শারদীয় মাধুকরী

১৪২৬

শিল্পী - মেঘমল্লার (ডালাস, টেক্সাস)

 

প্রবন্ধ

গল্প 

কবিতা

কাব্য আলোচনা

রম্য রচনা

ভ্রমণ 

Family Trip

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

প্রচ্ছদ শিল্পী - মেঘমল্লার (ডালাস, টেক্সাস)

লেখক ও লেখিকাবৃন্দ ​

প্রবন্ধ

 

বাঙ্গালী আর মানুষ

হইবে কি?

ভাস্কর সিন্হা

দোহা, কাতার

পরোক্ত শিরোনামায় জনৈক শুভাভিলাষী বিদ্বজন শঙ্কায়- আশঙ্কায় রবীন্দ্রস্মরণ করলে, ওনাকে আশ্বত্ত্ব করা গেল এই বলে যে, রবীন্দ্রনাথ তো বাঙ্গালীর ভাবের, চিত্তের এবং গানের জগতের মেঘমালায় চিরকালীন। তাই প্ল্য়ানচেটবিলাসী, যদিও তিনি আজ স্বর্গগগনবিহারী, তিনি প্রায়শঃই এসে থাকেন আমাদের দিবানিশির আলোচনায়। শুধু তিনি-ই বা কেন, আরও অনেক গুণীও তো আসবেন আমাদের আলোচনায়।

হ্য়াঁ বাজার এখন সরগরম, মৌসুমী বায়ু এখন প্রবেশিত। নির্বাচন আসন্ন। ঘূর্ণি আবর্তে নিম্নচাপে সব ইঁট- পাটকেল জড়ো এক জায়গায়। নির্বাচনী প্লাবনে ভাষার তোড় কোনো বাঁধাই মানে না। আ মরি বাঙ্গলা ভাষা! তা রাজনীতির উৎসবে কবেই বা ভাষণ লৌহকপাটের কারার অন্তর্বতী ছিলো? তবে গুটিকতক ঘোষিত দলবাহী সংবাদ মাধ্য়ম ব্য়তীত- যাদের কর্মই আপনার ঢাক- বাদন, বাকি সংবাদমাধ্য়মের শিরোনামাগুলি দেখলেও অত্য়ন্ত হতাশার উপলব্ধি হয়। শাসক, শাসিত, বিরোধী পক্ষের সম্বন্ধে ব্য়ঙ্গ-বিদ্রূপের সুরারোপণের মূর্ছনায় মূর্ছাপ্রাপ্তি অবশ্য়ম্ভাবী। নিতান্ত সহজেই পাঠকের নিশানায়, এবং আরও অনায়াসসাধ্য় সহজিয়া শরবিদ্ধ মৃগ। এ ভাষার তো হেথায় তুরে মানাইছে না গো অবস্থা।

এখানেই বাঙ্গালীর অস্বাতন্ত্র্য! উড়ে, বিহারী, মারোয়াড়ী, পাঁইয়া, গুজ্জু, মাদ্রাসী, কাটা ইত্য়াদি- ইত্য়াদি সবাই তরল উপহাসের পাত্র। মহামহিম বাঙ্গালী বিদ্বজ্জনের সামনে সকলেই অর্বাচীন, উজবুকের দল। কথাবার্তার শালীনতা, সুষ্ঠু আচরণ, জনপরিসরে ভদ্রতা, সর্বপোরি এক সহমানুষের প্রতি সহমর্মিতার বড়ই অভাব ঘটেছে বাঙ্গালী মানসে ও জীবনে। হয়তো শুধু বাঙ্গালী নয়, সমগ্র ভারতবর্ষেই। যেহেতু বাঙ্গালীই এখানে আলোচনার বিষয়, তাই বাকিদের কথা অন্য় সময়ে হবে। বাঙ্গালী বুঝতেই পারেনা যে অন্য়রা কতো শতপথে অগ্রবর্তীমান। বাঙ্গালী তো বাঙ্গালী-ই। খালি যুক্তিবিহীন একপেষে হিসাব। সুভাষ তো সুভাষ-ই। সেখানে বাঙ্গালীর কাছে স্বয়ং গাঁন্ধীও অতি অবহেলার পাত্র। বাঙ্গালী জানার প্রয়োজনবোধও করেনা নেতাদের মধ্য়ে যে পারস্পরিক সৌজন্য়বোধ ছিলো তাকে। সংঘাত ছিলো সর্বদাই তাত্ত্বিক। আত্মিক পারস্পরিক যোগাযোগের হিসাব সাধারণ বাঙ্গালীর কাছে নেই। যেখানে সুভাষও নিজেই গাঁন্ধী, নেহেরু, আজাদ ইত্য়াদি বিগ্রেড বানিয়েছিলেন। গুরুদেব আর মহাত্মা পরস্পর পরস্পরের পূণ্য় নামকরণ করেছিলেন। নেহেরু কন্য়াকে গুরুদেবের শরণে পাঠিয়ে ছিলেন কিছু দিনের জন্য়। বাঙ্গালীর আজি নিজেকে অন্তরের মধ্য়ে দেখিবার বড়ই প্রয়োজন বোধ হয়ে পড়েছে। অন্তরে আজি আলোক নাহিরে হলে ভীষণই মুশকিল, কুমঙ্গল। হতভাগা অপরকে অবহেলায় পারদর্শী বাঙ্গালী বেমালুম ভুলে যায় যে রবীন্দ্রনাথের ইয়েট্স বা পিয়ার্সন সাহচর্য। বিশ্বভারতী গঠনকল্পে মারোয়াড়ী ব্য়বসায়ীদের যোগদান। স্বামীজির বিদেশযাত্রায় খেতরীরাজার অসীম অবদান। স্বামীজির মহাজীবনে এই খেতরীর রাজারও কম ভূমিকা নেই রামকৃষ্ণের থেকে। রামমোহনের জীবনরক্ষায় এক তিব্বতীনির সুমহান ভূমিকা ছিলো। শরৎচন্দ্রের মানসিপটভূমি তৈরীতে বর্মাদেশীয়দের সোৎসাহ। মহান নেতার অন্তর্ধানে অবাঙ্গালীভাষীদের সক্রিয়তা এবং যারপরনাই

তৎপরতা। অর্বাচীন বাঙ্গালীর এহেন ভূমিকায় নিদারুণ ক্ষুব্ধ বিদ্য়াসাগর শেষজীবন অতিবাহিত করেন কর্মাটারে, অবাঙ্গালী আদিবাসীদের সাথে। যাহোক একপেষে বাঙ্গালীর একবগ্গার রোগ চিরকালের। স্বয়ং বীর সন্ন্য়াসী প্রথমে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরাগভাজন ছিলেন। যদিও পরবর্তীকালে কিছু অধ্য়য়নের পরে তাঁর বিরাগ কিয়ৎ হ্রাস পায়। বৌদ্ধ ধর্মের মঝ্ঝিম পন্থা মানবজীবনের এক অতুল অবদান। মাঝামাঝি পথে চলে উগ্রতার আর হিংস্রতার মানবিকরণ করা তো যেতেই পারে। দরকার সদ্দিচ্ছার আর জীবনকে দুই চক্ষে পূর্ণরূপে দেখা। নইলে একচক্ষু হরিণের ন্য়ায় একদিকে থাকে শুধুই আঁধার। সবাইকেই আসন ছেড়ে যেতে হয়। ভারত বা বাঙ্গলায় সেই নিয়ম অবশ্য় খাটে না। আমেরিকার মতো দেশে সর্বাধিক দুই বারের জন্য় রাস্ট্রপতির আসনপ্রাপ্তি আছে, তার বেশী নয়। এখানে চিরকালীন। যেতে নাহি দিব। শরীর, মন না চাইলেও, দল যে চাইবে শেষ দিন পর্যন্ত। রাজনীতি আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে ঢুকে গিয়েছে। পৃথিবীর যাবৎ চাকুরি বা কর্মে প্রবেশগত যোগ্য়তার প্রয়োজন। প্রবেশ যোগ্য়তা যে শুধু ছাঁকনির কাজ করে তাই নয়, মানুষকে ঐ কর্মের জন্য় পারদর্শী হতে উৎসাহিত করে এবং ঐ কর্মে সফল হবার প্রয়োজনীয় মানের সক্ষমতার অর্জনের বোধ জাগায়। অবশ্য় রাজনীতিতে প্রবেশ যোগ্য়তার কোনো প্রয়োজন নেই, তাই মাপকাঠিরও কোনো ব্য়াপার নেই। নেতা হতে হলে বংশপরিচয় আর যোগাযোগটাই জরুরী। এমতাবস্থায় আমরা রাজনৈতিক ব্য়ক্তিসমূহের কাছ হতে কি-ই বা প্রত্য়াশা করতে পারি? এদিকে রাজনীতি সম্পদ আনার আর জোগানোর মূল শক্তি। কিছু স্বার্থান্বেষী মানবের হাতে পড়ে রাজনীতি আর দেশের হয়েছে দফারফা। স্বাধীনতার আমলের সংগ্রামী রাজনীতি আর আজকের রাজনীতি অবশ্য়ই আলাদা আলাদ বিষয়। আজকের রাজনীতি ক্ষমতাপ্রাপ্তি আর ক্ষমতার কুক্ষিগততার কাহিনী বিশেষ। কিন্তু মানদন্ডহীনতায় এই রাজনীতি মাৎসন্য়ায়ের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে। বাঙ্গালী হিসাব কষে: তুমি ভালো না খারাপ? তুমি কোন দলের? ঘটনাচক্রে তুমি সহমতের না হলে, বিপদ অবশ্য়ম্ভাবী। দলের আর বাহুবলীদের আস্ফালন চলবে তোমার শরশয্য়া বা কঙ্কটশয্য়ায় পতন না হওয়া পর্যন্ত। এই অভিমুখের অবশ্য় পরিবর্তন আশু কর্তব্য়। মাঝামাঝি কেউ থাকতেই পারেন। তোমার সর্বকর্মে আমার উৎসাহ- উদ্দীপনার অবকাশ নাও থাকতে পারে।  এমতবস্থায় আমি তোমার বন্ধু না হলেও, অমিত্রও না হতে পারি। কিছু তো মানদন্ডের মানবসমাজের সর্ব ক্ষেত্রেই মান্য়তা থাকা উচিত। নইলে অন্য় অবোলা প্রাণীকুল হতে আমরা তথাকথিত সভ্য় কিসে? অপার বুদ্ধির অধিকারী কিসে? আত্মনিরীক্ষণ আর বুদ্ধের মঝ্ঝিম পন্থায় বাঙ্গালীমনে শান্তির অবকাশ আনবে। উগ্রতা, রূঢ়তায় ঠান্ডার প্রলেপ দেবে। আমরা একই জাতি, সবাই অমৃত্য়স পুত্রাঃ! ধংসাত্মক ভূমিকা ছেড়ে, গঠনাত্মক ভূমিকার দিকে বাঙ্গালীর সুষম মনোনিবেশ অত্য়ন্ত জরুরি।

Comments

Top

প্রবন্ধ

 

সাচ্চা-ঝুটা

শাশ্বতী ভট্টাচার্য

ম্যাডিসন, উইস্কন্সিন

লেখক পরিচিতিঃ- যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে রসায়নে মাস্টার্স  করে CSIR এর Indian Institute of Chemical Biology তে গবেষণা  করেন এবং যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে Ph.D  ডিগ্রী অর্জন করেন। আমেরিকার National Institute of Health এর অন্তর্বতী National Cancer Institute এ কিছুদিন পোস্টডকের কাজ করার পর এখন ইউনিভার্সিটি  অফ উইস্কসিন ইন ম্যাডিসনে ডিপার্টমেন্টের অফ মেডিসিনের সায়ান্টিস্ট। স্বামি ও কন্যা সহ ওঁনার বাস উইস্কন্সিনের  শহর ম্যাডিসনে। । পেশায় বিজ্ঞানী শাশ্বতী বাংলা ভাষায় লিখতে ও পড়তে ভালোবাসেন।

প্রথম দেখি অফিসের মিটিংয়ে।  পিঁজা আর তার সাথে ডায়েট কোক। কি ব্যাপার?  না হেলদী। এমনি কোকে তো অনেক চিনি, তাই ডায়েট কোক। শূন্য ক্যালোরি।  হেলদী, স্বাস্থ্যকর। 

-সিরিয়াসলী?

