
প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা
প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা

ফেব্রুয়ারী
২০২৬

অনিমিখ প্রকাশন/লেখক: শ্রী শাশ্বত বোস
আলোচক: শ্রী অমিত সরকার/ আলোচনার শিরোনাম: স্থানিক সময়সঙ্কটের একটি অনিবার্য ভাষাদলিল
প্রচ্ছদঃ সুরজিত সিনহা
লেখক/লেখিকাবৃন্দ

সাইকেলের ঘণ্টি
আর দূরদেশের গন্ধ
সুব্রত মজুমদার
হিউস্টন, টেক্সাস
প্রবন্ধ
কয়েক বছর আগে কলেজ স্ট্রিটের এক পুরোনো বইয়ের দোকানে হঠাৎই তুলে নিয়েছিলাম একটা সাদামাটা মলাট—দুচাকায় দুনিয়া। কৌতূহলেই কিনেছিলাম, তারপর বুকশেলফের এক কোণে ধুলো জমতে দিয়েছিলাম। গত মাসে এক নিবন্ধে এই অবিশ্বাস্য সাইকেল-ভ্রমণের কথা হঠাৎ চোখে পড়তেই স্মৃতি টনকে উঠল; কৌটো থেকে পুরোনো আলতা বের করার মতো আলতো করে বইটা নামালাম, পাতাগুলোতে হাত বুলিয়ে পড়া শুরু করলাম, আর পড়তে পড়তেই মনে হল—এই অভিজ্ঞতা না শেয়ার করলে তো নিজেরই ক্ষতি।
বইটা খুলতেই প্রথমে যে গন্ধটা উঠল, তা পুরোনো কাগজে আটকে থাকা গ্রিজ, ঘাম, ধুলো আর দূরদেশের বন্দরের নোনা বাতাস। কালি শুকোনোর একধরনের মিষ্টি গন্ধ আছে, জানেন তো? সেই গন্ধে ভর করে যেন টাউন হলের সিঁড়িতে দাঁড়ানো চারজন তরুণের পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। বেল বাজানোর একটা টুং, বাঁধা ট্রাঙ্কের ধাতব ধক্ধকে, ভিড়ে-ভরা এক সকালের কোলাহল—সব মিলিয়ে প্রথম পাতাই আমাকে ফিরিয়ে নিল এক শতাব্দী পেছনে। কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, কপালে হারকিউলিসের ঘাম, মশলার দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই কেউ পাওনাদারের সঙ্গে দর কষাকষি করছে, আর ওই তরুণরা—বিমল, অশোক, আনন্দ, মণীন্দ্র—সাইকেলের হ্যান্ডলে শরীর ভর দিয়ে দম নিয়ে নিচ্ছে।
এই শহরেরই টাউন হলে এক শীতসকাল, ১২ ডিসেম্বর ১৯২৬, চারজন তরুণ নিজেদের কাঁধে তুলেছিলেন আরেক রকম শহর-স্বপ্ন: দু’চাকার ওপরে বসে পৃথিবীটাকে নিজের চোখে পড়া। তাদের মধ্যে একজনের নাম ছিল—বিমল মুখার্জি। সেই নাম উচ্চারণ করতেই যেন নাকে আসে তাজা গ্রীসের গন্ধ, কানে বাজে লোহার চেনের টিকটিক শব্দ, আর বুকের ভেতর নড়েচড়ে ওঠে বাঁধ ভাঙা পথ-লালসা। সেদিন ভিড়ের ভেতর থেকে যে উল্লাস উঠেছিল, তার ঢেউ আজও যেন কলেজ স্কোয়্যারে এসে লেগে থাকে; ফুটপাতের পুরনো বইয়ের স্তূপে যদি হঠাৎ মিলেও যায় দুচাকায় দুনিয়া, পাতার গন্ধে মনে পড়ে—আমাদেরই একজন বাঙালি, নিজের পায়ের জোরে পৃথিবী ঘুরে এসে তা লিখে রেখে গেছেন।
শীতল বাতাসে দুধ-চায়ের ধোঁয়া উঠে এসে চোখে লাগে, নাকে লাগে গরম চিনি মেশানো জিলিপির গন্ধ— যাত্রা শুরু হওয়ার আগে শহরের রঙিন গন্ধগুলো যেন সবাই মিলে একটা আশীর্বাদের মতো জড়ো হয়ে আছে।
বিমল মুখার্জির ভাষা খুবই সহজ, সংযত; কিন্তু তিনি শরীর দিয়ে পথকে যেভাবে পড়েছেন, তা পড়তে পড়তে নিজেরই হাঁটুতে যেন টান ধরতে থাকে। মরুভূমির অধ্যায়ে এসে বুক শুকিয়ে যায়—দুপুরের দিকে বালির ওপর দিয়ে সাইকেল তোলা, টায়ারের ট্রেডে জমে থাকা লালচে ধুলো, গরম বাতাসের সঙ্গে জিভে টের পাওয়া তিক্ত লবণ। জলের বোতল ঠোঁটে ছোঁয়াতেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শিহরণ নেমে যায়; মনে হয়, ঠাণ্ডা জল নয়, যেন জীবনই একটু একটু করে শরীরে ফিরছে। আবার এক জায়গায় রাতে মন্দিরের বারান্দায় শোয়ার কথা আছে— পাথরের মেঝে, টেরানো শীত, দেওয়ালে ঝুলে থাকা ধূপের ঘ্রাণ, দূরে কুকুরের হালকা ঘেউ— শবদেহের উপর ফুটে ওঠা ফুলের মতো একটুকরো নিরাপত্তা। পড়তে পড়তে বুঝলাম, পথে রাত কাটানো কেবল রোমান্টিকতা নয়, বরং ধার করা আকাশের নিচে শরীরটাকে সামলে রাখা— কখনও মসজিদের আঙিনা, কখনও স্টেশনের বেঞ্চ, আর কখনও কোনো সদয় গৃহস্থের উঠোন।
ইউরোপের পাতায় পৌঁছে দৃশ্য বদলে যায়— রাস্তা ঝকঝকে, টার-এর গন্ধে একটা ঝিম ধরা গরম; বেকারির ওভেন থেকে বেরোনো রুটির ওপর মাখন গলছে, গন্ধে ছোট্ট চৌকাঠটা যেন নড়ে ওঠে। কফির কাপ হাতে নেওয়ার মুহূর্তে যে তেঁতো উষ্ণতা জিহ্বায় লাগে, লেখক তারও হিসেব রেখেছেন— এক চুমুকেই ঘুম ভাঙা, আরেক চুমুকে শরীর গরম। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ঠান্ডার অংশটা পড়তে পড়তে কাঁধে নিজেরই শালটা টেনে তুললাম; হাওয়ায় কাঁচা বরফের গন্ধ, শ্বাস বেরোলেই মুখের সামনে মিহি সাদা ধোঁয়া— আর ওদিকে সাইকেলের চেন টিকটিক করে চলেছে নিজের মতো। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নামার সময় যে হাড়ভাঙা কাঁপুনি, বিমল সেটাকে শব্দে নয়, শরীরের স্মৃতিতে ধরেছেন— প্যাডলে চাপ পড়ার স্পন্দন, হাতের তালুতে হ্যান্ডলের ঠাণ্ডা ধাতুর শিরশির, আর দূরে সাগরের কাঁচা নোনতা এসে গাল ছুঁয়ে যাওয়া।
আমেরিকার বন্দর-নাকাল আর বড় শহরের নিয়ন— এই দুই ছায়া-আলোতে ওদের বেঁচে থাকার চেষ্টাটা রীতিমতো সিনেমার দৃশ্য। কোথাও কাজের খোঁজে বক্তৃতা, কোথাও কাগজে খবর; কখনও একটা কারখানার ক্যান্টিনে ভাতের বদলে রুটি, তবে গরম স্যুপের বাটি হাতে পেলেই মনে হয়েছে— এই তো আবার চলা যাবে। দক্ষিণ আমেরিকার অংশটায় পাহাড়ি পাতলা বাতাসের কথা আছে—শরীরে অক্সিজেন কমে গেলে হাঁটু আলগা হয়ে আসে; পড়তে পড়তেই আমার নিজেরই পায়ে যেন ভার জমল। আর প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে হাওয়াই— নারিকেলের জলের এক টুকরো স্বচ্ছ মিষ্টতা, কানে ঢেউয়ের ভেজা শব্দ, সন্ধ্যেয় ফুলের মালায় সুগন্ধী বাতাস— সব মিলিয়ে পথের কাব্যে হঠাৎই একটা নরম বিরামচিহ্ন।
পূর্ব এশিয়ার অধ্যায়ে ভাবলেশহীন, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের সূক্ষ্মতার বর্ণনা পড়তে পড়তে চোখে যেন অনেকগুলো ছোট ছোট জিনিস ভেসে ওঠে— ঝকঝকে সাইকেল-গ্যারেজের নীরবতা, মন্দিরের ধূপে নরম ধোঁয়া, চায়ের কাপে পাতার সুগন্ধ, ভেজা গলির পাথরে চাঁদের আলো। বিমল এখানে পর্যটকের চোখে জাপান বা চীনকে দেখেননি; বরং একটু দূরে দাঁড়িয়ে মানুষের চলাফেরা, লাইন ধরে কাজ করা, হাসলে চোখের কোণে ভাঁজ পড়ার ছন্দ— এসবেই দৃষ্টি গিয়েছে। তিনি বারবারই লিখেছেন ‘আমরা বুঝতে চেয়েছি’— এই কথাটাই আমাকে সবচেয়ে টেনে নিয়েছে। দুনিয়া দেখা মানে শুধুই ছবি তোলা বা নাম-চেনা জায়গায় টিক দেওয়া নয়; মানুষের মুখ, ভাষা, অভিব্যক্তির ভিতর দিয়ে যে বিশ্ব-শ্রুতি, সেইখানেই আসল শেখা।
যাত্রার মধ্যে এক সময় সঙ্গীরা ছিটকে পড়েছেন— কেউ দেশে ফিরেছেন, কেউ জীবনের অন্য পথে চলে গেছেন। সেই সব বিদায়ের বর্ণনা খুব আড়ম্বরহীন; কিন্তু পড়তে পড়তে বুকের মধ্যে একটা টান লাগে। একসঙ্গে শুরু করে একা চলা— এই অংশটাই বইটাকে নিছক ভ্রমণ-কাহিনি থেকে মানুষের গল্প বানিয়ে দেয়। দুপুরের রৌদ্রে বালির পথে থমকে দাঁড়িয়ে যখন তিনি মনে মনে হিসেব করছেন— এখান থেকে পরের পাম্প কোথায়, কত দূর গেলে জল পাওয়া যাবে— তখনই অনুভব করি, সাহস আসলে একরকম নিত্যব্যবহার্য বস্তু; প্রতিদিন একটু একটু করে তাকে গড়ে নিতে হয়। হাঁটুতে ব্যথা, কাঁধে ট্রাঙ্কের দাগ, পকেটে খুচরো টাকা, হঠাৎ কোথাও আবহাওয়া খারাপ— সবই আছে; তবু পরদিন আবার প্যাডলে পা।
বইটা পড়তে পড়তে আমার নিজের কলকাতাও বদলে যেতে লাগল। রাস্তায় কোনো সাইকেলের ঘণ্টি টুং করে বাজলেই মনে হচ্ছিল, বিশ্বের অনেক শহরে এই একই শব্দ শুনে কেউ থেমে তাকিয়েছিল— ‘ইন্ডিয়া থেকে?’ — তারপর হেসে দিয়েছে। কলেজ স্ট্রিটের ধারেকাছের গলিতে যখন ভেজা বইয়ের গন্ধ ভেসে এল, মনে পড়ল উত্তর ইউরোপের ভোরের সময়টা— নতুন খবরের কাগজ খোলার সময় যে কালি-সুগন্ধ ওঠে, তাতে একটা পরিচিত ঘরোয়া উষ্ণতা থাকে। এমনকি এখানকার তেলের কড়াইয়ে পেঁয়াজ পড়ার টুংটাং আর সুগন্ধও আমাকে ফিরিয়ে নিল ইউরোপের বেকারিতে; ওই উষ্ণতা, এই উষ্ণতা, দূরত্ব কমিয়ে দেয়। বইটা যেন শহরের ভেতরেই একটা নতুন মানচিত্র বানিয়ে দিল— গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ, স্বাদ আর আলো দিয়ে আঁকা মানচিত্র।
অবশ্য এই কাহিনি কেবল এক ব্যক্তিকে নিয়ে নয়; সময়টা নিজেও একটা চরিত্র। তখন ভারত ঔপনিবেশিক ছায়ায়, আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তোলপাড়। এমন সময়ে দু’চাকার ওপর ভর করে বিশ্বভ্রমণ মানে কেবল অ্যাডভেঞ্চার নয়— ‘আমরাও পারি’ এই বলার সাহস। এই সাহসটাকে বিমল কোনো রাজনৈতিক স্লোগানে ধরেননি, ধরেছেন পথের শালীনতায়; হোটেলের রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কাজের সন্ধান, স্কুল-মাঠে বক্তৃতা, কোনো ভারতীয় পরিবারের হাতের রুটি-ডাল— এইসব ছোট ছোট উজ্জ্বলতা দিয়ে। আমার কাছে বইটির সবচেয়ে বড় মূল্য এখানেই— উচ্চকিত বীরত্ব না দেখিয়ে, মানুষের সৌজন্য আর নিজের শৃঙ্খলা দিয়ে যে দূরত্বভাঙা যায়, সেটাই তিনি পাতায় পাতায় প্রমাণ করেছেন।
পাঠের আরেকটা আকর্ষণ হল ‘দেখার নীতি’। বিমল দেখেন, কিন্তু তাকিয়ে থাকেন না; প্রশ্ন করেন, কিন্তু রায় দিয়ে ফেলেন না। বাজারে কোরিয়ান্ডারের ঝাঁঝ, রাস্তায় ভাজা কফিবিনের গন্ধ, বরফমাখা বাতাসে হাত ঢুকিয়ে গরম রাখা— এসব বর্ণনা নিছক নান্দনিক নয়; বরং ধীরে ধীরে একটা ‘সহানুভূতির লেন্স’ তৈরি করে। দূরদেশি মানুষকে তিনি কৌতূহলের জিনিস করেন না; মানুষের শরীরী ভাষা, আচরণ, কণ্ঠস্বরে যে মিল-অমিল— সেখানে একটু জায়গা রেখে দেন। তাই পাঠক হিসাবে আমিও তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছই না; বরং পাশে দাঁড়িয়ে দেখি, শিখি। আজকের তড়িঘড়ি ভ্লগ-কালচারে এই ধৈর্যটাই সবচেয়ে দরকার।
বইটা পড়ে শেষ করে খেয়াল করলাম, লেখকের ‘আমি’ কখনো সামনে, কখনো পেছনে সরে যায়। বিপদে পড়লে ‘আমি’ সামনে— বালির মধ্যে চাকা ডেবে গেলে কাঁধে তোলা, তুষারে আঙুল অসাড় হলে পকেটে পুরে দেওয়া— এইসব জায়গায় তিনি খাঁটি এবং অকপট। আবার মানুষের গল্পে—অচেনা শহরের ভাঙাচোরা ইংরেজি-হিন্দিতে আলাপ, কারও বাড়িতে গিয়ে মেঝেতে পাতা মাদুরে বসে খাওয়া, বিদায়ের সময় এক মুঠো বাদাম হাতে তুলে দেওয়া— সেখানে লেখক একটু সরে দাঁড়ান; আলোটা পড়ে ‘মানুষ’-এর ওপরে। এই ভারসাম্যই বইটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
আরেকটা কথা না বললেই নয়— এটা নিছক পুরোনো দিনের গৌরবকথা নয়। প্রতিটি পাতায় আছে প্রস্তুতির শিক্ষা: কমে চলা, গুছিয়ে চলা, ভদ্র থাকা, আর ক্লান্ত হলেও অন্যকে হাসিমুখে ধন্যবাদ জানানো। এমনকি ব্যর্থতার ব্যবস্থাপনাও আছে— টায়ার পাংচার হলে কীভাবে ভরসা ধরে রাখতে হয়, নিজের শরীরকে কীভাবে বোঝাতে হয় ‘আরও একটু গেলেই হয়তো কিছু পাওয়া যাবে’ - কেবল পথের হিশেব নয়; জীবনেও এই মন্ত্র চলে। বইটা শেষ করে যখন শেলফে রাখতে গেলাম, দেখলাম হাতের তালুতে পুরনো কাগজের গুঁড়ো লেগে আছে— মনে হল, যেন কোনো দূরদেশের বন্দর থেকে বয়ে আসা নোনা ধুলোই বোধহয় আমার ঘরে এসে আমার হাতে পড়ে আছে। এ এক অদ্ভুত সংযোগ: ঘরের মধ্যে বসে থাকা সত্ত্বেও দিগন্তের কাছে যাওয়ার অনুভূতি।
পাঠ-অভিজ্ঞতার শেষে কিছু ব্যক্তিগত অনুরণন রয়ে যায়। কলেজ স্ট্রিটের সেই দোকানে গিয়ে আবারও পুরোনো বইগুলো হাতড়াতে ইচ্ছে করছে— কে জানে, কোন মলাটে আবার কোন প্রতিষ্ঠাতার গল্প লুকোনো। শহরের রাস্তায় সাইকেল গেলে আর টুং শব্দটা নিছক শব্দ বলে মনে হয় না— শোনার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে, এই শব্দই ছিল বহু দীর্ঘ দিনে একমাত্র সঙ্গত। চা-কফির প্রথম চুমুকটা এখন যেন একটু বেশি সচেতন; গন্ধটা নাকে তুলেই মনে হয়, কোনো বন্দরের কফি-ঘরে বসে কেউ আজও একইভাবে ভোরকে ডাকছে। আর যখন সন্ধ্যেয় দূরে একটা ট্রেনের হুইসেল ভেসে আসে, ভাবি—পথ আসলে কোথাও থামে না; আমরা থামি, কিন্তু পথ চলতেই থাকে।
অধিকাংশ সময়েই বাঙালি ছেলেদের নিয়ে একধরনের রসিকতাপূর্ণ প্রচলন আছে—তারা নাকি ভীরু, কুঁকড়ে থাকা, বেপরোয়া সাহসে নয় বরং আরামে বাঁচতে ভালোবাসে। ঔপনিবেশিক আমলে এই ধারণাটাই আরও দৃঢ় করে দেওয়া হয়েছিল; ব্রিটিশরা প্রায়ই বাঙালিকে “বাবু” বলে খোঁচাতো, যাদের সাহস নেই, কেবল কলম ঘোরাতে জানে। অথচ সেই সময়েই বিমল মুখার্জি নিজের পায়ের জোরে, পকেটে খুচরো পয়সা নিয়ে, নিছক দৃঢ়তা আর কৌতূহলকে সঙ্গী করে পৃথিবী ঘুরলেন। মরুভূমি, তুষার, অচেনা ভাষা, অভাব— কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। ঠিক এইখানেই তিনি আমাদের চোখে সত্যিকারের নায়ক। তিনি দেখিয়েছেন— বাঙালি কেবল ঘরের ভেতরে আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; দুঃসাহস, সহনশীলতা আর অধ্যবসায়েও তিনি বিশ্বমানের। তাই আজও বিমল মুখার্জিকে মনে করলে মনে হয়— এ শুধু এক ব্যক্তির কৃতিত্ব নয়, সমগ্র বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক।
শেষমেশ, যারা ভ্রমণ ভালোবাসেন, কিংবা ভালোবাসতে চান—দুচাকায় দুনিয়া আপনাদের জন্যে। বইটা কেনার আনন্দ তো আছেই; তবু যদি হাতে পাওয়া শক্ত হয়, বিভিন্ন অনলাইন সাইটে খোঁজ করলে মাঝেমধ্যে মিলেও যায়— কখনও নতুন ছাপা, কখনও পুরোনো কপি। যেভাবেই হোক, পড়াটা জরুরি— কারণ এই পাঠ আপনাকে গন্তব্যের নয়, চলার—‘চালিয়ে যাও’—এই মন্ত্র দেবে। ইচ্ছে থাকলে আজ থেকেই রুট এঁকে নেওয়া যায়—হয়তো শহরের পার্ক সার্কাস থেকে সল্টলেক, বা হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে শ্যামবাজার; কিন্তু সেই ছোট পথেই আপনি বুঝে যাবেন, দু’চাকার এই জগতে সাহস আর সৌজন্য—দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তারপর যখন সত্যিই দূরে যেতে ইচ্ছে করবে, হাতে থাকবে এই বই— পথের প্রথম শিক্ষক।
শেষে ছোট্ট অনুরোধ: সময় করে বইটা পড়ে দেখুন। বলাবাহুল্য এই বই কেনায় বা কেনায় আমার কোন লাভ বা লোকসান নেই, শুধু আছে একটুকরো আপ্লুতা এক অসমসাহসী বাঙ্গালির জন্য। কলেজ স্ট্রিটের দোকানে ভাগ্য থাকলে মিলবে, নাহলে অনলাইনেও খোঁজ করতে পারেন—কখনও স্টকে থাকে, কখনও একটু অপেক্ষা করতে হয়, কিন্তু পেলে খুশিটা আলাদা। পড়ে দেখুন, নিজের শহরটার সঙ্গে দুনিয়ার সুতো কোথায় কোথায় বাঁধা আছে। হয়তো আমরাও, আমাদের নিজের ছন্দে, কোনো এক সকালে অকারণে একটু বেশি দূর প্যাডল চেপে ফেলব।

পলাশীর যুদ্ধ ও নবাব সিরাজদ্দৌলার পরিণতি
ড.অরুণ কুমার গোস্বামী
ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রবন্ধ
লেখক পরিচিতিঃ অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী , লেখক ও গবেষক; পরিচালক, সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ, ঢাকা। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও সাবেক ডীন, সামাজিত বিজ্ঞান অনুষদ, সাবেক চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
নবাব সিরাজদ্দৌলার ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ হাতির পিঠে চাপিয়ে মুর্শিদাবাদের অলি-গলি, বাজারে ঘোরানো হচ্ছিল! উদ্দেশ্য ছিল মুর্শিদাবাদের অধিবাসীদের জানানো যে সিরাজকে হত্যা করা হয়েছে! তারিখটি ছিল ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই। পালিয়ে যাওয়ার পথে রাজমহল থেকে সিরাজকে ধরে ০২ জুলাই তৎকালীন বাংলা বিহার উড়িষ্যার রাজধানী শহর মুর্শিদাবাদ আনা হয়েছিল। তারপরে ০২ এবং ০৩ জুলাই মধ্যবর্তী রাতে নবাব সিরাজদ্দৌলাকে কুপিয়ে হত্যা এবং টুকরো টুকরো দেহ শহর প্রদক্ষিণের জন্য হাতির পিঠে তোলা হয়েছিল। নবাব সিরাজের ‘সেই বীভৎস শবযাত্রার মধ্যেই মাহুত জেনে বুঝেই হুসেইন কুলি খাঁয়ের বাসভবনের সামনে সিরাজের মরদেহ বহনকারী হাতিটিকে দাঁড় করিয়েছিল। দুই বছর আগে হুসেইন কুলি খাঁকে হত্যা করেছিলেন সিরাজ। এখন তাঁর(সিরাজের) মরদেহ থেকেও কয়েক ফোঁটা রক্ত রাস্তায় গড়িয়ে পড়ল, যেখানে হুসেইন কুলি খাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। সৈয়দ গোলাম হোসেন তবাতবাঈ এর লেখা “সিয়ার-উল-মুতাখ্খেরীন” এ এই বর্ণনা পাওয়া যায়!
সিরাজদ্দৌলা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব হিসাবে অভিষিক্ত হওয়ার আগে যখন আলিবর্দী খাঁ নবাব ছিলেন তখন হুসেইন কুলি খাঁ-এর হত্যাকান্ডটি ঘটেছিল। তখন মুর্শিদাবাদের শাসন ‘ক্ষমতা’র সঙ্গে সিরাজদ্দৌলার ছিল ‘নৈকট্য’। আর এখন পূর্বে যারা তাঁর দ্বারা উপকৃত হয়েছিল তারাই হতভাগ্য নবাব সিরাজদ্দৌলাকে ধরাধাম থেকে চিরবিদায় দিয়ে দিয়েছে! তাঁর মৃতদেহ যখন রাজধানী মুর্শিদাবাদ শহর প্রদক্ষিণ করছে তখন ‘ক্ষমতার’ সঙ্গে নবাব সিরাজদ্দৌলার ‘নৈকট্য’ কিংবা ‘দূরত্ব’ উভয়ই সর্বপ্রকার পরিমাপের বাইরে চলে গিয়েছে! কিন্তু প্রশ্ন হলো, হত্যা করার পরে সিরাজের মৃতদেহ হাতির পিঠে চাপিয়ে যার বাসভবনের সামনে আনা হয়েছিল সেই হুসেইন কুলি খাঁ কে ছিলেন? নবাব সিরাজদ্দৌলার সাথে তার সম্পর্ক কী ছিল? কেনই বা সিরাজ হুসেইন কুলি খাঁ-কে হত্যা করেছিলেন? পলায়নরত নবাব সিরাজদ্দৌলাকে সদ্য ক্ষমতাগ্রহণকারী নবাব মীর জাফরের লোকজনের হাতে কে ধরিয়ে দিয়েছিল?
‘ক্ষমতা’ সম্পর্কে উত্তর আধুনিক যুগের ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোঁ’র দৃষ্টিভঙ্গি জটিল এবং বহুমুখী, যা ক্ষমতাকে দমনমূলক এবং উৎপাদনশীল উভয় হিসেবেই দেখে। তিনি যুক্তি দেন যে ক্ষমতা একটি বিস্তৃত এবং সঞ্চালিত শক্তি যা জ্ঞান, ডিসকোর্স এবং প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে। ক্ষমতা/জ্ঞান সম্পর্কে তার বিশ্লেষণ তুলে ধরে যে কীভাবে জ্ঞান ক্ষমতার সম্পর্ক দ্বারা গঠিত হয় এবং বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোকে শক্তিশালী এবং বৈধ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। তিনি যুক্তি দেন যে ‘জ্ঞান হল অন্যদের উপর ক্ষমতা, অন্যদের সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতা।’ তাঁর ‘দ্য আর্কিওলোজি অব নলেজ’ গ্রনে’ কোন ঘটনার ইতিহাস সম্পর্কিত জ্ঞান অন্বেষণের ক্ষেত্রে সনাতন প্রশ্নসমূহের পরিবর্তে যুগোপযোগী যে কয়েক ধরনের প্রশ্ন ফুকো উল্লেখ করেছেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, তাদের মধ্যে কোন ধরনের সম্পর্ক (হায়ারআর্কি, আধিপত্য, তারবিন্যাস, ইউনিভোকাল ডিটারমিনেশন, এবং বৃত্তাকার কার্যকারণ) -’জ্ঞাপন করা যেতে পারে? এছাড়া, অন্যান্য সাক্ষাৎকারে, নিবন্ধে এবং গ্রনে’ ফুকোঁ ‘ক্ষমতা’ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব জটিল তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। ফুকোঁর মতে ‘ক্ষমতা সম্পর্ক’ ছাড়া কোন সমাজ হতে পারে না, ‘নো সোসাইটি ক্যান একসজিস্ট উইদআউট পাওয়ার রিলেশন’। ফুকোঁ বলছেন, ‘ক্ষমতা’র কোন মালিকানা হতে পারে না। এই ধারণাগত কাঠামোর আলোকে ‘ক্ষমতা’, ‘সম্পর্ক’ এবং ‘কৌশল’ প্রভৃতি ধারনার ভিত্তিতে ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে সংঘটিত যুদ্ধের আগেকার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে ক্ষমতা-সম্পটর্কের ‘নৈকট্য’, যুদ্ধে পরাজয়ের পর সৃষ্ট ক্ষমতা-সম্পর্কের ‘দূরত্ব’ এবং এজন্য অনুসৃত ‘কৌশল’ প্রভৃতির দ্বারা কীভাবে নবাব সিরাজদ্দৌলার চরম পরিণতি নির্ধারিত হয়েছিল সে সম্পর্কে ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে!
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সকাল ৮:০০ টায় পলাশীর যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তারপর দুপুরের দিকে ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল, তাতে নবাবের পক্ষের গোলাবারুদ ভিজে গিয়েছিল। এরপর মীর মদনের গায়ে ইংরেজ পক্ষের ছোঁড়া একটা গোলার আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। মীর মদনের মৃত্যুর পর মোহন লাল বীরত্বের সাথে ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। যুদ্ধের এই সময় প্রধান সেনাপতি মীর জাফর তাঁর সৈন্যদের নিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ইংরেজদের সুবিধা করে দিচ্ছিল। এহেন নিষ্ক্রিয় মীর জাফরের পরামর্শে নবাব সিরাজদ্দৌলা পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন। এরপরই নবাবের সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে শুরু করেছিল। এই অবস্থায় নবাব সৈন্য প্রত্যাহারের আদেশ জারি করেছিলেন এবং তিনি নিজে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে মুর্শিদাবাদ-’ রাজপ্রাসাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। পরদিন ২৪ জুন সকালে রাজপ্রাসাদে এসে পৌঁছেছিলেন। প্রাসাদে তাঁর সাথে দেখা-সাক্ষাতের জন্য সেসময় কেউই আসেনি। অর্থাৎ ২৪ জুন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রাসাদে তিনি একাই ছিলেন, এরপর ভোররাতের দিকে সেখান থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কোন কোন ইতিহাসবিদের মতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত নবাব সিরাজদ্দৌলা পালিয়ে যেতে ফরাসি সৈন্যদের সাহায্যে শক্তি সঞ্চয় করে পুনরায় ইংরেজ বাহিনীর উপর আক্রমণ করে তাঁর রাজধানী পুনরুদ্ধারের চিন্তা করেছিলেন! যা হোক, এ ব্যাপারে সৈয়দ গোলাম হোসেন খান তবাতবাঈ লিখেছেন,
- ‘ভোররাত তিনটার দিকে তাঁর প্রাসাদ ছেড়ে নবাব সিরাজদ্দৌলা পালিয়ে যান; এটি ছিল শাওয়াল মাসের সপ্তম দিন।’ (ভল্যুম ২, পৃ.২৩৫)
রাত ৩টার সময় ছদ্মবেশে পালিয়ে তিনি প্রথমে মুর্শিদাবাদ থেকে গিয়েছিলেন ভগবানগোলায়। এর দিন দুয়েক পরেই নদীর স্রোত ধরে পালাচ্ছিলেন তিনি। পথে যেতে যেতে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েছিলেন নবাব সিরাজদ্দৌলা ও তাঁর সঙ্গীরা। ‘সিয়ার-উল-মুতাখ্খেরিন’ থেকে জানা যায়, নিয়তির থাবায় আটকা পড়া সিরাজদ্দৌলাকে রাজমহলের বিপরীত তীরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তিনি প্রায় এক ঘন্টার জন্য অবতরণ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, শুধুমাত্র নিজের জন্য, তার মেয়ের জন্য, এবং তার স্ত্রী-সহ অন্যান্যদের খাবার জন্য কিছু খিচুড়ি প্রস্তত করা। মুর্শিদাবাদের প্রাসাদ থেকে রওনা দেয়ার পর থেকে তিন দিন ও রাত পর্যন্ত তারা কেউই খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেননি। ঘটনাক্রমে সেই পাড়ায় একজন ফকির বাস করতেন। নানা নবাব আলীবর্দী খান যখন বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার ক্ষমতার মসনদে আসীন ছিলেন তখন ‘ক্ষমতার’ সাথে
তাঁর ‘নৈকট্যের’ দিনগুলিতে সিরাজদ্দৌলা এই ফকিরকে আঘাত করেছিলেন। অনেকে বলেন সিরাজদ্দৌলা তাঁর কান কেটে দিয়েছিলেন! এই ফকিরের নাম ছিল শাহ-দানা। সে সিরাজের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ এতদিন পুষে রেখেছিল। সিরাজদ্দৌলা ফকিরের আস্তানায় হাজির হওয়ার কারণে প্রতিশোধ গ্রহণের এই সুবর্ণ সুযোগে ফকির আনন্দিত হয়েছিলেন! তিনি (ফকির শাহ দানা) তাঁর (সিরাজের) আগমনে বাহ্যিকভাবে কিছু খাবার প্রস্তুত করার ছলে সিরাজের আগমনবার্তা তাঁর শত্রু মীরজাফরের লোকজনের কাছে পাঠিয়ে দেয়। পলাশীর যুদ্ধ অবসানের পর থেকে সিরাজদ্দৌলাকে ‘স্বর্গমর্ত’ খুঁজে বেড়াচ্ছিল মীর জাফরের লোকজন। শাহ-দানার কাছ থেকে খবর পেয়ে মীর-কাসেম এবং মীর-দাদ দ্রুত ফকিরের আস্তানায় চলে আসে। তাদের সাথে আসা সশস্ত্র লোকেরা দ্রুত সিরাজকে ঘিরে ফেলে। মীরজাফরের লোকেরা হতভাগ্য সিরাজের পরিবার এবং তাদের রত্নগুলির মালিক হওয়ায় বেশ আনন্দিত হয়েছিল। (পৃ.২৩৯) করম আলি খান রচিত ‘মোজাফফরনামা’ বইয়ের ‘হত্যার চক্রান্ত’ শিরোনামের দু’টি পরিচ্ছেদে, আলীবর্দি কীভাবে হোসেন কুলি খাঁ-কে হত্যা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আলীবর্দি খানের জ্ঞাতসারেই প্রকাশ্য দরবারে সিরাজদ্দৌলা যে হোসেন কুলি খাঁ-কে হত্যা করার জন্য লোক নিয়োগ করেছিলেন, করম আলি খান তাও তুলে ধরেছেন। এখানেই থেমে থাকে না ঘটনা। সেই চক্রান্ত ফাঁস হয়ে গেলে আলীবর্দি নিজে হোসেন কুলি খাঁ-কে হত্যা করার চক্রান্তে লিপ্ত হন। এই সাথে সিরাজকে নবাব করার বিরোধী আলীবর্দি খানের কন্যা ঘসেটি বেগমের সাথে হোসেন কুলি খাঁ-র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিষয়ক তথ্যও প্রাসঙ্গিক। এর পেছনে ছিল কারণ একটাই-আলীবর্দি খান মনে করতেন, হোসেন কুলি খা-ঁই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি (ভবিষ্যতে) সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করার ক্ষমতা রাখেন। ফলে তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া অনিবার্য বলে মনে করেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তাই করা হয়েছিল।
সৈয়দ গোলাম হোসেন খান তবাতবাঈ তাঁর সিয়ার-উল-মুতাখ্খেরিনে হোসেন কুলি খাঁ-র মৃত্যুকে ‘নিরীহ রক্তপাত’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলছেন, এই হত্যাকান্ডটি এমন এক ধারাবাহিক ঘটনার জন্ম দেয় যা সেই শক্তি এবং আধিপত্যের জন্য মারাত্মক প্রমাণিত হয়, যা আলিবার্দি-খান এত কায়িক শ্রম দিয়ে তৈরি করেছিলেন এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে লালন-পালন করেছিলেন; এটি একটি অন্ধ আগুন জ্বালিয়ে দেয় যা এই দুটি হত্যার পরপরই ধোঁয়া নির্গত করতে শুরু করে; এবং যা অবশেষে তার অগ্রগতিতে সমস্ত অসংখ্য পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়; এবং এর ধ্বংসযজ্ঞ দূর-দূরান্তে বিস্তৃত করে, বাংলার সেই একসময়ের সুখী অঞ্চলের সবকিছু গ্রাস করে। এই পুরো কাহিনীটি সেই অমোঘ বাক্যটির সত্যতা প্রকাশ করে যেখানে বলা হচ্ছে: তুমি যা করবে; তুমি তাই পাবে। (মুতাখ্খেরিন খণ্ড ২, পৃ. ১২৬)
তাঁর নিজের দাসদের হাতে সিরাজদ্দৌলা বন্দী হয়ে পড়েছিলেন, তাকে মুর্শিদাবাদে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, রাজপ্রাসাদ থেকে পালিয়ে যাওয়ার আট দিন পর। তারিখটি ছিল হিজরি ১১৭০ সালের ১৫ শাওয়াল। এসময় সিরাজ এতটাই করুণ অবস্থায় ছিলেন যে, যারা তাঁকে সেই দুর্দশায় দেখেছিলেন এবং শৈশবকাল থেকেই যে সুস্বাদুতা, গৌরব, যত্ন এবং জাঁকজমকের সাথে লালিত-পালিত হয়েছিলেন তা স্মরণ করছিলেন, তারা তার মেজাজের প্রখরতাকে স্মরণ করছিলেন। ক্ষমতা হারানোর পর নবাব সিরাজদ্দৌলার জীবনের লজ্জাজনক কর্মকাণ্ড ভুলে এবং তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে দেখে করুণার অনুভূতির কাছে নিজেদের সমর্পণ করেছিলেন। উপস্থিত কেউ কেউ নবাব সিরাজদ্দৌলার দুর্দশার এই অতিরিক্ততা সহ্য করতে পারেননি তবে তারা পতিত নবাবকে অবিলম্বে আটক অবস্থা থেকে উদ্ধার করতেও চাননি। (মুতাখেরিন খণ্ড ২, পৃ. ২৪০-২৪১)
ইতিমধ্যে নবাব সিরাজের ছেড়ে যাওয়া রাজপ্রাসাদ নতুন নবাব মীরজাফর দখল করে সিংহাসনে বসে পড়েছিল। রাজপ্রাসাদের সন্নিকটে যখন সিরাজকে আনা হয়েছিল তখন মীরজাফর দিবা নিদ্রায় ছিল। এসময় মীরজাফরের পুত্র সিরাজকে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের কাছে আটকে রাখার নির্দেশ দেয় এবং তার বন্ধুদের একটি বিশাল দলকে, যারা তখন উপস্থিত ছিলেন, সরাসরি গিয়ে সেই দুর্ভাগ্যবানকে অর্থাৎ সিরাজকে লাঞ্ছিত, অপমানিত ও আঘাত করার কথাও বলে। কিন্তু তাদের সকলেই এই প্রস্তাব অকপটে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নবাব সিরাজদ্দৌলার সাথে খারাপ আচরণ করে তারা নিজেদেরকে কলঙ্কিত করতে চাননি। কেউ কেউ আবার এই প্রস্তাবের বিরোধীতাও করেছিলেন। অনেকেই ক্রোধের সাথে প্রত্যাখ্যান করার পর অবশেষে, মোহাম্মদী বেগ নামে একজন এই কাজটি করতে সম্মত হয়েছিল। মোহাম্মদী বেগ ব্যক্তিগত এবং পারিবারিকভাবে নবাব সিরাজদ্দৌলার পিতার সাহায্যে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছিল। সেই ব্যক্তিটিই তখন সিরাজদ্দৌলার ওপর ভয়াবহ কাজটি করতে রাজি হয়েছিল। সিরাজদ্দৌলাকে ধরে নিয়ে আসার দুই-তিন ঘন্টা পরে, মোহাম্মদী বেগ সিরাজের সামনে এসে হাজির হয়েছিল। সিরাজদ্দৌলা সেই দুষ্কৃতীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সে কি তাকে হত্যা করতে আসেনি?’ একজন এ প্রশ্নের উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলেছিল। সিরাজ সমস্ত করুণার স্রষ্টার সামনে নিজেকে বিনীত করেছিল, তার অতীত আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়েছিল, বলেছিল, "তারা তাহলে নয়, (তিনি আবেগঘন কণ্ঠে ভেঙে পড়েছিলেন), তারা আমার অন্য কোথাও যেতে অবসর নেওয়া এবং সেখানে পেনশনের উপর আমার শেষ দিনগুলি অতিবাহিত করার সুযোগ দিতেও প্রস্তুত নয়; (এখানে তিনি কিছুক্ষণ থামলেন, এবং, যেন কিছু মনে পড়ছে, তিনি যোগ করলেন)---না---তারা নয়, ---এবং আমাকে মরতে হবে--- হোসেন কুলি খাঁ-এর হত্যার প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য।" তাঁর আর কিছু বলার সময় ছিল না; এই কথাগুলির পর কসাই তাঁকে তার তরবারী দিয়ে বারবার আঘাত করেছিল; আর তাঁর সেই সুন্দর মুখের উপর কিছু আঘাত পড়ল, যে মুখের মাধুর্যের জন্য সারা বাংলায় তার এত খ্যাতি ছিল। গোলাম হোসেন খান তবাতবাঈ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, "যথেষ্ট হয়েছে, ---এটাই যথেষ্ট----আমার কাজ শেষ,---আর হোসেন-কুলি-খাঁ-এর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে. . .", এই কথাগুলো বলার সাথে সাথে, সিরাজ উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন, তাঁর আত্মা তাঁর সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে গেল এবং নিজের রক্তের মধ্য দিয়ে তিনি এই দুঃখের উপত্যকা থেকে বেরিয়ে গেলেন। অসংখ্য আঘাতে সিরাজের দেহ টুকরো টুকরো করা হয়েছিল এবং শহরের সবচেয়ে ঘনবসতি এলাকা প্রদক্ষিণ করার জন্য একটি হাতির পিঠে মরদেহটি ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল। সিরাজের মৃতদেহ সমস্ত শহরব্যাপী প্রদক্ষিণের মাধ্যমে সকলের কাছে নতুন নবাব মীরজাফর কর্তৃক ক্ষমতা দখলের বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। পলাশীর যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভ ও বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের ‘কৌশলে’র অসহায় শিকার পরাজিত নবাবের হত্যার মাধ্যমে প্রতিশোধ কিংবা প্রতিহিংসা চরিতার্থ হলেও, স্বাধীন থাকার প্রতি সিরাজদ্দৌলার রাজনৈতিক অঙ্গীকার, স্বাধীনতাকামী ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের চেতনায় সার্ব্বজনীনভাবে বহমান!
কবিতা
ড: সুমন্ত দত্ত
নৈহাটি, উঃ ২৪ পরগণা
জীবন
সাত রঙের ওই ঐক্যতান,
জীবন ব্যাথার বুঝি টান।
ব্যাথার স্পন্দন হয়ে নাহি আজ,
গাইব যে জীবনের জয়গান।
পথের পথিক মোরা,
জীবনে শুধুই চলা,
ফিরে তাকানোর সময় আবার
পাই কি ফিরে মোরা?
একদিন যাব চলে,
গাঙজোয়াড়ের পাড়টি ধরে,
ব্যাথার শুধুই রয়ে যাবে,
ফাঁকা চিত্রপট।

কবিতা
সোমদেব পাকড়াশী
লেক গার্ডেনস, কলিকাতা
অভিলাষ
ইচ্ছা ছিল তোমার কাছে
বসবো এসে আসন পেতে। বলব কথা অনেক কটা
দেখব চেয়ে নির্নিমেষে - তোমার যত রূপের ছটা দেখব কত রঙের ঘটা, ভাবব বসে সকাল বিকাল,
তোমায় নিয়ে আকাশ পাতাল।
যখন কথা ছিল চলার তোমায় নিয়ে নানান সাজে, কাজ অকাজের গোলকধাঁধায় পথ হারাল পথের মাঝে। হয়তো তখন চোখে আমার ঘোর লেগেছে, কেন - জানিনে মন বলছে, ‘যা হোক তা হোক কারো আমি ধার ধারিনে।‘

‘যাহোক গিয়ে’ – বলেও তবু ভাবছি বসে হয়তো কভু
বলবে তুমি করতে দেখা সুযোগ মতো পরের বারে -
ছেড়ে নিজের যত দেমাক খুঁজে নিতে সে’বার বেবাক বসুধার যত রঙরূপেরে, বলবে তুমি, ‘ভয় কি ওরে?‘
অভয় যদি পেলাম তবে, দিলেই যদি সাহস মনে, বিনতি মোর রাখবে বল, শুধাই তবে সঙ্গোপনে। আর্জি খানি ছোট্ট এবং মোটেই তা'নয় বেজায় ভারী - আর একটি বার,ওগো বসুন্ধরা, যেন তোমার কাছে আসতে পারি।
কবিতা
সুকান্ত পাল
ফরাক্কা, পঃ বঙ্গ
এনট্রপি প্রেম
থার্মোডাইনামিক্সের জটিল তত্বের মতো
দুরুহ তুমি—তোমাকে বোঝা বড় দায়।
কাইরাল তোমার হৃদয়— সেখানে প্রেম আছে,
কামনা আছে, অভিমান আছে আর দ্বন্দ্ব।
ভয় হয় রিডাকটিভ রিয়াকশানটাতেই—
কখন অক্সিডেশন নাম্বার আমার জিরো হয়ে যায়
তোমাকে বোঝা বড় দায়।
কখনো রেজোন্যান্স, কখনো ইনডাকটিভ,
কখনো হাইপারকনজুগেশন ঘটে যায়!
এ ভাবেই ঘটতে ঘটতে একদিন সংকরায়ন
হয়ে যায়—
আমি আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম সাম্য ধ্রুবককে—
একটা এনট্রপি সব উলট পালট করে দিল—
এখনো তোমার গায়ের অ্যারোমেটিকের গন্ধ স্পষ্ট~
এখনো দু’চোখে অ্যালকোহলের নেশা—
সন্মুখ আর বিপরীত বিক্রিয়াহার সমান হলেইরাসায়নিক সাম্য—ঘর বসে তোমার - আমার!

