন বিশেষ নেই। সারা রাত তনিমার কোনও খবর নেই তাই তাড়াতাড়ি করে একটা বুথ দেখে তনিমার নম্বরে ফোন করল। রিং হয়ে কেটে গেল কিন্তু কেউ ফোন তুললো না। রাতের ঘটনা মনের মধ্যে যেন একটু একটু করে সত্যি হতে লাগল। তাড়াতাড়ি রাস্তা পেরিয়ে সামনের ফ্ল্যাটে এসে কোনও কোলাহল বা মানুষের জটলা না দেখে খুব আস্বস্থ হলাম। তাহলে তনিমার কিছু হয় নি। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে ভাবতে মনে হল- তনিমার এই বিল্ডিংয়ে আসার কোনও কারণ থাকতে পারে না। তাহলে কাল রাতে যাকে ছাদের উপর দেখেছি সেটা পুরোটাই কি একটা ভ্রম? আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে নিজের বিলিডংয়ের সামনে আসতেই একটা ছোট্ট জটলা চোখে পড়ল। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় এই দিকটা লক্ষ্য করিনি। আমি এগিয়ে গেলাম সেই দিকে। এক অজানা আতঙ্ক আমায় ঘিরে ধরল। বৃষ্টি ভেজা শহরের স্যাঁতসেঁতে গন্ধে মাথার ব্যথাটা আবার জেগে উঠল। যত এগিয়ে গেলাম সেই ভিড়ের দিকে মাথার যন্ত্রণা যেন তত বেশি তীব্র হতে লাগল। দু-হাত দিয়ে নিজের মাথাটা চেপে ধরে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। কিছু লোক সেইদিক থেকে সরে আসছে আবার কিছু লোক সেখানে জড়ো হচ্ছে। কিন্তু কেউ আমায় লক্ষ্যও করছে না। দু-একজনের চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর পর তাদের মুখের ভাব দেখে মনে হল তারা যেন কেউ আমায় দেখতেই পাচ্ছে না। আমি এগিয়ে গেলাম আরো একটু। কিছু শুনে বোঝার চেষ্টা করলাম কিন্তু কিছুই শুনতে পেলাম না। এতোগুলো লোক জড়ো হয়েছে অথচ সবাই নীরব- এটাও কি সম্ভব? আমি সাহস ভরে ভিড় ঠেলে একেবারে সামনে এসে দাঁড়ালাম। নীল জিন্স আর সাদা শার্ট পড়া এক মানুষের সেখানে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আর প্রচন্ড আঘাতে তার মাথার পিছনের দিক থেঁতলে গিয়ে একটা রক্তের ধারা বৃষ্টির জলের সাথে মিশে অনেকটা দূর পর্যন্ত লাল দাগ কেটে গেছে। লোকটার মুখের উপর চোখ পড়তেই আমি আঁতকে উঠে দু-পা পিছিয়ে এলাম। শুয়ে থাকা মানুষটা আর কেউ নয় আমি নিজে। মাথার ভিতরের যন্ত্রণাটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। কিছু ভাবার আগেই সামনের জানলার কাঁচে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাতে দেখতে পেলাম আমার প্রতিচ্ছবি কাল রাতের মতো আমার দিকে তাকিয়ে ডান হাত নাড়াচ্ছে সাথে তার ঠোঁটে লেগে আছে এক অপার্থিব শান্তির  নির্মল হাসি।  

Comments

Top

গল্প

 

ইসমাইল 

অপর্ণা চক্রবর্তী

টালিগঞ্জ, কলকাতা 

সেই ছোট থেকে রিকশা চালায় ইসমাইল। তখন তার বার কি তের বছর বয়স। মধ‍্যবয়সে এসেও- সে রিকশাওয়ালা। এক বগ্গা ঘোড়ার মতো তেজী ইসমাইলের রিকশা। চেন-চাকা-প‍্যাডেল-সিট সব কিছু ঝকঝক করছে। একঘেঁয়ে প‍্যাকপ‍্যাক হর্নটাও একটা বিশেষ তালে বাজায় সে। রিকশাটা তার নিজের নয়। মালিককে রোজ রিকশা বাবদ পঞ্চাশ টাকা ভাড়া গুনতে হয়। 

রোজ সকালে আজান সেরে, রিকশা নিয়ে স্ট‍্যান্ডে আসে ইসমাইল। সিটের পিছনে অ‍্যালুমিনিয়াম পাতের ওপর  ফুলকারি  নকশায় নাম লেখা "চেতক"। তেল ঘষা স্টিলের চাকায় সকালের আলো পড়ে, চকচক করে ওঠে।
জুতো বিহীন চওড়া পা- প‍্যাডেলে চাপ ফেললেই, চেতকের শরীরে প্রাণ সঞ্চার হয়। চালকের আসন থেকে ইসমাইলের কোমর উঠে যায়। ডান পা- বাঁ-পায়ের অবিরত ঘূর্ণনে, চেতকের গতি ক্রমে বাড়তে থাকে। 
বড় রাস্তায় - ব্রীজের ঢাল থেকে নামার সময় - দু'হাতে হাতল চেপে ধরে, প‍্যাডেলের ওপর দু'পায়ে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ে ইসমাইল। তীরের বেগে ঢাল বেয়ে রিকশা আপনি নামতে থাকে। চেন -চাকা- টায়ারের অবিরত ঘর্ষণ পিচের রাস্তায়- খ‍্যাস্-খ‍্যাসে একটা যান্ত্রিক শব্দ তৈরী হয়। দ্রুত গতির জন্য - ইসমাইলের চুল হাওয়ায় উড়তে থাকে; তখন তাকে ঠিক চেতকের পিঠে সওয়ার রাণা প্রতাপের মতোই মনে হয়। 

এই সময়- পিছনে সিটে বসে, তার আব্বুকে অবাক হয়ে দেখে মোমিনা। গতির সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য রাখতে - প্রাণপণে নিজেকে চেপে বসিয়ে রাখে আসনে। ছাউনির শিকগুলো ছোট্টো হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। তবু একবারও বলে না ----- আব্বুউউউ আস্তে চলো।-----
পড়ন্ত বিকেলের হলুদ আলোয় আব্বুকে দেখতে বড় ভালো লাগে মোমিনার। তার আব্বুর তেলহীন - রুক্ষ - উড়ন্ত  চুল দেখলে বুকের মধ্যে কিসের একটা অচেনা কষ্ট জমা হয়! ঠিক বুঝতে পারে না মেয়েটা, কেন এমন হয়!

ঈদের​ দিন বড় পীরের দরগায় নামাজ পড়া হয়ে গেলে, বাপ মেয়েতে বেরিয়ে পড়ে চেতক কে সঙ্গে নিয়ে। মসজিদের​ মাঠে আজ ঘুড়ির প‍্যাঁচে লড়াই হবে। দু'চোখে রোদ আড়াল করে, আকাশে উড়ন্ত লাল নীল হলুদ সবুজ গোলাপী রঙ দেখবে মেয়েটা। আর বাবা দেখবে তার মেয়ের মুখে পরীর হাসি। আজ, ইসমাইলের 'জন্নত' নেমে আসবে মসজিদের​ মাঠে। সেই কোন ছেলেবেলায় রুজি রোজগারের পথে নেমেছে ইসমাইল। যে বয়সে তার মাঠে ঘাটে ছুটে বেড়ানোর কথা, সেই বয়স থেকে সে রিকশা ছুটিয়েছে। ছোট ছোট আহ্লাদগুলো তুচ্ছ করে, উড়িয়ে দিয়েছে অনায়াসে। কিন্তু, ঘুড়ি আর ওড়ানো হয়নি কোনদিন। ইসমাইল ঘুড়ি ওড়াতে শেখেনি।

মোমিনার খুব ইচ্ছা হয়, তার আব্বুও বড় মসজিদের মাঠে সবার সাথে ঘুড়ি উড়াক। এবার ঈদে মেয়ের ইচ্ছা মত ঘুড়ি- লাইট - মাঞ্জা - সুতো সবকিছু কেনা হলো। সুতোয় বাঁধা ঘুড়ির দুই প্রান্ত ধরে, মাথার ওপর ঘষে চেত্তা দিল মোমিনা। তারপর হুশ করে যতটা সম্ভব উঁচুতে উড়িয়ে দিল ঘুড়িটাকে। অনধিকে ইসমাইল আপ্রাণ চেষ্টায় সুতোয় এলোমেলো টান দিচ্ছে। হাওয়ার সঙ্গে কিছুতেই ঘুড়ির তাল মেলাতে পারছে না। বারবার মাটিতে মুখ থুবড়ে গোত্তা খাচ্ছে ঘুড়ি। একবার - দুবার - আরও অনেকবারের প্রচেষ্টাতেও ঘুড়ি বাতাস কেটে আকাশে উড়ল না। 

ব‍্যর্থ হয়ে, চল্লিশোর্ধ ইসমাইল শিশুর মতো অবোধ অসহায় হাসি হাসি মুখ করে, মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। আব্বুর এই অসহায় মুখ দেখলেই সেই অচেনা কষ্টটা আবার বুকের মধ্যে টের পায় মোমিনা। মনে হয় যেন - আব্বুকে সে অনেক দিন দেখতে পাবে না। আব্বু দূরে কোথাও চলে যাবে।
ঘুড়ি ওড়ানোর ব‍্যর্থ প্রচেষ্টার পর, মেয়ের দিকে তাকিয়ে ইসমাইল দেখল -- মা মরা মেয়েটা কেমন দু্ঃখী আনমনা হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তখন হঠাৎই - লাটাইটাকে দু'হাতে আঁকড়ে, মাথার ওপর তুলে বনবন দৌড়াতে লাগল সে। লাটাইয়ের সুতোয় বাঁধা ঘুড়িটা ফরফর করে উড়তে শুরু করল। হাওয়া কেটে কেটে সারা মাঠ দৌড়াচ্ছে ইসমাইল। ঘামে ভিজে-  জামাটা লেপ্টে যাচ্ছে রোগা শরীরে, বুকের ভিতরে নিঃশ্বাসের হাপর পড়ছে। আর ঘুড়িটা যেন ওকে তাড়া করে করে উড়ছে মাথার পিছনে।

হঠাৎ, আব্বুর এমন কান্ড দেখে, অবাক হল মোমিনা। হাসিও পেল। আব্বু বুড়ো হয়ে যাবে, তবুও ঘুড়ি আর ওড়াতে শিখবে না!! নিজের থেকে আব্বুকে কমবয়সী লাগে মাঝে মাঝে। মা চলে যাবার পর, তাকে ভোলাতে, মাঝে মাঝেই এমনি সব কান্ড করে তার আব্বু। সব বোঝে সে। ছোট থেকেই মেয়েটা রুগ্ন। জ্বরটা কিছু দিন পর পর ঘুরে ফিরে আসে। মা মারা যাওয়ার পর মেয়েটাও আনমনা থাকে খুব। জ্বরের ঘোরে মাকে কাছে ডাকে। মা ভেবে কতবার আব্বুকেই ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে!

জ্বরের তাপে মেয়ের মুখটা লাল হয়ে থাকে। বন্ধ চোখের পাতা দুটো কাঁপে। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে, সাদা দাঁতগুলো অল্প দেখা যায়। মোমিনাকে বড় সুন্দর দেখতে লাগে এই সময়। ইসমাইল তাকিয়ে থাকে মেয়ের মুখের দিকে। ভয় লাগে আজকাল। জ্বর হলেই মেয়েটা এতো সুন্দর হয়ে যায় কেন! এই রূপ সে দেখতে চায়না। এই মুখ তার ভালো লাগে না। জ্বর ছাড়ার পর মেয়ের ওই শীর্ণ ক্লান্ত মুখটা দেখার জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে ইসমাইল। 

জ্বরের সময় চোখের সামনে আম্মুর জংলা ছাপা শাড়ির আঁচল দেখতে পায় মোমিনা। একটানা চুড়ির আওয়াজ ভেসে আসে কানে। আব্বুর ঘামে ভেজা মুখ, চেতকের সিটে

বসা আবছা নিজেকেও দেখেছে অনেকবার। কিন্তু, কোন রাস্তা ধরে যে তার আব্বু তাকে সওয়ারি করে নিয়ে যায়, ঘোরের মধ্যে ঠিক চিনতে পারে না। আর একটা স্বপ্ন দেখে মোমিনা -- আব্বুর ঘুড়িটা উড়তে চাইছে। ছটফট করছে সুতো ছিঁড়ে ফেলার জন্য। কিন্তু আব্বু কিছুতেই সুতোয় ঢিলা দিচ্ছে না। আব্বু লাটাই বুকে চেপে দৌড়চ্ছে।  লাটাই ছেড়ে দিলেই সব সুতো নিয়ে ঘুড়ি একা একা উড়ে যাবে এক্ষুনি।

সন্ধ‍্যার আজান সেরে এসে ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে দিল ইসমাইল। হলদে বাল্বের ম্লান আলো ছড়িয়ে আছে তার দৈন‍্য সংসারে। তেলচিটে বিছানার একপাশে কুঁকড়ে শুয়ে আছে মেয়েটা। দু'দিন চোখ খোলে নি। এবারের জ্বরটা কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। মেয়ের শীর্ণ, দূর্বল চেহারার দিকে তাকাতে পারে না ইসমাইল। কোন ওষুধই ঠিক মতো কাজ করছে না। সদর হাসপাতালে ডাক্তার বাবুর ওষুধেও জ্বর নামছে না ঠিক মতো। মেয়ের গায়ে চাদর টা টেনে দিয়ে, মাথার কাছে বসল ইসমাইল। আজ সারারাত সে দোয়া পাঠ করবে, পরম করুনাময়ের এর কাছে।

বন্ধ চোখের সামনে হলদে সবুজ আলোর ফুলকি দেখতে পাচ্ছে মোমিনা। আব্বু ডাকছে তাকে। আব্বুর গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে সে -- একটানা দোয়া পাঠ শুনতে পাচ্ছে মৌমিনা। 
------"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল হালীমুল হাকীম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুল আরশিল আজীম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি- ওয়া রাব্বুল আরশিল কারীম।" ------ পরম করুণাময়ের স্তুতি করছে আব্বু।

হালকা হয়ে আসছে মোমিনার শরীর। শীত করছে খুব। দূরে থেকে ভেসে আসা ডানার ঝটফট্ শুনতে পাচ্ছে মোমিনা। বড় মসজিদের ওপর থেকে সব পায়রাগুলোকে একসাথে কেউ ফরফরিয়ে উড়িয়ে দিলো হয়তো। বন্ধ চোখের সামনে হলদে সবুজ আলোর ফুলকিও সরে সরে যাচ্ছে ক্রমশ। এখন শুধুই সাদা আলোয় ভরা আকাশ দেখছে সে। আর সেই আকাশে দূরে অনেক দূরে উড়ছে আব্বুর ঘুড়িটা। আজ খুব খুশি মোমিনা। একবার চিৎকার করে আব্বুকে জানাতে চাইল ---- আব্বু দেখেছ, ঘুড়িটা উড়ছে, অনেক উঁচুতে, আমি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু, গলা বুঝে আসছে তার। আব্বুর গলার আওয়াজও দূরে চলে যাচ্ছে, ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। 
তার কানে তালা লেগে যাচ্ছে কেন! আর কোন কিছুই শোনা যাচ্ছে না কেন! একটানা পিঁ-পিঁ-পিঁ শব্দ কিসের! চোখ খুলতে চাইল মোমিনা। একবার আব্বুকে দেখতে চেষ্টা করল। আব্বু দূরে চলে যাচ্ছে। আর হয়তো দেখা হবে না কখনো।

ইসমাইলের দোয়া কবুল হয়নি। তিন চার দিনের একটানা জ্বরে, চলে গেল মোমিনা। যাবার সময়ও মেয়েটা একবার পরীর মতো হেসেছিল, তার আব্বুর জন্য। 

কবরে শেষ মাটি দিয়ে, চেতকের সঙ্গে একা ফিরে এল ইসমাইল। সিটে মাথা রেখে পাদানীতেই ঘুমিয়ে পড়ল কখন। রোজের মতো ভোরের আজানেই ঘুম ভাঙল তার। চেতক কে সঙ্গে নিয়ে আবার স্ট‍্যান্ডের দিকে চলল সে। 
জীবন তো আর থেমে থাকে না! 

বেশ কিছুদিন হল -- কানাঘুষো শুনছিল ইসমাইল। রিকশা মালিক নাকি তার সব রিকশা, স্ট‍্যান্ড থেকে তুলে নেবে। বাজার চলতি নতুন দুটো ব‍্যাটারী টোটো  কিনেছে মালিক। 
লাভ-ক্ষতির পাটিগণিত ঠাসা মগজে হিসাব নিকাশ করে - রিকশা মালিক একদিন ইসমাইলকে জানিয়ে দিল -
---- "রিকশায় আর তেমন লাভ দেখছি না রে ইসমাইল। ঈদের পরে রিকশা জমা দিয়ে - তুই অন‍্য ভাড়া খুঁজে নিস।"

এ' অঞ্চলের রিকশা মালিকরা সবাই চেনে ইসমাইলকে। নতুন ভাড়া পেতে একদিনও সময় লাগবে না তার। কিন্তু, এতো দিনের সুখ দুঃখের সঙ্গী চেতককে আর কিছুদিন পরেই ছেড়ে দিতে হবে! তার মোমিনার বড় প্রিয় ছিল চেতক। মেয়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে চেতকের সিটে- চাকায়। মালিকের কাছে ওটা তো শুধুমাত্র একটা রিকশা। যা সারাদিনে মাত্র পঞ্চাশ টাকা রোজগার দেয়।

কবরের পাশে শুয়ে আছে ইসমাইল। চেতকও তিন পায়ে দাঁড়িয়ে আছে মোমিনার কবরের কাছেই। হয়তো শেষ বারের মতো। আজ খুশির ঈদ। কাল চেতককে রেখে আসতে হবে তার আসল মালিকের জিম্মায়।
একটা ভালো চাদর মেয়ের কবরের জন্য এনেছে ইসমাইল। কিছু ফুল, আর লাটাইয়ে বাঁধা লাল ঘুড়ি। 

চিত হয়ে শুয়ে, আকাশ দেখছে ইসমাইল। বড় মসজিদের মাঠে ঘুড়ি উড়ছে; আলোময় আকাশ জুড়ে - লাল নীল সবুজ পেটকাটি চাঁদিয়ালের মেলা। একভাবে অপলক সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে তার। তবু পলক পড়ছে না। বুক ছেঁচা জল চোখের ধার বেয়ে - কানের পাশ হয়ে- গড়িয়ে পড়ছে কবরের পাশে মাটিতে। 

ছোটবেলার মতো এখনো তাকে হাতছানি দেয় উড়ন্ত ঘুড়ির ঝাঁক। ওই আকাশেই মিশে আছে তার মোমিনার শেষ ইচ্ছা। মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করতে পারেনি ইসমাইল। আকাশের কোণে বিন্দু হয়ে কখনো ওড়েনি তার ঘুড়ি। লাটাইয়ের সুতোয় ঘুড়িটাকে বেঁধে নিয়ে, ফুল ছড়ানো মেয়ের কবরের চারপাশে -আজ আবার বনবন দৌড়াচ্ছে ইসমাইল।

Comments

Top

গল্প

 

একটি

পাখির প্রেম

সন্দীপ চ্যাটার্জী

ধরত্রিগ্রাম, বর্ধ্মান 

জ হঠাৎ ইচ্ছা হল তোকে কিছু বলতে, শুনবি? শুনবি আমার কথা?
আমি? কে আমি? 
আমি হলাম একটি পাখি,কোন দেশের তা জানি না। কিন্তু আমি উড়ে এসেছিলাম তোর দেশে, তোর শহরে, তোর পাড়ায়। ওই যে সেদিন দুপুরবেলায় বসেছিলাম তোর জানালায়, তুই আমায় দেখে হেসেছিলি, ভালবেসেছিলি আমায়। 
আমি যে ঠিক কখন তোকে ভালবেসেছিলাম তা বলতে পারব না।
কিন্তু....কিন্তু যখন আমার খুব খিদে পেলো আমি খিদের জালায় জোরে জোরে ডাকছিলাম, তখন তুই আমার দিকে সেই রুটির টুকরোটা ছুঁড়েছিলি। তোর ভাষা তো আমি জানি না, তাই তোকে আমি বলতে পারি নি, খাবার চাইতে পারি নি তোর কাছে। কিন্তু তবু তুই কেমন আমার মনের চাওয়াটা বুঝেছিলি। ঠিক তক্ষনি আমি তোকে আমার মনটা দিয়ে দিয়েছিলাম.... তোকে বড্ড ভাল লেগেছিল আমার। কিন্তু কিভাবে তোকে বলবো বুঝতে পারিনি, আর তাইতো তাইতো আমি তোর হাতে ঠক্কর মেরেছিলাম। তোর খুব ব্যাথা লেগেছিল না রে? অভিমান হয়েছিল আমার ওপর? তাই তুই আমায় ওভাবে সেদিন তাড়িয়ে দিয়েছিলি তোর জানালা থেকে?
জানিস আমি কিন্তু একটুও কষ্ট হয়নি সেদিন। তোর বকুনিটা আমায় তোর প্রতি আমার ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে সাহায্য করেছিল। যখন তুই আমায় তাড়িয়ে দিলি তখন বুঝেছিলাম তোকে ছেরে যাবার ব্যাথাটা। জানিস তারপর থেকে রোজ তোর জানালায় আসি, তোকে দুর থেকে দেখি, খুব ভাল লাগে তোকে দেখতে। তুই হয়তো আর আমায় লক্ষ্য করিস না, আমি কিন্তু রোজ তোর জন্য একটা গোলাপ পাতা তোর জানালায় রেখে আসি। তুই

দেখিস রে? দেখিস না?