এর পরে এই শূন্য বা কম ক্যালোরির খাবার সব জায়গায় দেখতে শুরু করলাম।  সভা-সমিতি, জলসা-ঘরে, বিবাহবাসরে। হোটেল-রেস্তোরায় তো বটেই। 

সত্তরের দশকে যার স্থান ছিল মেডিসিন ক্যাবিনেটে তা ছড়িয়ে পড়লো রান্না ঘরে, এমনকি পানীয় জল খাবার কুঁজোতেও।  আমার ডায়াবেটিক দিদা চায়ে স্যাকারীন মিশিয়ে খেতেন, তাই ওই কেমিক্যালটিকে  আমার মা ঘরে  মজুত রাখতেন, অবশ্যই তা থাকত আমাদের নাগালের বাইরে,  ডেটল, বার্ণল আর এ্যনাসিনের সাথে। তবুও শান্তি ছিল, সেটা তখনও পূর্ন-বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

তারপর একদিন ওই শূন্য ক্যালোরিকে দেখলাম শিশুদের ব্যবহার্য খাদ্য-দ্রব্যে। 

প্রিয় বন্ধুর রান্না ঘরে দুধ, ডিম, ময়দা, তেল, ইস্টের পাশে পাতার পর পাতার কৃত্রিম চিনির  স্যাচেট। শুধু তাই নয় , কেকের সমারোহ বৃ্দ্ধি করার নানা রং-বেরঙ্গের আইসিং, ফ্রস্টিংয়ের যে সমাহার,  তার উপরেও কালো -কালির বড়ো হরফে লেখা শূন্য ক্যালোরি কথাটা চোখে পড়লো।

--এইখানে এইগুলো কি রে? তোর ছেলে তো সবে দুই, আর মেয়েটা এই সেদিন থেকে স্কুলে যাচ্ছে?  ওরা কি ডায়া...? বলতে বলতে থেমে গিয়েছি।   এই রকম একটা অশুভ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা আমার একান্তই অনুচিত নয় কি?

--আরে বলিস কেন?  আমার মেয়ের খুব রান্নার সখ বুঝলি?  এই বয়সেই ও যা রান্না করে না! নির্ঘাত এমেরিল লাগাসের ঠাকুরমা ছিল গতজন্মে । দেখ না দেখ, এই কুকি, এই কেক, এই প্যস্ট্রি বানিয়ে চলেছে। তারপর  উইক-এন্ড হলো কি না, আসে পাশের গাদা গুচ্ছের সাদা-কালো  সব বন্ধু–বান্ধবকে  ঘরে  ডাকবে..., ওই সব ডেসার্ট বানাবে, খাবে আর  ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলবে!  আসলে ওর বাবারও তো ভিডিও গেমের শখ, তাই আমাদের বাড়িতে ভালো স্টক আছে।  হইহই করে  কথাগুলো বলে বন্ধু আমার দিকে তাকায়, সম্ভবত কিছু পড়েছে আমার ভ্রকুঞ্চনে, ...চিন্তা করিস না, ওগুলো সব জিরো ক্যলোরী।  ভিডিও গেম খেলাটাতে তো তেমন কোন এক্সারসাইজ নেই!  বুঝলি না? এক ঢিলে দুই পাখি।

--না।  বুঝলাম না বন্ধু। কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যা,  সাচ্চা-ঝুটা ঝুটা-সাচ্চা সব কি আমরা গুলিয়ে ফেলছি? এতো ঠিক মঙ্গলময় বার্তা নয়। আমি দীর্ঘশ্বাস গোপন করি।  জিভকে নকল মিষ্টির স্বাদ পাইয়ে নয় তো ফাঁকি দেওয়া গেল, কিন্তু এই মিষ্টির ব্যপারটা জিভেই শেষ হয়কি? জিভ থেকে যে বার্তাটা মগজ মানে, যাকে আমরা ইংরাজীতে ব্রেন বলি তার কথা মনে রেখেছো তো বন্ধু?  বার্তাটা  পাওয়ার পর শরীরে অন্তত এক প্রকারের হরমোনের ক্ষরণ হতে পারে তার কথাটা মনে রেখেছো তো বন্ধু?  সেদিন বলতে পারিনি। 

মাধুকরীতে আমার এই লেখাটা আজ তাই বন্ধু, তোমায় দিলাম।

বাজারে আরো তো চারটে স্বাদ আছে, তবে কেন মিষ্টির প্রতি এই আকর্ষণ?   ব্যপারটা জটিল নয়, যদি মেনে নিতে পারি যে “মিষ্টি” শুধু মাত্র একটা  স্বাদই  নয়।  কেন মিষ্টির দিকে আমাদের এই অপ্রতিরোধ্য ঝোঁক, তা বোঝার জন্য বেশী দূর নয়,  মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর আগের কথা ভাবলেই চলবে।

জীবাশ্ম বিজ্ঞান অনু্যায়ী প্রায় ২.৬ মিলিয়ন খৃষ্টাব্দে মানুষের পূর্বসূরী Hominids  এর দেখা পাওয়া যায়।   যদিও Neolithic (New Stone age, আনুমানিক  খৃষ্টাব্দ ১০,২০০ সাল) যুগকে মনুষ্য  সভ্যতার  শুরুর যুগ বলা যেতে পারে, বুঝতে হবে, তারও প্রায় ১৯০ হাজার বছর আগের Paleolithic (Old-Stone age)  যুগে আজকের মানুষ বা Homosapien এর আবির্ভাবকাল। সবে বন্য জন্তু জানোয়ারের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য পাথরের ব্যবহার সে শিখেছে বটে, কিন্তু অন্য সমস্ত জীবিত প্রাণীর মতো নিছক প্রাণ ধারণের জন্য মানুষেরও দরকার ছিল খাদ্যের।

তার সেই অস্থায়ী যাযাবরের জীবনে না ছিল কোন বাসস্থান, না ছিল কোন নির্দিষ্ট খাবারের সরবরাহ, না   ছিল বিশেষ একটা বাছ-বিচার করার পরিস্থিতি। তার বেঁচে থাকা, অথবা না-থাকা প্রধানতঃ কার্বোহাইড্রেট তথা গ্লুকোজের ওপর নির্ভর-শীল।  নানা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সেই গ্লুকোজের রূপান্তরিত হয়ে তৈরী হবে এটিপি নামক এক অণু। যাবতীয় কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির মুদ্রা (Currency) এই অণুটি।

অতএব, বিবর্তনের সহজাত কর্ষণে মানুষ বুঝতে শিখেছে কিভাবে পরিশ্রমকে এক রেখে বেশী গ্লুকোজ তথা এটিপি পাওয়া যেতে পারে।  মিষ্টি পাকা ফলটা তাই, কাঁচাটার থেকে অনেক বেশী বাঞ্ছনীয়। এইভাবেই সদ্য জাত শিশুর প্রথম খাদ্য মায়ের দুধে মিষ্টি এবং তা উপভোগ করার জন্য যেমন জিভে তার উপযোগী স্বাদ-কলিকা, ব্রেনেও তেমনি, চিনির সরসতায় নির্দিষ্ট আনন্দানুভূতি এসেছে। এর অন্য প্রান্তে অদূর ভবিষ্যতে অনাহারের সম্ভাবনায় যতটা প্রয়োজন ঠিক ততখানি খরচা করে বাড়তি গ্লুকোজকে ফ্যাটের আকারে গড়ে মজুত করে রাখার আয়োজন হয়েছে।

বন্ধু, বলা বাহুল্য এই  ভাঙ্গা আর গড়ার কাজগুলি করার জন্য যার অবদান অপরিহার্য,  তিনিই সেই সুপ্রসিদ্ধ ইনসুলিন হরমোন জগতের  Swish army knife,  কিম্বা সর্ব-ঘটের কদলী বৃন্ত।  প্রাণী জগতে এই ভদ্রলোক ইনসুলিনটি বাবুটির  আবির্ভাবকাল নিয়ে নানা গবেষণা থেকে বলা যায়, ইনি অতিবৃদ্ধ।

অন্তত পক্ষে মিলিয়ন বছর আগে তো বটেই, কেউ কেউ বলেন তার চেয়েও আরও আগে!

আজকাল দেখেছি অনেকে সাদা চাল, ওরফে ভাত পাউরুটি ইত্যাদি কার্বোহাইড্রেটকে শুধু কার্ব বলে ডাকেন (এবং বেশ ছিঃ ছিঃ কারও করেন)।  ভুললে চলবে না চাল যেমন কার্বোহাইড্রেট, যে কোন ফল, সবজি, ডাল, দুধ , আলু, ভুট্টা, ওটমিল সব কিন্তু সেই একই।  কার্বোহাইড্রেট এক ধরণের অণুর বংশগত নাম।  গ্লুকোজ এই কার্বোহাইড্রেটের গোত্রের সব থেকে সিধাসাদা সদস্য, এবং  এই প্রবন্ধে একেই আমি  সুগার, কিম্বা মাঝে মাঝে চিনি বলি ডেকেছি। নানা বিপর্যয় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে, বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে  কার্বোহাইড্রেট আহরণ করার জন্য এবং তাকে ঠিক মতো ব্যবহার করার এই যে রীতিমতো এটা অখণ্ড (ফেল প্রুফ) একটা সিস্টেমের উদ্ভাবন হয়েছে প্রকৃতিতে, ভাবলে অবাক হতে হয়। অতএব পাঠক, পাকা আমটি মুখে দিয়ে যে সুখ, সেই সুখ এক-দুই দিনের মামলা নয়, বিগত কয়েক শত হাজারের বছরের বিবর্তনের আমদানি। মিষ্টির আকর্ষণ তো শুধু মাত্র জিভেই সীমাবদ্ধ নেই, লাল টুক-টুকে স্ট্রবেরীটিকে তাই চোখে দেখেও সুখ! ওটা মুখে পড়লে ব্রেন যে “আহা আহ্ আহা” বলে জানান দিয়ে উঠবে। তুমি আমি বন্ধু তো নশ্বর মানুষ, মেরে কেটে একশো বছরের আয়ু।

কৌতূহলী পাঠকের জন্য জানাই, পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণীর যাবতীয় দৃশ্য বা অদৃশ্য কাজ করার জন্য প্রয়োজন এটিপির। সাধারণতঃ  গ্লুকোজ (তথা অযৌগিক কার্বোহাইড্রেট) 

থেকে এটিপি উৎপাদন হয় বটে, তবে ফ্যাট এবং সবিশেষ প্রয়োজনে আমাদের শরীর প্রোটিন থেকেও এটিপি উৎপাদন করে, (তার আগে কিন্তু সেই প্রোটিন থেকে কোন প্রকারে গ্লুকোজ বানাতে হয়) তবে সেটা কেন ঠিক অভিপ্রেত নয় আজকের প্রবন্ধে সেই আলোচনায় যাবো না। মিষ্টি শুধু খেতেই নয়, মিষ্টি নিয়ে লিখতেও সুখ।  হ্যাঁ, আধুনিক মনুষ্য-সমাজ ঠিক এই রকম  পরিস্থিতির কবলে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে, রাসায়নিক পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে, আঁখ থেকে হোক, বা  ভুট্টা দানা থেকে হোক, আমরা চিনিকে ঘনীভূত করতে শিখেছি।  আর যেই না তা পেরেছি, আমাদের চেনা প্রায় সমস্ত খাদ্যে আমরা মিষ্টি দিতে শিখেছি, মুখে দেওয়ার মতো কিছু হলেই হলো, রুটি, পাউরুটি, ভাত, ডাল, মাংস, মায় ওষুধ...। A spoonful of sugar helps the medicine go down, in the most delightful way!

আর তার ফল?  শিকারী খুদ ইহা শিকার হো গয়া!