কবিতা
দেবাশিষ পট্টানায়েক
দিল্লী
পাথর জেগে পরশপাথর
অহল্যা
চোখ মেলে তাকাও,
দেখো
পাথরের ঘুম ভাঙছে;
কত দীর্ঘদিন তোমাকে ঘুমিয়ে থাকতে হয়েছে
রামের আপেক্ষায় !
সময় বদলে গেছে –
যারা পাথর হয়ে গিয়েছিল
দারিদ্র্যের অভিশাপে,
ক্ষুধার অভিশাপে,
অবহেলার অভিশাপে,
আজ তারা জেগে উঠছে।
ভেঙে ফেলে প্রাচীন মানসিকতার শৃঙ্খল,
চোখে স্বপ্নের প্রলেপ এঁকে
আত্মবিশ্বাসের মন্ত্র জপে
বন্ধুর রাস্তায় দৃঢ় পদক্ষেপ ফেলে
লড়াইয়ের ময়দানে
প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে
দাঁড়িয়ে অটল—
আর নীরবতা নয়,
আর মেনে নেওয়া নয়,
প্রতিটি হৃদস্পন্দন এক ঘোষণা,
প্রতিটি পদক্ষেপ এক স্ফুলিঙ্গ,
পরিবর্তনের সুর।
নৈরাশ্যের গহ্বর থেকে
আশার আলোর জোয়ারে
জয়ী হয়ে ফুটে উঠছে তারা
ছুঁয়ে ফেলছে সোনালি ভবিষ্যৎ—
পাথর হয়ে উঠছে পরশপাথর।
অহল্যা
তুমি কি শুনতে পাচ্ছো
তাদের জয়গান?
অন্ত:সলিলা
বিদায় বেলায়
বারবার তুমি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলে
যাতে চোখে চোখ না পড়ে,
মনের আলোড়ন না তুফান তোলে
চোখের লোনাজলের ধারাপাতে।
আমার ভিখারি মনে
একটা আশার কুসুম
অকারণে জেগে উঠছিল
ফুটে ওঠার আগেই ঝরে পড়ছিল -
তুমি কি আমায় বুকে টেনে নেবেনা,
গোলাপি অধরের মিষ্টতা
আমার মুখে ঢেলে দেবেনা!
বোধহয় তুমি জানতে
আমি সুরদাস নই
কাঙ্খিত প্রার্থনায় লজ্জা পাব না,
চিত্ত শুদ্ধির মোহ নেই,
হয়ত হাত ধরে বলে বসব
আর কিচ্ছুক্ষন থেকে যাও।
তাই মাথা নীচু করে চলে গেলে
শুধু রেখে গেলে
তোমার কবিতার খাতা।
নীল আঁকাবাঁকা লেখা,
নাকি তোমার মন -বুছলাম আমি যেন বর্ষার নদী
কোন বাধা মানি না,
আর তুমি শান্ত স্বচ্ছ ফল্গুধারা
মাটির আবরণের নীচে লুকানো
এক আঁচলা জলতৃষ্ণার্ত পথিকের জন্য।
চাঁদের সাথে, তারাদের সাথে
আজ সারারাত জাগবো
শিশির ঝরবে চোখের পাতায়
মন আঁকবে এক মৃন্ময়ীর ছবি।
এক মাতালের গল্প
কারনে -অকারনে যখন- তখন
শ্রাবনের ধারা -
চোখ বলল - মনটা ভীষণ দুষ্টু,
একটু একা পেলেই গল্প শোনায়
দুঃখের, ভয়ের;
এইতো সেদিন
রূপকথার গল্প শোনাল -
'এক রাজকুমার
ছুটে চলছে তেপান্তরের মাঠে,
চোখে স্বপ্নের ফুলকি,
মাঠ পেরোলেই নাকি গুপ্তধন, রাজকন্যা।
হটাৎ কালো মেঘ
ভীষণ কাল বৈশাখী ঝড়,
রাজকুমার পথ হারিয়ে
ঘুরপাক খাচ্ছে মরুভুমিতে'।
মন বলল- আমার কি দোষ!
চোখ তার ক্যামেরাতে ছবি তুলে
আমায় পাঠাতে থাকে,
আমি কোলাজ করিআর তা গল্প হয়ে উঠে।
চোখ বলল- এই নে মরুদ্যানের ছবি,
মরুদ্যানে মহুয়া ফুটেছে,
এবার একটা গল্প শোনা।“
আর কোনো গল্প নয় এখন,
”মনের স্বপ্নালু জবাব,
“আমার নেশা হয়েছে
আমায় ঝিমিয়ে থাকতে দে,
স্বপ্নের জোয়ারে ভেসে যেতে যেতে
পারিজাতের মালা গাঁথতে দে।
এক পেয়ালা মদ
আমায় এক পেয়ালা মদ খেতে দিও
সন্ধে হলে,
একটা নেশা হারিয়ে গেলে
আরেকটা নেশায় আশক্ত হতে হয়।
আগে অন্ধকার ভালো লাগত
আলো নিভিয়ে আলো জ্বালানোর নেশা-
আলো নিভে গেলে
বুকে আগুন নিয়ে
তারাদের ফুটে ওঠার খেলা।
এখন অন্ধকারকে ভয় -
গোধূলি বেলায় পাখির ক্লান্ত ডানা ঝাপটানো,
সোনালী পালক খসে পড়ে একে একে,
সূর্য বুঝি হারিয়ে যায় কালো মেঘের গহ্বরে,
সামনের ধূ ধূ ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে
কূলায় পৌঁছাতে হবে।
স্মৃতির শীতলতা আড়ষ্ঠ করে শরীর -
ওরে আয়না দেখিস না
সেই বালককে আর খুঁজিস না;
এক পেয়ালা মদ খেতে দাও
বিস্মৃতির চাদরে শরীরকে ঢাকি।
তোমার হত্যাকাণ্ডের পর
তোমার হত্যাকাণ্ডের পর তোমার নিশিযাপন পদ্মপাতায়
তেঁতো তেঁতো সব অহংকার
এক চিলতে বিশ্বাস
পায়ের পর পায়ের স্থাপত্যে মুষড়ে পড়া দিনকরের আশীর্বাদ
ছায়ালোকের সন্ধিক্ষণে মুঠো মুঠো গর্ত
খাপছাড়া মুখের অন্য নাম
পিছমোড়া কে উঠছে প্রিজন ভ্যানে?
তার সামনে কালো পর্দার বিষণ্ণতা
আর লুকিয়ে বাড়ছে গদিআটা মসনদের অহংকার
কে কাকে জব্দ করছে?
শুনানি চলছে
দশক…. শতক… সহস্রাব্দ…
শব্দহীন শব নড়াচড়া করছে
শিশিরের ভিতর শিরশিরানি
আর প্রস্রাবখানার বাইরে ডিজিটাল ন্যাপকিন
আর গোটা একটা গোরস্থান
আর বৃষ্টি খুব কালো
আমি কিন্তু খুলির ভিতর জংশনে রেখে দিয়েছি হাতুড়ি
আর চোখে মারলেই বমি, রক্ত লাল লাল
আর তখন কেউ আমাকে দোষ দিতে পারবে না
পাটাতনে শুয়ে আছে সী- গাল
আর অনন্ত কোন ভোর নেই।
কবিতা
পার্থ সরকার
প্রস্তাবিত খসড়া আর খাপছাড়া ডামাডোল
প্রস্তাবিত খসড়া আর খাপছাড়া ডামাডোল
ভাত ফুটছে
কিছুটা অক্সিজেনে সাঁতার কাটছে মৃত্যু
সমাপতন!
গ্রহের হলুদ অংশ
প্রজাপতির ড্রইংখাতা
শূন্যে ভাসছে স্থলপদ্ম
আর ঘরের অগাধ কোষে হকারের চিৎকার
আর বংশপরিচয়ে যাচ্ছে না দর্শনের রিংটোন
তিনফোঁটা জারকরসে আশ্বিনের পাটাতন
আর কিছু ভুল নেই তাতে
ভৌগোলিক পাঠশালায় দুটো তাৎপর্য
হেরে অথবা না হেরে বাড়ি ফিরে যাওয়া।

কবিতা
শুভঙ্কর ঘোষ
প্রস্থান
আমার জন্যেই
সে ক্রমশ শ্মশান হয়ে উঠছিল।
দক্ষ ডোমের মত কাঠ নেড়ে নেড়ে অনেকদিন
আমি উসকে দিয়েছি চিতা।
গভীরে গোপনে সে এই প্রতিদিনের মৃত্যু থেকে
একটি মুক্তি চাইলো।
নীরবে নিভৃতে দ্রুত একটি মুক্তি চাইলো।
একটি মানুষের মৃত্যুকে রোজ উসকে দেওয়ার চাইতে
মস্ত পাপ আর কিছু নেই বোধহয়।
পুরাতন পাপের বোঝা হাতে তাই বেড়িয়ে পড়লাম।
বহুদূরের ওপারে যেতে হবে।
তার জন্যে রেখে এসেছি অনন্ত ধারার একটি নদী।
শরীরে রেখেছি শীতল চন্দন।
পোড়া ক্ষত এবার সেরে উঠবে শীঘ্রই।

কবিতা
দেবরঞ্জন গুহঠাকুরতা
কোন্নগর, হুগলি
মা
মায়ের কোলে ঘুমায় ছেলে, শক্ত কাঠের তক্তপোশে;
যদিও ছেলে স্বপ্নে বিভোর, মা এখনও জাগছে বসে।
ছেলের গায়ে রোদ পড়ে না, মায়ের ছায়া আগলে রাখে,
কাঠফাটা সেই রোদটা পোড়ায় নরম পিঠের চামড়াটাকে।
অধ্যাবসায় বন্ধুমহল এসব নিয়ে চিন্তা যত
ঘাম জমায় ছেলের কপালে, মা সেগুলি মুছতে রত।
তবুও মা তার কষ্ট লুকায় নীরব নয়ন অশ্রুপাতে,
ছেলে এখন মগ্ন ঘুমে, বাঁচবে মা কার সাহারাতে?
কত যুগের অপুষ্টিতে ধুঁকছে মায়ের দেহখানি,
শরীর যে আর দেয় না; তবু খাটছে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি।
চোখ বুজে আর থাকিসনে রে, একবার দেখ দুচোখ মেলে-
জীর্ণ মায়ের উদার হাসি চোখ ভরাবেই অশ্রুজলে!
যদি ও চোখে জল না আসে, চোখ বুজে তুই আবার ঘুমা,
এ ঘুম আবার ভাঙবে, যেদিন মাথার উপর থাকবে না মা!
ব্যর্থ কবি
ঘন্টার পর ঘন্টা চেয়ারে বসে
সামনে সাদা দেয়াল;
টেবিলে চামড়া বাঁধানো ডায়েরি রাখা,
আর এক মাথা খেয়াল।
সে খেয়ালগুলি ছন্দ মিলিয়ে ইচ্ছা
লিখব কাব্য এক,
জাগবে হৃদয়ে আবেগের রসায়ন
জানবে আইউপ্যাক (IUPAC)।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ থাকবে, অন্ত্যমিলও
থাক শেষে।
তাইতে খানিক সুর জড়ালেই
গাইবে তুমি, গাইবে সে।
তবে সে গুড়ে পড়ল বালি, ছন্দটা
আর মিলছে কই?
মাত্রাবৃত্ত যাত্রা করেছে
গন্তব্যটা অনন্তই।
মোদ্দা কথা,কাব্য লেখা আমার
দ্বারা হচ্ছে না;
অন্ত্যমিল খুঁজতে কলম
এক ইঞ্চিও সরছে না!
শুধু ঘন্টার পর ঘন্টা চেয়ারে বসে
সামনে সাদা দেয়াল
টেবিলে চামড়া বাধানো ডায়েরি রাখা
আর এক মাথা খেয়াল
পারছিনা কোন ছন্দ মেলাতে, কীভাবে
লিখব কাব্য এক?
কাব্যই নেই, তায় রসায়ন! ফিরে যাও
তুমি আইউপ্যাক (IUPAC)|
একটা মানুষ
একটি মানুষ, যে এতদিন ধরে
চলেছিল বন্ধুর জীবন সফরে
সেই তবে একেবারে নিয়ে নিল ছুটি!
রেখে গেল কিছু চিঠি স্মৃতি ডাকঘরে।
একটি মানুষ,সেই একটি মানুষ
কত হৃদয়েই না সে পেয়েছিল স্থান!
হাসিমুখে চলে গেল সকলকে ফেলে
বেছে নিল বসতির পাশের শ্মশান;
তার চলে যাওয়া কত-কে করলো খুশি?
কত বুকে চাপল শিলার গুরুভার?
কে দেবে সেই হিসাব? আমি নাকি তুমি?
যে পারতো দিতে, সে তো ফিরবে না আর;
মানবজীবন, সম্পর্কের ভাঙ্গা গড়া,
সবটাই কত খেলো, কত অস্থায়ী;
গেছে পাখি খাঁচা ফেলে, রইলো না তাও,
পড়েছিল ক-টুকরো হাড় আর ছাই।।

কবিতা
রথীন্দ্রনাথ বড়াল
ডঃ নগেন ঘোষ লেন
কলিকাতা

হয়তো
হয়তো, মন ভালো নেই
হয়তো, কাজে আছ ব্যস্ত,
হয়তো, দিচ্ছে না শরীর—
এই সতত্ সংঘাতে।
হয়তো, আমার দুঃখ কমার পাত্রপূর্ণ,
হয়তো, তোমার দুঃখ ভরার পাত্র খালি।
হয়তো, সব-ই ভুল
হয়তো, কিছু ঠিক।
হয়তো, বিরক্ত হবে পরে
হয়তো, অর্থহীন কিছু পেয়ে—
হবে খুশী—
হয়তো, অনন্ত এই পথচলায়, ডেকে বলবে
‘একটু ছায়ায় বসি’।
প্রবন্ধ
‘রঙ্গমঞ্চ’…আদি থেকে অবক্ষয়,
যেন অনুসারী মায়াময়তার আখ্যান
শাশ্বত বোস
শ্রীরামপুর, হুগলী


তিরিশে অগ্রহায়ণ, কৃষ্ণা দ্বাদশী তিথি, ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর, রবিবার, শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস বসে আছেন মঞ্চের সামনে। ঠিক পাশেই বসেছেন মাস্টার বাবুরাম ও নারায়ণ। বাংলার গ্যারিক শ্রী গিরিশ ঘোষও এসেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সহাস্যে গিরিশবাবুর লেখা নাটকের প্রশংসা করছেন। বরং গিরিশের মনেই তখন ঈষৎ সংশয়! “লিখেই গেছি শুধু ঠাকুর! ধারণা হল কই!” ঠাকুর আশ্বস্ত করে বলছেন, “লিখেছ এমন, ধারণা নিশ্চিত হয়েছে।” গিরিশ হয়তো তখন নিজের creative rut ঝেড়ে ফেলছেন ঠাকুরের সামনে, “মাঝে মাঝে মনে হয় থিয়েটার আর করা কেন!” উত্তরে ঠাকুর হয়তো সহাস্যে বলছেন, “না না ও থাক, ওতে লোকশিক্ষে হবে।” খানিকক্ষণের মধ্যে যদি ফ্রেমটা ফেড আউট করে যায় চোখের সামনে থেকে, বেশ কিছুটা দৃশ্যগত প্রতিক্রিয়া আর অনেকবার স্নায়ুশিরা কেঁপে ওঠার পর ধীরে ধীরে আমরা হয়তো বুঝতে পারবো, এই থিয়েটারের লোকশিক্ষা দেবার দায়টা প্রায় যুগ যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত সত্য। প্রখ্যাত আমেরিকান অভিনেতা ও ব্যারিটোন গায়ক টেরেন্স ভন মান এর একটি প্রখ্যাত উক্তি আছে, “Movies will make you famous, Television will make you reach But theatre will make you good” এর আগে বাংলা থিয়েটারকে মূল স্রোতে নিয়ে এসেছিলেন স্বয়ং শ্রী রামকৃষ্ণ। সেই ১৮৮৪ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর, ঠাকুর স্বপার্ষদ গিরিশচন্দ্রের চৈতন্যলীলা দেখতে গেলেন। দেখতে দেখতে বেশ কয়েকবার ভাব হোল তাঁর। দেখার শেষে ‘কেমন হয়েছে?’ এর উত্তরে তিনি গিরিশ্চন্দ্রকে বললেন, “আসল নকল সব এক হয়ে গেছে।” সেই স্থানেই স্বয়ং নটী বিনোদিনী তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলে আশীর্বাদ করে তিনি বিনোদিনীকে বলেন, সেই শাশ্বত সারাৎসার, “মা তোর চৈতন্য হোক!”
কিন্তু সত্যিই কি থিয়েটারকে লোকশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে নিয়েছিল সুশীল সমাজ! সাধারণত রঙ্গমঞ্চের শুরুর দিকে ছেলেরাই মেয়েদের পোশাক পরে অভিনয় করতেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরামর্শে বেঙ্গল থিয়েটারে প্রথম অভিনেত্রীদের প্রবেশ ঘটে এবং সেই সাথেই পতিতাবৃত্তির মতন কৌলিন্যহীন পেশাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা মেয়েরা যেন জীবন যুদ্ধে শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে ওঠবার ছাড়পত্র পায়, এই পুরুষশাসিত সমাজের কাছে। বাইজিঘরে বা বেশ্যাকোঠার বিছানায় শুধু নয়, রঙ্গমঞ্চের আমোদক্ষেত্রে বিনোদনমূলক প্রোডাকশনগুলোতেও এবার থেকে তথাকথিত বাবু শ্রেণী পেতে শুরু করলো, ‘মেয়েছেলে’র স্বতঃস্ফূর্ত ছলাকলার আস্বাদ! কিন্তু ঠিক সেই দিন থেকেই ভদ্র ও শিক্ষিত বঙ্গসমাজ থিয়েটারের সাথে সব পাট চুকিয়ে দেয়। কেশব সেন থেকে নরেন্দ্রনাথ এমনকি স্বয়ং বিদ্যাসাগর মশাইও মঞ্চে পতিতার অভিনয় মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু স্বয়ং শেক্সপিয়ার তো তার ‘অ্যাস ইউ লাইক ইট’ নাটকে বলতে পেরেছেন, সমগ্র বিশ্ব একটি মঞ্চ এবং সকল নারী ও পুরুষ সেই মঞ্চে এক একজন খেলোয়ার। থিয়েটার মূলতঃ একটি পারফর্মিং আর্ট যা এই genZ, chatGPT আর গুগল এর জমানাতেও সমান ভাবে চিরকালীন আবার একইসাথে চূড়ান্তভাবে মৌলিকতা ও মানব দক্ষতা নির্ভর। আবার হয়তো সেই থিয়েটারই পারে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে মানব মনের গভীরে গিয়ে মূল্যবোধে নাড়া দিতে। তৈরী করে দেয় অখণ্ড আত্মবিশ্বাস! ভেঙে দেয় মুহূর্তের গায়ে সমসত্ত্বে লেগে থাকা লুকোনো ভয় ভীতির নিখাদ আঁধার!
১৯৪৪ সালে নবান্ন নাটকের মাধ্যমে মূলত গ্রূপ থিয়েটারের জন্ম হয় এবং সেই প্রথম হয়তো পেশাদারী রঙ্গমঞ্চ নিজের যাত্রাপথে বেমক্কা এক বাঁক নিল! কলকাতা থিয়েটার ও দ্য প্লে হাউস এর মতো মঞ্চগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কলকাতার প্রথম দিককার নাটক ছিল মূলত অভিজাত ও ইউরোপীয়দের জন্য। এইবারে হয়তো সেই আত্মবিস্মৃত শিল্প প্রদর্শন, খুঁজে পেল এক অতীন্দ্রিয় মানব চেতনা! জন্ম হল গণনাট্যের! উদ্দেশ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে শ্রেণীচেতনার উন্মেষ ঘটানো! এই ভীষণ প্রতিক্রিয়াশীল সময়ে পেশাদারী রঙ্গমঞ্চের দাপট কিন্তু বিন্দুমাত্র কমেনি। ক্রমবিবর্তনের হাত ধরে মঞ্চ ও সিনেমা এই দুই আপাত স্ববিরোধী মাধ্যম শিল্পের তাগিদে একে অপরের হাত ধরাধরি করেই চলেছে অবিরত। নটসূর্য্য অহীন্দ্র চৌধুরী, পাহাড়ি সান্যাল, কমল মিত্র, নটসম্রাট ছবি বিশ্বাসের হাত ধরে রঙ্গমঞ্চ ও সিনেমায় প্যারালাল অ্যাক্টিং এর যে ধারা শুরু হয়েছিল অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়, শিশির ভাদুড়ী, শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, অরুন মুখোপাধ্যায়, রমাপ্রসাদ বণিক, মনোজ মিত্র হয়ে নিজ নিজ সময়ের চিত্র তারকা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, নৃপতি, শ্যাম লাহা, কানু বন্দোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, নির্মল কুমার, মাধবী মুখোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, ভানু বন্দোপাধ্যায়, জহর রায়, সত্য বন্দোপাধ্যায়, কালী ব্যানার্জী, রঞ্জিত মল্লিক এমনকি আশি বা
নব্বইয়ের দশকে উঠে আসা শঙ্কর চক্রবর্তী, ভাস্কর বন্দোপাধ্যায়, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, পাপিয়া অধিকারী, তাপস পাল, মহুয়া চৌধুরী, রাজেশ্বরী রায়চৌধুরী মায় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় নামক অভিনয়ের চারাগাছটির ইন্ডাস্ট্রি হয়ে ওঠবার প্রাক মুহূর্ত অবধি সে ধারা নিজস্ব গমকে মুখর করে রেখেছে অভিনয় জগতের দিগমণ্ডল। এমনকি অনেকেই হয়তো জানেন, ষ্টার থিয়েটারে প্রায় তিনশ রজনী দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন স্বয়ং মহানায়ক, শ্যামলী নাটকে তার অনন্য অভিনয় শৈলীর মাধ্যমে। সাথে বোধহয় যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিলেন কিংবদন্তী শিল্পী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এক মূক মেয়ের চরিত্র চিত্রণের মধ্য দিয়ে। ইতিহাস বলছে প্রথম বাংলা নাট্যমঞ্চ স্থাপন করেন রুশ মনীষী লেবেদেফ। ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে ডোমতলায়। এখন রকমারি আলোর পসরা সাজিয়ে যে জায়গাটি এজরা স্ট্রিট নামেই বেশী পরিচিত, ঠিক সেখানটাতেই বেঙ্গলী থিয়েটার স্থাপন করে সেই বছরেই ২৭শে নভেম্বর কাল্পনিক সংবদল নামের একটি বাংলা অনুবাদ নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। এর আগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত দুটি নাট্যমঞ্চ ছিল। যেখানে কেবল ইংরিজি নাটকই অভিনীত হত। কিন্তু লেবেদেফের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে উনিশ শতকে বাঙালিরা কলকাতায় বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ করেন। যেমন হিন্দু থিয়েটার (১৮৩১), ওরিয়েন্টাল থিয়েটার (১৮৫৩), জোড়াসাঁকো নাট্যশালা (১৮৫৪) বিদ্যোৎসাহিনী মঞ্চ (১৮৫৭) ইত্যাদি। ১৮৫৮ সালে কলকাতার পাইকপাড়ায় রাজ ভাতৃদ্বয় ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ ও প্রতাপচন্দ্র সিংহের উদ্যোগে তাদের বেলগাছিয়া ভিলায়, বেলগাছিয়া থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়। যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, গুরুদাস বসাক, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ এই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটারের সভ্যগণ সর্বশ্রেণীর দর্শকদের সুবিধার্থে ১৮৭২ সালে ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠা বছরেই ৭ই ডিসেম্বর দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকটি অভিনয়ের মাধ্যমে এই থিয়েটারটির উন্মোচন হয়। ১৮৭৩ সালের ১৬ই আগস্ট আশুতোষ দেবের দৌহিত্র শরৎচন্দ্র ঘোষ কর্তৃক কলকাতার ৯ নম্বর বিডন স্ট্রিটে বেঙ্গল থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮৩ সালে কলকাতার ৬৮ নম্বর বিডন স্ট্রিটে গিরিশ ঘোষ, বিনোদিনী দাসী ও অমৃতলাল বসু প্রমুখ নাট্যব্যক্তিত্বের স্মৃতিধন্য ষ্টার থিয়েটার ১ এর জন্ম হয়। ১৮৮৮ সালে হাতিবাগানে প্রতিষ্ঠা হয় ষ্টার থিয়েটার ২ এর, যার সাথে পরে গিরিশ ঘোষ যুক্ত হন। ১৮৯৩ সালে কলকাতার ৬ নম্বর বিডন স্ট্রিটে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের জমিতে প্রতিষ্ঠা হয় মিনার্ভা থিয়েটারের। তখন থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত্য গিরিশচন্দ্র, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, ক্ষীরোদপ্রসাদ, অমৃতলাল, অমরেন্দ্রনাথ সহ অন্যান্য নাট্যকার বিরচিত প্রায় ৬০ খানা নাটক এখানে মঞ্চস্থ হয়েছিল। প্রঙ্গত উল্লেখ্য ষ্টার থিয়েটারের মঞ্চেই হীরালাল সেন প্রথম বায়োস্কোপের ক্যামেরায় ‘Flower of Persia’ নাটকের দৃশ্য চিত্রবদ্ধ করেছিলেন। সে অর্থে রঙ্গমঞ্চই কিন্তু প্রথম সিনেমার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে এলো টিভি, তারপর স্মার্টফোন, ওটিটি, সোশ্যাল মিডিয়া রিলস। মানুষের স্ক্রিনটাইম বাড়লো, ধৈর্য্য কমলো, হলগুলো ডুবে গেলো অমাবস্যার অন্ধকারে। ১৯৪২ সালে শিশিরকুমার নাট্যনিকেতন মঞ্চ লিজ নিয়ে তৈরী করেন শ্রীরঙ্গম। ১৯৬৬ সালে সেইখানেই জন্ম নিলো বিশ্বরূপা। তারাশঙ্করের আরোগ্য নিকেতন, শংকরের চৌরঙ্গী, সেতু একসময় বিশ্বরূপার এসব নাটক সারা ফেলেছিল অফিস ফেরত দর্শকের মনে। ১৯৩১ সালে কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে রবীন্দ্রনাথ রায় ও সতু সেনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় রংমহল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, কৃষ্ণচন্দ্র দে (সম্পর্কে গায়ক মান্না দের কাকা), মহেন্দ্র গুপ্ত, ধনঞ্জয় বৈরাগীর মতো মানুষের স্মৃতিধন্য সেই রংমহল, যেখানে মায়ামৃগ, সাহেব বিবি গোলাম, দুই পুরুষ, কবি, শতবর্ষ আগের মতো থিয়েটার মঞ্চস্থ হয়েছে, সেই রংমহল আজ শপিং মল! বিশ্বরূপার জায়গায় মাথা তুলেছে অভিজাত আবাসন! রাজা রাজকৃষ্ণ স্ট্রিট, একসময় রঙ্গমঞ্চের পীঠস্থান ছিল যে রাস্তাটি, সেখানে আজ শুধুই ছোপ ছোপ বিষন্নতা! কিন্তু ঠিক কি কারণ লুকিয়ে আছে, বর্তমান প্রজন্মের থিয়েটার বিমুখতার পেছনে! দর্শকের অভাব কেন! কেন এই চরম অর্থনৈতিক সংকট! খামতি বা ঔদাসীন্য ঠিক কোন পক্ষের! শাসক না বিরোধী! অভিনেতা না দর্শক! উত্তর হারিয়ে যায় উইংসের পেছনে ভিড় করা অন্ধকারে! সাঁজোয়া আলোর পেছনে মুখ লুকোনো শিল্পরুচিকে পুরোপুরিভাবে অপ্রয়োজনীয় বলে দাগিয়ে দেওয়া কিংবা অপসৃয়মান সুখস্মৃতির সম্পূর্ণ বিলোপ, এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আলো আর আবহে বুঁদ হয়ে থাকা অগোছালো বাঙালি আসলে জানে না আসল থিয়েটারে থার্ডবেল বলে কিছু হয়না যেমন হয় না রিয়েল লাইফেও!
তথ্য সূত্র: অন্তর্জাল
শেষ যাত্রার আগে:
কলকাতার হলুদ ট্যাক্সি ও আমার গল্প
সুব্রত মজুমদার
হিউস্টন, টেক্সাস
গল্প

প্রবাসী প্রবীণ বাঙালি বলে আর যেখানে থাকি সে যায়গাটা ঠাণ্ডা বলে কোলকাতার গরমটা গায়ে লাগে। অনভ্যাসের জন্য অসুবিধে হয়। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পা রাখলাম। পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম একটা এয়ার কন্ডিশান উবার ডাকব বলে, আর ঠিক তখনই চোখে পড়ল একটা চেনা দৃশ্য— কোলকাতার পরিচিত হলুদ অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি, রোদে ঝলমল করছে। গাড়ির গায়ে রঙের ছোপ পড়েছে, ক্রোমের চাকচিক্য ম্লান হয়ে এসেছে, তবুও যেন এক গর্বিত প্রবীণের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মনে পড়ল হলুদ ট্যাক্সি নাকি বন্ধ হয়ে যাবে।
- “এই যে দাদা, আপনি যাবেন?”
চালক আমার দিকে তাকালেন। বয়স পঞ্চাশের কি ষাটের, কাঁধে একটা পুরনো তোয়ালে, চোখেমুখে অভিজ্ঞতার ছাপ। হেলান দিয়ে আরামে সিগারেটে সুখটান দিচ্ছেন। মাথা নেড়ে দরজা খুললেন। আমি উঠতেই সেই চেনা শব্দ— একটা শক্ত কিছুতে পেছনটা ঠেকল। ঠিক এমন ছিল না আমার শৈশবে, তারুণ্যে। ফ্লোর বোর্ড এর একটা জায়গায় দেখলাম গর্ত, রাস্তা দেখা যাচ্ছে। বাইরের আওয়াজ আর ভেতরের আওয়াজে কোন তফাৎ নেই।
ভেতরে বসতেই নাকে এল পেট্রোল, পুরনো ভিনাইল আর দীর্ঘদিনের গাড়ির ভেতর জমে থাকা এক অদ্ভুত পরিচিত গন্ধ। চামড়ার সিটগুলো বয়সের ভারে নরম হয়ে গেছে, আর ড্যাশবোর্ডে রাখা ছোট্ট কালীমায়ের মূর্তিটা, বছরের পর বছর ধোঁয়ার আস্তরণে ঢেকে গিয়েছে। ব্যাক ভিউ মিররের নিচে শুকিয়ে যাওয়া প্লাস্টিকের ফুল ঝুলছে, ট্যাক্সির গতির সঙ্গে ধীরে ধীরে দুলছে।
- “গাড়ি চলে যাবে, দাদা। আমরাও চলে যাবো",
চালক হালকা হাসলেন, কিন্তু গলার স্বর ভারী। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম— ডালহৌসির ঐতিহ্যবাহী বিল্ডিংগুলো পিছিয়ে পড়ছে, কলেজ
স্ট্রিটের পুরনো বইয়ের দোকানগুলো পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি। শহর পাল্টে যাচ্ছে, সময় এগিয়ে চলেছে, কিন্তু এই ট্যাক্সির মধ্যে যেন সবকিছু আটকে আছে।
- “এই গাড়ি চালিয়ে চলতে চলতে ৩০ বছর পার করলাম,” চালক বললেন, স্টিয়ারিং চেপে ধরলেন দক্ষ হাতে, এক স্বাচ্ছন্দ্যে যা কেবল অভ্যাস থেকে আসে।
- “সোজা গাড়ি, ইলেকট্রনিকস নেই, ভাঙলে ঠিক করবো, কিন্তু এখন তো আমাদেরও বন্ধ হতে হবে।”
তার কণ্ঠে একরাশ অভিমান। এটা কেবল একটা গাড়ির বিদায় নয়, এক যুগের সমাপ্তি। এক সময় কোলকাতা তার নিজস্ব ছন্দে বেঁচে ছিল, যেখানে মানুষ তাদের চেনা ট্যাক্সিচালককে চিনত, শহরের গতি ছিল ধীর কিন্তু হৃদয় উষ্ণ।
আমি গন্তব্যে পৌঁছে টাকা এগিয়ে দিতেই চালক এক মুচকি হাসলেন, “আবার আমাকে দেখলে উঠবেন, দাদা। যতদিন চলবে, ততদিন আছি।”
দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একচিলতে বিষণ্ণতা বুকের মধ্যে বাজলো। হলুদ ট্যাক্সিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, শহরের কোলাহলে হারিয়ে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, জানি, হয়তো এটাই ছিল আমার শেষ ট্যাক্সি যাত্রা এই রঙিন স্মৃতির গাড়িতে।
হলুদ অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সিগুলো ছিল শহরের হৃদস্পন্দন, তারা শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়নি, বরং একটা সময়, একটা অনুভূতি বহন করেছে। এখন যখন তাদের দিন শেষের পথে, আমার নিজের তারুণ্যের একটা অংশও যেন মুছে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত, এই শহরের আত্মা—তার হলুদ ট্যাক্সিগুলো—
আমার হৃদয়ে বেঁচে থাকবে, যেমন ছিল, তেমনই রয়ে যাবে। রবি ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হোল - কলিকাতা কি এখনো কলিকাতায় আছে?
গল্প
ডুকরিবাড়ি
সায়ন রায়
কলকাতা

জীবন রহস্যে কত যে গুপ্তকথা লুকিয়ে থাকে কে বা জানে কিন্তু জীবনের শিক্ষা যে জীবন দিয়েই হয় - এটা আমি খুব বুঝতে শিখেছি। আমি যা লিখছি, এটা আমার জীবনের শুধুই একটা ঘটনা বললে ভুল হবে কেন না আমি যা দেখলাম, আমি যা শুনলাম, সেটা এক ঘটনার থেকে বেশি এক বীভৎস অনুভূতি বা এক দুর্দান্ত শিক্ষা যা সমাজ ধৰ্ম সাধারণ অসাধারণের সীমানাকে এক বুদ্ধিহীনতার শুন্যে ব্যক্ত করে।
আজ আমি জ্বর থেকে উঠলাম, তাই লিখতে পারছি - প্রায় দু সপ্তাহ আগে ফিরেছি সেই দুরহ স্থানের অসম্ভব ভুয়োদর্শন থেকে - ত্রাস কাটেনি এখনো! জ্বর ও ভয়ের সম্মিলিত কম্পন থেকে হাতটা একটু নিষ্কৃতি পেয়েছে বলে লিখতে পারছি - আমি গিয়েছিলাম ঘাটশিলায় এক বাড়ির খোঁজে, কিনবো বলে। মালিকের সাথে আগেই কথা হয়ে গিয়েছিলো, বলেছেন বাড়িটা একটু নিরিবিলি জায়গায় বলে কেউ কিনতে চায় না অথচ কিন্তু সেই বাড়িতে সবই প্রায় আছে - বড় বড় ঘরের সারি, মস্ত বড়ো বাগান, ফুল, ফল, ছায়া ইত্যাদি। অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল একটা পুরানো বাড়ি কিনবো কিন্তু অনেক খুঁজেও অমন বাড়ি যার নিঃসঙ্গতা ও মরছে পড়া জানালার সাথে প্রাণ বেঁধে যায় - তেমন বাড়ি খুঁজে পাইনি। যখন এই লোকটি জঙ্গল বাড়িটির বর্ণনা দিলো, তখন মনের অদম ইচ্ছাটিকে পূর্ণ হতে দেখলাম, ঠিক করে ফেললাম একবার গিয়ে জায়গাটা ঘুরে দেখে আসি নয়!
যখন জামা-কাপড় গুছিয়ে তৈরি হয়ে বাড়িতে তালা দিলাম, তখন রাত সাড়ে আটটা প্রায়। ট্যাক্সি করে স্টেশনে পৌঁছাতে আরো এক ঘন্টা লেগে গেলো। তারপর রাতের রেলগাড়িতে বসে কৃষ্ণপক্ষের ভাসা-ভাসা চন্দ্রিমায় বাইরের ছিন্ন ভিন্ন হতে থাকা গ্রাম, পথ, আল পথের টান দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম! চিন্তাশক্তির বিস্তার ও কাঁটাতারের অন্তর্জালের মধ্যে যে একটা গভীর সম্পর্ক থেকে যায় - সেটা কিন্তু অস্বীকার করা যায় না। এইসব দার্শনিক অর্ধ আধ্যাতিক ভাবনায় দ্বীপ্ত মস্তিস্ক কখন অচেতনের অতলে হারিয়ে গেছে - জানি না। একটা ধাক্কায় জেগে উঠলাম! বুঝলাম গন্তব্য স্টেশনে এসে পৌঁছেছি, যেন কেউ আমায় ডেকে জাগিয়ে তুলেছে।
ট্রেন থেকে নামতেই দেখলাম ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজে, এক বন্য দেশের অপরিচিত অন্ধকার বেশিরভাগ জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল আর স্টেশনটি ঢেকে আছে - এক অনন্ত নীরবতা যেন তাকিয়ে আমারই দিকে! যে আমায় সেই বাড়িতে নিয়ে যাবে সে দশ হাত দূরে কুয়াশা ভরা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো। একজন ঘন দাড়িওয়ালা ব্যক্তি, বয়স ত্রিশের ঘরে, নাম হলো কালি। কালীকে বাড়ির মালিকের নাম বলতেই সে আমায় গাড়িতে উঠতে বললো। আমি উঠে বসলাম।
বসে বসে কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইলাম। ভীষণ কালো অন্ধকার, শব্দহীন নিশাচর রাত্রি। শুধু মাঝেমাঝে একটা হিমেল হাওয়া রাতের একঘেয়ে মলিনতা কেটে কেটে এগিয়ে চলেছে। কালিচরণের গলা বাইরে থেকে পেলাম, 'বাবু, আপনি ডুকরিবাড়ি যাবেন তো?'
'ডুকরিবাড়ি! এ আবার কেমন নাম?' জঙ্গলবাড়ির অদ্ভুত নামটা আমার চিন্তাধারায় একটা ক্ষতর মতো দাগ করে গেলো, 'ওটাই কি জায়গাটার নাম? তোমরা বুঝি ওই নামে ডাকো?'
'হাঁ বাবু' গাড়ির বাইরে থেকে আবার আওয়াজ এলো।
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
ঘোড়ার গাড়ি যে গতিতে কালো রাতকে সরাতে সরাতে উড়ে চললো, ঠিক একই গতিবেগে বন্য পথও কখনো সোজা কখনো আঁকা বাঁকা নিজের আত্মপ্রকাশ করতে লাগলো! আমার মনোযোগ নিশীথ অরণ্যের দিক থেকে সরল না - রাত যত যায়, বন ও রাস্তা এই দুই বেড়ে চলে। কোথাও দেখা কোনো দুর্বোধ্য আলোহীন স্মৃতির কণা ফিরে ফিরে আসে! পথ চলে, মানুষ হারিয়ে যায়।
যখন প্রায় রাত দুটো, তখন সেই জায়গায় পৌঁছলাম। চারিপাশে এক বর্বর অন্ধকার বিরাজমান। গাড়ি থেকে নামতেই একটা তিন তলা পুরানো বাড়ি চোখে পড়লো, শন শন করে একটা গরম হাওয়া আমার পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। কালো, নিশ্চুপ ঘনান্ধকার। গাছ গাছড়া লতা পাতার সমবেত জীর্ণ বাড়িটাকে আঁকড়ে ধরে আছে।
বাড়িটা সত্যি খুব বড় কিন্তু ভারী একা! জনহীন এক গাঢ় নিরাবতা যেন গ্রাস করে চলেছে এই তমাশাছন্ন নিদ্রালোককে - সব কিছু যেন কোনো নিঝুম ঘুমে আদৃত। যেই আসে এখানে, সেই ঘুমিয়ে পরে!
আরেকটু এগিয়ে দেখলাম নিচের একটা ঘর থেকে হালকা একটা আলো নির্গত হচ্ছে, যেন কোনো অচেনা পথের আনমনা আলেয়া আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। মনটা কেমন ভারী হয়ে উঠলো, চোখটা ঘুমে বুজে এলো। আরেকটু এগিয়ে দেখলাম সদর দরজাটাও খোলা, কেউ কি আছে ওখানে?
কালি আমার সুটকেস নিয়ে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করতেই একটা স্নিগ্ধ মিষ্টি সুভাষ পেলাম যেন কোনো অতৃপ্ত নৈশ ফুল এক অনন্ত রাতের খেয়ালে নিজের ইচ্ছা বাতাসে বুনে চলেছে! বাড়ির আরো অন্তরে ঢুকতে দেখলাম অন্ধকারের ঘনত্ব আরো জটিল হয়েছে, কালি আলো নিয়ে আগে আগে এগিয়ে চলে আর আমি চলি তাকে অনুসরণ করে করে।
নিচের সেই ঘরটায় পৌঁছে দেখলাম একটা উঁচু বিছানা ও তার পাশে একখানা গোল আয়না দেওয়ালে ঝুলছে! কালিকে বিদায় জানিয়ে দরজায় শিকল তুলে দিলাম। ক্লান্ত, নিদ্রাচ্ছন্ন কখন বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।
পরদিন সকাল দশটায় কালির সাথে জায়গাটা দেখতে বেরোলাম। সকালের সোনালী আলোয় বাড়িটা এক অপরূপ অলোকে ঝকঝক করছে, রাতের সেই অন্ধকারের লেশ মাত্র নেই। 'ভারী সুন্দর এই পুরানো বাড়িটা', আমি ভাবছি আর মহানন্দে সারি সারি দেওয়া প্রাচীন ঘরগুলিকে দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি- মস্ত বড় উঠন, জীর্ণ পাঁচিল, ভগ্নপ্রায় গুদাম, বৈঠকখানা ঘরের কাঁচে ধরা চির - দেখতে দেখতে কখন যে সোনালী সকাল ভরদুপুরে পরিণত গেলো, বুঝতেই পারলাম না।
কিছুটা সময় আরও কাটিয়ে বাগানের দিকে অগ্রসর হলাম। অমন সুবিশাল বাগান আমি আগে
কখনো দেখিনি - অতো টগর অতো গোলাপ, অতো জুঁই ফুলের সমাহার দেখে আমার মনে হলো আমার সেই সুদীর্ঘ যাত্রা সার্থক হলো অবশেষে - মনে মনে ঠিক করে ফেললাম এই বাড়িটা নিশ্চয়ই কিনবো! ঠিক তিনটের সময় তিনতলা থেকে নিচে নেমে এলাম। প্রথমে একটু গরম ভাত ফুটিয়ে তারপর কালিচরণের আনা মাছটাকে ভালো করে ভেজে খাওয়াটা সেরে ফেললাম। শেষে নিজের ঘরে ফিরে গেলাম।
একটা ঘুম দিয়ে যখন উঠলাম তখন তারাহীন রাতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঘরটা মিলে-মিশে এক হয়ে গেছে। আমি নিরেট অন্ধকারে দু চোখ মেলে শুয়ে রইলাম। কেউ কোথাও নেই, সব একেবারে চুপচাপ, সবটাই এক নিদ্রাবৃত স্বপ্নের অভিযান! স্বপ্নের এই নিদ্রাপুরীতে কোনো আলোর অস্তি নেই, শুধু আছে ছায়াজালে বাঁধতে হতে থাকা আঁধার ও আঁধারে বাঁধতে থাকা কোলাহল। আরো একবার চোখ বুঝে বাড়ির ধুঁ ধুঁ করতে থাকা নিঃসঙ্গটাকে অনুভব করে নিলাম - কি এক যন্ত্রণাদায়ক মলিন বিষন্নতা? চোখটা আপনা আপনি খুলে গেলো।
আমি বিছনায় উঠে বসলাম, কিছু কি শোনা যাচ্ছে? আলোটা জ্বালিয়ে চারিপাশ ভালো করে দেখে নিলাম, তারপর ঠিক করে আবার শোনার চেষ্টা করলাম - না, না, সব একেবারে নিশ্চুপ! বিছানা থেকে নেমে তিনতলার বারান্দার দিকে চাইলাম - কেউ কি দাঁড়িয়ে ওখানে? আমার গা একবার শিঁউরে উঠলো, আমি ভালো করে চেয়ে রইলাম ওদিকে - না কেউ তো নেই? মূর্তির মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপর ধীরে ধীরে ঘরের দরজাটা খুলতেই এক ভীষণ রাত্রি শীতল উদাসীন হাওয়া আমায় স্পর্শ করলো। দেখলাম গাছপালা কিটপতঙ্গ সব যেন কোনো স্তব্ধতার ইন্দ্রজালে বদ্ধ! তারপর নিজের দিকে অনুভূতি ফেরাতে বুঝলাম সকালের মধুর ভাবটা মন থেকে যেন উবে গেছে, যেন সবই এক ঘুমের ব্যবধানে হারিয়ে গেছে!
আমি অন্ধকারে বেরিয়ে পরে দীর্ঘকায় বাড়িটির দিকে চাইলাম। উপর থেকে নিচ, এদিক থেকে ওদিক, যত দূর চোখ যায় অদ্ভুত এক জিনিস লক্ষ্য করলাম - সব কিছু স্থির, কিছুই যেন জায়গা বদল করে না সেখানে! অথচ একটা রিন্ রিনে ঠান্ডা হাওয়া কিন্তু বাড়ির ভিতর দিয়ে ভেসে চলেছে ক্রমাগত - উঠোনে কে কেউ বসে আছে? কেমন সব কিছু ধূসর হয়ে গোলমেলে হয়ে গেলো! পরক্ষণে যা দেখলাম তাতে আমার শরীর রক্ত হিম ক্লেশে উতলে উঠলো। দেখলাম দীর্ঘকায় বাড়িটির ছায়ার মধ্যে আরো একটি গভীর কালিমার পিন্ড উঠনে পাক খাচ্ছে? স্পষ্ট কিছু চলে বেড়াচ্ছে বাড়ির অন্তর দিয়ে। একটু এগিয়ে উঠনে পা রাখতেই যা বুঝলাম - তাতে শ্বাস-প্রশ্বাস রোধ হয়ে মরণ জগতে প্রবেশ করার জোগাড়! চাঁদের ভাঁঙ্গা ভাঁঙ্গা আলোয় পরিষ্কার প্রত্যক্ষ করলাম একটা দ্বিতীয় ছায়া সরে সরে যাচ্ছে উঠোন থেকে দালানের দিকে! অতো তাড়াতাড়ি যে কোনো মানুষ সরতে পারে না - সেটা বুঝতেই এক নাম না জানা বিভীষিকা আমার স্নায়ুগুলোকে এক অপার্থিব আতঙ্কের জালে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেললো। আমার দৃষ্টি আঠার মতো ওই দিকেই আটকে রইলো - দাঁতে দাঁতে লেগে গেল - একটা বিকৃত বিশ্রী ছায়া পাশে পাশে চলে হেঁটে বাড়ির গহবরে ঢুকে পড়লো। স্থানুর মতো কতক্ষণ ওখানে যে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না - হুঁশ ফিরলো এক রক্ত যন্ত্রণার কাতর আর্তনাতে!
আমি দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছি তখন মর্মঘাতী আওয়াজটি আবার পেলাম - আতঙ্কে ত্রাসে বিচ্ছিন্ন বোধশক্তিকে এক তন্ত্রে চারণা করে বুঝলাম এটা কোনো মানুষের কাকুতি যার সজ্ঞানে মৃত্যু হতে চলেছে! কিছু একটা আছে বাড়ির অন্তরালে - কোনো একটা কিছু যা এই মানুষটির ক্রমে ক্রমে প্রাণ হরণ করছে। থর থর করে আমার হাত পা কাঁপতে লাগলো, পকেটে রাখা রিভলভরটা বার করে ফেল্লাম। আওয়াজটার দিকে কিছু পা অগ্রসর হয়েছিই প্রায় যখন আবার সেই চিৎকার শুনলাম - হয়তো শেষ বারের জন্য। সেই অভাগার হার হিম করা মরণ যন্ত্রনার আর্তি বন্ধ হতেই প্রকৃতি আবার শব্দহীন নিথরতায় ফিরে গেল। দেখলাম রিপুর দমনে দহিত বৃক্ষ, পত্র, মাকড়সা, ফুল ফল সব কোনো রূপকথার জাদুবলে পাথরে পরিণত হয়েছে! হতবাক মরছে পড়া নষ্ট পাতাগুলিকে কাছ থেকে দেখলাম - ঝোপে ঝাড়ে লাটায়, অভিশপ্ত ডালের পাতায় পাতায় ঘুন ধরেছে! কোনো উটকো দুঃস্বপ্নর নিদ্রারসে মস্তিষ্কের মাংসপেশীর দল বিকল হয়ে এলো, কিছুক্ষণ নিজের বুদ্ধি বিবেচনা একত্রিত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় কালের ক্ষণ হারাতে হারাতে একেবারে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়লাম। তারপর একটি উন্মাদ খেয়ালের বশে চাঁদের আলোয় ওই পোড়া বাড়ির জং ধরা সিঁড়ি ধরে নিচের দিকে নামতে থাকলাম - ঠিক যেখান থেকে সেই বিদীর্ণকারী আওয়াজটি শেষ বার পেয়েছিলাম। আজ বলছি আমার সেটা করা ঠিক হয়নি - প্রকৃতির বিধি আর মনুষ্য জ্ঞাপনের মাঝে এক অস্পষ্ট রেখা আছে, সেটাকে ভাঙ্গলে চলে না, ভাঙ্গার চেষ্টাও করতে নেই।
আমার এখনো বলতে বলতে ভয় হচ্ছে সেই লণ্ঠনের আধো আলো আধো অন্ধকারে আমি যখন বাড়িটার সর্বনিম্ন অংশে গিয়ে পৌঁছলাম, সেখানে এক কানাগলি পেলাম! গলিটার দুদিকে উঁচু নিরেট দেওয়াল, কোন ঘর কিছু নেই, গলির শেষে মরচে পড়া একটা ভাঙ্গা জানালা, আর তার নিচে মর-মর করে কিছু ভাঙার শব্ধ! দেখলাম কারা যেন বসে আছে ওখানে! ধীর পায়ে আরেকটু এগিয়ে পরক্ষণেই আলো আধারিতে আমি যা দেখলাম, সেটা শিক্ষা জ্ঞানের পরিধিকে ভেঙ্গে এক দুরাচর দুঃস্বপ্নের ক্রূর নির্মমতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় - পাঁচটা ডিম্বাকার ধব ধবে সাদা মুখ, চোখ দিয়ে তাদের রক্তধারা বয়ে চলেছে, তাদের পিছনে ঝুলন্ত এক নারীর ছায়া - সে তার বীভৎস তীক্ষ্ণ দন্ত দিয়ে একটা অর্ধমৃত মানুষের মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে তার পাঁচ শিশুকে খাইয়ে দিচ্ছে!
দেখেই আমার হৃৎপিণ্ড কর্মশক্তি হারিয়ে কোনো তুষার হ্রদে প্লাবিত হলো। চরম আতঙ্কের কবলে পাগল দিলাম এক ছুট! ভয়ে ঘামে অবিশ্বাসে ম্রিয়মান জরাজীর্ণ দেওয়াল সিঁড়ি হাতড়াতে হাতড়াতে ওখান থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলাম। মনে হলো কেউ যেন পিছনে তীক্ষ্ণ সুরে উড়ে উড়ে আমারই দিকে ভেসে আসছে, বাড়ির নিচের স্তম্ভগুলো কেঁপে কেঁপে উঠলো কিন্তু সেই অস্পষ্ট ছায়াটি আর উপর ওব্দি এলো না! আতংকিত এক বিভীষিকার সাক্ষী হয়ে আমি বাড়িটা ছেড়ে দিলাম এক দৌড়। সেই ভীষণ দৃশ্যটি চোখের সামনে ভেসে ভেসে, ভেসে আসতে থাকলো। ভয় ঘৃণা শিহরণে দৌড়াতে দৌড়াতে একটি গ্রামের সীমানায় পৌঁছে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। কিছুদিন পর বেধরক জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরি। নিদ্রায়, স্বপ্নে, জাগরণে, সেই বিভীষিকা আমার সঙ্গ ছাড়ে না! এখনো দুঃসহ যন্ত্রণার সেই বিকট কান্নাটা আমায় ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়! কি যে সেই ঋণাত্মক শক্তি? কারা যে ছিল তারা? জানি না। জানতেও চাই না!
সলমন রুশদির দ্য ইলেভেন্থ আওয়ার:
এ কুইন্টেট অফ স্টোরিজ –
এক ক্রান্তদর্শী লেখকের
বহুস্বরের পাঁচভুবন
ডঃ অবিন চক্রবর্তী
Assistant Professor and Head
Department of English
Salboni Govt. General Degree College, West Bengal
প্রবন্ধ

