জুন ২০২০

প্রচ্ছদঃ সুরজিৎ সিনহা, হলদিয়া 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

প্রবন্ধ

কবিতা

 

গল্প

 

স্বাধীনতার

সুখ

সব্যসাচী বসু

বর্ধমান, পঃ বাংলা

টা প্রকাণ্ড ছাতা। লাল-নীল-সবুজ। যেন মেলা বসেছে রঙের। পেছনে হেলানো। সামনে ‍‍‍স্থির ফতনাটার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে বসে আছে অন্তুজেঠু। কখন একটুখানি নড়েচড়ে উঠবে তারই প্রতীক্ষায়।যেন রঙচঙে মাছরাঙা পুঁটিমাছের ভেসে ওঠার অপেক্ষায়। জামপুকুরের শান্ত জলে ভেসে রয়েছে সাদা ফতনাটা। স্বচ্ছ-শীতল জলের নীচে বহু গভীরে কোথায় লুকিয়ে আছে মাছটা! যার জন্যে অধীর আগ্রহে বসে আছে অন্তুজেঠু।

পুকুরে তো মাছ কত থাকে। তাহলে জেঠু কেন বলে, “আজ বড় কাতলাটা ধরবো যার লেজটা ভেঙে দিয়েছিলাম আগের বছর”! ঐ মাছটাই যে ধরা পড়বে ছিপে তার কি কোনো মানে আছে! অন্তুজেঠুকে প্রশ্ন করলে জেঠু বলে, “এ যে ভক্তের সাথে ভগবানের সম্পর্ক রে। কান টানলে যেমন মাথা আসে তেমনি আমি ডাকলে ওও আসবে; দেখিস। তবে ডাকাটা আন্তরিক হওয়া চাই।”

এসব কথা ওর মাথায় ঢোকে না। ও কেবল চেয়ে থাকে ফতনাটার দিকে। তবে বেশিক্ষণ চুপ করে থাকা ওর স্বভাব বিরুদ্ধ। একটা প্রশ্ন ওর মনে বারবার উঁকি দেয়। সেটাই করে ফেলে।

“প্রতিবছর এই দিনেই তুমি আসো কেন,জেঠু?” শীতের সাতসকালের আলগা রোদ্দুরের মতো এক মিষ্টি হাসি খেলে যায় অন্তুজেঠুর নিখুঁত গালে।

“ছুটি থাকে বলে? বছরে তো আরো ছুটি থাকে। না কি এই সময় মাছেরা তোমার কথা শোনে?” উত্তরে সেই নীরব হাসি।

সত্যিই ভেবে পায় না ও। দুর্গাপুজোর ছুটিটা না হয় বাদই গেল। শহরের পুজোর জাঁকজমকই আলাদা। কালীপুজোতেও হবে না। নৈহাটির কালী বিখ্যাত। বড়দিনে নয় কেন! শীতের আমেজে রোদে হেলান দিয়ে তো জমিয়ে মাছ ধরা যাবে। সকালের উষ্ণ রোদ্দুর গায়ে মাখতে মাছটা ভুস করে ভেসে উঠবে। মুখের সামনে কেঁচো দেখে হাঁ করে খেতে আসবে। সারারাত ঘুমের পর জেগে উঠেই চাঁচাঁ খিদে। আর তখনই ঘনিয়ে আসবে মরণঘুম।

তা না করে এই ঘোর বর্ষায় এক হাঁটু কাদা ভেঙে সেই তিন কিলোমিটার দূরের বাসস্টান্ড থেকে কেনই বা হেঁটে আসে অন্তুজেঠু! সারাদিন থাকতে রাতের অন্ধকারে কেন আসতে পছন্দ করে তাও বোঝে না ও। আবার প্রশ্ন করলে উত্তরের বদলে ঐ নীরব হাসি। তাই ও উঠে পরে।

পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে জলের ধারে। হাঁটুজলে খেলা করছে বেশ ক’টা তেচোখা মাছ। কে যেন বলেছিল নামটা। ওদের কি তিনটে চোখ! ওরা কি দেবী দুর্গার সন্তান! তাই দেবীর ত্রিনয়ন ওদের মাথায় বসেছে!

না, ওকে আজ ছেলেমানুষীতে পেয়েছে। অবশ্য ওতো ছেলেমানুষই। কতই বা বয়স ওর! মনের বয়স তার চেয়েও কম।

বেশ লাগে এই মাছেদের খেলা। আসলে খেলা নয়-ওরা খাবারের খোঁজে হয়রান। খুব ছোট ছোট পোকা খায় ওরা। তাতো খাবেই। ওরাই বা কতটুকু! ওর কড়ে আঙুলটার মতো হবে বড়জোর।

একটু দূরে বাঁদিকে শালুক ফুটেছে কত! সাদা আর গোলাপি-দুরকমের। অন্যসময় দেখেছে সাঁওতাল পাড়ার ছেলেদের ফুল তুলতে। কি করে ওরা এতো ফুল নিয়ে!

ডানদিকে অশথ গাছটার তলায় রাখালেরা বসে আছে। অবাক হয়ে দেখছে রঙবেরঙের ছাতা আর তর নীচে বসে থাকা রঙিন মানুষটাকে।

রঙিনই বটে! সিন্থেটিক রঙিন চকমকে লুঙ্গি। অথচ খালি গা! ফরসা টকটকে রঙ। বাবুটিকে বেশ লাগে ওদের। বছরের এই সময়ই তো দেখা হয়। ওরা কখন জানি পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছে।

“কিরে ভানু, গোপলা, আসরফ, হারু-ভালো আছিস তোরা? সকলে হাসে। মাথা নেড়ে জানায় তারা ভাল আছে।

“আপনি ভালো আছেন জেঠু? হিন্দোলের জেঠু মানে তো তাদেরও জেঠু। তারা মানে ভানু পাল,গোপাল সোরেন, আসরফ আলি আর হারু দফাদার।

“আজ আর মাছ পড়বে নেগো জেঠু-উঠে পড়েন।”

“ও সব অলুক্ষুনে কথা বলিস না তো গোপলা”, আসরফ বাধা দেয়।

“জেঠুকে দেখেছিস কোনোদিন খালি হাতে ফিরতে?”, ফুটকাটে হারু।

আর ঠিক তখনই ফতনাটা নড়ে ওঠে। আচমকা ডুবেও যায়।

“খেয়েছে-খেয়েছে”, একসাথে বলে ওঠে ওরা। “পেছন থেকে সরে যা”, চাপাস্বরে নির্দেশ দেয় অন্তুজেুঠু। একটা হেঁচকা টান লাগায় মাছটা। সুতো ছাড়তে থাকে অন্তুজেঠু। ছাতা গড়াগড়ি দিচ্ছে পাড়ে। লুঙ্গিটার খুঁট একদিকের কোমরে গোঁজা। ও এগিয়ে যায়। ততক্ষণে মাছটা বহুদূরে চলে গেছে। সারা শক্তি দিয়ে লড়ছে। এ নিয়মটা এতবছরে জেনে গেছে ও। এটাও খেলা। আহত মাছটা ছুটিয়ে ক্লান্ত করে করে একসময়ে পড়ে তুলবে। তখন সুতো গুঁটোবে হুইলের। পোড়খাওয়া হাতে একটা টান।জলের মাছ ডাঙায় আছড়ে পড়বে। ছুট্টে যাবে ছেলেগুলো। জেঠু সাবধানে মাছের রক্তাক্ত ঠোঁট থেকে বঁড়শিটা খুলে নেবে। মাছটাকে ভরে ফেলবে ব্যাগে।

এমনই হয় ফি-বছর। আগস্টের চোদ্দই সন্ধ্যেয় সদরদরজাটা পার হয় সেই চেনা চেহারাটা-রঙিন পাঞ্জাবী, দূরের বাসস্ট্যাণ্ডেই পাল্টে নেওয়া প্যান্টের বদলে রঙচঙে লুঙ্গি; একহাঁটু

কাদা, কাঁধে ঢাউস সাইডব্যাগ। মুখে সেই চেনা মিষ্টি হাসিটা। পেছনে দুটো বড়ো চটের ব্যাগ হাতে বাবা। একটায় সবজী। আরেকটায় মুরগী। জ্যান্ত। পরের দিন - স্বাধীনতা দিবসে আত্মবলিদানের জন্যে।

“বৌমা—” সেই চেনা হাঁক। মাথায় আঁচল দিয়ে মায়ের প্রণাম।

“তোমাকে এতবার বলেছি ঘোমটা দিতে হবে না। তা ভালো আছো তো তোমরা?”

“জেঠু কই আমার?”

এই প্রশ্নটার জন্যেই অপেক্ষা করে থাকে ও। সারাবছর। এই দুদিন আর লেখাপড়া নয়।লেখাপড়া যে ভাল লাগে না তা নয়। আসলে অন্তুজেঠু মানেই দেশবিদেশের ভ্রমণকাহিনী আর ইংরেজি সিনেমার গল্প। ক্যামেরায় ছবি তোলা শেখা। খাওয়াদাওয়া। মজা। পরদিন স্বাধীনতা দিবসে সাতসকালে উঠোনে পতাকা তোলা। কবিতা বলা, টেপরেকর্ডারে গান বাজানো। আর মাছধরা। স্বাধীনতার অন্য একটা মানে ও খুঁজে পায় এই দিনক’টায়। এইরকমই হয়ে আসছে শৈশব থেকে কৈশোর। সন্ধ্যেয় টকমিষ্টি চানাচুর আর আমতেল মাখা ফোলা ফোলা মুড়ি খেতে খেতে জমিয়ে গল্প।

“সত্যি তোদের বর্ধমানের মুড়ি যেন অমৃত। এই মুড়ির জন্যেই যে এক’শ বছর বাঁচতে ইচ্ছে করে রে।”

“জেঠু সেই গল্পটা বলো না -রুদ্রপ্রয়াগের চিতাবাঘ। সেই জিম করবেট যেটাকে মেরেছিল। ”সময়টা পিছিয়ে যায় বিশ শতকের গোড়ায়। শিকারী জিম করবেট যখন ঘুরে বেড়ান একা রাইফেল হাতে এক দৈবিক ক্ষমতাওয়ালা চিতাবাঘের পেছনে। কখনও বাঘ জেতে।কখনও তিনি।অবশেষে সেই প্রতীক্ষিত দিন এলো। এলো মুহূর্ত। মাত্র একটা গুলি। সব আতঙ্কের অবসান। কোথায় যেন হারিয়ে গেলো ও।

“তুমি ঐ জায়গাটা দেখেছো?”

“হ্যাঁ রে। ওখানে একটা স্মৃতিস্তম্ভ করা আছে।”

ও অন্তুজেঠুর গা ঘেঁষে বসে। শীতল একটা স্পর্শ অনুভব করে ও। অন্তুজেঠু প্রচুর পান খায়। জর্দা দিয়ে। কেমন একটা মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে অন্তুজেঠুর গা থেকে। জেঠুর কাছেই শোনা কস্তুরীমৃগের নাভির সুবাসের মতো। বিরল।

“তোদের দেখা আন্দামান আর কি আছে রে”, বাবাকে আক্ষেপ করে অন্তুজেঠু,“ একবার জাহাজে আর একবার প্লেনে গেছি – তখন প্লেন ডাইরেক্ট যেতো না। রেঙ্গুন হয়ে যেতো। অমলিন সবুজ দ্বীপ আজ গাড়ির ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে।”

ওর বাবার সহোদর দাদা নয়, কোন তুতো দাদাও নয়-এক তুতোদাদার তুতো ভাই এই অন্তুজেঠু। হি ন্দোলের সবচেয়ে কাছের মানুষ।

“এই দ্যাখ,সেই কাতলা মাছটাই উঠেছে”, বড়শি থেকে মাছটা ছাড়াতে ছাড়াতে বলে অন্তুজেঠু,“ ভালই হয়েছে। গরম গরম ভাজা খাওয়া হবে। কি বল্?”

ঘাড় নাড়ে ও। জীবনে বহু মাছের মৃত্যুর কারণ হয়েছি। না রে ছেড়েই দি-একজন অন্তত থাক, যে আমায় মনে রাখবে। ও আমার পোষ্য হয়ে গেছে। রামের পোষা মাছদুটোর মতো। ওদের নাম মনে আছে তোর?”

“কার্তিক-গণেশ”

“ঠিক বলেছিস”

পরম যত্নে মাছটাকে হাতে ধরে দেখে জেঠু। ও লক্ষ্য করে অন্তুজেঠুর চোখে জল। মাছটাকে জলের কাছে নিয়ে যায়- স্বচ্ছ জলে নামিয়ে দেয়। কুতকুতে চোখে বেশ অবাক হয়ে তাকায় কাতলাটা। অন্তুজেঠু ওর দিকে হাত নাড়ে। মাছটাও তার ভাঙা লেজ নাড়িয়ে যেন বিদায় জানায় তার মুক্তিদাতাকে। তারপর খলবলিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। ওরা হাততালি দিয়ে ওঠে। ভানু, গোপলা, আসরফ আর হারু। ও..ও হাততালি দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। জেঠুর দিকে নজর পড়ে। শেষ শ্রাবণের মধ্যাহ্নে অন্তুজেঠুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সারা গা পিচ্ছিল হয়ে উঠেছে। গামছাটা কোমর থেকে খুলে মোছে জেঠু।

“আজ আর মাছ ধরবো না, জানিস, শরীরটা ভাল লাগছে না। চারের ব্যাগটা নে।” ওরা উঠে পড়ে।

“জানিস জেঠু, কেন মাছ ধরি, কেন তোদের এখানে বছরে এসময় আসি!” মাথা নাড়ে ও।

“সারাবছর নানা কাজের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তাই এই বর্ষাকালে তোদের এখানে এসে ক্লান্তিটা কাটাই। আবার চাঙ্গা হয়ে নি বাকি বছরটার জন্যে। এটাই আমার স্বাধীনতার সুখ রে জেঠু, বুঝলি?”

