top of page
সূচীপত্র
Saraswati3.jpg
জুলাই ২০২১
girl.JPG

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা

জুলাই ২০২১ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

কবিতাঃ উজ্জ্বল মিশ্র

কবিতা

ডাঃ উজ্জ্বল মিশ্র

আসানসোল, পঃ বাংলা

উপোসী আগুন
                        

বালিশে গুঁজেছে মুখ উপোসী আগুন,
রূপসী চাঁদের আলো বিছানা ভাসায়।
কথা যে রাখে নি জানে ব্যর্থ ফাগুন,
তবু নিত্য আয়োজন মিথ্যে আশায়।

নিত্য যে দহনজ্বালা শরীরে ও মনে,
অব্যক্ত ব্যথার বিষ অন্তঃপুরময়।
রাতের চাদর ঢেকে অতি সংগোপনে
নিজেকে উজাড় করে নগ্ন সময়।

লক্ষ প্রতীক্ষার পরে উপেক্ষার জ্বালা
বুকময় দাগ নিয়ে চন্দ্রমাও জানে।
বালিশে মুখ গুঁজে যতো অবহেলা
চাদরে কুঁকড়ে খোঁজে জীবনের মানে।

কতদিন বাঁচতে ভুলেছো 

 

তোদিন মাখো নি গায়ে যুবতী চাঁদের থেকে

চুঁইয়ে পড়া লুটোপুটি আলো।

শ্রাবণের রিমঝিম গানে মাতোয়ারা

বেহিসেবি উচ্ছ্বাসে

কতদিন মাতো নি বলো

অবিরাম বরিষণ স্নানে।

বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসে ঘাসে

সঞ্চিত বিন্দু বিন্দু হিমেল শিশিরে
কতদিন ভেজাও নি পা,
পৌষের কোনো এক ভোরে।
কতদিন হয় নি দেখা
কুয়াশার জাল ছিঁড়ে 
কমলা সূর্যোদয় নদীর ওপারে।
অকারণ পুলকে কতদিন
গলা ছেড়ে হয় নি গাওয়া গান,
অরণ্যে পাহাড়ে রহস্যময়
নীরবতা খান খান ভেঙে।
জ্যোৎস্না রাতে মাঝ গাঙে
হাল ছেড়ে নৌকায় পাল তুলে
নিরুদ্বেগ ভেসে থাকা 
হয় নি কতদিন।
কতদিন কারণে অকারণে 
হাসতে ভুলেছো প্রাণ খুলে।
যতো কাজ পিছুটান 
সব কিছু ভুলে অখণ্ড অলসতায়
ঠাঁই বসে বসে দেখা
গাছেদের ডালে ডালে পাতায় পাতায়
জানা অজানা পাখিদের নাচ
ভুলে গেছো কতদিন।

কতদিন কত যুগ 
বুক ভরে বাঁচতে ভুলেছো।

কেমন হতো
          

কেমন হতো হঠাৎ যদি 
হারিয়ে যেতাম
ভোঁকাট্টা ঘুড়ির মতো।
বন্ধ দুয়ার দরাজ খুলে
সটান পা বাড়িয়ে দিতাম 
নিরুদ্দেশে, ঠুনকো যতো
মান অভিমান, মিথ্যে মায়া,
সব পিছুটান পেছনে ফেলে।
কেমন হতো হঠাৎ যদি
চেনা পাড়া, চেনা বাড়ি,
যতো চেনা গণ্ডিগুলো
বিস্মরণের খামে ভরে
উড়িয়ে দিতাম।
কিম্বা যদি হঠাৎ করে        
চেনা সুর, চেনা মুখ,
চেনা চেনা সুখ ও দুখ
চেনা যতো গল্পকথার
নটে গাছটি মুড়িয়ে দিতাম।
ফুরিয়ে যেতো নিত্যদিনের মিথ্যে নাটক।

মিথ্যে যতো কান্না হাসি,

মেকি উৎসব সাঙ্গ হতো।

কেমন হতো হঠাৎ যদি দমবন্ধ 
বৃত্তটাকে ছাড়িয়ে যেতাম।

কেমন হতো সত্যি যদি
নিরুদ্দেশেই হারিয়ে যেতাম।

কবিতা

সৃজিতা ধর

কবিতাঃ সৃজিতা ধর

জুলাই ২০২১ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

মুখোশ সরলেই...

 

মুখোশ শব্দের অর্থ হল মুখ লুকিয়ে রাখার জন্য কৃত্রিম মুখ। আমরা জীবনের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই 'নকল' মুখের ব্যবহার করি, বা বলা ভালো ব্যবহারের দরকার হয়।

এই করোনা কালে বাড়িতে থাকার জন্য আরও বেশী মুখোশের দরকার হয়ে পড়েছে।

সত্যি বলতে কি, করোনা না হলে হয়তো জানতেই পারতাম না পরিবারের মানুষগুলোর কৃত্রিম আর আসল চেহারার পার্থক্য। একটানা প্রায় ৬ মাস এভাবে বাড়িতে থাকার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি।

একদম প্রথম দিন মনে হয়েছিল, বাড়ির কাছের মানুষগুলোর সাথে সবসময় লেগে থাকতে পারবো।

আড্ডা দিতে পারবো।

একসাথে খাবার টেবিলে বসে এঁটো হাতে বাজার,

রাজনীতি নিয়ে দারুণ জমজমাট আসর বসাতে পারবো। 

কিন্তু, না- খুব ভুল ছিলাম।

আসলে সবাই সবার কৃত্রিম মুখগুলোকেই চিনতাম,

করোনা আসল মুখগুলো সামনে নিয়ে এলো।

নাহ্, এতটা ধাক্কা বোধহয় নিজের ব্রেকআপের সময়ও পায়নি।

বুঝতে পারলাম নিজের মানুষগুলোর আসল মানসিকতা।

আর ঠিক তখনই আবার দরকার পড়লো 'মুখোশ' এর। 

করোনা হয়তো বাড়ির বাইরে চলার পথে মাস্ক পড়তে শিখিয়েছে, কিন্তু ঘরের মানুষের স্বার্থপরতার মুখোশ টেনে খুলে দিয়েছে।