সলমন রুশদির সাম্প্রতিকতম গল্পসঙ্কলন দ্য ইলেভেন্থ আওয়ার: এ কুইন্টেট অফ স্টোরিজ, সংক্ষিপ্ত পরিসরে রুশদির লেখকসত্তার প্রতিনিধিত্বমূলক জৌলুসকে প্রকাশ করে, আবার একইসঙ্গে এক প্রবীণ লেখকের ক্ষয়, মৃত্যু ও শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে আকস্মিক মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাকেও তুলে ধরে। ঔপন্যাসিক কে রাষ্ট্রের প্রতিস্পর্ধী সত্তা হিসেবে আখ্যানকারী রুশদি গত চার দশক ধরে ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী হিন্দুত্বের উত্থান, ইতিহাস বিকৃতি, ইসলামি মৌলবাদ, ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য ও ট্রাম্পশাসিত যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবিদ্বেষ ও অভিবাসীভীতির পুনরুত্থানসহ বহু বিষয়বস্তুকে তাঁর কল্পনাময় কথাসাহিত্যের মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। দ্য ইলেভেন্থ আওয়ার (অতঃপর EH) একদিকে যেমন এই ঐতিহ্যেরই অংশ তেমনি ২০২২ এর হত্যা প্রচেষ্টায় আহত লেখকের মৃত্যু, শোক ও উত্তরাধিকার সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব অন্বেষণও। পাঁচটি গল্প জুড়ে, কল্পবাস্তবের পরিচিত জাদুলেখনীর ঔদার্যে, রুশদি আমাদের সামনে মেলে ধরেন ক্ষমতা, ঐশ্বর্য এবং জনপ্রিয়তা থেকে উদ্ভূত আধিপত্যবাদের নাগালের বাইরে থাকা এক স্বাধীনতা, সম্ভাবনাময় ও বহুবাচিক জগত যা একজন দায়িত্বশীল, নির্ভীক বুদ্ধিজীবি হিসেবে তাঁর অবস্থানকে সুস্পষ্ট করে।
খুব স্বাভাবিকভাবেই, সঙ্কলনের প্রথম গল্প থেকেই আমাদের কাছে মৃত্যুর কেন্দ্রিকতা প্রকট হয়ে ওঠে। In The South গল্পটি দু’জন সমনামী প্রবীণ ব্যক্তি— সিনিয়র ও জুনিয়র— যারা পরস্পরের প্রতিবেশী ও সঙ্গী, তাঁদের ঘিরেই আবর্তিত। দু’জনেই বার্ধক্যের উদ্বেগ ও ভঙ্গুরতা নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন: “শিশুকাল শুধু আমাদের অতীত নয়, আমাদের ভবিষ্যৎও” (EH ১১)। এই উদ্বেগ তাঁদের বন্ধু ডি’মেলোর একটি গল্পেও প্রতিফলিত হয়— সে মুম্বাইয়ের একজন বিশিষ্ট কবির কথা বলে যিনি অ্যালঝাইমারস রোগে আক্রান্ত হয়ে কার্যকারণ- জ্ঞানশুন্য হয়ে প্রতিদিন অফিস ও বাড়ির মধ্যে যাতায়াত করতেন। Knife এবং রুশদির সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার থেকে পাঠকরা জানেন, হত্যাচেষ্টার পর এবং একটি চোখ হারিয়ে রুশদি নিজেও গভীরভাবে লেখকজীবনের পরিসমাপ্তি এবং অথর্ব হয়ে থাকার আশঙ্কায় ত্রস্ত ছিলেন। ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরের সুনামির পর লিখিত এই গল্পটি বিশ বছর পরের ব্যাক্তিগত যন্ত্রণার সাথে বিস্ময়করভাবে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠে। তবে রুশদি এটাও জানেন যে তাঁর জীবনে যেভাবে দুর্ভাগ্যের আঘাত নেমে এসেছিল, আততায়ীর ছোরার সাথে, ঠিক একইভাবে, অসংখ্য মানুষ, ব্যাক্তিগত এবং সমষ্টিগত স্তরে নানান দুর্ভাগ্যের আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। সেই কারণেই জুনিয়রের অকস্মাৎ দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর সাথে সুনামির ধ্বংসলীলার সমাপতন পরিলক্ষিত হয় গল্পের ক্যানভাসে। সিনিয়রের শোক ও নিঃসঙ্গতা এক্ষেত্রে স্বজনবিয়োগের আঘাতে ক্লিষ্ট সকল সাধারন মানুষের বিষাদময় অসহায়তার প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়। কিন্তু মৃত্যুর এই অনিবার্যতা কখনই রুশদির কাছে শেষকথার আসন লাভ করেনি। বরঞ্চ, Knife এর ছত্রে ছত্রে উঠে এসেছে বেঁচে থাকার অদম্য তাগিদ এবং বিবর্ণ প্রাত্যহিকতার মাঝে প্রায়-অলৌকিকের বিস্ময়কর অভ্যুত্থান। সেই কারণেই, জুনিয়রের মৃত্যুর পরেও বহু দশকের অভ্যাসের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই সকাল বেলায় সিনিয়রের পাশের বারান্দায় হঠাৎই নড়েচড়ে ওঠে অবর্তমান জুনিয়রের ছায়া। ছায়াসঙ্গীর দেহাবসানের পরেও সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটি মানুষের বন্ধুত্ব এভাবেই অবিনশ্বর থেকে যায় এবং আমাদের ইঙ্গিত করে এমন এক পূর্ণতার জগতের প্রতি যেখানে বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্যের ধারণাই মূর্ত হয়ে ওঠে।
লেখনীর সাহায্যে অমরত্ব অর্জনের যে বিশ্বাস স্মরণাতীত কাল থেকে চলে আসছে তারই ধারা অনুসরণ করে, সঙ্কলনের তৃতীয় গল্পেও আমরা দেখি এক মৃত্যু-পরবর্তী অস্তিত্বের বিবরণ যার মাধ্যমে বিখ্যাত প্রয়াত লেখক এবং এক বিলিতি কলেজের শ্রদ্ধেয় আবাসিক সাইমন মার্লিন আর্থার তাঁর অপূর্ণ ভালবাসা এবং নিজের প্রতি ঘটা অবিচারের প্রতিকার অনুসন্ধান করেন। রোজা নামক এক ভারতীয় ছাত্রীর সাথে এক অবিশ্বাস্য, ভৌতিক আলাপচারিতার সূত্রে, ‘Late’ নামাঙ্কিত এই গল্পে, সাইমন একদিকে তুলে ধরেন বিশ শতকের প্রথমার্ধের একজন সমকামী পুরুষের একাকীত্ব এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্কট, তেমনি অন্যদিকে বর্ণনা দেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জার্মান সাঙ্কেতিক বার্তার গোপন তথ্যের পাঠোদ্ধারে নিয়োজিত বিশেষ গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার। দুর্ভাগ্যবশত এহেন অসামান্য ভুমিকা পালনের পরেও একটি সমকামী সম্পর্কে লিপ্ত থাকার কারণে বিশ্বযুদ্ধের বছর দশেক পরেই তাঁর কারাবাসের উপক্রম হয়। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্টের হস্তক্ষেপে কারাবাস এড়াতে পারলেও সাইমনকে বাধ্য করা হয় একটি বিশেষ ওষুধ খেতে যা কিনা তাঁর শরীরে টেস্টস্টেরনের ক্ষরণ বন্ধ করে রাসায়নিক বন্ধ্যাত্বের আঘাত নামিয়ে আনে। এরই সাথে সাথে সাইমনের লেখক জীবনেও যবনিকা নেমে আসে – তাঁর অন্য সকল অবদান অগ্রাহ্য করে, শুধুমাত্র যৌন পরিচয়ের কারণে সাইমন অপরাধী বিবেচিত হন এবং রাষ্ট্র তাঁকে এক নিষ্ফল, একাকী জীবনের পথে ঠেলে দেয়। অবিচারের ক্রোধ এবং স্মিত হাস্যরসের সমাহারের মাধ্যমে নির্মিত এই কাহিনী এক ক্লিষ্ট- মধুর পরিণতির দিকে এগিয়ে যায় যখন দুটি ভৌতিক আতঙ্কের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রভোস্ট লর্ড এমেম নিজের অতীত-অবিচারের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং সাইমন ও নিজের যৌবনের দুই হারানো প্রেম, খান সাহেব ও মি. শাহ-এর সঙ্গে, একটি অলৌকিক নৌকা বেয়ে, রাজা আর্থারের কিংবদন্তীতে উল্লিখিত আভালনের পথে মিলিয়ে যায়। অস্কার ওয়াইল্ড ও অ্যালান টিউরিং-এর জীবনের অনুষঙ্গে পূর্ণ এই কাহিনী যৌন পরিচয়ের কারণে, সমাজের হাতে এক প্রতিভাবান মানুষের ধ্বংসের আখ্যানকে একটি ক্ষুদ্র আর্থারীয় রোমান্সের মোড়কে শেষ পর্যন্ত এক কল্পিত ন্যায়ের দুনিয়ায় উপস্থিত করে যেখানে এক ক্ষতবিক্ষত নাইট অবশেষে স্বীকৃতি পায় এবং মিথ, কিংবদন্তি ও ইতিহাসের সংমিশ্রনে এক মানবিকতার দিগন্ত জেগে ওঠে।
রুশদি জানেন যে বাস্তবে এই আশা, পূর্ণতা এবং শান্তির জগতের সন্ধান অনেক সময়েই অসম্ভব। আর্থারের আভালন, অ্যালিসের ওয়ান্ডারল্যান্ড, কাফকার আমেরিকা – সবই যেন এক কল্পিত আশ্রয়, এক আদর্শ দেশ, যেখানে জীবন মুক্ত, নৈতিক এবং সম্পূর্ণ। কিন্তু সেগুলো কেবলই কল্পনার ভূগোল— বাস্তবে যার কোনো প্রবেশদ্বার নেই। এই কল্পিত স্থানগুলোর আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয় কোথা থেকে? রুশদি বলেন— বাস্তব দুনিয়ার দমবন্ধ করা অন্ধকার, অন্যায়, অবিবেক ও অমানবিকতার কারণে। যখন পৃথিবী অযৌক্তিকতা ও সহিংসতার অন্ধ নৃত্যে উন্মত্ত হয় তখন মানুষ মনেই তৈরি করে অন্য এক পৃথিবীর দরজা। এই অনুসন্ধানের বর্ণনা প্রসঙ্গেই জার্মান দার্শনিক আর্নস্ট ব্লখ উত্থাপন করেন Heimat এর কথা: “যে ঘর আমরা অনুভব করেছি, কিন্তু কখনো সত্যিই পাইনি।” হয়ত সেই কারণেই “Oklahoma” গল্পটি জুড়ে ছড়িয়ে থাকে নানা অসম্পূর্ণ কাহিনীর ভগ্নাংশ যা মানবমনের এই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার, অনুসন্ধানের প্রতিচ্ছবি। শিল্প একদিকে যেমন এই আদর্শ আবাসের অনুসন্ধানের বাসনার প্রেরণা জাগায় তেমনি যে দুঃস্বপ্নের মত বাস্তবতা এহেন চাহিদার উন্মেষ ঘটায় তারও স্বরূপ আমাদের সামনে তুলে ধরে। তাই এই গল্পের মধ্যে অবস্থিত একটি অসমাপ্ত কাহিনীতেই আমরা পাই ফ্রান্সিসকো নামের এক চিত্রশিল্পীর আখ্যান যে সমসাময়িক রাজসভার দুর্নীতি ও অত্যাচারী কার্যকলাপে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে –
খুনিরা খুনের জন্য সঠিক লোকদের খুঁজছিল, যাদের মৃত্যু রাজার অনুমোদন লাভ করবে। কিছু বিপরীতধর্মী ঠাট্টা-বিদ্রুপকারী ছিল যাদের কাজ ছিল রাজাকে হাসানো বা তাকে অস্বস্তিকর সত্য বলা নয় বরং রাজার হাস্যরসহীন কথাবার্তা এবং নির্লজ্জ মিথ্যাচার শুনে অনিয়ন্ত্রিতভাবে হাসতে থাকা এবং প্রশংসা করা। অপরাধী দলের সর্দারদের রাজা পুলিশ বাহিনীর দায়িত্বে রেখেছিলেন। সেখানে ছিল কুটিল আইনজীবী, কুটিল বিচারক, কুটিল কেরানী, সবাই উপস্থিত ছিল নিশ্চিত করার জন্য যে দেশের আইন ভেঙে পড়ে সেই রাজার পদতলে যিনি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছিলেন। (EH 196)
এই ছবি কেবল অতীত স্পেনের নয়—বরং ভারত, আমেরিকা, তুরস্ক, রাশিয়া—যে কোনো আধুনিক স্বৈরতান্ত্রিক বাস্তবতার প্রতিফলন।) রুশদির ক্রান্তদর্শী কল্পনা এই সমস্ত দানবীয় বিষয়গুলিকে বিবেচনায় নেয় এবং ঠিক এই কারণেই হিয়েরোনিমাস বশের ভৌতিক কণ্ঠস্বর এক পাগলামির অতিমারীর কথা বলে: "পাগলামির কৃমি পাথর। এটি ক্যাথে থেকে আমেরিকায় ভ্রমণ করছে এবং ইউরোপের মধ্য দিয়েও যাবে। এটি সর্বত্র থাকবে এবং বছর কেটে যাবে … " (EH 202) এই ধরনের উন্মাদনা অবশ্যই Two Years, Eight Month and Twenty Eight Nights-এ উল্লিখিত সেই মৌলবাদী ধ্বংসের দানবদের “কিম্ভূত সময়ের” সাথে তুলনীয়। সঙ্গত কারণেই বশের ভূত বধির চিত্রশিল্পী ফ্রান্সিসকোকে সতর্ক করে বলে যে "যুক্তির পলায়ন দানবদের জন্ম দেয়" (EH 201)।
বিখ্যাত লেখক জে কে চেষ্টারটন বলেছিলেন যে “রূপকথা শিশুদের ড্রাগনের অস্তিত্ব সম্পর্কে বলে না। শিশুরা ইতিমধ্যেই জানে যে ড্রাগনের অস্তিত্ব রয়েছে। রূপকথা শিশুদের বলে যে ড্রাগনদের হত্যা করা যেতে পারে।” রুশদিও তাঁর সাহিত্যে বারবার করে বাস্তব ও রূপকথার সংমিশ্রণের মাধ্যমে পরাবাস্তবের জাদুকাঠির সাহায্যে অশুভ শক্তির বিনাশ করেছেন। Haroun and The Sea of Stories, Two Years Eight Months and Twenty Eight Days, Victory City ইত্যাদি বিভিন্ন উপন্যাসে আমরা এই একই ছাঁচের পুনরাবৃত্তি দেখে থাকি। “The Musician of Kahani” গল্পটিও এই একই প্রবণতার প্রকাশ এবং এই সঙ্কলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাহিনী। গল্পটি আবর্তিত হয় কাহানি শহরের এক আশ্চর্য মানবী, চাঁদনি কনট্রাকটর কে কেন্দ্র করে, যে ছোটবেলা থেকেই বিস্ময়কর বাদ্যপ্রতিভার অধিকারী। পিয়ানো এবং সেতারের মাধ্যমে অতুলনীয় সুরের তরঙ্গ সৃষ্টিকারী এই নারী অনেকাংশেই দুনিয়া দ্য জিনিয়া বা পম্পা কাম্পানার মত আশ্চর্য নায়িকাদের একজন যার মাধ্যমে রুশদি আধুনিক ভারতের দুটি অন্যতম অসুখের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন – ধর্মের নামে রাহাজানি এবং অতুল ঐশ্বর্যের দর্পময় প্রচার-সর্বস্বতা। চাঁদনির জীবনে এই সমস্যা দুটি উদ্ভূত হয় তাঁর পিতা ও স্বামীর সূত্রে। চাঁদনির বাবা রাহিম কনট্রাকটর গুরু শঙ্কর নামক তাঁদের এক প্রতিবেশীর দ্বারা প্রচারিত Possibilities of Mankind Movement–এর দ্বারা মোহিত হয়ে ঘর ছাড়েন। তিনি বুঝতে পারেননা যে নানা উচ্চকিত দাবী করলেও অর্থ, বিলাসিতা এবং সীমাহীন যৌনতার উপর প্রতিষ্ঠিত এই গোষ্ঠী আসলে প্রকাণ্ড ভণ্ডামি ও প্রতারণার এক সংগঠিত কারবার। আসারাম বাপু, গুরু রাম রহিমের মত বিভিন্ন অপরাধীরা যে ভারতে নিজেদেরকে ঈশ্বরের দূত বা সিদ্ধপুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং বিপুল ভক্তকুলের আনুগত্যের প্রাপক হয়েছেন সেই দেশের নিরিখে গুরু শঙ্করের এই অদ্ভুত রূপান্তর একেবারেই
আশ্চর্যের নয়। সধগুরু বা শ্রী শ্রী রবি শঙ্করের মত আধ্যাত্মিক গুরুদের সংস্থাগুলিও নানা অভিযোগের পরেও প্রভূত ধন সম্পদের মালিক। সেই একই প্রক্রিয়ায় শঙ্করও ভারতের পূর্ব উপকূলে এক বিশাল বিলাসবহুল উপনগরী গড়ে তোলে এবং মিথমু নাম গ্রহণ করে সেখানেই নিজের ভক্তসমাগমের আয়োজন করে। নিজের স্ত্রী ও কন্যাকে ত্যাগ করে রাহিম কনট্রাকটর ও সেই চন্দ্রাকৃতি উপনগরে উপস্থিত হয়। আশ্চর্য ভাবে এই বিপুল বৈভব ও প্রতারণাকে শেষ পর্যন্ত উদ্ঘাটন করে এক তদন্তকারী দল, যারা অদ্ভুতভাবে পরিচালিত হয় চাঁদনির সঙ্গীতের দ্বারা। এই সঙ্গীতের ইশারায়ই মিথমুর প্রাসাদের গোপন কুঠুরি, কার্পেটের নীচে লুকোনো কোটি কোটি টাকা, সোনা, গহনা, প্রাসাদের নির্জন কক্ষ—সবই আবিষ্কৃত হয়। রুশদি লেখেন -
… ধ্রুপদী সেতার সঙ্গীত, রাগ মেঘ মালহার, তাদের কানে ভরে উঠছিল, যদিও কোনও সেতারবাদককে দেখা যাচ্ছিল না। এবং সঙ্গীতটি কোনওভাবে ... তাদের পথ দেখাচ্ছিল। তারা যা খুঁজছিল তার কাছাকাছি থাকাকালীন এই বাজনা আরও জোরে বাজত এবং দূরে থাকাকালীন দুর্বল হয়ে পড়ত। অবর্ণনীয় সঙ্গীতের সাহায্যে তারা প্রাসাদের কার্পেটের নীচে লুকানো লক্ষ লক্ষ জিনিস, গোপন বেসমেন্টে সোনার পিণ্ড, জলের ফোয়ারার কাছে সিঁড়ির নীচে পুঁতে রাখা ঘড়ি এবং রত্ন এবং যৌন কক্ষ, সঙ্গীত কক্ষ, ধ্যান কক্ষ এবং অন্য সর্বত্র রাখা গোপন প্যানেলে সমস্ত ধনসম্পদ খুঁজে পেয়েছিল। যখন তারা সবকিছু খুঁজে পেয়ে গেল, আকাশ ভেঙ্গে প্রবল বৃষ্টি নেমে এল, যেন জাদুকরী বৃষ্টির রাগ তাদের শুভ কাজের জন্য তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছিল। (EH 83)
ভারতের মত দেশে যেখানে দুর্নীতি সর্বব্যাপী, এবং সুবিচার অনেকাংশেই অধরা, যেখানে ইলেক্টোরাল বন্ডের মতো রাষ্ট্র-পোষিত বিশাল কেলেঙ্কারি ঘটে, সেখানে বাস্তবে যে শাস্তি অসম্ভব—তারই কল্পিত ন্যায়বিচারের রূপ দেখান রুশদি। মার্ক্স যেভাবে পৃথিবীর দার্শনিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে দুনিয়া পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, প্রায় তার পরিপ্রেক্ষিতেই রুশদি একদা লিখেছিলেন যে “বিশ্বকে পুনরায় বর্ণনা করা—এটাই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।” (Imaginary Homelands, ১৪) এই পরিবর্তনের অনুঘটক হয়ে ওঠে চাঁদনির জাদুসঙ্গীত, যা ডেকে আনে ন্যায়ের করুণাধারা—উপন্যাসের ভুবনে যা সম্ভব হলেও বাস্তব পৃথিবীতে বিরল।
তবে চাঁদনির ন্যায়ের সংগ্রাম শুধু মিথমুকে ধ্বংস করেই শেষ হয় না। তাঁর শিল্পের ক্রোধ আঘাত হানে আরেক দানবীয় শক্তিতে—তার স্বামী মজনু ফেরদৌসের পিতার শিল্প- সাম্রাজ্যে। ঠিক যেভাবে এক বছর আগে সারা ভারত এবং বিশ্বের বিভিন্ন অংশ কয়েক মাস ব্যাপী আম্বানিদের বিবাহ উৎসবের খবরে নিমগ্ন ছিল এবং প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আগত দেশি, বিদেশী অভ্যাগতদের ভিড়, তাদের অভ্যর্থনা, বিলাস ও বৈভবের অবিশ্বাস্য আয়োজন, অসম্ভব ব্যয়বহুল উপহার এবং উপঢৌকনের সম্ভারের সম্প্রচার করছিল, ঠিক একিরকম ভাবে রুশদি আমাদের সামনে তুলে ধরেন মজনু ফেরদৌস এবং চাঁদনি কনট্রাকটর এর বিবাহ উৎসবের অভাবনীয় বাহুল্যের বহর। তবে এই প্রাচুর্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল শিল্পবোধহীন দেখনদারি এবং অমার্জিত আধিপত্যের এক কারাগার যা চাঁদনিকে ক্রমশ ক্লান্ত করে তুলেছিল। তবে আসল সর্বনাশ নেমে আসে চাঁদনি সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর। সবকিছু ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে অনাগত পুত্র সন্তানকে কেন্দ্র করে লাগামহীন উৎসবের ঘনঘটা এবং অপরিমিত ঐশ্বর্যের অশোভন উদযাপন যা কিনা চাঁদনি ও তার সন্তানের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রয়োজনীয়তাকেও গ্রাস করে ফেলে। এমনকি চাঁদনির সন্তান জঠরে মৃত্যুবরন করেছে জেনেও ফেরদৌসরা তাদের উৎসবের উদযাপনে ব্যস্ত থাকে এবং মৃত্যুসংবাদ সম্প্রচারনের বিষয়টিকে তাজমহলে নির্ধারিত বিচিত্রানুষ্ঠানের সাথে জুড়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও চলতে থাকে, সকল যৌক্তিকতা ও নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে। এই নির্লজ্জ অমানবিকতাই চাঁদনির মনে প্রতিশোধের ইপ্সাকে সুদৃঢ় করে তোলে এবং ফেরদৌস সাম্রাজ্যের পতন ডেকে আনে। সন্তানবিয়োগ এবং বিবাহ বিচ্ছেদের কিছুদিন পরেই চাঁদনির সঙ্গীতের মায়া আরেক বিধ্বংসী বিচারের ঝড় নামিয়ে আনে। সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবেই ফেরদৌসদের বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে শুরু করে: জাহাজ ডুবে যায়, কলকারখানায় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ঘোষিত হয়,
নির্মীয়মাণ বহুতল ইমারৎ ধ্বসে পড়ে, হোটেল বুকিং বাতিল হতে থাকে, আইটি কোম্পানির চুক্তি বাতিল হয়ে যায়, শেয়ার বাজারে বিপর্যয় নেমে আসে এবং বিশেষ তদন্তে বেরিয়ে আসে দুর্নীতি, ঘুষ, কর ফাঁকি ইত্যাদির নানা গুরুতর অভিযোগ। চাঁদনির শ্বাশুড়ি দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং মজনু ফেরদৌসের ক্রিকেট জীবনও এক বিরল দুর্ঘটনায় সমাপ্ত হয়ে যায়। এই সব কিছুই ঘটতে থাকে চাঁদনির মায়া- সঙ্গীতের বদান্যতায়।
আর যেখানেই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটছিল, লোকেরা শপথ করে বলছিল যে তারা এক অলৌকিক সঙ্গীত শুনেছে, এমন এক ধরণের সঙ্গীত যা আগে কখনও শোনা যায়নি, এবং কে এটি বাজাচ্ছে, কোথা থেকে আসছে, অথবা কোন যন্ত্রে এটি তৈরি করা হচ্ছে তা জানার কোনও উপায় ছিল না। এটি এমন একটি সঙ্গীত যা শুনে সকলে সন্ত্রস্ত থয়ে উঠেছিলো। এটি বাজানোর সময় বৃদ্ধরা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না এবং তরুণরা দেখতে পেল যে তাদের চুল সাদা হয়ে গেছে। (EH 96)
কনফুসিয়াস বলতেন যে ব্যাপক ধন বৈষম্যের সমাজে বিত্তশালী হওয়াটাই লজ্জার। কিন্তু আধুনিক ভোগবাদী সমাজে প্রবল আর্থিক বৈষম্যের পরেও বিত্ত এবং দেখনদারি হাত ধরাধরি করে চলে বেহায়া আধিপত্যবাদের সাথে এবং সমাজে দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও শোষণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। চাঁদনির দুর্দশা ও সন্তানবিয়োগ একদিকে যেমন এই গভীর হতাশার, স্বপ্নহত্যার বাস্তবকে তুলে ধরে তেমনি অন্যদিকে ফেরদৌস সাম্রাজ্যের পতন এই অসাম্যের অতিমারীর বিরুদ্ধে শৈল্পিক ধিক্কার হিসেবে প্রতীকায়িত হয়। এহেন কাব্যিক সুবিচার অবশ্যই বাস্তবে এবং সাহিত্যে বিরল। হারুন এবং কাহিনীসাগরের উপন্যাসেই রুশদি সেই দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। কিন্তু পরাবাস্তবের দুনিয়ায় অনেক অসম্ভবই সম্ভব হয়ে ওঠে এবং হারুনের কাহিনীর শেষ অঙ্কের মতই এখানেও সুবিচারের সাথে যুক্ত হয় পুনর্মিলিত পরিবারের রূপকল্প। অপরাধবোধে বিধ্বস্ত রাহিমও পরিবারে ফিরে আসে এবং মা–মেয়ের সঙ্গে তার মিলনের মাধ্যমে যে প্রশান্ত মুহূর্ত তৈরি হয়, তা ছুরিকাঘাত পরবর্তী সময়ের স্মৃতিচারণায় রুশদির নিজের পরিবার সম্পর্কে যে শান্তি, স্বস্তি ও সৌহার্দ্যের বিবরণ পাওয়া যায় তার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। যাবতীয় বীভৎসা, নীচতা ও অনৈতিকতা অতিক্রম করে, এই পারিবারিক শান্তির বর্ণনা, ভালবাসা, বহুত্ব এবং স্বাধীনতার সেই আবাসের দ্যোতক হয়ে ওঠে, যার অনুসন্ধান এই সঙ্কলনে এবং রুশদির অন্যান্য উপন্যাসে বারবার ফিরে এসেছে।
কিন্তু যে কোনো সাহিত্যিক সৃষ্টির মূল উপাদান হলো ভাষা। তাহলে কী ঘটে যখন ভাষাই আক্রান্ত হয়— মিথ্যা, প্রোপাগান্ডা, ক্ষমতার অহংকার ও ইতিহাস বিকৃতির চাপে? সংবেদনশীল শিল্পী হিসেবে এ প্রশ্নই রুশদির মনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে এসেছে—বিশেষ করে সঙ্কলনের শেষ গল্পটিতে – The Old Man in the Piazza। আজকের দুনিয়ায় যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্নমত মানেই দেশদ্রোহ, স্বচ্ছ নির্বাচক তালিকার মানে লক্ষাধিক মানুষের ভোটাধিকার খারিজ এবং ফুলকপির মত সব্জিও গণহত্যার আহ্বায়ক তখন ভাষার বিকৃতি যে চরমে তা অনস্বীকার্য। Haroun and the Sea of Stories–এ যেমন গল্পের সমুদ্র একসময় দূষিত হয়ে উঠেছিল, ভাষাও এখন এক “অসুখ”-এর শিকার। রুশদি এটিকেই তাঁর গল্পের ভাষায়— “the time of the yes” — ‘হ্যাঁ’– এর যুগ হিসেবে অভিহিত করেন যেখানে সবাইকে সবসময় সম্মতি জানাতে হয়। যে বিষয়ই উচ্চারিত হোক, তা যতই হাস্যকর, অবৈজ্ঞানিক বা অমানবিক হোক না কেন— প্রশ্ন তোলা নিষিদ্ধ। বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারী প্রবণতার বাড়বাড়ন্তের সময়ে এহেন এক সময়ের উত্থাপন গনতন্ত্রের সঙ্কট সম্পর্কে বিচলিত লেখকের সার্বজনীন সাবধানবানী। তবে গল্পের বক্তা আমাদের জানান যে একসময় এই বাধ্যতামুলক সম্মতির যুগ থাকলেও, শেষ পর্যন্ত ভাষার নিজের চিৎকৃত প্রতিবাদই সেই অসুখের অবসান ঘটিয়ে মুক্ত স্বরের যুগ প্রতিষ্ঠিত করে এবং শহরের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে এক কলহসমৃদ্ধ বহুস্বরের চারণভূমি। গল্পের এই অংশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— Haroun–এর “Gup Army”–র বিতর্ক-ভিত্তিক গণতন্ত্রকে, আবার Two Years Eight Months and Twenty-Eight Nights–এর সেই আদর্শ বহুত্ববাদী নগরকেও। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ- উত্তর পৃথিবীর সার্বিক গণতান্ত্রিক অগ্রগতি যেমন বিগত কয়েক বছরে স্বৈরাচারের আক্রমণে উত্তরোত্তর সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে, ঠিক একিরকমভাবে এই গল্পের নাগরিকরাও স্বেচ্ছায় নিজেদের স্বাধীনতাকে ক্রমশ তুলে দেন চত্বরে বসে থাকা এক প্রবীণের হাতে, যিনি উপদেশের আধার থেকে ক্রমে পরিণত সকল সিদ্ধান্তের ধারক এবং বাহকে। এক নতুন বাধ্যতামূলক সম্মতির যুগ ফিরে আসে। অনেকটা লেডি লিবার্টির আদলে কল্পিত নারীরূপী ভাষাও এই পরিবর্তনে বিক্ষুব্ধ এবং উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। পূর্বের মত আবার সে সব নিয়মের শিকল ছিঁড়ে গর্জে ওঠে। কিন্তু এবার তার চিৎকারে আসে না শব্দের বন্যা—বরং আসে নীরবতা। বক্তা সভয়ে জানান “আমাদের শব্দগুলি আমাদের ত্যাগ করেছে। আমরা জানি না এখন কী করতে হবে।” (EH ২৫৪) এটিই রুশদির সবচেয়ে গুরুতর সতর্কবার্তা: যদি আমরা উদাসীন, নিষ্ক্রিয়, ভীত ও অনুগত হয়ে যাই— তাহলে ভাষা নিজেই হারিয়ে যায়, গণতন্ত্রের ভিত্তি ভেঙে পড়ে। রুশদির আগের উপন্যাস Victory City–এর শেষে পাম্পা কাম্পানা ঘোষণা করেছিলেন— “শুধু শব্দই বিজয়ী।” (২০২২: ২৮৭) কিন্তু The Eleventh Hour–এর শেষ গল্পটি শেষ হয় এক সম্পূর্ণ বিপরীত সুরে—
শব্দের ব্যর্থতা দিয়ে। সমাপ্তির এই অন্ধকার, ভাষাহীন শূন্যতা শুধু রাজনৈতিক নয়— বরং ব্যক্তিগতও। একজন বয়স্ক লেখকের মনে তার নিজের সৃজনশীলতার স্থায়িত্ব নিয়ে যে উৎকণ্ঠা থাকে— এটি তারও ইঙ্গিত বহন করে।তবে রুশদি আগেই বলে দিয়েছিলেন— চরিত্রের হতাশা মানেই লেখকের হতাশা নয়। চাঁদনির প্রলয়ংকর সঙ্গীত, জুনিয়রের দুলতে থাকা ছায়া, মৃত আর্থারের অবশেষে স্বস্তির যাত্রা, ওকলাহোমার অসমাপ্ত পথ, ভাষার বিদ্রোহ— এই সবই রুশদির চিরায়ত বার্তা বহন করে: স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কল্পনা, নীরবতার বিরুদ্ধে ভাষা, একরৈখিকতার বিরুদ্ধে বহুত্ব— এই লড়াই কখনো শেষ হয় না। সবশেষে লেখক পাঠকদের হাতে তুলে দেন সিদ্ধান্ত: আমরাই ঠিক করব— আমরা কি “হ্যাঁ–এর যুগ”-এর অনুগত প্রজা হব, নাকি শব্দ, শিল্প, সত্য ও স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াব। রুশদি— ফতোয়া সত্ত্বেও, হামলার ক্ষত সত্ত্বেও, বার্ধক্য সত্ত্বেও—অটলভাবে আমাদের শেখান— গণতন্ত্র বাঁচে কণ্ঠে, বিরোধে, কল্পনায়, বহুবাচনে। এটাই তাঁর বহুত্বের পাঁচভুবন—যা এই সংকলনের প্রতিটি গল্পে দীপ্ত।
গুরুগ্রাম: পেঙ্গুইন, ২০২৫। আইএসবিএন ৯৭৮০১৪৩৪৭৬৯৫৫। পৃষ্ঠা ২৫৫। মূল্য ৮৯৯/- টাকা।
গল্প
কলকাতা

