top of page
পুজো বার্ষিকী
১৪৩৩
girl-surajit.jpg
durga101.jpg
সূচীপত্র
Durga1-Trina-Dutta.jpg

প্রচ্ছদঃ সুরজিত সিনহা

লেখক/লেখিকাবৃন্দ

প্রচ্ছদ - সুরজিৎ সিনহা ​

​

উপন্যাস-বিন্দু জীবন
Sudip Ghosal.jpg

বিন্দু জীবন

সুদীপ ঘোষাল

পূর্ব বর্ধমান, পঃ বাংলা 

touch.jpg

উপন্যাস

এক

- বাজে বকিস না। সফল হতে গেলে একটু আধটু এদিক ওদিক করতে হয়।

- আমি ওসব পারি না।

– সবাই কি সবকিছু পারে। অভ্যাস করতে হয়।

- দরকার নেই।

অমল অম্লান বদনে শ্যামলকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। যুক্তি দিয়ে তর্ক করে। শ্যামল এখন গান শেখে। যখন সময় পায় লেখারও চেষ্টা করে। শ্যামল, অমলের প্রিয় বন্ধু। বন্ধুকে অমল খুব তাড়াতাড়ি বিখ্যাত করতে চায়।

অমল তাই শ্যামলকে আবার বললো, 'বেশি বকিস না, যা বলছি করবি, তোর মতো সাধু চালাক সমাজে বোঝা হয়ে চিরকাল ঠাকে।

শ্যামল উত্তর দেয়, 'প্রবঞ্চনা করার ক্ষেত্রে ঠকে যাওয়া 'ভালো'।

– প্রবঞ্চনা বলছিস কেন?

- বলবো না, কেউ আমাকে বললো পুরস্কৃত করবো। আর আমি রাজি হয়ে যাবো। কি করেছি আমি যে একেবারে লজ্জা শরম ছেড়ে স্টেজে উঠে উত্তরীয় পরবো। -তোর নিজের প্রতিভা সম্বন্ধে তোর নিজেরই ধারণা নেই।

যে সামনে আমার প্রশংসা করে আমি তাকে সহ্য করতে পারি না।

অমল আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেলো। পাড়ার নেতাজি সংঘ শ্যামলকে সংগীতজ্ঞ হিসাবে সম্মাননা দিতে চায়। কিন্তু সে রাজি নয়। তার মতে এখন সে শিক্ষানবীশ। সংগীতের জগৎ হলো সমুদ্রের মতো। মাত্র চল্লিশ বছর বয়স তার। এখনও অনেক কিছু শেখা বাকি।

কিন্তু নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে শ্যামল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু নিজেকে সে প্রকাশ করতে রাজি নয়। তার গান শুনে দশজন শ্রোতা যদি আনন্দ পায় হাততালি দিয়ে তাকে সম্মান জানায়, তার চেয়ে বড়ো পুরস্কার আর কি হতে পারে? কিন্তু পৃথিবীতে এইরকম মানুষের সংখ্যা কম। পুরস্কার ঠিক মাংসের মতো। মাংসের লোভে সারমেয় যেমন জিভ থেকে জল ফেলে ঠিক সেইরকম পুরস্কারের লোভে অনেক মানুষ নিজের অবস্থান ভুলে যায়। ভুলে যায় নিজের সীমানা। আর তখনই হয় লোক হাসানের ব্যাপার।

গত এক সপ্তাহ অমল শ্যামলের কাছে আসেনি। প্রত্যেকদিন একবার করে দেখা করে যায়। তাই শ্যামল মোবাইলে অমলের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলো। না, কেউ ধরলো না। হয়তো 'ব্লাক লিস্ট'-এ রেখেছে। শ্যামলের মনটা একটু খারাপ হলো। শ্যামল এখনও বিবাহ করেনি আর করবে বলেও মনে হয় না। ভ্রাতৃবধূ সীমাকে ডেকে বললো, 'সীমা এক কাপচা করতে পারো?'

— হ্যাঁ নিশ্চয়ই। এখনই দিচ্ছি।

সীমা চা করতে চলে গেলো। ইতিমধ্যে মা এসে বসলেন শ্যামলের পাশে। বৃদ্ধা জননীর এখন একমাত্র সঙ্গী শ্যামল। শ্যামল মায়ের সঙ্গে কথা বলে খুব শান্তি পায়।

সীমা চা দিয়ে গেলো। কিন্তু মাকে দিলো না। শ্যামল চা নিজে না খেয়ে মাকে দিলো। মা বলছেন, 'তোকে দিলো তুই খা।"

- না, আমার ভালো লাগছে না খেতে, তুমি খাও।

– কেন রে? শরীর খারাপ হলো নাকি?

– না, না। একদম ঠিক আছে। তুমি খাও।

হারমোনিয়াম নিয়ে শ্যামল পরপর পাঁচটি গান মাকে শোনালো। শ্যামাসংগীত। মায়ের চোখ দিয়ে অশ্রু করে পড়তে লাগল। শ্যামলের কণ্ঠে শ্যামা সংগীত শুনলেই মা সবসময় আবেগে আপ্লুত হয়ে যান। শেষ গানটি 'শ্যামা মা কি আমার কালো"। গান শোনার পরে মা শ্যামলকে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। জীবনে অনেক কষ্ট করে ছেলেদের মানুষ করেছেন। কিন্তু ছোট ছেলে ও পুত্রবধূ মাকে ভালোভাবে কথা পর্যন্ত বলে না। দশ বছর আগে শ্যামলের বাবা মারা গেছেন। সেই থেকে বিধবা মায়ের মাছ, মাংস, ডিম, পেঁয়াজ সব খাওয়া নিষেধ। কালো পাড় সাদা শাড়ি পরে দশ বছর কাটালেন। অনেকে বলে, আমরা নাকি আধুনিক হয়েছি। শুধু বইয়ের পাতায়, স্টোজে নেতার বক্তৃতায়। বাস্তবে অন্য ছবি। করে ঘুচবে এই ভারতের দুর্দশা। শ্যামল মায়ের সঙ্গে বসে রোজ এবেলা ওবেলা দু'বার। যত কাজই থাকুক শ্যামল মায়ের সঙ্গে সময় কাটাবেই। খাওয়ার সময় অভ্যাসমতো উঠে আসেন। আসন পেতে দেন। আজ পূর্ণিমা। বাড়িতে নারায়ণ পুজো করে শ্যামল নিজে। ব্রাহ্মণ নয় তো কী হয়েছে। নিজের মনের মন্দিরে পূজার অর্ঘ্য যদি ভক্তি হয়, তাহলে অন্য কাউকে প্রয়োজন হয় না। নিজেই করা যায় সবকিছু। 'আত্মবৎ সর্বভূতেষু' – এই আপ্তবাক্যটি শ্যামলের জীবনের প্রধান মন্ত্র। তাই তার কারও সঙ্গে ঝগড়া হয় না। মনোমালিন্য হয় না। আজীবন গান করেই জীবন কাটাতে চায়। আর মা। গান আর মা। এই হলো তার জীবনের বড় পাওনা। নারায়ণ পূজার পরে শ্যামল প্রতিবেশীদের ডেকে প্রসাদ বিতরণ করল। তারপর বাড়ির লোকেদের দিলো। তারপর মাকে প্রণাম করার পরে নিজে খেলো। তার এই আদর্শ দেখে অনেকে তার মতো পথ চলতে চায়, কিন্তু ক'জনে পারে?

আজ নেতাজি সংঘের পঞ্চদশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছেন। দশজন বিখ্যাত লোককে আজ সম্মাননা জানানো হবে। তারপর গান ও নাটক। এলাহি ব্যাপার। উদ্বোধনী সংগীত শুরু করলো শ্যামল। শ্যামলের গানের পর একে একে সভার নিয়ম অনুযায়ী সব কাজ করতে শুরু করলো। শ্যামল এসে বসল নীচে অধীরের পাশে। অধীর এপাড়ার বুদ্ধিমান ছেলে। সে শশবাস্তের শ্যামলের পাশে বসে উপযুশ করতে শুরু করলো। এতবড় বিখ্যাত লোক যে তার পাশে বসতে পারে তা সে চিন্তা করতে পারেনি। অধীর বলল, "শ্যামলদা আপনি চেয়ারে বসুন। - না রে, আমার নীচে বসতেই ভালো লাগে।

- আমার কেমন কেমন করছে।

- কিছু ব্যাপার না। তুই চুপ করে বসে অনুষ্ঠান দেখ। অধীর দেখল উদঘাস্তের মতো একটি লোক শ্যামলের দিকে এগিয়ে আসছে। কি তার উদ্দেশ্যে বোঝা যাচ্ছে না। কাছে এলে লোকটি বলল,' শ্যামলবাবু, একবার শুনুন

- আপনি রমেনবাবু কিছু বলছেন?

- হ্যাঁ, একটা কথা আছে।

- কি বলুন।

রমেনবাবু আমতা আমতা করছেন। মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। কি করে কথাটা শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না। শ্যামল প্রতিবেশী রমেনবাবুকে চেনেন। শান্তশিষ্ট, পরোপকারী এই লোকটাকে শ্যামলের খুব ভালো না তো। সাহস দিয়ে বললেন, 'বলুন না কি হয়েছে বলুন??

- না, আপনি বাড়ি চলুন।

- আরে বলুন না। এখানেই বলুন।

- আপনার মা-মা, মানে মা মারা গেছেন।

- কখন কীভাবে?

– সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে হার্টফেল করেছেন।

শ্যামল ছবির মতো স্থির হয়ে গেলো। মাথাটা বনবন করে। ঘুরতে শুরু করলো। তারপর আর কিছু মনে নেই। এদিকে অনুষ্ঠান হচ্ছে। সকলের দৃষ্টি সেই দিকে। চারজন ছেলেকে নিয়ো রমেনবাবু শ্যামলকে পথের একটি বাড়ির বারান্দায় শোয়ালেন। মাথায় জল দিলেন, সবাই হাওয়া দিলেন হাতপাখা ঘুরিয়ে। মিনিট দশেক পরে শ্যামলের জ্ঞান হলো। জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু এতবড় বাক্কা সামলানো মুখের কথা নয়। মা অন্তপ্রাণ শ্যামলবাবু কাঁদতে শুরু করলেন। চারজন ছেলে ও রমেনবাবু ধরে শ্যামলকে বাড়ি নিয়ে চললেন। শ্যামলের এখন একটাও শ্যামাসংগীত মনে আসছে না। একিহলো তার বিপদে আপনে কোনদিন এরকমতো হয়নি। শ্যামল ক্লান্ত পায়ে পথ চলেছে। বাড়ি আর আসছে না। যত দেরি হয় ততই ভালো। মায়ের মরা মুখ দেখতে চায় না। কি করে দেখবে। যে মায়ের সঙ্গে দু'বেলা কথা না বললে আর ঘুম হয় না। সে কি করে আজ মায়ের সামনে দাঁড়াবে। হঠাৎ সে ঘুরে দাঁড়ালো। নাঃ বাড়ি যাবো না।" শ্যামল দৌড়চ্ছে, পালিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ অমল দেখতে পেল শ্যামলাকে। জড়িয়ে ধরে ফেলল শ্যামলকে, 'কি হয়েছে তোর?' পাগলের মতো করছিস। কেন?'ইতিমধ্যে পিছন পিছন রমেনবাবু এসেছেন, অমলকে দেখে শাস্ত হলেন। বললেন, 'শ্যামলের মা মারা গেছেন। তা উনি বাড়ি না গিয়ে এদিকে ছুটছেন।'বাল্যবন্ধু শ্যামল সবকিছু বুঝতে পারলো এক লহমায়। বাল্যবন্ধুরা একবার দেখলেই বন্ধুর মনের ছবি দেখতে পায়। এবার অমল ও রমেনবাবু বরে ধরে শ্যামলকে বাড়ি নিয়ে আসছেন। শ্যামল বোবা হয়ে গিয়েছে। এখন কোনো কথা বলছে না। শুধু দু'চোখ বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। বাড়ির কাছে যেতেই দেখতে পেল অনেক মানুষের ভিড়। মাঝে দেখা যাচ্ছে না। ভাই, ভ্রাতৃবধূ ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। শুধু একটা কান্নার সুর ভেসে আসছে। আর মায়ের মুখটা মনে পড়ছে। মা বেঁচে থাকতে বলতেন, সত্যকে সব সময় সহজভাবে নিবি। কোনো কিছুর বিনিময়ে সত্যকে ত্যাগ করবি না।' শ্যামল এগিয়ে যায় সামেনের দিকে।


দুই

আদুরি শ্যামলের পাশের গ্রামে থাকত। ছোট থেকেই গ্রামেই মানুষ। তার বাবা-মা তার জন্মের পরেই মারা যায় এবং সে তার দাদা বৌদির কাছে মানুষ হয়। ছোটবেলায় মাত্র তের বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। আর দুবছর পরেই তার স্বামী মারা যায়। অর্থাৎ সে বাল্যবিধবা হয়ে জীবন কাটায়। 
এখনো কুসংস্কার সমাজে এমন দানা বেঁধে আছে যে বিদ্যাসাগর মহাশয়  বিধবা বিবাহ প্রচলন করলেও তার প্রয়োগ সমাজে এখনও স্বীকৃত নয়। নানাজনে নানা কথা বলে। তার ফলে অনেক বাল্য বিধবা আর বিয়ে করতে চায় না। 
সুখে দুখে শোকে আদুরি আধুনিক জীবন কাটায়। এইভাবে এই মধ্য বয়সে পৌঁছে যায় 
যখন তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স তখন তার শরীরে ধরা পড়ে, স্তন ক্যান্সার। 
পাঁচবাড়ী কাজ করে আদুরির কিছু টাকা পয়সা জমেছে সেই পয়সাগুলো খরচ করে সে তার জামাইকে নিয়ে চলে আসে কলকাতা চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালে। সেখানে জামাই মদ খেয়ে মাতলামি করে, টাকাপয়সা গুলো  কেড়ে নিয়ে চুরি  করে নিয়ে পালিয়ে যায় আর আদুরি পড়ে থাকে হাসপাতালের মেঝেতে। 
ডাক্তারবাবু ও নার্সরা তাকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে তাকে হাসপাতালে একটা বেড করে দেয়। তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই  ডাক্তারবাবু বলেন,তাহলে স্তন কেটে বাদ দিলে তুমি সেরে উঠবে। তুমি কি এই প্রস্তাবে রাজী আছো? 
আদুরি বলে, আমি রাজী।
প্রায় পনের দিন পরে আদুরির স্তন অপারেশন করে বাদ দেওয়া হয়। 
প্রায় দুমাস হাসপাতালে থাকার পরে সে ছাড়া পায়।
আদুরি পথে নামে। কপর্দকশূন্য আদুরির এখন পথেই জীবন, মরণ নির্ভর করছে। 


তিন

অনিমেষ চুক্তিভিত্তিক কর্মি। মুখে মাস্ক পরে চাইল্ড রেজিস্টারের কাজে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছেলেমেয়েদের নাম ও তথ্য সংগ্রহ করছে। পুরো দুটো গ্রামের ভার তার উপরে পড়েছে। একটা টোটো ভাড়া করে অনিমেষ প্রথমে হাজরাপাড়ায় গেল। টোটো থেকে নেমে সে দিবাকরকে জিজ্ঞেস করল, তোমার ছেলেমেয়ে কটা? 
দিবাকর বলল - এক ছেলে আর এক মেয়ে।
- আচ্ছা, ওদের জন্মসার্টিফিকেট বের করো তো।
- ঠিক আছে স্যার। বের করছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দিবাকর জন্মসার্টিফিকেট বের করে অনিমেষের হাতে দিলো। অনিমেষ জন্মের তারিখ লিখে নিল, মোবাইল নাম্বার, পিতামাতার নাম, জন্মস্থান ও আরও অনেক তথ্য সংগ্রহ করে আবার অন্য বাড়িতে ঢুকল। এইভাবে একটা একটা করে প্রায় কুড়িটা বাড়ি ঘোরার পরে বারোটা বেজে গেল। অনিমেষ টোটোভাড়া মিটিয়ে নিজের বাড়িতে গিয়ে স্নান, খাওয়া সারলো।
এদিকে অসুস্থ মা বিছানায় পড়ে আছেন। ছেলেটা এম,এ পড়ছে। স্ত্রী বিকেলে টিউশানি পড়ান।ভাইরা সব পৃথক হয়েছে। একসাথে যৌথ পরিবারে বাস এখন অসহ, হয়ে পড়েছে।
অনিমেষের ছেলে বলে, বাবা একসঙ্গে ছিলাম যখন কি সুন্দর লাগত জীবনটা।
অনিমেষ বলে, ঠিক বলেছ কিন্তু সবাই তো একই চরিত্র নিয়ে জন্মায় না। প্রত্যেকের নিজস্ব একটা মত আছে।"যত মত তত পথ" বুঝেছিস।
অনিমেষের সংসারে একটা শান্তির পরিবেশ বিরাজমান। অনিমেষ, তার ছেলে আর বউ। আর ভাগের মা আছেন তিনমাস। চারছেলে মায়ের। তিনমাস করে দায়ীত্ব পড়েছে মায়ের দেখাশোনা করার। ছেলেদের মধ্যে অনিমেষের মাটির বাড়ি তাও আবার অজয় নদের ধারে। অনিমেষের মা বলেন, আর বেঁচে থাকা অসহ্য হয়ে পড়েছে। ভাগের সংসারে ভাগের মা হয়ে আর বাঁচতে চাই না। মরতে পারলে বাঁচি।
অনিমেষ বোঝে মায়ের কথা। যে ছেলেদের তিনি নিজের হাতে গড়েপিঠে মানুষ করেছেন তারাই এখন মাকে ভাগ করেছে, আহাম্মকের মত। দিন দিন পৃথিবীটা সত্যি বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।তালিবানি শোষণ চলছে পৃথিবীর আনাচে কানাচে, মুখোশের আড়ালে। অনিমেষের ছেলে বলে, বাবা মানুষ মুখোশের আড়ালে থাকে চিরকাল। এখন শুধু মুখোশটা প্রকট হয়ে ফুটে রয়েছে সকলের সামনে।
অনিমেষ বলে, ওসব বলতে নেই বাবা। মহাপুরুষরা বলেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।এখন মানুষ মুখোশ পরে রোগের থেকে বাঁচার জন্য। অনিমেষ কায়দা করে বিষয়টা সম্পর্কে এড়িয়ে যায়।

পরেরদিন সকালে উঠেই স্ত্রীর কান্নাশুনে অনিমেষ মায়ের ঘরে যায়। মা মারা গেছেন রাতে। সকালে অনিমেষের স্ত্রী উঠে প্রথমে দেখে।
অনিমেষ কান্নাভেজা গলায় বলে, মা ছিলেন বলে অনেকটা নিশ্চিন্ত ছিলাম। এবার মা ছাড়া কি করে চলবে সংসার জানি না। মা ছিলেন একটা বটগাছের মত। তার আশ্রয়ে বড় হয়েছি। যাইহোক তারপর সব কর্তব্য সারা হলো। সবছেলেরা এল। মায়ের গহণা ভাগ হল। শ্রাদ্ধশান্তি মিটে গেলে চাইল্ড রেজিস্টারের কাজ শেষ করে এস,আই অফিসে জমা দিল অনিমেষ। এখন স্কুল ছুটি।অবসরে বাড়ির কাজগুলো সেরে ফেলে অনিমেষ।
অনিমেষের ছেলে পড়াশোনায় ভালো। তবে ছোটথেকে একা একা মানুষ হওয়ায়, অন্য লোকের সঙ্গে কথা বলতে তার অসুবিধা হয়। একান্নবর্তী পরিবারে কিন্তু এই অসুবিধা ছিল না। সকলে মিলেমিশে থাকার ফলে ছেলেমেয়েদের মনের স্বাস্থ্য ভালো থাকত। এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি।নিজেরটা গুছিয়ে নেওয়ার দিন। তারফলে দাদুদিদা বা কাকা পিসির আদর, স্নেহ তারা উপলব্ধি করতে পারে না।
অনিমেষের কাজের নিশ্চয়তা নেই। লকডাউনের সময় নিয়মিত বেতনও পায় না। তাই এখন সে বাড়ি বাড়ি পুরোহিতের কাজটা করে সামান্য আয় করে। এছাড়া গৃহশিক্ষকতাও করে। ছেলে ও স্ত্রীও ছাত্র ছাত্রী পড়ায়। কোনরকমে সংসার চলে যায়, পরিবারের সকলের মিলিত প্রচেষ্টায়।
এবার বর্ষাকাল এল। অজয়নদের ধারে বাড়ি। শ্রাবণ মাসের একটাটানা বৃষ্টি ও ডিভিসির জলছাড়ার কারণে বন্যা দেখা দিল। বন্যায় অনেকের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে পড়ছে। অনিমেষের বুক কাঁপছে। কারণ তার বাড়িতেও জল ঢুকছে। অনিমেষ ও তার পরিবার অতি দ্রুত মালপত্তর নিয়ে স্কুলবাড়িতে আশ্রয় নিল। একতলা সমান উঁচু জল, আরও বাড়ছে। স্কুলবাড়ি তিনতলা হওয়ায় প্রাণ শেষ হওয়ার আশঙ্কা কমলেও অনিমেষের বাড়ি ভেঙ্গে নদীর গহ্বরে চলে গেলো।
অনিমেষ অজানা পথে পা বাড়ালো সপরিবারে। তার মাথা ঘুরছে। চোখে সর্ষেফুলের ক্ষেত। ভিটে বলতে এটুকুই ছিল, এখন ভিটেমাটি খুইয়ে মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষগুলোকে সে খুঁজতে শুরু করে।


চার 

পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রাম থানার অন্তর্গত একটা গ্রাম পুরুলিয়া পুরুলিয়া গ্রামের আমরা কয়েকজন বন্ধু একটা কো-অপারেটিভ ব্যাংক খুলেছিলাম। বন্ধুদের মধ্যে আমি বিরাজুল রমেন, বিশু, জীবন, অলোক  ছিলাম। এ ছাড়াও বিভিন্ন বন্ধু নানা সময়ে যাওয়া-আসা করেছে কেউ ছেড়ে দিয়েছে ব্যাঙ্ক। টাকা তুলে নিয়েছে। কেউ নতুন করে জয়েন করেছে। অনেক বন্ধু ছিল এই চরিত্রগুলো বর্ণনা করতে করতে আসবে। নতুন যুবক কত আসবে। যাদের বিয়ে হয়ে গেছে তাদের স্ত্রীদের নাম ঢুকবে। এইভাবে আমরা কো অপারেটিভ ব্যাঙ্ক  করেছিলাম ভ্রমণের উদ্দেশ্যে এবং আমাদের দলে প্রায় বারো জন সদস্য ছিল। সব সময় সবাই যেত না। অসুবিধা থাকত অনেকের। চার পাঁচজন নিয়েই আমরা সারা ভারত ঘুরতাম এমনকি বিদেশেও গেছি। বিদেশে যখন গেছি, তখন কিন্তু চারজন বন্ধু নিয়ে জাপানে গেছিলাম। জাপান থেকে ঘুরে এসে তার অভিজ্ঞতাও আমরা এখানে বর্ণনা করেছি। হয়তো দেখা যাবে বন্ধুদের নামগুলো পরিবর্তন হয়ে গেছে। কারণ কেউ তারা কোনদিন যাওয়া-আসা করেছে অন্যস্থানে চাকরির জন্য। ক্ষণিক বন্ধুত্ব হয়েছে। দলে আমাদের শিক্ষক থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কের কর্মচারীও ছিলো। হয়ত দলছাড়া হয়েছে। কেউ হয়তো অন্যত্র চাকরির জন্য চলে গেছে কেউ। একজন আসানসোল চলে গেছে। কেউ কেউ কলকাতা চলে গেছে। কেউ মেট্রো রেলে চাকরি করে। এইভাবে বন্ধুদল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে অনেকদিন আগে। প্রথমে আমরা কাছাকাছি জায়গাগুলোতে ঘুরবার ব্যবস্থা করলাম এখানে হাজারদুয়ারি আছে কাছে মায়াপুর। আরও  কাছে নবদ্বীপ কাছে আছে তারপর এখানে বড় পূর্ব বর্ধমানের জন্ম কাশীরাম দাস কবিশেখর কালিদাস রায়, কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিক এর ভিটেবাড়ি একটা বেড়ানোর অভিজ্ঞতা তৈরি করে। বিশু আমাদের দলের ক্যাপটেন ছিলো। প্রথমে বিশুকে পরিচয় করিয়ে দেব আপনাদের সঙ্গে। তার চলন তা মনন তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। আমরা চার বন্ধু।  রমেন, জীবন, বিশু আর আমি। যেখানেই যেতাম একসাথে থাকতাম। বিশু ছিলো আমাদের দলের অলিখিত নেতা। নেতা তো এমনি এমনি হয় না। তার কাজ, দল চালানোর কৌশল তাকে নেতা বানিয়েছিলো। একদিন দুপুর বেলায় সে আমাদের ডাক দিলো তার বাঁশি বাজিয়ে। বাঁশির ডাক শুনেই মন চঞ্চল হয়ে উঠতো। ঠিক যেনো রাধার পোড়া বাঁশির ডাক। চুপি চুপি বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বটতলায়। আমাদের মিলন অফিস ছিলো এই বটতলা। চারজন ছুটে চলে যেতাম মাঠে। সেখানে বিশু বলতো, দাড়া কয়েকটা তাল কাঁকড়া ধরি। ভেজে খাওয়া যাবে। একথা বলেই হাত ভরে দিলো সোজা ধানের জমির গর্তে। একটা মাগুর ধরেছি, বলেই মাথা টিপে হাত বের করতেই দেখা গেলো মাছ নয় একটা বড় কালো কেউটে সাপ। বিশু সাপটাকে সাঁ সাঁ করে ঘুরিয়ে সহজেই ছুঁড়ে দিলো দূরে। তারপর তাল কাঁকড়া ধরে ভেজে খাওয়া হলো মাঠে। ভাজার সমস্ত সরঞ্জাম বিশু লুকিয়ে রাখতো একটা পোড়ো বাড়িতে। সাঁতার কাটতে যেতাম নতুন পুকুরে। একবার ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলাম তার প্রখর বুদ্ধির জোরে। মাথার চুল ধরে টেনে তুলেছিলো ডাঙায়। গ্রীষ্ম অবকাশে বট গাছের ডালে পা ভাঁজ করে বাদুড়ঝোলা খেলতাম বিশুর নেতৃত্বে। তারপর ঝোল ঝাপটি। উঁচু ডাল থেকে লাফিয়ে পড়তাম খড়ের গাদায়। এসব খেলা বিশুর আবিষ্কার। তারপর সন্ধ্যা হলেই গ্রামের বদমাশ লোকটিকে ভয় দেখাত বিশু। সুদখোর সুরেশ মহাজন বটগাছের ডাল থেকে শুনলো, কি রে বেটা খুব তো চলেছিস হনহনিয়ে। আয় তোকে গাছে ঝোলাই। সুদখোর অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো। তারপর থেকে ও পথে যেত না মহাজন। সাদা চুলো গান্ধিবুড়িকে রোজ সন্ধ্যাবেলা নিজের মুড়ি খাইয়ে আসতো অতি আদরে। বিশু বলতো, আমি তো রাতে খাবো। বুড়ির কেউ নেই, আমি আছি তো। শ্রদ্ধায় মাথা নত হত নেতার হাসিতে। একবার বন্যার সময় স্কুল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের নেতা। কোথাও সাঁতার জল কোথাও বুক অবধি জল। একটা সাপ বিশুর হাতে জড়িয়ে ধরেছে। বিশু এক ঝটকায় ঝেরে ফেলে দিলো সাপটা। স্কুল আমাদের যেতেই হবে। সাঁতার কাটতে কাটতে আমাদের সে কি উল্লাস। যে কোনো কঠিন কাজের সামনাসামনি বুক চিতিয়ে সমাধান করার মতো মানসিকতা বিশুর ছিলো। সে সামনে আর আমরা চলেছি তার পিছুপিছু। শেষ অবধি পৌঁছে গেলাম স্কুল। হেড মাষ্টারমশাই খুব বাহবা দিলেন স্কুলে আসার জন্য। তিনি বললেন, ইচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। টিফিনের সময় ছুটি হয়ে গেলো। আসার সময় একটা নৌকো পাওয়া গেলো। মাঝি বললেন, আমার বয়স হয়েছে আমি একা অতদূর নৌকা বাইতে পারবো নি বাবু। তাছাড়া আমার এখনও খাওয়া হয় নি। বিশু সঙ্গে সঙ্গে নিজের টিফিন বের করে দিলো। আমরাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো টিফিন বের করে দিলাম। মাঝি ভাই বললেন, এসো সবাই এক হয়ে খেয়ে লি। তারপর নৌকার কান্ডারি হলো বিশু। আর আমরা সবাই মুড়ি মাখিয়ে খেতে শুরু করলাম। মাঝি ভাই ও বিশু খেলো। ধীরে ধীরে পৌঁছে গেলাম গ্রামে। মাঝি ভাইকে পারিশ্রমিক দিয়ে বিদায় জানালাম। পরের দিন রবিবার। রঙিন সকাল। আকাশে মেঘের আনাগোনা। কাশের কারসাজি নদীর তীর জুড়ে। বন্যার জল নেমে গিয়েছে। পুজো পুজো ভাব। বিশু কাশফুলের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। কয়েকদিন হলো তাকে দেখা যাচ্ছে না। আমি ঘুরতে ঘুরতে পুজো বাড়ির ঠাকুর দেখতে গেলাম। সেখানে দেখি বিশু হাতে কাদা মেখে শিল্পীকে সাহায্য করছে। তিন দিন ধরে এখানেই তার ডেরা। এখন তার মনে বাজছে ঢাকের ঢ্যামকুড়াকুড়। মন মন্দিরে তার দুর্গা গ্রামদেশ ছাড়িয়ে অভাবি বাতাসে বাতাসে। পুজো বাড়িতে আমাকে দেখেও কোনো কথা না বলে হাঁটতে হাঁটতে বাইরে চলে গেলো। আমি জানি সে এখন চাল, ডাল নিয়ে সর্দার বুড়িকে রেঁধে খাওয়াবে। সে বলে, ওর যে কেউ নেই। ও খাবে কি? বিশুর বাবা বছরে একবার বাড়ি আসেন। তিনি ভারতীয় সৈন্য বিভাগে কাজ করেন। বাড়িতে এলেই বিশুর হাতে হাতখরচ বাবদ তিনি বেশ কিছু টাকা দিয়ে যান। সেই টাকা বিশু লোকের উপকারে কাজে লাগায়। বড়ো অবাক হয়ে ভাবি, ছোটো বয়সে এতবড় মন সে পেল কোথা থেকে? স্কুলের দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় আমাদের চার বন্ধুর বাড়ির গার্জেনরা শলা পরামর্শ করে হোষ্টেলে থাকার কথা বললেন। দায়িত্ব নিলো বিশু। কিন্তু হেড মাষ্টারমশাই বললেন, সেশনের মাঝে হোষ্টেল পাবি না। ঘর ভাড়া নিয়ে চারজনে থাক। পরীক্ষা এসে গেছে। কাছাকাছি থাকিস তিনটি মাস। রেজাল্ট ভালো হবে। ঘুরে ঘুরে অবশেষে ভাড়া ঘর পেলাম। কিন্তু বাড়িওয়ালার পাশের প্রতিবেশি বললেন, সাবধান ওই বাড়িতে ভূত আছে। আমরা ভয় পেয়ে তিনজনে বলেুু উঠলাম, তাহলে অন্য ঘর দেখি চল।
 

পাঁচ

বিশু বললো, টাকা দেওয়া হয়ে গেছে। ভূতের বাড়িতেই থাকবো। বিশু যখন সঙ্গে আছে, ভয় কি তোদের।
তার অভয় বাণী ভরসা করে আমরা মালপত্তর নিয়ে ঢুকে পড়লাম লড়াইয়ের কোর্টে। ক্যাপটেন বিশু বাড়িটা এক চক্কর পাক দিয়ে হাতে একটা লাঠি নিয়ে বললো, চলে আয় ভূতের বাচ্চা। আমরা ওর সাহস দেখে অবাক হতাম। রমেন বলে উঠলো, ভূতের শেষ দেখে ছাড়বো। জীবনের মরণের ভয় একটু বেশি। সে কাঁপা গলায় বলে উঠলো, যদি গলা টিপে ধরে ভূত। বিশু বললো, ভয় নেই, আমি একাই একশো। তোর কিছু হবে না। হলে আমার হবে। 
এই বাড়ির নিচু তলায় কিছু অসামাজিক লোকের কাজকর্ম বিশু এক সপ্তাহের মধ্যেই টের পেয়ে গেলো। তারাই এই ভূতের ভয় দেখায়। একদিন জীবন বাথরুম গেছে এমন সময় নাকি সুরে একজন বলে উঠলো, এঁখান থেকে পাঁলা। ঘাড় মটকে দেবো। আবার একদিন রমেন ভয় পেলো। ঠিক সেই বাথরুমে। বিশু তদন্ত করে দেখলো বাথরুমের ভেন্টিলেটার ভেঙ্গে একটা সরু দড়ি ঢোকানো হয়েছে। বাইরে গিয়ে দেখলো দড়িটা নিচের ঘরের বারান্দায় শেষ হয়েছে। বাথরুমে ভাঙ্গা কাঁচে টান পরলে বিকট আওয়াজ হয়। আর মুখ বাড়িয়ে মুখোশ পড়ে নাকি সুরের কথায় সকলেই ভয় পাবে। বিশু বললো সবাই তৈরি থাকিস। আজ রাতেই ভূত ধরবো।

আজ আর কেউ স্কুল গেলাম না। একটা উত্তেজনা রাতে জাগিয়ে রেখেছে। এবার সেই বিকট শব্দ। বিশু বাঘের মতো লাফিয়ে লাঠি হাতে নিচের তলায় গিয়ে জলজ্যান্ত ভূতের পাছায় লাঠির আঘাতে ভূতকে কাবু করে ফেললো। ভূত বাবাজি জোড় হাতে বলছে, ছেড়ে দাও বাবা আমি আর ওসব করবো না। ভূতের সঙ্গিরা সব পালিয়েছে, আমাদের হাতে লাঠি দেখে। বিশু বললো, যাও, যেখানে বিশু আছে সেখানে চালাকি করার চেষ্টা কোরো না। বিপদে পড়বে।
তারপর থেকে আর কোনোদিন ভূতের উপদ্রব হয়নি সেই বাড়িতে।
বিশুর বাহাদুরি দেখেই আমরা সাহসী হয়ে উঠেছিলাম। বিশুর সঙ্গে আমরা বেরোলে সকলের চোখেমুখে একটা সাহসের, শান্তির ছাপ ফুটে উঠতো। পাড়ার কোনো মানুষ বিপদে পরলে বিপদের বন্ধু এই টাইগার বিশুকেই স্মরণ করতো। তার সঙ্গে আমরা তো থাকতাম অবশ্যই। রমেন, জীবন, বিশু, আমি একবার বন্যার সময় নৌকা করে মানুষের খাবার জোগাড় করতে চড়খী গ্রামে গিয়েছিলাম। হেলিকপ্টার থেকে চিড়ের বস্তা, গুড়ের বস্তা ফেলছে চড়খীর ব্রীজে যার আসল নাম কাশীরাম দাস সেতু। সেখান থেকে আমরা চিড়ে, গুড়ের পাটালি নৌকায় তুললাম। রমেন পেটুক। বললো, একটু টেষ্ট করলে হয় না। বিশু বললো, এখন এটা সকলের সম্পত্তি। যা হবে সকলের সামনে হবে। কেউ হাত দিবি না। এখন তাড়াতাড়ি চল। বান বাড়ছে। বিশু দাঁড় টানে আর আমরা সবাই সাহায্য করে নৌকা ও খাবার নিয়ে চলে এলাম নতুন পুকুরের পাড়ে। সেখানে বাড়ি বাড়ি সকলকে সমানভাবে খাবার ভাগ করে দিলো বিশু। তারপর আমরা বাড়ি এসে জীবনের মায়ের হাতের রান্না, গরম খিচুড়ি আর পেঁপের তরকারি খেলাম। অমৃতের স্বাদ। বিশু বললো, কাকীমা অনেক পেঁপে গাছ পড়ে গেছে বন্যার স্রোতে। আমরা আপনাকে অনেক পেঁপে এনে দেবো। সেবার বন্যায় পেঁপে, গ্রামের লোকের প্রাণ বাঁচিয়েছিলো। আমাদের গ্রাম অজয় নদীর ধারে। গ্রামগুলিও খুব নীচুস্থানে অবস্থিত। নদীর নাব্যতা বা গভীরতা অল্প। ফলে বন্যা প্রায় প্রতি বছর দেখা দিয়ে যেতো। জল যখন কমে যেতো তখন তোতনের মা ও পাড়ার মা বোনেরা মাঠে মাছ ধরার জন্য যেতো। নানারকমের শাক, ঢোল কলমি, শুশুনি তুলতো। খুব ভালো লাগতো নানারকমের মাছ ভাজা খেতে। আমি দেখলাম, তোতনের মা মাঠ থেকে দুই তিন রকমের শাক তুলেছে। ওরা ভিটামিন বোঝে না, শরীরচর্চ্চাও বোঝে না। ওরা জানে খাটবো, রোজগার করবো আর খাবো পেট ভরে। মাঠেই পাওয়া যেতো বেশির ভাগ শাক, সব্জী। খলসে, ওআরও নানারকমের মাছ মাঠের জলে সাঁতার কেটে বেড়াতো। বেলে, তে চোখো, চ্যাঙ, ছিঙুরি, গচিমাছ ছাড়াও ছোটো কাঁকড়া তাল কাঁকড়া পাওয়া যেতো। গর্তে হাত ঢুকিয়ে বিশু অনরকবার তআল কাঁকড়া বের করে আমাদের দেখিয়েছে। পাঁকাল, গুঁতে, কৈ, মাগুর, ল্যাটা প্রভৃতি অসংখ্য মাছ। বিত্তি পেতে দিতো স্রোতের মুখে।

বিশু বলছে, খাল কেটে মাঝখানে বিত্তি পেতে জল যাওয়ার নালা কেটে দিতো। মাছ লাফিয়ে ওই গর্তে পড়তো। টানা জাল, পাতা জাল দিয়ে মাছ ধরতো। এখন তোতনের মায়ের জায়গায বৌমা মাঠে যায়। কিন্তু কৃষিকাজে সার, ওষুধ প্রয়োগ করার ফলে সেইসব মাছ ইতিহাসের পাতায় চলে গেছে। শাকপাতাও পায় না মা বোনেরা। এখন সব বাজারমুখী। তখন শাক আঁচলে করে নিয়ে গিয়ে বাউরীবউ মুড়ি নিয় আসতো চাষি বাড়ি থেকে। মাঠের টাটকা শাক সবাই নিতো জলের দরে।  আজ আর টাটকা কিছু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
বিশুর কথা একশো শতাংশ সত্য। এখন আমরা বড় হয়ে গেছি। কিন্তু, স্বর্ণ যুগের সেইসব স্মৃতি মনের মণিকোঠায় চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

বিশুর কথা ভোলা যায় না। স্কুলের বন্ধু হলেও হৃদয়ের মণিকোঠায় চিরদিনের মতো ঠাঁই করে নিয়েছে সে। জোর করে কারও হৃদয় দখল করা য়ায় না। তার জন্য নীল আকাশের মতো হৃদয়ের প্রসারতা চাই। বললো,অনুপম। অনুপম তার দলবল নিয়ে স্কুল থেকে ছাত্রদের ও ছাত্রীদের পুরী বেড়াতে নিয়ে গিয়ে ছিলো। অনুপম জনপ্রিয় ভালো গৃহশিক্ষক। একটা ঘর ভাড়া করেছিলো শহরে। অনুপমের বয়স বত্রিশ বছর। ছাত্রদের বলতো, স্যার বলবি না। ওসব ভালো লাগে না। দাদা বলবি বা নাম ধরেও ডাকতে পারিস। অন্তরের ভালো লাগা বা শ্রদ্ধা থাকলেই অনেক। যদি তোদের মধ্যে একটা হৃদয়ে জায়গা হয় আমার সেটাই যথেষ্ট। গুঁতিয়ে হরিনাম হয় না রে। সামনে ভক্তি আর পেছনে গালাগালি। পছন্দ করি না কাকা। 
ছাত্রদের মধ্যে বিশু খুব ডানপিটে ছেলে। অনুপম দাদা বাথরুমে গেলেই তার আলনায় ঝোলানো জামার পকেট থেকে সিগারেট বের করে খেতো। অনুপম জানতো। কিছু বলতো না। পড়ানোর সময় বলতো, সিগারেট খেলে ক্যানসার হয়, ধর্ষণ করলে ফাঁসি হয়। তবু কিছু মানুষ এগুলো ভুলে যায়। সাবধান। শুধু পড়াশোনা নয়। মানুষ হতে হবে।
বিশু পুরী বেড়ানোর দলে ক্যাপটেন। অনুপম ছেলে মেয়েদের দেখাশোনার দায়ীত্ব বিশুর ওপর দিয়েছে। তাদের জন্য জান দিতেও পিছুপা হবে না বিশু, একথা সবাই জানে। 
ট্রেনের সিট খুঁজে সবাই উঠে বসলো জগন্নাথ এক্স্প্রেস। ঠিক পরের দিন দশটার সময় পৌঁছে গেলো পুরী হোটেলে। সেখানে একটা সুন্দর ফুলের বাগানে তারা অনেক ছবি তুললো। রবি একটা ফুল তুলেছে। গোলাপ। হোটেলের মালকিন ডেকে পাঠালেন স্যারকে। বললেন, হাজার টাকা ফাইন দিতে হবে। যারা ফুলের মর্যাদা দিতে জানে না, গুণীজনের মান দিতে জানে না, তাদের শাস্তি হওয়ায় উচিত। স্যার অগতির গতি বিশুকে ডেকে পাঠালেন। বিশু এসেই ম্যাডামকে বললো, ম্যাডাম আমাদের দলে একটি ছেলে ভুল করেছে। ভুল তো মানুষের হয়। কিন্তু আপনি তার থেকে বড়ো ভুল করতে চলেছেন।

- কি রকম ভুল?

- আপনি গোলাপের চারায় পিঁপড়ের সারি দেখেছেন?
- কই না তো?
- আমি কিন্তু প্রথমেই দেখেছি এবং সকালবেলা দোকান থেকে গ্যামাক্সিন পাউডার কিনে এনেছি। পিঁপড়ে মারার বিষ।
- দেখলে আমিও আনতাম। দিন ছিটিয়ে দিন। একবেলাতে মরে যাবে।

- হ্যাঁ, আপনার ফাইন কতো?
- না, না আর দিতে হবে না। ফুল যে ভালোবাসে। তা ব্যাথা বোঝে, আমি তাকে শ্রদ্ধা করি।

এমনি কত সমস্যা যে বিশু চুটকিতে সমাধান করে দিতো তার ইয়ত্তা নাই। নুলিয়াদের সঙ্গে সমুদ্রে স্নান করতো। সে যেনো সমুদ্রের সন্তান। কত সখ্য জলের সঙ্গে। ভাসিয়ে রাখতো তাকে মায়ের আদরে। ঝুলু, মিলু জিজ্ঞেস করতো, আমরা কেন ওর মতো হতে পারি না। ম্যাডাম বলেছিলেন, ওসব মন কোটিতে গুটি। ওসব মনের তল পেতে গেলে নিজেকে রাঙিয়ে নিতে হবে ওর হৃদয় রঙে।

তারপর আমরা ফিরে এসেছিলাম। আমরা প্রত্যেকে উপহার দিয়েছিলাম আমাদের প্রাণের বিশুকে। দুদিন পরে দেখলাম ও সব উপহার বিলিয়ে দিচ্ছে বায়েনপাড়ার বন্ধুদের।

বিশু ও আমরা তখন, বিল্বেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার বন্ধু ছিল অনেক। তার মধ্যে সর্দার ছিলো বিশু। এখন যার কথা বলবো তার নাম অলক। বাড়ি তার কোমডাঙ্গা। স্কুলে যত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো তার প্রধান দায়ীত্বে থাকত আমাদের দলের প্রধান বিশু। আর কান টানলেই মাথা আসে। হাত বাড়ালেই বন্ধুদল হাজির। বিশু মানেই আমরা সবাই। আমাদের বন্ধুরা এই পরোপকারী নির্ভিক নেতার ভক্ত।

​

ছয়

স্কুলে ঠিক হলো এবার রবীন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠান হবে সন্ধ্যাবেলায়। নাটক, আবৃত্তি, গান সব হবে। হষ্টেলের ছেলেরা বললো, বিশুদা তোমাকে থাকতে হবেই। বিশু বন্ধুদের কথা ভেবে বললো, আমাদের বাড়ি অমেকদূর।প্রায় চার ক্রোশ দূরে। হেঁটে আমরা যাওয়া আসা করি দিনেরবেলা বলে সম্ভব।
মাষ্টারমশাই বললেন, বিশু তুমি আর তোমার দলবল থাকবে। তোমাদের ছাড়া অনুষ্ঠান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। প্রয়োজনে রাতটা হষ্টেলে কাটাবে।
বিশু বললো, তাই হবে স্যর। অসুবিধা হবে না। তবে রাতে থাকা যাবে না।
- কেন? কি এমন রাজকাজ আছে তোমার?

- স্যর, আমার গ্রামের ডোম পাড়ার তিন বুড়ির কাছে আমি রাতে থাকি। তাদের সুবিধার জন্য রাতে আমি কোথাও থাকি না।

মাষ্টারমশাই বিশুকে চেনেন, জানেন। চোখের জল আড়াল করে বললেন, বেশ তাই হবে।

তারপর চলে এলো ২৫শে বৈশাখ। দিনেরবেলা বলা হলো সকলের বাড়িতে। দুপুরে ঘুমিয়ে নিলাম সবাই।তারপর সকলকে সঙ্গে করে বিশু চললো স্কুলে। কোমডাঙ্গার অলক চলে এলো আমাদের সঙ্গে। আলপথে হেঁটে চলে এলাম কাঙরা গাবা। সেখানে একটা কাঁদর। তার পাশে একটা ঝুড়ি নামা বটগাছ।দিনের বেলাতেই জায়গাটা অন্ধকার। বিশু বললো আমি রাতে ফিরবো। তোরা হষ্টেলে থেকে যেতে পারিস। আমি বললাম, না আমরা সবাই বাড়ি ফিরবো। বিশু বললো, তাই হবে।

তারপর কাঁদর পেরিয়ে চলে এলাম হেঁটে স্কুলে। তারপর কাজ শুরু হলো। বিশু ঘোষকের ভূমিকায়।বড় সুন্দর অনুষ্ঠান পরিচালনা করে বিশু। প্রথমে লীলা উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করলো, আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে"। তারপর সভাপতি নির্বাচন। প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, প্রধান অতিথি বরণ হলো। সকলে কবিগুরুর গলায় মালা দিলেন। তাঁর সম্বন্ধে দু চার কথা বললেন। 
আমি বললাম, সভাপতি নির্বাচন আগে করলে হত না। বিশু বললো, জানি সব জানি। তবে কি জানিস, আমার প্রিয় কবির জন্মদিনে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো করার মত তাঁকে আগে বরণ করলাম। বাংলার মাষ্টারমশাই বললেন, তুই বিশু যাই করিস আমাদের ভালো লাগে। চালিয়ে যা। তারপর নাটক হতে হতে রাত দশটা বেজে গেলো। বিশু তাড়াতাড়ি স্যারের হাতে দায়ীত্ব দিয়ে আমাদের কাছে চলে এলো। হষ্টেলে খাওয়া হলো। তারপর বেড়িয়ে পড়লাম বাড়ির উদ্দেশ্য।

আমরা দুটো হ্যারিকেন এনেছিলাম। রতন বললো, বিশু হ্যারিকেন দুটো জ্বালিয়ে নি। বিশু বললো, অনেকটা পথ। দুটো হ্যারিকেন একসাথে জ্বালাস না। একটা হলেই হবে। আমি সামনে থাকবো। আর সাপ খোপ আছে। সবাই পা ফেলবি পরিষ্কার জায়গায়।
তারপর বিশু সামনে আর আমরা পিছনে। বেশ দ্রুত হাঁটছি আমরা। খিড়কি পুকুর, বটতলার মাঠ, তেমাথার মাঠ পেরিয়ে আমরা চলে এলাম কাঙরা গাবায়। এখানে একটা কাঁদর আছে। ছোটো নদীর মত। এবার পার হতে হবে। আমরা গামছা পড়ছি এমন সময় দেখলাম অলক প্যান্ট জামা পরেই জলে নামছে। বিশু বললো, অলক তুই সাঁতার জানিস না। পাকামি করিস না।
বিশু ছুটে গিয়ে অলককে ধরতে গেলো আর সঙ্গে সঙ্গেই এক বিকট হাসি অলকের মুখে। যে অলক সাত চরে রা কাড়ে না সেই অলক ভূতুড়ে হাসি হাসতে হাসতে কাঁদরের জলের উপর দিয়ে হেঁটে পার হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমি বললাম, বিশু অলক কই? বিশু বললো, এই কাঙরা গাবায় ভূত আছে। এসব তার কাসাজি। শুনে রতন ও আমি বু বু করতে লাগলাম ভয়ে। বিশু বললো, চল ওপাড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই। আমরা কাঁপতে কাঁপতে জল পার হয়ে ছুটে চলে গেলাম অনেক দূরে। বিশু বললো, হ্যারিকেন দুটো ফেলে এসেছি। চল নিয়ে আসি। আমরা বললাম, বিশু তোর পায়ে পড়ি বাড়ি চল। হ্যারিকেন চুলোয় যাক।

তারপর বিশু ও আমরা অলকের বাড়ি গেলাম। বাড়ি যেতেই ওর বাবা বাইরে এলেন। বিশু বললো, কাকু অলক ফিরেছে। কাকু বললেন, না তো। সে কোথায় গেলো। বিশু সব ঘটনা খুলে বললো।কাকু বললেন, চলো আমরা সবাই থানায় যাই। সেখানে একটা খবর দেওয়া দরকার। আমি জানি কাঙরা গাবায় তেনারা থাকেন। রাতে তোমাদের যাওয়া ঠিক হয় নাই গো।

থানায় মেজবাবু সব শুনে বললেন, কাল সকাল অবধি অপেক্ষা করুন। দেখা যাক লাশ পেলেই সব বোঝা যাবে।
বিশু বললো, ও মরে নি। হাওয়ায় উড়ে গেছে। মেজবাবু বললেন, ঠিক আছে। সব কথাই শুনে রাখলাম। দেখা যাক এটা নিশি ভূতের কাজ কি না?
থানা থেকে বেড়িয়ে আমরা সবাই অলকের বাড়িতে থাকলাম আর বিশু চলে গেলো তার নিজের কাজে।ও বললো, সকালবেলা আমি আপনার বাড়ি চলে আসবো কাকু। আপনি চিন্তা করবেন না। নিশি ভূত কাউকে প্রাণে মারে না।
এই বলে সে চলে গেলো ডোম পাড়ার বুড়িমার কাছে।
কাকু বললেন, বিশু ঠিক বলেছে। আমার অলক ঠিক ফিরে আসবে।
তখন কোনো মোবাইল ছিলো না। ল্যান্ড ফোন দু একটা বাড়িতে ছিলো। বিশু সকলের বাড়ি গিয়ে বলেছিলো, ওরা সবাই অলকের বাড়িতে আছে। কাল দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ করেছেন কাকু।বিকেলে সবাই চলে আসবে।

আমরা সবাই রাত জেগে গল্প করে কাটিয়ে দিলাম। অলকের বাবা লিকার চা করে খাওয়ালেন। ধীরে ধীরে পূব আকাশে সূর্য উঠলো। সব ভয় সরে গিয়ে আলো ফুটে উঠলো।

সবাই আমরা উৎকন্ঠা নিয়ে বসে আছি। কখন আসবে বিশু। ঠিক সকাল দশটায় পুলিশের গাড়ি চলে এলো গ্রামে। আমরা সবাই অবাক হয়ে দেখলাম পুলিশের গাড়ি থেকে নামছে অলক। এর মধ্যে বিশুও হন্ত দন্ত হয়ে আমাদের কাছে এসে বললো, যাক কাকু, অলক এসে গেছে। মেজবাবু কাকুকে বললেন, এটাই আপনার ছেলে অলক তো?
- হ্যাঁ স্যার।
- আমাদের থানার আশেপাশে ঘুরতে দেখে ওকে নিয়ে এলাম। আমাদের স্থির বিশ্বাস ছিলো এটা অলক। ওর মুখে সব কিছু শুনলে বুঝতে পারবেন ওর সমস্যা। যাই হোক, আমরা আসি।
পুলিশের গাড়ি চলে গেলো। প্রায় দুঘন্টা হলো অলক ঘুমিয়ে আছে। দুপুর একটায় ওর ঘুম ভাঙ্গলো। বিশু জিজ্ঞাসা করলো, তোর কি হয়েছিলো বল তো অলক?
অলক বলতে শুরু করলো তার অলৌকিক কাহিনী।

সে বললো, আমরা সবাই যখন কাঙরা গাবায় কাঁদর পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি তখনই আমাকে খনা গলায় নিশি ভূতটা বললো, কি রে তোর বাড়ি গিয়ে ডাকলাম। সাড়া পেলুম না। তাই গন্ধ পেয়ে এখানে এলাম। চল আমার সঙ্গে তোকে হাওড়া ব্রীজ দেখিয়ে আনি। আমি বললাম,এই রাতে বন্ধুদের ছেড়ে আমি হাওড়া যাবো না। নিশিটা বললো,যা বলবো শুনবি। তা না হলে উঁচু থেকে ফেলে দেবো। আমি আর ভয়ে কথা বলিনি। নিশি আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেলো হাওড়া ব্রীজে। আমি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। তারপর যখন নিশিটা আমাকে নিচে নামালো তখন জ্ঞান এলো। নিশি বললো, কেমন লাগছে। কি খাবি বল। তারপর আবার বললো, গঙ্গার জলে সাঁতা কাটবি নাকি?
আমি বললাম, আমি সাঁতার জানি না।
নিশি বললো, আমি থাকলে ওসব কিছু দরকার হয় না। এই বলে আমাকে ওপর থেকে গঙ্গার বুকে ঝুপ করে ফেলে দিলো। তারপর জামাটা মুঠো করে পুুতুলের মত তুলে নিয়ে ওপরে এলো। আমি ভাবলাম, আমার জীবনের শেষ দিন আজকে। নিশি মনের কথা জানতে পেরে বললো, আমরা প্রাণে মারি না কাউকে। শুধু ঘুরে বেড়াই। কাজ করি। তারপর দিনের আলো ফুটতেই নিশিটা পালিয়ে গেলো।

আমি দেখলাম একজন ভদ্রলোক আমার হাতে একশো টাকা দিলেন। তিনি বললেন, তোমাকে দেখে তো ভালো ছেলে মনে হচ্চে। তা তুমি এখানে কেন?
আমি বললাম, আপনি বিশ্বাস করবেন না আমার কথা। আমাকে নিশি ভূতে এখানে এনেছে।
ভদ্রলোক বললেন, আমি বিশ্বাস করি। তুমি সাবধানে যাবে।
আমি বললাম, আমাকে কাটোয়ার ট্রেনে চাপিয়ে দেবেন।
ভদ্রলোক বললেন,নিশ্চয়। ভোর চারটে পাঁচের ট্রেনটা পাবে চলো।
আমি তার সাথে চলে গেলাম। তিনি বললেন, মর্নিং ওয়াকে এই পথেই আমার আসা যাওয়া। তাই তোমার সঙ্গে দেখা হলো। যাও আর কোথাও নাববে না। সোজা বাড়ি চলে যাও।
অলক বললো, বুঝলাম অনেক ভালো লোক কলকাতায় আছেন। তারপর ট্রেন থামলো থানার কাছের স্টেশনে। সেখান থেকেই পুলিশ আমাকে ধরে আর এখানে নিয়ে আসে।
অলক আবার বললো, আমি আরও একটু ঘুমোবো। কাকু বললেন, ভাত খেয়ে নে। অলক বললো,পরে খাবো।
অলক খেলো না বলে বিশু ও আমরা না খেয়ে চলে এলাম। কাকু আর জোর করেন নি।  

ছোটো থেকে বড়ো হলো। সত্যি কি বড় হলো।
বন্ধুর বলতো ওর বয়স বেড়েছে, মনটা কিন্তু শিশুর মতো রয়ে গেছে। ছোটোবেলায় কেউটে সাপ ধরা, গঙ্গা সাঁতার কেটে পেরোনো, গ্রামে গিয়ে ভূত ধরা সব মনে পরে বন্ধুদের। বাউড়ি বৌকে নিজের খাবার দিয়ে দিতো বিশু। সেই বিশু আজ নিজে একমুঠো খাওয়ার জন্য ছাত্র পড়ায়। বিয়ে করেছে সে।একটা কন্যা সন্তান হয়েছে। তারা গ্রামের বাড়িতে বড়দার কাছে থাকে। বড়দাকে মাসে পাঁচশো টাকা দিয়ে আসে। বিশু বাসা ভাড়া করে থাকে শহরে। একটা বোতল আর বিছানা তার সম্পত্তি। খাওয়াটা বেড়ার সস্তার হোটেলে সেরে নেয়। একটা ট্রেনের যাত্রীর মত তার জীবন। তবু তার মনে আনন্দের অভাব ছিলো না। আনন্দের ফেরিওয়ালা সে। কারও কোনো অসুবিধা হলেই তার ডাক পড়তো আগে। এবার বিশু চললো গঙ্গার ধারে নীলুদার আশ্রমে। নীলুদা বললেন, ওই তো সামান্য রোজগার। নিজেই সব খেয়ে নিলে পরিবারকে খাওয়াবি কি?
বিশু বললো, দাদা, তোমার ঘাড়ে বোঝা হয়ে যাবো আমি। তুমি সাধক মানুষ। তোমার অসুবিধা হবে না তো? নীলুদা বললেন, আমি ওসব বুঝি না। যদি আমি খেতে পাই। তোরও একমুঠো হবে। যা ওপরের ঘরে যা। রাত হোলো। বিশুর ঘুম আসে না, গঙ্গার ধারে ওপাড়ে মরা মানুষ পুড়ছে।শবদেহের পোড়া গন্ধ ভেসে আসছে। হঠাৎ বিশু শুনতে পেলো, কিঁ রেঁ, ভয় পাঁচ্ছিস? বিশু তাড়াতাড়ি নীচে নেমে এলো। নীলুদা বললেন, কি রে ঘুম আসছে না? এই নে খা। তারপর গিয়ে শুয়ে পড়। মোরোব্বা খেয়ে ঠাকুরকে প্রণাম জানিয়ে বিশু শুয়ে পড়লো। ঘুম ভাঙ্গলো একদম সকালে। সকালে হরিনাম শুনলো। মন্দিরের সিঁড়িতে জল দিয়ে ধুয়ে ফুল রাখলো। তারপর চলে গেলো ছাত্র পড়াতে। সেখানে চা বিস্কুট খেলো।
পরপর বারোটা অবধি ছাত্র পড়াতো। যেসব ছাত্ররা স্কুলে যেতো না, তারা ফোন করে ডেকে নিতো বিশু মাষ্টারকে। ছাত্রদের সঙ্গ তার ভালো লাগতো। তবে দু একটি বাড়িতে ছাত্রের অভিভাবক বসে থাকতেন। পড়ানো পরখ করতেন। তারওপরই মাষ্টারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করতো। একবার এক বড়লোকের বাড়িতে মালকিনের ধমকে সে অপমানিত হয়ে পড়ানো ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলো।কারণ, ছাত্র প্রথম স্থান অধিকার করতে পারে নি। বিশু বলেছিলো, এবার পারেনি, আসছে বার পারবে নিশ্চয়। মহিলা বলেছিলেন, সরকারি চাকরি পাবে না, সেকেন্ড হলে। ফার্ষ্ট হতে হবে। আমি অন্য মাষ্টার দেখবো। বিশু ছেড়ে দিয়েছিলো পড়ানোটা। তারপর এলো সুখবর। নীলুদা বললেন, তুই মায়ের সেবা করে যা। মা তোকে দেখবেন। সত্যি, মা দেখেছিলেন। জীবনের কঠিন সময়ে মা সত্যিই একটা পার্শ্বশিক্ষকের চাকরী পাইয়ে দিয়েছিলেন। বিশুর ভাই খবর পাঠালো, দাদা গ্রামের স্কুলে দু হাজার টাকায় পার্শ্ব শিক্ষক নেবে। তুমি আ্যপ্লাই করো। বিশু পেয়ে গিয়েছিলো চাকরীটা।টিউশানির থেকে ভালো। মাইনে কম হলেও নিশ্চয়তা আছে। বিশু বন্ধুদের বললো। বন্ধুরা বললো, তুই সকলকে সাহায্য করিস। তোর কোনোদিন অভাব হবে না। মানুষের আশীর্বাদ তোর সঙ্গে আছে। তারপর নীলুদার আশীর্বাদে বিশুর নিজস্ব বাড়ি হোলো। আর বাসা বাড়ি নয়। নিজের বাড়িতে নিয়ে এলো মেয়ে আর বৌকে। চারদিকে বাঁশের বেড়া। কাছেই একটা গরীব পাড়া আর একটা পুকুর। সাপের রাজত্ব। সেখানে ঘর বাঁধলো বিশু। একবার রাতে বিরাট এক গোখরো ঢুকে পড়লো বিশুর ঘরে। ফণা তুলে ফোঁস ফোঁস করছে সাপটা। মশারির ভেতরে বৌ আর ঘুমন্ত কন্যা। বিশু এক হাতে লাঠি নিয়ে ফণা চেপে ধরলো সাপটার। আর অন্য হাতে সাপের লেজ ধরে ঝুলিয়ে নিয়ে এলো বাইরে।
তারপর বনের ভিতর ছেড়ে দিলো সাপটা। রাত হলেই তার উঠোন দিয়ে চলাচল করতো নানারকম সাপ। ডোমনা চিতি, শাঁখামুটি, চন্দ্রবোড়া, গোখরো কিছুই বাদ ছিলো না। সকলে বলতো মাঝমাঠে বাড়ি করলে ওইরকমই হয়। বিশু কি করে বোঝাবে, সে প্রকৃতির সন্তান। এই বন, জঙ্গল, সাপ তার বড় প্রিয়। সে সবাইকে নিয়ে আনন্দে থাকতে চায় না। কিন্তু মানুষ, সবাইতো আর সমান হয় না। প্রতিবেশিদের একজন তাকে শিক্ষা দিতে চায়, গাড়ি, বাড়ি আর নারী, ভেবেচিন্তে নিতে হয়। বড় নিষ্ঠুর কিছু মানুষ। গাড়ি, বাড়ি জড় পদার্থের সঙ্গে মায়ের তুলনা করে। বিড়বিড় করে সে। মনে ভাবে, আমি বিশু, আমার সামনে যা তা কথা বলে পার পেয়ে যায় এখন মানুষ। কিন্তু জানে না, এই বিশু ওদের শায়েস্তা করতে পারে এক মিনিটে। কিন্তু সময় বড় বিচারক। সে আজ বিশুকে কঠিন লড়াইয়ে নামিয়ে দিয়েছে। জীবনে টিকে থাকার লড়াই। এই যুদ্ধে ক্রোধের জায়গা নেই। ক্রোধকে জয় করার লড়াইয়ে জিততে হবে। তবেই হবে তার জয়।

সে এখন তার বাড়িতে অনেক ফুল গাছ লাগায়। আর অনেক ফুলের মাঝে সে সহজ হয়ে যায়।
ভাটফুল, ঢোল কলমি,পাহাড়ি কলমির ফুলের ঘ্রাণে, প্রাণে ভারতবর্ষের নির্মল সুন্দর গন্ধ ভেসে ওঠে। সুবাসে মন মাতোয়ারা। বসন্তের রঙ বাহারি ফুলের গানে হৃদয় দুলে ওঠে বিশুর।
ফল গাছের মাঝে বসে সে ভাবে পুরোনো দিনের কথা। সে জানে, change is the only constant in the world.
বিশু ভাবছে পুরোনো দিনের কথা, শীতকালে বন্ধুরা গোল হয়ে বসতাম।মাঝখানে জ্বলতো আগুন। পাতা চোতা কুড়িয়ে দিতাম আগুনে। আগুন নিভতো না। সেই আগুনে সেঁকে নিতাম হাত পা। আবার বাড়িতে গিয়ে মায়ের রান্নাঘরে মাটির তৈরি উনুনে সেঁকে নিতাম শীতল হাত, পা। মা সরজুগুলি, পিঠে বানাতেন। উনুনের ধারে বসে নলেন গুড়ের সঙ্গে আয়েস করে খেতাম। পায়েস খেতাম শেষ পাতে। রকমারি খাবারের সুগন্ধে মৌ মৌ করতো মায়ের হেঁসেল ঘর। পালো, বলে একরকমের খাবার মা বানাতেন যত্ন করে। সকালে উঠেই পালো খেয়ে ভুরিভোজ সারতাম। তারপর পিঠে রোদ লাগিয়ে সরব পড়া। বোঝার থেকে চিৎকার হতো বেশি। আনন্দ পেতাম সরব পড়ার প্রতিযোগিতায়। পাশের বাড়ির বন্ধুদের সরব পাঠের আওয়াজ পেলেই, ততোধিক জোরে শুরু করতাম পাঠ। স্কুলে গিয়ে তার আলোচনা হতো ক্লাসে। আরও জোরে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিযোগিতা চলতো মাসের পর মাস। কোনো দুঃখ, কষ্ট আমাদের মনে রেখাপাত করতে পারতো না। জীবনের আনন্দ ছড়ানো থাকতো ধুলো জোড়া পথে। এই ধুলো, মাটির সুগন্ধ আমাদের ভারতবর্ষের প্রাণ। বিশু ভাবে, জন্মালাম মানুষ হয়ে অথচ মানুষের কিছু করতে পারলাম না, এই শোকে বিশু মনে মনে কাঁদে। বিশুর তার বন্ধু অলকেশকে ভোলে নি। সে বিশুর খুব প্রিয় ছিলো। অলকেশ শান্ত ভদ্র ছেলে। লেখাপড়ায় খুব ভালো। পরোপকারী। ভালো চাকরী করে। তার ভাই নিখিলেশ আরও ভালো চাকরী করে। বাবা পেনশন ভোগী। অলকেশের কাছেই বাবা, মা থাকেন।তারও এক কন্যা। আর আছে তার স্ত্রী। সেও স্কুল শিক্ষিকা। এই অবধি সব ভালো। হঠাৎ মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়লো। ধনেপ্রাণে মারার রোগ। পৃথিবীটা অলকেশের কাছে বড় শূণ্য হয়ে ঘুরতে লাগলো। জীবন অর্থহীন মনে হোলো। মাসে দুলক্ষ টাকা খরচ। তাহলে কিছুদিন মাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে। এখন কোন দিকে যাবে অলকেশ। সব আয় এক করেও তো মাসে দুলক্ষ হবে না। অলকেশের মা বললেন, আমাকে বাড়ি নিয়ে চ। আমার কিছুই হয় নি। মনের জোরের কাছে ক্যান্সার হেরে গেলো...। আজ দশ বছর পরেও অলকেশের মা জীবিত। বিশুর মুখে সত্য ঘটনা শুনতাম গল্প শোনার আগ্রহে। একবার বিশু তার মামার বাড়ি নিয়ে গেলো আমাদের। বিলের ধারে বনভোজনের জন্য বসেছি। এমন সময়ে, মুর্শিদাবাদের বিলে সত্তরজন লোক নিয়ে বাসটি জলে পরলো সেদিন ঠিক সেই সময়ে বিলের পাড়ে এসেছিলো প্রকৃতির সন্তান বিশু। তার মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে, বন্ধুদের নিয়ে। বাসটা জলে পরা মাত্র পাড়ে বাঁধা নৌকো খুলে মাঝিকে পাঠালো মাঝ বিলে। আর নিজে ডুব সাঁতারে প্রায় তিরিশ ফুট নিচে নেমে তুলে আনলো প্রাণ। আবার ডুব দিলো। এইভাবে প্রায় দশজনের প্রাণ বাঁচালো বিশু। নৌকায় তুলে, নিয়ে এলো বিলের পাড়ে। তাদের মধ্যে একজন মারা গেলো। আর বাকি নয়জনকে পাঠিয়ে দিলো হাসপাতালে। জনতা রেগে আগুন ধরিয়ে দিলো আর একটি বাসে। বিশু বললো, এসো আমরা সবাই প্রাণ বাঁচাই। আগুন ধরিয়ে কোনো সুরাহা হবে না। তার কথায় কাজ হলো। সবাই একত্রে বাঁচালো আরও প্রাণ। আর বাকি মানুষগুলো মরে ভাসতে থাকলো চোখের সামনে, মরা মাছের মতো। বিশুর চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল পরলো শান্ত বিলের জলে। জলের ভাষা পড়তে জানে বিশু। সে শুনতে পেলো, একটা পাগল বলছে, আমার তো অপরাধ নেই। শান্ত বুকে আছাড় মেরে মানুষ মারার দল টাকার লোভে আইন মানে না। রাস্তায় চলার নিয়ম জানে না। তবু তোমাকে আমি শ্রদ্ধা জানাই বিশু। তুমি প্রকৃতির সন্তান। এই পাগলটা বিশুকে খুব ভালোবাসতো। সে তাকে বলতো, তুই আমার ভগবান বিশু...। বিশু বলতো, ভগবান নই, আমি মানুষ। মানুষের জন্য তাই আমার হৃদয় কাঁদে। বিশুর বয়স বাড়ছে আমাদের বয়সের তালে তালে। কিন্তু তার মনের বয়স বাড়ে নি আমাদের মতো। কোনো বাচ্চাকে রাস্তায় দেখলে কোলে তুলে আদর করা, কুকুর ছানা দেখলে কোলে নেওয়া এখনও তার প্রিয় সখ। তার স্পর্শে সেজন ধন্য হয়ে যেতো। বিশু এখন দু একটা গান লেখে। আবার নিজের কন্ঠে গায়। তার গাওয়া গানে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। ভ্রমণবিলাসী চারজন বেরিয়ে পরলাম ভ্রমণে। আমিও গেলাম। প্রথমে ওরা গেল মুকুটমণিপুর। সপ্তাহান্তে পিকনিক বা একদিনে ছুটিতে কাছাকাছি বেড়ানো অন্যতম জায়গা হল মুকুটমণিপুর। আমি, বিশু, রজত দাস আর সোমা দুজন স্বামী স্ত্রী। আর দুজন বন্ধু মিহির আর রমা। বাঁকুড়া পৌঁছে রমা বললো, চলো আমরা এখন কিছু খেয়ে নি তারপর আমরা মুকুটমণিপুরে উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। রিমা জিজ্ঞাসা করল বাঁকুড়া থেকে মুকুটমণিপুর কত দূরে দাদা। মিহির বলল, প্রায় ৫৫ কিলোমিটার হবে। তারপর খেয়ে দেয়ে ওরা রওনা হল বাঁকুড়া থেকে বাসে করে মুকুটমণিপুরে উদ্দেশ্যে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরে তারা পৌঁছে গেল মুকুটমণিপুর। কংসাবতী নদীর তীরে অবস্থিত মুকুটমণিপুরে প্রাকৃতিক শোভা অনবদ্য। ঝাড়খন্ডের সীমানা ঘেঁষে মুকুটমণিপুরে রয়েছে দেশের বৃহত্তম নদী বাঁধ কংসাবতী। নদীর উপর বাঁধ দেখতে মানুষেরা ভিড় জমায়। তারা গিয়ে দেখল অনেক লোক আসে সাধারণভাবে নদীর তীরে পিকনিকের মজা নিতে। তারাও আনন্দ করতে মুকুটমণিপুর এসেছে। কংসাবতীর শীতল জলে স্নান করে ওদের পরিশ্রমের ক্লান্তি দূর হলো। আমি ও বিশু সেই দিনটা খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম নিয়ে পরদিন ভোর বেলায়  হতে, সূর্য ওঠা দেখতে গেলাম। কংসাবতীর বাঁধ থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার দৃশ্য অপূর্ব। আবার পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আলোয় কংসাবতী  তীরের সৌন্দর্য  দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যাবে। ঘরে এসে বিশুু আর রজত বলল আজ রাত্রিবাস করলেই বোঝা যাবে চাঁদের আলোয় কংসাবতীর তীরে সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য দেখতেই সবাই বেড়াতে আসে এখানে। আমরা সেখানে রাত্রি বাস করব।তারপর তারা চলে গেল লজে। রাত্রিবেলায় রজত সবাইকে নিয়ে বাইরে এল আর চাঁদের আলোয় সেই বাঁধের উপর হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। তাদের খুব ভালো লাগলো। রজত বলল- ওই নদীবাঁধ ছাড়াও মুকুটমণিপুরে আছে জৈনদের অন্যতম তীর্থস্থান কুড়িটি মন্দির সন্নিবিষ্ট পরেশনাথ পাহাড়, ডিয়ার পার্ক ঝিলিমিলি। মুকুটমণিপুরে একটি রাত্রি বাস করলে পরদিন ভোরে উঠে গাড়ি ভাড়া করে এই সমস্ত স্থান ঘুরে আসা যায়।নদীয়া জেলায় পঞ্চাশটির মত হরিণ শাবক সহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মিলবে। এখানে ব্যবস্থা আছে মুকুটমণিপুর থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান। এখানে উপজাতি সম্প্রদায় হাতের তৈরি ঘর সাজানোর সামগ্রী বিখ্যাত।মিহিরকে বাঁকুড়ার একটি লোক বলল মুকুটমনিপুরে রাত্রি বাস করার জন্য কয়েকটি হোটেল রয়েছে। মুকুটমণিপুর খুব একটা দুর নয়। তবে হাওড়া থেকে মুকুটমণিপুর যাওয়ার ট্রেন বাঁকুড়া ষ্টেশনে নেমে বাসে বা গাড়িতে যেতে হয়। আর সড়ক পথে যেতে হলে কলকাতা থেকে উনিশ নম্বর জাতীয় সড়ক দিয়ে মুকুটমণিপুর যেতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। ওখানে রাত্রি বাস করার পর সকাল বেলা উঠে ওরা ঠিক করল মায়াপুর যাবে। নবদ্বীপে মায়াপুরের দেখার জায়গা চৈতন্যদেবের জন্ম ভূমি। নবদ্বীপ তার প্রথম জীবনের লীলাক্ষেত্রও বটে। রিমা বললো আমার বহুদিনের শখ আমি ওখানে গিয়ে পুজো দেবো। মায়াপুরে গিয়ে আমি পুজো দিতে পারলে আমার মনস্কামনা পূর্ণ হবে। তাই বস্তুত হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম তীর্থক্ষেত্রে পরিগণিত হয় নবদ্বীপ ধাম। শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থান  আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হল মায়াপুর। কথা বলতে বলতে চলে এলো মায়াপুর। নবদ্বীপ থেকে বেরিয়ে গেল। নদীর তীরে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেখানে মন্দির। তারা আশ্রয় নিল নবদ্বীপের একটি লজে। পাশাপাশি রয়েছে এবং চৈতন্য সম্প্রদায়ের মিলনভূমি নবদ্বীপ। রমা বললো চলো আমরা নৌকায় যাব। নবদ্বীপ থেকে। তারপর চারজন মিলে জলঙ্গি নদী পেরোলেই মায়াপুর। জলঙ্গি নদীতে নৌকা আছে অনেক। সেখানে মাঝিদের বলে তারা নৌকাবিহার করল এবং সেখানেই রয়েছে বিখ্যাত চন্দ্রোদয় মন্দির। মায়াপুর যাওয়ার জন্য কথা বললে অবশ্য কিছুটা ভুল বলা হবে। রজত বলল, এটি আসলে হুগলি নদীর মিলনস্থল। রিমি বললো দেখো এই দুই নদীর মিলনস্থল দেখে বোঝা যাচ্ছে ভিন্ন রংয়ের জলের ধারা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা ঘিরে রয়েছে মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দির। ইসকন চত্বরে রয়েছে আরও মন্দির। সোমা বলল, আর কি কি মন্দির মন্দির আছে? গৌড়ীয় মঠের মন্দির গোস্বামী মহারাজের মন্দির প্রভুপাদের মন্দির আছে। এছাড়াও মন্দির চত্বরে কর্মীদের পাশাপাশি পর্যটকদের ব্যবস্থা আছে। এবার দেখা যাবে সন্ধ্যায় আরতি। সুন্দর আরতি দেখার পর রজত বলল-এই আরতি না দেখলে  মায়াপুর আসাটাই মনে হয় অসম্পূর্ণ থেকে যেতো। এ ছাড়া বিকেলে রাধামাধবের ছবি ফুল দিয়ে সাজিয়ে নামকীর্তনের সঙ্গে ভক্ত পরিবারের বিহার অসাধারণ। ওখানকার স্থানীয় একজন লোক রজতকে বলল যে সেবিকাদের মন্দির চত্বর পরিভ্রমণের অসাধারণ দৃশ্য দেখবেন। আর তাছাড়াও ইসকন মন্দিরের কথা তো না বললেই নয়। টিকিট কেটে এবং বিনামূল্যে দু রকম ভাবে পাওয়া যায়। টিকিট কেটে দুপুরের ভোগ পাওয়া যায় তার মধ্যে ভাত ডাল রুটি সবজি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের থাকে। আর কি কি থাকে আর বিনামূল্যে বিভিন্ন সবজি দিয়ে খিচুড়ি টিকিট কেটে বিভিন্ন পাওয়া যায়। তার চেয়ে যেন বেশি খিচুড়ি বিতরণ করা হয় তাই নবদ্বীপ মায়াপুর ইসকন মন্দির। মায়াপুরে একদিন কাটিয়ে ওরা চারজন চলে এলো অবিভক্ত বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে। বাংলার ইতিহাস ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে তাদের মূলত ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে প্রসিদ্ধ মুর্শিদাবাদ হাজারদুয়ারি। ইমামবাড়ী আজো বাংলার নবাবদের সাক্ষ্য বহন করে। মুর্শিদাবাদে থাকার জায়গা খুঁজে নিল তারা এখানে একা থাকবে। এখানে আসতে তেমন অসুবিধা হয়নি। নবদ্বীপ থেকে একদম চলে এসেছে মুর্শিদাবাদ বহরমপুর। ট্রেনে বাসে এখানে এসে গাড়ি করে তারা চলে এসছে হাজারদুয়ারি। হাজারদুয়ারিতে গাইড পাওয়া যায় অনেক একজন গাইড খুঁজে নিয়ে তারা ঘুরতে শুরু করলো, সেখানকার জলঙ্গী নদীর তীরবর্তী মতিঝিল পার্ক অন্যতম স্থান মুর্শিদাবাদ কাশিমবাজার দিল্লি চাঁদনীচক মার্কেটে। অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত রেশমি শাড়ি আপনারা এখানে কিনে নিতে পারেন। শিক্ষামূলক ভ্রমণের জন্য মুর্শিদাবাদ অদ্বিতীয়। হাওড়া থেকে শিয়ালদা হয়ে লালগোলা প্যাসেঞ্জার ট্রেন আছে। আপনারা এভাবেও আসতে পারতেন। মুর্শিদাবাদ দেখার পর পরের দিন রজত আর মিহির মিলে ব্যাগ কাঁধে করে চলে এলো বাসে। বাসে চাপল তারা। বাসে চেপে এখন তাদের উদ্দেশ্য হল তারাপীঠ যাওয়া। তারাপীঠ যেতে গেলে বাস ছাড়া গতি নেই এখান থেকে। তারা ভালোভাবে বাসের সামনে এসে বসলো বললো, হিন্দুদের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র তারাপীঠ। তন্ত্র সাধনার অন্যতম স্থান বললে ভুল হবে না। আজ অমাবস্যা রাতে জেগে ওঠে তারাপীঠ। তারাপীঠ মন্দির নির্মাণের ইতিহাস রয়েছে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান পেয়েছে সাধক বামাখ্যাপা। এটাই আমাদের ব্যাপার, জয় তারাপীঠ তারাপীঠ। তারাপীঠে অনেক পুরোহিত আছেন। তারা সবকিছু এখানকার পরিচয় দিয়ে থাকেন, তারা চেনেন সবকিছু। ওরা চারজন প্রথমে একটা থাকার জায়গা খুঁজে নিয়ে ব্যাগে রেখে নিয়ে ঘোরার জন্য বেরিয়ে পরলো একজন গাইডকে নিয়ে তারা ঘুরতে শুরু করলো তারাপীঠ। বামাক্ষ্যাপার জন্মভিটে থেকে ঘুরে আসা যেতে পারে তারাপীঠে গেলে।এখান থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। রাস্তা দিয়ে ভ্যানে করে আটলা যাওয়ার সময় প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করল তারা। সূর্যাস্ত দেখার মজা অসাধারণ। তারপর মন্দিরের পুরোহিত বললেন তারাপীঠের রাত্রি বাস করলে পরদিন ভোরে গাড়ি ভাড়া করে বক্কেশ্বর, মেসেঞ্জাের, নলাটেশ্বরী মন্দির ঘুরে আসতে পারবেন। তারাপীঠ থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নলাটেশ্বরী মন্দির ৫১ সতীপীঠ কথিত আছে। নলহাটিতে দেবীর গলার নলি পড়েছিল। নলাটেশ্বরীর অন্য আরেকটি শক্তিপীঠ প্রধান মহিষাসুরমর্দিনী মন্দির। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চলে আসে তাছাড়া ময়ূরাক্ষী নদীর উপর নির্মিত বাঁধ অন্যতম দর্শনীয় স্থান। বক্রেশ্বর গিয়ে রজতের সঙ্গে এক ব্যক্তির পরিচয় হয়েছিল। তিনি অকৃতদার। তিনি রজতকে খুব ভালবেসে ফেলেছিলেন। তিনি বললেন, আমার কেউ নেই তুমি আমার ছেলের মত। রজত বলল- আপনি কুড়িয়ে-পাওয়া বাবার মতন। তাই আপনার নাম দিলাম ধুলো বাবা। এই ধুলো বাবা কিন্তু রজতের শেষ দিন অব্দি সঙ্গী ছিল। ফিরে আসার সময় রজত বলল-আমার শ্বশুরবাড়ি সিঙ্গী চলো। আমরা কলকাতায় ফিরে যাব। সোমা বললো এই সুযোগে বাবা মাকে একবার দেখে নিতে পারব। তারা সিঙ্গীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো। রিমি বাড়িতে ব্যাগপত্র সব রেখে চারজনকে নিয়ে সবাই মিলে বেরিয়ে পড়ল ঘোরার জন্য।

কাশীরাম দাস এর জন্মস্থান। বড় মধুর বড় সুন্দর পথের ধারে একা পূর্বপ্রান্ত নিকেতন শান্তিনিকেতন হোমের সামনে একটা পুকুর। জেলা পূর্ব বর্ধমান। ১২ বছরের প্রাচীন এক জনপদ।কলকাতা থেকে মাত্র ১৬০ কিলোমিটার পথ। মিহির কলকাতার ছেলে। তার কাব্য ভাব জেগে উঠলো। সে বলল, শীতের আড়মোড়া ভেঙে যাচ্ছে কড়াইশুঁটির ক্ষেত। সবুজ খোসা ছাড়িয়ে সবুজ দানার মত নরম মিষ্টি রোদ্দুর আকাশ থেকে মাটির আঙ্গিনায় গড়িয়ে পড়ছে।
সেই রোদের আদর গায়ে মেখে সপরিবারে উইকেন্ডসে আমরা এসেছি এখানে ভালোবাসার টানে। বহুবছরের ঋণ মনে হয় জমা হয়ে আছে এই খোলা মাঠের মায়ায়। মিহির বলল, তুমি ব্যাটা শ্বশুরঘর এসে কবি হয়ে গেলে। সোমা বলল, এটা আমার জন্মভূমি দাদা আপনাদের আনতে পেরে ভালো লাগছে খুব। 
রজত সোমাকে বললো তোমার গ্রাম সম্বন্ধে কিছু বল। সোমা বললো সিঙ্গি হল বাংলার প্রাচীন গ্রাম। এই গ্রামেরই নদী পুকুর খাল বিল জলাশয় সব আছে। ফসল বিলাসী হওয়ার গন্ধ আছে সিঙ্গীর মাটির উর্বরতায় ফুলে ফলে ফসলের সুন্দর গ্রাম।
বাংলার সব পাখিরা কমবেশি সিঙ্গীর আকাশে বাতাসে ঘুরপাক খায়। তিনি বিখ্যাত করেছেন ইতিহাসে স্থান করে দিয়েছেন। কবি কাশীরাম দাস সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন মহাভারতের কাহিনী। এই মহাপুরুষের জন্মভিটার সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। আমরা দিনে তাঁর ভিটাতে দাঁড়িয়ে তাঁকে শ্রদ্ধাসংগীত শোনাতে পারি। তারপর রিমি অনেকটা হেঁটে গিয়ে দাসপাড়া পেরিয়ে গিয়ে বটবৃক্ষের তলায় দাঁড়াল উদাস হয়ে। এই স্থানের মাটি কপালে বুলিয়ে নিল একবার। সবাইকে ক্ষেত্রপালের মন্দির নিয়ে গেল। ক্ষেত্রপাল বটবৃক্ষষের নিচে অবস্থিত। তারপরে রাস্তা দিয়ে গিয়ে সোজা শিব মন্দির। 
এখন পাকা রাস্তা হয়ে গেছে বুড়ো শিবের মন্দির যেতে। রিমা বলল, ছোটবেলায় আমরা মাটির রাস্তা ধরে ধুলোমেখে ঘরে ঢুকতাম। বর্ষাকালে এক হাঁটু কাদা হয়ে যেত। গোরুর গাড়ি ছাড়া কিছুই যান ছিল না। আর ছিল পাল্কি। গ্রামের ছেলেমেয়ের বিয়ে হলেই শুনতাম পাল্কির গান। 

এবার ওরা আনন্দময়ীর মন্দিরে গেল। সেখানে সবাইকে দেখালো এবং পাশের গ্রাম আছে। সেখানেও তারা যাবার ঠিক করল।

তারা নিশ্চিন্তে বিশ্রামের উদ্দেশ্যে সিঙ্গীতে থেকে গেল কয়েকদিন। পারিপার্শ্বিক অবস্থানের থেকে সামান্য দূরে রয়েছে যোগাদ্যা সতীপীঠ। ক্ষীর গ্রামে অবস্থিত।
ঝঙ্কেশ্বরী মন্দির আছে মশাগ্রামে। এর জন্য বিখ্যাত গ্রামটি। এসব মন্দির ঘুরে বেরিয়ে দারুণভাবে ছুটি উপভোগ করা যায়।

সোমার জন্মভূমি এই সিঙ্গি গ্রামে। সে হঠাৎ হাটবারে এক গ্রামবাসীর দেখা পেয়ে গেল। তাকে সে দাদু বলতো। সেই বয়সেও তিনি প্রতি হাটবারে ঘর ছেড়ে হাতে চলে আসেন এক জায়গায় চুপ করে বসে থাকেন হাট দেখেন দেখেন বড় আজব মানুষ।

দাদু কথায় কথায় বললেন কাশীরাম দাস গ্রন্থাগার উদ্বোধন করতে এই গ্রামে নাকি ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় এসেছিলেন সে বহুকাল আগেকার কথা। চারজন মিলে সঙ্গীতে বেশ আনন্দ করলো খাওয়া-দাওয়া দই-মিষ্টি কোন কিছুর অভাব নেই শহরের যাবতীয় সুবিধা এই গ্রামে থেকেও পাওয়া যায়।এবার বাবা-মাকে ছেড়ে সোমার কলকাতা যাওয়ার পালা পালা সকলেই তৈরি হয়ে সকাল বেলা রওনা হলো কিন্তু রিমার চোখে জল দেখে সকলের মন খারাপ হয়ে গেল এখন ছেড়ে যাওয়ার সময় চোখের জল নিয়ে তাকে গ্রামকে আবার কোনদিন আসার অপেক্ষায় চলে যায় তারা।

কোপা গ্রামের দীপ আর অংশু আমদের কো অপারেটিভ সোসাইটিতে নাম লিখিয়েছিলো। আমি, বিশু, দীপ আর অংশু আর একজন মেয়ে এই পাঁচজন একবার বেড়াতে গেলাম। 

সবাই তো দার্জিলিং,পুরী কিংবা দিঘা যায়। চল না নির্জন কোনো এক জায়গায়। যেখানে মানুষের ভিড় নেই। শান্ত সবুজের পরশ আছে। বললো দীপ।, অংশু বললো, চল যাওয়া যাক। কিন্তু সমমনস্ক আমরা দুজনে যাবো। কেনাকাটা করার লোকের সংখ্যা বেশি। তারপর আসল কাজ, ঘোরা, দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দীপ বললো, ঠিক বলেছিস। তাহলে ঝালং ওঝান্ডি ঘুরে আসি চল। অংশু রাজী হলো।

তারপর সামান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ওরা বোলপুর থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরে চলে এলো নির্দিষ্ট জায়গায়। একটা হোটেলে উঠে মালপত্তর রেখে দিলো ওরা। কিছু হাল্কা খাওয়া দাওয়া করে বেরিয়ে পরলো বাইরে।

সুন্দর সবুজ পাহাড় দেখে মন জুড়িয়ে গেলো বল দীপ, অংশু বললো। দীপ দেখলো, সমান্তরাল পাহাড়ের শ্রেণী দিগন্ত ঘিরে রেখেছে। পাহারা দিচ্ছে সুন্দর বাগান।

মানুষের ভিড় খুব কম। তার ফলে নোংরা আবর্জনা কম। দীপ বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলো। হঠাৎ একটা মেয়েকে দেখতে পেলো। পাহাড়ি, লোকাল মেয়ে। খুব সাহস। ভাঙ্গা বাংলায় বললো, এ বাবু। বেশি ভেতরে যাস লাই। লাফা জোঁক আছে। রক্ত চুষে লেবে। দীপ বললো, তাহলে তুমি এলে কেনো। তোমার ভয় করে না। মেয়েটি খিল খিল করে হেসে উঠলো। বললো, ভয় কি রে। আমাকেই সবাই ভয় করে। তারপর কোমর থেকে একটা ধারালো কুকরি বের করে দেখালো। বললো, এর ডগায় বিষ মেশানো আছে রে বাবু। একটু ছিঁড়ে দিলেই কাম ফতে। আমি আর বিশু দুদিন পরে চলে এসেছিলাম ওদের ছেড়ে কারণ বিশুর কাকা মারা গেছিলো বয়সের কারণে। ওরা থাকলো। পরে ওদের মুখে গল্প শুনেছি ওদের জীবনের। দীপ আর অংশু মোবাইল ফোনে সব কথা বলত। 

দীপের মনে আছে একবার কোম্পানী ওকে ডমিনিকান রিওপাবলিক পাঠিয়েছিলো। কাজ সেরে ও গিয়েছিলো হিস্প্যানিওলা দ্বীপ। ওখানে নিয়ে যাবার জন্য লঞ্চ আছে। লঞ্চ তো নয়, ছোটোখাটো জাহাজ। ভূগোলে পড়েছিলো ও দ্বীপের দখলাতি নিয়ে স্পেন আর ফরাসীদের মধ্য লড়াই। কলহ হবে না কেন। গাইড ওদের বলেছিলো, এখানে মাটি খুব উর্বর সাধারণত সামুদ্রিক মাটিতে দুর্লভ। তারপর যোগাযোগ ব্যাবস্থা সবই ভালো।

মানুষে মানুষে মিল দেখলেই ভারতবর্ষের কথা মনে পড়ে। কৃষিনির্ভর দেশ। পাশ্চাত্য দেশের রাস্তাঘাট, টেলি কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক, বিলাসবহুল রিসর্ট দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেছিলো দীপের। তবু ভারতবর্ষ, এক মন আনচান করার মোহময় দেশ। আনন্দময় দেশ। সেখানেও একটা সাহসী মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো।

আবার পাহাড়ি মেয়েটার কথায় চেতনা ফিরে এলো দীপের। বললো কি দেখছিস হাঁ করে বাবু। আমাকে না ওই পাহাড়কে। দীপ বললো, দুটোই।
মমে মনে ভাবলো, তোমার পাহাড় তো বাস্তবের পাহাড়কে হার মানিয়েছে। সাহস হলো না বলতে। কুকরি আছে। সাবধান। দীপ ভাবলো, মেয়েরা এখানকার সব চেনে। গাইড হিসাবে একেই নিতে হবে। অবশ্য মেয়েটি রাজী হলে তবেই।

দীপ বললো, আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবি তোদের পাহাড়। আমার একটা বন্ধু আছে।
মেয়েটি বললো, আমার একদিনের মজুরি দিবি, তাহলে সব দেখাবো।

দেবো, দেবো নিশ্চয় দেবো।

আগে দে। গতবার এক হারামি পয়সা না দিয়ে পালিয়েছে।

দীপ একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে ওর হাতে দিলো। মেয়েটা হাসিমুখে একটা নমস্কার করলো। বললো, তু খুব ভালো। চ আমার সঙ্গে আয়।

দীপ আর অংশু ওর সঙ্গে গিয়ে দেখলো ওদের কাঠের বাড়ি। বুড়ো বাপ মেয়েটার রোজগারে খায়। খুব গরীব। এই গরীব মানুষগুলো ভারতের প্রাণ। বললো অংশু। বললো, এদের লাখ টাকা দিয়েও দেশ ছাড়াতে পারবি না। ওরা দেশকে হৃদয়ের এক অংশ মনে করে। দীপ বললো, এটা তোর পাকামির কথা। ভুগে মরবে তবু দেশ ছাড়বে না। তিন হাঁটুর এক মানুষকে দীপ বললো, আমার সঙ্গে যাবে। তোমার কোনো অভাব থাকবে না। লোকটি দুই হাঁটুর মাঝখান থেকে নেড়া মাথা তুলে বললো, তোর পয়সা তু রাখ, আমাকে আমার জাগায় থাকতে দে। মায়ের কোল ছেড়ে যাবো একবারে শ্যাষ দিনে। অংশু বললো, বেশি ঘাঁটাস না বোকাচোদা। ঝাড় খাবি।

মেয়েটা এবার সব জোগাড় করে ছাগলের দুধ দিয়ে চা বানিয়ে দিলো। দীপ আর অংশু খেলো
তারপর মেয়েটা ঝান্ডি পাহাড়ের আনাচে কানাচে ঘুরিয়ে আনলো। ঝালং এ ওরা বাস করে। খুব দূরে দূরে দুএকটি বাড়ি। ছবির মতো কোন শিল্পী এঁকেছেন কেউ জানে না। বললো অংশু।

সব ঘোরানোর পরে মেয়েটা বললো, রাতে কখন আসবি। বলে দে। আমার কাছে সোজা কতা। শরীল লিতে গেলে আরও টাকা লাগবে।

দীপ বললো,তার মানে। সে আবার কি। তু আমাদের সব দেখালি, পয়সা নিলি। তোর পরিশ্রমের হক্কের পাওনা। মনে রাখবি। তুই খুব ভালো। যা বাড়ি যা। শরীর চাই না। যা।

মেয়েটার চোখে জল। বলে সবাই আমার রূপ দেখে, মন দেখে না। তোর ভালো হবে।

এই বলে চলে গেলো। সেই রাতে দীপ ঘুমোতে পারলো না। শুধু পাহাড়ের ছবি জুড়ে সবুজ বরণ সাজ। মন পাগল করা সরলতা।

অংশু বললো, তুই প্রেমে পড়েছিস নাকি? কালকে রাতে ঘুমিয়েছিস তো?

চারদিন ওখানে থাকার পর ওরা আবার কলকাতা ফিরে এলো। দীপ বোলপুরে কাজ করে। কলকাতায় মেয়ে আর মেয়ের মা থাকে। মেয়ের মা বড়লোকের একমাত্র মেয়ে। ভালোবাসা কাকে বলে জানে  না সে। দীপ ভাবে, হয়তো জিজ্ঞেস কর বে, ঘুরতে গেছিলে কেমন লাগলো। কিছু না। মেয়েটা এসে বললো,বাপি আমাদের এখানে একটা কাকু আসে মাঝে মাঝে। কে হয় আমাদের। দীপ সব জানে। ও বললো,আমাদের বাড়ি আসে মানেই আমাদের লোক। তোমার মায়ের বন্ধু। তুমি ভালো করে পড়বে। ওসব তোমাকে দেখতে হবে  না মামণি।

দুদিন কলকাতা থেকে দীপ চলে গেলো বোলপুর কাজের জায়গায়। সারাদিন কাজ আর কাজ। বাড়ি ফিরে ও স্নান করে। মন আর শরীর দুটোই ফ্রেশ হয়। তারপর লেখা নিয়ে বসে। পড়াশুনা করে রাত বারোটা অবধি কোনো কোনো দিন। দীপ ভাবে, গ্রামে ও বড়ো হয়েছে। তুলি তখন দশম শ্রেণিতে পড়ে। দীপ তখন বারো ক্লাসে। একই স্কুলে পড়তো দুজনে। সাইকেলগুলো একটা ঘরে রাখতে হতো। দীপ সুযোগ বুঝে তুলিকে ডেকেছিলো। সেই ডাকে কি ভীষণ সারা তুলি যে দিয়েছিলে তা আজও মনে আছে দীপের। কেউ ছিলো না। টিফিনে মিড ডে মিল খেতে ব্যস্ত সবাই। তুলি তার তুলতুলে শরীরে শরীর ঘষে শিহরণ তুলেছিলো সারা শরীর জুড়ে। দীপ ভাবে, যদি তুলির সঙ্গে নদীর ধারে কুটির বেঁধে বাস করতো তাকে বিয়ে করে তাহলে এক টুকরো আকাশের মালিক হতে পারতো। কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। মেয়ে আছে। মেয়ের জন্য ত্যাগ স্বীকার তাকে করতেই হবে। মেয়ের মা তাকে ভালোবাসে না। তার কাছে কোনোদিন শোয় না। তাহলে মেয়েটা কার? কার সুখ আমি বয়ে নিয়ে বেড়াই নিশিদিন। দীপ ভাবে ছি ছি কি ভাবছে এসব। মেয়ের অকল্যাণ হবে না।

তারপর সুখেদুখে কেটে গেলো কুড়ি বছর। মেয়ের মা মারা গেছে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। কোলকাতার বাড়িতে এখন জামাই আর মেয়ে থাকে। আর দীপ রিটায়ার্ড হওয়ার পরে বোলপুরেই থাকে।

একদিন দীপ শান্তিনিকাতনে ঘুরতে গেছে হেঁটে। এসময় হাঁটাহাঁটি শরীরের পক্ষে খুব ভালো। বয়স হয়েছে তো। দীপ হঠাৎ দেখলো একজন বিধবা মহিলা তার দিকেই এগিয়ে আসছেন। দীপ বিব্রত বোধ করছে। তিনি এসেই বললেন, এই যে আপনাকে বলছি, আপনি দীপ না?  দীপ অবাক। আমার নাম জানেন কে আপনি?

- আমি তুলি, তোমার তুলি।

- তোমার তুলি! ও আমার হারিয়ে যাওয়া তুলি।
- হ্যাঁ আমার এখানেই বিয়ে হয়েছিলো। ছেলেপিলে নেই। স্বামী মারা গেছেন। বাড়িতে আমি একা। তুমি কোথায় থাকো?

- আমি ভাড়া বাড়িতে থাকি।

- ও কোলকাতায় থাকো না।

- না ওখানে মেয়ে থাকে। তার মা মরে গেছে অনেক আগেই।

- তা হলে এখন আমরা আবার আগের মতো হয়ে গেছি, সময়ের বিচারে।

- কেন, আশীর্বাদ বলা যায় না?

- বলতে ভয় হয়। পোড়া কপাল আমার।

- সময় তো আশীর্বাদই করে, মানুষ তার যথাযথ সদব্যবহার করতে পারে না।

​

সাত 

দীপ তুলিকে নিয়ে এখন কোথাও যেতে পারবে না। কারণ তুলি বিধবা। প্রথমে সঠিক একটা পরিচিতি বানাতেই হবে। তা না হলে মানুষ বিভিন্ন রকমের কথা বলবে। তাই একটা ভালো দিন দেখে ওরা বিদ্যাসাগরের ছবিতে প্রণাম জা নিয়ে কঙ্কালিতলায় বিয়েটা সেরে নিলো। তারপর নতুন একটা ঘর দেখে কীর্ণাহার শহরে ঘর ভাড়া করলো। সবাই নতুন বুড়োবুড়িকে বেশ হাসিমুখে বরণ করে নিলো। পূর্বকথা ওরা কেউ জানলো না। তুলির বাড়িটা বিক্রি করে অনেক টাকা পেয়েছে। ওরা ঠিক করলো, আর বাড়ি করবে না। কিছুদিনের মধ্যেই তো আপন বাড়িতে ফিরতে হবে। তাই তার আগে ভারতবর্ষের সমস্ত জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখবে। আর দীপ তার কলমে ফুটিয়ে তুলবে ভারতবর্ষের রূপ।

বাইরের ডাকে সাড়া দেবার আগে দীপ মেয়েকে মোবাইলে সব কথা জানালো। মেয়ে বাবার খুশিতে সুখী হলো। এবার দীপও তুলি বেরিয়ে পরলো আনন্দের সন্ধানে। ওরা চলে গেলো হিমালয়। কেদারনাথ, বদ্রিনারায়ণের পট খুলবে তৃতীয়ার দিন থেকে সাত দিনের মধ্যে।

হিমালয়ের পথে পথে কেদার, বদ্রি, উখিমঠ, তিঙ্গনাথ, চোপতা সব ঘোরা হলো দুজনের। পরের দিন সকালে হরিদ্বার থেকে গাড়িতে রওনা হয়ে পথে পথে দেবপ্রয়াগ। ভাগীরথী এবং অলকানন্দ বেশ কিছুটা পথ আলাদা ভাবে গিয়ে গঙ্গা নামে বয়ে চলেছে। বাণীপ্রসাদ গাইড। সে সব বুঝিয়ে চিনিয়ে দিচ্ছে। দীপ আর তুলি দুজনেই খাতা, পেন বের করে সব টুকে রাখছে। লেখার সময় কাজে আসবে, বললো তুলি। বাণীপ্রসাদজী বলে চলেছেন, আমাদের বাস কর্ণপ্রয়াগে চলে এসেছে। গাড়োয়ালে অলকানন্দার সঙ্গে কুমায়ুন থেকে বয়ে আসা পিন্ডার নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। রাতে পিপলকোটি হোটেলে আশ্রয় নিলো সবাই। মোট তিরিশজন যাত্রী আছে। কেউ গুজরাটি। কেউ মারাঠি কেউবা বিদেশী টুরিষ্ট। সারা পৃথিবীর মিলনমেলা। বাইরে বেরোলে মন বড়ো হয় বলো, বললো তুলি। দীপ বললো, এদের মাঝে এসে আর কোনো দুঃখ আমাদের কাহিল করতে পারবে না। জীবন শুধু সংসারে আবদ্ধ রাখলে হবে না। তুলি মাথা নেড়ে সায় দিলো। তারপর রাত কেটে গেলো । প্রভাতের আলোতে তুলি আর দীপ বন্দনা করলো জগদীশ্বরের। তারপর প্রাতরাশ সেরে ওরা বেরিয়ে পরলো যোশীমঠ হয়ে বিষ্ঞুপ্রয়াগ। তুলি বললো, এখানেই নারদমুনি ভগবানের বরে তাঁর অভিশপ্ত মানবজীবন থেকে মুক্তি পান।
গাইড এবার বললেন,আমরা বদ্রিনাথে এসে পরেছি।

সত্যযুগে শ্রীবিষ্ঞু এখানে পদার্পণ করেছিলেন। বিশাল কষ্টিপাথরের মূর্তি। দীপ বললো, চলো এবার দুপুরের খাবার খাওয়া যাক। তারপর বিকালের দিকে পায়ে হেঁটে ভারতবর্ষের শেষ গ্রাম মানাগ্রাম। মানাগ্রাম খুব ভালো লেগে গেলো তুলি ও দীপের। ওরা গাইডকে হোটেল ও খাওয়া খরচাবাবদ সমস্ত টাকা মিটিয়ে দিয়ে বললো, ভাই আমরা এখানেই থাকবো। আর কোথাও যাবো না। গাইড বললো, আপলোগকো বালবাচ্চা কিদার হ্যায়। দীপ বললো, হাম অর মেরে জানানা। অর কোই নেহি। গাইড বললো, হম আপকো লেড়কা মাফিক,আপ্লোগোকা খেয়াল রাখুঙ্গা। দীপ ওর কথা শুনে আরও পাঁচশো টাকা বখশিস দিলো। সে বললো, বাপকা দিয়া হুয়া আশীর্বাদ এহি রুপাইয়া। হম খরচা নহি করেঙ্গে। মেরা সাথ সাথ রহেগা। চোখের জলে বিদায়ের পালা শেষ হলো। তুলি আর দীপ মানাগ্রামে একটা ঘর নিলো। সামনেই বদ্রিনাথ। সকালে পুজো দেয়, প্রার্থনা করে। রান্না করার সবকিছু জোগাড় হয়েছে। কোনো অসুবিধা নাই। সামনে শ্মশান আছে। গাড়ি করে নিয়ে যায় এরা। কিছুটা দূরে সরস্বতি নদী পাহাড়ের ফাটল থেকে অলকানন্দা নাম নিয়ে বদ্রিনাথ মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে। মন খারাপ হলেই ওরা দুজনে সেখানে বসে। তুলি বলে, প্রকৃতির ভাষা পড়তে পারলে কোনো দুঃখ থাকে না। মানা গ্রামের কিছুটা দূরে চিনের বর্ডার।
এগ্রামের বৈশিষ্ট্য হলো প্রত্যেক পরিবারের কেউ না কেউ ভারতীয় সেনা বিভাগের কাজে যুক্ত।

ওখানে থাকাকালীন সকলের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেলো তুলি আর দীপের। ভাষা ওদের বাধা হয়নি। অল্প হিন্দী ভাষা এরা জানে। আবার ওদের কেউ কেউ বাংলা জানে।

হঠাৎ একদিন সেই গাইড এসে হাজির। সে বললো,মা  কিছু বাংলা হামি জানি। হামি এখানে টুরিষ্ট আনলে একবার দেখা করে যাবে। তুলি বললো, নিশ্চয় আসবে বাবা।

দীপ ভালো মিষ্টি  এনে পাতানো ছেলেকে খাওয়ালো।
তুলি এক নতুন বৌয়ের কাছে যায়। তার স্বামী বিয়ের পরে যুদ্ধে চলে গেছে। খুব চিন্তা। তুলি সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু একদিন খবর আসে তার স্বামী যুদ্ধে নিহত। কি মর্মান্তিক ভাষায় বর্ণনা কর যায় না, বললো দীপ। ওর শ্বাশুড়ি বললো, অপয়া মেয়েটা আমার ছেলেকে খেলো। ওকে ঘরে রাখবো না। শেষে তুলি তাকে তুলে আনলো মেয়ের পরিচয়ে। সে তাদের মেয়ে হয়ে আছে। খুব কম বয়স মেয়েটার। সতেরো বছরের রূপবতী মেয়ে। সবার লক্ষ্য তার দিকে। দীপ বললো, এর বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। মেয়েটার বাবা মা বললো,  আপলোগ ব্যাবস্থা করে দিন। আমরা গরীব আদমী। তুলি বললো, ঠিক আছে, তাই হবে।

আবার একমাস পরে গাইড ছেলেটি এলে তুলি বললো, তোমার বিয়ে হয়নি? ছেলেটি বললো কে দেবে আমাকে লড়কী বলেন। দীপ বললো, তোমার মতো আমার একটা মেয়ে আছে। করবে বিয়ে। কিন্তু তার বিয়ে হয়েছিলো। স্বামী মারা গেছে।

গাইড বললো, করবো সাদী।

তারপর মেয়েটিকে দেখে গাইডের খুব পছন্দ। একদিন বাবা মা কে দেখিয়ে নিয়ে গেলো গ্রামের সবাই উপস্থিত থেকে ওদের বিয়ে দিয়ে দিলো।

আটদিন পরে যখন ওরা এলো খুব ভালো লাগছিলো তুলির। কি সুন্দর মানিয়েছে। ঠিক যেনো হরগৌরী। গ্রামের লোক সবাই ধন্য ধন্য করলো তুলি ও দীপের নামে। গ্রামের প্রিয়জন হয়ে গেলো ওরা। কিন্তু ওরা বাঁধা জীবনে আর থাকবে না।

কাউকে কিছু না জানিয়ে সমস্ত মায়া ছেড়ে তার আবার চললো অজানার সন্ধানে, পথে পথে...

এবার ওরা গেলো পুরী। জগন্নাথ দেবের দর্শন সেরে সমুদ্রের কাছে একটা ঘর ভাড়া করলো।
পরিচয় হলো শিবরূপের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে। সমীর বলে একটি  ছেলে একদিন বললো, দীপ দা একদিন আমার বাড়ি চলুন। দীপ বললো  যাবো। তুলিকে দীপ বলছে, বুঝলে আজ সমীর বলে একটি ছেলের সাথে পরিচয় হলো। সে অনেক কথা বললো। তার কাছে শোনা কথা তোমাকে বলি শোনো। 
সমীর সমুদ্রের কাছাকাছি একটি গ্রামে বাস করে। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। স্ত্রী রমা খুব কাজের মহিলা। কাজের ফাঁকে গাছ লাগায় ছেলে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে। সমীর গ্রামে গিয়ে ছেলে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে গাছ লাগায়। আবার সময় পেলেই বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে অনেক অজানা তথ্য গ্রামবাসীদের শোনায়।
-পরিবেশ বলতে কি বোঝায় গো অমর দা? একজন গ্রামবাসী জিজ্ঞাসা করলেন।

- সবুজ গাছপালা, জীবজন্তু, মানুষ নিয়েই পরিবেশ। আমাদের পৃথিবীর নানা দিকে বরফের পাহাড় আছে। অতিরিক্ত গরমে এই বরফ গলে সমুদ্রের জল স্তর বাড়িয়ে দেবে। ফলে সুনামী, বন্যায় পৃথিবীর সবকিছু সলিল সমাধি হয়ে যাবে। সবুজ পরিবেশ আমাদের বাঁচাতে পারে একমাত্র।

- তাহলে এর থেকে বাঁচার উপায় কি?
- মানুষকে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে।
- কি পদ্ধতি বলুন দাদা। কি করতে হবে আমাদের, সাধ্যমত করবো। 
- এই যে পাখি ওপশুরা মল ত্যাগ করে বিভিন্ন স্থানে তার সঙ্গে গাছের বীজ থাকে। এই বীজ গুলি থেকে বিভিন্ন গাছের চারা বেরোয়। বাবলা, গুয়ে বাবলা, নিম, বট প্রভৃতি চারা প্রকৃতির বুকে অযাচিতভাবেই বেড়ে ওঠে। শিমূল গাছের বীজ উড়ে চলে আসে। একে আমরা বুড়ির সুতো বলি। তারপর বর্ষাকালে জল পেয়ে বেড়ে ওঠে।
- তাহলে আমাদের কাজ কি?
- আমাদের কাজ হলও ওই চারাগুলি বড় করা। তার জন্য আমাদের বাঁশের খাঁচা বানিয়ে ঢাকা দিতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ যদি এই নিয়মে মেনে গাছ লাগায় তবেই একমাত্র বিশ্ব উষ্ণায়নের কোপ থেকে রক্ষা পাবে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় মানুষের চেতনা এখনও হয়নি। গাছ কাটা এখনও অব্যাহত আছে। তাইতো এত গরম। বৃষ্টির দেখা নেই।

অমর খুবই চিন্তার মধ্যে আছে। রাতে তার ঘুম হয় না। বর্ষাকাল চলছে। সমুদ্র ফুলে উঠেছে আক্রোশে। কি হয়, কি হয়। খুব ভয়।
সমীর ভাবে, মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে বেইমানি করেছে। এর প্রতিশোধ প্রকৃতি নেবেই। তারপর অন্য কথা।

একদিন বর্ষাকালে রাতে সবাই ঘুমিয়ে আছে কিন্তু জেগে আছে অমর আর সমুদ্রের বিষাক্ত ফণা। মাঝ রাতে সুনামীর একটা বড় ঢেউ এসে গ্রামের সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ধ্বংসের পথে। এখন সেই গ্রাম শ্মশানের মত ফাঁকা।
প্রকৃতি এখনও সুযোগ দিয়ে চলেছে বারেবারে। সাবধান হলে বাঁচবে। তা না হলে ধ্বংস অনিবার্য।দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে তুলি বললো, শত সহস্র অমরকে এগিয়ে আসতে হবে পৃথিবীর রক্ষাকর্তা হয়ে।তবেই বাঁচবে আমাদের পৃথিবী।

দীপ বললো - বন্যার জলে সব কিছু সম্প্ত্তি ভেসে গেলেও অমর কিন্তু লড়াই করে বেঁচে আছে। সাঁতার কেটে শিশুপুত্রকে নিয়ে নিজেদের জীবন কোনোরকমে বাঁচিয়েছে। 
তারপর দীপ ও তুলি গেলো অমরের বাড়ি। অমরের স্ত্রী তুলির সঙ্গে গল্প করছে। দীপ অমরকে কাছে পেয়ে বলতে শুরু করলো ছোটোবেলার কথা। দীপ বলছে,

- আমরা ছোটোবেলায় মোবাইল পাই নি। কিন্তু আমরা যেসব আনন্দের অংশিদার ছিলাম সেসব আনন্দ এখনকার ছেলেরা আর পায় না। ইতিহাসের বাইরে চলে গেছে ভুলোলাগা বামুন।
- ঠিক বলেছেন দাদা, আপনি বলুন। আমি শুনছি।

দীপ আবার বলতে শুরু করলো,

- জানো, তিনি ঝোলা হাতে মাথায় গামছা জড়িয়ে আসতেন শিল্পকর্ম দেখিয়ে রোজগার করতে। তিনি আমাদের বাড়িতে এসে শুরু করতেন নিজের কথা বা শিল্পকর্ম। নাটকের অভিনয়ের ভঙ্গিমায় বলতেন, আর বলো না বাবা। তোমাদের গ্রামে আসতে গিয়ে চলে গেলাম ভুলকুড়ি ভুল করে। তারপর মেলে, কোপা, বিল্বেশ্বর, চুরপুনি, সুড্ডো ঘুরে কোমডাঙ্গা। তারপর কেতুগ্রাম, কেউগুঁড়ি হয়ে গুড়ি গুড়ি পায়ে হেঁটে পোশলা, নঁগা, খাটুন্দি, পাঁচুন্দি হয়ে তৈপুর, পাড়গাঁ, বাকলসা, পাঁচুন্দি, মুরুন্দি, সেরান্দি, খাটুন্দি পার করে কাঁদরের গাবায় গাবায় হেঁটে এই তোমাদের গ্রামে। 

আমরা জিজ্ঞেস  করতাম, এতটা পথ হাঁটলে কি করে দাদু। তিনি বলতেন, সব ভূতের কারসাজি। তেনারা ভুলো লাগিয়ে দেন। ভর করে দেহে। তাই এতটা পথ হাঁটতে পারি। তারপর চালটা, কলাটা, মুলোটা দিতেন তার ঝোলায় আমার মা বা পিসি। 
অমর আবার কবি। তাই আমার বাতেলা শুনতে ভালেবাসে।
কবিকে বললাম, তুমি তো জানো আমি রূপসী বাংলার রূপে ছুটে যাই। কিন্তু আমার চেনা পৃথিবীর সবটা হয়ে যায় অচেনা বলয়, মাকড়সার জালের মতো জটিল। সবাই এত অচেনা অজানা রহস্য ময়। বুকটা ধকধক করছে, হয়তো মরে যাবো, যাবো সুন্দরের কাছে, চিন্তার সুতো ছিঁড়ে কবির ফোন এলো। এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে, অভয়বাণী মিলেমিশে সৃষ্টি করলো আশা। আর আমি একা নই, কবির ছায়া তাঁর মায়া আমাকে পথ দেখায়...