সন্ধ্যেতেই ঘটনাটা ঘটল। হঠাৎই বুকে ব্যথা শুরু হয়। গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারের মতে হার্ট অ্যাটাক। বর্ধমানের এই প্রত্যন্ত গ্রামে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। একটা অ্যাম্বাসাডার ছুটে চলেছে রাতের নিকষকালো আঁধার ভেদ করে-দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ে বেয়ে-ঝড়ের গতিতে। হু হু করে ছুট্টে পালাচ্ছে রাস্তার পাশের ধানক্ষেত, জলা আর তীব্র হাওয়া। অন্তুজেঠু শুয়ে আছে ওর কোলে মাথা রেখে। এখনও কানে বাজছে মাকে বলা জেঠুর শেষ কথা - “আর বোধহয় আসা হবে না…”

তখনও পতাকাটা নামানো হয়নি। এখনও উড়ে চলেছে সে, রাতের আঁধারে উঠোনের কোণে, অন্তুজেঠুর একমুঠো স্বাধীনতার সুখ হয়ে।

Comments

Top

কবিতা

অভিষেক চন্দ

ঠাকুরপুকুর, কোলকাতা

মেঘ-বৃষ্টি
                              

মেঘ নেমেছে যখন, বৃষ্টি তখনও 
                 মাইল খানেক দূরে। 
হাতের রেখায় অল্প অল্প করে,
তাকে এঁকেছি কলম বন্ধ রেখে
                   অনেক যত্ন করে।
মেঘলা বিকেল তখন,
                 ছিল বড্ড আনমনা।
আলোকে দিয়ে ফাঁকি, বোধহয়
       হয় তোমারই আনাগোনা
                   নিঃশব্দে...
বৃষ্টি আসে তোমার পায়ের কাছে,
ক্রমাগত সে মুছতে থাকে আবছা ছায়াটাকে।
সে তো জানেনা
কেন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যেবেলা আসে,
কেনই বা হাজার শব্দ মুখ ফিরিয়ে হাসে...
সে শুধু বোঝে
কালির কলম্ থামে, লেখা থমকে গেলে।
বাইরে বিকেল নিয়েছে ছুটি।
সন্ধ্যে এসেছে পা টিপে টিপে
             বৃষ্টির হাত ধরে।।

কবিতা

শক্তিপ্রসাদ ঘোষ

নিউটাউন কোচবিহার

ফ্যাকাসে স্বপ্ন
                              

নীল রাত্রি নিগরে দুঃখিততম কবিতা

পৃথিবী কাঁপে অতর্কিতে করাল আঘাতে

গর্জে উঠে আঘাত

জ্বলে উঠে উন্মত্ততা

ফ্যাকাসে অন্ধকারে

নেমে আসে শীতল মুহূর্তের নির্ঘণ্ট

প্রতিটি শরীর ভয়ার্ত মূর্তি

দূরত্ব বজায় রেখে গড়ে উঠে

নূতন সামাজিক নকশা

ঘণ্টার গলাভাঙা আওয়াজে

বেদনায় মুমূর্ষু, বীভৎস দাবানলে জ্বলছে চিতা

সবুজ মাঠে

মণি আভা ফ্যাকাসে স্বপ্ন গোনে। 


          
       

কবিতা

বিধান জানা

শ্রীরামপুর, হুগলী

খাত

ফুল ফোটে গাছে গাছে আকাশেতে তারা

ঘরে ঘরে মেমসাব স্বপ্নের পারা

গাড়ি ছোটে সাঁই সাঁই ঢাকা কাঁচ কালো

ল্যাম্প পোস্ট জেগে আছে ঘুমিয়েছে আলো

হাত কাটা গেঞ্জিতে আধখোলা বুক

ঘুম নেই গাঢ় রাতে অলীক অসুখ

হাড় ভাঙা সারাদিন রাত ঘন কালো

ড্রেনে বয় কালো জল সময় ঘোরালো

কয়েকটা ভাই বোন টুকরো বিছানা

ট্রলিব্যাগ বড় লাগে ঘর একখানা

আকাশেতে চাঁদ জাগে জেগে থাকে চোখ

বাবা জাগে কেশে কেশে বুকে ক্ষয়রোগ

ওপারেতে দোতলায় পরী জেগে ওঠে

রাত পোশাকের নিচে জোড়া চাঁদ ফোটে

সারাদিন গেটে খাড়া কখনো বা টুল

বুকে শালা টাই ঝোলে এপ্রিলফুল

তলপেটে চিনচিন রক্তেতে ঝড়

ঝাঁপাবে বাঘের মত দেবেই কামড়

বাইরে ঠান্ডা হাওয়া ঝিমিয়েছে রাত

হাইড্রেন মাঝখানে মারিয়ানা খাত।

 
 
 

Comments

Top

 

জাহাজডুবির গল্প

শরীরে বল্কল ছিল, আভরণ-উদ্বেলিত ছন্দ,
চাঁদের স্তিমিত আলোয় ছুঁয়ে ছিলাম তোমার ক্র্যানবেরি-ভেজানো ঠোঁট,
নেশা-পথ প্রশস্ত, রাত-নিরালায় তখন চলছিলো পাপ-স্খলনের উন্মাদনা,
একাগ্রতা একেই বলে? বলো? ভালোবাসায় ছুঁয়ে থাকা স্তব্ধ পায়রার তুলতুলে ঠোঁটে আলপনা এঁকে দিয়েছিলে তোমার বিমূর্ত প্রণয়াকাঙ্খার,
জলে ভরা নৌকো দাঁড় টেনে গিয়েছিলো ছলাৎ ছলাৎ,
আঁকড়ে ছিলাম শেষ পারানির কড়ি, আর পাটাতন-বালিয়াড়িতে হিসেব কষে আছড়ে পড়েছিলো পরিপ্লবের রংমিলান্তি,
থমকে ছিলো লুব্ধ-চাঁদের সময়, ধোঁয়া, চিকন-হদিশ নাগকেশরের ফুল
আর অবাঞ্ছিত ছাদনাতলায় হিন্দোলিত-বাদন,
বলো ভালোবাসাকে থামতে বলিনি আমি?
উপচে-পড়া দুধের সফেন, সামুদ্রিক রিকিঝিকিমিকির প্রজাপতি-পাখায় তুমি আলতো করে স্পর্শ করেছিলে
তুষারাবৃত ফেনিল-শিখর আর চাঁদ মিশে গিয়েছিলো চাঁদের গভীর উত্তাপে
কোনো এক ফ্লেমিংগো-দেশের আনাচেকানাচে, ঠোঁট দিয়ে তুলে আনছিলো অদৃশ্য রূপকথার রাজকুমারীর মৃগতৃষ্ণা।

কবিতা

তন্বী চক্রবর্তী

কেমন আছো আফরোজ?

কেমন আছো আফরোজ? অফিসের তাড়ায়, টাই বাঁধার বিপন্নতায় আজ কেমন আছো আফরোজ?
সময়ের ভ্রুকুটি না-মানা আফরোজ, মনোরঙ্গিণীর মন-মাতানো বিহ্বল বাতাসে আমার শেষ চুম্বন নিয়ে আজ কি ভালো আছো একটুও?
গল্পটা তো সরল ছিলো; তোমার অস্থিরতার জল-নিকোনো উঠোন-দেশ,

তোমার কাঁধের কোনে ছোট্ট একটা তিল,
শরীর জুড়ে আশাবরী স্বপ্ন, 
আফরোজ তুমি তো জানতে চেয়েছিলে বন্দুকের ট্রিগার আর জটিলতার ম্যানিফেস্টো বাদ দিয়ে কিভাবে শরীরে নকশা খোঁজা যায় 
কেমন আছো আজ? আফরোজ? শুনতে পাচ্ছো শব্দের শিথিলতা? 
দেখতে পাও আজও এরোড্রোমের নিচে চাপা পড়া কালচে,

শুকনো রক্তের ফোঁটা?
তুমি কি সত্যিই ভালো আছো আফরোজ?

তোমার ক্যানভাসে আজও রয়ে গেছে আমার ছেড়ে আসা নীলঘূর্ণি আর বসন্তবৌরির ধুকপুকানি?
রডোডেন্ড্রনের পাপড়ি-মেলা স্নিগ্ধ বিস্ময়ে,

জাহাজের বন্দর ছাড়ার বুক-চাপা কান্নায়,
আমাদের সুহানা সফরের দিন-ক্ষণ-পুঁজি-পুঁথি-মুখশ্রীর শূন্য শস্যাগারে ঢেউ খেলে যায় অপাংক্তেয় বাক্য-বিনিময় 
পথচলতি ট্রাম-রিক্সা-দুপুর-ফেরিওয়ালা আর ঘামে-ভেজা উষ্ণ প্রস্রবণ... 
ভালো থেকো আফরোজ, যদি পারো, 
ভালোবেসো।

 
 

কবিতা

অরুনাভ সর 

যান্ত্রিক

শিক্ষার কোনো শেষ নেই,দুঃখের নাই রেশ
দুঃখ আজ কোনোভাবেই ভালো লাগছে না বেশ
পেশা চলে গেছে শুধু ঘরে শুই উঠি বার দশেক জেগে
ভাবা হয় না কিছুই,

আবার শুয়ে পড়ি রেগে
যন্ত্রের ভরসায় পরে আছে যারা ভাবনা নেই আর
কত কিছুই আছে চুপচাপ ঘরে বসে করার
ঘরে বসে লিখছি এটা ভাবতে পারো কি তা!! 
যন্ত্রের মাঝে ঢুকে গেছে আজ তোমায় বলাই বৃথা

কবিতা

সাইদুর রহমান সাঈদ

ঈদ মোবারাক

উঠলো চাঁদ গগনমাঝে
ধরা সাজে নতুন সাজে,
পশ্চিমে দেখো ঢলল শশী
সবার মুখে রাঙল হাসি।

হাসছে আকশ হাসছে বাতাস
হাসছে নিখিল দূর-মহাকাশ!
হাসল মরু হাসল তরু
আপনমনে চপল-চারু
দিচ্ছে দোল মায়ের কোলে
শোন খোশঢাক শোন বিহ্বলে!

আসল ঈদ-খোশ-সওগাত,
ধরাকোলে সুখ হল মাৎ!
তাকধিনাধিন ধিন তিকতাক
সবাইকে জানাই ঈদ মোবারাক!!

এই দুর্যোগে, মহামারিতে-

যত কবিতা লেখা হল

বোনা হল যত গল্প।

তত ত্রান পৌঁছল কি
ক্ষুধার্থ জঠরে?

দেওয়ালে দেওয়ালে -
রক্তাক্ত যত ক্ষত
বাতাসে দীর্ঘশ্বাস।
তত স্নেহার্দ্র হাত
ছুঁয়েছে কপালে?

রক্তবীজের মতো-
অনিঃশেষ সহমর্মিতা
আর শোক মিছিল।
পৌঁচ্ছে ছিল কি
দুঃখীর ঠিকানায়?

নাকি সবটুকু আয়োজন-
গল্প, কবিতারা
দুঃখ বিলাসীতা নিয়ে
নেমেছিল পথে
কপট লোকাচারে!

Comments

Top

Comments

Top

 

কবিতা

দেবযানী পাল

করোনা
 

বিশ্ববিজয়ী করোনা
তোমার দ্রুত পদক্ষেপে 
বসুন্ধরা আতঙ্কিত 
স্বর্গ, মর্ত, পাতাল উত্কন্ঠিত
তোমার নেই কোনোও করুণা।

সারা বিশ্ব স্তম্ভিত শঙ্কিত 
প্রিয়জন বন্ধুজনের বিদায়ে 
সীমাহীন শোকে আপ্লুত 
অভাবিত, অশান্ত ভাবনায় ভীত।

তোমার থেকে আকাঙ্ক্ষিত নিষ্কৃতি হল ব্যবধান 
কি আশ্চর্য সে মানুষেরই অবদান 
ধনী-দরিদ্র, দেশ-জাতি-প্রজাতির

চীর-ভেদাভেদ অনন্তকাল বিদ্যমান।
প্রার্থনা করি তোমার অন্তিম বিদায় গ্রহণ 
বিশ্বজনের ভেদাভেদের শাশ্বত সমাপন 
বৈচিত্র্যময়, ঐতিহ্যময় অখণ্ড মানবতার স্থিতি চিরন্তন।

কবিতা

পার্থ সরকার

জিরো আওয়ারে, জিরো বাল্বে

ঝিমিয়ে আসে মশাল পালকের

জিরো আওয়ারে, জিরো বাল্বে

বিভ্রান্ত মাছ খালেবিলে পাদুকাবেলার শব্দে

ডেকেই চলে কাকে জনান্তিকে সঘন ভিক্ষুক

আছে পড়ে আটকে বেতালা গান

কান খাড়া করে শোনে সে কথা ময়ূর

অথচ কবেই গেছে মরে বর্ষামঙ্গল

কবেই সুরক্ষার নবোদিত দঙ্গল


পড়ে আছে বাতাস এক চিলতে

ঘরের ভিতর

এক চিলতে সোহাগ তাপের ভিতর

বাকি সব

যাওয়ার ভিতর যাওয়া

শূন্য মাঠে ভরা

ভরা শূন্য কায়া ।

 

Comments

Top

 

কবিতা

দেবদাস ভট্টাচার্য্য

ডালাস, টেক্সাস

মা  


দিন শুরু হয়নি তখনো, 
পূব দিকে আধো অন্ধকারে -  
একফালি আলোর আভাষ, 
মশারির দড়ি খুলে 
কে যেন নিঃশব্দে 
পূবের জানালা দিল ঠেলে,  
অমনি দামাল শিশুর মত 
এক ঝলক পূবালী বাতাস 
হুটোপুটি করে গেল রাতের ক্লান্তিতে 
ভাঙ্গা ন্যাতানো শরীরে। 
চোখের উপরে নেমে আসা চুলে 
কারো হাত খেলে গেল,
সরে গেল আলতো আঙ্গুলে।
কপালের ঠিক মাঝখানে
কেউ যেন চুমু খেল,
চেনা গন্ধে ঘর ভরপুর – 
ঊষার আলোয়, পূবালী বাতাসে 
টের পাই তার উপস্থিতি – 

ভারী মিষ্টি ভারী মায়াময় 
ঠিক যেন ভৈরবীর সুর। 

রোজ সকালে ঘুম ভাঙ্গে 

দিনের রুটিন, কিছু পাখি চেঁচামেচি করে 

ঘুম থেকে তোলে। 

বাইরে আসি, বুক ভরে শ্বাস নিই, 

গন্ধ পাই তার – 

সেকি রয়েছে ওই বুনো জুঁই, বেদানার ফুলে?  
স্বচ্ছ নীলাকাশ, ছেঁড়াখোঁড়া মেঘেদের সারি 
ভেসে চলে মন্থর অলস, 
ঠিক যেন আমার অতীত 
চেয়ে দেখি প্রতিটি মেঘের বুকে ছোট্ট মুখ 
চেয়ে আছে নির্নিমেষে 
দিঘির জলের মত টলটলে 
মাতৃস্নেহে ভরা যেন পূর্ণ কলস। প্রশ্নেরা ভীড় করে – 
জীবনের এই উত্তরণ 
জানি না এ সফলতা কিনা, 
কে দেবে উত্তর, শুধুই জিজ্ঞাসা চিহ্ন – 
শুধু জানি এটাই বাস্তব, 

 

ধ্রুব সত্য, নিষ্ঠুর নির্মম। 

চোখ বুজে দেখি – 
সেও দাঁড়িয়ে আছে 
ঠিক আমারই মত 
পূবের জানালা খুলে

শিক দুটি ধরা কোনমতে -  

ভাঙ্গা গালে নবার্কের রক্তরাগ,

মন তার ধেয়ে আসে সাগর পর্বত মেরু ভেঙ্গে কে ঠেকাবে তাকে, 

সে আসছে ছেলের কাছে অরুণের সপ্তাশ্ব রথে। 

আমি ঠিক আছি, ঠিক থাকি,তবু কখনো কখনো অবুঝ শিশুর মত কেঁদে ওঠে, দেখি তাকে সে আসছে আলুথালু টলোমলো পায় -

ছোট্ট মেয়েটির মত, সে রয়েছে কাছে,

ধানের শিষের বুকে হেমন্তের শিশিরের মত,

সে আমার প্রতি রোমকূপে, 

সে আমার রক্তকণিকায়। 

Comments

Top

গল্প

 

ইন্টারভিউ

অভিষেক চন্দ

ঠাকুরপুকুর, কলকাতা

ন্ধ্যে সাড়ে সাতটা। রাসবিহারীর মোড়ে জ্যামে আটকাল ট্যাক্সিটা। হাল্কা হাল্কা বৃষ্টিতে রাস্তার ওপর স্ট্রিট লাইটের আলোয় লেখা ছোট গল্পরা শহরের ছায়াতেই লুকিয়ে পড়ে। ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসে কাঁচটা তুলে দিল মহেন্দ্র। বয়স ষাটোর্ধ। রঙ ফর্সা। দোহারা চেহারায় মেদের স্থান কিঞ্চিৎ। সময় আর ত্রিশ বছর পশ্চিমে গেলে এখন হয়তো ট্যাক্সি থেকেই নেমে যেত ও। হাল্কা বৃষ্টিতে ভিজে যেত মাথার চুল। জামার বুকের দুটো বোতাম খুলে হেঁটে যেত পর্বতের চূড়া ছুঁয়ে থাকা মেঘলা মেঘেদের কবিতার শব্দের ছন্দে। হ্যাঁ, মহেন্দ্র কবি। ও কবিতা লিখতো। যথেষ্ট খ্যাতনামা। তবে এখন শুধু ওই নামটুকুই বাকি। শব্দরা বড় একটা তার কাছে ঘেঁষে না। সেও খুব একটা খোঁজেনা আর। বোধহয়  বড্ড দেরী হয়ে গেছে।