সত্যিই হয়তো এতটা 'আসল' চেহারা দেখতে হবে কোনোদিন মাথায় আসেনি।

আজ ভীষণভাবে মনে হচ্ছে,

মুখোশ সরলেই যদি কাছের মানুষগুলোর কদর্য চেহারা দেখতে হয়,

তবে আমি সারাজীবন মাস্ক পড়তে রাজি।

Big Wave
অনুপম

প্রবন্ধ - কল্পবিজ্ঞান

জুলাই ২০২১ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

অনুপম

কুমকুম বৈদ্য 

কলকাতা

Big Wave

সাল ২০২৫, সময় সন্ধ্যা ৭ টা, কলকাতা শহর। একটা ওভাল শেপের ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে আসছেন প্রফেসার চক্রবর্তী। চোখে মুখে আলোর দ্যুতি। আজ তিনি নিজের ফ্ল্যাটের মুখার্জীবাবুকে যে রোবট চাকরটা দিয়েছেন ল্যাব থেকে তার মাথাতে একটা থট রিডার প্রোগ্রামিং আর কিছু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পুরে দিয়েছেন সবার অজান্তে। এটা তার নিজস্ব গবেষণা লব্ধ অ্য়াল্গোরিদিম। তাই তিনি আজ খুব এক্সাইটেড। ষাট ঊর্ধ্ব মুখার্জীবাবুর বাড়িতে তিনি আর তার গিন্নি। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, সে ও কাছেরই একটা ফ্ল্যাটে থাকে। পাঁচ বছরের নাতনী প্রায় প্রতিদিনই দাদু দিদার সাথে খেলতে আসে। এখন কাজের লোকের যা ডিম্যান্ড, গ্রাচুইটি, পেনশনের টাকা দিতে হবে, তারপর হাতে গোনা কাজ, সবদিক ভেবে চিন্তে মুখার্জীবাবু ২৪ ঘণ্টার রোবট চাকরই নেওয়া ঠিক করলেন। শুধু দিনে ১ ঘন্টা চার্জ দিলেই হবে আর কোনো হ্যাপা নেই। আর পড়শি চক্রবর্তীবাবু জ্ঞানী মানুষ, আর ওনার দৌলতে ২% ডিসকাউন্ট ও পাওয়া গেল। এতদিনে গিন্নির সব সমস্যার সমাধান হবে।
মুখার্জীবাবুর রোবট চাকরের নাম হল অনুপম। ভালো করে চার্জ দিয়ে মুখার্জীবাবু চালু করলেন অনুপমকে। অনুপম - বাবা একটু চা করে আন তো। অনুপম জিজ্ঞেস করল বাবার অ্যাড্রেসটা দেবেন। মুখার্জীবাবু ঢোক গিলে বললেন মানে আমাকে এক কাপ চা করে খাওয়াতে বলছিলাম। অনুপম রান্নাঘরে চলে গেল, সে  নিজেই লোকেশন ডিটেক্ট করতে পারে, ইনগ্রেডিয়েন্ট ও নিয়ে নিল। চা এর সসপ্য়ান এ হাত দিয়ে খানিক হিস্ট্রি রিড করে নিল অনুপম কত কাপ জলে কত কাপ চিনি আর চা আর দুধ দিয়ে করা হয় চা। দেখল চিনি দেওয়া হয় না চা তে, আবার মাঝে মধ্যে আদা পড়ে। অনুপম খানিক ডেটা অ্য়ানালিসিস করে চা বানিয়ে আনল। গিন্নি এখন বাড়ি নেই, অনুপম সুন্দর আদা এলাচ দিয়ে চা বানিয়ে দিয়েছে গিন্নির মতই প্রায়। মুখার্জীবাবু পুরো দিলখুস। গিন্নি বাড়ি নেই, এলে খুশি করে দেবার ব্যবস্থা করতে অনুপমকে বললেন - ঘরদোরগুলো গুছিয়ে

রাখো তো বাপু। অনুপম চট করে তাকে বাপুজি রচনা শুনিয়ে দিল। মুখার্জীবাবু তো থ। না মানে বলছি কি ঘরটা একটু গুছিয়ে ফেলো। অনুপম আধ ঘন্টা পরে ঘর একদম গিন্নি যেখানে যা রাখে ফিটফাট হয়ে গেল। অনুপমকে বলে রাখলেন, গিন্নি ফিরলেই যেন চা করে দেওয়া হয়। খানিক পরে ডিং ডং, গিন্নি ফিরলেন। দেখো নিউ ইয়ারে তোমার গিফট, তোমার সব কাজ একদম তোমার মতো করে করে দবে অনুপম. দেখো কেমন ঘর গুছিয়েছে।গিন্নি হুম বলে দুম দুম করে পা ফেলে বাথরুমে ঢুকলেন, বাথরুম থেকে বেরিয়ে অনুপমের হাতের এককাপ চা খেতে খেতে গিন্নির মুখে কালো মেঘ দেখা দিল। অনুপমের থার্ড আই তাকে এলার্ট দিল গিন্নিমা তার মত কাজ করতে পারাটা ভালো মনে নিচ্ছেন না।রাতের খাবারে তরকারিতে  নুন সামান্য কম হল, ভাতটা ও একটু বেশি গলা হল. গিন্নি ঘোষণা করলেন কাল থেকে তিনি অনুপমকে রান্না শিখিয়ে দেবেন। পরের দিন থেকে অনুপম মুখার্জী গিন্নির ন্য়াওটা হয়ে উঠল। গিন্নি মনে কিছু ভাবলেই অনুপমের থট রিডারে তা ধরে নিয়ে অনুপম সুন্দর ব্যবস্থা করে আর মুখার্জী গিন্নির ভোকাবুলারি ও কদিনেই রপ্ত করে নিল অনুপম বেশ চলছিল দিন কিন্তু গোল বাঁধালো ওই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অ্য়ালগোরিদিম। অনুপম আস্তে আস্তে মুখার্জী গিন্নির মায়া মমতা আর ভালোবাসার অনুভূতি নিজের মধ্যে রেপ্লিকেট করে নিল।ফলে মুখার্জীবাবুর শরীর খারাপ হলে অনুপমের ও একই রকম মন খারাপ হতে লাগল এবং অনুপম শুকনো মুখে মেয়েদের তো অভিমানী পায়ে সারা বাড়ি ঘুরতে লাগল এবং সন্ধ্যাবেলা ঠাকুরের কাছে কষে প্রেয়ার করল। যদি ও অনুপমের শরীরে হরমোনের কোনো প্রভাব থাকা সম্ভব নয় কিন্তু তা ও অনুপমের একটা মন জন্ম নিল, আর তার ঠেলায় মুখার্জী দম্পতি নাস্তানাবুত। তার থেকে ও মুশকিল যেটা হল দেখতে ছেলেদের মত রোবট অনুপম মনে মনে মেয়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে শেষমেশ মুখার্জীবাবু অনুপমকে ল্যাব এ ফিরিয়ে দিয়ে এলেন। প্রফেসার চক্রবর্তী সব মন দিয়ে শুনে অনুপমকে ফিরিয়ে নিয়ে আবার শুরু করলেন তার কাজ।