অমর বলত, দীপদা, আপনিও কবি। কি সুন্দর কথা বলেন।

দীপ বলে দেখো বিদেশের লোকরা নেচে নেচে খোল করতাল বাজিয়ে আমাদের মহাপ্রভু চৈতন্য দেবের নামগান করে। এই হলো ভারতবর্ষ।
অমর বলে, ঠিক,আমরা তার সম্মান রাখতে পারছি কই? দীপ বললো,
- শোন আমাদের পুজোবেলার কথা। পুজো আসার আগে থেকেই বাড়িতে মা ও বাবা নানারকম মিষ্টান্ন তৈরি করতে শুরু করতেন। গুড়ের নারকোল খন্ড, চিনি মিশ্রিত নারকোল খন্ড, সিড়ির নাড়ু, গাঠিয়া প্রভৃতি। গুড়ের মিষ্টির ব্যতিক্রমি গন্ধে সারা বাড়ি ম ম করতো। আমরা স্বতঃস্ফুর্ত অনুভূতিতে বুঝে যেতাম পুজোর দেরি নেই। পুজোর কটা দিন শুধু খাওয়া আর খাওয়া। বাড়িতে যারা যাওয়া আসা করতেন তারাও পুঁটুলি বেঁধে নিয়ে যেতেন চিড়ে, মুড়কি, মিষ্টি মায়ের অনুরোধে ও ভালোবাসায়।

এখন গুড়ের মিষ্টি, ছানার মিষ্টির তুলনায় ব্রাত্য। কিনলে সবই পাওয়া যায়, ভালোবাসা মাখানো তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?
আমি বহু জায়গায় ঘুরে ঘুরে বাস করি রেল স্টেশনের ধারেই আমার তখন বাসস্থান। অই পাড়ায় আমি পনেরো বছর ছিলাম। সকালের দৃশ্য বড়ো মনোহর। শহরের মহিলা পুরুষ  সকলেই একসাথে প্রাতঃভ্রমণে ব্যস্ত। সবুজের নির্মল হাওয়ায় মন হারিয়ে যায় সুন্দর হাওয়ায়। তারপর সারাদিন স্টেশনের ব্যস্ততার সময়। ঠিক গোধূলির আলোয় আবার মানুষের মন হারানোর পালা। চুপিচুপি অন্ধকার রূপের আদরে আশাতীত ভালোলাগার পসরা সাজায় প্ল্যাটফর্ম। হারিয়ে যাওয়ার আনন্দে আলোকের গোপন ইশারা, তোমার অন্ধকার ভোগের শেষে। অন্ধকারের মূল্য অসাধারণ। আলোর স্পর্শে ভালোলাগার কারণ এই আঁধার।
আঁধার কালো, কালো সুন্দর, অকৃত্রিম আনন্দের সাজি সাজায় কালো। এইসব চিন্তা করতে করতে রাত নামে। আলো জ্বালিয়ে বুড়োদের তাস খেলার আসর শেষ হয়। সমস্ত প্রবীণ অভিমান তারা ঝেরে ফেলে ঝরঝরে নবীন মনে বাড়ি ফেরেন তারা।

গল্প করতে করতে কখন যে রাত হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি দীপ।

বৌমা বললো,আজ রাতে আপনারা আমাদের বাড়িতে থাকুন। আজ যেতে দেবো না।

তুলি আর দীপ এদের নিয়ে বেশ সুখে আছে। ঈশ্বর দর্শন ওদের মানুষের মাঝেই হয়ে গেছে।
রাত জেগে ওরা ঠিক করেছে, আগামীকাল ওরা আবার অন্যস্থানে ঘুরতে যাবে। কিন্তু ওরা অন্য কাউকে তাদের গোপন কথা বলে না।

দশদিন অমর দীপদার দেখা পায় নি। তাই একবার ওদের বাসা বাড়িতে দেখা করতে গেলো। বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলো, দীপ দাদা কোথায় গেছে।

বাড়িওয়ালা বললো, বড় ভালো মানুষ পেয়েছিলাম গো। আমাকে এক মাসের পয়সা বেশি দিয়ে চলে গেছে।

অমর বললো - কোথায় গেছেন বলতে পারবেন।

- না, বাবা। ওরা বললো আমাদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। সব সাধু লোক গো। সংসারে কে যে কোন রূপে থাকে চেনা যায় না বাবা। এই বলে হাতটা কপালে ঠেকালেন।

অমর মাথা নীচু করে বাড়ি ফিরে চললো।

সে ভাবে, দিবারাতি নিজেকে ঠকিয়ে কোন ঠিকানায় ঠাঁই হবে আমি সর্বস্য মানুষের। নিজেকে নিজের প্রশ্ন কুরেকুরে কবর দেয় আমার অন্তরের গোপন স্বপ্ন। জানি রাত শেষ হলেই ভোরের পাখিদের আনাগোনা আরম্ভ হয় খোলা আকাশে। আমার টোনা মাসিকে টোন কেটে অনেকে অভিশাপ দিতো। আমি দেখেছি ধৈর্য্য কাকে বলে। আজ কালের কাঠগোড়ায় তিনি রাজলক্ষ্মী প্রমাণিত হয়েছেন। কালের বিচারক কোনোদিন ঘুষ খান না। তাই তাঁর বিচারের আশায় দিন গোনে শিশুর শব, সব অবিচার, অনাচার কড়ায় গন্ডায় বুঝে নেবে আগামী পৃথিবীর ভাবি শিশু প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি। অপেক্ষায় প্রহর গোনে নিজের অন্তরের প্রদীপ শিখা জ্বালিয়ে। সাবধান খুনীর দল , একবার হলেও অন্তত নিজের সন্তানের জন্য শান্ত পৃথিবী রেখে যা। ঋতু পরিবর্তন কিন্তু তোর হত্যালীলায় বন্ধ হবে না নির্বোধ। শান্ত হোক হত্যার শাণিত তরবারি। নেমে আসুক শান্তির অবিরল ধারা। রক্ত রঙের রাত শেষে আলো রঙের নতুন পৃথিবী আগামী অঙ্কুরের অপেক্ষায়। 

তারপর সংসারের টানা পোড়েন। রাগ, হিংসা, ক্রোধের সংমিশ্রণে সংসার স্রোতে ভাসতে ভাসতে জীবন প্রবাহ এগিয়ে চলে। হয়তো এর ফলেই দাদুর শেষজীবনে সেবার সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা। আমি নিয়ম করে দাদুকে গীতাপাঠ করে শোনাতাম। দাদু কত গল্প বলতেন। কোনোদিন হা পিত্যেশ করতে দেখিনি। আমার সময় কাটতো দাদুর কাছেই বেশি। পড়াশোনার ফাঁকে চলতো গীতাপাঠ। আমি জিজ্ঞেস করতাম, দাদু মরণের পরে আমরা কোথায় যাই? দাদু বলত মরন, জানি না ভাই। তবে। মরণের পরে যদি যোগাযোগ করা যায়,তাহলে আমি তোকে নিশ্চয় জানাবো। দাদু বলতেন, আমি যখন শেষ বিছানায় শোবো,তখন আমি ইশারা করবো হাত নেড়ে। তখন তুই গীতার কর্মযোগ অধ্যায় পড়ে শোনাবি। তোর মঙ্গল হবে। আমিও শান্তিতে যেতে পারবো। হয়েছিলো তাই। কর্মযোগ পাঠ করা শেষ হতেই দাদুর হাত মাটিতে ধপাস করে পরে গেলো। দাদু ওপাড়ে চলে গেলেন হেলতে দুলতে চারজনের কাঁধে চেপে। মাথাটা দুই বাঁশের ফাঁক গলে বেরিয়ে ঝুলছিলো। আমি বলে উঠলাম, ওগো দাঁড়াও দাদুর লাগবে। মাথাটা ঠিক কর বালিশে দি। কেঁধো বললেন, মরে গেয়েচে। ছেড়ে দে। আমি বললাম, না ঠিক করো। তারপর ঠিক করলো দাদাভাই, দাদুর মাথাটা বালিশে দিয়ে।  
আমি ভাবতে শুরু করলাম, মৃত্যু কি জীবনের আনন্দ কেড়ে নিতে পারে? পারে না। 
সব কিছুর মাঝেই ঋতুজুড়ে আনন্দের পসরা সাজাতে ভোলে না প্রকৃতি। সংসারের মাঝেও সাধু লোকের অভাব নেই। তারা মানুষকে ভালোবাসেন বলেই জগৎ সুন্দর আকাশ মোহময়ী, বলেন আমার মা। সব কিছুর মাঝেও সকলের আনন্দে সকলের মন মেতে ওঠে। সকলকে নিয়ে একসাথে জীবন কাটানোর মহান আদর্শে আমার দেশই আদর্শ।
সত্য শিব সুন্দরের আলো আমার দেশ থেকেই সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করুক। 
আমি বললাম, এক নাগাড়ে বকে গেলি অনেকক্ষণ। বন্ধু বললো, তুমি আরও কিছু বলো। সেই জন্যই তোমার কাছে আসা। আমি আবার বলতে শুরু করলাম, আমার কথা আমার গোপন কথা। আমার অনুভবের কথা। কবি বন্ধু আমার কথা শুনতে ভালোবাসে। সে সংসারী। তবু সব কিছু সামলে তার কবিতা ত লিখে চলে। আমি বন্ধুকে বলতে শুরু করলাম শরত জীবনের কথা। 

শিউলি শরতের ঘ্রাণে শিহরিত শরীর। শিউলি নামের শিউলি কুড়োনো মেয়েটি আমার শৈশব ফিরিয়ে দেয়।
মনে পড়ে পিসির বাড়ির শিউলি গাছটার তলায় অপেক্ষা করতো ঝরা ফুলের দল। সে জানত ফুল ঝরে গেলেও তার কদর হয় ভাবি প্রজন্মের হাতে। সে আমাদের ফুল জীবনের পাঠ শেখায়। মানুষও একদিন ফুলের মত ঝরে যায়। শুধু সুন্দর হৃদয় ফুলের কদর হয়। শিমূল ফুলের মত রূপ সর্বস্ব মানুষের নয়। শরত আমাদের তাই শিউলি উপহার দেয় শিমূল নয়। 
শিউলি ফুল তোলার পরে আমাকে দিত। শরতের মেঘ।  হঠাৎ বৃষ্টি।
আমার মনে পড়লো মাধবী আমাকে বৃষ্টির একটা বর্ণনা লিখে পাঠিয়েছিলো। সে বলেছিলো, তুমি তো লেখালেখি করো। আমার লেখাটা পড়ো। সে লিখেছিলো, বর্ষার কথা। 

ঝরে চলেছে অবিশ্রান্ত। রাস্তায় বর্ষাতি ঢাকা প্রেমঋতুর আনন্দ বরিষণ বাড়িয়ে চলেছে উদ্দাম বৃষ্টির গতি। আনন্দে সে ভাসিয়ে চলেছে খাল বিল নদীর প্রসারিত কামদেশ। এখন ভাসাতে ব্যস্ত। তার সময় মাত্র দুই মাস। তারপর তাকে ময়দান ছাড়তে হবে। তাই সে নিজেকে উজার করে ঢেলে সাজাতে চায় ভিজাতে চায় শুকিয়ে যাওয়া ফুরিয়ে যাওয়া হৃদয়। মাঝে মাঝে খেয়ালের বশে এত বেশি উচ্ছল হয় বর্ষাহৃদয় যে নদীর ধারা উপচে পড়ে ঘটায় অনর্থ। বন্যারাণী আবেগের ধারায় ভাসিয়ে দেয় গ্রাম শহরের সভ্যতা। মানুষের প্রতি রাগ যেনো ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। মানুষ তবু শিক্ষা পায় কি? কিছু অর্বাচিন গাছ কেটে সাহারাকে ডেকে আনতে চায়। কিছু মানুষ প্রকৃতির গতি হাতের মুঠোয় বন্দী করতে চায়। ফল হয় বিপরীত।
অমর পৃথিবীর মানুষকে বলতে চায় তার অন্তরের কথা। 
এসো বন্ধু আমরা সবাই বর্ষাহৃদয়ে ভিজি। যতদিন বাঁচি ভিজি, আনন্দ করি, বৃষ্টির সাথে খেলা করি। তারপর আমরা সকলে মিলিত হবো শেষ সম্মেলনে ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে। সেখানে কি খুঁজে পাবো এই বৃষ্টিহৃদয়?

এইসব ভাবতে ভাবতে সে পথের সন্ধান পেলো। পথ চলাই জীবন। এখনও তাকে চলতে হবে অনেক অজানা আকাশের পথ। তারপর শুরু হবে সোনার ধানের মরশুমে।

​

আট 

আজ আমরা ফাঁকা মাঠে বসে আছি আকাশের তলায় এখানে মিরাজুল, বিশু, আমি, রমেন সবাই আছি। বিরাজিল হঠাৎ পুরনো দিনের শিল্পীদের কথা বলতে শুরু করল। সেই শীল কোটার মানুষ সেই পথ দেখানোর মানুষ সেই ভাললাগা বামুন আর দেখা যায় না। মিরাজুল বলে আমি বলছি এদের কথা আমিও ছোটবেলায় দেখা এই সব শিল্পীদের আমি ভুলতে পারি না কখনো। বিরাজুল বলে, হাতে একটা ময়লপড়া ঝোলা হাতে শিলকোটানি হেঁকে চলত, শিল কোটাবে গো শিল, শিল কোটাও গো শিল...
বাড়ির বৌ ঝি রা ত্রস্ত হয়ে বেরিয়ে আসত বাইরে। বাইরে এসে বলত, এসো গো আমার দ্বারে আমার শিল একবার কোটাতে হবে। শিলকোটানি লোকটা ময়লা ঝোলা থেকে বের করত ছেনি, হাতুড়ি। তারপর পাথরের শিলের উপর নক্সা ফুটিয়ে তুলতো ঠকঠক শব্দে। আশেপাশে কচিকাঁচা ছাড়াও প্রতিবেশিদের বৌরা দেখত আগ্রগভরে এই শিলকোটা। কিভাবে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে নক্সা হাত ও হাতুড়ির যুগলবন্দীতে।
তারপর একজনের দেখে প্রতিবেশিদের দশজন কুটিয়ে নিত শিল। পাশের বাড়ির অনিতা বললো, আমাদের বাঁটনা বাঁটা শিলটাও কেমন সমান হয়ে গেছে। ফুটো ফুটো না থাকলে মশলা ভালো করে বাঁটা যায় না।
শিলকোটানি লোকটা বলে, নিয়ে এসো গো মা। কুটে দিই শিলটা। আবার কবে আসব জানা নাই।
তারপর দশ বারোটা শিল কুটে রোজগার করে শিলকোটানি চলে আসত তার বাড়ি।
ছেনি, হাতুড়ির সব সময় ঠিক রাখত। অনেকে পাথরের শিল মাথায় করে নিয়ে আসত তার কাছে। কত যত্নে সে শিল কুটতো। তখন তার শিল্পীহৃদয় নিয়ে যেত কল্পনার জগতে। সেখানে রঙ আর রঙীন মেঘের আনাগোনা। সেই মেঘের আশীর্বাদ পেয়ে সে বোধহয় এই কাজ পেয়েছে। সে এই কাজ পেয়ে খুব খুশি। বিশু বললো, অবসরে তিনি কি কাজ করতেন। বিরাজুল বললো,অবসর সময়ে বাগানে গাছ লাগাতেন। আবার সকাল হলেই বেরিয়ে পড়তেন শিকোটানোর কাজে। এখন আর শিলকোটানোর যুগ নেই। মিক্সির চাপে পেশাই হয়ে গেছে প্রচলিত এই পেশা। সেই শিলকোটানোর লোকটির বাড়িতে এখন নাতিদের মিক্সির বাজার। হারিয়ে গেছে পুরোনো সেই শিলের কথা। আর এক সম্প্রদায়ের মানুষ ছিল তারা হাবু গান গাইতো সাথে লাঠি দিয়ে পিঠে আঘাত করত। এইসব আঘাত দেখে সহ্য করতে না পেরে বেশি টাকা দিয়ে তাদের এই খেলা দেখাতে বারণ করত। এইভাবে হাবুগান চলত। কিন্তু তার প্রচলন এখনো দু-এক জায়গায় রয়ে গেছে। হাবু গানে প্রচলিত গান গুলো ছাড়াও কাউকে ব্যঙ্গ করে বা কোন সমাজের অত্যাচার কে ব্যঙ্গ করে গান গাওয়া হতো, যেমন, "আমগাছেতে কখনও জাম ফলে না। বাবুর বেটা এখন হাবু গায় না।" তারপর নিজের পিঠে একটা লাঠির বাড়ি দিত। রমেন বলল এই হাবু গানটা উঠে যাওয়া প্রয়োজন নিজের পিঠে নিজে লাথি মারে দেখতে খুব খারাপ লাগে।
আমি বললাম - হ্যাঁ ঠিক বলেছিস রমেন এটা একদম দেখতে ভালো লাগে না ওরা এলেই আমি লুকিয়ে পড়ি। বিশু বললো, বীরভূম থেকে বহুরূপী সম্প্রদায় এখানে এসে অন্যরকম সাজে অভিনয় করে দেখাতো বহুরূপী রাম সীতা হনুমান এইভাবে তারা বিভিন্ন রকম সাজে সজ্জিত হয়ে আনন্দিত এবং তার বদলে টাকা-পয়সা উপার্জন করে তাদের সংসার চলত। বহুরূপী সম্প্রদায় এখনো অনেক জায়গায় আছে শহরের বিভিন্ন জায়গায় মাঝে মাঝে দেখা যায় হনুমান সেজে কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে কেউ রাবণ সেজে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তারা বিভিন্ন জায়গায় ভান করে বা মজার ছড়া বলে না কিছু উপার্জন করছে এবং এই উপার্জিত টাকা পয়সা তাদের জীবন নির্বাহ হয়। প্রচণ্ড গরমে তারা সারা দেহে রং মেখে এইভাবে পরিশ্রান্ত হয়ে দিনের পর দিন অর্থ উপার্জন করে এবং দিন চলে গেলে তখন তাদের আর কাজ থাকেনা তখন তারা অন্য কাজ করে। 

বিশু বলে আমরাও ছোটবেলায় দেখেছি ভুলো লাগা ব্রাহ্মণ এসে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে তারা ছড়ার মত করে বলতো না বিভিন্ন গ্রামের নাম করত এবং বলতো যেসব গ্রাম ঘুরে এসে শেষে আপনাদের বাড়ি এলাম। হয়তো গ্রামগুলো আশপাশের গ্রামগুলোর নাম বলতো, মেলে পোশলা কোপা ভুলকুরি হয়ে তারপর মুলগ্রাম শিবলুন তাড়াতাড়ি হয়ে তারপর আমাদের গ্রামে এসেছে। দিক দিয়ে ভুলো লাগা ভূত নাকি তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শেষে এইগ্রামে এনেছে। তারপর ঘুরতে ঘুরতে রাস্তা ধরে প্রচন্ড গরমে মালিকের বাড়িতে এলাম বাড়িতে এসে দাঁড়াতেই কথা বলতেন একথা শুনে শিশু থেকে বৃদ্ধ এবং তাকে বসিয়ে হয়তো তার উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসার চলতো সংসার চলত। তারপর এক ধরনের ব্যবসাদার ছিল তারাও সরু লিকলিকে বাসের উপর সেই বোম্বে মিঠাই মিঠাই নানান রঙের মিঠাছড়ি এনে বাচ্চাদের বিভিন্ন রকম পুতুল তৈরি করে দিতে হতো বলতো আমাকে সাপ তৈরি করেছে মিঠাই মিঠাই দিয়ে তৈরি করে দিত আর আমাকে পুতুল বানিয়ে দাও বিভিন্ন নতুন নতুন ছোটদের মনভোলানো আর দেখা যায় না এর অর্থ উপার্জন করত। এই বোম্বাই লাঠি বানানোর জন্য প্রথমে নিজেকে ফুটিয়ে ফুটিয়ে হাজারের মতো তৈরি করা হতো আটা লেগে গেলে বিভিন্ন রঙে রঙিন করা হলুদ নীল সবুজের জরিনা জরিনা হতো প্রথমে তারপর যদি না হতো এবং তাতে প্লাস্টিক জড়িয়ে রাখো ধুলোবালি যাতে না পড়ে তারপর শিশুদের চাহিদামত পুতুল তৈরি করা হতো।

বিরাজুল বলে, তাছাড়া একটা টিনের বাক্স নিয়ে শনপাপড়ি বিক্রেতা শোনপাপড়ি বিক্রি করত। তারা একটা চাকা ঘোরাতো টিনের বাক্সের মধ্যে থাকা এবং তাতে চিনির জল বিভিন্ন রং মিশিয়ে চাকা ঘুরিয়ে দিলে মাকড়সার জালের মত মিঠাই তৈরি হত। সেটাকে এক জায়গায় করে শোনপাপড়ি বিক্রি হতো। এক টাকায় হয়তো একটা দেখা গেল একটা বড় ফুটবলের মত শোনপাপড়ি। অনেকে এর নাম দিয়েছিল দিল্লিকা লাড্ডু। এখনো অনেক  জায়গায় দেখা যায় ঘটিগরম বলে একটা জিনিস যেটা ভুজিয়া জাতীয় জিনিস দিয়ে মিশিয়ে দেওয়া হয়। সেই হাতেধরা জায়গায় থাকে একটা উনুুন এবং সেই উনুনে গরম করে পিঁয়াজ ও নানারকম মশলা মিশিয়ে ঘটিগরম তৈরি করা হয়। 

অনেকক্ষণ আড্ডা মারার পর বিশু বলল তাহলে আবার ব্যবস্থা হয়ে যাক ভ্রমণের। রাজু বলল হ্যাঁ তাতো হবেই আমরাও সবাই সম্মতি দিলাম। বিশু আজ আমাদের সকলকে শৈশবের ঘটনা বলছে, বন্যা এসেছে। আমাদের তখন মাটির দোতলা বাড়ি। কাকিমা রান্না সেরে নিচ্ছেন। বন্যার ঢেউ মাটির দেওয়ালে ধাক্কা মারছে। মাটির দেওয়াল জলের ধাক্কায় পরে গেলো। মা কান্নাকাটি শুরু করলেন। বললেন, কত কষ্ট করে এই বাড়ি হয়েছে। আর হবে না আমার বাড়ি। কাকু বললেন, চলে এসো পাকা বাড়িতে। বেঁচে থাকলে আবার হবে বাড়ি। আমাদের সবাইকে নিয়ে মা কাকুদের বাড়ি চলে এলেন। দুদিন আমরা অই বাড়িতে ছিলাম। আখের গুড় আর ছোলা ভিজে খেলাম সবাই। গোপালদা গরু মোষ দেখার জন্য নীচে ছিল। সে বলল, আমি দেখ এখানে বসে আছি। বাবু বলল, গোপাল দা তোমার পাশে শাঁখামুটি সাপ। গোপাল দা বলল, ভয় নেই আমার। ওরাও জলে থাকতে পারছে না। থাকুক কিছু করবে না।

সারারাত সে সাপের সঙ্গেই ছিলো। কিছু ক্ষতি হয় নি। বিপদে সবাই মিলেমিশে থাকে। বললেন, গোপাল দা। তারপর বন্যার জল নেমে গেলে বাবা, গোপালদা দুজনে মিলে পাকা ঘরটার কাদা বালি পরিস্কার করে জিনিসপত্র নিয়ে এলেন। মাটির বাড়িটা পড়ে গেছে। বড্ড ফাঁকা লাগছে। পাকা ঘর একটা সেখানেই আমরা সবাই একসাথে বাস করতে লাগলাম। আমরা এখন পাঁচজন। তিন ভাই আর বাবা, মা। কাকিমা দুই বোনকে নিয়ে কাটোয়ায় থাকেন। কাকিমা চাকরি পাওয়ার পর কাটোয়া চলে এলেন যাতায়াতের অসুবিধার জন্য। তারপর আবার প্রকৃতির নিয়মে নতুন বছর এলো।
নতুন বছরে নতুন মন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্পৃহা জেগে ওঠে মনে। তারপর এই ইচ্ছেটা ধরে রাখাই খুব কঠিন কাজ বলে মনে হয়। প্রথম প্রথম কবিতা লিখতে এসে, নতুন কবির পাতার পর পাতা ভরে যায়। কিন্তু যখন কবিতা, কবিতা হয়ে ধরা দেয় ভাষা যায় ফুরিয়ে। ছমাসে, নমাসে হয়ত একটা কবিতা ধরা দেয়।

এখানেই মহাপুরুষের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য। তাঁরা হাল ছাড়েন না। লেগে থাকেন। আর লেগে থাকলেই হবে। যে কোনো কাজে সফল হওয়া যাবেই। প্রেমে লেগে থাকলেই হবে। পড়াশোনায় তাই। লেখা সমস্ত কিছুতেই লেগে থাকলেই, চর্চা করলেই সফলতা পাওয়া যায়। তাই লেগে থাকতে হবে। বিফলতাগুলো সফলতার এক একটা স্তম্ভ। বাবা এইসব কথা আমাদের বলতেন। বাবা চাষবাস দেখাশোনা করতেন আর বড়দা লিলুয়ায় চাকরী করতেন একটা বড় স্টিল কারখানায়। আমি গ্রামের স্কুল থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে হাওড়া নরসিংহ দত্ত কলেজে ভর্তি হলাম।

লিলুয়া শহরে যখন ভাড়াটে হিসাবে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতাম চার ভাই, তখন আমরা নিজেরাই রান্নাবান্না করে নিতাম। উনুন ধরিয়ে আঁচ দেওয়া, বাসনমাজা সবকিছু নিজেরাই করতাম। খাবার জল আনতে যেতে হত দু কিলমিটার দূরে। বালতি নামাতে, নামাতে আনতাম খাবার জল। কোনদিন আমার পালা পড়ত। ছোটোবেলা থেকেই এখানে কাটিয়েছি মা, বাবার সঙ্গে। তখন ভাল লাগত। আর এখন মা বাবা এখানে নেই। ভাল লাগত না। মনে হত যাই ছুটে মায়ের কোলে। যেতে পারতাম না। রোজগার করতে হবে। বসে বসে খেলে ত হবে না। বড়দা বলতেন, তোর যখন মন হবে বাড়ি চলে যাবি। মেজদা বলতেন, যা, মায়ের কাছে যা। এখানে তোর ভালো লাগবে না। কিন্তু আমার মনে একটা অপরাধবোধ কাজ করত। বসে বসে খাব। এটা চিন্তা করতেই মন খারাপ হয়ে যেত। তখন গ্রাজুয়েট হয়ে গেছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র পড়াই। আর ফাঁকা ঘরে আমি একা পড়তাম বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, রবীন্দ্রনাথ, মাণিক, শরৎচন্দ্র, নিমাই, শীর্ষেন্দু, শঙ্কর ও আরো অনেকের লেখা। মায়ের অভাব, তাদের লেখাই ভুলিয়ে দিতো নিমেষে।

কিন্তু অতিরিক্ত নাটক, কবিতা, গল্প পড়ার ফলে আমার চাকরী-বাকরী হয় নি। গোড়া, গৌতম, গোবিন্দ, অসীম আসতো বাসায়।

দাদার কাছ থেকে চলে এলাম মায়ের কাছে ছোটো ভাইয়ের হাত ধরে। শিবলুন স্টেশনে নেমে মাটির গন্ধে আমি আত্মহারা হয়ে গেলাম। মাটির স্পর্শ পেলাম। তারপর বাড়ি গিয়ে মা কে দেখে চোখে জল চলে এল। মায়ের চোখেও জল। তারপর সহজভাবে গ্রাম্য পরিবেশে মিশে গেলাম। ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েদের নিয়ে খোলা মাঠে বসতাম। গল্প শোনাতাম। এদিকে শুরু করলাম তিন ভাই মিলে গানের ক্লাস। তারপর আমার বিয়ে হলো কাশীরাম দাসের জম্মস্থান সিঙ্গি গ্রামে। মনে আছে বন্ধুদের পাল্লায় পরে কাটোয়া এনিস সেলুনে ফেসিয়াল করেছিলাম। ফলে বিয়ের ছবিগুলো খুব সুন্দর হয়েছিল। বিয়ের তিন বছরের মধ্যেই পুত্র সন্তান হলো। ভাই নাম রাখলো সৈকত।

এবার জীবিকার সন্ধানে চলে এলাম কাটোয়া শহরে। সস্তার জায়গা দেখে বাড়ি বানালাম। বেড়া দিয়ে ঘিরলাম জমি। কিছু গাছ লাগালাম। গ্রামের পরিবেশ। এটাই আমার সাদা কালো জীবনে বেশ খাপ খায়। তারপর মরণের সঙ্গে সহবাস। সস্তার সাত অবস্থা। সাপের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হলেও পালাবার পথ বন্ধ। মায়ার শেকল পায়ে জড়িয়ে গেছে। সামনে গঙ্গা নদী। ভয়ের চোটে আমি স্বপ্নে দেখছি আমি গঙ্গা নদীর জলে ডুবে গেছি। কিছুক্ষণ জলের তলায় পরে থাকলাম। তারপর ফুলে ফেঁপে ভেসে উঠলাম। পেট ফোলা দেখে একটা কাক এসে বসলো আমার উপরে। তারপর খুঁটে খেতে লাগলো পেটের চর্বি। পেট ফুটো হলেই জল ঢুকতে শুরু করলো। আবার আমার দেহ চলে গেলো জলের তলায়। এবার কুমীর, বোয়াল মাছে খেতে লাগলো আমার দেহের মাংস। শেষে কুমীরটা গিলে ফেললো আমার কংকাল শরীর। কুমীরটা, খাওয়ার পরে সাঁতার কেটে চলে গেলো আনন্দে। আমি দেহ শূন্য হয়ে উড়তে উড়তে আকাশের পথে চলেছি। আমি এখন আমার মৃত দাদু, বাবা, ঠাকুমা সবাইকে দেখতে পাচ্ছি। তারা এক একটা তারা হয়ে জ্বলজ্বল করছে। আমি থমকে গেছি। তাদের কাছে যেতে পারছি না। দাদু এগিয়ে এসে নিজের আলো ছড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। আমি তার সঙ্গে চলতে শুরু করলাম। তাদের মাঝে আমারো জায়গা হলো।

আমি মাঝে মাঝে গ্রামে যাই। মায়ের কাছে। মাটির কাছে। এবার গ্রামে গিয়ে দেখলাম, গোস্বামি বাড়িতে রাধামাধব এসেছেন। 

রাধামাধাব আসলে আমাদের গ্রাম বৃন্দাবন হয়ে উঠত। ঘরে ঘরে হরিনাম হত। আমরা নিমন্ত্রন পেতাম সাতদিন ধরে। গোস্বামি বাড়ির পুজোতলায় রাতে বসত কির্তনের আসর। রাধার উজাড় করা প্রেমের কাহিনী শুনে মা, পিসির চোখে জল বাঁধ মানত না। বিশু বলে চলেছে, আমার মা মহাভারতের অনেক গল্প বলতেন। আমাদের ছোটোবেলাতে অনেক গল্প শুনে মুখস্ত হয়ে গেছিল। রামায়ণের গল্প সুর করে পড়ে শোনাতেন আমার দাদু। দাদু ভাল গান করতেন একতারা বাজিয়ে। তখনকার দিনে যাত্রা শিল্পে মহিলা পাওয়া কঠিন ছিল। আমার দাদু মহিলা সেজে স্টেজে অভিনয় করতেন। বেশ ছিল ছোটোবেলার দিনগুলো। এখন বয়স বেড়েছে। আবেগ এখন পাগলামি বলে মনে হয়। অথচ এই পাগলামি ছিল বলেই দাদু এত নামকরা শিল্পী হয়েছিলেন। বিশুর দেশপ্রেম, মানবপ্রেম দেখে আমরা তার ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। কোন্নগরে থাকে আবার নতুন বন্ধু মানে ওই কো-অপারেটিভ ব্যাংকের যোগ দিয়েছে এবং তাদের নিয়েই আমরা ভ্রমণ করেছি। আমাদের বেড়ানোর একটা দল ছিল একদল দেখে আমরা একটা কো-অপারেটিভ বানিয়েছিলাম। মাসে মাসে ২০০ টাকা করে জমা দিয়ে এক একজন এইভাবে পাঁচ বছরে প্রায় দু'লাখ এর উপর জমা হয়ে গেল। আমাদের দলের আমরা প্রধান ছিলাম চারজন আমি রমেন বিশু আর ববিরাজুল। আমরা প্রথমে গেছিলাম পুরি। পুরি দেয়া হয় কাটোয়া থেকে গেলাম হাওড়া। হাওড়া জগন্নাথ এক্সপ্রেস ধরে পুলিশ স্টেশনে যখন আমি পাণ্ডাদের পাল্লায় পড়ে গেলাম আমাদের নিয়ে গেল একটা হোটেলে সেই হোটেলে আমরা থাকলাম সমুদ্রের ধারে হোটেলটা কাছাকাছি ধারে না হলেও কাছাকাছি এবং সেখানে খাওয়া-দাওয়া সবই পাওয়া যেত হোটেল থেকে আমরা করলাম তার কারণ সকলের সাথেই পরিবার ছিল আমি আরবি ছড়া। সাইটসিন ঘোরার জন্য আমরা বাস ভাড়া করলাম এবং বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করলাম তারপর সমুদ্রে স্নান করার অপূর্ব দৃশ্য বড় বড় ঢেউ ঢেউ কিন্তু দিঘার ঢেউ এর মত নয় বড় বড় বিশাল তালগাছের মতো কেউ সৈকতের কাছে এসে বসে আছে অনেকটা অনেক করেও গেছে আমরা থাকতাম।

​আবার ৫ বছর পর আমরা চলে গেলাম দার্জিলিং। দার্জিলিং এ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে আমরা পরাজিত ভাড়া করলাম। সেখানে জিৎ ড্রাইভার। তাছাড়া ওই পাহাড়ে উঠতে পারবে না তাদের ভাড়া করে আমরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দার্জিলিং পৌছালাম। দার্জিলিঙে আমার এক বন্ধু রেলে চাকরি করে। যোগাযোগ করে সেখানে ঠিক করে রেখেছিল ঘর। সেখানে গিয়ে আমরা রান্নাবান্না করে কদিন খাওয়া-দাওয়া করে খুব সুন্দর ভাবে কাটালাম। পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিকাল পার্কঃ এই চিড়িয়াখানায় রেড পান্ডা, স্নো লেপার্ড, তিব্বতীয় নেকড়ে সহ পূর্ব হিমালয়ের প্রচুর বিপদগ্রস্ত ও বিলুপ্ত পক্ষী ও প্রাণীদের দেখতে পেলাম। কাঠমান্ডুতে ধীরধাম মন্দির। এটি বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দিরের অনুরূপ। বেঙ্গল ন্যাচারাল হিস্টোরি মিউজিয়ামঃ এই জাদুঘর গাছপালা ও পশুপাখিদের প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্দরে প্রবেশ করায়। লাওডস্ বোটানিকাল গার্ডেনঃ এই উদ্যানে অর্কিড, প্রিমুলা, সহ নানা জাতের হিমালয়ান উদ্ভিদ পাওয়া যায়।লেবং রেস কোর্স, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট এবং সর্বোচ্চ রেস কোর্স। ঘুম বৌদ্ধ মনেস্ট্রি। এটি এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ মনেস্ট্রি। অবজারবেটরি হিলঃ ধীরধাম মন্দির এবং বৌদ্ধ সংরক্ষণালয় এই পর্যবক্ষেণ পাহাড়ের উপর অবস্থিত। দার্জিলিং ঘুরতে ঘুরতে বিরাজিল বলল- দেখ মনে হচ্ছে আমরা ছবি দেখছি কোনোদিন ভাবতে পারিনি এই ছবি আমরা দেখতে পারবো। বিশু বলল - হ্যাঁ সত্যিই তাই ভারতের উচ্চতম রেল স্টেশনের নাম শুনেছি শুনেছি কিন্তু আজ এই প্রথম দেখলাম ।এই ঘুম স্টেশনটি হচ্ছে সবথেকে উচ্চতম রেল স্টেশন। আমরা দার্জিলিং থেকে ফিরে আসার সময় কার্শিয়াং এস্টে করেছিলাম সেখানে খাওয়াদাওয়া সারলাম এবং আমাদের ড্রাইভার বললেন - এখানে যাদের কাজ করবেন না কারণ নিচে সবারই আছে আমরা তো এভাবে অভ্যস্থ নই। আমরা সমতল এলাকার ছেলে তাই বুঝতে পারিনা পাহাড়ের আমাদের সতর্ক করে দিলেন। বিশু পরোপকারী সত্যবাদী এবং বন্ধুদের জন্য প্রাণপণ খাটে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করে সে। চিরকালই নিঃস্বার্থ। নিজের জন্য কোনদিন ভাবেনি। তার বাবা সৈন্য বিভাগে চাকরি করতো এবং তার কাছে টাকা দিয়ে যেত অনেক তার টাকার কোনো অভাব ছিল না সেই টাকা কিন্তু নিজের জন্য খরচ করত না আগেই বর্ণনা করেছি ও সর্দার বুড়ি বা সরদারপাড়ার যারা খেতে পেত না তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতো। বিরাজুল সবসময় সত্যবাদী এবং সে সাহসী। সব কাজেই সে আমাদের সঙ্গে আগে যেত এবং বুক পেতে বিপদে মুকাবিলা করত। একমাত্র দলের মধ্যে আমি ছিলাম ভিত  এবং সবার পিছনে থাকতাম শুধু পর্যবেক্ষণ করতাম কে কেমন ভাবে চলাফেরা করে। আমার খুব ভালো লাগতো সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসে থাকতাম বন্ধুদের সাথে। আমি শুধু সেই পর্যবেক্ষকের কাজ করতাম। নাটকের শ্রুতিধরের সেই কাজটাই করে চলেছি। এবার পুরী কথায় আসি পুরীভ্রমণের কথায় আসি। পুরীর স্বর্গদ্বার সত্যি যেন স্বর্গ। সারারাত জার্নি করে শরীরের যে ক্লান্তিভাব ছিল তা মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে হালকা ঠান্ডা ও সমুদ্রের বিরামহীন হাওয়ায় শরীর ও মন সব তাজা হয়ে গেল। এদিকে সঙ্গীরা আমার স্বর্গদ্বারে বসে স্বর্গের সুখ উপভোগ করছে। পান্ডারা হোটেলে নিয়ে গেল। বেড়িয়ে পড়লাম বেড়াতে। পুরী আসার আগেই ওখানকার হোটেল, হোলিডে হোম সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে এসেছিলাম। তাই স্বর্গদ্বারের পাশ দিয়ে ভারত সেবাশ্রমের রাস্তা ধরে পুরীর বাজারের দিকে এগিয়ে চললাম এখন আর পুরীর শশ্মান থেকে ও অনেকটা দূরে যেখানে ঝাঁঝালো কোন গন্ধ নেই। আমার মত ছাপোষা বাঙ্গালীর জন্য ভাড়াটা ও সাধ্যের হোটেল বুকিং করে চললাম আমার সঙ্গীদের নিয়ে আসার জন্য যাকে আবার পুরীর স্বর্গদ্বারের সামনে বসিয়ে রেখেছি। যুদ্ধ জয়ের বীরের হাসি নিয়ে বন্ধুকে নিয়ে এলাম হোলিডে হোমে। আমার বন্ধু আবার বাংলাদেশ থেকে পদ্মার ইলিশ নিয়ে এসেছে। রুমে ঢুকেই আমার বন্ধুর কারিকুরি শুরু হয়ে গেল। আমার ৫ দিনের পুরী ট্যুরে বন্ধুর হাতে তৈরি বিভিন্ন রকমের মাছ ভাজা, পর্মফ্রেট ফ্রাই, চিংড়ি মাছের ফ্রাই, বেগুনী আর ঘন্টায় ঘন্টায় চা, কফি সহ আরো কতকিছু খেয়েছি। সত্যি বন্ধুদের হাতে সুস্বাদু খাবার খেয়ে যেন চেহারাটা বেশ বেড়ে গিয়েছিল। হোলিডে হোমে এ ব্যাগ রেখে ছুটলাম পুরীর বাজারে। ওখানে গিয়ে চাল, ডাল, নুন, লংকা সহ যাবতীয জিনিসপত্র কিনে চলে এলাম হোলিডে হোমে। ওদিকে হোমের কেয়ারটেকার দাদা ওভেন, সিলিন্ডার, বাসনপত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। আমার সঙ্গী ঝটপট করে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা পদ্মার ইলিশ ভাজা, বেগুন ভাজা ও ডাল দিয়ে সকালের টিফিন তৈরি করে ফেললো। কি অমৃত খেতে তেল দিয়ে ইলিশ মাছ ভাজা দিয়েই সকালের টিফিনটা করলাম। তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার ছুটলাম সমুদ্র সৈকতে। পুরীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান হলো সমুদ্র। শুধু সমুদ্রের গর্জন ও ঢেউ দেখে কিভাবে পুরো দিন কেটে যায় তা বোঝাই দায়। সোনালী রংয়ের বালির পাড় ধরে হেঁটে সমুদ্র দেখার মজাই আলাদা। সাথে রয়েছে উট, ঘোড়া। বিশেষ করে উটের পিঠে চড়ে সমুদ্র দেখা এক আনন্দের ব্যাপার।পুরীর জগন্নাথ মন্দির, সমুদ্র, জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি তারপর পুরনো পাহাড়গুলো তারপর আরও অনেক জায়গা আমরা ঘুরলাম বাসে করে। ফিরে এলাম আবার নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে চলে গেলাম সেখানে ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল ট্রেনে যেতে আবার হাওড়া এসে হাওড়া থেকে কাটোয়া চলে এলাম। বিশু বলল ভালোভাবে পুরোটা ঘোরা হল না আর একবার পড়ে যাওয়া হবে।আমরা চারবন্ধু গরমের ছুটিতে ঘুরতে যাব ঠিক করলাম। এবার আমরা ঠিক করলাম মধ্যপ্রদেশে শাসিতে যাব আমরা চারজন ইতিহাসের ছাত্র ছিলাম তাই চারজনে এক বাক্যে রাজি হওয়াতে আর তোরা কারো কমিটির অসুবিধা হলো না। আমি, রাজু, শ্যামলী আর সোমা। চারজনই আমরা ইতিহাসের ছাত্র। এক কলেজে পড়ি।

সোমা বলল, সাঁচি স্তুপ দেখে আসি চল। বলল, মধ্যপ্রদেশের রাজধানী শহর ভূপাল থেকে ৪৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সাঁচির বিদিশাগিরিতে অবস্থিত বৌদ্ধ স্তূপ। সম্রাট অশোক এই স্তূপ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজু বলল, হ্যাঁ ইতিহাসে পাওয়া যায় এইসব কাহিনী। অশোককের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরও কলিঙ্গবাসী পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ নরনারী প্রাণ হারায় এবং প্রায় দেড়লক্ষ নরনারী বন্দী হয়। এই যুদ্ধের এই বীভৎসতা সম্রাট অশোককে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। পরে তিনি যুদ্ধের পথত্যাগ অহিংসার পথে সাম্রাজ্য পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ক্রমে ক্রমে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং উপগুপ্ত নামক এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে দীক্ষা নিয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর গুরু উপগুপ্তকে সাথে নিয়ে কপিলাবস্তু, লুম্বিনী, কুশীনগর, বুদ্ধগয়া-সহ নানা স্থানে ভ্রমণ করেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেন। এই সময় তিনি নানা স্থানে স্তূপ, স্তম্ভ এবং পাহাড়ের গায়ে বুদ্ধের বাণী লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা করেন। এই সূত্রে তিনি বর্তমান সাঁচি থেকে দশ কি.মি দুরে বিদিশাগিরি নামক পাহাড়ে একটি বৌদ্ধ স্তূপ তৈরি করেছিলেন। আমি জানি, সম্রাট অশোকের তৈরি মূল স্তূপটির ব্যাস প্রায় ৩৬.৬ মিটার ও উচ্চতা প্রায় ১৬.৫ মিটার। কথিত আছে অশোকের কন্যা সঙ্ঘমিত্রা ও পুত্র মহেন্দ্র শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারে যাওয়ার আগে, সাঁচিতে এই স্তূপ পরিদর্শন করেছিলেন। বিদিশাগিরির শীর্ষে রয়েছে সম্রাট অশোকের তৈরি মহাস্তূপ। একে এক নম্বর স্তূপ বলা হয়। মনে করা হয় এই এক নম্বর স্তূপের মধ্যে বুদ্ধদেবের ভস্ম আছে। উল্লেখ্য সম্রাট অশোক যে স্তূপ গড়েছিলেন তা এখনকার স্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। একশ বছর পরে সেই স্তূপের উপর আরো বড় স্তূপ তৈরি হয়। তা ঘিরে তৈরি হয়েছিল পাথরের অলিন্দ। কালক্রমে সে অলিন্দের পাথর অনেকটা ক্ষয়ে গিয়েছিল। এই কারণে পরে স্তূপের পাশে গোল বারান্দার মতন প্রদক্ষিণ পথ তৈরি হয়। এরও প্রায় একশ বছর পর স্তূপের চারদিকে চারটি তোরণ নির্মাণ হয়। এক নম্বর স্তূপের উত্তরমুখী তোরণ এখনও অক্ষত। এতে আছে কাঠ বা হাতির দাঁতের সূক্ষ্ম কারু কাজ। তোরণের স্তম্ভ ও ফলকে বৌদ্ধ জাতকের গল্প খোদাই করা আছে। বুদ্ধের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু দৃশ্য এখানে দেখা যায়। তবে তোরণ বা স্তম্ভে বুদ্ধের কোন মূর্তি নেই। কখনও গাছ, কখনও ধর্মচক্র, কখনও পদচিহ্ন-এসব প্রতীক দিয়ে বুদ্ধের উপস্থিতি বোঝান হয়েছে। এর কারণ সম্ভবত এই যে সে সময় বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের ভিতর বুদ্ধমূর্তি পূজোর নিয়ম ছিল না। আমরা হাওড়া এসে ট্রেনে চাপলাম। তারপর যখন ভূপাল এলাম তখন রাত্রি। আগে থেকে হলিডে হোম বুক করা ছিল। এখান থেকেই আমরা সাইড সিন ঘুরে কভার করব। প্রয়োজনে ফিরে আসব এখানেই। রাজু বলল, এখান থেকে মাত্র ৪৬ কিলোমিটার দূরে বিদিশাগিরি। সেখানে ভগবান বুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বৌদ্ধ স্তূপ সাঁচিতে অবস্থিত। মালপত্তর রেখে রেডিমেড খাবার খেয়ে আমরা বিশ্রাম নিলাম। আমি আসলে সোমার প্রেমে আবদ্ধ আর রাজু, শ্যামলীর প্রেমে হাবুডুবু খায়। পড়াশুনা শেষ হলে চাকরি পেয়ে বা ব্যবসা করে আমরা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হব একথা আমাদের দুই পরিবারই জানে। আমরা শুয়ে পড়লাম রাত একটার সময়। তারপর সকালে উঠে বাস আসার অপেক্ষা। বাস আমাদের নিয়ে গেল আজ সাঁচী।

আমাদের গাইড বলছেন, বাবু ইতিহাসের কথা একটু মন দিয়ে শুনে লিবেন। তাহলে মজা পাবেন। সোমা বলল, লোকটা তো ভালো বাংলা বলে। আমি বললাম, হ্যাঁ। গাইড বলতে শুরু করলেন, মৌর্য বংশের অবসানের পর, ব্রাহ্মণরা বেশ কয়েকবার সাঁচির স্তূপ আক্রমণ করে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালায়। এই সময় অশোকের স্তূপ ছাড়াও সাঁচির সমস্ত সৌধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও স্থানীয় গৃহী বৌদ্ধরা নতুন উদ্যমে কিছুটা মেরামত শুরু করেন। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক ধাক্কা সাঁচির উপরেও পরে। ফলে নতুন উদ্যমে মঠ স্তম্ভ নির্মাণের কাজেও ভাঁটা পড়ে। এবং শেষে একেবারে থেমে যায়। গুপ্তযুগে দেশে কিছু শান্তি ও সমৃদ্ধি এলে সাঁচিতে কারুশিল্প ও স্থাপত্যের কাজ নতুন ভাবে শুরু হয়। এ সময়ই মূর্তির দেখা মেলে। এসময়ে সতেরো নম্বর মন্দিরটি নির্মিত হয়। এভাবে দুশো বছর কাজ চলতে থাকে। তারপর হুনেরা ভারত আক্রমণ করে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ফলে এই স্তূপের নিয়মিত সংস্কার বন্ধ হয়ে যায়। ৬০৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা হর্ষবর্ধনের শাসনকালে বৌদ্ধধর্ম বিস্তার লাভ করে। এই সময় সাঁচিতে বেশ কিছু মঠ ও মন্দির বানানো হয়। এই ধারা প্রায় ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এরপর হিন্দু আধিপত্যের কারণে সাঁচিতে বৌদ্ধ-ধর্মাবলম্বীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ক্রমে স্তূপে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ফলক স্থাপিত হতে থাকে। একসময় সাঁচি বৌদ্ধশূন্য এলাকায় পরিণত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর দিকে সাঁচির বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকা একটি পরিত্যাক্ত এলাকায় পরিণত হয়। কালক্রমে স্তূপটি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়।১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ জেনারেল টেলার সাঁচির ধ্বংসস্তূপ আবিষ্কার করেন। এই সময় গুপ্তধনের আশায় লোকজন শেষবারের মতো স্তূপটির ক্ষতি করে। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাপটেন জনসন এক নম্বর স্তূপটি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলে। ফলে স্তূপের গায়ে প্রকাণ্ড ফাটলের সৃষ্টি হয় এবং পশ্চিমের তোরণ ভেঙ্গে পড়ে। একইভাবে দু নম্বর স্তূপও ধ্বংস হয়। ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে আবার দুই ও তিন নম্বর স্তূপ খোঁড়া হয়। এক নম্বর স্তূপের মধ্যে রত্নরাজির সন্ধানে লোহার রড ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এই সময় স্থানীয় এক হিন্দু জমিদার অশোক স্তম্ভটি তিন টুকরো করে বাড়ি নিয়ে যান। ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দের পরে স্তূপটি সংরক্ষণের চেষ্টা করেন মেজর কোল। পরের তিন বছর তিনি এই উদ্যম সচল রাখেন। এর বেশ পরে পরে ভারতের আর্কিওলজিকাল সার্ভের ডিরেক্টর এ কাজে এগিয়ে আসেন। মেজর কোল বিদিশাগিরির জঙ্গল কেটে গোটা পাহাড় পরিষ্কার করান। এক নম্বর স্তূপের ফাটল মেরামত করেন। পশ্চিম ও দক্ষিণদিকের তোরণগুলি তুলে যথাস্থানে স্থাপন করেন। এরপর বাকি কাজ করেন স্যার জন মার্শাল।

১৯১২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে এই স্তূপের যে সংস্কার করা হয়, বর্তমানে তাই পুরাকীর্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। আমরা বাসের সকলে হোটেলে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। এখানে দেওয়ালের কারুকাজ দেখলেই সমগ্র ইতিহাস দেখা যায় চোখে। সোমা বলল মহামতি জীবকের কথা দেওয়ালে খচিত আছে। আমরা পড়েছি, জীবক অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা শাস্ত্র এবং ভেষজ বিজ্ঞান অধ্যায় পর চিকিৎসক হিসেবে বিম্বিসারের সভায় যোগদান করেন এবং ভগবান বুদ্ধের শিষ্য গ্রহণ করেন। কিন্তু অজাতশত্রু রাজা হওয়ার পরে বৌদ্ধবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন।রাজু পুরোনো অট্টালিকায় দাঁড়িয়ে বলল, আমি অজাতশত্রুর অভিনয় করছি আর তুই হয়ে যা মহামতি জীবক। আমি বললাম, তাই হোক। তারপর আমি বললাম, আজ রাজসভায় অজাতশত্রু কথা বলছেন, রাজু শুরু করল অভিনয়। সেনাপতি সোমা আর রাজপুরোহিত শ্যামলী। সবাই এক্সপার্ট। কলেজের সোশালে ওরা নাটকে অভিনয় করে। - শোন হে পারিষদ বর্গ। আমার রাজ্যে বৌদ্ধগান বন্ধ করতে হবে। সেনাপতি কোথায়?- আজ্ঞে  আমি, হাজির। আদেশ করুন।- আমার রাজ্যে আমিই এক এবং একক। আর কেউ ধর্ম প্রচার করে বড় হবে এ আমি কিছুতেই সহ্য করব না। তাই হবে রাজন। আজ থেকে আমি দেখব। আপনার আদেশ শিরোধার্য।- না খুব কড়াকড়ি করার প্রয়োজন নেই। রাজার আদেশ তারা যেন পালন করেন এবং কর ঠিকমত দেয় তার ব্যবস্থা  করুন। শুধু ধর্ম নিয়ে পেট ভরে না।রাজা অজাতশত্রু আদেশ দিলেন। তারপরও তিনি ভাবছেন বুদ্ধদেবকে সকলে ভগবান বলে মানে। কেন? তার মধ্যে কি এমন আছে যে রাজার থেকেও সাধু বড় হয়ে যায়। তিনি রাজপুরোহিতের কাছে যান। রাজপুরোহিত বলেন, বুদ্ধদেব বাল্যকালে রাজপাট ছেড়ে কঠোর সাধনায় ব্রতী হয়েছেন। দীর্ঘ সময় সাধনা করে তিনি সিদ্ধিলাভ করেছেন। তিনি সাধারণ মানুষ নন। তিনি তাঁর ভক্তদের কাছে ভগবানস্বরূপ রাজা বলেন, হ্যাঁ শুনেছি। রাজপুত্র বাইরে বেরিয়েছিলেন চারদিন। চারদিন তিনি মানুষের যৌবন, জ্বরা, ব্যাধি ও মৃত্যু দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে মানুষের যদি শেষ পরিণতি মৃত্যু হয়, তাহলে এই যে সংসার জীবন, এর কোন অর্থ হয় না। রাজপুরোহিত বললেন, হ্যাঁ ঠিক বলেছেন তারপর তিনি এক গভীর রাতে রাজ্যপাট ছেড়ে মাকে ছেড়ে, বাবাকে ছেড়ে, রাজ্যের লোভ ছেড়ে তিনি বাইরে ফিরছিলেন সন্ন্যাসী হবেন বলে। তারপর বটবৃক্ষের তলায় কঠিন সাধনা শুরু করেছিলেন। সেই সাধনায় তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তারপর সুজাতা নামে এক মহিলার পায়েস খেয়ে তিনি সেই সাধনা ভঙ্গ করেন। তিনি বুঝেছিলেন শরীরকে কষ্ট দিয়ে সাধনা করা যায় না। সাধনা করতে গেলে শরীরকে কষ্ট দিতে নেই।নাটক শেষে, গাইড আবার বললেন, ইতিহাসের কথা, এখন তিনি ভগবান বুদ্ধ নামে পরিচিত। তার কাছে অনেক মানুষ মনের অশান্তি, যন্ত্রণা নিয়ে আসেন এবং মনে সুন্দর এক ভাবনা নিয়ে ফিরে যান। একজন এসে তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, কেন আমার ঘরে মৃত্যু বারবার প্রবেশ করছে? আমি মরতে চাই না। তিনি বলেছিলেন, ঠিক আছে তুমি এমন কোন বাড়ি থেকে আমাকে একমুঠো সরিষা এনে দাও যার ঘরে মৃত্যু প্রবেশ করেনি। সেই সরিষা খেলে তুমি অমর হয়ে যাবে। সেই ব্যক্তি বক্তব্যের সারাংশ বুঝে চলে গিয়েছিলেন খুশিমনে। রাজপুরোহিত বলেছিলেন, কিন্তু বুদ্ধদেবের চিকিৎসা করেন

এক চিকিৎসা বিজ্ঞানী, সে মস্ত বড় চিকিৎসক তার নাম জীবক। আমাদের রাজপরিবারের চিকিৎসক তিনি রাজা বিম্বিসারের আমল থেকে। তুমি এই জীবককে প্রাসাদে এনে রাখতে পারো সে তোমার চিকিৎসা করবে। রাজপরিবারের চিকিৎসা করবে। অজাতশত্রুর আগে মহারাজ বিম্বিসার সবরকম খোঁজখবর নিয়ে জীবককে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তার রাজসভায় জীবক এসেছিলেন। জীবক রাজি হয়েছিলেন রাজসভায় যোগদান করার জন্য। আবার বুদ্ধদেবের প্রধান শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জীবক। অজাতশত্রু বৌদ্ধ বিদ্বেষী হয়েও জীবককে মর্যাদার আসনে রেখেছিলেন। মহামতি জীবক রাজপরিবারের চিকিৎসা করতেন। আর যেখানে খবর পেতেন সেখানেই চিকিৎসা করতে চলে যেতেন পায়ে হেঁটে। একবার এক গরীব মানুষ সপ্তপর্ণী গুহাপ্রদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রাজসভায় মহামতি জীবকের সন্ধান করেছিলেন। সেই দরিদ্র রাজপ্রাসাদের গেটের বাইরে অধীর আগ্রহে আশাবাদী হয়ে উঠলেন মহামতির দর্শন পাওয়ার জন্যতিনি প্রহরীকে বললেন, একবার মহামতি জীবকের কাছে যেতে চাই। প্রহরী বলল, তোর সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি। তুই সামন্য এক কৃষক হয়ে রাজার চিকিৎসকের সাহায্য চাইছিস? যা পালা। তার সঙ্গে দেখা হবে না। তিনিমএখন চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করছেন। লোকটি বলল, আমাকে বাঁচান। আমার স্ত্রী মরে যাবে। প্রহরী বলল, তোর মরে যাওয়াই ভালো। গরীব কৃষক কান্নাকাটি শুরু করলেন। গোলমাল শুনে মহামতি জীবক জানালা থেকে গোলমালের কারণ অনুধাবন করলেন। তারপর তার চিকিৎসার থলে নিয়ে হাজির হলেন গেটের সামনে। মহামতি প্রহরীকে বললেন, দরজা খোলো। আর কোনো লোকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে না। জীবনে কষ্ট পাবে খারাপ আচরণের ফলে। প্রহরী লজ্জিত হয়ে গেট খুলে দিল। জীবক গরীব কৃষকের হাত ধরে চলে গেলেন পায়ে হেঁটে দশ মাইল পথ। তার চিকিৎসায় সেরে উঠেছিল কৃষকের স্ত্রী। কোনদিন কোন গরিব মানুষ তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়নি। তিনি অর্থের বিনিময় চিকিৎসা করতেন না। তিনি চিকিৎসা করতেন মানুষকে ভালোবেসে। ভগবান বুদ্ধের বাণী তার জীবনকে প্রভাবিত করেছিল অনেকখানি। রাজা অজাতশত্রু জীবকের কাছে ভগবান বুদ্ধের বাণী সম্পর্কে অনেককথা শুনেছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি তাঁর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন এবং জীবককে অবসর সময়ে রাজা নিভৃতকক্ষে ডেকে পাঠাতেন। তন্ময় হয়ে শুনতেন জীবকের কথা। জীবক বলতেন, জীবে দয়া, ভালোবাসা আর শান্তি তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। জীবক সময় কাটাচ্ছেন রাজার কক্ষে এবং বুদ্ধের বাণী শোনাতেন রাজাকে। জীবন শান্তি ধর্ম আর ভালোবাসার জন্য। বৌদ্ধ ধর্মের মূলকথা, যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। শান্তিই একমাত্র সমস্ত কিছুর সমাধান করতে পারে। ভালোবাসা আর শান্তি, এই হল বুদ্ধদেবের বাণীর মূলকথা। অজাতশত্রু তার বাবার কাছেও শুনেছিলেন জীবকের কথা। বিম্বিসার জানতেন বৌদ্ধ যুগের ভারতবর্ষে বিজ্ঞানে, চিত্রকলায়, দর্শনে সর্বত্র নিয়োজিত হয়েছিল এক প্রতিবাদ এবং সেগুলি জগতের কাছে একটি বিস্ময়। মহারাজ বিম্বিসার বলতেন, মহামতি জীবককে পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম সেরা চিকিৎসক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী বলা যেতে পারে কথিত আছে ইনি বারবনিতার সন্তানরূপে জন্ম নিয়েছিলেন আবর্জনার স্তুপে। পরিণত করেছিলেন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়। চিকিৎসা শাস্ত্র এবং বিজ্ঞান চিকিৎসক মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন এবং ভগবান বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। অজাতশত্রু প্রচন্ড বুদ্ধবিরোধী হলেও এবং পিতাকে বন্দি করলেও জীবকেকে চিকিৎসক পদে বহাল রেখেছিলেন। জীবকের অসাধারণ চিকিৎসা নৈপূণ্যের জন্য। সাধারণ জীবন যাপন করছেন জীবক। ধর্মপ্রচারের পরিবর্তে তাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন শেষে তার আচরণ অজাতশত্রুকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে শত্রুতা করেও তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করেছিলেন এবং তাদের পরামর্শে অজাতশত্রু প্রথম বৌদ্ধ সম্মেলন আহ্বান জানিয়েছিলেন। পর্বতের গুহায় সম্মেলন হয়েছিল এবং ভগবান বুদ্ধের বাণী গুলিকে একত্রিত করা হয়েছিল। অজাতশত্রু একদিন জীবককে বললেন, আমি ভগবান বুদ্ধের শরণাপন্ন হতে চাই। জীবক বললেন, চলুন আমি আপনাকে ভগবানের কাছে নিয়ে যাই।ভগবান বুদ্ধের কথা শুনে অজাতশত্রুর জীবনে বিরাট এক পরিবর্তন আসে। তিনি বৌদ্ধ মহাসম্মেলনের ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেন, ভগবান বুদ্ধের বাণীগুলি সংরক্ষণ করে রাখা হবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলি যুবকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গ্রন্থগুলি থেকে জানা গেছে তিনি দু-দুবার বুদ্ধকে কঠিন রোগ থেকে মুক্ত করেছিলেন। সংসার থেকে বৌদ্ধভিক্ষু ১০০ বছর বয়সে পদব্রজে বৌদ্ধবিহার গুলিতে যাওয়া আসা করতেন কেবলমাত্র চিকিৎসার কারণে। বহুদূর থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে আসতেন চিকিৎসার জন্য। কাউকে বিমুখ করতেন না। জীবককে বলা হয় বেদোক্ত যুগের ধন্বন্তরি। রোগীকে না দেখেও কিরকম চিকিৎসা করতেন তা শুনলে চমকিত হতে হয়। কথিত আছে ভগবান বুদ্ধ একবার কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ওষুধগুলো পদ্মফুলে মিশিয়ে রেখেছিলেন। বুদ্ধদেব গ্রহণ না করায় যুবকদের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। ঘ্রাণ গ্রহণ করেই তাঁর রোগ ভালো হয়েছিল। সেবার কাজে নিজেকে শতত নিয়োজিত রাখলেও বিজ্ঞানকে বঞ্চিত করেননি জীবক চিকিৎসা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সেগুলো পরের দিকে হারিয়ে গেলেও পরবর্তীকালে ভারতীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট সাহায্য করেছিল তার শেষ বয়সে শ্রেষ্ঠ রচনা শিশু রোগ চিকিৎসা গ্রন্থ পৃথিবীর প্রথম শিশু চিকিৎসা সংক্রান্ত বই অতি মূল্যবান গ্রন্থ যা পরবর্তীকালে ভারতীয় চিকিৎসকদের শিশুরোগ সংক্রান্ত গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।জীবক বলতেন শুধু ধর্মপ্রচার নয় গরীব রোগীদের সেবা করতে হবে তাদের সেবায় নিয়োজিত হতে চাই।ধর্ম প্রচার এর পরিবর্তে দীনদরিদ্র, রোগগ্রস্তদের সেবায় তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। শেষে তার আচরণ অজাত শত্রুকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে শত্রুতা ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেও অজাতশত্রু প্রথম বৌদ্ধ সম্মেলন আহ্বান জানিয়েছিলেন। অজাতশত্রু বললেন আমি এক বড় বৌদ্ধ মহাসম্মেলন করতে চাই। জীবক বললেন কিন্তু এত বড় মহাসম্মেলন আপনি করবেন কোথায়? ভারতবর্ষের প্রত্যেক প্রদেশ থেকে বহু লোকের সমাগম হবে। অজাতশত্রু বললেন আমি স্থান নির্বাচন করেই রেখেছি গৃধ্রকুট পর্বতে সপ্তপর্ণী গুহায় সম্মেলন করা হবে।রাজপুরোহিত বললেন তার সমস্ত বাণী সংরক্ষণ করতে হবে। তারপর সমস্ত সেনাপতিদের সাহায্যে, সমস্ত নাগরিকদের সাহায্য নিয়ে সেই গৃধ্রকুট পর্বতে বিরাট বড় মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। সপ্ততপর্ণী পর্বতের গুহায় সম্মেলন হয়েছিল এবং ভগবান বুদ্ধের বাণী গুলো কে একত্রিত করা হয়েছিল রাজার কথামত।একবার ভগবান বুদ্ধের শরীর অসুস্থ হয়ে উঠল চরম।জীবক বললেন, আপনি ঔষধ সেবন করুন। তাহলেই সুস্থ হয়ে উঠবেন। ভগবান বললেন, আমি ঔষধ সেবন করব না। এবার তো বয়স হয়েছে। তোমরা বেশি চিন্তা কোরো না। তাঁকে কেউ রাজী করাতে পারল না।শেষে জীবক এক ফন্দি আঁটলেন। তিনি তার এক বন্ধুকে বললেন তুমি আমার বাড়ি যাবে গোপনে কেউ যেন জানতে না পারে ওখানে আমি ভগবানের ওষুধ দিয়ে দেবো এবং ভগবান সেই ওষুধ ওষুধ ঠিক হয়ে যাবে। যুবকের বন্ধু জীবনের বাড়ি এলেন এবং বললেন আমি এসে গেছি তুমি কি দেবে বলেছিলে দাও। তারপর জীবক করলেন কি ভগবান বুদ্ধের প্রিয় শ্বেত পদ্ম ফুলের ভিতর ওষুধ দিলেন এবং তার মধ্যেই ওষুধের বিভিন্ন রকম পদ্ধতিতে ঔষধ মিশ্রিত  করলেন এবং বন্ধুর হাতে তুলে দিলেন। তারপর মহামতি যুবকের বন্ধু ভগবান বুদ্ধের কাছে গেলেন।তিনি ভগবান বুদ্ধকে বললেন আপনার প্রিয় শ্বেতপদ্ম এনেছি। ভগবান বুদ্ধ প্রসন্ন চিত্তে তারপর শ্বেতপদ্ম গ্রহণ করলেন। তারপর নাকের কাছে নিয়ে সুগন্ধি পুষ্পের ঘ্রাণ গ্রহণ করলেন।কিছুদিন পরে ভগবান বুদ্ধ সুস্থ হয়ে উঠলেন। সাধারণে এক ভিক্ষুক মত জীবন যাপন করতেন মহামতি জীবক ধর্মপ্রচারে পরিবর্তে দুঃখিত রোগগ্রস্ত সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন শেষে তার আচরন অজাতশত্রুকে খুব মুগ্ধ করেছিল এবং তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করেছিলেন। তুই মহামতি যুবক ১০০ বছর বয়সেও পায়ে হেঁটে চিকিৎসা করে বেড়াতেন গ্রামে গ্রামে। এবার অজাতশত্রু তাঁকে ডেকে বললেন, আপনি চিকিৎসা শাস্ত্র রচনা করুন ভবিষ্যৎ দুনিয়ার জন্য। জীবনটা শেষ বয়সে শ্রেষ্ঠ রচনা শিশু রোগ চিকিৎসা গ্রন্থ রচনা করেন। পৃথিবীর প্রথম শিশু চিকিৎসা সংক্রান্ত বই, অতি মূল্যবান গ্রন্থ, বৃদ্ধ জীবক তন্ত্র। যা পরবর্তীকালে ভারতীয় চিকিৎসকদের শিশু রোগ সংক্রান্ত গবেষণা যুদ্ধে সাহায্য করেছিল। রাজা বিম্বিসার বুদ্ধকে ধর্মগুরু হিসেবে মান্য করে প্রাসাদে নিয়ে যান। বুদ্ধ তাঁকে চতুরার্য সত্য সম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করেন। এরপর বৌদ্ধ সংঘের সহস্রাধিক ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য বেণুবন নামক তার প্রমোদ উদ্যানটি গৌতম বুদ্ধকে প্রদান করেন। পরে রাজা সেখানে একটি বিহার নির্মাণ করেন। এই বিহারটি 'বেণুবন বিহার' নামে পরিচিতি পেয়েছিল। বিম্বিসারের অনুরোধে বুদ্ধ অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে উপোবাস ব্রত পালনের বিধি প্রচলন করেন। কথিত আছে, বিম্বিসারের অনুরোধেই বুদ্ধ বর্ষাকালে পরিব্রাজন না করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে সাধনার 'বর্ষাবাস' নামক রীতি প্রচলন করেন। ভিক্ষুদের বর্ষাবাসের সুবিধার জন্য কুটীর নির্মাণ এবং বুদ্ধ ও ভিক্ষুদের চিকিৎসার জন্য রাজবৈদ্য জীবককে নিযুক্ত করেন। রাজার পত্নী পরবর্তীকালে ভিক্ষুণী সংঘে যোগদান করে অর্হত্ত্ব লাভ করেন। এরপর তিনি তাঁর পিতার অনুরোধে কপিলাবাস্তুতে আসেন। এখানে এসে তিনি তাঁর পিতার শত অনুরোধেও প্রথমে গৃহে প্রবেশ করতে রাজী হলেন না। রাজবাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী গোপা পুত্র রাহুলকে ডেকে বললেন - ওই তোমার পিতা মতাকে ডেকে আন। রাহুল নিজের পরিচয় দিয়ে ঘরে যেতে বললেন। গৌতম সে আহ্বান অগ্রাহ্য করলেন। এরপর সকলের কাতর অনুরোধে ইনি বাড়িতে প্রবেশ করলেন কিন্তু কোথাও দাঁড়ালেন না। রাজবাড়ি থেকে শেষবারের মতো বের হওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী বুদ্ধের সামনে তাঁর দীর্ঘ চুল বিছিয়ে অপেক্ষা করলেন। গৌতম বিন্দু মাত্র বিচলিত না হয়ে সে চুল মাড়িয়ে রাজবাড়ী থেকে বেরিয়ে এলেন। এই সময় ইনি তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই নন্দ এবং সাত বৎসরের পুত্র রাহুলকে দীক্ষিত করে রাজধানী ত্যাগ করলেন। এরপর ইনি ১৩ বৎসর ধরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর ধর্মমত প্রচার করে বেড়ালেন। পিতার অসুস্থাতার কথা শুনে ইনি কপিলাবস্তুতে আসেন এবং পিতার মৃত্যুকালে উপস্থিত হলেন। পিতার মৃত্যুর পর ইনি পুরনারীদের ভিক্ষু বানালেন। এই ভিক্ষুদলের নেত্রী বানালেন তাঁর স্ত্রী গোপাকে। এরপর ইনি তাঁর ধর্মমত প্রচারের জন্য আবার পথে বেড়িয়ে পড়েন। ৮০ বছর বয়সে নেপালের কুশী নগরে ইনি দেহত্যাগ করেন। কথিত আছে তাঁর জন্ম বোধিত্ব লাভ ও মৃত্যু- একই তারিখ ও সময়ে হয়েছিল। বুদ্ধ বেণুবনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ উদ্‌যাপন করেন। শেষ বছরে সারিপুত্র ও মৌদ্‌গল্যায়ন বুদ্ধের শিষ্য হন। গাইড আবার বলতে লাগলেন ইতিহাসের কথা, এই সময় রাজবৈদ্য জীবক তাঁর আম্রকাননে বুদ্ধ সংঘের জন্য একটি বিহার নির্মাণ করে দেন। বর্তমানে এই বিহারটি 'জীবকাম্রবন' বামে পরিচিত। কাছে হিন্দু দর্শনে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। কিন্তু এই জ্ঞানে পরিতৃপ্ত হতে পারেন নি। তাই এখান থেকে তিনি উদ্দক রামপুত্তের কাছে শিক্ষাগ্রহণের জন্য আসেন। এই গুরুর কাছে তিনি সাংখ্য এবং যোগবিদ্যা শেখেন। এই নতুন জ্ঞানও তাঁকে শান্ত করতে পারলো না। এরপর তিনি মগধের রাজধানী রাজগিরীতে আসেন। লোকমুখে নতুন সন্ন্যাসীর প্রশংসা শুনে বিম্বিসার তাঁর সাথে দেখা করেন এবং রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু বুদ্ধ এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে জানান যে, যদি কখনও সত্যের সন্ধান পান, তাহলে তিনি রাজার আমন্ত্রণ রক্ষা করবেন। এর কিছুদিন পর, রাজা এক যজ্ঞানুষ্ঠানের জন্য ১০০০ মেষ বলির উদ্যোগ নেন। এই কথা জানতে পেরে বুদ্ধ রাজার সাথে দেখা করেন এবং মেষ বলি থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করেন। রাজা এই অনুরোধে বলি বন্ধ করে দেন। এরপর বুদ্ধ উরুবিল্ব গ্রামের নিকটবর্তী এক উপবনে এসে তপস্যা শুরু করেন। এখানে তিনি কঠোর তপস্যা শুরু করেন। সে সময় পাঁচজন সন্ন্যাসীও তাঁর সাথে ধ্যান শুরু করেন। বুদ্ধের কঠোর তপস্যা দেখে এই পাঁচ সন্ন্যাসী তাঁর ভক্ত হয়ে পড়েন। এরপর তিনি ভারতের বর্তমান বিহার প্রদেশের গয়া জেলার একটি গভীর অরণ্যের ভিতর, নিরাঞ্জনা নদীর তীরস্থ একটি অশ্বত্থ গাছের নিচে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। এই সময় অনাহারে অনিদ্রায় তাঁর শরীরের মেদ-মাংস ক্ষয়ে কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিলেন। এই সময় তাঁর শারীরীক অক্ষমতার কারণে ধ্যানে মনোনিবেশ করতে পারছিলেন না। তাই তিনি অল্প কিছু আহার করতে থাকেন। এই সময় সুজাতা নামক এক গৃহবধু প্রথম পুত্র সন্তান লাভের পর বনদেবতার পূজা দিতে আসতেন। তিনি সেখানে বুদ্ধকে দেবতা ভেবে পূজা দিতে গেলে, বুদ্ধ তাঁর ভুল ভেঙে দিয়ে বলেন যে, তিনি দেবতা নন। তিনি সুজাতার নিবেদিত পায়েস গ্রহণ করে বলেন যে, তোমার মনস্কাম যেমন পূর্ণ হয়েছে, এই পায়েস গ্রহণের পর আমার মনস্কামও যেন পূর্ণ হয়। বুদ্ধের এই খাদ্যগ্রহণ দেখে, বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে, তাঁর সাথের সন্ন্যাসীরা তাঁকে ত্যাগ করেন। এরপর তিনি একাই ধ্যান করতে থাকেন। প্রায় ৪৯ দিন ধ্যান করার পর, তিনি বৈশাখী পূর্ণিমায় গৌতম বুদ্ধত্ব লাভ করেন। এই সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৫ বৎসর। বোধিপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর নাম হল তাঁর বুদ্ধ।  কথিত আছে তিনি এই রাতের প্রথম যামে পূর্বজন্মের জ্ঞান লাভ হয়, দ্বিতীয় যামে তাঁর দিব্যচক্ষু বিশুদ্ধ হয়, অন্তিম যামে দ্বাদশ প্রতীত্যসমুৎপাদ এবং অরুণোদয়ে সর্বজ্ঞাতা প্রত্যক্ষ করেন। বর্তমানে নিরঞ্জনা নদীকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ফল্গু। আর উরুবিল্ব গ্রামের নাম বুদ্ধগয়া এবং তিনি যে গাছের নিচে বসে বোধিত্ব লাভ করেছিলেন, সেই অশ্বত্থগাছের নামকরণ করা হয়েছে বোধিবৃক্ষ। বোধিবৃক্ষ এবং মন্দির ছাড়া এখানে একটি দীঘির নাম সুজাতা দিঘি। কথিত আছে। এই দিঘির জলে স্নান করে বুদ্ধদেবকে পায়েস নিবেদন করেছিলেন। শরীরকে কষ্ট দিয়ে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করা অসম্ভব একথা তিনি বলতেন। আমাদের  গাইড ঘুরে ঘুরে সমস্ত স্থান দেখালেন এবং ঐতিহাসিক বিবরণ  দিলেন। আমরা চুপ করে গোগ্রাসে গিললাম ইতিহাসের কথা। লজে ফিরে সোমা বলল, স্ত্রী চুল বিছিয়ে দিয়েছিলেন মায়ার শেকল। আমি বললাম, ভগবান মায়ার শেকল ছিন্ন করে সংসার ছাড়লেন। তাই তো মানুষের জন্য কাজ করতে পারলেন। শ্যামলী বলল, তাহলে। স্ত্রীর কথাটাও ভাবুন...আমি আর রাজু নিরুত্তর হয়ে রইলাম। পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিকাল পার্কঃ এই চিড়িয়াখানায় রেড পান্ডা, স্নো লেপার্ড, তিব্বতীয় নেকড়ে সহ পূর্ব হিমালয়ের প্রচুর বিপদগ্রস্ত ও বিলুপ্ত পক্ষী ও প্রাণীদের দেখতে পাওয়া যায়।ধীরধাম মন্দিরঃ এটি কাঠমান্ডুর বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দিরের অনুরূপ। বেঙ্গল ন্যাচারাল হিস্টোরি মিউজিয়ামঃ এই জাদুঘর গাছপালা ও পশুপাখিদের প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্দরে প্রবেশ করায়। লাওডস্ বোটানিকাল গার্ডেনঃ এই উদ্যানে অর্কিড, প্রিমুলা, সহ নানা জাতের হিমালয়ান উদ্ভিদ পাওয়া যায়। লেবং রেস কোর্সঃ এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট এবং সর্বোচ্চ রেস কোর্স। ঘুম বৌদ্ধ মনেস্ট্রিঃ এটি এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ মনেস্ট্রি। অবজারবেটরি হিলঃ ধীরধাম মন্দির এবং বৌদ্ধ সংরক্ষণালয় এই পর্যবক্ষেণ পাহাড়ের উপর অবস্থিত। আমাদর ছোটবেলার বন্ধু বিশু একবার জাপান দেশ ভ্রমণ করার আবেদন করল বন্ধু কমিটিকে। রমেন বললো, খরচ অনেক। আদৃজা বললো, এক একজনের বিমানে আসা যাওয়া আশি হাজার টাকা ভাড়া লাগবে। বিশু বললো, আমাদের বন্ধু কোঅপরাটিভে অনেক টাকা জমেছে। পাঁচবছর কোথাও যায় নি। এবার টাকাগুলো ভ্রমণে খরচ হবে আর বাকিটা দান করা হবে, গরীবদের, ফিরে এসে। বিশুর মুখের উপর আমরা কেউ কথা বলি না। তার কথাই ফাইনাল হলো। আদৃজা, রমেন, বিরাজুল, বিশু ও আমি দমদমে পৌঁছে গেলাম এক শুভদিন দেখে সকালবেলা। অবশ্য আগে থেকে ভ্রমণ সংক্রান্ত ভিসা সমস্যা ও আনুষঙ্গিক আইনি কাজ মিটিয়ে নিয়েছে বিশু। বিশু লাগেজগুলো একসঙ্গে বিমানবন্দরে ট্রলারে চাপিয়ে পৌঁছে গেল ওয়েটিং রুমে। চেকিং পর্ব সেরে আমরা নিশ্রাম নিচ্ছি। হঠাৎ গোপাল ভিন্ডার সঙ্গে দেখা। আমাদের রাজস্থানী বন্ধু। একসাথে আমরা মেসে ভাড়া থাকতাম কলকাতার আমহার্ষ্ট স্ট্রীটে। গলির ভেতরে ভাঙ্গাচোরা, স্যাঁতসেতে এক ভুতুড়ে বাড়িতে আমরা থাকতাম কয়েকজন বন্ধু। গোপাল বললো, ক্যায়সা হো তুমলোগ?

বিশু বললো, বাড়িয়া ভাইয়া। আপলোগ ঠিক হো তো।
গোপাল আমাদের সকলকে কফি খাওয়ালো। কফি পানের পরে বিদায়পর্ব। আমাদের বিমান ছাড়ার সময় হয়েছে। গোপাল এখানে কাজ করে। সে সবকিছু ঠিকমত বলে আমাদের অসুবিধা দূর করলো।
বিমানে আদৃজা বিশুকে ভিসা সম্পর্কে কিছু তথ্য জানতে চাইলো। বিশু বললো, ভারতীয়দের ভিসা লাগে ইউরোপীয় দেশগুলো ভ্রমণের ক্ষেত্রে। আশা করি সবদেশেরই হয়ত লাগে। ভিসা-মুক্ত বা আগমনের পর ৪৯ টি দেশে ভিসা প্রাপ্তির ভিত্তিতে বৈশ্বিকভাবে ভ্রমণ স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ভালো। ভারতীয়রা বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে পাড়ি জমায় বিশেষভাবে ইউরোপ-আমেরিকাতে, সেইজন্যে ভারতীয়দের ক্ষেত্রে ইউরোপ-আমেরিকা ভ্রমণে কড়াকড়ি আরোপ করা আছে। ৮ আগস্ট ২০১৭ তারিখ থেকে ভারতীয় টুরিস্ট এবং ব্যবসায়ীরা বা চিকিৎসা সেবা নিতে ইচ্ছুক মানুষরা রাশিয়াতে ভিসা ছাড়াই যেতে পারবে। ভারতীয় ভ্রমণকারীদের ভূটান এবং নেপাল ছাড়া অন্য রাষ্ট্রে ভ্রমণকালে অপরিশোধযোগ্য কাজে লিপ্ত হতে হলে একটা ভিসা বা কাজের স্বীকৃতিপত্র নিতে হয়। রাজ্যের বাসিন্দা নয় এমন ভারতীয় নাগরিকদের জন্য এইসব রাজ্যে ভ্রমণকালে ইনার লাইন পারমিট (ILP) নিতে হয়। আইএলপি অনলাইন বা এইসব রাজ্যের বিমানবন্দর সমূহ থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে। বিরাজুল বললো, এত খুঁটিনাটি আমরা জানতে পারি না কেন?  
বিশু বললো, জানতে হয় না হলে পিছিয়ে পড়তে হয়। ​​

নয়

আমরা জাপানের টোকিও-র চিবা বিমানবন্দরে নেমে একটা গাড়িতে করে খোঁজ নিয়ে চলে এলাম হোটেলে। বিশাল হোটেল তেমনই তার সুব্যবস্থা। 
রমেন বলল - উদীয়মান সূর্যের দেশে আমরা এলাম। এ আমার কল্পনার বাইরে ছিলো। বিরাজুল ও আদৃজা বললো -  খুব ঘুরবো কয়েকদিন। আমি বললাম, জাপান দেশের বিবরণ কিছু দিতে পারবি। আসার আগে পড়াশুনা করেছিস কিছু। বিরাজুল বললো, জানি অল্প। তবে বিশু আছে। ও একাই একশ। আমরা সকলে বললাম, তা বটে তা বটে। একদম হককথা কইছে বিরাজুল। বিশু বললো,  পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র হল জাপান। এই দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জাপান সাগর, পূর্ব চীন সাগর, চীন, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও রাশিয়ার পূর্ব দিকে উত্তরে ওখোৎস্ক সাগর থেকে দক্ষিণ পূর্ব চীন সাগর ও তাইওয়ান পর্যন্ত প্রসারিত। যে কাঞ্জি অনুসারে জাপানের নামটি এসেছে, সেটির অর্থ "সূর্য উৎস"। জাপানকে প্রায়শই "উদীয়মান সূর্যের দেশ" বলে অভিহিত করা হয়। জাপান একটি যৌগিক আগ্নেয়গিরীয় দ্বীপমালা। এই দ্বীপমালাটি ৬,৮৫২টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। জাপানের বৃহত্তম চারটি দ্বীপ হল হোনশু, হোক্কাইদো, ক্যুশু ও শিকোকু। এই চারটি দ্বীপ জাপানের মোট ভূখণ্ডের ৯৭% এলাকা নিয়ে গঠিত। জাপানের জনসংখ্যা ১২৬ মিলিয়ন। জনসংখ্যার হিসেবে এটি বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম রাষ্ট্র। জাপানের রাজধানী টোকিও শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৯.১ মিলিয়ন। এই শহরটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার ২য় বৃহত্তম মূল শহর। টোকিও ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন রাজ্য নিয়ে গঠিত বৃহত্তর টোকিও অঞ্চলের জনসংখ্যা ৩৫ মিলিয়নেরও বেশি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম মহানগরীয় অর্থনীতি।
আমি বললাম, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা সাগালিন দ্বীপের কথা বলেছিলেন। মনে আছে তোর বিশু। বিশু বললো, জাপানের সাগালিন এবং ওহোতস্ক সমুদ্র দ্বারা সাখালিনটি ধুয়ে ফেলা হয়, এটি জাপান থেকে লা পেরুজের তলদেশে তাতার তীর দ্বারা মহাদেশ থেকে পৃথক হয়। সাখালিনের মোট এলাকা ৭৬ হাজার বর্গ কিমি এবং ফর্ম, এটি একটি মাছ অনুরূপ, এশিয়ার তীরে বরাবর প্রসারিত। দ্বীপটির দক্ষিণে, পাহাড়গুলি আয়ত্ত করে, উত্তরের কাছে, তাদের নিম্নভূমি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, এবং শুধুমাত্র শ্মিট্ট উপদ্বীপে, সাখালিনের চূড়ান্ত উত্তর দিকটি হ'ল পাহাড়ের শিখরগুলি আবার দৃশ্যমান। যেমন একটি জটিল ত্রাণ, পাশাপাশি সমুদ্র এবং সমুদ্রের নিকটবর্তী, উদ্ভিদ এবং প্রাণী বিশ্বের মৌলিকত্ব নির্ধারিত। সাখালিন বৃহত্তম রাশিয়ান দ্বীপ। জাপানীরা এই দ্বীপটি করাফুতোকে উপভোগ করে, যার অর্থ "ঈশ্বরের ভূমি মুখ।" দ্বীপটি ১৬৪৩ সালে ডাচম্যান দে ভ্রিসের আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে, সাখালিনকে উপদ্বীপ বলে মনে করা হয়েছিল। সম্ভাব্য কারণ দ্বীপটি মূল ভূখন্ড থেকে পৃথক হওয়ার স্রোত শীতে ঠান্ডা হয়। জাপানের সাখালিন এবং ওহোতস্ক সমুদ্র দ্বারা সাখালিনটি ধুয়ে ফেলা হয়, এটি জাপান থেকে লা পেরুজের তলদেশে তাতার তীর দ্বারা মহাদেশ থেকে পৃথক হয়। সাখালিনের মোট এলাকা 76 হাজার বর্গ কিমি। এবং ফর্ম, এটি একটি মাছ অনুরূপ, এশিয়ার তীরে বরাবর প্রসারিত। দ্বীপটির দক্ষিণে, পাহাড়গুলি আয়ত্ত করে, উত্তরের কাছে, তাদের নিম্নভূমি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, এবং শুধুমাত্র শ্মিট্ট উপদ্বীপে, সাখালিনের চূড়ান্ত উত্তর দিকটি হ'ল পাহাড়ের শিখরগুলি আবার দৃশ্যমান। যেমন একটি জটিল ত্রাণ, পাশাপাশি সমুদ্র এবং সমুদ্রের নিকটবর্তী, উদ্ভিদ এবং প্রাণী বিশ্বের মৌলিকত্ব নির্ধারিত। কারণ সাখালিন তাহা তার প্রজাতি বৈচিত্র্যের মধ্যে রাশিয়াতে সবচেয়ে ধনী। নিজের জন্য বিচারক - দ্বীপে প্রায় ২00 টি প্রজাতির গাছ ও ঝর্ণা বেড়ে যায়। সখালিনের প্রধান গাছটি জিমেইলিন লার্চ। অন্যান্য ধরনের গাছগুলি খুব কমই প্রতিনিধিত্ব করা হয়: পাতলা লেইড লার্চ, আইয়ানস্কি স্প্রুস, সখালিন ফির। হোয়াইট এবং পাথর birches, aspens, সুগন্ধি poplars, শিশির উইল, জাপানি elms, হলুদ ম্যাপেল, এবং alder hardwoods মধ্যে prevail। সাখালিন ফল এবং বেরিতে সমৃদ্ধ। চেরি, ক্যারাট, ব্লুবেরি, রাস্পবেরি, ব্লুবেরি, রেডবেরি এবং ক্র্যানবেরি এখানে বেড়ে যায়। এবং দ্বীপের দক্ষিণে এক অনন্য প্রাকৃতিক সমন্বয় পালন করতে পারে: সাখাওয়ালীন বাঁশের ঝোপঝাড় দ্বারা বেষ্টিত একটি শঙ্কু বন। এই ধরনের ইউনিয়ন বিশ্বের অন্য কোথাও দেখা যায় না। বাঁশ, অবশ্যই, এখানে উচ্চ নয়, তবে এর ঝড় আসলে সবচেয়ে দুর্বল, যেহেতু ইলাস্টিক টুকরাগুলি সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ভাবে আটকে থাকে এবং ছুরিগুলির মত তীক্ষ্ণ পাতাগুলি সহজে ত্বকে কাটাতে পারে।দুর্ভাগ্যবশত, গত কয়েক বছরে সাখালিনের প্রাণীরা উল্লেখযোগ্যভাবে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। একবার দ্বীপে, ঘুর্ণিমান হরিণ চারপাশে লাফিয়ে পড়েছিল এবং বন্য ডোরা তাদের কান্না দিয়ে পার্শ্ববর্তী বনগুলিকে পড়েছিল। না যারা অন্য বা বাকি আছে। পরে এল্ক এবং লাল হরিণ বিনষ্ট হয়। শেষ শতাব্দীর মাঝামাঝি বর্ধমান বনজনিত কারণে, সযোগ্য এবং র্যাকুন কুকুর অদৃশ্য হয়ে যায়। পর্বত ভেড়া এবং নদী otters চিরতরে দ্বীপ ছেড়ে। এক স্টাফ নেকড়ে, একবার একবার সাখালিনে ভডিভিশগো, যাদুঘরে একাকী একাকী। সমুদ্রের নিকটবর্তী, উদ্ভিদ এবং প্রাণী বিশ্বের মৌলিকত্ব নির্ধারিত। আমাদের ক্যাপটেন বিশু আরও বললেন, টোকিও বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলির একটি। এর আয়তন প্রায় ২৪০ বর্গকিলোমিটার। মূল শহরে প্রায় ৯০ লক্ষ লোকের বাস। বৃহত্তর টোকিও মহানগর এলাকাতে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ লোকের বাস, যা জাপানের মোট জনসংখ্যার এক দশমাংশ; এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল বৃহত্তর মহানগর এলাকা।টোকিও থেকে বন্দরনগরী ইয়াকোহমা পর্যন্ত অঞ্চলটি অবিচ্ছিন্নভাবে জন-অধ্যুষিত বলে কিছু বিশেষজ্ঞ টোকিও ইয়োকোহামাকে একটিমাত্র মহানগর এলাকা হিসেবে গণ্য করেন, যার জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ। জাপান হচ্ছে একটি দ্বীপদেশ যা মহাসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত। এখানকার মানুষ সবসময় প্রচুর সীফুড খাওয়ার সুবিধা গ্রহণ করেছে। এটি কিছু খাদ্যবিদদের মতামত যে জাপানি খাদ্য সর্বদা উপর নির্ভর করে প্রধানত শষ্যের উপর সাথে থাকে শাকসব্জি বা সামুদ্রিক আগাছা, দ্বিতীয়ত পাখিজাত মাংস এবং সামান্য পরিমাণ লাল মাংস। বৌদ্ধধর্ম প্রসার লাভের আগ থেকেই জাপানে মাংস গ্রহণের এই অনীহা ভাব ছিলো। ইদো যুগে ইয়োতসুশি বা চারপেয়ে জন্তু খাওয়া নিষিদ্ধ ছিলো। এই সত্ত্বেও জাপানে লাল মাংস ভোজন সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়নি। গৃহপালিত পশুদের বিপরীতে বন্য খেলা খাওয়া মেনে নেওয়া হয়েছিলো। বিশেষ করে ফাঁদ পেতে খরগোশ শিকারের জন্য এমন শব্দ (ওয়া) ব্যবহার হতো যা সাধারণত একটি পাখির জন্য সংরক্ষিত শব্দ। সাধারণ খাদ্যদ্রব্যগুলির ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে জাপানী পরিবারের প্রক্রিয়াকৃত খাবারগুলি র ব্যবহার আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিয়োটো সবজি বা কিয়াইয়াই জনপ্রিয়তা বাড়ছে এবং বিভিন্ন ধরনের কিয়োটো সবজির ব্যবহার আবারো ফিরে আসছে। বিশুর কাছে জাপানের কথা শুনে আমাদের একটা মোটামুটি ধারণা হলো। টোকিও ঘোরার ব্যাবস্থা করলো বিরাজুল। সে গাড়ি ঠিক করে আসার পরে আমরা সকলে খেয়ে শুয়ে পড়লাম। সকালে আমরা একজন গাইডকে পেয়েছি। তিনি একটু আধটু বাংলা জানেন। তিনি বললেন যা সেটি আমরা ভালো বাংলাতেই বলব।তিনি বললেন, মূল টোকিও শহরটি ২৩টি বিশেষ প্রশাসনিক এলাকা নিয়ে গঠিত। জাপানের রাজকীয় প্রাসাদটি টোকিও শহরের হৃৎকেন্দ্রে অবস্থিত। প্রাসাদটি পাথরের প্রাচীর, পরিখা ও প্রশস্ত বাগান দিয়ে পরিবেষ্টিত। রাজপ্রাসাদের পূর্ব-দিক সংলগ্ন বর্ণিল মারুনোউচি এলাকাটি জাপানি ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র। প্রাসাদের দক্ষিণে আছে কাসমিগাসেকি  এলাকাটি, যেখানে বহু জাতীয় পর্যায়ের সরকারী কার্যালয় অবস্থিত। তার পশ্চিমে রয়েছে নাকতোচো উঁচু এলাকা, যেখানে জাপানের জাতীয় দিয়েত বা সংসদ ভবনটি অধিষ্ঠিত। টোকিওতে কোনও কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকা নেই। শহরটি অনেকগুলি গুচ্ছ গুচ্ছ শহুরে এলাকা নিয়ে গঠিত; এই এলাকাগুলি মূলত রেল স্টেশনগুলিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে, যেখানে দোকান, বিপণীবীথি, হোটেল, ব্যবসায়িক কার্যালয় ভবন এবং রেস্তোরাঁগুলি ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে অবস্থান করছে। এই গুচ্ছগুলির মাঝে মাঝে অপেক্ষাকৃত কম ভবনবিশিষ্ট অনাধুনিক এলাকাগুলি অবস্থিত, যদিও এগুলিতেও একই ধরনের ভবনের দেখা মেলে। টোকিওর ভবনগুলি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এখানে এখনও প্রাচীন জাপানি কাঠের বাড়ির দেখা মেলে, যদিও এদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে। এছাড়া এখানে মেইজি পর্বে (১৮৬৮-১৯১২) নির্মিত অনেক পাথর ও ইটের তৈরি ভবন আছে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরে শহরে কংক্রিট ও ইস্পাত দিয়ে অনেক গগনচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণ করা হয়। শহরকেন্দ্রের পূর্বভাগে অবস্থিত আলোয় ঝলমল করা গিনজা নামক কেনাকাটার এলাকাটি বিশ্বখ্যাত। রাজপ্রাসাদের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত কান্দা এলাকাটিতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, বইয়ের দোকান ও প্রকাশনী অবস্থিত। টোকিওর নগর-উদ্যানগুলি ইউরোপ-আমেরিকার মত বড় না হলেও সংখ্যায় প্রচুর এবং এগুলিতে প্রায়ই মনোরম সুদৃশ্য বাগান থাকে। টোকিও জাপানের প্রধানতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। টোকিও শহরে অত্যাধুনিক জীবনধারার সাথে ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ ঘটেছে। এখানে নিয়নের আলোয় উদ্ভাসিত গগনস্পর্শী অট্টালিকা যেমন আছে, তেমনই আছে ঐতিহাসিক সব মন্দির। সমৃদ্ধ মেইজি সিন্ত এর সুউচ্চ প্রবেশদ্বার এবং চারপাশ ঘিরে থাকা বৃক্ষশোভিত এলাকার জন্য পরিচিত। টোকিও জাদুঘর জাপান ও এশিয়ার ধ্রুপদী শিল্পকলা ও ইতিহাস বর্ণনাকারী অনেক প্রদর্শনী আছে। একই এলাকাতে একটি বিজ্ঞান জাদুঘর, একটি চিড়িয়াখানা এবং দুইটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকলা জাদুঘর অবস্থিত। রাজপ্রাসাদের আশেপাশেও বেশ কিছু বিজ্ঞান ও শিল্পকলা জাদুঘর আছে। এছাড়া শহর জুড়েই অন্যান্য আরও অনেক ধরনের জাদুঘর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।  পুনর্নির্মিত  নাট্যমঞ্চ পরিদর্শন করা সম্ভব। টোকিওর নাট্যশালাগুলিতে নিয়মিতভাবে ঐতিহ্যবাহী কাবুকি নাটকের পাশাপাশি আধুনিক নাটক পরিবেশন করা হয়। এছাড়া ঐকতান, গীতিনাট্য, ইত্যাদি পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নৃত্যকলা সর্বদাই পরিবেশিত হয়। এদের মধ্যে বিশ্বববিদ্যালয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গাইড বললেন, এলাকার পুরাতন, সরু রাস্তাগুলি দিয়ে হাঁটলে দোকানপাট, -পরিহিতা নারী ও ৭ম শতকে নির্মিত  চোখে পড়বে। এর বিপরীতে  এলাকাতে গেলে উদ্দাম উচ্ছ্বল নৈশক্লাব ও  গান গাওয়ার বার দেখা যাবে। এলাকায় পাওয়া যাবে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির দোকানের সমাহার। মদ্যপান করার জন্য ইজিকায়া নামের ঘরোয়া জাপানি ধাঁচের পাবগুলি টোকিওর সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শহরের কেন্দ্রের কাছে আছে  যেটি টুনা মাছের নিলামের জন্য বিখ্যাত। সুউচ্চ  নামক স্থাপনার শীর্ষে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত পর্যবেক্ষণ মঞ্চ থেকে গোটা টোকিও শহরের বিস্তৃত পরিদৃশ্য অবলোকন করা সম্ভব। টোকিওর খাবারের দোকানগুলি সবসময়ই জমজমাট থাকে। ও এলাকাতে গেলে হালের কিশোর-কিশোরীদের পোশাকশৈলী সম্বন্ধে ভাল ধারণা পাওয়া যায়। টোকিও জাপানের পরিবহনের প্রধান কেন্দ্র। এছাড়া এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিবহন কেন্দ্র। বৈদ্যুতিক রেল, পাতালরেল, বাস ও মহাসড়কের এক ঘনসন্নিবিষ্ট জালিকা টোকিওর সেবায় নিয়োজিত। রেল সমগ্র জাপানের জন্য কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন। আমরা হিকারি এক্সপ্রেস নামে উচ্চগতিসম্পন্ন রেলগাড়িতে চাপলাম। এখান দিয়ে যাওয়া যায় টোকিও থেকে উত্তর জাপান অভিমুখী সমস্ত রেললাইনগুলি, 'উয়েনো' এসে মিলেছে। অন্যদিকে হনশু এবং টোকিওর পশ্চিমের শহরতলী থেকে আগত রেলগাড়িগুলির শেষ গন্তব্যস্থল পর্যন্ত। আমরা ঘুরছি আর গাইডের গল্প শুনছি, কিছু বেসরকারী মালিকানাধীন বৈদ্যুতিক রেলপথ নগরে পরিবহন সেবা দান করে। টোকিওর, চিবা বন্দর শহরে অবস্থিত। অন্যদিকে টোকিও উপসাগরের কাছে অবস্থান আভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহন সেবা প্রদান করে। টোকিও সারা বছরই ব্যস্ত থাকে। জানুয়ারির ১ তারিখে গ্রেগরিয়ান মতে নববর্ষ উদযাপন করা হয়; এসময় সমাধিমন্দিরগুলিতে অনেক তীর্থযাত্রীর ভিড় হয়। এপ্রিলে সারা টোকিও শহর জুড়ে চেরি পালিত হয়। মে মাসে উৎসব পালিত হয়, যেখানে বহনযোগ্য সমাধির শোভাযাত্রা হয়। জুলাই মাসে সুমিদা নদীর আতশবাজি উৎসব হয়। আগস্ট মাসে ওবোন নামে একটি বৌদ্ধ ছুটির দিবসে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয়। একই মাসে উৎসবে কোয়েঞ্জি রেলস্টেশনের আশেপাশে শোভাযাত্রা-মিছিলের আয়োজন করা হয়।২০১৪ সালে  নামক পর্যটকদের সহায়তাকারী ওয়েবসাইটে "স্থানীয়দের সাহায্যদানকারী মনোভাব", "নৈশজীবন", "কেনাকাটা", "স্থানীয় গণপরিবহন" এবং "রাস্তাঘাটের পরিচ্ছন্নতা"-র ক্ষেত্রে "শ্রেষ্ঠ সামগ্রিক অনুভূতি। গাইড বয় আমাদের সাখালিনের বনভূমির কথাও শোনালেন। সাখালিনের বনভূমিগুলির বৈশিষ্টসূচক প্রতিনিধিরা প্রধান ভূখণ্ডের প্রাণী, চরিত্রগত ও দুধ চাষের দুধঃ এইগুলি অনেকগুলি ভেজাল এবং তরমুজ। দ্বীপের দক্ষিণে কলাম পাওয়া যায়। এই প্রাণী জাপান থেকে আনা হয়েছিল, কিন্তু তাদের সংখ্যা এত ছোট। সাখালিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রবল শত্রু বাদামী ভালুক। এই দৈত্যগুলির বৃদ্ধি দুই মিটার এবং ওজন - ৫০০ কেজি পর্যন্ত পৌঁছায়। লাল, ধূসর এবং রৌপ্য-কালো বনের মধ্যে অনেক লাল শিয়াল আছে। নদী প্লাবনভূমিতে সর্বত্র হরেস এবং গহ্বর পাওয়া যায়, আপনি নদী otters দেখতে পারেন। আমাদের গাইড আমাদের কৌতূহল দেখে হিমবাহ ও সাগালিন সম্পর্কে অনেক অজানা কথা বললেন। জাপান এসেছি বলে কি আর অন্য অজানা খবর শুনব না। হতেও তো পারে কোনদিন হিমবাহের সামনাসামনি হলাম। অতএব, "জানার কোন শেষ নাই "....কিন্তু সাখালিনের হরিণটি বেশিরভাগ পেঁচা দ্বারা পালিত হয়। বন্য দ্বীপ শুধুমাত্র উত্তর অংশে পাওয়া যায়। Srenely দ্বীপ এবং musk হরিণ প্রায় migrates। এটি রেড বুক তালিকাভুক্ত করা হয়।হিমবাহ  হল বরফের বিরাট চলমান স্তুপ বা নদী। সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলে শীতকালে তুষার পড়ার হার গ্রীষ্মে গলনের হারের চেয়ে বেশি হলে পাহাড়ের উপরে তুষার জমতে শুরু করে এবং জমে শক্ত বরফে পরিণত হয়। এই বরফজমা এলাকাটিকে বরফক্ষেত্র (Ice field) বলে। যখন এই জমা বরফ নিজের ওজনের ভারে এবং মাধ্যাকর্ষণের টানে ধীরগতিতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করে, তখন তাকে হিমবাহ বলে। তবে জমা বরফ এত পুরু হয় এবং এর নিম্নগতি এতই ধীর যে তাকে স্থিরই মনে হয়। বিশু হিমবাহ সম্পর্কে কিছু কথা বললো, ভারতের উত্তরে পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালাতে অবস্থিত গ্রেট বালটোরা পৃথিবীর দীর্ঘতম হিমবাহ। এর দৈর্ঘ্য প্রায় আটান্ন  কিলোমিটার। হিমালয়ের এভারেস্ট শৃঙ্গের কাছে রংবুক ও কাশৃঙ্গ হিমবাহ অবস্থিত। অস্ট্রিয়া-ইতালি সীমান্তে আল্পস পর্বতমালার সিমিলাউন হিমবাহে উনিশশো একানব্বই সালে একজন মানুষের অবিকৃত দেহের সন্ধান পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় দেহটি প্রায় পাঁচহাজার বছর সেখানে সমাহিত হয়ে ছিল। হিমবাহ ও সাকালিনের বর্ণনা শুনে আমাদের আশ্চর্য অনুভূতি হল। পৃথিবী একটা ছোট গ্রহ। তার সব খবর জানা কঠিন। আর মহাকাশ বা ব্রম্ভান্ডের কথা বাদই দিলাম। অসীম এই মহাকাশ। কত বিচিত্র। তার কিছুই কি আমরা জানি?  নিজেকে খুব বোকা লাগে যখন জ্ঞানের অহংকারে মত্ত হই। 

ছেলের জন্য মায়ের অপেক্ষা চিরকালের প্রথা হয়ে গেছে। রাত্রিবেলা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আমার তারা গুনতে ইচ্ছা হয়। যারা চার দেওয়ালে শ্বেত পাথরের আড়ালে বড় হয় তারা কি এই খোলা আকাশ আর আপন-মনে বেড়ে ওঠা প্রকৃতি বাগান দেখতে পায়। এইসব চিন্তা করতে করতে হাঁটার সময় গতি শ্লথ হয়ে যায়। আর মায়ের চিন্তা বাড়ে।
আমি জানি যত রাতই হোক মা ঠিক অপত্য স্নেহ নিয়ে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে। আমরা চার ভাই দুই বোন। চারা গাছের মত বেড়া দিয়ে যত্ন করে মা আমাদের মানুষ করেছেন।
কোনদিন কোন অভাব তিনি বুঝতে দেননি।
বাবা চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সকালবেলা ব্রেকফাস্ট করে তিনি বেরিয়ে পড়তেন সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে। আবার দুপুর সাড়ে বারোটায় খেতে আসেন। তারপর দুপুর দুটোর সময় অফিস গিয়ে রাত্রি আটটার সময় বাড়ি ফিরতেন। ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি প্রাণ মন সমর্পণ করে কাজ করতেন। নিজের কাজে বাবা খুব একটিভ ছিলেন। 

সকালবেলা চোখ মেলেই দেখি মায়ের সুন্দর দেবী প্রতিমার মত মুখ। হাতে চা মুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি মাঝে মাঝে মাঝে মাকে একটা প্রণাম করে নিতাম। জানি সকালবেলা মায়ের মুখ দেখলে সারা দিনটা ভালো যাবে। রক্ত দিয়ে  ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করা মা আমাদের জ্যান্ত দেবী। 

এখন ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। যে যার নিজের মতো সংসার নিয়ে ব্যস্ত।
মা বৃদ্ধা হয়েছেন।
এবার মাকে তো যত্ন করে দেখাশোনা করা চিকিৎসা করানো তার খাওয়া-পরার সমস্ত ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন। 

আমি আমার মায়ের নাম করে পৃথিবীর সব মায়ের ৭০% মা কিভাবে থাকেন তার কথা বলছি।

আর শতকরা তিরিশ ভাগ মা যেসব আছেন তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন। তারা ভালই থাকেন আশা করি।
আমি কোনো বিতর্কে যেতে চাইছি না আমার দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একটা ঘটনা বলছি।
তারা সবাইকে নিয়ে সুখে থাকে। কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে তাদের মাকে নিয়ে। ওদের আলাদা সংসারে একটি দুটি করে বাচ্চা স্বামী অফিস চলে গেলে স্ত্রীর আর কোন কাজের চাপ থাকে না। কারণ ছেলেও স্কুল চলে গেছে। নিজে বেশ পেট ভরে ভালোমন্দ খেয়ে ফাঁটিয়ে টিভির সামনে বসে অখন্ড অবকাশ কাটাচ্ছেন। 

হয়তো মা  বললেন, বৌমা এবার আমাকে খেতে দাও বেলা দুটো হলো, যাহোক একটু খাই। 
বৌমা বললেন, যান রান্না ঘরে ঢুকে নিজে খেয়ে নিন। ছোট ছেলের কাছে ছয় মাস। বড় ছেলের কাছে ছয়মাস মা থাকেন। বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই। এখন বিধবা মা। তিনি একাদশী করেন। তাহলে মায়ের খাবার কথা চিন্তা করা কি উচিত নয়?

কিন্তু ছেলেরা বলছে বাজে খরচ করার পয়সা নেই।

একাদশী বা উপবাসের দিন কষ্ট হয় বেশি মায়ের। ছেলেরা ওসব পাত্তা দেয় না। মেয়েরা তবু শ্বশুরবাড়ি সামলে মাকে দেখেন যতটা পারেন।

মা বিছানায় শয্যাশায়ী। পায়খানা, পেচ্ছাপ সবকিছু এখন বিছানায়। ছেলেরা যুক্তি করে মাকে হাসপাতালে ভরতি করে দিল। হাসপাতালে নাতি যায় দেখতে মাঝেমাঝে ঠাকুমাকে। নাতির অন্তর কেঁদে ওঠে। কিন্তু তার হাতে তো পয়সা নেই। ঠাকুমা হাতের সোনার বালা আর গলার চেনটা খুলে নাতির হাতে দিলেন উপহারস্বরূপ। নাতি কলেজে পড়ে। যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। সে সোনার গহনাগুলো বিক্রি করে ঠাকুমাকে দেখাশোনার জন্য আয়া রাখল। ফলমূল এনে ঠাকুমাকে খাওয়াত। ঠাকুমা প্রাণভরে আশীর্বাদ করতেন নাতিকে। এসব কিন্তু বাড়ির লোকজন জানত না। তারা অপেক্ষায় থাকত কখন বুড়ি মরবে। মরবে বললেই তো মরা হয় না। সময় তার বিচারক। নাতি বলল, ঠাকুমা এবার আমি তোমাকে ঘরভাড়া করে আলাদা জায়গায় রাখব। তোমার যত্ন করব। সেই রাতেই ঠাকুমা নাতিকে ছেড়ে চলে গেলেন। ছেলেমেয়েরা এল। দাহকাজ সমাপ্ত হল। নাতি বলে উঠল আবেগ ভরা কন্ঠে, মা এবার তো ঠাকুমা নেই। এবার তোমার পালা শুরু হল। কি হবে গো, ঠাকুমার চোখের জলের অভিশাপ তোমাদের দগ্ধ করবে না তো...। আমি বললাম, না রে শত কষ্টেও মা ছেলেদের অভিশাপ দেন না। ভাইপো ইন্দ্র বললো, দিলে ভাল হত কাকা। আমি বললাম, ওসব বলতে নেই সোনা। আবার জীবনসংগ্রাম শুরু হলো। আমরা মিশে গেলাম জীবন সমুদ্রে। আমরা চারবন্ধু গরমের ছুটিতে ঘুরতে যাব ঠিক করলাম। আমি, রাজু, শ্যামলী আর সোমা। চারজনই আমরা ইতিহাসের ছাত্র। এক কলেজে পড়ি। সোমা বলল, সাঁচি স্তুপ দেখে আসি চল। শ্যামলী বলল, মধ্যপ্রদেশের রাজধানী শহর ভূপাল থেকে ৪৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সাঁচির বিদিশাগিরিতে অবস্থিত বৌদ্ধ স্তূপ। সম্রাট অশোক এই স্তূপ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজু বলল, হ্যাঁ ইতিহাসে পাওয়া যায় এইসব কাহিনী। অশোককের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরও কলিঙ্গবাসী পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ নরনারী প্রাণ হারায় এবং প্রায় দেড়লক্ষ নরনারী বন্দী হয়। এই যুদ্ধের এই বীভৎসতা সম্রাট অশোককে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। পরে তিনি যুদ্ধের পথত্যাগ অহিংসার পথে সাম্রাজ্য পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ক্রমে ক্রমে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং উপগুপ্ত নামক এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে দীক্ষা নিয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর গুরু উপগুপ্তকে সাথে নিয়ে কপিলাবস্তু, লুম্বিনী, কুশীনগর, বুদ্ধগয়া-সহ নানা স্থানে ভ্রমণ করেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেন। এই সময় তিনি নানা স্থানে স্তূপ, স্তম্ভ এবং পাহাড়ের গায়ে বুদ্ধের বাণী লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা করেন। এই সূত্রে তিনি বর্তমান সাঁচি থেকে দশ কি.মি দুরে বিদিশাগিরি নামক পাহাড়ে একটি বৌদ্ধ স্তূপ তৈরি করেছিলেন।আমি জানি, সম্রাট অশোকের তৈরি মূল স্তূপটির ব্যাস প্রায় ৩৬.৬ মিটার ও উচ্চতা প্রায় ১৬.৫ মিটার। কথিত আছে অশোকের কন্যা সঙ্ঘমিত্রা ও পুত্র মহেন্দ্র শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারে যাওয়ার আগে, সাঁচিতে এই স্তূপ পরিদর্শন করেছিলেন। আমাদের কপাটি ব্যাংক এখন মহিলা সদস্য হয়েছে শ্যামলী তাদের মধ্যে অন্যতম। বিদিশাগিরির শীর্ষে রয়েছে সম্রাট অশোকের তৈরি মহাস্তূপ। একে এক নম্বর স্তূপ বলা হয়। মনে করা হয় এই এক নম্বর স্তূপের মধ্যে বুদ্ধদেবের ভস্ম আছে। উল্লেখ্য সম্রাট অশোক যে স্তূপ গড়েছিলেন তা এখনকার স্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। একশ বছর পরে সেই স্তূপের উপর আরো বড় স্তূপ তৈরি হয়। তা ঘিরে তৈরি হয়েছিল পাথরের অলিন্দ। কালক্রমে সে অলিন্দের পাথর অনেকটা ক্ষয়ে গিয়েছিল। এই কারণে পরে স্তূপের পাশে গোল বারান্দার মতন প্রদক্ষিণ পথ তৈরি হয়। এরও প্রায় একশ বছর পর স্তূপের চারদিকে চারটি তোরণ নির্মাণ হয়। এক নম্বর স্তূপের উত্তরমুখী তোরণ এখনও অক্ষত। এতে আছে কাঠ বা হাতির দাঁতের সূক্ষ্ম কারু কাজ। তোরণের স্তম্ভ ও ফলকে বৌদ্ধ জাতকের গল্প খোদাই করা আছে। বুদ্ধের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু দৃশ্য এখানে দেখা যায়। তবে তোরণ বা স্তম্ভে বুদ্ধের কোন মূর্তি নেই। কখনও গাছ, কখনও ধর্মচক্র, কখনও পদচিহ্ন-এসব প্রতীক দিয়ে বুদ্ধের উপস্থিতি বোঝান হয়েছে। এর কারণ সম্ভবত এই যে সে সময় বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের ভিতর বুদ্ধমূর্তি পূজোর নিয়ম ছিল না।
আমরা হাওড়া এসে ট্রেনে চাপলাম। তারপর যখন ভূপাল এলাম তখন রাত্রি। আগে থেকে হলিডে হোম বুক করা ছিল। এখান থেকেই আমরা সাইড সিন ঘুরে কভার করব। প্রয়োজনে ফিরে আসব এখানেই। রাজু বলল, এখান থেকে মাত্র ৪৬ দূরে বিদিশাগিরি। সেখানে ভগবান বুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বৌদ্ধ স্তূপ সাঁচিতে অবস্থিত। মালপত্তর রেখে রেডিমেড খাবার খেয়ে আমরা বিশ্রাম নিলাম। আমি আসলে সোমার প্রেমে আবদ্ধ আর রাজু, শ্যামলীর প্রেমে হাবুডুবু খায়। পড়াশুনা শেষ হলে চাকরি পেয়ে বা ব্যবসা করে আমরা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হব একথা আমাদের দুই পরিবারই জানে। আমরা শুয়ে পড়লাম রাত একটার সময়।

তারপর সকালে উঠে বাস আসার অপেক্ষা। বাস আমাদের নিয়ে গেল আজ সাঁচী।
আমাদের গাইড বলছেন, বাবু ইতিহাসের কথা একটু মন দিয়ে শুনে লিবেন। তাহলে মজা পাবেন। সোমা বলল, লোকটা তো ভালো বাংলা বলে। আমি বললাম, হ্যাঁ। গাইড বলতে শুরু করলেন, মৌর্য বংশের অবসানের পর, ব্রাহ্মণরা বেশ কয়েকবার সাঁচির স্তূপ আক্রমণ করে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালায়। এই সময় অশোকের স্তূপ ছাড়াও সাঁচির সমস্ত সৌধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও স্থানীয় গৃহী বৌদ্ধরা নতুন উদ্যমে কিছুটা মেরামত শুরু করেন। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক ধাক্কা সাঁচির উপরেও পরে। ফলে নতুন উদ্যমে মঠ স্তম্ভ নির্মাণের কাজেও ভাঁটা পড়ে। এবং শেষে একেবারে থেমে যায়। গুপ্তযুগে দেশে কিছু শান্তি ও সমৃদ্ধি এলে সাঁচিতে কারুশিল্প ও স্থাপত্যের কাজ নতুন ভাবে শুরু হয়। এ সময়ই মূর্তির দেখা মেলে। এসময়ে সতেরো নম্বর মন্দিরটি নির্মিত হয়। এভাবে দুশো বছর কাজ চলতে থাকে। তারপর হুনেরা ভারত আক্রমণ করে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ফলে এই স্তূপের নিয়মিত সংস্কার বন্ধ হয়ে যায়।৬০৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা হর্ষবর্ধনের শাসনকালে বৌদ্ধধর্ম বিস্তার লাভ করে। এই সময় সাঁচিতে বেশ কিছু মঠ ও মন্দির বানানো হয়। এই ধারা প্রায় ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এরপর হিন্দু আধিপত্যের কারণে সাঁচিতে বৌদ্ধ-ধর্মাবলম্বীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ক্রমে স্তূপে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ফলক স্থাপিত হতে থাকে। একসময় সাঁচি বৌদ্ধশূন্য এলাকায় পরিণত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর দিকে সাঁচির বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকা একটি পরিত্যাক্ত এলাকায় পরিণত হয়। কালক্রমে স্তূপটি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়।১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ জেনারেল টেলার সাঁচির ধ্বংসস্তূপ আবিষ্কার করেন। এই সময় গুপ্তধনের আশায় লোকজন শেষবারের মতো স্তূপটির ক্ষতি করে। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাপটেন জনসন এক নম্বর স্তূপটি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলে। ফলে স্তূপের গায়ে প্রকাণ্ড ফাটলের সৃষ্টি হয় এবং পশ্চিমের তোরণ ভেঙ্গে পড়ে। একইভাবে দু নম্বর স্তূপও ধ্বংস হয়। ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে আবার দুই ও তিন নম্বর স্তূপ খোঁড়া হয়। এক নম্বর স্তূপের মধ্যে রত্নরাজির সন্ধানে লোহার রড ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এই সময় স্থানীয় এক হিন্দু জমিদার অশোক স্তম্ভটি তিন টুকরো করে বাড়ি নিয়ে যান।১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দের পরে স্তূপটি সংরক্ষণের চেষ্টা করেন মেজর কোল। পরের তিন বছর তিনি এই উদ্যম সচল রাখেন। এর বেশ পরে পরে ভারতের আর্কিওলজিকাল সার্ভের ডিরেক্টর এ কাজে এগিয়ে আসেন। মেজর কোল বিদিশাগিরির জঙ্গল কেটে গোটা পাহাড় পরিষ্কার করান। এক নম্বর স্তূপের ফাটল মেরামত করেন। পশ্চিম ও দক্ষিণদিকের তোরণগুলি তুলে যথাস্থানে স্থাপন করেন। এরপর বাকি কাজ করেন স্যার জন মার্শাল। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে এই স্তূপের যে সংস্কার করা হয়, বর্তমানে তাই পুরাকীর্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। 

আমরা বাসের সকলে হোটেলে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। এখানে দেওয়ালের কারুকাজ দেখলেই সমগ্র ইতিহাস দেখা যায় চোখে। সোমা বলল মহামতি জীবকের কথা দেওয়ালে খচিত আছে।আমরা পড়েছি, জীবক অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা শাস্ত্র এবং ভেষজ বিজ্ঞান অধ্যায় পর চিকিৎসক হিসেবে বিম্বিসারের সভায় যোগদান করেন এবং ভগবান বুদ্ধের শিষ্য গ্রহণ করেন। কিন্তু অজাতশত্রু রাজা হওয়ার পরে বৌদ্ধবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। 
রাজু পুরোনো অট্টালিকায় দাঁড়িয়ে বলল, আমি অজাতশত্রুর অভিনয় করছি আর তুই হয়ে যা মহামতি জীবক। আমি বললাম, তাই হোক। তারপর আমি বললাম, আজ রাজসভায় অজাতশত্রু কথা বলছেন, রাজু শুরু করল অভিনয়। সেনাপতি সোমা আর রাজপুরোহিত শ্যামলী। সবাই এক্সপার্ট। কলেজের সোশালে ওরা নাটকে অভিনয় করে। 

- শোন হে পারিষদ বর্গ। আমার রাজ্যে বৌদ্ধগান বন্ধ করতে হবে। সেনাপতি কোথায়?