হয়তো তুই দেখার আগেই বাতাস তোকে দেওয়া আমার সেই উপহারটি উড়িয়ে দেয়। আমি কিন্তু কোনোদিন তাই ভেবে তোকে গোলাপ পাতা দিতে ভুলি না। আমি জানি বাতাস-ও একদিন আমার ভালোবাসার কাছে হেরে যাবে, সেদিন আমার উপহারটি ঠিক তোর কাছে পৌঁছবে।
আচ্ছা তোকে সেদিন অতো মানুষ মিলে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলো রে? তুই ঘুমাচ্ছিলি, তোর খাট-টা কি সুন্দর ফুল দিয়ে সাজানো ছিল। তোকে কি সুন্দর লাগছিলো। সেদিনও আমার বড্ড খিদে পেয়েছিল, তুই বুঝতে পেরেছিলি না রে? তাই তুই সবাইকে বলেছিলি আমায় খেতে দিতে? সবাই রাস্তায় খই ছড়িয়ে দিল, আর ওই খই খেতে গিয়েই তোর দিকে তাকাতে পারিনি কিছুক্ষণ। সেই ফাকেই সবাই তোকে কোথায় একটা নিয়ে চলে গেল। আর তো দেখতে পেলাম না।
জানিস আজও আমি তোর জানালায় আসি। কিন্তু সেদিনের পর থেকে আর তো তোকে ঘরে দেখিনা। আজ দুটি বসন্ত পার হয়েছে, তোর কথা খুব মনে পড়ে। তুই কোথায় রে? তোকে আর আমি দেখিনা কেন? তুই কি আমার ওপর রাগ করেছিস তাই আমায় দেখা দিচ্ছিস না?
কি জানি তুই কোথায়।
জানিস আজ আমার খুব ইচ্ছা হয় একটি-বারের জন্য যদি মানুষ হতাম কতো ভালো হত, মানুষের মতো কথা বলতে পারতাম। দেখতিস কাউকে সুধীয়ে ঠিক পৌঁছে যেতাম তোর নতুন জানালায়।  

Comments

Top

প্রবন্ধ

রবীন্দ্রানুরাগী

রামচন্দ্রন

দিলীপ মজুমদার 

পর্নশ্রী, বেহালা, কলকাতা 

 

জ থেকে একশো বছর আগে দক্ষিণ ভারত থেকে একটি তরুণ এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো করতে। সেই তরুণটির নাম গি রামচন্দ্রন। কেরলের পেরুমাথান্নিতে ১৯০৪ সালে তাঁর জন্ম। এই তরুণটির জীবনের ধ্রুবতারা হলেন এ দেশের দুই মনীষী—রবীন্দ্রনাথ আর গান্ধীজি।
১৯২০ সালে রবীন্দ্রনাথ ত্রিবান্দ্রমে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ভারতবন্ধু সি এফ এন্ড্রুজ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রামচন্দ্রনের পরোক্ষ পরিচয় হয়েছিল সেন্ট জোশেপ স্কুলে। সে স্কুলের প্রধান শিক্ষক কুলন্দি স্বামী ছিলেন রবীন্দ্রভক্ত। তাঁর কাছেই রামচন্দ্রন শোনেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা। সেসব কবিতা শুনে তাঁর ‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি’। এন্ড্রূজের সঙ্গে পরিচয় ছিল রামচন্দ্রনের। এন্ড্রুজ রামচন্দ্রকে পরিচয় করিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। জানালেন রামচন্দ্র পড়তে চায় বিশ্বভারতীতে। এত দূরে গিয়ে পড়াশুনোর ব্যাপারে তাঁর বাবার মত ছিল না। কিন্তু নাছোড়বান্দা রামচন্দ্রন। শেষপর্যন্ত রাজি হতে হল বাবাকে। দাদা রঘুবীরনকে সঙ্গে নিয়ে রামচন্দ্রন ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাসের এক শীতের সকালে হাজির হলেন শান্তিনিকেতনে।
বৃক্ষলতায় ঘেরা শান্তিনিকেতন তাঁর হৃদয়হরণ করে নিল কয়েকদিনের মধ্যে। দেখলেন সুন্দর এক ছন্দে বাঁধা এখানকার আশ্রমজীবন। ভোর সকালে উঠে পড়তে হয় ছাত্রদের। সূর্য ওঠার আগে। তারপরে গান গাইতে গাইতে প্রভাত ফেরি। রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রকৃতি বন্দনামূলক গান । তারপরে প্রার্থনা। সে প্রার্থনাগীতি রবীন্দ্রনাথেরই লেখা। জাতি-ধর্ম-বর্ণের কোন স্পর্শ সে প্রার্থনাগীতিতে ছিল না। প্রাতঃরাশের পরে সকাল সাড়ে সাতটায় শুরু হত ক্লাশ। মাঝে কিছু সময়ের বিরতি। পরের ক্লাশ শুরু হত আড়াইটেতে। তার সময়সীমা ২ ঘন্টা। তারপরে খেলাধুলো। সন্ধ্যের সময় কোনদিন ছাত্রদের সভা, কোনদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অলস বা নিশ্চল থাকতে পারে না ছাত্ররা। আবার এই শ্রম তাদের গায়েও লাগে না, কারণ এর মধ্যে একঘেয়েমি নেই।
আরও একটা জিনিস অভিভূত করল রামচন্দ্রনকে। শ্রীনিকেতনে তিনি দেখলেন অন্য এক দৃশ্য। আমাদের পল্লিজীবনের বাস্তবতার পাঠ নিলেন তিনি অধ্যাপক পিয়ার্সনের কাছে। দেখলেন পল্লি পুনর্গঠনের কাজ। পরবর্তী জীবনে এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন ‘গান্ধী গ্রাম’। বুঝলেন কৃষিকে দিতে হবে প্রাথমিক গুরুত্ব। তারপরে নজর দিতে হবে পল্লির কুটিরশিল্পের দিকে। এভাবে পল্লির মানুষ হতে পারবে স্বাবলম্বী।
বিশ্বভারতীতে সাহিত্য, দর্শন, সমাজতত্ত্ব অধ্যয়নের সঙ্গে সঙ্গে সমাজসেবা তথা দেশসেবার পাঠ নিতে লাগলেন তিনি। বিশ্বভারতীর আদর্শ তাঁর তরুণ মনেকে প্লাবিত করছিল। সে আদর্শ যথার্থ মানবতার আদর্শ। সে আদর্শ মনের মুক্তি ও স্বাধীনতার আদর্শ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

প্রথমে আমি শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপন করে এই উদ্দেশ্যে ছেলেদের এখানে এনেছিলুম যে, বিশ্বপ্রকৃতির উদার ক্ষেত্রে আমি এদের মুক্তি দেব। কিন্তু ক্রমশ আমার মনে হল যে, মানুষে মানুষে যে ভীষণ ব্যবধান আছে তাকে অপসারিত করে মানুষকে সর্বমানবের বিরাট লোকে মুক্তি দিতে হবে। আমার বিদ্যালয়ের পরিণতির ইতিহাসের সঙ্গে সেই আন্তরিক আকাঙ্ক্ষাটি অভিব্যক্ত হয়েছিল। কারণ বিশ্বভারতী নামে যে প্রতিষ্ঠান তা এই আহ্বান নিয়ে স্থাপিত হয়েছিল যে, মানুষ শুধু প্রকৃতির ক্ষেত্রে নয়, কিন্তু মানুষের মধ্যে মুক্তি দিতে হবে।    রামচন্দ্রনের মনে গুনগুন করে বাজে রবীন্দ্রনাথের কত কবিতার পঙক্তি। যে সব কবিতায় কবি মানুষের মনের মুক্তির কথা বলেছেন। আবিষ্টচিত্তে রামচন্দ্রন আবৃত্তি করতে থাকেন:চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর / আপন প্রাঙ্গনতলে দিবসশর্বরী / বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি, / যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে / উচ্ছ্বসিয়া উঠে............. রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গান্ধীজিরও গভীর প্রভাব পড়ছিল রামচন্দ্রনের মনে। তিনি লক্ষ্য করছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজি পরস্পরকে শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু নানা ক্ষেত্রে তাঁদের মতের মিল ছিল না। শান্তিনিকেতনে এইরকম এক বিতর্কের সূত্রপাত হল। রামচন্দ্রন তার প্রত্যক্ষদর্শী।

তখন শুরু হয়েছে অসহযোগ আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ ‘মডার্ন রিভিউ’ কাগজে সে আন্দোলনের সমালোচনা করছেন। সমালোচনা করছেন চরকা নিয়ে। শান্তিনিকেতনের একদল ছাত্র তখন সে সব আন্দোলনে মেতে উঠেছে। রামচন্দ্রনও তাদের একজন। তিনি তখন ছাত্র সংগঠনের সম্পাদক। রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীর মতামত নিয়ে তিনি আয়োজন করলেন এক বিতর্কসভার। সে সভার বিষয়:  ‘In this controversy in regard to the immediate tasks to be accomplished in India Mahatma Gandhi’s programme is the only right programme’. বিতর্কসভায় রামচন্দ্রন জোরালো ভাষায় খন্ডন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের মত।
খবরটা রবীন্দ্রনাথের কানে গেল। তিনি ডেকে পাঠালেন রামচন্দ্রনকে। ডাক পেয়ে রামচন্দ্রন একটু দ্বিধাগ্রস্ত ও ভীত হলেন। গুরুদেবের প্রতিষ্ঠানের ছাত্র তিনি, অথচ সেই গুরুদেবের মতামতের বিরুদ্ধতা করছেন তিনি। কি বলবেন গুরুদেব?
বিতর্কসভার পরের দিনই রামচন্দ্রন গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। মৃদু হেসে তাঁকে অভ্যর্থনা করলেন রবীন্দ্রনাথ। অবাক রামচন্দ্রন। ক্রোধ বা বিরক্তির চিহ্নমাত্র নেই গুরুদেবের মুখে। বললেন, ‘কালকের বিতর্কসভার কথা শুনেছি। তোমরা যে সাহসের সঙ্গে নিজের মতামত প্রকাশ করেছ সেজন্য আমি আনন্দিত।’ হতবাক রামচন্দ্রন। এতটা ভাবেন নি তিনি। গুরুদেব আরও বললেন, ‘তোমরা কি আরও একটা সভার আয়োজন করতে পারবে? সেখানে আমি আমার কথা আরও একটু খোলসা করে বলতে পারব তোমাদের কাছে?’
আর একটা সভার আয়োজন করার অনুমতি চাইছেন গুরুদেব? অনুমতি চাইছেন ছাত্রের কাছে? এ যে অভাবিত। তার পরের দিন একটা সভার আয়োজন করা হল। রবীন্দ্রনাথ বললেন তাঁর নিজের জীবনের কথা। বললেল কেন তিনি এ ধরনের আশ্রম বিদ্যালয়ের কথা ভাবলেন। ছোটবেলায় স্কুলকে তাঁর জেলখানা মনে হত। শিক্ষার্থীর কোন স্বাধীনতা ছিল না। তার উপর বড়রা বোঝা চাপিয়ে দিতেন। এটা শিক্ষার্থীর আত্মবিকাশের পক্ষে এক প্রবল বাধা।

শিক্ষার্থীর সেই আত্মবিকাশ ও মনের স্বাধীনতার কথা ভেবেই তিনি শান্তিনিকেতনে এরকম বিদ্যালয়ের কথা ভেবেছিলেন। তিনি বললেন গান্ধীজির প্রতি তাঁর নিগূঢ় শ্রদ্ধা আছে, কিন্তু তাঁর কোন কোন মত তিনি মেনে নিতে পারেন নি। তিনি চান আসমুদ্রহিমাচলের মানুষ গান্ধীজিকে অনুসরণ করুক নিজের নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে, কিন্তু তা যেন কখনও অন্ধ অনুসরণ না হয়। অন্ধ অনুসরণে আত্মার স্বাধীনতা পরাজিত হয়।
রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলি মনে গেঁথে গিয়েছিল রামচন্দ্রনের। শ্রদ্ধাবোধ অক্ষুণ্ণ রেখেও কিভাবে ভিন্নমত প্রকাশ করা যায় সে শিক্ষা তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছেই লাভ করেছিলেন। গান্ধী গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সময় এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি। চিত্তকে ভয়শূন্য রেখে, শিরকে উন্নত করেই রামচন্দ্রন পরাধীন ভারতবর্ষের ইংরেজ শাসকের সমালোচনা করতে পেরেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

কস্তুরবা গান্ধীর মৃত্যুর জন্য ব্রিটিশ প্রশাসনকে দায়ী করে তিনি ভাইসরয় লর্ড ওয়েভেলকে বলতে পেরেছিলেন: ‘An Empire afraid of Kasturaba Gandhi was a doomed Empire‘. স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল গান্ধী গ্রামে এলে রামচন্দ্রন পুলিশ বা নিরাপত্তারক্ষীদের প্রতিষ্ঠানের ভেতর প্রবেশ করতে দেন নি। চিন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের পরে এন সি সি বাধ্যতামূলক করা হয় কিন্তু রামচন্দ্রনের প্রতিষ্ঠানে সে নিয়ম লাগু করা যায় নি।
আত্মার স্বাধীনতার পাঠ তিনি যেমন নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে, তেমনি নিয়েছিলেন আন্তর্জাতিকটার শিক্ষা। বুঝেছিলেন ‘জাতিপ্রেম নাম ধরি প্রচণ্ড অন্যায়/ধর্মেরে ভাসাতে চাহে বলের বন্যায়’। রবীন্দ্রনাথের মতো নিখিল মানবের ধ্যান ছিল তাঁর হৃদয়ে। মন্ত্রের মতো হৃদয়ে গুনগুন করত রবীন্দ্রনাথের বাণী: ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পায়ে ঠেকাই মাথা/তোমাতে বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা’।

Comments

Top

ঐতিহ্যের ঠিকানাঃ

নদীয়ার শান্তিপুর

শুভদীপ রায়চৌধুরী

প্রবন্ধ

 

"ন্দে তং শ্রীমদদ্বৈতাচার্য্যমদ্ভুতচেষ্টিতম্।

যস্য প্রসাদাদজ্ঞোহপি তৎস্বরূপং নিরূপয়েৎ।।"

(শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত)

অর্থাৎ যাঁহার প্রাসাদে অতি অজ্ঞ ব্যক্তিও তাঁহার স্বরূপনিরূপণে সমর্থ হয়, সেই অদ্ভূত লীলাশালী শ্রীমৎ অদ্বৈতাচার্য্য প্রভুকে আমি বন্দনা করি। নদীয়া জেলার শান্তিপুর একটি অত্যন্ত সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যপূর্ণ স্থান, বিশেষত গঙ্গার তীরবর্তী জনপদ। মহাপুরুষ চৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষাগুরু অদ্বৈত আচার্যের সাধনপীঠ নিকটবর্তী বাবলাগ্রামে।

"শ্রীলদ্বৈত গুরুং বন্দে হরিণাদ্বৈতমেব তং

প্রকাশিত পরম্ ব্রহ্ম যোহবতীর্ণ ক্ষিতৌ হরিং।।

অন্তঃকৃষ্ণ বহিগৌরং কৃষ্ণচৈতন্য সংজ্ঞ কং।

প্রেমাধিবং সচ্চিদানন্দং সর্ব্বশক্তাশ্রয়ং ভজে।।

শ্রীনিত্যানন্দরামহি দয়ালুম্ প্রেম দীপকং।

গদাধরঞ্চ শ্রীবাসং বন্দে রাধেশসেবিনং।।"

শ্রীঅদ্বৈত প্রকাশ গ্রন্থের প্রারম্ভে ঈশান নাগর লিখেছেন- কলিকাল ঘোর পাপচ্ছন্ন, জীবের দুর্দশা দেখে বৈষ্ণব চূড়ামণি শঙ্কর কলির জীবকে উদ্ধারের জন্য যোগমায়ার সঙ্গে পরামর্শ ক’রে কারণ সমুদ্রের তীরে উপনীত হন। সেখানে সাতাশ বছর তপস্যায় জগৎকর্ত্তা মহাবিষ্ণু পঞ্চাননকে দর্শন দিয়ে বলেন-"তুমি আর আমি অভেদ নই। তোমার এবং আমার আত্মা এক, দেহ ভিন্ন।" এই বলে মহাবিষ্ণু পঞ্চাননকে আলিঙ্গন করেন, ফলে দুই দেহ এক হয়ে যায়। এই দৃশ্য দর্শনের সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছিল তারা অত্যাশ্চর্য হয়ে যায়। 'শুদ্ধ স্বর্ণ বর্ণ অঙ্গ উজ্জ্বল বরণ' ইহা দর্শন হয়। মহাবিষ্ণু তখন কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে হুঙ্কার ছাড়লেন, সঙ্গে সঙ্গে চমৎকার এক দৈববাণী হয়। "শোন মহাবিষ্ণু তুমি এই মূর্তিতে লাভার গর্ভে অবতীর্ণ হও।"

অদ্বৈতাচার্যের বংশেই জন্ম আরেক বৈষ্ণবসাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। তাঁরও স্মৃতি মন্দির রয়েছে এই শান্তিপুরে। এছাড়া তন্ত্রসিদ্ধ কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের বংশধর শান্তিপুরে দক্ষিণাকালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন, যা আগমেশ্বরী নামে পরিচিত। এছাড়া বহু প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শনও রয়েছে এই অঞ্চলে। তাদের মধ্যে অন্যতম চাঁদুনীমায়ের প্রাচীন ইতিহাস, খাঁ বংশের ইতিহাস, শ্যামচাঁদ মন্দিরের ঐতিহ্য, জলেশ্বর শিবমন্দির, দক্ষিণাকালীর পঞ্চরত্ন মন্দির, প্রাচীন সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির ইত্যাদি। সেই ইতিহাসের কিছু অংশই গবেষণায় উঠে এল বনেদীয়ানা পরিবারের সদস্যদের হাতে। আজ তাই আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য। ভবিষ্যৎ-এ আরও প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যপূর্ণ তথ্য শান্তিপুর তথা বঙ্গের বহু স্থানের তুলে ধরা হবে।

"জ্ঞান নেত্রং সমাদায় উদ্ধরেদ্ বহ্নিবৎ পরম।

নিস্কলং নিশ্চলং শান্তং তদ্ ব্রহ্মাহ মিতি স্মৃতম।।"

 

জ্ঞাননেত্র অবলম্বন করে অগিড়বতুল্য পরমজ্যোতি নিয়ে, জ্যোতির্ময় সেই পরমব্রহ্মকে জানতে হবে। অমূল্য নিধির মত সযত্নে তাকে আহরণ করবে। যাঁরা বিদ্বান, তাঁরা সবসময় এই চিন্তাই করবে-"আমিই সেই নিষ্কল(কলাহীন), নিশ্চল(ধ্রুব), শান্ত (নির্বিকার মঙ্গলময়) ব্রহ্ম!"

শান্তিপুর পূণ্যতোয়া ভাগীরথীর তীরস্থ একটি নগর, বৈষ্ণব ও শাক্তের মিলনক্ষেত্র এবং শৈব ধারারও প্রাচীনত্ব দেখা যায় এই অঞ্চলে। শুরুতেই শ্রীশ্যামচাঁদ জীউ- প্রাচীন ইতিহাস।

শ্যামচাঁদ জীউঃ

শান্তিপুরের প্রাচীন মন্দিরের মধ্যে অন্যতম এই শ্যামচাঁদ মন্দির। এই মন্দিরের ইতিহাস বললেন শ্রী অলোক দাস(মন্দির পরিচালন কমিটির সদস্য) এবং শান্তিপুরে বিগ্রহবাড়ি সমন্বয় সমিতির পত্রিকা। অদ্বৈতপ্রভুর দ্বাদশ বছর বয়েসে যখন শান্তিপুরে আসে, সঙ্গে আসেন গোবিন্দ দাস। এই গোবিন্দদাস সহ অন্যান্য ভাইয়েরা অদ্বৈত পরিবারে দীক্ষিত। গোবিন্দদাসের পুত্র ব্যবসা সূত্রে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। তিনি "ভাগ্যবস্তু" খ্যাতি লাভ করে "ভাগ্যবন্ত" নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর পুত্র শ্রীমন্ত সম্মানসূচক খাঁ উপাধি লাভ করেন। এঁরা ৮টি দেব বিগ্রহ এবং ১০৮টি পুষ্করিণী স্থাপন করেন। শ্রীমন্ত খাঁ-র তিন পুত্রসন্তান, যথাক্রমে রঘুনাথ, কৃষ্ণবলভ ও বিশ্বেশ্বর। বিশ্বেশ্বরের পুত্র রঘুনাথ। রঘুনাথের পুত্র জগন্নাথ এবং জগন্নাথের পুত্র চার, যথাক্রমে রামগোপাল, রামজীবন, রামভদ্র এবং রামচরন। এই শ্যামচাঁদ মন্দির তৈরী হয় ১৬৪৮ শতাব্দে। মন্দির তৈরী হওয়ার দুইবছর আগে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয়। রামগোপাল খাঁ চৌধুরীর মাতা স্বপ্ন দেখেছিলেন রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। এঁরা এতটাই প্রতিপত্তিশালী ছিলেন যে শিল্পী নিয়ে এসে রামগোপাল মূর্তি তৈরী করান, কিন্তু তাঁর মা বলেন এই মূর্তি সেই স্বপ্নাদেশে যে মূর্তি দেখেছিলেন সেই মূর্তি নয়। যে মূর্তি রামগোপাল তৈরী করিয়েছিলেন সেই মূর্তি কালাচাঁদ মন্দিরে রয়েছে। অবশেষে আবার মূর্তি তৈরী হল এবং সেই বিগ্রহ দেখেই রামগোপাল খাঁ চৌধুরীর মা বলেন, “এই বিগ্রহই আমার স্বপ্নে দেখা মূর্তি”। তখন দুইবছর এই শ্যামচাঁদ জীউ কালাচাঁদ মন্দিরে সেবা পেতেন। তারপর ১৬৪৮ শতাব্দে রামগোপাল খাঁ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই শ্যামচাঁদ মন্দির তৎকালীন সময় ৮-৯ লক্ষ টাকার ব্যয়ে। শ্যামচাঁদ মন্দিরটি আটচালা শ্রেণীর। উচ্চতা ১১০ ফুট, দৈর্ঘ্যে এবং প্রস্থে ৬৮ ফুট। কৃষ্ণনগরের কৃষ্ণচন্দ্রের পিতা রাঘুরাম রায়কে মন্দির উদ্বোধনের জন্য আহ্বান করা হয়েছিল। বাংলার স্থাপত্য গৌরবে এই মন্দির অদ্বিতীয়। সুউচ্চ চুড়োয় ত্রিশূল ও ধাতু নির্মিত পতাকা। নদীয়া রাজ রঘুরাম শান্তিপুরে আসেন এবং খাঁ বাড়ির বিশাল সভায় শীর্ষ স্থান অলংকৃত করেন। মহারাজের অভ্যর্থনায় লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করায় প্রতিষ্ঠাতারা খাঁ উপাধিতে ভূষিত হন।

বর্তমানে বিধায়ক শ্রী অজয় দে তিনি একটি মন্দির কমিটি গঠন করেন, এবং সেই কমিটির মাধ্যমেই বর্তমানে শ্যামচাঁদ মন্দির পরিচালিত হয়। এই বিগ্রহ রাসের সময় শোভাযাত্রায় যান না। রাস উৎসবে বিগ্রহ মন্দিরের দালানে উপস্থিত হন একমাত্র দোলেই শ্যামচাঁদ নগর পরিক্রমায় যান। এছাড়া পৌষ মাসের শুক্লপক্ষের দ্বাদশীতিথিতে এই মন্দিরে ১৫ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান হয় এবং প্রায় ২০,০০০ ভক্তবৃন্দের জন্য মহোৎসবের আয়োজন করা হয়। এই বিগ্রহের চরণপদ্মে দাস চৌধুরী লেখা আছে, রামগোপাল দাস চৌধুরী পরবর্তীকালে "খাঁ" উপাধি পান। নবাব মুর্শিদকুলি যখন গঙ্গাবক্ষে যুদ্ধজয় করে মুর্শিদাবাদে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন তাদের খাদ্য সংকট দেখা যায়। তখন নবাব জানতে পেরেছিলেন এই শান্তিপুরে গ্রামে একজন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি ছিলেন। নবাব যোগাযোগ করেন এবং নবাব ও তঁর সৈন্যদের পর্যাপ্ত খাদ্য প্রদান করেন এই শান্তিপুরের প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি। পরবর্তীকালে নবাব তাঁদের দরবারে ডেকে পাঠালেন এবং "খাঁ" উপাধি দিলেন। বর্তমানে এই শ্যামচাঁদ মন্দিরে নিত্যভোগ, পূজাপাঠ নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।