সবেধন সাঁপুই, বংশের কুলপ্রদীপ। স্কুল পরীক্ষার শেষ ধাপের বৈতরণী পার হতে বার তিনেক বিফল হলে, পিতৃদেব হারাধন সাঁপুই এর উপরোধে পারিবারিক তেল কলে শিক্ষানবিশ পদে বহাল হয়েছিল। স্কুলের বৈতরণী পার না হলেও ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে উদ্ভাবনী শক্তি ছিল সবেধনের মজ্জা গত। সে অল্প দিনেই আবিষ্কার করল কোন বস্তুর মিশলে - সরষের তেলের রূপ, রস, গন্ধ ও স্পর্শ বজায় রেখে তেলের পরিমান বাড়ানো যায়। ছেলের প্রতিভায় গদগদ হারাধন তাঁর পিতৃদেব স্বর্গত রামধন সাঁপুই এর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে – সবেধনের হাতে ব্যবসার হাল ছেড়ে হরি সংকীর্তনে মনোনিবেশ করেছিলেন।
মা সুরধনী ঘটকের পর ঘটক নিযুক্ত করেছিলেন, প্রমাণ সাইজের এ্যালবামে দেশী প্রবাসী বিবাহ যোগ্যাদের ছবি সাঁটিয়েছেন কিন্তু বিধি বাঁয়েই হেলে রইলেন, সবেধনের মুখে কোন ছবি - হাসি ফোটাতে পারেনি। বহু দিন চেষ্টা করেও সুরধনী তাঁর চোখের মণি - স্নেহ বহুল খাদ্যে পরিপুষ্ট নধর সবু’র মর্তমান কলার ছড়ার মত করতলের উপযুক্ত একটি বামা করতল যোগাড়ে ব্যর্থ হয়ে, ভগ্ন মনোরথ তিনি ও হারাধন একে একে ধরাধাম পরিত্যাগ করলেন।
অতএব বংশের কুল প্রদীপ সবেধন পারিবারিক তেল কলের একচ্ছত্র মালিক হল।
রোজ বেলার দিকে বেনারসী জর্দা ঠাসা গোটা দুয়েক ছাঁচি পান মুখে গুঁজে বাড়ি লাগোয়া ঠাকুরদা স্বর্গত রামধন স্থাপিত তেল কলের ফরাস বিছানো অফিসে বসে কষ চোঁয়া পানের রস মুছতে মুছতে নোটের তাড়া গোনে।
সবেধনের দুটি শখ – একটি হল সন্ধ্যের পর তাঁর পাড়ার বহু কালের বন্ধু অমল, কমল ও বিমলের সাথে ঠাকুরদা আমলের এক লজঝড়ে গাড়িতে গঙ্গার ধারে এক চক্কর মেরে, সাহেব পাড়ার রংমশালি রেঁস্তোরার হাতছানি – সাধ্য থাকলেও সাহসের অভাবে, এড়িয়ে চলে আসা আর দ্বিতীয়টি হল সান্ধ্য ভ্রমণের পর হরিহর আত্মা অমল, বিমল ও কমলের সঙ্গে একতলার বসার ঘরে ফুলকো লুচি রাবড়ি সহযোগে অনেক রাত তক হরেক কিসিমের সিনেমা দেখা। এই হল তার দীর্ঘকালের রুটিন। এই শখটি তাঁর ছোটবেলা থেকেই ছিল। আশ্চর্য মনে হলেও হতে পারে, সবেধন এই সিনেমার নায়িকাদের চরিত্রগুলির সঙ্গে নিজেকে দেখতে পেত সিনেমায় দেখানো পরিবেশে।
আপাত দৃষ্টিতে সে বেশ তুরীয় মেজাজে ছিল। কিন্তু তার মনের দুর্গম অতলে দানা বেঁধে ছিল এক বিষম হতাশা বা বাস্তবে বিশেষ কিছু না-পাওয়ার ‘অ-সুখ’। সেই অ-অসুখটি হল -- শয়নে স্বপনে বিশেষ কোন চলচ্চিত্রের একটি মানবী চরিত্র তাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছিল বহুকাল। সেই বিশেষ পরিবেশের মানসীটির মিল খোঁজার সে চেষ্টা করেছে ঘটকদের দেওয়া রাশি রাশি ছবিগুলির ভিতর কিন্তু মানানসই কাউকে খুঁজে না পাওয়ার হতাশা চিরস্থায়ী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার মন সায়রে ভেসে থাকা সেই সিনেমার স্বপ্ন সুন্দরী --- অধরা থেকে গেছে। তার কল্পনার জগতে জ্বলজ্বল করত এই ছবিটি --
“ব্রাহ্ম মুহূর্তের ক্ষীণ চন্দ্রলোক পরিখা প্রাকারবেষ্টিত শ্বেত মর্মর রাজপ্রাসাদের সৌধ চুড়ায় চক্রাকারে উড্ডীয়মান সদ্য ঘুম ভাঙা কয়েকটি শ্বেত কবুতর। সৌধ চূড়ার আলিসার ধারে আলুলায়িত সাদা ওড়নার অবগুন্ঠনে অস্পষ্ট মুখাবয়ব - চন্দ্রালোক স্নাতা এক যুবতী দণ্ডায়মান। তাঁর বিরহ কাতর দৃষ্টি প্রাসাদ পরিখা দ্বারে গমনোদ্যত নায়কের পানে। ভাবি রাজ জামাতা ও তার ঢোল বাদক সুহৃদ দূর দেশে চলেছে রাজকার্যে। সৌধ চুড়ার আলিসার দিকে নায়ক হাত নেড়ে বিদায় জানাতেই সাদা ওড়নায় অবগুণ্ঠিতা নায়িকা মিলিয়ে গেল ফিনফিনে চন্দ্রলোক ---“
বংশ পরম্পরায় পাওয়া বিশাল এক চার ছত্রীযুক্ত খাটে সারা রাত সবেধন এপাশ ওপাশ করে, আধো ঘুমে স্বপনচারিনীর আগমন হয় - চমকে সবেধন জেগে ওঠে। মনের এই বিষম ‘অ-সুখ’ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে ফেরে। ব্রাহ্ম মুহূর্তে জ্যোৎস্না অভিসারে যাওয়ার লুকনো ইচ্ছে তার অধরাই থেকে গেছে।
বাড়িতে ছিল তার মায়ের দূর সম্পর্কের বিধবা বোন গোঁড়া কৃষ্ণ ভক্ত - মাথায় সফেদ বয়েজ কাট চুল, রসকলি চর্চিত খেন্তী মাসি। সুরধনী গত হওয়ার পর সংসারের ঝঞ্ঝাট সানন্দে নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।
সুতরাং সংসার ঝঞ্ঝাটহীন জীবনটা, শখ ও অ-সুখ নিয়ে বয়ে চলেছিল বেশ। সবেধনের বয়স তখন কত হবে! তেত্রিশ বা চৌঁত্রিশ তো বটেই। জীবনের সাংঘাতিক সময়। অমল, কমল ও বিমলের নানা পরামর্শ ও না – পাওয়ার যাতনার ঘাত প্রতিঘাতে সে তখন ঘুরপাক খাচ্ছে – ঠিক সেই সময় খেন্তী মাসী একদিন জানালেন— তাঁর গ্রামের পাড়াতুত ভাইঝি, শহরে নার্সিং পাঠরতা রাধুমনি গ্রাম থেকে ডেলি প্যাসেঞ্জারিতে বড়ই কাতর হয়ে পড়েছে। রাধুমনি যদি এই বাড়ি থেকেই কলেজ করে, তা’হলে মেয়েটির সুবিধে হয় আবার তিনিও একাকীত্ব থেকে মুক্তি পান। সবেধন আপত্তি করেনি।
অফিস ঘরের জানলা দিয়ে মাঝে মাঝে সবেধন লক্ষ্য করেছে বাড়ির দোতলার বারান্দায় কাপড় শুকোতে দিতে ব্যস্ত একটি পৃথুলা সুশীলা শ্যামবর্ণা মেয়েকে – কিন্তু সৌধচূড়ার আলসেতে দাঁড়িয়ে থাকা স্বপনচারিনী রমনীর আকৃতির সাথে মিল না থাকায় বিশেষ আমল দেয় নি।
স্বপনচারিনীর সাথে কল্পিত জ্যোৎস্না অভিসারে সবেধন তখন হাল ভাঙা নৌকার মত ঘুরপাক খাচ্ছে - অতল দরিয়ার মাঝে। কখন ঘূর্ণীর অসীম টানে তলিয়ে যাবে ঠিক নেই। জীবনের এই সাংঘাতিক সময় বিধাতা করলেন চরম রসিকতা। খেন্তী মাসি তক্কে তক্কে থেকে সেদিন সবেধনকে পাকড়াও করলেন –
“দ্যাখ সবু তোর মা বরাবর দু:খু করে গেছে তোর বিয়ে নিয়ে। মারা যাওয়ার আগে আমার হাত ধরে বলেছিল খেন্তী - হঠাৎ যদি মরে যাই তুই ওর বিয়ের ব্যবস্থাটা করিস।" –
"এখন কাকে তোর পছন্দ বল আমিই তোর বিয়ের ব্যবস্থা করছি। আর না বলতে পারবি নে।” খেন্তী মাসির ঘন ঘন তাগাদায় কম কথার মানুষ, অতিষ্ঠ সবেধন এক দিন টিভির স্ক্রিনে তার সেই সিনেমার “স্বপনচারিনী” কে দেখিয়ে দিলে – স্তম্ভিত খেন্তী মাসি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে বলেন – “হায় কপাল! এ কি ছিষ্টিছাড়া জেদ তোর সবু! তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? এখন বুজলাম আমার সুরো কেন এত দু:খু পেয়ে অকালে চলে গেল – এই ডানা কাটা পরী হুরী কি আমাদের পোষায়? যত অনাছিষ্টি কাণ্ড ---। তবে শুনে রাখ – এবার আমিই তোর জন্য পাত্রী ঠিক করব। যদি অবাধ্য হস – সেই দিনেই আমি কাশী বাসী হব।”
সে দিন বন্ধুদের সঙ্গে হাওয়া খেয়ে ফিরলে যথা রীতি বাবার আমলের কাজের লোক জগুদা বিকেলের খাবার দিয়ে যায়। অন্যমনস্ক সবেধন আজ কোন সিনেমা দেখবে এই চিন্তায় বন্ধুদের সঙ্গে গভীর আলোচনায় মগ্ন। হঠাৎ খাওয়ার প্লেটে চোখ পড়ায় চমকে উঠে বিষম খেলেন – বড় এক বাটি শুকনো মুড়ি আর রাজ্যের শশা, টম্যাটোর স্তুপ।
“এটা কি জগুদা?”
“দিদিমনি বলেছেন আজ থেকে এই খাবারই তোমায় খেতে হবে আর ওই রাবড়ি, সন্দেশ, লুচি, কষা মাংস - সব বন্ধ।“
“এ্যাঁ! এত পাশের পাড়ার হরি গোয়ালার গরুতেও ছোঁবে না! দিদিমনিটা আবার কে? মাসিমা কোথায়? জগুদার সাদা গোঁফের ফাঁকে মুচকি হাসি খেলে গেল –
“মাসিমা সকাল থেকে ঠাকুর ঘরে দোর দিয়েছেন – বলেছেন এই বয়সে আর পেরে উঠছেন না। আজ থেকে রাধু দিদিই সব ----।“ জগুদার কথা শেষের আগেই - বসার ঘরের দরজা ঠেলে হাজির সেদিনের বারান্দায় দেখা মেয়েটি।
“জগুদা ঠিকই বলেছে – আমাদের কলেজের ডায়েটিশিয়ান দিদি বলেছে আজকালকার লোকেরা কেবল তেল ঘি মিষ্টি খেয়ে শরীরের সব্বনাশ করছে। সবার এখন বেশী বেশী সব্জি ফল খাওয়া উচিত। এবার সকালেও ওই আটার রুটি সব্জী হবে – লুচি পরোটা বন্ধ। ডায়েটেশিয়ান দিদি খাবারের লিষ্টি লিখে দিয়েছেন।”
একটা কাগজ সবেধনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বন্ধু ত্রয়ের দিকে তির্যক প্রাণঘাতী কটাক্ষ হেনে
গটগটিয়ে জগুদার পৃথুলা রাধু দিদি প্রস্থান করল। অমল, বিমল, কমল অবস্থা বেগতিক দেখে– “আজ আসি রে সবু –” --- বলে পাততাড়ি গোটালো। এহেন সোজাসাপটা কথায় থতমত সবেধন – লিষ্টিতে চোখ বুলিয়ে এবার অকুল পাথারে পড়ল। সে রাতে তার সিনেমা দেখার ইচ্ছা চলে গেল। মনের গহনে ডুবে থাকা সেই অ-সুখের সঙ্গে যোগ হল আরেক যন্ত্রণা – ভালো মন্দ খাওয়াটাও গেল বন্ধ হয়ে। দিনের পর দিন যায় – খেন্তী মাসী ভিন্ন গ্রহে থানা গেড়েছেন। খুব দরকার না পড়লে তিনি ঠাকুর ঘর থেকে আর বেরোন না। কথাবার্তা বন্ধ। জগুদাও যেন কার অদৃশ্য অঙ্গুলী হেলনে চলেছে – তার যেন ধনুক ভাঙ্গা পণ - নতুন দিদিমণির খাবারের লিষ্টির বাইরে পাদমেকং ন গচ্ছামি। দিদিমণির নিঃশব্দ অগ্নি বর্ষি কটাক্ষের তাড়নায় অমল বিমল কমল আর বসার ঘরের ধারে কাছে আসে না। বৈকালিক ভ্রমণ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে। লাগাতার দুশ্চিন্তার নাগপাশে পড়ে সবেধনের স্বপনচারিনী বেশ কিছুদিন জ্যোৎস্না অভিসারে ক্ষান্তি দিয়েছেন। সবেধনের আড়েবহরে বর্ধিত স্নেহবহুল শরীর ইতিমধ্যে চোপসানো বেলুনের আকার ধারণ করেছে। এই দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার তাগিদে – অফিস পালিয়ে সবেধন এক বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে বসল সলা পরামর্শে। অনেক দিন পর পাড়ার দোকানে রাবড়ি সহযোগে বন্ধুদের সঙ্গে বিস্তর আলোচনার পর সাব্যস্ত হল সবেধন যত শীঘ্র সম্ভব মাসীর পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করলে, বেশি দিন লাগবে না -- জগুদার ওই দিদিমনি কে শায়েস্তা করবে ওই নতুন বউ।
কাল বিলম্ব না করে সবেধন তার বিয়ের ইচ্ছের কথা জানিয়ে দিল ক্ষেন্তী মাসিকে। এক গাল ফোকলা হাসি নিয়ে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করে ক্ষেন্তী মাসি জানালেন –
“অনেক দিন দেশে বাড়ি যাওয়া হয় নি রে সবু। শুনলাম রাধুর কলেজও মাস খানেক বন্ধ থাকবে - এই ফাঁকে মেয়েটাকে নিয়ে গ্রামে কয়েকটা দিন ঘুরে আসি রে। রাধু বেচারার মা বাপের জন্য বড়ই মন খারাপ – জগু এ কটা দিন সামলে দেবে।” ওই দজ্জাল মেয়েটা বিদেয় হবে শুনে সবেধন প্রায় নেচে উঠল।
দিন চারেক পর মাসী পাড়াতো ভাইজীকে নিয়ে দেশের বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলেন।
সবেধনের গত কয়েক মাসের মরুভূমি সম জীবনে সেই পুরনো মধুর বসন্ত ফিরে এল। প্রাণ ফিরে পাওয়া কমল, অমল ও বিমল মহানন্দে ভেসে গেল পুরনো রুটিনে। শুরু হয়ে গেল তাদের সান্ধ্য ভ্রমণ। সেই সঙ্গে ফিরে এল এক তলার বসার ঘরে চর্ব্য চোষ্য লেহ্যর সাথে বহু রাত তক সিনেমা দেখা – একেবারে তুরীয় আনন্দে ভেসে গেল চার বন্ধু। রাতের স্বপনচারিনীর উঁকি ঝুঁকি - আবার রসের ঢেউ ওঠায় সবেধনের আধো ঘুমে।
তবে সুখ বরাবরই ক্ষণস্থায়ী।
জীবনটা বেশ সরসর করে গড়িয়ে চলছিল – কিন্ত হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রাঘাত। সেদিন অফিস থেকে দুপুরের খাওয়া সারতে বাড়ি আসতেই সবেধন দেখে হাসি ভরা ফোঁকলা মুখে খেন্তী মাসী খাওয়ার ঘর তদারকিতে ব্যস্ত – আশপাশ উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখতে পেল না জগুদার রাধু দিদিকে – মনটা একটু শান্ত হলেও জগুদার সাদা গোঁফের ফাঁকে অহেতুক হাসির ঝলকে একটু সন্দিগ্ধ হলেন । চতুর্দিকে এই হাসির ফোয়ারার তল খোঁজার চেষ্টা করেন – ব্যাপারটা কি?
তরিবত করে পঞ্চব্যঞ্জন খাওয়ার আধা পথ আসতেই – মাসী এবার খোলসা করলেন –
“সবু তোর ওই ছিনেমার হূরি পরী ছাড় - একেবারে রাজ যোটক পাত্রী ঠিক করে ফেলেছি। আজ থেকে ঠিক এক মাস পর বিয়ে দিন ঠিক হয়ে গেছে।” সবেধন তখন সবে কাতলার একটা আধলা পিস্ চোখ বন্ধ করে চিবচ্ছিল - কথাটা শুনেই খেল এক রাম বিষম। চোখ বন্ধ অবস্থায় ভাবে – ‘আলাপ করানো বা ছবি দেখা নেই, এক্কেবারে বিয়ের পিঁড়ি!! এ কি তানাশাহি কাণ্ড! – এক্কে বারে ওঠ ছোঁড়া তোর বিয়ে? না না দেব দেবী স্মরণ করে লাভ নেই – এক্ষুণি তার অগতির গতি অমল বিমল কমলের স্মরণ না নিলেই নয়।’ কোন ক্রমে খাওয়ার পাট চুকিয়ে – দুদ্দাড় করে ছুট লাগালো অফিস ঘরের দিকে।
অমল বিমল কমল বিস্তর মাথা খাটিয়ে পরামর্শ দিলে – “বিয়েটা করেই ফ্যাল সবু – তোর নতুন বউ এসে ওই রাধুর সব ব্যাপারে নাক গলানো বন্ধ করবে। ভালোই হল -- চল বরযাত্রী যাওয়ার তোড়জোড় করা যাক।“
যথা সময় ক্ষেন্তী মাসী জানালেন মেয়ের বাড়ি তাঁর পাশের গ্রামে। সবুর বিয়ের আগে মেয়ে দেখা বা তার ছবি দেখার বায়না এক তুড়িতে উড়িয়ে – বিয়ের তোড়জোড়ে ব্যস্ত হলেন।
বরযাত্রী যথা সময় এসে পৌঁছল ক্ষেন্তী মাসির পাশের গ্রামে। হৈ হৈ হুল্লোড়ের সঙ্গে তান ধরেছে বেসুরো শানাই। নানান ফুলের ও এসেন্সের গন্ধের সাথে ম্যারাপ বাঁধা আঙিনার বদ্ধ বাতাস মিলেমিশে যেন জমাট বেঁধেছে। বিয়ের আসরে হাজিরার ডাক শুনে, সবেধন, বন্ধু তিনজনের আশ্বাস বানী শুনতে শুনতে – ঘামতে ঘামতে - বলির পাঁঠার মত বিয়ের মন্ডপে পৌঁছল। শুভ দৃষ্টির মাহেন্দ্র ক্ষণ হাজির হল। সবেধনের চোখের সামনে এক লহমায় সেই ফিলিমের রিল -- শ্বেত মর্মর রাজ প্রাসাদের সৌধ চুড়ার স্বপনচারিনীর অবয়ব ভেসে উঠেই মিলিয়ে যায় – “ওরে সবু চোখ খোল, চোখ খোল --” তিন বন্ধুর কাতর তাগাদায় সবেধন চোখ খুলেই ভিরমি খেল ---- একি !!সামনে ফুলের মালা টালা পরে দাঁড়িয়ে - এ যে সেই মূর্তিমতি রাধুমনি!! এর পর তিন বন্ধুর সহায়তায় কোন মতে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
সদ্য নতুন শ্বশুরবাড়ি থেকে নিজেদের বাড়ি অবধি নব বধু সমভিব্যাহারি সবেধন ছিল বিমর্ষ ও নিশ্চুপ। তিন বন্ধু বড়ই চিন্তিত হল। পরেরদিন তারা ও বাড়ির লোকেরা হল আরো অবাক। সবেধন তার শোওয়ার ঘর পরিবর্তন করেছে এক তলার বসার ঘরে।
বন্ধুদের সঙ্গে সেই একতলার ঘরে সিনেমা দেখা, রাবড়ি সহযোগে আড্ডা— একটু যেন বেপরোয়া সবেধন পুরনো অভ্যাস চালু করে দিল পুরোদমে। নতুন বউ রাধু প্রথমে কিছু বলেনি। এখন সে এক তলার ঘরের পাশে নিঃশব্দে বসে থাকে চোখে এক রাশ অভিমান নিয়ে। সেই সঙ্গে কড়া চাউনির নিঃশব্দ অগ্নি বর্ষণে অমল কমল ও বিমলের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার যোগাড় হল।
দু’চার দিনের মাথায় হঠাৎ খাবারের তালিকায় লুচি, রাবড়ি, কষা মাংস নির্বাসিত হল। বন্ধুরা দূরে সরে গেল, বৈকালিক ভ্রমণ বন্ধ, সিনেমার স্ক্রিনে স্বপ্ন চারিণীও যেন অভিমান করে উধাও হলেন।
সবেধন নতুন বউ এর দিকে ফিরে তাকায় না। তার জীবনের রঙ রস হল উধাও। এদিকে রাধুর জগত এখন রান্না ঘর সঙ্গে কাঁচ কলা আর পেঁপের রকমারি রন্ধন প্রক্রিয়া আবিষ্কারে আবদ্ধ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি মত অভিমান পুঞ্জীভূত হয়ে ফেটে পড়ার উপক্রম হল। সেই নিঃশব্দ রাগ এবার চরমে পৌঁছে রাধু কড়া চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিল— এই আলাদা ঘর, আলাদা জীবন, তাঁর পছন্দ নয়।
এক রবিবারের দুপুর। অঝোরে বৃষ্টির সাথে ঘন ঘন বজ্রপাতের কড়া নাড়ায় প্রকৃতি উন্মত্ত। ভর দুপুরে নেমে এসেছে অকাল সন্ধে। খেন্তী বুড়ি ঠাকুর ঘরে দোর দিয়েছেন। এমন দিনে বন্ধু ও সিনেমা বিহনে বিমর্ষ সবেধন গরম গরম খিচুড়ি বেগুনীর সাধ মনের কোনে চেপে, বিধিকে দোষারোপ করতে করতে বিছানায় চিৎ হয়ে অন্যমনস্ক মনে ঘরের কড়িকাঠ গুনছে – ঠিক সেই সময়, তার বিছানার পাশে আচমকা কারুর নি:শব্দ উপস্থিতির অনুভবের পর মূহুর্তে তার শুকিয়ে যাওয়া বপু সজোরে এক জোড়া নরম বামা হস্তে আলিঙ্গন বদ্ধ হল।
এরপর? এরপর ----
বাড়ি তখন নিস্তব্ধ। অনেকক্ষণ টিভিতে নাচ গানের শব্দ ভেসে আসছে না। কৌতুহলী খেন্তী মাসী ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে চুপিচুপি সবেধনের ঘরে উঁকি মেরেই ছিটকে সরে এলেন ------
তাঁর চোখে ধরা পড়ল এক দৃশ্য— গভীর চুম্বনে আবদ্ধ সবেধন ও রাধু। একজনের বহুদিনের জমা অভিমান, আর একজনের জমে থাকা নানা অ-সুখ ও স্বপণচারিণীর উধাও হওয়ার যাতনা – দুপুরের বৃষ্টি ভেজা ঝোড়ো হাওয়া এক ধাক্কায় সব উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল।
খেন্তী মাসী তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর তাঁর ফোঁকলা মুখে এক গাল হাসি ফুটে ওঠে, কপালে হাত ছুঁয়িয়ে রাধাকৃষ্ণের প্রতি নমস্কার জানিয়ে তাঁর স্বগতোক্তি --
“এই তো, আমার সুরো নিশ্চয়ই শান্তি পেল আজ। সবু, তুই তো দেখি সিনেমার নায়ক হয়ে গেলি! দেখ দিকি যত অনাছিষ্টি কাণ্ড – ঘরের খোলা দোরের দিকেও এদের নজর নেই।”
মাথা নাড়তে নাড়তে ক্ষেন্তী মাসি ঠাকুর ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
গল্প

গোল্ড প্রিন্টের শাড়ি পরে গড়িয়াহাটের মোড়ে আসতে পারি ঠিক সন্ধ্যা ছ’টায়। পাড়ার প্যান্ডেলে গানটি বেজে উঠেছে। মিঠু ও গুনগুন করতে লাগল গানটি।
আজ বিজয়া দশমী। মা বিসর্জন যাবেন। নিয়ে যাবেন এই বছরের সমস্ত ক্লেদ। তবে সেটা দুঃখের ঘটনা নয়। দশমী শেষ হতেই আবার অপেক্ষা শুরু হবে নতুন বছরের। নতুন আলোর। যেমন মিঠুর জীবনে আসতে চলেছে নতুন আলো।
মিঠুর দশ বছরের পুরনো প্রাক্তন প্রেমিক দেখা করতে আসছে কলকাতায়। বিকেলে মিঠু তার সাথে যাবে গড়িয়াহাটের মোড়ে। গোল্ড প্রিন্টের শাড়ি আগে থেকেই কেনা হয়ে আছে। আর কিনে রেখেছে কিছু নারকেল। ওর প্রাক্তন নাড়ু খেতে খুব ভালোবাসে। তাই বাজার থেকে নারকেল কিনে এনেছে মিঠু।
মিঠুর নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে গেলো। তিনি নাড়ু বানাতে বানাতে বলতেন, নারকেল হবে লোহার মতো শক্ত। তবেই না তার ভিতরে সাদা ধবধবে শাঁসটি পাওয়া যাবে। আর জলে টইটুম্বুর হয়ে থাকবে নারকেল। সেই নারকেল আদর্শ নারকেল নাড়ু তৈরি করার জন্য। বুঝলি রে পাগলি। আজ মিঠুর মা আর নেই। কিন্তু সকলের মা দূর্গা তো আছেন।
মায়ের কথা মনে রেখে লোহার বলের মতো শক্ত নারকেল নিয়ে এসেছে। এবার সে স্নান করবে, চুল বাঁধবে, নারকেলগুলো ভাঙবে এবং ভেঙে কুটিয়ে নারকেল নাড়ু তৈরি করবে। এটি সময়ের ব্যাপার। প্রথমে নারকেল ভেঙে তার জলটি একটি গ্লাসে ঢেলে দিতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে শাঁসটি খুরপি দিয়ে কুটিয়ে বাটিতে রাখতে হবে। তারপর শাঁসে চিনি মিশিয়ে গ্যাসের ঢিমে আঁচে ফোটাতে হবে। কাঠের বা কয়লার উনুন হলে ভালো হতো। কিন্তু আজকাল কী আর এই সব সরঞ্জাম পাওয়া যায় এই কলকাতা শহরে।
প্রথম নারকেলটি ভেঙে মিঠু নারকেলের জলটি একটি কাচের গ্লাসের পাত্রে রাখল। ভেতরের সাদা শাঁসটি কুটিয়ে বাটিতে রাখতে যাবে, এমন সময় দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ।
কে এলো এই সময়?
দরজার চৌকাটের ওপারে আগুন্তুকের আভির্ভাব ঘটেছে। মিঠুর বুকটি হালকা কেঁপে উঠল।
উত্তম। ঠাকুরপুকুর থানার সাব-ইনস্পেক্টর।
তবে আজ ইউনিফর্মে নেই। মুখ থেকে ভুরভুর করে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে।
মিঠুকে ধাক্কা দিয়ে উত্তম ঘরের ভেতরে ঢুকল।
– কী ব্যাপার? কিসের প্রস্তুতি হচ্ছে?
– বিজয়া দশমীর মিষ্টি বানাচ্ছি আমি। তুমি এখন যাও।
– যাবো তো পরে। কিন্তু খালি মায়ের বিসর্জনের সঙ্গে কারুর কি আগমনও হবে এখানে?
– মানে? কী বলতে চাও তুমি? – মিঠু জোর গলায় বলে উঠল।
– তোমার সোশ্যাল মিডিয়াটা আমি দেখছিলাম।
– কেন? আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে তুমি নাক গলাবে না!
উত্তম রাগে একটি থাপ্পড় কোষালো মিঠুর গালে।
– তোমার একটু ভুল হয়েছে মিঠু। আমি তো তোমায় ছাড়তে পারব না।
মিঠু ফোঁপাতে লাগল। ওর মাথায় কোনো কথাই ঢুকছে না।
এদিকে উত্তম চিৎকার করে চলেছে –
– তুমি ওই শয়তানকে কেন নিজের ইনস্টাগ্রামে বন্ধু করে রেখেছ?
– তুমি কি জানো না আমি কত ভালোবাসি তোমায়?
– আমাদের এখনো ডিভোর্স হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না।
মিঠু কিছুই শুনতে পাচ্ছে না, ওর সমস্ত পুরোনো দুঃস্বপ্ন যেন জীবনে আবার ফিরে আসছে।
উত্তমের মদ খেয়ে ওর ওপর অত্যাচার করা, সন্দেহবাতিক হয়ে ঝগড়া করে মারধোর করা, সেই অসহ্য যন্ত্রণা নিতে না পেরে আলাদা থাকা সব যেন বৃথা হয়ে যাচ্ছে। ও আর পারবে না এই অবস্থায় থাকতে। হঠাৎ আবার বাংলা গান বেজে উঠল প্যান্ডেলে – বালিতে তোমার নাম লিখে দেবো জলে ধুয়ে যাবে, জলে ধুয়ে যাবে ফুলেতে তোমার নাম লিখে দেবো রোদে জ্বলে যাবে, রোদে জ্বলে যাবে হৃদয়ে তোমার নাম লিখে দেবো বদনাম হয়ে যাবে, বদনাম হয়ে যাবে।…………….
ঠাকুরপুকুর থানার বড়বাবু একবার নিজের ঘড়িটা দেখলেন। রাত ৮টা বাজে। আর বিজয়া দশমীতে ঝামেলা না হলেই হলো। বড়বাবু আর কিছুক্ষণ বসে বাড়ির দিকে রওনা দেবেন। এমন সময় ল্যান্ডফোনটি বেজে উঠল ট্রিং ট্রিং শব্দে। কে আবার এখন ফোন করেছে?
– হ্যালো। ওপাশ থেকে কান্নার আওয়াজ আসতে লাগল।
বড়ো বাবু সতর্ক হয়ে উঠলেন সঙ্গে সঙ্গে।
– হ্যাঁ, কে বলছেন?
– মিঠু বৌদি, আপনি?
– ঠিক আছে, আমরা আসছি।
বড়বাবু ফোনের স্পিকার নামিয়ে রাখলেন। ঘরের ভিতর দু’জন হাবিলদার ওনার দিকে তাকিয়ে ছিল নির্দেশের অপেক্ষায়।
তিনি তাদের বললেন – জিপ বার করো, আমাদের একবার এই কাছেই যেতে হবে।
– কেন স্যার? কী হয়েছে?
– উত্তমের নাকি মৃতদেহ পাওয়া গেছে।
কিছুক্ষণ পরেই তীব্র গতিতে একটি পুলিশ ভ্যান থানা থেকে বেরিয়ে গেল।
ছিমছাম দোতলা বাড়ি উত্তমের। বা বলা ভালো মিঠুর। মিউচুয়াল সেপারেশনের আবেদন করার পর মিঠু একাই থাকে এখানে।
বড়বাবু উত্তম এবং মিঠু দুজনকেই চেনেন। উত্তম তো ঠাকুরপুকুর থানার কর্মীও বটে। এবং সেই সূত্রেই জানেন, ওর স্বভাব এবং চরিত্র দুটোই ভালো নয়। কিন্তু খুন তো খুনই।
তিনি ঘরের ভিতরে ঢুকলেন – এক কোণে পড়ে আছে উত্তমের দেহ। রক্ত বেরিয়ে এসেছে মাথা থেকে। অন্য কোণে মিঠু দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
ঘরের মাঝখানে রাখা একটি ডাইনিং টেবিল ।
এক এক করে ফরেনসিকের লোকজন প্রবেশ করতে লাগল ঘরের ভিতর। তন্নতন্ন করে তল্লাশি হতে লাগল ঘরটির ।
বড়বাবু এগিয়ে গেলেন মিঠুর কাছে। ওনাকে দেখে মিঠুর কান্না যেন আরও গতি পেল।
– কী হয়েছিল, বৌদি?
– জানি না, আমি কিছুই জানি না।
– উত্তম তো আপনার সঙ্গে থাকতো না, তাই না?
– হ্যাঁ, কিন্তু বাড়ির চাবি এক জোড়া ওর কাছে সব সময় ছিল।
– আমি বাজার করতে গিয়েছিলাম, বিজয়ার মিষ্টি বানাবো বলে নারকেল কিনে এনেছি। তারপর দেখি ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ভিতরে ঢুকতেই এই অনিষ্টকর কাণ্ড – মিঠু আবার কাঁদতে শুরু করল।
– আপনাদের কোনো ঝগড়া হয়েছিল?
প্রশ্নোত্তর মিঠু ও বড়বাবুর চলতে থাকল, এবং এরই মাঝে ফরেনসিকের এক কর্মী এসে বড়বাবুকে ডাকল।
বড়বাবু মিঠুর থেকে একটু দূরে সরে বললেন – কিছু ক্লু পেলে? মার্ডার ওয়েপন?
– না, কিছু পাওয়া যাচ্ছে না এই মুহূর্তে, তবে একটা জিনিস পরিষ্কার।
– কী?
– উত্তমকে কোনো ধাতব বল দিয়ে মারা হয়েছে। আপনি মাথার জখমটা দেখুন, এরকম আকৃতির ক্ষত একমাত্র কোনো গোলাকার শক্ত বস্তু দিয়েই হতে পারে।
– আচ্ছা, খুঁজে দেখো সেরকম কিছু পাও কিনা।
– এমনও হতে পারে, কোনো পুরনো শত্রু সুযোগ বুঝে ঘাপটি মেরে মাতা ফাটিয়ে মেরেছে।
মিঠু আবার এল বড়বাবুর কাছে। ওর হাতে একটি থালা, তাতে কিছু নারকেল নাড়ু।
– আপনারা এত রাতে খালি পেটে থাকবেন, দয়া করে এটা খেয়ে নিন।
– না না, বৌদি, থাক।
– না, আজ বিজয়া দশমী, আপনারা খান। জানেন, এই তো এই সময় মিষ্টিমুখ করতে হয়, বলে বাটিটা ডাইনিং টেবিলের ওপর রেখে দিল মিঠু। ভেতরের ঘরে গিয়ে বসল।
ভেতরের ঘর থেকে ও শুনতে পেল – পুলিশের কথোপকথন
– না, মিষ্টিটা ভালোই হয়েছে।
– হ্যাঁ, যা বলছো। আমার মা বলতেন, নারকেলকে লোহার মতো শক্ত হতে হবে, তবেই সেটার থেকে মিষ্টি নারু হবে।
– নারকেলের গবেষণা ছাড়ো, এবার মার্ডার ওয়েপনটা কী বলো তো?
– জানি না, তবে আমার ইন্সটিংক্ট বলছে, ওটা আমাদের চোখের সামনেই আছে।
এটি শুনে হাসতে লাগল মিঠু –
উত্তম ওকে থাপ্পড় মারার পরও বেসামাল হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। হাতের কাছে ছিল একটি নারকেল, ওটি তুলে সপাটে মারে উত্তমের মাথায়। নারকেল ও উত্তমের খুলি দুটোই চূর্ণ হয়ে যায়। সেই ভাঙা নারকেলের নাড়ু এখন পুলিশ অফিসাররা খাচ্ছেন।
ঠিক এই মুহূর্তে উলু ধ্বনি বেজে উঠল লাউডস্পিকারে –
যা দেবী সর্বভূতেষু বুদ্ধিরূপেণ সংস্থিতা,
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।
প্রবন্ধ
বাংলার
পূর্ব-পশ্চিম
রথীন্দ্রনাথ বড়াল
ডঃ নগেন ঘোষ লেন, কলকাতা

আমেরিকায় পৌঁছে অবাক হয়েছিলাম বাসে চেপে। গাড়ীর স্টিয়ারিং উল্টোদিকে অর্থাৎ ভারতবর্ষের ডানদিকের বদলে বাঁদিকে। আপ-ডাউন রাস্তার চলনও উল্টো। থাকার ঘরে ঢুকে দেখলাম—আলো-পাখা জ্বালানোর সুইচ্ উল্টো। মানে আমাদের দেশে – নীচে নামালে আলো জ্বলে – ওদেশে ওপরে ওপরে তুললে আলো জ্বলবে। আজ আমেরিকার আর ভারতের বৈপরিত্যের কথা বলতে বসিনি। বলতে চেয়েছি—পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিদিনের ব্যবহারিক বৈপরিত্য।
মামাবাড়ি গেলে দেখা হল বেবেদিদিদের সাথে। খেলাধূলা-খাওয়াদাওয়া চলতে থাকত। আমরা ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ না করে কিছু মুখে দিতাম না। কিন্তু বেবিদিদি ও আরো ওই বাড়ির দাদাদিদিদের দেখতাম—দিব্যি, ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃরাশ সারতে। তাদের দাঁতমাজা স্নানের আগে। জানিনা এই ব্যবস্থা পূর্ববঙ্গের সব জায়গায় চালু কিনা। মুখ ধোওয়ার পর স্নান। আমরা স্নান করতাম খাওয়ার মানে মধ্যাহ্নভোজের আগে। কোনোদিন বাদ পড়লে—সেদিন আর স্নান করা হত না। কিন্তু অপরপক্ষে দেখতাম খাওয়ার আগে স্নানের বাধ্যবাধকতা না থাকা। আগে করলেও চলে পরে করলেও চলে। স্নানের আগে সারা অঙ্গে সরিষার তেল আর মাথায় নারকেল তেল মাখা অবশ্য কর্তব্য ছিল। কিন্তু পূর্ববঙ্গের দাদা-দিদি-বন্ধুদের মধ্যে এই বাধ্যবাধকতা ছিল বলে মনে হয়নি বরং স্নানের পর তেল মাখার প্রচলন ছিল কিংবা আছে বলেই মনে হয়। আর একটি বিষয়—গামছার ব্যবহার। গামছা ঘটিদের জীবনযাপনের অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। বাবা-কাকা-দাদুদের স্নানের আগে পরে গামছা পরে কাটাতে দেখেছি। আর আমদাদুতো জীবনটা কাটিয়ে দিলেন গামছা পরেই। শখ করে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভালো গামছা আনানো অনেক ঘটি বাবুদের অভ্যাস ছিল। বিশেষতঃ বাঁকুড়ার গামছা কিংবা উড়িষ্যার গেরুয়া গামছা। এই গামছা প্রীতি ওপার বাংলার মানুষের বোধহয় কম। গামছার পরিবর্তে অন্য প্রথা নিশ্চয়ই প্রচলিত ছিল।
স্নানের পরই আসে খাওয়ার কথা। এর বৈচিত্র্যের কথাতো বলে শেষ করা যায় না। কিছু কথা উল্লেখ করি—যেগুলো চোখে পড়েছে। ভুল কিছু বললে অবশ্যই ক্ষমা করবেন। প্রথমে বলি, পান্তা খাওয়ার কথা। আমরা ঘটিরা তো ভুলেও পান্তা খাব না। অরন্ধনের একদিনই এই পান্তাভাত অল্প করে খাওয়া হত। অথচ ওপার বাংলার মানুষের মধ্যে পান্তা খাওয়ার মধ্যে বিপুল ভালবাসা দেখেছি। নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গের মাছ আর শাকপাতা খাওয়ার অভ্যাসও—পশ্চিমবঙ্গের থেকে অনেকটা আলাদা।
নানারকম শাক, মান, কচু, ওল ইত্যাদির ব্যবহার এপার বাংলার মানুষের জানা ছিল না। কিন্তু ওপার বাংলার মামীমা, দিদাদের হাতের এইসব নিরামিষ পদ আমায় বার বার মোহিত করেছে। মাছের বৈচিত্র্য সত্যিই বাংলাদেশকে মানে পূর্ব-পশ্চিম দুই বাংলাকেই সমৃদ্ধ করেছে। রুই, কাতলা, ইলিশ, চিংড়ির জনপ্রিয়তা দুই বাংলায় থাকলেও— দুই বাংলার জন্য দুটো আলাদা তালিকা অবশ্যই আমি তৈরী করে দিতে পারি। পশ্চিমবাংলা—পারশে, ট্যাংরা, তপশে, ভাঙ্গ, গুরজারি, নেদশ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর পূর্ব বাংলার—আর, বোয়াল, চিতল পাবদা। এই চারটি মাছ আমরা ছোটবেলায় খাওয়ার সুযোগ পায়নি। পশ্চিমবাংলার তালিকার মাছ পূর্ববঙ্গের ভাইবোনেরা কতটা খেয়েছে ঠিক জানা না থাকলেও—ব্যবহারের প্রকট বৈপরিত্য অবশ্যই ছিল আছে। বেলে, গুলেও পশ্চিমবাংলার প্রিয় মাছ। ভেটকি, পমফ্রেট দুই বাংলারই প্রিয়। আর শুঁটকি মাছের নানা পদ—একান্তই পূর্ববঙ্গের। এই বঙ্গের কাউকে আমি শুঁটকি চাখতে দেখিনি। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। তবে মূল পার্থক্য বোধহয়—পরিশ্রম, অধ্যাবসায় আর মানসিকতায় সেক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গ আমাদের পশ্চিমবঙ্গকে কম করে ৫ গোল দিয়েছে। পশ্চিমবাংলার বাঙালীদের মধ্যে এক বড় অংশকে দেখেছি—কোন উদ্যোগ ছাড়া পৈতৃক বিষয় সম্পত্তির ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাতে। কেউ কেউ পৈতৃক ব্যবসা দেখাশুনা করতেন। ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রেই ঘটেনি। বরং সংকুচিত হতে হতে সেই সব ঐতিহ্যশালী প্রতিষ্ঠান চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। আমার মামাবাড়ীর ঐতিহ্যশালী সুপ্রাচীন বটতলার বইয়ের ব্যবসার কথা মনে আসে। অন্যত্র সে আলোচনা করব। মা-মাসী-কাকীদের কোনোরকম চাকরীক্ষেত্রে যোগদানের উৎসাহ দেখিনি কিংবা সামাজিক পরিস্থিতি সেকাজে বিরত করেছে। অপরপক্ষে পূর্ববাংলার মানুষদের কঠোর পরিশ্রমে ও কৃচ্ছ্বসাধনে এই বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেছি। বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী পদে তাদের যোগদান উল্লেখযোগ্য। ওপার বাংলার মা-মাসীরাও স্কুল কলেজে শিক্ষকতা করেছেন কিংবা ক্ষুদ্র সংগঠন/ব্যবসায় মনোনিয়োগ করেছেন। অলসতা সর্বক্ষেত্রে এবাংলাকে পিছিয়ে দিয়েছে। অপরপক্ষে উদ্যম ওপার বাংলার মানুষকে এগিয়ে দিয়েছে একটু একটু করে। এপার বাংলার মানুষ তাদের পাঁচমহল বাসস্থান রক্ষা করতে পারেনি। ভাড়া দিতে দিতে এক এক মহল হাতছাড়া হয়েছে। তারপর পুরোটাই প্রোমোটরদের দখলে। ওপার বাংলার কাকুরা, জ্যেঠুরা নিঃস্ব অবস্থায় এসে এক কামরা ঘরে অবর্ণনীয় কষ্ট করে—আজ তারা সুস্থ পরিচ্ছন্ন বাসস্থানের অধিকারী হয়েছেন। অপরপক্ষে, এ পারের অট্টালিকায় বট-অশ্বত্থের ঝুড়ি প্রায়শই দেখা যায়—যেগুলির সংস্কার করা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি। তাই ধ্বংস ক্রমশই ত্বরান্বিত হচ্ছে।
প্রবন্ধ