- আজ্ঞে  আমি, হাজির। আদেশ করুন।

- আমার রাজ্যে  আমিই এক এবং একক। আর কেউ ধর্ম প্রচার করে বড় হবে এ আমি কিছুতেই সহ্য করব না।

- তাই হবে রাজন। আজ থেকে আমি দেখব। আপনার আদেশ শিরোধার্য।

- না খুব কড়াকড়ি করার প্রয়োজন নেই। রাজার আদেশ তারা যেন পালন করেন এবং কর ঠিকমত দেয় তার ব্যবস্থা  করুন। শুধু ধর্ম নিয়ে পেট ভরে না।

 রাজা অজাতশত্রু আদেশ দিলেন। তারপরও তিনি ভাবছেন বুদ্ধদেবকে সকলে ভগবান বলে মানে। কেন?  তার মধ্যে কি  এমন আছে যে রাজার থেকেও সাধু বড় হয়ে যায়।

তিনি রাজপুরোহিতের কাছে যান। রাজপুরোহিত বলেন, বুদ্ধদেব বাল্যকালে রাজপাট ছেড়ে কঠোর সাধনায় ব্রতী হয়েছেন। দীর্ঘ সময় সাধনা করে তিনি সিদ্ধিলাভ করেছেন। তিনি সাধারণ মানুষ নন। তিনি তাঁর ভক্তদের কাছে ভগবানস্বরূপ।
রাজা বলেন, হ্যাঁ শুনেছি। রাজপুত্র বাইরে  বেরিয়েছিলেন চারদিন। চারদিন তিনি মানুষের যৌবন, জ্বরা, ব্যাধি ও মৃত্যু দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে মানুষের যদি শেষ পরিণতি মৃত্যু হয়, তাহলে এই যে  সংসার জীবন,এর কোন অর্থ হয় না ।
রাজপুরোহিত বললেন, হ্যাঁ ঠিক বলেছেন তারপর তিনি এক গভীর রাতে রাজ্যপাট ছেড়ে মাকে ছেড়ে, বাবাকে ছেড়ে, রাজ্যের লোভ ছেড়ে তিনি বাইরে ফিরছিলেন সন্ন্যাসী হবেন বলে। তারপর বটবৃক্ষের তলায় কঠিন সাধনা শুরু করেছিলেন। সেই সাধনায় তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তারপর সুজাতা নামে এক মহিলার পায়েস খেয়ে তিনি সেই সাধনা ভঙ্গ করেন।তিনি বুঝেছিলেন শরীরকে কষ্ট দিয়ে সাধনা করা যায়না। সাধনা করতে গেলে শরীরকে কষ্ট দিতে নেই।
নাটকশেষে, গাইড আবার বললেন, ইতিহাসের কথা,  এখন তিনি ভগবান বুদ্ধ নামে পরিচিত। তার কাছে অনেক মানুষ মনের অশান্তি, যন্ত্রণা নিয়ে আসেন এবং মনে সুন্দর এক ভাবনা নিয়ে ফিরে যান। একজন এসে তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, কেন আমার ঘরে মৃত্যু  বারবার প্রবেশ করছে? আমি মরতে চাই না। 

তিনি বলেছিলেন, ঠিক আছে তুমি এমন কোন বাড়ি থেকে আমাকে একমুঠো সরিষা  এনে দাও যার ঘরে মৃত্যু প্রবেশ করেনি। সেই সরিষা খেলে তুমি অমর হয়ে যাবে।
সেই ব্যক্তি বক্তব্যের সারাংশ বুঝে চলে গিয়েছিলেন খুশিমনে।
রাজপুরোহিত বলেছিলেন, কিন্তু বুদ্ধদেবের চিকিৎসা করেন এক চিকিৎসাবিজ্ঞানী, সে মস্ত বড় চিকিৎসক তার নাম জীবক।আমাদের রাজপরিবারের চিকিৎসক তিনি রাজা বিম্বিসারের আমল থেকে। তুমি এই জীবককে প্রাসাদে  এনে রাখতে পারো। সে তোমার চিকিৎসা করবে। রাজপরিবারের চিকিৎসা করবে।অজাতশত্রুর আগে মহারাজ বিম্বিসার সবরকম খোঁজখবর নিয়ে জীবককে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তার রাজসভায় জীবক এসেছিলেন। জীবক রাজি হয়েছিলেন রাজসভায় যোগদান করার জন্য। আবার বুদ্ধদেবের প্রধান শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জীবক। অজাতশত্রু বৌদ্ধ বিদ্বেষী হয়েও জীবককে  মর্যাদার আসনে রেখেছিলেন। মহামতি জীবক রাজপরিবারের চিকিৎসা করতেন। আর যেখানে খবর পেতেন সেখানেই চিকিৎসা করতে চলে যেতেন পায়ে হেঁটে।একবার এক গরীব মানুষ সপ্তপর্ণী গুহাপ্রদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রাজসভায় মহামতি জীবকের সন্ধান করেছিলেন।
সেই দরিদ্র রাজপ্রাসাদের গেটের বাইরে অধীর আগ্রহে আশাবাদী হয়ে উঠলেন মহামতির দর্শন পাওয়ার জন্য।
তিনি প্রহরীকে বললেন, একবার মহামতি জীবকের কাছে যেতে চাই।
প্রহরী বলল,তোর সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি। তুই সামন্য এক কৃষক হয়ে রাজার চিকিৎসকের সাহায্য  চাইছিস?  যা পালা। তার সঙ্গে দেখা হবে না। তিনি এখন চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করছেন।
লোকটি বলল, আমাকে বাঁচান। আমার স্ত্রী মরে যাবে।
প্রহরী বলল, তোর মরে যাওয়াই ভালো।
গরীব কৃষক কান্নাকাটি শুরু করলেন।
গোলমাল শুনে মহামতি জীবক জানালা থেকে গোলমালের কারণ অনুধাবন করলেন। তারপর তার চিকিৎসার থলে নিয়ে হাজির হলেন গেটের সামনে।
মহামতি প্রহরীকে বললেন, দরজা খোলো। আর কোনো লোকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে না। জীবনে কষ্ট পাবে খারাপ আচরণের ফলে।
প্রহরী লজ্জিত হয়ে গেট খুলে দিল।
জীবক গরীব কৃষকের হাত ধরে চলে গেলেন পায়ে হেঁটে দশ মাইল  পথ।
তার চিকিৎসায় সেরে উঠেছিল কৃষকের স্ত্রী। 
কোনদিন কোন গরিব মানুষ তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়নি। তিনি অর্থের বিনিময় চিকিৎসা করতেন না। তিনি চিকিৎসা করতেন মানুষকে ভালোবেসে। ভগবান বুদ্ধের বাণী তার জীবনকে প্রভাবিত করেছিল অনেকখানি।রাজা অজাতশত্রু জীবকের কাছে ভগবান বুদ্ধের বাণী সম্পর্কে অনেককথা শুনেছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি তাঁর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন এবং জীবককে অবসর সময়ে রাজা নিভৃতকক্ষে ডেকে পাঠাতেন। তন্ময় হয়ে শুনতেন জীবকের কথা। জীবক বলতেন, জীবে দয়া, ভালোবাসা আর শান্তি তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। জীবক সময় 
কাটাচ্ছেন রাজার কক্ষে এবং বুদ্ধের বাণী শোনাতেন রাজাকে।
জীবন শান্তি ধর্ম আর ভালোবাসার জন্য।  বৌদ্ধ ধর্মের মূলকথা, যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই।
শান্তিই একমাত্র সমস্ত কিছুর সমাধান করতে পারে। ভালোবাসা আর  শান্তি, এই হল বুদ্ধদেবের বাণীর মূলকথা।অজাতশত্রু তার বাবার কাছেও শুনেছিলেন জীবকের কথা। বিম্বিসার জানতেন  বৌদ্ধ যুগের ভারতবর্ষে বিজ্ঞানে, চিত্রকলায়, দর্শনে সর্বত্র নিয়োজিত হয়েছিল এক প্রতিবাদ এবং সেগুলি জগতের কাছে  একটি বিস্ময়।
মহারাজ বিম্বিসার বলতেন,  মহামতি জীবককে পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম সেরা চিকিৎসক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী বলা যেতে পারে কথিত আছে  ইনি বারবনিতার সন্তানরূপে জন্ম নিয়েছিলেন আবর্জনার স্তুপে। পরিণত করেছিলেন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়। চিকিৎসা শাস্ত্র এবং বিজ্ঞান চিকিৎসক মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন এবং ভগবান বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।অজাতশত্রু প্রচন্ড বুদ্ধবিরোধী হলেও এবং পিতাকে বন্দি করলেও জীবকেকে চিকিৎসক পদে বহাল রেখেছিলেন। জীবকের অসাধারণ চিকিৎসা নৈপূণ্যের জন্য। সাধারণ জীবন যাপন করছেন জীবক। ধর্মপ্রচারের পরিবর্তে তাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন শেষে তার আচরণ অজাতশত্রু কে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে শত্রুতা করেও তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করেছিলেন এবং তাদের পরামর্শে অজাতশত্রু প্রথম বৌদ্ধ সম্মেলন আহ্বান জানিয়েছিলেন। পর্বতের গুহায় সম্মেলন হয়েছিল এবং ভগবান বুদ্ধের বাণী গুলিকে একত্রিত করা হয়েছিল।অজাতশত্রু একদিন জীবককে বললেন, আমি ভগবান বুদ্ধের শরণাপন্ন হতে চাই।
জীবক বললেন, চলুন আমি আপনাকে ভগবানের কাছে নিয়ে যাই।
ভগবান বুদ্ধের কথা শুনে অজাতশত্রুর জীবনে বিরাট এক পরিবর্তন আসে। তিনি বৌদ্ধ মহাসম্মেলনের ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেন, ভগবান বুদ্ধের বাণীগুলি সংরক্ষণ করে রাখা হবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলি যুবকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গ্রন্থগুলি থেকে জানা গেছে তিনি দু-দুবার বুদ্ধকে কঠিন রোগ থেকে মুক্ত করেছিলেন। সংসার থেকে বৌদ্ধভিক্ষু 100 বছর বয়সে পদব্রজে বৌদ্ধবিহার গুলিতে যাওয়া আসা করতেন কেবলমাত্র চিকিৎসার কারণে। বহুদূর থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে আসতেন চিকিৎসার জন্য। কাউকে বিমুখ করতেন না।  জীবককে বলা হয় বেদোক্ত যুগের ধন্বন্তরি। রোগীকে না দেখেও কিরকম চিকিৎসা  করতেন  তা শুনলে চমকিত হতে হয়। কথিত আছে ভগবান বুদ্ধ একবার কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ওষুধগুলো পদ্মফুলে মিশিয়ে রেখেছিলেন। বুদ্ধদেব গ্রহণ না  করায় যুবকদের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। ঘ্রাণ  গ্রহণ করেই তাঁর রোগ ভালো হয়েছিল। 
সেবার কাজে নিজেকে শতত নিয়োজিত রাখলেও বিজ্ঞানকে বঞ্চিত করেননি জীবক চিকিৎসা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সেগুলো পরের দিকে হারিয়ে গেলেও পরবর্তীকালে ভারতীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট সাহায্য করেছিল তার শেষ বয়সে শ্রেষ্ঠ রচনা শিশু রোগ চিকিৎসা গ্রন্থ পৃথিবীর প্রথম শিশু চিকিৎসা সংক্রান্ত বই অতি মূল্যবান গ্রন্থ যা পরবর্তীকালে ভারতীয় চিকিৎসকদের শিশুরোগ সংক্রান্ত গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।জীবক বলতেন শুধু ধর্মপ্রচার নয় গরীব রোগীদের সেবা করতে হবে তাদের সেবায় নিয়োজিত হতে চাই।
ধর্ম প্রচার এর পরিবর্তে দীনদরিদ্র, রোগগ্রস্তদের সেবায় তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। শেষে তার আচরণ অজাত শত্রুকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে শত্রুতা ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেও  অজাতশত্রু প্রথম বৌদ্ধ সম্মেলন আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অজাত শত্রু বললেন আমি এক বড় বৌদ্ধ মহাসম্মেলন করতে চাই।
জীবক বললেন কিন্তু এত বড় মহাসম্মেলন আপনি করবেন কোথায়? ভারতবর্ষের প্রত্যেক প্রদেশ থেকে বহু লোকের সমাগম হবে। অজাতশত্রু বললেন আমি স্থান নির্বাচন করেই রেখেছি গৃধ্রকুট পর্বতে সপ্তপর্ণী গুহায় সম্মেলন করা হবে।রাজপুরোহিত বললেন তার সমস্ত বাণী সংরক্ষণ করতে হবে। তারপর সমস্ত সেনাপতিদের সাহায্যে, সমস্ত নাগরিকদের সাহায্য নিয়ে সেই গৃধ্রকুট পর্বতে বিরাট বড় মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। সপ্ততপর্ণী পর্বতের গুহায় সম্মেলন হয়েছিল এবং ভগবান বুদ্ধের বাণী গুলো কে একত্রিত করা হয়েছিল রাজার কথামত।একবার ভগবান বুদ্ধের শরীর অসুস্থ হয়ে উঠল চরম।
জীবক বললেন, আপনি ঔষধ সেবন করুন। তাহলেই সুস্থ হয়ে উঠবেন।
ভগবান বললেন, আমি ঔষধ সেবন করব না। এবার তো বয়স হয়েছে। তোমরা বেশি চিন্তা কোরো না। 
তাঁকে কেউ রাজী করাতে পারল না।শেষে জীবক এক ফন্দি আঁটলেন। তিনি তার এক বন্ধুকে বললেন তুমি আমার বাড়ি যাবে গোপনে কেউ যেন জানতে না পারে ওখানে আমি ভগবানের ওষুধ দিয়ে দেবো এবং ভগবান সেই ওষুধ ওষুধ ঠিক হয়ে যাবে।যুবকের বন্ধু জীবনের বাড়ি এলেন এবং বললেন আমি এসে গেছি তুমি কি দেবে বলেছিলে দাও। তারপর জীবক করলেন কি ভগবান বুদ্ধের প্রিয় শ্বেত পদ্ম ফুলের ভিতর ওষুধ দিলেন এবং তার মধ্যেই ওষুধের বিভিন্ন রকম পদ্ধতিতে ঔষধ মিশ্রিত  করলেন এবং বন্ধুর হাতে তুলে দিলেন।তারপর মহামতি যুবকের বন্ধু ভগবান বুদ্ধের কাছে গেলেন।
তিনি ভগবান বুদ্ধকে বললেন আপনার প্রিয় শ্বেতপদ্ম এনেছি।
ভগবান বুদ্ধ প্রসন্ন চিত্তে তারপর শ্বেতপদ্ম গ্রহণ করলেন । তারপর নাকের কাছে নিয়ে সুগন্ধি পুষ্পের ঘ্রাণ গ্রহণ করলেন।
কিছুদিন পরে  ভগবান বুদ্ধ সুস্থ হয়ে উঠলেন।সাধারণে এক ভিক্ষুক মত জীবন যাপন করতেন মহামতি জীবক ধর্মপ্রচারে পরিবর্তে দুঃখিত রোগগ্রস্ত সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন শেষে তার আচরন অজাতশত্রু কে খুব মুগ্ধ করেছিল এবং তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করেছিলেন।তুই মহামতি যুবক 100 বছর বয়সেও পায়ে হেঁটে চিকিৎসা করে বেড়াতেন গ্রামে গ্রামে। এবার অজাতশত্রু তাঁকে ডেকে বললেন, আপনি চিকিৎসা শাস্ত্র রচনা করুন ভবিষ্যৎ দুনিয়ার জন্য। জীবনটা শেষ বয়সে শ্রেষ্ঠ রচনা শিশু রোগ চিকিৎসা গ্রন্থ রচনা করেন। পৃথিবীর প্রথম শিশু চিকিৎসা সংক্রান্ত বই, অতি মূল্যবান গ্রন্থ, বৃদ্ধ জীবক তন্ত্র। যা পরবর্তীকালে ভারতীয় চিকিৎসকদের শিশু রোগ সংক্রান্ত গবেষণা যুদ্ধে সাহায্য  করেছিল।
রাজা বিম্বিসার বুদ্ধকে ধর্মগুরু হিসেবে মান্য করে প্রাসাদে নিয়ে যান। বুদ্ধ তাঁকে চতুরার্য সত্য সম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করেন। এরপর বৌদ্ধ সংঘের সহস্রাধিক ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য বেণুবন নামক তার প্রমোদ উদ্যানটি গৌতম বুদ্ধকে প্রদান করেন। পরে রাজা সেখানে একটি বিহার নির্মাণ করেন। এই বিহারটি 'বেণুবন বিহার' নামে পরিচিতি পেয়েছিল।  বিম্বিসারের অনুরোধে বুদ্ধ অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে উপোবাস ব্রত পালনের বিধি প্রচলন করেন। কথিত আছে, বিম্বিসারের অনুরোধেই বুদ্ধ বর্ষাকালে পরিব্রাজন না করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে সাধনার 'বর্ষাবাস' নামক রীতি প্রচলন করেন। ভিক্ষুদের বর্ষাবাসের সুবিধার জন্য কুটীর নির্মাণ এবং বুদ্ধ ও ভিক্ষুদের চিকিৎসার জন্য রাজবৈদ্য জীবককে নিযুক্ত করেন। রাজার  পত্নী  পরবর্তীকালে ভিক্ষুণী সংঘে যোগদান করে অর্হত্ত্ব লাভ করেন।এরপর তিনি তাঁর পিতার অনুরোধে কপিলাবাস্তুতে আসেন। এখানে এসে তিনি তাঁর পিতার শত অনুরোধেও প্রথমে গৃহে প্রবেশ করতে রাজী হলেন না। রাজবাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী গোপা পুত্র রাহুলকে ডেকে বললেন -ওই তোমার পিতা মতাকে ডেকে আন। রাহুল নিজের পরিচয় দিয়ে ঘরে যেতে বললেন। গৌতম সে আহ্বান অগ্রাহ্য করলেন। এরপর সকলের কাতর অনুরোধে ইনি বাড়িতে প্রবেশ করলেন কিন্তু কোথাও দাঁড়ালেন না। রাজবাড়ি থেকে শেষবারের মতো বের হওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী বুদ্ধের সামনে তাঁর দীর্ঘ চুল বিছিয়ে অপেক্ষা করলেন। গৌতম বিন্দু মাত্র বিচলিত না হয়ে সে চুল মাড়িয়ে রাজবাড়ী থেকে বেরিয়ে এলেন। এই সময় ইনি তাঁর  বৈমাত্রেয় ভাই নন্দ এবং সাত বৎসরের পুত্র রাহুলকে দীক্ষিত করে রাজধানী ত্যাগ করলেন। এরপর ইনি ১৩ বৎসর ধরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর ধর্মমত প্রচার করে বেড়ালেন। পিতার অসুস্থাতার কথা শুনে ইনি কপিলাবস্তুতে আসেন এবং পিতার মৃত্যুকালে উপস্থিত হলেন। পিতার মৃত্যুর পর ইনি পুরনারীদের ভিক্ষু বানালেন। এই ভিক্ষুদলের নেত্রী বানালেন তাঁর স্ত্রী গোপাকে। এরপর ইনি তাঁর ধর্মমত প্রচারের জন্য আবার পথে বেড়িয়ে পড়েন। ৮০ বছর বয়সে নেপালের কুশী নগরে ইনি দেহত্যাগ করেন। কথিত আছে তাঁর জন্ম বোধিত্ব লাভ ও মৃত্যু- একই তারিখ ও সময়ে হয়েছিল।বুদ্ধ বেণুবনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ উদ্‌যাপন করেন।শেষ বছরে সারিপুত্র ও মৌদ্‌গল্যায়ন বুদ্ধের শিষ্য হন। 
গাইড আবার বলতে লাগলেন ইতিহাসের কথা, এই সময় রাজবৈদ্য জীবক তাঁর আম্রকাননে বুদ্ধ সংঘের জন্য একটি বিহার নির্মাণ করে দেন। বর্তমানে এই বিহারটি 'জীবকাম্রবন' বামে পরিচিত।কাছে হিন্দু দর্শনে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। কিন্তু এই জ্ঞানে পরিতৃপ্ত হতে পারেন নি। তাই এখান থেকে তিনি উদ্দক রামপুত্তের কাছে শিক্ষাগ্রহণের জন্য আসেন। এই গুরুর কাছে তিনি সাংখ্য এবং যোগবিদ্যা শেখেন। এই নতুন জ্ঞানও তাঁকে শান্ত করতে পারলো না। এরপর তিনি মগধের রাজধানী রাজগিরীতে আসেন। লোকমুখে নতুন সন্ন্যাসীর প্রশংসা শুনে বিম্বিসার তাঁর সাথে দেখা করেন এবং রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু বুদ্ধ এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে জানান যে, যদি কখনও সত্যের সন্ধান পান, তাহলে তিনি রাজার আমন্ত্রণ রক্ষা করবেন। এর কিছুদিন পর, রাজা এক যজ্ঞানুষ্ঠানের জন্য ১০০০ মেষ বলির উদ্যোগ নেন। এই কথা জানতে পেরে বুদ্ধ রাজার সাথে দেখা করেন এবং মেষ বলি থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করেন। রাজা এই অনুরোধে বলি বন্ধ করে দেন। এরপর বুদ্ধ উরুবিল্ব গ্রামের নিকটবর্তী এক উপবনে এসে তপস্যা শুরু করেন। এখানে তিনি কঠোর তপস্যা শুরু করেন। সে সময় পাঁচজন সন্ন্যাসীও তাঁর সাথে ধ্যান শুরু করেন। বুদ্ধের কঠোর তপস্যা দেখে এই পাঁচ সন্ন্যাসী তাঁর ভক্ত হয়ে পড়েন। এরপর তিনি ভারতের বর্তমান বিহার প্রদেশের গয়া জেলার একটি গভীর অরণ্যের ভিতর, নিরাঞ্জনা নদীর তীরস্থ একটি অশ্বত্থ গাছের নিচে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। এই সময় অনাহারে অনিদ্রায় তাঁর শরীরের মেদ-মাংস ক্ষয়ে কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিলেন। এই সময় তাঁর শারীরীক অক্ষমতার কারণে ধ্যানে মনোনিবেশ করতে পারছিলেন না। তাই তিনি অল্প কিছু আহার করতে থাকেন। এই সময় সুজাতা নামক এক গৃহবধু প্রথম পুত্র সন্তান লাভের পর বনদেবতার পূজা দিতে আসতেন। তিনি সেখানে বুদ্ধকে দেবতা ভেবে পূজা দিতে গেলে, বুদ্ধ তাঁর ভুল ভেঙে দিয়ে বলেন যে, তিনি দেবতা নন। তিনি সুজাতার নিবেদিত পায়েস গ্রহণ করে বলেন যে, তোমার মনস্কাম যেমন পূর্ণ হয়েছে, এই পায়েস গ্রহণের পর আমার মনস্কামও যেন পূর্ণ হয়। বুদ্ধের এই খাদ্যগ্রহণ দেখে, বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে, তাঁর সাথের সন্ন্যাসীরা তাঁকে ত্যাগ করেন। এরপর তিনি একাই ধ্যান করতে থাকেন। প্রায় ৪৯ দিন ধ্যান করার পর, তিনি বৈশাখী পূর্ণিমায় গৌতম বুদ্ধত্ব লাভ করেন। এই সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৫ বৎসর। বোধিপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর নাম হল তাঁর বুদ্ধ।  কথিত আছে তিনি এই রাতের প্রথম যামে পূর্বজন্মের জ্ঞান লাভ হয়, দ্বিতীয় যামে তাঁর দিব্যচক্ষু বিশুদ্ধ হয়, অন্তিম যামে দ্বাদশ প্রতীত্যসমুৎপাদ এবং অরুণোদয়ে সর্বজ্ঞাতা প্রত্যক্ষ করেন। বর্তমানে নিরঞ্জনা নদীকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ফল্গু। আর উরুবিল্ব গ্রামের নাম বুদ্ধগয়া এবং তিনি যে গাছের নিচে বসে বোধিত্ব লাভ করেছিলেন, সেই অশ্বত্থগাছের নামকরণ করা হয়েছে বোধিবৃক্ষ। বোধিবৃক্ষ এবং মন্দির ছাড়া এখানে একটি দীঘির নাম সুজাতা দিঘি। কথিত আছে। এই দিঘির জলে স্নান করে বুদ্ধদেবকে পায়েস নিবেদন করেছিলেন। শরীরকে কষ্ট দিয়ে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করা অসম্ভব একথা তিনি বলতেন। 
আমাদের  গাইড ঘুরে ঘুরে সমস্ত স্থান দেখালেন এবং ঐতিহাসিক বিবরণ  দিলেন। আমরা চুপ করে গোগ্রাসে গিললাম ইতিহাসের কথা।
লজে ফিরে সোমা বলল, স্ত্রী চুল বিছিয়ে দিয়েছিলেন ৃমায়ার শেকল।
আমি বললাম, ভগবান মায়ার শেকল ছিন্ন করে সংসার ছাড়লেন। তাই তো মানুষের জন্য কাজ করতে পারলেন।
শ্যামলী বলল, তাহলে।স্ত্রী র কথাটাও ভাবুন...
আমি আর রাজু নিরুত্তর হয়ে রইলাম।

বেড়ানো পরে আমরা কিছুদিন বিশ্রাম নিন আর আমি ফাঁকা মাঠে আজকে আকাশের নিচে বসে আছি হঠাৎ বলল আমার মাস্টারমশাই দীনেশ বাবুর কথা মনে পড়ছে একটা গ্রামের লোক নীরেনবাবুর  কথা মনে পড়ছে। রমেন বলছে দুজনেই ছিলেন সাদাসিধে লোক তাদের খুব ভালো লাগলো তারা এখন নেই কিন্তু আমার মা তাদের খুব ভালোবাসতেন আমি তাদের কথা বলছি শোন, মাষ্টারমশাই দীনেশবাবু সাদাসিধা মনের মানুষ। একটা সাধারণ প্যান্ট জামা পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ট্রেনে তার নিত্য যাওয়া আসা। ট্রেনে যাওয়ার সময় অনেক বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ হয়। তারা হাসি মস্করায় ব্যস্ত থাকে। দীনেশবাবু নিজে জানালার এক কোণে বই নিয়ে বসে পড়েন। তিনি নিজেও অনেক বই লিখেছেন। কলকাতার নামীদামী প্রকাশনা থেকে তাঁর লেখা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তাতে তার কোনো অহংকার নেই। ছাত্র ছাত্রীদের কি করে ভালভাবে প্রকৃত মানুষের মত মানুষ করা যায়, এই নিয়ে তাঁর চিন্তা। শিক্ষকতা শুধু পেশা নয় তার সঙ্গে মিশে থাকে বাড়তি দায়ীত্ববোধ। তিনি এইকথা ভাবেন মনে মনে। কি করে সর্বোত্তম সেবা প্রদান করা যায়, এই নিয়েই দিনরাত চিন্তাভাবনা করেন।  স্কুলে পৌঁছান। ঘন্টা পড়ে প্রার্থনা সভার। জাতীয় সংগীত শেষ হওয়ার পরে শুরু হয় ক্লাস। ক্লাসে গিয়ে তিনি কোনোদিন চেয়ারে বসেন না। ছাত্রদের কাছে গিয়ে সমস্যার সমাধান করেন। পড়াশোনার কাজে সাহায্য করেন। স্টাফরুমে বসেন। তারপর কুশল বিনিময়ের পরে তিনি চলে যান ক্লাসে। কোন ক্লাস ফাঁকা আছে রুটিন দেখলেই জানতে পারেন। কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেই তাঁর ক্লাসে চলে যান নিয়মিত। টিফিনে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সময় কাটান। সদাহাস্যময় দীনেশবাবু নিজের কাজে ব্যস্ত থাকেন সারাদিন। স্কুল থেকে ফেরার পরে নিজের লেখা নিয়ে বসেন। কোনোদিন ভাষাসদনে যান। সেখানে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটান। তারপর বাজার সেরে বাড়িতে ঢোকেন।আমার মা বলেন, ভাল লোকের কোন পারফিউম লাগে না। তাদের গা থেকে আপনা আপনি চন্দনের সুগন্ধ পাওয়া যায়। মা আরও বলেন, ভরা কলসি টগবগ করে না।জ্ঞানী লোক কথা কম বলেন। তাঁরা প্রচারবিমুখ হন। দীনেশবাবু এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কথা কম বলেন কিন্তু কর্মি লোক। লোকের ভাল ছাড়া মন্দ ভাবেন না কোনোদিন। তাঁর স্বভাব দেখলেই সকলের ভাল লেগে যায়। দীনুবাবুও এই ধরণের লোক। দীনেশবাবুকে মা আদর করে দীনুবাবু বলেন।তিনি সকালে নিমকাঠির দাঁতন ব্যবহার করেন। জনশ্রুতি আছে, বারোবছর নিমকাঠির ব্যবহারে মুখে চন্দনকাঠের সুবাস হয়। কথা বললেই নাকি চন্দনের সুবাস বেরোয়। শুনে অনেকে নিমকাঠির ব্যবহার করেন। কিন্তু মা বলতেন, শুধু নিমকাঠির ব্যবহার নয়, তার সঙ্গে মানুষকে ভালবাসতে হয়। কারও অমঙ্গল কামনা করতে নেই। মিথ্যা কথা বলতে নেই। তাহলেই মানুষের মুখে সুগন্ধ হয়। এমনকি দেহের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। মানুষ তো দেবতার আর এক রূপ। 

দীনেশবাবু ছুটির দিনগুলোতে ফুটপাতের অসহায় লোকগুলোর জন্য হোটেল থেক ভাত তরকারি কিনে, প্যাকেটে ভরে তাদের হাতে  দেন। তাঁর ইচ্ছে আছে গরীব লোকগুলোকে প্রত্যেকদিন একমুঠো করে  মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার।
তিনি সংসারী লোক। তাই এগোতে হবে ধীরে ধীরে।তিনি জানেন,  এসব কাজে সবদিক চিন্তাভাবনা করে এগোতে হয়। তিনি ভাবেন, সামাজিক, আর্থিক, আইনগত সমস্ত  দিক দেখে তবেই কাজে নামা প্রয়োজন। 

আজ সকাল সকাল দীনেশবাবু ছেলেকে ডেকে তুললেন ঘুম থেকে। ছেলেকে বললেন, পড়তে বোসো বাবু। সকালে পড়া মুখস্থ হয় ভাল। ছেলে বলে, বাবা তোমার মুখ থেকে চন্দনের সুন্দর গন্ধ পাচ্ছি । 

 দীনেশবাবু বলেন, ও তাই নাকি?  তোমার মুখেও তে সুন্দর গন্ধ।

রাস্তায়, স্কুলে যেখানেই দীনেশবাবু যাচ্ছেন সকলের মুখেই এক কথা,দীনুবাবু আর একটু কথা বলুন। আপনার মুখে চন্দনের সুবাস। বসুন বসুন। সকলের আদরে তিনি  নিজেও যেন চন্দনের সুবাস অনুভব 
করছেন। আদরের আতিশয্যে তিনি খুশি। 

একটি শিশু দৌড়ে তাঁর কাছে এল চন্দনের সুবাস নিয়ে। দীনুবাবু শিশুটির  কপালে একটা চন্দন সুবাসের চুমু এঁকে দিলেন সস্নেহে.... 
রমেন এবার বলছে গ্রামের নীরেনবাবু সরকারি দপ্তরে কাজ করেন। মাইনেও ভাল পান। বাড়িতে বুড়ি মা আছেন। নীরেনবাবু  অকৃতদার।পথের কুকুরগুলোকে ধরে বাড়িতে রাখেন। কুকুরগুলোই তার ছেলেমেয়ে। তাদের খেতে দেন। চিকিৎসা করান। কিন্তু কাজের চাপে কুকুরগুলোকে দেখশোনার সময় পান না বেশি। বুড়ি মা বলেন, কুকুর তো প্রায় একশো ছাড়িয়ে গেল। আর কত আনবি।
নীরেনবাবু বলেন, মা তুমি আমার কাছে আছ বলে ভরসা পাই। কুকুরগুলোর কেউ নেই। পুজোতে কেউ লেজে পটকা বেঁধে আগুন দেয়। কেউ আবার গরম ফ্যান ঢেলে দেয় তাদের গায়ে। বড় নিষ্ঠুর তারা।
নীরেনের কথা শুনে তার মায়ের চোখে জল চিকচিক করে। মা বলেন, আমিও দেখব তোর পোষ্যদের। তুই কাজে যা।
নীরেনবাবু বললেন, মা আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি এদের দেখব বলে। আমিই এখন থেকে রান্না করব। তোমার তো বয়স হয়েছে। তুমি বিশ্রাম নাও আর আমার সঙ্গে থাক।

 তার মা বলেন তোর মত পাগলের খুব প্রয়োজন সমাজে...

এবার সময়ের তালে তালে সকলের বয়স বাড়লো সকলেই প্রায় পঞ্চাশের কোঠায় পৌঁছে গেল এখন আর বাইরে যাওয়ার সাহস করে না কেউ কিন্তু আশেপাশের নিজের গ্রামের আশেপাশে জায়গাগুলো যেগুলো এখনও দেখা হয়নি সেগুলো দেখার প্রাণপণ চেষ্টা করে। ভিশন কোথায় আমরা সাহসী হয়ে ওঠে সে বলে 50 বছর বছর বয়স হলে কি হবে চল এখন আমরা বাইরে বেড়াতে যেতে পারবো সব দায়িত্ব আমার যদি কিছু হয় আমি দায়িত্ব নিলাম। বিশু বলে বয়সটা কোনো ব্যাপার না কেবল সংখ্যা মাত্র আসল হলো মনের ব্যাপার মনের জোর থাকলে সব জায়গায় যাওয়া যায়। 

​

দশ

বর্তমান পূর্ব বর্ধমান জেলা অনেক কবি সাহিত্যিকের পীঠস্থান। কবি কাশীরাম দাস থেকে শুরু করে কবিশেখর কালিদাস রায়, কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক ইত্যাদি। আমরা বন্ধুরা ঠিক করলাম কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বাড়ি দেখব কবিশেখর কালিদাস রায়ের বাড়ি দেখব কবি কাশীরাম দাসের বাড়ি যাবো এইভাবে আমরা প্রথমে কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বাড়ি গেলাম। কবি কুমুদরঞ্জন এর বাড়ি অজয় নদীর ধারে কোগ্রাম গ্রামে সেখানে দেখলাম ছবিতে একজন দেখাশুনা করার লোক আছেন সেই ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম যে কোথায় কি দেখার আছে তিনি সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালেন এবং বললেন আমি একটা আমি সম্বন্ধে আপনাদের বুঝিয়ে ভালো করে বলবো তারপর খাওয়া দাওয়ার পর তিনি আমাদের সঙ্গে বসলেন এবং তিনি বলতে শুরু করলেন এক বিরাট বক্তব্য। কবি কাশীরাম দাস কবিশেখর কালিদাস রায় কবি কুমুদরঞ্জন এফবিতে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে কারণ আমাদের সকলেরই পূর্ব বর্ধমানের জন্য বারবার দেখেও আমাদের আশা মেটে না, বিশু বলল। সেইম কেয়ারটেকার লোকটি বললেন হ্যাঁ ঠিকই তো এগুলো তো উচিত প্রত্যেকের এগুলো সংস্কারকাজে সংস্কারের কাজে মন দেওয়া উচিত পূর্ব বর্ধমান পূর্ব বর্ধমানের ঐতিহ্য এগুলো।ভদ্রলোক ভাষণের মতো করে অনেকক্ষণ কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক সম্বন্ধে বলে গেলেন আমরা শুনলাম হৃদয়ে। তিনি বললেন, আজ আমি কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের জীবনী ও সাহিত্য সম্পর্কে দু চার কথা বলব। উনবিংশ শতকে সমগ্র বাংলা সাহিত্য জগত যখন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের কাব্যগাথার ছটায় উদ্ভাসিত, ঠিক সেই সময় নিজের স্বতন্ত্র লেখনী প্রতিভা নিয়ে কাব্য জগতে আবির্ভূত হলেন কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিক। তিনি ১৮৮৩ সনের ৩রা মার্চ অবিভক্ত বাংলার, বর্ধমান জেলার কোগ্রাম নামক গ্রামে এক বৈদ্য ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্র হিসাবে তিনি খুবই মেধাবী ছিলেন। ১৯০৫ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন এবং বঙ্কিম চন্দ্র স্বর্ণ পদকে ভূষিত হন।

পরবর্তীকালে বর্ধমানের মাথ্রন নবীনচন্দ্র বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন এবং এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার আলোকেই পরবর্তীকালে বাংলার আর এক স্বনামধন্য কবি বিদ্রোহী কবি রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। কথিত আছে তাঁর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া অজয় ও কুনুর নদীই তাঁর কবিতার মুখ্য প্রেরণা। তাঁর কবিতা মুখ্যত বৈষ্ণব ভাবনায় সম্পৃক্ত হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও গ্রাম বাংলার প্রতি ভালবাসা তাঁর কবিতাগুলিকে করেছে এক অনবদ্য সৃষ্টির আধার। তাঁর কবিতায় ধর্মের উপস্থিতি থাকলেও তা ছিল ধর্মীয় সংকীর্ণতার উর্দ্ধে। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল উজানী (১৯১১), বনতুলসী (১৯১১), অজয়(১৯২৭), স্বর্ণ সন্ধ্যা (১৯৪৮) প্রভৃতি। তবে তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মকে কাব্য জগতে আবদ্ধ না রেখে নাট্য রচনার দিকেও প্রসারিত করেছিলেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য নাটক হল দ্বারাবতী (১৯২০)। তিনি জগত্তারিণী স্বর্ণ পদক এবং স্বাধীনতার পর ভারত সরকার দ্বারা পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। কুমুদরঞ্জন ১৯০১ সালে এন্ট্রান্স, ১৯০৩ সালে রিপন কলেজ থেকে এফএ এবং ১৯০৫ সালে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। পরে বর্ধমানের মাথরুন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন এবং সেখান থেকেই ১৯৩৮ সালে প্রধান শিক্ষকরূপে অবসর গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, কাজী নজরুল ইসলাম ওই স্কুলে তাঁর ছাত্র ছিলেন। কুমুদরঞ্জনের কবিত্বশক্তির বিকাশ ঘটে বাল্যকালেই। পল্লীর মানুষ ও প্রকৃতি তাঁর কাব্যের প্রধান বিষয়। তাঁর কবিতায় নির্জন গ্রামজীবনের সহজ-সরল রূপ চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। পল্লী-প্রবণতার সঙ্গে বৈষ্ণবভাবুকতা যুক্ত হয়ে তাঁর কবিতার ভাব ও ভাষাকে স্নিগ্ধতা ও মাধুর্য দান করেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘কুমুদরঞ্জনের কবিতা পড়লে বাঙলার গ্রামের তুলসীমঞ্চ, সন্ধ্যাপ্রদীপ, মঙ্গলশঙ্খের কথা মনে পড়ে।’ তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা: উজানী (১৯১১), বনতুলসী (১৯১১), শতদল (১৯১১), একতারা (১৯১৪), বনমল্লিকা (১৯১৮), নূপুর (১৯২০), রজনীগন্ধা (১৯২১), অজয় (১৯২৭), তূণীর (১৯২৮), স্বর্ণসন্ধ্যা (১৯৪৮) ইত্যাদি।শিক্ষাবিদ, কবি। ১৮৮৩ সালের ১ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কোগ্রামে মাতুলালয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস একই জেলার শ্রীখন্ড গ্রামে। পিতা পূর্ণচন্দ্র মল্লিক ছিলেন কাশ্মীর রাজসরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। কুমুদরঞ্জন ১৯০১ সালে এন্ট্রান্স, ১৯০৩ সালে রিপন কলেজ থেকে এফএ এবং ১৯০৫ সালে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। পরে বর্ধমানের মাথরুন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন এবং সেখান থেকেই ১৯৩৮ সালে প্রধান শিক্ষকরূপে অবসর গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, কবি নজরুল ওই স্কুলে তাঁর ছাত্র ছিলেন। কুমুদরঞ্জনের কবিত্বশক্তির বিকাশ ঘটে বাল্যকালেই। পল্লীর মানুষ ও প্রকৃতি তাঁর কাব্যের প্রধান বিষয়। তাঁর কবিতায় নির্জন গ্রামজীবনের সহজ-সরল রূপ চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। পল্লী-প্রবণতার সঙ্গে বৈষ্ণবভাবুকতা যুক্ত হয়ে তাঁর কবিতার ভাব ও ভাষাকে স্নিগ্ধতা ও মাধুর্য দান করেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘কুমুদরঞ্জনের কবিতা পড়লে বাঙলার গ্রামের তুলসীমঞ্চ, সন্ধ্যাপ্রদীপ, মঙ্গলশঙ্খের কথা মনে পড়ে।’ তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা: উজানী বনতুলসী, শতদল, একতারা, বনমল্লিকা, নূপুর রজনীগন্ধ, অজয়, তূণীর  স্বর্ণসন্ধ্যা  ইত্যাদি। কুমুদরঞ্জন বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের প্রতিষ্ঠান সাহিত্যতীর্থের ‘তীর্থপতি’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি কলকাতা ইউনিভার্সিটি কর্তৃক ‘বঙ্কিমচন্দ্র স্বর্ণপদক’ ও ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ এবং ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। বর্ধমান জেলার মাথরুন নবীনচন্দ্র বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরূপে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখনীয় এই যে, বাংলার বিদ্রোহী কবি নজরুল ওই স্কুলে তাঁর ছাত্র ছিলেন।
ভদ্রলোকের কাছ থেকে আমরা বিদায় নিলাম তখন সুর্য ডুবুডুবু। 

বিরাজুল এক হিন্দু মেয়ে রুপাকে বিয়ে করেছিল তারা এখন টরন্টোয় থাকে সে টরন্টোতে কানাডাতে চলে গেল। রূপাও বিরাজুল একদিন বিদেশে পাড়ি দিলো। কানাডার টরেন্টো শহরে বাসা নিলো। দুজনেই কাজ পেয়ে গেলো। মাইনে মোটামুটি। তার সঙ্গে পড়াশোনা। রূপা দেখেছে, শরীর বেশিদিন ভালো লাগে না। ও বিরাজুলের মন দেখেছে। একটা সুরের সাধককে দেখেছে ওর মধ্যে, যে সুরের সাধনা না করেও মানুষের মনসুরের সন্ধানে ব্যস্ত। ওদের দুজনেরই এখন দেশের কথা মনে পড়ে। বিরাজুল ভাবে, আব্বা তাদের নবাবের মতো মানুষ করেছে। তাকে দেখেই শিখেছে, মানুষের হৃদয়ধন খোঁজা। আব্বা বলতেন, মন বড় রাকবি। মন বড়ো থাকলেই দেকবি মানুষের হৃদয়ে আল্লার অধিষ্ঠান। হৃদয় হলো মসজিদ আর মানুষ হলো আল্লার দূত। কোনো মানুষই ছোটো নয়। যদি একটা মানুষের মনে জায়গা করতে পারিস, তাহলেই তোর জীবন ধন্য হয়ে যাবে। আম্মির আদরে বিরাজুল মানুষ হয়েছিলো। সেই আম্মিকে ছেড়ে তার মন খারাপ করে। কিন্তু জীবনে সাধনার জন্য অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়। কুয়োর ব্যাঙ হয়ে থাকলে পৃথিবীটা অচেনা হয়ে যাবে।রূপা বাবার খুব আদরের একমাত্র মেয়ে। মা, বাবাকে রাজী করিয়ে সে বিরাজুলের সঙ্গে ঘর ছেড়েছে। মা, বাবাকে সে বলেছে, চিন্তা কোরো না, আমি ওর সঙ্গে সুখে থাকবো। আর ওর সঙ্গেই আমার সাধনার সুতো জড়িয়ে আছে।যে বিষয়ে রূপার অসুবিধা হতো পড়ার সময়, বিরাজুল সেই অসুবিধাগুলো সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলতো রূপাকে। ফলে রূপাকে পড়ার সময় ঝামেলায় পড়তে হতো না। দুজনের সুন্দর এক বোঝাপড়া ছিলো। রূপার মনে পরছে পিউ তার বান্ধবী, আর সে ন্যাশানাল পাড়ায় একটা বাড়িতে ভূত দেখেছিলো।
বিরাজুলের বরাবরই বিদেশের প্রতি টান ছিল সেই আমাদের জাপান যেতে উৎসাহিত করেছিল। তার কারণ বিরাজুলের ওখানে ঘরে থাকতো চাকরি সূত্রে। তার মামা ছিল টোকিওতে। সেই জন্য আমাদের জাপান যাত্রার অনেক সুযোগ হয়েছিল। তা না হলে জাপান যাওয়া হয়তো জীবনে কখনো হতো না।

বিশু আর্মিতে জয়েন করেছিল এবং যখন সে বাড়ি আসতো আমাদের প্রোগ্রামগুলো কিন্তু তখনই হতো। প্রথমেই বলেছি এটা পূর্ব বর্ধমান অঞ্চলে কেতুগ্রাম থানার দশ-বারোটি গ্রামের কথা এই দশ-বারোটি গ্রামের বন্ধু আমরা একসাথে চলাফেরা করতাম সকলে খুব ভালোবাসত আমরা পরে সমাজ এখন শহরে থাকি আমরা সবাই মিলে আমরা বলি চল আমরা আমাদের গ্রাম ঘুরে আসি আবার নতুন করে গ্রাম গুলো দেখতে ইচ্ছা করছে। বিশু বললোচল ট্রেনে যাব প্রথমে কাটোয়া থেকে শিবলুন যাব শিবলুন থেকে টোটো বা কোন রিক্সা ধরে নিয়ে গ্রামগুলো ঘুরব। 

আগে কাটোয়া তারপর শিবলুন স্টেশন থেকে টৌটোতে আধঘণ্টা যেতে হবে। কিংবা বড় বাস স্টপেজে নেমে ঢালাই রাস্তা ধরে নবগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিস পেরিয়ে, সর্দার পাড়া পেরিয়ে চলে এলাম ভট্টাচার্য পাড়ায়। পুরোনো মন্দির আর মসজিদ, গির্জা আমার মন টানে। কালের প্রবাহে সেগুলো অক্ষত না থাকলেও পুরোনো শ্যাওলা ধরা কোনো নির্মাণ দেখলেই আমি তার প্রেমে পড়ে যাই। অমরবাবু ছিলেন ষষ্টিতলায়। তিনি মা মঙ্গল চন্ডীর মন্দিরে নিয়ে গেলেন আমাকে। নবগ্রাম অজয় নদীর ধারে অবস্থিত। সবুজে ঘেরা এই গ্রাম। ভট্টাচার্য পাড়ার রঘুনাথ ব্যানার্জী বললেন, মা মঙ্গল চন্ডীর মন্দির অতি প্রাচীন। মায়ের পুজোর পালা পাড়ার সকলের একমাস করে পড়ে। মা দুর্গার পুজোর পালা তিন বছর পর এক একটি পরিবারের দায়িত্বে আসে।সকলে মিলে পাড়ার পুজো চালায় বছরের পর বছর। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বাজারে পাড়ায়।এখানে ঘোষ, পাল, মুখার্জী পরিবারের বাস। মুখার্জী পাড়ার ধ্রুবনারায়ণ বললেন, আগে মুখুজ্জে পুকুরের পাড়ে শিবপুজো হতো। মন্দির প্রায় দুশো বছরের পুরোনো হওয়ায় ভেঙ্গে পড়েছিলো।কৃষিকাজের সময় জল না হলে আমাদের বাবা, কাকারা শিবলিঙ্গ বাঁধ দিয়ে জলে ডুবিয়ে দিতেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ হতো ও বৃষ্টি হতো।মানুষের বিশ্বাসে সবকিছু। তারপর গোস্বামী পাড়ায় গেলাম। সেখানে বদরী নারায়ণ গোস্বামীর সঙ্গে দেখা হলো। তিনি বললেন, আমরা নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর বংশধর। মেয়ের বংশধর, দৌহিত্র বুঝলেন। আমার কাছে বংশলতিকা আছে। আমি বললাম, বলুন, আমি শুনি। তিনি শুরু করলেন, গঙ্গামাতা, তার স্বামী ছিলেন মাধব চট্টোপাধ্যায়, তার ভিটে এটা। তারপর প্রেমানন্দ, অনন্তহরি, পীতাম্বর, গৌরচন্দ্র, লালমোহন, শ্যামসুন্দর, নিকুঞ্জবিহারী, রামরঞ্জন, বংশগোপাল, বদরীনারায়ণ, বিনোদগোপাল। তারপর তিনি মন্দিরের গাত্রে লেখা বংশলতিকা দেখালেন। আমি ছবি তুলে নিলাম। পড়া যাবে নিশ্চয়। রাধা মাধবের মন্দিরে বারোমাস কানাই, বলাই থাকেন। অগ্রহায়ণ মাসে এই মন্দিরে রাধামাধব আসেন। তখন সারা গ্রামের লোক প্রসাদ পান। আমার মনে হচ্ছে এ যেন আমার জন্মস্থান। আমার গ্রাম। স্বপ্নের সুন্দর গ্রামের রাস্তা বাস থেকে নেমেই লাল মোড়াম দিয়ে শুরু। দুদিকে বড় বড় ইউক্যালিপ্টাস রাস্তায় পরম আদরে ছায়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে। কত রকমের পাখি স্বাগত জানাচ্ছে পথিককে। রাস্তা পারাপারে ব্যস্ত বেজী, শেয়াল আরও অনেক রকমের জীবজন্তু। চেনা আত্মীয়র মতো অতিথির কাছাকাছি তাদের আনাগোনা। হাঁটতে হাঁটতে এসে যাবে কদতলার মাঠ। তারপর গোকুল পুকুরের জমি, চাঁপপুকুর, সর্দার পাড়া, বেনেপুকুর। ক্রমশ চলে আসবে নতুন পুকুর, ডেঙাপাড়া , পুজোবাড়ি, দরজা ঘাট, কালী তলা। এখানেই আমার চোদ্দপুরুষের ভিটে। তারপর ষষ্টিতলা, মঙ্গল চন্ডীর উঠোন, দুর্গাতলার নাটমন্দির। এদিকে গোপালের মন্দির, মহেন্দ্র বিদ্যাপীঠ, তামালের দোকান, সুব্রতর দোকান পেরিয়ে ষষ্ঠী গোরে, রাধা মাধবতলা। গোস্বামী বাড়ি পেরিয়ে মন্ডপতলা। এই মন্ডপতলায় ছোটোবেলায় গাজনের সময় রাক্ষস দেখে ভয় পেয়েছিলাম। সেইসব হারিয়ে যাওয়া রাক্ষস আর ফিরে আসবে না। কেঁয়াপুকুর, কেষ্টপুকুরের পাড়। তারপর বাজারে পাড়া, শিব তলা, পেরিয়ে নাপিত পাড়া। এখন  নাপিত পাড়াগুলো সেলুনে চলে গেছে। সাতন জেঠু দুপায়ের ফাঁকে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরতেন মাথা, তারপর চুল বাটি ছাঁটে ফাঁকা। কত আদর আর আব্দারে ভরা থাকতো চুল কাটার বেলা। এখন সব কিছুই যান্ত্রিক। মাঝে মাঝে কিছু কমবয়সী ছেলেমেয়েকে রোবোট মনে হয়। মুখে হাসি নেই। বেশ জেঠু জেঠু ভাব। সর্বশেষে বড়পুকুর পেরিয়ে পাকা রাস্তা ধরে ভুলকুড়ি। আর মন্ডপতলার পর রাস্তা চলে গেছে খাঁ পাড়া, কাঁদরের ধার ধরে রায়পাড়া। সেখানেও আছে চন্ডীমন্ডপতলা, কলা বা গান, দুর্গা তলার নাটমন্দির সব কিছুই। পুজোবাড়িতে গোলা পায়রা দেখতে গেলে হাততালি দিই। শয়ে শয়ে দেশি পায়রার দল উড়ে এসে উৎসব লাগিয়ে দেয়। পুরোনো দিনের বাড়িগুলি এই গ্রামের প্রাণ। তারপর চলে এলাম গ্রামের মন্ডপতলায়। এই গ্রামে আমার জন্ম। লেখিকা সুজাতা ব্যানার্জী এই গ্রামের কন্যা। তার দাদু ছিলেন ডাঃ বিজয় বাবু।এখনও এই বাড়িগুলো গ্রামের সম্পদ। ডানদিকের রাস্তা ধরে হাঁটলেই খাঁ পাড়া। গ্রামের মাঝে গোপাল ঠাকুরের মন্দির, কৃষ্ঞ মন্দির। তারপরেই রক্ষাকালীতলা। কত ধর্মপ্রাণ মানুষের বাস এই গ্রামে। গোপাল মন্দিরের পুজো হয় বাড়ুজ্জে পাড়ায়। গ্রামের গাছ, পাথর, আমার গান আমার প্রাণ। সেখান থেকে অম্বলগ্রাম পাশে রেখে দু কিলোমিটার টোটো রিক্সায় এই গ্রাম। একদম অজ পাড়াগাঁ। মাটির রাস্তা ধরে বাবলার বন পেরিয়ে স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করতে হবে। তন্ময়বাবু গবেষক। এন জি ও সসংস্থার প্রধান কারিগর বনের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালেন। তার জগৎ।পশু, প্রাণীদের উন্মুক্ত অঞ্চল। বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে, সেখানে। মা কালীর মূর্তি আছে। কাঁচের ঘরে ইকো সিষ্টেমের জগৎ। কেউটে সাপ, ব্যাঙ থেকে শুরু করে নানারকমের পতঙ্গ যা একটা গ্রামের জমিতে থাকে। বিরাট এক ক্যামেরায় ছবি তুলছেন তন্ময় হয়ে। আমি ঘুরে দেখলাম প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে বানানো রিসর্ট। ওপেন টয়লেট কাম বাথরুম। পাশেই ঈশানী নদী। এই নদীপথে একান্ন সতীপীঠের অন্যতম সতীপীঠ অট্টহাসে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে চায় এন জি ও, নৌকায়। তন্ময়বাবু হাতে সাপ ধরে দেখালেন। শিয়াল, বেজি, সাপ, ভ্যাম আছে। তাছাড়া পাখির প্রজাতি শ খানেক। একটা পুকুর আছে। তার তলায় তৈরি হচ্ছে গ্রন্হাগার।শীতকালে বহু বিদেশী পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। তন্ময়বাবু বললেন, স্নেক বাইটের কথা ভেবে সমস্ত ব্যবস্থা এখানে করা আছে। ঔষধপত্র সবসময় মজুত থাকে। বর্ষাকালে ঈশানী নদী কিশোরী হয়ে উঠেছে। এই নদীকে মাঝখানে রেখে বেলুনের চাষিরা চাষ করছেন আনন্দে।এখানকার চাষিরা জৈব সার ব্যবহার করেন। কোনো রাসায়নিক সার প্রয়োগ করেন না। এক চাষি বললেন, আমরা সকলে একত্রে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জৈব সার প্রয়োগ করেই আমরা চাষ করবো।তাতে বন্ধু পোকারা মরবে না। ফলনও হয় বেশি। এক এন জি ও সংস্থার পরামর্শে তাদের এই সঠিক সিদ্ধান্ত অন্য চাষিদের অনুকরণযোগ্য। এই এন জি ও সংস্থার যুবকরা গ্রামের ভিতর কুকুরদের নির্বীজকরণ কাজে লেগেছে। একটা লম্বা লাঠির ডগায় সূচ বেঁধে তাতে ওষুধ ভরে চলছে কাজ। কোনো প্রাণী আহত হলে তার সেবাশুশ্রূষা করেন যুবকবৃন্দ। সাপ ধরতে জানেন এই যুবকবৃন্দ। কোনো গ্রামে কোনো সাপ দেখা গেলে এই যুবকেরা সেটি ধরে নিয়ে এসে তাদের সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেন। এখনও এই যুবকবৃন্দ কাজ করে চলেছেন মানুষ ও প্রাণীজগতকে ভালোবেসে। বর্ষাকালে প্রচুর বিষধর সাপের আনাগোনা এই অঞ্চলে। এখানে পা দিলেই সাবধানে থাকার পরামর্শ দেন এখানকার কর্মিবৃন্দ। ঘুরে দেখার জন্য গামবুট দেওয়া হয় পর্যটকদের। প্রচুর দেশি বিদেশি গাছ গাছালিতে ভরা এই প্রাঙ্গন। একটি কৃত্রিম জলাধার আছে। তার নিচে লাইব্রেরী রুম তৈরির কাজ চলছে। ওপরে জল নিচে ঘর। কিছুটা তৈরি হয়েছে। শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখি এসে হাজির হয়। সেই পাখিদের নিয়েও চলে গবেষণা। তাদের জন্য সব রকমের উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা হয়। আর একটি জলাধারে বিভিন্ন ধরণের মাছ রাখা হয়। পা ডুবিয়ে জলে দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ের চামড়ার মৃত কোষ খায় এইসব বিদেশি মাছেরা। ওপেন বাথরুমে ঈশানীর জল উপলব্ধ। এই রিসর্টগুলিতে সর্বসুখের ব্যবস্থা আছে। শীতকালে অনেক বিদেশি পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। রাতে থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থাও খুব সুন্দর। বেলুন গ্রামে ঢুকতে গেলে বাবলার বন পেরিয়ে মাটির আদরে হেঁটে যেতে হবে। এখন অবশ্য শিবলুন হল্ট থেকে নেমে বেলুন যাওয়ার পাকা রাস্তা হয়েছে। টোটো, মোটর ভ্যান চলে এই রাস্তা ধরে। চারিদিকে সবুজ ধানক্ষেতে হারিয়ে যায় মন এক অদ্ভূত অনাবিল আনন্দে। বেলুন ইকো ভিলেজ কাটোয়া মহুকুমার গর্ব। পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম থানার অন্তর্গত কাটোয়া মহুৃুকুমার পুরুলিয়া গ্রামে অবস্থিত মহেন্দ্র বিদ্যাপীঠ স্কুলে প্রায় চার শতাধিক ছাত্রছাত্রী পড়াশুনা করে। এই স্কুল গৃহটির পূর্ব মালিক ছিলেন মহেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পুত্র শ্রী অতুলবাবু এই গৃহটি পিতার নামে দান করেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। তারপর শুরু হয় কয়েকজন ছাত্র ছাত্রী নিয়ে পড়াশোনা। আজ সেই বিদ্যালয় পঞ্চাশ বছরে পদার্পণ করতে চলেছে। এবারে মাধ্যমিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক বিপুল পাল। সে পেয়েছে মোট ৬৪৬নম্বর। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে পুরস্কৃত করেছে স্বাধীনতা দিবসের দিনে। এক অখ্যাত গ্রামে এই বিদ্যালয় অবস্থিত হলেও এখানে পঠন পাঠন হয় খুব সুন্দরভাবে। প্রত্যেক শিক্ষক ও শিক্ষিকা মহাশয়ের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় প্রত্যেকবার মাধ্যমিকে ভালো ফল হয়। স্কুল বিল্ডিং অনেক পুরোনো। নবসাজে সজ্জিত হওয়ার প্রয়োজন আছে। কন্যাশ্রী ক্লাব, কম্পিউটার রুম, মেয়েদের ক্যারাটে প্রশিক্ষণ, পিরামিড গঠন প্রভৃতি অনেক কিছুই পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে শেখানো হয়। নানারকম অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা প্রভাত ফেরি করে। নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করে তারা। কন্যাশ্রী ক্লাব মেম্বারের মেয়েরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বাল্য বিবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করে। মেয়েদের কোনো শারীরীক সমস্যা হলে বাড়িতে সাইকেলে চাপিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসে।
এখন এই বিদ্যালয়ে নিয়মিত মিড ডে মিল খাওয়ানো হয় টিফিনে। আয়রন ট্যাবলেট ও স্যানিটারি ন্যাপকিন বিলি করা হয় নিয়মিত। প্রধান শিক্ষক মহাশয় শ্রী ভক্তি ভূষণ পাল। কম্পিউটার শিক্ষক শ্রী মেঘনাদ সাঁই মহাশয় ছাত্র ছাত্রীদের অতি যত্ন সহকারে পঞ্চম শ্রেণী থেকে কম্পিউটারে দক্ষ করে তোলেন। এই গ্রামে এ এক অতি পাওয়া বরের মত। যে বরে, ছাত্র ছাত্রীরা আধুনিকতার আলোয় আলোময় হয়ে ওঠে।
খেলার দিদিমণি মৌ মজুমদার মহাশয়া ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে হিউম্যান পিরামিড, ক্লাপিং ডান্স, হিল পিরামিড প্রভৃতি অভ্যাস করান। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এগুলির প্রদর্শন করানো হয়। সকল শিক্ষক, শিক্ষিকা মহাশয়ের সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে স্কুলের সুন্দর পরিবেশ। শ্রী রাজীব নন্দী মহাশয় ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ উৎসব পালন করলেন মহা সমারোহে। এছাড়া শ্রী বিশ্বরঞ্জন রানো, সুবীর কুমার ঘোষ, শারদশ্রী মন্ডল, সুবীর ঘোষ, শমীক ব্রষ্মচারী, মৌসুমী বিশ্বাস, মৌমিতা বৈরাগ্য, দেবযানী বিশ্বাস, সুদীপ ঘোষাল নীরবে নিভৃতে কাজ করে চলেছেন স্কুলের স্বার্থে।অনিমা পাল, সম্পদ ভাই, নন্দিতাদি নন টিচিং স্টাফের মধ্যে আছেন। বিভাসদাও আছেন। তারা সকলেই স্কুলের স্বার্থে কাজ করেন।স্বাধীনতা দিবসে ছাত্র ছাত্রীরা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন পিরামিড প্রদর্শন করলো। তাদের পিরামিড খুব সুন্দর দর্শনীয় এক ব্যালান্সের খেলা। স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যারা জড়িয়ে ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রজ  ঁহেমন্ত ঘোষাল,ঁ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অলোকময় বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রী বিজয় চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন ঁধ্রুবনারায়ণ চট্ট্যোপাধ্যায়। অন্যান্য শিক্ষকমহাশয়রা ছিলেন কাশীনাথ ঘোষ, পন্ডিত মহাশয়, হরেরামবাবু, সত্যনারায়ণবাবু, নারায়ণবাবু, অধীরবাবু, চন্ডীবাবু, দীপকবাবু, সুকুমারবাবু, মৌসুমী ভট্টাচার্য্য মহাশয়া, কাকলি ম্যাডাম প্রমুখ। সিদ্ধেশ্বরবাবু, গীতা থান্দার, বৃন্দাবনবাবু ছিলেন অশিক্ষক কর্মচারীবৃন্দ।
স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির আজীবন সদস্য হলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শ্রী প্রকাশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়।ঠিক সাড়ে দশটায় স্কুলের প্রার্থনা সভা শুরু হয়। ছাত্রছাত্রীরা এই সভায় নিয়মিত পিটির মাধ্যমে একটু শরীরচর্চা করে। তারপর, জনগণ মন অধিনায়ক, এই জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। তারপর যথারীতী ক্লাস শুরু হয়। ক্লাস প্রত্যেকদিন একদম শুরু থেকে শেষ অবধি হয়। সুবীর ঘোষ মহাশয়ের নিজস্ব উদ্যোগে স্কুলের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় থাকে। শ্রী বিশ্বরঞ্জন রানো মহাশয়ের অবদান অপরিসীম। এক কথায় তা প্রকাশ করা অসম্ভব।
পুরুলিয়া গ্রামের আমাদের এই স্কুলটি গৌরবের শ্রেষ্ঠ চূড়ায় পৌঁছবে এই আশা রাখেন অভিভাবকবৃন্দ।

আমি আর রমেন সংসারী হয়েছি। বিশু বিয়ে করেনি। তারপর, বিশু আর্মিতে জয়েন করেছিলো। প্রায় কুড়ি বছর ছিলো বর্ডারের প্রহরী। আজ দশমাস পরে বাড়িতে এসেছে। এসেই মা বাবাকে প্রণাম করে একদম আদুল গায়ে গামছা জড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে চলে গেলো অজয় নদে। ওর সঙ্গে আমিও ছিলাম। দেখলাম অনেক উঁচু টিলা থেকে লাফিয়ে নদীর জলে ঝাঁপ দিলো। তার পরেই বন্ধুরা। তারপর গান ধরলো,"ও আমার দেশের মাটি,তোমার পরে ঠেকাই মাথা"। আমি ওর গান শুনে মুগ্ধ। বড় দেশপ্রেমিক এই যুবক আমার সঙ্গেই বড় হয়েছে। আমার চোখে কেন জানি না জল এলো দু ফোঁটা। আমি ডুব দিলাম। নদীর জল আর চোখের জল মিলেমিশে ভালোবাসা তৈরি হলো।বিশু বর্ডারে ডিউটি দিতো রাইফেল হাতে ওপাড় থেকে একদিন একটা গুলি লেগে তার একটা পা জখম হলো। পা আর ঠিক হলো না। অফিসাররা তাকে সুস্থ করে পাঠিয়ে দিলেন বাড়ি। সে এখন গ্রামের বাড়িতে চাষবাস দেখাশোনা করে। আজ আমি বিশু আর আমি বসে আছি ফাঁকা মাঠে বটগাছের তলায় সেখানে বিশু তার পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করছে।
বিশু বললো, গ্রামের বাড়িতে আমাদের মাটির দোতলা বাড়ি ছিলো। সন্ধ্যাবেলা হলেই হ্যারিকেন নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতাম দোতলার ঘরে। আমরা ভাই বোন একসাথে পড়ছি, এমন সময়ে কালোদার গলা শুনতে পেলাম। পড়ার থেকে গল্প হত আমাদের বেশি। বড়দা সবাইকে চুপ করতে বললো, কিসের চিৎকার হচ্ছে।  
বিশু বললো, শুনলাম নিচে হৈ হট্টগোলে সবাই ছোটাছুটি করছে। কালোদা আমাদের বাড়ির লোকাল গার্জেন। তিনি নিচে থেকে বলছেন, ওপরে যারা আছো, কেউ নিচে নামবে না। বড়দা জিজ্ঞাসা করলো, কেন কালো দা? কালোদা জোরে চেঁচিয়ে বললেন, গোলার তলায় গুলবাঘ ঢুকেছে। সাবধান। ওরা মানুষের রক্ত খায়। বড়দা বললো, গুলবাঘ আবার কি? কালোদা বললো, বাঘের মত দেখতে। কিন্তু বাঘ নয়। সাইজে একটু ছোটো। ঠিক হায়েনার মত। ওরা খুব হিংস্র।
বাড়িতে সবাই আতঙ্কিত। সকলে ঘরে ঢুকে খিল দিয়ে বসে আছে। ড়দা বললেন, বিশুকে ডাকো। উঠোন একদম ফাঁকা করো। বিশু পরোপকারী, বুদ্ধিমান, দরদী এবং সাহসী যুবক। বিশু বললো, আমি গেলাম। আমি বললাম, আর পারা যাচ্ছে না। গুলবাঘ গোলার তলায় ঢুকে আছে। বের হচ্ছে না। দেখি খুঁচিয়ে বের করি। এই বলে একটা গিঁট তোলা লাঠি নিয়ে এলাম। একহাতে তিন ব্যাটারীর টর্চ আর এক হাতে লাঠি। সকলে চিৎকার করে উঠলো, যাস না হতভাগা। কিন্তু আমি মনস্থির করে ফেলেছি। আমি বুঝতে পারছি এটা ভয়ংকর কিছু নয়। কিন্তু  লাঠি দিয়ে খোঁচা মারার সঙ্গে সঙ্গে গুলবাঘ কাছে চলে এলো। দেখলাম, একটা ভোঁতা মাথা। টর্চ রেখে মারলাম লাঠি। কিন্তু একটাও গুলবাঘের শরীরে পড়লো না। জন্তুটা লাফিয়ে উঠছে তিন ফুট। তারপর মাথা ঠান্ডা করে অপেক্ষা করলাম  কিছুক্ষণ। দেখলাম, জন্তুটা বসে আছে আর মাথাটা নাড়াচ্ছে। তিন ব্যাটরীর টর্চের আলোয় দেখলাম ওটা মাথা নয়। একটা ঘটি। জলের ঘটি। অই ঘটিতে চারটে ট্যাংরা মাছ ছিপে ধরে রেখে ভুলে গেছি বাড়িতে বলতে। ঘটিটা হাত দিয়ে ধরে টান মারতেই খুলে গেলো। একটা বিড়াল মাছ খেতে গিয়ে ঘটিতে মাথা আটকে যাওয়ায় এই বিপত্তি। লাঠি রেখে বিড়ালটাকে ধরে আদর করলাম। সবাই বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। কালোদা বললো, শালা বিড়ালের লোভ আর যাবে না। মারো শালাকে। বিড়ালটা আদরে আব্দারে ডেকে উঠলো, ম্যাঁও।

আমি বললাম বিশুকে আমাদের বন্ধু বান্ধবীদের মধ্যে অনেকেই ছন্নছাড়া কে কোথায় থাকে আমরা নিজেরাই জানিনা অনেক বন্ধু আমাদের বান্ধবীদের বিয়ে করেছে আবার আসিস বলেছেন বন্ধুটা মারা গেছে তার হার্টের অসুখ ছিল এখন পৃথিবী চলছে তার নিজের নিয়মে কার্য কখন কি হবে কেউ বলতে পারে না।

উড়ু উড়ু মন শেষে উড়ে যায় ঝরাপাতার নিয়মে।

অনুপমা ও রাজুর কথা

অনুপমা ছোটো থেকেই বিভিন্ন ফুল ও ফলের গাছের ভক্ত। তাছাড়া যে কোনো গাছের কাছে গেলেই সেই গাছের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পরে। গাছটার সঙ্গে কথা বলে, আদর করে, গোড়ায় হাত বুলিয়ে দেয়। সে বলে বাড়ির উঠোনের আমগাছটাকে, কি রে আমি আগের জন্মে তোর বোন ছিলাম? বুঝলি আমি আগের জন্মে আবার গাছ হবো। তোর ডালে ডালে আমার সোহাগ উথলে ওঠে। আমি তোর বোন হবোই। সুন্দর সহজ সরল জীবন নিয়ে আমি সুস্থ রাখবো জগতের সমস্ত জীব কুলকে। আমি গাছ হবো।

উঠোনের আমগাছটার ইতিহাস আছে। অনুপমার দাদু বি-ডি-ও অফিস থেকে চারা এনেছিলেন। তিনি উঠোনে ছায়া হবে, আর সিজনে কিছু আম পাওয়া যাবে বলে গাছটা লাগালেন। গর্ত খুঁড়তে গিয়ে হাতটার আঙুলে কোদালের চোট পরে কেটে গেছিলো সেদিন। অনুপমার ঠাকুমা রেগে বললেন, উঠোনের মাঝে আমগাছ লাগালে। তারপর আবার বাধা। অপয়া গাছ। পাতা পরে জঙ্গল হবে। দাদু কোনো কথা বলে নি। শুধু বলেছিলো, খবর্দার এই গাছে কেউ যেনো হাত না দেয়। কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে ছাড়বো।

তখন অনুপমা ছোটো। অনুপমা বললো থাক, ঠাকমা  আমি পাতা পরিষ্কার করবো। তারপর ঠাকুমা, নাতনির মুখ চেয়ে আর কিছু বলেন নি। দাদু এবার দুবছর পরে বাড়ি এসেছে। থাকে অনেকদূরে। অনুপমা ভাবে, কেন, এতদূরে থাকে দাদু। একদিন ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করে দেখবে। কিন্তু বলতে সাহস হয় না। ঠাকমা যদি বকাবকি করে।

তারপর অনেক বৈশাখ কেটে গেলো। শেষে অনুপমার আঠারো বছর বয়সে আমগাছের মুকুল এলো। এতদিন গাছে জল দেওয়া, পাতা কুড়িয়ে পরিষ্কার করা সবকাজ সে নিজেই করেছে। তার ভালো লাগে তাই করে। আমের শুকনো পাতাগুলো এক জায়গায় জড়ো করে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিতো। পরিষ্কার হতো তাড়াতাড়ি।

বাবা, মা কে অনুপমার মনে পরে না। দাদুর কাছে শুনেছে, সে যখন এক বছরের মেয়ে তখন তার বাবা রোড আ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। মা তার এক বছর পরেই বাবার বাড়ি চলে যায়। মা তাকে নিয়ে যেতে চাইছিলো কিন্তু দাদু দেন নি। দাদু বলেছেন, ছেলের স্মৃতিটুকু তুমি নিয়ে যেও না বৌ মা। তাহলে আমি বাঁচবো না। আমার আর কেউ নেই ও ছাড়া। মা তারপর আর জোর করেন নি। একা চলে গিয়েছিলেন কাঁদতে কাঁদতে কোনো প্রতিবাদ না করে। তার মা নাকি এখন বিয়ে করেছে অনেক দূরে। মায়ের মুখ অনুপমার মনে পরে না। তাই মায়ের মায়া তাকে কাবু করতে পারে না। অনুপমা দেখতো, দাদু থাকে না বাড়িতে। তবু একটা ফর্সা, কটাপারা লোক ঠাকুমার ঘরে যায় প্রায়। তাকেও চকলেট দেয়। কিন্তু জানে না লোকটা কে? পাড়ার লোকেরা ওকে জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু ও বলে,আমি জানি না। তখন সবাই মুখ টিপে হাসে। ভালো লাগে না তার। মনে মনে বলে, একদিন ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করতেই হবে। কিন্তু ঠাকুমা যদি রেগে যায়।

একদিন দুপুর বেলা ঘুঙুর পরা হাঁসটা কেমন হেলেদুলে চলেছে। অনুপমার পিছনে পিছনে চলেছে হাঁসটা। তাকে এখন সরস্বতী ঠাকুরের মতো লাগছে। বাহন তার চলেছে সঙ্গে সঙ্গে। ঘাটে শান বাঁধানো সিঁড়িতে সে বসে পরলো। আর হাঁসটা উড়ে গিয়ে পরলো জলে। ডুব দিয়ে তাকে খেলা দেখিয়ে চলেছে। সে জলে ঝুঁকে পরা গাছটার ডাল ধরে তুলে আনলো পানিফল। ছাড়িয়ে খেতে গিয়ে পানিফলের কাঁটা ফুটে গেলো। লাল এক ফোঁটা রক্ত চুঁইয়ে পরলো মাটিতে। পাশে চাঁদু এসে বললো, দে দে আঙুলটা দে। অনুপমার আঙুলটা মুখে নিয়ে চুষতে লাগলো। তার খুব সুড়সুড়ি পেলো। সে হাসতে লাগলো। রাজু বললো, জানিস না, মুখের লালায় ঘা পর্যন্ত ভালো হয়ে যায়। রাজু আঙুল ছাড়ছে না, খুব ভালো লাগছে। সেও জোর করছে না। একটা ভালো লাগা শিরশিরেভাবে সে বিহ্বল। সে আঁচল থেকে কটা পাকা কুল দিলো রাজুকে, হাত ছাড়িয়ে। রাজু বললো, তোর সব সময় কাঁটা নিয়ে কাজ। কুলগাছেও কাঁটা থাকে। সে হাসতে হাসতে বললো, তুই তো আমার মিষ্টি কুল। তাইতো কাঁটা ভালোবাসি। রাজু পাশের পাড়ায় থাকে। কিন্তু তার সঙ্গেই তার ভাব বেশি। রাজু বলে অপরূপাকে, আমার মাকে আমার বাবা রোজ মারধোর করে। মাথা ফাটিয়ে দেয়। বড়ো হয়ে আমি এর শোধ নেবো। অনুপমা বলে, ওসব বলতে নেই। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। রাজু বলে, কিচ্ছু ঠিক হবে না। একটা রাক্ষস আমার ভেতরে আছে। তবু আমি আমার বাবাকে ভালোবাসি। তুই আমার থেকে সাবধানে থাকিস। রাক্ষসটা কখন জেগে উঠবে আমিও জানি না।

অনুপমার ভয় হয়। তার মনে পরে, রাজু আর চাঁদু তার দশজন বন্ধু, পুজো বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেয়াল ঘেঁষে বসতো। পিঠে সবুজ ছাপ পরে যেত। পুরোনো কারুকার্যের মুগ্ধতা ছাড়িয়ে ভালোবাসার গান বিরাট বাড়িতে প্রতিধ্বনি শোনাতো। বন্ধুদের মধ্যে চারজন মেয়ে ছিলো। দেবীকা বলতো, বন্ধু শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ করিস না। ভালো শোনায় না। কোনোদিন রাজু তাদের মেয়ে মনে করেনি। বন্ধু তো বন্ধুই। তার আবার ছেলে আর মেয়ে কি? বলতো রাজু। একই কাপে তারা কফি খেতো পুজো বাড়ির পাশের কফি হাউসে। ভাগে কম হলে রূপসী বলে বন্ধুটা রাস্তায় লোকের মাঝে দীনেশকে ফেলে মারতো খুব। তাদের বন্ধু দল বিপদে, আপদে কাজ করতো গ্রামে। তাই তাদের অনেকেই সম্মান দিতো। আর আদরের এই মার খেতেই দুষ্টুমি করে তার ভাগেরটা কম রাখতো। অভিভাবকরা কোনোদিন ছেলে মেয়েদের মেলামেশায় বাধা দিতেন না। দরজা ঘাটের বাঁধানো ঘাটে পানকৌড়ি আর মাছরাঙার কলা কৌশল দেখে পার হয়ে যেতো অবাধ্য সময়।

অন্ধকারে ফুটে উঠতো কালীতলার সার দেওয়া প্রদীপ। ঘরে ঘরে বেজে উঠতো শঙ্খধ্বনি। হাতগুলো অজান্তে চলে যেতো কপালে। তারপর হাত পা ধুয়ে ভাইবোন একসাথে বসে সরব পাঠের প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে যেতো পাড়া জুড়ে। কিন্তু অনুপমার ভাইবোন ছিলো না। সে চুপচাপ পড়তো। নীরব পাঠ। আর তার ফলে তার মনে ভেসে উঠতো রাজুর মুখ। বইয়ের পাতা জুড়ে প্রেমের খেলা।

কে কত জোরে পড়তে পারে,পাড়ায় প্রতিযোগিতা চলতো। একবার অতনুদের বাড়ি পড়তে গেছিলো অনুপমা মাটির দোতলা ঘরে। বুলু কাকা বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি শুনতে পেলেন অতনু পড়ছে, ন্যাটিওনাল মানে জাতীয়, ন্যাটিওনাল মানে জাতীয়। ঘরে ঢুকে কাকা বললেন,ন্যাটিওনাল নয় ওটা ন্যাশনাল। ঠিক করে পড়। অতনু জোরে পড়ছে বলে উচ্চারণটা ঠিক হলো। এই অতনু সেদিন বুলুকাকা যাওয়ার পরে তার পাশে বসে পড়ছিলো। আর বারবার তার হাঁটুতে সুড়সুড়ি দিচ্ছিলো। তারপর একটা আঙুল তার প্যান্টের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিলো যোনীপথে। খুব ভালো লাগছিলো। কিন্তু একটা অপরাধবোধ কাজ করছিলো ভিতরে। পড়া হয়ে গেলে সে চলে এলো নীচে।
তারপর পড়া হয়ে গেলে একান্নবর্তী পরিবারের সবাই উঠোনে খেতে বসলো। অনুপমা দেখলো, কি সুন্দর পরিবেশে অতনু বড়ো হচ্ছে। রাজুর বাড়ি যদি এই পাড়ায় হতো, তাহলে বেশ হতো।  আলাদা করে কোনো শিশুকে খাওয়া শিখতে হতো না,জোর করতে হতো না। সবার খাওয়া দেখে ধীরে শিখে যেতো নিজে খাওয়ার কায়দা। পরের দিন রাজুকে গল্প বললো। অতনুদের বাড়িতে পড়তে যাওয়ার গল্প। কিন্তু আঙুলের কথা বলতে পারে নি লজ্জায়।

রাজু শুনে বলতো, আমাদের কাকার মেয়ে, ছেলে সবাই পড়তে আসে আমাদের বাড়িতে। আমরা শুই সবাই একসাথে। কাকার মেয়ের সাথে মারামারি করি। শোওয়ার পালা আরও মজাদার। বড় লেপে তিন ভাই, বোনের  ঢাকা। কেউ একটু বেশি টানলেই খেলা শুরু হয়ে যেতো রাতে। কোনো কোনো দিন ভোরে। মা আরও ভোরে উঠে শীতকালে নিয়ে রাখতেন জিরেন কাঠের খেজুর রস। সকালে উঠেই খেজুর রস। সেই দিনগুলো আর কি ফিরবে? বড় মন খারাপ হয় বড়ো হয়ে যেতো রাজুর। রাজুর গল্প শুনে অনুপমার অপরাধবোধ কমে যেতো। সে ভাবতো, তাহলে রাজুও কাকার মেয়ের সাথে এরকম করে। ওর তো নিজের কাকা নেই। পাড়ার কাকা হবে হয়তো। তাহলে রাজু তো সব কথাই বলে। ওগুলো বলে না কেন? ওসব বলতে নেই। সে ভাবে, চিরকাল ছেলে মেয়েরা গোপন করে যায় ভালোলাগার কিছু মূহুর্ত। এগুলো হয়তো বলতে নেই। আকাশ পাতাল চিন্তা করেও হিসেব মেলাতে পারে না অনুপমার মতো কিশোরী মেয়েরা।

তারা একসাথে ঘুরতো। অনুপমারা খেলতো নানারকমের খেলা। চু কিত-কিত, কবাডি, সাতগুটি, ঘুরি ওড়ানো, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও আরও কত কি। বন্ধুরা জড়ো হলে, এলাটিং, বেলাটিং সই লো, যদু মাষ্টার কইলো..., তারপর আইশ, বাইশ কত কি। হাততালি দিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে খেলতাম, কাটুরিস, চায়না প্লিজ, মেম সাব, মেইন আপ... । তারপরের কথা, খেলা ডুব দিয়েছে কোন অতলে জানিনা, অনুপমা বলতো, সব কথা পুরো মনে পরে না। ছেঁড়া, ছেঁড়া স্মৃতিগুলো হৃদয়ের পদ্মপুকুরে ভেসে উঠেই ডুব দেয়, আর হারিয়ে যায় ব্যস্ত সময় সংসারে। সেখানে আবেগ মানে ছেলেখেলা পাগলামি। তবু তার মনে হয়, এরকম পাগলের সংখ্যা আরও বাড়ুক। বাড়লে পাওনাটা মন্দ হয় না। ভালো পরিবেশে মানুষ হয়েছে অনুপমা ও রাজু। সেই রাজুর মনে কি করে রাক্ষস ঢুকলো বুঝতে পারে না অপরূপা। সে ভাবে, মানুষ হয়তো পাল্টে যায় পরিস্থিতির চাপে। যে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে সে হয়ে যায় ডাকাত। আর যে সংসারী হয়ে সুখে থাকতে চায় সে হয়ে যায় খেলার পুতুল, রূপাগাছির অপরূপা বেশ্যা।

অনুপমা ভাবে, তিরস্কারের থেকে জীবনে পুরস্কারই বেশি পেয়েছি। পুরস্কার বলতে মানুষের আদর, ভালোবাসা। অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা। এর থেকে বড় পুরস্কার আমার অভিধানে নেই। আমার যোগ্যতার বেশি, তার পরিমাণ। ঈশ্বর সময় হলেই প্রত্যেকের যোগ্য পাওনাটুকু দিতে ভোলেন না। শুধু প্রয়োজন ধৈর্য আর সহনশীলতা। সময় কিন্তু কারও কথায় এগিয়ে আসবে না বা পিছিয়ে যাবে না। অভিজ্ঞ লোকেরা প্রথমে ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। অন্য মানুষকে সহ্য করা, সম্মান করা ধর্মেরই নামান্তর। মানুষের জন্যই মানুষ। শুধু শুকনো লোক দেখানো ধর্ম যা মানুষকে ছোটো করে সেটা কখনই ধর্ম হতে পারে না। ধর্ম হচ্ছে অণুবিক্ষণের মতো। ছোটো জিনিসকে বড়ো করে দেখে। পোকা, মাকড়ও ঈশ্বরের করুণা থেকে বাদ পরে না। ভাবনা আমার ভালো কিন্তু ভাগ্যের চাকাটা যে বনবন করে ঘোরে। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সে। 
অনুপমা কদিন ধরেই দেখছে রাজু কতগুলো ছেলের সঙ্গে মেশে। তাদের কোনোদিন দেখে নি সে। রাজুকে জিজ্ঞাসা করল বলে, অনেক দূরে বাড়ি ওদের। এখানে এলে আমার সঙ্গে দেখা করে যায়। অনুপমা বলে, তুই খারাপ হয়ে যাস না, ভালো হয়ে থাকিস। তুই আমার জীবনের ভরসা। আমার ভালোবাসার ধন। 
রাজু ভাবে, অনুপমা আমাকে ভালোবাসে। সে আমাকে ভালো হতে বলে। আর তো আমরা ছোটো ছেলে নই। বড়ো হয়েছি। বুঝতে শিখেছি ভালোমন্দ। কি করে সে ভালো হয়ে থাকবে। বাড়িতে নিত্য নতুন অশান্তি। বাবা, মায়ের মারামারি। মা সন্দেহ করে বাবাকে। এখন আমিও সন্দেহ করি বাবাকে। বাবা রোজ রাতে কোথায় যায়? বারোটার পর বাড়ি ফেরে। এত জানাশোনা আছে তার। তবু সে জানতে পারে না। রাজু ভাবে, কোনোদিন যদি জানতে পারি, আমার বাবাকে কেড়ে নিচ্ছে কে? আমি তাকে খুন করবো। আমাদের বাড়িতে অশান্তি ঢোকানোর বদলা আমি নেবোই। অপরূপা বলে, তুমি পুলিশকে জানাও, আইনের সাহায্য নাও। কিন্তু বাবার ভয়ে অতদূর এগোতে সাহস হয় না। তবে মনে মনে ভাবে সে, এর শেষ দেখে ছাড়বো। রাজু মা কে বলতে শুনেছে, তুমি অস্ত্র নিয়ে ঘোরাঘুরি করা ছেড়ে দাও। অন্য মেয়েছেলের সঙ্গ ছেড়ে দাও। অন্যায় করে রোজগার করা ছেড়ে দাও। তা না হলে আমি রোজ তোমার সঙ্গে অশান্তি করবো। রাজু ভাবে, কি করে একটা ভালো ছেলে বড়ো গুন্ডা হয়ে যায়, ডাকাত হয়ে যায়। খুনি হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় পাগল সেজে, মাতাল সেজে। পরিবারের পরিবেশ ভালো না হলেই এইসব হয়।

অনুপমা তার দাদুকে দেখেছে। অনুপমা ভাবে, দাদু তার জীবনের আদর্শ। মন মতো দাদু আমার খুব প্রিয় ছিলো। দাদু আমাদের জন্য নিরামিষ রান্না করতেন। কখনও সখনও দেখেছি নিজে ডেঙা পাড়া, থেকে হাঁসের ডিম জোগাড় করে নিয়ে আসতেন। ব্রয়লার মুরগির ডিম ভালোবাসতো না দাদু। দেশি মুরগির ডিম আনতেন কিনে। নগদ টাকার টানাটানি ছিলো। চাষের জমি থেকে চাল, ডাল, গুড় পাওয়া যেতো। মুড়ি নিজেই ভেজে নিতেন ঠাকুমা। আবার কি চাই। সামনেই শালগোরে। সেখানে দাদু নিজেই জাল ফেলে তুলে ফেলতেন বড়ো বড়ো রুই, কাতলা। আমি পূর্ব মেদিনীপুরের মেয়ে। দুপুরবেলা ঘুম বাদ দিয় শুধু খেলা। আর ওই সময়ে দাদু শুয়ে থাকতেন। ডিসটার্ব হতো।একদিন ভয় দেখানোর জন্যে বাড়ির মুনিষকে মজার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তখন ভূতের গুজব উঠেছিলো। আমরা দুপুরে খেলছি। দাদু বারবার বারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আজ কিন্তু ভূত আসতে পারে। জানিস তো ছড়াটা, ভর্তি দুকুরবেলা, ভূতে মারে তালা। থাপ্পরকে দাদু বলতো তালা। রেগে গেলেই বলতো, এক তালাতে ভুবন ঘুরিয়ে দোবে। আমি খুব ভিতু ছিলাম। আমার বন্ধুরা সবাইকে বললাম। তখন বারো থেকে পনেরো বছরের পালোয়ান আমরা। সকলের ভয় হলো। দাদু কোনোদিন মিথ্যা বলেন না। কথার মধ্যে কনফিডেন্স না থাকলে তিনি রাগ করতেন। একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই অঙ্কটা পারবি। পড়ে দেখ। আমি বললাম, বোধহয় পারবো। তিনি রেগে বললেন, বোধহয় কি? হয় বল না, কিংবা হ্যাঁ। নো অর ইয়েস। ধমকের চোটে কেঁদে ফেলেছিলাম। এই সেই দাদু বলেছেন, আজ ভূত আসবে। দিনে ভূত দেখা যাবে। ছেলে, মেয়ে সবাইকে ধরবে। বস্তায় ভরে নিয়ে যাবে অন্য দেশে। সাবধান। সবাই ঘুমোবি। দুপুরের রোদে বেরোবি না। বাধ্য হয়ে শুলাম। দাদুর নাক ডাকা শুরু হলেই সবাই দে ছুট। একেবারে বাদাম তলায়। আমের একটা গাছ ছিলো। ঢিল মেরে পারছি। এমন সময়ে মুখ বেঁধে কালো টিনের হাতে ভূত হাজির। টিনের হাতে বস্তা। বস্তা ছুঁড়ে ঢাকা দিতে চাইছে আমাদের। আমরা সকলেই প্রাণপণে বক্রেশ্বর নদীর ধারে ধারে গেলাম। আমরা তাড়িয়ে নিয়ে গেছিলাম লোকটাকে। ভূত তখন ভয়ে পগাড় পাড়। আর দেখা নেই। বড়ো হয়ে সত্য কথাগুলি জানতে পেরেছি। দাদু মিথ্যা কথা বলে ভয় দেখাতেন। দাদু খুব ভালো লোক ছিলেন। ওষুধ মলমের স্পর্শে যেমন ফোঁড়া ভালো হয়ে যায়। তেমনি বিপদের সময় দাদুর উপস্থিতি সকল সমস্যার সমাধান করে দিতো। একবার ডেঙা পাড়ায় ডাকাত পরেছিলো। জমিদার বাড়িতে। তখন ফোন ছিলো না। জানাবার উপায় নেই। পাশের বাড়ির একজন দাদুকে ডাকতে এসেছিলো। দাদু ঘুম থেকে রাতে উঠে, সড়কি হাতে লোকজন ডেকে সিধে চলে গিয়েছিলেন। তখন লাঠি, সড়কি, বগি ছিলো প্রধান অস্ত্র। সড়কি খেলায় দাদুর সমকক্ষ কেউ ছিলো না। চারজন বাছা বাছা তরুণকে বললেন, আমার মাথায় লাঠি মারতে দিবি না। তারপর শুরু হলো লড়াই। বারোজন মরদ সবকিছু ফেলে লাগালো ছুট। জমিদার গিন্নি দাদুকে বললেন, আপনার জন্যই আজকে বাঁচলাম। ভগবান আপনার ভালো করবেন। বাড়ির মহিলারা দাদুকে মিষ্টিজল খাইয়ে তবে ছাড়লেন। বাকি লোকেরাও খেলেন। দাদুর লাঠি খেলার দলের কথা আশেপাশে সবাই জানতো। দাদুর মুখেই শুনেছি হাটবারে ডাকাত সর্দার হাটে এসেছিলো। বলেছিলো, আপনার মায়ের দুধের জোর বটে। আপনাকে পেন্নাম। সাহসকে বলিহারি জানাই। আপনি ওই গ্রামে থাকতে আর কোনোদিন ডাকাতি করবো না। দাদু বলেছিলে, ছেড়ে দে ডাকাতি। তোকে জমিদার বাড়িতে ভালো কাজ দেবো। তা বলে কোনো ডাকাত কি কোনোদিন ভালো হয়? মনে মনে প্রশ্ন করে নিজেকে। ভালো আর মন্দ মিলেমিশে মানুষের গঠন। 
আজ আর দাদু নেই। এতবড় সাহসী লোক হয়েও দাদুর ঘরে শান্তি ছিলো না। দাদু বলতো, বাঘের ঘরে ঘোগার বাসা। দাদু আপশোষ করতো, নিজের বৌ যদি বেইমানি করে জগতে কারও সাধ্য নাই তাকে বাঁচায়। সে মরবেই। শান্তি তো কোনোদিন পাবেই না। দাদুর ক্ষেত্রে এই কথাগুলো সত্য হয়ে উঠেছিলো অভিশাপের মতো।

দাদুর মৃত্যু খুব মর্মান্তিক, ভয়ংকর। লোকে বলে, একহাত জিভ বেরিয়ে গেছিলো গলায় দড়ি দেবার পরে।  সেই ঘটনা অনুপমার মনে পরছে।

আমি আর ঠাকুমা দুজনের সংসার। ঠাকুমা অসুস্থ। ঠাকুমা বলেন, তুই যাকে ভালোবাসিস, তাকে বিয়ে কর। আমি হঠাৎ মরে গেলে তোর কি হবে বলতো?
আমি বলতাম, কিছু হবে না ঠাকুমা। আমার বিয়ে করার ইচ্ছে নেই। আমি তোমার কাছেই থাকবো। ঠাকুমা বলেন এ আবার কেমন কথা? মেয়েরা বিয়ে না করলে হয় না কি?

আমগাছটাকে বলছে অনুপমা, ছোটোবেলার বন্ধু রাজুকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। রাজুও ভালোবাসে। কিন্তু রাজুর বাড়ির লোকজন রাজী নয়। আমরা লুকিয়ে দেখা করি। ঠাকুমা জানে, কিন্তু ঠাকুমাকে একা রেখে আমি চলে গেলে, ঈশ্বর আমাকে মাপ করবে না। আমি কি করবো বলো? তবু হয়তো একদিন যেতেই হবে। বিয়ের ফুল ফুটলে কেউ অবিবাহিত থাকে না।

আমগাছটা তার ডাল দুলিয়ে, পাতা নাড়িয়ে হাওয়া দেয়। বুদ্ধি দিতে পারে না। অনুপমা ভাবে, গাছগুলো কথা বলতে জানলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো। গাছের নিচু ডালে বসে সে আকাশ পাতাল চিন্তা করতে আরম্ভ করলো।

মনে পরে দাদু যেদিন মারা যায় সেদিন ঠাকুমা খুব কাঁদছিলো। ঠাকুমার বিয়ের পর থেকে দাদুর সঙ্গে অশান্তি হতো। ঠাকুমার মুখে শুনেছে সে। ঠাকুমা বলেছিলেন, আমি আমাদের গ্রামের একটা ছেলেকে মানে...ভালোবাসতাম। 
অনুপমা বলে,ঠাকুমা বলো না ঠিক করে। তুমি তো আমার বন্ধুর মতো। সব কথা বলা যায় বলো।
ঠাকুমা বলছেন, ছেলেটার সঙ্গে মিশতাম। ভালোবাসা হয়ে গেলো। আমার মা বাবা না থাকলে ছেলেটা সুযোগ বুঝে ঘরে ঢুকে পরতো। রান্নায় সাহায্য করতো। আদর করতো। চুমু খেতো। কিন্তু আমাকে যে ভালোবাসতো না সেটা আমি জানতে পারলাম দুবছর পরে। আমার বন্ধু বিমলের কাছে শুনলাম আরও অনেক মেয়ের সঙ্গে ও এরকম ব্যবহার করে। ওরা সাত ভাই। তাই কেউ ভয়ে কিছু বলে না তাকে। তারপর একদিন চুপি চুপি ও আমাদের বাড়ি এলো। আমি বলে দিলাম, বাবা, মা, না থাকলে আমাদের বাড়ি আসবে না। ও জোর করে আমাকে নগ্ন করলো। ও বললো, আর আমি আসার সুযোগ পাবো না
ও বললো, কেন? আসবো না কেন?
আমি বললাম, কেন, তুমি জানো না? সব জানো তুমি। হাজারটা মেয়ের সর্বনাশ করছো তুমি। নিজেকে খুব চালাক ভাবো তুমি না?
তারপর দেখলাম ওর মুখ পেঁচার মতো হয়ে গেলো। ও মরিয়া হয়ে গেলো। আমাকে চিত করে ফেলে চেপে বসলো। আমি হাত দুটো মাথার উপরে তুলতেই পেয়ে গেলাম কাটারি। অই কাটারির উল্টো পিঠে মারলাম এক ঘা। বাবারে বলে, ভয়ে পালিয়ে বাঁচলো শালা।

তারপর থেকে কোনো কথা ছিলো না। কিন্তু আমার বিয়ের পর অশান্তি ঢুকিয়ে দিলো আমাদের জীবনে। তোর দাদুকে সব কথা বলে দিলো। ও আমার অপমানের আমার কাছে মার খাওয়ার বদলা নিলো।
তোর দাদু তারপর থেকে আমাকে মারধোর করতো। সন্দেহ করতো। আমি বারবার তোর দাদুকে বুঝিয়েছি। ওই খচ্চরটা আমার ইজ্জত নিতল পারে নি। তবু বিশ্বাস করতো না আমার কথা। আমাকে পেটাতো লাঠি দিয়ে। একবার মাথায় লেগে মরেই যেতাম। কোনো রকমে বাঁচলাম হাসপাতালে দেখিয়ে। সেখানেই পরিচয় হলো এক পুরুষের সঙ্গে। খড়কুটো ধরে ডোবার হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করলাম আমি। পুরুষটা ধান্দাবাজ, কামুক। আমার কথা শুনে বললো, কোনো চুতিয়া কিছু করতে পারবে না। আমি আছি তোমার সঙ্গে। টাকা পয়সার অভাব হবে না। শুধু চাই তোমার শরীর। একদম ষোলো আনা। আমি ষোলো আনাই দেবার প্রতিশ্রুতি দিলাম। 
আমি বাধ্য হয়ে এক শক্তিশালী যুবককে প্রেমের খেলায় ফাঁসালাম। সে আমার ঘরে বসতো। আমাকে নিয়ে বেড়াতে যেতো। তোর দাদুকে ও বলেছিলো, যদি শুনি মারধোর করেছিস, সেদিন তোর শেষ দিন। আমি গুন্ডা, বদমাশ লোক। মাথা গরম হলে খুন করে দেবো। এই কথা বলে কোমর থেকে বের করে একটা বড়ো নেপালা দেখিয়েছিলো। তারপর তোর দাদু সোনাপাড়ার জমি দেখাশোনা করতো। আমার কাছে আসতো না। আমিও খবর নিতাম না। তোর দাদু সড়কিখেলায়, লাঠিখেলায় ওস্তাদ ছিলো। কিন্তু নেপালা দেখে, মারমুখী মূর্তি দেখে তাকে বললো, ঠিক আছে আজ খালি হাতে আছি। তোর মৃত্যু আমার হাতে। মনে রাখিস, আমি ফালতু কথা বলি না।

অনেকবার চেষ্টা করেও পারে নি। তবে তোর দাদুর হাতে একটা নেপালার কোপ পরেছিলো। সেই দাগ আজও আছে। আমি জানি,তোর দাদু এই লোকটাকে খুন করবেই।

তারপর তোর বাবা বড়ো হলো। বিয়ে হলো। তুই হলি। ঘর ভরতি আলো। আমার নাঙ, তোর জন্মদিনে বিরাট আয়োজন করেছিলো। তারপর হঠাৎ একটা পথ দুর্ঘটনায় তোর বাবা মরে গেলো। তোর মা তার মাসখানেক পরে চলে গেলো। তোর দাদু তোকে রেখে দিলো। তোর মা কে আমি বাধা দি নি যাওয়ার সময়। কারণ আমার বাড়িতে যে ঢ্যামন আসতো তার নজর পরেছিলো তোর মায়ের গতরে। তোর মতোই সুন্দরী ছিলো তোর মা।

ধীরে ধীরে, সময়ের পাকে, তুই বড় হয়ে গেলি। তারপর তুই তো সব ঘটনা জানিস। তোর দাদুর ক্যান্সার হয়েছিলো লিভারে, অতিরিক্ত মদ্যপানে। তোর দাদু তখন বুদ্ধি করে এক রাতে আমার ঘর থেকে বেরনোর পর লম্পট লোকটাকে সিপাই দিঘির জঙ্গলে সড়কি পেটে ঢুকিয়ে খুন করে এলো। আমি দেখলাম হাতে রক্তমাখা সড়কি। 
বললো, তোর প্রেমিককে খুন করে এলাম রে খানকি মাগী এই বুড়ো বয়সে। শালা আমার সঙ্গে টক্কর, শালা আমার সঙ্গে পাঙ্গা। এবার তোর কুটকুটানি মরবে। তোকে মারবো না। বেঁচে থেকে তু শাস্তি ভোগ করবি। আমি ভূত হয়ে দেকবো।

তারপর আমি কিছু বোঝার আগেই গলায় দড়ি নিয়ে ঝুলে পরলো, তারই হাতে লাগানো আমগাছে।

ওই আমগাছটা সব জানে। ও তো আর কথা বলতে পারে না। ওই প্রধান সাক্ষী। তারপর পুলিশের ঝামেলা পেরিয়ে আজ এই অবস্থা। হয়তো আমার পাপেই তোর দাদু, বাবা মারা গেলো। এবার আমি গেলেই বাঁচি। অনুপমা বললো, না, না, ঠাকুমা সব বিধির লিখন। তোমার কপালে যা ছিলো তাই হয়েছে। দুঃখ কোরো না।

ঠাকুমা বলছে,তোরা দুজনে বিয়ে করে পালা। ওরা মানবে না ভালোবাসার বুলি। আজকেই পালিয়ে যা। অনুপমা কথাটা বলতে পারছিলো না। আজকে ঠাকুমা সব পথ সহজ করে দিলো। 
অনুপমা ছুটতে ছুটতে ঠাকুমার দেওয়া সোনাদানা নিয়ে রাজুর সঙ্গে দেখা কোরলো। রাজু তখন বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছিলো। বন্ধুদের সঙ্গে রাজু পরামর্শ করে, অনুপমাকে নিয়ে সোজা চলে গেলো সিপাই দিঘির জঙ্গলে। বললো, কি এনেছিস দেখা। অনুপমা বললো, সব সোনা এনেছি। নে এবার চ। ও অনুপমাকে চুমু খেলো। জঙ্গলে শুয়ে ওরা নিশ্চিন্ত হলো। তারপর বিয়ের আগেই ওরা মিলিত হলো প্রচন্ড আবেগে। অনুপমা নগ্ন হয়ে রাজুর ওপরে উঠে দীর্ঘস্থায়ী খেলা খেললো। রাজু পাল্লা দিয়ে সাড়া দিলো প্রচন্ড শীৎকারে। রাজু ভাবছে, শালি খানকির কায়দা কি করে শিখলো।খানকির বংশ তো।

হঠাৎ জঙ্গলে এলো কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা গুন্ডার দল। তারা বললো, এখানে তোরা কি করছিস। আমাদের আড্ডার কথা জেনে গেছিস রাজু। মেয়েটা কে রে? বেশ ডবকা মাল। একবার দেখি, বলেই অনুপমার উদ্ধত খোলা বুকে হাত দিলো। টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চাইলো তার মাই যুগল। একজন বললে, এক্কেবারে রেডি মাল। শালির রস গড়িয়ে পরছে। শালা গরম গরম, হাতে গরম।  

রাজু মুষ্ঠিবদ্ধ হাত চালিয়ে দিলো একজনের মুখে। রক্ত পড়তে শুরু করলো। একটা ডাল ভেঙ্গে মারতে আরম্ভ করলো। অনুপমা দেখলো রাজু সবাইকে চেনে। কারণ রাজু বলছে, শালা বন্ধু হয়ে মুখোশ পরে চালাকি, রাজুর সঙ্গে। তোদের থেকে বড় গুন্ডা আমি। মুখোশধারী একজন বললো, আমরা তোর বন্ধু নই, যম। ওরা বললো, মেয়েটাকে ছেড়ে দেবো ছিবড়ে করে। কিন্তু তোকে মরতেই হবে। ওরা দড়ি দিয়ে রাজু আর অনুপমাকে বেঁধে ফেললো। অন্ধকারে পাড়ার এই জঙ্গলে কেউ আসে না। একটা বড় পাথর দিয়ে থেঁতলে দিলো বোধহয়, রাজুর মাথাটা। রাজু চিৎকার করে থেমে গেলো।

অনুপমা কিছু দেখার আগেই মনে ভাবলো, রাজু হয়তো মরে গেছে। অতবড় পাথর দিয়ে মাথায় মারলে কি আর মানুষ বাঁচে। তবু একটা আশা। সে বলছে, ভগবান আমাকে মারো কিন্তু আমার রাজু বেঁচে থাক। অনুপমা কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তার বুকে নির্মম ভাবে আড়াল করে বসে আছে দুই নগ্ন পাষন্ড। তার বুক যুগল দলে, মুচড়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে লম্পটের দল। রাজুর মরা মুখ সে ভাবতেই পারছে না। শুধু শুনতে পেলো,দে শালার মাথা থেঁতলে। কেউ যেনো চিনতে না পারে। তারপর নদীর জলে ভাসিয়ে দেবো। এই কথা শুনে অনুপমা ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো। সেই সুযোগে ওরা পাঁচজন অমানুষিক অত্যাচার করলো তার উপর। তারপর সবাই ওরা চলে গেলো, অনুপমাকে নগ্ন অবস্থায় ফেলে। 
প্রায় দুঘন্টা পরে অনুপমার জ্ঞান এলো। দেখলো রাজুর দেহটা নেই। ওরা হয়তো গাড়ি করে নিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও বা কোনো নদীতে ফেলে দেবে। সে রক্তমাখা শরীর নিয়ে উঠলো। বুঝতে পরলো পশুরা তার সব সম্পদ কেড়ে নিয়েছে। কোনো রকমে ছেঁড়া জামাটা পরলো। ব্যাথায় টনটন করছে তলপেট। আর বাঁচার কোনো মানে হয় না রাজু নেই। পরে যাচ্ছে বারে বারে। সিপাই দিঘির এই জঙ্গলে আসতে মানা কোরতো ঠাকুমা। রাজু তাকে নিয়ে এলো। কতবার মানা করলাম শুনলো না। অনুপমা দেখলো দড়িটা ওর তার গলায় বেঁধেছিলো পশুরা কিন্তু সে মরে নি। টান করে বাঁধা তাও সে মরে নি। সে ভাবে মরে গেলেই ভালো হতো। ওরা হয়তো ভেবেছে, মরে গেছি আমি। দাদুকে মনে পরলো ওর। দাদু ডাকছে আর বলছে, গলায় দড়িটা শক্ত করে বাঁধ। ও আগে শুনেছে যাদের অপমৃত্যু হয় তারা এভাবেই ডাকে। অনুপমা দাদুকে বলছে, দাদু ওরা রাজুকে মেরে ফেলেছে। তাহলে আমি বেঁচে কি করবো। আমি তোমার কাছে যাবো। দাদু ডাকছে, দাদুর কথা শুনতে পাচ্ছে ও। দাদু ডাকছে, আয় আমার হাতে লাগানো বাড়ির আমগাছে আয়। ওখানেই ঝুলে পর। আমি আছি, আয়, আয়। অনুপমা ভাবের আবেশে বাড়ির উঠোনে এলো। এখন অন্ধকার রাত। মনেও কালো অন্ধকার, অনুপমার অন্তর জুড়ে, চাপ চাপ কালোর দলা পাকানো রক্ত। নীচু ডালে পা দিয়ে উঠে পরলো গাছে। দড়িটা শক্ত করে বাঁধলো ডালে। কোনোদিন কঠিন কাজ সে করেনি। কি করে দড়ি বাঁধলো সে নিজেও বুঝতে পারলো না। অবশেষে রাজুকে মনে করে ঝুলে পরলো ডাল থেকে। 

সকালবেলা অনুপমার ঠাকুমা কাঁদতে শুরু করলো। মরা কান্না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখে, গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে নগ্নপ্রায় নাতনি। ঠাকুমা দেখলো, অনুপমা গলায় দড়ি দিয়েছে দাদুর মতো। আর দেখলো পাড়ার সবাই ভিড় করে এসেছে তার নাতনিকে দেখতে। ভিড়ের মাঝে রাজুকে দেখতে পেলো ঠাকুমা। রাজু বলছে, ঠাকুমা এই অভিশপ্ত আমগাছটা কেটে ফেলতে হবে। অনুপমার ঠাকুমা বলে, তোমার সঙ্গে কাল দেখা হয় নি অনুপমার। রাজু বললো, না তো, আমি কাল একটু মামার বাড়ি বেড়াতে গেছিলাম। আসতে অনেক রাত হয়ে গেছে।
- কিন্তু ও যে বললো,তোমার কাছে যাবে।

- না, ঠাকুমা, আমাকে তো বলেনি কিছু।

- না, ও আমাকে বলে বাড়ি থেকে বেরোলো। আমার কাছে সোনাদানা নিয়ে বললো, আমি রাজুর কাছে যাচ্ছি। তোমার কোন পাড়ায় বাড়ি বাবা।

- ও আপনি চিনবেন না। আমরা একই স্কুলে পড়তাম। ছোটোবেলায় এই বাড়িতে কত খেলেছি। আপনিও তো আমাকে দেখেছেন।

- ঠাকুমা বললেন, হ্যাঁ দেখেছি। আমি সব জানি। কিন্তু ও গলায় দড়ি দিলো কেন?
- ঠাকুমা, সোনা দিয়েছেন ওকে। ও একা একা অন্ধকারে বেরিয়ে গেলো। আপনি ভুল করেছেন ঠাকুমা। সোনাদানা আর অন্ধকারে একা যুবতী মেয়ে। না না, ঠাকুমা এটা আপনি ঠিক করেন নি। পাড়ার লোক বলুক। আপনি ভাবুন তো একবার।

রাজু দেখলো ওর পাশে ওর সব শাগরেদ হাজির। ওদের দেখে ডাকাতের ছেলে রাজুর সাহস বেড়ে গেলো। বাপকা বেটা..বললো, শুনুন ঠাকুমা পুলিশ যদি জানে, আপনি নিজে সোনা দানা সমেত একটা যুবতী মেয়েকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছেন, তাহলে ঝামেলা হবে। তারপর পুলিশ এলে পোষ্টমর্টেম হবে। যদি রেপ হয়েছে বুঝতে পারে আপনার নাতনির বদনাম হবে। কাগজে, কাগজে ছেপে যাবে আপনার বাড়ির ইতিহাস। আপনার পরিবারের ইতিহাস। আপনার সমগ্র ইতিহাস।

- তা হলে কি করা যায় বলো তো। মেয়েটা তো মরেই গেছে। তাছাড়া আমি বুড়ি। এই বয়সে আমি অত ধকল সইতে পারবো না। তুমি যা ভালো বোঝো করো। আমাকে বাঁচাও।

- ঠিক ভেবেছেন আপনি। আমার উপর ভরসা রাখুন। আমি দিল দিয়েছিলাম ওকে। আমার কথা মনে করলো না ও। কি নিষ্ঠুর তুমি অনুপমা। 
ঠাকুমা রাজুর চোখ মুছিয়ে দিলেন। বললেন,যা হয়েছে,তা আর ফিরে আসবে না। তুমি পাড়ার লোক ম্যানেজ করে তাড়াতাড়ি শ্মশানে নিয়ে যাও।
রাজু তার দলবল নিয়ে পাড়ার লোকদের বললো,আপনারাই বলুন। একা বুড়ি মানুষ পুলিশের ঝামেলায় যেতে চাইছে না। তাহলে আমরা কি মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাবো। পাড়ার সব লোক ফিসফাস করলো। কেউ ঝামেলায় থাকবে না। একজন বয়স্ক মহিলা বললেন,নিয়ে যাও,ওর ঠাকুমাই তো মালিক। উনি যা বলবেন,তাই করো। আমাদের আপত্তি থাকবে কেন?
রাজু ভাবছে এখনও শালি, বুড়িটা টাকা দিলো না। মদ, মাংস খেতে হবে। পাড়ার লোক, বন্ধু -বান্ধব, শ্মশান খরচ খানকি বুড়ি...
- তা হলে, ঠাকুমা, চাঁদা তুলি।
- আরে, ছি, ছি বলো কি? টাকার কোনো অভাব নেই। যত লাগে দেবো। সব তো নাতনির জন্যই রাখা আছে। 
দশ মিনিট পরে ঠাকুমা রাজুর হাতে কুড়ি হাজার টাকা দিলেন। বললেন, আরও লাগলে দেবো। টাকার কোনো অভাব নেই। রাজু টাকা নেয় আর ভাবে, শালি, আমার বাবার কাছে ঝারা মাল। আমার বাবাকে খুন করেছে তোর স্বামী। তার ফল ভোগ কর শালি, খানকি। তারপর হাসি হাসি মুখে বলে, আর কোনো চিন্তা নেই। আপনি চেয়ারে বসে দেখুন। রাজুর নেতৃত্বে তার দল আমগাছে উঠে লাশ পারলো। ট্রাকটর চলে এলো। কুড়িজন লোক সঙ্গে করে চলে গেলো শ্মশানে। বন্ধুকে আড়ালে বলছে রাজু, শালা এবার বুড়ির পালা। তারপর ওই জায়গায় গজিয়ে উঠবে আমাদের আড্ডা। শালা প্রথমে ক্লাব হবে, পাশে মন্দির হবে। রাজু বলে উঠলো, বল্লো হরি... সবাই সমস্বরে বলে উঠলো, হরিবোল...আবার বল্লো,...শ্মশানের চিতাটা রাজুর চিৎকারে হেসে উঠলো দাউ দাউ শব্দে..

কবিতা

সোমদেব পাকড়াশী 

পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

কবিতা 

​

শত সহস্র সাঁঝ ও সকাল

না জানি কতনা রাগ অনুরাগ

কত সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বিরাগ

সাথে তার যায় লয়ে।

কবি মনে মোর দীপ্ত বাসনা

সযতনে করি সাধ্য সাধনা

এসবের কিছু কেমনে সাজাব সুকথনে

কবিতা কতক রচিব নানান বলয়ে।

 

বারে বারে সদা লিখে চলি তাই

মার্জনেরও কোনো যতি নাই।

যত বার লিখি তার বেশি কাটি

দিন শেষে দেখি সব হল মাটি।

 

দিবা নিশি শুধু আসে আর যায় 

কবিতা সে কেন কায়া নাহি পায় -

ভাবি বিমর্ষ বদনে

 

​সেদিন বিরলে গভীর নিশীথে

বিরস বদনে বসিয়া

ভাবিতেছিলাম উদাস চিত্তে

কে কহিল যেন ডাকিয়া,

'ভাবিতেছ  কিবা এতশত বাপু

দেখি নাই তোমা হেন -

বিশ্ব জগতে আদি ও অন্ত

সে যে একে চেনো।

 

চক্ষু মেলিয়া দেখ চারিধারে

সাজান সে থরে থরে

সে আছে অসীম ঘন নভোনীলে

আছে ছায়াপথ ধরে।

 

দেখ তারে ওই নদী মোহনায়

প্রবাহিনী যেথা সাগরে মিলায়।

জেগে ওঠে যথা সারা প্রাণীকুল

পাখির কাকলি কূজনে

লহমাতে সেথা রচিত কবিতা

প্রভাত রবির কিরণে।

সে আছে বিজনে গিরি, গুহা, বনে,

নায়াগ্রা জলপ্রপাতে

বিকশিত সে যে বোরিয়ালিসে,

কোজাগরী পূর্ণিমাতে।

মরু সাহারায় মরীচিকা মাঝে

অনায়াস তার ভাষা,

ডলফিন জলে ঘাই মারে যেথা,

ছোট ডিঙি স্রোতে ভাসা।

ঢেউ অবিরাম অকুল পাথারে

কবিতারে সেথা পাওয়া, 
যেথা নিত্যদিন দিগবলয়ে

রবি করে আসা যাওয়া।

ঘন বরষার অশনি চমকে

রামধনু সাত রঙে

মেঘ সবিতার লুকোচুরি চলে

কবিতার নানা ঢঙে।

কত যে কবিতা রয়েছে ছড়িয়ে
                                         

গিজা পিরামিডে যতনে

কবিতা অমর হয়ে আছে   

ওই তুতেনখামেন কফিনে।

এলোমেলো চুলে টোলপড়া গালে 

কন্যা সলাজ ষোড়শী    

কবিতা তাহার চলনে বলনে   

কবিতা যে তার প্রেয়সী। 

মূর্ত কবিতা পাবে সদা
যথা স্তন্যদাত্রী কোলে - 
শিশু আনন্দে দোলে;   
গাগরী ভরণে যেথা   
বধূগণ জলে চলে। 
কবিতারে আন মনের মাঝারে
খোঁজ দরকারী নয়
মিলেমিশে সে যে আছে দশদিশে 
কবিতা বসুধাময়।


রবির নরম প্রথম প্রকাশে  
নিশি হল অবসান  
অবগাহ করি কবিতা সায়রে
জাগিয়া উঠিল প

 

কাল এর ফাঁদ
 

কাল এর ফাঁদে পড়ছ কেন 
কাল যে দেবে ফাঁকি   
আজ পুরোটা সেরেই ফেল 
রাখবে নাকো বাকী।

 

হাজার খানা উদাহরণ

তোমার কাছেও আছে

দেখবে তাতে আয়েশ করে

সময় শুধুই গেছে।

বড় ছোট যার যা ছিল,

ভেবে ভেবেই সার,

মনের সে সাধ পূরণ করা
হলই নাক আর।

​

এই দেখ না, রাবণ রাজা

কাল পরশু করে

পৌঁছতে আর পারলো কোথা

স্বর্গে-সিঁড়ি চড়ে।

সিঁড়ির সারি বানানো তার 

হলনা শেষ মেষ,-

রামের হাতে প্রাণটা যে তার

আগেই হল শেষ।

 

শশক কূর্ম রেস এর কথা
হয়ত আছে মনে -     
দৌড়ে আগে পৌঁছবে কে       
নির্ধারিত স্থানে,   
এই নিয়ে তো দুই বন্ধুর
রেষারেষির শুরু,  
এই দৌড়ে প্রথম হলে
মানবে সবাই গুরু।          
কিছু সময় যাবার পরে
শশক ভাবে মনে,                                       

আমার দ্রুত গতির কথা

সবাই ভাল জানে। 

অল্প এখন আরাম করি

এই দিঘীটার ধারে

হ্যান্ডিক্যাপে মাত করব

বোকা কাছিমটারে।  

শেষকালে যে কি ফলাফল

সেটাও জানা সবার

পথটা গোটা না থেমে ধীর

কূর্ম করল কাবার।  

কাছিম য্খন পৌঁছে গেল  

নির্ধারিত স্থানে শশক ভায়া ঘু

মেই কাদা শীতল দিঘীর কোনে।  

কাল এর কাজটি আজ   
আর আজ এর  টি এখন      
এই মন্ত্রে স্যার বীরেনের  
ছিল জীবন যাপন।
মোদের মাঝে আরও     
কত বিদ্যা বুদ্ধি ধর       
ছিলেন যেমন, রবি   
ছিলেন, বিদ্যার সাগর|   
সাহা সত্যেন সুভাষ.            
ছিলেন বিবেকানন্দ স্বামী,
আছেন তেন্ডলা বিশ্বনাথন
অমর্ত্য সেন, জানি।
‘কর্ম যোগই সেরা
যদি তা ঠিক সময়ে করা 
এক জীবনে কামাল
করে দেখিয়ে দিল এরা।     
বলছ তুমি, ‘কাজে কর্মে

আছে কি ছাই সুখ?’ 

বলছ, ‘যত বড়াই করি,

পরিশ্রমই দুখ।

সারা জীবন দিনের মজুর

কতই কষ্ট করে

নুন আনতে পান্তা ফুরায়

বেকারই ঘাম ঝরে।

দেখ্ চেয়ে ওই চতুর্দিকে

চাষাভুষোর দল                                        কর্ম করে ক্লান্ত, তবু                     
আধপেটা সম্বল।

অনেক মজার সুপ্তি বিলাস

দূর হোক সব কর্ম,

হোকনা কেন আয়েষ আরাম

মোদের জীবন ধর্ম‘।

ঠিক আছে ভাই,

হোক তবে তাই -

দুপুর কাটুক ভাত ঘুমে -

দিয়ে নাসিকায় তেল, 

বায়সের কি যায় বা আসে

গাছেতে পাকিলে বেল।                                

 

আমার পথটা সহজ সরল

থাক মনে এই জোর   -

কালকের কাজ করব যে আজ

এই অভীপ্সা মোর।

কবিতাঃ সোমদেব পাকড়াশী 
কবিতাঃ ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল

কবিতা

ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল, কসবা, কলকাতা 

rudrajit paul_edited.jpg

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

women.jpg

তিনটি লিমেরিক

 

১।।

​

লিমেরিক মানে কী? কি করে বা লেখে?

এডওয়ার্ড লিয়রের বই নাও দেখে।

এক দুই ছাঁদে যথা

তিন চার ছোট কথা 

পাঁচ নম্বরে ফের মিল দিও রেখে।। 

 

২।। 

বাংলা ভাষা বাঁচবে না কো মিটিং মিছিল করে-

ভাবছ শুধু প্রাচীন ভাষা একশো বছর ধরে।​

প্রযুক্তিময় নতুন দিনে

নতুন ভাষা নাও গো চিনে

আনো নতুন শব্দরাশি, নিয়ম ভাঙো জোরে।।  

 

৩।।

নতুন মানুষ নতুন ভাষায় ভরবে কথার ঝুড়ি, 

তবেই গিয়ে বাঁচবে ভাষা, প্রাণের পরশ জুড়ি।

দুচ্ছাই ওই নতুন কথা! 