আজকের দিনটা বড্ডই অদ্ভুত, ভীষণই প্রাসঙ্গিক মহেন্দ্রর কাছে। আজ থেকে ঠিক একবছর আগে, না! চারদিন কম একবছর আগে, দুপুর তিনটে কুড়িতে সমস্ত সমারোহের মাঝেই চিরবিদায় জানায় একজন। ফিরে গেছে তার সবটুকু, সবকিছুই ছেড়ে। হারিয়েছে সবার থেকেই। নাম অবিনাশ চক্রবর্তী। চিত্রকরদের জগৎ অবশ্য এই নাম জানেনা। চেনে এক অন্য নামে। অবিন। জন্মেছিল বিজয়ার দিন। আর চলে গেছে বোধনের দুপুরেই। মহালয়া আজ।

অবিনের মৃত্যুবার্ষিকীতে এক টিভি চ্যানেলের বিশেষ অনুষ্ঠানে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়ে বাড়ি ফিরছে মহেন্দ্র। যদিও আসল তারিখটা আজ নয়, তবে যেহেতু মহালয়া, তাই অনুষ্ঠানটা হয়েছে আজই। মেজাজটা বশে নেই। হঠাৎ একটা বিচ্ছিরি শব্দে ট্যাক্সিটা স্টার্ট নিলো। মহেন্দ্র ঘড়ি দেখল। প্রায় আটটা বাজতে চলেছে। জানলার কাঁচটা একবার হাতে করে মুছে দিল ও। ভেতরের বাষ্পে বাইরেটা ঝাপসা ছিল। মুছল খানিক। এরমাঝেই একটা কথা কানে এল ওর। বাইরে কে যেন ফোনে কাউকে বলল, “ আমি তো আর রামকৃষ্ণ নই যে… ”। বেশ একটা ব্যঙ্গার্থক সুরেই কথাটা বলা। হঠাৎ মহেন্দ্রর মনে হল, হয়তো অবিন থাকলে বলত, “কেন ?”। ভেবে একটু নিজের মনেই বলল, “না রে, তোর না থাকাটাই ভাল হয়েছে! কেউ বুঝতো না তোকে। আমিও তো ভুলই বুঝলাম রে! শুধুই ভুল বুঝলাম! ” বড্ড অস্থির লাগছে মহেন্দ্রর। জানলাটা একটু নামাল।

“দাদা, সিটটা পুরো ভিজে যাবে যে! খুব বৃষ্টি তো!” ড্রাইভার একটু পেছন ফিরে বলল মহেন্দ্র কে।

“আরে আর কিছুটা তো রাস্তা, কিচ্ছু হবেনা। বেশি খুলিনি।” জানলাটার দিকে ইশারা করে বলল মহেন্দ্র।

সেই কথা শুনে আর কথা বাড়াল না ড্রাইভার। আসলে পাড়ারই লোক। তাই চুপ করে গেল। বাইরের দিকে চেয়ে রইল মহেন্দ্র। অনিমিখে।

গতকাল বিকেলেই ফোনটা আসে মহেন্দ্রর কাছে এই ইন্টারভিউটার ব্যাপারে। সবে মাত্র ও তখন নিজেরই পুরনো একটা কবিতার বই খুলে পড়তে বসেছিল। লেখারা আর আসেনা। তাই ধরে রাখার চেষ্টা। আর মাঝে মাঝে সে গুলো দেখেই নিজেকে আবার করে খোঁজা।

“হ্যালো”

“আমি কি মিস্টার মহেন্দ্র বসুর সাথে একটু কথা বলতে পারি?” এক পুরুষ কণ্ঠ। শুনে মনে হল মাঝবয়সী। বছর চল্লিশেক হবে।

“তার সাথেই কথা বলছেন আপনি। কি ব্যাপার সেটা বলুন।” একটু মজার স্বরেই কথাটা বলেছিল ও।

“নমস্কার স্যার, আমি সৌরভ দত্ত, ‘সুর ও ছন্দ’ চ্যানেল থেকে কথা বলছি।”

“হ্যাঁ বলুন কি করতে পারি?” এরকম ফোন খুব চেনা মহেন্দ্রর কাছে। অনেক সময় এখনও নানান ইন্টারভিউ এর জন্য ওর কাছে সময় চায় অনেক টিভি চ্যানেল। ও সাধারণত এখন ‘না’ করেই থাকে এগুলি। তবে এবারের ব্যাপারটা পারেনি এড়িয়ে যেতে।

“স্যার, কালকে  আমাদের একটা বিশেষ অনুষ্ঠান হতে চলেছে। আর আমরা আপনাকে আমাদের গেস্ট হিসেবে কালকে পেলে খুব খুশি হবো!”

“সে তো বুঝলাম, কিন্তু আমি তো আর কোন চ্যানেলে এখন মুখ দেখাতে যাইনা! আমায় মাফ করুন।” বলেই ফোনটা রেখে দিতে যাচ্ছিল মহেন্দ্র।

“স্যার, প্লিজ ফোনটা রাখবেন না, একটু শুনুন!” ছেলেটার গলাটা একটু ভীত শোনাল।

“বলুন।”

“স্যার, কালকের প্রোগ্রামটা অবিন বাবুকে নিয়ে, মহালয়া কাল।...”

এটুকু শুনেই একটা ধাক্কা খেয়েছিল মহেন্দ্র। একটা আলপিন যেন বুকটা মুহূর্তে ফুটো করে দিল। ছেলেটা বলতে থাকলো,

“আমরা সবাই জানি যে উনি আপনার স্নেহধন্য ছিলেন। আপনি যদি আসেন আমাদের অনুষ্ঠানে, তাহলে আমাদের কালকের অনুষ্ঠান বলতে গেলে সত্যিকারের পূর্ণতা পাবে। একটা ইন্টারভিউ স্যার, প্লিজ!”

একমুহূর্ত থমকেছিল ও। তারপর সামলে নিয়ে বলল,

“ঠিক আছে, যাব।” খুব আস্তে বলেছিলো কথাটা।

“ধন্যবাদ স্যার, অজস্র ধন্যবাদ! আমি আপনার মেলে বাকি ডিটেলস পাঠিয়ে দিচ্ছি এক্ষুনি। ধন্যবাদ স্যার আপনার সময় দেওয়ার জন্য।” বলে ফোনটা রেখেছিল ছেলেটা। মহেন্দ্রও ফোন রেখে নিজের চেয়ারে বসে ব্যাল্কনি থেকে তাকিয়ে ছিল।

“কি হল? কে ফোন করেছিল?” বিছানায় শুয়েই প্রশ্ন করেছিল মিতালি। মিতালি বসু। মহেন্দ্রর স্ত্রী। আগে ছিল মজুমদার। একসুতোয় বাঁধা হয়ে যাওয়ার পর সেটা বিসর্জিত। মানুষটাও বোধহয়। এক কলেজে পড়াশোনা, সেই সূত্রেই আলাপ। মহেন্দ্রর কবিতায় প্রেম, তারপর বিয়ে। তারপর সেই একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন পিসি, মাসি, আরও কত কি!আগে ছবি আঁকতো, সেটাও এখন বন্ধ!

“ঐ একটা টিভি চ্যানেল থেকে, একটা ইন্টারভিউ এর জন্য। কালকে।”

“ও!, যাবে?” ‘না’ উত্তরটা পাবেই ধরে নিয়েছিল মিতালি। ওকে চমকে দিয়ে মহেন্দ্র বলেছিল,

“হ্যাঁ, যাব। কালকের অনুষ্ঠানটায় যাব।” অন্য দিকে চেয়ে উত্তরটা দিয়েছিল মহেন্দ্র। মিতালি অবাক হয়েছিল যথেষ্ট!

“তুমি যাবে? বাবাহ! কি এমন ব্যাপার গো যে তুমি রাজি হয়ে গেলে যেতে?”

“কাল দেখো টিভিতে, তাহলেই বুঝতে পারবে।” ছোট্ট করে প্রশ্নটা এড়িয়েছিল ও। মিতালিও আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

সন্ধ্যের দিকে ছাদে চলে গেছিল মহেন্দ্র। অবিন। অবিনাশ। যার বিনাশ নেই। যে শেষ হয়না। কথাগুলো মাথাটাকে পুরো ঘেঁটে দিচ্ছিল ওর। ছেলেটার সাথে ওর প্রথম দেখা বেশ অনেক বছর আগে। বইমেলায়। মহেন্দ্র তখন যথেষ্ট নামি কবি। ওর একটা নতুন বইয়ের উদ্বোধন ছিল সেইদিন। সমস্ত কাজ মিটিয়ে যখন একটু ফাঁকা সময় পেয়েছিল ও, তখন প্রায় মেলার শেষ লগ্ন উপস্থিত ছিল। একটু চারপাশটা ঘুরে দেখতে দেখতে প্রথম চোখে পড়ে একটা কমবয়সী চিত্রকরকে, পোর্ট্রেট আঁকছিল মানুষের। একের পর এক ছবি এঁকেই চলেছিল। একটু খেয়াল করে বুঝেছিল মহেন্দ্র, যে ওর আঁকার স্টাইলটা একটু আলাদা। ছবি তো অনেকেই আঁকে, পোর্ট্রেট আর্টিস্ট অনেক দেখেছে ও। ওরা সবাই ভীষণ পারফেক্ট। তবে এই ছেলেটা পারফেকশনের ধার ধারে না। স্মুথ এবং এফর্টলেস পেনসিল স্ট্রোক। মানুষ গুলোর মুখের শুধু আদলটা ও স্কেচ করছিল। বাকিটা ছিল ওর ব্রেন-চাইল্ড। ব্যাকগ্রাউন্ড কালার করছিল এক একজনের এক এক রকম! কারুরটা নীল, তো কারুরটা উজ্জ্বল কালোর ওপর অফ হোয়াইট এর স্প্রে পেইন্ট। মহেন্দ্র পেরিয়ে গেছিল ছেলেটাকে। আরও অনেকের আঁকা দেখেছিল সেদিন। তবে ওরা ভীষণ পারফেক্ট!

চোখ-নাক-মুখ সব অসাধারণ, নিখুঁত। তবে কিছু যেন মিসিং ছিল। হয়তো একটু ইম্পারফেকশন, হয়তো শিল্পীর কল্পনার ব্যাপ্তি। ও আবার ফিরে গেছিল সেই ছেলেটার কাছেই। তখনও ছেলেটা আঁকছিল।

“আমার একটা পোর্ট্রেট এঁকে দেবে?” মহেন্দ্র প্রশ্ন করেছিল। জবাবে মাথা নেড়ে ছেলেটা বলেছিল,

“দেব স্যার, এইটা শেষ করেই দিচ্ছি।”বলেই আবার আঁকতে লেগেছিল ছেলেটা। শেষ হতেই ও বলেছিল,

“এবার আপনার পালা!”  মহেন্দ্র সবে ছেলেটার সামনে গিয়ে বসবে, ঠিক এই সময়েই ছেলেটা বলেছিল, “ আসতে হবেনা আমার সামনে, ঐখানেই বসুন।” মহেন্দ্র বসেছিল ছেলেটার ডান পাশে, একটু কোন করে। ওর কথা শুনে একটু অবাকই হয়েছিল মহেন্দ্র। তবে কথাটা শুনেছিল।

ছেলেটা এঁকেছিল। পেস্তা রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা স্প্রে পোর্ট্রেট। ঐ একটু মুখের পাশটাই। মহেন্দ্র ছবিটা দেখে খুশি যতটা হয়েছিলো, অবাক হয়েছিল আরও অনেক বেশি।

“তোমার নাম কি?” টাকা দিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল মহেন্দ্র।

“আমার নাম অবিন। অবিনাশ চক্রবর্তী। কেন স্যার?” ছেলেটার চোখে মুখে এক অদ্ভুত সারল্য লক্ষ্য করেছিল মহেন্দ্র।

“না, কিছুনা। কি করা হয়? শুধুই ছবি আঁকা হয়, নাকি অন্য কিছুও কর?”

“আর কিছু করিনা স্যার, কেন?”

“চাকরি করবে? ভাল জায়গায়। করবে?” প্রশ্নটা ইচ্ছে করেই করেছিল ও।

“না স্যার। করব না। আটকে যাব।” উত্তরটা শুনে আরও খুশি হয়েছিল মহেন্দ্র। সেই থেকেই অবিনের সাথে আলাপ। ছেলেটার বাবা-মা দুজনেই চাকুরীজীবী। ভাল পরিবার। ওরা ছিল দু’ভাই। ও ছোট। ওর দাদা তখন পি.এইচ.ডি. করছিল দিল্লী ইউনিভার্সিটি থেকে। আর ও ছিল বাড়ির যাকে বলে ব্ল্যাক শিপ! পড়াশোনায় মন বসেনি। কোন রকমে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে শুধুই নিয়ম ভাঙার খেলাতে মশগুল থাকতো ও। ছবি আঁকা ছিল ওর কাছে একটা গবেষণার মত। এক্সপেরিমেন্টের মত। কোন নির্দিষ্ট পথে ও যেত না। কনট্রাস্ট জানত, বুঝত। তবে খুব একটা মানত না। পারফেকশন থেকে ছিল অনেক দূরে। ওকে যিনি শেখাতেন, তিনি নাকি ওকে সবসময় বলতেন,

“‘টাচ অফ্‌ ইমোশন অ্যান্ড ইম্যাজিনেশন’ ছাড়া ছবি শুধুই একটা পিস অফ্‌ পেপার ফিল্ড উইথ্‌ লাইনস্‌ অ্যান্ড কালার্স।” তিনি গত হয়েছেন, তবে অবিনকে দিয়ে গেছিলেন তাঁর স্বপ্ন দেখার চোখ।

মহেন্দ্রর পরিচয় জানার পর অবিন একদিন বলেছিল,

“তার মানে আপনি আর আমি এক কাজই করি! ”

“কিভাবে? ” মহেন্দ্র উত্তরটা আঁচ করেই প্রশ্নটা করেছিল।

“স্যার, দুজনেই স্বপ্ন দেখাই, আমি রং দিয়ে, আর আপনি শব্দ দিয়ে! এটুকুই পার্থক্য শুধু।” বলে চোখে হেসেছিল অবিন। অবিন স্বপ্ন দেখত, দেখতে জানত। হয়তো বিশ্বাস করত যে সেটাও হতে পারে সত্যি! এটাই ছিল ওর সাথে বাকিদের তফাৎ! ওর ছবি কথা বলতো। ও শুধু পেইন্টার ছিল না, হি ওয়াজ্‌ এন আর্টিস্ট!  

পরে একদিন সকালে মহেন্দ্রের ফোনে অবিনের ঘুম ভাঙে,

“হ্যালো স্যার, বলুন কি হয়েছে?”

“প্রথমে এই স্যার বলাটা থামাতো! হাজার বার বলেছি, আমায় কাকু বলবি, নাহলে দাদাই বলবি, তবে স্যার না! ” একটু রেগেই বলেছিল কথাটা। তবে আদর মেশানো ছিল।

“হা হা হা হা!! ঠিক আছে, আর ভুল হবেনা। এবার বলুন কি হয়েছে?”

“বলছি, আমি তোর ছবির একটা এক্সিবিশন করতে চাই। তুই কি রাজি? মানে তোর যত ভাল ভাল ছবি আছে, আমি চাই সেগুলো সবার সামনে আসুক!”

“অ্যাঁ! আপনি সত্যি বলছেন? আমার ছবির এক্সিবিশন?” গলাটা হঠাৎ যেন একটু ভারী শুনিয়েছিল অবিনের।

“হ্যাঁ রে বাবা! তুই যদি রাজি থাকিস, তাহলেই।”

“রাজি দাদা! টাকাপয়সা...”

“ওসব কথা থাক, বাকি ব্যাপারগুলো আমি সামলে নিচ্ছি। শোন অবিন, তোকে ভাল আঁকতেই হবে, তোর বহু কিছু দেওয়ার আছে। এটুকু মনে রাখিস্‌। রাখছি রে।”

“দাদা,” বলে থেমেছিল ও।

“বল, কিছু বলবি?”