বেঁচে থাকার তাগিদে যে গ্লুকোজ তথা  মিষ্টির দরকার ছিল এবং তাকে ভালো লাগার এবং সংযতভাবে ব্যবহার করার যে উপকরণ বিবর্তনের রাস্তা ধরে আমাদের মস্তিকে, শরীরের বিভিন্ন  অঙ্গ প্রত্যঙ্গে প্রোথিত হয়েছিল তা আজ এক আশ্চর্য আসক্তি হয়ে বহু মানুষের দূর্বিসহ জীবন এবং ক্ষেত্র-বিশেষে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিষ্টি বহু মানুষের কাছে অবিকল সিগারেট বা মদের মতো নেশাকারক এবং জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে সেই নেশায় এনারা আক্রান্ত। বলা বাহুল্য বাড়তি চিনি ইনসুলিনের প্রভাবে ফ্যাট বা বাড়তি ওজনে পরিণত হয়েছে এবং আদমশুমারি অনুযায়ী গত ২০১৫ সালে, সারা পৃথিবীতে বাড়তি ওজন মনুষ্য সভ্যতার প্রায় ৩০ শতাংশকে (২.২ বিলিয়ন)  অসুবিধায় ফেলেছে।তা হলে উপায়?  নাহ,  কোন চিন্তা নেই!

যে বিজ্ঞান গোটা আঁখকে ছিবড়ে করে তার হৃদয় থেকে বার করে এনেছে জমায়িত চিনির স্ফটিক মানিকটিকে,  কিম্বা  ভুট্টার রস থেকে আমাদের মুখে তুলে দিয়েছে গ্লুকোজের ভাই ফ্রুকটোজকে সেই বিজ্ঞান এবার আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে বেশ কয়েক প্রকারের আর্টিফিসিয়াল সুগার, বিগত কয়েক হাজার হাজার বছর ধরে বিবর্তিত হওয়া আমার মগজ যাদের মোটেও চেনে না। 

এই ‘অচেনা” চিনিগুলোকে তাদের চরিত্র অনুযায়ী গোষ্ঠীবদ্ধ করলে, যারা এক্কেবারে রাসায়নিক দ্রব্য তারা হলো Sweet'N Low (Saccharin), Equal, NutraSweet (Aspartame),  Sweet One (Acesulfame potassium)  Neotame (Aspartame বড়ো দাদা)। এর পরে  লাইন দিয়ে এলো Erythritol,  Isomalt, Lactitol,  Maltitol,  Mannitol, Sorbitol,  Xylitol, Splenda (Sucralose)  প্রভৃতি। এরা চিনি কিন্তু চিনি নয়, এরা Sugar alcohol। মোটামুটি চিনির মতো একটা অণু, তার সাথে একটা আরেকটা অণু এমন করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে এদের মধ্যে যে আমাদের সেই সুপ্রসিদ্ধ বয়োজ্যেষ্ঠ ইনসুলিন বাবা-জীবন এদের ছোঁবেনও না, এরা মোটামুটি বাহ্য পদার্থ!  বহু ক্ষেত্রে জোলাপের মতো এদের আচার ব্যবহার।  এর মধ্যে Stevia নামক নকল চিনিটার মধ্যে যদি ও বা একটা প্রাকৃতিক- প্রকৃতিজ ভাব আছে , আসলে কিন্তু ওটিও Stevia rebaudiana  নামক এক গুল্ম-ঝাড়ের পাতা থেকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে বার করে আনা পদার্থ (stevioside)।

তা হলে কি দাঁড়ালো? ভেবে দেখলে ব্যাপারটা অত্যন্ত সহজ। স্বাদের বিচারে এরা চিনি থেকে বহুতর গুনে মিষ্টি  হওয়া সত্বেও বাড়তি চিনি সংক্রান্ত  কোন ঝামেলা থাকছে না।  কেন না এরা তো মোটেও চিনি নয়, তাই ইনসুলিন নিঃষ্করণ হবে না ধরে নেওয়া যেতে পারে। আর কে না জানে ওই ইনসুলিনটাই তো যত্তো  গন্ডগোলের মূলে।  এই সে গ্লুকোজকে কোষের কাছে বিলি করে  তার থেকে এনার্জি তৈরী করতে সাহায্য করছে, এই সে বাড়তি চিনিকে ফ্যাট তৈরী করে লিভারের কাছে জমা রাখতে এগিয়ে আসছে!

তা হলে তো মুস্কিল আসান?  প্রবলেম সল্ভড।

না! ধীরে বন্ধু ধীরে। গবেষণা চলতে চলতে থাকল এবং  প্রথম অন্তরায় দেখা গেল...।

যেমনটি ভাবা গিয়েছিল,  দেখা গেল তেমনটি ঠিক হচ্ছে না। অচেনা চিনির কয়েক জন সদস্য ইঁদুরের শরীরে ইনসুলিন বাড়িয়ে দিচ্ছে!  সত্যি?  কৃত্রিম চিনির সপক্ষে যাঁরা তারা বললেন, --বুঝেছি।  ইঁদুর ব্যবহার করা হয়েছে না? তাই। মানুষ আর ইঁদুর এক নাকি?

আসতে থাকল,  ‘এই কৃত্রিম চিনিটা ওই নকলটার থেকে ভালো’র  বিবৃতি, এবং একের পর এক নকল চিনিতে বাজার ছেয়ে যেতে লাগলো।

এই সব ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে, সেই চাপান উতোর চলতেই থাকল, আর অন্য দিকে, ১৯৮০ থেকে আজকের ২০১৮ সাল অবধি, বাজারে এতো প্রকারের কৃত্রিম চিনি এবং তাদের বিক্রি পুরো মাত্রায় বজায় থাকা সত্ত্বেও থেকে জন-সাধারণের ওজন বাড়তেই থাকল।

কেন? কোথায় বাঁধলও গন্ডগোলটা? উত্তরের আশায় গবেষণা এবং কারণের খোঁজে জল ঘোলা হতেই থাকল। 

জানা গেল, কিছু কিছু নকল চিনি খাওয়ার পর মানুষের শরীরেও ইনসুলিনের ক্ষরণ হয়।  তখন সে প্রথমে খোঁজে তার অতি পরিচিত আসল গ্লুকোজটিকে  (তার পরে হাত বাড়ায় ফ্যাট কিম্বা প্রোটিনের ওপর)। ফলাফল সরূপ- রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম, এবং মগজে ক্ষুধানুভূতির বার্তা। খিদে পেয়েছে! খাবার কই? খাবার চাই! এখুনি চাই।  ফলাফল সরূপ-অতিভোজন।

জানা গেল, নকল মিষ্টি স্যাকারিন কোকেনের মতো বহুপ্রসিদ্ধ নেশার জিনিষের চাইতে বেশি আকর্ষণীয় এবং নেশাকারক, অন্তত গবেষণাগারের কতগুলি ইঁদুর কাছে।২০১৭ সালে মার্চ এবং ডিসেম্বরে প্রকাশিত হওয়া সুস্থ মানুষ নিয়ে করা দুটি প্রবন্ধের (Physiol Behav. 2017, 182:17-26, এবং International Journal of Obesity, 2017 41, 450–457) কথা উল্লেখ করবো।

এই দুটোতেই বক্তব্য যদিও বা সেই ‘আরো গবেষণার প্রয়োজন’ ভাবনাটা আছে, দুটোতেই গবেষকেরা কৃত্রিম চিনির কোন উপকারীতা দেখতে পারেন নি। উল্টে নিয়মিত কৃত্রিম চিনি সেবন যে পৃথুলতা বা ডায়াবেটিস নামক রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে এমন একটা স্টাডির (CMAJ. 2017;189:E929-E939) কথা  বলা আছে একটি  প্রবন্ধে।

আমি নকল মিষ্টির সপক্ষে নই এটা হয়তো এতক্ষণে বোঝাতে পেরেছি।  আর রসগোল্লার বদলে যদি আপেল কিম্বা আমে মিষ্টি রসনা তৃপ্ত হয়, সেই চেষ্টাটাও তো করে দেখা যাক না বন্ধু। জলের মতো পানীয় আর হয় না কি?

বন্ধু, শেষ পর্যন্ত মানুষ অভ্যাসের দাস, কুকির বদলে কতগুলো ব্লুবেরী বা আঙ্গুর মুখে ফেলে দেখলে হয় না?  হয়তো কয়দিনেই সেটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।

কথায় বলে না “Prevention is better than cure”?

পরিশেষে বলি, পাঠক, মিষ্টি খেতে ইচ্ছা হলে মিষ্টিই খান না! আপনি নেশাগ্রস্থ কিনা সেটা আপনারই বিচার। ভালো থাকুন, রসে বশে থাকুন। 

Comments

Top

কবিতা

সুদীপ্ত বিশ্বাস

নদী ও প্রেমিক 

পাহাড়ের বুক চিরে ঝর্ণাটা নামে

অনেক না বলা কথা আছে নীল খামে।

ঝর্ণারা মিলেমিশে হয়ে যায় নদী

শুনবে নদীর গান, কান পাতো যদি।

ও নদী কোথায় যাও? ছল ছল তানে?

দাও নদী দাও বলে জীবনের মানে।

ঘন্টার ঠুন ঠুন, আজানের সুর

নদী জলে মিশে যায় সোনা রোদ্দুর।

ছোট ছোট ঢেউ তুলে নেচে নেচে যায়

সব মেয়ে তাই বুঝি নদী হতে চায়?

ও নদী চলেছ বয়ে, নদী তুমি কার?

প্রেমিকটা প্রাণপণ কাটছে সাঁতার।

সাঁতরে সাঁতরে আরো  কতদূর যাবে?

কতটা গভীরে গেলে তবে তল পাবে?

নদীটা যেই না গিয়ে সাগরেতে মেশে,  

প্রেমিক ঘুমিয়ে পড়ে সঙ্গম  শেষে...

আয় বৃষ্টি ঝেঁপে

বৃষ্টি রে তুই আয় না ঝেঁপে আমাদের এই গাঁয়ে 
দে ছুঁয়ে দে মিষ্টি ছোঁয়া রাঙা মাটির পায়ে।
ওই যে মাটি, মাটির ভিতর শিকড় খোঁজে জল
বল না বৃষ্টি ওদের সঙ্গে খুশির কথা বল।
টিনের চালে অল্প আলোয় যখন ঝরিস তুই
পুকুর ভরে শালুক ফোটে বাগান জুড়ে জুঁই ।
আকাশ তখন সাত রঙেতে রামধনুটা আঁকে 
সেই খুশিতে টুনটুনিটা টুটুর টুটুর ডাকে। 
রামধনুর ওই সাতটি রঙে মন হারিয়ে যায়
অনেক দূরে তারার দেশে মেঘের সীমানায়।
মাছের খোঁজে পানকৌড়ি ওই তো দিল ডুব 
বৃষ্টি নামুক  বৃষ্টি নামুক টাপুর টুপুর টুপ...

আগডুম বাগডুম

গডুম বাগডুম ওই ঘোড়া ছুটল
ভোরবেলা চুপিচুপি ফুলটাও ফুটল।
বাগানেতে টুনটুনি টুই-টুই ডাকছে
গুনগুন মৌমাছি ফুলে মধু চাখছে।
ছপছপ দাঁড় টেনে নৌকারা চলছে

ছলছল কলকল নদী কথা বলছে।

আকাশের মগডালে ওই চিল উড়ছে

চিকচিক রোদ্দুরে পিঠ তার পুড়ছে।

চুপিচুপি মেঘ এসে সূর্যকে ঢাকল

তারপর রেগে-মেগে গুরগুর হাঁকল।

কড়কড় বাজ ফেলে মেঘ যেই থামল

টুপটাপ ঝিরঝির বৃষ্টিটা নামল...