বেগুনকোদার রেলওয়ে স্টেশন

গল্প 

জুলাই ২০২১ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

বেগুনকোদার

রেলওয়ে স্টেশন

চন্দন চ্যাটার্জি

begun.JPG

দি ইন্টারনেটে পৃথিবীর দশটি ভুতুরে রেলওয়ে স্টেশনের নাম খোঁজ করা যায় তবে পুরুলিয়ার এই বেগুনকোদার রেলওয়ে স্টেশনের নাম অবশ্যই আসবে। এই স্টেশনটি পড়ে পুরুলিয়া জেলায়, ঝালদা এবং কোট শিতা স্টেশনের মাঝখানে। এটি একটি হল্ট স্টেশন, এখানে কোন এক্সপ্রেস গাড়ি থামে না। শুধু কিছু প্যাসেঞ্জার গাড়ি থামে। 
একবার আমার এই স্টেশনে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেটাই আমি এখন বলব।আমি একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে আভ্যন্তরীণ হিসাব পরীক্ষক হিসাবে কাজ করতাম। এই কোম্পানির হেডঅফিস ছিল কলকাতায়, লেলিন সরণির কমলয়া সেন্টারে। সারা পশ্চিমবাংলা জুড়ে তার বাইশটি শাখা অফিস ছিল। এর মধ্যে একটি  শাখা অফিস হল পুরুলিয়া শহরে। আমি অফিসের অডিটিং কাজের জন্য গিয়েছিলাম তখনই অভিজ্ঞতা হয়।
সেবার দূর্গাপুজো পড়েছিল অক্টোবর মাসের শেষের দিকে, কাজেই দেওয়ালী পড়েছিল প্রায় নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি। দেওয়ালীর ছুটি কাটিয়ে যখন অফিসে যাই তখন আমার এক উচ্চপদস্থ কর্তা বলেন পুরুলিয়ার অফিস খোলা হয়েছে প্রায় ছয় মাস হল এখনো একবার অডিটিং হয়নি কাজেই ওখানে একবার আমার যাবার প্রয়োজন রয়েছে এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, আমার কাজটা শুধুমাত্র অডিটিং নয়, কিছুটা শাখার কর্মীদের প্রশিক্ষণ করতে হয় অর্থাৎ কিভাবে হিসাব রাখা উচিত, ক্যাশবুক কিভাবে লিখতে হয়, ভাউচার কিভাবে তৈরি করতে হয়,  কিভাবে আপলোড করতে হয়, ভেরিফাই করতে হয়।  এছাড়াও প্রতিদিন হেড অফিসে একটা রিপোর্ট পাঠাতে হয় এটা সম্বন্ধে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। 
নভেম্বর মাসের  মাঝামাঝি  কলকাতা শহরে  শীত অনুভূত না হলেও গ্রামে গঞ্জে এই সময় শীতের ভালো আমেজ পাওয়া যায় আর পাহাড়ী এলাকা হলে তো কথাই নেই। বিকালের পর থেকেই শীতের পোশাক জরুরী হয়ে যায়। আমি ২৫শে নভেম্বর হাওড়া থেকে পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হই, পাঁশকুড়া, খড়গপুর, টাটানগর, হয়ে পুরুলিয়া যেতে হয়। ট্রেনটি হাওড়া থেকে ছাড়লো সকাল ১০.১৫ মিনিটে। যখন টাটানগর পৌঁছল তখন সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। শীতকালে গ্রাম অঞ্চলে দেখা যায় বিকেলের পরেই ধোয়াগুলো একটা মেঘের মতো আকার নিয়ে মাটি থেকে কিছুটা উপরে থেকে এক সরলরেখায় অবস্থান করে, সূর্যের আলো কমতে কমতে একসময় অন্ধকার নেমে আসে। নভেম্বর মাসে দিন রাতের ফারাক বিস্তর। এখন দিনের তুলনায় রাত অনেক বেশি। ট্রেন যখন ঝালদা স্টেশন পাস করল তখন রাত্রি সাড়ে আটটা। যেহেতু এক্সপ্রেস ট্রেন তাই এই স্টেশনে থামে না, এর প্রায় ৩ মিনিট পর আমি দেখলাম ট্রেনটি বেগুনকোদর স্টেশন ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে। আমি ছিলাম শীততাপ কন্টোল্ড কামরায়। এটা ইঞ্জিন থেকে  চারটি  কামরা  পিছনে। আমার মনে হয় ট্রেনের শেষ কামরাটি বেগুনকোদর স্টেশন  ছাড়িয়েছে এমন সময় ট্রেনের গতি  কমতে শুরু করে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে গেল। পরের স্টেশন কোটশিতা প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে, সবাই ভাবল সিগনাল নেই তাই  দাঁড়িয়েছে। 
এইভাবে প্রায় ৪/৫ মিনিট কাটলো, আমি জানালা দিয়ে দেখলাম দূরের সিগন্যাল কিন্তু সবুজ আছে অথচ গাড়ি যাচ্ছে না। ব্যাপারটা কি বোঝার জন্য আমি ট্রেনের দরজার কাছে এসে দেখতে লাগলাম। আমার মতই অনেকেই বিভিন্ন কামরা থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখছে। কেউ কেউ আবার ট্রেন থেকে নেবে প্রাকৃতিক কর্ম সারছে। আমিও নেবে একটু দূরে গিয়ে প্রাকৃতিক কর্ম করার জন্য যখন প্যান্টের চেইন খুলেছি ঠিক তখনই হর্ন বাঁচিয়ে ট্রেন চালু হয়ে গেল আমিও যত সম্ভব তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে প্যান্টের চেইন টানতে টানতে চলন্ত ট্রেনটাকে ধরবো বলে ছুটতে লাগালাম। যারা ট্রেন থেকে নেমে ছিল সবাই ছুটতে ছুটতে ট্রেন ধরে ফেলল। আমার শরীর কিছুটা স্থুল। তাই আমি বেশি জোরে দৌড়াতে পারলাম না। তবুও যতটা সম্ভব জোরে ছুটতে গিয়ে একটা বড় পাথরে হোঁচট খেয়ে আছড়ে পড়লাম আর আমার সামনে দিয়ে ট্রেনটি সশব্দে চলে গেল। একটু পরে যখন ধাতস্থ হলাম তখন দেখলাম যারা ট্রেন থেকে নেবে ছিল তারা সবাই উঠে পড়েছে। কেবলমাত্র একজন আমার পিছন দিক থেকে রেল লাইন ধরে হেঁটে আসছে, অন্ধকারে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না তা হলেও বোঝা যাচ্ছে ভদ্রলোক বয়স্ক, স্থূল শরীর, সুগার আছে, চাকুরীজীবী। 
সুগার আছে, এটা প্রমাণ হয় এই বয়সে ও এই শরীরে কেউ স্টেশন ছাড়া নাবে না, আর চাকুরীজীবী কারণ শনিবারে এই সময় এইসব এক্সপ্রেস গাড়িতে সংরক্ষিত কামরায় সংরক্ষিত যাত্রী ছাড়াও অনেক অফিস ফেরত যাত্রী ওঠে। ভদ্রলোককে দেখে  আমি  একটু  দাঁড়ালাম, পরে কাছে আসতে জিজ্ঞাসা করলাম আপনিও কি এই ট্রেনে আসছিলেন। ভদ্রলোক  একটু গলা খ্যাঁকরে মোটা আওয়াজে উত্তর দিলেন আওয়াজে, “আজ্ঞে হ্যাঁ“
আমি বললাম, “আপনি কি পুরুলিয়া যাবেন?”
উত্তর এল, “আমার বাড়ি শিমুলতলা গ্রামে, পুরুলিয়া থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে। এই প্রথম আমি লক্ষ্য করলাম তার আওয়াজ আসছে অনেক দূর থেকে যেন আওয়াজটা ভেসে ভেসে আসছে, অথচ তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার অদূরে। 
একটু পরে ভদ্রলোক বললেন, “আপনাকে দেখে তো এখানকার লোক বলে মনে হচ্ছে না, তা আপনার আসা হচ্ছে কোথা থেকে?”  আমি বললাম, “কলকাতা, যাব পুরুলিয়া”
ভদ্রলোক -  “পুরুলিয়াতে কাউকে চেনেন?”
আমি - “ না, কিন্তু যে কোম্পানিতে যাব তার ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকে জানি। সে স্টেশনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে, এই গাড়িতে যাব বলেছিলাম”
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আপনি আমার সঙ্গে স্টেশনে চলুন মাঝরাতে একটা গাড়ি আছে সেটা যদি থামে তাহলে পুরুলিয়া পৌঁছাতে পারবেন”।
অন্য কোন উপায় না দেখে আমি ভদ্রলোকের সঙ্গে বেগুনকোদর স্টেশনের দিকে চললাম। স্টেশনের কাছাকাছি আসতে অল্প আলোয় ওকে দেখলাম একটা মোটা চাদর আপাদ-মস্তক ঢাকা, মাথায় হনুমান টুপি, চোখের পুরু ফ্রেমের চশমা ও মোটা কাচ, হাতে দস্তানা, পায়ের মোজা  ও রাবারের জুতো তাই চলার সময় কোন আওয়াজ হচ্ছে  না। 