শ্রীকালাচাঁদ জীউঃ

শ্রীকৃষ্ণের রাসযাত্রা প্রসঙ্গে মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বলেছিলেন,"শান্তিপুরের রাস, ঢাকার জন্মাষ্টমী এবং বৃন্দাবনের ঝুলন দেখার মতন"। প্রায় ৩০০ বছর আগে এই জাঁকজমকপূর্ণ রাস উৎসব দেখা যায় শান্তিপুরের খাঁ চৌধুরীর বংশে। এই পরিবারের প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহগুলির মধ্যে অন্যতম শ্যামচাঁদ, কালাচাঁদ, গোপীকান্ত, কৃষ্ণরায় উল্লেখযোগ্য। তাই কালাচাঁদ মন্দিরের ইতিহাসের সন্ধান দলেন পরিবারের দৌহিত্র বংশের বংশধর শ্রী রাজীব সেন মহাশয় (দৌহিত্র বংশের সপ্তমপুরুষ)। রাজীব সেনের কথায় কালাচাঁদ মন্দির প্রায় ২৫০-৩০০ বছর প্রাচীন। এই মন্দিরে শ্রীশ্রীরাধা কালাচাঁদ জীউর পূজার্চনা হয়। নিত্যপূজা ছাড়াও জন্মাষ্টমী, নন্দোৎসব, ঝুলনযাত্রা, দোলযাত্রা অতি ধুমধামের সহিত পালিত হয়। রাস উৎসবে কালাচাঁদ বিগ্রহ ঠাকুরদালানে উপস্থিত হন এবং তিনি সেই রাসের সময় শোভাযাত্রায় নগর পরিক্রমায় যান। দোলের দিন শ্যামচাঁদ আসেন এই মন্দিরে কারণ কথায় কথায় জানা গেল শ্যামচাঁদের আদিভিটে এই কালাচাঁদ মন্দির। কালাচাঁদ হলেন শ্যামচাঁদের বড়ভাই। তাই লোককথায় তিনি দোলের সময় দাদার সাথে দেখা করতে আসেন এই কালাচাঁদ মন্দিরে। রাজীববাবুর কথায় এই কালাচাঁদ মন্দিরে অন্নভোগ হয় না। এই মন্দিরে চিরে, খই, দই, মিষ্টি, ফল ইত্যাদি ভোগ দেওয়া হয়। নিত্যভোগ নৈবেদ্য সহযোগে হয়। বর্তমানে মন্দিরের পৌরোহিত্য করছেন শ্রী পার্থ মুখোপাধ্যায়। বর্তমানে ২০০৯ সালে আবারও মন্দির সংস্কার করা হয়। বাংলার প্রচীন মন্দিরের অন্যতম এই মন্দির যেখানে নিষ্ঠার সঙ্গে পূজা হয়।

শ্রীশ্রীরাধামদনগোপাল জীউঃ

শান্তিপুরের আরও একটি প্রাচীনতম মন্দির এই মদনগোপাল মন্দির। এই মন্দিরের ইতিহাসের সন্ধান দিলেন শ্রী স্বরূপ গোস্বামী (পরিবারের সদস্য)। সংগ্রহ করলেন শ্রীমান্ শুভদীপ রায় চৌধুরী। ১৪৩৪ খ্রীঃ শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্য্য শ্রীহট্টের লাউর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কুবের মিশ্র, মাতার নাম লাভাদেবী। অদ্বৈতাচার্যের বাল্যকালের নাম শ্রীকমলাক্ষ। বারো বছর বয়েসে তিনি শান্তিপুরে আসেন। স্মৃতি শাস্ত্র ও ন্যায়শাস্ত্র পড়ার জন্য। অদ্বৈতাচার্য্য মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পাঁচ বেদ সমাপন করে বেদ পঞ্চানন উপাধি পান। পিতামাতার পরলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য গয়ায় পিণ্ডদান করে বৃন্দাবনে উপস্থিত হন। উল্লেখ্য যে তিনি সারা ভারতবর্ষ পরিক্রমা করেছিলেন সেই পরিক্রমা শেষ করতে সময় লাগে প্রায় পঁচিশ বছর। বৃন্দাবনে রাতে বটবৃক্ষের তলায় অবস্থানকালে গভীর রাতে তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হন মদনমোহন বলেন, "হে অদ্বৈত, আমার অভিনড়ব বিগ্রহ পূর্বে কুব্জা দেবী সেবা করতেন, তাহা নিকুঞ্জবনে টিলার তলায় আছে, তাহা তুমি তুলিয়া সেবার ব্যবস্থা করো”। বলাবাহুল্য যে মদনমোহন সাক্ষাতে এসেছিলেন অদ্বৈতপ্রভুর কাছে রাখালরূপ ধরে। পরের দিন সকালে অদ্বৈতাচার্য্য সে কথা সকলকে জানিয়ে একজন বৈষ্ণব ব্রাহ্মণকে সেবার জন্য আহ্বান করেন। অদ্বৈতাচার্য্য গোবরধন পরিক্রমা করে এসে দেখেন সেই মদনমোহন মন্দিরে নেই। অনেক অনুসন্ধান করেও সেই খোঁজ পেলেন না। তারপর তিনি স্বপ্ন দেখলেন যে মদনমোহন তাঁকে বলছেন, "অভক্তের অত্যাচারে আমি ফুলের তলায় লুকিয়ে আছি”। তখন মথুরার চৌবে ব্রাহ্মণ আসলেন এবং তাঁকে সমস্ত বৃত্তান্ত বলে মদনমোহনকে তুলে দিলন। এরপর অদ্বৈতাচার্য্য আকুল আহ্বানে শ্রীশ্রীমদনমোহনের আদেশ পেলেন যে, “আমা অভিন্ন যাহা পূর্বে শ্রীমতী রাধারণী সখী বিশাখা দেবী অঙ্কিত চিত্রপট নিকুঞ্জবনে আছে, তা নিয়ে তুমি শান্তিপুরে ফিরে যাও ও আমার সেবাপূজা করো”। স্বরূপবাবুর কথায় এই মন্দিরের বহুবার সংস্কার হলেও মন্দির প্রথম তৈরী হয় প্রায় আনুমানিক ৪৩৫ বছর আগে এবং অদ্বৈতাচার্য্য নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই মন্দির। অদ্বৈতাচার্য্য চারভাই ছিলেন এবং তিনিই ছিলেন কনিষ্ঠ বাকি তাঁর তিন ভাই পরিভ্রমণ করতে গিয়ে ফিরে আসেননি। অদ্বৈতপ্রভু নিজের বাড়ি শান্তিপুরে ফিরে এলেন এবং চিত্রপটের সঙ্গে নিয়ে এলেন গণ্ডকী থেকে শালগ্রামশিলা। কিছুকাল পরে অদ্বৈতাচার্য্যের গুরুদেব মাধবেন্দ্র পুরীপাদ, তিনি বাংলাদেশে থাকতেন সেখানে তাঁর স্ত্রী পরলোকগমনের পর তিনি শান্তিপুরে চলে এলেন। তিনি তখন অদ্বৈতপ্রভুকে বললেন গোপিভাবে সেবা করো। তখন মাধবেন্দ্র পুরীপাদ বললেন, "তুমি বিবাহ করো, কৃষ্ণের কৃপায় তোমার সন্তান হবে। কৃষ্ণনাম প্রচার সেইভাবেই হবে।" মাধবেন্দ্র পুরীপাদ ছিলেন সাক্ষাৎ চলমান জগন্নাথ এবং তিনি অদ্বৈতাচার্য্যের গুরুদেব। অদ্বৈতপ্রভুর বয়স যখন ১০০ বছর তখন মহাপ্রভু পরলোকগমন করলেন। অদ্বৈতপ্রভু ১২৫ বছর জীবিত ছিলেন। অদ্বৈতপ্রভু তাঁর প্রতিষ্ঠিত মদনগোপালে বিলীন হয়েছিলেন। অদ্বৈতপ্রভুর ছয় সন্তান। জ্যেষ্ঠপুত্র শ্রীঅচ্যুতানন্দ তিনি গৃহত্যাগ করেছিলেন। দ্বিতীয় সন্তান শ্রীকৃষ্ণ মিশ্র (মদনগোপাল বাড়ি), তৃতীয় পুত্র শ্রীগোপাল এবং চতুর্থপুত্র শ্রীবলরাম মিশ্র (এই বলরাম মিশ্র থেকেই শান্তিপুরে অন্যান্য গোস্বামীবাড়ির সৃষ্টি), পঞ্চমপুত্র শ্রীস্বরূপ এবং ষষ্ঠপুত্র শ্রী জগদীশ।

শ্রীকৃষ্ণ মিশ্র ছিলেন উচ্চমার্গের। অদ্বৈতপ্রভু এবং মহাপ্রভুর আদেশে মদনগোপাল কৃষ্ণ মিশ্রকে দান করেন। তিনদিন ধরে রাস উৎসব হয়। প্রথম দিন মদনগোপাল রাসমঞ্চে ওঠেন। দ্বিতীয় দিনও রাসমঞ্চে ওঠেন প্রভু। তৃতীয় দিন ভাঙারাস পালন হয়। এই পরিবারের বহু কুলতিলক ছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম শ্রী রাধাবিনোদ গোস্বামী (শ্রেষ্ঠভাগবত ভাষ্যকার এবং পণ্ডিত), শ্রী রাধিকানাথ গোস্বামী (পণ্ডিত ও

চৈতন্যচরিতামৃত এবং মহাপ্রভুর সময়ে যে গ্রন্থ রচিত হয়েছিল তার সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার ছিলেন)। এছাড়া পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র গোস্বামী এবং কৃষ্ণগোপাল গোস্বামী ১৩০৫ বঙ্গাব্দে পি.এইচ.ডি করেছিলেন। পণ্ডিত বিশ্বেশ্বর গোস্বামী ছিলেন দর্শনশাস্ত্রে সুপণ্ডিত এবং সংক্ষিপ্ত মহাভারত কাব্য প্রণেতা। শ্রী জিতেন্দ্রনাথ গোস্বামী ছিলেন ভাগবত ভাষ্যকার। পরিবারে নিত্যভোগ দেওয়া হয়। আজও শ্রীশ্রীরাধামদনগোপাল মন্দিরে নিষ্ঠার সঙ্গে পূজাপাঠ হয়।

শ্রীশ্রীকৃষ্ণ রায় জীউ ও শ্রীশ্রীকেশব রায় জীউঃ

শান্তিপুরের প্রাচীন মন্দিরের অন্যতম এই দুই মন্দির এবং বিগ্রহ। এই মন্দিরের ইতিহাসের সন্ধান দিলেন শ্রী তপন গোস্বামী (পরিবারের বংশধর-১৪তম)। পাগলা গোস্বামী বাড়ির দুই বিগ্রহ কৃষ্ণ রায় ও কেশব রায় জীউ। এই পরিবারের পুর্বপুরুষ অদ্বৈতাচার্য্যের চতুর্থপুত্র শ্রী বলরামের দশম পুত্র কুমদানন্দ গোস্বামী ছিলেন পণ্ডিত ও সাধক। কথিত আছে কৃষ্ণনগর রাজ কর্তৃক প্রদত্ত সম্পত্তি প্রত্যাখ্যান বা নষ্ট করায়, তাঁহার "আউলিয়া" নামে খ্যাতি রটে এবং সেই জন্যই এই শাখার নাম আউলিয়া বা পাগলা গোস্বামী। কুমদানন্দের দ্বারা "কৃষ্ণরাই" প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাঁচ বছর পর পুনরায় "কেবশরাই" প্রতিষ্ঠিত হন। এই পরিবারে রাস উৎসব, দোলউৎসব, ঝুলনযাত্রা, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি হ’ত। বলরামের কনিষ্ঠপুত্র কুমদানন্দ গোস্বামী, তাঁকে নারায়ণ শিলা দিয়েছিলেন অদ্বৈতাচার্য্য। রাসের সময় রাসমঞ্চে একই সাথে দুই বিগ্রহ পূজিত হন। বিগ্রহের বয়স প্রায় আনুমানিক ৪৫০ বছর। কথায় কথায় জানতে পারলাম রাসমঞ্চে বিগ্রহ স্বর্ণালংকারে সাজানো থাকে। বিগ্রহ তৈরীর পাঁচবছর বাদে তৈরী হয় গৌরনিতাই। বংশের হরিনাথ গোস্বামীর স্ত্রী অদ্বৈতমহাপ্রভু ও তাঁর স্ত্রী সীতাদেবীকে মূর্তি আকারে প্রতিষ্ঠা করেন। পরিবারে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। সকালে মঙ্গলারতি হয় এবং বাল্যভোগে ক্ষীর, মাখন, মিষ্টি, ছানা, নাড়ু ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। দুপুরে শাক, শুক্তনি, ডাল, মোচার ঘন্ট, পটলের তরকারি, ফুলকপির তরকারি, পোলাও, পরমান্ন, দই, চাটনি ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। সন্ধ্যায় আরতি হয়। কথায় কথায় জানতে পারলাম রাসের সময় রাসমঞ্চে বিগ্রহের সামনে রৌপ্যপাত্রে ভোগ নিবেদন করা হয় - যার আকার বিশাল। ভাঙারাসের দিন নগর পরিক্রমায় যান। প্রথমে বড়গোস্বামী বাড়ির বিগ্রহের পরই এই পাগলাগোস্বামী বাড়ির বিগ্রহ নগর পরিক্রমায় যান। ভাঙারাসের শোভাযাত্রায় দুই বিগ্রহের হাওদা প্রদর্শন এক অনন্য নান্দনিকতার আবেশ সৃষ্টি করেন। চতুর্থ দিন বিগ্রহদ্বয় কুঞ্জভঙ্গ শেষে নিজ নিজ মন্দিরে অধিষ্ঠান করেন। এই ভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে পূজিত হন দুই বিগ্রহ।

ঐতিহ্যমণ্ডিত বড় গোস্বামী বাড়িঃ

শান্তিপুরের প্রতিটি ধুলিকণা যাঁর লীলার সাক্ষী, বহুভক্ত এখনও শান্তিপুরের বাতাসে যাঁর সেই ধ্বনি কর্ণগোচর করার চেষ্টা করেন সেই শান্তিপুরনাথ, শান্তিপুর পুরন্দর শান্তিপুরের শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্য্যের পুত্র বলরাম মিশ্রের পুত্র মথুরেশ গোস্বামীর প্রথমপুত্র রাঘবেন্দ্র গোস্বামী থেকে সৃষ্টি হয় বড়গোস্বামী। পরিবারের বংশধর শ্রী সুদেব গোস্বামী আমাদের সেই ইতিহাসের খোঁজে দিলেন, তার ফলে শান্তিপুর নিয়ে প্রথম গবেষণার কাজ আরও এগিয়ে গেল। শ্রীঅদ্বৈতাচার্য্য নেপালের গণ্ডকী নদী থেকে একটি নারায়ণ শিলা পান। তিনি অপ্রকটের পর সেই শিলার সেবাভার অর্পণ করেন বলরাম মিশ্রের হাতে। বলরাম মিশ্রের পর সেই শিলার সেবাভার পরম্পরায় মথুরেশ গোস্বামীর প্রাপ্ত হয়। মথুরেশ গোস্বামী বর্তমানে বাংলাদেশের যশোহর থেকে শ্রীশ্রীরাধারমন বিগ্রহ শান্তিপুরে এনে প্রতিষ্ঠা করেন। শান্তিপুরের ভাঙারাসের পুরোধা বিগ্রহ শ্রীশ্রীরাধারমন জীউ প্রথমে পুরীতে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের আমলে দোলগোবিন্দ নাম পূজিত হতেন। কালা পাহাড়ের মন্দির ও শ্রীবিগ্রহ ধ্বংস যজ্ঞে আতঙ্কিত হয়ে রাজা বসন্ত রায় যশোহরে নিয়ে আসেন এই দোলগোবিন্দকে। বসন্তরায়ের গৃহে বেশ কিছুকাল পূজিত হন। রাজা বসন্ত রায়ের শ্রীগুরুদেব ছিলেন সীতানাথের পৌত্র মথুরেশ গোস্বামী। তখন ভারত মোঘল শাসনাধীন এবং রাজা মানসিংহের অত্যাচারে অবিভক্ত বাংলা ভয়ে জর্জরিত। শ্রীবিগ্রহের রক্ষনাবেক্ষনের জন্য বসন্তরায় গুরুদেবের হাতে তাঁকে সমর্পণ করেন। প্রভুপাদ মথুরেশ গোস্বামী শ্রীবিগ্রহ পদব্রজে শ্রী বিগ্রহ নিয়ে আসেন ও বড় গোস্বামী বাটীর মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। শান্তিপুরে এনে বিগ্রহের নতুন নামকরণ হয় "রাধারমণ জীউ"। শ্রীশ্রীরাধারমনকে নিয়ে বেশ আনন্দে কাটতে থাকে, হোঠাৎ ছন্দপতন হয়, বড় গোস্বামী বাটী থেকে বিগ্রহ অপহৃত হল। তৎকালীন প্রভু ও তাঁদের স্ত্রীদের নাওয়া খাওয়া বন্ধ হল। অনেক চিন্তার পর মাথায় এল যে শ্রীধাম বৃন্দাবনে গোপীরা "কাত্যায়নী ব্রত" করে লীলাপুরুষোত্তমকে পেয়েছিলেন। তাই এই ব্রত করেন শ্রীশ্রীরাধারমনকে পাওয়ার জন্য। চিন্তানুযায়ী দুর্গাপূজর সময় শ্রীশ্রীকাত্যায়নী মাতার পূজা শুরু হল। পূজার তৃতীয় রাত্রে স্বপ্নাদেশে জানেন যে দিগন-গরে একটি জলাশয়ে তোমাদের ইষ্টদেবকে ফেলে রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট জলাশয়ে পেয়ে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হল। রাধারমণ যাঁর কাছে বাঁধা সেই রাধারমণকে চিরদিনের জন্য বড় গোস্বামী বাটীতে রাখতে তৎকালীন প্রভুপাদ রাধারমণের পাশে রাধারাণীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কারণ পুরী থেকে যশোহর হয়ে শান্তিপুরে রাধারমণের একম মূর্তি এসেছিলেন। শান্তিপুরে শোভাযাত্রা করে ঘোরানো হয় রাধারমণের পাশে রাধারাণীকে প্রতিষ্ঠা করা হয় রাস উৎসবের সময়। খাঁ চৌধুরীরা ছিলেন বড় গোস্বামী বাটীর শিষ্য। ভাঙারাসের পরের দিন বড় গোস্বামী বাড়ীর যুগল বিগ্রহকে নানালঙ্কারে সজ্জিত করে অনুষ্ঠিত হয় "কুঞ্জভঙ্গ" বা ঠাকুর নাচ একটি খুবই মনোরম অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষে বিগ্রহকে অভিষেক করে মন্দিরে প্রবেশ করানো হয়। মথুরেশ গোস্বামীর সময়ে বড়গোস্বামী বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ। পরবর্তীকালে খাঁ চৌধুরী পরিবার থেকে শ্রীশ্রীরাধা গোপাল রায় জীউ বিগ্রহ নিত্যসেবার ভার বড় গোস্বামী বাটীতে দেওয়া হয়। তৎকালেই প্রতিষ্ঠিত হয় নদীয়া জেলার সর্বপ্রথম মহাপ্রভুর ষড়ভুজ বিগ্রহ। অযোধ্যাপতি রামচন্দ্রের বিশাল বিগ্রহ পূজিত হয় এই মন্দিরে। বড় গোস্বামী বাড়িতে ইদানীং প্রতিষ্ঠিত হয় "শ্রীশ্রী শিবেশ্বর"। বৈশাখ মাসের বৈশাখী পূর্ণিমায় শ্রীশ্রীরাধারমনের ফুলদোল হয়। শ্রীশ্রীরাধারমন জীউর "জামাই ষষ্ঠী" অনুষ্ঠান হয়। রথযাত্রা উৎসবও হয়। এইভাবে বিভিন্ন উৎসব নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাটীতে।

শ্রীশ্রীবংশীধারী জীউঃ

এই বংশীধারী জীউ সম্পর্কে ইতিহাসের সন্ধান দিলেন শ্রী সুশান্ত কুমার হালদার (মন্দিরের সেবাইত)। শান্তিপুরের কাঁসারী পাড়া নিবাসী ভক্তিমান কৃষ্ণচন্দ্রনাথের একমাত্র পুত্র রাম যদু নাথ যিনি কাঁসারী নামে পরিচিত ছিলেন, অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ব্যবসা সূত্রে বহু অর্থ উপার্জন করেছিলেন এবং বহু সম্পত্তি থাকায় ১৮৬৫ সালে বহ দক্ষ কারিগর নিয়োগ করে বংশীধারীর মন্দির স্থাপন করেন। শকাব্দ ১৭৮৭-২০শে আষাঢ়। দেববিগ্রহের কথা উল্লিখিত আছে। পূর্বমুখী এই মন্দির প্রাঙ্গনের উত্তর ও দক্ষিণে দুইটি আটচালার শিবমন্দির আছে। মন্দিরগুলিতে প্রাণবন্ত পোড়ামাটির মূর্তিগুলির অনুপম ভাস্কর্যের অসামান্য নিদর্শন। শিবমন্দিরের গর্ভে উত্তরদিকে যাদবেশ্বর ও দক্ষিণে কেশবেশ্বর নামের কষ্টিপাথরের শিব এবং মধ্যে বংশধারী ও রাধিকার আকর্ষণীয় যুগলমূর্তি সদা জাগ্রত। বংশীধারী জীউর রাস উৎসব, দোল, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি সমারোহে পালিত হয়। রামযদুনাথের আরাধ্য শীলার নাম বংশীবদন বলে অনেকেই বংশীবদন ঠাকুর বাড়ি বা মন্দির বলে থাকেন। বহু নিষ্ঠার সঙ্গে আজও বংশীধারী জীউ পূজিত হয়ে আসছেন। ঐতিহ্যের মেলবন্ধন যেন শান্তিপুরে পাওয়া যায়।

শান্তিপুরের বিখ্যাত সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরঃ

শান্তিপুর বৈষ্ণব ও শাক্তদের মেলবন্ধনের পীঠস্থান। তাই এই অঞ্চলের অন্যতম মন্দির সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির। এই মন্দির তৈরী করা হয় ১৬০৬ সালে, যা আজ প্রায় ৪০০ বছর অতিক্রান্ত। তৎকালীন রাজা ভবানন্দ মজুমদার (কৃষ্ণচন্দ্রের ঠাকুরদাদা) তিনি পার্বতীচরণ মুখোপাধ্যায় অথবা মতান্তরে ফকিরচাঁদ মুখোপাধ্যায়কে এই মন্দিরের দায়িত্ব তুলে দেন। এই মুখোপাধ্যায় পরিবারের আদি পদবী ওঝা (কৃত্তিবাসের বংশধর)। এই মন্দিরের বার্ষিক পূজা হয় দীপান্বিতায়। এছাড়া অক্ষয়তৃতীয়া বা বিভিন্ন পূজায় মন্দিরে দর্শনার্থীদের ভীড় দেখবার মতন। দীপান্বিতায় দেবীকে পোলাও, খিঁচুড়ি, মাছভোগ দেওয়া হয়, মিষ্টি, পরমান্ন, ক্ষীর ইত্যাদি ভোগ নিবেদন করা হয়। কথায় কথায় জানা গেল শান্তিপুরে যে কটি কালীপূজা হয় এই সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজা দিয়ে শুরু হয়। সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের সামনে নাটমন্দির তৈরী করা হয় পরবর্তীকালে। তৈরী করেছিলেন মালদা’র সরকার পরিবারের সদস্য। আগে সিদ্ধেশ্বরী কালীমূর্তি আগে মাটির ছিল পরবর্তীকালে পাথরের মূর্তি করা হয় (১৩৮৭ বঙ্গাব্দে)। কাশী থেকে নিয়ে আসে হয়েছিল। সবথেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দীপান্বিতায় পূজা ১১.৪০ মিনিটেই হবে পূজা। কোন কোন সময় যদি দীপান্বীতার সময় কিছুটি এগিয়ে থাকে তাও রাত ১১.৪০ মিনিটেই পূজা শুরু করার রীতি রয়েছে।