ব্যঙ্গ করে যথা তথা—

কূপমণ্ডূক বুদ্ধিজীবী রইল চাদর মুড়ি।। 

চন্দ্রাহত


আমি ওপথে হাঁটিনি আর!
আমাদের পথ গেছে সরে।
বদ্ধ ঘরের কোণে,
মুঠোফোনে,
আর বোকাবাক্সয় ধরা পৃথিবীতে—
আমি হাঁটব না আর।
আমাদের পরিচয় নেই,
নাকি এটাই পরিচয়?
তোমাদের আঁকা ক্যানভাসে
আমার হাজার পাতা বই।
ছিঁড়ে নেব,
পাতা ছিঁড়ে নেব এক এক করে;
কত সাদা-সাদা গল্পের ভিড়ে,

যেমন খড়ে বোনা কবিতার নীড়

ঝড়ে ভাঙে!

সাদা নয়, কালো নয়, ধূসর বিভূতি—আমি নিঃশেষ হব,তবু—

এই রিলে ধরা জীবনের আঁকা

স্রোতেআমি ফিরব না আর।

তোমরাও কত ছবি আঁকো,

কত ছবি রাতজাগা পাখিটির তরে—

লাল, নীল, সাদা, কালো, কত রং, কত ছাঁদ!

তবু রাত হলে উড়ে যায় পাখি;

কত সাধে বোনা খেলাঘর খালি।

নিশ্চুপে রং তার মিশে যায়।

ঝাপসা বেলোয়ারী কাঁচে রোদ,

আলো-ছায়া, বেলাডুবি নকশায়—

এখনও সে খেলাঘর খালি।

আমাদেরও বেলা ডুবেছিল।

কবিতাঃ পর্ণাভ দে

কবিতা

পর্ণাভ দে, ​বারাসাত, উত্তর ২৪ পরগনা

parnabho-de_edited.jpg

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

আমাদেরও ঘরে রোদ কার্নিশ চুঁয়ে

এসেছিল বেলাশেষে সোহাগীর মতো;
তুমি দেখেছিলে তাকে—
পর্দার ফাঁক গলে একফালি রাঙা রোদ—
অভিমানে; ক্ষীণ, আরও ক্ষীণ।
তোমাদের রিলে আলো সেঁজুতি আঁধারে
জ্বলেছিল নিশ্চুপে আলেয়ার মতো।
সেই আলেয়ায় টেনেছিল পাখি

আমি ওপথে হাঁটিনি আর,
আমার পথ গেছে সরে।
নিছক ঘুমের ঘোরে,
স্বপ্নবিহীন ভোরে,
আর মায়া-ছলে দুনিয়ায় যন্ত্র-মানুষ হয়ে
আমি বাঁধা থাকব না আর।​

কবিতাঃ রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়

শরৎ - এ  আগমনী
 

শরৎ মানে শারদীয়ার গুচ্ছ মেঘের  ভেলা
শরৎ মানে মেঘ রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা
শরৎ মানে আবার নতুন দুর্গা পুজোর আসা
পুজো এলেই জীবনে আসে প্রথম ভালোবাসা।
শরৎ মানে জেলায় জেলায় নদী ছাপিয়ে বন্যা
শরৎ মানে নিরীহ মানুষের হাহাকার ও কান্না।
শরৎ মানেই মেঘ আর কাশের গুচ্ছ 
তার পাশে কেউ আসে না, সবই লাগে তুচ্ছ।

কবিতা

রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়

Rajashri Bhattacharya.jpg

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

শহর তুমি হারিয়ে গেছো কংক্রিটের দেয়ালে

আগে তোমায় দেখা যেত দুই পা বাড়ালে।

হয়তো তুমি আছো দূরে গ্রামের সীমানা ছাড়ালে
শহর তোমায় সরিয়ে নিয়েছে দুই চক্ষুর আড়ালে।
তবু তোমায় খুঁজে বেড়াই ভাদ্র আশ্বিন সকালে
শরৎ মানে জীবনে আসে অন্য রকম ছন্দ।
শরৎ মানে পুজো, পুজো আগমনীর গন্ধ।
পুজোর ছুটি এলেই পরে স্কুল-কলেজ বন্ধ।
ভাদ্র-আশ্বিন এলেই পরে আসে পুজোর মাস।
শরৎ - এ হাসি-কান্না আনন্দ এই নিয়েই আম বাঙালির বাস।

dhaak_edited.jpg
কবিতাঃ রুদ্র দাস

কবিতা

রুদ্র দাস

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

কালো রাত

কালো রাতে, গভীর ঘুমে
আসে কালো দূত
নিষ্পাপ সন্তানেরা ঘুমিয়ে আছে
বুকে অসীম সুখ।
হঠাৎ বুকে চালাল গুলি
চিরসুখে শায়িত হল
আমার দেশের ছেলেগুলি।
গহীন নিদ্রা ভাঙেনি আর
ফোটেনি গাছের কলি,
অকালে ঝড়ে গেল
আমার দেশের তারাগুলি।
কালো দূতের কালো হাত
ভাঙে জননীর পাঁজর,
মায়ের কষ্টে ব্যথিত সন্তান,
দিয়েছে কালো দূতের কবর।


বন্দি শিশুমন

শিশু, কিশোরের অমূল্য হাসি
লুপ্ত হয়েছে, প্রত্যহ দিবসি
বাবা-মায়ের বড় আশা;
ভাঙ্গছে শিশুর খেলার বাসা।
শিশু বিবেক করেছে বন্দি
আমি জানিনা কি তাদের অভিসন্ধি?
হস্তের পঞ্চ অঙ্গুরী নহে সম
নহে সম গুণ
তব রয়েছে গুরুত্ব সম
একটি ছাড়া অপরটি নির্গুণ।
শিশু বলে, আমি হব কবি
ছন্দে সাজাবো বিশ্ব;
হয়ে বিশ্বকবি।
কিশোর বলে, হব আমি রণতূর্য
সকল কিছু ভেঙে আনিব রণের বীর্য।
আঁকব সকল চেনা মুখ
যা আমারে দিয়েছে সুখ।
আঁকব সকল মলিনতার চিত্র,
যা বিশ্বে আনিবে বৈচিত্র।

​এ নহে কোনো উপার্জন
বৃথা যাবে ওসবে জীবন।
হবি তুই ডাক্তার,
হবি ইঞ্জিনিয়ার।
না হলে তবে,
কেমনে মুখ দেখাবো
আমি সবে।
রূদ্ধ হয়েছে শিশু সরলতা
বদ্ধ হয়েছে মন
তাই করেছে আজ উগ্র আচরণ।
তুমি খাঁচার পাখি
দূর আকাশ দেখে
ভেজে তোমার দুই আঁখি।
শিশুর গুণের নাই কদর
শুধুই চাপায় বইয়ের বহর।
দেশ তব আজও নহে উন্নত
সবে মিলে শিশুর সম্ভাবনাকে করেছে যে নত।

​

ফুলকলি

ক্ষতস্তদ্ব হৃদয়ে বহিছে স্রোতের নদী,

মেরেছ তুমি দুঃখের অসিতাও  

তোমার জন্য করব বরণ

মৃত্যুরূপ ফাঁসি।

গাত্র ভিজেছে আপন লহুতে
তবুও শুধু দেখি তোমার স্বরূপ;
যেন আছ জড়িয়ে আমারই বাহুতে।

যাতনা নাই তবু আর
যতই দেও যাতনা
তোমারে দেখে ভুলেছি
সকল বাসনা।

যতই দিচ্ছ কর্টকঘাত
দিচ্ছ আমার বলি
আপন হয়েছ তত তুমি
আমার সেই ফুলকলি।


চিরআশা

তুমি রূপের প্রভা
আমার অম্বরে উদিত সোম;
তুমি হিয়ায় জ্বলন্ত অনল
আমার খোয়াব এ আগত প্রিয়ার ভ্রম।

তুমি মোর দিলের কপোত
বাঁধি নাই কোনো বন্ধনে
যদি চির থাক মোর হৃদয় নিলয়ে
জীবন করিব উৎসর্গ তোমারই সন্ধানে;

দীপ্তিমান তোমার নয়ন
কে জানে? কী আছে ঐ আঁখিতে
আমারে জড়াচ্ছে যেন
রোজ নতুন ভঙ্গিতে।

হতে চাই তার পূজার বেদী
বক্ষে করিব ধারণ তারে
অন্তহীন অপেক্ষা করবে কি সে?
নিত্য ভালোবেসে মোরে।


অভিমান

আর চাহিবোনা ঐ বেহেশতের পানে
আর করবোনা অমৃত স্বর্গ পান
আর দেখিবোনা সেই চন্দ্রকমল
এই মোর অভিমান।
আমার আগমনে হবেনা বিচলিত;
হবেনা কোনো হেতুতে,
তবু করিব উৎসর্গ প্রাণ
তারই চোখের মায়াতে।
আর ভুলবনা ঐ মারণ দৃষ্টিতে
কষ্ট রাখবো গোপনে
তার জন্য ভিজাবোনা আমার আঁখি যুগল
আর তারই স্বপনে
তার নয়ন কম্পিত হবেনা আর
আমার দৃষ্টিতে
অধিকার যেন নেই মোর
খোদার এই সৃষ্টিতে।
এ নয় মোর রাগ,
নয় সূক্ষ্ম অভিমান
ও শুধু তার হৃদয় নিসৃত
বিষে  ভরা বান |


গোলাপ গাছ

ভালোবাসা যেন কাঁটাওয়ালা
গোলাপের গাছ
এ জীবন প্রান্তরে
শত আঘাত সহে যে

ভালোবাসা যেন পায় সে

তারও কথা পড়লে মনে

বন্ধুত্ব হয় যেন

সুখেরও সনে

আঘাত হয় নির্মল

তারও মধুর ছোঁয়াতে

সুখ-দুঃখ সবই যেন

তার রূপেরও সাজ

সব মিলে -অপরূপ এই গোলাপ গাছ।

​

মায়াজাল

উত্তাল সুরভিত গগন
বহিয়াছে  শ্রাবণের বান,
আঁখি পল্লব জুড়ায় যেন
দেখে প্রকৃতির দান।
ঝড়ে বাজায় চালে তাল
নিশিরাত্রে ভাঙছে যেন
সকল কলুষতার কাল।
দেহ পেল প্রাণ;
আত্মায় পায় মন;
তুমি পেলে সুখ;
আমায় দিলে শুধু
তোমারই স্মৃতির রূপ।
আজ প্রকৃতি করেছে খেলা
নিদারুণ এই সন্ধ্যাবেলা
হবেনা ভোর
আর কাটবেনা তোমারই ঘোর।
থেমেছে বাদল
আর নেই মেঘ,
করবেনা ক্রন্দন,
শুকিয়েছে জলধি,
ভুবন ভিজবেনা জলে
প্রকৃতি হবে না মাতাল
আর তোমারই মায়াজালে।


ঈদ

অখিল বিশ্ব উঠেছে মেতে
বাজির  আলোর তারার ঝাঁকে,
শশী উদিত পশ্চিমা গগনে
হৃদয়ে জাগে পবিত্রতার দীপ
সকল মলিনতা দূর করেছে,
আজ আমাদেরই ঈদ।
মনে জাগে নবীর কথা
আত্মায় কেবল আল্লাহর ভাষা,
আল্লাহ্ করুণাময়,
আপনি দয়াবান,
আমারে করুন দান
সকলের খুশিরই বরদান।
ভাইয়ে ভাইয়ে ঐক্য সুর
মন আনন্দের ভেলা
ভালোবাসায় উঠছে ভরে
সবার এই মিলন মেলা।
তুমি আমার

ক্ষুদ্ধ হয়েছেন মনের দেবী
কীভাবে করিব শান্ত  
রজনী হয়েছে দীর্ঘ আরো
আমারে করছে অশান্ত।
চন্দ্র হয়েছে জবা লাল
নিঃসৃত করছে তেজি বিভা
তবুও তারে লাগছে ভালো
তেজী রূপে সাক্ষাৎ রূপের প্রভা।
কেন কর অভিমান? ওগো উদাসী
আমি কে তোমার?জানোনা কি?  
ওগো প্রিয়সী।

কবিতাঃ সত্যজিৎ নস্কর 

ভালো আছো?

দুপুরের শব্দহীনতা ভেঙে 
মানুষ হেঁটে চলে, 
বেশি কথা বলা মানুষ
কম কথা বলা মানুষ
নির্বাক মানুষ কত!
অন্যের হৃদয় খুঁড়ে শব্দ তুলতে চায় যে 
কারো পাঁজরে খনিজ স্রোত দেখে ফেলে যে

maple_edited.jpg

কবিতা

সত্যজিৎ নস্কর, বনহুগলী, কোলকাতা

satyajit-naskar_edited.jpg

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

তার ঠোঁট কাঁপে 
কোন্‌  বাতাসে!
ভালো আছি ......
ভালো আছি ....
বার বার বলে কি বোঝাতে চাও?
এত পাল্‌টালে কি ভালো থাকা যায়!
এত বদ্‌লালে কি কাউকে ভাসানো যায়!
স্থির জল সেই হঠাৎ দুকূল ভাসায়।

তুমিই প্রকৃতি নারী


এমনই খেত ভরা সরিষার ফুলে
হলুদের সমারোহে অনিমেষে চেয়ে
আছি ভ্রমরের পানে। এলায়িত চুলে
বসন্ত বসনে সাজি তুমি কোন মেয়ে
হেন কালে এলে পাশে? কোন কারিগর
বলো গড়েছে তোমায়, এমন মায়ায়?
সুশোভিত কৃষ্ণ তিল অধরের 'পর
পাগল প্রেমিক এক দেখি মুগ্ধতায়।
আগুন লেগেছে দেখি পলাশের ডালে
তোমার ও' ওষ্ঠ রাঙা রক্তিম আভায়
প্রকৃতিকে দেখেছি তব মুখমণ্ডলে।
তুমিই প্রকৃতি নারী, মনে হয় তাই
আমার আঁখিতে কোনো তফাৎ না পাই।

জেগেছি নতুন করে

​

যা কিছু কাজ- সবই নির্ধারিত ভেবে
দিনের পর দিন তা করেছি পালন।
পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব তার কেউ নেবে
ঠিকই! নিশ্চিত আছে কোনো একজন।
এমনি ধারায় ভেবে জীবন সায়াহ্ণে
এসে দাঁড়িয়েছি আমি। ফিরে দেখি মোর
জন্ম হতে দশান্তরে- বিদায় লগনে;
কিছুক্ষণ পর আরও একটা ভোর।
নতুন আলোয় ভরা নতুন ভুবন
ঘুম ভেঙে দেখি তার বর্ণময় রূপ।
স্বপ্ন মনে হয়। নাকি সত্যি জাগরণ!
জেগেছি নতুন করে, তাইতো নিশ্চুপ।
শুরু করি কাজ আবার প্রথম থেকে,
এতদিন যা আমি করেছি স্বপ্নলোকে।

কবিতাঃ বিবর্তন
traveller2.jpg

কবিতা

বিবর্তন

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

ভাবনা বনাম ভয়

                    

বসে আছি গঙ্গাপারে

কোন এক ঘাটের ধারে,

দেখে যাই জোয়ার ভাটার খেল;

 

 ভাবি, সেই গোমুখ থেকে

 বয়ে এসে এঁকেবেঁকে,

 বঙ্গ-উপসাগরে মিশেল।

 

 আরো ভাবি,জাহ্নবী মা-

 বেনারস-এ রূপ কি তোমা!

 জন্ম- মরণ মাঝে তুমি-ই দ্বার;

 আধুনিক আর আদিম, সাথে-

 আহা! কী রূপ কলকাতাতে!

 মোহে হই গ্রস্ত বারম্বার...

 

 এতশত ভাবছি যখন,

 ভাব সাগরে ডুব দিয়ে মন;

 আটকেছে চোখ পায়ে,বাপ-রে-বাপ!

 

 গঙ্গা মায়ের বুক উজিয়ে-

 ডোরাকাটা উঠল কি এ?

 ওমা, এতো গাঙের কালাচ সাপ!

 

​

 এ সর্প তো গরল হাঁড়ি!

 মনকে আগে শান্ত করি,

 যথারীতি দেহ-ও হলো স্থির;

 

 কালাচ আমার পা টপকে,

 সাঁতার দিলো নদীর বুকে,

 গাঙের মাঝে ডোবালো শরীর।

 

 ঘটনাটির মুহূর্ত পর....

 কোথায় তখন ভাবের সাগর?

 সাগরের জল শুকিয়ে মাঠ;

 

 গঙ্গা মায়ের রূপ ভাবনা!

 ওই পানে আর যাব না,

 ঘাটে গিয়ে হয়েছে আমার ঘাট।

কবিতাঃ দেবরঞ্জন গুহঠাকুরতা

কবিতা

দেবরঞ্জন গুহঠাকুরতা​

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

কবিতাঃ ডঃ সুমন্ত দত্ত

জীবন

 

সাত রঙের ওই ঐক্যতান, 

জীবন ব্যাথার বুঝি টান।

ব্যাথার স্পন্দন হয়ে নাহি আজ,  

গাইব যে জীবনের জয়গান।

পথের পথিক মোরা,

জীবনে শুধুই চলা,​

কবিতা

ড: সুমন্ত দত্ত

Sumanta Dutta.webp

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

ফিরে তাকানোর সময় আবার 

পাই কি ফিরে মোরা?

 

একদিন যাব চলে, 

গাঙজোয়াড়ের পাড়টি ধরে,

ব্যাথার শুধুই রয়ে যাবে,

ফাঁকা চিত্রপট।

traveller2.jpg
art1.jpg

শাসন
 

পাউলির তত্ত্বটা কঠিন ছিল না তত

যতটা কঠিন ছিল তোমায় বোঝা
স্রোডিঞ্জারের সেই ইকুইয়েশ্যানের মতো ছিলে না সোজা। 
তোমার মনের কোড ডিকোডিং করতে ফুরিয়ে গিয়েছে জানো কত রাত
ক্যালকুলাসের আমি নিখুঁত হিসাব কষে মেলাতে পারিনি ঐ দুটি হাত। 
তাই প্রোমোশন আটকিয়ে গিয়েছে পরের ক্লাসে,

তোমার পাশের সিটে শূন্য আসন
ভুলত্রুটি সব আমারই, অনুযোগ করবো না কোরো শাসন। 

কবিতাঃ সুকান্ত পাল

কবিতা

সুকান্ত পাল​

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

যারা লিখছে তারা লিখুক

​

যারা লিখছে তারা লিখুক,
আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র ফুটুক।

অবিনাশী চেতনার নির্মানে শব্দের নকশী-বুনন 
বুনে যাক রুপকথা নকশী কাঁথার কথামালা 
তারা জ্বলা রাত, জোনাকির মিহিন কবিতা।

বিদ্রোহী শব্দসুন্দর হোক পিকাসোর শান্তি কপোত,
কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে জাগুক রক্ত-রাঙা বাণ,
আগুনের ডানায় উড়ুক দুঃসাহসী প্রমিথিউস।

নদীরা থমকে দাঁড়াক পথহারা অকস্মাৎ,
বরফ গলতে থাকুক বোবা যন্ত্রণায় নির্বাক,
ভালবাসা হোক চির নির্বাসিত -যাক দ্বীপান্তরে- 
বুলেট বিদ্ধ বুকে রক্ত ঝরুক অবিরাম।

​

কৃষ্ণচূড়ার ডালে এখন
হাজার তারার মেলা,
সাত-সকালে সূর্য ওঠা- 
আগুন রঙের খেলা।

বোবার মতো নিঝুম দুপুর,
ঠায় দাঁড়িয়ে কাক,
ঘুম ভেঙে যায় খোক-খুকুর- 
কৃষ্ণচূড়ার ডাক।

ডাক দিয়ে যায় বনের পাখি,
মাতাল হাওয়ার গান,
কৃষ্ণচূড়ার বুক জুড়ে আজ 
রক্ত-রাঙা বান।

কবিতাঃ রওশন মতিন

কবিতা

রওশন মতিন, ​বিরামপুর, দিনাজপুর, বাংলাদেশ

Rawsan Matin.webp

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

মানুষের জন্য ভালবাসার আকুলতা নিয়ে প্রতিদিন মহা পৃথিবীর বিশাল জনারণ্যে বেঁচে থাকা,
অবিরাম যুদ্ধে রক্তের বীজে একটি সজীব -
বৃক্ষের জন্ম কথা,যেন একটি শব্দের জন্ম-
একটি শিশুর অবিনাশী আত্মার জন্ম কথা।

যারা লিখছে তারা লিখুক,
আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র ফুটুক।

​

কৃষ্ণচূড়া

​

কৃষ্ণচূড়া এখন যেন 
লাল মোরগের ঝুঁটি,
মাতাল হাওয়ায় গা এলিয়ে 
হেসেই লুটোপুটি।

কবিতাঃ পার্থ সরকার

প্রমুখ জলধর  

সেচনে জলাধার 

কৃষিপণ্য। কার আবিষ্কার? 

অন্তিম শয়ন, শয়নে ভূধর 

 

পাতার নীচে শীতকাল 

আর কথা পর্ণমোচী 

শ্রোতা অবিনশ্বর খোলামকুচি 

আর ভ্যাকসিনে আস্ত মহাকাল  

​

দাবী পুনরায়, ছড়াও বীজ 

বীজ? কোথায় বীজ? এখন রাজা গোটা তাবিজ।

লালকুঠির ভিতর লাল জবা 

 

সন্দর্শনে হাত পাতে 

নিছক যন্ত্রের সর্বনাশ  

 

অশনি সংকেত 

 

অস্থির ভ্রমণে বাজি রেখে হারে 

সম্পত্তি দেবোত্তর 

বৃদ্ধি পায় উত্তর মেরুর দলিলে 

পাংশুটে চেহারার সরু নামাবলী 

আর নিছক প্রশ্নোত্তর 

 

নিয়োগ নেই অতপর 

অতপর 

বিকেল থেকেই বৃষ্টি 

ভরপুর জয়পুরে  

গোলাপি পরাজয়ে। 

এক পক্ষের স্বাভাবিক মৃত্যুতে 

 

এক পক্ষের স্বাভাবিক মৃত্যুতে 

সাক্ষী অন্য পক্ষ 

শহরের জনরবে আছে ভ্রমর আছে 

আছে দৃশ্য 

রক্ত বিপণি 

আর দাগ অধুনালুপ্ত বিশাল তৃণভোজী 

আর স্নায়ুকে কেউ উপেক্ষার নেই 

শুধু আছড়ে পড়ে ঢেউ 

আর শিহরিত হওয়ার কেউ নেই।  

​

​

হতাশ হয়েছে বাতাস 

 

ছড়ানো রূপকথা 

হাতের কাছেই পঞ্জিকা 

গঞ্জিকা সেবনে পত্রিকা 

ব্যস্ত পরিক্রমায় হাড়হিম চুপকথা  

কবিতা

পার্থ সরকার 

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

art1.jpg

যেখানে ঠিকানা বরাদ্দ একটা সূর্যাস্ত​

 

সব শহরে সবার নিজস্ব দুঃখ থাকে তা নয়
তবুও সবার সাথেই হেঁটে যায় সাগরের উদ্দাম উচ্ছলতা
আমরা আমাদের নিজেদের চৌহুদ্দি আঁকি
আর আমার পুরোনো পাড়ায় যে দুঃখ ভেসে বেরায় আমি
তার হদিশ জানি না

আমরা অন্য পৃথিবীর গান কেউ শুনিনি 
যদিও আমরা আমাদের গান গাই যে যাঁর নিজের মতো
গানের শব্দ গুলো পরিযায়ী পাখিদের সাথে ভ্রমণে বেরোয়
আর পাখিদের পালকের সাথে ভেসে চলে শূন্যতায়

কবিতাঃ উদয়ন চক্রবর্তী

আমরা নিজেকে নিংড়ে বাড়ি ফিরি আর

রাত ভোরে স্বপ্ন দেখি

একটা কৃত্তিম মেধা আমাকে চিবিয়ে খাচ্ছে
আর ছিবরে পড়ে থাকছে অনাথ শিশুর মতো

আমাদের দৃষ্টির বাইরে যে প্রাচীন আকাশ আছে
সেখানে কেউ আমাদের দেখছে কিনা জানি না
যদিও ধ্রুবতারা কিংবা লঘুসপ্তর্ষি মন্ডল ছিল আজও আছে

সন্ধ্যায় কিছু জিনিস মারা যায় জন্ম নেয় অন্ধকার
আমরা যদি নিজের নৌকো নিজেই না হাল ধরে রাখতে পারি
সেখানে কোনো অজুহাত একটা অজুহাত মাত্র
যেখানে ঠিকানা বরাদ্দ একটা সূর্যাস্ত।

rangasthalam2.jpg

কবিতা

উদয়ন চক্রবর্তী, কন্যাগড়, হুগলী

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

DIFFERENTIATION করি না –  


যারা হনুমান নৃত্য করছে –

আর যারা DA বাড়াবার - মাইনা বাড়াবার জন্য –

এদের সমর্থন করছে –

এদের মধ্যে DIFFERENTIATION করি না –

যারা প্রকাশ্যে -

দিবালোকে MOB LYNCHING করছে -

আর যেসব SCIENTIST -

PROFESSOR রা এসব দেখেও -

SEMINAR -

TRANSCRIPTION FACTOR এর আধুনিক দিক নিয়ে LECTURE দিচ্ছে -

এদের মধ্যে DIFFERENTIATION করি না –

যারা ইতিহাস জুড়ে NUCLEAR BOMB -

আর বিশ্বযুদ্ধ -

গণহত্যা সংগঠিত করেছে -

আর যারা শান্ত রান্নাঘরে চুপিচুপি শিখিয়ে যাচ্ছে –

মানুষ হওয়ার TECHNIQUE –

এদের মধ্যে DIFFERENTIATION করি না —

​

রাক্ষস - দেবতা – এবং –

রাবণ সন্ন্যাসীর বেশে সীতাকে হরণ করেছিল –
শিব পার্বতী কে বলে -
আমি সবাইকে মাপ করতে পারি -
কিন্তু যারা সন্ন্যাসীর নাম খারাপ করে -
তাদের কখনো নয় -
রৌরব নরকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিন -
যে ভন্ড সাধু রা -
অবিশ্বাসী -
পয়সার জন্যে –
অজ্ঞানী হয়ে জ্ঞানী সাজার অভিনয় করছে –
সাবধান –

কবিতাঃ বিশ্বজিৎ মজুমদার

হিজড়ে বাঙালি - রাজাকার বাঙালি –


একদিন যখন কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে বৃদ্ধা র ব্রা নিয়ে উড়ন্ত ছবি দেখেছিলাম খবরের কাগজে -

রাজপ্রাসাদ থেকে হাঁস চুরি বা মূর্তি ভেঙে প্রস্রাব করার ছবি -

এসবে ভবিষ্যৎ আমি অনেক আগেই বুঝে নিয়েছিলাম –

পালাবার পথ বন্ধ -

না হলে কবে পালিয়ে যেতাম –DA -

মাইনা বাড়ানোর জন্য -

রাজাকার বাঙালিদের দেখে -

কোন সংস্কৃতি নয় -

ঘৃণা জাগে –

মনে হয় -

বাদল সরকার -

না ন্দীকার -

ঋত্বিক ঘটক -

গোদার -

ত্রুফো -

জর্জ বিশ্বাস -

শান্তিনিকেতন -

আমি ভালোবাসি এইসব -

আমি CULTURAL CAPITAL এর নন্দন -

এর পিছনে আসলে অভিনয় -

চাকরি না পাওয়া বেকারত্ব কে বাইরে হা হা দেখানো -

ভিতরে ফুঁপিয়ে কাঁদা -

আর উল্টোদিকে বিরাট NETWORKING -

LONDON -

PARIS -

SAN DIEGO -এর 

বিপরীত ছবি নয়তো!!!???
 

আমি কেন আর সেমিনার এ যাই না

​

গত ২০ বছর কোন গ্যাটের কড়ি খরচ করে “ SEMINAR / CONFERENCE “-- এ যাই না —!!!

কেন জানেন!!!????


প্রথমত সেইসব “ DRUG COMPANY “-- অমুক ওষুধ লিখুন – EUROPE TOUR পাকা –

বা -

CM অপিসে একটা APPOINTMENT করিয়ে দিন –

AFRICAN SAFARI করিয়ে দেবো!!!--

আমার ক্ষমতা নেই!!!


আর যখন সত্যিই ২৫ বছর আগে PHD করবো –

PDF –

বিদেশে ভালো RESEARCH করবো -

তখন হাঁটুতে IQ --করিনা কাপুর -

বিপাশা বসু — US এ সুযোগ পেয়েছে!!!!!

আর আমরা DEDICATED RESEARCH SCHOLAR –

ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়িয়েছি কুত্তার মতো -অমোঘ ভাবে -
আর লবি বাজিকে -ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছি ---

 

teacher1.jpg

কবিতা

ডঃ বিশ্বজিৎ মজুমদার, কলকাতা 

unnamed_edited.jpg

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

পুজোর ছুটি

​

ভাদর মাসে, কাশের বনে
রোদের ঝিকিমিকি,
দুয়েক পশলা বৃষ্টি হলেই
আমরা সবাই বাঁচি। 

আশ্বিন মাসে ভোরের বেলা
শিশির ভেজা পদ্ম পাতা,
মা দুগ্গার আগমনে
বন্ধ যে বই খাতা।

maaforall.jpg

কবিতা

প্রসেনজিৎ দে, বারাসাত, কলকাতা 

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

কবিতাঃ প্রসেনজিৎ দে

রিফা

​

একটা রয়েল এনফিল্ড আসবে বলে শব্দ করে চলছে সুজুকি
ট্রাম্পেটের তালে জ্যাজের সুর তুলছে কোন গায়ক
ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে রাখতে পারছে না মাংসের দাম
ইটের রাস্তায় হাঁটছে সদ্যই বিয়ে করা যুবক-যুবতী
আগুনের পরশমণি বইছে কতক ভবনে
নিউজে দেখা গেল উদ্ধার হয়েছে পুরানো কোনো বোমা 
কোন পাপে যেন ডাস্টবিনে পাওয়া গেল সদ্যোজাত শিশু

kolkata1.jpeg

কবিতা

সম রায়হান, গাজিপুর, বাংলাদেশ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

মিরপুরে চলছে আনন্দজোয়ার বিহারিদের জন্য না
টকশোতে এগিয়ে আসছে গণমানুষ—
বিষের থলি উপেক্ষা করেও উৎপাদন হলো আমনের ধান
অথচ আবারো চাঁদে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে মানুষ।
রাস্তার ধারের মানুষটার চোখ খুঁজছে খোলা জানালার পাশে মোবাইল হাতে অসতর্ক আরেকটা মানুষ
সংকুচিত করা হবে না কি যমুনাকে!
সমস্ত বিস্ময় উপেক্ষা করে দেশ ছাড়ছে মানুষ—
আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না রিফা।

কবিতাঃ সম রায়হান

আমার গাঁ


এই যে আমার গাঁ
ঝুপ করে যেথায় সন্ধ্যা নেমে
ছড়িয়ে থাকে
উঠোন জুড়ে
মায়ের কাজের বাহানা
তার সাথেতেই ওঠে জ্বলে সর্ষের তেলের কুপি
হারিকেনের সোনা আলোয় ঝিঝি পোকার সারি
আর শুরু হয়,
ভাইবোনেদের গলা মেলানো সুর
মায়ের ভাষার মধুর ছোঁয়ায়
অ আ ক খ আর কতো গল্পের দূর
আমের পাতার মিষ্টি ঘ্রাণে মন ভরে যায় ভারী
তার ই নরোম পাতার ফাঁকে চাঁদ উঠে কয় বাহ রি!
চরকা কাটা চাঁদের বুড়ি 
উঠোন বিছিয়ে বসে
চিনবে আমায়?
নেবে সঙ্গে ওই দূর অলীকের পাড়ে?

​

কচি ধানের সরু ক্ষেতের আইল বেয়ে যে নামে 

কৃষক চাচার সেচের পানি 

রাত যে নিঝুম হলেই

village3.jpg

কবিতা

অস্মিকা আলম 

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

পূবের হাওয়া সেই নদীতে সুরখানা যে তোলে 
সেই সুরেতে চোখ মুজে ভাই নুয়াই মাথা বইয়ে
মা ডাকে যে আয় রে খোকন
এবার যাবি ঘুমে
ভোর হলে যে উঠবি ওরে
দেরি হলো বলে

​

ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি আর পক্ষীরাজের ঘোড়া 
দূর প্রাসাদের দ্বারে আমায় থামায় নিয়ে ওরা
ওই দেখা যায় সুয়োরাণী 
ওই যে সোনার বাঁশি
মস্ত বড় সেপাই আমি এই ভাবনায় ভাসি
বাঁশঝাড়ের ওই ঝোপ থেকে এক
হুক্কা হুয়া ডাকে
ছমছমে কি আবেশে ভাই
প্রাণ তাই আমার কাঁপে
ওই যে এক অরূপ ঘোড়া 
দিয়েছে এক ছুট
মধ্যরাতের সেই জোছনা আলোয়
পড়শী জানে 
এই শুনেছি খুব

 

নরম কাথার নিচে এবার মুখ গুঁজে ভাই পালাই
মায়ের গায়ের ওমে হারাই 
নিবিড় মায়ার আভায়

কবিতাঃ অশ্মিকা আলম
পুস্তক আলোচনা

পুস্তক আলোচনা

ড. বিশ্বনাথ মজুমদার, বেঙ্গালুর

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

বাসি গল্প

টাটকা স্বাদ 

ড. রথীন্দ্রনাথ বড়াল

Former Head Immunoregulation & Immunodiagnostics
Chittaranjan National Cancer Institute

basi-galpo.png

সমালোচক পরিচিতি: ড. বিশ্বনাথ মজুমদার

বেঙ্গালুরু নিবাসী একজন ক্যানসার বিজ্ঞানী। গবেষণার মূল বিষয় — ইম্যুনোলোজি ও ক্যানসারের অণুপরিবেশ-ভিত্তিক পার্সোনালাইজড চিকিৎসার প্লাটফর্ম। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি—বিজ্ঞানী জীবনের শুরুতে বেশ কয়েক বছর জাপানে, আমেরিকার  পিটসবার্গ ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা করেছেন। বেশ কিছু  কবিতা ও প্রবন্ধ ছাড়াও সম্প্রতি আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত 'ওষধি নিম: ক্যানসার চিকিৎসার নতুন দিগন্ত' বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন।

​​

সেই কবে কবি বলেছিলেন, "জেনো, বাসনার সেরা বাসা রসনায়।" আর বাঙালির মোক্ষের শেষ পিন কোড তাঁর প্রিয় মিষ্টির দোকানে। 'বনলতা সেন'- এর সাথে 'ভজহরি মান্না'র সেখানে কোনো বৈরিতা নেই। 'বাসি গল্প টাটকা স্বাদ'-এ ক্যানসার ইম্যুনোলোজি ইম্যুনোথেরাপির বরিষ্ঠ বিজ্ঞানী ও প্রিয় লেখক ড. রথীন্দ্রনাথ বড়াল সেই সব মিষ্টি নস্টালজিয়া ও 'নস্ট লজিক'-কে আশ্রয় করে ভোরের রাগ রাগিণীর আলাপে ডুব দিয়েছেন| মূলত শৈশব থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি জীবনের নানা টুকরো স্মৃতি মোট চোদ্দটি গল্পে লেখক আমাদের সাথে ভাগ করে নিয়েছেন| বৈঠকি আড্ডার ঢঙে লেখা এর গল্পগুলোতে টক-ঝাল-মিষ্টি-নোনতা — সব স্বাদের সন্ধান মেলে — আমাদের নিয়ে যায় স্মৃতিবেলার গলি থেকে রাজপথ হয়ে ধুসর গোধূলি প্রান্তরে। সেখানে প্রজাপতির পাখায় সকালের আলো এসে পরে। বিগত শতাব্দীর ষাট-সত্তরের দশকের আশেপাশে যাঁদের জন্ম, এই গল্পগুলোর স্থান-কাল-চরিত্র তাঁদের সময়ের ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়ার চলমান স্মৃতিভাষ্য। শৈশবের শুরুতে পিতৃ-বিয়োগ তাঁকে জীবনের অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারের শেষে আশাবাদের আলোকশিখা দেখতে শিখিয়েছে। তাই তাঁর সৃষ্ট গল্পমালায় যেমন প্রদীপের আলো আছে, তেমনি তার নিচে জমাট বাঁধা অন্ধকারের কথাও চাপা পরে থাকেনি। এখানে সাহিত্যের সেই মানবিক মুখটিকে আমরা আরো একবার খুঁজে পাই। গল্পগুলো পড়তে পড়তে মন চলে যায় কল্লোলিনী তিলোত্তমার সকাল-বিকেল-সন্ধ্যার কোলাহলমুখর পুরোনো পাড়া, তার বাড়ি-ঘর, ছোটবেলার খেলাঘর, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, মাসিক পত্রিকা, বৌবাজারের সাবেকি ঐতিহ্য, রথযাত্রা-দূর্গা পুজো- কালী পুজোর মতো বারো মাসে তেরো পার্বণ, ট্রাম লাইন, কলেজ স্ট্রীটের বইপাড়া, কফি হাউজ ও রসনার উদযাপনের দিনগুলিতে — যার  জায়গা এখন শুধুই  স্মৃতির চিলেকোঠায়। সুন্দর হাতের লেখার জন্য স্কুলের শিক্ষকের কাছে মার খাবার গল্পটি বেশ উপভোগ্য ও অর্থবহ। কথায় বলে, মাছে-ভাতে বাঙ্গালি। মাছ ছাড়া বাঙালির কোনও কাব্যই সম্পূর্ণ হয় না। দুই বাংলার মাছের নানা পদ নিয়ে জিভে জল আনা বর্ণনায় লেখকের গল্প বলার তরিকাটি বেশ মনে ধরে। নিজে ঘটি হয়েও কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে এপারে আসা ছিন্নমূল মানুষদের পরিশ্রম ও প্রতিষ্ঠালাভের

লড়াইকে তিনি যে শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন, তাতে তাঁর পরিণত ইতিহাসবোধ স্পষ্ট (‘বাংলার পূর্ব পশ্চিম’)। এর জন্য ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগানের খেলা হলে লাল-হলুদ গ্যালারি তাঁকে তাঁদের মধ্যে সাদরে বসার জায়গা করে দেবে! স্মৃতি যত বাসি হয় তত বেশি তাতে মেদুরতার মেঘ-রোদ্দুর খেলা করে। বাউল মনের একতারাতে তার সুর বাজে। আর এক বড়াল কবি — অক্ষয় কুমার বড়াল তাঁর একটি জনপ্রিয় কবিতায় লিখেছেন, “খসে খসে পরে পাতা, মনে পরে কত গাঁথা, ছায়া ছায়া কত ব্যাথা, ঘুরে ধরাধামে।” পাতা খসুক —ছায়া দীর্ঘ হোক —ব্যাথা গাঁথা হয়ে থাকুক — কিন্তু তার মধ্যেই মন আনন্দ খুঁজে চলুক। সেই তাগিদ নিয়েই উনিশ শতকের বাবু কালচারের নিভু নিভু আলোয় মধ্যবিত্ত বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কোলাজ লেখক তাঁর বইতে অলংকার বর্জিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন। স্কুলের ছাত্রদের দুষ্টুমির বিবর্তন—তার সাথে পাল্লা দিয়ে মাস্টারমশাইদের 'নিউটনের তৃতীয় সূত্র'র প্রয়োগ — সে সময়ের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের শ্রদ্ধাপূর্ণ অথচ প্রাণবন্ত দিকটি মনের আয়নায় মেলে ধরে ('প্রহারের আর্কাইভ')। 'গ্রীষ্মের দুপুর’-এ লোডশেডিংয়ের দুঃসহ যন্ত্রণাকে বিষয় করে অঙ্কন প্রতিযোগিতায় বাজিমাত — লেখকের শিশু কাল থেকে লালিত সৃজনশীল মনের একটা আভাস দেয়। শীতের দুপুরে মা-কাকিমাদের উল বোনার সেশন ও শেষে সেই সোয়েটার যখন গায়ে উঠতো, তার স্বর্গীয় অনুভতি হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের মায়াময় উষ্ণ স্পর্শকে ফিরিয়ে আনে। ‘মুড়ি কিচেন নাইফ ও চাঁদের হাসি’-তে লেখক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষামূলক ভ্রমণে মজার সব ঘটনা বলেছেন; তাতে গল্পের স্বাদে এক ভিন্নতর মুচমুচে বৈচিত্র্য যোগ হয়েছে।
প্রবাসে মাতৃভাষার প্রতি বাঙালির যে অমোঘ টান, তার কথা বলে স্বদেশে সেটা বাঁচিয়ে রাখায় যে ততটাই অনীহা — সেই পার্থক্য আমাদের মনে বেদনা সৃষ্টি করে। সেই সূত্র ধরেই ভূমিকায় আজকের দিনে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়া নিয়ে লেখকের আক্ষেপ খুবই যথাযথ মনে হয়েছে। কিংবদন্তি বটতলার প্রকাশনার ইতিহাসের সাথে তাঁর পূর্বপুরুষদের দীর্ঘ ব্যাবসায়িক যোগ বইটিতে অন্য মাত্রা দিয়েছে। ঝকঝকে ছাপার গুণ বইটিকে সুখপাঠ্য করেছে; মুদ্রণপ্রমাদও প্রায় শূন্য। এই কারণেও  লেখক ও প্রকাশকের বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য।
শিয়ালদহের গোমেজ লেনের পৃথিবীর সরুতম গলি, বাউন্ডুলে ঘুড়ির আকাশে কাটাকুটি খেলা— সেই সময়ের তীরভূমিতে মধ্যবিত্ত বাঙ্গালির সংকট, প্রেম-বিরহ— এইরকম কয়েকটি বিষয় বইতে অধরাই থেকে গেলো। জানি এই আত্মপ্রতিফলনের কোনও শেষ নেই, তবু আশা রইলো পরের বইতে সেই কথা শোনার। সব শেষে, ‘ওল ঢোল এগরোল বেলফুল মালা’ এই সব নিয়ে দুধে-ভাতে—থুড়ি, মাছে ভাতে— থাকুক আমাদের প্রিয় শহর, তার মানুষজন ও শেকড়— সেই বার্তাই হৃৎস্পন্দনের মতো এই বইয়ের পাতায় পাতায় ধ্বনিত। এই বই তাকেই হৃদমাঝারে আঁকড়ে রাখার কাহিনী।


বাসি গল্প টাটকা স্বাদ 
ড. রথীন্দ্রনাথ বড়াল  

Former Head Immunoregulation & Immunodiagnostics
Chittaranjan National Cancer Institute
অরিত্র প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ: কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা, ২০২৫
মূল্য: ২০০ টাকা
Website: aritraprakashani.com

Email: aritraprakashani@gmail.com

najma.png

আশার ঘর

নাজমা মুখার্জী

মুল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

banglow.jpg
বাংলা অনুবাদ - আশার ঘর

লেখক পরিচিতি – অসমিয়া ভাষার অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপিকা নাজমা মুখার্জী অসমিয়া ভাষার একজন বিশিষ্ট গল্প লেখক, ঔপন্যাসিক এবং ব্যঙ্গ রচয়িতা। রচিত গ্রন্থ সমূহ ‘পপ অসমীয়া’, ’আকৌ পপ অসমীয়া’ এবং ‘চিনাকি চুবুৰি অথবা আকৌ এবাৰ পপ অসমীয়া‘। এগুলি ছাড়া আরও দশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।​

​

​

​

​

অনুবাদক পরিচিতি- ১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি। হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ (সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য অকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

​​

​​​​​​​​শেষ পর্যন্ত বিলটাতেও মানুষের চোখ পড়ল। সরকারের কাছে দাবি জানাল। গ্রাহ্যও হল। দখলের অনুমতিও পাওয়া গেল। স্যারের নেতৃত্বে একদল মানুষ জমায়েত হল। তিনি লাল চোখ দেখিয়ে বললেন, ‘বিলটাকে ঘিরে ফেল।’ পরম শক্তিমান স্যারের কথা শুনে লোকগুলি আনন্দ, শিহরণ, সংশয় এবং ভয়ে একাকার হয়ে গেল।হাতে হাতে গোটা গোটা ভলুকা, জাতি বাঁশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সীমানা স্থির করে ফেলল। এই অংশটা আমার, সেটা তোমার। স্যারের জন্যও তাঁরা সযত্নে একটা অংশ ঘিরে দিল। সুন্দর প্লট।

এরা প্রথমে কথাটা শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। খাওয়া দাওয়া বন্ধ। বিলের পাশে কদম গাছটাতে থাকা বাড়িগুলি আশ্চর্যভাবে শান্ত। ছেলে মেয়ে, মায়েদের দেখাদেখি নেই। শুধুমাত্র বাবারা নিচে নেমে এসেছে। কেউ বিলের পারে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। কেউ লম্বা লম্বা পা ফেলে পায়চারি করতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে বহুদূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে আবার ধীর গতিতে ফিরে এসেছে। আশেপাশে মাছের সফল কিম্বা মন্থর গতি। মনোযোগই নেই।

রাতে সভা বসল। গুরু গম্ভীর, বয়স্ক ছেলেমেয়েদের জ্যাঠা বললেন, ‘এভাবে জায়গা দিতে পারব নাকি? তিন পুরুষ ধরে বাস করছি। এটাই আমাদের জীবিকার স্থল। মানুষ নিজের ইচ্ছামতো যা খুশি করবে তা তো আর মেনে যাওয়া যায় না। ধরিত্রী আমাদেরও মাতা। তাছাড়া জায়গাটার প্রতিও তো মায়া মমতা আছে!’

তরুণ ভাইপো কথাটা সমর্থন করল, ‘জ্যাঠা ঠিকই বলেছে। এই অন্যায় সহ্য করা হবে না।’

মা বলল, আমরা চুপচাপ বসে থাকাটা অনুচিত হবে জ্যাঠা।’

বিলটার অন্যপ্রান্তে দলিত, অবহেলিতের হয়ে কথা বলা বয়োবৃদ্ধা সমাজ সেবিকার ঘর। সকালবেলা দল বেঁধে গিয়ে কোনোমতে লজ্জা ভয়ে কথাটা উত্থাপন করতেই তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘শোন, আমি মানুষের সেবিকা, তোদের নই।’

লম্বা লম্বা পা ফেলে তারা ফিরে এল। ক্রোধ অভিমান হতাশার মিলিত অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে মুখগুলিতে। যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায়, পরিত্যক্ত প্রাণীর দল। আস্তে করে কেউ ঠেলে দিলেই পৃথিবী থেকে পড়ে যাবে।

কম বয়সী দুই চার জন বিলের পাশে ঘোরাঘুরি করছিল। স্বজাতি দলটা ফিরে আসায় এগিয়ে গেল।কারও মুখে কথা নেই। উদগ্রীব।

একটা থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হল। জ্যাঠা কাউকে কিছু না বলে পাখা ঝাপটে কদম গাছটার কাছে গেল। মাত্র কয়েকদিন আগে কাঁঠালের ডাল দিয়ে নতুন করে বাসাটা তৈরি করেছে। মাঝখানটা এত সুন্দর। গোলাকৃতি। গভীর। রাতে বড়ো আরাম করে ঘুমোয়। সে  চোখটা বুজে নিল।সঙ্গে সঙ্গে শিউরে উঠল। স্যারের মুখটা চোখের সামনে ভাসতে লাগল। তার খাকি পোশাক জোড়া, মাথার টুপি, প্যান্টের পকেটের পিস্তলটা। ভলুকা এবং জাতি বাঁশ। বিলটাকে কেউ যেন লাঠি দিয়ে খুঁচিয়েছে। শরীর থেকে ধারাসারে রক্তপাত হয়েছে। সে নিজে সঙ্গে গোটা পরিবারটা রক্তে মাখামাখি হয়েছে। কদম গাছটা কেউ কাটতে শুরু করেছে। সে কেঁপে উঠল। তড়িৎ গতিতে উড়ে গিয়ে পাশের বেল গাছটাতে বসল। সেখান থেকে শহরটা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়।

দেখতে দেখতে জায়গাটা কীভাবে বদলে গেল। শৈশব থেকে তো সে এখানেই বড়ো হয়েছে। শুধু জন্মটা এখানে হয়নি। দূরান্তের গ্রামের পাশে থাকা অনেকগুলি শিমুল গাছ জুড়ে ছিল তাদের বাড়িঘর। পাশেই পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে থাকা বিস্তৃত জলাশয়। আশেপাশে ছোটো ছোটো জঙ্গল। গ্রামের মানুষগুলি প্রায়ই খড়ি-কুড়োনোর  জন্য আসে। কখনও বা জঙ্গল থেকে লাঠি কুড়িয়ে নেয়, কখনও দলবল নিয়ে এসে বড়ো গাছও গড়িয়ে নেয়। সেদিন যেন মানুষগুলোর উৎসব। হাসি-ঠাট্টার আর শেষ নেই। এভাবেই একদিন শিমুল গাছগুলিকেও মানুষগুলি ধ্বংস করল। উপায় না দেখে তাকে কোলের শিশু অবস্থাতেই নিয়ে মায়েরা এখানে এসেছিল। বাকি ভাই বোনদের এখানেই জন্ম হয়েছে।

বড়ো হওয়ার পর থেকেই সে দেখছে, জায়গাটাতে খাবার জিনিস অফুরন্ত। মাছ তো মাছই, সাপ, ব্যাঙ কত কী! এটা অবশ্য বহুদিন আগের কথা। এখন আর আগের মতো নেই। তথাপি যা আছে সেটাই বা কম কীসে? মোটের ওপর জায়গাটা ভালো। থাকার চিন্তা নেই, খাওয়ার চিন্তা নেই।সেইজন্যই বোধহয় জায়গাটার প্রতি তাঁদের মমতা!

তাঁর মাথার চুল একেবারে কমে এসেছে। যে কয়েকটা আছে সেটাও দাঁড়িয়ে আছে। বয়স তো কম হয়নি। আটবছর পার হয়ে গেছে। স্ত্রী তো কবেই ওপারে চলে গেছে। বয়সের জন্য নয়, দুঃখ-শোকে বিদায় নিয়েছে বেচারি। একমাত্র ছেলের শোকে। জীবন্ত সেই স্মৃতিগুলি মন থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই দৃশ্যটা দেখতে পেল — একটা বিড়ালের বাচ্চার শবকে নিয়ে কাকদের কোলাহল। ছোটো কাক, কুচকুচে কালো দাঁড়কাক। কিন্তু দাঁড়কাক দুটোর উৎপাতে এরা কেউ কাছে যেতে পারছে না। ওরা দুটো যখন মাথা নিচু করে শবটাকে টানা হেঁচড়া করতে থাকে, এরা সবাই লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যায়। ওরা মাথা তুললেই এরা ভয়ে পিছিয়ে আসে।    

সে একবার শরীরটা নাড়িয়ে নিল। বসে থাকলে তো হবে না। কিছু একটা করতেই হবে। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে সে এবার উড়ার জন্য প্রস্তুত হল। পথ যে খুব দূরে তা নয়, তবে খুব কাছেও নয়। সে দক্ষিণমুখো হয়ে উড়তে শুরু করল। কিছু দূর গিয়ে এক জায়গায় বসে পড়ে। আবার উড়তে শুরু করে। একনাগারে বেশি দূর যাওয়ার অভ্যাস নেই তাদের। স্যারের সরকারি কোয়ার্টারের কাছে গিয়ে সে নিচে নেমে এল। বাঁকটাতে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিল। বুকটা ধড়ফড় করছিল। প্রকৃতিস্থ হল। তথাপি একটা ভয় ভয় ভাব মনের মধ্যে খোঁচাতে লাগল। সে ধীর পদক্ষেপে এগোতে লাগল। স্যারের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। বাড়ির সামনের গেটটা খোলা। তার ঠিক পাশেই একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে সে উঠোনের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার সামনেই তরতাজা পোষা বিড়ালটা  শুয়ে ছিল। তাকে দেখেই হঠাৎ উঠল। বাধা দেওয়ার ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে তার বিচিত্র শরীরটা, গলার কাছটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। ব্যস্ত পদক্ষেপে বৈঠকখানা ঘর থেকে পর্দা ঠেলে বেরিয়ে এলেন স্যার। অফিসের জন্য বেরিয়েছেন। ঠিক পেছনেই ব্রিফকেসটা হাতে নিয়ে দিদিমণি। মাথা নিচু করে বিনীতভাবে সে আরম্ভ করল – আমাদের কী হবে! আমরা কোথায় যাব স্যার! আর যাব বললেই কী যেতে পারি? সুযোগ-সুবিধারও তো কথা আছে। বিলটা ঘেরাও করে নিয়েছে, কদম গাছটাও নাকি কেটে ফেলবে!

– হ্যাঁ কাটব তো।

– আমরা কোথায় যাব?

– শোন ওর কথা। আমি কী জানি তোরা কোথায় গিয়ে মরবি। পাহাড় কেটে সেখানে মাটি ফেলব, বিলটা ভরাট করব, গাছ কাটব, সুন্দর বাড়ি বানাব। ছেলে মেয়ে নিয়ে সুখে বাস করব। কুকুর পুষব, বিড়াল পুষব।

– আর আমরা?

– ঐ কী তর্ক করতে এসেছিস? চড় মেরে মুখ ভেঙ্গে দেব একেবারে। ওদের কথা ভাবতে হবে! কত কষ্টে জায়গাটা জোগাড় করেছি! কুকুররা কী বুঝতে পারবি? যা!যা! ভালোয় ভালোয় এখান থেকে চলে যা। না হলে… সার প্যান্টের পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে নিলেন। তাঁর রাগ উঠে গেছে। কিন্তু লোকটি মোটেও ক্রোধে কাঁপছেন না। সবকিছু হাতের মুঠোতে থাকার পরেও প্রতিপক্ষকে অতি সহজে আয়ত্ত করতে পারার পরেও মানুষ যেভাবে অপ্রয়োজনীয় বীরত্ব দেখায়, সেরকম বীরত্ব তিনি দেখাতে চাইছেন।

BasudevDas.jpg

প্রাণের ভয়ে সে চিৎকার করে উঠল। দিদিমণি স্যারকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে স্যার গিয়ে গাড়িতে উঠলেন। কাঁপতে কাঁপতে কোনোভাবে পড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে সে দাঁড়িয়ে রইল। করুণা মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাঁর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে ভেতরে যেতে চেয়েও দিদিমণি বারান্দার চেয়ারটাতে ধপ করে বসে পড়লেন। অবিরাম কাশতে শুরু করলেন। ভালোভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছেন না। বড়ো মেয়ে দৌড়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। মুখের ভেতরে কিছু একটা জিনিস দিয়ে কিছুক্ষণ স্প্রে করতে লাগল। দিদিমণি কিছুটা প্রকৃতিস্থ হল। তারপরে মেয়ের কাঁধে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে চলে গেলেন।

এতক্ষণ সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আকষ্মিক সেই ঘটনাটা দেখছিল। দারোয়ান ধমক দিয়ে উঠায় তার সম্বিত ফিরল।…এ্যাই ক্যায়া দেখ রহা হ্যায়, ম্যাডাম কা দম বন্ধ হোনে যা রহা হ্যায়। আউর ইয়ে শালা… যা ভাগ… লাঠির আঘাতটা পিঠে পড়ার আগেই সে দৌড়ে বেরিয়ে এল। বুকটা কেমন যেন খালি খালি মনে হচ্ছে। শরীরটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আসলে শরীরটা নয়, বোধহয় মনটা। মনটা ক্লান্ত হলেই উদ্যম হারিয়ে যায়, শরীরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দুপুর হতে চলেছে। ধীরে ধীরে সে বাড়িমুখো হল। উড়ার শক্তি নেই, তথাপি উড়ছে। এখন একমাত্র আশ্রয় হল বাসাটা। অন্য কোথাও শান্তি পায় না, সে জানে। 

ভাইপোরা গাছেই বিমর্ষভাবে বসে আছে। জ্যাঠাকে দেখে এগিয়ে এল। আশেপাশে থাকা জায়গার খোঁজে গিয়েছিল ওরা। কিন্তু কোথাও বিন্দুমাত্র জায়গা নেই। সব জায়গাই মানুষের অধিকারে। গাছপালাতো এমনিতেই কেটে শেষ করে দিয়েছে। তাই জায়গা পরিবর্তন করা আর সম্ভব হবে না। বরং জীবনের গতিপথ পাল্টে দেওয়া যাক। না হলে সংখ্যা কমে কমে একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হবে। পরিবেশ ওদের বেঁচে থাকতে দেবে না।

কথাটা তার ভালো লেগেছে। মনঃপূত হয়েছে। স্যারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময়ের হতাশা, নিরাশাগুলি শীতের কুয়াশার মতো মনের গহন ছেড়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ঠিকই এখান থেকে কোথাও যাবে না! এখানেই থাকবে অন্য উপায়ে। ক্ষণিকের মধ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তটা তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল– মনের মতো ঘর  তৈরি করার জায়গা আর নেই। তাই জায়গা পরিবর্তনের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেকে পরিবর্তিত করে ফেলি এসো।

ভাইপোরা উচ্ছ্বসিত– ’হ্যাঁ বেঁচে থাকার কৌশল আয়ত্ত করতে হবে জ্যাঠা। নতুন কৌশল। আসলে ওরা রোমান্টিসিজমে বিশ্বাসী, অ্যাডভেঞ্চারে আগ্রহী। এটাই তারুণ্যের ধর্ম।

কম বয়সীরা তার মুখের দিকে তাকাল। তার কথা শুনে ওদের উচ্ছ্বাসের সীমা নেই – খুব ভালো হবে। মানুষ কত কী খায়!

– না না অসম্ভব। কখনও সেভাবে থাকিনি, খাইনি। তামাশা করিস না। দাদা- ভাইরা উত্তেজিত।

মা এগিয়ে এল– জ্যাঠা ভালোইতো বলেছেন। এছাড়া আর অন্য কোনো উপায় আছে কি? সত্যিই তো এর চেয়ে ভালো উপায় আর কিছু খুঁজে পাবি না।

শোন, অনাগ্রহীদের সমস্বর।

দেখতেই পাচ্ছিস শহরটাতে কতগুলি রান্নার কারখানা। মা মাথাটা কিছুটা ওপরের দিকে তুলে একটা হোটেলের দিকে দেখাল। সেখানে অনেক জিনিস রান্না হয়। মাছ থাকেই। লোকেরা মাছ খায়। খাবারের উচ্ছিষ্ট –এই যে দেখছিস বাক্সগুলি, এর মধ্যেই ফেলে যায়। সেসব আমরা খাব। আর এই সিনেমাহলটির ছাদে থাকব। সুন্দর হেলানো লাল ছাদ। এখানে মানুষ আসে না।

তিনি এবার এগিয়ে এসে এককথায় সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন, অরণ্য, জলাশয় ক্রমশ মানুষের বাসযোগ্য ভূমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তাই আমরা আশ্রয় নেব বহুতল বিল্ডিঙের পরিত্যক্ত ছাদে, খাব ডাস্টবিনে। পারবি তো?

ভাইরা ইতস্তত করে জবাব দিল—পা… র…ব।

ভাইপোরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল –পারবই।

সেদিন থেকে তারা ষোলো আনা শহরের হাড়গিলা। এতদিন শহরে থাকলেও পুরোনো সেই চাল-চলন নিয়ে তারা শহুরে হয়ে উঠতে পারেনি।        

জীবন যাত্রার মান পরিবর্তিত হয়েছে। বাপ কাকার রীতি তারা ছেড়েছে। বিল্ডিঙের ছাদে রাত্রি বাস। ঘুম থেকে উঠেই নিচে নেমে আসে। বিলের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। ডাস্টবিন থেকে মানুষের উচ্ছিষ্ট খায়। তারপর ছাদে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে।

এর মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে। রাতে ভালো করে ঘুম হয় না। সুন্দর মাঝখানটা গোলাকার– এরকম বাসায় যেন শুয়ে আছে, তা ভেবে আবেশে শরীরটা ছেড়ে দেয়। আর হেলানো ছাদ থেকে ধীরে ধীরে পিছলে পড়তে থাকে তারা। ধড়ফড় করে উঠে। ঘুম ভেঙ্গে যায়। প্রায়ই এরকম হয়– ঘুমের মধ্যে ডানা দিয়ে, পা দিয়ে খুঁজে বেড়ায় গাছের ডাল-পাতা। নেই, নেই। সুন্দর হেলানো চাল তা দিতে পারেনা। 

প্রকৃতি থেকে তারা যেন দ্রুতগতিতে সরে এসেছে। মাছের, সাপের, ব্যাঙের চোখের ভাষা বোঝার প্রয়োজন নেই। মনের ভাষা বোঝার প্রয়োজন নেই। ওদের বধ করার রোমাঞ্চ নেই। কোনো কর্ম চাঞ্চল্য নেই, ধৈর্য ধরার প্রয়োজন নেই।

এটাই আধুনিকতা। এর পরিণতি কী হবে তারা জানে না। নিশ্চয় সময় পথ দেখাবে। সময়ের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে পৃথিবীতে?

দেখতে দেখতে স্যার জায়গাটাতে মাটি ভরিয়ে, কদম গাছ কেটে সুন্দর বাড়ি তৈরি করে ফেললেন। ছবির মতো বাড়ি। সে দূর থেকে দেখে। একদিন দেখল– দিদিমণি, ছেলে-মেয়ে কুকুর বিড়াল সবাইকে নিয়ে নতুন বাড়িতে এসে উঠলেন স্যার।

মাঝেমধ্যে দেখা হয়। স্যার তার দিকে লাল চোখ করে তাকায়। সে মাথা নিচু করে না। আবার বীরদর্পে চলাফেরাও করে না। জীবনের তাগিদায় আপন গতিতে চলে। মাঝেমধ্যে ডাস্টবিনে আসে। অবশ্য খুব কম। নিজের রচনা করা আইনে নিজেই বন্দি হতে চায় না। খুব ইচ্ছা করে জলে ঘোরাঘুরি করতে। পুরোনো সমস্ত স্বপ্ন ক্রমশ ধূসর থেকে ধূসরতর হয়ে পড়ে। তথাপি জীবনে পরিপূর্ণতা এনে দেওয়া সেই জায়গাটার মমতায় সে ভরা পথ দিয়ে হাঁটে। মাথাটা নিচের দিকে করে ঠোঁট দিয়ে কল্পনার মাছ ধরে। স্যারের বাড়ির পাশ দিয়েও যায় এভাবেই।

সেদিন সন্ধ্যা বেলাতেও তাই করছিল। হঠাৎ স্যারের বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসতে শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। স্যারের বুক ভাঙা কান্না, স্যারের ছেলেমেয়েদের। কী বা হল? সে প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে আভাস পেতে চেষ্টা করল। ঠিকই,স্যারই কাঁদছে।… হায়! হায়! আমার সমস্ত কিছু শেষ হয়ে গেল… সমস্ত কিছু শেষ হয়ে গেল…। হঠাৎ তার শরীরের মধ্য দিয়ে একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ বয়ে গেল।…নিশ্চয় কোনো বিপদ হয়েছে। ভালোই হয়েছে। দুঃখ-যাতনা, বিপদ-আপদ কাকে বলে,এবার বুঝুক…ভেবে ভেবে সে প্রবেশদ্বারের লোহার জানালাটার কাছে পৌঁছে গেল। জানালা খোলা। দারোয়ান উঠোনের এককোণে বিমর্ষভাবে বসে আছে। সে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল। দারোয়ান কিন্তু তার দিকে তাকালোই না। সে সুযোগে দ্রুত উঠোনে পৌঁছে গেল। উঠোনে ধূপের প্যাকেট, গাঁদা ফুল ছড়িয়ে পড়ে আছে। এই কার্তিক মাসের সন্ধ্যাবেলা কয়েকজন মানুষ স্নান করে উঠোনের এককোণে দাঁড়িয়ে দিয়াশলাইর কাঠি জ্বালিয়ে হাত-পা সেঁকছে।

ভেতরে স্যার হাউমাউ করে কাঁদছে। সে ঢুকে গেল। তাকে দেখে স্যারের কান্না আরও বেড়ে গেল।…তুই এসেছিস? আয়…আয় …আমার সমস্ত কিছু শেষ হয়ে গেল রে…কত চেষ্টা করলাম …মানুষটাকে বাঁচাতে পারলাম না।…

তাঁর শরীর কেঁপে উঠছে। মন যেন বলছে…দেখ …দেখ…মহাপ্রতাপীটার অবস্থা দেখ। কেমন অসহায় হয়ে পড়েছে! হাস…প্রাণ খুলে হাস…প্রতিশোধ চরিতার্থ কর…এটাই সময়…।

নিশ্বাস দ্রুত হয়েছে। বহুদিন আগে বদমাশ কিছু ছেলে গাছে উঠে ধরে নিয়ে যাওয়া তার শিশু সন্তানের চোখ, শোকে দুঃখে মৃত্যুবরণ করা মায়ের করুণ চোখদুটি মনে পড়ছে।

কিন্তু কোনটা কার চোখ, ঠিক ধরতে পারছে না। মাথাটা ঘুরে উঠার উপক্রম হয়েছে, শরীরটা কেমন যেন করছে। নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে।

মুহূর্তের মধ্যে নিজের কর্তব্যও স্থির করে ফেলেছে। হিংসা, প্রতিশোধ চরিতার্থ বাসনাকে অবদমিত করে সে এগিয়ে গেছে…স্যারের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এবার ওপরের জনকে…।

-বলি নাই ভাবছিস! বলেছি। কত কাকুতি মিনতি করেছি…নিও না,নিও না… ছেলে মেয়েদের অনাথ কর না, এই বয়সে আমাকে পথে দাঁড় করিও না…ভগবান …তোমার দোহাই… আমাকে…স্যার কথা বলতে পারলেন না।

কী বলল সে?

কোনো কাকুতি মিনতি করল না, কাকুতি মিনতি করল না…

বেতের চেয়ারে বসে থাকা স্যার মুখটা ঢেকে ফেলল। জীবনের কঠিন পরীক্ষায় মুখোমুখি হওয়া মানুষটার শরীরটা অবশ হয়ে আসছে। দুঃখে তার মন গলে গেছে। সান্ত্বনার বাণীতে উপচে দিতে চাইছে স্যারের হৃদয়।

…এখন স্যারের শরীরে সহানুভূতির ঠোঁট বুলিয়ে দেওয়ার কথা, ধরে ধরে নিয়ে পাশের কোমল বিছানাটায় শুইয়ে দেবার কথা…সে ধীরে ধীরে স্যারের একেবারে কাছে চলে এল। সংকুচিত ঠোঁট দুটি এগিয়ে গেছে বিশাল শরীরটার দিকে। পুনরায় পিছিয়ে এল। আবিষ্ট দুটো ডানা দিয়ে স্যারকে তোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল বৃদ্ধ হাড়গিলা।

স্যারকে দেখছি সে নাগালও পায় না, শক্তিতেও না।

অসমিয়া গল্পের বাংলা অনুবাদ 

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

anton-chekhov.jpeg

ভিক্ষুক

মূল গল্প – The Begger

অ্যান্টন চেখব

অনুবাদ - পর্ণাভ দে

thief.jpg

"গরিবের উপর দয়া করুন, স্যার। ঈশ্বরের দিব্যি, তিন দিন কিছু খাইনি; আমার কাছে থাকা-খাওয়ার জন্য পাঁচ কোপেকও নেই। আট বছর আমি গ্রামের স্কুলে পড়িয়েছি; মিথ্যা অভিযোগে ওরা আমায় কাজ থেকে বের করে দেয়। আজ এক বছর আমার হাতে কোনো কাজ নেই। আমি কপর্দক শূন্য, দয়া করে আমায় কিছু ভিক্ষে দিন।"
সের্গেই, যিনি পেশায় একজন আইনজীবি, ভিক্ষুকটির দিকে তাকালেন। একে তিনি আগেও কোথায় দেখেছেন, সের্গেই মনে করতে পারলেন না। এই রুক্ষ, ধূসর ওভার কোট; লাল, মদিরাগ্রস্থ চোখ; শুষ্ক, ফেটে যাওয়া লাল গাল—তার অপরিচিত নয়।
"আমি কালুগা প্রদেশে একটি কাজের অফার পেয়েছি, কিন্তু আমার কাছে সেখানে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় টাকাটুকুও নেই। দয়া করে; আমি লজ্জিত, কিন্তু—আমি বাধ্য হয়েই আপনার কাছে সাহায্য প্রার্থী হয়েছি।" লোকটি একটানা এই কথাগুলো বলে থামল।
সের্গেইর নজর এবার লোকটির জুতোর ওপর পড়ল। "তুমি পরশু দিন সদভায়া স্ট্রিটে ভিক্ষে করছিলে না?" সের্গেই বললেন, "কিন্তু সেদিন তো তুমি বলেছিলে যে তুমি একজন বহিষ্কৃত ছাত্র, শিক্ষক নও। কী, মনে পড়ছে?"
"ন-না, এটা হতে পারে না," লোকটি সামান্য তোতলালো, "আমি একজন শিক্ষক, আমি গ্রামের স্কুলে পড়াতাম। চাইলে আপনাকে সেই কাগজ আমি এখনই দেখাতে পারি।"
"তোমার মিথ্যে বলা শেষ হয়েছে? তুমি বলেছিলে তুমি একজন ছাত্র। এমনকি কী কারণে তোমায় বহিষ্কার করা হয়েছে তাও বলেছিলে আমায়। আমার কি কিছু মনে নেই নাকি!"
সের্গেই এবার উল্টোদিকে হাঁটা লাগালেন। তাঁর মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। "এটা প্রতারণা; তুমি একজন জোচ্চোর, তোমায় আমি পুলিশে দেব।"

"স্যার! একটিবার শুনুন," লোকটি তার বুকে হাত রেখে বলল, "হ্যাঁ, আমি মিথ্যে বলেছি, মিথ্যে বলতে বাধ্য হয়েছি। আমি শিক্ষক নই, বিতাড়িত ছাত্রও নই। সত্যি কথা এই যে, আমি এক রাশিয়ান কয়ার-এর গায়ক ছিলাম, ওরা আমাকে মাতলামির জন্য বের করে দেয়। আমি আর কী করতে পারি ভিক্ষে করা ছাড়া? এই গল্প শুনে কি কেউ আমায় ভিক্ষে দেবে? আমি বাধ্য হয়ে মিথ্যে বলেছি স্যার, আমায় ক্ষমা করুন।"
"তুমি কী করতে পারো? তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছ তুমি কী করতে পারো?" সের্গেই রাগত স্বরে প্রশ্ন করলেন, "কাজ, কাজ করতে পারো তুমি, তোমায় খেটে খেতে হবে।"

"কাজ? হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন, কিন্তু কে কাজ দেবে আমাকে?"
"তুমি কাঠ কাটতে পারবে?"
"হ্যাঁ স্যার, কিন্তু বাজারে এত কাঠুরে থাকতে আমাকে কেউ কেন সে কাজ দেবে?"
"আমি দেব, তুমি রাজি আছো?"
"হ্যাঁ।"
"বেশ, তবে আমার সাথে এসো।"
হাতের তালু ঘষতে ঘষতে এগিয়ে চললেন সের্গেই। বাড়ির সামনে পৌঁছে রাঁধুনীকে ডাকলেন সের্গেই, "ওলগা! একে কাঠের শেড-এ নিয়ে যাও, এ আজ থেকে রান্নার কাঠ কাটবে।"

নিজ বাক্যপাশাবদ্ধ, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভিক্ষুক ওলগাকে অনুসরণ করতে বাধ্য হলো। তার চলনে, প্রতি পদক্ষেপে তার অহং প্রকাশ পাচ্ছিল। যেন তার আভিজাত্য এই কাঠুরের চাকরিতে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
অবশ্য এটাও সত্যি যে, ভদকার নেশায় চুর, অসুস্থ এই লোকটির শরীরে কাজ করার শক্তিও ছিল না।

সের্গেই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে কাঠ কাটার ছাউনিটা স্পষ্ট দেখা যায়। সের্গেই দেখলেন ওলগার সাথে লোকটি শেড-এ ঢুকল। মাতালটার দিকে বিরক্ত হয়ে তাকালো ওলগা, কনুয়ের ধাক্কায় তাকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে দুবার জোরে দরজায় ধাক্কা দিল। নিজেকে শিক্ষক দাবি করা লোকটি একটি কাঠের গুঁড়ির ওপর গিয়ে বসল, ফেটে যাওয়া লাল দুই গালে হাত দিয়ে দার্শনিকের মতো দূরে চেয়ে রইলো। ওলগা মাতালটার পায়ের কাছে একটা কুঠার ছুঁড়ে দিল এবং রাগত স্বরে গালিগালাজ করতে লাগল লোকটিকে।

কাঁপা হাতে একটি কাঠের টুকরো তুলে নিল লোকটা, পায়ের ফাঁকে রেখে দুর্বল ভাবে কুঠার চালাল। কাঠের টুকরোটা মাটিতে পড়ে গেল। আবার সেটাকে তুলে নিয়ে, বারকয়েক হাতে ফুঁ দিয়ে হাত গরম করল লোকটি, তারপর খুব সাবধানে কুঠার চালাল। এবারেও কাঠ ফস্কে মাটিতে পড়ল কুঠারের ঘা।
সের্গেইর দুঃখ হলো লোকটির জন্য। তিনি খানিক লজ্জিত হলেন অসুস্থ লোকটিকে এই ঠান্ডায় এমন করে খাটানোর জন্য।

ঘন্টাখানেক পরে ওলগা এসে খবর দিল, কাঠ কাটা হয়ে গেছে।
"বেশ! ওকে আধ রুবল দিয়ে বলো, ও চাইলে প্রতি মাসের পয়লা তারিখ এসে কাঠ কেটে দিয়ে যেতে পারে। ওর জন্য এখানে কাজের অভাব হবে না।"
পরের মাসের এক তারিখে সেই লোকটা আবার এল এবং টলমলে পায়ে কাজ শেষ করে আধ রুবল নিয়ে গেল। এরপর থেকে তাকে প্রায়ই সের্গেইর উঠোনে দেখা যেত। কখনো শাবল দিয়ে বরফ পরিষ্কার করা, কখনো কাঠ কাটার শেড পরিষ্কার করা বা কার্পেটের ধুলো ঝাড়ার কাজ পেত সে। সের্গেইর বাড়িতে সত্যিই তার জন্য কাজের অভাব হতো না। প্রতিবারই কাজের জন্য কুড়ি থেকে চল্লিশ কোপেক পেত সে।

যখন সের্গেই তাঁর নতুন বাড়িতে উঠে গেলেন, লোকটিকে ভাড়া করা হলো আসবাবপত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এবার তার মুখে চিরাচরিত হাসি ছিল না, বরং অনিশ্চয়তার অন্ধকার তাকে আচ্ছন্ন করেছিল। সে তেমন কোনো সাহায্যই করল না; শুধু মাথা নিচু করে অন্য চাকরদের অনুসরণ করল ওয়াগন পর্যন্ত। সব আসবাব সরানো হয়ে গেলে, নতুন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে সের্গেই তাকে ডাকলেন, "আমি তোমার পরিবর্তনে খুশি হয়েছি। তুমি যে আমার কথায় নিজেকে বদলে নেবে তা আমি আশা করিনি। এই নাও—" সের্গেই পকেট থেকে এক রুবল বের করে তার হাতে দিলেন। "এটা তোমার পারিশ্রমিক। আমি তোমার কাজে খুশি হয়েছি। আমার কোনো অভিযোগ নেই। আচ্ছা, তোমার নাম কী?"
"লুশকফ।"
"লুশকফ, তুমি কি লিখতে পারো?"
"হ্যাঁ।"
"বেশ, তাহলে এই চিঠিটা রাখো। এটা নিয়ে কাল আমার বন্ধুর কাছে যাবে। সে তোমাকে লেখা কপি করার কাজ দেবে। আমার অবর্তমানে তোমার টাকার কষ্ট হবে না। সৎভাবে কাজ করবে, মদ খাবে না, আর আমার কথাগুলো মনে রাখবে। বিদায়।"
একজন মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার গর্বে সের্গেই গাড়িতে উঠলেন। পরের দিন থেকে আর কখনো লুশকফকে ওই বাড়ির উঠোনে দেখা যায়নি।

এরপর দু বছর কেটে গেছে। একদিন সন্ধ্যায় থিয়েটারে টিকিট কাউন্টারে টিকিটের দাম দেওয়ার সময় সের্গেই দেখলেন তার পাশে দামি পশমের কোট পরিহিত এক ভদ্রলোক গ্যালারির সিটের টিকিট কাটছেন। "আরে লুশকফ না?" সের্গেই তার পুরোনো চাকরটিকে চিনতে ভুল করেননি, "কেমন আছ? এখন কি করা হয়?"

"আমি এখন একজন নোটারি হিসেবে কাজ করছি স্যার," লোকটি বিনীতভাবে উত্তর দিল। "এখন আমি মাসে পঁয়ত্রিশ রুবল মাইনে পাই।"
সের্গেই গর্বে বুক ফুলিয়ে বললেন, "আমি তোমার জন্য গর্ববোধ করি। দেখো, এক অর্থে তুমি আমার ধর্মপুত্র। আমি তোমাকে সঠিক পথে চালনা করেছিলাম। তোমার মনে আছে, প্রথম দিন আমি কী ভাষায় তোমাকে তিরস্কার করেছিলাম? ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তুমি আমার কথা ভুলে যাওনি।"
"আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।" লুশকফ বলল, "আপনি না থাকলে হয়তো আজও আমায় ভিক্ষে করে বেড়াতে হতো। সত্যিই আপনার আশ্রয়ে এসে আমি ওই পাঁক থেকে মুক্তি পেয়েছি।"
"আমি তোমার উন্নতিতে প্রসন্ন হয়েছি।"
"আমি চিরজীবন আপনার ও আপনার রাঁধুনির কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। ঈশ্বর ওই মহিলাকে আশীর্বাদ করুন। আপনি সেদিন আমায় আশ্রয় দিয়ে ছিলেন, আমি চিরঋণী আপনার কাছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সেদিন ওলগাই আমাকে রক্ষা করেছিল।"
"কীভাবে?"
"আপনি কি জানেন? আপনার বাড়িতে আমি একটি কুটোও নাড়িনি। আমি যখনই যেতাম, ওলগা আমার সামনে এসে আমায় শাপ-শাপান্ত করত আর সব শেষে আমায় গালাগাল করতে করতে অঝোরে কেঁদে ফেলত। আমার সব কাঠ ও-ই কেটে দিত। ও কেন যে আমার হয়ে কাজগুলো করে দিত, কেনই বা সে আমার মতো এক নগণ্য মাতালের জন্য নিজের চোখের জল ফেলত, আর কেনই বা তার সেই চোখের জল দেখে আমি মদ খাওয়া ছেড়ে দিলাম—তা আমি আজও জানি না। শুধু হৃদয় থেকে একটাই কথা বলতে পারি, ওলগাই আমায় নিজেকে চিনতে শিখিয়েছে। আজ যাওয়ার সময় হলো, ওই বেল শোনা যায়, ভালো থাকবেন।" বিদায় সম্ভাষণ করে দর্শকের ভিড়ে মিশে গেল লুশকফ।

ভিক্ষুক

  বিদেশী গল্পের বাংলা অনুবাদ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

দূর-দর্শন

রথীন্দ্রনাথ বড়াল

ডঃ নগেন ঘোষ লেন, কলকাতা 

boarding1.jpeg
দূর-দর্শন

দূরদর্শন, কলকাতা বলে একটা জনপ্রিয় শব্দবন্ধ ছিল। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এই শব্দবন্ধের সাথে খুব একটা পরিচিত নয়। কারণ দূরদর্শন তার দীর্ঘ যাত্রাপথ পেরিয়ে এখন যথেষ্ট স্মার্ট হয়ে গেছে—তাই স্মার্ট টিভি কিংবা গুগুল টিভি সেই মান্ধাতা আমলের টেলিভিশনকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। তবু মান্ধাতা আমলের কিছু স্মৃতিচিত্র তুলে আনলে বোধহয় খুব একটা বিরক্তি উদ্রেক করবে না।
জানি আজকের প্রজন্ম চোখ কপালে তুলবে, তবু সাহস করে চুপিচুপি একটা কথা বলে ফেলি। এই স্মৃতিচারক যখন পৃথিবীর আলো দেখেছে, তখন দূরদর্শন বা টেলিভিশন শব্দটি এই বাংলায় আসেনি। তবে ভারত সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রক ১৯৪৯-র ১৫ সেপ্টেম্বর টেলিভিশনের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শুরু করেন এবং ভারতীয় ভাষায় দূরদর্শন শব্দটি আসে টেলিভিশন শব্দটির যথাযথ অনুবাদ করে। তবে এই পশ্চিমবাংলায় এর পথচলা অনেক অনেক পরে। ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট। তখন আমরা স্কুলের অনেকগুলো ক্লাসই পেরিয়ে এসেছি। আমরা অবাক হয়ে জানলাম এতদিন রেডিওতে হওয়া যেসব অনুষ্ঠান আমরা শুনে এসেছি। সেগুলো সব চাক্ষুষ করা যাবে। ব্যাপারটা কি? এই প্রশ্নে এখন ক্লাস ওয়ানের কোন বাচ্চা খিলখিল করে হেসে উঠবে—আমাদের কিন্তু সত্যিই অবাক হওয়ার সময় ছিল সেটা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অথবা সুচিত্রা মিত্রের গান রেডিওতে পরিবেশিত হত। সেই গান শোনা যাবে, সাথে সাথে শিল্পীকেও দেখা যাবে গান গাইতে। অবাক কাণ্ড। হ্যাঁ, সেই অবাক কাণ্ডই চাক্ষুষ করা গেল। অবশ্য সেই ৭৫ সালে খুব কম বাড়িতেই টেলিভিশন বা টিভির আগমন ঘটেছিল। তাই দলে দলে আবালবৃদ্ধবনিতার ভিড় জমত—সেই সব বাড়িতে যেখানে টিভি বিরাজমান। বলাবাহুল্য, প্রথমদিকে কিছু অবস্থাপন্ন গৃহস্থই গৃহে টিভি আনতে পেরেছিলেন এবং আশার কথা তারা সেই দূর্মূল্য বস্তুটি নিজেদের কুক্ষিগত করে না রেখে সবার সাথে আনন্দ ভাগ করে নেবার মানসিক প্রসারতায় তাদের গৃহের দ্বার উন্মুক্ত রাখতেন, বর্তমানকালে এই উদারতা কারুর কাছেই আশা করা যায় না। সকলের সাথে এই টিভি নামক আশ্চর্য বস্তুটির আনন্দ ভাগ করে নেবার উদ্দেশ্যে – এটি রাখা হত কোন প্রশস্ত ঘরে, কিংবা লম্বাচওড়া মাথা ঢাকা বারান্দায়। এইসব টিভি-বাড়িতে বিশেষ ভিড় হত—যখন ক্রিকেটের টেস্ট ম্যাচ চলত, কিংবা বড় ফুটবল ম্যাচ। উদাহরণস্বরূপ—ভারত-ওয়েষ্ট ইণ্ডিজ টেস্ট ক্রিকেট। টিভি-র আবির্ভাবের পরে পরেই ভারতে এসেছিল ক্লাইভ লয়েডের প্রবল পরাক্রমশালী ক্রিকেট টিম। কলকাতার ইডেনে ছিল টেস্ট ম্যাচ। পাঁচদিনের টেস্ট ক্রিকেট দেখতে পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়ি ভিড় করত মানুষজন। অফিসে ছুটি নিয়ে। স্কুল-কলেজ বন্ধ রেখে বা কলেজ কেটে এই আজব বাক্সের টানে মানুষ জড় হত। ১৯৭৭ সালে ফুটবল সম্রাট পেলেকে নিয়ে কসমস টিম কলকাতায় এল এবং মোহনবাগানের সাথে ইডেনে এক প্রীতিমূলক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হল। পেলের আগমন মানুষকে উদ্বেলিত করে তুলল। যারা ইডেনে যেতে পারলেন তারা ভাগ্যবান, আর যারা যেতে পারলেন না, তারা ভিড় জমালেন টিভি-র সামনে। তখনও ঘরে ঘরে টিভি আসতে অনেক দেরী। পাড়ার ক্লাবগুলো চেষ্টা চরিত্র করে টাকা জোগাড় করে টিভি কিনে ফেলল। সেই খেলা ক্লাবের ঘরে দেখার জন্য স্বল্পমূল্যের টিকিটও কেউ কেউ বিক্রি করে কিঞ্চিত খরচ উশুল করতে চেষ্টা করল। আমি এক পরিচিতের বাড়ি গেছিলাম এই ম্যাচ দেখতে—এই অবস্থাপন্ন গৃহস্থ ছাদে ত্রিপলের আচ্ছাদন করে দিয়েছিলেন—আগত ফুটবল-প্রেমীদের জন্য। সাথে চা-জলখাবারের ঢালাও ব্যবস্থা। টিভিকেন্দ্রিক এই আতিথেয়তা আজ বহু দূর দর্শনেও মিলবে না। এই টিভি বা দূরদর্শনের বেশ কিছু

অনুষ্ঠান জনপ্রিয়তা পেয়েছিল প্রথম থেকেই। যে অনুষ্ঠানের কথা প্রথমেই বলা উচিৎ সেটি হল সংবাদ। বাংলা সংবাদ শ্রীমতি ছন্দা সেন কিংবা শ্রী দেবরাজ রায়ের পাঠে আর ইংরেজী সংবাদ পাঠে অদ্বিতীয় এন. বিশ্বনাথন। আর ছিল হিন্দী ও বাংলা সাপ্তাহিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন। কখনও শনিবার বাংলা সিনেমা, রবিবার হিন্দী আবার মাঝে মাঝে এই ক্রম পালটে যেত। সে যাইহোক পশ্চিমবঙ্গবাসী অধীর আগ্রহে এই সিনেমার জন্য অপেক্ষা করে থাকত। আজকের মতো নানা চ্যানেলে কিংবা OTT প্লাটফর্মে নিজের ইচ্ছামতো সিনেমা দেখার কোন সুযোগই সেদিন ছিল না। তাই সিনেমা হলের বাইরে সাপ্তাহিক সিনেমা দেখার জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। বর্তমানের মত সহজলভ্য না হওয়ায় এই সিনেমা সকলের ভালবাসা নিয়ে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছিল। আর একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল বাংলায় চিত্রমালা আর হিন্দীতে চিত্রহার। চলচ্চিত্রের গানের সুন্দর পরিবেশনা। সত্তরের দশকের শেষে বা আশির দশকের প্রথমে—তখনও ঘরে ঘরে টিভি আসেনি—তখন পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়ি গিয়ে এই অনুষ্ঠানের আনন্দ বাঙালী দর্শক নিয়েছে। ঘরভর্তি লোকজন টিভির  সামনে—আমরা ছোটবেলায় দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। আজ একা একা টিভির সামনে বসে, একাকীত্ব গ্রাস করার সুযোগ সেদিন ছিল না। আর একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল—দর্শকের দরবারে। কলকাতা দূরদর্শনের প্রথম দিন থেকে যিনি সংস্থাকে আগলে রেখেছিলেন সেই শ্রী পঙ্কজ সাহা মহাশয়ের পরিবেশনায়। দর্শকের নানা প্রশ্ন, আবদারের জবাব কি ধৈর্য্য সহকারে বছরের পর বছর দিয়ে যেতেন শ্রী সাহা। একই সাথে যে দুই শ্রদ্ধেয়া ঘোষিকার নাম কলকাতা দূরদর্শনের সাথে জড়িয়ে আছে—তাঁরা শ্রীমতী শর্মিষ্ঠা ও চৈতালী দাশগুপ্ত। জন্মলগ্ন থেকে তাঁদের ঘোষণায় কলকাতা দূরদর্শন সম্পৃক্ত হয়েছে।
দূরদর্শনের অনুষ্ঠানের কিছু টুকরো ছবি তুলে আনলাম। এবার বোকা বাক্সর বোকা চেহারার কথা একটু বলা যাক। সেই টিভি, অবশ্যই সাদা কালো, বিশাল বপু নিয়ে বাড়ীতে বাড়ীতে শোভা বর্ধন করত। বর্তমান স্মার্ট টিভির স্মার্ট প্রজন্ম সেই চেহারা দেখলে নিশ্চয়ই ভিরমি খাবে। চারটে সরু সরু পায়ের ওপর বিভিন্ন সাইজের বক্স বসানো থাকত। গড়ে ৪ ফুট x ৩ ফুট মত হবে। সামনে কাঠের দরজা বা পাল্লা, সেটা সরিয়ে দিলে ওভাল সেপের টিভি স্ক্রিন চোখে পড়ত—যার দিকে দর্শক তাকিয়ে থাকত শিল্পীদের দর্শন পাওয়ার আসায়। সেই সময় টিভি নির্মাতারা ছিল Weston, Telerama, Panorama, Televista, ECTV, Sonodyne, BPL প্রভৃতি। সেইসব টিভি কোম্পানী সবাই না থাকলেও কেউ কেউ আছে নিশ্চয়ই। তবে সেযুগে সাদাকালো ছবিও শান্তিতে দেখার উপায় ছিল না। কারণ? স্ক্রীনের ডান্স। হয়ত বৈজয়ন্তীমালা গানের সাথে নাচছেন, হঠাৎ মৃগী রোগীর মত কাঁপতে শুরু করলেন। কি হল কি হল! পাশের বাড়ির ডিসি পাখা চালানো হল। কারণ তখনও অধিকাংশ বাড়িতেই AC-র বদলে DC কারেণ্ট ছিল। সেই পুরানো DC পাখা থেকে প্রেরিত বার্তা বৈজয়ন্তীমালার মত দক্ষ নৃত্যপটীয়সীকে শুইয়ে দিত। কিছু করার ছিল না। DC পাখার মালিক কিংবা মালকিনকে পাখা বন্ধ করতে বললে—অযথা কলহ শুরু হবে। এইসব টিভিতে থাকত বড় বড় অ্যাণ্টেনা। ছাদের পাঁচিলে কিংবা জলের ট্যাঙ্কের ওপর লাগানো হত। ঝোড়ো হাওয়ায় অ্যাণ্টেনার অভিমুখ সরে গেলেও—ছবির বিকৃতি ঘটত। তখন বাড়ির ছেলেদের ডাক পড়ত। তারা বীরদর্পে ছাদে উঠে অ্যাণ্টেনা ঠিক করে দিয়ে আসত। সাদা কালোর যুগে কম্পমান ছায়াছবি দেখে বাঙালী বেশ কয়েক বছর আনন্দ নিয়েছে প্রতিদিনের ঘষা কাচের মত ম্যাড়মেড়ে জীবনে। প্রথম রঙ দেখলাম, যেদিন ছোটকাকা চাঁদনী থেকে হালকা রঙ দেওয়া একটা প্লাস্টিকের কভার এনে টিভির ওপর লাগিয়ে দিলেন। প্লাস্টিকটার মধ্যে বিভিন্ন রঙের আভা ছিল তার মধ্য দিয়ে টিভি অনুষ্ঠান দেখলে সেটাও একটু রঙিন মনে হত সেই বর্ণহীন সময়ে। ব্যাপারটা খুবই বোকাবোকা মনে হলেও রঙীন টেলিভিশন আসার বেশ কিছু সময় আগে, এই জিনিসটা আমদানী করে টিভির বৈচিত্র্য আনা হয়েছিল। আস্তে আস্তে আরো কিছু বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এল রঙীন টিভি। দূরদর্শনের সাথে সাথে একটা একটা করে নতুন চ্যানেল। মানুষকে ক্রমশ প্রলুব্ধ করতে থাকল নিত্য নতুন চ্যানেল—তাদের নানা অনুষ্ঠান। তবে দূরদর্শনের আদি ভালবাসার চরিত্রটা পালটে গেল। মানুষের ভালবেসে প্রাণের তাগিদে টিভির সামনে বসাটা পালটে যেতে থাকল। বৈচিত্র্য এল কিন্তু টিভির জন্য আকুলিবিকুলি করা মনের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে থাকল। তারপরও নানা পথ পেরিয়ে আজ তো টিভি মোবাইল ফোনে ঢুকে পড়েছে। আরো কত বিবর্তন আসবে—তবে সত্তরের দশকে দূরদর্শনের সাথে একাত্ততা বোধহয় আর ফিরে আসবে না।

প্রবন্ধ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

rudrajit paul_edited.jpg

মাইকেল মধুসূদনঃ

সৃষ্টির আড়ালে স্রষ্টা

ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল

কসবা, কলকাতা 

michael.JPG
মাইকেল মধুসূদন

বাংলার সংস্কৃতি সম্পর্কে যারা অবহিত, তাঁরা জানেন যে এটা মূলত ব্যক্তিপূজার দেশ। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, বিজ্ঞান, সব ক্ষেত্রেই বাঙালিদের নিয়ম হল কিছু আইকন বা ভগবান ঠিক করে নিতে হবে, সেটা দেশী বিদেশি যাই হোক। তারপর পরবর্তী একশো বা দুশো বছর ধরে এক নাগাড়ে তাঁর পূজা চালিয়ে যেতে হবে। এর জন্য তাঁর জীবনের যত বিতর্কিত বিষয়, যত খারাপ কাজ—সমস্ত হোয়াইটওয়াশ করে দিতে হবে। এবং নে সেয়ার বা ছিদ্রান্বেষী কেউ থাকলে তাকে সমবেতভাবে চিৎকার করে স্তব্ধ করে দিতে হবে। 

একদম শিশুবয়স থেকেই বঙ্গদেশে যারা বড় হয়েছেন, তাদের দশ বারোটা নাম একদম ভগবানের মত করে মুখস্থ করিয়ে দেওয়া হয়। এবং এদের তথাকথিত কৃতিত্ব বা মহত্ত্বের কথা জলে জঙ্গলে আকাশে বাতাসে ফলাও করে প্রচার করা হয়। এই সব মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের কোনও অপ্রিয় বিষয়ের উল্লেখ বাঙালি সমাজে কাম্য নয়—সেটা পরীক্ষার খাতাতেই হোক বা সুশীল সামাজিক অনুষ্ঠানে। 
মাইকেল মধুসূদন দত্ত এইরকম একজন বাঙালি আইকন। যে কোনও পুস্তকে ওনার নাম উল্লিখিত হলেই সেই সঙ্গে “ধূমকেতু”, “স্বকীয়তা”, “জিনিয়াস”, “ক্ষণজন্মা” ইত্যাদি বিশেষণ একদম কলকাতার দুর্গাপূজার আলোকসজ্জার মত প্রতিপদে ছড়িয়ে থাকে। “বিদ্রোহী” কথাটিও মাঝে মাঝে বলা হয়, যদিও নজরুল এবং কিছুটা সুকান্ত ভট্টাচার্য এই বিশেষণটি কিছুটা দখল করে রেখেছেন। এটা স্কুল ফাইনালের সহায়িকা পুস্তক হোক বা পাঠকবিরল গুরুগম্ভীর লিটল ম্যাগাজিন: সব জায়গাতেই সত্য। মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্যকীর্তির বিষয়ে এখানে আমি কিছুই বলব না। এর একটা কারণ যদি হয় যে, এই নিয়ে বেশ কয়েকশো পি এইচ ডি থিসিস হয়ে গেছে, তবে অন্য কারণ হল, আমি সাহিত্যের ছাত্র নয়। আমি যদি তাঁর কাব্যের বিশ্লেষণ করতে বসি, তাহলে ওই উইকিপিডিয়া ধাঁচের কিছু প্রাণহীন ভালো ভালো কথা কপি-পেস্ট করে বলেই শেষ করতে হবে। 
এই প্রবন্ধে আমার বিশ্লেষণের অভিমুখ হল মাইকেলের ব্যক্তিগত জীবন, বিশেষত তাঁর পারিবারিক জীবন। এটা নিয়ে বলার আগে প্রথমেই বলে দেওয়া উচিত যে, এই বিষয়ে সম্পূর্ণ প্রামাণ্য তথ্য কোথাও নেই। এর দুটো কারণ। এক---মাইকেলের বংশধরেরা সবাই খৃস্টান। ভদ্রলোক বাঙালি সমাজে এদের খুব বেশি কল্কে পাওয়া মুশকিল। অর্থাৎ, বাঙালি ভদ্রলোক খুব কায়দা করে বিজয়া সম্মিলনীতে মেঘনাদবধকাব্য অশ্রুসজল গলায় আবৃত্তি করতেই পারে। কিন্তু তাদের মধ্যে খুব কমই আছে যারা মাইকেলের বংশের লোকের সাথে বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী হবেন। এই ব্যাপারটা ছিল বলেই মাইকেলের বংশধরেরা যদি কেউ বেঁচেও থাকেন,কেউ খুব একটা বাংলায় এসে এখানে মেলামেশা করতে চেষ্টা করেন নি। আর দ্বিতীয় হল, মাইকেল নিজেও তো নিজের পরিবারের প্রতি একদমই সুবিচার করেন নি। ফলে তাঁর স্মৃতিকে সযত্নে আগলে রাখার ইচ্ছা পরবর্তীকালে কারুর নাই থাকতে পারে। 
এটা আমরা সবাই জানি যে, ১৮ বছর বয়সে বাড়ি থেকে বিয়ে ঠিক হওয়ায়, সেই বিয়ে এড়ানোর জন্য মাইকেল একদম চকিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ধর্ম পরিবর্তন করেন। যদিও সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই বিবাহের প্রস্তাবকে অসমীচীন বা বাল্যবিবাহ বলা যাবে না। বিদ্যাসাগর স্বয়ং বিবাহ করেছিলেন ১৪ বছর বয়সে! যাই হোক, যদি বিবাহ এড়ানোই মাইকেলের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। যদিও এটা কিছুটা ঢাকিসুদ্ধ বিসর্জনের মত ব্যাপার হয়ে গেল। কারণ বিবাহ যেমন ভেঙ্গে গেল, তেমনি পড়াশুনা, বাবা মায়ের সাথে সম্পর্ক এবং নিজের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ—সবই একসাথে বন্ধ হয়ে গেল। 
বাকিগুলো ঠিক আছে। কিন্তু পড়াশুনার দরজা বন্ধ হবার ব্যাপারটা বেশ আশ্চর্যের। কারণ হিন্দু কলেজ তো তখন প্রগতিশীলদের মৃগয়াভূমি (মনে রাখতে হবে যে নামে কলেজ হলেও এটা আসলে ছিল স্কুল)। ডিরোজিও মারা গেছেন বেশ কিছুদিন আগেই। কিন্তু তাঁর প্রভাব তখনও থাকার কথা। কিন্তু সেই তথাকথিত প্রগতিশীল কলেজের আলোকপ্রাপ্ত ছাত্রদের কেউই এটা নিয়ে কিছু প্রতিবাদ করেছেন, সেরকম প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং সেই কলেজের প্রিন্সিপাল যেই হুকুম দিলেন যে, তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ মাইকেলের সাথে দেখা করতে পারবে না, অমনি সবাই সুড়সুড় করে সেটা মেনে নিল। বাঙালিদের এই মুখে বীরত্ব আর কাজের বেলায় লবডঙ্কার ঐতিহ্য দুশো বছর আগেও ছিল, এখনও আছে। তখন তো শোনা যায় ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্ট চলছিল। অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশান তৈরি করে আকাশ কাঁপানো ডিবেট হচ্ছিল। তাহলে মধুসূদন ধর্ম পরিবর্তন করায় তাঁর যে হিন্দু কলেজে ঢোকা বন্ধ হল, সেই নিয়ে এই তার্কিকদের ডিবেট হল না কেন?
যাই হোক, মাইকেল তো মাদ্রাজে চলে গেলেন। অবশ্য না গিয়ে উপায় কি? চাকরি কে দেবে কলকাতায়? মাদ্রাজে গিয়ে এক অনাথাশ্রমে শিক্ষকের চাকরি পেলেন। এবং সেই আশ্রমের এক শিক্ষার্থীকে বিবাহ করলেন। মাইকেলের একদম কিশোর বয়স থেকে শখ ছিল নীলনয়না সুন্দরীকে বিবাহ করার। উনি বিবাহের পর কলকাতার বন্ধুদের জানিয়েছেন যে, এতদিনে স্বপ্ন সফল। একজন খাঁটি ইংরেজ নীলনয়না সুন্দরীকে উনি সঙ্গিনী হিসাবে পেয়েছেন। কিন্তু সেই কথা সত্যি কিনা, বলা মুশকিল। প্রথমত, তখন ছবি তোলার চল ছিল না। খুব বড়োলোক হলে ছবি আঁকানো হত। কিন্তু মাদ্রাজে মাইকেল স্ত্রীর ছবি আঁকিয়েছেন, সেরকম প্রমাণ নেই। ওনার নিজেরও প্রামাণ্য ছবি আঁকা হয়েছে এর অনেক পরে—শিল্পী অতুল বসু। 
দ্বিতীয়ত, তাঁর স্ত্রীর বংশপরিচয় নিয়ে সন্দেহ আছে। মাইকেল ওনাকে ইউরোপীয় বলে গর্ব করলেও উনি পুরো শ্বেতাঙ্গিনি না মিশ্র রক্তের, সেই রহস্যের সমাধান হয়নি। কিন্তু এটা একদম বাস্তব কথা যে, মাইকেল এই স্ত্রী এবং তাঁর চার সন্তানকে মাদ্রাজে ফেলে কলকাতায় ফিরে এসে তারপর দ্বিতীয় এক রমণীর সাথে বাকি জীবন ছিলেন। এই মাদ্রাজস্থিত স্ত্রী বা এই সন্তানদের কলকাতার বাঙালি সমাজের কেউ চোখে দেখেন নি। শোনা যায় যে মাইকেল কলকাতায় আসার পর মাদ্রাজের এক ইউরোপীয় বন্ধু রেবেকাকে নিয়ে নাকি একবার কলকাতায় এসেছিলেন। কিন্তু তারপর কী হল? আর সেই যুগে মহিলারা খুব একটা বাইরে বেরতেন না। ফলে সেই স্ত্রীর বর্ণনা তৃতীয় কোন বাঙালি ব্যক্তি স্বভাবতই দিতে পারেন নি। সেই বিষয়ে কোনও তথ্য নেই। মাইকেল নিজেও এই বিষয়ে কাউকে কিছু বলে যান নি। রেবেকা, অর্থাৎ এই প্রথমা স্ত্রী, আগেই বলেছি, অনাথ আশ্রমের একজন বাসিন্দা ছিলেন। সুতরাং, ওনার পারিবারিক লোকবল কিছুই ছিল না। ফলে, উনি যে কলকাতায় সন্তানদের নিয়ে এসে মাইকেলের সাথে ফয়সলা করবেন, সেটা সম্ভব ছিল না। উনি কতদিন ছিলেন, কার কার সাথে দেখা করেছিলেন এবং শেষে কোথায় ফিরে গেলেন, সেসব নিয়ে কোনও তথ্যপ্রমাণ নেই। 

তাহলে মাইকেলের এই স্ত্রীর পরিচয় কিন্তু পুরো কিছু চিঠিপত্র এবং দলিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এবং মাইকেলের কিছু কাব্যে ওনার প্রতি প্রেম নিবেদন রয়েছে, এই পর্যন্ত। এনার চেহারা, স্বভাব এবং সবচেয়ে বড় কথা, এনার বাকি জীবনের ইতিহাস---সব কিছুই একদম রহস্যে মোড়া। এমনকি ওনার মৃত্যু সংবাদ গেজেটে প্রকাশিত হলেও ওনার কবরের খোঁজ অবধি কেউ জানে না। তবে যদি সেই চার সন্তানের ভবিষ্যতে পরিবার বেড়ে থাকে, তাহলে এই কথা মনে করা অসমীচীন নয় যে, হয়ত এখনও দক্ষিণ ভারতের কোনও অংশে মাইকেল মধুসুদনের কোনও বংশধর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু ওই যে বললাম, উনি তো ছেঁড়া কাপড়ের মত তাদের ত্যাগ করে চলে এসেছিলেন। তাঁরা ওনাকে মনে রাখবে কেন? শুধু কয়েকটা কাব্য লিখেছেন বলেই যে তাঁর এই মনুষ্যত্বের অভাব ক্ষমা করে দিতে হবে, সেটা তো আর নয়!!এবং মাইকেল একদম হঠাৎ করেই এরকম একটা কাজ করেছিলেন। মাদ্রাজে একা রেবেকা আর তাঁর চার সন্তান। মাইকেল কী করলেন? পিতার মৃত্যু হয়েছে, সম্পত্তি রক্ষা করতে হবে, সেই অজুহাত দেখিয়ে সব ছেড়ে কলকাতার জাহাজে উঠে বসলেন। আর কোনদিন মাদ্রাজে ফিরলেন না। এরপর বিদেশ গেলেন ওকালতি পড়তে। ফ্রান্সে গেলেন। কিন্তু মাদ্রাজে আর গেলেন না। কেন? যে সন্তানের জন্মের পর কলকাতার বন্ধুকে উচ্ছ্বসিত চিঠি লিখলেন, সেই সন্তানের ভবিষ্যৎ বিষয়ে এত উদাসীন কেন? সত্যি বলতে এটা আর জানা যায় না। মাইকেল এবং রেবেকার মধ্যে ঠিক কী ঘটেছিলে? মাইকেলের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জন্য কী এই সংসার ভেঙ্গে গিয়েছিল? রেবেকা শিক্ষিত রমণী ছিলেন না। উনি নিজের জীবনের কথা লিখে রেখে যান নি। উনি অনাথ ছিলেন বলে পরিবারের কোনও সূত্রও ছিল না। ফলে মাইকেলের সংসার কেন ভেঙেছিল, সেই তথ্য একদম অজানা। মাইকেলের দ্বিতীয় সংসারের ঘরণী হেনরিয়েটা। এই বিষয়ে প্রচুর সন্দেহ এবং বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। কে এই হেনরিয়েটা? মাইকেল বন্ধুদের চিঠিতে বলেছেন যে ইনি নাকি মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। কিন্তু মাইকেলের এখন অবধি সবথেকে তথ্যসমৃদ্ধ জীবনীর লেখক, গোলাম মুরশিদ সেই বছরের মাদ্রাজ টু কলকাতা জাহাজের সমস্ত যাত্রীতালিকা দেখেও হেনরিয়েটা বলে কারুর সন্ধান পাননি। এনার বংশপরিচয় নিয়েও প্রচুর সংশয় রয়েছে। ইনি কলকাতায় আসার পর মাইকেল এবং এনার আরও চারটি সন্তান হয়েছিল। কিন্তু মুশকিল হল বাংলার স্কুলের পাঠ্য পুস্তক হোক বা স্কলারলি পেপার, মাইকেলের জীবনের এই সময়ের পারিবারিক জীবন নিয়ে কেউ আর উৎসাহিত নয়। এই সময়ে শর্মিষ্ঠা নাটক লেখা হচ্ছে, এবং অবশ্যই লেখা হচ্ছে মেঘনাদবধ কাব্য। সমস্ত জীবনীকার বা গবেষক এই সময়ে সরাসরি হাইপারবোলিতে চলে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, যে সব ভালো ভালো কথা লিখে গত একশো বছর ধরে বাংলার ঘরে ঘরে ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়ে আসছে, সেই সব কথায় মাইকেলের জীবনীগ্রন্থের এই পর্যায় একদম পরিপূর্ণ। বাংলা ভাষায় নতুন দিগন্ত, বাংলায় ধূমকেতু, কাব্যের নতুন জোয়ার----ইত্যাদি বিশেষণে মাইকেল তখন থেকেই গলা অবধি ডুবে আছেন। এর মধ্যে কে আর দুই সংসার নিয়ে ভাবার সময় পাবে? বাংলায় যে সব জীবনী লেখা হয়, বাংলা ভাষার আধুনিক যুগের উন্মেষের সময় থেকেই তাদের প্রায় একশো শতাংশ পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থেকে লেখা। ফলে মহান পুরুষ ব্যক্তি কারুর জীবনী লেখা হলে তাঁর সঙ্গিনীদের কথা দুইভাবে এসেছে---হয় তাঁরা সেই পুরুষের জীবনের সমস্ত কাজের নীরব প্রেরণাদাত্রী, আর নইলে তাঁরা সেই পুরুষের জীবনের সমস্ত খারাপ ঘটনার কারণ। মাইকেলের জীবনের বিভিন্ন সময়ে যে অর্থকষ্ট, তার জন্য তার জীবনীকারেরা গত একশো বছর ধরেই ঠারে ঠারে তাঁর জীবনের দুই রমণীকে বিভিন্ন ভাবে দায়ী করে এসেছেন। কিন্তু এই দারিদ্র্যের জন্য এদের ভূমিকা খুবই কম। হেনরিয়েটা সেই উনবিংশ শতকে একজন কৃষ্ণাঙ্গকে বিবাহ করেছিলেন ইউরোপীয় সমাজের রেসিজমকে অগ্রাহ্য করে। আবার বিবাহ হয়েছিল কিনা, সেটাও সন্দেহের। কারণ এই বিষয়ে প্রমাণ নেই। হয়ত লিভ টুগেদার। তাহলে? নিজের পরিবার, ইউরোপীয় পরিমণ্ডল—সব ছেড়ে একজন দেশীয় মদ্যপের সাথে লিভ টুগেদার করেছিলেন উনি—সেটা কি কিছু নয়? (মাইকেলের প্রথম জীবনে মদ্যপান করে রাস্তায় মাতলামির কথা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “সেই সময়” গ্রন্থে বিশদে লেখা আছে) এর বিনিময়ে মাইকেল যে তাঁকে বিশেষ সুখে রেখেছিলেন, তার কি কোনও প্রমাণ আছে? বরং মাইকেল যখন হঠাৎ বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে গেলেন, তখন এই হেনরিয়েটা তাঁকে প্রচুর সাহায্য করেছিলেন। এমনকি সেখানে গিয়ে ফ্রান্সে থাকার ব্যবস্থা করা অবধি। কিন্তু মাইকেল কী করলেন? ফ্রান্স থেকে আবার একা দেশে ফিরে এলেন হেনরিয়েটা এবং সন্তানদের ফেলে রেখে। এবং ফেলে রেখে এলেন কিসের ভরসায়? বিদ্যাসাগরের পাঠানো টাকার ভরসায়!! মাইকেলের পরবর্তী জীবনীকারেরা যতই এই সময়ে ওনার উজ্জ্বল কাব্যপ্রতিভা নিয়ে সুপার লেটিভ বর্ণনায় পাতার পর পাতা ভরিয়ে তুলুন না কেন, এ কথা অনস্বীকার্য যে, মাইকেল কলকাতায় একা ফিরেছিলেন ব্যারিস্টারি করে বাবুয়ানি করবেন বলে। ইনকাম করে সংসার সাজানোর জন্য নয়। বিদ্যাসাগরের ধারের টাকায় উনি এসেই বাবুয়ানি শুরু করেছিলেন। বাংলা ভাষাকে নতুন দিগন্ত দেখানোর স্বপ্নে আচ্ছন্ন হয়ে উনি সময় কাটাননি। 
কলকাতায় ফিরেও তো মন দিয়ে কাজ করেন নি। এক মাস কাজ করলে তিন মাস চন্দন নগরে ছুটি কাটাতেন। ফরাসী সংস্কৃতির চর্চা করবেন বলে। “সংস্কৃতিচর্চা” নামক যে ভূত এর পর থেকে বাঙালিদের মাথায় উঠে তাদের অর্থনৈতিক সর্বনাশ ঘটাবে, সেই চরিত্রের কিছু কিছু আদি রূপ মাইকেলের শেষ জীবনেও খুব বেশি করে দেখা যায়। বিশেষ করে বিদ্যাসাগরের কাছে বার বার টাকা চেয়ে মাইকেলের যে সব চিঠি, সেগুলো পড়লে সত্যিই বাঙালি হিসাবে লজ্জা হয়। এদিকে বিদেশে বা এদেশে বিলাস বৈভবে সময় কাটাচ্ছেন। গতর খাটিয়ে রোজগারের নাম নেই। আর ওদিকে ব্যাঙ্কে ধার হলেই বিদ্যাসাগরকে ইনিয়ে বিনিয়ে বাটারিং করে চিঠির পর চিঠি। সত্যি বলতে, আমার ধারণা বিদ্যাসাগর এইসব চিঠি পেয়ে যথেষ্ট বিরক্ত হতেন। এখন কলেজ স্ট্রিটের রান অফ দা মিল নোটবইতে বা ফেসবুকের নব্য বাঙালি পোস্টে মাইকেলকে মহাকাব্যের ট্র্যাজিক নায়ক ইত্যাদি বলা হয়। কিন্তু আসলে ওনার জীবনের যত সমস্যা, সবটাই ওনার নিজের সৃষ্টি। 
তাহলে শেষে এত কথা বলার পর কি দাঁড়ালো? মাইকেল মধুসূদন কি একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ? এই নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকতেই পারে না। যে বাংলা ভাষায় এই প্রবন্ধ লিখছি, সেই ভাষার অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। কিন্তু সেই সাথে এটাও সত্যি যে, মাইকেলের ব্যক্তিগত জীবন একজন স্পয়েল্ট ব্র্যাটের থেকে বেশি কিছুই নয়। মাইকেলের কাব্য আমাদের নমস্য, কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন ঠিক ততটাই নিন্দার্হ। অবশ্য বাঙালিদের মধ্যে যে একটা বিশাল অংশ আছে, যারা আকাশের তারা গুণে, অলীক সাহিত্য কল্পনায়, স্বপ্নের জগতেই দিন কাটাতে ভালোবাসেন, সেই অংশের আদি পুরুষ হিসাবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম করাই যায়।
পরিশেষে আরেকটা কথা। মাইকেল মধুসূদনের ছবি টাঙ্গিয়ে তাতে মালা দেওয়ার লোকের অভাব বাংলায় কোনদিন হবে না। কিন্তু উনি এবং হেনরিয়েটা যখন তিনদিনের ফারাকে পর পর ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন, তখন ওনাদের নাবালক চার সন্তান একসাথে অনাথ হয়ে পড়েছিল। মাইকেল ছিলেন পিতা মাতার একমাত্র জীবিত সন্তান। হেনরিয়েটারও আত্মীয়স্বজনের কোনও সঠিক খোঁজ পাওয়া যায় না। তাহলে তখন সেই অনাথ সন্তানদের কে দেখেছিল? বঙ্গ সমাজের থেকে কেউ কি এরপর তাদের আর খোঁজ নিয়েছিলেন? আমার দেখা সমস্ত মাইকেল বিষয়ক গ্রন্থ ওনার মৃত্যুতেই এসে থমকে যায়। তারপর সেই বইয়ের শেষ পরিচ্ছেদ হয় মাইকেলের অমরত্ব এবং কাব্যপ্রতিভা নিয়ে। কিন্তু এই অনাথ সন্তান এবং মাদ্রাজের বাকি পরিবার সম্পর্কে মাইকেলের মতোই, বঙ্গ সমাজ, ইতিহাস এবং তৎকালীন বুদ্ধিজীবী মহল সম্পূর্ণ নীরব।এটুকু শুধু জানা যায় যে, মাইকেলের উত্তরপুরুষেরা তাদের পদবী পরিবর্তন করে “ডাটন” করে নিয়েছিলেন। 

প্রবন্ধ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

সমতা'র অধিকার

সমতা'র

 

অধিকার

সাম্য সরকার 

drunk.jpeg

অধিকার বিষয়টা একটু গোলমেলে। স্থান, কাল সাপেক্ষে এর সংজ্ঞা আর চৌহদ্দি পাল্টে পাল্টে যায়। আর সেই সঙ্গে অধিকার সম্বন্ধে নাগরিক ধারণাগুলোও। প্রতিটি দেশের সংবিধানেই নাগরিকের প্রাপ্য মৌলিক অধিকার ও পালনীয় মৌলিক কর্তব্যগুলি নির্দিষ্ট থাকে। আধুনিক সংবিধানে গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয় সাম্যের অধিকার। রাষ্ট্রের চোখে, আইনের ন্যায়ের সামনে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা সমান।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিকতার জটিলতা যেখানে ভোটের ওয়েটেজ নির্ধারিত হয় ব্যক্তির পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা তথা সামাজিক স্থান সাপেক্ষে, গণএর তন্ত্র সেখানেও যে উপেক্ষিত হয় না তা ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটার্স আন্দোলনে প্রমাণিত। সাদা চামড়ার পুলিশ আধিকারিকের পায়ের তলায় চাপা পড়া কালো মানুষটার শেষ কথাটা 'আই কান্ট ব্রিদ' প্রবাদের তকমা পেয়েছে। হ্যাশট্যাগ হয়ে বিশ্বায়িত দুনিয়ায় প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছে। যার তরঙ্গে সুদূর উপমহাদেশের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের কালো মানুষদের ফর্সা করবার দায়মুক্ত হয়ে বিজ্ঞাপনী  প্রচার পাল্টাতে হয়েছে বহুজাতিক প্রসাধনী প্রস্তুতকারক এক সংস্থাকে। এ জয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায় বোধের। সম্মিলিত নাগরিক প্রতিবাদ সে দেশের ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। চামড়ার রঙের বিভেদকে পেছনে ফেলে জিতে গিয়েছিল গণএর তন্ত্র।

ভেদ যেখানে একটি চেনা ছকে সেখানে অসাম্যকে চেনা সহজ। যেমন গায়ের রং বা বর্ণ সাপেক্ষে নাগরিক সাদা-কালো বা লিঙ্গ সাপেক্ষে নারী-পুরুষ শ্রেণীতে বিভাজিত হবেন। সেখানে কালোর উপর সাদা বা নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্ববাদী চিহ্ন বা লক্ষণগুলোর সনাক্তকরণ সম্ভব কিন্তু বিভাজনের ভেতরে বিভাজন বা শ্রেণীর ভেতরের শ্রেণীকরণে দ্বৈততা অতিক্রম করে যখনই বহুত্বে উপনীত হয় তখনই ঘরের ভিতরে ঘর, তার ভেতর ঘর - চৌখুপিটা ছোট হতে হতে অসাম্যকে করে দেয় আকাশ ছোঁয়া, অলঙ্ঘ্যপ্রায়। 

সাদা পুরুষের তুলনায় কালো মহিলাকে বাইরে ও ঘরে, দুই দিকে দু'রকম অসম পরিবেশ এবং বর্তমান যুগে কর্মক্ষেত্রে একই সাথে দ্বিগুণ অসাম্যের সম্মুখীন হতে হয়। লিঙ্গ, ত্বকের রং পেরিয়ে ধর্ম, ধর্মের ভেতর জাত ও জাতি, তার ভেতর ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক ও যৌনতা - যত বেশি বিভাজন তত বেশি অসাম্য। অসাম্যের এই ভেদগুলি সব সময় সরল পথে চলে না। অনেক সময় একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে থাকে। নারীর প্রতি বৈষম্য সমস্ত নারীকে এক খোপে আনতে পারেনা। সেখানে নারীর অপরাপর সত্ত্বা তথা ধর্ম, বর্ণ, জাতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক স্থান কাজ করে থাকে। অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা উচ্চবর্ণের মানুষের করায়ত্ত হয়ে থাকে আবার শিক্ষার আলো তাদেরই অন্দরমহলে আগে পৌঁছায়। রাজনৈতিক প্রতিপত্তির অধিকারীও তারাই হয়। এখানেই ভূমিকা রাষ্ট্রের। শ্রেণীবিন্যাস ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হতে পারে একমাত্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের হাত ধরেই।

একটা কল্যাণকামী রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সমমর্যাদা ও সমান অধিকার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যে দেশে রাষ্ট্রের যতটুকু পরিসর তার মধ্য দিয়েই তা নিশ্চিত করার কথা। এটা রাষ্ট্রের দায়। পশ্চিম ইউরোপের উন্নত দেশগুলি ও কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডসের মতো একদা ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিও সমাজতান্ত্রিক না হলেও জনকল্যাণে রাষ্ট্র সদর্থক ভূমিকা পালন করে থাকে। তারাই মানব উন্নয়নের নিরিখ প্রথম সারিতে থাকে। সেখানে নাগরিকের মূল্য আছে। রাষ্ট্রের কাছে, সহনাগরিকের কাছে ও নাগরিকের নিজের কাছে। তাই নাগরিক অধিকার সেখানে গুরুত্ব ও মর্যাদা পেয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনতন্ত্রের আদর্শ উদাহরণ হওয়া এক দেশ আবার মানবাধিকার আন্দোলনের আঁতুড় ঘরও। ন্যায়ের শাসন সেখানে প্রতিষ্ঠিত বলা যায় কারণ যে সামাজিক শিক্ষা অধিকারবোধ, আত্মমর্যাদার জন্ম দেয় সেটা তারা অর্জন করতে পেরেছে। এই উন্নতি জিডিপির সংখ্যায় মাপা যায় না। তাদের ক্ষেত্রে অসাম্য এত বহু বিভক্ত ও জটিলও নয়‌। 

ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদী প্রভু পঁচাত্তর বছর আগে চলে গেলেও দাসত্বের অভ্যাস ঘাড় থেকে নামানো যায়নি। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়েই প্রশাসক যেমন ভুলে যায় নির্বাচনকারী জনগণের প্রতি প্রশাসকের তথা নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের কিছু দায় থাকে। নাগরিকরাও দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে ভুলেই থাকেন তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের কিছু দায় আছে। কথাটা আসলে শাসক নয় প্রশাসক। সেটা যিনি প্রশাসনে বসেন আর যারা বসান উভয়পক্ষই ভুলে যায়। প্রশাসকের নাগরিক অধিকারের কথা স্মরণে আসে পাঁচ বছর পর পর, ভোটের আগে। নাগরিকেরাও ওই একটি মাত্র দিনে তাঁদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করবার সুযোগ পান। অনেক সময় তাও পান না সে দায়িত্ব অন্য কেউ নিয়ে ফেলে বলে। বৈষম্যের তালিকায় সবার উপরে যাদের স্থান সমাজে তাঁদের স্থান সবচেয়ে নীচু তলায়। মাননীয় প্রশাসকগণ বটেই তারা নিজেরাও নিজেদেরকে অবমানব বলেই জ্ঞান করেন। তাইতো কোভিডকালে টিভির সামনে এসে চার ঘন্টার নোটিশে দেশজুড়ে লকডাউনের ঘোষণা করা যায় হাসি হাসি মুখে। দেশ ভাগের স্মৃতি উসকে দিয়ে পোটলা বাক্স নিয়ে শিশু কোলে মানুষের ঢল নামে। কিছু দেহ নিথর পড়ে থাকে রাস্তায়। আগুন, মাটি মেলেনা। কিছু দেহ পড়ে থাকে রেললাইনে। কিছু দেহ ভেসে যায় নদীতে। কত হৃদপিণ্ড থেমে যায় একলা বিছানায় তা কোনও সমীক্ষায় উঠে আসে না। এরপর বাস থেকে নামিয়ে কিছু মানুষকে উবু করে বসিয়ে হোসপাইপ থেকে স্যানিটাইজার ছুঁড়ে স্নান করানো হয়। প্রতিবাদ উঠে না। নির্বাচনের সময় নিজের পাড়াতে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাদের কেন্দ্রীয় বাহিনীর পুরুষ কর্মী এসে পিটাতে পারেন, কেদারনাথে অ-ভিআইপি সাধারণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভক্তদের প্রহার করতে পারেন। কেউ আওয়াজ তোলে না। গরীব আবার মানুষ কি!  
নিকোবরের চির হরিৎ অরণ্য, ছত্রিশগড়ের অবুঝমার, কারেগুট্টা, মহারাষ্ট্রের গরচিরোলি, মুম্বাই,

উড়িষ্যার সিজামালি, হাসদেও, সিমলিপাল, মধ্যপ্রদেশের বস্তার, যেখানেই পাহাড়, জঙ্গলের বুকের ভেতর খনিজ পদার্থ পাওয়া যায় সেখানকার আদিবাসীরা মাওবাদী হয়ে যান। উড়িষ্যার রায়গড়া, কালাহান্ডি, নিয়মগিরি জেলার বিস্তীর্ণ আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল জুড়ে বেদান্ত কোম্পানির বক্সাইট উত্তোলন প্রকল্প চালু হয়ে গিয়েছে। পরিবেশ মন্ত্রকের ছাড়পত্র ছাড়া, কোর্টের রায়কে উপেক্ষা করেই। সেই বেদান্ত গ্রুপ যার বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণে এই ১৪ই এপ্রিল তেইশ জন শ্রমিক মারা যান ছত্রিশগড়ে। সরকার দেয় নেয় না। সেই বেদান্ত গ্রুপ যারা অলিভ রিডলি কচ্ছপের প্রজননস্থল ভিতরকণিকায় অ্যালুমিনিয়াম উত্তোলন প্রকল্প গড়তে চেয়েছিল। ডবল ইঞ্জিন সরকারের পুলিশ করেই। সেই বেদান্ত গ্রুপ যার বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণে এই ১৪ই এপ্রিল তেইশ জন শ্রমিক মারা যান ছত্রিশগড়ে। সরকার দায় নেয় না। সেই বেদান্ত গ্রুপ যারা অলিভ রিডলি কচ্ছপের প্রজননস্থল ভিতরকণিকায় অ্যালুমিনিয়াম উত্তোলন প্রকল্প গড়তে চেয়েছিল। ডবল ইঞ্জিন সরকারের পুলিশবাহিনী যখন রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত মানুষের উপর চড়াও হয়ে জায়গা খালি করতে যায় তখন পুনর্বাসন, অরণ্যের অধিকার শব্দগুলো অলীক, অর্থহীন হয়ে পড়ে। সেইসব মানুষের কাছে গলায় দড়ি দিয়ে এক বুক জলে দাঁড়িয়ে জল সত্যাগ্রহ বা চিতায় শুয়ে মৃত্যুর দিন গোণা ছাড়া করবার আর কিছু থাকে না। কোনও প্রতিবাদ ওঠে না। উড়িষ্যায় যেমন সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভ তেমনি মধ্যপ্রদেশে পান্না টাইগার রিজার্ভ বলি হবে কর্পোরেট উন্নয়নের। তার দশ শতাংশ তলিয়ে যাবে জলের তলায়। সাথে ডুববে আরো দশটা গ্রাম। সাথে উচ্ছেদ হবে আরো চোদ্দোটা গ্রামের মানুষ। আদিবাসীতে ভরা রোগা সোগা কেন্ নদীর জল যাবে উত্তরপ্রদেশের আর্য গ্রামে। স্বাধীনতা উত্তর সময়ে দেশের উন্নয়ন, দশের উপকারের দায় বরতে আসছে আদিবাসীদের উপরে। এ ব্যাপারে ডান, বাম, রাম সবাই সমান। আদিবাসী আবার মানুষ কি! 