নগ্নতা

 

রাতের কাছে নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই

বরং ও রাত ঘন কালো চাদর মুড়ে

ঢেকে রাখে আমার যত নগ্নতা সব।

ওই আকাশে নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই

বরং আকাশ ছাতার মত মাথার উপর

মুড়ে রাখে সবকিছু  তার বুকের ভিতর।

​জল বাতাসে নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই

তারা বরং একটু বেশি খুশি হয়েই

ফিসফিসিয়ে বলে কিছু বাড়তি কথা।

​নদীর কাছেও নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই

বরং নদী ছলাত-ছলাত ছন্দ তুলে

নগ্ন হয়েই আমায় শুধু নাইতে বলে।

​বন-পাহাড়ে নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই

বরং তারা খুব খুশিতে দুজনেই চায়

আমি যেন খালি পায়ে যাই হেঁটে যাই।

​পশুপাখিওদের কাছেও লজ্জা তো নেই

বরং তারা বন্দুক আর চশমা-টুপি 

এসব ছাড়াই সত্যি কোনও বন্ধুকে চায়।

​এই পৃথিবীর সত্য যারা তাদের কাছে

নগ্ন হতে লজ্জা তো নেই,লজ্জা তো নেই

কারণ সত্য নগ্ন হতে লজ্জা পায় না।

​মানুষ দেখে নগ্ন হতে লজ্জা করে

মানুষগুলো লুকিয়ে রাখে নিজের মুখও

তার শুধুই মিথ্যে বলে, মুখোশ পরে।

​এই সমাজে নগ্ন হতে লজ্জা করে

গোটা সমাজ মিথ্যেবাদী, ভ্রষ্টাচারী

নগ্নতা আর সরলতার সুযোগ খোঁজে।

 ভালবাসা যদি ফিরে পাই

তবে তো নাচবো ভাই

তাধিন তাধিন...

পোড়া বিড়ি দেব ছুঁড়ে ফেলে।

ফেলে দেব তামাকের শিশি

ছেড়ে দেব সব ছাইপাঁশ

তেতো জল, বিলিতি বা দিশি।

ভালবাসা যদি ফিরে পাই

তবে তো গাইবো ভাই

গলা ছেড়ে যা আসবে মনে

বাতাসকে বলে দেব আমি কত সুখি 

আকাশকে বলে দেব আমি কত সুখি 

পাহাড়কে বলে দেব আমি কত সুখি 

তারাদের বলে দেব আমি কত সুখি। 

ভালবাসা যদি ফিরে পাই

তাহলে তো  ভাই

হয়ে যাব ফুল, পাখি, নদী।

ভালবাসা ফিরে পাই যদি -

নরম পালক নিয়ে

রামধনু রঙ মেখে এসে

বয়ে যাব তির-তির,

পাহাড়ের দেশে।

ভালবাসা যদি ফিরে পাই

তবে তো বাঁচবো ভাই

সমস্ত জীবন।

প্রতিটা মুহূর্ত বেঁচে বেঁচে

প্রতিটা শরৎ বেঁচে বেঁচে

প্রতিটা বছর বেঁচে বেঁচে

প্রতিটা দশক বেঁচে বেঁচে

তবুও তো ভরবে না মন।

বলে যাব, 'বড় ছোট এ জীবন।'

বাক্যহারা

বলা কথারা আটকে রয়েছে চোখে

অবুঝ মনের বোবা কান্নার মত

আজকে এখন পাথর চোখেতে শুধু

হারানো আবেগ পুরানো দিনের ক্ষত।

​বুঝলে না কিছু বুঝতে চাওনি বলে

সুরের ইশারা সুরকার শুধু জানে

দূরের বাতাস দূরে চলে যায় আরও

মন শুধু বোঝে হারানো গানের মানে।

​এসেছিল যেটা একদিন নিঃশব্দে

বাতাসেও ছিল চুপিচুপি আসা যাওয়া

রূপকথা দেশে হারানো বিকেলগুলো

সবটাই যেন মিথ্যে অলীক মায়া।

জীবনের খাতা ভাসানোর পর পর

দুচোখ ভেজায় অঝোর অশ্রুধারা

অল্প দুঃখে সশব্দে কেঁদে ওঠে

গভীর দুঃখে ঠোঁটেরা বাক্যহারা

 

Comments

Top

কবিতা

প্রসেনজিৎ ঘোষ

"আমি আর লিখতে পারি না"

মি আর লিখতে পারি না মণি!

তোর ‌জন্য ভালো ভালো কবিতা-

আর আসেনা আমার কলমে।

জানি তুই আমার কবিতা ভালোবাসতিস

এলোমেলো যাই লিখি না‌ কেনো।

ঘুম চোখে ও বারবার পড়ে

ঠিক ভুলটা ধরিয়ে দিতিস।

আর সে সব হয় না এখন।

জানিস আমিও খুব মিস্ করি

সেইসব দিনগুলো...

যেদিন প্রথম তোর ‌জন্য কবিতা লিখেছিলাম,

খুব মনে আছে.. একদম বাজে হয়েছিল।

তবুও একমাত্র তুই ই প্রশংসা করেছিলিস

খুব বাজে হয়েছিল জেনেও।

জানিস মণি আজ খুব মিস্ করি তোকে

যখন ই একা থাকি।

কেও আর আজ‌ তোর মতো

সারাদিন বকবক করে না

প্রতি সপ্তাহে ঘুরতে যাওয়ার ও‌ আর কেউ নেই।

আমি এখন দামোদর এর পাশে

পড়ে থাকি একা হয়ে।

সময় ও কাটে ... মলিন হয়ে।

আর স্মৃতিগুলো জড়িয়ে ধরে

আস্টেপিস্টে।

কাজের ফাঁকে গোধূলি বেলায়

নানান জিনিস মাথায় আসে

কখন কখন খুব ই ইচ্ছে করে

আবার তোর জন্য কবিতা লিখি

কিন্তু সত্যি আর আমি লিখতে পারি না

তোর ‌জন্য...

মণি আমি আর লিখতে পারি না।।।

Comments

Top

 

কবিতা

সৌমিলি ঘোষাল

 

বছর দশেক পর

ছর দশেক পর

আমি ঠিক এমনই একটা দিনের কথা ভেবেছিলাম,

যেদিন বাতাসে ভেসেছিল আম্রমুকুলের মৃদু সুবাস,

কুসুম বনে উঠেছিল ঢেউ,

নবজাতকের আগমনের তীব্র উন্মাদনা ছিল মনে,

উথাল পাথাল ছিল -

দখিন দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা আমার আঁচল,

আমি ঠিক এমনই একটা দিনের কথা ভেবেছিলাম

যেদিন ছিল তোমার আসার কথা।

তারপর হয়ে গেলো বছর দশ -  বারো,

মাঝে তিস্তা তোর্সা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল,

ধূসর স্মৃতিতে লেগেছে সময়ের প্রলেপ,

কষ্ট ধুয়ে জমেছে একরাশ অভিমান,

কিন্তু ফিরে আসার কথা ভাবনি তুমি।।

মন

ই সুদূরে যায় হারিয়ে

বিস্তৃত বালুরাশি

ওই আকাশে ঐ ছুয়ে যায়

একটু নীলের আভা

হাত বাড়িয়ে যেই ছুঁতে যাই

বাঁধন হারা ওই সীমানা

অমনি সেথা যায় হারিয়ে

এক নিমেষে ছড়িয়ে ধুলো

মেঘের ফাঁকে ফাঁকে

জন্ম যেথা মৃত্যু সেথা

যুগান্তরে যায়না বৃথা

সেই সীমাতে নিমেষ হারা

পাগল পারা মন।।

বন্ধু তুই

তুই-ই আমার মনের কথা,
কান্না হাসির গান
তুই -ই আমার সুজন মাঝি ,
কুহুদের কলতান
তুই- ই আমার চাঁদের আলো,
জোৎস্না মাখা প্রহর
তুই -ই আমার অতলান্ত,
অনুভূতির অবসর।

অসমাপ্ত

মি বেসেছি ভালো ওই নীলদিগন্তের, রামধনু মাখা ওই স্বপ্নগুলোকে।

আমি বেসেছি ভালো ওই একরাশ ধুলো মাখা স্মৃতিগুলোকে,

আমি থাকতে চেয়েছি একা  -

হৃদয়ের আঁকাবাঁকা

গোলক ধাঁধার ওই শুকনো গলিতে

আমি স্পষ্ট দেখেছি ওই

সেতারের সুরে বাজে

মলিন যন্ত্রণার নীরব প্রকাশ।

তাই এসেছি ফিরে আমি

তবু বারে বারে এই

জীবনের খাতায় গল্প লিখবো বলে

হয়ত থাকবো একা

দাঁড়িয়ে থাকবো তবু,

দেখবো আমায় ফেলে

এগিয়ে যাচ্ছে সব

চোখ মেলে তবু আমি

দেখবো দুচোখ ভরে

নতুন পৃথিবীটা নতুন করে।

Comments

Top

কবিতা

যশমন ব্যানার্জী

উইনচেস্টার, ভার্জিনিয়া 

 

দার্জিলিং


কুয়াশায় নির্জন বাঁকা পথ
হাজার বাঁক ঘুরে ঘুরে
জড়িয়ে ধরে ঘোলাটে সবুজ পাহাড়
ভোরে চান করে ঠান্ডা তুষার কনায়
ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘ চোখে মুখে ছুটে আসে
কথা বলা নিশ্বাস সেই ধোঁয়াতেই শান্ত
অল্প অল্প করে বেরিয়ে আসে মানুষ বাড়ি ঘর
কেমন যেন অচেনা স্বপ্ন কেটে গেল শোরগোলে
হোল্ডঅল নিয়ে স্টেশনে গরম চা
এবার দেখব নতুন স্বপ্ন কিছুদিন
তুমিও কি বদলেছ? দার্জিলিং?

কখনও রবীন্দ্রনাথ

কটা মেটে রোদ জড়িয়ে আছে শহর
ধোঁয়ায়, শব্দে ভরে গেছে উপেক্ষিত সূর্যাস্ত
ধুঁকতে ধুঁকতে চলেছে হাজার কলেবর
এদিক থেকে ওদিক দিকভ্রানত উদ্দেশ্যহীন
অপ্রয়োজনের জীবন এখন জীবনমুখী সাজে
প্রিয়জন আর প্রয়োজন নেই ব্যস্ততায়
নিজের জন্যেই টিঁকে থাকার তাগিদে
ধুঁকতে ধুঁকতে চলেছে হাজার কলেবর
এসবের মাঝে ভুল করে চোখে পড়ে
ফুল আকাশ আর কখন রবীন্দ্রনাথ

Comments

Top

কবিতা

ধীমান চক্রবর্তী

আকাশ

ছোটোবেলায় আকাশখানা..
ছিলো অনেক বড়ো,
বড়োরা সব বলতো তখন..
"বড়ো হয়ে ওঠো!"
উঠতে উঠতে ছুটতে ছুটতে..
বড়ো হবার পরে,
ছোটোবেলার বড়ো আকাশ..
হঠাৎ বড়ো ছোটো!
ইচ্ছেমতো ছোটাছুটির..
অবাধ ছেলেবেলা,
জানি না কোন ছোটার টানে..
নিলো কখন ছুটি!
ছুটির ঘন্টা মনের কানে..
হঠাৎ গেলো বলে..
"চল না আবার
..ছেলেবেলার আকাশ হয়ে উঠি!"
আকাশ হবার ইচ্ছেটাকে..
অনেক হিসেব কষে,..
.. আটকে দিয়ে সামলে চলি..
..বড়ো হবার ঠেলা,
বাচ্চাগুলোর বড়ো হবার..
..ইচ্ছে ডানা মেলে..
উড়তে থাকুক..
তোমার আমার সবার ছোটোবেলা!!

আয় বৃষ্টি

জানিনা আজ তুমি কেমন আছো..
আজকে কীসের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচো..
জানি না! তাই জানতে চাই না আর!
তবু হঠাৎ জানতে ইচ্ছে করে..
দিশাবিহীন ছুটতে থাকার ভিড়ে..
সব পাখি কি এলো বাসায় ফিরে?
আলতো পায়ে নামছে অন্ধকার!
জানতে চাওয়া! কী আসে যায় তাতে?
ব্যস্ত জীবন বইছে নিজের খাতে..
দেখছি তাকে জমকালো আয়নাতে..
নিজের মাপে বানিয়ে তোলা ফ্রেমে!
ভিতরবওয়া শুকিয়ে যাওয়া নদী..
রূপকথারা বৃষ্টি হয়ে যদি
জল ভরে দেয়! আপত্তি নেই তাতে..
কাঙাল জীবন উঠুক ভরে প্রেমে!
ছুটতে থাকা সবার ক্লান্ত মুখে..
চাওয়া পাওয়ার হিসেব-জ্বলা বুকে..
চাইছি! কেবল চাইছি যে বুক ঠুকে..
ভালোবাসার বৃষ্টি আসুক নেমে!!