স্টেশনে এসে দেখলাম একটা টিকিট কাউন্টার তাতে একজন লোক বসে ঝিমচ্ছে। প্ল্যাটফর্মের দুদিকে দুটো লাইট জ্বলছে। প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে একটা ফলকে তাতে হলদে ওপর কালো কালিতে লেখা আছে বেগুনকোদর হালট স্টেশন। বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায়। সমুদ্রতল থেকে ৩৬০ মিটার উঁচুতে, দক্ষিণ পূর্ব রেলওয়ে রাঁচি ডিভিশন। এটা সবাই জানে স্টেশন কখনো বন্ধ হয় না, কারণ রাত্রির গাড়িকে সবুজ সংকেত দেখানোর জন্য একজন লোক থাকা অবশ্যই দরকার। ছোট ছোট স্টেশনে এক ব্যক্তি একাধিক কাজ করে থাকেন যেমন কাউন্টার সামলানো, সিগন্যাল দেওয়া, আবার প্রয়োজন হলে অফিস সাফাই ও করতে হয়। আমার মনে হয় এই স্টেশনের এই ব্যক্তিটি এই একই কাজ করে থাকে। প্লাটফর্মে একটা বসার জায়গা আছে, সেখানে আমাকে বসতে বলে ভদ্রলোক চলে গেলেন ভেতর থেকে পরবর্তী ট্রেনের সময় জানতে। আমি যেখানটায় বসেছিলাম সেখান থেকে আবছা হলেও টিকিট কাউন্টার দেখা যাচ্ছিল। আমি দেখলাম ভদ্রলোক টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়ালো অথচ কাউন্টারের ভিতরের ভদ্রলোক যেমন ঝিমোচ্ছিল

তেমনি রইল, তাহলে কাউন্টারের ভদ্রলোক একবার মাথা তুলে কার সঙ্গে কথা বলছে সেটা দেখবার প্রয়োজন মনে করল না। একটু পরে আমার সাথী ভদ্রলোকটি এসে বলল, “পুরুলিয়া ইন্টারসিটি আসবে মাঝরাতের পর”।