শ্রীশ্রী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বাটীঃ

শান্তিপুরের প্রাচীন মন্দিরের অন্যতম শ্রীশ্রী শ্যামসুন্দর জীউ-এর মন্দির। এই শ্যামসুন্দর মন্দিরের ইতিহাসের সন্ধান দিলেন শ্রী প্রশান্ত গোস্বামী (এই পরিবারের ১৪তম বংশপুরুষ)। কথিত আছে অদ্বৈতাচার্য্য বলরাম আর দেবকীনন্দনের শ্রীশ্রী রাধাশ্যামসুন্দর শ্রীবিগ্রহের প্রতিষ্ঠা কার্য স্বহস্তে করেছিলেন এবং দেবকীনন্দনের সেই নির্দেশ মতন এখনও বিগ্রহের সেবাপূজা হয়ে আসছে। দোলপূর্ণিমা, ঝুলন পূর্ণিমা, জন্মাষ্টমী এই বাড়িতে সাড়ম্বরে হলেও এই বাড়ির বিশেষত্ব রাস উৎসব। রাসের তৃতীয় দিন যুগল মূর্তি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে শান্তিপুরের পথে নগর পরিক্রমায় অংশ নেয়। এই বংশে শ্রীশ্রীঅদ্বৈতপ্রভুর নবম পুরুষ আনন্দ কিশোর গোস্বামী নামে এক পরম ভাগবত পুরুষ জন্ম নেয়। আনন্দ কিশোর গোস্বামী ছিলেন শ্যামসুন্দর অন্তপ্রাণ। প্রশান্তবাবুর কথায় শ্যামসুন্দর মন্দির প্রায় আনুমানিক ৪৫০ বছর প্রাচীন। শ্রীশ্রীঅদ্বৈতপ্রভুর নাতি দেবকীনন্দন গোস্বামী এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। কথায় কথায় জানা গেল এই বিগ্রহের সাথে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী খেলা করতেন, মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন স্বয়ং শ্রীশ্রীঅদ্বৈতপ্রভু পৌরোহিত্য করেছিলেন। রাস উৎসবের দিন দরিদ্রনারায়ণ সেবা হয়।এছাড়া এই পরিবারে রাসের প্রথম দুইদিন গুণিজনের উদ্দ্যেশ্যে সম্মান প্রদান করা হয়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম জগৎগুরু কাশীর শঙ্করাচার্য, স্বনামধন্য শ্রী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, শ্রীমতী হৈমন্তী শুক্লা ইত্যাদি মানুষের আগমন ঘটেছে এই পরিবারে। রাস উৎসবের জন্য কলকাতা থেকে সমস্ত ধরনের ফল আনা হয়। ভোগে থাকে পোলাও, পঞ্চব্যঞ্জন,পরমান্ন, দই, মিষ্টি ইত্যাদি প্রদান করা হয়। এই পরিবারের কুলপুরোহিত ছিলেন শ্রী অমূল্য ভট্টাচার্য্য। আজও এই বাড়িতে নিষ্ঠার সঙ্গে পূজিত হন শ্রীশ্রী শ্যামসুন্দর জীউ। শান্তিপুরের প্রাচীন মন্দিরের মধ্যে অন্যতম এই গোপীকান্ত জীউ। শান্তিপুরের গোস্বামী বাড়ীগুলির শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার যুগল বিগ্রহের রাসীলীলা অনুষ্ঠানের নগর পরিক্রমানুষ্ঠানের প্রচলনের খাঁ বংশের পূ্র্বপুরুষ। এই বংশের রামগোপাল খাঁর তিন ভাই, রামজীবন, রামচরণ ও রামভদ্র। রামচরণ খাঁ শ্রীশ্রীগোপীকান্ত জীউ নামে কৃষ্ণ রাধিকা বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। মতান্তরে কৃষ্ণবল্লভ (শ্রীমন্ত খাঁর দ্বিতীয় পুত্র) এই জীউ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গোপীকান্তের নিত্যসেবার জন্য অনুকূল চন্দ্রকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। রাস উৎসব, দোল, জন্মষ্টমী ইত্যাদি উৎসব পালিত হয় এই মন্দিরে। আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পূজিত হন শ্রীশ্রী গোপীকান্ত জীউ।

শান্তিপুরপর্বের প্রাথমিক গবেষণায় ছিলেন শ্রীমান্ বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীমান্ সৌমজিৎ মাইতি এবং শ্রীমান্ শুভদীপ রায় চৌধুরী। শান্তিপুরের ইতিহাসচর্চার পর্ব ভবিষ্যৎ-এ আরও বিস্তারিত হবে। ইতিহাসের সাথে থাকুন, ঐতিহ্য, ধারাবাহিকতা, মেলবন্ধন এবং সঠিক তথ্যের অনুসন্ধান করাই বনেদীর-বনেদীয়ানা পরিবারের মূল লক্ষ্য।

​​কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ সমস্ত মন্দিরের সদস্যদের, পরিবারের সদস্যদের এবং শান্তিপুরের বহু মানুষ যারা বিভিন্ন ভাবে গবেষণায় সাহায্য করেছেন ।

তথ্যসূত্র গবেষণায়ঃ শ্রীমান্ শুভদীপ রায় চৌধুরী

Comments

Top

গল্প

মেঘবালিকা
মৈত্রেয়ী মুখোপাধ‍্যায়

 

টুপটাপ করে গাছের পাতায় জল পড়বার শব্দ। ওমা বৃষ্টি পড়ছে যে! জানলার গরাদ ছেড়ে ছোট্ট মেয়েটি এক ছুট্টে বাইরে। বৃষ্টিও এই ছোট্ট মেয়েটির সাথে খেলায় মেতে উঠল যেন। মেয়েটির চোখের পাতা ভিজিয়ে, গাল ভিজিয়ে বৃষ্টি আদর করছে। দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করছে যেন বারিধারাকে। চঞ্চল মেয়েটির পায়ের নিচে জল থৈ থৈ। মেঘও যেন মেয়েটির কাজল কালো চোখের কাজল মেখে নিয়েছে।
তাদের সঙ্গে সঙ্গ দিতে গাছগুলিও নাড়ছে মাথা। তাল মিলিয়ে ডাকছে ব‍্যাঙ। জুঁই- করবীর গন্ধে মাতোয়ারা চারিদিক।প্রকৃতি সেজেছে বর্ষারাণীর সাজে।
মেয়েটি নিজেকে ভাবে মেঘবালিকা। তার কল্পনালোকে অবাধ বিচরণ। মন‌‌‍স্চক্ষে দেখা দৃশ‍্যের নেই কোন পরিসীমা।
দরজার পাশ থেকে মা দেখে তর পাগলি মেয়ের কান্ড "ওরে ঘরে আয়,আর ভিজিস না, ঠান্ডা লাগবে তো।" মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ছোট্ট মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলে, "তুমিও এসো না মা।" ছুট্টে এসে মায়ের হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসে। "কি সুন্দর চারিদিক! না মা?" কোনো গোপন ব‍্যথা চেপে রেখে মা হেসে বলল, "ঠিক তোর মতো মিষ্টি।" মাকে জড়িয়ে ধরল সে, মায়ের স্নেহচুম্বন স্পর্শ করল তার ললাট।

আজো জানলার গরাদ ধরে দাঁড়িয়েছিল 'মেঘবালিকা', সদ‍্য যুবতী সে। টুপটাপ নয়,অঝোর ধারে চলছে বর্ষণ। তার মনখারাপের খবর মেঘ রাখে! অবাক হয় সে। বেরিয়ে আসে বাইরে, ছুটে নয়, ধীর পায়ে। চোখের কাজল আজ ধুয়ে যাচ্ছে চোখের জলেই, বৃষ্টি তো উপলক্ষ মাত্র। দুই হাত মেলে যেন আহ্বান করে বৃষ্টিকে। "আরো জল ঢালো মেঘ, তোমার মেঘবালিকার চোখের জল শুধু তুমি দেখবে, আর কেউ না, কেউ না।" উচ্ছ্বসিত কান্নায় ফুলে ফুলে উঠতে লাগল তার শরীর। প্রকৃতিও আজ যেন বিমর্ষ, মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিতে ব‍্যস্ত। মেয়েটি সুন্দরী, সবচেয়ে আকর্ষণীয় ওর দুটি কালো গভীর চোখ। মেয়েটি ছিল বাগদত্তা। তার বাবার বাল‍্যবন্ধু চেয়েছিলেন তার বড় ছেলের সাথে বিয়ে দেবেন মেয়েটির। কয়েকবছর আগে

আকস্মিক অসুস্থতায় উনি গত হয়েছিলেন। তার সাথেই তাঁর দেওয়া কথাও হারিয়ে গিয়েছে সেটা বোঝেনি মেয়েটি। ছেলেটি বিদেশে উচ্চপদে চাকুরিরত, তার মাও ভুলে গেছে তাঁর স্বামীর দেওয়া কথা তার অন্তরঙ্গ বন্ধুকে।
রঙিন স্বপ্ন চোখে সাজিয়েছিল মেয়েটি তিল তিল করে, আজ সেই স্বপ্ন তুরুপের তাসের মতো ভেঙে গেল প্রত‍্যাখ‍্যাত হয়ে। ছেলেটি কথাই বলেনি, তার মা ই স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে তার ছেলের জীবন এক অন্ধ মেয়ের জন‍্য নষ্ট হতে দিতে পারেন না। সে তার সুগভীর কাজল কালো চোখদুটি থেকে গড়িয়ে পড়া জল লুকোতে চলে এসেছিল তার সবচেয়ে প্রিয়স্থানে।
কখন বসে পড়েছিল খেয়ালই করেনি মেয়েটি। হঠাৎ পিঠে এক হাতের আস্বস্ত ছোঁয়ায় বুঝল মায়ের উপস্থিতি। জড়িয়ে ধরল তার গর্ভধারিনীকে। পরম মমতায় বুকে টেনে নিল মা‌। উভয়ে নির্বাক। মায়ের স্নেহচুম্বন ভেঙে দিল তার চোখের জলের বাঁধ। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে মা বলল, "ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন‍্য মা। সব ঠিক হয়ে যাবে, তোর উপযুক্ত কাউকে ভগবান ঠিক পাঠিয়ে দেবেন। কাঁদিস না আর, চল ঘরে চল।" "মা, সবাই কেন বাইরের চোখের উপস্থিতি খোঁজে? মনের চোখে যা দেখা যায় তা তো চোখে দেখার তুলনায় অনেক স্পষ্ট, অনেক খাঁটি।" কান্না ভেজা গলায় বলল 'মেঘবালিকা'।

"হ‍্যাঁ মা, তুই ঠিকই বলেছিস। মানুষকে তো চেনা যায় মনের চোখ দিয়েই। যারা সেটা বোঝেনা, যাদের কাছে বাহ‍্যিক চোখই প্রধান তারা তোকে বুঝবে না, সেটা তাদের বোধের পরাজয়।", মেয়েকে বোঝায় মা।প্রকৃতিও সহমত। আনন্দের হিল্লোল যেন উঠেছে পাতায়-পাতায়, ফুলে-ফুলে। মেঘও যেন খুশিতে আরো মুক্তো ছড়িয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টিও সানন্দে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাদের আদরের মেঘবালিকার চোখ, মুছিয়ে দিচ্ছে অশ্রুজল। আর তার সাথে তাল মিলিয়ে ব‍্যাঙ ও উঠল ডেকে। জুঁই-করবী ফুলে ফুলে আবার সাজল প্রকৃতি।

নতুন করে স্বপ্ন সাজানোর পালা যে!

Comments

Top

কবিতা

সুমিতাংশু দোয়শী

সহজ

হজ পথে সহজ ভাবে সহজ কথা চাই

রূপক কথা ভুল বুঝিয়ে দ্বন্দ্ব যে বাড়াই।

সহজ মতে সহজ রূপে মানুষ ভজন করো

সোনার মানুষ আসে পাশে খুঁজে নিয়ে ধরো।

তত্ব কত ঘাটবে বলো সময় কোথা পায়?

সহজ কথা আপন হয়ে হৃদে গো সিঁধায়।

কঠিন বলে সহজ কে ভাই মুখোশে লুকোলে,

কি লাভ হবে যারে দিলে সেই যদি না পেলে?

চালক অতি, জ্ঞানের বোঝা, বন্ধ গো মন করো

সব জনাকে আপন করে সবার সাথে ঘোরো।

মানুষ সনে মিশলে পরে রসিক পাওয়া যায়,

রসিক যেজন, আসল চতুর, লালন বলে তাই।

সহজ পথের মজা অনেক, চিন্তা কেনো করো?

পথ আছে ওই সামনে খোলা,যাত্রা শুরু করো।

সহজ অতি খাঁটি গো ভাই, সহজ কথা চাই,

সহজ মানুষ ছাড়লে পরে লাভ তো কিছুই নাই।

সহজ কথার মজা ভারী, সবে বুঝতে পারে,

মনের মানুষ নিজে আসেন হৃদ্মাঝারের ঘরে।

সহজ কথা মিষ্টি ভারি, মনে প্রবেশ করে,

ভাবনা ভরা মনকে গো ভাই অতি শান্ত করে।

সহজ খুঁজে, সহজ বুঝে সহজ চলি তাই,

বিপাসনায় মুগ্ধ হয়ে ধ্যান এ বসা চায়।

চিন্তা যত মুক্তধারা আপনি বয়ে চলে,

ভক্তি পদ্ম আমি গো ভাই তাই পরেছি গলে।

মূর্খ আমি অজ্ঞানি এক বিদ্যা কিছুই নাই

লালন, কবীর তাই শুনি গো, শান্তি বড়োই পাই।

মানুষ গুরুর করতে ভজন লালন এ কহিল,

সহজ কথা, কী সুন্দর, ছন্দে বেঁধে দিল।

এসো গো ভাই সকল মিলে মানব সাধন করি

অতি সহজ, সরল অতি, গুরুর চরণ ধরি।

অশান্ত সব জীবন যত শান্ত হওয়া চাই।

দ্বন্দ্ব বিভেদ ভুলে সবে মিলন হবে তাই।

মিলবে সবাই সবার সনে এই টুকুনি আশা

বইবে বুকে মিলন বাণী মধুর হবে ভাষা।

এপার সাথে ওপার মিলন নিজের চোখে দেখা

সুরের ছন্দে মিল হয়েছে, হিংসা মরুক একা।

যেজন বলে প্রেমের বাণী, সেজন একলা কভু নয়,

সবাই যে তার বন্ধু গো তার পর তো কেহই নয়।

মানুষ প্রেমে পড়লে গো ভাই সহজ বোঝা যায়

ভজলে মানুষ গুরুর চরণ শান্তি পাওয়া যায়।

শান্তি নামুক বিশ্ব ’পরে এই কামনা করি

মিলন হবে, বিভেদ যাবে, বিশ্বাসে ভর করি।

সবার মাঝে মিলে মিশে থাকতে সবাই চায়

সহজ হলেই মিলবে সবে, এই তো গো উপায়।

কবিতা

পীযূষ কান্তি দাস

জন্ম -অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম। ইচ্ছা ছিলো সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে নেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা আর নিয়তি টেনে নিয়ে গেল অন্যপথে আর পেশা হল স্বাস্থ্যকর্মী। দীর্ঘ চল্লিশ বছর পেশার চাপে সব রকমের সাহিত্য থেকে বহুৎ দূরে। 

আমার ছেলেবেলা 

​যাবি বন্ধু নিয়ে আমায় সেই সে সোনার গাঁ,

সবুজ যেথা আলপনা দেয় প্রতীক্ষায় রয় মা।

চৈত্র শেষে চড়ক পূজা কিংবা রথের মেলা , 

স্বপ্নেভরা দিনগুলো সেই আমার ছেলেবেলা। 

ধুলোমাখা লুটোপুটি চালতেগাছে ঝোলা,

বলনা সখা বলনা আমায় যায় কী সেসব ভোলা?

 

নদীর ধারে জল পি পি ডাক - পানকৌড়ির ডুব,

ছিপের ফাতনা উঠলে নড়ে  ঠোঁটে আঙুল "চুপ"।

ধরতে ছানা টিয়াপাখির শিরিষগাছে চড়া,

ভয়ে ভয়ে স্কুলে যাওয়া হয়নি যেদিন পড়া।।

 

গরমকালে দুপুরবেলা একসাথে সব মিলে,

পাড়ের থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া ময়নামতির ঝিলে।

মনে পড়ে এক রবিবার গিয়ে নদীর ঘাটে,

নৌকা খুলে নিরুদ্দেশে বক্সীগঞ্জের হাটে!

দুপুর গিয়ে বিকেল হলো ফিরি যখন বাড়ি,

বেঁচেছিলাম তাড়াতাড়ি ধরে মায়ের শাড়ি॥ 

 

জানাদের সেই পুকুরে ভাই কেমন মাছের ঘাই,

চোখ বোজালে আজও যে হায় দেখতে আমি পাই। 

অমল কমল কোথায় আছে কোথায় শ্যামলী তারা,

একলা বসি বারান্দায় আর দুই চোখে বয় ধারা॥ 

 

আজকে আছে বাড়ি -গাড়ি জামা -কাপড় দামী,

নাম হয়েছে যশ পেয়েছি নই রে সুখী আমি।

শেষ হলো প্রায় দিনগুলো হায় সাঙ্গ ভবের খেলা,

আজও আমায় কেমন কাঁদায় আমার ছেলেবেলা॥

কবিতা

রূপা মন্ডল

দুর্গাপুজোর দিনগুলি

​কাশের দোলায় সাজছে মাঠ, 

ঢ্যাং কুড়কুড় বাজছে ঢাক।

সেজে উঠেছে পুজো-বাড়ি,

খুকুর মায়ের নতুন শাড়ি।

খোলা চুলে আঁধার ঘনায়,

জল-পদ্ম রয়েছে থালায়।

পুজোর গন্ধে মাতোয়ারা,

ঠাকুর দালানে মন্ত্র পড়া।

শিউলি ফুলে গাঁথা মালা,

পঞ্চ-ব্যঞ্জন ভোগের থালা।

সবার মনে আনন্দ খুব।

কলা-বৌ দিলো ডুব।

ধান-দূর্বা, ফুল-চন্দন,

ঢাকের তালে খোকার নাচন!

সন্ধ্যাবেলা ধুনুচি নাচ,

আরতির প্রদীপের আঁচ।

রাত পর্যন্ত গল্প-গুজব,

পুজোর আনন্দে ভরা পরব।

সুন্ধিপুজোয় একশো-আট,

পদ্ম-মালা, ফুলের হাট।

সারি সারি প্রদীপ জ্বেলে,

ভক্তিভরে পুজো চলে।

দালান কোণে চন্ডীপাঠ,

হোমাগ্নিতে বেলের কাঠ।

হোমের টিপ্, হাতে প্রসাদ।

তুলনাহীন ভোগের স্বাদ!

দশমীতে মনটি ভার!

কৈলাসে মা যাবে আবার।

ফিরবে উমা বছর পরে,

ঢাকের বাদ্যি করুণ সুরে।

সিঁদুর খেলা, মা-কে বরণ,

স্পর্শ করি মায়ের চরণ।

 
 
 

Comments

Top

 

কবিতা

তনুশ্রী রায়

বিনাগুরি, জলপাইগুড়ি, পঃ বাংলা 

প্রলয়

​​সীমাহীন, বহুদূর, অজানা শপথ 

সবই নাকি মাফ, যার হৃদয় বৃহৎ 

এতো সংকীর্ণা! দেখে লাগে ঘেন্না!

বাড়াবাড়ি দাবি? নাকি হদ্দ অবোধ? 

 

বহুবার মোচড়ায়, আঁচড়ায় বুক 

হাতছানি দিয়ে হাসে না দেখা চাবুক 

কেন একাকিত্ব! অপ্রিয় সত্য!

হাড়হিম রাত? নাকি fantasy সুখ?

 

কটকটে লাল চোখ, কেঁদে ম্রিয়মাণ 

ফোটে হুল, নাকি শুল, শুষে খায় প্রাণ

কানফাটা শান্ত! লেখা পড়ে ক্লান্ত! 

tipsy তাকানো? নাকি নেকামোর ভান?

 

প্ররোচনা, মন্ত্রণা, যন্ত্রনা সয়

casual, নির্বাক, এড়ানো সময়

গা গরম করা peg! কবচ দেওয়া আবেগ!

উপড়ে ফেলবে? নাকি থামবে প্রলয়?