শ্রাবণ

কাল সারারাত ধরে.. 
আমার ঘুম আসেনি চোখে,
গাছের পাতায় জলের ফোঁটা..
পড়ার শব্দ শুনে..
সোঁদা মাটির গন্ধমাখা মনে..
সারা আকাশ আমায় নিয়ে..
বেরিয়েছিলো খুঁজতে শুধু তোকে!

নাম না জানা ফুল..
যেখানে নিজের মতো ফোটে,
মেঘেরা সব দলে দলে
নতুন কিছু করার তালে..
জানিনা আজ কীসের টানে..
সেই আকাশেই জোটে!

যে আকাশে উড়তো আমার..
ছোটোবেলার স্বপ্নমাখা ঘুড়ি,
স্বপ্নধোয়া টুকরো নিয়ে..
হেলাফেলার রং মাখিয়ে..
স্মৃতির পাতা যত্ন করে জুড়ি!

সেই পাতাটি দিয়ে আমার..
নৌকোখানা ভাসিয়ে দিলো মন,
বুকের ভেতর অঝোর ধারায়..
জলের পড়ায় পাতার নড়ায়..
ভেজাও আমায় বাইশে শ্রাবণ!!

 

Comments

Top

 

কবিতা

ভাস্কর সিন্হা

দোহা, কাতার

স্মৃতিসুধা

 

তালডিংলি পেরিয়ে, ময়নাগুড়ি এড়িয়ে, তিস্তাপাড়ের মংপোতে

হয় দেখা।

ইল্শেগুড়ির মতো বৃষ্টি ছিলো সেসময়।

মূর্তির জলে মিলিয়ে যখন যায় চাপরামারি আর গোরুমারার আরণ্য়িক কুহকতা।

হাজারো পক্ষীর ঐক্য়তানের আবেশ, মনভরা রঙ্গিন সে উচ্ছ্বাস।

টিক, শাল, শিমূল, শিরীষ আর খয়েরের উদ্দামতা পেরিয়ে,

বিষহারা পালায় রাজবংশী নৃত্য় শেষে, মাগুরমারির করমে।

বন্য়েরা বনেই আনন্দিত, দেখতে দেখতেই দামাল ঐরাবতে বস্কাদ্বার

যায় যে পেরিয়ে।

চালসা- খুনিয়া- ঝালং পথে বিন্দুপ্রান্তে সিন্ধুমাখা

কাঞ্চনজঙ্ঘা।

পুণ্য়ব্রতা তোর্সায় অবগাহনে সিদ্ধপ্রাণা।

চায়ের মেজাজী

আবেশ বয়ে চলে ভিজে, শীতে মোড়া ইংরেজী বাংলোয়।

প্রথম প্রেম

শুরুর পথে- প্রথম কর্মে আসা, এইস্থানেই।

ভোলার নয় লখুয়ার

শীতের ক্ষণেক রোদে নিস্পাপ সেই হাসি।

কেবল সাহেবের জুতাছাপ

শুকিয়ে যায় যে তার পিঠে।

আর নাম না জানা এক সুবেশী নেপালী গুড়িয়ার

উচ্চকিত হাস্য় খালি ডানা ঝাপটে নামে সমতলের মেদুর পথে।

মরুমহীরুহ
 

শ্চিমের না কি, উত্তরাগত সেই হাওয়া?
সব এলোমেলো, খেঁজুরে পাতার
অবিন্যস্ত রূপে পাওয়া।

থমকে এসে দুয়ারে
শুষ্ক নিম ডাল, আধো ভঙ্গুর, হতভাগ্য পাতা।
উত্তরের সাগর মুকুটে, পূর্বে জনপদ,
এই মরুদেশে পথহারা তাই, ঢুঁড়ে মরেছি 
যোজন বিস্তর।

খুঁজে ফিরি সুবর্ণ মরীচিকায়
ঘুমে- আধোভ্রমে, গৃহস্থ মোরগের সুপ্রভাতীয় 
বন্দনায়।

কুয়াশাময় সেই প্রহেলিকা-
আদ্য়ন্ত নগ্ন যে, বাহুডোরে আগলে রেখেছে
নগ্নিকারে।

রসায়নে সিক্ত হয়ে জন্মিছে আখ্যান-
প্রেমে, আবেগে, আবিষ্ট বীজ মন্ত্র যে মহীরুহতার। 
শাখা-প্রশাখায় আকাশ চুম্বিতে,

ধর পাকড়ে
চন্দ্র-তারা।

মূলস্থ সজীবতার সন্ধানে, গহন মৃত্তিকায় আপনহারা।

বিরস পরিভ্রমণ
 

শুভাকাক্ষী হে, অতি বিরস এ চলা।

কলাপত্রে পাত পেড়ে দুই দলা কিছু জ্বালা।

মদিরতার মোহ নেই যে সুলভ সুরায়-
আছে যা বিবশতায়, স্মৃতিবিবাগীতায় বা অন্তে রিক্ত বিবমিষায়।
স্বার্থকামী, স্বভূমে গগনব্যায়াপী লালসার হোমযজ্ঞে নিঃস্বের আহূতি।
প্রোজ্জ্বল যেন শীর্ষে মুকুটখানি আর অপরিবর্তনীয় সুশ্রী
কর্মকুন্ঠ সেই সিংহাসনী।

নিষ্প্রভ রিক্তের চকিত পশ্চিমা নিঃশ্বাস, 
চতুর্দিকে হারায়ে গেছে যে কবে।

ক্লেদাক্ত, মৃতপ্রায়, সর্বহারাগন উচ্ছিষ্টে খুঁজে 
মরে যে জীয়নকাঠি।

চার্চিলে হায়, আকাল কখনোই দেখে নাই কালাপানির পাড়ে।
কোন উপায়ে এই বাঁচা?

সহজিয়া আলো, বাতাসে আর জলের সন্তরণে বাঁচা যে 
অভিসম্পাতময়, পরিশ্রুতের সুদৃশ্য বিপননে দীন চেতন গেছে যে হারায়ে।
ফুরিয়ে যেতে- যেতে, প্রান্তিক হতে- হতে,

খামের রোগে মাথা কুটে মরা;
হয়তো বা মরিচঝাঁপির ছাউনিতে দুঃসহ এক দমবন্ধের দানবীয় লীলা।
জালিয়ানওয়ালাবাগ বলে যে, বা ইহুদিবস্তির নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ-
মানুষে- মানুষের সাংঘাতিক শত্রু এই শুধু নিশ্চিতরূপে বলা।

সাঁঝের পলাশ  

ফুটপাত জুড়ে ঝেঁপে নামে সাঁঝ,

আঁধারঘিরে ধরে দিবালোকের গ্লানি।

টিমটিমি জ্বলেতারাবৎ কিছু বাতি।

দগ্ধোদর কৈশোরের জ্বলৎস্বপ্ন মিশে যায় কুয়াশায়, 

পোড়া ছাই ছন্নছাড়া দিগ্বিদিকে,

যেদিকে খুশী- হাওয়ায় ঘুড্ডি ওড়া। 

কিছু দলা ভস্ম জেদী, আঁকড়ে থাকে যেন পুঁটুলির পাশে।

দুদিনের এই রাগ, ক্রোধ, আবেগ প্রশমিত যবে রমণে, লোভে, হীনতায়- সাধারণ মানে। 

দুহাতে কুশ্রীতা মেখেছি কতো?

জানে কি এক ভারতেই শত কোটি ভারত?

নিরন্নের, বাদীর- বিবাদীর, জাতির- বেজাতের, ধর্মের- অধর্মের, উচ্চ- নীচের, ভাবের- অভাবের, দুঃখের- সুখের-কারে ছাড়ি- কারে যে ধরি?

হায় রে, সব যে বসে আপনার সনে।

কখনো নিজের তরে তোমারে মানিনি।

ছিনিয়ে নিয়েছি-যত কুরুবিন্দ, ফিরাই দিয়াছি তব শুধু কুরব আর কুরন্ড। 

হিজিবিজি 
 

রস সবুজাভ ডালে বয়স্থ পাতার কারিকুরি,
ইষৎ সবুজ বোঁটায় হলুদ ব্যাপ্তিতে মৌমাছির মধু চুম্বন।
বাউন্ডুলে সূর্যিজ্য়াঠা যবে পশ্চিমে দেবে পাড়ি, সধবার একাদশীতে
তবে চন্দ্রিমার ব্য়াকুলিত সম্ভাষণ।

সিক্ত জমির বীজে ফসল 
দিয়েছে উঁকি, গোলাখানায় আজ আর নেইতো কিছুই ফাঁকি। 
পেলব হস্ত ও শুভ্র শঙ্খগুলি যেন হর্ষিত কমল বনে, দূরাবাসে এসে
ক্ষণিকের স্মৃতিপটে অবিরল ছবি জন্মায় যে মনে।

আবছায়ারা খালি কথাই বলে ভোরের রাতে এসে।

আধোভ্রমে, আধোঘুমে, অধরা, নাধরা বাক্যবুলি কোথায় হারায় যে হেসে।

বেড়ার কোন গলে,
কার্নিশের ফাঁক পেলে, শীত ঘিরে আসে, শিশির ঝরে পড়ে সঙ্গোপনে। 
ঘাসের বুকে নিম ফুলের সুঘ্রাণ, ইতি- উতি ঝরে পড়া, রহস্যের আবিলতা।
মিলিয়ে যায়, হারিয়ে যায় অজানা বুনো পথের মতো।

চকিত ঝোড়ো আবহাওয়ায় যদি ফিরে আসে কিছু হারানো বাস, ধূলিধূসর কিছু ব্যথা।

নিজস্ব প্রাপ্তিযোগের স্মৃতি- সততই মেদুর।

খুঁজে ফেরা যার রঙমশাল আর হারানো সুর।

Comments

Top

 

কবিতা

সন্দীপ ঘোষ

বাঁকুড়া, পঃ বাংলা 

কবিতা

শান্তনু বসু

 

রক্তচক্ষু
 

ক্তচক্ষু মুদিলে ক্ষণিক 
শান্তি একটু শান্ত নীড়ে।

মুদিত নয়নে ভাবিয়া ভাবিয়া সারা,
বিনা কবচে কবে লুটাইয়া দিবে উন্মত্ত কালবৈশাখী ঝড়ে।

আসিছে উৎসব দেখিছে জনতা, 
কি হয়! কি হয়! কি হয়!
প্রকৃতির মাঝে খাদ্য খুঁজিয়া মরে,
না-- আজ আর হয়রান নয়।

আসিছে উত্সব, আসিছে উত্সব---
তন্ত্রে তন্ত্রে হইতেছে ধ্বনি,
সঠিক ঠিকানায় পৌঁছিয়া যাইবে 
অনেকেই তাহা জানে।

অভিনব ভাবনার নাই কোন শেষ,
কলিকালে  আছে তা যে,
নিশানা ঠিকানা নিশানায়
হইলে অনুর্ত্তীন,
রক্তচক্ষুর দহনে পুড়িবে ঘিলু---

ঘিলু আর রহিবে না মগজে।

ছন্নছাড়া

প্রয়োজন আছে কবিতার,

তাই চাইনাও দিতে ছুটি

লিখতে পারিনা বলেই তো

গদ্য নাচায় ভ্রুকুটি।

মন চায় দিতে মতামত

ভয় দুচোখে "শমন" এর,

দুঃস্বপ্নের কারাগারে ঠাঁই মননের

সম্ভ্রম মাটিতে লুটোপুটি।

স্বপ্ন গিয়েছে ভেন্টিলেশনে

কোমায় রয়েছে বিবেক,

তেল মাখানোর দংশনে ক্ষত

বিক্ষত হাতে ভাগ্যের কাটাকুটি !