অপরের সাথে সাথে এ ভাবনা তাদের নিজেদেরও যে। দারিদ্র তাই শ্রেণী হয়ে ওঠে না। ভোটের ময়দানে লিঙ্গ, জাত, ধর্মে ভাগ হয়ে যায়। ধনীর বেপরোয়া গাড়ির চাকায় এক রত্তি ফুটপাতবাসীর দেহ পিষে গেলে তাঁরা শোকে কাতর হতে পারেন, প্রতিকারের দাবি জানাতে পারেন না। তেমনভাবে যে ভাবতেই শেখেননি তাঁরা। যাবতীয় বৈষম্য, বঞ্চনা, জুলুম তাঁরা তাঁদের দুর্ভাগ্য বলেই মেনে নেন। আক্রোশ সিনেমার ওম পুরি'র চরিত্রটির মতো। প্রশাসকও জানেন জাতির মগজ তাদের হাতের তালুতে।
গণতন্ত্রে চারটি মৌলিক স্তম্ভ - আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং সংবাদ মাধ্যম। শ্রম আইন, কৃষি আইন, অপরিহার্য পণ্য আইনের মত একের পর এক জনবিরোধী বিল পাশ হয় আর তার দ্রুত রূপায়ণ হয় বিরোধীহীন ফাঁকা সংসদে। রাষ্ট্র যখন গজাল পোঁতে দেশের ভেতরে দেশের মানুষের রাস্তা আটকাতে কিংবা সাঁজোয়া গাড়ি নিয়ে বুলডোজার আসে নিম্নবিত্তের ঘর, দোকান ভাঙতে বুঝতে হবে রাষ্ট্র তার কল্যাণকামী চরিত্র হারিয়েছে। বুঝতে হবে প্রথম স্তম্ভ দুটি ভেঙে পড়েছে। বিচার বিভাগ যখন কর্পোরেটের স্বার্থ রক্ষা করে পরিবেশবিধি লংঘনকে উপেক্ষা করে, বিচার  বিভাগের সর্বোচ্চ স্থান থেকে যখন বার্তা আসে ভোট দেয়া মৌলিক অধিকার নয় কিংবা একবার ভোট না দিলেই নাগরিকত্ব খারিজ হয়ে যায় না তখন বোঝা যায় নাগরিকের ভরসা শেষ আশ্রয় তৃতীয় স্তম্ভটি ও আর গোটা নেই। যাবতীয় সংবাদ মাধ্যম যখন স্কুলছাত্রীর গণধর্ষণের খবর চেপে যায় বুঝতে হবে চতুর্থ স্তম্ভটিও দাসখত দিয়ে বসে আছে। সম্পূর্ণ হয়েছে প্রশাসকের শাসক হওয়া।

অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না ভারতীয় সংবিধান (অনুচ্ছেদ ১৪) অনুযায়ী রাষ্ট্র সকল ব্যক্তিকে সমান আইনি অধিকার ও সমান সুরক্ষা দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। 

পশ্চিমবঙ্গে দুই মাসে সম্পন্ন হওয়া বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এস আই আর) প্রাথমিকভাবে ষাট লাখ মানুষ বাদ দেওয়ার পর কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গের জন্যই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নামে নতুন এক ইললজিকাল ছাঁকনি উৎপন্ন করে। যেখানে হাসপাতাল থেকে শ্মশান সবেতেই সনাক্তকরণের জন্য আধার ব্যবহার হয় সেখানে নাগরিককে কেন নিজের বাবা, ঠাকুরদার নথি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে সে প্রশ্ন করলেও উত্তর পাওয়া যাবে না। একটা অপরিক্ষীত সফটওয়্যার দিয়ে বাদ না যাওয়া নামগুলি আবার কি উদ্দেশ্যে স্ক্যান করা হবে সে প্রশ্নটাই অবান্তর কারণ ফলের মধ্যেই আছে ওই উত্তর। 

রাজ্যের সমস্ত বিচারককে দুই মাস ধরে নিযুক্ত রেখে নাগরিকত্ব ফিরে পান ১৩৬ জন মানুষ। সোনালী বিবির সঙ্গীরা জানেন অপেক্ষা মানে কখন অভিশাপ হয়। ভোট দেবার অধিকার নেই কিন্তু ভোট নেবার দায়িত্ব পাওয়া ৬৫ জন নাগরিককে কোনও সুরাহা দিতে পারেননি স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টও। বিশ্বের সর্ব বৃহৎ গণতন্ত্রে যেখানে মার্সিডিজ থেকে নামা আর সাইকেল থেকে নামা মানুষের একটি ভোটের মূল্য একই, রাজাহীন প্রজা'র তন্ত্রে যেখানে আইনের চোখে সকলেই সমান, সেখানেই প্রায় ৯০ লাখ মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলেন না। এ সরাসরি সংঘাত ভারতের সংবিধান ও ভারত রাষ্ট্রের। ৯০ লাখ বিচারাধীন মানুষের বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কেন হ্রদ করা হবে না বা নির্বাচনের আগেই কেন এস আই আর করানো হল এই প্রশ্নের কোন উত্তর পাওয়া যাবে না। কারণ বাতিল হওয়া ৯০ লাখ ভোট ব্যাকরণহীন   হলেও এর মধ্যে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী, মহিলা ও অতি দরিদ্র প্রান্তিক শ্রেণী বাদ গেছেন বেশী।  

বাদ না পড়া বাকি সংখ্যাগুরু  জনগোষ্ঠীর  বেশিরভাগের চোখে এই বাদ পড়াটা  বৈধ ঠেকেছে। সেজন্যই নারীর প্রতি নারীর, দরিদ্রের প্রতি দরিদ্রের কিংবা শূদ্রের প্রতি শূদ্রের সহানুভূতি তৈরি হয়নি। বাদ না পড়ারা বেরিয়ে এসে বাদ পড়াদের অধিকারের পক্ষে একযোগে গলা মেলান নি। রাস্তার পাশে, রেল স্টেশনে মধ্যরাতের  সেনা সুরক্ষিত বুলডোজারের সামনে অফিস যাত্রীরা ঢাল হয়ে দাঁড়ান নি। তাদের থেকে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকাদের জীবন জীবিকার অধিকার আদায় করে নেননি। ডিটেনশন ক্যাম্পের দেওয়ালগুলো প্রতিবেশীরা এসে ভেঙে দিয়ে যাননি। বহুত্বের মধ্যে একতার স্লোগান পাল্টাতে শুরু করেছে সবে একদশক। তার বহু আগে থেকেই ভারতবাসী হয়তো তাদের এই বহুত্বের কারণেই এক হতে পারেননি। বাইরের বা ভেতরের শত্রুর সামনে বহু বিভক্ত শ্রেণী হিসেবেই থেকে গেছেন। দেশের থেকে দেশবাসীকে বাদ দিলে যে খালি মানচিত্রটাই পড়ে থাকে, দেশপ্রেম মানে অনেকটা প্রেম অন্যের প্রতি, অপরায়ন নয়, দেশপ্রেম তো কিছুতেই নয় - এভাবে দেখবার চোখগুলো সব ঝাপসা এখন। যে ক্ষুরটা দিয়ে চেঁছে চোখের ওই ঝাপসা দৃষ্টি স্বচ্ছ করতে হয় তার নাম শিক্ষা। সকলের জন্য শিক্ষা। সমান শিক্ষা। ব্রাহ্মণ্যবাদী কর্পোরেট ধনকুবেরতন্ত্রে যা আকাশ কুসুম কল্পনার মত। সর্বস্তরে শিক্ষা পৌঁছানোর বর্তমান কাঠামোটা ধ্বংসের মুখে। সমতার অধিকার তাই শুধু ছাপার অক্ষর হয়ে গড়াগড়ি খায় প্রিঅ্যাম্বেলএ।

প্রবন্ধ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

ঈশ্বর ও মানুষ –

কে কার স্রষ্টা?

বলাই চন্দ্র দাশ

বারাসাত, কলকাতা 

Durga1.jpg
ঈশ্বর ও মানুষ

নদীর বুকে তখন প্রলয়। আকাশ কালো হয়ে নেমে এসেছে জলের ওপর, আর একখানা ছোট্ট ডিঙি নৌকা দুলছে যেন খড়কুটোর মতো। নৌকার মাঝি, যে সারাজীবন এই নদীকেই চিনেছে, এখন আর হাল ধরে রাখতে পারছে না। ঢেউ একটার পর একটা আছড়ে পড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, বিপদের চূড়ান্ত মুহূর্তে, তার মুখ থেকে আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে একটা ডাক — "ও মা গঙ্গা, বাঁচাও গো মা!" কেউ তাকে শেখায়নি এই ডাকটা ঠিক কখন দিতে হয়। বিপদ যত গভীর হয়, ডাকটাও তত জোরালো হয়। এই ডাক আসলে কোথা থেকে আসে? কেন মানুষের মন, একেবারে নিরুপায় মুহূর্তে, নিজে থেকেই একটা অদৃশ্য, শক্তিশালী, দয়ালু কাউকে খুঁজে বার করে নেয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গত কয়েক দশকে মনোবিজ্ঞানী আর দার্শনিকরা বেশ কয়েকটি চমৎকার তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। এই তত্ত্বগুলো ঈশ্বর সত্যিই আছেন কি নেই, সেই প্রশ্নের বিচার করে না — বরং দেখায়, মানুষের মন কোন কোন পথ ধরে, কোন কোন প্রয়োজন থেকে, নিজের ভেতরেই ঈশ্বরের একটা পরিষ্কার, জীবন্ত ধারণা তৈরি করে নিয়েছে। আসুন, একে একে দেখা যাক সেই পথগুলো।


কর্তা-শনাক্তকরণ তত্ত্ব (Hyperactive Agency Detection Theory)
ধরুন, আপনি রাত দুটোয় একা বাড়ি ফিরছেন। রাস্তা নির্জন। হঠাৎ পেছনে একটা পায়ের শব্দ শুনতে পেলেন। আপনার হৃৎপিণ্ড ধক করে ওঠে, শরীর সতর্ক হয়ে যায়, আপনি ঘুরে তাকান। দেখা গেল, ওটা নেহাতই বাতাসে পাতার খস খস শব্দ। কোনো বিপদ ছিল না। কিন্তু লক্ষ্য করুন — আপনার মন কিন্তু একবারের জন্যও ভাবেনি, "ওটা নিশ্চয়ই বাতাস" বা "ওটা কিছুই না"। মন সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিয়েছিল, পেছনে "কেউ" আছে — একটা ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন স্বত্বা, যা আপনাকে অনুসরণ করছে। 
এই প্রবণতাটাই মনোবিজ্ঞানী জাস্টিন ব্যারেট ২০০৪ সালে তাঁর Why Would Anyone Believe in God? বইতে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, কোনো অস্পষ্ট শব্দ বা ঘটনা দেখলে সে সবসময় ধরে নেয় তার পেছনে একটা "জীবন্ত স্বত্বা’  আছে — কারণ, বিবর্তনের চোখে এই ভুলটা করা লাভজনক ছিল। যে মানুষ প্রতিবার বাতাসকেও বাঘ ভেবে সতর্ক হতো, সে বেঁচে যেত। আর যে ভাবত, "ধুর, কিছুই না", দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা যদি সত্যিই বাঘ হতো, তাহলে সে আর বেঁচে থাকত না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই ভুল করার প্রবণতাটাই মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে গেছে। প্যাসকাল বয়ার ২০০১ সালে তাঁর Religion Explained বইতে দেখান, এই একই প্রবণতা বজ্রপাত, মহামারী, অতিবৃষ্টি, খরা — সবকিছুর পেছনে একটা "কারও ইচ্ছা" খুঁজে বেড়ায়। যে মন রাতের পাতার খস খস শব্দে "কেউ আছে" ভাবে, সেই মনই আকাশের বজ্রপাতে ভাবে, "কেউ রেগে আছেন"। এখান থেকেই প্রথম জন্ম নেয় অদৃশ্য, শক্তিমান কোনো সত্তার আবছা ধারণা — যাকে পরে মানুষ নাম দেয়, রূপ দেয়, আর একসময় তাকেই বলে ঈশ্বর।

 
অস্তিত্বমূলক মনতত্ত্ব (Existential Theory of Mind)
কিন্তু শুধু "কেউ একজন আছে" ভাবাটাই যথেষ্ট নয়। ঈশ্বর তো শুধু একটা উপস্থিতি নন — তিনি আমাদের কথা শোনেন, আমাদের বিচার করেন, আমাদের ভালোবাসেন বা আমাদের  প্রতি রাগ করেন। এই সম্পূর্ণ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ঈশ্বরের ধারণা তৈরি হতে মনের আরেকটা ক্ষমতা লাগে — যাকে বলে "অপরের মন বোঝার ক্ষমতা"। ছোটবেলা থেকেই আমরা শিখি, অন্য মানুষের ভেতর একটা মন আছে, যেখানে চিন্তা, ইচ্ছা, স্মৃতি জমা থাকে। মনোবিজ্ঞানী কার্ট গ্রে ও ড্যানিয়েল ওয়েগনার ২০১০ সালে তাঁদের একটি গবেষণায় দেখান, মানুষ যখন এই ক্ষমতাকে সীমার বাইরে নিয়ে গিয়ে কল্পনা করে এমন একটা মন, যা সব জানে, সব মনে রাখে, সবকিছু দেখতে পায় — তখনই জন্ম নেয় সত্যিকারের, ব্যক্তিগত ঈশ্বরের ধারণা। তাঁরা একে বলেছেন "অস্তিত্বমূলক মনতত্ত্ব"।
উদাহরণ দিয়ে বলি। একজন কৃষক তাঁর ধানখেতের দিকে তাকিয়ে আছেন। বৃষ্টি হচ্ছে না, মাটি ফেটে চৌচির। তিনি শুধু ভাবেন না, "এবার বৃষ্টি কম হয়েছে"। তিনি ভাবেন, "আমাদের ওপর তিনি রুষ্ট হয়েছেন", বা "আমাদের পাপের শাস্তি দিচ্ছেন উপরওয়ালা"। লক্ষ্য করুন, এখানে তিনি প্রকৃতিকে দোষ দিচ্ছেন না — তিনি এমন একজনের ইচ্ছার দিকে ইঙ্গিত করছেন, যাঁর একটা মন আছে, যিনি সবার কাজকর্ম মনে রাখেন, বিচার করেন, আর সেই বিচার অনুযায়ী পুরস্কার বা শাস্তি দেন। এই এক লাফেই সাধারণ "কর্তা-শনাক্তকরণ" পেরিয়ে মন পৌঁছে যায় সম্পূর্ণ একজন ঈশ্বরের ধারণায় — যিনি শুধু আছেন তাই নয়, যিনি আমাদের চেনেন, মনে রাখেন, বিচার করেন এবং পুরস্কার বা শাস্তি দেন। 

​

​শঙ্কা-ব্যবস্থাপনা তত্ত্ব (Terror Management Theory)

এবার আসা যাক মৃত্যুর কথায়। মনোবিজ্ঞানী আর্নেস্ট বেকার ১৯৭৩ সালে তাঁর বিখ্যাত বই The Denial of Death-এ লিখেছিলেন, মৃত্যুর সচেতনতা মানুষকে অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি তাড়া করে বেড়ায়। আর জেফ গ্রিনবার্গ, টম পিসচিনস্কি ও শেলডন সলোমন ১৯৮৬ সালে তাঁদের গবেষণাপত্রে দেখান, মানুষ এই ভয়ের মোকাবিলা করে দুটো উপায়ে — হয় নিজের নাম-যশ-

সন্তানের মধ্য দিয়ে "প্রতীকী অমরত্ব" খুঁজে, নয়তো সরাসরি পরকালে, স্বর্গে, বা পুনর্জন্মে বিশ্বাসের মাধ্যমে। এই তত্ত্বকে তাঁরা বলেছেন " শঙ্কা--ব্যবস্থাপনা তত্ত্ব"। এই তত্ত্বটা বোঝার সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হলো হাসপাতালের বেড। ধরুন, কোনো মানুষ, যিনি সারাজীবন খুব একটা ধর্মকর্ম করেননি, হঠাৎ জানতে পারলেন তাঁর মারাত্মক অসুখ ধরা পড়েছে। লক্ষ করে দেখবেন, এই খবর পাওয়ার পর অনেকেই হঠাৎ করে প্রার্থনা শুরু করেন, গীতা বা কোরান পড়তে শুরু করেন, আত্মার অবিনশ্বরতায় বিশ্বাস খুঁজতে থাকেন। কেন এই আকস্মিক পরিবর্তন? কারণ মৃত্যু যখন খুব কাছে এসে দাঁড়ায়, তখন "এখানেই সব শেষ" — এই ভাবনাটা মন সহ্য করতে পারে না। তখন সে এমন একটা বিশ্বাসের কাছে ছুটে যায়, যা বলে — না, শেষ নয়, এরপরও কিছু আছে, একটা আত্মা আছে, একজন ঈশ্বর আছেন যিনি তোমাকে ওপারে টেনে নেবেন। মৃত্যুভয় যত তীব্র হয়, ঈশ্বরের প্রয়োজনও তত তীব্র হয়ে ওঠে — এটাই এই তত্ত্বের মূল কথা।


অর্থ-অনুসন্ধান তত্ত্ব (Meaning-Making Theory)
মানুষের মন আরেকটা জিনিস কিছুতেই মেনে নিতে পারে না — সেটা হলো, বিনা কারণে কিছু ঘটা। মনোবিদ ভিক্টর ফ্রাংকল ১৯৫৯ সালে তাঁর Man's Search for Meaning বইতে দেখিয়েছিলেন, ভয়ংকরতম দুর্দশার মধ্যেও যদি মানুষ একটা "কেন" খুঁজে পায়, সে বেঁচে থাকার শক্তি পায়। নৃতত্ত্ববিদ ক্লিফোর্ড গির্ৎজ ১৯৭৩ সালে তাঁর লেখায় বলেছিলেন, ধর্মের একটা বড় কাজ হলো জগৎকে যথেচ্ছ নয়, বরং অর্থপূর্ণ করে দেখানো। আর গবেষক স্টিফেন ক্র্যানি ২০১৩ সালে তাঁর একটি সমীক্ষায় দেখান, যাঁরা দৃঢ়ভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, তাঁরা নিজেদের জীবনের বেশি অর্থ খুঁজে পান।
একটা উদাহরণ ভাবুন। কোনো পরিবারের একমাত্র তরুণ ছেলে হঠাৎ একটা দুর্ঘটনায় মারা গেল। পরিবারের মানুষগুলো ভেঙে পড়েছে, আর বারবার একটাই প্রশ্ন করছে — "কেন? ওরই কেন হলো?" এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। "নিছক দুর্ঘটনা, কোনো কারণ নেই" — এই উত্তরটা মন কিছুতেই মেনে নিতে পারে না, কারণ এ উত্তরটা বড় বেশি ফাঁকা, বড় বেশি নিষ্ঠুর। তখন কেউ একজন বলে, "ওপরওয়ালা হয়তো ওকে বেশি ভালোবাসতেন, তাই তাড়াতাড়ি নিয়ে গেলেন", বা "এটাই বোধহয় ওর নিয়তি ছিল, ঈশ্বরের ইচ্ছা"। 
লক্ষ্য করুন, এই কথাগুলো ঘটনাটাকে বদলায় না — ছেলেটা তো ফিরে আসবে না। কিন্তু এই কথাগুলো একটা অসহনীয়, অর্থহীন ঘটনাকে একটা গল্পের মধ্যে বসিয়ে দেয়, যেখানে কেউ একজন — একজন ঈশ্বর — সবকিছু জানেন, সবকিছুর পেছনে একটা পরিকল্পনা আছে। এই অর্থ খোঁজার তাড়না থেকেই মনের ভেতর ধীরে ধীরে দৃঢ় হয় সর্বজ্ঞ, পরিকল্পনাকারী ঈশ্বরের ধারণা।


প্রক্ষেপণ তত্ত্ব (Projection Theory)
সবশেষে আসা যাক সবচেয়ে গভীর তত্ত্বটায়। জার্মান দার্শনিক লুডভিগ ফয়েরবাখ ১৮৮১ সালে তাঁর The Essence of Christianity বইতে লেখেন, ঈশ্বরের মধ্যে আমরা যে প্রেম, যে ক্ষমা, যে অসীম মমতা দেখি, তা আসলে মানুষেরই সবচেয়ে ভালো গুণগুলোর সীমাহীনতার প্রতিচ্ছবি। কোন কল্পিত সত্ত্বার মধ্যে ঐ সব ভালো গুণগুলোর সীমাহীনতা আরোপ করা, বিভু করে দেখা, আর তারপর পূজা করা। মনোবিশ্লেষক সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর ১৯২৭ সালের প্রবন্ধে (পরে ১৯৬১ সালে ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত) আরেকটু নির্দিষ্ট করে বলেন — ‘ঈশ্বর আসলে শৈশবের সেই রক্ষাকর্তা বাবার প্রতিচ্ছবি, যাঁর কোলে ফিরে যেতে বড় হয়েও আমাদের মন ব্যাকুল থাকে’। 
এই তত্ত্বটা বোঝার জন্য একটু নিজের দিকেই তাকান। বিপদে পড়লে বাঙালি কাকে ডাকে? "ও মা!", "বাবা গো!", "মা কালী, রক্ষা করো!" — লক্ষ করুন, ঈশ্বরকে ডাকার সময়ও আমরা পারিবারিক সম্পর্কের ভাষাই বেছে নিই। ছোটবেলায় যে মা কোলে তুলে নিতেন যখনই আমরা কেঁদে উঠতাম, যে বাবা অন্ধকারে হাত ধরে থাকতেন, বড় হয়ে সেই একই নিরাপত্তার অনুভূতি আমরা খুঁজি ঈশ্বরের মধ্যে। ছোট শিশু যেমন ভাবে তার বাবা-মা সব জানেন, সব পারেন, তাকে কখনও ছেড়ে যাবেন না — বড় হয়ে সেই একই বিশ্বাস, একই নির্ভরতা, আমরা প্রক্ষেপণ করি এক অসীম, চিরন্তন "পিতা" বা "মাতা"-র ওপর। ঈশ্বর তাই অনেকটা সেই শৈশবের নিরাপত্তার স্মৃতি, যাকে আমরা বিভু করে, চিরস্থায়ী করে, আকাশের ওপারে বসিয়ে দিয়েছি।
সবগুলো সুতো এক জায়গায় এই পাঁচটি তত্ত্ব আলাদা আলাদা জায়গা থেকে শুরু হলেও, শেষে সবাই একই জায়গায় এসে মেলে। বিপদে "কেউ একজন আছে" মনে হওয়া (কর্তা-শনাক্তকরণ), সেই কাউকে একটা সচেতন, বিচারক মন দিয়ে সাজানো (অস্তিত্বমূলক মনতত্ত্ব), মৃত্যুর ভয় থেকে বাঁচার জন্য তাঁর কাছে অমরত্ব চাওয়া (শঙ্কা-ব্যবস্থাপনা তত্ত্ব), দুঃখ-কষ্টকে অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্য তাঁর একটা পরিকল্পনা খুঁজে নেওয়া (অর্থ-অনুসন্ধান তত্ত্ব), আর শৈশবের নিরাপদ বাবা-মায়ের ছবিটাকে তাঁর ওপর বসিয়ে দেওয়া (প্রক্ষেপণ তত্ত্ব) — এই পাঁচটি সুতো পরপর জুড়ে গেলেই তৈরি হয় সেই সম্পূর্ণ, জীবন্ত, বিভু, নিবিড় ঈশ্বরের ধারণা, যাকে মানুষ মন্দিরে, মসজিদে, গির্জায়, অথবা একলা প্রার্থনায় ডেকে ওঠে।
এই লেখা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার জন্য নয়। ঈশ্বর আছেন কি নেই, সে প্রশ্নের অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যও এ লেখার নয়। ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কি না সে আলোচনাও এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং এই লেখা দেখাতে চায়, ঈশ্বর বিশ্বাসের পেছনে লুকিয়ে আছে মানুষের মনেরই এক আশ্চর্য, গভীর, আর অসম্ভব মানবিক ইতিহাস। অর্থাৎ ঈশ্বরের অস্তিত্ব, মানুষের কল্যানে মানুষেরই মনন শক্তির এক অসম্ভব সুন্দর, কল্যাণময়,ও সত্যের বিভু প্রকাশ। 
নদীর মাঝির সেই ডাক — "ও মা গঙ্গা, বাঁচাও গো মা"—সত্যিই কোনো এক মায়ের কাছে  যদি না পৌঁছায়ও, তবুও সেই ডাক (ভগবান/ আল্লা/ ঈশ্বর) নিজেই, লক্ষ বছরের বিবর্তন আর অগণিত মানুষের ভয়, ভালোবাসা আর বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা, মানুষের মনের সুন্দরতম মধুরতম সৃষ্টি! 

 

[নোটঃ মানুষকে কি ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন? কেন? এই মহাবিশ্বে ব্যক্তি মানুষকে ঈশ্বর মনে রাখেন? বিচার করেন? এমন সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অবকাশ হয়নি এ লেখায়।]

প্রবন্ধ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

subrata majumder_edited.jpg

নেতাজির প্রিয় পুই-চচ্চড়ি ও এক মুঠো মুক্তি:

উত্তর কলকাতার

পাইস হোটেল কথা

সুব্রত মজুমদার

হিউস্টন, টেক্সাস​

picehotel.jpg
পাইস হোটেল

​বউবাজারের ঘিঞ্জি গলি আর কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের গন্ধ মাখা সেই পরিচিত বাঁকটা পেরোলেই যেন সময়ের ঘড়িটা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে। ভবানী দত্ত লেনের সেই পুরনো নীল রঙের বোর্ডটা আজও অম্লান— 
'স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল'। এই হোটেলের সামনে দাঁড়ালেই নাকে আসে সরষের তেলের ঝাঁঝালো সুবাস, ফুটন্ত মুগ ডাল আর কলাপাতা সেঁকার একটা মেঠো ঘ্রাণ। কানে আসে পিতলের থালা-বাসনের ঝনঝনানি আর ওয়েটারদের সেই চেনা সুর। ছেলেবেলায় বাবার হাত ধরে বা যৌবনে বন্ধুদের সাথে আড্ডার ফাঁকে এখানে আসা আমার কাছে ছিল এক পবিত্র রুটিন। সেইসব দিনের স্মৃতি আজও অমলিন।
একটুক্ষণের জন্য চোখ বন্ধ করে ১৯২০ সালের কলকাতার কলেজ স্কোয়ারের কথা ভাবুন। একটি সাধারণ খাবারের দোকানের ওপরে ঝুলছে একটি কাঠের সাইনবোর্ড। সরু গলি দিয়ে ট্রামের ঘন্টা বেজে চলেছে, আর মশলার সুগন্ধ বাতাসে ভেসে এসে ক্ষুধার্ত পথচারীদের টেনে আনছে দোকানের ভেতরে। ভেতরে কাঠের টেবিলে ভিড় জমিয়েছেন মানুষেরা—কেউ প্রাণবন্ত আড্ডায় ব্যস্ত, কেউবা নিজের চিন্তায় মগ্ন—সকলেই অপেক্ষা করছেন এক থালা গরম ভাত আর তরকারির জন্য। তাঁদের মধ্যে একজন যুবক সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবি পোশাক পরে অধীর আগ্রহে আঙুল ঠুকছেন টেবিলে। অবশেষে এক কর্মচারী তাঁর প্রিয় পুঁইশাকের চচ্চড়ি নিয়ে হাজির হতেই তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেই যুবকটি আর কেউ নন, তিনি ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। আর সেই খাবারের দোকান? সেটিই আজকের কিংবদন্তি 'স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল', এক শতাব্দী ধরে বাঙালির আত্মাকে পাতে পরিবেশন করে আসা এক রন্ধন ঐতিহ্য।
১৯১২ সালের সেই দিনগুলোর কথা ভাবুন। তখন এর নাম ছিল শুধুই 'হিন্দু হোটেল'। ওড়িশা থেকে আসা মনগোবিন্দ পাণ্ডা মশাই যখন এটি শুরু করেন, তখন কে জানত এই সাধারণ ভাতের হোটেলটাই হয়ে উঠবে বিপ্লবীদের দুর্গ? ব্রিটিশ পুলিশের বুটের শব্দ যখন রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হতো, তখন এই হোটেলের উনুন জ্বলত স্বাধীনতার স্বপ্নে। ইতিহাস সাক্ষী, এই হোটেলের একতলার রান্নাঘরের ধোঁয়ার আড়ালে চলত বিপ্লবীদের গোপন শলা-পরামর্শ। ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট মধ্যরাতে যখন সারা দেশ উৎসবে মাতোয়ারা, তখন এই হোটেলের নাম বদলে রাখা হলো 'স্বাধীন

ভারত হিন্দু হোটেল'। শোনা যায়, ব্রিটিশ পুলিশ যখন সামনের দরজা দিয়ে হানা দিত, মনগোবিন্দবাবু নিজে দরজায় দাঁড়িয়ে মার খেয়েও বিপ্লবীদের পেছনের গোপন দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করতেন। ১৯৪৩-এর ভয়াবহ মন্বন্তরের সময় এই হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ হয়নি, বরং ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে এক হাতা 'ফ্যান-ভাত' তুলে দিয়ে এটি মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিল।এই হোটেলটি উত্তর কলকাতার 'পাইস হোটেল' (Pice Hotel) সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। 'পাইস' শব্দটি এসেছে 'পয়সা' থেকে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে গ্রামবাংলা থেকে আসা ছাত্র এবং যুবকদের জন্য অত্যন্ত সস্তা বা সাশ্রয়ী মূল্যে বাড়ির রান্নার স্বাদ পৌঁছে দিতেই এই হোটেলগুলোর জন্ম। পাইস হোটেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর 'আ লা কার্টে' (A-la-carte) নিয়ম। এখানে পুরো মিলের বদলে প্রতিটি জিনিসের আলাদা দাম দিতে হতো—এমনকি কলাপাতার জন্যও। এর উদ্দেশ্য ছিল একটাই—যাতে দরিদ্রতম মানুষটিও তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী ঠিক ততটুকুই কেনেন যতটুকু তাঁর প্রয়োজন। অপচয় রুখতে এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এই নিয়ম আজও স্বাধীন ভারতের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থানে টিকে আছে। এখানে কোনো ছাপানো মেনু কার্ড ছিল না, আজও হয়ত নেই। রোজ সকালে মালিক নিজে বাজারে গিয়ে সেরা মাছটা বেছে আনেন। সেই বাজারের টাটকা খবরের মতোই ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লেখা হতো আজকের পদ—'চিতল মুইঠ্যা', 'মাগুর মাছের ঝোল' বা 'চুনো মাছের চচ্চড়ি'। তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে 'হিন্দু হোটেল' নামটি রাখা হয়েছিল যাতে গোঁড়া হিন্দু ছাত্র বা কর্মীরা নিশ্চিন্তে নিরামিষ বা তাঁদের রীতি মেনে তৈরি খাবার খেতে পারেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই স্বাধীন ভারত বা আদর্শ হিন্দু হোটেলের মতো জায়গাগুলোই হয়ে উঠল জাতপাতের বিভেদ ভাঙার ক্ষেত্র। কাঠের লম্বা বেঞ্চে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসতেন ব্যারিস্টার থেকে শুরু করে দিনমজুর। পাতের কোণে মাটির ভাঁড়ে রাখা জল আর গরম ভাতের ওপর গলে যাওয়া গাওয়া ঘি—এই স্বাদ সব ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিত।

আপনাদের কি মনে পড়ে সেই মেহগনি রঙের ভারী কাঠের বেঞ্চগুলোর কথা? যার ওপর বসলে একটা ঠান্ডা পরশ পাওয়া যেত। সামনে বিছিয়ে দেওয়া হতো তকতকে সবুজ একটা কলাপাতা। সেই পাতায় জলের ছিটে দিয়ে হাত বোলাতেই যে পিচ্ছিল অনুভূতি, তা যেন খিদের উদ্রেক আরও বাড়িয়ে দিত। তারপর আসত ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাতের পাহাড়। তার ওপর এক হাতা সোনা মুগের ডাল আর এক টুকরো গন্ধরাজ লেবু। লেবুটা চিপতেই তার সুগন্ধ যখন ডালের ভাপের সাথে মিশতো, তখন মনে হতো পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য এই এক থালা ভাতেই লুকিয়ে আছে। মাটির ভাঁড়ের ঠান্ডা জল তৃষ্ণা মেটাত ঠিকই, কিন্তু তৃপ্তি আসত সেই ঝোল-ঝাল আর অকৃত্রিম ভালোবাসায়।
আজকের কলকাতায় কাঁচ-ঘেরা এসি রেস্তোরাঁ আর কন্টিনেন্টাল খাবারের ভিড়ে 'স্বাধীন ভারত' এক জেদী ঐতিহ্যের নাম। 

আজও প্রতি বছর ২৩শে জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিনে প্রথম ১০০ জন গ্রাহককে নাকি বিনে পয়সায় খাওয়ানো হয়। সেই পুরনো প্রথা, সেই একই আন্তরিকতা। 
কর্মসূত্রে এখন আমি বিদেশে থাকি, তাই অনেকদিন এই জায়গায় যাওয়া হয়নি। কিন্তু আগে যখনই কলকাতায় যেতাম, চেষ্টা করতাম অন্তত একবার ঢুঁ মারতে। 
আপনিও হয়তো আজ বড় হয়েছেন, শহর বদলেছে, কিন্তু ওই কলাপাতা আর সরষের তেলের গন্ধটা আজও আপনাকে সেই কিশোরবেলার কলকাতায় নিশ্চই ফিরিয়ে নিয়ে যাবেই। সেই তামাটে রঙের ঘর, ঝাপসা হয়ে আসা পুরনো ছবি আর মাটির সোঁদা গন্ধের মাঝে 'স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল' আজও আমাদের ছোটবেলার সেই হারিয়ে যাওয়া স্বাদটাকে সযত্নে আগলে রেখেছে। 
আপনারা যারা এখনও নিয়মিত এই হোটেলে যান বা সম্প্রতি গিয়েছেন, আশা করি মন্তব্য করে জানাবেন এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটি এখনকার হালহকিকতে কেমন আছে।

প্রবন্ধ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

subrata majumder_edited.jpg

জাতি জন্মাল

সংসার ভাঙল

সুব্রত মজুমদার

হিউস্টন, টেক্সাস

protest.jpg
জাতি জন্মাল সংসার ভাঙল

স্বাধীনতা যেন ভোরের আলো হয়ে আসার কথা ছিল, কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তা হয়ে উঠল এমন এক দুঃস্বপ্ন, যার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। পতাকার কাপড় উড়তে থাকল, বক্তৃতার খসড়া লেখা হল, বিশ্ব অপেক্ষা করল এক নতুন জাতির জন্মের সাক্ষী হতে। অথচ আনন্দের শব্দের আড়ালে চাপা পড়ে গেল ভাঙা বাড়ির কান্না, উজাড় হয়ে যাওয়া পাড়া, আর শতাব্দীর সহাবস্থানের বন্ধনগুলোর এক মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার যন্ত্রণা। স্বাধীনতা এলো, কিন্তু তার সঙ্গে এলো আগুন, আতঙ্ক আর এক নিঃশব্দ শোক—যা ভোরের প্রত্যাশাকে মুহূর্তে পরিণত করল প্রবল বিদ্ধংসি এক ঝড়ে।
১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার মুহূর্তটি ভারতের জন্য এক অনুপম ভোর হওয়ার কথা ছিল। দু’শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের পর কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষা করছিলেন সেই রাতটির জন্য যখন মধ্যরাতের ঘন্টাধ্বনি একটি নতুন জাতির জন্ম ঘোষণা করবে। কিন্তু উৎসবের পর্দার পিছনে তখনই ঘনীভূত হচ্ছিল অন্ধকার। সেই অন্ধকারের জন্ম বহু দশকের ইতিহাসে, বহু বছর ধরে জমে ওঠা বিভাজনের বীজে। স্বাধীনতার দিন তাই এলো আনন্দের সঙ্গে নয়, এল আগুন, আতঙ্ক আর হৃদয়বিদারক রক্তক্ষয় নিয়ে। বিশ শতকের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বাংলা, পাঞ্জাব, দিল্লি—সমগ্র উপমহাদেশ তার দগদগে চিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছে।
এই বিপর্যয় হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। শিকড় ছিল বহু গভীরে, ব্রিটিশ শাসনের নকশাতেই। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিক থেকে যে নিয়মিত জনগণনা শুরু হয়েছিল, তা ছিল মানুষের পরিচয়কে বারবার ধর্মের খোপে পুরে দেওয়ার এক অদ্ভুত শিল্প। আগে যেখানে সামাজিক পরিচয় ছিল বহমান নদীর জলের মতো, সেখানে ব্রিটিশ প্রশাসন তৈরি করল স্থির, কঠিন, অনমনীয় খণ্ড। তার ওপর ১৯০৯ সালে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার সূচনা—যা ১৯১৯ সালে আরও বিস্তৃত হলো—রাজনীতিকে পাকাপাকিভাবে ধর্মের রেখায় ভাগ করে দিল। ভারত যেন ধীরে ধীরে এক জনপদ নয়, বরং পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলসমূহের বৃহৎ মঞ্চে পরিণত হচ্ছিল।
এই মঞ্চেই দাঁড়িয়ে ১৯৩০-এর পর্বে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু ও সর্দার পটেল নেতৃত্ব দিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে। তাঁদের স্বপ্ন ছিল একটি সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক ভারত—যেখানে মালিক হবে মানুষ, ধর্ম নয়। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় হয়ে উঠছিল মুসলিম লিগ, এবং এর নেতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ মনে করতেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মধ্যে মুসলিম রাজনীতি নিরাপদ থাকবে না। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেসের একতরফা বিজয় এবং মুসলিম লিগের সঙ্গে সরকার গঠনে অনীহা জিন্নাহর মনে গভীর সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি করল। তাঁর চোখে এটি ছিল স্পষ্ট সংকেত—একীভূত ভারতের সংসদে মুসলমানদের কণ্ঠস্বর অপরিহার্যভাবে চাপা পড়ে যাবে।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব প্রথমবার পাকিস্তানের ছায়ার আভাস দিল। সে সময় এটি ছিল এক ধরনের সতর্কবার্তা—স্বাধীন মুসলিম অধ্যুষিত ‘রাষ্ট্রসমূহ’-এর আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলন, কংগ্রেস নেতৃত্বের কারাবাস এবং মুসলিম লিগের ক্রমবর্ধমান প্রভাব সেই সতর্কবার্তাকে রূপ দিল কঠোর রাজনৈতিক দাবিতে।
১৯৪৬ সালে ব্রিটেন শেষ চেষ্টা করল ভারতকে একত্রে রাখার। ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান একটি ফেডারেল কাঠামো প্রস্তাব করেছিল—যেখানে প্রদেশগুলির হাতে থাকবে যথেষ্ট ক্ষমতা এবং

সংখ্যালঘুদের জন্য সুরক্ষা। পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে হয়তো বিভাজন এড়ানো যেত। কিন্তু তখন ইতিমধ্যেই পারস্পরিক অবিশ্বাস এত গভীর হয়ে গিয়েছিল যে কোনো আলোচনাই আর আলো দেখাতে পারেনি। প্রতিটি আশ্বাস ছিল কারও চোখে ছলনা, প্রতিটি ছাড় ছিল কারও সন্দেহের খোরাক।এই অবিশ্বাসের সরাসরি বিস্ফোরণ ঘটল ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে”-তে। জিন্নাহর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন, কিন্তু কলকাতার রাস্তায় তা রূপ নিল কয়েক দিনের নিষ্ঠুর দাঙ্গায়। আগুন, লাঠি, ছুরি, রক্ত—যেসব মানুষ একসঙ্গে বাস করত, তারা হঠাৎ পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিল। তার প্রতিশোধের আগুন ছড়াল নোয়াখালি, বিহার ও অন্যত্র। এই সহিংসতা প্রমাণ করল—দেশ এখন আর আগের ভারত নয়, সেখানে দুই জাতীয়তা, দুই ভয়, দুই ভবিষ্যৎ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। এমন সময় ব্রিটেন ক্লান্ত, নিঃস্ব ও রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। তারা চাইল দ্রুত ভারত ছেড়ে যেতে। লর্ড মাউন্টব্যাটেন এসে সেই তাড়াকে আরও ত্বরান্বিত করলেন; ১৯৪৮ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে পরিকল্পনা ছিল, তা এগিয়ে এনে ঠিক হল ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭। সময় রইল মাত্র কয়েক সপ্তাহ। এই কয়েক সপ্তাহেই ভারত-পাকিস্তানের সীমানা টানার দায়িত্ব দেওয়া হল স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফকে—একজন ব্রিটিশ আইনজীবী, যিনি এর আগে কখনো ভারত দেখেননি, জানতেন না এর ভাষা, মাটি, গ্রাম, নদী, বা মানুষের হৃদয়ের মানচিত্র।
সেই সীমানা, যা পরের বহু প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণ করবে, আঁকা হল তাড়াহুড়োয়, অপরিচয় থেকে, এবং প্রায় অন্ধভাবেই। কোনো গ্রাম অর্ধেক ভারত, অর্ধেক পাকিস্তান হয়ে গেল; কোনো নদী বিভক্ত হলো দুই তীরে; কোনো বাড়ির উঠোনের এক পাশ এই দেশ, অন্য পাশ অন্য দেশ। মানুষের কাছে খবর পৌঁছতে পৌঁছতে আর পালানোর রাস্তা ছিল না।
তারপর যা ঘটল, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকট। হিন্দু-শিখরা পাকিস্তান থেকে ভারতে ছুটে এল; মুসলমানরা ভারতে থেকে পাকিস্তানের দিকে। রাতের বাতাসে ভেসে বেড়াত জ্বলন্ত বাড়ির ঝাঁঝা গন্ধ। ট্রেন ভর্তি মানুষ রওনা দিত, স্টেশনে পৌঁছত শূন্য, রক্তমাখা। নারী নির্যাতনের কাহিনি আজও উচ্চারণে কাঁপুনি ধরে। মৃত্যুর সংখ্যা আনুমানিক কয়েক লক্ষ থেকে এক মিলিয়নের কাছাকাছি। উচ্ছেদিত মানুষের সংখ্যা ১.৫ থেকে ২ কোটি। তাদের জীবন ভেঙে গেল অচেনা এক রেখার নিটোল টানে।
এতেই শেষ নয়। স্বাধীনতার কয়েক মাসের মধ্যেই শুরু হল প্রথম ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ। জম্মু-কাশ্মীরের জটিল পরিস্থিতি—হিন্দু রাজা, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজা—দেশ দুটিকে টেনে নিল নতুন সংঘাতে। এর ফল হলো একটি বিভক্ত কাশ্মীর, একটি অসমাপ্ত প্রসঙ্গ, যা সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে বিষণ্ণ, জটিল এবং বিপজ্জনক রেখেছে। পরবর্তী যুদ্ধ, পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা, জোট পরিবর্তন, জলবণ্টন চুক্তি—সবকিছুর মূলে আছে ১৯৪৭-এর সেই ভাঙনরেখা।
কিন্তু পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকে মানুষের গল্প—যারা বাস্তুহারা হলেন, পরিবার হারালেন, স্মৃতি হারালেন, আবার কখনো স্মৃতি থেকেই হারিয়ে গেলেন। লাহোর, দিল্লি, কলকাতা—শহরগুলো বদলে গেল; পুরোনো পাড়াগুলো খালি হয়ে গেল; সম্পর্কগুলো ছিন্ন হলো; পেছনে রইল শুধু নীরবতা আর অনলস যন্ত্রণা।
স্বাধীনতা এল ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে এল চিরস্থায়ী এক প্রশ্ন—ভাগাভাগি ছাড়া কি ইতিহাস অন্য পথে যেতে পারত? দেশভাগ দেখিয়ে দিল, জাতীয়তাবাদ যদি বিশ্বাস ও সংলাপের জায়গায় সন্দেহ, ভয় ও তাড়াহুড়োর ওপর দাঁড়ায়, তবে মুক্তিও হয়ে ওঠে বিষণ্ণ। ধর্মের নামে রাজনীতি, রাজনীতির নামে তাড়াহুড়ো, আর তাড়াহুড়োর নামে মানুষের জীবনকে ফুটনোট বানানোর ফল যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তা ১৯৪৭ আমাদের শিখিয়েছে আজীবনের মতো।
তবু এই বিভাজনের ঝলসে যাওয়ার আগুন থেকে দুই জাতিই নিজেদের পথ খুঁজে নিয়েছে—আঁচ পেয়েছে, পুড়েছে, কিন্তু দাঁড়িয়েও গেছে নিজেদের মত করে। তবু সেই ক্ষত এখনো শুকোয়নি। ১৯৪৭ যেন আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মুক্তি পেতে সাহস লাগে ঠিকই, কিন্তু তারই সঙ্গে মুক্ত হতে লাগে আরও বেশি ধৈর্য, বোঝাপড়া ও সহানুভূতি।

প্রবন্ধ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

অজানা অস্তিত্ব

গোরাচাঁদ সাহা

বিরাটি, কলকাতা

deadbody.jpg

লেখক পরিচিতি:

গোরাচাঁদ সাহা একজন নাট্য অভিনেতা। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নান্দীকার, নাট্যআনন ও বিভিন্ন নাট্য সংস্থায় অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত শর্ট ফিল্ম আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি বর্তমানে তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কাজে নিয়োজিত।

​​

​মৃত্যু সর্বত্র। আমরা সকলেই জানি যে আমরা একদিন মারা যাব, তবুও আমরা এমনভাবে বেঁচে থাকি যেন আমরা চিরকাল এখানেই থাকব। আমাদের বেঁচে থাকার ইচ্ছাই আমাদের এটা ভাবতে বাধ্য করে। আমরা আসলে কে? আমরা কি কেবল হাড়, রক্ত, মাংস, চুল, ধমনী, শিরা উপশিরা সমূহ নাকি মস্তিষ্কের নিউরন ইত্যাদি? এই মুহূর্তটি সম্পর্কে চিন্তা করুন। আপনি এই মুহূর্তে এখানে আছেন, এই শব্দগুলি পড়ছেন। আপনার অস্তিত্ব বাস্তব এবং দৃঢ় মনে হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে, আপনি অন্য কোথাও থাকতে পারবেন না। আপনি এই মুহূর্তে নিউইয়র্কে নেই, লন্ডনে নেই,

প্যারিসে নেই, টোকিওতে নেই, পাহাড়ে নেই, অথবা সমুদ্রের ধারে নেই। আপনি কেবল এখানেই আছেন।

এর অর্থ কি আপনি অন্য কোথাও নেই? এক অর্থে, হ্যাঁ। সেখানে আপনার কোনও উপস্থিতি নেই। আপনি একবারে সর্বত্র থাকতে পারবেন না। এখন কল্পনা করুন প্রকৃত অস্তিত্বের অর্থ কী হবে।যদি কিছু সত্যিই গভীরতম অর্থে বিদ্যমান থাকে, তবে তা কি সর্বত্র, সর্বদা বিদ্যমান থাকা উচিত নয়? একই মুহূর্তে অসীম মহাবিশ্বের প্রতিটি কোণে সমানভাবে উপস্থিত থাকা উচিত নয়?

কিন্তু বাস্তবে, আমাদের অস্তিত্ব এমন নয়। আমরা সীমাবদ্ধ। আমরা এক সময়ে কেবল এক জায়গায় থাকতে পারি। আমরা জন্মগ্রহণ করি, কিছুক্ষণ বেঁচে থাকি, তারপর মারা যাই। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের অস্তিত্ব ক্ষণস্থায়ী।

হয়তো আমরা যাকে "আমাদের অস্তিত্ব" বলি তা আসলে মস্তিষ্কের কল্পনা। এই অস্তিত্বের ধারণা বা কল্পনা মস্তিষ্কের কার্যকারিতার উপর নির্ভর করে। যদি, কোনও কারণে, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এই দৃশ্যমান জগৎ চারদিক থেকে অদৃশ্য হতে শুরু করে। আবার, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধির সাথে সাথে, আমাদের এবং এই জগতের অস্তিত্ব আরও শক্তিশালী বলে মনে হতে শুরু করে। কিন্তু আমাদের এবং এই অসীম মহাবিশ্বের অস্তিত্ববোধ বলতে যা বুঝি সেটা কি আসলেই একটি মায়া? একটি সুস্থ দেহে, আমরা এই জগৎকে বাস্তব বলে মনে করি কারণ আমরা এটাই জানি। এই জীবন চিরন্তন এই বিশ্বাস আমাদের মনে কাজ করে, তাই আমরা এই জীবনকে অর্থপূর্ণ বলে মনে করি। আমরা আমাদের মুহূর্তগুলিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি কারণ আমরা সবকিছুকে চিরন্তন বলে মনে করি। আমরা আমাদের চোখের সামনে সবকিছুকে ক্ষণস্থায়ী দেখি, কিন্তু অজান্তেই, আমরা তাতে বিশ্বাস করি না। এটাই আসল বাস্তবতা। 

অজানা অস্তিত্ব

প্রবন্ধ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

SanojCharaborty.jpg

বক্তৃতার বিভূতি/বাঘা

তেঁতুল/বিবিধ

সনোজ চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুর, পঃ বঙ্গ 

kid1.jpeg

বক্তৃতার বিভূতি 
অবসরের দিন মধুসূদন স্যার কাঁদেন নি। আমাদের বিদ্যাবিনোদ শিক্ষায়তনের বাতাস বিষন্ন হলেও মধুসূদন স্যারের চশমা ঝাপসা হয় নি। কেঁদেছিলেন নরেন স্যার। মঞ্চে তখন মানপত্র পাঠ চলছে। ব্যাক স্টেজে বসে গানের খাতায় চোখ বোলাচ্ছিলাম--" ভরা থাক স্মৃতি সুধায়.."
নরেন স্যার আমাকে জড়িয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। " মা রে আমি যেদিন এভাবে যাব, সেদিন তুই থাকবি না।"
আমি যে তখন ক্লাস টুয়েলভ। সেদিন গান গাইতে পারি নি। বাড়ি ফিরে জানুয়ারীর কনকনে শীতে গায়ে জল ঢেলেছিলাম নাগাড়ে। সেদিন থেকে ফি বছর পাঁচই সেপ্টেম্বর এলে গা গুলিয়ে উঠে। বুকের উপর কেমন যেন অস্বস্তিকর চাপ অনুভব করি। শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে কাঁদি।
আজ চার বছর পর স্থান কাল পাল্টে ঘটনাটা শেয়ার করলাম-- যদি হালকা হওয়া যায়। কেয়া ব্যানার্জীর প্রোফাইলে লেখাটা পড়ার পর -- কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে এল। পাঁচই সেপ্টেম্বরের শ্রদ্ধা-- ফুলগুলো শুকিয়ে বিবর্ণ।
ভয়ে ভয়ে ক্লাস টেনের রিয়ার প্রোফাইল ঘুরে এলাম বার পাঁচেক।

​----------------********----------------

বাঘা তেঁতুল
'হ্যাঁ, হ্যাঁ আসুন আসুন।'
ঘাড় বাঁকিয়ে ফোনটা কানে চেপে অরুনাংশুকে ভেতরে আসতে বললেন দীপ্তেশ। অবশ্য অরুনাংশু একবার ডোর নক করেই ততক্ষনে ঢুকে পড়েছে ভেতরে। দীপ্তেশ ফোনে হ্যাঁ-হুঁ-  করেই চলেছে। মনে হয় না জরুরী কিছু কল। অস্থিরতা বাড়ছে অরুনাংশু -  এখন শুধু কল ড্রপের অপেক্ষা।
'স্যারি... '
দীপ্তেশকে থামিয়ে অরুনাংশু বলল--
'স্যারি বলছেন কেন,আমি আসার আগেই তো আপনি কলে ছিলেন,তাছাড়া জরুরী কল তো আসতেই পারে।'
'না, না স্যারিটা সে কারনে নয়, গতকাল আপনি  ফোনটা যে ফেলে গেছেন সেটা আমাদের জানানো উচিত ছিল।'
অরুনাংশু গতকাল এই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে গেছে বাবাকে। ছেলেবেলা থেকে সে কখনও বাবা ছাড়া থাকে নি।বাবাকে এখানে না রাখলে অন্য কোন উপায়ও ছিল না তার কাছে। হয়তো এসব দ্বিধাদ্বন্দ্বেই বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে গেছে ফোনটা।
'যদিও এডমিশন ডেট থেকে ওয়ান উইক আমরা দেখা করতে দিই না,তবে আপনি ইচ্ছে করলে যেতে পারেন আপনার বাবার রুমে। ফোনটা কাল রাতেই ওনাকে দিয়েছি আমরা।' --দীপ্তেশ কথাগুলো যেভাবে বললেন তাতে কারোরই ইচ্ছে থাকে না যাওয়ার।
'আসলে, ঠিক ফোনটা নয়, আমি বাবাকে ফিরিয়ে নিতে চাই।'-- কথাটা বলে একটু হলেও চাপ মুক্ত হল অরুনাংশু কিন্তু অস্থিরতটা কমল না। 
দীপ্তেশ একটা রেজিস্টার এগিয়ে দিলেন অরুনাংশুর দিকে। আঙুল দিয়ে একটা কলমে সই করতে বলে বললেন--
'এখানে একটা সই লাগবে। গতকাল আপনার আর আপনার মিসেসের মানসিক অবস্থা দেখে বুঝেই নিয়ে ছিলাম, আপনারা পারবেন না। নিয়ে যান, তবে দুঃখিত!  কোন রিফান্ড পাবেন না।'
গাড়ি ছুটে চলেছে কলতান পল্লীর দিকে।
বিপরীত দু'টি জানালায় চোখ রেখে একে অপরকে এড়াতে চাইছে বাপ-ব্যাটা। একফাঁকে অরুনাংশু দেখে নিয়েছে কল লগে অগুন্তি মিসকল। কিন্তু মিসকলের মূলে যে পোষ্টটা সেটা খুঁজে পায় নি সে। গতকাল রাত্রি থেকে ঐ পোষ্টটার জন্য ফোনে ফোনে নাজেহাল হয়ে উঠেছে সে আর স্ত্রী আরতি-- এতক্ষনে হয়তো কলতান পল্লীর ফ্ল্যাটে আত্মীয় সহ বন্ধু বান্ধব হাজির না হয়!
অরুনাংশু বুঝে উঠতে পারছে না--
পোষ্টটা করল কে!
এমাউন্টটা রিফান্ড না করে ফরফিট করার জন্য-- দীপ্তেশবাবু।
নাকি বাড়ি ফেরার জন্য-- বাবা!
গতকাল অরুনাংশুর ফেসবুক ওয়ালে লেখা ছিল--
'পিতৃহারা হলাম'।

----------------********----------------

প্রসঙ্গ#এক
মাস্টার মশাই তার উপর শিক্ষারত্ন। তা এহেন শিক্ষারত্ন তলব করলে যেতে হয় বৈকি। বইমেলা আপিসে সোফায় গা-ছড়িয়ে বসে আছেন তিনি। পায়ের উপর পা। সোজা প্রশ্ন--
- 'এই রিয়া কোথায়?'
- 'রিয়া তো আসতে পারবে না, ওর প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা চলছে।'
- 'কথা ছিল ওর পরীক্ষা আগে নিয়ে নেওয়া হবে!'
- 'আসতে পারবে না সেটা আগে জানাতে হবে তো।'
- 'দেখুন এগুলোর কোনটাই আমার জানার বিষয় নয়। আমরা ঘন্টা দেড় আগে পৌঁছেই আপনাদের আপিস এটেন্ড্যান্টকে সবটাই বলেছি-- বলেছি রিয়া আসতে পারবে না।'

কথাগুলো বলে সোজা বেরিয়ে এলাম মাঠে। দুপুর রোদের থেকেও বেশি গরম হয়ে গেছে মাথা। রিয়া আমাদের স্কুলের ছাত্রী তার বক্তৃতা করার কথা বইমেলার মাঠে।
পরীক্ষার কারনে সে যে আসতে পারছে না, তা হেডমাস্টার মশাই মেলা আসার আগে আমাকে জানিয়ে ছিলেন। সেইমত পৌঁচ্ছেই মেলার আপিসে বিষয়টা জানাই। সবচেয়ে বড়কথা একজন মাস্টার মশাই আর একজন মাস্টারমশাইের সঙ্গে এভাবে কথা বলেন কিভাবে!
আমি আমন্ত্রিত-- প্রথমে রীতিমাফিক আমাকে বসতে বলা উচিত। তারপর অন্য প্রসঙ্গ। সবচেয়ে উল্লেখের -- কোন সম্বোধন নেই!
- 'এই রিয়া কোথায়?' এভাবে কেউ কাউকে বলে! আমরা ছেলেপুলে নিয়ে গিয়েছিলাম মহিষাদল বই মেলায়।
যদিও আমার যাওয়ার কথা নয়-- ছেলে যাচ্ছে তাই বেরিয়ে পড়লাম।
এখন ইলেভেন-টুয়েলভ নেই তাই চাপও নেই। হেডমাস্টার মশাইকে বলতে সম্মতি মিলেছিল।

প্রসঙ্গ#দুই
তখন সাড়ে তিন। একটু একটু করে মেলায় লোকজন বাড়ছে অন্য দিকে আমাদের ফেরার সময় ঘনিয়েছে।
কিছু ছেলেকে বাসে( মেলা কমিটির)  বসিয়ে আপিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। জনা চার-পাঁচ ছেলে ততক্ষনও সেমিনারে--- অপেক্ষা করছি ওদের জন্য। এমন সময় মাস্টার মশাই শিক্ষারত্ন বললেন
- 'এই, কি যেন নাম..'
কিছুটা চেষ্টায় নাম মনে না করতে পেরে ইশারায় ডাকলেন আমাকে। আমি আপিসে যেতে গোটা পাঁচেক প্যাকেট হাতে বললেন
- 'ক'জন মাস্টার মশাই এসেছেন?'
- 'আমরা চুয়াল্লিশ জন ছাত্র আর চার জন শিক্ষক।'
সম্ভবত এই আটচল্লিশ জনের টিফিন বাসে পৌঁচ্ছে দেওয়া হয়েছে। টিফিন প্যাকেট রিফিউজ করে ফিরে এলাম।
হাতে তিনটি প্যাকেট-- দু'হাজার তিনশ কুড়ি টাকার বই। স্কুলের নয়, এ আমার ব্যাক্তিগত সংগ্রহ। জায়গা মতো সরাসরি রাগ উগরে না দিতে পারায় কাল সহকর্মীদের অনেকেই দু'কথা শোনাবে। সবাই যে সমান্তরালে নিচে নামতে পারেন না। আচ্ছা বই মেলা কিংবা প্যাকেট ভর্তি বইগুলোকি ভব্যতা শেখাতে পারে! না'কি শিক্ষক, শিক্ষারত্ন হলে পায়াভারি হয়ে অন্যকে অপমান করা যায়!

​----------------********----------------

​রিং টোনটা আসছিল 'কার্লি-বব'-এর প্যান্টের পকেট থেকে। শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকা প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করতে বেশ বেগ পেতে হল 'কার্লি-বব'কে। ভিড় সামলে 'কার্লি-বব' শেষ পর্যন্ত ফোনটা কানে চেপে ধরে বলল--' বল ড়াবাঁ।'

চমকে উঠলাম! হ্যালো না বলে এভাবেও বলা যায়! তবে কি হালফিল হ্যালোর প্রতিশব্দ 'বল বাঁ...!' ভাগ্যিস বাবদা কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে গান শুনছে। তমলুক পেরানোর পর কার্লি-বব সহ দুই ছোকারা সওয়ারি হয়েছিল বাসে। আপিস টাইমের ভিড়ের সঙ্গে স্কুল কলেজ ভিড়ে গিয়ে বাসে হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই।কথাবার্তায় এটুকু স্পষ্ট ভিড়ের বেশিটাই কলেজ পড়ুয়া। অন্যদের সঙ্গে তিন ইয়ারিও চলছে পরীক্ষা দিতে। গত দিনের পরীক্ষা ভাল হয় নি। একটা নিদিষ্ট কায়দায় মাথা দুলিয়ে কপালে নেমে আসা চুল নিদিষ্ট জায়গায় ফেরত করে, ফর্সা ছোকরা 'কার্লি- বব'কে বলল--'কাল ড়াবাঁ কোশ্চেনটাই কিচাইন করে দিল! ড়াবাঁ সামনের ছেলেটার থেকে কিছু জানব, ড়াবাঁ সেই তো কিছু জানে না ড়াবাঁ!'

তৃতীয় জন বলল--'আজ ড়াবাঁ একটু ঠিকঠাক না হলে- ড়াবাঁ মেইডেন ওভার যাবে।'

বাসে উঠা থেকে তিন বন্ধু নাগাড়ে ড়াবাঁ শব্দটা বলে চলেছে। বাক্যের আগে বা পেছনে অবলীলায় বসিয়ে দিচ্ছে পুরুষাঙ্গ। বাস ভর্তি বয়স্ক লোক, মায়ের বয়সি মহিলা, শিশু কাউকেই তোয়াক্কা নেই।অনেক সময় চুপ থেকে শেষমেশ, ফর্সা ছোকরাটি কি জিজ্ঞেস করলাম---

'কোন কলেজ?' ছোকরা মাথা নামিয়ে কলেজের নাম বলল।

- 'পরীক্ষা দিতে চললে।' মাথা দুলিয়ে কপালে নেমে আসা চুল সামলে-

- 'হু' বলল ছেলেটি।

- 'ক'ঘন্টার পরীক্ষা?'

- 'চার ঘন্টা।'

- 'কেমন পরীক্ষা হচ্ছে?' বিমর্ষ দেখাল ছেলেটিকে।

- 'ঐ আর কি।' এবার আমি মোক্ষম কথাটি পাড়লাম-

- 'চার ঘন্টা উত্তরপত্রে লিখতে লিখতে কতবার ড়াবাঁ লিখে ফেল?'

ফাঁটা বেলুনের মতো চুপসে গেল ছেলেটির মুখ, এমনকি কপালে নেমে আসা চুল ফেরত পাঠাতেও বেমালুম ভুলে গেল বেচারা। আমি আরো শান্ত গলায় বললাম,

- 'বাসে কত ভিন্ন বয়সী মানুষ রয়েছেন, এ তো আর তোমাদের বন্ধু বান্ধবের আড্ডা নয়!'

চুপসে যাওয়া মুখ থেকে কোন রকমে দুটি শব্দ বের হল.

-'সরি বাঁড়া।' 

​----------------********----------------
পায়ে আবির দিয়ে নৈঋতদা কে প্রণাম করে বললাম--
-- শুভ রং উৎসব।
নৈঋতদা আমার মাথায় হাত রাখল।
' কি অবস্থা করেছিস, সাতসকালে বাঁদুরে রং-এ তোকে তো চেনাই যায় না,যা আগে বাথরুমে গিয়ে টাক পরিস্কার করে নে।'
-- তোমার এখানে আসার সময় নটিবয় ক্লাবের সামনে, রীতিমত আমার সাইকেল থামিয়ে-মুখময় রং মাখিয়ে মিষ্টি খাবে বলে আড়াই'শ টাকা পকেট কাটল বিচ্চুগুলো!
' মিষ্টি! হাঁ হাঁ হাঁ.. ফেরার পথে দেখবি বাংলা গিলে ইংরাজী বলছে --- হ্যাপী হোলি।'
কিছুটা সাফ সুতরো হয়ে নৈঋতদার ড্রয়িং রুমের মস্ত আয়নার টাকের সীমান্ত বরাবর অবশিষ্ট ক'গাছা চুলে পরম মমতায় হাত বোলাতে থাকি।
'কেন ঝুঁকি নিস! আজকের দিনে কেউ বাড়ি থেকে বের হয়! যেটুকু আছে সেকি আর রাখতে পারবি!'
আমি দুঃখ দুঃখ মুখে বললাম--
-- রং তো মুখে ছিল তুমি টাক বলে খোঁটা দিলে কেন?
'তোর ছোট্ট মুখটা হ্যালিপ্যাডের মতো মস্ত টাকে এমন ভাবে মিশেছে যেন দিগন্তরেখা। টাক মুখ আলাদা করা যায় না।'
নৈঋতার এমন বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতায় না রেগে হেসে ফেললাম।
' আমি পারত পক্ষে হোলি এড়িয়ে চলি।'
-- কেন? সেকি শুধু বাঁদুরে রং এর কারনে?
' হু, সেটা তো একটা কারন,তবে আমরাও খেলতাম এককালে।'
-- তুমি হোলি খেলতে?
অবাক হয়ে তাকাই নৈঋতদার দিকে।
'তখনও নটিবয় ক্লাবের ইঁট গাঁথা হয় নি,বিকেলের দিকে শিবমন্দিরের চাতালে তাসের আসর বসত নিয়মিত।'
-- তুমি তাস খেলতে?
' না, খেলতাম না। দেখতাম। একবার হল কি, নরেন নাথ...'
নৈঋতদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম--
-- নরেন নাথ বলতে, রথতলার নাথ দশকর্মা?
' ঠিক তাই, নরেন আর আমি তো বন্ধু ছিলাম, নরেনও একসময় আমার মতো একমুখ দাড়ি রাখতো। নরেন বললে আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের হোলি। ব্যাস হইহই সব আয়োজন হয়ে গেল-- ঐ হোলিই আমার প্রথম আর ঐ হোলিই আমার শেষ হোলি।'
-- কেন? হয়েছিল কি?
' না, মানে হওয়ার তেমন কিছু নয়-- আমাদের সময় ক্লাব মানে  তো মদের আসর নয়-- ঐ সব চড়া দাগের নেশা ছিল না আমাদের সময়ে। উৎসব মানে সিদ্ধি।'
-- সিদ্ধিতে কি তেমন নেশা হয়?
'আলবাৎ হয়। সিদ্ধিতে একটু পোস্ত মিশিয়ে দিলে কেল্লা ফতে। 
সিদ্ধি নিউরোট্রান্সমিটারকে প্রভাবিত করে। ডোপামিন, যার কারনে আমরা আনন্দ উত্তেজনা অনুভব করি সিদ্ধি খেলে ডোপামিন সক্রিয় হয়।'
-- বুঝলাম ঐ কারনে সিদ্ধি খেলে লোকে হাসে।
' শুধু হাসে না সাময়িক অনেক কিছু ভুলেও যায় অবশ্য তার জন্য দায়ী গ্লুটামেট, সিদ্ধি গ্লুটামেটের কার্যকলাপে ব্যাঘাত ঘটায়।'
-- তবুও যে লোকে বলে সিদ্ধি খেলে বুদ্ধি বাড়ে।
' খলের ছলের অভাব হয় না। সেসব যাগ্গে--- সেবার হলটা কি- সিদ্ধি খেয়ে বাঁদর রং মেখে আমাদের তো যাতা অবস্থা-- কাউকেই চেনা যায় না, নেশায় কে কোথায় পড়ে তার কোন ঠিক নেই।
নাথ-দা'র মিসেস আমাকে নাথদা ভেবে উঠিয়ে নিয়ে গেল ওদের ঘরে, আবছা স্মৃতি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি আমি তোমার নাথ নই। কে কার কথা শোনে। শেষমেশ বাথরুমে শাওয়ার এর নিচে প্রায় বিবস্ত্র করে সাবান শ্যাম্পুতে সাফসুতরো হতে -- ভুত দেখা।'
আমি মজা করে বললাম--
-- এতো হেব্বি মজার ব্যাপার, আমি হলে পরের বার আরো বেশি সিদ্ধি আরো বেশি বাঁদর রঙে হোলি খেলতাম। আর তুমি ছাড়লে!
' ভয়ে ছাড়লাম ভাই।'
-- ভয়ে?
'হু,  যদি তোর বৌদি আমি ভেবে অন্য কাউকে শাওয়ারের তলায় দাঁড় করায়।' 

----------------********----------------
"সভা বসিয়াছে।"
শব্দ দুটি উচ্চারণ করে, দোলনায় দুলতে দুলতে
নৈঋতদা শিবনেত্র হলেন।
-- কোথায় সভা বসল?
" সভাস্থল লইয়া জিজ্ঞাসা কেন? সভ্যতা ভব্যতা যতেক নিম্নগামী-- সভ্য সমাজের অধঃপতনের ধারা ধরিয়া সভাস্থল অরণ্য হইলে -কিঞ্চিত আপত্তির উদ্রেক হইবে কি?"
কথাগুলো শেষ করে নৈঋতদা আবার শিবনেত্র হলেন।
আজ হঠাৎ নৈঋতদা সাধু বাক্যে কথা কইছে-- এ এক রহস্য!
-- সভা কি তোমার স্কুলে?
নৈঋতদা হ্যাঁ এবং না এর ভিতর এমন ত্রিশঙ্কুর মতো ঝুলে রইলে যে কিছুই স্পষ্ট হল না।
দোলনার গতি মন্থর হল ক্রমে-- শিবনেত্র নৈঋতদা, বলতে থাকলেন অবিশ্রান্ত --
" অপরাপর দিবসের ন্যায় অরণ্যের প্রাণপুরুষ সিংহের পৌরহিত্যে সভার কার্য প্রারম্ভ হইল--
একে একে উপস্থিত হইল করী,কপি,কুরঙ্গ,তুরঙ্গ,
শার্দূল,সম্বর,জম্বুক,ঋক্ষ,বরাহ,গৌর,গৃধ্র সহ সকল অরণ্যচারী। অরণ্য তৎসহ অরণ্য পরিবেশ ও তার মান উন্নয়নের জন্য আশু একটি সমিতির প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে--সেবিধায় অরণ্যনাথ সিংহের নেতৃত্বে কার্য সম্পাদন করিবে উক্ত সমিতি।"
নৈঋতদাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম --
-- অনেকটা তোমার স্কুলের ইয়ের মতো।
" গল্পের ভিতর এইরূপ অহেতুক কৌতুহল যথার্থ নহে।" 
দোলনা স্থির- কথাকটি বলে আমার দিকে বিরক্তি সূচক তাকাল নৈঋতদা।
আমি অপরাধ বুঝে মুখ নিচু করলাম।
নৈঋতদা আবার শিব নেত্র হলেন-
" অরণ্যের সভ্যরা প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য পরস্পরের সহিত আলোচনায় রত। এমতাবস্থায় সিংহ জানালেন-- অপর প্রতিনিধিদের সহিত এরূপ এক সভ্যর নাম সভা প্রস্তাব করুক যিনি সংখ্যালঘু প্রকারান্তরে  সংকটাপন্ন।"
-- অরণ্যনাথ কি নিদিষ্ট কোন সভ্যকে
     বিবেচনা করার ঈঙ্গিত... 
নৈঋতদা আমার দিকে ফের স্থির দৃষ্টিতে তাকাতে আমি কথা না শেষ করে চুপ করে গেলাম।
নৈঋতদা আবার শিবনেত্র হলেন--
" অরণ্যনাথের অভিপ্রায় বুঝিয়া অরণ্য জগতের মহার্ঘ-সভ্য গন্ডার...."
মহার্ঘ-সভ্য! নৈঋতদাকে থামিয়ে বলি-
-- গন্ডারের সুকীর্তি কোথায়!
    কেবল চেহারায় ভারি,স্বভাবে গোঁয়ার,খটমট
    তাছাড়া না আছে রূপ না সৌন্দর্য, যত্রতত্র শিং
    গলায়,সতত গুতোগুতি করে। 
    অবশ্য কেউ কেউ নিজেই নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ
    ঘোষণা করিলে- অন্য কথা।
   এরা স্বঘোষিত অবতার।
নৈঋতদা আবার আমার দিকে ক্রোধানল নিক্ষেপ করলেন, আমি মুখে কুলুপ দিলাম।
" গন্ডার বলিল সম্বর সংখ্যালঘু বলিয়া বিবেচিত হইবে ইহা কি যথার্থ! সম্বরের অরণ্য পরিবেশের সম্যক ধারণা নাই, নিজেই লতা পাতা গুল্মাদি খাইয়া পরিবেশ বিনষ্ট করে। সম্বরকে বিবেচনা আগামীর জন্য ভয়ানক হইবে। বরং যাহার পূর্ব অভিজ্ঞতা রহিয়াছে-- অরণ্য ও তাহার সংস্কার লইয়া সুষুপ্তি স্বল্পতায় সংক্রামিত(ইনসোমনিয়াহত) এমন সভ্যকে বিবেচনা করাই উচিত হইবে।
সম্বরের নাম প্রস্তাবে গন্ডারের এইরূপ সরাসরি আপত্তি সভা প্রত্যাশা করে নাই। তাছাড়া স্মরণাতীত কালে এইরূপ সরাসরি আক্রমনের কোনরূপ নজিরও নাই- ফলসরূপ সভা স্তব্ধ।
কাহারও মুখে কোন প্রকার বাক্য নাই-- কেবল মেরামতির ধপাধপ শব্দ সেই নিরবতাকে খানখান করিতেছিল।"
আমি প্রতি-প্রশ্ন করলাম 
-- মেরামতি! তার শব্দ ধপাদপ?
নৈঋতদা এতক্ষণে শান্ত ভাবে বললেন--
"বিগত বছরগুলিতে নবনির্মানের নামে গন্ডারেরা শিং লইয়া অরণ্যাঞ্চলের যে বিস্তর খোড়াখুড়ি করিয়াছিল,পরবর্তীতে তাহা অরণ্যের স্বাস্থ্য ভঙ্গের উদ্রেক ঘটায়, সভা চলাকালীন তাহারই মেরামতি চলিতেছিল। যাহাহউক সভায় আলপিন পতনের নিরবতা-- কেহ যেন সম্মোহনী শক্তিতে সভ্যদের বাকশক্তি খর্ব করিয়াছে। মুহুর্তকালে বিলম্বে সম্বর উঠিয়া দাঁড়াইল-- স্বভাবোচিত শান্ত কন্ঠে সে যে উক্ত কার্যের যোগ্য নয় তা সভাকে আরো একবার স্মরণ করাইয়া -- প্রতিপ্রস্তাবে গন্ডারের নাম উল্লেখ করিল-- সভা মুহুর্ত কালে পূর্বপেক্ষা অধিক মুক হইল-- কেবল গন্ডারকুলে রণ বিজয়ের পুলক অপ্রকটিত হইয়াও প্রকটিত হইল।
আশ্চার্যেই এই --সভায় গন্ডারের নাম দ্বিতীয় কেহ প্রস্তাব করিল না, এমনকি সমর্থনও করিল না। কেবল স্বঘোষিত অবতার-ইষ্ট অপেক্ষা তাহার উরঃ দ্বিগুন অর্থাৎ শতাধিক দ্বাদশ হইল।
উক্তসভা হইতেই নির্লজ্জতার নিদর্শ হিসাবে গন্ডারের চর্ম গৃহীত হইল।"
আমি নৈঋতদাকে মহাভারতের মাধব ঠাহর করে জানতে চাইলাম--
-- তাৎপর্য! 

বক্তৃতার বিভূতি/বাঘা তেঁতুল/বিবিধ

প্রবন্ধ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

প্রবন্ধ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

Sukhamay Ghosh_edited.jpg

বিস্মৃতির অতলে এশিয়ার প্রথম

 

শবব্যবচ্ছেদকারী

সুখময় ঘোষ

শ্রীরামপুর, হুগলী

Madhusudan_Gupta.jpg

১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারী, কোলকাতা শহরের বাসিন্দাদের স্বাভাবিকভাবেই দৈনন্দিন কাজকর্ম চলছে। সর্বত্রই বিরজমান নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রা। হঠাৎই সকলকে সচকিত করে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে কয়েকবার তোপধ্বনি শোনা গেল। কৌতূহলী নাগরিকদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জল্পনার সৃষ্টি হল, প্রকৃত কারণ না জানার জন্য  হাওয়ায় ভাসতে লাগল নানান গুজব। অবশেষে জানা গেল, পন্ডিত মধুসূদন গুপ্ত তাঁর চারজন সহযোগী নিয়ে কোলকাতা মেডিকেল কলেজে প্রথম মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করলেন। যা ভারত তথা এশিয়ায় প্রথম যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে চিহ্নিত হল। সমস্ত কোলকাতা জুড়ে সে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী সংবাদ, এমনকি সারা এশিয়ার চিকিৎসা বিজ্ঞান ইতিহাসে প্রথম সংস্কার ভাঙার নজির। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ১ জুন কোলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই ঘটনা এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা ছিল। সেদিন মেডিক্যাল কলেজের প্রবেশপথগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল পাছে এই বিধর্মী কাজে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য গোঁড়া হিন্দুরা কলেজে হামলা করে বসে। শব ঘরের সামনে ডাক্তার ও ছাত্রদের তখন উত্তেজিত ভীড়। নির্দিষ্ট সময়ে ডাক্তার গুডিভের সঙ্গে শব ব্যবচ্ছেদ ঘরে প্রবেশ করলেন একদা সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ বিভাগের ছাত্র পন্ডিত মধুসূদন গুপ্ত। যদিও তাঁর সহযোগী হিসাবে নাম ছিল উমাচরণ শেঠ, রাজকৃষ্ণ দে, দ্বারকানাথ গুপ্ত ও নবীনচন্দ্র মিত্রের। তাঁরা ঘরের বাইরে অপেক্ষারত ছিলেন। ঘরে ধুকে নির্ভুল নিশানায় তীক্ষ্ণ ছুরি দিয়ে নিখুঁতভাবে কোনরূপ আড়ষ্টতা ছাড়াই একাই শবব্যবচ্ছেদ করলেন পণ্ডিত মধুসূদন। ৩০০০ হাজার বছর পরে ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞান ইতিহাসে শল্যবিদ সুশ্রূতের পর এই প্রথম শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করার কৃতিত্ব  দেওয়া হল এই পণ্ডিত ডাক্তারকেই। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন – “সেকালের লোকের মুখে শুনিয়াছি এই মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ লইয়া সে সময়ে তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হিয়াছিল”। এই সম্বন্ধে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিশন রিপোর্টের ১ম খন্ডের প্রকাশিত বিবরণী থেকে জানা যায় –ঃ  
The teaching was given in English and the courage of Pandit Madhusudan Gupta in defying an ancient prejudice by beginning the dissection of the human body, marks an era in the history of Indian education almost as important as Macaulay’s minute. সংস্কার ভেঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞান ইতিহাসের এমন একটা অবিস্মরণীয় পদক্ষেপ নিয়ে তাঁর  দেখানো পথে পরবর্তী বছরে ছাত্ররা মোট  ৬০টি মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করেছিল ১৮০০ খ্রীস্টাব্দে মধুসূদন গুপ্ত হুগলী জেলার বৈদ্যবাটির এক বৈদ্য পরিবারে জন্ম। আয়ুবের্দিক চিকিৎসার বিখ্যাত এই পরিবারে তাঁর প্রপিতামহ ‘বকশি’ উপাধি পেয়েছিলেন এবং পিতামহ ছিলেন হুগলীর নবাব পরিবারের গৃহচিকিৎসক। শৈশবে পড়াশুনায় ভীষণরকম অমনোযোগী মধুসূদন গুপ্ত প্রথাগত ব্যবস্থার চরম বিরোধী ছিলেন। শোনা যায়, এইকারণে সেই সময় পিতা তাঁকে বাড়ী থেকে বার করে দিয়েছিলেন। গৃহত্যাগের পূর্বে পিতাকে বলেন যে সত্যিকারের মানুষ না হলে তিনি আর বাড়িতে ফিরবেন না। ১৮২৬ সালে ডিসেম্বর মাসে তিনি সংস্কৃত কলেজের সদ্য স্থাপিত বৈদ্যক (আয়ুর্বেদ) বিভাগে ভর্তি হন। এই কলেজে ব্যাকারণ, ন্যায়, কাব্য, অলংকার সাহিত্য পাঠের সঙ্গে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও তিনি অসামান্য ব্যুৎপত্তি দেখিয়েছিলেন। আয়ুর্বেদ ক্লাসে প্রশিক্ষণের সময় মধুসূদন গুপ্ত ছোট ছোট জীবজন্তু ব্যবচ্ছেদ করে অভিজ্ঞতা ও সাহস অর্জন করেন। কাঠ ও মোম দিয়ে  তৈরী মানুষের হাড়ের মডেলগুলি তাঁর চর্চার অন্যতম বিষয় ছিল। এই সময় ইংরাজীতে লেখা ডাক্তারী বই সংস্কৃত বা আরবীতে অনুবাদ করে ছাত্রদের পড়ান হত। এই সব বই তিনি নিজে ইংরাজীতে পড়ে ফেলেছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতা, পান্ডিত্য ও পারিদর্শিতাকে কুর্নিশ জানিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ এক সাহসী পদক্ষেপ নেয়। আয়ুর্বেদ বিভাগের অধ্যাপক ক্ষুদিরাম বিশারদ অসুস্থ পড়লে ঐ জায়গায় বৈদ্যক শ্রেণীর কৃতি ছাত্র পন্ডিত মধুসূদন গুপ্তকে স্থলাভিক্ত করা হয়। এর জন্য তিনি মাসিক ৬০ টাকা বেতন হিসাবে পেতেন। 
এ দেশের মানুষদের অন্ধ কুসংস্কারের ধারনায় বীতশ্রদ্ধ হয়েই ইংরেজরা ১৮৩৫ সালের ২৮ জানুয়ারীতে এক আদেশ বলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মাদ্রাসা ও সংস্কৃত কলেজে চিকিৎসা বিজ্ঞান পাঠ্যসূচী এবং ‘স্কুল অব নেটিভ ডক্টরস’ বন্ধ করে দেওয়া দেয়। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ১ জুন কোলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সংস্কৃত কলেজের বৈদ্যক বিভাগও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সমস্ত ছাত্ররা মেডিকেল কলেজে যোগ দেন। বিদেশী চিকিৎসাবিদ্যা আহরণের জন্য প্রথমে কেউই এগিয়ে যায় নি। সেইজন্য উৎসাহ দিতে মাসিক সাত টাকা থেকে বার টাকা পর্যন্ত বৃত্তিতে শিক্ষার ব্যবস্থা হয়। প্রথম যে পঞ্চাশ জন শিক্ষার্থী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিল তাঁদেরকে এই বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। কোলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পূর্বে ইংরেজ কর্তৃপক্ষ একটি মেডিক্যাল কমিশন গঠন করেন যার সভাপতি ছিলেন সি জে গ্রান্ট ও সদস্যরা হলেন এম জে ব্রামলি, জি সি সাদারল্যান্ড, ট্মাস স্পেন, সি  জি ট্রাভেলিয়ান এবং রামকমল সেন। ১৮৩৪ সালে কমিশন যে রিপোর্ট পেশ করে জানান শব ব্যবচ্ছেদ ব্যতীত চিকিৎসা বিষয়ক শিক্ষাদান অসম্পূর্ণ থাকে। এর সাথে সাথে কমিশন প্রস্তাব করে পাশ্চাত্যরীতিতে চিকিৎসাশাস্ত্র চর্চার জন্য মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রয়োজন। এই আবহে ডেভিড হেয়ার একবার ভারত বন্ধু গর্ভনর বেন্টিংকে বলেছিলেন যে ভারতবর্ষে কেবলমাত্র আয়ুর্বেদ ও ইউনানী পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হয়। আধুনিক এলোপ্যাথিক চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা এ দেশে নেই। তাই আধুনিক মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা জরুরী। লর্ড বেন্টিংক উত্তরে বলেছিলেন, “কলেজ স্থাপন করলেই তো কাজে আসবে না, এদেশে দেশীয় ভাষায় পড়ানোর অধ্যাপক কই”? সেই দিকে তাকিয়ে হেয়ার সাহেব এবং মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ মিঃ ব্রামলী পন্ডিত মধুসূদন

অনুরোধ করেছিলেন অধ্যাপক হিসাবে মেডিকেল কলেজে যুক্ত হওয়ার জন্য। আধুনিক চিকিৎসার ডিগ্রী না থাকলেও তিনি পিছিয়ে যান নি। একই সঙ্গে ছাত্র ও ডেমনস্ট্রেটর হিসাবে মধুসূদন গুপ্ত ঐ কলেজে নিযুক্ত হন এবং সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত থাকেন।

আসলে ছয় বছর সংস্কৃত কলেজে আয়ুর্বেদ ক্লাস করার আগে থেকেই তিনি দেশীয় পদ্ধতিতে রোগ নির্ণয় ও তার নিরাময়ের নিদান দিতে শিখেছিলেন ‘কেবলরাম কবিরাজ’ নামে একজন অভিজ্ঞ দেশীয় কবিরাজের কাছে। সেই সময় তিনি  গ্রামে গ্রামে ঘুরে কবিরাজ শিক্ষকের নির্দেশে রোগীদের সেবা করতেন। শোনা যায়, পিতা তাঁকে বাড়ী থেকে বার করে দিলে তিনি এই কবিরাজ গুরুর আশ্রয়েই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সাহেব ডাক্তারা তাঁকে সহকারী হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু একজন কবিরাজের কাছে ছাত্ররা পাঠ নিতে আপত্তি করেন, কারণ তাঁদের বক্তব্য ছিল মধুসূদন একজন কবিরাজ মাত্র, ডাক্তার নন। ছাত্রদের অনুরোধ মেনে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ডিগ্রীধারী ডাক্তারী পরীক্ষায় বসতে বলেন। তিনি রাজী হয়ে যান এবং সসম্মানে ডাক্তারী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কবিরাজ থেকে ডাক্তারে পরিণত হন। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁর মেধা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও চূড়ান্ত পরীক্ষায় সফলতার ভিত্তিতে তাঁকে যে সশংসাপত্র প্রদান করে তাতে উল্লেখ করা হয়েছিল – “বৈদ্যবাটির মধুসূদন গুপ্তর উত্তরপত্রটি পরীক্ষা করে বুঝেছি যে শারীরসংস্থান, শারীরবৃত্ত, রসায়ন, মেটারিয়া মেডিকা ইত্যাদিতে তাঁর অসামান্য জ্ঞান আর ঔষধ, শল্যচিকিৎসা ও তার ব্যববহারিক প্রয়োগ ক্ষমতা বিষয়ে তাঁর দক্ষতা সংশয়াতীত।” 

১৮৩৬ খ্রীস্টাব্দের জানুয়ারীর শুরুতে ডেভিড হেয়ার, অধ্যক্ষ মিঃ ব্রামলি ও অ্যানাটমি বিভাগের প্রধান মিঃ গুডিভ আলোচনায় উঠে এল মেডিকেল কলেজে অ্যানাটমি বা শবব্যবচ্ছেদ জরুরী। কারণ আধুনিক এলোপ্যাথিক চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে হলে শবব্যবচ্ছেদ মাধ্যমে শারীরবিদ্যা পাঠ অতি আবশ্যক। কিন্তু ব্যবচ্ছেদ কে করবে? কেননা হিন্দু সমাজে এই ধরনের কাজকে অত্যন্ত গর্হিত ও ধর্মনাশের কারণ হিসাবে মনে করা হত। সেইহেতু রক্ষণশীল সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কোন ভারতীয় ছাত্র এই ব্যবচ্ছেদে রাজী হবে? হেয়ার সাহেব কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, মধুকে ডাক? আমি তাঁকে বোঝাব। সব শুনে মধুসূদন গুপ্ত জানালেন তিনি রাজী। মিঃ ব্রামলি তাঁকে বললেন গোঁড়া হিন্দু সমাজ যদি তাঁকে বাধা দেয়? প্রত্যয়ী মধুসূদন গুপ্ত উত্তর দিলেন, ‘ তাঁদেরকে আমি বোঝাব। হিন্দু শাস্ত্রে শব ব্যবচ্ছেদ নিয়ে কোন বাধা নিষেধ নেই’। নতুন কাজের দায়িত্ব পেয়ে তিনি তখন উদ্দীপ্ত ও আকুতোভয় এবং দৃঢ়চেতা। কিন্তু ক্রমশ কলেজ গন্ডী ছাড়িয়ে এই দুঃসাহসিক খবর ছড়িয়ে পড়ল রক্ষণশীল সমাজে। হিন্দু সমাজপতিরা দল বেঁধে এল তাঁর বাড়ীতে। মধুসূদন গুপ্তের পিতাকে হুমকি দেওয়া হল, শবব্যবচ্ছেদ বন্ধ না হলে সমাজ থেকে বার করে দেওয়া হবে। পিতা ডেকে পাঠালেন মধুসূদনকে, বললেন শবব্যবচ্ছেদ থেকে নিরস্ত হতে। কিন্তু পুত্র মধুসূদন নির্লিপ্ত কন্ঠে বোঝাতে শুরু করলেন অ্যানাটমির প্রয়োজনীয়তার পক্ষে। গোঁড়া সমাজপতিরা দিলেন ধর্মীয় ব্যাখা। পাল্টা মধুসূদন উত্তরে শোনালেন প্রাচীন ভারতের শল্য চিকিৎসার ইতিহাস, টেনে আনলেন সুশ্রুতের শবব্যবচ্ছেদের উদাহরণ। সংস্কারী হিন্দুদের সামনে আর কোন যুক্তি ছিল না। পিতা মধুসূদনকে আর্শীবাদ করে বললেন – “আমরা বৈদ্যের পরিবার, চিকিৎসা জগতেই আমাদের পরিসর। আমার বিশ্বাস তোমার উপর অর্পিত দায়িত্ব শল্য চিকিৎসার ইতিহাসে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে”। এই ব্যাপারে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের অবদানও উল্লেখযোগ্য ।তিনি প্রত্যহ অ্যানাটমির ঘরে এসে ছাত্রদের উৎসাহ দিতেন। ছাত্রদের বোঝাতেন যে শবব্যবচ্ছেদ করলে কোন অধর্ম হয় না। এই করে ছাত্রদের মনে ভ্রান্ত ধারণা দূর হয়ে তাঁরা সাহসী হয়ে  উঠেছিল। ১৪ বছর পর বেথুন স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, “দৃশ্যটি আমার কাছে বর্ণনা করা হয়েছে। এই ব্যাপারে মনস্থির মধুসূদন একটু সময় নিয়েছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি কোন দ্বিধা-বোধ করেন নি। নির্ধারিত সময়ে মধুসূদন গুপ্ত হাতে স্ক্যালপেল নিয়ে ডাক্তার গুডিভকে অনুসরণ করে শব কাটার ঘরে প্রবেশ করেন। ছাত্ররা সব ভয় মিশ্রিত কৌতূহলে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করার জন্য দরজার বাইরে ঝিমিলের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছিল। মধুসূদন অকম্পিত হাতে শব দেহের বক্ষদেশে ছুরিটি বসিয়ে দিলেন। প্রথম কাটার পর দর্শকদের মধ্যে থেকে উৎকন্ঠামুক্ত স্বস্থির শ্বাস বেড়িয়ে আসে”।

শুধুমাত্র শিক্ষা দান ব্যতীত মধুসূদন গুপ্তের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অবদানের একটি হল ‘লন্ডন ফার্মাকোপিয়া’ (১৮৪৯ সালে) এবং ‘অ্যানাট্মমি’ (১৮৫৩ সালে) নামক বই দুটি ইংরাজী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। সংস্কৃত কলেজে পড়ার সময় তিনি হুপারের লেখা “Anatomist’s Vade Mecum” নামে বইটির সংস্কৃত অনুবাদ করে ১০০০ টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন। মেডিক্যাল কলেজের হিন্দি বিভাগ ও বাংলা বিভাগ এই দুইয়েরই তিনি সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদে আমৃত্যু বহাল ছিলেন। শল্য চিকিৎসক হিসাবে তিনি সমসাময়িক ইংরেজ চিকিৎসকদের কাছেও সমানভাবে সফল ও সমাদৃত ছিলেন। সেই সময়ের কোলকাতার বিখ্যাত সার্জেন জেমস রোনাল্ড মার্টিন যখন দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ নিরাময়ের জন্য তৎপর হয়েছিলেন তখন ১৮৩৫ সালে তিনি বিশিষ্ট্য ব্যক্তিদের নিয়ে ‘জেনারেল কমিটি অব দ্য ফিভার হসপিটাল আন্ড মিউনিসিপ্যাল ইম্প্রুভমেন্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। তখনই যোগ্য ব্যক্তি হিসাবে ঐ কিমিটিতে মধুসূদন গুপ্তকে স্থান দেওয়া হয় এবং তাঁর পরামর্শে কমিটির কার্যবিধি চালু হয়। কোলকাতা শহরের জনস্বাস্থ্য, পরিস্রুত পানীয় জল, নিকাশি ব্যবস্থার সংস্কারের পরিকল্পনা, বসন্ত রোগের টিকাদান কর্মসূচী ও মেডিকেল কলেজের মাধ্যমে ‘হিন্দু ধাত্রী’ দল গঠন এই সমস্ত তিনি অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষ দর্শনের ভিত্তিতে কমিটিতে সুপারিশ ও কার্যকর করেছিলেন। দীনবন্ধু মিত্র তাঁর বিখ্যাত ‘সুরধুনী কাব্য’-এ  পন্ডিত মধুসূদন গুপ্তকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে লিখেছেন –ঃ
“দেয়ালে রয়েছে মধু ছবিতে চাহিয়ে। 

শিখেছিল এনাটমি আগে জাত দিয়ে”।।
মধুসূদন গুপ্ত ছিলেন ডায়াবেটিস রুগী। ডায়াবেটিস মেলিটাস রোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে শবব্যবচ্ছেদ করতে নিষেধ করা হয়। একবার ব্যবচ্ছেদ করার সময় সংক্রমণহেতু তাঁর হাতে গ্যাংগ্রিন ধরা পড়ে। পরবর্তীতে শবব্যবচ্ছেদ সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণার জন্য সেপ্টিসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৮৫৬ সালের ১৫ নভেম্বর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে মধুসূদন গুপ্ত পরলোক গমন করেন। কোলকাতা মেডিক্যাল কলেজ তাঁর নামে অ্যানাটমিতে অসামান্য অবদানের জন্য “ পন্ডিত মধুসূদন গুপ্ত মেমোরিয়াল লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড” প্রদান করে।

শবব্যবচ্ছেদকারী
rudrajit paul_edited.jpg

ঐতিহাসিক ফিকশান

​

এবং থ্রিলার
ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল

কসবা, কলকাতা 

To_Kill_a_Mockingbird.jpg

ঐতিহাসিক উপন্যাস বা এককথায় বললে, ফিকশান, সাহিত্যের ইতিহাসে একদমই নতুন নয়। বাংলা সহ পৃথিবীর সব ভাষার ভাণ্ডারেই ঐতিহাসিক গল্প উপন্যাস একটা বড় ভাগ দখল করে রেখেছে। একদম সরাসরি ঐতিহাসিক চরিত্রদের নাম করে তাদের জীবনের সত্যি ঘটনা নিয়ে লেখা উপন্যাসের সংখ্যাও কম নয় (যেমনঃ দা কনফেশান্স অফ আল কাপোন)। আবার অন্য এক গোত্রের উপন্যাস রয়েছে যেগুলি ঐতিহাসিক সত্যি ঘটনা নিয়েই লেখা, কিন্তু স্থান এবং পাত্র একটু পাল্টে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সাহিত্যিক নানা দিক থেকে ঐতিহাসিক ফিকশান লিখেছেন। যেমন, মূল যে প্রোটাগনিস্ট, তার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে লেখা ফিকশান রয়েছে; আবার সেই সময়ের একজন কাল্পনিক চরিত্রকে ফার্স্ট পারসন হিসাবে ব্যবহার করেও গল্প লেখা হয়েছে। আবার কোনও ঘটনার খলনায়কের দৃষ্টি থেকেও ঐতিহাসিক থ্রিলার লেখা হয়েছে (যেমন করম্যাক ম্যাকার্থির ব্লাড মেরিডিয়ান)। 
প্রথমে আমরা একটু দেখব যে ঐতিহাসিক ফিকশান লেখার সমস্যা কী কী। প্রথমত, যদি কোনও ঘটনা খুব বিখ্যাত বা কুখ্যাত হয়, তাহলে সেই ঘটনা সম্পর্কে সমাজের এক বিরাট অংশের পাঠকের ইতিমধ্যেই নিজস্ব কল্পনা, মতামত বা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েই থাকে। উদাহরণ হল, ভারতের স্বাধীনতালাভ। এই বিশেষ ঘটনা নিয়ে যে ফিকশানই লেখা হবে, সেটা কিন্তু পাঠকসমাজকে সরাসরি দুভাগ করে দেবে। লেখককে উপন্যাস লেখার সময়ে একটা দিক নিতেই হবে। অতিরিক্ত ভারসাম্য বজায় রাখতে গেলে কিন্তু সেই উপন্যাস একটি নীরস পেপার বা গবেষণাপত্র হয়ে দাঁড়াবে। সেটা সুখপাঠ্য ফিকশান হবে না। কিন্তু লেখক যেই এক তরফের দিকে ঝুঁকবেন, অমনি অন্য মতাবলম্বী লোকেরা রে রে করে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। ঐতিহাসিক ফিকশান লিখতে হলে কিন্তু এই ঝুঁকি নিতেই হবে। উদাহরণ হল সলমন রুশদির “মিড নাইটস চিলড্রেন”। একদিকে এই বই বিশ্বসাহিত্যের ক্লাসিক। আবার অন্যদিকে এই বই নিয়ে ভারতে বিতর্কের শেষ নেই। আসলে, ইতিহাস নিয়ে লেখা মানেই কিন্তু তাই। এটাই স্বাভাবিক যে ইতিহাসের যে কোনও ঘটনা সম্পর্কেই সমাজে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া থাকবে। এবং সেই ইতিহাস যত নিকটবর্তী হবে, সেই প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা ততই প্রখর হবে। সম্রাট অশোককে নিয়ে আজকে উপন্যাস লিখলে সেটা খুব বেশি প্রতিরোধের মুখে হয়ত পড়বে না। কিন্তু ৯/১১ নিয়ে উপন্যাসের সম্পর্কে বেশিরভাগ লোকের কিছু না কিছু প্রতিক্রিয়া থাকবেই। 
ঐতিহাসিক থ্রিলার হল এই গোত্রের উপন্যাসের একটি বিশেষ ভাগ। এরও আবার নানা ভাগ রয়েছে। একটি ভাগে রয়েছে ঐতিহাসিক সত্যিকারের চরিত্রকে একটি কাল্পনিক সমস্যার মধ্যে ফেলে তাকে দিয়েই এর সমাধান করানো। অর্থাৎ, সেই ঐতিহাসিক চরিত্রটি সম্পর্কে আমরা এখন অবধি যা জানি, সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করে তার মুন্সিয়ানা প্রমাণ করা। আর দ্বিতীয় ভাগ হল, একদম সত্যিকারের ঐতিহাসিক ঘটনা থ্রিলারের মত করেই লেখা। সেখানে সত্যিকারের বা সত্য আর কল্পনা মেশানো কিছু চরিত্র সেই থ্রিলারের নায়ক বা ভিলেন। আরও অনেক জঁরের মত ঐতিহাসিক থ্রিলারের ক্ষেত্রেও সব উপন্যাসকে এই ছকে বাঁধা যাবে না। এমন অনেক ক্লাসিক উপন্যাস রয়েছে যেগুলো জঁর-বেন্ডিং। মানে, হয়ত কিছু সত্যিকারের চরিত্র আর কিছু লেখকের কল্পনা মেশানো একটা সুস্বাদু ব্যঞ্জন রান্না হল। আসল কথা তো হল সাহিত্যিক উৎকর্ষ। সেটা যদি স্পর্শ করা যায়, তাহলে বাকি সব গৌণ। এই প্রসঙ্গে স্টিফেন কীংএর ১১/২২/৬৩ উপন্যাসটির নাম করা উচিত। একদিকে এটি অবশ্যই সায়েন্স ফিকশান। কিন্তু অন্য দিকে ৫০ এবং ৬০এর দশকের আমেরিকা নিয়ে লেখা একটি অনবদ্য ঐতিহাসিক উপন্যাসও বটে। 
ঐতিহাসিক ফিকশান নিয়ে উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রথমেই তোমাদের যে উপন্যাসের কথা বলব, সেটা হল “টু কিল আ মকিংবার্ড”। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাস তখনকার আমেরিকার তীব্র জাতিবিদ্বেষ নিয়ে লেখা এক আশ্চর্য উপাখ্যান। এটাকে ঠিক থ্রিলার বলা যায় না। অনেকে বলেন এটা সাউদার্ন গথিক। কিন্তু সেই সময়ে আমেরিকার দক্ষিণ অংশে কৃষ্ণাঙ্গদের যে দুর্দশা, তার এর থেকে ভালো বর্ণনা সাহিত্যে খুব কমই আছে। ঠিক এইরকম আরেকজন আমেরিকান লেখক ছিলেন উইলিয়াম ফকনার। আমেরিকার বর্ণবিদ্বেষ এবং গৃহযুদ্ধ নিয়ে ওনার বেশ কয়েকটি অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক উপন্যাস রয়েছে। নেটিভ আমেরিকানদের জমি ছিনিয়ে নিয়ে ক্রীতদাসদের সাহায্যে প্লান্টেশান চালিয়ে ধনকুবের হয়ে ওঠা শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের জীবন নিয়ে ওনার লেখাগুলি বিশ্বসাহিত্যের সম্পদ। ওনার উপন্যাসের চরিত্ররা সরাসরি আসল ঐতিহাসিক মানুষ না হলেও তখনকার অনেক মানুষের আসল জীবনের ছায়া ওনার লেখনী জুড়েই বিদ্যমান। 
আগেই বলেছি যে ঐতিহাসিক ফিকশান নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাট্যকার, শেক্সপিয়ার বেশ অনেকগুলোই ঐতিহাসিক নাটক লিখেছিলেন। একদম ব্রিটিশ ইতিহাসের আসল রাজাদের নাম করে করেই নাটক লেখা হয়েছে। যেমন তৃতীয় রিচার্ড। এছাড়া রয়েছে জুলিয়াস সিজার, ক্লিওপেট্রা ইত্যাদি। ম্যাকবেথ নাটকটিও কিছুটা ইতিহাস আশ্রয়ী, যদিও এটাকে একদম ইতিহাস অনুসারী বলা উচিত নয়। আর এগুলোকে থ্রিলার না বলা হলেও এদের মধ্যে ঘটনার ঘনঘটার কোনও অভাব নেই।
বাংলা সাহিত্য অবশ্যই পিছিয়ে নেই। বাংলার প্রথম উপন্যাস, বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী তো ইতিহাস নিয়েই লেখা। এছাড়া “রাজসিংহ” পুরোপুরি ঐতিহাসিক উপন্যাস। যে উপন্যাস গত কয়েক দশক ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে, সেই “আনন্দমঠ”ও কিন্তু সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নিয়েই লেখা। বাংলার প্রথম ঔপন্যাসিক, বঙ্কিমচন্দ্র, যে ধারা শুরু করেছিলেন, সেই ধারায় এরপর একের পর এক অত্যন্ত চমকপ্রদ ঐতিহাসিক ফিকশান এসেছে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তো এর মধ্যে

স্বমহিমায় উজ্জ্বল। বাংলায় ঐতিহাসিক উপন্যাসের যে কোনও পাঠক “তুঙ্গভদ্রার তীরে” বা “তুমি সন্ধ্যার মেঘ” পড়তে বাধ্য। এছাড়া ওনার ছোটগল্পগুলিতে বৌদ্ধ বাংলার ইতিহাস নিয়ে যে বিশ্লেষণ রয়েছে, তার তুলনা খুব একটা নেই। বৌদ্ধ বাংলার ইতিহাস কিন্তু আমাদের আকাদেমিক চর্চায় খুব সুলভ নয়। এমন অনেক পাঠক রয়েছেন, যারা এইসব উপন্যাস এবং গল্প পড়েই ইতিহাসের সেই যুগ সম্পর্কে প্রথম এবং শেষবার জেনেছেন। শরদিন্দুর আরেকটি খুব চিত্তাকর্ষক সিরিজ হল সদাশিব সিরিজ। এই গল্পগুচ্ছে মারাঠা বীর শিবাজীর ইতিহাস বর্ণনা হয়েছে একজন মরাঠী কিশোরের চোখ দিয়ে। তুলনা না করে উপায় নেই যে, আর্থার কোনান ডয়েলের ব্রিগেডিয়ার জেরার্ড সিরিজে যেভাবে একজন ফরাসী সেনার গল্প বর্ণনার ছলে নেপোলিয়নের ইতিহাস বর্ণনা হয়েছে, শরদিন্দু ঠিক সেই কাজটাই শিবাজী সম্পর্কে করেছেন। এই সদাশিব সিরিজ তাদের ন্যারেটিভ স্টাইল এবং তথ্যনিষ্ঠার জন্য বাংলা সাহিত্যে অনন্য। 
বাংলায় কলম ধরা প্রায় সমস্ত সাহিত্যিক যেমন গোয়েন্দা গল্পে অন্তত একবার উঁকি দিয়েছেন, ঠিক সেরকম প্রায় সবাই ঐতিহাসিক ফিকশান লেখাতেও একবার অন্তত পা বাড়িয়েছেন। সবার লেখা যে কালোত্তীর্ণ হয়েছে, সেটা নয়। কিন্তু, বাংলায় ঐতিহাসিক ন্যারেটিভ পড়তে হলে আরও দুটি নাম আমাদের জানতেই হবে। প্রথম হল, মহাশ্বেতা দেবী। একদম “ফিল্ড ওয়ার্ক” করে স্থানীয় “ডায়ালেক্ট” ব্যবহার করে সুখপাঠ্য ঐতিহাসিক উপন্যাস কিভাবে লিখতে হয়, সেটা শিখতে হলে ওনার অন্তত দুটি বই পড়তেই হবেঃ ঝাঁসির রাণী এবং অরণ্যের অধিকার। এই দুটি বই যে পুরোপুরি ফিকশান, তা নয়। হয়ত বেশিরভাগ জুড়েই একদম মনযোগী তথ্যের সমাহার রয়েছে। কিন্তু সেটাও যে কিভাবে দৃষ্টিনন্দন হতে পারে, সেটাও কিন্তু শেখার মত। ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে হলে একটা মূল বিতর্কের জায়গা দাঁড়ায় কথোপকথন। মানে, সেই ঐতিহাসিক চরিত্ররা নিজেদের মধ্যে কিভাবে কথা বলতেন, কিভাবে ঝগড়া করতেন, কিভাবে হতাশা ব্যক্ত করতেন। সেই ব্যাপারে মহাশ্বেতা দেবীর মুন্সিয়ানা প্রশ্নাতীত। কোনও আবেগতাড়িত আতিশয্য না করেও যে এই চরিত্রদের জীবন্ত করে তোলা যায়, সেটা ওনার লেখা থেকে বোঝা যায়। 
দ্বিতীয় যে নাম আমাদের জানা উচিত, সেটা হল শ্রীপারাবত। আসল নাম প্রবীর কুমার গোস্বামী। বাংলায় সবথেকে বেশি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন বোধহয় ইনিই। চমৎকার কিছু উপন্যাস রয়েছে এনারঃ যেমন আমি সিরাজের বেগম, মমতাজ দুহিতা জাহানারা বা আরাবল্লী থেকে আগ্রা। সেই সময়ে ভারতের ইতিহাসে ছিল ঘটনার ঘনঘটা। ফলে এইসব উপন্যাসেও থ্রিলের অভাব নেই। সমসাময়িক আরেকজন অত্যন্ত প্রতিভাবান সাহিত্যিকও ঐতিহাসিক উপন্যাসে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি হলেন নারায়ণ সান্যাল। তিনি ছিলেন বহুমুখী লেখক। কিন্তু “লাডলী বেগম” বা “বিশ্বাসঘাতক”-এর মত ঐতিহাসিক উপন্যাস বাংলা কেন, বিশ্বসাহিত্যেই বিরল। আর এই “বিশ্বাসঘাতক” এর মত ঐতিহাসিক থ্রিলার বাংলায় খুব বেশি লেখা হয়নি। 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে ইংরেজি সাহিত্যে থ্রিলারের রমরমা। আসলে এই একটা যুদ্ধ মানুষের ইতিহাসে এমন অভিঘাত রেখে গেছে যে, সেই নিয়ে গবেষণা, কল্পনা এবং বিতর্ক—কোনটাই এখনও শেষ হয়নি। বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরে পরেই আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডে এই ধরণের বিশ্বযুদ্ধ থীমের থ্রিলার লেখা শুরু হয়। এই বিষয়ে পথপ্রদর্শক ছিলেন স্কটল্যান্ডের অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলেন। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত ওনার এইচ এম এস ইউলিসিস ওনার নিজের রয়্যাল নেভিতে কাটানো দিনগুলির ভিত্তিতে লেখা এক অসাধারণ ঐতিহাসিক উপন্যাস। সরাসরি আসল জাহাজ বা আসল ঘটনার উল্লেখ না থাকলেও এই উপন্যাসটি যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ নেভির কর্মকাণ্ডের অনুসারী, সেই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ঠিক এইরকম আরেকটি ঐতিহাসিক থ্রিলার হল ফ্রেড্রিক ফরসিথের “ওডেসা ফাইল”। হলোকস্টকে জানতে হলে এই উপন্যাসটি কিন্তু অপরিহার্য। আধুনিক লেখকদের মধ্যে সুইডেনের হেনিং ম্যাঙ্কেল বেশ কিছু এই ধরণের উপন্যাস লিখেছেন। আধুনিক লেখকরা যখন ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখেন, তখন তাদের ক্যানভাস আরও বড় হয়। শুধু একটি ঘটনা বা কয়েকটি বিশেষ চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এদের লেখনী ইতিহাসের অনেক ঘটনা, কলোনিয়ালিজম, রেসিজম ইত্যাদি ছুঁয়ে যায়। এই হেনিং ম্যাঙ্কেলের “দা ম্যান ফ্রম বেজিং” হল এই ধরণের একটি ফিকশান। 
শেষ অংশে অন্য কয়েকজন আধুনিক লেখকের উল্লেখ করতেই হবে। তোমরা, আজকের পাঠকেরা, যদি ঐতিহাসিক ফিকশান পড়তে চাও, তাহলে কাদের বইয়ের দিকে প্রথমেই হাত বাড়াবে? ব্রিটিশ লেখিকা, হিলারি ম্যান্টেলের “ক্রোমওয়েল ট্রিলজি” কিন্তু এই শতকের এক উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি। বিশেষ করে এই তিনটে বইয়ের মধ্যে প্রথমটা- উলফ হল এক আধুনিক ক্লাসিক।
শেষে আর দুয়েকটি কথা না বললে বড় অবিচার হবে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক কে? এই প্রশ্নের যে কোনও একক উত্তর হয় না, সেটা তোমরা জানো। বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন ভাষায় কত লোক লিখেছেন। সুতরাং তুল্যমূল্য বিচার হয় না। কিন্তু তাও, একটা ঘরে যদি ১০০ জন সাহিত্য সমালোচককে বসিয়ে এই প্রশ্ন করা হয়, তাহলে এটা নিশ্চিত যে অন্তত ৮০ জন বলবেন একটাই নাম—লিও টলস্টয়। এই রাশিয়ান লেখকের কীর্তি সারা পৃথিবীতে এখনও বিস্ময় উৎপাদন করে। টলস্টয়ের লেখা ওয়ার এন্ড পিস কিন্তু এক অনুপম ঐতিহাসিক উপন্যাস। অবশ্য এই সামান্য তকমা ছাড়িয়ে এই উপন্যাস আরও অনেক কিছুই। তবু, ঐতিহাসিক ফিকশান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই নামটা বাদ পড়া কাঙ্খিত নয়। আর শেষ করব একদম ঘরের কাছের একজনের কথা বলে। রাখালদাস ব্যানার্জির নাম তোমরা সবাই জানো। মহেঞ্জোদারোতে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এবং প্রাচীন সভ্যতা আবিষ্কারের জন্য উনি বিখ্যাত। কিন্তু উনি কিন্তু প্রচুর ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছিলেন। উনি নিজে একজন হাতে কলমে কাজ করা ঐতিহাসিক ছিলেন। ফলে, ওনার উপন্যাসের রস কিন্তু এমনি ঘরে বসে লেখা সাহিত্যিকদের থেকে অন্যরকম হবেই। বাংলার এবং ভারতের ইতিহাসের বিভিন্ন সময় নিয়ে ওনার বেশ কিছু উপন্যাস রয়েছে। প্রথমেই আমি বলব “ময়ূখ” উপন্যাসের কথা। পর্তুগীজ শাসনে বাংলার সাধারণ মানুষের দুর্দশা নিয়ে এই উপন্যাস কিন্তু নির্বিকল্প। আমার মনে হয় না ইতিহাসের ঠিক এই পিরিয়ড নিয়ে বাংলায় বা ভারতে এরকম উপন্যাস আর লেখা হয়েছে। এছাড়াও ওনার কলম থেকে আমরা পেয়েছি “পাষাণের কথা” এবং শশাঙ্কের মত সৃষ্টি। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে এই ক্ষণজন্মা ঐতিহাসিক-লেখক আমাদের সাহিত্যচর্চায় ব্রাত্যই থেকে গেছেন।। 

ঐতিহাসিক ফিকশান

প্রবন্ধ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

jail.jpg
বাস

বাস

গোগোল

বর্ধমান, পঃ বাংলা 

bus driver.jpg

যে কোন গল্পেরই না তিনটি জিনিস থাকে লোকেশন, কাল এবং পাত্র। এই কাহিনীর লোকেশনটা অপ্রাসঙ্গিক। লোকেশন মানে স্তন - না সেটাতো  আলাদা বস্তু সে আসবে পরে কাহিনীতে; স্টান - না সেটাও না stunned তো আমরা সবাই হব কিন্তু এখন না; আসলে আমার না বাংলাটা একটু খারাপ। ক্ষমা করে দেবেন। কনভেন্ট স্কুল থেকে পড়েছি তাই বেঙ্গলী ইস মাই সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ - নট সো গুড। যাই হোক ফিরে আসা যাক। স্থান - এবার সঠিক শব্দচয়নটি করেছি। যা বলছিলাম এই গল্পের স্থান তার ভৌগোলিক অবস্থান জানার দরকার নেই। সবকিছু হয়েছে সরকারি বাসের ভিতরে। কোন শহর কোন রাস্তা এগুলো একদম অদরকারি তথ্য। 

কাল মানে সময়। এটা  বলা যেতে পারে সময়টা আজকের - একদম পিক অফিস টাইম। আর পাত্র আমি। আপাতত আমি। বাকি কেউ কি নেই  আছে কিন্তু ক্রমশঃ প্রকাশ্য। আপাতত উত্তম কুমার এর জবানীতে আমি তো আছি। যদিও তিনি মানে উত্তমকুমার কখনও সরকারি বাসে চেপেছেন বলে আমার জানা নেই। 

এই শহরের বাস কিন্তু আমার আপনার মতন সাধারণ যাত্রীর জন্য প্রচন্ড বিপদজনক। বিপদ কখনও বাসের বাইরে। এই আপনি দাঁড়িয়ে আছেন ফুটপাতে দেখলেন আপনার পায়ের উপর হালকা করে ড্রাইভার চালিয়ে দিলো ভারী চাকাটিকে। তারপর জানালা দিয়ে মুখ বের করে পুঁচুত করে খৈনির থুতু ফেলে খয়েরি করে দিলো রক্ত ভেঁজা মাটিকে। বিনা কারণে আপনি কাকাবাবু হয়ে গেলেন তাও আবার এই মুখপোড়া দেশে মাইনাস দি ডিটেক্টিভ অ্যাডভেঞ্চার। (সুনীলবাবু বোধ করি খুব আপত্তি করবেন না এই উপমায়।)

আর বাসের ভেতরের বিপদের গল্পেতো আসছি মশাই অত তাড়া কিসের। তার আগে একটি প্রশ্ন আছে আপনাদের জন্য। আপনারা কি জানেন পকেট কয় প্রকার ও কী কী? একটু ভাবুন ভেবে বলুন দেখি। প্রশ্নটা কী কঠিন হয়ে গেছে? ছাড়ুন। আর চাপ দেবনা। ঘরে গিয়ে ব্রেনলিয়া খেয়ে নেবেন। কিংবা  থাক। এই মুদ্রাস্ফীতির যুগে আর পয়সা খরচ করতে হবে না। আমি উত্তরটা দিয়ে দিচ্ছি। ৩৬ রকমের পকেট এই পৃথিবীতে ব্যবহার করা হয়। আর আমি সেই ৩৬ রকম পকেটে হাত ঢুকিয়ে মানিব্যাগ নিঁপুণ হস্তে আপন করে নিতে পারি। ব্লেড ফ্লেডের  দরকার  হয়  না আমার । প্রথম প্রথম একবার পুলিশ লকআপে লাঠি মারতে মারতে বলেছিল তোর বা হাতে জাদু আছে রে পাগলা এক ছিল মারাদোনা আর তারপর তুই হ্যান্ড অফ গড নিয়ে এসছিস এই পৃথিবীতে। বাঁ হাতটা মুচড়ে ভেঙে দিয়েছিল তারপর, এখনও তলপেটের আগুন নেবাতে গিয়ে হালকা চিন চিন করে ওঠে বুড়ো আঙুলটা। ইয়ার্কি মেরে বলে থাকলেও আমি হত্যদম হই নি। প্র্যাক্টিস করে করে নিজেকে মারাদোনার লেভেল এ নিয়ে গেছি। পকেটমারিতে কী করে এলাম? দেখুন কনভেন্ট এ পড়াশোনার করার সাথে কিছু শখ ও লালনপালন করার ইচ্ছে মানুষের মনে জেগে ওঠে। আমার ও হয়েছে - বয়সের ধর্ম এগুলো। তবে গাঁজা বিড়ি সিগারেট এসব সস্তা নেশা করিনা আমি। আমার স্ট্যান্ডার্ড আছে আফটার অল ওই যে আগেই বলেছি কনভেন্ট এ পড়াশোনা আমার। তাই পাউডার ছাড়া আর কিছু রোচেনা আমার মুখে। শখ মেটাতে শুরু করি বাবার পকেট থেকে। সেখান থেকে আজ আমি পকেটমারদের দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। এবার চলুন উঠে পড়ি মৃগয়া করতে, আজকে আবার যা বৃষ্টির জল জমেছে রাস্তায় বাসের সহযাত্রীর purse এ পাওয়া যাবে পার্শে মাছ। তা দিনটা বেশ ভালোই যাচ্ছে। বাসের পিছনের দরজা দিয়ে উঠেই শুরু করে দিয়েছি খেলা। টুক করে নীল জিন্স পরা পেট মোটা দাদুর শ্রীলেদার্সের মানি ব্যাগটা ব্যাক পকেট থেকে তুলতে তুলতে বললাম আরে দাদু একটু সাইড দিন সামনে যাব। একটা ছোট খুকু তার মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার কীর্তিটি উৎসুক চোখে দেখতে লাগল। খুকুর মায়ের আবার পরনে ভারী সুন্দর একটি ময়ূরপঙ্খী হার। সাহস আছে বলতে হবে ভদ্রমহিলার, নাহলে এই ভিড় বাসে খারাপ

লোকজনের কী অভাব আছে বলুন। আমি খুকুকে চোখ মেরে যেই পার্সটা আমার শার্টের পকেটে উদরস্থ করতে যাব তখনই আমার হাতটি পিছন থেকে টেনে ধরে - আরে আপ পকেটমারি করতা হে - বলে অলমোস্ট গোল লাইন এ স্লাইডিং ট্যাকেল করে সেভ করে দেয়া একটি আওয়াজ পুরো বাসে যেন গুঞ্জিত হলো। এই গলার অধিকারী কে তো আমি চিনি। গল্পের দ্বিতীয় পাত্রর আবির্ভাব ঘটেছে। তার নাম? 