কবিতা

বিদ্যার্থী দত্ত

ডিপার্ট্মেন্ট অফ লাইব্রেরী অ্যান্ড ইনফরমেশন সাইন্স বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়,

মেদিনীপুর, পঃ বাংলা 

অপেক্ষা

 

​অপেক্ষায় আছি,
গল্পের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা
ঘটনার ঘনঘটা
কালো বাদুড়ের মত ঝুলে আছে,
পুকুরের আয়নায় দোদুল দোলায়
কলাগাছের সারি।

অপেক্ষায় আছি,
কবিতার ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে পড়া
ছন্দের কথকতা
চড়ুই পাখির মত ধুলো ঘাঁটছে,
আকাশের ইশারায় পাখা মেলে দেয়
মহাশ্বেতার হাসি ।

অপেক্ষায় আছি,
নাটকের অঙ্কে অঙ্কে ঝিকিয়ে ওঠা
আবেগের অস্মিতা
মাতালের লাল চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছে,
ঈশানের কালো মেঘ ঝাঁকুনি দিয়ে যায়
আগন্তুকের ছুরি ।


অপেক্ষা অন্তহীন

সামগান রাত্রিদিন,
আকস্মিকের ফুলকি
অপেক্ষার অন্তরীপে
ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি।

 

কবিতা

দীনেশ দাস

কোল

দিনতো শুধু তরী বারই তরে,

কতো নিশি সাথে চলে যায়,

জীবনের প্রভাত সূর্য্য আজও,

দেখিলাম না এ চোখেতে হায়।

 

শুধু পথে বেসুরো একতারা হাতে,

আনন্দ সব কবেই গিয়েছে পাটে,

কোল খুঁজে বেড়াই আমি কাঁদবো শুধু,

তবে কি সারা জীবনে ঘুমাবো না কভু।

 

নিয়তির এই পরিহাস বেদনা রূপে অপরূপ,

যে যে জন ঘুড়িতেছ প্রেমের পিয়াসার তরে,

কেউ কি পেয়েছ দেখা তার এই মায়ার সংসারে।।

 

Comments

Top

কবিতা

অনর্ঘ

দুই  রাত্রির উপাখ্যান 

কটা রাতঃ

ধোঁয়াটে স্পর্শ খুঁজে মূহুর্তগুলো কেটে যায। 

শাব্দিক স্বপ্নেরা বদলে যায় উপমায়, 

আকাশচারণ করা লাল-নীল কল্পনায়।

নীরর পৃথিবী বাঁচে রাত্রির নিঃসঙ্গতায়।

আরেকটা রাতঃ

নিয়ন্তা অপ্সরা বেছে নিয়ে বেহেশতে যায়;

লাল আলো মিশে যায় সৃষ্টির কোণায় কোণায়।

মানুষের বেঁচে থাকা নিষিদ্ধ আদেশনামায়,

প্রগতির পইরহাসে কেউ ভেসে যায় নর্দমায়।

 
 

কবিতা

দীপক মান্না

এভাবেই গোলাপি বাগান পুড়ে ছাই হয়

 

বাঁ-দিকটা পুড়ছে ক্রমশ 

ছাই হয়ে যাচ্ছে জমানো ধনসম্পত্তি

প্রাচীর ভেদ করে ঢুকে পড়ছে -

আগুনের লেলিহান শিখা  

গোলার ভিতর সযত্নে রাখা বাসনাগুলো

উচ্চস্বরে চিৎকার করে দগ্ধ হতে থাকে  

কংক্রিট স্তম্ভের মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকি

বন্ধ চোখের ভিতর সরস্বতী বয়ে যায়

কানের পর্দায় আছড়ে পড়ে আর্তনাদ    

তিল তিল করে জমানো ইচ্ছেরা  

আগুন মেখে সংঞ্জাহীন লুটিয়ে পড়ে। 

এভাবেই তবে আগুন লাগে বুঝি

এভাবেই  গোলাপি বাগান পুড়ে ছাই হয়। 

Comments

Top

 

কবিতা

মৌমিতা দান

কথা দিলাম

 

​সবকিছু পরিপূর্ণ হওয়ার পর 

কোনো এক বৃষ্টিমুখর দিনে বিকেলবেলা ধোঁয়া উঠতে থাকা কফিমগ নিয়ে যদি কোনোদিন জানলার পাশে বসিস-

কথা দিলাম- আমি আসব। 

তোর ঘরে তখন স্পিকারে হালকা রবীন্দ্রসংগীত বা কোনো ইংরেজি গান চলবে... ঠিক তখুনি আমি আসব; তাল কাটতে কিংবা ওই সুরে ভেসেই তোর কানে বাজব।

তখনও কি বিরক্ত হবি? 

বা ধর ওই ঠান্ডা হাওয়ায় যদি মিশে আসি? 

কিংবা বৃষ্টিছাটে! 

ঠিক কীভাবে গেলে চিনবি আমায়? 

আমি বরং আশ্রয় চাইতে যাব-

এক বৃষ্টিভেজা মাছরাঙা হয়ে...

তুই যত্ন করে খেতে দিবি, 

আগুনের ওমে ভেজা শরীর শুকনো হবে। 

ফেরার সময়, ফিরব না হয় ধূসর নিয়ে। 

কথা দিলাম- তবুও যাব;

বৃষ্টিমুখর দিনে। 

 

কবিতা

কুশল চক্রবর্তী

অন্তরাল

ঠাৎ হয়তো থেমে যাবে ছন্দ

আলো আঁধারির গভীর অন্তরালে

গোধূলীর রক্তিম সূর্যের খানিক ছটা এসে পড়বে

নিস্তব্ধ নদীর কোলে

মিশে যাবে সব রঙিন আবেশ

কঠিন সত্যের অনুসন্ধানে

 

হঠাৎ হয়তো শুরু হবে স্তব্ধতার আগের হাসি

স্বপ্নে বিভোর নতুন সকালে

স্নিগ্ধতার কিরণে ভেসে ওঠা খুশির খেয়া

বহমান নদীর কোলে

সীমাহীন নীরবতায় মুগ্ধ সুরের রেশ

পূর্ণতা পাওয়া সুখের অনুসন্ধানে

Comments

Top

প্রবন্ধ

 

মার্গারেট নোব্‌ল্‌-এর নবমূল্যায়ন

ড. রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায়

লিখিত ‘কাগুজে সিংহী’

শ্রী সৌরভ দাশগুপ্ত, নিমতা বাসী,

রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ-অভেদানন্দ বিষয়ে লেখক।

অভিষেক চন্দ

ঠাকুরপুকুর, কলকাতা

ভারতবর্ষে ও বিশ্বের অন্যান্য কয়েকটি দেশে ২০১৭ সালে যখন ভগিনী নিবেদিতার জন্মের পর ১৫০ বছর পূর্তি মহা উৎসাহে পালিত হচ্ছিল, তার একটু আগেই জুন ২০১৭ অধ্যাপক রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায়ের লেখা “কাগুজে সিংহী”: মার্গারেট নোব্‌ল্‌ (বাঙলার মুখ প্রকাশন) আত্মপ্রকাশ ক’রে দাবী জানিয়েছে তাঁর নবমূল্যায়নের। একদিকে ভক্তি আপ্লুত জনমানসে নিবেদিতা সম্বন্ধে বহুভাষিত অতিকথন, অন্যদিকে লেখকের সত্যান্বেষণ ও বিশ্লেষণের ক্ষমতায় রচিত হয়েছে এই চমকপ্রদ জীবনীটি। সমগ্র বইটিতে ড. চট্টোপাধ্যায়, যিনি ১৯৮১-১৯৯৩ মার্কিন দেশে গবেষণান্তে পরে কলকাতার বসু বিজ্ঞান মন্দিরে গবেষক-অধ্যাপক ছিলেন, মার্গারেট নোব্‌ল্‌ (১৮৬৭-১৯১১) সম্বন্ধে গজিয়ে ওঠা মিথ্‌গুলিকে অপনয়নে ব্রতী।

বর্তমান প্রবন্ধে এই চমকপ্রদ জীবনীটির কিছু কিছু চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণ / সিদ্ধান্ত-গুলির উল্লেখ করছি।

১) বহুল প্রচলিত ‘সিসটার নিবেদিতা’ নামটির মধ্যে ‘Sister’ উপাধিটির উৎপত্তি-প্রসঙ্গে রাজাগোপালের আবিষ্কার, ওই উপাধিটি তৎকালীন কলকাতার সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান মিররেই সৃষ্টি (পৃ.৭-৮)।

২) নিবেদিতার ব্যক্তিজীবনে তিনি কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথা-মাফিক পড়াশোনা করেন নি। তাঁর লেখা-পড়া স্কুল জীবনেই শেষ হয়, যদিও রাজাগোপাল দেখিয়েছেন, ১৮৭৪ থেকেই ইংল্যান্ডে কেম্ব্রিজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় দুটিতেই মহিলাদের জন্য নতুন কলেজ শুরু হয়েছিল (পৃ.৩৩-৪০)। যদিও, পরবর্তীকালে মার্গারেট বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে এস নিজেকে পরিশীলিত করার সুযোগ পেয়েছিলেন (পৃ.৭৬-৯৪)। এনারা সকলে মার্গারেটের গুরুতুল্য। রাজাগোপালের দৃষ্টিতে, ‘সপ্তগুরু’।

৩) কলকাতা পৌরসংস্থার ‘পুরশ্রী’ পত্রিকার সম্পাদক হরিহর প্রসাদ মন্ডল তাঁর ‘ভগিনী নিবেদিতা – সার্ধশত জন্মবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি’ (ফেব্রুয়ারী, ২০১৮) বিশেষ সংখ্যাটির ভূমিকায় লিখেছেন, “স্বামী বিবেকানন্দের এই সুযোগ্যা শিষ্যা যে কেবল নারীশিক্ষা বিস্তারেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তা-ই নয়, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা সহ জীবনের সর্বত্র তাঁর বিচরণ বিস্ময়কর”। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে, এই ধরনের বক্তব্য থেকে নিবেদিতাকে ভারতের স্ত্রী-শিক্ষার পথিকৃৎ ভাবলে ভুল হবে। কারণ, ভারতে তাঁর আগমনের অনেক আগে থেকেই স্ত্রী-শিক্ষার সূচনা হয়েছিল। যেমন, Chandramukhi Basu – A pioneering Daughter of India, সুনন্দা ঘোষ লিখিত বইটিতে চন্দ্রমুখী বসু (১৮৬০-১৯৪৪) নামে এক বিদুষী বাঙালী মহিলার কথা আছে। চন্দ্রমুখী ১৮৮৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম এম.এ. পাস করেছিলেন ইংরেজীতে। পরে চন্দ্রমুখী বেথুন কলেজের অধ্যক্ষ পদে নির্বাচিত হন ও ১৯০১ সাল অবধি তিনি ঐ পদে আসীন ছিলেন। পরে তিনি স্থায়ীভাবে দেরাদুনে বসবাস করতেন। চন্দ্রমুখী বর্তমানে আলোচিত ড. কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর (১৮৬১-১৯২৩) বেথুন কলেজের সহপাঠিনী ; কাদম্বিনী ছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করা প্রথম লেডী-ডাক্তার। বেথুন কলেজে অধ্যাপক পদে থেকে চন্দ্রমুখী বসু ছাত্রীদের জন্য যে নির্দেশিকা (Guideline) প্রস্তুত করেছিলেন, শতাব্দীর অধিক অতিক্রান্ত হলেও তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কাজেই, শুধু শিক্ষাবিদ হিসেবে নয়, প্রশাসনিক দক্ষতায়ও চন্দ্রমুখী ছিলেন অত্যুজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব অথচ প্রচারের আলোক থেকে চিরবঞ্চিত ! এছাড়াও সময়ের বিচারে, কলকাতার বুকে বেথুনের পরেই স্থাপিত হয়েছিল ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়, সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের আয়োজনে(১৮৯০)। বেথুনের স্ত্রীশিক্ষা বা ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের কথা রাজাগোপাল তাঁর বইটিতে উল্লেখ না করলেও, মার্গারেটের অবদান বিচার করার তাগিদে শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতমা স্ত্রীভক্ত গৌরীমার বিষয়ে একটি গোটা অধ্যায় লিখেছেন, সেটির শিরোনাম : ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্যা মৃড়ানী চট্টোপাধ্যায় (১৮৫৮-১৯৩৮) বা গৌরীমা : রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপিত হবার আগেই সারদেশ্বরী আশ্রমের প্রতিষ্ঠাত্রী’ (পৃ.৯৫-১০১)। সন্ন্যাসিনী গৌরীমা কলকাতার অনতিদূরে ব্যারাকপুরে গঙ্গাতীরবর্তী শ্রীশ্রী সারদেশ্বরী আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৮৯৪/১৮৯৫, তখনও মার্গারেট ভারতে পা দেন নি। রামকৃষ্ণ মিশনের তরফ থেকে কোনও আর্থিক সাহায্য ছাড়াই, গৌরীমা ১৯১১ সালে তাঁর কলকাতার শ্যামবাজারের আশ্রমটির জন্যও অর্থসংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, ‘যা মার্গারেট নোব্‌ল্‌-ও পারেন নি’ (পৃ.১০১)।

৪) ড. রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায় ‘মার্গারেটের শিক্ষাচিন্তা ও বাগবাজারে স্কুল’ নামে একটি অধ্যায় লিখেছেন (পৃ.১৯২-২০৪)। খুব সংক্ষেপে বলা যায়, রাজাগোপাল দেখিয়েছেন, শিক্ষা সংক্রান্ত নিবেদিতার অনেকগুলি প্রবন্ধ অতি সুন্দর এবং আজও প্রাসঙ্গিক। এরপর আছে বাগবাজার পল্লীতে মার্গারেটের জীবনের কিছু বর্ণনা। শেষে আছে, বিদ্যালয় রূপায়ণে মার্গারেটের ব্যর্থতা (পৃ.২০২-২০৪), কারণসমেত ও প্রমাণসমেত।

৫) পূর্ণবয়স্কা নারী হিসেবে মার্গারেট নোব্‌ল্‌-এর চরিত্র, দোষ-গুণ সবকিছু বুঝতে হলে তাঁর জন্মভূমি আয়ারল্যান্ডে কাটানো বছর পাঁচেক ও শিক্ষাভূমি ইংল্যান্ডে কাটানো পরবর্তী ২৫ বছর, বিশদভাবে জানতে হবে। ড. রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায় সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন চারটি অধ্যায় – ‘মার্গারেটের ছেলেবেলা’ (পৃ.১১-২৩), ‘মার্গারেটের কৈশোর’ (পৃ.২৪-৩১), ‘মার্গারেট উচ্চশিক্ষায় যাননি’ (পৃ.৩২-৪০) এবং ‘মার্গারেটের চাকরী, সাহিত্যচর্চা ও প্রেম’ (পৃ.৪১-৫৭)। প্রধানত লিজেল রেমঁর লেখা The Dedicated : A Biography of Nivedita (নিউ ইয়র্ক, ১৯৫৩) ও শঙ্করীপ্রসাদ বসুর লেখা ‘লোকমাতা নিবেদিতা’ (১ম খন্ড ২য় পর্ব) ব্যবহৃত হয়েছে, তবে রাজাগোপালের নতুন বিশ্লেষণের সাহায্যে এগুলির অন্তর্নিহিত সত্যগুলি ফুটে উঠেছে। এই অধ্যায়গুলি ভালো ক’রে বোঝার জন্য ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রচুর রঙিন তৈলচিত্র, সাদাকালো চিত্র ও ফটোগ্রাফের সমাবেশ ছাপা হয়েছে, যা রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ-নিবেদিতা সাহিত্যে বিরল।

৬) বালিকা বিদ্যালয় রূপায়ণে মার্গারেট পুরোপুরি ব্যর্থ হলেও, জগদীশচন্দ্র বসুকে নানাভাবে সাহায্য করে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করার ব্যাপারে জগদীশচন্দ্রের একজন এজেন্টের মত কাজ করেছিলেন। রাজাগোপালের অভিমত, এগুলি ‘তাঁর শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানকেও অতিক্রম করেছিল’ (পৃ.২২৬)।

৭) রাজাগোপাল একটি আলাদা অধ্যায় লিখেছেন ‘মার্গারেটের বক্তৃতা সফর : পাশ্চাত্যে ও ভারতে’ (পৃ.২৬৬-২৮৭) শিরোনামে। ১৮৯৯-১৯০০ আমেরিকায় তাঁর বক্তৃতাসফরের নীট ফল ছিল শূন্য, কারণ বিষয়বস্তু না শিখেই তিনি বক্তা হিসেবে নিজেকে জাহির করতে গিয়েছিলেন (পৃ.২৭১)। ১৯০২ থেকে তাঁর ভারতের বক্তৃতাগুলির সফলতাও বেশ সীমিত ছিল (পৃ.২৮৬)। কাজেই, এরপর তিনি বক্তৃতার বদলে তাঁর লেখনী-প্রতিভার গুরুত্ব বুঝলেন (পৃ.২৮৭)।

৮) যেমন, শতধারায় বর্ষিত বৃষ্টির জলকে পৃথিবী ধারণ করতে হলে নদী-নালা বা পুষ্করিনীতে শূন্যতার প্রয়োজন, তেমনই, শিষ্য/শিষ্যার হৃদয়েও শূন্যতা আবশ্যক আপন গুরুর কৃপা-বারি হৃদয়ে ধারণ করার জন্য। নিবেদিতা যদিও বহু গুণে গুণান্বিতা, নানা বিচিত্র কর্মে সদা ব্যস্ত, কিন্তু বিশেষ করে প্রথম দিকে বক্তৃতায় স্বামীজী কিছু বললেই মার্গারেট তৎক্ষনাৎ আপত্তি প্রকাশ করতেন (পৃ.৬৬-৬৭)। পরে অবশ্য তিনি ভক্তে রূপান্তরিত হয়েছিলেন (পৃ. ১৭৬-১৭৭)। বর্তমান লেখকের ধারণা, ভারতীয় আধ্যাত্মচিন্তার রাজ্যে মার্গারেট যুক্তি-বুদ্ধির উপর নির্ভরশীল ছিলেন বলে, স্বামীজীর কিছু কিছু বাণীর মর্মস্থলে প্রবেশ করতে পারেন নি।

৯) স্বামী বিবেকানন্দের মহাপ্রয়াণের (জুলাই ৪, ১৯০২) ১৮ দিন পরে মার্গারেট রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিন্ন করেন, তা তৎকালীন সংবাদপত্রগুলিতে প্রকাশিত হয়। এই বিষয়ে স্বামী ব্রহ্মানন্দ এবং স্বামী সারদানন্দ মার্গারেটের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করেছিলেন। রাজাগোপাল এই বিষয়টি বহু তথ্যসহ উপস্থাপন করেছেন (পৃ.২৪৬-২৫৭), তবে তাঁর বক্তব্য, মার্গারেটের রাজনৈতিক কার্যকলাপ নয়, মিশনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গিই এই বিচ্ছেদের কারণ ছিল। এই প্রসঙ্গে বিবেকানন্দের মার্গারেটকে লেখা ১২/২/১৯০২-এর একটি চিঠিতে স্বামী ব্রহ্মানন্দের ন্যায়বিচারের প্রতি বিবেকানন্দের গভীর আস্থা প্রমাণিত হয় (“I recommend you none – not one – except Brahmananda. That old man’s judgement never failed mine always do.”)। ড. চট্টোপাধ্যায় তাঁর বইটির উৎসর্গে ও অন্যত্র (পৃ.২৫৭) স্বামী ব্রহ্মানন্দের সিদ্ধান্তটিকে যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন।

১০) সমগ্র জীবনীটি লেখার ফলে, রাজাগোপাল জানিয়েছেন, নারায়ণী দেবীর The Dedicated-এর বাংলা অনুবাদটি খুবই নীচু মানের এবং উৎস হিসেবে ত্যাজ্য (ভুমিকা, পৃ.ড)।

১১) সচিত্র ‘শাস্ত্র অনুযায়ী মার্গারেটের দৈহিক লক্ষণের তাৎপর্য’ নামে ৬ষ্ঠ অধ্যায়টি (পৃ.৫৮-৬৩) কোনও কোনও পাঠকের কাছে বিরক্তির কারণ বা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু দৈহিক লক্ষণ বিশ্বের সব প্রাচীন সভ্যতাতেই মানুষের বিশ্বাস, লোকমুখে প্রচারিত ও লোকচরিত্র বিশ্লেষণে সহায়ক। শ্রীরামকৃষ্ণদেব এবং তাঁর শিষ্যরা এই সুপ্রাচীন পদ্ধতিতে আস্থাশীল ছিলেন। ভারতীয় শাস্ত্র, বিশেষ করে শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী ও সামুদ্রিক শাস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে আলোচ্য নারী নিবেদিতার ফটোগ্রাফগুলিতে বিধৃত দৈহিক লক্ষণগুলির উপর। শুধু তাই ন

১২) দশম অধ্যায়ে অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর তিন বিখ্যাত সন্তান – সরোজিনী, বীরেন্দ্রনাথ ও হারীন্দ্রনাথের কথা লিখেছেন (পৃ.১০২-১১৯)। বিশেষ করে যখন আত্মবিস্মৃত বাঙালীর স্মৃতিতে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পথপ্রদর্শক অঘোরনাথ, তাঁর সুযোগ্য কন্যা সরোজিনী নাইডুও চর্চার বিষয় বলে গণ্য হন না, দশম অধ্যায়টি আপাতদৃষ্টিতে প্রক্ষিপ্ত বলে য়, পাঠকরা এটি তাঁদের প্রাত্যাহিক জীবনেও প্রয়োগ করতে পারেন (পৃ.৬৩)।

মনে হতে পারে। অঘোরনাথ প্রথম ভারতীয়, যিনি এডিনবরো বিশ্ববিদ্যালয়ে D.Sc. পান ও ন্যায়পরায়ণ-দেশপ্রেমিক এই মানুষটি হায়দ্রাবাদের নিজাম কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন। স্মৃতি শাস্ত্র বলেছে, ‘বংশো দ্বিধা, জন্মনা বিদ্যয়া চ’। বংশধর দু’ভাবে চিহ্নিত হয় – বিশিষ্ট ব্যক্তির বংশে জন্মের দ্বারা অথবা বিদ্যার সাগরে অবগাহন ক’রে। সমকালীন ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে সরোজিনী নাইডু ছিলেন একটি উজ্জ্বলতম নক্ষত্র – তাঁর বিদেশ পরিক্রমা, কবি হিসেবে স্বীকৃতি ও জাতীয় কংগ্রেসের সর্বপ্রথম মহিলা সভাপতি হিসেবে (১৯২৫-১৯২৭)। ১৯০৬ সালে সর্বভারতীয় কনফারেন্সের কলকাতায় অনুষ্ঠিত সভায় সরোজিনীর উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মহিলাদের শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠ করার জন্য (পৃ.১০৭)। সরোজিনী তাঁর চমৎকার ইংরাজী উচ্চারণ, অপূর্ব কণ্ঠস্বর এবং বিশ্লষণী ক্ষমতার সুবাদে গোখেলসহ তৎকালীন নেতৃবৃন্দদের মুগ্ধ করেন। তাঁর কবিসত্বার জন্য, সাহিত্যরচনার জন্য এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে সরোজিনী অনন্যা। মহাত্মা গান্ধীর সহকারী হিসেবেও তাঁর অসাধারণ অবদান ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে। সরলাদেবী চৌধুরানী (১৮৭২-১৯৪৫) স্বামীজীর আশীর্বাদ ধন্যা স্বর্ণকুমারীর পুত্রী। সরলাদেবী ১৮৯০ তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক; সংস্কৃত, ফরাসী ভাষায় দক্ষ; মহিলাদের মধ্যে বীরত্বব্যঞ্জক ভাবনার প্রবর্তন করেন প্রতাপাদিত্য উৎসব ও বীরাষ্টমীর ব্রত পালনের মাধ্যমে। কাজেই এই দুই বঙ্গ-তনয়ার অবদান নিবেদিতার অনুরূপ অবদানের অভাবকেই প্রকট করছে।

সরোজিনীর ছোট দুই ভাই বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও হারীন্দ্রনাথের কথাও দশম অধ্যায়ে জানা গিয়েছে (পৃ.১০৩-১০৬,পৃ.১১২-১১৯)। এর মধ্যে বীরেন্দ্রনাথের কাহিনী মাত্র ২০০৪ সালেই বেশ বিস্তারিতভাবে একটি ইংরাজী বইয়ের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে (পৃ.১১২)। স্বাধীন ভরতে এই বিশিষ্ট বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথের বিষয়ে খুব অল্পই আগে জানা ছিল, তাই রাজাগোপাল ইংরেজী বইটি থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি ও অনুবাদ করে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন (পৃ.১১২-১১৯)।

১৩) জনসাধারণের মনে একটি ভ্রান্ত ধারনার সৃষ্টি হয়েছে যে মার্গারেট ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন, যেখানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আন্দোলনে বিরত ছিলেন। যেমন, মার্গারেটের জীবনের দুটি ঘটনা – কার্জনের কনভোকেশন বক্তৃতায় ভারতীয়দের অবমাননার প্রতিবাদ ও স্বদেশী প্রসঙ্গে একটি প্রবন্ধ রচনা। প্রথম রচনাটি তাঁর স্বাক্ষরবিহীন