“আপনি আমাকে এতো বড় সুযোগ দিচ্ছেন, তার মর্যাদা রাখতে পারব তো?”

“পারবি। আমি আছি তো! ঘাবড়াস না।” বলে ফোনটা রেখেছিল ওরা। অবিন পেরেছিল।

আরও অনেক কথাই উঁকি দিয়েছিল রাতে। যখন সবাই ঘুমায়, তখন। রাতটা কেটেছিল গোপনে, স্মৃতিতে যেন জোনাকির দল ফসফরাসের আলো লাগিয়ে গেছিল। যত অন্ধকার, ততই প্রকট। সকাল হতেই মিতালি জিজ্ঞেস করেছিল,

“ কি গো, কখন তোমার ইন্টারভিউ?”

“ এই দুপুর নাগাদ বেরবো।“ বলে বাথরুমের দিকে এগিয়েছিল মহেন্দ্র।

“ওঃ, তারমানে খেয়েই যাবে। ঠিক আছে।” বলে মিতালিও চলে গেছিল রান্নাঘরের দিকে।

 দুপুরে ভাত খেয়েই একটা নাগাদ বেরিয়ে গেছিল মহেন্দ্র। মিতালি জিজ্ঞেস করেছিল,

“কোন চ্যানেলে এটা দেখাবে?”

“‘সুর ও ছন্দ’ না কি একটা চ্যানেল আছে, তাতে। বিকেল পাঁচটা থেকে। পারলে দেখো।”

এই বলে একটা ট্যাক্সি ধরে সোজা রওনা হয়েছিল টিভি চ্যানেলের ইন্টারভিউয়ের জন্য। সকাল থেকেই আকাশের মুখটা ভার। একদল কালো কালো মেঘেরা যেন তাদের দু’হাত দিয়ে গোটা আকাশটাকে মুড়ে দিয়েছিল।হাল্কা হাল্কা বৃষ্টিও শুরু হয়েছিল।রাস্তার দূরত্ব বেশি নয়, তবে পুজোর সময় প্রতি পদক্ষেপেই জ্যাম, তাই পৌঁছাতে বেজেছিল প্রায় তিনটে।মহেন্দ্রকে দেখেই একটা মাঝবয়সী ছেলে হাত জোড়া করে এগিয়ে এসেছিল।বলল,

“আসুন স্যার, আমি সৌরভ। আমিই আপনাকে কাল ফোন করেছিলাম।”

মহেন্দ্র বুঝেছিল তার অনুমান নিতান্তই সঠিক, চল্লিশের ধারে কাছেই হবে ওর বয়স। সে নিজেও হাত জোড়া করে নমস্কার জানিয়ে বলেছিল,

“দেরী করে ফেললাম না তো?”

“না না স্যার, এখন সবে তো তিনটে বাজে, আমাদের স্যুট পাঁচটা থেকে। আপনি লাউঞ্জে বসুন স্যার। আমরা চা আর স্ন্যাক্স পাঠাচ্ছি।” মহেন্দ্র লাউঞ্জে বসেছিল। জায়গাটা খুব সুন্দর। পুরো জানলাটাই কাঁচের, এবং কোন পার্টিশন নেই। অর্থাৎ পুরো প্যানারমিক ভিউ! ও গিয়ে বসেছিল একদম জানলার ধারের সোফাটায়। আটতলার ওপরে অফিস, তাই বৃষ্টিতে ভেজা গোটা শহরটাই ছিল ওর সামনে হাজির। বড্ড ক্লান্তি লাগছিল ওর। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে যে কখন চোখ লেগে এসেছিল, মনেই নেই মহেন্দ্রর। চোখ খুলেছিল সেই সৌরভের ডাকে।

“স্যার, শুটিং-এর সময় হয়ে গেছে। আসুন স্যার, আর আপনার ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম, তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।” হেসে বলেছিল ছেলেটা। মহেন্দ্র নিজের ঘড়িটা দেখেছিল। পৌনে পাঁচটা। মানে প্রায় দু’ঘণ্টা ও দিবা নিদ্রা দিয়েছিল। উঠে একবার ওয়াশরুমে গিয়ে সোজা পৌঁছল ইন্টারভিউ রুমে। সেট প্রস্তুত। দুটো চেয়ার,

মোটা গদি দেওয়া। দুদিকে দুটো ফুলের ভাস্‌, নানা রকম ফুল দিয়ে সাজানো। সুন্দর লাগছে। আর সেটটার ঠিক ফোকাস পয়েন্টে একটা পুরনো ছবি, ল্যামিনেট করা। অবিনের। হাসি মুখটা। ছবিটাতে মালা দেয়া হচ্ছে তখন। মহেন্দ্রকে দেখে সৌরভ বলেছিল,

“স্যার, আপনি ঐ ডানদিকের চেয়ারটায় গিয়ে বসে পড়ুন। ”

“আচ্ছা। আর শুনুন, এই ইন্টারভিউটা কতক্ষণের বলতে পারেন?” মহেন্দ্র জিজ্ঞেস করেছিল।

“এই মোটামুটি আধঘণ্টা মতন। স্যার, আপনার ইন্টারভিউ নেবেন অমিত স্যার, আপনি বসুন, উনি আসছেন।” এই বলে চলে গেছিল সৌরভ। মহেন্দ্র গিয়ে বসেছিল চেয়ারে। ছবিটা ততক্ষণে মালায় জড়ানো। মহেন্দ্র একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অপরাধবোধ বোধহয়। ঠিক পাঁচটাতেই শুরু হয়েছিল ইন্টারভিউ। অমিত এসে নমস্কার জানিয়ে নিজের চেয়ারে বসে প্রশ্নের তালিকাটা মিলিয়ে নিচ্ছিল। একটু চাপা গায়ের রং, তবে সুন্দর ব্যক্তিত্ব ছেলেটার। কিউ দেওয়া শুরু হল। দশ থেকে একে এলে শুরু হল শুটিং।

“নমস্কার। সুর ও ছন্দ চ্যানেলের পক্ষ থেকে সবাইকে জানাই মহালয়ার একরাশ ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা।...” অনুষ্ঠান শুরু।

“আজকের আমাদের অনুষ্ঠানটা অবশ্য একটু অন্যরকম, হয়তো ভিন্ন স্বাদের বলতে পারেন। কারণ, আজ মহালয়া। আর যারা ছবি আঁকা পছন্দ করেন বা আঁকেন তাদেরকে বোধহয় নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হবেনা আজকের দিনটা। গতবছর ঠিক মহালয়ার দিনে আমাদের মাঝখান থেকে বিদায় নেন একজন তরুণ নক্ষত্র। আমাদের প্রত্যেকের চোখে দিয়ে কান্না, তিনি ফিরে গেছিলেন। অবিন। ভাল নাম অবিনাশ চক্রবর্তী।“ বড্ড সুন্দর করে কথাগুলো বলছিল অমিত।

“আমাদের আলোচনা আজ তাঁকে ঘিরেই। আমাদের সঙ্গে আজ উপস্থিত আছেন প্রখ্যাত কবি মহেন্দ্র বসু।” মহেন্দ্র হেসে নমস্কার জানালে অমিত বলতে থাকে,

“মহেন্দ্র বাবু, আজ আপনাকে পেয়ে আমরা ভীষণ সৌভাগ্যবান। আমরা সবাই জানি যে অবিন আপনার খুব কাছের ছিলেন। বইমেলায় আলাপ, তারপর দাদা-ভাই সম্পর্ক। শিল্পী হিসেবে তো ওনার সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই, মানুষ হিসেবে উনি কেমন ছিলেন যদি একটু বলেন।” হেসেই প্রশ্নটা করেছিল অমিত।

“প্রথমেই সমস্ত দর্শকবৃন্দকে জানাই মহালয়া এবং দুর্গাপূজার আগাম শুভেচ্ছা।” ছবিটার দিকে একবার তাকিয়ে মহেন্দ্র বলেছিল,

“এবার অবিনের কথায় আসি। মানুষ হিসেবে ওকে বিশ্লেষণ করার যোগ্যতা বোধহয় আমার নেই। শিল্পী হিসবেই ওকে ব্যাখ্যা করাটা আমার জন্য ধৃষ্টতা। শুধু এটুকু বলতে পারি, ও ছিল ওর আঁকা ছবিগুলোর মতই বাঁধনছাড়া। ওকে আটকানো যায়নি। শেষেও গেল না।” কথাগুলো ভীষণ আস্তে আস্তে বলেছিল ও। বিশেষ করে শেষের কথাটা।

“‘বাঁধনছাড়া’ তো সব শিল্পীদেরই বিশেষত্ব, তাই নয় কি? আপনিও কবি, আপনার লেখাও আমাদের বাঁধন ভুলতেই বলে। তাহলে ওনার সাথে যদি সবার পার্থক্যটা একটু বলেন।” প্রশ্নটা অদ্ভুত।

মহেন্দ্র একটু থেমেছিল। তারপর তখন বলেছিল,

“সেটা ঠিক। নিয়মে আটকে পড়লে বোধহয় আর যাই হোক, শিল্পী হওয়া যায়না। তবে একটা জিনিস বলা দরকার। আমরা কিন্তু সবাই, মানে যারা কবিতা, গল্প লিখি বা ছবি আঁকি, বা যেকোনো ক্রিয়েটিভ কাজ-কর্ম করে থাকি, তারা কিন্তু কাজের জন্য নিয়ম ভাঙি। বাস্তবে আমরা একটু আটকেই পড়ি সেসব অচেনা রাস্তা দিয়ে চলতে। অবিন পারত নিয়ম ভাঙতে। পেরেছিল ভাঙতে। তাই ও ছিল আর্টিস্ট! আর আমি শুধু কবিতেই আটকা রইলাম। শিল্পী হওয়া হল না।”  

একটু দম নিয়েছিল ও। সত্যিটা স্বীকার করতে অসুবিধে নেই আজ। মানুষটাই তো আর নেই! মালা দেয়া ছবিটা দেখেছিল মহেন্দ্র। দুচোখ ভর্তি স্বপ্ন হঠাৎ যেন থমকে গেল।

“আপনার সাথে সম্পর্ক কেমন ছিল? মানে আপনাদের আলোচনা কি কোন গণ্ডি মানতো? নাকি সেটাও ছিল বাঁধনছাড়া? বিষয় কি শুধুই ছিল শিল্প? নাকি অন্য কিছুও ছিল রসদ?” প্রশ্নটা যেন একটু বেসুরো শুনিয়েছিল মহেন্দ্রর কানে। ও হয়তো আঁচ করতে পারছিল যে আস্তে আস্তে কোন দিকে এগোচ্ছিল কথোপকথন। মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করে উত্তর দিয়েছিল,

“আমাদের মধ্যে যে ঠিক কি কথা হতো, কিরকম আলোচনা হতো, সেটা বোধহয় ঠিক বোঝাতে পারবোনা আমি। এটা আমার সীমাবদ্ধতা বলতে পারেন। তবে এটা ঠিক, যে ওর সাথে আমি অনেক সময় কাটিয়েছি বটে, তবে ওকে ঠিক মতন বুঝে উঠতে পারিনি। ছবি আঁকা, কবিতা, গান সব কিছু নিয়েই কথা হতো আমাদের। আমার থেকে বয়সে অনেক কাঁচা ছিল ও, তবে বাকি সবকিছুতেই আমায় টেক্কা দিতো। এক কথায় বলতে গেলে, ওর কিছু কমেনি, বরং ওর সাথে কথা বলে আমিই ঋদ্ধ হয়েছি।”

“ব্যাস? আর কিছু না?” ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করেছিল অমিত।

“মানে?” মহেন্দ্র একটু একটু করে আভাস পাচ্ছিল কি আসতে চলেছে।

“না, কিছুনা। আচ্ছা,এবার আপনার স্ত্রী, মানে মিতালিদেবীর কথায় আসি। উনি তো অবিন বাবুর কাছে আঁকা শিখেছিলেন কিছুদিন। জানতে চাইবো যে উনি একজন শিক্ষক হিসেবে কিরকম ছিলেন।” প্রশ্নটা এমনভাবে করেছিল অমিত, যেন এই একটা প্রশ্নের জন্যই সমস্ত ইন্টারভিউটা। আর কিছু বুঝতে বাকি ছিলনা ওর।

“ও শেখানোর ব্যাপারে সত্যিই খুব একটা ভাল ছিলনা। তবে যেহেতু মিতালি আগেই আঁকা শিখেছিল, তাই ওর খুব কিছু অসুবিধা হয়নি শিখতে।”

“বাঁধনছাড়া হতেও কি শিখিয়েছিলেন অবিন?” প্রশ্নটা শুনে একবার ও তাকিয়েছিল অমিতের দিকে। অমিত তৈরি হয়েই এসেছিল। তিরের মতন প্রশ্নগুলো ধেয়ে আসছিল মহেন্দ্রর দিকে। এক অবোধ, সঙ্কীর্ণ  পৃথিবী চেয়েছিল ওর দিকে ।

“বুঝলাম না! একটু স্পষ্ট করবেন ঠিক কি বলতে চাইছেন?” মেজাজ হারাচ্ছিল মহেন্দ্র। বোধহয় চ্যানেলের টিআরপি ঊর্ধমুখী হচ্ছিল একইসাথে।

“না, তেমন কিছু না। আচ্ছা মহেন্দ্র বাবু, আপনার সাথে অবিনবাবুর শেষ দেখা কবে?”

“বছর তিনেক আগে। তারপর আর দেখা হয়নি।”

“হঠাৎ এরকম দূরত্ব কিভাবে তৈরি হোল যদি একটু বলেন।” একটার পর একটা চাল চেলে চলেছে অমিত। মহেন্দ্র বুঝেও বেরোতে পারছিল না।

“ব্যপারটা একটু ব্যক্তিগত। নাহলে না বলার কিছু নেই।”

“ও আচ্ছা। তবে আপনার কথায় আমরা এটুকু বুঝতে পারছি, যে যাই হয়ে থাক, সেটার দায় নিতে হয়েছিল আপনাদের সম্পর্কটাকে। সেই অধ্যায় বন্ধই থাক তাহলে।” এই কথাগুলো অমিত একটু ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবেই বলেছিল। ঠোঁটে ছিল অস্পষ্ট জয়ের অহংকার! মহেন্দ্র চুপ করেছিল। শুধু তাকিয়েছিল একবার অমিতের দিকে। একটু হেসে বলেছিল,

“হ্যাঁ, ঐ অধ্যায়টা বাক্সবন্দীই থাক।” তারপর একটু থেমে বলেছিল, “কারণ সেটা আমি বোধহয় বোঝাতে পারবো না, আর বাকিরা বুঝতে পারবেন না।”

ট্যাক্সিটা আবার আটকাল জ্যামে। স্টুডিও থেকে ফেরার সময় নিজের পাড়ারই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেছে ও। রাস্তা কম, তবু যেন কমছে না কিছুতেই। পুজোর বাজারের শেষ মুহূর্তের তড়িঘড়িতে অভিমানী শহর শুধু তাকিয়েই থাকে মুখ বুজে। বাইরে বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। পুরো জানলাটাই নামিয়ে দিলো মহেন্দ্র। কালো রাস্তাটা জলে ভিজে যেন এক আত্মসমালোচনার মঞ্চ হয়ে উপস্থিত। কিছু কথা মনে আঁচড়  কাটতে থাকে ওর।

“কিরে, নতুন ছাত্রী কেমন শিখছে?”

মহেন্দ্রর প্রশ্নে একটু অদ্ভুত হেসে অবিন বলেছিল,

“কি যে বলেন না আপনি! উনি তো আঁকতে জানেন। আর আমি নিজে কি জানি যে শেখাবো?” তারপর একমুহূর্ত চুপ থাকার পর বলেছিল,“ বরং একভাবে ভাবলে, ব্যপারটা উল্টো!“

“উল্টো মানে?”