বলছি। তার আগে আমার আরেকটি প্রশ্ন আছে। আপনারা কি জানেন গলার হার কয় প্রকার ও কী কী? এটা কিন্তু একদম সোজাসাপটা ফাঁকা গোলে পেনাল্টি শট নেবার মতো। আরে মশাই গলার হার দুই প্রকার - এক যা গলায় শেষ অবধি থাকে ও নিরাপদে বেলাশেষে আপনার আলমারীর লকারে প্রবেশ করে। আর দ্বিতীয় প্রকার দিনের আলো আর দেখে ওঠেনা। সোজা এই ঢোঁড়াই এর কুক্ষিগত হয়ে কোনো স্বর্ণকারের দোকানের পিছনের সরু গলিতে ফার্নেসের আগুনে নতুন অবতার লাভ করে। 

হাঁ। ঢোঁড়াই। আমার নেমেসিস। আমার ইস্কুলবেলার শত্রু। যখন ক্লাস ৫ এ আমি ভাঙের গুলী খেয়ে হেসে লুটোপোটি খাচ্ছি মালটা কী করেছিল জানেন। ক্লাস টিচারকে প্যাকেট দিয়ে বলল ম্যাম হি ইস ইউজিং ড্রাগস। আসলে জেলাসি। ওকে আমি ফুটবলে প্রত্যেকবার বিট করে গোল করতাম। তখন আমার বাঁ পাটা একদম মারাদোনার মতোই চলতো। ঢোঁড়াই  মালটা ছিল ডিফেন্ডার । ওকে প্রত্যেকবার ইন্টার স্কুল প্রতিযোগিতায় বীট করে গোল খাইয়েছি। তবে তার মোক্ষম বদলা ও নিয়েছিল। আমি যখন এই লাইনে জাস্ট নেমে তৃতীয়বার বাসে উঠে পকেট মারতে গেছি একটা টেকো পুলিশওয়ালার, জানেন এই ঢোঁড়াই ঢ্যামনাটা কি করেছিল? আমায় পুলিশটার সামনে নিয়ে গিয়ে বলে দেখিয়ে স্যার ইয়া আপকা জেব কাট রাহা থা। আমি প্রতিবাদ করে বলেছিলাম না স্যার বাজে কোথা বলছে এই ছাতুয়াটা, আসলে আমার বা হাতটাটিতে চুলকানি হচ্ছিল তাই মনে হয়ে - ফটাস করে একটি বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় চিটে গেলো আমার গালে - চল তোর হ্যান্ড অফ গডের দোষটা কাটিয়ে ঠিক করছি বলে থানায় নিয়ে গিয়ে - বাকীটা তো শুরুতেই আপনাদের বলেছি।হারামি নিজে মেয়েদের হার ছিনতাই করে আর সোশ্যাল মিডিয়াতে লেখে আমি ফেমিনিস্ট। ঢোঁড়াই  হচ্ছে শুদ্ধ বাংলায় পারভার্ট আর পিওর ইংরেজিতে ঢ্যামনা যাদের বলা হয়ে থাকে সেই প্রজাতির প্রাণী। শালা বউ পেটানো ফেমিনিস্ট।

যাই হোক বাসে আমার হাতটি ধরে ঢোঁড়াই আরও কিছু সিন করতে লাগল। তুম উহ পার্স চোরি কিয়া হায় ওয়াপিস কর আঙ্কেল কো। বাস হঠাৎ করে গরম হয়ে উঠেছে - কী দাদা দেখে তো ভদ্র ঘরের ছেলে বলে মনে হচ্ছে এইসব করা হয় নাকি। পিঠে ও যেন মনে হলো একটা চাটি ছুঁয়ে গেলো।  

আমার মনে ফ্ল্যাশব্যাক আসতে লাগল। এই শহরের গণপ্রহার হচ্ছে আন্তর্জাতিক খাতি সম্পন্ন। তারপর চাকরি বাকরি নেই এখানে, লোকজন খালি সুযোগ খুঁজছে একে অপরকে ধলাই দেওয়ার। এমন কি নিজের মা বাপকেও ছাড়ছে না। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলটা যেন হালকা করে চিন চিন করে উঠল ওয়ার্নিং হিসেবে। আমি কোন উপায় না দেখে ব্রহ্মাস্ত্র বের করে দিলাম - আরে মশাই কী বাজে কথা বলছেন - আমার মতো শুদ্ধ বাঙালিকে হেনস্তা করছেন? আমি সন অফ সয়েল। আপনারা বাঙালির রক্ত চুষবেন আর আমরা মার খেয়ে যাব। শালা বহিরাগত। আর আপনি তো এই মাত্র ওই ভদ্রমহিলার স্তন ছুঁয়ে থাকা ময়ূরপঙ্খী হারটা চুরি করেছেন।

খুকুর মা প্রথমে আমার দিকে তাকিয়ে নোংরা রাসকল বলে হাত উঠাতে তৎপর হয়ে ওঠে। খুকু বাধা দিয়ে মায়ের শাড়ির আঁচল টেনে বলে ওঠে মা তোমার হারটা কই? একটি তীব্র আর্তনাদ ছিঁটকে বেরোয় খুকুর মায়ের মুখ থেকে। তারপর ঠাস্‌ ঠাস্‌ দ্রুম দ্রাম্ হৈ হৈ মার্ মার্ সাথে  ‘বাপ্‌ বাপ্‌’ চিৎকার - আর আমি, আমি সরে পড়ি এইবার। 

বাস থেকে লাফ দিয়ে নেমে যেতে যেতে চড় থাপ্পড় এর শব্দ শুনতে পাই। আজ বোধহয় মারাই পড়বে জানোয়ারটা। ঠিক হয়েছে। যেমন কর্ম সেরকম ফল। পকেট থেকে ময়ূরপঙ্খী হারটা বের করলাম। আসলে পকেট মেরে আর চলছিল না। লোকজন আর পার্সে এ পয়সা রাখে না। আজকাল ডিজিটাল হয়ে গেছে সব। আমিও তাই ক্যারিয়ার এ রোল চেঞ্জ করে নিয়েছি। আপনাদের প্রীতি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন এবং  ঢোঁড়াই এর মৃত্যু কামনা রইলো। গল্পের এখানেই ইতি ।।।

আমি রাস্তা ক্রস করে একটু পাউডার কিনতে যাব হঠাৎ একটা বাস এসে আমার বা পায়ের উপর চালিয়ে চলে গেলো। আমি অজ্ঞান হবার ঠিক আগের মুহূর্তে দেখলাম রক্তর ঢেউ একটা লাল গুটকার ছোপ কে ঘিরে ধরে গ্রাস করে চলেছে। তার পাশে পড়ে আছে একটি ময়ূরপঙ্কী হার।
 

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

বোধন

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

বোধন

অনির্বাণ দত্ত

বিরেন রায় রোড, বেহালা, কলকাতা 

durga101.jpg

কালো স্করপিওটা দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল। স্পিড কমিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে বটতলার দিকে। সন্ধে নামছে— আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে রাস্তা যেন একটু থমকে।
পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে টাকার বান্ডিলগুলো ছুঁয়ে দেখল স্বপন। চারটে— প্রতি বান্ডিলে পঞ্চাশ হাজার করে। মোট দুই লাখ। গোল করে প্লাস্টিকে মোড়া, গার্ডার লাগানো। বেগুনি রঙের নোটগুলো অন্ধকারেও কেমন আলাদা করে চোখে পড়ে।
এই এলাকার মদের দোকানের কালেকশন। বড়োবাবুর শেয়ার।
স্করপিওটা এসে থামল বটগাছের তলায়। স্বপন রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে গেল। কালো কাচ নামতেই ভেতর থেকে দেখা গেল মহেন দত্তকে— থানার বড়োবাবু।
“কত?” জিজ্ঞেস করলো মহেন।
"স্যার, দুই আছে"।
"শালা! পুজোর আগে এই তোর কালেক্সান" ?
"স্যার, জানেন ই তো.. ব্যবসায় টান, এখন পাড়ায় পাড়ায় মদের দোকান, আমাদেরই তো কিছু থাকছেনা"।
"তোর থাকাচ্ছি হারামি, আজ মহালয়া, শনিবার, সামনের সপ্তাহে আবার আসবো, সপ্তমীর দিন, আরো দুই দিবি।"
"স্যার..."
কালো কাচ উঠে গেল স্বপনের মুখের ওপর, হুস করে বেরিয়ে গেল কালো স্করপিওটা, ঠিক একটা মোষের মতো।
"হারামির বাচ্চা শালা", স্বপন মিলিয়ে গেল পাশের অন্ধকার গলিতে।

***********************
“এই দেখ, এই শাড়িগুলো নিলাম এবার।“গত দুমাসের কেনাকাটার পসরা সাজিয়ে সোফায় বসেছে সুস্মিতা।
"দিদি, ঢাকাই এর রংটা তো দারুণ", বললো সুরমা।
"তোকে যেটা দিয়েছি আর এটা একদম সেম, শুধু রংটাই যা আলাদা। নবমীতে পড়বো ঠিক করেছি। এই ব্লাউসটার সাথে মানাচ্ছে তো? নাহলে আবার হাতি-বাগান ছুটতে হবে।"
"হ্যাঁ ভালোই তো লাগছে, ওই ব্যাগটায় কি আছে?"
"ওগুলো গত সপ্তাহে কিনলাম, সাউথ সিটি গিয়েছিলাম, কুর্তি, জিনস এইসব, যা মোটা হচ্ছি দিনকে-দিন, এসব মানাবে কিনা কে জানে।"
ঘরের কোণে পার্বতী ভেজা ন্যাতাটা হাতে নিয়ে চুপ করে শুনছে দুই বোনের কথাপকথন।
"তুই কি শুনছিস? ঘরটা মোছ তাড়াতাড়ি, এখুনি দাদা আসবে। কাচা হয়েছে?"
"হ্যাঁ", নালার মুখটা আটকাইনি, তোমার কি কাজ আছে বলছিলে, তাই”, ন্যাতা টা নিংড়ে নিয়ে ঘর মুছতে লাগলো পার্বতী।
"হ্যাঁ, ঠিক আছে, পার্লারের মেয়েটা আসবে।“

বাইরে গাড়ির শব্দ। কলিং বেল বাজতেই দরজাটা খুললো পার্বতী। ঘরে ঢুকেই সুরমাকে দেখে একটু ইতস্তত করে হাসলো মহেন। সোজা বেডরুমে গিয়ে ঢুকলো। টাকার ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে জামা-প্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গি পরলো। তারপর টাকাটা লকারে রাখার জন্য গেল পাশের ঘরে।
ব্যাগের চেন খুলে বান্ডিলগুলো লকারে রাখতে লাগলো মহেন। হঠাৎ লুঙ্গির খুঁট আলগা হয়ে যাওয়াতে তাড়াতাড়ি সেটাকে ধরতে গিয়ে হাত থেকে ব্যাগটা পড়ে গেল। দুটো বান্ডিল গড়িয়ে গিয়ে পড়লো মেঝেতে। একটা গিয়ে পড়লো ঘর মোছার ন্যাতার ওপর— পার্বতীর হাতের কাছে।

পার্বতী দেখলো— গোল করে প্লাস্টিক দিয়ে মোড়া টাকার গোছ, বেগুনি রঙের।
একটু ইতস্তত করে সেটা তুলে মহেনের দিকে এগিয়ে দিল।
“তোর এখন এই ঘরটাই মুছতে হবে?” বিরক্ত গলায় বলল মহেন। টাকার বান্ডিলগুলো লুঙ্গির খুঁটে গুঁজে ঘর থেকে বেরিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।
পার্বতী কাজ সেরে সুস্মিতাদের কাছে গিয়ে দরজার কোণে দাঁড়ালো।
“হ্যাঁ, অষ্টমীর দিন কোথাও খেতে যাওয়া যায়… কোলাঘাট যাবি?” বলছিল সুস্মিতা।
হঠাৎ তার চোখ গেল পার্বতীর দিকে—
“কাজ হয়েছে?”
“হ্যাঁ দিদি।”
“কাল লেট করবি না, আমার বেরোনো আছে।”
“আচ্ছা…”
পার্বতী দাঁড়িয়ে রইলো।
“কিছু বলবি?”
“হ্যাঁ… ওই এ মাসের টাকাটা কি আজ দিয়ে দেবে?”
“কিরে! আজ তো ২৮। মাইনে হয়নি, কোথা থেকে দেব?”
“ভাল হত একটু দিলে… ছেলেটার…”
“দাদার সাথে কথা বলে কাল বলবো।”
দরজা দিয়ে বেরোনোর সময় একটা জোর আর্তনাদ কানে এলো—
“উহ্! গেল গেল…”
দাদার গলা।
পার্বতী ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো।
***********************
আজ নেশাটা বেশ হয়েছে মহাদেবের। দু-ছিলিম গাঁজা, তারপর এক বোতল বাংলা। বস্তির মুখে দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ধরালো।
পুজোর আলো জ্বলছে চারদিকে। লোকজনের গুলতানি চলছে।
তবু তার মনে অদ্ভুত এক ফাঁকা ভাব।
পুজো এলেই মনটা একটু অন্যরকম হয়ে ওঠে। অকারণেই হালকা লাগে। কিন্তু সেই হালকালাগাটুকু বেশিক্ষণ থাকে না— দৈনন্দিন জীবনের ভার খুব তাড়াতাড়ি তাকে টেনে নামিয়ে আনে। তার জীবনটা যেন অনুর্বর জমি— সারা বছর চাষ করেও ফলন খুব কম।
বিড়ির আগুনটা হাতে লাগতেই হুঁশ ফিরলো। ধীরে ধীরে ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলো সে।

***********************​

ঘুম ভাঙল পাশের ঘরের ঝগড়ার আওয়াজে। ঘরে কেউ নেই— নিশ্চয় ওই বাওয়ালে মজা দেখতে গেছে। রোজই এই দুই জনের ক্যাচাল। একসাথে সারাদিন কাজ করে, আর সকালে ঝগড়া করে।

পার্বতী হাসতে হাসতে ঢুকলো ঘরে।
“টাকা ভাগ নিয়ে লেগেছে আজ। কাল কার বাড়িতে কাজ করে পাঁচশো পেয়েছে— এ বলে বেশি চাই, তো ও বলে বেশি কাজ করেছে।”
“এ তো রোজই হচ্ছে… ছেলে নিয়ে তুইও গিয়ে মজা লুটছিস! চা দে।”
“ঘুম থেকে উঠেই মেজাজ দেখাচ্ছ কেন? চা নেই ঘরে, টাকা দিয়েছ কবে মনে আছে?”
কেতো ঘরে ঢুকতেই পার্বতী তোশক তুলে পাঁচ টাকা ওর হাতে দিয়ে বলল—
“চা নিয়ে আয় তো বিশুর দোকান থেকে।”
“পুজোর আগে কিছু টাকা পাবে?” পার্বতী জিজ্ঞেস করল।

“দেখি… কথা বলব।”

“এখনও বলোনি? ছেলে টাকে কিছু কিনে দেবে না?”

“তোকে মাইনে দেয়নি?”

“না।”   কেতো চা নিয়ে ঢুকলো।

“বাবা, আমি দুটো বিস্কুট নিয়েছি… বলেছি তুমি দিয়ে দেবে।

”মহাদেব চুপচাপ চায়ে চুমুক দিল। কেতো বলল—“বাবা, আজ যাবে? জামা কিনতে?”

মহাদেব চায়ের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে রইলো।
“হুমম…”
“আর কবে যাবে? সবার তো হয়ে গেছে…”
“হবে হবে… তোকে ঘুড়ি কিনে দিয়েছিলাম না বিশ্বকর্মা পুজোয়?”
“হ্যাঁ… কিন্তু ছিঁড়ে গেছে…”
“আচ্ছা, আজ দুটো নিয়ে নে পল্টুর দোকান থেকে। আমি দিয়ে দেব।”
কিছুক্ষণ পরে বালতি নিয়ে বেরিয়ে গেল মহাদেব।
***********************
"দাদা, আজ টাকাটা কি পাব?” জিজ্ঞেস করল মহাদেব।
স্বপন বলল—
“সব কাজ কমপ্লিট হলে পেমেন্ট পাবো।”
“সব তো পুজোর আগে হবে না দাদা…”
“আরে ভাই, টাকা পেলে দেব। এদিকে পুলিশ টাকা নিচ্ছে, ওদিকে কাউন্সিলার দিচ্ছে না। তুমি এখন টাকার কি করবে? গাঁজার টাকা দিয়ে দেব…”
ম্যানহোলে নামার আগে ছিলিমে দু টান দিলো মহাদেব।
ভেতরে নামতেই দুর্গন্ধে মাথা ঘুরে যায়।
দু-তিনটা হোলের কাজ করে এসে একটু বসলো তেঁতুল গাছের তলায়।
আজ সারাদিন কেতোর মুখটাই ঘুরছে মাথায়।
আকাশের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়লো সে। সাদা মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছে— কুলফির মতো।
মনে পড়ে গেল ছোটোবেলার কথা… গ্রামের মাঠ, ধানক্ষেত, কাশবন, …
“নাঃ… গ্রামেই চলে যাবো,” মনে মনে বলল।
***********************
“ও মহাদেবদা, কি ভাবছো গো অত? এখনো যে কাজ বাকি আছে!”
“হুমম…” বলে উঠে দাঁড়ালো মহাদেব।
ম্যানহোলের গায়ের সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলো নীচে। শেষ ধাপটা অবধি আর গেল না— লাফ মারলো নীচে। পা ঢুকে গেল পাঁকের ভেতর। কড়ায় করে পাঁক, রাবিশ তুলতে লাগলো।
এই দুর্গন্ধে নেশা হয়ে যায়— মাথাটা কেমন ঘুরে উঠলো। পাশের দেওয়ালটা ধরে একটু দাঁড়ালো। ওপরে তাকিয়ে দেখল— কেষ্টা নেই।
ধীরে ধীরে বসে পড়লো নীচে। চোখ বন্ধ করলো।
ছেলের মুখটা ভেসে উঠলো।
হঠাৎ—
অন্ধকারের ভেতর যেন আলো ফুটে উঠল।
ঝাপসা চোখে মহাদেব দেখল— একটা ছোট্ট মেয়ের অবয়ব। লাল বেনারসি, মাথায় মুকুট। চারপাশের ঘন অন্ধকারের মধ্যে থেকেও তার শরীর থেকে যেন মৃদু আলো বেরোচ্ছে।
মেয়েটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
মহাদেবের গলা শুকিয়ে কাঠ। ভয় আর বিস্ময় মিশে গেছে। তবু চোখ সরাতে পারছে না।
মেয়েটা এসে তার সামনে দাঁড়াল।
একটা হাত বাড়িয়ে দিল।
মহাদেব যেন নিজের অজান্তেই হাত বাড়াল। মেয়েটা তার হাতে কিছু তুলে দিল।
সে সেটা নিল। পকেটে রাখল।
কাঁপা গলায় বলল—
“কে তুমি… মা?”
মেয়েটা কিছু বলল না। শুধু ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।
আলোটা ক্ষীণ হতে হতে মিলিয়ে গেল। ঝুপ করে আবার অন্ধকার নেমে এলো ম্যানহোলের ভেতর।
“ও মহাদেবদা! ঘুমাচ্ছো নাকি? মাল দাও— দেরি হয়ে যাচ্ছে! আর কিছু নেই নীচে?”
“না… নেই… ওপরে আসছি…”
হুঁশ ফিরলো মহাদেবের।

***********************
পার্বতী কাজের বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে দেখল দরজায় তালা।
যাহ কেলো! আজ টাকাটা দেওয়ার কথা ছিল।
বেরিয়ে আসার মুখেই দেখা হয়ে গেল সুস্মিতার সাথে। কালো শাড়ি, লাল লিপস্টিক।
“আজ কাজ করতে হবে না। আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে।”
“হাসপাতাল? কেন?”
“কাল দাদা বাথরুমে পড়ে গেছে। পা ভেঙেছে— অপারেশন করতে হবে। সব এই তোর জন্য! মেঝেটা ভালো করে মুছিসনি কেন? ওখানেই পা পিছলে পড়েছে।”
একটু থেমে আবার বলল—
“তার ওপর এতগুলো টাকা গেল ড্রেনে…”
তারপর নিজেকে সামলে নিল।
“তুই কাল আয়।”
পার্বতী চুপচাপ হাঁটতে লাগলো। মনে মনে ভাবলো, দাদা তো বাথরুমে চলে গিয়েছিল, দোষ দিতে পারলেই হলো!
বস্তির মুখে কেতো খেলছে। ওর দিকে তাকালো, কিন্তু কিছু বলল না।
আকাশে কালো মেঘ। সংকীর্ণ গলিতে জল জমে আছে। টুনির আলো সেই জলে দুলছে।
পার্বতীর গলার কাছে কান্না দলা পাকাচ্ছে।
ঘরে ঢুকতেই মহাদেব উঠে বসল।
“শোন! আজ একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে!”
পার্বতী ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল—
“পুজোর আগে আর টাকা দেবেনা গো…”
মহাদেব ওকে শান্ত হতে দিল। তারপর বলল—
“আমাদের দুঃখ নেই রে… আজ স্বয়ং লক্ষ্মী এসেছিল আমার কাছে!”
পার্বতী অবাক—
“কোথায়?”
“ম্যানহোলের নীচে!”
“ছি :!”
“সত্যি বলছি! দাঁড়া— দেখাচ্ছি।”
প্যান্টের পকেট হাতড়াতে লাগলো মহাদেব।
তারপর বের করল একটা গোল করে মোড়া বান্ডিল।
“এই দেখ!”
পার্বতী হাত বাড়িয়ে থামল। তারপর আস্তে করে টাকার বান্ডিলটা নিল। প্লাস্টিকে মোড়া, গার্ডার লাগানো— বেগুনি রঙের।
চোখ তুলে তাকাল মহাদেবের দিকে।
“বল এবার— লক্ষ্মী কিনা?”
মহাদেবের চোখে অদ্ভুত এক নিশ্চিন্ত বিশ্বাস।
এক মুহূর্ত চুপ করে রইল পার্বতী।
তারপর—
হাসি।
প্রথমে চাপা। তারপর দমফাটা, বিরামহীন হাসি।
“লক্ষ্মী?… হ্যাঁ, তাই বটে…”
হাসতে হাসতেই বলল—
ওরে আমার গাঁজাখোর বোমভোলানাথ!”
হাসি থামতে থামতে আবার উঠে এল।
বিছানার ওপর পড়ে রইল বেগুনি রঙের টাকার বান্ডিলটা।
বাইরে বৃষ্টি নামল।
নীরবে।
অবিরাম।

এক বসন্ত
Saswata_Bose.jpg

এক বসন্ত

স্বাধীনতার জন্যে

শাশ্বত বোস
শ্রীরামপুর, হুগলী, পঃ বাংলা

drunk.jpeg

লেখক পরিচিতি 

লেখকের জন্ম ১৯৮৯ সালের জানুয়ারী মাসে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার শ্রীরামপুর শহরে। হুগলী জেলারই রিষড়া শহরে শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয় থেকে স্টার মার্কস নিয়ে যথাক্রমে ২০০৫ ও ২০০৭ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখির সাথে যুক্ত। বিভিন্ন নামী পত্রিকা যেমন সন্দেশ, জোয়ার, কোরক, পথ ও পাঁচালি ইত্যাদি পরিবারের তিনি নিয়মিত সদস্য ছিলেন। বহু স্বনামধন্য লেখক-লেখিকাদের সাথে তিনি বিভিন্ন পত্রিকার শারদসংখ্যায় লেখালিখি করতেন। 

পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষা ও কেরিয়ারের জন্য সাময়িকভাবে সাহিত্যচর্চার জগৎ থেকে বিরতি নিয়েছিলেন। ২০১১ সালে ইলেকট্রনিক্স এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হবার পর একজন সফল আউটডোর ব্রডকাস্টিং ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে একটি খ্যাতনামা বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেলে যোগ দেন ও পরবর্তীতে তিনি ইন্ডিয়ান নেভি ডেপুটেশনেও কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি একটি নামি বহুজাতিক সংস্থায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত। বর্তমানে তিনি পুনরায় সাহিত্যর্চচার জগতে প্রবেশ করেছেন। তার বিভিন্ন লেখালিখির মধ্যে উল্লেখযোগ্য রচনা “অনন্ত বিকেলের রূপকথারা”, “বৈশালী_পাড়ার_প্রতিমারা”, “অতঃপর অশুচি বনেদিয়ানা, পুজোর বনসাই এবং .....”, "কান্না রাগের 'হোমা পাখি'", “ডরাইয়া মরে”, “রূপান্তরের পথে”, “প্রবাসের বিভীষিকা”, “বইমেলা ও একটি গোলাপ”, “পুরোনো মর্গটার কাছে” এবং “পিশাচসিদ্ধ”, যা একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত এবং ইতিমধ্যেই ইউ টিউবে অডিও স্টোরি হিসেবে সাড়া ফেলে দিয়েছে। এছাড়া ভ্রমণকাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য “পরবাসী টুসুর দেশে”।
তার লিখিত কবিতাগুলির মধ্যে “একটি ব্যর্থ প্রেমের ক্ষুব্ধ আখ্যান”, “উদ্বর্তিনী”, “প্রাণের পুজো”, “কালো মেয়ের উপাখ্যান”, “বাংলা ভাষার দেশ”, “অন্য বসন্ত”, “ভালোবাসা ও একটি বসন্ত”, “মন- শরীরী”,  “হে নজরুল”, “সমর শেষের অসিয়ৎনামা” উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয়।
এই স্বল্প কালেই বহু সংস্থা থেকে তিনি সেরার সেরা সম্মানে ভূষিত। এর মধ্যে “অচেনা পর্বত” সম্মান, রাজার কবিতা studio কর্তৃক প্রদত্ত “অয়ন সৃজন সম্মান” প্রণিধানযোগ্য। 

​

জঙ্গলের গা ঘেঁষে পাহাড়চূড়োর মতন অনন্ত নরম আকাশে, বসন্ত যেন উড়ে এসেছে মিহি রঙের গুঁড়ো আবিরের মতো। ওপাশে আপার তেন্দু ফরেস্ট আর এ পাশে পরপর চা বাগান পেরিয়ে গরুমারা ন্যাশনাল পার্ক। মাঝে বিগত যৌবনা কোন স্থানীয় রমণীর মতন, নিমগ্ন আলোড়নে ক্ষীণ রেখাটি হয়ে এঁকে বেঁকে বয়ে চলেছে মূর্তি নদী! শরীর জুড়ে তার অসংখ্য যাযাবর নুড়ি পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যেন কুচি কুচি জোনাকির দানা! হিমালয়ের পাদদেশে আষ্টে পৃষ্টে জড়ানো আবছা কুয়াশা ঘেরা বিস্ময় আর মহাশূন্য থেকে খড় কুটো মুখে করে নেমে এসে, সারাদিন উড়ে উড়ে-ঘুরে ঘুরে বেহিসেবী পথ খুঁজতে থাকা ক্লান্ত বসন্তবৌরীর মায়া শিসের মৌতাত হয়ে, বয়ে চলেছে সে বিহানবেলার আনন্দবিলাসী কোন এক নেশাতুর ম্যাজিক বিভঙ্গের লোভে। এ আকাশ সে আকাশে এখন আগুন খোঁজে কামতাপুরী ভাওয়াইয়া গানের সুর! এমন সুন্দর একখানি মধুময় ভূমিখণ্ডের সাথেই তো জন্ম জন্মান্তরের ঋণে জড়িয়ে যাওয়া যায়! গলায় এক আঁজলা অঞ্জলী জড়িয়ে গেয়ে ওঠা যায়, “এই অরণ্য, নদী, পর্বত, নুড়ি পাথরে ভরা এই ভূখণ্ড, আমার দেশ! আমার একার দেশ! “মোর দেশ, মোর স্বর্গ!”

কাল রাতে চা বাগানে চিতা বেরিয়েছিল। আজ সকালে এ বাড়ির গোয়াল ঘরের সামনে চিতার পায়ের ছাপ দেখেছে পার্বতী বর্মন। পার্বতী এ বাড়ির বড় বৌ। সকাল বেলায় গোয়ালে ধবলী গরুর দুধ দোয়াতে গিয়ে, আধমরা রক্তাক্ত অবস্থায় গরুটাকে পড়ে থাকতে দেখে সে। দুদিনের বাছুরটাকে মুখে করে তুলে নিয়ে গেছে বাঘটা। সেই নিয়ে চিৎকার করে সে বাড়ি মাথায় করেছে। তার ত্রাহি চিৎকার শুনে আশেপাশের ঘর থেকে লোকজন ছুটে এসে ছোটখাট একটা ভিড় জমিয়ে ফেলেছে ওদের উঠোনে। হিংস্র শ্বাপদের গবাদি পশু শিকার এই জঙ্গলে হয়তো খুব সাধারণ একটা ঘটনা! আকছার ঘটে! তবু যে এই ঝুপড়িটার চারপাশে এই যে এতো উদ্বেলতা, বিচলিত গুঞ্জন, বিষয়বস্তুর বিষণ্ণতা ব্যতিরেকে ভাঙা ভাঙা কিছু রাজবংশী শব্দের স্থানিক বিস্ফোরণ এবং এই স্বভাবসুন্দর মায়াবী প্রকৃতি আর তার গা সওয়া নিষ্ঠুরতার প্রশ্নে বেশ স্বস্তিদায়ক মধ্যবর্তী নিজস্ব একটা বলয় তৈরী করে নিতে চাওয়া, এগুলোকে শুধুই রহস্যময়ী এই অরণ্যের মাঝে ওঁৎ পেতে থাকা তামাম বিপদসংকূলতাকে, এদের নিজেদের যূথবদ্ধতার বর্ম দিয়ে আটকে দেবার একটা মরিয়া প্রচেষ্টা বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারতো। এই রহস্যময়ী অরণ্যের প্রাচীন সুর, স্বর আর শীতল আলস্যের গায়ে অনুচ্চারে লেগে থাকা বেদনার পারম্পরিক দ্বন্দ্বের আখ্যানে, ট্রাজিক উপাদান হিসেবে হয়তো তাকে আরও ভাল মানাতো। কিন্তু যারা জানার তারাই শুধু জানে, এই লঘু জীবনে শুধু বয়ে যাওয়া কিছু মুহূর্তের কাছে কোলাহলপ্রিয় এই জটলাটা ঠিক কতটা আরামদায়ক এবং কিছু ক্ষেত্রে কতকটা মুখরোচকও! সেখানে শোক কিংবা ভীতি প্রদর্শন আর প্রাধান্য পায় না বরং নিরাপত্তাহীনতা, সংশয় কিংবা উদ্বেগ এসবের মাঝেই প্রকৃতির স্থিতিশীল নির্জনতা আর নির্বিকার খাদ্যশৃঙ্খলের মাঝে পড়ে, নিজেদের আব্রুহীন জীবনে সে যেন এক অবান্তর উদযাপন হয়ে ওঠে! সীমিত সাধ্যের এইসব জীবনগুলোয় ঘটে যাওয়া এরকম অধিকাংশ ঘটনায় যখন নিজেদেরই কোন হাত থাকে না, তখন এইসব গল্প করে বা গল্প শুনে তবু তো মানবিক অনুভূতিগুলো সজাগ থাকে পূর্ণমাত্রায়! কাল জঙ্গলে কাঠ কাটতে যাবার সময় পার্বতী হাতির পালের মুখে পড়েছিল। সে কথা হাত পা নেড়ে এরই মধ্যে সে সকলকে বলতে শুরু করেছে। হাতি প্রায়ই এখানে জঙ্গল ছাড়িয়ে বসতির কিনারায় এসে পড়ে। সরু পাথুড়ে রাস্তায় এসে এমনভাবে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন সাক্ষ্যাৎ মাশান দেব! মৃত্যুর ঠিক আগের রূপকের খোঁজে, মিছিল করে জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে ফেরার পথ ভুলেছে। আসলে এই হিরণ্ময় উন্মুক্ত অরণ্যের মাঝে এদের আসা যাওয়া তো এমনই! জঙ্গল যেন শুধু এদেরই! এই চরাচর জুড়ে খেলা করে বেড়ানো বালিহাঁস, ডাহুক, চোখগেল, পাপিয়া, দলছুট হাতিদের দল, এরাই তো জঙ্গলের গর্ভকাল নির্ধারণ করে। ডুয়ার্সের এই জঙ্গলটা বারবার যেন এই আদিম বন্যতাকে জন্ম দেয়, সযত্নে বড় করে তোলে, শারীরবৃত্তিয় শৃঙ্খলে বেঁধে পথভোলাদের ঘরে ফেরায়। আবার এদের গর্ভেই হয়তো সংক্রামিত প্রেম আর ভালোবাসার অনর্গল সঙ্গমে নতুন করে জন্ম নেয় এই মোহক বনাঞ্চল! এদেরই পাপহীন দেহে বিমর্ষ শিশুটির মতো ঘুমিয়ে থাকার ভান করে মুখ গুঁজে, চোখ বুজে পড়ে থাকে। চন্দ্রাহত জ্যোৎস্নায় প্লাবিত এ জগৎ সংসারে, রাতচোরা হুতোমের ধূসর চোখে জঙ্গলের সেই ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে, কমলা জেগে থাকে সারারাত। তার ঝুপড়ির কয়েক কিলোমিটারের ভেতর কলকল কলাকৌশল আর স্রোতস্বিনী জাদুটোনার হাত ধরে তখন এক আচ্ছন্ন ঘুমের আবেশ তৈরী হয়। স্মৃতির নক্ষত্রেরা শিশিরভেজা জলছবি আঁকে তার ভাবনার ভিতর, নিদ্রাবিহীন স্বপ্নের ভিতর।ঘরে তার প্রায় ডজন খানেক ছেলে মেয়ে। সাতটি ছেলে, পাঁচটি মেয়ে। শেষেরটির বয়স এখন কুড়ি দিন। নেহাতই দুধের শিশু! তবে তাতে ওর স্বামী হীরেন ঠিক যেন নিশ্চিন্ত হতে পারে না! আসলে এরা শুধু তো সন্তান নয় ওদের কাছে বরং এরা এই বর্মন দম্পতির জন্য এদেশে ক্রমশঃ বাড়াতে থাকা মৌলিক অস্তিত্বের শিকড়! এই বনাঞ্চল, পায়ের নীচের পাতালকক্ষ, মাথার উপরে অনন্ত সীমাহীন নক্ষত্রবীথি, পরিব্যাপ্ত মহাকাশ এসবের মাঝে প্রতিস্থাপন করা একটা নিজস্ব ‘আমি’কে স্থায়ী নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করার অলংকার! প্রতিবার পোয়াতি হলে সদরের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয় কমলা। প্রতিবার বাচ্চার সাথে নতুন সরকারি কাগজ। আসলে কমলা-হীরেন-পার্বতী মায় পুরো এই বর্মন পরিবার, এমনকি এই জনপদের অধিকাংশ বাসিন্দাই তো এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নয়! এদের অনেকেই কয়েক যুগ আগে পরিযায়ী হয়ে চলে এসেছে বাংলাদেশ থেকে। কেউ আবার এসেছে আসাম থেকে। এদের স্বাভাবিক জীবনভঙ্গিমায়, সত্ত্বায়, প্রবণতায় এপার ওপার মিলে মিশে গেছে খুউব সহজ বিবর্তনে। এদের শৈশব কৈশোর হয়তো সনাতনী জল হাওয়ার মতোই ভাগ হয়ে গেছে দেশকালের সীমানায়। কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি, সুর এগুলোকে কি এতো সহজে ভাগ করা যায়? ইদানীং সরকারি অফিস থেকে ভোটের কাজ করতে এসে বাঁকা চোখে তাকায় ওরা এদের দিকে। সে দৃষ্টিতে কখনো কখনো কপট চাতুরীর সাথে চিনির মতো গুলে থাকা মৌলিক বঞ্চনাবাদের ভ্যাজাল দৃষ্টিকটুভাবে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে! প্রতি রাতে তাই হীরেনের পুরুষ শরীর জেগে ওঠে, সদ্য খোলস ছাড়া চা বাগানের রাজগোখরোর মতন! বর্ষার মেঘের মতো ছড়ানো চুলে কুসুমিত কামিনী তেলের হাহাকার নিয়ে পড়ে থাকা কমলার লোলচর্মসার শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে সে হাতড়ায় কামড়ায়! তার আঙুলের প্রতিটা নখে লেখা হতে থাকে লালা, মাংস আর রক্তের অযুত সহজপাঠ! আকাঙ্ক্ষার উন্মাদ আগুন জ্বলে যেন! কমলার স্তনের বোঁটা বেয়ে দুধ বেরিয়ে এসে ভিজে যায় চারপাশ! হীরেনের দাপাদাপি তবু থামে না! যেন কাঁটা বসানো ক্ষুরধার লিঙ্গ তার! কমলার জরায়ুর বেদনা ভুলতে দিতে চায়না সে কোনোমতে! ঢুকিয়ে, পেঁচিয়ে প্রতিদিন নতুন করে খনন করে চলে সে কমলার যোনিদেশ! তিরতির করে কাঁপতে থাকা লম্ফের আলোয় সে গমন পথে রাতের অবয়ব ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে ওঠে! ফুলে ওঠা ঠোঁট, শরীর জোড়া কালো কালশিটে, ঝুলে যাওয়া স্তনবৃন্তে কস্তুরীহীন, চিনচিনে, হেঁচড়ানো সম্ভ্রমহীনতা নিয়ে দূরে কান পাতে কমলা। রাতের বুক চিরে তখন পাথরে পাথরে জলের ধাক্কা লাগার শব্দ, জঙ্গলের নিস্তরঙ্গ নীরবতা এড়িয়ে নিশাচর পাখিদের ডাক, নিশিকৃষ্ণতিথিতে অদ্ভুত লয়ে নিরলস জৈবিক কসরতে ব্যস্ত ঝিঁঝিঁ পোকার ঝমাঝম নগরকীর্তন, আশ্লেষী হায়নার পিশাচ হাসি এসবের পাশাপাশি ঝুপড়ির ঠিক বাইরেটা থেকে লোহার শিকলের একটা হালকা ঠুনঠুন শব্দ ভেসে আসে। জঙ্গলের ভেতর গাছপালার গভীরতা ভেদে যেমন আলো আঁধারি বাড়ে কমে, ঠিক তেমন নদীর বুক বেয়ে বয়ে চলা বিভ্রান্ত হাওয়াটার ধাক্কায় শব্দগুলোর গভীরতা যেন কমতে থাকে! কেমন ফাটা ফাটা অস্পষ্ট হয়ে মাত্রা হারিয়ে ফেলে শেষে! ফি বছর হীরেনের স্থায়ী নাগরিকত্বের পক্ষে দাখিল করতে চাওয়া চামড়া মাংসের কাগজপত্রগুলোকে নিজের গর্ভ দিতে না পাড়ার পাপ ধুয়ে ফেলতে ফেলতে, কমলা যেন দেখতে পায় বাইরে বাঁধা হাতিটা ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছে এখন! ঘন ঘন মাথা নাড়ছে! পিছনের দুপায়ের মাঝে শিকলটাকে হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলতে চাইছে! এ আজ নতুন কিছু না। কমলা দেখেছে প্রায় প্রতি রাতেই এই সময়টায় হাতিটা যেন ক্রমশঃ অস্থির হয়ে ওঠে। ওদের সঙ্গমের তীব্রতা যত বাড়ে তত যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে সে! মাস ছয়েক হোল মূর্তি বিট অফিস থেকে হাতিটাকে দিয়ে গেছে হীরেনের জিম্মায়। জলদাপাড়া ফরেস্ট অফিস যখন হস্তীশাবকটিকে ওর মায়ের থেকে আলাদা করার পদ্ধতি শুরু করেছিল তখন হয়ত সেটির বয়স চার বছর! ফি বছরই এই কাজ চলে। মায়ের থেকে আলাদা করার সময় মা হাতিটির অস্থিরতায় তটস্থ থাকতে হয় বনদপ্তরের সকলকে! এসময় তাকে শান্ত রাখে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য কুনকি হাতির দল। এসবই কমলা শুনেছে হীরেনের মুখে। হীরেন বেশ কয়েক বছর ধরে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে একটা পার্ট টাইম কাজ বাগানোর ধান্দায় ছিল। মাহুত হবার ট্রেনিং নিয়েছে সে বেশ কিছুদিন। নিজে হাতে হাতি বাঁধার দড়ি বানিয়েছে। ওর মতন আরো অনেকেই ট্রেনিং নিয়েছে যদিও। তার পর প্রধান মাহুত বাসের আলীকে হাত করে, এটা সেটা ফাই-ফরমাস খেটে দিয়ে, কিশোরগঞ্জের দোক্তা পাতা সাপ্লাই দিয়ে, আস্তে আস্তে মাহুত হবার বিশ্বাস সে অর্জন করেছে। এখন সে নিজেই বুক ফুলিয়ে, ছুঁচলো গোঁফের আগা সরু করে বলে, “হামরা বর্মন! মাহুতের জাত! মোর দাদা পরদাদা আসাম থাকি হাতি ধরি আনি, পোষ মানি খেলা দেখাইত।” হাতিটাও দিব্যি এখন হীরেনের পোষ মেনেছে। হীরেনই বলতে গেলে এখন ওর ‘মাহুত বন্ধু’! হাতিটাকে সেই এখন চান করায়, খেতে দেয়, তার পিঠে চেপে জঙ্গল, নদীর ধার চড়তে বেরোয়। রোজ একবার বিট অফিসে রিপোর্ট করে আসে। সেসময় রাখালিয়া বাঁশিতে সুর তোলে হীরেন। তার বাঁশির সুরে জঙ্গলের শাল-সেগুন-গামার গাছে জন্ম নেয় কয়েকশো চুমুর রোমান্টিকতা! হয়তো ওর না বলা ভালোবাসাগুলো অব্যক্ত প্রেম আর ব্যর্থযাপনের কবিতা হয়ে তাতে মিশে থাকে। যেন এক আদিম অরণ্যমানবের সবুজ হারানো উদাস কথকতা, দূরের পাহাড়ের গায়ে তোলা অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসে, এক ফোঁটা গাড় বাদামী রঙের জাদু ধ্বনি হয়ে! হাতিটা সত্যি দিব্যি পোষ মেনেছে হীরেনের! পেছনে বাড়ি মেরে ‘বোট’ বললে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে! হাতের বেতের লাঠিটা দিয়ে একটু খুঁচিয়ে ‘মাইল’ বললে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে! আবার একটু চেঁচিয়ে ‘তিরে’ বললে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে! হাতিটার সামনে গিয়ে হীরেন ‘ধের’ বললে কেমন শুঁড়ে করে পেঁচিয়ে ধরে ওকে! ব্যালেন্স করে ওর কাঁধে চড়ে বসে হীরেন। প্রতিদিনের কাজের ফাঁকে এসবই দূর থেকে লক্ষ্য করে কমলা। হাতিটার পেছনের পা দুটো একটা মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা এখনো! পাটের দড়িটা রোদে পুড়ে জলে ভিজে হলদে হয়ে গেছে। দড়িটা সোজা উঠে হাতিটার পেটের তলা দিয়ে ঘুরিয়ে লেজের তলায় পাক দিয়ে বাঁধা। একে মাহুতদের ভাষায় ‘জাঙ্গিয়া’ বলে। এই বাধনটার ফলে তার লেজটা একটু উঁচু হয়ে আছে এবং লেজ নাড়লে হাতিটার ঈষৎ কালচে যোনিদেশ বেরিয়ে পড়ছে মাঝে মাঝে। হাতিটা এখন আপন মনে আখের ছোলা চিবোচ্ছে। ধীর পায়ে সেটার কাছে এগিয়ে যায় কমলা। প্রশিক্ষণের প্রথম কয়েক মাস গলার কাছে রশি দিয়ে কষে বাঁধা থাকে। একে বলে ‘ফাঁদ’! তাছাড়াও বুকের কাছ থেকে জড়িয়ে সামনের পা দুটোও বাঁধা থাকে। তাকে মাহুতেরা বলে ‘বুক ফারা’। হীরেনের মুখে শুনেছে কমলা, পোষ মানানোর প্রথম দিনের কথা! সে দৃশ্য বড় নির্মম! হাতিটার চারটে পা চারটে খুঁটির সাথে বেশ মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে এই বাঁধনগুলো পড়াবার কাজ চলে। সেসময় হস্তীশাবকটির কান ফাটানো চিৎকারে পুরো জঙ্গল কেঁপে ওঠে! অনেক টানা হ্যাঁচড়ার পর স্ব-যাপনের যুদ্ধে হেরে যায় হাতিটি! তার শূন্য, ক্লান্ত শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে! স্তব্ধ হয় তার যাবতীয় তর্জন গর্জন! স্মৃতি ঘোলাটে হয়, অনুজ্জ্বল চোখদুটো জুড়ে তার ঘুম নেমে আসে। হাতিটার গায়ে বাঁধনগুলো হয়তো তখন কষে বসে গেছিল! সে দাগ এখনো সুস্পষ্ট! জায়গাগুলোয় হাত রাখে কমলা। ওর হাতের তালুর নীচে কয়েকটা অমসৃণ বলিরেখা ভেসে চলে যায়। ওর হাতের নাগালের ভিতর হাতিটার পিঠের শুকিয়ে যাওয়া ফোস্কাগুলো জেগে থাকে শুধু, শুকনো পাথরের গায়ে ঋতুর হাত ধরে জন্ম নেওয়া, অদৃশ্য ফাটলের অন্ধকার নিয়ে। মাকে ছেড়ে আসার শোক, শৈশব হারিয়ে ফেলার অভিমান আর লড়াই করে বেঁচে থাকার অহংকার এসব নিয়েই কবে যেন বড় হয়ে গেছে এই হস্তীশাবক। সে এখন তার মাহুতকে ভোলাতে জানে। সময় সময় নাকরা করে ব্যস্ত করে তুলতে পারে। পৃথিবীর বুকে এর থেকে বড় ভালোবাসার দৃশ্য হয়তো আর কিছু নেই! শুধু কমলা কাছে এলেই হাতিটা পিছন ফিরে দাঁড়ায়! মুখ ঘুরিয়ে নেয় অন্যদিকে! কমলা যেন ওর কতকালের সতীন! এই মুহূর্তে হাতিটার সাথে একটা চেনা অচেনার আত্মময়তা অনুভব করে কমলা। শিরা ধমনীতে বহমান নিঃশব্দ সে আবেগ, মূর্তির কুলুকুলু স্রোতের মতোই স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ! একদিন মা বাপের ঘর ছেড়ে সেও এসেছিল হীরেনের কাছে। ঘরকন্যার সুখ পেতে জঙ্গলের বুকে হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসা নিতান্ত অপ্রয়োজনীয়

শিয়ালকাঁটার মতোই হয়তো সেও ভেসে এসেছিল। এখন গোটা শীতকাল জুড়ে পেয়ে বসা স্মৃতির অবসন্নতা আর মূর্তির প্রায় নিশ্চিহ্ন শরীর জুড়ে বেছানো ঠান্ডা বিছানার চাদর চিরে, সদ্য যুবতীর সোহাগের ওম এনে দেওয়া চৈত্র শেষের তপ্ত রোদকে ফিকে করে দিয়ে, ডেকে যায় শুধু নিখাদ ভালোবাসার লোভে কপাল পোড়ানো, কুলত্যাগী কোন এক চরিত্রহীনা কোকিলা! কমলার নিজের বিয়ের দিনের গীত মনে পড়ে যায়।
“বালির বাবার বাড়ি রে।
কলা সারি সারি রে।।
কোথা গিয়া পাইলা মধু।
বৈদেশী ভ্রমরা রে।।”

কুশে বাঁধা পড়েছিল দুটো হাত। আলতা চিহ্ন মাখামাখি সে হাতের রেখা যেন তখন তৃপ্ত মধুভান্ডের মতোই পূর্ণ! এতদিন এই যুগল পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু সেই লগনে রূপবতী লাবণ্যেযেন পুনর্জন্ম হয়েছিল কমলার। মধুল গান, সারি গান, পান-তামুল, খৈ ছেটানো আর কলা গাছের সারিকে সাক্ষী রেখে, উজ্জ্বল প্লাবনে ভেসে গেছিল কমলার যৌবনবতী শরীর, ডাগর ডাগর চোখ, ডিঙি নৌকার মতন বাঁকানো মুখ, ভারী বুক, টিকোলো চিবুক! যেন চাঁদের আলোয় ভিজছে বনস্থলী! ফেলে আসা জীবনের যাবতীয় দুঃখ গন্ধকে মুছে ফেলে সে যেন তখন এক নতুন জীবনের আলোয় ফেরা। পাথুরে পথের ধুলো জড়িয়ে আরো নব নব প্রাণে ছড়িয়ে পড়া তেল হলুদের গন্ধমাখা আঁচলে। ওর ভাতারকে সেই প্রথমবার দেখে ওর পছন্দ হয়েছিল খুব। বেশ নির্মেদ, পেশীবহুল, টানটান চেহারা যেন ফুট ছয়েক লম্বা ধনুকের একটা ছিলা। দেখলেই কেমন যেন ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। মরদ হীরেনকে দেখে কমলার নরম বুকে তীব্র কর্ষণ ইচ্ছা জেগে উঠেছিল সেদিন! ঠিক ততক্ষণ কর্ষণ যতক্ষণ না অবধি ফাঁপা কুয়োয় জমে থাকা ধাতুরস দুকূল ছাপিয়ে গৃহস্থের বাড়ি ভাসিয়ে দেয়। শ্বশুরবাড়িতে এসে বৌ দেখানোর সময় এই পার্বতীই ওর মুখ দেখে বলেছিল, “এ ছয়রি মায়া জানেই! আজি থেকেই মোর দেবর বশ হল!” আঁকা বাঁকা সর্পিল পথে স্থিরচিত্রের মত স্থির হয়ে যাওয়া যায় এমন একটা জড়তা ছিল সেদিন পার্বতীর চোখের চাহনিতে! তারপর চোখে ঈষৎ বাঁকা দৃষ্টি এনে সামনে রাখা ধানের গোছা থেকে বেশ কিছুটা ধান মুঠো করে নিয়ে, ওর সিঁথিতে ছড়িয়ে দিয়েছিল। সে দৃশ্যে এসে সজোরে ধাক্কা দিয়ে একখানা আস্ত রামধনু এঁকে দিয়ে গেছে তখন, টলটলে দু একটা ভবঘুরে হাওয়ার স্মৃতি! পাশে বসা পুরুষটির মুখে তখন নির্নিমেষ তৃপ্তির হাসি। আসে পাশে শুধু পক্ককেশ রাজবংশী বৃদ্ধা গোষ্ঠীর মুখরিত গুঞ্জন। আশীর্বাদ পর্ব সেরে পার্বতী তার দেবর আর দেবরানীর কপালে আলতো করে চুমু দিয়েছিলো। শ্রাবণের জলভরা মেঘ যেমন স্রোত নিয়ে আসে মূর্তির বুকে, জঙ্গল ঋতুমতী হয়, ওজন লাগে তার ভারী শরীরে, ঠিক তেমন একটা সমর্পিত স্তনভারে পার্বতীর শরীরটা ঝুঁকে পড়েছিলো সামনের দিকে। অনিমেষ মায়ায় ভরা সে চুম্বন! যেন অনেক দূর দিয়ে ভেসে গেছে নির্বাক কল্পনারা! দিনের দূরগামী আলোর গভীরে যেন তাতে বোনা হয়ে আছে, ক্রোধ-ভয় আর সমবেদনার রূপবতী অক্ষর! এর পরের সাংসারিক জীবনে অবশ্য পার্বতী আর বিশেষ সদ্ভাব রাখেনি কমলার সাথে! জঙ্গলে কাঠ কুড়ানো, শুয়োর গরু প্রতিপালন, রাত জেগে হাতির হাত থেকে ক্ষেত পাহারা দেওয়া, এসব কাজ সমানে সমানে ভাগ হয়ে গিয়েছে। এমনকি বিষুয়ায় আটকলাই-বাটকলাই ভেজে বাড়ির চালে ছড়ানো, ঘরের দরজায় পিয়াজ-রসুন-পানিমুদ্রি পাতা-বেতের ডাল ঝোলানো ইত্যাদি লোকাচার কিংবা বকা পিঠা, পাকন পিঠা, চিতই পিঠা বা নাড়ু বানানো এইসবই ওরা করেছে হাসিমুখে। সবার সামনে দেখিয়েছে ওরা কত ভাল আছে! মিলে মিশে আছে! কিন্তু কমলা ঠিকই বুঝতে পারে ওর বিয়ের পর থেকেই ভিতরে ভিতরে একটা জং ধরা কাতরতায় ডুবে গেছে পার্বতী! নিজের অসম্পূর্ণতাকে চেপে রেখে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকে, অপছন্দকে গ্রহণ করলে যেমন হয় কিংবা যেমনটা হয় নিজের একান্ত পছন্দকে বুকে পাথর চেপে পর করে দিলে! কমলার কাছে এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই তাই আর এসব নিয়ে ভাবলে কষ্টও হয়না ওর! হাতে হাতে তিল আর খেঁজুর গুড় জড়ো করে ঢেঁকিতে দেয় পার্বতী আর তালে তালে পা চালায় কমলা। যেন একই পুরুষের সাথে সফল আসক্ত একটি সঙ্গমের পর কোনো কাল্পনিক নাগরদোলার দুই মাথায় চড়ে বসেছে দুই নারী! একদিকে শর্তাধীন নীরবতা আর অন্যদিকে অশুচি একাকীত্ব! দুজনেই আপাত ক্রিয়াশীল কিন্তু ভেতরে ভেতরে কি ভীষণ হিসেবী! যেন চরম ব্যক্তিগত কোন সুখে বা অসুখেও কেউ কাউকে একবার জিজ্ঞেস করবে না, “কেনে আছো?” (কেমন আছো?)

এখানে এখন ধূসর আকাশ মাথার ওপর ঝুলে থাকে সুঠামদেহী কোন পরপুরুষের মতন! তার গায়ে মেঘেরা লেগে থাকে লুকোনো কোন বিষণ্ণতা নিয়ে। অলক্ষ্যে ভিজে ওঠে বাতাস। শ্যামলা রঙের বিকেলবেলাটায় যেন পুরোনো কোন কান্নার গন্ধ মিশে থাকে। এখানে এখন জন্ম-মৃত্যু-যৌনতা-নাগরিকত্ব চাপা পরে থাকে ছেঁড়াফোড়া শুকনো পাতার মতন। পাথুরে মাটির গা বেয়ে উল্লাস আর বিষাদের লুকোচুরি খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়া মূর্তি নদীর শীতল জলে পা দিলে, এই ক্ষরতপ্ত বসন্তের বিকেলবেলাতেও হালকা শীত শীত ভাব হয়। নদীর পশ্চিমের তট বরাবর ধানক্ষেত নেমে গেছে ধাপে ধাপে। এসময় বেশ অনেকক্ষণ ধরে বেশ অনেকটা ওপর থেকে, পরিশ্রমী চিলের আতসী চোখে মূর্তিকে দেখলে মনে হয়, অন্ধকারের গভীর থেকে উঠে আসা শীর্ণকায় এক বালুপথ! যেন ঋতুমতী নিঃসঙ্গ তরুণীটি! আশেপাশের পরিচিত সবকিছুর ছোয়াঁচ বাঁচিয়ে সে একাকী হেঁটে চলেছে দূরে, কিছু রঙিন ফুল আর সুগন্ধীর বন্ধুত্বের আশায়। দিনের আলো শেষে বিকেলের ছায়াতেই অন্ধকার নামে একটু একটু করে। নোনাধরা দুপুরের শেষে নিষ্প্রাণ যৌবনের মতো একা তেতে পুড়ে শেষ হয়ে যেতে পারে এমন একটা জীবন অবশিষ্ট থাকে শুধু! ঠিক সেই রকম একটা জীবনকে সাথে করে আজ নদীর ধারে এসেছে কমলা। সেই জীবনের যে রং চোখে দেখা যায়, সেই রং নয় বরং চোখের আড়ালে গাড় হয়ে ঝিম ধরে যে রং সেই রং নিয়ন্ত্রণ করে বেঁচে থাকার ছলাকলা! এতক্ষণ ঠিক সেই রঙের পৃথিবীটাকে একটা কাঁচের বোতলে বন্দী করে তাতে চোখ রেখেছিল কমলা। এদিক সেদিক থেকে কিচির মিচির পাখির ডাক ভেসে আসছে। ওরা গান গাইতে চাইছে বোধহয়! ভালোবাসার গান! ঠিক তখনি তাকে আবার দেখা গেল! পরনের সেমিজটা হাঁটুর উপর গুটিয়ে, একটা সুরতি মোষের পিছু পিছু গোড়ালি জল ডিঙিয়ে মূর্তি পারাপার করছে সে। মূর্তি নদীর জলে বোনা ঝাপসা আয়নায় তার কোন স্পষ্ট ছায়া পড়ে না! তার পায়ে পায়ে খেলা করে যায় বোরোলি মাছের ঝাঁক! দৃশ্যটার ভেতর অনেকখানি মায়া, অনেকখানি জাগতিক মাদকতা লুকিয়ে থাকে যেন! সেদিকে দেখতে দেখতে বুঝি কমলার মনের ভেতর শিরশিরে বাতাস বয়! বুকের মাঝে অজস্র খঞ্জনি বেজে ওঠে ঝনঝন! সব আনন্দ যেন ঠেসে জমা হয়েছে দৃশ্যটায়! এ দৃশ্য যেন তার বহুদিনের চেনা। যেন এর আগেও কয়েক হাজারবার দেখেছে সে। তবু আজ আবার তাকে দেখে ছন্নছাড়াভাবে স্বাধীন হবার বোধটা বুঝি আবার সজীব হয়ে উঠলো কমলার মনের ভেতর। সে যেন দেখতে ঠিক সেরকম, যেমনটা সংসারের শুরুর দিনগুলোতে কমলাকে দেখতে ছিল। ডাগর ডাগর চোখ, ঈষৎ ভারী বুক, বাঁকানো চিবুক, ডিঙি নৌকার মতন মুখ। বহু কাঙ্ক্ষিত ঘুমের ভাব থেকে সরে আসা একটা নিষ্পলক চাহনি নিয়ে সে যেন ওকে ওর গতজন্মের কথা বলে। জীবনের অলিগলি, ভুলভুলাইয়া পথে হারিয়ে যাওয়া অতীত খুঁড়ে, সযত্নে তুলে আনে একখানা আধপোঁড়া স্বপ্নের ফালি। ওকে দেখলেই খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করে কমলার! কিরকম একটা বৃষ্টি শুরু হয় ভেতর ভেতর! প্রথমে ঝিরঝিরে, তারপরে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে বেগ। মনে মনে বেজে ওঠে রংপুরী ভাওইয়ার সুর।
“মইষাল রে, তোর মইষের গলার ঘন্টি
বাজে ঠুন ঠুনাইয়া রে...
সেই ঘন্টির শব্দে মোর পরান
কান্দে উঠে গুমরাইয়া রে।“

কিন্তু তারপর আর সুর মেলে না, তাল কেটে যায়! চৈত্র শেষের ঝোড়ো হাওয়ায় অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে তার জট পাকিয়ে যাওয়া রুক্ষ চুল। তার খোঁপা থেকে নদীতে পড়ে ভেসে যায় গোলাপী রঙের এক নাম না জানা ফুল। কমলাকে দেখে সে মাঝনদীতে দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। ঈষৎ স্তনভারে সামনের দিকে ঝুঁকে গেছে তার শরীর। অর্ধ উন্মীলিত বক্ষদেশের নীচে তার নির্মেদ কটিদেশ বেরিয়ে রয়েছে, শাল জঙ্গলে পথ হারানো ভীরু হরিণীর মতো! না সেখানে মাতৃত্বের কোন চিহ্ন নেই! হাত দুয়েক দূরত্বে মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্থির দুটো মানুষকে জড়িয়ে ধরে, ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকানো এই হিম হিম কালবেলায় রচিত হয় এক অসীম, অপার মায়ার মাধুকরী। ও সুমিত্রা! নামটা অবশ্য কমলারই দেওয়া। খুব ছোটবেলায় যখন কমলার মা মারা গেল বসন্ত রোগে সেদিন প্রথম ওকে দেখেছিল কমলা। তারপর থেকে বেনের পুতুল নাচের আসরে, কাউনিয়ার বাড়ির আনাচে কানাচে, একা পুকুর ঘাটে, সন্ধ্যেবেলা তুলসীতলায়, ঋতু আসার আগে বা খুব নিকটজনকে দাহ করে ফিরে অশুচি হয়ে যাবার সময়ে আবার নিকট পরিবার পরিজনের হাতে ‘খারাপ’ হতে গিয়ে, ওর নিজের না বলা কথায়, বলে ফেলা সব কথায়, স্মৃতির পাতা হাতড়ে, সব খানে কমলা শুধু তাকেই দেখতে পায়। যৌবনের প্রথম মিলন কামনায় চঞ্চলা কিশোরীর মতন প্রবল কামজ্বরে পুড়েছে কমলা ওকে ঘিরে। ওদের দেহতাপে পুড়ে গেছে সেই গৃহস্থ দুপুরগুলো! আজও রাতের অন্ধকারে যখন ওর শোবার ঘরে বাঁধ ভাঙা রতির সন্ত্রাস চলে, ওর যোনিদেশে আঁকা হয় ভবিষ্যৎ নাগরিকত্বের স্থায়ী বন্দোবস্ত, যখন ওর বুকে হৃৎপিণ্ডের দৌড়োনো বেড়ে যায় প্রায় দুন্দুভি শব্দের বেগে, ওর নিম্নাঙ্গে ধেয়ে আসে রাতনিবিড়ের নিটোল চাকভাঙা মহুলের গন্ধতরল, ঠিক সেই সময় কাঁপা কাঁপা আলোয় তাকে প্রহেলিকার মতন ঘরের এককোণে বসে থাকতে দেখেছে কমলা! প্রেমিক চোখে ওর নাভির গভীরে আলতো জিভের ছোঁয়ায় দেশ-কাল-মানুষের মানচিত্র আঁকতে দেখেছে! সম্ভোগ শেষে হীরেন ওকে ছেড়ে দেবার পর ওর যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীরটার পাশে এসে বসেছে সুমিত্রা। ওর বিবশ শরীর জুড়ে বুলিয়ে দিয়েছে ময়ূর পালক। উন্মুক্ত জিহ্বা দিয়ে চেটে নিয়েছে ওর সব রক্ত-স্বেদ-বেদনা-ক্লান্তি! নরম হাতের পরশে ওর চোখ জুড়ে নেমে এসেছে বহু কাঙ্ক্ষিত হেমন্তের রাত! ঠিক যেন ওর মায়ের স্পর্শ! ওর কানে কানে এসে সে শুনিয়েছে, ছেলেবেলায় কমলার বাবার গলায় শোনা গাড়িয়ালের গান, 
“ও মুই নাই ওর আর না জাইম গাড়িয়াল
তোমার গাড়িত চড়ি।
তোমার গাড়ির হাঙরাত বাজি
ছিরি গেইল মোর বিয়ার শাড়ি।”

সুর, গান এসব কমলার রক্তে! ওর বাবা নিজেই কত ভাওইয়া রচনা করেছেন! সুর দিয়েছেন! তা হয়তো কোথাও লেখা-জোকা নেই। মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ঘুরে প্রচলিত তকমা পেয়ে গিয়েছে। কামতাপুরের আকাশ, বাতাস, ভাষা, লোকগানের সুর, পাখির শিস এই সব কিছুর ওপর ওদের আকণ্ঠ ঋণ! তাই তো মাতৃসম ভাষার বঞ্চনার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের দেশ গড়ার জন্য বাপ বেটায় মিলে সুর ছেড়ে বন্দুক নিয়েছিল হাতে। পুলিশের গুলি খেয়ে লাশ হয়ে ভেসে গেছিল বুড়িবাসরার জলে। দেশ বানায় মানুষ, মানুষই মানুষের স্বাধীনতার সীমানা বাঁধে! সেই মানুষ আবার সুরও তো বাঁধে! সুরের সাথে মিলেমিশে যেতে পারলে মানুষ নদী হয়ে যায়! স্রোতের মতন ঝর্ণা হয়ে গড়িয়ে পরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে! খুব তীক্ষ্ণ একটা পাখির শিস ভেসে আসছে এখন। সুরটা বড় চেনা লাগে কমলার। ইষ্টিকুটুম! দূরের সজনে গাছে পাতায় মোড়া পিঁপড়ে বাসা, হাওয়ায় দোল খাচ্ছে ফুটবলের মতন। আগত বৈশাখের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ এসব উপলব্ধি করে জঙ্গলের বুকে গাছেরা নতুন পাতা বোনার সুর তোলে। সময়ের বাঁকে গোত্তা খেয়ে সে সুর হয়তো জঙ্গলেই হারিয়ে যায়! সাধারণ মানুষের কান অবধি এসে পৌঁছয় না। তবু তো এ পৃথিবীতে সবই তৈরী হয়, দুঃখ-আনন্দ-হাসি-জন্ম-মৃত্যু-উৎসব! সব কিছু! নদীর বুকে কোন শ্রমজীবী জল ছেঁচে পাথর তুলছে এখন! এতে করে হয়তো মূর্তির বুক পরিষ্কার হবে! স্রোত আসবে! কমলা সুমিত্রা এখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মাঝে হয়তো সাদা দেওয়াল! বেপরোয়া প্রেমিকার মতন দুহাত দিয়ে সে আচ্ছাদন সরিয়ে নদী-মাঠ-পাহাড়ের আহবান নিয়ে সুমিত্রায় মিশে যেতে ইচ্ছে করে কমলার! যেন ওর আমি মিশে যাবে ওর নিজের আমিতেই! যেমন নদী গিয়ে শেষ হয় বড় নদীতে কিংবা শেষমেশ বাউল আঁকড়ে ধরে নিজের দোতারাকেই! 
“কালা তোর দোতরার ডাং
কালা তোর ভাওইয়া গান
উরাং বাইরাং মোর মন থাকিবার না পারে
ও কালা রে..”

আজ এতক্ষণে নিশ্চয়ই ওদের ঝুপড়িটা ঘিরে আবার একটা জটলা জুটে গেছে। প্রতি দুপুরের মতো এই দুপুরেও ঝুপড়িতে ওদের ঘরে একাই ছিল কমলা। মাটিতে কোলেরটাকে শোয়ানো ছিল। আজ সকাল থেকে সেটা চিল চিৎকার করে কান্না জুড়েছে। বারবার চেষ্টা করেও তাকে থামাতে পারেনি কমলা। এখন ওর বুকে আর এক ফোঁটাও দুধ নেই! ভয়ংকর বেসুরো ওটা! ভয়ংকর বেতালা! লয়ের সাথে লয় মেলে না মোটে! সোম এ পড়ে যায় ফাঁকি! বড় ছেলেটা বাকিগুলোকে নিয়ে ইস্কুলে গেছে। ওদের মধ্যে তিনটে তিন ‘কেলাসে’ পড়ে আর বাকিগুলো ইস্কুলের বাইরে বসে থাকে, মিড ডে মিলের জন্য। হীরেন গেছে বিট অফিসে। এই সুডৌল বসন্তে নিজের কঙ্কালসার শরীরে নিদারুণ স্তন্যহীনতা আর অন্যদিকে খিদের জ্বালায় দুগ্ধপোষ্যের বিষম চিৎকার এই দুয়ের মাঝে পড়ে দিশেহারা হয়ে গেছিল কমলা। ওটাকে চুপ করাতে দুহাতে সজোরে ওর গলাটা চেপে ধরেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একেবারে চুপ! যেন রক্তচক্ষু দিয়ে শ্বাস রোধ করা হল ক্ষোভের! যে কোনো মৃত্যুই চাপাকান্নার শব্দ বয়ে নিয়ে আসে। কোথাও মৃত্যু হয় একটা গোটা জন্মেরই! কমলা এখন নির্বাক! ওর চোখে জল কিন্তু চেতনায় কোথাও শোক নেই হয়তো! ওর গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে মুক্তিহীন, অবসরহীন, অগোছালো দৃশ্যেরা। কাউনিয়ার সবুজ ধানক্ষেত, আলের উপর দিয়ে ছুটে চলে দুইটি মেয়ে, দেখতে হুবহু এক! ইন্ডিয়া থেকে বয়ে আসা সরু নদীগুলোয় ঝাঁপায় তারা অহরহ! সাঁতরে চলে যায় ওপারে। সর্ষে ক্ষেতের ভেতর দুজনে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে সারা বেলা। দূরে মুখ তুলে দেখে ইন্ডিয়ার বর্ডার, বিএসএফ এর চেকপোস্ট। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে আসে তারা ছায়াঘেরা সবুজ বাঁশবনের ভেতর দিয়ে। তুচ্ছ বেঁচে থাকা ও মরে যাওয়ার মাঝে, গৃহহীন, রাষ্ট্রহীন ওই দুইজন কান পেতে থাকে রাতের তারার দিকে। সুরেলা মিঠে বাতাসে কোমল নিষাদের মতন তখন ভেসে আসে অনামী কোন সাধকের গাঁথা বিনিসুতোর ভাওয়াইয়া, 
“উড়িয়া যায় চখুয়ার পঙ্খী বগীক বলে ঠারে
ওরে তোমার বগা বন্দী হইছে ধল্লা নদীর পারে রে।
ফান্দে পরিয়ে বগা কান্দে রে..”

জঙ্গলে এখন বৃষ্টি নেমেছে হঠাৎ করেই। অবিরাম বৃষ্টি! মূর্তির শীর্ণ শরীরে যেন হঠাৎ করে বান ডেকেছে! অনুভূতির দুর্বলতম জায়গায় গভীর আঘাত পেয়ে এক মাঝি নদী পাড়ে হাপুস নয়নে কাঁদতে বসেছে! বৃষ্টির তোরে তার নৌকাখানা ভেসে গেছে। জঙ্গলের পাখিদের ডানার পালক ভিজে ভারী হচ্ছে ক্রমশঃ। অসুখের দুঃখ, অন্যায়ের দুঃখ, বঞ্চনার দুঃখকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রেখে একটা নতুন জন্মকে আর নিজের পরিচয়ের দলিল বানাতে এখন নারাজ কমলা। সে চাইছে পাখি হয়ে বাঁচতে শুধু বাঁচার আনন্দে।

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

ছাই রঙের মাটি

লেখক পরিচিতি 

লেখকের জন্ম ১৯৮৯ সালের জানুয়ারী মাসে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার শ্রীরামপুর শহরে। হুগলী জেলারই রিষড়া শহরে শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয় থেকে স্টার মার্কস নিয়ে যথাক্রমে ২০০৫ ও ২০০৭ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখির সাথে যুক্ত। বিভিন্ন নামী পত্রিকা যেমন সন্দেশ, জোয়ার, কোরক, পথ ও পাঁচালি ইত্যাদি পরিবারের তিনি নিয়মিত সদস্য ছিলেন। বহু স্বনামধন্য লেখক-লেখিকাদের সাথে তিনি বিভিন্ন পত্রিকার শারদসংখ্যায় লেখালিখি করতেন। 

পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষা ও কেরিয়ারের জন্য সাময়িকভাবে সাহিত্যচর্চার জগৎ থেকে বিরতি নিয়েছিলেন। ২০১১ সালে ইলেকট্রনিক্স এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হবার পর একজন সফল আউটডোর ব্রডকাস্টিং ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে একটি খ্যাতনামা বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেলে যোগ দেন ও পরবর্তীতে তিনি ইন্ডিয়ান নেভি ডেপুটেশনেও কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি একটি নামি বহুজাতিক সংস্থায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত। বর্তমানে তিনি পুনরায় সাহিত্যর্চচার জগতে প্রবেশ করেছেন। তার বিভিন্ন লেখালিখির মধ্যে উল্লেখযোগ্য রচনা “অনন্ত বিকেলের রূপকথারা”, “বৈশালী_পাড়ার_প্রতিমারা”, “অতঃপর অশুচি বনেদিয়ানা, পুজোর বনসাই এবং .....”, "কান্না রাগের 'হোমা পাখি'", “ডরাইয়া মরে”, “রূপান্তরের পথে”, “প্রবাসের বিভীষিকা”, “বইমেলা ও একটি গোলাপ”, “পুরোনো মর্গটার কাছে” এবং “পিশাচসিদ্ধ”, যা একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত এবং ইতিমধ্যেই ইউ টিউবে অডিও স্টোরি হিসেবে সাড়া ফেলে দিয়েছে। এছাড়া ভ্রমণকাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য “পরবাসী টুসুর দেশে”।
তার লিখিত কবিতাগুলির মধ্যে “একটি ব্যর্থ প্রেমের ক্ষুব্ধ আখ্যান”, “উদ্বর্তিনী”, “প্রাণের পুজো”, “কালো মেয়ের উপাখ্যান”, “বাংলা ভাষার দেশ”, “অন্য বসন্ত”, “ভালোবাসা ও একটি বসন্ত”, “মন- শরীরী”,  “হে নজরুল”, “সমর শেষের অসিয়ৎনামা” উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয়।
এই স্বল্প কালেই বহু সংস্থা থেকে তিনি সেরার সেরা সম্মানে ভূষিত। এর মধ্যে “অচেনা পর্বত” সম্মান, রাজার কবিতা studio কর্তৃক প্রদত্ত “অয়ন সৃজন সম্মান” প্রণিধানযোগ্য। 

 

ঝাঁ চকচকে একটা কর্পোরেট অফিস! এই অফিসের ক্যান্টিন থেকে বাথরুম সবজায়গায় একটা হাইফাই ব্যাপার আছে। একবার অফিসটায় ঢুকে পড়লেই মনে হয় যেন কোন ফাইভ স্টার হোটেলে এসেছি! বিশাল বড় ক্যান্টিন। সুবেশী স্টুয়ার্ডরা সর্বত্র হাসিমুখে বিরাজমান। প্রতিটা ফ্লোরে সুবাসিত মেল ও ফিমেল রেস্টরুম। দেওয়াল জুড়ে টাঙানো বিশাল বিশাল আয়নায় নিজেকে দেখতে পেলে মনে পড়ে যায় আগুপিছু তিরিশটা বছর। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা মায়াময় বালকের মুখ।
দেওয়ালের খাঁজে রাখা ছোট্ট গোলাপ চারাটা হ্যান্ড ড্রায়ার থেকে বেরিয়ে আসা রোদ জলহীন ভিজে হাওয়ায় মাথা নাড়ছে সজোরে। প্রায় মাথা ছুঁতে চাওয়া আয়নাটার মাথায় আবার লেখা ‘Am I looking Smart?’ ঠিক তার পাশের দেওয়ালে ক্লঁদে মনেটের আঁকা একটা ছবি। ছবিটার ভেতর শূন্য হয়ে যাওয়া একটা বাড়ি। তার বাইরেটায় একটা জমাট বাঁধা অন্ধকার। তার থেকেও বেশী অন্ধকারে হয়তো সমর্পণ, ক্লান্তি আর অভিমানের নিঃশব্দ অভিসার ঘটে চলে প্রবালের মন আর মাথা জুড়ে। ছোট্ট গোলাপ গাছটাকে খুব সুন্দর মানিয়েছে এই পরিবেশটায়। গো গ্রীন ভাবনাটাও বেশ অভিনব! চারাটায় সবে একটা কুঁড়ি এসেছে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ টবের মাটিটায় চোখ আটকে গেল প্রবালের! কালো ভুসভুসে একটা মাটি, কালির মত কালো। শতেক রকমের জৈব অজৈব সার নিশ্চয়ই মিশেছে মাটিটায়। একটা অমেরুদণ্ডী কেঁচো হয়তো শুরু থেকে শুরু করে মাটিটার শরীর বেয়ে অনেকটা নীচে নেমে এসে কণাগুলির গভীরে বুনে চলেছে একটা যৌথজীবনের গল্প। কঠিন শাস্তির মত ওর এই জীবনচক্র, গাছটার শরীর জুড়ে এই কৃত্রিম শীতল সায়াহ্নে শারীরিক উষ্ণতার পরশ এনে দিচ্ছে হয়তো! হয়তো ওর অনায়াস নিস্পৃহ জীবনের বুকে পা দিয়ে, মাটিটা থেকে সব রস শুষে নিয়ে কাল সকালে গাছটায় ফুটে উঠবে সবুজের খিদে মেরে দেওয়া একটা কালো গোলাপ। একটা মধ্যবিত্ত উঠোনের নিকোনো গন্ধ সাথে কিছুটা লেবুপাতা ফেলা টকডাল আর আমচুর দেওয়া কামরাঙ্গার চাটনির গন্ধ, গাছটার গা থেকে ভেসে এসে বাথরুমটার বাতাসে বেশ খানিকক্ষণ আটকে থেকে, প্রবালের নাকের ভেতর দিয়ে ঢুকে ওর সুষুম্নাতন্ত্রে ভর দিয়ে, নেশার মত একটা কালের সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায় ওকে। এই গোলাপের আঁতুরঘর যেন অনেকদিন থেকে চেনে প্রবাল, অর্থহীন অথচ এক দৃঢ় মূক চেতনার ভেতর দিয়ে।
হাজার হাজার বছর অগেকার কাল থেকে বয়ে চলেছে নদীটা। ঢেউ তার অবিচল। কখনো তা ধীর শান্ত, কখনো তাকে ফুঁসে উঠে পাড় ভাঙতে দেখেছে প্রবাল! বর্ষাকালে তার উচ্ছাস দুপাশের বেলে মাটিতে ছোট ছোট গর্ত তৈরী করতো। সঙ্গে করে নিয়ে এসে ফেলতো ছোট ছোট মাছেদের স্তুপ। জল সরে গেলে সেগুলো খাবি খেত পাটের ব্যবসায় ফাঁপরে পড়া কলিম চাচার মত। তখন গামছায় করে ধরে নিয়ে এসে সেগুলোকে বাড়ির রান্নাঘরে চালান দিত ওরা। এই ওরা বলতে ঠিক কারা সেটা ঠিকঠাক মনে পরে না প্রবালের! শুধু ভেসে ওঠে ছায়া ছায়া কিছু শরীর। এই ছায়াগুলোর মাঝে কোথাও একটা তীব্র ‘আমি’ আছে বলে মনে করে প্রবাল। ও জানে অতীতকে নতুন করে কল্পনায় গড়ে তুলতে গেলে ফিরে ফিরে যেতে হয় ওই ছায়াদের কাছে। প্রায় সকলের অলক্ষ্যেই ওর সাথে কথা হয় ওর অতীতের ছায়ার। ছায়াটা ওকে দেখায় একটা নিটোল মুখ,টানা টানা দুটো চোখ, টিকোলো নাক, এক ঢাল এলো করে ছড়ানো চুল! ছায়াটা যেন সর্বক্ষণ চোখে চোখে আগলাচ্ছে প্রবালকে।
সেন্সর বেসড কলটা থেকে কিছুটা স্বচ্ছ জল আঁজলা করে তুলে নিয়ে চোখে মুখে ছেটায় প্রবাল। সামনের আয়নায় তখন ক্রমশঃ দূরের ছবি ফুটে উঠছে। একটা নদী, পাড়ে বাঁধা নৌকা, বাঁশের সাঁকোটার শুরুর দিকে জঞ্জালের মতন শিকড় ছড়ানো একটা জামরুল গাছ, সেই গাছের গায়ের ফাটলে বাসা বাঁধা দুটো প্যাঁচা আর তাদের ছানারা, যাদের ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাবার জন্য গাছটার চারপাশে ঘুর ঘুর করত প্রকান্ড সব গাংচিল আর শিয়ালের দল। সেই ছবিটার ভেতর থেকেই প্রবাল শুনতে পায় একটা হিম ধরা গলার “বুলু, বুলু” ডাক! ডাকটা ভীষণ চেনা চেনা লাগে ওর। এই ডাকটা জুড়ে যেন জন্ম নেয় এক খণ্ড কালো মেঘের মতন পরিত্যক্ত ভালোবাসার গল্প! একটা নাম গোত্রহীন জগৎ থেকে দোষে গুণে ভরা এই পৃথিবীতে একটা উল্কা এসে পড়ার সময় মাঝপথে থেমে গেলে যেমন হয়, ঠিক তেমন একটা শূন্যতা নিয়ে ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে প্রবাল। কৌতূহল হয়তো খুব বেশী নেই ওর, শুধু একটাই প্রশ্ন জাগে ওর মনে। ওই “বুলু, বুলু” ডাকটা কার? এই বুলু টা ঠিক কে? বুলু নামটার সাথে কি ওই সুন্দর মুখটার কি আদৌ কোন সম্পর্ক আছে?
প্রবালের পুরো নাম প্রবাল কুমার বসু। একটা মূলত ন্যাশনাল কোম্পানিতে ডেলিভারি ম্যানেজার লেভেলে আছে ও। নিউটাউনের কাছে একটা অভিজাত আবাসনে প্রবালের নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে। একাই থাকে। সদ্য একটা বিলিতি গাড়িও কিনেছে। চাকরিটা ওর দৈনন্দিন জীবনে বেশ একটা আভিজাত্যের ছাপ এনে দিয়েছে। আদপে ওরা নদীয়া জেলার বাসিন্দা। টবের মাটিটাকে এই মুহূর্তে ভীষণ আপনার বলে মনে হয় ওর! অতি প্রাচীন কালের থেকে যেন সেটা প্রতি শনিবার বিকেলে অনন্ত চালচিত্রের ছবি হয়ে ফুটে থেকেছে পশ্চিম আকাশের রামধনুর মতন। জীবনবাদী দার্শনিক

শিল্পীর মতন গভীর রেখায় ধীর দাগে এঁকে চলেছে সর্বনাশের বিবর্ণ ক্যানভাস। মাটিটা ওকে যেন কিছু বলতে চায়। হয়তো কিছু ধরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু সেটা ঠিক কি বুঝে উঠতে পারে না প্রবাল। যেন অনেক পুরোনো একটা ভাবনার সাথে নির্জনতা আর আধ্যাত্মিকতা মিশে গিয়ে একটা আপসোস জন্ম নেয় ওর মনে। নিজের ডেস্ক থেকে রিসিভারটা তুলে অ্যাডমিন অফিসারকে ওর কেবিনে ডেকে পাঠায় প্রবাল। “আচ্ছা মিস্টার পাড়ুই, পাড়ুই তো?” একটু হোঁচট খায় প্রবাল। একবার উল্টোদিকে বসা ভদ্রলোকের বুকের কাছে সাঁটানো ছোট্ট ধাতব নেমপ্লেটটায় চোখ বুলিয়ে নেয়। “গ্রাউন্ড ফ্লোরের মেল রেস্টরুমে একটা রোজ বুশ দেখলাম, ওটা কি ব্রীড বলতে পারেন? ডিটেল্সটা একটু আমার লাগবে মানে কোথা থেকে সাপ্লাই হয় পার্টিকুলার কোন নার্সারী, এগুলো আর কি।”“অ্যাকচুয়ালি স্যার, আমার মনে হয় দিশি। ইমপোর্টেড কিছু নয়। তবু স্যার একবার গার্ডেনিং কন্ট্রাক্টরের সাথে কন্ফার্ম করে আপনাকে জানাচ্ছি। আমরা কোথা থেকে নরমালি এই ফ্লাওয়ার প্লান্টস কিনি এন্ড মোর ডিটেলস আমি হাফ অ্যান আওয়ার এর ভেতর আপনাকে সব মেইল করে দিচ্ছি স্যার।”

লোকটি বেশ বেকায়দা পড়েছে বুঝতে পারে প্রবাল। হয়তো ইনি গার্ডেননিং সেকশনটা দেখেন না। হয়তো হেড অফিস থেকে সব অর্ডার ফাইনাল হয়। শুধু তো একটা কৌতূহল আর তো কিছু না! কিন্তু শুধুই কি একটা কৌতূহল? আদিম ধূসর প্রকান্ড একটা গাছের থেকে একটা সোঁদা সোঁদা সার মেশানো মাটির গন্ধ ভেসে আসে ওর নাকে। খুব মেপে মেপে পা ফেলে যেন ওর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল লোকটা। তবে আধঘন্টা নয় পরবর্তী দশ মিনিটেই প্রবালের মেলে নোটিফিকেশন এলো। কাজের এই গতি দেখে যেন একটু বিরক্তই হল প্রবাল। হয়তো এতটা তাড়াতাড়ি জবাব না এলেই ভালো হত। মাথার ভেতর ছবিটাকে আরো কিছুটা ভালোভাবে সেঁধিয়ে নেওয়া যেত। অভ্রমাখা মুখের চকচকে আয়নায় এবার ভেসে উঠলো ওর ছেলেবেলার সময়ের একটা ইঁটভাটার ছবি। ওর বয়সী অনেকে সেখানে কাজ করছে। মাথায় করে ইঁট বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চুল্লির ঠিক সামনেটায় রাখছে। ওর বয়সী শ্রমিকদের কাজ অতটুকুই। এরপর থেকে কাজটাকে যারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের মধ্যেও একটা চেনা মুখ দেখতে পেল প্রবাল। দেখতে অনেকটা ওর বাবার মতন। এই মানুষগুলো মানেই এঁদের সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস-স্মৃতি-দর্শন। সময়ের টানে ফুরিয়ে আসা বালিঘড়িটা ঠিক জানে, সময় কত নিঃশব্দে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের কিনারে। ডেস্কের উপর মাথাটা নীচু করে প্রবাল। ওর মাথার ভিতর প্রলাপের মন্বন্তর লাগে। আর কি কোন স্মৃতি নেই? নেই কি বেঁচে মনের ভিতর চিন্তার কোন ধূপছায়া তরঙ্গ? ইঁটভাটার পাশে আমবাগানে ছোট্ট একটা শিশুকে বসিয়ে দোল দিচ্ছে একটি বালিকার হাত। বয়স মেরে কেটে বছর দশেক হবে। কোমল হাতে ইঁট বয়ে বয়ে শিশুটির মত মেয়েটির হাতেও প্রোথিত হয়েছে কয়েকটি শুকনো ক্ষত। তার শুষ্ক চামড়া জৌলুস হারিয়েছে। বাতাসে ভেসে আসা আবছা আলোর মতোই ম্লান ছায়া ও অস্ফুট শব্দের মতোই চিত্রকল্পগুলো এই মুহূর্তে ভেসে আসে প্রবালের মাথার ভিতর। উকিলনাড়া মাঠের চড়ক, চূর্ণী নদীর পাড়ের মাটির ঢালে প্রায় শুয়ে পড়া শ্যাওড়া গাছ, তার তলায় জমা হওয়া পাতার অরণ্যে দমকা হাওয়া এসে লাগে ঘূর্ণির মতন। ভোঁতা শব্দের আলোড়ন তুলে সেখানে খুলে যায় হাজারখানা দুয়ার। বেরিয়ে আসে অনামী সুর, ‘আমি কৃষ্ণ ভালোবাসি গো, সখী আমি কৃষ্ণ ভালোবাসি।’
মেইলটা এতক্ষণ খোলা অবস্থায় পড়েছিল। হঠাৎই নতুন ইনকামিং মেইলের নোটিফিকেশন সাউন্ডে সম্বিৎ ফিরে পায় প্রবাল। মেল চেক করে প্রবাল দেখে অ্যাডমিন থেকে একটা কার্ড এসেছে মেলে। সাবজেক্ট ‘গার্ডেননিং ডিটেলস’। মেইল টা আবার ফরওয়ার্ড হয়েছে কর্পোরেট ইসথেটিক্স গ্রুপ থেকে। সেই মেলটা আবার এসেছে ভেন্ডরের কাছ থেকে। এই অতিরিক্ত বড় মেল চেনটা যেন প্রবালের সব চিন্তাভাবনাগুলোকে গুলিয়ে দিতে চায়। মেল থেকে ইমেজটা ডাউনলোড করে প্রবাল জুম করে পড়ে, ‘শ্রীগুরু নার্সারি, শিবপুর ঘাট, পায়রাডাঙ্গা’। চোখের সামনে একটা রেলস্টেশন দেখতে পায় প্রবাল। নদীর দিকে যাবার পথে যেন ওই স্টেশনেই একদিন অনেকক্ষণ বসে থেকেছে ও। বসে থাকতে থাকতে সে দেখতে চেয়েছে চোখের দেখা ছাড়িয়ে আরও অনেকটা। এই পায়রাডাঙ্গায় পুরো ছেলেবেলাটা কেটেছে প্রবালের, মা বাবা ঠাকুমার সাথে। একাত্তরে ওর বাবা ওপার থেকে ভিটেমাটির টান পাকাপাকিভাবে ছিন্ন করে এদেশে চলে এসেছিলেন। দেশান্তরের স্মৃতি ওর নেই, থাকবার কথাও নয়। ওদের দেশ, ওদের মাটি কখনও দেখা হয়ে ওঠেনি ওর। পায়রাডাঙার মাটিতেই অনস্তিত্ত্বের মাঝে নিজের একান্ত আপন অস্তিত্বকে খুব সচতন ভাবে খুঁজে নিয়েছিল প্রবাল। ওর মনে আছে দেলদার শেখ বেশ একজন প্রভাবশালী লোক ছিল এই পায়রাডাঙ্গা-রানাঘাট চত্ত্বরে। ওর শিবপুরের ইঁটভাটাতেই কাজ করত প্রবালের পুরো পরিবার। কানাঘুষো শোনা যেত দেলদার বর্ডার পেরিয়ে মেয়ে পাচার করে, বেচুয়া হাটের কেনা গরু পারাপারের মতো। ওই বয়সে লোকটাকে দেখলেই ভয়-ঘৃণা-ক্রোধ মিশিয়ে একটা নিয়ন্ত্রণহীন অন্ধকার চাগার দিয়ে উঠতো প্রবালের মনে। ওর ছোটবেলার জীবনটার শুরুর দিকে প্রবালের একটা দিদি ছিল বলে শুনেছিল ও। সেই দিদির যখন বছর দশেক বয়েস তখন কি যেন একটা ভয়ঙ্কর গন্ডগোল হয়েছিল। তার পর থেকেই প্রবাল দেখেছে অন্ধকার ঘরের এক কোণে ওর বাবা বসে বসে কাঁদত। সেসময় ভারী ফ্রেমের চশমার ঘষা কাঁচের ফাঁক দিয়ে তাঁর চোখদুটিকে দেখলে যন্ত্রণার বোধ থেকে সরে আসা একটা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন আত্মাকে দেখতে পেত প্রবাল। সেই দিদিরই কি নাম ছিল বুলু?
চূর্ণী নদীর বাঁকে ডুবে যাওয়া বিকেলটার শরীর জুড়ে ঘরে ফিরতে চাওয়া পাখি কিংবা পূর্বপুরুষের ভিটেকে স্বাক্ষী রেখে তৈরী হয় পৃথিবীপাড়ের গণসংগীত।
“মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া?
রঙ্গীলা দেশের নাইয়া
মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া।”
ইঁটভাটার কাজটা ওরা ছেড়ে দিয়েছিল। ঠিক কবে কখন সে স্মৃতি ফুরিয়ে গেছে। শিবপুরের ঘাটের কাছে ওই ইঁটভাটার পাশেই ওর বাবা কিছুটা দখলী জমিতে একটা গোলাপ নার্সারি খুলেছিল। ততদিনে অবশ্য দেলদার খুন হয়েছে নিজেরই ডান হাত রাফির হাতে। প্রবালের মা রানাঘাট, নিয়ামতপুর, মুকুন্দনগর, উকিলনাড়া, জগপুর পর্যন্ত্য বাড়ি বাড়ি ঠিকে ঝিয়ের কাজে যেত। পাতায় পাতায় কাটাকুটি খেলার মুহূর্তে বারবার প্রবাল নতুন করে ওর ছোটবেলার দিনগুলোকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছে। প্রতিবারই ওকে ফিরে ফিরে আসতে হয়েছে সেই আমবাগান জুড়ে নেমে আসা আয়তাকার রাতে। সেই “বুলু, বুলু” ডাকটা হঠাৎ করেই যেন হারিয়ে গেছিল ওর জীবন থেকে! বুলুকে কি ওরা রানাঘাটে পিসির বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল নাকি দেলদার ওকে ভোগ করে বডিটা ছুড়ে দিয়েছিল ইঁটভাটার চুল্লিতে? সেই আগুনেই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ওর সেই টিকোলো নাক, টানা টানা চোখ, লক্ষ্মী প্রতিমার মতো নিটোল মুখ আর কোমর ছাপানো চুলের বাহার। নাকি ওকে ধরে কেউ চালান করে দিয়েছে বর্ডার পেরিয়ে ওপারে, জীবনের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলো যেখানে ভাবনা বা চিন্তার কোনো অদৃশ্য বলয়ে গিয়ে, খেই হারিয়ে ফেলে। তার পর থেকে ওর মা আর বাবা শ্মশানের আধপোড়া মড়াগুলোর হাড়গোড় জড়ো করে নিয়ে এসে, সারা রাত জেগে হামানদিস্তায় গুঁড়ো করতো। কার্বন! মাটিতে মিশে সার হয়ে গোলাপের পাপড়িকে সুগঠিত করে। বিছানায় শুয়ে অজানা কোনো বাড়ি থেকে আসা হারমোনিয়ামের সুরের মতন প্রবাল শুনতে পেত টং টং টং!
শত সহস্র আলোকবর্ষ থেকে ছুটে আসা শেষ রাতের ট্রেনের মাথা থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোর পরে পড়ে থাকা চাপ চাপ অন্ধকারের মতন, ইঁটভাটার ছাই ঠিক যেখানটায় গিয়ে চূর্ণী নদীতে গিয়ে মিশে যেত সেই জায়গার জমাট বাঁধা কালো মাটিটার মতন, শ্রীগুরু নার্সারির গোলাপের মাটিতেও কি অল্প একটু দেলদার আর অল্প একটু বুলু পাশাপাশি মিশে আছে? অনেকগুলো মৃত্যুর মাঝে আরও অনেকখানি কালো হয়ে গোলাপটা ঝরে যাবে একদিন! বাথরুমটা থেকে একটা কটূ পেচ্ছাপের গন্ধ ভেসে আসে! মোমঝরা জাদুকরী আয়নাটার ওপারে তখন বুলু দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে অবিকল প্রবালের মতন।

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

Saswata_Bose.jpg

ছাই রঙের মাটি

শাশ্বত বোস
শ্রীরামপুর, হুগলী, পঃ বাংলা

Durga1.jpg
বৃষ্টির আশ্রয়

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

subrata majumder_edited.jpg

 

​বৃষ্টির আশ্রয় 

 

সুব্রত মজুমদার

হিউস্টন, টেক্সাস

​

girl.jpg

মুকুটমণিপুরগামী বাসে ওঠার মুহূর্ত থেকেই রিয়ার মনে হচ্ছিল—এই যাত্রাটার কোথাও একটা ভুল আছে। ঠিক কী, সে বলতে পারছিল না। শুধু বুকের ভেতরে একটা অস্বস্তি জমে ছিল, যেমনটা হয় ঝড় ওঠার আগে—হাওয়া হঠাৎ থেমে গেলে, পাখিরা চুপ করে গেলে।
বিকেল চারটের ঠিক আগে সেই অস্বস্তিটা সত্যি হয়ে উঠল।
বাসটা হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে থামল। ব্রেকের ঘষা শব্দে কয়েকজন যাত্রী সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। বাইরে বৃষ্টি তখন আর নামছে না—আছড়ে পড়ছে। জানলার কাচে মোটা মোটা ফোঁটা লাফাচ্ছে, যেন কেউ বাইরে থেকে কাচে নখ ঠুকছে। রাস্তার ওপরে জল এমনভাবে জমেছে যে কোথায় রাস্তা শেষ, কোথায় নদী শুরু—চোখে আলাদা করা যাচ্ছে না।
ড্রাইভার দরজা খুলে নামল। ভেজা শার্ট গায়ে লেপ্টে আছে। ফিরে এসে সে মাইকে নয়—সরাসরি, ক্লান্ত, প্রায় আত্মসমর্পণের সুরে বলল,
“আর কোথাও যাচ্ছি না আমরা, দিদি-দাদারা। ড্যাম থেকে জল ছাড়া হয়েছে। সামনে রাস্তা পুরো ডুবে গেছে।”
বাসের ভেতর একসঙ্গে একটা নিঃশ্বাস পড়ে গেল।
“ডুবে গেছে মানে?” কেউ ফিসফিস করে বলল।
“আবার কখন নামবে জল?” এক বৃদ্ধ মহিলা আঁচল শক্ত করে ধরলেন।
পেছন থেকে একটা বাচ্চা কেঁদে উঠল—মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে।
রিয়া ধীরে কপাল ঠেকাল ধুলো-মাখা কাচে। কাচের ঠান্ডা স্পর্শে বুকের ভেতরের গরম অস্থিরতাটা আরও পরিষ্কার হয়ে উঠল। সে এসেছিল ছৌ নাচের ছবি তুলতে—উৎসবের আগে টানা তিনদিনের রিহার্সাল। মুখোশ, শরীরের ভঙ্গি, গ্রামের মাটির গন্ধ—সব ধরা পড়ার কথা তার লেন্সে। বাংলার হারিয়ে যেতে বসা শিল্প নিয়ে যে কফি-টেবিল বইটা সে বানাচ্ছে, তার প্রাণ এই ছবিগুলোতেই। কাজটার কথা ভাবলেই তার নিঃশ্বাস যেন ছোট হয়ে আসে—যেন দেরি হলে সবকিছু হাতছাড়া হয়ে যাবে।
ড্রাইভার আবার বলল,
“আধ কিলোমিটার পিছনে একটা PWD রেস্ট হাউস আছে। উঁচু জায়গায়। চলুন সবাই ওখানেই অপেক্ষা করি।”
কেউ কিছু বলল না। শুধু ভেজা জামার ঘর্ষণের শব্দ, আর বাইরে বৃষ্টির গর্জন।
হাঁটা শুরু হতেই বোঝা গেল—এই আধ কিলোমিটারটা ছোট নয়। কাদা পায়ের তলা টেনে ধরছে, যেন ছাড়তে চায় না। আড়াআড়ি বৃষ্টি মুখে এসে লাগছে কঞ্চির মতো—চোখ খুলে রাখা মুশকিল। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, সঙ্গে দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসা পচা পাতার সোঁদা গন্ধ। কেউ পিছলে গেলে অন্য কেউ চিৎকার করে ওঠে—“ধীরে! ধীরে!”
রিয়া ক্যামেরার ব্যাগটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরল। স্ট্র্যাপটা আঙুলে কেটে যাচ্ছে, তবু ছাড়ছে না। একবার পিছলে পড়লে শুধু সে পড়বে না—তার লেন্স, তার নেগেটিভ, তার এতদিনের সাধনাও কাদায় মিশে যাবে। পায়ের পাতায় কাঁপুনি নিয়ে সে হাঁটল। প্রতি ধাপে মনে হচ্ছিল, মাটিটা বুঝি সরে যাচ্ছে, ঠিক নিচ থেকে।
হঠাৎ বৃষ্টির পর্দার ভেতর থেকে একটা অবয়ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
খাটো, কংক্রিটের দালান। দেওয়ালের হলুদ রং জায়গায় জায়গায় খসে পড়েছে। টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ এমন জোরে পড়ছে, যেন কেউ লোহার ড্রামের ওপর হাতুড়ি মারছে একটানা।
দরজায় একজন চৌকিদার দাঁড়িয়ে। ভারী চেহারা, গোঁফে জল জমে ঝরছে, গলায় ভেজা গামছা। তিনি এক হাত তুলে ডাক দিলেন—
“আসুন, আসুন! সবাই ভেতরে আসুন! বাইরে দাঁড়াবেন না!”
রিয়া তখনও জানত না—এই দরজার ভেতরেই তার জীবনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মুখোমুখি হওয়াটা অপেক্ষা করছে।

রিয়া দরজার অর্ধেকটা পেরিয়েছে—ঠিক তখনই তার পা থেমে গেল।
ভেতরের ঘরটা অল্প আলোয় ভিজে আছে। লণ্ঠনের আলো কাঁপছে, দেওয়ালে ছায়াগুলো নড়ছে। মানুষের ভেজা জামা থেকে জল পড়ার শব্দ, দূরে ছাদের ওপর বৃষ্টির একটানা আছড়ে পড়া—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।
হঠাৎ রিয়ার মনে হলো—এই ভিড়ের মধ্যে কোথাও একটা শূন্যতা আছে।
একটা জায়গা, যেখানে কেউ কথা বলছে না। একটা স্থিরতা, যা এই ঝড়ের সঙ্গে বেমানান। চোখটা নিজে থেকেই সেদিকে গেল। দূরের জানলার কাছে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
সে ভিড়ের মধ্যে নেই, আবার একেবারেই আলাদা নয়। জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া ধূসর আলো তার গায়ে পড়ছে। ফিকে নীল কুর্তা ভিজে শরীরে লেগে আছে। দু’হাত জানলার ফ্রেমে ভর দিয়ে সে বাইরে তাকিয়ে—ঠিক বাইরে নয়, যেন ঝড়ের ভেতর কোথাও অনেক দূরে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু পিঠ। শুধু কাঁধের রেখা। অথচ সেই কাঁধের ভঙ্গিটাই রিয়ার বুকের ভেতর কোথাও একটা সুচ ঢুকিয়ে দিল। এই ভঙ্গিটা সে চেনে। এতটাই চেনে যে তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য রিয়ার মনে হলো—ভুল দেখছে। বৃষ্টি, ক্লান্তি, ভেজা চোখ—সব মিলিয়ে মস্তিষ্ক খেলছে তার সঙ্গে। সে চোখ নামিয়ে নিতে চাইল। পারল না।
লোকটা তখনও ঘোরের মতো দাঁড়িয়ে। তারপর, খুব ধীরে— সে ঘুরল।
মুখটা পুরো দেখা গেল না প্রথমে। লণ্ঠনের আলোয় চোখ, তারপর নাক, তারপর ঠোঁট। যেন আলো নিজেই একটু একটু করে তাকে প্রকাশ করছে। ঠিক তখনই রিয়ার ভেতরের সময়টা ভেঙে পড়ল।
ভিক্রম।
কোনো শব্দ হলো না। শুধু পাঁচ বছরের পরিশ্রম—নিজেকে জোড়া লাগানো, নতুন করে শ্বাস নিতে শেখা, নিজেকে শক্ত করা—সব এক নিমেষে আলগা হয়ে গেল।
ক্যামেরার ব্যাগটা হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল। আঙুলগুলো অবশ। শেষ মুহূর্তে স্ট্র্যাপটা কবজিতে পেঁচিয়ে কোনওমতে ধরে ফেলল সে। বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ধসে পড়ছে—নীরবে, কিন্তু ভয়ংকর শব্দে।
“রিয়া।”
নামটা খুব আস্তে বেরোল। ফিসফিস নয়—যেন কারও ঠোঁট থেকে শব্দটা পড়ে গেল।
ভিক্রম নিজেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। রিয়া কিছু বলল না। বলতে পারল না। নিঃশ্বাস নিলে কষ্ট হচ্ছে। না নিলেও।
ঘরের শব্দগুলো হঠাৎ দূরে সরে গেল—চৌকিদারের হাঁটার শব্দ, বৃষ্টির গর্জন, মানুষের ফিসফাস—সব যেন কাঁচের ওপার থেকে ভেসে আসছে। চৌকিদার তখন পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, কিছুই বোঝেনি।
“আহা, ভালোই তো! আগে থেকেই সঙ্গী আছে দেখছি, দিদি! ভদ্রলোকের মোটরসাইকেলটা বিগড়ে গেছে—ভীষণ দুর্ভাগ্য!”
মোটরসাইকেল। একটা ছোট, নিরীহ শব্দ। কিন্তু রিয়ার মাথার ভেতরে সেটা বজ্রপাতের মতো শব্দ করল। মানে—ভিক্রম এখানে আগেই ছিল। মানে—এই ঘরটায়, এই ঝড়ের মধ্যে, সে কি জানত রিয়া আজ এখানে আসবে? অপেক্ষা করছিল? এই উপলব্ধিটা তার হাঁটু দুটোকে হঠাৎ আলগা করে দিল।
রিয়া টলতে টলতে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। পিঠে ঠান্ডা কাঠের স্পর্শ লাগতেই বুঝল—এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা তার নেই। চোখ নামিয়ে রাখল। কারণ চোখ তুললেই আবার সেই কাঁধটা দেখতে পাবে।
আর সে জানে—এই গল্পটা আজ এখানেই শুরু হবে।

পাঁচ বছর আগে, ঠিক এই ক্যামেরার ব্যাগটাই রিয়া গুছিয়েছিল। ঘরটা অদ্ভুতভাবে চুপচাপ ছিল—শুধু জানালার বাইরে দূরের ট্রাফিকের শব্দ। ভিক্রম শোবার ঘরের মেঝেতে বসে ছিল। পিঠ দেয়ালে ঠেকানো, চোখ মেঝের দিকে। তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিল ওষুধের পাতা—খোলা, অক্ষত। যেগুলো সে দিনের পর দিন ছুঁয়েও দেখেনি।
রিয়া ধীরে বলেছিল, “আজও খাওনি?”
ভিক্রম মাথা নাড়েনি, না-ও বলেনি। একটু পরে বলেছিল, “খেয়ে কী হবে?”
রিয়া থমকে গিয়েছিল।

“ডাক্তার বলেছেন—নিয়ম না করলে অবস্থা আরও খারাপ হবে।”
ভিক্রম হেসেছিল। খুব অল্প, খুব তিক্ত।
“খারাপ?” সে বলেছিল। “তুমি জানো আজ কী হয়েছে?” রিয়া জানত। প্রতিদিনই জানত।
কোনও মেয়েটাকে পাচার করা হয়েছে। কোনও ছেলেকে কাজের নাম করে তুলে নিয়ে গেছে। পুলিশ অভিযোগ নেয়নি। এনজিওর ফান্ড আটকে গেছে। ফাইল ঘুরেছে—কিন্তু কাউকে ধরা যায়নি।
“আমি ওদের বাঁচাতে পারিনি,” ভিক্রম বলেছিল। গলাটা সমান, কিন্তু ভেতরে টান।
“টাকা নেই। ক্ষমতা নেই। সিস্টেমটা আমাদের চেয়ে বড়। প্রতিদিন কাউকে না কাউকে হারাচ্ছি”
রিয়া মেঝেতে বসে পড়েছিল, তার সামনে। “এগুলোর দায় তোমার একার না।”
ভিক্রম এবার তাকিয়েছিল। চোখ দুটো লাল, ক্লান্ত।
“কিন্তু আমি নিজেকে সেটা বোঝাতে পারছি না। ওষুধ খেলে সব কিছু দূরে চলে যায়। তখন আর রাগ লাগে না, কষ্ট লাগে না। আর আমি চাই না সেভাবে বাঁচতে।”
“তুমি যেটা অনুভব করছ, সেটা ব্যথা,” রিয়া খুব আস্তে বলেছিল।
“কিন্তু তুমি সেটা একা নিতে রাজি নও। তুমি চাইছ আমি সেটার ভার টানি।”
ভিক্রম কিছু বলেনি। সে বুঝেছিল। কিন্তু বোঝা মানেই থামা নয়।
গত কয়েক মাস ধরে রিয়া তাকে অনুরোধ করেছে—থেরাপি, নিয়মিত ওষুধ, একটু বিরতি। আর ভিক্রম প্রতিবারই বলেছে, “আর একটু সময় দাও। কাল থেকে ঠিক হবে।” কিন্তু কাল আর আসেনি।
রিয়া উঠে দাঁড়িয়েছিল। ব্যাগের স্ট্র্যাপ কাঁধে তুলেছিল। “আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি কারণ তুমি অসুস্থ—এটা ঠিক নয়,” সে বলেনি।
সে শুধু বলেছিল, “আমি আর পারছি না, ভিক্রম। তুমি যাদের বাঁচাতে পারোনি, তাদের দুঃখ আমি বইতে পারছি না। তোমাকে ভালোবাসতে গিয়ে আমি নিজে ভেঙে যাচ্ছি।”
ভিক্রম চুপ করে বসে ছিল। সেই চুপচাপের ভেতরেই রিয়া বুঝেছিল—এইবার তার নিজের দিকে তাকানো জরুরি।
ডিভোর্সের কাগজে সই করার সময় রিয়ার মুখে অদ্ভুত একটা স্বাদ লেগেছিল—
ব্যর্থতার, কারণ সে ভিক্রমকে বাঁচাতে পারেনি… আর স্বস্তির, কারণ অন্তত এবার সে নিজেকে বাঁচাচ্ছে। এক ফোঁটা জল এসে পড়ল তার হাতে। রিয়া চমকে উঠল।
ছাদের কোথাও ফাঁক ছিল—বৃষ্টির জল টুপটাপ পড়ছে। রেস্ট হাউসের ভেতরে লণ্ঠনের আলো কেঁপে উঠল। বাইরে ঝড় এখনও থামেনি।
সে চোখ তুলে তাকাল।
ভিক্রম তখন চৌকিদারের সঙ্গে কথা বলছে। ভেজা কুর্তা শরীরের সঙ্গে লেগে আছে। চুল থেকে জল পড়ছে মেঝেতে। ঠিক পাঁচ বছর আগের মতোই—কাজের মধ্যে ডুবে আছে, অন্যদের নিয়ে ব্যস্ত।
রিয়ার বুকের ভেতর হালকা একটা চাপ অনুভব হল। এই মানুষটাই কি সেই মানুষ—যে ওষুধের পাতার পাশে বসে বলেছিল, “খেয়ে কী হবে?”
লণ্ঠনের আলোয় তার মুখটা একটু স্পষ্ট দেখা গেল। চোখের কোণে নতুন ভাঁজ। চোয়ালের রেখা আরও শক্ত। সে বুঝল—এই পাঁচ বছরে সব বদলায়নি। আবার অনেক কিছু বদলেছে।
রিয়া নিঃশ্বাস ছাড়ল। ধীরে। নিয়ন্ত্রিত। যেমন থেরাপিতে শিখেছিল। বাইরে বজ্রপাত হল। আলো নিভে এসে আবার জ্বলে উঠল। আর ঠিক তখনই—রিয়া বুঝল, সে আর স্মৃতির ভেতরে নেই।
সে এখন এখানে। এই বৃষ্টির মধ্যে। এই রেস্ট হাউসে। এই মানুষটার সঙ্গে—যাকে সে একদিন ভালোবেসেছিল, যাকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল, আর যে হঠাৎ আবার তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
ভিক্রম ফিরে তাকাল। চোখাচোখি হল। কোনও কথা হল না। কিন্তু দু’জনেই জানত—
এই রাতটা শুধু বন্যার নয়। এটা তাদের অসম্পূর্ণ কথাগুলোর রাত।

ঘণ্টা পেরোতে লাগল। রেস্ট হাউসের ভেতরে লণ্ঠনের আলো জ্বলে উঠল, বেঞ্চগুলো গুছিয়ে রাখা হলো। রিয়া দেখল—ভিক্রম চৌকিদারকে লণ্ঠন ঝুলিয়ে দিতে সাহায্য করছে, জানলা বন্ধ করছে, ভেজা মেঝেতে কারও পা পিছলে না যায় সেদিকে নজর রাখছে। সংকটে সে বরাবরই কাজে লাগে। অপরিচিতদের সামনে সে গুছিয়ে থাকে—সক্ষম থাকে। ভেঙে পড়েছিল শুধু রিয়ার কাছে। শুধু রিয়ার সঙ্গে। এক তরুণী মা—অঞ্জলি—কাঁদতে থাকা তিন বছরের মেয়ে পারিকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। আর দিনেশবাবু—বয়স্ক, মুখ ধূসর, বুক চেপে অস্বস্তিতে নড়ছেন। ভিক্রম লক্ষ করল। এগিয়ে গিয়ে বলল, “কাকু, ঠিক আছেন তো?”

দিনেশবাবু হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “ওষুধ… আমার প্রেসারের ওষুধ… বাসেই রয়ে গেছে। সিট চৌদ্দর নিচে।”

ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে বলল, “বাস লক করা। এই আবহাওয়ায় বেরোনো বিপজ্জনক—”

ভিক্রম শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “ওষুধ না খেলে আপনি আর কতক্ষণ থাকতে পারবেন?”