আমি বললাম , “ইন্টারসিটি গভীর রাত্রি নয়”। 
সে বলল, “ট্রেন লেট করেছে তাই রাত্রি পৌঁছাবে”
অগত্যা কি করা যায় আমি বসে রইলাম কিছুক্ষণ পরে ভদ্রলোক বললেন, “একটু জল হবে ?”
আমি বললাম, “জল – খাবার সব আমার ব্যাগে ছিলো সেটা তো এখন আর পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না“। 
ভদ্রলোক, “আপনার কি রিজার্ভেশন ছিল?”
আমি, “বি-৩, ২৮ সাইড লোয়ার”।
ভদ্রলোক, “আচ্ছা “
এরপর প্রায় এক ঘন্টা কেটে গেছে, ইতিমধ্যে আমি প্ল্যাটফর্মের বাইরে গিয়ে একটু চা খেয়ে এসেছি মাত্র। ভদ্রলোক কোথাও দেখছিলাম না, বসে বসে ঝিমুনি ও এসেছে, এমন সময় একটা ঠান্ডা স্পর্শে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, দেখলাম সেই ভদ্রলোকটি আমাকে ডাকছেন।
ভদ্রলোক, ”আপনার ব্যাগটি পাওয়া গেছে”
আমি , “কি করে?”
ভদ্রলোক, “আমার এক পরিচিত আপনার কামরায় সফর করছিল সে আপনাকে নামতে দেখে আপনার ব্যাগটি নিয়ে পুরুলিয়া স্টেশনে নেমেছিল, তার বাড়ি এই স্টেশনের উল্টোদিকেই, বাইরে আমার সঙ্গে দেখা হলো, কথায় কথায় আমি আপনার কথা বললাম তখন সে  আপনার ব্যাগটি আমাকে দিয়ে চলে গেল”। 
আমি মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম এবং এমন একটা সংযোগও যে হতে পারে সে বিষয়ে ভাবতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে ভদ্রলোক বললো, “দেখুন আপনার গে সব ঠিকঠাক আছে তো“। আমি ব্যাগের চেইন খুলে দেখলাম আমার ল্যাপটপ, জলের বোতল, টিফিন, অফিসের কাগজপত্র ইত্যাদি সবই আছে। 
আমি বললাম, “আপনি জল খাবেন বলেছিলেন”। এই বলে জলের বোতলটা তার দিকে এগিয়ে  দিলাম। ভদ্রলোক বললেন, “না দরকার নেই আমি বাইরে দোকান থেকে খেয়েছি”। রাত অনেক হয়েছে তাই আমি টিফিন বার করে খেয়ে, জল খেয়ে, আবার বসলাম। আমার একটু পানের নেশা আছে। রাত্রে খাবার পর খয়ের ছাড়া ১২০ জর্দা দিয়ে একটা পান দরকার হয়।   
আমি বললাম, “আপনি বসুন আমি দেখি বাইরে একটা পান পাওয়া যায় কিনা”। 
ভদ্রলোক বললেন, ”আমার কাছে আছে“ এই বলে একটা কাগজের মোড়ক আমার হাতে দিলেন। সেটা হাতে নিতে বুঝতে পারলাম এটা বরফের মত ঠান্ডা । 
আমি বললাম, “এত ঠান্ডা কেন?”। 
উত্তর এলো, “এটা আমার পকেটে ছিল তাই“।
মনে মনে ভাবলাম পকেটে থাকলে তো গরম হওয়ার কথা, আর একটা কথা আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে যখন যেটা প্রয়োজন সবই এর কাছে আছে কেন, এই সব নানা কথা ভাবছি।
যাই হোক, আমি যে রকম পান খাই এটা ঠিক সেই রকমই। পানটি গালেপুরে চিবুতে চিবুতে তাকে একটা ধন্যবাদ জানালাম, এবং জিজ্ঞাসা করলাম, “দুঃখিত আপনার নামটা জানা হয়নি, আজ আপনি এত উপকার করলেন তার জন্য অজস্র ধন্যবাদ। বাই দি ওয়ে আমার নাম চন্দন চট্টোপাধ্যায়”।
ভদ্রলোক উত্তর দিলেন তার নাম বিকাশ চক্রবর্তী। এরপরে বললেন, “একটা এক্সপ্রেস গাড়ি আসছে ডাউনে”।
আমি বললাম, “ ডাউন এর গাড়ি তো আমার লাগবে না যদি আপে হয় তো ভালো, তাও আবার যদি এখানে দাঁড়ায় তো“।
হ্যাঁ  ঠিক বটে খানিকক্ষণ পরে সত্যিই একটা ট্রেনের শব্দ শুনতে পেলাম এবং অনেক দূরে ট্রেনের আবছা আলো দেখা যাচ্ছে। ক্রমে আলোটা উজ্জ্বল হতে লাগলো, আবছা স্টেশন অনেকটা আলোকিত হতে লাগলো। আমি একটু এগিয়ে গিয়ে লাইনের ধারে দেখতে গেলাম কি ট্রেন আসছে । 
আমাকে যেতে দেখে লোকটি উঠে দাঁড়ালো এবং কর্কশ আওয়াজে আদেশের সুরে বলল,    “লাইনের ধারে যাবেন না মারা পড়বেন”।   
“আমি কি ১০ বছরের শিশু যে মারা পড়বো, ট্রেনের হওয়া আমাকে টেনে নেবে“, এই কথা বলে আমি যেমনি আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম ট্রেনের আলোয় পরিষ্কার দেখতে পেলাম ভদ্রলোকের মুখ বলে কিছুই নেই, শুধু দুটি জ্বলন্ত চোখ যেন আমাকে গিলে খেতে চাইছে। এইরকম দৃশ্য দেখার পর আমি একটা বিকট চিৎকার করে টিকিট কাউন্টারের দিকে ছুটলাম একটু  দৌঁড়াতে একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে জ্ঞান হারালাম। 
যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটা হাসপাতালে বেডে। একটু সম্বিত ফিরে পেয়ে ডাক্তারবাবুকে বললাম, “আমি এখানে কি করে এলাম”।