“উল্টো মানে, আমি নিজেই বোধহয় নতুন করে আঁকা শিখছি আমার ছাত্রীর কাছে!”

“তুই নতুন করে আঁকা শিখছিস? তাও আবার মিতালির কাছে? কি যে বলিস না তুই!” মুখ বেঁকিয়ে কথাটা বলেছিল মহেন্দ্র। ভেবেছিল অবিন হয়তো মজা করছে। অবিন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল। তারপর বলেছিল,  

“দাদা, আপনার লেখারা কি সবাই মুক্ত? সবাই আকাশ পেয়েছে?”

“মানে? মুক্ত বলেই তো ওরা কবিতা হয়েছে রে।” কথাটা শুনে অবিন মাথাটা হাল্কা নাড়িয়ে বলেছিল,

“না, আমি ঠিক সেটা বলছি না। বলছি যে, আপনার সব লেখাই কি সেই আকাশের ঠিকানা পেয়েছে যেখানে কবির লেখা আকাশও ছায়া খুঁজেছে?” অবিনের কথায় যেন এক অন্য পৃথিবী আত্মপ্রকাশ করছিল।

“দ্যাখ অবিন, আমার লেখারা মুক্তি খোঁজে পাঠকদের কাছে। তারাই সেই আকাশ, যার হদিশ আমার কবিতা করে চলে অনবরত।”

“পেয়েছে হদিশ?”

একটু অপ্রস্তুত হয়েছিল মহেন্দ্র। কথাগুলো যেন একটু অদ্ভুত ছিল। এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন এর আগে কখনও হয়নি ও। মহেন্দ্র ঘুরিয়ে বলেছিল,

“হয়তো পেয়েছে। কেন রে তোর ছবি কি আকাশ খোঁজে না? তারা কি ঠিকানা পেয়েছে?”

“বোধহয় পেয়েছে। সেই একটা আশ্রয়, যেখানে আমার আঁকা ছবিগুলো আমারই টানা দাগের সীমানা ছাড়িয়ে মিশেছে গোটা আকাশটায়। মুক্তি পেয়েছে সেইখানে।”

মহেন্দ্রর দিকে তাকিয়েছিল অবিন, বলেছিল, “সেই আকাশেরই আমি ছাত্র।”  

কথাগুলো অবিন বলেছিল অদ্ভুতভাবে। এই আকাশ যে কে, সেটা বুঝতেও খুব কিছু অসুবিধা হয়নি মহেন্দ্রর। হঠাৎ করে এক অধিকারবোধ বুকে থাবা বসিয়েছিল ওর। সেদিন কিছু বলেনি মহেন্দ্র। অবিন ফিরে গেছিল।মহেন্দ্র বাড়ি ফিরতেই মিতালি হাতে একটা ছবি নিয়ে ওকে বলেছিল,

“এই শুনছো, এই ছবিটা দেখো! এটা অবিন এঁকে আমাকে দিয়েছে। সুন্দর না?” ছবিটায় একটা মেয়ের মুখ কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে। ডানহাতটা ঠিক বাঁ চোখের নিচে। চোখদুটো বোজা। দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে হাত বেঁয়ে। আর একটা ছেলে, আকারে ছোট, সেই জলের ফোঁটায় যত্ন করে প্রদীপ জ্বালাচ্ছে নিজের হাতের তুলি দিয়ে। ছবিটা দেখে কিছুই বলেনি মহেন্দ্র। চুপ করে ছাদে চলে গেছিল। এক লহমায় তীব্র অধিকারবোধ শিল্পীসত্ত্বাকে গ্রাস করেছিল সেদিন। এরপর হঠাৎ একদিন মহেন্দ্র অবিনকে বারণ করে দেয় মিতালিকে আঁকা শেখানোর জন্য। কিছু না বুঝেই অবিন জিজ্ঞেস করেছিল,

“কেন দাদা, আমি কি কিছু ভুল শেখাচ্ছি?” প্রশ্নটার কোনরকম উত্তর না দিয়েই চলে যাচ্ছিল মহেন্দ্র। অবিন আবার একই প্রশ্ন করায় মহেন্দ্র বলেছিল,

“যেটুকু বলেছি, শুধু সেটুকুই কর। আমি চলি। ভালো থাকিস।” কথাগুলো অবিনের কাছে অচেনা ছিল। ও বোঝেনি সেদিন তার দাদা তাঁর শিল্পীসত্ত্বাকে ভাসিয়ে দিয়ে এসেছিল সীমাবদ্ধতার বাঁধানো ঘাটে।

“ভালো থাকবো মানে? আপনি কোথায় যাচ্ছেন আমায় একা ফেলে? আমি কি করেছি মহেন্দ্রদা?” মহেন্দ্রর হাতটা চেপে ধরেছিল ও। মহেন্দ্র অবিনের হাতটা একঝটকায় ছাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল,

“তুই কি করেছিস, সেটা বোধহয় আমায় নতুন করে বলে দিতে হবেনা, কি বলিস? আর এখন তুই যথেষ্ট বিখ্যাত। আমায় আর দরকার হবে না তোর। চলি।”  অবিন খানিক চুপ করে গেছিল। তারপর কিছু একটা আঁচ করতে পেরে বলেছিল,

“দাদা, আপনি ভুল বুঝছেন। মিতালি ...” কথাটা শেষ করতেই দেয়নি মহেন্দ্র। অন্যদিকে তাকিয়ে বলেছিল,

আমি কিছু জানতে চাইনা।”

সেদিন আর কোন কথা হয়নি ওদের। সেই শেষ কথা ছিল ওদের। শেষ দেখাও বটে। ফিরে গেছিল মহেন্দ্র। অবিন দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ। ওর দুটো চোখ ছিল জলে ভরা। তাকিয়েছিল মহেন্দ্রর হেঁটে চলে যাওয়ার পথটার দিকে।। আর কখনও যোগাযোগের চেষ্টাও করেনি ও। শিল্পী ছিল। অভিমানটা ছিল ওর বড্ড দামী। হয়তো, ওর নিজের থেকেও।

ট্যাক্সিটা থামল ওর ফ্লাটের তলাতেই। নেমে ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকলো মহেন্দ্র। লিফ্‌ট নিলো না। ছেলেটা মরে গেছে প্রায় একটা বছর পেরিয়ে গেল। ব্রেনস্ট্রোক হয়েছিল হঠাৎ। মহেন্দ্র খবরটা পেয়েছিল পরেরদিন কাগজে। একটা অপরাধবোধও যেন হঠাৎ কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করেছিল ওকে। মহেন্দ্র বোঝেনি কখন যে সে এক সঙ্কীর্ণতার গণ্ডিতে একজন শিল্পীকে বাঁধতে চেয়েছিল। ভেবেছিল আর পাঁচজনের মতন হয়তো অবিনেরও কল্পনার বিস্তৃতি একটা অতিসাধারণ মাপকাঠি দিয়ে মাপা যায়। তবে ভাবনাটা ভুল ছিল। নিজের কাছেই আজ প্রমাণিত, বোধহয় ও নিজেই ঐ পাঁচজনের মধ্যে একজন। তার বাইরের নয়। বোঝে নি, কখন ও নিজেই মিতালির আঁকা কবিতাগুলো মুছে দিয়েছে। নিজের হাতেই। আকাশ! অবিন মিতালিকে আকাশ ভাবতো। যেখানে ওর কল্পনার রং পেতো পূর্ণতা, আঁকা ছবিগুলো হয়তো পেয়েছিল সীমাহীন আশ্রয়।সত্যিই, অবিনকে ছুঁতেই পারেনি ও! নিজের ফ্ল্যাটের সামনে এসে কলিংবেলে চাপ দিলো মহেন্দ্র। কাজের মেয়েটা দরজা খুললে ও ভেতরে ঢুকলো। খেয়াল করলো, দুচোখ নিচু করে ঘরে বসে আছে মিতালি। চোখে চোখ পড়তেই মহেন্দ্র বুঝল, বৃষ্টি হয়েছে। কথা বললো না কেউই। অস্থির।অস্থিরতা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে ওকে। নিজের মনের ভেতরে জড়ো হওয়া অদ্ভুত একটা কিছু ক্রমাগত ধিক্কার জানাচ্ছে মহেন্দ্রকে। “তুমি নাকি শিল্পী?” প্রশ্নটা বড্ড বিঁধছে ওকে। রক্তাক্ত। মুখেচোখে জল দিয়ে নিজের ঘরে গেল মহেন্দ্র। আলো জ্বালালো না। ‘শিল্পীরা বাঁধনছাড়া হয়’- কথাটা লিখতে বা বলতে ভালো লাগে। তবে মানতে পেরেছে কি মহেন্দ্র? কান্না আসছে না, কথা আসছেনা। স্তব্ধতাও যেন পথ হারিয়েছে। জানলার সামনে গিয়ে নিজের টেবিলে বসলো মহেন্দ্র। কাঁচটা আটকানো। বাইরে কালো ভেজা আকাশটা দেখা যাচ্ছে।বৃষ্টিটা থেমেছিল। এখন আবার হচ্ছে আস্তে আস্তে। জানলার কাঁচটায় একবার হাত বোলাল ও। মনে একবার বললো, “আর আসবে না কক্ষনো? ক্ষমা কি আমি আর পাব না কোনদিন?” গলাটা একটু বুজে আসছে ওর। হঠাৎ কি মনে হলো, দিলো জানলাটা খুলে একঝটকায়। শুরু হলো ঝড়বৃষ্টি। চমকালো বিদ্যুৎ! ভেজা বৃষ্টির ছাঁটের মতো তারা ঢুকে এল অন্ধকার ঘরটায়। এপাশ-ওপাশ থেকে এসে একসাথে ভিড় করলো মহেন্দ্রর সামনে। একঝাঁক ফেলে আসা রূপকথার মতো বললো, “এসেছি আবার। আর ফিরিয়ো না! আমাদের আর ফিরিয়ো না।” নির্বাক মহেন্দ্র চুপ করে চেয়ে রইল এক মুহূর্ত। চোখের সামনে একদল অভিমানী শব্দ, যারা অনেক আগে তাদের কবির থেকে মুখ ফিরিয়েছিল, আজ বৃষ্টিতে আপাদমস্তক ভিজে উপস্থিত তারই ঘরের ভেতর। মহেন্দ্র খাতা খুললো। কলম ধরে আস্তে আস্তে তাদের সাজাতে থাকলো নিজের মতন করে। নতুনের কবিতা লিখছে ও। আজ বহু বছর পর, হারানো শব্দরা নতুন করে খুঁজে পেল আশ্রয়, তাদের পুরনো কবির কলমে।।

Comments

Top

 

ভয়

কল্যান সেনগুপ্ত

নেতাজীনগর, কলকাতা

গল্প

স্যার, আপনাকে অভিক রায় ডেকেছেন। ফ্লোরের পিয়ন এসে দাঁড়ায়।

-কে অভিক রায়? অনির্বাণের আজ প্রথম দিন নতুন অফিসে, ড্রয়িং হলে বসে একটু নিজের বইপত্র গুছিয়ে রাখছে, এমন সময় পিয়ন এসেছে।

আজ্ঞে সামনের চেম্বারে উনি বসেন। মালিকের ভাগ্নে।

-গেল তাহলে। এনার কাছেও কি ইন্টারভিউ দিতে হবে? ভিতরটা গুড় গুড় করে ওঠে। কেমন লোক হবে কে জানে? পাশের টেবিলে বসা ছেলেটি বলে- বেশি কিছু বলবেন না।শুধু শুনবেন। যান দেখে আসুন উনি কি বলেন।লোক খারাপ না।

ঢুকতেই অনির্বাণ দেখে অন্তত ছয় ফুট কয়েক ইঞ্চি লম্বা একটা মধ্য বয়েসি মানুষ টেবিলের ওপারে বসে আছে। ফরসা টিকলো নাক, এক মাথা কাল চুল পিছন দিকে উল্টানো। মুখে একটা পাইপ। এককথায় খাঁটি বাংলা সাহেব। গলাটাও বেশ ভারিক্কি। গলায় টাই, চেয়ারের পিছনে কোটটা ঝুলচ্ছে। চেম্বারে এদেরকেই মানায়। পিছনের তাকে অগুনতি মোটা মোটা বই। টেবিলে গাদাগুচ্ছের বই, কোড, খাতা, খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছিলেন। অনির্বাণ দরজা ঠেলে ঢোকাতে সব থামিয়ে একগাল হাসি ঝুলিয়ে সাহেবি কায়দায় হাত বাড়িয়ে দিলেন।অভিক রায়। ওয়েলকাম টু আওয়ার অফিস। বসুন বসুন।

অনির্বাণ বসে পরে। চেহারায় আর উপস্থিতিতে একটা প্রছন্ন আভিজাত্য। দেখে বুঝতে পারে খুব গম্ভীর কোন সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। আলাপ হয়। অভিক রায় হাল্কা হেসে বলেন- কেমন লাগছে? তেমন কিছু নয়, আপনি আজ জয়েন করেছেন শুনলাম তাই স্রেফ আলাপ করার জন্যে। এর আগে কোথায় ছিলেন?

অনির্বাণ উত্তর দেয়। সব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর বই চারিদিকে।

- নিশ্চয়ই আপনিও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার?

অভিক রায় একটু ঘার বাঁকিয়ে বলে - ঠিক ধরেছেন। খাসা বিষয় কিন্তু। জানেন ত এ হল মাদার অফ ইঞ্জিনিয়ারিং?

মাথা নাড়ে অনির্বাণ।

এত নতুন নতুন কোম্পানি থাকতে এইখানে কি ভেবে?

অনির্বাণ বলে - অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল এখানে জয়েন করবার। শুনেছি প্রচুর শেখবার আছে এখানে। আপনাদের লাইব্রেরিটা দেখলাম। দারুণ কালেকশন।

হ্যাঁ। সেটা ঠিক। ওনার মুখটা কঠিন হয়ে যায়। জানবেন, সব জানবেন, এসেছেন যখন। মালিকের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

না। শুনেছি উনি এখানে নেই।

কিছুদিন যাক। এখন বাইরে গেছেন আসলে দেখা হবে।

মুখটা কাছে এনে বলে- ভীষণ কৃপণ লোক মশায়। মাইনে বাড়াতেই চায় না। বলে হাসতে থাকেন – ঠাট্টা করছিলাম। কিন্তু দেখবেন এরা সব সময় আপনাকে ভয়ে আর টেনশনে রাখবে।

কিরকম? অবাক হয়। ভয় কেন? কিসের ভয়? অনির্বাণ কিছুটা আশ্চর্য হয়। মালিকের সঙ্গে দেখা হয়নি কিন্তু শুনেছে উন্নীতও ভালই লোক।

- দেখবেন দেখবেন। ড্রয়িং ছাড়ার তাড়া, এস্টিমেসন এর তাড়া, ডিজাইন এর তাড়া, সবাই দেখবেন দৌড়াচ্ছে। না হলেই আর বছরে মাইনে বাড়বে না। কেউ সব সময় আপনার কাজ খেয়াল করে যাচ্ছে। কেমন ভাবে করছে আপনি জানেন না। বাইরে থেকে অনেক কিছু মনে হয়।

অনির্বাণ অবাক হয় তাই নাকি?

রাগ প্রকাশ করে ফ্যালেন। বুঝলেন, অনেকদিন ত আছি। আমাকে কেউ চিনল না। জানেন ত আপনাদের মালিক আমার মামা হন। উঠে পরে হাঁটতে থাকেন ঘরের মধ্যে। এই মামাই আমার বারটা বাজিয়ে দিয়েছে। আমার লাইফ বরবাদ করে দিল। অনির্বাণ কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। অভিক রায় একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছে। ভীষণ অস্থির। ঘরে চোখ বোলাতে বোলাতে অনির্বাণ দেখে ক্রিকেটের প্যাড, গ্লাভস পরে আছে।কথা ঘোরাবার জন্যে বলে- এগুলো এখানে? আপনি কি রেগুলার ক্রিকেট খেলেন?

ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসেন। একটা স্নেহের হাসি হাসে অভিক রায়- তাই মনে হচ্ছে বুঝি? ওটা হচ্ছে প্রোটেকশনের জন্যে। ক্রিকেটের জন্যে নয়।

কি রকম?

জানেন ত মানুষ যা কিছু কাজ করে তার পিছনে কোথাও না কোথাও একটা ভয় কাজ করে? স্রেফ ভয়ে মশাই, ভয়ে।

কাকে ভয়- কিসের ভয় অনির্বাণ বোঝে না।

এবার রহস্য ভাঙ্গেন –মোটর সাইকেল কিনেছি মশায় বাড়ি আসা যাওয়ার জন্যে।

তার সঙ্গে ক্রিকেটের এগুলো? ঠিক বুঝতে পারলাম না।

বোঝেন নি ত? বাড়িতে অফিসে সবাই বলেছে এতে খুব রিস্ক রাস্তাঘাটে। খুব অ্যাকসিডেন্ট হয়। ব্যাস ভেবে বার করে ফেললাম উপায়। আমাকে কাত করা অত সোজা নয়।

কে ওনাকে কাত করতে চায়?। নতুন অফিসে এসে কি মুশকিল হল?

অনির্বাণ আস্তে করে জিজ্ঞাসা করে- কিরকম? কে কাত করবে আপনাকে?

অনেক শত্রু মশাই। কাউকে বিশ্বাস করা মুশকিল। না, না, আপনাকে বলছি না। কি করেছি জানেন? বলুন দেখি?

দেখুন আমি কেমন করে জানব। আপনিই বলুন।

সাদা খাতার পাতায় হিজিবিজি কাটতে কাটতে বলেন- হু! হু! একজন ড্রাইভার রেখেছি। সে চালায় আর আমি হেলমেট, প্যাড আর গ্লাভস পরে পিছনে। একদম নিশ্চিন্ত। বলুন কেমন দিয়েছি? মুচকি মুচকি হাসতে থাকেন অভিক রায়। কেন বলুন ত? সেই ভয়। অ্যাকসিডেন্টের ভয়। আঘাত লাগার ভয়। এখন আর আমার ভয় নেই। আয় কত অ্যাকসিডেন্ট হবি।

আর আপনার ড্রাইভার কিছু লাগিয়ে দিলে?

হেলমেট, প্যাড আর গ্লাভস এইগুলিই বাঁচিয়ে দেবে তখন।

অনির্বাণ চেয়ে থাকে লোকটাকে দেখেই ভয় লাগতে থাকে। একি স্বাভাবিক আচরণ? কে জানে? হঠাৎ মনে পড়ে ফ্লোর ম্যানেজার আস্তে বলেছিল। উঠে পড়ে। আজ আসি পরে দেখা হবে। হ্যাঁ, হ্যাঁ আসুন। নিজেই উঠে এগিয়ে দেয়। পরে কথা হবে। 

সময় যায়। আস্তে আস্তে অনির্বাণ বুঝতে পারে অভিক রায়কে অফিসে কোন কাজই করেন না। সবাই মালিকের ভাগ্নে বলে একটু দূরে দূরে থাকে। কাজও দিতে চায় না। মাঝে মাঝে ওনার ডিপ্রেশন হয় তখন মানুষটা ভীষণ গম্ভীর হয়ে থাকেন, মাঝে মাঝে কারণে অকারণে রেগে যান। আর রাগটা ওনার মামার ওপরই বেশি। কিন্তু সবাই বলে ওনার মামা ওনাকে আর ছোট বোনকে ভীষণই ভালবাসেন। এইরকম লোককে কে রাখবে? তাই উনি এখানেই এনে রেখেছেন নিজের চোখের সামনে। ডিপ্রেশনের সময় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া।বেশি বাড়াবাড়ি হলে সামাল দিতে নাকি মামাই করেন। কিন্তু মানুষটা অদ্ভুত। একটা অদ্ভুত জগতে থাকেন। অফিস এর লোকেরা বলাবলি করে অনির্বাণকে অভিক রায়ের খুব পছন্দ।

অভিক রায়ের দৃষ্টি ঘোলাটে হলেই অনির্বাণের মুশকিল। যখন তখন নতুন, নতুন বুদ্ধি নিয়ে হাজির হবেন। এই সেদিন, বস দিনের শুরুতে বলে গেছে আজ প্লান্ট রোডের ড্রয়িং ছাড়তেই হবে যে করেই হোক। সবে ড্রয়িং খুলে বসেছে অনির্বাণ, অনেক কিছু কাজ বাকি, কিকরে যাবে আজ ড্রয়িং কে জানে। সামনে এ্যানুয়াল ইঙ্ক্রিমেন্ট, আজ ড্রয়িং না গেলে গেল সব মান সম্মান। মালিকের ভাগ্নে বলে কথা। তারপর আবার মানসিক দিকে মাঝে মাঝেই আবার গন্ডগোলের। শুধু অনির্বাণকে উনি পছন্দ করেন বলে যত নতুন নতুন চিন্তা ভাবনাগুলো,ওকেই বলেন। মাঝেমাঝে যখন উদ্বেলিত হয় মন,যখন মনে হয় ওনাকে কেউ চাইছে না, যখন ঘুম কম হয়, ঘুমের ওষুধ খেতে হয় তখন মাঝে মাঝেই সামান্য কারণেই রেগে ওঠেন। অফিসের বেশিরভাগ লোকে তখন এড়িয়েই চলতে পছন্দ করে। ঠিক এমনি এক অভিশপ্ত দিনেই সকাল বেলা দরজা খুলে যায়।

আসতে পারি? চেম্বার এর দরজায় অভিক রায়ের হাসি হাসি মুখ।

আসুন, আসুন। মনে ভয় ঘনাতে থাকে অনির্বাণের। আবার কি গল্প নিয়ে এল কে জানে।

বুঝলেন-বলে হাতের সিগারেট বাক্সটা টেবিলের ওপর রেখে অদ্ভুত ঘোলাটে দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। তারপর হেসে বললেন- কি ভাবে আসেন?

এই রহস্য বোঝা মুশকিল- মানে? কোথায়? অফিস? বাসে।

অভিক মুচকি হাসে। মাথায় একটা দারুণ প্ল্যান এসেছে। আপনাকে বলতে পারি যদি কথা দেন আপনি এখুনি কাউকে না বলবেন না। যদিও রিপোর্ট জমা হলে অবশ্য লোকে জানবেই।

অনির্বাণ বুঝতে পারেনা এবার আবার কি প্লান নিয়ে এলেন। ডিপ্রেশনের রোগী, মাথায় নানা রকম উদ্ভাবনী প্ল্যান নিয়ে ঘোরেন। যারা চাকরী করে এখানে তারা সময় করে ওনার কথা শুনতে হয়। না শুনলে চাকরীর ভয়। উনি কিছু করেন না কিন্তু অন্যদের অফিসের কাজ ঠিক সময় না করলে বিপদ।

মুখে বলে-বলুন, বলুন। আমি আর কাকে বলব?

এই ধরুন শহীদ মিনার, ওই ইন্সপিরেশন টাওয়ার, সাউথসিটি টাওয়ার, হাইল্যান্ড টাওয়ার, আরো আছে। এগুলোকে বুঝলেন শুধু শুধু দাঁড়িয়ে থাকলেই ত হবে না।

কি করতে চান? ছুঁড়ে দ্যায় অনির্বাণ। এইবার খোলসা করে –এই যে আপনারা এত কষ্ট করে দক্ষিণ থেকে উত্তর যাতায়াত করেন এর একটা সহজ সুন্দর উপায় বার করেছি বাস ট্রাম কে বাদ দিয়ে।

সেকি? চমৎকৃত অনির্বাণ নড়েচড়ে বসে। শুনি শুনি।

এই উঁচু উঁচু বাড়ীগুলোকে কাজে লাগিয়ে যাতায়াতের একটা আকাশপথ বার করেছি। বলেন কি মশায়? কি ভাবে?

সে আবার কোন যান্ত্রিক সাহায্য ছারাই। এইটুকু বলেই কেমন দিয়েছি দেখ মতন একটা অপার্থিব দৃষ্টি মেলে ধরে আঙ্গুল দিয়ে টরেটক্কা করে টেবিল বাজাতে থাকেন অভিক রায়।

বলেন কি? তাহলে এত তেল খরচা, এত পরিবেশ দূষণ, এমন কি এই ঝুলে ঝুলে বাসে ট্রামে যাওয়া সব শেষ?

অফিস যাওয়াটা মশাই হবে কেবল কারে বেড়াতে যাওয়ার মত নির্মল বাতাস খেতে খেতে।অনির্বাণ এবার আর থাকতে পারে না। রহস্য করবেন না মশাই। জানি আপনি অনেক কিছু ভাবতে পারেন যা আমরা পারিনা। তাই বলে এই রকম? করেছেন কি? করতে পারলে ত মশাই নোবেল আপনার পকেটে। এই শতকের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। শুনি শুনি খুলে বলুন দেখি।মুচকি মুচকি হাসতে থাকেন অভিক রায়। একটা রিপোর্ট আকারে জমা দেব সরকারের ঘরে।তার আগে শুধু আপনাকেই বললাম।

একটু খুলে।

এই ধরুন কপিকল দেখেছেন? তেমনি আপনি শহরের বিভিন্ন উঁচু বাড়ীর ছাদে উঠবেন একটা বাকেটে করে আর উল্টো দিকে আরেকদিকে আরেকটা বাকেটে লোকে নামবে ছাদ থেকে মাটিতে। শুধু নামার দিকের বাকেটটা একটু বেশি ভারি হবে। নামার ওজনই নিচের বাকেট কে ওপরে ঠেলে তুলবে। বলুন বুদ্ধিটা কেমন?

আর তারপর?

এই ছাদ থেকে দুরের অন্য টাওয়ারের নিচে গিয়ে কেবল কার গিয়ে নামিয়ে লোক পৌঁছে দেবে উত্তর থেকে দক্ষিণে বাস। কোন মোটর নেই, কোন বিদ্যুৎতের ব্যবহার নেই, যান্ত্রিক সুবিধা শুধু দিয়ে যাতায়াত ওঠাপড়া।

অনির্বাণ রূপকথার জগতে পৌঁছে যায় বলে- তাহলে শুরুতে প্রথম বাকেট উঠবে কি করে?উঠবে, উঠবে বন্ধু। মুচকি হেসে অভিক অনির্বাণের কাঁধে হাত রাখেন। - হয় কিছু লোক একবারের জন্যে লিফটে করে ওপরে গিয়ে চেন এর ওপর দিকে ওজন বাড়িয়ে নেমে আসবে আর অন্য দিকের বাকেটকে ওপরে তুলে দেবে আর সেখান থেকে নিজেদের ইচ্ছে মত দিকে কেবল কারে চড়ে চলে যেতে পারবেন। আমি দু একটা স্কেচও করেছি সুন্দর করে বোঝানর জন্যে।

অনির্বাণ দুহাতে হাততালি দিয়ে ওঠে। এত সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। তাহলে বাস ট্রাম ত রায়মশাই লাগবেই না ।কি বলেন?

অভিক রায় –কিছুটা গম্ভীর হয়ে যান। ঠিকই বলেছেন। এরপর ভাবছি মাটিতে অনেক গাছপালা লাগিয়ে সবুজায়ন করে শহরটা বাঁচানোর চেষ্টা করব।

অনির্বাণ অভিক রায়ের বুদ্ধির তারিফ না করে পারেন না। আজকের দিনটা যখন গেছেই তখন একটু খুঁচিয়ে তোলে অভিক রায়কে। চিড়িয়াখানার পশুদের তাহলে ময়দানের মাঠে ছেড়ে দিলে কেমন হয়? ওরাও হেসে খেলে চড়ে বেড়াতে পারে। আগামী প্রজন্ম জঙ্গল সাফারি করতে পারবে। আর কেব্‌ল কারে করে যেতে যেতে নীচে সব জীবজন্তু দেখতে দেখতে মানুষ যাবে। বলুন কেমন জমে যাবে?

অভিক রায় একটু সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে অনির্বাণকে দেখেন। একটু গম্ভীর হয়ে যান, বলেন-বলছেন যখন ভেবে দেখি। সেরকম হলে দ্বিতীয় পর্যায় রিপোর্টে জমা দেবার সময় ভাবব। চলি বুঝলেন, আমার নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। মুখের সামনে পরে থাকা চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে সড়াতে সড়াতে উঠে পড়েন আর বসেন না, অনির্বাণ ছাড়া পেয়ে ড্রয়িং দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

দুদিন অভিক রায়ের দেখা নেই অফিসে। আবার একদিন দরজা খুলে যায়- আসতে পারি?ঢুকেই চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন- বলুন ত আপনার কখনো মনে হয়েছে আপনাকে কেউ অনুসরণ করছে?

ড্রয়িং থেকে মাথা তুলে অনির্বাণ হাসে- না তো। সেরকম কোনদিন তো মনে হয়নি।

কেন বলুন ত?

আমার ত মনে হচ্ছে সব সময়ে।

ব্যাপারটা একটু গম্ভীর মনে হয়। – একটু খুলে বলবেন? কেউ কি আপনাকে ফলো করছে?

অভিক বলে- আমি কিন্তু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় বলছি। আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা। কিছুদিন যাবদ রাস্তায়, দোকানে বেরোলেই মাঝে মাঝে পিছন ঘুরে দেখি। মনে হয় সবসময় আমার কেউ পিছু নিয়েছে ।

আপনি তাকে দেখেছেন কখনো ?

না।

একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?

বলুন।

কেন আপনাকে ফলো করবে কেউ? এটা ভেবেছেন কি? কি স্বার্থ তার?

চোখের কোনে কালি, ঘোলাটে চাহনি,একটা চাপা গর্ব মুখে। এখনো বোঝেন নি? রিপোর্ট মশাই,ওটা হাতিয়ে নেবার জন্যে?

কোন রিপোর্ট?

মাথা ঝাঁকাতে থাকে অভিক রায়। ইসস এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে চলবে? ওই যে বলেছিলাম আপনাকে আমার কলকাতার আগামী দিনের যানবাহন নিয়ে চিন্তাধারাটা? রোজ বাড়ী ফিরে আলমারি খুলে একবার দেখে নেই আছে কিনা? চুরি যাবার খুব সম্ভাবনা।

অনির্বাণ ভাবতে থাকে - সর্বনাশ। এবার বোধহয় অসুস্থতাটা বেশীই হয়েছে। ওকে কেন কেউ ফলো করবে?