“সাতটার মধ্যে খেতে হয়,” ডিনেশবাবু ফিসফিস করলেন।

“তারপর…” রিয়া ঘড়ি দেখল। ছ’টা পনেরো। ভিক্রম কী করবে, দাঁড়ানোর ভঙ্গী থেকেই রিয়া বুঝে গেল—চোয়াল শক্ত, কাঁধ চওড়া, চোখে সেই পুরনো দৃঢ়তা।

“আমি নিয়ে আসছি।”

সে ড্রাইভারের দিকে ফিরল।

“চাবি দিন।”

“ভিক্রম—” শব্দটা রিয়ার মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে গেল। ঘরের সবাই তাকাল। ভিক্রমও তাকাল—রেস্ট হাউসে ঢোকার পর এই প্রথমবার রিয়াকে সরাসরি দেখল। 

“ওনার ওষুধ দরকার, রিয়া।”

“তাহলে অপেক্ষা করো,” রিয়া বলল।

“বৃষ্টি একটু থামতেও পারে—”

“বা আরও বাড়তে পারে,” ভিক্রম বলল। গলা নরম, কিন্তু অনড়।

“আধ কিলোমিটার। এর চেয়েও খারাপ অবস্থায় আমি হেঁটেছি।”

হ্যাঁ। রিয়ার মনে পড়ল—বন্যায় ডোবা বস্তি, ভেজা জামা, বাচ্চাদের কাঁধে তুলে আনা—সবসময় সাহায্য, কখনো থামা নয়।

“প্লিজ যেও না।”

তার গলা ফেটে গেল।

“ঝুঁকিটা… দরকার নেই।”

ভিক্রমের চোখে এক ঝলক কেঁপে উঠল—বিস্ময়, সে এখনো যে চিন্তা করে।

“দিনেশবাবুর জীবনটার মূল্য আছে।”

“তোমার জীবনটারও আছে।”

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ভিক্রম তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,

“সাবধানে যাব। কথা দিচ্ছি।” সে আগেও কথা দিয়েছে—সব ভেঙেছে। শুধু একটা কথা ভাঙেনি: ভালোবাসা। সে এমনভাবে ভালোবেসেছিল যে শেষ পর্যন্ত সেই ভালোবাসাই তাদের দু’জনকে ডুবিয়েছিল।ভিক্রম চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেল। দরজাটা দুলে দুলে বন্ধ হলো। রিয়া দাঁড়িয়ে রইল—বুকের ভেতর আতঙ্কের জল ঢুকতে লাগল, প্লাবনের মতো। যদি ভিক্রম পিছলে যায়? যদি জলে তলিয়ে যায়? আর যদি শেষ কথা হয়, “প্লিজ যেও না”? তার এই ভয় পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। সে তো ডিভোর্স করেছে। নিজের বাঁচাটাকে বেছে নিয়েছে—ভিক্রমের আত্মধ্বংসের বদলে।তবু হাত কাঁপছিল। অঞ্জলি আলতো করে বলল,“দিদি, বসুন।”

“ও সবার প্রাণ বাঁচাতে পারে,” রিয়া ফিসফিস করল,

“শুধু নিজেরটা নয়।”

মিনিটগুলো টানটান হয়ে বাড়তে লাগল—দশ, পনেরো, কুড়ি। চৌকিদার রান্নাঘরে ঢুকল। একটু পরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল ভাত বসার গন্ধ, ডালের নরম গন্ধ।

“বেশি কিছু নেই,” সে ডাকল,

“কিন্তু আজ রাতে আমার বাড়িতে কেউ না খেয়ে থাকবে না।” রিয়া খাবারের কথা ভাবতে পারল না। শুধু ওই দরজা। পঁচিশ মিনিট। দরজাটা হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে খুলে গেল। ভিক্রম টলতে টলতে ঢুকল—ভিজে একাকার, হাতে কালো ব্যাগ আঁকড়ে। চুল-দাড়ি থেকে জল পড়ছে। পা খালি, রক্তাক্ত। কিন্তু—জীবিত। রিয়ার হাঁটু দুর্বল হয়ে এল। 

“সিট চৌদ্দ,” ভিক্রম হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ব্যাগটা তুলে ধরল। “কথা রাখলাম।”

ঘরে একসঙ্গে যেন নিশ্বাস পড়ল। দিনেশবাবু কাঁপা হাতে ওষুধ খেলেন, চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে।

“ধন্যবাদ বাবা… আমার প্রাণ বাঁচালে।”

চৌকিদার তোয়ালে আনল, ভিক্রমের পা বেঁধে দিল। কেউ কেউ বলল,

“আপনি তো হিরো!”—কেউ আবার শুধু মাথা নাড়ল, চোখে কৃতজ্ঞতার জল। রিয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল, মুঠো করে রাখা হাতটা মুখে চেপে ধরল—নিজেকে সামলাতে। শ্বাসটা যেন ঠিকমতো ঢুকছিল না।

“রিয়া।”

ভিক্রমের গলা—নরম, খুব কাছে। রিয়া ফিরল। দু’ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে ভিক্রম—ক্লান্ত, ভেঙে পড়া, কিন্তু জীবিত।

“শোনো—” রিয়া বলল।

“ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য ক্ষমা চাইতে এসো না—”

“আমি ক্ষমা চাইতে আসিনি,” ভিক্রম থামিয়ে দিল, আস্তে।

“আমি বলতে চাইছিলাম—ধন্যবাদ। সবকিছুর পরও আমাকে থামাতে চাওয়ার জন্য। আমাকে নিয়ে ভাবার জন্য।”

রিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“আমি জানি, তোমার এই ভাবনা পাওয়ার অধিকার আমার নেই,” ভিক্রম বলল।

“তবু… এটা আমার কাছে অনেক কিছু।”

চৌকিদার খাওয়া দিল—ভাত, ডাল, আলুর তরকারি, আচার।

“সবাই খাবেন! গরম থাকতে থাকতে!”

তারা বেঞ্চে পাশাপাশি বসল—দূরত্ব রেখে। খাচ্ছিল না।

“তুমি রাগ করে আছ,” ভিক্রম বলল।

“রাগ করার অধিকার নেই,” রিয়া বলল।

“তোমার সব অধিকার আছে,” ভিক্রম শান্ত গলায় বলল।

“যা-ই অনুভব করো।” রিয়া তাকে দেখল—ভিজে জামায় শরীর লেগে আছে, রোগা, পাঁজর গোনা যায়।

“কেন করলে?”“কারণ পারতাম,” ভিক্রম বলল।

“এখানে বসে জেনে-বুঝে সাহায্য না করে থাকাটা—আমি আর সে মানুষটা হতে চাই না।”

“তাহলে তুমি কেমন মানুষ হতে চাও?”

“যে টেকসইভাবে সাহায্য করে,” ভিক্রম বলল ধীরে।
“যে সবার ব্যথা নিজের ভেতরে নিয়ে ডুবে যায় না।”
সে এক ঝলক রিয়ার দিকে তাকাল।
“আমি ভারসাম্য খুঁজছি।”
চারপাশে মানুষ খেতে খেতে একটু ঢিলে দিল। চৌকিদার গল্প শুরু করল—ত্রিশ বছর এই রেস্ট হাউস সামলাচ্ছে। কত ঝড়, কত আশ্রয়।
“১৯৭৮ সালে জল উঠেছিল এখানে পর্যন্ত,” সে বুকের কাছে হাত তুলে দেখাল।
“সাতাশ জন ছিল তিন দিন। পরিবার হয়ে গেছিলাম। সবাই চলে গেছে, কিন্তু আমি সবাইকে মনে রেখেছি… এখানে।”
সে বুকের ওপর চাপড় দিল।
ভিক্রম সেই গল্প শুনল একরকম অনাবৃত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে—কোথাও নিজের জন্য একটা নিরাপদ ‘থাকা’র জায়গা চাই, কেউ যেন তাকে আফসোস নয়—মমতা দিয়ে মনে রাখে।
“খাও,” রিয়া খুব নিচু স্বরে বলল, তার প্লেটটা সামান্য ঠেলে। তারা নীরবে খেল। খাবারের স্বাদে যত্ন ছিল—সস্তা খাবার, কিন্তু অবহেলিত নয়।
ঝড় আবার বাড়ল। নতুন নতুন ফাটল দিয়ে জল চুঁইয়ে পড়তে লাগল। চৌকিদার চেঁচিয়ে উঠল, “সবাই মাঝখানে! জল বাড়ছে!”
রিয়া ক্যামেরার ব্যাগ তুলতে গিয়ে টান মারল—স্ট্র্যাপ আটকে গেল। সে টানছে—আরও জট পাকাচ্ছে। ভিক্রমের হাত এসে স্ট্র্যাপটা খুলে দিল।
“আমি আছি,” সে বলল—একদম স্বাভাবিক স্বরে, যেন এটাই তাদের পুরনো ভাষা।
তারা কথা না বলেই কাজ করতে লাগল—পুরনো কোরিওগ্রাফি, সংকট-অভ্যাস। একসঙ্গে সরানো, ধরাধরি, মানুষকে জায়গা করে দেওয়া।
ছাদটা একটু একটু করে দেবে যাচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে রিয়া হোঁচট খেল—
ভিক্রম তাকে ধরে ফেলল—দু’হাত তার কোমর ঘিরে, টেনে নিজের বুকের কাছে এনে। এক মুহূর্তের জন্য যেন পৃথিবী থেমে গেল—তার নিঃশ্বাস রিয়ার গলায়, ভিক্রমের হৃদস্পন্দন রিয়ার পিঠে।
রিয়ার শরীর তাকে চিনে ফেলল। আরেক মুহূর্ত হলেই সে বুঝি ভেঙে পড়বে—এই উষ্ণতার মধ্যে নিজের সব সীমা গলে যাবে। “ঠিক আছ?” ভিক্রমের গলা খসখসে। রিয়া মাথা নাড়ল। ভিক্রম সঙ্গে সঙ্গে তাকে ছেড়ে দিল।
ঠিক তখনই যে জায়গাটায় রিয়া দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই ছাদ ভেঙে পড়ল।

এখন সবাই মাঝখানে—ঘন হয়ে, একে অপরের গায়ে গা লাগিয়ে। ভিক্রম এক দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসল। রিয়া তিন ফুট দূরে। লণ্ঠনের আলোয় তার মুখটা আরও স্পষ্ট লাগছে—চুলে ধূসর, চোখের কোণে নতুন রেখা, শরীর খুব রোগা।
“তুমি তাকিয়ে আছ,” ভিক্রম চোখ বন্ধ রেখেই বলল।
“সরি।”
“সরি বলো না,” ভিক্রম বলল।
“আমি পুরো সন্ধে তোমার দিকে তাকিয়েছি।”
রিয়ার বুকটা একবার লাফ দিল।
“ভিক্রম—”
“আমি জানি, আমরা পারব না,” ভিক্রম চোখ খুলল।
“আমি জানি, যা ছিল সেটা আমি নষ্ট করেছি।” তার গলা কেঁপে উঠল।
“কিন্তু রিয়া… আমি সত্যিই দুঃখিত। ভীষণ দুঃখিত।”
রিয়া বহু বছর কল্পনা করেছে—সে চিৎকার করবে, অভিযোগ করবে, ক্ষতগুলো একে একে গণনা করে তাকে কষ্ট দেবে।
কিন্তু ভিক্রমের এই খাঁটি স্বীকারোক্তির সামনে তার ভেতরে শুধু ক্লান্তি নামল—আর একধরনের শান্ত সত্য।
“আমি জানি তুমি অসুস্থ ছিলে,” রিয়া বলল।
“আমি জানি তুমি ইচ্ছে করে আমাকে আঘাত করতে চাওনি।”
“তাতে ব্যথা কমে না,” ভিক্রম বলল।
“না,” রিয়া বলল, শব্দগুলো মেপে।
“তোমার অসুখ তোমার দোষ ছিল না। কিন্তু সেটা সামলানো তোমার দায়িত্ব ছিল। আর তুমি সেই দায়িত্ব নিতে চাওনি—যখন আমি ততদিনে ভেঙে পড়েছি।”
ভিক্রম কেঁপে উঠল, কিন্তু চোখ সরাল না।
“তুমি ঠিক।”
“আমি চেয়েছিলাম তুমি সাহায্য নাও,” রিয়া বলল।
“তুমি নাওনি। তুমি বলতে—তুমি কষ্ট পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু সেই কষ্টটা তুমি আমাকে দিয়ে দিলে।”
“আমি দিয়েছি,” ভিক্রমের গলা ভারী।
“আর পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করছি—যেন আমি আর কারও ওপর সেটা না চাপাই।”
“মানে?”
“ডিভোর্সের এক বছর পর NGO ছেড়েছি,” ভিক্রম বলল।
“ট্রিটমেন্টে ঢুকেছি—সপ্তাহে দু’দিন থেরাপি, কাজ করে এমন ওষুধ, সাপোর্ট গ্রুপ।”
সে মুখ ঘষল।
“এখন রাঁচিতে একটা কমিউনিটি সেন্টারে কাজ করি। বাচ্চাদের আর্ট আর মিউজিক শেখাই। টেকসই। ধীরে।”
“রাঁচি?” রিয়া অবাক। “কলকাতা ছেড়ে?”
“কলকাতা আমাকে মনে করিয়ে দিত—আমি কী হয়ে গিয়েছিলাম,” ভিক্রম বলল।
“থেরাপিস্ট বলে—‘নতুন করে শুরু’। আমি বলি—‘পালিয়ে যাওয়া’। কিন্তু কাজ করেছে।”
সে এমন দেখাচ্ছিল—যেন নরক থেকে হেঁটে ফিরতে শিখেছে।
“ভালো,” রিয়া ধীরে বলল।
“আমি অনেক সকাল জেগে উঠেছি এই ভেবে… তুমি বেঁচে আছ তো?”
“একবার খুব কাছে গিয়েছিলাম,” ভিক্রম বলল।
“তুমি চলে যাওয়ার ছ’মাস পর। হাওড়া ব্রিজে খুব ভোর বেলায় দাঁড়িয়ে ছিলাম—লাফ দেব বলে।”
রিয়ার শ্বাস থেমে গেল।
“একটা রাস্তার ছেলে—গোলাপ বিক্রি করার জন্য যাচ্ছিল, আমাকে থামাল,” ভিক্রম বলল।
“বারবার জিজ্ঞেস করছিল—বউ-এর জন্য ফুল নেবেন? শেষে আমি বললাম, আমার বউ নেই, কারণ আমি তাকে নষ্ট করে ফেলেছি।”
ভিক্রম শুকনো হাসল।
“ও বলল—‘তাহলে আগে নিজেকে ঠিক করুন, তারপর বউকে নিয়ে আসুন। তেরো বছরের ছেলে। আমার চেয়ে বুদ্ধিমান।” সে চোখ নামাল।
“পরদিনই হাসপাতালে ভর্তি হলাম।” রিয়ার চোখে জল জ্বলে উঠল।
“আমাকে বলোনি কেন—”
“তুমি তো আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই প্রায় মারা গিয়েছিলে,” ভিক্রম বলল।
“তোমার রিপোর্ট দেখেছি—ওজন কমে যাওয়া, প্যানিক অ্যাটাক—সবই আমার কারণে।”
সে মাথা নাড়ল।
“আমাকে নিজেকে বাঁচাতে হতো—নিজের জন্য। তোমাকে ফিরে পাওয়ার জন্য নয়। তোমাকে জেতার জন্য নয়। আমাকে শিখতে হতো—তোমাকে ছাড়াও আমার জীবনের মূল্য আছে।”
সত্যটা তাদের মাঝখানে নেমে এল—ভেজা কাপড়ের মতো ভারী, কিন্তু পরিষ্কার।
“একটা প্রশ্ন করতে পারি?” ভিক্রম বলল।
“করো।”
“তুমি কি সুখী? আমাকে ছাড়া?”
রিয়া একটু থামল। স্টুডিও। পুরস্কার পাওয়া প্রদর্শনী। থেরাপি। সীমা শেখা। এমন সম্পর্ক, যেখানে নিজেকে জ্বালিয়ে দিতে হয় না।
“আমি কিছু একটা গড়ছি,” রিয়া বলল।
“একটা জীবন—যেটা আমার। আমি পুরোপুরি পৌঁছাইনি। কিন্তু আগের চেয়ে অনেক কাছে।”
“ভালো,” ভিক্রমের হাসিটা বিষণ্ণ।
“দুই বছর আগে তোমার প্রদর্শনী দেখেছিলাম—পুরুলিয়ার মুখোশকারদের ছবি। তখনই বুঝেছি—তুমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছ।”
“তুমি গিয়েছিলে?” রিয়ার গলা কেঁপে উঠল।
“শেষ দিন,” ভিক্রম বলল।
“তুমি আসার আগে। একটা ছবির সামনে বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিলাম—এক বৃদ্ধ কারিগরের হাতের ছবি। অসাধারণ ছিল।”
“তুমি কখনও কিছু বলোনি।”
“আমার অধিকার ছিল না,” ভিক্রম বলল।
“তুমি আমাকে ছাড়াই যেটা বানিয়েছ, সেটা আমি ছুঁতে চাইনি।”
একটা নরম নীরবতা নামল—ব্যথার নয়, চাপ না দেওয়া একধরনের সম্মতির।
“ভিক্রম,” রিয়া খুব আস্তে বলল, “তুমি যখন বেরিয়ে গেলে… আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম।”
সে একবার গিলে নিল।
“আর আমি সেই ভয়কে ঘৃণা করেছি, কারণ আমার তো অধিকার নেই। কিন্তু তুমি দরজা পেরোতেই মনে হলো—আমার হৃদয়টা শরীরের বাইরে চলে গেছে। তুমি না ফেরা পর্যন্ত আমি শ্বাস নিতে পারছিলাম না।” ভিক্রম স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।
“আমি জানি না এটা নিয়ে আমি কী করব,” রিয়া বলল।
“কারণ আমি আর তোমার জন্য নিজেকে পুড়িয়ে দিতে পারব না। আমি আর তা করব না।”
তার গলা কঠিন হলো।
“কিন্তু আমি মিথ্যে বলব না—তোমার কী হয়, সেটা আমার কাছে এখনও গুরুত্ব রাখে।”
“দুঃখিত,” ভিক্রম গলা ভারী করে বলল।
“তোমাকে ওই ভয়টা বহন করিয়েছি বলে।”
“তুমি কি এখনও এমন মানুষ, যাকে আমাকে ‘বেঁচে থেকে পার হতে’ হবে?” রিয়া জিজ্ঞেস করল।
ভিক্রম গভীরভাবে ভাবল।
“আমি জানি না,” সে বলল সত্যি করে।
“আমি ভালো আছি আগের চেয়ে। কিন্তু এটা কোনোদিন একেবারে চলে যায় না। শুধু ম্যানেজ করা যায়। কিছু দিন খুব কঠিন হয়।”
“সত্য কথা,” রিয়া মাথা নাড়ল।
“আমি প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না যে খারাপ দিন আসবে না,” ভিক্রম বলল।
“কিন্তু আমি প্রতিশ্রুতি দিতে পারি—আমি সেটা তোমার দায়িত্ব করব না। আর কখনও না।”
রিয়ার বুকের ভেতর কোথাও যেন একটা গিঁট আলগা হলো।
“তাহলে… যোগাযোগ রাখবে?” ভিক্রম খুব সাবধানে বলল।
“ফের চেষ্টা করার জন্য নয়। আমরা যা শিখেছি, তা ভুলতে পারব না।” সে থামল।
“কিন্তু… এমন মানুষ হিসেবে, যারা একে অপরের কী হয় সেটা নিয়ে এখনও ভাবে?”
“বন্ধু,” রিয়া ধীরে বলল।
“সত্যি বন্ধু। যারা একে অপরের সবচেয়ে খারাপটা দেখেছে—তবু শুভ কামনা করতে পারে।”
“বন্ধু,” ভিক্রম বলল।
সে হাত বাড়াল। রিয়া হাত ধরল। উষ্ণ তালু, পরিচিত স্পর্শ। দু’জনেই সঙ্গে সঙ্গে ছাড়ল না।
“যা বলার, বলা দরকার,” ভিক্রম বলল।
“তুমি আমার জীবনের সেরা ঘটনা ছিলে। আমি জানতাম না কীভাবে তোমাকে ধরে রাখতে হয়। আর হয়তো তোমাকে হারিয়েই আমি শিখেছি—কীভাবে এমন মানুষ হতে হয়, যাকে ভালোবাসা যায়।”
“তোমাকে—”
“থামিও না,” ভিক্রম বলল। “শুধু… জানাতে চেয়েছিলাম।”
বৃষ্টি ধীরে ধীরে কমল। ঝড় যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তারা হাত ধরে বসে রইল—ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নয়।

ভোর এল—ধূসর, কিন্তু পরিষ্কার। বৃষ্টি থেমেছে। রিয়া টের পেল—সে ভিক্রমের কাঁধে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ সোজা হয়ে বসতেই ভিক্রমও চোখ মেলল—কিছু না বলে, কোনো অস্বস্তি না বানিয়ে।
বাইরে পৃথিবীর গন্ধ বদলে গেছে—ভেজা মাটি, ধোয়া পাতার গন্ধ, আর একধরনের নতুন সম্ভাবনা।
ড্রাইভার বাস দেখে বলল, “এক ঘণ্টা। তারপর রওনা।”
ভিক্রম বাইরে গিয়ে মোটরসাইকেলটা দেখল—হাতে সেই পুরনো দক্ষতা, কিন্তু মুখে নতুন ধীরতা।
চৌকিদার দরজায় দাঁড়িয়ে ধন্যবাদ নিচ্ছিল, টাকা নিতে রাজি নয়।
“এটাই আমার ধর্ম,” সে বলল।

“আশ্রয় দেওয়া। সবাই আবার আসবেন।”
রিয়া ক্যামেরা তুলল—চৌকিদারের মুখ, রাতের ক্লান্তি, মানুষের বাঁচার কৃতজ্ঞতা—সব ছবিতে ধরল।
তারপর সে দেখল ভিক্রম বাইক স্টার্ট দিচ্ছে।
“আমি যাচ্ছি,” ভিক্রম বলল। 
“চরিদার দিকে। মুকুটমণিপুর পেরিয়ে।”

“আমি যাব মুকুটমণিপুর,” রিয়া বলল। “ছৌ নাচের দল অপেক্ষা করছে।”
কাদামাখা ভোরের আলোয় তারা দাঁড়িয়ে রইল।
“রিয়া চ্যাটার্জি ফটোগ্রাফি,” ভিক্রম বলল, ঠোঁটের কোণে ছোট হাসি। “অনলাইনে খুঁজে পাব?”
“পাবে,” রিয়া বলল। “আর তোমারটা? রাঁচি ইয়ুথ আর্টস—কী যেন?”
“রাঁচি ইয়ুথ আর্টস কালেকটিভ,” ভিক্রম বলল।
তারপর হেসে উঠল—অল্প, কিন্তু সত্যি।
“ওয়েবসাইটটা খুবই বাজে। কিন্তু আমরা আছি।” বাসের হর্ন বেজে উঠল।
“আমায় উঠতে হবে,” রিয়া বলল। তবু কেউ নড়ল না।
“ধন্যবাদ,” ভিক্রম বলল।
“ঘৃণা না করার জন্য। আর… যাই হোক—এইটুকুর জন্য রাজি হওয়ার জন্য।”
“ধন্যবাদ,” রিয়া বলল।
“সাহায্য নেওয়ার জন্য। বেঁচে থাকার জন্য।” 
ভিক্রম এক পা পিছিয়ে গেল—জোর করে নয়, সম্মান রেখে।
রিয়া বাসে উঠল। জানলার কাচে কপাল ঠেকাল—আগের মতো, কিন্তু এবার নিজের ভেতরের কাচটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার লাগছিল। ভিক্রম এক হাত তুলল—বিদায় নয়, আশীর্বাদের মতো।
রিয়া হাত তুলল—একটা স্বীকৃতি, একটা নতুন শুরুর মতো।  বাসটা ধীরে ধীরে মোড় নিল। কাচের বাইরে ভিক্রমের অবয়বটা এক মুহূর্তের জন্য ঝাপসা হলো, তারপর গাছের আড়ালে মিলিয়ে গেল—যেন সে আদৌ সেখানে ছিল কি না, এই প্রশ্নটা হঠাৎ মনে জাগিয়ে দিয়ে। রিয়া জানলার দিকে তাকিয়ে রইল।
বাইরে পৃথিবীটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। রাতের বৃষ্টি সব ধুলো, ক্লান্তি, ভার যেন ধুয়ে নিয়ে গেছে। গাছের পাতাগুলো এত সবুজ যে চোখে ঠেকে—প্রতিটা পাতার কিনারে জল জমে আছে, আলো পড়লেই ঝিলমিল করে উঠছে। রাস্তার ধারে লাল মাটিটা এখন পরিষ্কার, গাঢ়—কাদার বদলে যেন নতুন করে রঙ করা। দূরের পাহাড়ের গায়ে হালকা কুয়াশা, ঠিক যেন কেউ ইচ্ছে করে নরম পর্দা টেনে দিয়েছে।
আকাশটা ফ্যাকাসে নীল। কোথাও কোথাও মেঘের ফাঁক দিয়ে আলো নামছে—একেবারে মঞ্চের আলোর মতো। মনে হলো, প্রকৃতি নিজেকে স্নান করিয়ে আজ প্রদর্শনীতে বসিয়েছে—ভেতরের সৌন্দর্যটুকু খুলে দেখানোর জন্য।
রিয়া গভীর একটা  নিশ্বাস নিল। ভেজা মাটির গন্ধ, কচি ঘাসের গন্ধ, দূর থেকে আসা জলের সোঁদা গন্ধ—সব মিলিয়ে বুকটা ভরে গেল। এতক্ষণ ধরে ভেতরে জমে থাকা টানটা যেন একটু আলগা হলো। কিছুক্ষণ সে শুধু দেখল। ক্যামেরা তুলল না। কিছু সৌন্দর্য আছে, যেগুলো ধরা যায় না—শুধু শরীরের ভেতরে রেখে দিতে হয়। 
হঠাৎ—
বাসের ভেতরে একটা বাচ্চার কান্না। ধরেই রাখা যায় না এমন কান্না—হঠাৎ ওঠা, তীক্ষ্ণ, অস্থির।
রিয়া চমকে উঠল। বাস্তবটা আবার ফিরে এল—ভেজা জানলা, বাসের সিট, মানুষের গা ঘেঁষাঘেঁষি। সে দেখল, এক তরুণী মা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে দোলাচ্ছে, ফিসফিস করে কিছু বলছে, তবু কান্না থামছে না। রিয়া ধীরে ফোনটা বের করল। স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই ক্যামেরার ছবিগুলো একে একে ভেসে উঠল—
পারির খোলা হাসি, চোখে জল জমে থাকা দিনেশবাবুর মুখ, চৌকিদারের গরম ভাতের হাঁড়ি থেকে উঠতে থাকা ধোঁয়া।
তারপর—একটা ছবি।
ভিক্রম।
হাসছে সে। ক্যামেরার দিকে নয়—কারও দিকে তাকিয়ে। সেই হাসি, যেটা আসে যখন কেউ নিজের কথা ভুলে অন্যের জন্য কিছু করতে থাকে। মুখে যে আলো ওঠে—নাটক নয়, জেতার চেষ্টা নয়—শুধু খাঁটি উপস্থিতি। রিয়া ছবিটা একটু বেশি সময় ধরে দেখল। তারপর খুব সাবধানে, যেন ভেঙে যাবে—ছবিটা সেভ করল।
বাসটা সামনে এগিয়ে চলল। বাইরে সবুজটা ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাচ্ছে। আর রিয়ার ভেতরে—কিছু একটা, অজান্তেই, জায়গা করে বসছে। তারপর সে রাঁচি ইয়ুথ আর্টস কালেকটিভকে ইমেল লিখল— 
বিষয়: প্লাবনের ভেতর থেকে হ্যালো। 
ভিক্রম,
ভালোভাবে চলছে সব কিছু। গত রাতের কয়েকটা ছবি পাঠালাম—ভাবলাম, তোমার বাচ্চাগুলো তাদের শিক্ষককে “হিরো” হিসেবে দেখলে খুশি হবে। আগামী মাসে কলকাতায় একটা প্রদর্শনী করছি। তুমি যদি তখন শহরে থাকো—কফিটা কিন্তু বাকি রইল।
ভালো থেকো,
রিয়া
সেন্ড করল। 
বেশ কয়েক মিনিট পর উত্তর এল—
আমার খুব ভালো লাগবে, চেষ্টা করব। ছবিগুলোর জন্য ধন্যবাদ… আর গত রাতের জন্যও। সব কিছুর জন্য। তুমিও ভালো থেকো।
—ভি
রিয়া মৃদু হাসল, ফোনটা ব্যাগে রেখে দিল। সে জানে না—এই বন্ধুত্ব টিকবে কি না। পুরনো ক্ষত আবার জ্বলে উঠবে কি না। কিন্তু আজ, পাঁচ বছর পর প্রথমবার, ভিক্রমকে ভাবলে বুকের মধ্যে ছুরি বসছে না। শুধু একটা ব্যথা থাকে—নিঃশব্দ, পুরনো ক্ষতের মতো—যেমন আবহাওয়া বদলালে শরীর বোঝে কোথাও একদিন ভেঙেছিল।
আর সেইটুকু ব্যথা—সহ্য করা যায়। মুকুটমণিপুরের জলাধার দূর থেকে দেখা দিল—বিশাল, রূপোলি। বাসটা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে চলল। পেছনে প্লাবন কমছে। জল নামছে।
কিন্তু রিয়া জানে—এই  বৃষ্টি আবার আসবে। মনসুনের মতোই ব্যথাও ফিরে আসে। তবু মনসুনের পর ভোরও রোদ নিয়ে আসে। আর যদি আবার কখনও জল ওঠে—
হয়তো এবার তারা দু’জনেই জানবে, কীভাবে আশ্রয় নিতে হয় নিজেদেরকে হারানো ছাড়াই। 
হয়তো এটুকুই যথেষ্ট।

কুয়াশার ভিতর নীল বাড়ি

প্রথম পর্ব

যে বাড়ি প্রতি পূর্ণিমায় শ্বাস নেয় বহরমপুর শহরের শেষ প্রান্তে, যেখানে পিচ ঢালা রাস্তা হঠাৎ করেই মাটির পথে মিলিয়ে যায়, সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পুরোনো নীল রঙের বাড়ি। বাড়িটির দেয়ালে সময়ের দাগ, জানালার কাঠে শ্যাওলার ছাপ, আর ছাদের কার্নিশে বাসা বেঁধেছিল কয়েক প্রজন্মের শালিক।
লোকেরা বলত, বাড়িটি জীবন্ত।
প্রতি পূর্ণিমার রাতে বাড়িটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কেউ কেউ দাবি করত, গভীর রাতের নীরবতায় তার দেয়ালগুলো সামান্য ওঠানামা করে, যেন সে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আবার অনেকে বলত, বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা পুরোনো দোলনাটি নিজে থেকেই দুলতে শুরু করে।
অর্ণব এসব গল্পে কখনো বিশ্বাস করত না।
সতেরো বছর বয়সী অর্ণব তার মায়ের সঙ্গে কলকাতা থেকে এই শহরে এসেছে দাদুর মৃত্যুর পর। দাদু রেখে গেছেন এই নীল বাড়ি আর একটি অদ্ভুত চাবি। চাবিটির মাথায় খোদাই করা ছিল একটি প্রজাপতির নকশা।
"এই চাবিটা কখনো হারিও না," দাদু মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগে বলেছিলেন।

"বাড়ির সব দরজা চোখে দেখা যায় না।" তখন কথাটার কোনো অর্থ খুঁজে পায়নি অর্ণব।
সেদিন ছিল পূর্ণিমা। রাত প্রায় বারোটা। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে ছিল। অর্ণব ঘুমোতে পারছিল না। হঠাৎ সে শুনল—ধুপ... ধুপ... শব্দটা যেন বাড়ির ভেতর থেকেই আসছে। সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। শব্দটা আবার হলো।

ধুপ... ধুপ...
এটা কি কারো পায়ের শব্দ? নাকি সত্যিই বাড়ির হৃদস্পন্দন? সাহস সঞ্চয় করে অর্ণব দরজা খুলল। করিডোর জুড়ে ছড়িয়ে ছিল চাঁদের নীলাভ আলো। দেয়ালে ঝোলানো দাদুর ছবির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, ছবির চোখ দুটো যেন আগের চেয়ে উজ্জ্বল।
হঠাৎ করিডোরের শেষ প্রান্তে একটি দরজা দেখা গেল। অর্ণব থমকে দাঁড়াল। সে এই বাড়িতে এক মাস ধরে আছে। কিন্তু এই দরজাটা আগে কখনো দেখেনি। কালো কাঠের দরজা। মাঝখানে প্রজাপতির আকৃতির তালা। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল। পকেটে হাত দিয়ে সে অবাক হয়ে দেখল—দাদুর দেওয়া চাবিটি তার সঙ্গেই আছে। চাবিটি যেন উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
বাড়ির চারপাশের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। বাইরে হাজার হাজার ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক এক মুহূর্তে থেমে গেল। অর্ণব ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। চাবিটি তালার কাছে আনতেই তালা নিজে থেকেই খুলে গেল। কড়কড় শব্দে দরজাটি অল্প ফাঁক হলো। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কদম ফুলের গন্ধ আর হালকা কুয়াশা।
অর্ণব ভেতরে তাকিয়ে দেখল—ওপাশে কোনো ঘর নেই। বরং সেখানে একটি বিস্তীর্ণ মাঠ, যার ঘাসগুলো রুপালি আলোয় জ্বলছে। আকাশে ভাসছে তিনটি চাঁদ। দূরে একটি বিশাল বটগাছের নিচে বসে আছে একজন বৃদ্ধা, আর তার চারপাশে উড়ছে কাগজের তৈরি মাছ।
বৃদ্ধা মাথা তুলে অর্ণবের দিকে তাকালেন। "অবশেষে তুমি এলে," তিনি বললেন।
"আপনি কে?" কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল অর্ণব। বৃদ্ধা হাসলেন।
"আমি গল্পের রক্ষক। আর তোমার দাদু ছিলেন আমার শেষ সহকারী।" অর্ণব কিছু বলার আগেই বৃদ্ধা আবার বললেন,
"তোমাদের পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে। কারণ মানুষ যখন কোনো গল্প ভুলে যায়, সেই গল্পের পৃথিবী ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে।"
বটগাছের ওপর বসে থাকা একটি নীল রঙের শিয়াল কথা বলে উঠল,
"আর সময় খুব কম।"
অর্ণব বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল।
"কিসের সময়?" সে জিজ্ঞেস করল। বৃদ্ধার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
"কেউ একজন স্মৃতিগুলো চুরি করছে। যদি তাকে থামানো না যায়, তাহলে মানুষ শুধু গল্প নয়, নিজেদের অতীতও ভুলে যাবে।"
ঠিক তখনই দূরের আকাশে তিনটি চাঁদের একটি ফাটতে শুরু করল। রুপালি আলো ধীরে ধীরে কালো হয়ে উঠতে লাগল। বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন।
"অর্ণব," তিনি বললেন, "এখন তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তুমি কি ফিরে যাবে তোমার স্বাভাবিক জীবনে, নাকি এমন এক যাত্রা শুরু করবে, যেখানে বাস্তবতা আর কল্পনার সীমারেখা নেই?"
অর্ণব নীল বাড়ির দিকে একবার তাকাল। তারপর অজানা সেই জগতের দিকে পা বাড়াল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, নীল বাড়িটি গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।


দ্বিতীয় পর্ব
অর্ণব যখন দরজার ওপাশের মাঠে প্রথম পা রাখল, তখন তার মনে হলো মাটিটা যেন নরম মেঘ দিয়ে তৈরি। চারপাশের বাতাসে কদম ফুলের গন্ধ, আর দূরের বটগাছের পাতাগুলো ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
নীল রঙের শিয়ালটি লাফিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
"এত ধীরে হাঁটলে চলবে না," সে বিরক্ত গলায় বলল। "স্মৃতি-চোর কারও জন্য অপেক্ষা করে না।"
অর্ণব বিস্ময়ে বলল, "তুমি সত্যিই কথা বলতে পারো?"
শিয়ালটি চোখ ঘুরিয়ে বলল, "এই জগতে কথা বলতে না পারাটাই অস্বাভাবিক।"
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন, "ওর নাম নীল। অনেক বছর ধরে সে গল্পের পথ পাহারা দেয়।"
বটগাছের গোড়ায় বসে বৃদ্ধা মাটিতে হাত রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে মাটির ভেতর থেকে অসংখ্য আলোকিত সুতো বেরিয়ে এলো। সেগুলো বাতাসে ভেসে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ল।
"এগুলো কী?" অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
"মানুষের স্মৃতি," বৃদ্ধা বললেন। "প্রতিটি সুখ, দুঃখ, স্বপ্ন আর গল্প—সবকিছুর সঙ্গে এই সুতোগুলোর সংযোগ আছে।"
হঠাৎ একটি সুতো কালো হয়ে নিভে গেল। তারপর আরেকটি। আরেকটি। বৃদ্ধার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল।
"সে কাছে চলে এসেছে।"
দূরে কুয়াশার মধ্যে একটি অবয়ব দেখা দিল। কালো আলখাল্লা পরা সেই ছায়ামূর্তির মুখ দেখা যাচ্ছিল না। তার হাতে ছিল একটি কাঁচের লণ্ঠন, যার ভেতরে ছোট ছোট আলোর বিন্দুগুলো বন্দি।
নীল শিয়াল নিচু গলায় বলল, "ওই হলো স্মৃতি-চোর।" অর্ণবের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
"সে মানুষের স্মৃতি কেন চুরি করে?" বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"কারণ ভুলে যাওয়া মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। যে নিজের গল্প ভুলে যায়, সে নিজের পরিচয়ও হারিয়ে ফেলে।"
স্মৃতি-চোর ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। তার প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে মাঠের রুপালি ঘাস ধূসর হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ অর্ণবের মাথায় তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো।
সে দেখতে পেল ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজার স্মৃতি, মায়ের মুখে শোনা ঘুমপাড়ানি গল্প, দাদুর সঙ্গে কাটানো বিকেলগুলো—সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
"না!" অর্ণব চিৎকার করে উঠল। বৃদ্ধা দ্রুত তার হাতে একটি ছোট্ট কাঁচের শিশি দিলেন।
"এটা তোমার প্রথম স্মৃতি," তিনি বললেন। "যতক্ষণ এটা তোমার কাছে থাকবে, তোমার আসল স্বত্তা কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।"
শিশিটির ভেতরে অর্ণব দেখল—চার বছরের ছোট্ট সে প্রথমবার আকাশে রামধনু দেখছে।
স্মৃতি-চোর থেমে গেল। তার মুখের জায়গায় যেন কুয়াশা ঘুরপাক খাচ্ছে।
"ছেলেটিকে আমার হাতে তুলে দাও," কর্কশ কণ্ঠে সে বলল। "তার পরিবারের কাছে এমন কিছু আছে, যা আমার প্রয়োজন।" নীল শিয়াল দাঁত বের করে গর্জে উঠল।
"কখনো না।" ঠিক তখনই আকাশের দ্বিতীয় চাঁদটিও ফেটে যেতে শুরু করল।
বৃদ্ধা আতঙ্কিত হয়ে বললেন, "যদি তিনটি চাঁদই নিভে যায়, তাহলে এই জগতের সব গল্প হারিয়ে যাবে।"
স্মৃতি-চোর তার লণ্ঠন উঁচু করল। লণ্ঠনের ভেতরের আলোগুলো আর্তনাদের মতো কেঁপে উঠল।
অর্ণব অনুভব করল, তার পকেটের প্রজাপতি-খোদাই করা চাবিটি গরম হয়ে উঠছে।
চাবির গায়ে ধীরে ধীরে কিছু শব্দ ফুটে উঠল—
"যে নিজের গল্পকে মনে রাখে, তাকে অন্ধকার গ্রাস করতে পারে না।"
অর্ণব শক্ত করে চাবিটি ধরে স্মৃতি-চোরের দিকে তাকাল।
"আমি জানি না আমি কে," সে বলল, "কিন্তু আমি সেটা খুঁজে বের করব। আর কাউকে তার গল্প হারাতে দেব না।"
স্মৃতি-চোর নিস্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে সে বলল, "তাহলে প্রস্তুত হও, কারণ তোমার দাদু যে সত্য লুকিয়ে রেখেছিলেন, তা জানার পর তুমি আর আগের মানুষ থাকবে না।" কথা শেষ হতেই চারপাশের কুয়াশা ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘুরতে শুরু করল। অর্ণব অনুভব করল, মাটি তার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে। আর শেষ মুহূর্তে সে দেখল—স্মৃতি-চোরের গলায় ঝুলছে ঠিক তার দাদুর মতো একটি প্রজাপতি-আকৃতির লকেট।

​

তৃতীয় পর্ব 

ঘূর্ণায়মান কুয়াশা থেমে গেলে অর্ণব বুঝতে পারল, সে আর সেই রুপালি মাঠে নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল গ্রন্থাগারের সামনে। ভবনটি এত উঁচু যে তার ছাদ মেঘের ভেতর হারিয়ে গেছে। দেয়ালজুড়ে ছিল অসংখ্য ঘড়ি, কিন্তু কোনো ঘড়ির কাঁটাই একই সময় দেখাচ্ছিল না। বিশাল দরজার ওপর সোনালি অক্ষরে লেখা—
"স্মৃতির গ্রন্থাগার" নীল শিয়াল পাশে এসে দাঁড়াল।
"পৃথিবীতে যত মানুষের স্মৃতি, স্বপ্ন আর ভুলে যাওয়া গল্প আছে, সেগুলোর প্রতিধ্বনি এখানে সংরক্ষিত থাকে," সে বলল। অর্ণব ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে ঢুকতেই সে অবাক হয়ে গেল। বইয়ের বদলে তাকজুড়ে রাখা ছিল হাজার হাজার কাঁচের বোতল। প্রতিটি বোতলের ভেতর ছোট ছোট দৃশ্য ভেসে বেড়াচ্ছে। কোথাও একটি শিশু প্রথমবার হাঁটতে শিখছে। কোথাও একজন বৃদ্ধ বহু বছর পর তার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করছে। কোথাও কেউ প্রথম প্রেমপত্র লিখছে।
"এগুলো কি মানুষের স্মৃতি?" অর্ণব ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
"হ্যাঁ," পেছন থেকে বৃদ্ধার কণ্ঠ ভেসে এল। "কিছু স্মৃতি মানুষ ভুলে যায়, কিন্তু স্মৃতি কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।"
হঠাৎ অর্ণবের চোখ পড়ল একটি পুরোনো কাঠের টেবিলের ওপর। সেখানে একটি বোতলের ভেতর সে তার দাদুকে দেখতে পেল। দাদু তখন অনেক তরুণ। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেকজন মানুষ—মুখটা স্পষ্ট নয়, কিন্তু গলায় ঝুলছিল প্রজাপতি-আকৃতির লকেট। অর্ণবের বুক ধক করে উঠল।
"ওই মানুষটা কে?" বৃদ্ধা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বললেন, "তিনি একসময় তোমার দাদুর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন।"
"তাহলে তিনি এখন কোথায়?" নীল শিয়াল মুখ ফিরিয়ে নিল। বৃদ্ধা ধীরে বললেন, "তিনিই এখন স্মৃতি-চোর।" অর্ণব যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
"কিন্তু কেন?" বৃদ্ধা একটি কাঁচের বোতল তুলে ধরলেন। ভেতরে দেখা গেল—দাদু ও তাঁর বন্ধু এই জগতের তিনটি চাঁদের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন।
"অনেক বছর আগে," বৃদ্ধা বলতে শুরু করলেন, "তারা দুজনই গল্পের রক্ষক ছিলেন। তারা মানুষের স্মৃতি ও গল্পকে নিরাপদ রাখতেন।"
"তাহলে কী হয়েছিল?" বৃদ্ধার চোখে গভীর বিষাদের ছায়া নেমে এলো।
"এক ভয়াবহ রাতে তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হারান। তিনি চেয়েছিলেন সেই স্মৃতিগুলো মুছে ফেলতে—কারণ সেগুলো খুব কষ্ট দিত।"
"কিন্তু দুঃখের স্মৃতিও কি গুরুত্বপূর্ণ?" অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
"অবশ্যই," বৃদ্ধা উত্তর দিলেন। "আনন্দ আমাদের হাসতে শেখায়, কিন্তু দুঃখ আমাদের গভীরতা দেয়। কোনো স্মৃতি মুছে ফেলতে গেলে মানুষ নিজেকেও একটু একটু করে হারিয়ে ফেলে।"
ঠিক তখনই পুরো গ্রন্থাগার কেঁপে উঠল। দূরের তাকগুলো থেকে কয়েকটি কাঁচের বোতল মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। ভেতরের আলোগুলো নিভে যেতে শুরু করল। নীল শিয়াল চিৎকার করে উঠল, "সে এখানে এসেছে!" গ্রন্থাগারের বিশাল দরজাগুলো নিজে থেকেই খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতি-চোর। তার হাতে থাকা লণ্ঠন আগের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল।
"আমাকে থামানোর চেষ্টা করো না," সে বলল। "মানুষ কষ্ট পেতে পেতে ক্লান্ত। আমি তাদের সব বেদনাদায়ক স্মৃতি মুছে দিতে চাই।" অর্ণব সামনে এগিয়ে এল।
"কিন্তু তাহলে তারা কি নিজেদের সম্পূর্ণভাবে মনে রাখতে পারবে?"
স্মৃতি-চোর কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর বলল,
"সম্পূর্ণ মানুষ বলে কিছু নেই, অর্ণব। আমরা সবাই আমাদের ভুলে যাওয়া অংশগুলো নিয়ে বেঁচে থাকি।"
অর্ণব শক্ত করে প্রজাপতি-খোদাই করা চাবিটি ধরে বলল, "হয়তো। কিন্তু ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মানুষকে নিজেকেই নিতে হবে। অন্য কেউ সেটা ঠিক করতে পারে না।" স্মৃতি-চোরের লণ্ঠনের আলো কেঁপে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে অর্ণবের চাবি থেকে নীল আলো বেরিয়ে এসে গ্রন্থাগারের এক গোপন দরজার দিকে নির্দেশ করল। দরজার ওপর লেখা ছিল—
"যেখানে শেষ স্মৃতিটি লুকিয়ে আছে।" বৃদ্ধা আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন,
"না... ওই দরজা কখনো খোলা উচিত নয়।" অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।
"কেন?" বৃদ্ধা উত্তর দিলেন, "কারণ ওই দরজার ওপাশে রয়েছে সেই সত্য, যা তোমার দাদু মৃত্যুর আগে পর্যন্ত গোপন রেখেছিলেন।" স্মৃতি-চোর ধীরে ধীরে বলল, "অবশেষে সময় এসে গেছে।"
গ্রন্থাগারের সব ঘড়ি একসঙ্গে বাজতে শুরু করল। আর অর্ণব কাঁপতে থাকা হাতে গোপন দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

চতুর্থ পর্ব

গোপন দরজাটির সামনে দাঁড়িয়ে অর্ণব অনুভব করল, তার হাতের তালু ঘামে ভিজে উঠেছে। গ্রন্থাগারের অসংখ্য ঘড়ি একসঙ্গে বাজছে—টিক... টিক... টিক... যেন সময় নিজেই কোনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
দরজার ওপর হাত রাখতেই প্রজাপতি-খোদাই করা চাবিটি হালকা কম্পন করতে শুরু করল।
ক্লিক।
দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল। ভেতরে কোনো ঘর ছিল না। বরং সেখানে ছিল একটি ছোট্ট উঠোন। মাঝখানে একটি কদম গাছ। গাছের নিচে একটি কাঠের বেঞ্চ। আর বেঞ্চে বসে ছিলেন অর্ণবের দাদু। যেন তিনি কখনো মারা যাননি। "দাদু!" অর্ণব বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল।
বৃদ্ধ মানুষটি মৃদু হেসে বললেন, "আমি সত্যিকারের মানুষ নই, অর্ণব। আমি তোমার দাদুর রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি।" অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল।
"আপনি আমাকে এসব কিছু আগে বলেননি কেন?" দাদু কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।
তারপর বললেন, "কারণ কিছু সত্য মানুষকে নিজে থেকেই আবিষ্কার করতে হয়।"
কদম গাছের পাতা থেকে ছোট ছোট আলোকবিন্দু ঝরে পড়ছিল। দাদু হাত বাড়িয়ে একটি আলো ধরলেন।
"অনেক বছর আগে, আমি আর অনিরুদ্ধ—যাকে তুমি স্মৃতি-চোর নামে চেনো—একসঙ্গে গল্পের রক্ষক ছিলাম।"
"অনিরুদ্ধ?" অর্ণব অবাক হলো।
"হ্যাঁ," দাদু বললেন। "সে ছিল অসাধারণ সংবেদনশীল মানুষ। অন্যের দুঃখ সে নিজের দুঃখের মতো অনুভব করত।"
"তাহলে সে এমন হয়ে গেল কেন?" দাদুর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
"যখন সে তার মেয়েকে হারায়, তখন সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে কষ্টের স্মৃতি মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। সে পৃথিবী থেকে সব বেদনাদায়ক স্মৃতি মুছে ফেলতে চেয়েছিল।"
"আর আপনি তাকে থামিয়েছিলেন?" দাদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"আমি তাকে থামাইনি। আমি তাকে বুঝতে পারিনি।"
ঠিক তখনই উঠোনের অন্য প্রান্তে কুয়াশা জমতে শুরু করল। সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন স্মৃতি-চোর।
আজ তার মুখের কুয়াশা কিছুটা সরে গেছে। ক্লান্ত, বিষণ্ণ এক মানুষের মুখ দেখা যাচ্ছে।
"তুমি এখনো আমাকে দোষ দাও না?" তিনি দাদুকে জিজ্ঞেস করলেন।
দাদু শান্ত গলায় বললেন, "দোষ দিই। কিন্তু তার চেয়েও বেশি, আমি অনুতপ্ত।" স্মৃতি-চোরের চোখে এক মুহূর্তের জন্য জল চিকচিক করল।
"তুমি জানো না কেমন লাগে প্রতিদিন সেই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে।" অর্ণব ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
"আমি জানি না," সে বলল। "কিন্তু আমি এটুকু বুঝি—কষ্ট ভুলে গেলে হয়তো যন্ত্রণা কমে, কিন্তু ভালোবাসার গভীরতাও হারিয়ে যায়।" স্মৃতি-চোর চুপ করে রইলেন। অর্ণব আবার বলল,
"আপনি আপনার মেয়েকে ভুলে যেতে চাননি। আপনি শুধু তার অনুপস্থিতির কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন।" কথাগুলো শুনে স্মৃতি-চোরের হাতে ধরা লণ্ঠনটি কেঁপে উঠল। তার ভেতরে বন্দি স্মৃতির আলোগুলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হতে লাগল। হঠাৎ আকাশে প্রবল শব্দ হলো।
তিনটি চাঁদের মধ্যে দুটি প্রায় সম্পূর্ণ কালো হয়ে গেছে। দাদু উঠে দাঁড়ালেন।
"সময় শেষ হয়ে আসছে," তিনি বললেন। "তৃতীয় চাঁদটিও নিভে গেলে গল্প ও স্মৃতির জগত ভেঙে পড়বে।"
"আমি কী করতে পারি?" অর্ণব উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল। দাদু তার হাতে প্রজাপতি-খোদাই করা চাবিটি তুলে দিলেন।
"এই চাবি দরজা খোলে না, অর্ণব। এটি মানুষকে তার হারিয়ে যাওয়া গল্পের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।"
"তাহলে আমাকে কী করতে হবে?" দাদু মৃদু হেসে বললেন,
"তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—স্মৃতি কি শুধু আনন্দের জন্য, নাকি সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার জন্য?"
স্মৃতি-চোর নীরবে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দূরে শেষ চাঁদটির আলো কাঁপতে শুরু করেছে।
অর্ণব বুঝতে পারল, পরবর্তী সিদ্ধান্ত শুধু এই জগতের নয়, অসংখ্য মানুষের স্মৃতি ও গল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
আর ঠিক তখনই কদম গাছের কাণ্ডে একটি নতুন দরজা ফুটে উঠল। দরজার ওপরে লেখা—
"যে নিজের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতির মুখোমুখি হতে পারে, শুধুমাত্র সেও আলোকে রক্ষা করতে পারে।"
অর্ণব গভীর শ্বাস নিল। সে জানত, এবার তাকে নিজের ভেতরের সেই স্মৃতিগুলোর সামনে দাঁড়াতে হবে, যেগুলো থেকে সে এতদিন দূরে পালিয়ে এসেছে।

 

পঞ্চম পর্ব

অর্ণব কদম গাছের কাণ্ডে ফুটে ওঠা দরজাটির সামনে দাঁড়িয়ে রইল। দরজার কাঠে অদ্ভুত নকশা আঁকা—কোথাও হাসিমুখ, কোথাও অশ্রুবিন্দু, কোথাও আবার উড়ে যাওয়া প্রজাপতি।
দাদুর শেষ স্মৃতিটি শান্ত কণ্ঠে বলল,
"মনে রেখো, যে স্মৃতি থেকে আমরা পালাতে চাই, অনেক সময় সেগুলোই আমাদের সবচেয়ে বেশি কিছু শেখায়।"
অর্ণব মাথা নেড়ে দরজার হাতলে হাত রাখল। দরজাটি খুলতেই চারপাশের সবকিছু বদলে গেল। সে নিজেকে দেখতে পেল তার শৈশবের বাড়ির উঠোনে। বৃষ্টির পানি জমে আছে মাটিতে। ছোট্ট অর্ণব কাগজের নৌকা ভাসাচ্ছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার মা হাসছেন। দৃশ্যটা এত জীবন্ত ছিল যে অর্ণবের মনে হলো, সে সত্যিই ফিরে গেছে সেই দিনে।
"এগুলো তোমার স্মৃতি," নীল শিয়ালের কণ্ঠ ভেসে এল। "কিন্তু সাবধান, সব স্মৃতি সুখের নয়।"
চারপাশের আলো হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল। দৃশ্য বদলে গেল।
অর্ণব দেখতে পেল, দাদুর মৃত্যুসংবাদ শোনার সেই দিনটি। হাসপাতালের করিডোর। মায়ের নিঃশব্দ কান্না। নিজের অসহায়তা। তার বুক ভারী হয়ে উঠল। সে চোখ ফিরিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু ঠিক তখনই কদম ফুলের গন্ধ ভেসে এলো।
দাদুর কণ্ঠ যেন বাতাসে মিশে বলল, "কষ্টকে অস্বীকার কোরো না, অর্ণব। তাকে বুঝতে শেখো।"
অর্ণব ধীরে ধীরে সেই স্মৃতির দিকে তাকাল। সে অনুভব করল, দুঃখের মধ্যেও ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। দাদুকে হারানোর যন্ত্রণা ছিল, কারণ তিনি তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। হঠাৎ তার হাতে ধরা প্রজাপতি-চাবিটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চাবির ওপর নতুন শব্দ ফুটে উঠল—
"যে স্মৃতিকে গ্রহণ করে, সে নিজেকেও গ্রহণ করে।"
ঠিক তখনই গোলকধাঁধার মাঝখানে একটি ছোট্ট মেয়ে দেখা দিল। তার বয়স হয়তো আট বা নয় বছর। হাতে কাগজের প্রজাপতি। সে শান্ত চোখে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল,
"তুমি কি আমার বাবাকে সাহায্য করবে?"
অর্ণব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "তুমি কে?" মেয়েটি মৃদু হাসল।
"আমার নাম অন্বেষা। আমি অনিরুদ্ধের মেয়ে।" অর্ণবের বুক কেঁপে উঠল।
"কিন্তু... তুমি তো..."
"হ্যাঁ," মেয়েটি বলল, "আমি এখন শুধু একটি স্মৃতি। কিন্তু স্মৃতি মানেই তো পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়া নয়।"
সে কাগজের প্রজাপতিটি অর্ণবের হাতে দিল।
"বাবা আমাকে ভুলে যেতে চান না। তিনি শুধু কষ্ট পেতে ভয় পান।" অর্ণব নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।অন্বেষা আবার বলল, "তুমি কি তাকে মনে করিয়ে দিতে পারবে যে ভালোবাসা আর বেদনা একে অপরের শত্রু নয়?"
কথা শেষ হতেই মেয়েটি ধীরে ধীরে অসংখ্য কাগজের প্রজাপতিতে ভেঙে বাতাসে মিলিয়ে গেল।হঠাৎ চারপাশ কেঁপে উঠল। নীল শিয়াল দৌড়ে এসে বলল,
"দ্রুত চলো! তৃতীয় চাঁদের আলো নিভে যাচ্ছে!"
অর্ণব গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আবার স্মৃতির জগতে ফিরে এলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে দেখল, শেষ চাঁদটির অর্ধেক অংশ কালো হয়ে গেছে। স্মৃতি-চোর—অনিরুদ্ধ—নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে লণ্ঠন, কিন্তু আগের মতো দৃঢ়তা নেই। অর্ণব ধীরে ধীরে তাঁর কাছে এগিয়ে গেল। তার হাতে থাকা কাগজের প্রজাপতিটি অনিরুদ্ধের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
"অন্বেষা আমাকে এটা দিতে বলেছে।" অনিরুদ্ধের হাত কেঁপে উঠল।
"অসম্ভব..." তিনি ফিসফিস করে বললেন। প্রজাপতিটির ডানায় লেখা ছিল—
"বাবা, আমাকে ভুলে যেও না। আমার জন্য হাসতেও ভুলে যেও না।" অনিরুদ্ধের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
বহু বছরের মধ্যে প্রথমবার, তাঁর হাতে থাকা লণ্ঠনের কালো আলো ফিকে হতে শুরু করল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ থেকে বজ্রের মতো শব্দ ভেসে এলো। শেষ চাঁদটিতে একটি গভীর ফাটল দেখা দিল। বৃদ্ধা আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন,
"এখন আর শুধু স্মৃতি-চোরকে থামালেই হবে না। চাঁদকে রক্ষা করার জন্য গল্পের উৎসকে জাগিয়ে তুলতে হবে!"
অর্ণব বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, "গল্পের উৎস কোথায়?" বৃদ্ধা দূরের কুয়াশার দিকে আঙুল তুলে বললেন।
সেখানে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে একটি বিশাল দরজা, যা অসংখ্য বই, পাখির পালক আর তারার আলো দিয়ে তৈরি।

"ওখানেই," তিনি বললেন, "প্রথম গল্পের জন্ম হয়েছিল।" অর্ণব আকাশের ভাঙতে থাকা চাঁদের দিকে তাকাল। তারপর বিশাল দরজাটির দিকে। সে জানত, এই যাত্রার শেষ অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে।

 

ষষ্ঠ পর্ব 

অর্ণব, নীল শিয়াল, বৃদ্ধা এবং অনিরুদ্ধ সেই বিশাল দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটি যেন কোনো বস্তু দিয়ে তৈরি নয়—বরং অসংখ্য গল্পের টুকরো দিয়ে গঠিত। কোথাও মায়ের মুখে শোনা রূপকথা, কোথাও যুদ্ধ থেকে ফেরা মানুষের স্মৃতিকথা, কোথাও আবার শিশুর কল্পনায় জন্ম নেওয়া অসমাপ্ত গল্প।
দরজার মাঝখানে লেখা ছিল—
"যে গল্প মানুষকে মানুষ থাকতে শেখায়, সেই গল্প কখনো শেষ হয় না।" আকাশের শেষ চাঁদটি ক্রমশ অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছিল। বৃদ্ধা বললেন,
"তিনটি চাঁদ তিনটি জিনিসের প্রতীক—স্মৃতি, কল্পনা এবং সহমর্মিতা। এদের যে কোনো একটি হারিয়ে গেলে গল্পের জগত অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে।" অর্ণব জিজ্ঞেস করল,
"তাহলে এগুলোকে কীভাবে রক্ষা করা যায়?" বৃদ্ধা তার দিকে তাকালেন।
"শুধু সত্যকে গ্রহণ করে। আনন্দের সত্য, বেদনার সত্য, হারিয়ে ফেলার সত্য—সবকিছু।"
অনিরুদ্ধ অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। তার হাতে থাকা লণ্ঠনের আলো এখন আর কালো নয়। মৃদু সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ছে।
"আমি ভেবেছিলাম মানুষের কষ্ট মুছে দিলে তাদের মুক্তি দিতে পারব," তিনি বললেন।

"কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি, স্মৃতি থেকে বেদনা মুছে ফেলতে গেলে ভালোবাসার গভীরতাও হারিয়ে যায়।"
তিনি অর্ণবের দিকে তাকালেন।
"তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি আমাকে আমার মেয়ের হাসি মনে করিয়ে দিয়েছ। শুধু তার অনুপস্থিতি নয়।"
অর্ণব মৃদু হেসে বলল, "ভালোবাসা থেকে পালিয়ে যাওয়া যায় না। কারণ সেটাই আমাদের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।" ঠিক তখনই প্রজাপতি-খোদাই করা চাবিটি অর্ণবের হাতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল। ভেতরে কোনো প্রাসাদ, ধনসম্পদ বা রহস্যময় শক্তি ছিল না। সেখানে ছিল একটি ছোট্ট ঘর। একজন বৃদ্ধা একটি শিশুকে গল্প শোনাচ্ছেন। একজন বাবা তার মেয়েকে ঘুমপাড়ানি গান গাইছেন। বন্ধুরা একসঙ্গে বসে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলছে।
একজন মানুষ নিজের ডায়েরিতে দিনের কথা লিখছে। অর্ণব অবাক হয়ে বলল,
"এটাই প্রথম গল্পের উৎস?" বৃদ্ধা হাসলেন।
"হ্যাঁ। গল্পের জন্ম জাদু থেকে হয়নি। গল্পের জন্ম হয়েছে মানুষের একে অপরকে বোঝার আকাঙ্ক্ষা থেকে।"
সেই মুহূর্তে অর্ণব বুঝতে পারল—গল্প শুধু বিনোদন নয়। গল্প মানুষকে একে অপরের আনন্দ, ভয়, ক্ষতি এবং আশাকে অনুভব করতে শেখায়। অনিরুদ্ধ তার লণ্ঠনটি মাটিতে রেখে দিলেন। লণ্ঠনের ভেতরে বন্দি সব আলোর বিন্দু মুক্ত হয়ে আকাশে উড়ে গেল।
আকাশের ভাঙতে থাকা শেষ চাঁদটি ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে উঠল। প্রথম চাঁদ স্মৃতির আলোয় জ্বলে উঠল। দ্বিতীয় চাঁদ কল্পনার রঙে উজ্জ্বল হলো। তৃতীয় চাঁদ সহমর্মিতার উষ্ণতায় দীপ্ত হয়ে উঠল।
নীল শিয়াল হাসল।
"মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা আরেকটু সময় টিকে থাকবে।" সবার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
হঠাৎ দাদুর শেষ স্মৃতিটি অর্ণবের সামনে এসে দাঁড়াল। "আমার কাজ শেষ," তিনি বললেন।
অর্ণবের গলা ভারী হয়ে এল। "আপনি কি চলে যাবেন?" দাদু স্নেহভরে তার মাথায় হাত রাখলেন।
"মানুষ চলে যায়, অর্ণব। কিন্তু তারা যে গল্পগুলো রেখে যায়, সেগুলো বেঁচে থাকে।"
"আমি কি পারব?" অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
দাদু বললেন, "তোমাকে নিখুঁত হতে হবে না। শুধু মানুষদের গল্প মন দিয়ে শুনবে। কারণ প্রত্যেক মানুষের জীবনেই একটু করে জাদু লুকিয়ে থাকে।"
দাদুর অবয়ব ধীরে ধীরে কুয়াশার সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। অর্ণব চোখের জল সামলে দাঁড়িয়ে রইল। এরপর সে আবার নীল বাড়ির করিডোরে ফিরে এল।
সকাল হয়ে গেছে। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঘরে ঢুকছে। সবকিছু যেন আগের মতোই স্বাভাবিক। কিন্তু টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটি কাগজের প্রজাপতি।
আর তার পাশে একটি ছোট্ট চিরকুট—
"গল্পগুলোর যত্ন নিও। কারণ মানুষ অনেক সময় বেঁচে থাকে তাদের বলা গল্পগুলোর মধ্যেই।"
অর্ণব জানালার বাইরে তাকাল। দূরে একটি নীল শিয়ালকে দেখা গেল। সে একবার ফিরে তাকিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। 

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

Sudip Ghosal.jpg

কুয়াশার ভিতর 

নীল বাড়ি

সুদীপ ঘোষাল 

পূর্ব বর্ধমান, পঃ বাংলা

bighouse1.jpg

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

রাধাচূড়া

রাধাচূড়া

অস্মিকা আলম

women edu.jpg

১৮৮৪ সাল। ওড়িশা।
আকাশে ঘন মেঘ। বৃষ্টির ঝাপ্টা শুরু হলো বলে। ত্রিলোচনের ঘর তার সদ্য জন্ম নেয়া লক্ষীর হাসির খিল খিল শব্দে প্রাণে প্রাচুর্য্য হয়ে আছে। আতুর ঘরে স্ত্রী যশোদা ক্লান্ত শরীরে শুয়ে আছে। কন্যার হাসির শব্দ কানে পৌছলেও অবশ শরীর তাতে তাল মেলাতে অপারগ। বৃষ্টির শব্দে টিনের ভাঙা ঘরের চালে নিরবিচ্ছিন্ন শব্দ শুরু হয়ে গেলো। ত্রিলোচন পৌছুলো এই মাত্র বড়বাবুর কাছ থেকে দুই পয়সা জোগার করে এনে। ঘরে যশোদা, ত্রিলোচনের মা, আর পাশের বাড়ির বউরা এসেছে। যশোদার প্রসব বেদনার সময় ওরা থেকেছিলো।
ত্রিলোচন এর এই সংসারে আজ ১২ বছর পর সন্তান এলো। কন্যা সন্তান। সকলেই আশা করেছিলো একটি পুত্রের। পাড়ার লোকের মুখ গোমড়া থাকলেও ত্রিলোচনের মুখে আজ কয়েক যব লম্বা হাসি। আনন্দে তার চোখ ছল ছল করছে। বহুবছরের প্রতীক্ষার ফল ঠাকুর আজ দিয়েছে। পকেটের ধার করা দুই পয়সা দিয়ে আজ ত্রিলোচন সকলকে সন্দেশ খাওয়াবে। বড়াই করে বলবে তার ঘরে লক্ষী এসেছে। বৃষ্টির উঠোনের কাদায় লম্বা লম্বা পা ফেলে ত্রিলোচন চললো সুরেন্দ্র ময়রার দোকানে সন্দেশ কিনতে।

১৮৯৫ সাল
লক্ষীর পাতলা লম্বা কোকড়া চুল আর সারাক্ষণ খিলখিল হাসির মমতা যেন ত্রিলোচনের তুখারের সংসারের একমাত্র হিল্লোল। তার অপরিপক্ক শরীরের চঞ্চলতায় যশোদার ক্লান্তির শেষ নেই। ১১ বছরের বয়সের মেয়ের এই উড়নচন্ডী স্বভাব পাড়ার লোকে কইবে কি? বিয়ে দিবে কি করে? দুমদাম তার অপুষ্ট কাধের উপর বসিয়ে দিতে যশোদা বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। ত্রিলোচন দিনের পর দিন তুখার শ্রম দেয়। টাকার এই সংসারে মানুষের পা না চাটতে পারলে কি পেটে ভাত জুটবে?
এক বিকেলে যশোদা উঠোনে বসে বসে লক্ষীর মাথায় তেল মেখে দিচ্ছে। পাশের বাড়ির সুধীর বউ এসে বললো বড়বাবুর বাড়িতে কি যেন ঝামেলা চলছে। সকল কুলিদের ডাকা হচ্ছে। বড় বৌয়ের নাকি গয়না পাওয়া যাচ্ছে না। যশোদা বলে উঠলো, "পাওয়া যাচ্ছে না তা পাওয়া যাবে বৈ কি! রেখেছে হয়তো কোথাও।" সুধীর বৌয়ের মুখ খানা কেমন যেন করে উঠলো এমনটা ঠেকলো যশোদার কাছে। এরপর আচমকা বলে উঠলো সকলে বলছে এতো এতো ছোটলোক বাড়ির ভেতর যখন তখন ঢুকছে বেরুচ্ছে। সবার তল্লাসী চলবে। যশোদার হৃদপিণ্ড যেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার যোগাড়। সুধীর বৌ খানিক্ষণ যশোদাকে আস্বস্তি দেয়ার ভান করে চলে গেলো।
সন্ধ্যা পাড়ি হয়ে রাত গভীর হতে লাগলো। ত্রিলোচনের খোঁজ নেই। মোমের আলোয় যশোদার শ্যামলা রোদে পোড়া ঘর্মাক্ত মুখের পাথরের মতোন শক্ত হয়ে যাওয়া স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিলো। যশোদা ভাবতে লাগলো সুধীর বৌয়ের বাড়ি একবার যায় নাকি। ওমনিই দরজায় হুলুস্থুল ভঙ্গিতে কে যেন কড়া নাড়লো। সুধীর বৌ তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকেই বললো ত্রিলোচন সহ ৩ জন লোককে বড় বাবুর লোকেরা বেধড়ক মার মেরেছে। ত্রিলোচনকে ওরা ঘাড়ে করে নিয়ে আসছে। মিনিট পনেরো পর উঠোনে গোঁ গোঁ শব্দ শুনতে পেলো যশোদা। ত্রিলোচন অর্ধজ্ঞ্যান অবস্থায় কাত হয়ে পাশের সুধীর কাধে মাথা এপাশ ওপাশ করছে। মুহুর্তের মধ্যেই গল গল করে বমি করে দিলো। যশোদা উঠোনের মাটিতে কুপি ধরতেই দেখতে পেলো ত্রিলোচন রক্ত বমি করেছে। সকলেই হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ত্রিলোচনকে খোপের ভিতর শুইয়ে দিলো। যশোদা খেয়াল করলো ত্রিলোচনের বা হাতের এক পাশ বিশ্রী ভাবে নীলা পড়ে গিয়েছে। যশোদা নিথর ভাবে ত্রিলোচনের পাশে বসে রইলো। জানিনা হৃদয়ের কোন অন্তস্থঃস্থল হতে কেমন এক ডাক এলো, যশোদার সমস্ত সংসার এক অতল গহ্বরে তলিয়ে গেলো।
ত্রিলোচন পরে ছিলো ঘরে সাত দিন। ভয়াবহ অভাবের যশোদার জীর্ণ শীর্ণ সংসারে এক কানাকুড়ি ছিলোনা ত্রিলোচনের চিকিৎসার জন্য। সুধীর পরিবার পাশে এসে দাঁড়ালো। শহর থেকে ডাক্তার এলো। ত্রিলোচনের অপুষ্ট শরীর সেদিনের ঐ নির্মম নির্যাতন নিতে পারেনি। গরীব কুলি, কোনরকমে নুন, ভাত খেয়ে যার জীবন কেটেছে, তার শরীর কি আর জীবনে আহার বলতে আমরা যা বুঝি তা চেখে দেখেছে! কোনোরকমে হাড্ডির সাথে মাংস লেগে আছে। সেই লোকের শরীর এ অমন মার পরলে তার আর কি বাকি থাকে। শহর থেকে ডাক্তার এসেছিলো। ডাক্তার অষুধ লিখে দিয়েছিলো। আর বলেছিলো রোগীর পর্যাপ্ত খাবার প্রয়োজন। পর্যাপ্ত খাবার আর অষুধ দিলে হয়তো রোগী আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। সংসারে ত্রিলোচন বাদে কেউ নেই কামাই করার। কোথায় পাবে এতো পয়সা।
ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেই যশোদাকে এক ফিরিস্তি ধরিয়ে দিলো। যশোদা পড়তে জানেনা। সুধী গেলো সেই শহরে অষুধ কিনতে। অষুদের দাম পড়লো সর্বমোট ২৫ টাকা। সুধী ধার দিয়ে ফিরিস্তির আংশিক অষুধ ত্রিলোচনকে এনে দিলো। আর যশোদা লক্ষীকে বাপের পাশে রেখে রোজ

যেত পাশের গায়ে বামুনদের ঘরে ধান ভাঙতে। মোটে যা টাকা পেতো সেই টাকা দিয়ে ত্রিলোচন এর চিকিৎসার সব অষুধ কেনা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সাত দিনের মাথায় ত্রিলোচন এর শরীর ছেড়ে দিলো। ছেঁড়া বিছানায় পরে ছিল ত্রিলোচনের হাড্ডিসার শরীর। যশোদা এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি সেদিন। পাড়ার লোক বুঝে গিয়েছিলো ত্রিলোচনের সংসার আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। পড়ে ছিল শুধু যশোদাদের ভাঙা উঠোন যে উঠোনে বৃষ্টি নামলেই ছোট্ট পরিবারে আনন্দের বান ভেসে যেতো আর ত্রিলোচনের নিশ্চুপ অনুপস্থিতি। সুধীদের পরিবার ছিল ওদের চেয়ে অবস্থাপন্ন। করুণায় দূর থেকে আহা গো করাই ছিল ওদের শেষ সান্ত্বনা। সেদিন ছিল এমনই এক বর্ষার দিন। দাহ করার জন্য শ্মশানে যাওয়া দায় হয়ে উঠলো যশোদাদের। বৃষ্টি একটু থামতেই এক হাঁটু কাদা ভেঙে ত্রিলোচনের শরীর পাটিতে মুড়িয়ে নিয়ে চললো কাছের এক শ্মশানে। ত্রিলোচন তার আদরের লক্ষীর খিল খিল হাসি পেছনে রেখে চলতে লাগলো না জানি কোথায়। যেখান থেকে আর কোনোদিনও লক্ষীকে তার দুই হাতে ভরে কোলে তোলা সম্ভব হবে না।
এগারো বছরের সোনা লক্ষী ধাপ করে যেন জীবন বুঝতে শুরু করলো। যশোদা নির্বিকার। ঘরে কোন চাল নেই। তিন দিন আগে মাধবীদের বাড়ি থেকে চাল এনে রেখেছিলো। একসাথে অনেকখানি ভাত রেঁধে জল দিয়ে রেখেছিলো। সেই জল দেয়া পান্তা ভাতে আজ তিন দিন পর ফেনা ধরে গিয়েছিলো। ক্ষুধায় লক্ষীর পেট পুড়ছিলো। শৈশবের স্বপ্নের জীবনে কোনদিনও শোক না দেখা মেয়ে বাপের শোক আর পেটের শোক একসাথে বুঝে গিয়েছিল। লক্ষীর স্বভাব যেন লক্ষীর মতোনই। কোন অভিযোগ না করে সে ওই ফেনা ওঠা ভাতই সোনামুখ করে খেয়ে নিল। রাতে যেই শুয়েছে তিন দিনের গন্ধ ওঠা ভাত পেটের ভেতর গিয়ে আর টিকতে পারেনি। হরহর করে সব ফেলে দিলো লক্ষী উঠোনে। যশোদার এবার যেন হুশ ফিরলো। না খেয়ে আছে সেও। যশোদা এক সাদা থান পড়ার ও সুযোগ পায়নি। লক্ষীকে জড়িয়ে ধরে সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগলো। তার আর্তনাদে শুষ্ক ঠোঁট দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছিলো। লক্ষীর ছোট্ট, অবুঝ মনটি পৃথিবীর নির্মম বাস্তবতার এই অনিবার্যতা সেদিন পুরোপুরি ঠাহর করতে পারেনি। সে শুধু জানলো এই ভুবনে তার এই মায়ের আঁচল বাদে আর কোন আশ্রয়ের নিচেই সে আর কোনদিন ঠাঁই পাবে না।
যশোদা চাকরি নিয়েছিলো এক বামুন বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে। বিয়ের কথা কোনদিনই ভাবেনি যশোদা। সকলেই সারাজীবন বলেছে যশোদার গায়ের রঙটা বেশ ময়লা। কিন্তু মুখখানা যে ভারী মিষ্টি। জীবনের আকস্মিকতায় যশোদার সেই মিষ্টি মুখখানা চাপা পরে গেল হাড্ডিসার দেহের নিচে। রোজ সারাদিন কাজ করে যশোদা ক্লান্ত শরীর নিয়েও হন হন করে যাত্রা করত বাড়ির উদ্যেশ্যে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরবে বলে। বেতন ছিলো মাত্র ২ টাকা। তা দিয়ে লক্ষী যশোদার জীবন পার করে দেয়ার মতন চলছিল। বাপ ছাড়া মেয়ের সমাজের নানান কুনজরের ভয় ছিল বলেই হয়তো লক্ষীর বাড়ির বাইরে যাওয়া ছিল একেবারেই নিষেধ। যশোদা প্রতিজ্ঞা করেছিল লক্ষীকে মানুষ করবে। নিজের পায়ে দাঁড় করাবে। পাড়াতেই এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলো লক্ষী। দিন পার হয়ে যেতে লাগলো ত্রিলোচনের অনুপস্থিতির ভয়াবহ যন্ত্রণা যশোদা লক্ষী ভুলে থাকতে চাইতো। পৃথিবী হয়তো কারোর জন্য কিছু থমকে দেয় না। যশোদা ছিল অক্লান্ত পরিশ্রমী। ত্রিলোচনের মৃত্যু শোক তাকে ঘরের আদুরে গৃহিণী থেকে বানিয়ে তুলেছিল পোড়া কয়লার মতোন শক্ত।
ধীরে ধীরে পার হয়ে গেলো পনেরোটি বছর। লক্ষী পা দিয়েছে ছাব্বিশ বছরে। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো যশোদারা। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে একলা নারীদের যে বড্ড ভয়। অভাব অনটনের সংসারে খেয়ে না খেয়ে লক্ষী লড়েছিলো খুব। যশোদা জানতো ত্রিলোচনের আদরের কন্যাকে ঘিরে ত্রিলোচনের স্বপ্নের কথা। ত্রিলোচনের এই আদরের মেয়েটিকে জীবনের ঝড়ের মুখে যশোদা কোনদিনই ফেলে দিতে চায়নি। লক্ষী পড়েছিল খুব।
ধীরে ধীরে পনেরো বছর পাড়ি হয়ে গেছে। উড়নচন্ডী সেই খিলখিল হাসির আদুরে লক্ষী আজ পাড়ার এক হাই স্কুলের শিক্ষিকা। মায়া মাখা সেই মুখখানা হয়ে ওঠেছে আজ প্রাপ্তবয়স্ক এক মহিলার মুখ। যে মুখ দিয়ে সারাক্ষণ হাসির ঝর্ণা বইতো, কচি পাতার মতন নরম ঠোঁট দিয়ে ফুঁ দিয়ে ফুলের পাপড়ি উড়ানো ছিল যার প্রিয় খেলা, আজ সেই মুখ দিয়ে ভারী ভারী কঠিন শব্দে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে লেকচার দেয় সে।
যশোদার বয়স হয়েছে খুব। তার এক সময়কার দৃঢ়, আত্মার জোরে পৃথিবীকে হারিয়ে দেয়ার শরীর আজ বড্ড ভঙ্গুর। সময় যে বড্ড নিষ্ঠুর। কাউকে সে ছাড় দেয়না।
লক্ষী কখনো ত্রিলোচনকে মনে করে না। তার যন্ত্রণার কাতরতায়, চোখের জলে সেই সুদিনের স্মৃতি হয়ে উঠেছে আজ ঝাপসা। শুধু মনে পরে......
এমনই একদিন বিকেলে লক্ষী ফিরছিল স্কুল থেকে। পায়ে হেঁটে হেঁটে রাস্তায় পরে থাকা মরে যাওয়া পাতার মর্মর শব্দের ভেতর দিয়ে মাথা নিচু করে বাড়ির উদ্দেশ্যে চলছিল সে। এমনই এক সময় সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দে পেছন ফিরলো সে। পাশ দিলো সে সাইকেলটিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। লক্ষী দেখলো সামনের এক দোকানে সাইকেলটি থামলো। একজন লোক সাইকেলটি থামিয়ে মেয়ের জন্য খাতা পেন্সিল কেনার জন্য দোকানদারকে তাগাদা দিলো। এগারো বারো বছরের একটি মেয়ে অপেক্ষা করছিল সাইকেলের সামনে। গাঢ় সবুজ রঙা শাড়ি পড়া মেয়েটিকে ভীষণ সুন্দর লাগছিল লক্ষীর কাছে। বাবার সামনে বায়না ধরলো খেলনা এক গাড়ি কিনবে বলে। লোকটি মেয়ের এই বায়নায় জলদি মেয়ের হাতে খেলনা গাড়িটি এনে দিলো। রাস্তার পাশে তক্ষুণি এক রাঁধাচূড়া গাছে বিকেলের দক্ষিণের হাওয়া বয়ে গেল। লক্ষী আকাশের গায়ে কমলা রঙের রাধাচূড়ার মেলে থাকা দেখে চুপ হয়ে গেল। মায়ের কাছে গল্প শুনেছিল লক্ষী রাধাচূড়া যে তার বাপের ভীষণ প্রিয় ফুল ছিল।

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

পৌরুষ

সঞ্জীব চক্রবর্তী

টালিগঞ্জ, কলকাতা  

himadri1.jpg

নায়ক বিক্রম কুমার দীর্ঘ পেশী বহুল হাতে নায়িকা তনুশ্রীর যৌবন দীপ্ত দেহ টেনে নেয় তার চওড়া বুকে – গভীর প্রশ্বাসে তনুশ্রীর স্ফুরিত সুডৌল অধর পাপড়ির মত খুলে যায় –বিক্রম তার নায়িকার স্বপ্নাতীত প্রতিদানে দিশাহারা হয়ে পড়ে --   
শায়ক দীর্ঘশ্বাস ফেলে৷ মেট্রোর সুড়ঙ্গ প্রাচীরে সরে সরে যাওয়া কামরার আলোর প্রতিসরণে অন্য মনস্ক চোখ রাখে, ট্রেন তখন রবীন্দ্র সদন পেরোচ্ছে৷ তার চিন্তায় ঘোরাফেরা করে সদ্য দেখা ফিল্মের বিখ্যাত নায়কের দীর্ঘ পেশী বহুল চেহারা ও রুক্ষ সৌন্দর্য আর তার প্রেম নিবেদনের সাহস। সত্যিকারের পুরুষ সিংহ। হীনন্মন্যতা ঘিরে ধরে তা’কে। হতাশাগ্রস্ত মনে– প্রেমবিহ্বলা নায়িকার প্রেম নিবেদনের সিনেমার দৃশ্য ভেসে ওঠে – নায়িকার তীব্র শরীরী আকর্ষণে হার মেনেছে অসহায় পুরুষ সিংহ।        
আপন মনে মাথা নাড়ে শায়ক –আগুনের মত এমন সর্বগ্রাসী প্রেম নিবেদনের বাস্তবতা সন্দেহ জাগায়৷ তবুও কোনো অতৃপ্ত বাসনার ছোঁয়া লাগে মনে-

“ধুস: একেবারে অবাস্তব যত সব অলীক কল্পনা - সিনেমাতেই সম্ভব!” 
অশান্ত মনকে শান্ত করার চেষ্টা করে শায়ক – ‘আরে! গল্প বা রুপালী পর্দার প্রেম সত্যি হয় নাকি! যত সব অলীক চিন্তা! 

আবার নিজেকে প্রবোধ দেয় শায়ক –

সব মিলিয়ে সে ভাগ্যবান – এই তো চাকরির পরীক্ষায় পাশ করে সাধারণ কর্মচারী হিসেবে বড় সংস্থায় যোগ দিয়েছে। শরীরটা তার রোগা পাতলা হতে পারে কিন্তু কোনো রোগ বালাই নেই। চাকরির দৌলতে কারুর ওপর সে নির্ভরশীল নয়। এই সংসারে তার মুখাপেক্ষীও কেউ নেই, সে ঝাড়া হাত পা। নিজেকে সবার থেকে ভাগ্যবান মনে করে কারণ দিতির মত মেয়েকে বিয়ে করতে চলেছে। আর কি চাই? মনটা খুশিতে ভরে ওঠে শায়কের।   

কিন্তু দিতির কথা ভাবতেই তার মনে কোনে ধূসর ছায়া ঘনিয়ে আসে। তার অবচেতনে লুকিয়ে থাকা কোনো অস্বস্তি মাথা চাড়া দেয়। কিছুতেই সেই অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলতে বা মেনে নিতে পারে না। অস্বস্তিটা হল – দিতির প্রতি তার ভালোবাসা নিখাদ হলেও, কেন জানে না - দিতিকে আজকাল ‘সে ভয় পায়’। 
তার সঙ্গে আলাপ শহরের বই মেলায় – তা প্রায় বছর দু’ই হলো। মনে আছে বন্ধুর বোন দিতিকে প্রথম দেখার দিনটা, তথাকথিত সুন্দরী নয়। ছিপছিপে মেয়েটি, সাধারণ অথচ রুচিসম্মত পোষাক, গর্বিত সুডৌল হংস গ্রীবা৷ ব্যক্তিত্বের সতন্ত্রতা, কথাবার্তার স্নিগ্ধতা তাকে রোমাঞ্চিত করেছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে দিতির পাশে তার নিজের ঘাটতিগুলো ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছিল৷ অস্বস্তির কারণ তার সহজাত ঘাটতি যা আড়াল করে রেখেছিল দিতির প্রবল বাস্তববোধ।     

সিনেমার নায়িকা তনুশ্রী ও দিতিকে পাশাপাশি রাখে শায়ক। না: বন্ধু ও প্রেমিকা হিসাবে দিতির ধারে কাছে আসতে পারে না তনুশ্রী। কল্পনাও করতে পারে না – তনুশ্রীর মত লাস্যময়ী বিক্রমের ছিঁড়ে যাওয়া পাঞ্জাবী রিপু করছে! – এক কথায় অসম্ভব। তনুশ্রী ক্ষণস্থায়ী রঙিন বুদবুদ। কখন মিলিয়ে যাবে কেউ জানে না। 

দিতি বুদ্ধিমতি – জীবনের চলার পথ তার দৃঢ় ও পরিকল্পিত। তার প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে দিতির প্রখর দৃষ্টি ও ভুল ভ্রান্তি ধরিয়ে দেওয়া। এই কয়েক বছরে সে হয়ে উঠেছে তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। দিতি পাশে থাকলে - সে থাকে নিশ্চিন্ত।      
তবুও মনের গভীরে ঘুরপাক খায় – দিতির বাস্তব চিন্তায় যদি কিছুটা রঙিন স্বপ্নের ছোঁয়া থাকত!  

মনে হয় দিতি অতি সতর্কতা আর সাধারণ বোধই তাকে করে তুলেছে অতি বাস্তববাদী। শায়কের মাঝে মাঝে হঠাৎ উচ্ছ্বাস জেগে ওঠে। যেমন সে সামনের পূজোর পরই বিয়ে করতে চেয়েছিল। দিতি তাকে বোঝায়—এত তাড়াহুড়োর দরকার নেই, এক-দু’ বছর আরো অপেক্ষা করা যাক। শায়কের মাইনে আর একটু বাড়ুক। বুঝতে পারলেও তার উচ্ছাসের বেলুন গেল চুপসে। সেবার পুজোর বোনাস পেয়ে, আনন্দে কিনে ফেলেছিল একটি দামী আংটি। দিতি যেন আঁতকে উঠে, জোর করে সেটি ফেরত দিয়ে কিনলো একটা সস্তার আংটি। তার আনন্দ চাপা পড়ে যায় প্রবল বাস্তবতায়। শায়কের আর একটি শখ ছিল নিজের স্কুটার কেনা। কলেজে পড়ার সময় এক বড়লোক বন্ধুর স্কুটারে চালানো শিখেছিল। কলেজের পর সেই শখ চাপা পড়ে যায় মনের গহনে। তবু সে স্বপ্ন দেখে। দিতিকে বলার সাহস হয় নি কোন দিন। দিতির অজানা রয়ে গেছে সেই চাপা স্বপ্নের কথা।

সে মানতে বাধ্য হয় – দিতির প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিখুঁত। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়— দিতি বাস্তবতার শক্ত মাটি ছেড়ে কখনো যদি ভাসতে পারতো রঙিন কল্পনায়।! তার আধিপত্যতার রাস যদি কিছুটা হালকা হত।

তার প্রতিটি ইচ্ছার ভালমন্দের চুলচেরা বিচার এড়াতে সে এখন কিছু কিছু ইচ্ছা গোপন করে, সেই গোপনীয়তা আবার বাড়িয়ে তোলে দিতির প্রতি তার অপরাধ বোধ।

অফিসের কাছেই ছিল এক নামী কোম্পানির স্কুটারের শো রুম৷ যেতে আসতে ঝকঝকে বাহন গুলোর মধ্যে ছিল একটি হলুদ রঙা স্কুটার৷ দেখে মনে হত কোনদিন পয়সা হলে সে কিনবে ওই স্কুটারটা৷ কল্পনায় ভেসে উঠত সেই স্কুটার নিয়ে কোলকাতার রাজপথে হু হু করে ছুটে চলেছে, স্বপ্নের তরতাজা কালো ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ছুটে চলেছে রাজপথের সম্রাটের মত। না: কল্পনার স্কুটার হয়ত দুরাশাই থেকে যাবে।

হঠাৎই এক দিন জানতে পারে চাকরিতে যোগদানের সময় থেকে তার মাস মাইনে কিছুটা বেড়েছে এবং সেই বকেয়া অংশ এক সঙ্গে বেশ কিছুটা থোক টাকা হয়ে হাতে আসতে চলেছে। মনের মধ্যে বহু কালের চাপা পড়া স্বপ্নটা জেগে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে মন জুড়ে ঘনিয়ে ওঠে সেই চিন্তা।  

প্রথমে মনে এল হঠাৎ পাওয়া টাকার খবর দিতিকে আগে জানানো কিন্তু পরক্ষণে মন জানান দিল সে কী বলবে – 
“ভবিষ্যতের জন্য ওই পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা বকেয়া টাকাটা ব্যাঙ্কে ফিক্সড করাই ঠিক হবে, কি বল?”

তখন তার অনেক দিনের শখ পূরণের সাহস হবে না। কিন্তু মনে জেগে উঠেছিল ছেলেমানুষি জেদ – অফিসের ওপরওলার কলমের একটা আঁচড়ের দৌলতে, অবিশ্বাস্য সৌভাগ্য যেন তাকে বার্তা দিল – 
“এই টাকাটা তোমার নিজের – যেমন খুশি খরচ করো।” 

শায়কের দুর্বল মন এবার বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, এখন সে – বড়লোক না হলেও – অন্তত একসাথে পাওয়া এমন অঙ্কের টাকার মালিক হবে, যা তার স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করবে। সেই হলুদ রঙা, চকচকে স্কুটারটার দাম যদি সে এখন দিতে পারে, এই প্রথম কিছুর মালিক হবে শায়ক।

নিজের মনে বলে ওঠে –

"ধুর! জীবনে মাত্র একবার নিজের ইচ্ছে মত কাজ করব। পরে দিতি কি বলে, দেখা যাবে।" 
দিতিকে টাকা পাওয়ার কথা না জানানোই হল তার প্রথম অপরাধ।

কয়েক দিন পর এক সকালে ঘুম থেকে উঠে শায়কের চোখে আলো ঝলমল আকাশ যেন নিয়ে এল এক অজানা উদ্দীপনার রেশ। সমস্ত পৃথিবীটা যেন ক্ষণিকের তরে এলো তার হাতের মুঠোয়।

সে দিন অফিস আসার পথে মনে সাহস এনে শায়ক ঢুকে পড়েছিল সেই কাঁচে ঘেরা স্কুটারের শো রুমে। —যেখানে ঝকঝকে চকচকে নানা রঙে গর্বিত স্কুটারগুলো সার বেঁধে যেন দাঁড়িয়ে আছে তার প্রতীক্ষায়। নিজেকে অবাক করার মত এক বেপরোয়া ভঙ্গিতে সেই হলুদ স্কুটারটা কিনে ফেলে । মনে হল স্কুটার কেনাটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ!

এখন চার দিন হলো স্কুটারটা তার নিজের- কোনো বড়লোক বন্ধুর নয়। বাইরে থেকে শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছে শায়ক। দিতিকে এখনও কিছু জানানোর প্রয়োজন বোধ করে নি। তাকে স্কুটার কেনার কথাটা না জানানো তার দ্বিতীয় অপরাধ। 

এই কয়েকটা দিন দুপুরের অবকাশে এক অফিস বন্ধুর কাছে সে স্কুটার চালানো ঝালিয়ে নিচ্ছে। ক্রমশ যেন আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে শায়ক।
সামনের সপ্তাহে কিসের একটা ছুটি আছে। দিতি বলেছিল, ওই ছুটির দিনটায় তার বাড়িতে যেতে। বাড়ির কোনো অনুষ্ঠানে আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে শায়কের আলাপ করাবে৷ ইতিমধ্যে নিজের ইচ্ছা মত ওই নতুন স্কুটার নিয়ে একটা দিন কাটানোর পরিকল্পনা ছকে ফেলেছিল শায়ক৷ সে একেবারে বোকার মত মিথ্যে বলেছিল— এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে সে ওই দিনটা কাটাবে তবে রাতের দিকে ওদের বাড়ি আসার চেষ্টা করবে। দিতি একটু অবাক হয়েছিল কারণ শায়কের কোনো নিকট বন্ধু নেই সে জানে। তার মনের ভেতর চাড়া দিয়ে ওঠে অপরাধবোধ৷ এই মিথ্যেটা ছিল তার তৃতীয় অপরাধ। না: ওই দিনটা আগে নিজের মত কাটিয়ে দিতিকে জানাবে – নিজেকে সান্তনা দেয় শায়ক৷   

সেই কাঙ্খিত ছুটির আগের রাত। কাল সকালে তার প্রিয়তমা স্কুটার নিয়ে ঘুরবে ছুটির শহরের রাস্তায়৷ দিতিকে সে মিথ্যে বলেছে, আর দরকার হলে আবারও বলবে। তার শরীর আর মন দুটোই এখন নতুন স্কুটারের দাস হয়ে গেছে। এই স্কুটার হল তার না পাওয়া রোম্যান্স, অ্যাডভেঞ্চার, যা স্বপ্নে এতদিন চেয়েছিল কিন্তু কখনও পাবে আশা করেনি। আগামীকাল প্রিয় স্কুটার নিয়ে পথে বেরোবে। ধুলোয় ভরা বাতাসে সাঁতার দিয়ে ছুটে বেড়াবে এই শহরের পথে পথে, কোলাহল আর ব্যস্ততার বুক চিরে চলে যাবে শহরের বাইরে—সামনে থাকবে শুধু  ছুটির সকালের খোলা রাস্তা…
আধ ঘুমে রাতটা পার হয় হরেক কল্পনায়। শরতের ঝকঝকে সকালের আকাশ নিয়ে এল আগাম না জানা এক শিহরণ। ভাবে “ওইসব বাজে সিনেমা দেখে আর রোমাঞ্চের স্বাদ নিতে হবে না”।

আজ তার জীবনের প্রথম এ্যাডভেঞ্চার, দিতির সঙ্গে প্রথম দিনের দেখার হওয়ার থেকেও রোমাঞ্চকর। আজ তার স্বপ্নের দিন—ঝকঝকে সোনালী সকাল, সাদা মেঘ ভেসে যাওয়া নীল আকাশ, আর সূর্যমুখি ফুলের মতো হলুদ রোদ। পরম স্নেহে হাত রাখে হলুদ স্কুটারে।
দুঃসাহসী অভিযানে বেরিয়ে পড়ে শায়ক। রেস কোর্সের রাস্তার রেড সিগনালে হোঁচট খাওয়ায় সার্জেন্টের ভ্রুকুটি, ‘মা’ ব্রিজে ওঠার আগে ঘটল আর এক বিপত্তি। অনভ্যাস গিয়ারের শব্দে স্কুটার আপত্তি জানায়, ব্রেকের বারবার ঝাঁকুনিতে স্কুটার হল টালমাটাল, আশপাশের গাড়িগুলোর থেকে ভেসে আসে রাজ্যের টিপ্পনি, গালমন্দ। নতুন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর শায়ক ভ্রু-ক্ষেপ করে না। একজন নতুন হিসেবে সে খুব খারাপ চালাল না, নিজের কৃতিত্বে গর্বিত হয়ে ওঠে শায়ক। কিছুক্ষণ পরেই সে পৌঁছে গেল ইষ্টার্ন বাইপাসে। ছুটির দিনে রাস্তায় গাড়ি ছিল কম। শরীরে ঝোড়ো বাতাসের ঝাপটায় শিহরিত হয়ে, নতুন স্কুটারের মালিকানার গর্বে, গতিমান বাহনের উপর বসে সে মাতাল হয়ে ওঠে৷ দুরন্ত দামাল ঘোড়ার রাস হাতে, শরতের পৃথিবীর বুক চিরে সে ছুটে চলে দুরন্ত গতিতে, থরথরিয়ে কাঁপে জীবন্ত হয়ে ওঠা যান্ত্রিক বাহন। বাঁধন ছাড়া উল্লাসে ভরে উঠল শায়কের মন, আকাশ পানে চেয়ে প্রাণ খোলা হাসিতে বিদ্রুপ ছুঁড়ে আঘাত হানে নায়ক বিক্রমের পৌরুষে। 
কালো পিচ ঢালা রাস্তায় আপন মনে ছুটে চলা এত দিন শুধু ছিল কল্পনায়। নিজের মধ্যে নতুন জেগে ওঠা আত্মবিশ্বাস উপভোগ করে শায়ক। দুপুরে খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ে দুধ সাদা ঘন কাশের ঝোপে ঘেরা এক পুরনো ধাঁচের খোড়ো চালার ধাবায়, সামনের পরিস্কার মাটি নিকানো আঙ্গিনা, দড়ির খাটিয়ায় চিৎ হয়ে শুয়ে তাকিয়ে থাকে উন্মুক্ত নীল আকাশে, চারপাশের চাষের সবুজ ক্ষেত ও শ্বেত কাশের জঙ্গলের মাঝে এক অদ্ভুত জগত, যেন স্বপ্নের মতো৷ এমন দৃশ্য সে আগে কখনও কল্পনাও করেনি। ধাবার চত্বরে অপেক্ষা করা নিজের হলুদ স্কুটার, তাকে এই জগৎ উপহার দিয়েছে।
সূর্য কখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে খেয়াল নেই। অবশেষে গভীর অনিচ্ছা উঠে পড়ে৷ এক দিকে দিতির কাছে পৌঁছনোর তাগিদ আবার আর এক দিকে এই ক্ষণিক স্বাধীনতার আবেশ--

অন্ধকার রাস্তার ধারে টিম টিমে আলো, জমে থাকা উনুনের ধোঁয়ায় ঢাকা ছোট্ট চা’এর দোকানে দাঁড়িয়ে পড়ে, ঘড়িতে তখন সন্ধ্যে সাতটা পেরিয়েছে – 

মনের ঝড় ওঠে –

“কী আসে যায় যদি সে মাঝ রাতের আগে না পৌঁছায়? কী আসে যায় যদি সে আর কখনও ফিরে না যায়?” এই মুহূর্ত এই পরিবেশ থেকে চলে যেতে মন চাইছে না শায়কের।
দিতির কাছে পৌঁছলে অপেক্ষা করে আছে এত দেরির জন্য অনিবার্য জবাবদিহি আর এক গুচ্ছ অভিযোগ …। মনটা কেমন বিরূপ হয়ে ওঠে। 

আবার স্কুটার নিয়ে চলতে শুরু করে— মাথায় ঘুরছিল তার মত গতানুগতিক দিন কাটানো সাধারণ মানুষের মন ছুঁয়ে যাওয়া আজকের হঠাৎ পাওয়া সারা দিনটা - যদি আর একটু বড় করো নেওয়া যেত দিনের সময়টা? 

হাইওয়ের উপর ছড়িয়ে পড়েছে অন্ধকার, দূরে দূরে রাস্তার লাইটের ম্লান আলো যেন নিস্তব্ধতার মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। পাশ দিয়ে দ্রুত যাওয়া ট্রাকের ধাক্কায় বাতাসে ঢেউ তোলার শোঁ শোঁ শব্দ, হেডলাইটের জোরালো আলোয় চোখ ধাঁধায়। শায়ক মজ্জাগত ভীরুতায় স্কুটার চালাচ্ছিল খুব সতর্কতায়। মনে সবসময়ই ভয় জাগিয়ে তুলছে—চারপাশের অন্ধকারের অপরিচিত বা এই অচেনা পরিস্থিতি- অতি পরিচিত কারুর আশ্বাস বাণীর অভাব বোধ জাগে তার দুর্বল মনে। 

হঠাৎই দেখে প্রায় অন্ধকার রাস্তার ধারে বনেট উঠিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বড় গাড়ি। পাশে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা, আর চারপাশে কিছু সন্দেহজনক চেহারার ছেলে ঘুরঘুর করছে। ট্রাকের আলোয় মুহূর্তের জন্য স্পষ্ট হয় মহিলার মুখ—ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে।

শায়কের বুক ধক করে ওঠে। তার মন বলছে কি দরকার এই সব ঝামালায় জড়ানো কিন্তু অদ্ভুত ভাবে তার ভিতরে যেন এক ঝড় উঠল। সে স্কুটার থামাল। হেডলাইটের আলো মহিলার মুখে পড়তেই তিনি প্রায় দৌড়ে এসে কাঁপা গলায় বলে—

“আমার গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে… আমাকে একটু হেল্প করুন। এরা অনেকক্ষণ ধরে আমাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে—বাঁচান প্লিজ।”

মহিলার অসহায়তায় শায়কের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। পালিয়ে থাকা স্বভাবের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সে হঠাৎই বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে ছেলেগুলোকে সরে যেতে বলে। তার কণ্ঠে এমন জোর ছিল যে ছেলেগুলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে রাস্তার ওপারে সরে গেল। এই কড়া কথাগুলো কি সত্যিই সে বলল? শায়ক নিজেই অবাক হয়—

সে দৃঢ়তার স্বরে মহিলাকে সান্তনা দেয়—
“চিন্তা করবেন না। ওরা চলে গেছে। তাড়াতাড়ি স্কুটারে উঠে পড়ুন।”

মেয়েটি স্কুটারে উঠে কৃতজ্ঞতা জানায় --
“আপনি এই সময় না এলে না জানি কি হত…” 
মাত্র দু তিন মিনিটে সমস্যাটা সরল হয়ে গেল। 

শায়ক এবার স্কুটার নিয়ে দ্রুত এগোতে গিয়ে মাথা গুলিয়ে ফেলে। অ্যাক্সেলেটর আর ব্রেকের মধ্যে গুলিয়ে গিয়ে স্কুটার উল্টে যাওয়ার মত অবস্থা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত মহিলা নিজের ভয় ভুলে তাকে প্রাণপণে সাহস জোগাতে চেষ্টা করে। উৎসাহ দেওয়া কথায় শায়ক খুঁজে পায় দিতির পরিচিত আশ্বাসের আভাস, সে সংযত হয়ে ওঠে। হলুদ স্কুটার আবার গুনগুন করে সঠিকভাবে এগিয়ে চলে।

অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে চলে স্কুটার। চারপাশে নিস্তব্ধ, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে যেন এক নতুন আলো জ্বলে ওঠে—মানসিক শক্তির আলো। স্বভাব ভীতু শায়কের মনে জন্ম নিল এক অচেনা শক্তি, সে যেন মুহূর্তের জন্য সিনেমার নায়ক বিক্রমের সমকক্ষ হয়ে ওঠে।

মহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ছিল, তারপর ধীরে ধীরে বলল—

“আপনার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম --৷”

শায়ক হেসে ফেলে, একটু লজ্জিত হয়ে বলে—

“না… আমি আসলে খুব ভীতু মানুষ। আজ কীভাবে যেন সাহস পেলাম।”

মহিলা ধীরে ধীরে বলে -
“সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়। ভয়কে জয় করা। আজ আপনি সেটাই করেছেন।”

শায়কের মনে এই কথাগুলো যেন তার ভিতরে নতুন এক আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। সে বুঝল, মানুষ কখনো কখনো নিজের ভেতর চিরকালের লুকিয়ে থাকা অচেনাকে আবিষ্কার করে— আজ সারা দিনে নিজেকে সে সঠিকভাবে খুঁজে পেয়েছে। শায়কের মন এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে যায়—তার নিজের মধ্যেও একজন নায়ক ঘুমিয়ে ছিল সে টের পেল। কিন্তু ভেতরে চলছিল দ্বন্দ্ব। নিজেকে জিজ্ঞেস করে - “আমি কি সত্যিই বদলেছি? নাকি এটা  মুহূর্তের আবেগ?”

মহিলার কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল, এবার স্পষ্টভাবে।
“আপনি ঠিক আছেন তো?”

শায়ক ধীরে মাথা নাড়ে কিন্তু একেবারে নতুন পরিস্থিতি, মনের মধ্যে জন্ম দিয়েছে এক স্তম্ভিত শূন্যতা আর নিজের দৃঢ় সিদ্ধান্ত - আর শুধু পালিয়ে নয়, এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকা শিখতে হবে।
যশোর রোড ছেড়ে বাঁক নিল ইষ্টার্ন বাইপাসের রাস্তায়। খেয়াল হয়, ঘটনা পরম্পরায় মহিলাটিকে, কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছে! এমন কি মহিলাকে ভালো করে দেখেও নি। অকুস্থল থেকে এনাকে বাঁচিয়ে এতটা আসার পর তার হুঁশ ফেরে। এয়ারপোর্ট যাওয়ার রাস্তার ধারে স্কুটার থামিয়ে প্রায় মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে পড়ে।
মহিলাটি আবার বলেন - “আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন?”

শায়ক যেন শুনতে পেল না। সে তখন এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তার ভেতর তখন চিন্তার গুঞ্জন:

“আমি কি সত্যিই ওই জটিল পরিস্থিতি সামাল দিলাম? এতদিন তো সবকিছু এড়িয়ে চলেছি, ভীরু ছিলাম। হঠাৎ এই সাহস কোথা থেকে এলো?”

“এটা কি নিজের শক্তি, নাকি কোনো অজানা প্রেরণা আমাকে চালিত করছে?”

“যদি আবার সেই পুরনো ভীরুতায় ফিরে যাই?”

তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবী যেন থেমে গেছে। বাইরের শব্দ, মহিলারটির কণ্ঠস্বর—যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে। শুধু নিজের মনের প্রশ্নগুলোই তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
এর মধ্যে কোনো গাড়ির হেডলাইটের আলো এসে পড়ে মহিলারর মুখে। শায়কের নিঃশ্বাস আটকে যায়। তার অতি সাধারণ জীবনে, তারই মত অতি সাধারণ পরিচিতদের মধ্যে এত অভিজাত মহিলা দেখে নি। পোষাক-আষাক বেশ দামী মনে হল, সঙ্গে সঙ্গে মন পড়ে সেই খারাপ হয়ে যাওয়া বিশাল দামী গাড়িটা। 

এবার স্কুটার স্টার্ট দিয়ে এগোতে গিয়ে একদিকে টাল খেতে, মহিলাটি প্রায় পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে ওঠেন। হাসি ছিল তাঁর মতোই অপূর্ব।

‘বুঝতে পেরেছি আপনি স্কুটার খুব বেশি দিন চালাচ্ছেন না। আমাকেই চালাতে দিন। এই রাস্তায় গাড়ির ভিড়ে চালানো কঠিন, আপনি পেছনে বসুন, এখন যেখানে যাব, বেশী রাস্তা নয়, আমি নিয়ে যাচ্ছি।” 
শায়ক অবাক হয় মহিলার স্কুটার চালানোর দক্ষতায়। সেই সঙ্গে তার দ্রুতবেগে বেপরোয়া চালানোয় সে ভয় পেয়ে তাঁর কাঁধ শক্ত করে ধরে। 

তিনি হো হো করে হাসতে হাসতে বলেন- 
“ভয় পেয়ে গেলেন! আমার জোরে চালাতে ভালো লাগে। চিন্তা করবেন না, আমি ছোট থেকে গাড়ি বা স্কুটার চালাতে অভ্যস্ত।” 
স্কুটার হঠাৎ বাঁক নিল নিউ টাউনের রাস্তায়। দ্রুত চলা গাড়িগুলোকে নিপুণ হাতে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পাশ কাটিয়ে ছুটে চলল স্কুটার। সত্যিই ভালো চালায়, কিন্তু বড়ই ঝুঁকি নিচ্ছে। শায়কের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

কিছুক্ষণের মধ্যে স্কুটার নিউ টাউনের বিখ্যাত এক হোটেলের পোর্টিকোয় দাঁড়াতে শায়ক একটু ঘাবড়ে যায়। সে জীবনে কখনো এদিকে আসে নি- আর এই হোটেলে আসা সে স্বপ্নেও কখনো ভাবে নি। নিজের পোশাকে নজর পড়ায় বেশ অস্বস্তি তে পড়ে। খবরের কাগজে এই হোটেল নিয়ে অনেক খবর পড়েছে আর জানে সমাজের উঁচুতলার মানুষদেরই এখানে আনাগোনা। তার অস্বস্তি চরমে পৌঁছয়। 

আড়ষ্ট শায়ক হোটেলে ঢুকতেই আরো আশ্চর্য হয়। হোটেলের কয়েকজন কর্মচারী দৌড়ে এসে মহিলাকে এমন একটি নামে আপ্যায়ন করল সে চমকে ওঠে কারণ ওই নামটা সে দেখেছে খবরের কাগজের সিনেমার পাতায়। তার মাথা ঘুরছিল। সেই নায়িকার সৌন্দর্য ও সাহসী অভিনয় দক্ষতার উচ্ছাসিত প্রশংসা সে পড়েছে। আর এক জন বিখ্যাত চলচ্চিত্র তারকার সঙ্গে তার বাগদানের খবর সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। শায়ক রুমালে কপালের ঘাম মোছে।

সুন্দর নীল ইউনিফর্মে সজ্জিত মেয়েরা হোটেলের ক্যাফের একদিকে মেজে থেকে সিলিং অবধি কাঁচে মোড়া জানলার পাশের টেবিলে বসায়। সাধারণ মানুষ শায়কের মনে হয় এগুলোই যেন দ্রুতগতির জীবনের প্রতীক। 

কফির কাপ হাতে নায়িকা অতি পরিচিতের মত অনর্গল কথা বলে যেতে থাকেন – শায়কের মন তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে অলীক স্বপ্নের দেশে – হঠাৎ শোনে নায়িকা বলে চলেছেন ----

“------আপনি হয়তো বুঝবেন কি না জানি না। একই জিনিস বারবার করতে করতে মানুষ একসময় ক্লান্ত হয়ে যায়—সব সময় একই রকম পথে জীবনটা ছুটে চলেছে নিজেকে হরেক মুখোসের আড়ালে ঢেকে ও মনকে সরিয়ে রেখে। জানেন শেষে সব কিছুর সঙ্গেই মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আজ দুপুর থেকে মনটা ভীষণ ছটপট করছিল, পালিয়ে যেতে ইচ্ছে জেগে ওঠে। সাতপাঁচ চিন্তা না করে ড্রাইভার না নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। আপন মনে বহু দূর চলে গেছিলাম। মনে হয়েছিল আর যদি না ফিরি! কিন্তু বিকেল হয়ে যেতে ফেরার পথ ধরলাম। ফিরতি পথে হল বিপত্তি। আপনি ঠিক যেন অরণ্যদেবের মত হাজির হয়ে আমাকে বাঁচালানে। 
স্বপ্নময় হাসির সঙ্গে তাঁর চোখ যেন জনবহুল ক্যাফে থেকে দূরে কোথাও হারিয়ে গেল।
শায়ক অবাক হয়ে চেয়ে থাকে – সে ভাবছে তার সামনে বসে এমন একজন মহিলা, যাঁর ভেতরের মুচড়ে ওঠা যন্ত্রনার ছায়া জড়ানো সৌন্দর্যও যে কোনো মানুষকে মোহিত করবে। এনার সৌন্দর্য নেশা ধরায় কিন্তু চটুল নয়। নিজের মনে মাথা নাড়ে শায়ক। নায়িকার পীড়াপীড়িতে তার নতুন স্কুটার কেনা থেকে শুরু করে সারা দিনের ঘটনা বলে ফেলে। 
নায়িকা সব শুনে হো হো করে হেসে ওঠেন –
“তা’হলে আজ সারাটা দিন আমরা দু’জনে প্রায় একই ভাবে উদ্দেশ্যহীন পথে পথে ঘুরেছি, কি বলেন?” আবার তাঁর হাসির লহর ওঠে।

এরপর শায়ক খেয়াল করে কফি শপে বসা মানুষ জনের একটানা গুঞ্জন হঠাৎই যেন স্তিমিত হয়ে এল, লক্ষ্য করে টেবিলে বসা ছেলে মেয়েদের সবার চোখ স্থির হয়ে আছে কফি শপের ভিতরে আসার দরজায়। পর মুহূর্তে হল জুড়ে শুরু হয়ে গেল নানা কন্ঠের ফিসফিসানির লহর। দেখে দৃপ্ত পদে এগিয়ে আসছেন দীর্ঘ পেশী বহুল নায়কোচিত  চেহারার একজন, ঠিক যেন সিনেমায় দেখা সেই বিক্রম কুমার। ধীরে ধীরে তিনি এগিয়ে এলেন তাদের টেবিলের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর চারপাশ জড় হল রঙিন প্রজাপতির মত এক ঝাঁক তরুণী৷ তাদের বলয় বৃত্ত হয়ে নায়ক এসে বসেন শায়কদের টেবিলে। 

নায়কের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ঘুরে যায় নায়িকার পাশে বসা শায়কের দিকে- নায়িকা উচ্ছাসিত গলায় তখন বলে যান আজ সন্ধ্যে থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনার পরম্পরা - “জানো, শায়ক আজ ওই সময়টা যদি না এসে পড়ত – কি যে হত ভাবতেই ভয় করছে।” শায়ক তখন বোঝে এই নায়কের বাগদত্তা হলেন- তার আজকের সন্ধ্যার নায়িকা। পিঠ চাপড়ে নায়কের আরো এক কফির অফার এড়িয়ে শায়ক উঠে পড়ে। নায়িকা বলেন – “সে কি এখনি চলে যাবেন? ঠিক আছে চলুন আপনাকে গেট অবধি পৌঁছে দিয়ে আসি।      
স্বপ্নাবিষ্ট শায়ক নায়িকার পাশে পাশে আড়ষ্ট পায়ে এগিয়ে চলে। অনুভব করে কফি শপের মানুষদের অনুসরণিত কৌতূহলী  দৃষ্টি, তার জড়তা আরো বাড়িয়ে দেয়৷ হোটেলের পার্কিং লটে হরেক নামীদামী গাড়ির ভিড়ের এক কোনে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার নতুন হলুদ স্কুটার। 
স্কুটারে পরম স্নেহে হাত রেখে নায়িকা আচমকা শায়কের হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলেন – 
“আপনার কাছে চিরকালের জন্য কৃতজ্ঞ রইলাম।” 

হলুদ স্কুটার ঝড়ের মতো ছুটে চলে। পেছনে পড়ে থাকে কুয়াশা ঘন শহরের উপকণ্ঠে সম্ভ্রান্তদের নতুন টাউনশীপ৷ মিঠে ঠান্ডা বাতাস, আর সেই টাউনশীপের অজানা পথ। বাতাসে মিশে ছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা—যেন জীবনের সব জড়তা সরিয়ে নতুন এক পথে পা রেখেছে সে।

শায়কের চোখে ঝলমল করছে আত্মবিশ্বাসের আলো। গতকাল পর্যন্ত সে ছিল একেবারে সাধারণ মানুষ—চুপচাপ, ভীরু, নিজের স্বপ্নকে লুকিয়ে রাখা এক অতি সাধারণ কর্মচারী। কিন্তু আজ সে অন্য কেউ। এখন তার হাতে উদ্দাম হলুদ  স্কুটার, সামনে খোলা রাস্তা—তার চোখে জ্বলে আগুনের দীপ্তি।

বোধহয় মুহূর্তের সাহসই তাকে বদলে দিয়েছে। সে এখন নিজের গল্পের নায়ক।

আজকের দিনটা ছিল যেন রোমান্স আর অ্যাডভেঞ্চারের! সত্যি কি রোমান্স!

রাত প্রায় বারোটার ঘরে। মধ্য কোলকাতার প্রায় ঘুমন্ত ফ্ল্যাটে ঢুকল শায়ক, মুখে আত্মবিশ্বাসের হাসি—

“একটু দেরি হয়ে গেল।”

অতিথিরা চলে যাওয়ার পর দিতি খাওয়ার টেবিল পরিস্কার করছিল৷ একটু কাষ্ঠ হেসে ঠান্ডা গলায় বলে -
“তোমার সেই বন্ধুর সঙ্গে সারাদিন ভালো কাটল তো?” 

শায়ক এবার দৃঢ় স্বরে বলে –

“এখন বেশ রাত হলেও কিছু বলার জন্যে চলে এলাম।” 

শায়কের কথায় আজ মানসিক দ্বিধার ছোঁয়া নেই --

“বন্ধুর কাছে যাওয়ার কথাটা ছিল মিথ্যে। আর অফিসে কাজে যোগ দেওয়ার সময় থেকে বেড়ে যাওয়া এই মাস অবধি মাইনে এক সাথে পেয়েছি৷ এই খবরটা তোমায় পরে জানাব ঠিক করেছিলাম কারণ জানতাম বলবে টাকাটা ব্যাঙ্কে জমা রাখতে। তাই তোমায় না জানিয়ে অনেক দিনের শখ মেটাতে একটা স্কুটার কিনেছি, সেই স্কুটার নিয়ে আজ ঘুরে বেড়ালাম কারণ আবার কবে এমন ছুটি পাব জানি না৷ আর তুমি জানলে আমাকে যেতে দিতে না। 

“ওহ!” দিতির আশ্চর্য হয় -!
দিতি টেবিল মোছার ঝাড়ন হাতে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে – কিন্তু ভ্রু একটু কুঁচকে যায়।
“সারা দিন কাটালে কোথায়? খাওয়া দাওয়া কোথায় হল”? 

“ভোজনং যত্র তত্র – বুঝলে প্রিয়ে! আর পথে পথে লাগাম হীন চলার কি আনন্দ – ” শায়কের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা মন খোলা হাসির শব্দে দিতির বাবা মা ঘরের বাইরে চলে আসেন। দিতির হাতে ধরা ঝাড়ন মেজেতে পড়ে যায় – 

‘মানুষটা কি সত্যিই শায়ক? ওই জোরালো হাসি! আর এমন বেপরোয়া কথা’!