ষাটের দশকের কলকাতা আমার জীবনের সবচেয়ে গভীর স্মৃতি। আমি তখন তরুণ, কলেজে পড়ি, বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখি। প্রতিদিন সকালে বেরোলে মনে হতো শহরটা যেন এক বিশাল নাট্যমঞ্চ, যেখানে একই সঙ্গে চলেছে আনন্দ আর দুঃখ, গান আর স্লোগান, প্রেম আর মৃত্যু।
সকালবেলা কলেজ স্ট্রিটে পা রাখলেই ভেসে আসত ছাপাখানার কালি, পুরোনো বইয়ের পাতা আর ভিজে মাটির গন্ধ। ফুটপাত জুড়ে ধুলো ধরা বইয়ের স্তূপ, ছেলেরা আঙুল চালিয়ে পাতার ভেতর খুঁজছে জীবন বদলে দেওয়া বাক্য। আমিও আঙুল চালিয়ে পাতা উল্টাতাম— কখনো উপন্যাস, কখনো রাজনৈতিক তত্ত্ব, কখনো কবিতার বই। খুব বেশি টাকা থাকত না, তাই দর কষাকষি করে কয়েক আনা কমিয়ে কিনে নিতাম। বিক্রেতা হেসে বলত, “আপনারা তো সবাই ভবিষ্যতের বড়লোক হবেন।” আমি বুক ফুলিয়ে ভাবতাম— হ্যাঁ, আমি বড় হব।
ট্রামের ঝনঝন শব্দ যেন শহরের সুর। হাতচালিত রিকশাওয়ালাদের ক্লান্ত মুখ, ঘামভেজা শরীর, গলির ভেতর ভরপুর ভিড়—সব মিলিয়ে কলকাতা যেন সর্বদা চলমান। তবুও প্রতিটি মোড়ে এক অজানা ভয়। কখন যে কোন মিছিল বেরোবে, পুলিশ কবে লাঠি চালাবে, রাস্তা কবে রক্তে ভিজবে, কেউ বলতে পারত না।
কিন্তু সেই স্বপ্নের শহরের বুকেই জমে ছিল ক্ষুধার আর্তনাদ। এক ভোরে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম লম্বা লাইন— কোলে শিশু নিয়ে মায়েরা, বালতি হাতে বৃদ্ধরা, চোখে নিদ্রাহীন ক্লান্তি। সবাই চাল কিনতে এসেছে। দূরে মিছিলের গলা ফাটানো স্লোগান—
“চাল চাই, চাল চাই, নইলে গদি ছাড়তে হবে। ”
”লাল সেলাম, লাল সেলাম। ”
”চিনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান। ”
”বাঙালি গরজে উঠুন। ”
”চারু মজুমদার জিন্দাবাদ”
মাটির বুক কেঁপে উঠছিল। অথচ একই মুহূর্তে পাশের দোকান থেকে ভেসে আসছিল হেমন্তর কণ্ঠ—“এই পথ যদি না শেষ হয়।”
ক্ষুধা আর সুর একসঙ্গে নাচছিল সেই সকালের কলকাতায়।
কফি হাউস ছিল আমাদের স্বপ্নের ঘর। কাঠের চেয়ার, সাদা মার্বেল টেবিল, সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘন হয়ে থাকা বাতাস। এক কাপ কফি, ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক। কেউ চেঁচিয়ে বলছে—
“কমিউনিজমই মুক্তি।” কেউ বলছে—
“না, সিনেমাই সমাজ বদলাবে।” সত্যজিৎ রায় সদ্য চারুলতা বানিয়েছেন, আমরা চোখ ভিজিয়ে দেখেছি, তারপর উত্তপ্ত কণ্ঠে আলোচনা করেছি— চারুলতার নিঃসঙ্গ দৃষ্টি আসলে আমাদেরই সময়ের প্রতিচ্ছবি। সিগারেটের ধোঁয়া ঘুরে বেড়াত টেবিলের উপর, আর সেই ধোঁয়ার ভেতরেই যেন আমরা স্বপ্ন বুনতাম।
তবুও, এই শহরের আকাশে নেমে এসেছিল নকশাল আন্দোলনের অন্ধকার। প্রতিটি মোড়ে পুলিশের ছায়া, প্রতিটি গলিতে র্যাডিকালদের হুঁশিয়ারি। রাতের অন্ধকারে গুলির শব্দ, সকালে
খবরের কাগজে ছবি— আরেক তরুণ পড়ে গেল গুলিতে। আমার অনেক বন্ধুই পথ বেছে নিয়েছিল, বই ফেলে বন্দুক তুলে নিয়েছিল। তাদের চোখে ছিল উন্মাদ আগুন, বিশ্বাস— বিপ্লবেই মুক্তি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খবর এলো— তারা এনকাউন্টারে খতম। আমারই বয়সী, আমারই মতো স্বপ্নবাজ বন্ধুরা চলে গেল, আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম শূন্য হাতে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্তটা ঘটেছিল এক বিকেলে। চোখের সামনে দেখেছিলাম— একটা ডাবল-ডেকার বাস জ্বলছে! লেলিহান আগুন আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে, টায়ার ফেটে বিস্ফোরণের শব্দ, মানুষ হাহাকার করছে। কিছুক্ষণ আগে আমি ওই বাসটায় বসে ছিলাম। আমার পায়ে যেন মাটি ছিল না, আমি ছুটে পালিয়েছিলাম। কয়েক মিনিট পরে পুলিশ, দমকল, অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছল। কিন্তু আমি জানতাম— সেকেন্ড দেরি হলে হয়তো আমি আর থাকতাম না। সেই আগুনের তাপ আজও আমার মুখে লেগে আছে, যেন সময়ও তাকে মুছতে পারেনি।
তবুও এর মাঝেই প্রেম থেমে থাকেনি। কলেজের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ পড়া, বইয়ের পাতার ভাঁজে ছোট্ট চিরকুট রেখে যাওয়া, কিংবা গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার বাতাস খাওয়া— এসবই ছিল আমাদের প্রেম। ডবল-ডেকার বাসের ছাদে বসে ফেরার সময় বাতাসের ঝাপটা গালে লাগত, নিচে শহরের আলো ঝলমল করত। মনে হতো, এই শহর যত ভয়ই দেখাক, তার বুকেই প্রেমের নরম আলো জ্বলছে।
আমাদের প্রজন্ম ভীষণ দুঃখ বহন করেছে। ক্ষুধার্ত মানুষ, দাঙ্গার ভয়, নকশালের গুলি, আগুনে জ্বলতে থাকা বাস, বন্ধুদের হারানোর বেদনা— সবকিছু আমাদের চারপাশে ছিল। তবুও আমরা হাল ছাড়িনি। আমরা বই পড়েছি, গান শুনেছি, আড্ডা দিয়েছি, প্রেমে পড়েছি। কারণ আমরা জানতাম, বেঁচে থাকা মানে শুধু ভাত খাওয়া নয়, বেঁচে থাকা মানে স্বপ্ন দেখা।
আজ আমি বৃদ্ধ। কিন্তু চোখ বন্ধ করলে আবারও দেখি কলেজ স্ট্রিটের ভিড়, কফি হাউসের সিগারেটের ধোঁয়া, আগুনে জ্বলতে থাকা বাস, আর গঙ্গার ধারে দাঁড়ানো তরুণ আমি— হাতে বই, চোখে স্বপ্ন। আমি গর্বিত যে আমি সেই প্রজন্মের সন্তান, যারা ভয়ের মাঝেও আলো খুঁজতে শিখেছিল। আমি নাতনিদের বলি— “আমাদের সময় সহজ ছিল না। আমরা বন্ধু হারিয়েছি, আমরা ভয় পেয়েছি, তবুও আমরা লড়াই করেছি, স্বপ্ন দেখেছি। তোমরাও যদি চাও, অন্ধকার যতই হোক, আলো খুঁজে পাবে।”
ষাটের দশকের কলকাতা আমাকে শিখিয়েছে— জীবন কখনো একরঙা নয়। স্লোগানের পাশে গান বাজতে পারে, আগুনের ছাই থেকে প্রেমের আলো ফুটে উঠতে পারে, মৃত্যু আমাদের ভেঙে দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই ভাঙা টুকরোগুলোতেই নতুন শক্তি জন্ম নেয়। এ শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, আবার ভালোবাসতেও শিখিয়েছে। ষাটের দশকের কলকাতা আমাদের থেকে কেড়ে নিয়েছিল অনেক কিছু— বন্ধু, শান্তি, নিরাপত্তা। কিন্তু দিয়েছিল এক শিক্ষা: অন্ধকার যত গভীর হোক, স্বপ্ন দেখা থামানো যায় না। আমি আজও সেই শহরের সন্তান।
পাখি জন্ম
মোহনার বাঁকে
শাশ্বত বোস
শ্রীরামপুর,হুগলী
রিভিউ - অমিত সরকার
পুস্তক-আলোচনা


অমিত সরকার
বই রিভিউ: পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে
অনিমিখ প্রকাশন
লেখক: শ্রী শাশ্বত বোস
আলোচক: শ্রী অমিত সরকার
আলোচনার শিরোনাম: স্থানিক সময়সঙ্কটের একটি অনিবার্য ভাষাদলিল
অমিত সরকার - কবি পরিচিতিঃ পেশায় ধাতুবিদ্যা বিষয়ক প্রযুক্তিবিদ। জন্ম ষাটের দশকের শুরুতে হাওড়া শিবপুরে। মূলত আটের দশক থেকে সিরিয়াস কবিতা লেখার শুরু। মাঝখানে অন্য কোনও নেশায় দীর্ঘ পনেরো বছর লেখালিখির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ। আবার ফিরে আসা, নতুন অভিজ্ঞতায় জারিত হয়ে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের অসংখ্য বড় ও ছোট পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে ও হয়ে চলেছে তাঁর কবিতা। এছাড়া লেখেন গল্প ও প্রবন্ধ। “দেশ” বা “আরম্ভ” সহ বিভিন্ন বিশিষ্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনেক গল্প। নিজে সম্পাদনা করেন পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট একটি কবিতাপত্রিকা “চর্যাপদ”।
স্থানিক সময়সঙ্কটের একটি অনিবার্য ভাষাদলিল
পাঠ প্রতিক্রিয়া - অমিত সরকার
যে কোনও সার্থক সাহিত্যকে সাধারণত আমরা আসলে সমসাময়িকতার একটি ভাষাদলিল হিসেবে চিহ্নিত করতেই অভ্যস্ত। তবে তার সঙ্গে অনিবার্যভাবেই জড়িয়ে থাকে পাঠক হিসেবে আমাদের অন্তর্লীন বয়স্ক অভিজ্ঞতা। অবশ্য সেক্ষেত্রে পাঠকের নিজস্ব দীক্ষা ও ঋক অনুযায়ী কিছু কূটাভাস মেঘাচ্ছন্ন থেকে গেলে, অবচেতনে ভেসে আসতেই পারে একের পর এক অমূলতরু দৃশ্যকল্প যেগুলো হয়তো রচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়। চেতনার মধ্যে ধ্বনিত হতে পারে অপরিচিত অতিচেতনার কন্ঠস্বর। কিন্তু যিনি অনায়াসে একটি সাহিত্যকর্ম পড়ছেন, তাঁর চেতন অংশে সেগুলিকে একটা গ্রন্থিতে আবিষ্কার বা প্রতিস্থাপন করাই পাঠক হিসেবে তাঁর পঠনশৈলীর নিজস্বতা। অবশ্যই তখন লেখক অনুপস্থিত। তাই কোনও বই, বিশেষত আখ্যাননির্ভর গদ্য পড়তে গেলে বিনির্মাণের জানলাগুলো সম্পূর্ণ খোলা রেখে এগুনোই লেখক ও পাঠক, উভয়ের পক্ষেই বাঞ্ছনীয়। এই কথাগুলি আমার মনে এলো অতি সম্প্রতি শাশ্বত বোসের লেখা 'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে' গল্পগ্রন্থটি পড়তে পড়তে। বইটির প্রকাশক অনিমিখ প্রকাশন।
তাঁর এই লেখাগুলির ডিসকোর্স বেশ খানিকটা অন্যরকম। বর্তমান সময় সারণীতে দাঁড়িয়ে এটিকে শুধুমাত্র একটি গল্পগ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ এই বইটিতে আখ্যানের বা ন্যারেটিভের ওপরে মেঘের মত ছেয়ে আছে লেখকের ভিন্ন ভিন্ন স্তরীয় বা লেয়ারড সাব-অল্টার্ন যাপন অভিজ্ঞতা। যার সঙ্গে আদ্যন্ত নাগরিক আমার অন্তত সরাসরি কোনও অভিজ্ঞতা-যোগ নেই বা কখনো ছিলো না। অন্যভাবে দেখলে, এটি কোনও একটি একক ঘরানার বই নয়, বরং এটি মূলত চিহ্নিত করছে কয়েকটি বা কিছু প্রান্তিক জীবনের ঘটনাপরিসর বা ভাষ্যকে, যেখানে ন্যারেটিভ, কবিতা, স্মৃতি ও সমাজদর্শন মিলেমিশে নির্মাণ করেছে এক বহুস্বরীয় আখ্যান। বইটির নামের মধ্যেই যে রূপকধর্মী ইশারা অর্থাৎ —“মোহনা”—নিশ্চিতভাবেই তা কেবল নদী ও সমুদ্রের ভৌগোলিক মিলনবিন্দু নয়, বরং জীবনের বহু বিপরীত প্রবাহের সংঘাত ও সহাবস্থানের প্রতীক। বহতা স্রোতের মতোই এখানে এসে মিশেছে শহর ও জঙ্গল, মার্ক্স ও বনবিবি, বিপ্লব ও লোককথা, কামনা ও ক্ষুধা, ঈশ্বর ও মানুষের জটিল নিঃসঙ্গতা। এই মোহনাতেই তো জন্ম হয় ‘পাখি’দের— শাশ্বতের লেখায় যারা স্বাধীনতার, প্রশ্নের, প্রতিবাদের, আবার কখনো বা হয়তো নিঃশব্দ বিলুপ্তির প্রতীক। শাশ্বত’র লেখার প্রধান শক্তি তাঁর ভাষা। যে ভাষা এই আখ্যানগুলিতে শহুরে শিক্ষিত বুদ্ধিবৃত্তিপ্রবণ এলিট পাঠকের সঙ্গে আদিবাসী জীবনের, তাঁদের লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় আচার ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অনন্য ও গভীর সংলাপ তৈরি করেছে। সেই সংলাপ বিশ্বাসযোগ্য এবং অবশ্যই পরিসর নির্ভর। এবং শাশ্বত’র লেখার প্রধান দুর্বলতাও তাঁর ভাষা। কারণ যে ভাষা গদ্যের মরুভূমিকে সহজেই কবিতার বৃষ্টিতে সিঞ্চিত করে ভাবনায় লজিকাল ক্র্যাক তৈরি করে, সে ভাষায় সার্থক এবং নিরপেক্ষ রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নির্মাণ সম্ভব নয়। এবং একজন আধুনিক ও মনস্ক

পাঠক হিসেবে আমি গভীর বিশ্বাস করি, যে গদ্যে বা ন্যারেটিভে কোনও না কোনও ভাবে রাজনৈতিক অ্যাসিমিলেশন নেই, সেই রচনার পক্ষে সার্থক হওয়া খুব শক্ত। যাই হোক, কিছু কিছু সিদ্ধান্তের ভার সচেতন ভাবেই 'কালে'র ওপরে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। তাঁর বাক্যগঠনের সিনট্যাক্স অনেক সময় দীর্ঘ, স্তরীয় এবং প্রলম্বিত, কিন্তু সেটিকে কেবল তাঁর একটি আলংকারিক চরিত্র বলতে আমার দ্বিধা আছে। বরং আমার মনে হয়েছে, এই দীর্ঘসূত্রিতা লেখকের সচেতন ভাবনা থেকে নির্মিত, তাঁর অভিপ্রেত দর্শনেরই অংশ। পাঠককে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দেবেন না, বরং অনুরোধ করবেন ভাবনার অশরীরী চার্বাকে হাঁটতে, মৃত্যুর আগেও, এমনকি মৃত্যুর পরেও। তাই তাঁর বাক্যেরাও এই আখ্যানগুলিতে হাঁটে, চলে, থামে, আবার ঘুরে দাঁড়ায়—ঠিক প্রান্তিক মানুষের জীবনের মতোই। এবং অবশ্যই এই দীর্ঘসূত্রিতা লেখকের আলস্যনির্মিত নয়, বরং এটি তাঁর শিল্পবোধের একটি সচেতন স্টাইলাইজেশন।
তাঁর এই আখ্যানগুলিতে বারবার ফিরে আসে প্রান্তিক মানুষ—আদিবাসী নারী, শ্রমজীবী পুরুষ, শহরের অনুচ্চারিত নিঃসঙ্গতা, রাজনৈতিক হিংসা, ধর্ম ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। আসে জামবনির মাওবাদ থেকে সুন্দরবনের খাল-বিল সমৃদ্ধ কোস্টাল স্পেকট্রামের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট। এই বিপুল ও জটিল পরিসরগুলিতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে কোথাও আমার রোমান্টিক অথবা ভয়ারিস্টিক লাগেনি, আবার নিষ্ঠুর বাস্তবতাতেও তিনি কোথাও সংবেদনশীলতা হারাননি। প্রেম, শরীর, খিদে, যৌনতা কিংবা হিংস্রতা—সবকিছুই তাঁর এই আখ্যানগুলিতে এসেছে একটি নির্মোহ অথচ গভীর সহানুভূতির সঙ্গে।বইটির প্রথম গল্প “বিপ্লব একটি পাখির নাম” গল্পে বিপ্লব কোনও রোমান্টিক স্লোগান নয়, বরং স্মৃতি, ক্ষুধা ও শ্রেণীচেতনার সহবাসে গড়ে ওঠা এক বিষণ্ণ উপলব্ধি। একটি অ্যাবস্ট্রাক্ট অথচ মানবিক স্বপ্ন। এখানে বিপ্লব দুহাতে ছিঁড়তে চায় বৈদিক জ্যোৎস্নার শূন্যতাকে, আবার পাখিজন্মে সেই মলত্যাগ করে যায় শহুরে আলোর ওপরে—এই দ্বৈততা বা ডুয়ালিটিই লেখকের সাহস, চেতনা ও মননের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রকল্পনা। একইভাবে “হিমজ্যোৎস্নায় বনবিবি” বা “নষ্টভূমি ও ঈশ্বরী বনজ্যোৎস্না”-য় লোকবিশ্বাস ও বাস্তবতার সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে। দেবী এখানে ধর্মীয় আইকন নন, বরং জীবনে টিকে থাকার প্রতীক হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন প্রান্তিকতার আশ্রয়, ভরসা, আর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। চিরাচরিত ক্ষমতার হাতিয়ার থেকে ধর্ম এখানে রূপান্তরিত হয় ভয় আর বিশ্বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের একান্ত প্রার্থনায়।
আমাকে স্বীকার করতেই হবে, এই আখ্যানগুলিতে শাশ্বতের গদ্য প্রায়ই কবিতার সীমান্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে। অতিক্রম করেছে কাঁটাতার। কখনো তা পাঠকপ্রিয় হয়েছে, আবার কখনো মনে হয়েছে অপ্রয়োজনীয় লিরিক্যাল। তবে আকাঁড়া 'র' প্রকৃতির পরিসরে, বিশেষ করে জঙ্গল, রাত, চাঁদ, আগুন, নদী—এই ধরণের অনুষঙ্গে তাঁর ভাষা মুখরতার পরিবর্তে তৈরি করেছে এক গভীর নৈঃশব্দ্য। যে নৈঃশব্দ্যের ভেতরে কান পাতলে মরমি পাঠক অবশ্যই শুনতে পাবেন প্রান্তিক মানুষের আত্মজৈবনিক উচ্চারণ—যা মূলধারার ইতিহাসে সাধারণত অনুপস্থিত।
'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে' পাঠকের কাছে কোনও একটি আরামদায়ক পাঠ নয়। এই বই এলিট নাগরিক পাঠককে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমাদের শহর, আমাদের রাজনীতি, আমাদের সভ্যতা ঠিক কাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে? এই বই পড়া মানে নিজের ভেতরের সেই নিশ্চিন্ততার সমাজ, রাজনীতি এবং নিজের অবস্থানের ওপর ফিক্স করা ডিটোনেটরের বোতামটি নিজের হাতে টিপে দেওয়া। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে এই গ্রন্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চারণ। এটি দেখিয়ে দেয়, প্রান্তিকতা এখনও নিঃশব্দ নয়, বরং তা উলঙ্গ দিগন্তের সামনে সভ্যতার দিকবদলের এক অনিবার্য হাওয়ামোরগ। একজন কবি এখনও সে ভাষা খুঁজে পেতে পারেন এবং পাঠককে সরাসরি দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন বিনোদনের বদলে তাঁর নিজস্ব বিবেকের মুখোমুখি। কামনা করি বইটি পাঠকপ্রিয় হোক।
=====
পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে /শাশ্বত বোস
অনিমিখ প্রকাশন / বিনিময়ঃ ৪০০ টাকা
যোগাযোগ: ৮৫৮৫০৬১২৬২ / ৯০০৭১৮২১০৬
জীবন দর্শন

আমার চলচ্চিত্র
নির্মাণের দর্শন
গোরাচাঁদ সাহা
বিরাটি, কলকাতা
লেখক পরিচিতি:
গোরাচাঁদ সাহা একজন নাট্য অভিনেতা। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নান্দীকার, নাট্যআনন ও বিভিন্ন নাট্য সংস্থায় অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত শর্ট ফিল্ম আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি বর্তমানে তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কাজে নিয়োজিত।
বৃহস্পতিবার। সকাল নটা বাজে। রাস্তার ধারে ছোট্ট একটা খবরের কাগজের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে দিনের শিরোনাম পড়ছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটা সংবাদে। সংবাদটা ছিল এই রকম। শহর জুড়ে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড। আতঙ্ক। পুলিশের অসহায় তল্লাশি। সপ্তাহের পর সপ্তাহ— কোনো সূত্র নেই, কোনো সন্ধান নেই। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ তাড়া শেষে তাকে পাওয়া গেল। কিন্তু জীবিত নয়। সে আত্মসমর্পণ করেনি। কোণঠাসা হয়েও শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়ে গিয়েছিল। গুলিবর্ষণে, পুলিশের ঘেরাটোপে, তাকে শেষ করা হলো।
গির্জার সামনে ফুটপাথে পড়ে থাকা সেই রক্তাক্ত দেহ। ছিন্নভিন্ন। কিন্তু মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা দুটো চোখ— কোনো ভয় নেই, শুধু এক অস্বস্তিকর শান্তি। হাত থেকে ছিটকে পড়া রিভলভার। কোমরবন্ধে আরেকটা, গুলি-ভরা। পিঠের পাশ থেকে ঝোলানো ছোট্ট নীল ব্যাগটি রাস্তায় পড়েছিল। ভেতরে দশটা একশো টাকার নোট, একটা নীল টি-শার্ট, একটা নীল রঙের জিনসের প্যান্ট, আর একটা ছোট্ট লাল ডায়েরি।
নীল কালিতে কয়েকটা ঠিকানা। লাল কালিতে কিছু ব্যক্তিগত কথা— শেষ স্বীকারোক্তি হয়তো।
ডায়েরিতে লেখা ছিল:
"এই পৃথিবীতে নিজের জায়গা করে নেওয়ার সংগ্রাম চিরকালীন। আমরা স্বীকৃতি চাই, উদ্দেশ্য খুঁজি, আত্মীয়তার খোঁজ করি। কিন্তু সব উচ্চাকাঙ্ক্ষার গভীরে থাকে একটাই সত্য— ভালোবাসা। রোমান্টিক ভালোবাসা নয়, ক্ষণস্থায়ী আবেগ নয়। নিঃস্বার্থ মানবিক ভালোবাসা। যে ভালোবাসা দেয়াল নয়, সেতু তৈরি করে। যে ভালোবাসা জীবন বাঁচায়।'
'কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা আরও নিঃসঙ্গ পথ হাঁটে। তাদের হৃদয় স্পন্দিত হয় এমন বিশুদ্ধতায়, যা এই পৃথিবীর জন্য খুব দুর্লভ। তাদের সততা অটুট। তাদের ভালোবাসা অরক্ষিত। তাদের মানবতা অটল। আর ঠিক এই কারণেই তাদের শাস্তি দেওয়া হয়।'
'সমাজ জানে না এমন মানুষের সাথে কী করতে হয়— তাই তাদের ভেঙে দেয়, প্রতারণা করে, পাশে ফেলে দেয়। তবুও বারবার তারা উঠে দাঁড়ায়— রক্তাক্ত, আহত, কিন্তু তিক্ত নয়।'
'যতদিন না একদিন ভেতরে কিছু একটা পাল্টে যায়। কেউ কেউ সরে যায় নীরবতায়, প্রার্থনায়, একাকিত্বে। তারা হয়ে ওঠে 'ঈশ্বরের সন্তান'— যারা প্রতিশোধের বদলে আলোকে বেছে নেয়।'
'আর বাকিরা... বাকিরা ঘুরে যায় আগুনের দিকে। তারা হয়ে ওঠে 'শয়তানের পুত্র'— জন্মসূত্রে নয়, বিশ্বাসঘাতকতায়। তারা ফিরে আসে এই পৃথিবীতে— খোলা বাহু নিয়ে নয়, মুষ্টিবদ্ধ হাত নিয়ে। এই সমাজকে আরোগ্য দানের উদ্দেশ্যে নয় বরং পুড়িয়ে দিতে।"
ডায়েরির ঠিকানা ধরে পুলিশ খুঁজে পেল তার পরিবার, বন্ধুদের। তাদের মুখে শোনা গেল পুরো ঘটনা। সে একসময় সৎ মানুষ ছিল, শিক্ষিত ছিল, সততার প্রতীক ছিল। কিন্তু সমাজ তাকে জায়গা দেয়নি। সম্মানের বদলে পেয়েছিল বিশ্বাসঘাতকতা, দয়ার বদলে স্বার্থপরতা। একের পর এক আঘাতে সে হারিয়ে ফেলেছিল বিশ্বাস— যে পৃথিবীকে সে সেবা করতে চেয়েছিল সেই পৃথিবীর প্রতি। সেই ক্ষতি থেকেই জন্ম নিয়েছিল বিধ্বংসী ক্রোধ। আর সেই ক্রোধই তাকে বদলে দিয়েছিল এক অচেনা সত্তায়।
সেই নিবন্ধ পড়ে আমার ভেতরে ঝড় উঠেছিল। যে মানুষটা বিশ্বাস করেছিল, সেই পৃথিবীই তাকে ধ্বংস করে দিয়েছে— এই গল্প আমার ভেতরে গভীর কিছু স্পর্শ করল। শুধু নাড়া দিল না— তাড়িত করল। ঘুম আসত না। রাতের পর রাত ভাবতাম: কীভাবে একটা বিশুদ্ধ হৃদয় অন্যদের নিষ্ঠুরতায় দানবে পরিণত হতে পারে?
বুঝতে শুরু করলাম— এই দূষিত ব্যবস্থা, যেটা সৎ মানুষদের পিষে ফেলে আর প্রতারকদের পুরস্কৃত করে, এর মুখোমুখি হতেই হবে। না হলে আরও হারিয়ে যাওয়া আত্মা তৈরি হতে থাকবে। কিন্তু আমি একা কী করতে পারি? অসহায় বোধ করছিলাম। তবুও জানতাম— নীরবতা পাপ। যদি কিছু না করি, নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।
কয়েকটা নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে, হঠাৎ একটা চিন্তা বজ্রের মতো আমাকে আঘাত করল।
পরের দিন যোগাযোগ করলাম মুম্বাইয়ের একটা ছোট স্বাধীন চলচ্চিত্র বিতরণ কোম্পানির মালিকের সাথে। তিনি আগে আমার তৈরি একটা ভৌতিক শর্ট ফিল্ম রিলিজ করেছিলেন। প্রায়ই উৎসাহ দিতেন নতুন কিছু বানাতে। যখন বললাম এই বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে একটা ফিল্ম বানাতে চাইছি, তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর উৎসাহিত হয়ে বললেন যে, এই অসাধারণ কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ শেষ হলে তিনি অবশ্যই তার সংস্থা থেকে প্রকাশ করবেন।
সেই মুহূর্তে জানতাম, আমি খুঁজে পেয়েছি আমার লড়াইয়ের অস্ত্র। সহিংসতা নয়— সিনেমার মাধ্যমে।
তখন পকেটে মাত্র দুই হাজার টাকা। কিন্তু স্বপ্ন ছিল বাজেটের চেয়ে বিশাল। চেয়েছিলাম বড় কিছু বানাতে— অনেক অভিনেতা, শক্তিশালী দৃশ্য। কিন্তু নির্ভর করার মতো কেউ নেই। সবকিছু শুধু আমার ওপর।
তবুও শুরু করলাম।
সপ্তাহখানেকের মধ্যে এমন এক উদ্দীপনায় কাজ করছিলাম যা বছরের পর বছর অনুভব করিনি। গল্প লিখছি, পুনর্লিখন করছি— সেই সংবাদপত্রের ঘটনা থেকে আঁকা। তারপর সেই গল্প অনুযায়ী চিত্রনাট্য লিখলাম। ধীরে ধীরে নতুন মানুষ যুক্ত হতে লাগল। মহড়া শুরু হলো। অবাক করা ব্যাপার— সেশনগুলো দারুণ চলছিল। এরপর পরিকল্পনা করলাম শুটিং শুরুর।
আশাবাদী ছিলাম। খুশি ছিলাম। প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছিল স্বপ্ন রূপ নিচ্ছে। কিন্তু ভাগ্যের অন্য পরিকল্পনা।
আমার সব অভিনেতা কাজ করত একটা বেসরকারি বীমা কোম্পানিতে। একদিন সেই কোম্পানি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। সবাই চাকরি হারাল। তাদের পরিবারে শুরু হলো বিশৃঙ্খলা, অশান্তি। তাদের ব্যক্তিগত জীবন ভেঙে পড়ল। এমন পরিস্থিতিতে আমার ফিল্মের সাথে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ল তাদের পক্ষে। মুষড়ে পড়েছিলাম। কিন্তু হাল ছাড়িনি।
গভীর চিন্তার পর গেলাম আমার এক বন্ধুর কাছে। সে মনোযোগ দিয়ে শুনল আমার পুরো গল্প। তার একটা নিজস্ব ক্যামেরা ছিল। তাকে বললাম— আমার ক্যামেরাম্যান আর কাস্টিং ডিরেক্টর দুটোই তাকে হতে হবে। সে রাজি হলো। যদিও সে আমাকে বলেছিল যে, মাত্র দুই হাজার টাকা দিয়ে আমার লেখা গল্পের চিত্রনাট্য অনুযায়ী ভালো মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ খুবই কঠিন। আমি তাকে বলেছিলাম যে, মোটামুটি গল্পের মূল কাঠামোটা বজায় রেখে যতটা পারা যায় ততটা হলেই চলবে। অভিনয়, ক্যামেরার কাজ ও এডিটিংয়ের সময় দৃশ্য অনুযায়ী সঠিক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। এই তিনটি বিষয় ঠিক থাকলেই যথেষ্ট।
কয়েক দিনের মধ্যে সব শিল্পী জোগাড় হলো। শুটিং শুরু হলো।
শুটিংয়ের সময় অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মনে আছে সেই রাতটার কথা— রেললাইনে। গভীর রাত। আবছা আলোয় রেললাইনে শুটিং— সুরক্ষা নেই, শুধু ছায়া আর ইস্পাত।আমি ছিলাম হত্যাকারীর ভূমিকায়। হিংস্র, উন্মত্ত এক পৈশাচিক মানুষ। বন্য জন্তুর মতো ছুটছি, বিশাল চকচকে ছুরি হাতে। চোখ নিবদ্ধ কাল্পনিক শিকারের ওপর। শরীর জ্বলছে ক্রোধে। আমি চরিত্র হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ, অন্ধকার ভেদ করে একটা ট্রেন ছুটে এলো পাশের ট্র্যাক থেকে। আমি দেখিনি। শুনিনি। খুব দূরে চলে গিয়েছিলাম— হত্যাকারীর মনের ভেতর। কয়েক ভয়ানক সেকেন্ড— বাস্তবতা অদৃশ্য। চারপাশের পৃথিবী ঝাপসা। ইন্দ্রিয় হাইজ্যাক হয়ে গেছে। ভুলে গিয়েছিলাম যে আমি শুধু একজন অভিনেতা। যদি আরেক পা ফেলতাম, আরেক মুহূর্ত এগিয়ে যেতাম তাহলে এই গল্প বলার জন্য বেঁচে থাকতাম না। বন্ধুর দ্রুত প্রতিক্রিয়া আমাকে বাঁচাল। রেলওয়ে পুলিশ এসে গ্রেপ্তার করতে চাইল, কিন্তু রেলওয়ে বিভাগের অনুমতিপত্র ছিল আমাদের কাছে। সেটা বার করে তাদের দেখালাম। সেটা দেখে তারা নীরবে ফিরে গেল। কয়েক দিন পর আরেকটা ভয়ংকর ফাইট সিন শুট করলাম। একা আমি, বিরুদ্ধে অনেক শত্রু। শুটিংয়ে গুরুতর আহত হলাম। সারা রাত ভয়ানক ব্যথায় ঘুমাতে পারিনি। শুধু সেদিন নয়— বারবার আহত হয়েছি। তবুও ব্যথা উপেক্ষা করে শুটিং চালিয়ে গেছি। কিন্তু সেই কঠোর পরিশ্রম, অসহনীয় ব্যথা, খরচ করা অর্থ— সব ব্যর্থ হলো একদিন। যাকে কাস্টিং ডিরেক্টর আর ক্যামেরাম্যানের দায়িত্ব দিয়েছিলাম— সে বিশ্বাসঘাতকতা করল। খুব চতুর ছিল সে, যা আমি ছিলাম না। আমি তার জীবনে অনেক সাহায্য করেছিলাম। ভেবেছিলাম বন্ধু হিসেবে সে আমাকে সাহায্য করবে। ভুল ভেবেছিলাম। সে বুঝতে পেরেছিল যে আমার এই চলচ্চিত্রটি অসাধারণ রোমাঞ্চকর হতে চলেছে। তাই প্রতারণার মাধ্যমে সে আমার চলচ্চিত্রের যাবতীয় অধিকার নিজের নামে করে নিল। যেহেতু আগে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করিনি তার সাথে, তাই তার বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারলাম না।
আর ঠিক একই সময়ে মারা গেলেন আমার মেজ কাকা, যিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের স্তম্ভ।এসব ঘটনায় শারীরিক আর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়লাম। সবকিছু চলে গেল। বুঝতে পারছিলাম না এরপর কী করব। আবার একা। কিন্তু ইচ্ছেটা মরে যায়নি। উৎসাহ হারিয়ে যায়নি।নতুন উদ্যমে আবার শুরু করলাম মানুষ খোঁজা। হঠাৎ মনে পড়ল এক বন্ধুর কথা— যার সাথে কয়েক বছর আগে একটা নাট্য সংস্থায় পরিচয় হয়েছিল এবং আমরা একই নাটকে অভিনয়
করেছিলাম। পরের দিন গেলাম তার বাড়িতে। বিস্তারিত বললাম আমার ভয়ানক পরিস্থিতি। সে রাজি হলো সাহায্য করতে।
মূল বিষয়বস্তু অক্ষুণ্ণ রেখে নতুন গল্প লিখলাম— আগেরটার চেয়েও উত্তেজনাপূর্ণ। সেই অনুযায়ী চিত্রনাট্য লিখলাম।
তারপর তার সাহায্যে ফিল্মের কাজ শুরু করলাম। রবিবার একটি নির্দিষ্ট দিনে অডিশনের ব্যবস্থা করলাম। সেই অনুযায়ী একজন লোক নিয়োগ করলাম পুরো শহর জুড়ে ঘোষণার জন্য। সে লাউডস্পিকার নিয়ে খোলা গাড়িতে শহর ঘুরে অভিনেতাদের ডাক দিল। শীঘ্রই অভিনয় করার ইচ্ছা প্রকাশ করে অনেকেই যোগাযোগ করতে শুরু করল। রবিবার নির্দিষ্ট দিনে অনেকে হাজির হলো অডিশনে। পুরুষ অভিনেতাদের নির্বাচন করলাম— কিন্তু আমার বিপরীতে নায়িকার জন্য উপযুক্ত অভিনেত্রী পাচ্ছিলাম না। শেষে অনেক চেষ্টার পর আমার বন্ধু একটি মেয়েকে রাজি করাল আমার বিপরীতে নায়িকা হতে। কিন্তু শুটিংয়ের দিন অদ্ভুত কিছু ঘটল। আমার বন্ধু আরেকটি মেয়েকে আমন্ত্রণ জানাল সেটে আসার জন্য, যাকে সে আগে থেকে চিনত। সে এই চলচ্চিত্রে একটা বড় ভূমিকায় অভিনয় করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ে কোনো বড় ভূমিকা বাকি না থাকায় তাকে দেওয়া হলো ইন্টারভিউ দৃশ্যে ছোট্ট একটা ভূমিকায় অভিনয় করার সুযোগ।
তার কাজ ছিল চাকরির ইন্টারভিউ দৃশ্যে অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের একে একে ডাকা। ভালোই পারফর্ম করল সে। খুশি হলাম তার কাজ দেখে।
তারপর শুরু হলো আমার আর আমার নায়িকার দৃশ্যের প্রস্তুতি। জানতাম যে মেয়েটি নির্বাচিত হয়েছিল, সে-ই আমার নায়িকা হবে। সেই নির্বাচিত মেয়েটি আমার কাছেই দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু শুটিং শুরু হতেই চমকে গেলাম। নির্বাচিত মেয়েটির বদলে সেই নতুন মেয়েটিকে হঠাৎ রাখা হলো আমার সামনে— নায়িকার ভূমিকায়। আমাকে না জানিয়ে এই কাজ করেছিল আমার বন্ধু। হঠাৎ তার মনে হয়েছিল যে এই নতুন মেয়েটি নায়িকার ভূমিকার জন্য বেশি উপযুক্ত।
যদিও মেয়েটি ভালোই অভিনয় করল, আমি পারলাম না। সেই দৃশ্যে অভিনয় করার সময়ে আমার একাগ্রতা আসছিল না, কারণ আমার বিপরীতে অভিনয় করতে আসা এই মেয়েটির ব্যক্তিত্ব আমার ভাল লাগছিল না।
শুটিং শেষে বাড়ি ফিরলাম। কয়েক দিনের মধ্যে অনুভব করতে শুরু করলাম মনে হঠাৎ এক অদ্ভুত পরিবর্তন। বুঝতে পারছিলাম না ভেতরে কী ঘটছে! ওই মেয়েটির প্রতি একটা গভীর আকর্ষণ অনুভব করতে লাগলাম।
অন্যান্য মেয়েদের প্রতি পুরুষদের সাধারণত যে রকম স্বাভাবিক একটা আকর্ষণ থাকে সেই রকম না। এটা ছিল এমন অদ্ভুত ধরনের রহস্যময় গভীর আকর্ষণ যা জীবনে কখনো কারও জন্য অনুভব করিনি। হৃদয়ের গভীর টান দিন দিন বাড়তে লাগল। সবসময় শুধু তার কথাই ভাবতাম, অন্য কোনো চিন্তা মনে আসত না।
পরবর্তী দিনগুলোতে, তার সাথে প্রতিটি রোমান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করার সময়— আমার ভালোবাসা শুধু অভিনয় ছিল না। ছিল বিশুদ্ধ।
যাই হোক, আমরা সবাই কঠোর পরিশ্রম করেছি এই চলচ্চিত্রের জন্য। আমাদের ক্যামেরাম্যানের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। অ্যাকশন দৃশ্যে তাকে লড়তে হয়েছে আমাদের ওপর ক্যামেরা ফোকাস রাখতে।
মনে আছে, একটা ছোট পাহাড়ের মতো জায়গায় যখন হত্যার দৃশ্য নিচ্ছিলাম, হঠাৎ আমাদের ক্যামেরাম্যান অজ্ঞান হয়ে গেল— অত্যন্ত গরম আর রুক্ষ পরিবেশে। আমরা সবাই দ্রুত তাকে নিয়ে গেলাম নদীর তীরে। চোখে-মুখে ছিটিয়ে দিলাম নদীর জল। কয়েক মিনিট পর চেতনা ফিরল। পনেরো মিনিট বিশ্রাম নিয়ে আবার শুটিং শুরু করল সে।
আর আমার কথা বলতে গেলে— প্রচণ্ড রোদের নিচে অ্যাকশন দৃশ্যের সময়, প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল পড়ে যাব— হার্ট অ্যাটাক হবে হয়তো। কিন্তু যন্ত্রণা সহ্য করে শুটিং চালিয়ে গেছি।
এখনও মনে আছে রেললাইনে সেই প্রথম হত্যার দৃশ্য, প্রত্যন্ত এক গ্রামে। ছোট্ট গ্রাম— শান্ত মাঠ, ধূলোবালিময় রাস্তা। প্রথম হত্যার দৃশ্য শুরু করতেই কৌতূহলী গ্রামবাসীরা জড়ো হতে শুরু করল। প্রথমে কয়েকজন, কয়েক মিনিটেই ভিড় হয়ে গেল কয়েক ডজন। তারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে লাগল— আমরা ক্যামেরা, রক্ত, অস্ত্র নিয়ে কী করছি?
তারপর মজার ঘটনা। পুলিশের পোশাক পরা অভিনেতারা এলে গ্রামবাসীরা ভাবল— আসল পুলিশ! হত্যার দায়ে আমাদের সকলকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে! আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল তৎক্ষণাৎ। কেউ গাছের পিছনে দৌড়ালো, কেউ বাড়িতে লুকোলো, কেউ কেবল পালিয়ে গেল।
যখন বুঝলাম কী হয়েছে, হাসি থামানো গেল না।
কয়েক মিনিট সময় লাগল সবাইকে শান্ত করে ব্যাখ্যা করতে— আমরা শুধু ফিল্ম বানাচ্ছি। এবার বুঝল, ভয় পাল্টে গেল উত্তেজনায়। যারা মুহূর্ত আগে আতঙ্কিত ছিল, তারাই এখন ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে উল্লাস করছিল— প্রতিটি টেক দেখছিল বিস্ময় নিয়ে বড় বড় চোখে।
যাইহোক, এইসব বিভ্রান্তির পর আবার শুটিং শুরু করলাম। সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ করলাম। সেই দিন মনে করিয়ে দিল— সিনেমা কতটা শক্তিশালী। কথাসাহিত্য আর বাস্তবতার মধ্যে রেখা ঝাপসা করে দেয়।
আরেক দিন, গভীর বনে শুট করতে নদী পার হলাম। জায়গাটা আমাদের থেকে অনেক দূরে। সেদিন আমার সাথে অনেক লোক। ঝলসানো দিন— হত্যাকারী আর পুলিশের মধ্যে বড় ফাইট সিন। সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত— শুধু অ্যাকশন। ক্লান্ত কিন্তু সন্তুষ্ট হয়ে বাড়ি ফিরলাম।
কিন্তু সেই কঠোর পরিশ্রম নষ্ট হলো। কয়েক দিন পর, সেই দিনের ফুটেজ ডিভি থেকে ডিভিডিতে স্থানান্তরের সময়, এডিটর ভুল করল। রেকর্ড করা ফুটেজের ফ্রেম খুব ছোট করে কেটে ফেলল যা আর ঠিক করা সম্ভব হলো না। পুনরায় শুট করার টাকা নেই। সেই দিনের কঠোর পরিশ্রম করে শুটিং করা দুর্দান্ত অ্যাকশন দৃশ্যগুলো চিরতরে হারিয়ে গেল।
এই কথাগুলো লিখতে লিখতে আজকের জন্য বিদায় জানাচ্ছি।
এই ফিল্ম শুধু একটা গল্প নয়। এ এক হিসাব-নিকাশ। এমন এক আয়না যা তুলে ধরা হয়েছে সেই সমাজের দিকে— যে সমাজ তার সবচেয়ে সৎ হৃদয়কে ব্যর্থ করে। এ এক প্রতিবাদ। এক চিৎকার। এক সতর্কবার্তা।
কারণ যখন ভালোবাসা প্রত্যাখ্যাত হয়, সত্যকে শাস্তি দেওয়া হয়, তখন ছাই থেকে যা জন্ম নেয় তা শান্তি নয়। সেটা ক্রোধ।
আমার সিনেমার যাত্রা কখনো শুধু একটা ফিল্ম বানানোর বিষয়ে ছিল না। এ ছিল বেঁচে থাকার সংগ্রাম— সৃজনশীল, মানসিক, আধ্যাত্মিক।
শুরুতে হাতে প্রায় কিছুই ছিল না— শুধু দুই হাজার টাকা আর এক অসম্ভব স্বপ্ন। কোনো স্টুডিও নেই, স্পন্সর নেই, দল নেই। শুধু একটা গল্প— যা আমাকে ঘুমাতে দেয়নি।
ব্যথা, বিশ্বাসঘাতকতা, ক্ষতি, অন্তহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শিখেছি— চলচ্চিত্র নির্মাণ অর্থ বা সুবিধার বিষয়ে নয়। এ বিশ্বাসের বিষয়ে। যে গল্পটা বলতে চাও তাতে বিশ্বাস। যারা পাশে দাঁড়ায় তাদের প্রতি বিশ্বাস। আর নিজের প্রতি বিশ্বাস— যখন চারপাশের সবকিছু ভেঙে পড়ে।
রাতগুলো ছিল যখন রেলওয়ে আলোর নিচে শুট করেছি— খালি ট্র্যাকে, বিপদ আর নীরবতায় ঘেরা। দিনগুলো ছিল যখন ভেবেছি ক্লান্তিতে পড়ে যাব। তবুও, প্রতিটি কষ্ট শিখিয়েছে এমন কিছু যা কোনো ফিল্ম স্কুল শেখাতে পারে না— শিল্প জন্ম নেয় আরাম থেকে নয়, বিশৃঙ্খলা থেকে।
আমার ফিল্ম বেড়ে উঠেছে সেই বিশৃঙ্খলা থেকে। এ ব্যথার গল্প, রূপান্তরের গল্প, ভালোবাসা আর ক্রোধের মধ্যে সূক্ষ্ম রেখার গল্প। এ একটা সহজ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে: যখন সততা আর ভালোবাসাকে পৃথিবী শাস্তি দেয়, তখন কী ঘটে?
এই ফিল্ম বানাতে গিয়ে আমার হৃদয়ে যে গভীর চিন্তাগুলো কাজ করেছিল:
প্রযুক্তির পিছনে দৌড়িও না— সত্যের পিছনে ছোটো।
দর্শকদের স্পর্শ করতে উন্নত মানের ক্যামেরা বা উন্নত মানের আলোর দরকার নেই। দরকার আবেগ। দরকার সততা। পৃথিবীর সব সরঞ্জাম কিনতে পারো, কিন্তু যদি অভিনেতারা বিশ্বাস না করে— অনুভব না করে— ফিল্ম সুন্দর হবে, কিন্তু শূন্য।
ক্যামেরা আলো ধরে।
শিল্পী ধরে জীবন।
যখন আমার ফিল্ম বানিয়েছি, বেশি কিছু ছিল না— শুধু মুস্টিমেয় কিছু মানুষ যারা আমার মতোই গভীরভাবে বিশ্বাস করত। শুট করেছি গরমে, ব্যথায়, নিদ্রাহীন রাতে। কোনোভাবে সত্য খুঁজে পেয়েছে তার পথ। আর সেই সত্য— সেই কাঁচা আবেগ— সিনেমার আসল কথা।
কারুশিল্প শেখো, কিন্তু বন্দী হয়ো না। কারুশিল্প শেখো, কিন্তু পূজা করো না। ক্যামেরা হোক যন্ত্র, পরিচয় নয়। যে গল্প হৃদয় থেকে আসে সেগুলো বলো, অ্যালগরিদম থেকে নয়। যারা অনুভব করে তাদের সাথে কাজ করো, শুধু যারা পারফর্ম করে তাদের সাথে নয়।
কারণ একদিন, যখন আলো নিভবে আর ক্রেডিট ম্লান হবে, দর্শকরা ক্যামেরার ব্র্যান্ড মনে রাখবে না। সাউন্ডের স্বচ্ছতা মনে রাখবে না। লেন্সের দাম মনে রাখবে না। তারা মনে রাখবে আবেগ। মনে রাখবে সত্য। মনে রাখবে তুমি তাদের কীভাবে অনুভব করিয়েছিলে।
শুধু এই কারণেই তোমাকে মনে রাখবে।
এটাই সিনেমার শক্তি। এখানেই শুরু হয় প্রতিটি সত্যিকারের চলচ্চিত্র নির্মাতার যাত্রা।
দেশের মেয়েরা,
মেয়েদের দেশ
সাম্য সরকার
মল্লিকপাড়া, শ্রীরামপুর, হুগলী