আর কয়েকদিন পরেই জমা দেব। মনেহয় আপনি ছাড়া আর কেউ ব্যাপারটা জানতে পেরেছে। আপনি কাউকে বলেছেন নাকি? ওটার জন্যে যে কেউ লড়ে যাবে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন অভিক রায়।

অনির্বাণের গলা শুকিয়ে আসে, তোতলে যায়, বলে আমি তো কাউকে কিছু বলিনি। 

– কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, ঠান্ডা ঘরেও ভিতরের জামা ভিজে ওঠে। কিছুটা সময়ের জন্যে চোখের দৃষ্টিতে অবিশ্বাস এসেই আবার মিলিয়ে যায়।

অভিক রায় গলা নামিয়ে মুখ এগিয়ে বলে- আপনি ও সাবধানে থাকবেন। উঠে গিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে ফিরে আসে। কাউক বলবেন না। চারিদিকে খেয়াল রাখবেন। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় মাঝে মাঝে পিছন ফিরে দেখবেন। আমার ধারনা কারুর উপস্থিতি টের পাবেন।

আপাতত বাড়ি খালি। রাখী ওর মেয়ে ঝিনুককে নিয়ে বাপের বাড়ি গেছে। ড্রাইভার ও দেশে গেছে। অফিস যেতে একটা উবের ডেকে নেয় অনির্বাণ। ওদের কাছে টাকা গচ্ছিত আছে পকেট থেকে টাকা দিতে হয়না।অফিসে এসে বাড়ির ট্যাক্স, মেয়ের স্কুলের এর ফিস, ইলেকট্রিক বিল দিয়েছে। প্রথম বেলা কেটে যায় শুধু মিটিং করে। দুপুরে অর্ডার করে খাবার আনিয়েছে। সন্ধ্যেবেলা বেড়িয়ে প্রথম রাখীর ওষুধ, তারপর মানস এর সঙ্গে দেখা কফি শপে বসে আড্ডা, তারপর উবের ডেকে বাড়ি ফিরে আসে। রাত্রে খেতে বসে মনে হয় দিনকাল কত এগিয়ে গেছে। আজকাল টাকা পয়সা না থাকলেও দিব্বি সারাদিনের কাজকর্ম করে বাড়ি ফিরে আসা যায়। যেমন আজ মানিব্যাগটা রাখতে গিয়ে মনে হল আজ পকেট থেকে কোন ক্যাশ দিতেই হয়নি। রাখী ফোন করে-খেয়েছ? কোথায় কি রাখা আছে বলে দেয়। রাখী অন্য কথায় যায়। অ্যাই শোন বাবা বলছে ব্যাঙ্কের সব পাসওয়ার্ডগুলো পালটে ফেল।

চমকে ওঠে, সেকি? কেন? সে তো ভীষণ ব্যাপার। পরে করা যাবে এখন। তাড়া আছে কি?রাখীর বাবা পুলিশে চাকরী করেন। খবর রাখেন অনেক কিছু।

রাখী বলে। জান আজ আমাকে একটা অভূত ফোন এসেছিল। প্রথমে বলে সে ব্যাংক থেকে বলছে। তারপর বলছে আমাদের যে স্টেটব্যাংক এর এটিএম কার্ড আছে সেটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওরা সেটা চালু করবে তাই পাসওয়ার্ডটা দিতে হবে।

এ্যাঁ! তারপর তুমি কি বললে?

আরে আমাদের ত স্টেটব্যাংকের এটিএম কার্ডই নেই। যেই বললাম ওটা আমাদের নেই সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিল। তাই বাবা বলছিল যেহেতু সব জয়েন্ট একাউন্ট তাই পালটে ফেলাই ভাল। আর জানিতো এরকম কিছু আজেবাজে লোক পাসওয়ার্ড জেনে টাকা তুলে নিচ্ছে।

অনির্বাণ একটু নিশ্চিন্ত হয়। বলে-যাক বাঁচালে। এরপর এরকম ফোন এলে আমাকে ফোন করতে বল।

বাবা বলছিল আমাদের সামনের দাসবাবুর এইভাবে অনেক টাকা মার গেছে। শেষে ব্যাংক একাউন্ট বন্ধ করে বাঁচে।

ঠিক আছে আমি ব্যাংকেরটা আমি আজই পালটে দেব। রাখীর সঙ্গে ফোনে কথা বলে খেয়ে উঠে মোবাইলটা নিয়ে বসে। মেলবক্সে দিকে তাকিয়ে দেখে অনেক প্রাইভেট মেল এসে রয়েছে। প্রথমটা উবেরের সকালে অফিস যাবার, এর রসিদ,পরেরটা মেয়ের স্কুল এর মাইনে জমা দেবার রসিদ, তারপর খাবার এর, ওষুধের, কফির এবং আবার বাড়ি ফেরার উবেরের রসিদ। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনেহয় তাহলে রসিদগুলো থেকে কিন্তু বোঝা যাচ্ছে সকালে কখন ও কোথায় কখন গেছে, কোথা থেকে কি খেয়েছে, কোথা থেকে ওষুধ কিনেছে, কি কিনেছে, কোথা থেকে কফি খেয়েছে, কখন বাড়ি ফিরেছে। তাহলে তো মোবাইল সার্ভারের ঘরে ওর সারাদিনের গতিবিধি লুকিয়ে আছে, ওর ব্যাংক এর ডিটেল লুকিয়ে আছে। বুকের মধ্যে হঠাৎ ঠাণ্ডা শিরশিরানি অনুভব হয়। এরপর মনের অন্য দরজা খুলে যায় তাহলে তো ওর ব্যাংক একাউন্টও কারুর কাছে খোলা খাতার মত। যে ওর এক নবের আঁচড়ে টাকা এখান থেকে ওখানে পাঠিয়ে দিচ্ছে সে নিশ্চয় ওর জমানো টাকার ফিক্সড ডিপোজিট আর মিউচুয়াল ফান্ডের সব হদিস জানে। জানবে ত বটেই, মনে পড়ে মিউচুয়াল ফান্ডের মাসিক জমানো তো ওর অজান্তেই কেটে নেয় ব্যাঙ্ক। ব্যাংক থেকে সার্ভার হয়ে তার কাছে মেসেজ আসে। অনেকেই তার একাউন্ট দেখতে পায়। তাহলে যেকোনো দিন একাউন্ট খালি হয়ে গেলে কাকে ধরবে অনির্বাণ?

গলা শুকিয়ে আসে। ঠাণ্ডা ঘরের মধ্যেই কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে থাকে। অনেকদিন থেকেই তো এই ভাবে চলছে কোনদিনতো এমন করে মনে হয়নি। খালি বাড়িতে নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগতে থাকে। এদিক ওদিক অনির্বাণ তাকাতে থাকে। পাশের ঘরে মনেহয় কেউ ঘোরাঘুরি করছে। তাহলে তো ওর চলাফেরা, কেনাকাটা, খাওয়াদাওয়া, সবই কারুর নজরে এর মধ্যে আছে? কে সে? যে সব দেখছে দূর থেকে মেঘনাদের মত।

অভিক রায়ের কথা মনে পরে যায়। কেউ আপনাকে ফলো করছে।যার হাত থেকে আমাদের মুক্তি নেই। লুকোবার কিছু নেই। দম বন্ধ হয়ে আসছে, বারান্দায় এসে দাঁড়ায় অনির্বাণ জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে থাকে। মনে হতে থাকে দূরে ফুটপাতে কেউ যেন দাঁড়িয়ে ওকে দেখছে।

Comments

Top

গল্প

বেঁচে থাকার গান

সুশোভন দাশ

ফিনল্যান্ড

 

ভার-ব্রিজের নীচে এক তাল দলা পাকানো কাদার মতো শুয়ে আছে প্রায় জনা পঞ্চাশেক শ্রমিক। তাদের দেহে স্পন্দনের নূন্যতম আন্দোলনটুকুও যেন হারিয়ে গেছে। অনেকের খালি গা আবার অনেকের গায়ে জামা বা গেঞ্জি জাতীয় কিছু আছে। কিন্তু দূর থেকে তাদের জামা ও গায়ের রঙ মাটির সাথে একেবারে মিশে গিয়ে আলাদা করার এতোটুকুও সুযোগ রাখেনি। স্ট্রীট ল্যাম্পের আলো সরাসরি তাদেরকে ছুঁতে পারেনি। আবছা অন্ধকারে বহুদিন চাপা পড়ে থাকা ঘাসের মতো ফ্যাকাশে আবরণ তাদেরকে ঢেকে রেখেছে। মাটিতে কান পাতলে অনেক দুরের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। এখানেও তার অন্যথা হল না কিন্তু যে শব্দ শুনতে পাওয়া গেল তা সেই ঘুমন্ত শ্রমিকদের সম্মিলিত হৃদস্পন্দন নয়। তা তাদের আগামী দিনের চিন্তার; না না, দুশ্চিন্তার চিৎকার। সেই চিৎকারে নেই কোনো বাহুল্যতা, নেই কোনো সুবিধাবাদীদের সুযোগ বাড়ানোর অজুহাত, নেই কোনো স্বপ্ন পূরণের স্বার্থপরতা। শুধু আছে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে মানুষের আদিম চাহিদা খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের লড়াই।

ভোরের আলো পূব আকাশের অন্ধকার চিরে বেরিয়ে আসতেই সেই কাদার তালে লেগে গেল এক ক্ষিপ্র চঞ্চলতা। ক্ষণকালের জন্য কিছুটা বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে পড়ে আবার তারা একজায়গায় জড়ো হয়ে বসল। ফাগুনের আগুন এখনো অতোটা তীব্র হয় নি। কিন্তু ভোরের আলোয় তাদের গা থেকে চুঁইয়ে পড়া পোড়া তামাটে রঙ অনেক আগুনের সাক্ষ্য প্রমাণ দিচ্ছে। নিষ্পলক চোখে একটা অজানা আশঙ্কা জমাট বেঁধে থমকে গেছে ঠিক যেমন ঝড়ের আগের নিষ্প্রাণ নীরবতা। ভোরের আলো লিখে দেয় এক নতুন দিনের সূচনা, এঁকে দেয় আশায় ভরা জলছবি। কিন্তু এখানে নতুন দিনে সূচনায় কে যেন থাবা বসিয়েছে জলছবিতে। আঁচড়গুলো এতটাই গভীর যে ভবিষ্যতের দিনের উপরেও তার দাগ রাখতে উদ্ধত। কপালের প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজে তাদের একটাই প্রশ্ন-বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এবার কি হাতিয়ার ফেলে আত্মসমর্পণ করতে হবে?

সকাল সাতটায় গির্জার ঘণ্টা বাজার একটু পরেই প্যান্ট-শার্ট পড়া এক ভদ্রলোক মুখ-নাক একটা মাস্কে ঢেকে শ্রমিকদের থেকে প্রায় দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে যা বললেন তা আক্ষরিক অর্থে- ‘করোনা নামক এক সংক্রামিত রোগের কারণে এখানের কাজ আপাতত এক মাসের জন্য স্থগিত থাকবে। তবে পরিস্থিতি দেখে এর মেয়াদ আরো দীর্ঘায়ীত হতে পারে। তোমাদের যা পাওনা তা অফিস রুমে এসে নিয়ে যাও।‘

একটা গুঞ্জন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল। তাদের মাঝ থেকে এক যুবক দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করল,- ‘কিন্তু আমাদের এখানে আনা হয়েছিল ছ’মাসের কাজ আছে বলে। তিন মাসও হল না তার মধ্যে আমাদের এমন ভাবে কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন?’

ভদ্রলোকটি এবার মুখ থেকে মাস্কটা সরিয়ে বললেন,- ‘এখানে কাজ বন্ধ থাকবে। কাউকে কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু যদি কাজটাই না থাকে তাহলে তোমাদের মুখ দেখে তো আর কেউ টাকা দেবে না। আর কাজটা কোম্পানি বন্ধ করছে না, একেবারে প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী থেকে অর্ডার এসেছে।‘ কথাগুলো বলেই ভদ্রলোক মাস্কটা আবার মুখে আটকে নিয়ে উল্টো দিকে হাঁটা দিলেন। গুঞ্জনটা একটা সোরগোলে পরিণত হল আর একে একে তা একটা লাইন করে অফিসের দিকে এগোল।

প্রায় আড়াই হাজার টাকা পেল সুধীর। খুচরোগুলো জামার পকেটে রেখে দুটো কড়কড়ে দু-হাজার টাকার নোট সঞ্চিত টাকার বান্ডিলে মুড়ে চোরা পকেটে চালান করে দিল। টাকা নিয়ে সবাই এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ল। বাঁধাধরা এক চায়ের দোকানের দোকানী অনেকটা বেলা করেই তার দোকান খুলল আজ। অন্যান্য দিন কাজের তাড়া আর ওভার টাইমের জন্য বলে সুধীর খুব বেশি সময় কাটায়নি এখানে। আজ আর কাজের কোনো তাড়া নেই তাই সকালের জল-খাবারের জন্যেও দোকানীকে বলল। কয়েক মিনিট পর দুটো সেঁকা পাঁউরুটি আর এক কাপ চা প্লেটে করে এগিয়ে দিল তার দিকে। সুধীরের সাথে আরো অনেকেই সেখানে খেতে এসে গল্প করছিল, কিন্তু টিভির সংবাদ দেখে তারা সবাই হঠাৎ চুপ করে গেল। সারা দেশে লকডাউন। বাস-ট্রেন কিছুই চলবে না। অন্যান্য দেশের মানুষের মুখে মাস্ক ঠিক যেমনটা আজ সকালে ওই ভদ্রলোকের মুখে ছিল। অনেক মানুষ মরে যাচ্ছে। বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশের মাথারাও খুব আতঙ্কে আছে। তাদের মধ্যে চীন ও ইতালির নাম বার বার করে বলছে। আর যে কথাটা সব থেকে বেশি বার শুনল তা হল করোনা ভাইরাস।

চা-খাবার শেষ করে সবাই বাস স্টপে এলো। অন্যান্য দিন রাস্তায় বাস-লরির অভাব হয় না কিন্তু আজ কিছু খাম-খেয়ালী ট্যাক্সি আর বাইক ছাড়া অন্যকিছু চোখে পড়ল না। একটা ট্যাক্সিকে দাঁড় করিয়ে সুধীর হাওড়া যাওয়ার কথা বলতে ড্রাইভার বলল,- ‘হাওড়া প্রায় আট-দশ ঘন্টার রাস্তা। এই বন্ধের বাজারে একেবারেই না। পাঁচ-দশ কিমির মধ্যে হলে বলুন নিয়ে যেতে পারি।’ সুধীর আর কথা বাড়াল না। মনে মনে ভাবল,- ‘পাঁচ-দশ কিমি হলে আমি নিজেই হেঁটে চলে যেতাম।‘ এলাকার দেড়-দু কিলোমিটারের মধ্যে একটা বড় বাস টার্মিনাল আছে। সবাই সেই বাস স্টপের দিকে হাঁটা দিল। এখানে অনেক মানুষ ভিড় করে আছে টিকিট কাউন্টারের সামনে। চেঁচামেচি করছে তাদের টিকিট নিয়ে। কিন্তু একটা বাসও আজ ছাড়ছে না। একটা টিভি দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখল কলকাতায় পুলিশ নামিয়েছে। লোকজন বাইরে বেরোলেই পুলিশ লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে আর তাড়া করছে। সারা রাজ্যেই নাকি এমন পুলিশ নামিয়ে দেবে। টিভিতে এমন পরিস্থিতি দেখে তার সবাই একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল। কয়েক জন বলে উঠল, - এখানে আটকে গেলে থেকে যাব এখানে। বাড়ির বাইরে থাকা, এ আর নতুন কিছু নয় আমাদের কাছে।‘

সুধীর এখানে চুপ করে সবার কথা শুনল আর মনে মনে বেশ প্রমাদ গুনলো। সে প্রতি মাসে একদিন ছুটি নিয়ে বাড়ি আসে টাকা দিতে। বাড়িতে তার মা বৌ ও চার মাসের মেয়ে। বৌয়ের পক্ষে এখন অন্যের বাড়িতে কাজ করা একেবারেই অসম্ভব। তাই টাকা তাদের হাতে না দিলে তারা না খেয়েই মারা যাবে। যে ভাবেই হোক হাওড়া পৌঁছাতে পারলে বাড়ি ফেরার একটা আশা থাকে। না হলে যে কি হবে, তা তার চিন্তার বাইরে। অনেকে ঠিক করল হাইওয়ে ধরে হাঁটা দেবে বাড়ির উদ্দেশ্যে। কিন্তু সবাই একমত হল না। বাস-লরির অপেক্ষায় কিছুজন বাস টার্মিনালে থেকে গেল আর বাকিরা হাঁটা শুরু করল হাইওয়ে ধরে। সুধীরও হাঁটা দিল তাদের সাথে। একটু পরেই সূর্য মাঝ আকাশে এলো। অনেকেই এর মধ্যে ক্লান্ত হয়ে হাঁটার সিদ্ধান্ত থেকে সরে গিয়ে আবার বাস টার্মিনালে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছে। তিন কিলোমিটার পথও হেঁটে আসেনি এখনো আর এর মধ্যেই সব উল্টো সুরে গান ধরেছে দেখে সুধীরের বেশ রাগ হল। কয়েকবার একটু জোর গলায়,- ‘না না বাড়ি ফিরতেই হবে থামলে হবে না’ বলায় অনেকেই তাকে পাল্টা মেজাজ দেখিয়ে বলল,- ‘তোর এতোই যদি দম থাকে তাহলে না হেঁটে তুই দৌড়ে বাড়ি যা। আমরা ভাবছি বাস টার্মিনালেই ফিরে যাব’।