তিনি বললেন, “বিকাশ চক্রবর্তী বলে কেউ আপনার পরিচিত আপনাকে লাইনের ধারে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে উঠিয়ে নিয়ে এসে এখানে ভর্তি করে দেয়। এখন কেমন বোধ করছেন”।
বললাম, “ভালো“
একটু পরে সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মত আমার সব কথা মনে পড়ে গেল।  ট্রেন থেকে নামা, হোঁচট খাওয়া, এক ভদ্রলোক সঙ্গে পরিচয় হওয়া, আমার ব্যাগ ফিরে পাওয়া, পান খাওয়া, শেষে ডাউন ট্রেনের আলোতে এক জ্বলন্ত চোখ দেখা এবং জ্ঞান হারানো। আমি দেখলাম আমার ব্যাগটি মাথার কাছেই আছে। খানিক পরে ডাক্তারবাবু আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা করে ছেড়ে দিলেন।  
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “একবার হাসপাতালের ভিজিটার বুকটা দেখতে পারি”।
ডাক্তারবাবু বললেন, “হ্যাঁ” এই বলে তিনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে রিসেপশনে ভিজিটর বুকটা দেখালেন। তাতে সই আছে বি. চক্রবর্তী। 
হঠাৎ আমার মনে হলো হাসপাতালের লোক যদি তাকে দেখে থাকে, তাহলে হাসপাতালে সিসিটিভি ক্যামেরাতে নিশ্চয়ই তার ফটো উঠবে। আমি হাসপাতালে সুপারের কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বললাম এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ক্লিপিংস দেখতে চাইলাম। তাতে দেখা গেল আমি স্ট্রেচারের উপর শুয়ে আছি, রিসেপশনিস্ট কথা বলছে, কিন্তু সামনে যে ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছে তাকে দেখা যাচ্ছে না। কলমটা যেন নিজে থেকে উঠে ভিজিটের বুকে সই করছে, আমার ব্যাগটা যেন শূন্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা দেখে, হাসপাতালের সুপারও সিসিটিভি অপারেটর দুজনেরই জ্ঞান হারাবার অবস্থা।

প্রবন্ধ

প্রেমধর্ম

জুলাই ২০২১ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

‘মার খেয়েছি না হয় আরও খাব।

তাই বলে কি প্রেম দিব না?’

প্রেমধর্ম-রবীন্দ্র সাহিত্যে

ও চৈতন্য চরিতামৃতে
ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

chaitanya.jfif

শ্রীচৈতন্য বলেছেন কলিযুগে ভগবানের দিব্য নাম কীর্তন করা ছাড়া আর কোন ধর্ম নেই। এই দিব্য নাম হচ্ছে বৈদিক মন্ত্রের সার।

চৈতন্যদেব প্রবর্তিত নাম কীর্তনের কথা বলতে গেলে যেমন আসে, -
“হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে”
তেমনি রবীন্দ্রনাথের ভাবনাতেও নামের মাহাত্ম্য স্বীকৃতি পেয়েছে, -
“তোমারি নাম বলব নানা ছলে,
বলব একা বসে আপন মনের ছায়াতলে॥
বলব বিনা ভাষায়, বলব বিনা আশায়,
বলব মুখের হাসি দিয়ে, বলব চোখের জলে॥
বিনা প্রয়োজনের ডাকে ডাকব তোমার নাম,
সেই ডাকে মোর শুধু শুধুই পূরবে মনস্কাম”।
চৈতন্যদেবের আবির্ভাবে ধর্মে, সাহিত্যে সর্বোপরি নাম-সংকীর্তনের মাধ্যমে একসময় বাঙালি জাতির মধ্যে যে মহাভাব জেগে উঠেছিল, রবীন্দ্রনাথ আশা প্রকাশ করে লেখেন, - “তাই আশা হইতেছে- আর একদিন হয়তো আমরা একই মত্ততায় পাগল হইয়া সহসা একজাতি হইয়া উঠিতে পারিব, বৈঠকখানার আসবাব ছাড়িয়া সকলে মিলিয়া রাজপথে বাহির হইতে পারিব, বৈঠকি ধ্রুপদ খেয়াল ছাড়িয়া রাজপথী কীর্তন গাহিতে পারিব”। 
শ্রীচৈতন্যদেবের দৃঢ় ব্যক্তিত্ব এবং জীবনাদর্শে রবীন্দ্রনাথ কতটা মুগ্ধ ছিলেন তা বোঝা যায় ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ প্রবন্ধে শ্রীচৈতন্যদেব সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যে। এই প্রবন্ধে শ্রীচৈতন্যদেবের গৌরবময় কর্মকুশলতা স্মরণ করে তিনি লেখেন, - 