বা রচয়িতার নাম উহ্য (পৃ.৩২৩), যদিও কবি তাঁর লেখায় নাম দিয়েছিলেন (পৃ.৩২৪)। স্বদেশী প্রসঙ্গে যেখানে রবীন্দ্রনাথ ও ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় আলাদা আলাদাভাবে ১৯০৪ সাল থেকেই অনেক কিছু লেখেন, মার্গারেটের ১টি মাত্র প্রবন্ধ ১৯০৬-তে বের হয়, তাও স্বাক্ষরবিহীন। রাজাগোপাল লক্ষ্য করেছেন, ভারতে নিবেদিতার জীবন প্রায়শই বিশিষ্ট ও অতি বিশিষ্টদের মধ্যেই কেটেছে, শিলাইদহে তাও রবীন্দ্রনাথের অতিথি হিসেবে গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটেছিল। রাজাগোপাল মনে করেন, ‘গোরা’ উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ায় মার্গারেট খুবই দুঃখিত ও আতঙ্কিত হন, যদিও রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপর্যুপরি অনুরোধে ‘প্রবাসী’তে ছাপা ওই উপন্যাসটি বিয়োগান্তকের বদলে মিলনান্তক করেন। ‘গোরা’ প্রবাসীতে বের হবার পর, বছর দেড়েক মাত্র মার্গারেট বেঁচেছিলেন। তাই মার্গারেটের অল্প বয়সে মৃত্যু ঘটায়, কবির মনে নিশ্চয়ই এক ধরণের অনুশোচনা কাজ করেছিল (পৃ. ৩০২, ৩৪৯), যার প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখা শোক-সংবাদটিতে সদ্যপ্রয়াতা নিবেদিতাকে ‘লোকমাতা’ বিশেষণ দিয়ে ফেলেছিলেন (পৃ.৩৪৯)। রাজাগোপাল এও লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতার মনের গভীরের খবর না জেনেই তাঁর মন্তব্য করেছিলেন (পৃ.৩৪৯), কারণ তাঁর চিঠিপত্র তখনও ছাপা হয়নি। কাজেই রবীন্দ্রনাথ নিজেই যখন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মার্গারেটের কিছু কিছু নিন্দা করেছিলেন (পৃ.৩৫০), এই সাময়িক উচ্ছ্বাস-উদ্ভুত বিশেষণটিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া অনুচিত। রাজাগোপাল লিখেছেন, ‘লোকমাতা’ বিশেষণটি একমাত্র রাণী রাসমণির ক্ষেত্রেই মানানসই (পৃ.৩০২)।

রবীন্দ্রনাথ-নিবেদিতা প্রসঙ্গে ড. চট্টোপধ্যায় যেমন দেবাঞ্জন সেনগুপ্তের বইটি ব্যবহার করেছেন, তাঁর অনেকগুলি ভুল সিদ্ধান্তও দর্শিয়েছেন (পৃ.২৮৯-৩০২), অনেকগুলি ক্ষেত্রে সমস্যাগুলির সমাধানও করেছেন যা দেবাঞ্জনবাবু পারেন নি।

১৪) ত্রয়োবিংশ অধ্যায়ের নাম ‘দ্বিতীয়বার ইংল্যান্ড যাত্রার পূর্বে বিবিধ ঘটনা, রাজনীতির ছোঁয়া’ (পৃ.৩০২-৩২৭)। মাদ্রাজে বক্তৃতাসফর বা জানুয়ারী ১৯০৩ থেকে আগষ্ট ১২, ১৯০৭ এই পর্বটি বিস্তৃত। মার্গারেটের চিঠিপত্র, মুক্তিপ্রাণা-লিখিত জীবনী, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তাতে নিবেদিতার ভূমিকা নিয়ে দুই বিখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার (পৃ.৩০৭-৩১০) ও বিমানবিহারী মজুমদারের (পৃ.৩১০-৩১৪) দুটি বইয়ের বিস্তারিত আলোচনা, ব্রিটিশ সরকারের গোপন রিপোর্ট (পৃ.৩০৬-৩০৭) ইত্যাদি থেকে দেখিয়েছেন, মার্গারেট কখনই তেমনভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেননি। পরন্তু শ্রীঅরবিন্দ, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ও দেবব্রত বসু এনারা তাঁকে বিপ্লবীদের অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার দেন নি (পৃ.৩১৪-৩১৫) তাই দেখা যাচ্ছে। রাজাগোপাল সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, হয়ত এনারা নিবেদিতাকে রাজশক্তির গুপ্তচরই মনে করতেন (পৃ.৩১৫)। গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরীর বই থেকেও বহু উদ্ধৃতি লেখক এই অধ্যায়ে ব্যবহার করেছেন, কেবল রাজাগোপাল মনে করেন নিবেদিতার আন্দোলনে কোনও সক্রিয় ভূমিকা ছিল না (পৃ.৩২৫)। শঙ্করীপ্রসাদের ২য় ও ৩য় খন্ড ঘেঁটেও তেমন কোনও প্রমাণ মেলেনি, রাজাগোপাল জানিয়েছেন।

লেখকের অনালোচিত দুটি আরও মন্তব্য ফিরে দেখা যায়, দুই ভিন্ন মেরুর স্বাধীনতা সংগ্রামীর লেখা থেকে। কলকাতায় ফেব্রুয়ারী ১৯০২ মার্গারেটের স্মৃতি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর লেখায় - ‘I then ascertained the place of residence of Sister Nivedita, and met her in a Chowringhee mansion. I was taken aback by the splendour that surrounded her, and even in our conversation there was not much meeting ground. I spoke to Gokhale about this, and he said he did not wonder that there could be no point of contact between me and a volatile person like her.’ (An Autobiography, M. K. Gandhi, Ahmedabad, 1999, p198)। গান্ধী পরে এও লিখেছেন যে, ‘volatile’ বিশেষণটি অপেক্ষাকৃত মৃদু বলে লিখেছিলেন, যদিও গুজরাটি থেকে অনুবাদের সময় ‘violent’ ও ‘fanatical’ শব্দদুটির কথাও ভেবেছিলেন।

অন্যদিকে শ্রীমতী জীন হার্বার্ট (লিজেন রেমঁ)-কে পাঠানো ইংরাজী চিঠিতে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ১৮/৮/১৯৩৯ লিখেছিলেন - ‘… We used to meet only very occasionally, she being more connected with the open outer movement and I with the underground one. She had been connected with several abortive attempts at starting secret revolutionary societies here, specially the one started by Baron Okakura. She was connected with ours too as an ardent sympathiser but not as an actual worker. To my knowledge she did not send anybody to France [for gun/explosives training]. Our society sent Hem Chandra Das to France for that purpose & Madame Kama [Cama] …’। মাডাম কামার সঙ্গে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ১৯০৯-১৯১০ Talvar পত্রিকা চালাতেন প্যারিসে (পৃ.১১৭)।

বিশদ জীবনীটির কিছু কিছু বিষয় এই লেখায় আলোচিত হল, তবে অনেক ইন্টারেস্টিং বিষয় অনালোচিতই থেকে গেল।

১৫) ‘কাগুজে সিংহী’ : মার্গারেট নোব্‌ল্‌ জুন ২০১৭ প্রকাশের ১৬ মাস পরে, ২০১৮ অক্টোবরে ড. রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায় ইংরাজীতে ‘Paper Lioness’ : Margaret Noble প্রকাশ করেছেন। ইংরেজী জীবনীটি তুলনায় সংক্ষিপ্ত, ২৫৬ পাতার, যেখানে ‘কাগুজে সিংহী’ ৩৭৬ পাতার। এছাড়া, ইংরেজী জীবনীটির ৮০ পাতার আর্ট পেপারে ছাপা আছে, বাংলা বইটিতে যেখানে ছিল ৯৬ পাতার আর্ট পেপার। ইংরেজী বইটিতে ২১টি অধ্যায়, যেখানে বাংলা বইটিতে ২৪টি। এর মধ্যে আর্ট পেপারে ৪৮ পাতায় ছাপা রঙিন ছবিগুলি অবশ্য দুটি বইতে একই, তফাৎ সাদা-কালো ছবিগুলিতে।

ইংরেজী বইটির ভুমিকায় ড. চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, লিজেল রেমঁ-জীন হার্বার্টের The Dedicated অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হলেও, এই আদি জীবনীটির মধ্যে ভুলও প্রচুর। মুক্তিপ্রাণা রচিত ‘ভগিনী নিবেদিতা’ (১৯৫৯ ও পরবর্তী সংস্করণগুলি) শ্রেষ্ঠ জীবনী হলেও, ইংরেজীতে সব তথ্য তখনও জীবনীর আকারে লভ্য ছিল না, তাই ‘Paper Lioness’ সময়োচিত। অন্যদিকে, ইংরেজীতে প্রব্রাজিকা আত্মপ্রাণার Sister Nivedita (১৯৬১ থেকে) থাকলেও প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণার লেখাটির তুলনায় অনেক সংক্ষিপ্ত। আত্মপ্রাণা জন্মসূত্রে অবাঙালী ছিলেন, তাই বাংলায় ছাপা তথ্যাদি পড়ে ওঠা তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল। মোটের উপর ইংরেজী জীবনীটি আকারে ছোট হলেও, কিছু তথ্য এখানে নতুন, যা ‘কাগুজে সিংহী’-তে নেই।

নতুন সংযোজনগুলির মধ্যে প্রধান, ১৯১১ সালের জানুয়ারীতে আমেরিকায় সারা চ্যাপম্যান বুলের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার জন্য সারার কন্যা ওলিয়ার আনা কোর্ট কেসে মার্গারেটের অপরাধী সাব্যস্ত হওয়া। মার্কিন কোর্টে চারজন সাক্ষীই মার্গারেটের বিরুদ্ধে একই কথা বলেছিলেন যে তিনি দু’মাস ধরে তাঁর বান্ধবী সারা চ্যাপম্যান বুলকে ভারতবর্ষ থেকে না আয়ুর্বেদিক ওষুধ মকরধ্বজ জোর করে খাইয়েছিলেন রোগীর বিস্তর আপত্তি ও মার্কিন ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও। রাজাগোপাল দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, কেন মকরধ্বজ ঠিক-ঠাকভাবে প্রস্তুত না হয়ে থাকলে, একটি বিষাক্ত পদার্থ। সারার দেহে ওই ওষুধ সেবনে যে লক্ষণগুলি দেখা গিয়েছিল, তা এই বিষক্রিয়ার ফলেই ঘটেছিল। গ্রেপ্তার হবার প্রবল ভয়ে মার্গারেট ফেব্রুয়ারী ৮, ১৯১১ নিউ ইয়র্ক বন্দরে জাহাজে চড়ার মুখে ধরা পড়ে যান। কারণ ইতিমধ্যে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদপত্রে সারা চ্যাপম্যান বুলের মৃত্যু এবং গুলিয়ার অভিযোগ রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল, এবং মার্গারেট নোব্‌ল্‌ যে সম্ভাব্য দোষী তাও জাহাজের অভিবামন দপ্তরের লোকেরা জানতো। তাই কাগুজে সিংহী এরপর বসটন বন্দর থেকে ছাড়া একটি জাহাজে মার্চ ১, ১৯১১ একটি ধনী মহিলার চাকরানী সেজে ভীত সন্ত্রস্ত খরগোশের মত পালিয়ে গ্রেপ্তারী এড়ান। তখনকার দিনে ভৃত্য-ভৃত্যাদের পাসপোর্ট লাগত না, তবে মার্কিন কোর্টের আদেশে এই তথ্য জানা যায় ও সংবাদপত্রগুলিতে ছাপা হয়। ‘কাগুজে সিংহী’ যখন রাজাগোপাল লেখেন এই অত্যাশ্চর্য খবরগুলি তাঁর জানা ছিল না, এগুলি তিনি প্রব্রাজিকা প্রবুদ্ধপ্রাণা-সংকলিত Sister Nivedita in Contemporary Newspapers (জুলাই, ২০১৭, সারদা মঠ) পড়ে তাঁর ইংরেজী বইটিতে সন্নিবিষ্ট করেন।

রাজাগোপালের মতে, মার্গারেটের তুলনায় সারা চ্যাপম্যান বুলের অবদান অনেক বেশী (‘কাগুজে সিংহী’ পৃ.৩৩৯), কারণ বেলুড় মঠ তৈরীর আদি লগ্নে তাঁর দেওয়া ১ লক্ষ টাকাই ছিল সর্বোচ্চ দান। আবার বসু বিজ্ঞান মন্দির স্থাপনাতেও সারা বুল ছিলেন সবচেয়ে বড় দাতা (পৃ.২২৫-২২৬)। সারা বুল উত্তরাধিকার সূত্রে প্রভূত অর্থ তাঁর প্রয়াত স্বামী, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বেহালা-বাদক ওলি বুলের কাছ থেকে (ছবি, পৃ.২২৪) পেয়েছিলেন। ওলি বুলের আরও কয়েকটি ছবি তাঁদের Lysoen এর দ্বীপ ও তারমধ্যে Villa-র ছবির উপর সাঁটা হয়েছে ফটোশপ ব্যবহার ক’রে (পৃ.১৮৫-এর কাছে)। মিঃ ওলি বুলের (১৮১০-১৮৮০) বিষয়ে রামকৃষ্ণ মিশন প্রকাশিত গ্রন্থাবলীতে তেমন কিছু জানা যায় না, যদিও তাঁর বিধবা পত্নী সারা চ্যাপম্যান বুল সম্বন্ধে অনেক কিছু তথ্য আছে। তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর সারা কিভাবে হিন্দুধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হলেন, সেই কাহিনীও রামকৃষ্ণ মিশন সম্পূর্ণ জানান নি – রাজাগোপালের এই বইটির ছবির বর্ণনা (পৃ.১৬৮-এর পরে) থেকে ও অন্যত্র (পৃ.২৯০) জানা যায়, ১৮৮৩ থেকেই ঠাকুর বাড়ির জামাই মোহিনী মোহন চ্যাটার্জীর কথা সারা জেনেছিলেন এবং ১৮৮৬ থেকেই তাঁর বক্তৃতা শুনে সারা হিন্দুধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। এমনকি, মার্গারেটও এই মোহিনীবাবুকে পছন্দ করতেন, তা নিয়ে জগদীশচন্দ্রের ফষ্টিনষ্টির উল্লেখ আছে (ভূমিকা, পৃ.ঢ)।

১৬) তাঁর ভূমিকার শেষে রাজাগোপাল লিখেছেন, মার্গারেট ও ক্রিস্টিন সম্বন্ধে শ্রী অরবিন্দের একটি মন্তব্যের কথা। অরবিন্দ বলেছিলেন, বিবেকানন্দের এই দুই শিষ্যা হিন্দুধর্ম ও স্বামীজীর শিক্ষায় প্রভাবিত হলেও, আচার-ব্যবহারে খাঁটি ইউরোপীয়ই থেকে গিয়েছিলেন (পৃ.ণ)। মার্গারেট ভারতে এসে কতদূর ভারতীয় হতে পেরেছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। স্বামী নির্লেপানন্দের প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ‘রামকৃষ্ণ-সারদামৃত’ বইটিতে আছে, মার্গারেটের ‘বাংলা ভাঙা ভাঙা কোঁতানো। কৃষ্টিনের বাংলা বলা আরও উঁচুদরের, শুনেছি।।...কৃষ্টিন চাপা মানুষ, অধিকতর সাত্ত্বিক। মার্গারেট রজোগুণী মর্দনা মেয়ে। দুটি আলাদা ছাঁচ, ধাঁচ’। রাজাগোপালের সিদ্ধান্তের সঙ্গে স্বামী নির্লেপানন্দের বর্ণনার যথেষ্ট মিল পাওয়া যাচ্ছে, যদিও নির্লেপনন্দের বইটি তিনি ব্যবহার করেন নি। নির্লেপানন্দের স্মৃতিগুলিতে রাজাগোপালের সিদ্ধান্তগুলির সমর্থন মিলছে।

এইভাবে, সারা বই জুড়েই রাজাগোপাল নিবেদিতার তথাকথিত গুণাবলী বা খ্যাতির কাহিনীগুলিই যে ‘গোড়ায় গলদে’ পরিপূর্ণ, পরাধীনতার  ফলে সাদা চামড়ার মেমসাহেবদের ভূমিকাকে স্ফীত করে দেখা নেটিভদের রোগবিশেষ, ইংরেজ ঔপনিবেশিকতা মার্গারেটের মাধ্যমে এখনও ভারতীয়দের মধ্যে বর্তমান, তা দেখিয়েছেন। ‘কাগুজে সিংহী’ বা ‘Paper Lioness’ শব্দযুগল বিভিন্নভাবে মার্গারেটের চরিত্র ব্যাখ্যা করে, এমন ৫টি ব্যাখ্যা রাজাগোপাল হাজির করেছেন।

‘কাগুজে সিংহী’ : মার্গারেট নোব্‌ল্‌, রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায়, প্রকাশক : প্রদীপকুমার চক্রবর্তী, বাংলার মুখ প্রকাশন, মূল্য ৮৯৯ টাকা। বিক্রি: আদি দে বুক স্টোর, কলকাতা – ৭০০০৭৩ এবং ভারতের মধ্যে Amazon মারফৎ। ISBN 978-93-84108-45-8, মে ২০১৭ প্রকাশিত।

‘Paper Lioness’ : Margaret Noble, Rajagopal Chattopdhyaya, Publisher : Pradip Kumar Chakraborty, Banglar Mukh Prakashan, Price Rs.700/-, sold at Adi Dey Book Store, 13, Bankim Chatterjee Street, Kolkata – 700073 and through Amazon within India. ISBN 978-93-84108-16-8, published September 2018. Overseas prices $35 and $32 for the 2 books respectively ; add $8 per copy for delivery by Registered Air Mail, send requests to author at rchatto2001@yahoo.co.in

Comments

Top

 

অকপট

চৈতালী সরকার

বিদ্যাসাগর পল্লী

সার্কাস ময়দান, পূর্ব বর্ধ্মান 

গল্প

টিফিনের পর মাত্র দুটো পিরিয়ড, তারপর ক্লাস  ছুটি। দুপুরে মিডে মিলে গরম ভাত, তরকারীতে খাওয়া ভালোই হয়। তবু বন্ধুদের সাথে টুকিটাকি চিপস, চানাচুর, আইসক্রিম না হলে চলে! এইজন্যই তো বায়না করে দশ টাকা এনেছে দিশা।

স্কুলে ঢোকার পারমিশন পেয়েছে দুজন। রামদা আনে চিপস, কুড়কড়ে আরও কত কি ! আইসক্রিমের গাড়ি নিয়ে মতিকাকু হাজির হয় ঠিক দেড়টায়। শুধু ঘন্টা পড়ার অপেক্ষা, তারপরই গেটের মুখে অনাবিল আনন্দের স্রোত! নাইন টেনের  দিদিদের টপকে জিনিস কেনার অধিকার অন্য ক্লাসের নেই। জিনিস কেনা নিয়ে কখনও ধাক্কাধাক্কি, কখনও মুখবর্ষণ দিয়ে সেদিনকার মতো মিটে যায়। ঠিক এই সময় স্টাফরুমও মেতে ওঠে দ্বিপ্রাহরিক ভোজনে। 

ব্যাগেই তো ছিল! টয়লেট যাবার আগেও দেখে গেছে দিশা। পাশ থেকে পল্লবী বলল, "বই বের করে  দেখ তো। টাকাটা হয়তো ভেতরেই আছে।" দিশা বই বার করে ঝাড়তে লাগল। না, কোত্থাও নেই। হতাশার কালো ছায়ায় ভরে গেল দিশার ফর্সা মুখ। ঘরময় শুরু হল খোঁজাখুঁজির বাতাবরণ। ক্লাসরুম রীতিমতো পুলিশি প্রহরায়। দেবিকার উদ্যোগই সবচেয়ে বেশি। ও এই ক্লাসের মনিটর। দেবিকা প্রত্যেকের ব্যাগ সার্চ করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ও আবিষ্কার করল টাকা। খুব দূরে নয়, দিশার বেঞ্চেই বসে ছিল সুজাতা। ওর ব্যাগের জ্যামিতি বক্স থেকে পাওয়া গেল পরিষ্কার দশটাকা। ক্লাসের সবাই জানে সুজাতার বাড়ির অবস্থা ভালো নয়। ওর বাবা কোন একটা দোকানে কাজ করে। সংসার চালাতে মাকেও কাজ নিতে হয়েছে। পড়াশোনায় সুজাতা ভালো বলেই এই স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছে। প্রায় দু বছর হয়ে গেলেও সুজাতা বন্ধুদের সাথে মিশতে পারে না। বেশিরভাগ সময় শামুকের মতো গুটিয়ে থাকে। চোখে চোখ রেখে কথা বলতেও যেন ওর ভয়!

সুজাতা হঠাৎ দৃঢ়তার সাথে বলে উঠল, "এই টাকা আমি বাড়ির থেকে এনেছি। আমার টাকা কেন দেবো?" দেবিকা নাছোড়বান্দা, এই টাকা সে আদায় করবেই। মনিটর হওয়ার কৃতিত্ব ওকে দেখাতেই হবে। একদল মেয়ে সুজাতাকে ঘিরে ধরেছে। দিশা অপেক্ষা করছে কখন দশ টাকা নিজের মালিকানায় আসে। সুজাতা কিছুতেই দেবে না। ও নিজের ব্যাগ চেপে ধরল। পল্লবী বলল, "চল বড়দির কাছে যাই। বড়দি শাস্তি দিলেই সুজাতা টাকা দিয়ে দেবে।" দোতলায় ছিল বড়দিদিমণির ঘর। নামীদামি স্কুল না হলেও এখানে ডিসিপ্লিন আছে। ইচ্ছেমতো ছাত্রীদের স্কুলের বাইরে যাওয়ার অধিকার নেই। কোনো ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে ফোনে বাড়ির লোক ডেকে তবে ছাড়া হয়। শিক্ষিকাদের হাজিরার ক্ষেত্রেও নিয়ম বেশ কড়াকড়ি। সাড়ে দশটায় অ্যাটেনডেন্স, অন্যথা হওয়ার উপায় নেই। বড়দিদিমণি সামনের টেবিলে রাখা কাগজপত্রে চোখ বোলাচ্ছেন। দিশা, দেবিকা গুটিগুটি পায়ে দরজার সামনে এল। ভয়মিশ্রিত গলায় দিশা বলল, "বড়দি সুজাতা আমার টাকা দিচ্ছে না।" বড়দি চোখ তুলে বললেন, "কিসের টাকা"। এবার সোজাসুজি দেবিকার উত্তর, "দিশা বাড়ি থেকে দশ টাকা এনেছিল। ও যখন টয়লেট গেছে, সুজাতা সেটা নিয়ে নিয়েছে।" ঝোড়ো হাওয়ার মতো দেবিকা এক নিশ্বাসে বলে চলল। কথাগুলো আত্মস্থ করে বড়দি সুজাতাকে ডেকে পাঠালেন। তারপর জেরা শুরু হল। ভীত হরিণী যেন বাঘের সামনে এসেছে! ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল সুজাতা। সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। কথাগুলো ওর কন্ঠ থেকে ছিটকে

বেরিয়ে যাচ্ছে। দিশা, দেবিকা, পল্লবীদের সাবলীল বর্ণনায় হার মানল সুজাতা।

ইতিমধ্যে অন্যান্য টিচার্সরা এসে গেছে। সুলেখাদি তো বলেই বসলেন, "সুজাতা এই কাজ করতেই পারে না।" ছন্দাদি অবশ্য বললেন "কাউকে ওভাবে চেনা যায় না। ছোটো মেয়ে একটা ভুল করে ফেলেছে।" বড়দিরও মনে হল সুজাতাই টাকা নিয়েছে। তিনি বললেন, " সুজাতা তুমি আর একাজ কোরো না। অন্যের জিনিস কখনো নিতে নেই। যাও দিশাকে টাকাটা দিয়ে দাও।" হুড়রে বলে দেবিকা ক্লাসে ধ্বনি তুলল। এই জয় যেন সম্পূর্ণ ওর। দিশার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ক্লাসের অন্যান্য মেয়েরা হাফ ছেড়ে বাঁচল। যেভাবে জেরার মধ্যে ওদের পড়তে হয়েছিল!  