অর্থ লালসা ভোগ পুঁজিবাদে

সাজিয়েছে ডালি যৌবন,

মান সম্মান নিয়ত বিকোয়

দালাল চালছে গুটি।

শিক্ষক নামে ব্যস্ত মিছিলে

হাতে শিক্ষার বাটি

বন্ধ দরজা জোর তরজায়

বিদ্বজ্জন পরিপাটি।

দেশ গড়ার মহান কার্যে

যাতে না ঘটে দোষ ত্রুটি,

গোয়েন্দা গিরিটা ছেড়েছে প্রদোষ,

ফেলুদারা করে রাজনীতি।

Comments

Top

প্রবন্ধ

রবীন্দ্রনাথ ও কর্নেল মহিম:

বন্ধুতা-বিরোধ-বন্ধুতা

দিলীপ মজুমদার

বেহালা, পর্ণশ্রী, কলকাতা

 

র্নেল মহিমচন্দ্র। রাজা নন, কিন্তু ত্রিপুরা রাজপরিবারের এক প্রভাবশালী পুরুষ। বর্ণবন্ত চরিত্র তাঁর, তুলনাহীন ব্যক্তিত্ব। সাংবাদিক হরিশ মুখার্জীর মতো প্রথাগত শিক্ষা ছিল না তাঁর অথচ তাঁরই মতো ইংরেজি ভাষায় অনন্য পারদর্শিতা। দুজনেই স্বশিক্ষিত এবং বিচক্ষণ। দুজনেরই প্রখর রাজনৈতিক জ্ঞান। তবে হরিশ ছন্নছাড়া, মদ্যাসক্ত; কর্নেল মহিম হিসেবি ও স্থিতধী।   

আগরতলার ঠাকুর পরিবারে ১৮৬৪ সালে মহিমের জন্ম। ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বয়সের পার্থক্য মাত্র তিন বছরের। মহিমের পিতা ভারতচন্দ্র ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের রাজপরিষদ, মাতা সাবিত্রী রানি ভানুমতীর সহচরী। মহিমচন্দ্রের জীবনে সাবিত্রদেবী ছাড়া আর যে নারীর গভীর প্রভাব পড়েছিল তিনি তাঁর জ্যাঠাইমা। মহিমের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কুমিল্লা শহরে। তারপর তিনি চলে এলেন কলকাতার হেয়ার স্কুলে। কিন্তু প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না তিনি। কারণ অকৃতকার্য হলেন অঙ্কে। প্রথাগত লেখাপড়ায় ইতি এখানেই। অঙ্ক নয়, মহিমের রুচি ও অনুরাগ সাহিত্যে। তাই বলেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব এবং সেই সূত্রে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অনায়াস যাতায়াত, রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য। সাহিত্যপাঠ ও সাহিত্যালোচনায় হৃদয়কে রঞ্জিত করা। তবু বৈপরীত্য ও ব্যতিক্রম ছিল। রসের জগতে বিচরণ করেও মহিম রাজনীতি ও প্রশাসনিক ক্রিয়াকর্মের পাঠও গ্রহণ করেছিলেন। নবাব আবদুল লতিফ চিনতে ভুল করেন নি তাঁকে। তিনি মহিমকে নিয়ে এলেন লাটসাহেবের দপ্তরে। নিযুক্ত করলেন আবগারি দপ্তরের পরিদর্শকের পদে।ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র অনেকদিন ধরে নীরবে লক্ষ্য করছিলেন মহিমকে। ভাবছিলেন আর একটু পরিণত হলে বলা যাবে। কিন্তু যখন দেখলেন সরকারি চাকরিতে যোগদানের সিদ্ধান্ত পাকা হতে যাচ্ছে, তখন ডেকে পাঠালেন মহিম-চন্দ্রকে নিযুক্ত করলেন তাঁর এ ডি সই পদে । সেই থেকেই মহিমচন্দ্র ত্রিপুরা রাজসভার সঙ্গে যুক্ত। সুদক্ষ প্রশাসক, নানা বিরোধের সেতু, নানা সংকটের পরিত্রাতা এবং কিছু ষড়যন্ত্রের শিকার।

ত্রিপুরার রাজপরিবারে যোগদানের কিছুপূর্বে মহিমচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়। তরুণ রবীন্দ্রনাথের ‘ভগ্নহৃদয়’ পাঠ করে আপ্লুত বীরচন্দ্র রাধারমণ ঘোষকে দূত হিসেবে পাঠিয়ে ছিলেন কবির কাছে। আপ্লুত রবীন্দ্রনাথ লিখলেন:
“মহারাজ তাঁকে সুদূর ত্রিপুরা হতে বিশেষভাবে পাঠিয়েছিলেন কেবল জানতে যে, আমাকে তিনি কবিরূপে অভিনন্দিত করতে ইচ্ছা করেন।”
রাজা ও কবির পরোক্ষ পরিচয় ঘটল যখন মহিম তখন কলকাতায়। মহারাজের নির্দেশ এল তাঁর কাছে। মহিম জানাচ্ছেন:
“বাংলায় প্রকাশিত নতুন গ্রন্থ মহারাজ বীরচন্দ্রের নিকট পেশ করিবার ভার আমার মতো কিশোর সেবকের উপর অর্পিত ছিল, সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের সহিত আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ক্রমে বন্ধুত্বে পরিণত হয়।” বীরচন্দ্র মাণিক্যের উত্তরাধিকারী কে হবেন তা নিয়ে দ্বন্দ্ব সংকট সৃষ্টি হয়। শেষপর্যন্ত রাধাকিশোরই রাজপদ লাভ করেন। মহিমছিলেন রাধাকিশোরের পক্ষে। রাধাকিশোরের রাজত্বকাল ছিল ১৮৯৭-১৯০৯। এই বারো বৎসরের সময়সীমায় রবীন্দ্রনাথ রাজার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ট হয়েছেন, তাঁর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন, নানাবিষয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেছেন, প্রশাসন নিয়ে মাথা
 

ঘামিয়েছেন। মহিমচন্দ্রের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই সূত্রপাত হয়েছে বিরোধের।ত্রিপুরা রাজ্যে তখন শোচনীয় আর্থিক অনটন। তারই মধ্যে বন্ধু রবীন্দ্রনাথের আবেদনে রাজা অন্ধকবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য মাসিক ১৫ টাকা বৃত্তি বরাদ্দ করেছেন, বিলাতে গবেষণার জন্য জগদীশচ্দ্র বসুকে ১০ হাজার টাকা দান করেছেন, ‘বঙ্গদর্শন’ পুনঃপ্রকাশের জন্য আর্থিক সহায়তা করেছেন। এসব ব্যাপারকে মহিমচন্দ্রের অবিমৃশ্যকারিতা বলে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
প্রশাসনিক ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের উপর রাধাকিশোরের আত্যন্তিক নির্ভরতা মহিমচন্দ্রের পছন্দ হয় নি। রবীন্দ্র ও মহিম দুজনেই রাধাকিশোর তথা ত্রিপুরার মঙ্গলাকাঙ্খী ছিলেন কিন্তু সেই মঙ্গলসাধনের পথ সম্বন্ধে দুজনের মতের পার্থক্য ছিল।
১.  রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন রাধাকিশোর মহৎ মানুষ, কিন্তু  প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ। তাই উপযুক্ত মন্ত্রী নির্বাচন করে তাঁর হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদান করা প্রয়োজন।
মহিমচন্দ্র কিন্তু রাজার কর্তৃত্ব খর্ব করার ব্যাপারে একান্তভাবে বিরোধী ছিলেন।
২. রাজকার্য পরিচালনার ক্ষেত্র বিশ্বস্ত বহিরাগতের উপর নির্ভর করতে বলেছিলেন।
মহিমচন্দ্র কিন্তু এক্ষেত্রে ত্রিপুরার ভূমিপুত্রকে প্রাধান্য দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন।
সম্ভবত মন্তী নিয়োগের ব্যাপারে সম্ভবত মহিমচন্দ্রের একটা অভিমান ছিল রবীন্দ্রনাথের উপরে। মহিমের যোগ্যতা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের উচ্চ ধারনা ছিল। তিনি লিখেছিলেন, ‘ ইহা নিশ্চয় বুঝিয়াছি মহিমের বুদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত ও তীক্ষ্ণ, তাঁহার ধারনা শক্তি প্রবল এবং ত্রিপুরা রাজ্যের হিত সম্বন্ধে তাঁহার যে উৎসাহ নাই তাহা নহে।’ অথচ মহিমকে মন্ত্রীপদে নিয়োগের সুপারিশ করেন নি তিনি। 
মহিম সম্বন্ধে অভিযোগ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে ভাষা প্রয়োগ করেছিলেন সেটাও মহিমের অভিমানের কারণ হতে পারে। মহিমকে লেখা কবির দুটি চিঠির কিছু অংশ:
      ১. ‘তুমি মহারাজের অনুগ্রহে পালিত, ত্রিপুরার এই অবস্থায় তুমি কি সর্বনাশের স্রোত ঠেকাইবার জন্য একাগ্র মনে চেষ্টা করিয়াছ? নাকি স্বার্থান্বেষী.......’
      ২. ‘লোকের সাধু উদ্দেশ্যে তোমাদের বিশ্বাস নাই—সকলকেই তোমরা সন্দেহ চক্ষে দেখ-মহারাজের স্বাভাবিক ঔদার্যকে তোমরা আচ্ছন্ন করিয়া আছ।’

রাজা রাধাকিশোরকে লেখা এক চিঠিতেও রবীন্দ্রনাথ মহিমচন্দ্রের বুদ্ধিমত্তা স্বীকার করেও বলেন, ‘কিন্তু সেই সঙ্গে তাহার দুর্বলতা আছে। সে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ একেবারে ভুলিতে পারে নাই, এই আমার বিশ্বাস।’
মহিমচন্দ্রের সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের এই ভ্রান্তির মূলে ছিল ত্রিপুরার বাঙালি কর্মচারীদের বিকৃত তথ্য পরিবেশন। মহিম সম্বন্ধে ঈর্ষান্বিত ছিলেন তাঁরা। রবীন্দ্রনাথের কান ভাঙানোর কাজও করে যাচ্ছিলেন ক্রমাগত।
শেষপর্যন্ত রাধাকিশোরই রবীন্দ্রনাথের ভ্রান্তি দূর করেন। বিরোধের পরে ফিরে আসে বন্ধুতা। রবীন্দ্রনাথ রাধাকিশোরকে লেখেন: 
“মহিম সম্বন্ধে আমার যে ধারণা হইয়াছে তাহা সম্ভবত অমূলক এবং সেই অমূলকতার সম্ভাবনা মনে রাখিয়াই তাহার সহিত বন্ধুভাব রক্ষা করা আমার পক্ষে কঠিন হয় না।.... মহিম সম্বন্ধে আমি নিজের কাছে নিজে লজ্জিত হইয়া আছি।”

Comments

Top

 

গল্প

বিবাহ উৎসব

জয়দীপ চক্রবর্তী

বেলঘোরিয়া, কলকাতা

রিমোট কন্ট্রোল চিরদিন একজনের হাতে থাকে না। ছেলেকে এক সময়ে খেলার মাঠ থেকে টেনে প্রাইভেট টিচারের পাঠ নিতে বাধ্য করেছে যে বাবা, সেই বাবাকেই এখন ছেলের কথা মেনে শক্তিগড়ের ল্যাংচা ছেড়ে নিম-বেগুন বা উচ্ছের তরকারি খেতে হয়। নিজের শরীরের ভালোর জন্য সে নয় খাওয়া যায়, কিন্তু নিজের একমাত্র ছোটো-মেয়ের বিয়ে কখনই পঞ্জিকা না মেনে দেওয়া যায় না। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়ার জন্যও যুক্তি খাড়া করল ছেলে সৌরজ্যতি।

- পঞ্জিকা মেনে বিয়ের ডেট ঠিক করা যাবে না বাবা। তাতে অসুবিধে অনেক। বিয়ের ডেটটা আমাদের সুবিধে মতই ফেলতে হবে।

- বিয়ে আবার নিজেদের ইচ্ছেমত ডেটে হয় নাকি? কালে কালে আর কত শুনবো!