রাস্তার পাশে একটা ছোটো ধাবা দেখে সবাই সেখানে ঢুকলো একটু কিছু খেয়ে নেওয়ার জন্য। সুধীর একটু ইতঃস্তত করে ধাবার পাশের দোকান থেকে এক প্যাকেট মুড়ি কিনে গলার গামছার সাথে বেঁধে নিল। সবাই অল্প-বিস্তর কিছু খাবারের অর্ডার দিয়েছে ধাবায়। কিন্তু সুধীর কিছু অর্ডার না দিয়ে খাটিয়ার ধারে চুপ করে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। তাদেরই দলের একজন বয়স্ক মানুষ সুধীরকে বলল,- ‘একটু কিছু খেয়ে নে। না হলে হেঁটে বাস টার্মিনালেও ফিরতে পারবি না।’

সুধীর মুখ নীচু করেই ঘাড় নাড়তে নাড়তে বলল,- ‘আমি বাস টার্মিনালে ফিরে যাব না।‘ ইতি মধ্যে এক ট্রাক ড্রাইভার ও তার সঙ্গী ভালো করে খেয়ে লুঙ্গিতে হাত মুছতে মুছতে নিজেদের মাল বোঝাই করা লরির দিকে গেল। ধাবার সামনের খোলা জায়গায় একরাশ ধুলো উড়িয়ে চারদিক অন্ধকার করে বড় রাস্তায় উঠল। ছোটো গাড়িগুলো পাকা রাস্তা পেলেই গতি বাড়িয়ে দেয় কিন্তু মাল বোঝাই করা এতো বড় লরি পাকা রাস্তাতেও বেশ ধুঁকিয়ে ধুঁকিয়ে চলতে লাগল। ধাবার সবাই সেদিকে লক্ষ্য না দিয়ে নিজের নিজের কাজ ও গল্পে মেতে রইল। কিন্তু এর মাঝেই হঠাৎই একটা ঘটনা ঘটে গেল। পাকা রাস্তা ধরে লরিটা একটু এগোতেই সুধীর দৌড়ে গিয়ে লরির পিছনে মাল বেঁধে রাখা দড়ির সাথে ঝুলে গেল। তারপর ধীরে ধীরে দড়ি ধরে একেবারে লরির উপরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। যে বয়স্ক লোকটা সুধীরকে খাওয়ার কথা বলছিল সে হতভম্ব হয়ে ‘সুধীর চলে গেল চলে গেল’ বলে চিৎকার করে উঠল। তার চিৎকারে সবাই এদিক-ওদিক দেখে বুঝল সুধীর নেই। তারপর লোকটার কাছে সুধীরের দৌড়ে লরির পিছনে উঠে যাওয়ার কথা শুনে সবাই রাস্তার ধারে এসে লরিটাকে দেখার চেষ্টা করল। ততক্ষণে লরি বাঁক পার হয়ে হাইওয়ে ধরে নিয়েছে। আর দূর থেকে লরির মাথায় কেউ আছে তা বোঝাই গেল না।

লরির গতি খুব একটা বেশি না হলেও ফাঁকা মাথার উপর হাওয়া সুধীরকে বেশ নাজেহাল করে দিল। মাথার উপর সূর্যের তাপ প্রখর তবু সে নিজের শরীরে খুব ঠান্ডা অনুভব করল। দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি তার তাই খিদেটাও বেশ জোরে লেগেছে। ধাবায় বয়স্ক লোকটার কথা তার খুব মনে পড়ল। একটু কিছু খেয়ে নিলে তখন ভালই হত। কিন্তু খেতে গেলে এই লরিটা আর ধরা যেত না। তার ব্যাগের ভিতর মুড়ি আছে কিন্তু লরির ছাদে শুয়ে শুয়ে কি ভাবে খাবে তা বুঝে পেল না। এই অবস্থায় মুড়ি বের করলে হাওয়ায় উড়ে যাবে সবটাই। পেটে কিছুই যাবে না। খাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে বাড়ির কথা ভাবতেই সকালের খবরের দৃশ্যগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। মাথা তুলে রাস্তার দিকে তাকিয়ে সে কিছুই বুঝল না। লরি হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে। আশে-পাশে দোকান-প্রসারী বলতে কিছুই নেই। দু-একটা গাড়ি হুস-হুস শব্দ করে তার পাশ দিয়ে চলে গেল। তাড়াতাড়ি করে সে মাথা নামিয়ে নিল। সময় যত কাটছে তার ততই ঠান্ডা লাগছে। নিজের ব্যাগ থেকে চাদরটা কোনো ভাবে বের করে মাথা-গলার সাথে খুব ভাল করে বেঁধে নিল ঠান্ডা হাওয়া আটকানোর জন্য। কিন্তু পেটের খিদে তার শরীরকে ক্রমশ আরো ঠান্ডা করে দিচ্ছে।

হঠাৎ করে লরিটা একটা জায়গায় থেমে গেল। উঁকি মেরে সে দেখল জায়গাটা একেবারে ফাঁকা। কোনো টোল ট্যাক্স বা পুলিশের রাস্তা আটকানো নয়। এই সময় লরির ড্রাইভার ও খালাসী লরি থেকে নেমে রাস্তার ধারে খালের কাছে নেমে গেল। মিনিট দু-তিন পর তারা আবার লরিতে ফিরে এলো। এই অল্প সময়টুকুর মধ্যে সুধীর তাড়াতাড়ি করে নিজের ব্যাগ থেকে মুড়ি বের করে গোগ্রাসে যতটা পারল খেয়ে জলের বোতল থেকে একটু জল নিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিল। অনেকটা সুস্থ বোধ করছে সে এখন। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। লরির ছাদে শুয়ে শুয়ে ভাবল- এইভাবে হাওড়া পর্যন্ত চলে গেলে মাঝ রাতের মধ্যে সে বাড়ি ঢুকে যাবে। এমন সময় সে বুঝল লরি এবার ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে দিয়ে খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। মাথা তুলে দেখল সামনে টোল ট্যাক্স। এখানে ক্যামেরা থাকে। যদি ধরা পড়ে তাহলে এখুনি তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। একবার ভাবল সে লরি থেকে নেমে হেঁটে রাস্তার পাশ দিয়ে টোল ট্যাক্স পার হয়ে যাবে। পরক্ষণেই ভাবল একবার যদি লরি থেকে নামে তাহলে আর সে লরিতে উঠতে পারবে না। সাত-পাঁচ ভেবে সে নিজের চাদরটা দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে একেবারে মড়ার মতো শুয়ে রইল। কতক্ষণ সে এভাবে ছিল জানে না। লরির গতি যখন আবার বাড়ল তখন সে মুখের উপর থেকে চাদর সরিয়ে আকাশের তারা দেখতে পেল।

টোল ট্যাক্স পেরিয়ে একটু সময় যেতে না যেতেই লরি হাইওয়ে থেকে নেমে একটা ধাবার সামনে দাঁড়াল। ড্রাইভার ও খালাসী যথারীতি একসাথে নেমে ধাবায় ঢুকলো খাবারের জন্য। একটু সুযোগ বুঝে সুধীর লরি থেকে নেমে বোতলে জল ভরতে এলো। ধাবার টিভিতে এবার খবর দেখে তার হাত-পা অসাড় হয়ে গেল। পুলিশ নেমেছে সব জায়গায়। একটা শ্রমিকের দলকে আটক করে তাদের উপর কীটনাশক ছড়ানো হচ্ছে। এক পলকে সেই শ্রমিকের দল দেখে সুধীরের চিনতে ভুল হল না। এই দলটা থেকেই সে সকালে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে। জল ভরে নিয়ে লরির পিছনের অন্ধকারে গা ঢাকা দিল সে। সেখানেই সে আরো কিছুটা মুড়ি আর জল খেয়ে লরির উপর খুব সাবধানে উঠে শুয়ে পড়ল। টিভির সংবাদ, বাড়ির চিন্তা আর সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন যে তার চোখ বুজে এসেছিল তা সে টের পায়নি। কতক্ষণ সময় কেটে গেছে তার কোনো হদিস ছিল না তার। হঠাৎ লরি চলা শুরু করার ঝাঁকুনিতে তার ঘুম ভাঙল। দু-হাত দিয়ে দড়ি শক্ত করে ধরল। ঝাঁকুনি আর ঠান্ডা হাওয়ায় তার ঘুম কেটে গেল। আর বেশি পথ বাকি নেই। টিভিতে পুলিশের কর্মক্ষমতা দেখে সে বুঝে গেছে হাওড়ায় নামা যাবে না। তাকে সুযোগ বুঝে আগে নেমে পুলিশের নজর বাঁচিয়ে বাড়ির পথ ধরতে হবে। লরি হাইওয়ে ছেড়ে শহরের রাস্তায় ঢুকেছে। জায়গাগুলো তার সব চেনা। ফাঁকা রাস্তা তাই লরি ভালো গতিতেই লিলুয়া পেরিয়ে গেল। সালকিয়া মার্কেট পেরিয়ে একটা বাঁকের মাথায় লরিটা একটু আস্তে হতেই সুধীর লাফিয়ে নেমে পড়ল। পথ-ঘাট সব শূন্য। এমন কিছু রাত হয়নি কিন্তু জনমানব হীন রাস্তার অস্বস্তিকর নীরবতা তার মনে একটা ভয়ের সঞ্চার ঘটাল।

মানসিংহপুর এখান থেকে অনেক দূর। রাস্তার নির্জনতা দেখে গাড়ি পাবে সে আশা তার একেবারেই মরে গেল। কিন্তু বাড়ি তাকে যেতেই হবে। কোমরে গামছাটা ভাল করে বেঁধে নিয়ে চাদরটা খুব শক্ত করে জড়িয়ে নিল। তারপর রাস্তা ছেড়ে গলি পথ ধরে একেবারে রেল লাইনের ধারে। রেললাইন পার হওয়ার সময় কয়েকজন পুলিশের নজর পড়ে তার উপর। তারা টর্চের আলো ফেলতেই সুধীর দৌড় দিল। তাড়াতাড়ি রেললাইন পার হয়ে নেমে এলো জলা-জমির উপর। পুলিশের দল কিছুটা তার পিছনে ধাওয়া করে হাল ছেড়ে দিল। দূরে রাস্তার আলোর দিকে চোখ রেখে সুধীর এগিয়ে যেতে লাগল। অসময়ে বৃষ্টির জমা জল-কাদায় কয়েকবার পড়ে গিয়েও সে এগিয়ে যেতে থাকল। তার সারা শরীরে কাদার ছিটে। কোমর থেকে পা একেবারে কাদায় মাখামাখি। একবার সে রাস্তার ধারে উঠে এসেছিল রাস্তা দিয়ে হাঁটবে বলে, কিন্তু সেখানেও পুলিশের গাড়ি যাতায়াত করছে দেখে আবার জলাজমিতে নেমে এলো। প্রায় অবচেতন ভাবে কতক্ষণ যে হেঁটেছে তার ঠিক নেই। একটা সময় সে দেখল আকাশ একটু একটু করে পরিষ্কার হয়ে আসছে। পাখির দল কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে যাচ্ছে। দূর থেকে নিজেদের গ্রামের সীমানা দেখে সে লাফিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি করে সে জমির আল ধরে ছুটতে থাকল। কিছুটা যেতে না যেতেই সে হাঁপিয়ে গিয়ে গতি কমিয়ে হাঁটতে লাগল। দিনের আলো বাড়তেই দূর থেকে কয়েকজনের দেখা পেল। কাল রাত থেকে পুলিশের পর এই প্রথম সে কোনো সাধারণ মানুষের দেখা পেল। জলা-জমি পেরিয়ে মাঠের এক প্রান্তে শুরু হয়েছে বাজার। মাঠ পেরিয়ে যখন সে বাজারে ঢুকলো তখন প্রায় সাতটা বাজতে চলেছে। বাজারের দু-এক জন তাকে দেখে চিনতে পেরে তার ফেরার খবর জানতে চাইল। সুধীরের মুখ থেকে ‘এইতো কাজ থেকেই ফিরছি’ শুনে অনেকে তার দিকে সন্দেহের দৃষ্টি দিল। সবার মুখে মাস্ক শুধু মাত্র সে বাদে। তাই একটা গন্ডগোলের আভাস পেতেই আর কথা না বারিয়ে সে তাড়াতাড়ি বাড়ির পথ ধরল। মোড় মাথায় আসতেই দু-টো মাস্ক পরা পুলিশ হঠাৎ করে একেবারে তার দশ হাতের মধ্যে চলে এলো। তার কাদা মাখা পোশাক আর মুখে মাস্ক নেই দেখে পুলিশ দুটো তার দিকে এগোতে থাকল। সুধীর তাড়াতাড়ি করে দৌড় দিল বাড়ির দিকে। কাল থেকে সারাদিন সে টিভিতে যা খবর দেখেছে তাতে সে এটা বুঝে গেছে যে মাস্ক ছাড়া বাড়ির বাইরে বেরলে পুলিশের মার অবধারিত আর বাইরে থেকে কেউ ফিরলে তাকে চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে, না হলে এই অজানা রোগ পরিবারের সবাইকে ধরবে।

বাড়ির একেবারে কাছে এসে সুধীর খুব জোরে জোরে মা আর বৌকে ডাকতে থাকল। সকাল সকাল এমন ডাকাডাকি শুনে তার মা বেরিয়ে এলো বাড়ির সামনে। পিছন পিছন তার বৌ ও এলো চার মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে। নিজের পরিবারকে দেখে সুধীরের মন আনন্দে ভরে গেল। খুব ইচ্ছা করল তার মেয়েকে সে কোলে নিয়ে একটু আদর করবে। কিন্তু সে বাঁশের বেড়ার কাছে এসে থেমে গেল। পুলিশ দু-টো তখন দৌড়ে আসছে তার দিকে। হঠাৎ সুধীর ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে হাত তুলে জোর গলায় বলল,- ‘দাঁড়াও। আমি তোমাদের কাছে আসছি এখুনি।‘ আচমকা এমন কথা শুনে পুলিশ দু-টো থমকে দাঁড়িয়ে গেল সেখানেই। কালবিলম্ব না করে সুধীর নিজের চোরা পকেট আর জামার পকেট থেকে সব টাকা বের করে বেড়ার মাথার উপর রেখে দিয়ে মা কে বলল,- ‘এগুলো ভালো করে ধুয়ে শুকনো করে তারপর ব্যবহার করবে। আমি দিন পনেরো পরে ফিরব। ভয়ঙ্কর রোগ হচ্ছে সবার। খুব সাবধানে থাকবে।’ কথা গুলো বলেই সুধীর পুলিশদের দিকে এগিয়ে গেল।

সুধীরের বৌ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল,-‘ তুমি চললে কোথায়? বাড়ি আসবে না?’

সুধীর হাসতে হাসতে বলল,- ‘জেলে যাচ্ছি না রে। ডাক্তারখানায় যাচ্ছি। বাইরে থেকে আসলে ডাক্তার দেখিয়ে তবেই ঘরে ঢুকতে পারব। টাই এখন নিয়ম।‘

একটা পুলিশ তার লাঠির দিয়ে সুধীরের পেটে