কেউ লক্ষ্য করেনি শেষ বেঞ্চে মাথা গুঁজে বসে আছে সুজাতা। বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা ওর চিবুক গড়িয়ে ড্রেসে ঝরে পড়ছে। ড্রেসের কিছুটা অংশ ভিজে উঠেছে। এত মেয়ের মধ্যে নিজেকে ওর একা মনে হল। মনে হল চারিদিকের মুখগুলি ভেংচি কেটে বলছে, "তুমি, তুমি ..."ঠিক সেইসময় সুজাতার পিঠে হাত রাখল সুমনা। ফিসফিস করে বলল, "আমি জানি তুই টাকা নিস নি। ওদের ভুল হয়েছে।" সুমনার কথায় মুখ তুলে চাইল সুজাতা। তখনও চোখে জল টলমল করছে। ওর মনে পড়ল কতদিন মাকে বলেছে, মা, জানো স্কুলে সবাই আইসক্রিম খায়! তাইতো মা বাবার আড়ালে টাকাটা দিয়েছিল। দিশা বইগুলো ঠিকমতো সাজাতে লাগল। ব্যাগটার ভেতরে ছেঁড়া জায়গাটায় হাত যেতেই কি যেন বাঁধল। কাগজের মতো লাগছে। টেনে বার করতেই বেরিয়ে এল পরিষ্কার দশ টাকার নোট। যার জন্য আজ তোলপাড় হল স্কুল। দোষী প্রমাণিত হল সুজাতা। দিশার মনে হল একটু ভালো করে দেখলেই হয়তো টাকাটা পাওয়া যেত। খুব খারাপ লাগল দিশার কিন্তু প্রকাশ করল না। ও তাড়াতাড়ি ব্যাগে পুড়ে নিল টাকা। একজোড়া চোরা চাহনি চারিদিক দেখে দিল কেউ দেখছে কিনা! দিশা ঠিক করল, একথা ও কাউকেই জানাবে না! স্থির হতে পারছে না দিশা। কেমন অস্বস্তি লাগছে!

সুজাতার দিকে তাকিয়ে মনে হল ও যেন ধরা পড়ে গেছে। কোথায় লুকাবে? ব্যাগের ভেতরের চেন থেকে ও টাকাটা রাখল জ্যামিতি বক্সে। তবু ধরা পড়ে যাচ্ছে! দিশার মনে পড়ল দিদিমণিদের কথা। দিদিরা প্রায়ই বলেন, "সব সময় সত্যি বলবে। কোনো ভয় করবে না।" দিশার ভীষণ ভয় করছে। মা,বাবা, স্কুলের দিদিদের কথা বারবার মনে পড়ছে। সবসময় সত্যি কথা সব সত্যি...... ....! ওর মনে হল একদম ভয় করবে না, সব সত্যি কথা বলবে।ক্লাসরুম প্রায় শান্ত হয়ে এসেছে। মেয়েরা নিজের জায়গায় টুকিটাকি কথা বলায় ব্যস্ত। ঠিক সেইসময় দিশা দশটাকা তুলে বলল, "আমার টাকা পেয়ে গেছি, এটা সুজাতারই টাকা।" সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। দেবিকা বিরক্তির সাথে বলল, "না দেখে মিথ্যে বল্লি কেন?" 

থিতিয়ে যাওয়া বিষয়টি নিয়ে শুরু হল শোরগোল। সুজাতার চোখের জল বাঁধ মানল না। সত্যি বলতে পেরে দিশার মনের গুমোট কেটে চোখে জল গড়িয়ে এল। ক্লাসে ততক্ষণে শর্মিলাদি এসে গেছেন। দিশার স্বীকারোক্তিতে তিনি প্রশংসা করলেন। সত্যি বলার মধ্যে এতো আনন্দ থাকে দিশা প্রথম বুঝতে পারল। 

ভয়হীন সেই ছোঁয়ায় কেটে গেল বাকি দুটো পিরিয়ড। 

Comments

Top

ভ্রমণ

রোমান হলিডে

সুব্রত মজুমদার

 

রোম দেখার শখ ছিল ছেলেবেলার থেকে। সেই যখন ছোটবেলায় স্কুলে ইতিহাসের ক্লাসে রেনেসাসের কথা পড়তাম, লীয়নার্দোর কথা পড়তাম, মাইকেল অন্জেলোর কথা পড়তাম| ইচ্ছেটা আরও বেড়ে গেল যখন পড়া শেষ করলাম ড্যান ব্রাউনের লেখা “এঞ্জেলস এন্ড ডিমন্স” বইটি। লেখক এই বইটিতে বেশ জমজমাট একটা রোমাঞ্চকর গা ছমছম করা গল্পের মধ্যে দিয়ে রোমের নানান জায়গা দিয়ে পাঠককে দৌড় করিয়েছেন।তাই সুযোগটা যখন এসে গেল রোমে যাওয়ার গত বছরের শেষের দিকে সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না।তল্পিতল্পা গুছিয়ে সোজা হাজির হলাম ডিট্রয়ট থেকে প্লেনে চেপে রোমের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এয়ারপোর্টে।

এয়ারপোর্ট থেকে কাস্টমস ও ভিসা চেক হওয়ার পর যখন হোটেলে পৌঁছলাম তখন বেলা একটা বাজে। দেখলাম শহরটা ঘুরে দেখার বেশ কিছু সময় এখনো হাতে আছে।জেট ল্যাগকে গুলি মেরে ব্যাগগুলোকে কোনমতে ঘরের মধ্যে রেখে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।প্ল্যান করে রিক স্টিভের, রোমের ওপর লেখা একটা গাইড বই, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। খুব সুবিধে হয় এই ধরনের একটা বই সাথে থাকলে। ভেবে দেখলাম যা সময় আছে তাতে কলিসিয়ামটা ভালোভাবেই দেখা হয়ে যাবে। মেট্রো রেলে চেপে কলিসিয়ামের খুব কাছাকাছি পোঁছে গেলাম। স্টেশন থেকে বেরিয়েই অভূতপূর্ব ও বিশাল পাথর দিয়ে বানানো সেই আম্পিথিয়েটার ওপর চোখ পড়ল, যার নাম কলিসিয়াম। চিত্রার্পিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ আইকনটির দিকে তাকিয়ে। গ্রীষ্ম কালে এখানে সব থেকে বেশি ভিড় হয়। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। শীতকালে আসতে লাইনটা খুব বড় বলে মনে হল না। টিকিটটা কেটে অপেক্ষা করছিলাম টুর গাইডের জন্য। যদিও শীতকাল কিন্তু ঠান্ডা খুব একটা লাগছিল না। রিক সাহেবের লেখা বইটা আরেকবার ঝালিয়ে নিলাম। প্রায় ৭০-৮০ ক্রির্স্টাব্দ নাগাদ ফ্লেভিয়ান সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট ভেস্পিয়ান রোমের নগরবাসীদের আনন্দ বিনোদনের জন্য অর্ধচন্দ্রাকারে সাজানো ক্রমোচ্চ আসন শ্রেণী সহ এই মুক্ত অঙ্গন রঙ্গমঞ্চটি উপহার দেন। শুরুতে রঙ্গমঞ্চটি খুবই জনপ্রিয় ছিল। লাগাতার একশ দিন ধরে একনাগাড়ে চলত নানাধরনের কান্ডকারখানা। তার মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় ছিল গ্ল্যান্ডিয়েটদের অথবা পশুদের সঙ্গে আমরণ যুদ্ধ। প্রায় চারশ বছর ধরে চলছিল এইসব। তখন ছিল রঙ্গমঞ্চটির রমরমা বাজার। তারপর যা হবার তাই হল। রোম সাম্রাজ্যের অথনৈতিক মন্দার কারনের সাথে আরো অনেক কারণের ফলে রঙ্গমঞ্চটি অবহেলা, অযত্ন, অনাদর, অবজ্ঞার শিকারে পড়ে আবর্জনার অস্তাকুপে পরিনত হল। যদিও দুই ত্রিতিয়াংশ সময়ের কবলে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে তবুও এই ভগ্নদশাতেও রঙ্গমঞ্চটি আজও ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশৃঙ্খল ও কোলাহলপূর্ণ রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিভু হয়ে সেই বিগত দিনগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। কত ঘটনা, কত দুঃখ, কত সম্রাঠের উত্থান আর পতন দেখেছে এই কলিসিয়াম নিরব দর্শক হয়ে। মনে হল ওর বুকটা ফেটে যাচ্ছে সবকিছু আমাকে বলার জন্য।

আমার সাথীদের কলরবে ফিরে এলাম বাস্তবে। আমাদের গাইড হাজির, আমাদের টুর শুরু হবে এখনই। আমাদের গাইড একটি অল্পবয়সী মেয়ে, নাম আলিসিয়া। দেখতে সুন্দর, অনেকটা সোফিয়া লরেনের মতো। আমার যাত্রার সঙ্গী ভদ্রমহিলাদের কথাটা বলাতে তাদের কাছে থেকে খুব একটা সমর্থন পেলাম না। উল্টে কেউ কেউ ফিরে গিয়ে একটা ভালো চোখের ডাক্তার দেখানোর উপদেশও দিয়ে দিলেন। একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। আমাদের গ্রূপে আমরা প্রায় তেরজন ছিলাম। আলিসিয়া আমাদের সবাইকে একটা করে ওয়াকিটকির মতো জিনিস ধরিয়ে দিল। এটার সঙ্গে লাগানো আছে একটা হেডসেট যেটা কানে সব সময় লাগিয়ে রাখতে হবে। এটা ওয়ারলেসে কাজ করে। ওয়াকিটকির সঙ্গে এটার তফাৎ হল এটা ওয়ান ওয়ে, অর্থাৎ আলিসিয়া যখন কথা বলবে আমরা সবাই একই সঙ্গে শুনতে পারব কিন্তু আলিসিয়া আমাদের কারো কথা শুনতে পাবে না। যার ফলে যখন আলিসিয়া আমাদের কলিসিয়ামের ইতিহাস বর্ননা করছিল আমরা হাঁটতে হাঁটতেই ওর সব কথা শুনছিলাম, কোন একটা জায়গায় সবাইকে দাঁড়িয়ে শুনতে হচ্ছিল না। আমার মনে হল এতে সময় অনেকটা বাঁচে।

আলিসিয়ার কোথায় জানা গেল যে কলিসিয়াম সমন্ধে যা যা পড়েছিলাম আর শুনেছিলাম সবই সত্যি। যেমন গ্ল্যাডিয়েটারদের যুদ্ধ, চোরেদের সিংহের মুখে ফেলে দেওয়া, রক্তারক্তি ব্যাপার – সব সত্যি। মনে পড়ে গেল “গ্ল্যাডিয়েটর” মুভিটার কথা।কলিসিয়ামের ভিতরে ঢোকার পর থেকেই মনে হল ৫৫০০০ লোক চারিদিক থেকে একসঙ্গে চিৎকার করছে “মাক্সিমাস মাক্সিমাস”। ঠিক আজকের দিনে যেমন লোকে ফুটবল খেলার মাঠে চিৎকার করে “মেসি মেসি” করে। শুধু তফাৎ আজকের দিনে লায়নেল মেসির জীবন মরণের সমস্যা নেই কিন্তু তখনকার দিনে হলে হতো। একটা ব্যাপার নতুন জানলাম যে ক্রিস্টানদের এখানে সিংহের মুখে ফেলা হত না, শুধু ছিঁচকে চোরদের ফেলে দেওয়া হত। ছিঁচকে চোর এখনও আছে রোমে কিন্তু বাজেটে কুলোয় না বলে আজকাল আর তাদের সিংহের মুখে ফেলে দেওয়া হয় না। ক্রিস্টানদের অদৃষ্ট অপেক্ষা করত কাছাকাছি “সার্কাস মাম্ক্সিমাস “ নামের একটা জায়গায়। অদৃষ্টের পরিহাস কিনা জানিনা ওই জায়গাটার ওপরেই এখন ভ্যাটিকানের জমিদারী।

যে সব জন্তু জানোয়ার বা গ্ল্যাডিয়েটররা অংশ নিত তারা অপেক্ষা নিচের তলায়, যতক্ষণ না তাদের ডাক পড়ত। এখন সব যদিও ধংস হয়ে গেছে তাই নিচের তলাটা ওপর থেকে পরিস্কার দেখা যায়, কিন্তু তখনকার দিনে সেটা দর্শকরা দেখতে পেত না। অনেকটা ভোজবাজির মতই অংশগ্রহণকারীরা হঠাৎ উঠে আসত নিচের তলা থেকে ওপরে, এলিভেটরের সাহায্যে। হাততালিতে ফেটে পড়ত এই মুক্ত অঙ্গন রঙ্গমঞ্চটি। আজকের দিনের গিয়ারের মতই মেশিনের ব্যবস্থা ছিল। শুধু ইলেক্ট্রিসিটির বদলে ব্যবহার করা হত ক্রীতদাসদের। ওদের পরিশ্রম দিয়ে ওরা ঘোরাত ওই গিয়ারগুলিকে, আর এলিভেটরটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠত। আজকের দিনের পার্ফফরমারও যখন কনসার্ট করেন তখন তাঁদের মধ্যে অনেকেই এইভাবে নিচ থেকে ওপরে আভির্ভূত হয়ে দর্শকদের চমক দেন।শুধু তফাৎ এই যে তাঁরা বেঁচে থেকে আরও বড় অংকের কন্ট্রাক্ট সই করার সুযোগ পান।

জানতে পারলাম যে আমজনতা দর্শকদের কোন পয়সা দিতে হত না কলিসিয়ামে ঢোকার জন্য। একেই বলে ফ্রি এন্টারটেনমেন্ট। রাত্রিবেলায় কলিসিয়ামটিকে আলো দিয়ে সাজানো হয়। আমাদের আর সেটা দেকার সুযোগ হয় নি। ফেরার সময় রাস্তা পার হতে গিয়ে ভেস্পা স্কুটার, স্মার্ট কার এবং অন্য অনেক গাড়ির ড্রাইভারদের গালিগালাজ খেতে হল। পুরনো কলকাতাবাসী হওয়াতে ব্যাপারটা মন্দ লাগল না, বেশ মিল পেলাম।

পরের দিন খুব ভোর ভোর উঠে দেখতে গেলাম ভ্যাটিকান শহরটি। অত ভোরে গিয়েও দেখি লম্বা লাইন। রোমের টুরিস্টদের মধ্যে বেশিভাগই আসেন এই শহরটিকে দেখার জন্য| লাইন অবশ্যই তাড়াতাড়ি এগোচ্ছিল। একটু অপেক্ষা করার পরেই আমরা ভিতরে ঢুকতে পারলাম। গাইডের ব্যবস্থা আগেই করা ছিল। যদিও ভ্যাটিকান একটি সম্পূর্ণ দেশ কিন্তু একটি নতুন দেশে ঢুকতে গেলে যেমন পাশপোর্ট ভিসা এসব লাগে বা দেখাতে হয় এখানে সেরকম কিছু করতে হল না, কোনো কাউন্টারও দেখলাম না।

প্রথমে ফাঁকা জায়গা দিয়ে প্রবেশ পথ তারপর বেশ কয়েকটা ঘর পার হবার আমরা প্রবেশ করলাম একটি হলের মধ্যে। দেখলাম দেয়ালে দেয়ালে ঝুলছে ছবি আর নান ধরনের স্ট্যাচু। বুঝলাম আমরা ভ্যাটিকান মিউজিয়ামে ঢুকে পড়েছি। ছবি ও মূর্তিগুলির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। খুঁটিয়ে পড়তে চেষ্টা করলাম বৃতান্তগুলি। আর্টিস্ট ও ভাস্করদের নাম, পরিচিতি, কোন সালে তৈরী এবং তাদের ইতিহাস সবই দেওয়া আছে সংক্ষেপে নিচের দিকের ফলকে। বেশির ভাগই ইটালির রেনেসাস যুগের কলাকার। কয়েকজনের নাম চেনা লাগল যেমন লিওনার্দো, মাইক্যান্জলো, রাফয়েল, ব্রামানটি। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যে দেওয়াল ছাড়া অনেক ছবি ছাদেও আঁকা হয়েছে। কি সুন্দর আঁকা সব ছবি।তুলির টানে আঁকা কিন্তু কি জীবন্ত সেই সব ছবি। কিছু ছবি দেখলে মনে হবে থ্রি-ডিমেন্স্যানাল। তখনকার দিনে এইধনের অপটিক্যাল ইলিউসন এর সৃষ্টি কি করে করেছিলেন, কে জানে? তারপর মনে হল ওঁরা তো রেনেসাস যুগের শিল্পী। ওঁরা তো যুগপুরুষ, পরের প্রজন্মকে পথ দেখানোর জন্যই তো মানবসমাজের দূত হিসেবে ওনাদের জন্ম নিতে হয়েছিল।

প্রায় দুমাইল এইভাবে হাঁটা পথে যাবার পর একটা বিরাট ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। গাইড আমাদের জানালো যে আমরা সিষ্টিন চ্যাপেলের ভিতরে ঢুকেছি। গাটা কেমন জানি শিরশির করে উঠল নামটা শুনে। এত নামডাক শুনেছি এই চ্যাপেলের। সেই বিখ্যাত সিষ্টিন চ্যাপেলের মধ্যে আমি দাঁড়িয়ে আছি এটা ভাবতেই আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। নিজেকে একটা চিমটি কেটে পরখ করে নিলাম সব সত্যি কিনা। জানা গেল ঘরটি দৈর্ঘে প্রায় ৪০ মিটার, প্রস্থে প্রায় ১৩ মিটার আর উচ্চতায় প্রায় ২০ মিটার। যদিও ঘর বলছি কিন্তু আমার মনে হল যেন একটা বড়সড় গুহার ভিতরে আমরা ঢুকে পড়েছি। সমস্ত দেওয়াল জুড়ে এমনকি সমস্ত ছাদেও ছবিতে ছয়লাপ। এতটুকু জায়গাও খালি নেই।পনের শতকের গোড়ার দিকে পোপ সিক্সটাসের আদেশে এই চ্যাপেলের কাজ শুরু হয়। তাঁর নামের সঙ্গে মিলিয়েই এই চ্যাপেলের নাম রাখা হয়েছে। এই চ্যাপেলের দেওয়ালের ছবিগুলি যাঁরা একেঁছেন তাঁদের মধ্যে স্বনাম ধন্য আর্টিস্ট হলেন বটেচেলি, ঘিরল্যান্দিও, পেরুজিনো নামক শিল্পীরা। তবে সিস্টিন চ্যাপেলের সবথেকে নামডাক যে শিল্পীর জন্য, এবং যাঁর জন্য দর্শকদের এত ভিড় তিনি হলেন মাইকেল এন্জেলো। এই সিস্টিন চ্যাপেলের আঁকা ছবির মধ্যেই তিনি অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেনও। তাঁর শিল্প কলার অপূর্ব সব নমুনা রেখে গেছেন এই চ্যাপেলে। একদিকের দেওয়ালে যেমন আছে শিল্পীর আঁকা প্রখ্যাত ছবি “লাস্ট জাজমেন্ট “ আবার অন্যদিকের দেওয়ালে আর ছাদে আছে গল্পচ্ছলে আঁকা কৃষ্টিও যুগের নানন কীর্তিকলাপ। একটা কথা বলতে ভুলে গেছি যে আমাদের গাইড সাবধান করে দিয়েছিল যে এই চ্যাপেলের ভিতরে কোনরকম ছবি তোলা নিষেধ। জানা গেল এই চ্যাপেলের ডোমটি নাকি পৃথিবীতে যত ডোম আছে তার মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে পড়ে। জায়গাটা এত বড় যে এত লোক জমায়েত হওয়া সত্বেও মনে হচ্ছিল না যে গায়ে গায়ে লাগছে| উঁচু হয়ে তাকাতে তাকাতে ঘাড়ে ব্যথা লাগছিল। একটা ফাঁকা বেঞ্চ দেখে বসে পড়লাম। বসে পড়ার পর মনে পড়ল গাইডের কাছে শোনা তখনকার দিনের কিছু মজার মজার ঘটনার কথা। মাইকেল এঞ্জেলো আর তখনকার পোপ জুলিয়াসের মধ্যে ভাব ভালোবাসা খুব একটা ছিল না। উনিই জোর করে মাইকেলকে ঘাড়ে চ্যাপেলের ছবি আঁকার কাজটি ধরিয়ে দেন। তার করন তিনি জানতেন যে মাইকেল কাজটা শেষ করতে পারবেন না। মাইকেলের না পারার কারণ হল যে তিনি পেশায় ছিলেন স্থপতি। স্থপতি হিসাবে ওনার সবথেকে বড় কাজ হোল পৃথিবী বিখ্যাত “ডেভিডের” মূর্তি। মাইকেল আবার ছবি আঁকা তেমন পছন্দ করতেন না।