দিতি হাল ছেড়ে বসে পড়ে চেয়ারে। আত্ম প্রত্যয়ে ভরপুর শায়ক তার কাছের চেয়ার ধরে দাঁড়ায় - 

“দ্যাখ! আর বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে পারব না। আমার মাইনে এখন যথেষ্ট ভালো, আর আগামী মাসেই বিয়ে করতে চাই।” 

দিতি অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। তার চোখে বিস্ময় আর প্রশংসা এখন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। দিতির সেই দৃষ্টি শায়কের মনে ঝড় ওঠায়। এই নতুন দৃষ্টিতে সেই বিরক্তিকর মাতৃসুলভভাব আর নেই। এটাই সে ভেতর ভেতর চাইত, এই তার নারী।
“হ্যাঁ বা না এখনই বলতে হবে?” এক পা এগিয়ে এসে বলে শায়ক। 

“এ্যাঁ -হ্যাঁ—হ্যাঁ,” আড়চোখে বাবা মা’র দিকে তাকিয়ে দিতি তোতলাতে থাকে –

“কিন্তু, শায়ক, কী হয়েছে বল দেখি? তোমায় আজ কেমন যেন অন্য মানুষ মনে হচ্ছে।”

“হ্যাঁ ঠিক ধরেছ” মুখে চওড়া হাসি নিয়ে দিতিকে শক্ত হাতে নায়ক বিক্রম কুমারে মত জড়িয়ে ধরে শায়ক৷ এবার সেই নায়কের মত বলে – 
“রাত আর এমন কি হয়েছে, চল এক চক্কর ঘুরে আসি আমাদের ওই হলুদ রঙা নতুন স্কুটারে।”
দিতি নিঃশব্দে হেসে বলে “চল”৷ 

পৌরুষ

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

কেক চোর
NupurRoychoudry.webp

কেক চোর

নুপূর রায়চৌধুরী

Project 118.jpg

লিনা একটা স্কুলে মাস্টারি করে, ঘরে তার দিদিমা সুধারানি ছাড়া আর কেউ নেই। সুধারানির বয়স সত্তর পেরিয়ে গেলেও ছেলেমানুষের মতোই সময় সময় খুব অবুঝপনা করেন। কথাটা কিন্তু একটুও বাড়িয়ে বলা নয়, হরি ডাক্তার এর অকাট্য সাক্ষী। সুধারানির মধুমেহ রোগটা বাড়াবাড়ি রূপে ধরা পড়তেই ডাক্তার মিষ্টি খাওয়া একদম নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন, তা তাতে সুধারানির বেজায় রাগ হয়েছে, লুকিয়েচুরিয়ে মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা তার এতটাই বেড়ে গেছে যে ওসব জিনিস রান্নাঘরে জায়গামতো লুকিয়ে রাখতে গিয়ে লিনাকে রীতিমতো মাথা খাটাতে হয়। কিন্তু লিনা যতই লুকোছাপা করুক না কেন, সুধারানি ঠিক শেষ পর্যন্ত তা বের করে ফেলেন, আর ফাঁকতালে তা গলাধঃকরণ করেন, আবার বেমালুম সেকথা চেপে যেতেও কসুর করেন না। লিনা তাই ওসব আনা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। 

কিন্তু সেদিন হলো কী, পাশের বাড়ির কবিতার জন্মদিন। সে আবার লিনার হাতে তৈরি আপেল-কেক খেতে বড়োই পছন্দ করে। লিনা তাই ঠিক করে যে, ভোর রাতে উঠেই ছোট্ট একটা কেক কবিতার জন্য বানিয়ে নেবে। সুধারানি টের পাবেন না, কারণ তিনি তো তখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাকেন। 

যেই ভাবা সেইমতো কাজ। লিনা তড়িঘড়ি করে কেকটা বানিয়ে রান্নাঘরের একদম নিচের তাকে, চুপড়ি ঢাকা দিয়ে সেটা সরিয়ে রেখে স্কুলে চলে যায়। মনে মনে ঠিক করে নেয় যে, স্কুল থেকে এসে সেটা নিয়ে কবিতাদের বাড়িতে ঢুঁ মেরে আসবে। 

স্কুল থেকে ফিরে, হাতমুখ ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকতেই লিনা দেখে যে, সুধারানি রান্নাঘর লাগোয়া ডাইনিং টেবিলের কাছে বসে প্লেটে ক’রে কী যেন কী একটা খাচ্ছেন, লিনাকে দেখেই তিনি ব্যস্তসমস্ত হয়ে প্লেটটার উপর হাতচাপা দিয়ে দেন।

লিনা জিজ্ঞাসা করে, ‘’ও দিদা, তুমি কি খাচ্ছ?’’    

‘’কৈ, কিছু না তো,’’ বলেই সুধারানি চট ক’রে, আঁচল দিয়ে প্লেটটা ঢেকে, সেটাকে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে উঠে যাবার ধান্দা করতে থাকেন।

দিদার ভাবভঙ্গি দেখে লিনার কেমন জানি সন্দেহ হয়, সে এক ছুটে রান্নাঘরের দিকে দৌড় দেয় কেকটা খুঁজবার জন্য, কিন্তু গিয়ে দেখে যেখানে সে রেখেছিল, সেখান থেকে কেকটা উধাও।

লিনা দুমদুম ক’রে পা ফেলে ডাইনিং রুমে এসে উপস্থিত হয়, উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞাসা করে, ‘’দিদা, ও দিদা, আমার কেকটা কোথায় গেল?’’

‘’কেক? কীসের কেক? আমি কী করে জানব! বানিয়েছিলিস বুঝি? কখন?’’

‘’হ্যাঁ, আজ সক্কাল সক্কাল কেকটা কবিতার জন্য বানিয়েছিলাম।’’ 

‘’সে কী, গেল কোথায়? সুধারানি যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়েন, ‘’খোঁজ, খোঁজ, ভালো করে খোঁজ!’’

অনেক খুঁজল লিনা, কিন্তু না, কোথায়ও নেই সেটা  কান্না পাচ্ছে লিনার, কবিতাকে কী বলবে সে এখন, মেয়েটা কত আশা করে বসে আছে।

’উমম... কেমন দেখতে কেকটা? ছোট না বড়?’’ সুধারানির দৃষ্টি যেন এবার কেমন একটা ভাবুক ভাবুক দেখায় ।

‘’ছোট ই তো,’’ থমথমে মুখে উত্তর করে লিনা।

‘’ওহ, ওতে কি আপেল দিয়েছিলিস?’’

‘’হ্যাঁ, হ্যাঁ ওতে অনেকটা আপেল দিয়েছিলাম।’’ দুঃখ দুঃখ মুখে বলে লিনা।

‘’আচ্ছা কেকের রংটা কেমন হয়েছিল? হলুদ নাকি?’’ সুধারানি আবারও জিজ্ঞেস করেন।

‘’হ্যাঁ, ওটা তো হলুদ রঙেরই ছিল!’’ লিনা উত্তেজিতভাবে ব’লে ওঠে।

‘’কেকটা খেতে তাহলে বেশ ভালোই হয়েছিল তাহলে, তাই না?’’

‘’তা জানব কী করে? খেয়ে তো দেখিনি, তবে আগে যতবার করেছি সকলে খেয়ে তো ভালোই বলেছে, ওই একই রেসিপিতে তো এবারও বানিয়েছি, কথাগুলো বলতে বলতেই লিনার চোখ হঠাৎ খর হয়ে ওঠে।

সে সুধারানির এক্কেবারে কাছটিতে এসে বলে, ‘’দাঁড়াও, দাঁড়াও দিদা, তুমি এত কথা জিজ্ঞেস করছ কেন? সত্যি করে বলতো তুমি কি আমার কেকটা কি সাবড়ে দিয়েছ?’’

‘’না না, আমি কেন খেতে যাব? আমার তো ওসবে বারণ আছে, তুই তো জানিস!’’ খলবলিয়ে বলে ওঠেন সুধারানি। 

‘’তাহলে ঘর থেকে কি পাখনা মেলে উড়ে গেল কেকটা?’’ লিনা ঝাঁঝিয়ে ওঠে।

‘’তা আমার উপর চোটপাট করছিস কেন? আমি ছাড়া কি এ বাড়িতে আর কেউ পা রাখে না? মোতির মা আছে, পাশের বাড়ির পিন্টু ও তো মাঝে মাঝেই এই বাড়িতে চক্কর মেরে যায়, তাছাড়া চকোত্তিদের নুলো মেনিটা ও তো কম যায় না, ওদেরকে শুধা গিয়ে, সবসময় কেবল আমার দিকেই যত আঙ্গুল তোলা’’- রগে গজগজ করতে থাকেন সুধারানি। 

‘’হুমম, ঠিক আছে, তোমায় এতসব প্রশ্ন করলাম বলে কিছু মনে করো না দিদা, আসলে মনটা একদম খিঁচড়ে গেছে, কত শখ করে চকলেট সিরাপ দিয়ে কেকটা বানালাম, কোথায় যে গায়েব হলো,’’ ফোঁত করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে কেমন একটা উদাসী স্বরে বলে ওঠে লিনা।

‘’চকোলেট কেক? মোটেই না, কেকটায় তো ভ্যানিলার গন্ধ পেলাম’’- হড়বড় ক’রে কথা কটা বলে উঠেই আচমকা থিতিয়ে যান সুধারানি।

কিন্তু ও কি, লিনা তো আর চেঁচামেচি করছে না, শুধু কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সুধারানির দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল, ‘’হুমমম, আমার কেকটায় ভ্যানিলাই ছিল দিদামণি, চকোলেট নয় গো’’- বলেই ফিঁকফিঁকিয়ে হেসে ওঠে সে আর হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়ে সুধারানি এবার এক্কেবারে স্পিকটি নট, তিনি তাড়াতাড়ি তাঁর শোবার ঘরের দিকে সত্যি সত্যি টুকটুকিয়ে সরে পড়েন।

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

আমি মেজর আয়ুস্মান চৌধুরী। ভারতীয় সেনা বাহিনীর এক বীর সৈনিক। মৃত্যুর সঙ্গে ‘আঁখ মে চোলী’ খেলাই আমার নিত্যদিনের কাজ। কিন্তু সেদিনের সেই মৃত্যুর ঘটনাটা ছিল অন্যরকম। কেন?... বছর তিনেক আগের এক অমাবস্যার রাতের সেই হাড় হিম্‌ করা অভিজ্ঞতার কথাটি আপনাদের খুলেই বলি তাহলে।
সেবার নবরাত্রির তখনও বেশ কিছুটা দেরী। কর্মস্থলে নতুন পোস্টিং-এর কারণে পুজোর ছুটি হাত ছাড়া হয়েছে। বহুদিন ঘর ছাড়া। স্বাভাবিকভাবেই মনটা তাই খুবই বিষন্ন ছিল। কিন্তু কি এক অজ্ঞাত কারণে জানি না হঠাৎ মন ভাল করা বসন্তের হাওয়ার মত ৫-৬ দিনের ছুটি মঞ্জুরির আনন্দের খবরটা উড়ে এলো। খুশীতে ডগমগ হয়ে অবশেষে চড়ে বসলাম বিহারগামী একটি ট্রেনে। এবার গন্তব্য পশ্চিম চম্পারন জেলার অন্তর্গত অনামী একটি গ্রাম। স্টেশন থেকে আঠাশ কিলোমিটার দূরত্বে আমার পৈত্রিক ভিটেতে পৌঁছনোর একমাত্র মাধ্যম একটি স্থানীয় বাস। অনেকক্ষণ সেটির দেখা না মেলায় জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম চালকের সঙ্গে বাস মালিকের কি বচসার জেরে কালকের আগে তার দেখা পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। এখন সম্বল শুধুমাত্র অপেক্ষা। রাত আসন্ন প্রায়। মরিয়া হয়ে তাই হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার দু’ধারে ঘন জঙ্গল, জনবসতির লেশমাত্র চিহ্ন নেই চারিপাশে। বহুদিন প্রবাসে থাকায় এদিকের ভৌগলিক চালচিত্রটাও অনেকটা অপরিচিত ঠেকছিল। যাই হোক, প্রায় কুড়ি মিনিটের প্রচেষ্টায় মাথা গোঁজার একটি আশ্রয় মিলল বটে।
তখন আমার আস্তানা জঙ্গলের ভিতর এক বাংলো। তার গা ঘেঁসেই বয়ে চলেছে বুঢ়ী গন্ডকের একটি উপশাখা। নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে হল। কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর দেখা মিলল বাংলোর চৌকিদার রামসেবকের। একান্ত আলাপচারিতায় জানতে পারলাম সে ও তার স্ত্রী সাবিত্রী অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব পালন করে চলেছে, তা বেশ অনেকদিন হল।…
হঠাৎ ঘরের আলো নিভে গেল। রামসেবক জানালো প্রতিদিন সন্ধ্যায় বেশ কয়েক ঘন্টার জন্য এখানে কারেন্ট থাকে না। বাইরে অমাবস্যার অন্ধকার। তার সঙ্গে লোডশেডিং হাত মেলানোয় সব মিলিয়ে বাংলোয় কি রকম একটা গা ছম্‌ছমে ভাব তৈরী হয়েছে। একটা লন্ঠন রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময়ে খানিকটা ইতস্ততঃ ভাবে রামসেবক জানালে জায়গাটি সুরক্ষিত তবু আমি যেন রাত দশটার পর বাংলোর বাইরে না বেরোই।…
সামনে কুয়াশার চাদরে মোড়া অমাবস্যার জঙ্গল। জলের কুলু ধ্বনি শীর্ণ নদীটির অস্তিত্ব বহন করে চলেছে। রামসেবকের ঘরের রেডিয়ো থেকে ভেসে আসছে ফরমায়েসি গানের সুর — “নদীয়া কিনারে হেরাই আয়ী কঙ্গনা”…। বারান্দার চেয়ারে বসে রামসেবকের অনাড়ম্বর, শান্তিময় জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছিলাম খেয়াল নেই। হঠাৎ দরজায় তীব্র কড়াঘাতের শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গে যেতেই একরাশ চুড়ি ও নুপূরের আওয়াজ কানে এলো। “দাঁড়াও সাবিত্রী আসছি” বলে দরজা খুলতেই অপরিচিত এক স্থানীয় তরুণী আমার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, “বাবুজী, আমি লাজবন্তী আছি।” আকন্ঠ ভয় মাখা গলায় এরপর চোস্ত ভোজপুরীতে সে যা বলল তার মর্মার্থ এরকম — সে তার সম্প্রদায় বহির্ভুত একজনকে ভালোবাসার কারণে ওখানের সমাজ সংসারে আজ তারা ব্রাত্য। দুই পরিবারেই তাদের মৃত্যুর পরোয়ানা ঘোষিত হয়েছে। তাই তারা আজ এই নদী পেরিয়ে ভিন রাজ্যে গিয়ে তাদের সুখের ঘর বাঁধবে ঠিক করেছিল। কিন্তু কোনওভাবে বাড়ির লোকরা খবরটা জেনে ফেলায় শিকারী কুকুরের মত তারা ওদের খুঁজে বেড়াচ্ছে।

তারা সকলেই সশস্ত্র। হাতের নাগালে পাওয়া মাত্র টুকরো টুকরো করে ওদের এই জঙ্গলের মাটিতেই পুঁতে ফেলবে। শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল কোনও বলিউডী হিন্দী সিনেমার রোমহর্ষক

দৃশ্য দেখছি। কিন্তু সামনে তো সেলুলয়েড নেই; দাঁড়িয়ে রয়েছে রক্ত-মাংসের লাজবন্তী।কাতর স্বরে মিনতি করে সে বলল, “বাবুজী, আপনি তো সৈনিক আছেন। কত শত্রুর হাত থেকে গোটা দেশকে রক্ষা করেন। পারবেন না আমাদের মত সাধারণ, নিরপরাধ দু’জনকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচাতে? বলুন না বাবুজী। ভালোবাসা কি অপরাধ? তাহলে কেন মৃত্যুর কাছে হার মানবো আমরা? দয়া করে আপনার বন্দুক ও পিস্তলটি দেবেন ওদের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য?
আমার ভিতরের বীর যোদ্ধা ততক্ষণে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। আমার বন্দুকটা তুলে দিলাম লাজবন্তীর হাতে। বললাম, তোমাদের কোনও ভয় নেই। আমি থাকতে তোমাদের কেউ কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। তোমরা পালাও। আমি তোমাদের শত্রুদের সামলাচ্ছি।…
কতক্ষণ দৌড়াচ্ছিলাম খেয়াল নই। হঠাৎ চোখে এসে পড়ল কিছু মশালের ঝলকানি। নিজের পিস্তলটা বার করতে যাব, মনে পড়ল তাড়াহুড়োয় সেটা সঙ্গে নেওয়া হয়নি। বাংলোতেই পড়ে আছে। এরই মধ্যে কতকগুলো ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের শব্দে ও বন্দুকের আর্তনাদে হিমেল রাতের নিঃস্তব্ধতা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল এবং তখনই আমার সামনে এক হাঁটু জল নদীতে লুটিয়ে পড়ল লাজবন্তীর প্রেমিক সূরযের নিথর দেহ। লাজবন্তী পাগলের মত ছুটে চলল সেই মৃতদেহের দিকে। তার বিশ্বাস সূরয বেঁচে আছে। আমি তাকে বাধা দিতে যেতেই সে এক ঝটকায় আমার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “আপ য়াপাস যাইয়ে বাবুজী। নহীতো, ইয়ে পিশাচলোগ আপকো ভী মৌতকে ঘাট উতার দেগা।” যুদ্ধ ক্ষেত্রে এত মৃত্যু মিছিল দেখেছি। কিন্তু কেন জানিনা এক তীব্র বেদনা ও অসহায়তার লজ্জায় আমার মন-প্রাণ নিমজ্জিত হয়ে আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে এলো।…
… “বাবুজী, আপ ঠিক হৈ না? কারা যেন আমায় ডাকছে? চোখ মেলতেই চারিপাশের রৌদ্রস্নাত অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য় চোখে পড়ল। এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “লাজবন্তী কোথায়? রামসেবক ক্ষীণ গলায় বলল, এখানে, তো আপনি ছাড়া আর কেউ ছিল না বাবুজী”। হঠাৎ একটা হেঁড়ে গলা কৌতুক মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠলো, কাল আপনে জাদা পী লিয়ে থে ক্যায়া? রামসেবক পরিচয় করিয়ে দিল ওখানকার স্থানীয় থানার দারোগা সাহেব বলে। নমস্কার পর্ব সেরে কোনও উত্তর না দিয়ে বাংলোর দিকে পা বাড়ালাম। অনেক প্রশ্ন হেঁয়ালির মত মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কে বলে দেবে লাজবন্তী এখন কোথায়? কেমনই বা আছে?...
ঘরে ফিরে একরাশ শারীরিক অস্বস্তি নিয়ে রামসেবকের দিকে তাকাতেই ডুকরে কেঁদে উঠে সে বলল, লাজবন্তী আপনার কোনও ক্ষতি হতে দেয়নি বাবুজী। বললাম, তার মানে? এরপর চোখ মুছতে মুছতে রামসেবক বলে চলল, পাশের গ্রামেরই মেয়ে ছিল লাজবন্তী। রামসেবক ও সাবিত্রীর বড় আদরের ছিল সে। সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে প্রতি আশ্বিনের অমাবস্যায় অভিশপ্ত রাতে লাজবন্তীর অতৃপ্ত আত্মা তার প্রেমকে বাঁচানোর তাগিদে একইভাবে বাংলোয় অবস্থানকারী পুরুষ অতিথির দ্বারস্থ হয়। এখনও পর্যন্ত তিন ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। আপনাকে ফিরে পেয়ে আমরা খুবই আনন্দিত বাবুজী।
রামসেবকের কথাগুলো ক্ষীণ হয়ে এলো। অনুভব করলাম শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসছে হিমেল স্রোত। কানে ভেসে এলো লাজবন্তীর গলা, বাবুজী, আপনি ভালা আদমী আছেন। আমার দুঃখভরী বাঁতো কো আপনে বিশওয়াস কিয়া। আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কোনও ক্ষতি করারও চেষ্টা করেননি; বরং আমাদের প্রেমকে বাঁচানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। জগতে সবাই কেন আপনার মত ভাল হয় না বলতে পারেন? ফিরে যান বাবুজী, আপনি ফিরে যান।…
হ্যাঁ, এবার ফেরার পালা। ততক্ষণে ম্লান গোধূলি চম্পারনর বাংলো, জল, জঙ্গলকে জড়িয়ে ধরেছে। এবার নিজেকে গুছিয়ে নিতে হবে, কারণ বাস আসতে আর মিনিট পনেরো মাত্র দেরী। মনে পড়ে গেলো আমার বাড়িতেও এক লাজবন্তী অধীর আগ্রহে আমার জন্য অপেক্ষারত। ভবিষ্যতের কোনও প্রয়োজনে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রামসেবকের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। কোথা থেকে যেন গান ভেসে আসছে — “মেরে সাজন হ্যায় উস্‌ পার, মৈ মন মার, হুঁ, ইস পার, ও মেরে মাঝি, লে চল পার, ওরে মাঝি”…
মনে পড়ল একটা কাজ বাকি থেকে গেছে। মনে মনে লাজবন্তীকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাম, পারলে সবাইকে ক্ষমা কোরো লাজবন্তী। তোমার ও সূরযের আত্মার শান্তি কামনা করি। তোমাদের ভালবাসা হারেনি, ভালোবাসা কখনও হারে না; সে চির অমর হয়ে লইল।
চম্পারন জেলার ছোট্ট একটি গ্রামের সেই অভশিপ্ত ডাক বাংলো ও জঙ্গলকে পিছনে ফেলে আমার বাস তখন ছুটে চলেছে দুরন্ত গতিতে। কিন্তু একটা ভাবনা কিছুতেই পিছু ছাড়ল না; আজও ছাড়েনি জানেন! — “সত্যি তো! বাইরের শত্রুকে পরাজিত করার কত রণকৌশলই না আমার আয়ত্বে। শুধু জাত-ধর্মের অমানবিক বেড়াজালে আবদ্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্তরের মলিনতা, বিদ্বেষকে পরাজিত করার কোনও ম্যাজিক বা কৌশল যদি জানা থাকত” হায়…”

বিঃদ্রঃ সব চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক।

এক সৈনিকের ডায়েরী থেকে

এক সৈনিকের

ডায়েরী থেকে

ডঃ মৈত্রেয়ী মুখার্জ্জী
অধ্যাপিকা, দর্শন বিভাগ
বিবেকানন্দ কলেজ ফর উইমেন 
বেহালা, বড়িশা, কলকাতা 

himadri3.jpg

শতাব্দীর ওপার থেকে

স্বস্তিকা চ্যাটার্জী দাস

​

banglow.jpg

জেসিকার মন একদম ভালো নেই। জমজমাট শিকাগো ছেড়ে, বাবাকে ফেলে, মা কেন এলো এই বাজে নির্জন জায়গাটায়? বারো বছরের জেসিকা আর ওর আট বছরের ভাই রবার্টকে নিয়ে ওদের মা,এমিলি, এসে উঠেছেন ওদের দাদু, হেনরির, মন্টানা স্টেটের বিউট শহরের এই বাড়ীতে। মা নাকি এক বছর কি সব রিসার্চের কাজ করবেন এখানকার ইউনিভার্সিটিতে। আসার আগে বাবাও খুব রেগে ছিলেন-প্রায় রোজ বাবা-মা খুব তর্কাতর্কি করতেন; বাবা একেবারেই চাননি মা ওদের নিয়ে শিকাগো ছেড়ে এতো দূরে আসুক। আসার আগে অবশ্য ওদের দুজনের খুব উত্তেজনা হচ্ছিল, কারণ মার কাছে অনেক গল্প শুনেছে এই জায়গাটার। ওদের দাদু এখানকার ইউনিভার্সিটিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতেন; ওদের মা এখানেই হাইস্কুল অবধি পড়াশোনা করেছেন। তারপর দাদু অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিলেন কিন্তু এই বাড়িটা রেখে দিয়েছিলেন "মাউন্টেন রিট্রিট হোম" হিসেবে আর প্রায় প্রতি গরমেই দাদু - দিদিমা এখানে এসে কয়েক মাস থাকেন। ওরা এখানে এসেছে মে মাসের শেষে, দাদু-দিদিমা ততদিনে বাড়ি গুছিয়ে ওদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। 
এই শহরটা এককালে খুব নাকি নামকরা ছিল। জেসিকা ওর দাদুর কাছে গল্প শুনেছে খনিজ সম্পদের জন্যে, প্রায় দেড়শো বছর আগে থেকে পাহাড়ের বুকে এই ছোট্ট জায়গায় শুরু হয়েছিল সারা পৃথিবীর মানুষের আনাগোনা ও বসবাস। খনিজ ব্যবসার সেই রমরমার জন্যে জায়গাটাকে বলা হতো "পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী পাহাড়"; তখন এখানে অনেক লোকজন থাকতো। আজও সারা শহরটার নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে পুরোনো খনির "হেডফ্রেম"। ওদের দাদু-দিদিমার বাড়ীর খুব কাছেই একটা একশো বছরের পুরোনো খনি আছে - ঐতিহাসিক ঐতিহ্যবাহী জায়গা হিসেবে রক্ষিত আছে। প্রথম দিন এসে জেসিকা আর রবার্ট ওরকম বিশাল উঁচু একটা লোহার কাঠামো দেখে একেবারে থ হয়ে গেছিলো। তারপর দাদু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ওই কাঠামোগুলো হল "গ্যালোস বা গ্যালাস ফ্রেম” যার সঙ্গে কপিকল লাগিয়ে, কর্মীরা খনি-গহ্বরে যাতায়াতের জন্যে ব্যবহার হতো। এছাড়াও মূল্যবান খনিজ ধাতু, যন্ত্রপাতি, জিনিসপত্র, ইত্যাদি ওঠানো-নামানোর কাজে ব্যবহার হতো। রাত্রিবেলায় আবার ওই বিশাল লোহার ফ্রেমগুলো লাল আলোর মালায় সেজে ওঠে। 
একেই এই জায়গাটা একেবারে নির্জন, রাত্রি হলে আরও থমথমে হয়ে যায়। প্রায় প্রতিদিন ডিনারের পর জেসিকা আর রবার্ট, দাদু বা দিদিমার কাছে বসে সেইসব পুরোনো দিনের গল্প শোনে - শুনতে শুনতে রবার্ট ঘুমিয়ে পড়ে। মা, দাদু-দিদিমা শুভ রাত্রি জানিয়ে, ওদের আদর করে শুতে চলে যান; কিন্তু জেসিকার ঘুম আসতে দেরী হয়। তাই ওদের ঘরের কাঁচের জানলার সামনে রাখা মস্ত সোফাটায় গা ডুবিয়ে বসে বই পড়ে; মাঝে মাঝে ভারী পর্দা সরিয়ে তাকায় বাইরে - বাড়ির বাইরের লন পেরিয়ে অন্ধকার পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই আলোকোজ্জ্বল হেডফ্রেমগুলোর দিকে দেখতে দেখতে ওর মন উধাও হয়ে যায় দাদুর কাছে শোনা পুরোনো দিনের গল্পে। কোনো কোনো রাতে হঠাৎই ওর গা'টা কেমন অজানা কি এক ভয়ে ছমছম করে ওঠে। মনে হয় যেন ওই অন্ধকারের ভিতর কেউ দাঁড়িয়ে আছে - দুটো অদৃশ্য চোখ ওকে দেখছে। ভয়ে শিউরে উঠে তাড়াতাড়ি পর্দা টেনে দিয়ে চটপট বিছানায় গিয়ে কম্বলের ভিতর ঢুকে চোখ বুজে শুয়ে পড়ে!
জেসিকা আর রবার্ট এখানে এসে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে কিন্তু কিছুদিন ক্লাস করার পরই সামার ভ্যাকেশন শুরু হয়ে গেছে - তাই এখানে ওদের এখনো সেরকম নতুন বন্ধুবান্ধব জোটেনি। আর ওদের বাড়ির আশেপাশে বেশিরভাগ একটু বয়স্ক মানুষদের বসবাস যাদের সাথে ওদের দাদু-দিদিমার বেশ বন্ধুত্ব আছে। কিন্তু ওদের সমবয়সী কারুর সাথে পরিচয় না হওয়ায় দুই-ভাইবোন নিজেরাই বাড়ির কাছাকাছি যে হাঁটার রাস্তা (ওয়াকিং ট্রেল) আছে সেখানে ঘুরে বেড়ায় বা ওদের নিজেদের লনে খেলাধুলো করে। দাদুদের পোষা কুকুর জিমিও এখন ওদের সবসময়ের সঙ্গী হয়েছে। 
গত সোমবার বিকেলে, জেসিকা আর রবার্ট, জিমিকে নিয়ে ওদের "কপার স্ট্রিটের" বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছিলো সেই একশো বছরের পুরোনো মাইন ইয়ার্ডের কাছে। পুরো জায়গাটাই তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। আর তার পাশ দিয়ে ঢালু উঁচু, নিচু পাহাড়ি পথের হাঁটার শুনশান রাস্তা বহুদূর চলে গেছে। দুই ভাই বোন তারের বেড়ার গায়ে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ভয় মেশানো কৌতূহলে তাকিয়ে দেখছিলো মাইন ইয়ার্ডের ভিতরের দিকে - যতটা চোখ যায়। নির্জন নিঃশব্দ পরিবেশে, মাইন ইয়ার্ডের কালো-কালো মাথা উঁচু "হেডফ্রেম", বন্ধ রাখা বহু দিনের পুরোনো অফিস ঘর, গুদামখানা - কেমন একটা গা ছমছমে পরিবেশ। দাদু ওদের বলেছেন একদিন ভিতরে নিয়ে গিয়ে ঘুরিয়ে দেখাবেন। রবার্ট বললো, "জেসি, আজকে কিন্তু দাদুকে মাইন দেখানোর কথা মনে করিয়ে দিতে হবে।" জেসিকা হাসলো, "চল, পাহাড়ের দিকে হেঁটে আসি।" জিমিকে নিয়ে ওরা খানিকটা এগিয়েই দেখতে পেলো সামনে একটা টানেল। ছায়া-ছায়া জায়গাটার ভিতর এ ঢুকতে গিয়ে থমকে গেলো জিমির জন্যে - ও কেমন যেন ভয় পাওয়া গলায় "কুঁই, কুঁই" ডাকছে আর পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে; জেসিকার হাতে ধরা ওর গলার চেনটা টেনে পিছনে দৌড় লাগানোর চেষ্টা করছে। ততক্ষণে রবার্ট এগিয়ে গেছে টানেলের ভিতরের রাস্তায়। জেসিকা শুনলো রবার্ট যেন কাকে বলছে, "হাই, গুড ইভিনিং"; ওর মিহি গলার আওয়াজ টানেলের পাথুরে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে দ্বিগুণ হয়ে ভেসে এলো। জেসিকা বেশ অবাক হলো কারণ রাস্তা প্রায় শুনশান; বেশ কিছুক্ষণ আগে দুজন বয়স্ক ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলাকে জগিং করে ওদের পাশ দিয়ে চলে যেতে দেখেছে। তারপর আর কাউকেই দেখেনি। তাহলে, বব (রবার্ট) কাকে "হাই" বললো? এদিকে জিমি এমন করছে যে জেসিকা কিছুতেই এগোতে পারছে না। বাধ্য হয়ে ও চেঁচালো "বব! বব! চলে আয়, বাড়ি ফিরতে হবে।" কিন্তু টানেলের ওদিক থেকে রবার্টের কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। জেসিকা পড়েছে ভারী মুশকিলে - কি করে এখন? ইতিমধ্যে জিমি একটু শান্ত হয়েছে। কিন্তু ওকে নিয়ে টানেলের দিকে যেতে গেলেই যে ঝামেলা করবে সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। জেসিকা তখন জিমির গলার চেনটা বেশ খানিকটা লম্বা করে দিয়ে রাস্তার ধারের একটা খুঁটির সাথে বাঁধলো, তারপর জিমির গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে একটু আদর করে ছুটলো টানেলের দিকে। টানেলটা বেশ খানিকটা লম্বা। একটু এগিয়ে, জেসিকা আবার রবার্টকে ডাকলো "বব, বব!" কিন্তু কোনো জবাব এলো না। দুপাশের পাহাড়ের পাথুরে দেওয়ালে ওর গলার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে নিঝুম, ছায়া ছায়া অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতরে গমগম করে ঘুরতে ঘুরতে মিলিয়ে গেলো। জেসিকার বুক একটা অজানা ভয়ে কেঁপে উঠলো; কিন্তু ওকে তো ভাইকে খুঁজে বের করতেই হবে। ও আর অপেক্ষা না করে দৌড় লাগলো। সুড়ঙ্গ পেরিয়ে এসেও ট্রেলের যত দূর চোখ যায় কোথাও রবার্টকে দেখতে পেলো না। আবার দৌড়......। বেশ খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর, রাস্তা যেখানে একটু ঢালু হয়ে নিচের দিকে চলে গেছে, হঠাৎ সেখানে দেখলো কয়েকটা বাড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সব কটারই বেশ দৈন্যদশা চেহারা - লোকজন তেমন থাকে বলে মনে হয় না। জেসিকা দাঁড়িয়ে পড়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলো - হ্যাঁ, ওর আন্দাজই ঠিক মনে হয়; প্রায় সব বাড়ির মেন গেট বন্ধ, অপরিষ্কার লন, কোনো মানুষ বা তাদের পোষ্যদের চিহ্ন নেই। রবার্ট কোথায় গেলো? ও একা একা এতদূর চলে এলো? এরকম দুঃসাহসী তো ও নয়! জেসিকা এইসব ভাবতে ভাবতে দ্রুত পায়ে আরো খানিকটা এগিয়ে গেলো। আর তখনই দেখতে পেলো রবার্টকে! অন্য বাড়িগুলো থেকে একটু দূরে একটা বাড়ির লনে রাখা দোলনায় আপন মনে দুলছে। বাড়িটার উঁচু কাঠের গেটের একটা বড়সড় ভাঙা ফাঁক দিয়ে ওকে দেখা যাচ্ছে! জেসিকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, পড়িমরি করে দৌড়ে পৌঁছে গেলো ওই বাড়িটার গেটে। আরে, গেট তো বন্ধ! তাহলে, রবার্ট ভিতরে ঢুকলো কি করে? গেটটা বিশাল কিছু উঁচু না হলেও, বারো বছরের জেসিকার মাথার উপর বেশ কয়েক ফুট ওপরে উঠেছে। বাধ্য হয়ে ও বাইরে থেকেই চেঁচালো "বব, বব! এখানে কি করছিস? বাইরে আয়।" এবার রবার্ট সাড়া দিলো আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই জেসিকা বাইরে থেকে শুনলো রবার্ট কাকে যেন "বাই, আবার দেখা হবে..."বলতে বলতে গেট খুলছে। রবার্ট বাইরে বেরোতেই জেসিকা ওকে জড়িয়ে ধরে বললো, "উফ, তুই তো আমায় খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি। একা একা এতদূর চলে এলি - তোর ভয় করলো না? আর কার সাথে কথা বলছিলি? -এই পোড়ো বাড়িতে?" রবার্ট খুশি-খুশি মুখে জেসিকার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে বললো, "এখানে তো লিন্ডা থাকে। আমার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে আর তাই ওদের বাড়িতে খেলতে নিয়ে এলো।" জেসিকা অবাক হলেও, ও নিজেও বেশ খুশি হলো রবার্ট একজন খেলার সাথী পেয়েছে বলে। ওকে নিয়ে টানেল পেরিয়ে এগিয়ে গেলো যেখানে জিমিকে বেঁধে রেখে এসেছে, সেই দিকে। হাঁটতে, হাঁটতে শুনছিলো, রবার্টের উচ্ছসিত বকবকানি। ভাবলো, ওরও যদি এমন বন্ধু জুটে যায়, তবে বেশ হয়! জিজ্ঞেস করলো, "লিন্ডার আর কোনো দাদা, দিদি নেই, রে?" রবার্ট একটু থমকে গিয়ে দিদির মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, "জানিনা তো! লিন্ডা কিছু বলেনি। কালকে আবার আসবি? তাহলে দুজনে মিলে ওদের বাড়িতে খেলতে যাবো; বেশ মজা হবে, তাই না?"

জিমি দূর থেকে ওদের দেখতে পেয়েই লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। রবার্ট অবাক হয়ে জেসিকাকে প্রশ্ন করলো, "জিমিকে এখানে আটকে রেখেছিস কেন?" জেসিকা ওকে জানালো জিমির বিচিত্র ব্যবহারের কথা। জিমিকে বাঁধন থেকে খুলে দিতেই সে ল্যাজ নেড়ে, ওদের চারপাশে লাফিয়ে আনন্দ প্রকাশ করলো। সেদিন বাড়ি ফেরার পর রবার্ট হইহই করে দাদুর সাথে ওর নতুন বন্ধুর গল্প জুড়লো। দাদু প্রথমে খুব বিরক্ত হয়েছিলেন ওরা ওরকম জায়গায়, বাড়িতে না জানিয়ে গেছে বলে। তারপর, বেশ অবাক হয়ে বললেন, "ওই দিকের বাড়িগুলো তো বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে ছিল জানতাম। জায়গায়টাও তো একেবারে নিরিবিলি হয়ে গেছে। মনে হয়, সস্তায় প্রপার্টি পেয়ে নতুন কেউ কিনে নিয়েছে। যাক, তোর বন্ধু আর তার বাবা-মা'কে আমাদের বাড়িতে আসতে বলিস।" কিন্তু জেসিকা যখন জানালো জিমির অদ্ভুত ব্যবহারের কথা, দাদু ভারী বিস্মিত হয়ে বললেন, "সে কি! জিমি তো ভীষণ সাহসী! এরকম কেন করলো?" তারপর কয়েকদিন রবার্ট খুব বায়না করছিলো লিন্ডার সাথে খেলতে যাবে বলে, কিন্তু দাদু অসন্তুষ্ট হবেন ভেবে, জেসিকা ওদিকে যেতে সাহস করেনি। একটা শনিবারে ওদের মা, এমিলি বাড়িতে ছিলেন; রবার্টের গোমড়া মুখ দেখে, বিকেলের দিকে গাড়ি করে ওদের নিয়ে গিয়েছিলেন ইউনিভার্সিটির লাগোয়া একটা খেলার মাঠে - জিমিকে নিয়ে ওরা খুব হৈহৈ করে খেলেছে; অনেকদিন বাদে এমিলি'ও  ওদের সাথে বেশ দৌড়োদৌড়ি করলেন। খানিক বাদে জেসিকা দেখলো রবার্ট মা'র গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে মুখ করে কি যেন বলছে - "নিশ্চয় কোনো নতুন আবদার!", ভাবলো জেসিকা। এমিলি বললেন, "চল জেসি, লিন্ডার বাড়ীতে বব'কে খেলতে রেখে, আমরা ওয়ালমার্টে গ্রসারি কিনতে যাবো। তারপর, ফেরার পথে ওকে তুলে, বাড়ি ফিরবো।"

"মা, জিমি কিন্তু ঝামেলা করবে ওই টানেলের ট্রেলের দিকে গেলে", জেসিকা মা'কে সাবধান করতে চাইলো। এমিলি ওর কথায় তেমন গুরুত্ব দিলেন বলে মনে হলো না, "দেখি, চল" বলে, ওদের গাড়িতে উঠতে বললেন। একটুক্ষণের মধ্যেই ওরা পৌঁছে গেলো ট্রেলের মুখে, যেখানে সেই মাইন ইয়ার্ড শুরু হয়েছে। ওখানেই একটা খোলা জায়গা আছে, সেখানে গাড়ি পার্ক করে এমিলি তিনজনকে নিয়ে ট্রেল ধরে হাটতে শুরু করলেন। এই জায়গাটার কোনো পরিবর্তনই হয়নি-তাঁদের ছোটোবেলাতেও একদম এরকমই ছিল। তবে তখনো এই দিকটায় বেশি আসতো না - নাইন্থ বা টেন্থ গ্রেডে পড়ার সময় দু-তিন বার স্কুলের বন্ধুদের সাথে ওই টানেলের ভিতরে ঢুকে হৈহৈ করেছিল; নিজেদের গলার আওয়াজের প্রতিধ্বনি শুনে খুব মজা পেয়েছিলো। আরেকবার স্কুলের একটা বাইসাইকেল ম্যারাথন রেসে অংশগ্রহণ করেছিল বলে এই রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে গিয়েছিলো। ছোটবেলার সেই ভাবনা-চিন্তাহীন, সরল দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, এমিলির মনটা কেমন এক স্মৃতিমেদুর অনুভূতিতে ভরে উঠলো। রবার্টের হাত ধরে বললেন, "চল তবে, তোর বন্ধুর বাড়ি।" মা সঙ্গে আছেন, তাই জেসিকাও উৎসাহিত হয়ে জিমিকে নিয়ে ওদের সাথে এগোলো। আশ্চর্যের ব্যাপার জিমি কিন্তু আজকে দিব্যি ওদের সাথে টানেলের ভিতর দিয়ে লাফাতে লাফাতে চললো! রবার্ট ওর মা'র হাত ছাড়িয়ে সামনের দিকে দৌড় লাগালো। আর ওকে দৌড়োতে দেখে জিমিও ওর সাথে পাল্লা দেওয়ার জন্যে এমন ব্যগ্র হয়ে উঠলো যে জেসিকার হাতে ধরা গলার চেনটা প্রায় ছেড়ে যায় আর কি! বাধ্য হয়ে ওকেও দৌড়তে হলো। এমিলিও তাড়াতাড়ি পা চালালেন। জেসিকা সেই বাড়িটার কাছাকাছি পৌঁছে দেখলো রবার্ট বাড়িটার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মিহি গলায় "লিন্ডা, লিন্ডা" বলে ডাকছে। জেসিকা এগিয়ে এসে গেটের সেই ভাঙা অংশটায় চোখ রাখলো - কি আশ্চর্য! সেদিন যে দোলনাতে রবার্টকে ও দুলতে দেখেছিলো, সেটা একেবারে ভাঙাচোরা অবস্থায় একটা শতছিন্ন দড়িতে কোনোরকমে ঝুলছে। সমস্ত বাড়িটা জরাজীর্ণ, চারপাশে লম্বা লম্বা ঘাসের জঙ্গল। গেটের থামের ওপর একটা অপরিষ্কার মার্বেল স্ল্যাবের ওপর খুব অস্পষ্ট একটা লেখা - এটা জেসিকা আগের দিন খেয়াল করেনি। কাছে গিয়ে ভালো করে দেখলো - প্রায় সবটাই মুছে গেছে, শুধু "সালিভ ...." অবধি পড়তে পারা যাচ্ছে। আর তার নিচে একটা সালের

শুধু দুটো সংখ্যা পড়া যাচ্ছে - "১৯ ...."
ততক্ষনে এমিলিও সেখানে পৌঁছে গেছেন। অবাক হয়ে বললেন, "তুই এই বাড়িতে লিন্ডার সাথে খেলেছিলি? এখানে তো আমাদের ছোটবেলাতেও কাউকে থাকতে দেখিনি - তখনও এদিকের বাড়িগুলো পরিত্যক্ত আর পোড়ো হয়েই ছিল। শুনেছিলাম বহু বছর আগে, যখন এখানকার মাইনগুলো চালু ছিল, তখন এখানে লোকজনের বসতি ছিল।" রবার্ট কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, "লিন্ডা থাকে এখানে, আমি খেলেছি ওর সাথে"। এমিলি জেসিকার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,"তুইও লিন্ডাকে এই  বাড়িতে দেখেছিস?" জেসিকা হতবুদ্ধি ভাবে দুদিকে মাথা  নাড়ালো - "না, আমি তো লিন্ডাকে দেখিনি। তবে, সেদিন বব যে দোলনাতে দুলছিলো সেটা তো এরকম ভাঙাচোরা অবস্থায় ছিল না, তাই না রে বব?" রবার্ট দিদির কথায় মুখ গোমড়া করে সম্মতি জানালো। 
সেদিন ডিনার টেবিলে ঘটনা শুনে দাদু-দিদিমা দুজনেই অসন্তুষ্ট হলেন আর ওদের মা'কেও একটু বকাবকি করলেন। এমিলি বললেন, "জেসি, বব - তোরা ওদিকটায় নিজেরা আর কখনো যাস না।" তারপর তাঁর মা আর বাবাকে বললেন, "আমার খুব অবাক লাগছে যে কেউ যদি ওই বাড়িটা কিনেই থাকে, তাহলে ওইরকম অপরিষ্কার অবস্থায় ফেলে রাখবে কেন? তোমরা কি খোঁজ নিতে পারবে? কোনো সমাজ বিরোধী কাজকর্ম চলছে না তো?" তারপর জানালেন জেসিকা নেমপ্লেটে যে অস্পষ্ট লেখা দেখেছে। হেনরি খানিক চিন্তা করে বললেন, ”সালি…তার মানে কি “সালিভান”- আইরিশ পদবি? বিউটের সেই পুরনো দিনের রমরমার সময়ে অনেক আইরিশ এখানে খনি ব্যবসায় নিজেদের ভাগ্যান্বেষণে এসে বসবাস শুরু করেছিল আর আজও এই শহরের জনসংখ্যার বেশিরভাগ তাদেরই বংশধর। হয়তো তারাই কেউ ওই বাড়িতে এখনও থাকে। আচ্ছা, খোঁজ করে দেখি।“
তারপর কয়েকদিন রবার্ট আর তেমন জেদ করেনি লিন্ডার বাড়িতে খেলতে যাওয়ার ব্যাপারে।
দিন দশেক পরে একদিন, দুপুর থেকে জেসিকা আর রবার্ট নিজেরাই আছে বাড়িতে। দাদু, দিদিমা জিমিকে নিয়ে ওঁদের কোন বন্ধুর বাড়িতে লাঞ্চের নেমন্তন্নে গেছেন আর মা তো প্রতিদিনকার মত সকালেই ইউনিভার্সিটিতে কাজে চলে গেছেন। ওরা দুজনে লাঞ্চ করে নিজেরা প্রথমে খানিকক্ষণ একটা বোর্ড গেম নিয়ে বসলো, তারপর কিছুটা সময় টিভিতে কার্টুন দেখে কাটালো। কিন্তু বিকেলের পর থেকে রবার্ট আবদার শুরু করলো লিন্ডার সাথে খেলতে যাবে বলে। জেসিকারও খুব “বোর” লাগছিলো। ও বললো, “চল, ঘুরে আসি। কিন্তু লিন্ডাদের বাড়িতে গেলে বকুনি খাবো। ওকে বাইরে ডেকে নিস। আর কেউ বাড়িতে আসার আগেই আমাদের ফিরে আসতে হবে; তুই কিন্তু তখন ঝামেলা করলে, তোকে রেখে চলে আসব।“ 
ওরা হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরনো মাইন ইয়ার্ডের পাশ দিয়ে ট্রেলের পথ ধরে টানেলের দিকে এগিয়ে গেল। টানেলের ভিতরটায় কেমন গা ছমছমে অন্ধকার, ঠাণ্ডা ভাব। একটু এগোতেই শুনলো একটা মিহি গলার “হ্যালো…” আর সেই রিনরিনে গলা টানেলের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন চারপাশ থেকে বলতে লাগলো “হ্যালো…হ্যালো…“হ্যালো…” জেসিকা, ভাইয়ের হাত চেপে ধরে থমকে দাঁড়িয়ে গেলো, কিন্তু রবার্ট আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলো, ”লিন্ডা, লিন্ডা…কোথায় তুই?” আবার সেই তীক্ষ্ণ রিনরিনে গলা, “এই তো, এইখানে...” ওরা দেখলো, যে টানেলের পাথুরে দেওয়ালের আবছায়া কোণে একটা উঁচু পাথরের ওপর বসে লিন্ডা পা দোলাচ্ছে। তারপর এক মুহূর্তেই ওদের সামনে! জেসিকা অবাক হয়ে দেখছিল মেয়েটাকে – রবার্টের থেকে বড়ই হবে মনে হয়। খুব রোগা, প্রায় কোমর অবধি নেমে আসা অগোছালো খোলা সোনালি চুল আর ফ্রকটা কেমন অন্যরকম – জেসিকা বা ওর বন্ধুরা তো এরকম জামা পরেনা! রবার্ট উচ্ছসিত হয়ে বললো, “লিন্ডা, দ্যাখ, আমার দিদি জেসি এসেছে।“ লিন্ডা জেসিকার দিকে একবার তাকিয়ে পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলো – “কি জোরে হাঁটছে রে বাবা! যেন হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে!” জেসিকা ভাবলো। রবার্ট ততক্ষণে তার হাত ছাড়িয়ে ছুটে চলে গেছে লিন্ডার পাশে। বাধ্য হয়ে সেও তাড়াতাড়ি পা চালালো। কিন্তু মেয়েটা তো নিজের বাড়ির দিকে যাচ্ছে না!! জেসিকা জিগ্যেস করতে যাবে, তখনই রবার্ট খুব উত্তেজিত ভাবে বললো, “জেসি, লিন্ডা আমাদের মাইন দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে; ও সব চেনে!” জেসিকা অবাক হয়ে ভাবলো, “দাদু তো বলেছিলেন যে ওই মাইনে ঢোকার জন্যে আলাদা অনুমতি লাগে আর একজন গাইডের সাথে ঘুরতে হয়!” কিন্তু ওর কচি মন এরকম অভিযানের উত্তেজনায় সব সম্ভব-অসম্ভবের ভাবনা এক মুহূর্তে দূরে সরিয়ে দিলো। দৌড়োতে শুরু করলো লিন্ডা আর রবার্টের সাথে। কি অদ্ভুত ব্যাপার… লিন্ডা কেমন করে চলে গেলো মাইন ইয়ার্ডের ভিতরে, বন্ধ গেট পেরিয়ে?? ওদের ডাকছে হাতছানি দিয়ে! রবার্ট আর জেসিকা গেটের কাছে এসে দেখলো একপাশের ছোট একটা গেটে কোন তালা নেই – হাত দিয়ে ঠেলতেই খুলে গেল। গুটিগুটি পায়ে, ভয় মিশ্রিত কৌতূহল নিয়ে ওরা হাত ধরাধরি করে ভিতরে ঢুকলো। ওরা খেয়ালও করলো না-ওদের পিছনে গেটটা আপনাআপনি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল! লিন্ডা দাঁড়িয়ে আছে সেই বিশাল উঁচু “গ্যালোস"টার কাছে, ওদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পুরো জায়গাটা কী ভীষণ নির্জন আর থমথমে! এদিকে ওদিকে কয়েকটা কালো-কালো ঘর, কি সব বিশাল বিশাল যন্ত্রপাতি! জেসিকার মনে হলো একটা ঠাণ্ডা হাওয়া ওদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর সেই বাতাসে যেন অনেক মানুষের ফিসফাস; অজানা ভয়ে ওর বুক কেঁপে উঠলো। রবার্টের হাতটা জোরে চেপে ধরে বলতে চাইলো, “চল, ফিরে যাই"; কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোলো না। রবার্টও তার স্বভাবগত ছটফটানি ভুলে কেমন জেসিকার একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গোলগোল চোখে এদিক-ওদিক দেখছে। ওদিকে লিন্ডার হাতছানির কি এক অমোঘ আকর্ষণ!
ওরা দুজনে গ্যালোসের ধরে লিন্ডার কাছে পৌঁছতে, ও আরো এগিয়ে গেলো সেই কপিকল লাগানো জায়গাটার কাছে - দাদুর কাছে শুনেছিলো এই কপিকল দিয়েই খনির ভিতরে যাতায়াত করা হত। আর ঐখানেই মাটিতে লিন্ডা বসে পড়েছে। অদ্ভুত আকুল গলায় ডাকছে "ড্যাডি, ড্যাডি" - ওর চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে। ওরা কাছে যেতে রবার্টের দিকে তাকিয়ে বললো, "আমাদের ড্যাডি..., তুমি এসো এখানে।" মনে হলো ও যেন জেসিকাকে দেখতেই পাচ্ছে না।    

জেসিকা অবাক হয়ে দেখলো রবার্ট ওর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো লিন্ডার পাশে বসে পড়ে একই ভাবে ডাকতে লাগলো, "ড্যাডি, ড্যাডি"! জেসিকা ভয়ে, বিস্ময়ে হতবুদ্ধি – তাও রবার্টকে নিজের কাছে টেনে আনার জন্যে ওর কাঁধ খিমছে ধরলো; ভাঙ্গা গলায় ফিশফিশ করে ডাকলো, “বব!” কিন্তু সেই মুহূর্তেই লিন্ডা জেসিকার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে তার হাতটাকে রবার্টের কাঁধ থেকে ঠেলে সরিয়ে দিলো। উফফ! কি সাংঘাতিক শক্ত আর ঠাণ্ডা লিন্ডার হাত; আর চোখদুটো দিয়ে যেন আগুনের হল্কা বেরিয়ে আসছে। আর ওর ভাই রবার্ট – সে তো তার দিকে তাকিয়েই দেখছে না; একই ভাবে "ড্যাডি, ড্যাডি" বলে ডেকে যাচ্ছে! ও কাকে “ড্যাডি” বলে ডাকছে? ওদের বাবা তো শিকাগোতে! জেসিকার খুব খুব কান্না পাচ্ছে, ভয় করছে; ভাইকে রেখে পালাতেও পারছে না। ওদিকে সেই শতাব্দী প্রাচীন খনির কপিকল যেন কোন জাদুশক্তিতে আবার চালু হয়ে গেছে। ঘটঘট আওয়াজ করে উঠে আসছে খনির গহ্বর থেকে! আর আর…এরা সব কারা?? কালো ধুলো মাখা কঙ্কালসার কতগুলো আবছায়া অবয়ব বেরিয়ে আসছে কপিকলের সাহায্যে উঠে আসা লিফটের ভিতর থেকে! চারদিকে বিশ্রী পোড়া গন্ধ.........উফফ! জেসিকা আর দাঁড়াতে পারছে না……কিন্তু, রবার্ট অদ্ভুত গলায় বলছে “ড্যাডি, আমরা আসছি…ই” আর লিন্ডার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে ওই ছায়ামূর্তিগুলোর দিকে! 
সন্ধ্যেবেলায় সাড়ে ছ’টা নাগাদ এমিলি বাড়ি ফিরে জেসিকা আর রবার্টকে না দেখতে পেয়ে হেনরিকে ফোন করলেন, “বাবা, জেসি আর বব কি তোমাদের সাথে গেছে?” হেনরি প্রচণ্ড অবাক, ’’না তো, ওদের তো বাড়িতেই থাকার কথা! হয়তো আশপাশেই কোথাও খেলতে গেছে-তুই খুঁজে দ্যাখ; আমরা একটু বাদেই আসছি।”

“ধারে কাছে কোথায় খেলতে যেতে পারে? লিন্ডা ছাড়া তেমন কোন নতুন বন্ধু হয়েছে বলে তো শুনিনি! সেই মেয়েটির বাড়িটা তো বেশ দূরে; তাছাড়া, ওদের বারবার বারণ করা হয়েছে ওই নির্জন জায়গায় নিজেরা না যেতে। আর গেলেও, সন্ধ্যের পর বাড়ীর বাইরে ওরা তো কখনো থাকে না!” নার্ভাস এমিলি, মাথায় অজস্র চিন্তার ভিড় নিয়ে, আবার গ্যারাজ থেকে গাড়ি বের করে আশপাশের রাস্তা দিয়ে ড্রাইভ করে ঘুরে দেখতে লাগলেন। নাঃ, কোথাও নেই; এমিলি বাড়ি ফিরে এসে দেখলেন ওঁর বাবা-মা ততক্ষণে চলে এসে আশপাশের প্রতিবেশীদের ফোন করছেন। কোনো সন্ধান না পেয়ে, তিনজনে মিলে ঠিক করলেন যে সেই লিন্ডাদের বাড়ির দিকেই যাবেন খোঁজ করতে।
রাত্তির প্রায় আটটা, যদিও গরমকাল বলে এখনও পুরোপুরি অন্ধকার নেমে আসেনি, তবু সূর্যের আলো নিবু নিবু; এরকম সময়ে হেনরিও এই পুরনো খনির দিকের ট্রেলে কখনো আসেননি। গাড়ি পারকিং’এর জায়গাটাও শুনশান। ওনারা গাড়ি রেখে খনির পাশ দিয়ে ট্রেল ধরে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলেন। ততক্ষণে খনির চত্বরের ভিতরের বিশাল হেডফ্রেমে জ্বলে উঠেছে আলোর মালা। আধা অন্ধকার, নির্জন পরিবেশের মধ্যে ওই জ্বলজ্বলে আকাশচুম্বী কাঠামো – সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত অতিপ্রাকৃত পরিবেশ; কি এক অজানা ভয়ে এমিলির গা ছমছম করে উঠলো। তার উপর চিন্তায় অধীর - “ছেলে, মেয়ে দুটো কোথায় যে গেল? লিন্ডার বাড়িতে ওদের যদি না পায়?” এমিলি ছোট মেয়ের মত ওঁর বাবার হাত জড়িয়ে ধরলেন।
লিন্ডাদের বাড়ির ভাঙাচোরা গেটের সামনে যখন পৌঁছলেন তখন প্রায় রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। কিন্তু বাড়িতে কেউ আছে বলে তো মনে হয় না – কোথাও কোন আলো জ্বলছে না। দূরে দূরে আরও যে ভগ্নদশা বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলোও তেমনই অন্ধকার; পুরো অঞ্চলেই কোন মানুষের বসবাস আছে বলে মনে হয় না। হেনরি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, “বব আর জেসির সাথে তুই এই বাড়িতে এসেছিলি? তোরা সেদিন বলার পর আমি এখানকার কিছু পুরনো ও বৃদ্ধ বাসিন্দাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম; তারা সবাই বললেন যে পঞ্চাশ বছরের ওপর হয়ে গেছে এই জায়গাগুলো পরিত্যক্ত আর সাম্প্রতিককালে কেউ কোন বাড়ি এখানে কিনেছেন বলে ওনারা শোনেননি। তবে কিছু অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপারের গুজব শোনা যায়। যাই হোক, এখন জলদি চল, পুলিশে খবর দেওয়া দরকার। তোর মা তো ফোন করেননি? – মানে ওরা বাড়িতে ফেরেনি”।

পুলিশ বাহিনী তাদের স্নিফার কুকুর নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছে সেই রাস্তায়; সঙ্গে এমিলি আর হেনরি। মাইনের দিকে আসতেই স্নিফার কুকুর তীর বেগে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো বন্ধ গেটের ওপর। আর তখনই ভিতর থেকে ভেসে এলো ছোট মেয়ের রিনরিনে দুর্বল গলার আকুতি, “হেল্প, হেল্প…”। এমিলি আর হেনরি চিৎকার করে উঠলেন, “জেসি, জেসি, বব……কোথায় তোরা?”

যদিও ওই পুরো খনি অঞ্চলটাই ঐতিহাসিক জায়গা হিসেবে বিশেষ ভাবে সংরক্ষিত, কিন্তু কোন সবসময়ের সুরক্ষা কর্মী ওখানে বহাল নেই। কিন্তু পুরো জায়গাটাই কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা আর সব গেটগুলোও তো বন্ধ – তাহলে বাচ্চা দুটো ভিতরে ঢুকলো কি করে?

জেসিকার ক্ষীণ গলার আওয়াজ আর পাওয়া যাচ্ছে না; স্নিফার কুকুরের উচ্চকিত ডাক লক্ষ্য করে পুলিশের জোরালো টর্চের আলো গিয়ে পড়লো “হেড ফ্রেমের” নিচে মাটির ওপর উপুড় হয়ে বিচিত্র ভাবে পড়ে থাকা রবার্টের গায়ে। এমিলি দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো, “বব, বব…”; অজ্ঞান রবার্টকে কোলে তুলে নিলো। ততক্ষণে খানিকটা দূরে পাওয়া গেল আধা-অচৈতন্য জেসিকাকে!
তারপর এক সপ্তাহ কেটে গেছে। জেসিকা, রবার্ট দুজনে এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি; প্রাথমিক ধুম জ্বর আর ভুল বকা কমে এসেছে; তবে হতবুদ্ধি ভাব আর মাঝেমাঝেই রবার্টের লিন্ডার নাম ধরে ডাকা, “ড্যাডি, ড্যাডি” বলে ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা – এসবে ওদের মা, দাদু, দিদিমা খুবই চিন্তান্বিত। খবর পেয়ে, শিকাগো থেকে ওদের বাবাও এসেছেন; রবার্ট “ড্যাডি” বলে ডাকলেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন, তাকে কোলে টেনে আদর করতে যাচ্ছেন – কিন্তু রবার্ট তাঁকে যেন চিনতেই পারছে না, আড়ষ্ট হয়ে হাত ছাড়িয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে কেউ ওদের কোন প্রশ্ন করে সেদিনের ঘটনা জানার চেষ্টা করছে না।

পুলিশ তদন্ত করে জেনেছে ওই ভগ্নদশা বাড়িটার বয়স একশ বছরের ওপর! ওখানে “সালিভান” পরিবার থাকতো; ম্যাথু সালিভান ওই খনির একজন সুপারভাইসার ছিলেন, যিনি খনির বুকে ঘটে যাওয়া সেই সাঙ্ঘাতিক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান। তারপর বছরখানেকের মধ্যেই ওই পরিবারের সবাই “স্পানিশ ফ্লু” মহামারিতে মারা যায়। 

এমিলি শহরের সবচেয়ে পুরনো কবরখানায় গিয়ে খুঁজে পেয়েছে “সালিভান” পরিবারের চার সদস্যের আগাছায় ভরা কবরের ভাঙাচোরা পাথরের ফলক; সময়ের ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেই একশো বছরের স্মৃতিকে আগলে; এখানে যেহেতু বছরের প্রায় ছ’মাস বরফ পড়ে, সেরকম ধুলোর আস্তরণ হয়নি; কিন্তু সময়ের ছাপ খোদাই করা নামগুলোকে অনেকটাই অস্পষ্ট করে দিয়েছে; খুব কষ্টে উদ্ধার করা গেল প্রায় মুছে যাওয়া নামগুলো - ম্যাথু, রোজ, লিন্ডা আর……এই নামটা দেখে এমিলি প্রচণ্ড চমকে গেল; ওর যুক্তিবাদী মনও কেঁপে উঠলো এক ভয়ঙ্কর অবিশ্বাস্য অশনি সঙ্কেতে…… “রবার্ট!!” এমিলির মাথা ঘুরে উঠলো; তিনি কোনরকমে একটা গাছের গুঁড়িতে ভর দিয়ে নিজেকে সামলালেন। তবে কি, তবে কি…? তাঁর আদরের ছোট্ট বব সেই সব অবাস্তব গল্পের মত জাতিস্মর…এক শতাব্দী আগের “রবার্ট সালিভান” ফিরে এসেছে? এমিলি বুকফাটা আর্তনাদ ”না, না…আ…আ…, বব, বব…” করতে করতে পাগলের মত আগাছার জঙ্গল মাড়িয়ে ছুটতে লাগলেন। সেই প্রাচীন কবরখানা যেন হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠেছে; এমিলির মনে হচ্ছে তাঁকে ঘিরে ঘিরে যেন কত গলার ফিসফিসানি আর তারই ভিতর থেকে ছাপিয়ে ধেয়ে আসছে দুটো বাচ্চার মিহি, তীক্ষ্ণ গলার উচ্চকিত কান্নার আওয়াজ … “ড্যাডি, ড্যাডিই…ই…ই!!
(গল্পটি পুরোপুরি আমার কল্পনাপ্রসুত। বাস্তবের কোন ঘটনা বা চরিত্রর সাথে মিল থাকলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও কাকতালিয়।)

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

শতাব্দীর ওপার থেকে

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

bishnu.jpg

ভালোবাসার

সবুজ পাতা

বিষ্ণু প্রসাদ দাস

maple1.jpg

​নদীর তীরে একটি ছোট্ট পার্ক। পার্কটির একেবারে শেষ প্রান্তে, বাগানের সীমানা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি শুকনো গাছ। কতদিন ধরে যে গাছটি এভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তার হিসাব হয়তো কারও জানা নেই। একসময় গাছটি ছিল সবুজ পাতায় পরিপূর্ণ। ডালে ডালে ফুটত লাল ফুল। ফুলের মধু আর গাছের ছায়ার টানে কত পাখি যে এসে বসত! তাদের কল কাকলিতে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। মনে হতো, গাছটি যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত কবিতা।

কিন্তু সে দিন আর নেই। সময়ের নির্মম আঘাতে তার যৌবন হারিয়ে গেছে। সবুজ পাতা ঝরে গেছে, ফুল ফুটে না, পাখিরাও আর আসে না। এখন শুধু তিন-চারটি শুকনো ডাল আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে….যেন অতীতের কোনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা। আমি প্রায়ই পার্কের একটি নির্জন কোণে বসি। ক্লান্ত জীবনের নানা অনুভূতি, পাওয়া-না-পাওয়া, আনন্দ-বেদনা নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলি। আর সেই বৃদ্ধ গাছটির দিকে তাকিয়ে মনে হয়…মানুষের জীবনও কি এমন নয়?

যৌবন একদিন চলে যায়, শরীরের শক্তি কমে আসে, চারপাশের মানুষের ভিড়ও ধীরে ধীরে কমে যায়। অথচ স্মৃতিগুলো থেকে যায়। শুকনো ডালের মতোই তারা আমাদের অতীতকে আঁকড়ে ধরে রাখে।…. তবে এই গাছটির একটি অদ্ভুত বন্ধু আছে। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি কাক এসে ওই শুকনো ডালের ওপর বসে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে। তারপর কয়েকবার ডাক দেয়, কখনও ডালে ঠোঁট দিয়ে টোকা মারে। তারপর আবার উড়ে চলে যায়।

প্রতিদিন একই ঘটনা। আমি অবাক হয়ে ভাবি…কেন আসে সে? হয়তো কোনো পুরোনো সম্পর্কের টানে। হয়তো এই শুকনো গাছটির সঙ্গে তারও কোনো অদৃশ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। হয়তো  ভালোবাসা কেবল মানুষই বোঝে না; প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর মধ্যেই তার নিজস্ব ভাষায় ভালোবাসা

বেঁচে থাকে।  

একদিন দেখলাম, তিন-চারজন প্রবীণ মানুষ গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। কৌতূহলবশত একটু কাছে গিয়ে শুনলাম। তাঁরা নাকি গাছটি কেটে ফেলার কথা আলোচনা করছেন। তাঁদের যুক্তিও অযৌক্তিক নয়।…..“গাছটি শুকিয়ে গেছে। আর কোনো কাজে আসে না। বরং কোনো দিন ডাল ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কেটে ফেলাই ভালো।”

কথাগুলো শুনে আমার মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে গেল। কয়েকদিন পর আবার পার্কে গিয়ে দেখলাম, গাছটির চারপাশে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়েছে। সবাই গাছটির দিকে তাকিয়ে আছে। আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তাহলে কি আজই গাছটিকে কেটে ফেলা হবে? আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম।

কিন্তু হঠাৎ দেখলাম…সবাই গাছটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আমি চোখ মেলে তাকালাম ।….অবিশ্বাস্য! শুকনো ডালের এক কোণে ফুটে উঠেছে এক টুকরো সবুজ পাতা! তারপর আরও ভালো করে দেখলাম…আরও কয়েকটি ছোট্ট কুঁড়ি। যে গাছকে সবাই মৃত ভেবেছিল, যে গাছকে কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত প্রায় হয়ে গিয়েছিল, তার বুকের ভেতর কোথাও যেন এখনও জীবন নিঃশব্দে স্পন্দিত হচ্ছিল।

সেদিন আমার মনে হলো…এ কি শুধু প্রকৃতির খেলা? নাকি ঈশ্বরের কোনো অদৃশ্য লীলা? হয়তো জীবন কখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। যতক্ষণ শিকড় মাটির গভীরে বেঁচে থাকে, ততক্ষণ ফিরে আসার সম্ভাবনাও থেকে যায় ।

তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। গাছটিতে ধীরে ধীরে আরও পাতা এসেছে। হয়তো আবার ফুলও ফুটবে একদিন। আর সেই কাকটিও এখনও আসে। প্রতিদিন একই সময়ে। শুকনো ডালের পাশে এখন যে কচি সবুজ পাতাগুলো দুলতে থাকে, তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ যেন তারও কথা হয়। কয়েকবার ডাকে, ডালে ঠোঁট দিয়ে টোকা দেয়, তারপর উড়ে যায়।

সেদিন থেকে পার্কে বসে আমি আর শুধু আমার প্রিয় গাছটিকে দেখি না। আমি দেখি...একটি অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার নিরন্তর জীবনসংগ্রাম। আমি দেখি…কাকটির সময়জ্ঞান, তার দীর্ঘ অপেক্ষা আর ফিরে আসার অদ্ভুত বিশ্বাস। আমি দেখি…স্মৃতিকে; যে স্মৃতি কখনও শুকিয়ে যায় না, পাতাঝরার ঋতুতেও যার রঙ মুছে যায় না। আর সবচেয়ে বেশি অনুভব করি...আমাদের তিনজনের এক অদ্ভুত ত্রিকোণ বন্ধুত্ব…আমি, গাছ আর সেই কাক। আমরা কেউ কারও ভাষা বুঝি না, তবু একে অপরের নীরবতা বুঝে নিই। কেউ কাউকে কিছু বলতে পারি না, তবু প্রতিদিনের উপস্থিতিতে জানিয়ে দিই…… সবুজ পাতার ভালোবাসাকে....।

ভালবাসার সবুজ পাতা
নটুবাবুর মাস্টারি বিভ্রাট
Shantanu Ghosh_edited.jpg

নটুবাবুর মাস্টারি বিভ্রাট:

ছাত্র যখন শ্বশুরমশাই

শান্তনু ঘোষ

oldman2.jpg

নটুবিহারী নট্ট মশাইয়ের স্মৃতিশক্তি অনেকটা বর্ষাকালের ব্যাঙের মতো, মাঝে মাঝে এমন লাফ দেয় যে তালগোল পাকিয়ে একাকার হয়ে যায়। নটুবাবু এককালে দাপুটে স্কুল শিক্ষক ছিলেন, এখন অবসর নিয়েছেন। কিন্তু মাস্টারি রক্ত কি আর অত সহজে শান্ত হয়?
​সেদিন নটুবাবু গিয়েছেন নিজের পুরনো স্কুলে একটা কাজে। স্কুলের বারান্দায় বসে আছেন, এমন সময় দেখলেন এক ভদ্রলোক একটি বছর পাঁচেকের ফুটফুটে মেয়েকে নিয়ে হেডমাস্টার মশাইয়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
​নটুবাবুর আবছা মনে পড়ল, আরে
! এই ভদ্রলোককে তো চেনেন তিনি। মাস তিনেক আগেই তো এর বাড়িতে গিয়ে এলাহি ভুরিভোজ করে এলেন। খাসির মাংসটা যা রেঁধেছিল না! ব্যস, নটুবাবুর মস্তিষ্কের রিলে রেস শুরু হয়ে গেল। তিনি ভেবে নিলেন, এই ভদ্রলোকই তাঁর সেই প্রিয় ছাত্র 'পচা' ওরফে পঞ্চানন, যার ছেলের অন্নপ্রাশনে তিনি গিয়েছিলেন।
​​নটুবাবু আসন ছেড়ে উঠে গিয়েই ভদ্রলোকের পিঠে এক ধপাস করে চড় মারলেন। ভদ্রলোক চমকে উঠে তাকাতেই নটুবাবু দাঁত বের করে হাসলেন।
"কী রে পচা
! ছেলেকে ছেড়ে এখন মেয়েকে ভর্তি করতে এনেছিস তা বেশ, বেশ। বংশবৃদ্ধি তো ভালোই করছিস দেখছি!"
​ভদ্রলোক তো আকাশ থেকে পড়লেন।
"আজ্ঞে, আপনি কি আমাকে বলছেন? আমি ঠিক..."
​নটুবাবু তাঁকে কথা শেষ করতে দিলেন না।
"আরে লজ্জা পাচ্ছিস কেন? তোকে যখন ক্লাস এইটে জিওগ্রাফিতে জিরো দিয়েছিলাম, তখনও তো এমন লাল হয়ে যেতিস
! শোন খোকা," বলে তিনি ছোট্ট মেয়েটির মাথায় হাত রাখলেন,

"তোর এই বাবাকে আমি কত যে পিটিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। বড্ড পাজি ছিল। তুই যদি ওর মতো দুষ্টুমি করিস, তোকেও কিন্তু এই বুড়ো মাস্টার পেটাবে! হা হা হা!"

ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি, ​ভদ্রলোক তো ঘামতে শুরু করেছেন। তিনি তোতলামি করে বললেন, "দেখুন স্যার, আপনি বোধহয় ভুল করছেন। আমি আসলে..."
​নটুবাবু আবার থামিয়ে দিলেন।

"চুপ! একদম কথা বলবি না। মাস্টারের ওপর কথা? আমি জানি তুই এখন বড় চাকরি করিস বলে ভাবছিস নটু স্যারের চড় খাবি না? পকেট থেকে মোবাইল বের কর, তোর বাবাকে ফোন লাগা। অবিনাশবাবুকে অনেকদিন গালমন্দ করিনি।"
​স্কুলের বারান্দায় তখন লোকে লোকারণ্য। সবাই নটুবাবুর কাণ্ড দেখছে। ওই ভদ্রলোক লজ্জিত হয়ে এদিক ওদিক পালাবার পথ খুঁজছেন। নটুবাবু তখন শুরু করেছেন জীবনের পরম জ্ঞান দেওয়া— "বুঝেছিস পচা, শিক্ষা ছাড়া মানুষ হওয়া যায় না। তুই তো স্কুল ছাড়ার পর সব ভুলে গেছিস। অন্নপ্রাশনে নিমন্ত্রণ করলি অথচ এখন আমায় চিনতে পারছিস না? কলিকাল আর কাকে বলে!"

​এমন সময় স্কুলের করণিক বিকাশবাবু ফাইল হাতে ওদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন।

"আরে নটুদা! আপনি নীলমাধববাবুর সাথে কী করছেন?"
​নটুবাবু ভ্রু কুঁচকে বললেন, "নীলমাধব কে হে? এ তো আমাদের পচা! ওর ছেলের অন্নপ্রাশন খেয়ে এলুম ক’মাস আগে।"
​বিকাশবাবু মাথায় হাত দিয়ে বললেন, "আরে নটুদা, সর্বনাশ করেছেন! ইনি আপনার ছাত্র পচার শ্বশুরমশাই! নীলমাধববাবু। পচার বিয়ে হয়েছে বছর দুয়েক আগে। আপনি যাঁর অন্নপ্রাশন খেয়ে এসেছেন, সে পচার ছোট ভাই নয়, পচার নিজের ছেলে! আর এই যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, এটি নীলমাধববাবুর ছোট মেয়ে, মানে পচার শ্যালিকা!"
​নটুবাবুর হাসিটা মুখেই জমে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি যাকে ছাত্র ভেবে ধমকাচ্ছিলেন, তিনি আসলে তাঁর ছাত্রের মুরুব্বি স্থানীয় শ্বশুরমশাই। আর যাঁর বাবাকে পেটানোর গল্প শোনাচ্ছিলেন, তিনি আসলে এই ভদ্রলোকের নিজের বাবা, যাঁকে নটুবাবু চেনেনই না!
​নীলমাধববাবু তখন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি করুণ স্বরে বললেন, "স্যার, আমি তো বারবার বলছিলাম যে আমি পচা নই... কিন্তু আপনি তো আমাকে জ্ঞান দিতে দিতে সেই ক্লাস এইটে নামিয়ে দিলেন!"
​নটুবাবু আর দাঁড়ালেন না। রুমাল দিয়ে কপাল মুছতে মুছতে স্কুলের পেছনের গেট দিয়ে এমন ভাবে প্রস্থান করলেন, যেন তিনি সর্ষে ক্ষেতে হারিয়ে যাওয়া এক নীলগাই।

গল্প

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

soumendra.webp

মানসের

জঙ্গলে

সৌমেন্দ্র দরবার

বাগুইআটি, কলকাতা

হাতির কথোপকথন.jpg
মানসের জঙ্গলে

"পাহাড়, সমুদ্র, নদী তো অনেক হলো, এবার একটু জঙ্গলে গেলে হয় না"। গত বছর সেপ্টেম্বরে শান্তিনিকেতনে আড্ডা মারতে মারতে ঠিক এই কথাটাই হয়ে ছিল আমাদের মধ্যে। দু তিনদিনের ছুটিতে, ঘরের কাছে, আবার পকেট সামলে কোথায় যাওয়া যায় সবাই যখন এই চিন্তায় মশগুল ঠিক তখনি মনে এলো পাশের রাজ্য আসামের কথা। ঠিক প্রকৃতি যেন আসামকে নানা রূপে সাজিয়ে তুলেছে। আসামের জঙ্গল, তাহলে কি কাজিরাঙা? বাণী আর শ্রীময়ী বললো না কাজিরাঙা যাবো না। অন্য কোথাও যাবো। ঠিক তখনি মাথায় এলো ঘরের পাশে মানস ন্যাশনাল পার্কের কথা, যেখানে চোখের সামনে ধরা দেয় সারি সারি বন্যপ্রাণ। সবুজ যেখানে মনকে আরো সবুজ করে তোলে আর মানস নদীর ঘন নীল জল মনকে করে তোলে রঙিন। ঠিক হলো সামনের বসন্তে (মার্চে) হবে আমাদের মানস ভ্রমণ। সেইমতো সৌর্য্য ঠিক দুমাস আগে ট্রেনে টিকিট বুকিংয়ের প্রথম দিনে যাওয়া ও আসার টিকিট কেটে নিলো। হোমস্টেয়ের মালিকের সাথে কথা বলে অ্যাডভান্সও করে দিলো। এবার শুধু দিনগোনার অপেক্ষা, যাওয়ার দিন কবে আসবে। 

১৮ই মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে ১৫৯৫৯ আপ কামরূপ এক্সপ্রেস হুইসেল দিয়ে নির্ধারিত সময়ে হাওড়া স্টেশন ছাড়লো। আমাদের কোচ এ ১, এ সি টু টিয়ার। এই যা পরিচয় পর্বটাই তো এখনো হয় নি। এবারের ট্রিপে আমরা মোট ৬ জন। সৌর্য্যে, ওর স্ত্রী বাণী, ওর তিন বছরের মেয়ে বরফি, আমি, শ্রীময়ী আর আমার মেয়ে রাই। দাদা ভাইয়ের ছোট্ট পরিবার। ট্রেনে উঠেই শুরু হলো কত গল্প। রাই আর বরফি নিজেরা নিজেদের মত করে সময় কাটাতে লাগলো। চা, বিস্কুট আর চিপস খেয়ে শুরু হলো তাস খেলা। রাত ৮টায় রাতের খাবারের অর্ডার নিতে এলো। ২টো পনির আর ৩টে চিকেন থালি অর্ডার দেওয়া হলো। রাত পৌনে দশটায় খাবার এলো। ডিনার করে সবাই সবাইকে গুডনাইট জানিয়ে শুয়ে পড়লো। সূর্যের প্রথম কিরণ কাঁচের জানলা ঠেলে ঘুম ভাঙালো। ট্রেন অনেক্ষণ হলো নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। ট্রেন রানিং স্ট্যাটাসে দেখলাম ট্রেন অন টাইমে চলছে। ব্রেকফাস্ট খেয়ে নানা বিষয় আলোচনা করতে করতে আমরা এগিয়ে চললাম গন্তব্য পথের দিকে। নির্ধারিত সময় থেকে ১০ মিনিট লেটে ১১ টা ৫৫ মিনিটে ট্রেন পৌঁছলো বরপেটা রোড স্টেশনে। ব্যাগপত্তর নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে সবাই মিলে গ্রুপ ফটো তোলা হলো। আগে থেকে আমাদের গাড়ি বলা ছিল। একনম্বর প্লাটফর্মএ গিয়ে গাড়িতে ব্যাগপত্তর তুলে শুরু হলো আমাদের স্বপ্নের মানস যাত্রা। আজ আমাদের সারথি আনোয়ার। সকালে বৃষ্টি হয়েছে, এখন ঝলমলে রোদ। স্থানীয় বাজার পেরিয়ে দুদিকের অপরূপ শোভা উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চললাম। মিনিট ৪০ বাদে দূরে দেখা গেলো মানস ন্যাশনাল পার্কের বিশাল গেট। এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, যা তার অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বাঘ, এবং একশৃঙ্গ গণ্ডারের জন্য বিখ্যাত। গাড়ি তোরণ গেট পেরিয়ে বাঁদিকে ঘুরলো। মিনিট খানেক যাবার পর আমরা এসে উপস্থিত হলাম মানস অর্কিড হোমস্টেটে। প্রথম দর্শনেই মনটা বেশ ভালো হয়ে গেল। মনে মনে যা ভেবেছিলাম বাস্তবে তার থেকেও ভালো। হোমস্টেয়ের মালিক কৃষ্ণ পাঠক একগাল হাসি নিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। অতি অমায়িক ব্যবহার। ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস দিয়ে আমাদের বরণ করে নেওয়া হলো। আগে থেকেই আমাদের কটেজ বুক করা ছিল। পাশাপাশি ৩টি কটেজের ২টিতে আমরা থাকবো। নতুন কটেজে আমরাই আজ প্রথম অতিথি। ঘর দেখে মন ভোরে গেল। কৃষ্ণ বললো, আপনাদের হাতে একঘন্টা সময় আছে, এরমধ্যে স্নান খাওয়াদাওয়া করে রেডি হয়ে নিন। আপনাদের জন্য আফটারনুন সাফারি বুক করা আছে। আড়াইটার মধ্যে জঙ্গলে এন্ট্রি নিতে হবে। মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। সবাই স্নান করে রেডি হয়ে ডাইনিং এরিয়াতে এলাম। আজ দুপুরে আমাদের নিরামিষ থালি সঙ্গে তিনটে চিকেনের প্লেট। থালিতে ছিল ভাত, ডাল, ফুলকপির তরকারি, আলুভাজা, স্যালাড ও আচার। খাবারের স্বাদ এতটাই ভালো ছিল যে সবাই নিরামিষ খাবারই মহানন্দে খেয়ে নিলো আর চিকেনগুলো রাতের জন্য তুলে রাখলো। খাওয়া যখন শেষ হলো, ঘড়িতে তখন ২টো কুড়ি। টুকটাক কিছু খাবার কাগজে প্যাক করে নিলাম। মানসের জঙ্গলে প্লাষ্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি মিনারেল ওয়াটার বোতল ও নিষিদ্ধ। আমরা আগে থেকেই নন ডিস্পোসেবল বোতল সঙ্গে এনেছিলাম। তাতে জল ভোরে জিপে উঠলাম। আজ সাফারিতে আমাদের সারথি বিলাল। বরফি আর রাইয়ের উৎসাহ ছিল সব থেকে বেশি। জিপ মেন গেটে এসে দাঁড়ালো। বিলাল ফরেস্ট অফিসে পারমিশন দেখিয়ে সই করে এলো। এন্ট্রি নিলাম মানসের জঙ্গলে। একটা অন্যরকম ভালো লাগায় মনটা ভরে গেল। দুটো ময়ুর আমাদের অভিবাদন জানলো। কি তাদের রূপ। সৌর্য্যের ক্যামেরার শাটার পড়তে শুরু করে দিলো। জিপ এগিয়ে চললো গভীর অরণ্যে। যারা পাখি ভালোবাসে মানস তাদের কাছে স্বর্গ রাজ্য। বিলাল বর্ণনা দিতে দিতে একটার পর একটা পাখি দেখতে লাগলো আর আমরা ছবি তুলতে লাগলাম। কিছু ক্যামেরায় ধরা দিলো কিছু রইলো মনের অলিন্দে। দেখতে দেখতে আমরা এলাম মানস নদীর পাড়ে। জায়গাটা অপূর্ব সুন্দর। দুদিকে জঙ্গল তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে মানস নদী। দেখা মিললো ওয়াটার বাফেলোর। অনেকটা দূরে মোবইলে ছবি ভালো এলো না। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। বিলাল বললো স্যার "এ তো ট্রেলার হে, পিকচার আভি বাকি হ্যায়"। কিন্তু এখনো অবধি পাখি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না। গাড়ি ডানদিকে টার্ন নিলো। সামান্য যাওয়ার পর বাঁদিকে দেখা দিল উন্মুক্ত ঘাসের জমি সঙ্গে একপাল বন্য হাতি। সবাই আনন্দে আত্মহারা। ছবির পর ছবি উঠলো। আরো কিছুদূর যাবার পর দেখা পেলাম নীলকন্ঠ পাখির। কি যে তার রূপ তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। এদিকে ছবি তোলার আগেই হগ ডিয়ার রাস্তা পেরিয়ে গেল। এবার সবার মনে পুলক। ধীরে ধীরে আলো কমে আসতে লাগলো। সূর্য পশ্চিমে ঢোলে পড়তে শুরু করেছে। জঙ্গলের বুকচিরে এগিয়ে চলেছে আমাদের জিপসি। অনবরত ডানদিকে বাঁদিকে নানা পাখির ছবি তোলা। ঘাড় ব্যাথা হয়ে গেল। আবারো দেখা মিললো একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী হাতির, সঙ্গে বাচ্চা। সম্পূর্ণ পরিবার নিয়ে পারিবারিক ভ্রমণ। আরো কিছুটা গিয়ে দূরে দেখা পেলাম কয়েকশো লম্বা শিঙওয়ালা বুনো বাইসনের। বিলাল বললো আমরা ওদের সামনে দিয়েই যাবো। সোজা গিয়ে জিপ ডানদিকে ঘুরে একটি নালার সামনে দাঁড়ালো। আমাদের থেকে ৫০ - ৬০ মিটার দূরে একদল বাইসন। সবাই ছবি তুলতে মন দিলো। ওরাও মাঝে মাঝে পোজ দিতে লাগলো। জীবনে এই প্রথম এতো বাইসন একসাথে দেখলাম। তাও আবার বন্য। আনন্দও হলো আবার ভয় ও লাগলো যদি তেড়ে আসে। না সে সব কিছুই হলো না। অনেকক্ষণ সময় কাটিয়ে সামনের পথ ধরলাম। সন্ধে প্রায় হয় হয়। দূরে বেশ কয়েকটা হরিণ দেখতে পেলাম। কম আলোতে ছবি আর তুলতে পারলাম না। ধীরে ধীরে গেটের কাছে এলাম। বিলাল সই করে এলো। ফিরে চললাম মানস অর্কিড হোমস্টেটে। ফ্রেশ হয়ে চা আর পাকোড়া অর্ডার করে দিলাম। খুব খিদে পেয়েছে বলে বাণী আর শ্রীময়ী সঙ্গে তিনটে ম্যাগি আরো দিতে বললো। আমি আর সৌর্য্য একটু কেনাকাটা করতে বেরোলাম, কাছাকাছি কোনো দোকান নেই, প্রায় দু কিলোমিটার যেতে হবে। অন্ধকার রাস্তা সঙ্গে ময়ূরের ডাক। এক মায়াবী পরিবেশ। কেনাকাটা করে আবার অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে ফিরে এলাম হোমস্টেতে। এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম। এবার চা খেতে খেতে চললো তাস খেলা। রাই ফোন দেখছে আর বরফি ছবি কালার করছে। রাত পৌনে দশটায় ডিনারে ডাক পড়লো। বাইরে বেশ ঠান্ডা হওয়া বইছে। রুটি, তরকারি, স্যালাড, আচার আর চিকেন দিয়ে জমিয়ে ডিনার হলো। কাল আমাদের ভুটান সফর। সবাই খুব এক্সসাইটেড। আমি আর রাই সামনের অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে বেরোলাম। একটা পেঁচা বিকটভাবে ডেকে গেল। মিনিট দশেক বাদে ফিরে এলাম। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে, সবাইকে গুডনাইট জানিয়ে পাড়ি দিলাম ঘুমের দেশে।                     ভোর ৩টে, ঝমঝম শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। ব্যালকনিতে বেরিয়ে দেখি মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। চারিদিকের নিকশ অন্ধকার ভেদ করে অবিরাম বারিধারা নিজস্ব খেয়ালে ঝরে পড়ছে। এই বৃষ্টিতে সারা দিনের সাফারি কিভাবে হবে ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। চিন্তায় ঘুম আর কিছুতেই এল না। ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটল। কখনো জোরে কখনো আসতে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। সকাল সাতটায় বৃষ্টির দাপট কিছুটা কমে এল। মেঘ কাটতে শুরু করল। সবাই স্নান করে রেডি হতে থাকলাম। আটটা নাগাদ বৃষ্টি থেমে গেল। পুরি, আলু মটরের তরকারি, ম্যাগি আর চা দিয়ে ব্রেকফাষ্ট সেরে সবাই রেডি। বরফি আর রাই এর উৎসাহ আজও সবথেকে বেশি। সে কি আনন্দ ওদের বলে বোঝাতে পারব না। আমাদের ড্রাইভার বিলাল সবাইকে জিপে উঠতে বলল। ঠিক নটায় সাফারি শুরু হল। আজ আমরা প্রথমে যাব মাথানগুড়ি, পরে সেখান থেকে বর্ডার পেরিয়ে ভূটান। ইন্টারন্যাশনাল সফরের আনন্দে সবাই মশগুল। মানসের গেটে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখিয়ে আমরা গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। বৃষ্টিভেজা জঙ্গল যেন আজ আরো সবুজ। পাতার এক অদ্ভুত সুন্দর গন্ধে চারিদিক ভরে আছে। বৃষ্টি থামার পর সূর্যের আলো পড়ছে নদীর জলে, সবুজ ঘাস রোদের আলোয় ঝলমল করছে, আর দূর থেকে শোনা যাচ্ছে হাতির তূর্যধ্বনি। এমন মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে বারেবারে মানসে ছুটে আসা যায়। অন্যান্য জিপের সাথে আমাদের জিপ ও এগিয়ে চলল। কিছুদূর যেতেই দুটো হগ ডিয়ার জঙ্গলের ডানদিক থেকে রাস্তা পেরিয়ে নিমেষে বাম দিকের জঙ্গলে চলে গেল। চারিদিকে কত নাম না জানা পাখি। বিলাল তাদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে লাগল। কিছু পাখিকে ক্যামেরা বন্দী করলাম কিন্তু বেশিরভাগই বন্দী হয়ে রইলো মনের ক্যানভাসে।

আরো কিছুটা এগিয়ে দেখা মিলল গজরাজের। নিশ্চিত মনে গাছের পাতা খেতে ব্যস্ত। যেতে যেতে দেখা মিলল বিপন্ন প্রজাতির বেঙ্গল ফ্লোরিকান, গ্রেটার র‍ম্যাকেট-টেইলড ড্রঙ্গো, বিরল প্রজাতির রুফাস-নেকড লাফিংথ্রাশ, মাছরাঙা, আরও কত নাম না জানা পাখির। মানস পাখি প্রেমিদের কাছে সত্যিই স্বর্গরাজ্য, যেখানে ৪৫০টিরও বেশি প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। কাঠবিড়ালীর খুনসুটি, গিরগিটির রঙ পাল্টানো আর প্রজাতিদের মধু আহরণ দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছলাম আপার মাথানগুড়ি বনবাংলোতে। সামনে মানস নদী, দূরে ভূটান পাহাড় আর পিছনে গভীর অরণ্য, সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। ক্যামেরার শার্টার চলল তার আপন খেয়ালে। মানস নদীর তীরে অবস্থিত এই ফরেস্ট বাংলো থেকে ভুটান পাহাড়ের দৃশ্য এবং নদীর শান্ত পরিবেশ মুগ্ধ করার মতো। আসাম সরকার এখন আর টুরিস্টদের এই বন বাংলোয় থাকতে দেয় না। বাংলোর দোতলায় একটা খুব সুন্দর মিউজিয়াম আছে। আমরা সবাই সেটা ঘুরে দেখলাম। ক্যান্টিন থেকে গরম গরম ম্যাগি আর চা নিয়ে নদীর ধারে বসে খেলাম। সামনে উন্মুক্ত প্রাকৃতিক শোভা। মানস নদীর তীরে অবস্থিত এই ফরেস্ট বাংলো থেকে ভুটান পাহাড়ের দৃশ্য এবং নদীর শান্ত পরিবেশ মুগ্ধ করার মতো। তারপর আরও কিছু ছবি তুলে এগিয়ে চললাম ভূটানের রয়্যাল মানসের দিকে। জিপ এসে দাঁড়ালো ভুটান বর্ডার চেকপোস্টে। আমাদের হোমস্টের মালিক কৃষ্ণ পাঠক আগে থেকেই আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় পারমিট করিয়ে রেখেছিলো। ড্রাইভার বিলাল সবার আই ডি দেখিয়ে এন্ট্রি করিয়ে নিল। সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে বেকি নদী, ওপারে ভুটান পাহাড় যার প্রাকৃতিক শোভা অতি মনোরম। সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। রাই আর বরফি বিভিন্ন পোজে ছবি তুলতে লাগলো। বিলাল সবাইকে তাড়া দিয়ে জিপে তুললো। ধীরে ধীরে ইন্দো ভুটান বর্ডার পেরিয়ে আমরা ভুটানে প্রবেশ করলাম। কিছুদূর এগিয়ে জিপ থামলো। বাঁদিকের গাছে হলদে কালো সাদা রঙের হর্নবিল। লম্বা হলুদ ঠোঁটে কি যে অপূর্ব লাগছিলো তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তারা উড়ে চলেছে একডাল থেকে অন্য ডালে। ক্যামেরার শার্টার ঘন ঘন পড়তে লাগলো। অনাবিল আনন্দে মন ভোরে গেল। অনেক্ষণ সময় কাটিয়ে আবার এগিয়ে চললাম। চারিদিকের দৃশ্য এতটাই মনোরম চোখ ফেরানো দায়। চোখের পলক ফেলার আগেই স্পটেড ডিয়ার রাস্তা পেরিয়ে গেল। সামনে দু-দুটো অসম্ভব ভালো মনেস্ট্রি দেখে, বেকি নদীর ব্রিজ পেরিয়ে জিপ এসে দাঁড়ালো পানবং এর মারাংদত্ত

জঙ্গল লজ এ। এদের রেস্তোরাঁতে আজকে আমাদের দুপুরের খাবার ব্যবস্থা। জায়গাটা অসাধারণ। নদীর ধরে পাহাড়ে ঘেরা লজ। খাওয়া ভুলে সবাই লজ ঘুরতে ব্যস্ত। অগত্যা সৌর্য্য সবার খাবার অর্ডার দিলো। সবার নিরামিষ খালি আর সঙ্গে তিনটে ওমলেট। মিনিট পনেরো বাদে পেতলের থালা বাটিতে সুসজ্জিত খাবার পরিবেশিত হলো। আমি সঙ্গে একটা ভুটানি পদ নিলাম। নাম "ঈমাদাসী"। কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ, রসুন আর আদা দিয়ে তৈরি অসাধারণ একটা আচার। বাকিরা যারা খাবে না বলেছিলো তারাও একচামচ করে টেস্ট করলো। রাই আর বরফির তো ওমলেট বেজায় ভালো লাগলো। দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে এবার ফেরার পথ ধরলাম। ঘড়িতে তখন তিনটে। হ্যাঙ্গিং ব্রিজ এর কাছে এসে বিলালকে বললাম আমাদের তিনজনকে নামিয়ে দিয়ে ওপারে চলে যেতে। রাই, বাণী আর আমি নেমে পড়লাম, পুরোনো ব্রিজটা হেঁটে পার হবো বলে। অনেকদিনের পুরোনো ব্রিজ, বেশ ভয় ভয় লাগলো, আবার  ভালোও  লাগছিলো। চারিদিকের দৃশ্যপট অনবদ্য। ঘন্টার পর ঘন্টা এখানে কাটিয়ে দেওয়া যায়। সৌর্য্য আর শ্রীময়ী ওপার থেকে আমাদের ছবি তুলছিলো। এবার জিপে উঠে সবাই বললো সামনের মার্কেটে যাবে। বাঙালি বিদেশে এসেছে কিছু না কিনে কি বাড়ি যাবে? অগত্যা বেচারা বিলাল, মার্কেটে একটা বড়ো দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করালো। ভুটানি কোল্ডড্রিঙ্কস, চকলেটস আর কিছু কসমেটিকস কিনে আবার পাহাড়ি জঙ্গলের পথ ধরে পথ চলা। বর্ডারের কাছে এসে আবারও হর্নবিলদের দেখা পেলাম। আবার ছবি তোলা শুরু। হর্নবিলদের ফ্রেমবন্দি করে এবার বর্ডার পেরোলাম। শেষ হলো ঝটিকা ভুটান সফর। এবার আবার ভারতে ফিরে যাওয়া। জঙ্গলের পথ ধরে জিপ এগিয়ে চললো। কিছুদূর এগিয়েই চোখে পড়লো নীলকণ্ঠ পাখির। তারপর হলুদ, সবুজ, লাল, সাদা, কালো রংবেরঙের কত পাখি যে ধরা দিলো চোখের ক্যানভাসে তার হিসাব দিতে গেলে একটা বই লেখা হয়ে যাবে। সে সব সযত্নে থাক মনের গভীরে। দুদিকের ঘন সবুজ জঙ্গল ভেদ করে আমাদের জিপ এগিয়ে চললো। সামনে দেখা মিললো দিগন্ত বিস্তীর্ণ

তৃণভূমির আর একপাল বন্য হাতির। সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। জিপ স্টার্ট বন্ধ করে দিলো। চললো হাতিদের খুনসুটি দেখা। বিলাল বললো, স্যার প্রায় পাঁচটা বাজে এখনো অনেকটা পথ বাকি, গেট বন্ধ করে দেবে। অগত্যা আবার চলা। হঠাৎ দূরে আবছা বেশ কয়েটা প্রাণী দেখা গেল। খালি চোখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সৌর্য্য বাইনোকুলার দিয়ে দেখে বললো ‘রাইনো’। অবশেষে তাঁর দেখা মিললো। আসামের বিখ্যাত একশৃঙ্গ গন্ডার। বাইনোকুলারে সবাই একবার করে চোখ রেখে দেখে নিল। পড়ন্ত বিকেলে অস্তমিত সূর্যের আভা দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে চললাম। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামতে লাগলো। হঠাৎ বিলাল জিপ দাঁড় করিয়ে দিলো। ডানদিকে তাকিয়ে দেখলাম হাত চারেক দূরে জঙ্গলের মধ্যে আমাদের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা সম্বর ডিয়ার। যেন স্ট্যাচু। ক্যামেরা বন্দী করে এগোলাম। ঘড়িতে পৌনে ছটা। এবার ভয় করতে লাগলো। আজ বনকর্মীরা গেটে ফাইন করবেই। অবশেষে ছয়টায় মেইন গেটে পৌঁছলাম। বিলাল গিয়ে কি সব কথা বলার পর গেট খুলে দিলো। বুকে যেন বল এলো। বিলালের মতো ড্রাইভার পেয়ে আমরা যে স্মৃতি সঞ্চয় করলাম তা অক্ষত হয়ে থাকবে। ফিরে এলাম অর্কিড হোমস্টেতে। ফ্রেশ হয়ে চা আর পাকোড়া খেতে খেতে চললো তাস খেলা। বরফি আর রাই নিজেরা খেলতে লাগলো। রাত সাড়ে-নটায় ডিনারের ডাক পড়লো। রুটি, আলু বেগুন বড়ির তরকারি, স্যালাড, আচার আর চিকেন কষা দিয়ে জমিয়ে ডিনার হলো। কৃষ্ণ পাঠকের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথাও হলো। অবশেষে সবাই সবাইকে গুডনাইট জানিয়ে পাড়ি দিলাম ঘুমের দেশে।      
ঘুম ভাঙলো ঠিক পাঁচটায়। বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। সকাল ছটায় এলিফ্যান্ট সাফারি। যা বৃষ্টি পড়ছে তাতে এলিফ্যান্ট সাফারি কিছুতেই সম্ভব নয়। স্বভাবতই মনটা তাই খারাপ। দরজা খুলে দেখি বাইরের লনে সৌর্য্যে ছাতা মাথায় শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাফারি না হওয়ার জন্য দুজনেরই কিছু ভালো লাগছিলো না। ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। বৃষ্টির তোড়টা একটু কমলো। হঠাৎ ৬টা ১৫ মিনিট নাগাদ কৃষ্ণ এসে ডাকলো। ফরেস্ট রেঞ্জার ফোন করেছিল, এলিফ্যান্ট সাফারিতে যেতেই হবে, এখুনি রেডি হয়ে নিন। আমি আর রাই ২ মিনিটে রেডি হয়ে বাইরে এলাম। শ্রীময়ী বললো সাফারিতে যাবে না। সৌর্য্য আর বাণী তখনও রেডি হচ্ছে। কৃষ্ণ বললো আপনাদেরকে আগে রেখে আসি তারপর সৌর্য্য স্যারদের নিয়ে যাবো। ছাতা নিয়ে জিপে চেপে আমি আর রাই পৌঁছলাম এলিফ্যান্ট সাফারির স্টার্টিং পয়েন্টে। ইতিমধ্যে সৌর্য্য কৃষ্ণকে ফোন করেছে। ও আবার ওদের আনতে ছুটলো। তিন মিনিটের মধ্যে ওরাও চলে এলো। টিপ্ টিপ্ করে বৃষ্টি পড়ছে। ছাতা মাথায় দিয়ে শুরু হলো আমাদের সাফারি। একটা হাতিতে আমি আর রাই, অন্য আর একটাতে সৌর্য্য আর বাণী। চারিদিকের সবুজে চোখ ও মন দুটোই ভরে গেল। সে এক অন্য অভিজ্ঞতা। মর মর শব্দে গাছপালা ভেঙে দুলতে দুলতে আমাদের হাতিরা এগিয়ে চললো। আমি আমাদের মাহুতকে জিজ্ঞাসা করলাম গন্ডার কি দেখতে পাবো? সে বললো স্যার কপাল ভালো থাকলে দেখা মিলতেও পারে। মিনিট দশেক পর মাহুত বললো স্যার ডানদিকে দেখুন, গন্ডার। মন আনন্দে নেচে উঠলো। মাত্র তিন - চার হাত দূরে মা ও মেয়ে নিশ্চিন্ত মনে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঘাস খাচ্ছে। হাতি দাঁড়িয়ে পড়লো। কত যে ছবি নিলাম তা আর মনে নেই। সামনে এগোতেই বাঁদিকে কুচ্কুচে কালো ওয়াটার বাফেলো আমাদের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। পরে জলার মধ্যে আরো দুটো গন্ডারের দেখা পেলাম। নানা ধরনের বক, পাখি, ময়ূর, হরিণ দেখে শেষ হলো আমাদের একঘন্টার এলিফ্যান্ট সাফারি। যা দেখলাম আর যা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম বহুদিন মনের মনিকোঠায় সযত্নে রক্ষিত থাকবে। হাতিদের সঙ্গে অনেক ছবি তোলা হলো। গেট থেকে বেড়িয়ে সামনের দিগন্ত বৃস্তিত চা বাগানে চললো ছবি তোলার পালা। চারিদিকের উন্মুক্ত সবুজে মন ও সবুজ হয়ে গেল। ফিরে এলাম হোমস্টেতে। টিপ্ টিপ্ করে বৃষ্টি পরেই চলেছে। 

 

 

 

​

 

কৃষ্ণই দুঃসংবাদটা জানালো। এই বৃষ্টিতে আজ রাফটিং বন্ধ। আমি আর সৌর্য্য কৃষ্ণর সাথে আলোচনায় বসলাম। আজ আমাদের ফিরে যাওয়ার ট্রেন রাত আটটায়। সারাদিন কি করা যায়। আলোচনা করতে করতে কৃষ্ণ বললো পশ্চিম মানসের জঙ্গলটা ঘুরে যান স্যার, এখনো বেশি ট্যুরিস্টদের ছোঁয়া লাগেনি। খুব ভালো লাগবে। সঙ্গে সঙ্গে ডিসাইড করলাম যাব। কৃষ্ণ পরামর্শ দিলো আপনারা একেবারে চেকআউট করে দশটা নাগাদ বেরিয়ে যান, লাগেজ এখান থাকে আমি গাড়ি করে পাঠিয়ে দেব। আরো বললো বিকেলে গাড়ি আপনাদের কে বরপেটা রোড থেকে নিয়ে নিউ বঙ্গাইগাওঁ স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসবে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। বাগপত্তর গুছিয়ে রেডি হয়ে ডাইনিংয়ে এলাম ব্রেকফাস্ট করতে। আজ ব্রেকফাস্ট এ পুরি, সব্জি, ডিম সিদ্ধ, ম্যাগি আর চা। মুশকিল একটাই, আজ ঈদ, তাই বিলাল ও নেই। নতুন ড্রাইভার, অন্য জিপ। কি আর করা, তাই সই। আমাদের একটু লেট হলো। সাড়ে দশটার সময় আমরা রওনা দিলাম। অনেকটা রাস্তা, প্রায় ৪০ কিলোমিটার। জিপ চললো ঝড়ের গতিতে। মাঝে মাঝে রাস্তা খুব খারাপ ছিল। চারিদিকের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চললাম। বারোটার সময় আমরা এসে পৌঁছলাম জঙ্গলের এন্ট্রি গেটে। জঙ্গলের নামটাই তো এখনো বলা হয়নি। আজ আমরা এক্সপ্লোর করবো 'কহিতামার' জঙ্গল। এটা পশ্চিম মানস। কৃষ্ণ আগেই বিট অফিসে ফোন করে সব ব্যবস্থা করে রেখে ছিল। আধ ঘন্টার মধ্যে ড্রাইভার এন্ট্রি পারমিট করিয়ে সঙ্গে গাইড এবং বন্দুকধারী গার্ড নিয়ে ফিরে এলো। জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। সবুজ ঘাসজমির ওপর দিয়ে ছুটে চললো আমাদের জিপ। অপূর্ব সে দৃশ্য। মিনিট দশেক যাবার পর শুরু হলো আসল জঙ্গল। নিচে ঘাস জমি তার ওপরে রুক্ষ গাছের সারি, মাঝে মাঝে বিশাল বড়ো বড়ো গাছ। সূর্যের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে জঙ্গলে এসে পড়ে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আমাদের বিদেশ মনে হলো। ভারতে যে এইরকম জঙ্গল আছে জানতামই না। এই জঙ্গলের স্বাদ নেওয়ার জন্য যে কোনো মূল্য দেওয়া যায়। নীলকণ্ঠ যে কত ধরণের হতে পারে তা এখানে না এলে কোনো ধারণা হতো না। সারি সারি বক উড়ে বেড়াচ্ছে। ময়ূর চলেছে হেলে দুলে। সবুজ কালো হাজারো পাখি ডালে ডালে বসে শিস্ দিচ্ছে। মাঠে আপনমনে হরিণ ঘুরে চড়ে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে দেখা মিললো গজরাজের। একটা পুরুষ অন্যটা স্ত্রী। পুরুষ হাতিটার বিশাল দাঁত। হঠাৎ তারা আমাদের খেয়াল করলো। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে আমাদের দিকে চেয়ে আমাদের দিকে পা বাড়ালো। ভয়ে সবার হার্ট বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। দাঁতাল হাতিটি গুটিগুটি পায়ে আমাদের দিকে এগোতে থাকল। সবাই ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। ড্রাইভার জিপ স্টার্ট দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হল। বেশ অনেকটা যাওয়ার পর পিছন ফিরে দেখলাম গজরাজ রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। এবার স্বস্তি। আমরা আবার এগিয়ে চললাম। সামনের বাঁদিকের উন্মুক্ত তৃণভূমিতে অনেকগুলো ইন্ডিয়ান গোউর এর দেখা পেলাম। ক্যামেরা বন্দী হলো তারা। জিপ প্রবেশ করলো আরো গভীর জঙ্গলে যেখানে সূর্যের আলো প্রায় ঢোকেই না। রীতিমতো গা ছম্ছমে পরিবেশ। আমরা ছাড়া আর কোনো টুরিস্ট এখানে নেই। মিনিট কুড়ি জিপ সাফারি করে আমরা এসে পৌঁছলাম মানস নদীর তীরে। উল্টোদিকে ভুটান পাহাড়, সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে মানস নদী। অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। বানেশ্বর বললো, আপনারা এনজয় করুন আর ছবি তুলে নিন। নদীর পারে পাথরের ওপর বসে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতে লাগলাম দূষণহীন প্রকৃতিকে। কত রকমের পোজে সবাই ছবি তুলতে লাগলো। রাই, বরফি, বাণী, শ্রীময়ী, সৌর্য্য আর আমি সবাই একসাথে গ্রুপ ফটো তুললাম। গাইড বানেশ্বর ফটো তুলে দিলো। এবার ফিরে যাওয়ার পালা। সবাই আবার জিপে উঠে পড়লাম। সবে মিনিট দুয়েক এগিয়েছি, বানেশ্বর বলল, টায়ার পাংচার। বিপদ যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। ভাগ্যিস গাড়িতে একটা এক্সট্রা টায়ার ছিল, তাই মনে একটু বল পেলাম। ড্রাইভার ও বানেশ্বর টায়ার চেঞ্জ করতে বসল। সৌর্য্য ও হাত লাগাল। গার্ড চারিদিকে লক্ষ রাখতে লাগল যাতে কোন জন্তু জানোয়ার অ্যাটাক না করে। মিনিট পনেরো পরে জিপ আবার স্টার্ট নিলো। প্রচুর ময়ূর আর হরিণের দেখা পেলাম। দেখা মিললো গোল্ডেন লেঙ্গুরের। অসংখ্য পাখি দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। সামনে নদী পড়লো, আমাদের জিপ সন্তর্পণে নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে নদী পেরোলো। অর্ধেকেরও বেশি পথ যখন পেরিয়েছে, ঠিক তখনই বানেশ্বর আবার দুঃসংবাদ বয়ে নিয়ে এলো। স্যার, চেঞ্জ করা টায়ারটা আবার পাংচার। আর বাঁচার কোনো পথ খোলা নেই, জঙ্গলেই প্রাণটা দিয়ে দিতে হবে। কারো মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। বানেশ্বর ড্রাইভারকে বললো খুব আস্তে আস্তে চালাতে। ধীরে ধীরে জিপ চলতে লাগলো। ডানদিকের নালায় একটা বিশাল ওয়াটার বাফেলো আগুন চোখে আমাদের পর্যবেক্ষণ করছে। আমরা না দাঁড়িয়ে এগিয়ে চললাম। মিনিট খানেক যাওয়ার পর জিপ দেহ রাখলো। টিপ্ টিপ্ করে বৃষ্টি পড়ছে, আকাশে মেঘ, আলো কমে আসছে। কারো মাথা আর কাজ করছে না। দূর থেকে কোনো জন্তুর একটা বিকট আওয়াজ ভেসে আসছে। ভয়ার্ত পরিবেশ। গার্ডকে বললাম ফরেস্ট অফিসে ফোন করতে। তিনি বললেন ‘স্যার’ ফোনে টাওয়ার নেই। সত্যিই তো, কারো ফোনেই টাওয়ার নেই। ভয়ে সবার হার্ট আবার বন্ধ হয়ে যাবার যোগার। আমার বি এস এন এল সিমএ টাওয়ার কিছুটা ছিল বলে আমার ফোন থেকে ফরেস্ট বিট অফিসে ফোন করতে বললাম। গার্ড ফোনে অনেক্ষণ কথা বললো। তারপর আমাদেরকে বললো আধ ঘন্টার মধ্যে বিট অফিসের থেকে গাড়ি পাঠাচ্ছে। এবার বানেশ্বর ও ড্রাইভার কৃষ্ণ পাঠকের সাথেও কথা বললো। সৌর্য্যকে বললাম যে ড্রাইভার আমাদেরকে স্টেশনে নিয়ে যাবে সেই আনোয়ার এর সাথে কথা বলে নিতে, যাতে সে গাড়ি বিট অফিসে নিয়ে আসে। সেইমতো কথা বলে সৌর্য্য আনোয়ারকে সব বুঝিয়ে দিলো। আনোয়ার রাজি হলো গাড়ি নিয়ে বিট অফিসে আসতে শুধু ওকে কিছু বেশি টাকা দিতে হবে। এই বিপদের সময়ে আমরা রাজি হয়ে গেলাম। এবার নিস্তব্ধ জঙ্গলে টিপ্ টিপ্ বৃষ্টির মধ্যে রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা। এক একটা মিনিট, এক একটা ঘন্টা মনে হতে লাগলো। হাতির ডাক, পাখিদের কলতান, ময়ূরের ডাক, চারিদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ সব মিলেমিশে সে এক রোমহর্ষক পরিবেশ। এরই মধ্যে দুটো হুনুমান বিকট আওয়াজ করে এক ডাল থেকে অন্য ডালে চলে গেল। গার্ড বললো, এতো বাঘ থাকার লক্ষণ, মনে হচ্ছে কাছাকাছি বাঘ থাকলেও থাকতে পারে। আগের সপ্তাহে বাঘ একটা মহিষ মেরেছে। সবাই প্রাণ হাতে করে শুধু ভগবানকে ডাকতে লাগলাম। সময় যেন আর কাটতেই চাইছে না। বৃষ্টি একটু বাড়লো। অন্ধকার গভীর হচ্ছে। মাথা আর কাজ করছে না। ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। মিনিট পঁচিশ পর শুকনো পাতার মর মর শব্দ কানে এলো। সবাই চুপ। গার্ড বললো, ফরেস্টের গাড়ি আসছে। সবার থমথমে মুখগুলোতে হাসি ঝলসে উঠলো। মাল বহনকারী একটা সাদা গাড়ি সামনে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ মনে হলো "আজ কি আনন্দ আকাশে বাতাসে"। শ্রীময়ী, বাণী, রাই আর বরফি মাঝখানের সিটে বসলো, আমরা বাকিরা সবাই উঠলাম গাড়ির পিছনে মালপত্তর নিয়ে যাবার খোলা জায়গায়। বানেশ্বর আর ড্রাইভার আমাদের পিছনে জিপ নিয়ে ধীরে ধীরে আসতে লাগলো। জঙ্গল, নদী, মাঠ পেরিয়ে, সাত কিলোমিটার পথ পেরিয়ে, আমরা ফরেস্ট বিট অফিসে এসে পৌঁছলাম। বিট অফিসার আমাদেরকে ওনার ঘরে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়ালো। ভদ্রলোক খুব ভালো মানুষ, আমাদের সাথে অনেক গল্প করলেন। আমরা ওনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানালাম। ওনার জন্য আমরা এ যাত্রা রক্ষা পেলাম, প্রাণে বাঁচলাম। 'কহিতামার' জঙ্গলে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম তা সারা জীবনের স্মৃতি হয়ে রইলো। 
মিনিট পনেরো অপেক্ষা করার পর আনোয়ার আর্টিগা নিয়ে হাজির হলো। বিট অফিসার ও অন্যান্য সমস্ত স্টাফকে আরেকবার ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা রওনা দিলাম নিউ বঙ্গাইগাঁও স্টেশনের দিকে। পিছনে রইলো কাহিতামার স্মৃতি যা কোনো দিন ভোলার নয়। সাতটা কুড়িতে স্টেশনে এলাম। ট্রেন ৮ টা ১০ শে।ওয়েটিং রুমে সবাই ফ্রেশ হলো। আজ আমরা ফিরবো গত মাসে চালু হওয়া কামাক্ষা - হাওড়া বন্দে ভারত এ সি স্লিপার ট্রেনে। ইচ্ছে ছিল বন্দে ভারত স্লিপারে একবার সফর করার, আজ তা বাস্তবায়িত হবে। পাঁচ মিনিট আগেই ট্রেন স্টেশনে ঢুকলো। রাই আর সৌর্য্য ট্রেন ঢোকার ভিডিও করলো। আমাদের কোচ নম্বর এ ফোর। কোচে উঠতেই সবার মন ভালো হয়ে গেল। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ঝক ঝকঝকে কম্পার্টমেন্ট। টয়লেটগুলো আলট্রা মডার্ন। সমস্ত মডার্ন ফেসিলিটি আছে। নির্ধারিত সময়ে ট্রেন ছাড়লো। কিছুক্ষণ আগে যে পরিবেশে আমাদের যে অবস্থা ছিল তা ভেবেই গায়ে কাঁটা দিলো। রাত ৯ টা নাগাদ ডিনার দিয়ে গেল। বেশ ভালো ডিনার। আমাদের ছিল ২টো নিরামিষ থালি আর ৩টে আমিষ থালি। থালিতে ছিল পোলাও, ডাল, স্যালাড, তরকারি, পনির বাটার মশলা, পরোটা, চাটনি ও গুলাব জামুন। আমিষে পনিরের বদলে চিকেন। সঙ্গে জলের বোতল। আজ সবাই ক্লান্ত। ডিনার করে সবাই শুয়ে পড়লো। কু ঝিঁক ঝিঁক করে ট্রেন চললো তার আপন গতিতে। সকাল সাড়ে ৬টা। ঘুম ভাঙলো। ফ্রেশ হওয়া পর চা, বিস্কুট আর কেক দিয়ে গেল। সঙ্গে টেলিগ্রাফ ও আনন্দবাজার। বাইরে রোদ ঝলমলে আকাশ। ট্রেন বান্ডেল ছাড়লো। বাণী বললো, আমার বাড়ি চলে গেল। সৌর্য্যর শ্বশুরবাড়ি বান্ডেল। বাণী আমাদেরকে একদিন ব্যান্ডেল আসার অগ্রিম আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখলো। আসতে আসতে রেডি হয়ে বাগপত্তর গুছিয়ে নিলাম। ট্রেন ১০ মিনিট আগেই হাওড়া পৌঁছলো। শেষ হলো আমাদের এডভেঞ্চারাস সফর। আজ সবার মন খারাপ। বেড়াতে যাবো যাবো করে বেড়ানো শেষ। আবার সেই গতানুগতিক জীবন। আবার কবে ঘুরতে যাবো কে জানে। বন্দে ভারতের ইঞ্জিনের সামনে সবাই মিলে সেলফি তুলে হাওড়াকে টা টা জানালাম। সাড়ে ৮টায় আমাদের বুক করা উবের রওনা দিলো বাড়ির পথে। চোখে লেগে রইলো মানসের স্মৃতি, ঝটিকা ভুটানের বাকরুদ্ধ সফর আর কহিতামার রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা।                                      
পথের দিশা: মানসের সব থেকে কাছের রেল স্টেশন হল বরপেটা রোড। হাওড়া থেকে কামরূপ এক্সপ্রেস ধরে বরপেটা রোড। স্টেশন থেকে রিজার্ভ গাড়িতে মানসের বাঁশবাড়ি গেট, দূরত্ব ২২ কিমি।। এছাড়া যে কোন ট্রেনে নিউ বঙাইগাঁও স্টেশন পৌঁছে, সেখান থেকে গাড়িতে মানস, দূরত্ব ৭৬ কিমি। সবথেকে কাছের এয়ারপোর্ট গুয়াহাটি।    
গৃহের ঠিকানা: মানস জাতীয় উদ্যানে থাকার জন্য বাঁশবাড়ি এলাকার আশেপাশে বেশ কিছু ভালো ইকো-ক্যাম্প এবং লজ রয়েছে, যা বন্যপ্রাণী প্রেমীদের জন্য উপযুক্ত। জনপ্রিয় অপশনগুলোর মধ্যে রয়েছে মুসা জঙ্গল রিট্রিট, ফ্লোরিকান কটেজ, বাঁশবাড়ি লজ, স্মাইলিং টাস্কার এলিফ্যান্ট ক্যাম্প, ইগল নেস্ট ইকো রিট্রিট, ডাওমার ইকো রিসোর্ট। আমরা ছিলাম বাঁশবাড়ি রেঞ্জ এর কাছে "মানস অর্কিড হোমস্টে’ তে। তবে আগে থেকে বুকিং করে আসাই ভালো। 
কি কি দেখবেন: মানস জাতীয় উদ্যান ভারতের আসামে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি বিখ্যাত ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, টাইগার রিজার্ভ এবং বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ। এটি বিপন্ন পিগমি হগ, একশৃঙ্গ গণ্ডার এবং বাঘের জন্য পরিচিত, যা ভুটানের রয়্যাল মানস ন্যাশনাল পার্কের সাথে সীমান্ত ভাগ করে নেয়। এছাড়া ময়ূর, টিয়া, বাজিগর, নীলকন্ঠ, লঙ্গুর, বুশ্চাট, ফ্লোরিকান সহ দেখতে পাওয়া যায় নানা ধরণের পাখির মেলা। অরণ্য জুড়ে নানা ধরনের প্রজাপতি অন্যান্য কীটপতঙ্গ ও সাপের আনাগোনা। তবে গোল্ডেন লঙ্গুর এর দর্শন পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
রসনাবিলাস: গ্রাম্য ঘরোয়া খাবার। চাইলে খেতে পারেন ম্যাগি, মোমো, স্যান্ডউইচ। ভূটানে লাঞ্চ করলে চাইলে খেতে পারেন ভূটানি খাবার। সঙ্গে আসাম চা তো থাকবেই।
ভ্রমণকাল: আদর্শ সময় অক্টোবর থেকে এপ্রিল। মার্চ ও এপ্রিল মাসে সব থেকে ভালো জীবজন্তুর দেখা পাওয়া যায়।
রাফটিং: মানস নদীতে রাফটিং করার সুযোগ রয়েছে, যা এক দারুণ অভিজ্ঞতা।
পরামর্শ: বন বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে জঙ্গল ট্রেকিং বা ট্রেকিং করা যেতে পারে।
পরিবেশ: স্থানটি খুব মনোরম, শান্ত এবং কম ভিড়যুক্ত, যা মানসিক শান্তির জন্য চমৎকার। 

ভ্রমণ

  পুজো বার্ষিকীঃ ১৪৩৩ ।। মতামত ।। সূচীপত্র

Please mention the "name of the article and the author" you would like to comment in the following box... Thank you.

bottom of page