- অবাক হওয়ার কিছু নেই বাবা। বিদেশে এই কনসেপ্টেই দুর্গাপূজা হয়। ওদেশে পাঁজি মেনে চার-পাঁচদিন ধরে দুর্গাপূজা করার কারো সময় নেই। যে ডেটেই পূজা পড়ুক না কেন, ওরা উইক এন্ডেই করে। তাছাড়া দিন, ক্ষণ, লগ্ন মেনে বিয়ে হলেই যদি সবার ম্যারেজ লাইফ সুখের হয়ে যেত, তবে  এতো ডিভোর্স হতো না, আর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এতো ঝগড়া বিবাদও সব সময় লেগে থাকতো না।

- তাহলে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করলেই হয়। এতো ঘটা করে নিয়ম মেনে বিয়ে দেওয়ার কি দরকার আছে।

- না,না। রেজিস্ট্রি ম্যারেজে ভিডিও শুটের স্কোপ কোথায়? তাছাড়া মাম্পির বিয়ে বলে কথা। শুধু তো বিয়ে, বৌভাত নয়, আইবুড়ো ভাত, মেহেন্দি, সঙ্গীত, তত্ত্ব সাজানো, প্রি-ওয়েডিং ভিডিওগ্রাফি, হাজারও অনুষ্ঠান। এতো ছুটি তো পাওয়া যাবে না। আমি পেলেও পাত্র নিজেই পাবেনা। দেবসুর্যই তো ফোন করে আমাকে বলল, বিয়েটা স্যাটার ডে ফেললে ওর সুবিধে হয়। ফ্রাইডে গুড ফ্রাইডে। ওর তিন দিন পরপর ছুটি আছে। সোম,  মঙ্গল দুদিন ছুটি নিলেই তবে হয়ে যাবে। আমি গ্রিন সিগন্যাল দিলে ও ফ্রাইডে ফ্লাইটের টিকিট কাটবে।

- ও, সবকিছু ঠিকই করে ফেলেছ। তাহলে আমাকে জিজ্ঞাসা করছ কেন?

- বাবা, তুমি রাগ না করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর। বিয়ের পাঁচ ছয়মাস আগে বিয়ের ডেটে কোনও বিয়ে বাড়ি পাবে না। মাম্পির বিয়েতে প্রায় হাজার খানেক নিমন্ত্রিত থাকবে। যে সে বিয়েবাড়ি ভাড়া করলে চলবে? তাছাড়া বিয়েটা তো ঐ বৈশাখ মাসেই হচ্ছে। শুধু কয়েকটা দিন আগে পরে এই যা।

মনে না নিতে পারলেও ছেলের যুক্তিকে মেনে নিতেই হল সৌম্যজিতকে। অবসর-প্রাপ্ত ব্যাঙ্ক ম্যানেজার সৌম্যজিত গোস্বামীর দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ে দেবস্মিতার বিয়েটা স্ত্রী মহামায়ার আপত্তি সত্ত্বেও একটু তাড়াতাড়িই দিয়েছিলেন উনি। দেবস্মিতা তখন সবে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। ছেলে সৌরজ্যতি চাটার আকাউন্টেন্ট। বেশ নামকরা একটি বেসরকারি কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত। ছোটোমেয়ে মাম্পি ওরফের ত্রিপর্না ছোটো থেকেই পড়াশোনায় বেশ ভালো। প্রাথমিক পড়াশোনার গণ্ডি কৃতিত্বের সাথে পেড়িয়ে ট্রান্সলেশনাল মেডিসিন নিয়ে পড়ার জন্যে লন্ডনে যায়। ওখানেই প্রবাসী বাঙালী দেবসুর্যের সাথে ওর পরিচয় হয়। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে আপাতত নিজের দেশে ফিরে এলেও বিয়ের পর ঐ দেশের কোনও রিসার্চ সেন্টারের সাথে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে আছে মাম্পির।

দেবসুর্য ও ত্রিপর্ণার বিয়ের দিন স্থির হয়ে গেল। অকাল বোধনের মতো অকাল বিয়েই ঠিক হল। আর সেই সঙ্গে চলল নানা রকম প্রস্তুতি পর্ব। ইভেন্ট ম্যানেজার নখদর্পণ ধরের উপর সম্পূর্ণ দায়িত্বটা থাকলেও প্রতিটি বিভাগ তত্বাবধনের দায়িত্ব বাড়ির লোকজনদের উপরই রইল।

বেশ বড়সড় একটা রিসোর্ট ভাড়া করা হল। সামনে অনেকটা জায়গা নিয়ে একটা উদ্যান রয়েছে। তার কিছুটা অংশে রকমারি খাওয়ারের স্টল বসবে। আর কিছুটা ছাড়া থাকবে অতিথিদের গাড়ি রাখার জন্য। বিয়েবাড়িটির সবকিছু মনমতো হলেও এটা সৌরজ্যতিদের বাড়ি থেকে পাঁচটি স্টেশন পড়ে, একটি পাণ্ডব বর্জিত জায়গায়। আশেপাশে দোকানপাট তেমন নেই। তাই প্রয়োজনীয় সবকিছু আগের থেকে গুছিয়ে নিয়ে বিয়ে বাড়িতে যেতে হবে। বাড়ি থেকে ঘন-ঘন যাতায়াত করাত কোনও উপায় নেই।  

সুসজ্জিত বিয়ের কার্ড তৈরি হল। একটি সুদৃশ্য ফিতে বাঁধা বাক্স। যার মধ্যে অনেকগুলো কার্ড। একটিতে ইংরাজিতে লেখা আমন্ত্রণ পত্র, একটিতে বাংলায়, আর একটি রয়েছে হিন্দিতে। একটি কার্ডে ইংরাজি হরফে রয়েছে অনুষ্ঠান বাড়ির যাওয়ার পথ নির্দেশ। এছাড়া প্রতিটি আমন্ত্রণ বাক্সে একটি ফর্ম রয়েছে। ঐ ফর্মে আমন্ত্রিতের সংখ্যা, উপস্থিত হইবার সম্ভাব্য আমন্ত্রিত, কার পার্কিং দরকার কিনা, ড্রাইভার সাথে যাবে কিনা, প্রভৃতি লেখার জায়গা রয়েছে। নিমন্ত্রণ করার সময় যিনি নিমন্ত্রণ করছেন, তিনি ফর্মটা বের করে নিমন্ত্রণ বাক্সটি আমন্ত্রিতের হাতে দেবেন। এবং আমন্ত্রিতের সাথে কথা বলে ফর্মটি পূর্ণ করবেন। এই ফর্ম থেকেই বিয়ের দিন সম্ভাব্য উপস্থিত আমন্ত্রিতের সংখ্যা, ড্রাইভারদের জন্য প্রয়োজনীয় পার্সেলের একটা ধারনা পাওয়া যাবে।

আমন্ত্রিতের তালিকায় পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়, কিছু আত্মীয়ের আত্মীয়, যেমন দেবস্মিতা, সৌরজ্যতির মামা শ্বশুর, কাকা শ্বশুর, কাছের বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, সৌরজ্যতির অফিস কলিগ, বন্ধু-বান্ধব, সৌম্যজিত বাবুর এক্স অফিস কলিগ, বন্ধু-বান্ধব, মহামায়া, ত্রিপর্নার বন্ধু-বান্ধব, কেউই বাদ পড়ল না।   

দেবস্মিতার মেয়ে ঐন্দ্রিলা ক্লাস এইটে পড়ে। আঁকার হাত ভীষণই ভাল। তাই আলপনার দায়িত্ব ওকে দেওয়া হয়েছে। অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মাসির বিয়ে। তাই পড়াশোনার চাপ নেই। নিশ্চিন্তে বিয়ে এনজয় করতে পারবে। কিভাবে আলপনা দেবে তা এখন থেকেই ভেবে রেখেছে ঐন্দ্রিলা। সাধারণ রঙ নয়। বিভিন্ন রঙের আবীর, হলুদের গুঁড়ো, চকের গুঁড়ো, প্রভৃতি দিয়ে রঙ তৈরি হবে। দোলের সময় অনেক রকম আবীর কিনে বিয়ের জন্য সরিয়ে রাখতে হবে ঐন্দ্রিলাকে।    

আলপনার সঙ্গে তত্ত্ব সাজানোর টিমেও ঐন্দ্রিলা রয়েছে। তত্ত্ব সাজানোর মুল দায়িত্বে রয়েছে সৌরজ্যতির স্ত্রী দেবাঞ্জনা। অনেক তত্ত্ব। একার হাতে করা সম্ভব নয়। দেবাঞ্জনা তাই চার-পাঁচ জনের একটা টিম করে নিয়েছে।

বিয়ের কেনাকাটা অনেক আগে থেকে শুরু হলেও কিছু জিনিষ বাদ থেকেই যায়। কোনের গয়না, বড় কোনের পোশাক, দেবাঞ্জনার ডিজাইনার ল্যাহেঙ্গা প্রভৃতি কেনা হয়ে গেলেও কিছু প্রণামী শাড়ি সহ তত্ত্বের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু বাকি থেকে গেল। বিয়ের একমাসও বাকী নেই। প্রতিটি দোকানেই চৈত্র সেলের ভিড়। তার মধ্যেই কেনাকাটা সারতে হল ত্রিপর্না, দেবাঞ্জনাদের।

বিয়ের এক সপ্তাহ আগে থেকেই অতিথিদের আগমন শুরু হয়ে গেল। দেবস্মিতার পরিবার, ওদের মাসি, পিসির পরিবার, ত্রিপর্নার স্কুল লাইফের এক বন্ধু, এক এক করে সকলেই এসে উপস্থিত হল। বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল করে এক সপ্তাহ ধরে খাওয়া দাওয়া চলল। এতো লোকের থাকার ব্যবস্থা ঐ বাড়িতে করা সম্ভব নয়। তাই পাড়া প্রতিবেশীর সাহায্যের আশ্রয় নিতে হল।

বিয়ের ঠিক আগের রবিবার, বাড়ির কাছে একটি অনুষ্ঠান বাড়ি ভাড়া করে ত্রিপর্নার আইবুড়ো ভাত অনুষ্ঠিত হল। শ-তিনেক লোক আমন্ত্রিত হল এই অনুষ্ঠানে। মাংস না থাকলেও তিন রকমের মাছ সহ অনুষ্ঠান বাড়ির নিয়মিত বিভাগের সকল মেনুই খাদ্য তালিকায় স্থান পেয়েছে। ফটোগ্রাফি, সেলফিগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফির মধ্যমে অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত পিঞ্জরিত হল। এই অনুষ্ঠান যেন মুল বিয়ের অনুষ্ঠানের ট্রেলার। মুল অনুষ্ঠানটি কেমন হবে, তা এই ট্রেলার দেখে সহজেই অনুমেয়।

বাড়ির সামনে সুসজ্জিত প্রবেশ দ্বার ও কৃত্রিম জোনাকি বাল্বের আলোক সজ্জা সৌরজ্যতিদের বাড়িটাকে আর পাঁচটা বাড়ি থেকে আলাদা করে রেখেছে। সমবয়সী মহিলা পুরুষদের আড্ডা, ইয়ার্কি, হাসাহাসি, খুনসুটি বাড়িটাকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে। এখন যেকোনো কারণেই কারণ-সুধা উপস্থিত থাকে। এখানেও তার কোনও ব্যতিক্রম নেই। বাড়ির এক কোনে একটা আড়াল খুঁজে সোমরসের আসক্ত, ভক্তরা তা সেবন করছে। কচিকাঁচারা বাবা-মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে কেউ গেম খেলছে, কেউ বা ইউটিউবে নানা ধরনের ভিডিও দেখছে। এভাবেই মুল অনুষ্ঠানের দিন এগিয়ে আসছে।

বিয়ের দুদিন বাকি। বিয়ে বাড়িতে মেহেন্দি উৎসব চলছে। পার্লার থেকে দুইজন ভদ্রমহিলা এসে মেহেন্দি পরাচ্ছে, আর পাত্রী সহ সব মেয়েরাই লাইন দিয়ে দুহাত পেতে মেহেন্দি পরছে। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় সজনের অনেকেই রয়েছে সেই মেহেন্দি পরার দলে। দুজনে পরিয়ে কুল করতে পারছে না। পরিস্থিতি সামলাতে ঐন্দ্রিলাও নেমে পড়ল মেহেন্দি

পড়াতে। পেশাদারীদের চেয়ে কোনও অংশে কম হল না ওর শিল্প। বরং নতুনত্বের স্বাদ মিশে হস্ত শিল্পগুলি আলাদা করে সকলের নজর কাড়ল। সকল হাতের শিল্পকলাই ক্যামেরা-বন্দী হল।    

বিয়ের আগের দিন মহামায়ার মনে পড়ল যে খুকুকে বলা হয়নি। খুকু হল সৌম্যজিতের খুড়তুতো বোন। ডিভোর্সি। ছেলেকে নিয়ে একাই থাকে। কারো সাথেই তেমন যোগাযোগ নেই। এদিকে দেবসুর্য আসছে। ত্রিপর্ণাকে নিয়ে দেবসুর্যকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে যাবে সৌরজ্যতি। সঙ্গে থাকবে ভিডিও ফটোগ্রাফার। সবাই মিলে ইকোপার্কে যাবে প্রি-ওয়েডিং স্যুট করতে। তাই খুকুদিকে নিমন্ত্রণ করা সৌরজ্যতির পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক কষ্টে নম্বর যোগার করে ফোন করলেন সৌম্যজিত। খুকুর ছেলে ধরল।

- খুকু আছে?