প্রবন্ধ
"সবাই ভাবে আমরা শিল্পী, নিজেদের জগতেই থাকি। বাইরের জগতের কিছুই আমাদের কাছে পৌঁছায় না। তা সত্য নয়। একদিকে আমাদের দেশে নারীকে পূজা করা হয়, আর অন্যদিকে সেই নারীর মুখে অ্যাসিড ছোঁড়া হয়, পণের জন্য পুড়িয়ে মারা হয়, গণধর্ষণ করা হয়। বলবেন এগুলো সব দেশেই হয়। তা হয়। কিন্তু আর কোথাও দেবীজ্ঞানে নারীর পূজা হয় না। ভারতে হয়।" নজরুল মঞ্চে বালিগঞ্জ কালচারাল ক্লাব আয়োজিত একটা অনুষ্ঠানে কথাগুলো বলেছিলেন ওস্তাদ আমজাদ আলী খান। সেদিন তিলোত্তমা হত্যার রায় বেরিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টে। "দুর্গা যখন কাঁদে কেমন লাগে সেটা আজ আপনাদের শোনাবো", বলে ধরেছিলেন রাগ দুর্গা। কয়েকটা তার আর তার উপর আঙুলের চলাচল - এ থেকে জন্ম নেওয়া ধ্বনি বেজেছিল বুকে এসে। মুচড়ে গিয়েছিল। মর্দ-কো-দর্দ-নেহি-হোতা-সমাজে বেড়ে ওঠা পুরুষ বলে জল নামেনি চোখ বেয়ে কিন্তু সুরের অভিঘাত মস্তিষ্ক বেয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা শরীরে। প্রায় অবশ অবস্থায় ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম এভাবেও অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়! যা চেয়েছিলেন তাই তো পেলেন। ঘটিয়ে ছাড়লেন যন্ত্রণার সংক্রমণ। এভাবেও করা যায় অন্যের শরীরে আপন কর্তৃত্ব স্থাপন! শুভ বোধের দ্বারা চালিত হলে মানুষ নিজেকে কোথায় পৌঁছে দিতে পারে! আবার আশ্চর্য! এই হাত, এই আঙুলেরই অন্য ব্যবহার দেখা যায় অস্ত্র ধারণে, নারী ধর্ষণে।
স্বাধীনতার আগে নারী অধিকার নিয়ে লড়া মানুষগুলি অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন এই ভেবে যে নিজেদের মানুষের গড়া প্রশাসন লিঙ্গ সাম্য আনবে, মেয়েদের অবস্থার উন্নতি হবে। বাস্তবে যে তা হয়নি তা ভারতে নারীর অবস্থান কমিটির ১৯৭৫ সালের টুওয়ার্ডস্ ইক্যুয়ালিটি নামে রিপোর্ট থেকে পরিষ্কার হয়। ১৯৭৫ থেকে দীর্ঘ পাঁচ দশকে আমরা চাঁদে অশোক স্তম্ভের ছাপ ফেলেছি কিন্তু লিঙ্গ সাম্য? না, তা এখনও আসেনি। বরং হিংসা নেমে এসেছে তাঁদের উপর নিত্য নতুন প্রকারে। নারী নির্যাতনের ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যান থেকেই তা পরিষ্কার। কিছু কিছু রাজ্য পুলিশ প্রশাসন একে বরং তাদের সাফল্য হিসেবে ধরছেন। ভয় ভেঙে মানুষ থানায় আসছে, সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, জনসংখ্যাও তো বেশি ইত্যাদি। সংখ্যা, অজুহাতের তলা থেকে উঁকি মারে একটা প্রশ্ন - বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ অর্থনীতির দেশে কতটা নিরাপদ তার মেয়েরা?
দেশের সমাজের ক্ষুদ্রতম একক বা প্রতিনিধি হলো বাড়ি। জাতীয় অপরাধপঞ্জি ব্যুরোর (এনসিআরবি) তথ্য অনুযায়ী মেয়েরা সবচেয়ে বেশি হিংসা, যৌন নির্যাতনের শিকার হন নিজের বাড়িতে। এরপর কর্মক্ষেত্রে। পুরুষের সমান হতে গেলে মেয়েদের হতে হয় দ্বিগুণ। আর দিতে হয় কিছু অতিরিক্ত পরীক্ষা। সেখানে মেয়েরা কখনও টিকে থাকার জন্য, কখনও বেঁচে থাকার জন্য, কখনও কাজ হাসিল করার জন্য এই আপোষটা করেন। যোনি নিয়ে জন্মানো নারী ঘরে, বাইরে সর্বত্র ভালনারেবল। আর সুযোগ নেওয়া মানুষগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচিত, কাছের মানুষ।
পেশা নির্বিশেষে পুরুষ যখন ক্ষমতার ধারক হয় তার কাছ থেকে কার্য উদ্ধার করতে হলে মেয়েদের একটা বিনিময় মূল্য চোকাতে হয় অনেক সময়। যেটা ছেলেদের বেলায় লাগেনা। প্রশ্ন আসা উচিত, কেন? কেন এই প্রশ্নটা আপাতত মূলতুবি রেখে এর সমাধানের দিকে তাকাই। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি হওয়া বিশাখা গাইডলাইন্স বর্তমানে ভারত সরকার প্রস্তাবিত কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হয়রানি (প্রতিরোধ, নিবারণ, প্রতিকার) আইন, ২০১৩ এ রূপান্তরিত বেশ কিছু বদল নিয়ে। এই আইন অনুসারে দশ জনের বেশি কর্মী থাকা অফিসে একটি ন্যূনতম চার সদস্যের (একজন এনজিও কর্মী বাধ্যতামূলক) একটি অভ্যন্তরীণ অভিযোগ সমিতি তৈরি করতে হবে যার অর্ধেক সদস্য মহিলা হতে হবে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে বা কর্মী সংখ্যা দশের কম হলে বা নিয়োগ কর্তা নিজেই অভিযুক্ত হলে জেলাশাসক পরিচালিত স্থানীয় অভিযোগ সমিতিতে অভিযোগ জানাতে হবে। ইতিহাসে এখনও চাপা পড়ে যায়নি সে ঘটনা যেখানে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ নিজের বিরুদ্ধে আনা যৌন হয়রানির মামলা নিজে শুনে নিজেই খারিজ করে দিয়েছিলেন। অভিজ্ঞতা আমাদের জানিয়েছে এইসব সমিতি পড়ে থাকে একপাশে আর ক্ষমতাধর ব্যক্তি থেকে যায় নাগালের বাইরে। তাই বেশিরভাগ সময় ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কিছুদিন সহ্য করে নেওয়া, অনিচ্ছায় বা স্বেচ্ছায় মানিয়ে নেওয়াকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন মেয়েরা। যাঁরা পারেন না সেই গুটিকয়েক অভিযোগ এসে পৌঁছায় অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটিতে, অন্য পরিসরে থানায়। পরিসংখ্যানে যা উঠে আসে তা কাজেই এক প্রকাণ্ড হিমশৈলের চূড়া মাত্র।
আইন প্রয়োগের শৈথিল্য মানুষকে বাধ্য করে আইন প্রণেতাদের দিকে তাকাতে। বিলকিস বানোর এগারো ধর্ষকদের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে, অনৈতিকভাবে গুজরাট হাইকোর্ট শুধু মুক্তই করেনা, কারাগার থেকে বেরোনোর পর ফুল মালা দিয়ে সম্বর্ধনাও জানানো হয়। হারেম খুলে বসা সন্ত রাম রহিম শাস্তির মেয়াদের বেশিরভাগ সময় প্যারোলেই থাকে যেখানে বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, পরিবেশ কর্মী সোনম ওয়াংচুক, গবেষক ওমর খালিদ বিনা বিচারে বন্দী থাকেন। হাথরস, উন্নাও, বঁদায়ুএর বর্বর ও ভয়ঙ্করতম ধর্ষণে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসক থাকেন আশ্চর্য রকম নীরব। মণিপুরে নারীকে নগ্ন করে ঘোরানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তিনি স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে মৌন থাকেন। বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও বিজ্ঞাপন নয়, মুখোশ হয়ে যায়। আড়ালের মৌনতা দেখিয়ে দেয় আসল চেহারাটা। রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসকের ভাবমূর্তি সেখানে স্বচ্ছ, মুখোশহীন। "সাজানো ঘটনা, ছোট ছোট ছেলেরা দুষ্টুমি করে ফেলেছে, বয়ফ্রেন্ড ছিল - প্রেগন্যান্ট হতে পারে, ধর্ষিতার ফাঁসি চাই, রাত করে মেয়েদের বাইরে যেতে দেওয়া উচিত নয়...এ কথামৃতে তার অবস্থানটা বুঝে নিতে কোন অসুবিধেই হয় না। অথচ ক্ষমতায় ওঠার সিঁড়িতে পুলিশ ভ্যানে ধর্ষিতা মূক, বধির মেয়েটাও ছিল। ক্ষমতার স্বাদ মুখে লাগলে লিঙ্গচেতনা, নিজে নারী হিসেবে সমানুভূতি বর্জিত হয় কুখাদ্যের মত। দিদির রাজ্যে দুষ্টু ভাইদেরই রাজত্ব। সরকারি প্রশাসনের সমান্তরাল দলীয় প্রশাসনের তারাই যে স্তম্ভস্বরূপ। সেই কাঠামোতেই কলেজ পাস না করা ছাত্র অস্থায়ী কর্মী হয়ে থেকে যেতে পারে সেখানেই। কতটা বরাভয় থাকলে, স্পর্ধা কতদূর বাড়লে ছাত্রনেতা থুড়ি চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী শিক্ষা কর্মী কলেজ (আইন) প্রাঙ্গণের মধ্যেই ধর্ষণ করবার সাহস রাখতে পারে। নৈরাজ্য কোন পর্যায়ে গেলে সরকারি হোমগার্ড (শাসক দল ঘনিষ্ঠ) সরকারি চিকিৎসককে প্রহার করে ধর্ষণের হুমকি দিতে পারে। এ দুঃসাহস একদিনে আসে না।
এই মে মাসেই মধ্যপ্রদেশে খান্ডোয়া জেলায় এক পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী আদিবাসী মানুষ, অবশ্যই নারী ধর্ষিতা হন তারই অর্ধেক বয়সী দুই প্রতিবেশীর দ্বারা। পাড়ারই এক মেয়েকে এগিয়ে দিতে গিয়ে যাদের একজনের বাড়ি থেকে গিয়েছিলেন তিনি। ধর্ষকের মা সকালে তাকে যখন আবিষ্কার করেন তিনি নিস্তেজ, তাঁর অন্ত্র বেরিয়ে যোনির বাইরে। সে সময় তাকে হাসপাতালে নয়, নিয়ে যাওয়া হয় বাড়িতে যেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। হাঁসখালিতে ধর্ষিতা কিশোরীটি রক্তে ভেসে গেলেও তার মা তাকে হাসপাতালে নেবার কথা ভাবতে পারেননি। বরকেই বলেননি 'লজ্জায়'। খবরের কাগজে না ওঠা উত্তর প্রদেশের একটি ঘটনায় একটি মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে বিষ খেলে তার বাপের বাড়ির লোকেরা বাড়ি নিয়ে আসার সময় পথেই তার মৃত্যু হয়। বাড়ির বদলে 'দেহ' তখন যায় শ্মশানে। দায়িত্ব শেষ। মানুষ যদি নারী হয় মূল্যে সে এতটাই খাটো হয় যে চিকিৎসা, স্বাস্থ্যের অধিকার সিলেবাসের বাইরে থেকে যায়। গ্রাম পার হয়ে শহরে ঢুকলেও ছবিটা তেমন বদলায় না। তার শ্রমের মূল্য কম বা স্রেফ নেই সেজন্যে তারও মূল্য কম বা স্রেফ নেই। দেহ তার গুরুত্ব পায় অন্যভাবে।৫৮'র প্রৌঢ় যখন ১৮'র স্তন জরিপ করেন ২৮এর সামনে, "সব মেয়েই কারোর না কারোর মেয়ে, আমার তো নয়" তখন প্রবাহিত হয় দর্শন, সংস্কার এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে। অথচ স্তনের
উপাস্য হওয়ার কথা ছিল, জীবন রসের উৎস যা তার হওয়ার কথা ছিল শ্রদ্ধার্হ্য। নদী যেখানে মা স্তন সেখানে শুধুই যৌন খেলনা। সৃষ্টিতে পার্বতীদের যোগদান পঁচানব্বই ভাগ হলেও পূজিত হয় শুধু একা শিবলিঙ্গ। কিন্তু তার ধারক পার্বতী যোনি থেকে যায় অনুল্লেখিত, স্রেফ নেই।
এবার আসা যায় মুলতবি রাখা প্রশ্নটাতে। কেন? গবেষণা, উচ্চশিক্ষা, কর্পোরেট কী অভিনয় জগতে মেয়েদের একটা অতিরিক্ত বিনিময় মূল্য চোকাতে হয়। কেন? মেধাবী, বিদুষী, শিল্পী, গুণী, প্রতিভাধর এভাবে বলতে গেলে আগে সামনে থাকা ব্যক্তিকে মানুষ হিসেবে ভাবতে হয়। মনন আর উচ্চতা পাঁচ ইঞ্চিতে আটকে থাকা পুরুষের চোখ দেখে শুধু নারী। নারী যার একটা যোনি আর দুটি স্তন থাকে। আর কিছু নেই, স্রেফ নেই। মেধা, যোগ্যতা, পোটেনশিয়াল দেখতে পায় না পাঁচ ইঞ্চির চোখ।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয় বছর তিনেক আগে এই কলকাতা শহরের তিলজলায় সাত বছরের একটি মেয়েকে প্রতিবেশী নিজের সমস্যার সুরাহার জন্য তান্ত্রিকের পরামর্শ মত বলি দিতে গিয়েছিল। বলি দেবার আগে অবশ্য একটু ধর্ষণ করে নিয়েছিল। সে গল্পটা সবাই জানে যেটায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আঙুল কেটে গিয়েছিল দেখে গোপাল ভাঁড় ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন বলায় রাজামশাই খেপচুরিয়াস হয়ে গোপাল ভাঁড়কে জেলে পোরেন। তারপর নিজে জঙ্গলে মৃগয়া করতে গিয়ে ডাকাতের হাতে ধরা পড়েন। মহারাজের নধর স্বাস্থ্য দেখে দস্যুরা বেজায় খুশি হয়ে তাকে দেবীর সামনে বলি দিতে যায়। কিন্তু বলি দেওয়া গেল না। কারণ ওই কাটা আঙ্গুল। খুঁতো আইটেম দেবীর শ্রীচরণে উৎসর্গ করা যায় না। তান্ত্রিক রীতিনীতি সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞান থাকবার প্রয়োজন নেই, ছোটবেলায় গোপাল ভাঁড়ের এই গল্পটা যাঁরা শুনেছেন তাঁরা ভেবে দেখলে বুঝতে পারতেন তন্ত্রসাধনার গল্পটা এখানে কেমন হাস্যকর রকমের অসাড়। সাত বছরের কচি বাচ্চার অগঠিত যৌনাঙ্গ উপযুক্ত হয় না প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষএর যৌনাঙ্গ ধারণ করবার। রক্তপাত হবেই। ক্ষত হবেই। আর খুঁতো আইটেম দেবীর সামনে বলি দেওয়া যায় না। সে সময় মানুষের মনে তথা ফেসবুকে আলোড়ন ফেলেছিল খাস কলকাতার বুকে এমন তান্ত্রিক আচরণ পালন। সৃজনশীল মানুষের প্রতিক্রিয়াশীল কলম ক্ষোভ ঝরিয়েছিল সামাজিক মানুষের ওই পেছন পানে হাঁটা নিয়ে। তীক্ষ্ণ ব্যাথা একসময় যেমন ভোঁতা হয়ে যায়, প্রতিদিন হওয়া যন্ত্রণা একসময় সয়ে যায় যেমন করে তেমনিই কী কাগজে নিত্যনৈমিত্তিক ধর্ষণের খবর মানুষের মনে আর কোনও অভিঘাত সৃষ্টি করে না? সাত বছরের শিশু হলেও করে না? ছোট্ট শরীরে বিভীষিকা চালিয়ে তাকে দুহাতে গলা টিপে মারলেও করে না? যে সমাজে শিশুর ধর্ষণের চেয়ে বেশী গুরুত্ব পায় কূসংস্কার সে সমাজে এমনটা তো হওয়ারই কথা। বারবার হওয়ার কথা। বানতলা গণধর্ষণের ঘটনায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ঠিক এ কথাই বলেছিলেন, "এমনটা তো হয়েই থাকে"। সেই অসংবেদনশীলতার পুনরাবৃত্তি পরবর্তীকালেও দেখা গিয়েছে বারবার। এই ঘটনা তাই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কোনও কোনও ঘটনা যখন বীভৎসতায় বিশেষ হয়ে ওঠে তখন নাগরিকের হাতে হাতে মোমবাতি জ্বলে ওঠে, বারাসাত থেকে শ্যামবাজার গড়ে ওঠে মানব শৃঙ্খল। বাকি ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা অবিশেষ সাধারণ নির্যাতনের বেলায় খবরের কাগজের পাতা উল্টে যায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মৃত্যুতে র্যাগিং নিয়ে আলোচনা, ধিক্কার হয় সারা দেশ জুড়ে। পেছনে পড়ে থাকে তার সাথে লাগাতার হয়ে চলা যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলি। ১৪০ কোটির দেশে যৌনতা নিয়েই যখন অস্বস্তি তখন যৌন হিংসা আলোচনার পরিসরের বাইরেই থেকে যায়। পুরুষের প্রতি হলে দ্বিগুণ ঘা লাগে পুং জাত্যাভিমানে। তাই বোধ হয় সেখানে অপার নৈঃশব্দ্য।
কেন পুরুষ (ক্ষেত্রবিশেষে নারী) ধর্ষণ করে সেটা হয়তো মনোবিদ বা সমাজতাত্ত্বিকদের গবেষণার ক্ষেত্র। এটা মনে করা যেতে পারে উল্টো দিকের মানুষটির মতামত, অনিচ্ছেকে স্বীকৃতি দেবার আদৌ প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না বলেই করে। নিজেকে শ্রেষ্ঠ আর অন্য মানুষটিকে কখনও বা একটা গোটা শ্রেণীকে তুচ্ছ জ্ঞান করবার শিক্ষা মানুষ রাতারাতি পায় না। দশ বছর বয়সী ফুলমণি দাসীর মৃত্যু হয়েছিল ফুলশয্যা রাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জেরে। সে অবশ্যি ছিল ১৮৯৮ সাল। এখন মেয়েদের
বিয়ের বয়স বড্ড বেড়ে গিয়েছে। কাজেই এমনটা তো হতেই পারে। সামাজিক দর্শন কেমন হলে চোখ শিশুর মুখের স্নিগ্ধতা পেরিয়ে যোনির গভীরতা খোঁজে! নারীকে তার ধী, প্রজ্ঞা, বিদ্যা, ব্যক্তিত্ব বাদ দিয়ে শুধু দৈহিক সৌন্দর্য দিয়ে মাপা -- প্রকৃত সুন্দরী, ফর্সা, ঘরোয়া --- নারীর এই পণ্যায়ন একদিনের নয়। এ যুগ যুগান্তের প্রাচীন এমন এক শিক্ষা যা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বাহিত হয়ে আসছে সভ্যতার জন্ম লগ্ন থেকে। যার সমান শরিক মেয়েরা নিজেরাও। রূপ নিয়ে তাঁদের সচেতনতা, উদ্বেগ কতটা তাঁদের নিজেদের আর কতটা সমাজের গড়ে দেওয়া তা কোনও ফর্মূলায় ফেলে মাপা যাবে না। দ্বিতীয়টা থেকেই প্রথমটার জন্ম। কাব্যে যে পরিমাণ শব্দ ব্যয় হয় নারীর রূপ, তার কেশ, তার বেশ নিয়ে তার সিকিভাগও বরাদ্দ হয়না পুরুষের রূপ, রং নিয়ে। তার কোমর, বক্ষ, পশ্চাৎদেশের সৌন্দর্য নিয়ে যে নিত্য আরাধনা সেখানে পুংলিঙ্গের সৌন্দর্য নিয়ে কালি খরচ বিশেষ চোখে পড়ে না। পুরুষদের বর্ণনা যা পাওয়া যায় তা সবই তার ফিটনেস, স্ট্যামিনা, এক কথায় বল প্রকাশ করে। অবলা নারী শব্দটা যেখানে একে অপরের পরিপূরক, নির্বল পুরুষ শুনলেই কেমন হাসি পায় যদি না তা বিশেষ কোনো জাতি, শ্রেণী নির্দেশ করে। কারণ বল -- দৈহিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক যে রূপেই আসুক না কেন তা পুরুষেরই করায়ত্ত থেকেছে চিরটাকাল। ইহাই পিতৃতন্ত্র। সেই তন্ত্রে পুরুষের থাকবে শৌর্য, বীর্য, দর্প, ক্ষমতা, নারীর থাকবে লজ্জা, কমনীয়তা, বিনম্রতা, অসহায়তা। পুরুষের হবে অধিকার, নারীর হবে সমর্পণ। নারীর ভূমিকা এখানে সুনির্দিষ্ট -- বংশবিস্তারের মাধ্যম, বংশপ্রদীপগণের পালক, পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতির বাহক। জাতক কথায় আমরা পাই দাসী, গরু, স্বর্ণমুদ্রা ছাড়াও সুন্দরী রমণী উপঢৌকন হিসেবে দান করা হচ্ছে। দাসী ও রমণী আলাদাভাবে উল্লেখ করার কারণ তাদের অ্যাসাইনড ওয়ার্ক সুনির্দিষ্ট। রমণ করেন যিনি তিনিই রমণী। উল্টো প্রতিশব্দ বাংলায় খুঁজে পাওয়া যায় না। পুরুষের সে ভূমিকা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। রমণীকে হতে হয় আকর্ষক, সুন্দরী। সময়ের সারণী বেয়ে এ ধারণা ক্রোমোজোমের গভীরে এমন সেঁধিয়েছে যে বৈষম্য বলে একে চেনা দায়। প্রবাদে, কথকতায়, ছড়ায়, মিমে যুগে যুগে মেয়েদের বুদ্ধিবৃত্তিকে, সত্ত্বাকে খাটো করা হয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দৈনন্দিন জীবনের সেক্সিজমে অন্য এক তন্ত্রধারায়। পিতৃতন্ত্র - যার প্রচ্ছন্ন শরীক কম বেশী সকলেই। অন্য এক তন্ত্রের। পিতৃতন্ত্রের।
মানুষ পুরুষ বা নারী হয়ে জন্মায় না, গড়ে ওঠে। যে পরিসরে মানুষের বেড়ে ওঠা, প্রতিনিয়ত শিখা চলা বদল দরকার সে পরিসরে। সে পাঠ শুরু করতে হবে শুরুতেই। প্রাথমিক স্তর থেকে। মেয়েদেরকে শেখানো নিজেদের মূল্য বুঝতে, অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হতে, না পেলে আদায় করে নিতে। ছেলেদেরকে শেখানো তাদেরকে পালন যারা করতে জানেন, করে চলেন আজীবন নানা রূপে, প্রয়োজনে শুধু পাশে থাকতে, সমব্যথী সঙ্গী হতে। এটুকু হলেই মেয়েদেরকে রক্ষা করার প্রয়োজন তাদের ফুরাবে।
গল্প
আবীরের
আকাশ
মোঃশওকত আলী খান
ঘোড়াচরা, ফুলকোচা।সিরাজগঞ্জ সদর, বাংলাদেশ

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি জাগেনি, আকাশের কোণে কেবল এক রেখা ফিকে আলো। সিরাজগঞ্জ শহরের নিদ্রামগ্ন ঘর-বাড়ি, নিস্তব্ধ গলিপথ, আর দূরের মিনার থেকে ভেসে আসা আজানের সুর সব মিলিয়ে এক গভীর প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে। এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই যমুনা নদী ধীরে ধীরে জেগে ওঠে।
নদীর বুকে কুয়াশা যেন দুধের আস্তরণ, জলে আর আকাশে পার্থক্য বোঝা যায় না। বাতাসে শিশিরের গন্ধ, কোথাও কোথাও ঘাসে জলের বিন্দু ঝলমল করছে। নদীর স্রোত ধীর, অথচ তার ভেতরে এক অদৃশ্য শক্তির প্রবাহ, যেন সে নিঃশব্দে সময়কে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
পাড়ের ধারে কজন জেলে নৌকা বেঁধে রাখছে, কারও হাতে বা, কারও হাতে ভেজা জাল। ঠান্ডা বাতাসে তাদের নিশ্বাস সাদা ধোঁয়ার মতো ভেসে যায়। এক পাশে কিছু ছেলে দাঁড়িয়ে আছে তারা নদীর বুকে সূর্যের ওঠা দেখতে ভালোবাসে।
সূর্য যখন আস্তে আস্তে উঠতে শুরু করে, যমুনার রং বদলে যায়। মুহূর্তেই ফিকে নীল থেকে তা হয়ে ওঠে রুপালি, তারপর সোনালি। জলের ওপর ছোট ছোট ঢেউ রোদে চিক চিক করে যেন হাজার ছোট আয়না, আকাশের সৌন্দর্য প্রতিফলিত করছে।
দূরের চরাঞ্চল তখন স্পষ্ট দেখা যায় না, কিন্তু ভোরের আলোয় সেখানে গরুর ঘণ্টাধ্বনি, মানুষের হাঁকডাক মিলেমিশে এক সজীব সুর তোলে। শহরের ঘুম ভাঙে ধীরে ধীরে, কিন্তু যমুনা তখনই পূর্ণ জাগ্রত, তার বুকের ঢেউয়ে প্রাণ জেগে ওঠে সমগ্র সিরাজগঞ্জে।
নদীর ধারে কিছু গাছ, তাদের পাতায় রোদের প্রথম কিরণ পড়তেই সোনালি আভা ছড়িয়ে দেয়। বাতাসে ভেসে আসে আলতার মতো লাল সূর্যের আলো। নদীর তীরে বসে কোনো বৃদ্ধ হয়ত নামাজ শেষে চুপচাপ তাকিয়ে আছে, চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে নীরব দোয়া। যমুনা নদীর ভোর যেন কোনো দৃশ্য নয়, এক অভিজ্ঞতা।
এখানে সময় থেমে যায়, মানুষ ক্ষণিকের জন্য নিজের সব ব্যস্ততা ভুলে যায়।
এ নদী কেবল পানি নয়, এ যেন এক জীবন্ত কবিতা, যেখানে প্রতিটি ঢেউয়ে লেখা থাকে শহরের শ্বাস, মানুষের আশা, আর জীবনের চলার অনন্ত প্রতিধ্বনি।
সিরাজগঞ্জের যমুনা ভোরে এমনই নিঃশব্দ অথচ গভীর, শান্ত অথচ শক্তিশালী।
যেন প্রকৃতি নিজেই এখানে প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নেয়। শহরের ভোরটা আজ অন্যরকম। যমুনা নদীর ওপরে হালকা কুয়াশার পর্দা, আর দূর থেকে শোনা যায় ইঞ্জিন চালিত ট্রলারের শব্দ। শহরের ঘাটে তখনও পুরো আলো ফোটেনি, তবু এক টোকাই ছেলে আবির তার ছেঁড়া ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়েছে। বয়স বারো বা তেরো হবে। চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া, তবু এক অদ্ভুত সাহস আছে তার চাহনিতে।নদীর ধারের ধুলো মাখা রাস্তায় সে হাঁটে, কখনো বোতল কুড়িয়ে নেয়, কখনো পুরোনো কাগজ। ভোরের ঠান্ডায় তার খালি পা কাঁপে, কিন্তু মুখে কোনো অভিযোগ নেই।কোথাও তার কেউ নেই, বলা চলে সিরাজগঞ্জ রেলস্টেশন এখন তার ঠিকানা। দুই বছর আগে মা মারা গিয়েছিল যক্ষ্মায়। বাবা নদীতে নৌকা চালাতে গিয়ে হারিয়ে গেছে এক বর্ষায়। এরপর থেকেই আবির রেললাইনের পাশে কাটায় দিন-রাত।তবু আবিরের একটা স্বপ্ন আছে, সে একদিন স্কুলে যাবে। নাম লিখিয়েছে একবার, কিন্তু টিফিনে খাবার দিতে না পারায় দুই সপ্তাহেই ছেড়ে দিতে হয়েছিল।সিরাজগঞ্জ শহর এখন অনেক বদলে গেছে। নতুন সেতু, দোকানপাট, মোবাইলের দোকানে সারাদিন গান বাজে। কিন্তু ফুটপাথে বসবাস করা মানুষদের জীবনে কিছুই বদলায়নি।আবির কখনো পৌর পার্কের পাশে পুরোনো বোতল কুড়িয়ে, কখনো বাজারের আবর্জনা ঘুরে যা পায় তাই বিক্রি করে। এক কেজি প্লাস্টিকের দাম পাঁচ টাকা, আর কাগজের দাম দশ। দিনে কষ্টে পঞ্চাশ টাকা ওঠে।
বিকেলে আবির নদীর ঘাটে বসে থাকে, দূরে জেলে নৌকা ফেরে, ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে বাড়ি যায়। ওদের গায়ে ঝকঝকে ইউনিফর্ম, কাঁধে ব্যাগ। আবির নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে।একবার সাহস করে নদীর ধারে বসা এক স্কুল ছাত্রের কাছে বলেছিল,
ভাই, তোমার বইটা একটু দেখতে পারি? ছেলেটা একটু বিরক্ত হয়ে বলেছিল, এই সব টোকাইয়েরা বই দেখবে কেন?
সেই দিন থেকে আবির কারও কাছে বই দেখতে চায় না। শুধু মাঝে মাঝে ডাস্টবিনে ছেঁড়া পৃষ্ঠা পেলে সেগুলো গুছিয়ে নিজের ব্যাগে রাখে।
একদিন বিকেলে পৌর পার্কের পাশে আবির কুড়াচ্ছিল প্লাস্টিক। হঠাৎ এক বৃদ্ধ লোক থেমে দাঁড়ালেন। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে পুরু চশমা।
লোকটি বললেন, এই ছেলে, নাম কী তোমার? আবির। তুমি কি প্রতিদিন এখানে আসো?
জি, সকালে রেলস্টেশন, বিকেলে এখানে।”
লোকটি মুচকি হাসলেন। তিনি শহরের এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, মো. আমিনুল ইসলাম স্যার। বয়স সত্তরের কাছাকাছি, স্ত্রী মারা গেছেন বহু আগে, একমাত্র ছেলে থাকে ঢাকায়। একাকিত্ব কাটাতে প্রতিদিন বিকেলে পার্কে আসেন।
সেদিন থেকে স্যার ও আবিরের অদ্ভুত বন্ধুত্ব শুরু হয়। স্যার মাঝে মাঝে তাকে ডেকে দেন, বিস্কুট বা কলা খেতে দেন, কখনো পুরোনো পত্রিকা দেন। একদিন হঠাৎ স্যার জিজ্ঞেস করলেনতুমি কি পড়তে চাও?আবিরের চোখ জ্বলে উঠল। খুব চাই স্যার, কিন্তু স্কুলে গেলে পেট খালি থাকে। স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, তুমি সন্ধ্যায় আমার বাসায় আসো। আমি তোমাকে পড়াবো।
সেই রাতেই আবির ভয় পেতে পেতে গেল স্যারের বাসায় পুরাতন বাজারের পেছনে ছোট দোতলা বাড়ি। স্যার তাকে এক গ্লাস দুধ দিলেন, পুরোনো বই দিলেন।
এই বইটার নাম বর্ণ পরিচয়। তুমি প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা পড়বে। আবিরের চোখে জল এসে গেল। কেউ তাকে এত স্নেহ দেয়নি আগে। সেদিন থেকেই তার জীবনে একটা আলো জ্বলে ওঠে।
প্রতিদিন ভোরে সে প্লাস্টিক কুড়িয়ে বিকেলে স্যারের বাসায় যেত। স্যার তাকে শুধু পড়া শেখাতেন না, জীবনের দীক্ষাও দিতেন।
বলতেন, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয় কেবল একটাই জিনিসে, জ্ঞানে। সে শহরের এক টোকাই, তাই অনেকেই আবিরকে ভালো চোখে দেখত না। রাস্তার দোকানদাররা বলত, এই টোকাই আবার বই পড়ে নাকি! কেউ কেউ হাসত, কেউ তিরস্কার করত। কিন্তু আবির কারও কথায় ভ্রূক্ষেপ করত না।
সে জানত তার মাটি ভেজা পায়ের নিচেও স্বপ্নের বীজ আছে। একদিন পৌরসভা স্কুলে এক শিক্ষক শুনলেন আবিরের গল্প। স্যারের সুপারিশে তাকে ভর্তি করে নিলেন ক্লাস টুতে। বইপত্র, ইউনিফর্ম সব দিলেন স্যার নিজ হাতে। আবিরের প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন শহরের মানুষ তাকিয়ে দেখেছিল, ছেঁড়া জামার জায়গায় ঝকঝকে ইউনিফর্ম, মুখে হাসি। যমুনার হাওয়া যেন একটু নরম হয়েছিল সেদিন। তবে সুখ বেশিদিন থাকে না। এক রাতে স্যার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। স্যার চিরনিদ্রায় চলে গেলেন, রেখে গেলেন একটি খাম।
ভেতরে লেখা, আবির, তুমি একদিন অনেক বড়ো হবে। আমার বইয়ের আলমারিটা আর একটা বৃত্তির ব্যবস্থা করে তোমার জন্য রেখে গেলাম। তোমার স্যার, আমিনুল ইসলাম। আবির তখন কাঁদছিল নদীর ধারে, সেই পুরোনো ঘাটে। কিন্তু স্যারের কথা মনে করে আবার উঠে দাঁড়াল। পাঁচ বছর পর সিরাজগঞ্জ শহরের “যমুনা শিশু শিক্ষা কেন্দ্র”নামের এক ছোট স্কুলে এক তরুণ শিক্ষক পড়ান। তাঁর নাম আবির হাসান। ছোট ছোট টোকাই, পথশিশুদের নিয়ে তৈরি করেছেন সেই স্কুল।
প্রতিদিন সকাল বেলা তিনি রেলস্টেশনে যান, যে পথটা একসময় তার ছিল, আজও সেই ধুলো উড়ে আসে তার মুখে। তিনি শিশুদের বলেন, তোমরা জানো, আমি একসময় তোমাদের মতোই টোকাই ছিলাম। কিন্তু একতা স্যার আমার জন্য আকাশ খুলে দিয়েছিলেন।
তোমাদেরও পারবে, যদি মন থেকে চাও।দূরে যমুনা নদী ঝলমল করছে।
আবির আকাশের দিকে তাকায়, সেখানে হয়ত কোথাও স্যার তাকিয়ে আছেন, হাসছেন।
ইউরেনাস
গ্রহে মানুষ
সুদীপ ঘোষাল
পূর্ব বর্ধমান