“বহুকাল পূর্বে একদা নবদ্বীপের শচীমাতার এক প্রবল দুরন্ত ছেলে এই আশা পূর্ণ করিয়াছিলেন”। 
চৈতন্যদেব যেমন আপন তেজে বঙ্গবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন – এই তেজ আত্মশক্তিজাত। রবীন্দ্রনাথও তেমনি আপন তেজে বঙ্গবাসীকে কূপমণ্ডুকতা থেকে বেরিয়ে মননচর্চায় যোগ দিতে উৎসাহ দিয়েছিলেন।
মহাপ্রভু আর বিশ্বকবি। দুই মহাপুরুষের জীবনেও কি আশ্চর্য মিল। অপূর্ব দেহকান্তি নিয়ে গৌরাঙ্গ বিশ্বম্ভর জন্মগ্রহণ করেন সেকালের কলকাতা নবদ্বীপে। আর রবির আলোর মত উজ্জ্বল রবীন্দ্রনাথের জন্ম একালের জোড়াসাঁকোর কলকাতায়। দুজনেরই আদি নিবাস বর্তমান বাংলাদেশে। চৈতন্যদেবের আয়ুষ্কাল ৪৮ বছর। তার অর্ধাংশ কেটেছে বাংলাদেশে। বাকি অর্ধাংশ অন্যত্র। ২৪ বছর বয়সে তিনি নবদ্বীপ ছেড়ে পুরি শ্রীক্ষেত্রকে নতুন কর্মক্ষেত্র করে তোলেন। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে ছিলেন আশি বছর। তিনিও জীবনের ঠিক অর্ধাংশ কলকাতায় কাটিয়ে ঠিক ৪০ বছর বয়সে নতুন কর্মযজ্ঞ শুরু করেন শান্তিনিকেতনে। চৈতন্যদেব নিজে সাহিত্যস্রষ্টা না হয়েও বাংলা সাহিত্যে নতুন জোয়ার আনেন তাঁর মহিমান্বিত প্রভাবে। তাঁর জীবন অবলম্বন করে গড়ে ওঠে বিশাল জীবনী সাহিত্য, বৈষ্ণব পদাবলী পায় নতুন প্রেরণা। তাঁর আবির্ভাবের পরেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে গৌরবের সূচনা। ঐশ্বর্যবান বাংলা সাহিত্য সম্ভারের গৌরচন্দ্রিকা সেই সুসময়েই। রবীন্দ্রনাথেরই ভাষায়, “চৈতন্য বঙ্গভাষায় তাঁহার প্রেমাবেগ সর্বসাধারণের অন্তরে সঞ্চারিত করিয়া দিয়াছিলেন” (শিক্ষার হেরফের)।
সেকালের বাংলা সাহিত্য যেমন চৈতন্যদেবের প্রেমভক্তিরসে আপ্লুত, একালের বাংলাসাহিত্য তেমনি রবিকরোজ্বল। সাহিত্যের পর সঙ্গীত। চৈতন্যদেব আর রবীন্দ্রনাথ আমাদের উপহার দিয়েছেন দুটি সম্পদ – কীর্তন আর রবীন্দ্রসঙ্গীত। বাঙালি জাতির সবচেয়ে গর্ব এই দুটি জিনিস নিয়ে। দুটিই বাংলার প্রাণ। তাছাড়া, দুজনেই উপলব্ধি করেছিলেন, সঙ্গীত যেখানে নিঃশেষ, সেখানের শুরু নৃত্যের। ভাষাহীন সুরহীন নৃত্য-ছন্দ স্বর্গের সুষমা আনে। দুজনেই যেন বলেছেন, “নৃত্যরস চিত্ত মম উচ্ছল হয়ে বাজে”। তাই বারবার দেখি মহাপ্রভু কৃষ্ণনাম করতে করতে ভাবাবেশে নৃত্য শুরু করেছেন এবং রবীন্দ্রনাথও অন্ধ বাউল বা ঠাকুরদার ভূমিকায় নেমে গানের সুরের সঙ্গে মঞ্চে হঠাৎ নৃত্যের ছন্দ তোলেন। নাচকে এমন মর্যাদা চৈতন্যদেব আর রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ দেননি।
চৈতন্যদেব ব্রাহ্মণ হয়েও ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামেন পতিত উদ্ধারিতে, নামগান প্রচার করেন সবার অধম সবহারাদের মাঝে। রবীন্দ্রনাথও জন্মগতভাবে উপবীতধারী বাহ্মণ, তবু অনায়াসে ঘোষণা করেন, ‘আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন’। দুজনেই মধুর রসের পথিক, কিন্তু বলিষ্ঠ মতের প্রচারক। দুজনেই ছিলেন দীর্ঘদেহী গৌরাঙ্গ। দু’জন দুই পথের পথিক হয়েও দুইভাবে বিপ্লবী। এই বিপ্লব প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী না হয়েও সুদূরপ্রসারী। আনন্দময় উৎসবকে দুজনেই প্রাধান্য দিয়েছেন জীবনে। তাঁর মধ্যে বসন্ত ঋতুর প্রতি পক্ষপাতিত্ব দুজনের। একজন বলেন দোললীলা, আরেকজন বলেন বসন্তোৎসব। দুজনেরই যিনি উপাস্য, তাঁর বর্ণ শ্যামল। একজনের শ্যামল কৃষ্ণ, আরেকজনের শ্যামল প্রকৃতি।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর দিব্যজীবন এবং তাঁর বৈষ্ণবদর্শন প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল রবীন্দ্রনাথকে। অনেকের ধারণা, রবীন্দ্রনাথের ধ্যান-ধারণা যেন শুধু উপনিষদ কেন্দ্রিক। উপনিষদ নিশ্চয়ই তাঁর প্রেরণার অন্যতম উৎস, কিন্তু বৈষ্ণব দর্শন ও সাহিত্য যে তাঁকে কতটা প্রেরণা দিয়েছিল, সেই সম্পর্কে অনেকেই অবহিত নন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, উপনিষদ আর বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রতি তাঁর ঋণের কথা। ১৯২১ সালে বন্ধু ব্রজেন্দ্রনাথ শীলকে লেখা এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, - “বৈষ্ণব সাহিত্য এবং উপনিষদ বিমিশ্রিত হইয়া আমার মনের হাওয়া তৈরি করিয়াছে। নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন যেমন মিশে তেমনি করিয়া তাহারা মিশিয়াছে”। 
শ্রীচৈতন্যের জীবনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় সেই বাল্যকাল থেকে। বিভিন্ন সময়ে তিনি চৈতন্যদেবের জীবনী পরম আগ্রহে বারবার পড়েছেন। ১৯১০ সালে লেখা একটি চিঠিতে বলছেন, - 

“বৈষ্ণবকাব্য এবং চৈতন্যমঙ্গল প্রভৃতি কাব্য অবলম্বন করে চৈতন্যের জীবনী আমি অনেক বয়স পর্যন্ত বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে আলোচনা করেছি”। ১৯৩৬ সালে হেমন্তবালা দেবীকে আর একখানা চিঠিতে লিখেছেন, - 
“কল্যাণীয়াসু, প্রথম বয়সে বৈষ্ণবসাহিত্যে আমি ছিলুম নিমগ্ন, সেটা যৌবনচাঞ্চল্যের আন্দোলনবশত নয়, কিছু উত্তেজনা ছিল না এমন কথা বলা যায় না। কিন্তু ওর আন্তরিক রসমাধুর্য্যের গভীরতায় আমি প্রবেশ করেছি। চৈতন্যমঙ্গল চৈতন্যভাগবত পড়েছি বারবার। পদকৰ্ত্তাদের সঙ্গে ছিল আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয়। অসীমের আনন্দ এবং আহ্বান যে বিশ্বপ্রকৃতির সৌন্দর্য্যে ও মানবপ্রকৃতির বিচিত্র মধুরতায় আমাদের অন্তরবাসিনী রাধিকাকে কুলত্যাগিনী করে উতলা করছে প্রতিনিয়ত, তার তত্ত্ব আমাকে বিস্মিত করেছে।