- না, আপনি কে বলছেন?

- আমি ওর সৌম্যদা বলছি।

- ও, বড়মামু। মা তো নার্সিংহোমে ভর্তি। হিমোগ্লোবিন খুব কমে গেছে। ডাক্তার ইমিডিয়েটলি রক্ত দিতে বলেছে। মাকে কিছু বলতে হবে?

-  না, অনেকদিন কোনও খবর পাইনা, তাই ফোন করেছিলাম।

- আমি তো এখন ব্লাড ব্যাঙ্কে আছি। নার্সিংহোমে গিয়ে মাকে তোমার কথা বলব। তুমি ফোন করেছ শুনলে মা খুশি হবে।

-  ঠিক আছে। এখন তবে রাখি। পড়ে ফোন করে খবর নেব।

ফোন রেখে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন সৌম্যজিত।

শুটিং শেষ করে দেবসুর্যকে ওর মামা বাড়ি পৌঁছে দিল সৌরজ্যতিরা। মামাবাড়ি থেকেই বিয়ে করতে আসবে ও। ভিডিও ফটোগ্রাফাররা আজ সন্ধ্যে বেলাতেই মেয়েদের জলভরা, গঙ্গা নিমন্ত্রণের ভিডিও তুলবে। কাল অতো সকালে তাদের পক্ষে আসা সম্ভব নয়। বাড়ির কাছাকাছি পুকুর নেই। তাই একটি সুইংপুলে অধিকর্তাদের অনুমতি নিয়ে প্রক্সি   জলভরা, গঙ্গা নিমন্ত্রণ হল এবং তা চলমান ক্যামেরায় বন্দী হল।

ত্রিপর্নাকে বাড়ি পৌঁছে, সৌরজ্যতি রিসোর্টে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে গেল। ত্রিপর্না বাড়ি ফিরে দেখল মা, বৌদিরা জল ভরার পর্ব শেষ করে বাড়ি ফিরেছে। ফটোগ্রাফাররা ত্রিপর্নার দধি-মঙ্গলের ভিডিও ও স্টিল ফটোগ্রাফিও ঐ দিনই সেরে নিলো। 

নখদর্পণ ধরের তত্ত্বাবধানে দশকর্মা সহ বিয়ের সমস্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী রিসোর্টে পোঁছে গিয়েছে। রিসোর্টটি সুসজ্জিত হয়ে উঠছে। পেশাদার শিল্পীদের দিয়ে তত্ত্ব সাজানো হয়েছে। বিয়ের কুঞ্জ প্রস্তুত হচ্ছে। দুই একটা ছোটোখাটো সংশোধন, পরিবর্তন করতে বলে একটু রাত করেই বাড়ি ফিরল সৌরজ্যতি।

পরের দিনের গোছ-গাছ ও গল্পগুজব করে সবাই এতো রাতে ঘুমল যে বিয়ের দিন কেউই ভোরে উঠতে পারল না। তাই ত্রিপর্নার দধি-মঙ্গলটা আর হল না। তবে আগের দিনই ফটো-স্যুট হয়ে যাওয়াতে কেউই তেমন চাপ নিলো না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে বাড়ির নানা কাজকর্ম ও ব্যস্ততা শুরু হল। অনুষ্ঠান বাড়ি ও এদিক সেদিক যাওয়ার জন্য বাড়ির গাড়িটি যথেষ্ট নয়। আরও দুটো গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। প্রথমে ঐন্দ্রিলা সহ আরও কয়েকজনকে প্রাতঃভোজন করিয়ে একটা ভাড়াগাড়িতে অনুষ্ঠান বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ওখানে পোঁছে ঐন্দ্রিলা বিবাহ-কুঞ্জে নিজের আলপনা শিল্পকর্ম শুরু করল। এরপর একে একে সকলেই অনুষ্ঠান বাড়িতে পৌঁছল।

যথা সময়েও ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদের তত্ত্ব এসে উপস্থিত হল। পাত্রপক্ষ প্রবাসী হওয়ায় বিয়ের নিয়ম-কানুনের সাথে অতোটা অভ্যস্ত নয়। তবে আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর পরামর্শ মত যতটা সম্ভব প্রচলিত নিয়ম মেনেই ছেলের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন ওনারা। গায়েহলুদ, স্নান, খাওয়া-দাওয়া প্রভৃতি সেরে ত্রিপর্না, সাজতে বসল। একটি নামকরা পার্লার থেকে বিউটিশিয়ান আনিয়েছে নখদর্পণ। ত্রিপর্না সহ সবার সাজগোজ সম্পূর্ণ হতে সন্ধ্যে গড়িয়ে গেল। ধীরে ধীরে আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করল। ক্রমশই বাড়টি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল। বিভিন্ন খাবারের স্টলের একপাশে একটি অস্থায়ী মঞ্চে অর্কেস্ট্রা সহযোগে কণ্ঠি সঙ্গীত পরিবেশিত হচ্ছে। তারই তালে তালে মঞ্চের সামনে কিছু আমন্ত্রিত অতিথি কোমর দোলাচ্ছে। এই কারণেই বিয়ের লগ্ন একটু রাতে ঠিক করেছে সৌরজ্যতিরা। 

সুসজ্জিত, অতিসজ্জিত, স্বল্প-বাসিত মহিলারা কখনও একক, কখনও বা সমবেত ভাবে সেলফী তুলে মোবাইল বন্দী করছে। ত্রিপর্নার সাথে ছবি তোলার জন্যও সকলে ব্যাকুল। ত্রিপর্নার এই চাপ এড়াতে ফটোগ্রাফাররা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছে। ওর কিছু ছবি তারা আগেই তুলে রেখেছে। এবারে যার ছবির সাথে জোড়ার দরকার তার ছবি তুলে ক্যামেরাতেই জুড়ে দিচ্ছে তারা। ছবি দুটি যে আলাদা ভাবে তোলা, তা ছবি দেখে একদমই বোঝা যাচ্ছে না। পুরো অনুষ্ঠানটি ফেসবুক লাইভ হচ্ছে। যে সকল আত্মীয় বন্ধুবান্ধবরা দূরে থাকার জন্যে, বা অন্য অসুবিধের জন্যে বিয়েতে আসতে পারেনি, তারাও অনুষ্ঠানটি দেখতে পাচ্ছে।

একটু দেরীতেই বর এসে উপস্থিত হয়েছে। বর বরণ, বর ও বরযাত্রীর আপ্যায়ন, ফটোগ্রাফির পর বরকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হল। সৌম্যজিত সম্প্রদান করবেন। নির্ধারিত মন্ত্রপাঠ চলল। নাচ গান, খাওয়া-দাওয়া সেরে বিয়ে দেখতে ভীর করেছে সবাই। নির্ধারিত সময়ে কনেকে আনা হল। সাত-পাঁক, শুভদৃষ্টি, মালাবদলের পর কন্যা সম্প্রদান হল। সবকিছু প্রথা মতোই চলছে। তবে একটু সংক্ষিপ্ত। ফটোগ্রাফির প্রয়োজনে ফটোগ্রাফারের নির্দেশে পাত্রপাত্রীদের  মাঝেমাঝেই স্ট্যাচু হতে হচ্ছে। যজ্ঞ শেষে সিঁদুর-দান পর্ব। পুরোহিতের নির্দেশে লজ্জ্বাবস্ত্র দিয়ে ঢাকা হল কনেকে। কিন্তু সিঁদুর কোথায়? পুরোহিতের ফর্দ অনুযায়ী নখ-দর্পণ যা যা এনেছে, তারমধ্যে সিঁদুর নেই। সিঁদুর তো ছেলের বাড়ির তত্ত্বের সাথে আসে। বললেন মেয়ের এক আত্মীয়া। কিন্তু সেই তত্ত্বেও সিঁদুর নেই। ছেলের বাড়ির লোক বলল, আমাদের এইসব নিয়ম কানুন ভালো জানা নেই। আমাদের সিঁদুর পাঠানোর ব্যাপারে কিছু তো বলা হয়নি।

এখন কার দোষ সেটা না খুঁজে, কিভাবে সমস্যাটার সমাধান করা যায়, সেটা ভাবতে হবে।  সৌরজ্যতির বক্তব্য।

-  আশে পাশে কোনও দোকানও নেই। আর এতো রাতে কোন দোকানই খোলা থাকবে?

-  এখন বাড়িতে গিয়ে নিয়ে আসতেও বড্ড দেরী হয়ে যাবে।

-  একদম পাণ্ডব বর্জিত জায়গা। আশে পাশেও কোনও বাড়ি নেই।

- আর বাড়ি থেকেই কি কোনও লাভ হোতো? এখন কোনও মহিলারাই গুঁড়ো সিঁদুর ব্যবহার করেনা। সিঁদুর স্টীক বা লিকুইড সিঁদুর দিয়ে কাজ সারে। উপস্থিত সকলেই নানা রকম মন্তব্য করতে লাগলো। কিন্তু কারো কথাতেই সমাধান বেরিয়ে এলো না। পুরোহিত মশাই বললেন, সিঁদুর স্টীক বা লিকুইড সিঁদুরই দেখুন না উপস্থিত কোনও মহিলার কাছে পাওয়া যায় কিনা। অগত্যা ওটা দিয়েই কাজ সারি।

- না, না। ওসব চলবে না। ওতে ফটো ভালো উঠবে না। নাকে সিঁদুর না পড়লে আবার সিঁদুর-দান হল নাকি? ফটোগ্রাফার অসম্মতি প্রকাশ করল।

- না না। লিকুইড সিঁদুর ফিদুর চলবে না। ফেসবুক লাইভ হচ্ছে। আমার বিদেশের বন্ধুরাও বিয়ে দেখছে। লোকে দেখে বলবে কি? কিন্তু কোনও উপায়ও তো দেখছি না। সৌরজ্যতির কথায় চাপা উত্তেজনা।  বাড়ির বড় জামাই অংশুজিত এতক্ষণ চুপচাপ বসে কি যেন ভাবছিল। হঠাৎ মেয়ে ঐন্দ্রিলাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, তুই যা যা দিয়ে আলপনা দিয়েছিস, তার কি কিছু অবশিষ্ট আছে?

- আছে তো। আমি গুছিয়ে যত্ন করে রেখে দিয়েছি।

- ওখানে দ্যাখ তো একটু লাল আবির আছে কিনা।

- হ্যাঁ আছে তো। অনেকটাই আছে। আমি এখুনি নিয়ে আসছি।

ঐন্দ্রিলা আবীর নিয়ে এলে অংশুজিত ওটা সৌরজ্যতির হাতে দিয়ে বলল, নেও এটা দিয়ে কাজ সারো। তোমার ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি বা ফেসবুক লাইভ, কোনটাতেই কিছু বোঝা যাবে না।

দারুণ আইডিয়া। সৌরজ্যতি যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেল।

আবীর দিয়েই সিঁদুরদান পর্ব সাঙ্গ হল। খুব সুন্দর ফটো ও ভিডিও উঠল। সোশাল মিডিয়ায় কোনও ত্রুটিই প্রকাশ পেল না। শুধু  সৌম্যজিত ও মহামায়ার মনের কোথায় যেন একটা অতৃপ্তি রয়েই গেল।

Comments

Top

 

গল্প

শেষ

থেকে শুরু

মৈত্রেয়ী মুখোপাধ্যায়

মেদিনীপুর, পঃ বাংলা

(১)

নিতা দেবীর বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই। বারো বছর হলো তাঁর স্বামী গত হয়েছেন। দুই ছেলে মেয়েকে নিজের হা