কল্প-বিজ্ঞান
সুমনবাবু শুধু গোয়েন্দা নন। তিনি একাধারে বিজ্ঞানী, গোয়েন্দা এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি বিজ্ঞানের সংবাদ রাখতে আগ্রহী। তোতন তার ছাত্র ও সহযোগী হিসেবে থাকে সবসময়। তারা দুজনে ঘরে পড়াশোনা করছিলেন। কলিং বেল বাজতেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল তোতন। তোতন দেখল, এক বৃদ্ধ ব্যক্তি এসেছেন, সমস্যা নিয়ে কথা বলতে। তিনি বললেন,
- 'বিপদে পড়েছি বাবা। আমি সুমনবাবুর সাহায্য চাই।'
- 'আমাকে বলুন কি সমস্যা? আমার নাম তোতন। আমি তার সহকারী।' বৃদ্ধ ব্যক্তি বললেন,
- 'আমাদের একটা সমস্যা হয়েছে গ্রামে। একটু বিশদে আলোচনা করলেই ভালো হয়'।
তোতন বলল, - 'আসুন ঘরে। আসুন, বসুন অই চেয়ারে।' সুমনবাবু বললেন,
- 'বলুন আপনার সমস্যা কি?' বৃদ্ধ শুরু করলেন,
- 'আমাদের এক প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি। সেখানে হঠাৎ একদিন রাতে আবিষ্কার করলাম একটি অদ্ভূত প্রাণীকে। এটি পৃথিবীর প্রাণী নয়, অন্য কোন গ্রহের প্রাণী মনে হয়। হয়ত তারা মানুষের ভাষা বুঝতে পারে। গ্রামের কোন লোক বিশ্বাস করছে না, আমার কথা। গ্রামের লোক আমাকে পাগল বলছে। এটাকে দেখাতে না পারলে লজ্জায় আমাকে মরতে হবে। জীবটি লুকিয়ে পড়ল, বনের কোন এক জায়গায়। তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। এখন আপনার সাহায্যে প্রাণীটিকে আবিষ্কার করে আমার কথার সত্যতা প্রমাণ করতে চাই। তার জন্য অর্থ ব্যয় করতেও আমি প্রস্তুত আছি।' সুমন বলেন,
- 'আপনি ব্যস্ত হবেন না।' বৃদ্ধ বললেন,
- 'আমি তো বেশি লেখাপড়া জানি না। তবু দেখলাম সূর্যের বিপরীতে মানুষের ছায়া যত দীর্ঘ হয়, ঠিক সেরকম দীর্ঘ চেহারার ছায়ার মত কালো চেহারার লোক। লোক বলাই ভাল। এ লোক, মানুষ নয় অথচ মানুষের মত প্রাণী, অন্য গ্রহ থেকে আসা মনে হচ্ছে আমার। আমাদের পৃথিবীর মানুষ নয়। আপনি গিয়ে সেটা আবিষ্কার করতে পারলে সব থেকে ভাল হবে।' সুমন বললেন,
- 'নিশ্চয়ই যাবো আমরা আপনার ওখানে যাব। ঠিক আছে আমরা আপনার সঙ্গে দেখা করে সমস্ত কথা বলব।' বৃদ্ধ আমন্ত্রণ জানিয়ে চলে গেলেন।
পরেরদিন, সুমন সহকারী তোতনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সেই বৃদ্ধের গ্রামের উদ্দেশে। ঠিক চার ঘন্টা ট্রেন জার্নি। তার পরে তারা তার বাড়িতে পৌঁছালেন। বৃদ্ধ তৈরি ছিলেন তাঁদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। তিনি নিয়ে গেলেন ঘরে এবং তাদের থাকার জায়গাটি দেখিয়ে দিলেন। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে গোয়েন্দা সুমন আর তোতন গ্রাম দেখতে বেরোলেন। বেশ বৈচিত্র্যে ভরা সবুজ সবুজ গাছগাছালি মন কেড়ে নেয়। পাশেই ফালি নদী। নদীর পাড়ে ফল গাছ। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তোতন আর সুমন কথা বলতে বলতে চলেছেন। এক জায়গায় তারা বসে পড়লেন। জঙ্গল খুব ভালোবাসেন সুমনবাবু। পাশ দিয়ে বয়ে চলছে ঈশানী নদী। বড় মনোরম জায়গা। তিনি সবুজ একটা পাতা হাতে নিয়ে বললেন,
- 'এটা কি গাছের পাতা বল তো?' তোতন বলল,
- 'এই পাতায় আপনি হাত দিয়েছেন? আপনার তালুতে আছে কোন অস্বস্তি হচ্ছে না। সুমন বলছেন - না তালুতে বিছুটি পাতার কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। কিন্তু এটা শরীরে ঘষে দিলে এর রস, তখন জ্বালা করতে শুরু করবে।' তোতন বলে,
- 'আমি চিনি এটা, বিছুটি পাতা।' সুমন আক্ষেপ করে বললেন,
- 'এখনকার ছেলেরা এই বিছুটি পাতা, ডুমুর গাছ, নয়ন তারা গাছ, তারপর বাঁদর লাঠিগাছ এইগুলো কি আর চিনতে পারবে? কত বিভিন্ন রকমের প্রকৃতিতে গাছ আছে। যারা আপনাআপনি বেড়ে ওঠে। তাদের লাগাতে হয় না। কদবেল, গাছ বেলগাছ এগুলো আস্তে আস্তে যেন হারিয়ে যাওয়ার পথে। বিশ্বপ্রকৃতির কতটুকু চিনি আমরা ভাই।'
সুমন আর তোতনের কথা বলতে বলতে কখন যে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে তারা বুঝতেই পারেনি। হঠাৎ বন্ধ করলো তাদের আলোচনা একটা ছায়ামূর্তি। কে যেন আড়ালে সরে গেলো। তোতন ইশারা করে গোয়েন্দা সুমনকে, এগিয়ে গেলেন জঙ্গলের পাশে। তিনি দেখতে পেলেন একটা ছায়ামূর্তি যাচ্ছে। ওরা দুজনেই পিছনে ছুটতে শুরু করলেন। তাড়া করতে করতে জঙ্গলে গভীরে গিয়ে ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে গেল আগ্রহভরে। সে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার বাংলা ভাষায় বলল,
- 'কেন তোমরা আমার পিছু ধাওয়া করেছ? কোন প্রয়োজন আছে।' সুমন উত্তরে বললেন,
- 'আপনি এত সুন্দর পরিষ্কার বাংলা ভাষা কি করে বলছেন?' তখন ছায়ামূর্তি উত্তর দিলো,
- 'আমাদের গ্রন্থিতে ভাষা অনুবাদের গ্রন্থি ব্রেনে সিলেক্ট করা আছে যাতে আমরা সব ভাষাই বুঝতে পারি।' সুমন বললেন,
- 'আপনি কোন গ্রহ থেকে এসেছেন।' ছায়ামূর্তি বলল,
- 'আমি ইউরেনাস গ্রহ থেকে এসেছি। আমরা পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে এসেছি। এখানকার জীব বৈচিত্র। এখানকার সবুজ প্রকৃতি বৈচিত্র দেখতে। আমার মত অনেকেই এখানে এসেছেন। ইউরেনাসের একটি মেরু সূর্যের দিকে প্রায় ৪২ বৎসর থাকে, এই সময় অন্য মেরু অন্ধকারে থাকে। ইউরেনাসে সূর্যের আলোর তীব্রতা পৃথিবীর ৪০০ ভাগের ১ ভাগ পরিমাণ। এর উপরিতলের গড় তাপমাত্রা -১৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে শীতলতম অবস্থায় তাপমাত্রার পরিমাণ দাঁড়ায় -২২৪ সেলসিয়াস। বিষুব অঞ্চলে প্রায় ২৫০ মিটার/সেকেন্ড বেগে বাতাস প্রবাহিত হয়।আমরা বছরে একবার মাত্র মল ত্যাগ করি।' গোয়েন্দা সুমন বললো,
- 'আমাদের প্রকৃতি খুব সুন্দর। দেখে আপনার আনন্দ হবে আশা করি। জল, বাতাস মাটি আমরা দূষিত করি না। কোনো ভাইরাস আমাদের শরীরে বাসা বাঁধতে পারে না। সাইকোভেগাস বললন, - - - 'আপনাদের গ্রহে আরো গাছ লাগান। সবুজে ভরে তুলুন। তা না হলে, 'ভেগো ভাইরাসে 'ধ্বংস হয়ে যাবে এই গ্রহ। তোতন বলল,
- 'আমরা শুনেছি ইউরেনাস এত মাটি নেই। কি করে গাছ হবে?' সাইকোভগাস বলল,
- 'মানুষ ছাড়া পৃথিবীবাসীর অনেক জীব ভূমিকম্পের আগে বুঝতে পারে। লাল পিঁপড়ে, পোকামাকড় এমনকি কুকুর পর্যন্ত বুঝতে পারে বিপর্যয়। কিন্তু তারা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। তাদের গতিবিধি দেখে বুঝতে হয়। স্কাইল্যাব এ চড়ে আমরা মহাবিশ্বে ঘুরে বেড়াই। এই মহাবিশ্বের কতটুকু খবর রাখেন আপনারা মানুষেরা।' সুমন বললো,
- 'আমরা দুজন আপনাদের গ্রহে যেতে চাই আপনি কি নিয়ে যেতে রাজি?' সাইকোভগাস বলল,
- 'হ্যাঁ নিশ্চয়ই।' গোয়েন্দা সুমন আর তোতন সাইকোভগাসের মহাকাশযানে চেপে বসলো। গোয়েন্দা সুমন বললো,
- 'আমাদের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ফেরত দিয়ে যাবেন তো? সাইকো বলল,
- 'আমরা কথা ও কাজে সত্যতা রাখি। আমাদের যানের গতি আলোর গতির থেকেও বেশি। গতির সঙ্গে টাল রাখার জন্য আপনাদের একটা পোশাক দেব।' সাইকো বলল,
- 'আমাদের প্রতিটি মিনিট খুব দরকারি তাই আমরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আপনাকে এখানে পৌঁছে দেবো কথা দিচ্ছি।' মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেল ইউরেনাস। প্রচুর অক্সিজেন। সুমন বললেন, - 'আপনাদের এখানে এত নির্জন কেন। যে যার নিজের কাজ করছে। এরা এত অসামাজিক কেন?' সাইকোভগাস বলল,
- 'আমরা আমাদের মানুষ বলি না। মানুষ তো নয় এদের অন্য নাম আছে। ভার্জিন প্লানেটেরিয়ান। এরা অসামাজিক নয়। কাজের সময় কাজ। সময় একবার পার হলে আর ফিরে আসে না। সময়ের সদ্ব্যবহার করি আমরা। কেউ কারও নিন্দা করি না। এতটাই উন্নত আমাদের গ্রহ যে এখানে পুলিশ থানা বা আইন আদালতের প্রয়োজন হয় না। সকলের মস্তিষ্ক উন্নত। জনসংখ্যা কম। গ্রহের উন্নতির জন্য সকলে সচেষ্ট। এখানে জাতিভেদ নেই। নরনারীর সমান অধিকার। যৌন আকাঙ্খা মিউট করা থাকে। একমাত্র নর নারী উভয়ে একত্র হলে মিউট পজিশন আনমিউট হয়। একজনের ইচ্ছায় মিলন করলে যৌনঅঙ্গ বিকল হয়ে যাবে। অটোমেটিক্যালি ধর্ষণ অসম্ভব। এই গ্রহে বেশিরভাগ সময় রাতে ঘুমোতে হয় এবং ঘুমিয়ে থাকার ফলে এদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশ্রাম পায় এবং পরম আয়ু বাড়ে। সুমন বলল,
- 'আপনারা কি করে এত উন্নত হলেন এই সামান্য ঘন্টা জেগে থেকে। সে বলল,
- 'আমাদের প্রতিটা মিনিট হচ্ছে ঘন্টার সমান। আপনারা এক ঘন্টায় যতটা কাজ করেন আমরা এক মিনিটে সেই কাজ করি। তাই আমরা সময় পাই বেশি। আমরা প্রত্যেকটা মুহূর্তকে সুন্দর কাজে ব্যয় করি। বিজ্ঞানী সুমন বললেন,
- 'এই রহস্য আমাকে একটু বিশ্লেষণ করুন বলুন। তখন সাইকোভগাস বলল,
- 'প্রায় উনিশ লক্ষ বছর ধরে এই ১২ ঘন্টা বাধ্যতামূলকভাবে এই গ্রহে শারীরবৃত্তীয় বিবর্তন ঘটেছে।আমরা উপযোগী হয়ে উঠেছি এই গ্রহে। এটা লক্ষ্য করবার মতো আমাদের যেমন দিনের বেলায় খিদে পায়। রাতে সে অনুভব খিদে করে না। অল্প বয়সে যারা আমাদের গ্রহের ঝটপট করে কিন্তু রাত্রে ১২ ঘণ্টা ঘুমিয়ে না খেয়ে কাটিয়ে দেয় কি করে এটা সম্ভব হয় একমাত্র মানবদেহে অপেক্ষাকৃত অল্প পরিমাণে যারা ঘুমোয় তারা বেশিদিন বাঁচে না।' গোয়েন্দা সুমন ঠিক ধরেছেন এই পয়েন্টটা বললেন,
- 'আমাদের মানব শরীরে ঘ্রেলিন হরমোন নিঃসরণঘটে। এটা তো আপনাদের জীবনের সঙ্গে মানবজীবনকে মিলিয়ে দিচ্ছে।' সাইকোভগাস বলল,
- 'অতএব নিশ্চিত হয়ে যান। আপনাদের পরমায়ু ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। তবে শর্ত হল সবুজ গ্রহ চাই। তাহলে এটা কিন্তু আপনাদের গ্রহের জীবের সঙ্গে আমাদের গ্রহের জীবের হরমোন একদম মিলে যাচ্ছে। সাইকোভগাস বলল,
- 'দীর্ঘকালীন হরমোন নিঃসৃত অপেক্ষাকৃত অল্প পরিমাণে যার জন্য দেহে ক্ষুদ্র উদ্যোগ সামান্য হয় অন্যদিকে ওই সময় ক্ষুদ্রতম নিঃসরিত হয় এই দুটি রাসায়নিক যৌগের সমানুতা নিয়ে বিব্রত হয় না মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে ঘুমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কেননা ঘুমের দৈর্ঘ্য যখন ৮ ঘন্টা থেকে কমিয়ে ৫ ঘন্টা না হয় তখন দেখা যায় ক্ষুদ্র ঋণের পরিমাণ শতকরা ১৫ ভাগ বেড়ে গেছে অন্যদিকে ক্ষুদ্র ঋণের পরিমাণ শতকরা ১৫ ভাগ কমে গেছে। সাইকোভগাস বলল,
- 'এই শরীর দীর্ঘ ঘুমের উপযুক্ত হয়ে বিবর্তিত হয়েছে বর্তমান জীবে কাজের পরিমাণ বাড়ায় ঘুমের পরিমাণ কমে গেছে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা ঘুম মনে হয় সর্বনিম্ন পরিমাণ এর থেকে কম হলে শরীর ও মনে নানা রকম বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় ভূমি মানুষের সঞ্জীবনী সুধা সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে কার্যকর শারিরীক ও মানুষিক বন্ধু শত দুঃখ ভরা রাত্রি যখন প্রয়াত হয় তখন রাতের ঘুম থাকে এক নতুন মানুষের পরিণত করে সকল আশা উদ্দীপনা নিয়ে নতুন করে জীবন সংগ্রামে। বন্ধু সুমন বললো,
- 'তাহলে এই ঘুমের পরিমাণ পৃথিবীর মানুষের বেড়ে গেলে তাদেরও পরমায়ু আপনাদের মত বেড়ে যাবে সাহস বললো নিশ্চয়ই বাড়বে এবং এটাই একমাত্র উপায় কিন্তু একটা শর্ত আছে শর্ত হলো সবুজ গ্রহ চাই সবুজ ছাড়া মানুষের মুক্তি নাই। তোতন বলল,
- 'তাহলে আমরা শিখলাম মানুষের বার্ধক্য ত্বরান্বিত হয় দীর্ঘকাল ধরে শরীরে কার্বোহাইড্রেট মেটাবলিজম সংক্রান্ত ব্যাহত হয় দেহ কোষের মধ্যে অক্সিডেশন বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ বাড়ে তার ফলে কোশপর্দার ডিএনএর ক্ষতি হয় বহু পরীক্ষার ফলে এটা আজ প্রমাণিত হয়েছে যারা ৬-৭ ঘন্টা ঘুমায় তারা ৪-৫ ঘন্টা ঘুমায় তাদের থেকে।' সাইকোভগাস বলল,
- 'আমি শুনে খুশি হলাম। সুমনের সাহায্যকারী তোতন যে এত জ্ঞানী মানুষ তা দেখে আমার ভালো লাগলো। আপনারা দীর্ঘজীবী হোন। সাইকোভগাস বলল,
- 'শুধু ক্যান্সার নয় সুদীর্ঘ একটানা নিদ্রা ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়া আলসার মানসিক অবসাদ কাটাতে সাহায্য করে রাত্রে সুনিদ্রা দেহের ইমিউন সিস্টেমকে সতেজ করে ক্ষতিপূরণের সাহায্য করে আমাদের অজান্তে আমাদের সমস্ত পাকস্থলীর লাইন মেরামত করে রক্তে সংক্রমণ প্রতিহত করা উপযোগী কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং মেলানিনের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে এই মেলাটোনিন দেহে ক্যান্সার রোগ প্রতিহত করবার সময় উপযোগী একটি এন্টি-অক্সিডেন্ট যেসব নারীরা কাজকর্ম করে তাদের ঘুমের সময় বারবার পরিবর্তন ঘটলে তাদের স্তনে ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা ৭০ গুণ বেড়ে যায়।' গোয়েন্দা সুমন বলল,
- 'আপনি মানুষ মানবদেহের শরীরে মানবদেহ সম্পর্কে এত কিছু জানলেন কি করে? সাইকোভগাস বলল,
- 'ওই যে বললাম আমরা সারা মহাবিশ্বের সমস্ত খোঁজখবর আমাদের রাখি আমরা যখন তখন কম্পিউটারে দশগুণ কাজ করতে পারি।' গোয়েন্দা সুমন এই ধরনের জীব দেখে অবাক ইউরেনাসে শেষে ঘুরতে পেয়ে অবাক। খুশিতে তারা ডগমগ। কি করে এবার ফিরে যাবে সেই নিয়ে তারা চিন্তায় আছে।
আমাদের খোঁজে সেই বৃদ্ধ ব্যক্তি খুঁজতে হয়তো বেরিয়ে পড়েছেন, সারা গ্রামের লোকদের নিয়ে। তখন সে বলল,
- 'আপনি চিন্তা করবেন না। কয়েক ঘন্টার মধ্যে আপনাদের পৃথিবীতে ফিরে নিয়ে আসব। সুমন বলল,
- 'মানুষের শরীর আর আপনাদের শরীরের মধ্যে পার্থক্যগুলো কি কি একটু বলুন।সাইকোভগাস বলল,
- 'মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। কিন্তু আমাদের গ্রহের জীবে কম করে ৫২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। এই মানুষের দেহে ২৩ জোড়া মধ্যে ২২ জোড়া ক্রোমোজোম বাকি একজোড়া কে বলা হয় সেক্স ক্রোমোজোম। কিন্তু আমাদের মধ্যে ক্রোমোজোমের সংখ্যা অনেক বেশি সংখ্যক থাকার ফলে উন্নত অতি উন্নত লক্ষণ প্রকাশিত হয়।সাইকোভগাস আবার বললো,
- 'প্রোটিন প্রয়োজনের নির্দেশ দেয় শরীরের ক্লান্তি। ধারণা ছিল মানুষের প্রায় ১ লক্ষ জিন আছে এখন জানা গেছে এই সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। আমাদের দেহে এর সংখ্যা ৩০ কোটির মত একটি ক্রোমোজোমে সারিবদ্ধভাবে মালার মত থাকে। যেহেতু আমাদের গ্রহের জীব, প্রাণী স্বাভাবিক অতিমানবিক শারীরিক-মানসিক বৈশিষ্ট্য বিশিষ্ট। এটা সহজেই অনুমেয় যে এই অতিমানবিক অবস্থার জন্য জিন দায়ী। এঅবস্থা ছাড়াও দৈহিক বিকৃতি অসম্পূর্ণতা অস্বাভাবিক গঠন মানসিক প্রতিবন্ধকতা জরায়ু ক্যান্সার ইত্যাদির জন্য দায়ী এই জীন বৈশিষ্ট্য। একে বিভিন্ন রকমভাবে ভাগ করা হয়েছে আপনারা জানেন একটি জিন হচ্ছে প্রবলভাবে প্রকাশিত আরেকটা হচ্ছে প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশিত।' তোতন বললো,
- 'তাহলে আপনাদের আমাদের এই শরীরের মতো শরীর নয় কেন? মনে হয় যেন আমাদের ছায়া। ছায়ার মতো শরীর অন্ধকারময় কেন? সাইকোভগাস বলল,
- 'এটা হয় তখন, আমরা বায়ুর থেকে প্রতিসরাঙ্ক কমিয়ে অদৃৃশ্য হতে পারি। বায়ুর প্রতিসরণাঙ্কের সমান করলে ছায়ার মত হতে পারি। অহেতুক আমরা প্রকাশিত হতে চাই না। আমরা আড়ালে থাকতে ভালবাসি। বায়ুর থেকে প্রতিসারাঙ্ক কমিয়ে নিয়ে আমরা ভ্যানিশ হয়ে যেতে পারি। অবাক করে অনেক সময় আমরা ভ্যানিশ হতে পারি। বিশ্ব বাংলার লোগোর মতো সবুজ গোল ফুটবলের মত গ্রহে যানে চেপে ভালই লাগছিল।' সুমন, তোতনের কথা হল ভালভাবে। এতদিন অবাক জগতে ছিল। আজ বাস্তব জগতে পদার্পণ করার আগে উত্তেজনা হচ্ছিল তাদের। তারা আস্তে আস্তে গল্প করছিল। তাদের ড্রাইভার ছিল ভেতরে। তারপর পৃথিবীতে নেমে তারা তোতন এবং সুমনকে বাইরে আসতে বলল। সুমনা তোতন বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল অনেক লোকের ভিড়। সবাই খোঁজাখুঁজি করছে টর্চ নিয়ে লাইট নিয়ে।
জঙ্গল আলোময় হয়ে উঠেছে। এখন রাত দুটো বাজে। তারা অন্য গ্রহে গেছিলো প্রায় ছয় ঘন্টা।সবুজ গোল যানের গতিবেগ আলোর গতিবেগের থেকেও বেশি -- সুমন বললেন। সবাই দেখলো তিনটে ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। দুজনকে তারা চিনতে পারল। কিন্তু একজন কে চিনতে পারল না। তখন গোয়েন্দা সুমন বললেন,
- 'ইনি হচ্ছেন আপনার দেখা সেই অন্য গ্রহের জীবের ছায়া, যিনি আমাদেরকে তাদের গ্রহে নিয়ে গেছিলেন। আমরা দেখে এলাম। পরে আপনাকে সমস্ত ঘটনা বলা যাবে। এখন ওনাকে আমরা বিদায় সম্ভাষণ জানাবো।' বৃদ্ধ ভদ্রলোকসহ সকলে অবাক বিস্ময়ে আকাশে দেখল তুবড়ির মত রোশনাই আর শুভেচ্ছার আশা ভরসা ছড়িয়ে তারা তাদের মহাকাশযানে চেপে বিদায় নিল, পৃথিবী থেকে।
গল্প
কসবা, কলকাতা


অভিজ্ঞান তার ছেলে ঋতুরাজকে ঘড়ি দেখা শেখাচ্ছে। ঋতুরাজ, ওরফে রিজ্-এর বয়স সাড়ে ছয়। কোনও জায়গায় তাকে এক মিনিটের বেশি বসিয়ে রাখাই একটা চ্যালেঞ্জ। যাই হোক, অনেক কষ্টে অভিজ্ঞান রিজ্কে ধরে এনে ঘরে বসিয়ে ঘরের দেওয়াল ঘড়ির দিকে দেখাল।
“এই ঘড়িতে কটা বাজে বল্ তো?”
রিজ্ সেদিকে তাকিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলল, “এটা বাজে ঘড়ি। মা বলেছে এটা স্লো।“
“সেটা বাদ থাক এখন। তুই আমাকে বল যে ঘড়িতে টাইম দেখে কিভাবে?”
রিজ্ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “তিনটে চল্লিশ।“
অভিজ্ঞান অবাক হয়ে বলল, “এটা আবার কে বলল তোকে?”
“কালকে সবিতামাসি ঘড়ি দেখে বলেছিল তিনটে চল্লিশ।“
“সে তো সেই সময়ে ঘড়িতে ওটা টাইম ছিল। কিন্তু এখন তো সেটা নয়। এখন অন্য টাইম। ঘড়িতে টাইম তো বদলে বদলে যায়।“
“বাজে টাইম। তুমি ঘড়িটাকে তিনটে চল্লিশ করে দাও। সবসময় শুধু তিনটে চল্লিশ বাজবে।“
অভিজ্ঞান বলল, “না বাবা। ঘড়ির টাইম সবসময় পাল্টে যায়। তার জন্য আমাদের ঘড়ি দেখা শিখতে হবে।“
রিজ্ আবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তিনটে একচল্লিশ?” অভিজ্ঞান মাথা নাড়ল। “তুই গেস্ করছিস। ওভাবে হয় না। আগে আমার কাছে শেখ্ কিভাবে ঘড়ি দেখবি, তারপর টাইম বলবি। এখন নয়।“
ছেলে ওর কোল থেকে নেমে বলল, “শিখব না!”
“কেন?”
“আমার কিচ্ছু শিখতে ভালো লাগে না। চলো খেলব।“
“ঠিক আছে, খেলব। কিন্তু পাঁচ মিনিট একটু ঘড়ি দেখে নিই আমরা?”
ছেলে সন্দেহভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে তারপর আবার কোলে এসে বসল।
অভিজ্ঞান শুরু করলেনঃ “এই দেখ্। ঘড়ির তিনটে কাঁটা থাকে। ঘণ্টা, মিনিট আর সেকেন্ড।“
“কাঁটা কী?”
“ওই যে ঘড়ির ওপর তিনটে তিন সাইজের রড। তার মধ্যে একটা ঘুরছে। আর অন্য দুটো থেমে আছে এখন, সেগুলো।“
“কাঁটা বলে কেন?”
“ওটা নাম। এমনি নাম।“
“ওই কাঁটা হাতে ফুটে যায়? যদি আমি ঘড়িতে হাত দিই, তাহলে হাতে কাঁটা ফুটে যাবে?”
“না না। এটা সেই কাঁটা নয়। এগুলো সময় দেখায়। ছোটটা হল ঘণ্টার কাঁটা, তার থেকে বড়, মোটাটা হল মিনিটের কাঁটা।“
“কালকে আমার গলায় মাছের কাঁটা ফুটেছিল।“
অভিজ্ঞান চমকে গেলেন। “কখন?”
“কালকে। আমি মাছ খাব না।“
“ঠিক আছে। কিন্তু গলায় কাঁটা? তুই খাচ্ছিস কি করে?”
“আবার চলে গেছে।“
“কখন?”
“জানি না।“
অভিজ্ঞান সেই কথা বাদ দিয়ে আবার ঘড়ির দিকে ফিরলেন। “এই যে কাঁটা, একে ইংরেজিতে বলে হ্যান্ড।“
“হ্যান্ড? মানে হাত?”
“হ্যাঁ। আওয়ার হ্যান্ড, মিনিট হ্যান্ড—”
“ঘড়ির হাত থাকে? ওই হাত দিয়ে ও দেওয়াল ধরে আছে?”
“এটা সেই হাত নয় বাবা।“
“তাহলে কী হাত? রাইট হ্যান্ড?”
“না না। মানুষের রাইট হ্যান্ড থাকে, লেফট হ্যান্ড থাকে। ঘড়ির সেসব থাকে না।“
“কেন থাকে না?”
“ঘড়ি তো মানুষ নয়।“
“ঘড়ি মানুষ নয়? তাহলে কথা বলে কি করে?”
অভিজ্ঞান চুপ করে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ছেলে সেই ফাঁকে অভিজ্ঞানের হাতের আইওয়াচটার স্ক্রীন একবার টিপে দিল। ঘড়ি যান্ত্রিক স্বরে
বলে উঠল, “টাইম নাও ইজ ফরটি পাস্ট সেভেন।“
“বাবা, এই ঘড়ি কথা বলছে কি করে? এটা মানুষ নয়?”
“না। এটা মানুষ নয়। এটা যন্ত্র।“
“ও”
“দেওয়াল ঘড়ির দিকে দেখ্ আবার। ফার্স্ট কাঁটা হল ঘণ্টা বা আওয়ার। এক থেকে বারো হয়। তারপর আবার এক, দুই, এভাবে হয়।“
“বারোর পর তেরো হয় না?”
“এই ঘড়িতে হয় না। সেটা ডিজিটাল ঘড়িতে হয়। এইসব অ্যানালগ ঘড়িতে এক থেকে বারো। আমায় বল যে এখন ঘণ্টার কাঁটা কতয় আছে?” ছেলে বেশ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “এইট?”
“না, ভালো করে দেখ্। সেভেন আর এইটের মাঝখানে।“
“তার মানে সাড়ে সাতটা বেজেছে?”“না। সেটা নয়। এরপর আমাদের দেখতে হবে মিনিটের কাঁটা কোথায়। এখন এটা আছে নয় লেখা ঘরে। তার মানে পয়তাল্লিশ। মানে, সময় হল সাতটা পয়তাল্লিশ।“
“বাবা!”
“কী?”
“ঘণ্টার কাঁটা সেভেন আর এইটের মাঝখানে? তাহলে আটটা পয়তাল্লিশ নয় কেন?”
“না না। ঘণ্টার কাঁটা এইট অবধি যায়নি। যাচ্ছে। আট লেখাটার ওপর পৌঁছে গেলে তখন আটটা বাজবে।“
“সেভেন থেকে এইট অবধি যেতে ওর কতক্ষণ লাগবে?”
“এক ঘণ্টা।“
“এক ঘণ্টা মানে কতক্ষণ?”
“আরে এক ঘণ্টা মানেই তো এক ঘণ্টা।“
“সব ঘড়ির ঘণ্টা এক?”
“হ্যাঁ। নইলে তো আমরা কেউ ঘড়ি দেখতেই পারব না। সব ঘড়ি একভাবে চলে।“
“কে বলে দেয় সেটা?”
“যারা তৈরি করে, তারা। যাকগে। এখন দেখ্, মিনিটের কাঁটা এবার নয় পেরিয়ে দশের কাছে গেল। এরপর এগারো, তারপর বারো। আগেরদিন তোকে বলেছি। মিনিটের কাঁটা বারোর ওপর গেলে কী হবে?”
“সাতটা বারো?”
“না। মিনিটের কাঁটা এক থেকে ষাট অবধি যায়।“
“তাহলে সাতটা ষাট?”
“হ্যাঁ। কিন্তু সেটা আমরা বলিনা। আমরা কী বলি?”
“সাতটা?”
“না!” অভিজ্ঞান এবার রেগে গেলেন। “ষাট মিনিটে এক ঘণ্টা হয়ে যায়। তাহলে সাতটা ষাট মানে কী? ঘণ্টার কাঁটা কোথায় এখন?”
“তাহলে আটটা ষাট?”
“ষাট নয়। শুধু আটটা।“ ছেলে আবার কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল। তার আগেই অভিজ্ঞান বললেন, “শেষ আর একটু আছে। থার্ড কাঁটা হল সেকেন্ডের কাঁটা।“
“সেকেন্ড না থার্ড?”
অভিজ্ঞান এই কথাটা বলেই বুঝেছেন যে মস্ত ভুল হয়ে গেছে। “না না। তিন নম্বর কাঁটা হল সেকেন্ড।“
“তুমি যে বললে সেকেন্ড কাঁটাটা মিনিট?”
অভিজ্ঞান এবার চীৎকার করে উঠলেন, “আরে এই সেকেন্ড আর ঘড়ির সেকেন্ড এক নয়। ঘড়ির সেকেন্ড হল সময়। আর তুই যে সেকেন্ড বলছিস, সেটা হল এক দুই তিন---সেই সেকেন্ড।“
ছেলে ওর দিকে তাকিয়ে বসে রইল। তারপর পাশ থেকে বাবার ফোনটা তুলে আনলক্ করে জিজ্ঞাসা করল, “ওকে গুগল, এখন টাইম কত?”
ফোন থেকে দিব্যি শোনা গেল, “এখন সময় হল আটটা বেজে চার মিনিট!!!”
ছেলে বলল, “বাবা, গুগল তো আছেই। তাহলে আর ঘড়ি দেখা শিখব কেন?”
অভিজ্ঞান বললেন, “যদি গুগল না থাকে?”
ছেলে একটু ভেবে বলল, “গুগল যেখানে নেই, আমিও সেখানে থাকব না।“
গল্প

কাফন
বানু মুস্তাক
কন্নড় থেকে ইংরেজি: দীপা ভাস্তি
ইংরেজি থেকে বাংলা: গৌতম চক্রবর্তী
"উদ্ভটতম স্বপ্নেও সে ভাবেনি যে মরার পরেও বুয়া তাকে দেখা দেবে।"
কোন কোন দিন সকালের নামাজ পড়তে ওঠা সাজিয়ার পক্ষে অসম্ভব হত। এইজন্য ও উচ্চ রক্তচাপের অজুহাত দিত। বারবার বলত যে হতচ্ছাড়া ট্যাবলেটগুলোর জন্য ওর মনে কোন শান্তি নেই। সাজিয়ার মা বলতেন,
- "এই সব হল শয়তানের খেলা। খুব সকালে এসে পা টিপে দেয়, গায়ে জড়িয়ে দেয় কম্বল। তারপর পিঠে চাপড় দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় যাতে তুই নামাজ পড়তে না পারিস। লাথি মেরে তাড়াতে হবে ওকে আর প্রার্থনার জন্য ঠিক সময়ে উঠে পড়ার অভ্যাস করতে হবে।"
ব্যক্তিগত ভৃত্যের মত শয়তানের এই পা টিপে দেওয়ার গল্প সাজিয়ার কাছে বেশ রোমান্টিক লাগত। এই জন্য সে বারবার পা ছুঁড়ে লাথি মারার ভান করে বেশ মজা পেত। তবে বদলাল না সাজিয়ার দেরি করে ওঠার অভ্যাস আর এই উপলক্ষে শয়তানকে দোষারোপ।
সেদিন সাজিয়া ভোর হয়ে যাওয়ার বেশ পরেও গভীর ঘুমে মগ্ন ছিল। হঠাৎ করে জেগে উঠে নিজের দিকে দেখল। কর্তার দিকে হাতটা ছড়িয়ে দিয়ে তাকে ছুঁয়েও ঠিক বুঝতে পারল না ঠিক কোথায় সে আছে। চেনা বালিশে মাথা আর গায়ে জড়ানো বিদেশি কম্বল দেখে বুঝতে পারল যে নিজের বাড়িতে নিজের ঘরেই ও এখন আছে। পরিচিত পরিবেশে জেগে উঠে ও যুগপৎ সুখ ও তৃপ্তি বোধ করল।
কিন্তু এই তৃপ্তি বেশিক্ষণ থাকল না। শুনতে পেল কে যেন বাইরে ডাকাডাকি করছে। ধীরেসুস্থে উঠে দরজার কাছে গিয়ে ছেলে ফারমানের গলা শুনতে পেল। তাড়াতাড়ি বারান্দায় বেরিয়ে এসে দেখল যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আলতাফ দাঁড়িয়ে আছে। আর ফারমান ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছে,
- "যা ঘটার তা ঘটেছে। এই সব কারও হাতে নেই। দুশ্চিন্তা করো না, বাড়ি যাও। আম্মি উঠলে আমি সব তোমার বাড়িতে দিয়ে আসব। আম্মি এখন ঘুমোচ্ছে, জাগাব না, শরীরটা ভালো নেই মোটে। ডাক্তার যত বেশি সম্ভব বিশ্রাম নিতে বলেছেন।"
"কিন্তু ভাই, জামাত বলেছে যে রাত পাঁচটায় কবর দিতে হবে। আমরা আর কারওর জন্য অপেক্ষা করছি না। তাই গোসল ও অন্যান্য আচার তাড়াতাড়ি সেরে নিতে হবে।"
ফারমান মেজাজ হারিয়ে বলল, "দেখ, তুমি আমার হেফাজতে কোনও কাফন রাখনি। আম্মি হজ থেকে ফিরেছে ছ'সাত বছর হল। ইয়াসিন বুয়া ওর কাফন কেন মার কাছ থেকে নিয়ে আগে রেখে দেয়নি? আবার এও হতে পারে নিয়ে হয়তো কোথাও রেখে দিয়েছে। ঘরে আর একবার খুঁজে দেখে বলো।"
সাজিয়া ফারমানের পিছনে এসে দাঁড়িয়ে মনে মনে বেশ ধাক্কা খেল। বলল,
- "হচ্ছেটা কী এখানে? কার সঙ্গে কথা বলছ বেটা।" ফারমান ঘুরে তাকাল,মুখে প্রবল অসহিষ্ণুতার চিহ্ন। মনে মনে ভাবল, "এই সব মহিলারা কিছুতেই নিজের খাওয়াদাওয়া, পোষাক-আষাক বা ব্যক্তিগত কাজকর্ম নিয়ে শান্ত থাকতে পারে না। একাধিক বিষয়ে নাক না গলাতে পারলে খাওয়া যেন হজম হয় না।" কিন্তু মুখে সেই অপছন্দের ভাব প্রকাশ না করে ফারমান বলল,
- "মা, যাও ঘুমিয়ে পড়। কেন উঠে এসেছ এখানে? আলতাফ এসেছে। বলছে, ইয়াসিন বুয়ার ছেলে। কাফন চাইছে।"
সাজিয়ার মনে হল মাথায় যেন হাজারো বজ্রাঘাত হচ্ছে। সে দৌড়ে এসে আলতাফের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। রাগতভাবে বলল,
- "সাতসকালে কী সব হট্টগোল লাগিয়েছ? কাফনটা গেল কোথায়? কার বাড়ি কখন যাওয়া যায় সে বিষয়ে কোন বোধ হয়নি এখনও।" সাজিয়া বেশ বুঝতে পারছিল যে ফারমানের এসব মোটেই পছন্দ হয়নি। আলতাফ সাজিয়ার দিকে দুখী দুখী মুখে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
- "চিকাম্মা, আম্মি আজ সকালের নামাজের সময় মারা গেছে। তাই আমি একটা কাফনের খোঁজে এসেছি।" খবরটা শুনে সাজিয়া ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ল। নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে ধপ করে কাছের একটা চেয়ারে বসে পড়ল। এযে এক অকল্পনীয়, অসম্ভব ঘটনা। কী করে মুখোমুখি হবে? কী করে সামাল দেবে? কোন চিন্তাই আর সাজিয়ার নিয়ন্ত্রণে রইল না। ভিতরে ভিতরে ছাড়খার হয়ে পরিতাপ করতে লাগল," ভগবান, শেষমেশ এই কী ঘটার ছিল!"
সাজিয়া না চাইলেও ওর মন অতীতচারী হল। সেদিন বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান ছিল। এই উপলক্ষে পরিবারের লোকজন ও বন্ধুবান্ধব অনেকে জড়ো হয়েছিল। সাজিয়া আর ওর স্বামী সুভান হজ করতে যাবে। এর মধ্যে ওরা অনেক নিকটাত্মীয় ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে ফেলেছে। প্রত্যেককে আলিঙ্গন করে বলেছে যে ভুল কিছু বলে থাকলে, কাউকে আঘাত দিয়ে থাকলে, কোন প্রিয়জনের অভিযোগ থাকলে বা ওদের বিষয়ে অসত্য কথা কিছু বলে থাকলে ওরা দু'জনেই ক্ষমাপ্রার্থী। আত্মীয়েরা ওদের জন্য ভোজ দিয়েছে, যথাসাধ্য পোষাক বা অন্যান্য উপহার দিয়েছে, আর ওদের দু'জনকে অনুরোধ করেছে দোষত্রুটি কিছু করে থাকলে ক্ষমা করে দিতে। পারস্পরিক ভুল-ত্রুটি ক্ষমাধন্য হয়েছে এবং আচরণবিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছে এই সন্তুষ্টি নিয়ে নিকটাত্মীয় ও বন্ধুরা হালকা মনে ওদের বিদায় জানায়।
হজে যাওয়ার এক সপ্তাহ আগেও অনেকের সঙ্গে দেখা করা বাকি। স্বামী-স্ত্রী দু'জনে মিলে দূরের আত্মীয়স্বজনকে বাড়িতে ডেকে নেয়। ওদের তরফে ভুলত্রুটি কিছু হয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিতে বলে। সুভানের বড়সড় ব্যবসা, সাজিয়া বিরাট বাংলোর মালকিন। যাওয়ার আগে সবার সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করার ফুরসত ছিল না বলে ওঁরা সবাইকে একসঙ্গে কাছে পাওয়ার জন্য ভোজের ব্যবস্থা করেছিল। পারস্পরিক ক্ষমা প্রার্থনার আচারবিধি সেখানেও বলবৎ ছিল।
অনাহুত অথচ বিনম্র, অনসূয়া যে মানুষটি সেই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তিনি ইয়াসিন বুয়া। তিন বছরের ব্যবধানে বুয়াকে দুই সন্তানের জননী করে স্বামী কোন পিছুটান না রেখে প্রয়াত হন। কৃষি পণ্য বিপণন সমিতির প্রাঙ্গণে তিনি মাল বোঝাইয়ের কাজ করতেন। একদিন মাল বোঝাই করার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ইদ্দত বা অপেক্ষাপর্ব পালন করেননি। তখন বুয়ার ভরা যৌবন। মাথায় একটা রুমাল জড়িয়ে বেশ কিছু বাড়িতে সামনের উঠোনে বসে বাসন মাজতেন। এছাড়া ঘর ঝাঁট দিতেন, মেঝে মুছতেন। বিয়ে বাড়ি, উৎসব, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান, জন্মদিন সব আনন্দের থেকে মানসিকভাবে দূরে। অথচ শিশু সন্তানদের খোরাক যোগাতে এই সব অনুষ্ঠানের আনন্দ-স্ফুর্তির ভার বহনে অক্লান্ত। ইদ্দত পর্বে তিনি মাথা ঢাকা দিয়ে ঘরে বসে থাকেননি, প্রয়াত স্বামীর জন্য প্রার্থনা বা বাধ্যতামূলক শোকপর্ব পালন করেননি। অনেক জিভ নড়েচড়ে উঠেছে, অনেকে কাদা ছুঁড়েছে। কিন্তু সন্তানদের মঙ্গল কামনা ও ক্ষুধা নিরসন ইয়াসিন বুয়ার কাছে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বুয়ার কঠিন পরিশ্রমে ছেলেমেয়ের জীবন গড়ে উঠেছে। একটু লেখাপড়া শিখে মেয়েটা অন্য মেয়েদের কোরান শিখিয়ে সামান্য অর্থ উপার্জন করছে। এই অর্থের সঙ্গে বুয়া নিজের উপার্জিত টাকা জমিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখন বুয়া অটোচালক ছেলের সঙ্গে থাকেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়গুলো যখন ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে, হাতের শিরাগুলো ফুলে ওঠে, বুয়া অন্যত্র কাজ বন্ধ রাখেন।
বুয়ার বড় ইচ্ছে ছেলের বিয়ে দেবেন। কিন্তু তার থেকেও বড় ইচ্ছে বুয়ার দেহমনকে এখন পেয়ে বসেছে। সারাদিন ধরে তিনি সেই ইচ্ছের শিখার পাশে ঘুড়ির মত উড়ছেন। বুয়া সঞ্চয়ী, কৃপণ বলে নয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের উদ্বেগে। ছেলের বিয়ের জন্য রাখা সঞ্চয় থেকে কাফন কেনার টাকা নিতে গিয়ে বুয়ার মনে হয় তিনি যেন অন্য কারওর টাকা চুরি করছেন। এই বিরাট অপরাধের বোঝা ঝেড়ে ফেলতে না পেরে তিনি অস্থির হয়ে ওঠেন, তিনদিন ধরে আঁচলের খুঁটে বেঁধে রাখেন এই টাকা। কিন্তু এই জননীসুলভ প্রবৃত্তিও একসময় ব্যক্তিগত স্বপ্নের কাছে হার মানে। এক অদ্ভুত জেদ বুয়ার উৎসাহকে বাড়িয়ে দেয়। খুঁটে কষে টাকা বেঁধে দ্রুত সাজিয়ার বাড়ির দিকে পা চালান তিনি। সেখানে কত লোক, কত উদযাপন, কত রকম আনন্দ...
না, কেউ বুয়াকে আসতে বলেনি। স্বাগত জানিয়ে "ও তুমি এসেছ" তেমন বলার মত কেউ সেখানে ছিল না। আতিথেয়তা দেখিয়ে "এসো, খেতে এসো" তেমনও কেউ বলতে আসেনি। সম্মান কী, সমাদর কী জীবনে সেই অভিজ্ঞতা বুয়ার হয়নি। অশ্রদ্ধা কী তাও তো অজানা। কেউ না বললেও তিনি সামর্থ্য অনুযায়ী কাজে লেগে পড়লেন। পোর্সেলিনের থালা ধুতে ধুতে হাত ভারি হয়ে এল বুয়ার। বিরিয়ানির তেলতেলে ভাব হাত থেকে সহজে যাওয়ার নয়, গেলও না। সবার খাওয়া শেষ হলে তিনি সামনের সিমেন্ট বাঁধানো উঠোনে বসে কিছু মুখে দিলেন। বুয়ার সমস্ত মনোযোগ এখন সাজিয়ার দিকে। মনে মনে বললেন,"ভাগ্যবতী, পয়মন্তী।" ভাবলেন সাজিয়াকে কখন ফাঁকা পাওয়া যাবে, বলা যাবে মনের কথা। একমনে তিনি সাজিয়া কী করছে তা দেখতে থাকলেন। সাজিয়া কখন একটু অবসর পাবে? অসংখ্য আত্মীয় ও বন্ধুদের কাছ থেকে শুভ কামনা ও উপহার পেতে পেতে সে ক্লান্ত। জড়িয়ে ধরে শুভ কামনা জানানোর সময় কেউ কেউ ব্যক্তিগত সমস্যার কথা দিয়ে শেষ করছে আর হজে গিয়ে ওদের জন্য প্রার্থনা করার কথা বলছে। একজন বলল,
- "সাজিয়া আপা, আমার ছোট মেয়ের জন্য ভালো বর পাচ্ছি না। ওর জন্য একটু প্রার্থনা করো।" আরেকজন বলল,
- "আমার শালীর ক্যান্সার। প্রার্থনা কোরো সে যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে।" কেউ বলল,
- "আমার ছেলেটা চাকরি পাচ্ছে না। বেশ কষ্টে আছে। প্রার্থনা কোরো যেন ওর একটা চাকরি হয়। চাহিদার তালিকা ক্রমশ বাড়তেই থাকে। সাজিয়া হেসে উত্তর দেয়,
- "ইনশাল্লাহ, আমি সবার জন্য প্রার্থনা করব।" ক্লান্তি সত্ত্বেও সে তা প্রকাশ না করে সবাইকে হাসিমুখে বিদায় দিল। যদিও এই ভোজ ছিল দুপুরে, সন্ধেবেলাও অনেকে আসতে থাকল। ইয়াসিন বুয়া সমানে বাসন মাজা, খাওয়ার থালা পরিষ্কার, ঝাঁট দেওয়া চালিয়ে গেলেন এই আশায় কখন তাঁর পালা আসবে। রাত তখন প্রায় এগারটা। ক্লান্ত সাজিয়া সোফায় বসে নরম কার্পেটে পা দু'টো ছড়িয়ে দেয়। চোখে পড়ে শোওয়ার ঘরের দরজার কাছে ইয়াসিন বুয়ার ছায়া। ধৈর্যচ্যুত বুয়া বলে ওঠেন,"ওরে আর পারি না। বড় ক্লান্ত।" সাজিয়ার অবস্থা দেখেও বুয়ার বড় মন খারাপ। আঁচলে হাতদুটো মুছে তিনি গুটিগুটি পায়ে সাজিয়ার দিকে এগিয়ে এলেন। ভাবখানা এমন যে ওঁর নোংরা ফুটিফাটা পায়ের দাগ যেন দামি কার্পেটে না লাগে। সাজিয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রশ্ন করে,
- "কখন এলে, বুয়া? সাজিয়ার সঙ্গে দেখা করতে পেরে বুয়া খুব খুশি। বলল,
- "অনেকক্ষণ।" সাজিয়া বলে,
- " তাই নাকি? আমি কিন্তু সারা সন্ধে তোমায় খুব একটা দেখিনি।" তারপর আরও একটু সুর নরম করে বলে,
- "খেয়েছ তো বুয়া?" কৃতজ্ঞচিত্তে ইয়াসিন বুয়া বলে,
- "হ্যাঁ, তাঈ। তোমার বাড়ির অন্নে আমার জীবনটা এখনও টিকে আছে। তোমার ছোঁয়ায় সবকিছু সোনা হোক। তোমার গৃহ সমৃদ্ধ হোক।" সাজিয়া বলে,
- "খুব দেরি করে ফেলেছ বুয়া। কী করে বাড়ি ফিরবে তুমি?" ঘোরতর মেয়েলি এই উদ্বেগে বুয়া উত্তর দিল,
- "আলতাফ এসে ওর অটোয় করে আমাকে নিয়ে যাবে। ও এলেই আমি বেরিয়ে যাব।" সাজিয়া নজর করেছে যে বুয়া সারাদিন এই বাড়িতে কোন না কোন কাজে ব্যস্ত ছিল। সাজিয়া ক্লান্ত শরীরটাকে টানতে টানতে ঘরে গিয়ে কিছু টাকাপয়সা নিয়ে এল। বলল,
- "এই নাও বুয়া, সামান্য হাতখরচ। তিন দিন বাদে আমরা হজে যাচ্ছি। ৪৫ দিন পর ফিরব। আল্লাহ যেন আমাদের হজ কবুল করেন। আমাদের জন্য প্রার্থনা কোরো।" বুয়ার মুঠোয় টাকা ভরে সাজিয়া দুই হাতে চেপে ধরে। অভিভূত বুয়ার দু'চোখ জলে ভরে ওঠে। তাঁর মত একজন হেঁজিপেঁজি মানুষের জন্যও এত দয়া, এত সখ্য। কিন্ত সাজিয়ার থেকে বুয়া কোন টাকাপয়সা নিলেন না। বদলে আঁচলের খুঁটের গিঁট খুলে তিনি কিছু ভাঁজ করা টাকা বার করে বললেন," মা রে, এখানে ৬০০০ টাকা আছে। তুমি তো হজে যাচ্ছ। আমার জন্য পবিত্র জমজমের জলে ধোয়া একটা কাফন এন। এই পবিত্র কাফনে করে আমি অন্তত স্বর্গে যেতে পারব।"মুহূর্তের জন্য সাজিয়া কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না। একাজটা তেমন দুরূহ বলে তখন তাঁর মনে হল না।
- "হে ভগবান, সামান্য একটা কাফন মাত্র। একটু বেশি টাকা লাগলেও আমি নিয়ে আসতে পারব," সাজিয়া ভাবল। স্বতঃস্ফূর্ত সেই পরিস্থিতির নিরিখে আর কোন কথা না বাড়িয়ে সে রাজি হয়ে গেল।
বুয়ার হাত থেকে টাকা নেওয়ার সময় সাজিয়া বুঝতে পারল গরীব মানুষ আর ওদের পকেটের টাকা অনেকটা একই রকম—ছেঁড়া, ফাটা, কোঁচকানো, ভাঁজ-পড়া, অন্তরে ও বহিরঙ্গে খাটো। এক এক সময়ে সাজিয়ার মনে হয়েছে যে গরীব মানুষকে যতই মুচমুচে নোট দাও না কেন, একসময়ে তা অদ্ভুত ও কুৎসিত রূপ নেবে। এখন সে এবিষয়ে নিশ্চিত হল। বুয়াকে বলল,
- "ঠিক আছে, এখন যাও, ফিরলে ফের এস।" বুয়াকে বাড়ি পাঠিয়ে সাজিয়া লাগোয়া গোসলঘরে ঢুকে বেসিনের ওপর টাকাগুলো রাখল। তারপর জীবাণুরোধী সাবানে ভাল করে হাত ধুয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
সাজিয়ার মনে পড়ল না ইয়াসিন বুয়ার দেওয়া টাকা ও বেসিন থেকে তুলেছে কিনা। হজ কমিটির ব্যবস্থাপনায় ওরা সকালের উড়ানে রওনা দিয়ে মদিনা পৌঁছল। নতুন পরিবেশ, ধর্মীয় স্থানে ভ্রমণ, এবং আট দিনের অবস্থানে আবশ্যিক চল্লিশ বার নামাজ এসবের মধ্যে দিয়ে কী করে যেন সময় ফুরিয়ে এল। সুভান ওকে কেনাকাটা করতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু সাজিয়া কি আর বিধিনিষেধ মেনে চলার লোক? ওর মতে আইন তৈরি হয়েছে ভাঙার জন্য। তাই ও দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে নিজের মতে চলল। পরিস্থিতির কোন বদল হল না।
সুভান নিয়তের প্রসঙ্গ তুলল। হজে যাওয়ার আগে ওরা তীর্থযাত্রা ও প্রার্থনার অভিপ্রায় স্থির করে রেখেছিল। সুভান সাজিয়াকে বলেছিল যে হজের পর ও কেনাকাটা করতে পারে। ওকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিল যে আগে থাকতে কিছু কেনাকাটা করলে নিয়তের উদ্দেশ্যে ব্যর্থ হবে। মদিনা ছেড়ে মক্কা যাওয়ার সময় ওর আরেক নতুন অভিজ্ঞতা হল। এই সব কাজকর্মের মাঝে ও গ্রাম আর বাড়ির কথা ভুলতে বসেছিল। মক্কায় কয়েকদিন ভোলার মত নয়। ভারতের হজ কমিটি বেশ কয়েকটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল। কিস্তিতে কে কত ভাড়া দিয়েছে তার ভিত্তিতে তীর্থযাত্রীদের ঘর বরাদ্দ করা হল। দু'টো ঘরের জন্য একটা গোসলঘর, একটা ছোট রান্নাঘর, স্টোভসহ একটা গ্যাস সিলিন্ডার, একটা ফ্রিজ, একটা কাপড়কাচার মেশিন এবং আবাসিকদের জন্য আনুষঙ্গিক অন্যান্য কিছু সুবিধা। সাজিয়ার মাতৃকুলের চারজন একসঙ্গে গেছিল বলে তাদের জন্য একটা বড় ঘর বরাদ্দ করা হয়েছিল। যথারীতি রান্নার দায়িত্ব ছিল মেয়েদের হাতে। ওদের বেশিরভাগ সময় কেটে গেল নামাজ পড়ে, কাবা প্রদক্ষিণ করে, প্রার্থনা আর অন্যান্য ধর্মীয় কাজেকর্মে। হীরা গুহা (যেখানে নবী প্রথম দৈববাণী শুনতে পেয়েছিলেন) ছাড়া অন্যান্য মসজিদ ভ্রমণ এবং নির্ধারিত সময়ে নামাজ পড়ার কাজে সবাই ব্যস্ত থাকলেন। সৌদি সরকার, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও অন্যান্য দাতারা বড় বড় ট্রাকে করে খাবারের প্যাকেট, জুস ও জলের বোতল এনে নামাজের পর তীর্থযাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করলেন। হজযাত্রীরা আল্লাহর অতিথি বলে ওদের আপ্যায়ন করলে আল্লাহ খুশি হবেন এই ছিল সকলের বিশ্বাস। তাই আতিথ্যই জীবনের মূল লক্ষ্য এই আচরণ সকলের মধ্যে দেখা গেল।
সাজিয়া আর ওর লোকজন হজের বাকি আচার-অনুষ্ঠান শেষ করার কাজে ব্যস্ত ছিল। একদিন সকালে নামাজের পর কাবা প্রদক্ষিণ করে ও ফিরে এল। ইচ্ছে না থাকলেও সম্ভবত চড়া রোদে বাড়ি ফেরা আর দুপুরের খাওয়া পেটে পড়ার পর ক্লান্তিতে ওর চোখ বুজে এল। ছোট্ট ঘুম দিয়ে জেগে ওঠার পর সাজিয়া তরতাজা বোধ করল। এইবার অসর নামাজের জন্য আল-হারাম মসজিদে যাওয়ার পালা। ওজু করতে গিয়ে কিছু একটা দেখে ও থমকে গেল। পাশের ঘরের জয়নাব ওদের খাবার জলের জার থেকে ১০ লিটারের একটা বালতিতে জল ঢালছে। বিস্ময়ে সাজিয়া জিজ্ঞাসা করল," করছটা কী, জয়নাব?"
সাজিয়ার দিকে তাকিয়ে জয়নাব বলল, "কাফনটা ধুতে হবে?"
- "কী বললে?" সাজিয়া রাগে ফেটে পড়ল।
- "পানীয় জল চুরি করছ তুমি। ঠিক এটা?" হজ করতে এসেও এরকম খেলো আচরণ! সাজিয়ার চিৎকার শুনে জয়নাব বালতি নিয়ে ঘরে ঢুকে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল। হজের সময় পানীয় জল সরবরাহের দায়িত্ব সৌদি সরকারের। জল সরবরাহ করার সব কোম্পানি, প্লাস্টিকের ডাব্বায় করে এই জল আনে না। ওরা কাবা চত্বরের ভিতরে পাতকুয়ো থেকে পবিত্র জমজমের জল ট্যাঙ্কে ভরে নিয়ে আসে। তারপর দুটো ঘরের ব্যবহারের জন্য রাখা জলের পাত্রে ভরে দেয়। তা প্রায় ১০-১৫ লিটার জল। বিকেল তিনটে নাগাদ ওরা আসে। সাজিয়া কদাচিৎ এই পানীয় জল সংগ্রহ করার সুযোগ পায়। বেশিরভাগ দিন সুভান নামাজ সেরে বাড়ি ফেরার সময় ৫ লিটারের জার নিয়ে আসে।
খুব রেগে গেল সাজিয়া। জয়নাবের মিনমিনে জবাব ওর শরীরে যেন আগুন জ্বালিয়ে দিল। এই অবধি চুরি করা জলে জয়নাব কতগুলো কাফন ধুয়েছে? পরিবারের সবাইকে কী ও জমজমের জলে ধোয়া কাফনে শোয়াতে চায়? সাজিয়া যখন এইসব ভাবছিল ওর গলার আওয়াজে সুভান দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। এসে দেখল সাজিয়া হাসিতে ফেটে পড়েছে। একটু আগেই সাজিয়া চিৎকার করছিল কিনা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল,
- "হয়েছেটা কী, সাজিয়া? এত হাসছ কেন?" হাসতে হাসতে ও বলল,
- "দেখ দেখি, এই সব লোক মোটেই হজের গুরুত্ব বোঝে না। এখানে এসে এত সামান্য কারণেও লোক ঠকায়।" সামান্য হেসে ও বলল,
- "আজ জানলে বুঝি? আমি যেদিন এখানে এসেছি বুঝে গেছি। কিন্তু আমি না রাগ করেছি, না তোমার মত ঝগড়া। এই কারণেই রোজ আমাদের জন্য জল কিনে নিয়ে এসেছি। ছেড়ে দাও। এতো কোন ঝগড়াঝাটির বিষয় নয়।"
সাজিয়ার হঠাৎ মনে পড়ল ইয়াসিন বুয়ার কাফনের কথা।
- “হ্যাঁ গো, বুয়ার জন্য আমাদের একটা কাফন কিনতে হবে। সন্ধেবেলা নামাজ পড়ে ফেরার সময় কিনব,” সাজিয়া বলল। প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়ায় সাজিয়া আর একদম দেরি করতে চাইল না। সুভান মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল আর চটপট তৈরি হয়ে নিল, দেরি হয়ে গেছে বেশ। ওরা যেরকম ভেবেছিল সেরকম ব্যস্ততা এখন আল-হারাম মসজিদে। নিয়মমত নারী-পুরুষের আলাদা-আলাদা জমায়েত। মসজিদের স্তম্ভগুলোর মাঝখানে ওরা করজোড়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। সাজিয়া আর সুভানের যেতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাই মসজিদের বিস্তৃত আঙিনায় ওরা পাশাপাশি দাঁড়াল। কিছুক্ষণ বাদেই দেরিতে আসা লোকজনে আঙিনা ভরে গেল। রোদ্দুর ছিল বেশ। বড় বড় ছাতা আপনাআপনি খুলে গিয়ে ছায়া দিল। আবার পড়ন্ত সূর্যে সব ছাতা বন্ধ হয়ে যেতে স্তম্ভের মত লাগল। সাজিয়ার চোখে সে এক বড় আকর্ষণীয় দৃশ্য।
ঈশার নামাজের পর এইবার ওদের কাবা চত্বর থেকে ফেরার পালা। মূল সড়ক ও অলিগলি দিয়ে লাখে লাখে লোক ফিরছে। সুভান বুঝতে পারল না যে এই ভিড়ে কোন দোকানে ও কাফনের খোঁজ করবে। সাজিয়াকে তো কিনে দিতে হবে একটা ইয়াসিন বুয়ার জন্য। সুভান স্ত্রীর হাত শক্ত করে চেপে ধরে চলতে লাগল। এই ভিড়ে যদি সাজিয়া হারিয়ে যায় কী করে ও খুঁজে পাবে! অভ্যাসমত সাজিয়ার হাত ধরে বা কোমর জড়িয়ে ধরে ওরা এগিয়ে চলল। কোন সঙ্কোচ বা দ্বিধার বালাই ছিল না। সাজিয়ার অলস গতির সঙ্গে তাল মেলাতে সুভানকে আস্তে চলতে হল। চলতে চলতে সুভান প্রত্যেক দোকানে দাঁড়িয়ে খোঁজ নিল সেখানে কাফন পাওয়া যায় কিনা। সেই খোঁজ করতে করতে একটা গালিচার দোকান সাজিয়ার সব মনোযোগ কেড়ে নিল। সেই সব গালিচা দেখে সাজিয়ার এমন অবস্থা যে মনে হল ও দোকানেই থেকে যাবে। কী সুন্দর, নক্সাদার, বর্ণময় বুনন এই সব গালিচার! সুভানের সম্মতি না নিয়ে ও একটা গালিচার দরদাম শুরু করে দিল। ফালতু কেনাকাটা থেকে সাজিয়াকে বিরত করার জন্য সুভানের পরিকল্পনা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নিয়তের উদ্দেশ্যে ব্যর্থ হবে বা সাজিয়ার অভিপ্রায় সন্দেহের আতসকাচে দেখা হবে এইসব আবেগের কথা বাতাসে কোথায় যেন ভেসে গেল। হজের আচারবিধি সম্পন্ন হওয়ার পর খুশিমত কেনাকাটা করার কথাও সাজিয়ার মনে কোন আলোড়ন তুলল না। সুভান যথাসাধ্য চেষ্টা করেও ওকে দোকানের বাইরে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হল।
সব কিছু ভুলে, সবাইকে ভুলে সাজিয়া ওর পছন্দের তুর্কি গালিচায় নিজেকে হারিয়ে ফেলল। ব্যর্থ সুভান ফিসফিস করে দোকানের বিক্রয় সহকারীকে জিজ্ঞাসা করল,
- ”এখানে কি কাফন পাওয়া যায়?” সহকারী তৎক্ষণাৎ একটি কাফন বার করে দেখাল, প্লাস্টিকে জড়ানো, মৃতদেহের মত ভারি। সুভান সাজিয়ার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করল। গালিচায় চেপে বসে ও বাঁহাতে কাফনটাকে তোলার চেষ্টা করল। বলল,
- “আয়াপ্পা! কী ভারি এই কাফন! কীভাবে এটা নিয়ে আমরা বাড়ি ফিরব!” মুহূর্তে বাতিল হয়ে গেল ওর কফিন কেনার ভাবনা। গালিচার দিকে চলে গেল সমস্ত মনোযোগ।
শেষপর্যন্ত কেনাকাটা শেষ হল। সুভান পকেট থেকে টাকা বার করে দিল। তারপর দোকানদারের বেঁধে দেওয়া গালিচা কাঁধে ফেলে হাঁটা লাগাল। রাস্তায় তখন অটো বা কুলি পাওয়ার কথা নয়। তাই সুভানকেই ঘাড়ে করে টেনে নিয়ে যেতে হল। ওকে কারওর চোখে পড়বে না ভাবলেও পথে চেনা কয়েক জনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। মাঝপথে সাজিয়ার খারাপ লাগল। ও সুভানকে নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল,
- ” হ্যাঁ গো, খুব ভারি?” কোন উত্তর এল না। খুব রাগ হয়েছিল সুভানের। ইচ্ছে করছিল সাজিয়াকে মেরে বেহুঁশ করে দেয়। কিন্তু খুব শান্তভাবে ও গালিচা ঘরের এক কোণে নামিয়ে রাখল। তারপর একটা গভীর শ্বাস ছাড়ল। অন্য কোন পরিস্থিতিতে সে সাজিয়ার দিকে রুষ্ট হয়ে তাকাত বা ওকে বকাবকি করত। কিন্তু এখন হজ, ঘরে অনেক আত্মীয়স্বজন, তাই নিজেকে শান্ত রাখল।
হজের মেয়াদ শেষ হল। এখানে ওখানে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি হলেও ওরা উভয়েই সন্তুষ্ট হয়েছিল। মিনা থেকে ফেরার পর একটু উদ্বেগ বাড়িয়ে সাজিয়া বিছানা নিল। রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার ফলে দিন দুয়েকের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হল। ছেড়ে দেওয়ার পর আরও একদিন বিশ্রাম নিয়ে রক্তচাপ আয়ত্তে এল। কেনাকাটার সময় নষ্ট হচ্ছে দেখে সাজিয়ার বেশ রাগ হল। সাজিয়া জোর দিয়ে বলল -
- "যে ও ভাল আছে, অন্তত সুভানের সামনে।" আর খুব তাড়াতাড়ি ও সুস্থ বোধ করতে লাগল। কেনাকাটা স্থগিত রাখার জন্য সুভান নানারকম ফন্দি আঁটতে লাগল। টাকার চিন্তা ওর ছিল না। চিন্তা ছিল বেশি মালপত্র থাকলে উড়ানে ফেরার অসুবিধে হবে। সে ওই ফাঁদে পা দিতে চাইল না। কিন্ত সাজিয়াকে হতাশ করতেও সুভান চাইল না। এতে ওর রক্তচাপ আবার যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তাই কেনাকাটায় কাঁটছাঁট করার চিন্তা ধোপে টিকল না। সাজিয়াকে কে আর থামাবে এখন।
কেনাকাটার নেশায় ছুটতে ছুটতে সাজিয়ার মনে ইয়াসিন বুয়া আর তাঁর কাফনের কথা ঝলকের মত আসত, যেত। শেষে তা অন্য কিছুর আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল। তারপর সম্পূর্ণ বিস্মৃতি। এই জাদু শহরে কাফনের মত মন খারাপ করা, ভারি একটা বিষয়ের চিন্তা মনের কতটা জায়গা জুড়ে নেয়। হে ভগবান! ভারতে কি কাফন পাওয়া যায় না? পাওয়া যায় না কি, আমাদের গ্রামে? গিয়ে বলে দেব এখানে ওসব পাওয়া যায় না।
গল্প
শূন্য দৃশ্যের
ছবিওয়ালা
শাশ্বত বোস
শ্রীরামপুর, হুগলী