পোপ জুলিয়াসের দাবি ছিল সিস্টিন চ্যাপেলের সবকিছু হবে ছুবি এঁকে, কোন মূর্তি থাকবে না। জুলিয়াসের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে মাইকেল কাজ শুরু করার কিছু দিনের মধ্যেই হাল ছেড়ে দেবেন। যেহেতু ছবি তাঁর আঁকায় তাঁর পারদর্শিতা তেমন ছিল না।জুলিয়াসের আগে থেকেই ঠিক করা ছিল যে কাজটা তিনি তখনকার দিনের বিখ্যাত আর্টিস্ট ব্রামানটিকে দিয়ে করাবেন। তখন তিনি সবাইকে ডেকে বলবেন দ্যাখো তোমরা তো বল মাইকেল খুব বড় আর্টিস্ট তাই কাজটা ওকে দিয়েছিলাম, কই ও তো পারল না।আসলে তোমরা যা ভাব তা নয়, মাইকেল তেমন বড় কিছু আর্টিস্ট নয়, আমি আগেই জানতাম। আরও জানা গেল যে কাজ চলাকালিন পোপ নাকি যে কোন সময় চ্যাপেলে ঢুকে পড়ে মাইকেলকে জিজ্ঞাস করতেন “এত দেরী হচ্ছে কেন?”। মাইকেল তার উত্তরে কি করেছিলেন? উনি পরিস্কার পোপকে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চ্যাপেলে ঢুকতে মানা করে দিয়েছিলেন। ভগবানের ছেলের সঙ্গে এরকম ব্যবহার। বুকের পাটা ছিল বলতে হবে। পোপ জুলিয়াসের দাবি ছিল সিস্টিন চ্যাপেলের সবকিছু হবে ছুবি এঁকে, কোন মূর্তি থাকবে না। জুলিয়াসের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে মাইকেল কাজ শুরু করার কিছু দিনের মধ্যেই হাল ছেড়ে দেবেন। যেহেতু ছবি তাঁর আঁকায় তাঁর পারদর্শিতা তেমন ছিল না। জুলিয়াসের আগে থেকেই ঠিক করা ছিল যে কাজটা তিনি তখনকার দিনের বিখ্যাত আর্টিস্ট ব্রামানটিকে দিয়ে করাবেন। তখন তিনি সবাইকে ডেকে বলবেন দ্যাখো তোমরা তো বল মাইকেল খুব বড় আর্টিস্ট তাই কাজটা ওকে দিয়েছিলাম, কই ও তো পারল না।আসলে তোমরা যা ভাব তা নয়, মাইকেল তেমন বড় কিছু আর্টিস্ট নয়, আমি আগেই জানতাম। আরও জানা গেল যে কাজ চলাকালিন পোপ নাকি যে কোন সময় চ্যাপেলে ঢুকে পড়ে মাইকেলকে জিজ্ঞাস করতেন “এত দেরী হচ্ছে কেন?”। মাইকেল তার উত্তরে কি করেছিলেন? উনি পরিস্কার পোপকে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চ্যাপেলে ঢুকতে মানা করে দিয়েছিলেন| ভগবানের ছেলের সঙ্গে এরকম ব্যবহার। বুকের পাটা ছিল বলতে হবে। সিসটিন চ্যাপেলের থেকে বেরোনোর পরেই মুক্ত অঙ্গন, অনেকক্ষণ বাদে বদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে মুক্ত নীল্ আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ভালো লাগল। পাশেই পোপের থাকার বাড়ি আর একটু এগোলেই সেন্ট পিটার্সবার্গ স্কোয়ার। পোপের বাড়ির গেটের সামনে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত রকমের পোশাক পরা জনাকয়েক প্রহরী। পোশাকটা কেমন যেন আজকালকার দিনের সার্কাসের জোকারদের মত। জানলাম এই প্রহরীদের পোশাক নিজে হাতে ডিজাইন করে ছিলেন স্বয়ং মাইকেল এঞ্জেলো। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে, বদলায় এতটুকু। এই প্রহরীরা সবাই হলেন সুইস অর্থাৎ সুইজারল্যান্ডবাসী। এরা ছাড়া আর কেউ প্রহরী হতে পারবে না। একে যদি ড্রিসকৃমিনেশন না বলি তো কাকে বলব। স্বয়ং পোপ যাঁর কাছে সব মানুষই সমান, তিনিই কিনা তাঁর নিজের নিরাপত্তার জন্য সুইস ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করেন না। অবাক কান্ড। পোশাক যেমনই হোক না কেন, এদের দক্ষতা, ক্ষিপ্রতা, বাহাদুরি ও কর্মক্ষমতার ব্যাপারে কারো কোন প্রশ্ন নেই। তবে প্রশ্ন হবেই বা কেন? অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পরেই তো এদের বাছাই করা হয়।কিছুক্ষন ঘুরে বেড়ালাম সেন্ট পিটার্সবার্গ স্কোয়ারে। চত্বরটা ইলিপ্টিকাল আকারের, চারদিকটা বড় বড় কলাম দিয়ে ঘেরা। জানা গেল মোট যে মোট ২৮৪টা কলাম স্কোয়ারটিকে ঘিরে।

হাঁটতে হাঁটতে সোজা চলে এলাম সেন্টপিটার্স ব্যাসিলিকাতে। যে রাস্তা বা পথটা দিয়ে হাঁটছিলাম জানা গেল রোমান এম্পারার নিরো নাকি ওই রাস্তার ওপরেই তাঁর বিখ্যাত চ্যারিয়েট রেসের দৌড় করাতেন। আরও জানতে পারলাম যে ঠিক এই জায়গাতেই সেন্টপিটার্সকেও হত্যা করা হয়| সিকুরিটির চেকপয়েন্ট পেরিয়ে বেশ কয়েকটা কলাম ছাড়িয়ে এসে ঢুকলাম বেসিলিকার ভিতরে। পৃথিবীতে যত চার্চ আছে তার মধ্যে সবথেকে বড় হল এই সেন্টপিটার্স ব্যাসিলিকার চার্চ। এই চার্চটি সম্পূর্ণ করতে সময় লেগেছে প্রায় ১৭৬ বছর। চার্চটি দৈর্ঘে ৬৯৩ ফুট, প্রস্থে ৯০ ফুট আর উচ্চতায় ১৫১ ফুট। এর ডোমটি ডিজাইন করেন মাইকেল এন্জেলো। চার্চটিতে ঢোকার মুখেই পড়বে মেকেল এন্জেলোর তৈরী মূর্তি “পিয়েটা”। মূর্তিটি গ্লাসকেসের ভিতরে রাখা। একটু “এগোতেই চোখে পড়ল বারনিনির তৈরী ২৯ মিটার উচ্চতার চারটে পিলার যার নাম “বান্দাচিনি”।

গাইডের মুখে শুনলাম এই বান্দাচিনির নিচেই নাকি সেন্টপিটার্স এর কবর ।বান্দাচিনি পার হয়ে সোজা এগিয়ে গেলাম একদম শেষের যে দেওয়াল সেটার কাছাকাছি।মুখোমুখি দাঁড়ালাম বার্নিনির “ক্যাথেড্রা পেট্রি” সামনে। অনেকটা সিংহাসনের মোট দেখতে তাই বোধহয় এর আর একটা নাম সেন্টপিটার্স এর সিংহাসন। ক্যাথেড্রা পেট্রির ওপর দিকে তাকালে পিছন দিকের দেওয়ালে চোখে পড়বে একটা হলুদ রঙের কাঁচের জানলা। সেই জানলায় আছে স্টেন গ্লাসের ওপর আঁকা একটি সাদা পায়রা, শান্তির দূতের প্রতীক। হলুদ রঙের জানলার ভিতর দিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে সূর্যের আলো পড়ে সাদা পায়রাটিকে মনে হচ্ছিল জীবন্ত। কি অপূর্ব সেই দৃশ্য। এইসব দেখার পর আর এত ঘোরাঘুরি করার পর যা হওয়ার তাই হল, খিদে পেয়ে গেল। বসে পড়লাম ছাদবিহীন একটা রেস্তরায়। এখানে পাস্তা আর পিজ্জা সবথেকে জনপ্রিয়।

পরেরদিন দেখতে গেলাম আর একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য যার উচ্চারণ “প্যান্ -থিওন“। এম্পারার হেড্রিয়ান এটিকে বানিয়েছিলেন ১২০ ক্রিস্টাব্দে। জানা না থাকলে খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত। রোমের রাস্তাঘাট একেবেঁকে ঘোরাফেরা করে, গোলকধাঁধার মতো। চেনাশোনা লোকজন ছাড়া যাওয়া উচিত নয়। তাছাড়া আছে ছিচকে চোরের ভয়।ওরা যে কোন সময় পকেট কেটে সবকিছু নিয়ে যেতে পারে। একা একা বেরোলে পকেটটাকে একটু সামলে রাখতে হবে। আমাদের কপালটা ভালো ছিল। হোটেলের থেকেই আমাদের ব্যবস্থা করে দিল প্যানথিয়নে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার ও নিয়ে আসার। বয়স দুহাজার বছর হলেও বেশ পাকাপোক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। আরো দুহাজার বছর অনায়াসে টিকে থাকতে অসুবিধে হবে বলে মনে হল না। প্যানথিয়নের সব থেকে বড় বিশেসত্ব হল যে ডোমের মাঝখানে একটা নয় মিটারে গর্ত। দিনের বেলায় এই গর্ত দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকে প্যানথিয়নের ভিতরটাকে উজ্জ্বল করে রাখে। বৃষ্টির সময় যখন ওই গর্ত দিয়ে জল নিচে পড়ে তখন সেই জল ড্রেন করার ব্যবস্থাও আছে দেখলাম। এই চার্চটি যে কিভাবে বার্বেরিয়ানদের আক্রমন আর সময় ও মাধ্যাকর্ষণের কবল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে আজও মাথা ঊচু করে দাড়িয়ে আছে সেটাই অবাক বিশ্বয়। গবেষকদের ধারণা যে জড়ো উপাদান দিয়ে এই স্থাপত্য নির্মিত হয়েছিল সেটি অনেকটা আমাদের বর্তমান কালের কনক্রিটের মতোই। তফাৎ হল এটিতে কোন লোহা ব্যবহার করা হয় নি।বিখ্যাত আর্টিস্ট রাফ্যায়েলকে এখানে কবর দেওয়া হয়। আর একটি বিশেত্ব হল প্যানথিয়নের দরজার মাথায় ওপর একটি মেটালের গ্রিল বসানো আছে, সেই গ্রিলটির ওপর যখন মধ্যাহ্ন সূর্যের আলো এসে পড়ে তখন সেই প্রতিফলিত আলো সামনের উদ্যানটিকে উজ্বল আলোয় আলোকিত করে দেয়। ২১শে এপ্রিল হল রোমানদের স্মরণীয় দিন, রোম শহরের জন্মদিবস। ওই দিনটিতে রোমের এম্প্রারাররা এসে গ্রিলের নিচের ভিত্তিবেদির ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতেন তখন তাঁদের মাথার পিছনে মনে হত হাজার হাজর পাওয়ারের বাতি জ্বলছে। হাততালিতে উদ্যান ফেটে পড়ত, রোমানরা মনে করত তাদের এম্পারার হল ভগবানের পাঠানো দেবদূত। অতএব আর কোন কিছু চিন্তা না করে কায়েমনবাক্যে তাঁরা সম্রাঠের পায়ে নিজেদের সমর্পণ করে দিতেন। বুঝলাম ভোটের জন্য তখনকার দিনেও ব্যবস্থা করতে হত। যে জায়গাটি না দেখলে রোমে আসা সার্থক হয় না সেইদিকে পা বাড়ালাম। দেখতে গেলাম “ট্রেভি ফাউন্টেন”। তখনকার দিনের অনেক তাবড় স্থপতির নাম জড়িয়ে আছে এই ট্রেভি ফাউন্টেনের সঙ্গে। তবে সবথেকে বেশী নাম হল গিউসেপ পাণিনির ও নিকোলা সালভি।গিউসেপ পাণিনির বানানো নেপচুনের রথে অবস্থিত অবস্থায় বড়সড় মূর্তিটি জগৎ বিখ্যাত। এই ফোয়ারাটি রোমের সবথেকে পুরোনো, ক্রিস্টর জন্মের প্রায় ১৯ বছর আগে।তিনটি রাস্তার সন্ধিস্থলে এই ফোয়ারাটি অবস্থিত, তাই এই নামকরণ। আমরা বাঙালিরা হয়ত এর নামকরণ করতাম ত্রিবেনী প্রস্রবণ। এটি ছিল জনসাধারণের জন্য খোলা জায়গায় জল সরবরাহের ফোয়ারা। এই ফোয়ারাটিকে লা দলচে ফিদা, রোমান হলিডে ছাড়াও আরো অনেক মুভিতে দেখানো হয়েছে। ট্রেভি ফাউন্টেনের সঙ্গে একটি কিংবদন্তি জড়িয়ে আছে। এই ফোয়ারাটির দিকে পিছন ফিরে কেউ যদি পয়সা ছোঁড়ে ওই ফোয়ারার জলে, তাহলে সে রোমে আবার ফিরে আসবেই। আমার মনে হয় রোমের টুরিজিম ডিপার্টিমেন্ট এই কিংবদন্তি সঙ্গে বেশ ভালভাবে জড়িত। অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত লাগছিল তাই একটু বিশ্রাম নিলাম স্পানিস সিড়ির ওপর বসে। স্পানিশ এম্বাসির পাশে বলেই হয়ত এই নামকরণ। সিড়িটা দুধের মত সাদা রং আর রংবেরঙের ফুল দিয়ে সাজানো। লোকে এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে, গল্প করে, আড্ডা মারে। সিড়িটার একদম মাথার ওপর আছে ট্রিনিটি দে মনটি নামের একটি চার্চ। এই সিড়িটার আশেপাশেই হল নামিদামি ডিজাইনারদের দোকান। গাইড আমাদের সাবধান করে দিয়েছিল এখানকার জামাকাপড়ে কোন প্রাইস ট্যাগের লেবেল নেই। তার কারণ জিগ্যেস করাতে বলেছিল যে যারা এখান থেকে কেনে তাদের কাছে দামটা বড় কথা নয়। কাপড়ের কোয়ালিটি, ডিজাইন, রং এইসব দেখেই তাঁরা কেনাকাটি করেন।অর্থাৎ বড়লোক আর তাদের বৌদের জন্যই এইসব দোকান। আমি একটু উইন্ডো শপিং করে এলাম।

সর্বশেষে যে জায়গাটাতে গেলাম তার নাম “পিয়াজা নভানো কোয়াটার“। সুন্দর সাজানো গোছানো একটা বেড়ানোর জায়গা। এখানে মুক্ত অঙ্গনে বসে খাবারের রেস্টুরান্ট অনেক আছে দেখলাম। এককালে এখানে কলিসিয়ামের থেকেও বেশি ভিড় হত। এম্পারার দেমিশিয়ানের আমলে (৮১-৯৬ ক্রিস্টাব্দে) এটি বানানো হয়।

বারনিনির বানানো এই ফোয়ারাটি পৃথিবীর চারটি নদীর সমন্বয় বা প্রতিক –দানিউব, গঙ্গা, নাইল আর রিও ডি লা প্লা তে। একটা রেস্টুরান্টের চেয়ারে বসে এক কাপ কফি নিয়ে অলস চোখে দেখছিলাম সবকিছু। আর্টিস্টরা ছবি আঁকছে, তাদের আঁকা ছবি বিক্রি হচ্ছে, বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে, কিছু লোক আমারই মতো বসে চা বা কফি পান করছে। বেশ ভালো রকম আঁতেলর মতো দেখতে কয়েকজন দাড়িওয়ালা লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। শান্ত সুন্দর নিরিবিলি মনোরম পরিবেশ। 

আমার রোমের যাত্রা এখনই শেষ হল। রেনেসাসের যুগের শিল্পী ও বুদ্ধিজীবিরা পরবর্তী কালের মানুষের জন্য যা রেখে গেছেন তার সম্বদ্ধে যতই বলি না কেন কম বলা হবে। যেটা জেনে ভালো লাগল তাঁরাও আমাদের মতই রক্ত মাংসের মানুষ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হিংসা, ক্রোধ, ভাব, ভালোবাসা সবই ছিল সাধারণ মানুষের মতো, কিন্তু একটা বিশেষত্ব তাঁদের ছিল আর সেটা হল ভবিষ্যতের কথা বর্তমানে বসে চিন্তা করা।লোকে বলে যখন রোমে আসবেন তখন রোমানরা যা করে আপনিও তাই করবেন। কথাটা সত্যি – রোমে না এলে, বুঝতে পারতাম না।

Comments

Top

ভ্রমণ

 

পাতাঝরা পান্না

সব্যসাচী বসু

বর্ধমান,পশ্চিমবঙ্গ

মারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ...”

সপরিবারে প্রথমবারের জঙ্গল ভ্রমণের জন্যে তাই হয়তো মধ্যপ্রদেশের পান্নাকেই বেছে নিয়েছিলাম রবিকবির কবিতারই সূত্রে। কিন্তু বড়দিনের কনকনে ঠান্ডার ঘনকুয়াশা মাখা প্রভাতে জঙ্গলে প্রবেশ করে একটু যেন ধাক্কা খেল মন। এ কেমন জঙ্গল! এখানে কোথায় গেল ঘন সবুজ! পাতাঝরা অরণ্যানি চারপাশে। কোথাও বা বাদামি-হলুদ শুষ্ক তৃণাঞ্চল।ইতিউতি উঁকি দিচ্ছে বেণুবন।

ক্রমে মনকে মানিয়ে নিলাম। ভারতের জঙ্গলের কত না রূপ! দক্ষিণ ভারতের ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় শুষ্ক চওড়া-পাতার বন এখানে এসে মিশেছে গাঙ্গেয় সমভূমির আর্দ্র পর্ণমোচী বনের সাথে। সুতরাং পরিচিত সেগুনের পাশে অপরিচিত কুমীরের আঁশের মতো ছালের চিরহরিৎ বৃক্ষের সহাবস্থান।

মধ্যপ্রদেশ পর্যটনবিভাগের মাদলা জঙ্গল ক্যাম্পের আধুনিক তাঁবুতে রাত্রিবাসের পর কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে হাজির হয়েছিলাম কর্ণাবতী টিকিট কাউন্টারে। অন্তর্জালের মাধ্যমে আমি-তুমি-সে: তিনজনের মাদলা দ্বার দিয়ে জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ নিশ্চিত ছিলই।বাকি ছিল জিপসির ছয় সদস্যের বাকি তিনজনাকে সংগ্রহ করে পথপ্রদর্শক ঘাড়ে লটকে জিপসিতে চেপে বসা।

আধাঘণ্টার প্রতীক্ষার পর সচিন তেন্ডুলকারের রাজ্যের এক আমি-তুমি-সে পরিবারের সাথে ৮১৫ নং জিপসির শিশিরসিক্ত আসনে চড়ে বসা। যথারীতি এর মাঝে অবসরে ক্ষুদ্র কিন্তু চমৎকার বনদপ্তরের প্রদর্শনশালা দর্শনে বিনোদন ও জ্ঞানার্জন--বাঘ-বাঘিনীর ‘পাগ-মার্কের’ তফাৎ জানা। অন্তর্জালের তথ্যের সাথে মিলিয়ে নেওয়া­­— ৫৪৩ বর্গকিমির জঙ্গলটির দুটি দ্বার-মাদলা ও হিনাউটা; চারটি রেঞ্জ-মাদলা, পান্না, হিনাউটা ও (কেন নদীর পশ্চিমপাড়ে) চন্দ্রনগর; তিনটি বনবিভাগ-উত্তর ও দক্ষিণ পান্না এবং ছত্রপুর; দুটি জেলা-পান্না ও ছত্রপুরে ছড়িয়ে আছে পান্না, ছত্রপুর ও বিজাওয়ার রাজাদের অতীত মৃগয়াক্ষেত্র যা ১৯৭৫ সালে অভয়ারণ্য থেকে ১৯৮১ সালে জাতীয় উদ্যানে পরিণতা হয়ে ১৯৯৪ সালে ‘প্রজেক্ট টাইগারের’ অন্তর্গত হয়েছে। যদিও মাঝে ২০০৯ সালে সম্পূর্ণ বাঘশূণ্য হয়েছিল, তবু বর্তমানে মধ্যপ্রদেশের অন্যান্য জঙ্গল থেকে বাঘ-বাঘিনী নিয়ে আসায় শাবকের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ২০১১ সালে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভে পরিণতা।

বাঘিনীর গ্রাম্য মোষ সদ্য শিকারের খবর থাকায় মড়িসংলগ্ন তৃণপ্রান্তরে হাজির হলাম।টিভিতে দেখা দৃশ্যের অবতারণা-সবকটা জিপসি থেকে দর্শকের তথা ক্যামেরার নজর সামনে কুয়াশা পাতলা হতে থাকা প্রান্তরে। আয়েসী বাঘিনী আর চার বছরের ভ্রাম্যমান ছানার(যদিও একই আকার) নানা পোজ চক্ষু ও ক্যামেরার লেন্সবন্দী। একদল বুনোশুয়োরের দিকভ্রান্ত দৌড়, ভরপেট বাঘিনী ও ছানার উদাসীনতা, বাঘিনীর অলস রোদে গড়াগড়ির দৃশ্যাবলী উপভোগ।‘ আর কতক্ষণ ব্যাঘ্রলীলা দেখব!’, ভেবে পিছু ফেরা।

পাহাড়ি পথে আতঙ্কিত শম্বরের ডাক, চিতার আগমন প্রতীক্ষা, বুকের মাঝে গুরুগুরু করবেট-অভিজ্ঞতা, ঝর্ণার ঝিরিঝিরি বয়ে যাওয়া, বুনোপাতার নিঃশব্দ খসে পড়া, চিতল হরিণ-হরিণী-বাচ্চার ঘাস খাওয়া, নীলগাইদের বিড়িপাতা ছেঁড়া,শুষ্ক ডালে নীলকণ্ঠ পাখীর নিশ্চুপ বসে থাকা, বাঘের দাঁত থেকে মাংস-খুঁটে-খাওয়া কমলা-হলুদ Rufaus treepie পাখীর ওড়াউড়ি, বৃক্ষসওয়ারী একদল বিজ্ঞ লেঙ্গুর, ছুটন্ত বেঁজি, খয়ের গাছের গুঁড়িতে আটকে থাকা হরিণের শিং, কেন নদীর জলে ময়ূরদ্বয়ের জলপান ও পাড়ে কুমীরের অলস রোদপোয়ানোর দৃশ্যাবলীকে মনের মণিকোঠায় চিরসঞ্চয় করে ফিরতি পথ ধরা।

মধ্যপ্রদেশের কাটনি জেলার কাইনুর রেঞ্জে উৎপন্ন কর্ণাবতী নদী (ইংরেজদের দেওয়া নাম-কেন) ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ বেয়ে (মধ্যপ্রদেশে ২৯২,উত্তরপ্রদেশে ৮৪ ও দুই রাজ্যের সীমান্ত বরাবর ৫১) উত্তরপ্রদেশের ফতেপুর জেলার চিল্লাগ্রামে যমুনানদীতে মিশেছে। পান্না জাতীয় উদ্যানের পশ্চিমাঞ্চলে ৭২ কিলোমিটার এর অন্তর্ভূক্ত।

সকালের কুয়াশামাখা পান্না জাতীয় উদ্যানে বাঘ-চিতল-সম্বর-নীলগাই-বুনোশুয়োর দর্শনের পর পৌঁছেছিলাম কেন্ নদীতীরে। দূরবীণ আর ক্যামেরার লেন্স খুঁজে নিয়েছিল নদীতে জলপানরত ময়ূরদ্বয় আর পাড়ে আলসেমিমাখা কুমীর।

দুপুরে এসেছি মন্দিরনগরী খাজুরাহো। আহার সেরে পূর্ব ও উত্তর অঞ্চলের মন্দিরগুচ্ছ দেখেই রওনা দিয়েছিলাম একই অটোয় পান্না জাতীয় অরণ্যেরই উত্তরের অঞ্চল কেন্ ঘড়িয়াল অভয়ারণ্যে। অটোর প্রবেশমূল্য ও বাধ্যতামূলক গাইডমূল্যের বিনিময়ে অরণ্যে প্রবেশ।

বর্ষীয়ান-অভিজ্ঞ গাইডের বর্ণনা আর তথ্যপরিবেশন চললো। সকালের অলসরোদে যার সাথে প্রথম দেখা গোধূলিবেলায় তার সাথে পুনর্বার সাক্ষাৎ। একইরকম অরণ্যপথে একইরকম বন্যপ্রাণী দর্শন।তবে এ পথ পাহাড়ি। ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোটবড় প্রস্তরখন্ড।

গ্যালারী - ১