প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

 
Durga1.jpg
পুজো বার্ষিকী 
১৪২৯
maaforall.jpg
 

‘ও দাদা দুটো টাকা দ্যাও না, বড্ড খিদে নেগেছে’ – জামার পিছন থেকে একটা ছোট্ট টান। ধুলো ময়লা মাখা, শীর্ণ হাতের ছোঁয়া।  
বেহালা সখেরবাজার মোড়। সকালের দিকে প্রাত্যহিক যানজটে শহর কলকাতা আর র‍্যাট রেসে অভ্যস্ত শহরবাসী। গলির মুখে বাস স্ট্যান্ডের কাছে বেশ ভিড়। কি একটা কাজে গিয়েছিলাম, অতটা মনে নেই। পিছন ফিরে দেখি বছর সাত আটেকের একটা ছেলে। তখনও ওর শুকনো মুখে ভোরের প্রত্যাশার আলো লেগে। 
- ‘কেন, কিছু খাস নি?’ 
- ‘খেয়েছি... সে তো কোন সক্কালে’ 
- ‘তাহলে, চাইছিস কেন? কি খেয়েছিস সকালে?’
- ‘বিস্কুট’ 
এভাবেই আমাদের কথাবার্তা শুরু। নতুন কোন ঘটনা নয়। পথেঘাটে কোন না কোন সময়ে এর সম্মুখীন আমাদের সবাইকেই হতে হয়। হাতে কাঁচা পয়সা দেওয়ার পক্ষপাতী আমি নই, টাকা পয়সার একটা অন্যদিক আছে, খিদে কমিয়ে দিতে পারে। ছেলেটা সামনে একটা হাত পেতে কাঁচুমাচু মুখে মাথা চুলকোতে লাগল। ওর দেখাদেখি আর একটা কখন যে এসে হাজির খেয়াল করিনি। তবে এটা বয়েসে একটু ছোট, হাঁ করে আমাদের কথা গিলছে। 
‘দ্যাও না কিছু’ - মুখটা ব্যাজার করে আবার বলে উঠল। অন্যদিকে তাকালাম। ভাবলাম চলে যাবে। মনে মনে ভাবলাম, আরে যা না, এখনও দাঁড়িয়ে! অবজ্ঞাও বোঝে না!
‘ও দাদা, দ্যাও না’ – এ তো বড্ড নাছোড়বান্দা! এবার একটু বিরক্ত হয়ে বললাম – ‘সত্যিই খিদে, না তোর অন্য কোন ধান্দা আছে?’ আর এত লোক থাকতে - আর আমাকেই বা কেন বাবা! বিরক্তিকর! 
- ‘বললুম তো! খিদে পেয়েছে। কতবার বলব বল দিকি? –

একটু ঝাঁঝিয়ে উঠে বিরক্তি উগড়ে দিল। কাঁচা বয়স, বুঝবে কি, যে সামর্থ্য না থাকলে কিছু পেতে এই সমাজে একটু ‘কুই কুই’ করতে হয়। সচ্ছল, সামর্থ্য লোকেরাই করে স্বার্থের জন্য, আর এরা তো কোন ছাড়! এটাই নিয়ম, পেটে ভাত থাকলে তবেই মেরুদণ্ড সোজা। আমার খুব একটা তাড়া নেই, তবে বাসটা চলে এলে দুম করে উঠে পালিয়ে যেতে পারতাম, এই যা। সেটা মনে হয় আজ আর হচ্ছে না। 
কিছুটা বাধ্য হয়েই বললাম – ‘না ভাই, তোদের পয়সা দিচ্ছি না। খিদে পেলে চল আমার সঙ্গে।’ দুজনেই একটু চুপ মেরে গেল। বোধহয় আশা করে নি। ভেবেছিল দু-একটা টাকা গুঁজে দেব ওদের হাতে। কিন্তু তা আর হল না। তবে কোটরের ভিতর থেকেই ওদের চোখগুলো দপ করে জ্বলে উঠল মনে হল। অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য যাদের নিত্য দিনের সঙ্গী, তাদের চোখের ভাষায় বিশ্বাস স্থান পায় না। প্রতি মুহূর্তেই এই বাপে খেদানো বিপিনের দল আমাদের এই ভদ্রসমাজকে বিশ্বাস করতে ভয় পায়। একটু চুপ করে থেকে ঘাড় নেড়ে বলল – ‘চলো তাহলে’। পাশের ছোটটা আমাদের সঙ্গ নিতেই, তাকে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বড়টার এক ধমক –

‘তুই আসছিস কেন, আমি কি তোকে ডেকেছি?’ সমস্যা গভীরে। এখানেও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, ভয়। আমিত্ব অমৃত-সমান। বাঁচিয়ে রাখার লড়াই সমাজের প্রতিটি স্তরেই। আড়ালে আবডালে এর গতি প্রবাহমান। কচিটাও দমবার পাত্র নয়। টিকে থাকার লড়াইতে গলা উঁচু করে বাঁচতে হয়। গালাগাল দিয়ে বলে উঠল – ‘আমি এয়েচি তো তোর বাপের কি?’
দু-পা হেঁটে সখেরবাজারের দিকে যেতে বাঁ দিকে একটা ছোট্ট দোকান। সামনে বিশাল লোহার তাওয়া। নিচে গনগনে কয়লার আঁচ। বড্ড লাল, চোখে ধাঁধাঁ লাগে। গরম গরম পরোটার গন্ধে ছোট্ট দোকানটা ভরপুর। পাশে বিশাল একটা ডেকচিতে লাল টকটকে আলুর দম। দোকানের পাশে একটা ভাঙ্গা বেড়ার পাশে একটা সাইকেল কাত করা, নিচে একটা কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে, একটু ঘুম কাতুরে মনে হল।   
- কি নাম তোর? বসে গেলাম ওদের সঙ্গে। ছোট্ট স্টিলের থালায় আমার জন্য এল হালকা পেটানো, ফিনফিনে, রূপসী পরোটা আর সঙ্গে বাটিতে লালচে আলুর দম।
- ‘পরেশ’। সবে পরোটা-টা ছিঁড়ে গালে পুরতে যাবে, থামিয়ে বলে উঠলাম– 'যা হাত ধুয়ে নে। দেখ... হাতে তো সব নোংরা লেগে রয়েছে’। অনিচ্ছা সহকারেই উঠল। 
- ‘আর তোর’ – ছোটটা আমার ডানদিকে বসে। মুখখানা মিষ্টি। গাল দুটো ফোলা ফোলা, ঢল ঢল চোখ, এখনও শৈশবের আদল চিবুক ছুঁয়ে।  
- 'ভুটে’ 
- 'ভুটে!!! ভুটে কারোর নাম হয় নাকি?' আমি তো অবাক। 
- 'হয় তো, আমারই নাম তো ভুটে।‘  বল পড়তে না পড়তেই ছক্কা। 
- 'স্কুলে যাস না?'
- 'না।' 
- 'কেন?' 
কোন উত্তর নেই। ঠক ঠক করে কাচের গ্লাসে চামচ নাড়ার শব্দ। গরম আগুনের আঁচ খেতে খেতে চায়ের জল নাচছে, তাতে বড় কয়েক চামচ দুধ পড়ল। এবার দুধ জলে মিশে একটা বড় সড় জলতরঙ্গের প্রস্তুতি। যার ফলশ্রতু চায়ের জলে উথলে পড়া বান, যা সামলাতে দোকানীর শকুনি দৃষ্টি। 
বাচ্চা দুটোর কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। ছোট