প্রকান্ড একটা সাদা ক্যানভাসের গায়ে ফ্ল্যাট ব্রাশটা দিয়ে আঁকিবুঁকি, অবাধ্য আঁচড় কাটছে সমীরণ। আজ অনেকদিন পর ছবি আঁকবে ও। হাফ হাতা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্টে লিখে ফেলবে স্ব-যাপনে আত্মমগ্ন একটা শরীরকে। শরীরের ভিতর ভাঁজ হয়ে থাকা আরেকটা শরীর! বহুদিনের পুরোনো একটা শরীর! সম্ভবত কয়েক শতাব্দী পুরোনো। সে শরীরে কোন জানালা নেই। শরীরটার মুখে চোখে খানিকটা ভয় লেগে থাকে হয়তো। হয়তো লেগে থাকে অনেকটা বিস্ময়! সর্বদর্শী শরীরটা হয়তো আচমকা দেখায়, ক্লান্ত পতঙ্গের মতো ঘুমে ঢলে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, কারো উপর জাদুপ্রভাব বিস্তার করতে পারে। সেই শরীরটার চামড়া ফেটে বেরিয়ে এসে বেশ খানিকটা মায়াবী আলো সমীরণের মন মাথায় ধীর গতিতে মাকড়সার জাল বোনে। অঝোরে বৃষ্টির পর গজিয়ে ওঠা আঠালো জীবনটায় নিষ্প্রাণ গাঢ় শ্যাওলা রং লাগে। এরপর সেই ধূসর শরীরটা ছায়া ছায়া অন্ধকারে ধীরে, অতি ধীরে নেমে যাবে কোনো অন্ধকার কুয়োয়, পড়ার টেবিলে ছড়ানো ছেটানো এক রাশ বইয়ের মত অনিয়মের অস্থির আকুলতা নিয়ে! জলপাই রঙের মৃত্যুর আধিপত্য আর তার অলোকিক ও জটিল বর্গক্ষেত্রে, একটা কৌণিক বিন্দুতে এসে দাঁড়ায় সমীরণ। ওর দুচোখে গলগলিয়ে সন্ধে নামে, মাথা ভার হয়ে আসে, শরীর এলিয়ে দেয়। তবু ছবি আজ ও আঁকবেই!
সমীরণ দিব্যি টের পায় ওর বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুলের নখটা বড় হয়েছে বেশ। গোড়ার দিকে মোটা কিন্তু আগার দিকটা সরু হয়ে ছুঁচোলো হয়েছে, ঠিক মুখ ভোঁতা ছুরির মত। প্যালেট থেকে ওই নখে করেই বেশ কিছুটা ক্যাডমিয়াম রেড, ইয়েলো অকর্, আল্ট্রাম্যারিন ব্লু আর টাইটেনিয়াম হোয়াইট খামচে তুলে এনে, রতিস্নাত জ্যোৎস্নার মত ক্যানভাসটার সারা শরীরে হরবোলা পাখির সুর এঁকে দিতে ইচ্ছা করে ওর। বহু যুগের ওপার থেকে ভেসে আসে পাখিটার শিস। আধ পোঁড়া ইটের ভাঁজে ভাঁজে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিকে খুঁচিয়ে তুলতে তার জুড়ি মেলা ভার! এটাই হয়তো পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়া প্রথম গান। এর আগেও কেউ কোনদিন গান গায়নি, পরেও না। প্যালেট নাইফটার কাজ কেড়ে নিল শুধু ওর বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলে গজিয়ে ওঠা এই নখটাই! বিষয়টা ওকে ভিতরে ভিতরে ভীষণ তাঁতিয়ে দেয়! ক্যানভাসটা জুড়ে তখন বিস্তৃত একটা নিবিষ্ট সমকোণী সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ। কোন অজানা মানবীর মুখের বেস লাইনস এগুলো! পোট্রেট পেইন্টিং এর একদম প্রাথমিক ধাপ! সমীরণের জীবনটা যেন তার ঠিক দুটি বাহুতে এসে দাঁড়িয়েছে, যেন গন্তব্যের দুদিক! আজকাল ও যেন দুটি সম্পূর্ণ পৃথক মানুষ! দুটি আলাদা আলাদা রঙের মন ওয়ালা দুটি পৃথক জীবন যেন সর্বক্ষণ ভর করে থাকে ওর ওপর। কোড়া কাপড়ে বেশ খানিকটা সাদা আর অল্প কালো মিশে গিয়ে তৈরী হওয়া ছাই রঙের একটা জীবন! তোলপাড় ধুলোঝড়ের মত আস্তে আস্তে সে জীবন কালো হয়ে আসে, মিহি সুতোপাড়ে জমা হয়ে আসা থকথকে আলকাতরার মতন। নির্জন, নির্বাক, নগ্ন! আবার ঠিক তার উল্টোপিঠে হলুদ, কালো আর লাল মিশে সঙ্গম লবণের ভারে মেহগনি রঙের ঘনঘোর, অশিষ্ট একটা মন। ভিজে নিঃশেষ হয়ে যাবার মত্ত একটা জেদে যার অসুখের পরোয়া নেই। যেন রুক্ষ্ম মরুভূমির মতন। এই প্রবল জলকষ্ট আবার এক ঢোঁকেই ভেতরে জল থৈ থৈ! ভ্রম আর ভ্রমর সেখানে বাস করে আলোর সমকামী হয়ে। এই প্রখর মে মাসের দুপুর। যে দুপুরে ঠাটা রোদে তৃষ্ণার্ত কাক একফোঁটা জল না পেয়ে ছটফট করে। বছর বেয়াল্লিশের বিধবাকে একমাত্র ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ট্রেনে ট্রেনে হকারি করতে হয়, পেন-পেন্সিল-চিরুনী ফেরি করতে হয়। গনগনে ইমারতের গা বেয়ে ইঁটের পাঁজা মাথায় নিয়ে বারোতলার ছাদে উঠতে হয় বছর ছত্রিশের স্বামী পরিত্যক্ত বিলকিসকে। একটা নিরেট লালসার প্রতিক্রিয়াহীন অভিব্যক্তি যখন পোড়ায়, ভেপ্সে যাওয়া ঘামের গন্ধে বিবর্ণ শরীরগুলোকে, তখন সেই অপরিসীম কষ্ট আর লড়াইয়ের সমান্তরাল জগতে বসে কেবল ছবি আঁকে সমীরণ, মধ্য কলকাতার পুরোনো, জীর্ণ বাড়িটার দোতলার এই বন্ধ ঘরটায় বসে।
ঠিক এখানটাতেই রক্তগোলাপের ছিটে হয়ে ক্যানভাসটায় প্রবেশ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে বিকশিত হওয়া সুররিয়েলিজমের দৃশ্য ও পোশাকের কাল্পনিক বন্ধনে তৈরী ইমেজারি আর ‘কাইফোর্ড স্টিল’ এর হাত ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চালু হওয়া ‘এবস্ট্রাক্ট এপ্রেশনিসম’ এর নীলচে মিশেলে মূর্ত, রাতের বাঁকে পথ হারিয়ে ফেলা উতল চন্দ্রভাগা! সমীরণের শুধু মনে হয় যেন প্রাগৈতিহাসিক কালের থেকে ও দাঁড়িয়ে আছে ইজেলটার সামনে। ক্যানভাসটা ধুপকাঠির মত নগ্ন হয়েছে, শুধু ব্রাইট ব্রাশ, ওয়াশ ব্রাশ, ফিলবার্ট ব্রাশ আর এগবার্ট ব্রাশের খোঁচায়। ড্রাই ওয়াশিং, স্ক্র্যাম্বলিং, গ্লেজিঙ, হ্যাচিং ইত্যাদি স্পেসিফিক ব্রাশিংয়ের সোহাগে আদরে! এখন ছবিটার জায়গায় জায়গায় ইম্পেস্ত করার জন্য ২৪ নম্বরের স্টিফ ব্রাশটাও বড় অপ্রয়োজনীয় মনে হয় ওর কাছে। শুধু এই নখ আর রং দিয়েই হয়তো ও এঁকে ফেলতে পারবে সেই মুখ! সুন্দর আর মাঝামাঝি রকম
দেখতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে যে মুখ, গন্ধ ফুরোনো আরব্যরজনীর সময় থেকে স্মৃতির ঘুঙুর পায়ে! ঘন-ঘিঞ্জি-ভয়-হত্যা-আতঙ্কের গলিতে বসে যে মুখটার ধ্যান করেছে ও সেই কিশোরবেলা থেকে। আবার সেই মুখটা দেখলেই হয়তো ওর মাঝে মাঝে স্বমেহনের ইচ্ছে জেগেছে! কয়েকটা মুখ অনায়াসে ও এনে বসাতে পারে এই মুখটির জায়গায়। সাইকেলের চাকার ধুলোকাদা মেখে কয়েকটা মানুষ এভাবেই বেঁচে আছে আজও, অনিবার্য্য ঘুম ঘুম নির্জনতার হাত ধরে। যেমন টুকিদি।
বৈজয়ন্তীমালার মত ধীর এক্সপ্রেশন খেলা করে যেত টুকিদির গোটা মুখ জুড়ে! ওর জমে যাওয়া কাফ সিরাপের মত ওয়াইন কালারের দুটো ঠোঁটে, কন্সেন্ট্রেটেড চুমু খেতে চেয়েছিল সমীরণ! টুকিদি মুখ সরিয়ে নিয়েছিল। কোন এক অনুভূতি প্রখর দুপুরে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা পড়ানোর সময় মুখটা গাঢ় সেপিয়া টোনে হালকা ব্রাউনিশ হাইলাইটিং এর মত করে টুকিদি বলেছিল, “তুই বাড়ি যা বাবলু, কাল থেকে আর আসিস না।” সেই টুকিদির বডিটা যখন শেষবারের মত এল এ পাড়ায়, ফর্সা মুখখানা জুড়ে ছোপ ছোপ নীল! যেন লাইট বেসের উপর আর্টিস্ট স্পঞ্জে করে উইনসর ব্লু ছুপে দিয়েছে কেউ! হয়তো এরই ভালো নাম নিঃসঙ্গতা! এই নিঃসঙ্গতার উপর মাদুর পেতে দীর্ঘ্যদিন শুয়ে থেকেছে সমীরণ টুকিদির ডেডবডিটার দিকে চেয়ে। একটা ভীষণ টাটকা বডি। আইভরি কালারের একটা ব্যাকলাইট এসে পড়েছে মুখটায়! যেন এক্ষুনি ডাকলেই উঠে বসবে। নিজের মন এবং অঙ্ক কষতে না পারা জীবনের সবটুকু অভিজ্ঞতা ছেঁচে নিয়ে, সব স্বপ্নকে হিঁচড়ে নামিয়ে এনেছে সমীরণ সেই অন্ধকার কুয়োটার ধারে, যেখান থেকে কেউ আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে! ছোটবেলায় ওর মা ওকে আঁকা শেখাতেন। মায়ের সেই ঢলঢলে মুখটা যেন খুব বেশী মনে পরে ওর ইদানীঙ। দুটো চোখের বিস্তৃত দেখায় ও দেখতে পায়, দেখতে পাওয়াকে ছাড়িয়ে অসীমে। ঠিক যেখান দিয়ে চলে গেছে একটা ফাঁকা রাস্তা! যে রাস্তাটা দিয়ে কেউ কখনো হেঁটে আসেনি।
তবু ক্ষণজন্মা শিল্পীর মতন আলুথালু স্বপ্নের স্পাইরাল পথ বেয়ে, একবার ঠিক করে মুখটা এঁকে ফেলতে চায় সমীরণ! ডার্ক ব্যাকগ্রাউন্ডে ফুটে ওঠা মুখটার নাকের কাছে রিগার ব্রাশটা ঘষে ঘষে নোজ ব্রিজটা সরু করতে থাকে, উপরের ঠোটটাকে আরেকটু মোটা। চোখদুটো আরো সাদা হবে! তিরিশ বছর আগের দিনে ফুলশয্যায় পাতা চাদরের মত সাদা। বেশ সতর্ক তুলির আঁচড়! আয়নার ওপর থেকে এক্ষুনি হয়তো উঁকি দেবে একগাদা লোক। অনেকটা একরকমের দেখতে! বসিয়ে দেবে গোল টেবিল! বলে উঠবে, “জন সিঙ্গার বা গুস্তাভ ক্লিমত তো গুলি মার ছোকরা! তোমার ছবি, তোমার তুলি এক্সপ্রেশনিজমের ধার দিয়েও যায় না! কিচ্ছু হয়নি! আবার শেখো নতুন করে। নন্দলাল, যামিনী রায়, হেমেন মজুমদার, যোগেন চৌধুরী দেখো। হেঁটে যাও নির্জন পথের সেই রাস্তা দিয়ে, যেখানে আশেপাশে ছড়িয়ে আছে শুধু কটা ল্যাম্পপোস্ট আর কটা গাছ। সেদিকে তাকিয়ে আপনমনেই বলে ওঠো তারপর, ‘ফুল ধরেছে।’” ঠিক এর পরেই লোকটার মুখের ভাব ভঙ্গি পাল্টে যাবে। মুখাবয়বে ধীরে ধীরে ফুটে উঠবে বিপন্নতা আর বিষন্নতার আখ্যান, বলে উঠবে, “মেয়েদের বুকে মাথা রেখেছ কোনোদিন? মেয়েদের বুক আঁকতে শিখেছ? নিটোল দুটো বুক, তিতির পাখির মত নরম!” আয়নার ওপারের সারা শরীর জুড়ে তখন চিৎকার করতে চায় সমীরণ! পৌরাণিক অভিশাপের মত নিশ্চল কেউ তখন মন্ত্রের মত বলে যায় ওকে,
“শান্ত হ, শান্ত হ।” মন্ত্রের ভেতর থেকেই যেন একটা তোলপাড় ফেনিয়ে ওঠে! ওর খুব ইচ্ছে করে পালক বিহীন পাখিদের মুখ আঁকে, বদলে দেয় গোটা পৃথিবীর জ্যামিতি! ‘ইথানেশিয়া’, এই একটা শব্দ। তাকে ঘিরে যেন অনেকে এসে দাঁড়ায়। সমীরণ ঠিক মাঝখানে, একেবারে একা! এই পাল্টে যাওয়া সময়টাতে নিজেই নিজের সাথে কথা বলে সমীরণ। ওর সাথে কথা বলার যে আর কেউ নেই। ও এখন নিজেই নিজের বন্ধু, নিজেই নিজের অভিভাবক, আবার কখনো নিজেই নিজের শত্রুও! নিজেই একহাতে নিজের গায়ে চিমটি কাটে, অপর হাত দিয়ে শান্ত করে। “ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসর্ডার!” রোগটার আগে নাম ছিল বোধহয় “মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসর্ডার।” আমার আমিটা আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়। এ রোগের যত বয়স বাড়ে তত মানুষ আরো বিবর্ণ, অস্পষ্ট ও অগভীর হয়ে যায়। শুধু তার মাথার মধ্যে সেঁদিয়ে থাকা লোকগুলো তখন বেরিয়ে আসে বেশী করে। চেঁচামেচি করতে থাকে ব্যস্ত রাস্তায় যান্ত্রিক হর্ন দিতে থাকা গাড়িগুলোর মত।
সমীরণ পাশের টেবিলে রাখা বিষের শিশিটার দিকে হাত বাড়ায় ধীরে ধীরে। সেটার শরীরে তখন কচুরিপানার নীল! ঠিক যেমন একটা নীল প্রজাপতি বসেছিল সেদিন টুকিদির গালে, শরীরে যার অজস্র ক্ষত!
গল্প
রাহী ও একটি
ইলিশ
বর্ণালী ঘোষদস্তিদার

ঝুড়িতে থরে থরে সাজানো চকচকে রূপোলি সুন্দরী ইলিশের সম্ভার দেখে হঠাৎই কেমন আনমনা হয়ে গেল রাহী। অনেকদিন পর বাজারে এসেছিল একটু জ্যান্ত তেলাপিয়া বা পোনামাছের সন্ধানে। কিন্তু এখন ইলিশ দেখে….কেন যে মন উচাটন হলো রাহীর….কে জানে।
আজ প্রায় দশ দিন ঋভু ট্যুরে গেছে। আসতে এখনও হপ্তাখানেক দেরি। যাবার সময় কিছু বাজার-হাট করে দিয়ে গিয়েছিল। মাছ ডিম একটু চিকেন। সেসব প্রায় শেষ। অগত্যা বেরোতে হলো রাহীকে।
রাহী সাধারণত বাজার করে না। ফর্দ করে দেয়। ফর্দ মিলিয়ে নিয়ে আসে ঋভু। সে ফর্দে কী না থাকে? সব্জি তরিতরকারি ফল মাছ মাংস তো আছেই সঙ্গে এছাড়াও অনেকসময় থাকে ফুলঝাড়ু, বাল্ব, পেন্সিল ব্যাটারি, লাল রিফিলের পেন, ধূপকাঠি, মশা মারার কালো হিট, আরশোলা মারার লাল হিট, রান্নাঘরের ন্যাকড়া, কী নয়? ঠিকমতো লিখে দিলে সবই গুছিয়ে নিয়ে আসে ঋভু। তবে ফর্দের বাইরে শুধু নিজের পছন্দের ইলিশ মাছ আর খাসির মাংস ছাড়া বাড়তি কক্ষনও কিছু আনে না। সব্জি তরিতরকারি নিজে তেমন খায় না বলে কম্বিনেশন মিলিয়ে আনতেও পারে না। সিজনের সব্জি বা ফল কাকে বলে সে বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা নেই ঋভুর। ফলে কদাচিত কখনও বাজারের দিকে যেতে হলে নিজের পছন্দমতো একটু মোচা, থোড়, ওল, মান, গাঁটিকচু, কচুশাক কচুর লতি, মাশরুম, সুইটকর্ন, নানা ধরনের শাক নিয়ে আসে রাহী। সীমা যত্ন করে রান্না করে দেয়। রাহী একা খানিক খেয়ে অবশিষ্টটা সীমাকে আর বাসনমাজা ঘর পরিষ্কারের লোক পারুলকে দিয়ে দেয়। এসব কখনও ছুঁয়েও দেখে না ঋভু। বহু খাস বাঙালি ডেলিকেসির স্বাদও জানে না। রাহী কতবার বলেছে বুঝিয়েছে ঋভুকে,
- “তুমি বাঙালি ঘরের ছেলে। বাংলায় বসবাস করো। বাংলায় লিখে বাংলা কাগজে সাংবাদিকতা করে তোমার অন্ন জোটে। অথচ বাংলার গ্রামগঞ্জে ভান্ডার উজাড় করে ভরে প্রকৃতি সাজিয়ে রেখেছে মানুষের অসংখ্য আহার্য খাদ্য তার হদিশই রাখো না। খালবিলের ধারে গজিয়ে ওঠা কলমি হেলেঞ্চা, অযত্নে জন্মানো কচু, মাঠের ধারের আগাছার মধ্যে নটে শাক বর্ষায় নদী জলায় বিলে অজস্র চুনোমাছ….. এসবের রূপ এসবের আস্বাদ জানতে ইচ্ছে করে না তোমার?”
অনেক বলেও ব্যর্থ হয়ে রাহী বুঝেছে এসব খাওয়ায় ঋভুর রুচি দূরে থাক এসবের নামও সে জানতে চায় না। জানবার কোনো আগ্রহও নেই। বাজার করার প্রয়োজন হলে চোখের সামনে আলু, পেঁয়াজ, কুমড়ো, পটল, বেগুন, ঝিঙে, ঢ্যাঁড়শ যে গড়পরতা সব্জি দেখবে তা ই ব্যাগ ভরে নিয়ে চলে আসে। তারপর টেলিফোনে বন্ধুদের বুক বাজিয়ে বলে “বাজার করে এলাম।”
ইলিশমাছটা অবশ্য খুবই ভালো কেনে ঋভু। কারণ ইলিশমাছ ওর সবথেকে প্রিয়। নিজে খেতে ভালোবাসে বলে বর্ষার সিজনে প্রায়দিনই ইলিশ নিয়ে আসে ঋভু। এবং সে মাছ অধিকাংশ দিন যথেষ্ট সুস্বাদুও হয়। সব মিলিয়ে এই ধারণাটা ঋভু প্রতিষ্ঠা করে ছেড়েছে যে বৃষ্টির মরশুমে ঋভু নিজের হাতে বাছাই করা ইলিশ নিয়ে আসবে। কারণ পূর্ববঙ্গীয় হবার কারণে ইলিশের ওপর তারই একচ্ছত্র অধিকার। রাহী এমন কি আর বোঝে ইলিশের? বাঙাল বলে ঋভুই বোঝে জলের এই উজ্জ্বল শস্যের যথার্থ মর্ম। অতএব এটাই স্বতসিদ্ধ যে ঋভু -রাহীর সংসারে ঋভু ছাড়া ইলিশ আসবে না। কারণ একমাত্র ঋভুই পারে ইলিশের মর্যাদা দিতে। ফলে একটা অলিখিত প্রথা হয়ে গেছে এটাই যে একমাত্র ঋভু কিনলেই ইলিশ আসবে বাড়িতে। নয়তো নয়। ইলিশ রাহীরও যথেষ্ট প্রিয়। কিন্তু ঋভু নেই অথচ রাহী ইলিশমাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছে এ যেন কেমন অসম্ভব একটা ব্যাপার। ইলিশ মাছ ঋভুই কিনে আনবে এবং ঋভুর পাতে প্রথমেই সেরা পিসটা তুলে দিয়ে রাহী নিজের জন্য নেবে….এটাই চালু নিয়ম। এটাই দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
অফিসের কাজে মাঝে মাঝেই ট্যুরে যেতে হয় ঋভুকে। তখন সব্জিপাতি মাছ ফুরিয়ে গেলে রাহীর বাজার যাওয়াটা বাধ্যমূলক হয়ে ওঠে। তবে এ ও একটা সুযোগ। নিজের পছন্দমতো মাছ সব্জি তরিতরকারি কিনতে পারে রাহী। কয়েকটাদিন একটু খাওয়াটা অন্যরকম হয়। জিভে নতুনের স্বাদ আসে। যদিও তা সাময়িক।
ঋভুর টুরে যাওয়া আর দীর্ঘ অনুপস্থিতি এখন একটা পড়ে পাওয়া সুযোগ। ঋভু থাকলে হয় একঘেঁয়ে কাটাপোনা নয় চিকেন। এখন কটাদিন রাহী নিজের খুশিমতো ব্যতিক্রমের আস্বাদ পাবে।এসব ভেবেই বাজারে গেছিল রাহী। এমন সব্জি মাছ কিনবে যার ঋভু নামই জানে না। খাওয়া তো দূরের কথা।
বিকেলের বাজারও সকালবেলার মতোই রমরমিয়ে চলছে। এই সময়টা অফিসফেরত লোকদের বাজার করার সময়। সকালে উঠেই তো কোনোরকমে নাকেমুখে গুঁজে দৌড়ে হাজিরা দিতে হবে কর্মস্থলে। জমিয়ে গুছিয়ে বাজার করার সময় তখন কোথায়? তাই বাজারে ডিউটি থেকে ফেরা লোকেদের ভীড়। কলেজ ফিরতি পথে রাহীও গেল বাজারে। ঋভু যা কিনে দিয়ে গেছিল শেষ হয়েছে সব। ফ্রিজ খালি। এখন চাট্টি না কিনলেই নয় ভেবে ঢুকলো প্রথমেই মাছের বাজারে। যতদিন ঋভু না ফিরছে একটু অন্যধরনের মাছ খাবে রাহী। চিকেন খেয়ে খেয়ে জিভে চরা পড়ে গেছে। এখন কটাদিন নিশ্চিন্তে দুবেলা তৃপ্তি করে মাছভাত খাবে। এগিয়ে যায় রাহী। কাইয়ুম বলে একজন মাছ বিক্রেতার সঙ্গে বেশ ভাব আছে রাহীর। খুব ভালো মাছ দেয়। আর নানা ধরণের আনকমন মাছও থাকে তার স্টকে। চোখবুজে মানুষকে বিশ্বাস করাটা রাহীর স্বভাব। এই স্বভাবের
কারণে সে যে ঠকেনি কখনও এমন নয় কিন্তু তার এই পঞ্চান্ন বছরের জীবনে ঠকার চেয়ে জেতার সংখ্যাই মনে হয় বেশি।
প্রথমদিন যেদিন কাইয়ুমের কাছে মাছ কিনতে গেছিল রাহী সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছিল। বলেছিল “তোমার ওপর ছেড়ে দিলাম। তুমি নিজে ভালো জিনিসটা বেছে দাও। তাহলে আমি তোমার কাছে বারবার আসবো। শুধু তোমার কাছেই আসবো মাছ কিনতে”।
কাইয়ুম কি ভেবেছিল কে জানে রাহীর কাছে ন্যায্য দামে সেরা মাছটাই বেচেছিল। সেই থেকে কাইয়ুমের ওপর বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে রাহীর। মাছের প্রয়োজনে সে কাইয়ুম ছাড়া আর কারুর কাছেই যায় না।
সেদিনও অন্য কোনোদিকে না তাকিয়ে রাহী সটান গিয়ে দাঁড়ালো কাইয়ুমের সামনে। মামুলি রুই কাতলা কটা। আর ঝুড়িভর্তি রূপোলি ইলিশ কাইয়ুমের স্টকে। রাহীকে দেখেই কাইয়ুম বললো,
- “অনেকদিন পরে এলে দিদি। মাছ খাওয়া ছেড়ে দিলে নাকি? আমরা বাঙালি। মাছ ছাড়া চলেনা আমাদের। বলো দিদি কোনটা দেবো? খুব ভালো মাছ।”
- “তোমার কাছে কি আজ শুধুই রুই, কাৎলা? তেলাপিয়া, বাছা, কাজলি, তোপসে, আমোদি এসব নেই?”
- “কেন ইলিশ আছে তো? ইলিশের সিজনে এখন এসব কেন খাবে দিদি? একটা বড়ো দেখে দিই? খুব টেস্ট হবে। এক্কেবারে এক্লাস মাছ।”
কাইয়ুমের ঝাঁকাভর্তি ঝকঝকে ইলিশগুলোর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না রাহী। পাশাপাশি বেশ কজন খদ্দের এসে পটাপট কিনে নিল কখানা। কাইয়ুম একা হাতে মাছ তুলছে। ওজন করছে। কাটছে। দ্রুত হাতে বেচাকেনা করছে।
রাহী দাঁড়িয়ে আছে এককোনে। কাইয়ুম তাকে ইলিশ নিতে বলছে। সে কি নেবে? রাখবে কাইয়ুমের কথা? ইলিশমাছ খুব ভালো চেনে না রাহী। কখনও কেনেনি। তার চেয়েও বড়ো কথা ইলিশ মাছ কেনার অভ্যাসটাই গড়ে ওঠেনি তার। কিন্তু কাইয়ুমকে সে বহুদিন ধরেই চেনে। রাহীকে কক্ষনো ঠকাবে না কাইয়ুম। কিন্তু ঋভু নয়। বরং ঋভুর অনুপস্থিতিতে রাহী নিজের হাতে ইলিশ কিনবে এতো একদম অচেনা অজানা একটা অভিজ্ঞতা। ঋভু-রাহীর দীর্ঘ দাম্পত্যে প্রথার বাইরে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি। কখনও হয়তো ঘটতোও না। কিন্তু আজ যেন কাইয়ুম একটা অন্যরকম কিছু ঘটাতে চলেছে। ইলিশ তো ভীষণ ভালোবাসে রাহীও। কিন্তু এর আগে ঋভু যখন ট্যুরে গেছে কখনও তো নিজে পছন্দ করে কিনে ইলিশ খাবার কথা মনে হয়নি তার। একা থেকেছে যখন কেন কেনেনি এতোদিন? প্রথা আর অভ্যাসের গন্ডির বাইরে পা রাখতে কি ভয় পেয়েছে রাহী? না কি ঋভু ও ইলিশ এই ধারাবাহিক প্রচলিত পরম্পরাকে এতোটাই মর্যাদা দিয়েছে যে কখনও নিজের ব্যক্তিগত ইলিশ প্রেমটুকু আবিষ্কার করতেই পারেনি। চলতি প্রথার কাছে নিজের সামান্য ভালোলাগাটুকুও সমর্পণ করে থেকেছে।
রাহীর মনে একটা তোলপাড় চলছিল। কাইয়ুমের কথায় চমক ভাঙলো।
- “দিদি নাও। তোমাকে একেবারে বেস্ট পিসটা দিয়েছি। অন্যদের কাছে চোদ্দশো টাকা করে কিলো নিলাম। তুমি আমার লক্ষ্মী খদ্দের। তোমাকে ওই একই জিনিস দিলাম বোরোশ’য়। খেয়ে এসে রিপোর্ট দেবে।”
গোটা একখানা ইলিশ? একা মানুষ কেমন করে খাবে রাহী ওটা? কদিন ধরে খাবে? কিন্তু আজ যেন আস্ত একখানা ইলিশ কিনে রাহীর মনটা হঠাৎ অজানা আনন্দ আর খুশিতে ভরে উঠেছে।
না, খাবে সে। একাই খাবে। অনেকদিন ধরে খাবে। বন্ধু তিতাস প্রায়ই আসে। ইলিশ খুব প্রিয় ওর। ওকেও ভেজে দেবে কয়েক টুকরো। সহকর্মী বন্ধু তিতাসকে বড্ড ভালোবাসে রাহী। ওর সরল সাদাসিধে মুখখানায় যেন কেমন মায়া মাখানো। তিতাস গভীর দৃষ্টিতে রাহীর দিকে তাকালে রাহীর গতানুগতিক অভ্যাসের চক্রে আর সংসারের জাঁতাকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা মনটা পায়ের শিকল আলগা করে ওই দূর আসমানে উড়াল দেয়।
ঋভু এখন নেই। রাহী কল্পনা করে প্রাণের বন্ধু তিতাসকে নিয়ে ও নিজের বাড়ির ছোট্ট ডাইনিং টেবলটায় খেতে বসেছে। শৌখিন বোনচায়নার প্লেটে একরাশ যুঁইফুলের মতো ধবধবে ভাত। আর তার ওপর চুঁইয়ে পড়া সোনা রং ইলিশতেল। ভাতে মেখে একটি পরিপুষ্ট কাঁচালঙ্কা সহযোগে জলের উজ্জ্বল শস্যের আস্বাদ নিচ্ছে তিতাস আর রাহী। মরশুমি ইলিশের ওপর ঋভুর একচেটিয়া অধিকারের প্রভুত্বকে শেষপর্যন্ত আঘাত দিতে পেরে ভারি আনন্দ হয় রাহীর। কোনোদিন যা করেনি কখনও করবে ভাবেওনি তাই করে বসে।
কাইয়ুম একটা বড়োসড় পুরুষ্ট ইলিশমাছ নিজের হাতে বেছে ধুয়ে কেটে যত্ন করে তুলে দেয় রাহীর হাতে। এবার আর তেলাপিয়া আমোদি বাঁশপাতি তোপসে কাজলির মতো আনকমন মাছ নয়। একটা গোটা স্বাস্থ্যবান সতেজ সুস্বাদু ইলিশ।
কালো ভিজে পলিব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেয় রাহী।
Please mention the "name of the article and the author" you would like to comment in the following box... Thank you.
ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ।। মতামত