কিন্তু আমার কাছে এই তত্ত্ব ছিল নিখিল দেশকালের— কোনো বিশেষ দেশে বিশেষ কালে বিশেষ পাত্রে কতকগুলি বিশেষ আখ্যায়িকায় আবদ্ধ করে একে আমি সঙ্কীর্ণ ও অবিশ্বাস্য করে তুলতে পারিনি”।
তাই আমরা দেখতে পাই প্রেমিক চৈতন্য, বিপ্লবী চৈতন্য, মানবদরদী চৈতন্য এবং বাঙালি জাতির ভাষার ও সাহিত্যের উদ্বোধক চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রতি রবীন্দ্রনাথ এত শ্রদ্ধাশীল।
রবীন্দ্রনাথ চৈতন্যদেবকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন। প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, আইন অমান্য আন্দোলন, বিক্ষোভ মিছিলের সংগঠন, আপামর জনসাধারণকে পরম স্নেহে বুকে তুলে নেওয়া, প্রেমধর্মের প্রচার ইত্যাদি রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর রচনাবলীতে মহাপ্রভু সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, 
“আমাদের আশ্বাসের কারণও আছে। আমাদের বাঙালির মধ্য হইতেই তো চৈতন্য জন্মিয়াছিলেন। তিনি তো বিঘা কাঠার মধ্যেই বাস করিতেন না, তিনি তো সমস্ত মানবকে আপনার করিয়াছিলেন। তিনি বিস্তৃত মানবপ্রেমে বঙ্গভূমিকে জ্যোতির্ময়ী করিয়া তুলিয়াছিলেন। তখন তো বাংলা পৃথিবীর এক প্রান্তভাগে ছিল, তখন তো সাম্য ভ্রাতৃভাব প্রভৃতি কথাগুলোর সৃষ্টি হয় নাই, সকলেই আপন-আপন আহ্নিক তর্পণ ও চণ্ডীমণ্ডপটি লইয়া ছিল-তখন এমন কথা কী করিয়া বাহির হইল।
‘মার খেয়েছি নাহয় আরও খাব।
তাই বলে কি প্রেম দিব না? আয়। '
এ কথা ব্যাপ্ত হইল কী করিয়া? সকলের মুখ দিয়া বাহির হইল কী করিয়া? আপন-আপন বাঁশবাগানের পার্শ্বস্থ ভদ্রাসনবাটীর মনসা-সিজের বেড়া ডিঙাইয়া পৃথিবীর মাঝখানে আসিতে কে আহ্বান করিল এবং সে আহ্বানে সকলে সাড়া দিল কী করিয়া? একদিন তো বাংলাদেশে ইহাও সম্ভব হইয়াছিল। একজন বাঙালি আসিয়া একদিন বাংলাদেশকে তো পথে বাহির করিয়াছিল। একজন বাঙালি তো একদিন সমস্ত পৃথিবীকে পাগল করিবার জন্য ষড়যন্ত্র করিয়াছিল এবং বাঙালিরা সেই ষড়যন্ত্রে তো যোগ দিয়াছিল। বাংলার সে এক গৌরবের দিন। তখন বাংলা স্বাধীনই থাকুক আর অধীনই থাকুক, মুসলমান নবাবের হাতেই থাকুক আর স্বদেশীয় রাজার হাতেই থাকুক, তাহার পক্ষে সে একই কথা। সে আপন তেজে আপনি তেজস্বী হইয়া উঠিয়াছিল”।
চৈতন্যদেবের সংগ্রাম ছিল সমস্ত ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে। তাঁর অস্ত্র ছিল প্রেমধর্ম। সাম্য ও ভক্তির মিশ্রণে গঠিত তাঁর প্রেমধর্ম হরিনাম সংকীর্তনের সন্মোহনী শক্তিতে আকৃষ্ট করেছিল সর্বশ্রেণীর, বিশেষ করে পতিত অবহেলিত সমাজের লোকদের। এই বলিষ্ঠ অথচ প্রেমময় ভাববন্যার বিশ্লেষণ করে রবীন্দ্রনাথ বলেন, 
“আসল কথা, বাংলায় সেই একদিন সমস্ত একাকার হইবার জো হইয়াছিল। তাই কতকগুলো লোক খেপিয়া চৈতন্যকে কলসীর কানা ছুঁড়িয়া মারিয়াছিল। কিন্তু কিছুই করিতে পারিল না। কলসীর কানা ভাসিয়া গেল। দেখিতে দেখিতে এমনি একাকার হইল যে, জাতি রহিল না, কুল রহিল না, হিন্দু-মুসলমানেও প্রভেদ রহিল না। তখন তো আর্যকুলতিলকেরা জাতিভেদ লইয়া তর্ক তুলে নাই। আমি তো বলি, তর্ক করিলেই তর্ক উঠে। বৃহৎ ভাব যখন অগ্রসর হইতে থাকে তখন তর্কবিতর্ক খুঁটিনাটি সমস্তই অচিরাৎ আপন-আপন গর্তের মধ্যে সুড়্‌সুড়্‌ করিয়া প্রবেশ করে। কারণ, মরার বাড়া আর গাল নাই। বৃহৎ ভাব আসিয়া বলে, সুবিধা-অসুবিধার কথা হইতেছে না, আমার জন্য সকলকে মরিতে হইবে। লোকেও তাহার আদেশ শুনিয়া মরিতে বসে। মরিবার সময় খুঁটিনাটি লইয়া তর্ক করে কে বলো”।
প্রেমধর্মের আদর্শনিষ্ঠা ও তাঁর বহুমুখী আবেদন রবীন্দ্রনাথকে সারাজীবন মুগ্ধ রেখেছিল। ‘সমূহ’ গ্রন্থের ‘দেশহিত’ প্রবন্ধ বাংলাদেশের স্বাদেশিকতার আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি চৈতন্যদেবের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, - 
“চৈতন্যদেব একদিন বাংলাদেশে প্রেমের ধর্ম প্রচার করিয়া